Friday, February 21, 2025
সাক্ষাৎকারে ভি এস নাইপল

ভি এস নাইপল এর সাক্ষাৎকার
লন্ডনের লিটারেরি রিভিউতে নেওয়া সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ ভাষান্তরিত। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ফাররুখ ধোনী।
ভিএস নাইপলের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। ভারতীয় চিকিৎসক ও চিকিৎসা তাঁর কাছে ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের চেয়ে স্বস্তিকর মনে হওয়ায় চিকিৎসা ও সেরে ওঠার জন্য কয়েক মাস তিনি দিল্লিতে থেকে যান। তারপর লন্ডনে ফিরে আসেন এবং আবার লিখতে শুরু করেনে।
আমি তাঁর উইন্টশায়ার কটেজে আসি এবং দুদিন সময় নিয়ে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করি।
তিনি বললেন, তিনি আমাকে পছন্দ করেছেন কারণ সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য আমি তাঁর পদ্ধতিই অনুসরণ করি – সাক্ষাৎকারদাতা যা বলে যান আমি তার হাতে লেখা লম্বা নোট নিই। তিনি টেপ-রেকর্ডারকে বিশ্বাস করেন না। আমিও না। তাই আমি পকেট সাইজের দুটো
টেপ-রেকর্ডার নিয়ে এসেছি এবং অনধিকার চর্চা করে দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম ডাইনিং টেবিলের এমন একটা জায়গায় রেখেছি, তার আগে নিশ্চিত করেছি যে ব্যাটারিগুলো নতুন। বিড়াল অগাস্টাস কিছুক্ষণ পরপর জানালার চৌকাঠের সামনে আসছে এবং ভেতরে আসতে চাইছে। তার ধৃষ্টতা সাধারণ বিড়ালের চেয়ে বেশি এবং বিদ্যাধরের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পীড়াপীড়ি করে। তিনিও তাকে শুয়ে পড়ার হুকুম জারি করার পথটি জানেন। অবাক করে দিয়ে অগাস্টাস বিদ্যাধরের হুকুম তামিল করে এবং আমাদের পায়ের কাছে কু-লী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে।
লিটারেরি রিভিউর জন্য এটা আমার দ্বিতীয় বর্ধিত সাক্ষাৎকার। ২০০১-এর আগস্টে প্রকাশিত প্রথমটি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ই এম ফর্স্টার, জন ম্যানার্ড কিনস এবং জেমস জয়েসের ওপর তাঁর মন্তব্যকে প্ররোচনামূলক মনে করা হয়েছে। আমরা যখন শুরু করি, আমি আমরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকব, তিনি সম্মত হন।
ফাররুখ ধোনী : একজন লেখকের লেখক-জীবন ও সাফল্যে ভাগ্যের কোনো ভূমিকা আছে বলে কি আপনি মনে করেন?
বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল : আমি অনেক বিষয় নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছি। ভাগ্য এসেছে গোড়ায়, যখন আমি শুরু করার চেষ্টা চালাচ্ছি। সেদিন ল্যাঙ্গহাম হোটেলে বিবিসি ভবনে কাজ করছি, পোর্ট অব স্পেনের যে-রাস্তায় আমি বেড়ে উঠেছি, হঠাৎ যদি সে-রাস্তার কাহিনি লেখার কথা মনে না হতো তাহলে হয়তো আরো অনেক বছর আমাকে কী লিখব তা নিয়ে হাতড়ে বেড়াতে হতো। বিবিসির সেই রুমে ফ্রিল্যান্সাররা যদি উৎসাহিত না করতেন তাহলে হয়তো আমার শুরুটাই কখনো হতো না।
আমি বেশ অনুভব করেছি, কাজটা আমি আমার নিজের মতো করে করছি – ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। আমি যে-বইটা, মিগেল স্ট্রিট, লিখছিলাম পরের চার বছরেও তা প্রকাশিত হয়নি। সেকালে লেখালেখি নিয়ে ইংল্যান্ডের ধারণা ভিন্ন ছিল – আমি যা করছিলাম তা থেকে ভিন্ন।
ধোনী : আপনি কি বলছেন যে, ইংরেজি সাহিত্যের ঐতিহ্যের বাইরে আপনি লেখালেখি করছিলেন?
নাইপল : সেটা লিভিস (ফ্রাঙ্ক র্যায়মন্ড লিভিস তখন ক্যামব্রিজের তথা ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাহিত্য-সমালোচক) এবং ক্যামব্রিজ ঘরানার – এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হচ্ছে – আমি কী কাজ করছি ইংল্যান্ড বুঝতে পারেনি। এটা যদি আমার নিজের ভূমি হতো তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কিন্তু আমার কোনো দেশ নেই। আমি যে-কাজ করেছি ইংল্যান্ড তার প্রশংসা করেনি, স্বীকৃতিও দেয়নি। আমার কাজ ছিল একটি পাঠকগোষ্ঠী গড়ে তোলা। আমার বেলায় এটা ছিল ধীরগতির – খুব ধীরগতির।
ধোনী : আপনি যে নিজস্ব পাঠকের জগৎ উন্মোচন করার চেষ্টা করছেন এ-সম্পর্কে নিজে কি সচেতন ছিলেন?
নাইপল : আমি সবসময়ই অতি ক্ষুদ্র একটি পাঠকগোষ্ঠীর জন্য লিখেছি : আমার স্ত্রী (প্যাট্রিসিয়া, এখন নাদিরা), বিবিসিতে আমার চেনা কেউ, আমার প্রকাশক, আমার প্রকাশক ডয়েসের সম্পাদক।
ধোনী : মুসলিম বিশ্বভ্রমণ শেষে লেখা আপনার বই অ্যামাং দ্য বিলিভার্স নিশ্চয়ই বৈশ্বিক পাঠকের জন্য লিখিত?
নাইপল : যেহেতু লেখালেখি হচ্ছে শেখার একটি প্রক্রিয়া, সেই বইটি লেখাও আমার জন্য একটি প্রক্রিয়া। প্রকাশিত হওয়ার পর বইটি পাঠক পেয়েছে। হার্ভার্ড ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) মতো জায়গায় এই বই নিয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে। এসব জায়গায় কিছু জ্ঞানী লোক আছেন, যাঁরা তাদের প্রাজ্ঞতা দিয়েই জানতে পারেন, কী ঘটছে দেখার জন্য তাঁদের যেতে হয় না। যা জানার তা এর মধ্যেই তাঁরা জেনে গেছেন। অবশ্য আমি এটা খুব জোর দিয়ে বলছি না যে, যা কিছু আমি আবিষ্কার করেছি এবং লিখেছি সবই আমার জন্য। দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে এমআইটিতে যাওয়ার কারণ বইটির ওপর কথা বলার জন্য তাঁরা আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, আমার মনে হয়েছে তাঁরা ইরান নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। আমার মনে আছে রক্তের জন্য ইরানিদের ভালোবাসার কথা আমি বলেছি। একটি ধর্মীয় বিক্ষোভে একজন মানুষ যখন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, লোকজন তার ক্ষত ও রক্তে হাত ও কাপড় ডুবিয়ে রক্তে ভেজাচ্ছিল। আমি এমআইটিতে যাদের সঙ্গে ছিলাম তারা এটি বিশ্বাস করতে অস্বীকার করল। এমন কিছু ঘটতে পারে না; ওহ্ ঈশ্বর! তারা কত জ্ঞানী। একটি আমেরিকান পত্রিকা তিন খ-ে আমার বইটি ছাপতে যাচ্ছিল; কিন্তু তা বাতিল করে দিলো।
ধোনী : কেন?
নাইপল : সেখানকার জ্ঞানী লোকজন তাদের বলে থাকতে পারে এটা প্রকাশ করা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কুড়ি বছর পর মনে হতে পারে, অপেক্ষমাণ পৃথিবীকে যদি এই ভাবনাটা দেওয়া যেত … কিন্তু তখনো তাদের কঠিন সময় যাচ্ছিল।
এমনকি আমার প্রথম বই মিগেল স্ট্রিট-এ আমি নিরীক্ষামূলক কাজ করেছি; আমি চেয়েছি এটা খুব সহজ হোক, নতুন হোক, দৃশ্যগুলো যেন ভেসে ওঠে। প্রতিটি বাক্যে তা-ই করেছি।
ধোনী : আপনি যখন এগোতে থাকলেন, আপনার লেখার অভিজ্ঞতাও কি বদলে গেল?
নাইপল : আমি যখন লিখতে থাকি লেখার ‘আইডিয়া’ গড়ে ওঠে। আমার একমাত্র আইডিয়া হচ্ছে লেখাটা নন-ফিকশন হলে এটা সত্যনিষ্ঠ হতে হবে। আমি যাদের নিয়ে লিখছি তারা এর ভেতর সত্যটা দেখতে পাবে। আমরা যে-বইটি নিয়ে কথা বলছিলাম অ্যামাং দ্য বিলিভার্স প্রকাশিত হওয়ার পর আমি ইরান থেকে চিঠি পেয়েছি যে, আমি মূল বিষয়টি ধরতে পারিনি। আমি তেহরানে গাড়ি চালানোর কথা লিখেছিলাম – এটা ভয়ংকর ও আশঙ্কাজনক অভিজ্ঞতা। আমি যে-গাড়িতে ছিলাম প্রত্যেক জায়গা থেকে অন্য গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়ে সে-গাড়ির কিছু রং তুলে এনেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রোতাদের সামনে যখন বইয়ের অংশবিশেষ পড়ি, তাদেরও একইরকম প্রতিক্রিয়া – সত্য কথা লেখা ‘ঔপনিবেশিক’ মানসিকতাজাত।
ধোনী : আপনি কি মনে করেন এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনি গোঁড়া কিংবা বোকাটে ধরনের লোকের দেখা পেয়েছেন? নাকি জ্ঞানী?
নাইপল : আমি সেরকম কিছু মনে করছি না। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শীর্ষ অতিক্রম করে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-ধারণা তা শেষ হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘসময় ধরে ‘ঐশ্বরিক’ উৎপাদন করেছে। তারপর অক্সফোর্ড একটা বাঁক নিল এবং চটপটে মানুষ তৈরি করতে শুরু করল। শেখার ধারণা এসেছে বেশ পরে, সম্ভবত উনবিংশ শতকে – কোনোভাবে বিংশ শতক পর্যন্ত এসেছে। এখন মনে হচ্ছে বিজ্ঞানের বিষয় ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। সমাজতন্ত্রীরাও সবাইকে এখানে পাঠাতে চায়। আমি মনে করি, এসব জায়গা গুটিয়ে ফেলা উচিত এবং চাইলে সার্টিফিকেট কিনতে মানুষ পোস্ট অফিসেই যেতে পারে।
ধোনী : নিশ্চয়ই বিজ্ঞান বিষয়ের সার্টিফিকেটও নয়।
নাইপল : না ওগুলো থাকতে হবে। মানবিক বিভাগ – ‘হিউম্যানিটিজ’ – আমার মনে হয় অর্থহীন বিষয়।
ধোনী : আপনি বলেছেন যখন লিখতে থাকেন, লেখার আইডিয়াটাও গড়ে উঠতে থাকে। অতীতে আপনি একটি সংস্কৃতিতে লেখালেখির ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন এবং লিখেছেন। যেমন রাশিয়া …
নাইপল : এবং ফ্রান্স। এই আইডিয়া নিজেরাই নিজেদের গড়ে তুলেছে। শুরুতে আমার কাছে আসেনি। আমি বেশ অজ্ঞ ছিলাম। আমি যখন মোপাসাঁ পড়তে শুরু করি আমি পুরোপুরিভাবে তাকে মূল্যায়ন করতে পারিনি। একটি সংস্কৃতি এবং সেই সংস্কৃতির একজন লেখককে দেখার আগে কিছু প্রাজ্ঞতা, কিছু অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। আপনি যদি পঁচিশ বছর আগে আমার সাক্ষাৎকার নিতেন তাহলে আমি বলতাম বালজাক ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ফ্রেঞ্চ লেখক। এখন আমি বলি মোপাসাঁ – একজন সত্যিকারের বড় মানুষ। আমি বালজাক পড়তে শুরু করি এবং তাঁকে নিয়ে আমার কিছু সমস্যা হয়। আমি নিজেকে নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ি। আমি মোপাসাঁর গল্প হাতে নিই। সবই গল্প – ১১০০ পৃষ্ঠা। গল্পগুলো লেখার কাল অনুযায়ী সাজানো এবং অনুবাদও চমৎকার। এটা আমার জন্য শিক্ষা।
শুরুতে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লিখতেন, একটি ভুল পদক্ষেপও যেন না হয় খেয়াল রাখতেন। মাঝখানে এসে তিনি আরো বেশি নিরাপদ ও নিশ্চিত হলেন। তিনি সহজাতভাবে ভালো কাজ করেছেন, শেষদিকে তাঁর মৃত্যুচিন্তা এসে যায়, তাঁর লেখাগুলো সংক্ষিপ্ত এবং খুবই মেকি হয়ে আসে।
শেখভের নাটকে একটি চরিত্র আছে যে মোপাসাঁ সম্পর্কে কথা বলে; এবং বলে তাঁর মেধা অতিপ্রাকৃতিক। আমি তাঁর সঙ্গে একমত হই কারণ তাঁর প্রায় সব গল্পেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন তিনি দেখিয়েছেন। আর তাঁর গল্পের সংখ্যা কত! বিস্মিত হতে হয়, এত গল্পের উপাদান তিনি পেলেন কোথায় – প্রতিটি গল্পই মনে হয়েছে কেমন স্বাভাবিক ও সহজ।
আপনি যখন গল্পটা পড়েন, তা বিশ্লেষণ করতে পারেন, তাঁর গল্পের পদ্ধতিটি বুঝতে পারেন। তিনি সবসময়ই তাঁর গল্পের মানুষকে একটি চরিত্র দেন – সেটা খুব জরুরি। তাঁর এখানে একটি আবেগরেখা থাকে, তাঁর লেখার সঙ্গে সঙ্গে আবেগের
হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, পাঠক গল্পের মামুলি বর্ণনা কেমন করে শেষ হয়ে এলো তা অনুসরণ না করে লেখকের আবেগকে অনুসরণ করেন। আমি মনে করি মোপাসাঁর মতো আর কেউ নেই।
তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের নির্মমতা রয়েছে। তাঁর বয়স যখন তিরিশের ঘরে তিনি লিখতে শুরু করেন, তারপর দশ বছরেই সব প্রায় শেষ হয়ে যায়। তিনি যন্ত্রণায় ছিলেন, তারপর পাগল হয়ে যান, কাজেই যা কিছু করার তিনি দশ বছরেই করেছেন। তাঁকে অবশ্য সারাক্ষণই লিখতে হয়েছে, তাও কত সহজভাবে লিখে গেছেন। এটি অতিপ্রাকৃতিক মেধা। তাঁর গল্প পড়তে পড়তে আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করেন কোন সেই দেশ, যে-দেশ তাঁকে লেখায় বিস্ময়কর এত উপাদান দিয়েছে; তারপর কিছু সময় পর আপনি বুঝতে পারেন কোনো দেশ তাঁকে এসব উপাদান দেয়নি। তাঁর দেখার শক্তি দিয়ে তিনি দেশ সৃষ্টি করছেন। অদ্ভুত ব্যাপার। আমরা যখন স্কুলে মোপাসাঁ পড়ি, আমরা বড্ড প্রাদেশিক হয়ে পড়ি – ফ্রেঞ্চ! এটা এখনো সত্য, কিন্তু তাঁর কাজ সবার জন্য।
ইংরেজি ভাষার লেখকদের নিয়ে এমন কথা বলা যায় না। (আমরা চার্লস ডিকেন্সকে আলোচনার বাইরে রাখতে পারি)। ইংরেজি ভাষায় লেখা স্পষ্টতই ইংল্যান্ডের জন্য, ইংল্যান্ডের মানুষের জন্য, খুব বেশি দূরে যাওয়ার জন্য নয়।
ধোনী : কোন কোন লেখক বিশেষ করে এই ইংরেজিপনা – ‘ইংলিশনেসে’র কাতারে পড়বে বলে আপনি মনে করেন?
নাইপল : (টমাস) হার্ডি। একজন অসহ্য লেখক।
ধোনী : কেন?
নাইপল : তিনি লিখতে জানেন না; একটা প্যারাগ্রাফ কীভাবে তৈরি করতে হয় তিনি জানেন না। আমি বলব রোমান্টিক মেয়েলি কাহিনির এরকম বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
ধোনী : এমনকি বড় লেখকরাও – জেইন অস্টিন?
নাইপল : জেইন অস্টিন নিয়ে আমার কী সমস্যা? যারা ইংরেজি কেতায় শিক্ষিত হতে চান জেইন অস্টিন তাদের জন্য। এটা যদি আপনার লক্ষ্য না হয়, তাঁর বই দিয়ে আপনি কী করবেন, তাও আপনার জানা নেই।
কবছর আগে বাথে একটি সম্মেলন হয়েছিল, আমাকে দাওয়াত করা হয়েছে। আমি বাজে ধরনের কনফারেন্স অতিথি। আমি একটি কথাও বলিনি। তাঁরা আমাকে বাথের প্রেক্ষাপটে লেখা জেইন অস্টিনের নর্থহ্যাঙ্গার অ্যাবে উপন্যাসটি দেন। সাম্প্রতিক অসুস্থতার পর থেকে আগে আমার যেসব বই পড়া হয়নি, সেগুলো তুলে নিচ্ছি। কাজেই বইটা নিলাম। বইটার অর্ধেক পর্যন্ত আমার মতো একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ, এই ভয়ংকর নীরস নারীর তথাকথিত প্রেমের জীবন – একজনের সঙ্গে একবার দেখা হওয়ার পরই তিনি বলছেন প্রেম – আমি এ-জিনিস নিয়ে কী করব? এটা আমার জন্য নয় – রাস্তার কারো পড়ার জন্য হতে পারে, আমার নয়।
ধোনী : জেইন অস্টিনকে নিয়ে এত কথা – আপনি কি তাতে বিস্মিত হলেন?
নাইপল : হ্যাঁ, এটা নির্ভর করে পৃথিবীর রাজনৈতিক শক্তির ওপর। আপনি যদি ইংল্যান্ডের হয়ে থাকেন, আপনার কাছে দেশ যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এ-ধরনের বাজে অর্থহীন লেখা আপনার কাছে গুরুত্ব পাবে। উনবিংশ শতকে যদি দেশটির পতন ঘটত, তাহলে কেউ জেইন অস্টিন পড়ত না। বইগুলো হতো ব্যর্থতা নিয়ে। লেখকরা ব্যর্থতার কারণ প্রদর্শন করতেন।
আমি জেইন অস্টিন নিয়ে যা বলছি আর জ্ঞানী লোকেরা তাঁকে নিয়ে যা বলছেন, আমি তা গুলিয়ে ফেলতে চাই না। বিভিন্ন জ্ঞানবান স্থানের অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষেরা বলছেন জেইন অস্টিন একটি বড় ধরনের ভ্লাদিমির প্রতিনিধিত্ব করেন। যেখানে ক্যারিবিয়ান ফসলের ক্ষেতে ক্রীতদাসরা পরিশ্রম করে যাচ্ছে, সেখানে তরুণদের হৃদয়ের ব্যাপার নিয়ে মজে থাকা ভ্লামিই তো। কী ভ্লমি! জ্ঞানীরা এমনই বলে থাকেন। এটা বোকামি কারণ তাঁরা যদি তাঁদের নিজের বিষয়ের বাইরের কিছু বিষয় নিয়ে জানতেন, বুঝতেন ১৮০৭ সালে ক্রীতদাস ব্যবসা – ব্রিটিশ ক্রীতদাস ব্যবসা নিষিদ্ধ হয় আর এসবের যৌক্তিকতা সংবেদনশীলতা – এসব নিয়ে আলোচনা ১৮৩৪ সালে ক্রীতদাস প্রথা অবলুপ্ত করার পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজে লেগেছে। পরিশুদ্ধকরণ আচরণ এসবের ধারণা হচ্ছে অবলুপ্তির পরিবেশ।
ধোনী : তাহলে জেইন অস্টিনের কিছু প্রভাব আছে?
নাইপল : তাঁর কোনো প্রভাব নেই, তিনি ছিলেন এর অংশ। তিনি নিজেই এর প্রতিফলন। প্রাচীন রোমানদের সঙ্গে যদি এর তুলনা করি – তাঁরা ভালো জীবনের কথা বলেছেন আবার নিজেদের চারপাশে সবচেয়ে নির্মম দাসপ্রথাকেও উৎসাহিত করেছেন। তাঁদের চারপাশে যে-জীবন সে-জীবন নিয়ে তাঁরা কখনো প্রশ্ন করেননি। ক্রীতদাসদের সঙ্গে যে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অ্যারেনায় তাদের ভয়াবহ মৃত্যু হচ্ছে, এ নিয়ে সিসেরো কৌতুক করেছেন। দিনের বিভিন্ন সময়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের নির্মমতা নির্ধারিত ছিল। অপরাধীকে নিরস্ত্র অবস্থায় সশস্ত্র ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পাঠানো হতো। অসমতার এই লড়াই তো আর সত্যিকারের লড়াই নয়, তবু তা জনতার মধ্যে এক ধরনের সরল উত্তেজনা জাগাত। সেনেকাই বলেছেন, তোমাদের মনে রাখতে হবে ক্রীতদাসও মানুষ। তিনি এর বেশি এগোননি। রোমান দাসত্ব ছিল অত্যন্ত পাশবিক।
ইংল্যান্ড দাসত্ব বিলোপকারী প্রথম দেশ। এটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। জেইন অস্টিনের উপন্যাস পড়ার দরকার নেই, তবে এটা মনে রাখতে হবে, যে আচরণ ও সংবেদনশীলতার কথা তিনি লিখেছেন, যে-শিক্ষা দাসত্বের বিলুপ্তি ঘটিয়েছে, এটা তারই অংশ।
ধোনী : ইংরেজ লেখকদের মূল্যায়নের সময় আপনি চার্লস ডিকেন্সকে ছাড় দিচ্ছেন কেন?
নাইপল : আমি কিছুদিন আগে তাঁর প্রথমদিককার লেখা
কিছু প্রবন্ধ পড়েছি। স্কেচেস বাই দ্য বজ খুবই ভালো। কিন্তু ডিকেন্সের লেখায় এত বেশি বাজে জিনিস। কেবল শব্দের জারিজুরি – বড্ড বেশি শব্দ, শুধু পুনরাবৃত্তি। তিনি কিছু একটা করতে চেষ্টা করছিলেন, দোহাই ঈশ্বরের আফ্রিকানদের কখনো জঘন্য শত্রু ছিল না। তাঁর একটি প্রবন্ধে …
ধোনী : কোন প্রবন্ধ?
নাইপল : আমি স্মরণ করতে পারছি না। যদি তারা দাসত্ব অবলুপ্ত না করত জ্ঞানী লোকেরা যে কত কথা বলত। ডিকেন্স কালো মানুষদের ঘৃণা করতেন। অদ্ভুত তাই না?
ধোনী : আপনি কি একইভাবে বিংশ শতকের ব্রিটিশ লেখকদের বিচার করেন?
নাইপল : এটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এটা (এভলিন) ওয়াফের বেলায় সত্য। আন্তর্জাতিক পাঠক লাভের বিষয়টি খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। এইচজি ওয়েলস যখন তাঁর প্রথমদিককার গল্পগুলো লিখছেন তিনি বাইরের মানুষের জন্য লেখেননি। তিনি সাম্রাজ্যবাদের বহু চর্বিতচর্বণ গ্রহণ করে গল্পগুলো লিখেছেন, যদিও তিনি একজন ভালো লেখক। আশির দশক থেকে লেখা গল্পগুলোতে রয়েছে আফ্রিকান ভুডু – প্রেতধার্মিক, ভারতীয় যাজক ইত্যাদি। তিনি দেশের বাইরে যাচ্ছেন না, যেসব আইডিয়া তিনি গ্রহণ করছেন তা লেখায় কাজে লাগাচ্ছেন।
যদিও কোনো ফিকশন লেখেননি (বার্ট্রান্ড) রাসেল ছিলেন বৈশ্বিক। তিনি খুব সাধারণভাবে, স্পষ্টভাবে দার্শনিকী ভাবনা ব্যাখ্যা করেছেন।
ধোনী : ভারতে যাঁরা ইংরেজি বলেন তাঁদের মধ্যে রাসেলের বড় পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে। যেমন হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি।
নাইপল : হ্যাঁ, তবে সবাইকে বিশ্বের জন্য লিখতে হবে এমন নয়, তাঁরা অবশ্যই নিজেদের জন্য লিখবেন, তাঁদের বন্ধুদের জন্য লিখবেন।
ধোনী : কিন্তু তাতে কি বইয়ের গুরুত্ব অস্বীকার করা হয় না?
নাইপল : না। উত্তম যুগে লেখকরা নিজেদের জন্য যা লিখেছেন তা-ই মানুষের কাছে চলে এসেছে। বইয়ের এই সফরের ব্যাপারটি ঘটার কারণ, পৃথিবী এতটাই প্রতিবন্ধী যে দেখার মতো তার নিজের সামান্যই আছে। আমি এটা বলছি না বাইরের পৃথিবীর জন্য মানুষের বার্তা নিয়ে যাচ্ছে। বইয়ে যে-ধরনের কৌতূহল সঞ্চার করা হয়েছে স্বাভাবিকভাবে তা অন্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
আমেরিকান লেখার কথাই ধরুন। মার্ক টোয়াইন হচ্ছেন বৈশ্বিক, যে কেউ তাঁর বই পড়তে পারেন এবং তাতে তাঁদের আগ্রহের বিষয় পেতে পারেন, কিন্তু আমেরিকার জন্য ফিটজেরাল্ড হচ্ছেন লোকাল – স্থানীয়। মার্ক টোয়াইনের লেখায় আমরা হিউমার পাই – এতে এমন এক স্বর রয়েছে যা সব মানুষের সঙ্গে কথা বলে; তারপর বস্তুর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, বস্তুর গুরুত্ব নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত হননি।
দেখবেন এখনকার ভারতীয় লেখকরা তাঁদের বস্তুগত অর্জন নিয়ে উচ্ছ্বসিত। তাঁরা ড্যাডি, মাম্মি, চাচা, চাচি এসব নিয়ে লিখছেন, তাঁদের অর্জিত বস্তুর জন্য আনন্দিত হচ্ছেন। ভারতীয় বইয়ের বেচারা সমালোচকরা হয়তো এই উপসংহারে আসতে পারেন : ‘হাঁ, ঈশ্বর! এক্স, ওয়াই, জেড এত বড় ভারতীয় পরিবার থেকে এসেছেন, আমরা জানতামই না।’
ধোনী : ভারতীয় লেখকদের বইয়ে আমরা শুধু এসবই পাই না।
নাইপল : আপনাকে ওই ভয়ংকর আমেরিকান হেনরি জেমসের দিকে তাকাতে হবে। আসলে পৃথিবীতে তিনি সবচেয়ে বাজে লেখক। তিনি কখনো নিজের ত্রিসীমানার বাইরে যাননি। হ্যাঁ, তিনি ইউরোপে এসেছেন, কিন্তু এখানে এসে ‘লেখকের জীবন’ যাপন করেছেন। তিনি কোনোকিছুর ঝুঁকি নেননি। তিনি নিজেকে কোনো ঝুঁকির সামনে দাঁড়াতে দেননি। তিনি ভদ্রলোক হিসেবে সফর করেছেন। আমেরিকান ম্যাগাজিনের জন্য যখন তিনি ইংলিশ আওয়ার্স লিখলেন, তিনি দূর থেকে এপসম (সারের একটি ছোট শহর) ঘোড়দৌড় নিয়ে লেখেন। তিনি কখনো ভাবেননি জনতার সঙ্গে মিশবেন, তারা কেন সেখানে এসেছে, কী তাদের আচরণ তা জানবেন। গাড়ির ওপরে থেকে কিংবা ট্যুরিস্ট কোচের ওপরতলায় বসে তিনি এ-কাজটি করবেন। তাঁর অনেক লেখা এরকমই। তাঁর লেখায় বস্তুর জয়গান, তিনি মনে করেন এ-বিষয়ের ওপর লেখার জন্যই তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন, ইউরোপের জাঁকজমক এবং আমেরিকার নতুন টাকার চাকচিক্য কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। অনেক বছর আগে এলিজাবেথ হার্ডউইক (১৯১৬-২০০৭; সাহিত্য-সমালোচক) আমাকে বলেছেন, কী হচ্ছে? হেনরি জেমস যাদের সঙ্গে কথা বলছেন সবাই আমেরিকান। আর এর ফলে আমেরিকান তরুণরা ভাবছে তারা ইউরোপ দেখতে বেরোবে এবং তাঁর মতো ‘একটা হেনরি জেমস’ লিখে ফেলবে।
ধোনী : আপনি নিশ্চয়ই হেমিংওয়ে সম্পর্কে এ-কথা বলতে পারেন না, তরুণ আমেরিকানরা তাঁকেও অনুসরণ করার চেষ্টা করে। তিনি তো জনগণের সঙ্গে মেশেন।
নাইপল : হেমিংওয়ে কোথায় ছিলেন তিনি নিজেও জানতেন না। তিনি আমেরিকান হওয়া নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন আর তাঁর বিষয়ও তেমনই। আপনি হেমিংওয়ে কিংবা ফিটজেরাল্ডের গল্প কিংবা অন্য কোনো রচনা, কিংবা প্যারিস নিয়ে লেখা কোনো কিছু থেকে
এ-ধারণাই পাবেন না – দুই যুদ্ধের মাঝখানের সময়টাকে প্যারিসকে কী কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁরা কেবল কাফে, পানীয়, শামুক ঝিনুক এসব নিয়ে লিখেছেন। বাইরের বৃহত্তর পরিসরকে তাঁরা দেখেন না। এ-ধরনের লেখা পড়তে এবং এগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে আমার অসুবিধা হয়। এসব আমার জন্য নয়, রাস্তার অন্য মানুষের জন্য।
তাঁরা ‘গে প্যারিস’ কিংবা এ-ধরনের বিষয় নিয়ে লিখেছেন। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের মৃত্যু – এসব নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতে চাননি। এখন তো কেউ ফ্রান্স নিয়ে লেখার জন্য সেখানে যাচ্ছেন না। কারণ একটা জায়গার যখন সব ঠিকঠাক, যেমন এখনকার ফ্রান্স, লেখাটা কেমন হবে জানা কঠিন। যেখানে গিয়ে আপনি স্থানীয় জনগণের ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন, সেখানে লেখা সহজ। আপনি ভারতে যেতে পারেন, নেপালে যেতে পারেন। সেখানে অগণ্য জনতার ভিড়। এসব লোকের জন্য যারা ঠেলে আপনার বইয়ে উঠে আসার জন্য পথ করে নেবে তাদের জন্য ট্রাভেল এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রতি মাসে আমার কাছে অনেক বই আসে, তারা আপনার কাছে পাঠাবে না, কারণ আপনি তেমন করে ভারত নিয়ে বই লেখেননি।
জোনাথান রোসেন ও তরুণ তেজপালের নেওয়া ১৯৯৮-এর প্যারিস রিভিউর সাক্ষাৎকার থেকে :
প্রশ্ন : আমি আপনার বইয়ের নাম অ্যা ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড শুনেই হতবাক। এটা আমাকে প্যারাডাইস লস্টের শেষাংশের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্বর্গ থেকে বের করে দেওয়ার পর উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি। বাড়ি ছাড়ার পর আপনি যেখানে আসেন এটা সেই বিশ্ব?
নাইপল : আমার মনে হয়, আপনি কোথায় বাস করছেন তার ওপর এটা নির্ভর করে। আমি বুঝতে পারছি না এটা ন্যায্য কোনো প্রশ্ন কি না কিংবা আমি এর উত্তর দেবো কি না। আপনি বরং অন্যভাবে প্রশ্নটি করুন।
প্রশ্ন : আমার মনে হচ্ছে বিশ্ব বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন সেটাই জানতে চাচ্ছি।
নাইপল : মানুষ খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করতে পারে। তাই না? চিন্তাভাবনা ছাড়া কোথাও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে। আমি মনে করি, আপনি যখন চিন্তা করেন তখন যেখানে প্রবেশ করেন সেটাই বিশ্ব – যখন আপনি শিক্ষিত হয়ে ওঠেন, যখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন – আপনি বিশাল বিশ্বে থাকতে পারেন এবং পুরোপুরি আঞ্চলিকও হতে পারেন।
প্রশ্ন : আপনি কি বৃহত্তর ভাবনার একটি বিশ্বে বেড়ে উঠেছেন? আপনার ‘বিশ্ব’ শব্দে যে ধারণা দিতে চেয়েছেন?
নাইপল : আমি সবসময়ই জানতাম বাইরে একটি বিশ্ব আছে। আমি সে-বিশ্বে বেড়ে উঠেছি – কৃষিভিত্তিক ঔপনিবেশিক সমাজ – আমি তা মেনে নিতে পারিনি। এত বিষণœ, এত সীমিত আপনি থাকতে পারেন না।
প্রশ্ন : অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করার জন্য আপনি ১৯৫০ সালে ত্রিনিদাদ ছেড়ে যান। আপনার উচ্চাশা চরিতার্থ করার জন্য সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অপরিচিত এক দেশে।
নাইপল : আমি খুব বিখ্যাত হতে চেয়েছিলাম। আমি একজন লেখকও হতে চেয়েছি, লেখার জন্য বিখ্যাত। আমার সেই উচ্চাশার অসম্ভব দিকটি ছিল – আমি কী লিখতে যাচ্ছি, সে-সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। বাস্তবে আমার অনেক আগে উচ্চাশাটি এসে যায়। চিত্রনির্মাতা শ্যাম বেনেগাল একবার আমাকে বলেছিলেন, তিনি ছ-বছর বয়স থেকে সিনেমা বানাতে চেয়েছেন – আমি লেখক হতে চেয়েছি দশ বছর বয়স থেকে। …
প্রশ্ন : সবকিছুর সমাধানের পথ হিসেবে লেখালেখিটাই কেন আপনার জীবনের মূল প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে?
নাইপল : জীবনের লক্ষ্য হিসেবে এটা আমাকে দেওয়া হয়েছে। বরং আমি আমার বাবার উদাহরণ দিই। তিনি একজন লেখক ছিলেন – একজন সাংবাদিক; তিনি গল্পও লিখতেন। আমার কাছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি এটাকে পেয়েছেন নির্দয় প্রেক্ষাপটে; তাঁর গল্প থেকে আমি বুঝতে পারি তাঁরটা ছিল খুব নির্দয় বিশ্ব। কাজেই আমি এই ভাবনা নিয়েই বেড়ে উঠি যে, সবসময়ই বাইরের শত্রুকে খোলাসা করার দরকার নেই, জরুরি হচ্ছে নিজের ভেতর দিকটাতে তাকানো। অবশ্যই আমাদের নিজেদের পরীক্ষা করতে হবে – আমাদের নিজেদের দুর্বলতাকে পরীক্ষা করতে হবে। এটা আমি এখনো বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, লেখালেখি আপনি দেখছেন সত্যিকারের মহান আহ্বান হিসেবে।
নাইপল : হ্যাঁ, আমার জন্য এটা মহান আহ্বান। এটা মহান, কারণ সত্য নিয়ে এর কারবার। আপনার অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করতে আপনাকে পথ খুঁজতে হয়। আপনাকে তা বুঝতে হয়, বিশ্বকে বুঝতে হয়। লেখালেখি হচ্ছে গভীরতর উপলব্ধির নিরন্তÍর প্রচেষ্টা। এটা বেশ মহান কাজ।
প্রশ্ন : আপনি কখন লিখতে শুরু করেন?
নাইপল : ১৯৪৯-এ একটি উপন্যাসের কাজ শুরু করি। মজার একটি চিন্তার এটা বেশ প্রহসনমূলক লেখা – ত্রিনিদাদের একজন কালো মানুষ আফ্রিকার একজন রাজার নামে নিজের নাম রাখছেন। আমি এই ভাবনাটিরই অনুসন্ধান করছিলাম। এই লেখাটা টানতে টানতে দুবছর নিয়ে নিই, কারণ আমি এতটাই তরুণ ছিলাম যে, বেশি কিছু তখনো আমার জানা হয়নি। আমি বাড়ি ছেড়ে বেরোনোর কদিন আগে লেখাটা শুরু করি, অক্সফোর্ডের একটা লম্বা ছুটির সময় শেষ হয়। আমি খুশি হই কারণ একটি বই শেষ করতে পারার যে-অভিজ্ঞতা তা আমি অর্জন করি। অবশ্যই এই বইয়ের কিছুই হয়নি।
আমি যখন অক্সফোর্ড ছেড়ে যাই সত্যিকারের আর্থিক টানাটানির মধ্যে পড়ে যাই – আমি খুবই সিরিয়াস কিছু একটা লিখতে শুরু করি। আমি আমার নিজের স্বর, নিজের সুর খুঁজতে থাকি – যা একান্তই আমার নিজের। কারো কাছ থেকে ধার করা নয়, কিংবা অভিনীত কিছু নয়। সিরিয়াস স্বর আমাকে নিয়ে গেল গভীর হতাশার দিকে। এটা আমাকে কিছুকাল টেনে রাখল, যতক্ষণ আমার পাঠানো পা-ুলিপি পড়ে একজন পরামর্শ দিলেন এসব ছেড়ে দাও। …
প্রশ্ন : এ-সময়ই কি আপনি মিগেল স্ট্রিট লিখতে শুরু করেন?
নাইপল : হ্যাঁ। কোনো কিছু নিয়ে সবার আগে কিছু লেখাটা খুব কঠিন কাজ। এরপর এটা অনুসরণ করা বেশ সহজ। আমি যে-বইটি লিখেছি তাতে রয়েছে আমার পর্যবেক্ষণ, লোককথা, সংবাদপত্রের ক্লিপিং এবং আমার স্মৃতির মিশ্রণ। এরকম অনেকেই করতে পারেন কিন্তু সে-সময় আমি যা করেছি ভেবেচিন্তে করতে হয়েছে।
একবার ভাবুন, ১৯৫৫ সালে মিগেল স্ট্রিটের মতো একটা বই লেখা হয়েছে। এখন তো মানুষ ভারতের এবং অন্য কোনো সাবেক উপনিবেশের লেখালেখি নিয়ে আগ্রহী, কিন্তু সে-সময় এগুলো লেখা বলে বিবেচিত হতো না। প্রকাশিত হওয়ার আগে চার বছর এই বইটি বহন করা আমার জন্য খুব কঠিন একটি কাজ ছিল। এতে আমি ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম এবং তা এখনো আমার ওপর কালো ছায়া ছড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন : ১৯৫৫ সালে আপনি দুটি বই লিখেছেন। দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর এবং মিগেল স্ট্রিট। প্রথম বইটি ১৯৫৭-র আগে এবং গল্পগুলো ১৯৫৯-এর আগে প্রকাশিত হয়নি।
নাইপল : আমার জীবন ছিল বেশ কঠিন। যখন আপনি তরুণ যখন আপনি নিঃস্ব, যখন আপনি আপনার উপস্থিতি পৃথিবীকে জানাতে চান, তখন অপেক্ষার দুবছর অনেক লম্বা সময়। আমাকে সত্যিই অনেক ভুগতে হয়েছে। দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর (এর বাংলা হতে পারে অতীন্দ্রিয় অঙ্গমর্দনকারী) শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে এবং আমার নিজের পত্রিকা (আমি তখন নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় কাজ করি) বইটিকে নাকচ করে দেয়। অক্সফোর্ড থেকে পাশ করা পরবর্তীকালে বেশ খ্যাতিমান একজন এটাকে ঔপনিবেশিক দ্বীপ থেকে আসা কিঞ্চিৎ চাটনি বলে উড়িয়ে দিলেন – এতে কোনো শ্রমের স্বাক্ষর নেই।
সে-সময় বইয়ের আলোচকরা কোনগুলোকে সত্যিকারের বই বলতেন তা দেখাটা কৌতূহলের ব্যাপার। এখন এসব আমাকে বলা অর্থহীন। যাকগে, বইটা তো চল্লিশ বছর ধরে বাজারে আছে এবং এখনো ছাপা হচ্ছে। কিন্তু আমি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি উপেক্ষায় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছি। এখন এ-ধরনের বই সহজেই প্রকাশিত হয় – এজন্যই অভিযোগ করেন। আমি কখনো অভিযোগ করিনি, আমি আমার মতো চালিয়ে গেছি।
প্রশ্ন : আপনি মূলত আত্মবিশ্বাসের বলে টিকে গেছেন?
নাইপল : এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। যখন আমি শিশু ছিলাম, সে-সময় থেকেই আমার বিশ্বাস ছিল আমি চিহ্নিত; আমি আলাদা।
প্রশ্ন : অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরই লিখতে শুরু করেন?
নাইপল : হ্যাঁ। আমি মরিয়া হয়ে একটি বিষয়ের জন্য চারদিকে খোঁজ করছিলাম। এটা খুব হতাশাব্যঞ্জক ছিল, আমি যথেষ্ট নিশ্চিতবোধ করছিলাম না বলে পেনসিল দিয়ে লিখতে শুরু করি। আমার যে-ধারণাটি কাজ করে, তাতে আমার বাবার মতো একটি চরিত্র, যে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে যেসব জিনিসপত্র তাঁকে ঘিরে রেখেছে, সেগুলো দেখছে, ভাবছে এগুলো কেমন করে তাঁর জীবনে এলো। আমি দীর্ঘসময় কোনো ধরনের অনুপ্রেরণা ছাড়াই লিখে গেছি, প্রায় নয় মাস।
প্রশ্ন : আপনি কি প্রতিদিনই লেখেন?
নাইপল : প্রতিদিনই লিখি, কঠোরভাবে এটা বলা যায় না – মন খারাপ থাকলে অনুপ্রাণিত হয়ে আপনি লেখালেখির কাজটা চালাতে পারেন না। আমি একই সঙ্গে আমার লেখার রিভিউয়ার হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কেউ একজন নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকার কাছে আমাকে সুপারিশ করেছিল। তারা আমাকে একটার পর একটা কাজ পাঠাতে থাকে, আমি খুব চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, কিন্তু চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারপর তারা আমাকে জ্যামাইকার ওপর কিছু বই পাঠায়। একসময় চমৎকার সহজ স্বরটি আমার অধিকারে চলে আসে। তার মানে আমার সে-সময়ের কিছু সাফল্য আছে – কেমন করে একটা বই নিয়ে ছোট কিন্তু মজার একটা লেখা দেওয়া যায়, কিংবা কেমন করে বইটিকে পাঠকের কাছে সত্যিই বাস্তব করে তোলা যায় – এসব শিখেছি। শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটি গতি পেয়ে গেল, তারপর সে-গতিতেই চলতে থাকল। আমি প্রতি চার সপ্তাহের তিন সপ্তাহই লেখালেখির জন্য ছেড়ে দিচ্ছি। আমি খুব শিগগির বুঝতে পারি, এটি একটি ভালো বই হতে যাচ্ছে। আমি তখন খুব সন্তুষ্ট, আমি যদিও তরুণ তবু নিজেকে বড় কাজের জন্য প্রতিশ্রুত করাতে পেরেছি – আমি বরং ছোট আকারেই কাজটা শুরু করেছিলাম এবং ভেবেছি নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে পারলে বড় কাজ ধরব। সে-সময় কেউ যদি আমাকে রাস্তায় আটকে দিয়ে বলত, কাজটা বাদ দাও আমি তোমাকে এক মিলিয়ন পাউন্ড দেবো আমি তাকে বলতাম : কেটে পড়ো। আমার বই আমাকে শেষ করতেই হবে।
প্রশ্ন : বইটাকে (অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস) কেমনভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল?
নাইপল : প্রকাশক যখন বইটা পড়লেন তখন থেকেই বইটা ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে বলা যায়। এটা বলতে পারলে ভালো হতো যে, প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বইটি সংগ্রহের জন্য ভিড় লেগে যায় – কিন্তু অবশ্যই সেরকম কিছু হয়নি। এটা বলতে পারলে ভালো হতো বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী দাঁড়িয়ে গেল এবং বইটি পৃথিবীর নজরে পড়ল – অবশ্যই সেরকম কিছু হয়নি। আমার অন্য বইগুলোর পাশে এটা মৃদু টুনটুন শব্দই করল, তবে বইটিকে নিজের পথ করে নিতে অনেকটা সময়ই পার করতে হলো।
গল্প- অতিকায় ডানাওয়ালা এক বুড়ো by গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

দুঃস্বপ্নে আতঙ্কিত পেলাইয়ো স্ত্রী এলিসেন্দার কাছে ছুটে গেল। স্ত্রী তখন অসুস্থ শিশুর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল। পেলাইয়ো তাকে উঠোনের পেছন দিকে নিয়ে এলো। নির্বাক নিস্পন্দন দুজন মানুষ মাটিতে পড়ে থাকা দেহটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার পরনে কাপড়-কুড়ানিদের ছিন্নবেশ। টেকো মাথায় কিছু বিবর্ণ চুলের আভাস তখনো রয়ে গেছে, মুখে অল্প কটি দাঁত, একদা যদি তার প্রপিতামহের মাহাত্ম্য থেকেও থাকে তার দুর্দশাগ্রস্ত ভেজা শরীর তা একেবারেই ম্লান করে দিয়েছে। তার বিশাল বাজডানার অর্ধেক পালক ঝরে গেছে, কাদামাটিতে মাখামাখি, যেন চিরদিনের জন্য মাটিতে গেঁথে গেছে। পেলাইয়ো এবং এলিসেন্দা দীর্ঘ সময় ধরে বুড়োর দিকে তাকিয়ে থেকে তাদের ঘোর কাটালো; একসময় মনে হলো বুড়ো তাদের চেনা। তারা সাহস করে বুড়োর সঙ্গে কথা বলল। বুড়ো দুর্বোধ্য এক আঞ্চলিক ভাষায় নাবিকের জোরালো স্বরে জবাব দিলো। ডানার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে এবার তারা বুদ্ধি খাটিয়ে বের করল বুড়ো আসলে ঝড়ে জাহাজডুবিতে বিচ্ছিন্ন বিদেশি নাবিক। তারপরও তারা প্রতিবেশী এক বৃদ্ধাকে ডেকে আনল। জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে বৃদ্ধা সবই জানে। একবার তার ওপর চোখ পড়লেই ডানাওয়ালা বুড়োকে নিয়ে তাদের যে-বিভ্রান্তি বৃদ্ধা তা কাটিয়ে দিতে পারবে। বৃদ্ধা বললেন, ‘তিনি একজন দেবদূত। নিশ্চয়ই তিনি শিশুটির জন্য এখানে আসছিলেন। কিন্তু বেচারা এতটাই বৃদ্ধ, বৃষ্টি তাকে আছড়ে ফেলে দিলো।’
পরদিন সবাই জানল রক্তমাংসের এক দেবদূত পেলাইয়োর বাড়িতে আটকা পড়েছেন। তাদের প্রতিবেশী সেই জ্ঞানী বৃদ্ধার এই রায়ের কারণে এই দেবদূত বেঁচে গেলেন – তখনকার আমলের ধারণা, এরা হচ্ছেন আধ্যাত্মিক ষড়যন্ত্রের বেঁচে যাওয়া পলাতক প্রাণী, যাদের মুগুরপেটা করে হত্যা করা হতো।
নিজ হাতে পেয়াদার মুগুর তুলে নিয়ে পেলাইয়ো সারা বিকেল রান্নাঘর থেকে তার ওপর চোখ রাখছিল। তবে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তাকে টেনেহিঁচড়ে কাদা থেকে তুলে আনে এবং মুরগির খোঁয়াড়ে মুরগির সঙ্গে তালাবদ্ধ করে রাখে। মধ্যরাতে যখন বৃষ্টি থামে পেলাইয়ো ও এলিসেন্দা তখনো কাঁকড়া মেরে চলেছে। এর কিছুক্ষণ পরই শিশু উঠে বসে, তার গায়ের জ্বর ছেড়ে দেয় এবং সে খেতে চায়। তারা কৃতজ্ঞতার প্রশান্তি অনুভব করল, দেবদূতকে একটি মাচানের ওপর বসিয়ে তার জন্য পানি ও তিনদিন চলার মতো খাবারের জোগান দিলো; ঠিক করল তারপর তাকে নিয়তির কাছে ভরা সাগরে ফেলে আসবে। কিন্তু ভোরের আলো ফুটতেই তারা যখন উঠোনে নামল, দেখল প্রতিবেশীরা মুরগির খোঁয়াড়ের সামনে দেবদূতকে নিয়ে মজা করছে – তার ওপর এতটুকু শ্রদ্ধা তাদের নেই, খোঁয়াড়ের তারের ফাঁক গলিয়ে ভেতরে খাবার ছুড়ে মারছে – যেন তিনি কোনো অতিপ্রাকৃতিক সৃষ্টি নন, কেবল সার্কাসের একটি জন্তু মাত্র।
অদ্ভুত এই খবরটি শুনে ফাদার গনজাগা সকাল ৭টার আগেই এসে হাজির হলেন। ততক্ষণে আরো যেসব দর্শনার্থীর আগমন ঘটল তারা কেউই ভোরের দর্শনার্থীদের মতো এমন চপলচিত্তের নয়। তারা এই বন্দির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের জল্পনা-কল্পনা শুরু করল। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সহজ-সরল তারা ভাবল, এই দেবদূতকে গোটা পৃথিবীর মেয়র ঘোষণা করা উচিত। আর যারা একটু কঠোরমনা তারা মনে করল, ভবিষ্যতের সব যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য তাকে ফাইভ স্টার জেনারেল পদে উন্নীত করা দরকার। যারা ভাবুক ধরনের তারা মনে করল, এই দেবদূতকে আটকে রেখে তাকে দিয়ে জ্ঞানী ও পাখাওয়ালা সন্তান উৎপাদনের কাজে লাগানো যেতে পারে – এই নতুন প্রজন্মের জ্ঞানী মানুষ গোটা বিশ্বের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে। ফাদার গনজাগা পাদ্রি হওয়ার আগে বেশ দশাসই একজন কাঠুরে ছিলেন। খোঁয়াড়ের তারের বাইরে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তিনি দরজা খোলার নির্দেশ দিলেন। ভেতরে একদল বিমুগ্ধ মুরগির মাঝে তাকে হাড়-জিরজিরে অতিকায় একটি মুরগির মতোই মনে হচ্ছিল। তিনি এক কোণে শুয়ে রোদে সকালবেলার দর্শনার্থীদের ছুড়ে দেওয়া ফলের ছালবাকল ও অবশিষ্ট নাশতার মধ্যে তার ছড়ানো ডানা শুকাচ্ছিলেন।
ফাদার গনজাগা যখন মুরগির খোঁয়াড়ে ঢুকে ল্যাটিন ভাষায় তাকে সুপ্রভাত বললেন, পৃথিবীর প্রগল্ভতার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা এই দেবদূত কোনোরকমে তার প্রাচীন চোখদুটো তুলে নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কিছু একটা বিড়বিড় করে তার জবাব দিলেন।
পাদ্রির আওতাধীন উপাসকরা যখন দেখল এই প্রাণী ঐশ্বরিক ভাষা বোঝেন না কিংবা পাদ্রিকে কীভাবে সম্ভাষণ জানাতে হয় তাও জানেন না, তাকে প্রতারক মনে করল। পাদ্রি আরো কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি তো মানুষের মতোই, তার শরীরে লেগে থাকা আবর্জনার অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ, তার পাখার পেছন দিকটাতে প্যারাসাইট গজিয়েছে আর মহাজাগতিক ঝড়ের দাপটে ডানা দুটো কাহিল হয়ে পড়েছে; এসব আঘাতের কারণে কোনো মাপেই তাকে গর্বিত দেবদূতের মতো মনে হচ্ছে না। পাদ্রি মুরগির খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে এসে উৎসাহী দর্শকদের নসিহত করলেন এবং তাদের মূঢ়তার জন্য সতর্ক করে দিলেন। তিনি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিলেন বিচিত্ররূপী শয়তান অসতর্ক মানুষকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করে থাকে। বাজপাখি এবং উড়োজাহাজের পার্থক্য বুঝতে শুধু ডানা দেখাই যথেষ্ট নয়। আর দেবদূত শনাক্ত করার জন্য ডানা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তারপরও তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন বিষয়টি নিয়ে তিনি তার অধিকর্তাকে চিঠি লিখবেন, আর তিনি লিখবেন সুপ্রিম পনটিফের কাছে, সর্বোচ্চ আদালত থেকে এই অতিকায় ডানাওয়ালা বুড়ো সম্পর্কে রায় জানা যাবে।
পাদ্রির জ্ঞানগর্ভ নসিহত কৌতূহলী মানুষের বন্ধ্যা হৃদয় স্পর্শ করতে পারল না। দেবদূত ধরা পড়ার খবরটি এত দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ির উঠোন বাজারে পরিণত হয়ে বাড়িঘর ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। আর তাদের সামাল দিতে বন্দুকের ডগায় বেয়নেট লাগানো সৈন্যদের ডাকতে হলো। বাজারে পরিণত হওয়া আঙিনার ময়লা সাফ করতে গিয়ে এলিসেন্দার শিরদাঁড়া ভেঙে পড়ার অবস্থা। শেষ পর্যন্ত তার মাথায় বুদ্ধি এলো বরং উঠানের চারপাশে বেড়া দিয়ে আটকে দেবে, কেউ দেবদূতকে দেখতে চাইলে পাঁচ সেন্ট দিয়ে তবে ভেতরে যাবে।
বহুদূর থেকে মানুষ আসতে শুরু করল। ভ্রমণে বের হওয়া একটি কার্নিভাল এখানে এসে থামল। তাদের একজন উড়ন্ত বাজিকর কসরত দেখিয়ে দর্শক টানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। কারণ বাজিকরের ডানা দুটো দেবদূতের ডানার মতো নয়, বরং আকাশচারী বাদুড়ের মতো। সবচেয়ে হতভাগ্য পঙ্গু লোকজন সুস্বাস্থ্যের আশায় এখানে জড়ো হলো। সেই শৈশব থেকে হৃদ্যন্ত্রের ধুকপুক গুনতে থাকা এক বৃদ্ধার গোনার মতো সংখ্যা ফুরিয়ে গেছে, সেও এসেছে। পর্তুগিজ লোকটিকে আকাশের তারারা হইচই শব্দ করে বিরক্ত করছে, তারও সমাধান চাই। ঘুমন্ত অবস্থায় হেঁটে বেড়ানো একজন জেগে থাকা অবস্থায় সম্পন্ন করা তার সারাদিনের কাজ লন্ডভন্ড করে দেয়। যেনতেন রোগব্যাধি নিয়েও অনেকেই আসে। জাহাজডুবির পর বিশৃঙ্খল অবস্থা পৃথিবীতে কাঁপন তুলেছে; এত ক্লান্তির মধ্যেও পেলাইয়ো এবং এলিসেন্দা খুব খুশি – কারণ এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তাদের ঘর টাকায় ভরে গেছে আর দেবতীর্থে ঢোকার জন্য অপেক্ষমাণ তীর্থযাত্রীর লাইন ততক্ষণে দিগন্তরেখায় গিয়ে ঠেকেছে।
এই কর্মযজ্ঞে একজনই কেবল নিজের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেননি। তিনি দেবদূত। তেলের বাতির নারকীয় উত্তাপ আর চারপাশে উৎসর্গের মোমের আলোতে বিভ্রান্ত দেবদূত অন্যের আশ্রয়ে যতটা সম্ভব নিজেকে সইয়ে নিচ্ছিলেন। তারা তাকে প্রথমে কর্পূর খাওয়াতে চেষ্টা করল, জ্ঞানী সেই বুড়ি জানিয়েছে দেবদূতদের জন্য খাবার হিসেবে এটাই নির্ধারিত। কিন্তু তিনি এ-খাবার প্রত্যাখ্যান করলেন। ঠিক একইভাবে তিনি প্রায়শ্চিত্তকারীদের আনা গির্জার মধ্যহ্নভোজ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ অবশ্য জানতে পারেনি তিনি বার্ধক্যের কারণে, না দেবদূত হওয়ার কারণে এই খাবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বেগুনের ভর্তা ছাড়া আর কিছুই খেলেন না। এ পর্যন্ত একমাত্র ধৈর্য ছাড়া তার মধ্যে অন্য কোনো অতিপ্রাকৃতিক গুণের প্রকাশ ঘটেনি। বিশেষ করে প্রথম দিনগুলোতে যখন তাকে মুরগি ঠোকর, ডানায় ঢুকে পড়া নাক্ষত্রিক প্যারাসাইট খোঁজা, তার শরীরের বিভিন্ন অংশ স্পর্শ করার জন্য টেনে পালক তুলে ফেলা, তাকে শোয়া অবস্থা থেকে দাঁড় করানোর জন্য এমনকি অত্যন্ত সদয় হয়ে নিক্ষেপ করা পাথর – সবকিছুতে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। কেবল একবারই তারা দেবদূতকে নাড়াতে সমর্থ হয় যখন তপ্ত লোহার শলাকা তার শরীরের একাংশে লাগিয়ে দেয় – তিনি এতটা স্থবির হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চুপ পড়ে ছিলেন যে সবাই ধরে নিয়েছে তিনি মারা গেছেন। তবে শরীরে ঝাঁকি দিয়ে তিনি জেগে ওঠেন, তার তপোবনের ভাষায় কথা বলেন এবং তার চোখে অশ্রুপাত শুরু হয়।
তিনি কয়েকবার তার ডানা ঝাপটান, আর তাতে মুরগির বিষ্ঠা, মহাকাশের ধুলো এবং আতঙ্কের যে ঘূর্ণিপাত হতে থাকে তা নিশ্চয়ই পার্থিব কিছু নয়। অনেকেই তখন মনে করেছে দেবদূতের এই প্রতিক্রিয়া ক্রোধের নয়, বরং যন্ত্রণার আর এরপর থেকে কেউ তাকে উত্ত্যক্ত করতে চেষ্টা করেনি – তাদের অধিকাংশই বুঝতে পেরেছে এই নিষ্ক্রিয়তা সবকিছু মেনে নেওয়ার কারণে নয়, বরং তা ঝঞ্ঝার পর নীরবতার মতো।
ফাদার গনজাগা যখন বন্দির প্রকৃতির সম্পর্কে সর্বোচ্চ মহলের চূড়ান্ত রায়ের প্রতীক্ষা করছেন, জনতার এই খেয়ালিভরা চাপল্যকে কাজের বুয়ার কৌতূহল বলে মেনে নিলেন। পাদ্রির কাছে রোম থেকে যে পত্রটি এসেছে তাতে মনে হলো না বিষয়টি কত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ তা তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন। বন্দির নাভি আছে কি না, তার মুখের ভাষার সঙ্গে আরামায়িক ভাষার যোগাযোগ আছে কিনা, আলপিনের ডগার খোঁচা কবার সহ্য করতে পারেন, বন্দি আসলে ডানাওয়ালা নরওয়েজিয়ান কি না – এসব নিয়ে তারা সময় কাটিয়েছে। এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিঠি চালাচালি চলতেই থাকত যদি না একটি দৈব ঘটনা পাদ্রিদের এসব কীর্তিকলাপের ইতি টানত।
সেই দিনগুলোতে শহরের মেলার একটি বড় আকর্ষণ ছিল মেলায় আসা এক নারী, বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়ায় সে মাকড়সাতে পরিণত হয়। তাকে দেখার জন্য যে দর্শনী নির্ধারণ করা হয় তা দেবদূতের দর্শনীর চেয়ে কেবল কমই নয়, উৎসুক জনতা চাইলে তাকে নারীর এই অসম্ভব রূপান্তর সম্পর্কে যে-কোনো ধরনের প্রশ্ন করতে পারে, যাতে তার এই ভয়াবহ দশা দেখে মনে কোনো সন্দেহ না জাগে সেজন্য উলটেপালটে পরীক্ষা করে দেখতে পারে। ভেড়ার আকৃতির একটি মাকড়সা, মাথায় বসানো বিষণ্ণ এক নারীর মুখ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়টি এই নারীর আকৃতি নয়, বরং তার মুখে এই হতভাগ্য জীবনের বর্ণনা। যখন বলতে গেলে তার শৈশবও কাটেনি অনুমতি না নিয়ে চুপিচুপি বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নাচের আসরে যোগ দিলো। সারারাত নাচানাচির পর যখন বনের মধ্য দিয়ে বাড়ি ফিরে আসছে, আকাশফাটা বজ্রপাত ঘটল আর সেই ফাটা অংশ দিয়ে বিদ্যুৎ ঝলকের সঙ্গে বেরিয়ে আসা গন্ধকের টুকরো গায়ে পড়ে সুন্দর সেই মেয়েটিকে মাকড়সাতে রূপান্তরিত করল। সদয় মানুষেরা তার মুখের দিকে যে মাংসের টুকরো ছিঁড়ে দেয়, তা-ই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার কাহিনিতে যে করুণ মানবিক সত্য ও ভয়ংকর শিক্ষা তা উদ্ধত বন্দি দেবদূতকে পরাস্ত করতে বাধ্য, তিনি তো এমনকি দয়াবশত মর্তের মানুষের দিকে চোখ তুলে তাকান না। তাছাড়া যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটানোর কৃতিত্ব দেবদূতকে দেওয়া হয়েছিল তাতে কিছু মানসিক বিপর্যয়ও ঘটে। যেমন একজন অন্ধের বেলায় দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার বদলে তার তিনটি নতুন দাঁত গজায়; পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন হাঁটার শক্তি ফিরে পাওয়ার বদলে জিতে নেয় লটারি আর কুষ্ঠরোগীর ক্ষতস্থানে বেরিয়ে আসে সূর্যমুখী ফুল। এগুলো অলৌকিক ঘটনার সান্ত্বনার বদলে বরং মজাদার কৌতুক – যখন মাকড়সাতে রূপান্তরিত নারীর আগমন ঘটল দেবদূতের খ্যাতি ধূলিসাৎ হয়ে গেল, মাকড়সা-নারী তাকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করল। এভাবে ফাদার গনজাগা তার অনিদ্রারোগ থেকে একেবারে সেরে উঠলেন আর পেলাইয়োদের বাড়ির উঠান তিনদিনের টানা বৃষ্টি আর শোবার ঘরে কাঁকড়া হাঁটাহাঁটির সময় যেমন জনশূন্য ছিল, ঠিক সে-অবস্থায় ফিরে এলো।
বাড়ির মালিকদের হা-হুতাশ করার আর কোনো কারণ রইল না। যে-টাকা তারা জমিয়েছে তা দিয়ে ব্যালকনি ও বাগানসহ দোতলা প্রাসাদ বানিয়ে ফেলল, চারদিক নেট দিয়ে ঘিরে দিলো যেন শীতকালে বাড়িতে কাঁকড়া ঢুকতে না পারে। জানালায় বসানো হলো লোহার পাত, যেন তা ঠেলে দেবদূত ঢুকতে না পারে। শহরের কাছাকাছি একটি খরগোশের খামার স্থাপন করে পেয়াদার চাকরিটা চিরদিনের মতো ছেড়ে দিলো। আর এলিসেন্দা কিনল উঁচু হিল সাটিনের পাম্প শু, বিচিত্রবর্ণ সিল্কের বহু পোশাক – সেকালের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত নারীরা রোববারে এসব পোশাকই পরত।
মুরগির খোঁয়াড়টার ওপর কারো নজর পড়েনি। তারা যে-ক্রেওলিন দিয়ে ভেতরটা ধুয়ে রাখত, চক্ষুজ্বলা ধূপ দিত, এর কোনোটাই দেবদূতের প্রতি সমীহের কারণে উপচার নয়, বরং গোবরস্তূপের দুর্গন্ধ সরাতে – যে-দুর্গন্ধ ভূতের মতো চারদিক লেপ্টে রেখেছে এবং নতুন বাড়িটাকে পুরনো বাড়িতে পরিণত করেছে। প্রথমে শিশুটি যখন হাঁটতে শিখল সবাই সতর্ক থাকল যেন সে মুরগির খোঁয়াড়ের কাছে না যায়। তারপর ধীরে ধীরে তাদের ভয় কাটতে লাগল, দুর্গন্ধ সহনশীল হয়ে উঠল, দু-নম্বর দাঁতটি উঠতেই শিশুটি খেলার জন্য খোঁয়াড়ে ঢুকতে শুরু করল। খোঁয়াড়ের তারগুলো খুলে খুলে পড়ছে। মর্তের অন্যদের বেলায় দেবদূত যেমন গুরুগম্ভীর ছিল, শিশুটির বেলাতেও এতটুকু ছাড় দেননি, তবে তিনি সব ধরনের যন্ত্রণা ও গঞ্জনা মোহমুক্ত কুকুরের মতো সহ্য করে চলেছেন। দুজনেরই একই সঙ্গে জলবসন্ত হলো। যে-ডাক্তার শিশুটির চিকিৎসা করলেন তিনি দেবদূতের হৃদ্স্পন্দন শোনার লোভ সংবরণ করতে পারলেন না। তিনি তার হৃৎপিন্ডের শোঁ-শোঁ শব্দ শুনলেন, কিডনিতেও বিচিত্র শব্দ; তিনি ধরে নিলেন দেবদূতের পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল দেবদূতের দেহে ডানা লাগানোর যুক্তি – অত্যন্ত প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতোই দেহসংলগ্ন; ডাক্তার বুঝতে পারেন না, তাহলে এরকম ডানা অন্য মানুষেরও নেই কেন।
শিশুটি ততদিনে স্কুলে যেতে শুরু করল; রোদে-বৃষ্টিতে মুরগির খোঁয়াড় ধসে গেল। পথেঘাটের মরণাপন্ন মানুষের মতো দেবদূত নিজের শরীর টেনে এখানে-ওখানে পড়ে রইলেন। ঝাঁটাপেটা করে তারা দেবদূতকে শোবার ঘর থেকে বের করতেই পরক্ষণে দেখা গেল তিনি রান্নাঘরে পড়ে আছেন। মনে হলো তিনি একই সঙ্গে কয়েক জায়গায় অবস্থান করছেন। তারা ভাবতে শুরু করল, তিনি নিজের মতো দেখতে হুবহু একজন দেবদূত সৃষ্টি করতে পারেন – এখন সারা বাড়িজুড়ে তার মতো একেকজন। ধৈর্যচ্যুত ও মুখে লাগামহীন এলিসেন্দা চেঁচিয়ে বলতে শুরু করল, দেবদূতে ভরা এই বাড়ি নরক হয়ে গেছে, এখানে বাস করা অসম্ভব।
দেবদূত খাবার মুখে তুলতে পারছেন না, তার প্রাচীন জোড়াচোখ এতই ঝাপসা হয়ে এসেছে যে তিনি খুঁটিতে খুঁটিতে ধাক্কা খাচ্ছেন। তার আর অবশিষ্ট রয়েছে ডানার কিছু পালক। পেলাইয়ো তার দিকে একটি কম্বল ছুড়ে দেয় এবং শেডের নিচে ঘুমোতে দেওয়ার মতো দয়ালু হয়ে ওঠে। তখনই তারা টের পায় দেবদূত জ্বরে আক্রান্ত। বৃদ্ধ নরওয়েজিয়ানে জিহবা জড়ানো শব্দে প্রলাপ বকছেন। আরো দু-একবারের মতো এবারো তারা আশঙ্কা করল, তিনি মারা যাচ্ছেন। এমনকি প্রতিবেশী জ্ঞানবৃদ্ধাও বলতে পারলেন না মৃত দেবদূতকে নিয়ে কী করতে হবে।
এদিকে দেবদূত কেবল সেই শীতে টিকেই রইলেন না, প্রথম কদিনের রৌদ্রালোকে তার শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতিও ঘটল। উঠানের সবচেয়ে দূরের এক কোণে তিনি কদিন অনড় পড়ে রইলেন, কেউ তাকে দেখতে আসেনি। ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে তার পাখায় কিছু শক্ত পালক গজাতে শুরু করল, কাকতাড়ুয়ার পাখার মতো। দেখে মনে হলো, জরাজীর্ণ আরেকটি মূর্তিমান দুর্ভাগ্য। কিন্তু এ পরিবর্তনের কারণ নিশ্চয়ই দেবদূতের জানা, কারণ তিনি খুব সতর্ক ছিলেন যেন এই পরিবর্তন অন্য কারো চোখে না পড়ে। তারাভরা আকাশের নিচে কখনো কখনো তিনি যে-সাগরসংগীত গেয়েছেন, তা যেন কেউ না শোনে। এক সকালে এলিসেন্দা দুপুরের খাবারের জন্য কয়েকগুচ্ছ পেঁয়াজ কাটছিল, তখন তার মনে হলো গভীর সমুদ্র থেকে একটি ঝোড়ো বাতাস এসে রান্নাঘরের ভেতর বইছে। তখন সে জানালার কাছে গিয়ে দেখল, দেবদূত ওড়ার প্রথম চেষ্টাটি করছেন। কিন্তু প্রচেষ্টাটি এতই অগোছালো যে, তার আঙুলের নখের খামচিতে সবজির বাগানে বলিরেখার দাগ পড়েছে, পাখার দুর্বল ঝাপটায় তার শেডটি ভেঙে পড়ার অবস্থা, তার ঝাপটা ফসকে যাচ্ছে, বাতাসে ভর করতে পারছেন না। তারপরও দেখা গেল দেবদূত বেশ খানিকটা ওপরে উঠে গেছেন। এলিসেন্দা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল – নিজের জন্য, স্বামীর জন্য; অসুস্থ শকুনের মতো ঝুঁকি নিয়ে কোনোভাবে ডানা ঝাপটে বাতাসে ভর দিয়ে যখন তিনি শেষ বাড়িঘরগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে গেলেন, এলিসেন্দা তাকিয়ে রইল। পেঁয়াজকাটার মাঝখানে এলিসেন্দা তাকে উড়ে যেতে দেখছে যতক্ষণ তাকে দেখা যায় – কারণ দেবদূত আর কখনো তার জীবনে বিরক্তি সৃষ্টি করবে না, বরং দিগন্তবিস্তৃত সাগরের ওপর একটি কল্পবিন্দু হিসেবে রয়ে যাবে।
Wednesday, December 11, 2024
ড. মোমেনকে চেয়ারম্যান করে দুদক গঠন
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদের সই করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (২০০৪ সনের ৫ নম্বর আইন)-এর ৬(১) ধারার বিধান অনুসারে তাদেরকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। এর মধ্যে দুদক আইন, ২০০৪-এর ৫(১) ধারার বিধান মতে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনকে কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হলো। নিয়োগকৃতদের মধ্যে চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের বেতন, ভাতা, অন্যান্য সুবিধা ও পদমর্যাদা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারকের এবং কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদের বেতন, ভাতা, অন্যান্য সুবিধা ও পদমর্যাদা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারকের সমরূপ হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) সহকারী একান্ত সচিব ও পরিচালক, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক, কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক, ঢাকার জেলা প্রশাসক, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক, অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক, বিআরটিএর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিমানের এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুগ্মসচিব থাকার সময় ২০০৯ সালে আবদুল মোমেনকে ওএসডি করে আওয়ামী লীগ সরকার। পরে ২০১৩ সালের ৬ই জুন তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
তার জন্ম ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৫৭। বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ড. মোমেনের লেখক নাম আন্দালিব রাশদী। তিনি সরকারি চাকরির পাশাপাশি লেখালেখিতেও বেশ সমাদৃত। প্রধানত কথাসাহিত্যিক; পাশাপাশি প্রবন্ধ লিখেন, অনুবাদ করেন, কলাম লিখেন, শিল্পকলা বিষয়ক লেখালেখিও করে থাকেন। এ ছাড়াও কিশোর সাহিত্যে রয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এ পর্যন্ত তার শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে।
গত ২৯শে অক্টোবর মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশনের অবসান হয়। সেদিন দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক ও কমিশনার মোছা. আছিয়া খাতুন (অনুসন্ধান) পদত্যাগ করেন। ৩১শে অক্টোবর তাদের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। গত ১০ই নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ৫ সদস্যের দুদক পুনর্গঠনে সার্চ কমিটি গঠন করে সরকার। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠিত হয়। কমিটির অপর সদস্যরা ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নূরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম ও অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন।

Saturday, July 6, 2024
মুক্তিযুদ্ধের গল্প- খুকী by আন্দালিব রাশদী
![]() |
| অলংকরণ: মাসুক হেলাল |
খুব নোংরা একটা কথা হজম করতে হলো মাকে। এমন ধিঙ্গি মেয়েটাকে ছাতার মাথা কী পড়াচ্ছ—মেয়ে কবে জজ-ব্যারিস্টার হবে তারপর ভাড়ার টাকা শোধ করবে! ধিঙ্গিটার পেছনে যে টাকা খরচ করো, সেটা বন্ধ রাখলেও এক মাসের ভাড়া শোধ করতে পারতে। বরং রাস্তায় নামিয়ে দাও, প্রতি রাতে পাঁচ-দশ টাকা তো কামাবে। এ রকম মেয়ের রেট ভালো।
এমন চাপের মুখে আমার মায়ের চোখ ছলছল করতে থাকে।
আমিই এগিয়ে গিয়ে বলি, খালাম্মা, দু-এক দিনের মধ্যে টাকা দিয়ে দেব, বাবা আমাদের গ্রামের একটা জমি বেচতে গেছেন।
আমার কথায় তিনি আরও চটে গিয়ে বললেন, পাছার নাই ছাল, কোন জমিদারের...(কথাটা ছালের সঙ্গে মিল দিয়ে বলা, কিন্তু লেখা যাবে না, সমস্যা আছে)!
তিনি দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, নামের কী বাহার। জান্নাতুল ফেরদৌস। এমন পাইলা-কালা গায়ের রঙের মেয়ে তো জাহান্নামেও খুঁজে পাওয়া যাবে না—তার নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। আবার গানও গায়। গত মাসেই তো বলেছি, প্যাঁ-পো করার যন্ত্রটা বেচে দিলেও ভাড়ার টাকা শোধ করা যায়। নাকি ভুল বললাম?
তিনি আমাদের উঠানে একদলা থুতু ফেলে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ৩১ তারিখের মধ্যে ভাড়া শোধ না করতে পারলে তোদের সবার নেংটি খুলে রাস্তায় বের করে দেব।
তাঁর ক্ষোভ আমার প্যাঁ-পো করার যন্ত্র হারমোনিয়ামটার ওপর। তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের পরিমল স্যারের এক কাঁধে ঝোলা সব সময়ই থাকত, পায়ে জুতো-স্যান্ডেল কেউ দেখেনি, ভারী হারমোনিয়ামটা অন্য কাঁধে নিয়ে আমাদের বাসায় এলেন। বাসা মানে ভাড়া বাসাটা—রাজাবাজার মসজিদ থেকে খানিকটা উত্তরে গিয়ে একটা পাকা কবরের পাশ দিয়ে পশ্চিমে।
পরিমল স্যার বললেন, তোর গানের গলা ভালো। এটা দিলাম। আমি যে এনেছি, আমার টাকাপয়সা লাগেনি। এক ছাত্রীর বাড়িতে দেখলাম যন্ত্রটা ধুলোতে ঢাকা পড়ে আছে। বললাম, নিই। ছাত্রীর মা বলল, আচ্ছা।
আমি সত্তরে সেকেন্ড ডিভিশনে স্কুল ফাইনাল পাস করেছি, পাঁচ শ আশি। ফিফটি এইট পার্সেন্ট। আমরা বলি হায়ার সেকেন্ড ক্লাস। স্কুলের নাম নাজনীন হাইস্কুল, আমি ছিলাম মর্নিং শিফটে।
হেসেখেলে ইডেন কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। কিন্তু ক্লাসের দেখা নেই। একটা কিছু চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চূড়ান্ত মানে—ক্ষমতা যাবে শেখ সাহেবের হাতে।
মা বাবাকে বললেন, অবশ্য খুকীর গায়ের যে রং, কে বিয়ে করবে? আর আপনারও তো এমন কোনো রাজত্ব নেই জামাইকে অর্ধেক রাজত্বের জায়গিরদার বানিয়ে রাখবেন। ঘরে একটা বাড়তি রুমও নেই যে ঘরজামাই করবেন।
বাবা বলেন, সবুর করো, টিয়া। যার পাঁজরের হাড় দিয়ে আমার খুকী তৈরি হয়েছে, তাকে তো আসতে হবে। আদমের হাড়ে হাওয়া। আমার হাড়ে টিয়া।
আপনার পাঁজরে কয়টা হাড়? আমার বোন ময়নাকে দিলেন, আমি পেলাম। আমাকেও জিনের আছরের কথা বলে পাগল বানিয়ে বাড়িছাড়া করবেন? আধা হাত লম্বা ঝামা লোহার গজাল গনগনে আগুনে লাল করে আপনার চোখের মণি বরাবর ঢুকিয়ে দেব।
আমার মায়ের নাম ময়না, তার গায়ের রং ছিল কালো। তিনি আমার বাবা শহিদুল্লাহ মিয়ার প্রথম স্ত্রী। আমি মায়ের গায়ের রংটা পেয়েছি। আমার বয়স দুই ছোঁয়ার আগেই আমার মায়ের ওপর জিনের আছর হয়। মাথার কাপড় ফেলে গলা ছেড়ে গান ধরে। মাথায় আউলা লেগে যায়, স্বামীর গালে চড় মারে, ইমাম সাহেবের পড়া-পানি ফেলে দেয়, ব্লাউজ খুলে শাড়ি ছেড়ে দেয়। হুজুরের পরামর্শে জং ধরা শিকলে মাকে বেঁধে রাখা হয়। শিকল নিয়েও মা গান ধরে: ‘নিসাধামাপানিসারেগা/গারে পাখি গা/সোনার খাঁচা দেব, সোনার শেকল দেব সোনায় ভরিয়ে দেব গা।’
মাথাটা যখন আরও আউলে যায়, অমাবস্যার রাতে সবার অলক্ষ্যে আমার মা শিকলসহ ঘর ছাড়ে। অনেক খোঁজখবর করা হয়েছে, ভালোমন্দ কোনো সংবাদই আসেনি।
কালো মেয়ে গছিয়ে দিয়ে শহিদুল্লাহকে ঠকানো হয়েছে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ফরসা মেয়ে টিয়াকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই টিয়াও তিন ছেলে এক মেয়ের মা।
স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমি একবার গেয়েছিলাম লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া একটি গান: ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে/আমার নয়ন দুটি শুধুই তোমারে চাহে/ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে...।’
হারমোনিয়াম বাজিয়েছিলেন লুবনা ম্যাডাম। গান শেষ হতেই যখন ওয়ান মোর ওয়ান মোর রব উঠেছিল, তখন গেয়েছিলাম রেডিওতে শোনা গান: ‘আকাশের ওই মিটিমিটি তারার সাথে কইব কথা/নাই বা তুমি এলে...।’
পরিমল স্যারও নিশ্চয়ই আমার গান শুনেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাড়িতে হারমোনিয়াম আছে? বাজাতে পারো?
আমার দুটো জবাবই না।
পরদিনই এক কাঁধে উঠিয়ে হারমোনিয়ামটা আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন।
-----২.-----
গ্রামের বাড়ি থেকে বাবা খালি হাতে ফিরে এসেছেন। জমি বেচতে পারেননি, মানুষের হাতে তেমন পয়সাকড়ি নেই। তিনি নিজেও চাকরিতে নেই তিন মাস ধরে। সাসপেন্ডেড। তাঁকেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে কবে শেখ সাহেব টেক-ওভার করবেন, তার আগে ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বাড়িওয়ালার স্ত্রী শাসিয়ে গেলেন বাবাকে, বেশ্যা মেয়েটাকে আমার মহসিনের পেছন লেলিয়ে দিয়েছেন নাকি?
বাড়িভাড়া বকেয়া না থাকলে আমিই কথা শুনিয়ে দিতাম। মহসিন তো মেট্রিকই পাস করেনি। অশিক্ষিত গুন্ডা। তেজগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে চুরি-রাহাজানির মামলাও আছে। তার চেহারাও যেমন, বাম চোখটা ট্যারা, গালে চাপাতির কোপের দাগ।
একদিন বাইরে থেকে জানালার পর্দা উঠিয়ে মহসিন বলল, গলা তো ভালোই। কুসুম গরম পানিতে খাঁটি মধু মিশাইয়া খাইবা।
আমি থ হয়ে গুন্ডাটার দিকে তাকিয়ে থাকি। এত কিছু জানে!
গুন্ডা বলে, কেউ কিছু কইলে আমারে জানাইবা, তার মায়রে বাপ, মাছ মার্কা চাক্কু দিয়া পেট ফাসাইয়া দিমু।
পরদিন জানালার পর্দা সরিয়ে আধসেরি বোতলের এক বোতল মধু টেবিলের ওপর রেখে বলে, খাঁটি মধু, সর্ষে ফুলের।
একদিন গুন্ডাটা নাজনীন স্কুলের সামনে আমাকে আটকে হাতে একটা ছোট খাম ধরিয়ে দিলে কাঁপতে থাকে আমার হাত-পা। আমি জানি ভেতরে নোংরা চিঠি আছে, ও তো আজেবাজে কথা বলে, মেয়েদের শরীরের গোপন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ছবিও এঁকেছে নিশ্চয়ই। ছেলেরা বদমাশই হয়।
সম্বোধনহীন একটা চিঠি:
মাকে ঠান্ডা করতে ২০০ টাকা দিলাম। তিন মাসের ১৮০ টাকা দিয়ো। ২০ টাকা তোমার। তোমার মা-বাবাকে বলবে, পরিমল স্যার দিয়েছেন। এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে তিন চামচ মধু, প্রতিদিন খাবে।
আমি বাবার হাতে পুরো ২০০-ই দিই, পরিমল স্যার দিয়েছেন। আত্মসম্মানে লাগলেও বাড়িওয়ালার স্ত্রীর চেহারা মনে করে টাকাটা হাতে নিয়ে বাবা বললেন, পরিমলবাবুকে বলিস মাস দুয়েক পর দিয়ে দেব।
পঁচিশের রাতে অবিরাম গোলাগুলি ও গনগনে আগুনে ঢাকা শহরের চেহারা বদলে গেল। মানুষ পালাচ্ছে। যুবকেরা গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, তরুণী শিকার হচ্ছে ধর্ষণের।
মার্চের ২৭ তারিখে যখন কারফিউ শিথিল হলো, বাবা সবাইকে গ্রামে রেখে আসতে চাইলেন। আমি গো ধরি, যাব না।
আমি বলি, আমার মতো এমন কালো মেয়েকে কেউ ছুঁয়েও দেখবে না, পাকিস্তানি আর্মিও না।
আমার গোঁয়ার্তুমির কাছে বাবা পরাস্ত হলেন। গ্রামে তাঁর একটা ভিটে ছাড়া আর কিছুই নেই, জমিজমাও না। বেঁচে থাকতে হলে তো কিছুই কামাই লাগবে, গ্রামে কে খাওয়াবে?
গুন্ডাটা বাবাকে শোনায় আশার বাণী: কার কত বড় বুকের পাটা, মহসিনের বাড়িতে এসে মেয়েমানুষের গায়ে হাত দেয়! হাত কাইটা পেটের ভেতর ঢুকাইয়া দিমু।
২৮ মার্চ মতিঝিলের আল্লাওয়ালা বিল্ডিংয়ে ভীরু পায়ে নিজের অফিসে ঢুকে বাবা শোনেন অবাঙালি বস গতকালই তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, বকেয়া বেতন দেওয়ার আদেশ হয়েছে।
থমথমে ঢাকা শহরে খালি পায়ে হাঁটা পরিমলবাবুকে সামনে পেয়ে বাবা বললেন, মে মাসে আপনার টাকাটা শোধ করে দেব।
বিদঘুটে শব্দ করে তিনি বললেন, কিসের টাকা?
কথা না বাড়িয়ে বাবা বাড়ি ফিরে এলেন।
-----৩.-----
জানালার পর্দা তুলে ট্যারা মহসিন একবার বলল, সময় খারাপ। সময় ভালো হইলে এই গানটা গাইবা, বুঝলা—এই গানটা আমার। একটা চিরকুট ছুড়ে দিয়ে গুন্ডাটা চলে যায়।
আমি ভাঁজ খুলে একটি পুরো গানই পাই। গানের মুখটা এমন: ‘তুমি সুন্দর যদি নাহি হও/বলো কি বা তাতে যায় আসে/প্রিয়ার কি রূপ সেই জানে/ওগো যে কখনো ভালোবাসে।’
আমার শরীরের সব প্রাণশক্তি শুষে নেয় ওই ট্যারা মহসিন গুন্ডা। আমি ‘না’ বলতে পারি না, মাথা তুলে পারি না দাঁড়াতে, তার ইশারার দাসানুদাস হয়ে পড়ি।
শেষ পর্যন্ত গুন্ডাটার সঙ্গে আমি এক রিকশায়। সোজা লালবাগ—কাজি অফিস।
কাজি সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কত টাকার কাবিন সাব্যস্ত?
বিড়বিড় করে বললাম, আমি কাবিনের টাকা চাই না।
আহাম্মক আওরাত! অন্তত ১০ হাজার টাকা তো বলবে।
মহসিন বলল, কিসের ১০ হাজার? লিখখ্যা দেন এক লক্ষ এক টাকা।
এর নামই না মর্দ, আলহামদুলিল্লাহ।
ফেরার পথে হুড ওঠানো রিকশায় আমার হাত ধরে রাখে গুন্ডাটা। বাসা থেকে খানিকটা দূরে যখন রিকশা থেকে নামি, আমার হাতে একমুঠো টাকা গুঁজে দেয় মহসিন। মিষ্টি করে শুদ্ধ ভাষায় বলে, এখন থেকে তোমার ভরণপোষণের সব দায়িত্ব আমার।
কায়েদে আজমের ছবিওয়ালা বড় নোট। এক দুই তিন...আঠারো। এত টাকা!
হাবিব ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট করে ফেল।
টাকা লাগবে না। দরকার হলে আমি চেয়েই নেব।
আবারও মহসিনের গলা, দেশের অবস্থা তো দেখছই, কে কোথায় ছিটকে পড়বে কেউ জানে না। তোমার অ্যাকাউন্টে আমিও কিছু টাকা রাখব। সামনে খরচ বাড়বে না—বাচ্চাকাচ্চার পেছনে অনেক খরচ।
আমি মুচকি হাসি, স্ত্রীর হাত ধরে রিকশায় কিছুক্ষণ বসে থাকলেই কারও স্ত্রী প্রেগন্যান্ট হয় নাকি। আমি গার্হস্থ্যবিজ্ঞানও পড়েছি, অনেক কিছুই আমি জানি। গুন্ডাপান্ডারা কি মেয়েদের কিডন্যাপ করে শুধু হাত ধরে বসে থাকে নাকি?
আমি জিজ্ঞেস করি, টাকা পেলেন কোথায়?
পরিমল স্যার দিয়েছেন।
ধ্যাত! আমি খুকী, তবে কচি খুকী নই।
ট্যারা মহসিন সেদিন লালবাগ কাজি অফিসে যাওয়ার পথে আমার হাতে একটা ভারী আংটিও দিয়েছিল। বলেছে, পরার দরকার নেই, কোথাও লুকিয়ে রেখো। আরও অলংকার আছে, পরে পাবে।
-----৪.-----
তেজগাঁও থানার পুলিশ মধ্যরাতে বাড়িওয়ালার বাসাটা ঘিরে ফেলল। কাজ হলো না, সে রাতে মহসিন বাড়িতেই ফেরেনি। শুনলাম অবাঙালি মালিকের প্লাটিনাম জুয়েলার্স লুট হয়েছে। সেই লুটতরাজে মহসিনও ছিল।
আংটিটা তাহলে প্লাটিনাম জুয়েলার্স থেকে লুট করা।
মহসিনকে পায়নি পুলিশ, তন্ন তন্ন করে খুঁজে পায়নি একরত্তি স্বর্ণালংকারও। পরে বাড়িওয়ালাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করেছে।
নিরুদ্দিষ্ট মহসিন গুন্ডার একটি চিঠি, লেখা হয়েছে ১৯৭১-এর ১১ মে। আর আমার হাতে চিঠিটি এসে পৌঁছেছে ২২ জুন, ১৯৭১। ডাকেই এসেছে।
আজ বর্ডার পার হচ্ছি। মুক্তিতে যোগ দেব। পুলিশের বাচ্চারা বাড়িতে এক তোলা অলংকারও খুঁজে পাবে না। ফিরে এসে তোমাকে দেব। একটা ভুল করে ফেলেছি—আসার আগে যেভাবে হোক তোমার কাছে আমার একটা বাচ্চার বীজ রেখে আসলে পারতাম। ফিরে এসে দেখতাম বাচ্চাটা খিলখিল করে হাসছে। হাবিব ব্যাংকে তোমার অ্যাকাউন্টে আরও তেরো শ টাকা জমা রেখে এসেছি। পরের চিঠিতে ঠিকানা জানাব।
এটুকুই। ভালোবাসা জেনো, আমার চুমু রইল—এ রকম একটা কথাও নেই। কাকে লিখছে, কে লিখছে, চিঠি পড়ে বোঝার উপায় নেই। কেবল খামের ওপর জান্নাতুল ফেরদৌস খুকী। পোস্ট অফিসের সিল এমনই লেপ্টে গেছে যে বোঝার উপায় নেই কোত্থেকে পোস্ট করা।
সেদিন রাতেই রাজাবাজারে ঢোকে আর্মি। আমবাগানে একটা তাঁবুও ফেলে। পরদিন বাবা সব ব্যবস্থা করে তবেই বাসায় এসেছেন। সন্ধ্যার দিকে একটা পুরোনো উইলি জিপে চাপাচাপি করে বসি আমরা। সঙ্গে আরও একটি পরিবার। রাস্তায় মিলিটারি টহল। রাত ১০টা নাগাদ পার হই ডেমরা ফেরি, তারপর কিছুটা হেঁটে, কিছুটা রিকশায়, কিছুটা পথ নৌকায়—প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর গ্রামের বাড়িতে।
আমি আমার মহসিন গুন্ডার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। শুরু হয় আমাদের এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ছোটাছুটি। কখনো শুনতে পাই, মিলিটারি আসছে, আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, গুলি করে মেরেছে, বেইজ্জতি করেছে। রাতের বেলা রেডিওতে শুনি: ভোমা ভোমা খান সেনারা মুক্তিবাহিনীর গাব্বুর মাইরে যেখানে-সেখানে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলাইতাছে।
মহসিন গুন্ডা কী লিখেছিল? চিঠিটা আমি আনতে ভুল করিনি। ছি ছি ছি। এ কথাটা তো চুমোর চেয়েও বেশি লজ্জার। আমার কাছে মহসিন গুন্ডা একটা বাচ্চার বীজ রেখে যেতে চেয়েছে। কেমন করে?
বারবার এই একটি পঙ্ক্তি পড়তে পড়তে আমি আবিষ্কার করি, আমার পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেছে, বমি ধরে রাখতে পারছি না, সবার কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছি আমি। আমার পেট ফুলে উঠছে, গুন্ডার বাচ্চা আমার পেটে হাত-পা ছুড়ছে, দ্রুত বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সীমান্তে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ। শব্দ এতই ভয়ংকর যে মনে হয় আকাশ ভেঙে পড়ছে। আমি নিজেকে বোঝাই, বাচ্চা এত দ্রুত বেড়ে ওঠে না। সময় লাগে, অন্তত নয় মাস।
আমি মেনে নিই—আচ্ছা, ঠিক আছে। নয় মাসই।
পেটের ভেতর গুন্ডার বাচ্চা পুষতে পুষতে দেশটা স্বাধীন হয়ে গেল। আমার আর দেরি সইছে না। বাচ্চাটা এখনই হোক, নতুবা সে তো ফিরে এসে খিলখিল করে হাসতে থাকা বাচ্চার দেখা পাবে না।
আমার নিজের ভেতরের একজন ডাক্তার বলে, খুকী, এখনই না। তাহলে বেবিটা প্রিম্যাচিউর হবে।
------৫.------
ডিসেম্বরের ২১ তারিখ আমরা ঢাকা শহরে ফিরে আসি। বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসছে। আমাদের বাসা লুট হয়েছে। পরিমল স্যারের হারমোনিয়ামটা নেই। গত অক্টোবরে বাড়িওয়ালাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, নভেম্বরের তিন তারিখে তাঁর মৃতদেহ ফিরিয়ে দেওয়ার সময় বলে গেছে, তোমাদের ভাগ্য ভালো তাই ফিরিয়ে দিলাম।
২১, ২২, ২৩...৩১ ডিসেম্বর পেরিয়ে গেল। মহসিন গুন্ডার ফেরার নাম নেই। বাহাত্তরের প্রথম দিকে গুন্ডার মা আচম্বিতে আমাকে আক্রমণ করে বসলেন, চুল ধরে টেনে মেঝেতে ফেলে দিলেন, বল হারামজাদি, মহসিন কোথায়?
দুই হাতে আমার পেট চেপে ধরি। আমাকে যা ইচ্ছে করুক, আমার গুন্ডার বাচ্চাটার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
হঠাৎ তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। এরপর একদিন এক মুক্তি এসে জানিয়ে গেল, কসবার যুদ্ধে মহসিন নিহত। কেল্লাপাথরে অনেককে সমাহিত করা সম্ভব হলেও মহসিনের লাশটি রয়ে যায় আর্মির দখলে। মহসিনসহ আরও দুজন নিষ্প্রাণ তরুণকে সালদা নদীতে ফেলে দেয় তারা।
সে রাতে গর্ভের সন্তানকে দেখি আমি—ওই গুন্ডাটার মতোই দেখতে, গালে লম্বা একটা দাগ, বাঁ চোখটা একটু ট্যারা। পেটের ভেতর বাচ্চার এখন কয় মাস? স্ফীত পেট নিয়ে চলতে আমার কষ্ট হয়। বাচ্চা ক্রমেই বেড়ে উঠছে। আমি চিৎকার করে কাঁদছি, আমার গর্ভের পানি ভেঙে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ডেলিভারি করাও। কেউ আমার কথা শোনে না। বছরের পর বছর একটা বাচ্চা পেটের ভেতর বয়ে বেড়াই আমি। আমার বাচ্চা আর খালাস হয় না।
-----৬.-----
কিন্তু খুকী প্রেগন্যান্ট কখন হলো?
ওই যে লালবাগ কাজি অফিসের পথে, রিকশায়।
ধ্যাত, ও তো শুধু হাত ধরে বসেছিল।
তা হোক, গুন্ডাপান্ডাদের বিশ্বাস নেই।
Friday, February 18, 2022
দুর্বিনীত কথাসাহিত্যিক ভি এস নাইপল by আন্দালিব রাশদী

স্বদেশবিদ্বেষী, পরদেশবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী, স্ত্রীবিদ্বেষী (অন্তত স্ত্রী প্যাট্রিসিয়ার মৃত্যু তাঁর নির্মমতার প্রমাণ দেয়), কালো মানুষবিদ্বেষী, সাদা মানুষবিদ্বেষী, নিজ আমলের এবং আগের আমলের লেখকবিদ্বেষী, ইসলামবিদ্বেষী, খ্রিষ্টানবিদ্বেষী, হিন্দুবিদ্বেষী, এমন কোনো অঙ্গন নেই, যেখানে নাইপলের বিদ্বেষের বাষ্প লাগেনি।
তারপরও তিনি প্রিয় লেখক। নাইপল ঢাকা এসেছিলেন সাহিত্য-উৎসবে, মাতিয়ে গেছেন। তিনি নিজের পরিচিতি-সংকটের কথা বলেছেন : ‘ইংল্যান্ডে আমি ইংরেজ নই, ভারতে ভারতীয় নই।’ তিনি অবিরাম বৈরিতা সৃষ্টি করে গেছেন, বন্ধুকে শত্রুতে পরিণত করেছেন।
আমি মুগ্ধ হয়ে একসময় ভি এস নাইপল পড়েছি। ১৯৭৬-এ আমার অনুবাদে নাইপলের মিগুয়েল স্ট্রিটের একটি অনুচ্ছেদ ‘ম্যানম্যান’ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে এবং বাংলা ভাষায় সম্ভবত এটিই প্রথম প্রকাশিত নাইপল।
নাইপলের অনেক সমালোচনা করা হলেও প্রয়াত এই লেখককে শ্রদ্ধা জানাতেই এই নিবন্ধ।
ভি এস নাইপল কে?
ভি এস নাইপল কে তা বোঝার জন্য তাঁর নিজের কিছু কথা উদ্ধৃত করছি :
‘আমি সবসময়ই জানতাম আমি কে। কোথা থেকে এসেছি। আমি নিজের জন্য কখনো অন্যের জমির খোঁজ করিনি।’
‘লেখক হতে হলে তোমাকে পৃথিবীর পথে বেরোতে হবে, পৃথিবীতে ঝুঁকি নিতে হবে, পৃথিবীতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে হবে, পৃথিবীর খোঁজে বেরোতে হবে। বয়স বেড়ে গেলে কাজটা কঠিন হয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষের বেলায় মানুষের দিনগুলো ছোট, তখন বাইরে যাওয়া ও বাইরের পৃথিবীতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’
‘পৃথিবীর ব্যাপারে বিষাদময় বিষয়টি হচ্ছে এটি শুধু আহাম্মকে পরিপূর্ণ। আর আহাম্মকজন ও সাধারণজনের লাভের জন্য পৃথিবী পরিচালিত হয়ে থাকে।’
পাঠক-পছন্দ লেখক হলেও ঔদ্ধত্য, দুর্বিনীত আচরণ এবং কখনো কখনো একপেশে মন্তব্যের জন্য সমালোচকের অনুগ্রহ তিনি তেমন পাননি। মূলত ফিকশন লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এবং প্রতিষ্ঠিত। বুকার ও নোবেল পুরস্কার লাভ করলেও বেশি আলোচিত হয়েছে তাঁর নন-ফিকশন।
বিভিন্ন রূঢ় মন্তব্যের কারণে বরাবরই আলোচনায় ছিলেন। এমনকি মৃত্যুর পরও লেখা হয়েছে ‘নাইপল কাউকেই ছাড় দেননি – ঔপনিবেশিক শাসককেও না, উপনিবেশে শাসিত প্রজাদেরও না।’
নয়/এগারো-পরবর্তী রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নোবেল কমিটিকে সম্ভবত খুব স্পর্শ করেনি। নতুবা ফিলিপ হেনশার যা বলেছেন তার মানে, ইসলাম-নিন্দার অ্যামাং দ্য বিলিভার্সের লেখকের ব্যাপারে তাঁদের সতর্ক হওয়ারই কথা ছিল। ২০০১ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী বিদিয়াধর সুরজপ্রসাদ নাইপল ১৭ আগস্ট, ১৯৩২ গ্রামীণ ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাস গ্রামে একটি দরিদ্র হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পেরসাদ নাইপল, মা দ্রোয়াপতি; পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। ১৮৮০-র দশকে তাঁর পিতামহ-পিতামহী ভারত থেকে ত্রিনিদাদের আখক্ষেতের ঠিকা শ্রমিক হিসেবে দেশান্তরি হন; তখন দাসপ্রথা অবলুপ্ত হতে চলেছে; আখচাষের জন্য
সস্তা শ্রমিক আনা সে-সময় অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। নাইপলের বাবা পেরসাদ সাংবাদিকতা করতেন, তাঁর খানিকটা সাহিত্যের উচ্চাশাও ছিল। ১৯২৯-এ তিনি ত্রিনিদাদ গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি চাগুয়ানাস প্রতিনিধির দায়িত্বও পান। নাইপলের পিতামহ, তাঁর দাবি অনুযায়ী, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারে ধর্মানুরাগ অন্তর্হিত হয়, এমনকি তাঁরা ধীরে ধীরে ভারতীয় ভাষা থেকেও সরে যান। শেষদিকে নাইপলের মায়ের ব্যবহৃত একমাত্র ভারতীয় শব্দ ছিল ‘বেটা’। সবাই স্থানীয় ইংরেজিতে ধাতস্থ হয়ে ওঠেন। নাইপল যখন সাত, পরিবারটি চাগুয়ানাসের গ্রাম ছেড়ে ত্রিনিদাদের রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে চলে আসে, নাইপল সেখানকার ব্রিটিশ মডেলে স্থাপিত কুইন্স রয়াল কলেজ থেকে পাশ করেন এবং তিনি ঔপনিবেশিক এই স্বপ্নহীন পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন এবং সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে চলে যান।
১৯৫৫ সালের গ্রীষ্মের এক অপরাহ্ণে নাইপল লিখে ফেললেন ‘বোগার্ট’ – মিগুয়েল স্ট্রিটের প্রথম এপিসোড। সতেরোটি এপিসোডের সমন্বয়ে মিগুয়েল স্ট্রিট। তখনই প্রকাশ করতে সম্মত হলেন না প্রকাশক। তাঁর আশংকা – অপরিচিত ক্যারিবিয়ান লেখকের বই যদি বিক্রি না হয়। প্রকাশক তাঁকে উপন্যাস লিখতে বললেন। ১৯৫৫-র শরতে তিনি লিখলেন দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর – এর মানে হতে পারে অতীন্দ্রিয় অঙ্গমর্দনকারী। ৮ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ প্রকাশক উপন্যাস প্রকাশের জন্য গ্রহণ করলেন, নাইপল পেলেন একশ পঁচিশ পাউন্ড। নাইপল দশ-এগারো বছর বয়স থেকেই জানতেন তিনি লেখকই হবেন।
তিনি লেখকই হয়েছেন। উপনিবেশ থেকে শাসকের রাজ্যে উঠে এসে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছেন, নোবেল প্রাইজ জিতেছেন, নাইটহুড পেয়েছেন; বহু মানুষের অপছন্দের লেখক হওয়ার পরও ঈর্ষণীয় পাঠক-ভাগ্য তাঁর।
কিন্তু তিনি বলেছেন, ‘আমার বই কে পড়বে আর কে পড়বে না এই সমস্যা নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি। যদি ভাবতাম তাহলে সম্ভবত লেখালেখি ছেড়ে দিতাম। আমি ব্যাপারটাকে এভাবে কখনো দেখিনি, আমি সাহিত্যের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করেছি। আমি বিশ্বাস করেছি কেউ যদি লেখেন এবং তা যদি ভালো লেখা হয় তাহলে তার পাঠক থাকবেই।’
লেখকদের চোখে নাইপল
ভি এস নাইপল কেমন লেখক?
একদা প্রিয় বন্ধু পল থুরো নাইপলের সঙ্গে বন্ধুত্বে চিড় ধরার আগে লিখেছেন : তিনিই সম্ভবত একমাত্র লেখক যার ওপর প্রভাবের কোনো প্রতিধ্বনি নেই।
এ-সম্পর্কে নাইপলের নিজের কথা, ‘আমি একটি ছোট সমাজ থেকে এসেছি; আমি সচেতন ছিলাম যে, আমার ওপর এই পৃথিবীতে কোনো প্রভাব নেই। আমি প্রভাব থেকে দূরে। আর আমার অবস্থান একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে, আমি সেখান থেকে সরে যাই, হয়ে যাই বিদেশি, লেখক হয়ে যাই – সরাসরি সম্পর্কিত থাকা থেকে আমি কতটা প্রত্যাহৃত দেখতেই পাচ্ছেন।’
এডওয়ার্ড সায়ীদ নাইপলকে অভিযুক্ত করেছেন কারণ তিনি অযৌক্তিক ব্যাখ্যায় প্রাচ্যের সংস্কৃতিকে আদিম, বর্বর এবং অশিক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; আফ্রিকা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জেনে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করার ভান করেছেন, প্রাচ্যের মূল্যায়ন করেছেন।
এভলিন ওয়াফ একবার বলেছিলেন, ‘নাইপলের গদ্য তাঁর সমকালীন ব্রিটিশদের লজ্জা দেয়।’ এভলিনের মতো কাঠখোট্টা লেখক-সমালোচকের মুখে এটি একটি অসাধারণ প্রশংসা।
ভারতীয় খুশবন্ত সিং লিখেছেন, ‘নাইপল তাঁর অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস গ্রন্থে সুরুজকু-ের মনোহরণ দৃশ্য মাত্র চারটি শব্দে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ময়লার আস্তরণে ঢাকা শিশুদের নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি কাশ্মিরের জাফরান জমিন নিয়ে একই কাজ করেছেন। শরতে প্রস্ফুটিত ফুলের একটু কেবল উল্লেখ করে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন কাশ্মির-নারীরা কেমন করে তাদের পিরহান উঠিয়ে মলত্যাগ করতে বসে। মনে হয় নাইপল নোংরা-আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটির বাতিকগ্রস্ত।’ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকট যতটা না ক্রোধে তার চেয়ে বেশি দুঃখে নাইপলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।
সালমান রুশদি মনে করেন, সাহিত্য বা রাজনীতি কোনো বিষয়ে তিনি ভি এস নাইপলের সঙ্গে একমত হতে পারেননি।
এদিকে এডওয়ার্ড সায়ীদ যতটা না দুঃখে তার চেয়ে বেশি ক্রোধে তাঁকে নব্য বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশবাদ প্রচারের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
ডেরেক ওয়ালকট বলেছেন, ‘নাইপল নিগ্রোদের পছন্দ করেন না।’ এই রেশ ধরে এডওয়ার্ড সায়ীদ নাইপলের উৎস ও
পিতৃপুরুষের সীমাবদ্ধতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে শ্রমিক হিসেবেই নব্য দাস্যবৃত্তিতে সেখানকার অনেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নাটাল থেকে ফিজি, কেনিয়া, গায়ানা, মালয় এবং ত্রিনিদাদে চলে এসেছে। ত্রিনিদাদে ভারতীয় এবং আফ্রিকানদের মধ্যে সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব ও ঘৃণা বর্ষণের প্রতিযোগিতা লেগেই ছিল। একপক্ষ গালি দিত ‘নিগার’ অন্যপক্ষ বলত ‘কুলি’ – পিতৃপুরুষের এই ঔপনিবেশিক ব্যাধিতে সংক্রমিত হয়েছেন এবং বেড়ে উঠেছেন নাইপল, লেখকজীবনেও তা ছাড়তে পারেননি।
নাইপলের ত্রিনিদাদ
ব্রিটিশরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের গায়ানা ও ত্রিনিদাদ দেড়শো বছরের অধিককাল উপনিবেশ হিসেবে শাসন করেছে। বর্ণবাদের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ ঘটেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। যারা ‘নন-হোয়াইট’ তারা যে সাদাদের চেয়ে নিম্নমানের তা স্পষ্ট করে তুলতে তারা কোন স্কুলে পড়বে, কোন ধরনের চাকরি পাবে, তাদের ওপর কোন ধরনের শাস্তি বলবৎ হবে ‘হোয়াইট মাস্টারগণ’ তা নির্ধারণ করে দিত। এই দাস্যবৃত্তি তাদের অনুকরণপ্রিয়ও করে তোলে। সাদা প্রভুরা যা করে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, অ-সাদারা স্বজাতির অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের ওপর তা-ই প্রয়োগ করতে থাকে। তাদের নির্যাতনের শিকার হয় নারী ও শিশু। শিশুর অপরাধের জন্য শিশুর বাবা-মাও নির্যাতনের শিকার হয়।
অ-সাদাদের দুটি ভাগ : ইন্ডিয়ান এবং আফ্রিকান। ইন্ডিয়ান পরিবারগুলো দেশ ছেড়ে ব্রিটিশ গায়ানা ও ত্রিনিদাদে আসার সময় তাদের প্রথা, সংস্কার, সংস্কৃতি ও ধর্মাচার সঙ্গে নিয়ে আসে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রাধান্য পরম্পরাও অটুট রাখে। এখানে সবাই আসে কৃষিশ্রমিক হিসেবে আখক্ষেতের মজুর হয়ে। এরকম একটি পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষিত উত্তরসূরি আর্নল্ড গিরিধারী ভিএস নাইপলের হাতে চিত্রিত মূলোৎপাটিত ভারতীয় ত্রিনিদাদবাসীর জীবনাচরণের একটি বর্ণনা দেন : ‘শুক্রবার সন্ধ্যায় মজুরি পাওয়ার পর শ্রমিকদের কেউ কেউ নিকটস্থ শুঁড়িখানা ‘রামশপে’ গিয়ে অত্যধিক পান করে চুর হয়ে কাটিয়ে দেয় সপ্তাহান্ত। কঠোর পরিশ্রমের কামাই এভাবেই ফতুর করে দেয়। স্বামীরা স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের গালাগাল দেয়। আশ মিটিয়ে পেটায়। জিন্দেগির এই ফাঁদে পড়ে এভাবেই জীবন কাটিয়ে দেয়। গায়ানা ও ত্রিনিদাদের বিনোদন বাজারে ঢোকে ব্রিটেন ও আমেরিকার সিনেমা। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের সিনেমার পুরুষ আধিপত্য শ্রমজীবী এই মানুষগুলোকেও প্রভাবিত করে। প্রায় একই ধারার ভারতীয় সিনেমাও মুক্তি পায় এখানকার সিনেমা হলে। নিজের পিতৃপুরুষের সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন বাস্তবতাবর্জিত এক সাংস্কৃতিক রুচি তাদের গড়ে উঠতে থাকে।’
ত্রিনিদাদের ভারতীয় সমাজের ফাঁপা অবয়বটি নাইপলকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট ও বিচলিত করে।
ত্রিনিদাদ, নিজের মাতৃভূমি সম্পর্কে বলেছেন : ‘আনইম্পর্ট্যান্ট, আনক্রিয়েটিভ, সিনিক্যাল, এ ডট অন দ্য ম্যাপ।’ দেশবাসী সম্পর্কে আপত্তিকর ভাষায় বলেছেন : ‘একটি বানরও দেখতে পাইনি যে আমার বই পড়ে। কেবল শারীরিক যে জীবন সেই জীবনই তারা যাপন করে; আমার কাছে তা ঘৃণ্যজীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী বর্বরদের সম্পর্কে পড়াশোনা করছে ত্রিনিদাদের লোক তাদের জন্য কৌতূহলের বিষয় হতে পারে।’
রিচার্ড সুডান লিখছেন : ‘ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ত্রিনিদাদে জন্ম বিশিষ্ট ব্যক্তির ঘাটতি নেই – বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী এরিক উইলিয়ামস, সমাজতাত্ত্বিক সিএলআর জেমস, পৌরাণিক খ্যাতির ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব অলিম্পিক স্বর্ণপদক বিজয়ী হ্যাজলি ক্রফোর্ড, ক্রিকেটার ব্রায়ান লারা, স্প্রিন্টার অটো বোলডোন। এখানকার বিচিত্র সাংস্কৃতিক অবয়ব উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক অতীত থেকে, সেখানকার অধিকাংশ মানুষ ইন্ডিয়ান ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ত্রিনিদাদের সন্তান নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী লেখক ভি এস নাইপল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ লেখকদের অন্যতম প্রধান তিনি। ১৯৮৯ সালে তিনি নাইটহুড লাভ করেন, ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার। ত্রিনিদাদে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে তাঁর উপন্যাস। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর আধিপত্য, পড়তে বাধ্য করা গদ্য ও বিবরণের জোর সাফাই গেয়েছেন শ্বেতত্বক ইংলিশ লেখকরাই – কিন্তু তাঁর গদ্যের গভীরে অন্ধকার গুপ্তস্রোতে লুকিয়ে আছে বর্ণবাদ – তাঁর নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এবং তা খোলামেলাভাবেই।’
নাইপল যেভাবে বর্ণনা করেছেন বাস্তবের ত্রিনিদাদ তার চেয়ে বেশ খানিকটা ভিন্ন, তাঁর বিবরণীর চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ। নাইপল যেসব মানুষের স্থবিরতা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন তারাই পুরনো রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙে পিপলস ন্যাশনাল মুভমেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক মডেলে ভোট দিয়ে পিপলস পার্টিসিপেশনকে জয়ী করেছেন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী কমলা পেরসাদ বিশ্বেশ্বরকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। নাইপলের কথা সত্য হলে এত বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হতো না। তারপরও বর্ণবাদী যে-রেশ রয়ে গেছে তা দাসত্বের কাল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালের। হীনমন্যতার বীজ তো জন্মের পরপরই ড্রাম পিটিয়ে শিশুর কানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় – নাইপলের উপন্যাস মিগুয়েল স্ট্রিট এবং অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস এ কাজটি করেছে। নাইপল উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি নিয়ে জীবনযাপনের তিক্ত চিত্র তুলে ধরেছেন, উপনিবেশ স্থাপনকারীদের সম্মান নাইটহুড সানন্দে গ্রহণ করেছেন। নব্য উপনিবেশবাদের পক্ষেই প্রকারান্তরে লিখে গেছেন।
রিচার্ড সুডান মনে করেন, ‘ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার যে উৎসব, যে কার্নিভাল ভিএস নাইপল উদযাপনকারী ত্রিনিদাদবাসীর নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারেননি। তিনি ত্রিনিদাদিয়ান যে-অহংকার তা অনুধাবন করেননি।’
ত্রিনিদাদ সম্পর্কে ভিএস নাইপলের নিজের কী মূল্যায়ন? তিনি লিখেছেন : ‘ত্রিনিদাদকে জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু যাঁরা ত্রিনিদাদকে জানেন তাঁরা বেশ ভালোই জানেন এই সরল, ঔপনিবেশিক একটি অসভ্য সমাজ।’
ত্রিনিদাদ নিয়ে তাঁর আরো কথা : ‘আমি এক ক্ষুদ্র জায়গায় বেড়ে উঠি এবং যখন তরুণ তখনই সেই জায়গাটা ছেড়ে যাই এবং বৃহত্তর পৃথিবীতে প্রবেশ করি।’
তিনি আরো লিখেছেন, ‘ত্রিনিদাদে কিছুই তৈরি হয়নি।’ এখানে এটাও বলা আবশ্যক, নাইপলের ইংল্যান্ড স্তুতিও নিষ্কলুষ নয়। তিনি বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডের মানুষ নিজেদের আহাম্মক হওয়া নিয়ে বেশ গর্ব করে থাকে।’
নাইপলের ভারত
২০০১ সালে চেলটেনহাম সাহিত্য-উৎসবে তাঁর সূচনা-বক্তব্যে নাইপল বলেন, ‘আমার মতো মানুষ যদি সমাজ নিয়ে লিখে যে-সমাজের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন নেই, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। তারা যদি বইটা পড়ে – অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা বই পড়ে না – কিন্তু তারা অনুমোদন চায়। … এখন ভারতের উন্নতি হয়েছে, বইগুলো গৃহীত হয়েছে (বইগুলো মানে তিনটি ভারতবিষয়ক বই : অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস, এ ওন্ডেড সিভিলাইজেশন এবং ইন্ডিয়া : এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ)।
‘চল্লিশ বছর আগে ভারতের মানুষ ধর্মীয় প্রথাবৃত্তে বন্দি ছিল, অন্যান্য দিকের মধ্যে এদিক দিয়েও আমি ভারতকে সাহায্য করেছি।’
ভারত নিয়ে লেখা অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস-এ তাঁর হতাশা প্রতিফলিত কি না এক কথোপকথনে খুশবন্ত সিং তাঁকে জিজ্ঞেস করলে নাইপল জবাব দেন : ‘এটা হতাশা নয়, আমি আহত হয়েছিলাম। এটা আমার জন্য বড় ধরনের ক্ষত। আপনাকে মনে রাখতে হবে আমরা ত্রিনিদাদের খুব হতাশ একটি সম্প্রদায়। ভারত নিয়ে আমাদের কাছে কোনো গল্প ছিল না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ত্রিনিদাদে আসার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা ভয়ানক কোনো জায়গা ছেড়ে এসেছেন। আমাদের ভারত-ধারণা বড় নির্মম। এদেশটা আসলে কেমন, আমাদের কাছে কখনো বর্ণনা করা হয়নি। কাজেই ভারত কখনো আমাদের কাছে সত্য হয়ে ওঠেনি, আমি যখন প্রথম এখানে আসি ভারত নিয়ে লেখার পূর্ণ প্রস্তুতি আমার ছিল না।’
তিনি মনে করেন, ‘বাবর যে ভারতে বাবরি মসজিদ তৈরি করেছিলেন তা ছিল ঘৃণার ফসল। তিনি মোটেও ভারতপ্রেমিক ছিলেন না। … খ্রিষ্টবাদী ও ইসলামপন্থি উভয়ই পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণু। তাদের ইতিহাস অসহিষ্ণুতার ইতিহাস। অন্ধকার ইতিহাস খ্রিষ্টানদেরও। ‘কালো বুদ্ধিবৃত্তি’ দিয়ে ভারতে নির্মমভাবে খ্রিষ্টধর্মের প্রবেশ ঘটেছে।’
নাইপল আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এলেন। রাজীব গান্ধী তখন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জ্যেষ্ঠ কোনো রাজনীতিবিদের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন। খুশবন্ত সিং মনে করলেন, মন্ত্রিসভার দু-একজন ছাড়া অন্যরা হয়তো নাইপলের নামই শোনেননি। এমন কারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ দুপক্ষের জন্য বিব্রতকর হবে। তিনি রামনিবাস মির্ধার সঙ্গে সাক্ষাৎ করালেন। নাইপল বিস্মিত হলেন যে, এই মন্ত্রী তাঁর সব লেখাই পড়েছেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘অতুলনীয়’, ‘সভ্য’ – এ-মানুষটি এখানে (রাজনীতিতে) কী করেন?
নাইপল লেখেন : ‘আমার পিতৃপুরুষের দেশের প্রতি আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা থেকে প্রথম ভারতে আসি। ভারত সম্পর্কে আমি যাই লিখি তার জন্য আমার প্রকাশক কিছু আগাম টাকাও দিলেন। টাকার অংক ছোট কিন্তু পেয়ে আমি স্বস্তিবোধ করি। কেমন করে ভারতে এগোব আমার জানা ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমাকে পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। আমি ভারতে গিয়েছিলাম। গেরিলা কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা – ফাঁপা এবং বোকা। তাদের মধ্যে কোনো বিপ্লবী মহিমা ছিল না, একেবারেই না।’ এটি তাঁর পরবর্তী অনুধাবন। তিনি দেখেছেন, বিপ্লবও সাময়িক স্বার্থের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
নাইপলের আফ্রিকা
‘আফ্রিকা কোনো মজার জায়গা নয়। মজার জায়গা হয় সেটি, যা আত্মাকে উদ্বুদ্ধ করে, অনুভূতিকে সস্নেহে লালন করে। আমি
যে-আফ্রিকা সফর করেছি তার সম্পর্কে এ-কথা বলা যায় না।’ ভয়ংকর বর্ণবাদী তাঁর উচ্চারণ : ‘আফ্রিকানরা লাথি চায়, এটাই একমাত্র জিনিস, যা তারা বোঝে।’
কালো মানুষ নিজের কথা লিখতে পারার শিক্ষা ও সাহস পেয়েছে অনেক পরে। সাদা মানুষ তাদের দেখেছে নিজেদের বোঝা হিসেবে – ‘হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন’। নাইপল আফ্রিকার যে-দিকটাতে আলোকসম্পাত করেছেন, সাদা মানুষ সে-পথে কখনো এগোয়নি। অরবিন্দ আদিগা বলেছেন, ‘নাইপলের আফ্রিকানরা ‘মিমিক ম্যান’ (১৯৬৭-তে প্রকাশিত নাইপলের উপন্যাস মিমিক ম্যান থেকে নামটি নেওয়া) তারা পশ্চিমের প্রতিষ্ঠানসমূহ – সরকার, আইন, পুলিশ ইত্যাদি তাদের জন্য কতটা লাগসই তা না ভেবেই অনুকরণ করে বলেছে, অসংগতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তাদের সমাজ ভেঙে খানখান করে দিচ্ছে এবং কৃষ্ণ মহাদেশ – ডার্ক কন্টিনেন্টের যে বহুল চর্চিত ধারণা তাকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে।
নাইপলের ব্যক্তিত্ব ও রুচি তাঁর দ্য মাস্ক অব আফ্রিকার সারাৎসার অপহরণ করে নিয়েছে। তিনি যখন জানলেন আইভরি কোস্টের মানুষ জীবন্ত বিড়াল সেদ্ধ করে খায় (নাইপল নিজে ক্যাট পারসন – বিড়ালপ্রিয় মানুষ), তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে, গোটা দেশটাই বাজে, অপদার্থ। রান্নাঘরে বিড়াল নিয়ে এই নির্মমতার কারণে আইভরি কোস্টের সবই তাঁর কাছে গুরুত্বহীন হয়ে উঠল। অরবিন্দ আদিগা আরো লিখেছেন : ‘পরবর্তী সময়ে তিনি জেনেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্মাচার ও জাদুটোনার জন্য বিভিন্ন জন্তুর নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হয়; এতে তাঁর কাছে পুরো অঞ্চলটিই অমানুষের অঞ্চল হয়ে উঠল।’ নাইপল লিখলেন, ‘আমি মনে করেছি এটা ভয়ংকর ব্যাপার, এটা ভীষণ হতাশার ব্যাপার। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষকে অনেক বড় সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমি আশা করেছিলাম বড় সংগ্রাম তাদের বড় মানুষে পরিণত করবে।’
আফ্রিকা তাঁর কাছে বিড়াল সেদ্ধ করার আর গরুর নাড়িভুঁড়ি বের করার মহাদেশ হয়ে রইল। ‘আমার শৈশবে আমার মনে আছে ‘কালো’ – ব্ল্যাক ছিল একটি অপমানজনক শব্দ। বরং লোকজন কালোর বদলে ‘কালার্ড’ শুনতে পছন্দ করত; ‘আফ্রিকান’ বলাটা ছিল অপমানজনক : পরিস্থিতি গায়ানাতে একটু ভিন্ন ছিল, সেখানে ‘আফ্রিকান’ ব্যবহৃত হতো, কিন্তু নিগ্রো ছিল অপমানজনক শব্দ। আর এখন কালো খুব জনপ্রিয় এবং কবুল করে নেওয়া শব্দ।’
কিন্তু সেই কালো আফ্রিকার ভবিষ্যৎ কি?
নাইপল চাঁছা জবাব দিলেন, ‘আফ্রিকার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’
আর্জেন্টাইন টেরর : নির্জনতার আতংক
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নাইপলের দৃষ্টি এড়ায়নি। ১৯৭৭-এ বুয়েনেস আইরেস ঘুরে এসে লিখলেন :
আর্জেন্টিনায় ঘাতক গাড়ি – যে-গাড়িতে দাফতরিক বন্দুকধারীরা তাদের কাজে বেরোয় তার নাম ফোর্ড ফ্যালকনস। আর্জেন্টিনাতেই তৈরি হয় ফ্যালকন, শক্ত ছোট গাড়ি, গাড়ির চেহারার তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই – হাজার হাজার গাড়ি রাস্তায়। কিন্তু ঘাতক ফ্যালকন দেখলেই চেনা যায়। এসব গাড়িতে কোনো লাইসেন্স প্লেট থাকে না। এসব গাড়ি সাদাসিধে কাপড়ে পরা মানুষ পরিবহন করে – এ গাড়ির উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে হয়, মানুষ কখনো কখনো দাঁড়ায় দেখে। কয়েক সপ্তাহ আগে তারা টুকুম্যান উত্তরাঞ্চল শহরের প্রধান চত্বরে দাঁড়িয়েছিল এবং দেখছিল সরকারি সদর দফতরের সামনে অর্ধবৃত্তাকার ড্রাইভওয়েতে ফ্যালকনগুলো পার্ক করা; ভবনটি উনিশ শতকের ইউরোপিয়ান কান্ট্রি হাউজের মতো সাজানো পাথরে গড়, বারান্দায় এবং সযতেœ লালিত অনেকটা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বাগানে মেশিনগান হাতে ইন্ডিয়ান সৈন্য – সেখান থেকে একঝলক ইউনিফর্ম, হ্যান্ডশেক, স্যালুট দেখা যায় – যতক্ষণ না সাদা পোশাকের মানুষগুলো অভিজাত শিকারদলের সদস্যের মতো নেমে এসে লুকোনো মেশিন নিয়ে প্রশস্ত পদক্ষেপে ছোট ফ্যালকনে আরোহণ করে, গতি না বাড়িয়ে, সাইরেন না বাজিয়ে গাড়ি চলতে থাকে। এই নীরবতার কী নাটকীয় পরিণতি কর্তৃপক্ষ তা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে – এটা সন্ত্রাসের একটি অংশ, যে-সন্ত্রাসের অনুভব সর্বত্র।
… আগের দিনগুলোতে যুদ্ধটা ছিল গেরিলা বনাম একদিকে সেনাবাহিনীর একাংশ, অন্যদিকে পুলিশ। এখন যুদ্ধ সবাইকে স্পর্শ করেছে। গণমঞ্চে এখন গণসন্ত্রাস।
নাইপল যে-চিত্র এঁকেছেন তা কেবল আর্জেন্টিনার নয়, আমাদেরও।
হেনরি জেমস : পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে লেখক!
লেখক যদি বৈরিতা সৃষ্টি করতে না পারেন তিনি মৃত – এটি নাইপলের কথা। এ-কারণেই তিনি ক্রমাগত বৈরিতা সৃষ্টি করে চলেছেন। তিনি হেনরি জেমসকে বলেছেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে লেখক।’
হেনরি জেমসের দ্য পোর্ট্রটে অব অ্যা লেডি, দ্য উইংস অব দ্য ডাভ, দ্য অ্যাম্বাসাডর্স বিখ্যাত উপন্যাস।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো বিশ্ববরেণ্য কথাশিল্পী সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি জানতেন না কোথায় আছেন, তিনি আমেরিকান হওয়া নিয়েই বড় ব্যস্ত ছিলেন।’ তাঁর এই মন্তব্য বিপুলসংখ্যক সাহিত্যামোদীকে ক্ষুব্ধ করেছে।
১৯৮৬-র নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ওলে সোয়েঙ্কা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি কিছু লিখেছেন নাকি?’ তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়াটা নোবেল কমিটির ‘অনেক উঁচু স্থান থেকে সাহিত্যের ওপর মূত্রপাত করার মতো ব্যাপার।’
ই এম ফস্টারকে যৌন-দানব বানিয়েছেন। বলেছেন, ‘ভারতে অবশ্যই ফস্টারের নিজের ধান্ধা ছিল। তিনি ছিলেন সমকামী আর ভারতে তাঁর হাতে সময়ও ছিল। তিনি চিনতেন রাজভবন, কিছু মধ্যবিত্ত, আর মোহিত করবেন এমন কিছু বাগানবালক।’
নাইপল টমাস হার্ডি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি একজন অসহ্য লেখক, তিনি লিখতে জানেন না, একটা প্যারাগ্রাফ কীভাবে তৈরি করতে হয়, তাও জানেন না। তাঁর লেখা রোমান্টিক মেয়েলি কাহিনির মতো।’
এমনকি জেইন অস্টিনও নয়
বিতর্ক সৃষ্টিতে ভি এস নাইপলের সমকক্ষ কোনো লেখকের দেখা গত তিন দশকে মেলেনি।
রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, নারী লেখকদের মধ্যে কেউই তাঁর সমকক্ষ নন। জেইন অস্টিন তো ননই। তিনি জেইন অস্টিনের ‘আবেগময় উচ্চাকাক্সক্ষা’ এবং ‘পৃথিবী সম্পর্কে আবেগময় অনুভূতি’র অংশীদার হতে রাজি নন। তিনি মনে করেন, নারী লেখকরা ভিন্ন ধরনের – ‘আমি যখন কোনো লেখা পড়ি – এক দুই অনুচ্ছেদ পড়ার পরই আমি বুঝতে পারি তা নারীর লেখা না পুরুষের।’
তিনি মনে করেন, নারীর আবেগময় সংকীর্ণ দৃষ্টি তাঁকে গৃহের প্রভুতে পরিণত করতে পারে না – সেটা তাঁর লেখাতেও প্রতিভাত হয়। ‘আমার প্রকাশক ভদ্রমহিলা চমৎকার রুচিশীল সম্পাদক ছিলেন কিন্তু তিনি যখন লেখক হলেন দেখুন মেয়েলি কী সব যাচ্ছেতাই লিখছেন।’ ভারতীয় মহিলা লেখকদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তাঁরা মামুলি বিষয় নিয়ে লিখে থাকেন।’
ব্রিটেনের লেখক সাংবাদিক অ্যালেক্স ক্লার্ক বললেন, ‘তিনি কি এটাই বলতে চান যে, হিলারি ম্যানটেল, এ এস বাইয়াত, আইরিস মারডক আবেগপ্রবণ মেয়েলি লেখা লিখছেন?’
সাহিত্য-সমালোচক হেলেন ব্রাউন তাঁকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, এসব তাঁর ‘উদ্ধত দৃষ্টি আকর্ষণী’ আচরণ।
নাইপলের ইসলামফোবিয়া
নাইপল বলছেন, ‘উৎস বিবেচনায় ইসলাম একটি আরব ধর্ম। যারা আরব নন, এমন মুসলমানরা সবাই ধর্মান্তরিত মুসলমান। ইসলাম ধর্মের চাহিদাটা বেশি। ধর্মান্তরিত একজন মুসলমানকে পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারণা পালটে ফেলতে হয়। তার পবিত্র স্থানগুলো অন্য দেশে, তার পবিত্র ভাষা আরবি। তাকে তার নিজের ইতিহাস প্রত্যাখ্যান করতে হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতে হয়। গভীরভাবে দেখতে গেলে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের ঔপনিবেশিক মানুষ মনে হবে।’
খুশবন্ত সিং তাঁর কাছে ইসলাম নিয়ে মোহভঙ্গের ব্যাখ্যা শুনতে চাইলে নাইপল বললেন : ‘আমাকে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটা মোহভঙ্গের বিষয় নয়। আমি বস্তুনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করেছি। আমি ভেতরে ঢুকে ইসলামকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। অমুসলমান পূর্বকালের (মুসলমান হওয়ার আগের সময়কার) স্মৃতি থেকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মৌলবাদীরা মুক্তি চায়। ইরানের বেলাতেও এ-কথা সত্য। পারস্য বিশাল দেশ ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ইরান ধ্রুপদ গ্রিসকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। এখন তারা বলছে ইসলাম কবুল করার আগের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনির সময়ের বিচারক আয়াতুল্লাহ খালখালি পার্সেপোলিসের ধ্বংসাবশেষ এবং আড়াই হাজার বছর আগেকার সাইরাস প্রাসাদের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে ফেলতে চেয়েছেন। এটা পাগলামি। কিন্তু ধর্মান্ধতার এ নির্দেশনা জনসাধারণ গ্রহণ করবে।’
হিন্দু মৌলবাদ নিয়ে নাইপল বলছেন – ‘শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের কথা বলা যায়। তিনি হিন্দু দেবদেবীর নগ্ন ছবি এঁকেছিলেন। তারা তাঁর ছবি নষ্ট করেছে, ঘরবাড়ি তছনছ করেছে। আমি খুব নিশ্চিত, তিনি যদি হিন্দু হতেন তাহলে এ নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হতো না।’ নাইপল মনে করেন, কাজের মধ্য দিয়ে হিন্দু ও মুসলমান মৌলবাদীরা পরস্পরকে শক্তি জোগায়। ‘আমি ইসলামিক প্রশ্নাবলি নিয়ে খুব কৌতূহলী হয়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম মূল থেকে তা বুঝতে চেষ্টা করব। সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব এবং সে আবিষ্কারের একটি বর্ণনামূলক লেখা লিখব।’ কিন্তু জার্নি অ্যামাং দ্য বিলিভার্স গ্রন্থে ধর্মভিত্তিক সমাজের অসারতার কথাই বলেছেন।
সাধারণভাবে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতদের কথা বলেছেন, ‘ধর্মান্তরিত মানুষের ওপর ধর্মান্তকরণের ভয়ংকর প্রভাব পড়ে। এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে তোমাকে তোমার অতীত ধ্বংস করতে হবে, ইতিহাস ধ্বংস করতে হবে। এই খত সই করে তোমাকে বলতে হবে, আমার পিতৃপুরুষের সংস্কৃতি বিরাজ করে না, আর তাতে কিছুই আসে-যায় না।’ নাইপল মনে করেন, অখণ্ড ভারত রাষ্ট্রের ভেতর একটি মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটাতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষকে নিহত হতে হয়েছে, লাখ লাখ মানুষকে মূলোৎপাটিত হতে হয়েছে। রাষ্ট্র নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও ধর্মের অবস্থান সুরক্ষিত ও শক্তিশালীই রয়েছে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে তার মানে এই নয়, রাষ্ট্রের জন্য যে-স্বপ্ন তাতে ভেজাল ছিল কিংবা ধর্মের যে-বিশ্বাস তা দূষিত ছিল। এটা ঘটার কারণ মানুষই ধর্মের বিশ্বাসকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। নাইপল মনে করেন, পাকিস্তান লাভ ধর্মীয় অর্জন না হয়ে রাজনৈতিক অর্জন হওয়াটাই গৌরবের বিষয় হতো।
ডোয়াইট গার্নার ইসলাম সম্পর্কে নাইপলের জ্ঞানকে দেখছেন পর্বত-প্রমাণ অজ্ঞতা হিসেবে, আর এই অজ্ঞতাকে যৌক্তিকীকরণ করেছেন এই বলে : ‘আমি সারাজীবন ধরে মুসলমানদের চিনে আসছি কিন্তু তাদের ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান সামান্যই। ইসলামের ডকট্রিন (আমি একে ডকট্রিন হিসেবেই দেখি) আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। এটা গবেষণার উপযুক্ত কোনো বিষয় বলে আমার মনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে সফরের পরও ত্রিনিদাদে বালক বয়সে ইসলাম সম্পর্কে যে জ্ঞান ছিল তার সঙ্গে তেমন কিছু যোগ করতে পারিনি। ধর্মের গৌরব অতীতের ব্যাপার। এটা রেনেসাঁসের মতো কিছু সৃষ্টি করতে পারেনি। মুসলিম দেশগুলো তো উপনিবেশ ছিল না। সেখানে ছিল স্বৈরাচার আর তেল পাওয়ার আগে তাদের সব দেশই ছিল দরিদ্র।’ (অ্যামাং দ্য বিলিভার্স থেকে উদ্ধৃত) নাইপল ইসলামকে বরাবরই বৈশ্বিক হুমকি মনে করে এসেছেন।
লেখালেখি নিয়ে নাইপল
* আপনি যদি কেবল উপন্যাসই লেখেন, আপনি লিখতে বসে কিছু বর্ণনাও বয়ন করেন। এটা ঠিকই আছে কিন্তু এর কোনো গুরুত্ব নেই।
* আপনি যদি সিরিয়াস বই লিখতে চান, আপনাকে ফর্ম ভাঙার জন্য তৈরি থাকতে হবে; ফর্ম ভাঙতে হবে।
* মনে করা হয় আমি একজন কঠিন লেখক, কিন্তু আমি সত্যিই কোমল।
* আমি হচ্ছি সে ধরনের লেখক, যার সম্পর্কে ভাবে অন্যরা আমার লেখা পড়ছে।
* আমি অনেক কিছু পড়ি। পৃথিবী সম্পর্কে আমার জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা পূরণ করতে আমি পড়ি।
* আমি যখন আমার নিজের লেখা একটি বাক্য পড়ি এবং দেখি এটার টিকে থাকার গুণাগুণ আছে, আমি ভাবি এটা বিস্ময়কর।
* লেখকের জীবনী এবং এমনকি আত্মজীবনী সবসময়ই অসম্পূর্ণতার দোষে দুষ্ট। তবে আমার সম্পর্কে মূল্যবান যা কিছু সব আমার বইগুলোতেই আছে।
* তুমি কী কাজটি করেছ তা দেখার জন্য একজন মানুষ দরকার, সে এটা পড়বে, বুঝবে এবং এর ভেতর কী আছে তার মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করবে।
* পরিস্থিতিগত সত্যটা অবশ্য বুঝতে চেষ্টা করতে হবে – এতেই বিষয়টি বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারে।
* সাহিত্য নিয়ে কথা বলার মতো আমার কোনো ছাত্রবন্ধু ছিল না। কিন্তু আমার শিক্ষক ছিলেন চমৎকার মানুষ, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, কিন্তু তাঁর কোনো সাহিত্য বিচার-ক্ষমতা ছিল না।
* জীবনী ইতিহাস এবং শিল্পকলা নিয়ে মহৎ গ্রন্থ রচনা করা যায়।
* লেখক যদি বসে বসে কেবল শোষণ আর নিপীড়নের কথাই বলেন তাদের পক্ষে বেশি কিছু লেখা হয়ে ওঠে না। লেখকদের উচিত ‘অসম্মতি’কে প্ররোচিত করা।
* আত্মজীবনী কাহিনিকে বিকৃত করতে পারে, ঘটনাকে নতুন করে বিন্যাস করতে পারে, কিন্তু ফিকশন কখনো মিথ্যে বলে না, লেখককে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে।
* আমি যখন কোনো লেখা পড়ি, দু-এক প্যারাগ্রাফের মধ্যেই বুঝতে পারি এটা নারীর লেখা না পুরুষের।
* শিশু হিসেবে বলতে গেলে আমি কিছুই জানতাম না, আমার দিদিমার বাড়ি থেকে যা কিছু তুলে এনেছি তার বাইরে কিছুই নয়। আমি মনে করি, সব শিশু এভাবেই পৃথিবীতে এসেছে, তারা কে তা না জেনেই।
* কথা বলার দুটি ধরন রয়েছে – একটি সহজ ধরন, যেখানে হালকাভাবে কথা বলা হয় আর একটি হচ্ছে বিবেচিত ধরন। বিবেচিত ধরনের পাশেই আমি আমার নামটি লিখেছি।
* একজন লেখক বরাবরই নিঃসঙ্গ।
* বদরাগী মানুষের যে-খ্যাতি আমার খ্যাতির ধরনটা সে-রকম। (প্রায় বাইশ বছর উপন্যাস প্রকাশিত না হওয়ার পর) আমি কখনো উপন্যাস পরিত্যাগ করিনি।
* যখনই আমি ফিকশন লিখতে গিয়েছি, আমাকে সবসময়ই একটি চরিত্র আবিষ্কার করতে হয়েছে, যার প্রেক্ষাপট অনেকটা আমারই মতো।
* জীবনের সমস্ত কিছুর বিস্তারিত বর্ণনা, অভ্যাস, বন্ধুত্ব সব আমাদের জন্য বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে কিন্তু লেখালেখির রহস্য রয়েই যাবে। যত চিত্তাকর্ষকই হোক কোনো দলিল-দস্তাবেজ আমাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারবে না।
* আমার দুঃখ হচ্ছে প্রকাশনার জগৎ আর বই লেখার জগৎটা ভয়ংকর বাজে, নোংরা এবং রদ্দি।
* একজন নাস্তিকের আবার কেমন করে ভাবাদর্শ থাকে? নাস্তিক হওয়ার মানেই তো বিশ্বাসের কিছু অঞ্চল থেকে মুক্ত হয়ে আসা। সেটা কেমন করে ভাবাদর্শ হয়, আমি তার কারণ খুঁজে পাই না।
* আমার বয়স যতই বাড়ছে আমি ততই নিজেকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছি মানুষকে যে সর্বোত্তম স্বীকৃতি আমরা দিতে পারি তা হচ্ছে তারা কেবল অস্তিত্বে বিরাজমানই নন, তারা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিরাজ করছেন এবং তাদের নির্দিষ্ট বাস্তবতা রয়েছে।
* কিছু লেখক কেবল শৈশবের অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখালেখি করেন, কারণ সে-অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ। অন্য ধরনের লেখকের বেলায় জীবন বয়ে যায় এবং তিনি সেই জীবনকে প্রক্রিয়াকরণ করে লিখে থাকেন।
* আপনি যদি অন্য একটি দেশে অভিবাসন নিয়ে সে-দেশের আইন মেনে বসবাস শুরু করেন, তাতে আপনি সেই সংস্কৃতির আত্মার প্রতি অসম্মান জ্ঞাপন করেন না। এটা এক ধরনের আগ্রাসন।
* একজন মানুষ যখন তিরিশ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন, তার বয়স যখন পঞ্চাশ বা ষাট হয় তখন তার অধিকাংশ লেখা হয়েই যায়। আশি হতে হতে তার আর তেমন কিছুই থাকে না।
* আমি যখন অক্সফোর্ড (বিশ্ববিদ্যালয়) ছেড়ে যাই আমি সত্যিই লেখালেখির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তারপর আমি লিখতে বসি। শিল্পের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান আমার বরাবরই ছিল। আমি সবসময় অনুভব করেছি লেখালেখি একটা কাজ।
* অনেক লেখক জীবনের শেষপর্যায়ে এসে তাঁর বইগুলোর সারাংশ লিখতে শুরু করেন।
* চলচ্চিত্রের প্রথম পঞ্চাশ বছর ছিল সত্যিকারের মহান কীর্তির সময়। মৌলিক মানস তখন গল্প বলার একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেছে। আর এখন যা ঘটছে তা হচ্ছে অনুকরণ, মহৎ সৃষ্টিকারীরা যা করেছেন কেবল তারই নকল।
* আমি সবসময়ই আমার প্রজ্ঞা দিয়ে চালিত হয়েছি। সাহিত্যের হোক কিংবা রাজনীতির – আমার কোনো পদ্ধতি নেই। আমাকে পরিচালিত করার কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শও নেই।
* যে-সভ্যতা বিশ্বকে ভয়ে করে নিয়েছে তাকে মরণাপন্ন বলার কারণ নেই।
* স্কুলে আমার গুণমুগ্ধ ছিল, আমার কোনো বন্ধু ছিল না।
নতুন লেখকের জন্য নাইপলের সাত টিপস
১. লম্বা বাক্য লিখবেন না।
(একটি বাক্যে দশ-বারোটির বেশি শব্দ থাকবে না)
২. প্রতিটি বাক্যে স্পষ্ট বিবৃতি থাকতে হবে।
(আগের বাক্যের বিবৃতির সঙ্গে এটি যুক্ত হবে এবং সংগতিপূর্ণ হবে। একটি ভালো অনুচ্ছেদ হচ্ছে কতগুলো স্পষ্ট ও সম্পর্কিত বাক্য।)
৩. বড় শব্দ লিখবেন না।
(কম্পিউটার যদি বলে গড়পড়তা শব্দে পাঁচটির বেশি অক্ষর রয়েছে তাহলে বুঝতে হবে কোথাও সমস্যা রয়েছে। ছোট শব্দের ব্যবহার লেখককে চিন্তা করতে বাধ্য করে তিনি কী লিখছেন। এমনকি কঠিন ভাবনাকেও ছোট শব্দে ভেঙে নেওয়া যায়।)
৪. যে-শব্দের মানে সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত নন, তা লিখবেন না।
(এই আইন যদি ভঙ্গ করেন তাহলে লেখালেখি ছেড়ে অন্য কাজ দেখুন)
৫. রং, আকার, সংখ্যা – এসব ছাড়া নতুন লেখককে বিশেষণ ব্যবহার এড়াতে হবে।
(বিশেষণের বিশেষণ অ্যাডভার্বও যত কম সম্ভব ব্যবহার করবেন)
৬. বিমূর্ত বর্ণনা এড়িয়ে যাবেন।
(সবসময় সঠিক বস্তুটি লেখায় উঠিয়ে আনবেন, বিমূর্ত কিছু নয়)
৭. প্রতিদিন অন্তত ছয় মাস এভাবে লেখালেখির চর্চা করুন।
(আপনি কেবল তখনই এই লেখালেখির বিধান ভাঙবেন যখন এগুলো পুরোপুরি আপনার রপ্ত হয়েছে এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছেন)।
নাইপল : টাইমলাইন
১৯৩২ : ১৭ আগস্ট জন্ম, ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাস গ্রামে। বিদিয়াধর সূরজপ্রসাদ নাইপল (বাংলায় সম্ভবত বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল। নাম অনূদিত না হওয়াই ভালো। লেখক যেভাবে সংবর্ধিত হতে চান সেটাই উৎস। আমরা ঢাকায় তাঁর স্ত্রীকে শুনেছি বিদিয়া বলে ডাকতে) তাঁর পিতা সি প্রসাদ নাইপল, মা দ্রোয়াপাতি নাইপল।
১৯৩৯ : পরিবার ত্রিনিদাদের রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে স্থানান্তর।
১৯৪০ : ত্রিনিদাদের সবচেয়ে আধুনিক ব্রিটিশ স্টাইল স্কুল কুইন্’স রয়াল কলেজে ভর্তি।
১৯৫০ : পড়াশোনার জন্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে বৃত্তিলাভ।
১৯৫২ : খেলার মাঠে পরবর্তীকালের প্রণয়িনী ও স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া হেইলের সঙ্গে সাক্ষাৎ।
স্পেন ভ্রমণ এবং বেপরোয়া ব্যয়।
১৯৫৩ : নাইপল এবং প্যাট্রিসিয়া অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট হলেন।
নাইপলের পিতার মৃত্যু।
১৯৫৪ : টুকরো কাজ, প্যাট্রিসিয়ার অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিবিসি রেডিওর ক্যারিবিয়ান ভয়েসে উপস্থাপকের চাকরি (তিন মাস পরপর নবায়নযোগ্য) পান।
১৯৫৫ : দুপক্ষের পরিবারের অজান্তে নাইপল ও প্যাট্রিসিয়া বিয়ে করেন। প্যাট্রিসিয়ার কর্মস্থল বার্মিংহাম, লন্ডনে উইকএন্ড কাটান নাইপলের সঙ্গে। পুরনো ল্যাঙ্গহাম হোটেলে বিবিসির ফ্রি ল্যান্সারদের রুমে গ্রীষ্মের এক অপরাহ্ণে মিগুয়েল স্ট্রিটের প্রথম গল্প ‘বোগার্ট’ লেখেন।
প্রকাশক প্রথম উপন্যাস দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর গ্রহণ করেন।
১৯৫৭ : প্রথম উপন্যাস প্রকাশ এবং পুরস্কার লাভ।
১৯৫৮ : দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য সাফ্রেজ অব এলভিরা প্রকাশিত।
১৯৫৯ : প্রথম লেখা বই মিগুয়েল স্ট্রিট গ্রন্থাকারে প্রকাশ। প্রথম নন-ইউরোপিয়ান লেখক হিসেবে সমারসেট মম অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন এই বইটির জন্য এবং লেখক সমারসেট মম নিজে তা অনুমোদন করেন।
১৯৬১ : নাইপলের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস-প্রকাশিত।
১৯৬২ : দ্য মিডল প্যাসেজ নন-ফিকশনপ্রকাশিত।
১৯৬৩ : ব্রিটেনের প্রেক্ষাপটে প্রথম উপন্যাস মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইটস কোম্প্যানিয়ন-প্রকাশিত।
১৯৬৪ : অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস : অ্যান এক্সপেরিয়েন্স অব ইন্ডিয়া-প্রকাশিত।
১৯৬৬ : রাইটার-ইন-রেসিডেন্স হিসেবে উগান্ডার কাম্পালায় ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর অবস্থান।
১৯৬৬ : দ্য মিমিক ম্যান প্রকাশিত, ডব্লিউএইচ স্মিথ পুরস্কার লাভ।
১৯৭১ : ইন অ্যা ফ্রি স্টেট প্রকাশিত, বুকার প্রাইজ লাভ।
১৯৮১ : অ্যামাং দ্য বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি প্রকাশিত।
১৯৯১ : নাইটহুড প্রাপ্তি।
১৯৯৬ : স্ত্রী প্যাট্রিসিয়ার মৃত্যু।
পাকিস্তানি সাংবাদিক নাদিরা খানম আলভিকে বিয়ে করেন।
২০০১ : নোবেল সাহিত্য পুরস্কার লাভ।
২০১৬ : বাংলাদেশে ঢাকা লিট ফেস্টে আগমন।
২০১৮ : ১২ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ।
নাইপলের সাহিত্যকর্ম
ফিকশন
* দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর (১৯৫৭)
* দ্য সাফ্রেজ অব এলভিরা (১৯৫৮)
* মিগুয়েল স্ট্রিট (১৯৫৯)
* অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস (১৯৬১)
* মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইটস কোম্প্যানিয়ন (১৯৬৩)
* দ্য মিমিক ম্যান (১৯৬৭)
* অ্যা ফ্ল্যাগ অব দ্য আইল্যান্ড ((১৯৬৭)
* ইন অ্যা ফ্রি স্টেট (১৯৭১)
* গেরিলাস (১৯৭৫)
* অ্যা বেন্ড ইন দ্য রিভার (১৯৭৯)
* দ্য এনিগমা অব অ্যারাইভাল (১৯৮৭)
* অ্যা ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (১৯৯৪)
* হাফ অ্যা লাইফ (২০০১)
* দ্য নাইটওয়াচম্যানস অকারেন্স বুক : অ্যান্ড আদার কমিক ইনভেনশন্স (২০০২)
* ম্যাজিক সিডস (২০০৪)
নন-ফিকশন
* দ্য মিডল প্যাসেজ : ইমপ্রেশনস অব ফাইভ সোসাইটিজ-ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, অ্যান্ড ডাচ ইন দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ অ্যান্ড সাউথ আমেরিকা (১৯৬২)
* অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস (১৯৬৪)
* দ্য লস অব এলডোরাডো (১৯৬৯)
* দ্য ওভারক্রাউডেড বারাকুন অ্যান্ড আদার আর্টিকেলস (১৯৭২)
* ইন্ডিয়া : অ্যা ওন্ডেড সিভিলাইজেশন (১৯৭৭)
* অ্যা কঙ্গো ডায়েরি (১৯৮০)
* দ্য রিটার্ন অব এভা পেরন অ্যান্ড কিলিংস ইন ত্রিনিদাদ (১৯৮০)
* অ্যামাং দ্য বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি (১৯৮১)
* ফাইন্ডিং দ্য সেন্টার : টু ন্যারেটিভস (১৯৮৪)
* অ্যা টার্ন অব দ্য সাউথ (১৯৮৯)
* ইন্ডিয়া : অ্যা মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ (১৯৯০)
* বেয়ন্ড বিলিফ : ইসলামিক এক্সকার্সনস অ্যামাং দ্য কনভার্টেড পিপলস (১৯৯৮)
* বিটউইন ফাদার অ্যান্ড সান : ফ্যামিলি লেটার্স (১৯৯৯, গিলন অ্যাটকেন-সম্পাদিত)
* দ্য মাস্ক অব আফ্রিকা (২০১০)
Wednesday, December 30, 2020
গল্প- শুভ নববর্ষ by আন্দালিব রাশদী

শুভ নববর্ষ।
২০১৫ আপনার জন্য বয়ে আনুক অনাবিল সুখ ও সমৃদ্ধি। অনাবিল-টনাবিল – এ-ধরনের গেয়ো শব্দ আমার মেজাজ খারাপ করে দেয়।
বছরের প্রথম দিন আমি মেজাজ ঠান্ডা রাখতে চাই – একেবারে কুল। আগের নববর্ষে যেসব রেজোল্যুশন নিয়েছিলাম বছরের শেষ দিন তা রিভিউ করেছি।
আমার টপমোস্ট রেজোল্যুশন ছিল সাড়ে পাঁচ কেজি ওজন কমানো। বাসার ওয়েইং স্কেলটাতে আমার ভরপেট ওজন আর খালি পেট ওজন একই দেখায় বলে আমি নিউমার্কেট ফুটওভারব্রিজের ওপর ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রের স্বচ্ছ পস্ন্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে কাঁটাটা কোথায় গিয়ে স্থির হয় তা বের করেছি। এটা আমার বছরের শেষদিনের কাজ। আমার ওজন সাড়ে পাঁচ কেজি কমেনি। আরো সোয়া দুই কেজি বেড়েছে। সুতরাং এ-বছর অর্থমন্ত্রীর রিভাইজড বাজেটের মতো রিভাইজড রেজোল্যুশন নিতে হলো – এ-বছর লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে ওজন কমাতে হবে পৌনে আট কেজি – তার মানে ৭ হাজার ৭৫০ গ্রাম। ৩৬৫ দিনে বছর – তার মানে প্রতিদিন সোয়া একুশ গ্রাম ওজন কমাতে হবে।
একটি মাত্র রেজোল্যুশন শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। সিদ্ধান্ত ছিল : বানিয়ে বানিয়ে লেখা কোনো বইপত্র পড়ব না। ২০১৪-তে আমি কারো লেখা কোনো গল্প-উপন্যাস পড়িনি। এটা ২০১৫-তেও অব্যাহত রাখতে হবে।
রাত বারোটা এক মিনিট থেকে সকাল সাড়ে নটার মধ্যে আমি তেরোটি শুভেচ্ছা এসএমএস পেয়েছি।
আগে হ্যাপি নিউ ইয়ার লেখা কার্ড পেতাম। সেগুলো জমিয়ে রাখতাম। আমার ব্যক্তিগত আর্কাইভে আমাকে পাঠানো বিভিন্ন ধরনের অন্তত আড়াইশো কার্ড রয়েছে।
এসএমএস অনেক সস্তা। বিশ টাকার প্যাকেজ নিলে একশ একটা এসএমএস করা যায়।
আমি এসএমএস পাই, দু-এক সপ্তাহ পরপর ডিলিট করি। গোয়েন্দারা চাইলে কিছু কিছু এসএমএস রিট্রিভ করতে পারেন। এটা জমিয়ে রাখার নয়, ডিলিট করার যুগ। সম্পর্ক ধরে রেখে বোঝা বাড়াতে নেই, কান্নাকাটি অর্থহীন, ডিলিট করে ফেললেই হলো।
আমি যে-তেরোটি এসএমএস পেয়েছি তার পাঁচটি বাংলায় টাইপ করা। পাঁচটিই বেশ ইন্টারেস্টিং।
১. পাত্র ও পাত্রীর বন্দোবস্ত করতে পারি। আমরা অগ্রিম কোনো ফি চার্জ করি না। পরীক্ষা প্রার্থনীয়। পাখিভাই মেট্রোমনিয়ালস।
২. শুভ নববর্ষ। আপনাকে স্বীকার করতেই হবে নারীর সৌন্দর্য তার স্তন। আমরা নারীর ফিগারের সঙ্গে সংগতি রেখে স্তনের সমন্বয় করে থাকি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হারবাল মেডিসিন প্রয়োগ করে স্তনের বৃদ্ধি ও হ্রাসের জন্য সত্বর যোগাযোগ করুন : ব্রেস্টএইড, পেট্রোনাস পস্নাজা, রোড-১৬-এ (পুরাতন ২৭)।
দ্র : ব্রেস্টএইডের সব ওষুধ ও সেবা ৫০% হ্রাসকৃত মূল্যে পাবেন পুরো জানুয়ারি মাস।
৩. রঞ্জুর বাবা,
২০১৫ সালে আপনার ওপর আল্লাহর গজব নাজেল হোক। আপনি ধ্বংস হয়ে যান। – ফাতিমা।
৪. শুভ নববর্ষ। সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। – তুষার।
৫. তিতির ইনশাল্লাহ এ-বছর তোর বিয়ে হবেই। দোয়া করি। – ছোটখালা।
আশ্চর্য, ছোটখালাও বাংলা টাইপ শিখে গেছে। আর আমাকে লিখতে হয় ইংরেজি হরফে।
আমি শুধু একটিই পাঠিয়েছি। ইংরেজি হরফের বাংলায় : নতুন বছরের শুভকামনা। ভালো থাকবেন।
সম্বোধন করিনি, ইতিতে নামও লিখিনি। আমার নম্বর তার সেভ করা। আমি পাঠিয়েছি ২০১৫-এর প্রথম মিনিটে – রাত বারোটা এক মিনিটে। ১২ ঘণ্টায়ও কোনো জবাব আসেনি।
আমার কী লেখা উচিত ছিল : আপনার তিতির?
১৮ ঘণ্টায়ও যখন জবাব এলো না, নিজেকে মনে হলো বেহায়া। এই মেসেজটা আমার পাঠানোর কী দরকার ছিল?
তৃতীয় বার্তাটি রঞ্জুর বাবাকে দেওয়া, কোনোভাবেই আমাকে নয়। প্রথমত, কারো বাবা হওয়ার শারীরিক সামর্থ্য আমার নেই। ফাতিমা আমার অপরিচিত নাম নয়; কিন্তু এই ফাতিমা সম্ভবত রঞ্জুর মা, তিনি মোটেও পরিচিত নন।
নবীজির কন্যা ফাতিমা মুসলিম জাহানের অশেষ শ্রদ্ধার পাত্রী। পাকিস্তানের আইয়ুব আমলে বাঙালিরা প্রেসিডেন্ট পদে সমর্থন করেছিলেন জিন্নাহর ভগ্নি ফাতিমা জিন্নাহকে, ফাতিমা ভুট্টো পিতামহ জুলফিকার আলীর ফাঁসি নিয়ে বই লিখেছেন, ফাতিমা লোপেজ নামে একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং ফাতিমা রবিনসন নামে একজন নৃত্যশিল্পী রয়েছেন, তারা কেউই আমার সরাসরি পরিচিত নন, পরোক্ষভাবে জেনেছি। প্রত্যক্ষ পরিচিত একজনই, আমার ক্লাসমেট ফাতিমা আওরঙ্গজেব। গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন, কিন্তু মৃত্যু তাকে গ্রহণ করেনি। কৌতূহল থেকেই বছরের প্রথম দিনই অভিযোগের বার্তা পাঠানো নারী ফাতিমাকে কলব্যাক করলাম।
প্রথম রিংয়ে ফোন ধরে আমার হ্যালো শোনার আগেই তিনি বললেন, বেহায়া কোথাকার! ফোন করতে তোমার লজ্জা হলো না?
আমার নারীকণ্ঠ শুনে তিনি থতমত খেয়ে পরক্ষণেই বললেন, তুই তা হলে সেই বেশ্যা, যে রঞ্জুর বাবাকে কব্জা করে রেখেছিস। এ-বছরই আল্লাহর গজব তোর ওপরও নাজেল হবে।
বছরের প্রথম দিন আমাকে ‘বেশ্যা’ গাল শুনতে হলো এবং সঙ্গে আল্লাহর গজবের অভিশাপ।
আমি বিনয়ের সঙ্গেই বললাম, ফাতিমা ম্যাডাম এটা রং নম্বর। তিনি বললেন, ওই গাধাটাকে দে কিছু কথা শোনাই।
কৌশল পালটে এবার আমি ধমক লাগাই এবং তুই সম্বোধন করে বলি, তোর সব কথা আমি রেকর্ড করেছি, এগুলো পুলিশকে দেবো।
তখন তিনি বললেন, আপনি কে? কে বলছেন!
আমি তো এটাই বলতে চাচ্ছিলাম, যে আপনি মেসেজটা রং নম্বরে পাঠিয়েছেন।
কিন্তু তিনি তো আমাকে এই নম্বরই দিয়েছেন। আগে যে-নম্বরে কথা বলতাম সেটা এখন আর ব্যবহার করে না।
তিনি সতর্ক ছিলেন নববর্ষের অভিশাপটা যাতে তার কাছে না পৌঁছে। কিন্তু তিনি কি আপনার হাজব্যান্ড? মানে রঞ্জু আপনার ছেলে।
সরি আপা, মাথা ঠিক ছিল না, কী বলতে কী বলেছি ক্ষমা করে দেবেন। দেখুন ফাতিমা আমার নাম নয়, তিনি আমার হাজব্যান্ডও নন এবং রঞ্জু নামে আমার কোনো ছেলেও নেই। যে-মেয়েটি এই বাংলা এসএমএস লিখে দিয়েছে তার নাম ফাতিমা, ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠেছে, আমি ফাতিমাদের বাসায় ভাড়া থাকি। ভুলে সে নিজের নাম লিখে ফেলেছে। কিন্তু আপনি কে বলছেন?
আমার নাম তিতির।
তিতির মানে, ওই যে মুরগির মতো? তিতিরের মাংসের স্বাদ কেমন? আমি কখনো খাইনি। এক কেজির দাম কত পড়ে?
দেখুন তিতিরের মাংসের স্বাদ কেমন, কেজি কত আমার কোনো ধারণা নেই। কিন্তু আপনি রঞ্জুর বাবাকে এত বড় একটা ভয়ংকর অভিশাপ দিলেন কেন?
আপনি আমার মেসেজটা ডিলিট করে ফেলুন। আমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিল না। এই সময় লোকটা ঢুকে পড়ে, মানে আমার সঙ্গে একটা সম্পর্ক করে ফেলে, আমাকে বিয়েও করতে চায়। কিন্তু সমস্যা ছিল তার ছেলে রঞ্জু। রঞ্জুর বয়স এগারো বছর। মা নেই। লোকটা বলল, লাখদশেক টাকা হলে রঞ্জুকে কানাডায় একেবারে স্থায়ীভাবে রেখে আসবে। রঞ্জুর ছোট ফুপুর কোনো ছেলে নেই। পাঁচটা মেয়ে, তিনি তাকে অ্যাডপ্ট করবেন। কিন্তু তার আর্থিক অবস্থা খারাপ, সেজন্য তাকেও লাখপাঁচেক টাকা দেওয়ার কথা। আমি আমার হাজব্যান্ডের টাকা মেরে, আমার সব অর্নামেন্ট বেচে তাকে দশ লাখ টাকা দিয়েছি। দুমাস আগে কানাডা যাওয়ার সময় আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে শেষ ফোন করেছে। বলেছে, একুশ দিন পর এসে আমার সঙ্গে বিয়ের কাজটা সেরে নেবে। তার কোনো সাড়া না পাওয়ায় কদিন ধরে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ পত্রিকায় দেখলাম তার ছবি – একটি কোম্পানির বিপুল অংকের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছে। তার এলাকার থানায় খোঁজ নিয়ে জানলাম ছমাস ধরে পলাতক, স্ত্রী ও শাশুড়িকে হত্যা করে পালিয়েছে। তার রঞ্জু নামের কোনো সন্তান নেই।
এবার আমি জিজ্ঞেস করি, লোকটার নাম কি রইসুল ইসলাম খান?
আপনি চেনেন? আপা আপনি কি তাকে চেনেন? কোথায় আছে বলতে পারবেন?
আমি বললাম, রঞ্জুর তো লিউকেমিয়া, বস্নাড ক্যান্সার। মাসদুয়েক আগে আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে রঞ্জুর চিকিৎসার জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা দিলাম। রইসুলের তো ছেলে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে অ্যাপয়েন্টমেন্টের কাগজও দেখিয়েছে। রইসুল অনেকদিন আগে আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার ছিল। হঠাৎ মাসতিনেকের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় তার চাকরি চলে যায়। সবাই তাকে পছন্দ করত। তার চাকরি ফিরিয়ে দিতে সবাই বলেছে, ইউনিয়নও চাপ দিয়েছে; কিন্তু সিইও সাহেব রাজি হননি। রইসুল রঞ্জুর চিকিৎসা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছে, সামনাসামনি এবং ফোনে। আমার নম্বর তার ফোনে সেভ করা ছিল। রইসুল তাহলে আমার নম্বরটাই আপনাকে দিয়েছে।
এবার তিনি বললেন, আপা আপনার সঙ্গে দেখা করব!
আমি প্রথমে বললাম, কী দরকার?
তারপর ঝামেলা এড়াতে মিথ্যাটাই বললাম, আমি আগামী দুমাস দেশের বাইরে থাকব।
আমি তার ফোন আর ধরিনি। নম্বরটি বস্নক করে দিই।
ব্রেস্টএইড আমার নম্বরটি কোথায় পেল?
স্তন ক্যান্সার-সচেতনতা সপ্তাহের একটি অনুষ্ঠানে আমি লাম্প ডিটেক্টর নিয়ে একটি বক্তৃতা দিই, সঙ্গে ছিল ডিজিটাল প্রেজেন্টেশন। আমাদের কোম্পানির ফার্মাসিউটিক্যাল ইকুইপমেন্টস আমদানির লিস্টে সিনোরা ব্রেস্ট লাম্ব ডিটেক্টরও আছে। আমি বলি, কোনো পুরুষ ডাক্তারকে স্তন দেখানোর বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়ে এমনকি অন্য কোনো নারীকেও না বলে আপনি নিজেই এই ছোট যন্ত্রটি দিয়ে আপনার স্তনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন। কোনো শক্ত বা নরম মাংসপি- ভেতরে বেড়ে উঠতে থাকলে মেশিনই আপনাকে বলে দেবে, সতর্ক করে দেবে।
সেই অনুষ্ঠানে এক ডজন স্পন্সরের মধ্যে ব্রেস্টএইডও ছিল। কাজেই আয়োজকদের কাজ থেকে আমার নম্বর পেতেই পারে। তাদের নববর্ষের শুভেচ্ছাটির সঙ্গে স্তন ক্যান্সার সারানোর কোনো সম্পর্ক নেই, স্তনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির আহবান আছে। এই আহবানে আমার সাড়া দেওয়ার কোনো কারণ নেই। নায়িকা সালমা হায়েক, গায়িকা জেনেট জ্যাকসন, স্পাইস গার্লস ব্যান্ডের ভিক্টোরিয়া বেকহাম, বেওয়াচের পামেলা অ্যান্ডারসন সিলিকন ইমপস্ন্যান্ট করে স্তনের আকার বাড়িয়ে নিয়েছে – বড় স্তন আকর্ষণ করে না বিকর্ষণ করে ছেলেরাই ভালো বলতে পারবে। আমি বলব, পামেলা অ্যান্ডারসনকে কেবল বড় স্তনের কারণে আমার একটুও ভালো লাগে না।
পাখিভাই ম্যাট্রোমনিয়ালস আমাকে শুভেচ্ছা পাঠাতেই পারে। মৃত্যুর আগে আমার মা নিজের হাতে আমার ছবি ও বায়োডাটা দিয়ে এসেছেন – তারা যেন তিতিরের জন্য একটি উপযুক্ত পাত্র খুঁজে দেয়। বিজ্ঞাপন বার্তায় যা-ই লেখা থাকুক, আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবে তিন হাজার সাতশো টাকাও দিতে হয়েছে। পুলিশের খাতায় নাম ওঠা দুশ্চিন্তার কারণ হতেই পারে, ঘটকের খাতায় নাম উঠলে এতটুকু আশ্বস্ত থাকা যায়, জীবনের কিছুটা দায় তো তিনিই নিয়ে নিলেন। আমার বেলায় ঘটক সাহেব এখনো উপযুক্ত পাত্র উপস্থাপন করতে পারেননি। তিনি আমাকেই বলেছেন, ইনশাল্লাহ আগামী ষাট দিবসের মধ্যেই আমাদের ভগ্নি তিতিরের একটি ফয়সালা হয়ে যাবে। বড় বিয়েতে ঘটকই দাওয়াত পায় না। ভগ্নি, ভুলবেন না কিন্তু।
পাঁচ নম্বর এসএমএসটি আমার ছোটখালার। তিনি মনে করছেন কোনো একটা অশুভ প্রভাবে আমার জন্য ভালো কোনো প্রস্তাব আসছে না, আমার বিয়ে হচ্ছে না। আজমির শরিফ থেকে ইচ্ছাপূরণ সুতো এনে আমার বাহুতে বেঁধে দিয়ে বলেছেন, লক্ষ্মীসোনা, দোহাই আল্লাহর হাত থেকে এটা খুলিস না, গোসলের সময়ও না। এই পূর্ণিমাতে বেঁধে দিলাম অমাবস্যাতে খুলে দেব। খাজা বাবার দোয়ায় ইনশাল্লাহ তোর বিয়েটা হয়ে যাবে।
তিনি ধরে নিয়েছেন, পির-পয়গম্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া আমার বিয়ে হবে না। শ্বশুরবাড়ির ওমরাহ-ফেরত এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের জেরিক্যান থেকে ছোটখালা এক গ্লাস জমজমের পানিও রেখে দিয়েছেন। এই পানির সঙ্গে সেদ্ধ করা ফিলটার করা স্বচ্ছ পানি মিশিয়ে পাঁচশো এমএল বোতলে ভরে আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। তার উপস্থিতিতে বিসমিল্লাহ বলে আমাকে প্রায় চারশো পঞ্চাশ এমএল পানি খেয়ে নিতে হলো। অবশিষ্ট পানির সঙ্গে আরো মিশিয়ে আবার পাঁচশো এমএল, এভাবে মোট তিনদিন খাবার হুকুম দিলেন। দুটো ঘটনাই ২০১৪ সালের। তেমন উলেস্নখযোগ্য কোনো প্রস্তাব এলো না।
ছোটখালার মনে তখন ভিন্ন প্রশ্ন – কেউ তাবিজ করেনি তো? আমি হাসি।
ছোটখালা বলেন, হাসিস না। কুফরি কালাম করে মানুষের ক্ষতি করা যায়। তোর বিয়ে ঠেকানোর জন্য কেউ হয়তো তোদের বাড়ির সীমানার ভেতরেই কোথাও তাবিজ পুঁতে রেখেছে।
তিনি আবার মেয়েদের বয়স প্রসঙ্গে ফিরে আসেন। ছেলেদের বয়স যত বাড়ে বাড়ুক সমস্যা নেই। কিন্তু একটা বয়সের পর মেয়েদের লাবণ্য কমতে থাকে। বিয়ের কাজটা সারতে হয় তার আগে। বাচ্চাকাচ্চাও নিয়ে হয় তরতাজা যৌবনে। ভাটির কোনোটাই জুতমতো হয় না – বিয়েও না, সন্তানও না।
তা হলে আমার লাবণ্য কমতে শুরু করেছে?
ছোটখালা বললেন, আমি তা বলিনি, কিন্তু এটা তো সত্য বিশ্বসুন্দরীদের অনেকে এর মধ্যে বুড়ি হয়ে গেছেন। সুস্মিতা সেন, ঐশ্বরিয়া রাই এমনকি এ-বছর যে-মেয়েটা মিস ইউনিভার্স হলো কী যে তার নাম – সবাই বেঁচে থাকলে থুত্থুড়ে বুড়ি হবে। এটাই সত্যি। চার নম্বর এসএমএসটিতে একটি প্রাচীন, বহুল ব্যবহৃত, জরাজীর্ণ দার্শনিকী বাক্য : সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কথাটা তুষার আমাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছে। তার মানে আমি সাড়া না দিলে সে আমার জন্য বসে থাকবে না, কিংবা আমি বসে থাকলে সময়ের বার্ধক্যলেপন থেমে থাকবে না। একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে যাব! আমার চেহারাটা এমন হাড়গিলার মতো হলো কেমন করে? আমি তো এমন ছিলাম না।
তুষার নিশ্চয়ই মনে করেছে এতদিন পর তার বার্তা পেয়ে আমি গদগদ হয়ে তখনই কল করে বসব। একদম ভুল ধারণা। তুষার যতই সেলিব্রেটি হয়ে উঠছে, তার সম্পর্কে আমার আগ্রহ ততই কমেছে। ততই দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাকে নিয়ে গসিপ কলাম যা ইচ্ছা তা-ই লিখুক, কখনো আমাকে যেন না জড়ায়। তুষার এখন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, চ্যানেল ঘুরিয়ে যেখানেই যাই সেখানেই তুষার। স্টুপিড, আমার যেন কাজ নেই।
----দুই----
আমি বছরের প্রথম দিনের খবরের কাগজ হাতে তুলে নিই। প্রথম পৃষ্ঠায় বাঁদিকে এক কলাম ইঞ্চিতে রজনীগন্ধার কটি ডাঁট, এরই নিচে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সব পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীকে ২০১৫ সালের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
আমাদের বাড়িতে চার-পাঁচটি পত্রিকা আসে। একটি কেবল গাঁটের পয়সায় কেনা, বাকিগুলো সৌজন্যে আসা। আমার বাবা মোটামুটি একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক।
আমাদের বাড়িতে আমিই, আর কেউ কখনো পত্রিকার ভাঁজ ভাঙে না, বাবা কখনো নয়। আমার যেদিন ইচ্ছা হয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি, বিশেষ করে ক্ল্যাসিফায়েড বিজ্ঞাপনের পাতা। বছরের প্রথম দিন বলে খুব মনোযোগ দিয়ে যা পড়েছি তার কিছুটা তুলে ধরছি :
শ্রীলংকার প্রিমিয়ার লিগে খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের কৃতী ক্রিকেটার আশরাফুল ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। জেরার মুখে তিনি স্বীকার করেছেন, ২০১২-এর ২৬ আগস্ট রুহুনু রয়ালস ভার্সাস ওয়েমবা ইউনাইটেডের খেলায় তিনি ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অপরাধ করেছেন। পাঁচ বছরের জন্য তাকে ক্রিকেট থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ছোটখাটো গড়নের আশরাফুল আমার প্রিয় ব্যাটসম্যান ছিলেন। এখন কী আর করা – যদি প্র্যাকটিস ছেড়ে দেন, ফিরে আসার আর সম্ভাবনা থাকবে না।
রওশন এরশাদ বলেছেন, নির্বাচনের সময় এলে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা দল ছেড়ে চলে যান। সেটাই তো করার কথা। যেখানে তাদের প্রাপ্তিযোগ বেশি হবে, ভবিষ্যৎ বেশি ঝলমলে মনে হবে, তারা তো সেখানেই যাবেন। এটা দোষের কিছু নয়। তিনি বলেছেন, এ-কারণেই তিনি পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। আপনি ঠিক কাজটিই করেছেন, পার্টি চেয়ারম্যানের নির্দেশ পালিত হবে না তো কারটা পালিত হবে। তাছাড়া তিনি তো আপনার স্বামীও। স্বামীর নির্দেশ পালনে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। আমার স্বামী নেই, থাকলে আমিও তার কথা শুনতাম। স্বামী নেই মানে এই নয় যে, আমি অল্পবয়সে বিধবা কিংবা স্বামী-পরিত্যক্ত কোনো নারী। কিংবা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্বামীকে দুনিয়া থেকে একেবারে সরিয়ে দিয়েছি, এমনও নয়। আমার বিয়েই হয়নি। মা বলত, উপযুক্ত ছেলে আসছে না। চেষ্টা অব্যাহত আছে। পাখিভাই ম্যাট্রোমনিয়ালস ছাড়াও অনানুষ্ঠানিকভাবে আমার মায়ের পরিচিতজনরা আমার বিয়ের জন্য সক্রিয়।
বলেছিই তো, স্বামী থাকলে আমি তার কথা শুনতাম। কিন্তু আমার মেজফুপু তার স্বামীর কথা শুনতেন না, শুনতেন আপনার স্বামীর কথা। এ-নিয়ে তাদের সংসারে যথেষ্ট অশাস্তি হয়েছে। ফুপু এই অশাস্তিটাই উপভোগ করতেন। ফুপা ভোট দিতেন নৌকায় আর ফুপু লাঙলে।
ফুপা এরশাদ সাহেবকে নিয়ে এটা-ওটা বলতেন। কিন্তু ফুপু যেদিন বললেন, তুমি কত বড় সাধু আমার তা জানা আছে – এর পর থেকে ফুপা আপনার স্বামীর সঙ্গে নারীনাম জড়িয়ে বিদ্রূপ করা বন্ধ করলেন। পরে নৌকা ও লাঙলের সমন্বয় ঘটে যাওয়ায় তাদের ঘরে শাস্তির সুবাতাস বইতে থাকে।
ফুপু সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফুপুর চেয়ে বারো বছরের কমবয়সী এবং যথেষ্ট আকর্ষণীয় একজন নারী কনুইয়ের গুঁতোয় তাকে থমকে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। ফুপু নমিনেশনের দৌড়ে অনেক পিছিয়ে পড়েন।
ফুপা তার স্ত্রীর এই পিছিয়ে-পড়াটা খুব উপভোগ করেন এবং বলেন, তোমার আরো পনেরো বছর আগে জন্মগ্রহণ করা উচিত ছিল।
আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি লোকজন কেন আপনার স্বামীকে স্বৈরাচার বলে। তিনি যদি আমাদের এলাকা থেকে নির্বাচন করেন, আমি তাকে ভোট দেবো। তবে আমার মেজফুপু শওকত আরা জুলহাস উদ্দিনের মন এতটাই ভেঙে গেছে যে, তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন, এমনকি আর কখনো ভোট দেবেন না – এ-ঘোষণাও দিয়েছেন।
আমি ফুপুকে ফোন করি।
ফুপু, শুভ নববর্ষ।
আরে রাখ তোর শুভ নববর্ষ। নববর্ষের গুষ্টি মারি।
সরি ফুপু, তোমার সম্ভবত মেজাজ খারাপ। এ-সময় আমার ফোন করা ঠিক হয়নি।
তাহলে কখন করতি, রাতের বেলায়? তাহলে তো তৃতীয় মহাযুদ্ধের গোলাগুলির শব্দ শুনতি। গত দুদিনের মধ্যে এখনই বরং মেজাজটা ভালো। সারা সকালে মাত্র এক কাপ কড়া কফি খেয়েছি। তোর কী খবর? ঘটক কাউকে এখনো পায়নি?
চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বলেছেন ইনশাল্লাহ ২০১৫ সালে পেয়ে যাবেন।
শোন তিতির আমি তোকে বলি। এখনই ভালো আছিস। তোর মা ভেবেছিল, তোকে কারো গলায় ঝুলিয়ে দেবে, যেমন করে সে নিজে আমার ভাইটার গলায় ঝুলে পড়েছিল। খোকাবাবু একটা মাটির মানুষ, সেজন্য নূপুরকে মেনে নিয়েছে। তোর বেলায় হবে ঠিক তার উলটো, পাত্র এসে তোর গলায় ঝুলে পড়বে। বাপের ভোগাস্তির প্রায়শ্চিত্ত তোকেই করতে হবে। তুই দেখতে সুন্দর, পড়াশোনায় ভালো, বিদেশি ডিগ্রি পেয়েছিস, ভালো চাকরি আছে। তোর বিয়ে করার কী দরকার? সুখ আর স্বাধীনতা সহ্য হয় না, তাই না? আমার যদি তোর মতো পড়াশোনা থাকত, বিদেশি একটা এমবিএ থাকত, একটা ভালো চাকরি থাকত, আমি সৈয়দ জুলহাস উদ্দিনকে বিয়ে করি?
ফুপু আস্তে বলো, ফুপা শুনলে আমার ক্ষতি হবে। তুমি খুব ভালো করে জানো আমার পাঁচজন ফুপার মধ্যে আমি জুলহাস ফুপাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। বিদেশে গেলে একমাত্র তিনিই বইয়ের দোকানে ঢুকে আমাকে ফোন করে বলেন, বইয়ের নাম বলো কী বই কিনব। অথচ আমি জানি তিনি নিজে একটা বইও পড়েন না। একবার আমার ফোনে চার্জ ছিল না। আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেননি তবু অনুমান করে আমার জন্য দুটো বই কিনে এনেছেন : ওরিয়ানা ফ্যালাসির ইন্টারভিউ উইথ হিস্টি আর ওয়াল্টার স্কেটের দ্য কনসাইজ ডিকশনারি অব ইংলিশ ইটিমোলজি, হার্টের বাইপাস সার্জারি করাতে সিঙ্গাপুর গিয়ে ফেরার সময় আনলেন লি কুয়ান ইডর ফ্রম দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট।
ফুপু বললেন, থাম থাম, দুটো বই দিয়ে তোর মাথা কিনে নিয়েছে। তার নিজের মাথায় কী ছিল কে জানে? লিলিয়ানকে কী এনে দিত জানিস কিনা বল?
আমি জিজ্ঞেস করি, লিলিয়ান কে?
লিলিয়ান রড্রিগস। জুলহাস উদ্দিনের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তার জন্য আনতো ব্রা আর প্যান্টি আর আমার জন্য এনেছিল সৌদি বোরকা। জুলহাস কোম্পানির তিনজন বোর্ড মেম্বার আর লিলিয়ানকে নিয়ে হ্যাপি নিউ ইয়ার করতে কক্সবাজার গেছে। বছরের শেষে সূর্যাস্ত দেখবে। হুইস্কি খেয়ে রাত বারোটা এক মিনিটে নতুন বছরকে বরণ করবে। অথচ আমাকে বলেছে প্রোডাক্ট প্রমোশন ম্যানেজারদের কনফারেন্স। আমি জিজ্ঞেস করি, লিলিয়ানও যাচ্ছে? কী বলেছে শুনবি, ওর সেক্রেটারিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স ছাড়া তো চলবেই না? অন্য কেউ হলে বলত ‘তার’, লিলিয়ানের বেলায় ‘ওর’।
ফুপু তোমার সঙ্গে শিগগির দেখা করব, ভালো থেকো।
ক্যান্ লিলিয়ানের কথা আর শুনবি না? আজই চলে আয় সন্ধেবেলায়, পুতুল আর পুপুল বার-বি-কিউ করবে।
ফুপুর যমজ দুই মেয়ে পুতুল আর পুপুল। আইডেন্টিক্যাল টুইন। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বেরোব না, জানিয়ে দিই।
ফুপু ধ্যাৎ বলে লাইনটা কেটে দিলেন।
ভালো করেছেন। আমাকে পেপারটা তো পড়তে হবে।
নিচের দিকে দু-কলাম জুড়ে : স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই দাম্পত্য নির্যাতনের শিকার।
পাঁচ থেকে পঁচিশ বছর দাম্পত্যজীবন কেটেছে এমন পাঁচশো ষাট দম্পতির ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাহাত্তর শতাংশ নারী এবং নয় শতাংশ পুরুষ দাম্পত্য নির্যাতনের শিকার। বাকি উনিশ শতাংশ নারী ও পুরুষ বলেছেন, সংসার এমনই। স্বামী বা স্ত্রীর বিরুদ্ধে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। এই উনিশ শতাংশের কয়েকজন স্বামী ও স্ত্রীর সাড়া লক্ষণীয় :
আমার বাবা আমার মায়ের ওপর যে নির্যাতন চালাতেন সে-তুলনায় আমার স্বামী তো ফেরেশতা।
আমার শাশুড়ি প্ররোচনা না দিলে আমার স্বামী কখনো নির্যাতন করেন না, এটা তো আর তার দোষ নয়।
আমার মায়ের ক্যাটক্যাট শুনতে শুনতে আমার বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, আমি তো এখনো আছি।
সমীক্ষকরা ধরে নিয়েছেন, দাম্পত্যজীবনের প্রথম পাঁচ বছরে স্বামী ও স্ত্রীর প্রকৃত চেহারার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে না, আর পঁচিশ বছর সংসার করে ফেলতে পারলে যা-ই ঘটুক, সবটাই গা-সহা হয়ে যায়।
এই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি কমসংখ্যক নমুনার ওপর ভিত্তি করে করা। আমার চারপাশে যত দম্পতি দেখতে পাচ্ছি মেজফুপাসহ অধিকাংশ স্বামীই নির্যাতিত বলে আমার ধারণা। এমনকি আমাদের গৃহকর্মী (আমরা এখন আর কাজের বুয়া বলি না) গোলাপের মাও বলেছে, একটা ফিউজ বাল্ব গোলাপের বাবার ওপর ছুড়ে মেরেছিল, গালের কাছে বেশ খানিকটা কেটে রক্ত বেরিয়েছে। শেষ পৃষ্ঠার একটি সংবাদ : তিন বোতল ফেনসিডিলসহ পুলিশের কনস্টেবল মামুন চৌধুরী গ্রেফতার। রাত একটার দিকে সিভিল ড্রেসে কুড়িগ্রামের মিতালী সিনেমা হলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওত পেতে থাকা মাদক প্রতিরোধ বাহিনী সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে তাকে আটক করে। তার ব্যাগ তল্লাশির পর তিন বোতল ফেনসিডিল পায়। তাকে থানায় সোপর্দ করা হয়।
মাত্র তিন বোতল ফেনসিডিল!
কাশি সারাতেই তো দুই বোতল লেগে যায়। বছরের শুরুতে এমন লঘুপাপে একজন পুলিশ গ্রেফতার – বছরটা পুলিশের জন্য না জানি কেমন যায়।
আরো একটি খবর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে :
একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে সিফাত নামের এক যুবক সঙ্গোপনে ঢুকে বর ও তার সঙ্গীদের ওপর গুঁড়ো দাহ্যপদার্থ ছড়িয়ে তাদের ওপর জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি ছুড়ে মারে। দাউদাউ আগুন জ্বলে ওঠে। সিফাতকে ধাওয়া করে ধরে ফেলা সম্ভব হয়। জনতা তাকে গণধোলাই দেয়। বর সেলিমউল্লাহসহ তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ছয় মাস আগে একই পাত্রীর সঙ্গে সিফাতেরও গায়ে হলুদ হয়। কিন্তু গায়ে হলুদের পর পাত্রী বিগড়ে যায় এবং সিফাতকে প্রত্যাখ্যান করে। প্রতিশোধ নিতেই এ-কা- করেছে বলে সে জানায়, কিন্তু যেহেতু মেয়েটিকে সে ভালোবাসে সেজন্য তাকে অক্ষত রেখেছে। দুজন পাত্র এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাচ্ছে, কিন্তু আমার বেলায়?
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১৪ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬.৩১, বাড়ি ভাড়া ৯.৭৫; বাড়ি ভাড়া সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বস্তি এলাকায় ১৬.০৭ আর ফ্ল্যাটের ভাড়া বেড়েছে ১২.৮২ শতাংশ। দাম কমেছে ভোজ্যতেল, লবণ, ডাল, সুগন্ধি চাল, মসলা, চা, ডিম ও আটার। এসব প্রতিবেদন পড়ে আমার কী লাভ? নিজের অবস্থা বুঝতে পারা? হতে পারে। অক্টোবরে আমার বেতন শতভাগের কাছাকাছি বেড়েছে। কাজেই আমার যথেষ্ট উদ্বৃত্ত থাকবে।
----তিন----
সম্পাদকের নববর্ষের শুভেচ্ছার ঠিক নিচে প্রথম পৃষ্ঠায় যে-সংবাদটি দেখে আঁতকে উঠব বলে কেউ কেউ মনে করে থাকবে তা মোটেও আঁতকে ওঠার মতো কিছু নয়। বেশ পুরু হরফে ছাপা : ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সচিবের ছড়াছড়ি। যে-কজনের ছবি ছাপা হয়েছে মোস্তফা আল আমিনও তাদের মধ্যে আছেন।
আমি অবাক হইনি তার কারণ আমি তো মোস্তফা আল আমিনকে সেই কবে থেকে চিনি, মনেও নেই। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার সময়ও তিনি হুংকার দিতেন, আমি আফটার অল বীর মুক্তিযোদ্ধা। জয়নব, তার বোকা স্ত্রী বলল, একটা ভীরু মুক্তিযোদ্ধা দেখাও তো? কোন ফ্রন্টে তুমি লড়াই করেছিলে বলো তো শুনি? আমি সব খবর জানি। তুমি একাত্তরে নারায়ণগঞ্জে বেশ্যাখানায় গিয়েছ, বাহাত্তরে নূরজাহান রোডের বাড়িতে বিহারি মেয়ে রেপ করেছ, তিয়াত্তরে তুমি প্রকৃতই শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে বাস্ত্তচ্যুত করে সে-বাড়ি দখল করেছ।
মোস্তফা আল আমিন বললেন, ইম্পসিবল! একাত্তরে আমার বয়স তো বারোও হয়নি, তেরো বছরের ছেলের পক্ষে বিহারি মেয়ে রেপ করা সম্ভব? আর চোদ্দো বছর বয়সে কী করেছি বললে?
বলেছি তুমি একটা ভ-। তুমি একটা ভুয়া, তোমার সবই ভুয়া।
দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, আর একবার যদি কথাটা শুনি, তাহলে…।
এ পর্যন্ত বলে তিনি দম নিলেন। তারপর সাঁড়াশির মতো নিজের দুই বলিষ্ঠ হাতে স্ত্রীর গলা টিপে ধরলেন, জোরে, আরো জোরে।
সম্ভবত দম বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে মোস্তফা আল আমিনের মাথায় তার মেয়ের সদ্য কেনা গিটারের প্রচ- আঘাত লাগলে তিনি ছিটকে পড়েন, মাথা থেকে অঝোরে রক্তের ধারা নেমে আসে। গলা থেকে হাতের ফাঁস সরে যাওয়ার পর চোখ খুলে রক্ত দেখে তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন, আমি কিছু করিনি।
মোস্তফা আল আমিন, সরকারের স্থায়ী সচিব এবং রণাঙ্গনের বীর দাবিদার সুদর্শন মানুষটি আতঙ্কিত চোখে এদিক-ওদিক তাকান – কোনো সাংবাদিক আসেনি তো?
গিটারের আঘাতটা কি ঠিকমতো লাগেনি? লাগলে মেয়েটি খুনের মামলায় জড়িয়ে যেত। মেয়েটি সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে আর ফিরে যায়নি। মার মৃত্যুর সময় বাংলাদেশেই ছিল না।
এটা জানা কথা, তিনি বলেছেন, আরে ধ্যাৎ, পত্রিকায় ছবি ছাপা হলেই হলো? সংখ্যায় তো আমরাই বেশি। আসল আর কজন চাকরি পেয়েছে? ভোট হলেও আমাদের কেউ হারাতে পারবে না। গণতন্ত্র বলে একটা কথা আছে না।
মেয়ে জানে, বাবা-মায়ের বিষয় নিয়ে ছেলেমেয়েদের মাথা ঘামাতে নেই। সেও ঘামাবে না।
তাছাড়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার মেয়ের বিয়ে বাবার ভুয়া হওয়ার কারণে ভেঙে গেছে – এমন নজির নেই। ভুয়া হলেই বরং কামাই বেশি। আর্থিক নিরাপত্তা গ্যারান্টেড। সুযোগও বেশি।
ছোটখালা ফোন করলেন, বললেন, দুলাভাইয়ের এবার খুব নামডাক হয়েছে, সব কাগজে ছবি। তিতির, তোর বিয়ে এবার কেউই ঠেকাতে পারবে না।
একুশ ঘণ্টা পর তুষারের আর একটা বাংলা এসএমএস : তিতির, তোমার বাবা তো খুব ইন্টারেস্টিং মানুষ! হ্যাপি নিউ ইয়ার।
গিটার কত কাজে লাগে। আর একটা কিনব।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1997)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
