Showing posts with label ইকরাম সেহগাল. Show all posts
Showing posts with label ইকরাম সেহগাল. Show all posts

Tuesday, June 30, 2020

মহান আমেরিকান রস পেরট সিনিয়রের কীর্তিগাঁথা by ইকরাম সেহগাল

রস পেরট সিনিয়র ও ইকরাম সেহগাল (বাঁয়ে)
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এই মহান বৃদ্ধলোকটি যখন হেরে যান, তখন তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ডালাসে রস পেরট সিনিয়রের মৃত্যুর খবরটি এসেছিল কষ্টের খবর হিসেবে। এটা ছিল ব্যক্তিগত দুঃখের খবর। কারণ তার ছেলে রস পেরট জুনিয়র আমার অন্যতম সেরা বন্ধু।

টেক্সাসে ১৯৩০ সালে মহামন্দার সময় সাধারণ অবস্থায় জন্মগ্রহণকারী পেরট নিজের চেষ্টায় বিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন। একবার এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন যে তিনি বাস করেন এক ‘আমেরিকান স্বপ্নের মধ্যে,’ যে স্বপ্ন দেখে অনেকে তাদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করে ভাগ্য বদলাতে আমেরিকায় পাড়ি দেয়।

তিনি সাত বছর বয়সে সংবাদপত্র বিতরণের কাজ করেন। প্রতি দিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তিনি পত্রিকা বিলি করতেন। ১৯৫৩ সালে মার্কিন নেভাল একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েট করে তিনি চার বছর নৌবাহিনীতে কাজ করেন। এখানেই তিনি প্রথম কম্পিউটার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। এতে তিনি যে আগ্রহ লাভ করেন তাই তাকে দুটি ডাটা প্রসেসিং কোম্পানির মাধ্যমে ভাগ্য গড়তে সহায়তা করে। তিনি বড় ধরনের মুনাফা নিয়ে ১৯৯০-এর দশকে কোম্পানি দুটি বিক্রি করে দেন।

রস পেরট সিনিয়র ১৯৫৭ সালে নৌবাহিনী ত্যাগ করে আইবিএম সেলসম্যান হন। আইমিএমের সিইও যখন দেখলেন যে এই লোক কমিশনের মাধ্যমে তার চেয়ে বেশি উপার্জন করছেন, তখন তিনি তার আয় হ্রাস করার জন্য কমিশনে সীমা নির্ধারণ করে দেন। পেরট সিনিয়র প্রথম মাসেই ওই সীমায় পৌঁছে যান।

সেলসম্যান হিসেবে তিনি খুবই ভালোভাবে সার্ভিসিংয়ের অভাবের বিষয়টি অবগত ছিলেন। এর ফলে আইবিএম তাদের পূর্ণ ধারণ ক্ষমতায় কম্পিউটার বিক্রি করতে পারছিল না। তিনি বিষয়টি আইবিএমের ব্যবস্থাপকদের অবহিত করলেও তারা তাতে কর্ণপাত করেনি। হতাশ হয়ে রস সিনিয়র ১৯৬২ সালে আইবিএম ত্যাগ করেন।

তিনি মাত্র ১০০০ ডলার পুঁজি নিয়ে ইলেকট্রনিক ডাটা সিস্টেমস (ইডিএস) গঠন করে বিক্রয়োত্তর সেবার দিকে মনোযোগ দেন। ড. ইহসান ও আমি যখন ইডিএস পরিদর্শনে গিয়েছিলাম, তখন তিনি তার স্ত্রীর কাছ থেকে উদ্যোগের প্রথম বিনিয়োগ হিসেবে পাওয়া ঐতিহাসিক ১০০০ ডলারের চেকটি গর্বভরে আমাদের দেখিয়েছিলেন।

আজকের কঠোর বাস্তবতা হলো, বিশ্বজুড়ে আইবিএমের সবচেয়ে লাভজনক অংশ হলো আইমিএম গ্লোবাল সার্ভিসেস। রস সিনিয়র শেষ পর্যন্ত ১৯৮৪ সালে ২.৪ বিলিয়ন ডলারে ইডিএস বিক্রি করেন জেনারেল মটর্সকে। তিনি ১৯৮৮ সালে পেরট সিস্টেমস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি ডেল সিস্টেমস কিনে নেয় ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে।

দুর্দান্ত ভিশনের অধিকারী উদ্যোক্তা রস সিনিয়র স্টিভ জবসের উদ্যোগে ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। তবে এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ত্যাগ করেন। এরপর তার সাফল্য কাহিনী ছিল ‘নেক্সট’।

পেরট সিনিয়র তার দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন, এই দেশের কল্যাণে যত্নবান ছিলেন। তার এত টাকা তাকে উদ্ধত করেনি, তার দেশের জনগণের ভাগ্য সম্পর্কে উদাসীন হননি।

ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের সাথে কঠোর আচরণের খবর পেয়ে তিনি ১৯৬৯ সালে সংগঠিত চেষ্টায় বিমান থেকে খাবার ও চিকিৎসা সামগ্রী ফেলার চেষ্টা করেন। এই চেষ্টাটি সফল হয়নি। তিনি এই কাজে কেবল হ্যানয় বা মস্কোর কাছ থেকেই বাধার মুখে পড়েননি, সেইসাথে ওয়াশিংটনেও বৈরী অবস্থায় পড়েন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ সমাপ্তির অনেক পরও তিনি এই যুদ্ধবন্দীদের প্রতি আবিষ্ঠ ছিলেন। প্রতিটি যুদ্ধবন্দীর নিরাপদে ফেরা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার জন্য তিনি প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন।

তার কোম্পানিতে কর্মরত দুই কর্মী ১৯৭৮ সালে শাহের পতন্মুখ সরকারের সাথে চুক্তিগত বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতির অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়। কোম্পানিকে বলা হয়, তাদের মুক্তির জন্য ১২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে। কার্টার প্রশাসনের উদাসিনতা লক্ষ্য করে এবং তার কর্মীদের ভাগ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি অবসরপ্রাপ্ত স্পেশাল ফোর্সেস অফিসার কর্নেল আর্থার সাইমন্সের নেতৃত্বে একটি উদ্ধার মিশন গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে শাহের নির্বাসনবিষয়ক বিশৃঙ্খলার মধ্যে তারা প্রথমে কিছুই করতে পারেননি। তবে বিপ্লবী জনতা তেহরানের কাসর কারাগারে হামলা চালিয়ে এক হাজার বন্দীকে মুক্ত করলে তাদের সুযোগ আসে। পেরট ও সাইমন্স অবশেষে তাদের সহকর্মীদের পেয়ে তাদেরকে ভ্যানে চড়িয়ে নিয়ে আসেন। তাদের এই উদ্ধার অভিযানটি ছিল রোমহর্ষক।

এই ঘটনাতে উদ্দীপ্ত হয়ে কেন ফোলেট ‘অন উইয়িং অব ইগলস’ ও টেলিভিশন মিনি সিরিজ নির্মাণ করেন। কর্মীদের উদ্ধারে তার এই উদ্যোগের ফলে তার জাতীয় স্বীকৃতি মেলে।

তিনি কখনো সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ না করেই ১৯৯২ সালে এক টকশোতে ঘোষণা করেন যে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন। প্রচারণাকালে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট, চাকরির জন্য বিদেশে আউটসোর্সিংয়ের কথা তুলে ধরেন।

তিনি নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রে এগ্রিমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলেন, এমনটা হলে প্রধানত এশিয়ানদের কাছে আমেরিকানরা চাকরি হারাবে।

তিনি আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন। এ দিক থেকে তিনি ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বসূরী। পেরটের ছোট সরকার ও বিশ্বায়নবিরোধী দাবির কারণেই ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ১৯৯২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৩৯ ভাগ জনমত পেয়ে এগিয়ে থাকা অবস্থাতেই অজ্ঞাত কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যান।

তবে অনুসারীদের অনুরোধে আবার নির্বাচনে এসেছিলেন ১ এপ্রিল। কিন্তু তখন আগের ধারাটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে তিনি হয়েছিলেন তৃতীয়। বিল ক্লিনটন পেয়েছিলেন ৪৫ ভাগ, জর্জ বুশ ২৭.৫ ভাগ আর তিনি ১৯ ভাগ। মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীর এটিই সেরা সাফল্য।

রাজনৈতিক পরিকল্পনা ত্যাগ করে ১৯৯৬ সালে তিনি তার ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পেরট সিস্টেমস করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও সিইওর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০০ পর্যন্ত তিনি ছিলেন কোম্পানিটির প্রধান। ৭০ বছর বয়সে তিনি তার ছেলে রস পেরট জুনিয়রের কাছে দায়িত্বভারটি অর্পণ করেন।

তবে দেশ নিয়ে তার উদ্বেগ কখনো কমেনি। আমেরিকার জাতীয় ঋণ নিয়ে তিনি চিন্তায় ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি তার দেশবাসীকে সচেতন করতে থাকেন।

আমি ১৯৯৪ সালে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার ছেলে জারারের গ্রাজুয়েশনের সময় আমি প্রথম রস পেরট সিনিয়রকে দেখি। তিনি ছিলেন ওই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ভালো বক্তা। পরে তার ছেলে রস পেরট জুনিয়রের সুবাদে আমি পেরট পরিবারের ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলাম। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল পেরট সিনিয়রের সাথে সাক্ষাত করার। ২০১৩ সালে প্রথম সাক্ষাতের সময় তার বয়স ছিল ৮৩ বছর।

রস জুনিয়রও অন্যদের মতো ধনী নন। তিনি তার পিতার মতোই দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ মানুষ। তিনিও নানা সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন।

ডাভোসে পাকিস্তান ব্রেকফাস্টে আমার একটি বড় সাফল্য ছিল রস জুনিয়রের উপস্থিতি। তিনি টানা কয়েক বছর এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ব্রেকফাস্টে ২০১২ ও ২০১৩ সালে ইমরান খান (তখন তিনি ছিলেন স্রেফ একজন পরিচিত রাজনীতিবিদ) উপস্থিত ছিলেন, তখন তিনিও ছিলেন। তিনি তখনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এই লোক নিকট ভবিষ্যতে তোমাদের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার কথা সত্যে পরিণত হয়েছে।

জর্ডানের আম্মানে কয়েক বছর আগে গত ইস্ট ওয়েস্ট ইনস্টিটিউট (ইডব্লিউআই) ডিরেক্টর্স বোর্ড মিটিংয়ে রস জুনিয়র ও আমার উভয় পরিবার দারুণভাবে একত্রিত হয়েছিলাম।

রস পেরট সিনিয়রের মৃত্যুর পর এক বিবৃতিতে পেরট পরিবার যথার্থভাবেই বলেছে যে ব্যবসা ও জীবনে রস ছিলেন সৎ ও কাজের লোক। একজন দেশপ্রেমিক আমেরিকান, বিরল ভিশনের অধিকারী, নীতিবান ও গভীর সহানাভূতিসম্পন্ন লোক হিসেবে তিনি সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধফেরত সৈনিকদের প্রতি অটল সমর্থন ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছেন।

টেক্সাসের পেরটরা সত্যিই মহান আমেরিকান পরিবারগুলোর অন্যতম।

>>>লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Wednesday, October 2, 2019

আইসিজে কার্যত ভারতকেই সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে by ইকরাম সেহগাল

ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মরত অফিসার কূলভূষণ যাদব (১৯৯১ সালে কমিশনপ্রাপ্ত, গ্রেফতারের সময় ছিলেন লে. কমান্ডার র‌্যাংকে) ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর এজেন্ট হিসেবে পাকিস্তানের ভেতরে অন্তর্ঘাত চালানোর কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাকে ২০১৬ সালের মার্চে বালুচিস্তান থেকে গ্রেফতার করা হয়। ভিডিও টেক করা জিজ্ঞাসাবাদে কূলভূষণ জানান, ২০০১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় পার্লামেন্টে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে র-এর হয়ে কাজ করতে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন তিনি। ভিডিওতে তিনি স্বীকার করেন যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কিংবা বেসামরিক যে কোনো লোককে হতাহত করার জন্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সহিংসতামূলক কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন। পাকিস্তানের একটি সামরিক আদালতে ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাগত সাফল্য।

ভারত ও র কখনো এই লোক বা তার কার্যক্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। তারা এমনকি বালুচিস্তান বা পাকিস্তানে তাকে আটক করার কথাও অস্বীকার করে যাচ্ছে। তারা বলছে যে তাকে ইরান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিজে) যে রায় দিয়েছে তাতে যাদবের মুক্তি ও তাকে ফেরত দান ও প্রত্যাবর্তনের ভারতের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে কার্যত পাকিস্তানের সামরিক আদালতের রায়কে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। রায়ে ভারতের জন্য যেটুকু স্বস্তি রয়েছে তা হলো তাকে ‘কনস্যুলার এক্সেস’ প্রদান করা হবে। এই সিদ্ধান্তের কারণ আইসিজে কনস্যুলার এক্সেস নিয়ে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটিকে বৈধ বলে স্বীকার করেনি (এটি জাতিসংঘে নিবন্ধিত নয় বলে)। দ্বিপক্ষীয় ভারত-পাকিস্তান কনস্যুলার এক্সেস চুক্তিটি দুই পক্ষ সই করে ২০০৮ সালে। এতে গোয়েন্দাদেরকে কনস্যুলার এক্সেস প্রদান স্পষ্টভাবেই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তান এটি জাতিসংঘে নিবন্ধন করেনি। পাকিস্তান যদি জাতিসংঘে এটি নিবন্ধন করে নিত, তবে আইসিজে এতে সম্পৃক্ত হতো না। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারে। কারণ উভয়ে জানত যে এ ধরনের পরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটতে পারে। চুক্তিতে সই করার ফলে ভারত এ সম্পর্কে জানত, কিন্তু সেটি তার নিজের আইনে বাতিল করেছে। চুক্তি সই করে পরে তা নিয়ে প্রয়োজনে অভিযোগ করাটা একটি ভণ্ডামি। ভারত আইসিজেকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচার করছিল যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের মদতদাতা দেশ। আইসিজে রায় কিন্তু বিপরীতই হয়েছে, রায়ে ভারতকেই সন্ত্রাসে মদতদাতা দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

পাকিস্তান বলে আসছে যে ভিয়েনা কনভেনশন গুপ্তচরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এটি বৈধ যুক্তি হলেও আদালত তা গ্রহণ করেনি। তুলনামূলকভাবে আলাদা ও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে থেকে দি হেগ আসলে বুঝতে পারছে না যে ১৯৬৩ সালে সই হওয়া ও ১৯৬৭ সালে ১৮০টি দেশে অনুস্বাক্ষরিত হওয়া চুক্তিটি বর্তমানের গোপন যুদ্ধেরকালে ভিন্ন আবহ সৃষ্ট করেছে। ১৯৬৩ সালে চুক্তিটির সময় স্নায়ুযুদ্ধ ছিল সর্বোচ্চ মাত্রায়। ওই সময় কনস্যুলার অফিসাররা ছিলেন যোগাযোগের জন্য মুক্ত। বিদেশী নাগরিকরা আটক হলে তাদের দূতাবাসগুলোকে বিষয়টি জানানো হতো, যাতে কনস্যুলার অফিসাররা তাদের সাথে সাক্ষাত করে বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

আর ১৯৬১ সালে কিউবায় সিআইএ বিদ্রোহী গ্রুপ ব্রিগেড ২৫০৬ গঠন করেছিল। ওই সময়ও সন্ত্রাসবাদ আর হাইব্রিড যুদ্ধের অস্তিত্ব ছিল। তবে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে হাইব্রিড যুদ্ধ নতুন মাত্রা লাভ করেছে। এখন ভিয়েনা কনভেনশন সেকেলে হয়ে পড়েছে। নতুন পরিস্থিতিতে এটির অবস্থায় সমন্বয় সাধন করতে হবে। যখন রাষ্ট্রই হয় আগ্রাসী, সেই রাষ্ট্র যখন সন্ত্রাসী পাঠায়, তখন আটক সন্ত্রাসীর জন্য কনস্যুলার এক্সেস কতটুকু বৈধ হয় তা দেখার বিষয়।

তবে অতি সম্প্রতি রেকো ডিক চুক্তি নিয়ে পাকিস্তান একটি মামলায় হেরে যাওয়ার পর আইসিজে পাকিস্তানকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। আর ফেব্রুয়ারিতে বিমান বাহিনীর পাকিস্তান হামলার পর এটি ভারতের জন্য ছিল আরেকটি বিপর্যয়। ওই বিমান হামলায় ভারতের দুটি জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করে পাকিস্তান, তাদের এক পাইলট পাকিস্তানের মাটিতে ধরা পড়ে। এটা ছিল তাদের কাছে শোচনীয় পরাজয়। অবশ্য ভারতীয় মিডিয়া এই রায়কে বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলগুলো বাস্তবতা সম্পর্কে খুবই সচেতন, তারা কষ্ট অনুভব করছে। তবে আমরা এখান থেকে কোথায় যাব?

রায়ের পর একটি কর্তব্য হলো ইন্দো-পাকিস্তান এগ্রিমেন্ট অন কনস্যুলার এক্সেসটি জাতিসংঘে পাস করানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এছাড়া আইসিজে ও জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থায় ভারতের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আলোচনা শুরু করা দরকার পাকিস্তানের।

ভারতের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আইসিজে কার্যত ভারতকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক মহলসহ সব ফোরামে প্রচার করতে হবে। আরেকটি প্রশ্ন হলো, মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হবে কিনা? বাস্তবতা হলো, যাদবের একটি ক্ষমার আবেদন স্থগিত রয়েছে। অবশ্য যাদবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে ইন্দো-পাকিস্তান সম্পর্ক আরো জটিল হয়ে পড়বে।

পাকিস্তান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাদবের মামলাটি সামাল দিয়ে আসছে। আর এ কারণেই আইসিজেও সামরিক আদালতের রায়কে বাতিল করে দেয়নি। আর এর মাধ্যমে আইসিজে পাকিস্তানের সামরিক আদালত ও এর রায়কে বৈধতা দিয়েছে। আর এর মাধ্যমে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে আইসিজে। সন্ত্রাসীদের (এবং তাদের রাষ্ট্রীয় মদতদাতারা) উচিত হবে বিষয়টি লক্ষ্য রাখা।

>>>লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Wednesday, August 14, 2019

ভারতের মুখোশ খুলে দিতে দেশে দেশে দূত পাঠাতে হবে পাকিস্তানকে by ইকরাম সেহগাল

ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৫এ ও ৩৭০ অনুযায়ী কাশ্মীরীরা বিগত পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে যে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে আসছিলো বিজেপি তা বাতিল করতে পারে কিনা সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। যদি তাই হয়, তাহলে ভারতের পার্লামেন্টে কোন ভোটভুটি ছাড়াই শুধু প্রেসিডেন্টের আদেশের বলে দেশের আইনে (ল’ অব দি ল্যান্ড) এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আনা যায় কিনা সেটাও একটি প্রশ্ন।

বিজেপি’র সিদ্ধান্তটি ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোর প্রায় সবাই এর বিরোধিতা করেছে। তবে, মোদির সত্যিকারের বিরোধিতা করার মতো শক্তি সেখানে বিরোধী দলগুলোর নেই।

গত নির্বাচনে লজ্জাজনক পরাজয়ের পর রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (আইএনসি)’র নেতৃত্ব এখন পুরোপুরি বিশৃঙ্খল অবস্থায়। আর মোদি সরকারের মূল রাজনৈতিক মন্ত্র হলো ‘জোর যার মূলুক তার’, কোন আনুষ্ঠানিকতার ধার তারা ধারে না।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় যেতে বিজেপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিলো ধারা ৩৭০ ও ৩৫এ বাতিল করা। তাই তাদের কাজটি প্রত্যাশিত ছিলো।

গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে ভারত তার আগ্রাসী চেহারা প্রকাশ করে দেয়। এতে তারা দুটি জঙ্গিবিমান খোয়ায় ও একজন পাইলটকে হারায়। আরেক পাইলট পাকিস্তানের হাতে ধরা পড়ে। এরপর আসে আইসিজে’র রায়, যেখানে ভারতীয় গুপ্তচর কুলভূষণ যাদবকে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করে নেয়া হয়। ভারত শুধু জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ‘কনস্যুলার এক্সেস’ বিষয়ে ছাড় পায়।

নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপার থেকে পাকিস্তানী ভূখণ্ডে গোলা বর্ষণ, পাকিস্তানের বেসামরিক লোকদের বিরুদ্ধে গুচ্ছ বোমা ব্যবহার ভারতের গভীর হতাশাকেই প্রকাশ করে দিয়েছে। তাছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সফল যুক্তরাষ্ট্র সফর দুই দশক ধরে ভারতের ছড়ানো পাকিস্তান-বিরোধী বয়ানকে মিথ্যা প্রমাণিত ও বাতিল করে দিয়েছে।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার ব্যাপারে ট্রাম্প যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাও ভারতকে ক্ষুব্ধ করেছে। এটা কাশ্মীরের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা গ্রহণে বিজেপি’কে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

কাশ্মীরে মাত্র সাত মিলিয়ন মানুষকে সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অর্ধ মিলিয়ন সদস্যকে আগে থেকেই মোতায়েন করে রাখা হয়েছিলো। সাম্প্রতিক সময়ে আরো ৩০,০০০ সেনা মোতায়েন করা হয়। সেখানে থেকে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের জোর করে বের করে দেয়া হয়। পাকিস্তান সীমান্তের কাছে বিপুল সংখ্যক সেনা সমাবেশ করা হয়। তখনই বোঝা গিয়েছিলো যে বড় কোন কাজ করতে যাচ্ছে ভারত।

পৃথিবীতে ভারত একমাত্র দেশ যারা আফগানিস্তানে শান্তি কায়েম নিয়ে বিচলিত। আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। তাহলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ অব্যাহত রাখা ছাড়া ভারত কি শান্তিতে থাকতে পারে? কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল কি মার্কিন-তালেবান শান্তি আলোচনাকে নস্যাৎ করার কোন মরিয়া প্রচেষ্টা?
ভারতীয় নিরাপত্তা সদস্যদের লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ছে কাশ্মীরী তরুণরা
>>>লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক