Monday, December 30, 2013

নতুন করে শিক্ষা নিয়ে ভাবুন by মোঃ মুজিবুর রহমান

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহেও দেশে যে ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় অস্থিতিশীল রাজনীতির উত্তাপ সহজে কমবে না। বরং দিন দিন তা আরও বাড়বে। এরই মধ্যে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে চলেছে দেশ। অন্যদিকে, নির্বাচন বর্জনকারী বিরোধীদলীয় নেতৃত্বাধীন জোট বর্তমান নির্বাচন অনুষ্ঠানের কার্যক্রম বাতিল করে নতুনভাবে তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তারা নবম সংসদ ভেঙে দেয়ারও দাবি উত্থাপন করেছে। নির্বাচন নিয়ে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে প্রবাহিত হয় সেটাই দেখার বিষয় হয়ে রইল। এদিকে আমরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এরই মধ্যে একরকম ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছে; শিক্ষাকে এক ধরনের টেনে নিয়ে গেছে খাদের কিনারে। এ নিয়ে আমরা পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে বহু আবেদন-নিবেদন করেছি, একই কথা বিভিন্নভাবে বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কার্যত আমাদের আবেদন-নিবেদন কোনো কাজে আসেনি। গণমাধ্যমও গুরুত্বের সঙ্গে এসব বিষয় তুলে ধরেছে, তাতেও তেমন কোনো ফল দেখা যায়নি। বরং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পরিকল্পনা মতোই এগিয়ে চলেছে। অথচ ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এবং তাতে শিক্ষার্থীদের কী ক্ষতি হচ্ছে, সেদিকে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না! রাজনৈতিক পরিস্থিতির সর্বশেষ ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করে আমাদের মনে এখন এমন ধারণার জন্ম হচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও মহাবিপদ! কারণ আমরা দেখলাম, রাজনৈতিক ঝড়-ঝঞ্ঝার কবলে পড়ে ২০১৩ সালের পুরো বছর শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। রাজনৈতিক তাণ্ডবের মুখে বিপর্যস্ত হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রাথমিক স্তর থেকে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষা বিঘ্নিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা, দেখা দিয়েছে সংশয়। এখনও প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে আছে। ২০১৪ সালের শুরুতেই যদি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসে তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আর বাঁচানো যাবে কিনা তাতে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। কারণ এমনিতেই শিক্ষার যতটুকু ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে, এখন আগামী দিনগুলোতে যদি শিক্ষা কার্যক্রম নিরাপদে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া না যায় তাহলে শিক্ষার্থীদের কপালে আরও দুর্ভোগ আছে- এটা একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়!
রাজনৈতিক কার্যক্রম কিভাবে চলবে তা রাজনীতিকদের ওপর নির্ভর করলেও শিক্ষা কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হবে সেটা নিয়েও রাজনীতিকদের ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। একইভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন নির্ভরশীল। যে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যত বেশি স্থিতিশীল, সে দেশ তত বেশি উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারে। অথচ আমাদের দেশে উন্নয়নকামী মানুষরা শিক্ষা নিয়ে সৃষ্টিশীল চিন্তা করবে কখন, তাদের অধিকাংশের সময় কাটে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের হিসাব করতে। আমরা দেখছি, বর্তমানে দেশে শিক্ষা যেন কোনো গুরুত্বই পাচ্ছে না। বরং এক কথায় বলা যায়, শিক্ষা সবচেয়ে অবহেলিত খাত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে শিক্ষায় যতটুকু সফলতা অর্জিত হয়েছিল তাও এখন মলিন হতে চলেছে। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, তেমনি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্বও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এড়াতে পারে না। বরং শিক্ষাসহ সব খাতের নিরাপদ পরিচালনা নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। দেশে যদি সারা বছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করে তাহলে কোনো কার্যক্রমই স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। মোটা দাগে কথা হল, রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে সব ধরনের কর্মকাণ্ড মুখ থুবড়ে পড়ে, বিঘ্নিত হয় উন্নয়ন কার্যক্রম। শিক্ষা এমন একটি খাত যে খাতের স্বাভাবিক বিকাশ এবং সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অথচ এটাই আমাদের দেশে সম্ভব হয়নি আজও।

এরা যদি অবরোধকারী, পিকেটার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী হয়ে থাকে, তাহলে সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত, দুষ্কৃতকারী কারা? by মহিউদ্দিন আহমদ

কিছু দিন ধরে খবর শুনতে দেখতে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো খুললে বা পত্রিকাগুলো হাতে নিলে আমার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। দুনিয়ার এতগুলো দেশে চাকরি করলাম, এতগুলো দেশে সরকারি বা ব্যক্তিগত সফরে গেলাম, কিন্তু কোথাও এসব দেশের টিভি চ্যানেলে বা পত্র-পত্রিকা, রেডিওর খবরে বোমা হামলাকারীদের সম্মানজনকভাবে বর্ণনা বা উল্লেখ করতে দেখিনি। এ কলামটি যখন লিখছি আজ (শুক্রবার) সকালে তখন ব্যাংকক, কায়রো, ইস্তাম্বুল, আংকারা, দক্ষিণ সুদান, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, ইউক্রেনে এই-সেই কারণে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, বোমা হামলা, মারামারি-কাটাকাটির খবর দেখছি বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা টিভি চ্যানেলগুলোতে। কিন্তু কোনো বিদেশী চ্যানেলেই তো দেশের প্রযোজ্য আইন-কানুন লংঘনকারীদের এমন মর্যাদা সম্মান দিয়ে বর্ণনা করা হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর প্রতিটি নিউজ বুলেটিনে এমনটি করা হচ্ছে সৎ সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন-বিধিবিধান লংঘন করে।
গত ২৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার চ্যানেল আই-এর দুটার খবর দেখছিলাম। প্রথম ৫ মিনিটে ১০ বারের মতো ‘অবরোধকারী’ শব্দটি ব্যবহার করা হল দেশের বিভিন্ন জায়গার অবরোধের খবর দিতে গিয়ে। তারা বোমা হামলা চালিয়েছে, মানুষ মেরেছে, ককটেল ফুটিয়েছে, গাছ কেটেছে, রাস্তা কেটেছে, রেললাইন উপড়ে তুলেছে, গাড়িতে আগুন দিয়েছে, তারপরও তারা সন্ত্রাসী নয়, পিকেটার নয়, দুর্বৃত্ত নয়, দুষ্কৃতকারী নয়; তারা অবরোধকারী, পিকেটার, শিবির বা বিএনপির নেতাকর্মী!! ২৫ তারিখ বুধবার সকাল ৬টায় এটিএন নিউজে খবর দেখছিলাম। আগের দিন রাতে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বাংলামোটরের পুলিশের রিকুইজিশন করা বাসে আগুন দিয়ে। তখন দেখলাম ‘দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে’ শব্দগুলো ব্যবহার হতে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার ‘অবরোধকারী’ শব্দে ফিরে গেল এটিএন নিউজ। আজ (শুক্রবার) ভোর ৬টায় এটিএন নিউজের প্রতি ঘণ্টার খবরের সঙ্গে ‘অবরুদ্ধ বাংলাদেশ’-এর ওপর আগামী দুই দিন বিশেষ খবর দেখানো হবে বলা হয়েছে। কিন্তু একই খবরে রাজশাহীর পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থ রায়ের হত্যা ১৮ দলীয় সমর্থকদের বোমা হামলায় ঘটেছে, বলা হয়েছে। এর বিপরীতে শুক্রবার সকাল ৭টায় চ্যানেল ’৭১-এর খবরে সিদ্ধার্থ রায়ের হত্যাকারীদের কয়েকবারই ‘দুর্বৃত্ত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এক চ্যানেলের খবরে যারা ‘দুর্বৃত্ত’ অন্য চ্যানেলের খবরে তারা ‘সমর্থক’ কেন? এটিএন-এর বুলেটিনে যারা বোমা মেরেছে, ককটেল ফুটিয়েছে, তারা কি সন্ত্রাসী নয়? তাহলে তাদের আবার ‘অবরোধকারী’, ১৮ দলীয় সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করা হল কেন? অবরোধকারী তাদেরই বলা যাবে, যারা আইন মেনে শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ করবে। প্রতিবাদ করতে, রাস্তায় শুয়ে পড়তে এবং নিজ ইচ্ছায় দলে দলে গ্রেফতার হতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে এবং পরেও অনেক দেখেছি।
সেই ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের কয়েকটি ছবি ঐতিহাসিক মর্যাদা পেয়েছে। এমন একটি ছিল মওলানা ভাসানী রাস্তায় হাত তুলে নামাজের নিয়ত করছেন, আর একটিতে দেখি প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় পাকিস্তানের এক এয়ারফোর্স চিফ এয়ার মার্শাল (অবসরপ্রাপ্ত) আসগর খানের ওপর পুলিশের গাড়ি থেকে পানি ছিটানো হচ্ছে। একটি উদোম গায়ের সাত-আট বছরের এক শিশুকে আর একটি ছবিতে কচি হাত তুলে চিৎকার করে স্লোগান দিতে দেখি একটি মিছিলের আগে আগে। যতটুকু মনে পড়ছে ছবিটি তুলেছিলেন রশিদ তালুকদার। মনে রাখা জরুরি এবং ‘ফরজ’ যে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানটি ছিল একজন সামরিক শাসক আইউব খানের বিরুদ্ধে, জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন নিয়ে বিজয়ী কোনো নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে নয়।
দুই.
দৈনিক ‘প্রথম আলো’ এবং ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’কে দেশের প্রথম শ্রেণীর, প্রভাবশালী পত্রিকা হিসেবে বর্ণনা করতে গিয়ে আমি গত দুই-তিন বছরে কত জায়গায় যে সমালোচিত এবং নিন্দিত হয়েছি, তার বর্ণনা দিতে হলে আমাকে আলাদা একটি কলাম লিখতে হবে। কিন্তু তাই বলে আমি দমিনি। পত্রিকা দুটি বিভিন্ন সময়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে আমি তার তারিফ করি। কাদের সিদ্দিকীর (‘ব্রিজোত্তম’, এই উপাধিটি মুনতাসীর মামুনের) ওপর কয়েক বছর আগে প্রথম আলো যে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করেছে তা এখনও আমি সংরক্ষণ করে চলেছি। বসুন্ধরা গ্র“পের পত্রিকা ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ এই ‘ব্রিজোত্তম’ একজন মর্যাদাবান কলাম লেখক। কিন্তু এই ‘ব্রিজোত্তম’ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংয়ের এতগুলো কন্ট্রাক্ট পেয়ে প্রায় সব টাকা তুলে নিলেন, কিন্তু ব্রিজগুলোর একটির কাজও কেন শেষ করলেন না- এ প্রশ্নটির জবাব এই কয়েক বছর দৈনিক প্রথম আলোর মতো আমিও খুঁজে চলেছি। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ কি কোনো দিন তাকে এ প্রশ্নটি করেছে? গোলাম মাওলা রনি চার মাস আগে সাংবাদিক পিটিয়ে এই দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন অফিস থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেন, জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর একজন বিশিষ্ট কলাম লেখক!! যেমন বিশিষ্ট লেখক নূরে আলম সিদ্দিকী! উদোম গায়ে নূরে আলম সিদ্দিকীকে প্রথম দেখি ছবিতে, ১৯৭২ এর প্রথম দিকে লন্ডনে সাংবাদিক সাইমন ড্রিং আয়োজিত বাংলাদেশের ওপর একটি ‘ফটোগ্রাফিক একজিবিশন’-এ। ছবিতে নূরে আলম সিদ্দিকীর কোমরে একটি রিভলবার, তখনও দাপটশালী চার খলিফার এক খলিফা। তারপর ডলার ব্যবসায়ে তার উত্থান পর্বে তাকে দেখি দ্বিতীয়বার সামনাসামনি, আমার সম্পর্কে চাচাতো ভাই মরহুম আমীর হোসেনের দিলকুশা সোনালী ব্যাংকের অফিসে। বিডিআরের ডাইরেক্টর জেনারেল শহীদ মেজর জেনারেল শাকিলের শ্বশুর মরহুম এই আমীর হোসেন তখন এই সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার। ডরিন টাওয়ার নিয়ে তার সব অপকীর্তি ডেইলি স্টার ছবিসহ প্রকাশ করেছে দুই বছর আগে। আওয়ামী লীগের টিকিটে ঝিনাইদহে এমপি নির্বাচনে দুইবার ব্যর্থ নূরে আলম সিদ্দিকী; এবার তার ছেলে একই নির্বাচনী এলাকা থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী!
দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার এই তিন জনপ্রতিনিধির ওপর বিভিন্ন সময়ে যেসব রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সেগুলোকে আমি তারিফ করেছি। আমার ধারণা, প্রথম আলো তাদের অপকর্ম-অপকীর্তি উন্মোচন করেছে বিভিন্ন সময়ে; বসুন্ধরা গ্র“পের এই পত্রিকায় তাদের এত ইজ্জত-মর্যাদা-সম্মান। বিএনপির মিডিয়াপল্লী শিরোনামের রিপোর্টটিও আমি সংরক্ষণ করে চলেছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাকারী আমাদের কিছু পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল বিএনপি-জামায়াত জমানায় কেমন সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে তার ওপরও কতগুলো ফাইল আমার কাছে আছে।
আমাদের কয়েকটি টিভি চ্যানেল এই-সেই উপলক্ষে যেসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেসব অনুষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাকারী কুতুবমিনার সাইজের কিছু ‘সিভিল’কেও দেখি। গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলকেও উৎসব করতে দেখলাম। সেখানে বড় বড় এই ‘সিভিল’দের সাক্ষাৎকারও ছিল। ভালো কথা। কিন্তু এইসব সিভিল, আমাদের সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং অধ্যাপক আবু সায়ীদ কোনোদিন কি তাদের এইসব টিভিতে বিজ্ঞাপন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেছেন? তারপর এসব সিভিলের বোধ হয় জানা নেই; A corrupt media cannot fight corruption. দুর্নীতিগ্রস্ত গণমাধ্যম দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না। কথাটি আমার নয়। কথাটি বলেছেন তুরস্কের এক কলাম লেখক ইয়াভুজ বেদর (Yavuz Baydor)। গত ১৯ জুলাই দুনিয়ার পাঁচটি প্রভাবশালী দৈনিকের একটি, নিউইয়র্ক টাইমস-এ ‘In Turkey Media- Bosscs Are Undermining Democrac’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধে।
বাংলাদেশেও তুরস্কের মতো এমনটি হচ্ছে না তো?
তিন.
আবদুল কাদের সিদ্দিকীর ওপর প্রথম আলোতে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাটির কথা প্রতিবারই মনে পড়ে যখন তার কোনো লেখা বা বক্তৃতা-বিবৃতি বা সাক্ষাৎকার পড়ি বা দেখি। গতকালই বোধ হয় বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেই দেশে শান্তি ফিরে আসবে। যোগ্য লোকের যোগ্য প্রেসক্রিপশন! মুক্তিযুদ্ধে কাদের সিদ্দিকীর বীরত্বের তারিফ করি। তারিফ করি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তার প্রতিরোধের চেষ্টা। তাকে সম্মান করি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন থেকে তিনি কোনো দিন মাংস মুখে নেননি। কিন্তু তিনি এমন নিশ্চিত হলেন কি করে যে, জামায়াত নির্বাচনে না এলে বিএনপি নির্বাচনে আসবে? প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও বিএনপি কি তখন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবিতে আবার অবরোধ-হরতাল দেবে না? বিএনপির কি কখনও উছিলার অভাব হয়েছে?
প্রথম আলো ফজলে নূর তাপসের যে সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করেছে- তা পড়ে আমি আঁতকে উঠেছিলাম। তার বাবা শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে ৬০-এর দশকের প্রথমদিকে ছাত্রলীগ করতাম। ১৯৬১-তে সলিমউল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ প্রার্থীদের ‘ক্রেডেনসিয়েল’ কয়েকশ’ টাকার অভাবে ছাপাখানা থেকে যখন আনা যাচ্ছিল না, তখন এই মণি ভাই হাতের আঙুলের আংটিটি খুলে দিয়েছিলেন, স্মৃতিটা এখনও জ্বলজ্বল করে। একটি দৈনিক পত্রিকা- এমনি এমনিতে তো পত্রিকাটির পেইড সার্কুলেশন সাড়ে ৫ লাখ নয়। এতসব কৃতিত্ব পত্রিকাটির, কিন্তু এই পত্রিকাটি যে এখন বর্তমান মহাজোট সরকারবিরোধী তা আর প্রচ্ছন্ন নয়, বলতে গেলে এখন তা প্রকাশ্য। কিন্তু তাতেও আমার আপত্তি নেই। আমাদের এই দেশে তো দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং দৈনিক দিনকালও আছে। দৈনিক প্রথম আলো তো এই পত্রিকাগুলোর মতো মৌলবাদের প্রচার করছে না, যদিও মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হই।
কিন্তু এই প্রথম আলো গত ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার যে জনমত জরিপটি প্রকাশ করেছে, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। দৈনিক প্রথম আলো প্রতিদিন তার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম কলামে ‘অনলাইন ভোট’ শিরোনামে আগের দিন একটি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন রাখে এবং এ প্রশ্নের পক্ষে-বিপক্ষে পরদিন প্রাপ্ত ভোট প্রকাশ করে থাকে। ১১ তারিখ বুধবারের প্রশ্নটি ছিল এমন- ‘১৮ দলীয় জোটের অবরোধ-কর্মসূচি শুক্রবার ৬টা পর্যন্ত বাড়ালো- সমর্থন করেন কি?
পরদিন বৃহস্পতিবার প্রথম আলোতে প্রকাশিত রেজাল্টটি ছিল এমন : অবরোধ বাড়ানোর পক্ষে হ্যাঁ, ৭০.৩২%; না, ২৭.০৫% এবং বক্তব্য নেই, ২.৬৩%!!
মানেটা কি দাঁড়াল? দেশের ৭০.৩২% মন্তব্যদানকারী বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলের অবরোধ সমর্থন করে? তার মানেটা কি আরও এই যে, এই সমর্থনকারীরা অবরোধের পক্ষে? সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত ও দুষ্কৃতকারীদের এতসব নিরীহ মানুষ হত্যা, গাছ হত্যা, বাসে-গাড়িতে-সিএনজিতে আগুন দেয়ার পরও এত বিশাল সংখ্যার সমর্থক এই বাংলাদেশে?
যদি প্রথম আলোর এই জনমত সঠিক হয়ে থাকে তাহলে এতসব টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ভয়ঙ্কর ভয়াবহ সব ছবি কি দেশের মানুষদের চিন্তাচেতনা-ভাবনায় কোনোই প্রভাব ফেলছে না! প্রথম আলোর বিভিন্ন পাতায় এতসব মর্মান্তিক ছবিসহ প্রকাশিত খবর সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়র কোনোই কি আছর পড়ছে না? তাহলে দৈনিক প্রথম আলোই বা কেন এতসব সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় ছবি খবর ছাপাচ্ছে? মূল্যবান নিউজপ্রিন্টের এমন বিপুল অপচয় করছে? ১২ ডিসেম্বরের দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠাতেই একটি সড়কের ওপর বড় বড় ১০-১২টি কাঠের গুঁড়ি দিয়ে সড়ক অচল করে দেয়ার ছবি আছে। একই প্রথম পৃষ্ঠায় আরও একটি ছবি,- ছবিটির ক্যাপশন এমন : ‘জামায়াতে ইসলামীর নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় মঙ্গলবার রাতে কার্যকর করা হবে, এমন খবর প্রচার হওয়ার পরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর ও নাশকতার ঘটনা ঘটে। সেই রাতেই ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের শাহজাহানপুর উপজেলার ফত্কী সেতুর রেলিং ভাংচুর করেন শিবিরের কর্মীরা। গতকাল সকালে তোলা ছবি। প্রথম আলো।’ প্রথম আলোর ক্যাপশনের শেষ বাক্যটি আবার দেখুন! ‘ভাংচুর করেন শিবিরের কর্মীরা’। ভাংচুর করেন? এখানে দন্ত্য ‘ন’ দিতে হবে? দন্ত্য ‘ন’ যারা ভাংচুর করেছে তাদের জন্যও থাকবে? তারা ‘শিবিরের কর্মীরা’? তারা শিবিরের সন্ত্রাসী নয়? তারা শিবিরের দুর্বৃত্ত নয়?
শিবিরের সন্ত্রাসীদের সম্মান-মর্যাদা দিয়ে তাজীমের সঙ্গে উদ্ধৃত করতে হবে? লিখতে হবে? এই দিন ১২ ডিসেম্বরের প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘২০ জেলায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব দ্বিতীয় শিরোনামের পরও?’ এই একই দিন পত্রিকাটির ভেতরের অন্যসব পাতায় অবরোধে সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত, দুষ্কৃতকারীদের হামলা-ভাংচুর, মানুষ হত্যা, গাছ কাটার ওপর ১১টি মর্মান্তিক ছবি আছে। বাংলাদেশে বিএনপি, আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল এবং দেশের কতগুলো টিভি চ্যানেল এবং পত্র-পত্রিকা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জামায়াত এবং ছাত্রশিবিরকে সমর্থন, মর্যাদা এবং গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এই জামায়াতের প্যারেন্ট রাজনৈতিক দল মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে মিসরের সরকার। মুসলিম ব্রাদারহুডকে একেবারেই সমর্থন করে না, পছন্দ করে না সৌদি সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার মুসলিম ব্রাদারহুডকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে মিসর সরকার। আর তাতে তাৎক্ষণিক সমর্থন জানিয়েছে সৌদি আরব। কিন্তু বাংলাদেশে মুসলিম ব্রাদারহুডের এক সন্তান জামায়াতে ইসলামকে বুকে কোলে তুলে নিয়েছে বিএনপি!!
চার.
বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা, টিভি সম্পর্কে আমি একটু খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি। গত অক্টোবর-নভেম্বরে আমার নিউইয়র্ক সফর শেষে আমি যে বিশ-পঁচিশটি বই এনেছি, তার মধ্যে ১০-১২টি মিডিয়ার ওপর। একটি বই দুনিয়ার মিডিয়া মোঘল রুপার্ট মারডক এবং অন্য একটি আলজাজিরা টিভি চ্যানেলের ওপর। আমাদের এই গণতন্ত্রের দেশে আমাদের টিভি এবং পত্র-পত্রিকাগুলো সবার ওপরেই খবরদারি করে প্রত্যাশিতভাবেই। কিন্তু আমাদের মিডিয়ার ওপর কার্যকর খবরদারি করার কোনো ব্যবস্থা নেই এই দেশে। তথ্য জানার অধিকার আইনে সরকারের অনেক ধরনের তথ্য জানার অধিকার আমাদের মিডিয়ার তো আছেই, আছে আমাদের সাধারণ নাগরিকদেরও।
কিন্তু আমাদের এতসব পত্র-পত্রিকা, টিভি সম্পর্কে কিছুই জানার অধিকার রাখা হয়নি তথ্য অধিকার আইনে। বিশ্বাস হয়? কিন্তু আমাদের মিডিয়াকেও খোলামেলা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক হতে হবে নিজেদের স্বার্থে, বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হলে।
অন্যের জবাবদিহিতা চাইবেন প্রতিদিন, অথচ নিজেরা তার ঊর্ধ্বে থাকবেন, তা কি হয়? এ পর্যায়ে বিষয়ের ওপর সম্পাদক সাংবাদিক সাহেবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এক. মোহতারেমা খালেদা জিয়া গত ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার প্রেস কনফারেন্সে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে তাতে মর্মাহত হয়েছেন বলেছেন, কিন্তু পাকিস্তানের এই প্রস্তাব গ্রহণকে তিনি নিন্দা জানাননি। তার এই ‘ওমিশন’টিকে আমি ইচ্ছাকৃত মনে করি। কূটনীতিবিদ হিসেবে আমাদের যা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, তাতে যা দৃশ্যমান তা যেমন আমরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, যা বলা হয়নি বা অদৃশ্য এবং যা যা সব ‘ওমিশন’, তার ব্যাখ্যাও আমরা করে থাকি। মোহতারেমার এই ওমিশনটি গুরুতর মনে করি।
দুই. ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের ভোরে সাভার স্মৃৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে না গিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং বিজয় দিবসকে অপমান করেছেন মোহতারেমা খালেদা জিয়া ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের এই আচরণের ওপর কোনোই মন্তব্য করেননি তার প্রেস কনফারেন্সে। কেন তার এই ‘ওমিশন’?
তিন. প্রেস কনফারেন্সে মোহতারেমা খালেদা জিয়া কোনো সাংবাদিকের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি। তার মানে তিনি কি আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবার দেয়া হবে না, সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন ‘এনটারটেইন’ করা হবে না?
তাহলে এই প্রেস কনফারেন্স এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, নয়াপল্টন এবং দেশের অন্যসব জায়গায় বা জাতীয় সংসদে তার দেয়া বক্তৃতার মধ্যে কী ফারাক থাকল? তাহলে প্রেস কনফারেন্স এবং প্রপাগান্ডা কনফারেন্সের কী পার্থক্য? আমরা অতীতেও দেখেছি, সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে তিনি চান না। তার জোট আরোপিত এতসব হরতাল-অবরোধে দেশের যে এত বিপুল বিশাল পরিমাণে ক্ষতি হচ্ছে, এতসব মানুষ আগুনে পুড়ে, বোমা, ককটেল হামলায় মারা যাচ্ছেন, তার কি কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না? সম্পাদক সাংবাদিকরা যদি এই জবাবদিহিতা আদায় করতে না পারেন, গত কয়েক মাসে দেশের হাজার হাজার অসহায়, নিষ্পাপ শিশু, কিশোর-কিশোরী, মা-বাবা, ভাইবোন, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বিধবার চোখের পানি বুকফাটা আর্তনাদও যদি প্রশ্ন করতে আপনাদের এতটুকু সাহস না জোগায়, তাহলে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের কী দায়িত্বটা আপনারা পালন করছেন?
সবশেষে একটি সতর্কবার্তা ও একটি প্রস্তাব। সতর্কতা,- বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আতাউর রহমান আবার ঢাকায় ফিরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বায়ান্ন জনকে একই বছর ফার্স্ট ক্লাস দিয়ে তিনি ‘খ্যাতিমান’ হয়ে উঠেছিলেন। অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এক-এগারোর সরকারকে জায়েজ করার জন্য তিনি প্রবল ভূমিকা রেখেছিলেন। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আসলেই কী ঘটতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী জানতে বাংলাদেশ প্রতিদিন বা প্রথম আলো তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে পারে।

সহিংসতার বিরুদ্ধে চাই জনতার প্রতিরোধ by মোঃ আবু সালেহ সেকেন্দার

রাজনৈতিক সহিংসতায় উত্তপ্ত সাতক্ষীরা। প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষ। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিন্টু সাতক্ষীরার বাসিন্দা। তার সঙ্গে আলাপকালে জানতে চাইলাম সে কেমন আছে। তার কণ্ঠে আতংকের ছাপ স্পষ্ট। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম সেখানে জামায়াত-শিবির আর যৌথ বাহিনী সাধারণ মানুষকে নিয়ে যে কানামাছি খেলছে তার বিবরণ। শুধু সাতক্ষীরায় নয়; গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও সীতাকুণ্ড আজ এক ভয়ানক জনপদ। এসব এলাকার নতুন প্রজন্ম একাত্তর দেখেনি; কিন্তু আজ যা দেখছে তা একাত্তরের শোনা গল্পকেও যেন হার মানায়!
আমরা যে ঢাকা শহরে বাস করছি, সে শহরও কি নিরাপদ? এখানে গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে অহরহ। কোথাও মানুষ পুলিশের গুলিতে মরছে, কোথাও ককটেলে ঝলসে যাচ্ছে। কোথাওবা পিকেটারের ছোড়া হাতবোমায় জনগণের প্রাণপাখি উড়ে যাচ্ছে। নষ্ট এই রাজনীতির খেলায় শহর-গ্রাম, রাজপথ-রেলপথ জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও রাজনীতিকদের যেন কোনো দায় নেই! সরকারি দল-বিরোধী দল কারোই যেন কোনো ভাবান্তর নেই। আর জনগণ অসহায় নাকি ভাবলেশহীন- এর উত্তর পেতে আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ইতিহাস বলে, বাঙালির সবকিছু মেনে নেয়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। তারা দেয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে প্রতিবাদ করে না। মুঘল সম্রাট বাবর বাঙালির এ চরিত্রকে উপলব্ধি করে তার আÍজীবনীতে লিখেছেন- বাংলাদেশে অদ্ভুত রীতি আছে, এখানে জনগণ সিংহাসনকে শ্রদ্ধা করে। রাজাকে হত্যা করে যে কোনো ব্যক্তি সিংহাসনে বসুক না কেন, তাকে সবাই রাজা বলে স্বীকার করে।

বর্তমান সংকটে ক্যাপটিভ এডিটর ও সুশীল সমাজের ভূমিকা by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাংলাদেশের ইংরেজি সাংবাদিকতায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটার মতো একটি ঘটনা ঘটছে দেখতে পাচ্ছি। মনীষীদের মতে, ইতিহাস নিজেই নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। প্রথমে ঘটায় ট্রাজেডিতে। তারপর ঘটায় ফার্স বা প্রহসনে। বাংলাদেশের ইংরেজি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এই মনীষী বাক্যের সত্যতা এখন প্রমাণিত হতে দেখতে পাচ্ছি। সম্প্রতি ঢাকার একটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক ঘন ঘন তার পত্রিকায় নিজ নামে প্রতিবেদন লিখতে শুরু করেছেন। সবই নিরপেক্ষতা ও ইংরেজি ভাষার শালীনতার আড়ালে হাসিনা ও তার সরকারের ক্রুড সমালোচনা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটিতে আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার জন্য একটি কপট আবেদন জানানো হয়েছে শেখ হাসিনার কাছে। এর আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরে আলোচনায় আসছি। আগে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির কথায় আসি। আজ থেকে ৪৩ বছর আগের কথা। পাকিস্তান আমলের ঘটনা। ১৯৭০ সালে সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন। অত্যন্ত সংকট-সন্ধির নির্বাচন। এ নির্বাচনেই পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। পাকিস্তান তার গণতান্ত্রিক অস্তিত্ব ফিরে পেয়ে তার অখণ্ডতা রক্ষা করতে পারবে, না সামরিক শাসনের থাবার নিচে ধ্বংস হয়ে যাবে। তা নির্ধারিত হবে এ নির্বাচনে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু তার আওয়ামী লীগ নিয়ে বাঙালির ম্যাগনাকাটা ছয় দফা দাবি নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার পিপলস পার্টি নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন।
নির্বাচনী প্রচারযুদ্ধ শুরু হতেই যখন বোঝা গেল, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন অনিবার্য, তখন এই নির্বাচন স্থগিত করা, বিলম্বিত করা অথবা বাতিল করার জন্য সামরিক শাসকচক্র এবং দেশটির কায়েমি স্বার্থ উঠেপড়ে লাগে। পূর্ব পাকিস্তানেও সাম্প্রদায়িক দলগুলো এবং কিছু কট্টর আওয়ামীবিরোধী নেতা ও মিডিয়া এই চক্রান্তে হাত মেলায়। হামিদুল হক চৌধুরী ও তার অবজারভার গ্র“পের পত্রিকাগুলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবির সমর্থক হলেও আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চরম বিদ্বেষী হওয়ায় এ নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে তখন বহুল পঠিত ইংরেজি দৈনিক ছিল পাকিস্তান অবজারভার (বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাম হয়েছিল বাংলাদেশ অবজারভার)। আবদুস সালাম ছিলেন সম্পাদক, তখনকার বিখ্যাত ত্রয়ী সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন। স্বাধীনচেতা এবং পূর্ব পাকিস্তানের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। কিন্তু পত্রিকার মালিক হামিদুল হক চৌধুরীর চাপে তাকে তার মতামত প্রকাশের ব্যাপারে অনেক সীমাবদ্ধতা মেনে চলতে হতো।
’৭০ সালের নির্বাচনের ব্যাপারেও অবজারভারের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। এ সময় যেন সামরিক জান্তার মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্যই নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের ঠিক আগে ১৯৬৯ সালের নভেম্বর মাসের গোড়ায় এক ভয়াবহ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোন হল পূর্ব পাকিস্তানে। এক রাতে ১০ লাখ নরনারী মারা যায়। পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এর সুযোগ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে রাওয়ালপিন্ডির সামরিক জান্তার সমর্থক মহল, এমনকি কিছু অনুগ্রহভোগী বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট দাবি তোলেন, বিপন্ন মানবতার উদ্ধারকার্য ও ত্রাণকার্যের স্বার্থে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেয়া হোক। ঢাকার রাস্তায় স্লোগান উঠল, আগে বিপন্ন মানবতার ত্রাণ, তারপর নির্বাচন। এ সময় মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) খণ্ডিত অংশটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক দল। মওলানা ভাসানী ধ্বনি তুললেন, ভোটের আগে ভাত চাই। তা নইলে নির্বাচন বর্জন। সঙ্গে সঙ্গে প্রচার শুরু হল, ন্যাপের (ভাসানী) মতো দেশের একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না এলে এই নির্বাচন ‘সকলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না।’ সুতরাং নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পেছাতেই হবে।
এ প্রচারণার জবাবে বঙ্গবন্ধু এবং তার আওয়ামী লীগের বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, আর একদিনও সামরিক শাসন বহাল রাখতে দেয়া যায় না। যথাসময়ে নির্বাচন করতে হবে। একমাত্র জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারই বিপন্ন মানবতা ও দুর্গত ত্রাণে দ্রুত দায়িত্ব পালনে সক্ষম। সুতরাং নির্বাচন পেছালে চলবে না। শুধু ভয়ানকভাবে বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে নির্বাচন স্থগিত রেখে পরবর্তী কাছাকাছি একটা সময়ে তা সম্পন্ন করে ফেলা যাবে।
ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ‘অবজারভার’ পত্রিকাটি তখন নির্বাচন স্থগিত রাখার প্রশ্নে ক্যাম্পেইন শুরু করে। যেমন- বর্তমানে শুরু করেছে হালের একটি ইংরেজি দৈনিক। অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম তখন স্বনামে একাধিক উপ-সম্পাদকীয় লেখেন। একটি লেখায় তিনি শেখ মুজিবকে রাজা ক্যানিউটের সঙ্গে তুলনা করে লেখেন, “শেখ মুজিব কি রাজা ক্যানিউটের মতো ভাবেন, তার হুকুমে ঝড় বন্যা সমুদ্রের ঢেউ স্থগিত হয়ে থাকবে? বাংলাদেশে এই শীতের মৌসুমে একটা বড় গর্কি (সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস) হয়ে গেছে। আরেকটি শিগগিরই হওয়া সম্পর্কে আবহাওয়া বিশারদরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। তা সত্ত্বেও শেখ মুজিব যথাসময়ে নির্বাচন চান। তা পেছাতে চান না। তিনি কি ভাবছেন, তার নির্দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগও মান্য করে চলবে?”
তখনকার একাধিক শক্তিশালী মিডিয়া এবং তৎকালীন এলিট শ্রেণী বা সুশীল সমাজের একটি অংশের এই জোর বিরোধিতা সত্ত্বেও সামরিক শাসকরা নির্বাচন মুলতবি ঘোষণা করতে সাহসী হননি। মাত্র কয়েক দিন পিছিয়ে ডিসেম্বর মাসেই (১৯৭০) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকটি দুর্গত এলাকায় কিছু পরে স্থগিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ সময় একদিন একটি সরকারি প্রেস ব্রিফিং-মিটিংয়ে গেছি। মানিক মিয়া তখন নেই। আমি ইত্তেফাকে কর্মরত। তখনকার অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালামও এসেছেন সেই ব্রিফিং-মিটিংয়ে। ‘পাসবান’ নামে একটি উর্দু দৈনিক তখন ঢাকায় ছিল। এই পত্রিকার বিহারি সম্পাদক ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি নির্বাচন বন্ধ বা স্থগিত রাখার ক্যাম্পেইনের সমর্থন করেননি। তখন জোর প্রচারণা চালানো হচ্ছিল যে, মওলানা ভাসানীর ন্যাপের মতো দেশের একটি বৃহৎ দল যখন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, তখন এই নির্বাচন জনগণের সার্বিক ম্যান্ডেট হিসেবে বৈধতা পাবে না। ‘পাসবান’ কাগজটি এই প্রচারণার জবাবে লিখেছিল, ‘নির্বাচনের দরজা কোনো দলের জন্য বন্ধ রাখা হয়নি। ভাসানী ন্যাপ যদি স্বেচ্ছায় এই নির্বাচনে না আসে, তাহলে দেশের ভাগ্য নির্ধারণকারী একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন শুধুমাত্র একটি দলের খেয়ালখুশিকে প্রশ্রয়দানের জন্য বন্ধ রেখে দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তোলা কি উচিত হবে?’ আমার ধারণা ‘পাসবান’ কাগজটি আজ বেঁচে থাকলে ২০১৩ সালেও বিএনপি ও সুশীল সমাজের নির্বাচন বন্ধ রাখার দাবি সম্পর্কে একই কথা লিখত।
যা হোক সরকারি ব্রিফিং-মিটিংয়ের কথায় ফিরে আসি। এই মিটিংয়ে পাসবান সম্পাদক হঠাৎ অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালামকে জিজ্ঞাসা করে বসলেন, ‘সালাম ভাইয়া, মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী এবং আপনাকে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানের জাগ্রত বিবেক। মানিক মিয়া আজ নেই। তিনি আজ বেঁচে থাকলে সামরিক জান্তাকে খুশি করার জন্য বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক নির্বাচন বন্ধ করার ক্যাম্পেইনে সমর্থন দিতেন না। আপনি তো বেঁচে আছেন। আপনি কেন এ ক্যাম্পেইনে সমর্থন দিতে গেলেন?’ দীর্ঘকাল আগের কথা। তবু এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে, সালাম সাহেব বিমর্ষ হাসি হেসে বলেছিলেন, ‘আপনিও তো একজন এডিটর। কিন্তু স্বাধীন এডিটর। নিজেই কাগজের মালিক। মানিক মিয়াও ছিলেন তাই। ইত্তেফাকের মালিক। আপনারা নিজেদের স্বাধীন মত স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করতে পেরেছেন এবং এখনও পারেন। কিন্তু আমি তো ক্যাপটিভ এডিটর। আমার মাথার উপরে সব সময় সূক্ষ্ম দড়িতে বাঁধা একটি তলোয়ার ঝোলে। আমি কি ইচ্ছা করলেই সব সময় স্বাধীনভাবে নিজের মত ব্যক্ত করতে পারি?’
দীর্ঘ ৪৩ বছর পর প্রয়াত অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালামের মুখে উচ্চারিত এই ক্যাপটিভ এডিটর কথাটি আমার মনে পড়েছে ঢাকায় অধুনা বহুল পঠিত একটি ইংরেজি কাগজের সম্পাদকের শেখ হাসিনার কাছে নির্বাচন বন্ধ রাখার অনুরোধ(?) জানানো প্রতিবেদনটি পাঠ করে। কারণ তিনিও কাগজটির মালিক নন। আংশিক মালিকানা থাকতে পারে, কিন্তু বেতনভোগী সম্পাদক। দেশ-কাল পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। এ ধরনের সম্পাদকদের মাথার ওপর এখন আর শুধু মালিকের বিধিনিষেধের সূক্ষ্ম তরবারি ঝোলে না, আরও অনেক স্বার্থ সুবিধার তরবারি ঝোলে। এগুলো হল বিগ এনজিও, বিগ বিজনেস, মৌলবাদী অর্থভাণ্ডার ও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের অঢেল অর্থ ও অনুগ্রহ। এগুলোর কাছে আজ বিবেক, আত্মা ও সততা বন্ধক রাখার একটা হিড়িক পড়েছে বাংলাদেশে। কেবল একজন কি দুজন ক্যাপটিভ এডিটরকে দোষ দিয়ে লাভ কি? একটি ক্যাপটিভ সিভিল সোসাইটিও গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে।
এ লেখার শুরুতে আমাদের ইংরেজি সাংবাদিকতায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে প্রথমে ট্রাজেডি এবং পরে ফার্স বা প্রহসন ঘটার কথা উল্লেখ করেছি। ১৯৭০ সালে নির্বাচন বন্ধ রাখার ক্যাম্পেইন সফল না হলেও নির্বাচনটি ট্রাজিক পরিণতি ডেকে এনেছিল। অর্থাৎ ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা নির্বাচনের রায় মেনে না নিয়ে বাংলাদেশে বর্বর গণহত্যা চালিয়েছিল। অন্যদিকে ২০১৩ সালে নির্বাচন বন্ধ বা পিছিয়ে দেয়ার ক্যাম্পেইনটিও সফল হবে মনে হয় না। প্রহসনে পরিণত হবে মনে হয়। তবে এই প্রহসনেও দেশের মানুষের রক্ত ঝরছে। সেদিকে ক্যাপটিভ এডিটর বা ক্যাপটিভ সুশীল সমাজের নজর নেই।
বিস্ময়ের কথা, নির্বাচন বন্ধ রাখার দাবিতে ৪৩ বছর আগে ঢাকার তখনকার ইংরেজি দৈনিকটি যেসব কথা লিখেছিল, ৪৩ বছর পর আজ তারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে আরেকটি ইংরেজি দৈনিকের কণ্ঠে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি ছিল বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জন্য একটি ভাগ্য নির্ধারণকারী নির্বাচন। প্রশ্ন ছিল বাংলা মুক্ত স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশ হবে, না ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী পাকিস্তানের জঙ্গিশাহীর পদানত দেশ হয়ে থাকবে? তেমনি বর্তমানের (২০১৩-১৪) নির্বাচনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এই যে, এই নির্বাচন দ্বারাই অথবা তা অনুষ্ঠিত হওয়া বা না হওয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন মুক্ত ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে টিকে থাকবে, না ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পতাকাবাহী রাজনৈতিক জোটের আধা তালেবানি শাসনের অধীনে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো স্থায়ী কিলিং ফিল্ডে পরিণত হবে? এই শেষোক্ত পরিণতির একমাত্র প্রতিষেধক ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। কোনো অজুহাতেই এ নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা উচিত হবে না।
১৯৭০ সালে নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দেখানো হয়েছিল, নির্বাচন করতে গেলে দুর্গতদের ত্রাণকার্য ব্যাহত হবে এবং ভাসানী ন্যাপের সম্ভাব্য নির্বাচন বর্জনের আন্দোলনের ফলে রক্তপাত হবে, নির্বাচন কেন্দ্র আক্রান্ত হবে এবং দেশে বিপর্যয় দেখা দেবে। ২০১৩ সালের ইংরেজি দৈনিকটির কণ্ঠেও একই যুক্তি। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নেই। বিএনপির নির্বাচন বর্জনের ফলে দেশে রক্তপাত ঘটবে। নির্বাচন বৈধতা পাবে না। দেশের সর্বনাশ হবে।
কিন্তু ক্যাপটিভ এডিটর মহোদয় এ কথা বুঝতে চাইছেন না যে, দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই ভয়াবহ রক্তপাত হচ্ছে। তা ঘটাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরই এবং কিছু তুচ্ছ দাবি তুলে বিএনপি স্বেচ্ছায় এ নির্বাচনে আসছে না। এ ব্যাপারটি ক্যাপটিভ সুশীল সমাজেরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি তথাকথিত সুজন, ট্রান্সপারেন্সির উদ্যোগে যেসব সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে রেহমান সোবহান, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রমুখ সুশীল সমাজের মাথাওয়ালা ব্যক্তিরাও হাজির হয়েছিলেন। নির্বাচন পেছানোর জন্য তারা যে যুক্তি দেখিয়েছেন তার সঙ্গে ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনের যুক্তির বিস্ময়কর মিল। বুঝতে অসুবিধা হয় না এসব যুক্তিতর্কের উৎস এবং উৎসাহদাতা অভিন্ন। এ বিতর্ক সভায় রাশেদ খান মেনন একটি চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার দাবির জবাবে বলেছেন, ‘নির্বাচন না হয় পিছিয়ে দেয়া গেল, কিন্তু পিছিয়ে দেয়ার পরও বিএনপি নির্বাচনে আসবে তার নিশ্চয়তা কি কেউ (সুশীল সমাজ) দিতে পারেন?’ মেননের এ প্রশ্নের জবাব ইংরেজি পত্রিকাটির সম্পাদকের কাছে নেই। তিনিও আজকাল বিভিন্ন টকশোতে জোরেশোরে অংশ নিচ্ছেন।
যেখানে এই ইংরেজি কাগজের সম্পাদক ও সুশীল সমাজের উচিত ছিল, নির্বাচন বন্ধ করার দাবি জানানোর আগে বিএনপির কাছে আন্দোলনের নামে এই বিভৎস হত্যাকাণ্ড, অগ্নিকাণ্ড, গুপ্তহত্যা বন্ধ করার জন্য এবং যুদ্ধাপরাধী সন্ত্রাসী দল জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসার জন্য দাবি জানানো এবং তারপর প্রয়োজন হলে সরকারকে নির্বাচন স্থগিত রাখার পরামর্শ দেয়ার, সেখানে তারা সরকারকে সব অপরাধে অপরাধী করে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণের জন্য দাবি জানাচ্ছেন! এরা কি সত্যিই একটি দেশের দেশপ্রেমিক সুশীল সমাজ?
এদের তো জানা উচিত ছিল আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একটি স্বাভাবিক সময়ের স্বাভাবিক নির্বাচন নয়। এটা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচন নয়। এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীনতাবিরোধী শিবির ও সন্ত্রাসীদের হামলা থেকে মুক্ত রাখার নির্বাচন। এ নির্বাচনের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু দেশের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামো রক্ষা করার জন্য বর্তমান সরকারের সামনে এর কোনো বিকল্প পথও নেই। অবশ্যই এ নির্বাচনের রায় দ্বারা হাসিনা সরকার আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ শাসন করতে চাইবে না। দেশ এই ক্রাইসিস পিরিয়ড মুক্ত হলে, মৌলবাদী সন্ত্রাস দমন হলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্র বিপদমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে অবশ্যই অতি দ্রুত (ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে) আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ততদিন আল্লাহর ওয়াস্তে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই ক্যাপটিভ এডিটর ও ক্যাপটিভ সুশীল সমাজ তাদের মায়াকান্না বন্ধ করুন। নইলে ইতিহাসের কাছে তারা দেশের আপতকালের ‘চরম অমিত্র’ বলে গণ্য হতে পারেন এবং সেদিনটি খুব দূরে নয়।

সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে!

২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘাত ও নাশকতার আশঙ্কা করছে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিএনপি, সুশীল সমাজ ও রাজনীতিক বিশ্লেষকরা। সময় যত যাচ্ছে উত্তেজনা ও উদ্বেগ ততই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে উৎকণ্ঠাও। দুই পক্ষেও মুখোমুখি অবস্থানের কারণে ব্যাপক সংঘাতের আশঙ্কায় সরকার ও বিএনপি বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিবে। কোনো ধরনের ছাড় দিবে না। এই জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যতটা কঠোর হওয়া সম্ভব তা হওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে তারা ২৯ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতিও সম্পন্ন করছে। অবস্থা বুঝে আরো ব্যবস্থা নিবে। সরকারি দলের একাধিক নেতা বলেছেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা যাতে ঢাকায় নয়াপল্টনের সামনে দাঁড়ানে না পারেন ও যেতে না পারেন এই জন্য সব ব্যবস্থা করতে হলেও তারা তা করবে। রক্ত দিয়ে হলেও কর্মসূচি ব্যর্থ করে দিবেন।
অন্য দিকে সরকার বেগম খালেদা জিয়াকেও সংঘাতের আশঙ্কায় ও সরকারের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করতে না দিতে নয়াপল্টনে তাকে যেতে দিবে না। ওই দিন তাকে বাড়ি থেকে বাইরে বের হতে দেওয়া হবে না। নয়াপল্টনে গেলে ও সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীরা সেখানে আসলে তিনি উস্কে দিলে সেখানে পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হতে পারে। সেই সঙ্গে নির্বাচন বানচাল করার জন্য ওই সমাবেশ থেকে যে কোনো ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা হতে পারে। তাদের টার্গেট করেও নাশকতার ঘটনা ঘটানো হতে পারে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়, সরকারি অফিসেও হামলা ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো ঘটতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকার আশঙ্কা করছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সরকারের কাছে এই ধরনের আশঙ্কার কথাই জানিয়েছে। সরকারের কাছে ওই দিনের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে বলেও তথ্য রয়েছে। তারা জানতে পেরেছে বিএনপি ওই দিন মরণ কামড় দিবে। এই কারণে সরকার কোনোভাবেই বিএনপিকে সমাবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইতোমধ্যে ডিএমপি কমিশনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপিকে নয়াপল্টনে ২৯ ডিসেম্বর সমাবেশ করার অনুমতি দিবেন না। ওই দিন কর্মসূচি পালন করতে দিলে নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে মনে করে তারা বিভিন্ন নাশকতার আশঙ্কায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে এরপরও তাদের কাছে খবর রয়েছে বিএনপি ও ১৮ দলের নেতাকর্মীরা এবং সব বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে ঢাকায় আসার চেষ্টা করবেন। ইতোমধ্যে অনেকেই ঢাকায় চলে এসেছেন। তারা সকল বাধা উপেক্ষা করে সেখানে যাবেন। গতকাল পর্যন্ত নেতাদের প্রতি সুস্পষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা বেগম খালেদা জিয়ার দিক থেকে ছিল না। গতকাল তিনি এক ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে সেই দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। দেড় মিনিটের ওই ভিডিও বার্তাতে বেগম খালেদা জিয়া সকল বাধা উপেক্ষা করে ২৯ ডিসেম্বর রোববার গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসূচি সফল করতে সবাইকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান। গতকাল বিকেলে ভিডিও বার্তায় খালেদা জিয়া আরো বলেছেন, আমি আপনাদের পাশে আছি, থাকব সব সময়। যদি আমি আপনাদের পাশে থাকতে না পারি, তাহলেও আপনারা আপনাদের এই কর্মসূচি, এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ সরকারের বিদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এ দেশে আমরা গণতন্ত্র এনেছি, আবারও গণতন্ত্র আনব। আরো বলেছেন, সেদিন আর বেশি দূরে নেই, বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। তিনি নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর প্রতি এই আহ্বান জানান।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শমসের মুবীন চৌধুরী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া এখন কার্যত অন্তরীণ রয়েছেন। তার সঙ্গে দেখা করতে আমাদের কাউকে যেতে দিচ্ছেন না। তার বাসায় তার সঙ্গে কাউকে কথা বলতে দিচ্ছেন না। এতে বোঝা যায় সরকার কি করতে চাইছে। তবে এইভাবে আন্দোলন থামানো যাবে না। এদিকে সূত্র জানায়, বেগম খালেদা জিয়াও আশঙ্কা করছেন সরকার তাকে নয়াপল্টনে যেতে দিবেন না। এই কারণেই তিনি আগাম বার্তা পাঠান। তার বার্তা পাওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা আরো উৎসাহ নিয়ে ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২৯ ডিসেম্বরের কর্মসূচি সফল করার জন্য বলেছেন। এতে করে এখন ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদেরকে বলা হয়েছে, যেখানেই তারা বাধার মুখে পড়বেন। সেখানেই অবস্থান নিবেন। কেউ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করবেন। যে কোনো মূল্যেই কর্মসূচি তাদেরকে সফল করতে হবে। এটাই নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় সমাবেশ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে সবার কাছে প্রমাণ করতে হবে বিএনপির চেয়ে সরকারি দলের চেয়ে অনেক জনপ্রিয়। বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচন চাইছে সেটা এই দেশের মানুষও চাইছে। সরকারের কথাকে মিথ্যে প্রমাণ করতে হবে এই সব বিষয়সহ তারা নির্বাচন প্রতিহত করার ও এই নির্বাচন যে জনগণ মানে না সেই জন্য তারা প্রমাণ দিতে চাইছেন। বিএনপির এক নেতা বলেন, এই কর্মসূচি সফল করার জন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি রাখবো। সরকার যদি আমাদেরকে নির্যাতন করে ও বাধা দেয় আমরাও ছাড়বো না। আশা করি সরকার শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে দিবে। দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণেই সবাই মনে করছে সংঘাত এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দল যে অবস্থানে রয়েছে দুই দল দুই দলকে প্রতিহত করার মতো মারমুখী অবস্থানে রয়েছে। একদল আরেক দলের কর্মসূচি ও উদ্দেশ্য সফল হতে দিবে না। এই কারণে দুই দলের মধ্যে এনিয়ে ব্যাপক সংঘর্ষ হতে পারে। বিএনপির নেতাকর্মীদের হাতে থাকা লাঠিও তারা মারপিঠের জন্য ব্যবহার করতে পারে।
বেগম খালেদা জিয়া ভিডিও বার্তাতে আরো বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় পতাকা হাতে আমি আপনাদের প্রতি ঢাকায় নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সমবেত হতে অনুরোধ করছি। আশা করি, সব প্রতিকূলতা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ওই দিন ঢাকায় গণতন্ত্র রক্ষার সমাবেশে শরিক হবেন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই সরকারের প্রহসনের নির্বাচনে শরিক হতে না বলতে হবে। তা বলার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রকে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনকে হ্যাঁ বলার জন্যও আহ্বান জানাই।
এদিকে বিএনপির এক নেতা বলেন, ম্যাডাম কোনো কারণে সমাবেশে নাও থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন। এই কারণে বলেছেন তিনি না থাকলেও এই কর্মসূচিতে শরিক হয়ে আন্দোলন সফল করতে নির্দেশ দেন।
এর আগে গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, জন নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি এই কথার বলার পর বিকেলেই বেগম খালেদা জিয়া ভিডিও বার্তা পাঠান। গতকাল দুপুরের আগে পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার গণমাধ্যমকে জানান, সমাবেশের অনুমতির বিষয়ে সময়মতো বিএনপিকে জানানো হবে। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করছে। সময়মতো জানানো হবে। ওই দিন পুলিশের ভূমিকা কি হবে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ জনস্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। বিএনপির নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসছে এই বিষয়ে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। জনস্বার্থ সমুন্নত রেখেই পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সারা দেশে নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে বলেছেন, পুলিশ বিধি অনুসারেই অভিযান চালাচ্ছে। গ্রেপ্তার করছে। কেউ বিধি না মানে, তাহলে সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বেশ কিছুদিন ধরেই একটি চক্র দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে।
উল্লেখ, বিএনপি চেয়ারপারন বেগম খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর বিএনপির চিফ হুইপ জয়নুল আবেদীন ফারুক নয়াপল্টনে সমাবেশের অনুমতি, সহযোগিতা ও মাইক ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদনও করেন। ওই সময়ে কমিশনার কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। কিন্তু ওই কর্মসূচির পরই সরকারের বিভিন্ন নেতারা স্পষ্ট করেই বলে দেন বিএনপির কর্মসূচি সফল করতে না দেওয়ার।
এদিকে বিএনপির সূত্র জানায়, সরকার বিএনপিকে বাধা দিবে সমাবেশ করতে দিবে না এটা আমরা জেনেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেছেন। বিএনপিরসহ ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। ঢাকায় অনে্েক আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। বিএনপির নেতারা যদিও অভিযোগ করছেন বিভিন্ন স্থানে বাস-লঞ্চ বন্ধ রেখে নেতাকর্মীদের ঢাকা আসার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এরপর বেগম খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, সমাবেশ করতে বাধা দিলে পরিণতি ভালো হবে না। কঠোর কর্মসূচি হবেই। বেগম খালেদা জিয়া তার ভিডিও বার্তায় স্বাধীনতার যুদ্ধের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন। বলেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়র মাসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় পতাকা হাতে আমি আপনাদের প্রতি নয়াপল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে সমবেত হতে অনুরোধ করছি। তিনি সরকার পতনেরও ডাক দিয়েছেন বলেছেন, আমি আপনাদের পাশে থাকতে না পারি, তাহলেও আপনারা এই কর্মসূচি আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। বর্তমান সরকারের বিদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেছেন, কোনো শক্তিই ২৯ ডিসেম্বরের কর্মসূচিতে বাধা দিতে পারবে না। গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য এই কর্মসূচি অবশ্যই পালন করা হবে। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন। তিনি আরো বলেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ডিএমপির কাছে লিখিতভাবে অনুমতি চেয়েছি। এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো উত্তর পাইনি। তবে আশা করছি, পুলিশের পক্ষ থেকে অনুমতি পাব।
সূত্র জানায়, বিএনপির নেতারা এখন যে কোনো মূল্যে কর্মসূচি সফল করার জন্য কাজ করছেন। তারা মাঠে না থাকলেও গোপনে থেকেই কাজ করছেন। আর এদিকে আওয়ামী লীগ নেতারাও বসে নেই। তারাও সমাবেশ ঠেকানোর জন্য সব ব্যবস্থা করছেন। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত ও বন্ধ করার ক্ষমতা বিরোধী দলের নেই। এত অবরোধ দিলেন, এত কর্মসূচি দিলেন, নির্বাচন কি বন্ধ করতে পেরেছেন? রোববারের মার্চ ফর ডেমোক্রেসি প্রতিরোধ করার জন্য ১৯৭১ সালের মতো প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বলেন, বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সময় প্রস্তাব দিয়েছিলাম তফসিল ১০ দিন পিছিয়ে দেব। নির্বাচনে আসুন। রাজি হলেন না। বললেন, তফসিল স্থগিত করতে হবে। বলা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে আসুন। তাতেও তাদের না। বললেন, শেখ হাসিনার অধীন ছাড়া ক, খ যে কারও অধীনে নির্বাচনে যাব। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই শেখ হাসিনার অধীনে তিনি নির্বাচনে আসেননি। তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এসব নৈরাজ্য সহিংসতা বন্ধ করুন। পরিণতি ভালো হবে না।
সূত্র জানায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট কর্মসূচি সফল করার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকার তা ব্যর্থ করার সব উদ্যোগ নেওয়াতেই এখন উদ্বেগ আরো বাড়ছে। (আমাদের সময়.কম)

দিল্লির নতুন মুখ্যমন্ত্রী আম আদমি-অরবিন্দ

রামলীলা ময়দানে শনিবার দিল্লির সপ্তম এবং কনিষ্ঠতম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আম-আদমি পার্টির (এএপি) অরবিন্দ কেজরিওয়াল। সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আম-আদমির আরও ছ’জন- মণীশ সিসোদিয়া, রাখী বিড়লা, সোমনাথ ভারতী, সৌরভ ভরদ্বাজ, সত্যেন্দ্রকুমার জৈন এবং গিরিশ সোনি। তারা কে কোন দফতরের দায়িত্ব পেলেন, দুপুরের পরপরই তাও জানিয়ে দেয়া হয় দলের তরফ থেকে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম ভাষণে অরবিন্দ বলেন, ‘মন্ত্রী হতে আসিনি। এসেছি সেবা করতে। দেশ থেকে দুর্নীতি বিদায় করতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন।’ এই সরকার যে দিল্লির দেড় কোটি মানুষের সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার হাতে কোনো জাদুকাঠি নেই। দু’-একদিনে কোনোকিছু হওয়া সম্ভবও নয়।
তবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতকে ‘সোনার পাখি’ হিসেবে গড়ার প্রত্যয়ে দিল্লি এসেছে আম-আদমি।পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বাকি সদস্যদের নিয়ে মেট্রোতেই রামলীলা পৌঁছেছিলেন অরবিন্দ। সকাল সাড়ে ১০টায় বাড়ি থেকে কৌশাম্বী স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। বারাখাম্বা স্টেশনে নামতেই জনজোয়ারে আটকে পড়েন। গলায় মালা পরিয়ে তাদের নেতাকে বরণ করে নেয় দলীয় সমর্থকরা। ভিড় কাটিয়ে রামলীলা ময়দানে পৌঁছে বেলা ১২টায় মঞ্চে ওঠে টিম-কেজরিওয়াল। সঙ্গে দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জং। উচ্ছ্বসিত জনতার অভিনন্দন-চিৎকারের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন অরবিন্দ। একে একে আরও ছ’জনকে শপথবাক্য পাঠ করান নাজিব। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির থাকতে পারেননি কেজরিওয়ালের ‘গুরু’ আন্না হাজারে। এদিন সকালে চিঠি দিয়ে তিনি সেকথা জানিয়েও দিয়েছিলেন। এএপির প্রশাসনিক যাত্রা শুরুর দিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে আন্না বলেছেন, ‘অরবিন্দ যেভাবে কাজ করছে সেটাই সঠিক পথ। আমার বিশ্বাস ও আরও ভালো কাজ করবে।’ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দিল্লির কোনও মুখ্যমন্ত্রী রামলীলা ময়দানে শপথ নিলেন। অরবিন্দের আগে ১৯৯৬ সালে বিজেপির সাহিব সিংহ বর্মা ঐতিহাসিক এই ময়দানে শপথ নিয়েছিলেন। তবে এ দিনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বিজেপির হর্ষবর্ধন ছাড়া আর কোনো হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতাকে রামলীলা ময়দানে দেখা যায়নি। এমনকি, যারা এএপিকে বাইরে থেকে সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে, সেই কংগ্রেসের কোনো নেতাও সেখানে ছিলেন না।
যাননি দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতও। তবে বিজেপির সভাপতি রাজনাথ সিংহ ‘এএপি’ সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম ভাষণ শেষে অরবিন্দ গেয়ে উঠলেন গান। ১৯৫৯ সালে একটি হিন্দি চলচ্চিত্রে মান্না দে’র গাওয়া গানটি অরবিন্দ যখন মঞ্চে গাইছেন, তার সঙ্গে গলা মেলালেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যেরা। বোবা থাকেননি ময়দানে উপস্থিত সাধারণ মানুষও। তাদের মধ্যে ততক্ষণে যে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ’র উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছেন ‘আম-আদমি’র নতুন মুখ্যমন্ত্রী। প্রকাশ্যেই তিনি বলেছেন, ‘প্রশাসনের কোনো ব্যক্তি যদি ঘুষ চান, তাকে তা দিন। এবং আমাদের তা জানান। আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব।’ কীভাবে সাধারণ মানুষ যোগাযোগ করবেন তার সঙ্গে? মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, কয়েক দিনের মধ্যেই যোগাযোগের সব নম্বর প্রকাশ করা হবে। দিনের শুরুটা দেখে অন্তত অনেকেরই মনে হচ্ছে, ‘ইমানদারি’র কথা বলে ভোট-পরবর্তী ‘আম-আদমি’র মন জয়ের প্রাথমিক কাজটা সেরে ফেলেছেন অরবিন্দ। বাকিটা এখন ইতিহাস! টাইম অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি।

প্রথম দিনেই কাজ শুরু করলেন কেজরিওয়াল

মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েই কাজ শুরু করে দিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। পানি বোর্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিদ্যুৎ মাশুল নিয়ে কথা বলেছেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। ক্যাবিনেটের সঙ্গেও বসেছেন। আর কড়া সুরে জানিয়ে দিয়েছেন ঘুষ দিয়ে কাজ নয়। ঘুষ ছাড়াই দ্রুত কাজ হবে এএপি সরকারের প্রশাসনে। কাজে ঢিলেমি বরদাস্ত করবেন না। শপথের দিনেই বুঝিয়ে দিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। শনিবার শপথ নিয়েই একের পর এক বৈঠক করলেন। কখনও বসলেন পানি বোর্ডের সঙ্গে। তো কখনও বৈঠক করলেন ক্যাবিনেটের সঙ্গে। শহরের আইন-শৃংখলা নিয়েও বৈঠক করেছেন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে। প্রশাসনে স্বচ্ছতা একান্ত প্রয়োজন। সেটা মাথায় রেখেই পুরনো সব সচিবকে সরিয়ে দিয়েছেন। শপথ মঞ্চ থেকে দিল্লিবাসীকে বার্তা দিয়েছেন। এএপি প্রশাসনে দুর্নীতির জায়গা নেই। প্রথম দিনেই দফতর বণ্টন করেছেন কেজরিওয়াল।
কাজে গতি আনতে মন্ত্রিসভার বহর ছোট রেখেছেন। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের হাতে স্বরাষ্ট্র, অর্থ, বিদ্যুৎ, পরিকল্পনা, পরিষেবা ও ভিজিলেন্স দফতর। সত্যেন্দ্র জৈন হয়েছেন স্বাস্থ্য ও শিল্পমন্ত্রী। পূর্ত ও শিক্ষামন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া। নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্বে মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে ছোট রাখী বিড়লা। মন্ত্রী ঠিক হলেও তাদের কারোর জন্যই নেই নিরাপত্তার কড়াকড়ি। আর পাঁচজনের মতো পায়ে হেঁটে, মেট্রোয় চড়ে শপথ নিতে এসেছিলেন এএপি নেতারা। জানিয়ে দিয়েছেন আগামী দিনেও আম-আদমির মতোই চলতে ফিরতে চান। সচিবালয় থেকে সুরক্ষা বলয় সরিয়ে নিয়েছেন। আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন লালবাতি লাগানো গাড়ি নৈব নৈব চ। প্রথম দিনটা বাড়িই ফিরছেন না। হনুমান রোডে দলীয় দফতরে কাটিয়ে দেবেন রাতটা। যতটা কাজ এগোন যায়। রোববার (আজ) সকাল ১০টায় জনতার দরবার সেরে তবে বাড়ি যাবেন। রামলীলা ময়দানেই জানিয়ে দিয়েছেন তার সরকারে বড়-ছোটর কোনো ভেদ নেই। মানুষই তাকে ভোট দিয়ে এনেছে। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসে তিনিও তাই আম-আমদির একজন হয়েই থাকতে চান। শুধু আক্ষরিক অর্থে নয়- বাস্তবেও।

কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে আগুন দিল ব্রাদারহুড

মিসরের রাজধানী কায়রোয় আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ভবনে আগুন দিয়েছে দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকরা। মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসার বিরোধিতা করে কর্মসূচিতে নামে মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মীরা। তাদের বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বিক্ষোভকারীরা। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ ভবনে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়।
এরপর কৃষি অনুষদ ভবনেও আগুন দেয়া হয়। এর আগে শুক্রবারের বিক্ষোভে নিহত হয়েছে অন্তত তিনজন। সেদিন বিক্ষোভ হয়েছে পুরো মিসরে। তবে, রাজধানী কায়রো, মিনয়া প্রদেশ এবং নীল বদ্বীপের দামিয়েতা শহরে মারা গেছে তিনজন। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আহত হয়েছে কয়েকডজন মানুষ। সব জায়গায় মুসলিম ব্রাদারহুড নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে পুলিশ। রাজধানী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে ছাত্ররা পুলিশের সঙ্গে পাথর ছুড়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতেও আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এদিনের সংঘর্ষের পর বিভিন্ন শহর থেকে প্রায় ৩শ’ ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ।

সংবিধান ও গণতন্ত্র—কোনো নামেই অশান্তি নয়

গতকাল ‘সরকারি অবরোধ’ চলাকালে বিরান
গাবতলী বাস টার্মিনাল ছবি: সাজিদ হোসেন
১৮-দলীয় জোটের নেতা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আজ ঢাকা অভিমুখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রার কর্মসূচি দিয়েছেন। তিনি তাঁদের এই কর্মসূচির নাম দিয়েছেন ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’। জাতীয় পতাকা হাতে সবাইকে ঢাকায় দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমবেত হওয়ার অনুরোধ করেছেন। তিনি ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনকে ‘না’ বলতে এবং গণতন্ত্র, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনকে ‘হ্যাঁ’ বলতে ওই সমাবেশ আহ্বান করেছেন। অন্যের বিঘ্ন না ঘটিয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা এবং সভা-সমাবেশ করা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। সেদিক থেকে তাঁর ওই সমাবেশ আহ্বান গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি মহাজোট তা প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। তারা দলীয় কর্মীদের ‘পাড়া-মহল্লায়’ ওই কর্মসূচি প্রতিহত করতে নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসন থেকে সভা-সমাবেশের অনুমতি নেওয়াই বিধি। ১৮-দলীয় জোট থেকে তার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে যথারীতি আবেদন করা হয়। মহানগর পুলিশ সমাবেশ করার অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা সংবাদমাধ্যমকে বলেছে, ‘জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।’ অন্যদিকে গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় বাধা দিতে শুক্রবার থেকেই ঢাকামুখী বিভিন্ন রুটের বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন বাস-লঞ্চ মালিক ও শ্রমিকনেতারা। তাঁদের দাবি, অবরোধসহ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাস ভাঙচুর করা হয়।
তাই তাঁরা দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁদের এ দাবিও অযৌক্তিক নয়। ঢাকা অভিমুখে অভিযাত্রার কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক ও নৌ-যোগাযোগ শুক্রবার থেকেই প্রায় বিচ্ছিন্ন। গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুকদের অসুবিধা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় দেশের কত শতাংশ মানুষ অংশ নেবেন, সে সম্পর্কেও আমাদের কোনো ধারণা নেই। কিন্তু প্রতিদিন কোটি কোটি সাধারণ মানুষ দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় জীবিকার জন্য ও বিভিন্ন প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। ঢাকা অভিমুখে অভিযাত্রা ঠেকাতে বাস-লঞ্চ বন্ধ রাখা এবং ট্রেন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার। বিরোধী দলের কর্মসূচিকে বানচাল করতে গিয়ে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করা ও জনগণের সাংবিধানিক অধিকারকে হরণ করা কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ হতে পারে না। এসব খুবই নিন্দনীয় ও নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সভা-সমাবেশ, লংমার্চ, মানববন্ধন প্রভৃতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়।
বিরোধী দল আন্দোলনের নামে সহিংসতায় অভ্যস্ত। গত কয়েক মাসে বিরোধী দলের, বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তারা রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে ফেলেছে। মহাসড়কের পাশের গাছপালা উজাড় করে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। যানবাহনে আগুন লাগিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। রেলগাড়িকে লাইনচ্যুত করেছে। বাসে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। এসব ফৌজদারি অপরাধ ও সহিংসতা প্রতিরোধ করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকদের যথেষ্ট তৎপর দেখা যায়নি। সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্কতা তো ছিলই না। নেতারা তাঁদের এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে জীবন যাপন করছেন। আজকের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা ‘শান্তিপূর্ণ’ হবে বলেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়েই খালেদা জিয়া তাঁর জোটের নেতাদের নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বড় বড় সমাবেশ করেছেন। সুতরাং আজকের সমাবেশটি তাঁকে শান্তিপূর্ণভাবে করার সুযোগ দিলে সরকারের ক্ষতি হতো না।
একতরফা নির্বাচন করতে গিয়ে সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ১৮-দলীয় জোটের এই গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় বিচিত্র কৌশলে বাধা দেওয়ার একটিমাত্র কারণই থাকতে পারে। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকলে যদি খালেদা জিয়ার সমাবেশে বিপুল জনসমাগম হতো, তাহলে তা হতো মহাজোটের জন্য বিব্রতকর। তাতে প্রমাণিত হতো, জনগণ ৫ তারিখের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করছে। সেই সুযোগটি ১৮ দলকে সরকার দিল না। এখন যখন বেশি লোকের জমায়েত হবে না, তখন মহাজোটের মুখপাত্ররা সাংবাদিকদের বলতে পারবেন যে খালেদার ডাকে মানুষ সাড়া দেয়নি। তারা একটি জিনিস বোঝার প্রয়োজন বোধ করেনি যে দলীয় কার্যালয়ের সামনে না গিয়ে ঘরে বসেও কোনো কর্মসূচিতে সমর্থন দেওয়া যায়। একাত্তরে টিক্কা খান ও ফরমান আলীদের সামরিক জান্তা স্বাধীনতাকামীদের কোথাও সভা-সমাবেশ করতে দেয়নি। তাতে প্রমাণিত হয়নি যে মানুষের মুক্তিযুদ্ধে কোনো সমর্থন নেই। যদিও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নেতারা সে কথাই বলেছেন। বিএনপির বড় বড় নেতা-কর্মী মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই কারাগারে। কেউ আত্মগোপন করে আছেন গ্রেপ্তার ও রিমান্ড এড়াতে। দু-চারজন যাঁরা সরকারের দয়ায় বাইরে আছেন, তাঁরাও দলের কার্যালয়ে ঢুকতে পারছেন না। ছোট নেতা-কর্মীরা দলের কার্যালয়ের ত্রিসীমানায় যেতে পারছেন না।
গেলেই গ্রেপ্তার বা লাঠিপেটা, এই অবস্থাটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কোনো গণতান্ত্রিক দলের নেতা যখন কোনো অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে ভিডিও বার্তায় তাঁর কথা প্রচার করেন, তা দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে কী বার্তা দেয়? আশা করি, সরকারি দলের নীতিনির্ধারকেরা তা ভালো বোঝেন। খালেদা জিয়া তো সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, যে সংসদ এখনো জীবিত। ২৪ জানুয়ারির আগে তার বিলুপ্তির সম্ভাবনা কম। শুক্রবার বেগম জিয়া এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘আমি আপনাদের পাশে আছি। থাকব সব সময়। যদি আমি আপনাদের পাশে থাকতে না পারি, তাহলেও আপনারা এ কর্মসূচি, এ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ সরকার বিদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এ দেশে আমরা গণতন্ত্র এনেছি, আবারও গণতন্ত্র আনব। সেদিন আর বেশি দূরে নেই। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।’ ‘যদি আমি আপনাদের পাশে না থাকতে পারি’—কথাটির অর্থ কী? তিনি ‘নিজের বাসায় রয়েছেন’।
তাঁর সঙ্গে তাঁর দলের নেতাদের দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। কলকাতার টিভি চ্যানেলের সংবাদে বলা হয়েছে, তিনি ‘গৃহবন্দী’। বাংলাদেশি গণতন্ত্রের অনেক জঘন্য দৃষ্টান্তের সঙ্গে আরও একটি খারাপ দৃষ্টান্ত যোগ হলো। তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখায় মানুষের সমর্থন তাঁর প্রতি কিছুমাত্র কমার সম্ভাবনা নেই। ২৯ ডিসেম্বর নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বিরোধী নেতা-কর্মীদের থেকে সংযত আচরণই কাম্য। সরকারের এতটা আগাম তৎপরতা দেখানোর দরকার ছিল না। আগে বিরোধী দলের অবরোধে হয়েছে জনজীবন দুর্বিষহ। এখন সরকার বন্ধ্ ঘোষণা করে দুর্ভোগে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। তবে দুর্ভোগ ও দুর্দশা যতই হোক আমাদের আশা, দিনটি শান্তিপূর্ণভাবেই অতিবাহিত হবে। সংবিধানের নামেই হোক বা গণতন্ত্রের নামেই হোক—অশান্তি মানুষ চায় না। বিরোধী ও সরকারি উভয় পক্ষের কাছেই এই আমাদের আবেদন।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

আইন নয়, শক্তির শাসন চলছে

আইন নয়, শক্তির শাসন চলছে। ‘সরকারি অবরোধ’ও এবারই নতুন নয়, এবারই শেষ নয়। নতুন চটকদার স্লোগান ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ মানে মসনদের দিকে অভিযাত্রা। দুই দলের নেতা-কর্মীদের আজ যাদের মাঠে সক্রিয় দেখা যাবে, তারা নিশ্চয়ই সম্পদশালী অথবা তাদের খেদমতগার। কারণ, সম্পদশালীরাই অবরোধ করার সময় পায়। ঠেকানোরও সময় পায়। তাই এ ধরনের বালা-মুসিবত থেকে রেহাই চাইলে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের হদিস পেতে হবে। এটা আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়। এটা রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এটা তথাকথিত ভোটের অধিকার হরণের সংকটও নয়। এটা মূলত অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করা ও তা রক্ষা করার সমস্যা। সম্পদ বিবরণীর খবর আমাদের নির্বাচন কমিশন শুধু নয়, সুপ্রিম কোর্ট ও দুদকের দিকেও নতুন করে তাকানোর সুযোগ করে দিল। আসুন, প্রতিহত করা ও প্রতিরোধ করার ডামাডোলের মধ্যে আমরা বরং অবৈধ সম্পদ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাগুলোর দিকে নজর দিই। কয়েক দিন ধরে পত্রিকায় মন্ত্রী, মন্ত্রীপত্নী ও শাসকদলীয় রুই-কাতলাদের সম্পদের পাহাড় গড়ার খবর এক-এগারো কালে সুপ্রিম কোর্ট ও দুদকের বিশেষ ভূমিকাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
আজকের পরিস্থিতির দায়, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট এড়াতে পারেন না। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সংবাদ সম্মেলনে চলতি সম্পদ কেলেঙ্কারি নিয়ে মুখ খুলতে ভোলেননি। কিন্তু তা ততটুকুই, যতটুকু তাঁর জুতার মাপে লাগে। পুনর্বার সিংহাসনে বসতে তাঁর যেখানে যতটুকু প্রতিশ্রুতি না দিলেই নয়, সেটুকু তিনি দেবেনই। তাই তিনি এবং তাঁর মিত্ররা এইট পাস আবু সাফাকে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় সম্পর্কে মুখ খোলেন না। দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব যখন ইসি গোপন করে চলে, তখনো দুই দল দুই নেত্রী এককাট্টা থাকেন। ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’র আয়োজন ও প্রতিহত করতে কার কত খরচ হলো, সেটাই আমরা জানতে চাই। আজকে মন্ত্রী, মন্ত্রীপত্নী ও প্রভাবশালীরা বিএনপি সরকারের মতোই সম্পদের পাহাড় গড়তে পারলেন। তাঁদের প্রত্যেকের ওপরে ওপরের ‘দোয়া’ আছে। দায়মুক্তির রক্ষাকবচও আছে। আইনি রক্ষাকবচটা রাজনীতিকেরা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন। দুদক মায়াকান্না জুড়ল। কারণ, দুদক আইন পাল্টে সংসদ সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষা দিল। এই সুরক্ষা হলো দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা। দুদক ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যথারীতি ক্ষমতাসীন দলের তল্পিবাহক হয়ে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। আবার এই দুদক যদি তৎপর হতোও তাহলে কী ঘটত, সেটা আঁচ করতে আমরা এক-এগারোর উপাখ্যান ভুলতে পারি না। এটা পর্যালোচনা করব। হাতেনাতে পরীক্ষা করে দেখব, দুর্নীতিতে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন দেশটির সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের শাস্তি দিতে কী ধরনের প্রবণতা দেখিয়ে থাকে।
এমনকি গণমাধ্যমও কমবেশি একই সুরে কোরাস গাইতে অভ্যস্ত। অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি কেবলই দুর্নীতির সূচক নয়, এটা নির্বাচনী দুর্নীতি ও ভোট অবমাননার সূচকও বটে। দুই নেত্রী ঠেকানোর রাজনীতি করছেন। শেখ হাসিনা শেখাচ্ছেন, ভোট নয়, যুদ্ধাপরাধীর বিচারই আসল। আর খালেদা জিয়ার মন্তব্য, ‘দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে একটি ঐকমত্য ও সমঝোতা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।’ এটা আক্ষরিক অর্থে রক্তারক্তি এড়ানো অর্থে সত্যি। এর চেয়ে বেশি নয়। ডাকাবুকোদের সঙ্গে মনোনয়ন-বাণিজ্য বা অবরোধ-বাণিজ্য করে দুই দল যদি ক্ষমতার ‘শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর’ ঘটাত, তাহলে আজকের অবস্থা সৃষ্টি হতো না। এক-এগারো সৃষ্টি হতো না। ১৯৯৬-তে নিয়মরক্ষার নির্বাচন করতে হতো না। আমি সন্দেহ করি না যে বিএনপি যেদিন সরকার করবে, সেদিনই আরেক সংকটের সূচনা ঘটবে। আবারও ‘সরকারি অবরোধ’ পত্রিকার শিরোনাম হবে। এর কারণ, তারা কেউ আবু সাফা বনাম নির্বাচন কমিশন মামলার রায় মানে না। মানার মতো সংগঠন তারা গড়তে চায় না। কারণ, তেমন সংগঠন গড়লে নেতৃত্বের খাসতালুকটা টলে উঠবে। তাই ওরা ওদের শর্তে ভোটাধিকার এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটদান জপ করে। দুই দলের আঁতাত এখানে নিরঙ্কুশ। চলতি ডামাডোলের মধ্যেও ওদের ঐক্যটা লক্ষণীয়। আইনজীবী আবদুল মোমেন চৌধুরী রিট করেছিলেন। প্রার্থীদের আটটি তথ্য জানার অধিকারকে সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুষঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করেন বিচারপতি এম এ মতিন। ২০০৫ সালের ২৪ মে তিনি যখন এই যুগান্তকারী রায়টি লেখেন,
তখন দুই দলের কারও কানে পানি ঢোকেনি। সরকার ও ইসির প্রতি দুটি রুল জারি হয়েছিল। কিন্তু কেউ তাতে পাত্তা দেয়নি। কোনো এফিডেভিট ইন অপোজিশন ছিল না। ড. কামাল হোসেন একাই শুনানিতে অংশ নেন। আদালতের কাগজপত্র সাক্ষ্য দিচ্ছে, মূল দুই দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা আইনজীবীরা এই রায় থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। এই নাটকের দুটি বিবেক চরিত্র ড. কামাল হোসেন ও বিচারপতি এম এ মতিন। তাঁরা বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাঁদের ডাক শুনতে সরকারি অবরোধ ও অভিযাত্রাওয়ালাদের কেউ প্রস্তুত ছিল না, এখনো নেই। আট তথ্য প্রকাশে বিচারপতি এম এ মতিন কিন্তু নির্দিষ্টভাবে আরপিও শোধরাতে বলেননি। এক-এগারোতে অধ্যাদেশ করে এটা চালু করা হয়েছিল। ভাগ্যিস, নবম সংসদ এটা বাতিল করেনি। সুপ্রিম কোর্টের রায় দুই নেত্রী ও তদীয় স্তাবকদের প্রয়োজনের সঙ্গে যখন যতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, ততটাই গ্রহণযোগ্য এবং এই প্রজাতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। বাকিটা বাতিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা বলে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে। এখন মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলছেন, এনবিআর ছাড়া সম্পদের বিবরণী নিয়ে আর কারও উচ্চবাচ্য বারণ। তাঁর এই বক্তব্য আদালত অবমাননা। আওয়ামী লীগ যদি সংগঠনগতভাবে এটা মানে তাহলে আওয়ামী লীগও আদালত অবমাননাকারী। বিচারপতি এম এ মতিনের ওই ১১ পৃষ্ঠার রায়টির তাৎপর্য এই মুহূর্তে বহুমাত্রিক। আর সেটা কেবলই সম্পদের বিবরণীসংক্রান্ত নয়। ক্ষমতাসীনদের ধড়ফড়ানি সত্ত্বেও ওয়েবসাইট থেকে সম্পদের বিবরণী সরায়নি ইসি। সরালে তারা মামলায় পড়ত।
আওয়ামী লীগ ও ইসি কার্যত সুপ্রিম কোর্ট ও সংবিধান অবমাননা করে চলেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে দুই রায় দাতার মধ্যে বিচারপতি খায়রুল হক যতটা আলোচিত বিচারপতি মতিন ততটাই অনালোচিত। বিচারপতি খায়রুলের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঝেড়ে ফেলা হয়। বিচারপতি মতিনের রায় ‘একতরফা’ নির্বাচন আটকাতে পারে না। এটা অবৈধ বলে গণ্য হয় না। ওই রায়টি এখন প্রচলিত আইন। যে আইন নির্দিষ্টভাবে সংবিধানের নির্বাচনসংক্রান্ত বিধানাবলি ব্যাখ্যা করেছে। বলেছে ‘প্রার্থী সম্পর্কে জানার অধিকার নাগরিকের ভোটাধিকারের অন্তর্ভুক্ত’। সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে নির্বাচন করার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ইসিকেই ঘোষণা করা আছে। এটি বলেছে, নির্বাচন অনুষ্ঠান তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার ইসির ওপর ন্যস্ত। বিচারপতি মতিন লিখেছেন, ‘ইসির এই ক্ষমতা পূর্ণাঙ্গ। ধরে নিতে হবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে যখন যেমন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তার প্রয়োগ করা দরকার, সেটা ইসিকে সংবিধান দিয়েই রেখেছে। নির্দিষ্টভাবে কোনো বিষয়ে তাকে নিষেধ করা হলে সেটাই কেবল বাদ যাবে।’ অথচ ইসি এতটাই অন্ধ যে তারা এখন ‘৯০ দিনের মধ্যে’ কথাটা ছাড়া আর কিছু দেখছে না। নাগরিক সমাজও তাই। তারা ওই রায় থেকে শুধু সম্পদ বিবরণীর অংশটুকু নিয়ে মাততে চায়। বাকিটুকু তার মগজে ঢোকে না। আমি পরিষ্কার দেখি, বিচারপতি মতিনের এই অংশ মানলেই ইসি সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদের আওতায় সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু এভাবে ইসি সবল হোক সেটা বিএনপিও চায় না। ‘সরকারি অবরোধ’ ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা দুটোই শঠতাপূর্ণ।
আগামীকাল: সুপ্রিম কোর্ট যখন সংবিধানবিচ্যুত
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

তপ্ত শীত এবং সামান্য ক্ষতি!

কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। এবারের পৌষে চারপাশে হাঁসফাঁস অবস্থা। শীত আছে, কিন্তু রাজনৈতিক উত্তাপে পুড়ছে সব। রাজনীতির আগুনে দগ্ধ গীতা সেনের ভাষায় ‘অসুস্থ’ রাজনীতি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সাধারণ মানুষ এখন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। সবাই যেন গৃহবন্দী হয়ে আছে। সব সময়ই ভয়, যদি কিছু হয়। কখন কার অবস্থা ‘শান্ত’র মতো হয়, কেউ বলতে পারে না। শান্তও এই শীতে তৃতীয় শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা শেষে মা আর ভাইকে নিয়ে খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। রাজধানীর মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুলের সামনে ১৩ ডিসেম্বর সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছে শান্ত। শান্তর বাবা সোবাহান ব্যাপারীর আর্তনাদ এখনো কানে বাজে: ‘আমার পোলাডার...শরীরে কতগুলা গুলি? এইভাবে কেউ কি কেউরে মারে?’ শান্তর মায়ের বিলাপ: ‘আমার ছেলে তো কোনো অন্যায় করে নাই। কেন তারে এইভাবে হাসপাতালে শুইয়া থাকতে হইতেছে? এর জবাব কি কেউ দিতে পারব?’ দেশের এ অবস্থায় এই প্রশ্ন আজ অনেকের। বিশেষ করে, যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর কার কাছ থেকে পাওয়া যাবে?
কেউই তো দায়িত্ব নিচ্ছে না, কেবল দোষ চাপিয়েই খালাস। অচলাবস্থায় শুধু সচল আছে রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার মমতাহীনতাই কি রাজনীতি? অথচ জনগণই নাকি সকল ক্ষমতার উৎস। দুই পক্ষই ১৬ কোটি জনগণের দোহাই দিচ্ছে! দুই পক্ষেই যদি সমহারে জনগণ থাকে, তবে এ দেশের জনসংখ্যা এখন ৩২ কোটি হওয়ার কথা। প্রতিদিন মানুষ মরছে। কারা মরছে, কীভাবে মরছে, তা অনেকেই জানতে পারেন না। অজানা-অচেনাদের বলা হয় অজ্ঞাতপরিচয়, আর তারাই হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ক্ষমতার উৎস! অথচ অসাধারণ (!) কেউ যদি হাতে কিংবা হাঁটুতে একটুখানি চোট পান, তাহলে ২৪টি চ্যানেলে যেমন ব্রেকিং নিউজ ভেসে আসে, ‘উনি আহত হয়েছেন’। অর্থাৎ রাষ্ট্রের মালিক, জনগণের মৃত্যুর চেয়ে কথিত সেবকের একটু চোট পাওয়ার গুরুত্বই যেন বেশি। রাজনীতিকেরা বলেন তাঁরা জনতার সেবক। অথচ সেই জনগণকে নিয়ে কারও কোনো ভাবনা আছে, তা বর্তমান বাস্তবে অন্তত দৃশ্যমান নয়। একটি জনপ্রিয় গানের পঙিক্ত, ‘মানুষ মানুষকে জীবিকা করে, মানুষ মানুষকে পণ্য করে’। সাধারণ মানুষ আজ রাজনীতির পণ্য। তাদের ব্যবহারের বিধিও একেক পক্ষের একেক রকম। দুই পক্ষ উত্তপ্ত বক্তব্য দিচ্ছেন, আর পিটুনি খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কাঁদানে গ্যাসে কাঁদছেন সাধারণ মানুষ। ক্যাডারদের পিস্তল বা চাপাতির আঘাতে জর্জরিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দুর্ভাগ্য, ‘সাধারণ মানুষের কোনো দল নেই’। তারা নির্বাচনে দাঁড়ান না। দাঁড়াতে পারেন না।
কোনো টক শোতে তাঁদের অতিথি করা হয় না। তাঁদের কোনো বিবৃতি ছাপা হয় না পত্রিকায়। সাপ ফোঁস ফোঁস করে, নইলে কেউ হয়তো তাকে কেঁচো ভাবতে পারে। যে সাপই কীটপতঙ্গ খেয়ে বেড়ায়, মৃত্যু হলে আবার কীটপতঙ্গই সাপকে খায়। তাই কারও নিজেকে সাপ ভেবে ফোঁস ফোঁস করা ঠিক নয়। সাধারণ মানুষ জেগে উঠলে তাঁদের ক্ষমতার কাছে সবাইকে হার মানতে হবে। রাজনৈতিক বিভাজন ডালপালা বিস্তার করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে। টক শোগুলো দেখলে এই বিভাজনের কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, নিজের মত প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা যত যুক্তিতর্কই উপস্থাপন করি না কেন, দৃশ্যমান সত্যি হচ্ছে, দেশ অশান্ত, দেশ অচল। ফসল বিক্রি করতে না পারায় কৃষকেরা দিশেহারা। ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ধ্বংসের পথে, শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সারা পৃথিবী আমাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখে হাসাহাসি করছে। অনেক আনুষ্ঠানিকতাও তারা বর্জন করছে। সাধারণ মানুষকে বোঝালে বোঝে, কিন্তু অসাধারণ দুই পক্ষকে বোঝানোর ক্ষমতা বোধকরি কারোরই নেই। প্রয়োজন পড়ে তৃতীয় পক্ষের। স্বদেশি হলে চলবে না, হতে হবে বিদেশি! বড় দুটি দলকে একত্রে বসানোর জন্য সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সমাজ কতই না চেষ্টা করল! সবাই ব্যর্থ হওয়ার পর এলেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত মি. তারানকো। বেচারা তারানকো বেশ কদিন চেষ্টা করে অন্তত আলোচনায় বসাতে সক্ষম হন।
তবে এটুকু কাজ করতে গিয়ে এই শীতেও তিনি কী পরিমাণ ঘর্মাক্ত হয়েছেন, তা তো আমরা টিভিতেই দেখেছি। শুধু তা-ই নয়, দুই পক্ষের কেউই কারও স্থানে গিয়ে বসবেন না। সেটাও বসতে হলো বিদেশিদের কোনো অফিসে গিয়ে। তারানকো আশার বাণী শুনিয়ে গন্তব্যের পথে ছুটলেন, আর আমরা ছুটলাম গন্তব্যহীন পথে। অর্থাৎ তৃতীয় পক্ষও কোনো কাজে এল না। আমরা চাই না মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হোক। শান্তিতে সুনাম অর্জনকারী দেশটি নিজেই অশান্তির আগুনে পুড়তে থাকুক। চাই না ব্যক্তিস্বার্থের যূপকাষ্ঠে বলি হোক জনস্বার্থ। রাজনীতির অসুস্থতায় মৃত্যুশয্যায় ছটফট করুক জাতি। আবার এটাও চাই না বিরাজনৈতিকীকরণের মাধ্যমে গণতন্ত্র মিশে যাক ধুলোয়। তাই প্রয়োজন সুস্থ রাজনীতির, প্রয়োজন সুস্থ রাজনীতিকের। রাজনীতিতে বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু তা যেন দেশবিরোধী না হয়। দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, সংসদে নিজের প্রতিনিধি পাঠাতে অবাধ ভোটাধিকার যেন গুরুত্ব পায় সবচেয়ে বেশি। পেশিশক্তি বেশি শক্তি নয়, দেশি চেতনার উন্মেষই বড়। শীতে খড়কুটো জ্বেলে আগুন পোহানো ভালো, আগুন লাগানো নয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতার কাশীর মহিষী নদীতে স্নান শেষে কৃষকের পর্ণকুটিরে আগুন দিয়ে শীত নিবারণ করেছিলেন। তাঁর শীত নিবারণের তুলনায় এটা ছিল সামান্য ক্ষতি, কিন্তু কৃষকের কাছে ছিল সর্বস্ব হারানো। রাজমহিষী তা না বুঝলেও রাজনীতিকদের তা বোঝা উচিত। কারণ, এ দেশ রাজতন্ত্রের নয়, গণতন্ত্রের।
হানিফ সংকেত: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, লেখক।
hanifsanket@gmail.com

গণতন্ত্র ও জবাবদিহি- আইন নয়, শক্তির শাসন চলছে by মিজানুর রহমান খান

আইন নয়, শক্তির শাসন চলছে। ‘সরকারি অবরোধ’ও এবারই নতুন নয়, এবারই শেষ নয়। নতুন চটকদার স্লোগান ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ মানে মসনদের দিকে অভিযাত্রা।

সমঝোতার পথ খুঁজুন- কেন সরকারি অবরোধ?

বিরোধী দলের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি ২৯ ডিসেম্বর হলেও সরকার আরও আগেভাগেই প্রস্তুত। দুই দিন আগে থেকেই সম্ভব-অসম্ভব সব উপায়ে ঢাকামুখী চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে রেখেছে সরকার।
সড়ক, নৌ ও রেলপথের কোনোটিই যাতে বিরোধী দলের সমর্থকেরা ব্যবহার করতে না পারে, তার জন্য চলছে ‘সরকারি অবরোধ’। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি, একচেটিয়া ক্ষমতা ব্যবহারের পরিণাম—কোনো কিছুরই পরোয়া করছে না সরকার।

ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ যে কার্যত বিচ্ছিন্ন, তার পেছনে সরকারের হাত রয়েছে। সরকারের এই ‘অবরোধ’ কর্মসূচির সঙ্গে তুলনীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার রাজার আহাম্মকি। পায়ে ধুলা লাগবে বলে সমস্ত পথঘাট চামড়া দিয়ে মুড়ে দেওয়া যায় না। বরং নিজের পায়ে জুতা পরাই বুদ্ধিমানের কাজ। সরকার বিরোধী দলের কর্মসূচি ঠেকাতে সমগ্র রাজধানীসহ সারা দেশের যান চলাচল বন্ধ করে সেই ভুলই করছে। জন চলাচলে বাধা দিয়ে, গণহারে তল্লাশি-হয়রানি-গ্রেপ্তার করা কোনো আইনি কর্তৃপক্ষের আচরণ হতে পারে না।

বিরোধী দল যতবার কর্মসূচি দেবে, ততবারই কি সরকার এই আচরণ করবে? সেটা কি কার্যত সম্ভব? এতে কি সরকারের জনবিচ্ছিন্নতাই আরও বাড়বে না? এতে কি দেশের ক্ষতি হয় না? প্রতিযোগিতাহীন নির্বাচন, বিরোধীদের ধরপাকড়-দমন, কর্মসূচি পালনে সর্বাত্মক বাধা—বিশ্বের কাছে এই চিত্র মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এসব আসলে মূল সমস্যা থেকে উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থাকার শামিল।
একদিকে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে অভিযানে অংশ নিচ্ছেন, বিরোধীদের ঘরবাড়ি তছনছ করছেন, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিরোধীদের সমাবেশ ঠেকাতে দলীয় কর্মীদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানোর ডাক দিতে দ্বিধা করছেন না। ঢাকার প্রবেশপথ দিয়ে মাছিও যাতে প্রবেশ না করতে পারে, তার জন্য কর্মীদের পুরস্কারের আশ্বাস ও শাস্তির হুমকি দিচ্ছেন। বিরোধী দল ও সরকারের আচরণ যদি সংঘাতের পাণ্ডুলিপি অনুসরণ করে দেশের অধোগতি অনিবার্য।
দেশ চালাতে হলে, দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে বিরোধী দলের সঙ্গে আপস-মীমাংসার পথ বের করতেই হবে সরকারকে। বিরোধী দল মানে কতিপয় নেতা-নেত্রী নন; বিরোধী দল মানে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ, যারা ওই সব নেতা-নেত্রী এবং তাঁদের দাবি-দাওয়ার সমর্থক। বিরোধী দলকে দমনের মাধ্যমে সরকার দেশবাসীর একটি অংশকে অপদস্থ ও উপেক্ষিত করে রাখতে পারে না। সরকার দলনির্ভর হলেও তাকে দেশের অধিকাংশ জনগণের দিকে তাকিয়ে দেশ চালাতে হয়। একতরফা নির্বাচন করতে ‘সরকারি অবরোধ’ ও পুলিশি শক্তির মাত্রাছাড়া ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পথ যে ব্যর্থ হতে বাধ্য, সরকারের এই উপলব্ধি ছাড়া সামনে সমূহ অমঙ্গল এড়ানো সম্ভব নয়। আবার আন্দোলনের নামে বিরোধী দলের সহিংসতা ও নাশকতাও গ্রহণযোগ্য নয়।

ক্ষমতা- আমাদের আম-আদমিরা কোথায়? by ওয়াসি আহমেদ

বিস্ময়কর হলেও মানতে হবে, পৃথিবী থেকে আম আদমি লুপ্ত হয়নি। এই সেদিন ভারতের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির (এপিপি) অভাবিত সাফল্যের সুবাদে তাদের খোঁজ পাওয়া গেল।