Friday, March 3, 2017

বিদেশি স্বামীদের ফেলে যাওয়া ভারতীয় স্ত্রীদের দুর্দশা by হাসনাইন মেহেদী

ভারতের চন্ডিগড়ে গোপন কোনো স্থানে চলছে বিশেষ এক বৈঠক। পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থান থেকে নারীরা প্রাদেশিক রাজধানীতে জড়ো হয়েছেন। ‘হেলপিং হেল্পলেস’ নামের একটি দাতব্য সংস্থার প্রধান আমানজোত কর রামুওয়ালিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন তারা। ভাগ্যহত এসব নারীকে ফেলে চলে গেছে তাদের বিদেশি স্বামীরা। রামুওয়ালিয়ার সংস্থাটি নারীদের জন্য কাজ করে। তিনি জানালেন, রাজ্যজুড়ে এমন পরিস্থিতির শিকার ১৫ হাজারেরও বেশি নারী। রামুওয়ালিয়া সপ্তাহে স্বামী ফেলে যাওয়া ১৫ জনের মতো নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সংখ্যা বাড়ছে বলে তিনি জানান। বিবিসির ইনসাইড আউটকে তিনি বলেন, ‘অনেক সুন্দরী, শিক্ষিতা নারীকে আমি দেখি। তারা বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে। স্বামী পরিত্যক্তা স্ত্রী হিসেবে সমাজে বাস করতে তারা হীনম্মন্যতায় ভোগেন। আমি বিশ্বাস করি এটা মানবাধিকারের বড় এক লঙ্ঘন।’
ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের এই নারীদের দুর্দশার ঘটনা উঠে এসেছে বিবিসির ইনসাইড আউট অনুষ্ঠানের বিশেষ একটি পর্বে। সোমবার বিবিসি ওয়ার্ল্ড লন্ডনে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয়। বিবিসি ওয়ার্ল্ডে তা পুনঃপ্রচার হবে ৪ঠা মার্চ। ‘আউটকাস্ট ওয়াইভস: অ্যান ইনসাইড আউট স্পেশাল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয় বিবিসির এক প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, এসব নারীর স্বামীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক। তবে, প্রধানত ওইসব দেশ থেকে বেশি যেখানে দক্ষিণ এশিয়ানদের বসবাস রয়েছে যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। নারীরা বিদেশে উন্নত জীবনের আশায় বিয়েতে রাজি হয়। তবে, পাত্রদের আগ্রহ বেশি থাকে অর্থের দিকে, ভালোবাসা নয়। ধারণা করা হয়, এমন পুরুষদের এক-তৃতীয়াংশ বৃটেন থেকে যাওয়া। রামুওয়ালিয়া বলেন, ‘পাত্ররা এখানে আসে আর মোটা অঙ্কের যৌতুক দাবি করে। এরপর বিয়ে করে। যৌতুকের অর্থ নিয়ে মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করে। আর কখনো ফিরে আসে না তারা।’
১৯৬১ সালে যৌতুক নিষিদ্ধ করা হলেও ভারতের অনেক স্থানে এখনো পাত্রকে পাত্রীপক্ষের অর্থ বা উপহার দেয়ার চল রয়েছে। কখনো কখনো যৌতুকের অঙ্ক হাজার হাজার পাউন্ডও হয়ে থাকে। চন্ডিগড়ে এদিনের গোপন বৈঠকে যোগ দেয়া এক নারী এসেছেন পাঞ্জাবের প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে। কমলজিত কর নামের ওই নারী তিন বছর আগে ইতালি থেকে আসা এক পুরুষকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরই সে কমলজিতকে রেখে চলে যায়। সে সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন কমলজিত। তিনি বলছিলেন, ‘বিয়ের পর পরই যৌতুক নিয়ে অভিযোগ করা শুরু করে সে। সে বলতো, তার পরিবার আমাকে নিয়ে খুশি নয়।’ এক পর্যায়ে কমলজিতের স্বামী ভারতে তাদের পারিবারিক বাড়ি ছেড়ে ইতালি ফেরত যায়। এরপর আর তাকে দেখেনি কমলজিত। তাদের কন্যা সন্তান জন্ম নেয় গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে। কিন্তু শ্বশুর বাড়ির লোকজন কোনো প্রকার সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানায়।
কমলজিত বলেন, ‘তারা বলতো, বাচ্চা প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিয়েছে। আমরা তাকে চাই না। আমাদের সম্পর্ক শেষ।’ দুর্দশার এখানেই শেষ নয়। কয়েক মাস পর কমলজিতের মেয়েটি মারা যায়। তার স্বামী তার সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি।  
এমন পরিস্থিতির শিকার নারী ও তাদের পরিবারের জন্য দুর্ভোগের আরো একটি কারণ হলো- ভারতে বিদেশি নাগরিককে ডিভোর্স দেয়া অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল এক প্রক্রিয়া। এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তোভোগী নারীর পরিবারকে নানাভাবে বিপর্যস্ত হতে হয়।
দর্শন নামের এক পিতা তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৯৭ সালে। তার মেয়ের কপালেও ওই একই পরিণতি হয়। স্বামী ফেলে চলে যায়। এখনো ওই বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারটি। তিনি বলেন, ‘সে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কিছুই বলেনি। যাওয়ার সময় সে বলে যে, বিদেশে আমি বিবাহিত। আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে আছে। কাজেই আমি আপনার মেয়েকে নিতে পারবো না। আপনারা যা পারেন করেন।’ দর্শন জানান, তারা আইনি পদক্ষেপ নেন। তবে ১৬ বছর ধরে একই ঘূর্ণাবর্তে ঘুরছেন। কোনো সমাধা হয়নি।
নন-রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান কমিশন অব পাঞ্জাবের একজন আইনজীবী দলজিত কর বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনি ব্যবস্থা একটু ধীরগতির। আর রায় পেতে কয়েক বছর লেগে যায়। কয়েক রকম জটিলতা রয়েছে। তার ওপর আইনি ব্যবস্থার খরচ বহন করার মতো অর্থ এই মেয়েদের নেই।’
ওদিকে, চন্ডিগড়ে এই পরিস্থিতির শিকার একদল নারীকে পরামর্শ দিচ্ছেন আমানজোত কর রামুওয়ালিয়া। কিন্তু তিনি যে সহায়তা দিতে সক্ষম তা সীমিত। ভারতে স্ত্রীকে ফেলে চলে যাওয়া অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও বিদেশি নাগরিক একবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গেলে তাদের বিচারের আওতায় আনা অত্যন্ত কঠিন। রামুওয়ালিয়া বলেন, তার শোনা কিছু কিছু ঘটনা অত্যন্ত মর্মবিদারক। তিনি বলছিলেন, ‘এক মেয়ের বিয়ে হয়। তার স্বামী নিয়মিত তাকে ধর্ষণ করতো। শেষে তার গর্ভে বাচ্চা দিয়ে তাকে রেখে চলে যায়। জোরালো কোন আইন নেই যা আপনাকে এর প্রতিকার দেবে। মেয়েটিকে তার সারা জীবন পরিত্যক্তা স্ত্রী হওয়ার লজ্জা নিয়ে বাচতে হবে।’ রামুওয়ালিয়া মনে করেন, অন্য দেগুলোকে তাদের দেশের নাগরিকদের এমন কর্মকান্ড নিয়ে সচেতন হওয়া উচিত এবং দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ভারতীয় সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করা উচিত। কিন্তু, তেমনটা সত্যি হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতারণার স্বীকার ভারতীয় স্ত্রীদের বাস্তবতা হলো তাদের জীবন অবহেলার ঘেরাটোপে।

‘কবরস্থান সৃষ্টি বন্ধে আইন করা উচিত’

কবরস্থান বা গোরস্থান বানানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই ভারতে। তাই কবরস্থান সৃষ্টি বন্ধের জন্য একটি আইন করা উচিত। একই সঙ্গে মুসলিমরা মারা গেলে তাদের দাফন না করে দাহ করার প্রস্তাব করেছেন ভাতীয় জনতা পার্টির এমপি সাক্ষী মহারাজ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জি-নিউজ। এতে বলা হয়, সাক্ষী মহারাজা উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়ার জন্য বহুল বিতর্কিত। তিনি সোমবার উত্তর প্রদেশের উন্নাও-এ এক র‌্যালিতে বক্তব্য রাখার সময় বলেন, করবস্থান বা শ্মশান যা-ই হোক না কেন- কাউকে সমাহিত করা উচিত নয়। ভারতে ২ থেকে আড়াই কোটি হিন্দু সন্ন্যাসী আছেন। তারা মারা যাওয়ার পর তাদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে। এ জন্য জমির প্রয়োজন হবে। এখানে ২০ কোটি মুসলিম আছে। তাদের কবরে দাফন করতে হবে। হিন্দুস্থানে এত জমি বা জায়গা কোথায়?
তার এমন বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বিরোধী দল কংগ্রেস। মঙ্গলবার তারা বলেছে, সাক্ষী মহারাজার বিতর্কিত ‘কবরস্থান’ বিতর্ক সাম্প্রদায়িকতা। উত্তর প্রদেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন চলছে। তাতে সুবিধা পাওয়ার জন্য তারা এমন মন্তব্য করছেন। কংগ্রেসের নেতা সন্দ্বীপ দীক্ষিত বলেছেন, প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব রীতি সেই ধর্মের মানুষ অনুসরণ করে। যদি কবরস্থানের প্রয়োজন হয়, তাহলে তা নির্মাণ করা হবে। একইভাবে যদি শ্মশানের প্রয়োজন হয় তাহলে শ্মশান নির্মাণ করা হবে। কোনো নেতা বা সন্যাসীর বিতর্কিত মন্তব্যে এতে কোনো প্রভাব পড়বে না। একই রকম মত দিয়েছে সমাজবাদী পার্টি। দলের নেতা নরেশ আগরওয়াল বলেছেন, সাক্ষী মহারাজার বিবৃতি সম্প্রদায়িকতা চড়িয়ে দেবে। এতে মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে ব্যবধান আরো বাড়বে। তাদের এমন কথাবার্তায় বোঝা যায়, বিজেপি কতটা হতাশাজনক অবস্থায়। আলোচনার জন্য তাদের কাছে কোনো ইস্যুই নেই। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফতেহপুরে এক র‌্যালিতে বলেন, দুপক্ষের জন্যই জমি বরাদ্দে কোনো বৈষম্য রাখা উচিত হবে না। যদি কোনো গ্রামে কবরস্থান সৃষ্টির প্রয়োজন হয় তাহলে একই সঙ্গে একটি শ্মশানও সেখানে সৃষ্টি করা উচিত।

আস্থা ফেরানো নতুন ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা বলেছেন, মানুষের আস্থা অর্জন করা নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ মানুষের মধ্যে এখন প্রশ্ন, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি না। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। শামসুল হুদা বলেন, কমিশনের কথাবার্তায়, কাজেকর্মে জনমনে এই আস্থা তৈরি হতে হবে যে এই কমিশন দলবাজি করবে না। কোনো ধরনের সংশয় যেন তৈরি না হয়। এসময় নতুন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার পরামর্শ দেন তিনি। গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে গবেষক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কমিশনের দায়িত্ব। নৈতিক বলপ্রয়োগ ছাড়া শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সংবিধান পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। এটি মাথায় রেখে এখন থেকেই ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করার জন্য কাজ করতে হবে। আইনের প্রচুর সংস্কার করতে হবে। শুধু নির্বাচন কমিশন দিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়, নির্বাচনকালীন সরকারের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, নতুন কমিশনের অংশীজনদের আস্থায় নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সীমিত পর্যায়ে ই-ভোটিং চালু করার পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নতুন কমিশনের সামনে ১৯টি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, গত কমিশনের ব্যর্থতা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে খাদে ফেলে দিয়েছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জন-অনাস্থা তৈরি হয়েছে। নতুন কমিশন বিতর্কমুক্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশা করেন।

মধুবালার ডাক লাগবনি লন বাবা, গাঁজা by মহিউদ্দিন অদুল

‘এই বাবা আছে। গাঞ্জা আছে। নিয়া যান। ক’টা দিমু। ক’টাকার দিমু। লন। এই কালা মামা। সোনা ভাইয়া। এই চশমা ভাই। লাল শার্ট। এই চিকনা। লাগবো নি। বাবা না গাঁজা। এভাবে প্রকাশ্য ডেকে ডেকে পণ্য বিক্রির মতো বিক্রি করছে মাদক বিক্রেতাদের। বিক্রেতাদের মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। তরুণী থেকে বৃদ্ধা, যুবক থেকে প্রৌঢ় সবাই স্বতঃস্ফূর্ত। কাওরান বাজার ও তেজগাঁও রেল লাইনে প্রতিদিন মাদকের পসরা সাজিয়ে এমন প্রতিযোগিতায় নামে শতাধিক মাদক বিক্রেতা। কাপড়ের ব্যাগে গাঁজার পুঁটলি। হাত বা বুকে গুঁজে রাখা কৌটায় ইয়াবা ট্যাবলেট। বাসায় অন্যান্য মাদক। 
গত সোমবার এমন শতাধিক বিক্রেতার মাদকের পসরা দেখা গেছে সেখানে। তবে স্বাভাবিক পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের চেয়ে এখানে রয়েছে কিছুটা ভিন্নতা। সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাদের চেয়ে মাদকের রাজ্যে উভয়ের হৃদ্যতা বা ঘনিষ্ঠতাও একটু বেশি। তড়িৎ কাজকারবার। সম্বোধনে আছে ঠমক-চমক। দাম দর ঠিক ঠাক। ক্রেতার টাকাও আগে থেকে গুণা থাকে। শুধু পকেট থেকে বের করে দেয়া। ৩০, ৫০ ও ১০০ টাকা এগিয়ে দিতেই ক্রেতার হাতে গুঁজে দেয়া হচ্ছে গাঁজার ছোট, মাঝারি ও বড় পুরিয়া। ১০০ ও ২৮০ টাকা এগিয়ে দিতেই হাতে চলে আসছে ছোট ও বড় আকারের একটি করে ইয়াবা ট্যাবলেট। বেশি ক্রয়ে টাকাগুণে নেয়ার সময়টুকুই কেবল অপেক্ষা। এরপরই নিজে পথ ধরছে ক্রেতা। দর কষাকষিও কদাচিৎ। দর কষাকষি বা টাকা কম দিলে ক্রেতাদের হজম করতে হয় মেয়েলি কণ্ঠের গালাগালি। মুখের ওপর ছুড়ে মারা হয় টাকা। অবশ্য বেশি কেনায় ১০-২০ টাকা বলে কয়ে কম দিতেও দেখা গেছে। 
মাদক বিক্রেতা ১৬ বছরের তরুণী মধুবালা বলেন, আগে কমলাপুর রেল স্টেশনে পসরা সাজিয়ে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করতাম। বেশ কয়েক বছর ধরে এখানে করি। থাকিও এখানকার বস্তিতে।
সোমবার বেলা ১১টা। কাওরান বাজারের পাইকারি মাছ বাজার সংলগ্ন গলি দিয়ে রেল লাইনে উঠতেই দেখা গেল পাশাপাশি দু’টি বেঞ্চ পাতা। একটি জলছাপের আল্পনার কাপড়ের থলে সামনে নিয়ে বসে আছে আলতা-প্রসাধনী মাখা কিশোরী মধুবালা। সামনে কাপড়ের ব্যাগ। নিচে মাদুর পেতে বসে আছে আরো দু’তরুণী। লায়লা ও শিউলি। তাদের সামনেও কাপড়ের ব্যাগ। তিনজনের ব্যাগ ভর্তি কাগজে মোড়ানো গাঁজার পুঁটলি। বুকে গুঁজানো ছোট কৌটায় লাল রংয়ের ইয়াবা। চোখে চোখ পড়তেই নিয়া যান। কটা দিমু।
ষোড়শী মধুবালা। সোমবার ছিল চাঁদপুরের এই কন্যার বিয়ের তৃতীয় দিন। হাতে-পায়ে আলতা। মুখে লেগে আছে মেকআপের জরি। স্বামী সিএনজি চালক রনি বেরিয়ে গেছে গাড়ি নিয়ে। আর সকালেই প্রতিদিনের মতো ব্যবসার পসরা সাজিয়ে মধুবালা রেল লাইনের ধারে। অন্য মাদকেও ঘাটতি নেই। চাইলেই বাসা থেকে এনে দিতে প্রস্তুত। তার পাশে একটি কাঠ ও পলিথিন পেতে বসা লায়লা ও শিউলি। অন্তঃসত্ত্ব্বা লায়লা দু’পা ছড়িয়ে বসেছে। দু’পায়ের মাঝখানে রাখা কাপড়ের পুটলির মধ্যে গাঁজা। আর শিউলির পুঁটলির মুখটা অর্ধেক ডাকা। কোলে শিশু পুত্রকে নিয়েই চলছে তার ব্যবসা।
বেলা ১১টার পর এক কিশোর রেললাইন ধরে কাছে আসতেই মধুবালার ডাক ‘গাঞ্জা না বাবা’। মাঝখানে বসা শিউলী তার দিকে তাকিয়েই বললো ‘লাগবো না তার’। মিনিট খানেক পর লুঙ্গি পরা এক লোক দেখেই মধুবালা ডাক দেন, ‘এই লুঙ্গি। নিয়া যান।’ কিন্তু লুঙ্গি পরা লোকটি এগিয়ে যায় লায়লীর কাছে। ‘ছোট একটা দেন’ বলে লায়লীর হাতে টাকা তুলে দিতেই সে হাতে গুঁজে দিলেন এক পুরিয়া গাঁজা। ছোট পুরিয়াগুলো বিক্রি হচ্ছিল ৩০ টাকায়। ২০ টাকায়ও পাওয়া যায়। উত্তর দিক থেকে হাতে বস্তাসহ ময়লা পোশাকে এলো শিশু টোকাই। মুখে কোনো কথা নেই। এগিয়ে দিল ১০০ টাকার নোট। লাইলী তুলে দিল একটি ছোট্ট লালচে ইয়াবা টেবলেট। বেশ কয়েক গজ দূরে গিয়েই সে তা সেবনে বসে পড়লো। লাইলী ‘এই চশমা’ বলে অন্য একজনকে ডাক দিলো। মনে হলো জিন্স ও গেঞ্জি পরা লোকটির সম্মানে লেগেছে। সে তার কাছে নয়, প্রথমে থাকা মধুবালার কাছ থেকেই নিল গাঁজা। পরে আসা লোকটিও তার কাছ থেকেই ৩০০ টাকার নোট দিয়ে তিনটি ইয়াবা ট্যাবলেট কিনলো। এরই মধ্যে কমলাপুর থেকে ধেয়ে এলো একটি ট্রেন। তখন এই মাদক বিক্রেতারাই স্বেচ্ছাসেবী। লাইনের উপর দিয়ে হাঁটতে থাকা লোকদের সরে যেতে হাঁকডাক। ট্রেন পাশ দিয়ে যেতেই পেছনের বাসার চালা থেকে নেমে মাটি পর্যন্ত ঝুলন্ত ত্রিপলের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো মধুবালা ও শিউলী। ধুলবালি থেকে রক্ষার জন্যই ওই চেষ্টা। ট্রেন যেতেই আবার বেরিয়ে পড়লো তারা।
বেলা ১২টার পর ক্রেতার সমাগম বাড়তে দেখা যায়। আধঘণ্টা পর্যন্ত সাধারণ চোখে পথচারী বলে মনে হওয়াদের অর্ধেকের বেশি লোকই গাঁজা ও ইয়াবা কিনে নিলো। পাইকারিতেও কিনলো কয়েকজন। আবদুর রহিম নামে এক লোক এসে চাইলো ১২টি গাঁজার পুরিয়া। কিন্তু সে দিল ১০টার দাম। কারণ জানতে চাইলে লাইলী বললো ‘নিয়মিত কাস্টমার। তাই দু’টা ফ্রি’। দুপুরে তাদের সঙ্গে এসে যোগ দিলো সাদিয়া। সে শিউলির বোন। মধুবালার পাশে সে মাটিতে তক্তা পেতে বসলো। তার ব্যাগ থেকে বের হলো কাগজের বান্ডেল ও অন্তত এক কেজি গাঁজার পলিথিন। তার নিচে পুঁটলি। ছোট পুঁটলি ৩০ টাকার হলেও সে ২০ টাকায়ও নতুন পুঁটলি বানিয়ে দিচ্ছিল। তখন চারজনের মধ্যে তার বিক্রিই বেশি হচ্ছিল। দুপুরের পর লাঠিতে ভর দিয়ে এলো এক ভিক্ষুক। নাম শুক্কুর মিয়া। ভিক্ষার পাশাপাশি তার ক্ষুদ্র মাদক ব্যবসা। তিনটি ইয়াবা নিল। তারপর ২০ ও ৫০ টাকার নোটের সঙ্গে দিল অনেকগুলো পাঁচ ও দুই টাকার নোট। দিতেই তা ছুড়ে মারলো সাদিয়া। বললো, ‘ভাঙতি টাকা এখানে চলে না। তা তুই জানস না। দে, আমার বাবা ফেরত দে।’ শুক্কুর বলে, ‘আজ টাকা বদলির দোকানটি খোলা না থাকায় এনেছি। আজ নেয় না বোন।’ কিছুতেই নিবে না সে। অগত্যা সে ভাঙতি টাকা দিয়ে নোট বদলে আনার জন্য একটি দোকানে দিকে চললো।
সাদিয়া বলেন, চোখ-মুখ দেখলেই বুঝতে পারি কারা নেশা করে। তাদের চলাফেরায়ও বুঝা যায়। বলেন, এই রেললাইনে শতাধিক নারী ও পুরুষ মাদক বেচা কেনা করে। রাত দিন ২৪ ঘণ্টাই খোলা মাদকের হাট। মাদক কিনে এখানে সেবনের ব্যবস্থাও আছে বাসাগুলোতে। বসরা পুলিশকে ম্যানেজ করে। ধরা পড়লে ছাড়িয়ে আনে। পুলিশকে ম্যানেজ করে বা লুকোচুরি মাধ্যমেই চলে এই প্রকাশ্য মাদক বেচা-কেনা।