Friday, December 5, 2014

আবর্জনা ফেলতে নিরাপত্তা চায় নাসিক

সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার ময়লা-আবর্জনা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে অস্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনে ফেলতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে লেখা চিঠিতে নাসিক-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেছেন, ডাম্পিং স্পট নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে স্টেডিয়াম থেকে দূরে খালি জায়গায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ফেলতে সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। নাসিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের নির্ধারিত স্থানে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে নানা খেলা শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৩শে নভেম্বর মানববন্ধন ও মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন বক্তব্য দেয়া হয়। ২৪শে নভেম্বরের পত্রিকায় বিষয়টি ফলাও করে প্রচার পেয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠির সঙ্গে ওই পেপার কাটিংয়ের কপি যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। নাসিক-এর চিঠিতে বলা হয়েছে, ২৪শে নভেম্বর থেকে আবর্জনা ফেলতে কিছু ব্যক্তি বাধা দিচ্ছে। আবর্জনা ফেলার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বাধা সৃষ্টিসহ হুমকি দিয়ে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে। তাই বর্জ্য ফেলার কাজ বন্ধ করা হলে শহরের বর্জ্য অপসারণ কাজ ব্যাহত হবে। এতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়বে। সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে দিলেও আশেপাশের ইউনিয়ন পরিষদ ও মিল কারাখানার বর্জ্য ফেলতে কোন ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে না। এদিকে নাসিক-এর আওতাভুক্ত এলাকার বর্জ্য অপসারণ করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোন ডাম্পিং স্পট নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডাম্পিং স্পট নির্মাণের জন্য সিটি রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিআরডিপি) থেকে নাসিক-এর বিপরীতে ইতিমধ্যে অর্থ বরাদ্দ আছে। তাই অত্যাধুনিক ডাম্পিং স্পট নির্মাণের জন্য জমি কেনা বা অধিগ্রহণের জন্য প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে নাসিক উল্লেখ করেছে, বর্জ্য ফেলার মতো বিকল্প কোন জায়গা না থাকার কারণে নিতান্ত বাধ্য হয়ে ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে স্টেডিয়াম থেকে দূরে ও ফাঁকা জায়গায় সাময়িকভাবে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশন ছাড়া ফতুল্লাসহ অন্যান্য ইউনিয়ন ও মিল-কারখানার বর্জ্য ওই স্থানে আগে থেকেই ফেলা হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নাসিক থেকে বেশ কয়েকবার ওই ময়লা ফেলার স্থান ড্রেজিং করে মাটি ও বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এ বছর ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনরায় ড্রেজিং ও মাটি এবং বালু ভরাট করতে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু নানা বাধার কারণে এ কাজ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

বিস্ময়কর শব্দে কেঁপে উঠলো বৃটেন

মহাশূন্য থেকে ভেসে এল বিকট এক শব্দ। তাতে কেঁপে উঠল বৃটেন। লানদুদনো থেকে ক্রাইডোন, ডেভন থেকে নরউইচ সর্বত্রই এ শব্দ। মানুষ হতবিহ্বল হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। আকাশে তাকিয়ে দেখতে পেল সেই চিরায়ত মহাশূন্য। আগে যেমনটা ছিল এখনও তেমনি আছে। না কোন এলিয়েন বা আগন্তুক নেই। নেই গোয়েন্দা বিমান। তাহলে কোথা থেকে ভেসে এলো এই রহস্যময় শব্দ! কোন কূল কিনারা করতে পারলেন না কেউ। তবে এক বিশেষজ্ঞ বললেন, হতে পারে এটা কোন অত্যন্ত গোপন যুদ্ধবিমান থেকে বিস্ফোরণ ঘটানোর শব্দ। এ ঘটনা ঘটেছে শনিবার রাত সাড়ে দশটায়। এ রাতে হাজার হাজার মানুষ শুনেছে এ শব্দ। বিকট সেই শব্দ। বজ্রপাতের মতো। কেউ মনে করেছিলেন এটা কোন সুপারসনিক বিমানের, যা শব্দের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে চলার সময় তৈরি করে বিকট শব্দ। চারদিকে এমন শব্দ নিয়ে ব্যাপক কৌতুহল। কোথা থেকে এলো এ শব্দ! সঙ্গে সঙ্গে টুইটার ও ফেসবুকের মতো সামাজিক মিডিয়ায় কৌতুহলী প্রশ্ন। এসব সাইট মিনি টুইটে সয়লাব হয়ে যায়। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো- একই রকম শব্দ শোনা গেছে নিউ ইয়র্কের বাফেলোতেও। এই বাফেলো বৃটেন থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে।

ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করবেন স্টিফেন হকিং

জেমস বন্ড ছবিতে অভিনয় করতে চান পদার্থবিদ, গণিতজ্ঞ স্টিফেন হকিং। তার হুইল চেয়ার ও কম্পিউটারে সৃষ্ট কণ্ঠস্বর তাকে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রিকতা। ভিলেন হতে হলে এমন কণ্ঠের যথেষ্ট কদর আছে। তাই তিনি মনে করেন স্টার ট্রেক বা অন্যান্য সায়েন্স ফিকশন ছবিতে তাকে ভিলেন হিসেবে ব্যবহার করলে তা আলাদা এক মাত্রিকতা এনে দেবে। তার শারীরিক যে অক্ষমতা রয়েছে তা সায়েন্স ফিকশন ছবিতে ভিলেন হওয়ার জন্য খুবই উপযোগী, যিনি চেয়ারে বসে নিয়ন্ত্রণ করবেন তার সাম্রাজ্য। এর আগে ‘দ্য সিম্পসন’ ছবিতে তার এনিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে। ‘মন্টি পাইথন’ সিরিজে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছেন। পিংক ফ্লোয়েড ট্র্যাকে তিনি তার কণ্ঠ ধার দিয়েছেন। তিনি বিশ্বের অত্যন্ত সুপরিচিত এক পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, লেখক, লেকচারার। এতে যেন তার মন ভরছে না আর। এবার তাই তিনি সিনেমায় অভিনয় করতে চান। জানুয়ারিতে প্রকাশিতব্য ‘উইয়ার্ড’ ম্যাগাজিনকে তিনি একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাতে তিনি বলেছেন, জেমস বন্ড ছবিতে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতে চান। ৭২ বছর বয়সী স্টিফেন হকিং বলেন, ভিলেন হওয়ার জন্য আমার হুইল চেয়ার ও কম্পিউটারে সৃষ্ট শব্দ এক্ষেত্রে উপযুক্ত হবে।

মোবাইলে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ জনপ্রিয় হচ্ছে

দেশে মোবাইলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল দেয়ার হার বাড়ছে। সময় রক্ষা, লাইন বিড়ম্বনা এবং দূরত্বের কষ্ট এড়াতে নগর এবং পল্লী উভয় অঞ্চলের মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে বিল পরিশোধে আগ্রহী হচ্ছেন।  নগরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রথমবারের মতো এ সেবা দিচ্ছে গ্রামীণফোন। ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে মোবাইলে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ নিয়ে কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এ সেবার নাম গ্রামীণফোন বিল-পে সার্ভিস। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রথম এবং উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল গ্রামীণফোনের এ উদ্যোগ। বিল পরিশোদের বিড়ম্বনা দূর করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দূরত্বে বাধা দূর করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়। শুরুতেই বেশ জনপ্রিয় হতে থাকে এ সেবা। তরুণ থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী মানুষ এ সেবার মাধ্যমে দ্রুত বিল পরিশোধ করতে পারছেন। প্রথম দিন গ্রামীণফোন বিল-পে সার্ভিসে মোট ৭,৬১৬ টাকার ৮টি বিল জমা পড়ে। ২০০৬ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মোট ২৬ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন টাকার বিল জমা পড়েছে এ মোবাইল সেবার মাধ্যমে। গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিল-পে সেবার মাধ্যমে গ্রামীণফোনের গ্রাহকরা ছাড়াও অন্য অপারেটর ব্যবহারকারীরা এমনকি যাদের মোবাইল নেই তারাও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে পারবেন। গ্রামীণফোন গ্রাহকদের ১২০০ নম্বরে একটি এসএমএস পাঠিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে যে অ্যাকাউন্ট তৈরি হবে সে অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রাহক যখন খুশি তখনই বিল পরিশোধ করতে পারবেন। এ সুবিধা দিতে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণফোন বিল-পে বা মোবিক্যাশ আউটলেট স্থাপন করা হয়েছে। অন্য অপারেটরের গ্রাহকরা এবং যাদের মোবাইল নেই তারা বিলের কাগজ নিয়ে বিল-পে বা মোবিক্যাশ আউটলেটে গিয়ে বিল পরিশোধ করতে পারবেন। বিল পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ নিশ্চিত করতে ফিরতি এসএমএস চলে আসে। এছাড়া, বিল-পে কল সেন্টারে ফোন করে বিল পরিশোধের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এ জন্য যে কোন জিপি নম্বর থেকে ১২০০ এবং অন্য অপারেটর থেকে ০১৭১৩২৩৪৫৬৭ নম্বরে ফোন করে নিশ্চিত হওয়া যায়। নিজ মোবাইলে বিল পরিশোধ করলে *৭৭৭# এ ডায়াল করলেই তথ্য পাওয়া যায়। এ জন্য কোন চার্জও লাগে না। গ্রাহকরা ইচ্ছা করলে গ্রামীণফোন সেন্টার থেকে পরিশোধিত বিলের স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করতে পারেন। এ সেবার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে ব্যাংক খুঁজতে দূর-দূরান্তে যাওয়ার দরকার নেই। গ্রাহকদের সুবিধার জন্য দেশের প্রতিটি এলাকাতেই গ্রামীণফোন বিল-পে/মোবিক্যাশ আউটলেট স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ সেবার মাধ্যমে লেনদেন প্রক্রিয়া ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এছাড়া, বিল জমা দেয়ার জন্য সকাল ৯টা থেকে ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার ঝামেলা নেই। দিনে ও রাতে যে কোন সময় বিল-পে/মোবিক্যাশ আউটলেটের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা যায়। ২০০৬ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বিল-পে সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়নে। এ প্রক্রিয়ায় গ্রামীণফোনের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), তিতাস, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো), বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেম লিমিটেড (বিজিএসএল), কর্ণফুলী গ্যাস লিমিটেড (কেজিএসএল) এবং জালালাবাদ গ্যাস লিমিটেড (জেজিএসএল)। বর্তমানে গ্রাহকরা বিল-পে সেবার আওতায় পিডিবি চট্টগ্রাম, পিডিবি সিলেট, ডেসকো, ডিপিডিসি, বাখরাবাদ গ্যাস, কর্ণফুলী গ্যাস, জালালাবাদ গ্যাস, তিতাস গ্যাস এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার বিল পরিশোধ করতে পারছেন।

রাস্তা পারাপার: সেই আগের চিত্র

আইন ভেঙে রাস্তা পারাপার ঠেকাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সপ্তাহব্যাপী অভিযান গত ১লা ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। সপ্তাহব্যাপী এ অভিযানে প্রায় ৯৭২  জন পথচারীকে জরিমানা, এক পথচারীকে এক মাসের কারাদ- দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযান শেষ হওয়ার একদিন পর গতকাল সরজমিন হোটেল সোনারগাঁও মোড় থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায় পথচারীরা আগের মতো আইন ভেঙেই রাস্তা পার হচ্ছেন। এ সব পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও তারা অনেকটা দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। তারা জানিয়েছেন অভিযানের সময় মোবাইল কোর্ট তাদের সহযোগিতা নিলেও পরে তাদেরকে আর কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। বাংলামোটর মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, পুলিশ বক্স থেকে মাইকের মাধ্যমে পথচারীদের সচেতন করা হলেও পথচারীরা আগের মতো ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তা পার হচ্ছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সুব্রত সরকারের কাছে নিচ দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন সিগন্যাল পড়েছে, তাই রাস্তা পার হচ্ছি। সিগন্যালের সময় যদি রাস্তা পার না হওয়া যায় তবে সিগন্যাল দেয়া হয়েছে কেন?  বাংলামোটর মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মেজবাহ উদ্দিন বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে পথচারীদের সচেতন করা হচ্ছে। এরপরও যারা নিচ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে আমরা ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করতে অনুরোধ করছি। কিন্তু অনেকেই তাদের শারীরিক সমস্যার কথা বলছেন। তবে আগের তুলনায় পথচারীরা বেশি ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করছেন। কাওরান বাজার মোড়ে দেখা যায় সেখানে হোটেল সোনারগাঁও ও একুশে টিভি ভবন সংলগ্ন দুটি জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পথচারীরা রাস্তা পার হচ্ছেন। একুশে টিভি ভবনের সামনের জেব্রা ক্রসিংটি অভিযানের পড়ে আঁকা হয়েছে। সার্ক ফোয়ারার পূর্বদিকে হোটেল সোনারগাঁও অংশে এবং সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম দিকে পান্থপথ অংশের জেব্রা ক্রসিংয়ে যানবাহন সব সময় চলমান থাকায় জেব্রা ক্রসিংয়েও ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে মানুষ। সিগন্যালে আটকে থাকার সময় গাড়িগুলো জেব্রা ক্রসিংয়ে থেমে থাকায় পথচারীদের রাস্তা পারাপারে সমস্যা হচ্ছে। অভিযানের  আওতায় থাকা দু’টি অঞ্চলের দৃশ্যমান উন্নতি হলেও ফার্মগেট খামারবাড়ি মোড়ের চিত্র একটুও বদলায়নি। সেখানে একটি ফুটওভারব্রিজ থাকলেও পথচারীরা ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হচ্ছেন। বিএএফ শাহীন কলেজের ছাত্র জাহিদুর রহমান জানান, সে আইন সম্পর্কে জানে তবুও বন্ধু তার জন্য অপেক্ষা করছে তাই সে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয়েছে। অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয় ইইই বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল হালিম জানান, ফুটওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার না হওয়া যে অপরাধ সেটা তিনি জানতেন না। গৃহিণী মোমেনা খাতুন অনেকক্ষণ ধরেই রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এক সময় একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কাও খান তিনি। দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. রফিক জানান, সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ডিএমপি সপ্তাহব্যাপী অভিযান পরিচালনা করেছে। যারা সচেতন হয়েছেন তারা ফুটওভারব্রিজ দিয়ে পার হচ্ছেন। যখন অভিযান চলছিল তখন মাইকিং, লিফলেট বিতরণ করে এবং ২ প্লাটুন পুলিশ সদস্য দিয়ে পথচারীদের রাস্তা পারাপারে নিবৃত্ত করা হয়েছিল। এখন যে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্বে আছেন তারা যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করবেন নাকি পথচারীদের রাস্তা পারাপারে বাধা দেবেন? দায়িত্বরত অপর এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এত কম সময়ের অভিযানে সফলতা আশা করা বৃথা। ন্যূনতম ৬ মাস এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হলে পজিটিভ কিছু পাওয়া যেতো। অভিযান শেষ হওয়ার পর পথচারীদের ফের আইন ভেঙে রাস্তা পারাপার প্রসঙ্গে অভিযান পরিচালনাকারী ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল কুদ্দুস বলেন, সংবাদপত্রের মাধ্যমে ইতিমধ্যে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। ডিএমপি কমিশনার বেনজির আহমেদ সরকারি সফরে মালয়েশিয়া আছেন। ৮ই ডিসেম্বর তিনি দেশে এলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ডিএমপির উচিত আরও কিছু দিন সময় যে সব জায়গায় ফুটওভারব্রিজ রয়েছে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা।

একজন পুষ্প রানী by মো. আমির হোসেন

হানাদারদের হিংস্র থাবা ল-ভ- করে দেয় পুষ্প রানীর সংসার। ওই দিন বাড়ির অন্যদের বেঁধে আগুন দিয়ে ৯ জনকে জীবন্ত দগ্ধ করে হায়েনারা। এতেও শান্ত হয়নি তারা। নিয়ে যায় পুষ্প ও তার জা মালতিকে। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আহমদাবাদ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গোছাপাড়া গ্রামের ব্যবসায়ী রাখাল চন্দ্র শুল্ক বৈদ্যের স্ত্রী পুষ্প রানী শুল্ক বৈদ্য ২ সন্তান নিয়ে ভালই দিন কাটাচ্ছিলেন। তাছাড়া রাখালের পরিবারের ছিল এলাকায় বেশ প্রভাব প্রতিপত্তি। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে ভারত ছুটছিল। তখন রাখাল চন্দ্রের মা সুখমীয় শুল্ক বৈদ্য বাদ সাধেন। তিনি বলেন, মরতে হলে নিজের ভূমিতেই প্রাণ দেবো। যে কারণে এ পরিবারের কারোর ভারতে যাওয়া হয়নি। জ্যৈষ্ঠ মাসের ১২ তারিখ। গভীর রাতে হানাদার বাহিনী তাদের বাড়িতে হানা দেয়। রাখালের ভাই অক্ষয় চন্দ্র শুক্ল বৈদ্য ঘুম থেকে উঠেছিলেন গোয়ালঘরে গরু-বাছুরদের খাবার দিতে। বাড়ির আঙিনায় অবস্থান করা হানাদারদের হাতে আটক হন তিনি। এরপর ঘরের দরজা ভেঙে রাখাল চন্দ্রকে টেনেহিঁচড়ে বের করে পাক আর্মিরা। তাদেরকে বেঁধে রাস্তার পাশে দাঁড় করানো দুটি জিপের পাশে নিয়ে যায়। জিপের রডের সঙ্গে বেঁধে গাড়ি চালিয়ে পার্শ্ববর্তী পাল বাড়ির সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে অক্ষয় চন্দ্র শুক্ল বৈদ্য ও যতীন্দ্র রাম শুক্ল বৈদ্যকে হত্যা করে। গুলির শব্দ শুনে বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় অক্ষয় চন্দ্রের বড় ছেলে টেনু শুক্ল বৈদ্য (১৬)। তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করে হানাদাররা। একই সময়ে পাক আর্মি হত্যা করে পালবাড়ির বিপিন পাল, হরেন্দ্র পাল, ব্রজেন্দ্র পাল ও একজন পুরোহিতকে। এরপর তাদেরকে খড়ের গাদার সঙ্গে বেঁধে আগুন দেয়। মৃত্যু নিশ্চিত করতেই আগুনে পুড়িয়ে অঙ্গার করে তাদেরকে। এরপর পাকবাহিনী পার্শ্ববর্তী মীর বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়া পরিবারের অন্য সদস্যদের আটক করে সুখদেবপুরে নিয়ে যায়। ওই গ্রামে পাকবাহিনীর অনুসারী রশিদ মিয়ার বাড়িতে সবাইকে জিম্মায় রাখে। শঙ্কা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এবং শোকে মুহ্যমান থাকলেও অন্যদের সঙ্গে রশীদ মিয়ার বাড়িতে তাদের দুর্বিষহ দুটি দিন কেটে যায়। তৃতীয় দিন দুপুরে একটি জিপে করে চার পাকসেনা আসে রশিদ মিয়ার বাড়িতে। তারা আটককৃতদের মধ্যে পুষ্প ও মালতি ছাড়া অন্য সবাইকে উঠানে এনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। এ সময় পুষ্প ও মালতিকে দুর্গাপুর এলাকার একটি বাড়িতে নিয়ে রাখে। ওই সময়ের পুষ্প রানীর বয়স ছিল বিশ বছর। সুন্দরী পুষ্প রানী ও মালতিকে দেখে পাক হানাদারদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে এবং তাদের শরীর নিয়ে উন্মত্ততায় মেতে ওঠে। প্রথম দিন চারজন পাকসেনা লালসা মেটায়। এদেশীয় দোসররাও নির্যাতনে শামিল হয়। দীর্ঘদিন দুর্গাপুরে নির্যাতিত হন তারা। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করলেও মুক্তি মেলেনি তাদের। দীর্ঘ ৬ মাস পাকসেনাদরে বন্দিশালায় আটকে রাখা হয় দু’জনকে। এ সময় প্রতিদিনই পাকসেনারা পর্যায়ক্রমে তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাতো। দীর্ঘ সময় বন্দি থাকার পর ডিসেম্বরে দেশ শত্রুমুক্ত হলে মুক্তি পান দুই জা। মুক্তি পেয়ে দু’জনই চলে যান বাপের বাড়িতে। সেখান থেকে ফিরে আসেন স্বামীর ভিটায়। এদিকে বাড়ির অন্য ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেলেও রাখাল বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তা জানা যায়নি আজও। পুষ্প রানী মুক্তিযুদ্ধের পর একযুগ স্বামীর জন্য সিথিতে সিঁদুর পরেছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কোন স্বামী যদি ১২ বছর নিরুদ্দেশ থাকেন তাহলে তাকে মৃত বলেই ধরে নেয়া হয়। রাখাল শুক্ল বৈদ্যকেও সনাতনী বিধান অনুযায়ী মৃত বলে ধরে নেয়া হলো। ১৯৮৫ সালে রাখাল শুক্ল বৈদ্যের ছেলেরা বড় হলে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের বেদনা ভুলে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন পুষ্প রানী। তার দুই ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। দুই ছেলেকেই বিয়ে করিয়েছেন। বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং স্বামীর প্রাপ্ত সম্পত্তি সব মিলিয়ে বেশ ভালভাবেই দিন কাটছে তার। এ ব্যাপারে পুষ্প রানীর সঙ্গে কথা বললে তিনি সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। দিনের পর দিন তাদের আটতে রেখে হায়েনার দল কিভাবে পাশবিক অত্যাচার চালায় তার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমরা কোনদিন স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্য দেখতে পারবো তা ভাবতে পারিনি। পুষ্প রানী বলেন, পাকসেনাদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর গ্রামের মানুষ ও স্বজনরা আমাদেরকে ভাল চোখে দেখতো না। মনে হয়েছিল কেন ওই সময় আমাদের মৃত্যু হলো না। পুষ্প বলেন, বর্তমান সরকার আমাদেরকে বীরাঙ্গনা হিসেবে স্মীকৃতি দেয়ায় আমরা গর্ববোধ করছি। আবারও আমাদের প্রাণ ফিরে পেয়েছি। পুষ্প রানী বলেন, হবিগঞ্জের মহিলা সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর মাধ্যমে এই স্মীকৃতি পাওয়ায় আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

ইন্দ্রা গ্রামের ফাতেমা by নূর ইসলাম

’৭১-এ লড়াই করেছেন ফাতেমা বেগম। জীবন আর যৌবন উৎসর্গ করেছেন দেশমাতৃকার জন্য। সহ্য করেছেন পাকিস্তানি সেনাদের অসহনীয় নির্যাতন। হায়েনার দল নারী জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ লুটে নিয়েছে দিনের পর দিন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার সুখ ভোগ করার অতৃপ্ত আশা নিয়ে সেসব নির্যাতন আর যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করেছেন। অশীতিপর এই যোদ্ধার জীবনের শেষ ইচ্ছা মৃত্যুর আগে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ সাহেবের বেটি হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তার অব্যক্ত কিছু কথা তাকে বলবেন। তার স্বপ্ন মৃত্যুর পর নিজের নামের একখ- জমিতে যেন তাকে দাফন করা হয়। তার নিজস্ব জমি নেই, এ কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন এ বীরকন্যা। তিনি বলেন, কষ্ট হয় যখন দেখি স্বাধীনতা বিরোধীরা রাতারাতি স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হয়ে ওঠে। ক্ষমতা দখল করে অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে তাদেরকে বীরাঙ্গনা বলে ঠাট্টা-তামাশা করে। দেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবসে যখন তাদের মূল্যায়ন করার কোন লোক থাকে না, সবাই ব্যস্ত থাকেন ’৭১-এর পরাজিত শকুন ও তাদের দালালদের নিয়ে, তখন মনে হয় যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এখনো সুদূর পরাহত। যশোর শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার পূর্ব- উত্তরের গ্রাম ইন্দ্রা। বর্তমানে এটি যশোরের বাঘারপাড়া থানার অন্তর্গত। বাঘারপাড়া শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে নারিকেল বাড়িয়া সড়ক ধরে এগুলেই ফাতেমার বাড়ি। পাকা রাস্তার ধারের সেই বাড়িটি দেখলেই পল্লী কবি জসীম উদ্‌দীনের সেই বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি চরণ মনে পড়ে যায়। ‘আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিম উদ্দিনের ছোট্ট বাড়ি রসুল পুরে যাও। বাড়ি তো বাঁশের বেড়া ভেন্না পাতার ছানি, একটু খানি বৃষ্টি হলে গড়িয়ে পড়ে পানি।’ এই অমর কবিতার সঙ্গে ফাতেমার ঘরের অপূর্ব এক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বেড়ার ঘর আর কলা পাতার ছানি দেয়া সেই ছোট্ট একটি ঘরে বাস করছেন ’৭১-এর বীর কন্যা ফাতেমা খাতুন। এই গ্রামের কৃষক মীর সৈয়দ আলীর মেয়ে তিনি। ১৯৭১ সালে তিনি ১৭ বছরের টগবগে কিশোরী। সুশ্রী ফাতেমা খাতুন যেমন ছিলেন  সুন্দরী তেমনি লম্বা। ফর্সা তার গায়ের রং। অভাব-অনটন আর দারিদ্রের কারণে পিতা সৈয়দ আলী ফাতেমাকে লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। বিবাহযোগ্য মেয়েকে নিয়ে পিতার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। দেশে যুদ্ধ বেধে গেছে। ইন্দ্রা গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা সিদ্দিক মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখিয়েছে। সে এলাকার তরুণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে ইন্দ্রা স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি অস্থায়ী প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খুলেছেন। সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা লে. মতিউর নড়াইল থেকে এসে ওই ক্যাম্পের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন। সিদ্দিক মামার সঙ্গে স্কুলছাত্রী হালিমা ওই ক্যাম্পে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকা- দেখে। এভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর খবর পৌঁছে যায় বাঘারপাড়ার পাক সেনাদের কাছে। মে মাসের প্রথম দিকে পাকবাহিনী ইন্দ্রা স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে হামলা চালায়। গোটা গ্রামে তারা তা-ব চালিয়ে সিদ্দিকের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগেভাগে খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাশের শ্রীরামপুর গ্রামে অবস্থান নেয়। এই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে হালিমা ও তার অপর দুই বান্ধবী ফাতেমা আর রোকেয়াও শ্রীরামপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যায়। দেশের জন্য যুদ্ধকারী মুক্তি সেনাদের সেবা-যত্ন করার পাশাপাশি তারা এই ক্যাম্পের অধিনায়ক লে. মতিউর রহমানের কাছে ছোট ছোট অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। জুন মাসের শেষের দিকে শ্রীরামপুরে পাক সেনারা অভিযান চালায়। এখানে পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জম্পেশ লড়াই হয়। এই যুদ্ধে  সামছুর রহমান, বজলুর রহমান আর রতন পাক সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে মালঞ্চ গ্রামে আশ্রয় নেয়। ৩ দিন পর পাক সেনারা মালঞ্চ গ্রাম ঘিরে ফেলে। শুরু হয় যুদ্ধ। প্রায় ৩ ঘন্টা সম্মুখ লড়াই করে মুক্তিযোদ্ধারা ফের পিছু হটে শেখের বাথান গ্রামে আশ্রয় নেয়। এই যুদ্ধে গোলাম সরোয়ার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পরদিন সকালে পাকসেনারা শেখেরবাথান গ্রামে আক্রমণ চালালে মুক্তিযোদ্ধারা ফের অবস্থান পাল্টে শ্রীরামপুর স্কুলে অবস্থান নেন। জুন মাসের মাঝামাঝি ফের এই ক্যাম্পে হামলা চালায় পাক সেনারা। এভাবে মে জুন মাসে পাক সেনাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় যুদ্ধ হয় এ এলাকায়। একপর্যায়ে সোলায়মান, আয়েনউদ্দিন, হাসান আলী, হোসেন আলী, কাওছার আলীসহ আরও অনেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যান। তাদের সঙ্গে ফাতেমাসহ তার অন্য ২ সাথী রোকেয়া আর হালিমা যেতে চাইলেও মেয়ে বলে তাদেরকে সঙ্গে নেয়া হয়নি। একপর্যায়ে সিদ্দিক মামা ও তার অন্য সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ফাতেমা ও তার অপর ২ সহযোগী পার্শ্ববর্তী বিরামপুরে আশ্রয় নেন।  জুন মাসের শেষের দিকে পাক আর্মিরা ফের বিরামপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে পাক সেনারা কোরবান, সোহরাব, ফাতেমা, হালিমা আর রোকেয়াকে ধরে ফেলে। তাদের চোখ মুখ বেঁধে বাঘারপাড়া সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ক্যাম্পের পাশে সোহরাব আর কোরবানকে গুলি করে হত্যা করে তারা। আর ফাতেমাসহ তিন নারী যোদ্ধাকে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। এখানে ২/৩ দিন আটকে রাখার পর তাদেরকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রেখে চালানো হয় চরম নির্যাতন। যুদ্ধ করার অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হতো। সপ্তাহে ১/২ দিনের বেশি খাবার দেয়া হতো না। চালানো হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। পাক সেনাদের ইনফরমার হিসেবে কাজ করার অফারও দেয়া হয় তাদরেকে। বলা হয় পাক সেনাদের হয়ে কাজ করলে তাদের মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু শত নির্যাতন আর গঞ্জনা সহ্য করে তারা অপেক্ষার গ্রহর গুনতে থাকে কবে দেশ স্বাধীন হবে। এভাবে তারা তিন নারী দীর্ঘ ৬ মাস যশোর ক্যান্টনমেন্টে আটকা ছিলেন। ৭ই ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হলে পাক সেনারা ক্যান্টনমেন্ট ফেলে পালিয়ে যায়। সে সময় মুক্তি সেনারা ক্যান্টনমেন্টের দখল নেন। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা এই ৩ সহকর্মীসহ আরও অনেক বন্দি যোদ্ধাকে উদ্ধার করেন। এর পরের ইতিহাস আরও করুন। স্বাধীনতার ২৮ বছর পর ১৯৯৯ সালে ফাতেমা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভ করেন। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য তিনি এখন সেই স্বীকৃতির কোন সনদ পাননি। প্রতি মাসে তিনি সরকারি সহায়তা হিসেবে ৫ হাজার টাকা ছাড়া আর কোন অনুদান পাননি।

আমাদের দিকে ফিরে তাকান by প্রধানমন্ত্রীকে নিখোঁজদের স্বজনরা

গুমের শিকার ৮ ব্যক্তিকে ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাদের স্বজনরা। ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ওই ৮ ব্যক্তিকে বাসা থেকে দুর্বৃত্তরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে উঠিয়ে নিয়ে যায়। প্রিয়জন হারানোর এক বছর পূর্তিতে তারা সমবেত হয়েছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে। সেখানে সংবাদ সম্মেলন করে তারা জানিয়েছেন, ছেলের খোঁজ না পেয়ে কয়েকজনের বাবা-মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। সন্তানদের সঠিক খোঁজ চান তারা। আর সরকার চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের সন্তানরা ফিরে আসবে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিখোঁজ ঢাকা মহানগরের ৩৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনের ছোট বোন সানজিদা ইসলাম তুলি। উপস্থিত স্বজনরা এসময়  কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভিআইপি লাউঞ্জে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশের। উপস্থিত সংবাদকর্মীদের অনেকে আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন। সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। এ পরিবারগুলোর সঙ্গে সরকার রসিকতা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা মাসব্যাপী বিজয় দিবস উদযাপন করি। পারলে বছরজুড়ে উদযাপন করি। মুক্তিযুদ্ধের নাম করে সরকার বড় বড় কথা বলে এ স্বজনদের কণ্ঠস্বরকে নিচু করে দিচ্ছে। এ অমানবিকতা বন্ধ হোক। তাদের জানতে দেয়া হোক তাদের সন্তানরা কোথায় আছে। প্রশাসনের কাছে এই পরিবারগুলো বোঝা হয়ে গেছে। র‌্যাব এখন কথা বলতে চায় না, বিরক্ত হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ ক্ষমতাসীনরা কত রকমের আইন করছে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। সরকারের উদ্দেশে মান্না বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রয়োজন কম নয়। যে সব পরিবারের সদস্যরা গুম হয়েছে তারা এ দেশেরই নাগরিক। ১ বছর পার হয়ে গেল এখনও সরকার বলতেই পারছে না তারা কোথায় আছে কিভাবে আছে- নাকি মরে গেছে। তাদের স্বজনরা তাদের জন্য দোয়াও করতে পারে না কারণ তাদের কোন খবরই এখনও কোন স্বজনই পায়নি। আমরা এরকম চাইনি কখনও। বাংলার কোটি মানুষের নিরাপত্তার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। এ গুমের ঘটনার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে দাবি করে মান্না বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার জনগণকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। গত ১০ মাসে সরকার জানিয়েছে তোমরা ভোট দাও বা না দাও তোমাদের উন্নয়নের দায়িত্ব আমরা নিলাম। এখানে কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে সে বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ।
মাজহারুল ইসলাম রাসেলের বোন লাবণী আক্তার বলেন, আদরের ছোট ভাই রাসেল মেধাবী ছাত্র। জানি না তার কি অপরাধ। মা বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। বাবা অস্বাভাকি আচরণ করছেন। এমন জীবন চাই না। পৃথিবীতে কেন জন্ম নিলাম? ফজরের নামাজের আগে ঘুম থেকে উঠে মা কান্না শুরু করেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাবার কান্না শুনতে পাই। এত কষ্ট কিভাবে সহ্য করি। প্রতিটি মুহূর্ত আমরা অপেক্ষা করি। আর কত অপেক্ষা করতে হবে জানি না। আসাদুজ্জামান রানার বোন মিনারা বেগম বলেন, এক বছর পূর্ণ হলো। আমরা জানতে পারলাম না আমাদের ভাই কোথায়। অনেক কষ্ট করে রানা পড়ালেখা করেছে। তার ইচ্ছে ছিল বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেবে। মা যখন রানার কথা জিজ্ঞেস করে তখন কোন উত্তর দিতে পারি না। এ ঘটনা জানলে কোন গ্রামের ছেলে আর ঢাকায় পড়ালেখা করতে আসবে না। অনেক বলেছি। মনে হয় এসব কথা প্রধানমন্ত্রীর কানে যায় না। আমাদের ভাগ্যে কি হয়েছে তা-ও জানি না। সঠিক সংবাদ জানতে চাই। আর কতকাল আমরা কাঁদবো? সাজেদুল ইসলাম সুমনের ৪ বছরের শিশুকন্যা আরোয়া ও ৯ বছরের রাইয়া প্রেস ক্লাবে এসেছিল বাবাকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি নিয়ে। তাদের মুখে একটাই কথা, বাবাকে ফিরিয়ে পেতে চাই। বাবাকে এনে দাও। মাসুমের মা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মাসুমের জন্ম ১৬ই ডিসেম্বর। গত বছরের ৪ঠা ডিসেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার আগে তাকে বারণ করেছিলাম বাইরে না যাওয়ার জন্য। সে বলেছিল, মা আমি চোর না, সন্ত্রাসী না। আমি কেন ফিরবো না? ছেলের জন্য ঘুরে বেড়াই। কোন হদিস পাই না। কি অপরাধ তাদের? সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ার কারণে কোন কথাই বলতে পারছিলেন না আদনান চৌধুরীর মা কানিজ ও শাহীনবাগের স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা কাওসার আহমেদের মা কমলা আক্তার। কাওসারের মা শুধু বিলাপ করছিলেন, ছেলেকে হারিয়ে আমি এখন রাস্তার ভিখারি। আমার ছেলেকে একটু দেখতে চাই। জাহিদুল কবির তানভীরের মা নিলুফা বেগম পুুতুল বলেন, আমার ছেলে ফজরের নামাজের সময় ডেকে দিতো। এখন আর কেউ আমাকে ডাকে না। ভাইয়ের সন্ধান পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন ফেরদৌসী আক্তার আঁখি বলেন, আমরা আর পারছি না। আমাদের দিকে ফিরে তাকান। ছোট্ট ভাইয়ের চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছোট্ট মেয়ে আরোয়া বাবাকে ফিরিয়ে আনতে বলে। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য। আজ নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা নেই। সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা খাতুন বলেন, এক বছর পার হয়ে গেল। আমি আর কিছু চাই না আমি আমার সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত চাই। অন্যান্য মায়ের সন্তানদেরও তাদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আমি সরকারের কাছে একজন অসহায় মা হিসেবে ফরিয়াদ করছি। তিনি আরও বলেন, সরকার ইচ্ছা করলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমার সন্তানসহ অন্যান্য মায়ের সন্তানরা কোথায় আছে কিভাবে আছে তা বের করে দিতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার সমিতির মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসার সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন নাগরিক ঐক্যের সদস্য জাকিয়া বেগম, সুরক্ষা কমিটির সদস্য মো. জাকির হোসেন। এর আগে সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গুম হওয়া ৮ ব্যক্তির সন্ধান চেয়ে মানববন্ধন করে জাতীয় মানবাধিকার সমিতি। জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-তথ্য বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, বাংলাদেশ ন্যাপের যুগ্ম মহাসচিব স্বপন কুমার সাহা, লেবার পার্টির ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক শামসুদ্দিন, তেজগাঁও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার মানববন্ধনে অংশ নেন।

ধনাঢ্যদের বিয়ে করে সম্পদ হাতিয়ে নেয়াই তার পেশা

ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিয়ে করে সম্পদ হাতিয়ে নেয়াই তার পেশা। একাধিকবার বিয়ের সাজে সাজলেও অবিবাহিতা বলে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন তিনি। টার্গেট করেন ধনাঢ্য কোন ব্যক্তিকে। পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। এক পর্যায়ে সোনা-গয়না আর নগদ টাকা নিয়ে কেটে পড়েন। তার ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক মার্কিন নাগরিক। এছাড়া আরও দু’ব্যক্তির সঙ্গেও একই কায়দায় প্রতারণা করেছেন। এই মহিলার নাম আইরিন আক্তার। মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনের সরকারি কলোনির ১৭ নম্বর ভবনে পরিবারের সঙ্গে থাকেন তিনি। তার পিতা স্কুল শিক্ষক আবদুল হাই ও ভগ্নিপতি দেলোয়ারও এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতারণার শিকার মার্কিন নাগরিক শরফুদ্দিন আহমেদ জানান, ২০০৫ সালে আইরিন আক্তারের ভগ্নিপতি দেলোয়ারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের পরপরই দেলোয়ার তাকে তার শ্যালিকার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মায়ের মৃত্যুশয্যার কথা শুনে জুন মাসে শরফুদ্দিন আহমেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে আসেন। এ সময় তড়িঘড়ি করে ওই বছরের পয়লা আগস্ট আইরিন আক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শরফুদ্দিন আহমেদ জানান, বিয়ের সময় আইরিন নিজেকে অবিবাহিতা দাবি করেছিলেন। বিয়ের কাবিননামাতেও তা লেখা রয়েছে। বিয়ের দুই দিন পর তিনি আমেরিকায় চলে যান। তিন মাস পর পিতার মৃত্যুর সংবাদে আবার দেশে আসেন এবং দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে অবস্থান করেন। এ সময় আইরিন আক্তার সুকৌশলে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তগত করে নেয়ার চেষ্টা করেন। আইরিন আক্তারের চাপের এক পর্যায়ে তার নামে ২০ লাখ টাকার ডিপোজিট করে দেন তিনি। শরফুদ্দিন আহমেদ বলেন, এক পর্যায়ে তিনি জানতে পারেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে পড়ার সময় বরিশালের মুলাদি থানাধীন বশির উদ্দিনের ছেলে জনৈক ইব্রাহীম খলিলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। ২০০২ সালের ১১ই অক্টোবর সেই বিয়ে হয়। শরফুদ্দিন বলেন, বিষয়টি নিয়ে আইরিনের সঙ্গে তার তর্ক-বিতর্ক হলে গত বছরের ৯ই  মার্চ সে বাসা থেকে প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রাদি নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। এ বিষয়ে তিনি তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি  (জিডি নং ৬২৮) করেন। শরফুদ্দিন বলেন, কিছুদিন পর আইরিন তার কাছে সব স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা ফেরত দেয়ার শর্তে তার মণিপুরিপাড়ার বাসায় আসেন। এ সময় তিনি আইরিন আক্তারের কাছে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নেন। কিন্তু বাসায় কয়েক দিন থাকার পর আবারও বড় একটি লাগেজে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান। শরফুদ্দিন আহমেদ বলেন, গত বছরের ২০শে আগস্ট জনৈক মোহসিন মিয়া ওরফে সোহাগ ও তার অভিভাবক তার বাসায় আসে। তারা জানায়, আইরিন আক্তার তাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা-পয়সা আত্মসাৎ করেছে। বিষয়টি আইরিন স্বীকার করলে তিনি ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী সোহাগকে তার পাওনা ফেরত দেন। শরফুদ্দিন আহমেদ জানান, আইরিনের প্রতারণা বিষয়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তিনি দু’টি পৃথক মামলা করেছেন।

মৃত ঘোষণার ৩ ঘণ্টা পর...

দুপুর ২টায় মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল ৪৫ বছর বয়সী অজ্ঞাত এক নারীকে। মৃত্যুর প্রমাণপত্রও (ডেথ সার্টিফিকেট) ইস্যু করা হয়েছিল তার নামে। কিন্তু ঘন্টা তিনেক পর মর্গের দায়িত্বে থাকা ডোম যখন ওই নারীর লাশ নিতে গেলেন, তখনই ঘটে বিপত্তি। নড়ে উঠল মৃতদেহটি। চিৎকার করে উঠলেন ডোম। খবর দেয়া হলো চিকিৎসককে। চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখলেন ওই নারীর হৃৎস্পন্দন রয়েছে। শুরু হলো নতুন করে চিকিৎসা। গতকাল চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা মেডিক্যালের নতুন ভবনের ৮০২ নম্বর ওয়ার্ডে। সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সময় এক নারীকে সেখানে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর নির্দেশ দেন অধস্তন কর্মকর্তাদের। অজ্ঞাত নারী হিসেবে তাকে ভর্তি করা হয় ৮০২ নম্বর ওয়ার্ডের ৭ নম্বর ইউনিটে। অপুষ্টির কারণে ওই নারী অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চলমান চিকিৎসার  এক পর্যায়ে গতকাল দুপুর ২টার দিকে ওই নারীকে মৃত বলে ঘোষণা করেন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা একজন নারী চিকিৎসক। ওই মহিলার নামে একটি ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। ওয়ার্ডবয় বেলাল সেই ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে যান মর্গের অফিসে। মর্গের দায়িত্বে থাকা নূর আলম বাবু লাশটি আনার জন্য তার সহকারী আজিজকে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে পাঠান। বেলালকে সঙ্গে নিয়ে ডোম আজিজ বিকাল ৫টার দিকে ওয়ার্ড থেকে ওই নারীর লাশ আনতে যান। মৃতদেহটি ট্রলিতে তোলার সময় আজিজ খেয়াল করেন তার হাত-পা নড়ছে। মৃতদেহের নড়ে ওঠা দেখে চিৎকার করে ওঠেন আজিজ। পুরো ওয়ার্ডে এ সময় চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। ওয়ার্ডবয় বেলাল ডেথ সার্টিফিকেট লুকিয়ে ফেলে দৌঁড়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে ডেকে আনেন। কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসক মৃতদেহের হৃৎস্পন্দন পরীক্ষা করে দ্রুত ক্যানোলা লাগিয়ে স্যালাইন পুশ করেন। তিনি জানান, আসলে তাকে যখন মৃত ঘোষণা করা হয়, তখন তার হৃৎকম্পন বা শারীরিক কোন সচলতা ছিল না। ওই ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন মোয়াজ্জেম হোসেন মঞ্জু জানান, দুপুরে চিকিৎসকরা ওই নারীকে তাদের সামনেই মৃত ঘোষণা করেন। বিকাল ৫টার দিকে মর্গের লোকজন তাকে ভ্যানে ওঠাতে গেলে লাশটি নড়েচড়ে ওঠে। তখন আশপাশের লোকজনই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে। জানতে চাইলে ইউনিট ৭-এর প্রধান অধ্যাপক আমিনুল হক বলেন, এ জন্য ডিউটি ডাক্তার দায়ী। তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ডিউটি ডাক্তারের নাম জানতে চাইলে তিনি মোবাইলের লাইন কেটে দেন। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ঢামেক জরুরি বিভাগ সংলগ্ন রাস্তায় অবৈধ দোকান উচ্ছেদকালে ২রা ডিসেম্বর ওই নারীকে ফুটপাতে পড়ে থাকতে দেখি। তখন লোকজন দিয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করি। ওই রোগীকে ‘মৃত’ ঘোষণার পর জেগে ওঠার ব্যাপারে ?জানতে চাইলে তিনি বলেন, দোষী চিকিৎসককে বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে।

বাংলাদেশী শ্রমিক না নেয়ার চাপ মালয়েশিয়ায় by মিজানুর রহমান

বাধা পদে পদে। বাংলাদেশ থেকে যাতে শ্রমিক নেয়া না হয়, সেজন্য মালয়েশিয়ার নেতৃত্বের ওপর প্রচন্ড রকমের চাপ রয়েছে। দেশটির নির্বাচনী রাজনীতিতেও ‘বাংলাদেশ’-এর নাম যুক্ত হয়ে গেছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে! মালয়েশিয়ার বারিসান ন্যাশনাল কোয়ালিশনের পক্ষে ভোট বাড়াতে বাংলাদেশ থেকে লোক আমদানি করা হয়- এমন তকমা জুড়ে দেয়া হয়েছে বিগত নির্বাচন থেকে। নির্বাচন শেষ হয়েছে, কিন্তু সেই বিরোধিতার রেশ এখনও কাটেনি। বরং দিনে দিনে এর নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। অতি সমপ্রতি মালয়েশিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস অনেকটা ঘোষণা দিয়ে ‘বাংলাদেশী শ্রমিক’ আমদানির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটির তরফে কিছু মৌলিক বিষয়কে যুক্তি হিসেবে সামনে এনে বিরোধিতার পক্ষে বৃহৎ জনমত গড়ার চেষ্টা চলছে। চারদিকে যখন এত নেতিবাচক প্রচারণা, এত দুঃসংবাদ! ঠিক সেই সময়ে একটি সুখবরের আশায় ছিলেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বিশেষ করে শ্রম সংশ্লিষ্টরা। একটি হাইপ্রোফাইল সফরকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল সেই প্রত্যাশা। দীর্ঘ এক যুগ পর পুরোপুরি দ্বিপক্ষীয় সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুলালামপুর যাচ্ছেন, তা-ও মালয়েশিয়ান সরকার প্রধানের ঢাকা সফরের ‘ফিরতি সফর’ হিসেবে। দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ মিশন, হাইকমিশনের পদস্থ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশী কমিউনিটির সরকার সমর্থক নেতৃবৃন্দের ব্যস্ততা ও কথাবার্তায় ব্যাপক হতাশার মধ্যেও একটু আশার আলো খোঁজে পান বাংলাদেশীরা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর শুরুর আগে থেকেই মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট নিয়ে জটিলতাসহ সম্ভাবনাময় ওই শ্রম বাজারের বিষয়ে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির অনেক ঘাটতি ছিল। তারপরও বাংলাদেশের সরকার প্রধানের ওই সফর থেকে একটি সুখবর পাওয়ার আশা করেছিলেন প্রবাসীরা। ২রা ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুর পৌঁছার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রবাসী বাংলাদেশীদের তরফে তাকে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা জানানো হয়। আয়োজক মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠন। আমন্ত্রণপত্র হাতে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে কয়েক শ’ শ্রমিকও যোগ দেন সেই অনুষ্ঠানে। স্থানীয় সময় সাড়ে ৬টায় এটি শুরুর কথা আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ থাকলেও তারা আগেই অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছতে শুরু করেন। যদিও নির্ধারিত সময়ের অনেক পর অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াত সরকারের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রম বাজারের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। পরিস্থিতির উত্তরণে শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্যের বিস্তারিত তুলে ধরে দীর্ঘ বক্তৃতা করেন মন্ত্রী। পরে প্রধানমন্ত্রীও তার বক্তৃতায় বিএনপি-জামায়াত আমলের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দেশে-বিদেশে শ্রমিকদের অধিকার সমুন্নত রাখার অঙ্গীকারও করেন তিনি। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) যে চুক্তি হয়েছে তা নিয়ে অনেকে নাখোশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এ বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেন। একই সঙ্গে তার সফরের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোসহ সার্বিক সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করেন। ওই অনুষ্ঠানের পরদিন মালয়েশিয়া প্রধানমন্ত্রী নজিব রাজাকের সঙ্গে শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সেখানে বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হয়েছে। চারটি বিষয়ে চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা হয়েছে। সম্পাদিত প্রটোকলের আওতায় দেশটির সারাওয়াক প্রদেশে ১২ হাজার বাংলাদেশীর কাজের সুযোগ তৈরি হবে বলে কর্মকর্তাদের তরফে জানানো হয়েছে। দেশটিতে এখনও প্রায় ২ লাখ অবৈধ বাংলাদেশী রয়েছেন। যারা বৈধভাবে গিয়ে নানা কারণে অবৈধ হয়ে পড়েছেন, বা গেছেনই অবৈধ পথে। তাদের বৈধতার বিষয়- মালয়েশিয়া সরকার প্রধানের কাছে তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নানা সূত্রের খবর নাজিব রাজাক নাকি এতে খানিকটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি বিষয়টি ‘দেখা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বাকি চুক্তি ও সমঝোতার বিষয়ের মধ্যে রয়েছে কূটনীতিক ও অফিসিয়ালদের ভিসা প্রক্রিয়া শিথিল এবং পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার বাড়ানোর বিষয়টি। কুয়ালালামপুর বা গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেই বাংলাদেশীদের বসবাস। দেশটিতে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের হেতিমগঞ্জের আবদুল কুদ্দুস। তিনি সেখানে বিয়ে করে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। প্রধানমন্ত্রী যখন কুয়ালালামপুরে (৩রা ডিসেম্বর সন্ধ্যায়) তখন শহরের পুডো বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তার দোকানে বসে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। আগ্রহ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা ফল জানতে চান। বিশেষ করে শ্রমিক পাঠানোর নতুন কোন চুক্তি হয়েছে কিনা, অবৈধ বাংলাদেশীদের বৈধতার কোন আশ্বাস মিলেছে কিনা এমন নানা বিষয়ে জানতে চান তিনি। সারাওয়াক প্রদেশের শ্রমিক পাঠানোর চুক্তি এবং অবৈধদের বৈধতা দেয়ার সুনির্দিষ্ট কোন আশ্বাস না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, সারাওয়াকে যেতে অনেকেই আগ্রহী হবে না। জি-টু-জি পদ্ধতি নিয়ে ওই প্রবাসী বলেন, প্রত্যেকে তার আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে আসতে চায়। নিজেরা চেষ্টা করে ভিসা বের করে অর্থ যোগাড় করে। কেবল মাত্র জি-টু-জি হলে ব্যক্তি উদ্যোগে আর কোন ভিসা বের হবে না। মালয়েশিয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মালির কাজ করেন গোলাপগঞ্জ সদরের আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা এখানে অনেক বাংলাদেশী কাজ করি। আমি ৭ বছর থেকে আছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই। তারা মালয়েশিয়ান কোম্পানিকে কন্ট্রাক্ট দেয়।  তারা আমাদের নিয়োগ দেয়। ওই শ্রমিক বলেন, সুযোগ পেলে যে কেউ তার পরিবারের সদস্যদের আনতে চায়। সেখানে সরকারিভাবে কাউকে আনা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। শ্রম বাজার সম্প্রসারণ বিষয়ে সেখানে কর্মরত সরকারের এক কূটনীতিকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত সরকারি পর্যায়ে লোক পাঠানোর বিষয়টি কিভাবে দ্রুততর করা যায় তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে।

জীবন নিয়ে যেভাবে ফিরে এলেন শারমিন by রোকনুজ্জামান পিয়াস

(স্ট্রেচারে করে এয়ারপোর্ট থেকেই হাসপাতালে নেয়া হলো শারমিনকে) ভাগ্য বদলের আশায় লেবানন গিয়ে নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে অবশেষে ফিরলেন শারমিন আক্তার। তবে বাড়িতে নয়। এয়ারপোর্ট থেকে তাকে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। স্ট্রেচারে করে বিমান থেকে নামিয়ে তোলা হলো এম্বুলেন্সে। সে সময় অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। বুধবার রাতে এয়ার এরাবিয়ানের একটি ফ্লাইটে তিনি হযরত শাহ্‌জালাল বিমানন্দরে পৌঁছান। এর আগে নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে লেবাননে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। দীর্ঘ ৬ মাস সেখানকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। লেবাননের ভীতিকর সেসব দিনগুলোর কথা মনে করে এখনও শিউরে ওঠেন মা-বাবা হারানো এ যুবতী। লেবাননে দেখে এলেন বাংলাদেশী মেয়েদের দিয়ে পাতানো অনৈতিক ব্যবসার ফাঁদ। দেখে এসেছেন কিভাবে প্রতারিত হয়ে এ পেশায় নাম লেখাচ্ছে সহজ সরল মেয়েরা। শারমিন সুকৌশলে নিজের সম্ভ্রম বাঁচালেও দেশে ফিরতে পারেননি অক্ষত শরীর নিয়ে। কবে স্বাভাবিক জীবন পাবেন সে নিশ্চয়তাও নেই। এদিকে কিভাবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে সে কথা ভেবেও দিশাহারা একমাত্র আপনজন আঞ্জুমান মুফিদুলে লাশ বহনের কাজ করা দুলাভাই কিসমত আলী। স্বামী পরিত্যক্তা শারমিন ঢাকার গে-ারিয়ায় বসবাসকালে নিপা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে ভাগ্য বদলাতে লেবাননে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিপা নিয়মিত যাওয়া-আসা করতো লেবানন। নিপার পরামর্শ মোতাবেক ৩০শে এপ্রিল বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স বাংলাদেশ এক্সপোর্ট করপোরেশনের মাধ্যমে লেবাননে যান। সে দেশে পা রাখার পর এয়ারপোর্ট থেকে নিয়োগকর্তার ছেলে তাকে নিয়ে যায় বাড়িতে। সেখানে ১০০ ডলার বেতনে গৃহকর্মীর কাজ করতে থাকেন শারমিন। এর দু’তিন পর নিপা আসে ওই বাড়িতে। তবে তখন তার নাম আর নিপা নয়, সেখানে সে পরিচিত সুমি নামে। প্রতিদিন এসে শারমিনকে বোঝাতে থাকে এখানে কম বেতন। অন্য জায়গায় কাজ করলে আরও বেশি বেতন পাওয়া যাবে। প্রথমে রাজি না হলেও পরে সুমির চাপাচাপি ও ভাল বেতনের আশায় রাজি হন শারমিন। ছদ্মবেশী সুমি তাকে নিয়ে যায় একটি সুরম্য দোতলা বাড়িতে। সেখানে শারমিনকে রেখেই কেটে পড়ে সে। সেখানে ছিল আরও ২০ জনের মতো বাঙালি মেয়ে। প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও পরে জানতে পারেন একটি পতিতালয়ে এসে পড়েছেন তিনি। এ সব মেয়ে সবাই দেহ ব্যবসায় জড়িত। পরদিন আঁখি নামের একটি মেয়ে বুঝিয়ে দেয় কি করতে হবে তাকে। আঁখি ওই বাসার সর্দার ছিল।  সে-ই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতো। শারমিন এ অনৈতিক কাজে অস্বীকৃতি জানান। এজন্য তার ওপর চলে নির্যাতন। না খাইয়ে রাখা হয় তাকে। মারধরও করতে থাকে সর্দার আঁখি। শারমিন জানান, প্রতিদিনই রাতের বেলা বিলাসবহুল গাড়িতে করে ওই বাড়িতে আসতো  লেবানিজ পুরুষরা। তারা গাড়িতে করে একজন করে মেয়েকে নিয়ে যেতো। পরে ভোরবেলায় তাদেরকে পৌঁছে দিতো। প্রথমে তাকেও পাঠানোর চেষ্টা করতো, কিন্তু তিনি যেতে চাননি। এ অবস্থায় শারমিন পালানোর পথ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু আঁখির নজরদারিতে তিনি পালাতে ব্যর্থ হন। অবশেষে সেখান থেকে পালানোর জন্য কৌশলের আশ্রয় নেন। ওই বাড়িতে ৫ দিন থাকার পর তিনি আরবীয় একজন পুরুষের সঙ্গে যেতে রাজি হন। মাইক্রোবাসে উঠেই অনুনয় বিনয় করতে থাকেন তিনি। হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেন। এতে ওই ব্যক্তির দয়া হলে সে তাকে পালিয়ে যেতে দিতে সম্মত হয়। পথেই তাকে নামিয়ে দেয়। এ সময় মাইক্রোবাস থেকে নেমে তাড়াহুড়ো করে পালাতে গিয়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। ওই বাসায় রেখে আসার পর থেকে কথিত সুমির সঙ্গেও যোগাযোগ হয়নি তার। সে দেশের ফাইদা এলাকায় ওই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ডা. মনজের আল-হাজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। তার দু’পায়ের হাড় তিন টুকরা হয়ে ভেঙে যায়। প্রথমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার পা দু’টি কেটে ফেলতে চাইলেও সেখানে কর্মরত বাঙালি চিকিৎসক ডা. ওয়ালিদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে পা কেটে না ফেলার অনুরোধ করেন। এতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার পা দু’টি না কেটেই দীর্ঘদিন ধরে তাদের খরচে চিকিৎসা চালিয়ে আসছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রায় দু’মাস ধরে বিনা চিকিৎসায় ওই হাসপাতালের বেডেই পড়েছিলেন তিনি। এরপর ওই হাসপাতালে কর্মরত শাহিদা নামে এক বাংলাদেশী মেয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারপর সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেন শারমিনের দুলাভাই কিসমত। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন তাকে ফেরত আনতে ২০ লাখ টাকার উপরে খরচ পড়বে। গত ২৯শে অক্টোবর শারমিনকে নিয়ে মানবজমিন-এর প্রথম পাতায় রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর আমির উদ্দিন নামে এক বাংলাদেশী তাকে হাসপাতালে দেখতে যান। তার খোঁজখবর নেন। শারমিন জানান, আমির উদ্দিন প্রতিদিন খাবার নিয়ে দেখতে যেতেন। তিনি তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে। আমির উদ্দিন একজন স্বেচ্ছাসেবী। এদিকে বুধবার রাতে বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে। রাতেই ভর্তি করা হয় তাকে। হাসপাতালের বেডে ঠিকমতো বসতেও পারছেন না। শারমিনের দুলাভাই আঞ্জুমান মুফিদুলে কর্মরত মো. কিসমত জানান, জন্মের সময় শারমিনের মা মারা গেছেন। এর ৩ বছর পর মারা যান তার বাবাও। আমিই ওকে বড় করেছি। আমি ছাড়া তার কেউ নেই। বিয়ে হলেও পরে জানা যায় তার বউ এবং সন্তান রয়েছে। পরে বনিবনা না হওয়ায় সে বিয়েতেও বিচ্ছেদ ঘটে। শারমিনকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখন শারমিনকে সুস্থ করতে অনেক টাকার দরকার। কোথায় পাবো এত টাকা কিছুই ভাবতে পারছি না।

না কমা দুঃখজনক

সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ালেও দুর্নীতি কমেনি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আর এ দুর্নীতি না কমাকে দুঃখজনক বলেও জানান মন্ত্রী। গতকাল সকালে নবনির্মিত সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের কাছে মন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের দুর্নীতি কমাতে শুরু থেকে কাজ করছে। এজন্য প্রথমে সরকারি অফিসে দুর্নীতি কমাতে বিগত পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ৬২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল হলে দুর্নীতি কমে- এ কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশে দুর্নীতি কমাতে সরকার কাজ করছে। আগামীতে দেশে দুর্নীতির হার কমেও আসবে। দুর্নীতিতে আমরা উপরে উঠেছি কিংবা নিচে নেমেছি এখনই সেই বিচার করা খুব সহজ নয়। এদিকে, সমপ্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ ও ছাত্রলীগ কর্মী সুমন খুনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন সেশনজট নেই। তেমন কোন সংঘাতও ছিল না। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমপ্রতি সময়ের সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা দুঃখজনক বলেও জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সেখান থেকে বের করে দিতে হবে। তবেই ওই ক্যম্পাসে ফিরে আসবে শান্তি। এজন্য তিনি সকালের সহায়তা কামনা করেন। সকাল ১০টায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সিলেটের নবনির্মিত শহীদ মিনার পরিদর্শনে আসেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত সিলেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা তাকে স্বাগত জানান। অর্থমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে নির্মাণাধীন শহীদ মিনার পরিদর্শন করেন এবং দ্রুত শহীদ মিনারের কাজ শেষ করার তাগিদ দেন। পরে মন্ত্রী শহীদ মিনারের সামনে বসে সিলেটের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে মন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে টিআই’র রিপোর্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে কথা বলেন। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুজ জহির চৌধুরী সুফিয়ান, সিলেটের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আ ন ম শফিকুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা সুজাত আলী রফিক, বিসিবির পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, আওয়ামী লীগ নেতা নাছির উদ্দিন খান, যুবলীগ মহানগর সভাপতি আলম খান মুক্তিসহ সিলেট সংস্কৃতি অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ।

‘উদ্যোগহীনতায় দুর্নীতি বেড়েছে’

সরকারের উদ্যোগ-হীনতায়ই দুর্নীতি বেড়েছে বলে মনে করেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় দুর্নীতি উৎসাহিত হয়েছে। সরকারের প্রচেষ্টায় দুর্বলতা ও আইনগতভাবে ত্বরিত ব্যবস্থা না নেয়ায় দুর্নীতির সূচকে দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। অবস্থা একই ভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ অবস্থানের আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনরা। গত বুধবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সারাবিশ্বে একযোগে দুর্নীতির ধারণাসূচক প্রকাশ করে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে গত এক বছরে দুর্নীতি বেড়েছে। সূচকে অবনতি হওয়ায় নিম্ন ক্রমের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৪তম। আগের বছর এ অবস্থান ছিল ১৬তম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। বড় কথা হলো আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে, যেটা আমরা পারিনি। তাছাড়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। যেখানে যেখানে দুর্নীতি হয় সেখানে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার এবং এর পরিধি বাড়াতে হবে। আইনিভাবে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব না হওয়ায় দুর্নীতিতে উৎসাহ যুগিয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদের ব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে ও নিরপেক্ষভাবে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এছাড়া ‘অনেকেই বলে থাকেন সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হলেও তারা দুর্নীতি করছে’- এ বিষয়ে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে কি লাভ- যদি নৈতিকতা তৈরি করতে না পারি? নৈতিক বোধ সৃষ্টিতে সরকারকে প্রশিক্ষণমূলক কাজ হাতে নিতে হবে। অন্যদিকে যারা দোষী তারা শাস্তির আওতায় আসছে না। ফলে ঘুষ-দুর্নীতি বহু গুণে বেড়েই চলেছে দিনকে দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, দেশে ঘুষ-দুর্নীতির আদৌ কোন উন্নতি হয়নি। এ নিয়ে সরকার ও সমাজের কোন উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। আর এটা দীর্ঘ দিনের সমস্যা। সরকার ও সামাজিক উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর প্রতিবেদন নিয়ে বলার কিছু নেই। তাদের প্রতিবেদন সূচকেই সব উঠে এসেছে। এতে বাংলাদেশ দুর্নীতির সূচকে দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। এর মূল কারণ সরকারের প্রচেষ্টায় দুর্বলতা ছিল। তাছাড়া, সরকারের মৌখিক যে কার্যক্রম তা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আর দুর্নীতি বাড়ছে। বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, গত ১ বছরে দুর্নীতি বিশেষত এমপিদের হলফনামা, ব্যাংকের জালিয়াতি থেকে শুরু করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও অসৎ লেনদেনসহ এ সংক্রান্ত সংবাদ জনসম্মুখে এত এসেছে-দুর্নীতি থেকে দুদকের দায় মুক্তির হিড়িক দেখে আমার মনে হয়েছিল টিআইয়ের ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা আরও নিচে নামবে। সেই প্রেক্ষাপটে আরও দু’ধাপ নিচে নামার রিপোর্ট খুব খারাপ বলবো না। তবে এই ধারা বজায় থাকলে শিগগিরই দুর্নীতিতে প্রথম স্থান আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারবো। তিনি বলেন, একদিকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে স্পষ্টতই দুর্নীতি বাড়ছে। একদিকে গণতন্ত্র ও উন্নতি। পাশাপাশি দুর্নীতি। এ দু’টো একসঙ্গে চলতে পারে না। দুর্নীতি যেহেতু বাড়ছে, সেহেতু গণতন্ত্র ও উন্নতি বাড়ছে-এটা বলা যাবে না। যারা এটা বলে তারা সম্ভবত জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে টিআই’র বৈশ্বিক দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশের সময় টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের দুর্নীতির সূচক দেশে দুর্নীতির প্রকট রূপেরই ইঙ্গিত করে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হওয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। দুর্নীতির সূচক (সিপিআই) ফেব্রুয়ারি ২০১১ সাল থেকে আগস্ট ২০১৪ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ করে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

ভিন্নমত থাকলেও মাও সেতুং-এর নিশানা মোছেনি চীন by মাহবুবা চৌধুরী

চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সিপিসির আমন্ত্রণে সাত দিনের সফরে চীন গিয়েছিলাম। পনেরো সদস্যের বেশ বড়সড় একটা দল। দলে ছিলেন সাংবাদিক, কূটনৈতিক, কলামনিস্ট এবং শিল্প উদ্যোক্তা। ঢাকা থেকে কুনমিং দুই ঘণ্টা। কুনমিং-এ যাত্রাবিরতি প্রায় দেড় ঘণ্টা। কুনমিং থেকে বেইজিং সাড়ে তিন ঘণ্টা। বেইজিং বিমানবন্দরে পৌঁছতেই দেখলাম আমাদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছেন চীনা কর্মকর্তারা। ঝকঝকে তকতকে সুপরিসর বাসে উঠে পড়লাম। বিমানবন্দর থেকে ওয়ান সু হোটেলে পৌঁছতে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা। যখন হোটেলের রুমে ঢুকলাম তখন রাত সাড়ে তিনটা। বলা হলো ভোর সাড়ে ছ’টায় ওয়েকআপ কল দেয়া হবে। হোটেলে সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে নাস্তা সেরে সকাল ন’টায় মিটিং! একটু অবাক হলাম। এত রাতে ঘুমিয়ে এত সকালে উঠবো কি করে? হ্যাঁ, আমরা ঠিকই উঠেছি। সময়মতো মিটিংয়েও উপস্থিত হয়েছি। পরে বুঝেছি, চীনারা এত কর্মঠ আর পরিশ্রমী বলেই এত উন্নতি করতে পেরেছে। সকাল ন’টায় বাংলাদেশ, চায়না, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার করিডোর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। চায়না ইনস্টিটিউট অব সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়ান অ্যান্ড ওসেনিয়া স্টাডিজের উপপরিচালক লি লি আশাবাদ ব্যক্ত করলেন, এই করিডোর চারটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই করিডোরটি কলকাতা হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম, মিয়ানমারের মান্দালয় দিয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত যাবে। এ ব্যাপারে চীন খুবই আন্তরিক। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনকে নিয়ে শীর্ষ সম্মেলনে আগ্রহী। ভাবলাম, সত্যি কি কোনদিন এই করিডোর হবে? নাকি শুধু আলোচনায়ই সীমাবদ্ধ থাকবে? বেলা এগারোটায় মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করলেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ভাইস মিনিস্টার গুয়ো ইয়াঝু। খাবার টেবিলে চীনের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক- সব বিষয়েই আলোচনা হলো। দুপুর দেড়টায় ইম্পেরিয়াল প্যালেস এবং তিয়ানআনমেন স্কয়ারে গেলাম। ইমপেরিয়াল প্যালেস দেখতে প্রচুর লোকসমাগম হয়। প্রাসাদগুলো অনেকটাই মঠের আদলে তৈরী। বিরাট এলাকা জুড়ে প্রাসাদ। চারদিকে গাছগাছালি, লেক, স্নিগ্ধ-শান্ত পরিবেশ। তিয়ানআনমেন স্কয়ারে বহু মানুষের আনাগোনা। সবাই ঘুরেফিরে দেখছেন। কেউ ছবি তুলছেন। আবার কেউবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে জটলা করে আড্ডা দিচ্ছেন। ভাবতে অবাক লাগে- এই তিয়েনআনমেন স্কয়ারে একদিন গণতন্ত্রকামী ছাত্র দমনে রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়েছিল। এর কাছেই মাও সেতুং-এর বিশাল রঙিন ছবি। দেখে অবাক হলাম, বর্তমান চীন মাওয়ের অনেক নীতির সঙ্গেই একমত নয়। তার অনেক সিদ্ধান্তই ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। বর্তমান চীন এগিয়ে চলেছে আধুনিক ধ্যানধারণা নিয়ে। তাই বলে মাও সেতুং-এর নাম-নিশানা তারা মুছে ফেলেনি। বর্তমান শাসকরা তার যোগ্য সম্মানটুকু দিতে কার্পণ্য করেনি। চীনের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। বিকালে নিউচিয়ে মসজিদে গেলাম। চীনে প্রায় আড়াই কোটি মুসলমান রয়েছেন। মসজিদের ইমাম সাহেব আমাদের স্বাগত জানালেন। মহিলা ও পুরুষদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। দেখলাম, বেশ কিছু মুসল্লি নামাজ পড়ছেন। মসজিদের এক পাশের একটা কামরায় চোখ জুড়ানো তৈজসপত্র। তাতে সোনালি হরফে লেখা রয়েছে আল্লাহর কালাম। রয়েছে নানা রঙের নানা আকারের নজরকাড়া তসবিহ। এ সব কিছুই বিক্রির জন্য।
দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে চীনের বিভিন্ন পর্যায়ের গবেষক, নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাদের মূল কথা হচ্ছে- চীন থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রসারে আরও মনোযোগী হতে হবে। সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য চীন সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেমন অবৈতনিক শিক্ষা, খাদ্য ও অর্থ সাহায্য।
চীনের বিভিন্ন প্রদেশে আমরা অবস্থান করেছি এবং নানা ধরনের চীনা খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেছি। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের চাইনিজের সঙ্গে আসল চীনা খাবারের সামান্যতম মিলও খুঁজে পাইনি। খাবার টেবিলে প্রায়ই মজার ঘটনা ঘটতো। আমাদের অনেকেই না বুঝে অনেক কিছু খেয়ে ফেলতো। পরে এ নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছে। বেইজিং-এ পিকিং ডাক রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছি। বিরাট টেবিল। টেবিলের মাঝখানে বড়সড় গোল চাকতি। ওয়েটাররা একের পর এক খাবার এনে রাখছে। চাকতি ঘুরিয়ে নিজের কাছে খাবারের ডিশ এনে সবাই খাবার তুলে নিচ্ছেন। ওয়েটারগুলো এক শব্দও ইংরেজি বোঝে না। নানা পদের খাবার আসছে। এবার এলো ছোট ছোট টুকরার ভুনা মাংস। ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করা হলো। সে ইংরেজি বোঝে না। কেউ বললো- এটা ছোট মুরগি, কেউ বললো পাখি। অনেকেই মনের আনন্দে খেতে শুরু করলেন। আমি সব সময়ই কোন না কোন চীনা কর্মকর্তার পাশে বসার চেষ্টা করতাম। উদ্দেশ্য তাদের কাছ থেকে খাবার সম্পর্কে জেনে নেয়া। আমার পাশে বসা চীনা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, দিস ইজ ফ্রগ, ভেরি টেস্টি। খাওয়ার পর সবাইকে বললাম, ওই পাখির মাংসটা কেমন? অনেকেই বললেন, বেশ ভাল। কেন আপনি খাননি? বললাম, না, ওটা পাখির মাংস নয়। ওটা ছিল ব্যাঙ। যারা খাননি তারা হো হো করে হেসে উঠলেন। আর যারা খেয়েছেন তারা তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আরেক দিন ডিনারে অনেকেই তৃপ্তি করে পিৎজা খাচ্ছেন। আমি গাইড মিস নিয়েকে বললাম, পিৎজায় কিসের মাংস একটু জেনে দেবে? মিস্‌ নিয়ে এসে বললো, ওটা পর্ক অর্থাৎ শুয়োর। আমি এসে বলতেই যারা খাওয়া শুরু করেছিলেন তারা ফেলে দিলেন। যারা খেয়ে ফেলেছেন তারা পানি খেতে শুরু করলেন।
শিল্প সংস্কৃতিতেও রয়েছে চীনের বর্ণাঢ্য ঐতিহ্য। লিউ আন থিয়েটারে পিকিং অপেরা দেখতে গেলাম। ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নানা রঙের, নানা ঢঙের মুখোশ পরে কি সুন্দরভাবে চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তুলছে অবাক বিস্ময়ে দেখলাম। অপেরা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন কোন সুদূর অতীতে হারিয়ে গেছি।
চীনে গিয়ে চীনের প্রাচীর দেখবো না তা তো হয় না। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই রওনা হয়ে গেলাম। সেদিন ছিল প্রচ- শীত। তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের নিচে। হাত মোজা, পা মোজা, জাম্পার কোট টুপি এক গাদা গরম কাপড় গায়ে চড়িয়ে গ্রেটওয়ালে পৌঁছলাম। পথে যেতে লক্ষ্য করলাম দোতলা-তিনতলা ফ্লাইওভার, যানজটের বালাই নেই। ছিমছাম দালানকোঠা। প্রচুর গাছগাছালি। কি বিরাট দেশ। ১৩৫ কোটি জনসংখ্যা, তবু যেন রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাঁকা। আমাদের দেশের মতো লোকারণ্য নয়। গ্রেটওয়ালের আশেপাশে প্রচুর উঁচু-নিচু পাহাড়। পাহাড় কেটে কেটেই তৈরি হয়েছে গ্রেটওয়াল। ক্যাবল কারে করে যেতে হয় গ্রেটওয়ালের বেদীতে। তার পর সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা। গ্রেটওয়াল নির্মাণের পেছনে যে কারণটি রয়েছে তা হলো- মঙ্গোলিয়ান দস্যুরা চীনে ঢুকে ধন-সম্পদ লুট করে পালিয়ে যেতো। ওই দস্যুদের রুখে দেয়ার জন্যই গ্রেটওয়ালের পরিকল্পনা। ছোটবেলায় গ্রেটওয়ালের কথা বইতে পড়েছি। মনে মনে কল্পনা করেছি গ্রেটওয়াল দেখবো। গ্রেটওয়ালে দাঁড়িয়ে মনে হলো বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো আজ।
বিকালে কুনমিং-এর উদ্দেশে যাত্রা করলাম। সাড়ে তিন ঘণ্টা পর কুনমিং পৌঁছলাম। কুনমিং হোটেলে মালপত্র রেখে ডিনার সেরে নিলাম। পরদিন সকাল ন’টায় ইউননান প্রদেশের বৈদেশিক বিষয়ক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং। দুপুরে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করলেন মি. হাও কুন, ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল ফরেন অ্যাফেয়ার্স, ইউননান প্রদেশ।
বিকালে এথনিক ভিলেজ পরিদর্শনে গেলাম। বিরাট এলাকা জুড়ে এই সংখ্যালঘু জাতিসত্তার গ্রাম গড়ে উঠেছে। এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পোশাক-আশাক, রীতিনীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, বাসস্থান- সব কিছুই সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত ছেলেমেয়েরা নিজ নিজ সম্প্রদায়কে তুলে ধরছে। ইচ্ছে করলে ওদের পোশাক পরে ছবি তোলা যায়। তবে তার বিনিময়ে কিছু পয়সা গুনতে হয়। এথনিক ভিলেজে রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী দোকান। সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তৈরি পণ্যসামগ্রী ইচ্ছে করলে কেনা যেতে পারে। এথনিক ভিলেজে রয়েছে প্রচুর সবুজ গাছগাছালি। নানা রঙের ফুল, নানা জাতের পাখি আর থিরথিরে ঢেউ তোলা দিঘি।
রাতে পুয়ারের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। পুয়ারে জিং লান হোটেলে পৌঁছতে রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল।
পরদিন সকালে সোজা নিনগার কাউন্টির মিনঝেং ভিলেজ। সেখান থেকে পিকান বাগান পরিদর্শন। পিকান হচ্ছে অনেকটা আখরোট জাতীয় ফল। খেতে খুবই সুস্বাদু। বছরে পঞ্চাশ হাজার টন পিকান উৎপন্ন হয়। সেগুলো মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। উৎপাদনের প্রায় ৭০ ভাগই রপ্তানি করা হয়।
সেখান থেকে নেকলি ভিলেজ। এখানে বলাবাহুল্য, বিভিন্ন ভিলেজে গিয়ে উপভোগ করেছি উষ্ণ আতিথেয়েতা। অনাবিল সৌন্দর্য আর নতুন অভিজ্ঞতা। পুয়ার আমার কাছে সৌন্দর্যের লীলাভূমি। সারি সারি পাহাড়। পাহাড়ের গাঘেঁষে ঘন সবুজ চায়ের বাগান। পাহাড়ের পাদদেশে নাম না জানা ফুলের সমারোহ। ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাচ্ছে নানা জাতের পাখি। যেন এক রূপকথার রাজ্য।
পুয়ার মিউজিয়াম আমাকে মুগ্ধ করেছে। চীনারা চায়ের চাকতি করে সেটা সংরক্ষণ করে রাখে বহুদিন। এই মিউজিয়ামে ১২০ বছরের পুরনো চায়ের চাকতি রয়েছে। এটা নয়নাভিরাম কাচের বাক্সে সংরক্ষণ করা হয়েছে। চীন হচ্ছে চায়ের সূতিকাগার। চীনে প্রথম যে ব্যক্তি চা আবিষ্কার করেছিলেন তার নাম পায়লা। বহু বছর আগে ওই ভদ্রলোক একটা গুহায় আটকা পড়েছিলেন। তার সঙ্গে খাবার-দাবার কিছুই ছিল না। তখন সে পানিতে চায়ের পাতা ভিজিয়ে সেই পানি পান করে অনেকদিন সুস্থভাবে বেঁচে ছিলেন। গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পর পায়লা সবাইকে সেই কাহিনী বলেন এবং গ্রামের সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হন- এই পাতা গরম পানিতে ভিজিয়ে খেলে সুস্থ থাকা যায়। তখন থেকেই গ্রামবাসী চা খেতে শুরু করে এবং চা চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে ক্রমে তা সারা চীনে ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে উঠেই পুয়ার টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন দেখতে গেলাম। বিশাল এলাকা জুড়ে টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। যতই দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। ঘুরে ঘুরে দেখানো হলো সব কার্যক্রম।
পরের গন্তব্য পুয়ার ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্ক। প্রায় দুই কিলোমিটার উঁচু-নিচু সিঁড়ি বেয়ে এই পার্ক ঘুরে দেখতে হয়। ঘন সবুজ বনের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে। আমরা হেঁটে চলেছি। দু’ধারে কত রঙবেরঙের পাখি। রোদ পোহাচ্ছে হিপোপটেমাস। দেখলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট বানর। হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম বানরপল্লীতে। হাতে ক্যামেরা দেখে বানরকুল ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছে। সত্যিই অভূতপূর্ব দৃশ্য। এ গাছ থেকে ও গাছে লাফিয়ে পড়ছে ওরাং ওটাং। বক, সরস আরও কত নাম না জানা পাখি রোদ পোহাচ্ছে দল বেঁধে। দেখলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম মাছ। আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের যে ঘটনাটি অপেক্ষা করছিল তা দেখে আমি অভিভূত। চোখের সামনে বসে আছে পান্ডা। একটি নয় দু’টি নয়, বেশ কয়েকটি। পান্ডা দেখার জন্য হংকং-এর ওশান পার্কে গা ঝলসানো রোদে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পান্ডার দেখা পাইনি। কোন ঝোপের আড়ালে পান্ডা নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। দেখলাম, পান্ডাকে আপেল খাওয়ানো হচ্ছে। গাইড বললো, পান্ডাকে আদর করতে পারো। সাবধান, ওর লেজ ধরবে না। লেজ ধরলে ওরা ভীষণ রেগে যায়। যদিও পান্ডা খুবই নিরীহ প্রাণী। রাতের ফ্লাইটে কুনমিং ফিরে এলাম। পরদিন দুপুরে ঢাকার পথে যাত্রা করলাম।
এই সফরে আমার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মধুর। চীনারা খুবই বন্ধুবৎসল, অতিথিপরায়ণ ও পরোপকারী। চীন যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে চীন পৌঁছে যাবে উন্নতির উচ্চ শিখরে। বর্তমানে চীনে মাথাপিছু আয় প্রায় ছয় হাজার ডলার।

কূটনৈতিক পল্লীতে বিস্ময়

গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের অবনতি ঘটার পর দীর্ঘদিন স্থিতাবস্থা বিরাজ করছিল। তবে দু’দেশের সম্পর্কের আগের টানাপড়েনের চেয়ে এবারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের কটূক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে বিরাট প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গুলশান-বারিধারার কূটনৈতিক পল্লী বিস্মিত। কারণ, দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে গেলেও কাদা ছোড়াছুড়ি বা এতটা নিম্নমানের কটূক্তির দরকার পড়ে না। ফিদেল কাস্ত্রো, হুগো শ্যাভেজ, গাদ্দাফি কিংবা সাদ্দাম হোসেন কট্টর আমেরিকা বিরোধী হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের অনেকে বলেছেন, কিন্তু তারা কখনও ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ ধরনের উক্তি করেননি। এর কোন দরকার পড়েনি। কারণ, কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা বিশ্বের সব সমাজে অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়।
প্রফেসর ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি থাকা না থাকা নিয়ে জাতি বিভক্ত হয়েছিল। আওয়ামী লীগও কিছুটা বিভক্ত ছিল। কিন্তু এবারে কি এমন ঘটলো, যে কারণে আওয়ামী লীগকে এ রকম কঠিন অবস্থান নিতে হলো- সেই প্রশ্ন সর্বত্রই  ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে এবারের বিষয়টি নিরঙ্কুশভাবে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন। যে কোন রাষ্ট্র দরকার হলে যুক্তরাষ্ট্রে তার পোশাক রপ্তানি বন্ধ বা তাকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিংবা আরও কোন চরম পথ অবলম্বন করতে পারে। কিন্তু তাই বলে ভিয়েনা কনভেনশনের বরখেলাপ করতে পারে না। একজন বিদেশী রাষ্ট্রদূত, যিনি তার দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং সার্বভৌমের মুখপাত্র তাকে এতটা নির্দয়তায় বিশেষ করে নিজের মর্যাদা খাটো করে অপমান করতে হবে কেন? বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগের শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যেও। এ অবস্থান কি সুচিন্তিত? তারা যুক্তি দিচ্ছেন, আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে অসেনৌজন্যমূলক আচরণ করার বিষয়টি ঢাকায় অবস্থানরত কূটনৈতিক কোরকেও বিচলিত করতে পারে। এ কূটনৈতিক কোরের একজন ডিন রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কাজের মেয়ে মর্জিনার বিষয়টি কূটনৈতিক কোরের নিয়মিত বৈঠকে উঠতে পারে।  
উল্লেখ্য, সৈয়দ আশরাফ ঢাকায় নিযুক্ত বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনাকে তাঁর বাসার ‘কাজের বুয়া মর্জিনা’র সঙ্গে তুলনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাইকে ‘দুই আনার মন্ত্রী’ বলে উপহাস করেন। বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা না করার’ বিদেশনীতি অনুসরণ করতে বাধ্য। তাই কোন একটি দেশকে বৈরী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা বাংলাদেশ সংবিধান সমর্থন করে না। তবে বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, যে বিষয়টি অনেকেরই নজর এড়িয়ে যাচ্ছে সেটি হলো সৈয়দ আশরাফ নিজের অবচেতনে হলেও ‘কাজের বুয়াদের’ খাটো করেছেন। কাজের বুয়া একটি মানবিক সেবাধর্মী পেশা। বাংলাদেশ রেমিট্যান্স নিয়ে বড়াই করে। কাজের বুয়াদের অবদান সেখানে কম নয়। তাছাড়া একজন মন্ত্রী হিসেবে তিনি সমাজের কোন অনগ্রসর অংশকে আহত করতে একেবারেই পারেন না।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর মনে করেন, নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পর্যায়ে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক এ দূরত্ব কমানোর কার্যকর কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। উপরন্তু সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্য এ দূরত্ব কমাতে মোটেও সহায়ক হবে না।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে, ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ককে কেবল দ্বিপক্ষীয় ফ্রেমে দেখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। বাংলাদেশ বলছে- তারা এখন পূর্বমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু চীন ছাড়া পূর্বের প্রায় সব দেশের বিদেশনীতি মার্কিন নীতির সঙ্গে কোন না কোনভাবে বাধা। অনেকে পরিহাস করে বলছেন- চীন, জাপান ও ভারতের সঙ্গে দৃশ্যমান ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করার পর আওয়ামী লীগ যদি মনে করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রকে আর গুরুত্ব দেয়ার দরকার নেই তাহলে সেটা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। অনেকের মতে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে হালকা করে দেখা কিংবা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বললেই অবশ্য আওয়ামী লীগ দলগতভাবে প্রচ- ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এর আগে মার্কিন সিনেটের শুনানিতে ঢাকায় ড্যান মজিনার উত্তরসূরি মার্কিন নারী রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যের পর কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী একই ভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। তা-ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারসম্মত কিনা সেটাও ছিল এক প্রশ্ন।    
এটা লক্ষণীয়, ড্যান মজিনা কিছুদিন আগে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে বক্তব্য রাখলে ক্ষমতাসীন মহলকে সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছিল। গত ২৭শে নভেম্বর তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। ২৮শে নভেম্বর তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গেও তিনি একই দিনে সাক্ষাৎ করেন। ওই দুই ‘রুটিন’ সাক্ষাৎকালে মার্কিন মন্ত্রী পরবর্তী নির্বাচন কবে হতে পারে সে বিষয়ে  জানতে চান। ২৯শে নভেম্বর ঢাকা ছাড়ার আগে দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি মন্তব্য করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) গণতন্ত্রের বিকাশ দেখতে চায় এবং সে লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।’
ওই একই দিন প্রায় একই সময়ে খুলনা সার্কিট হাউসে মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নিশা দেশাইকে ‘দুই আনার মন্ত্রী’ বলে উপহাস করেন। তিনি বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই আনা মন্ত্রী, চার আনাও না, এক মন্ত্রী আছে নিশা দেশাই।’ তিনি  এসময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ কিন্তু ওই অবস্থায় নাই যে কাজের মেয়ে মর্জিনা বাংলাদেশের ক্ষমতার রদবদল করতে পারে।’ অনেকের মতে ‘ওই অবস্থার’ কথা ইঙ্গিত করে সৈয়দ আশরাফ ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন নাকি এর পরের কোন পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা স্পষ্ট নয়। উইকিলিকস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এক-এগারোতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। কথা বলেছেন।
অনেকের মতে নিশা দেশাইয়ের সফর সম্পর্কে সরকার হয়তো ভিন্ন কোন বার্তা পেয়ে থাকবেন। কারণ, সরকারি মহল মনে করে, বিএনপির আন্তর্জাতিক লবিংয়ের অংশ হিসেবে তিনি ঢাকায় আসেন। তাই প্রধানমন্ত্রী তাকে সাক্ষাৎ দেননি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে নিশা দেশাইয়ের সাক্ষাৎকে সরকার ভালভাবে নেয়নি। কারণ, তিনি সরকারি মহলের বিবেচনায় এখন আর বিরোধীদলীয় নেতা নন। পাশাপাশি পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে নিশা দেশাইয়ের মন্তব্যেও সরকারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের শুভাকাঙক্ষীরা মনে করেন, বিএনপি আদৌ লবিং করে আনলে তাকে পাল্টা লবিং করে ঠেকাতে হবে। লবিংয়ের উত্তর লবিং। প্রকাশ্য বৈরিতা কোন উপযুক্ত উত্তর নয়। এর আগে সরকারের চারজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর মন্তব্যের উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের হতাশা বাংলাদেশকে জানিয়েছিল।
উল্লেখ্য, বর্তমানে  যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক দেশ। এশিয়ায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পর বাংলাদেশই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক বৈদেশিক সাহায্য পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তার একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র’ বিবেচনা করে। সে কারণে শেখ হাসিনাই এর আগে একটি চুক্তি করেছেন। গত মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত দু’দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে অংশীদারত্বের সংলাপেও উভয় পক্ষই পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সংকল্প ব্যক্ত করে।
২০১৫ সালের গোড়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর ওয়াশিংটন সফর প্রায় ঠিক ছিল। এখন এ সফর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে কিনা সেটাও প্রশ্ন। বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, ‘নির্বাচনের ব্যাপারে যে কোন মন্তব্যকেই বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সুনজরে দেখবে না। মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়ার কোন পরিকল্পনা এই সরকারের নেই। ফলে নির্বাচন বিষয়ক যে কোন ইঙ্গিত তাদের গাত্রদাহের কারণ হতে পারে। সম্ভবত আওয়ামী লীগ মনে করে, তাদের আমেরিকাকে প্রয়োজন নেই। আমি আজই (গত মঙ্গলবার) পড়ছিলাম, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক আমদানি না করে আমেরিকার কোন উপায় নেই। কারণ, বাংলাদেশ থেকে আমদানি বন্ধ করলে আমেরিকা তৈরী পোশাকের সঙ্কটে পড়বে। তার এ কথার অর্থ সম্ভবত এই যে আমেরিকাকে বাংলাদেশের যতটা প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি আমেরিকার প্রয়োজন বাংলাদেশকেই। বলাই বাহুল্য, এ রকম ধারণা হাস্যকর। দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে এই নীতি অনুসরণের ফল ভয়াবহ হবে। তবে চলতি সরকার দীর্ঘ মেয়াদের কথা ভাবছে বলে মনে হয় না।  বাংলাদেশ সম্ভবত একই সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশকে জানান দিতে চায় যে চীন তাদের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাস।’
উল্লেখ্য, এর আগে মাইলাম তার একাধিক নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশ ক্রমশ কার্যত একদলীয় সরকার ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।’ ওবামা সরকার যে বাংলাদেশের চলতি ‘একতান্ত্রিক লক্ষণের’ বিরুদ্ধে কোন কঠোর অবস্থান নেয়নি, তাতে মাইলাম তার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

শিম্পাঞ্জি টমির ‘কোন মানবাধিকার নেই’

যুক্তরাষ্ট্রে টমি নামের একটি শিম্পাঞ্জির ‘কোন মানবাধিকার নেই’ এবং তার মনিবের কাছ থেকে মুক্ত করারও প্রয়োজন নেই। নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আপিল আদালতের এক রায়ে বলা হয়েছে, খাঁচায় আটকানো শিম্পাঞ্জি টমি যেহেতু ‘কোন বৈধ দায়িত্ব’ পালন করতে পারে না, তাই তাকে ‘আইনগতভাবে একজন ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব নয়। আদালতের রায়ে আরও বলা হয়, কোন প্রাণীকে কখনও মানুষের সমান মর্যাদা দেয়ার নজির বিশ্বে নেই। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। গত অক্টোবর মাসে ননহিউম্যান রাইটস প্রজেক্ট (এনএইচআরপি) নামে একটি সংগঠন শিম্পাঞ্জি টমিকে খাঁচা থেকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়ে এ মামলা করে। মামলার ভাষ্যে বলা হয়, মানুষের সঙ্গে আচরণগত বেশ কিছু বিষয়ে সাদৃশ্য থাকায়, শিম্পাঞ্জিদের স্বাধীনতাসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার থাকা উচিত। আদালতের রায়ে বলা হয়, বলা বাহুল্য, শিম্পাঞ্জি মানুষের মতো আইনগতভাবে বৈধ দায়িত্ব পালন করতে পারে না। শিম্পাঞ্জির কোন দায়দায়িত্ব নেই এবং নিজ কাজের জন্য তাকে আইনের কাছে জবাবদিহিও করতে হয় না। এ রায়ের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করবে বলে জানিয়েছে এনএইচআরপি। স্বাভাবিকভাবেই, টমির মালিক প্যাট্রিক ল্যাভারি আদালয়ের রায়ে খুশি। টমির বয়স আনুমানিক ৪০ বছর এবং সে আগে সার্কাসে দর্শকদের বিনোদন দেয়ার কাজ করতো। ১০ বছর আগে ল্যাভারির কাছে দেয়া হয় টমিকে।

‘ষড়যন্ত্রের দুঃস্বপ্ন দেখছে সরকার’ -মির্জা ফখরুল

সরকার ষড়যন্ত্রের দুঃস্বপ্ন দেখছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বলেছেন, সরকার বুঝতে পারছে, তারা চোরাবালির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ঘর  যে কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। সে কারণে তারা ষড়যন্ত্রের দুঃস্বপ্ন দেখছে। বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে স্বৈরাচার পতন দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা আলমগীর বলেন, এরশাদের আমলের চেয়ে দেশ এখন আরও ভয়াবহ স্বৈরাচারের যাঁতাকলে। হাসিনার বিরুদ্ধে সেøাগান উঠতে হবে। আওয়াজ তুলুুন, নব্য স্বৈরাচার শেখ হাসিনা নিপাত যাক। উত্তর-দক্ষিণ সেøাগান না দিয়ে এ ধরনের সেøাগান দিতে হবে। তিনি বলেন, বলেন, একদিনে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়নি। দীর্ঘ ৯ বছর সংগ্রাম করে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন হয়েছে। তিনি বলেন, স্বৈরাচার এরশাদকে বাঁচিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বেঈমানি করে নির্বাচনে গিয়েছিলেন। তার সে ঋণ শোধ করতে এরশাদ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের মৃত্যুর পর বিক্ষোভের বিষয়টি উল্লেখ্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, আমেরিকায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের মৃত্যুতে লাখ লাখ মানুষ মিছিল করেছে। দেশে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, শত শত মায়ের কান্না শোনা যায়, কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। আমাদের মাঠে নামতে হবে। শপথ নিতে হবে, কোনভাবেই এদের ছাড় দেব না। বাধ্য করবো, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে। মির্জা আলমগীর বলেন, সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। এ কারণে তারা কথায় কথায় ষড়যন্ত্র দেখে। দুঃস্বপ্ন দেখে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপির আন্দোলন যখনই দানা বাঁধে তখন সরকার বলে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য বিএনপি আন্দোলন করছে। বিএনপি কাউকে রক্ষা করার জন্য আন্দোলন করে না। বিএনপির আন্দোলন গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দিচ্ছে। তারা একদলীয় শাসনের দিকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মির্জা আলমগীর। আলোচনা সভায় বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আমানউল্লাহ আমান, নাজিম উদ্দীন আলম, জয়নুল আবদিন ফারুক, সৈয়দ মোয়াজ্জেম  হোসেন আলাল, হাবীব-উন নবী খান  সোহেল, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, হাবিবুর রহমান হাবিব, শিরিন সুলতানা, মীর সরফত আলী সপু, রাজিব আহসান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

‘কেউ পাশে না থাকলে মরে যাবো না’ -প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোন দেশ পাশে না থাকলে আমরা একেবারে মরে যাব না। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতা করেছিল। তারপরও দেশ স্বাধীন হয়েছিল। তাই এখনও কোন দেশকে পাশে না পেলে কোন বাংলাদেশের সমস্যা হবে না। এছাড়া গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র সব রকম চেষ্টাই করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। আজ বিকালে গণভবনে অষ্টাদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ও মালয়েশিয়া সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। মার্কিন মন্ত্রী সম্পর্কে সৈয়দ আশরাফের মন্তব্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শেখ হাসিনা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন, তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। কেউ যদি কোন মতামত দিয়ে থাকেন তাহলে সে দায়িত্ব তার। তাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিলেন, আর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশেই তা করা হয়েছিল বলে শোনা গেছে। আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সারা বিশ্ব তন্ন তন্ন করে খুঁজেও প্রমাণ পায়নি। কোন সমস্যা হলেই কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে বলে মনে করেন না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর একাত্তরেও যুক্তরাষ্ট্র বিরুদ্ধে ছিল, বাংলাদেশ শেষ হয়ে যায়নি। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে ‘গতকাল রাতে বৈঠকে’ যেসব সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইন তার আপন গতিতে চলবে। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, রাতের অভিসার বাদ দিন। দিবালোকে কাজ করুন। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শর্ত সাপেক্ষ্যে শিথিল করা হবে কিনা- এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, কারও সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সুযোগ নেই। সমস্যা থাকতে পারে। পাশাপাশি আলোচনাও হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এটিই নিয়ম। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে বক্তব্য দেন মালয়েশিয়া সফর নিয়ে। এই সফরে জনশক্তি রপ্তানি, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ এবং পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি, দুটি সমঝোতা স্মারক ও একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে।

‘নির্যাতনের শিকার নারীদের ন্যায়বিচারে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে’ -প্রধান বিচারপতি

সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার নারীরা যেন ন্যায়বিচার পান, এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন। আজ রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পারিবারিক ও যৌন সহিংসতার শিকার মেয়েদের বিচারের অধিকার’ শীর্ষক একটি কর্মশালার উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধান বিচারপতি বলেন, নারী নির্যাতন বন্ধে শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের দরকার। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ-রাষ্ট্র সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আশার বিষয় হলো, বাংলাদেশে শিক্ষার হার বাড়ছে। নারীর ক্ষমতায়নে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী সবাই নারী। তৈরি পোশাক খাতের ৮০ ভাগ শ্রমিকই এখন নারী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারীদের সমান অধিকার দিয়েছে সংবিধান। সেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে আন্তর্জাতিক আইনগুলোতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। নারীরা যেন সুবিচার পান, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে। বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, সংবিধান নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দিলেও অশিক্ষা, দারিদ্র্য বাংলাদেশের নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা। এ দেশের সহিংসতার শিকার একটি মেয়েকে থানার পুলিশ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সংকট মোকাবিলা করতে হয়। পদে পদে সবাই বোঝানোর চেষ্টা করে যেন মেয়েটাই দায়ী।

‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে’

গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপিয়ান কমিশনের হেড অব ডিভিশন পাওলা পামপালনি। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার গণতন্ত্র খুবই নাজুক ও হতাশাজনক; তাই  রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে সংলাপের ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব আরেকটি নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা উচিত। বুধবার ইউরোপিয়ান কমিশন ইউকের নিজস্ব কার্যালয়ে ওভারসিজ স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন ‘বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ইউকে’র উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। পাওলা পামপালনি বলেন, যেসব গুম, খুন, ক্রসফায়ার, ও রাজনৈতিক নির্যাতন বাংলাদেশে চলছে তা অচিরেই বন্ধ না হলে বর্তমান সরকারকে কঠিন সময় পার করতে হবে। কারণ বহিবিশ্ব এই বিষয়গুলো নজরদারিতে রেখেছে।
বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ইউকে’র চেয়ারপার্সন আতা উল্যাহ ফারুকের সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইউরোপিয়ন কমিশনের রাজনৈতিক কর্মকর্তা জায়ানা ক্রুস সেলিং। তিনি বলেন,
বাংলাদেশ বর্তমানে গার্মেন্টস সেক্টর থেকে শুরু করে অনেক দিকে উন্নয়ন করেছে। তাই সরকারের কাজ হবে কোন অরাজকতা সৃষ্টি না করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা করা। তিনি বলেন, গুম, খুন কখনোও দেশের সুফল বয়ে আনতে পারেনা। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এটা সুখকর নয়।
সেমিনারে ইউরোপিয়ান কমিশন কর্মকতারা বলেন, ক্ষমতার মোহে সরকার জনগণের মৌলিক অধিকারের তোয়াক্কা না করায় দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। তাই দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আন্তরিক পরিবেশে আলোচনার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে দুই দলের মতৈক্যে পৌঁছা উচিত। বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ ইউকে’র চেয়ারপার্সন আতা উল্যাহ ফারুক বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সকল রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে আলোচনায় বসা উচিত। সেমিনারে আরোও বক্তব্য রাখেন অ্যালেসআন্ডারা ভোটা, কেইলি গ্যালার, এস এইস সোহাগ, খালেদ পাভেল, ফরহাদ হোসেন প্রমুখ।

সৎকার করা ‘পাপ’ তাই ‘গডম্যানে’র মৃতদেহ ফ্রিজিং: আশ্রমকে ঘিরে চলত যৌনতা

মারা যাওয়ার ১১ মাস পরেও ‘গডম্যান’-এর মৃতদেহ সৎকার না করে ফ্রিজিং করে রাখা হয়েছে। তিনি পাঞ্জাবের স্বগোষিত গডম্যান আশুতোষ মহারাজা। তার মৃতদেহ দীর্ঘ ১১ মাস ধরে রাখা হয়েছে জলন্ধরের দিব্য জ্যোতি জাগরতি সংস্থানে। গত মাসের শেষের দিকে আদালত রায় দেয় ১৫ দিনের মধ্যে আশুতোষের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হবে। আদালতের রায় মেনে নিতে পারছেন না বাবা আশুতোষের ভক্তরা। তারা বলছেন, বাবার সৎকার করা ‘পাপ’। আগামী ১২ই ডিসেম্বর বিরাট জমায়েতের ডাক দেয়া হয়েছে। তারপর দিনই কোর্টের  বেধে দেয়া সময়সীমা শেষ হচ্ছে। চলতি বছর ২৯শে জানুয়ারি চিকিৎসকরা আশুতোষ মহারাজকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর বাবার ভক্তরা আর কাউকে আশুতোষের দেহ পরীক্ষা করতে দেয়নি। সেদিন  থেকেই বিশেষ উপায়ে ফ্রিজিং করে আশুতোষের দেহ রেখে দেয়া হয়। প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ভক্ত বাবার মৃতদেহকে প্রণাম করে আসে। কিছুদিন আগে হরিয়ানার স্বঘোষিত গডম্যান রামপালের আশ্রমে হানা দিতে গিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়ে পুলিশ। সেই অভিযানে বেশ কয়েকজন মারা যান। আহত হন অনেকে। সেইরকমই কিছুর আশঙ্কা জলন্ধরের এই আশ্রমেও করা হচ্ছে।
আশ্রমকে ঘিরে চলত যৌনতা ও স্বেচ্ছাচার:
এদিকে অভিযোগ আছে, তার আশ্রমে ধর্মকে বর্ম করে পুরোদমে চলত অবাধ  যৌনতা ও স্বেচ্ছাচার। প্রতিদিন রাতে তাকে সেবা করার জন্য শয্যাসঙ্গী হতেন সুন্দরী ভক্তরা। হরিয়ানার ‘গডম্যান’ রামপালের শোওয়ার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে তার যৌনচর্চার ভূরিভূরি প্রমাণ হাতে পয়েছে পুলিশ। হিসারের সৎপাল আশ্রমের ভিতরে বাবা রামপালের দেখানো পথে অবাধ যৌন স্বেচছাচারে মেতে উঠতেন তার ভক্তরাও। আর এক স্বঘোষিত ধর্মগুরু রজনীশের আদলে রামপালও আশ্রমের আড়ালে রীতিমতো মধুচক্রের আসর  ফেঁদে বসেছিলেন। রামপালের আশ্রম থেকে তার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল বিলাসবহুল ঘর থেকে পুলিশ উাদ্দার করেছিল একাধিক গর্ভনির্ণায়ক যন্ত্র, যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ। এমনকি তার ঘরের সঙ্গে লাগোয়া শৌচালয় থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক মহিলাকে উদ্ধার করে পুলিশ। ওই মহিলার উপর যৌন নিগ্রহ চালানো হয়েছে বলে পুলিশের অনুমান। কিশোরী ও তরুণীদের আশ্রমে জোর করে আটকে রেখে তাদের উপর শারীরিক নিগ্রহ চালানো হত বলেও অভিযোগ উঠেছে। রামপালের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা শুনে উত্তরপ্রদেশের বেরেলি থেকে হিসারের আশ্রমে ১৪ বছরের বোনকে নিয়ে এসেছিলেন বিমলেশ কুমার নামে এক তরুন। তার অভিযোগ, রামপাল বোনের সঙ্গে কথা বলবে বলে তাকে আলাদা করে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে বোনের কোনও খোঁজ পাননি। তার আশঙ্কা, বাকিদের মতো বোনকেও রামপালের যৌনলালসার শিকার হতে হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রামপালের এলোমেলো বিছানা ও বসার আসনের নীচে লুকনো ছিল ওষুধ ও গর্ভনির্ণায়ক যন্ত্র। প্রথমে তার আলমারি খুলতেই দেখা যায় রিভলবার, রাইফেল-সহ বিস্ফোরক। বিছানার তলায় অস্ত্র লুকিয়ে রাখা থাকতে পেরে অনুমান করে পুলিশ বিছানা সরাতেই বেরিয়ে পড়ে গডম্যানের যৌনচর্চার সামগ্রী৷ এরপরই প্রকাশ্যে আসে ৬৩ বছরের রামপালের যৌন কেলেঙ্কারির কথা। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় ধর্ষণে অভিযুক্ত স্বঘোষিত গুরু আশারামবাপুর কথা।

ভটভটি অথবা সোনার বিস্কুট by শোয়ায়েব মুহাম্মদ

চার খাঁচা লাউ নিয়ে ভটভটি কাঠগড় বাজারে উঠলে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। ভটভটি মানে ইঞ্জিন ট্রাক্টরের পেছনে ভ্যানগাড়ি। লাউয়ের সঙ্গে ছিল করিম। পুলিশ ভ্যানগাড়ি আটকালে সে লাউ নামিয়ে ভটভটি মালিক মবিনকে ফোন করে। বলে, ‘থানাঅলা হাটে ভটভটি ধরছে।’ খবর পেয়েই মবিন দোকান বন্ধ করে থানায় যাওয়ার রিকশা নেয়।
কাঠগড় বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে স্বাধীনহাট। নামে হাট, আসলে বাজার। তাতে মবিনের মুদি দোকান। দোকানের পাশাপাশি এবার ইলেকশনের আগে থেকে জোরেশোরে পার্টি করছে। রিকশায় উঠে সে তার পরিচিত সাব-ইন্সপেক্টর শওকতকে ফোন করে। দু-তিনবার রিং হয় কিন্তু কেউ ধরে না। মবিনের ভেতর অসহিষ্ণুতা বাড়ে। সে বারবার রিং করে।
পনেরো গন্ডা জমিতে আমন ধান কাটা চলছে। পুলিশে আটক ভটভটিটির বাজারে লাউ নামিয়ে জমি থেকে কাটা ধান নিয়ে আসার কথা। থানা থেকে ভটভটি ছাড়াতে না পারলে কাটা ধান জমিনে কাটা পড়ে থাকবে।
এসআইকে না পেয়ে মবিন করিমকে ফোন করে। টাউনের ব্যাপারী আজ হাটে নেমেছে বেশি। লাউয়ের বাজার গরম। খাঁচা নামানোর সঙ্গে সঙ্গে সব বেচা হয়ে গেছে। মবিন করিমকে জিজ্ঞেস করে, ‘আটক ভটভটি বাজারে, নাকি থানায় নিয়ে গেছে?’
হাটে মাছ বেচতে এলে লোকেরা আসে ফিটফাট হয়ে আর তরকারি নিয়ে আসা লোকদের চুলে চিরুনির আঁচড়ও থাকে না। ভোরে জমিনে গিয়ে মাল তোলা, মাল তুলে পানিতে ধুয়ে গোছগাছ করতে করতে নিজের পরিপাটির কথা খেয়ালও থাকে না। করিমের চুলকাটা দরকার তিন হাট ধরে। ড্রাইভারসহ ভটভটি থানায় নিয়ে গেলে করিম সেলুনে ঢোকে। গত হাটবারেও নিয়ত ছিল চুল কাটার। কিন্তু আনা তরকারি গরম গরম বিক্রি হয়ে গেলে সেলুনে না ঢুকে ঢুকেছিল পাশের সিনেমা হলে। শো বারোটা থেকে তিনটা।
সিনেমা হলে এ সপ্তাহেও নতুন পোস্টার। খেতে ধান কাটা চলছে আর থানায় আটক ভটভটি ছাড়ানোর জন্য মালিক ব্যস্ত থাকবে। সে জন্য চুল কেটে তাড়াতাড়ি ফিরে যাবে ভাবে। চুল কাটতে সেলুনে ঢুকেছে—এ সময়েই মবিন ফোন করে। করিম বলে, ‘ভটভটি ড্রাইভারসহ নিয়ে গেছে থানায়।’
মবিন তাকে ভ্যান ভাড়া করে ধানগুলো নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে বলে। আর বলে, চেয়ারম্যানকে সে ফোনে পাচ্ছে না। যাওয়ার সময় যাতে চেয়ারম্যান বাড়ি হয়ে যায় আর বাড়ি থাকলে তাকে যেন থানায় ভটভটি আটকের খবর দেয়।
চুল কাটা শেষ করে খালি খাঁচা চারটে বেঁধে করিম চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে রওনা দেয়। হাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে চেয়ারম্যানের কাছারি। কিছুদূর গেলেই দেখা হয় আসানের ভ্যানগাড়ির সঙ্গে। আসান আর করিম এক গ্রামের। আসান রিহার্সাল করছে নাটকে—অশ্রু দিয়ে লেখা। ঐতিহাসিক নাটক। প্রতিবছর অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ধান কাটার পর গ্রামে নাটক হয়। এ বছরও হচ্ছে। আসানের পার্ট গোরা চাঁদের। এশার পর প্রতিদিন রিহার্সাল হয় বাবুল সওদাগরের দোকানের পেছনে। আসান করিমকে দেখে একটা সংলাপ দেয়: ‘হ্যাঁ, বাঁচতে আমাদের হবেই। হাবশি শাসনের কশাঘাতে সাত কোটি বাঙালির আজ ঘুম ভেঙেছে, বাঙালির আকাশে আজ মেঘমুক্তির লগ্ন। রাম রহিম এলে তোমরা বলে দিয়ো, গোরা চাঁদ সব দিয়ে গেছে, নিয়ে গেছে শুধু বুকভরা আশার আলো। তারা যেন হিন্দু-মোসলমান এক হয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে কণ্ঠ মিলিয়ে ঘোষণা করে, আমরা হিন্দু নই, মুসলমান নই, আমরা বাঙালি।’ আসানের কথা বলা আর হাত নাড়ানোর ঢং দেখে করিম হাসে। আসান ভ্যানগাড়ি চালায় আবার শীত মৌসুমে অনেক দূর দূর কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা, রাউজান গিয়ে নাটকের পার্ট করে। এক নাইট চার শ টাকা। রাস্তার পাশে পড়ে বাঁধাকপি খেত। খেতের সবুজে করিমের চোখ জুড়ায়। বলে, ‘কপ্পি খেতের বাহাদুরি বোরনে।’ খেতের দুটো আল পরেই চেয়ারম্যান বাড়ির রাস্তা। করিম ভ্যান দাঁড় করিয়ে চেয়ারম্যান বাড়িতে যায় আর মবিনের ভটভটি আটকের বৃত্তান্ত বলে। চেয়ারম্যান তখন তৈরি হচ্ছিল পরিষদে যাওয়ার জন্য। করিমের বৃত্তান্ত শুনে বলে, ‘ঠিক আছে। আই থানাত ফোন করমু।’ মোবিনের দোকান ইউনিয়ন পরিষদের সামনে। একই পার্টির লোক বলে অন্তরঙ্গতা আছে চেয়ারম্যানের সঙ্গে।
২. মবিন থানার কাছাকাছি পৌঁছলে দেখে, থানায় আজ আমন ধান শুকানোর নিকানো উঠোনের সাজগোজ। সবকিছু ফিটফাট পরিষ্কার করা। এক পাশে তার ভটভটিসহ আরও কয়েকটি ভটভটি দাঁড় করানো। থানার সামনে পৌঁছে মবিন এসআই শওকতকে আবার ফোন করে। বারবার রিং বেজে চলে, কারও সাড়া পাওয়া যায় না। থানায় ঢুকে ডিউটি রুম দেখে, ওসির রুম দেখে। সব জায়গা খালি। কাউকে না পেয়ে মবিন মূল দরজার সিপাহিকে জিজ্ঞেস করে, ‘শওকত সাহেব থানায় আছে নাকি?’ সিপাই বলে, ‘আজ এসপি সাহেব আসছে। স্যারেরা সবাই ব্যস্ত।’ থানায় কাউকে না পেয়ে মবিন আসে বাজারে। রাস্তার দুই পাশে গৃহস্থেরা সবজি নিয়ে বসেছে। কাঠগড় বাজার আদতে সবজির হাট। চলে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। সবজির বাজার বলে হাটের দিন ভটভটি আসে বেশি। লাউ, শিম, ফুলকপি, জাত বেগুন বোঝাই ভটভটি। মবিনরা আগে মাল আনত রিকশায়, তারপর ভ্যানগাড়িতে। এখন সবাই মাল আনে ভটভটিতে। ভটভটি এলে পুলিশকে বকশিশ দিলে ছেড়ে দেয়, কিন্তু আজ ধরেছে। মবিন থানায় ভটভটি পেলেও ড্রাইভারকে দেখে না। মবিন ড্রাইভার আর এসআইকে হাটে খোঁজে। হাট থেকে কিছু দূরে অস্থায়ী চা-দোকানে ড্রাইভারকে পায়। মবিনদের গ্রামের কয়েকজনও তরকারি বেচে দোকানে এসে বসেছে। ভটভটি আটকের খবর গ্রামেও পৌঁছে গেছে। ভটভটি করে তরকারি আনা চাষারা ভটভটি হাট থেকে কিছু দূরে রেখে তরকারি নিয়ে আসছে। তার গ্রামের খেতওয়ালাদের সঙ্গে কথা বলছে, এ সময় এসআই শওকতকে দেখে মবিন। কাঠগড় বাজার থেকে থানার দিকে ফিরছে। এসআইকে দেখে মবিন স্যার স্যার বলে দৌড়ে যায়। শওকত থামলে মবিন বলে, ‘স্যার, থানা আমার ভটভটি আটকাইছে।’ আজ ডিসি সাহেব থানায় আসবে। রাস্তা খারাপ তাই হাটবার মানে কাঠগড় বাজারে যানজট। তাতেও কিছু হতো না। প্রতি হাটবারেই সকালে গৃহস্থের তরকারি আনা রিকশা, ভ্যানগাড়ি, ভটভটিতে আর বিকেলে সেই সবজি দূর দূর শহরে নেওয়ার ট্রাকে কাঠগড় বাজারে যানজট থাকে। ঝামেলা তৈরি করেছে কাগজওয়ালারা। গত সপ্তাহে জেলা সদরের প্রধান দৈনিকের প্রধান খবর ছিল, ভটভটিতে কাঠগড় বাজারে যানজট। তাই ডিসি সাহেব আসার আগেই বাজার থেকে সব ভটভটি আটক চলছে। মবিন শওকতকে তার ভটভটি আটকেছে বললে, এসআই বলে কোনো কিছু করার নাই। আজ কোনো তদবির চলবে না। ডিসি সাব বাজারে ভটভটি দেখলে খবর আছে। এবার ইলেকশন আর গ্রামের সালিস বিচারসূত্রে পুলিশের সঙ্গে পরিচয়ে কাজ হলো না দেখে মবিন ভাবে, এবার এমপিকে ফোন করবে।
৩. চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে করিম ভ্যানগাড়িতে ফিরে এলে আসান তাকে একটা বিস্কুট দেখায়। মাঘ মাসে ফোটা গাঁদা ফুল রং। করিম আসানকে জিজ্ঞেস করে, ‘সোনার?’ তার গলায় অবিশ্বাস আর বিস্ময়। আসান বিস্কুট পাওয়ার বৃত্তান্ত বলে। বলে, গতকাল ঘাটঘরের লাস্ট ট্রিপ মেরে খালি রিকশা জেলেপাড়ার টেকে এলে রাস্তার ওপর লেখা কাগজসহ বিস্কুটটা পায়। করিম জিজ্ঞেস করে, ‘সোনার দোকানে দেখাইছ?’
আসান বলে, কাঠগড় বাজারের বণিকেরা তার চেনা। এ রকম বিস্কুট দেখালে নানা রূপ সন্দেহ করবে। তাই কাল থেকে ভাবছে, আপন কারও সঙ্গে সলা করবে। আসানের বক্তব্য করিমকে খুব তাড়িত করে। করিম ভাবে, আসানের বিস্কুট সে কিনে নেবে। তার কাছে লাউ বেচা টাকা আছে আর আছে এগারো শ মডেলের নকিয়া সেট। এগুলোর বদলে বিস্কুট নিলে কাঠগড় বাজারে বণিকদের কাছে বেচে পরে মোবাইল আর মবিনের টাকা দিয়ে দেবে। করিম বলে, ‘আসান ভাই, তোয়ার যন এত ঝামেলা, বিস্কুট আঁর কাছে বেচি দ।’ আসান রাজি হয় না। বলে, ‘কী দিবি?’ করিম মোবাইল আর লাউ বেচা বারো শ টাকা দেবে জানায়। রাস্তার পাশে কুমড়ো খেত। খেতের প্রতি তাবায় রোদ ঠেকানোর জন্য শুকনো খেজুর ডাল লাগানো। আসান খেতের পাশে ভ্যান রাখে। মোবাইল আর টাকা নিয়ে বিস্কুট বের করে দেয়। করিম বিস্কুট হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখে। দেখে মনে হয় আসল সোনার।
৪. এমপি সাহেব কাঠগড় বাজারে জনসংযোগ সেরে নির্বাচনী ক্যাম্পে বসে বলেছিলেন, ‘এখন অথবা নির্বাচনে যদি জিতি, কোনো সুবিধা-অসুবিধা সংকোচ ছাড়া জানাবেন। এই নেন আমার মোবাইল নাম্বার।’ মবিন ছিল কাঠগড় নির্বাচনী ক্যাম্পের প্রধান। ভোটে জেতার পর মালা নিয়ে রাতেই ছুটেছিল এমপি সাহেবের বাড়ি। তার ভেতর অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল। সমগ্র আসন একত্রে হয়তো মার্কার প্রার্থী জিতেছে। কিন্তু প্রতি কেন্দ্রে আলাদা কষ্টে মবিনরা নিজস্ব বিজয় তৈরি করেছে। ভোটের রাতে এমপির বাড়িতে এমপিকে মালা পরাতে গিয়ে মবিন কেঁদে ফেলে। এখন তার শেষ ভরসা পরিচিত পুলিশ অফিসার আটকানো ভটভটি ফেরত অসম্ভব বললে, মবিনের এমপি সাহেবের কথা মনে পড়ে। ভটভটি না হলে খেতের ধান, তরকারি আর দোকানের মুদি বাজার আনায় মুশকিলে পড়বে। মবিন এমপি সাহেবকে ফোন করে। বলে, ‘আঁই মবিন, স্যার। কাঠগড় বাজারের তোন।’ ওপাশে স্লোগান, হট্টগোল, অনেক কণ্ঠ শোনা যায়। এমপি লাইন কেটে দেয়। মবিন আবার ফোন করে। বলে, ‘আঁর ভটভটি পুলিশে লৈ গেছে গৈ স্যার।’ জেলার সবচেয়ে বড় মাঠে তখন নির্বাচনে জেতা মন্ত্রী-এমপিদের সংবর্ধনা চলছিল। এমপি আবারও লাইন কেটে দেন। মবিন কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফোন করে। বারবার ফোন পেয়ে এমপি থানায় ফোন করে।
৫. আসান থেকে বিস্কুট কিনে পরদিন সকাল সকাল করিম হাজির হয় কাঠগড় বাজারে। বণিকেরা দোকান খুলে তন্ত্রমন্ত্রের পর সবে চায়ের অর্ডার দিয়েছে। আগে থেকে আলগা পরিচয় ছিল, করিম বি বি জুয়েলার্সে বিস্কুটটা দেখায়। করিম কাঠগড় বাজারে এলে থানা থেকে পুলিশ যায় মবিনের বাড়িতে। কাল ডিসি আসায় ঝামেলায় ছিল বলে লোকাল এমপির হুকুম পালন করতে পারেনি। সকালেই এমপির হুকুম পালন করতে পুলিশ রওনা হয়েছে। লোকাল এমপি জেলার বড় জনসভার মাঠ থেকে কাল ফোনে নালিশ করেছে, কাঠগড় বাজারের মবিন নামে একজন তাকে বারবার বিরক্ত করছে। পুলিশ যেন থানায় নিয়ে একটু টাইট দেয়। রোদ একটু তাতলে মবিনকে পুলিশ থানায় নিয়ে আসার সময় করিমকে বি বি জুয়েলার্স জানায়, তার আনা সোনার বিস্কুট জাল।

চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে বঞ্চিত মানুষ বসে থাকবে না: সন্তু লারমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ নেতা সন্তু লারমা বলেছেন, পাহাড়ে আন্দোলন চলছে। সরকার যদি শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তবে আন্দোলন আরও গতি পাবে। শান্তি চুক্তি বিরোধীদের দোহাই দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করা হলে যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ বসে থাকবে না। গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজারে ডেইলি স্টার কার্যালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে বিশেষ শাসন ব্যবস্থায় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ শীর্র্ষক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সন্তুু লারমা বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হলেই পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ শাসন ব্যবস্থার আওতায় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে। তবে তার আগে প্রয়োজন নির্বাচিত, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল উদার শাসন ব্যবস্থা। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদকে নিজেদের প্রতিপক্ষ অ্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের পক্ষে তারা পার্বত্য শান্তি চুক্তি সমর্থন করবে না। সন্তু লারমা বলেন, সশস্ত্র ও নিরস্ত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। ১৭ বছর পর আবারও আমাদের মনে হচ্ছে, সেই অবস্থায় ফিরে যেতে হবে। সামরিক ও বেসামরিক আমলাতান্ত্রিকতাকে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পর বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি সরকারপ্রধান সাহসী ভূমিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষদের নিয়ে এগিয়ে আসেন তাহলে স্বাভাবিকভাবে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, পূর্ব পাকিস্তানিরা একসময় বাঙালিদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। এখন বাংলাদেশ পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। নিপীড়িত কিভাবে নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। তিনি বলেন, আমরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে না তবে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রাজনীতি চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ রকম চলতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়িরা সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ অসাধারণ মডেল হতে পারতো অভিমত প্রকাশ করে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে এটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। দৈনিক প্রথম আলোর উপ-সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা এক অমানবিক মনস্তাত্ত্বিকতা নিয়ে বাস করি। তারা পাহাড়ে গেলে মুসলমান হয়ে যায় আর বিহারী ক্যাম্পে গেলে বাঙালি হয়ে যায়। বাঙালিরা বা মুসলমানরা যে অধিকার ভোগ করে পাহাড়িদেরও সে অধিকার ভোগ করতে দিতে হবে দাবি করে তিনি প্রশ্ন রাখেন- তিন পার্বত্য জেলায় ৬টি সেনানিবাস কার জন্য?  সামরিক কর্তা, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা পাহাড়িদের সঙ্গে বর্ণবাদী আচরণ করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, পাহাড়িদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে শান্তি চুক্তির প্রতিটি ধারা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিক। আর তা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। ১৭ বছরেও পার্বত্য চট্টগ্রামে ভোটার তালিকা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে পাহাড়িদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়তে হয়।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের জন্য পাহাড়িরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছেন। তারা জুম চাষ করতে না পেরে মাটির আলু খাচ্ছেন। অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ও ঋণ লাভের আশায় ধর্মান্তরিত হয়েও তাদের লাভ হচ্ছে না। উপরন্তু কাপ্তাই লেক ও সামরিক ক্যাম্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা থাকলেও আমলাদের কারণে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ড. হালিম।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী আমাদের দেশে যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে সেজন্য তাদের একত্রিত না করে আমাদের উদযাপন করার কথা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এত বছর পরেও আমরা তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারিনি। পাহাড়ে সংগঠিত ধর্ষণ ও অপহরণের একটিরও বিচার হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, দেশে প্রচলিত ন্যূনতম আইনের শাসন পাহাড়ে নেই। শান্তি চুক্তির ৭১টি ধারার মধ্যে ৬৮টি বাস্তবায়িত হয়েছে অথচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমি বণ্টন সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রভাবশালী মহল শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে অভিযোগ করে শাহীন প্রশ্ন রাখেন- তাহলে কি প্রভাবশালীরা রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী? সরকারের সদিচ্ছা থাকলে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে ৬ মাসও লাগবে না বলে জানান তিনি। কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ সারেনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আদিবাসীদের জন্য সংসদীয় ককাস গ্রুপের সদস্য অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্‌ এমপি, উষাতন তালুকদার এমপি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বক্তব্য রাখেন।

১০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা, সাতটিরই কারণ ছাত্রলীগ by মোশতাক আহমেদ

(শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষকালে রামদা হাতে দুই কর্মী। ফাইল ছবি।) দেশের আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও দুটি সরকারি কলেজে বর্তমানে যে অস্থিরতা চলছে, এর মধ্যে সাতটির কারণ হচ্ছে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। ছাত্রলীগের এসব কর্মকাণ্ডে সম্প্রতি সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা চলছে। এর মধ্যে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ ছিল। এর ফলে বাড়ছে সেশন জটের আশঙ্কা। ছাত্রলীগের দ্বন্দ্বসহ বিভিন্ন কারণে গত ছয় বছরে অন্তত ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে অনির্ধারিতভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। এসব ঘটনায় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই অন্তত ১৫ জন খুন হয়েছেন। নিজেদের স্বার্থ নিয়ে সরকার-সমর্থক শিক্ষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের কারণে অচলাবস্থা চলছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দ্বন্দ্বসহ বিভিন্ন ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বন্ধ ছিল কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি সাড়ে পাঁচ মাস অনির্ধারিতভাবে বন্ধ ছিল। এর মধ্যে বাস দুর্ঘটনায় এক ছাত্রের নিহত হওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে গত রোববার আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি। এতে সেখানে সেশনজট দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন ঘটনায় গত ছয় বছরে বিভিন্ন সময়ে বন্ধ রাখা বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্লাস ও পরীক্ষা পিছিয়ে অন্তত ছয় মাসের সেশনজটের সৃষ্টি হয়। সংঘাত-সংঘর্ষে এখন সেশনজট আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই অশান্ত পরিস্থিতিতে তাঁরা ক্ষুব্ধ, হতাশ ও উদ্বিগ্ন। তবে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করবেন। এ জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাহসী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
গত ২০ নভেম্বর সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের দুই উপদলের মধ্যে সংঘর্ষে একজন ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। অথচ এখন প্রায় সব বিভাগের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। এর আগে ২০১৩ সালের ১২ মে ছাত্রলীগের দুই উপদলের সংঘর্ষে গ্রীষ্মকালীন ছুটি এক সপ্তাহ এগিয়ে আনা হয়। নাম প্রকাশ না করে একজন শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, এখানে বর্তমানে প্রায় ছয় মাসের সেশনজট আছে। এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধে আরও কয়েক মাস পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও শিবিরের সংঘর্ষে দুজন মারা যাওয়াসহ কয়েকটি ঘটনায় ৭৩ দিন বন্ধ ছিল। সর্বশেষ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কোন্দলে গত ৯ ও ১০ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। এখানে ছাত্রলীগের কোন্দল এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এই উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই একটি ছাত্রাবাসের নিয়ন্ত্রণ নিতে সংগঠনটির তিনটি পক্ষের তৎপরতায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ক্যাম্পাস। এর আগে ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ ও শিবিরের সংঘর্ষে দুজন মারা যাওয়ার ঘটনায় ৫৮ দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল।
ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১০ মাসেই ৫২ দিন ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী সরকারি ও অন্যান্য ছুটি বাদ দিয়ে গত ১০ মাসে ১৯০ দিন ক্লাস-পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ১৩৮ দিন। এ কারণে এ বছর দুটি সেমিস্টার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র একটি শেষ হয়েছে। সর্বশেষ ময়মনসিংহ শহরের ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মহড়ার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা গত ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ক্লাস বর্জন করেন। এর আগে গত ১ এপ্রিল ছাত্রলীগের এক অংশের হাতে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ও একই সংগঠনের নেতা সায়াদ ইবনে মোমতাজ নিহত হওয়ার ঘটনায় ২৩ দিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক শফিউল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় ১৫ নভেম্বর থেকে অস্থিরতা চলছে। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি ও সান্ধ্যকোর্স চালুর প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ ও ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৩ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে। এতে টানা ৩৫ দিন বন্ধ থাকে। এ বছরের ৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে নিজকক্ষে খুন হন হল ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রস্তম আলী আকন্দ। এর পর দুই দিন ক্যাম্পাসে ধর্মঘট পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ।
পূর্ব ঘটনার জের ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২৩ নভেম্বর ছাত্রলীগের এক পক্ষের ওপর আরেক পক্ষের কর্মীরা হামলা চালান। এ ঘটনায় গুরুতর আহত এক ছাত্রের বাবা ছাত্রলীগের ১৩ জনের নামসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এ নিয়ে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব আবার মাথাচাড়া দিল।
নকলের দায়ে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে বহিষ্কারের প্রতিবাদে ও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত মাসে ধর্মঘট পালন করেছে ছাত্রলীগ। ফলে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক কার্যক্রম। এ নিয়ে এখনো সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি কমিটি নিয়ে গত ১৮ নভেম্বর সংঘর্ষ হয়। এখানে তিন মাস রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পদোন্নতির সুবিধার দাবিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২৭ অক্টোবর থেকে অচলাবস্থা চলছে। সরকার-সমর্থক শিক্ষকেরাই এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষকেরা গত ৯ নভেম্বর সব ধরনের প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি তাঁরা উপাচার্য এ কে এম নূর উন নবীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। এর আগে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০১২ সালে প্রায় ৮০ দিন ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে গত ১১ নভেম্বর ছাত্রলীগের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষ হয়। এছাড়া কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কর্মীরা নিজেরাও মারামারি করেছেন। এ কারণে কলেজটিতে উত্তেজনা চলছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনানুযায়ী সেখানে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্রলীগ কমিটি গঠন করে। এ নিয়ে গত জুলাই মাসে ছাত্রলীগের এক কর্মী খুন হন। এ ঘটনায় কয়েক দিন ছাত্রলীগ সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ কারণে সেখানে চাপা উত্তেজনা চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম কথা হলো, সব না হলেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য লোকদের উপাচার্য না করার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর ছাত্রলীগ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপর তারা ছড়ি ঘোরাচ্ছে, টাকা কামাচ্ছে। শিক্ষার স্বার্থে যেকোনোভাবেই হোক, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ, এসব কারণে সেশনজটে পড়ে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম আলোর প্রতিনিধি ও এসব এলাকার প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক )