Tuesday, August 27, 2013

শিকাগোর ঝকঝকে রোদ, কার্বন বাণিজ্য by কামরুল ইসলাম চৌধুরী

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে গ্রীষ্মের ঝকঝকে রোদ। সেই সাত-সকালে জুলাইয়ের নরম রোদ মাখিয়ে লেক মিশিগানের তীর ধরে আমাদের ট্যাক্সি ছুটে চলেছে হোটেল হায়াত রিজেন্সি ম্যাকর্নি প্লেস অভিমুখে। সঙ্গে ১৭ বছরের কিশোর দূত শাহ মিম রাফায়াত চৌধুরী। নেপালি স্মার্ট তরুণ ট্যাক্সিচালকের প্রশ্ন : ‘তোমরা কি নোবেলজয়ী আল গোরের জলবায়ু সম্মেলনে যাচ্ছো?’ কানাডার টরন্টো নগরী লাগোয়া লেক মিশিগানের নদী জলরাশি ফুঁড়ে ততক্ষণে লাল আভা ছড়িয়ে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি তাড়িয়ে আকাশজুড়ে সূর্য উঠেছে। ট্যাক্সিচালককে বললাম, ‘হ্যাঁ, ৭টার আগে ওখানে পৌঁছতে হবে।’ আল গোরের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক। রাফা আর আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক হয়ে শিল্পনগরী শিকাগো পৌঁছেছি। এখনও দু’দিনের টানা জেট ল্যাগ কাটেনি। আল গোরের নিমন্ত্রণ বলে কথা। কত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ছুটে আসা হল এই সুদূর মার্কিন মুল্লুকে। ছেলে তার ছোটবেলার আইডল আল গোরের একটুখানি সান্নিধ্য পাবে এ আশায়। কাঁটায় কাঁটায় দিনের কর্মসূচি প্রাতঃরাশ দিয়ে শুরু। সাতটার আগেই সবাই হাজির। রসকষহীন বিষয় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ, বিরূপ প্রভাব, বিপন্নতা, স্লাইড শো, ভিডিও ক্লিপ, তথ্য-উপাত্তসহ উদাহরণ দিয়ে অসাধারণ বাগ্মিতায়, হাসি-কৌতুকের ব্যঞ্জনায়, অনন্য প্রাঞ্জলতায় আল গোর তার ভাষণ দিয়ে চলেছেন। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার মোড় ঘোরানো শিক্ষকের কথা উঠল, কী করে তিনি সদ্য তরুণ আল গোরকে জলবায়ু পরিবর্তন বিজ্ঞানের সঙ্গে পরবর্তী গোটা জীবন জড়িয়ে দিলেন। জলবায়ু পরিবর্তন যে হচ্ছে, তা যে ধ্র“ব সত্য, ইনকনভেনিয়েন্ট ট্র–থ, সে কথা নানাভাবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বুঝিয়ে চললেন তিনি। বাবা-ছেলে আমরা দু’জন কত কাছ থেকে তার সম্মোহনী ভাষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছি। হƒদয়ঙ্গম করছি। রাফায়াত সেই ২০০৬ সালে গোরের ‘ইনকনভেনিয়েন্ট ট্র–থ’ ছবিটি দেখেছে অতি কাঁচা বয়সে। বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা ওর মুখস্থ।
আল গোর তার জীবনের ভুল-শুদ্ধ, চড়াই-উৎরাই সবকিছু ক্লাইমেট রিয়েলিটি লিডারশিপ প্রশিক্ষণে আসা সবার সঙ্গে অকপটে শেয়ার করলেন। তার জলবায়ু ভাবনার কথা জানালেন। বারবার কৃতজ্ঞতা জানালেন আমরা তার ডাকে সাড়া দিয়েছি বলে। জলবায়ুতাড়িত বিপন্নতা, সর্বগ্রাসী সংকটের চিত্র আঁকলেন। তার আশংকার কথা জানালেন। সমাধানের পথ বাতলালেন। হারিকেন স্যান্ডি, সিডর-আইলার কথা বললেন। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত ও দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জলবায়ুতাড়িত বিপর্যয়ের কথা বললেন বিস্তারিত ও বিরামহীনভাবে। ওবামার সাম্প্রতিক জলবায়ু ভাষণের প্রশংসা করে বললেন, জলবায়ু সংকট সমাধানের জন্য এখন কার্বন ট্যাক্স চালু করা জরুরি। নইলে কার্বণ দূষণ থামানো যাবে না। জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলার সুবর্ণ সুযোগ হেলাফেলায় হারানো যাবে না। রাষ্ট্রনায়কদের চটজলদি সমঝোতায় পৌঁছতে হবে, জরুরিভাবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কার্যক্রম নিতে হবে।
বিকালের চা বিরতির ফাঁকে আল গোর প্রতিষ্ঠিত ক্লাইমেট রিয়েলিটি প্রোগ্রামের বোর্ড সদস্য অস্ট্রেলিয়ান ডন হেনরি কাছে এসে অনুযোগের সুরে বলল, ‘তুমি আল গোরের সঙ্গে কিয়োটো প্রটোকল তৈরির সময় কাজ করেছ, তা বলনি তো? তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে আমি খুবই সৌভাগ্যবান। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তুমি আসায় আল গোর খুবই খুশি হয়েছেন। আরও আনন্দিত হলাম তোমার ছেলে এ প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বলে। তোমাদের পিতা-পুত্রের সঙ্গে আল গোর একান্ত বিশেষভাবে কথা বলতে চাইছেন।’
শুনে তো রাফা তখনই ছটফট শুরু করেছে। মিনিট বাদে আরও দু’জন কর্মকর্তা এসে জানালেন, দিনজুড়ে ভাষণ উপস্থাপনা শেষে সন্ধ্যায় আমাদের দু’জনকে একান্তে কথা বলার সময় দিয়েছেন সাবেক আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট। আর রাতে অতি অল্পসংখ্যক আমন্ত্রিত ভিআইপি ডিনার রিসেপশনে বাপ-বেটাকে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে আমাদের দু’জনকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়া হল বেসমেন্টের সিঁড়ির পাশে জলবায়ু তথা শান্তিতে নোবেলজয়ীর অস্থায়ী ক্যাম্পের সামনে। রাফা তার ‘বর্ণ টু স্মাইল’ আল গোরের হাতে তুলে দিল। দেখলাম কী নিবিড়ভাবে প্রতিটি পৃষ্ঠায় তিনি চোখ বুলিয়ে যাচ্ছেন। আমার ছেলের কাজ দেখছেন কী অবাক বিস্ময়ে। ১৭ বছরের এক কিশোরের লেখা, সম্পাদনা, তথ্য-উপাত্ত চিত্র। রাফার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ব্যক্তিগত আলোকচিত্রীদের বললেন। আমি আল গোরকে বললাম, ‘তুমি ওর ছোটবেলার আইডল।’ আল গোর তার হাতের মায়াবী পরশ আমার ছেলের মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘না, তুমি ওর বড় আইডল। তুমি এখনও জলবায়ু নেগোসিয়েশন নিয়ে সেই আগের মতোই লেগে আছ। আই এডমায়ার ইওর টেনাসিটি অ্যান্ড গ্রেট কমিটমেন্ট।’
ডিনার রিসেপশনে আল গোর আবার রাফার সঙ্গে ছবি তুললেন। ঠিকভাবে ছবি উঠেছে কি-না পরখ করে দেখলন। বললাম, ‘আগামী নভেম্বরে ওয়ারশ জলবায়ু সম্মেলনে যেতে হবে। ওবামা ও অন্যদের সঙ্গে কথা বলো। নইলে জলবায়ু নেগোসিয়েশনে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে।’ বললেন, ‘আমি বদলেছি, তুমি কিন্তু একদম বদলাওনি হে আমার বন্ধু। কথা দিলাম কথা বলব। তোমরাও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাও।’
২ আগস্ট শিকাগো থেকে নিউইয়র্ক ফেরার পথে বারবার মনে হচ্ছিল, জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় বৈশ্বিক প্রয়াস কতটা সফল হবে নিকট-আগামীই তা বলে দেবে। কার্বন বাণিজ্য লবির অর্থ ও ক্ষমতা বৃত্ত ভেদ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করবে তার ওপর।
কামরুল ইসলাম চৌধুরী : উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অন্যতম শীর্ষ জলবায়ু নেগোসিয়েটর, জাতিসংঘ অভিযোজন কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের চেয়ারম্যান

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের দুর্বলতা দূর করতে হবে by ধীরাজ কুমার নাথ

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ দিন অবধি, যার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান তখন পাকিস্তান প্রতিরক্ষা অধ্যাদেশ এবং পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধি জারি করেন। তদানীন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের অতিশয় বুদ্ধিমান কর্মকর্তাদের পরামর্শে এবং ভূমি প্রশাসনের কর্মচারীদের প্ররোচনায় সংখ্যালঘুদের জায়গা-সম্পত্তিগুলো শত্র“সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে আইন করে এবং রাতারাতি ইজারা নিয়ে দখল করে ফেলা হয়। এ দখলকারীরা ছিল বেশিরভাগ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কানুনগো, তহসিলদার ইত্যাদি। তবে রাজনৈতিক কর্মীরাও বিভিন্ন সময়ে কখনও বন্ধু হিসেবে, আবার কখনও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এসব সম্পত্তির মালিক বনে যান। সংক্ষেপে বলা যায়, এ কালাকানুন পাকিস্তানে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের জীবনে এক অন্ধকার যুগের সূচনা করে, যা গত ৪৮ বছর ধরে সমান তেজে ও তৎপরতায় বহাল আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি, বিভেদ ও হিংসাকে দীর্ঘায়িত করেছে ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ড. আবুল বারকাতের গবেষণালব্ধ প্রকাশনা ‘বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের অবিরাম বঞ্চনার কাহিনী’তে (উবঢ়ৎরাধঃরড়হ ড়ভ ঐরহফঁ গরহড়ৎরঃু : ধ ংঃড়ৎু ড়ভ ঢ়বৎঢ়বঃঁধষ ফরংপৎরসরহধঃরড়হ) উল্লেখ আছে, ১৯৬৫ থেকে ২০০৬ সাল অবধি ১২ লাখ গৃহস্থালী পরিবার এবং ৬০ লাখ লোক শত্র“/অর্পিত সম্পত্তি আইনের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা ২৬ লাখ একর জমি হারিয়েছেন। সবচেয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে, এ অবিরাম বঞ্চনা একটি সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা এ জনপদের ঐতিহাসিক ভাবধারার পরিপন্থী। গত ২৮ ফেব্র“য়ারির পর হিন্দু মন্দির ভাঙার যে অবিরাম ঘটনা ঘটছে, তার অন্যতম একটি কারণও এ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের পরিণতি।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই আইন সংশোধন করে সংখ্যালঘুদের ওয়ারিশদের, যারা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছে, তাদের সম্পত্তি ফেরত দানের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু উদ্যোগটি মনোযোগ অথবা সদ্দিচ্ছার অভাবে ২০০১ সাল অবধি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ দলটি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে সংখ্যালঘুদের দাবির মুখে আবার বিষয়টি বিবেচনায় আনে। তবে ৪ বছর সময় লাগে এ কাজ শুরু করতে। অবশেষে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন ২০১১ এবং ২০১২ সালে এর সংশোধনী জারি করে । এ আইনে ‘ক’ ও ‘খ’ তফসিল সৃষ্টি করে অর্পিত সম্পত্তি চিহ্নিত করে এবং পৃথক ট্রাইব্যুনাল তৈরি করে। ইতিমধ্যে ৬ লাখের বেশি মামলা হয়েছে এসব ট্রাইব্যুনালে। নিষ্পত্তির সংখ্যা ১ শতাংশের কম। অনেকে মনে করেন, তাও হয়েছে মূলত রাজনৈতিক কারণে। হাইকোর্টের এক রায়ে ১৯৭৪ সালে শত্র“সম্পত্তি আইনের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চের রায়ে বলা হয়েছে যে, সেই সময়ের পর নতুন করে কোনো সম্পদকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তফসিলভুক্ত করা যাবে না। ভুক্তভোগীরা আশা করেছিল, ১৯৭৪ সালের রায় মেনে অর্পিত সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতার অবসান হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন অর্পিত সম্পত্তি নামে একটি ‘খ’ তফসিল সৃষ্টি করে যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে নতুন নতুন সম্পত্তিও অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ফলে এটি এক ভয়াবহ পরিস্থিতি ও নতুনভাবে বিবাদের সূচনা করেছে। তালিকাটি দিনের পর দিন বড় হচ্ছে। অনেকের মতে, এ নতুন তফসিল একদিকে যেমন বেআইনি, অপরদিকে সম্পূর্ণ ত্র“টিপূর্ণ, যা বিভেদের সূত্রপাত করেছে নতুনভাবে। দৈনিক সংবাদ পত্রিকা তাদের ৭ আগস্ট প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে, ‘‘যেহেতু তথাকথিত অর্পিত সম্পত্তি একশ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তির দখলে আছে এবং এর সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তাও জড়িত, সেহেতু ‘খ’ তফসিলের উদ্ভাবন করা হয়েছে। আর এ প্রভাবশালী দখলদারদের বেশিরভাগই হচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।’’ অনেকে মনে করেন, সরকার একটি দুর্বল আইন প্রণয়ন করেছে ইচ্ছাকৃতভাবে, তহসিলদারদের প্ররোচনায় বা প্রভাবে। কর্তাব্যক্তিরা বুঝতেই পারেননি কোনটির অর্থ কী বা এর ফল কী হতে পারে। তাদের অজ্ঞতার সুযোগে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ভুক্তভোগীদের অধিকার হরণ করা হয়েছে। এছাড়া অনেকের বদ্ধমূল ধারণা, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ বিষয়ে আদালতের রায় অনুযায়ী এখনই বিহিত করা না হলে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবল দূর করা সহজ হবে না।
কিভাবে সৃষ্ট এ সমস্যার সমাধান করা যায় তা নিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। পরীক্ষা করে দেখতে হবে, কেন ট্রাইব্যুনালগুলো কাজ করতে পারছে না বা করছে না। কোথায় দুর্বলতা? এ ধরনের দুর্বলতা উদ্দেশ্যমূলক অথবা আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা কি-না, বিশেষ পর্যবেক্ষণ দল তা পরীক্ষা করে দেখতে পারে। অবশ্যই অর্পিত সম্পত্তিবিষয়ক বিচারিক কার্যক্রমকে দ্রুত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টের রায়ে অর্পিত সম্পত্তি আইনটির মৃত্যু হয়েছে ১৯৭৪ সালে। তাই ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চের পর যেসব সম্পত্তি ‘ক’ তফসিলভুক্ত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে গেজেট করা হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে। সরকারের ভেতর থেকে সরকারি আইনকে যারা উপেক্ষা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, বেআইনিভাবে তৈরি করা ‘খ’ তফসিল বাতিল করতে হবে। চতুর্থত, অর্পিত সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণে যে জটিলতা রয়েছে, তা কোর্টের নজির বা অতীতের রায়ের আলোকে সুরাহা করতে হবে। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে শত্র“ সম্পত্তির মালিককে যদি খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে তার মৃত্যু হয়েছে বলে গণ্য করা যেতে পারে। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারা মতে ৭ বছরের অধিককাল কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া না গেলে তার মৃত্যু (সিভিল ডেথ) হয়েছে বলে ধরা হয়। হিন্দু আইনে ১২ বছর অবধি কোনো ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া না গেলে ধরে নেয়া হয় তিনি মৃত। স্বামীর খোঁজ ১২ বছর না পেলে হিন্দু মহিলারা শাঁখা ভাঙে এবং সিঁদুর মুছে ফেলে। এ আইনে এ ব্যাপারে যে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে তার নিরসন অবশ্যই করতে হবে।
পরিশেষে বলতে হয়, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি ২০০১ সালের মধ্যে। এবারও ২০১১ সালে এসে কাজটি হাতে নিয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবরের আগে কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন করতে পারবে বলে মনে হয় না। যদি দলটি আবার ক্ষমতাসীন হয়, তাহলেও ২০১৯ সালের আগে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে হয় না। যদি অন্য কোনো দল বা জোট ক্ষমতাসীন হয়, তবে তারা নতুন করে ভেবে দেখবে কী করা যায়। তাতেও হয়তো ২০১৯ সাল এসে যাবে। অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে মাত্র ৭ দিনে যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তার কুফল ভোগ করবে ৭০ বছর এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে। এজন্যই বোধ হয় কবি বলেছেন ‘জন্মই তোমার আজন্ম পাপ’। বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের মতো প্রিয় হচ্ছে ‘ভূমি’। অথচ এ দেশে কোনো সরকার ভূমি সংস্কার বা মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি পরিহারের মাধ্যমে ব্যাপক সংস্কার সাধনে মনোনিবেশ করেনি। কারণ তাদের অনেকেই এর সুবিধাভোগী এবং উকিল-মোক্তার শ্রেণীর লোকজন। এ ধরনের মামলা না থাকলে তাদের আয়-রোজগার চলবে না বা তারা নিজেরাও মাতব্বরি করতে পারবে না। দেশে প্রায় প্রত্যেক সভা-সমিতিতে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণের স্পন্দন বক্তৃতামালায় প্রকাশ পায় অবারিতভাবে, সাবলীল কথামালায়। কিন্তু ভেতরে-বাইরে তাদের ব্যাপক পার্থক্য। এটা জাতির দুর্ভাগ্য। অর্পিত সম্পত্তির সমস্যার সমাধান অত্যন্ত জরুরি। এ সমস্যা জাতীয় সংহতি ও সহমর্মিতার পথে অন্যতম অন্তরায় হিসেবে অবস্থান করছে। রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে এ সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান করা হলে তা অগ্রগতির পথে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব, কলাম লেখক

ফেসবুক দেশে কী ভূমিকা রাখছে by রাজীন অভী মুস্তাফিজ

একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের জীবনে বিনোদনের উৎস খুবই সীমিত! পুরো বাংলাদেশের কথা না হয় বাদই দিলাম, রাজধানী ঢাকাতেই একটা ভালো পার্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো একটা পাবলিক পার্কে যদি আপনি ভুল করে ঢুকে পড়েন, তাহলে পদে পদে আপনাকে বিব্রত হতে হবে। প্রথমত, নোংরা আর্বজনা সরিয়ে সরিয়ে এগোতে হবে। তারপর ভাগ্য আরও খারাপ হলে আপনাকে পড়তে হতে পারে চাঁদাবাজ বা ছিনতাইকারীর খপ্পরে! আর যদি চিড়িয়াখানায় কিছু সময়ের জন্য বেড়িয়ে আসতে চান, উৎকট দুর্গন্ধ, অব্যবস্থাপনা আর মুমূর্ষু প্রাণীগুলো দেখে কখন সেখান থেকে বের হতে পারবেন, তা নিয়ে চিন্তিত থাকবেন আপনি। যদি আপনি খেলা দেখে বিনোদন পেতে চান সেখানেও অবিশ্বাস- আপনার দেখা সেই ম্যাচটি পাতানো কি-না! আর যদি টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে নির্মল বিনোদন নিতে চান, তাহলে অতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণায় কিছু সময় পরই আপনি ভুলে যাবেন বিরতির আগে আপনি আসলে ঠিক কী দেখেছিলেন। আসলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নিজস্ব বিনোদনের ওপর আমাদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। হয়তো সেজন্যই যখন ইন্টারনেটের ভেতর দিয়ে আমরা সামাজিক যোগাযোগের একটা মাধ্যম খুঁজে পেলাম, খুব সহজেই সেটার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম। ফেসবুক হচ্ছে সেই সোস্যাল নেটওয়ার্ক, যার ওপর দিন দিন আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। কেউ কেউ হয়তো টুইটারের জনপ্রিয়তার কথাও বলবেন। কিন্তু সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে টুইটার ততটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি এখনও। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বের এক নম্বর জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক আসলে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে? আমার কিছু পরিচিত মানুষের ভাষ্য হচ্ছে, ফেসবুক বা এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসলে কোনো প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হচ্ছে, যাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে, তাদের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যাদের সঙ্গে বহু বছর ধরে যোগাযোগ নেই, বুঝতে হবে সেসব মানুষের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ রাখা বা না রাখার তেমন কোনো গুরুত্ব বা দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবতার বিচারে তাদের এ বক্তব্যের সঙ্গে একাÍ হওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বায়নের এ যুগে নিজের মুক্তচিন্তার পরিধি, স্বাধীন মতপ্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং যে কোনো বিষয়ে ভালো লাগা বা মন্দ লাগার অনুভূতি বিস্তৃত করার পাশাপাশি সমাজের অন্য মানুষদের মতাদর্শ জানতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে ফেসবুক একটি প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি ফেসবুকের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিবাচক ফলাফল। একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি অরাজনৈতিক অনেক সফলতাও চোখে পড়ে ফেসবুকের মাধ্যমে। আর পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগের বিস্তৃতির কথা তো উল্লেখ না করলেই নয়।
আমাদের তরুণ সমাজের কাছে ফেসবুক এখন অত্যন্ত পরিচিত একটি শব্দ। কম্পিউটার বা সেলুলার ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যেসব তরুণ ‘ফেসবুকিং’ করছে না, তাদের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু ঠিক কী ধরনের সুফল এ তরুণরা পাচ্ছে ফেসবুক থেকে? এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তাদের সামাজিক যোগাযোগের পরিধি বেড়েছে। এখন তারা খুব দ্রুতই কোনো বিষয় নিয়ে নিজেদের ভেতর যোগাযোগ করতে পারছে। যেমন ধরা যাক, কোনো মুমূর্ষু রোগীর রক্তের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ফেসবুকের অন্য বন্ধুদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে তারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে পারে, কিংবা তারাও তাদের বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করে বৃহত্তর একটি যোগাযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও এখন ফেসবুকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বেশিরভাগ গণমাধ্যম, রেস্তোরাঁ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির নিজস্ব ফ্যান পেইজ আছে, যেখানে মতামত দেয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ করা যায়, যা নিঃসন্দেহে পারস্পরিক যোগাযোগের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আর বিখ্যাত কোনো ব্যক্তির অনুসারী হয়ে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত জানার সুবিধাটুকু তো আছেই। এছাড়াও আরও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক খুঁজে পাওয়া যায় এ ফেসবুক দুনিয়ায়।
অন্যদিকে এটাও মিথ্যা নয় যে, আমাদের দেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিশেষত তরুণরা ঠিক যে ধরনের কাজে ফেসবুক ব্যবহার করছে, তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সময়ের অপচয় হচ্ছে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে বোধহয় ব্যাপারটা আরেকটু সহজ হবে। আমি লক্ষ্য করেছি, দেশের অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী একটু পরপরই তাদের স্ট্যাটাস আপডেট করছে অর্থাৎ চলমান ধারাভাষ্যের মতো তাদের প্রতিমুহূর্তের অনুভূতি অন্য ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে তারা হয়তো তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে যা অন্যদের জানার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে আর ব্যক্তিগত রাখছে না, যা নিঃসন্দেহে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণও হতে পারে। এছাড়াও লক্ষ্য করা যায়, কেউ কেউ প্রায় প্রতিমুহূর্তেই তাদের ছবি প্রকাশ (আপলোড) করছে, যা তার অন্য ফেসবুক বন্ধুরা দেখতে পারছে। কারও কারও ক্ষেত্রে এর সংখ্যা এত বেশি যা তার অন্য বন্ধুদের করছে বিব্রত। ফেসবুকে ঘন ঘন ছবি আপলোড নিয়ে যুক্তরাজ্যের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়- ওয়েস্ট অফ ইংল্যান্ড, এডিনবারা ও বার্মিংহামের গবেষকরা উপসংহারে পৌঁছেছেন, ঘন ঘন ছবি প্রকাশ বাস্তব জীবনে ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি জনবিচ্ছিন্ন করে এবং ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফেসবুকে লক্ষ্যহীন সময় অপচয়কারীদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত দিয়েছে আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তারা বলেছেন, ফেসবুকে অনেক বেশি সময় অপচয়কারীরা একটা সময় উপলব্ধি করতে পারে যে, তারা অকারণেই জীবনের অনেক মূল্যবান সময় ফেসবুকে ব্যয় করে ফেলেছে, যা তাদের হতাশ ও অসুখী করে তোলে। তারপরও কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে সময় কাটাচ্ছি আমরা? এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় আন্তঃসম্পর্কিত। প্রথমত, ফেসবুক ব্যবহার আমাদের অহংবোধের (বা ইগো) স্ফুরণ ঘটায়। যেমন, যে কোনো একটি অনুভূতি বা ছবি প্রকাশ করেই একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী আশা করতে থাকে, তার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা অন্য ব্যবহারকারীরা এ বিষয়ে তাদের ইতিবাচক মতামত দেবে এবং ‘লাইক’ বাটনটি ক্লিক করে তাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে। এভাবে আমরা প্রতিমুহূর্তে সামাজিক স্বীকৃতির আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুক ব্যবহার করে চলেছি। কখনও নিজের স্ট্যাটাস আপডেট, কখনোবা অন্য বন্ধুদের স্ট্যাটাস বা প্রকাশিত ছবিতে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে প্রতিনিয়ত নিজের অস্তিত্ব¡ জানান দিতে ব্যস্ত আমাদের তরুণ সমাজ। দ্বিতীয়ত, ফেসবুকের প্রোফাইলের মাধ্যমে আমরা আমাদের সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চাই। আমরা চেষ্টা করি আমাদের ফেসবুক প্রোফাইলটা ঠিক সেভাবে সাজাতে, যা সেই শ্রেণীর কাছে খুব সহজেই গ্রহণযোগ্য হয় যাদের সঙ্গে আমরা নিজেদের একাত্ম করতে চাই।
বাংলাদেশে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট পরবর্তী যুগ আমাদের সমাজকে সূক্ষ্মভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে। এক পক্ষ হচ্ছে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সম্পর্কে স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রায় অব্যবহারকারী অভিভাবকরা। অন্যপক্ষ হচ্ছে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জ্ঞানসম্পন্ন ও ব্যবহারকারী তারুণ্য। এমন নয় যে, আমাদের অভিভাবকরা চাইলে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট বিষয়ে দক্ষ হতে পারবেন না। কারণ এগুলো এমন কোনো জটিল বিষয় নয় যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেখার দক্ষতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু যেহেতু তারা জীবনের বেশিরভাগ সময় কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ছাড়াই সব কাজ সমাধা করেছেন, সেহেতু তারা এতে দক্ষ হওয়ার তেমন কোনো তাগিদ অনুভব করেন না। তবে চাইলেই তারা তা করতে পারেন।
আমাদের সমাজে একটি মহল আছে যারা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে অস্বীকার করতে চায়, শুধুই এর নেতিবাচক দিক খুঁজে বের করতে চায়। তাদের ধারণা, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সামাজিক এসব যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের সমাজে শুধুই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি। একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে অনলাইন/ইন্টারনেট বা নিউ মিডিয়াকে অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় নেই। নিউ মিডিয়ার প্রভাব ও এর ইতিবাচক ভূমিকাকে খাটো করে দেখারও কোনো উপায় নেই। এটা যেমন সত্য যে, পুলিশ কর্মকর্তা-দম্পতির হত্যায় অভিযুক্ত মেয়েটি তার অপর হত্যা-সহযোগীদের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছে, তেমনি এটাও সত্য, মিসরে হোসনি মোবারক সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট লাখ লাখ মানুষ তাহরির স্কয়ারে এসেছিল ফেসবুকের একটা ছোট্ট যোগাযোগের সূত্র ধরেই। সেক্ষেত্রে বলা যায়, যে কোনো একটি বিষয় থেকে আমরা ঠিক কী ধরনের সেবা নেব বা ঠিক কিভাবে কাজে লাগাব, সেটা নির্ভর করছে আমাদের ওপরই। তাই ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফেসবুক আমাদের সামনে যে এক নতুন দুনিয়া উন্মোচন করেছে, তা কাজে লাগিয়ে সমাজে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারি।
রাজীন অভী মুস্তাফিজ : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষক

শিক্ষকদের ওপর হামলা সরকারের ফ্যাসিস্ট চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ by বদরুদ্দীন উমর

১৯ আগস্ট বেসরকারি প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকরা সরকারের কাছে তাদের দাবি-দাওয়া জানানোর জন্য শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছিলেন। বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যেকটি সরকারের আমলেই বারবার নিজেদের নানা দাবি নিয়ে আন্দোলন করে এসেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কিছু ছোটখাটো দাবি পূরণ হলেও তাদের দাবি প্রত্যেক সরকারের দ্বারাই উপেক্ষিত হয়ে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, দাবি জানাতে গিয়ে শিক্ষকরা প্রায়ই সরকারের নির্দেশে পুলিশি হামলার শিকার হয়েছেন। ১৯ আগস্টও তা-ই ঘটেছে। শিক্ষকরা শহীদ মিনারে তাদের সভা শেষ করে মিছিল বের করার সময় পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে। বেধড়ক লাঠিচার্জ করে, রাবার বুলেট ছুঁড়ে ও পানি ছিটিয়ে তারা আন্দোলনরত শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ করে। ১৫ জন শিক্ষককে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং সাতজন তাদের আক্রমণে আহত হন। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, সরকারের কাছে নিজেদের দাবি-দাওয়া জানাতে গিয়ে এই গরিব বেসরকারি প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকরা তাদের যা পাওনা সেটা ভালোভাবেই পেয়েছেন! শহীদ মিনারে সমবেত শিক্ষকরা সবাই বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য দেয়া লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ কারণে নিয়োগের দাবিতেই শিক্ষকরা তাদের সমাবেশ করছিলেন। তাদের কর্মসূচি ছিল সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে তাকে স্মারকলিপি দেয়া। সরকার পরিচালিত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ৪২ হাজার শিক্ষক চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে ১৪ হাজার শিক্ষককে বিভিন্ন স্কুলে নিয়োগ দেয়া হলেও অন্যরা নিয়োগ পাননি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, দেশে এখন কোনো বেসরকারি স্কুল নেই। সব বেসরকারি স্কুলই সরকারি হয়েছে। এ কারণে বেসরকারি স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষকদের কোনো নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়। (দৈনিক বর্তমান ২০.০৮.২০১৩)
শিক্ষা বিভাগের সরকারি কর্মচারীদের এ বক্তব্যে না হয় বোঝা গেল, কিন্তু তার জন্য আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর পুলিশের হামলার কী প্রয়োজন হল? তারা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মতো লাঠিসোটা, ইটপাটকেল, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মিছিলে আসেননি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আক্রমণ করাও তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। এই কর্মহীন, গরিব শিক্ষকরা দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে নিজেদের স্মারকলিপি প্রদান করতে চেয়েছিলেন। কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই এ ধরনের আন্দোলন, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ নয়। তা হতে পারে না। কাজেই নির্বাচনের সময় যে প্রধানমন্ত্রীকে এসব শিক্ষকসহ অন্যদের কাছে ভোট ভিক্ষার জন্য যেতে হয়, তাদের নানা রকম প্রতিশ্র“তি দিতে হয়, তিনি গদিতে বসার পর শিক্ষকদের কাছ থেকে স্মারকলিপি পর্যন্ত গ্রহণ করার পরিবর্তে তাদের ওপর যখন পুলিশ দিয়ে হামলা চালান, তখন প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের চরিত্র বিষয়ে কার আর সন্দেহ থাকতে পারে? শিক্ষকরা দেশের জনগণের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিতে গেলে সেটা গ্রহণ করাই তার কর্তব্য। সব থেকে ভালো হয়, গণতান্ত্রিক কায়দায় যদি প্রধানমন্ত্রী নিজে বের হয়ে এসে শিক্ষকদের সামনে দাঁড়িয়ে সরকারের কোনো অসুবিধা থাকলে সেটা ব্যাখ্যা করা এবং সাধ্যমতো তাদের চাকরির ব্যবস্থার কথা বলা। এটা সম্ভব না হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্মারকলিপি শিক্ষকদের কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারতেন। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবেই এ কাজ সম্পন্ন করা যেত। আসলে শিক্ষকরা তা-ই চেয়েছিলেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বা সরাসরি তার হাতে স্মারকলিপি দেয়ার কোনো দাবিও করেননি। এ অবস্থায় শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মিছিল করে গেলে রাষ্ট্র ও সরকার কীভাবে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হতো, সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। কাজেই একে গদির গরম ছাড়া আর কীভাবে আখ্যায়িত করা যায়? এই গদির গরমে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা কীভাবে জনগণ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখেন এবং শুধু তাই নয়, জনগণের ওপর ফ্যাসিস্ট হামলা চালাতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেন না- এটা বাংলাদেশে যেভাবে দেখা যায় সেটা কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেখা যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশ প্রথম থেকেই এ ধরনের একটি শাসন ব্যবস্থার অধীনেই তার যাত্রা শুরু করেছে এবং প্রত্যেকটি নির্বাচিত ও অনির্বাচিত সরকার একই কায়দায় এই ঐতিহ্য রক্ষা করে এসেছে। ১৯ আগস্ট আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর সরকারি পুলিশের হামলা তারই একটি মামুলি উদাহরণ মাত্র।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও সরকার এখন এমন ফ্যাসিস্ট চরিত্র পরিগ্রহ করেছে যাতে শুধু শিক্ষকরা কেন, কারও পক্ষেই সরকারি হামলার মুখে না পড়ে কোনো আন্দোলন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এখন সভা-সমিতি, মিছিল কার্যত প্রায় নিষিদ্ধ বললেই চলে। ঢাকার মুক্তাঙ্গনের মতো জায়গায় এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালেও সভা-সমাবেশ করা যেত। কিন্তু তারপর থেকে মুক্তাঙ্গন সরকার কর্তৃক সভা-সমাবেশের জন্য নিষিদ্ধ হয়। বস্তুত এর দ্বারা ঢাকায় সভা-সমিতির জায়গা বলতে আর কিছুই রাখা হয়নি। পল্টন ময়দানের অবস্থা মুক্তাঙ্গনের মতোই। কাজেই এখন সভা-সমাবেশের জায়গা হয়েছে প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তার ওপর! এভাবেই বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট কায়দায় সরকার গণতান্ত্রিক শাসন চর্চা করছে!! এখানে শিক্ষকদের দাবির প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলা দরকার যে, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমন আইন করছে যে, কোনো শিক্ষক যদি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলে বা আন্দোলন করে তাহলে তার এমপিওভুক্তি বাতিল করা হবে!!! এর থেকে ‘বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক’ কারবার কোনো সরকারের পক্ষে আর কী হতে পারে?
বাংলাদেশে কোনো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা আছে এটা তো বলাই যাবে না, এমনকি এখানে কোনো দলীয় শাসন আছে এটা বলার মতো অবস্থাও নেই। কারণ প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে পারিবারিক জমিদারি মনে করে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন। এজন্য তাদের দলের নেতাদের কাজ হল, প্রধানমন্ত্রীর সব বক্তব্যই তোতা পাখির মতো করে বলা। এক্ষেত্রে হাস্যকর হলেও তাদের ট্রাজিক ভূমিকা হল সভা-সমিতিতে, সংবাদ সম্মেলনে চোখ-মুখ নাচিয়ে শেখ হাসিনার চোঙা ফুঁকা। অবস্থা দেখে মনে হয় না যে, আওয়ামী জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো কার্যকর ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। তার সম্ভাবনা যে নেই, এটা মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে নিয়ে তাদের দলীয় নেতাদের জো হুজুরগিরি থেকেই বোঝা যায়। কম বুদ্ধির লোকের অন্যদের পরামর্শ-উপদেশের প্রয়োজন বুদ্ধিওয়ালাদের থেকে বেশি। আওয়ামী লীগের দুর্ভাগ্য যে, সে সুযোগ থেকে দলটি সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। এ অবস্থায় বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকার বেপরোয়াভাবে ফ্যাসিস্ট কায়দায় পরিচালিত হচ্ছে। ১৯ আগস্ট শিক্ষকদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান ও মিছিলের ওপর যে পুলিশি হামলা হয়েছে, এটা ব্যতিক্রমী কোনো ব্যাপার নয়। সর্বক্ষেত্রে জনগণের আন্দোলনের বিরুদ্ধে এখন এভাবেই সরকারের ফ্যাসিস্ট হামলা হচ্ছে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল