Showing posts with label কূটনীতি. Show all posts
Showing posts with label কূটনীতি. Show all posts

Monday, December 22, 2025

দূতকে হুমকি অস্বীকার দিল্লির, বিষিয়ে উঠছে সম্পর্ক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়ছে। দুই প্রান্তের সাম্প্রতিক নানা ঘটনা পরিস্থিতিকেই বিষিয়ে তুলেছে। শনিবার রাতে নজিরবিহীনভাবে দিল্লির নিরাপদ কূটনৈতিক জোনের বাংলাদেশ হাউজের গেটে গিয়ে বিক্ষোভ দেখায় একদল উগ্রপন্থি। তারা চাণক্যপুুরির একের পর এক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে একেবারে রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের সামনে (সড়কের ডিভাইডারে) গিয়ে অবস্থান নেয় এবং হাইকমিশনারের বাসভবন লক্ষ্য করে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। তারা হাইকমিশনারকে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে গালমন্দ এবং নানা হুমকিও দেয়। ঢাকায় প্রাপ্ত রিপোর্ট বলছে এ ঘটনার সময় বাসভবনে থাকা বাংলাদেশ দূত এবং তার পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনার ব্যানারে একদল উগ্রপন্থি বাংলাদেশ হাউজের মূল ফটকে অবস্থান নেয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।

রোববার বিকালে তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তাছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে পৃথক বিবৃতিও প্রচার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের বরাতে প্রেসনোটও ইস্যু করা হয়েছে। যেখানে এ সংক্রান্ত বাংলাদেশি মিডিয়ার রিপোর্টকে অতিরঞ্জন বলে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতকে হুমকি দেয়ার বিষয়টি দিল্লি অস্বীকার করেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা দিল্লির প্রেসনোটকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই বিক্ষোভ নিয়ে ভারতের দাবি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রশ্ন রাখেন দিল্লির সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতের বাসভবন পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা প্রবেশ করতে পারলো কীভাবে? এটাকে গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন- হাইকমিশনারের বাসভবনের সামনে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা শুধু বাংলাদেশে একজন হিন্দু নাগরিক হত্যার ঘটনায় স্লোগান দেয়নি বরং অন্যান্য বক্তব্যও দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সঠিক দাবি করে উপদেষ্টা বলেন ২৫ বা ৩০ জনের একটা হিন্দু চরমপন্থি সংগঠনের একটা দল এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন একটা স্যানিটাইজড এলাকার মধ্যে। তার মানে তাদের আসতে দেয়া হয়েছে। তাহলে যেভাবে তারা আসছে, আসতে পারার কথা না কিন্তু নরমালি এবং তারপরে সেখানে তারা দাঁড়িয়ে শুধু ওই হিন্দু নাগরিকের হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে চলে গেছে তা না, তারা অনেক কিছু বলেছে সেটা আমরা জানি এবং আমাদের পত্রপত্রিকায় যে রিপোর্টটা আসছে সেটাকে তারা বলছে মিসলিডিং এটাও সত্য না। আমাদের পত্রপত্রিকায় মোটামুটি সঠিক রিপোর্টই এসেছে। আমরা যেটুকু তথ্য পেয়েছি আমার কাছে প্রমাণ নেই যে, হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু আমরা এটাও শুনেছি, তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, সেটা কেউ একজন কথা বললো, সেটার মধ্যে হতে পারে। কিন্তু আমার কথা হলো যে, এ পর্যন্ত আসতে পারবে কেন? এসে এখানে হুমকি দিতে পারবে কেন? সাধারণত আমরা যখন কোনো প্রটেস্ট গ্রুপ যখন যায় সেটা আগে থেকে ইনফর্ম করা হয় এবং পুলিশ তাদেরকে একটু দূরে এক জায়গাতে আটকে দেয়। কখনো যদি কোনো কাগজপত্র দেয়ার থাকে দুইজন এসে দিয়ে যায়। এটা হলো নর্ম। সবখানেই এটা হয় আমাদের দেশেও হয়। এটা আমরা গ্রহণ করি না। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দ্বিতীয়ত বিষয় হচ্ছে যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। এটার সঙ্গে মাইনরিটিজের নিরাপত্তাকে একসঙ্গে করে ফেলার কোনো মানে হয় না। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক যাকে হত্যা করা হয়েছে এবং অবিলম্বে বাংলাদেশের সরকার এই ব্যাপারে অ্যাকশন নিয়েছে। ইতিমধ্যে আপনারা জানেন যে বেশ কিছু অ্যারেস্ট করা হয়েছে। তো এ ধরনের ঘটনা যে শুধু বাংলাদেশে ঘটে তা নয়। এই অঞ্চলের সব দেশেই ঘটে এবং প্রত্যেক দেশের দায়িত্ব হচ্ছে সেক্ষেত্রে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া। বাংলাদেশ নিচ্ছে অন্যদেরও উচিত সেরকম ব্যবস্থা নেয়া। প্রতিবাদে কীভাবে জানাবে ঢাকা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখুন ফরমেট নিয়ে বরং আমরা আলাপ না করাই ভালো কারণ তারাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, আমরাও যোগাযোগ রাখি, যোগাযোগ আছে এবং আমরা যেটাকে বলার সেটা বলি, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই যে প্রেস নোট এসেছে, যে কারণে আমাদেরও এখন এটা একইভাবে ওপেনলি যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ভরসা রাখছি যে ভারত যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেবে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এখানে ব্যাপারটা শুধু কিন্তু যে তারা এখানে এসেছে দুটো স্লোগান দিয়েছে তা না। এর ভেতরে কিন্তু একটা পরিবার বাস করে, হাইকমিশনার এবং তার পরিবার ওখানে বাস করে তারা থ্রেটেন ফিল করেছে এবং তারা কিন্তু আতঙ্কিত হয়েছে যে কারণ এডিকুয়েট সিকিউরিটি অফ ছিল, দুইজন গার্ড ছিল তারা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। কাজেই এটাকে আমরা মনে করি যে আরেকটু পৃথক করাটা সত্যিকারই ওই দেশের দায়িত্ব।

দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা হয়নি: ভারত সরকার
এদিকে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভকারীরা সেখানকার নিরাপত্তা বেষ্টনী (ফেন্স) লঙ্ঘন করেনি বলে দাবি করেছে দেশটির  বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ২০শে ডিসেম্বর রাতে বিক্ষোভের যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে মিডিয়ার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ওই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের কিছু মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডার বিষয়টি আমরা জেনেছি। প্রকৃত সত্য হলো, ২০শে ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক সমবেত হয়। তারা ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশে সব সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা রক্ষার আহ্বান জানায়। কোনো সময়ই তারা নিরাপত্তা বেষ্টনী বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি লঙ্ঘন করার উদ্যোগ নেয়নি। কয়েক মিনিট পরেই সেখানে থাকা পুলিশ ওই গ্রুপকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সবার দেখার জন্য এ বিষয়ে ভিজ্যুয়াল প্রমাণ আছে। ভিয়েনা কনভেনশনের অধীনে বিদেশি মিশন/পোস্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত। একই বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আবর্তিত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে ভারত। জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন আমাদের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে আমাদের দৃঢ় উদ্বেগের কথা অবহিত করেছেন তারা। (দীপু চন্দ্র) দাসের বর্বর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাই আমরা।

হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ নিয়ে দিল্লির দাবি প্রত্যাখ্যান ঢাকার: ওদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শনিবার বাংলাদেশ হাইকমিশনের বাসভবনের সামনে সংঘটিত বিক্ষোভের ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত, অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘বিভ্রান্তিকর প্রচার’ চালানো হচ্ছে বলে ভারত যে দাবি করেছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। রোববার সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্যের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রতিক্রিয়া জানায়। শনিবার রাতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’র ব্যানারে বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে এসে বিক্ষোভ করেছে একদল লোক। তারা প্রায় ২০ মিনিট ব্যানার নিয়ে বাংলাদেশ হাউসের সামনে অবস্থান করে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেয়। এ সময় ২০ থেকে ২৫ জনের ওই বিক্ষোভকারীরা ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকিও দেয়। এ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো হচ্ছে বলে রোববার বিকালে দাবি করে ভারত। দিল্লিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ওই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ দূতাবাসের জন্য কোনো নিরাপত্তা ঝুঁঁকি তৈরি হয়নি।

ঢাকার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুষ্কৃতকারীদের হাইকমিশনের সীমানার ঠিক বাইরে তাদের কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেয়া হয়। ফলে কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থানরত কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এ ধরনের একটি সংঘটিত কর্মসূচি সম্পর্কে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে আগাম কোনো তথ্য জানানো হয়নি। তবে আমরা ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা লক্ষ্য করেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাসকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন হামলা’ উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘ভারত এ ঘটনাকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। আমরা তাদের এমন প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করছি। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজনদের বাংলাদেশ সরকার দ্রুত গ্রেপ্তার করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সামপ্রদায়িক পরিস্থিতি ভালো। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এ অঞ্চলের সব সরকারেরই দায়িত্ব।

https://mzamin.com/uploads/news/main/195251_dut.webp

Monday, October 6, 2025

দুর্লভ খনিজের কূটনীতি : চীনের আধিপত্য রুখে দিচ্ছে ভারত? by মানিশ বৈদ্য

দুর্লভ খনিজে চীনের আধিপত্য (বৈদ্যুতিক যান, ইলেকট্রনিক পণ্য, টারবাইন ও প্রতিরক্ষার সরঞ্জাম তৈরির জন্য অপরিহার্য উপাদান) দীর্ঘদিন ধরে ভারতের জন্য একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু এখন নয়াদিল্লি এখন সেই দুর্বলতাকে কৌশলগত সুবিধায় রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর ভারত সফরে বেইজিং ভারতের বিরল খনিজের চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ ঘোষণা এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা সম্মেলনে (৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর) ঠিক আগে, আর এ বছরের শেষ দিকে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনের প্রাক্কালে।

বিশ্বের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের সঙ্গে এ কূটনৈতিক তৎপরতা দেখায় যে ভারত কীভাবে দ্বৈত মঞ্চ ব্যবহার করে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে আপস না করেই সরবরাহশৃঙ্খলের ক্ষেত্রে তাদের ঝুঁকি মোকাবিলা করছে। এটি যতটা ভারতের কূটনৈতিক উদ্যোগ, ঠিক ততটাই এসসিও সম্মেলনের আগে চীনের দিক থেকে উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল। চীনের দিক থেকে এটি মোটেই কাঠামোগত বিষয় নয়; বরং তাৎক্ষণিক কৌশলগত হিসাব।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে চীন সাত ধরনের বিরল খনিজ রপ্তানি লাইসেন্সের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ চালু করে। এতে ভারতের শিল্পমহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির শিল্পমালিকের সতর্ক করে দেন যে, এতে করে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। সব মিলিয়ে চীনের বিধিনিষেধে ভারতের শিল্প বিকাশ ও সবুজ প্রযুক্তির আকাঙক্ষা বাস্তবায়নে বিরল খনিজের গুরুত্ব যে সীমাহীন সেটা স্পষ্ট।

বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসে ভারত দর–কষাকষির জায়গা তৈরি করে নেয় এবং চীনকে কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য করে। যদিও পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, এসব প্রতিশ্রুতি তখনই কার্যকর হবে, যখন রপ্তানি লাইসেন্স লাইসেন্সের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য আসবে।

এদিকে ভারত বিরল খনিজে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। জুন মাসে দেশটির ভারী শিল্প মন্ত্রণালয় স্থানীয়ভাবে বিরল খনিজ উৎপাদনে আর্থিক সহায়তা ও মজুত গড়ে তোলার জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করে। এর উদ্দশ্য হলো চীন থেকে আমদানি করা বিরল খনিজের মূল্যের ব্যবধান কমানো। অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওডিশায় নতুন বিরল খনিজ অনুসন্ধান প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে।

বিশ্বের প্রধান দুটি কৌশলগত জোটে সদস্যপদ থাকার কারণে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত নিয়ে গঠিত কোয়াড জোটে যুক্ত হয়ে নয়াদিল্লি সরবরাহশৃঙ্খলের নিরাপত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। গত জুলাইয়ে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

এর বিপরীতে এসসিও সম্মেলনে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের উপস্থিতি দেশ দুটির সঙ্গে ভারতের টেকসই সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আনে। তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ভারত যে বাস্তব সমস্যা সমাধানে বহুপক্ষীয় চ্যানেল ব্যবহার করতে আগ্রহী, সে ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে।

এসসিও জোটের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও কোয়াডের মাধ্যমে প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করা—এই দুইয়ের মধ্য দিয়ে ভারত একটি বাস্তবসম্মত কূটনীতি পরিচালিত করছে। বিশ্বের খুব কম মধ্যম শক্তিই এ বাস্তবসম্মত পথ অনুসরণ করতে পেরেছে।

এই দ্বৈতপথ কোনো বিরোধপূর্ণ অবস্থান নয়; বরং এটি পরিকল্পিত। ভারত কোয়াডের মাধ্যমে চীনের সরবরাহশৃঙ্খলের বিকল্প পথ খুঁজছে আর দেখায়, আবার এসসিওর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা আদায় করছে।

বিরল খনিজের সরবরাহশৃঙ্খলে যদি আরও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, ভারত আরও বেশি করে কোয়াড অংশীদার হবে এবং দেশি সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। অন্যদিকে যদি কোয়াডের কার্যক্রম স্থবিরতা নেমে আসে, তাহলে এসসিও জোটের কাছ থেকে সুবিধা নিতে পারবে। তবে সন্দেহবাদীরা সতর্ক করেছেন, চীন যদি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে এবং কোয়াড অংশীদারেরা যদি তাদের কাজ বাস্তবায়নে ধীর হয়ে যায়, তাহলে ভারতের কূটনীতি অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়বে। তবে একাধিক বিকল্প রেখে ঝুঁকি কমানোর কৌশল ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পথেরই অনুসরণ।

ভারত সম্ভাব্য সংকটকে কূটনৈতিক সুবিধায় পরিণত করেছে। এসসিও জোটে যাওয়া, দেশি উৎপাদন এবং কোয়াডের মাধ্যমে ভারত তার বিরল খনিজের দুর্বলতা মোকাবিলা করতে চায়।

এটি শুধু নীতি পরিবর্তন নয়, ভারতের ভূরাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রমাণ। ভারত চায় চীন কিংবা পশ্চিমাদের ওপর নির্ভর না করে শিল্প ভবিষ্যৎ নিজস্ব শর্তে নির্ধারণ করতে। তবে ভারতের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষা হচ্ছে, দেশি বিরল খনিজের ইকোসিস্টেমটা দ্রুত গড়ে তোলা, যাতে চীনের সদিচ্ছার ওপর দেশটির নির্ভরতা কমানো যায়।

* মানিশ বৈদ্য, ভারতের অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনে জুনিয়র ফেলো
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

চীনের দুর্লভ খনিজের খনি
চীনের দুর্লভ খনিজের খনি। ছবি : রয়টার্স

Tuesday, August 26, 2025

ট্রাম্পের চাপে মোদি: নতুন কূটনৈতিক পথের খোঁজে দিল্লি by শীলা ভাট

বিশ্ব এখন ভারতের দিকে তাকিয়ে আছে। ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশের অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন শুল্ক আরোপ করার যে সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছেন, তা ভারতের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। এ চাপ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারতীয় কূটনীতির নতুন পথ খুঁজে নিতে বাধ্য করছে। মোদির দল আশা করছে, মোদির বেছে নেওয়া নতুন পথ ভারতের ঘরোয়া রাজনীতিকে আরও সংহত করবে।

সাত মাস ধরে ট্রাম্পের কূটনীতির লক্ষ্য হচ্ছে তার মূল ভোটার গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখা, বিশাল মার্কিন ঋণ কমানো এবং তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (সংক্ষেপে যাকে বলে ‘মাগা’) পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ট্রাম্পের এই মাগা রাজনীতি সারা বিশ্বেই আলোড়ন সৃষ্টি করছে।

এটা একধরনের বিদ্রূপ যে মোদির সমর্থকদের বড় অংশই ভারত-মার্কিন সম্পর্ক আরও মজবুত করার পক্ষেই ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের এ ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ তাদের মনে অবিশ্বাসের বীজ বপন করবে।

১৯৭১-৭২ সালের ইন্দিরা গান্ধীর পর ভারতীয় কোনো নেতা খুব কমই এমন সংকটময় অবস্থায় পড়েছেন, যেখানে ‘শয়তান’ আর ‘অতলপাতাল’—এই দুটোর একটাকে বেছে নিতে হয়, অর্থাৎ এদিকেও বিপদ, ওদিকেও বিপদ। তবে মোদি এখন তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

দীর্ঘ আলোচনার পর মোদি ট্রাম্পের ভারতবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে ‘দাঁড়িয়ে যাওয়ার’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিজেপির নেতারা ইতিমধ্যেই বলছেন, ভারতকে ট্রাম্পের নির্দেশ না মানার কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

মোদিই স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে তাঁর নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রতের কৃষক, জেলে ও পশুপালনকারী সম্প্রদায়ের স্বার্থের ক্ষতি করে, এমন যেকোনো নীতির বিরুদ্ধে মোদি দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

এটাও তাৎপর্যপূর্ণ যে জয়শঙ্কর ট্রাম্পের সঙ্গে ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলতে পারেন এবং পুতিনের সঙ্গে রুশ ভাষায় জারদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

সব মিলিয়ে ভারত-রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এখন এক নতুন গুণগত পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

মোদির চীন সফর প্রমাণ করছে, শুল্কবৃদ্ধির আঘাত থেকে দুর্বল ভারতীয় অর্থনীতিকে সামলাতে ভারত কতটা প্রস্তুত। সংকটে পড়লে মোদি নমনীয় কৌশল অবলম্বন করেন। এক ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষায়, ‘টিম মোদি’ এখন বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো সামাল দিচ্ছে চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সমন্বয়ে।

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলকে ওয়াশিংটনে বাণিজ্যচুক্তি ও শুল্কসংক্রান্ত আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের অন্য সদস্যরা হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, কৃষি ও কৃষককল্যাণমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এবং অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। তাঁরা নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং বাস্তব সময়ে মতামত ও তথ্য বিনিময় করছেন।

শুল্কযুদ্ধের কারণে নরেন্দ্র মোদি এখন নয়াদিল্লির প্রো-আমেরিকান ও অ্যান্টিচায়না (চীনবিরোধী) লবির আক্রমণের মুখে। অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক, যাঁরা মোদি সরকারের রাজনীতির সমালোচক ছিলেন, তাঁরা রাতারাতি চীনের সঙ্গে সংলাপ পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি হজম করতে পারছেন না। বিশেষত অভিযোগ রয়েছে যে পাকিস্তানকে সহায়তায় চীন ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভূমিকা রেখেছিল।

তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান জটিল অবস্থার জন্য মূলত ‘মোদির কূটনীতিই বেশি দায়ী’। তাঁদের ধারণা, চীনের প্রতি ভারতের এ নরম অবস্থান কোনো মূল্য ছাড়া আসবে না।

অন্যদিকে পাকিস্তানকে ‘খেলায় ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করা এবং রুশ তেল আমদানির বিষয়ে নয়াদিল্লির প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান ভারতের সব রাজনৈতিক মহলের কাছে ‘অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর’।

মোদির সমালোচকদের মতে, ভারত এখন কৌশলগত প্রজ্ঞার চেয়ে বাধ্যবাধকতা থেকেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। না হলে রাতারাতি কোয়াড উদ্যোগকে স্থবির করে দিয়ে ব্রিকসকে গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাখ্যা কী হতে পারে? তবে চাকরির বাজার ও জিডিপিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, এমন গভীরতর সংকটের মুখে এ সমালোচনা এখন অনেকটাই অর্থহীন হয়ে গেছে।

মোদি সম্ভবত এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দেবেন না। কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনের তারিখও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

আরও তীব্র সমালোচনা আসছে তাঁদের কাছ থেকে, যাঁরা সারা জীবন ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দৃঢ় করতে কাজ করেছেন। তাঁরা অভিযোগ করছেন, মোদি ও জয়শঙ্করের যুগলবন্দী ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এজেন্ডা সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।

তবে মোদি-জয়শঙ্কর জুটি এসব সমালোচনা পাত্তা দিচ্ছেন না। কারণ, মোদির হাতে সময় নেই। বৈশ্বিক বাজারে এখন ভারতের জন্য উপযুক্ত বিকল্পও বেশি নেই। এ মুহূর্তে চীন ও রাশিয়াই ভারতের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম।

মোদি দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছেন যাতে ভারতের জিডিপি হঠাৎ তীব্রভাবে না কমে যায়। অনেক বিশেষজ্ঞ আগাম সতর্ক করে বলেছেন, জিডিপি প্রায় অর্ধশতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ভারত সরকারের এক সূত্র বলেছে, ট্রাম্পসৃষ্ট বিশাল সংকট সামাল দিতে ভারত চীনের সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং একই সঙ্গে পুরোনো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সতর্ক থাকবে, জাতীয় স্বার্থ মাথায় রেখে।

লক্ষণীয় যে মাসের শেষে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য মোদির চীন সফর জাপান সফরের সঙ্গে একত্রে পরিকল্পিত। তাঁর পরিকল্পনা হলো ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে ভ্রান্ত প্রত্যাশা পেছনে ফেলে দ্রুত বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করা।

গোপনে, যেমনটা এখন বিশ্বের অনেক রাজধানীতেই ঘটছে, নয়াদিল্লির রাইসিনা হিলে এক বাস্তবতা উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। সেটি হলো ভারত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ ও তাঁর মাগা এজেন্ডা সঠিকভাবে মূল্যায়নে ভুল করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চীনবিষয়ক কূটনীতিতে ভারতের কোনো গুরুত্ব নেই। আসলে মার্কিন কংগ্রেসে এখন পররাষ্ট্র দপ্তর কার্যত ক্ষমতাহীন, আর স্টিভ উইটকফের মতো রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত প্রভাব খাটাচ্ছেন। মার্কিন সরকারের পুরোনো কূটনৈতিক ব্যবস্থাগুলো বিনা নোটিশে ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের ব্যবসায়িক মনোভাব মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দীর্ঘদিনের নীতিকে আড়াল করে দিয়েছে।

চীন, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের সঙ্গে বহুপক্ষীয় সম্পর্কে ভারতের নতুন কৌশল ট্রাম্পের কারণেই, যিনি মোদিকে দুটি অস্বস্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য বিকল্প দিয়েছিলেন।

প্রথমত, কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কি কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারেন যে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁকে পাকিস্তান বিষয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দিয়েছেন, বিশেষত যখন ট্রাম্প সত্যকে গোপন করে কথা বলেন?

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রতি ট্রাম্পের বিস্ময়কর অজ্ঞতা ও সংবেদনশীলতার অভাবই সমস্যার মূল। তিনি মোদিকে এমন একটি প্রকাশ্য বিকল্প প্রস্তাব করেছিলেন, যা তিনি কখনোই গ্রহণ করতে পারেন না। নয়াদিল্লিতে কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন প্রস্তাব একমুহূর্তও বিবেচনা করবেন না। হয়তো এ উপলব্ধিই ট্রাম্পকে বিরক্ত করছে।

দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদির ওয়াশিংটন সফরের সময় ট্রাম্প ভারতীয় কৃষি ও দুগ্ধ বাজারে মার্কিন প্রবেশাধিকার চেয়েছিলেন। এ বিষয়গুলো পরবর্তী বাণিজ্য আলোচনায়ও তোলা হয়। এর পর থেকে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভারতে কৃষিসংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলোর মতোই সংবেদনশীল।

ভারতীয় সূত্রগুলোর দাবি, মার্চ থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা স্পষ্ট করে যে ভারতের কৃষি ও দুগ্ধশিল্প যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত করার প্রশ্নটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর ইস্যু হয়ে উঠেছে। এ কারণেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।

ট্রাম্পের দলের সদস্যরা ভারতের দুগ্ধ সমবায় ব্যবস্থা ও কৃষিভিত্তিক সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না রেখেই এমন কিছু চাইছেন, যা কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মেনে নিতে পারবেন না।

প্রতিবারই ভারত-মার্কিন আলোচনাকারী দল নানা সমঝোতার পর বাণিজ্যচুক্তির খসড়া তৈরি করে হোয়াইট হাউসে পাঠাত, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হতো।

কেন? অধিকাংশের ধারণা, ট্রাম্প তাঁর মাগা–সমর্থকদের দেখাতে চেয়েছিলেন, ‘দেখো, আমার বন্ধু মোদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৪০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার খুলে দিয়েছে।’ তিনি অবিবেচকভাবে ভেবেছিলেন, ভারতীয় ক্রেতারা ভুট্টা, সয়া, গরুর মাংস, চিজ ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির ভারত-মার্কিন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছেন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী ভারতের প্রতি অ-কূটনৈতিক, অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য দাবি উপস্থাপন করছে।

ভারতের কৃষিশিল্পে ট্রাম্প যে ধরনের ছাড় চাইছেন, তা কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দিতে পারবেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির জন্য এটি কার্যত অসম্ভব। ট্রাম্প শুল্ক কমাবেন, এমন আশা খুবই ক্ষীণ।

২৭ আগস্টের সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ভারতের শীর্ষ মহল পুরোপুরি ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলে নেমেছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঝুঁকি বিশ্লেষণ করছে, আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় দূতাবাসগুলো নতুন বাজার খুঁজছে।

আসন্ন সংকট মোকাবিলার জন্য জিএসটি কাঠামোয় সংস্কারসহ অন্যান্য পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে না এলে মোদি সরকারকে রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

এ পরিস্থিতিতে একমাত্র আশা, ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা দ্রুত তাঁদের পণ্যের জন্য বিকল্প বাজার খুঁজে পাবেন। শুল্ক-সন্ত্রাস বাস্তব।

চীনের সঙ্গে কূটনীতির পথ পরিবর্তন থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে ভারত সরকার বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে না।

* শীলা ভাট, দিল্লিভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
- দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প–মোদি বৈঠকের পরও ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে
ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প–মোদি বৈঠকের পরও ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, May 27, 2025

গাজায় বর্বরতার জেরে কূটনৈতিক সংকটে ইসরায়েল

ইসরায়েলি সেনাদের ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় লাগাতার বোমাবর্ষণ ও মানবিক সহায়তা বন্ধের নীতির কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একের পর এক মিত্র হারাচ্ছে ইসরায়েল।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার আজ এমন এক কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে, যেখানে তার দীর্ঘদিনের পশ্চিমা সহযোগীরাও আর প্রকাশ্যে সমর্থনে এগিয়ে আসছেন না।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর নেতানিয়াহুর প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন ছিল নজিরবিহীন। বিশ্বজুড়ে নেতারা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারে সরব সমর্থন জানান।

কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজার মানবিক বিপর্যয় আরও প্রকট হয়। প্রাণহানি, খাদ্য সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং জরুরি সহায়তা বন্ধের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

চলতি বছরের মার্চ মাসে যুদ্ধবিরতির চুক্তি বাতিল করে ইসরায়েল গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করে এবং একই সঙ্গে খাদ্য, পানি ও ওষুধের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এই পদক্ষেপের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন একে একে হারিয়েছে নেতানিয়াহু।

এ মাসের শুরুতে জিম্মিদের মুক্ত করতে ও যুদ্ধ বন্ধের একটি শান্তিচুক্তির সুযোগ এলেও ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে গাজার কেন্দ্রীয় শহর রাফায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক চাপ আরও তীব্র হয়।

১৯ মে ফ্রান্স, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, নেতানিয়াহু সরকার যদি এই জঘন্য আক্রমণ অব্যাহত রাখে এবং মানবিক সহায়তায় বাধা সৃষ্টি করে, তবে আমাদের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হবে।

এই বিবৃতির জবাবে নেতানিয়াহু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে দাবি করেন, এই তিন নেতা হামাসের পক্ষেই কাজ করছেন। এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, যারা গণহত্যাকারীদের প্রতি নমনীয়তা দেখায়, তারা ইতিহাস, মানবতা ও ন্যায়বিচারের ভুল দিকে দাঁড়িয়ে আছেন।

ইসরায়েলের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন কমার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেছে এবং বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

ফ্রান্স আগামী মাসে সৌদি আরবে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে, যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ব্যাপারে আলোচনা হবে।

স্পেন ইতিমধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইসরায়েলকে ‘গণহত্যাকারী রাষ্ট্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতা থেকেও ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তত ১৭ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য ও সহযোগিতা চুক্তি পুনর্বিবেচনার পক্ষে মত দিয়েছেন। মাল্টাও শিগগিরই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ইসরায়েল সরকারের ভেতর থেকেও সতর্কবার্তা এসেছে। মার্চে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’আর নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছিলেন—মানবিক সহায়তা বন্ধ করলে হামাস দুর্বল হবে না, বরং তা ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বন্ধন ছিন্ন করবে। বাস্তবতা এখন সেটিই প্রমাণ করছে।

এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন,“আমরা ভয়াবহ কৌশলগত ভুল করেছি। এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবুও নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রথমবারের মতো বলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হবে না।

এই পরিকল্পনার অধীনে গাজার মানুষকে প্রথমে একটি তথাকথিত ‘মানবিক জোনে’ এবং পরে বিদেশে স্থানান্তর করার প্রস্তাব রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল যদি এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তবে আন্তর্জাতিক মিত্রতা আরও দ্রুত হারাবে এবং নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতার দেয়াল আরও ঘনীভূত হবে।

ইসরায়েল আজ এমন এক কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে তার অর্জনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিত্র হারানো, সমালোচনার ঝড় এবং যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ইসরায়েল এখন কেবল যুদ্ধের নয়, কূটনীতির ময়দানেও এক অস্থিরতার মুখোমুখি।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত


Wednesday, May 14, 2025

কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নবদিগন্তের অন্বেষণ by রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

দোহায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রখর তাপমাত্রায় মোহাম্মদ রহিম বাংলাদেশ দূতাবাসের বাইরে অন্তহীন লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কপাল থেকে শ্রান্তির স্বেদবিন্দু ঝরছে। তৃষ্ণায় কণ্ঠনালি শুকিয়ে কাঠ। তবু তাঁকে প্রতীক্ষার কঠিন বাস্তবতা থেকে একচুলও নড়ানো যায়নি। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) লাগবে। এটি শেষ সুযোগ। শত শত প্রবাসী শ্রমিক সূর্যের প্রখর তেজ উপেক্ষা করে ধীরলয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে দিচ্ছেন না।

ঘর ছেড়ে আসা এই খেটে খাওয়া মানুষেরা মাতৃভূমির রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের স্বপ্নে স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে অকুণ্ঠচিত্তে কারাবাসের ঝুঁকিও নিয়েছিলেন। তাঁদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারই পতিত স্বৈরাচারের খাদের কিনারে রেখে যাওয়া অর্থনীতি ফেরানোর চালিকা শক্তি। রহিম ও তাঁর মতো কোটি বাংলাদেশি উৎসুক নয়নে তাকিয়ে আছেন, এই পরিবর্তনের ঢেউ তাঁদের প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না।

বিংশ শতাব্দীর ডিজাইন দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রয়োজন কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। কীভাবে এই রাষ্ট্র তার অগণিত প্রবাসী নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত, বাণিজ্য বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব জোরালোভাবে বিস্তার করবে? চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ও ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি ভূরাজনৈতিক খেলার মঞ্চে কীভাবে শান্তি, সমৃদ্ধির বঙ্গোপসাগর অঞ্চল গড়ে তুলবে? এমনই অনেক প্রশ্ন নিয়ে তর্ক–বিতর্ক জরুরি।

উপাত্তভিত্তিক পুনর্বিন্যাস

বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক স্থায়ী রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল ও পারস্পরিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি আবশ্যক। একইভাবে কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণও জরুরি। কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব নির্ধারণে অন্যান্য বিবেচনার সঙ্গে সুস্পষ্ট ও ন্যায়সংগত মূল্যায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচটি প্রধান সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক সম্পর্ক—মোট গুরুত্বের ৩০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত তাৎপর্যের গভীরতা বিবেচিত হবে।

দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য (২৫ শতাংশ)—বর্তমান অর্থনৈতিক লেনদেন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তৃতীয়ত, প্রবাসীর আকার (২০ শতাংশ)—বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা ও গুরুত্ব। চতুর্থত, নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্টতা (১৫ শতাংশ)—সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। এবং পঞ্চমত, বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা (১০ শতাংশ)—আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরামে সক্রিয়তার গুরুত্ব।

এই পাঁচ সূচকের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানের ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক মিশন শূন্য থেকে ১–এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মান লাভ করবে। যেসব অবস্থানের মান শূন্য দশমিক ৭ বা তার বেশি হবে, ওই স্থান পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস স্থাপনের জন্য বিবেচিত হবে। শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৭ মানযুক্ত স্থানে কনস্যুলেট স্থাপন যুক্তিযুক্ত এবং শূন্য দশমিক ৪-এর চেয়ে কম মানযুক্ত স্থানে নিকটবর্তী দূতাবাস থেকে অনাবাসী রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

এ ধরনের নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন, সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠনে বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

কৌশলগত পুনর্গঠন

বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে তীব্র উত্তেজনায় লিপ্ত থাকলেও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীন বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রেখেছে। বৈশ্বিক শক্তিদ্বয়ের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে চলমান টানাপোড়েন এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট ও জাতিগত সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে কার্যকরভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের উন্নত পরিষেবা প্রদানের জন্য রিয়াদ, দুবাই, মাসকাট ও দোহার কূটনৈতিক কার্যক্রমকে জরুরি ভিত্তিতে সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে ওই উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত কূটনৈতিক পোস্টগুলোকে একত্র করে কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। দুর্নীতিগ্রস্ত অভিবাসনপ্রক্রিয়া, ভিসার নামে হয়রানি, ভুল চাকরি ও বেতনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগের সূত্রপাত। এই সমস্যার সমাধান ঢাকায় শুরু হওয়া উচিত। অ্যাপভিত্তিক কনস্যুলার সেবা সময়ের দাবি।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক দৃশ্যপটও বিবেচনায় আনতে হবে। বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করেন। মনে রাখা জরুরি, ভবিষ্যতের শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা বিদ্যমান বিধায় ১৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঊর্ধ্বে বাণিজ্যে সক্ষমতায় পৌঁছাতে হবে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য সুচিন্তিত নীতির প্রয়োজন। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর ব্রাসেলসের এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র তথা বার্লিন মিশন সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। অন্যান্য মিশন একত্র করা যেতে পারে। ডি-৮–ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কার্যকর করতে তুরস্কের দূতাবাসকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সব প্রতিবেশীই সর্বাধিক গুরুত্ব দাবি করে। দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীর পাশাপাশি আসিয়ানও প্রতিবেশী। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ উন্মোচনে আসিয়ান সদস্যপদ প্রাপ্তি অতীব জরুরি।

বাংলাদেশ ১৭ কোটি ভোক্তার বাজার। আসিয়ান তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ব্লক। বিপুল পরিমাণে অভিবাসী মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত। আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়ায় বয়সী মানুষ দ্রুতগতিতে বাড়ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সাড়ে ৪ কোটির বেশি ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী। সদস্যপদ উভয়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মিশনগুলোর জন্য আলাদা কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আফ্রিকায় গুরুত্ব বিবেচনা করে পুনর্গঠন করা যেতে পারে। আফ্রিকান ইউনিয়ন হাব, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য প্রবেশদ্বার এবং ফ্রাঙ্কোফোন আফ্রিকার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের দিকেই মনোযোগ দেওয়া যায়।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো

প্রয়োজন সমন্বিত কাঠামো, ‘সমগ্র সরকার’ভিত্তিক কৌশল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফল্য অন্য মন্ত্রণালয়েরও ওপর নির্ভরশীল। ‘এক দেশ, এক কৌশল’ নীতির ভিত্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একা নয়; বরং অর্থ, বাণিজ্য, প্রবাসীকল্যাণ, প্রতিরক্ষা, শিল্প, পরিকল্পনা, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিয়ে সমন্বিত কূটনৈতিক কাঠামো জরুরি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘জাতীয় কূটনৈতিক সমন্বয় পরিষদ’-এর মাসিক সভায় অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ এবং আন্তমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্বের সমাধান করা হবে।

সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত বিধানাবলি প্রণয়ন ছাড়াও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রাতিষ্ঠানিক সহমর্মিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও মিশনভিত্তিক সীমিত কূটনৈতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান উইংগুলোর ব্যাপক পুনর্গঠন এবং শক্তিশালী ‘কর্মদক্ষতা ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ প্রবর্তন জরুরি। প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রধান সূচকগুলোর ভিত্তিতে স্কোরিং অনুযায়ী সব কার্যক্রমের মূল্যায়ন হতে পারে। মূল্যায়নের আলোকে ‘ট্যালেন্ট অপটিমাইজেশন’–পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। কৌশলগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন উইং, যেমন ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক গতি বৃদ্ধির প্রয়োজন। একই কারণে মিশনগুলোর বাজেট বরাদ্দকাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। কৌশলগত মিশনে জনবল ও ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দূতাবাস রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। মিশন পর্যায়ে রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে ‘সমন্বিত কান্ট্রি টিম’ গঠনের পাশাপাশি আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য ‘ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড’ চালু করা যেতে পারে। কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর, সমন্বিত ও ভবিষ্যৎমুখী করতে গুণগত সংস্কার আবশ্যক।

* রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। প্রতীকী ছবি: এআই/প্রথম আলো

Tuesday, May 13, 2025

কূটনীতি: ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি by মিজানুর রহমান

চির বৈরী ভারত-পাকিস্তান। বহু বছর পর ফের যুদ্ধের মহড়া দিলো। তবে তারা আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণের মধ্যে এখনো সীমাবদ্ধ। দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চলমান সংঘাত বড় আকারে বা দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা- তা এখনো অনুমান করা মুশকিল। তবে এটা সর্বজনবিদিত যে, পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে সেই উত্তাপ নিজ বাড়ি অবধি আসে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি ‘যুদ্ধ’ হলে বাংলাদেশসহ গোটা অঞ্চলেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষাবলম্বন না করে পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেটাকে এখনো কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। ভারত, পাকিস্তান বা ভিনদেশিদের প্রতি বাংলাদেশে আনুগত্যশীল মানুষ অনেক। বিশেষ করে এ দেশের মূলশক্তি ‘মধ্যবিত্ত’ যাদের জ্ঞানী-গুণী ভেবে একটু কদর করে সেই তথাকথিত সুশীলদের ব্যবসা এটাই!

তারা যতটা না বাংলাদেশপন্থি তারচেয়ে ঢের দিল্লি, ইসলামাবাদ, মস্কো বা আমরিকাপন্থি বলে নিজেকে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দেশমাতৃকার প্রতি ভালবাসা তথা তাদের ন্যূনতম দরদটা যদি থাকতো তাহলে বাংলাদেশের আজ এই চেহারা হতো না!

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে না জড়ানোর যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। রেশিও হিসেবে এটি ৭০-৩০। কিন্তু সেই আশঙ্কা যত কমই থাকুক না কেন এটি বেঁধে গেলে বাংলাদেশের ক্ষতি অপূরণীয়। বিশেষ করে অর্থনীতি, রাজনীতি, মধ্যবিত্ত সমাজ তথা দেশের সর্বত্র এর বহুমুখী প্রভাব পড়বে। বুধবারের মহড়া থেকে সেটা অন্তত অনুমেয়। বিদ্যমান উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নতুন করে বড় ধাক্কা খেয়েছে। সেই সংঘাতের প্রত্যক্ষ অংশীদার না হয়েও এর উত্তাপ থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়া। পরোক্ষ অভিঘাতে অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়ে গেছে এরইমধ্যে। উত্তেজনার ক্ষতি আর যাই হোক- দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। আন্তঃসীমান্ত তথা আকাশ, জল ও স্থলপথে তৈরি হয়েছে অজানা আতঙ্ক। মানুষ এবং পণ্যের অবাধ চলাচল ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। বুধবার নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারত-পাকিস্তান গোলাগুলি চলাকালে দেশ দু’টির আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে হয়েছে বাংলাদেশকে। শুধু তা-ই নয় পাকিস্তানকে লক্ষ্যবস্তু করে আরব সাগরে অভিযান চালিয়েছে ভারত। ফলে এ অঞ্চলের সমুদ্রগামী পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে তখন বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়েছে। খেলাধুলাসহ অন্য রুটিন অনেক এক্টিভিটিসে প্রভাব পড়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে ভারতের ২৪টি বিমানবন্দরে বেসামরিক সেবা বন্ধ। নিরাপত্তা শঙ্কায় অনেক ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। স্থগিত করা হয় ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ আসর আইপিএল। ভারত-পাকিস্তান এই সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস যে আহ্বান জানান, সেখানে তিনি বলেন, দুই প্রতিবেশীর সামরিক সংঘাতের ভার বিশ্ব বহন করতে পারবে না। সাম্প্রতিক ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তনে হিমশিম খায় আন্তর্জাতিক বিমানসংস্থাগুলো। ভারত ও পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ শতাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়।

পাকিস্তানে আক্রমণের ক’ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারের দরপতন শুরু হয়। তড়তড়িয়ে নামতে থাকে সূচক। যুদ্ধ লেগে যাওয়ার আশঙ্কায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রতিবেশী দেশ দু’টি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ালে পুঁজিবাজারের চিত্র  কি হতে পারে তা বুঝতে গবেষণা জরুরি নয়। তারপরও চূড়ান্ত বিচারে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আগামী কী ধরনের সম্পর্ক হবে? বিশেষত: পরিস্থিতি কতটা অবনতি ঘটবে? যুদ্ধ লেগে গেলে সার্বিক ভাবে কী কী সমস্যা হবে? তা নিয়ে নিশ্চয়ই বাংলাদেশে সরকারিভাবে গবেষণা হচ্ছে এবং হবে। তবে হ্যাঁ, সার্বিক একটি চিত্র পেতে ‘প্রাক্কলন’টা জরুরি। সেই সঙ্গে এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় এখনই দেশের নীতিনির্ধারকদের কৌশল ঠিক করতে হবে। দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সম্প্রতি এ নিয়ে বেশক’টি পর্যালোচনা ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়, ঠিক যুদ্ধ না হয়ে যদি দেশ দু’টির মধ্যে যুদ্ধ, যুদ্ধ ভাব থাকে তাতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি, যোগাযোগসহ বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে। আমদানি-রপ্তানি তথা সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই এখনই এর বিকল্প ভাবতে হবে। সে ক্ষেত্রে ‘প্ল্যান বি’ তৈরির সুপারিশ এসেছে। বলা হয়েছে- ঐতিহাসিক কারণেই ভারতের পশ্চিম সীমান্ত অস্থির হলে পূর্ব সীমান্ত অর্থাৎ বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ে। যেকোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে কাছের এবং দূরের দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার এই সংঘাতকে অব্যাহতভাবে নিরুৎসাহিত করে যেতে হবে। কোনো ফর্মে কোনোভাবেই নয়াদিল্লি বা ইসলামাবাদ- কারও পক্ষাবলম্বন দূরে থাক, ন্যূনতম ঝুঁকে পড়া বা ফুয়েলও দেয়া যাবে না।

রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বিদায় নেয়া শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে ছিল অতিরিক্ত মাখামাখি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছিল যে, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে প্রার্থিতার প্রশ্নেও ভারতীয় প্রভাবের বিষয়টি আলোচনায় আসতো। আমরা যেন দিল্লির বাইরে কিছুই চিন্তা করতে পারতাম না। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক চলে গিয়েছিল ডিপ ফ্রিজে। ৫ই আগস্টের পর থেকে দেশ দু’টির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের রসায়ন বদলেছে। দিল্লি ইউনূস সরকারের ওপর গোস্সা। তারা অনেক কিছু থেকে দূরে। যদিও ঢাকা কাছাকাছি থাকার এবং সম্পর্ক অটুট রাখার বার্তা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। সম্পর্কে সবচেয়ে ক্ষতি করছে ভারতীয় মিডিয়া। একটি অংশ অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অসত্য প্রচারণায় ব্যস্ত। দেশটির সরকার এবং রাজনীতিবিদরা হাসিনার শোচনীয় পরাজয় ও পলায়নকে এখনো মেনে নিতে পেরেছেন বলে দৃশ্যমান কোনো সাইন নেই।

অন্যদিকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে চাইছে। ঢাকাও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পক্ষে। উভয়ের মধ্যে একটি বোঝাপড়া শুরু হয়েছে। সফর বিনিময়, আলাপ-আলোচনা বেশ দূর এগিয়েছিলো। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সমুদয় উদ্যোগ আটকে গেছে। বরং উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশে পুশইন করেছে ভারত। সীমান্তের জমি নিয়ে নতুন করে বিরোধিতা শুরু হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে গেছে। সম্পর্কের টানাপড়েন সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশ থেকে আমাদের অনেক খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাত স্থায়ী হলে নিশ্চিতভাবে আমদানীনির্ভর সেসব পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে। যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে। শুধু তাই নয়, এটি গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

উল্লেখ্য, ভারত-পাকিস্তান বহুবার মুখোমুখি হয়েছে। ’৪৮, ’৬৫, ’৭১ এবং সর্বশেষ কারগিল যুদ্ধ, যদিও এটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দু’-চার সপ্তাহ স্থায়ী ছিল। কিন্তু তখন কারো হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না। এখন তো দু’দেশের মজুতেই ভয়াবহ এই মারণাস্ত্র রয়েছে। ফলে কোন এক পক্ষ ট্রিগারটা চাপলেই হয়!

সূত্র: জনতার চোখ
mzamin

রয়টার্সের বিশ্লেষণ: নয়া দিল্লির কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরীক্ষার মুখে

যুক্তরাষ্ট্রের এক ধাক্কায় একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রান্তসীমা থেকে ফিরেছে ভারত-পাকিস্তান। এতে বৈশ্বিক একটি কূটনৈতিক শক্তি হয়ে উঠার জন্য নয়া দিল্লির যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তা এখন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। কারণ, কাশ্মীর বিরোধে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ভারত দ্রুততার সঙ্গে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে উঠে এসেছে। এতে তার আস্থা বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বমঞ্চে সমীহের স্থান করে নিয়েছে, যে বিশ্বমঞ্চে তারা আঞ্চলিক সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক ধস এবং মিয়ানমারে ভূমিকম্প।

কিন্তু কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে ভারতের রাজনীতির স্নায়ুতে স্পর্শকাতরতার সঙ্গে ছুঁয়ে গেছে। এই যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র। আকাশ পথে লড়াই হয়েছে। এতে কমপক্ষে ৬৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এমন অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও তাতে নিজেদের স্বার্থ কীভাবে তুলে ধরবে তা নিয়ে ভারতের কূটনীতিকে নির্ভর করতে হবে বড় অংশে দেশের ভিতরকার রাজনীতির ওপর। এটাই কাশ্মীর নিয়ে সংঘাতের ভবিষ্যত নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, যুদ্ধবিরতির জন্য বৃহত্তর যে ডাক তার জন্য হয়তো ভারত আগ্রহী নয়। তারা চ্যালেঞ্জ টিকিয়ে রাখতে চায়।
এই যুদ্ধবিরতি কতটা যে ভঙ্গুর তার ইঙ্গিত মেলে দুই দেশের সরকার একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্য দিয়ে।

কুগেলম্যান বলেন, উত্তেজনা যখন চরমে ছিল ঠিক সে সময় তড়িঘড়ি করে যুদ্ধবিরতি করা হয়েছে। এরপর রোববার ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতির পর তিনি এই দুটি বড় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে যাচ্ছেন। এই যুদ্ধ যখন শুরু হলো তার পর থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। কাশ্মীরকে ভারত তার দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। এ নিয়ে তারা কোনো আলোচনায় রাজি নয়। এমনকি তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতা পর্যন্ত মানতে রাজি নয়। হিমালয়ের পাদদেশে এই কাশ্মীরের পুরোটাই ভারত এবং পাকিস্তান দাবি করলেও এর কিছু অংশ ভারত আর কিছু অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে আছে। এটা নিয়ে দুই দেশ দুটি যুদ্ধ করেছে। এ ছাড়া অনেকবার সংঘর্ষ হয়েছে। তাতে ভারত দাবি করেছে, কাশ্মীরে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট বিদ্রোহীরা অবস্থান করছে। ভারতের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তান। ভারতের প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি বলেন, মাত্র তিন দিনের সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় অভিযান বাতিল করতে রাজি হয়েছে ভারত। এতে কাশ্মীর বিরোধের দিকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ভারত। পাকিস্তানের সীমান্তের দিকে যে উগ্রপন্থা আছে সেই সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি।

১৯৪৭ সালে দুই দেশ আলাদা হওয়ার পর পশ্চিমারা ভারত ও পাকিস্তানকে এই লেন্সে দেখে। তারা দেখে যে, এই দুই দেশ কাশ্মীর নিয়ে নিয়মিতভাবে সংঘাতে জড়ায়। এই ধারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবর্তন হয়েছে। এ সময়ে অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছে ভারতের। অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থনীতি ভারতের অর্থনীতির এক-দশমাংশেরও কম। এ অবস্থায় কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাব, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা দিয়েছেন যে- নিরপেক্ষ কোনো স্থানে বিস্তৃত ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু করবে ভারত ও পাকিস্তান।

যুক্তরাষ্ট্রের এ ভূমিকায় ভারতের অনেককে ক্ষুব্ধ করেছে। অন্যদিকে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে বার বার ধন্যবাদ জানিয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু ভারত এ বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। ইতিমধ্যে বিশ্লেষক এবং ভারতের বিরোধী দলগুলো প্রশ্ন তুলছে। তারা জানতে চাইছে, গত সপ্তাহের বুধবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে নয়া দিল্লি কি তার কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণ করেছে? পাকিস্তানের অনেক গভীরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার পূর্বসুরিদের চেয়ে খুব বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে যুদ্ধবিরতিতে দেশের ভিতরেই তার বিরল সমালোচনা শুরু হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির সাবেক এমপি স্বপন দাসগুপ্ত বলেন, যুদ্ধবিরতি ভারতের জন্য ভালো হয়নি। কারণ, আকস্মিকভাবে এর মধ্যে আবির্ভাব ঘটেছে ট্রাম্পের এবং তিনি একটা রায় দিয়ে দিয়েছেন। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তো আরো একটু এগিয়ে গেছে। তারা ওয়াশিংটন ডিসি থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার বিষয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেন, আমরা কি (কাশ্মীর নিয়ে সমস্যার সমাধানে) তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতার দরজা খুলে দিলাম?

যদিও যুদ্ধ থেমে গেছে, তবু সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় আছে, যা ভারতের দৃঢ় সংকল্পকে পরীক্ষা করবে এবং কঠোর অবস্থান গ্রহণে প্ররোচিত করবে। পাকিস্তানের জন্য শীর্ষ পয়েন্ট হবে সিন্ধু নদের পানি চুক্তি। এই চুক্তি ২২শে এপ্রিলে পেহেলগাম হামলার পর স্থগিত করে ভারত। পাকিস্তানে কৃষি কাজ ও পানিবিদ্যুৎ বিষয়ক স্থাপনার জন্য সিন্ধু নদের পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, ব্যাপক অর্থে আলোচনার নিশ্চয়তা যদি যুক্তরাষ্ট্র না দিতো, তাহলে পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতো না। পাকিস্তান জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মোঈদ ইউসুফ বলেন, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা ভাঙতে হলে বড় বা বিস্তৃত পরিষদে চুক্তিতে আসতে হবে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো রয়ে গেছে। প্রতি ছয় মাসে, এক বছরে, দুই বছরে বা তিন বছরে এই রকম ঘটনার সৃষ্টি হয়। তারপর দুই দেশ পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

mzamin

Friday, February 21, 2025

ডিপ্লোম্যাটের রিপোর্ট: শেখ হাসিনাকে নিয়ে উভয় সংকটে ভারত

শেখ হাসিনাকে নিয়ে উভয় সংকটে ভারত। তাকে ফেরত দেয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। এখন সেই অনুরোধে রাজি হলেও ভারতের সামনে বিপদ। আবার প্রত্যাখ্যান করলেও বিপদ। দেখা দিতে পারে বিশৃঙ্খলা। অনলাইন দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত ‘দ্য কমপ্লেক্স রোড টু এক্সট্রাডিশন: উইল ইন্ডিয়া এগ্রি টু সেন্ড শেখ হাসিনা ব্যাক টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কাছে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ১৩ই   ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম এ কথা জানিয়েছেন। ডিসেম্বরে একটি নোট ভারবালের মাধ্যমে হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বার্তা দিলেও তাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের অনুরোধের কোনো উত্তর দেয়নি ভারত। নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘রিজার্ভ’ অবস্থান বজায় রেখেছে। বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা অনুরোধ পাওয়ার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেয়া ছাড়া আর কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে। ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত বন্দিবিনিময় চুক্তির অধীনে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বৈধতা আছে বাংলাদেশের। এই চুক্তিটি ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়। হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বৈধতা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে জটিল অবস্থায় রয়েছে। যদি হাসিনাকে ফেরত দিতে রাজি হয় ভারত, তাহলে প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিক কিছু পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে হতে হবে। প্রথমত তাতে আসবে ভারত-বাংলাদেশ বন্দি বিনিময় চুক্তি এবং তারপরই আন্তর্জাতিক কূটনীতির কঠোর বাস্তবতা। এ বিষয়ে পাঞ্জাবে রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী প্রফেসর ড. সংগীতা তাক বলেন, যদিও বন্দিবিনিময় চুক্তিটি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় টেকনিক্যাল দিক দিয়ে, তবে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোর বিবেচনা এ প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস্য জটিল ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত করবে।

সংগীতা তাক বলেন, ভারতের কাছে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক ফেরত পাঠানোর আবেদন করার মধ্যদিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত বর্ণনা থাকতে হবে অনুরোধের সঙ্গে। সংগৃহীত নথির সমর্থন থাকতে হবে। এর মধ্যে আছে বিচারিক আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের বিষয়। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের এই অনুরোধের সঙ্গে অবশ্যই নিশ্চিয়তা থাকতে হবে যে, বাংলাদেশে তার বিচার স্বচ্ছ হবে এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হবে না। অন্যকথায় অপরাধের নথিপত্রের বাইরে অনুরোধে অবশ্যই এটা নিশ্চয়তা দিতে হবে যে- রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বমূলক বিচারের শিকার হবেন না হাসিনা। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যা ভারত হাসিনাকে ফেরত দেয়ার কথা বিবেচনা করার আগে যাচাই করবে।

উল্লেখ্য, এরই মধ্যে এসব বিষয়ের সবটাই পূরণ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এরপর কি?
একবার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে, তখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে দেখবে চুক্তির সব বাধ্যবাধকতা পূরণ করা হয়েছে কিনা। বিশেষ করে প্রাথমিকভাবে এই কাজ করবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংগীতা তাক বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যেহেতু ভারতের এরই মধ্যে একটি বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে, তাই ভারত সরকার চুক্তি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। তারা এটা নিশ্চিত করবে যে, বন্দিবিনিময় চুক্তি যথাযথ পূরণ করা হয়েছে। পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় যাচাই করে দেখা হবে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা আইনগতভাবে দুই দেশের ক্ষেত্রেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কিনা। এই ধারণাকে দ্বৈত অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আরও যাচাই বাছাই করে দেখবে যে, কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক, সামরিক বা ধর্মীয় অপরাধের ছাড়ের ভেতরে পড়ে কিনা। এমনটা নিশ্চিত হলে তারা হাসিনাকে ফেরত দেয়ার অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এমনকি প্রাথমিক প্রশাসনিক পর্যালোচনা অনুকূলে থাকলেও বিষয়টি সেখানেই শেষ হবে না। হাসিনাকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি এরপর ভারতের বিচার বিভাগের পর্যালোচনার বিষয় হবে। সেখানে বিশেষায়িত প্রত্যাবর্তন বিষয়ক আদালত ফেরত পাঠানোর বৈধতা ও মেরিট যাচাই করবে। যদি আদালত দেখতে পায় যে, রাজনৈতিক বিচার করার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি আছে, তাহলে ফেরত দেয়ার অনুরোধকে আটকে দিতে পারেন আদালত। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রত্যাবর্তন বিষয়ক আইনের অপব্যবহার রোধে তা হবে বিচার বিভাগের অত্যাবশ্যকীয় সুরক্ষা। নিশ্চিত করতে হবে যে, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে আইন অনুসরণ করা হয়েছে দৃঢ়ভাবে।

ভারতের আদালত এবং নির্বাহী শাখা শেষ পর্যন্ত যদি প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ- সেটা হতে পারে পুলিশ বা কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী এজেন্সি থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা। সংগীতা তাক বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতে গ্রেপ্তার করা হলে তাকে এমন একটি নিরাপদ স্থাপনায় রাখতে হবে- যেখান থেকে তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা আয়োজন করা যায়। আইন তাকে আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রমের জন্য আটক রাখা অনুমোদন করে। শেখ হাসিনার পরিচিতি এবং উচ্চপর্যায়ে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের কারণে তাকে ব্যতিক্রমী নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিতে হবে- যাতে কোনো রকম বিঘ্ন বা পালানোর সুযোগ না থাকে। এমন হলে প্রত্যার্পণের শেষ পদক্ষেপ হবে শেখ হাসিনাকে শারীরিকভাবে ভারতের হেফাজত থেকে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের হেফাজতে দিয়ে দেয়া। এক্ষেত্রে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে। নিশ্চিত করতে হবে যে, সব আইনগত এবং কূটনৈতিক প্রটোকল মেনে চলা হয়েছে। সংগীতা তাক আরও বলেন, এসব যাচাই বাছাই শেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের হেফাজত থেকে বাংলাদেশিদের কাছে তুলে দেয়া হবে। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে দুই দেশের মধ্যে সম্মতি থাকা একটি ব্যবস্থায়- সেটা হতে পারে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্তে বা বিমানবন্দরে। এক্ষেত্রে সরকারের ভাড়া করা একটি বিমান ভারতের কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে অবতরণ করতে পারে ঢাকায়। অথবা পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপয়েন্টের মতো কোনো সীমান্ত পয়েন্টে হতে পারে এই বিনিময়।

এসব আইনগত ও পদ্ধতিগত পদক্ষেপগুলো বর্ণিত থাকলেও, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি হতে পারে অত্যন্ত রাজনৈতিক। সংগীতা তাক বলেন, রাজনৈতিক নেতারা কখনো কখনো সুনির্দিষ্ট দায়মুক্তি এবং সুরক্ষা ভোগ করেন। এ বিষয়টি হাসিনাকে ফেরত দেয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, এক্ষেত্রে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো হস্তক্ষেপ করতে পারে। তারা বলতে পারে, শেখ হাসিনা অন্যায্য বিচারের মুখোমুখি হবেন অথবা বাংলাদেশে তার বড় ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আইনগত চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। এমন হস্তক্ষেপ হলে এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে। তাতে ভারতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে মানবাধিকারের সব সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। উপরন্তু শেখ হাসিনা নিজে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন। বাংলাদেশে তার ওপর নিষ্পেষণের দাবি তুলতে পারেন। এমন হলে তাকে ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠবে- বলেন সংগীতা তাক।

এসব আইনগত জটিলতার বাইরে ভারতকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা বাংলাদেশের অনুরোধ রক্ষা করবে নাকি প্রত্যাখ্যান করবে। এ অবস্থায় অবশ্যই সুদূরপ্রসারি পরিণতি  দেখা দেবে। ঢাকার দাবি মেনে নিলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। তারা সেইসব দেশ যারা মনে করে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন। ভারতের ওপর চাপ বাড়লে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়াকে দেখা হতে পারে একটি ‘নন-স্টার্টার’ হিসেবে। আবার সরাসরি যদি ঢাকার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে ভারত তাহলে আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, যেমনটা আগেই আন্দাজ করা হয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ ‘মনসুন আপরাইজিং’ শিরোনামে সম্প্রতি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের সঙ্গে আইনপ্রয়োগকারী এজেন্সিগুলোর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করার কথা বলা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার অনুরোধে রাজি হওয়া বা তা প্রত্যাখ্যান করা- উভয়ই নয়াদিল্লির জন্য পরিণতি বহন করবে। ঠিক এ কারণেই ভারত চুপ রয়েছে এবং তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ হিসেবে দেখছে। সম্ভবত এটাই এখন ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো সুযোগ।

mzamin

Tuesday, February 4, 2025

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি by ইমরান মালিক

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে (পুনরায়) উদীয়মান ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে তাদের যৌক্তিক উপসংহারে নিয়ে যেতে হবে। অতীত এবং বর্তমান, বাস্তব এবং অনুভূত সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তাদের অবশ্যই একটি স্থায়ী সম্প্রীতির দিকে নিয়ে যেতে হবে। তাদের অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে সংশয় ও ফাটল সৃষ্টির (পুনরায়) কৌশলমূলক প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, সামরিক, খেলাধুলা, শিক্ষা এবং পর্যটনসহ এই সম্পর্কগুলোকে বহুমাত্রিক হতে হবে। তাদের অবশ্যই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্থাপন করতে হবে, একে অপরের অর্থনীতিতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে, ভিসামুক্ত ভ্রমণের প্রচার করতে হবে, সরাসরি ফ্লাইট এবং সামুদ্রিক সংযোগ পুনরায় চালু করতে হবে এবং রাজনীতিবিদ, পণ্ডিত, ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, ক্রীড়াবিদ এবং জনগণকে পারস্পরিক সফরের সুবিধা দিতে হবে। পাকিস্তান-বাংলাদেশ পুনর্মিলনের লক্ষ্য অবশ্যই দুই দেশের জনগণের মধ্যে ব্যাপক (পুনরায়) সম্পৃক্ততা তৈরি করা এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্ধন পুনরুদ্ধার করা। তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও সহযোগিতা শুরু করতে পারে।

পাকিস্তানের নিজস্ব শক্তিশালী সামরিক-পরমাণু-ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা বারবার প্রদর্শন করে এসেছে দেশটি। পাকিস্তান সর্বদা তার প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাথে কার্যকরীভাবে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে এসেছে।পাকিস্তান শুধুমাত্র অত্যন্ত পেশাদার, সুশৃঙ্খল, যুদ্ধে দক্ষ, সুসজ্জিত এবং সু-প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনীর অধিকারীই নয়, পাশাপাশি সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক এবং সামরিক ইচ্ছাও প্রদর্শন করেছে। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে, এটি বহিরাগত আগ্রাসন রোধে বাংলাদেশকে অনুরূপ সামরিক শক্তির বিকাশ ও সমন্বয় সাধন করতে সহায়তা করতে পারে।

পাকিস্তানের একটি উল্লেখযোগ্য সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স রয়েছে যা বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই JF-17 ব্লক থ্রি বিমানে আগ্রহ দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সাপেক্ষে পাকিস্তানও নৌযান, যান্ত্রিক/সাঁজোয়া যান, ট্যাংক, ড্রোন, আর্টিলারি বন্দুক, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সব ধরনের যুদ্ধাস্ত্র এবং এমনকি অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক এবং স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার কথা বিবেচনা করতে পারে। সামনে সুযোগ সীমাহীন। তাই সহযোগিতার পরিধিও সীমাহীন হওয়া উচিত।

অন্যদিকে, ভারত তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে এই নতুন বন্ধুত্ব দেখে শঙ্কিত হতে পারে। ভারত যখন তাদের আলাদা রাখার প্রচেষ্টা করে এসেছে তখন এই অপ্রত্যাশিত উন্নয়ন ভারতের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। উদীয়মান ভূ-রাজনৈতিক এবং ভূ-কৌশলগত পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ভারত অবিলম্বে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে ভারত যখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠবার চেষ্টা করছে তখন ‘প্রজেক্ট বাংলাদেশ’ তার হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বড় ধাক্কা। ভারত ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান এবং এখন বাংলাদেশসহ প্রায় সমস্ত প্রতিবেশীর ওপর তার প্রভাব হারিয়েছে। ভারত তার প্রভাবের ক্ষেত্র থেকে অনেকটাই বেরিয়ে গেছে। তাই  শুধু বাংলাদেশের দ্বারা উদ্ভূত ভূ-রাজনৈতিক এবং ভূ-কৌশলগত অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই নয়, বরং এই অঞ্চলের অন্যত্র নিজের হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করতে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে স্পষ্টতই এটি পশ্চাদপসরণ!

তাহলে, দক্ষিণ এশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে ভারতের সামনে বিকল্প কী আছে? প্রথমত, ভারত বর্তমান স্ট্যাটাস মেনে নিতে পারে। কিন্তু তা অসম্ভব, কারণ ভারত বরাবর আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে চেয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ও তার জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে ভারত। একাত্তরের স্বাধীনতার যুদ্ধের মৃত ঘোড়াকে নিরলসভাবে চাবুক মারা চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণ এখন তাদের দুর্ভাগ্যজনক অতীতকে অতিক্রম করে একটি উজ্জ্বল, পারস্পরিকভাবে সুরক্ষিত ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সংকল্পবদ্ধ হতে পারে। ভারতের এ ধরনের প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তৃতীয়ত, এটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কূটনীতির পাশাপাশি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধের সুবিবেচিত কৌশল অবলম্বন করতে পারে।  এর মধ্যে মিডিয়া এবং কূটনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি বাণিজ্য যুদ্ধ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এটি সীমান্ত সমস্যা, পানি বণ্টন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, অভিবাসন এবং অন্যান্য বিষয়েও বাংলাদেশকে চাপ দেয়া  শুরু করতে পারে।

পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস এবং অন্যান্য উপায়ে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে। এটি ভারতের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য পদ্ধতি বলে মনে হচ্ছে। চতুর্থত, শেষ অবলম্বন হিসাবে, ভারত বাংলাদেশের বুকে  সামরিক হস্তক্ষেপ এবং/অথবা ঢাকায় শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করার কথাও বিবেচনা করতে পারে। তবে এটি সম্ভবপর হবে বলে মনে হচ্ছে না, কারণ বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিপুল জনসমর্থন উপভোগ করছে। ভারতের এই ধরনের কৌশল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের থেকে কোনো সমর্থন পাবে না বলেই অনুমান। ভারত এইভাবে সীমান্ত বিরোধ অথবা তার ভৌগোলিক উত্তেজনাপূর্ণ উত্তর-উত্তরপশ্চিম এবং পূর্ব-উত্তরপূর্ব- উভয় ক্ষেত্রেই গতিশীল ক্রিয়াকলাপে জড়িয়ে পড়তে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না যে কোয়াডের- সদস্য হিসাবে ভারত  নির্ধারিত প্রতিপক্ষ ছাড়া অন্য কারো বিরুদ্ধে তার সময়, প্রচেষ্টা এবং শক্তি ব্যয় করুক।

ভারত স্পষ্টতই বাংলাদেশে এবং অন্যান্য প্রতিবেশীদের মধ্যে তার দৃঢ় উপস্থিতি এবং প্রভাব হারিয়েছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভারতকে আরও আধুনিক, বাস্তবসম্মত এবং প্রাসঙ্গিক নীতি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এটা বুঝতে হবে যে, চীন এখন শুধু বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তি নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তি হিসেবেও আবির্ভুত হয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর মাধ্যমে,  ভারতকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা তৈরি করছে চীন। যার জেরে এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব হারাতে চীন একাই ব্যাপকভাবে অবদান রাখতে পারে। এগুলি হল ভূ-রাজনৈতিক এবং ভূ-কৌশলগত বাস্তবতা যা ভারতকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে এবং মেনে নিতে হবে।

যতদিন চীনের ফ্যাক্টর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাসঙ্গিক থাকবে, ততদিন এই অঞ্চলের অবিসংবাদিত আধিপত্য হওয়ার ভারতের স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থাকবে। এমনকি দূরবর্তী শক্তির সমর্থন, সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন, এই উদীয়মান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট ফ্যাক্টর নাও হতে পারে। এর জেরে ভারত কি আরও মার্কিন শিবিরের দিকে ঝুঁকবে?  দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কি হতে পারে তা সত্যিই অনুধাবন করা কঠিন।

লেখক-  পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার
সূত্র : দ্য নেশন

Monday, November 4, 2024

দেশে দেশে দুর্বল কূটনীতির কবলে বাংলাদেশ by এম এস সেকিল চৌধুরী

দেশে নতুন পট পরিবর্তনের পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কিছুটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে বিশেষ করে দল-অনুগত কর্মকর্তাদের মধ্যে “আছি কি নেই, আছি কি নেই”- এই অবস্থা বিরাজমান। অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ চাইলেও পুরোদমে কাজ করতে পারছে না। সুতরাং এই অবস্থার আশু সমাধান প্রয়োজন।

বিশ্বায়নের কারণে প্রতিটি দেশ একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সংযুক্তির মূল চালক কূটনীতি। যে দেশের কূটনীতিবিদরা কূটনীতিতে দক্ষ সে দেশ তত বেশি লাভবান। তবে শুধু দক্ষ কূটনীতিবিদ নয়, দেশের সৎ, দেশপ্রেমিক ও সুদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা বহু অংশে সফল কূটনীতির জন্য অপরিহার্য।

বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর গতিশীলতার কারণে ধীরগতির কূটনীতি আজ অচল। পৃথিবীর সকল অগ্রবর্তী দেশ ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ অবিক্রয়যোগ্য দেশপ্রেমিক জনবল দিয়ে দেশের কূটনীতি সাজায়। এই শ্রেণির মানবসম্পদ দেশের অন্য অংশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত চৌকস ও কর্মক্ষম হয়ে থাকে। তারা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিভাজনের চেয়ে দেশের সামগ্রিক স্বার্থ সর্বাগ্রে রাখে।

এজন্য কূটনীতি-সফল দেশগুলো ঘন ঘন জনবল পরিবর্তন করে না। এক্ষেত্রে আমরা একটু ভিন্ন, আমরা দলের অনুগত লোকদের দিয়ে কূটনীতি পরিচালনা করি। ফলে সরকারি দলের পরিবর্তন হলে গোটা কূটনীতিবিদদের পরিবর্তন ঘটে যায়। প্রতিযোগিতা-সক্ষম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও দক্ষ জনবলকে পরিবর্তনের ফলে কূটনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে মূলত দর্শনগত যে পরিবর্তন হয় সেটুকু অর্জনের জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও কূটনীতিক পরিবর্তনের রেওয়াজ আছে, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া অচল করে দেয়ার বিধান কোথাও নেই। তবে কূটনীতিকদের দলবাজি অন্যান্য দেশে এত প্রকট নয় যা আমাদের মিশনগুলোতে আছে।
শুধু দলীয় অনুগত লোক দিয়ে কূটনীতি চলে না, এখানে ব্যক্তির পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতা অগ্রগণ্য হওয়া উচিত। সামপ্রতিক ছাত্র-জনতা ও সর্বস্তরের জনগণের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমাদের কূটনীতি খুব নাজুক অবস্থায় আছে।

জনবলের মনোবলের অভাবে দেশে দেশে দুর্বল কূটনীতির কবলে বাংলাদেশ আজ নিপতিত। এই অবস্থা খুবই ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমাদের প্রতিযোগী ও প্রতিবেশী দেশগুলো এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। এমনিতেই পেছন থেকে ঘাড়ের উপর স্বার্থান্বেষী বাংলাদেশ-বিরোধীদের নিঃশ্বাসের শব্দ অনুমান করা যাচ্ছে।

বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে সর্বত্রই আজ “যোগ্যতমের বেঁচে থাকা’’ নীতি চলে, কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। অনেক দক্ষ কূটনীতিক গত কয়েক বছরে “দলবাজ কূটনীতিক”-এ পরিণত হয়েছেন, কেউ কেউ নিজের বাড়তি সুবিধা আদায়ের জন্য,  আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে এই অবস্থায় গেছেন। এরা বিদেশে দেশের কাজ ও সাধারণ মানুষের সেবা প্রদানের পরিবর্তে রাজনৈতিক দল, দলের নেতা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সেবা প্রদানে ব্যস্ত থেকেছেন তাতে দেশের কূটনীতি ও সাধারণ প্রবাসীদের সেবাপ্রাপ্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষ পেশাজীবী কূটনীতিবিদরা দলবাজ ও তদবিরবাজদের দাপটে পেছনে পড়ে গেছেন।

দল-অনুসারী কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে নির্মূল করা বেশ কঠিন কাজ। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তত সামনের দিকের দল-অনুগত কূটনীতিবিদদের কাজের স্থান পরিবর্তন করে দেশের কূটনীতি গতিশীল করা আজ খুবই জরুরি।

বেশ কিছু পরিবর্তন ও জরুরি সংস্কার আজ আলোচনায় আছে এগুলো সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক মতামত পক্ষে নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী সফল কূটনীতি আজ অত্যাবশ্যকীয়। এই বিবেচনা মাথায় রেখে সমাজের অভিজ্ঞ ও নানা জ্ঞানে সুদক্ষ জনবলকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্ত করা অতি জরুরি। আমাদের অত্যাবশ্যকীয় সকল উদ্যোগ ও ইতিবাচক সংস্কারের নতুন চিন্তাগুলোকে কার্যকর করার স্বার্থে দেশে ও প্রবাসে আধুনিক জ্ঞান-সম্পন্ন তরুণ ও কিছু সংখ্যক প্রবীণ মানুষকে কূটনীতিতে যুক্ত করা দরকার, এমনকি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়ও যুক্ত করা প্রয়োজন।

কালবিলম্ব না করে বাজপাখির ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করে আরও এগিয়ে নিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহায়ক কার্যক্রম গ্রহণ করে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।  

অর্থনীতি, সমাজনীতি ও বাণিজ্য নীতি  সবই দেশে-বিদেশে কূটনীতির মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। কেউ যেচে কিছু দেয় না। সুতরাং “যাহা চাই যেন জয় করে পাই” এই নীতিকে পুঁজি করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

mzamin

Sunday, September 15, 2024

অতীত বিবেচনায় ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বার্তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র: প্রতিনিধিদল ঢাকায় by মিজানুর রহমান

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল এখন ঢাকায়। প্রতিনিধিদলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হচ্ছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডনাল্ড লু। মার্কিন প্রতিনিধিদলের সব সদস্য শনিবার ঢাকায় পৌঁছান পৃথক ফ্লাইটে। সফরের প্রথমদিনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। আজ প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়াও অর্থ উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, পররাষ্ট্র সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করবেন তারা। আলোচনায় দু’দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, অর্থনীতি ও অংশীদারিত্বের বিষয় থাকবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। প্রতিনিধিদলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ডনাল্ড লু বাংলাদেশে আসার আগে ৩ দিন ভারতে ছিলেন। তিনি শনিবার বিকালে বাংলাদেশে পৌঁছান।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ওয়াশিংটন কীভাবে কাজ করতে পারে তা নিয়ে আলোচনাই লু’র এবারের সফরের মুখ্য উদ্দেশ্যে। দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে এরইমধ্যে খবর বেরিয়েছে, গত ৩ দিনে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিরিজ আলোচনা হয়েছে সফরকারী মার্কিন প্রতিনিধিদলের। ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক আন্দোলনে ভারতের বর্ডার লাগোয়া বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশে যে অভাবনীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, সেটি তাদের আলোচনার বাইরে ছিল না। যদিও এ নিয়ে এখনো কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি। বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে দিল্লি পাঠিয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু কাজ হয়নি। বিরোধী দলকে বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন নিয়ে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের অবস্থানে ভিন্নতা ছিল সেটি তাদের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের সফরে প্রমাণ হয়। অনেকে এখন বলছেন, সেই সময়ে বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে আজ শেখ হাসিনার এই পরিণতি হতো না। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনাসহ নানা কারণে সম্পর্কের টানাপড়েন থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো এ অঞ্চলে ভারতকে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে। লু’র দিল্লি সফরে তার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির কেন্দ্রস্থলে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের স্বাতন্ত্র্যতা রয়েছে সেটি ট্রাম্প আমল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দফায় দফায় স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন। এটা প্রতিষ্ঠিত যে, এক সময় দিল্লির চোখেই বাংলাদেশকে দেখতো যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু না, গত ক’বছরে সম্পর্কের চরম টনাপড়েনের মধ্যেও ঢাকার সঙ্গে সরাসরি ডিল করেছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরের পর থেকে। পর্যবেক্ষকরা বলছে, নানা কারণে মার্কিন ফরেন পলিসিতে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানই এখানে মুখ্য। বাংলাদেশের পট পরিবর্তনে নানা কথা চাউর রয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন এটা স্পষ্ট করেছে যে, যেটুকু পরিবর্তন এসেছে তা বাংলাদেশের দেশের মানুষই ঘটিয়েছে। পরিবর্তিত বাংলাদেশ তথা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যে যুক্তরাষ্ট্র সর্বোতভাবে প্রস্তুত, সেটি স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিফ্রিংয়ে বারবার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অতীতের টানাপড়েন বিবেচনায় নিয়ে অর্থাৎ নিকট অতীতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। যা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ছায়া ফেলেছ। সেটি মনে রেখেই পরিবর্তিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। এই বার্তা দিতেই নতুন সরকারের এক মাসের মাথায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের এবারের সফর হচ্ছে।  

সফর নিয়ে মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিজের মূল্যায়ন: এদিকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফরের সম্ভাব্য দিক বিশ্লেষণ করেছেন স্বাধীন বৈদেশিক নীতি বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ফরেন সার্ভিস অফিসার জন ড্যানিলোভিজ। একযুগ আগে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। একটি নিবন্ধে তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসনের আন্তঃএজেন্সি প্রতিনিধিদল শিগগিরই  বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করবেন। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণের উদ্দেশ্যেই এই সাক্ষাৎ। মার্কিন ট্রেজারির ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এখন ঢাকায়। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এই প্রথম  আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হতে চলেছে, তথাপি এই বৈঠক পরবর্তী মাসগুলোর জন্য একটা দিশা দেখাতে পারে (অন্তত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নতুন মার্কিন প্রশাসন দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত)। যদিও বৈঠকের ফোকাস থাকবে সামনের দিকে, তবে উভয়পক্ষই সামপ্রতিক ইতিহাস সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। ইতিবাচক দিক হলো, সামপ্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার হাস্‌) বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সমর্থনে সোচ্চার ছিল। একই সময়ে, মার্কিন নীতির সমালোচকরা  উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াশিংটন তার বক্তব্যের সমর্থনে আরও কিছু করতে পারতো, বিশেষ করে বাংলাদেশে  ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগে এবং পরের মাসগুলোতে। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং প্রধান উপদেষ্টা পদে অধ্যাপক ইউনূসের নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

ঢাকায় একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্তটি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে জড়িত থাকার ওয়াশিংটনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এর থেকে বোঝা যায় যে,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র   দু-দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিকে মনোনিবেশ করতে চাইছে। একটি ইস্যু যা এই সফরে বড় হয়ে উঠবে তা হলো ভারতের নজরে না দেখে বাইডেন  প্রশাসন কি তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে  বাংলাদেশের সমস্যার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত?  ওয়াশিংটন পোস্ট এবং বেশকিছু  রিপোর্ট  প্রমাণ করে যে বিষয়টি নিয়ে কিছু সংশয় রয়েছে। আসলে বাংলাদেশ সফরের আগে মার্কিন প্রতিনিধিদলের  ভারতে পা রাখার বিষয়টি এই জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে যে দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে রাখতে হয় সেই পাঠ এখনো শেখেনি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনপক্ষের তরফে  তাদের বাংলাদেশি প্রতিপক্ষদের আশ্বস্ত করা গুরুত্বপূর্ণ যে তারা অন্য কারও সুরে কথা বলছে না। সামপ্রতিক বছরগুলোতে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সংলাপের বেশির ভাগই চীন এবং ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। চীনের কথা মাথায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।  হাসিনা সরকার এবং তার সমর্থকরা বেইজিংয়ের  কাছাকাছি যাওয়ার কৌশল নিয়ে বাংলাদেশের  গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রতি আমেরিকার মনোযোগ সরাতে চেয়েছিলেন।   কখনো কখনো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই  ফাঁদে পা দিয়েছিল বলেও  মত বিশেষজ্ঞদের।  ৫ই আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তার উন্নয়নে বাংলাদেশের ভূমিকাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে। বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকার দিকে মনোনিবেশ করার পরিবর্তে, চীনকে ঠেকাতে জুলাই বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা একটি শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। একটি পারস্পরিক  অংশীদারিত্বের বিকাশে প্রতিশ্রুতি প্রদর্শনের জন্য উভয়পক্ষের কাছে বেশ কয়েকটি সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, গত পনেরো বছরে সংঘটিত অপরাধের জন্য বাংলাদেশের জবাবদিহিতার আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ  অবস্থানে রয়েছে (জুলাই/আগস্টে বিশেষ ফোকাসসহ)। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ফৌজদারি বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি আর্থিক অপরাধের জন্য দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়ার প্রচেষ্টা। সহযোগিতার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডাকে সমর্থন (দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সংস্থার মাধ্যমে) অন্তর্ভুক্ত। নিঃসন্দেহে, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার  আরও টেকসই সমাধান নিয়ে উভয় দেশ  আলোচনা করবে। 

mzamin

Tuesday, September 3, 2024

ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা ভারতের কূটনৈতিক মাথাব্যথা হয়ে উঠেছেন -এএফপি’র রিপোর্ট

ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে ভারতে গিয়ে ভারত সরকারের কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা। ছাত্রদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে বিপ্লব হয়েছে তাতে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আকাশপথে পালিয়ে নয়াদিল্লি চলে যান। তা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা চারদিকে। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ভারতের অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার কারণে তিনি এখন ভারতের  জন্য কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ১৫ বছর ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধীদের ওপর দমনপীড়নের পর গত মাসে শেখ হাসিনার কঠোর শাসনের অবসান ঘটে। বাংলাদেশে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্ররা এখন শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছে ফেরত চাইছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে পর্যন্ত তাকে ক্ষমতায় রেখে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী এই ভারত। আন্দোলনের সময় যেসব প্রতিবাদীকে হত্যা করা হয়েছে তার জন্য শেখ হাসিনার বিচার দাবি করছেন ছাত্ররা।

কিন্তু ৭৬ বছর বয়সী এই নেত্রীকে বাংলাদেশের কাছে ফেরত পাঠালে তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে। এই অঞ্চলে চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারত এমনিতেই তীব্র লড়াই করছে। যুদ্ধ বিষয়ক থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, এটা স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না ভারত। যদি তাকে ফেরত পাঠানো হয় তাহলে এ অঞ্চলে অন্য দেশগুলোর যেসব নেতার সঙ্গে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, তা খুব ইতিবাচক হবে না। তা হলো- ভারত তোমাকে রক্ষা করবে না।  
গত বছর মালদ্বীপে পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ মুইজুর কাছে পরাজিত হতে দেখছে নয়াদিল্লি। পর্যটনের গন্তব্য মালদ্বীপ বেইজিংয়ের দিকে খুব বেশি ঝুঁকে পড়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় এই অঞ্চলে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রকে হারিয়েছে ভারত। শেখ হাসিনার সময়ে তার সরকার যাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, তারা প্রকাশ্যে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মেগাফোন কূটনীতি চালু করেছেন এবং পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের দিকে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ৮৪ বছর বয়সী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকারকে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু মোদি তার ক্ষমতার মেয়াদে হিন্দুত্ববাদের বিশ্বাসকে শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বার বার ড. ইউনূসের প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে ধর্মীয় হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষিত রাখতে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র চেয়ে বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের জন্য আওয়ামী লীগকে বেশি সুরক্ষাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর রেডফোর্টে বার্ষিক স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে মোদি বলেছেন, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিপদে আছেন। পরে তিনি এই ইস্যু উত্থাপন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কিছু হিন্দু ও তাদের মন্দির টার্গেট হয়েছে। কিন্তু তাকে অতিরঞ্জিত করে ভারতের সরকারপন্থি নিউজ চ্যানেলগুলো প্রচার করে। তাতে মোদির দলের সঙ্গে যুক্ত এমন হিন্দুত্ববাদী অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে।
বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শেখ হাসিনাকে সমর্থন করে ভারত তার সব ফল এক ঝুড়িতে রেখেছে। তারা জানতো কীভাবে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া হয়। তিনি এএফপিকে বলেন, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় বাংলাদেশের জনগণ। তবে সেটা তাদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। দুর্ভাগ্যজনক হলো ভারতের মনোভাব আস্থা সৃষ্টির মতো নয়।
এমনই যখন অবিশ্বাসের পরিবেশ তখন আগস্টে ভয়াবহ বন্যা উভয় দেশের বিপুল অংশকে ডুবিয়ে দেয়। এর জন্য অনেক বাংলাদেশি ভারতকে দায়ী করেন। তারা বলেন, তাদের কারণে অনেক মৃত্যু হয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি নয়াদিল্লির কাছে সরকারিভাবে তুলে ধরেনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির কাছে একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে সুরক্ষিত অবস্থায় আছেন। তার বিষয় তুলে না ধরলেও এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করেছেন। এর মধ্যদিয়ে তার সফরের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বন্দি প্রত্যার্পণের চুক্তিতে ২০১৩ সালে প্রথম স্বাক্ষর করে দুই দেশ। ফলে ফৌজদারি অপরাধের বিচারের জন্য শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো অনুমোদন করে। চুক্তির একটি ধারা বলে যে, যদি অপরাধটি ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ হয় তাহলে প্রত্যার্পণ নাও করা হতে পারে। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ঢাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে চাপ সৃষ্টি করলে তিক্ত হয়ে উঠতে পারে। তিনি আরও বলেন,  যেকোনো পরিণত সরকার এটা বুঝতে পারবে যে, ভারতে হাসিনার অবস্থানকে ইস্যু করা হলে তা কারও জন্য সুবিধা দেবে না।

Friday, August 9, 2024

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের বাজি উল্টে গেছে :ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের নিবন্ধ by বেঞ্জামিন পারকিন এবং জন রিড

ভারত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সমর্থক ছিল। নির্বাসিত হবার পর তাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। বাংলাদেশিরা তার বর্বরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করার আগে পর্যন্ত হাসিনার  সরকারকে সমর্থনও  করে এসেছে  । এই সপ্তাহে দীর্ঘসময় ধরে  শাসনকারী প্রধানমন্ত্রীর উপর নয়াদিল্লির বাজি হঠাৎ পাল্টে গেছে। কয়েক সপ্তাহের ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর শেখ হাসিনা সোমবার ভারতে পালিয়ে যান যখন সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবনের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছিলো ।

১৫ বছর পর তার সরকারের আকস্মিক পতন বাংলাদেশে একটি অনিশ্চিত  শূন্যতা তৈরি করেছে।  ১৭০ মিলিয়নের এই দেশটিকে  ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক অংশীদার বলে মনে করা হয় । হাসিনার এই আকস্মিক পতন নয়াদিল্লির আঞ্চলিক কৌশলেও  ধাক্কা দিয়েছে বিশেষ করে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব মোকাবেলা করতে চাইছেন। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে সমর্থন করার ভারতের সিদ্ধান্ত অনেক বাংলাদেশির চোখে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

 ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশি রাজনীতির বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন , এটি ভারতের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন যা হাসিনাকে ক্ষোভ  থেকে রক্ষা করেছে এবং তাকে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করেছে। এই মুহূর্তটি নয়াদিল্লির কাছে একটি বার্তা যে তারা এমন একটি শাসনব্যবস্থার প্রতি  সমর্থন অব্যাহত রেখেছে যার মানবাধিকার রেকর্ড ছিল ভয়ঙ্কর ।'

ভারতীয় কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর যে সহিংসতা হয়েছে তাতে সতর্কতার সাথে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সোমবার বাংলাদেশে ১৩০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করেছেন যে, সংখ্যালঘুদের - বিশেষ করে হিন্দুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সংসদে জয়শঙ্কর বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ বহু দশক ধরে  ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে । স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে  আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার না হওয়া  পর্যন্ত ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন থাকবে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবথেকে বড় ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যা এবং ৩.৫ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির দেশ ভারতের   তার প্রতিবেশীদের সাথে একটি জটিল ইতিহাস রয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে (  যেটি ভৌগোলিকভাবে প্রায় ভারত দ্বারা বেষ্টিত) চরমপন্থী এবং চীনা দখলদারি  নিয়ে চিন্তিত । তারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে ইসলামবাদের প্রতি নরম মনোভাবাপন্ন এবং বেইজিংয়ের নিকটতম  হিসেবে দেখে এসেছে। কিছু ভারতপন্থী সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং নিউজ আউটলেটগুলি বাংলাদেশের বিদ্রোহকে  কিছু ক্ষেত্রে  'পশ্চিমা চক্রান্ত' হিসাবে চিত্রিত করেছে।

শেখ হাসিনার সাথে ভারতের দৃঢ় বন্ধনের মূলে রয়েছে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের ১৯৭১  সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ। সেই মুক্তি যুদ্ধে  ভারত তার  পিতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সমর্থন জানিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে একটি অভ্যুত্থানে তিনি এবং তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য নিহত হওয়ার পর ২৭ বছর বয়সী শেখ হাসিনাকে  দিল্লিতে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে  চীনা প্রভাব বিস্তারের প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং সংযোগ জোরদার করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কৌশলের একটি অংশ হয়ে ওঠেন।

ভারত বাংলাদেশের জন্য ৮বিলিয়ন ডলারের ক্রেডিট  লাইন উন্মুক্ত করেছে , যা এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। রাজনৈতিকভাবে মোদি সরকারের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত আদানি গোষ্ঠী বাংলাদেশে লাভজনক বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি করেছে। দিল্লির এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ফেলো সি রাজা মোহন বলেছেন - 'হাসিনা ভারতপন্থী ছিলেন এবং শাসন  পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত মানসিকতার ছিলেন  ।  কৌশলগত প্রশ্ন হল: আমরা কি সেই  সম্পর্ক তৈরি করতে পারি যা শাসন পরিবর্তনেও  টিকে থাকবে?" তার কর্তৃত্ববাদ এবং দুর্বল মানবাধিকার রেকর্ডকে ঘিরে  ঘরে ঘরে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ সত্ত্বেও , জুনে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনাই প্রথম নেত্রী  যিনি মোদির সাথে দেখা করেন।

জানুয়ারীতে শেখ হাসিনার পুনঃনির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,  যুক্তরাজ্য  বিরোধী বিএনপির বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের ক্র্যাকডাউনের সমালোচনা করলেও ভারতের মুখে তা শোনা যায়নি  এবং কিছু বাংলাদেশি সুশীল সমাজ কর্মী হাসিনার  শাসনকে রক্ষা করার জন্য ভারতের অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন। একজন ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি পণ্ডিত কান্তি বাজপেয়ী বলেছেন , "গত কয়েক বছরে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা আগেই ভারতের ভালোভাবে বোঝা উচিত ছিল। ভারত সরকার এই  ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে গা বাঁচাতে পারতো।  . . এটা এখন একটা সমস্যা।”

শেখ হাসিনার পতন মালদ্বীপের মতো  ভারতের কাছে  আরেকটি কূটনৈতিক ধাক্কা।   নভেম্বরে "ইন্ডিয়া আউট" প্ল্যাটফর্মে নেতৃত্ব দিয়ে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজু  মালদ্বীপে ক্ষমতায় আসেন   এবং ভারতীয় সৈন্যদের প্রত্যাহার করেন । শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানে ভারত প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের সঙ্গে লড়াই করছে। ভারতের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হল শেখ হাসিনাকে নিয়ে এখন কী করা উচিত। জয়শঙ্কর নিশ্চিত করেছেন যে হাসিনা সোমবার "খুব অল্প নোটিশে" দিল্লি পৌঁছান। প্রতিবাদকারীরা  ঢাকার বাসভবনে হামলার  আগে হাসিনাকে  নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করে  ভারত তাকে সম্ভাব্য সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে এবং বাংলাদেশে আরও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সহায়তা করেছিল।

কিন্তু  ৭৬ বছর বয়সী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি  নয়াদিল্লির ভাবমূর্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের সাথে সম্পর্ককে জটিল করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা ।শেখ হাসিনা তৃতীয় কোনো দেশে আশ্রয় চাইছেন, কিন্তু তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ মিডিয়াকে বলেছেন, তার মা  কোথায় যাবেন তা ঠিক করেননি এবং আপাতত কিছুদিনের জন্য দিল্লিতে থাকবেন । জয়শঙ্কর হাসিনার সঙ্গে দেখা করার পর জানান তিনি অত্যন্ত মর্মাহত ছিলেন , কথা বলতে পারছিলেন না। বাংলাদেশের নবনিযুক্ত অন্তর্বর্তী নেতা তথা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন তিনি স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে এবং "নতুন নির্বাচনের একটি রোড ম্যাপ" তৈরি করতে কাজ করবেন।

বাংলাদেশে নতুন নির্বাচন বিএনপিকে একটি প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দিতে পারে, এবং দলটি ভারত বিরোধী তকমা  ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে এসেছে। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল জানিয়েছেন - 'একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিএনপি সবসময় ভারতের দিকে তাকিয়ে । আমরা  আশা করি ভারত সরকার শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির উপর নির্ভর করা বন্ধ করে  ( শেখ হাসিনা)  সরাসরি বাংলাদেশের জনগণের সাথে কাজ করবেন।'

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে যিনিই ক্ষমতায় আসবেন, তার কাছে বৃহত্তর প্রতিবেশীর   সহায়তা চাওয়া  ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির মনে করেন , " বাংলাদেশে কেমন সরকার গঠিত হবে  তা নিয়ে নয়াদিল্লিতে এখন অনেক চাপানউতোর  রয়েছে। কিন্তু ভূরাজনীতি এবং ভৌগলিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে  ভারতের সাথে কাজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।”