Saturday, December 27, 2025
অবরোধ চলবে, রাতেও শাহবাগে অবস্থান, ঘোষণা ইনকিলাব মঞ্চের
আজ শুক্রবার দুপুরে শাহবাগে অবস্থান নেওয়ার পর রাতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের এ ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সারা রাত এখানে বসে থাকব। আমরা কম্বল আনতে পাঠিয়েছি। হাদি ভাই জীবিত থাকতে এই কম্বল কিনেছিলেন বস্ত্রহীনদের জন্য। কিন্তু তিনি সেই কম্বল দিয়ে যেতে পারেননি। আমাদের সুস্থ থাকতে হবে। কর্মসূচি শেষ হলে সেই কম্বল আমরা বস্ত্রহীনদের কাছে পৌঁছে দেব।’
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, সরকারের উপদেষ্টারা জনগণের সামনে এসে না দাঁড়ানো পর্যন্ত তাঁরা শাহবাগ ছাড়বেন না। উপদেষ্টাদের শুধু এলেই চলবে না, হত্যার পরিকল্পনাকারী, হত্যাকারী ও তাঁদের ভারতে পালাতে সহায়তাকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা রাজপথে অবস্থান চালিয়ে যাবেন।
অবরোধ থাকলেও আগামীকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের আটকাবে না ইনকিলাব মঞ্চ। আল জাবের বলেন, ‘সকাল নয়টা থেকে আমরা চারপাশে অবস্থান নেব, পরীক্ষার সুযোগ করে দেব। কিন্তু অবরোধ তুলে নেব না। পরীক্ষার নামে অবরোধ তুলে নেওয়া যাবে না।’
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে শাহবাগে বিক্ষোভের কর্মসূচি আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী আজ জুমার নামাজের পর শাহবাগে অবস্থান নেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা–কর্মীরা। পরে টানা অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এতে শাহবাগের আশপাশের রাস্তায় যানজট তৈরি হয়েছে।
কর্মসূচিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাদের সঙ্গে আরও মানুষও যোগ দিয়েছে। বিকেলে ইনকিলাব মঞ্চ ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের জনগণকে শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগে এসে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানায়।
শাহবাগে অবস্থান নিয়ে ওসমান হাদির ভাই শরিফ ওমর বিন হাদি সন্ধ্যায় বলেন, দাবি মানা না হলে তাঁরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন। প্রয়োজনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনা ঘেরাও করার হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা রাজপথে নেমেছি, বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না। আমরা কিন্তু আরও কঠিন কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হব। রাষ্ট্রের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই বলে দিতে চাই, আমাদের বাধ্য করবেন না ক্যান্টনমেন্ট বা যমুনা ঘেরাও করতে।’
আজ সন্ধ্যায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত শহীদ হাদি হত্যার পেছনে যাঁরা জড়িত, এর যাঁরা পরিকল্পনাকারী, হত্যাকারী—তাঁদের সবাইকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ছি না। আমাদের আর ঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আজকে শাহবাগ অবরোধ করেছি। আগামীকালও করা হবে। সারা বাংলাদেশ থেকে জনতা আসছে।’
রাত সাড়ে তিনটার সময় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তখনও শাহবাগ মোড়ে অবস্থান করছিলেন মঞ্চের নেতা–কর্মীরা। তাঁদের সঙ্গে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। তাঁরা হাদি হত্যার বিচার চেয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। ‘বিচার বিচার চাই, হাদি হত্যার বিচার চাই’; ‘সুশীলতার দিন শেষ, বিচার চাই বাংলাদেশ’ ইত্যাদি স্লোগান দিচ্ছেলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখ ওসমান হাদি গত বছরের আগস্টে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেন ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন তিনি।
১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। তাঁকে মাথায় গুলি করার পর আততায়ীরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। ২০ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে তাঁর জানাজা হয়। এরপর তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলের পাশে দাফন করা হয়।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে পুলিশ ও র্যাব গ্রেপ্তার করলেও গুলিবর্ষণকারী হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম মাসুদ এখনো অধরা। তাঁর বাবা, মা, স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি ভারতে পালিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানাচ্ছে।
![]() |
| শহীদ হাদির খুনিরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। রাত ১টা। ছবি: মেহেদী হাসান |
Sunday, July 7, 2019
গ্যাসের দামে নাখোশ সবাই: বাম জোটের হরতাল আজ

এদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানোয় আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যন্য রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ সারা দেশে আধাবেলা হরতাল পালন করবে বাম গণতান্ত্রিক জোট। ভোর ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এ হরতাল পালিত হবে। বাম জোটের এই হরতালে বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্যসহ আরও কয়েকটি দল নৈতিক সমর্থন জানিয়েছে। হরতালের সমর্থন বাম জোটের পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন প্রচারণাও চালিয়েছে। এদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি পুর্নবিবেচনা করার আহবান জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্য শরিকরা।
গত মার্চে গণশুনানিতে অংশ নিয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলের নেতারা গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগে শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। গ্যাসের দাম বাড়ালে কারখানার বিকাশে বাধাগ্রস্ত হবে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। গণশুনানিতে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএসহ ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগঠনগুলোর গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির বিরোধিতা করে। দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসার পর শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে পন্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এছাড়া এতে ব্যবসার খরচও বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
এ দফায় ভোক্তা পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যহার বর্তমান ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়িয়ে গৃহস্থালির ক্ষেত্রে মিটারভিত্তিক গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ১২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগে ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৯ টাকা ১০ পয়সা। এক চুলায় প্রতিমাসে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯২৫ টাকা। যা আগে ছিল ৭৫০ টাকা। দুই চুলায় ৯৭৫ টাকা, যা আগে ছিল ৮০০টাকা। সিএনজির ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩ টাকা। যা আগে ছিল ৩৮ টাকা। হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ক্ষেত্রে ২৩ টাকা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার, শিল্প ও বাণিজ?্যক খাতেও গ?্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।
গত বছরের এপ্রিল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়, যার দাম পড়ছে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৩০ টাকা। এ দর দেশীয় গ্যাসের চার গুণের বেশি। এলএনজির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। গণশুনানি করে বিইআরসি গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়িয়েছিল। অবশ্য ভোটের আগে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় গ্যাসের বাড়তি দাম বাড়ানো হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ১০ বছরে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ৭ বার।
হরতাল সফল করতে বাম জোটের আহ্বান: জনস্বার্থ উপেক্ষা করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ডাকা হরতাল সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন ৮টি বাম দল নিয়ে গঠিত ‘বাম গণতান্ত্রিক জোটে’র নেতারা। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। সমাবেশে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু বলেন, গণশুনানিতে আমাদের বক্তব্য অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অযৌক্তিভাবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করেছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। সিএনজির দাম বৃদ্ধি করায় পরিবহন ব্যয় বাড়বে। শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করায় শিল্প পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলে শিল্প পণ্যসহ, কৃষি সেচে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এইভাবে ব্যয় বৃদ্ধির ফাঁদে জনগণ নিপতিত হবে। সমাবেশে অনান্যের মধ্যে বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাসদ (মার্কসাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মানস নন্দী, গণসংহতি আন্দোলনের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বাচ্চু ভূঁইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
Tuesday, October 30, 2018
অসভ্যতা, অমানবিকতা: ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেও চরম ভোগান্তি, চালকদের কান ধরে উঠবস, অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়িকেও বাধা

গতকাল মহাখালী বাস টার্মিনালে মাথার নিচে ব্যাগ রেখে যাত্রী ছাউনিতে শুয়ে ছিলেন শাহরিয়ার ইসলাম।
পাশে যেতেই চোখ খুলে তাকান। তার চোখে-মুখে হতাশা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটে দ্বিতীয় শিফটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ট্রেনে ঢাকায় ফিরেছেন। ঢাকা থেকে যাবেন বাড়িতে বগুড়ার শেরপুরে। কমলাপুর থেকে সকাল ১০টায় মহাখালী এসে হতাশ হয়েছেন। কোনো গাড়িই ছাড়ছে না। শুধু শাহরিয়ার না, এরকম অনেক যাত্রীকে দেখা গেছে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে। যদি গাড়ি ছাড়ে এই আশায় প্রহর গুনছেন তারা। এই কর্মবিরতির শেষ কোথায় শ্রমিকরাও নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না। রাজধানীতে দূরপাল্লা ও লোকাল গণপরিবহনের দেখা মিলেনি গতকালও। যে কারণে অনেকের ভরসা ছিল অ্যাপসে চালিত বাইক, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা ও ভ্যান। তবে ফকিরাপুল, মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, প্রেস ক্লাব, বাংলামোটর, মগবাজার, রামপুরা, ফার্মগেট, তেজগাঁও, মহাখালী এলাকায় অনেককেই দেখা গেছে পায়ে হেঁটে পথ চলতে। এই দুর্ভোগের কারণে জরুরি কাজ ছাড়া বাসার বাইরে বের হননি কেউ।
মিরপুর-১১ থেকে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়েও সিএনজি অটোরিকশা পাননি মোহাম্মদ রকি। হাইকোর্টে জরুরি কাজে যাওয়ার কথা। পরে অ্যাপসের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং কোম্পানির একটি বাইক চালককে কল দেন। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করে পরে জানিয়ে দেন অ্যাপসে যাবেন না। অ্যাপস চালু না করে বাংলামোটর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারবেন তিনি। ২৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে বাংলামোটরে পৌঁছেন রকি। পরে পায়ে হেঁটে শাহবাগ পর্যন্ত যান। সেখান থেকে রিকশায় দোয়েল চত্বর হয়ে হাইকোর্টে পৌঁছেন। ততক্ষণে সময় ব্যয় হয়েছে অনেক। একইভাবে রোগী নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন অনেকে।
রামপুরা থেকে হাত ভাঙ্গা এক শিশুকে নিয়ে রিকশায় ও পায়ে হেঁটে শেরেবাংলা নগর এলাকার অর্থোপেডিক হাসাপাতালে পৌঁছেন সামিয়া বেগম নামে এক গার্মেন্টকর্মী। সকালে প্রচণ্ড দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন অফিসগামীরা। গণপরিবহন না পেয়ে অ্যাপসে চালিত বাইকের ভরসায় ছিলেন। তাও মিলেনি সবার। রিকশাও পাননি অনেকে। খিলগাঁও থেকে পায়ে হেঁটে মতিঝিলের অফিসে যেতে হয়েছে মমিনুল ইসলামকে। এরকম দৃশ্য দেখা গেছে দিনব্যাপী।
মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বাসস্ট্যান্ডজুড়ে। আড্ডা দিচ্ছেন। অনেকে ক্যানভাসারের মজমায় সময় কাটাচ্ছেন। কখনও কখনও দু-একজন করে যাত্রী আসছেন। হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ উপায় না পেয়ে বিভিন্ন বাসের কাউন্টারে বসে আছেন। তাদের চোখে-মুখে বিমর্ষতা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এরকম দৃশ্যই দেখা গেছে ওই এলাকায়।
দুপুরে বোরকাপরা এক নারীকে দেখা গেছে একটি বাস কাউন্টারের সামনের বেঞ্চে বসে থাকতে। সঙ্গে ১০-১১ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু। কথা হয় ওই নারীর সঙ্গে। তার নাম ফাতেমা। গৃহপরিচারিকার কাজ করেন লালমাটিয়া এলাকায়। সেখান থেকেই এসেছেন। উদ্দেশ্য মাকে দেখতে যাবেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির আসমিতা গ্রামে। ফাতেমা জানান, তার মা খুব অসুস্থ, যেতেই হবে। গাড়ি যে একদমই চলে না তা জানতেন না তিনি। ভেবেছিলেন দু-একটি গাড়িতো চলতেই পারে। সকাল ৯টা থেকে বাসস্ট্যান্ডে বসে আছেন। শ্রমিকরাও নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না।
আসকির নামে এক পরিবহন শ্রমিক জানান, কর্মবিরতি চলছে। যেকোনো সময় কর্মবিরতি শেষও হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত গাড়ি না পেলে ট্রেনে যাবেন বলে জানান ফাতেমা। প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।
বিকাল ৪টায় বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় ১৪ বছরের কিশোর জুবাইদের সঙ্গে। কাঁধে স্কুলব্যাগ জুবাইদ চাকরি করে হাজারীবাগের একটি রেস্টুরেন্টে। ফাতেমার মতো সেও বুঝতে পারেনি গাড়ি একদমই চলছে না। জুবাইদ বলে, এত কঠিন ধর্মঘট বুঝতে পারিনি। নেত্রকোনার কলমাকান্দা নিজেদের বাড়িতে যেতে চেয়েছিল জুবাইদ। গাড়ি না পেয়ে হতাশ হয়ে কিশোর ছেলেটি হাজারীবাগে ফিরছে। তাও কোনো বাস নেই। ফিরতে হবে সিএনজি অটোরিকশায়। সিএনজি অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল জুবাইদ।
বাসস্ট্যান্ডের সামনে পার্কিং করা ১৫-২০টি মোটরসাইকেল। প্রায় সবগুলোই অ্যাপসে ভাড়ায় চালিত। মোটরসাইকেলের যাত্রীরা জানান, অনেকেই এখন অ্যাপসে যাত্রী নিতে চান না। এখন যাত্রী বেশি। অ্যাপসে নিলে লাভ কম। কথা বলে ভাড়া নির্ধারণ করলে বেশি ভাড়া আদায় করা যায়। একইভাবে সিএনজি অটোরিকশার চালকরাও যাত্রীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি ভাড়া আদায় করছেন।
এদিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, খিলগাঁও, মালিবাগ, মগবাজার, ধানমন্ডি, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন এলাকায় কোনো বাস চলতে দেখা যায়নি। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কোনো দূর পাল্লার গাড়িও ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে পরিবহন শ্রমিকদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
প্রথমদিনের মতো যানবাহনে হামলা ও চালকদের শরীরে মবিল লাগানোর তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সকালের দিকে কিছু কিছু এলাকায় প্রাইভেট যানবাহনের চালকদের কানে ধরিয়ে উঠবস করানোর কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। পুলিশি বাধায় শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরা এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে। তবে গতকালও গণপরিবহন না পেয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। সকালে সরজমিন যাত্রাবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী থানা থেকে ১০০ হাত দূরে অবস্থান নেন শ্রমিকরা। দলবেঁধে তারা সেখানে দাঁড়িয়ে প্রাইভেট কার, মাইক্রো, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালকদের হেনস্তা করা শুরু করে। এ সময় তারা কিছু কিছু যানবাহনে লাথি-ঘুষি দেয়। কয়েকজন চালককে মবিল লাগিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে শ্রমিকদের সেখান থেকে সরিয়ে দেন। মুগদা-মানিকনগর এলাকায় সকালে পরিবহন শ্রমিকরা প্রাইভেট যানবাহনের চালকদের ওপর চওড়া হন। কয়েকজন চালককে কানে ধরে উঠবস করাতেও দেখা গেছে। এর পর থেকে সারাদিন শ্রমিকদের আর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
দুপুরের দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে জানা যায় গতকালও কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। তবে দূরপাল্লার যাত্রীরা সকাল থেকেই টার্মিনালে আসেন। অনেক যাত্রীই বাস না পেয়ে নিরাশ হয়ে ঘরে ফিরেন। আল আমিন নামের এক ব্যবসায়ী গত দুু’দিন ধরে আটকা পড়েছেন ঢাকায়। ব্যবসার কাজে গত শনিবার তিনি ঢাকা এসেছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার। মানবজমিনকে তিনি বলেন, শনিবার ঢাকা এসেছিলাম। কাজ শেষ করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায়। পরে আর ওইদিন কুমিল্লা যাইনি। রাতের বেলা একটি হোটেলে কাটিয়ে রোববার সকালের দিকে টার্মিনালে আসি। এসে দেখি কোনো বাস নাই। আমার মতো আরো অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। কাউন্টারগুলো বন্ধ রয়েছে। কথা বলে তথ্য নেয়ার মতো কোনো মানুষ পাচ্ছিলাম না। পরে জানতে পারি পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট চলছে। আজও একি অবস্থা দেখছি।
হবিগঞ্জের মাধবপুরের যাত্রী নজরুল ইসলামও জানালেন তার সমস্যার কথা। পারিবারিক কাজে যেতে হবে মাধবপুর। সকাল ১০টায় এসেছেন কিন্তু গত দুই ঘণ্টা ধরে একটি বাসের দেখা মেলেনি। আর না গেলেও হবার নয়। তিনি কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের আশপাশের সড়কে দেখা যায়, একুশে পরিবহন, স্টার লাইন, নিউলাইন, এনা পরিবহন, শ্যামলী, মামুন, আল রিয়াদ, ঢাকা এক্সপ্রেস, বলাকা, জননীসহ আরো একাধিক কোম্পানির বাস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। টার্মিনালের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ বাস শ্রমিকরা বাস পরিষ্কারের কাজ করছেন। পুরাতন চাকা খুলে নতুন চাকা লাগাচ্ছেন।
এদিকে গতকাল অফিস, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। গণপরিবহন না থাকায় অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। আবার অনেকেই জরুরি কাজে বের হয়ে আবার ফিরে গেছেন বাসায়। সকাল ১০টার দিকে মালিবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন নুসরাত আরা। তিনি উত্তরার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তিনি বলেন, অনেকক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। একটি বাসও চলাচল করছে না। সিএনজিচালকদের সিগন্যাল দিচ্ছি তারা ৪০০/৫০০ টাকা ভাড়া দাবি করছে। এছাড়া পাঠাও, উবারে রিকুয়েস্ট পাঠাচ্ছি কোনো চালকই তা গ্রহণ করছেন না।
মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় দাঁড়িয়ে সকালে বাসের অপেক্ষা করছিলেন মোহাম্মদ আলী। তিনি যাবেন মিরপুরের বিআরটিএতে। বাস না থাকায় অনেকবার পাঠাওকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। পরে অ্যাপস ছাড়া এক চালককে ঠিক করে তিনি মিরপুর যান। ধানমন্ডির ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাবে) লেখাপড়া করেন আসিফ শাওন। খিলগাঁও থেকে কোনো বাস না পেয়ে তিনি পরে ১৫০ টাকা দিয়ে রিকশা ভাড়া করে ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্য রওনা দেন। শাওন বলেন, বাস নাই এই সুযোগে রিকশাচালকরা সুযোগ পেয়ে গেছে। ৭০/৮০ টাকার ভাড়া তারা ২০০ টাকা চেয়ে বসে আছেন। এছাড়া রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাও-উবারেও আমন্ত্রণ জানিয়ে কোনো লাভ হয়নি।
পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি সংসদে: ধর্মঘটের নামে পরিবহন শ্রমিকরা সারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান। এ বিষয়ে সরকারের পুলিশ প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করেন। সোমবার দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষদিনের বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন। পরিবহন ধর্মঘটের প্রসঙ্গ তুলে পীর ফজলুর রহমান বলেন, এই সংসদে পাস করা সড়ক পরিবহন আইনের কিছু ধারা পরিবর্তনের দাবিতে গত দুইদিন থেকে পরিবহন শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করছে। এই অবরোধের নামে শ্রমিকদের কেউ কেউ নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে।
বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ও চালকদের মুখে পোড়া মবিল মেখে দেয়া হয়েছে। একটি অসুস্থ শিশুকে হাসাপাতালে নেয়ার সময় এম্বুলেন্স আটকে দেওয়ায় শিশুটি মারা গেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই অবরোধে সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অবরোধের নামে মানুষের আত্মমর্যাদায় যারা আঘাত করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীরব রয়েছে। এই ঘটনা আমাদের আহত করেছে। আমি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করছি।
রূপগঞ্জে যাত্রীদের ওপর শ্রমিকদের হামলা: আহত ১০
স্টাফ রিপোর্টার, রূপগঞ্জ থেকে জানান, সোমবার সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড ও বরপা এলাকায় লেগুনা ও অটোরিকশা যাত্রীদের ওপর হামলা চালিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। এসময় ১০ যাত্রী আহত হয়।
জানা যায়, শ্রমিক ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে রূপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড, বরপা, রুপসী, গাউছিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই অবস্থান নেয় পরিবহন শ্রমিকরা। তারা স্থানীয় রুটে চলাচলরত লেগুনা, থ্রি হুইলার, ব্যাটারিত চালিত অটোরিকশা, সিএনজিসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলে বাঁধা দিতে থাকে। সকাল ৯টার দিকে বরপা এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা একটি লেগুনা আটক করে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। এ সময় যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রীদের উপর হামলা চালিয়ে আমান উল্লাহ, আনোয়ার, বিল্লাল, সিদ্দিকসহ ৫ যাত্রীকে পিটিয়ে আহত করে। অপরদিকে, মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা অটোরিকশার যাত্রী রেহেনা আক্তার, সালাম, আকবর আলী ও শাকিলসহ আরো ৫ যাত্রীকে গণপরিবহনে উঠার দায়ে প্রহার করে।
লাশের গাড়ি আটকে চালককে মারধর করলো শ্রমিকরা
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, প্রিয়জনের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন স্বজনরা। একদিকে কান্নার রোল অন্যদিকে রাস্তায় ভোগান্তি। লাশবাহী এম্বুলেন্স থামিয়ে চালককে পিটিয়ে আহত করেছে কিছু শ্রমিক। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার সকাল ১০টায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের আউশকান্দি এলাকায়। মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নারায়ণ কর্মকার জানান, আমার বড়ভাই বাদল কর্মকার রোববার সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সোমবার সকালে সিলেট থেকে লাশ নিয়ে এম্বুলেন্সযোগে মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর গ্রামে আসার সময় আউশকান্দি এলাকায় পৌঁছালে ৫/৬ জনের একদল শ্রমিক তাদের লাশবাহী এম্বুলেন্স আটক করে। পরে চালককে গাড়ি থেকে নামিয়ে ব্যাপক মারধর করে তারা। এ সময় এম্বুলেন্সে থাকা তাদের স্বজনরা অনুনয়-বিনয় করে চালককে না মারার অনুরোধ করলেও তাদের মন গলেনি। পরে স্থানীয় কিছু লোকের অনুরোধে শ্রমিকরা এম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেয়। একটি স্বাধীন দেশে লাশ নিয়ে যেতে দেয়া হয় না- এটা কি ভাবা যায়। আমরা কোন দেশে বাস করি। এভাবে কথাগুলো বলে বিচার দাবি করেন জগদীশপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নারায়ণ কর্মকার।
Monday, October 29, 2018
মন্ত্রীর সংগঠনের ধর্মঘটে জিম্মি দেশ

শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে ধর্মঘট হলেও ব্যক্তিগত গাড়ি, রপ্তানিসহ বিভিন্ন জরুরি সেবার যানবাহন আটকে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে পথে পথে। ধর্মঘটে অচল ছিল পুরো দেশ। লাখ লাখ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের নামে এই ধর্মঘট ডাকে নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। মন্ত্রী এ সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি। পুরো দেশকে জিম্মি করে ধর্মঘট ডাকার বিষয়ে কোনো কথা বলেননি শাজাহান খান। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে রাতে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। যদিও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন এই মুহূর্তে আইন পরিবর্তন সম্ভব নয়।
৮ দফা দাবিতে ধর্মঘট চলাকালে সকাল থেকে সরকারি মালিকানাধীন বিআরটিসি’র কিছু সংখ্যক বাস ছাড়া কোনো গণপরিবহন রাস্তায় দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন রুটে ব্যক্তিগত গাড়ি, ভাড়ায় চালিত সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা গেলেও চালকরা দাবি করেন পথে পথে পরিবহন শ্রমিকরা তাদের হেনস্তা করেন। সকালে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে, নাবিস্কো থেকে মহাখালী মোড় পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে বাসের সারি। পার্ক করে রাখা হয়েছে এসব গণপরিবহন। রাস্তায়, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন শ্রমিকরা। যাত্রীরা আসছেন, হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তাদেরই একজন বিলকিস বেগম। দ্বিগুণ টাকায় সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ থেকে মহাখালী পৌঁছেন। সঙ্গে দুই শিশু সন্তান।
উদ্দেশ্য গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বীরগঞ্জে যাবেন। শাশুড়ি অসুস্থ। এতটা পথ গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। বিলকিস বলেন, ‘গরিব মানুষ। বিপদে পড়ে গেছি। এখন কেমনে কি করি। গাড়ি তো ছাড়বে না।’ কথা বলছিলেন আর অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন তিনি। তারপর সিএনজি অটোরিকশাতে করেই ফিরে যান তিনি। রিকশা থেকে নেমে দ্রুত এনা পরিবহনের কাউন্টারে ছুটে যান শরণ। বাসের কাউন্টার বন্ধ। ফোনে কল দিলেও রিসিভ করছে না কেউ। শরণ সোমবারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে চট্টগ্রামে যাবেন। টিকিট কেটে রেখেছিলেন বেশ আগেই।
শনিবার যখন জানতে পারলেন শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে ঠিক তখনই ওই পরিবহন সার্ভিসের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করেন। শরণ জানান, কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছেন, টিকিট বাতিল করা হয়নি। তাই গাড়ি ছাড়তে পারে। তাদের কথায় আশ্বস্ত হয়েই গতকাল ফার্মগেট থেকে দুপুরে মহাখালী ছুটে যান তিনি। এখন কি করবেন জানতে চাইলে শরণ বলেন, কি করবো বুঝতে পারছি না। ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাওয়া যায় কিনা চেষ্টা করবো। এ ছাড়া উপায় নেই। পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবো কিনা বুঝতে পারছি না। কথা বলার সময় তার চোখ ছলছল করছিলো। ধর্মঘট জানার পরও বাসস্ট্যান্ডে গিয়েছিলেন নিকেতনের লুৎফর রহমান। তিনিসহ বেশ কয়েক জন যাবেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে। সোমবারে তার চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে। চাচাতো ভাইয়ের অভিভাবক বলতে লুৎফর রহমান। না গিয়ে উপায় নেই। পরিবহন শ্রমিকদের কাছে বারবার জানতে চাচ্ছিলেন, গাড়ি কখন ছাড়বে, ধর্মঘট কী আজ শেষ হবে না? লুৎফরসহ বিভিন্ন যাত্রীদের এরকম নানা প্রশ্নে বিরক্ত হচ্ছিলেন শ্রমিকরা।
বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছেন শ্রমিকরা। কেউ কেউ অলস সময় কাটাচ্ছিলেন চায়ের দোকানে। বাসস্ট্যান্ডে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে ভিড় করেন তারা। শ্রমিকরা বলেন, আমরা শ্রমিক। জরিমানা দেব, জেল খাটবো। এটা হবে না। এসব আইন মানি না। শ্রমিকদের মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটের ইমাম পরিবহনের সুপারভাইজার শামীম শেখ বলেন, দেশের মানুষ কী সব শিক্ষিত হয়ে গেছে, যে অষ্টম শ্রেণি পাস ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না। আমরা গরিব মানুষ। লেখাপড়া করতে পারিনি। ভাতা জুটে না ঠিকমতো, লেখাপড়া করবো কীভাবে? এখন যদি গাড়ি চালাতে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হয় তাহলে না খেয়ে মরতে হবে আমাদের। পাঁচ বছরের জেল-জরিমানা থাকলে কেউ গাড়ি চালাবে না।
এই আইন পরিবর্তন করতে হবে বলে দাবি করেন এই শ্রমিক। মহাখালী, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, শাহবাগ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কোথাও কোনো গণপরিবহন নেই। বৃদ্ধা মাকে ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন এক তরুণী। বাংলামোটর এলাকায় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, তালতলায় দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কোনো গাড়ি পাননি। মা অসুস্থ। তাকে ঢাকা মেডিকেলে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর কথা। এতদূরে রিকশায় যাওয়া সম্ভব না। তাই বাধ্য হয়েই ভ্যানে উঠেন। তবে অনেককেই দেখা গেছে, পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে। রাজধানীর রাস্তাগুলো ছিল ফাঁকা। প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও রিকশা-অটোরিকশা ছাড়া কোনো গণপরিবহনের দেখা মিলেনি।
সকাল থেকেই যাত্রাবাড়ী মোড়ে অবস্থান নেন ওই এলাকার পরিবহন শ্রমিকরা।
সেখান থেকে কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে তারা ডেমরা, পোস্তগোলা, দয়াগঞ্জ, চিটাগাং রোডে অবস্থান নেন। এসময় তারা ওইসব সড়কে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, ব্যাটারিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেলের ওপর হামলা করেন। পোড়া মবিল লাগিয়ে দেন গাড়ি ও চালকের শরীরে। এ ছাড়া নানাভাবে করেন হেনস্তাও। কেউ কেউ গাড়িতে লাথি-ঘুষি দিয়ে ভেঙে দেন প্রাইভেট গাড়ির হেডলাইটসহ নানা যন্ত্রাংশ। শ্রমিকদের হাতে-পায়ে ধরেও রেহাই পাননি অনেকে। সারা দিনই বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিকরা। দুপুরের দিকে যাত্রাবাড়ী থানা থেকে ১০০ গজ দূরে চিটাগাং রোডে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকরা একের পর এক প্রাইভেট গাড়ির যাত্রী ও চালকদের হেনস্তা করছিলেন।
খিলগাঁও থেকে আসা ঢাকা মেট্রো থ-১৩-১৯৪০ নম্বরের একটি সিএনজিকে আটকে তারা ভাঙচুর করেন। লাথি দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দেন সিএনজিটিকে। এসময় শ্রমিকরা ওই চালকের পুরো শরীর মবিল দিয়ে লেপ্টে দেন। তার কিছুক্ষণ পর ঢাকা মেট্রো গ-১৭-৭৩৭৩ নম্বরের একটি প্রাইভেট কারকে একইভাবে হেনস্তা করতে দেখা গেছে। বিকালের দিকে ডেমরা সড়কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহন করা একটি বাসের চালকের ওপর পোড়া মবিল ঢেলে দেয় শ্রমিকরা। এসময় শিক্ষার্থীরা শ্রমিকদের ওপর ক্ষেপে উঠেন। বিক্ষুব্ধ হয়ে তারা সড়কে অবস্থানরত শ্রমিকদের ধাওয়া করেন। ধাওয়া খেয়ে শ্রমিকরা সেখান থেকে পালিয়ে যান। শ্রমিকরা পালিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীরা সড়কে আড়াআড়ি বাস দাঁড় করিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে সেখানে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ছাড়া পরিবহন ধর্মঘট থাকার কারণে সড়কে কোনো ধরনের বাস চলাচল না থাকায় সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। যাত্রাবাড়ী মোড়ে হাজার হাজার যাত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেকে জরুরি প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে যেতে চাইলেও কোনো পরিবহনের দেখা পাননি। বিকল্প হিসেবে রিকশা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে। জরুরি কাজে মিরপুর যাওয়ার জন্য যাত্রাবাড়ী মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন আশরাফি সুলতানা। তিনি বলেন, এ কেমন ভোগান্তি শুরু হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি তবুও একটাও বাসের দেখা পেলাম না। এখন এতদূর রিকশা নিয়ে যাওয়ার উপায় নাই। আবার না গেলেও হবে না। অনেক সিএনজিকে সিগন্যাল দিয়েছি। তারা মিরপুর যেতে অনেক ভাড়া চায়। অসুস্থ রোগী দেখতে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে কোনো বাস পাননি যাত্রাবাড়ীর সোহেল হায়দার। পরে ৪০০ টাকা খরচ করে তিনি বিশ্বরোড পর্যন্ত একটি সিএনজি ভাড়া করেন। নারায়ণগঞ্জ যাবার জন্য বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মানিকনগরের আয়েশা খাতুন ও তার ছোট দুই সন্তান। মানিকনগর থেকে রিকশা করে এসে পৌঁছান যাত্রাবাড়ী। সেখানে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। রিকশা করেও এতদূর যাওয়া সম্ভব নয়। পরে তিনি বাধ্য হয়েই ফিরে যান বাসায়।
এদিকে গতকাল সকাল থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যেতে দেখা যায়নি। টার্মিনাল ও তার আশেপাশের সকল সড়কে সারিবদ্ধভাবে বাস পার্কিং করে রাখা হয়েছিলো। শ্রমিকরা তখন বিভিন্ন সড়কে দলবেঁধে ধর্মঘট পালন করছিলেন। আর বাস টার্মিনালের বাসের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় শত শত যাত্রীকে। শাহ আলম নামের এক যাত্রী বলেন, প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে সপরিবারে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। জরুরি কাজে পরিবার নিয়ে সিলেট যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এখানে একটি বাসের কাউন্টারও খোলা নাই। কি করে সিলেট যাবো জানি না। ভৈরবগামী আরেক যাত্রী সোহেল মিয়া জানান, কয়েক ঘণ্টা ধরেই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কোনো বাস ছাড়ছে না। শুনেছি সকাল থেকে একটাও বাস ছেড়ে যায়নি।
একই চিত্র দেখা গেছে, রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে। দিনভর সেখান থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা কোনো যানবাহন চলতে দেয়নি। ওই এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা ও লেগুনা চলাচলেও বাধা দেয় শ্রমিকরা।
Monday, October 8, 2018
কয়েক জনের অবরোধে ভোগান্তিতে লাখো মানুষ

যানবাহনও চলেনি সড়কে। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের যানবাহনকে ডাইভারসন করতে দেখা গেলেও যুবকদের সরাতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দশটার দিকে অবস্থানকারীরা সরে গেলে যানবাহন চলাচল শুরু করে। বেলা একটার পর আন্দোলনকারীদের ২০ থেকে ২৫ জন ফের সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণ পর তাদের সঙ্গে যোগ দেন আরো ২০ থেকে ২৫ জন।
এরপর থেকে শাহবাগ মোড় হয়ে আর যানবাহন চলেনি রাত পর্যন্ত। এতে পুরো এলাকায় যানজট দেখা দেয়। ব্যস্ততম এ সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী লাখ লাখ মানুষকে পড়তে হয় দুর্ভোগে। গতকালের অবরোধে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড এর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদও যোগ দেয়। সকাল থেকে সড়ক অবরোধ থাকায় সায়েন্সল্যাব, বাটা সিগন্যাল থেকে আসা যানবাহনগুলো সবই বন্ধ ছিল। তবে মাঝে ১০টা থেকে কিছু সময় যানচলাচল শুরু হলেও দুপুরের দিকে আবারো আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ করেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও রাস্তা না ছাড়ায় ওই সড়কটির কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। অন্যদিকে কাওরান বাজার থেকে গুলিস্তান যাওয়ার সড়কও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে ডাইভারসন করে দেয় পুলিশ। ফলে এদিক থেকে যাওয়া যানবাহনগুলোর দীর্ঘ জটলা সৃষ্টি হয়। শাহবাগের এ রাস্তাটিতে যানবাহন চলাচল করতে না পারায় শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে সড়কটিতে তিনটি হাসপাতাল থাকায় এখানে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে এসে বিপাকে পড়েন অনেকে। আবার কাউকে ফার্মগেট পর্যন্ত এসে ফিরে যেতে দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পায়ের ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা জাহানারা বেগম জানান, গাজীপুর থেকে ডাক্তার দেখাতে আসছি। কিন্তু এখন বাসায় যাইতে পারতেসি না। ওইদিক থেকে সব গাড়ি বন্ধ।
ঢাকায়ও থাকার মতো জায়গা নেই। সুব্রত নামের একজন কচুক্ষেত থেকে এসেছেন। তিনি হাঁপানিসহ বেশ কিছু রোগে ভুগছেন। সুব্রত বলেন, সকাল বেলায় অনেক কষ্ট করে আসছি। এদিকে রাস্তা বন্ধ থাকায় তেজগাঁও পর্যন্ত যানজট লেগে যায়। সেখান থেকে কয়েকবার রাস্তা বদল করে হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসছি। এখন বাসায় ফিরবো, কিন্তু কোনো যানবাহন নেই। এই শরীর নিয়ে এখানে দাঁড়িয়েও থাকতে পারছি না। অপারেশন শেষে খিলগাঁওয়ে বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে ফিরবেন নাজিম উদ্দিন নামের একজন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটা কেমন কথা! যখন তখন এ দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। মানুষ মরলেও কারও কোনো খবর থাকবে না। আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় যাবো? ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে এসে বিপাকে পড়েন শামসুজ্জামান নামের আরেক ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি হার্টের রোগী। বাসা যাত্রাবাড়ীতে। শরীরের কি অবস্থা যাচ্ছে আমি বুঝছি। কিন্তু কোনো সিএনজি বা বাস পাচ্ছি না এক ঘণ্টা ধরে। এ অবস্থায় কি করবো বুঝতে পারছি না। আমার স্ত্রী সঙ্গে এসেছে। সে অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু কোনো কিছু ম্যানেজ করতে পারছে না। শুধু হাসপাতালের রোগী নন, ব্যস্ততম সড়ক হয়ে যাওয়া আসা করেন ঢাকার কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশ। ঢাকার উত্তর দক্ষিণ ও পূর্ব পশ্চিমের সবচেয়ে বড় সংযোগস্থল শাহবাগ মোড় অবরুদ্ধ থাকায় কর্মজীবী মানুষদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
আশপাশের সড়কে যানজট তৈরি হওয়ায় তা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে অনেক রাস্তায়।
এদিকে শনিবার লাগাতার অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও গতকাল আন্দোলনকারীরা কর্মসূচির পরিবর্তন করেছেন। তারা জানিয়েছেন, আজ থেকে বিকাল তিনটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শাহবাগে অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন জানান, আমাদের ছয় দফা দাবি। দাবিগুলো হলো- ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কটূক্তির বিচার, মুক্তিযোদ্ধা পারিবারিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাড়িতে হামলার বিচার, প্রশাসনে রাজাকার ও রাজাকারদের সন্তানদের তালিকা করে বরখাস্ত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান। তিনি জানান, যত দিন পর্যন্ত আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করা না হবে, তত দিন পর্যন্ত শাহবাগে প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত লাগাতার কর্মসূচি ও সারা বাংলাদেশে একই কর্মসূচি পালিত হবে।
Sunday, October 7, 2018
শাহবাগে সমাবেশ দুর্ভোগ চরমে: অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ঘোষণা

পরিপত্র স্থগিত করে আগামী সোমবারের মন্ত্রী সভার বৈঠকে তা প্রত্যাহার করতে হবে। আমাদের একদফা একদাবি। তিনি বলেন, আমরা দেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বাঁচতে চাই না। আমরা ন্যায্য দাবি নিয়ে এখানে এসেছি, ভিক্ষার জন্য আসিনি। এ সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদেও দাবি না মানা পর্যন্ত আপনারা অবরোধ চালিয়ে যাবেন। গতকাল দুপুর ২টার পর থেকে শাহবাগ চত্বরে সারা দেশ থেকে বিভিন্ন ব্যানারে জড়ো হতে থাকেন অনেকে।
চারপাশের সড়ক বন্ধ করে তারা ‘তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালি’ ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’ ’জামায়াত-শিবির-রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’ ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগান দিতে থাকেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই তারা তাদের সমাবেশ চালিয়ে যান। সমাবেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের পঞ্চগড়, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মাধবপুরসহ আরো কিছু জেলার ব্যানার দেখা যায়। সমাবেশ চলাকালীন সময়ে শাহবাগ চত্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাঁটাবন, বাংলামোটর, মৎস্য ভবনগামী সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়। আশেপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যান চলাচলে ধীরগতি ছিল। শাহবাগ মোড় দিয়ে ডাইভারশন থাকায় পথচারীরা টিএসসি দিয়ে ঘুরে গন্তব্যে যান। বাংলামোটর ও প্রেস ক্লাবগামী গাড়িগুলো দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকা পড়ে। ঢাকা মেডিকেল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেলে আসা এম্বুলেন্স প্রবেশ করতে বেগ পেতে হয়। সমাবেশের পাশেই শাহবাগ পুলিশ বক্সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।
পঞ্চগড় থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের নাজমুল বলেন, ‘আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। ৩০ ভাগ কোটা পুনর্বহাল করা উচিত। এজন্য অবস্থান নিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিব বাহিনীর সদস্য কাজী শাহজাহান বলেন, কোটা বাতিলের মাধ্যমে রাজাকাররা আবারও ষড়যন্ত্র করছে। কোটা বাতিল করে আমাদের অসম্মান করা হয়েছে। আমরা আমাদের সম্মান চাই, অধিকার চাই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ডের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা দেশ নিয়ে এলো আর সেই মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেয়া হলো, এটা দুঃখজনক। আমরা বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্ববহাল চাই। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগসহ সারা দেশে আমাদের অবস্থান ও অবরোধ চলবে। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ফেডারেশনের সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন মাসুদ বলেন, আমাদের একটাই দাবি ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল চাই। এটা পুনর্ববহাল না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান করবো। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে রাজপথে জীবন দেব তবুও রাজপথ ছেড়ে যাবো না।
Friday, August 3, 2018
ঘোষণা ছাড়াই দূরপাল্লার বাস বন্ধ, ভোগান্তি

সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা ও নগর বাস টার্মিনালের বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, আতঙ্ক ও অস্থিরতার মধ্যে আছি। গুজব ছড়াচ্ছে যে, চালকদের ধরছে। মালিকরা গাড়ি বন্ধ রাখেনি। তবে চালকরা ভয়ে গাড়ি চালাতে চাচ্ছেন না। যাদের লাইসেন্স নেই তারা তো আসছেন না। আর যাদের বৈধ লাইসেন্স আছে তারাও ভয় পাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা ব্রেক দিয়ে গাড়ি আটকাচ্ছেন এমন খবরে টার্মিনালে কোনো গাড়ি আসেনি বৃহস্পতিবার। অথচ এই টার্মিনালে দৈনিক গড়ে ১৫ থেকে ১৭শ’ গাড়ি চলাচল করে। তিনি আরো বলেন, আমরা রাস্তা স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছি। স্বাভাবিক হলেই গাড়ি পুরোদমে চলবে। এ প্রসঙ্গে মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক মানবজমিনকে বলেন, সড়কে আমরা গাড়ি চালাতে চাই। সড়কের যে পরিস্থিতি তাতে গাড়ি চালানো সম্ভব না। রাস্তা নিরাপদ ও স্বাভাবিক হলে আমরা গাড়ি রাস্তায় নামাবো। তিনি বলেন, আমরাও জনদুর্ভোগ চাই না। শৃঙ্খলা চাই। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার গাড়ি ছাড়ছেন না কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস্তা স্বাভাবিক হলে গাড়ি চলবে। এই টার্মিনাল থেকে দৈনিক দেশের বিভিন্ন জেলায় ৭ থেকে ৮শ’ গাড়ি চলাচল করলেও বৃহস্পতিবার এই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যে সব গাড়ি টার্মিনালে ঢুকেছে সেগুলোও ছেড়ে যায়নি।
এদিকে গতকাল রাস্তায় বাসের সংখ্যা ছিল খুবই সামান্য। ফলে বিপাকে পড়েছে মানুষ। বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় বিচার চেয়ে রাজপথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জের ধরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাজধানীতে দেখা গেছে গণপরিবহনের তীব্র সংকট। ছিল না দূরপাল্লার গাড়িও। হাতেগোনা কিছু বাস দেখা গেছে রাস্তায়। সেগুলোতেও ছিল উপচেপড়া ভিড়। বেশির ভাগ মানুষ হেঁটেই কর্মস্থলের দিকে গেছেন এবং বাসায় ফিরেছেন। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যানবাহন না পেয়ে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মোটরবাইক ব্যবহার করে অফিসে গেছে তারা। অল্পকিছু লোকাল বাস চলাচল করেছে। আর সেগুলোতেও রয়েছে উপচেপড়া ভিড়। মিরপুর, কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া, তালতলায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে শ’ শ’ অফিসগামী মানুষকে। দূর থেকে কোনো বাস আসতে দেখলেই তারা অপেক্ষা করেছেন।
কাছে আসতেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেগুলো বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিসের স্টাফ বাস। ফলে বারবার আশাহত হয়েছেন এসব এলাকার অপেক্ষমাণ যাত্রীরা। পরে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় কর্মস্থলে পৌঁছতে চেষ্টা করেছেন তারা। আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, র্যাংগস ভবন, কাকরাইল, শাহবাগ, সাতরাস্তার মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোও ছিল তুলনামূলক ফাঁকা। ফুটপাথে ছিল হেঁটে রওনা হওয়া মানুষের ভিড়। তবে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যেই দেখা যায়নি তেমন বিরক্তি। অবশ্য অনেকে এসব বিষয়ে কথাই বলতে চাননি। মাহমুদ নামের এক যাত্রী জানান, গত চারদিন ধরেই কষ্ট হচ্ছে। তবু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে কোনো বিরূপ মনোভাব নেই তার। গত ২৯শে জুলাই রাজধানীর এয়ারপোর্ট রোডে দুই কলেজ শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হন। এরপর থেকে ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নে প্রতিদিন সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। নিরাপত্তার অজুহাতে বৃহস্পতিবার ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন জেলা এবং ঢাকার মধ্যে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।
Thursday, March 2, 2017
গণপরিবহনের নৈরাজ্য

ধর্মঘটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সকালে তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ওই বৈঠকে শ্রমিক প্রতিনিধিও ছিলেন। বৈঠকে ওবায়দুল কাদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের কড়া নির্দেশনা দেন। এরপর নৌমন্ত্রী মতিঝিলে বিআরটিসি ভবনে সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাকে নিয়ে শ্রমিক-মালিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরই ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন শাজাহান খান। আগের দিন রাতে নৌমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে বৈঠকের পর ধর্মঘটের ঘোষণা আসে বলে পত্রিকায় খবর আসে। ওই মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গাও ছিলেন। এদিকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণার পর রাজধানীসহ দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল শরু হয়।
মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় পরিচালক তারেক মাসুদ ও ফটো সাংবাদিক মিশুক মুনীর নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় জামির হোসেন নামের এক পরিবহন শ্রমিককে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন আদালত। এছাড়া সাভারের ট্রাক চাপায় এক নারীকে হত্যার ঘটনায় মীর হোসেন মীরু নামে আরেক চালককে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন সিএমএম আদালত। এ দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেয়। মঙ্গলবার সকাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ করে দিলেও সন্ধ্যার পর থেকে শ্রমিকরা নৈরাজ্য শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাবতলীতে ওইদিন বিকাল থেকে সমাবেশ করে পরিবহন শ্রমিকরা। তাদের বিক্ষোভের মুখে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে তারা। একপর্যায়ে শ্রমিকরা গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। রাত ৯টার দিকে গাবতলী বাস টার্মিনালের পাশের একটি পুলিশ বক্সকে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করে পরিবহন শ্র্রমিকরা। কিছুক্ষণ পর ওই বক্সে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। একইসঙ্গে গাবতলী টার্মিনাল এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এছাড়া পুলিশের একটি রেকারেও আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিছুক্ষণ পর মিরপুরের স্থানীয় এমপি আসলামুল হক সেখানে পৌঁছেন। তিনি শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তার কথায় কর্ণপাত করেনি। পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরে পুলিশ সাঁঝোয়া যান ও জলকামান ব্যবহার করে। নিক্ষেপ করে রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল। এ ঘটনার পর গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা দিয়ে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে দেয়নি শ্রমিকরা। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়িও যেতে দেয়নি। এসব গাড়ি মাজার রোডের ডাইভার্সন রোড দিয়ে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। রাত ১টা ২৫ মিনিটে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে একটি লাশবাহী মিনি ট্রাক হাজির হয় টেকনিক্যাল মোড়ে। গাড়িটি গাবতলীর রাস্তায় রওনা হলেও শ্রমিকরা গাড়িটিকে সোজা রাস্তায় যেতে দেয়নি। এ ছাড়া, কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুরও করেছে তারা। গতকাল সকাল থেকে রিকশা কিংবা মোটরসাইকেলও যেতে দেয়নি। রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে শ্রমিকরা আবারো বিক্ষোভে নামে। গাবতলী ও আশপাশের এলাকায় সতর্ক অবস্থান নেয় র্যাব-পুলিশ। একইসঙ্গে শত শত শ্রমিক রাস্তায় অবস্থান নেয়। ফলে যাত্রী নিয়ে গাবতলী থেকে কোনো যানবাহনই রাজধানীর বাইরে যেতে পারেনি। সকালের দিকে কিছু সময় পর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। মাঝে মাঝে পুলিশের রায়ট কার দিয়ে টহল দিলে শ্রমিকরা রাস্তা ছেড়ে আশপাশের এলাকায় লুকিয়ে পড়ে। পরে আবারো জড়ো হয়ে রায়ট কার লক্ষ্য করে ইট ছোঁড়ে। মোটরসাইকেল আরোহীদেরও যেতে বাধা দিয়েছে তারা। এমনকি কয়েকজনকে মারধরও করেছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
টাঙ্গাইলের নাগরপুরের বাসিন্দা ৬৬ বছরের বৃদ্ধ আবদুল কাদির। দেখতে রোগা। তিনি একটি গেঞ্জি গায়ে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। দূর থেকে কোনো পথচারী আসছে এমন মনে হলেই তাকে থামিয়ে তিনি জানতে চাচ্ছেন কিভাবে এলেন? কথা হয় আবদুল কাদিরের সঙ্গে। তিনি জানান, গত ৭ মাস আগে স্ট্রোকে তার এক পাশ অবশ হয়ে যায়। মতিঝিলের ডিএইচকে নামে একটি হাসপাতালে দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসা নিয়ে মঙ্গলবার সকালে ছাড়া পেয়েছেন। এরপর ৭টায় টার্মিনালে এসে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। সঙ্গে রয়েছেন তার বৃদ্ধ স্ত্রী। দিনভর অপেক্ষা করে কোনো কূলকিনারা না পেয়ে রাত ৮টায় হোটেল চৌধুরীতে উঠেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকায় সঙ্গে অনেক জিনিসপত্র রয়েছে। আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, এখন মনে হচ্ছে হাসপাতালে থাকাই ভালো ছিল। আবদুল আলিম নামে এক পথচারী জানান, তিনি সাটুরিয়া থেকে এসেছেন। হেঁটে-রিকশায় এভাবে। প্রায় হাজার খানেক মতো টাকা খরচ হয়ে গেছে তার। কুষ্টিয়া থেকে আসা এক ব্যক্তি জানান, তিনি মঙ্গলবার ভোরে গাবতলী এসেছেন। বোনের হার্টের অসুখ। তাকে দেখাবেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদালয়ে। কিন্তু পরিবহন চলাচল না করায় পাশেই একটি হোটেলে উঠেছেন। রোগীর অবস্থাও খারাপের দিকে। টার্মিনালের এক ব্যবসায়ী আবদুল হালিম। তিনি একটি দোকান করেন। বলেন, রাতে ভয়ে দোকান বন্ধ করে চলে যান। সকালে এসে দেখেন প্রায় হাজার খানেক টাকার মালামাল চুরি হয়ে গেছে।
এদিকে শ্রমিক-পুলিশ সংঘষের্র সময় শাহ আলম নামে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি গুলিতে নিহত হন। নিহত শাহ আলম বৈশাখী পরিবহনের চালক। সকালে গুলিতে আহত হওয়ার পর তাকে স্থানীয় সেলিনা আক্তার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মঞ্জুরুল হক বলেন, এখানে যখন তাকে নিয়ে আসা হয় আমরা তার পালস পাইনি। আমরা তো মৃত ঘোষণা করতে পারি না। তাই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলি। পরে অন্য শ্রমিকরা শাহ আলমের লাশ সোহরাওয়ার্দীতে না নিয়ে গাবতলী নিয়ে যায়। পুলিশ সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢামেকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
গাবতলীর বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়ও একই চিত্র। যাত্রাবাড়ী গিয়ে দেখা যায় সেখানে দলবদ্ধ কিশোর-তরুণরা। সবার হাতে লাঠি, ইটের টুকরো। তারা টায়ারে অগ্নিসংযোগ করেছেন রাস্তায়। এর মধ্যেই একটি সিএনজি অটোরিকশায় শনির আখড়া থেকে এই দিক দিয়ে চাচ্ছিল। ঘিরে ধরেন শ্রমিকরা। আতঙ্কে গাড়ি থামিয়ে দুই হাত জোড় করে চালক বলেন, ‘বড় ভাইরা গাড়ি ভাঙবেন না। যাত্রী রোগী। গর্ভবর্তী মহিলা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি।’ কিন্তু কোনো কথা শুনতে চান না বিক্ষোভকারী শ্রমিকরা। তারা সবাই এক বাক্যে বলছেন, ‘তোরে আজ গাড়ি চালাইতে বলছে কে। ফিরে যা। নইলে কেউ গাড়ি ভাঙলে আমরা দায় নেব না।’ কথা শুনে অসহায় হয়ে যান চালক। এর মধ্যেই মহিলা যাত্রীর সঙ্গে থাকা কিশোর ও এক বৃদ্ধ নারী নামেন সিএনজি অটোরিকশা থেকে। নারী চিৎকার করেন, অযৌক্তিকভাবে ধর্মঘট দিছো, গাড়ি চালাইবা না-চালাইওনা। আমাদের আটকাও কেন। এই রোগীর গাড়িও আটকাও। কি পাইছো? মহিলার কথা শুনে বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ নীরব হয়ে যান। এর মধ্যেই চালক সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে যেতে সক্ষম হন। সকাল থেকেই পরিবহন ধর্মঘটের নামে সায়দাবাদ, যাত্রাবাড়ী এলাকায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল বিক্ষোভকারী শ্রমিকরা। লাঠি হাতে দল বেঁধে রাজপথে নামেন তারা। কোনো গাড়ি দেখলেই দৌড়ে তা আটক করেন। অটোরিকশা এমনকি রিকশারও গতিরোধ করেন তারা। লাঠির ভয় দেখিয়ে নিরীহ যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হয়েছে ওই এলাকায়। মতিঝিল যাওয়ার উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠছিলেন এক মধ্য বয়সী নারী। শ্রমিকরা ‘হুররে’ চিৎকার দিয়ে ওই রিকশার সামনে যায়। মহিলাকে অনেকটা ধমক দিয়েই রিকশা থেকে নামিয়ে দেয় তারা। এরকম দৃশ্য ছিল অহরহ। দুপুরে যাত্রাবাড়ী থানার পাশে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা। এ সময় আশপাশ দিয়ে কয়েকটি অটোরিকশা যাওয়ার চেষ্টা করলে তাতে হামলা চালায় তারা। ভাঙচুর করা হয় কয়েকটি অটোরিকশা। এ সময় পুলিশ তাদের সরাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে শ্রমিকরা। তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে পুলিশ ধাওয়া করলে ওই স্থান ছেড়ে যায় শ্রমিকরা। ধর্মঘট চলাকালে সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে গতকাল দূরপাল্লার কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি। সব ধরনের পণ?্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার পাশাপাশি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশ পথে ব্যক্তিগত যানবাহনও ঢুকতে বাধা দেয়া হয়েছে। সকালে মুন্সিগঞ্জ থেকে কয়েকটি মিনিবাস সায়দাবাদ শাহজালাল টার্মিনালে পৌঁছলে বিক্ষোভরত শ্রমিকরা ওই বাসগুলোর শ্রমিকদের উপর হামলা চালায়। পরে শ্রমিক নেতা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। গাড়ি বন্ধ থাকায় নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ থেকে হিউম্যান হলার, লেগুনা, পিকআপে করে ঢাকায় ঢোকার চেষ্টা করেন অনেকে। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের বাধার কারণে যাত্রাবাড়ী মোড় পার হতে পারেননি তারা। অনেকে ভ্যানে ও রিকশায় করে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে চাইলে তারাও বাধার মুখে পড়েন। সায়দাবাদ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, কাঁচপুর, চিটাগাং রোড, সাইনবোর্ড, মাতুয়াইল, রায়েরবাগ, গোলাপবাগ, মতিঝিলসহ বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে লাঠি হাতে অবস্থান নেন শ্রমিকরা। এসময় দুর্ভোগের শিকার হন রোগী, অফিসগামীরা। একইভাবে নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে।
একই অবস্থা ছিল রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। সকালে মোহাম্মদপুর-বছিলা ও কেরানীগঞ্জের আঁটি রোডের সিএনজি অটোরিকশাগুলো যাত্রী নিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় গেলে ধর্মঘটী শ্রমিকদের হামলার শিকার হয়। হামলায় লাঠি হাতে শিশু শ্রমিকরাও অংশ নেয়। দিনভর রাজধানীতে রিকশা ও পায়ে হেঁটে চলাচল করেছেন। ধর্মঘটের কারণে রিকশা ভাড়া ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এমনকি কাল দুপুরের পর হঠাৎ করেই বাড়ানো হয় বিমানের টিকিটের মূল্য। গতকাল দেশে ফিরে বিপাকে পড়েন অনেকেই। তাদের মধ্যে একজন লন্ডনপ্রবাসী হারুন-অর-রশীদ। তিনি জানান, ধর্মঘটের কথা শুনে ভেবেছিলেন বিমানে সিলেটের বাড়িতে যাবেন। কিন্তু চাহিদা বেশি থাকায় বিমানের টিকিটও পাওয়া যায়নি। সূত্রমতে, দুপুরের পরপরই বিমানের টিকিটের মূল্য বেড়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের টিকিটের মূল্য ছিল ৬ হাজার ৫শ’, বাংলাদেশের বিমানের সিলেটের টিকিট বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৩শ’ টাকায়।
সকাল ১০টার দিকে মহাখালী বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জেলার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য মহাখালী বাস টার্মিনালে এসে বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা। সকালে এসে গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকলে অনেকে যাত্রী ছাউনির বেঞ্চে ঘুমিয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার গাড়ি না পেয়ে দূর দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এসে ক্লান্ত থাকায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। আবার কাউকে কাউকে রাস্তার পাশে পার্কিং করে রাখা গাড়ির পাশে ব্যাগ-বস্তা রেখে তার উপরে বসেই অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। টার্মিনালে বাস চালক ও শ্রমিকদের মধ্যেও ব্যাপক সতর্কতা দেখা গেছে। সকাল থেকেই কোন সিএনজি বা ইঞ্জিনচালিত যানকে টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছিলেন না তারা। মো. সাইদুর রহমান নামের এক যাত্রী বলেন, হরতাল অবরোধের মধ্যে দুই একটা গাড়ি পাওয়া যায়। এই আশায় বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় রিকশা, সিএনজি ও প্রাইভেট কার ছাড়া আর কিছুই পাইনি। ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে শান্তি নগরের বাসা থেকে এসেছি টার্মিনালে। যাব গ্রামের বাড়ি শেরপুরে। মহাখালী বাস টার্মিনালে এসে সকাল ৮টা থেকে বসে রয়েছি গাড়ির জন্য। কিন্তু কখন গাড়ি ছাড়বে তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না।
সালাউদ্দিন নামের এক যাত্রী মাদারীপুর থেকে রাতের লঞ্চে পরিবার নিয়ে এসেছেন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। পরে জানতে পারেন পরিবহন ধর্মঘট তাই গাড়ি ছাড়বে না। তখন নিরুপায় হয়ে যান কমলাপুর রেল স্টেশনে। গিয়ে দেখেন যতগুলো ট্রেন দাঁড়ানো সবগুলোতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে রয়েছে যাত্রীতে। সবাই আগে থেকেই উঠে সিট দখল করেছে। কারণ যে সময়ই ছাড়ুক গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন। সঙ্গে পরিবার থাকায় ট্রেনে না গিয়ে সিএনজি করে চলে এসেসেন মহাখালী বাস টার্মিনালে। তিনি বলেন, এখানে এসেও জানতে পারলাম কবে গাড়ি ছাড়বে তা কেউ জানে না। এখন আব্দুল্লাহপুর আত্মীয়ের বাসায় যাব। যেদিন পারি সেদিন বাড়ি ফিরব। তিনি আরো বলেন, ধর্মঘটের কারণে কোথাও কোনো গাড়ি নেই। তাই সদরঘাট থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সিএনজি ভাড়া দিতে হয়েছে ৩০০ টাকা। কলমাপুর থেকে মাহাখালী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত আসতেও ৩০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। এখন আব্দুল্লাহপুর যেতে ৪০০ টাকা ভাড়া চেয়েছে সিএনজি ওয়ালারা। কিন্তু স্বাভাবিক সময় ১০০ টাকার ভাড়াও না। মিরপুর ৩ নম্বর থেকে হবিগঞ্জের বানিয়াচং যাওয়ার জন্য এসেছেন তপন সরকার। বাড়িতে পূজার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিন ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে সাথে নিয়ে। সকাল থেকেই অপেক্ষা করছেন মহাখালী বাস টার্মিনালে। যাত্রী ছাউনিতে অন্যান্য যাত্রীদের মতো তারাও পরিবার মিলে বসে রয়েছেন গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষায়। মো. রাকিব নামের অপর এক যাত্রী বগুড়া থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চাকরির পরীক্ষা দিতে এসছিলেন ঢাকায়। এখন পরিবহন ধর্মঘটের কারণে আর ফিরতে পারছেন না। তাই মহাখালী বাস টার্মিনালেই গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষা রয়েছেন। মো. আনোয়ারুল ইসলাম এসেছেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানার বালুর চর ইউনিয়ন থেকে। সেখানে ফার্নিচারের দোকানে কাজ করেন তিনি। হঠাৎ ছোট বোনের বিয়ের আয়োজন হওয়ায় যাবেন গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুরে। সকালে ছোট ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে রওনা হন। রাস্তায় বের হয়ে কোনো গাড়ি না পেয়ে ৫০০ টাকায় সিএনজি ভাড়া করে আসেন মহাখালী বাস টার্মিনালে। কিন্তু এসে দেখেন কোনো গাড়ি ছাড়ছে না। পরে সিএনজি ভাড়া করে আবার মুন্সিগঞ্জের বাসার দিকে রওনা হন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, শুনেছি ধর্মঘট চলছে। কিন্তু দেশের হরতাল-অবরোধের মধ্যে তো সারাদেশেই গাড়ি চলে। এই জন্য এসেছিলাম যদি কোনো লোকাল গাড়িও পাওয়া যায় তাতে করে বাড়ি যাব। আসার সময় রাস্তায় দুই একটা বিআরটিসির গাড়ি দেখেছি। আর কোনো গাড়ি রাস্তায় পাওয়া যায়নি। গ্রামের বাড়ি শেরপুরে যাওয়ার জন্য বাস টার্মিনালে এসে অপেক্ষা করছেন অপর এক যাত্রী মো. মোশাররফ হোসেন। ঢাকার মগবাজারের বাসা থেকে ৮০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে সকাল ১০টার দিকে টার্মিনালে আসেন তিনি। দুপুর ১২টার পরও টার্মিনাল থেকে কোনো গাড়ি ছাড়বে কিনা তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না পাওয়ায় আবার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। খলিলুর রহমান নামের অপর এক যাত্রী আসেন নারায়ণগঞ্জের কাচপুর থেকে। কাউন্টারে গিয়ে জানতে চাইলে গাড়ি ছাড়ার বিষয়ে কেউ কিছু বলছে না দেখে টার্মিনালের ভেতরের যাত্রী ছাউনিতে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। এনা পরিবহনের কাউন্টার থেকে সেলস এক্সিকিউটিভ কামরুল আহসান জানান, গতকালও অনেক যাত্রী এসেছে। আজও সকাল থেকে যাত্রী আসছে অনেক। কিন্তু উপর থেকে আমাদের বলেছে টিকিট বন্ধ রাখতে আমরা রেখেছি। আবার ছেড়ে দিতে বললে আমরা ছেড়ে দিব। এটা শ্রমিকদের আন্দোলন, আমাদের কোনো বিষয় না।
সকালে ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন ইটনা উপজেলার কৃষি সমপ্রসারণ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া। তিনি গাজিপুরের টেলিকম স্টাফ কলেজে পরিচালিত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের একজন প্রশিক্ষণার্থী। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সচিবালয়ে সংযুক্তিতে যাওয়ার পথে উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের সামনে প্রশিক্ষণার্থীদের বাসে ইট ছুড়ে শ্রমিকরা। ইটটি তার গালের একাংশে আঘাত করলে মাংস থেতলে পড়ে যায়। দুটো দাঁতও পড়ে যায়। আহত সুমন মিয়াকে প্রথমে উত্তরা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় সিএমএইচ-এ নেয়া হয়। আগেরদিন বিপিএটিসির একটি অ্যাম্বুলেন্সও ভাঙচুর করে শ্রমিকরা। গতকাল বিকালে গাবতলী টার্মিনালে শ্রমিকদের হামলার শিকার হন বিডিনিউজের সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহ। ওই এলাকার পরিস্থিতি দেখতে গেলে শ্রমিকরা তার ওপর হামলা চালায়। গাছের ডাল দিয়ে তাকে আঘাত করলে তা মুখে আঘাত লাগে। এছাড়া তার মোটরবাইকও ভাঙচুর করে পরিবহন শ্রমিকরা।
উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নৈরাজ্য চলছে: ফখরুল
পাবনার সুজানগর উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের গণসংযোগে হামলার অভিযোগ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আগামী ৬ই মার্চ অনুষ্ঠিতব্য দেশের কয়েকটি উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব এখন চরম মাত্রা পেয়েছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালিয়ে তাদেরকে আহত করা হচ্ছে। লিফলেট, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। প্রচার-প্রচারণায় ব্যাপকভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনী এলাকাগুলোতে আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে এলাকাবাসী এখন আতঙ্কিত জীবনযাপন করছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের সন্ত্রাসীরা বিরোধী প্রার্থী ও প্রার্থীর সমর্থকদের ভয় পাইয়ে দিতেই অস্ত্রবাজির মাধ্যমে সরকারি দলের প্রার্থীদের জয় সুনিশ্চিত করতে চাইছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদেরকে সহযোগিতা দেশবাসীকে আরো উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত করে তুলেছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা স্থানীয় ও জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। মনে হচ্ছে- সরকারি প্রশাসন সরকারি দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতেই কাজ করছে। উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রমাণ করে নতুন নির্বাচন কমিশন তাদের বাগাড়ম্বর বক্তব্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুর মো. মাসুম বগা, আনিছুল হক বাবু, শহিদুল ইসলাম টুটুল বিশ্বাস ও জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি টিপুসহ অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এছাড়া সুজানগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক চেয়ারম্যান কামাল বিশ্বাসের বাড়ি ভাঙচুর করেছে সন্ত্রাসীরা। অন্যদিকে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হোগলাপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিফাত উল্লাহর ওপর হামলা করেছে সরকার সমর্থকরা। মির্জা আলমগীর এসব ন্যক্কারজনক ও বর্বরোচিত ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
নজিরবিহীন by শামীমুল হক

২০১১ সালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের জোকায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও প্রখ্যাত সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় করা মামলার রায়ে সম্প্রতি মানিকগঞ্জের একটি আদালত ঘাতক বাসটির চালককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। এছাড়া, ২০০৩ সালে সাভারে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাকচাপা দিয়ে এক গৃহবধূকে হত্যার দায়ে সোমবার ঢাকার একটি আদালত ওই চালকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এ দুটি রায়ের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ জনগণ এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। সরকার সমর্থক পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের ডাকা এ ধর্মঘটে হতবাক সবাই। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এভাবে ধর্মঘট ডেকে গোটা দেশ অচল করে দেয়া নজিরবিহীন ঘটনা।
Monday, January 25, 2016
সিলেটে ছাত্রলীগের তুলকালাম ব্যবসায়ীদের সড়ক অবরোধ
সিলেটে ১৫০ ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক
সিলেটে জোরেশোরে শুরু হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক অভিযান। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে নগরীর সব পয়েন্টে ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক শুরু করেছে ট্রাফিক পুলিশ। বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অভিযানে দেড় শতাধিক অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক করা হয়। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নিকোলিন চাকমা বলেন, উচ্চ আদালতে রিট খারিজ হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। এদিকে উচ্চ আদালতে গত ১৯ জানুয়ারি খারিজ হওয়া রিট ১৩৯৯৬/১২-এর নিষ্পত্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র সিলেট রিকশা মালিক সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতি এমএএম শাহজাহান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, সিলেটের জেলা প্রশাসক ও সিলেট সিটি করপোরেশনে রোববার দুপুরে হস্তান্তর করেন। এ সময় লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আদালত রিট আবেদনের রুল জারি করলেও কোথাও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দেননি। রিট খারিজ হওয়ায় বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা উচ্ছেদে কোনো বাধা নেই। সিলেট রিকশা মালিক সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতির প্রধান উপদেষ্টা সহিদুল হোসেন আহমদ মামুন বলেন, আমরা রিট খারিজ সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছি। রিট ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি নয়। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, সিলেট নগরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে এসএমপির সহায়তায় সিসিক অভিযান চালাবে। গত ১৯শে জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি এসএম মজিবুর রহমানের যৌথ বেঞ্চ শুনানি শেষে সিলেট ব্যাটারি চালিত রিকশা মালিক সমিতির রিট খারিজ করে দেন। এরপর থেকে রোববার অভিযান শুরু করে এসএমপির ট্রাফিক বিভাগ।
Wednesday, December 9, 2015
পোশাকশ্রমিকদের অবরোধ, ভাঙচুর- কমলাপুরে আকলিমা হত্যার ক্ষতিপূরণ দাবি
![]() |
| রাজধানীর কমলাপুর-সংলগ্ন মুগদায় বাস ভাঙচুরের সময় আহত এক নারী যাত্রী আতঙ্কিত শিশুকে কোলে নিয়ে যানটি থেকে নামছেন। ছবিঃ সাজিদ হোসেন |
গত শুক্রবার রাতে কমলাপুরে বাসস্ট্যান্ডের কাছে বলাকা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় আকলিমা ঘটনাস্থলে মারা যান। তাঁর সহকর্মী রহিমা বলেন, কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফেরার সময় বাসের ধাক্কায় নিহত হন আকলিমা। তিনি কমলাপুরের অলিও অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। এ ঘটনায় একই কারখানার শ্রমিক হাজেরা (৩২) ও ভ্যানচালক জসিম (৩০) নামে আরও দুজন আহত হন। আশপাশের লোকজন বলাকা পরিবহনের চালক আরিফকে বাসটিসহ আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর গতকাল সকাল নয়টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে নটর ডেম কলেজের মোড় পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, আশপাশের ছয়-সাতটি পোশাক কারখানার হাজার খানেক শ্রমিক সড়কটিতে জড়ো হন। তাঁরা লাঠি নিয়ে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। টায়ার জ্বালিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ সময় বাসচাপায় নিহত শ্রমিকের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ, বাসচালকের বিচার এবং দুর্ঘটনাস্থলে পদচারীসেতু স্থাপনের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন শ্রমিকেরা। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা বেশ কয়েকটি বাস ভাঙচুর করেন। টানা কয়েক ঘণ্টা অবরোধে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় কমলাপুর, মুগদাপাড়া, আরামবাগ, ফকিরাপুলসহ কয়েকটি এলাকার সড়কগুলোতে যানজট ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশে ব্যারিকেড দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে পুলিশ। পরে ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত সচিব মনসুর খালেদ, অলিও অ্যাপারেলস লিমিটেডের কর্মকর্তা কাজী তসলিম উদ্দিন ও পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেন।
নিহত আকলিমার পরিবারকে দুই লাখ টাকা এবং আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার খরচ, চিকিৎসাকালীন ছুটি ও অন্যান্য ভাতা দেওয়ার আশ্বাস দেন কাজী তসলিম উদ্দিন। এ ছাড়া আকলিমার লাশ দাফনের জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেয় বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ। এরপর বেলা পৌনে দুইটার দিকে অবরোধ তুলে নেন শ্রমিকেরা।
পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ডিসি আনোয়ার হোসেন বলেন, বাসচাপায় নিহত নারী শ্রমিক ও আহত দুজনকে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছে পোশাক কারখানার মালিকপক্ষ। এ ছাড়া পদচারীসেতু স্থাপনের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ করা হবে।
Monday, October 19, 2015
অকস্মাৎ বাস বন্ধ নাকাল যাত্রীরা
সরকার ১লা অক্টোবর থেকে নতুন বাস ভাড়া নির্ধারণ করে বাস মালিক ও শ্রমিকদের। তবে, অভিযোগ ছিল রাজধানীর ৪০ শতাংশ গণপরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করছে যাত্রীদের কাছ থেকে। এ বিষয়ে খোদ যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বলেছিলেন কিছু গণপরিবহন নির্ধারিত বাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। গতকাল সকালের দিকে মিরপুর তালতলা এলাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেয়ার অপরাধে হিমাচল পরিবহনের একজন সুপারভাইজারকে ১ মাসের কারাদণ্ড দেন বিআরটিএ’র একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এছাড়া আরও কিছু রুটেও বাসচালকদের জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি বিভিন্ন রুটের বাস মালিক, চালক ও সুপারভাইজাররা। আর এর প্রতিবাদেই বাস চলাচল বন্ধ রাখে মালিক ও শ্রমিক পক্ষ।
এদিকে বাসচালক ও মালিকদের এমন সিদ্ধান্তে দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন বিভিন্ন কাজে ঢাকায় প্রবেশ করা হাজার হাজার মানুষ। রাজধানীর সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী, সদরঘাট, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে নেমেই তারা বিপাকে পড়েন। নির্ধারিত গন্তব্যের বাস না পেয়ে অনেকেই পায়ে হেঁটে, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা, কেউ খোলা পিকআপ ভ্যানে চড়ে গন্তব্যে রওয়ানা হন। তবে বিকল্প পথে গন্তব্যে পৌঁছতে তাদের গুনতে হয়েছে বাড়তি অর্থ। গতকাল সকাল এগারটার দিকে ফার্মগেট এলাকার উভয়পাশে দেখা যায় মিরপুরগামী ও মিরপুর থেকে ফার্মগেট, গুলিস্তান, মতিঝিল অভিমুখী গণপরিবহন একেবারে নেই বললেই চলে। যাত্রীদের আকর্ষণ করতে গণপরিবহনের লাইনম্যানদের সেই চিরাচরিত হাঁকডাকও ছিল না। তবে, ফার্মগেটের উভয়পাশে শত শত যাত্রী ছিলেন গন্তব্যে যাবার অপেক্ষায়। কিন্তু তখনও তারা বুঝে উঠতে পারেননি হঠাৎ করেই কেন গণপরিবহনের সংখ্যা কমে গেল। দুর্ভোগে পড়া মানুষেরা এ নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন একে অন্যকে। দুপুর ১টার দিকে ফার্মগেট, কাওরানবাজার, সার্ক ফোয়ারা মোড় পার হয়ে বাংলামোটর এলাকা যেতে পাশের সড়কগুলোতে দেখা গেছে মানুষের সারি। কাঙ্ক্ষিত বাস না পেয়ে অনেকেই পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন অনেকে। তবে, অসুস্থ, মহিলা ও শিশুদের দুর্দশার অন্ত ছিল না এসময়। দুপুর ২টার দিকে প্রেস ক্লাবের সামনে দেখা যায় মিরপুর, ফার্মগেট অভিমুখী বাসের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষ। কিন্তু বিআরটিসির বাস ছাড়া কাঙ্ক্ষিত কোন বাসই আসেনি এই এলাকায়। আবদুল্লাহপুর টু গুলিস্তান রুটে চলাচলকারী গণপরিবহনগুলোও শাহবাগ, মৎস্যভবন পর্যন্ত এসে আবারও যাত্রী নিয়ে ফিরে যায়। বিকাল ৫টায় ফার্মগেট এলাকায় দেখা যায় ঘরমুখো শত শত মানুষ রয়েছেন অপেক্ষায়। বিশেষ করে গাবতলী, মিরপুর-১ ও ২ এর যাত্রী সংখ্যাই ছিল বেশি। কিন্তু এসব রুটের গণপরিবহনই আসতে দেখা যায়নি এসময়। ফার্মগেট এলাকার বিআরটিসি বাস কাউন্টারের অপারেটর ইলিয়াস হোসেন বলেন, সরকারি বাস ছাড়া আর কোন রুটের বাস খুব একটা দেখিনি। একারণে বিআরটিসির বাসে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। একেকটি গাড়ি এসে থামতেই অসংখ্য মানুষ তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।
ফার্মগেট থেকে গাবতলীর উদ্দেশে যাওয়ার জন্য মেয়েকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন গৃহিণী রিজিয়া পারভীন। কিন্তু অপেক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত বাস আসেনি। তেজগাঁও কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান জানান, মিরপুর-১ নম্বরে যাবার জন্য ১ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেও তিনি কোন বাসের দেখা পাননি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, বেশি ভাড়া নেয়ার অপরাধে হিমাচল পরিবহনের একজন সুপারভাইজার ও কয়েকজন বাস শ্রমিককে কারাদণ্ড ও জরিমানা করেছিল বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর প্রতিবাদে মিরপুর সহ বিভিন্ন রুটের বাস মালিক ও শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ রাখে। তবে এটি কোন পরিবহন ধর্মঘট ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, সন্ধ্যায় বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান, বাস মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে আলাপ-আলোচনা করি। পরে ৫টার দিকে বাস চলাচল পুনরায় শুরু হয়। খন্দকার এনায়েতউল্লাহ আরও বলেন, ইতিমধ্যে বেশি ভাড়া নেয়ার অপরাধে বেশ কয়েকজন বাস শ্রমিককে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। কিন্তু অপরাধ করলে জরিমানা করতে পারে। সংশ্লিষ্ট পরিবহনের লাইসেন্স বাতিলসহ মামলা করতে পারে। কিন্তু এভাবে কারাদণ্ড দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
আকস্মিক ধর্মঘটে ভোগান্তি- অধিক ভাড়া আদায় : বাসশ্রমিকের জেল
![]() |
| রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকায় গতকাল পরিবহন শ্রমিকেরা অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন : নয়া দিগন্ত |
গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুরে একটি বাসের কন্ডাক্টরকে বিআরটিএর ম্যাজিস্ট্রেট জেল-জরিমানা করলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই রুটে চলাচলকারী সব ধরনের গণপরিবহন পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দেন বাসচালক ও পরিবহন শ্রমিকেরা। খবর ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য রুটের বাসও বন্ধ করে দেয়া হয়। তারা শুধু চলাচল বন্ধ করেই ক্ষান্ত থাকেননি; রাস্তার ওপর এলোপাতাড়ি বাস রেখে অন্য যানবাহন চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করেন। ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ নগরীর অভ্যন্তরীণ বাস টার্মিনাল ও স্ট্যান্ডগুলোয় গাড়ি এলোপাতাড়ি রাখা হয়।
এ অবরোধ শুরুর পর চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েন মিরপুর-আজিমপুর-গুলিস্তান-মতিঝিল, গাবতলী-উত্তরা-আজিমপুর, গাবতলী-গুলশান-বাড্ডা, সদরঘাট-মিরপুর রুটসহ মিরপুর ১১ নম্বর হয়ে চলাচলরত বিভিন্ন রুটের হাজার হাজার যাত্রী, স্কুল ও কলেজফেরত শিক্ষার্থীরা। শুধু গুলিস্তান-মিরপুর রুট নয়, এর প্রভাবে পুরো রাজধানীতেই সৃষ্টি হয় জনদুর্ভোগ। এ সময় অনেকেই উপায় না পেয়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। দুপুরে মিরপুর ১১ নম্বর পূরবী সিনেমা হলের সামনে অবস্থান নেয়া শতাধিক বাসশ্রমিককে বিভিন্ন ধরনের স্লোগানও দিতে দেখা যায়।
বিকেলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক ও মালিক সমিতির নেতাদের সাথে পরিবহন শ্রমিক ও বিআরটিএর কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। এর পরই আবারো বাস চলাচল শুরু হয়েছে বলে জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মো: আবু নাসের।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গতকাল বেলা ১১টার দিকে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত আগারগাঁও আবহাওয়া অধিদফতরের সামনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারী বাসচালক ও কন্ডাক্টরদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। এ সময় গাড়ির কাগজপত্র না থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট আল আমিন মিরপুর থেকে নারায়ণগঞ্জগামী হিমাচল পরিবহনের কন্ডাক্টরকে এক মাসের জেল ও জরিমানা করেন। এ নিয়ে সেখানে উপস্থিত পুলিশের সাথে শ্রমিকদের কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ একজনকে ধরে বেধড়ক পিটুনি দেয়। এর পরই তারা সড়কে বাস বন্ধ করে গাড়িতে বসে থাকেন। বাস কন্ডাক্টরের জেল-জরিমানার খবর মুহূর্তে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে ওই রুটে চলাচলকারী সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়েন ওই পথে চলাচলকারী স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
আগারগাঁও এলাকায় দেখা গেছে, উত্তরাগামী জাবালে নূর পরিবহনের সব বাস বন্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলে দাঁড় করানোর কারণ জানতে চাইলে জাবালে নূর পরিবহনের একজন বাসচালক জানান, পরিবহন সমিতির লোকজনের সাথে পুলিশ খারাপ আচরণ করেছে। মারধর করেছে। এ জন্যই আমরা সব বাস চলাচল বন্ধ রেখেছি। এর একটা বিহিত হওয়া উচিত। পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগÑ ট্রাফিক পুলিশ ‘নানা অজুহাতে’ নিয়মিতই তাদের হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ করেন বাসশ্রমিক ইস্রাফিল। তিনি বলেন, আমরা পেটের দায়ে কাজ করি। প্রতিদিনই নির্দিষ্ট হারে টাকা মালিকের হাতে তুলে দিতে হয়, না পারলে আমাদের মজুরি থেকে কেটে রাখা হয়। এ অবস্থায় রাস্তায় গাড়ি নামালেই যদি জরিমানা গুনতে হয়, তাহলে তো এ কাজ করে আর ভাত জোটানো সম্ভব না। এর আগে বেলা ২টার দিকে বিুব্ধ শ্রমিকেরা একটি বিআরটিসি বাসসহ কয়েকটি গণপরিবহনের কাচ ভেঙে ফেলে। পূরবী সিনেমা হলের সামনে গাড়ির জন্য অপোরত কয়েকজন যাত্রী জানান, উত্তরা থেকে এসে অনেকেই সেখানে আটকে গেছেন। শ্রমিকেরা যাত্রীদের নামিয়ে বাস ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। প্রায় একই ভাষ্য পাওয়া গেছে গাবতলী থেকে একটি বাসে আসা যাত্রীদের কাছেও।
ব্যবসায়ী রাজিউন ইসলাম জানান, তিনি তার দোকানের মালপত্র নিয়ে গুলশান যাচ্ছিলেন। পূরবী আসার পর শ্রমিকেরা তাদের জোর করে নামিয়ে দিয়েছেন। বাস বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়া অনেক যাত্রীকেই হেঁটে যেতে দেখা গেছে। এ রুটের বাস চলাচল বন্ধ হওয়ায় এর প্রভাব পড়ে পুরো রাজধানীজুড়ে। এভাবে পরিবহন শ্রমিকদের কাছে বিকেল পর্যন্ত নগরীর মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ে। বিকেলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ও মালিক সমিতির হস্তক্ষেপে পরিবহন শ্রমিকেরা কাজে ফিরে যান।
সুরিটোলায় ভিক্টর পরিবহনের বাসচালক হাসান মিয়া বাসেই ঘুমাচ্ছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নেতারা আটক হবেন, আমরা যথাযথ ভাড়া পাবো নাÑ এটি হতে পারে না। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায়ই থাকব।
সদরঘাট থেকে গুলিস্তান আসা যাত্রী ফয়সাল আহমেদ বলেন, এভাবে মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা ঠিক না। রাস্তায় এভাবে গাড়ি পড়ে থাকলে ঢাকা তো অচল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ছোট ভাইকে নিয়ে শাহবাগে হাসপাতালে যাবো। আমার মতো আরো অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বের হননি। তাই যারা এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছেন, তাদের ভাবা উচিত মানুষের কী পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে।
মিরপুর রুটের একাধিক বাসযাত্রী এ প্রতিবেদককে বলেন, বাসচালক ও কন্ডাক্টররা যাতে ভাড়া ইচ্ছামতো নিতে পারেন এ জন্যই তারা আজকে পরিকল্পিতভাবে রাস্তা বন্ধ করে সড়ক অবরোধ করে সরকারসহ সবাইকে জানান দিয়েছেন। কিন্তু সরকারেরর উচিত হবে, এদের কোনোভাবেই ছাড় না দেয়া। যারা জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা নতুবা পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
পরিবহন শ্রমিকদের অবরোধ প্রসঙ্গে মিরপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সাংবাদিকদের জানান, গাড়ির যথাযথ কাগজপত্র না থাকায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেট কন্ডাক্টরকে সাজা দিয়েছেন। এ আদেশের প্রতিবাদে চালকেরা বাস চলাচল বন্ধ করে দেন।
গত রাতে সড়ক পরিবহন ও মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আগারগাঁওয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাথে ভুল বোঝাবুঝিতে এমনটি হয়েছিল। কী হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, হিমাচল পরিবহনের একটি বাসের কন্ডাক্টর যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করেছিলেন। পরে ম্যাজিস্ট্রেট তাকে সাজা দিয়েছেন। বিকেলে পরিবহন শ্রমিকদের সাথে আমি বৈঠক করেছি। এর পরই তারা অবরোধ তুলে কাজে ফিরে গেছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা পুরো সড়কে কোন কোন পরিবহন শ্রমিক যাত্রীদের কাছ থেকে বাস ভাড়া অতিরিক্ত আদায় করছেন, সেগুলো মনিটরিং করছি।
তবে খন্দকার এয়ায়েত উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রতিবার বাস ভাড়া বাড়ানোর পর কিছুটা নিয়ম-অনিয়ম হয়। একসময় সব ঠিক হয়ে যায়।
Wednesday, September 16, 2015
সিপিবি-বাসদের অবরোধ পণ্ড, আটক ১৫
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সকাল সাড়ে ১১টায় উপজেলা বাজারে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে মাইক লাগিয়ে সংগঠনের কয়েকশ নেতা-কর্মী অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এতে মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ ৪ রাউন্ড ফাঁকা রাবার বুলেট ছোড়ে ও লাঠিপেটা করে। এ সময় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জেলা শাখার আহ্বায়ক সাদেক হোসেন, অর্থ সম্পাদক মৌসুমী আকতার ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন আহত হন। পুলিশ কর্মসূচির ব্যানার খুলে নিয়ে যায়।
কমিউনিস্ট পার্টি রংপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহীন রহমান বলেন, পুলিশ বিনা উসকানিতে তাঁদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা চালিয়ে তা পণ্ড করে দিয়েছে।
মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির বলেন, অবৈধভাবে মহাসড়ক বন্ধ করে তাঁরা সমাবেশ করছিলেন। গাড়ি চলাচল বন্ধ হওয়ায় ৪ রাউন্ড ফাঁকা রাবার বুলেট ছুড়ে তাঁদের হটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ১৫ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
Wednesday, August 5, 2015
‘সেতু অবরোধ করে রাখলে চলাচল করব কীভাবে?’
গত শনিবার থেকে পরিবহন শ্রমিকেরা বাংলাদেশ চীন মৈত্রী বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু টোলমুক্ত করার দাবিতে অবরোধ করে রেখেছেন। গত তিন দিনের মতো তাঁরা আজও সেতুর দুই পাশে ট্রাক এনে ব্যারিকেড দেন। এ সময় শ্রমিকেরা সেতুতে অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেননি। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের কেরানীগঞ্জ, দোহার, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা, শরীয়তপুর ও মাওয়া রুটের যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের স্বীকার হতে হয়।
সিরাজুল ইসলাম নামে এক ট্রাকচালক বলেন, তিনি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে ইট আনতে পাগলা থেকে রওনা হয়েছেন। কিন্তু ট্রাকটি সেতুর কাছে আসতেই অবরোধকারীরা বাধা দেয়। তিনি বলেন, এই বিষয়গুলো সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
বুড়িগঙ্গা ১ম সেতু টোলমুক্ত সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক এমদাদুল হক দাদন বলেন, যত দিন পর্যন্ত সেতু টোলমুক্ত না হবে, তত দিন পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
এ প্রসঙ্গে কেরানীগঞ্জ সড়ক উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এসএম খায়রুল ইসলাম বলেন, সেতুর সমস্যাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
![]() |
| পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা টানা চতুর্থ দিনের মতো বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু অবরোধ করে রাখলে আজ মঙ্গলবারও দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা |
Monday, August 3, 2015
বুড়িগঙ্গা সেতুতে অবরোধ অব্যাহত
![]() |
| বাড়তি টোল আদায়ের প্রতিবাদে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু ‘টোলমুক্ত’ করার দাবিতে পরিবহনচালক ও শ্রমিকেরা আজ রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো টানা অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন। ছবি: ফোকাস বাংলা |
বাড়তি হারে টোল আদায়ের প্রতিবাদে ঠিক এক সপ্তাহ আগে গত ২৫ জুলাই ওই সেতু পাঁচ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন পরিবহন শ্রমিকেরা। তখন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ আগের হারে টোল আদায়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তাঁরা অবরোধ তুলে নেন। কিন্তু গত শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকে আবার বাড়তি টোল আদায় শুরু করে কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে এবার কোনো ধরনের টোল না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে অবরোধ কর্মসূচিতে নেমেছেন পরিবহনচালক ও শ্রমিকেরা।
গতকালের ধারাবাহিকতায় আজ ভোর থেকে বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন অবরোধকারীরা। এতে রাজধানী ঢাকা থেকে খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, দোহার ও কেরানীগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে সীমিত আকারে ভ্যান ও রিকশা চলাচল করলেও অবরোধকারীরা সেগুলোতে বাধা দিচ্ছেন।
বরিশাল থেকে আসা বাসযাত্রী আব্দুর রহিম জানান, ‘মাওয়া ঘাট থেকে বাসে করে সায়েদাবাদ যাচ্ছিলাম। পথে মুন্সিগঞ্জের নিমতলী এলাকায় একাধিকবার সিএনজি চালকেরা বাধা দেয়। বাসটি কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুর এলাকায় পৌঁছালে অটোরিকশা চালকসহ অন্যান্য যানবাহনের চালক ও শ্রমিকেরা বাধা দিয়ে আমাদের নামিয়ে দেয়। পরে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে পোস্তগোলায় আসি।’
আরেক যাত্রী রেহানা বেগম জানান, যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে করে খুলনা যাচ্ছিলাম। আমাদের বাসটি পোস্তগোলা প্রথম সেতুর কাছে আসামাত্র যানবাহনের শ্রমিকেরা বাসটিকে সেতুতে উঠতে না দিয়ে নামিয়ে দেয়। কোনো মতে ভ্যানে করে দুই ছেলে, এক মেয়ে ও মালামাল নিয়ে কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া এলাকায় এসে বাসের সন্ধানে বসে আছি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সেতুকে টোলমুক্ত করা নিয়ে যানবাহনের শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেছে কিন্তু আমরা যাত্রীরা পড়েছি বিপাকে। সরকারের উচিত এ বিষয়ে সুদৃষ্টি দেওয়া।’
সেতু টোলমুক্ত সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ইমদাদুল হক দাদন বলেন, ‘আমরা এই সেতুর টোল সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করছি। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের দাবি মানা হচ্ছে, আমরা আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাব। এতে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে সাময়িক অসুবিধা হলেও তাদের স্বার্থেই আমরা কর্মসূচি পালন করছি।’
ঢাকা জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি মো. ওসমান গনি সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার যে কয়েকটি পয়েন্ট রয়েছে তার মধ্যে শুধুমাত্র প্রথম সেতুতে টোল দিতে হয়। বাস্তবতা বিবেচনা করে অন্যগুলো আগেই টোলমুক্ত করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জবাসীসহ পরিবহন শ্রমিক-চালক ও মালিকদের প্রাণের দাবি এই সেতুটি টোলমুক্ত করে দেওয়া হোক। অন্যায়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে আমরা তা মানব না। প্রয়োজনে সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হবে।’
কেরানীগঞ্জ সড়ক উপবিভাগের প্রকৌশলী এস এম খায়রুল ইসলাম জানান, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা এখনো টোল আদায় করছি। পরবর্তীতে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত এলে আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম আজাদ খান বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য সওজ কর্তৃপক্ষ ও অবরোধকারীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলছে। আশা করছি শিগগিরই একটি সুরাহা হবে। তিনি আরও বলেন, জন সাধারণের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে; যাতে কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







