Tuesday, December 1, 2015

সাত খুন মামলার চার্জশিট মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ : হাইকোর্ট

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার চার্জশিটে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। এই মামলায় অধিকতর তদন্ত চেয়ে নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির করা রিট আবেদনের শুনানিতে আজ মঙ্গলবার আদালত এই মন্তব্য করেন।
শুনানির এক পর্যায়ে বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, সাত খুন মামলার চার্জশিট আমি পর্যালোচনা করে দেখেছি। পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও চার্জশিট পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছে, এতে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে।
আবেদনকারীর আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, আমি ত্রুটির বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করবো না। আপনারা অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করুন। পর্যালোচনা করে ত্রুটির বিষয়টি বের করুন। এরপর আবেদনকারীর আইনজীবীর সময় বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী রোববার এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট।
সাত খুন মামলার চার্জশিট দাখিলের পর এর বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন জানায় নিহত কাউন্সিলের নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। কিন্তু তার আবেদন নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এবং জেলা ও দায়রা জজ খারিজ করে দেন। ওই খারিজের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। এতে মামলাটির অধিকতর আবেদন জানানো হয়। গত ২৯ নভেম্বর এই আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়।
শুনানির শুরুতেই আবেদনকারীর আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, মামলার বাদি এজাহারে যাদের আসামি করেছিলেন, তাদের মধ্যে চার্জশিটভুক্ত পাঁচজনের নাম বাদ দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এছাড়া এই মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন দেশের বাইরে ছিলো। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাওয়া যায়নি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পেলে অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বিচারপতি এম ইনায়তুর রহিম বলেন, মামলার চার্জশিট হয়ে গেছে। এখন নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ আছে কি-না? যদি থাকে তাহলে এর নজির দেখান।
এ সময় আদালত আরো বলেন, অধিকতর তদন্তের নামে এই মামলার বিচারের কাজ যদি কোনো কারণে বিলম্বিত হয়, তাহলে যারা ভেতরে (আসামি) আছেন, তারা না আবার সুযোগ নেয়। আবার এটিও সত্যি- যারা এই মামলার আসামি তাদের সকলেরই বিচার হওয়া দরকার।
এক পর্যায়ে বাসেত মজুমদার প্রস্তুতির সময় চাইলে আদালত রবিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল দুপুরে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড থেকে অপহরণ করা হয়। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের এবং ১ মে অপরজনের লাশ পাওয়া যায়। নিহত অপর পাঁচজন হলেন- নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম। এ ঘটনায় নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ফতুল্লা মডেল থানায় নূর হোসেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়া, হাসমত আলী, আমিনুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন ও ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ ছাড়া চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল একই ঘটনায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একই থানায় আরেকটি মামলা করেন।

জলবায়ু চুক্তি না হলে কী ঘটবে?

বিশ্বের জলবায়ু পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রতিকূল আবহাওয়াসহ বিভিন্ন সংকটের মুখামুখি হচ্ছে বিশ্ব। এজন্য বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি উন্নয়নে জলবায়ু চুক্তির বিকল্প কিছু নেই। উষ্ণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি : জলবায়ু চুক্তি ছাড়া বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সম্মত হবে না কেউই। এজন্য নতুন প্রজন্মকে ‘গ্রিনবিশ্ব’ উপহার দিতে জলবায়ু চুক্তির গতান্তর কিছু নেই। জলবায়ুবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি)
তথ্য মতে, বিগত শতকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি : ২০১২ সালে প্রকাশিত আইপিসিসির তথ্য অনুসারে, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৬ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৮২ ডিগ্রি সেন্টিমিটারে উন্নিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য মতে, জাতিসংঘ প্রণীত বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব না হলে বিশ্বের প্রায় ২৮০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খারাপ আবহাওয়া : বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হাড় কাঁপানো শীত, মারাত্মক ঝড়, অবাধ্য তাপ প্রবাহের মত ভয়াবহ প্রকোপ সাধারণ ব্যাপার। গবেষণায় পাওয়া তথ্য মতে, জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ না নিলে বন্যা, খরা, তুষার ঝড়, টাইফুন, হ্যারিকেনের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হবে।
পানি সংকট : দীর্ঘমেয়াদি খরা ও বিধ্বংসী বন্যার একটাই কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা। জলবায়ু চুক্তির বাস্তবায়ন না হলে বিশ্বে অধিকাংশ জায়গায় পানির অভাব দেখা দেবে বলে বিশ্বাস করেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
মানবিক সংকট : প্রাণহানিকর রোগ, ফসলের ক্ষতি বিশ্বের দারিদ্র্যের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। পানির স্বল্পতা ও ফসলের অপ্রতুলতার কারণে যুদ্ধ ও ভয়াবহ শরণার্থী সংকট দেখা দেবে। মালদ্বীপ, ফিলিপিন্স ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল তলিয়ে যাবে।

মুসলিম-খ্রিস্টান ভাই-ভাই

মুসলিম ও খ্রিস্টানরা একে অপরের ভাই। তাদেরকে এক সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করার পরামর্শ দিলেন ভ্যাটিকানের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস। খ্রিস্টান মিলিশিয়াদের আত্মসমর্পণের কথা বলেন তিনি।
রোববার আফ্রিকা সফরের শেষ দেশ হিসেবে সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকে যান পোপ ফ্রান্সিস। সেখানে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় মসজিদে গিয়ে ইমাম নেহেদিদ তিদজানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। দেশটিতে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের দাঙ্গায় ১৫ হাজারের মতো লোক নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে বহু লোক।

জাপানে সবচেয়ে বড় মসজিদ উদ্বোধন

জাপানে সবচেয়ে বড় মসজিদের উদ্বোধন করা হয়েছে। দেশটির নাগোয়া শহরের কাছে নির্মিত নতুন এ মসজিদের উদ্বোধন করা হয়। আর এর মধ্য দিয়ে পূর্ব এশিয়ার এ দেশটির সঙ্গে ইসলাম ধর্মের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে একথা জানানো হয়েছে। ‘বায়েত-উল আহাদ’ নামে এ মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে বেশ রাজকীয় নির্মাণশৈলীতে। এর মূল ভবনে একসঙ্গে ৫০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। ১৯৩৫ সালে জাপানে কোব মুসলিম মসজিদ নামে প্রথম একটি মসজিদ স্থাপিত হয়। এছাড়া দেশটির যেসব অঞ্চলে মুসলমানরা বাস করেন,
সেখানে ছোট ছোট মসজিদ স্থাপিত হয়েছে যেগুলো বেশির ভাগই মুসলমানদের কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৩৫ সালেই জাপানে আসেন আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন। তবে এবারই প্রথম তারা নিজেদের জন্য নিজ অর্থায়নে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে সক্ষম হলেন। জাপানের সবচেয়ে বড় এ মসজিদটির উদ্বোধনী দিনে জাপানের রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের দুই কোটি আহমদিয়া মানুষের সর্বোচ্চ নেতা খলিফা মির্জা মাসরুর আহমাদ।

৪৮ গরিব রাষ্ট্র বিপদে

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বিপদে রয়েছে ৪৮টি গরীব রাষ্ট্র। জলবায়ু পরিবর্তনে নেয়া পরিকল্পনা পূরণে বিশ্বের ৪৮টি গরিব রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে প্রয়োজন হবে মাত্র ১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ফান্ড। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য ২০২০-২০৩০ সালের মধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের। ফ্রান্সের প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে জাতিসংঘকে এ পরিকল্পনার খসড়া প্রেরণ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর ৯৩ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করবে দরিদ্র দেশগুলো। লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর ইনভার্নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইইডি) রিপোর্ট অনুসারে, এ পরিকল্পনার আওতায় কার্বন নিঃসরণ কমাতে বার্ষিক ৫৩.৮ বিলিয়ন ডলার এবং বৈরী আবহাওয়া ও সমুদ্র উত্তাল নিয়ন্ত্রণে ৩৯.৯ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করবে স্বল্পোন্নত দেশগুলো। আইআইইডির পরিচালক এন্ড্রিউ নর্টন বলেন, ধনী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে প্রদত্ত অর্থ সহায়তার খুব সামান্য অংশই যায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তহবিলে। তিনি আরও বলেন, প্যারিসে কপ-২১ সম্মেলনের মাধ্যমে একটা অবাধ ও কার্যকরী চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে অর্থ তহবিল গঠনে সহায়তা দেবে জাতিসংঘ। ইথিওপিয়া, জাম্বিয়া, ইয়েমেন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে খরা, বন্যা, ঝড় ও উপকূলবর্তী জলোচ্ছ্বাসের কারণে অনেক ভোগান্তিতে আছে। এসব দেশে অর্থনৈতিক উৎসের অপ্রতুলতা থাকায় বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে পারছে না। তারপরেও অধিকাংশ স্বল্পোন্নত দেশ বিশ্বকে বাঁচানোর প্রত্যয়ে শামিল হওয়ার চেষ্টা করছে। আইআইইডির রিপোর্ট অনুসারে, বুরকিনা ফাসো, জিবুতি ও জাম্বিয়া- এই ৩ দেশ তাদের নিজেদের সীমানার মধ্যে অর্থের উৎস বের করার ব্যাপারে ‘অভূতপূর্ব প্রতিশ্র“তি’ প্রদান করেছেন। জলবায়ু গবেষণায় ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আশ্বাস! যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ১৯টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ক্লিন এনার্জি রিসার্চে (পরিবেশবান্ধব জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা) পাঁচ বছরের জন্য ২০ বিলিয়ন বা দুই হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের অঙ্গীকার করেছে।
টেকজায়ান্ট মাইক্রোসফটের স্বত্বাধিকারী বিল গেটস ও ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ এ সংক্রান্ত গবেষণায় আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। গবেষণায় তহবিল বাড়ানোর প্রচারণায় নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও রয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীন, ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এ দেশগুলোই বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর পরিচালক ও কার্বন নির্গমনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। এ দেশগুলোর প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিল গেটস, জর্জ সোরস, মেগ হোয়াইটম্যান ও মার্ক জাকারবার্গ, ভারতের রতন টাটা ও মুকেশ আম্বানি এবং চীনের জ্যাক মা পরিবেশবিষয়ক গবেষণার জন্য বাড়তি ব্যয়ের বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। হোয়াইট হাউসের সিনিয়র অ্যাডভাইজার ব্রিয়ান ডেসি বলেন, ‘এ প্রতিশ্রুতির ফলে বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর প্রতি এ সংকেত পৌঁছাচ্ছে যে পরিবেশের বিপর্যয় রোধে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং স্বল্প ব্যয়ে তাদের অর্থনীতির ওপর চাপ না ফেলেই এ সমাধান সম্ভব।’ ক্লিন এনার্জি খাতে ব্যয় করার জন্য শিল্পপতিদের নিয়ে গঠিত এ জোটে প্রায় ১৯ সরকার ও ২৮ জন বিশ্ব ধনকুবের থাকবেন। যৌথ এ উদ্যোগটির ওপর থেকে পর্দা উঠবে মিশন ইনোভেটিভের মাধ্যমে। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ভারতের প্রদানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এরই মধ্যে ক্লিন এনার্জির গবেষণা ও বাস্তবায়নে তাদের তহবিল দ্বিগুণ করতে সম্মত হয়েছে। এদিকে বিল গেটসসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করবেন।

কোটি টাকার পানিফল বাণিজ্য

দেওয়ানগঞ্জে পানিফল চাষীদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে। এবছর পরিত্যক্ত জলাশয়ে আড়াই কোটি টাকার পানিফল চাষ হয়েছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রায় ১’হাজার নারী-পুরুষ পানিফল ক্রয়-বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
বিভিন্ন এলাকায় পানিফল শুকিয়ে আটা তৈরী করে রুটিসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হচ্ছে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাসহ আশপাশ এলাকায় পরিত্যক্ত জলাশয়ে পানিফল চাষ হয়। উৎপাদিত পানিফল প্রক্রিয়াজাত করে গ্লুকোজ তৈরি করা যাবে বলে মনে করেন কৃষিবিদরা।

১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্লাস্টিক শিল্পনগরী

দেশে প্লাস্টিক খাতের বিকাশে ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন শিল্পনগরী হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) ধলেশ্বরী নদীর কাছে ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কের পাশে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় এ শিল্পনগরী স্থাপন করা হচ্ছে। আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিতব্য এ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন। জানা গেছে, এ শিল্পনগরীটি গড়ে উঠলে পুরান ঢাকার আশপাশে অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে ওঠা কারখানাগুলোকে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে এটি তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ হাজার ৩০টি প্লাস্টিক শিল্পকারখানা রয়েছে। যার অধিকাংশই বেসরকারি মালিকানাধীন। এর মধ্যে ৫০টি বড়, ১ হাজার ৪৮০টি মাঝারি এবং প্রায় ৩ হাজার ৩০টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে ৮০ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক এবং ক্ষুদ্র কারখানার ৯০ শতাংশই পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত। প্লাস্টিক শিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এ শিল্পের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ঘটেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে হলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের অবদান বহু গুণ বাড়ানো সম্ভব। প্লাস্টিক শিল্পগুলো মূলত বেসরকারি উদ্যোগে বেশিরভাগই অপরিকল্পিত, অপরিসর এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে উঠেছে। এতে পরিবেশগত ভারসাম্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। এ কারণে এসব শিল্পকে ঢাকা শহরের নিকটবর্তী কোনো পরিবেশসম্মত স্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২০০৮ সালের পর ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জে চরগুলগুলিয়া নামক স্থানে শিল্পনগরীটি স্থাপনের জন্য বিসিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি)
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এরপর একনেক সভায় তা অনুমোদন দেয়া হয়নি। ওই সভায় ৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণের যৌক্তিকতা ও অধিগ্রহণের বিষয়ে পুনঃপরীক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়। এ বিষয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশ এবং মন্ত্রণালয়ের এডিপি সভায় নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য ২৫ একর জমির প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্লাস্টিক শিল্প মালিকরা ১০০ একর জমির ওপর শিল্পনগরীটি স্থাপনের দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পমন্ত্রী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ড্যাপের কারণে ইতিপূর্বে কেরানীগঞ্জের চিহ্নিত স্থানটি স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়। এ পর্যায়ে বিসিক নতুনভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্গত বড়বর্তা এলাকায় নতুনভাবে স্থান নির্বাচন করে। সম্ভাব্যতা কমিটি প্রকল্পের আয়তন ৫০ একর করার সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশ ও শিল্পমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রকল্পটির আকার ৫০ একর ধরে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। গত ২৫ মে প্রকল্পটির ওপর পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে এটির প্রক্রিয়াকরণ সমাপ্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্পশক্তি বিভাগের সদস্য এসএম গোলাম ফারুক বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিল্পনগরীতে ৩৭০টি শিল্প প্লট স্থাপিত হবে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ মহিলা উদ্যোক্তার জন্য সংরক্ষণ করা হবে। ৩৭০টি প্লটে কমবেশি ৩৬০টি শিল্প ইউনিট স্থাপিত হবে। এসব শিল্প ইউনিটে ১৮ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এসব বিবেচনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্মূল হবে জঙ্গিবাদ

ডিসেম্বর মাস এলেই আমাদের ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের কথা মনে পড়ে। একাত্তরের ডিসেম্বরে আমরা একটা ভয়ংকর আতংকের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু এই ডিসেম্বরেই আতংকগুলো কেটে যাচ্ছিল, কারণ সবাই এটা বুঝতে পারছিল পাকিস্তানিরা পারবে না, তাদের পরাজয় হবে। কিন্তু পরাজয়ের মুখে হানাদার পাকসেনারা ১৪ ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ভয়ানক যে ঘটনাটি ঘটায় সেই শোকাবহ ঘটনাটি আমাদের বিজয়ের আনন্দকে বিষাদে পূর্ণ করে তোলে। তাই আমাদের বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে বিষাদও জড়িয়ে গিয়েছিল। যারা শহীদ হলেন তারা আমাদেরই সহকর্মী-বন্ধু-ভাই ও আত্মীয়স্বজন। তাই আমাদের বিজয়ের আনন্দ অবিমিশ্র ছিল না। এত বড় ক্ষতি হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে একটা আশা ছিল, আমরা এ ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। স্বপ্ন ছিল আমরা যে নতুন দেশটি পেলাম সেটি আমরা গড়ে তুলতে পারব। ১৬ ডিসেম্বর আমরা যেন একটা রোগ থেকে মুক্তি পেলাম।
আমরা যে স্বপ্ন দেখতাম সেই স্বপ্ন আবার দেখতে শুরু করলাম। আমরা একটা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতাম, যে বাংলাদেশ একটা নতুন ধরনের রাষ্ট্র হবে, তার সমাজ হবে বৈষম্যহীন। যে দেশে সব মানুষের অধিকার এবং সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু গত ৪৪ বছরে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত তো হয়ইনি বরং যা ছিল অকল্পনীয় তাই ঘটেছে জঙ্গিদের উত্থানের মধ্য দিয়ে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি আলবদর বাহিনীর বর্বরতার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। একাত্তরে তাদের পৃষ্ঠপোষক হানাদার পাকসেনাদের পরাজয়ের মাধ্যমে ভাবা গিয়েছিল এদের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে কিন্তু তা ঘটেনি। ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হয়নি, বিচার করা হয়নি তাদের সহযোগীদেরও। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এরা আবার বেড়ে উঠেছে। পুনর্বাসিত হয়েছে সমাজে। আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম সে সময়, আলবদর একটি রোগের নাম- সুযোগ পেয়ে, পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আবার বেড়ে উঠেছে সেই রোগ। এই রোগ ফিরে আসার কারণ হচ্ছে এ রোগের লালনক্ষেত্র রয়েই গেছে। এ দেশে সব মানুষের অধিকার এবং সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি, সমাজটিকে মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়নি। এখানে মানুষের অধিকারগুলো স্বীকৃতি পায়নি। এখানে মানুষের নিরাপত্তা বাড়েনি। সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, দেশে এখন মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা বিশ ভাগ;
তার অর্থ হচ্ছে শতকরা আশি ভাগ মানুষ হচ্ছে দরিদ্র। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে বঞ্চনা বোধ ও বিক্ষোভ আছে। বিনিয়োগের অভাবে বেকারত্ব আছে সর্বোপরি আছে নিরাপত্তাহীনতা। এসব মিলে বর্বরতার পুরনো রোগটিকে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে। শিক্ষাকে সার্বজনীন করা যায়নি। চালু করা যায়নি অভিন্ন শিক্ষাপদ্ধতি। মাতৃভাষার মাধ্যমে সবার জন্য একই শিক্ষার ব্যবস্থা না করায় সমাজে বৈষম্যের সূচনা ঘটছে শুরু থেকেই। উচ্চবিত্তদের সন্তানদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমে বিদেশী কারিকুলাম অনুযায়ী, মধ্যবিত্তদের জন্য একরকম আর দরিদ্রদের সন্তানদের জন্য মাদ্রাসা। দেশে এত মাদ্রাসা পাকিস্তান আমলেও ছিল না। গরিব মানুষের সন্তানরা মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে কর্মহীন জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। খুব সহজেই এদেরকে বিভ্রান্তি পথে পরিচালিত করা সম্ভব হচ্ছে। এদের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্ররাও জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আলবদর এই রোগের মূল উৎপাটনের জন্য তাই বাংলাদেশের জন্মলগ্নের স্বপ্ন সব মানুষের অধিকার এবং সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত করার কোনো বিকল্প নেই। ডিসেম্বর মাস আমাদের সে কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

কেরানীগঞ্জে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক কেমিক্যাল উদ্ধার

দেশকে অস্থিতিশীল করতে যখন বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখন রাজধানীর পাশে কেরানীগঞ্জ থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক কেমিক্যাল উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার দিনব্যাপী অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন গোডাউন থেকে ৫২৯ ড্রাম রাসায়নিক কেমিক্যাল উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। বিষয়টি আইনশৃংখলা বাহিনীকেও ভাবিয়ে তুলেছে। আশংকা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব নাশকতার ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে এই কেমিক্যাল মজুদ করার মধ্যে বিশেষ যোগসূত্র থাকতে পারে। এসব কেমিক্যাল ব্যবহার করে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের সময় বড় ধরনের নাশকতামূলক সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টিও তারা উড়িয়ে দিতে চান না। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ড্রামে ভয়ংকর রাসায়নিক কেমিক্যাল রয়েছে। প্রতিটি ড্রামে যে পরিমাণ দ্রব্য রয়েছে তা বিস্ফোরিত হলে ওই এলাকা নিমেষেই ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হবে। এছাড়া এগুলো বহনের সময় রাসায়নিক কেমিক্যাল বাতাসে ছড়িয়ে আশপাশের পরিবেশকেও দূষণ করছে। এদিকে বিষয়টি নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ছাড়াও আইনশৃংখলা বাহিনী ইতিমধ্যে এর পেছনে জড়িত মূল হোতাদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে।
ইতিমধ্যে কেরানীগঞ্জের ব্রাহ্মণকিত্তা এলাকায় অবস্থিত গোডাউনটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। জব্দ করা বিস্ফোরকদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে মিথাইলিন ক্লোরাইড ২২ ড্রাম, গ্লিসারিন ৫২ ড্রাম, ড্রাই ইথাইল গ্লু ক্রাইড ৫৬ ড্রাম, ডাইক্লো মিথেন ৩২১ ড্রাম, অন্যান্য রাসায়নিক কেমিক্যাল ৭৮ ড্রাম। এ প্রসঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ঢাকার সহকারী পরিচালক মো. তারেক মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা মেসার্স সাইজু এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানটির গোডাউনে অভিযান চালান। এরপর সেখান থেকে মজুদ করে রাখা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক কেমিক্যাল জব্দ করা হয়। জব্দ করা রাসায়নিকের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো দ্রুত পরীক্ষা করা হবে। তিনি জানান, গোডাউনটি সিলগালা করার পাশাপাশি এসব রাসায়নিক কেমিক্যালের মালিককে আমদানি ডকুমেন্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব কেমিক্যাল ভারত, চীন ও কোরিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছে। তবে যে কেমিক্যালের নাম দিয়ে এগুলো আমদানি করা হয়েছে বাস্তবে ড্রামে সেই কেমিক্যাল আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। জানা যায়, সোমবার বেলা ২টার দিকে অভিযান শুরু করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। অভিযানে নেতৃত্ব দেন শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তারেক মাহমুদ ও ওমর ফারুক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শিপু সরকার ও সবুজ মিয়া। বেলা ২টার দিকে গোডাউনে প্রবেশ করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের আভিযানিক দল। এ সময় এত বিপুল বিস্ফোরকদ্রব্য দেখে কর্মকর্তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তারা মোবাইলে যোগাযোগ করেন বিস্ফোরকদ্রব্য আমদানিকারক সারফুদ্দিনের সঙ্গে। তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়। কিন্তু তিনি নানাভাবে কালক্ষেপণ করে সন্ধ্যার দিকে প্রিন্স নামে তার এক ব্যবসায়িক পার্টনারকে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু এসব কাগজ যথাযথ কিনা তা নিয়ে শুল্ক বিভাগের সন্দেহ হওয়ায় সেগুলো অধিকতর যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শুল্ক বিভাগ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত গোডাউনটি সিলগালা করে দেয়া হয়। এরপর শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পার্শ্ববর্তী গদারবাগে সোনার বাংলা আবাসন প্রকল্পের ভেতর আরও দুটি গোডাউনে অভিযান চালান। গোডাউনের একটির মালিক প্রিন্স। অপরটির মালিককে পাওয়া যায়নি।
প্রিন্সের গোডাউনে নীল রংয়ের কিছু ড্রাম পাওয়া যায়। তবে সেগুলো ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। এগুলোর মধ্যে থাকা রাসায়নিক কেমিক্যাল আগেই বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে মালিক না থাকায় অপর গোডাউনে ঢুকতে পারেননি শুল্ক গোয়েন্দারা। জানা যায়, সারফুদ্দিন ও প্রিন্স নামে দুই ব্যক্তি রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় কেমিক্যালের ব্যবসা করেন। এজন্য তারা বিদেশ থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক ও বিস্ফোরকদ্রব্য আমদানি করেন। আমদানি ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রাসায়নিক ও বিস্ফোরকদ্রব্য তারা মজুদ করেছেন। এগুলো অবৈধভাবে বাইরে বিক্রি করে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। আইনশৃংখলা বাহিনী ও চট্টগ্রাম কাস্টমসকে ফাঁকি দিয়ে এসব অতিরিক্ত রাসায়নিক ও বিস্ফোরকদ্রব্য কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গোডাউন বানিয়ে মজুদ করে রাখা হয়- যা সম্পূর্ণ বেআইনি। সময় সুযোগ বুঝে এসব কেমিক্যাল বাইরে বিক্রি করে দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আবাসিক এলাকায় এসব বিস্ফোরকদ্রব্য রাখার নিয়ম না থাকলেও আইনশৃংখলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে তারা আবাসিক এলাকায় গোডাউন বানিয়ে মজুদ করে রাখছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃংখলা বাহিনীর কেউ কেউ বিষয়টি জানলেও তারা রহস্যজনক কারণে চুপ থাকেন। এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি ফেরদাউছ হোসেন বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষ থেকে আমাকে ঘটনাটি জানানো হয়েছে। বিপুল রাসায়নিক কেমিক্যাল মজুদের অভিযোগে একটি গোডাউন তারা সিলগালা করে দিয়েছেন। সেখান থেকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো আসলে কি তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যাবে।

নব্বইয়েও দুরন্ত!

বয়স আসলেই একটা সংখ্যা। না হলে, নরওয়ের ৯০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা কীভাবে এমন অবলীলায় ফুটবল নাচাতে পারেন তার পায়ের ওপর! মেরি নর্দাজেন নামের এ বৃদ্ধার বল নাচানোর একটি ভিডিও ইদানীং দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে নরওয়েতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমতো ‘ভাইরাল’ তার এ ভিডিও। সবাই অবাক-বিস্ময়ে দেখছেন এ ‘বিস্ময়-বৃদ্ধা’র ফুটবল কারিশমা। পায়ের ওপর বল নাচিয়ে দারুণ একটা রেকর্ডও আছে এ মেরি নর্দাজেনের। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে, ১৫ বছর বয়সে পায়ের ওপর ১ হাজার তিনবার বল নাচিয়ে রেকর্ড করেছিলেন তিনি।
আজ ৯০ বছর বয়সেও সেই প্রতিভায় ধুলো জমেনি এতটুকুও। না, আগের মতো হাজার বার বল নাচাতে পারেন না। কিন্তু এ বয়সে যা করছেন, বয়সের তুলনায় সেটিকে ১৫ বছর বয়সের সেই কীর্তির চেয়ে কম মনে হচ্ছে না মোটেও। লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মেরি নর্দাজেনের এ ভিডিও ফুটেজটি দেখেছেন কিনা জানা নেই। এ সময়ের এ দুই বিশ্বসেরা দেখে থাকলে বৃদ্ধা মেরি নর্দাজেনে নিশ্চয় মুগ্ধ হবেন।

মেসি-রোনাল্ডোর সঙ্গে এবার নেইমার

ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটিকে একরকম ব্যক্তিগত সম্পত্তিই বানিয়ে ফেলেছেন ফুটবলের দুই দিকপাল- লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। গত সাত বছরে ঘুরে-ফিরে এ দু’জনই জিতে নিয়েছেন সব ব্যালন ডি’অর। এবারও সেই ধারায় ছেদ পড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রতিবারই ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণার সময় সবার আগ্রহ থাকে তৃতীয় নামটি নিয়ে। সেরা তিনে মেসি ও রোনাল্ডোর থাকাটা তো অলিখিত নিয়মই হয়ে গেছে। গতবার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সেরা তিনে ছিলেন ম্যানুয়েল নুয়ার। তার আগেরবার ফ্র্যাংক রিবেরি। শেষপর্যন্ত দু’জনকেই তৃতীয় হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। এবার সেরা তিনে মেসি ও রোনাল্ডোর সঙ্গে জায়গা করে নিলেন নেইমার। বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচনের জন্য ভোটিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বেশ আগেই। ফিফার প্রতিটি সদস্য দেশের জাতীয় দলের কোচ ও অধিনায়কের পাশাপাশি একজন করে সাংবাদিক এই ভোটে অংশ নেন। ভোটের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ পয়েন্ট পাওয়া তিনজনের নাম কাল প্রকাশ করেছে ফিফা।
এই তিনজনের মধ্য থেকেই আগামী ১১ জানুয়ারি জুরিখে ব্যালন ডি’অর গালা নাইটে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। বার্সেলোনা সমর্থকদের আশা ছিল, এবার ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ক্লাবের লাতিনত্রয়ী মেসি, নেইমার ও সুয়ারেজকে দেখা যাবে। কিন্তু রোনল্ডোকে হটিয়ে সেরা তিনে জায়গা করে নিতে পারেননি সুয়ারেজ। এর আগে ফিফা বর্ষসেরা একাদশে থাকলেও ব্যালন ডি’অরের সেরা তিনে এবারই প্রথম জায়গা পেয়েছেন নেইমার। গত মৌসুমে বার্সেলোনার ট্রেবল জয়ে মেসির মতো এই ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ডের বড় অবদান ছিল। তবে পঞ্চমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে আছেন মেসিই। গত মৌসুমে বার্সার ট্রেবল জেতানোর পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। অন্যদিকে স্প্যানিশ লীগে সর্বোচ্চ ৪৮ গোল করলেও রিয়াল মাদ্রিদকে কোনো শিরোপা এনে দিতে পারেননি গত দুবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী রোনাল্ডো। ব্যালন ডি’অরের পাশাপাশি কাল বর্ষসেরা নারী ফুটবলার, কোচ ও বর্ষসেরা গোলেরও সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছে ফিফা। বর্ষসেরা গোলের তালিকাতেও আছেন মেসি। এদিকে ফুটবলের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট গোল ডটকমের এক জরিপে সর্বকালের সেরা ক্লাব ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন মেসি। ওয়েবসাইট।
সংক্ষিপ্ত তালিকা

সেই পুরনো গল্প

অন্য দলগুলোর তুলনায় চিটাগাং ভাইকিংসের অধিকাংশ বিদেশী খেলোয়াড় আগেই চলে এসেছেন। প্রায় পুরো শক্তির দল নিয়েই প্রতি ম্যাচে মাঠে নামছে তারা। কিন্তু কোনো কিছুতেই লাভ হচ্ছে না। পাঁচ ম্যাচে মাত্র এক জয়। বিপিএলে সেরা চারে থাকার লড়াই থেকে প্রায় ছিটকে যাওয়ার উপক্রম। চিটাগাংয়ের শুরুটা প্রতি ম্যাচেই ভালো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেনি তারা। কাল নিজেদের আঙিনায় বরিশাল বুলসের বিপক্ষে হেরেছে ৩৩ রানে। ম্যাচ শেষে চিটাগাং অধিনায়ক তামিম ইকবাল জানালেন, ‘আমাদের শুরুটা ছিল দারুণ। এর চেয়ে ভালো আশা করা যায় না, বিশেষ করে প্রথম ৬ ওভারে। এরপর সেই পুরনো গল্প। ক্যাচ মিস, রানআউটের সুযোগ নষ্ট করা। এসবই আমাদের ভুগিয়েছে।’
দলে অনেক বড় নাম থাকলেও কাজের সময় কেউই কিছু করতে পারছেন না। এনিয়ে সতীর্থের ওপর ক্ষোভ ঝাড়লেন তামিম, ‘আমি তো আর হাতে ধরে বুঝিয়ে দিতে পারব না! এ পর্যায়ে সবাইকে বুঝতে হবে যে কী করা উচিত। আমার দলে এ ব্যাপারটিই মূল সমস্যা। সবার বোঝা উচিত তাদের কার কী দায়িত্ব।’ আউট হওয়ার ধরন দেখে তামিম সতীর্থদের স্কুলপড়ুয়াদের সঙ্গে তুলনাও করলেন। এখন পর্যন্ত মোহাম্মদ আমির ছাড়া কাউকেই বোলার মনে হচ্ছে না তামিমের। বোলিং আক্রিমণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দলে একজনই বোলার, যাকে দেখে মনে হয় উইকেট নিতে পারে, সে মোহাম্মদ আমির। এছাড়া আর কাউকে দেখছি না। শফিউল অবশ্য ভালো করছে। এছাড়া আর কেউ না। এ জায়গায় একটু ঘাটতি আছে আমাদের। নাম কিন্তু এটা বলে না। নাম যা বলে, তারা করছে অন্য কিছু।’ শেষ চারের আশা অবশ্য এখনই ছাড়ছেন না তামিম, ‘আমাদের জন্য কাজটা এখন অনেক কঠিন। পরের পাঁচ ম্যাচের অন্তত চারটা জিততে হবে।
ক্রিকেটে অসম্ভব কিছুই নয়। যে কোনো কিছুই হতে পারে। একটি ভালো ম্যাচ দরকার, এরপর সেই মোমেন্টটাকে বয়ে নিতে হবে।’ তামিম মনে করেছিলেন চট্টগ্রামে নিজেদের ফিরে পাবে চিটাগাং। বেশি দাম দিয়ে কেনা বিদেশী খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দিলেন তাদের কাছে দলের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তামিম বলেন, ‘সবাই পেশাদার ক্রিকেটার। কামরান আকমল যেভাবে আউট হয়েছে সেটার কোনো জবাব নেই আমার কাছে। দিলশান যে মানের ব্যাটসম্যান সেভাবে ব্যাটিং করে গেলে আমরা ভালো অবস্থায় থাকতাম। এ দায়িত্বের জায়গাটা বুঝতে হবে। ওদের ওপর আমাদের নির্ভরতা অনেক বেশি।’ সাগরিকার উইকেট নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ নেই। ভালো উইকেট বলেই মনে করছেন সবাই। কাল চিটগাংয়ের শেষ ১০ ওভারের বোলিং দেখে অনেকেই ফিক্সিংয়ের গন্ধ পেয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে এ প্রশ্নওটা উঠে এলো। তবে তা উড়িয়ে দিলেন তামিম, ‘সন্দেহজনক নয়, আমরা খারাপ খেলেছি। এজন্য এমন হয়েছে। এটা নিয়ে চিন্তাও করছি না। সবাই ভালো, ফেয়ার ক্রিকেট খেলছে।’

আমির খান ইস্যুতে মুখ খুললেন শাহরুখ খান

বলিউড অভিনেতা আমিন খান ইস্যুতে এবার মুখ খুললেন শাহরুখ খান। ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে নিজের ৫০তম জন্মদিনে শাহরুখ বলেছিলেন ‘দেশ এখন অহিষ্ণুতার শীর্ষে’। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে এবার তার কথায় থাকল আমির খানকে জবাব দেয়ার রেশ? কিছুদিন আগেই আমির জানিয়েছিলেন দেশের সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে তার স্ত্রী এতটাই আতংকে আছেন, বাচ্চার ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে দেশ ছাড়তে হবে কি না সে শংকাও প্রকাশ করেছেন? সেই মন্তব্যের রেশ ধরেই শাহরুখ সম্প্রতি বলেছেন, দেশ নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই? বলিউড স্টারদের যা কিছু বিত্ত-বৈভব-সম্মান সব এদেশই দিয়েছে। দেশ ছাড়ার কথা বলে আমির অবশ্য নিজ কর্মস্থলের সহকর্মীদের কারও কারও রোষানলে পড়েছিলেন। অনুপম খের বলেছেন, এদেশেই তাকে সুপারস্টার তৈরি করেছেন, স্ত্রীকে যেন সে কথা বলেন আমির। আমির খান অবশ্য নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে টুইটারে লিখেছেন, তিনি দেশ ছাড়ার কথা বলেননি?
তিনি যা বলেছিলেন, সেই অবস্থান থেকে তিনি সরেও যাচ্ছেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে দেশের সংহতি, সংস্কৃতি, বহুত্ববাদের কথা তুলে ধরেন তিনি। কিন্তু শাহরুখ খান পাল্টা বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘দেশ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি আমার সন্তানদের বলি ধর্ম দিয়ে কোনো কিছু বিচার না করতে? ধর্ম নিয়ে ছোটখাটো ঝামেলা চলতেই থাকে? কখনও কখনও কেউ ঘটনার বাইরে গিয়ে মন্তব্য করে ফেলেন; কিন্তু তার মানে এ নয় যে, দেশ আমার প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।’ স্পষ্টতই ব্যক্তিগত জায়গা থেকে নিজের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন শাহরুখ খান। কিন্তু বলি অন্দরের খবর, এমন মন্তব্যের মাধ্যমে মূলত আমির খানকে জবাব দিলেন শাহরুখ। বলিউডে খান সাম্রাজ্যে আগে বিরোধের আবহ থাকলেও স্মরণকালের অতীতে তা অনেকটাই বন্ধুত্বের পরিবেশে বদলে গেছে। শাহরুখের এ মন্তব্যের পর অনেকেই মনে করছেন, তবে কি আবার দুই খানের দ্বৈরথ জমে উঠল?

উপস্থাপনাই আমার প্রথম পছন্দ

*বিপিএলের উপস্থাপনা কেমন উপভোগ করছেন?
**এক কথায় অসাধারণ। এটি আমার ক্যারিয়ারে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বড় ক্যানভাসে এটিই আমার প্রথম উপস্থাপনা। অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছি; কিন্তু এ ধরনের কাজ আগে কখনোই করা হয়নি। প্রথম দিকে কিছুটা ভয় ছিল। ধীরে ধীরে সেটা কেটে গেছে। এখন আমি পুরোটাই প্রাণবন্ত বলতে পারি। তারপরও মাঝে মধ্যে টেনশন থাকে। পরের দিনের কাজের জন্য আগের রাতে প্রস্তুতি নিই। তাই খুব বেশি সমস্যা হয় না।
*মাঠে উপস্থিত দর্শকদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
**অনেক বেশি। মাঠে থাকার সুবিধা হল, দর্শকদের রেসপন্স সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যায়। পাশাপাশি সোস্যাল মাধ্যম থেকেও বুঝতে পারি, দর্শক আমার উপস্থাপনা ভালোভাবেই গ্রহণ করছেন।
*আর কোন কোন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন?
**বিপিএলের জন্য অন্য কাজগুলোর কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে ম্যানেজ করে নিচ্ছি। দেশটিভিতে ‘সিনেমা এক্সপ্রেস’, এনটিভির ‘উদ্দীপন’ ও আরটিভির ‘মিউজিক স্টেশন’ অনুষ্ঠানগুলোর সঞ্চালনা করছি।
*অভিনয়ের ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে?
**‘নীড় খোঁজে গাঙচিল’, ও ‘আয়নাঘর’ ধারাবাহিক দুটোর কাজ করছি। কিছুদিন আগে বান্দরবানে সকাল আহমেদের পরিচালনায় একটি নাটকের শুটিং শেষ করে এসেছি। এটি পরিচালনা করছেন সকাল আহমেদ। নাটকের নাম এখনও ঠিক হয়নি। পাশাপাশি কয়েকটি খণ্ডনাটকেও অভিনয় করেছি।
*অভিনয় নাকি উপস্থাপনা- কোনটিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
**অবশ্যই উপস্থাপনা। এটি আমার প্রথম পছন্দ। উপস্থাপনার প্রতি আমার ভালোবাসা একেবারেই অন্যরকম। অভিনয়ও অবশ্য পছন্দ করি। তবে প্রায়োরিটি বেশি দেই উপস্থাপনা।
*চলচ্চিত্রে অভিনয়ে কোনো ইচ্ছে আছে কী?
**অবশ্যই আছে। তবে সেটা গল্প এবং চরিত্র বুঝে। আমার ইমেজের সঙ্গে যায় এমন চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
আনন্দনগর প্রতিবেদক

দোষ স্বীকারে সংবিধান ও আইনের অবস্থান by ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার দেয়া হয়েছে। সংবিধান প্রণয়ন-পরবর্তী এ যাবৎকাল পর্যন্ত সংবিধানে ১৫টি সংশোধনী আনা হলেও এ অনুচ্ছেদটি এককভাবে কখনো সংশোধনীর সম্মুখীন হয়নি, যদিও চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রথমে এ অনুচ্ছেদটির ক্রমিক নম্বর পরিবর্তিত হয়ে ৫৭ হয় এবং অতঃপর পুনঃদ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদটি আগেকার ৪৯ নম্বর ক্রমিকে ফিরে আসে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত উভয় পদ্ধতি দ্বারা শাসিত হলেও এবং উভয় পদ্ধতির শাসনকালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও এ অনুচ্ছেদটিতে রাষ্ট্রপতিকে যে অধিকার দেয়া হয়েছে তা অপরিবর্তিত থাকে।
প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা দ্বারা শাসিত থাকাকালীন এর নির্বাহী কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত ছিল, যদিও বর্তমানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় এটি প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত। ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা প্রদর্শনের যে অধিকার দেয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ রয়েছে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি এককভাবে এ ক্ষমতাটি প্রয়োগ করতে পারতেন, কিন্তু সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে প্রদত্ত এ ক্ষমতাটি অনুচ্ছেদ নম্বর ৪৮-এর দফা (৩)-এ উল্লেখিত শর্তের অধীন। অনুচ্ছেদ নম্বর ৪৮-এর দফা (৩)-এ বিবৃত হয়েছে, ‘সংবিধানের ৫৬ নম্বর অনুচ্ছেদের দফা (৩) অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন।’ উল্লেখিত অনুচ্ছেদের দফা (৩)-এর মর্মানুযায়ী রাষ্ট্রপতি তার একক সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও তিনি তার অপর সব কার্য প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতিরেকে সম্পন্ন করতে পারেন না। প্রণিধানযোগ্য যে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে প্রদত্ত ক্ষমতাটি স্বেচ্ছাধীন নয়। এর কারণ হলো, জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বা অন্য কোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন ব্যতীত অপর কাউকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সুযোগ নেই। অনুরূপ প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি যদি তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আপিল বিভাগে জ্যেষ্ঠতম বিচারককে অতিক্রান্ত করেন, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি যাকে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করা হয় তার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ হবে।
রাষ্ট্রপতিকে ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, এ ক্ষমতাটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দু’ভাবে প্রয়োগ করা হয়। এর একটি হলো, বিচারিক আদেশে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কর্তৃক ক্ষমা প্রার্থনা এবং অপরটি দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ দিন উপলক্ষে সরকারের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ক্ষমা প্রদর্শন। উভয় ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমতাটি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ ব্যতিরেকে সম্পন্ন করতে পারেন না।
আমাদের মূল দণ্ড আইন দণ্ডবিধি অনুযায়ী একজন অপরাধীকে অপরাধ প্রমাণসাপেক্ষে বিচার সমাপনান্তে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পাঁচ ধরনের দণ্ড প্রদান করা যায়। যথা- মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, যেকোনো মেয়াদের সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্তির দণ্ড ও অর্থদণ্ড। অনুচ্ছেদ নম্বর ৪৯-এ রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ সাপেক্ষে ওই ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে যেকোনো দণ্ড মার্জনা, বিলম্বন, বিরাম, মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারেন। উপর্যুক্ত যেকোনো দণ্ডের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হলে তিনি ক্ষমার মাধ্যমে ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত যেকোনো প্রতিকার প্রদান করতে পারেন। স্পষ্টত, ক্ষমা প্রদর্শন ও প্রাণভিক্ষা এক বিষয় নয়। ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদের কোথাও প্রাণভিক্ষা বিষয় উল্লেখিত হয়নি। প্রাণ যিনি দিতে পারেন, তিনি হলেন একমাত্র মহান রাব্বুল আলামিন। যিনি প্রাণ দিতে পারেন তিনি ব্যতীত অপর কারো প্রাণভিক্ষা দেয়ার ক্ষমতা নেই। একজন মানুষের জন্মগ্রহণের মতো মৃত্যু কখন, কোথায়, কিভাবে হবে তা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানেন এবং এটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত।
রাষ্ট্রপতি তার এ ক্ষমতাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে একজন ব্যারিস্টার খেতাবধারী সাবেক আইনমন্ত্রীর অভিমত- ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ওই আইনের দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে তার এ ক্ষমতাটি প্রয়োগ করতে পারবেন না। এ বিষয়ে আমাদের সংবিধান অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, অনুচ্ছেদটিতে রাষ্ট্রপতিকে মৃত্যুদণ্ডসহ অপর যেকোনো ধরনের দণ্ড মার্জনা, বিলম্বন, বিরাম, মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাসের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সে অনুচ্ছেদটিতে স্পষ্টত উল্লেখ রয়েছে, রাষ্ট্রপতি তার এ ক্ষমতাটি যেকোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ডের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে অভিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য রিটের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের নিকট প্রতিকার চাওয়ার অধিকার খর্ব করা হলেও তা ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে কোনোভাবেই খর্ব করে না। আর তাই এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তা সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৪৯-এর চেতনার আলোকে যথার্থ নয় বিবেচিত হয়। উল্লেখ্য, সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদে দফা (৩) ও ৪৭ক অনুচ্ছেদ সন্নিবেশনের মাধ্যমে বলা হয়- যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ প্রযোজ্য, তাদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ, ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদের দফা (১) ও (৩) এবং ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারগুলো প্রযোজ্য হবে না।
রাষ্ট্রপতিকে সংবিধানের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ক্ষমা প্রদর্শনের যে অধিকার দেয়া হয়েছে, মূলত এ অধিকারটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি উপলক্ষ মাত্র। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের সুপারিশ ব্যতিরেকে নিজ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমাপ্রার্থীকে কোনো প্রতিকার প্রদান করতে পারেন না। আমাদের সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় সরকারের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত থাকায় প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষাই সরকারের আকাক্সক্ষা। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির নিকট যে সুপারিশ করা হয়, প্রকারান্তরে সেটি সরকারেরই সুপারিশ।
সংবিধানের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ক্ষমা প্রদর্শন সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতিকে যেরূপ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে কিছু দণ্ডের ক্ষেত্রে সরকারকে অনুরূপ ক্ষমতা এবং মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে অনেকটা সমরূপ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নম্বর ৪০১, ৪০২ ও ৪০২ক প্রাসঙ্গিক। আলোচ্য নিবন্ধ সংশ্লেষে ধারা নম্বর ৪০১-এর উপধারা (১), (২) ও (৫) বিশেষভাবে সম্পৃক্ত।
ধারা নম্বর ৪০১-এর উপধারা (১) অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, ওই উপধারায় বলা হয়েছে- যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো অপরাধের দায়ে দণ্ড প্রদান করা হয়, সরকার যেকোনো সময় শর্তবিহীন অথবা দণ্ডিত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত শর্তসাপেক্ষে তার দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত অথবা আরোপিত দণ্ড সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ করতে পারে।
ওই ধারার উপধারা (২) অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, এ উপধারায় বলা হয়েছে- সরকারের নিকট যখন দণ্ড স্থগিত বা মওকুফের আবেদন করা হয়, সরকার প্রয়োজনে যে আদালতের বিচারক কর্তৃক দণ্ড প্রদান অথবা নিশ্চিত করা হয়েছে, আবেদনটি মঞ্জুর অথবা নাকচ বিষয়ে যুক্তিসহ তার মতামত প্রদানের জন্য বলতে পারে এবং ওই মতামতের বর্ণনার সাথে বিচারিক নথির অনুলিপি অথবা ওই নথি যে অবস্থায় আছে, তা অগ্রগামী করার জন্য বলতে পারে।
একই ধারার উপধারা (৫) অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, এ উপধারায় বলা হয়েছে- এ ধারার অন্তর্ভুক্ত কোনো কিছুই রাষ্ট্রপতির দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন, বিরাম ও মওকুফের অধিকারের প্রতি হস্তক্ষেপ রূপে বিবেচিত হবে না।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০২ ধারা অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, ওই ধারায় বলা হয়েছে- দণ্ডবিধির ৫৪ ও ৫৫ ধারার হানি না ঘটিয়ে সরকার দণ্ডিত ব্যক্তির সম্মতি ব্যতিরেকে নিম্নলিখিত যেকোনো দণ্ডকে পরবর্তীকালে বর্ণিত দণ্ডে হ্রাস করতে পারে, যেমন- মৃত্যুদণ্ডের স্থলে যাবজ্জবীন কারাদণ্ড, যেকোনো মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ডের স্থলে যেকোনো মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, কারাদণ্ডের স্থলে অর্থদণ্ড।
ফৌজদারি কার্যবিধি ৪০২ক ধারা অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, ওই ধারায় বলা হয়েছে- ধারা নম্বর ৪০১ ও ৪০২-এর দ্বারা সরকারের ওপর প্রদত্ত ক্ষমতা মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রয়োগ করা যেতে পারে।
দণ্ডবিধির ধারা নম্বর ৫৪ অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, ওই ধারায় বলা হয়েছে- মৃত্যুদণ্ড দান করা যেতে পারে এরূপ প্রত্যেক ক্ষেত্রে সরকার অপরাধীর সম্মতি ব্যতিরেকে এ বিধির অধীন প্রদত্ত অপর কোনো দণ্ডে হ্রাস করতে পারবে।
একই বিধির ধারা নম্বর ৫৫ অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দান করা যেতে পারে এরূপ প্রত্যেক ক্ষেত্রে সরকার অপরাধীর সম্মতি ব্যতিরেকে ওই দণ্ডকে যেকোনো প্রকারের অনূর্ধ্ব ২০ বছর মেয়াদের দণ্ডে হ্রাস করতে পারবে।
ফৌজদারি কার্যবিধির বর্ণিত দু’টি (৪০১ ও ৪০২) ধারা এবং দণ্ডবিধির বর্ণিত দু’টি (৫৪ ও ৫৫) ধারা থেকে যে ধারণাটি পাওয়া যায়, তা হলো এ দু’টি আইনের বিধান অনুযায়ী সরকার যেকোনো দণ্ড সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ অথবা হ্রাস করাসহ এর কার্যকারিতা স্থগিত করতে পারে।
আমাদের প্রচলিত দণ্ড আইনে যে পাঁচটি দণ্ডের বিষয় উল্লেখ রয়েছে, এর মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ড হলো মৃত্যুদণ্ড। মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ সরকার কর্তৃক মওকুফ, হ্রাস বা স্থগিত করার বিধান থাকলেও তা ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় নয়। তা ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধিতে সরকারকে বিভিন্ন দণ্ড মওকুফ, হ্রাস বা স্থগিত বিষয়ে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই সংবিধানে বিভিন্ন ধরনের দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন, বিরাম ও মওকুফ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির যে অধিকার রয়েছে, এর প্রতি কোনোরূপ হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত নয়।
যেকোনো দণ্ডের ক্ষমা প্রদান বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে সংবিধান যে অধিকার দিয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ মওকুফ হ্রাস বা স্থগিত বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধিতে রাষ্ট্রপতিকে যে অধিকার দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ অত্যাবশ্যক। সুতরাং সংবিধানের মতো ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন মৃত্যুদণ্ডের অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কোনো প্রতিকার প্রদান করতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের সুপারিশ ব্যতিরেকে তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের সমর্থনে নির্বাচিত হলেও তিনি দেশের সংবিধান ও সব নাগরিকের অভিভাবক। তা ছাড়া তিনি জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। রাষ্ট্রের ১ নম্বর ব্যক্তি হিসেবে তিনি সবার ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। রাষ্ট্রপতির প্রতি দেশের সব নাগরিকের আস্থা ও বিশ্বাস যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়ে সবার বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের সচেষ্ট থাকা উচিত। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় যেহেতু যেকোনো দণ্ডের ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার প্রয়োগ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির জন্য প্রধানমন্ত্রীর বা সরকারের সুপারিশ অত্যাবশ্যক, সেহেতু ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্পৃক্ত না করে ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন সরকারকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা প্রয়োগের মাধ্যমে যদি সম্পন্ন করা হয়, তাতে রাষ্ট্রপতির প্রতি দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ক্ষুণ্ন হওয়ার কোনো ধরনের অবকাশ সৃষ্টি হবে না।
অতীতে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে ব্যবহার করে যেমন অপ্রত্যাশিতভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় জঘন্য অপরাধীদের দণ্ড মার্জনা করা হয়েছে, অনুরূপ রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত প্রতিকার দেয়া হয়নি, যদিও উভয়টির কোনোটিই কাম্য নয়। আর তাই যেকোনো ধরনের দণ্ডের মার্জনা, মওকুফ ও হ্রাস বা স্থগিত বিষয়ে সরকারের রাষ্ট্রপতির মতো অনুরূপ ক্ষমতা থাকার কারণে তা সরকার কর্তৃক প্রয়োগ যথার্থ বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্রপতি বা সরকার কর্তৃক ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন কোনো অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তা শর্তবিহীন অথবা দণ্ডিত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত শর্তসাপেক্ষে এবং ক্ষেত্রবিশেষে যে বিচারিক আদালত কর্তৃক দণ্ড প্রদান করা হয়েছে, ওই আদালতের মতামতসাপেক্ষে প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীন যখন কোনো অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়, তখন সেখানে কোনো ধরনের শর্ত বা আদালতের মতামতের আবশ্যকতা নেই।
দণ্ডপ্রাপ্ত একজন অপরাধী সংবিধানের অধীন রাষ্ট্রপতির নিকট মৃত্যুদণ্ড অথবা অন্য যেকোনো ধরনের দণ্ড মার্জনা বা মওকুফের আবেদনের ক্ষেত্রে তার জন্য দোষ স্বীকার অত্যাবশ্যক কি না- এ প্রশ্নে আইনজ্ঞ, আইনের শিক্ষক, আইনের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে মতদ্বৈধতা রয়েছে। একটি মত হলো- একজন দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী মৃত্যুদণ্ড বা যেকোনো দণ্ডের মার্জনা বা মওকুফ চাইলে তাকে অবশ্যই রাষ্ট্রপতির নিকট আবেদন করার ক্ষেত্রে দোষ স্বীকারপূর্বক আবেদন করতে হবে। অপর মতটি হলো, ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক আবেদন করতে হবে এবং দোষ স্বীকার অত্যাবশ্যক নয়। দ্বিতীয় মতামতটি যারা ধারণ করেন তারা উল্লেখ করেন- ইতঃপূর্বে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অপরাধীর আপিল উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকাবস্থায় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অপরাধীকে দণ্ড মার্জনাপূর্বক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়ার নজির রয়েছে। তাদের অভিমত- এ ধরনের অপরাধী যদি ক্ষমা প্রার্থনার সময় দোষ স্বীকার করেন, সে ক্ষেত্রে তাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বা সরকারের কোনো পদে নিয়োগের সুযোগ নেই। এ ধরনের নিয়োগ-পরবর্তী যেহেতু অদ্যাবধি নিয়োগের বিষয়টি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি, তাই যারা দ্বিতীয় মতামতটি ধারণ করেন তাদের মতামত যথার্থ প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৪৯ অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, ওই অনুচ্ছেদে এমন কিছু ব্যক্ত হয়নি, যাতে ধারণা করার মতো অবকাশ সৃষ্টি হয় যে, যেকোনো দণ্ডের মার্জনা বা মওকুফের প্রার্থনার ক্ষেত্রে দোষ স্বীকার অত্যাবশ্যক।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

স্বৈরাচারবিরোধী গণ–অভ্যুত্থানের ২৫ বছর by মিজানুর রহমান খান

আজ ১ ডিসেম্বর। আর কদিন পরই জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সফল হওয়ার ২৫তম বার্ষিকী। একটানা সাড়ে আট বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘতম গণতান্ত্রিক লড়াই। এতে কত মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, কত মানুষ আহত বা তাঁদের কতজনের স্থায়ী অঙ্গহানি ঘটেছিল, সরকারি ও বেসরকারি খাতে কী পরিমাণ সম্পদের হানি ঘটেছিল, তার সঠিক হিসাব আজও করা হয়নি। এমনকি তেমন জোরালো দাবি কখনো ওঠেনি।
১৯৯০ সালের ১ ডিসেম্বর সারা দেশ ছিল উত্তেজনায় উত্তপ্ত। মিরপুরে হরতাল চলাকালে জনতার মিছিলে তৎকালীন বিডিআর গুিল চালিয়েছিল। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। এদিন অবশ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ছয়টি পৃথক সহিংস ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু ঘটেছিল। আহত হয়েছিলেন অনেকেই। এর পাশাপাশি সরকারের গ্রেপ্তার অভিযান চলছিল। রাজনীতিবিদেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সাংবাদিকদের আন্দোলনের কারণে ২৮ নভেম্বর থেকে কোনো পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় বেতার– টিভিতে আন্দোলন-সংগ্রামের কোনো খবর ছিল না। ফলে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা সংবাদই ছিল ভরসা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন প্রথমবারের মতো সব মত ও পথের মানুষ, বিশেষ করে রাজনীতিক ও রাজনৈতিক কর্মী এবং পেশাজীবীদের কাছাকাছি এনেছিল। তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন রাজনৈতিক ঐক্য। তিন জোটের রূপরেখায় সমগ্র জাতির ন্যূনতম দাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। বিভিন্ন ধরনের এমনকি মতাদর্শগতভাবে পরস্পরবিরোধী সংগঠন ও নেতারা একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ২৫ বছর পরে সেদিনের ওই অর্জনকে আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়।
১৫, ৭ ও ৫-দলীয় জোটের আওতায় মধ্য, বাম, ডান শক্তির সম্মিলন ঘটেছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনটা এর আগে কখনো ঘটেনি।
গত আড়াই দশকের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভক্তি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। আর লাখো প্রাণের বিনিময়ে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার দশক পূর্তি না হতেই আমাদের জাতীয় নেতারা আবারও শোক কাটিয়ে উঠতে না পারা জনগোষ্ঠীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানালেন, ‘আসুন, গণতন্ত্রের লড়াইয়ে যোগ দিন। আসুন, সামরিক শাসন উচ্ছেদ করি।’
নব্বইয়ের ডিসেম্বরে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল। সাধারণভাবে গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের বক্তৃতা-বিবৃতিতে ‘গণ-অভ্যুত্থান’ কথাটির ব্যবহার ব্যাপক কিন্তু গবেষক ও রাজনীতিবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে বেশ সন্দিহান। তাঁরা যুক্তি দেখান যে গণ-অভ্যুত্থান ঘটলে কী করে কতিপয় মৌলিক গণ-আকাঙ্ক্ষা আজও অপূরণীয় থাকতে পারল।
উল্লেখ্য, তিন জোটের রূপরেখায় এমন কতগুলো বিষয় ছিল একান্তভাবে শাসনগত। কোনো দলের মতাদর্শগত বিষয় ছিল না। ১৯৯০-এর ১ ডিসেম্বরে জন্ম নেওয়া শিশুটির আজ ২৫তম জন্মদিন। তাদের নতুন করে জানা উচিত তাদের পূর্বপুরুষেরা অবাধ নির্বাচন, বাক্ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকার খর্বকারী কালাকানুন বাতিলের মতো কয়েকটি দাবি প্রতিষ্ঠায় থেমে থেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তাঁরা তাঁদের জীবনে ১৯৬৯ ও ১৯৯০–এ একটি অভিন্ন স্বপ্ন বুকে ধরেছেন।
সাতাশিতে একজন নূর হোসেন বুকে-পিঠে উল্কি দিয়ে সেই স্বপ্ন এঁকেছিলেন: স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক। তিন জোটের রূপরেখায় লেখা হয়েছিল: ‘সাংবিধানিক পন্থায় অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হাতবদল ও হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে। সংসদকে সার্বভৌম করতে হবে। গণপ্রচার মাধ্যমকে পরিপূর্ণভাবে নিরপেক্ষ রাখতে রেডিও-টিভিসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যকে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। মৌলিক অধিকার পরিপন্থী সব আইন বাতিল করতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ২৫ বছর পরে আজ অনেকে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জীবনমানের উন্নতি অর্থাৎ মানুষের রুজি–রোজগার বৃদ্ধির মতো কিছু বিরাট প্রাপ্তির জন্য সন্তোষ আর তিন জোটের রূপরেখায় দেওয়া শাসনগত প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার বঞ্চনায় বেদনাহত হতে পারেন। যদিও তাঁরা সাহসের সঙ্গে দৃঢ়চিত্তে বলবেন, ‘গণতন্ত্রের ঘাটতি’ পূরণের লড়াই চলছে এবং চলবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

আসমা, আমির, অলোকদের জন্য ভালোবাসা by সোহরাব হাসান

অসহিষ্ণুতার শিকার অভিনেতা আমির খান স্ত্রী ও পুত্রের সঙ্গে
অসহিষ্ণুতা নামের সংক্রমণ ব্যাধিটি মানুষের ভেতরে যে শুভবোধ, শুভচিন্তা ও মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা থাকে, সেসব ধ্বংস করে দেয়। অসহিষ্ণুতাজাত হিংসা ও ঘৃণা দেশে দেশে যুদ্ধ বাধায়, মানুষে মানুষে রক্তপাত ঘটায়। আমরা এই অসহিষ্ণুতার চরম প্রকাশ দেখতে পাই আইএস নামের জঙ্গি সংগঠনটির নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতায়। আবার তাদের দমনের নামে যে অভিযান চালানো হয়, সেটিও কম নিষ্ঠুর নয়।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফরি ডি স্যাকস আইএসের উত্থানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘এটা আসলে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, হর্ন অব আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ায় মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রকাশ্য ও গোপন সামরিক অভিযানের এক ভীতিকর ও অপ্রত্যাশিত ফলাফল।’ কিন্তু কোনো কারণই প্যারিসে কিংবা তুরস্কে কিংবা তিউনিসিয়ায় নিরীহ মানুষ হত্যাকে জায়েজ করতে পারে না।
২.
দুনিয়াজুড়েই আজ হিংসা আর রক্তপাত। কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও রাষ্ট্রের নামে, কোথাও–বা রাজনীতির নামে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। আবার হত্যাকারী মানুষ নিজেও আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। প্যারিসের হামলায় যুক্ত আটজনের ছয়জনই আত্মহত্যা করেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে। প্যারিস বা সিরিয়া থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে। আমাদের নেতারা বলছেন, আইএস থেকেও আমরা ঢের দূরে আছি। কিন্তু মানুষ হত্যা থেমে নেই। মনে হচ্ছে, অসহিষ্ণুতার দৈত্যটি নিয়ত ঘাড়ের ওপর বিষ নিশ্বাস ফেলছে।
‘আইএসমুক্ত’ বাংলাদেশেও আজ জনজীবন নিরাপদ নয়। বিশেষ করে যদি আপনি হন সংখ্যালঘু কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেউ। সুযোগ বুঝে সন্ত্রাসীরা মিছিলে, মসজিদে, প্রকাশনালয়ে হানা দিচ্ছে। গুলিতে-বোমায়-চাপাতির কোপে মানুষ মরছে। লাঞ্ছিত হচ্ছে দেশ ও মানবতা। পত্রিকায় চোখ মেললেই, টিভি খুললেই নারী ও শিশুর রক্তাক্ত মুখ। আগে একজন মানুষের মৃত্যু আমাদের যেভাবে বিচলিত করত, এখন শতজনের মৃত মুখও তেমন করে না। কেবল রাষ্ট্রের মন নয়, মানুষের মনও পাথর হয়ে গেছে। আমাদের সমাজের যাঁরা নেতা, তাঁরা আলো দেখাতে পারছেন না, রাষ্ট্র ও রাজনীতির যাঁরা চালক, তাঁরাও নিরাপত্তা দিতে পারছেন না। এ রকম অবিমৃশ্য ও অবিশ্বাসী সময় সম্ভবত আর আসেনি। দেশে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে, আর আমরা পরস্পরের ওপর দোষ চাপিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছি। বহু বছর আগে জীবনানন্দ দাশ ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় লিখেছিলেন: যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’ আজকের বাংলাদেশের জন্য কথাটি শতভাগ সত্য।
কেবল পৃথিবী নয়, বাংলাদেশটিও নিয়ত হিংসার বারুদে দগ্ধ হচ্ছে (বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরে নয় জেনেও কথাটি বলছি)। প্রতিহিংসার আগুন নিকট অতীতে আমাদের অনেক জীবন নিভিয়ে দিয়েছে। কেউবা আহত হয়ে হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছেন। চলতি বছরের শুরুতে যে আগুন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল; সেই আগুন নিভেছে বলে মনে হয় না। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে লক্ষ্য করে আগুন ছুড়ে মারছে। অন্য পক্ষ সেই আগুন থামাতে গুলি–গুমের আশ্রয় নিয়েছে। আর সাধারণ মানুষ হয় আগুনে পুড়েছে, নয়তো গুলি খেয়ে মরেছে। তিন মাসের হরতাল-অবরোধের অবসান হলে আমরা ভাবলাম এবার রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু এই ঘৃণার আগুন কিংবা গুলি কখনো থামে না। সেই হিংসা তাড়িয়ে বেড়ায় নির্জন রাস্তায় পথচলা কিংবা রিকশায় বসা বিদেশি নাগরিককে। সেই হিংসা থামিয়ে দেয় তাজিয়া মিছিল এমনকি মসজিদে নামাজের জন্য প্রস্তুতিরত মুসল্লিকেও। কখনো সেই হিংসা পুড়িয়ে দেয় বইয়ের পাতা, ছিনিয়ে নেয় তরুণ প্রকাশক ও মুক্তবুদ্ধির লেখকের জীবন।
পরের মাসের ক্যালেন্ডারের পাতা যেমন আগের মাসের পাতা ঢেকে দেয়, তেমনি একটি নৃশংস ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে ভুলিয়ে দেয়। নতুন হত্যাকাণ্ডে পুরোনো হত্যাকাণ্ডের ছবিও ঝাপসা হয়ে আসে। প্রতিদিনই মৃতের তালিকা বাড়ে। এখন ক্যালেন্ডারের সব তারিখই লাল মনে হয়, যা মানুষের খুনে এবং স্বজনহারাদের অশ্রুতে সিক্ত। আমাদের সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ, আমাদের বিরোধী দল গণতন্ত্র রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী—তারপরও হত্যা থামছে না। হিংসার আগুন নিভছে না।
৩.
ভারতের অভিনেতা আমির খান। পাকিস্তানের মানবাধিকারকর্মী আসমা জাহাঙ্গীর। বাংলাদেশের লেখক অভিজিৎ, ব্লগার ওয়াশিকুর, প্রকাশক দীপন, সমাজকর্মী অলোক সেনসহ আরও অনেকে অসহিষ্ণুতার শিকার। আমির খান ও আসমা জাহাঙ্গীর ভাগ্যবান যে তাঁরা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হননি। উগ্রপন্থীরা তাঁদের দেশ ছাড়ার হুমকি দিয়ে ক্ষান্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা যাকেই নিশানা করে, তাকেই শেষ করে দেয়। তাদের হাত থেকে খুব কম লোকই রেহাই পায়।
যেকোনো ঘটনায় কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। হোক সেটি ব্যক্তিগত কিংবা জাতিগত অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়। কিন্তু পাকিস্তানে আসমা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কেউ আদালতে মামলা করেননি। উগ্রপন্থীরা সরাসরি তাঁকে দেশছাড়া করার হুমকি দিয়েছেন। আয়শা বালুচ নামে একজন লিখেছেন, বাংলাদেশ যদি তাঁর এত প্রিয় হয়ে থাকে তিনি সেখানে যান না কেন? ফাতিমা আলী নামে আরেকজন তাঁকে পাকিস্তান থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আসমা জাহাঙ্গীরের অপরাধ? তিনি বাংলাদেশের দুই যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তান সরকারের দ্বৈতনীতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, যখন পাকিস্তানের সামরিক আদালতে বা সৌদি আরবে অন্যায়ভাবে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, তখন পাকিস্তান সরকারকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যায় না।
আর ভারতের আমির খান এক টুইটে সাম্প্রতিক ঘটনায় নিজের উদ্বেগ জানাতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার ঘটনাগুলোয় তিনি আতঙ্কগ্রস্ত। নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিরণ (স্ত্রী) এতটাই উদ্বিগ্ন ছিল যে আমাকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল, আমাদের কি ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।’ এরপরই উগ্রপন্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চালাতে থাকে। সুধীর কুমার ওঝা নামে এক আইনজীবী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। পাঞ্জাবের শিবসেনা–প্রধান ঘোষণা দিয়েছেন, যে আমির খানের গালে চড় মারবে, তাঁকে এক লাখ রুপি পুরস্কার দেওয়া হবে। ভাবা যায়, অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধীর ভারতে এ রকম হিংসা ও ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হচ্ছে!
এসব অপপ্রচারের জবাবে আমির খান বলেছেন, ‘আমি বা আমার স্ত্রী কিরণ কারোরই দেশ ছাড়ার কোনো ইচ্ছে নেই। দেশ ছাড়ার কথা একবারও বলিনি। আমার স্ত্রী কিরণও বলেনি।.....ভারত আমার দেশ, আমি একে ভালোবাসি, এ দেশে জন্মে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি, এবং এখানেই আমি থাকব।’
ভারতের ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় ও সামাজিক অসহিষ্ণুতার পরিপ্রেক্ষিতে মুখ খুলেছেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক এ আর রহমান। তাঁকেও আমির খানের মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিছুদিন আগে মুহাম্মদ: দ্য মেসেঞ্জার অব গড ছবির সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি মুসলিম উগ্রপন্থীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছিলেন। তিনি এ-ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে ‘আমরা মহাত্মা গান্ধীর দেশের মানুষ।’ অনুরূপ প্রতিবাদ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বহু রাজ্যে। আমির খানের ঘটনায় ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো উগ্রপন্থার কঠোর সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, সংবিধান রচনায় যাদের পূর্বসূরিদের কোনো অবদান ছিল না, তারাই সংবিধানের বহুত্ববাদী চেতনার ওপর আঘাত হেনেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, আমির খানের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। সে জন্য কেউ তাঁকে দেশ ছেড়ে যেতে বলতে পারে না।
৪.
ভারতের প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও বিজয় লক্ষ্মী পণ্ডিতের কন্যা নয়নতারা সেহগাল ঢাকা লিট ফেস্টিভ্যালে এসে বলেছিলেন, যখন বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতার আগুন জ্বলছে, তখন তিনি সাহিত্য নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলতে আসেননি। তিনি এসেছেন তাঁর দেশ ভারতে কী ঘটেছে, সেসব বলতে। বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির মানুষের ভারতে রাষ্ট্র বা সরকার নাগরিকদের ওপর হিন্দুত্ববাদ চাপিয়ে দিতে পারে না। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ভাগনি নয়নতারা সম্প্রতি লেখক হত্যা এবং দাদরি ঘটনায় সরকারের নীরবতার প্রতিবাদে প্রথম সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার ফেরত দেন। তাঁর দেখাদেখি ৭০ জনেরও বেশি লেখক-শিল্পী-বিজ্ঞানী ইতিহাসবিদ তাঁদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন। কেবল তাই নয়, অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতার বিরুদ্ধে তাঁরা রাজ্যে রাজ্যে মহাসমাবেশ করেছেন। শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে জনমত তৈরি করছেন। একইভাবে বাংলাদেশও আজ চরম অসহিষ্ণুতা ও হিংসার বলি হলেও আমাদের লেখক, শিল্পী কিংবা নাগরিক সমাজকে সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে যূথবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামতে দেখা যায় না। অথবা রাস্তায় নামলেও তাঁদের কণ্ঠ এত ক্ষীণ যে তা সন্ত্রাসীদের কর্ণকুহরে পৌঁছায় না।
ভারতে তবু আমির খানের ওপর হুমকির প্রতিবাদ করেছেন সে দেশের অনেক রাজনীতিক, লেখক-শিল্পী ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশের অলোক সেনদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে দেখিনি কোনো রাজনীতিককে। প্রতিবাদ সমাবেশ করেননি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কেউ। সেই কাজটি করতে হলো হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা-কর্মীদেরই।
আমাদের বিবেক এতটাই অন্ধ ও বধির হয়ে গেছে!
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান

যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকাসম্পর্কিত বাংলাদেশের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। গতকাল সোমবার ইসলামাবাদে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মৌসুমী রহমানকে তলব করে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানায়।
পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক) বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করেছেন। তাকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার ২৩ নভেম্বর একটি নোটের মাধ্যমে যেসব অভিযোগ করেছে তা ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করছে পাকিস্তান সরকার। যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত থাকার যে ইঙ্গিত পাকিস্তানের প্রতি করা হয়েছে সরকার তাও প্রত্যাখ্যান করছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পাকিস্তান আগ্রহী। তারপরও পাকিস্তানকে মানহানি করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টা দুঃখজনক। পাকিস্তান বিশ্বাস করে দুই দেশের জনগণ বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কেবল বজায় রাখাই নয়; বরং আরো শক্তিশালী করতে চায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশ সরকার এ চেতনাকে সম্মান দেখাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
গত বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের খবরে জানানো হয়, পাকিস্তানের আইনপ্রণেতারা বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করার পরদিন এমএনএ শেখ আফতাব আহমেদ ইসলামাবাদে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। আইনপ্রণেতারা বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যেতে পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে পাকিস্তান সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করায় গত ২৩ নভেম্বর দেশটির হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। এ দিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পাকিস্তান হাইকমিশনারকে তলব করে প্রতিবাদ জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মিজানুর রহমান। হাইকমিশনারের হাতে দেয়া প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী ও গণহত্যাকারীদের পক্ষ নিয়ে পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধাকালে সংঘটিত অপরাধগুলোর সাথে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা স্বীকার করে নিলো। এ ধরনের অযাচিত মন্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নগ্ন হস্তক্ষেপ, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচারের রায় দেয়া হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ায় কেবল অভিযুক্তদের অপরাধ বিবেচনায় নেয়া হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়। একটি স্বাধীন দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে ভিত্তিহীন ও ধার করা মন্তব্য করা পাকিস্তানের উচিত নয়।
এর এক দিন আগে অর্থাৎ ২২ নভেম্বর পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘আমরা গভীর উদ্বেগ ও বেদনার সাথে দুঃখজনক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখলাম। এ ঘটনায় পাকিস্তান খুবই মর্মাহত। ১৯৭১ সালের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে ত্রুটিপূর্ণ বিচারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ করছি।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল স্বারিত বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান চুক্তির চেতনার ভিত্তিতে বিষয়টির মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। ১৯৭১ সালের বিষয়গুলোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়াই এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল।
চুক্তিটি অনুসরণ করলে বাংলাদেশের ‘সম্প্রীতি ও সুনাম’ আরো বাড়ত বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

প্যারিসের পর কী? by রিচার্ড এন হাস

প্যারিস হামলার শিক্ষা হচ্ছে, সামনে বিভিন্ন
জায়গায় কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে
বৈরুতে বোমাবর্ষণ ও মিসরের সিনাই উপদ্বীপে রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর ইসলামিক স্টেট প্যারিসে হামলা করল, এতে বোঝা যাচ্ছে, সন্ত্রাসবাদের হুমকি এক নতুন স্তরে প্রবেশ করেছে। ইসলামিক স্টেট ঠিক মুহূর্তে কেন হামলা করল, তার কারণ আমরা শুধু অনুমান করতে পারি। হতে পারে যে তারা ইরাকে ভূমি হারানোর ক্ষতি বৈশ্বিক পরিসরে পুষিয়ে নিতে চাইছে। এখন যুক্তি যা-ই হোক না কেন, এটা নিশ্চিত যে আমাদের পরিষ্কারভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।
আসলে ইসলামিক স্টেট যে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে, সেটা মোকাবিলায় নানা স্তরে কাজ করতে হবে। কারণ, কোনো একক নীতি যথেষ্ট মনে হচ্ছে না বলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এর একটি হচ্ছে সামরিক ব্যাপার, আকাশ থেকে ইসলামিক স্টেটের তেল, গ্যাস ও নেতাদের ওপর আরও তীব্র হামলা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো বিমানবাহিনীই এককভাবে এ কাজ করতে পারবে না, যদি তাদের জমি কেড়ে নিতে হয়, তাহলে ভূমিতেও যথেষ্ট তীব্র আক্রমণ চালাতে হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভূমিতে একদম শুরু থেকে অংশীদার বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এটা করার চেষ্টা করা হলেও শেষমেশ তা ব্যর্থ হয়েছে, আর আরব রাষ্ট্রগুলো তেমন কিছু একটা করতে অনাগ্রহী। ইরাকি সেনাবাহিনীও কোনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি, আর ইরান-সমর্থিত রক্ষী সেনারা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে ফেলেছে।
ফলে বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হচ্ছে, কুর্দি সেনাদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং ইরাক ও সিরিয়ায় সুন্নি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা। এর মানে হচ্ছে, গোয়েন্দা ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করা এবং আরও সেনা পাঠানোর ইচ্ছা পোষণ করা, সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সাহায্য করা।
এমন কোনো প্রচেষ্টা নেওয়া হলে তার প্রকৃতি সামষ্টিক হতে হবে। এটা অনানুষ্ঠানিক হতে পারে, ‘ইচ্ছুকদের জোট’ জাতীয় কিছু একটা হতে পারে, যেখানে সঠিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, আরব রাষ্ট্র এমনকি রাশিয়াও থাকতে পারে, যে জোট ন্যাটো ও জাতিসংঘের আনুকূল্যে পরিচালিত হতে পারে। জোটে কে কে থাকল তার চেয়ে ফলাফলটাই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও প্রতীকী যুদ্ধ ঘোষণার ব্যাপারটা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, পাছে ইসলামিক স্টেট না প্রতিদিনই জিততে শুরু করে।
কূটনৈতিক তৎপরতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা যা-ই করার চেষ্টা করি না কেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনের ফলে ইসলামিক স্টেটের সদস্য বাড়ছে, তাঁকে অবশ্যই যেতে হবে। কিন্তু পরবর্তী সরকারকে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে, ইসলামিক স্টেট যাতে ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে, লিবিয়াতে তারা যেটা করেছে।
এ ছাড়া নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে গেলে তা রুশ ও ইরানি সমর্থন ছাড়া সম্ভব হবে না। যে এক মেয়াদি বিকল্প বাজিয়ে দেখা যেতে পারে, সেটা হলো সংখ্যালঘু আলাওয়াইট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিসহ জোট সরকার গঠন করা। আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মূল্য হিসেবে এই ছাড়টা দেওয়া যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে ও নীতিগতভাবে একটি অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় সরকার গঠন করা যেতে পারে, যদিও ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন করার আলোচনা যেকোনো পরিস্থিতিতেই উদ্ভট।
এই ধারায় কোনো আপসরফায় আসা একরকম অসম্ভবই বটে। সে কারণে বেসামরিক মানুষদের রক্ষা করতে আরও বড় ও নিরাপদ জায়গা বের করতে হবে, আর ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। সিরিয়া কোনোভাবেই আর স্বাভাবিক দেশ নয়, আরও দীর্ঘদিন সে স্বাভাবিক হবে না, যদি কোনো দিন সে আদৌ স্বাভাবিক হয়। ফলে দৃশ্যগোচর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো এমন এক সিরিয়াকে দেখব, যেখানে থাকবে শুধু ছিটমহল ও প্রশাসনিক উপবিভাগ।
কোনো কার্যকর কৌশলের অপরিহার্য বিষয় হচ্ছে, তুরস্ককে সাহায্য করা বা তাকে আরও চাপ দেওয়া, যাতে সে ইসলামিক স্টেটের দলভুক্তিকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারে। জর্ডান ও লেবাননের মতো তুরস্কের আরও আর্থিক সহায়তা দরকার, কারণ শরণার্থী সংকটের সিংহভাগই তাকে সামলাতে হচ্ছে। আরব ও মুসলিম নেতারা ইসলামিক স্টেটের লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাদের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন।
সব নীতিরই একটি অভ্যন্তরীণ মাত্রা রয়েছে। সব দেশকেই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলা করতে হবে, সীমান্ত ও দেশের ভেতরের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। যারা উন্মুক্ত সমাজে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়—এমন খুচরা সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা খুব কঠিন কাজ। এসব হামলার বাস্তবতা ও হুমকি মোকাবিলায় আরও গুরুতর সামাজিক প্রতিরোধ লাগবে, আর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামগ্রিক নিরাপত্তার মধ্যে নতুন করে ভারসাম্য আনতে হবে।
আরও একটি প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে, বাস্তবতা সম্পর্কে অধিকতর স্পষ্ট ধারণা। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা প্রথাগত যুদ্ধের মতো নয়। আমরা এদের শিগগিরই নিশ্চিহ্ন করতে পারব না, কারণ এরা যেমন একটি সংগঠন, তেমনি একটা নেটওয়ার্ক ও চিন্তা। একই সঙ্গে তারা কার্যত একটি রাষ্ট্র, যাদের দখলে আছে ভূমি ও সম্পদ।
হ্যাঁ, সন্ত্রাসবাদ আজকের যুগের এক কলঙ্ক, ভবিষ্যতে আরও অনেক দিন সে সভ্যতার কপালে কলঙ্ক তিলক হয়েই থাকবে। ভালো খবর হচ্ছে, ইসলামিক স্টেট মধ্যপ্রাচ্য ও সারা পৃথিবীর জন্য যে হুমকি হয়ে উঠেছে, সেটা দীর্ঘ ও সমন্বিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব। প্যারিস হামলার শিক্ষা হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের একইভাবে কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
রিচার্ড এন হাস: যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের প্রেসিডেন্ট।

দুর্বল আইএসের বদলি কৌশল প্যারিস হামলা by আলী রীয়াজ

গত কয়েক মাসে আইএস ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল
প্যারিসে আইএসের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া যেমন অনুমান করা হয়েছিল, তার বাইরে ঘটেনি। অর্থাৎ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে যে সংগঠন—আইএস বা ইসলামিক স্টেট—তার ঘাঁটি বা কথিত রাজধানী সিরিয়ার অভ্যন্তরে অবস্থিত রাকায় ফ্রান্স উপর্যুপরি বিমান হামলা চালিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ যেমনটি বলেছিলেন, ফ্রান্স এক ‘নির্দয়’ যুদ্ধের সূচনা করবে, তা-ই করেছে ফ্রান্স। কিন্তু ফ্রান্সের এই প্রতিক্রিয়া আবেগের বিবেচনায় যতই সঠিক মনে হোক এবং যতই আমরা বলি না কেন যে এগুলো হচ্ছে আইএসের প্রাপ্য উত্তর, আসলে তা সমস্যার সমাধান কি না, সেটা ভেবে দেখা দরকার। যদিও এখন—এই বেদনাবহ সময়ে—এই কথা যথাযথ শোনাবে না তবু বলা দরকার যে শোককে অস্ত্রে পরিণত করা (ইংরেজিতে বললে ওয়েপেনাইজেশন অব গ্রিফ) সহজ, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তার ফল বিরূপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
একই রকমের আবেগ ও শোকের তাড়নায়, এর চেয়ে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট হয়ে এবং জাতিসংঘের পরোক্ষ কিন্তু অস্পষ্ট নয়, এমন সম্মতি নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে আফগানিস্তানে যুদ্ধের সূচনা করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে এবং সামরিক কৌশলের বিবেচনায় যাকে বলা হয় ‘এক্সিট প্ল্যান’, সেগুলো ছাড়া সূচিত যুদ্ধের পরিণতি কেবল যে প্রাণঘাতী ও রক্তক্ষয়ীই হয় তা নয়, তা আরও বেশি অস্থিতিশীলতা এবং সহিংসতার সূত্রপাত ঘটাতে পারে। অনেকেই বলতে পারেন ওই অঞ্চলে বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে যে পরিস্থিতি, তার আর কত অবনতি ঘটবে, আর কত সহিংসতা বৃদ্ধি পাবে? তদুপরি কেউ কেউ এই বক্তব্যের মধ্যে আইএসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার ইঙ্গিত দেখতে পাবেন। ফলে সুস্পষ্ট করে বলে নেওয়া দরকার যে আইএসের মতো একটি অমানবিক শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করা, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমি পুনরুদ্ধার করা, তাদের হাতে যারা কার্যত জিম্মি হয়ে আছে, সেই মানুষদের মুক্ত করা, আইএসের হাতে অর্থের যেসব উৎস আছে, সেগুলোকে উদ্ধার বা ধ্বংস করার লক্ষ্যে যেকোনো ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে আমার মনে কোনো সংশয় নেই, তার আর কোনো বিকল্পও আছে বলে আমি মনে করি না। আমি যেসব পদক্ষেপের কথা বলছি, তার মধ্যে সামরিক অভিযানও রয়েছে। তারপরেও আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে ফ্রান্সের এই প্রতিক্রিয়া আসলে আইএসেরই প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া কি না।
২০০১ সালে আল-কায়েদা যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোকে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালনের পথে টেনে নিয়ে দুনিয়াজুড়ে এক ‘অনন্ত যুদ্ধের’ পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, এখন আইএস ফ্রান্সের হাত ধরে আবার পশ্চিমা বিশ্বসমেত সারা দুনিয়াকে বাকি পথটুকু নিয়ে যেতে চলেছে কি না, সেটা সবারই ভাবা দরকার। যাঁরা এই যুদ্ধকে কেবল ফ্রান্স ও পশ্চিমাদের সঙ্গে আইএসের লড়াই ভাবেন এবং তা থেকে পশ্চিমাদের অবশ্যম্ভাবী ক্ষতি বলে তাঁদের লাভ মনে করেন, তাঁদের কাছেও আমার আবেদন—ভেবে দেখুন। কেননা, বিস্মৃত হওয়ার উপায় নেই যে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের লড়াইয়ের বিরূপ ফল সবচেয়ে বেশি কাদের বইতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কাদের প্রাণনাশ হয়েছে বেশি, নিরাপত্তার নামে কারা তাদের অনেক কষ্টে অর্জিত নাগরিক অধিকার হারিয়েছে, পৃথিবীজুড়ে রাষ্ট্রগুলো কীভাবে নিপীড়নের শক্তি সঞ্চয় করেছে, কী করে আমরা সবাই একধরনের নজরদারির মধ্যে জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছি এবং কী অজুহাত দেখিয়ে মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশগুলোতে কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা তাদের স্বৈরাচারী শাসনকে বৈধতা দিয়েছে।
আমার কথাগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য তিনটি প্রশ্ন সাহায্য করবে। প্রথমত, আইএস কেন এখন ইরাক-সিরিয়ার বাইরে (যেমন তুরস্ক, বৈরুত, মিসর থেকে উড্ডয়নরত রাশিয়ার বিমান, প্যারিস) হামলা চালাচ্ছে? দ্বিতীয়ত, আইএসের এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ফলে বিভিন্ন দেশের নিজ দেশে ও বাইরে কোন প্রতিক্রিয়াকে আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নেব? তৃতীয়ত, আইএসকে পরাজিত করার উপায় কী?
২০১৪ সালের গ্রীষ্মকালে আইএসের প্রতিষ্ঠার সময় আমরা লক্ষ করেছিলাম যে আইএস নিজেকে একটি রাষ্ট্র বলে দাবি করে এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে জায়গা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আনার জন্য সচেষ্ট হয়। তারপর থেকে যাঁরা আইএসের উত্থানকে ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ করেছেন, তাঁরা দেখেছেন যে আইএস তার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তাদের মতো করে একটি প্রশাসনিক কাঠামো পর্যন্ত তৈরি করে ফেলে, তারা তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে নিয়মিত রাজস্বের একটা উপায় তৈরি করেছে, এমনকি স্থানীয়ভাবে রাজস্ব আদায়ের উপায়ও বের করেছে। গত কয়েক দশকে আমরা যেসব আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান দেখেছি, তারা কেউই নিজেদের জন্য জায়গা তৈরি করতে চায়নি। কেননা, কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার অর্থই হচ্ছে প্রতিপক্ষের আক্রমণের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হওয়া।
সহিংস উগ্রপন্থী সেসব গোষ্ঠীই কেবল নিজেদের জন্য ভূমির সন্ধান করেছে, যাদের লক্ষ্য ব্যাপকার্থে জাতীয়তাবাদী, যাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা একটি অঞ্চলকেন্দ্রিক এবং যারা জানে যে ওই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তাদের সমর্থনের ভিত্তি রয়েছে, এমনকি যদি তা সংখ্যায় অতি ক্ষুদ্রও হয়। যারা একটি আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় বিশ্বাস করে, তারা ঘাঁটি বা অবস্থানের জন্য অন্যদের ওপরে নির্ভর করে। আল-কায়েদার ইতিহাস এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তার পরিচালনাকেন্দ্র ছিল প্রধানত পেশোয়ারে; ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সুদানে, ১৯৯৬ সালের পরে আফগানিস্তানে। সুদান বা আফগানিস্তানে আল-কায়েদা চাইলে ক্ষমতা দখল করে সরকার চালাতে পারত বলেই ধারণা করা হয়; কিন্তু আল-কায়েদার নেতারা তা করেননি। আইএসের উত্থানের পটভূমিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় (এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখতে পারেন আমার লেখা তিন পর্বের আলোচনা, প্রথম আলো ১৬, ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)। এর জন্য প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোকে দোষারোপ করা হয়ে থাকে; সেই আলোচনায় না গেলেও এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে ইরাকের রাজনীতিতে সুন্নি মতানুসারীদের কোণঠাসা করা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় ট্রাইব বা গোত্রগুলোর সমর্থন লাভ এবং ইরাকি সেনাবাহিনীর ব্যর্থতার ফলে কম সময়ের মধ্যে আইএস তার ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছিল।
এক বছরের বেশি সময় ধরে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও হিজবুল্লাহর আক্রমণ মোকাবিলা করে টিকে আছে এবং সারা পৃথিবী থেকে, বিশেষ করে ইউরোপ থেকে তরুণ-তরুণীদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছিল। আইএসের আদর্শের নামে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে কিছু অভিযান বিভিন্ন দেশে পরিচালিত হলেও কয়েক দিন ধরে সংঘটিত আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞের আগে আইএসের জ্ঞাতসারে, তাদের পরিকল্পনার মাধ্যমে কোনো অভিযানের ঘটনা ঘটেনি। তাহলে এখন এমন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে আইএস কার্যত তার শত্রুদের ঘরে ডেকে আনছে? তার কারণ এই নয় যে আইএস নিজেকে শক্তিশালী মনে করছে, বরং ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে আসলে ঘটনা ঠিক তার বিপরীত।
গত কয়েক মাসে আইএস ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। আগে তারা বিদেশ থেকে যে হারে তরুণদের আকর্ষণ করছিল, তা আর করছে না। গত দুই মাসে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা হারিয়েছে। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে সম্প্রতি সিনজির শহরের পতন। সিরিয়ার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আইএসকে যে সুবিধা দিয়েছিল, এখন তা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে—যুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ, ভিয়েনায় কুড়িটি দেশের সম্মেলনে একটি রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা, বাশার আল-আসাদকে আপাততভাবে হলেও ক্ষমতায় রেখে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্মতি এবং আইএসের বর্বরোচিত আচরণের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠা—এগুলো আইএসের অস্তিত্বকে ক্রমেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছিল। আর সে কারণেই আইএসের নেতারা বুঝতে পেরেছেন যে তাঁদের এখন কৌশল বদলের বিকল্প নেই। সেই ক্ষেত্রে তারা তাদের অনিবার্য ধ্বংস থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে চাইছে। একদিকে যদি তারা পশ্চিমা কোনো দেশের দৃশ্যমান হামলার কারণে সরে যেতে বাধ্য হয়, তবে তা মনে হবে তাদের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ। তদুপরি তাদের ওপরে হামলার সময় যে ধরনের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি হবে, তাকে আইএস সাংগঠনিকভাবে পুঁজি করতে না পারলেও ভবিষ্যতে তাদের মতো অন্য কোনো সংগঠন যে তাকে পুঁজি করতে পারবে, সেটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। প্রাসঙ্গিকভাবে স্মরণ করা দরকার যে সিরিয়ায় আল-কায়েদার শাখার মধ্য থেকেই আইএসের উত্থান ঘটেছে। ফলে আইএসের এই আক্রমণকে যাঁরা আইএসের শক্তি প্রদর্শন ভাবছেন, তাঁদের সঙ্গে আমি ভিন্নমত পোষণ করি। কিন্তু পাশাপাশি এটাও আমার অনুমান যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তারা আগের যেকোনো সংগঠনের চেয়ে বেশি ভয়ংকর হবে।
আইএসের এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ফলে ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে আরও বেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, আইএসকে ধ্বংস করার সংকল্প ঘোষণা। এগুলো স্বাভাবিক এবং সম্ভবত আইএসের প্রত্যাশিত। পাশাপাশি ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশপ্রেম বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, মসজিদে হামলা হচ্ছে, অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রাণে বাঁচার আশায় যে মানুষেরা এখন ইউরোপে, তাদের দেখা হচ্ছে এমনভাবে, যেন তারাই অপরাধী। ইউরোপের দক্ষিণপন্থীরা এই অবস্থা থেকে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে তৎপর। তাদের সঙ্গে কার্যত যোগ দিয়েছে ইউরোপের কিছু উগ্র ইসলামপন্থী। তারাও চায় এই সময়ে সমাজের ভেতরে তৈরি হোক বিভক্তি। এই বিভক্তি ইউরোপের অভিবাসীদের মধ্যে, অভিবাসীদের উত্তরসূরিদের মধ্যে তৈরি করবে বিচ্ছিন্নতা, ক্ষোভ। আর আইএস বা তার মতো সংগঠন আজ হোক কাল হোক, তাকে পুঁজি করতে চাইবে, তাতে সম্পূর্ণ সফল হওয়ার দরকার হবে না, সামান্য সাফল্যই এক অনন্ত যুদ্ধের পথে ঠেলে দেবে। ‘আমরা’ আর ‘তারা’—এই ভাগে আর শেষ হবে না। আইএসের একটি ডকুমেন্টে বলা হয়েছে যে তারা চায় পৃথিবীকে সাদা-কালোতে বিভক্ত করতে, যে ‘ধূসর এলাকা’ (গ্রে জোন) আছে, তা শেষ করে দুই শিবিরে ভাগ করতে।
তাহলে আইএসকে পরাজিত করতে হলে কী করতে হবে? আইএসকে পরাজিত করার একটি অংশ হচ্ছে সামরিক। আর সেটি অবশ্যই কেবল বিমান হামলা নয়। নাটকীয় বিমান হামলা করে আইএসের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা মুক্ত করা যাবে না, তার জন্য স্থল অভিযানের দরকার হবে। তবে তার দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারদের, সেখানকার নাগরিকদের। বিদেশি শক্তি—সেটি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ফ্রান্স কিংবা রাশিয়া যা-ই হোক—তাদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের ফল হবে বিপরীত। কিন্তু তার আগে দরকার হবে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা। দেশ পরিচালনায় সিরিয়ার নাগরিকদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা, ইরাকের নাগরিকদের মধ্যে বিভক্তির অবসান, লিবিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব পদক্ষেপ রাতারাতি অর্জন করা যাবে না, কিন্তু প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এখনই। যা অবিলম্বে করতে হবে তা হলো, আইএসের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন ও অর্থ জোগানোর পথ বন্ধ করে দেওয়া, তাদের সঙ্গে বাণিজ্যের পথ বন্ধ করে দেওয়া। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়েই সমস্যার সমাধান করতে হবে এটা ঠিক, কিন্তু সহিংস চরমপন্থা বিস্তারে কার কী ভূমিকা, সেটা সবার জানা। এসব ভূমিকা অব্যাহত রেখে আইএসকে পরাস্ত করা যাবে না।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

সবার জন্য আর্থিক পরিষেবা টাকার চেয়েও বেশি by ম্যাক্সিমা থরেইগিতা সেরুতি

নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমা গাজীপুরের
শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ
কার্যালয়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের
কার্যক্রম ঘুরে দেখেন l ছবি: পিআইডি
জাতিসংঘ মহাসচিবের ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ফর ডেভেলপমেন্ট-বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে এখন বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমা। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, আর্থিক পরিষেবা সম্প্রসারণ বিষয়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তাঁর নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে আমি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সম্মেলনে যোগদানের জন্য নিউইয়র্ক যাই। সেখানে বাংলাদেশ এবং আমার নিজের দেশ, কিংডম অব নেদারল্যান্ডসসহ ১৯৩টি দেশ কর্তৃক একটি সুদূরপ্রসারী নতুন বিশ্বজনীন কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল। এই পরিকল্পনাটি পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য উন্নয়নমূলক প্রচেষ্টাগুলোর একটি পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে। এটা দারিদ্র্য, ক্ষুধা, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণসহ সুদূরপ্রসারী উদ্বেগগুলোর প্রতি মনোযোগ দেবে; সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে এবং সব ধরনের জটিলতার মধ্যে স্বাভাবিক পৃথিবীকে সুরক্ষা প্রদান করবে।
এসব নতুন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ উচ্চাভিলাষী, তবে আমি এর আশা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জাতিসংঘে একটি সুগভীর বোধ আশাবাদ দেখেছি। আমি এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রতি বিশ্বনেতাদের অঙ্গীকার জোরদার হওয়ার কথা শুনেছিলাম। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে তাঁরা এসব লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। তাকেই চূড়ান্ত মনে করেননি, বরং চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম মনে করেছেন।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু অর্থের বিষয় নয়, এটি হলো সুযোগের দ্বার অবারিত করার বিষয়। দরিদ্র মানুষকে তাদের অসচ্ছলতা থেকে সুরক্ষা দিতে, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে এবং চাহিদা অনুযায়ী জীবন গঠন করতে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হলে সেগুলো সবার জন্য কার্যকর একটি দীর্ঘস্থায়ী পৃথিবী গঠন করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের স্পেশাল অ্যাডভোকেট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ফর ডেভেলপমেন্ট হিসেবে আমি বহু বছর ধরে আর্থিক পরিষেবায় দরিদ্র মানুষের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করার জন্য কাজ করছি। এবং এটা খুবই আনন্দদায়ক যে বাংলাদেশের সরকারসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতারা বিষয়টিকে আরও স্থিরসংকল্পের সঙ্গে নিয়েছেন।
নেতারা এখন কেন এই উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করছেন? বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্কদের চল্লিশ শতাংশ ২০০ কোটি মানুষ প্রাথমিক আর্থিক পরিষেবাসমূহ ছাড়া বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। তবে বর্তমানে, প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করতে আমাদের রয়েছে এক অভূতপূর্ব সুযোগ, ডিজিটাল ও মোবাইল প্রযুক্তির মতো নানাবিধ উদ্ভাবনী।
আর্থিক পরিষেবাসমূহ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে মানুষের জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসছে। ঢাকায় কাজ করেন এমন একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যখন নগদ অর্থের পরিবর্তে তাঁর পে-চেকটি সরাসরি একটি ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করেন, তখন তিনি তাঁর পুরো পারিশ্রমিক পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হন এবং সন্তানের শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন মেটাতে নিরাপদে অর্থ আলাদা করে রাখতে পারেন। সাতক্ষীরা জেলার একজন কৃষক যখন তাঁর শস্যের বিমা গ্রহণ করেন, তখন বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগ তাঁর ফসলের খেত নষ্ট করে ফেললেও তিনি তাঁর পরিবারের মঙ্গলের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন। দুবাইয়ে কর্মরত একজন নির্মাণশ্রমিক যখন মাত্রাতিরিক্ত ফি প্রদান ব্যতিরেকেই একটি ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কালাইয়ে তাঁর পরিবারের কাছে নিরাপদে অর্থ প্রেরণ করেন, তখন তাঁর কষ্টার্জিত বেতনটি আরও বেশি খাবার, পোশাক-আশাক এবং তাঁর স্বজনের পেছনে ব্যয় করতে পারেন।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বাংলাদেশের নবধারা প্রবর্তনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আছে। আধুনিক ক্ষুদ্রঋণের সূতিকাগার হিসেবে বাংলাদেশ যথার্থ ধারণাটি আবিষ্কার করতে সহায়তা করেছিল। বর্তমানে এটি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, বিশেষ করে ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবাসমূহের মাধ্যমে। গ্রাহকেরা ভরসা রাখেন এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন, এমন একটি দরিদ্রবান্ধব আর্থিক ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি এবং বণ্টন করতে হয়, তারই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো সফল মোবাইল আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী, বিকাশ।
তবে আর্থিক পরিষেবাসমূহে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করতে বাংলাদেশ আরও কাজ করতে পারে, বিশেষ করে মহিলাদের জন্য। কোনো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ পুরুষের অ্যাকাউন্টের বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মহিলার অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যে বৈষম্যটি বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন ঘটায়। এই পার্থক্যটুকু কমাতে পারলে তা অবশ্যই লিঙ্গ সমতা অর্জনে সাহায্য করবে, যা হলো দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি। তবে, এটি পরিবারের কল্যাণেও সাহায্য করবে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যখন কোনো মহিলা গৃহস্থালির আয় নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন তিনি এই আয়ের বেশির ভাগ অংশ খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করে থাকেন।
আমি সানন্দে বলছি যে বাংলাদেশ সরকার আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জসমূহকে সরাসরি মোকাবিলা করছে এবং এমন পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে, যা দেশটিকে দরিদ্র মানুষের জন্য আর্থিক প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করার সুযোগ করে দেবে। বর্তমানে দেশটি জাতীয় ব্যাংক মূলনীতির খসড়া প্রস্তুত করছে, যা মোবাইল আর্থিক পরিষেবাগুলোর বাজারকে সুবিন্যস্ত করবে।
জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কার্যকৌশল তৈরির বিষয়েও গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। একটি বিধিবদ্ধ কার্যকৌশল তৈরি করা হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন সম্ভব হয়। বাংলাদেশের একাধিক সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হতে পারে, একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি এবং তা বাস্তবায়নে যৌথ প্রতিশ্রুতি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জটিল কাজে বাড়তি গতি সঞ্চার করতে পারে।
পৃথিবীব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য যে নাগালের মধ্যে রয়েছে তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। গত তিন বছরে ৭০ কোটি মানুষ আর্থিক প্রবেশাধিকার পেয়েছে, যা হলো ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এখনো বাইরে থাকা ২০০ কোটি মানুষের কাছে আমরা যেহেতু পৌঁছাতে চাই, তাই বাংলাদেশকে একটি প্রধান দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে অগ্রগতি একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে যা ঘটবে সেটাই অন্যত্র এই কার্যক্রমের গতিধারা ঠিক করবে।
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ গ্রহণ করার মাধ্যমে সমতা ও স্থায়িত্বের দূরদৃষ্টির প্রতি বিশ্ব নিজেই অঙ্গীকার করেছে, যার জন্য প্রয়োজন হবে কঠোর পরিশ্রম, সহযোগিতা ও অধ্যবসায়। তবে এই লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে হলে আমাদের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এমন ভিত্তিসমূহকে দ্রুততার সঙ্গে গঠন করতে হবে। ওই সব ভিত্তির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি।
এটি দেখতে পাওয়া খুবই উৎসাহব্যঞ্জক যে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জে সাড়া দিয়েছে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে আরও গভীর করে তুলতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে জাতিসংঘে ১৯৩টি দেশ উপলব্ধি করেছে যে এভাবেই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সাধিত হয়—লক্ষ্য থেকে লক্ষ্যে, ধাপে ধাপে। লাখ লাখ বাংলাদেশির প্রভূত উপকার হতে পারে।