Tuesday, June 23, 2015

১৬ কোটি বাঙালিকে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছে মিয়ানমার -বিজিবির সক্ষমতা নিয়ে হাজি সেলিমের প্রশ্ন

নায়েক আবদুর রাজ্জাক
জাতীয় সংসদে গতকাল সোমবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বতন্ত্র সাংসদ হাজি মো. সেলিম। তিনি বলেছেন, ‘ছবিতে দেখেছি, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী রাজ্জাককে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছে। এর অর্থ ১৬ কোটি বাঙালিকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে, সারা বাংলাদেশকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে।’
গতকাল পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অনির্ধারিত আলোচনায় হাজি সেলিম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাজেটে বিজিবির জন্য কোটি কোটি টাকা রাখা হয়। তারা কী করে? তাদের কি শক্তি নেই? শক্তি থাকলে তো এমন হওয়ার কথা নয়। তাদের এ ভূমিকায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন²হচ্ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। বিজিপির সঙ্গে নেই। সারা বিশ্বে একটা কলঙ্কের নাম মিয়ানমারের বিজিপি। তারা চোরাচালান, মাদক আর ইয়াবার ব্যবসায় জড়িত। তারা গুলি চালাল আর একজনকে তুলে নিয়ে গেল। বিজিবি কিছুই করল না।
হাজি সেলিম বলেন, কোনো কূটনৈতিক আলোচনা না করে, পতাকা বৈঠক না করে রাজ্জাককে (বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাক) আটকে রাখা হয়েছে। এরপর বিজিপির ফেসবুকে তিনটি ছবি আপলোড করা হয়েছে। তার একটিতে দেখা গেছে, রাজ্জাকের নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। আরেকটিতে হাতকড়া পরিয়ে তাঁকে আসামির মতো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
গতকাল সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা, এম এ হান্নান প্রমুখ। এরপর সংসদের অধিবেশন আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
মিয়ানমার আইনের লঙ্ঘন করেছে: মানবাধিকার কমিশন
মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশের বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ধরে নিয়ে এবং তাঁকে ফেরত না দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, মিয়ানমারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, যাতে করে রাজ্জাককে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে তারা মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ করে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আজ মঙ্গলবার এ কথা জানানো হয়।
এতে বলা হয়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন জেনেছে, গত ১৭ জুন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নাফ নদীতে টহলরত অবস্থায় মিয়ানমারের বিজিপি ও বিজিবির মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একজন বিজিবি জওয়ান গুলিবিদ্ধ হন। বিজিপি সদস্যরা বিজিবি নায়েক আবদুর রাজ্জাককে অপহরণ করে মিয়ানমারে নিয়ে যায় এবং অদ্যাবধি তাকে ফেরত দেয়নি। এ ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ‌ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন জানায়, ঘটনার ৬ দিন পরও নায়েক রাজ্জাককে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেনি। হস্তান্তরের বিষয়ে দেশটি গড়িমসি করছে। কমিশন মনে করে, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানায় অনুপ্রবেশ করে সেই দেশের নাগরিককে অপহরণ বা আটক করা যায় না। এ ছাড়া মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নায়েক রাজ্জাককে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে, তাতে তার মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বলে কমিশন মনে করে।
অতি দ্রুত নায়েক আবদুর রাজ্জাককে সুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য কমিশন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে।

পটুয়াখালীতে বিধ্বস্ত বাঁধ মেরামত হয়নি- ৩৫ গ্রামের মানুষ পানিবন্দী

পটুয়াখালীতে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত না করায় জোয়ারের
পানিতে প্লাবিত হচ্ছে বাড়িঘর ও ফসলি জমি। ছবিটি গত
রোববার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর ইউনিয়নের
নিজামপুর এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো
পটুয়াখালী জেলায় আট কিলোমিটার বিধ্বস্ত বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত না করায় জোয়ারের পানি বেড়ে ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকছে। পাঁচ দিন ধরে প্লাবিত হচ্ছে ফসলি জমি। এতে অন্তত ৩৫ গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পটুয়াখালী ও কলাপাড়া কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। পটুয়াখালী পাউবোর অধীনে ৮০০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৪৫০ কিলোমিটার এবং কলাপাড়া পাউবোর অধীনে ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৩৫০ কিলোমিটার বাঁধ বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে।
এদিকে অমাবস্যার প্রভাবে নদ-নদীর পানি আরও বেড়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় অনেক এলাকা প্লাবিত হয়। গত বৃহস্পতিবার থেকে মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া লোনা পানিতে ডুবে রয়েছে ফসলি জমি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কলাপাড়ার উপকূলীয় লালুয়া ইউনিয়ন ও মহিপুর ইউনিয়নের নিজামপুর এলাকা। রামনাবাদ নদীঘেঁষা লালুয়া ইউনিয়নের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের দুই কিলোমিটার তিন বছর আগেই ভেঙে গেছে। এখন জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া, ছোট পাঁচ নম্বর, বড় পাঁচ নম্বরসহ ১২টি গ্রাম। ভাটার সময় পানি কিছুটা নামলেও জলাবদ্ধতা থাকছেই।
লালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর তারিকুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন পার করছে। বাঁধ নির্মাণ করে দিতে ব্যর্থ হলে জনজীবন মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়বে।
এদিকে মহিপুরের নিজামপুর এলাকার দেড় কিলোমিটার বাঁধ এক বছর আগে বিধ্বস্ত হয়। উপকূলীয় এই এলাকার নিজামপুর, কমরপুর, সুধীরপুর, বিপিনপুরের অধিকাংশ এলাকা ও মহিপুরের কিছু অংশ জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মসিউর রহমান বলেন, শুধু লালুয়ায় এক হাজার হেক্টর ফসলি জমি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০০ হেক্টর জমিতে আউশ ও রবি ফসল কৃষকেরা চাষাবাদ করতে পারছেন না। তবে ২০০ হেক্টর জমিতে চাষিরা স্থানীয় মোটা জাতের ধান চাষাবাদ করছেন। নিজামপুরে আট হেক্টর ফসলি জমি লোনা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কলাপাড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে লালুয়া এবং জাইকা নিজামপুরের বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছে। বর্তমানে জরিপসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বাঁধের নির্মাণকাজ যাতে দ্রুত শুরু করা যায়, সে ব্যাপারে তাঁদের উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে পটুয়াখালীর পাউবো কার্যালয় ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায়, জেলার দশমিনা উপজেলার রণগোপালদি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে ৫৫/বি-২ডি পোল্ডারের দেড় কিলোমিটার বাঁধও প্রায় এক বছর আগে বিধ্বস্ত হওয়ায় জোয়ারের পানিতে এখন আউলিয়াপুর, জৌতা, খালিশাখালীসহ সাতটি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামসুল আলম জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাউবোকে জানানোর পরও বাঁধ ঠিক করা হচ্ছে না।
গলাচিপার চর কাজলের ৫৫/৩ পোল্ডারের দুই কিলোমিটার বাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে ছোট চর কাজল ও বড় চর কাজল প্লাবিত হচ্ছে। সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের বলইকাঠি গ্রামের ৪৩/২বি পোল্ডারের ৪০০ মিটার ভেঙে গিয়ে তিনটি গ্রামে পানি ঢুকছে। ইটবাড়িয়া-লেবুখালী পোল্ডারের ৬০০ মিটার বিধ্বস্ত হয়ে পাঁচটি গ্রামের খেত ও বাড়িঘর তলিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া মির্জাগঞ্জের রামপুরা পোল্ডারের ৬০ মিটার বাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে ইউনিয়নের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ তালুকদার জানান, বিধ্বস্ত বাঁধ মেরামত ও নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন আ ক ম মোস্তফা জামান বলেন, লবণাক্ত পানিতে ফসলি জমির ক্ষতি হয়। সেই সঙ্গে ফসলে পলি পড়ে উৎপাদন কমে যাবে। দীর্ঘমেয়াদি এই দুর্যোগ থাকলে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা থাকেই। তাই দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।

সু চির জন্মদিন ও লাঞ্ছিত নায়েক রাজ্জাক by মনজুরুল হক

অং সান সু চি, আবদুর রাজ্জাক
সত্তরে পড়লেন প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বিরোধী নেত্রী অং সান সু চি। সত্তর বছর মানুষের জীবনের এ রকম এক মাইলফলক, মানুষ যখন পেছনের দিকে তাকিয়ে সাফল্য আর ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশের আলোকে সামনের দিনগুলো নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবনা-চিন্তায় নিয়োজিত হয়। অনেকের বেলায় সত্তরে কর্মময় জীবনের সমাপ্তি সূচিত হলেও ব্যস্ত আর বিখ্যাত মানুষজন যে এরপরও আরও বেশ কিছু বছর সক্রিয় থাকেন, সেই প্রমাণ তো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। আবার ক্ষমতার স্বাদ মানুষকে বয়সের ভার থেকেও মুক্ত রাখে। সু চির কর্মময় জীবনের বিস্তৃতি দীর্ঘ সময়জুড়ে হবে। তিনি ক্ষমতায় না গিয়েও ক্ষমতার স্বাদ ইতিমধ্যে অনুভব করতে শুরু করেছেন। অন্তত সত্তরতম জন্মদিনে প্রদত্ত তাঁর ভিডিও বিবৃতি থেকে সে রকম বার্তাই আমরা পাই।
সত্তরতম জন্মদিনে অং সান সু চির ঘটা করে বিশাল আকারের কেক কাটার ছবি পত্রপত্রিকা ও ইন্টারনেটে দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছে। জন্মদিনে এই কেক কাটার ছবি দেখলে আমরা বাংলাদেশিরা অবশ্য কিছুটা ভড়কে যাই। কেননা, আমাদের জীবনের বাস্তবতা এ রকম বার্তা আমাদের দেয় যে জন্মদিনের সেই রকম বিশাল আকারের কেকের নিচে অসত্যের অনেক ধুলা চাপা দেওয়া থাকে। তবে সু চির বেলায় সেটা হয়নি বলেই ধারণা করি। তারপরও ভিন্ন একটি কারণে সংশয়মুক্ত হওয়া হয়তো আমাদের অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
আমরা জানি, সু চি যখন জন্মদিনে টেবিলজুড়ে কেক কাটছেন, তাঁরই দেশের অসহায় কিছু মানুষ তখন ক্ষুধার জ্বালা আর প্রাণের ভয়ে দেশান্তরিত। আর অসহায় সেই মানুষগুলো যে তাঁরই দেশের মানুষ, সেই সত্য অস্বীকার করবেন কীভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী? শুধু সেটুকুই নয়। ইন্টারনেট আর পত্রপত্রিকায় যেদিন সু চির জন্মদিনের কেক কাটার ছবি দেখার সুযোগ আমাদের হয়, সেই একই দিনে আরেকজন অসহায় মানুষের ছবিও আমরা দেখি, সু চির দেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় (মিয়ানমার নয়) দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকার অপরাধে দেশটি তাঁর সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করছে। জন্মদিনের কেক কাটার উৎসবে আমাদের সেই নায়েকের অসহায় পরিণতির কথা সু চির আদৌ মনে হয়নি এবং এ বিষয়ে কোনো মন্তব্যও তিনি করেননি। যদিও আমরা জানি, একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে অন্তত এ বিষয়ে কিছু একটা বলা তাঁর উচিত ছিল। তবে কি আমরা ধরে নিতে পারি যে ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর থাকার কারণেই তিনি এ বিষয়ে কিছু বলা থেকে বিরত আছেন? দেশটির সামরিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যদি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কোনো ফারক না থাকে, তাহলে আমাদের উদ্বিগ্ন হতে হয় বৈকি।
কোন পরিস্থিতিতে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছেন এবং আরেক সীমান্তরক্ষী, নায়েক আবদুর রাজ্জাক বন্দী হয়েছেন, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলেছে, তাদের টহল নৌকা বাংলাদেশ জলসীমায়ই ছিল। মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশের (বিজিপি) দাবি, তারা তাদের জলসীমা থেকেই রাজ্জাককে আটক করেছে। সেটি যদি সত্যও হয়, বিজিবির সদস্য পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুই দেশের মধ্যে বিভক্তি রেখা টেনে দেওয়া নাফ নদীতে চোরাই পণ্যের লেনদেনের বিষয়টি সবার জানা। মনে পড়ে, ছাত্রজীবনে একবার শিক্ষাভ্রমণে সেই নাফ নদীর তীরে যাওয়ার সুযোগ যখন হয়েছিল, সেই সময়ও যে নদী দিয়ে চোরাই পণ্যের আদান-প্রদান হতো, তা আমাদের চোখ এড়ায়নি। এখন অবশ্য ইয়াবার মতো ক্ষতিকর মাদক আর অবৈধ অস্ত্র সেই পথে নিয়মিত আসছে বলে অভিযোগ আছে। ফলে সে রকম এক সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত টহল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সে রকম টহল দায়িত্ব পালন করছিলেন আমাদের নায়েক রাজ্জাক, মিয়ানমারের প্রতিপক্ষ যখন হঠাৎ তাঁর দলের একজনকে আহত করে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর থেকে বলা যায় এ রকম নতুন এক খেলার শুরু, আন্তর্জাতিক কূটনীতির খুবই লজ্জাজনক এক লঙ্ঘনই যেটা কেবল নয়, বরং প্রচলিত সব রকম আইন তথা জেনেভা কনভেনশনেরও পরিপন্থী।
আমরা চাই আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আপনি যেন দ্রুত পৌঁছে যেতে পারেন। কেননা, সেই সত্য আমাদের জানা আছে যে আপনার দেশের মানুষের জন্য সেটা হয়তো হবে একধরনের মুক্তি এবং আগামীর অভিজ্ঞতা হয়তো আপনাকে দেখিয়ে দেবে আজকের এই বিভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসার পথ নায়েক রাজ্জাকের যে ছবি মিয়ানমার প্রচার করেছে, সেখানে তাঁকে হাতকড়া পরা অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো সংজ্ঞাতেই প্রতিবেশী দেশের বন্দী এক সীমান্তরক্ষীকে হাতকড়া পরা অবস্থায় বসিয়ে রেখে ছবি তুলে নিয়ে তা বিশ্বজুড়ে প্রচার করার নিয়ম নেই। তবে দেশটির নৈতিক মানদণ্ড এখন এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার-বুদ্ধিও দেশের নীতিনির্ধারকেরা হারাতে বসেছেন।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কাছে কোনো রকম প্রত্যাশা থাকা আমাদের উচিত নয়। কেননা, আমরা জানি সেই জান্তা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের সব রকম অধিকারই কেবল খর্ব করেনি, সেই সঙ্গে দমন–পীড়নের পর জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত ও ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভোটের ফলাফল বানচাল করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। সে কারণেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করা বিরোধী দলের নেত্রী অং সান সু চির প্রতি আশা নিয়ে আমরা তাকিয়ে ছিলাম। কেননা, নীরব অথচ বলিষ্ঠ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জান্তার কুশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আদর্শ প্রতীক। আমরা তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেছি, মনে মনে চেয়েছি তিনি যেন তাঁর সেই অসম যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেন এবং হয়েছেনও। ফলে তাঁকে নিয়ে আমাদের মধ্যে গভীর প্রত্যাশাও জেগেছিল। সেই প্রত্যাশা হলো, ন্যায় বোধের দ্যুতিময় স্ফুলিঙ্গে উদ্ভাসিত অং সান সুচি অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না।
জন্মদিন পালন করলেন তিনি খুবই জাঁকজমকের সঙ্গে। আর এটা ঠিক তখন তিনি পালন করলেন, নিজের দেশের একটি জাতিগোষ্ঠী যখন নির্যাতনের স্টিমরোলারের চাপে পিষ্ট হয়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশের এক নাগরিককে যখন স্রেফ নিজ দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার অপরাধে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী করে রাখা হচ্ছে। আর এসব নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন আমাদের প্রত্যাশার সেই নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী।
না, জন্মদিনে আপনার জন্য অশুভ কোনো কামনা আমাদের নেই। আমরা চাই আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আপনি যেন দ্রুত পৌঁছে যেতে পারেন। কেননা, সেই সত্য আমাদের জানা আছে যে আপনার দেশের মানুষের জন্য সেটা হয়তো হবে একধরনের মুক্তি এবং আগামীর অভিজ্ঞতা হয়তো আপনাকে দেখিয়ে দেবে আজকের এই বিভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসার পথ। ফলে আপনার দিকে বাড়িয়ে রেখেছি আমাদের ভালোবাসার হাত।
টোকিও, ২০ জুন ২০১৫
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷

দোষ স্বীকার না করলেও মোবাইল কোর্টে শাস্তি

দোষ স্বীকার না করলেও সাক্ষী ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তকে দণ্ড দিতে পারবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অভিযুক্ত পালিয়ে গেলে তার বিরুদ্ধে মামলা করার হুকুম দিতে পারবেন তিনি। মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে আমলে নিতে পারবেন সংঘটিত অপরাধের ছবি, অডিও-ভিডিও ক্লিপ। মোবাইল কোর্টের এসব ক্ষমতা বাড়িয়ে গতকাল মোবাইল কোর্ট (সংশোধন) আইন ২০১৫-এর খসড়া ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এদিন সকালে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুপুরে সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সভার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা বলেন, মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ সালে প্রণয়ন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ আইনের বিধান অনুযায়ী বিচারযোগ্য ব্যক্তি দোষ স্বীকার করলেই কেবল মোবাইল কোর্টে শাস্তি দেয়া যায়। অনেকেই দোষ করে তা স্বীকার করেন না; স্বীকার না করলে মোবাইল কোর্টের আওতায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাস্তি দিতে পারেন না। এখানে একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংশোধিত খসড়া আইনে বলা হয়েছে, দোষ স্বীকার করলে শাস্তি তো পাবেনই, দোষ স্বীকার না করলে সাক্ষ্য নিয়ে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে ম্যাজিস্ট্রেট শাস্তি দিতে পারবেন। তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচারের ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। মানে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর ও বায়োমেট্রিক্স মোবাইল কোর্টের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আইনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভিত্তিতে নেই, তবে এটি একেবারে নতুন বিষয় নয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর ও বায়োমেট্রিক্স ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। মোবাইল কোর্টে এটি যুক্ত করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এছাড়া প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারবেন। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন ভূঁইঞা বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান, ইভটিজিং প্রতিরোধ, দুর্নীতিমুক্তভাবে পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ, নির্বাচনকালীন সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, জানমালের নিরাপত্তা বিধান ও দ্রুত ন্যায় বিচার নিশ্চিতে মোবাইল কোর্ট আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনটি প্রয়োগ করতে গিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয়। আইনের সীমাবদ্ধতা দূর এবং আইনটি আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে সংশোধনী আনা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট সংশোধনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মোবাইল কোর্ট আরও কার্যকর করতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন, মন্ত্রিসভা বৈঠক ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি ওয়ার্কশপ থেকে মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধনের সুপারিশ পাওয়া যায়। সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশোধিত আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছে। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে সাড়ে পাঁচ লাখ কেস (মামলা) নিষ্পত্তি হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মামলা নিষ্পত্তির হার খুব হাই (বেশি) ও স্পিডি (গতিময়)। মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে ৯৩টি আইন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত মোবাইল কোর্ট আইনটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ বাড়াবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের কোন আশঙ্কা নেই। আইনটির সংশোধনী বিচারিক আদালতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোন কনফ্লিক্ট (দ্বন্দ্ব) হবে না।
মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধনীতে যা থাকছে: বিদ্যমান মোবাইল কোর্ট আইনের ১২(১) ধারায় সংশোধনী এনে বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট- পুলিশ বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা চাহিলে পুলিশ বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কাজে আবশ্যিকভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য নিয়োগ নিশ্চিত করিবে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান অনুরূপ চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে’। আইনের ৬(১) সংশোধন করে বলা হয়- ‘ধারা ৫ এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ধারা ১১-এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করিবার সময় তফসিলে বর্ণিত আইনের অধীন কোন অপরাধ, যাহা কেবল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য, তাহার সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হইয়া থাকিলে তিনি উক্ত অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে গ্রহণ করিয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে, স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, অথবা চাক্ষুস ঘটনা, উপস্থিত সাক্ষীদের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচারে, দোষী সাব্যস্ত করিয়া, এই আইনের নির্ধারিত দণ্ড আরোপ করিতে পারিবেন।’ উল্লেখ্য, বিদ্যমান আইনে ‘অথবা চাক্ষুস ঘটনা, উপস্থিত সাক্ষীদের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচারের’ বিষয়টি উল্লেখ নেই। সংশোধনীর মাধ্যমে বিদ্যমান আইনে এ অংশটুকু সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়। অপরাধী পালিয়ে গেলে তার বিষয়ে মোবাইল কোর্ট আইনের ৬ ধারায় নতুন উপধারা সংযোজনের কথা বলা হয়েছে। সংযোজনীতে বলা হয়েছে- ‘মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করিবার সময় যদি এইরূপ কোন অপরাধ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হয় বা প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় কিন্তু অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, তাহা হইলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে অভিযোগ এজাহার হিসেবে গণ্য করিবার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করিতে পরিবেন।’ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে নতুনভাবে সংযোজন করা ৭(৫) ধারায় বলা হয়েছে- ‘মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক অভিযোগ অস্বীকার করিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য প্রদান করিলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট চাক্ষুস ঘটনা, উপস্থিত সাক্ষীদের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচারে তাহার বিবেচনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করিয়া যথোপযুক্ত দণ্ড আরোপ করিয়া লিখিত আদেশ প্রদান করিবেন।’ কোর্ট পরিচালনাকালে উপস্থিত যে কোন সংস্থার বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে উপধারা-৬ এ। এতে বলা হয়েছে ‘মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পরিচালনাকালে উপস্থিত বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে পারবেন।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো ছবি, অডিও-ভিডিও ক্লিপকে সাক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রেখে বিদ্যমান আইনের ৭ ধারায় নতুন আরও একটি উপধারা সংযোজন করা হয়েছে। উপধারায় বলা হয়েছে- ‘মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও আপিল আদালত কার্যক্রমে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার করা যাইবে। মোবাইল কোর্টে কোন ছবি, অডিও অথবা ভিডিও ক্লিপ সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, প্রসিকিউটিং এজেন্সি, অভিযুক্ত ব্যক্তি, কোন সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তির স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক স্বাক্ষর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আঙ্গুলের ছাপসহ বায়োমেট্রিক্স ব্যবহার করা যাইবে।’
ডব্লিউএসআইএস পুরস্কার প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর: জাতীয় তথ্য বাতায়নের একসেস টু ইনফরমেশন অ্যান্ড নলেজ ক্যাটাগরিতে জয় করা ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (ডব্লিউএসআইএস) পুরস্কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, গত ২৬শে মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের পরিচালক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার এ পুরস্কার গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী এ পুরস্কার দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টালে (জাতীয় তথ্য বাতায়ন) ২৫ হাজার অফিস যুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের আওতায় ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সরকারি ওয়েব পোর্টাল উল্লেখ করে মোশাররাফ হোসাইন বলেন, বিভিন্ন দেশের ৪৬টি উদ্ভাবনী প্রকল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তথ্য বাতায়ন পুরস্কার জিতেছে বাংলাদেশ। গত বছর ‘ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার’ প্রকল্পের জন্য এটুআই কর্মসূচি ডব্লিউএসআইএস পুরস্কার জিতেছিল। মন্ত্রিসভা এক ম্যাচ বাকি থাকতেই ভারতের সঙ্গে সিরিজ জয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ভারতের সঙ্গে সিরিজ জয়ে মন্ত্রিসভা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম, ম্যানেজার, কোচসহ সবাইকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এছাড়া, সভায় বাংলাদেশ শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ আইন ২০১৫-এর খসড়া ও পাট আইন ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়।

সৌদি আরবের ‘চেকবই কূটনীতি’ ফাঁস- ‘ধনবান চাচা’র কাছে হাত পাতে সবাই

উইকিলিকস
অর্থাভাবে দেহরক্ষীদের বেতন দিতে পারছিলেন না লেবাননের একজন রাজনীতিক। শেষমেশ তিনি ধরনা দেন সৌদি আরবের কাছে। ‘নানা সমস্যায় পতিত’ হয় পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা। সেসব সমস্যার সমাধানে সৌদির কাছে দুই হাজার মার্কিন ডলারের জন্য হাত পাতে তারা।
মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই সৌদি আরবের কাছে একটা চাওয়া ছিল মোহাম্মদ মুরসির। অবশ্য ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) এই নেতার চাওয়াটা ছিল নিতান্ত ছোট: নিজের পরিবারকে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিতে ভিসা প্রদান।
উইকিলিকস গত শুক্রবার সৌদি আরবের ৬০ হাজারের বেশি নথি ফাঁস করেছে। এসব নথিতে এ রকম ছোটখাটো নানা বিষয় উঠে এসেছে। এতে প্রতিফলিত হয়েছে, সৌদি আরবের ‘চেকবই কূটনীতি’। ‘মধ্যপ্রাচ্যের ধনবান চাচা’ সৌদির কাছে সবাই-ই কিছু না কিছু চায়। সৌদিরাও প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রাখতে সেসব দাবি মিটিয়ে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস গতকাল রোববার এ বিষয়টি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ফাঁস হওয়া নথিগুলোর অনেকগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থির সময়গুলোর ওপরে আলোকপাত করা হয়েছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া গণ-আন্দোলনে আরব নেতাদের উৎখাত হওয়া থেকে শুরু করে চলতি বছরের শুরুর দিকের ঘটনাগুলোও এর মধ্যে রয়েছে। অনেক নথিতে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শিয়া ইরানের প্রভাব মোকাবিলায় সুন্নি সৌদি আরবের নানা প্রচেষ্টার বিষয়টি স্পষ্ট। পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো ইরানপন্থী শিয়া সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে মদদ দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
ইরাক-সংশ্লিষ্ট তারবার্তাগুলোতে তৎকালীন ইরাকি শিয়া প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির বিরোধী রাজনীতিকদের সৌদি সমর্থনের প্রমাণ মিলেছে। একটি বার্তায় দেখা গেছে, ইরানের ঘনিষ্ঠ মালিকির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আয়াদ আলাবিকে বিতরণের জন্য দুই হাজার হজ ভিসা দেওয়া হয়েছে। কাতার-সংশ্লিষ্ট আরেক তারবার্তায় অভিযোগ করা হয়েছে, সৌদি আরবের প্রতিবেশী ইয়েমেনে চলমান সংকটের জন্য কাতার দায়ী। উপসাগরীয় দেশ কাতারও অর্থভিত্তিক কূটনীতি চালিয়ে থাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আব্দুল খালেক আব্দুল্লা কমবেশি ১০০টি তারবার্তায় পড়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক বলেন, সৌদি আরব যে ‘চেকবই কূটনীতি’র আশ্রয় নিয়ে থাকে, সেটা সবাই জানে। তবে এখন এমন কূটনীতিতে তাদের কাতার, কুয়েত ও ইউএইর মতো ধনী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, সে বিষয়টি এসব তারবার্তায় পরিষ্কার।
সৌদি সরকারের সঙ্গে মিসরের ইসলামপন্থী সংগঠন ব্রাদারহুডের সম্পর্ক গোড়া থেকেই ভালো নয়। তবে দীর্ঘদিনের মিত্র মিসরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারককে বাঁচাতে সৌদিরা ব্রাদারহুডের সঙ্গেও আপস করতে চেয়েছিল বলে ফাঁস হওয়া কিছু তারবার্তায় স্পষ্ট। গণ-আন্দোলনে মোবারক উৎখাতের পর মিসরে ক্ষমতায় আসে ব্রাদারহুড।
একটি নথিতে দেখা যায়, ব্রাদারহুডের এক নেতা সৌদিকে বলেছে, রিয়াদ ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিলে মোবারককে জেলে না পাঠানোর বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। অবশ্য ওই নথির ওপরে হাতে লেখা একটি নোটে বলা হয়েছে, মোবারকের জন্য ‘ঘুষ’ দেওয়ার বিষয়টি ‘ভালো বুদ্ধি’ নয়। কারণ, ব্রাদারহুড তাঁর কারাবরণ ঠেকাতে পারবে না।
নথিগুলোর ভেতরে একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, লেবাননের বিতর্কিত গায়িকা ন্যান্সি আজরামকে ভিসা প্রদান। বেশ কিছু গানের ভিডিওর কারণে রক্ষণশীল মুসলমানরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত। ফাঁস হওয়া নথিপত্র মোতাবেক, সব শিল্পী ও গায়ক-গায়িকার ভিসা আগে সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমোদন করাতে হয়। কিন্তু নিয়ম না মেনেই গায়িকা আজরামকে ভিসা দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা অফিস পরে বলেছে, গায়িকা আজরাম তাঁর স্বামীর সঙ্গে ভ্রমণের জন্য ওই ভিসা পান। তিনি ব্যক্তিগত সফরে এসেছিলেন, গায়িকা হিসেবে নয়।

বাজেট ২০১৫–১৬, প্রবৃদ্ধির হামাগুড়ি ও অর্থনীতির ক্ষুধামান্দ্য by মাহফুজ কবীর

দেরিতে হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর বাজেট বক্তৃতায় স্বীকার করে নিয়েছেন যে গত কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যোগ্য ছিল না। আসলে এ বছরের মধ্যেই ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। অবশ্য সাম্প্রতিক কালের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল বছর তিনেক আগের ঘটনা। গত বছর বাজেট ঘোষণার সময় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশের ওপরে ধরা হয়েছিল। অর্থবছরের শেষে এ হার ৬ দশমিক ৫১ শতাংশে নেমে আসে, যার মূল কারণ হলো বিদায়ী অর্থবছরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ধ্বংসলীলা। অবশ্য ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদে প্রবৃদ্ধির কোনো লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ হয়নি। পুরো সময়েই প্রবৃদ্ধি যেন হামাগুড়ি দিয়ে চলেছে।
বেসরকারি বিনিয়োগে চাঙাভাব দেখা না গেলে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি আসবে কোত্থেকে? বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। পাঁচ বছর ধরে এ হার অনেকটাই শ্লথ, বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি এসেছে মূলত সরকারি বিনিয়োগ থেকে। অবশ্য বেশ কয়েক বছর থেকেই বেশি সঞ্চয় আর কম বিনিয়োগ নিয়ে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা অনেকখানি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
কিন্তু এ বছরের উপাত্ত থেকে সঞ্চয়ের পুরোটাই বিনিয়োগ করা হয়েছে, এমনটি দেখা গেলেও তাতে উল্লসিত হওয়ার সুযোগ নেই। বিদায়ী অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, যা কিনা ২০১১-১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন। এ থেকে বোঝা যায়, দেশে সঞ্চয়ের প্রবণতা দিন দিন আনুপাতিক হারে কমছে। এটি নিশ্চয়ই উদ্বেগের বিষয়, কেননা এ বছর মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির মাত্র ২৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ, যা আসলে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল। আমরা সে অর্থে নিচু সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ভারসাম্যের ফাঁদে পড়ে গেছি।
প্রস্তাবিত বাজেটে কি উঁচু প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সরকারি অর্থায়নের কৌশল আছে? এ বাজেট গতবারের প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি, যা কিনা মোটামুটি গতানুগতিক বৃদ্ধি। অবশ্য সংশোধিত বাজেটের চেয়ে এটি ছিল ২৪ শতাংশ বেশি। উঁচু প্রবৃদ্ধি অর্জনের একটি পূর্বশর্ত হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ও এর বাস্তবায়নের হার। এ বছরের এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৯৩ শতাংশ, আর ৪৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে প্রথম নয় মাসে। তার মানে, এডিপির অর্ধেকটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে শেষ তিন মাসে। তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাপক রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে বাস্তবায়নের মান তেমন ভালো না হওয়াই স্বাভাবিক। প্রস্তাবিত এডিপি ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। তবে যেহেতু আগের বছরে এডিপির ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করেছে, তাই ২৯ শতাংশ এডিপি বৃদ্ধি ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে কতটা সহায়তা করবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
এ বছর বাজেট রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে বেশ খানিকটা চাপের মধ্যে আছে। এ কারণে সংশোধিত বাজেট মূল বাজেটের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গেছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ১৯ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা কম হওয়ার কারণে অর্থমন্ত্রীকে ব্যাংক ও দেশীয় অন্যান্য খাত থেকে আরও বেশি ধার করতে হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে দেশি উৎস থেকে সরকারি ঋণ ৪৩ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৪ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা, যদিও ব্যাংক থেকে ধার বাড়েনি। এতে করে ব্যাংক–বহির্ভূত খাত যেমন সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ বাড়াতে হবে। এ ছাড়া বাজেট ঘাটতি বিদায়ী অর্থবছরে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। সংশোধিত বাজেটে এটি দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশ, অথচ প্রস্তাবিত বাজেটে এ হার ২৭ শতাংশ ধরা হয়েছিল। আগামী বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯ শতাংশ। ব্যাংক থেকে ধারের লক্ষ্যমাত্রা ৩১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। বৈদেশিক সাহায্য প্রত্যাশা অনুযায়ী না এলে ব্যাংক থেকে ধারকর্জ আরও বাড়বে। ফলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে দৈত্যাকারের ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকায় ঘাটতি আগামী অর্থবছরে দেশীয় সম্পদে এডিপি অর্থায়নের সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এডিপির ৮৯ শতাংশ দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ধার করে অর্থায়ন করা হলে ঋণের এ দায়ভার পড়বে আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। এরপরও এডিপির আকার বিবেচনায় নিলে অর্থনীতি ক্ষুধামান্দ্যর শিকার হবে, যা কিনা প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির আলোকরেখাকে মরীচিকায় পরিণত করতে পারে।
প্রস্তাবিত এডিপির কাঠামো কি অবকাঠামো ও জ্বালানির ‘দ্বৈত ঘাটতি’ মোকাবিলা করতে সক্ষম, যা উঁচু প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। এডিবির বাড়তি অংশের বেশ খানিকটা চলে যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো আর পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে। বিদ্যুৎ বিভাগের এডিপি দ্বিগুণের প্রস্তাব করা হয়েছে, আর সেতু বিভাগের এডিপি বাড়ছে ৬৮ শতাংশ। সড়ক ও রাজপথের গুণমান বাড়াতে এ খাতে বিনিয়োগ অনেক গুণ বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হলেও এখানে এডিপি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ। ফলে সড়ক ও রাজপথের গুণমান বাড়বে না, আর পরিবহন অবকাঠামোর তীব্র ঘাটতিও দূর হবে না। সড়কে গাড়ির সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ার কারণে যানজটও বাড়বে।
আর এসব কারণেই ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধিকরণ পথে যে বাধাগুলো রয়েছে, তা দূর করতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়কালের প্রথম বাজেট কতটা সফল হবে, তা যথার্থই প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কোনো জাদুকরি চমক নেই, না আছে কোনো কর্মপরিকল্পনা। এ কারণে ‘দৃশ্যকল্প ২০২১’ অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির সোপানে উন্নীত হতে চাইলে বেসরকারি বিনিয়োগের গুরুত্ব বাড়াতেই হবে। এ জন্য বাজেট আলোচনা সংসদে চলাকালে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা আমরা আশা করতেই পারি।
ড. মাহফুজ কবীর: অর্থনীতিবিদ, ঊর্ধ্বতন গবেষণা ফেলো, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ।
mahfuzkabir¦yahoo.com

অসহায় মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে হবে by কফি আনান

ভূমধ্যসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাগরে মানুষের মৃত্যু ও দুর্দশার যে চিত্র আমরা দেখছি, তাতে মানবজাতির সবচেয়ে পুরোনো তৎপরতার প্রতি নতুন করে আমরা মনোযোগী হয়ে উঠেছি। সেটা হলো অভিবাসন। সময় এসেছে, আমাদের এ সত্য গ্রহণ করতে হবে যে সমুদ্রের ঢেউ যেমন থামানো যায় না, তেমনি সেই ঢেউ বেয়ে অভিবাসীদের দেশান্তরি হওয়াও বন্ধ করা সম্ভব নয়। সে কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অভিবাসনের বিষয়টিকে মোকাবিলা করতে হবে বুদ্ধিবিবেচনা ও সহমর্মিতার সঙ্গে।
আজ ২৫ কোটি অভিবাসী মানুষ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস ও কাজ করছে। আগামী দিনগুলোয় আরও অনেক মানুষ সেই কাতারে যোগ দেবে। মানুষের এই চলাচলের বিষয়টির সুব্যবস্থাপনার জন্য এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে যে দেশ থেকে মানুষ আসছে, যে দেশের মধ্য দিয়ে তারা যাচ্ছে এবং যে দেশে যাচ্ছে—সেই তিনটি দেশই লাভবান হয়। আর অবশ্যই অভিবাসীদের ভালো থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সেটা করতে চারটি ক্ষেত্রে নানা কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এটা শুরু করতে হবে এভাবে: প্রধান গন্তব্য দেশগুলো, যেমন: ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়ার দেশগুলোর বিপন্ন ও হতভাগ্য এসব মানুষের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া চলবে না। নির্বাচিত ব্যক্তিদের কাছে অভিবাসন এক জটিল রাজনৈতিক উভয়সংকট নিয়ে হাজির হয়। সেটা হচ্ছে, তারা কীভাবে নিজ দেশের নাগরিকদের দাবির সঙ্গে অভিবাসীদের দাবির মেলবন্ধন ঘটাবেন। অভিবাসনের মানবীয় নীতি প্রণয়নের সাহস তাঁদের থাকতে হবে। কিন্তু প্রায় সময়ই দেখা যায়, অভিবাসীদের সঙ্গে ব্যবহার করা হয় বলির পাঁঠার মতো। আবার এটাও ঠিক, অভিবাসীদের গন্তব্য দেশগুলোর সংস্কৃতি ও প্রথার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে হবে। কিন্তু গন্তব্য দেশগুলোর জনগণের এটা স্বীকার করতে হবে যে নতুন আসা মানুষ তাদের দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। গন্তব্য দেশগুলোয় দক্ষতার ঘাটতি থাকলে সেই সংকট মেটায় অভিবাসীরা। যে কাজ অন্যরা করে না বা করতে চায় না, সেটা করে তারা। আর কোনো দেশের কর্মী বাহিনীর বয়স বেড়ে গেলে অভিবাসীরা তার প্রতিস্থাপন হিসেবেও কাজ করে। মিউনিখ-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষম ও কর্মক্ষমতাহীন জনগণের মধ্যকার ভারসাম্য বজায় রাখতে শুধু জার্মানিরই ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩২ মিলিয়ন অভিবাসীর প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, অভিবাসীরা যাতে তাদের দেশে সহজে ও কম খরচায় অর্থ পাঠাতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ২০১৪ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পাঠানো অভিবাসীদের রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। সে তুলনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আনুষ্ঠানিকভাবে যে উন্নয়ন ব্যয় করে, তা অনেক কম। অবশ্য দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, আর্থিক মধ্যস্বত্বভোগীরা অভিবাসীদের পাঠানো আয়ের ৯ শতাংশই খেয়ে ফেলে। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের ভাগ কমানো সম্ভব হলে অভিবাসীদের পরিবারের আয় বাড়বে, সেসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিধি বাড়বে। এর সঙ্গে সেখানে দারিদ্র্য দূর হবে, আর তার পরিপূরক হিসেবে সেটা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
সীমান্তে উঁচু বেড়া বানিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। যত দিন আমরা সবচেয়ে দরিদ্র ও অরক্ষিত মানুষের এই দুর্দশা থেকে বের করে আনতে না পারছি, তত দিন অভিবাসন চলবে। এ দুর্দশা এড়াতেই তারা এখন দেশান্তরি হচ্ছে তৃতীয়ত, অভিবাসন-প্রক্রিয়াকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে, যাতে আশ্রয়-প্রত্যাশীদের আবেদন ন্যায্যতার সঙ্গে ও উন্মুক্তভাবে দ্রুত প্রক্রিয়া করা যায়; অভিবাসীদের রক্ষা ও পুনর্বাসন করা যায়। যেমন ইউরোপীয় দেশগুলোকে অভিবাসীদের আগমন ভাগাভাগি করে নিতে কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে। উন্নত বিশ্বের প্রায়ই এমন ভুল ধারণা জন্মে যে তাদের বিপুলসংখ্যক উন্নত জীবন-প্রত্যাশী মানুষের দায় নিতে হয়, এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাস্তবে দেখা যায়, ৭০ শতাংশ অভিবাসী উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অভিবাসন প্রত্যাশা করে। যেমন, লেবাননের কথাই ধরুন। দেশটির জনসংখ্যা ৪৫ লাখ। এ বছরের শেষের দিকে দেশটিতে আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা হবে প্রায় ২০ লাখ। যুদ্ধবিধ্বস্ত পার্শ্ববতী দেশ সিরিয়া ও অন্য দেশগুলো থেকে আসা মানুষ সেখানে আশ্রয় নিচ্ছে।
একসময় ইউরোপীয়রা যে কারণে দেশ ত্যাগ করেছিল, আজ যারা অভিবাসী হচ্ছে, তারাও সেই একই কারণে দেশ ত্যাগ করছে। তারা দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও নিপীড়ন এড়াতে এ পথে নেমেছে, অথবা নতুন দেশে উন্নত জীবনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে। তারপরও লেবাননে আসা অভিবাসীসহ আজকের অভিবাসন-প্রত্যাশীদের ১৯৫১ সালের কনভেনশন রিলেটিং টু দ্য স্ট্যাটাস অব রিফিউজিস ও পরবর্তীকালের প্রটোকল রিলেটিং টু দ্য স্ট্যাটাস অব রিফিউজিস অনুসারে আশ্রয় প্রার্থনার আইনি অধিকার আছে। সম্ভাব্য অভিবাসন-প্রত্যাশীদের যদি সমুদ্র থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয় বা তাদের অসন্তোষজনক পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয় এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আইনি ব্যাখ্যার কারণে তাদের ঢুকতে দেওয়া না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষা থাকে না। আর শেষমেশ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হলে পাচারকারীদের ওপর আরোপ করতে হবে, যারা এর ভুক্তভোগী তাদের ওপরে নয়। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে আমাদের জন্য অভিবাসন-প্রক্রিয়া আইনি পথ থেকে বেআইনি পথে চলে না যায়, যার কারণে অপরাধীরা এই অভিবাসন-প্রত্যাশীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অশ্লীল কায়দায় মুনাফা করতে পারে।
না, এটা গয়রহ অভিবাসনের পক্ষে ওকালতি নয়। কিন্তু এটা মেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ যে অভিবাসন-প্রক্রিয়ায় বাধা দিলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য, যার বিপর্যয়কর পরিণতির শিকার হবে সেই মানুষেরা। তারা ভূমধ্যসাগর ও আন্দামান সাগরে নৌকা ডুবে মরতে পারে, আবার দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও অন্যান্য জায়গায় তাদের (বিদেশিদের) ওপর আক্রমণে মারা পড়তে পারে।
সীমান্তে উঁচু বেড়া বানিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। যত দিন আমরা সবচেয়ে দরিদ্র ও অরক্ষিত মানুষের এই দুর্দশা থেকে বের করে আনতে না পারছি, তত দিন অভিবাসন চলবে। এ দুর্দশা এড়াতেই তারা এখন দেশান্তরি হচ্ছে। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে আমি জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থায় কাজ করতাম। সে সময় আমি দেখেছি, কীভাবে ইউরোপের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও বিদ্যায়তনের মানুষ ভিয়েতনাম থেকে নৌকায় করে পলায়নরত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আজ দুনিয়া সেই নৈতিক কর্তব্যের মুখোমুখি হয়েছে, সেদিনের মতো আবারও তাদের এই অসহায় মানুষদের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
(গত শনিবার ছিল আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস। সে উপলক্ষে এই নিবন্ধ ছাপা হলো।)
কফি আনান: জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব।

উইকিলিকসের নথি প্রচারে সৌদিতে নিষেধাজ্ঞা

উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সৌদি আরব। ফাঁস হওয়া প্রায় ৬০ হাজার তথ্যের মধ্যে ‘ভুয়া নথি’ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করতে পারে- এমন দাবি করে নাগরিকদের এসব তথ্য প্রচার না করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। রোববার সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওসামা নাকলি, ‘শত্রু পক্ষের স্বার্থ সিদ্ধির’ জন্য প্রকাশিত ওইসব নথির প্রচার ও প্রসারের ব্যাপারে সাবধান করেছেন। তার মতে, নথিগুলোর অধিকাংশই ভুয়া, যা নির্দিষ্ট স্বার্থ অর্জনের লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। উইকিলিকস প্রকাশিত দূতাবাস কূটনৈতিক কাজে ব্যবহৃত ই-মেইল, প্রতিবেদন এবং আঞ্চলিক ইস্যুর ব্যাপারে তাদের অবস্থান কেমন ছিল, তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে প্রকাশিত এ তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমগুলোতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর থেকে সৌদি সরকার রাষ্ট্রীয় যে কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করছে। সৌদি রাজতন্ত্রের ব্যাপারে মতানৈক্য দমনেও তৎপর রয়েছে দেশটি। এদিকে মিসরের সাবেক প্রতাপশালী স্বৈরশাসক হোসনে মোবারককে ছাড়াতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো দেশটির সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারকে ১০০০ কোটি ডলার মুক্তিপণ দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। উইকিলিকসের ফাঁস করা নথিতে এ কথা জনানো হচ্ছে। ডকুমেন্টে কোনো তারিখ ছিল না। তবে মিসরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১২ সালে মুসলিম ব্রাদারহুড যখন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন ডকুমেন্টটা প্রস্তুত করা হয়েছিল।

উদ্বোধনের অপেক্ষায় বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভবন

আকাশ ছোঁয়া ভবন নির্মাণ করে বিশ্ববাসীর নজর কাড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। তবে শুধু উচ্চতা নয় ব্যতিক্রমী নকশাসহ নানা চোখ ধাঁধানো দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য দান করা এ প্রতিযোগিতায় নতুন সংযোজন। বিশ্বের দ্বিতীয় গগনচুম্বী অট্টালিকা হয়েও বৈশিষ্ট্যে অদ্বিতীয় এ ‘সাংহাই টাওয়ার’ শিগগিরই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। চীনের বাণিজ্যিক রাজধানী সাংহাইয়ে ৬৩২ মিটার উঁচু (২০৮৬ ফুট) গ্লাস ও স্টিলের তৈরি বৃত্তাকার টাওয়ারটির বাইরের চারপাশে কিছুটা ত্রিভূজাকৃতির ১২০ ডিগ্রি কোণের বাঁক রয়েছে। অর্থাৎ ১২০ ডিগ্রি কোনে ঘুরতে সক্ষম ভবনটি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান জেন্সলারের প্রধান গ্রান্ট উহলির বলেন, চীনের জনগণের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক এ টাওয়ার। ২০০৮ সালে টাওয়ারটির নকশা নির্বাচন করা হয়। ৮২৮ মিটার উঁচু (২৭৩২ ফুট) দুবাইয়ের বুরজ আল খলিফা বিশ্বের সর্বোচ্চ টাওয়ার। ২৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের টাওয়ারটিতে থাকবে বিশ্বের সর্বোচ্চ গতির লিফট যা প্রতি সেকেন্ডে ১৮ মিটার গতিতে ওঠানামা করবে। এতে ৮৪ থেকে ১১০ তলা পর্যন্ত হোটেল। প্রতিদিন ১৬ হাজার থেকে ১৮ হাজার লোক আসা-যাওয়া করবে।

পতাকা-পিস্তল হাতে ঘাতকের ইশতেহার

দাসপ্রথা সমর্থিত সাবেক মার্কিন সেনাবাহিনীর পতাকা ও পিস্তল হাতে বর্ণবিদ্বেষী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল ডিলান রুফ। ‘নতুন যুক্তরাষ্ট্র’ গড়ার ওই ইশতেহার বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের চার্লসটনে কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জায় ঢুকে গুলি করে নয়জনকে করেছে রুফ। শনিবার একটি ওয়েবসাইটে চালর্সটন হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন খুনি ডিলান রুফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বর্ণবাদী ইশতেহার পাওয়া গেছে। ইশতেহারের পাশাপাশি পিস্তল ও যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধকালে কনফেডারেট সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত পতাকা হাতে রুফের ছবিও পাওয়া গেছে। রোববার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই ওয়েবসাইটটি কার তৈরি বা ছবিগুলো কে পোস্ট করেছে এবং সেগুলোর সত্যাসত্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তদন্তকারীরা ওয়েবসাইটটি আমলে নিয়ে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তদন্ত সংস্থা এফবিআই। ওয়েবসাইটের ছবিগুলোর একটির মধ্যে দশমিক ফোর ফাইভ ক্যালিভারের পিস্তল হাতে রুফকে দেখা গেছে, গির্জার হত্যাকাণ্ডেও একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওয়েবসাইটে দেয়া ওই বর্ণবাদী ইশতেহারে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে ডিলানের ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। তার মতে, আফ্রিকান-আমেরিকানদের সঙ্গে করা আচরণ নিয়ে কোনো অনুশোচনার কারণ নেই। নির্দিষ্ট না করা কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে লেখক ‘উদাহরণ’ স্থাপন করবেন বলে লেখায় প্রকাশ পেয়েছে।
ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমার অন্য কোনো পছন্দ নেই। আমি চার্লসটনকে বেছে নিয়েছি কারণ আমার রাজ্যে এটিই সবচেয়ে ঐতিহাসিক শহর এবং এক সময় দেশের মধ্যে এখানেই শ্বেতাঙ্গদের অনুপাতে কৃষ্ণকায়দের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল।’ রুফের হাতের ওই কনফেডারেট পতাকার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সংশ্লিষ্টতাও প্রকাশ পেয়েছে। গৃহযুদ্ধকালে (১৮৬১-১৮৬৫) দাসপ্রথা বিলোপের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। দেশটির দক্ষিণের ১১টি রাজ্য কেন্দ্রের দাসপ্রথা বিলোপের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে দাসপ্রথার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। বিদ্রোহী এই রাজ্যগুলো নিজেদের কনফেডারেট স্টেট অব আমেরিকা বলে ঘোষণা করেছিল। এই কনফেডারেট রাজ্যগুলোর সেনাবাহিনীর পতাকাই কনফেডারেট পতাকা হিসেবে পরিচিত। দাস প্রথার পক্ষে থাকায় এই পতাকার সঙ্গে বর্ণবাদের সম্পর্ক আছে বলে ধরে নেয়া হয়। বন্দর শহর চার্লসটন থেকেই সেই গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। এখানে কনফেডারেট বাহিনীর হামলা চালিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর একটি দুর্গ দখল করে নিয়েছিল। রুফের ছবিগুলোর মধ্যে কনফেডারেট সামরিক বাহিনীর জাদুঘর ও তুলার ক্ষেত্রে কাজ করা দাস শ্রমিকদের সংরক্ষিত বাড়ির সামনে তোলা ছবিও পাওয়া গেছে। রুফের ছবিগুলোর মধ্যে স্থানীয় এমন কিছু বিশেষ জায়গা বেছে নেয়া হয়েছে যেগুলোতে চালর্সটন শহরের বর্ণবাদী অতীতকে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ছবির মাধ্যমে শহরটির কৃষ্ণাঙ্গ সমাজকে আফ্রিকান-আমেরিকান অতীত মনে করিয়ে দিয়ে স্পর্শকাতর একটি ইস্যুকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরাইল ফ্রান্স জাপানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা বেশি : ওবামা

ইসরাইল, ফ্রান্স ও জাপানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা বেশি বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের চার্লসটনে কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জায় ঢুকে গুলি করে নয়জনকে হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে এক টুইটার বার্তায় আমেরিকায় বন্দুক হামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি। রোববার টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদী হামলা বেড়ে যাওয়ায় সংক্ষুব্ধ হয়েছেন বারাক ওবামা।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের টুইটার অ্যাকাউন্ট (পটাস) এ প্রকাশিত ওবামার পোস্টে বলা হয়, মাথাপিছু জনসংখ্যার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় ২৯৭ জনকে হত্যা করা হয়। যা জাপান, ফ্রান্স ও ইসরাইলের চেয়ে বেশি। জাপানে এ সংখ্যা ৪৯ ও ফ্রান্সে ৩৩। ওবামা তার টুইটার পোস্টে বলেন, শুধু সমবেদনা জানানোই যথেষ্ট নয়, সময় এসেছে ব্যবস্থা নেয়ার। এদিকে গার্ডিয়ান প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বন্দুকধারী মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের শতকরা ৮৮ জনের কাছে বন্দুক রয়েছে। ওবামার পাশাপাশি অস্ত্র আইন নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটের মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। সানফ্রানসিসকোর মেয়র সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। এদিকে আবারও বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটে একটি পার্টিতে। অস্ত্রধারীর গুলিতে ১ জন নিহত এবং অন্তত ১১ জন আহত হয়েছে। শনিবার স্থানীয় সময় বিকালে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, একটি বাস্কেট বল কোর্টে পার্টিটি চলছিল। ঘটনাস্থলে একাধিক শিশুও উপস্থিত ছিল। ডেট্রয়েট পুলিশের সহকারী কমিশনার স্টিভ ডোলন্ট জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশংকাজনক। তবে বাকিরা আশংকামুক্ত। তারা ওই হামলাকারীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। এরইমধ্যে পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিয়েন্সে গ্রেফতার একজনকে কারাগারে নেয়ার পথে গুলিতে শহরটির এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। শনিবার পুলিশের গাড়িতেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন নিউ অর্লিয়েন্সের পুলিশ কর্মকর্তারা। হত্যাকাণ্ডের জন্য পুলিশের গাড়িটি থেকে পালিয়ে যাওয়া গ্রেফতারকৃত ট্রাভিস বয়েসকে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাকে ফের গ্রেফতারে ব্যাপক অভিযান শুরু করা হয়েছে। পিছমোড়া করে হাতকড়া পরানো বয়েসকে গাড়িতে উঠিয়ে নিউ অর্লিয়েন্সের প্যারিশ কারাগারে দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন নিহত পুলিশ কর্মকর্তা ড্যারিয়েল হলওয়ে (৪৫)। ২২ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করা অভিজ্ঞ এ কর্মকর্তার গাড়িটি একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভেতরে তার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। ৩৩ বছর বয়সী বয়েসকে আর গাড়িতে পাওয়া যায়নি,
জানিয়েছে পুলিশ। কীভাবে হলওয়ে নিহত হলেন তা পরিষ্কার না হলেও পুলিশ বয়েসকেই সন্দেহ করছে। কিন্তু হলওয়ে যখন গাড়িটি চালানো শুরু করেন বয়েসের হাত পিছমোড়া করে হাতকড়া লাগানো ছিল। এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মাইকেল হ্যারিসন বলেছেন, পিছমোড়া করে হাতকড়া পড়ানো থাকলেও বয়েস কোনোভাবে কাঁধ ঘুরিয়ে তার শরীরের সামনের দিকে রাখা আগ্নেয়াস্ত্রের নাগাল পেয়েছিলেন এবং তা দিয়ে গুলি করেছিলেন। কিন্তু বয়েস অস্ত্র কোথা থেকে পেয়েছিলেন তা অপরিষ্কারই রয়ে গেছে, কারণ হলওয়ের সার্ভিস পিস্তল তার হোলস্টারেই ছিল এবং তা থেকে গুলি করা হয়নি বলে জানিয়েছেন হ্যারিসন। তবে হলওয়ে বয়েসকে গ্রেফতাকারী পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন না বলেও নিশ্চিত করেছেন হ্যারিসন। নিহত হলওয়েকে নিজের ব্যক্তিগত বন্ধু পরিচয় দিয়ে তাকে ‘খুব অভিজ্ঞ এক কর্মকর্তা’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। অন্যদিকে বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলিনার চার্লস্টনের চার্চটি উপসনার জন্য রোববার পুনরায় খুলে দেয়া হয়েছে। গত বুধবার (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার) আফ্রো-আমেরিকান চার্চটিতে গোলাগুলিতে ৯ কৃষ্ণাঙ্গ নিহতের পর তা বন্ধ করে দেয়া হয়। ‘মাদার ইমানুয়েল’ নামে পরিচিত ইমানুয়েল আফ্রিকান মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চটিতে শনিবার নিহতদের স্মরণে এর সদস্যরা একত্রিত হন। সেখানে নিহতদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা হয়। ওদিকে রুফের এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শনিবারও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে কৃষ্ণাঙ্গরা। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের নির্যাতনের যে বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তারই একটি অংশ বলে মনে করছেন বিক্ষোভকারীরা।

সুবিধাবঞ্চিত বাংলাদেশী শিশুদের পাশে একজন ইভা কেরনোভা by হাসনাইন মেহেদী

বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার স্বপ্ন লালন করেন স্লোভাকিয়ান এক নারী। নাম ইভা কেরনোভা। তার সে স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। ঢাকায় এক সফরে এসে বিভিন্ন বস্তিতে শিশুদের পরিস্থিতি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন ইভা। নিজের ভেতরে তীব্র এক তাড়না অনুভব করেছিলেন। আর সেই তাড়না থেকেই গোড়াপত্তন করেন ‘দ্য চয়েস চু চেঞ্জ’ নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের। ২০১০ সালে ২৫ জন শিশু নিয়ে শুরুটা করেছিলেন জরাজীর্ণ এক ভবনে। আর তাদের জন্য শিক্ষক ছিলেন মাত্র একজন। এখন সেটা পুরোদস্তুর এক স্কুলে পরিণত হয়েছে। এখানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে ১৫০ শিশু। ফুলটাইম কর্মকর্তা আছেন মোট ১০ জন। ইভা কেরনোভা শিক্ষার্থী শিশুদের সংখ্যা ৫০০-তে নিয়ে যেতে চান। দাতব্য এ প্রতিষ্ঠানটির সহায়তা শুধু শিক্ষা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়। এবারের রমজানে ইভা নিশ্চিত করেছেন- স্থানীয় সম্প্রদায়ের তিন শতাধিক মানুষ যেন তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইফতারের খাবার পায়।
স্লোভাকিয়ার এ ব্যক্তিটি কিভাবে সুবিধাবঞ্চিত বাংলাদেশী শিশুদের পাশে এসে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত হলেন স্বভাবতই সেটা জানার আগ্রহ জন্মায়। শুরুটা কাকতালীয় বলা যায়; তবে বিধাতার ইশারা বললেও বোধ হয় ভুল হবে না। ইভা থাকেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। আগে এতিহাদ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্র হিসেবে কাজ করতেন। বাংলাদেশে প্রথম সফরটা ইভার ইচ্ছাকৃত ছিল না। রীতিমতো বাধ্য হয়েছিলেন বাংলাদেশে আসতে। ২০১০ সালের কথা। যাওয়ার কথা ছিল ইউরোপে। আইসল্যান্ডে সে বছর এইজাফজাল্লাজোকুল আগ্নেয়গিরি থেকে অতিমাত্রায় ভস্ম উদগিরণের কারণে অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়। এ সময় ইভার ফ্লাইট অবতরণ করে ঢাকায়। আর এভাবেই হয়েছিল তার প্রথম ঢাকা সফর। ইভা বলেন, ঢাকার কাছাকাছি একটি স্থানে গিয়েছিলাম। সেখান ২ হাজারেরও বেশি বস্তি ছিল। প্রথম সে স্কুলটিতে আমি গিয়েছিলাম সেটা ছিল লালমাটিতে। জায়গাটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ছোট্ট একটা ঘর। আর তার মেঝেতে মাদুর বিছানো। শিক্ষার্থীদের কোন ইউনিফর্ম ছিল না। বস্তি এলাকায় মানুষকে যে পরিস্থিতিতে বাস করতে দেখেছি তা নরক সমতুল্য।
ইভা সহায়তা শুরু করেছিলেন ৫০০ দিরহাম অনুদান দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়েছেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলটি পরিচালনা করতে বছরে ব্যয় হতো ১ হাজার ডলারের মতো। এ অর্থ থেকে একজন শিক্ষকের মজুরি দেয়া হতো যিনি ২৫ জন শিশুকে মৌলিক শিক্ষা দান করতেন। এরপর ধীরে ধীরে প্রাথমিক শিক্ষা, ইউনিফর্ম, স্কুল ব্যাগ, বই, স্টেশনারি, মৌলিক চিকিৎসা সেবা, প্রাত্যহিক সকালের নাস্তা ও মাঝে মাঝে খাবার খরচ বাবদ মাসে খরচ গিয়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ডলারে। এ অর্থ প্রদানে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ডিএমএস গ্লোবালের সিইও মোহাম্মদ লোচ। তিনি ২০১৩ সালে ইভার উদ্যোগে সামিল হন। তিনি জানান, আমাদের দুজনের পরিচিত এক বন্ধু আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। বাংলাদেশে ইভার পরিচিত এক ব্যক্তি ছিলেন যার ওপর আস্থা রাখতে পারতেন তিনি। আর আমার প্রতিষ্ঠান ওই স্কুলটির কার্যক্রম প্রচারণায় সহায়তা করেছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে এতে সম্পৃক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছে। মোহাম্মদ লোচ একজন ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছেন আবুধাবিতে। এখন পর্যন্ত তিনি স্কুল ভবনটিতে পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য এডিআইপিইসি-কে অনুপ্রাণিত করেছেন। আর ‘ক্রোকস’ বস্তিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য ৩০০ জোড়া জুতা অনুদান দিয়েছে। এ প্রকল্পে আরও যোগ দিয়েছে এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠান এতিহাদ। প্রতি দুই মাস অন্তর প্রতিষ্ঠানটি ইভাকে স্কুলটিতে সফর করার জন্য বিনামূল্যে টিকিট দিয়ে থাকে। এর পাশাপাশি তাদের অতিথিদের এয়ার মাইলস স্কিম থেকে স্কুলের বাসের জন্য অনুদান দিয়েছে। বাসটি বস্তি থেকে শিশুদের স্কুলে আনা নেয়া করে। মি. লোচ বলেন, স্কুলটি শিশুদের শিশুশ্রম থেকে দূরে রাখছে। আর আমরা সব থেকে মেধাবী শিশুকে এক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করতে চাই।
আবুধাবির ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল শিশুদের জন্য ইউনিফর্ম কিনতে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। আবুধাবির এ স্কুলটির পরিচালক  এলিজাবেথ রেয়্যার বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের থেকে কম সৌভাগ্যবান শিশুদের সহায়তা দেয়ার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা অর্জন করেছে। এটা অসাধারণ একটা উদ্যোগ। আর এ উদ্যোগে সহায়তা করতে পেরে আমাদের স্কুল গর্বিত। এ কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে আবুধাবির শিশুদের সঙ্গে বাংলাদেশের শিশুদের একটি যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। এটা দারুণ শিক্ষনীয় একটা উপায় যার মাধ্যমে এখানের শিশুরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের জীবনধারা নিয়ে একটা উপলব্ধি অর্জন করতে পারছে। এটা তাদেরকে বুঝতে সাহায্য করছে যে তারা কতটা সৌভাগ্যবান।’
তবে সৌভাগ্যবান কিন্তু বাংলাদেশের ওই শিশুরাও যাদের পাশে মমতামাখা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন একজন ইভা কেরনোভা।
[তথ্যসূত্র:  সংযুক্ত আরবে আমিরাতের দৈনিক দ্য ন্যাশনাল]

বৃক্ষ কেন আমাদের পরম বন্ধু by আফতাব চৌধুরী

বৃক্ষনিধন ও বনাঞ্চল উজাড়ের খবর প্রায়শই পত্র-পত্রিকায় চোখে পড়ে। ক’দিন আগে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল একটি জাতীয় দৈনিকে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে যে, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সিলেট বন বিভাগের অধীনে বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে সমানে গাছ কাটা চলছে। একশ্রেণীর অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বন থেকে কোটি কোটি টাকার কাঠ ও বাঁশ অবৈধভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সরকার ইতোপূর্বে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও বনজ সম্পদ রক্ষার্থে গাছ কাটা নিষিদ্ধ করেছে। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল। সরকারের এ শিথিলতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের বনজ সম্পদ উজাড় করে চলেছে এবং সারাদেশের বনাঞ্চলকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে যে মুহূর্তে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব সোচ্চার সেই মুহূর্তে এমন খবর আমাদের জন্য ভীষণ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বনজ সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের প্রায় ৫ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বনাঞ্চল রয়েছে। এ বনাঞ্চল দেশের মোট জমির ৭ ভাগ মাত্র। দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ থাকার কথা ৩০ ভাগ কিন্তু আমাদের তা নেই। উপরন্তু এ ৭ ভাগ বনাঞ্চল থেকে বৃক্ষনিধন করা হচ্ছে। যেভাবে বৃক্ষনিধন ও বনাঞ্চল উজাড়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে বনাঞ্চলের পরিমাণ বর্তমানে ৭ ভাগ আছে কিনা, তাতে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো ছাড়াও বৃক্ষ এদেশের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে। বনভূমি বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে এবং বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি হতে প্রাণিকুলকে রক্ষা করে। পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃক্ষ ও বনাঞ্চলের অভাবে প্রায় প্রতি বছরই আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বনাঞ্চল সম্প্রসারণ করা ছাড়া কোনো গতি নেই। সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, সাতগাঁও, জুরী, সিলেটের টিলাগড়, খাদিমনগর এলাকার বনাঞ্চল হতে বন বিভাগের কিছুসংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে চোরাকারবারীরা কাঠ কেটে অবাধে চোরাই পথে বিক্রি করে চলেছে এই অভিযোগ পত্র-পত্রিকায় বারবার ওঠার পরও নেই কোনো প্রতিকার! চোরাই কাঠের বেশিরভাগই অবৈধভাবে বসানো স’মিলগুলোতে জড়ো করে তা করাতকলের মাধ্যমে সাইজ করে সড়ক ও নদীপথ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করে। এতে সিলেট অঞ্চলের বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে আসছে এবং এভাবে চলতে থাকলে সিলেট বিভাগের বনভূমির অস্তিত্ব ব্যাপক হুমকির সম্মুখীন হবে অচিরেই।
ইতোমধ্যে সরকার বৃক্ষরোপণের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নিকট অতীতে বৃক্ষমেলা উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রতি নাগরিককে অন্তত ১টি ফলদ, ১টি বনজ ও ১টি ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের বনভূমির পরিমাণ ৭ থেকে বৃদ্ধি করে ২০ শতাংশে উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তা তো বাস্তবায়ন হয়ইনি বরং দিনে দিনে বনভূমির পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং পরিবেশকে সুস্থ, সুন্দর, সবল ও প্রাণিকুলের বসবাস উপযোগী করার লক্ষ্যে জনগণকে সচেতন করে তোলার জন্য গণমাধ্যমগুলোও যথাসাধ্য প্রচারকার্য চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লাভ খুব একটা হচ্ছে বলে মনে হয় না। বৃক্ষরোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বনভূমি সম্প্রসারণের ব্যাপারে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর হরহামেশা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতার মূলোৎপাটন করে সব পর্যায়ের নাগরিককে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে শুধু বিবৃতি বা বক্তৃতা দিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না। বিভিন্ন পর্যায়ের দেশপ্রেমিক নাগরিকের বক্তব্য থেকে জানা যায়, বন বিভাগের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বনভূমি উজাড় হচ্ছে। তাদের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নীরব বা উদাসীন কেন? অবস্থা যা-ই হোক এর কোনোটাই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তাদের দুর্নীতির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ ও দেশের মানুষ। জানা যায়, বন বিভাগ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বনাঞ্চল সৃষ্টির জন্য প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে থাকেন। বিভিন্ন স্থানে মৌসুমের শেষ পর্যায়ে গাছের চারা রোপণ করা হলেও এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। এমনকি একটি গাছের চারা রোপণ করার পর একটি বছর অতিবাহিত হলেও এ গাছের চারাটির ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া হয় না। এর ফলে বনাঞ্চল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যয় করা টাকার ১০ ভাগও যথাযথভাবে কাজে আসছে না।
বিভিন্ন সূত্র ও মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়, মরুর দেশগুলোতেও আজ প্রচুর বৃক্ষচারা রোপণ করা হচ্ছে। বনাঞ্চল সৃষ্টির প্রয়াস চলছে অব্যাহত গতিতে আর এর বিপরীতে অত্যধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত আমাদের দেশে বৃক্ষনিধন করে বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। মানুষের বসবাসের জন্য যেমন বাড়িঘরের প্রয়োজন পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্যও বনভূমির প্রয়োজন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষের প্রয়োজনে বহু অরণ্য বৃক্ষহীন হয়ে পড়লেও তারা আজ বনাঞ্চল সম্প্র্রসারণ ও সংরক্ষণের জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে। আমরা জানি, গাছ কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করে এর বিনিময়ে অক্সিজেন সরবরাহ করে প্রাণিকুলের বাঁচার পথ সুগম করে। আমাদের দেশে গাছপালার অভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরূপ ও বৈরী হয়ে উঠছে। এ অবস্থা মোকাবিলা করতে আমাদের অবশ্যই যেখানে সম্ভব গাছের চারা রোপণ করতে হবে। বৃক্ষই আমাদের পরম বন্ধু। আমাদের অফিস-আদালত, কল-কারখানা, রেল ও সড়কপথের উভয় পাশে, বেড়িবাঁধে, বসতবাড়ির আঙিনায়, সরকারি খাস জমিতে এবং চা-বাগানের অনাবাদী ভূমিতে বৃক্ষ রোপণ করে বনাঞ্চল সৃষ্টির প্রয়াস চালাতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বৃক্ষ রোপণে জাতীয় স্বর্ণপদক (প্রথম) প্রাপ্ত

গণতন্ত্রের সঙ্গে ডুবছে আইনের শাসনও by এ কে এম জাকারিয়া

গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে একদম সুনাম নেই এমন দেশেও আইনের শাসন ভালোভাবেই কাজ করতে পারে। সিঙ্গাপুর এর বড় উদাহরণ। মালয়েশিয়ার অবস্থানও এ ক্ষেত্রে খুব খারাপ নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং এ বছরের ঢাকা সিটি নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক দেশের সুনাম বাংলাদেশও অনেকটাই খুইয়েছে। গণতন্ত্র নিয়ে বড় গলায় কিছু বলার সুযোগ আমরা অনেকটাই হারিয়েছি। সরকার অবশ্য তা চায় বলেও মনে হয় না। ‘গণতন্ত্র’ এখন আর সরকারের প্রাধান্যের মধ্যে নেই। বরং মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর ধরনের গণতন্ত্রকেই আমাদের ভবিষ্যৎ হিসেবে তারা তুলে ধরতে চাইছে। মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর মার্কা গণতন্ত্র না হয় আমরা মেনে নিলাম, আইনের শাসনের অবস্থাটা কি তাহলে তাদের মতো হবে? সে ক্ষেত্রেও কি সরকার তাদের অনুসরণ করবে?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি) বছর বছর বিভিন্ন দেশের আইনের শাসন পরিস্থিতি নিয়ে একটি সূচক প্রকাশ করে। এ বছরও করেছে গত মঙ্গলবার। ডব্লিউজেপি রুল অব ল ইনডেক্স, ২০১৫। তাদের দাবি, এই সূচকের মধ্য দিয়ে তারা বিভিন্ন দেশের আইনের শাসন পরিস্থিতির ‘বিশ্বাসযোগ্য’ তথ্য ও উপাত্ত তুলে ধরেছে। আটটি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে তারা কাজটি করেছে। ১. সরকারের ক্ষমতার সীমা, ২. দুর্নীতির অনুপস্থিতি, ৩. উন্মুক্ত সরকার, ৪. মৌলিক অধিকার, ৫. আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, ৬. আইন ও বিধিবিধান প্রয়োগ, ৭. দেওয়ানি বিচার ও ৮. ফৌজদারি বিচার। ১০২টি দেশ তাদের সূচকে জায়গা পেয়েছে। এই দেশগুলোর প্রতিটিতে তিনটি বড় শহরের (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা) এক হাজার নাগরিকের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এই আটটি বিষয় দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে যে আইনের শাসন বিষয়ে স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা কেমন। ডাব্লিউজেপি বলেছে, এ ধরনের সূচকের মধ্যে এই সূচক বিশ্বের সবচেয়ে ব্যাপক তথ্যভান্ডারে সমৃদ্ধ এবং শুধু প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তা করা হয়েছে।
১০২টি দেশের এই সূচকে বাংলাদেশের জায়গা হয়েছে ৯৩ নম্বরে। মানে আইনের শাসনের দিক দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ কয়েকটি দেশের একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। যে আটটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ডব্লিউজেপি কাজ করেছে, তার সবগুলোতেই বাংলাদেশের মান একদম নীচু পর্যায়ে। এই উপমহাদেশের তিন দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের অবস্থান ৪৮, ৫৮ ও ৫৯ নম্বরে। নেপাল ছয়টি বিষয়ে, শ্রীলঙ্কা পাঁচটি বিষয়ে ও ভারত তিনটি বিষয়ে মাঝারি অবস্থানে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের নিচে, তবে ৮টির মধ্যে একটি বিষয়ে (সরকারের ক্ষমতার সীমা) হলেও তারা মাঝারি অবস্থানে রয়েছে।
গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরকে আমাদের সরকার এখন আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে বলে মনে হয়, সেই মালয়েশিয়ার অবস্থান ৩৯ নম্বরে। আইনের শাসনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে তারা উঁচু পর্যায়ে এবং কয়েকটিতে মাঝারি অবস্থানে রয়েছে। আর সিঙ্গাপুরের অবস্থান ৯ নম্বরে। সবগুলো বিষয়েই তাদের অবস্থান উচ্চ পর্যায়ে। বোঝা গেল, আমাদের সরকারের কাছে শুধু গণতন্ত্র, নির্বাচন বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া অনুসরণীয় হয়ে উঠেছে। আইনের শাসনের ক্ষেত্রে নয়।
সরকার আমাদের এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে ‘উন্নয়ন’ চাইলে নির্বাচন বা গণতন্ত্রে ছাড় দিতে হবে। মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর এসবে ছাড় দিয়েছে এবং তারা যথেষ্ট উন্নতি করেছে। কিন্তু আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এই দেশ দুটি যে ছাড় দিচ্ছে না এবং তাদের উন্নয়নের পেছনে যে এর বড় ভূমিকা রয়েছে, তা আমাদের সরকারের বিবেচনায় আছে বলে মনে হয় না। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে দেশ দুটির খারাপ দিকটি অনুসরণে আমাদের সরকার যত আগ্রহী, তাদের ভালো দিকগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে ততটাই অনিচ্ছুক।
আইনের শাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কেন এত শোচনীয়, সেটা নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়েই টের পাই। খুবই সাম্প্রতিক দুটি বিষয় তুলে ধরছি। ডব্লিউজেপির প্রতিবেদন প্রকাশের আগের দিন (গত সোমবার) রানা প্লাজা ধসের মামলার যে চার্জশিট আদালতে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে ইউএনওকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ, সরকার তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি দেয়নি। অথচ মামলার এজাহারে তাঁর নাম এসেছিল। রানা প্লাজাকে যখন ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়েছিল, তখন এই ইউএনও বলেছিলেন, রানা প্লাজা নিরাপদ আছে, সেখানে কোনো সমস্যা নেই। পত্র–পত্রিকায় তাঁর এই বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তিনি সত্যিই যদি এমন কথা বলে থাকেন (যেটা তাঁকে আসামি করা হলে আদালতে নিষ্পত্তি হতো), তবে রানা প্লাজায় ১ হাজার ১৩৪ জন মৃত্যুর দায় থেকে তিনি কি মুক্তি পেতে পারেন? এতে যে বার্তা পাওয়া গেল, তা কতটুকু আইনের শাসনের পক্ষে গেল? মালয়েশিয়ায় বা সিঙ্গাপুরে এ ধরনের ঘটনার পর শুধু সরকারি কর্মকর্তা বিবেচনায় কারও দায়মুক্তি ঘটবে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। ‘গণতান্ত্রিক’ দেশের সূচকে তাদের অবস্থান যেখানেই থাক, আইনের শাসনের সূচকে তাদের এগিয়ে থাকার কারণটি পরিষ্কার।
আর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাজকর্ম দেখলেই তো দেশের দুর্নীতির অবস্থা টের পাওয়া যায়। দুর্নীতি দমনের কাজ বাদ দিয়ে এই কমিশন এখন ‘দায়মুক্তি’ দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। এই দায়মুক্তি অবশ্য খাটে কেবল সরকারি দলের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য। হয় তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান বা সাবেক মন্ত্রী, অথবা সাংসদ, তাঁদের স্ত্রী বা সরকারের নিজের লোক হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি। ‘স্বাধীন’ ও ‘সাংবিধানিক’ এই প্রতিষ্ঠানকে অনেকেই এখন ব্যঙ্গ করে ‘দায়মুক্তি কমিশন’ বলেন। দুদক দিনের পর দিন যা করছে, তা না বলে আর উপায় কী! গত মঙ্গলবার (২ জুন) দুদক দায়মুক্তি দিল পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান হোসেন মনসুরকে।
কর্ণফুলী গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডে নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে এবং দুদকের অনুসন্ধানে তার সত্যতা মিলেছে। অনুসন্ধান শেষে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমিশন চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়ে বাকি পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমতি দেয়। কেন তা জানতে গবেষক হওয়ার দরকার নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের এই শিক্ষক পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন সরকারের ‘কাছের লোক’ হিসেবে। এখন দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তাঁকে মুক্তি না দিয়ে উপায় কী! সরকারের ইচ্ছা–অনিচ্ছাই যে দুদকের ইচ্ছা–অনিচ্ছায় পরিণত হয়েছে।
এ ধরনের যে শাসন দেশে চলছে, তার সঙ্গে আর যাই হোক, আইনের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর সাধারণ লোকজন বিপদ-আপদে থানা-পুলিশে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন, বিচার চাইতে গিয়ে যে পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছেন, তাতে আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের এই অবস্থানে চমকে ওঠার সুযোগ আছে কি!
গণতন্ত্র নিভু নিভু, সঙ্গে আইনের শাসনও তো মনে হয় ডুবছে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

অপব্যবহারের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের by দীন ইসলাম

মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে এটি অপব্যবহারের মাত্রা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মোবাইল কোর্টকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। এটা হলে সাধারণ মানুষও এর ভুক্তভোগী হবেন। গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠকে সংশোধিত মোবাইল কোর্ট আইন অনুমোদন দেয়া হয়। আইনে বলা হয়েছে, দোষ স্বীকার না করলেও সাক্ষী ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে শাস্তি দেয়া যাবে। এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে মোবাইল কোর্টের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল কোর্টকে এমন ক্ষমতা দেয়া হলে এর অপপ্রয়োগ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী সংশোধিত আইনটি সম্পর্কে বলেন, এ আইনটি আরও গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবায়ন করা উচিত। এজন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আইনটি সংশোধন করা উচিত। এ রকম একটি সময়ে আইনের সংশোধন নিয়ে নানা কথা উঠবে। মোবাইল কোর্ট আইনের সংশোধনী সম্পর্কে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, মোবাইল কোর্ট আইনের সংশোধনের মাধ্যমে ওই অর্থে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা বাড়ছে না। এটাকে আমরা বলতে পারি লিমিটেড ক্ষমতা। আমি মনে করি ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সংশোধিত মোবাইল কোর্ট আইন বেশ কাজ দেবে। বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক মোবাইল কোর্ট আইনের সংশোধনীর বিষয়ে বলেন, মোবাইল কোর্ট আইনের কারণে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাই করা বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু তাৎক্ষণিক বিচারে তা সম্ভব না। এ কারণে মোবাইল কোর্ট আইন অপব্যবহার হতে বাধ্য। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি সংশোধনের পেছনে হয়তো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। আমি মনে করি এর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের বাইরে একপাক্ষিকভাবে বিচার করা হতে পারে। এ কারণে সংশোধিত আইনটি নিয়ে ঝুঁকি থাকতে পারে। আমরা এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ এজন্য যে, সাংবিধানিকভাবে মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া উচিত। আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে মানুষের ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েই যায়। আমার উদ্বেগের কারণটা হলো, যাদেরকে আইনটি প্রয়োগ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষতা সব সময় বিতর্কিত। এ কারণে এর প্রয়োগ ঠিকভাবে হবে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, এ আইনে পর্যাপ্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না থাকায় মানুষ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। আমরা মনে করি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আরও আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে আইনটি সংশোধন করা যেতে পারে।

যন্ত্রপাতি আমদানির নামে অর্থ পাচার! by সুজয় মহাজন

মূলধনি যন্ত্রপাতি বা পুঁজি বিনিয়োগের নামে কি তাহলে বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে? এ প্রশ্ন তুলেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি করা মূলধনি যন্ত্রপাতির ‘অস্বাভাবিক মূল্য’ বৃদ্ধি ঘটেছে। এটি কেন হচ্ছে তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
চলতি বছরের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অবস্থান নিয়ে চলতি মাসের শুরুতে সিপিডি তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন যে পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নামে টাকা পাচারের এ আশঙ্কা তুলে ধরা হয়। বাজেট-পরবর্তী সিপিডির একাধিক প্রতিবেদনেও এমন শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, বেশির ভাগ মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শুল্ক নেই। শূন্য শুল্কের এসব যন্ত্রপাতি আমদানিতে ওভার ইনভয়েসের (প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখানো) সুযোগ রয়েছে। তাই যেসব পণ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক নেই, সেসব পণ্য আমদানির তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।
চলতি অর্থবছরের (২০১৪-১৫ সাল) জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের আমদানি চালানের তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ৩০টি পণ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর আমদানি মূল্য ১০০ কোটির টাকার বেশি। সিপিডি বলছে, এসব পণ্যের আমদানি মূল্যের ১০০ শতাংশের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়কালে মূলধনি যন্ত্রপাতির মোট আমদানি মূল্য ছিল প্রায় ২৯৩ কোটি মার্কিন ডলার। আর এপ্রিল মাস শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩২১ কোটি মার্কিন ডলারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-এপ্রিল) ১০ মাসের মধ্যে প্রতি মাসেই ২০ থেকে ৫০ কোটি ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে।
চার ধরনের আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির ঘটনা বেশি ঘটেছে। এগুলো হলো হেলিকপ্টার ও অন্যান্য বিমান, কম্প্রেসর ইঞ্জিন ও যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক তার ও ট্রান্সফরমার। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি মূল্যের ক্ষেত্রে ‘খুবই উচ্চ’ প্রবৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছে সিপিডি। তাই এসব আমদানি করা যন্ত্রপাতির ‘আমদানি মূল্য’ বৃদ্ধির বিষয়টি আবারও খতিয়ে দেখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতি আহ্বান জানায় সিপিডি।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মূলধনি আমদানি যন্ত্রপাতির বিপরীতে যে অর্থ পরিশোধ
করা হয়েছে, তা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি।
এদিকে, বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে সিপিডি আলাদা যে জরিপ করেছে, তাতে দেখা যায় বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৬২ শতাংশই প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেই ‘অর্থ পাচারের’ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাই আমদানি পর্যায়ে অস্বাভাবিক কিছু প্রবণতা চিহ্নিত করে এর ভিত্তিতেই আমদানির নামে অর্থ পাচারের আশঙ্কা করছে সিপিডি।
সিপিডি আরও বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কম। সেখানে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও সেগুলোর আমদানি মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সন্দেহজনক বলেই মনে করা হচ্ছে।

কে এই বিশ্ব কাঁপানো বালক!

মুস্তাফিজুর রহমান। বিশ্ব কাঁপানো ছিপছিপে গড়নের একটি বালক। যার বিস্ময়ে অবাক বিশ্ব। সবার একই প্রশ্ন আজ, কে এই বালক? কোথায় তার যাদুর রহস্য? আসলে তিনি কোন দেবদূত নয়। সাধারণ এক পরিবারে জন্ম নেয়া এক বালক।
ব্যবসায়ী বাবা আবুল কাশেম গাজী, মা মাহমুদা খাতুনের ছোট ছেলে হিসেবে তাদের কোল আলোকিত করে ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ সালে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামে জন্ম নেয় মুস্তাফিজুর রহমান। চার ভাই ও দুই বোনের সংসারে বেড়ে উঠে দেশ কাঁপানো এই পেসার। তার বড় ভাই মাহফুজার রহমান গ্রামীনফোনের টেরিটরি অফিসার হিসেবে খুলনায় কর্মরত আছেন। মেজ ভাই জাকির হোসেন ও সেজ ভাই মোকলেছুর রহমান পল্টু এলাকার ঘের ব্যবসায়ী।
স্থানীয় বরেয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ক্রিকেট খেলার প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। বরেয়া জিলানী হাই স্কুলে ভর্তির পর তার ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। পড়াশোনায় অতটা মন তার কখনোই ছিল না। স্কুল ফাঁকি দিয়ে সে ক্রিকেট খেলতে যেত। এরপর থেকে ক্রিকেটই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। বরেয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নেট প্রাকটিস করতেন। ক্রিকেটের প্রতি তার অদম্য আগ্রহের কারণে দশম শ্রেণীতে টেস্ট পরীক্ষা দেয়ার পরও এসএসসি পরীক্ষায় আর অংশ গ্রহণ করা হয়ে উঠেনি তার। ক্রিকেট খেলায় আসার পিছনে সেজ ভাই মোখলেসুর রহমানের অবদান অনেক বেশী। নিজের মোটরসাইকেলে করে ছোট ভাইকে প্রাকটিসে নিয়ে যেতেন তিনি।
মোখলেছুর রহমান লাল্টু জানান, পাঁচ বছর আগে সে সাতক্ষীরায় অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে বাছাই পর্বে মুস্তাফিজ সবার নজর কাড়ে। তারপর তিন দিনের একটি প্রশিক্ষণ কোচ করানো হয়। এরপর ২০১০ সালে জেলা পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট খেলায় বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সাতক্ষীরার হয়ে প্রথম মাঠে নেমেছিল উদীয়মান এই খেলোয়াড়। এসময় সাতক্ষীরার গণমুখী সংঘে অনুশীলন করে এবং দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে অংশ নেয়। গণমুখী সংঘের কোচ আলতাফই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মুস্তাফিজের ক্রিকেট প্রতিভা। তারই প্রচেষ্টায় উদীয়মান এই পেসার ২০১১ ও ১২ সালে জেলার অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেট দলে অন্তর্ভুক্ত হয়। জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজকে আরো পরিপক্ব করে তুলতে পরিশ্রম করেন সাতক্ষীরা জেলা কোচ মুফাছিনুল ইসলাম তপু।
জেলা পর্যায়ে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি তাঁকে। ২০১৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খুলনা বিভাগীয় দলে ও পরে ডাক পান ন্যাশনাল লীগে খেলার জন্য। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এসে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে। নিয়মিতই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। ধারাবাহিক ভাবে বোলিং এ সাফল্য পাওয়ায় ২০১৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে দেশে শ্রীলংকার সঙ্গে। ওই বছরই দেশের হয়ে দুবাইতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্ব কাপে খেলেন মুস্তাফিজ। ৯ উইকেট নিয়ে রেকর্ড করেন তিনি। হয়েছিলেন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। ২০১৫ সালে এ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যায় কিন্তু না খেলেই দেশে চলে আসে সে। ঢাকার ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট খেলে। পরে আবাহনীর হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে অংশ নেয় এবং দলের হয়ে প্রথম ম্যাচেই ৫ উইকেট দখল করে পেসার মুস্তাফিজ সকলের নজর কাড়ে। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি ম্যাচে অবিস্মরণীয় খেলা বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্টোল বোর্ডের আবারো নজর কাড়েন।
মুস্তাফিজ এ ডিভিশনে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে। তারপর অভিষেক হয়েছিল ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচে। অভিষেক ম্যাচের চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স বাংলাদেশ দলে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করবে বলেই পূর্বাভাস দিয়েছিল। সব মিলিয়ে বলা যায় নতুন বিস্ময় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভূত হয় এই ১৯ বছর বয়সী তরুণ বাঁহাতি পেসার। নিজের যোগ্যতায় টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের পর ডাক পেয়ে যান বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ খেলার জন্য। বাঁহাতি পেসারের যে ঘাটতি অনুভব করছিলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তা হয়তো পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে এই সাতক্ষীরার কৃতি বাঁহাতি পেসার।
এদিকে তার এই পারফরমেন্সে খুশি তার গর্বিত পিতা আলহাজ্ব আবুল কাশেম গাজী। তিনি আবেগ জড়িত কণ্ঠে জানান, আমার ছেলে যে জাতীয় টিমে খেলছে এটি গর্বের বিষয়। ভারতের বিপক্ষে ছেলের খেলা দেখে সত্যিই আমি অভিভূত। দীর্ঘদিনের লালিত একটি স্বপ্ন আজ পূরণ হল। মুস্তাফিজ আমার একার ছেলে নয় গোটা জাতির হয়ে ২২ গজের রণাঙ্গনে লড়বে। জাতীয় দলের হয়ে সামনে যেন সে আরও ভাল খেলতে পারে তার জন্য তিনি সাতক্ষীরাবাসীসহ দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।

হার্ট অ্যাটাকের পর যা করবেন এবং যা করবেন না

হার্ট অ্যাটাক তখনই হয় যখন হার্টে রক্ত চলাচল সঠিক ভাবে হতে পারে না এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে হার্টের পেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর শুধুমাত্র হার্ট অ্যাটাকে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যু বরণ করে থাকেন। তবে এর পেছনে দায়ী থাকে শুধুই অসাবধানতা, অসতর্কতা এবং নানা শারীরিক জটিলতা। তবে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পরেও অনেক মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করেন। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের পর অনেক নিয়ম কানুন কঠোর ভাবে মেনে চললেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। তাই হার্ট অ্যাটাকের পর কি কি করা উচিত এবং কোন কাজগুলো একেবারেই করা উচিত নয় তা জেনে রাখা জরুরী সকলের জন্য। আপনার সাবধানতায়ই বাঁচতে পারে একটি জীবন।
হার্ট অ্যাটাকের পর অবশ্যই করণীয়
১) হার্ট অ্যাটাকের পর শারীরিক অন্যান্য জটিলতা না দেখা দিলে রোগী বিছানায় উঠা বসা বা সময়ের সাথে সাথে অল্প হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। হার্ট অ্যাটাক হলেই যে বাকি জীবন শুয়ে কাটিয়ে দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং সঠিক পরামর্শে সামান্য হাঁটা চলা রোগীর জন্য ভালো। তবে অবশ্যই আগের চাইতে বেশি বিশ্রাম নিতে হবে রোগীকে।
২) হার্ট অ্যাটাকের পরপর প্রথম দিকে তরল খাবার, এরপর নরম খাবার এবং পরবর্তীতে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো সম্ভব। এতে কোনো জটিলতার সৃষ্টি হবে না।
৩) পুরো রুটিন তৈরি করে খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম ও ঔষধের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই রুটিনের বাইরে যাওয়া যাবেন না হার্ট অ্যাটাকের পরবর্তী ৪-৬ সপ্তাহ সময় পর্যন্ত।
৪) খাবারের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পুষ্টিকর খাবার এবং ফলমূল বেশি পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। বিশেষ করে শাক সবজির তালিকা বড় করতে হবে প্রতিদিনের খাবারে।
৫) হাসপাতাল থেকে ফেরার প্রথম দিকে ঘরেই হালকা হাঁটাহাঁটি ও অল্প ব্যায়াম শুরু করা উচিত। এরপর সময়ের সাথে সাথে বাড়ির বাইরে হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করা উচিত। এবং প্রথম দিকে ৫-১০ মিনিট পরে প্রতি সপ্তাহে ৫-১০ মিনিট করে হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের সময় বাড়ানো উচিত। তবে ব্যায়ামের ফলে যদি বুকে ব্যথা হয় তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৬) শারীরিক অবস্থা ও মানসিক অবস্থা দুটোই ঠিক থাকলে হার্ট অ্যাটাকের ৬ সপ্তাহ পর থেকেই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে পারেন। তবে অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন, রোগীকে আগের মতো কাজের চাপ নিতে দেয়া চলবে না এবং বিশ্রামের ব্যাপারে অবহেলা করা চলবে না।
হার্ট অ্যাটাকের পর এড়িয়ে চলুন
১) অনেকেই শরীর কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর থেকেই নিজের ঔষধ কমিয়ে ফেলেন ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই। এই কাজটি ভুলেও করতে যাবেন না। এতে মারাত্মক ক্ষতির মুখে নিজেকেই ঠেলে দেবেন।
২) খাবারের দিকে কড়া নজর রাখুন। ফ্যাট, তেল-চর্বি, ক্যালরি ও কোলেস্টরল সমৃদ্ধ খাবার একেবারেই খাবেন না। এবং গরুর মাংসকে একেবারেই না বলুন।
৩) ভারী কাজ ও ভারী ব্যায়াম করবেন না। এতে আপনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।
৪) অতিরক্ত কাজের চাপ নেবেন না, মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকুন। ‘আমি সুস্থ হবো তো’, এই ধরণের চিন্তা করে বিষণ্ণ থাকবেন না। এতে ক্ষতি আপনিই ডেকে আনবেন।
৫) শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেই ডাক্তারের পরামর্শ মানতে হবে না এবং রুটিন না মেনে চলার ভুল কাজটি করবেন না একেবারেই। আপনার সর্তকতাতেই সুস্থ থাকতে পারবেন আপনি।

জাতীয়তাবাদী-ইসলামিস্ট জোটের পথে তুরস্ক

অনিশ্চিত ফলাফলের নির্বাচন পেরিয়ে টানা দু সপ্তাহের নানা জল্পনার অবসান হতে চলেছে তুরস্কে। রোববার নির্বাচনী ফলে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী প্রধান বিরোধী দলের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে এরদোগানের একে পার্টির সাথেই জোট গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে তৃতীয় বৃহত্তম দল এমএইচ পার্টি। এর মাধ্যমে অনেকটা ইসলামিক ঘরানার এরদোগান সরকারের ক্ষমতায় ভাগ বসাতে যাচ্ছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এই দলটি।
দল গুলোর পক্ষ থেকে কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসলেও আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়া চার দলই চাচ্ছে জোট সরকারের সমাধান। আর চারটি ভিন্ন আদর্শের মাঝে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদ ও ডানপন্থী ইসলামি দল হিসাবে এমএইচ পার্টির সাথে একে পার্টির জোট তুলনামূলক নিকটবর্তী সমাধান হিসাবেই দেখা দিয়েছে।
বিগত ১৩ বছর বিরোধী দলে থাকা জাতীয়তাবাদী দলটি সরকারি দল হিসাবে একে পার্টি ও এরদোগানের কঠোর সমালোচোক হিসাবেই পরিচিত ছিলো। এমনকি সাম্প্রতিক নির্বাচনে ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েও একে পার্টির জোটে না থাকার মন্তব্য করেছিলো দলদেনা দেউলেত বাহচেলি। সরকার গঠনে ১০ শতাংশ ভোটে পিছিয়ে থাকা একে পার্টির কদর পেয়ে সবশেষে পিছপা হতে পারেন তিনি। পরবর্তী সরকারে দুজন উপ প্রধানমন্ত্রী ও আটজন মন্ত্রীর পদের সাথে সংসদে স্পীকারের ক্ষমতা পেলে জোটে যেতে পারে দলটি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক সংবাদেও এর ইঙ্গিত দিয়েছেন বেশ কজন সাবেক মন্ত্রী ও আমলা। আগামী ২৪ জুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আগে আগে নতুন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশের সম্ভাবনায় দিন গুনছে তুরস্কবাসী।

মূল আসামির পক্ষে আ.লীগের সাফাই

ইমরান সজিব আকন
খুলনার লবণচরায় যুবলীগ কর্মী ইমরান সজিব আকনকে কুপিয়ে হত্যার তিন দিন পার হলেও মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো মূল আসামি হাফিজুর রহমানের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতারা। এ ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্ত সজিবের পরিবার বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
গতকাল রোববার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সজিবের পরিবার ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় এবং সুষ্ঠু বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে।
লিখিত বক্তব্যে সজিবের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি তিনি সাচিবুনিয়ায় একটি জমি কিনে প্লট আকারে বিক্রির উদ্যোগ নেন। গত বৃহস্পতিবার ওই জমিতে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে আসামি হাফিজুরের লোকজন বাধা দেয় এবং জমির কাগজপত্র নিয়ে হাফিজুরের অফিসে যেতে বলে। শুক্রবার সকালে হাফিজুরের অফিসে গেলে তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়। এরই মধ্যে দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে ফোন করে জানানো হয়, রূপসা এলাকার মান্দা খালপাড়ে তাঁর ছেলে সজিবকে কোপানো হচ্ছে।
সজিবের ভাই মিজান বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি দেখেন, দুর্বৃত্তরা একটি কাটা হাত নিয়ে উল্লাস করছে। তাঁকেও অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করা হয়। কিন্তু পুলিশ চলে আসায় বেশিদূর যেতে পারেনি সন্ত্রাসীরা। যে ঘরে সজিবকে কোপানো হয়েছে, সেই ঘরে ঢুকে দেখতে পান সজিব উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর কোমরের নিচ ও পিঠের এক ইঞ্চি জায়গাও অক্ষত নেই। মারা যাওয়ার আগে মাহাবুব, চঞ্চল, ভাগ্নে সুমন ও সিরাজের নাম বলে গেছেন সজিব। এঁরা হাফিজুরের লোক বলে তিনি জানান। পরে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলামের সহায়তায় বাঁ হাত কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সজিবকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সজিবের দুই পায়ে প্রায় ১১৪টি কোপের চিহ্ন ছিল। কাটা হাত সন্ত্রাসীরা খালের মধ্যে ফেলে যায়। পরে পুলিশ জাল ফেলে খাল থেকে ওই হাত উদ্ধার করে।
ওই দিনই নজরুল ইসলাম আকন বাদী হয়ে লবণচরা থানায় মামলা করেন। মামলায় খুলনা মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমানকে প্রধান আসামি করা হয়। তা ছাড়া আরও নয়জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লবণচরা থানার এসআই কাজী বাবুল হোসেন জানান, ঘটনার রাতেই অভিযান চালিয়ে মামলার ১০ নম্বর আসামি আরমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের কাছে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আজ সোমবার এ বিষয়ে শুনানি হবে। তা ছাড়া প্রধান আসামি হাফিজসহ অন্যদের বাড়িতে অভিযান চালিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। অভিযান চলছে।
আসামির পক্ষে সাফাই: মামলার এজাহারভুক্ত এক নম্বর আসামি হাফিজুর রহমানের পক্ষে ২০ জুন রাতে বিবৃতি দিয়েছে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ। নগর কমিটির সাবেক উপদপ্তর সম্পাদক মাহবুবুল আলম (সোহাগ) স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, যুবলীগ নেতা হাফিজুরকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হয়রানি করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি মহল ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডের সময় হাফিজুর খুলনায় ছিলেন না। অথচ তাঁকে এ হত্যাকাণ্ডে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জড়িয়ে মামলা করা হয়েছে। নেতারা সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মামলার প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
বিবৃতিদাতা হিসেবে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানসহ পার্শ্ববতী পাঁচটি থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম রয়েছে।
বিবৃতি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার খালেক বলেন, যখন সজিবকে হত্যা করা হয়, তখন হাফিজুর খুলনায় ছিলেন না। তাঁকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

এখনকার মেয়েদের ভনিতা নেই; ওরা আত্মবিশ্বাসী by খুজিস্তা-নূর-ই-নাহরিন

সময়টা ৭০ এর দশকের মধ্যভাগে। আমি তখন খুব ছোট। আমাদের পাড়ায় একটি বাড়ীতে নতুন বৌ এলো। বিয়ের পরদিন আমার মায়ের সাথে আমিও গেলাম বৌ দেখতে। মনে ভীষণ উত্তেজনা, নতুন বৌ দেখবো বলে। বাড়ী ভর্তি লোক জন, সবাই বৌ দেখতে এসেছে। কিন্তু এ কি নতুন বৌ চোখ খুলছে না কিছুতেই। মাথায় ঘোমটা পড়া বৌ চোখ বন্ধ করে আছে। মনে মনে ভাবলাম আমি যখন বৌ হবো এমন চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে হবে।
এবার আরেকটি বিয়েতে গেলাম। আমরা কন্যা পক্ষ। যদিও প্রেমের বিয়ে তবুও বেচারা মেয়েটি বরের সাথে যাওয়ার সময় আত্মীয়- স্বজনকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছিল বারে বারে। বুঝলাম শুধু চোখ বন্ধ রাখলে হবে না, এমন কাঁদতে কাঁদতে ফিট হয়ে যেতে হবে। তখন সবাই বলবে মেয়েটি ভীষণ নরম, কোমল প্রাণ একটি মেয়ে।
যতবার বিয়েতে যাই ততোবারই নিজেকে কান্নার জন্য তৈরি করি। বিয়ের কণেরা কতোভাবে কাঁদে, কেমন সলজ্জ ভঙ্গীতে বসে থাকে, ভীষণ সাধনায় অপরিসীম যত্ন নিয়ে একটু একটু করে রপ্ত করি, নিজেকে বিশেষ দিনের জন্য তৈরি করি। ৯০ এর দশকে সত্যি সত্যিই যখন আমার বিয়ের সময় হলো আমার পরিবারের সবাই এমন কান্না কাটি শুরু করে দিলো, যেন মনে হল আমার বিয়ে নয়, চল্লিশা হচ্ছে। আমি এতোদিনের প্রস্তুতি জলাঞ্জলি দিয়ে কাঁদতে ভুলে গেলাম। আমার বিয়েটা আমার পরিবারের অমতে, কিন্তু আমার পছন্দে হয়েছিল। তাই এই কান্না। উল্টো আমি সবাইকে সান্ত্বনা আর অভয়ের বাণী শুনাতে লাগলাম। পরিবারের বিপক্ষে যেয়ে বিয়ে করার অপরাধবোধের তাৎক্ষনিক পতিক্রিয়ায় খানিকটা কিংকর্তব্যবিমুরও হয়ে পরেছিলাম বুঝিবা। আর নিজের পছন্দের বিয়েতে কাঁদতে হবে কেন? শুধু মাত্র লৌকিকতা, লোক দেখানো? নাকি নিজেকে নরম, কোমল, অবলা, অসহায় হিসেবে তুলে ধরাটাই নিয়ম? কিছুতেই আমার কান্না এলো না ভিতর থেকে। অল্প কিছুদিনের ভিতর আরও কয়েকটি বিয়ে হলো। ওদেরটা অর্ধেক প্রেমের বিয়ে। অর্থাৎ বিয়ে ঠিক হওয়ার পর একসাথে ঘুরেছে ফিরেছে কথা বলেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ওদের তিন জনের বৌ বিয়েতে ভীষণ কান্না কাটি করলো। প্রায় ফিট হয় হয় অবস্থা। আমি ওদের কান্নায় চিন্তিত হয়ে পড়লাম, আর কান্নার কারণ খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলাম।
এবার অনেকেই আমার সাথে অন্য নতুন বৌদের তুলনা করতে লাগলো। ওরা এতো ভালো, এতো কোমল, এতো কেঁদেছে; আর আমি কাঁদিনি। আমি বললাম, "ওদের সাথে আমিও সমব্যাথী, আমিও ওদের কষ্টে কষ্টিত।" কারণ একজনের বরের মাথায় চুল নেই, একজনের বর ছাতার মত কুচকুচে কালো, অপরজন লম্বায় খাটো। ওরা কাঁদবে নাতো কে কাঁদবে। আমারতো এসব সমস্যা নেই, তবে কাঁদতে হবে কেন?
কয়দিন আগে বসুন্ধরা সিটি সেন্টারে এক বিয়েতে গেছি, আমার মেয়ে নাছোড় বান্দা কাছে যেয়ে বৌ দেখবে। আমি বললাম তুমি একা যাও। ফিরে এসে বললো, "জানো বৌটা বসে বসে ফেসবুক করছে।" আমি আঁতকে উঠলাম, আমার মেয়ে নিজের বিয়েতে ফেসবুক করার কথা ভাবছে নাতো! সময় এগিয়ে গেছে বহুদূর। যাই হোক এখনকার মেয়েদের ভনিতা নেই কিংবা হতে পারে ওরা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।