Friday, November 15, 2024

ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়িয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যাপ্তি

বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ অংশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) কে অনেকেই কম্পিউটার বিজ্ঞান বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রের ডোমেন হিসাবে মনে করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি এআই - এর প্রকৃত সম্ভাবনাকে সীমিত করে যা ওষুধ এবং ব্যবসা থেকে শুরু করে পরিবেশ বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান এবং কলা বিভাগ পর্যন্ত অসংখ্য শাখায় একটি রূপান্তরকারী শক্তি হয়ে উঠেছে। এআই-এর বিস্তৃত, আন্তঃবিষয়ক অ্যাপ্লিকেশনগুলিকে স্বীকৃতি দিয়ে, বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি  এআই-কে বিভিন্ন একাডেমিক ক্ষেত্রের মধ্যে সম্পৃক্ত করছে। এই ইন্টিগ্রেশন ছাত্রদের শুধুমাত্র ভিত্তিগত এআই জ্ঞান দিয়েই নয় বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথেও সজ্জিত করে তাদেরকে একটি বিকশিত, প্রযুক্তি-চালিত বিশ্বে সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে তুলছে। এই নিবন্ধতে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রগুলির বাইরে এআই-এর অ্যাপ্লিকেশনগুলিকে তুলে ধরা হলো।

ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনায় এআই : আজকের বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে এআই ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সক্ষম করে, দক্ষতার মাপকাঠিকে উন্নত করে এবং কোম্পানিগুলিকে প্রতিযোগিতামূলক রাখার মাধ্যমে ব্যবসাকে নতুন আকার দিচ্ছে। এআই-এর মুখ্য ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে, বিশ্বব্যাপী নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়িক স্কুলগুলি তাদের পাঠ্যক্রমের মধ্যে এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলিকে -  বিশ্লেষণ,আর্থিক পূর্বাভাস এবং প্রক্রিয়া অটোমেশনের কাজে অন্তর্ভুক্ত করছে। এটি শিক্ষার্থীদের বিপণন, ফিনান্স, এইচআর এবং লজিস্টিকসে এআই প্রয়োগ করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার সাথে সজ্জিত করে। ব্যবহারিক এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলির সাথে তত্ত্বের মিশ্রণের মাধ্যমে, এই প্রোগ্রামগুলি ব্যবসায়িক পেশাদারদের বিশেষ সুবিধা করে দিচ্ছে  যারা কৌশলগত সুবিধার জন্য এআই ব্যবহার করতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবন বিজ্ঞানে এআই : স্বাস্থ্যসেবাতে এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলি  ডায়াগনস্টিকগুলি উন্নত করে, চিকিত্সা পরিকল্পনা এবং রোগী পরিষেবার মানোন্নয়নে সহায়তা করে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের মতো প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল প্রোগ্রামগুলি এআইকে একীভূত করে, রেডিওলজিতে চিত্র বিশ্লেষণ, জিনোমিক সিকোয়েন্সিং -এর  মতো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, এআই-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামগুলি নির্ভুলতার সাথে ক্যান্সারের মতো রোগ শনাক্ত করতে পারে। এই ধরনের সরঞ্জামগুলিতে প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীরা এআই-চালিত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে রোগীদের কাছে নির্ভুল  ফলাফল পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

পরিবেশ বিজ্ঞানে  এআই:
পরিবেশ বিজ্ঞানের প্রোগ্রামগুলি যেমন  জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এআই ব্যবহার করছে। ইটিএইচ জুরিখ এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি পরিবেশগত অধ্যয়নের মধ্যে এআইকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তুতন্ত্র নিরীক্ষণ করতে, আবহাওয়ার ধরণগুলির পূর্বাভাস দিতে এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি সমাধান তৈরি করতে শেখে। উদাহরণ স্বরূপ- শিক্ষার্থীরা বন উজাড় ট্র্যাক করার জন্য উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করতে, সরকার এবং এনজিওগুলিকে বাস্তব সময়ে পরিবেশগত অবক্ষয়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করতে এআই মডেলগুলি ব্যবহার করতে পারে।

এআই ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যানুফ্যাকচারিং: ম্যানুফ্যাকচারিং, সিভিল ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং রোবোটিক্সের মতো ক্ষেত্রে, এআই উদ্ভাবন এবং দক্ষতা বিশেষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে । এমআইটি এবং মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামগুলিতে এআইকে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীদের প্রক্রিয়াগুলি অনুকরণ করতে, কাঠামোকে অপ্টিমাইজ করতে এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমগুলি বিকাশে বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে। উৎপাদনে এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলির মধ্যে রয়েছে  রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক অপ্টিমাইজেশান, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মান নিয়ন্ত্রণ। রোবোটিক্স শিক্ষার্থীরা  উদাহরণস্বরূপ সমাবেশ বা বিপজ্জনক উপাদান পরিচালনার মতো জটিল কাজের জন্য এআই-চালিত রোবট ডিজাইন করে।

সামাজিক বিজ্ঞান এবং মানবিকতায়  এআই :  সামাজিক বিজ্ঞান এবং মানবিক ক্ষেত্রকেও প্রভাবিত করছে এআই। এই ক্ষেত্রগুলিতে এতদিন ডেটা-সীমিত ছিল কিন্তু এখন এআই বিশ্লেষণের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টিতে সমৃদ্ধ। অক্সফোর্ড এবং টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সামাজিক নিদর্শন, আচরণগত প্রবণতা এবং নীতির প্রভাবগুলি অধ্যয়নের জন্য সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এআই  সরঞ্জামগুলি ব্যবহার করে।  রাজনৈতিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী ফলাফলের মডেল বা জনমত পরিবর্তনের মূল্যায়ন করতে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিশ্লেষণ ব্যবহার করতে পারে, অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রবণতা মূল্যায়ন করতে, সম্প্রদায়ের চাহিদা চিহ্নিত করতে এআই -চালিত বিশ্লেষণ প্রয়োগ করতে পারে।

আইন এবং পাবলিক পলিসিতে এআই : এআই আইন ও পাবলিক নীতিগুলিতেও রূপান্তর ঘটাচ্ছে। যে ক্ষেত্রগুলিকে এতদিন প্রযুক্তি বিরোধী  বলে বিবেচিত হত। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর এবং স্ট্যানফোর্ড ল স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি এখন আইনি গবেষণা, চুক্তি বিশ্লেষণ এবং কেস পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে এআই অ্যাপ্লিকেশনের কোর্স অফার করে। ছাত্ররা শিখছে কিভাবে এআই নথি পর্যালোচনাগুলি স্বয়ংক্রিয় করতে পারে, নজিরগুলি শনাক্ত করতে পারে এবং অতীতের রায়গুলির উপর ভিত্তি করে মামলার ফলাফলের পূর্বাভাস দিতে পারে। পাবলিক পলিসিতে, এআই স্বাস্থ্যসেবা অ্যাক্সেস, অপরাধের হার এবং শিক্ষার গুণমান বিশ্লেষণ করতে সক্ষম করে, ডেটা-চালিত নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণ প্রদান করে।

কলা বিভাগ এবং  ডিজাইনে এআই: সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনের নতুন দিক উন্মোচন করে  শিল্পকলা এবং ডিজাইনে এআই একটি   নতুন দিকের পরিচয় দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অফ আর্ট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্সনস স্কুল অফ ডিজাইনের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রামগুলি এআই-কে এমন কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করছে যা জেনারেটিভ ডিজাইন, ডিজিটাল আর্ট এবং মিউজিক কম্পোজিশন অন্বেষণ করে। এআই -এর মাধ্যমে, শিক্ষার্থীরা  ভার্চুয়াল বাস্তবতার অভিজ্ঞতা লাভ করে ,অ্যালগরিদমিক শিল্প বিকাশ করে , এমনকি মেশিন লার্নিং মডেল ব্যবহার করে সঙ্গীত রচনা করে। মিডিয়া শিল্পে, এআই -এর  বিশেষ প্রভাব রয়েছে  দর্শকদের অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তিগতকৃত করে এবং বিষয়বস্তু সুপারিশগুলিকে অপ্টিমাইজ করে এআই বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে।

সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগে এআই: দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ করা হয়, তৈরি করা হয় এবং বিতরণ করা হয়, এআই সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া সংস্থা এবং সাংবাদিকতা স্কুলগুলি দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করতে এআই-চালিত সরঞ্জামগুলি গ্রহণ করছে। এআই সরঞ্জামগুলি বিশাল ডেটাসেট বিশ্লেষণ করে, বিষয়বস্তু তৈরির স্বয়ংক্রিয়তা, ব্যক্তিগতকৃত সংবাদ বিতরণ এবং ভুল তথ্য সনাক্ত করে  সাংবাদিকদের আরও দ্রুত, নির্ভুলভাবে   সামগ্রী তৈরি করতে সক্ষম করে।রুটিন নিউজ থেকে শুরু করে ফ্যাক্ট-চেকিং বাড়ানো পর্যন্ত, এআই নিউজরুমগুলিকে দক্ষতার সাথে খবরগুলো  কভার করার সুযোগ প্রদান করে  সাংবাদিকদেরকে জটিল অনুসন্ধানমূলক কাজে সহায়তা  করে। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরা উদীয়মান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এবং মিডিয়াতে এআই-চালিত সুযোগগুলিকে কাজে লাগাতে  এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখে।  দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং রয়টার্সের মতো সংস্থাগুলি আর্থিক, খেলাধুলা এবং আবহাওয়ার রুটিন রিপোর্টগুলিকে স্বয়ংক্রিয় করতে এআই অ্যালগরিদম নিয়োগ করে, যা সাংবাদিকদের গভীর তথ্যগুলিতে ফোকাস করতে দেয়। এআই পাঠকদের পছন্দ অনুযায়ী বিষয়বস্তুকে ব্যক্তিগতকৃত করে, যেমনটি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং বিবিসি-তে দেখা যায়,   পাঠকের আগ্রহের উপর ভিত্তি করে নিবন্ধের সুপারিশ করে ।

সূত্র : দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস

mzamin

প্রজন্মে এমন সুযোগ একবার আসে, অন্তর্বর্তী সরকার হোঁচট খেলে বাংলাদেশ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে অথবা সামরিক শাসনের দিকে এগিয়ে যাবে -ক্রাইসিস গ্রুপের রিপোর্ট

নতুন নির্বাচনের জন্য ১৮ মাসের বেশি সময় নেয়া উচিত নয়। এর মধ্যে সংস্কার করে নির্বাচন দেয়া উচিত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের। এমন মন্তব্য করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত বাস্তবসম্মত সময়সীমার মধ্যে সংস্কার শেষ করে একটি নতুন নির্বাচন দেয়া। এই সময় ১৮ মাসের বেশি বা দেড় বছরের বেশি হওয়া উচিত নয়। তাদের মতে, যদি এই সরকার হোঁচট খায় তবে বাংলাদেশ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। এমনকি সামরিক শাসনের যুগেও প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘ সময় এ সরকারের ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়। নতুন পদক্ষেপের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছে তারা। দেশের বাইরের পক্ষগুলোকে সহায়তার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে বলা হয়েছে, ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণের মাঝে তাদের ভাবমূর্তি মেরামতে কাজ করা। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার প্রথম ১০০ দিনে গৃহীত সংস্কার ও অন্যান্য বিষয়কে মূল্যায়ন করে ‘এ নিউ এরা ইন বাংলাদেশ? দ্য ফার্স্ট হান্ড্রেড ডেজ অব রিফর্ম’ শীর্ষক দীর্ঘ ৩৭ পৃষ্ঠার রিপোর্টে এসব কথা বলেছে ক্রাইসিস গ্রুপ। বেলজিয়ামভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানটি রিপোর্টে বলেছে- গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার তিন মাস পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের সামনে এগুনোর পথে সুপ্ত বিপদেরও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার আরও এক বছর, সম্ভবত এর চেয়েও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করবে বলে মনে হচ্ছে। শেখ হাসিনার পনেরো বছরের শাসনের পর শাসনব্যবস্থার উন্নতির এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এক প্রজন্মের সামনে এমন সুযোগ একবারই আসে। বাংলাদেশ এমন সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ আরেকটি স্বৈরাচারী সরকারের উত্থানের পথ বন্ধ করতে পারে।

রিপোর্টে বলা হয়, অন্তর্র্বর্তী সরকার হোঁচট খেলে দেশ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, এমন কি সামরিক শাসনের যুগে প্রবেশ করতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কারের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখতে দ্রুত ফলাফল দৃশ্যমান করা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ আরও বলেছে, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে অনেক বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শেখ হাসিনা ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে তার পতন হয়েছে। এরপর ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকার দ্রুতই রাজনৈতিক, শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের সাহসী এজেন্ডা তুলে ধরে। বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য জনগণের প্রবল আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে অনেক বাংলাদেশিই হাসিনার পতনকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ (১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করে) হিসেবে অভিহিত করছেন। এখন পর্যন্ত ড. ইউনূস ও তার সহকর্মীদের প্রতি ব্যাপক সমর্থন আছে। কিন্তু জনপ্রত্যাশার ভালো-খারাপ দুই ধরনের পরিণতিই আছে। যদি সংস্কার আনতে অন্তর্বর্তী সরকার হোঁচট খায়, সম্ভবত এর পরিণতি দাঁড়াতে পারে সামান্য অগ্রগতিসহ একটি আগাম নির্বাচনে। সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যপটে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সামাজিক সমর্থনের ভিতকে শক্তিশালী রাখতে দ্রুত কিছু অর্জনের দিকে নজর দেয়া উচিত- যখন এই সরকার মূল সংস্কারগুলো ঘিরে ঐকমত্য গড়ে তুলছে এবং দেশকে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করছে। জাতীয় রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনায় সাহায্য করতে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ড. ইউনূস প্রশাসনকে সমর্থন দেয়া উচিত আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর। রিপোর্টে আরও বলা হয়, পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার পর শেখ হাসিনার সরকার ব্যাপকভাবে অ-জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষমতা ধরে রাখতে তার সরকার পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে, বিশেষ করে পুলিশ, বিচারব্যবস্থা এবং আমলাতন্ত্রের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সরকারবিরোধীদের ওপর নিয়মিত দমনপীড়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, চরম সামাজিক বৈষম্য ও ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি- বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে তার দল আওয়ামী লীগের সমর্থনকে দুর্বল করেছে। দলটি জানুয়ারির নির্বাচনে ব্যাপক জয় পেয়েছিল। তবে সে জয় এসেছিল বিরোধীদের বর্জন এবং কম ভোটার উপস্থিতির মধ্যদিয়ে। জুনে সরকারি চাকরিতে বিতর্কিত কোটা পুনর্বহালে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে, যা পরের মাসে গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া এবং মারাত্মক দমনপীড়নসহ হাসিনার নৃশংস পদক্ষেপে ছাত্র আন্দোলন জনপ্রিয় বিদ্রোহে রূপ নেয়, যা তাকে তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। হাসিনার বিদায়ে যে উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছিল তা টিকে আছে। কিন্তু সামনের পথের রূঢ় বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাজে অবস্থায় থাকা অর্থনীতি ধীরে এগুচ্ছে। এক মাসের বেশি সময়ের বিক্ষোভ এবং ক্ষমতা হস্তান্তর ঘিরে অনিশ্চয়তায় সেটি আরও ধাক্কা খেয়েছে। ইউনূসের সরকার প্রধানত বিক্ষোভ-বিরোধী দমনপীড়নে ব্যাপকভাবে জড়িত একটি পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভর করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হিমশিম খাচ্ছে। জনপ্রিয় সমর্থন ধরে রাখা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এর বিদ্যমান আইনে জোড়াতালি দেয়া আইনি ভিত্তির কারণে।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠনও হবে অনেক বড় অর্জন। আর অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে এ যাবৎকালের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও এর অনেক সদস্যের সরকার ও প্রশাসন পরিচালনায় তেমন অভিজ্ঞতা নেই। প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সমর্থন ধরে রাখা ইতিমধ্যেই চ্যালেঞ্জিং প্রমাণিত হচ্ছে। কেউ কেউ আগাম নির্বাচনের সুবিধার জন্য অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি ড. ইউনূসের মিত্ররাও সাংবিধানিক সংস্কার ও হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহিতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে আসছেন। যদিও হাসিনার দল এখন বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে, তবু ড. ইউনূসকে আওয়ামী লীগপন্থি গোষ্ঠীগুলো ও ব্যক্তিদের বাধার মুখেও পড়তে হতে পারে। এতে আরও বলা হয়, পূরণ করা তো দূরের কথা। আকাশচুম্বী জনপ্রত্যাশা সামলানোই হবে খুবই চ্যালেঞ্জিং। অভিজ্ঞতা বলে, অন্তর্বর্তী সরকার যত বেশি ক্ষমতায় থাকতে চাইবে, আগাম নির্বাচনের দাবি তত জোরদার হবে এবং তাদের বৈধতা নিয়ে আরও বেশি সন্দেহ দেখা দেবে। ড. ইউনূস সমাজের দুর্বল গোষ্ঠীগুলোকে আঘাত করতে পারে এমন অর্থনৈতিক সংস্কার এবং হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি কতোটুকু করবেন- এমন বিষয়সহ অ-জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন। অনেক বাংলাদেশি আওয়ামী লীগের নিপীড়নের প্রতিশোধ নিতে চান। এ প্ররোচনায় ড. ইউনূস সঠিকভাবেই প্রশ্রয় দিতে আগ্রহী নন।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, যদিও চ্যালেঞ্জ প্রচুর, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনে অভূতপূর্ব এক সুযোগ এনে দিয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে দু’টি দল- হাসিনার আওয়ামী লীগ ও তার চরম প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। পালাক্রমে সরকার গঠন করেছে তারা। উভয়েই রাষ্ট্রীয় অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করেছে। দলীয় গুণ্ডাবাহিনী লালন করেছে। নির্বাচনী নিয়মকানুনকে বিকৃত করেছে। ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে সুবিধাভোগী চক্র তৈরি করেছে। কিন্তু হাসিনা এসব কৌশলকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যান এবং বাংলাদেশের মানুষকে অনেক দূরে ঠেলে দেন। ফলে তিনি ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর ওপর আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও ভারসাম্য স্থাপনে অন্তর্বর্তী সরকারকে এক প্রজন্মে একবার মেলে- এমন এক অবাধ সুযোগ করে দিয়েছেন। আসন্ন সার্বিক সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য হলো বিগত পনেরো বছরের কর্তৃত্ববাদ এবং অনুগত অযোগ্যদের দিয়ে গঠিত প্রশাসন ব্যবস্থা যাতে ফিরে আসতে না পারে তা নিশ্চিত করা।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, ড. ইউনূসের টিম লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কতোটা সফল হতে পারবে যদিও তা স্পষ্ট নয়, বিকল্পগুলো সুখকর নয় বলেই মনে হচ্ছে। একটি আগাম নির্বাচন সম্ভবত ক্ষমতা কিছুটা কাটছাঁট করে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে। দলটির অতীত কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেরই সংশয়- আওয়ামী লীগের চেয়ে তারা তেমন ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে? রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হলে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে। এতে সামরিক শাসনামলের সূচনা হবে। ড. ইউনূসের সরকারকে যারা দুর্বল করতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে এই সরকার সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা হবে অব্যাহতভাবে নিজেদের কাজের সুফল দিয়ে যাওয়া। এটি এই সরকারকে জনসমর্থন ধরে রাখতে সাহায্য করবে, যখন তারা গভীর সংস্কারে হাত দেবে। দ্রুত অর্জনগুলোর মধ্যে থাকতে পারে সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ছোটখাটো দুর্নীতি মোকাবিলা, বিদ্যুৎ সরবরাহে উন্নতিসাধন এবং নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য কমানো। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জোরালো জনসমর্থন অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে বিএনপিকে এই সরকারের এজেন্ডার পক্ষে থাকতে চাপ দিতে পারে। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিক দল ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের জন্য নিরলস হওয়া উচিত, যেমন সেনাবাহিনী এবং শিক্ষার্থীরা যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিভাজন ঘুচিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকে বিচারের দাবির বিষয়ে এই সরকারকে ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত। তাদের সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তীতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে সংবিধানের সীমারেখার মধ্যে থাকা উচিত। বিদেশি সরকার ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরাপত্তা, বিচারিক, নির্বাচনী ও অর্থনৈতিক সংস্কারসহ কারিগরি ও আর্থিক সমর্থন দেয়া। দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চুরি হওয়া অর্থ বাংলাদেশের বাইরে ব্যাংকে ও আবাসন ব্যবসায় রয়েছে। ভারতের উচিত হাসিনার শাসনামল জুড়ে তাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দেয়ায় দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি মেরামতে পদক্ষেপ নেয়া। বাংলাদেশের যাতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের এই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে না যায়, যে পরিবর্তনের জন্য দেশটির অনেক মানুষ ব্যাকুল হয়ে আছে- তা নিশ্চিত করতে দেশের  ভেতরের ও বাইরের সমর্থন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

mzamin

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ৪০ শতাংশ প্রবাল

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলুপ্তির হুমকিতে আছে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী। বিলুপ্তির ঝুঁকির তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সেই তালিকায় বিভিন্ন ধরনের প্রবালের অবস্থা সম্পর্কে শঙ্কার তথ্য দিয়েছেন। বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি প্রবালের বাসস্থান ও বাস্তুতন্ত্র তীব্র হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। নতুন গবেষণা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রবাল প্রাচীরের একটি বড় অংশ বেঁচে থাকবে কি না, তার সম্ভাবনা কমিয়ে দিচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর রেড লিস্ট অব থ্রেটেনড স্পিসিস অনুসারে, বিশ্বব্যাপী রিফ-বিল্ডিং প্রবাল প্রজাতির প্রায় ৪৪ শতাংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন প্রবাল প্রজাতির বিরুদ্ধে প্রধান হুমকির মধ্যে রয়েছে ব্লিচিং, তেলদূষণ ও বিভিন্ন রোগের প্রভাব। অন্যান্য হুমকির মধ্যে রয়েছে মাছ ধরা, গভীর সমুদ্রে খনন, তেল ও গ্যাসের জন্য খনন বা গভীর সমুদ্রে স্থাপনা করার মতো কার্যক্রম প্রবালদের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

আইইউসিএন ২০০৮ সালে ৮৯২টি উষ্ণ পানির রিফ-বিল্ডিং প্রবাল প্রজাতির অবস্থা বর্ণনা করে। তখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই ঝুঁকির হার বেড়েছে। উষ্ণায়নের ঘটনা ও ব্লিচিংয়ের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। আইইউসিএন দুটি প্রবালের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। স্ট্যাগহর্ন প্রবাল ও এলখর্ন প্রবাল ক্যারিবীয় অঞ্চলের দুটি বিপন্ন প্রজাতির প্রবাল। উষ্ণতা বৃদ্ধি, দূষণ, ঘূর্ণিঝড় ও প্রবাল রোগের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এ বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) বিশ্বের চতুর্থ বৈশ্বিক প্রবাল ব্লিচিংয়ের ঘটনার কথা প্রকাশ করে। আগামী কয়েক মাসে আরও কয়েকটি প্রবাল ব্লিচিংয়ের ঘটনা দেখা যাবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। রাসায়নিক বা প্রাকৃতিক কারণে প্রবাল তার রঙের উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলে, এ বিষয়টিকে ব্লিচিং বলা হয়।

প্রবাল রক্ষা করা না গেলে উপকূলীয় অনেক মাছ ও প্রাণী হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রবাল প্রাচীর উপকূলরেখা ও উপকূলীয় আবাসস্থলকে স্থিতিশীল রাখছে। এসব প্রাচীর ধ্বংস হলে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকার বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করেন বিজ্ঞানীরা। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখতে পারে প্রবাল প্রাচীর। সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে বিভিন্ন দেশের প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন বিজ্ঞানীরা।

সূত্র: এবিসি নিউজ

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রবালও উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রবালও উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। ছবি: অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস/রয়টার্স

সৌদিতে অর্ধনগ্ন পোশাকে ফ্যাশন শো, মঞ্চ কাঁপালেন জেনিফার লোপেজও

সৌদি আরবের রাজধানীতে হয়ে গেল আধুনিক বিশ্বের মডেলদের অংশগ্রহণে এক ফ্যাশন শো। জমকালো অনুষ্ঠানের সেই মঞ্চে অর্ধনগ্ন পোশাকে হাঁটলেন পশ্চিমা খ্যাতনামা মডেলরা। বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন পপ আইকন জেনিফার লোপেজ।

আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার (১৩ নভেম্বর) রাতে রিয়াদে এ আয়োজন করা হয়। লেবানিজ আইকন এলি সাব এর পেছনের কারিগর। প্রাক্তন ফরাসি ভোগ সম্পাদক ক্যারিন রইটফেল্ড ফ্যাশন শোটির রানওয়ের নির্দেশনায় ছিলেন।

ইসলামি বিধিবিধান নিয়ে সরব দেশটিতে ‘এলি সাব শো’ নামে তৈরি মঞ্চে আধুনিক সব নজরকাড়া পোশাকে তারকারা উপস্থিত হন।

শোতে ‘১০০১ সিজনস অফ এলি সাব’ থিমের অধীনে ৩০০টি ডিজাইন প্রদর্শন করা হয়। যা মধ্যপ্রাচ্যের লোককাহিনী ‘আরব্য রজনীর’ প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলে আয়োজকরা জানান। সেই প্রখ্যাত লোককাহিনীর গ্রন্থটি ‘কিতাব আলফে লায়লা ওয়া-লায়লা’ (এক হাজার এবং এক রাতের কাহিনী) নামে সংকলিত। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশীয় গল্প এবং লোককথার অনন্য সংকলন এটি। এসব কাহিনী ইসলামের স্বর্ণযুগে আরবিতে সংগৃহিত হয়েছিল। বহির্বিশ্বে এটি এরাবিয়ান নাইটস নামেও পরিচিত।

ধর্মীয় অনুশাসন পালনের নামে যেখানে নারীদের কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে সেই রিয়াদের মঞ্চে এ ধরনের আয়োজনে অবাক হয়েছেন অনেকে। এমনকি এলি সাবের উদযাপনে মঞ্চে একে একে যখন তারকা লোপেজ, ক্যামিলা ক্যাবেলো, ন্যান্সি আজরাম, আমর ডায়াব ও কিংবদন্তি সেলিন ডিওন পশ্চিমা ঢঙ্গে উপস্থিত হচ্ছিলেন তখন উপস্থিত দর্শকরাও চমকে যান।

এক সময় সৌদি আরবে এ ধরনের আয়োজন কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান শিল্প-সাহিত্য চর্চায় উদারতা দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি দেশটিতে সরকারিভাবে সিনেমায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক সিনেমা হল। মূলত, সৌদি সরকার তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় নানামুখি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এ ধরনের কার্যক্রমের সুযোগ দিচ্ছে।

এদিকে সফল শো অনুষ্ঠানে খুশি আয়োজকরা। তারা জানান, এলি সাবের পোশাক সারা বিশ্বে নন্দিত। শো-তে প্রদর্শিত পোশাকে আগামী কয়েক মাসে বহু নারী বিয়ের আসরে বসবেন। এটি হয়ে উঠবে তাদের স্মৃতির এক অনুষঙ্গ। 

পারফর্ম করছেন জেনিফার লোপেজ। ছবি : সংগৃহীত
পারফর্ম করছেন জেনিফার লোপেজ। ছবি : সংগৃহীত

ট্রাম্পের প্রথম দুই বছর কি মসৃণ হবে!

নির্বাচনের রাতে ডনাল্ড ট্রাম্প বার বার যে বাক্য উচ্চারণ করেছেন, তাহলো- ‘প্রমিজেজ মেইড, প্রমিজেজ কেপ্ট’। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। প্রতিশ্রুতি রেখেছি। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্যদিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ এখন তার দল রিপাবলিকানদের হাতে। একদিকে ট্রাম্প নিজে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত, অন্যদিকে কংগ্রেস তার দলের। ফলে  যেসব প্রতিশ্রুতি তিনি প্রচারণার সময় দিয়েছেন তা রক্ষা করা তার জন্য খুব এবং খুবই সহজ। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন ও ট্রাম্পের প্রশাসন নিয়ে এসব কথা লিখেছেন বিবিসি’র উত্তর আমেরিকা বিষয়ক সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট গ্যারি ও’ডনোঘু। তিনি লিখেছেন, ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জয়ের এই ধারাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘গভর্নিং ট্রাইফেকটা’। যখন প্রেসিডেন্ট মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেট উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যান, তখনকার পরিস্থিতিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়। এই নিয়ন্ত্রণ এখন ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের আছে। এই নিয়ন্ত্রণ একটিমাত্র দলের কাছে থাকা সাধারণ বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এটা বিরল এবং এর মেয়াদ স্বল্পস্থায়ী হয়েছে। প্রায় দুই বছর পরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা মাঝে মাঝেই আসন হারাতে থাকে।  হোয়াইট হাউসের প্রথম দুই বছর এই ‘গভর্নিং ট্রাইফেকটা’ পরিস্থিতি উপভোগ করেছেন ট্রাম্প এবং জো বাইডেন দু’জনেই। কিন্তু তারা দু’জনেই দেখেছেন এই নিয়ন্ত্রণ একজন প্রেসিডেন্টের সামনে এগুনোর জন্য কোনো গ্যারান্টি নয়। সিগনেচার হিসেবে ক্ষমতার প্রথম মেয়াদের প্রথম দুই বছর ট্রাম্প একটি ট্যাক্স বিল পাস করেন। এই বিলে তিনি করপোরেট ট্যাক্স শতকরা ৩৫ ভাগ থেকে কমিয়ে ২১ ভাগে নিয়ে আসেন। ব্যক্তিবিশেষের কিছু ট্যাক্স কমিয়ে দেন। কিন্তু ২০১৬ সালে তিনি বিস্ময়করভাবে নির্বাচিত হয়ে শীর্ষে চলে যাওয়ার ফলে নিজের দলের কিছু সদস্যের বাধার মুখে পড়েন। অন্য লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে গিয়ে তাকে সংগ্রাম করতে হয়। তিনি অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (যেটা ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত) বাতিল করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। কারণ, তার দলের একজন শক্তিধর সিনেটর জন ম্যাকেইন-এর পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানান। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি অবকাঠামো বিষয়ক বিল পাস করবেন। তাতেও ব্যর্থ হন ট্রাম্প। ক্ষমতার প্রথম দুই বছর ডেমোক্রেট  প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একই অবস্থায় পড়েন। ওই সময় কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ছিল ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণে। আমেরিকান রেসক্যু পরিকল্পনা, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড জবস আইন এবং চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট পাস করাতে সক্ষম হন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। কিন্তু তাকে ব্যয় ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে ফিরে আসতে হয়। এর কারণ, তার নিজের দলের একজন সিনেটর এর বিরোধিতা করেছিলেন। সিনেটে কোনো বিল পাস করাতে গিয়ে কংগ্রেসে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও বড় বাধা হলো সিনেটে তিন-পঞ্চমাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ৬০টি ভোট পেতে হয়। এ কারণে কোনো বিল পাস করানোর আগে তা নিয়ে  খোলামেলা বিতর্ক হয়। এর অর্থ হলো যখন সিনেটে একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে তারা বিল পাস করাতে গেলে সবাইকে তার আওতায় টানার চেষ্টা করে।

আগামী ২০শে জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতায় আসছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ট্রাম্প। এটি তার দ্বিতীয় দফার ক্ষমতা। একে ট্রাম্প ২.০ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। তার এই দ্বিতীয় মেয়াদে রিপাবলিকানদের জন্য ‘গভর্নিং ট্রাইফেকটা’ কেমন হবে! এবার সিনেটে তারা স্বাস্থ্যবান সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। কিন্তু তার হাতে ম্যাজিক নাম্বার ৬০টি আসন থাকবে না। এটা যেকোনো বিলের বিরোধিতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন। বুধবার সিনেটে রিপাবলিকানরা ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কটের পরিবর্তে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন জন থুনে’কে। ট্রাম্প শিবিরের পরিষ্কার পছন্দের রিক স্কট। এর ফলে বড় এক আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। ট্রাম্প বেশ কিছু বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার মধ্যে আছে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকারে অভিবাসীদের দেশ থেকে বের করে দেয়া। বিদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপ। পরিবেশ সুরক্ষা থেকে সরে আসা। এসব ইস্যুতে দ্রুততার সঙ্গে সামনে এগুনোর চেষ্টা করবেন ট্রাম্প। এসব বিষয়কে বাস্তবায়ন করতে গেলে তাকে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা, এমনকি আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে তিনি এমন বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। ওই সময় নির্বাহী আদেশ ব্যবহার করেছেন বিস্তৃতভাবে। কিন্তু নিয়মিতভাবে এবং সফলতার সঙ্গে সেসব উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
বিচারিক প্রেক্ষাপটও ট্রাম্পের পক্ষে পরিবর্তিত হয়েছে। তার প্রথম ক্ষমতার মেয়াদে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে চেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টে তিনজন রক্ষণশীল বিচারককে বসিয়ে। এর উদ্দেশ্য হলো সম্ভবত সামনের দশকগুলোতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সুদৃঢ় করা। তিনি কমপক্ষে চার ডজন বিচারককে ফেডারেল আপিল কোর্টের জন্য নাম ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যদিয়ে তিনি আরও রক্ষণশীল হওয়ার চেষ্টা করেছেন। সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিয়েছে। প্রশাসনিক পদগুলোতে খুব সহজেই ট্রাম্প তার পছন্দের লোকদের বসাতে পারবেন। এর আগে ২০১৭ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি রিপাবলিকান দলের  ভেতর থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তা এখনো বিদ্যমান আছে। এসব মিলে আগামী দু’বছর ট্রাম্পের জন্য ব্যস্ত এবং সম্ভবত কঠিন সময় হতে পারে। সাম্প্রতিক ইতিহাস ইঙ্গিত করে যে, এই ‘গভর্নিং ট্রাইফেকটা’ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিন্তু আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসন সেই অবস্থাকে কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাইবে।

mzamin

৫ই আগস্ট গুলিবিদ্ধ আব্দুল্লাহ না ফেরার দেশে

প্রায় সাড়ে ৩ মাস ধরে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহত শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ। গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতনের দিন ৫ই আগস্ট মাথায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর আবারও অবস্থার অবনতি হলে আরেকবার অস্ত্রোপচার শেষে তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়া হয়। গতকাল ভোর ৫টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আব্দুল্লাহ। এরপর শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ২টার পরে আব্দুল্লাহর গ্রামের বাড়ি যশোরের উদ্দেশ্যে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় গ্রামের বাড়ি বড়আঁচড়ায় জানাজা শেষে আব্দুল্লাহর লাশ দাফন করা হবে। এদিকে আব্দুল্লাহর বাড়ি পরিদর্শন করেছেন নৌ-পরিবহন ও শ্রম এবং কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।

আব্দুল্লাহর বাবা আব্দুল জব্বার জানান, ৫ই আগস্ট তাঁতীবাজার এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন আবদুল্লাহ। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে সিএমএইচ-এ স্থানান্তর করা হয়। গতকাল ভোর ৫টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ঢাকার শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন আব্দুল্লাহ (২৩)। আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ঢাকায় বোনের বাসায় থেকে লেখাপড়া করা আব্দুল্লাহর গ্রামের বাড়ি যশোর জেলার বেনাপোল পোর্ট থানার বড়আঁচড়া টার্মিনাল পাড়া গ্রামে। তার পিতা আব্দুল জব্বার, পেশায় দিনমজুর। মাতা মারিয়া খাতুন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন আব্দুল্লাহ।
সূত্রে জানা যায়, গত ৫ই আগস্ট সন্ধ্যায় রাজধানীর তাঁতীবাজার মোড়ে বংশাল থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন। তার কপালের মাঝ বরাবর গুলি লাগে। এমন অবস্থায় প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা রাস্তায় পড়ে ছিলেন আব্দুল্লাহ। দীর্ঘ সময় রাস্তায় পড়ে থাকার পর প্রথমে তাকে মিটফোর্ড এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করে তার মাথা থেকে বের করা হয় গুলি। ১০ই আগস্ট তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। এরপর তাকে গ্রামের বাড়ি বেনাপোলে নিয়ে যান স্বজনরা। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে গত ১১ই আগস্ট রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। ঢামেকের চিকিৎসকরা আব্দুল্লাহ মাথার ভেতরে ইনফেকশন দেখতে পান, যা তরল প্লাজমার মতো। আবারও তার অপারেশন করা হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ২২শে আগস্ট আব্দুল্লাহকে সিএমএইচ-এ স্থানান্তর করা হয়।
এদিকে গতকাল বেনাপোল স্থলবন্দরে নির্মিত কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনাল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসে আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর পান নৌ-পরিবহন ও শ্রম এবং কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। সেখান থেকে তিনি বেনাপোল পোর্ট থানার বড়আঁচড়া গ্রামে অবস্থিত আব্দুল্লাহর গ্রামের বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় অব্দুল্লাহর মামা ইসরাইল সর্দার ও বড় দুই ভাইয়ের সঙ্গে উপদেষ্টার কথা হয়। তাদের সান্ত্ব্তনা দেন তিনি। সহযোগিতা করা হবে বলে আশ্বাস দেন উপদেষ্টা।

mzamin

হাসিনাকে থামান: ভারতকে বাংলাদেশ

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনার বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্য-বিবৃতিকে ভালো চোখে দেখছে না সরকার। এমনটাই জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মো. তৌফিক হাসান। গতকাল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ও ভারতীয় সরকারকে বিষয়টি জানিয়েছে। তাদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ৫ই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর সেখানকার বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে যে রাজনৈতিক বিবৃতি ও বক্তব্য দিচ্ছেন, সেটি বাংলাদেশ সরকার ভালোভাবে দেখছে না। এ ব্যাপারে সরকারের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের বক্তব্য-বিবৃতি প্রদান থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। তৌফিক বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সেটির জন্য এ ধরনের বক্তব্য থেকে তাকে বিরত রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের জবাব কি? জানতে চাইলে মুখপাত্র বলেন, আমরা যখন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছি, তখন তিনি বলেছেন, বিষয়টি তার সরকারের কাছে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে জানাবেন। আমরা আসলে সত্যিকার অর্থে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জবাব পাইনি। তারা বিষয়টি দেখবেন এরকম জানিয়েছেন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং তাকে ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করানো হবে কিনা? এ প্রশ্নে মুখপাত্র বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমাদেরকে যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, তখন আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেবো। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এমন বিষয় নিয়ে কোনো অনুরোধ পায়নি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও এমপি ভারতে অবস্থান করছেন-সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে কিনা? মুখপাত্র বলেন, না এ নিয়ে কোনো তথ্য নেই। ভারতের ভিসা পাওয়া সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে পররাষ্ট্রের মুখপাত্র বলেন, বিষয়টি আমরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বারবার বলে আসছি এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে তাদের লোকবল সংকটের কথা জানিয়েছে। স্বাস্থ্য ভিসা এবং তৃতীয় দেশে যাওয়ার জন্য ভিসা প্রত্যাশীদের বিষয়টি যেন তারা দ্রুততার সঙ্গে বিবেচনা করেন সেটি আমরা তাদের বলেছি। সেই সঙ্গে রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং ফিনল্যান্ডে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ভিসা পাওয়া সহজ করার অনুরোধ করেছি।

অপর প্রশ্নে তৃতীয় দেশের ভিসাপ্রার্থীরা দিল্লির পরিবর্তে ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তান থেকে ভিসা গ্রহণ করতে পারবেন বলে জানান মুখপাত্র মিস্টার হাসান।

কূটনীতিকদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা অত্যন্ত দুঃখজনক: এদিকে সমপ্রতি সামাজিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কূটনীতিকদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মো. তৌফিক হাসান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমপ্রতি দেখা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত বা বিভিন্ন কূটনীতিক, যারা রাষ্ট্রদূত হতে যাচ্ছেন- তাদের বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারণা হচ্ছে। এটি খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, ২০-২৫ বছর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরে একজনকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এবং যোগ্য না হলে সরকার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয় না বলে তিনি জানান। মুখপাত্র  বলেন, রাষ্ট্রদূতদের বিষয়ে এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা যারা করছেন- তারা ভালো কাজ করছেন না। এটি আসলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের নেতিবাচক ভাবমূর্তি বিদেশে তুলে ধরছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংস্কারের বিষয়ে তিনি জানান যে, অবসরে যাচ্ছেন অথবা অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক কিন্তু রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন- তাদের মেয়াদ আর বর্ধিত করা হচ্ছে না। ডিসেম্বরে ৭-৮ জন কূটনীতিক অবসরে যাচ্ছেন। তাদের কারও মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে না।

উপদেষ্টা হেনস্তায় কাউন্সেলর কামরুল ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’: ওদিকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে হেনস্তার ঘটনায় সেখানকার বাংলাদেশ মিশনের শ্রম কাউন্সেলর মুহাম্মদ কামরুল ইসলামকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করে মুখপাত্র। বলেন, সেই সঙ্গে ওই মিশনে স্থানীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া এক কর্মীকেও চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র তৌফিক হাসান বলেন, সুইজারল্যান্ডে জেনেভা মিশনের বিষয়ে যেটি আপনারা জেনেছেন, এটি একটি খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা। যে কারণে কিন্তু অলরেডি অ্যাকশন নেয়া হয়েছে, আপনারা ইতিমধ্যে দেখেছেন যে, এ ঘটনায় যারা জড়িত, আমাদের মিশনের একজন অফিসার এবং স্টাফ মেম্বার- তাদের বিরুদ্ধে কিন্তু অলরেডি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গভর্নিং বডি এবং সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। দূতাবাসের প্রটোকলে তিনি গাড়িতে করে জেনেভা বিমানবন্দরে পৌঁছান। গাড়ি থেকে নামার পর হঠাৎ একদল লোক এসে তাকে ঘিরে ধরে হেনস্তা করে। এ সময় আসিফ নজরুলের সঙ্গে ছিলেন জেনেভা মিশনের শ্রম কাউন্সেলর কামরুল ইসলাম ও মিশনের স্থানীয়কর্মী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মিজান। উপদেষ্টার প্রতি ওই ব্যক্তিরা চড়াও হলেও তারা দু’জনই চুপ ছিলেন। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৯ ব্যাচের কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম ২০২১ সালে জেনেভা মিশনে যোগ দেন। উপ-সচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা এর আগে প্রবাসীকল্যাণ সচিবের একান্ত সচিব ছিলেন। আসিফ নজরুলের সূচি বাইরে ‘জানাজানি’ হওয়া এবং বিদেশে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন ঘটনা এড়াতে বিদেশি মিশনগুলোতে নির্দেশনা দেয়ার কথা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তৌফিক বলেন, সবগুলো মিশনে আমরা নির্দেশনা পাঠিয়েছি যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রটোকল এবং সিকিউরিটির ক্ষেত্রে যেন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। 

mzamin

‘প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে’

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীসহ কোনো ব্যক্তি যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বলেছেন, আমরা নিশ্চিত করতে চাই, সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আমাদের আগামীর বাংলাদেশে আর কোনো ব্যক্তি এমনকি প্রধানমন্ত্রীও স্বৈরাচারী হয়ে যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন বা পারবেন না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারের প্রতিটি লেভেলে চেষ্টা করা হবে নিশ্চিত করতে কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আমরা দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের মতামতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা মানবাধিকার, মানবাধিকারকর্মী, সমাজকর্মী ও সাংবাদিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্‌। গতকাল রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে বিএনপি’র উদ্যোগে ‘৩১ দফা রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের রূপরেখা ও নাগরিক ভাবনা’- শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সেমিনার শুরু হয়। প্রথমে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের রূপরেখার পটভূমি তুলে ধরেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিহউল্লাহ। এরপর দলের তৈরি একটি পাওয়ার পয়েন্ট দুই পর্বে প্রদর্শন করা হয়। প্রথম পর্ব প্রদর্শন করেন ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল এবং দ্বিতীয় পর্ব প্রদর্শন করেন ড. মাহাদী আমিন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, ভারত, চীন, রাশিয়া, জাপান অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, নরওয়ে, পাকিস্তানসহ ৩৮ দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে নাগরিক ও রাজনীতিবিদরা বলেন, ৩১ দফার প্রতিটি ধারার পক্ষে এবং বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা হওয়া দরকার। এজন্য প্রত্যেকটি দফাকেন্দ্রিক তর্ক জারি রাখা দরকার। আর রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার এই দফাতে সম্পৃক্ত হওয়া দরকার।

বর্তমানে দেশে আলোচিত প্রায় সব সংস্কার প্রস্তাবই বিএনপি’র ৩১ দফায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান। বলেন, আমি সংস্কারের উদ্দেশ্য বলতে সেটিই বুঝি, যে সংস্কারের মাধ্যমে সংবিধানের কয়েকটি বাক্য নয়, বরং মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমি সংস্কার বলতে সেটিই বুঝি, যা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রতিটি নারী ও পুরুষের বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করবে। যে সংস্কার নারীদের সম্মান, স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে। যে সংস্কার সকল মানুষের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। যে সংস্কার দেশের সন্তানদের আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠন করবে। যে সংস্কার মানুষকে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা দেবে। যে সংস্কার বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম স্থিতিশীল রাখবে। আমি সংস্কার বলতে সেটিই বুঝি, যা কৃষক, শ্রমিক এবং সকল কর্মজীবী মানুষের ন্যায্য ও প্রাপ্য মজুরি নিশ্চিত করবে।

তিনি বলেন, আজকে আমরা যারা এখানে উপস্থিত রয়েছি, আমাদের রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্নতা আছে, সেটিই স্বাভাবিক। তবে আমি বিশ্বাস করি, ভিন্ন-ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মাঝেও বৃহত্তর পরিসরে আমাদের সবার মাঝে একটি বিষয়ে আদর্শিক ঐকমত্য রয়েছে। আর সেই বিষয়টি হলো, একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। আমরা সবাই এমন দেশ গড়তে চাই, যেখানে আর কখনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না। আমরা সবাই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ চাই, যেখানে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা কেউ কেড়ে নেবে না। আমরা সবাই একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত বাংলাদেশ চাই, যেখানে গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার নিশ্চিত করবে জনগণের মালিকানা ও অংশীদারিত্ব।
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের সময় আমরা তথাকথিত উন্নয়নের রাজনীতি দেখেছি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, পতিত সেই রাজনীতির ভিত্তি ছিল দুর্নীতি, দুঃশাসন ও দুর্বৃত্তায়ন। অন্যদিকে জনগণের ভোটে বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, আপনারা দেখতে পাবেন, আমাদের ৩১ দফার আলোকে, জনগণের ক্ষমতায়ন ও অংশীদারিত্বের রাজনীতি। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হবে আইনের অনুশাসন, মানবাধিকার এবং বাকস্বাধীনতা। আমরা যদি একটি রুলস-বেজড রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে আসতে পারি, সারা পৃথিবী থেকে প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ও প্রাইভেট ক্যাপিটাল নিজ গতিতেই বাংলাদেশে আসবে।

আমাদের পাবলিক সেক্টরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে, দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদনে ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, আমরা দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে চাই। ঠিক যেভাবে আজ থেকে দুই দশক আগে, বিএনপি সরকারের সময়, বাংলাদেশে মিডিয়া নির্ভয়ে সরকারের সমালোচনা করতে পারতো, কার্টুন আঁকতে পারতো। আপনাদের নিশ্চই মনে আছে, আমাকে নিয়ে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে, মিডিয়ার একাংশ ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করেছিল, মিডিয়া ট্রায়াল ও প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন করেছিল। কিন্তু আমরা তার প্রতিদানে কোনো মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করিনি, কাউকে হেনস্থা করিনি, কোনো সম্পাদককে জেলে পাঠাইনি। গত ১৬ বছরে আমার নিজের, আমার দলের এবং গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি তথা আপনাদের অনেকের ফ্রিডম অফ স্পিচ, ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন এবং ফ্রিডম অফ এসোসিয়েশন সম্পূর্ণভাবে হরণ করা হয়েছে। সেই উপলব্ধিকে ধারণ করে, আমরা সকল নাগরিক, বিশেষত মানবাধিকারকর্মী, সংবাদকর্মী, ও সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবো, ইনশাআল্লাহ্‌।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিজেদের ভাবনা প্রকাশের কারণে কিংবা প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে মন্তব্যের দায়ে, কাউকে হেনস্তা করা হবে না। সত্য গোপন করতে মেইনস্ট্রিম ও সোশ্যাল মিডিয়া যেমন বাধ্য থাকবে না, তেমনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে সেটির প্রচারেও সরকার কাউকে চাপ দেবে না। তবে দেশ গঠনের দায়িত্ব সবার এবং আমরা মিডিয়ার কাছ থেকে নিরপেক্ষ এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

তিনি বলেন, বিচার-বহির্ভূত হত্যা, গুম, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ও বিচার, পরোয়ানা ছাড়াই গণগ্রেপ্তার এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে যে ভয়ের সংস্কৃতি গত ১৬ বছরে গড়ে উঠেছিল জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে সেটি নির্মূল করার। জাতিসংঘ প্রণীত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুসারে আমরা নিশ্চিতের চেষ্টা করবো প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা। ক্ষমতার পরিবর্তন মানে কেবল একটি দল থেকে অন্য দলের কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তর নয়। বরং ক্ষমতার পালাবদলে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হওয়া উচিত, যেখানে সমাজের পরিবর্তিত অবস্থা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা যায়।

তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর গত ৩ মাসে, বিএনপি’র জাতীয় নেতৃবৃন্দ এমন অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যাতে রাজনীতিতে আধুনিকায়নের উন্মেষ ঘটে। সেইসব উদ্যোগকে, তারুণ্যের উদ্দীপনায়, দেশজুড়ে প্রতিপালন করেছে বিএনপি’র তৃণমূল। ফলে আপনারা দেখেছেন, অতীতের মতোই কীভাবে বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা বন্যার সময় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক শক্তি ও সাহায্য নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারগুলোকে আন্তরিক সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করছে, জনদুর্ভোগ এড়াতে মোটরসাইকেল বহর বা শোভাযাত্রা থেকে নিজেদের বিরত রাখছে, রাজনৈতিক প্রোগ্রাম শেষে অত্র স্থান পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করছে, নগরের দেয়াল থেকে ব্যানার ও পোস্টার অপসারণ করছে, ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছে জনসম্পৃক্ত ও সমাজবান্ধব রাজনীতিকে।

তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের দোসরদের ষড়যন্ত্র ঠেকাতে পূজার সময় বিএনপি’র নেতাকর্মীরা মন্দির ও উপাসনালয় পাহারা দিয়ে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সকল মানুষের সুরক্ষায় পাশে দাঁড়িয়েছে। ধর্ম-বর্ণ, কিংবা ভৌগোলিক-আদর্শিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক যেন তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকার বিনা বাধায় উপভোগ করতে পারে সেই লক্ষ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা লাখো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন। সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বিএনপি’র নীতি। জাতীয়তাবাদের আদর্শই বিএনপি’র রাজনীতি। আমরা বিশ্বাস করি ধর্ম, দল ও মত যার যার- তবে রাষ্ট্র সবার।

তারেক রহমান বলেন, আজ আমরা ৩১ দফার যে আলোচনা এখানে করেছি, তা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে আকাঙ্ক্ষার আলো দেখাবে পরিবর্তনকামী গণমানুষকে। রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের এই রূপরেখা তৈরি হয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০, বিএনপি’র জনসম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে প্রথমে প্রদত্ত ২৭ দফার ওপর ভিত্তি করে যা পরবর্তীতে যুগপৎ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শরিক সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে ৩১ দফায় পরিণত হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে বিএনপি সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রাখতে চায়, যাতে কেউ পরপর দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারে। আমরা আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখতে চাই। রাষ্ট্র পরিচালনায় সমাজের জ্ঞানী-গুণীদের প্রতিনিধিত্ব এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য তরুণ ও বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান, আর কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত যোগ্যতা অনুযায়ী বেকার ভাতা প্রবর্তন। আমরা নিশ্চিত করতে চাই সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ, তৃণমূলের ক্ষমতায়ন এবং আবারো ঐতিহাসিক খাল কাটা কর্মসূচির বাস্তবায়ন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, জ্বালানি, জলবায়ু, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রে আনতে চাই যুগোপযোগী আমূল পরিবর্তন। যেন তৈরি হয় দক্ষ মানবসম্পদ, বৃদ্ধি পায় রপ্তানিমুখী শিল্প ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, স্থাপিত হয় মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, কৃষক ও উৎপাদনকারীদের জন্য ন্যায্য মূল্য, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ও বহুভাষার প্রশিক্ষণ, বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সবার জন্য পর্যায়ক্রমে আবাসন সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষা। এই পরিকল্পনাগুলো ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-গোষ্ঠী- সমতল-পাহাড়ি নির্বিশেষে সুষম ও সমঅধিকারের আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণে একটি ঐকমত্যের ভিশন বলেই আমি মনে করি। পরিবেশ, পরিস্থিতি, দেশের প্রয়োজন এবং মানুষের চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ৩১ দফাকে সংযোজন, বিয়োজন, পুনর্বিন্যাস বা পরিবর্তনও করা যেতে পারে। তবে তা হবে স্টেকহোল্ডার কন্সালটেশন তথা অংশীজন পরামর্শ ও জনমত ঐক্যের মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে এই ৩১ দফাই একদিন আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য তথা সুখী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ অর্জনের দ্বার উন্মোচন করবে যা বিশ্ব মানচিত্রে পরিচিত হবে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, শিল্পায়নে সাফল্যমণ্ডিত, অর্থনীতিতে গতিশীল, মানবসম্পদে সমৃদ্ধ, এবং সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে।

তিনি বলেন, বিএনপি’র একজন কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য কেবল ক্ষমতায়ন নয়। বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন এবং জনগণের অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশও এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকে আমরা যারা এখানে সমবেত হয়েছি, দেশে-বিদেশে আমরা যারা বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে সবসময় ভাবি, আমাদের গড়ে তুলতে হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদার ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। আমাদের সবাইকে এক হয়ে এগিয়ে যেতে হবে বহুদূরে। এই অগ্রযাত্রার গতি হতে হবে দ্রুত তবে স্থির, লক্ষ্য হতে হবে সুনির্দিষ্ট। জাতীয় ঐতিহ্য ও অতীতের ভালো অর্জনগুলোকে ধারণ করে আমাদের চেতনা এবং দায়বদ্ধতাকে হতে হবে ভবিষ্যৎমুখী। গতানুগতিক ধারার রাষ্ট্র পরিচালনায় আবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমাদের উৎসাহ দিতে হবে আধুনিকতাকে, বরণ করে নিতে হবে অভিনবত্বকে। সামনের দিকে দৃষ্টিপাত করে আলিঙ্গন করে নিতে হবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চিন্তাধারাকে, যা পরবর্তীতে পরিবর্তন করে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও।

তিনি বলেন, গত ১৬ বছর ধরে এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন গণতন্ত্রের পক্ষের প্রতিটি ব্যক্তি, দল, সংগঠন ও গোষ্ঠী তাদের সকলের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে প্রতিটি শ্রেণি-পেশা মতের মানুষের অংশগ্রহণকে সম্মান জানিয়ে লুণ্ঠিত ভোটাধিকার ফিরিয়ে এনে এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে- একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের সমন্বিত অগ্রাধিকার।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দুই বছর আগে আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জাতির সামনে যে প্রস্তাব করেছিলাম, সেটা আবার আমরা নতুন প্রস্তাব করতে চাই। কারণ বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কারের উদ্যোগে নেয়া হয়েছে। আমরা সেই বিষয়টি আবার জনগণের সামনে তুলে ধরছি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই ৩১ দফাগুলোর সঙ্গে নতুন যে সংস্কারের প্রস্তাবগুলো আসবে, তার সঙ্গে অনেকগুলো মিলে যাবে এবং মিলতে হবে।  

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ এখন পলাতক। যারা ফ্যাসিস্ট সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য আন্দোলন করেছিলেন তাদের ভিতরেও আমি বিভেদ লক্ষ্যে করছি। আমরা কেনো দেশের মঙ্গলের জন্য এই সংঘাত এবং দ্বন্দ্বের উপরে উঠতে পারছি না।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সংস্কারের শুরুও নাই এবং শেষও নাই। সব সময় সংস্কার চলবে। আর নতুন বাংলাদেশ চান তাহলে দেশে গণতন্ত্র লাগবে, সেজন্য ভোট লাগবে। এমন ভোট, যেটা সবাই গ্রহণ করবে। এজন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ লাগবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমি শুধু গতানুগতিক সরকার পরিবর্তন করতে চায়নি। এই দফাগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে একটা জাতীয় ঐক্যে এবং মানুষের সমর্থন আমরা লক্ষ্যে করেছি। আমাদের প্রশ্ন করে বিএনপি যে ৩১ দফা করেছে, আপনারা কী ভরসা রাখছেন। আমরা বলেছি, এবার আমরা ভরসা রাখতে চাই।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি ৩১ দফা দিয়েছে, জামায়াত ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে এবং অন্য দলগুলোও দিয়েছে। এই দফাগুলো বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, বিএনপি যাতে ৩১ দফাতেই না থেকে যায়, প্রয়োজনে যাতে আমরা আরও কিছু সম্পৃক্ত করতে পারি।

মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্যে রাখেন অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, এডভোকেট এলিনা খান প্রমুখ। সেমিনারে সঞ্চালনা করেন শামা ওবায়েদ এবং এডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল। এ ছাড়া এতে বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদসহ দলটি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে জাতীয় পার্টির মোস্তফা জামাল হায়দায়, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, এলডিপি’র রেদোয়ান আহমেদ, এনপিপি’র ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, এবি পার্টির আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন যুগপৎ আন্দোলনের দল-জোট এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের নেতৃবৃন্দরা। 

mzamin

সরকারের ১০০ দিন একটি পর্যালোচনা

দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পূর্ণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। নানা চ্যালেঞ্জ আর সংকটকে সামনে রেখে দায়িত্ব নেয়া নতুন সরকারের ওপর এখন চাপ বাড়ছে নির্বাচনের। রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার প্রশ্নে সরকারকে সমর্থন দিলেও তারা চাইছে নির্বাচন এবং সংস্কারের কার্যক্রম একসঙ্গে চালাতে। নির্বাচনী কার্যক্রম দৃশ্যমান না হলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমবে বলে তারা মনে করছে। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে এই আহ্বান জানানো হয়। এই সময়ে নির্বাচনের বিষয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা না হলে রাজপথে আন্দোলনে নামার বিষয়েও কথা বলেছেন দলটির নেতারা। বিএনপি’র সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনের বিষয়ে সরকারকে অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

যদিও সরকার বলছে, নির্বাচন আয়োজনেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতকাল কমিশন গঠনে নাম প্রস্তাবের শেষ দিন ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই এই কমিশন গঠন হবে। নতুন কমিশন আসলে নির্বাচনী প্রক্রিয়াও দৃশ্যমান হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তিন মাস কোনো সরকারের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। যেহেতু এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচিত নয় তাই তাদের একটি নির্ধারিত রোডম্যাপ থাকা উচিত। যাতে নির্বাচন নিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায়। দায়িত্ব নেয়ার পর সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে নেয়া উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার শুল্ক করসহ নানা খাতে ছাড় দিলেও বাজার পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিদায়ী মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের ঘরে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এখনো পুরো স্বাভাবিক হয়নি। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছেন।

সরকারের তিন মাসের কার্যক্রমের মূল্যায়নে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার যে পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে সে অবস্থাটা একেবারে এক্সট্রা অর্ডিনারি সিচুয়েশন ছিল। শান্তিপূর্ণ অবস্থায় নির্বাচিত সরকার নব্বই দিনের মাথায় তার সাফল্য- ব্যর্থতা কতোটুকু সেটা আমরা যেভাবে করি এই সরকারের ক্ষেত্রে সেটা করা যাবে না। করা উচিতও না। কারণ একটা বিরাট গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনার সরকার পরাজিত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো। নতুন সরকার যখন দায়িত্ব নিলেন তখন দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। আমলাতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে, পুলিশ ধ্বংস হয়েছে, জুডিশিয়ারি ধ্বংস হয়েছে। আর বাকি যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে সবই কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে যারা দায়িত্বে আছেন তারা ওইভাবে পলিটিশিয়ান না। তাদের কাজকর্ম অন্যদের চাইতে একটু  পৃথক হবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, তারা অনেক কাজই হয়তো করছেন যেগুলো সঠিকভাবে করছেন। কিন্তু এগুলোর ফল আমরা চট করে পাচ্ছি না। তারা কাজ করেন মিনিস্ট্রির সেক্রেটারিদের মাধ্যমে। আজকে অনেকগুলো মিনিস্ট্রিতে সেক্রেটারি পর্যন্ত নাই। এবং বিশ্বাসযোগ্য লোকও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার প্রশ্ন উঠেছে যাদের পদায়ন করা হয়েছে বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে এদের মধ্যে অনেকেই আবার ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা হিসেবে চিহ্নিত।

তিনি বলেন, এই সরকার অর্থনীতির যে পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছে সেটা তো ভয়াবহ। দেশের অর্থনীতি বলে কিছু নেই এখন। যেহেতু সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত, মেগা প্রজেক্টের নামে অনাচার-দুর্নীতি করা হয়েছে পাশাপাশি গত তিন চার বছর ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে। এখন যে অর্থনীতি সে ধারাবাহিকতারই একটা অংশ।

আমরা যদি বলি তারা ব্যর্থ হচ্ছে সেটা সঠিক না। তবে আমি তাদের প্রতি যে সাজেশন থাকবে সেটা হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ লোকজনদের সঙ্গে তারা কথাবার্তা বলবেন, তাদের বুদ্ধি পরামর্শ চাইবেন। তাতে হয়তো কিছুটা সুফল তারা পেতে পারেন। দ্বিতীয়ত হচ্ছে তারা কী করতে চাচ্ছেন আর কী চাচ্ছেন না- সেটা যেন জনগণকে জানানো হয়।

এই সরকারকে নির্দিষ্ট কোনো সময় কেউ দেয়নি। সরকার কোনো সময়ের কথা বলছে না। তারা একথা বলছে না যে, দু’বছরের মধ্যে কাজগুলো করবো বা এক বছরের মধ্যে এ কাজ করবো। এগুলোর তো টাইম টার্গেট কিছু নাই। নির্বাচন করতে গেলে একবারে কমপক্ষে একটা ভালো নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। যারা অনেস্ট, অন্যের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে না, এ ধরনের লোকদের নিয়ে একটা নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। তারপরে নির্বাচন কমিশনের ভেতরকার যে আইন-কানুন রুলস আছে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। এবং সেটা পরিবর্তন দরকার।

এ সরকারককে দেখতে হবে নিজেরা সম্পূর্ণ ভালো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে জনসাধারণের মনোভাবটা কী বা তারা কীভাবে দেখছে- সেটা করেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি চট করে পরিবর্তন হবে না। আমার ব্যক্তিগত মত, কালবিলম্ব না করে পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে ছয় মাসের স্কিম নিয়ে সাজানো। সেখানে প্রয়োজন হলে আনসার বাহিনী থেকে বা অন্য কোনো বাহিনী থেকে লোক নিয়ে আসতে পারেন। এ ছাড়া যারা অন্যায় করে এখনো বসে আছে তাদের দ্রুত বিতাড়ন করা দরকার।

সরকারের তিন মাসের মূল্যায়নের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গত তিন মাসে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, সবাই যদি তাদেরকে সহযোগিতা করি তাহলে জাতির সামনে যে চ্যালেঞ্জ আছে তা পূরণে সক্ষম হবে।

৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত ১১ই সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন তিনি। পরবর্তীতে ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে কমিশনের প্রধান করে ছয় কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। পরে আরও চারটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন গঠনের দিন থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ১০ সংস্কার কমিশনকে সরকারপ্রধানের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে কমিশন প্রধানরা তাদের কাজের অগ্রগতির বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেছেন। কমিশনগুলোর মধ্যে সংবিধান সংস্কারে যে কমিশন হয়েছে তা নিয়ে কিছুটা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সংবিধান বাতিল, নাকি পুনর্লিখন এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। এছাড়া সংবিধান সংস্কার এই সরকার বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা এই প্রশ্নও সামনে এসেছে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন কমিশন প্রধান আব্দুল মুয়িদ চৌধুরী। তিনি জানান, তার কমিশনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সবার মতামত সংগ্রহ শুরু হয়েছে। কমিশনের সদস্যরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সফর করে জনসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন।

বৈঠকে পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেন কমিশন প্রধান সফর রাজ হোসেন। তিনি জানান, পুলিশ সংস্কার কমিশন ইতিমধ্যে ১০টি সভা করেছে। পাশাপাশি অংশীদারদের সঙ্গে আরও চারটি বৈঠক করেছে। জনসাধারণের মতামত চেয়ে একটি প্রশ্নমালা প্রস্তুত করা হয়েছে; যা ইতিমধ্যে ওয়েবসাইটে দেয়া হয়েছে। কিছু আইন ও বিধি সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে যেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন সংস্কারে কাজ করছে এ সংক্রান্ত কমিটি। এ কমিটির প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার সর্বশেষ বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে নিজেদের কার্যক্রমের বিষয় অবহিত করেন।

সর্বশেষ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই আইনটি বাতিলে সাংবাদিক সমাজ ও অংশীজনের কাছ থেকে জোরালো দাবি ছিল। এছাড়া উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরতদের তিন মাসের কাজের মূল্যায়নের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিবেদন চেয়েছেন। বিদায়ী সরকারের নাজুক অবস্থায় রেখে যাওয়া অর্থনীতি ও রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক খাত নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে সংস্কার আনা হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এসেছে। তবে এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বাজার পরিস্থিতি। সরকার অনেক পণ্যের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছে বা কমিয়েছে। কিন্তু দামে পরিবর্তন হচ্ছে না খুব একটা। নিত্যপণ্যের দাম কমানো ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও জোরালো উদ্যোগ চাইছে রাজনৈতিক দলগুলো।

mzamin

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল চায় জামায়াত

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ একধরনের বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করে। এজন্য আমরা ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল চেয়েছি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি জামায়াতে ইসলামী করতে চায়। বৃহস্পতিবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে জারি করা রুলের শুনানিতে জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরেন।

শিশির মনির মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে স্বাধীন ভোটাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখে। অনুচ্ছেদটি ব্যক্তির পছন্দ অপছন্দের সুযোগ থাকে না। তিনি স্বাধীনভাবে কোনো মতামত দিতে পারেন না।  সংসদ সদস্যরা তাদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের সংসদীয় আসন হারায়। শিশির মনির আরও বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর এই কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, এমনকি বিচার বিভাগকে এক প্রকার ধ্বংস করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক যে ভিত্তি আছে, তার সঙ্গে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক। আমরা এও বলেছি, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেটি বাংলাদেশের বাইরে সকল মানবাধিকার সংগঠন, গবেষণা সংগঠন এবং বাংলাদেশকে নিয়ে যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেখালেখি করেন, সকলেই বাংলাদেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন পদ্ধতিটাকে ধ্বংস করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়াকে ইচ্ছা করে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে নির্বাচন আর নির্বাচন থাকেনি। এজন্য পঞ্চদশ সংশোধনী বাংলাদেশের মানুষের আশা ও আকাক্সক্ষা ধ্বংস করেছে। বাংলাদেশের মানুষ ভোটকে উৎসব হিসেবে নিতে পারেনি। সেই নির্বাচনী উৎসবকে ধ্বংস করে আমরা এটিকে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারে পরিণত করেছি। আমরা নির্বাচন করেছি কিন্তু সেখানে বিচার বিভাগের কাছে কোনো প্রতিকার পায়নি। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। এই  পঞ্চদশ সংশোধনী বাংলাদেশের সাংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সিস্টেমের কথা বলে। এটা কোনো কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের কথা বলে না। এ জন্য এই পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া উচিত। দু’একটি বিধান রেখে বাকি সবগুলোই কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার ব্যবস্থাকে স্থায়ী করেছে। এগুলো সংবিধানের অংশ হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানে এসেছিল, সকল রাজনৈতিক দল, কৃষক, শ্রমিক, জনতা, ছাত্র সকলের মতামতের ভিত্তিতে। এবং সেটি হয়েছিল এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রথম বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা চালু হয়। এরপর সংবিধানের ১১তম সংশোধনী আনা হয়। সেখানে সব কথা বলা আছে। যে সংশোধনী মতৈক্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে তা কেন ধ্বংস করা হলো। এটিকে ধ্বংস করা সংবিধানকে ধ্বংস করার শামিল। অপরদিকে এদিন সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানের তুলনা করে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে শুনানি করেন। আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবার পরবর্তী শুনানির জন্য রাখা হয়েছে।

mzamin

চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ জানে আলম

জানে আলম জনির বয়স ২০ বছর। তার বাবা বেলাল হোসেনের ছোট একটি মুদি দোকানের সামান্য আয়ে চলে তাদের সংসার। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় জানে আলম খুঁজতে থাকেন উপার্জনের পথ। বছর তিনেক আগে চট্টগ্রামের শাহ আমানত মাজার এলাকার একটি টুপি-আতরের দোকানে কাজ নেন। থাকা-খাওয়া বাদে মাসে পেতেন ৭ হাজার টাকা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে সেই আয়ের পথ এখন বন্ধ।

জানে আলম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। নিয়মিত অংশ নিয়েছেন আন্দোলন কর্মসূচিতে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন ৫ই আগস্ট সকালে ছিলেন চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড় এলাকায়। হঠাৎ সেখানে পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে। গুলি থেকে বাঁচতে পেছনে ফিরতেই ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তারা সারা শরীর। সেই থেকে যন্ত্রণা শুরু। শরীরে অসংখ্য ছররা গুলি নিয়ে এখন বাড়িতেই ধুঁকছেন তিনি। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেন না। জানে আলমের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও ইউনিয়নের হাওরা গ্রামে। তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দেশ নতুন করে স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর পেছনে যাদের রক্ত ঝরেছে, তাদেরই একজন জানে আলমের খোঁজ কেউ রাখেনি। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে ছেলেটির জীবন এখন সংকটে।

জানে আলম বলেন, শুরু থেকেই চাকরির কথা চিন্তা না করে আন্দোলনে ছিলাম। ৫ই আগস্ট সকালের দিকে চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড় এলাকায় আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে থাকে পুলিশ। তিনি সামনে ছিলেন। গুলি থেকে বাঁচতে পেছনে ফিরতেই একের পর এক ছররা গুলি তার শরীরে লাগতে শুরু করে। বিশেষ করে মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত এমন কোনো জায়গা নেই যে তার গুলি লাগেনি। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তার মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন। সেখানে থাকা অন্য আন্দোলনকারীরা অচেতন ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন। জানে আলম বলেন, হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ দিয়ে পরদিন ছেড়ে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে পরামর্শ দেয়া হয় সার্জারি চিকিৎসক দেখানোর। অভাবের সংসার, যার কারণে অন্য কোনো ব্যবস্থা না দেখে পরিবারের লোকজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই তাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানে ওষুধপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে চিকিৎসা। কয়েক দিন অপেক্ষার পর আবার চলে আসেন বাড়িতে।

ছোট মুদি দোকান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালান জানে আলমের বাবা বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, সংসার চালাতেই অনেক কষ্ট হচ্ছে। পারিবারিক অসচ্ছলতায় ছেলেটাকে প্রাইভেট কোনো হাসপাতালে নিয়েও চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অর্থের অভাবে বর্তমানে ছেলেটার জন্য ওষুধও কিনতে পারছেন না। তিনি প্রশাসন ও সরকারের কাছে ছেলেটার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা চান।

জানে আলম বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার মাসখানেক পর মনোহরগঞ্জের সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজালা রানী চাকমা একটি মতবিনিময় সভায় তার সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে ইউএনও ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে তাকে কুমিল্লা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। সেখানে শরীর থেকে আটটি গুলি বের করা হয়। এরপরও শরীরে রয়ে গেছে শতাধিক গুলি। যার যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত কাতরাচ্ছেন। তিনি অনুদান নয়, উন্নত চিকিৎসা চান।

এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহরিয়া ইসলাম বলেন, আগের ইউএনও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে তার কিছু চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। তবে বর্তমানে তার উন্নত চিকিৎসা দরকার, যেটা অনেক ব্যয়বহুল। এ জন্য জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছেন। আশা করছেন, দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে।
জানে আলমের মা জাকিয়া বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে দেশের জন্য আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ছেলেটা এভাবে কাতরাচ্ছে। এত কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না।’

mzamin