Friday, September 7, 2018

সেই তামিমির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসরাইল

ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক ফিলিস্তিনি তরুণী অহেদ তামিমি ও তার পরিবারের ওপর বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তেল আবিব। ইসরাইলের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রায় দুই মাস পর এ নিষেধাজ্ঞা দিল ইহুদিবাদী ইসরাইল। ইসরাইলের এক সেনাকে থাপ্পড় মারার জন্য তাকে আট মাস জেল খাটতে হয়েছে।
তুরস্কের সরকারি বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে আজ (শুক্রবার) তামিমির বাবা বাসিম তামিমি বলেন, তার পরিবার জর্দান হয়ে ইউরোপ সফরের পরিকল্পনা করেছিল। এ সফরে তাদের ফিলিস্তিনি আন্দোলন নিয়ে কিছু অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জানিয়েছে যে, ইসরাইলকে না জানিয়ে তামিমির পরিবার বিদেশ সফর করতে পারবে না। বাসিম তামিমি জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালেই তাদের ইউরোপ সফরে বের হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অহেদ তামিমি ইরান সফরেরও পরিকল্পনা করেছিলেন।
ইরানের ইংরেজি ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল প্রেসটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অহেদ তামিমির বাবা বলেছেন, তার মেয়েকে ইসরাইল বিদেশ সফরের ব্যাপারে এই ভয়ে বাধা দিয়েছে যে, তারা মনে করে ইসরাইলের শত্রুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করে অহিদ তামিমি মধ্যপ্রাচ্যকে খণ্ডবিখণ্ড করা সংক্রান্ত ইহুদিবাদী ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবে। অহেদের বাবা আরো বলেন, তার মেয়েকে ইসরাইল বিদেশ সফরের বিষয়ে বাধা দিচ্ছে এই কারণে যে, অহেদ তামিমি মানবতার জন্য একজন অ্যাম্বাসাডর হয়ে গেছে এবং তার প্রতি তেল আবিবের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সহানুভূতিকে ইসরাইল ভয় পায়।
গত ডিসেম্বর মাসে অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে অভিযান চালিয়ে ইসরাইলের বর্বর সেনারা আটক করেছিল ফিলিস্তিনের ১৭ বছর বয়সী এ তরুণীকে। সে সময় তামিমি ইসরাইলের দুই সেনার মুখে থাপ্পড় মারেন এবং সেই ভিডিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাইরাল হয়ে পড়ে। তার বিরুদ্ধে সেনাদের ওপর হামলা, উসকানি দেয়া এবং ইসরাইলি সেনাদের কাজে বাধা দেয়াসহ ১২টি অভিযোগ আনা হয়। ইসরাইলি আদালত তাকে আট মাসের কারাদণ্ড দেয় এবং গত ২৯ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
ইসরাইলের সেনারা এর আগেও কয়েকবার অহেদ তামিমির পরিবারের সদস্যদের আটক করেছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আগ্রাসন রুখে দেয়ার জন্য তার বাবা ও ভাইকে আটক করা হয়। এছাড়া, ইসরাইলি বাহিনী ২০১২ সালে অহেদ তামিমির চাচা রুশদি আত-তামিমিকে গুলি করে হত্যা করে। ১৯৯৩ সালে ইসরাইলের পুলিশ অহেদ তামিমির ফুফু বাসিমা আত-তামিমিকে পিটিয়ে হত্যা করে। ওইদিন বাসিমা তার ছেলের বিচারকার্য দেখার জন্য ইসরাইলের আদালতে গিয়েছিলেন।

'বাংলাদেশে কোনো ফকির নেই'

বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রতি প্রচারিত একটি সরকারি প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞাপনটির একটি জায়গায় বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমানে কোন ফকির মিসকিন নেই।
বিজ্ঞাপনের শুরুতেই দেখা যায় হামিদ নামে এক ব্যক্তি গ্রামের রাস্তা দিয়ে প্রাণপণে ছুটছেন। এবং তাকে হৈ হৈ করে তাড়া করছেন গ্রামের একদল নারী পুরুষ।
সেই গ্রামেরই এক প্রবীণ ব্যক্তি দুই পক্ষের পথরোধ করে এই তাড়া করার কারণ জানতে চান।
এসময় এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, গ্রামের আরেক ব্যক্তি জহির তার প্রয়াত বাবা মায়ের স্মরণে ফকির মিসকিন খাওয়াতে চান। এজন্য তিনি হামিদকে পাঠিয়েছেন তাদেরকে দাওয়াত করতে। এতে তারা অপমানিত হয়েছেন।
"আমরা কি ফকির মিসকিন নাকি?" পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ওই নারী।
পরে ভিড় থেকে আরেক ব্যক্তি জানান, তারা আগে ফকির মিসকিন থাকলেও এখন আর নেই। এখন তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষ।
সরকার তাদের ঘর, বিদ্যুৎ সংযোগ, জায়গা জমি, পুকুর দেয়ার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়া সেইসঙ্গে উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলে জানান তারা।
সেখানে একটি সংলাপ ছিল যে, "আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না।"
সবশেষ তারা জানান, "এইদেশে ফকির মিসকিন খুঁজতে আহে। বাংলাদেশ আর সেই দেশ নাই।"
তথ্য মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন বিজ্ঞাপনটি প্রচার করে।
এটি মূলত সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে একটি উন্নয়ন মূলক বিজ্ঞাপন।
যেখানে বলা হয়েছে যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে এরইমধ্যে আড়াই লাখ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আরও এক লাখ পরিবারের পুনর্বাসনের কার্যক্রম চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া:
বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু নিয়ে এরইমধ্যে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
অনেকে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করতেও বাদ রাখেননি।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিজস্ব ফেসবুক পেইজে গিয়ে দেখা যায় ভিডিওটি গত বৃহস্পতিবার আপলোড করা হয়েছে।
এবং এরইমধ্যে এর ভিউয়ার সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছে। শেয়ার হয়েছে সাত হাজার বার। এছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে এই বিজ্ঞাপনটি নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকেও আপলোড করেছেন।
এছাড়া কমেন্ট পড়েছে এক হাজারেরও বেশি। তবে বেশিরভাগ কমেন্টেই এই বিজ্ঞাপনের দাবির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন ইউজাররা।
এ ব্যাপারে রাফিউল ইসলাম তার কমেন্টে বলেন "বাংলাদেশে ফকির মিসকিন নাই তাহলে কুরবানির চামড়ার টাকা দিলাম কাকে? ফকির মিসকিনের অংশটা নিলো কারা?"
মারলিন নামে এক ইউজার বলেন, "নাই তো একেবারেই নাই, তাই তো ইফতারি নিতে গিয়ে চাপা পড়ে মরে, মাংস নিতে লাইন দিয়ে মারামারি করে মরে।"
তাহমিদুল ইসলাম লিখেছেন, "আজকে মসজিদের সামনে যাদের দেখলাম. তারা কারা? আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ভিক্ষা করতে আসছে?"
মোহাম্মদ মুন্না এমএন প্রশ্ন তুলেছেন এসব প্রকল্প পরিচালনার ওপর।
তিনি বলেন, "তথ্য মন্ত্রণালয় এটা কেমন ভিডিও তৈরি করলো, যার কোন সার্থকতা নেই। সরকার ফকির মিসকিন দূর করার জন্য কাজের প্রকল্প হাতে নিলেও তা সঠিকভাবে পরিচালিত হয়না বলে এখনও হাজার হাজার ফকির মিসকিন আছে।"
এছাড়া অনেককেই ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করতে দেখা যায়, তাদের একজন হলেন, মোরশেদ আলম।
তিনি জানান, "সাইকেল চালাচ্ছিলাম, ভিডিওটা দেখে খাদে পড়ে গেলাম। উদ্ধারকারীরা আমাকে উদ্ধার করতে এসে ভিডিওটা দেখল। তারাও হাসতে হাসতে খাদে পড়ে গেল।"
সাইদুল ইসলাম নীরব লিখেছেন, "ভিডিওটা দেখে আমি বেহুশ হয়ে ছিলাম দুই ঘণ্টা। পরে অনেক কষ্টে কাঁপা কাঁপা হাতে একটি হাহা বিয়্যাক্ট দিলাম। এখন আমি আগের চাইতে অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।"
আশিকুর রহমান ইমনের লেখা কমেন্টটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, "বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় বিটিভিকে আবারও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। অনেকদিন পর আমার মনেহল আমি আবার ছোটবেলার আলিফ লায়লা দেখছি। ধন্যবাদ।"
দেশে ফকির মিসকিন নেই এই দাবির পক্ষে দ্বিমত পোষণ করলেও দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য শুভকামনা জানাতে দেখা যায় কয়েকজনকে। তাদেরই একজন, মানজুর ই খোদা।
তার ইংরেজিতে লেখা কমেন্টটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, "ইনশাল্লাহ খুব শিগগিরই এমন একটা সময় আসবে যেদিন আমাদের দেশ ফকির মিসকিনমুক্ত হবে। তবে দুর্ভাগ্যবশত আমার দেশে এখনও অনেক ফকির রয়েছে। যেকোনো জুম্মার দিন ঢাকার যেকোনো মসজিদের সামনে মানুষ প্রতিদিন এমন অনেককে দেখতে পান। আশা করি সরকার তাদের সবার পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। দারিদ্র দূরীকরণে সরকার যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এজন্য তাদের শুভকামনা।"
এই কমেন্টের জবাবে এহসানুর রহমান জনগণের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
তিনি লিখেছেন, "আমি আপনার সঙ্গে একমত। বাংলাদেশের বয়স ৪৭ বছর। এখন দেশের মানুষকে সুযোগ সুবিধা দেয়ার সময় এসেছে। স্বাধীনতার পর পর ১৯৮০ সালে সরকারের উচিত ছিল স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বেশি বেশি বিনিয়োগ করা। এখন সময় এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। হ্যাঁ, এটা আমাদের দেশ, জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে এবং সরকারকে সাহায্য করতে আমাদের সবার চেষ্টা করতে হবে।"
তবে বিজ্ঞাপনটির দাবির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন। তাদেরই একজন জুলফিকার হাসান পিয়াস।
তিনি বলেন, "দেশের অর্থনীতি কতোটা এগিয়ে গেছে তা অর্থনীতি বোঝেন বা অর্থনীতি বিষয়ে সামান্য জ্ঞান আছে অথবা নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা চিন্তা থেকে যেকোনো সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে পারেন। অথচ আমাদের দ্বিধাবিভক্ত সমাজ সেখানেও খুঁজে পেয়েছে হাসির খোরাক। দু:জনক ছাড়া আর কিছুই নয়।"
এই বিজ্ঞাপনের প্রচার ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশের টেলিভিশনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুনুর রশিদ জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনটি প্রচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এর পরিকল্পনার বিষয়ে তাদের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।
বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু বাস্তবতাকে সমর্থন করে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে এবিষয়ে তারা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
সূত্র- বিবিসি

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ট্রাম্প!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রীতিমতো ঝড় বইছে। আর তাতে লণ্ডভণ্ড হয়েছেন ট্রাম্প। বেরিয়ে এসেছে একের পর এক স্পর্শকাতর সব তথ্য। অপ্রত্যাশিত এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যেন রীতিমতো হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। এবার স্বয়ং ডনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের ‘অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন হোয়াইট হাউসেরই এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
ওই কর্মকর্তা বুধবার নিউ ইয়র্ক টাইমসে বেনামে একটি উপ-সম্পাদকীয় লেখেন। ‘আমি প্রতিরোধের অংশ’ শীর্ষক ওই উপ-সম্পাদকীয়তে তিনি লেখেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে কিছু কর্মকর্তা তার এজেন্ডা ও তার সবচেয়ে খারাপ প্রবণতাগুলো ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য কাজ করছেন। কিন্তু ট্রাম্প এ বিষয়টি উপলব্ধি করেন না। লেখক নিজেকেও এসব কর্মকর্তার একজন বলে দাবি করেন।
ইকোনমিস্টের খবরে বলা হয়েছে, উপ-সম্পাদকীয়তে একটি বিপর্যস্ত মার্কিন প্রশাসনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেখানে সব সমস্যার মূলে হলো প্রেসিডেন্টের নীতিহীনতা। তার সঙ্গে যারা কাজ করেন, তারা জানেন যে, তিনি এমন কোনো নীতিতে স্থির থাকেন না, যার আলোকে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মিনিটের ব্যবধানেই যে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত বদলে ফেলবেন না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেন আর এ ধরনের অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত না নিতে পারেন সে বিষয়ে হোয়াইট হাউসের  ভেতরেই অনেক কর্মকর্তা কাজ করছেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এ উপ-সম্পাদকীয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনার ঝড় বইছে। সিনেটর ডিক ডারবিন ওই উপ-সম্পাদকীয় নিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড নিয়ে যে সব তথ্য দেয়া হয়েছে, আমার কাছে সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। বিশ্বাস করুন, তার মেজাজ হারানো অবস্থায় আপনারা তার আশেপাশে থাকতে চাইবেন না। যখন তিনি দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যান, তখন সম্ভবত ঈশ্বরই রক্ষা করেন। এদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প  লেখককে ভীতু আখ্যা দিয়েছেন। তিনি লেখার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। উপ-সম্পাদকীয়র লেখক হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘রানিং মেট’ ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের দিকে। তবে ওই উপ-সম্পাদকীয়র সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন পেন্স।
বিখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড তার ‘ফেয়ার ইন’ বইয়ে হোয়াইট হাউসের ভেতরের খবর প্রকাশ করার পরের দিনই নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিস্ফোরক উপ-সম্পাদকীয়, দু’দিন ধরে ট্রাম্পের ওপর যেন ঝড় বয়ে চলেছে। টুইটার-প্রিয় এই প্রেসিডেন্ট সাধারণত দাম্ভিকতা ও নিজের কৃতিত্ব প্রকাশ করার জন্য টুইট করেন। সেই তিনিই গতকাল টুইট করলেন মাত্র এক শব্দে।  লিখেছেন- ‘বিশ্বাসঘাতকতা?’। এমন পরিস্থিতি যে তৈরি হতে পারে তা যেন তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না।

ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে দিল্লির বার্তা: বাংলাদেশের আতঙ্কের কিছু নেই

ব্রহ্মপুত্র নদের পানি দ্রুত ফুঁসে উঠতে পারে বলে বাংলাদেশকে সতর্ক করে ফ্যাক্স বার্তা পাঠিয়েছে ভারত। ওই ফ্যাক্স বার্তার ভিত্তিতে গতকাল বিকাল সাড়ে চারটায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ারের সভাপতিত্বে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদের তিন পয়েন্টে পানির উচ্চতা এখন কমতির দিকে।
চীনে অতি বৃষ্টির কারণে জমে যাওয়া পানি ছেড়ে দিলেও এর চাপ এক হাজার কিলোমিটার দূরে থাকবে। তাই ওই পানি নিয়ে বাংলাদেশের আতঙ্কের কিছু নেই। এদিকে অতি বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্রের উজানের নদী তাস্যাংপোর পানি স্তর ৫০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। ড্যামে জমা হওয়া ওই অতিরিক্ত পানি ভাটিতে ছেড়ে দেয়ায় বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চীনের তরফে বিপজ্জনক স্তরে থাকা ওই পানি ভাটিতে ছাড়ার বিষয়ে দিল্লিকে সতর্ক করেছে বেইজিং। ওই সতর্কবার্তা পাওয়ার পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ব্রহ্মপুত্র অববাহিকতায় থাকা অরুণাচল ও আসাম রাজ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে। দিল্লির তরফে ঢাকাকেও সতর্কবার্তাটি শেয়ার করা হয়েছে। এ নিয়ে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের পলিটিক্যাল কাউন্সেলর জামাল উদ্দিন আহমেদ একটি জরুরি ফ্যাক্স বার্তা পাঠিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগে।
যার একটি কপি পেয়েছে মানবজমিন। দিল্লি মিশনের ফ্যাক্স বার্তার বরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গতকাল বলেন, তিব্বতে অতি বৃষ্টির কারণে তাস্যাংপো নদীর পানি স্তর রেকর্ড ভেঙেছে। জমে যাওয়া পানি ব্রহ্মপুত্রে ছেড়ে দিয়েছে চীন। যার ফলে ভাটির দেশগুলোতে এর প্রভাব পড়বে। ইতিমধ্যে ভারতের অরুণাচল ও আসাম প্রদেশকে উচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বলা হয়েছে। ভারতের এই দুই প্রদেশে বন্যা হলে এর পানি বাংলাদেশে আসার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে অহেতুক আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারাও তা-ই বলছেন। তাদের মতে, ভারত হয়ে চীনের যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশে পৌঁছাবে তাতে খুব বেশি এলাকা আক্রান্ত হবে না বা সেটি ভয়াবহ হবে না।
এমন বন্যা পরিস্থিতি সামলে ওঠার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে বলেও দাবি কর্মকর্তাদের। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পানিসম্পদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়লে কি কি করা যেতে পারে ওই প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এ বৈঠকে আবহাওয়া অধিদপ্তর, স্পারসো, পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্পারসো প্রতিনিধি জানান, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমতির দিকে। তাই চীন পানি ছাড়লেও তা ডেঞ্জার লেভেলে যাবে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিনিধি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অতি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অতি বৃষ্টি হলেও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি খুব বেশি বাড়বে না। সভায় পানিসম্পদ সচিব ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি সম্পর্কে চীনের কাছ থেকে সরাসরি তথ্য যোগাড় করার তাগিদ দেন।

সেক্স ডলের পতিতালয়, খদ্দরের ঢল

ডিজিটাল যুগে বিশ্ব জুড়ে রোবটের চাহিদা বাড়ছে। যন্ত্র নির্ভরতা এতটাই বেড়েছে, যে বিপরীত বা সমলিঙ্গের মানুষ নয়, যৌনসঙ্গী হিসেবে রোবটই পছন্দ অনেকেরই। দৈনন্দিন কাজকর্মের গণ্ডি পেরিয়ে এখন যৌন চাহিদা মেটাচ্ছে এই যান্ত্রিক-মানবী। যৌনতার চেনা নিয়মের বাইরে নতুন কিছু পাওয়ার অভীপ্সা আরও চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে এই সেক্স ডলগুলির। আর এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়েই প্রথম সেক্স-ডল পতিতালয় তৈরি করে ফেললেন ইতালির এক ব্যবসায়ী। উত্তর-পশ্চিম ইতালির এক গোপন জায়গায় খোলা হয়েছে এটি। মালিকরা জানাচ্ছেন, খদ্দেরদের বুকিংয়ে রীতিমতো বান ডেকেছে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিদিনে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে-ইতালিতে এমনিতে পতিতালয় তৈরি নিষিদ্ধ। কোনও মানব-মানবীকে যৌন ব্যবসার কাজে লাগানো আইনত দণ্ডনীয়। তাই এই সেক্স ডলের চাহিদা সে দেশে চরমে। আপাতত সিলিকনের তৈরি আটটি মডেল সেক্স ডল নিয়ে শুরু হয়েছে এই পতিতালয়। সাতটি মহিলা এবং একটি পুরুষ মডেল রয়েছে সেখানে। বুকিংয়ের চাহিদা যত বাড়ছে তত বাড়ছে রেটও। আধ ঘণ্টার জন্য গ্রাহকদের গুণতে হচ্ছে ৮০ ইউরো। রাতে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা পর্যন্ত বুক করা যায় এই যন্ত্র মানবীদের। বেশ্যালয়টির ব্যক্তিগত ঘরে মুড লাইট লাগানো। তাতে রয়েছে বিছানা, বাথরুম আর পর্ন ছবি দেখার জন্য টিভি। পুতুলকে পছন্দ করা ছাড়াও তারা কে কেমন পোশাকে থাকবে তাও ঠিক করে দেন খদ্দরেরা। এই পতিতালয়ে পুতুলগুলির চাহিদা এত বেশি যে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বুক হয়ে গিয়েছে ২ দিনের জন্য। যৌন ফ্যান্টাসি পূরণের সবরকম উপকরণ মজুত এই সেক্স ডলগুলির মধ্যে। অথচ মানুষ হলে বহুরকমের ঝুটঝামেলা পোহাতে হয়, তার বালাই নেই। সুতরাং কে আর সেধে চাপ নিতে চায়! বরং চাপমুক্তিতে ইতালীয়রা একান্ত মুহূর্তে কাছে টেনে নিচ্ছে এই সেক্সি রোবটদেরই। এতে অবশ্য কিছুটা আপত্তি আছে ইতালির যৌনকর্মীদের। কারণ প্রকাশ্যে না হলেও আড়ালে আবডালে যাও বা ব্যবসা চলছিল, এই সেক্স ডলের পতিতালয় চালু হওয়ার পর তাও বন্ধ হওয়ার মুখে।

রোহিঙ্গা নিয়ে তদন্ত করার এখতিয়ার আছে: আইসিসি

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট মানবতা-বিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করার কর্তৃত্ব আদালতের রয়েছে। নেদারল্যান্ডস-এর দ্য হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রি-ট্রায়াল চেম্বার তাদের এ রায় দিয়েছে। তিন সদস্য বিশিষ্ট প্রি-ট্রায়াল চেম্বারের তিনজন বিচারকের মধ্যে দুইজন একমত পোষণ করলেও একজন ভিন্নমত দেখিয়েছেন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌশলী আদালতের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে রোহিঙ্গাদের যেভাবে মিয়ানমার থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে সেটির তদন্ত করার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রয়েছে কিনা। সে প্রেক্ষাপটে আইসিসি'র প্রি-ট্রায়াল চেম্বার রায় দিয়েছে যে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতের সদস্য না হলেও রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের কারণে ঘটনার একটি অংশ বাংলাদেশে সংগঠিত হয়েছে। ফলে আইসিসি মনে করেছে রোম সনদ অনুযায়ী ঘটনার তদন্ত করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। এ রায়ের ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌসুলি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে আদালত জানিয়েছে যে এ ধরণের তদন্ত একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।
আইসিসি'র উদ্যোগ এবং ঘটনাক্রম
. এপ্রিল মাসে আইসিসির প্রধান কৌসুলি আদালতের কাছে রোহিঙ্গাদের উপর মানবতা-বিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তের অনুমতি চেয়েছিলেন।
. মে মাসের প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে আইসিসি বাংলাদেশের মতামত জানতে চেয়েছে। এবং ১১ জুনের মধ্যে বাংলাদেশের জবাব চাওয়া হয়েছে।
. জুন মাসে আইসিসি মিয়ানমারের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছে এবং ২৭ জুলাই-এর মধ্যে জবাব দিতে বলেছে।
. ৯ অগাস্ট মিয়ানমারের তরফ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের উদ্যোগ এখতিয়ার বহির্ভূত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় আসার ১১দিন আগে জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগের দায়ে মিয়ানমারের সেনা প্রধানসহ শীর্ষ ছয়জন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত এবং বিচার হওয়া দরকার। এছাড়া, ঘটনা বিচারের জন্য বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর আহবান জানানো হয়েছে জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনে।
২০১৭ সালের অগাস্টে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরুর পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ফেলে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
নতুন এবং পুরাতন মিলিয়ে ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন প্রায় ১০ লাখের বেশি। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, লুটপাট, অপহরণ আর ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

বিকল্প ছাড়া লেগুনা বন্ধে দুর্ভোগ

রাজধানীতে হঠাৎ করে লেগুনা বন্ধ করার ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন এলাকার যাত্রীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে পারছেন না তারা। বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা চালু না করে লেগুনা বন্ধের সিদ্ধান্তে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।
যেসব সড়কে গণপরিবহন চলে না সেসব সড়কে কেন লেগুনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সেই জিজ্ঞাসা ভুক্তভোগীদের। লেগুনা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে অনেকে। তারা বলছেন, এসব অবৈধ যানবাহন বন্ধ করা ঠিকই হয়েছে। একদিকে এদের বৈধতা নেই, তার পরেও এসব গাড়ির ড্রাইভারদের বেশির ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্ক। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর অভ্যন্তরের প্রধান সড়কে লেগুনা চলেনি। বিভিন্ন পয়েন্টে লেগুনা যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে।
তবে রাজধানী পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন রুটে লেগুনা চলছে। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর। এখান থেকে স্বল্প ও দীর্ঘ দূরত্বের একাধিক রুটে লেগুনা চলাচল করে। এই এলাকার যেসব রুটে বাস চলে সেসব রুটে যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়নি। ভোগান্তিতে পড়েছেন গণপরিবহনবিহীন রুটের লেগুনা যাত্রীরা। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর থেকে লেগুনা চলে মহাখালী, মোহাম্মদপুর, ঝিগাতলা, রূপনগর, গাবতলী, আমিনবাজার, সাভার, দিয়াবাড়ী রুটে। এরমধ্যে শুধু বেড়িবাঁধ হয়ে বিরুলিয়া-সাভার রুটের লেগুনা চলছে। অন্যসব রুটের লেগুনা বন্ধ রয়েছে।
মিরপুর-১ নম্বর থেকে ঝিগাতলা রুটে নিয়মিত চলাচল করেন মো. আল-আমিন। তিনি বলেন, আমার ইউনিভার্সিটি ধানমন্ডিতে। ওই রুটে কোনো বাস চলে না। নিয়মিত লেগুনায় আসা যাওয়া করি। গতকাল থেকে খুব সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এখান থেকে মোহাম্মদপুর বাসে যাই, তারপরে আরেক বাসে যাই ধানমন্ডিতে। তিনি বলেন, সরকার আগে লেগুনার বিকল্প পরিবহন এ রুটে দিয়ে লেগুনা বন্ধ করে দিক। তার আগে যেন আমাদের কথা চিন্তা করে লেগুনা চলতে দেয়।
কামরুন্নাহার নামের এক সরকারি চাকরিজীবী বলেন, আমি মিরপুর-১ নম্বর থেকে প্রতিদিন মহাখালী রুটের লেগুনায় যাতায়াত করতাম। লেগুনা থেকে পাসপোর্ট অফিসের পাশে নামতাম। কিন্তু গত দুদিন খুব কষ্ট হচ্ছে। এই রুটে কোনো বাস নেই। আগে বাস চালু হোক, তারপরে যেন লেগুনা বন্ধ করে।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন আসগর নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার জন্য এই লেগুনা দায়ী। ওদের কোনো লাইসেন্স নেই। ছোট ছোট বাচ্চারা স্টিয়ারিংয়ে বসে। এগুলো বন্ধ করে সরকার ভালো করেছে। তবে এখন এসব রুটে পর্যাপ্ত গণপরিবহন দিতে হবে।
মিরপুর মাজার রোড থেকে বিরুলিয়া-সাভার রুটের লেগুনা গতকালও চলছে। এ রুটের লেগুনাচালক মহসিন বলেন, আমাদের লাইনম্যান বলছেন আমাদের লেগুনা বন্ধ না করতে। আমাদের রুটে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এজন্য লেগুনা বন্ধ করিনি। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের মতো অন্যসব এলাকার অধিকাংশ রুটেই লেগুনা বন্ধ রয়েছে। ফার্মগেট থেকে ধানমন্ডি, ৬০ ফিট, মোহাম্মদপুর সড়কে লেগুনা চলছে না। এছাড়া মোহাম্মদপুর-গুলশান, ফার্মগেট-নিউ মার্কেট, মহাখালী-মিরপুর-২ নম্বর, মগবাজার-মহাখালী এসব রুটের লেগুনা বন্ধ ছিল। তবে নিউ মার্কেট থেকে গুলিস্তান, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর রুটের লেগুনা মাঝেমধ্যে চলাচল করছে। একইভাবে গাবতলী থেকে মিরপুর-১৪ নম্বর রুটে চলাচলকারী লেগুনা চলতে দেখা গেছে। চালকদের দাবি, এগুলো হিউম্যান হলার নয়, মিনিবাস। চালকের এক সহকারী বলেন, আমরা ম্যানেজ করে চলছি। প্রথম পুলিশ বাধা দিয়েছিল পরে লাইনম্যান ঠিক করে ফেলছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে ধানমন্ডি ১৫ নম্বর বাসস্টান্ডে ফার্মগেট যাওয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন সোহরাব হোসেন। মিনিট বিশেক দাঁড়িয়ে থাকার পরও ফার্মগেটগামী কোনো লেগুনা দেখতে না পেয়ে হাঁটা শুরু করে জিগাতলার দিকে। সেখানে গিয়েও দেখেন একই পরিস্থিতি। ফার্মগেটগামী ঢাকা ইন্দিরা পরিবহনের কোনো লেগুনায় পাননি তিনি। জিগাতলা থেকে মিরপুর-১ নম্বরগামী লেগুনাও ছাড়েনি। কিন্তু আটি বাজার থেকে ছেড়ে আসা নিউ মার্কেটগামী লেগুনা চলাচল করছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে সোহরাব বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে লেগুনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ভালো কথা। কিন্তু সব রুটে লেগুনা বন্ধ হয়নি কেন? সোহরাবের মতোই ফার্মগেটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লেগুনা খুঁজছিলেন আরও অনেকে।
মিরপুর লিংক কোম্পানির একজন লেগুনাচালক বলেন, পুলিশে ঝামেলা করছে। কিন্তু কী করবো বলেন। আমাদেরও তো পরিবার আছে। তাদের পেটের ক্ষুধা মেটাতেই, অলিগলি দিয়ে রিস্ক নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। তবে দুই-একদিনের বেশি আর লেগুনা চালানো সম্ভব হবে না বলেও জানান তিনি।  নিউ মার্কেট নীলক্ষেত থেকে প্রতিদিন ফার্মগেটের মধ্যে যাতায়াত করা লেগুনা বন্ধ রয়েছে। তাই এ সড়কে যাতায়াতকারীদের রিকশায় গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি টাকা খরচের পাশাপাশি সময় খরচ হচ্ছে কয়েক গুণ। তবে একই স্থান থেকে ছেড়ে যাওয়া নীলক্ষেত থেকে বিজিবি গেট, হাজারীবাগ, টালি অফিসের লেগুনা ঠিকঠাক চলাচল করছে। এদিকে নীলক্ষেত থেকে বাবুবাজার, চকবাজার, গুলিস্থান, চানখাঁরপুলে লেগুনা চলাচল করেছে।
নীলক্ষেত-ফার্মগেট রুটে চলাচলকারী বেসরকাররি চাকরিজীবী লিজা আক্তার বলেন, দুই বছর যাবৎ চাকরির জন্য নিয়মিতই নীলক্ষেত থেকে লেগুনায় চেপে ফার্মগেটে যাওয়া-আসা করতে হয় তার। এত কষ্টের পাশাপাশি সময়ও বাঁচে তার। কিন্তু লেগুনা বন্ধ হওয়াই বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছেন তিনি। লিজা বলেন, নিউ মার্কেট, গ্রিন রোড পার হলেই ফার্মগেট। রাস্তা বেশি না। তাই লেগুনাই যাতায়াত করতাম আমি। লেগুনা বন্ধ করে দিয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা তারা করেনি।
মঙ্গলবার মাসব্যাপী ট্রাফিক সচেতনতা কার্যক্রম উদ্বোধন করে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ঘোষণা দেন রাজধানীর প্রধান সড়কে কোনো লেগুনা, হিউম্যান হলার চলতে পারবে না। এর পরপরই বন্ধ করে দেয়া হয় এসব অবৈধ যানবাহন। রাজধানীর প্রধান সড়কে এ ধরনের যানবাহন চলাচলের অনুমতিও নেই।

৮০ হাজার আসামি: আরো হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার by দীন ইসলাম ও কাফি কামাল

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। বিরোধীপক্ষের জোরালো কোনো কর্মসূচি না থাকলেও সারা দেশে চলছে ধরপাকড়। ঈদুল আজহার কয়েক দিন আগে থেকে এ পর্যন্ত শুধু বিএনপি ও অঙ্গ দলের দেড় হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দলটির দাবি। এই সময়ে নতুন করে ১২ শতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে।
এতে আসামি করা হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের জামিনও মিলছে না সহজে। জামিন পেলেও কারাফটক থেকে শ্যোন এরেস্ট দেখানো হচ্ছে। পুরনো মামলাগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে। অসমর্থিত সূত্রের দাবি, নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সক্রিয় নেতাকর্মীদেরও তালিকা হচ্ছে। ধরপাকড় ও পুলিশের অভিযানের কারণে অনেক নেতাকর্মী বাসায় থাকছেন না।
কঠোর অবস্থানে সরকার: ভবিষ্যৎ নির্বাচন ‘অনুকূলে’ রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপিসহ সরকারের বিরুদ্ধে থাকা দলগুলোর নেতাদের নামে দায়ের করা পুরনো মামলা সচল করার ওপর বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিরোধী নেতাদের নামে দায়ের করা মামলার গতি-প্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সারা দেশে অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গত ১লা সেপ্টেম্বর বিএনপি’র জনসভা শেষ হওয়ার পর রাজধানীসহ থানায় থানায় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীদের টার্গেট করেই এসব ঘটনাহীন মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। বিস্ফোরক দ্রব্য ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা এসব মামলায় এখন চলছে গ্রেপ্তার। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো এজন্য অভিযান পরিচালনা করছে।
গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের জামিন বাতিল হতে পারে- এমন খবর চাউর হয়েছে ক’দিন আগেই। জননিরাপত্তা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ প্রশাসনে শেষ মুহূর্তের গোছানোর কাজ চলছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালের মতো বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ঢাকার উপ-কমিশনার পদে সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এদিকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা তাদের নিজেদের এলাকায় পছন্দের ওসি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিতে চান। এ জন্য তারা আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিচ্ছেন। অনেকে ফোনে যোগাযোগ করে তদবির করছেন।
মামলা ও গ্রেপ্তারের হিড়িক: রাজপথে উত্তাপ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি নেই বিরোধী রাজনৈতিক জোটের। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। রাজনীতিতে যখন কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথ উত্তপ্ত করার চেয়ে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির প্রয়াস জোরদার তখন হঠাৎ করেই ধরপাকড় শুরু হয়েছে সারা দেশে। ঈদুল আজহার পর থেকে প্রতিরাতেই জেলায় জেলায় বিরোধী নেতাকর্মীদের বাসা-বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
প্রতিদিনই বিএনপি ও ২০দলীয় জোটের শরিক জামায়াতের শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মামলা দায়ের করা হচ্ছে শত শত অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে। সারা দেশে হিড়িক চলছে মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের। বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাকর্মীদের বাসায় না পেলে তাদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন অভিযোগও আসছে।
পরিবারের লোকজনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সংগ্রহ করা হচ্ছে নেতাকর্মীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নম্বর। কোনো কোনো এলাকায় নেতাদের আত্মীয়স্বজনের ঠিকানাও জোগাড় করছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা কারাগারে রয়েছেন তাদের জামিন মিলছে না সহজে। যারা মুক্ত রয়েছেন তাদের জামিনের মেয়াদ না বাড়িয়ে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামের সদস্য থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতা এসব তথ্য জানিয়েছেন। বিএনপি নেতারা জানান, ঈদের পর নানা জেলায় টুকটাক ধরপাকড় শুরু হয়েছিল। কিন্তু ১লা সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিশাল জনসভা করার পর থেকে বেড়ে গেছে ধরপাকড়। গত চারদিনে ধরপাকড়ের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে।
প্রতিদিন রাতেই পোশাকধারী ও সাদা পোশাকধারীরা নেতাদের বাসা-বাড়িতে হানা দিচ্ছে। নেতাকর্মীদের না পেয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে করা হচ্ছে দুর্ব্যবহার। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গিন হয়ে উঠেছে যে, ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা বাড়িছাড়া হয়ে পড়েছেন। বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জানান, ঈদের পর থেকে প্রতিদিনই সারা দেশে বিএনপি ও অঙ্গদলের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ।
নেতাকর্মীদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ ও বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা কারাগারে রয়েছেন তাদের জামিন দেয়া হচ্ছে না। যারা জামিনে মুক্ত রয়েছেন তারা পরবর্তী দিনে আদালতে গেলেই নতুন মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখানো হচ্ছে।
বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন- ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম ৫ দিনে সারা দেশে বিএনপি ও অঙ্গদলের দেড় হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নতুন করে দায়ের হয়েছে প্রায় ১২ শতাধিক মামলা। এসব মামলায় ১১ হাজারের বেশি বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার।
রুহুল কবির রিজভী জানান, মধ্যযুগে ইউরোপের ডাইনি শিকারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপিসহ বিরোধী দল শিকারের অভিযান চালাচ্ছে। ঘটনা না ঘটলেও বিভিন্ন থানায় অগ্রিম মামলা দায়ের করে হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করছে পুলিশ। সারা দেশে চলছে মামলার ছড়াছড়ি, গ্রেপ্তার ও আসামি করার হিড়িক। বিদেশে অবস্থানরত বা পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরবে অবস্থানকারী নেতাদের নামও যুক্ত করা হচ্ছে আসামির তালিকায়।
সারা দেশে কয়েকদিনের মামলা ও গ্রেপ্তারের চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, রাজধানীর রূপনগরে বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক ও বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হকের নিজ বাড়িতে এলাকার মুরব্বিদের নিয়ে আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে হানা দিয়ে পুলিশ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে।
পরে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে একটি নতুন মামলা করে আদালতে পাঠিয়ে একদিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ১১৮ জন, সুনামগঞ্জে ৩২ জন, কুষ্টিয়ায় বিএনপি ও জামায়াতের মিলিয়ে ৫৮ জন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নেত্রকোনা জেলায় ১লা সেপ্টেম্বরের পর থেকে ৩২০০ জনের নাম উল্লেখসহ অসংখ্য অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দিয়েছে পুলিশ। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ১০০ জনকে।
এছাড়া মেহেরপুর জেলা বিএনপি ও অঙ্গদলের ৬৫ জন নেতাকর্মী, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা ছাত্রদলের ৯ নেতাকর্মী, নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলাম সজীবসহ ছাত্রদলের ১৪ জন নেতাকর্মী, নাটোরের বড়াইগ্রাম পৌর বিএনপি সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মজিদ সরকার, বড়াইগ্রাম উপজেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক সরকার, ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদত হোসেন শামীমসহ ১৪ জন নেতাকর্মী, কুষ্টিয়ার মিরপুরে ৬ জন, পিরোজপুরে ১০ জন, নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা বিএনপির ১৩ জন নেতাকর্মী, বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব খান, বরিশালের গৌরনদী উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি জাকির হোসেন রাজাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এছাড়া সারা দেশে অন্তত কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি জানান, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, যুববিষয়ক সহ-সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, ডিসিসির সাবেক কমিশনার মীর আশরাফ আলী আজম, ইঞ্জিনিয়ার এসএম আবদুল আজিজ ও মোশাররফ হোসেন খোকনসহ ৩৬ জন নেতাকর্মীর নামে গত ৩রা সেপ্টেম্বর বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করেছে লালবাগ থানা পুলিশ।
রাজধানীর সূত্রাপুরে বিএনপির ২০ জনের নামে গতকাল ২টি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে পুলিশ দায়ের করেছে নতুন ১০টি মামলা। নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ২৭ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রহমত আলী রব্বানসহ ২৭ জন, বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেলসহ ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বগুড়া সদর থানায় বিস্ফোরক আইনে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করে পুলিশ।
ঝিনাহদহের শৈলকুপা উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শত শত নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলায় আসামি করা হচ্ছে। পুলিশ খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ৩০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার ও ৩০০ জনের বেশির নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করেছে। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজাসহ ১৬ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে ৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
তিনি জানান, বিএনপির সহ-বন ও পরিবেশ সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপুকে গ্রেপ্তারের জন্য তার বাসায় বারবার তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। স্বাস্থ্য বিষয়ক সহ-সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলামের সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় গিয়ে তাকে না পেয়ে পরিবারের লোকজনদের কাছে তার জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট চায়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর জানায়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পরদিন রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানায় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার ও জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামানসহ ৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে পুলিশ নাশকতার অভিযোগে মামলা করে। একই দিন বগুড়ার শাজাহানপুরে উপজেলা বিএনপির কার্যালয় থেকে বিস্ফোরক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার ও এ ঘটনায় ৩০ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে মামলা করে পুলিশ।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থানা বিএনপি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল করার পর পুলিশ ৩৫ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ এনে মামলা করে। কিন্তু বিএনপি নেতারা জানান, মিলাদটি পুলিশের উপস্থিতিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর জানায়, ঈদের পর থেকে সংগঠনের একজন সহ-সভাপতিসহ অন্তত ২৫০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
প্রতিদিনই ৪০-৫০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিএনপির সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও গ্রেপ্তারের জন্য তালিকা তৈরির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিএনপি ও অঙ্গদলের কর্মীদের মধ্যে যারা অনলাইনে সক্রিয় তাদের বিষয়েই প্রশাসনের তরফে বেশি খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করলেও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ছায়া, হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, বিএনপি’কে দমন by পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী

আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশে নির্বাচনী ডামাডোল বাজতে শুরু করবে। ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এইচ এম এরশাদের উৎখাতের পর থেকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর রীতিতে পরিণত হয়েছে। ২০০৭-২০০৮ সময়ে সেনা-সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকার ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনের ব্যতিক্রম। ২০১৪ সাল ছাড়া বাংলাদেশ কখনো ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরতে ভোট দেয়নি। সেবার বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ (এএল) ওয়াক-ওভার পেয়ে যায়। চলতি বছরের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই আবারো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পদক্ষেপকে নির্বাচনী-প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং এর মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের নীলনক্সা হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিক্ষোভ করেছিল। এর জের ধরে বিএনপি সরকার সংবিধানে বিধিটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেনা-সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার আয়োজিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাটি বাতিল করে।
সামরিক স্বৈরাচার আমলে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের সংবিধানে থাকা স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্যুলার মূলনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বাংলাদেশী সমাজে ইসলামিকরণ উৎসাহিত করা হয় সামরিক স্বৈরাচারদের আমলে, যারা ছিলেন পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের শাসনকাজের মডেল পাকিস্তানি অভিজ্ঞতা থেকে গ্রহণ করা হয়, ইসলামি দলগুলোর সাথে জোট গঠন করে। এসব দলের নেতারা পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিলেন।
সরকারি চাকরির কোটার মতো ঘরোয়া ইস্যু এবং ঢাকার অবাধ্য ও বিশৃঙ্খল যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা আন্দোলন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন ইস্যুতে হাসিনার সরকারের ছন্দপতন ঘটেছে, যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ঢাকার অবাধ্য যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। এসব চালক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। দুই ছাত্রের মৃত্যুর ফলে দেশব্যাপী ছাত্রদের ক্রোধ উষ্কে দেয়া ও এই ইস্যুতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নস্যাতের অভিযোগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার ছিল বেপরোয়া সিদ্ধান্ত। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে। কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করেননি।
হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতি। নির্বাচনী প্রচারণায় এসব ইস্যু ও ভারত ফ্যাক্টর প্রাধান্য পাবে। রাজনৈতিক বিরোধীদের অব্যাহতভাবে হয়রানি করার ফলে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নীরব ক্ষোভ বেড়েই চলেছে এবং ব্যাপকভাবে এই ধারণার সৃষ্টি করেছে যে আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে। ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। অনেক সমালোচক বিশ্বাস করেন, হাসিনা সরকার নির্বাচন ‘ম্যানেজ’ করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় একে বলা হয় ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’।
সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন যে প্রতিটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে আপস করে সেগুলো দলের প্রতি সহানুভূতিশীলদের দিয়ে বোঝাই করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি ‘গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবেশিত হয় বলে মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন। এতে অনেক নিরপরাধ মারা যায়। হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এক প্রধান বিচারপতি সরকারের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে ও বিদেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনসূচক থাকা হিন্দু সংখ্যালঘুরাও ক্ষুব্ধ, কারণ আওয়ামী লীগ নেতারা দায়মুক্তির সাথে হিন্দু সম্পত্তি জবরদখল করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা ছাড়া ভারতের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্য করা হলেও কিছু বলবে না।
ইতিবাচক দিক হলো, জঙ্গি ধর্মীয় চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ ছিল কার্যকর। হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে অর্থনীতিও খুব ভালো করেছে। অবশ্য দুর্নীতি ও যোগসাজশমূলক পুঁজিবাদ অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকে কলুসিত করে ফেলেছে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র চেয়ারম্যান, দু’বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির অভিযোগে জেলে যাওয়ায় দলটি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক জিয়া লন্ডনে প্রবাসী। কয়েকটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না। দেশে ফিরলে তাকে বেশ কয়েক বছর কারাগারে থাকতে হতে পারে। তবে দেয়াল পিঠ ঠেকে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে বিএনপি। এতে করে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ করার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও তা বিএনপির দাবি – ক্ষমতাসীনরা বাদে অন্য যেকেউ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে আসুক – পূরণ করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাব বিপুল ও তাদের একমতে পৌঁছা অসম্ভব। বিরোধীদের সাথে কোনো ধরনের সংলাপে অনীহার কথা বারবার জোর দিয়ে বলছেন হাসিনা।
বিএনপি আসন্ন নির্বাচন বয়কট করার ঝুঁকি গ্রহণ করবে না কারণ এটা করলে তারা নিবন্ধন হারাতে পারে। বিএনপির মিত্র, প্রধান ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীও বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। পাকিস্তানের পঞ্চম বাহিনী হিসেবে পরিচিত দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। দলটির গঠনতন্ত্র সংবিধান-পরিপন্থী হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে সে তার নিবন্ধন হারিয়েছে। শরিয়া আইন জারি ও মুসলিম উম্মাহর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার সাধারণ ইসলামি লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে বিশ্বাস করে জামায়াতে ইসলামী।
তারেক রহমানের সমর্থনপুষ্ট মধ্যপন্থী বিএনপি নেতারা ভারতের সাথে যোগাযোগ করেছেন। ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উৎসাহ দিয়েছেন তারেক। কয়েক দিনের মধ্যেই আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দিবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। তা ঘটলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। হাসিনা যদিও সামরিক বাহিনীর পরিচর্যায় খুবই যত্নবান, এর নেতৃত্ব বাছাই করেন যত্নের সাথে, কিন্তু তবুও সামরিক হস্তক্ষেপের বিপদ সবসময়ই ওঁত পেতে থাকে।
বিএনপির প্রবীণ নেতারা তারেককে অপছন্দ করেন, তারা নেতা হিসেবে খালেদাকেই অগ্রাধিকার দেবেন। বিএনপির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা রয়েছে, এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে ভাঙনের মাধ্যমে নতুন দলের আবির্ভাব ঘটতে পারে। সম্ভাব্য ভাঙনে আওয়ামী লীগের হাত আছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী প্লাটফর্মের মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি। দলটি অভিযোগ করছে, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অবদমিত করে রেখেছে। ভোট জালিয়াতি ও কারচুপির উদ্বেগ প্রশমন করতে হাসিনা ২০১৩ সালে বিএনপির নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিএনপি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে জোর দিয়ে বলেছিল যে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে হাসিনাকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে সরকারের দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে।
এদিকে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যেই যুক্তফ্রন্ট নামে একটি নতুন গ্রুপের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন গণফোরামের ড. কামাল হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী। তারেক রহমানের সাথে মতবিরোধের পর বি চৌধুরী বিএনপি ত্যাগ করেন, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরে তিনি রাজনৈতিক দল ‘বিকল্প ধারা’ গঠন করেন। ড. কামাল ছিলেন আওয়ামী লীগে, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনিও হাসিনার সাথে বিরোধে জড়িয়ে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেছিলেন। আরো কয়েকটি ছোট দলও যুক্তফ্রন্টে যোগ দিতে পারে। বিএনপি একে স্বাগত জানিয়েছে। তারা যে আসন্ন নির্বাচনের সময় একটি জোট গঠনের আশা করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রত্যাশা মতোই এই ফ্রন্ট নিয়ে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেছেন হাসিনা।
বাংলাদেশ প্রায় ১৭ কোটি লোক নিয়ে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ এবং ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম প্রতিবেশী। পিপিপি’র বিবেচনায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার জিডিপি নিয়ে দেশটি বৈশ্বিক জিডিপি র‌্যাংকিংয়ে ৩৪তম। বাংলাদেশ গত দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঘনিষ্ঠতম ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সরকারের আমলে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও ধারার ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্ত সফলভাবে দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে থাকা বিরোধগুলোর সমাধান করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি চুক্তি ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টিতে উৎসাগ যুগিয়েছিল। এ দুটি হচ্ছে সমুদ্র সীমা নির্ধারণ চুক্তি এবং স্থল সীমান্ত চুক্তি।
বাংলাদেশ ও ভারতে যথাক্রমে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বিএনপি’র হাসিনাকে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নতজানু দেখানোর সম্ভাবনা থাকায় ভারত ফ্যাক্টর হবে বিপুল। প্রধান সমালোচনা হবে, হাসিনা ভারতকে খুব বেশি ছাড় দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন অতি সামান্য। আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) প্রকাশের ফলে ইস্যুটি ভারতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে উদ্বিগ্ন করবে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এনআরসি থেকে সৃষ্ট অনিবার্য প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। নদীর পানিবণ্টন এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেলেও তা কাটিয়ে ওঠা যাবে না এমন নয়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পূর্ণ বিকশিত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর আরো একীভূতকরণ, সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র আরো আধুনিকায়ন, মটরযান চুক্তি, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ভবিষ্যতে আরো জোরালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন ভারত তার সাথে কাজ করবে। তাই বলে কোন হাসিনা-বিরোধীকে ভারত বিকল্প মনে করছে, এমনকিছু ভাবা হবে কষ্টকর কল্পনা। অবশ্য, হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তার প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয় – ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে।
[লেখক: দিল্লিভিত্তিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিঙগুইশড ফেলো। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ২০০৭-২০০৯ ও ডেপুটি হাই কমিশনার ১৯৯৯-২০০২। লেখাটি সাউথ এশিয়ান মনিটরে প্রকাশিত ]

ইসরাইলকে রক্ষার জন্য ট্রাম্পের 'শতাব্দির সেরা চুক্তি' পরিকল্পনায় যা আছে: পর্ব-এক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তার বিভিন্ন লক্ষ্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য 'শতাব্দীর সেরা চুক্তি' নামক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে তাদের সবাইকে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং এটা ছিল তাদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু কেউই এ সংকটের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। কারণ আমেরিকা সবসময় ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব অবসানে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করলেও কখনই তারা নিরপেক্ষ ছিল না বরং দখলদার ইসরাইল ও তাদের সমস্ত অপরাধী কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন দিয়ে এসেছে। ফিলিস্তিন সংকট নিরসনে আমেরিকা এ পর্যন্ত বহু রকমের পরিকল্পনা উত্থাপন করেছে। কিন্তু এসব পরিকল্পনা ঘুরে ফিরে কেবল ইসরাইলি স্বার্থের অনুকূলে হওয়ায় সংকট নিরসনে তা কোনো কাজে আসেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব নিরসন করা হবে তার সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ কারণে তিনি 'শতাব্দীর সেরা চুক্তি' নামক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেন এবং এর কিছু কিছু ধারা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জার্ড কুশনার, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জেইসন গ্রিনবালাত এবং ইসরাইলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রেডম্যান হচ্ছেন ওই পরিকল্পনার মূল প্রণেতা।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কথিত ‘শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে আমেরিকা। যদিও মার্কিন এ পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ এবং গত সাত মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নানা পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ডের আলোকে পরিকল্পনার বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। 'শতাব্দীর সেরা চুক্তি' নামক মার্কিন পরিকল্পনায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিন নামে দু'টি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলেও এর মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন।  ফিলিস্তিনকে পাশ কাটিয়ে ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করা আমেরিকার প্রধান উদ্দেশ্য। ইসরাইল ও ফিলিস্তিন নামক দুই রাষ্ট্র ভিত্তিক পরিকল্পনা অনুসারে সংকট নিরসনের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা মধ্যপ্রাচ্য আপোষ আলোচনায় এ বিষয়টি সংলাপের শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু দুই রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপায় ও এর বহু খুঁটিনাটি বিষয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য থাকার কারণে আজ পর্যন্ত তা সফলতার মুখ দেখেনি।
'শতাব্দীর সেরা চুক্তি' পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাসকে দখলদার ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ডিসেম্বর বায়তুল মোকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে স্থানান্তর করার ঘোষণা দেন। চলতি বছর মে মাসে দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে তিনি ওই ঘোষণা বাস্তবায়ন করেন। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাইয়্যেদ হাদি সাইদা আল-ফাকহি এ ব্যাপারে বলেছেন, 'শতাব্দীর সেরা চুক্তি' নামক মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বায়তুল মোকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।  
দখলদার ইসরাইলকে রক্ষা করা, বায়তুল মোকাদ্দাসকে ইহুদিকরণ এবং মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসকে বের করে আনা 'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন, "শান্তি আলোচনায় বায়তুল মোকাদ্দাস নিয়ে আর কোনো কথাবার্তা হবে না।"  এই পরিকল্পনায় আবুদিস এলাকাকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। ইসরাইলি দৈনিক হারেতয লিখেছে, 'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক ট্রাম্পের পরিকল্পনার দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, আমেরিকা চাচ্ছে পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাসে অবস্থিত আবুদিস গ্রামকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করা হবে এবং এর আশেপাশে ফিলিস্তিনের তিনটি অথবা পাঁচটি গ্রাম থেকে ইসরাইল সরে যাবে। ১৯৬৭ সালে এসব এলাকা ইসরাইলের দখলে আসে। এ পদক্ষেপের অর্থ হচ্ছে বায়তুল মোকাদ্দাসের প্রাচীন অংশটি ইসরাইলের দখলে থাকবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পরিকল্পনায় ইহুদি উপশহর নির্মাণ বন্ধ কিংবা দখলীকৃত এলাকাগুলো থেকে ইসরাইলের সরে যাওয়ার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেননি।
'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক ট্রাম্পের পরিকল্পনায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যে কথা বলা হয়েছে তাতে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র থাকতে পারবে না। এমনকি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফিলিস্তিনিদের নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসারও কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি বরং বলা হয়েছে ফিলিস্তিনিরা যেসব দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে তারা সেখানেই থাকবে যাতে এর মাধ্যমে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় ইহুদি উপশহরগুলো পুরোপুরি ইসরাইলের অধীনে রাখার কথা বলা হয়েছে।
'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক ট্রাম্পের পরিকল্পনা দখলদার ইসরাইলের জন্য অনেক বড় সেবা। ইসরাইলকে রক্ষায় এমন সময় এ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে যখন একদিকে, ইসরাইলের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ৩৩ ও ৫১ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের অপরাজিত হওয়ার দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে অন্যদিকে ইরাক ও সিরিয়ায় দায়েশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আবির্ভাব ঘটেছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ঐতিহাসিক বিজয় ইসরাইলের জন্য অনেক বড় আঘাত। কারণ ইসরাইল দায়েশ সন্ত্রাসীদের প্রধান সহযোগী ও সমর্থক। ইসরাইলের কর্মকর্তারা বহুবার স্বীকার করেছেন, ৩৩ কিংবা ৫১ দিনের যুদ্ধের মতো আর কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার মতো অবস্থা তাদের নেই। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ধারণা 'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই রাষ্ট্র ভিত্তিক পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে একদিকে তারা সমালোচনার মাত্রা কমিয়ে আনতে পারবে অন্যদিকে এর আগে ইসরাইল-মার্কিন পরিকল্পনাগুলোর ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে পারবে।
এভাবে ফিলিস্তিন সংকটের একটা সমাধান করার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল বিরোধী যেসব প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেসবকে দমন বা দুর্বল করা 'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক ট্রাম্পের পরিকল্পনার আরেকটি উদ্দেশ্য। গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এখানে দু'টি ধারা গড়ে উঠেছে। একটি হচ্ছে ইসরাইলসহ যেকোনো আগ্রাসী শক্তির সঙ্গে আপোষকামী একটি দল আর অন্যটি হচ্ছে আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকামী দল।
২০১১ সালে আরব দেশগুলোতে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণজাগরণ শুরু হওয়ার পর এবং ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সরকারের পতনের পর এ অঞ্চলে প্রতিরোধ সংগ্রাম জোরদার হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রতিরোধ সংগ্রাম যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য দায়েশ সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া হয়। সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে একদিকে সিরিয়ার ইসরাইল বিরোধী সরকারকে উৎখাত করার এবং অন্যদিকে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নির্মূল করার চেষ্টা করা হয়েছে। 'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক ট্রাম্পের পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়া।    
'শতাব্দির সেরা চুক্তি' নামক ট্রাম্পের পরিকল্পনার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে এ অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তি ও ইরানের বিরুদ্ধে আরব ও ইসরাইলকে ঐক্যবদ্ধ করা। দায়েশ সন্ত্রাসীদের দিয়ে প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ইসরাইল ও আরব দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা। বিষয়টি আগে গোপন থাকলেও এখন প্রকাশ্যে এসেছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিনা সালমান গত মার্চে দখলদার ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

আইনজীবীরা কী খালেদা জিয়াকে বয়কট করেছেন? -প্রধানমন্ত্রী

দুই কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কারাগারে স্থাপিত আদালতে যাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, যেহেতু আদালতে তার আইনজীবীরা যাচ্ছেন না তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি তার আইনজীবীরা মনে করছেন খালেদা জিয়াকে নির্দোষ প্রমাণ করতে তাদের হাতে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ নেই। অথবা-হয়তো আইনজীবীরা খালেদা জিয়াকে বয়কট করেছেন। এক্ষেত্রে কোনটা হয়েছে সেটা বিচার্য বিষয়। প্রধানমন্ত্রী গতকাল আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের  সভার সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ডাকা জরুরি এ বৈঠকে আলোচনা করেন।
সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০ বছর মামলা চলার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। একটা মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। কোর্টের রায় হয়েছে বলেই তিনি কারাগারে। আরেকটি মামলারও কাজ চলছে। যে কোনো মামলার সময় বাঁধা তাকে। কিন্তু যে কোনো ছুঁতায় হোক খালেদা জিয়া কোর্টে যান না। খালেদা জিয়া তো কোর্টে যানই না আবার তার আইনজীবীরাও সময় নেন। এখানে আমার একটি প্রশ্ন- তিনি যদি নির্দোষ হবেন তাহলে মামলা মোকাবিলা করতে ভয় কিসের। আর তার আইনজীবীরা কেন কোর্টে যাবেন না? ইতিমধ্যে তারা বলল খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার অভাব। উনার শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে। উনি বেশি নড়তে-চড়তে পারছেন না। তাই তার শারীরিক অবস্থা ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কোর্ট জেলগেটে বসানো হলো। সরকারি প্রজ্ঞাপনে কোর্ট যেকোনো জায়গায় বসতে পারে। কোর্টের ইচ্ছায় সে ব্যবস্থা করা যায়।
তিনি বলেন, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমাদের গ্রেপ্তার করেছিল। জেলখানা সাবজেল হয়ে গিয়েছিল আমাদের সংসদ ভবনগুলো। আর সেখানেই বাসানো হয়েছিল কোর্ট। আমিও ওই কোর্টে গিয়েছি। খালেদা জিয়াসহ আরো অনেকে ওই কোর্টে গিয়েছেন। ঠিক একইভাবে জিয়াউর রহমান যখন কর্নেল তাহেরের বিচার করেন সে বিচারও কিন্তু কারাগারেই হয়েছিল। সে বিচারে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। কাজেই এভাবে যেকোনো বিচার কিন্তু হয়। বিডিআরের ঘটনার বিচার কিন্তু কারাগারেরই জায়গায় হয়েছে। ৮শ’ আসামি নিয়ে যে কোনো কোর্টে বসার জায়গা নেই। সেজন্য সেখানে ঘর বানিয়ে কোর্ট বসানো হয়। কাজেই কোর্ট বসতে পারে যেখানে প্রজ্ঞাপন জারি করে সেখানে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেলগেটে বিচার কাজ এটা তো জিয়াউর রহমান শুরু করে গিয়েছেন। তিনি পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। কেউ কেউ বলছেন এটা নাকি গণতান্ত্রিক সময় হয় না মার্শাল ল’র সময় হতো। তাহলে তারা স্বীকার করছেন জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ জারি করেছিলেন বলেই ওই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার অধিকার তার ছিল।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, বিএনপি বলছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা নাকি প্রতিহিংসাপরায়ণ। এখানে হিংসার কি আছে? এতিমের টাকা তো আর আমরা খেতে চাইনি ভাগবাটোয়ারা করে। নাকি কম দিয়েছে বলে হিংসা করবো? তাতো না। এতিমখানার জন্য টাকা এসেছে। সে টাকা এতিমদের না দিয়ে নিজেদের কাছে রেখে দেয়। আবার কেউ কেউ বলছেন টাকা তো আছেই।
টাকা যদি থেকে থাকে তাহলে এত বছর আগে টাকা আসলো অর্থাৎ ৯২ সালে টাকা আসলো তাহলে একটা টাকাও এতিমরা পেলো না কেন? আর সে টাকা খালেদা জিয়া ব্যাংকে রেখে সুদ খেলো। ২৫ বছর ধরে এ টাকা সে রেখে দিলো আপন মনে করে। জিয়া অরফানেজ নাম দিয়েছে সে অরফানেজ কই? ঠিকানাটা কোথায়? সে ঠিকানা তো দেখাতে পারেনি, অরফানেজ দেখাতে পারেনি। কিন্তু অরফানেজের নামে টাকা তো আত্মসাৎ করেছে। এতিমের টাকা খেয়ে যদি কেউ জেলে যায় তাহলে সে দায় দায়িত্ব কার? ১০ বছর ধরে মামলা চলছে। এ সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা প্রমাণ করতে পারলো না যে তিনি নির্দোষ। সে দোষটাও কি আমাদের সরকারের?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোর্ট বসলে খালেদা জিয়া হাজির হয়েছেন কিন্তু তার আইনজীবীরা যান নাই। মাত্র একজন আইনজীবী গিয়েছেন। কিন্তু তার প্যানেল আইনজীবীরা যাননি। এই যে তারা গেলো না এখানে আমরা কি মনে করব? যে এই প্যানেল জানে যে খালেদা জিয়া দোষী। তাকে ডিফেন্ড করে খুব বেশি একটা লাভ হবে না। তাই কোন ছুঁতা ধরে তারা বোধহয় তাকে ডিফেন্ড করতে চায় না। সেজন্যই তারা কোর্টে যায় নাই। সাধারণ মানুষ তো এটাই ধারণা করবে। যেখানে কোর্ট বসবে সেখানে আইনজীবীরা যাবেন, যেখানেই জজ সাহেবরা বসবেন সেখানেই তারা যাবেন। মামলা করতে গেলে আইনজীবীদের কাজ হলো যেখানে কোর্ট বসবে সেখানেই তারা যাবে। তারা না গিয়ে খালেদা জিয়াকে বয়কট করলো কেন?
শেখ হাসিনা বলেন, তারা বলছে এটা ক্যামেরা ট্রায়ার। এটা তো ক্যামেরা ট্রায়াল না। কোর্টের দরজা তো খেলাই ছিলো। তাদের কোনো কোনো আইনজীবী কোর্টের গেটে গিয়ে বসেছিল কিন্তু কোর্টরুমে ঢোকে নাই। অবাধে সবাই যাতায়াত করতে পারছিল। তাহলে এটা ক্যামেরা ট্রায়াল হলো কি করে। বিএনপি নেতারা বলা শুরু করেছেন যে কোন কোর্ট বসানো অসাংবিধানিক। দুর্ভাগ্য আমাদের যে দলের জন্ম হয়েছিল অসাংবিধানিক উপায়ে। সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখলকারী যারা তাদের কাছে এখন সংবিধান শিখতে হবে আমাদের। এখানে অসাংবিধানিকটা কি হলো? তার মানে জিয়াউর রহমান মার্শাল ল’ দিয়েছিলেন অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল বলে। সেটা স্বীকার করুক। কিন্তু সেটা তারা করে না।
সভায় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সূচনা বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করেন। আলোচনায় আসন্ন নির্বাচন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলীয় কর্মসূচি স্থান পায় বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। 
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহ উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর
ভবিষ্যতে হয়তো ভর্তুকি ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হবে না
জাতীয় বিদ্যুৎ সপ্তাহ-২০১৮ উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এখন বিদ্যুতের উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্য নেয়া হচ্ছে। এতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা হয়তো রাখা সম্ভব হবে না। রাজধানীর বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৬ দশমিক ২৫ টাকা প্রতি কিলোওয়াট এবং বিক্রয় মূল্য রাখা হয়েছে ৪ দশমিক ৮২ টাকা প্রতি কিলোওয়াট। কাজেই এখানে আমরা ভতুর্কি দিচ্ছি।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে খরচ তা আমরা গ্রাহকের কাছ থেকে নিচ্ছি না। তিনি বলেন, মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন যত হতে থাকবে ভবিষ্যতে বিদ্যুতে যতটা খরচ হবে ততটাই তাদের প্রদান করতে হবে। তিনি বলেন, ‘সেক্ষেত্রে আমার একটা অনুরোধ থাকবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে।
বিদ্যুতের অপচয় বন্ধের জন্য আমি অনুরোধ জানাই। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে আলোচনা করেছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা একটা বিমসটেক সোলার গ্রিড লাইন করে দিচ্ছি। এই আন্তঃদেশীয় গ্রিডলাইনের মাধ্যমে কে কত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তা থেকে বাংলাদেশ কিনবে, এটা আমরা স্পষ্ট করে ফেলেছি। আঞ্চলিক সহযোগিতার যুগান্তকারী পদক্ষেপটা আমরা ইতিমধ্যেই গ্রহণ করেছি।
সরকার বিগত সাড়ে নয় বছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণে বেশ কিছু আঞ্চলিক চুক্তি স্বাক্ষর করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের সহযোগিতা চুক্তির আওতায় স্থাপিত দুই দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন কেন্দ্রের মাধ্যমে ভারত থেকে প্রথম গ্রিড আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে।
এ ক্ষমতা ১০০০ মেগাওয়াটে উন্নীতের কাজ চলছে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিতীয় গ্রিড আন্তঃসংযোগ উদ্বোধনের মাধ্যমে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। ভারত হতে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নেপাল এবং ভুটান থেকে জল বিদ্যুৎ আমদানির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত মাসেই তার সরকার নেপালের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ, ভুটান এবং ভারতের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
‘অনির্বাণ আগামী’ প্রতিপাদ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের সাফল্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে দিক নির্দেশনা প্রদানে এই জ্বালানি সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে।
জ্বালানি সপ্তাহের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জ্বালানি বিষয়ক সেরা প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিক ও দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কার প্রদান এবং গৃহস্থালী, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী গ্রাহকদের সম্মাননা প্রদান।
নেপালের জ্বালানি, পানিসম্পদ এবং সেচবিষয়ক মন্ত্রী বর্ষা মান পুন অনন্ত, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বিদ্যুৎ, জ্বলানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সভাপতিত্ব করেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভাগে সরকারের সাফল্য ও পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন এবং খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মোহম্মদ রহমাতুল মুনিম অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের বিদ্যুৎ খাতের সাফল্য নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছি। প্রতি মাসে ৩ থেকে ৫ লাখ গ্রাহক সংযোগের ফলে এখন মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটিতে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, তার সরকারের সময়ে মোট ২৪ হাজার ৩৫১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে ও ১০১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
এছাড়া বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকার প্রধান বলেন, আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণেও ছিলাম সচেষ্ট। বিগত সাড়ে নয় বছরে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ৮ হাজার কিলোমিটার হতে ১১ হাজার ১২২ সার্কিট কিলোমিটারে উন্নীত করেছি। বিতরণ লাইন ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার হতে ৪ লাখ ৫৭ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে।
২০০৯ সালে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭ শতাংশ যা বিগত সাড়ে ৯ বছরে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সরকারের প্রচেষ্টার ফলে দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে ৪৬৪ কিলোওয়াট-ঘণ্টায় উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ সিস্টেম লস ১৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে বর্তমানে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশে হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে।
বিগত সাড়ে নয় বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার নতুন সেচ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। দেশে গ্যাসের মজুদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গৃহস্থালি জ্বালানির চাহিদা পূরণে এলপিজির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ৫৬টি প্রতিষ্ঠানকে এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি প্রদান করায় এলপিজি সিলিন্ডারের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ খাতে প্রি-প্রেইড মিটার স্থাপন এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা প্রদান করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পায়রা বন্দর এবং মহেশখালীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি এবং স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ৯ই আগস্ট বিদেশি তেল কোম্পানির কাছ থেকে ৫টি গ্যাস ফিল্ড ক্রয়ের মাধ্যমে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু ঘৃণ্য কুচক্রীদের হাতে জাতির পিতা শাহাদতবরণ করায় তার এই স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার হত্যার পর ছয় বছর প্রবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর থেকে তার একটাই লক্ষ্য- কীভাবে বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা যায়। বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা যায়।

যে পাঁচজনের লড়াইয়ে ভারতে সমকামিতা বৈধ হল

১৯৯৮ সালে ম্যাসাচুসেটসের ক্লার্কস ইউনিভার্সিটি থেকে ডাবল মেজর করে ভারতে ফিরে আসার পর আয়েষা কাপুর যোগ দিয়েছিলেন ই-কমার্স খাতে, যা তখন এ দেশে সবে মাথা তুলছে। খুব শিগগিরি বিজনেস হেডের পদে পৌঁছতেও কোনও অসুবিধে হয়নি তার।
কিন্তু দশ বছরের মধ্যেই ছবিটা পাল্টে গেল - যখন তার সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের কথা জানাজানি হওয়ার পরই তাকে চাকরি ছাড়তে হয়। আয়েষার সঙ্গী ছিলেন একজন মহিলা।
পরে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করে তিনি ভারতের কর্পোরেট জগতে দারুণ সফল ঠিকই - কিন্তু নিজের সঙ্গীকে নিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক কোনও অনুষ্ঠানে যেতে তাকে এখনও সমস্যায় পড়তে হয়।
কিংবা, হত। বৃহস্পতিবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে সমকামিতা যেহেতু আর অপরাধ বলে গণ্য নয়, তাই এখন থেকে আর ওরকম ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধায় পড়তে হবে না বলেই আশা করছেন আয়েষার মতো আরও অনেকে।
ভারতীয় সমাজে সমকামিতা সামাজিকভাবে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হতে আরও কত সময় লাগবে বলা মুশকিল, তবে এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা যে আর থাকল না সেটাকেই বিরাট এক অর্জন বলে মনে করছেন এলজিবিটি (লেসবিয়ান-গে-বাইসেক্সুয়াল-ট্রান্সজেন্ডার) সমাজের সবাই।
অথচ ২০১৩ সালে ভারতের এই সুপ্রিম কোর্টই দিল্লি হাইকোর্টের একটি আদেশ খারিজ করে দিয়ে বলেছিল ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ৩৭৭ ধারা (যাতে সমকামিতা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ) বাতিল করার কোনও অধিকার আদালতের নেই, কারণ সে দায়িত্ব পার্লামেন্টের।
২০১৬-তে সেই রায়ের বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে আসা দেশের পাঁচজন সেলিব্রিটি - যার অন্যতম ছিলেন আয়েষা কাপুর। তাদের পিটিশনে তারা সুপ্রিম কোর্টেরই নিজেদের রুলিং পুনর্বিবেচনার আর্জি জানান।
এই পাঁচজন তারকার আইনি লড়াইয়ের সুবাদেই যে আজ ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের নিজেদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুযায়ী জীবন যাপনের অধিকার পেলেন, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু কারা এই পাঁচজন?
১) ৫৯ বছর বয়সী নভতেজ সিং জোহর ভারতের একজন বিখ্যাত ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী, ভারতনাট্যম নৃত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির পুরস্কারেও ভূষিত তিনি।
গত দুদশকেরও বেশি সময় ধরে যে সঙ্গীর সাথে রয়েছেন তিনি, তার সাথে মিলেই সুপ্রিম কোর্টে পিটিশনটি দাখিল করেছিলেন তিনি।
তার যুক্তি ছিল, ভারতের সংবিধান যে জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অঙ্গীকার করে - ৩৭৭ ধারা তার পরিপন্থী।
২) সাংবাদিক সুনীল মেহরা (৬৩), যিনি এক সময় ম্যাক্সিম ম্যাগাজিনের ভারতীয় সংস্করণের সম্পাদক ছিলেন, তার সঙ্গে নভতেজ সিং জোহরের দেখা হয়েছিল সেই ১৯৯৪ সালে।
প্রথম দেখা হওয়ার ছমাস পর থেকেই তারা এক সঙ্গে থাকতে শুরু করেন, সেই জুটি আজ প্রায় পঁচিশ বছর পরেও ভাঙেনি।
সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা পিটিশনে অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন সাংবাদিক সুনীল মেহরাও।
৩) রিতু ডালমিয়া (৪৫) ভারতের নামী সেলিব্রিটি শেফ-দের একজন। তার 'ডিভা' রেস্তোরাঁ চেইন ভারতে সেরা ইটালিয়ান খাবারের অন্যতম ঠিকানা বলে ধরা হয়।
রিতুর জন্ম কলকাতায়, শহরের বেশ রক্ষণশীল একটি বনেদী মারোয়াড়ি পরিবারে। তিনি নিজেকে পরিচয় দেন লেসবিয়ান হিসেবে।
এক সাক্ষাৎকারে রিতু নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি যে লেসবিয়ান সে কথা নিজের পরিবারের কাছে ঘোষণা করেছিলেন একদিন ডিনারের টেবিলে খেতে বসে। তার বাবা-মাও সেটা সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি।
৪) এই পিটিশনে যুক্ত ছিলেন ৬১ বছর বয়সী আমন নাথও - যিনি ভারতের নিমরানা হোটেল চেইনসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার।
তবে শুধু হোটেলিয়ার হিসেবেই নয়, শিল্পরসিক ও ইতিহাসবিদ হিসেবেও তার খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। শিল্পকলা, ইতিহাস, স্থাপত্য ও ফোটোগ্রাফির মতো বহু বিষয়ে তিনি অজস্র বই লিখেছেন।
৫) আমেরিকায় পড়াশুনো করে ফিরে আসা আয়েষা কাপুরের কথা তো আগেই বলেছি। তিনি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা পিটিশনের পঞ্চম মুখ।
ই-কমার্সের জগৎ ছেড়ে দেওয়ার পর আয়েষা এখন যুক্ত ফুড অ্যান্ড বিভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে - আর সেখানেও তিনি ভীষণ সফল।
৩৭৭ ধারাকে বিলুপ্ত করে ভারতের এলজিবিটি-রা যে নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন যাপনের অধিকার পেলেন, তার জন্য তারা অবশ্যই এই পাঁচজনের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন।
সূত্রঃ বিবিসি

১৫০০ কলেজ প্রকল্প: ১২০ কোটি টাকার অনিয়ম by নূর মোহাম্মদ

সারা দেশে নির্বাচিত বেসরকারি ১৫০০ কলেজ প্রকল্পে অর্থ নয়ছয়ের ঘটনা ঘটেছে। মালামাল সরবরাহ করার আগেই নিয়মবহির্ভূতভাবে ঠিকাদারদের ১২০ কোটি টাকার বিল দেয়া হয়েছে। পুরো টাকা বিলের অনুমোদন দেয়া হয়েছে সরকারি ছুটির দিনে। তাও প্রকল্প পরিচালকের অনুপস্থিতিতে। এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তোলপাড় চলছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির সমন্বয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। গতকাল থেকে তদন্ত শুরু করেছে কমিটি। অভিযুক্তদের ওএসডি বা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়েই কাজ শুরু  করছে কমিটি। গতকাল থেকে শুরু হওয়ার কমিটির ওপর প্রভাবশালী মহল দিয়ে নানা চাপ বিস্তার শুরু করেছে অভিযুক্তরা। বাধ্য হয়ে বিষয়টি এখন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন নিজেই তদারকি করছেন। আর নড়েচড়ে বসেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, সারা দেশে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজের উন্নয়নের জন্য এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ২০১৩ সালে। আসছে ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। শেষ বছরে এসে প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়ের ঘটনা হাতেনাতে ধরেন নতুন যোগ দেয়া প্রকল্প পরিচালক। এতেই প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দিতে তার বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লাগে একটি মহল। অন্যদিকে এ অনিয়ম ধরার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে বদলি করা হয়েছে বলে ওই দপ্তরে আলোচনা রয়েছে। মাউশির একজন পরিচালকের নাম নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে তদন্ত কমিটি। ফিন্যান্স ও প্রকিউরমেন্ট শাখার পরিচালক প্রফেসর মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মাউশির আরেকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এ অভিযোগে তাকেও ওই পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার গুঞ্জন আছে।   
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ৩রা জানুয়ারি অবসরে যান ওই প্রকল্পের সর্বশেষ পরিচালক (পিডি) প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম। আর গত ২০শে জুন প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ পান প্রফেসর ড. এসএম আলমগীর কবীর। তিনি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন ২১শে জুন। প্রকল্প পরিচালক না থাকাকালীন সময়ে রুটিন দায়িত্বে ছিলেন উপ-প্রকল্প (ডিপিডি) পরিচালক মীর আবদুল হালিম। নতুন পিডি নিয়োগ পেয়েছেন এমন খবর পেয়ে ভারপ্রাপ্ত পিডি দুই দিনে ৫টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১২০ কোটি টাকা অগ্রিম দিয়ে দেন। এক্ষেত্রে মাউশির মহাপরিচালক ও প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাকে কিছু জানানো হয়নি। তড়িঘড়ি করে ওই টাকা ছাড় করার বিষয়টি গত ৩১শে জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা সভায় এ আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ে। এ ছাড়াও আকতার ফার্নিচারের চাহিদা মোতাবেক পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে প্রকল্প থেকে। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের প্রত্যয়নপত্র দেয়ার বিধান নেই। নিয়মবহির্ভূত ভাবে এ কাজটি করেছেন মীর আব্দুল হালিম।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বিল পরিাশোধের ক্ষেত্রে ফাইলে কমপক্ষে তিনজন কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন দুইজন। ফাইল উঠিয়েছেন সহকারী পরিচালক মো. মনসুর হেলাল এবং অনুমোদন দিয়েছেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক মীর আবদুল হালিম। কম গুরুত্বপূর্ণ ফাইল উঠিয়েছেন হিসাব রক্ষক অথবা একজন কম্পিউটার অপারেটর। প্রকল্পে পঞ্চম গ্রেডের আরো ৫ জন কর্মকর্তা থাকলেও তাদের রাখা হয়েছে এক ধরনের অগোচরে। শুধু তাই নয় যেসব ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ বেশি সেখানে শুধু বিলের নাম্বার উল্লেখ করে টাকার বিষয়টি গোপন রাখা হয়। প্রকল্প সূত্র আরো জানায়, গত ২১, ২২, ২৯ ও ৩০শে জুন শুক্র ও শনিবার অফিস বন্ধের সময় পিছনে তারিখে ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকার ৭টি বিল জমা দেন। বিষয়টি প্রকল্পের হিসাব রক্ষক কর্মকর্তার নজরে এলে তিনি আপত্তি দেন। এরপর মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়নের পরিচালক এগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিল বিধায় ব্যবস্থা নিতে নিষেধ করেন। এরপর তিনি হজে চলে যান। অগ্রিম বিল পরিাশোধের কোনো আর্থিক বিধান না থাকার পর এসব বিল দেয়া হয়েছে মাউশির মহাপরিচালকের অগোচরে। কোনো বিলে মহাপরিচালকের স্বাক্ষর নেই।
নতুন প্রকল্প পরিচালক যোগদান করার পর বিষয়টি তার নজরে আসে। তিনি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা করার চেষ্টা করেও পারেননি। অভিযুক্ত দুইজন তাকে নানা জায়গা থেকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে মাউশির ডিজির অনুমতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা করানো হয়। অন্যদিকে সরকারি অডিট বিভাগ নিরীক্ষা করেও একই ধরনের অনিয়ম পেয়েছে। তারপর নতুন পিডিকে সরিয়ে দেয়ার জন্য তাকে বিএনপি জামায়াত সমর্থিত ও জুনিয়র কর্মকর্তা  বলে সরকারি বিভিন্ন অফিসে অভিযোগ করতে থাকে। পিডির অভিযোগ আমলে নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া অতিরিক্ত সচিব বেলায়েত হোসেন তালুকদার, পরিকল্পনা শাখার যুগ্ম প্রধান কাজী মনিরুল ইসলাম এবং মাউশির ফিন্যান্স ও প্রকিউরমেন্ট শাখার পরিচালক প্রফেসর মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, পুরো অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে অভিযুক্তদের এবার আর ছাড় নয় বলে জানান তিনি। একই সময় তার রুমে থাকা  মাউশির পরিচালককে প্রকল্পের সব নথি একটি করে দেখে একটি প্রতিবেদন তৈরি করার নির্দেশ দেন। প্রকল্পগুলোকে আরো কঠোর নজরধারী প্রয়োজনে নিজে প্রকল্প অফিসে গিয়ে ফাইল দেখার জন্য ডিজিকে নির্দেশ দেন।
প্রকল্পের নথি সূত্রে জানা গেছে, আগাম বিল নেয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে ফ্লোরা লিমিটেড, ইউনিক বিজনেস সিস্টেম, স্মার্ট টেকনোলজি লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কলেজে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া উপকরণ সরবরাহ করার কাজ পায়। প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম ৯৪ কোটি ১২ লাখ টাকা নিয়েছে। এর মধ্যে ফ্লোরা লিমিটেডে ৪টি লটে ৩৭৭টি কলেজ আইসিটি ল্যাব স্থাপনের জন্য ৬৮ কোটি ৬৩ লাখ ২১ হাজার টাকার চুক্তি হয়। একটি প্রতিষ্ঠানেও মালামাল সরবরাহ না করার আগেই এ প্রতিষ্ঠানকে ৫৯ কোটি ৮৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম বিল দেয়া হয়েছে। একই ভাবে ৭৫৬টি কলেজে ৫ হাজার ৯৭৫টি কক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর স্থাপনের জন্য ৪টি প্যাকেজে ফ্লোরা লিমিটেড, ইউনিক বিজনেস, ওরিয়েন্টাল কোম্পানির সঙ্গে মোট ৬৮ কোটি ১৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকার চুক্তি হয়। এর মধ্যে ২টি প্যাকেজে বিল বাবদ ৩৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি বিল দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আইসিটি ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্ট বাবদ অগ্রিম সর্বমোট ৯৪ কোটি ১১ লাখ ৯৯ হাজার ১৬১ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ফার্নিচার খাতে ই-জিপির মাধ্যমে মোট ৪টি প্যাকেজে ৩৭৫টি প্রতিষ্ঠানে ফার্নিচার সরবরাহের জন্য ১৯ কোটি ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭১৬ টাকার চুক্তি হয়। এর মধ্যে ৭৫টি প্রতিষ্ঠানে আখতার ফার্নিচার সরবরাহ করার পর দেয়া হয়েছে। এসব ফার্নিচার অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তৎকালীন যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) এবং মাউশি ও প্রকল্প সমন্বয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন বলা হয়েছে। তারপরও আরো ১০০ প্রতিষ্ঠানের ফার্নিচার সরবরাহ করার জন্য এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। বাকি ২টি প্যাকেজের মধ্যে পারটেক্স ও আরএফএল গ্রুপকে অগ্রিম ১০ কোটি ১৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে। আর বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের ৭টি ইউনিটের সঙ্গে ডিপিএম পদ্ধতিতে ৮২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ৫০ কোটি ৬২ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকার চুক্তি হয়। এ প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম দেয়া হয়েছে ১৫ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ৪০৮ টাকা। অর্থাৎ ফার্নিচার খাতে অগ্রিম পরিশোধ করা হয়েছে ২৬ কোটি ১০ লাখ ৫১ হাজার ৪০৮ টাকা। আইসিটি ও ফার্নিচার খাতে বিধিবহির্ভূতভাবে মোট ১২০ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করা হয়েছে। 
পুরো অভিযোগের ব্যাপারে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পিডি মীর আবদুল হালিম মানবজমিনকে বলেন,  এত বড় কোম্পানিগুলো অগ্রিম টাকা দিলে মেরে দিবে বা নিম্নমানের মাল দিবে এটা বিশ্বাস করা যায়? তিনি প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনি কী বিশ্বাস করেন। আগের পিডি একই ভাবে অগ্রিম বিল দিয়েছেন সে সূত্র ধরেই আমিও দিয়েছি। ওই সময়ের কাগজপত্র দেখাতে পারবেন এমন প্রশ্নে নির্বাক হয়ে তিনি বলেন, আমার কাছে নেই। আপনি সংগ্রহ করে নেন। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি ভালো দেখানোর জন্য আমি এ কাজ করেছি। 
সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. এসএম আলমগীর কবীর মানবজমিনকে বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। পিছনের তারিখ দিয়ে বিল দেয়ার বিষয়টি খুঁজতে গিয়ে এ জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরেছি। এরপর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েও বাধার মুখে পড়েছি। পরে ডিজি স্যারের অনুমতি নিয়ে কাজ করেছি। একই নিরীক্ষা এজি (সরকারি নিরীক্ষা বিভাগ) অফিসও করেছে। সব নিরীক্ষায় জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অগ্রিম বিল দেয়ার জন্য মাউশির পরিকল্পনা শাখার আপত্তি আসলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো অডিট আপত্তি আসেনি। বিষয়টি রহস্যজনক।

সাংবাদিকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করার অস্ত্র বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ -ডনের সম্পাদকীয়

সাংবাদিকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার একটি উপযোগী অস্ত্র হয়ে উঠেছে বিশ্বাসঘাতকতা বা রাষ্ট্রদ্রোহতার অভিযোগ। সোমবার তা আরো একবার প্রমাণিত হলো। এদিন মিয়ানমারে দু’জন সাংবাদিক ওয়া লোন এবং কাইওয়া সোয়ে ও’কে দেশটির অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টের অধীনে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়া হয়। তাদের দু’জনকেই সাত বছর করে জেল দেয়া হয়েছে। তারা কাজ করছিলেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হয়ে। তাদের কাছে রাখাইন রাজ্য ও সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সরকারি ডকুমেন্ট থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে বৃটিশ আমলের আইনের অধীনে। তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল গত ডিসেম্বরে। এসব কথা পাকিস্তানের অনলাইন ডনের এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, ওই দুই সাংবাদিক কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়েন কারণ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা চালিয়েছে তা নিয়ে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তারা বিরল সাহস দেখিয়েছিলেন। জাতিসংঘের একটি প্যানেল মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এ ছাড়া জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন নিন্দা জানিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদেরকে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার জন্য বিচার করার সুপারিশ করা হয়। এসব রিপোর্ট প্রকাশ করার পরই ওই দু’সাংবাদিকের বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনীর ভয়াবহ সেই অভিযানে গণহারে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। একে গণহত্যার উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড বলে বর্ণনা করা হয়েছে ওই রিপোর্টে। এর ফলে সীমান্ত অতিক্রম করে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
ভিন্ন মতাবলম্বীদের কণ্ঠ রোধ করতে এবং তারা যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তা যাতে প্রকাশ না পায় তা প্রতিরোধ করতে  সেকেলে অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট বহুবার ব্যবহার করেছে মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা। এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে তারাই একা নয়। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো ক্রমাগত কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে। ফলে সাংবাদিকদের জন্য সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্রমশ আরো প্রতিকূল হয়ে উঠছে। এমন উদাহরণের মধ্যে তুরস্ক, মিশর, ভারত ও পাকিস্তানের নাম করা যায়। এসব দেশে মিডিয়া বিশেষত সমস্যার (ট্রাবলিং) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এটার ধরন এক এক দেশে এক এক রকম- অন্তত এখনকার সময়ের জন্য। যেসব দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে রাষ্ট্র লুকোচুরি করে। সেখানে সাংবাদিকদের বানানো হয় বিশ্বাসঘাতক, ট্রাবলমেকার। এর ফলে সহিংসতার বিষয়ে তাদেরকে করে তোলা হয় বিপন্ন। অনলাইনে নির্যাতিত হন। হয়রান হন সাংবাদিকরা। তাদেরকে গ্রেপ্তার করে সন্ত্রাসের বানোয়াট অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। আবার জোরপূর্বক গুমও করে দেয়া হয়। অনেককে সংঘাতপূর্ণ বিষয়ে রিপোর্ট করা অবস্থায় তাদেরকে টার্গেটেড বা হত্যার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে। এমন অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ৩৯। বহু মিডিয়া আউটলেট ভয়াবহ চাপের মুখে আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। এসব চাপ এসেছে রাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন কৌশলে। তাই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর অবশ্যই সরকারগুলোর কাছে দাবি তোলা উচিত, যাতে মিডিয়া জনগণের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে সম্মান পায়। নিজেদের মধ্যে যতই মতবিরোধ থাক সাংবাদিকদের নিজেদের জন্য এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে।

আরপিও সংশোধনী নিয়ে ইসিতে লুকোচুরি by সিরাজুস সালেকিন

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-১৯৭২ সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদনের পর মুখে কুলুপ এঁটেছে নির্বাচন কমিশন। গত সোমবার খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইভিএম যুক্ত করে আরপিও সংশোধনের বিষয়টি প্রকাশ করলেও সেখানে আর কি কি সংশোধনী রয়েছে তা গোপন রেখেছে ইসি। ইসি’র আইন সংস্কার কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে আছেন নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম। গতকাল দিনভর চেষ্টা করেও তার সঙ্গে সাংবাদিকরা আরপিও নিয়ে কথা বলতে পারেননি। নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদও এবিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। ইসি সূত্রে জানা গেছে, ‘নির্বাচনব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার’ শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের অধীনে দেড় লাখ ইভিএম ক্রয় করতে চায় ইসি। এজন্য জাতীয় নির্বাচনের চার মাসেরও কম সময় সামনে রেখে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই কমিশনে এ প্রস্তাব পাঠানো হয়। ৩০শে আগস্ট কমিশন সভায় আরপিও সংশোধনের বিরোধিতা করে নোট অব ডিসেন্ট দেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। কমিশন সভাও বর্জন করেন তিনি। পরবর্তীতে ইভিএম ব্যবহারে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অস্বস্তিতে পড়ে কমিশন। এই অস্বস্তির মধ্যেই গত সোমবার আরপিও’র খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ইসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খসড়ার কপি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে সংরক্ষণ করছে ইসি। ইসি’র আইন শাখা, নির্বাচন সহায়তা শাখা ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার কোনো কর্মকর্তার কাছে খসড়ার কোনো অনুলিপি পাঠানো হয়নি। পুরো বিষয়টি ইসি সচিবের দপ্তর থেকে তদারকি করা হচ্ছে।
৩৫তম কমিশন সভায় উপস্থিত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ইসির সুপারিশগুলো খুবই দুর্বল। এ ধরনের সুপারিশ আইনে রূপ পেলে যেমন নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে না। একই ভাবে, অনিয়ম ঠেকাতে নির্বাচনে কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে না। অতীতের মতো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ইসি’র সীমারেখা সংকুচিত হয়ে যাবে। নির্বাচন ব্যবস্থা শক্তিশালী কিংবা নির্বাচনে কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে, এমন কোনো বিধি-বিধান যুক্ত না করেই কমিশন সভায় অনুমোদিত সংশোধিত আরপিও’র প্রস্তাবনাটি সচিবালয়ে পাঠানো হয়। কর্মকর্তারা জানান, সংশোধিত আরপিও’র প্রস্তাবে কম-বেশি ১০টি সুপারিশ রাখা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান এবং আলোচিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) যুক্ত হয়েছে। এর আগে আরপিও সংশোধন সংক্রান্ত আইন সংস্কার কমিটি ৩৫টি সংশোধনের প্রস্তাব সুপারিশ করেছিল সেখানে নির্বাচনে ইসি’র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কিছুটা সুযোগ ছিল।
ইসি কর্মকর্তাদের মতে, ইভিএম আরপিও’র সংজ্ঞায় যুক্ত করাসহ প্রায় একডজন সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছে ইসি। এসব সুপারিশ সংক্রান্ত ধারা নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে না। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থা শক্তিশালী ও নির্বাচনে কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতার জন্য আরপিও’তে বিধি-বিধান সংযোজন-বিয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিল সাংবিধানিক সংস্থাটি তা চূড়ান্ত প্রস্তাবে যুক্ত হয়নি। শুধু আরপিও’র যে সংশোধনী আনার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এর মধ্যে ইভিএম আরপিওতে যুক্ত করা হয়েছে যাতে সংসদ নির্বাচনে এটা ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি হয়। বর্তমানে এটি স্থানীয় নির্বাচনের বিভিন্ন স্তরে ব্যবহার হচ্ছে। অনলাইনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান করা হয়েছে সংশোধিত আরপিও’র খসড়া প্রস্তাবনায়। আগে প্রার্থী নিজে কিংবা প্রতিনিধির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জমা দেয়া লাগতো। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের ক্ষমতা থাকলেও এবার এর সঙ্গে বদলির ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে। আর ঋণ খেলাপিদের মনোনয়নপত্র জমার আগ পর্যন্ত ঋণ-পুনঃতফসিলের বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে। আগে তফসিল ঘোষণার আগে ঋণ পুনঃতফসিলের বিধান ছিল।
স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে টিআইএন সনদ যুক্ত করার বিধানে এবার জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জন্য এটা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলে যাচাইয়ে একজনের মনোনয়নপত্র বৈধ হলে যাচাইয়ের সময় তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হতো। নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে যাচাইয়ের পরিবর্তে প্রার্থী প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা যাবে। নির্বাচনের কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে নির্বাচনের আপিল ট্রাইব্যুনালে মোকদ্দমা করতে ৫ হাজার টাকা জমা দিতে হতো, নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র অফেরতযোগ্য করা হয়েছে; ফি ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, আরপিও সংশোধনে ইসি’র আইন সংস্কার কমিটির ৩৫ সুপারিশের মধ্যে অন্যতম ছিল, আরপিও’র ৯১ এ (১) ধারায় সংশোধনী। এ ধারাতে বলা ছিল নির্বাচনে বিচারিক কর্মকর্তাদের অবাধ ক্ষমতা প্রদান। সেখানে নির্বাচনী অপরাধের জন্য সামারি ট্রায়াল করে শাস্তি দেয়ার প্রস্তাব ছিল ইসি’র। এমনকি অপরাধের শাস্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনকে সুপারিশ করতে পারবে এবং প্যানেল কোডে যেভাবে অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে তার আলোকে সাজা দেবেন এসব কর্মকর্তা। সংশোধিত আরপিওতে এ বিধানটি বাদ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র কোনো ব্যক্তি প্রার্থী হলে  মোট ভোটারের ১ শতাংশ জনের স্বাক্ষর নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হতো; এ ঘটনায় অনেক ব্যক্তি প্রার্থী হওয়াতে বঞ্চিত হতেন। রাজনৈতিক দলবহির্ভূত এসব প্রার্থীর শর্ত শিথিল করে ১ হাজার  ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিয়ে প্রার্থী হতে পারবেন; এ বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছিল আইন সংস্কার কমিটি, এটিও সংশোধিত আরপিওতে রাখা হয়নি বলে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এছাড়া কমিটির অন্যান্য সুপারিশের  মধ্যে নির্বাচনে অবৈধ টাকার প্রভাব ও প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়সীমা নির্দিষ্ট রাখতে ব্যয় মনিটরিং কমিটি ও অডিটের নিমিত্তে আলাদা কমিটি গঠন, নির্বাচনে অভিযোগ দাখিল ও তা দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরাতে এ বিধান সংযোজন, নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা, নির্বাচন কর্মকর্তাদের সাজা বাড়িয়ে সর্বনিম্ন তিন বছর করার বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই-ই নয়, নির্বাচনী অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে অভিযোগকারীকে জানিয়ে দেয়া এসব বিধানও রাখা হয়নি এ প্রস্তাবে।
উল্লেখ্য, ভেটিংয়ে মন্ত্রণালয় ইসির প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ না করলে আসন্ন ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে আইনটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আসাদকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন টাম্প

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৭ সালে দামেস্ক সরকারের ওপর রাসায়নিক হামলার দোষ চাপিয়ে ট্রামপ ওই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে চেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড তার নতুন প্রকাশিত একটি বইয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছেন। বইটির নাম ফেয়ার। ওয়াশিংটন পোস্ট অনলাইনে প্রকাশিত এ বইয়ের অংশবিশেষে ডনাল্ড ট্রামেপর এ ইচ্ছের কথা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ডনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম মাত্তিসকে বলেছিলেন, তিনি আসাদকে হত্যা করতে চান। এর আগে, সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের খান শায়খুন এলাকায় কথিত রাসায়নিক হামলার জন্য সিরিয়ার সরকারকে দায়ী করে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প ফোনে মাত্তিসকে বলেছিলেন, আসাদকে মেরে ফেলুন। সিরিয়ায় ঢুকে আসাদ ও তার ঘনিষ্ঠদের হত্যা করতে হবে। এসময় ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন মাত্তিস। পরে তার একজন সিনিয়র সহযোগী বলেছেন, তারা আসলে এমন  কোনো পদক্ষেপই নেন নি। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টারা সিরিয়ায় বিমান হামলাকে বেছে নেন। ট্রাম্পই এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা টিম সিরিয়ার বিরুদ্ধে বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল। বব উডয়ার্ড আরো লিখেছেন, পররাষ্ট্র বিষয়ে ট্রাম্পের অজ্ঞতা দেখে জিম মাত্তিস বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি তার ঘনিষ্ঠ লোকজনকে বলতেন, ট্রাম্পের বুদ্ধি ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ গ্রেডের।
যুক্তরাষ্ট্রের দূত নিকি হ্যালি মঙ্গলবার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে কখনোই হত্যার পরিকল্পনা করেননি ট্রাম্প। তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র হামলা নিয়ে কথোপকথন সম্পর্কে তিনি জানেন। নিকি বলেন, আসাদকে হত্যা করার বিষয়ে একবারও প্রেসিডেন্টকে কথা বলতে শুনি নি আমি।
সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে একটি হচ্ছে সত্তরের দশকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেংকারি ফাঁস। তার অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে পদত্যাগ করতে হয় নিক্সনকে। তিনি দাবি করেছেন, ট্রামেপর কাছের মানুষ যারা এসব বক্তব্য দেয়ার সময় তার পাশে ছিলেন, তাদের থেকেই তিনি এ তথ্য পেয়েছেন। বব উডওয়ার্ড সমপর্কে বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে যারা থাকেন তাদের সঙ্গে তার এত দারুণ সমপর্ক রয়েছে যে কোনো কিছুই তার অজানা থাকে না।
নতুন লেখা বইয়ে তিনি বলেছেন, দেশকে নিরাপদ রাখতে ট্রাম্পের ডেস্ক থেকে বেশ কিছু ডকুমেন্ট চুরি করেছেন তারই সহযোগীরা। এসব ডকুমেন্ট ছিল বাণিজ্য চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার বেশ কিছু দলিল। এমন কি ট্রাম্পের বিচার বিবেচনার জন্য বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সহযোগী তাকে ‘ইডিয়ট’ ও মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। এতে বলা হয়েছে, সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক। মঙ্গলবার তার বইয়ের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এতে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অবস্থায় পড়েছেন ট্রাম্প।
বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এপি’র হাতে আসে একটি কপি। এরপরই এ বইয়ের উদ্ধৃতি ও কাহিনীগুলোকে এক টুইটার বার্তায় ট্রাম্প প্রতারণা ও জনগণের সঙ্গে মশকরা বলে অভিহিত করেছেন। এর সঙ্গে আরো যোগ করেছেন তিনি। বলেছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম মাত্তিস ও চিফ অব স্টাফ জন কেলি প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ওই বইয়ে সমালোচনার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে তার ডেস্ক থেকে সিনিয়র সহযোগীরা স্পর্শকাতর ডকুমেন্ট নিয়ে নিয়েছেন এমনটাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। মঙ্গলবার দিনের শেষের দিকে আবারো টুইটারে ফেরেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনসকে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ এবং ‘দক্ষিণাঞ্চলের এক নির্বোধ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন বলে বইটিতে যে কথা রয়েছে তাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি জেফ সহ অন্য কারো বিরুদ্ধে কখনো ওইসব শব্দ ব্যবহার করেন নি। কারণ, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ মহান হয়।
উল্লেখ্য, রাশিয়া তদন্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার পর জেফ সেশনস বহুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনার শিকারে পরিণত হয়েছেন। বব উডওয়ার্ডের লেখা বইটির প্রকাশনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে লেখালেখি চলছে। হোয়াইট হাউসের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের অনুমান তাদের প্রায় সবাই ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উদ্‌ঘাটনকারী সাংবাদিক বব উডওয়ার্ডকে সহযোগিতা করেছেন। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি সারা হ্যাকাবি স্যান্ডার্স ওই বইয়ের কাহিনীকে বানোয়াট ছাড়া কিছু নয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, সাবেক অনেক হতাশাগ্রস্ত কর্মী প্রেসিডেন্টের দুর্নাম ছড়ানোর জন্য এমন গল্প ফেঁদে থাকতে পারে। এ নিয়ে বব উডওয়ার্ড কোনো মন্তব্য করেন নি।
এ বইয়ে চিফ অব স্টাফ জন কেলিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি ট্রাম্পের মানসিক বিকার নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। এক পর্যায়ে তিনি ট্রাম্পকে ইডিয়ট বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তবে এ অভিযোগ মঙ্গলবার অস্বীকার করেছেন কেলি। এ বইয়ে আরো বলা হয়েছে, রাশিয়া তদন্ত নিয়ে ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী জন দোউদ। এই তদন্ত থেকে ট্রাম্প নিজেকে এড়াতে পারবেন কিনা তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে তিনি রাশিয়া তদন্ত নিয়ে স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুলারের সাক্ষাৎকারকে বুঝিয়েছিলেন। জন দোউদ জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, সাক্ষ্য দেবেন না। এটা হয়তো একটি অরেঞ্জ জাম্পসুট। তবে মঙ্গলবার এ কথা অস্বীকার করেছেন তিনি। ওই বইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম মাত্তিসকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি একবার ট্রাম্পকে ব্যাখ্যা করছিলেন উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মনিটরিং নিয়ে কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েনের বিষয়ে। মাত্তিস এক পর্যায়ে বলেন, আমরা তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধের জন্য এটা করছি। বইটিতে বলা হয়েছে, ওই সাক্ষাৎ নিয়ে জিম মাত্তিস তার ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন যে, তার কথা শুনে বোঝার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ গ্রেডের একজন শিক্ষার্থীর মতো আচরণ করছিলেন। তবে জিম মাত্তিস এমন কথা কখনো উচ্চারণ করেন নি বলে এক বিবৃতিতে বলেছেন। পেন্টাগনের মুখপাত্র কর্নেল রব ম্যানিং বলেছেন, বব উডওয়ার্ড কখনোই জিম মাত্তিসের সাক্ষাৎকার নেন নি।

সৌদি রাজপরিবারে ফাটল! অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

সৌদি আরবে রাজপরিবারের ভিতর সম্পর্কের ফাটল ধরার যে জল্পনা চলছে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন সৌদি আরবের বাদশা সালমানের ভাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজ আল সাউদ। বাদশা  সালমানের ছেলে ক্রাইন প্রিন্স যেভাবে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে ভিন্নমতাবলম্বীদের, বিশেষ করে বেশ কয়েকজন প্রিন্স, সুপরিচিত ধর্মীয় নেতা, নারী ও মানবাধিকার কর্মীকে তাতে রাজ পরিবারের সম্পর্কের ভিতর দ্বন্দ্বের আভাষ মিলেছে। লন্ডনের একটি জনসমাবেশে প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজ আল সাউদ যে বক্তব্য রেখেছেন সৌদি আরবের রাজ পরিবারের বিরুদ্ধে তাকে কেন্দ্র করে এমন আভাস, কানকথা ছড়িয়ে পড়েছে। ওই সমাবেশে তার দেয়া বক্তব্যের ব্যাপক প্রচার হয়েছে অনলাইনে। এতে তিনি তিন বছরে ইয়েমেনে সৌদি আরবের জড়িত থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন ‘এটা নিয়ে ওই পরিবারটি কি করেছে? অবশ্যই এর জন্য ব্যক্তিবিশেষ- বাদশা ও ক্রাউন্স প্রিন্স দায়ী’। কিন্তু এমন বক্তব্য দেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজ আল সাউদ। রিয়াদ থেকে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। ইয়েমেন যুদ্ধে সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে বলে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘ। এই যুদ্ধে সৌদি আরবের বড় ভূমিকা আছে। কিন্তু তা নিয়ে সেদেশের রাজপরিবারের ভিতর থেকে সমালোচনা বেরিয়ে আসা এক বিরল ঘটনা। তাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজ আল সাউদের মন্তব্যকে লুফে নিয়েছে অনলাইনের অসংখ্য ব্যবহারকারী। বহু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রচার হয়েছে। তবে এমন বক্তব্যকে যথাযথ নয় বলে নিজের বক্তব্যকে বা ছড়িয়ে পড়া জল্পনাকে অস্বীকার করেছেন প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজ আল সাউদ। মঙ্গলবার সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি তার একটি বক্তব্য প্রকাশ করেছে। তাতে তিনি বলেছেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলেছি যে, বাদশা ও ক্রাউন প্রিন্স রাষ্ট্র ও এর সব সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য দায়িত্বশীল। দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য এটা সত্য ঘটনা। তাই আমি যা বলেছি আমার সেই বক্তব্যকে অন্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে’।
ওদিকে সৌদি আরবের রাজপরিবারের মধ্যে ঐক্য প্রদর্শন করতে সৌাদি আরবপন্থি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো প্রিন্স আহমেদ বাদশা সালমানের হাতে চুমু খাচ্ছেন এমন ছবি প্রচার করেছে। এমন অনেক ছবি প্রচার হয়েছে। উল্লেখ্য, সৌদি আরবের রাজপরিবারের ভিতরকার আভ্যন্তরীণ বিষয় গোপন রাখা হয়। তাদের মধ্যে মতের অমিলের কথা বাইরে বের হয় না বললেই চলে। এমন ঘটনা বিরল। তবে সৌদি আরব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জেমস ডোরসি বলেছেন, লন্ডনের যে ঘটনা তা বলে দেয় ইয়েমেনে সৌদি আরবের সাড়ে তিন বছরের একটি বাজে যুদ্ধ নিয়ে আভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তার ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে দমনপীড়ন চালাচ্ছেন যখন ঠিক সেই মুহূর্তে এমন বক্তব্য করেছেন প্রিন্স আহমেদ। ক্রাউন প্রিন্স হলেন ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের পরিকল্পনাকারী। এ নিয়ে তার ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ওই যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার ইয়েমেনি নিহত হয়েছেন। অসংখ্য মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে।

৫ মিনিটে শনাক্ত হবে ক্যানসার: বাংলাদেশি গবেষকদের যুগান্তকারী উদ্ভাবন

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই আগে থেকে শনাক্ত করা যাবে ক্যানসার। এই পরীক্ষায় খরচ হবে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা আর সময় লাগবে মাত্র পাঁচ মিনিট। ক্যানসার শনাক্তকরণে অন্য যেকোনো পরীক্ষার চেয়ে এই পদ্ধতিই ইউনিক। এমনকি রক্তের অন্য কোনো পরীক্ষা করার সময়ও জানা যাবে তার ক্যানসার আছে কিনা? আগামী এক বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তির ডিভাইস তৈরি করা সম্ভব হবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) উদ্ভাবিত ক্যানসার শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ২৫ সদস্যের গবেষণা টিম কাজ করছে। এর নেতৃত্বে ছিলেন শাবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন হক। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘নন-লিনিয়ার অপটিক্স ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পটি উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রকল্প হেকেপের আওতায় গৃহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সহায়তায় এই হেকেপ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রথমেই শাবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নন-লিনিয়ার বায়ো-অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা হয়। এই ল্যাবরেটরিতে ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের রক্তের সিরামে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে নন-লিনিয়ার সূচক পরিমাপ করার কাজ শুরু হয়। বায়ো-কেমিক্যাল প্রক্রিয়ায় যে বাড়তি রি-এজেন্ট ব্যবহার করতে হয় উদ্ভাবিত নতুন পদ্ধতিতে তা প্রয়োজন হয় না। প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন একটি পদ্ধতিতে রক্ত পরীক্ষা করে সম্ভাব্য ক্যানসারের ভবিষ্যদ্বাণী করার একটি সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। এটি অল্প খরচে এবং কম সময়ে করা সম্ভব হবে। এই উদ্ভাবনী প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে শুধু ক্যানসার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্ত নয়, অন্য যেকোনো স্যাম্পলের নন-লিনিয়ার ধর্মী পরীক্ষা খুবই সহজে ও সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। বাংলাদেশের জন্য এটা ঐতিহাসিক ঘটনা। সংবাদ সম্মেলনে উদ্ভাবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন গবেষক দলের প্রধান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ইয়াসমীন হক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. নাস কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর রক্তের সিরামে একটা চেঞ্জ আসে, সেটা নন-লিনিয়ার অপটিক্স ব্যবহার করে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আগে ভাগেই পূর্বাভাস পাওয়া যাবে। সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ, ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. ইউসুফ আলী মোল্লা,  হেকেপ প্রকল্প পরিচালক ড. গৌরাঙ্গ চন্দ্র মোহান্ত, বিশ্ব ব্যাংকের চিফ অপরেশনস অফিসার ড. মোখলেছুর রহমান প্রমুখ।

স্কুলছাত্র রিয়াদ হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা by মতিউল আলম

চুরির অপবাদে গফরগাঁওয়ে অষ্টম শ্রেণির স্কুলছাত্র রিয়াদ (১৪)কে গাছে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার পর থেকে বাকপ্রতিবন্ধী রিয়াদের মা মাবিয়া আক্তার ও তার পরিবারের আহাজারি থামছে না। সরজমিন তাদের বাড়িতে গেলে রিয়াদের প্রতিবন্ধী মা মাবিয়া কখনো ছেলের বই দেখিয়ে, কখনো ছেলের ব্যবহৃত সাইকেল, আবার কখনো ছেলের খেলার জিনিসপত্র ও কাপড় চোপড় বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছেন। প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের ছোট ভাই ৫ম শ্রেণির ছাত্র রিফাত জানায়, ‘তার চোখের সামনেই তার ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় তার ভাই বাঁচার জন্য আকুতি করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।
রিয়াদের কলেজ পড়ুয়া বোন নীলফুল নাহার শান্তা জানায়, নির্যাতনকারীদের কাছে গিয়ে আমার ভাইয়ের প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও তারা নির্যাতন বন্ধ করেনি। এদের সবার হাতে দা-লাঠি থাকায় ভয়ে কাছে যেতে পারেনি পরিবারের কেউ। যারা আমার ভাইকে পৈশাচিক নির্যাতন করে হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসি চাই। প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, শিশু রিয়াদকে আটক করা হয় ভোর পাঁচটার পরে। আর নির্যাতন চলে দেড় ঘণ্টারও বেশি। সকাল ৭টার দিকে ছেলেটির মৃত্যুর পর ক্ষান্ত দেয় নির্যাতনকারীরা। আর এরপর ঘটনাস্থল নয়, এলাকাও ছেড়ে পালিয়ে যায় তারা। রিয়াদ ঘাগড়া-উথুরী-ছিপান উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে উথুরী গ্রামের সৌদি প্রবাসী সাইদুর রহমান শাহীনের ছেলে।
চুরির অপবাদ দিয়ে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া শিশু রিয়াদকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে নির্মম, পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। স্থানীয় ৩য় শ্রেণির ছাত্র ইয়াছিন, ৫ম শ্রেণির ছাত্র শাকিবুল, ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ফাহাদ, নাসিমা (৫০), ফালানী খাতুন (৬০), আহাদ মিয়া (৫২), কাঁচামাল ব্যবসায়ী জাকির (৪০) এরা সবাই প্রত্যক্ষদর্শী। এদের সামনেই সব হয়েছে। ফলে ঘটনার এক সপ্তাহ পরও প্রত্যক্ষদর্শী শিশু, নারী-পুরুষদের চোখে-মুখে এখনো আতঙ্কের ছাপ। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী শিশুরা মাঝে মাঝেই আঁতকে উঠছিল। চোখের সামনে হত্যার দৃশ্য কিছুতেই ভুলতে পারছে না নিহতের ছোট ভাই রিফাত, ইয়াছিন ও শাকিল।
গত ৩০শে আগস্ট বৃহস্পতিবার ঘটনার সময় নিহত রিয়াদের বাক প্রতিবন্ধী মা বাড়িতে ছিলেন না। বাবার বাড়ি থেকে তাকে ফোন করে ডেকে আনা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছেই তিনি বুঝে যান তার সহজ-সরল ছেলাটাকে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় বাক প্রতিবন্ধী মায়ের গগনবিদারী কান্না ও ভাই-বোনের চিৎকারে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শী ছিপান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্র শাকিবুল জানায়, সে ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাকা তাল সংগ্রহের জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। পরে ঘাগড়া টাওয়ারের মোড় বাজারের কাছে গেলে রিয়াদের চিৎকার শুনে এগিয়ে গিয়ে শোনে একজন বলছে এক ঘণ্টা হয়ে গেছে এখনো পা ভাঙতে পারলি না কেন? তখন রাশিদ পেটাতে শুরু করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সোহেল নামে আরেকজন পেটায়। পরে রিয়াদ পানি পানি করে চিৎকার করছিল। কেউ পানি না দেয়ায় রিয়াদ আবারো চিৎকার করে বলছিল আমাকে পাশের ক্ষেতে ফেলে দেন। সেখান থেকে আমি একটু পানি খাই। এভাবে বার বার মিনতি করতে করতে রিয়াদ নিস্তেজ হয়ে পড়লে নির্যাতনকারীরা কাঠের মাচানে করে পাশের একটি পতিত জমিতে ফেলে দেয়।
স্থানীয় উথুরী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ফাহাদ জানায়, ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি রিয়াদ পানির জন্য কাকুতি মিনতি করছে। তখনও তার উপর নির্যাতন চলেছে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ফালানী খাতুন বলেন, জীবনে এমন নিষ্ঠুর, নির্মম, পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড আর দেখেনি। রিয়াদকে বেদম মারধরের এক পর্যায়ে সে বলতে থাকে ও বাবারে আমারে আপনেরা মাইরা ফেলেন, তবুও আমারে একটু পানি দেন। আমি পানি নিয়ে এগিয়ে গেলে নির্যাতনকারীরা আমাকে মারতে উদ্যত হয়। তবু ছেলেটাকে পানি খাওয়াতে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওদের কারণে পারিনি। জান ভিক্ষা চেয়েও বাঁচাতে পারিনি। মুমূর্ষু অবস্থায় পিপাসা মেটাতে এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত দেয়নি পাষণ্ড হত্যাকারীরা।
নিহত শিশু রিয়াদ হত্যার ঘটনাস্থল উপজেলার গফরগাঁও ইউনিয়নের ঘাগড়া টাওয়ার মোড় বাজারে সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে- স্তব্ধ, সুনসান নীরব। এ হত্যাকাণ্ডের পর কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেনি। সারা গ্রামজুড়ে শোকের পরিবেশ। রিয়াদের বাড়িতে ও ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের খুঁজে বের করে হত্যার বর্ণনা শোনার সময় সবার চোখে-মুখেই আতঙ্ক বিরাজ করছিল। বিশেষ করে প্রত্যক্ষদর্শী শিশুরা ছিল বেশি আতঙ্কিত।
হত্যাকাণ্ডের পর পরেই গা-ঢাকা দেয় অপরাধীরা। গত ৩০শে আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৯ জনকে আসামি করে নিহত রিয়াদের ফুফা আবদুর রাজ্জাক বাদী হয়ে গফরগাঁও থানায় মামলা দায়ের করলেও এখনো পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। এদিকে হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছে রিয়াদের সহপাঠী, শিক্ষক, পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসী। গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ খান বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ জোরালো অভিযান চলছে।