Showing posts with label নির্বাচন. Show all posts
Showing posts with label নির্বাচন. Show all posts

Wednesday, October 28, 2026

সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না নেতানিয়াহু বা বিরোধী জোট, রেকর্ড সংখ্যক আসন পাচ্ছে আরব দলগুলো

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট কিংবা তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাওয়া বিরোধী জোট—কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না। মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে এমন আভাস পাওয়া গেছে। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল—চ্যানেল ১১, ১২ ও ১৩-এর বুথফেরত জরিপে কোনো পক্ষই পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাচ্ছে না।

জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা ৫০ থেকে ৫২টির মধ্যে থাকতে পারে। চ্যানেল ১৩-এর রাত ১টার জরিপে দুই পক্ষের আসনসংখ্যা সমান ৫১টি দেখানো হয়েছে।

এদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেতে পারে। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেতে পারে ২১ থেকে ২৩টি আসন। ফলে লিকুদ পার্টি পরবর্তী নেসেটের বৃহত্তম দল হিসেবে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৭ থেকে ১৮ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আমের মতো আরব দলগুলো সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। এ অবস্থায় নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো আসন থাকলেও বিকল্প সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

বিরোধী জোটের অংশ হিসেবে নাফতালি বেনেটের বিইয়াখাদ পার্টি ১২ থেকে ১৪টি আসন পেতে পারে। আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু ৭ থেকে ৯টি এবং ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৯ থেকে ১০টি আসন পেতে পারে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোটের শরিক ইতামার বেন-গভিরের ওৎজমা ইয়েহুদিত পার্টি ৬ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে। বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টি-জেহুত পেতে পারে ৬টি আসন। অতি-গোঁড়া ইহুদিদের প্রধান দুটি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম সম্মিলিতভাবে ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে।

বুথফেরত জরিপ প্রকাশের পর বিরোধী জোটের নেতারা ফলাফলকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁদের দাবি, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমে গেছে।

আইজেনকোট বলেন, প্রাথমিক বুথফেরত জরিপের ফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ও ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিকের নেতানিয়াহু এবং তাঁর ৭ অক্টোবরের হামলার সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের ওপর আস্থা নেই।

বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদও নেতানিয়াহুর জোটকে পরাজিত দাবি করেছেন। তাঁর ভাষায়, নেতানিয়াহুর জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে এবং জনগণ তাদের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার বার্তা দিয়েছে।

ডেমোক্র্যাটস পার্টির চেয়ারম্যান ইয়াইর গোলান বলেন, ইসরায়েলে প্রকৃত পরিবর্তনের সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্যবধান দূর করে শরিকদের সঙ্গে কাজ করতে এবং দায়িত্ব নিতে তাঁরা প্রস্তুত।

নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আপাতত কম বলে মনে করা হচ্ছে। আইজেনকোট নেতানিয়াহুর অধীনে, এমনকি পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রিত্বের ব্যবস্থাতেও, সরকার গঠনে রাজি নন। বিরোধী জোটের অন্য নেতারাও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।

এদিকে নেসেটের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে সব ভোট গণনার পর। অতীতেও বুথফেরত জরিপের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফলের পার্থক্য দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে সরকার গঠনের পথ তৈরি হতে পারে। তবে জোট গঠনের আলোচনা ব্যর্থ হলে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকার ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় ক্ষমতায় ছিল। ওই হামলার পর বিরোধীরা নেতানিয়াহুর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং হামলার পেছনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন।

নেতানিয়াহুর ক্ষমতা কি থাকছে, সরকার গঠনে কি নির্ধারক হবেন মুসলিমরা
নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ইসরাইলি আরব নাগরিক। ছবি: এপি

নেতানিয়াহুর জোট বড় পরাজয়ের মুখে, দাবি সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর

ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিরোধী জোটের অংশীদার ইয়েশ আতিদ পার্টির নেতা ইয়ার লাপিদ।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রাথমিক বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ইয়ার লাপিদ বলেন, ‘কেউ যেন আপনাদের বিভ্রান্ত করতে না পারে। নেতানিয়াহুর জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে।’

লাপিদ আরও বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ বিপর্যয়। জনগণ তাদের চলে যেতে এবং ঘরে ফিরে যেতে বলেছে।’

এদিকে ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির নেতা বেনি গান্তজ বলেছেন, ইসরায়েলের জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তবে সেই পরিবর্তন যেন সঠিক পথে হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাবেক এই সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা বলেন।

গান্তজ ইহুদিবাদী ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের প্রতি রাজনৈতিক জোটের বিভাজন পেরিয়ে একটি ‘ইহুদিবাদী ঐক্য সরকার’ গঠনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নতুন করে নির্বাচন এড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি।

নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান গান্তজ। জনমত জরিপে তার দলের সংসদে প্রবেশের ন্যূনতম আসনসংখ্যা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার পর তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।

যদিও ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এহাব জাবারিনের মতে, প্রাথমিক বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের অবস্থান দুর্বল হওয়ার চিত্র উঠে এলেও তাকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না।

আল-জাজিরাকে জাবারিন বলেন, ইসরায়েলের পার্লামেন্টে একক দল হিসেবে লিকুদ পার্টিই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে। দলটি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেতে পারে বলে প্রাথমিক জরিপে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে পাওয়া ৩২টি আসনের তুলনায় এবার তাদের আসন কমতে পারে।

জাবারিন বলেন, ‘এতে একই সঙ্গে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। ৭ অক্টোবরের হামলা ও তিন বছরের যুদ্ধের পরও নেতানিয়াহুর প্রতি অনুগত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু শুধু এই সমর্থন দিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা আর সম্ভব হচ্ছে না।’

তবে নেতানিয়াহুর জয় হয়েছে কিংবা তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

জাবারিনের মত, প্রাথমিক জরিপে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে বলে ইঙ্গিত মিললেও বিরোধীদের পক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করা কঠিন হতে পারে। কোনো পক্ষই সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান। ছবি: সংগৃহীত
নেতানিয়াহু সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা: বিরোধী নেতা। ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান। ছবি: সংগৃহীত। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রাথমিক বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইয়ার গোলান বলেন, ‘ইসরায়েলে প্রকৃত পরিবর্তনের সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। এই সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, তাদের দল সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে, মতপার্থক্য দূর করতে এবং দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। এদিকে বিরোধী জোটের ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট বলেছেন, প্রাথমিক বুথফেরত জরিপের ফল নেতানিয়াহু ও তার সরকারের প্রতি মানুষের ‘সম্পূর্ণ অনাস্থা’ প্রকাশ করছে। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে তিনি বলেন, ফল চূড়ান্ত হলে তা দেশটির মূলধারার ইহুদিবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠের বিজয় হবে। আইজেনকোট আরও বলেন, জনগণের ইচ্ছা বাস্তবায়নে তিনি কাজ করবেন। নেতানিয়াহু সরকারকে সরিয়ে যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় সংহতির ভিত্তিতে একটি ইহুদিবাদী সরকার গঠন করতে চান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যানও প্রাথমিক জরিপের ফল নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। ইসরায়েলের রাজনীতি ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ আল-জাজিরাকে বলেন, জরিপের ফল সঠিক হলে নেতানিয়াহুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ডানপন্থি জোটের ভরাডুবি, নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’

ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রাথমিক বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের বর্তমান ৬৪ আসনের জোটটি এবার পেতে পারে মাত্র ৫০ থেকে ৫১টি আসন। তবে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

মঙ্গলবারের (২৭ অক্টোবরের) নির্বাচনের পর ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। জরিপে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো ৫১ থেকে ৫২টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। অন্যদিকে আরবদের নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে মোট ১৮টি আসন।

নির্বাচনি প্রচারে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিত পার্টি আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে প্রাথমিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, এ জোট এবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেতে পারে।

আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোও নেতানিয়াহুর আরেক মেয়াদের বিরোধী। ফলে পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সদস্যের সম্ভাব্য সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৭০। কিন্তু ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী চার দলের মধ্যে তিনটিই নির্বাচনি প্রচারে আরবপ্রধান দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। তারা সেই অবস্থানে অটল থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা তাদের জন্য কঠিন হবে।

এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশে শুক্রবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বুথফেরত জরিপের সঙ্গে প্রকৃত ফলাফলের পার্থক্যও প্রায়ই দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যানও প্রাথমিক জরিপের ফল নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। ইসরায়েলের রাজনীতি ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ আল-জাজিরাকে বলেন, জরিপের ফল সঠিক হলে নেতানিয়াহুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টিকে থাকা ‘প্রায় অসম্ভব’ হয়ে পড়বে।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১৩-এর প্রক্ষেপণের বরাত দিয়ে ওয়াক্সম্যান বলেন, বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও তার ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোটের সম্মিলিত আসনসংখ্যা কমে ২০২২ সালের নির্বাচনের ৬৪ থেকে এবার সম্ভাব্য ৫০-এ নেমে এসেছে। এতে পরবর্তী সরকার গঠন করা নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

যদিও ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের জরিপেই নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। দলটির সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ২৪ থেকে ২৫, যা গত নির্বাচনে পাওয়া ৩২ আসনের চেয়ে কম।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোতের ইয়াশার পার্টি। দলটি ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে বলে জরিপে উঠে এসেছে। বিরোধী জোটের অংশীদারদের মধ্যে বিয়াখাদ পার্টি ১২ থেকে ১৩টি এবং আরবদের নেতৃত্বাধীন জোট ১১টি আসন পেতে পারে।

বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৯ থেকে ১০টি, ডানপন্থি বিরোধী দল ইসরায়েল বেইতেনু ৭ থেকে ৮টি এবং আরেক আরবপ্রধান দল রা’আম ৭টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অতিধর্মীয় সেফারদি শাস পার্টি ৬ থেকে ৮টি এবং অতিধর্মীয় আশকেনাজি ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৬ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে। উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইয়েহুদিতের সম্ভাব্য আসন ৬ থেকে ৭টি। একই ধারার রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি পেতে পারে ৬টি আসন।

এদিকে ডানপন্থি পিপল অব ইসরায়েল, মধ্যডানপন্থি রিজার্ভিস্টস এবং অতিধর্মীয় হারেদি পাবলিক পার্টি নির্বাচনে আলোচনায় থাকলেও পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না বলে জরিপে ধারণা করা হয়েছে।

তবে সরকারপন্থি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের অবস্থান তুলনামূলক ভালো দেখানো হয়েছে। নেতানিয়াহুপন্থি চ্যানেল ১৪-এর জরিপে তার জোট ৬২টি, বিরোধী জোট ৪০টি এবং আরব দলগুলো ১৮টি আসন পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। একইভাবে নেতানিয়াহুপন্থি আই২৪ নিউজের জরিপে তার জোটের সম্ভাব্য আসন ৫৫, বিরোধীদের ৪৯ এবং আরব দলগুলোর ১৬। নতুন চ্যানেল ১৬-এর জরিপে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৫৩, ৫১ ও ১৬।

নেতানিয়াহুর সমর্থন বাড়লেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনিশ্চিত

২০২২ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট ৬৪টি আসন পেয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছিল, এবার জোটটি সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে না। নির্বাচনের আগে শেষ কয়েক সপ্তাহে নেতানিয়াহু বারবার সতর্ক করে বলেন, তিনি পরাজিত হলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এ ধরনের প্রচার তার সমর্থন কিছুটা বাড়িয়ে থাকতে পারে। তবে প্রাথমিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, সেই সুবিধা তার নিজের রাজনৈতিক শিবিরের অন্যান্য দলের আসন কমার বিনিময়ে এসেছে। তিনটি প্রধান চ্যানেলের জরিপেই কোনো পক্ষ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বরং বিরোধীরা সামান্য এগিয়ে রয়েছে।

জরিপের ফল প্রকাশের পর আইজেনকোত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জনসমর্থন হারানোর দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘ইহুদিবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠ ও ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিক নেতানিয়াহু সরকারকে সম্পূর্ণ অনাস্থা জানিয়েছেন।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চূড়ান্ত ফল একই রকম হলে তা হবে ইসরায়েলের দায়িত্বশীল ইহুদিবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠের বিজয়।

আইজেনকোত আরও বলেন, জনগণের ইচ্ছা বাস্তবায়ন, নেতানিয়াহু সরকারকে প্রতিস্থাপন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ একটি ইহুদিবাদী সরকার গঠনে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।

তবে কীভাবে তিনি সরকার গঠন করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আরবপ্রধান দলগুলোর এক বা একাধিক দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে কিংবা নতুন সরকার গঠনের ভোটে তাদের বিরত থাকার ওপর নির্ভর করে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন তিনি।

কিন্তু ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যান এবং বিয়াখাদ পার্টির নেতা নাফতালি বেনেট আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে তাদের সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে হতে পারে। অবশ্য ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তারা দুজনই রা’আমকে নিয়ে গঠিত একটি স্বল্পস্থায়ী সরকারের অংশ ছিলেন।

আরব দলগুলোর ঐতিহাসিক সাফল্যের সম্ভাবনা

প্রাথমিক জরিপে সম্ভাব্য আসনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আরবদের নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থার মধ্যে দুই রাজনৈতিক শিবিরের নেতারাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

চ্যানেল ১২-কে আব্বাস বলেন, ‘সবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।’ তার এ বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নেতানিয়াহুপন্থি শিবিরের প্রতিনিধিরাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

আইজেনকোতের নেতৃত্বে সরকার গঠনের বিষয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও আব্বাস বলেছেন, এমন জোট বাস্তবে গঠন করা সম্ভব কি না, তা আগে নিশ্চিত হতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, বুথফেরত জরিপের হিসাবে এখনো সরকার গঠনের মতো আসনসংখ্যা নেই। জরিপে বর্তমান বিরোধীদলীয় জোট ৫২টি এবং রা’আম ৭টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে দুই কম।

অন্যদিকে, আরব নেতৃত্বাধীন জোটের সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর জরিপে দলটি ১০ থেকে ১১টি আসন পেতে পারে, এমন খবরের পর সমর্থকেরা করতালি দিয়ে উল্লাস করছেন।

এ সময় আরবি ভাষায় ‘বেন গভির, চলে যাও’ স্লোগানও শোনা যায়। দলটির নেতা ইউসেফ জাবারিন এবং অন্য নেতারাও উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগানে যোগ দেন।

সমর্থকদের উদ্দেশে জাবারিন বলেন, তাদের দল নেতানিয়াহু, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এবং ‘রক্তাক্ত সরকারকে’ বিদায় জানাতে চায়।

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে। ৭৭ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রাতভর ভোট গণনা করে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করবে।

প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও বিরোধীদের সরকার গঠনের পথও সহজ নয়। কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পাঁচবার নির্বাচন হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

Monday, October 26, 2026

এল-সাইয়েদকে ঠেকাতে নির্বাচনি সমাবেশে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ালেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন সিনেট নির্বাচনকে সামনে রেখে মুসলিম প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনি সমাবেশে তিনি দাবি করেন, একজন মুসলিম চিকিৎসক সিনেটর নির্বাচিত হলে বড়দিনও বাতিল হয়ে যেতে পারে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রোববার (২৫ অক্টোবর) মিশিগানে এক নির্বাচনি সমাবেশে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সাইয়েদকে লক্ষ্য করে এসব মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এ সময় তিনি এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দেন। এমনকি এল-সাইয়েদ নির্বাচিত হলে প্রেসিডেন্টের নির্দেশে তাকে প্রতিদিন মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি চাই, তার জন্য মেটাল ডিটেক্টর থাকুক।’

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে দেশটিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি, যাতে মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন জিহাদি সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হতে না পারেন।’

এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী নাগরিক এবং জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেছেন।

এর আগে তার বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যকে মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি অনেকটা উড়িয়ে দিয়েছিলেন এল-সাইয়েদ। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর মতো অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

নির্বাচনে এল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে এ আসনের নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে রিপাবলিকান পার্টি। বর্তমানে সিনেটে দলটির ৫৩টি আসন রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সিনেটের মোট ৩৫টি আসনে ভোট হওয়ার কথা।

২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় থেকেই রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ব্যবহার করে আসছেন ট্রাম্প।

২০১৫ সালে প্রথমবারের নির্বাচনি প্রচারের শুরুর দিকে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে তিনি অবস্থান নেবেন।

এর দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এক নির্বাহী আদেশে একাধিক মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প। তবে আদেশটি বেশিদিন কার্যকর ছিল না।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ।

ইসরাইলের নির্বাচনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

আল-জাজিরাঃ ইসরাইলে আগামীকাল মঙ্গলবার পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলা এবং এরপর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। ইসরাইলের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে এটিকে।

বহু বছর ধরে চলা একাধিক সংঘাতে জড়িয়ে আছে ইসরাইল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে। দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন গভীর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে, আগামী দিনে ইসরাইলের সরকার কোন পথে এগোবে।

নির্বাচন সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয় তুলে ধরা হলো।

১. প্রধান দলগুলো কারা, জনমত জরিপ কী বলছে

ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। কোনো দলকে পার্লামেন্টে আসন পেতে হলে নির্বাচনে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। পার্লামেন্টের মেয়াদ চার বছর।

এবারের নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য মূলত দুটি রাজনৈতিক জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। প্রথমটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট। এর প্রধান দল লিকুদ পার্টি। এই জোটে রয়েছে কয়েকটি উগ্র ইহুদিপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি দল। এর মধ্যে আছে রক্ষণশীল ধর্মীয় দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস। পাশাপাশি রয়েছে উগ্র ইহুদিপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের নেতৃত্বাধীন ওতজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোতরিচের নেতৃত্বাধীন রিলিজিয়াস জায়োনিজম-জেহুত।

প্রধান বিরোধী জোটে রয়েছে ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন চারটি রাজনৈতিক দল ও জোট। এগুলো হলো সাবেক ইসরাইলি সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি, সাবেক উপসেনাপ্রধান ইয়াইর গোলানের নেতৃত্বাধীন দ্য ডেমোক্র্যাটস, সাবেক অর্থমন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের নেতৃত্বাধীন ইসরাইল বেইতেনু পার্টি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন টুগেদার জোট। এ জোটে নেসেটের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদও রয়েছেন।

নতুন জনমত জরিপ প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে গত শুক্রবার প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপগুলোতে দেখা গেছে, কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার পথে নেই।

ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর এক জরিপে বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নেতানিয়াহুর জোট পেতে পারে ৫০টি আসন। বাকি আসনগুলো পেতে পারে অন্য দলগুলো। এর মধ্যে রয়েছে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের সমর্থনপুষ্ট দুটি প্রধান রাজনৈতিক তালিকা—রা’আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্ট এবং জয়েন্ট লিস্ট। জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাদাশ, বালাদ ও তাআল দল।

তবে নেতানিয়াহুপন্থি ও নেতানিয়াহুবিরোধী—দুই জোটই আপাতত আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে।

এতে নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে জটিল দর-কষাকষির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোনো জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা হতে পারে। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে ইসরাইলে আবার নির্বাচন হতে পারে।

২. নির্বাচনে প্রধান ইস্যু কী কী?

এবারের নির্বাচনে ইসরাইলিদের সামনে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা সংকট বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

দেশের ভেতরে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি বাড়ছে। একই সঙ্গে কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য নেতানিয়াহুর বারবার নেওয়া উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ আছে।

সমালোচকদের মতে, এসব উদ্যোগ ইসরাইলের উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ও ইসরাইলি-আমেরিকান ভাষ্যকার মেইরাভ জনসজেইন আলজাজিরাকে বলেন, ইসরাইলের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থি বিরোধী দলগুলো মনে করছে, গণতন্ত্র রক্ষা এবং নেতানিয়াহুর একের পর এক মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধারের এটাই শেষ সুযোগ।

দীর্ঘদিনের যুদ্ধেও ক্লান্ত ইসরাইলের জনগণ। একাধিক সামরিক সংঘাতের বিষয়ে দেশটির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে আলোচনা চলছে। অনেকেই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চান। তবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবাননের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে তাদের অনেকেরই আপত্তি রয়েছে।

৩. এবারের নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। এর মধ্যে ইসরাইলি সমাজে উগ্র-ইহুদিপন্থি মনোভাব বেড়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে বিভাজনও গভীর হয়েছে।

ইসরাইলের বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি আলজাজিরাকে বলেন, ইসরাইলি সমাজের একটি অংশে সহিংসতা ও উগ্র-ইহুদিপন্থি বক্তব্যের প্রবণতা আগে থেকেই ছিল। তবে বর্তমান সরকারের আমলে এসব প্রবণতা আরো দ্রুত বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরাইলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেশটির কয়েকটি মিত্র দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। গাজা ও লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলারও নিন্দা জানিয়েছে অনেক দেশ।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু ভাষণ দেওয়ার সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তাদের কেউ কেউ নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় বিদ্রূপ ও দুয়োধ্বনিও দেন।

এবারের নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসরাইলের পরবর্তী সরকার বর্তমান নীতি বজায় রাখবে, নাকি সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।

৪. নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে?

ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছরেরও বেশি সময় দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। সব মিলিয়ে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ১৯ বছর।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার কথিত ব্যর্থতা নিয়ে দেশে ও বিদেশে তার ওপর চাপ বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে দুর্নীতির অভিযোগেও তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন।

নির্বাচনে পরাজিত হলে দুর্নীতির মামলাগুলোতে তার ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার কারাদণ্ডও হতে পারে।

নতুন সরকার গঠিত হলে ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলা নিয়ে সম্ভাব্য তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগও প্রভাবিত হতে পারে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর চাপ তৈরি করছে।

৫. ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ইসরাইলি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকও রয়েছেন।

অন্যদিকে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ তাদের সীমান্ত, চলাচল ও আইনি অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল সরকার।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোট দেওয়ার হার ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশ ভোট আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর পক্ষে যেতে পারে। এসব দলই মূলত ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে।

ভোট দেওয়ার হার ৬৫ শতাংশে পৌঁছালে আরব দলগুলো নেসেটে ১৫টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে। নির্বাচনী প্রচারকেরা ভোট দেওয়ার হার ৭০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তা হলে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি দেখা যেতে পারে। এতে ছোট দলগুলোর জন্য পার্লামেন্টে আসন পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

গত মাসে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। ফলে আরব দল দুটি নির্বাচনে থাকার সুযোগ পায়। তবে ৭ অক্টোবরের হামলাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে লেখা একটি নিবন্ধের কারণে বালাদ দলের নেতা সামি আবু শাহাদেহকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুই প্রধান জোটই আপাতত তাদের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। কিন্তু আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া কোনো জোটের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে।

নেতানিয়াহু বারবার বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরব দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলানোর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, বিরোধীরা সরকার গঠন করলে এসব দলের সমর্থন নিতে পারে। আর এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে একমাত্র তার লিকুদ পার্টিই সক্ষম।

ইসরাইলের নেসেট সদস্য আয়মান ওদেহের সাবেক সহযোগী জোসেফ মানসুরের মতে, আরব দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নেতানিয়াহুর কৌশলের অংশ। এর ফলে কোনো জোট ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।

আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির জন্য লেখা এক নিবন্ধে মানসুর বলেন, ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন যদি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বিরোধীরা ৬১টি আসন থেকে পিছিয়ে থাকে, তাহলে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থাই নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি রাজনৈতিক সাফল্যে পরিণত হতে পারে।

ইসরাইলের নির্বাচনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ছবি: এপি

নেতানিয়াহু বিদায় নিলেই কি শান্তি ফিরবে মধ্যপ্রাচ্যে

ইসরাইলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আধিপত্য হারাতে পারেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর বিদায় কি ইরান, গাজা ও লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধনীতি বদলে দেবে, নাকি নতুন নেতৃত্বেও অব্যাহত থাকবে সংঘাত?

ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান ও কঠোর নীতির জন্য নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

তবে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকটও শান্তিবাদী নন। সাবেক এই সেনাপ্রধান হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে। তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধী। ফলে নেতৃত্ব বদলালেও ইসরাইলের মূল নিরাপত্তানীতি অপরিবর্তিত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাত থামার সম্ভাবনা কম

ইরানকে ইসরাইলের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন নেতানিয়াহু ও আইজেনকট দুজনই। আইজেনকট কূটনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে সমঝোতার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকাতে আগ্রহী। তবে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের পথও খোলা রাখতে চান তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সহজে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

গাজায় যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইল গাজায় গণহত্যা শুরু করে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেলআবিব।

হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়েও মতবিরোধ রয়ে গেছে।

আইজেনকট ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজলেও প্রয়োজনে সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে তিনি। ফলে নেতানিয়াহুর বিদায়ে যুদ্ধবিরতি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত নয়।

লেবাননে পরিবর্তন নাও আসতে পারে

লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আইজেনকট অতীতে লেবানন যুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামরিক প্রতিক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। নতুন সরকার সামরিক অভিযানের ধরন বা তীব্রতা বদলাতে পারে, তবে সীমান্তের ওপারে নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখার নীতি পরিত্যাগের সম্ভাবনা কম।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথও কঠিন

নেতানিয়াহুর মতো আইজেনকটও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধী। জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত অঞ্চলে ইসরাইলের পূর্ণ নিরাপত্তাগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে তিনি।

তবে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের কিছু উদ্যোগ, অবৈধ বসতি এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। তার নেতৃত্বে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিনের সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস নেই।

তাহলে কী পরিবর্তন হতে পারে

নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। ৭ অক্টোবরের হামলার নিরাপত্তাগত ব্যর্থতা তদন্ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক চাকরি থেকে অব্যাহতির মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের প্রভাবও কমতে পারে।

ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করা কোনো পক্ষের জন্যই সহজ নয়। আইজেনকটের আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোটে অনীহা তার সরকার গঠনের পথ আরও কঠিন করতে পারে।

সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর বিদায় ইসরিইলের নেতৃত্ব ও কূটনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের অবসান ঘটানোর নিশ্চয়তা দেবে না। ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইসরাইলের কঠোর নিরাপত্তানীতির প্রতি দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশের সমর্থন রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী বদলালেও সংঘাতের মূল কারণ ও নীতিগুলো থেকে যেতে পারে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

নেতানিয়াহু বিদায় নিলেই কি শান্তি ফিরবে মধ্যপ্রাচ্যে
ছবি: ইন্ডিয়া টুডে

Sunday, October 25, 2026

নির্বাচনের আগে ইসরায়েলে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ

ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার ঘটনা তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার দেশটির সাধারণ নির্বাচনের তিন দিন আগে শনিবার রাতে এ বিক্ষোভ হয়।

ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সরকারের ওপর তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

আয়োজকদের দাবি, এতে এক লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা জানানো হয়নি।

‘অক্টোবর কাউন্সিল’ নামের একটি সংগঠন এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। সংগঠনটিতে ৭ অক্টোবরের হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, সাবেক জিম্মি এবং নিহতদের স্বজনেরা রয়েছেন। তেল আবিবের হোস্টেজেস স্কয়ারে আয়োজিত সমাবেশে তারা হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সরকারের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান।

হামলায় নিহত এক জিম্মি ওরি দানিনোর বাবা এলহানান দানিনো অভিযোগ করেন, সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করছে না, কারণ তাদের হয়তো কিছু লুকানোর আছে। তিনি বলেন, হামলার তিন বছর পরও সত্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় তদন্ত শুরু হয়নি।

আরেক জিম্মির মা ভিকি কোহেন বলেন, ৭ অক্টোবর কী ঘটেছিল, সেই সত্য চাপা পড়তে দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তা বিভাগের ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ কর্মকর্তারা সরে গেছেন, এবার রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও দায় নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সমাবেশে নেতানিয়াহুর বিরোধী রাজনৈতিক জোটের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও যোগ দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির ইয়ার গোলান, ইসরায়েল বেইতেনুর আভিগদর লিবারম্যান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ।

ইয়ার গোলান বলেন, নির্বাচনের পর বুধবার থেকেই তারা সত্য উদ্ঘাটন ও নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেবেন।

ইসরায়েলে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয়ের তদন্তের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা। এটি সাক্ষীদের তলব করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে সুপারিশ দিতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ ধরনের কমিশন গঠনে রাজি হননি। তার দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ দেওয়া স্বাধীন কমিশন সরকারের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে।

৭ অক্টোবরের হামলায় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী ধরনের ব্যর্থতা ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সমাবেশে সাবেক জিম্মি ড্যানিয়েল আলোনি বলেন, ওই দিন শুধু মানুষকে অপহরণ করা হয়নি, মানুষের নিরাপত্তাবোধও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন নির্বাচনের পর শিশুদের জন্য ভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল

তেল আবিবের হোস্টেজেস স্কয়ারে বিক্ষোভ। ছবি: প্রো-ডেমোক্রেসি প্রোটেস্ট মুভমেন্ট
তেল আবিবের হোস্টেজেস স্কয়ারে বিক্ষোভ। ছবি: প্রো-ডেমোক্রেসি প্রোটেস্ট মুভমেন্ট

Friday, October 23, 2026

নির্বাচনের ৫ দিন আগে নেতানিয়াহুর গাড়িবহরে হামলা

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গাড়িবহর লক্ষ্য করে কাচের বোতল ছুড়েছেন এক ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে জেরুজালেমের মাহানে ইয়েহুদা মার্কেটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন নেতানিয়াহুর ৭৭তম জন্মদিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের মাত্র ৫ দিন আগে নেতানিয়াহুর গাড়িবহরের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটল। খবর দ্য জেরুজালেম পোস্টের।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাড়িবহর নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল লাইট রেল পরিষেবা। এ সময় হাজারো ইসরায়েলি নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানাতে এবং তার গাড়িবহর দেখতে জড়ো হন।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বোতল নিক্ষেপের পর নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত জনতার জন্য দেওয়া ব্যারিকেড টপকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে খুঁজতে যান। তবে এ ঘটনায় নেতানিয়াহুর গাড়িবহরের চলাচলে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।

মাহানে ইয়েহুদা মার্কেটে পৌঁছালে নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারাকে জন্মদিনের সংগীত বাজিয়ে স্বাগত জানানো হয়। অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে উপস্থিত ব্যক্তিদের লিকুদ পার্টির পতাকার পাশাপাশি ইরানের সিংহ ও সূর্যখচিত পতাকা ওড়াতে দেখা যায়। নেতানিয়াহুকে ফুলের তোড়া হাতে জনতার দিকে নাড়তে এবং পরে সেটি তাদের দিকে ছুড়ে দিতেও দেখা যায়।

মাহানে ইয়েহুদায় যাওয়ার আগে বৃহস্পতিবার তেলআবিবের হাতিকভা মার্কেট পরিদর্শন করেন নেতানিয়াহু। সেখানে এক ক্ষুব্ধ ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি হামাসকে লাখ লাখ ডলার কেন পাঠিয়েছিলেন?’

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি ঘটনাটি ধারণ করতে গেলে সেখানে উপস্থিত লিকুদ পার্টির সমর্থকেরা তার হাত থেকে ফোন ফেলে দেন এবং তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ওই মার্কেটে উপস্থিত ছিলেন নিহত জিম্মি গাই ইলুজের বাবা মিশেল ইলুজ, নিহত জিম্মি কারমেল গ্যাটের চাচাতো ভাই গিল ডিকম্যান এবং সাবেক জিম্মি মাতান জাঙ্গাউকারের মা আইনাভ জাঙ্গাউকার।

তারা নেতানিয়াহুকে বলতে সেখানে গিয়েছিলেন, ৭ অক্টোবরের ঘটনায় যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের সরকারের পদ ছাড়তে হবে। এ সময় মার্কেটে কয়েকজন মিশেল ইলুজের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ঘটনার সময় নেতানিয়াহু সেখানে ছিলেন না।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আইনাভ জাঙ্গাউকার লেখেন, ‘আমরা নেতানিয়াহুকে সত্যটা জানাতে গিয়েছিলাম; তিনি গণহত্যার জন্য দায়ীদের একজন। ৭ অক্টোবর যারা দায়িত্বশীল পদে ছিলেন, তাদের কেউই ক্ষমতায় থাকতে পারেন না, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তো নয়ই।’

সূত্র : দ্য জেরুজালেম পোস্ট

জেরুজালেমের মাহানে ইয়েহুদা মার্কেটে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এমআইএস
জেরুজালেমের মাহানে ইয়েহুদা মার্কেটে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এমআইএস

Tuesday, October 20, 2026

এল-সাইদের ধর্মবিশ্বাসে আক্রমণ রিপাবলিকানদের, উত্তপ্ত টাউন হল

সিএনএনঃ যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড ইস্যুটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইদকে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন রিপাবলিকানরা। অন্যদিকে, এল-সাইদের দাবি, তাকে অন্যায়ভাবে সেই ‘দ্বৈত আনুগত্যের’ অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, যে অভিযোগের মুখে একসময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ও বারাক ওবামাকেও পড়তে হয়েছিল।

এ সপ্তাহান্তে এল-সাইদ মুসলিম ব্রাদারহুডের নিন্দা করেন। ১৯২৮ সালে মিসরে প্রতিষ্ঠিত এই ইসলামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিয়ে প্রথমে এক ভোটারের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় এবং পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। এর আগে রিপাবলিকানরা সংগঠনটির সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক এবং এ বিষয়ে তার অতীতের মন্তব্যগুলো সামনে আনার চেষ্টা করছিলেন।

রোববার মিশিগানের ফ্লিন্টে একটি নির্বাচনী সমাবেশের পর সাংবাদিকদের এল-সাইদ বলেন, ‘তারা কেন এটিকে তাদের প্রচারের শেষ যুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়, সে বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘তারা মানুষের মধ্যে একধরনের পরোক্ষ দ্বৈত আনুগত্যের ধারণা তৈরি করতে চায়। আমাদের রাজনীতিতে এই ধারণার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—কেউ হয়তো একটু ভিন্নভাবে প্রার্থনা করেন, তাই তার দ্বৈত আনুগত্য রয়েছে। জন এফ. কেনেডি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তার সঙ্গেও একই কাজ করা হয়েছিল। তিনি ক্যাথলিক হওয়ায় তার নাকি দ্বৈত আনুগত্য রয়েছে—এমন ধারণা ছড়ানো হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামার ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হয়েছিল, শুধু তার বাবা মুসলিম বংশোদ্ভূত ছিলেন বলে, যদিও তার বাবা খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন।’

এল-সাইদ আরো বলেন, ‘এটি নতুন কিছু নয়। মানুষের জীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলো নিয়ে বলার মতো কোনো বক্তব্য না থাকলে তারা এ কাজই করে।’

এল-সাইদকে লক্ষ্য করে রিপাবলিকানদের আক্রমণ

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিনেট লড়াইগুলোর একটির শেষ কয়েক সপ্তাহে রিপাবলিকানরা ক্রমেই এল-সাইদের মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকে সামনে আনছেন। শুক্রবার রাতে এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এল-সাইদকে ‘মোহাম্মদ’ বলে উল্লেখ করেন এবং মিথ্যাভাবে দাবি করেন, ডেমোক্র্যাট এই সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা একজন ‘জিহাদি’। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যে এ ধরনের মন্তব্য নিয়মিত হয়ে উঠেছে।

এল-সাইদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য মাইক রজার্স রোববার বলেন, তিনি ‘কখনো তাকে সন্ত্রাসী বলেননি’। তিনি আরো বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের হয়ে কথা বলি না।’

তবে রজার্সের অভিযোগ, এল-সায়েদ মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছেন। মুসলিম ব্রাদারহুড একটি ইসলামপন্থি আন্দোলন, যার বিভিন্ন শাখা বিশ্বের নানা দেশে রয়েছে। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মিসরে, যেখানে একসময় তারা উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করেছে। সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সহিংস পদ্ধতি ব্যবহারের বিরোধিতা করে। তবে অতীতে সংগঠনটির কয়েকটি শাখার সঙ্গে হামলার সম্পর্ক থাকার অভিযোগ উঠেছে।

গত নভেম্বরে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। এর মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের নির্দিষ্ট কিছু শাখা বা উপবিভাগকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন কিংবা বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাংবাদিক ডানা বাশকে রজার্স বলেন, ‘আপনারা জানেন, তিনি নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরতে চান। বিষয়টি তা নয়। এটি আপনি কীভাবে চিন্তা করেন, তা নিয়ে; আপনি কীভাবে প্রার্থনা করেন, তা নিয়ে নয়। এটি আপনার মতাদর্শ এবং সেটি কতটা বিপজ্জনক, তা নিয়ে।’

টাউন হলের সভায় এল-সাইদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়

এল-সাইদকে মুসলিম ব্রাদারহুড ও ইসলামি চরমপন্থার সঙ্গে যুক্ত করার রিপাবলিকানদের চেষ্টা এ সপ্তাহান্তে মিশিগানের ক্যারো শহরে একটি টাউন হল সভায় প্রকাশ্য রূপ নেয়। সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি বারবার এল-সাইদের কাছে মুসলিম ব্রাদারহুড সম্পর্কে জানতে চান। তার বক্তব্য ছিল, প্রার্থীকে এখনো সংগঠনটির প্রত্যাখ্যান করতে শোনা যায়নি।

জনতার মধ্য থেকে ওই ব্যক্তি চিৎকার করে বলেন, ‘আবদুল, আপনি কি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করবেন?’ আন্দোলনটির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করার পর এল-সাইদ ওই ব্যক্তির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ওই ব্যক্তি পরোক্ষভাবে ধরে নিয়েছেন যে তার ‘দ্বৈত আনুগত্য’ রয়েছে।

এল-সাইদ বলেন, ‘আপনি ধরে নিচ্ছেন… আমি মুসলিম বলেই কোনোভাবে এমন কিছুর প্রতি আমার আনুগত্য থাকবে, যা আমাদের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ পরে তিনি আরো বলেন, ‘আমার কাছে ওই সংবিধানই পথনির্দেশক আলো।’ বাক্যবিনিময়ের পর ওই ব্যক্তি সভাস্থল ছেড়ে চলে যান। এ সময় উপস্থিত জনতা এল-সায়েদের পক্ষে উল্লাস করে।

পরিবারের অতীত নিয়ে প্রশ্ন

এল-সাইদকে লক্ষ্য করে রিপাবলিকানদের আক্রমণের মধ্যে তার সৎবোনের পুরোনো কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট নতুন করে সামনে এসেছে। এর মধ্যে ২০১২ সালের একটি পোস্টও রয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, সত্তরের দশকের শুরুর দিকে কলেজে পড়ার সময় মুসলিম ব্রাদারহুডে তার মায়ের সক্রিয়তা নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার ‘অসাধারণ একটি আলোচনা’ হয়েছে।

এল-সাইদ বলেছেন, সত্তরের দশকে মিসরে তার মা কী করতেন, তা তিনি জানেন না। তার ব্যাখ্যা, মা-বাবার বিচ্ছেদের সময় তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। এরপর বহু বছর তিনি মায়ের সঙ্গে দেখা করেননি। মিশিগানে মূলত তার বাবা ও সৎমায়ের কাছেই তিনি বড় হয়েছেন।

২০১২ সালে এল-সাইদ তৎকালীন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সমর্থন করে একটি খোলা চিঠিতেও স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই বছরের শুরুতে মিসরের কর্তৃত্ববাদী সরকার উৎখাতের পর মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থনে মুরসি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এর এক বছর আগে তিনি ‘হাফিংটন পোস্টে’ একটি মতামত নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে মিসরের তরুণ আরব বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মিসরে গণতন্ত্রকে সমর্থন করলে দেশটি মুসলিম ব্রাদারহুডের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে—এমন উদ্বেগকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

সম্প্রতি এক বিতর্কে রজার্স উল্লেখ করেন, এল-সাইদের মা ইসলামিক আমেরিকান রিলিফ এজেন্সিতে কাজ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালে সংস্থাটিকে সন্ত্রাসবাদে সহায়তাকারী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল।

এল-সাইদ প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি আমার মাকে আক্রমণ করছেন?’ রজার্স বলেন, ‘আমি ওই সংস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছিলাম, যার বিরুদ্ধে আল-কায়েদার কাছে অর্থ পাঠানোর অভিযোগে মামলা হয়েছিল। দেখুন, তিনি আপনার মা। আমার মা একটি ছোট বাণিজ্য চেম্বারে কাজ করতেন। এ বিষয়ে আমি যেকোনো দিন আমার মাকে সামনে আনতে পারি।’

জবাবে এল-সাইদ বলেন, তিনি একজন ‘বাবা ও চিকিৎসক’। তিনি চান, ‘রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব দূর হোক, মানুষের পকেটে অর্থ থাকুক এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার চালু হোক।’ তার অভিযোগ, রজার্স ‘নিজের কর্মকাণ্ডের রেকর্ড ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়কে সামনে আনতে চান’।

সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকায় আত্মীয়ের নাম ওঠার বিষয়েও বক্তব্য

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এল-সাইদ তার স্ত্রীর বোন মারিয়াম জুকাকুকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসী নজরদারি ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও কথা বলেছেন। ২০১৬ সালে একটি দলগত মামলার অংশ হিসেবে জুকাকু এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

জুকাকুকে কেন ওই তালিকায় রাখা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তিনি একসময় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়িতে শিক্ষাদান করেন এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। স্ত্রীর বোনের নাম ওই তালিকায় থাকার বিষয়ে ফক্স নিউজের প্রশ্নের জবাবে এল-সাইদ বলেন, ‘তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তাকে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, এরপর তিনি মামলা করেন এবং তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখানে এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে মানুষকে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই দোষী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, তাদের নাম ভিন্ন ধরনের। মাইক রজার্সের মতো লোকেরা যে কাঠামো তৈরি করেছেন, তার কারণেই এমনটা হচ্ছে।’

(এরিক ব্র্যাডনার এর প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেফ জেলেনি ও আলিনা ফায়াজ।)

এল-সাইদের ধর্মবিশ্বাসে আক্রমণ রিপাবলিকানদের, উত্তপ্ত টাউন হল
আবদুল এল-সাইদ

মসজিদে জরিমানা, বাড়িঘর উচ্ছেদ—ইসরাইলি নির্বাচনে উগ্রপন্থি বেন-গভিরের হাতিয়ার

ইসরাইলে নির্বাচনের আগে মসজিদে জরিমানা এবং আরবদের বাড়িঘর উচ্ছেদের ঘটনাকে নির্বাচনি প্রচারে ব্যবহার করছেন দেশটির উগ্রপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর তাল শেভার একটি মসজিদে লাউডস্পিকারের শব্দ নিয়ে জরিমানা করার ঘটনা তুলে ধরে সোমবার নির্বাচনি প্রচারে গর্ব করে জানান তিনি। খবর আনাদোলুর।

আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসরাইলি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আরব দলগুলো বেন-গভিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, তিনি ইসরাইলের আরব সম্প্রদায়ের ওপর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে নির্বাচনি স্বার্থে ব্যবহার করছেন এবং এর মাধ্যমে আরব ভোটারদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন।

এ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। এর মধ্যেই রোববার তাল শেভার আবু আনজা এলাকায় অবস্থিত আল-রাহমা মসজিদে অভিযান চালায় ইসরাইলি পুলিশ। মসজিদের লাউডস্পিকারে অতিরিক্ত শব্দের অভিযোগে জরিমানা করা হয়। দেশটির পুলিশ জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভিরের কর্তৃত্বাধীন।

সোমবার টেলিগ্রামে মসজিদটির ছবি প্রকাশ করে বেন-গভির বলেন, পুলিশ সদস্যরা সেখানে গিয়ে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করেছেন এবং ‘অগ্রহণযোগ্য শব্দ’ সৃষ্টির দায়ে জরিমানা করেছেন।

তিনি দাবি করেন, শুধু তাল শেভাতেই নয়, সারা দেশে মসজিদগুলোর শব্দদূষণসংক্রান্ত বিধি প্রয়োগ করছে পুলিশ। দায়িত্ব নেওয়ার আগে কয়েক দশক ধরে বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বেন-গভির বলেন, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি সন্তোষজনক না হলেও তারা সঠিক পথে এগোচ্ছেন।

গত কয়েক সপ্তাহে ইসরাইলে আরবদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও নির্বাচনি প্রচারে তুলে ধরেছেন বেন-গভির।

মসজিদে জরিমানা, বাড়িঘর উচ্ছেদ—ইসরাইলি নির্বাচনে উগ্রপন্থি বেন-গভিরের হাতিয়ার
ছবি: সংগৃহীত।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশা কি অতিরিক্ত বেশি

জাকারি বি. উলফ এর বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের সাফল্য বা ‘ব্লু ওয়েভ’-এর আশায় বুক বাঁধছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপের ফল তাদের সেই প্রত্যাশা আরো বাড়িয়েছে। এমনকি কয়েক মাস আগেও যেসব ঘাঁটিতে ডেমোক্র্যাটদের জয় প্রায় অকল্পনীয় মনে হতো, সেসব অঙ্গরাজ্যেও এখন জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন দলটির নেতারা।

তবে প্রত্যাশার পারদ এতটাই চড়েছে যে নির্বাচনের দিন ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের সাফল্য না পেলে দলটির ভেতরে হতাশা এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে নিতে না পারলে ডেমোক্র্যাটদের জন্য তা প্রত্যাশার তুলনায় কম সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সিএনএনের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড অ্যাক্সেলরড সোমবার কেসি হান্টের উপস্থাপনায় ‘দ্য অ্যারেনা’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমার মনে হয়, যথেষ্টসংখ্যক অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা এমন অবস্থানে আছে, যেখান থেকে তারা খুব ভালো ফল করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলেও আমি অবাক হব না।’

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের সিনেটে ৫৩টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি অ্যাক্সেলরড। তার ভাষায়, ‘ঢেউ কতটা বড় হবে, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।’ অর্থাৎ, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে কোনো না কোনো মাত্রায় জনসমর্থনের ঢেউ আসবে—এমন প্রত্যাশা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।

পরাজয়কেও যখন জয় হিসেবে দেখানো হয়

২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের সাংবিধানিক সুরক্ষা বাতিল করার পর ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক ভালো ফলের আশা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত দলটি প্রতিনিধি পরিষদের মাত্র ৯টি আসন হারায় এবং পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে চলে যায়। তারপরও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ডেমোক্র্যাটরা ফলটিকে প্রত্যাশার তুলনায় ভালো হিসেবে তুলে ধরেন।

নির্বাচনের পরদিন বাইডেন বলেছিলেন, ‘সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিশাল লাল ঢেউয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তা ঘটেনি।’ তিনি ফলাফলকে ‘গণতন্ত্রের জন্য ভালো দিন’ বলেও উল্লেখ করেন। যদিও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে তাঁর আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ কঠিন হয়ে পড়ে।

এর আগে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের ৪১টি আসন হারিয়ে পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। তবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারাকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। তার দাবি ছিল, রিপাবলিকানরা ঐতিহাসিক নজিরের তুলনায় অনেক ভালো করেছে।

এবারের নির্বাচনে যা-ই ঘটুক, ট্রাম্প ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক, তিনি ফলাফলকে নিজের পক্ষে ব্যাখ্যা করে কোনো না কোনোভাবে জয় দাবি করার চেষ্টা করতে পারেন।

জনমত জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা

এবারের নির্বাচন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আশাবাদ বাড়ছে। এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে নভেম্বরে কোন দলকে ভোট দেবেন—এ প্রশ্নে রিপাবলিকানদের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন ডেমোক্র্যাটরা।

সিনেট নির্বাচনেও আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস ও টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থানে রয়েছেন।

মিশিগান ও জর্জিয়ার মতো রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যেও লড়াই বেশ হাড্ডাহাড্ডি। এসব রাজ্যে নিজেদের হাতে থাকা আসন ধরে রাখতে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী গতি ও জনসমর্থনের ওপর ভরসা করছেন।

নির্বাচনের পর জনমত জরিপের যথার্থতা নিয়ে যে পর্যালোচনা হবে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—এবার জরিপকারীরা ডেমোক্র্যাটদের বাড়তি উদ্দীপনা যথাযথভাবে পরিমাপ করতে পেরেছিলেন, নাকি সেই উদ্দীপনাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।

ইতিহাস কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদের আসন হারায়। গত ১০০ বছরে মাত্র দুবার প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারায়নি।

এর একটি ঘটনা ২০০২ সালে, প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের শাসনামলে। ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর আগে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে রিপাবলিকানরা সুবিধা পেয়েছিল।

অন্য ঘটনাটি ১৯৯৮ সালে, যখন ডটকম ব্যবসার প্রসারে অর্থনীতি চাঙা ছিল এবং প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অভিশংসন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়েছিল।

সাধারণত কতটি আসন হারায় ক্ষমতাসীন দল?

এর নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। কয়েকটি আসন হারালেও রাজনৈতিকভাবে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।

২০২২ সালে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের ৯টি আসন হারিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। এটি ছিল স্পষ্ট পরাজয়, যদিও ওই বছর রিপাবলিকানদের বড় ব্যবধানে জয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

তবে কোনো কোনো নির্বাচনে আসনের বড় ধরনের রদবদল ঘটে। ১৯৯৪ সালে ক্লিনটনের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ৫৪টি আসন হারায়। ওই ঘটনা ‘রিপাবলিকান বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে ‘টি পার্টি বিপ্লব’-এর সময় ডেমোক্র্যাটরা ৬৩টি আসন হারায়। ওবামা ওই ফলকে ‘প্রচণ্ড আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। দুই নির্বাচনেই ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায়।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০১৮ সালে রিপাবলিকানরা ৪১টি আসন হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায়।

সিনেটের আসনবিন্যাস রিপাবলিকানদের অনুকূলে

প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটের নির্বাচনী মানচিত্র রিপাবলিকানদের জন্য বেশি সুবিধাজনক।

২০১৮ সালে সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন হয়েছিল। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর হওয়ায় প্রতি নির্বাচনে সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।

২০২৬ সালে সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে সিএনএনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের তালিকায় রয়েছে ১০টি। সিনেটে ৫১টি আসন পেতে ডেমোক্র্যাটদের এই ১০টির মধ্যে আটটিতে জয় পেতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ এই আসনগুলোর মধ্যে জর্জিয়া, মিশিগান ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের আসন বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের দখলে। অন্যদিকে আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও ও টেক্সাসের আসন রিপাবলিকানদের হাতে।

প্রতিনিধি পরিষদে ঝুঁকিতে বেশি রিপাবলিকান আসন

এবারের নির্বাচনে বড় ধরনের আসন পরিবর্তন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী এলাকার সীমানা দলীয় সুবিধা অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের সংখ্যা কমেছে।

নির্দলীয় কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের হিসাবে, প্রতিনিধি পরিষদের মাত্র ২১টি আসনকে ‘টস-আপ’ বা অনিশ্চিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি রিপাবলিকানদের এবং ছয়টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে।

কুকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আরও ১০টি আসনে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে রয়েছেন—এসব আসন ডেমোক্র্যাটদের জন্য নিশ্চিত, সম্ভাবনাময় অথবা এগিয়ে থাকার অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া একজন আইনপ্রণেতা রিপাবলিকান দল ছেড়ে স্বতন্ত্র হয়েছেন।

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা আটটি আসনে রিপাবলিকানরা এগিয়ে রয়েছেন বা জয়ের সম্ভাবনায় রয়েছেন।

এর অর্থ, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের হয়তো অনিশ্চিত আসনগুলোর মধ্যে মাত্র একটি বা কয়েকটিতে জয় পেলেই চলবে। তবে এসব আসনের বড় অংশে রিপাবলিকানরা জয়ী হলে তারা দাবি করতে পারবে, ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশিত নির্বাচনী ঢেউ বাস্তবে আসেনি।

সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের ফল এক রকম হয় না

দুই কক্ষের নির্বাচনী ফল সব সময় একই দিকে যায় না। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং বাইডেনের মেয়াদে ২০২২ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে এত আসন হারিয়েছিল যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। অথচ দুই নির্বাচনেই সিনেটে দলটি আসন বাড়াতে সক্ষম হয়।

২০১৮ সালে রিপাবলিকানরা সিনেটে চারটি আসন এবং ডেমোক্র্যাটরা দুটি আসন জেতে। ফলে ট্রাম্পের দল সিনেটে দুই আসন বাড়ায়, যদিও তখন তাঁর জনসমর্থনের হার বেশ কম ছিল।

২০২২ সালে বাইডেনের বিরুদ্ধে জনমত থাকা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে একটি আসন বাড়াতে সক্ষম হয়।

একই নির্বাচনে দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বদলানোর নজির কম

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত বিরতিতে বদলেছে। ফলে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই কোনো না কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তবে গত ১০০ বছরে মাত্র দুবার একই নির্বাচনী চক্রে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বদলেছে। ১৯৯৪ সালের রিপাবলিকান বিপ্লব এবং ২০০৬ সালে ইরাক যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের প্রেক্ষাপটে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী ঢেউ ছিল সেই দুটি ঘটনা।

লাল অঙ্গরাজ্যেও কি জিততে পারেন ডেমোক্র্যাটরা?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে যাওয়ায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপরও তার প্রভাব পড়ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তাই এমন কিছু অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যেখানে আগে তাদের জয় কঠিন বলে মনে করা হতো।

তবে প্রতিটি নির্বাচনী লড়াইয়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নর্থ ক্যারোলাইনায় সিনেটের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার জনপ্রিয় সাবেক গভর্নর। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন অসফ ইতিমধ্যে সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল। তার বিরুদ্ধে একাধিক বিতর্ক ও কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে এবং তিনি তুলনামূলকভাবে অজনপ্রিয়।

কানসাসে প্রায় ১০০ বছর ধরে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি। সেখানে ডেমোক্র্যাট হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মধ্যপন্থী একজন যাজককে ঘিরে দলটি আশাবাদী।

কানসাস ও টেক্সাসেও কি সত্যিই ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা আছে?

দুই অঙ্গরাজ্যেই জনমত জরিপে সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

টেক্সাসের একটি সিনেট আসন নিজেদের দখলে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা বহুদিন ধরেই আশাবাদ দেখিয়ে আসছেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালের পর সেখানে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয় পাননি। ওই বছরই জন্মগ্রহণ করেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টালারিকো।

কানসাসেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী অজনপ্রিয় রিপাবলিকান প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু ভোটের দিন তিনি হেরে যান।

তাই এসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের সমর্থন আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যদি সত্যিই ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বড় ধরনের নির্বাচনী ঢেউ আসে, তাহলে আরো বেশি রিপাবলিকান-অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠতে পারে। এর মধ্যে সাউথ ক্যারোলাইনাও রয়েছে। সেখানে ডেমোক্র্যাট চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ সিনেটর ডারলিন গ্রাহামকে হারানোর চেষ্টা করছেন। চলতি বছর তার ভাই লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর ওই আসনে ডারলিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ট্রাম্পও অ্যানি অ্যান্ড্রুজকে নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেছেন।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে কতটি আসন প্রয়োজন?

কংগ্রেসের দুই কক্ষেই বর্তমানে দুই দলের মধ্যে ব্যবধান খুব কম। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটি কক্ষে নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে।

প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইতিহাসের সবচেয়ে সংকীর্ণ। নির্বাচনের আগে পরিষদে রিপাবলিকান সদস্য ২১৮ জন। ৪৩৫ সদস্যের পরিষদে এটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ন্যূনতম সীমা। ক্যালিফোর্নিয়ার স্বতন্ত্র সদস্য কেভিন কাইলি প্রশাসনিক বিষয়ে রিপাবলিকানদের সঙ্গে ভোট দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সদস্য ২১৪ জন এবং দুই দলের একটি করে আসন শূন্য রয়েছে।

এ অবস্থায় ডেমোক্র্যাটরা কয়েকটি আসন বাড়াতে না পারলে তা দলটির জন্য বড় হতাশার কারণ হবে।

সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকান সদস্য ৫৩ জন। ডেমোক্র্যাট ৪৫ জন এবং তাদের সঙ্গে কার্যত যুক্ত দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর রয়েছেন।

১০০ সদস্যের সিনেটে নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের ৫১টি আসন প্রয়োজন। কারণ সিনেটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সমান ভোট হলে সিদ্ধান্তমূলক ভোট দিতে পারেন।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের কী হবে?

ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। ইতিহাসে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছু আসন হারায়—এ কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন।

একই সঙ্গে ট্রাম্প দ্রুত ও ব্যাপকভাবে নিজের নীতিগুলো বাস্তবায়ন করছেন। তার প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে এমন ধারণা পাওয়া যায়, মেয়াদের দ্বিতীয়ার্ধে কংগ্রেসের বিরোধিতা বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি আগেভাগে যতটা সম্ভব কাজ এগিয়ে নিতে চাইছেন।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি অনেক বাড়বে। তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা, তথ্য প্রকাশ্যে আনা এবং জনমত প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে তারা।

বাজেটের ওপরও ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। কংগ্রেস অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরও ট্রাম্প সেই অর্থ ব্যয় না করার নজির দেখিয়েছেন। তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ব্যয়সংক্রান্ত বিলের মাধ্যমে ট্রাম্পের অর্থ ব্যয়ের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা সম্ভব হবে। শুধু একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে এ ক্ষমতা তুলনামূলক সীমিত থাকবে।

তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকবে। কোনো বাস্তবসম্মত নির্বাচনী পরিস্থিতিতেই কোনো দল ফিলিবাস্টার অতিক্রম করার মতো সুপারমেজরিটি পাবে না। ফলে ব্যয়সংক্রান্ত বিল পাস করতে শেষ পর্যন্ত দুই দলের সমর্থন এবং হোয়াইট হাউসের সম্মতি প্রয়োজন হতে পারে।

রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প সরকার পরিচালনার অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যেতে দিয়েছেন। অর্থাৎ, নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তিনি অর্থায়ন নিয়ে অচলাবস্থা এড়াতে সব সময় আগ্রহী ছিলেন না।

ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে ভবিষ্যতের বাজেটসংক্রান্ত বিরোধ থেকে সুরক্ষিত রাখতেও রিপাবলিকানরা পদক্ষেপ নিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে, চলতি বছরের শুরুতে তারা ফিলিবাস্টার এড়িয়ে বাজেট পুনর্মিলন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থাকে (আইসিই) ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য কয়েক বছর মেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করেছেন।

তারা জানতেন, ইতিহাসের নজির অনুযায়ী মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের নির্বাচনী ঢেউ আসতে পারে। > সিএনএন

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশা কি অতিরিক্ত বেশি

ইসরাইলে সাত বছরে ষষ্ঠ নির্বাচন, কপাল পুড়তে পারে নেতানিয়াহুর

ইসরাইলের আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় ফেরা কঠিন হয়ে উঠতে পারে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য। তার নেতৃত্বাধীন জোট ও ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দুর্নীতির মামলায় বিচার চলার মধ্যেই নির্বাচনে লড়ছেন ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহু। গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক যুদ্ধ এবং লেবানন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন।

ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির হিসাবে, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক এবার ভোট দেওয়ার যোগ্য। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার সময়ও যারা লাইনে থাকবেন, তারা ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচনের দিন দেশটিতে সরকারি ছুটি থাকবে।

নেসেটে প্রবেশের জন্য কোনো দলকে জাতীয় ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। পার্লামেন্টের মেয়াদ চার বছর। তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদের কোনো সীমা নেই।

ইসরাইলে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নয়, রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। দেশটির কোনো দলই এখন পর্যন্ত এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।

নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই কোনো দল সরকার গঠন করতে পারে না। নির্বাচনের পর দলগুলোকে জোট গঠন করে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে হয়। এ জন্য প্রথমে ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়। প্রয়োজনে আরো ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। এই সময়ের মধ্যে কোনো পক্ষ সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আবার নির্বাচন আয়োজন করতে হয়।

জাতীয় নির্বাচনে প্রতিটি দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন করা হয়। কোনো দল ৩০ শতাংশ ভোট পেলে সাধারণত প্রায় ৩০ শতাংশ আসন পায়। তবে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে না পারা দলগুলোর ভোট আসন বণ্টনের হিসাব থেকে বাদ পড়ে। এ কারণে ছোট দলগুলো প্রায়ই নির্বাচনের আগে একীভূত হয় বা জোট গঠন করে।

ভোটাধিকার নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ

এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য প্রায় ৭৩ লাখ ইসরাইলি নাগরিক। তবে দেশটির সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ভোট দিতে পারেন না।

গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনি এমন একটি সরকারের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না, যে সরকার তাদের সীমান্ত, চলাচল ও আইনি অবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

ইহুদি ইসরাইলি নাগরিকদের পাশাপাশি প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরাইলি নাগরিকও ভোট দিতে পারেন। অধিকৃত পশ্চিম তীর ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ইসরাইলি বসতির বাসিন্দারাও ভোট দিতে পারেন। তারা এমন পার্লামেন্ট নির্বাচন করেন, যে পার্লামেন্ট তাদের বসবাসের এলাকার ওপর আইন প্রণয়ন করে।

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের অধিকাংশ ফিলিস্তিনির ইসরাইলি নাগরিকত্ব নেই; তাদের রয়েছে বসবাসের অনুমতি। তারা জেরুজালেমের নগর পরিষদের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, কিন্তু নেসেট নির্বাচনে পারেন না।

এর ফলে অধিকৃত পশ্চিম তীরে একটি বৈষম্য দেখা যায়। সেখানে কোনো ইসরাইলি বসতির বাসিন্দা ভোট দিতে পারেন, অথচ কাছাকাছি বসবাসকারী ফিলিস্তিনি পরিবার একই সামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে থেকেও সেই অধিকার পায় না।

বিদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ ইসরাইলি নাগরিকও ভোট দিতে পারেন না। কারণ, দেশটিতে সাধারণভাবে ডাকযোগে বা অনুপস্থিত অবস্থায় ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। নির্বাচনের দিন ভোটারকে শারীরিকভাবে ইসরাইলে থাকতে হয়। তবে কূটনীতিক ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশে দায়িত্ব পালনকারীরা ব্যতিক্রম। তারা ২০ অক্টোবর ইসরাইলি মিশনগুলোতে ভোট দেন।

নির্বাচনে যেসব বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে

এবারের নির্বাচনে ইসরাইলিদের সামনে রয়েছে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ইস্যু। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ থেকে অব্যাহতি, বিচারব্যবস্থার সংস্কার, যুদ্ধ ও নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। ঘটনার তিন বছর পরও সরকার এ বিষয়ে তদন্তের জন্য রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেনি। ওই হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু হয়। এতে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অবরুদ্ধ উপত্যকাটির অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। এই সুবিধার সমর্থকেরা বলেন, এর মাধ্যমে পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ রক্ষা করা হয়।

তবে সমালোচকদের যুক্তি, এতে অন্য নাগরিকদের ওপর সামরিক দায়িত্বের অসম বোঝা চাপানো হয়।

বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমানোর জন্য নেতানিয়াহুর উদ্যোগ যুদ্ধ শুরুর আগে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সমালোচকেরা এটিকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে মনে করেন। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, আদালত নিজের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধ ও নিরাপত্তার বিষয়টিও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণ মানুষ স্থিতিশীলতা চান। তবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবাননের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। নেতানিয়াহু ‘পূর্ণ বিজয়ের’ প্রতিশ্রুতি দিলেও হামাস ও হিজবুল্লাহ এখনো সক্রিয় রয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয়ও বড় ইস্যু। পণ্যের উচ্চমূল্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের তুলনামূলক কম মজুরি আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেট দ্বিগুণ হয়েছে। এতে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ আরো বেড়েছে।

বিদায়ী সরকারের আসনসংখ্যা

জুলাইয়ে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সময় নেতানিয়াহুর জোটের হাতে নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে ৬০টি ছিল। জোটে লিকুদের ৩২টি, শাসের ১১টি, রিলিজিয়াস জায়োনিজমের সাতটি, ইতামার বেন গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিতের ছয়টি এবং নিউ হোপের চারটি আসন ছিল। শাস ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকার ছেড়ে গেলেও জোটে থেকে যায়। আর নিউ হোপ এবারের নির্বাচনে লিকুদের সঙ্গে একীভূত হবে।

বিরোধী দলগুলোর হাতে ছিল ৫৯টি আসন। এর মধ্যে ইয়েশ আতিদের ২৪টি, ব্লু অ্যান্ড হোয়াইটের আটটি, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সাতটি, ইসরাইল বেইতেনুর ছয়টি, হাদাশ-তাআল ও রা'আমের পাঁচটি করে এবং লেবার পার্টির চারটি আসন ছিল। নোআমের একটি আসন কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।

কারা নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী

দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চললেও আবার নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন উগ্রডানপন্থী জোটের বিপরীতে রয়েছে ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন চারটি বড় বিরোধী দলের জোট। এসব দলের নেতারা নির্বাচনের আগে একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ না করার এবং ভোটের পর সরকার গঠনে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন।

সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটকে বিরোধীদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদের সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার নতুন দল ইয়াশার জনমত জরিপে লিকুদের সঙ্গে সমানে সমানে লড়ছে।

বিরোধী জোটে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন টুগেদার তালিকা, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরাইল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস পার্টি।

নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন উগ্রডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন গভির ও বেজালেল স্মোতরিচ, অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের দলগুলো এবং আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী রা'আম ও জয়েন্ট লিস্ট।

গত মাসে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রা'আম ও জয়েন্ট লিস্টকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তবে ২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতভাবে সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেন। আদালতের মতে, দল দুটিকে বাদ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি মানদণ্ড পূরণ করার মতো প্রমাণ ছিল না।

জয়েন্ট লিস্টের অন্যতম দল বালাদের নেতা এবং ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরাইলি নাগরিক সামি আবু শাহাদেহ নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। আদালত ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অধিকাংশ বিচারক তাঁর অযোগ্যতার সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারেন।

নির্বাচনের পর আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা এসব দলের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

সাত বছরে ষষ্ঠ নির্বাচন

আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন ২০১৯ সালের পর ইসরাইলের ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচন। তবে ৩৮ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম নেসেটের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার শুরু ২০১৯ সালের এপ্রিলে। ওই সময় নেতানিয়াহুর লিকুদ ও বেনি গান্টজের ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টি ৩৫টি করে আসন পেয়েছিল। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় নির্বাচনেও অচলাবস্থা তৈরি হয়। ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট ৩৩টি এবং লিকুদ ৩২টি আসন পায়। দুই নির্বাচনেই কোনো পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারেনি।

২০২০ সালের মার্চে তৃতীয় নির্বাচনে লিকুদ ৩৬টি এবং ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট ৩৩টি আসন পায়। এরপর নেতানিয়াহু ও গান্টজের নেতৃত্বে ঐক্য সরকার গঠিত হলেও এক বছরের মধ্যে তা ভেঙে পড়ে।

২০২১ সালের মার্চে লিকুদ ৩০টি এবং ইয়েশ আতিদ ১৭টি আসন পায়। এরপর নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে আট দলের জোট সরকার গঠিত হয়। ওই জোটে আরব দল রা'আমও ছিল। এর মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহুর টানা ১২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তবে সেই সরকারও এক বছর টিকেছিল।

২০২২ সালের নভেম্বরে আবার ক্ষমতায় ফেরেন নেতানিয়াহু। ওই নির্বাচনে লিকুদ ৩২টি এবং ইয়েশ আতিদ ২৪টি আসন পায়। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থি সরকার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে কোনো জোটকেই ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে দেখা যাচ্ছে না।

ইসরাইলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু

১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর দেশটিতে মোট ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন নেতানিয়াহু। তিন দফায় তার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ মোট ১৯ বছর—১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯, ২০০৯ থেকে ২০২১ এবং ২০২২ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত।

তার কাছাকাছি রয়েছেন ডেভিড বেন-গুরিয়ন। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সাল এবং পরে ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে যে ফলই আসুক, নতুন সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

prime minister

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে ফ্রান্সের মতো জ্বলবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রেও ফ্রান্সের মতো বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কানসাস অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের পক্ষে প্রচারে গিয়ে স্থানীয় সময় সোমবার (১৯ অক্টোবর) এ মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্যও দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। খবর রয়টার্সের।

ইরান যুদ্ধ ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের মধ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন ধরে রাখতে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রচার তৎপরতার অংশ ছিল এই সমাবেশ। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কানসাসে মার্শালের আসনটি এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘কানসাস, আমি তোমাদের ভালোবাসি। তবে আমি এখানে রজার মার্শাল নামের একজনের জন্য এসেছি।’

নিজের প্রচার বক্তব্যে নতুন করে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ তোলেন ট্রাম্প। তার দাবি, রিপাবলিকানরা জয়ী না হলে যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে সরকারি সেবা ব্যাহত হওয়ার প্রতিবাদে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফ্রান্সে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। একপর্যায়ে তা সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নেয়। কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতার ঘটনা হিসেবে এসব বিক্ষোভকে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও পণ্য ও সেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প। তা সত্ত্বেও সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা এই দেশকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে দেব না। ফ্রান্সে যখন গির্জার চূড়া জ্বলতে দেখবেন, চারদিকে আগুন জ্বলতে দেখবেন, তখন মনে রাখবেন; উগ্র ডেমোক্র্যাটরা আমেরিকার জন্যও এটাই চায়।’

ট্রাম্প ব্যঙ্গ করে ডেমোক্র্যাটদের ‘ডুমোক্র্যাটস’ বলে উল্লেখ করেন। অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে তার অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের বক্তব্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক মনোভাবকে স্বাভাবিক করে তোলে।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কানসাসে ১৬ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। রক্ষণশীল এই অঙ্গরাজ্যে গত ৯৪ বছরে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হননি।

তবে প্রথম মেয়াদের সিনেটর রজার মার্শাল এবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও মেথডিস্ট মেগাচার্চের যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটনের সঙ্গে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। হ্যামিলটন ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করছেন এবং প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বকে খামখেয়ালিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

হ্যামিলটন সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি চান, শ্বেতাঙ্গ হিসেবে জন্ম নেওয়ার জন্য তোমরা অনুতপ্ত হও।’

সমাবেশে মার্শালও ‘উগ্র ইসলাম’ ঠেকানোর মতো সাংস্কৃতিক ইস্যুকে সামনে আনেন। সমকামীদের অধিকার ও প্রাইড প্যারেডের প্রতি সমর্থন থাকায় হ্যামিলটনকে কানসাসের জন্য ‘অতিরিক্ত উদারপন্থি’ বলে আখ্যা দেন তিনি।

মার্শাল বলেন, ‘আমাদের এমন একজনকে দরকার, যিনি গরু ও ষাঁড় সামলাতে জানেন।’

কানসাসের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে দলটিকে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

সূত্র : রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

Monday, October 19, 2026

ইসরাইলের নির্বাচনে ‘কিং মেকার’ হতে পারে আরব দলগুলো

আলজাজিরার বিশ্লেষণঃ ইসরাইলের আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছে জনমত জরিপ। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট দল দুটি সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দল দুটি সম্মিলিতভাবে ১৩টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

২০২১ সালে রা’আম’ ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। একটি বৃহত্তর জোটে যোগ দিয়ে প্রথম আরব দল হিসেবে ইসরাইলি সরকারের অংশ হয়েছিল তারা। এর ফলে সাময়িকভাবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছিল।

দলটির নেতা মানসুর আব্বাস এবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ ধরে রাখতে চান। তবে নেতানিয়াহু ও প্রধান বিরোধী নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি প্রচারণায় দাবি করছে, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে আরব দলগুলোই বিরোধী সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে যে, নেতানিয়াহুর ‘লিকুদ’ পার্টি এবং তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোটের সঙ্গে জায়নবাদী বিরোধী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। ১২০ সদস্যবিশিষ্ট ইসরাইলি পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অবস্থানে নেই।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইলের রাজনীতিতে ডানপন্থিদের প্রভাব আরো বেড়েছে। আরব দলগুলোকে ওই হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করলেও ২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে।

নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র অতি-গোঁড়া ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমও চাপের মুখে রয়েছে। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি এবং সরকারি ভর্তুকি নিশ্চিত করার দাবিতে দল দুটির সঙ্গে লিকুদের বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা তাদের বিরুদ্ধে সামরিক দায়িত্ব এড়ানো ও বিপুল রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগের অভিযোগ তুলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর সরকার গঠনে আরব দল ও কট্টর ইহুদি দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব দলের সঙ্গে জোট বা সমঝোতা করতে গিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও সমর্থকদের প্রত্যাশার মধ্যে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

ইসরাইলের নির্বাচনে ‘কিং মেকার’ হতে পারে আরব দলগুলো
ছবি: সংগৃহীত

Sunday, October 18, 2026

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা কমছে, সহযোগীদের দুষছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনা কমে আসায় নিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও রাজনৈতিক কৌশলবিদদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনি প্রচারে অর্থ ব্যয়, নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং প্রার্থী বাছাই নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলছেন। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।

আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। তবে যেসব ভোটার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, তাদের সক্রিয় করতে সমর্থকদের বারবার বলছেন, তারা যেন এমনভাবে ভোটের বিষয়টি বিবেচনা করেন, যেন ব্যালটে ট্রাম্পের নামও রয়েছে।

নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপর তার নিজের কম জনপ্রিয়তার প্রভাব এবং নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণে তার ভূমিকা নিয়ে তিনি খুব একটা কথা বলছেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনি কৌশল নিয়ে মতবিরোধের কেন্দ্রে রয়েছেন ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সহযোগী জেমস ব্লেয়ার এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক সুপার প্যাক ‘মাগা ইনকরপোরেটেড’ পরিচালনা করেন ব্লেয়ার। নির্বাচনি প্রচারের তহবিল ব্যবস্থাপনায় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তদারকিতে ওয়াইলসের ভূমিকা নিয়েও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনি প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের অবস্থানের উন্নতি না হওয়ায় উপদেষ্টারাও পরস্পরকে দায়ী করছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াইলস এ পরিস্থিতির জন্য ব্লেয়ারকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে, ব্লেয়ার হোয়াইট হাউসের আইনপ্রণয়নবিষয়ক দলকে দায়ী করছেন।

ওই ব্যক্তি পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আসলে যা ঘটছে, তা হলো সবাই একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।’

বিভিন্ন জনমত জরিপের ইঙ্গিত, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের শেষ দুই বছরে নিজের আইনগত ও নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটরা তাঁর প্রশাসনের কার্যক্রম তদন্তের জন্য কংগ্রেসের সমন জারির ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনি প্রচার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে রিপাবলিকান শিবিরের অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে।

তবে শুক্রবার সুসি ওয়াইলসের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। তিনি ওয়াইলসকে ‘বুদ্ধিমান’ ও ‘দৃঢ়’ বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, তিনি নিজের পদেই বহাল থাকবেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘সুসি এখানে আছেন এবং দীর্ঘ সময় এখানেই থাকবেন।’

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তিনি এসব মন্তব্যকে ভিত্তিহীন জল্পনা বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, ‘কিছু লোক কোনো ভিত্তি ছাড়াই বিশেষজ্ঞ সেজে অনুমাননির্ভর কথা বলছেন।’

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও সুসি ওয়াইলস কোনো জবাব দেননি।

নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান শিবিরের এই মতবিরোধ দলটির নির্বাচনি কৌশল ও নেতৃত্বের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে ভোটের ফলাফলে।

সূত্র: রয়টার্স

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

Saturday, October 17, 2026

মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ নামের জনপ্রিয়তা নিয়ে ট্রাম্পের ঠাট্টা

মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ নামের ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) এক নির্বাচনি সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট পদ নিয়ে ব্যঙ্গ করার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর রয়টার্সের।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডালটনে সমবেত জনতার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের কারও নাম নিয়ে সন্দেহ হলে শুধু ‘মুহাম্মদ’ বলে ডাকবেন। ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬৫ শতাংশ। বলবেন, ‘হ্যালো, মুহাম্মদ। আমি বহু বছর ধরে এটা করছি। কখনো ভুল হয়নি।’

মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ ছেলেদের অন্যতম প্রচলিত নাম। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম অনুসারে অনেক মুসলিম পরিবার তাদের ছেলেদের এ নাম রাখেন।

জর্জিয়ার ডালটন মিউনিসিপ্যাল বিমানবন্দরের একটি উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গারে আয়োজিত সমাবেশে ইরান নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানই একমাত্র দেশ, যেখানে কেউ প্রেসিডেন্ট হতে চায় না।’ এরপর তিনি ‘মুহাম্মদ’ নামের কয়েকজনকে কল্পিতভাবে প্রশ্ন করার ভঙ্গি করেন, তারা প্রেসিডেন্ট হতে চান কি না। ২০২৪ সাল থেকে ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। ট্রাম্পের এই ঠাট্টায় সমাবেশে উপস্থিত জনতার মৃদু প্রতিক্রিয়া ছিল।

ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন মানবাধিকারকর্মী ও মুসলিম অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্পের বক্তব্যে মুসলিম, অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর এ ধরনের বক্তব্য আরও জোরালো করেছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে সোমালি ও মুসলিম বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের পাশাপাশি মুসলিম ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ এবং মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমরকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছেন তিনি। সোমালিয়ার শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ওমর দেশটির কংগ্রেস সদস্য।

সমাবেশে ট্রাম্প আবারও প্রতিশ্রুতি দেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করার লক্ষ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাত মাস আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপ এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ দমনের উদ্যোগকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র : রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ইসরাইলের নির্বাচনে ক্ষমতার চাবিকাঠি হতে পারেন আরব নেতা আব্বাস

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ ইসরাইলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন আরব রাজনীতিক মানসুর আব্বাস। একবার নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। এবারও সেই লক্ষ্য সামনে রেখে মধ্য-বামপন্থি ইহুদি নেতা ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়োভ সেগালোভিৎজের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন আব্বাস। তবে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার যে কৌশল তিনি নিয়েছেন, তা নিয়ে আরব ও ইহুদি—দুই পক্ষের রাজনীতিকদেরই সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রচারেও বারবার উঠে আসছে মানসুর আব্বাসের নাম। তার দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আমের নেতা আব্বাসকে কেন্দ্র করে ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করছেন নেতানিয়াহু। তার প্রচারের বক্তব্য, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে পরবর্তী সরকারে প্রকৃত ক্ষমতাধর হয়ে উঠবেন আব্বাস। তিনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম চালিকাশক্তি।

তবে আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারের সঙ্গে পশ্চিম তীর ও গাজার চেয়ে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যার সম্পর্ক বেশি। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব। তাদের বড় সমস্যা সহিংস অপরাধ, অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য এবং আবাসনের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি।

নেতানিয়াহুর ধারাবাহিক আক্রমণের পেছনে নির্বাচনে আব্বাসের সম্ভাব্য ভূমিকা বড় কারণ। ইসরাইলের বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থায় তিনি হয়ে উঠতে পারেন সরকার গঠনের নির্ণায়ক শক্তি। বিরোধী নেতারা তার সমর্থন নিতে রাজি না হলে নেতানিয়াহুকে সরানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট গঠন তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

এ কারণে আব্বাসকে ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিকদের একজন বলে মনে করা হচ্ছে। অথচ তার দল রা’আম সামাজিকভাবে রক্ষণশীল। ১৯৯৬ সালে ইসরাইলের ইসলামি আন্দোলনের একটি শাখা দলটি প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম পরিচয় শক্তিশালী করা এবং ইসরাইলের আরব সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন দলটির অন্যতম লক্ষ্য। এ অবস্থানে থেকেও উদারপন্থি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন আব্বাস।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার লক্ষ্য শুধু বর্তমান সরকারকে পরাজিত করা নয়। এই সরকারকে তিনি ‘বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী’ বলে অভিহিত করেন। তার লক্ষ্য এমন একটি সরকার গঠন, যেখানে আরব নাগরিকেরা অংশীদার হবেন, নিজেদের কথা বলতে পারবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রাখতে পারবেন।

ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন অধ্যুষিত শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে শত শত সমর্থকের সামনে তিনি বলেন, ক্ষমতাবানদের টেবিলে আরবরা অনাথ হয়ে পড়ে থাকবেন না। আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

নেতানিয়াহুকে একবার সরিয়েছিলেন আব্বাস

অনেকে আব্বাসকে ইসরাইলের সবচেয়ে কৌশলী রাজনীতিকদের একজন মনে করেন। ২০২১ সালে তিনি প্রথম বড় আলোচনায় আসেন। ওই সময় নেতানিয়াহুর সঙ্গে নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন তিনি। এতে একটি ইসলামপন্থি দলের সরকারে অংশ নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন আব্বাস। সেই জোটের হাত ধরেই ক্ষমতা হারান নেতানিয়াহু।

পরের বছর আবার প্রধানমন্ত্রী হন নেতানিয়াহু। তিনি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্র ডানপন্থি সরকার গঠন করেন। এরপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলা হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। হামলার পর অনেক ইসরাইলির মধ্যে ফিলিস্তিনিদের—এমনকি ইসরাইলের আরব নাগরিকদেরও—নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে।

এ পরিস্থিতিতে ইহুদিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আরো সক্রিয় হন ৫২ বছর বয়সি আব্বাস। ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই তিনি এর নিন্দা জানান। গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরাইলিদের থাকার ব্যবস্থা করতেও সহায়তা করেন। হামাসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সহিংসতার পথ ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে।

কিন্তু ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে এখন প্রায় সব দিক থেকেই আক্রমণের মুখে তিনি। নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা আব্বাসকে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে, যে ইহুদি জাতীয়তাবাদী বিরোধী নেতারা একসময় তাকে সাহসী পথিকৃৎ বলে প্রশংসা করেছিলেন, তারাও এখন দূরত্ব বজায় রাখছেন। ডানপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই তাদের এই অবস্থান।

আরব দলগুলোর অন্য নেতারাও আব্বাসের সমালোচনা করছেন। তারা সাধারণত ইসরাইলের সরকারগুলোর বিরোধিতা করেন, কিন্তু সরকারে অংশ নেন না। তাদের কেউ কেউ আব্বাসকে কার্যত আপসকামী বা নিজেদের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া নেতা হিসেবে দেখছেন।

তবে এসব সমালোচনায় দমে যাননি আব্বাস। তুবা-জাঙ্গারিয়ায় এক সমাবেশে মুসলিম পুরুষদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদের নেতৃত্ববিষয়ক শিক্ষার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন নেতার নিজের পথের ওপর আস্থা থাকা প্রয়োজন।

এর কয়েক দিন পর নাজারেতে এক সংবাদ সম্মেলনে আরো বড় পদক্ষেপ নেন আব্বাস। তিনি ঘোষণা করেন, মধ্য-বামপন্থি রাজনীতিক ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়োভ সেগালোভিৎজ তার দল রা’আমের প্রার্থী তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবেন। মূলধারার আরব ও ইহুদি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের মধ্যে এ ধরনের জোট ইসরাইলের রাজনীতিতে নজিরবিহীন।

সেগালোভিৎজকে পাশে নিয়ে হিব্রু ভাষায় আব্বাস বলেন, পরিবর্তন আনতে হলে অন্য ব্যক্তিকে শত্রু হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

আরব নাগরিকদের ‘জ্বলন্ত সমস্যা’ সমাধানের চেষ্টা

গালিলি অঞ্চলের দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিম অধ্যুষিত শহর মাগারে জন্ম আব্বাসের। রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা কখনোই তার ছিল না।

তার বাবা ছিলেন মুদি দোকানি। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় বিরোধ মেটাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শহরের মানুষ নানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তার বাবার কাছে যেতেন। আব্বাস বলেন, স্কুলে পড়ার সময়ও সহপাঠীরা তাকে বিরোধ মেটানোর দায়িত্ব দিত।

পরে দন্তচিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন আব্বাস। একসময় তার নিজ শহরে দ্রুজ ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়, হাজারো মানুষ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরিস্থিতি শান্ত করতে নিজের চিকিৎসাকেন্দ্র এক মাস বন্ধ রাখেন তিনি। মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। পরে বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের কাজও শুরু হয়।

মানুষের জন্য আরো বেশি কিছু করার ইচ্ছা থেকেই রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান আব্বাস। তার উপলব্ধি হয়েছিল, রাষ্ট্রের হাতিয়ার ব্যবহার করেই বড় পরিসরে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

২০১৯ সালে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে যোগ দেওয়ার পর থেকে আরব নাগরিকদের ‘জ্বলন্ত সমস্যা’ সমাধানে মনোযোগ দেন তিনি। বিশেষ করে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সহিংস অপরাধ ও চাঁদাবাজি ঠেকানো তার অন্যতম অগ্রাধিকার।

তুবা-জাঙ্গারিয়া থেকে ফেরার পথে আব্বাস বলেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে তিনিও হুমকির মুখে পড়েছেন। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের পাশাপাশি আরব, ইহুদি ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকেও সহিংসতার হুমকি পেয়েছেন তিনি।

তবে ইসরাইলের জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি বেশি ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগের কারণে। ২০২১ সালের মে মাসে ইসরাইলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে তিনি লোদের একটি পুড়ে যাওয়া সিনাগগ পরিদর্শন করেন। শহরের ডানপন্থি ইহুদি মেয়রকে সঙ্গে নিয়ে সেটি পুনর্নির্মাণে সহায়তার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সহিংসতার নিন্দা জানান।

তখন অনেক আরব তার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, ইসরাইলি পুলিশ যখন আরব নাগরিকদের আটক করছিল, তখন আব্বাস ভুল জায়গায় মনোযোগ দিচ্ছেন।

আরব সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি বলেন, ওই সময় আব্বাসের অবস্থান গ্রহণযোগ্য মনে করেননি অনেকে। ইসলামি আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা তাকে ফোন করে বলেছিলেন, আব্বাস তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে ফেলেছেন বলে তিনি লিখতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আব্বাস নিজের অবস্থানের যথার্থতা বোঝাতে সক্ষম হন।

সরকারে অংশ নেওয়া নিয়ে আরবদের মধ্যেও বিতর্ক

২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে রা’আমের যোগদান ছিল ইসরাইলের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর আগে আরব দলগুলো সাধারণত সরকারের বাইরে থেকে নীতির সমালোচনা ও প্রতিবাদ করত।

আব্বাসের যুক্তি, ক্ষমতায় অংশ নেওয়া ছাড়া বড় ধরনের অর্জন সম্ভব নয়। আরব নাগরিকদের অপছন্দের কোনো নীতির দায়ও যদি নিতে হয়, তাতে তিনি প্রস্তুত। তার ভাষায়, এর জন্য মূল্য দিতে হলেও তারা রাজি।

তবে আরব নাগরিকদের একটি অংশ মনে করে, এই কৌশলের জন্য আব্বাসকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে। পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তিনি খুব কম কথা বলেন। ইসরাইলের ভোটারদের মধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকেন তিনি।

গত আগস্টে দলের এক সম্মেলনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সংক্ষেপে কথা বলেছিলেন আব্বাস। এরপর তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গী বিরোধী নেতাদের কয়েকজনই ওই বক্তব্যের সমালোচনা করেন।

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হলেও এ বিষয়ে আরো জোরালোভাবে কথা না বলায় আরব নাগরিকদের একাংশ আব্বাসের সমালোচনা করেছে।

ইসরাইলে আরব-ইহুদি সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করা সংস্থা আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের সহসভাপতি বাশায়ের ফাহুম-জাইউসি বলেন, আব্বাসের কৌশলগত আপসের বিষয়টি আরব সমাজে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে।

কারো মতে, এ জন্য তাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে। তারা মনে করেন, তিনি ইহুদি জাতীয়তাবাদী দলগুলোর শর্তে বেশি ছাড় দিচ্ছেন। অন্য আরব দলগুলোর অবস্থান হলো, তাদের নিজেদের পরিচয় ও অবস্থান মেনেই গ্রহণ করতে হবে।

ইসরাইলের ইসলামি আন্দোলনের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেইজ বলেন, আরব নাগরিকেরা আব্বাসের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তবে তাদের অনেকেই বোঝেন, তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হলো সমঝোতা।

অন্যদিকে, অতীতে ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন বক্তব্যের জন্য ডানপন্থীদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ছেন আব্বাস। একসময় তিনি বলেছিলেন, জেরুজালেমের ওপর ইসরাইলিদের কোনো অধিকার নেই এবং তারা ওই ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশকারী।

রাজনীতিতে আসার আগে ইহুদি ইসরাইলিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ সীমিত ছিল বলে জানান আব্বাস। তার ভাষায়, এতে পরিস্থিতি, বাস্তবতা ও অন্য পক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার বোঝাপড়ায় প্রভাব পড়েছিল। সময়ের সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। অতীতের কিছু বক্তব্য এখন আর দেবেন না বলেও স্বীকার করেন তিনি।

আব্বাসের দাবি, তার এই অবস্থান ফিলিস্তিনি প্রশ্ন থেকে সরে আসার অর্থ নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত সমাধানের পথ তৈরি করতে চান তিনি।

তার মতে, ইসরাইলের ভেতরেই আরব ও ইহুদিরা একসঙ্গে সমস্যা সমাধান করতে পারেন—এটি প্রমাণ করা জরুরি। এর মধ্য দিয়েই যৌথ ভবিষ্যৎ গড়ার আশা ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

ইহুদি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে নতুন জোট

সেগালোভিৎজের সঙ্গে আব্বাসের জোট এই কৌশলের একটি উদাহরণ হতে পারে। নেসেটে একসময় তারা একসঙ্গে নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে রসিকতা করেছিলেন। ওই সময় সেগালোভিৎজ ছিলেন আব্বাসের অংশ নেওয়া জোট সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপমন্ত্রী।

আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অপরাধ দমনে কাজ করাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন সেগালোভিৎজ। তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ দলও গঠন করেন। তার দাবি, ওই উদ্যোগের সময় হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল।

এ কারণে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফেরার পর পুলিশের দায়িত্ব দেন উগ্র-ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন গভিরকে। এরপর সেগালোভিৎজের উদ্যোগগুলো পরিত্যক্ত হয় এবং হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে।

আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইসরাইলে রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক নিহত হন।

তবে আব্বাস ও সেগালোভিৎজের জোটে মতপার্থক্যও রয়েছে। সেগালোভিৎজ আরবি জানেন না, যা নির্বাচনী প্রচারে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। আব্বাস সমকামীদের অধিকারের বিরোধী। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ সেগালোভিৎজ এসব অধিকারের সমর্থক; তার মেয়েও সমকামী। আরো বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতভেদ রয়েছে।

তবে তারা জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে একমত না হলেও একসঙ্গে কাজ করতে চান।

সাবেক প্যারাট্রুপার সেগালোভিৎজকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে আব্বাসের জন্য দুটি সুবিধা হতে পারে। প্রথমত, ডানপন্থিদের আক্রমণের জবাব দেওয়া সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, রা’আমের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন নিয়ে বিরোধী নেতাদের উদ্বেগ কমতে পারে।

এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিৎজ বলেন, ইসলামপন্থি দলের প্রার্থী তালিকায় যোগ দেওয়ায় নেসেটের অনেকের কাছ থেকেই আক্রমণের শিকার হবেন বলে তিনি জানেন। তবে আব্বাসের ওপর তার আস্থা রয়েছে। তার ভাষায়, আব্বাস সাহসী মানুষ এবং সেই সাহসের জন্য তাকে মূল্য দিতে হয়। ইসরাইলের ভবিষ্যতের জন্য আব্বাসকে একধরনের আশার প্রতীক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনেই এই আশার বাস্তব পরীক্ষা হবে।

অপরাধ কমানোর আশায় আব্বাসকে সরকারে দেখতে চান ভোটাররা

উত্তর ইসরাইলের আরেক শহর সাখনিনে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে সমাবেশ শেষে দীর্ঘ সময় সমর্থকদের সঙ্গে কাটান আব্বাস। পরিচিতদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, ছবি তোলেন। সেখানে ৫৩ বছর বয়সি ভোটার ইহসান বশির তাকে পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এমনকি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার হলেও তাতে অংশ নিতে বলেন তিনি। তার আশা, এতে অপরাধের মাত্রা কমবে।

বশির বলেন, তার এক ছেলে ও চার মেয়ে রয়েছে। সন্তানদের বাইরে যেতে দিতে তিনি ভয় পান।

আব্বাস তার কথা শুনে হাসেন ও মাথা নাড়েন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রা’আম নির্বাচনে অনেক আসন পাবে এবং নতুন সরকার বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত হবে।

ইসরাইলের নির্বাচনে ক্ষমতার চাবিকাঠি হতে পারেন আরব নেতা আব্বাস
ইউনাইটেড আরব লিস্টের নেতা মানসুর আব্বাস। ছবি: এএফপি