Showing posts with label উৎপল শুভ্র. Show all posts
Showing posts with label উৎপল শুভ্র. Show all posts

Saturday, March 16, 2019

ক্রাইস্টচার্চ যেন ভুতুড়ে নগরী by উৎপল শুভ্র

শুক্রবার রাত মানেই আনন্দের রাত। সামনের দুদিন ছুটি, এই রাতে নিউজিল্যান্ডের কোনো শহর এমনিতেই ঘুমায় না। আর এই শুক্রবারটা তো ছিল বিশেষ কিছু। হাসি–আনন্দে–উৎসবে যেটির আরও রঙিন হয়ে ওঠার কথা ছিল। ১৭ মার্চ সেন্ট পিটার্স ডে। আইরিশদের সবচেয়ে বড় সন্তের জন্মদিন। সেটির জন্য অনেক দিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল ক্রাইস্টচার্চ। নানা আয়োজনে সাজছিল শহরের আইরিশ পাবগুলো। এই রাতে যেখানে ভিড় উপচে পড়ার কথা।
সেই শুক্রবার রাতেই ক্রাইস্টচার্চ যেন ভুতুড়ে এক নগরী! বার–পাব খোলা থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। রাস্তাঘাটও প্রায় জনশূন্য। এর সঙ্গে টিপটিপ বৃষ্টি মিলে অদ্ভুত একটা বিষণ্নতা নামিয়ে এনেছে চারপাশে। এই শহর যেন আর আগের সেই শহর নেই। আসলেই নেই। আর কোনো দিন আগের মতো হবেও না। ভয়াল এক শুক্রবার চিরদিনের মতো বদলে দিয়েছে ক্রাইস্টচার্চকে। আসলে তো পুরো নিউজিল্যান্ডকেই।
হিংসাকবলিত পৃথিবীতে এই একটা দেশই হয়তো বাকি ছিল, যেখানে এত দিন সেই অর্থে সন্ত্রাসের কালো ছায়া পড়েনি। শান্তির এক দেশ। যে দেশে নিশ্চিন্তে রাতবিরাতে যেখানে–সেখানে ঘুরে বেড়ানো যায়। বিমানবন্দরে চেকইন করার পরও যতবার ইচ্ছা বাইরে বেরিয়ে আবার ভেতরে ঢোকা যায়। যেখানে গুলি নেই, বোমা নেই। হায়, এর সবই এখন অতীতকাল দিয়ে লিখতে হবে। ‘যায়’–এর বদলে ‘যেত’, ‘নেই’–এর জায়গায় ‘ছিল না’।
সন্ত্রাসের ছোঁয়া থেকে দেশটাকে বাঁচিয়ে এমনই রাখতে অস্ট্রেলিয়ার প্রচণ্ড চাপ উপেক্ষা করেও কখনো কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি নিউজিল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার পরিণতি দেখে আরও বেশি করে খুঁজে পেয়েছে সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা। আর এক অস্ট্রেলিয়ানই কিনা রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে বদলে দিল এই দেশটাকে!
রাগ–ক্ষোভের হয়তো সময়মতো উদ্‌গিরণ ঘটবে, কিন্তু ভয়াল এই শুক্রবারে যতজন নিউজিল্যান্ডারের সঙ্গে কথা হলো, সবার একটাই অনুভূতি—অবিশ্বাস্য! আমাদের দেশে এমন কিছু কীভাবে হয়! নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বর্ষীয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক, রেডিও স্পোর্টের ব্রায়ান ওয়াডল বারবার মাথা নাড়ছেন আর বলছেন, ‘এটাও কি সম্ভব! আমাদের দেশে এমন কিছু আগে কখনো হয়নি।’
কাল দুপুরে ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভাল মাঠে যত মানুষ ছিল, সবাই একটা রুমে একরকম বন্দী। যেটির পোশাকি নাম ‘লক্ড ডাউন’। পুরো ক্রাইস্টচার্চই কাল বেলা দুইটার পর থেকে খণ্ড খণ্ড ‘লকড্ ডাউন’–এর সমষ্টি। যে যেখানে ছিল, সেখানেই থাকতে হবে। শহর নিরাপদ মনে হলেই কেবল অনুমতি মিলবে বাইরে বেরোনোর। হ্যাগলি ওভালে ‘হ্যাডলি প্যাভিলিয়ন’ নামে বিশাল হলরুমটাতে বাংলাদেশের সাতজন সাংবাদিক ছাড়া বাকি সবাই নিউজিল্যান্ডের। কেউ মোবাইলে সর্বশেষ অবস্থার খোঁজখবর নিচ্ছেন। কারও চোখ টেলিভিশনে। দেখছেন আর তাঁদের চোখেমুখে ফুটে উঠছে অবিশ্বাস আর চিরদিনের জন্য চেনা ক্রাইস্টচার্চকে হারিয়ে ফেলার বেদনা। স্কাই স্পোর্টসের ফ্লোর ম্যানেজার তারিনা স্টিফেনস, দেখে মনে হলো বয়স ত্রিশের একটু এদিক–ওদিকই হবে। একটু পরপর এসে হাতের মোবাইলে এটা–ওটা দেখাচ্ছিলেন। মসজিদে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালানো অস্ট্রেলিয়ান সন্ত্রাসীর ভিডিওটাও তাঁর সৌজন্যেই প্রথম দেখা। দেখাতে দেখাতে বললেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। আমাদের দেশে এমন কিছু হতে পারে না।’
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়েছিলাম বলে বারবার জানতে চাইলেন, কী দেখেছি সেখানে। দেখেছি রক্তাক্ত মৃতদেহ, সারা শরীরে রক্ত নিয়ে হেঁটে আসতে থাকা তরুণ, সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলা একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স, সাবমেশিনগান হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ...। থামিয়ে দিয়ে তারিনা স্টিফেনস বললেন, ‘আমিও টিভিতে দেখলাম, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো সাবমেশিনগান হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা তো এটা ব্যবহার করতে পারবে কি না আমার সন্দেহ হয়। কখনো ব্যবহার করেছে নাকি! আমাদের দেশে পুলিশের কাছে তো এমনিতে কোনো অস্ত্রই থাকে না। থাকে শুধু ছোট্ট একটা লাঠি।’
‘লকড্ ডাউন’ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের টিম হোটেল নভোটেলে পৌঁছে দিচ্ছিলেন কেটলিন গডফ্রে নামের এক তরুণী। একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করেন। যে কোম্পানির ওপর দায়িত্ব ছিল হ্যাগলি ওভাল সাজানোর। গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎই আবেগপ্রবণ হয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘এই শহরেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এখানে আমি কখনো একমুহূর্তের জন্যও অনিরাপদ বোধ করিনি। আর এখানেই কিনা...’। কথাটা শেষ করার আগেই তাঁর দুই চোখে জলের ধারা।
‘এখানে’ মানে শুধু ক্রাইস্টচার্চে নয়, পুরো নিউজিল্যান্ডেই তো এত দিন কেউ কখনো অনিরাপদ বোধ করেনি। নামাজ পড়তে যাওয়া বাংলাদেশ দলের বাসের সামনে–পেছনে পুলিশের গাড়ি দূরে থাক, বাসে যে একজন নিরাপত্তা কর্মীও ছিল না—এটি বাংলাদেশের বিবেচনায় অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু নিউজিল্যান্ডে এটাই তো স্বাভাবিক। যেখানে টিম হোটেলেও বাড়তি কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়নি কখনো। ক্রিকেটাররা রাতের বেলায়ও যেখানে ইচ্ছা যেতে পেরেছেন। কখনো দু–তিনজন মিলে। কখনোবা একাই। বাকি বিশ্বের সঙ্গে ব্যতিক্রম হয়ে এ দেশের আকাশ–বাতাস ছড়িয়ে দিত শান্তির বারতা। সেই বাতাসে এখন লাশের গন্ধ।
পরপর দুই বছরে দুটি বড় ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলে আবার আগের রূপে ফেরার লড়াই–ই শেষ হয়নি ক্রাইস্টচার্চের। ভাঙা ক্যাথেড্রাল, পরিত্যক্ত ভবন এখনো মনে করিয়ে দেয় সেই দুঃস্বপ্ন। সেসব হয়তো আবারও আগের রূপে ফিরে আসবে কোনো একদিন। কিন্তু ভয়াল এই শুক্রবারের পর ক্রাইস্টচার্চ আর কখনো আগের মতো হবে না। নিউজিল্যান্ডও না।

Monday, June 22, 2015

বাংলাওয়াশের হাতছানি by উৎপল শুভ্র

দুই ম্যাচে বাংলাদেশের বোলিংয়ের ভার নিয়েছেন তরুণ কাঁধে।
ভারতের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর সেই মুস্তাফিজুরকেই কাঁধে
তুলে নিলেন সতীর্থরা। কাল মিরপুরে l ছবি: শামসুল হক
শেষ পর্যন্ত কোন ছবিটা মনে আছে আপনার?
এই ম্যাচ তো টুকরো টুকরো অনেক হিরণ্ময় ছবির কোলাজ—ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই কাচের আড়ালে মাশরাফি বিন মুর্তজার মুষ্টিবদ্ধ উল্লাস।
ম্যাচ শেষে ধীর পায়ে মাঠে ঢুকে মুস্তাফিজুরের একটা স্টাম্প তুলে নেওয়া।
ধোনিদের সঙ্গে হাত মেলানোর পর মাঠে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কাঁধে কাঁধ রেখে রচিত ওই বিজয়ী মানববৃত্ত।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে প্রতীকী বোধ হয় ওই দৃশ্যটাই—তাসকিন ও লিটনের কাঁধে মুস্তাফিজুর রহমান।
এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেখানে স্কোরকার্ড বলছে দুই দলেরই রান সমান। অথচ এক দল ৬ উইকেটে জয়ী!
এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেটিতে ‘বাচ্চা’ বাংলাদেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় ‘বড়’ ভারতকে!
এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেটি সোচ্চারে ক্রিকেট বিশ্বকে জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের জয় এখন আর বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হওয়ার মতো কিছু নয়।
এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেটির মাহাত্ম্য শুধুই একটি জয়ের সীমানা ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর পরিব্যাপ্ত।
ভারতের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয়। সেটিও এক ম্যাচ বাকি থাকতেই। খেলা শেষ হতেই তাই আকাশে-বাতাসে উড়ে বেড়াতে শুরু করল শব্দটা। ক্রিকেট অভিধানে বাংলাদেশের কল্যাণেই যেটির অন্তর্ভুক্তি—‘বাংলাওয়াশ’!
আবারও সেটি হবে কি হবে না, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে মাত্র দুই দিনেরই অপেক্ষা। তবে একটা অপেক্ষার অবসান হয়ে গেল কালই। এ জয়েই নিশ্চিত হয়ে গেল, ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ থাকছে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিকে শীর্ষ আট দলের টুর্নামেন্ট বানিয়ে ফেলার পেছনে আসল উদ্দেশ্য যেটিই থাকুক, এ দেশের মানুষের কাছে এর অর্থ ছিল একটা—ক্রিকেটের ‘অভিজাত’ দলগুলোর উৎসবে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে যেন অকারণ ‘ঝামেলা’ হয়ে না থাকে!
মাঝখানে বিশ্বকাপ আর এর আগে-পরে জিম্বাবুয়ে আর পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে সিরিজ ক্রিকেট বিশ্বকে জানিয়ে দিল, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলাটা বাংলাদেশের অধিকার এবং সেখানে শুধুই সংখ্যা পূরণ করতে যাওয়া নয়!
ভারতের বিপক্ষে এর আগেও তিনটি জয় ছিল। তবে দুই জয়ে সবচেয়ে কম ব্যবধান ছিল প্রায় আড়াই বছরের। এই প্রথম ভারতের বিপক্ষে পরপর দুই ম্যাচে জয় এবং সেই দুই জয়েই সবচেয়ে জ্বলজ্বলে একটা নাম। মুস্তাফিজুর রহমান!
প্রথম ম্যাচের মুস্তাফিজুর সব অর্থেই ছিলেন বিস্ময়। অমন হইহই রইরই অভিষেকের কারণে তো বটেই, অজানা-অচেনা এই তরুণ বিস্ময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের জন্যও। তা প্রথম ম্যাচের মুস্তাফিজুরকে যদি বিস্ময় বলা হয়, দ্বিতীয় ম্যাচের মুস্তাফিজুরকে তাহলে কী বলা হবে! মাঝের দুই দিন ভারতীয় দলের হোমওয়ার্ক তো মুস্তাফিজুরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তারপরও ভারতের নামীদামি ব্যাটসম্যানদের কাছে মুস্তাফিজুর সেই একই রকম দুর্বোধ্য এক ধাঁধাই হয়ে রইলেন।
আগের দিন রোহিত শর্মার আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলার ঘোষণায় লুকিয়ে ছিল হুমকি। দ্বিতীয় বলেই সেটিকে বাগাড়ম্বরে পরিণত করার কাজটাও করলেন মুস্তাফিজুরই। ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল রোহিত শর্মাকে আউট করে। আরেকটি মুস্তাফিজুর-কাব্যের প্রথম স্তবকটিতেও সেই রোহিতই।
চাপে জর্জর ভারতকে আরও কম্পমান করে তুলতে শুরুর ওই ধাক্কাটির অসীম ভূমিকা। ৫ ওভারের প্রথম স্পেলে উইকেট ওই একটিই। ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিলেন দ্বিতীয় স্পেলে। মাশরাফি আবার যখন ফেরালেন তাঁকে, ম্যাচ দাঁড়িয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। ব্যাটিং পাওয়ার প্লে শুরু হচ্ছে, স্কোর ৪ উইকেটে ১৬২ এবং উইকেটে ধোনি ও রায়না। এর কিছুক্ষণ আগেই প্রেসবক্সে ছড়িয়ে পড়েছে, কলকাতা থেকে সৌরভ গাঙ্গুলী ফোনে ভারতীয় সাংবাদিককে বলেছেন, তাঁর কাছে উইকেট বেশি সুবিধার ঠেকছে না। বাংলাদেশ খুব ভালো ব্যাটিং করলে ভিন্ন কথা, নইলে ২২০-ই এখানে জেতার মতো স্কোর।
পাওয়ার প্লেটা কাজে লাগাতে পারলে ভারতের স্কোর এর চেয়ে বেশিও হতে পারত। মুস্তাফিজ-জাদুতে ওই পাওয়ার প্লে-ই ভারতের দুঃস্বপ্নে পরিণত। ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা অবশ্য এখন দুঃস্বপ্ন বলতে মুস্তাফিজের অফ কাটারকেই বোঝেন। দ্বিতীয় স্পেলের তৃতীয় বলে আততায়ী সেই কাটারেই সুরেশ রায়নাকে তুলে নিলেন। মাঝখানে এক ওভার। তৃতীয় ওভারে পরপর দুই বলে দুই উইকেট। এর মধ্যে প্রথমটিই সম্ভবত মুস্তাফিজুরের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হয়ে থাকবে। প্রথম ম্যাচে ধোনির ধাক্কা খাওয়ার সঙ্গে ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ জরিমানাও গুনতে হয়েছে। সেই ধোনি ২৬৪ ম্যাচের অভিজ্ঞতা দিয়েও মুস্তাফিজুরের কাটার বুঝতে ব্যর্থ!
পাওয়ার প্লের পাঁচ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ভারত তাই তুলতে পারল মাত্র ১৭ রান। ম্যাচটা সেখানেই বাংলাদেশের হাতের মুঠোয় চলে এল। মুস্তাফিজুর তো অবিসংবাদিত নায়ক, তবে পার্শ্বনায়কের ভূমিকা ভুলে গেলে অন্যায় হবে। ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপের সবচেয়ে দামি উইকেট বিরাট কোহলিকে ফিরিয়েছেন, উইকেটে সেট হয়ে যাওয়া শিখর ধাওয়ানকেও। ক্যারিয়ারে মাত্র দ্বিতীয়বার পুরো ১০ ওভার বোলিং করলেন। প্রথমবার ৩৩ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। সমান রান দিয়ে কাল নাসির হোসেনের মহামূল্যবান ২ উইকেট।
নায়কের গল্প এখনো শেষ হয়নি। ওয়ানডেতে প্রথম দুই ম্যাচেই ৫ উইকেট নেওয়ার ঘটনা ছিল একটিই। বাংলাদেশের তা খুব মনে আছে। ২০১১ সালে জিম্বাবুয়ের ব্রায়ান ভিটরির ওই কীর্তি বাংলাদেশের বিপক্ষেই। ঘটনাচক্রে এই ভিটরিও বাঁহাতি পেসার। বৃষ্টি যখন খেলা থামিয়ে দিল, মুস্তাফিজুরের তখনো একটি বল বাকি। আবার খেলা শুরু হওয়ার পর ওই এক বলেই ছাড়িয়ে গেলেন ভিটরিকে। পাঁচের পর ছয়—প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১১ উইকেট নেওয়ার কীর্তি ওয়ানডে এর আগে কখনো দেখেনি।
৪৭ ওভারের ম্যাচ বানিয়ে দেওয়া বৃষ্টির কারণে ডাকওয়ার্থ-লুইসের আবির্ভাব হলো। মুস্তাফিজুরের কাটারের মতোই দুর্বোধ্য যে সমীকরণ জানাল, ভারত যত রান করেছে, তা করতে পারলেই জিতবে বাংলাদেশ! স্ট্রোকের গরিমায় ‘গরিবের হেইডেন-গিলক্রিস্ট’ হয়ে ওঠা তামিম ও সৌম্যর ঝোড়ো সূচনায় সেটিকে কোনো রানই মনে হচ্ছিল না। কিন্তু ক্রিকেট ম্যাচ তো আর সরলরেখায় চলে না। ৯৮ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর একটু হলেও সংশয় তাই উড়ে বেড়াচ্ছিল বৃষ্টিভেজা বাতাসে। স্লিপে রায়না মুশফিকের ক্যাচটি নিতে পারলে সেটি আরও জোরালো হতো।
রানআউটের খাঁড়ায় মুশফিক যখন কাটা পড়লেন, তখন আর সেটি কপালে ভাঁজ ফেলার মতো কিছু নয়। নৈরাশ্যবাদী কারও মনে তারপরও যদি কোনো সংশয় থেকে থাকে, সেটিকে ঝেঁটিয়ে দূর করলেন সাকিব আল হাসান ও সাব্বির রহমান। দুর্দান্ত এক জুটিতে নয় ওভার আগেই খেলা শেষ!
‘কোন ছবিটা মনে রাখবেন’ দিয়ে শুরু হয়েছিল লেখাটা। আরেকটা ফ্রেমও বোধ হয় তাতে থাকা উচিত। ধবল কুলকার্নির বলে টালমাটাল সাব্বির উইকেটের ওপর পড়ে যেতে যেতে কোনোমতে হিট উইকেট হওয়া থেকে বাঁচলেন। পরের বলটা শর্ট আসবে অনুমান করে অদ্ভুত এক স্টান্সে দাঁড়িয়ে পুল করার ঘোষণাটা যেন জানিয়েই দিলেন বোলারকে। শর্ট বলই হলো, পুলও। বল পত্রপাঠ সীমানার বাইরে।
ম্যাচের প্রতীকী ছবি হিসেবে এটাকেও রাখতে পারেন। আগেই ঘোষণা দিয়ে সাব্বিরের ওই পুলটিতেই যে বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া—এ এক নতুন বাংলাদেশ!
দ্বিতীয় ম্যাচে ৬ উইকেটে জয়
ভারত ২০০/১০ ওভার ৪৫
বাংলাদেশ ২০০/৪ ওভার ৩৮

Friday, June 19, 2015

বাংলাদেশ এখন সত্যিই বাঘ by উৎপল শুভ্র

আউট হয়ে গেলেন জাদেজা, তাসকিনের পর বাংলাদেশের হয়ে
ওয়ানডে অভিষেকেই পাঁচ উইকেট নেওয়ার দ্বিতীয় কীর্তি গড়া
হয়ে গেল মুস্তাফিজুরের। বাংলাদেশের তরুণ পেসার
তাই সতীর্থদের উদ্‌যাপনের মধ্যমণি l শামসুল হক
শূন্যে লাফিয়ে বুকে বুক লাগিয়ে উদ্যাপন! মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তাসকিন আহমেদের সৌজন্যে যেটি বিখ্যাত হয়ে গেছে ক্রিকেট বিশ্বেই। বাংলাদেশের মানুষের মনে যা বিশ্বকাপের অমর ছবিও। মাশরাফি-তাসকিন মনে হচ্ছে পুনরাবৃত্তিতে বিশ্বাসী নন। কাল মিরপুরে ভারত-বধ কাব্য লেখার পর দুজন তাই ভিন্ন কিছু করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কোমর দুলিয়ে নাচ!
গ্যালারিও তখন নাচছে। পুরো বাংলাদেশও কি নয়! যেনতেন জয় হলেও বাতাসে উড়ে বেড়াত আনন্দের রেণু। আর এখানে বাংলাদেশ কি না জিতল ৭৯ রানের বিশাল ব্যবধানে! এমনই দাপুটে জয় যে, আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির অনেক আগেই আসলে ম্যাচের ফল জানা হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ‘টাইগার’ নাম নিয়ে একটা সময় বিস্তর টীকাটিপ্পনী শুনতে হতো। নামে বাঘ, আসলে বিড়াল—এমন অপমানজনক কথাও। অবশেষে কি সেসব ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এল! নামে বাঘ, মাঠের বাংলাদেশও তো এখন বাঘের মতোই ক্ষিপ্রতা আর শক্তির প্রতিচ্ছবি।
মেলবোর্ন ফিরে ফিরে আসছিল। বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে দগদগে এক ক্ষত হয়ে আছে ওই ম্যাচ। এরপর দুই দলের এটাই প্রথম দেখা। প্রথম সুযোগেই সেই ক্ষতে প্রলেপ বোলানোর কাজটা করে ফেললেন মাশরাফিরা। যেটির মাহাত্ম্য শুধুই একটি জয়ে আটকে নেই। সিরিজে এখন যা-ই হোক না কেন, ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে সাত নম্বরে উঠে গেছে বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি অলীক কল্পনা থেকে এখন ঘোরতর বাস্তবের সীমানায়।
এমন দাপুটে জয়টাকে যদি চমক বলেন, সবচেয়ে বড় চমকটা ম্যাচ শুরুর আগেই। এত দিন দেশের মাটিতে বাংলাদেশের ওয়ানডে সাফল্যের রেসিপি ছিল একটাই—স্পিনের ঘূর্ণিজালে প্রতিপক্ষকে জড়িয়ে ফেলা। সেখান থেকে সরে এসে বাংলাদেশ দলে কিনা চার পেসার!
নতুন কিছু করলে তা নিয়ে সংশয়মিশ্রিত প্রশ্ন থাকবেই। সেটি আরও বড় হয়ে উঠল বাংলাদেশের ইনিংস শেষে। ভারতের তিন পেসারের কাউকে দিয়েই ১০ ওভার করাননি ধোনি। তিনজন মিলে মোট ১৯.৪ ওভার। অনিয়মিত স্পিনার সুরেশ রায়না যেখানে টানা ১০ ওভারে ৪০ রান দিয়ে সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলার। বাংলাদেশ কি তাহলে ভুলই করল? মাশরাফি-রুবেল-তাসকিন ঠিক আছে, আনকোরা মুস্তাফিজুরকেও নামিয়ে দেওয়াটা কি দুঃসাহসী জুয়া খেলাই হয়ে গেল না?
এই প্রশ্নের উত্তর কী দুর্দান্তভাবেই না দিলেন লিকলিকে এই তরুণ! বাংলাদেশের ক্রিকেটে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব বললে মাশরাফি বিন মুর্তজার কথাই মনে পড়ে। মুস্তাফিজুরের গল্পও তো এর চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। বছর দুয়েক আগে সাতক্ষীরা থেকে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে পেস বোলিং ট্রায়াল দিতে এসে প্রথম দৃশ্যপটে। সেখান থেকে দ্রুতই অনূর্ধ্ব-১৯ ও ‘এ’ দলে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি অভিষেক। তখন কজনই বা তাঁকে চিনত! চিনিয়ে দিলেন প্রথম ম্যাচেই। ২০ রানে ২ উইকেট, টি-টোয়েন্টিতে প্রথম উইকেট শহীদ আফ্রিদি। ওয়ানডেতে প্রথম উইকেটটিও কম বড় নাম নয়। ওয়ানডেতে দুটি ডাবল সেঞ্চুরির একমাত্র মালিক ও বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে পোড়ানো রোহিত শর্মা।
বাঁহাতি পেসারদের সহজাত কোনাকুনি বলটা এমন দারুণ জায়গায় ফেলেন যে, ডানহাতি ব্যাটসম্যানরা তাতে হাবুডুবু খেতে বাধ্য। এর সঙ্গে আততায়ী এক কাটার, কালকের ম্যাচের পর যে কাটার এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথার অংশ। ৫টি উইকেটই কাটারে। এর মধ্যে পরপর দুই বলে রায়না ও অশ্বিনকে আউট করে সম্ভাবনা জাগালেন হ্যাটট্রিকেরও। এক বছর এক দিন আগে এই মিরপুরে এই ভারতের বিপক্ষেই অভিষেকে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তাসকিন আহমেদ। তাসকিনের সেই আনন্দ পূর্ণতা পায়নি দল হেরে গিয়েছিল বলে। কাল মুস্তাফিজুরের সেই দুঃখও থাকল না। অভিষেকে ৫ উইকেট, দলের জয় এবং তাঁর হাতে ম্যান অব দ্য ম্যাচের ট্রফি। স্বপ্নের দিন বোধ হয় এমনই হয়!
বাংলাদেশ দলকে যদি বাঘের সঙ্গে মেলান, মুস্তাফিজুরকে তো মেলানো যায় আরও বেশি। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন তো তাঁর বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। মুস্তাফিজুরকে নামিয়ে দিয়ে তাঁর হাতে নতুন বল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা মাশরাফির বলেই ধরে নেওয়া যায়। সে জন্য তাঁর করতালি প্রাপ্য। ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশের প্রথম ওভারটি করেছেন। সিদ্ধান্তটা তাই সহজ ছিল না।
মেলবোর্নের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে মিরপুরকে। হবেই। দশ বছর আগে-পরের ১৮ জুনে দারুণ আরেকটি মিলও কিন্তু আছে। ২০০৫ সালের এই দিনেই কার্ডিফে লেখা হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর এক কাব্য। সে সময়ের অজেয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যে জয় ওয়ানডে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর মধ্যে থাকে। পার্থক্য বলতে কালকের জয়কে অঘটন বলার উপায় নেই। নামে বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়টাকে বাংলাদেশ এমনই নিয়মিত বানিয়ে ফেলেছে যে, এখন ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ কখনো কখনো অঘটনের শিকার হয়, নিজেদের জয় আর অঘটন বলে বিবেচিত হয় না।
ম্যাচের আগের দিন দুই অধিনায়কই মেলবোর্নকে ভুলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। মনে মনে বোধ হয় ঠিকই ছিল ওই স্মৃতি। নইলে মাঠে এমন বারুদ ছুটবে কেন! আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশ ঝাঁজালো হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে ধোনি বলেছিলেন, সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, মাঠে কখনো অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। ধোনিই কিনা সেই ‘অপ্রীতিকর কিছু’ ঘটালেন! বোলিং করে মুস্তাফিজুর রহমান এর আগেও একবার ব্যাটসম্যানের দৌড়ের পথে চলে গিয়েছিলেন। আবারও তা করায় ধোনি কনুই দিয়ে এমনই প্রবল এক ধাক্কা দিলেন যে, শরীরে-স্বাস্থ্যে–শক্তিতে ধোনির অর্ধেক মুস্তাফিজুরকে ওভার অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে যেতে হলো মাঠ ছেড়ে।
ফিরে এসে তিন উইকেট নিয়ে জবাবটা ভালোমতোই দিয়েছেন। আবির্ভাবেই এমন উজ্জ্বল যে, দুটি করে উইকেট নিয়ে তাসকিন ও সাকিব সংগতকারীর বেশি কিছু নন।
বাংলাদেশের ইনিংসে অবশ্য নির্দিষ্ট কাউকে এমন নায়কের আসনে বসানো যাচ্ছে না। অনেকগুলো নাম সেখানে প্রায় সমান জ্বলজ্বলে—তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, সাকিব আল হাসান...। ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো তিন শ পেরোনোয় অবদান আছে সাব্বির, নাসির ও মাশরাফিরও। তামিম ও সৌম্যর উদ্বোধনী জুটিটিই বেঁধে দিয়েছিল ম্যাচের সুর। তামিমের ব্যাটে রুদ্ররূপের সঙ্গে ক্রিকেট বিশ্বের ভালোই পরিচয় আছে। সৌম্যও নিজেকে ভালোভাবেই চেনাচ্ছেন। নামের সঙ্গে ব্যাটিংয়ের কোনো মিল নেই। ‘সৌম্য’র বদলে নামটা ‘রুদ্র’ হলেই বরং ভালো মানাত!
দুজন পাল্লা দিয়ে শট খেলে মাত্র ৭৯ বলে স্কোরবোর্ডে এক শ তুলে দিলেন। বড় আট দলের বিপক্ষে যা বাংলাদেশের দ্রুততম এক শ। বৃষ্টির কারণে এক ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশের ইনিংস যখন আবার শুরু হলো, নিজের চার ওভারে তিন উইকেট তুলে নিয়ে ইনিংসটাকে বেপথু করে দিয়েছিলেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন। সাকিব ও সাব্বিরের ৮৩ রানের জুটিতে যেটি আবার কক্ষপথে ফিরল।
৩০৭ রান করার পরও শঙ্কা ছিল। ওয়ানডেতে এটা এখন আর মোটেই অনতিক্রম্য কোনো স্কোর নয়। তার ওপর ভারতের ওই প্রমত্ত ব্যাটিং লাইনআপ। কে জানত, সেটিকেই এমন তাসের ঘর বানিয়ে দেবেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ।
মুস্তাফিজুর রহমান!

Monday, March 30, 2015

বিশ্বকাপের রং হলুদ! by উৎপল শুভ্র

মাইকেল ক্লার্কের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি, অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বজয়ের উচ্ছ্বাস। এমসিজিতে
৯৩ হাজার দর্শকের সামনে পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করেছে অস্ট্রেলিয়া
বিশ্বকাপ ট্রফির সোনালি রংটা বদলে এখন সেটিকে হলুদ করে দিলেই হয়!
বিশ্বকাপকে তো হলুদই বানিয়ে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়া! কাল এমসিজিতে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে কোনো ক্রিকেট ম্যাচে সবচেয়ে বেশি দর্শকের সামনে পঞ্চমবারের মতো ট্রফিটা হাতে নিলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক।
১১টি বিশ্বকাপের ৫টিই তাদের, অন্য কোনো দলের যেখানে দুবারের বেশি বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের আসল প্রমাণ এখানে নয়। এই ৫টি বিশ্বকাপ এসেছে ক্রিকেট খেলা হয় এমন পাঁচ মহাদেশ থেকেই। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের রং তো আসলেই হলুদ! অস্ট্রেলিয়ার ফাইনাল যেমন হয়, এটাও তেমনই হলো। সেই ১৯৮৭ সালে বিশ্বকাপে শিরোপা পঞ্চকের প্রথমটি জয়ের সময়ই শুধু ফাইনালের শেষ অঙ্কেও কী হয় কী হয় অনিশ্চয়তা ছিল। পরের চারটি বিশ্বকাপ ফাইনালে একই গল্প। প্রথম ইনিংসেই ম্যাচ শেষ করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ২০০৩ ও ২০০৭ বিশ্বকাপে তা করেছিলেন ব্যাটসম্যানরা। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কাল অস্ট্রেলিয়ান বোলাররা দেখা দিলেন অপ্রতিরোধ্য বিধ্বংসী রূপে।
ম্যাচের ৭৯তম ওভারের প্রথম বলে স্টিভ স্মিথের বাউন্ডারিতে ম্যাচটা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো, তবে আসলে তা শেষ হয়ে গেছে আরও অনেক আগেই। অনেকে বলবেন, প্রথম ওভারেই। ফাইনালের সবচেয়ে রোমাঞ্চক লড়াইয়ের নাম ছিল ‘ব্রেন্ডন ম্যাককালাম বনাম মিচেল স্টার্ক।’ ম্যাককালাম নেমেছিলেন ১৯১.৮১ স্ট্রাইক রেট নিয়ে, স্টার্কের প্রতি ১৬.৭ বলে উইকেট। সেই লড়াই শুরু হওয়ার আগেই যেন শেষ! স্টার্কের প্রথম দুটি বলেই চালিয়েও বেঁচে গেলেন ম্যাককালাম। তৃতীয় বলটিতে আলো জ্বলে উঠল স্টাম্পে।
নিউজিল্যান্ডের স্বপ্নযাত্রায় শুরুতে ম্যাককালাম-ঝড়ের সবচেয়ে বড় অবদান। সেই ম্যাককালামের শূন্য রানে বিদায়েই লেখা হয়ে গেল একতরফা এক ফাইনালের পাণ্ডুলিপি। স্কোরবোর্ডে ৩৯ রান তুলতেই মার্টিন গাপটিল ও কেন উইলিয়ামসনেরও ড্রেসিংরুমে ফেরা সারা। ম্যাচ শুরুর আগের ‘ফাইনালটা কে জিতবে’ আলোচনা তখন ‘ফাইনালটা কখন শেষ হবে’ আলোচনায় রূপান্তরিত।
তবে ভাঙাচোরা ইনিংস পুনর্নির্মাণের কঠিন কাজটা তো করেই ফেলেছিলেন রস টেলর ও গ্রান্ট এলিয়ট। ৩৬তম ওভারে যখন ব্যাটিং পাওয়ার প্লে শুরু হলো, চতুর্থ উইকেট জুটিতে ১১১ রান উঠে গেছে। ২৬০-৭০ তখন একটুও অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। বলে ব্যাট ঠিকমতো লাগাতে পারলে এর চেয়ে বেশিও হয়ে যেতে পারে! ম্যাককালামের আউটেই ম্যাচের মীমাংসা হয়ে গেছে বলে যদি কেউ না-ও মানেন; পরের আট বলেই যে তা হয়ে গেল, এ নিয়ে বোধ হয় কোনো তর্ক নেই।
পাওয়ার প্লের প্রথম বলেই ডান দিকে ঝাঁপিয়ে অবিশ্বাস্য এক ক্যাচে টেলরকে ফেরালেন হাডিন। মাঝখানে এক বল। পরের বলেই কোরি অ্যান্ডারসনকে বোল্ড করে দিয়ে জেমস ফকনার বুঝিয়ে দিলেন, চোট পাওয়ার পরও কেন তাঁকে বয়ে বেড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া! স্টার্ক ফিরে এসেছেন আক্রমণে, তিনি কি আর বসে থাকবেন! লুক রনকিকে স্লিপে ক্লার্কের ক্যাচ বানালেন। পাওয়ার প্লেতে যেখানে বোলিং আক্রমণের ছত্রখান হয়ে যাওয়ার কথা, উল্টো ধ্বংসস্তূপে পরিণত নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং। গ্রান্ট এলিয়ট শুরু থেকেই দারুণ খেলছিলেন। কিন্তু ব্যাটিংয়ের লেজ শুরু হয়ে যাওয়ায় তাঁকে বাড়তি ঝুঁকি নিতেই হলো। ফকনারের স্লোয়ার বল মৃত্যু লিখে দিল তাঁরও। নিউজিল্যান্ড ১৮৩ রানে অলআউট!
বিশ্বকাপ ফাইনালে কোনো দল প্রথমে ব্যাটিং করে ১৮৩ করলে অবধারিতভাবেই মনে পড়বে ১৯৮৩ বিশ্বকাপের লর্ডস ফাইনাল। আগের দুবারের চ্যাম্পিয়ন প্রমত্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভারত ১৮৩ রান করার পর তো ওই ফাইনালও শেষ বলেই ধরে নিয়েছিলেন সবাই। অথচ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৪০ রানে অলআউট করে দিয়ে লেখা হয়েছিল ভারতীয় রূপকথা!
ব্রেন্ডন ম্যাককালাম কি ওই ফাইনালের গল্পটা জানতেন? ফিল্ডিংয়ে নামার আগে সতীর্থদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন সে কথা? কে জানে! তবে এটা খুব সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে, ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’ বলে যে মন্ত্রটা এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের স্বপ্নযাত্রার মূলে, সেটি নিশ্চয়ই বলেছেন। হয়তো বলেছেন অকল্যান্ডে দুই দলের ম্যাচটির কথাও। যেটিতে এর চেয়ে কম রান করেও প্রায় জিতে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া! কিন্তু অকল্যান্ড তো আর প্রতিদিন হওয়ার নয়।
এই বিশ্বকাপে ম্যাককালামের অধিনায়কত্ব শুধুই আক্রমণের তারে বাঁধা। কাল তো আক্রমণ না করে কোনো উপায়ই ছিল না। দ্বিতীয় ওভারে ট্রেন্ট বোল্টের বোলিংয়ে চার স্লিপ দাঁড় করিয়ে দিলেন। চতুর্থ বলেই অ্যারন ফিঞ্চকে ফিরিয়ে দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া স্টার্ককে আবার ধরেও ফেললেন বোল্ট। বিশ্বকাপে দুজনেরই ২২টি করে উইকেট। এর পর আরও ৯.২ ওভার বোলিং করার পরও বজায় থাকল এই সমতাই। সেটিই আসলে অনিশ্চয়তার শেষ সম্ভাবনাটুকুও মুছে দিল ম্যাচের গা থেকে।
৪৬ বলে ৪৫ করে ডেভিড ওয়ার্নারের আউটটি ম্যাচের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে কোনো আঁচড়ই ফেলতে পারেনি। যা পেরেছে তা হলো, মাইকেল ক্লার্কের বিদায়টা রঙিন করে তুলতে। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিন হঠাৎই ওয়ানডে ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। ক্লার্ক নামার সময় তাই দাঁড়িয়ে গেল এমসিজির ৯৩০১৩ জন দর্শক। আবার যখন উঠে দাঁড়ালেন তাঁরা, অস্ট্রেলিয়ার পুরো দলও বাউন্ডারি লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে। মাইকেল ক্লার্ক যে আউট হয়ে ফিরছেন!
ম্যাচ নিয়ে কোনো আগ্রহই তখন অবশিষ্ট নেই। জয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার দূরত্ব মাত্র ৯ রানের। জয়সূচক রানটা ক্লার্কের ব্যাট থেকে এলে সত্যিকার অর্থেই সেটি রূপকথা হয়ে যেত। সেটি একটু বেশি অবাস্তব হয়ে যায় বলেই কি না, ম্যাট হেনরির বল ব্যাটের কানায় লাগিয়ে বোল্ড হয়ে গেলেন ক্লার্ক। এর আগে ৭২ বলে ৭৪ রানের ঝলমলে ইনিংস। যখন নেমেছেন, স্মিথ তখন ১৪ রানে। যখন ফিরছেন, স্মিথ অনেক পেছনে (৪৭)। ভেট্টোরিকে সোজা উড়িয়ে মারা ছক্কাটির পাশে ১০টি চার, যার চারটি সাউদির পরপর চার বলে।
জয়সূচক রানটা যে স্মিথের ব্যাট থেকেই এল, এরও একটা প্রতীকী অর্থ চাইলেই খুঁজে নেওয়া যায়।
হলদে রঙের অস্ট্রেলিয়ায় মাইকেল ক্লার্ক এখন অতীত আর স্টিভ স্মিথ ভবিষ্যৎ!
নিউজিল্যান্ড: ৪৫ ওভারে ১৮৩
অস্ট্রেলিয়া: ৩৩.১ ওভারে ১৮৬/৩
ফল: অস্ট্রেলিয়া ৭ উইকেটে জয়ী

Friday, March 20, 2015

দুই অধিনায়কের দুরকম রাত by উৎপল শুভ্র

স্বপ্নযাত্রা থেমে গেল​ শেষ আটে, আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে হেরে গেল
বাংলাদেশ। মাশরাফি, তামিম, মাহমুদউল্লাহদের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে সব
একজন ওয়ানডেতে জয়ের ‘সেঞ্চুরি’ করে ফেললেন। আরেকজনের জুটল এই বিশ্বকাপে দলের সবচেয়ে বড় পরাজয়। সেই ক্ষতে নুন ছিটাতে আবার এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা।
প্রথমজন মহেন্দ্র সিং ধোনি। দ্বিতীয়জন মাশরাফি বিন মুর্তজা। দুই অধিনায়কের জন্য কী বিপরীত চিত্রনাট্যই না লিখে রেখেছিল এমসিজির এই রাত!
তবে ম্যাচ-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে একটা জায়গায় মিলে গেলেন দুজন। একটি মাত্র উইকেটই বদলে দিতে পারত এই ম্যাচের রং—একটু আগে মাশরাফির বলে যাওয়া কথাটারই যেন প্রতিধ্বনি করলেন ধোনিও। ২৮ ওভার শেষে ৩ উইকেটে ১১৫ রানে যখন ধুঁকছে ভারত, দ্রুত আরেকটি উইকেট তুলে নিলে এই বিশ্বকাপে ভারতের সাতে সাত হতো কি না সন্দেহ।
উল্টো রোহিত শর্মা ও সুরেশ রায়নার ১২২ রানের জুটি। আলিম দারের ইশারায় ইয়ান গোল্ড ওই বিতর্কিত নো বল না ডাকলে ৪১ রান কম হয় ওই জুটিতে। ধোনির আশঙ্কা তখন সত্যি হয়েও যেতে পারত। ভারতীয় অধিনায়ক যে তখন ২৬০ রানকেই অনেক ভাবতে শুরু করেছিলেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে স্লো ওভাররেটের শাস্তি শুধু জরিমানাতেই শেষ হলেও তা মাশরাফির মাথার ওপর একটি খড়্গ ঝুলিয়ে রেখেছিল। আরেকটি ম্যাচে এমন হলেই নিষেধাজ্ঞা। পাছে কোয়ার্টার ফাইনাল মিস করে ফেলেন, এ কারণেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি। কাল সেই ‘অপরাধের’ পুনরাবৃত্তি হওয়ায় জরিমানার সঙ্গে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধও হলেন। নির্ধারিত সময়ে ২ ওভার কম করার পেছনে কোনো ‘অজুহাত’ দেখানোরও সুযোগ ছিল না বলে মাশরাফি বিনাবাক্যে তা মেনে নিয়েছেন। ম্যাচ রেফারি রোশান মহানামাকে তাই আর শুনানির ঝামেলায় যেতে হয়নি।
বোলিংয়ে ১০ ওভারে ৬৯ রান, প্রশ্নবিদ্ধ অধিনায়কত্ব, দলের বড় পরাজয় এবং শেষে এই শাস্তি—সব মিলিয়ে মাশরাফির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি দুঃস্বপ্নের রূপ পেল। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের তিনটি জয়ের দুটিতেই ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে তাঁর হাতে। এই ম্যাচটা মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখিয়ে দিল মাশরাফিকে।
ভারতের বিপক্ষে খেলা হলে অদৃশ্য আরও অনেক প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তে হয়—এমন একটা ভয় বাংলাদেশ দলে আগে থেকেই ছিল। বিতর্কিত আম্পায়ারিং সেটিকে সত্যি বলে দাবি করার সুযোগও করে দিচ্ছে। তবে তাতে এই সত্যিটাকে আড়াল করা যাচ্ছে না যে, এই ম্যাচের প্রথম ৩০ ওভারের পর থেকে বাংলাদেশ খুব বাজে ক্রিকেট খেলেছে।
মাঠে একটু পর পরই মেজাজ হারাতে দেখা গেছে মাশরাফিকে। মিস ফিল্ডিংয়ে চার হয়েছে। ত্রিশগজি বৃত্তের মধ্যে নির্দিষ্টসংখ্যক ফিল্ডার না থাকার শিশুতোষ ভুলের কারণে নো বল। শর্ট বলে সুরেশ রায়নার দুর্বলতার কথা পুরো বিশ্বের জানা থাকার পরও মাশরাফির রুবেলকে আক্রমণে না আনাটাও একই রকম বিস্ময়ের। রায়না প্রথম বাউন্সার পেলেন কিনা ৪২ বল খেলে ফেলার পর!
ভারতকে তিন শ পার করে দেওয়ায় বিতর্কিত আম্পায়ারিং হয়তো ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু সেটিকেই পরাজয়ের কারণ দাবি করতে বাংলাদেশকে আরেকটু ভালো ব্যাটিং করতে হতো। ২৬০-৭০ করতে পারলেও চিৎকার করে বলা যেত, দেখো, শুধু আম্পায়ারের ভুলেই আজ আমরা হেরে গেলাম! যেখানে দুই শ-ও করতে না পারায় আম্পায়ারিং নিয়ে যৌক্তিক অভিযোগটাকেও অনেকে অজুহাত বলার সুযোগ পাচ্ছে।
এই ম্যাচের আগে ব্যাটিংয়ের ওপর তাঁর অগাধ আস্থার কথা জানিয়েছিলেন মাশরাফি। আগের ম্যাচগুলোর কারণে তা অকারণ বলেও মনে হয়নি। অথচ আসল ম্যাচেই কিনা সবচেয়ে করুণ চেহারায় দেখা দিল ব্যাটিং! তিন শ তাড়া করতে নেমে যেমন শুরু করা উচিত, তামিম তেমনই শুরু করেছিলেন। কিন্তু ২৫ বলে ২৫ রানেই তা শেষ! তখন কে জানত, এটিই বাংলাদেশের ইনিংসের সর্বোচ্চ স্কোর থেকে মাত্র ১০ রান কম হয়ে থাকবে!
ইনিংসের সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ৮ ও ৭ নম্বর ব্যাটসম্যানের, টপ অর্ডারের দুর্দশা বোঝাতে এটাই যথেষ্ট। সবচেয়ে বড় বিস্ময় সাকিব আল হাসান। বড় রান তাড়া করতে গেলে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়। তা নিতে গিয়ে অল্প রানে আউট হয়ে গেলেও একটা ব্যাখ্যা মিলত। কিন্তু সাকিবের মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে ২৯.৪১ (৩৪ বলে ১০) স্ট্রাইক রেটের ইনিংসের ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে হয়রান হতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যা মিলছেও না।
শেষটা ভালো হলো না বলে আক্ষেপ থাকবেই। তবে তাতে তো আর এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অর্জনগুলো মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ সর্বশেষ খেলেছে সেই ২০০৮ সালে, সেটিও বিশ্বকাপের কোনো মাঠে নয়, ডারউইনে। নিউজিল্যান্ডে সর্বশেষ সফরও প্রায় পাঁচ বছর আগে। বিরুদ্ধ কন্ডিশন আর অজানা-অচেনা সব মাঠে খেলা—দলের পারফরম্যান্স নিয়ে মাশরাফির গর্বিত বোধ করাটা তাই অবশ্যই যৌক্তিক। এই বিশ্বকাপ থেকে আগামী দিনের পাথেয় তো কিছু আসলেই জোগাড় করে নেওয়া গেছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ব্যর্থতার কথা ভুলে গিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দটাই নাহয় মনে রাখুন!

Wednesday, March 18, 2015

‘রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করব’ -মাশরাফি বিন মুর্তজা by উৎপল শুভ্র

দুদিন পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে টস করতে নামবেন। সেই রোমাঞ্চ ছাপিয়ে কাল সারা দিন মাশরাফি বিন মুর্তজার মনে বেদনার ছায়া। অকালপ্রয়াত প্রিয় বন্ধু মানজারুল ইসলাম রানার মৃত্যুবার্ষিকীতে ব্যথাতুর মাশরাফির সঙ্গে কথা শুরু হলো এ দিয়েই-
আজ যে একটা বিশেষ দিন, এটা কি আপনার মনে আছে?
মাশরাফি: মনে থাকবে না মানে, সকালে উঠেই মনে হয়েছে এই দিনে রানা চলে গিয়েছিল। আমার সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল ও। টুরে একসঙ্গে ঘুমাতাম। ও আলো থাকলে ঘুমাতে পারত না। দরজার নিচে যে একটু ফাঁক থাকে, ওখান দিয়ে আলো আসত বলে টাওয়েল গুঁজে দিত। আমি আবার অন্ধকারে ঘুমাতে পারি না। ওকে তাই মারতাম। ও-ই তাই স্যাক্রিফাইস করত। বলত, তুই আগে ঘুমা, আমি পরে ঘুমাব, আমি অন্ধকার ছাড়া ঘুমাতে পারি না।
২০০৭ বিশ্বকাপে রানা মারা যাওয়ার পরদিনই ভারতের সঙ্গে ম্যাচ ছিল। এবার আরেকটি বিশ্বকাপে দুই দিন পর সেই ভারতের সঙ্গেই খেলা। অদ্ভুত না?
মাশরাফি: হ্যাঁ। কিছুটা তো অদ্ভুতই। একটু আগে এটাই ভাবছিলাম, আবার সেই ম্যাচ। আসলে এই দুনিয়াতে কাকতালীয়ভাবে অনেক কিছুই মিলে যায়। আমরা নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে জিতলে তো দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে খেলতে হতো। আমরা এখন ভারতের সঙ্গে খেলছি।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের আগে আপনি বলেছিলেন, এই মেলবোর্ন আপনার অনেক কিছু নিয়ে নিয়েছে... রক্ত, মাংস...এবার যেন কিছু ফিরিয়ে দেয়। এই কোয়ার্টার ফাইনাল আপনাকে আবার সেই মেলবোর্নেই নিয়ে এল! এবার কি মেলবোর্নের কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার পালা?
মাশরাফি: আসলে সব কথা বলে ফেলা ভালো না। মনেরটা মনেই থাক। পারলে তখন বলব। তবে এটা সত্যি যে, এই মেলবোর্নে আমি অনেক কষ্ট করেছি। অপারেশনের পর অপারেশন। অপারেশন তো অজ্ঞান করে করেছে। বুঝিনি। কিন্তু এরপর যে কষ্ট...হাঁটতে পারি না, সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করা...
মেলবোর্নে আপনি কবে প্রথম এসেছিলেন? ২০০৩ সালে?
মাশরাফি: হ্যাঁ। ২০০৩-এ প্রথম আসি মেলবোর্নে।
এরপর তো আরও অনেকবার। তবে এবারই প্রথম মেলবোর্নে খেললেন, তাই না?
মাশরাফি: হ্যাঁ, তবে এর আগে বসে বসে প্র্যাকটিস দেখেছি এমসিজিতে। অপারেশনের কিছুদিন পর ডাক্তার বলতেন, এবার তুমি একটু হাঁটতে পারো। সারা দিন বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগত না। বাবু ভাই (অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ইকরাম) অফিসে যাওয়ার পথে আমাকে এমসিজিতে নামিয়ে দিতেন।
কোন টিমের প্র্যাকটিস দেখেছেন?
মাশরাফি: ভারতের প্র্যাকটিস দেখেছি। অস্ট্রেলিয়ার প্র্যাকটিস দেখেছি।
এই বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত তো আপনার কাছে মেলবোর্ন মানেই ডেভিড ইয়াং, অপারেশন...মেলবোর্ন মানেই যন্ত্রণা...
মাশরাফি: মেলবোর্নে এই প্রথম আমি হাঁটছি। খেলছি (হাসি)। এর আগে যতবার এসেছি, তিন-চার দিন হাঁটার পরই বিছানা (হাসি)। আসলে এই প্রথম মেলবোর্ন ঘুরে দেখতে পারলাম। বাবু ভাই যদিও তখনো ঘুরে দেখিয়েছেন। এখানে বাবু ভাই-মতিন ভাইদের মতো মানুষ না পেলে আমার আর ক্রিকেট খেলা হতো না।
২০০৭ বিশ্বকাপে মন্টিগো বেতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন ‘ধরে দিবানি’ কথাটা আমাকেই বোধ হয় আপনি প্রথম বলেছিলেন। বলেছিলেন, যদি উইকেট একটু ভেজা থাকে আর আমরা বোলিং করি, ভারতকে ‘ধরে দিবানি’। ওটা দিয়েই হেডিং করেছিলাম। এখন তো ‘ধরে দিবানি’ বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হয়ে গেছে।
মাশরাফি: ওই সময় তো অত কিছু বুঝতাম না। মনে হয়েছিল, বলে ফেলেছি (হাসি)। তবে এখানে যে উইকেট দেখছি, তাতে এটা ভেজা থাকার কোনো চান্স নেই। এখানে মনে হয়, ৩০০ রানের উইকেটই থাকবে। তবে ওই বার আমি ভালো বোলিং করলেও আমরা সবাই মিলে ভালো খেলেছিলাম বলেই জিততে পেরেছিলাম। পুরো টিম পারফরম্যান্স ছিল। এখানেও আমাদের টিম একসঙ্গে ভালো খেললে সুযোগ থাকবে। ওদের যে দল, তাতে আমরা এক-দুজন ভালো খেললে পারব না।
বাংলাদেশের প্রায় সব বড় জয়েই আপনার ওপেনিং স্পেলের একটা বড় ভূমিকা ছিল। সবাই তাই আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা কি চাপ না প্রেরণা?
মাশরাফি: মানুষ আমার কাছ থেকে আশা করে, এটাকে আমি সব সময় প্রেরণাই মনে করি। আর এখন এসে চাপটাপ নিয়ে একদমই ভাবি না। আমার জীবনে যা গেছে, তাতে এটা আর এমন কী চাপ! আমি যে এখনো ক্রিকেট খেলছি, সেটাই তো খেলার কথা না। এ জন্যই সব সময় ভাবি, আরও বেশি কিছু দিতে পারি কি না।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে কোন জিনিসটা নির্ধারক হবে বলে আপনার ধারণা?
মাশরাফি: আমাদের বোলিং।
তার মানে ব্যাটিংয়ের ওপর পুরো আস্থা আছে আপনার?
মাশরাফি: হ্যাঁ, কারণ ব্যাটসম্যানরা সবাই ফর্মে আছে। এই ম্যাচে কী হবে, সেটি পরের কথা। তবে এই বিশ্বকাপে যদি দেখেন দক্ষিণ আফ্রিকান বোলাররাও সংগ্রাম করছে, ভারতীয় বোলাররা এখনো সত্যিকার চ্যালেঞ্জে পড়েনি। অস্ট্রেলিয়ারও মিচেল স্টার্ক ছাড়া আর কেউ এমন বিরাট কিছু করেনি। বিশ্বের সেরা বোলিং অ্যাটাক বললে আপনি দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কথা বলবেন। নিউজিল্যান্ড নিজেদের মাঠে খেলেছে বলে ভালো করেছে, তার পরও আমাদের কাছেই ওদের বোলাররা মার খেয়েছে। এখানে ইউএই পর্যন্ত ২৫০ রান করে ফেলছে। এর কারণ হচ্ছে, এখানে ট্রু উইকেট, বল উঁচু-নিচু হয় না। ব্যাটসম্যানদের বিশ্বাস থাকে যে, বল ব্যাটেই লাগবে। এখানে তাই বোলিংটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ এত ভালো বলে এই ম্যাচে তো সেটি আরও বেশি, তাই না?
মাশরাফি: বাংলাদেশে অনেকে মনে করছে ভারতের বিপক্ষে পড়েছি বলে আমরা লাকি। আবার আনলাকিও মনে করছে অনেকে। আমি বলব, সমান সমান। এই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার পরই ভারত সবচেয়ে ভালো খেলছে। ভারতের এই ব্যাটিংয়ের বিপক্ষে বোলিং করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জটা নিয়ে যদি আমরা জিততে পারি, ম্যাচটা খুব এক্সাইটিং হবে।
আপনি বলেছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে পছন্দের প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই। তার পরও যদি সুযোগ থাকত, তাহলে কোন দলকে বেছে নিতেন?
মাশরাফি: সত্যি বলছি, কোনো পছন্দই নেই। আমি খুব করে চেয়েছিলাম যেন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে জিতি। জিতলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেতাম। সবচেয়ে বড় কথা, সবাই ভাবত আমরা অনেক বড় টিম। নকআউট ম্যাচে চাপ আছেই। সব দলই চিন্তা করবে, হেরে গেলেই বিদায়। আমরা যদি নিজেদের আট নম্বর দল ধরি, একমাত্র আমাদেরই এ নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। কারণ, আমাদের হারানোর কিছুই নেই। বাংলাদেশের মানুষ তো আশা করেছেই, কিন্তু এই বিশ্বকাপ নিয়ে এত যে কথা শুনেছেন, কাউকে কি বলতে শুনেছেন বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারবে? কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাওয়ার পর বলা হচ্ছে, ওরা কি এই চাপ নিতে পারবে? আমাদের ওপর কিসের চাপ, চাপ তো থাকবে অন্য দলের ওপর।
আপনার কি কখনো মনে হয় বাংলাদেশের মানুষ বাস্তবতাটা না বুঝে একটু বেশি আশা করে ফেলে?
মাশরাফি: এমন মনে হতে পারে। তবে এতে আমাদের পারফর্ম করতে সুবিধা হয়। আমরা তো বাংলাদেশের মানুষকে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। যদি চিন্তা করে দেখেন, আমরা গত ১৫ বছর একঘেয়ে ক্রিকেট খেলে গেছি। কখনো হয়তো জিতেছি। আমি সব সময়ই বলি, বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিটি জয়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমরা খুব বাজে খেলে হেরেছি। তার পরও বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দিনের পর দিন সমর্থন করে গেছে। খারাপ খেললে গালি দেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দিনের পর দিন আমাদের যেভাবে সমর্থন দিয়েছে, এটা অসাধারণ। না হলে এই খেলাটায় যে এত মধু আছে, এত আনন্দ আছে, এর কিছুই আমরা পেতাম না।
ভারতীয় দলে তো অনেক তারকা। তার পরও যদি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে একজনের কথা বলতে বলি...
মাশরাফি: বিরাট কোহলি।
কেন?
মাশরাফি: একটু আগে আপনিই বলছিলেন না, ভারতের যে-ই দাঁড়িয়ে যাবে, সে-ই ম্যাচ বের করে নিয়ে যেতে পারবে। ধাওয়ান আছে, রোহিত শর্মা ওয়ানডেতে ২৫০-এর বেশি রান করেছে। রায়না গত ম্যাচে এক শ মারল। ধোনি তো অহরহ করে আসছে। এমনকি রাহানেও দুর্দান্ত ক্রিকেটার। তার পরও কোহলির কথা আলাদা করে বলব, কারণ ও এমন একজন ব্যাটসম্যান, যে ম্যাচ শেষ করে দিয়ে বেরোবে। ধোনিও তা করে, তবে ও যেখানে খেলে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু কোহলি তিন-চারে নেমেও শেষ পর্যন্ত খেলে আসে। এটাও একটা-দুইটা বা পাঁচটা-ছয়টা ম্যাচ না, অসংখ্য ম্যাচে এমন করেছে। ওর উইকেটটা তাই তাড়াতাড়ি নিতে হবে।
শেষ প্রশ্ন, ‘ধরে দিবানি’ ঘোষণা দেবেন এবার?
মাশরাফি: না, ‘ধরে দিবানি’ বলব না। তবে একটা প্রমিজ করতে পারি, আমরা আমাদের রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করব। এত দূর যখন এসেছি, সহজে ছাড়ব না। তবে হ্যাঁ, খেলায় কিছু বলা যায় না। আমরা খুব বাজেভাবেও হারতে পারি। আবার খুব ভালোভাবে জিততেও পারি। তবে একটা নিশ্চয়তা দিতে পারি, আমরা সবাই নিজেদের উজাড় করে দেব।

ভারতের সঙ্গে খেলাটা শুধুই খেলা নয় by উৎপল শুভ্র

ল্যাংহাম হোটেলের লবিতে ইয়া মুষ্ক দুই জওয়ান। যে-ই হোটেলে ঢুকছে, তার দিকেই সন্দিগ্ধ দৃষ্টি। ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে একটুও সমস্যা হয় না, পেশাদার নিরাপত্তারক্ষী। এমনই তো হওয়ার কথা। এই হোটেলেই আগামী বৃহস্পতিবার কোয়ার্টার ফাইনালের দুই দল বাংলাদেশ ও ভারত। নিরাপত্তার একটু কড়াকড়ি তো থাকবেই।
কিন্তু ভারতীয় দলের হোটেলে ঢুকতে তো তখনো ঘণ্টা চারেক বাকি। আর বাংলাদেশ দল তিন দিন ধরেই এখানে। এই ‘সুমো কুস্তিগির’দের তো আগে দেখা যায়নি! কথা বলে এ-ও জানা গেল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট নামে যে একটা বস্তু আছে, সেটাই তাদের জানা নেই। তাহলে এঁরা কারা?
দুপুর ১২টার দিকে যাঁরা ল্যাংহাম হোটেলের সামনে ছিলেন, উত্তরটা তাঁদের জানা। মেলবোর্নের রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে তখনই হোটেলে ফিরলেন দৈত্যাকৃতির এক ভদ্রলোক। সাইকেল থেকে নামতেই তাঁকে ঘিরে বৃত্ত রচনা করলেন যে পাঁচ দেহরক্ষী, তাঁদের মধ্যে ওই দুজনও ছিলেন।
বডি বিল্ডিং, বিকিনি প্রতিযোগিতা আরও কী কী কাজে মেলবোর্নে আসা ‘টার্মিনেটর’ আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার যে ল্যাংহাম হোটেলেই উঠেছেন, সকালেই সেটি জানা হয়ে গেছে মুশফিকুর রহিমের সৌজন্যে। ব্রেকফাস্ট রুমে মুশফিক দূরের একটা টেবিলের দিকে চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘দেখেন তো, কালো গেঞ্জি পরা ওই লোকটাকে চিনতে পারেন কি না?’ মুশফিকের কণ্ঠে সহজে রোমাঞ্চ খেলা করে না। এখানে করছে। সকালে উঠেই জিমে গিয়েছিলেন, সেখানে পাশে সাবেক মিস্টার ইউনিভার্স! রোমাঞ্চিত হওয়ার মতো ব্যাপারই তো! মুশফিকের স্বপ্নের নায়ক অবশ্য শোয়ার্জেনেগার নন, ‘আমার র্যাম্বোকে দেখার খুব ইচ্ছা।’ র্যাম্বো মানে সিলভেস্টার স্ট্যালোনের শরীর আর কণ্ঠ দুটিতেই মুশফিকের মুগ্ধতা।
তারকাদেরও তাহলে তারকা থাকে! নইলে বেলা দেড়টার দিকে বাংলাদেশ দল যখন এমসিজিতে অনুশীলনে যাওয়ার বাসে উঠছে, মুশফিকদের এক নজর দেখতেও তো প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা জটলা। অটোগ্রাফ নেওয়ার চল এখন প্রায় উঠেই গেছে। স্মার্টফোনের যুগে এখন ভক্তদের চাহিদা প্রিয় তারকার সঙ্গে ছবি। বাসে ওঠার আগে সেই দাবিও মেটালেন অনেকে।
এমসিজিতে নেটের পাশে ভারতীয় সাংবাদিককুলের কাছেও বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তারকা মর্যাদাই পেল। মাহমুদউল্লাহর এমন দুর্দান্ত খেলার রহস্য, সৌম্য সরকার হঠাৎ কোত্থেকে এল, বাংলাদেশ যে এই বিশ্বকাপে এত ভালো খেলছে তাতে কোচের কী ভূমিকা, নভজোৎ সিধু কী যেন বলেছে তা নিয়ে নাকি বাংলাদেশে তোলপাড়—তাদের এমন হাজারো কৌতূহল মেটাতে হলো বাংলাদেশের সাংবাদিকদের। নেটে বোলিং করতে করতে মাশরাফি পরিচিত বাংলাদেশের সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছেন, এটা হয়ে দাঁড়াল অষ্টম আশ্চর্যের ব্যাপার।
কারণটা বুঝতে আপনাকে ধোনির দলের সঙ্গে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পর্কটা জানতে হবে। প্রতিটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের সময়ই ভারতীয় পত্রপত্রিকায় ছাপা হতে দেখবেন, ক্রিকেটার-প্রেস সম্পর্কটা এখন সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। পরের টুর্নামেন্টেই সেই রেকর্ড ভেঙে যায়। এবার বিরাট কোহলি ভারতীয় এক সাংবাদিককে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করার পর সেটি সত্যিকার অর্থেই তলানিতে। সামনে পড়ে গেলেও ক্রিকেটার-সাংবাদিকে চোখাচোখি পর্যন্ত হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমনই যে, ভারতীয় দলের নেট থেকে কোনো ক্রিকেটার কোনো সাংবাদিকের উদ্দেশে প্রীতিমূলক কিছু বললে সেই সাংবাদিক বোধ হয় বিস্ময়ে অজ্ঞান হয়ে যাবেন!
এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় কৌতুক হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় দলের মিডিয়া ম্যানেজার ডা. বাবার ই-মেইল। যাতে তারিখ বদলে একটা কথাই বোধ হয় বারবার কপি-পেস্ট করে দেওয়া হয়: ‘নো মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি।’ বিশ্বকাপে প্রতিটি দলই অনুশীলনের পর দলের একজনকে সংবাদ সম্মেলনে পাঠাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড তো অনুশীলন নেই, এমন দিনগুলোতেও। সেখানে ম্যাচের আগে-পরের সংবাদ সম্মেলন ছাড়া ভারতীয় ক্রিকেটাররা সাংবাদিকদের ছায়াও মাড়াচ্ছেন না। ধোনি নাকি এমনও বলেছেন, আইসিসির বাধ্যবাধকতা না থাকলে সংবাদ সম্মেলনটাও তুলে দিতেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডাও মারেন—এটা শোনার পর ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিকেরা তাই অতীত দিনের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর নবীনেরা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে থাকেন। তাঁদের কাছে যে ‘ক্রিকেটাররা শুধুই দেখার জিনিস। কথা বলার নয়।’ আইপিএল রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দেওয়াতেই কোহলিরা ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন—কান পাতলে ভারতীয় সাংবাদিকদের এই ধারণার সমর্থন কিন্তু বাংলাদেশ দলেও শুনতে পাওয়া যায়।
ভারতের বিপক্ষে খেলা মানে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে খেলা, এমন একটা ধারণা আছেই। বিশ্বকাপে ভারতীয় দল বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে, এই ক্ষোভও আছে অনেকের মনে। তাঁদেরই একজন তীব্র শ্লেষের সুরে বললেন, ‘শুনলাম, ধোনি নাকি সংবাদ সম্মেলনে ভ্রমণক্লান্তির কথা বলেছে। আমাদের তুলনায় ওরা তো রাজার হালে খেলছে! পার্থেই দুটি ম্যাচ খেলেছে, নিউজিল্যান্ডে গিয়ে বাসে দুই ঘণ্টা দূরত্বের হ্যামিল্টন আর অকল্যান্ডে পর পর দুটি ম্যাচ। এখানেই তো চলে গেল ২০-২২ দিন। আর আমরা এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে ঘুরতে ঘুরতে শেষ!’ নামটা নাহয় গোপনই থাক।
ভারতীয় দল অকল্যান্ড থেকে মেলবোর্নে আসার কথা সন্ধ্যার পর। সকালে ব্রেকফাস্ট রুমে গিয়ে তাই চমকে যেতে হলো—ওই টেবিলটায় গভীর চিন্তামগ্ন ওটা কে বসে, রবি শাস্ত্রী না? শাস্ত্রীই, কী কারণে যেন এক সাপোর্ট স্টাফকে নিয়ে আগেই চলে এসেছেন। ইন্টারভিউয়ের জন্য মিনিট দশেক সময় চাইতেই বললেন, ‘অনুমতি নিতে হবে।’ আপনি টিম ডিরেক্টর, আপনি আবার কার অনুমতি নেবেন? এবার শাস্ত্রী নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমরা কথা বলি না। আমরা কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী।’
রবি শাস্ত্রীর ম্যাচের আগে মনস্তাত্ত্বিক খেলায়ও খুব বিশ্বাস। কথাটা এরই অংশ হতে পারে। তবে তখন তিনি কীভাবে জানবেন, ঘণ্টা চারেক পর চন্ডিকা হাথুরুসিংহে তার চেয়ে এক কাঠি সরেস বলে প্রমাণিত হবেন! বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে কী পার্থক্য গড়ে দেবে—ভারতীয় এক সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের কোচ বললেন, কারা উপলক্ষটাকে বেশি উপভোগ করতে পারবে, এটাই হবে নির্ধারক।
এই কোয়ার্টার ফাইনালটা কোন দলের জন্য বেশি উপভোগের উপলক্ষ, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে!

Friday, July 11, 2014

এবার ‘ঈশ্বরের দুই হাত’ by উৎপল শুভ্র

বড় খবর! বড় খবর!!

>>২৪ বছর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা। মেসি, ডেমিচেলিস, রোহো, বিগলিয়া, প্যালাসিওরা এমন বাঁধভাঙা উল্লাসেই তো মাতবেন। পরশু টাইব্রেকারে হল্যান্ডকে হারিয়েই দুই যুগের অপেক্ষার অবসান হয়েছে আর্জেন্টিনার l ছবি: এএফপি
আলেসান্দ্রো সাবেলা হেসেছেন। বিশ্বকাপে অভূতপূর্ব এই ঘটনা গত পরশু রাতে অ্যারেনা করিন্থিয়ানসে সংবাদ সম্মেলনে। অভূতপূর্ব না বলে অবশ্য বিরল বলাই ভালো। সংবাদ সম্মেলনে না হলেও এই বিশ্বকাপে অন্য কোনো সময় কখনো না কখনো নিশ্চয়ই হেসে থাকবেন আর্জেন্টিনার কোচ।
এদিন অবশ্য হাসারই কথা। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফাইনালে! সাবেলার হাসির মতো অভূতপূর্ব না হলেও বিরল তো বটেই। সেই কবে ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপ, এর পর এই প্রথম। মাঝখানে দুই যুগ, পাঁচটি বিশ্বকাপ। সাবেলার হাসিটা অবশ্য ফাইনালে ওঠার আনন্দের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল না। যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচ নিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকে এত কথা, সেমিফাইনালে হারলে সেটিই হতো এই বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। এ সম্পর্কিত একটা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েই সাবেলার ওই হাসি।
মাঠে অবশ্য হাসি-আনন্দের চূড়ান্ত করেছে আর্জেন্টিনা দল। দুই যুগ পর ফাইনালে ওঠার আনন্দে এমনই আত্মহারা হয়ে গেছে যে, ম্যাচ শেষে প্রায় বাধ্যতামূলক সাধারণ সৌজন্যটুকু দেখাতেও ভুলে গেছে। ডাচ খেলোয়াড়েরা মাঠের অন্য প্রান্তে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু আর্জেন্টাইনরা গ্যালারির সমর্থকদের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে মাথার ওপর জার্সি ঘোরাতে এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়ল, প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোর কথা মনেই থাকল না। ব্যাপারটা এমনই দৃষ্টিকটু ছিল যে, ম্যান অব দ্য ম্যাচের সংবাদ সম্মেলনের জন্য বরাদ্দ তিনটি প্রশ্নের মধ্যে একটি হলো এ নিয়েই। সেটি করলেন বাংলাদেশেরই এক তরুণ সাংবাদিক। যা শুনে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার নায়ক যারপরনাই বিব্রত, ‘আসলে আমরা এত বছর পর ফাইনালে উঠেছি তো, সবাই তাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলাম। নইলে এর আগে সব ম্যাচের পরই তো আমরা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেছি।’
দুই যুগ আগে-পরে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠায় বড় একটা মিলও পাওয়া যাচ্ছে এই সার্জিও রোমেরোর কল্যাণেই। ইতালি বিশ্বকাপে জঘন্য নেতিবাচক ফুটবল খেলেও আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল টাইব্রেকারে এক গোলরক্ষকের বীরত্বে। কোয়ার্টার ফাইনালের পর সেমিফাইনালেও যিনি টাইব্রেকারে জিতিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর নামের প্রথম অংশটাও ‘সার্জিও’-ই। সেই সার্জিও গয়কোচিয়ার বয়স এখন পঞ্চাশ পেরিয়েছে এবং এদিন তিনি টেলিভিশন ধারাভাষ্যকারের ভূমিকায় মিডিয়া ট্রিবিউনে উপস্থিত। রোমেরোর বুক থাপড়ানো উল্লাস দেখতে দেখতে যিনি ফিরে গেছেন নেপলসের ওই রাতে।
অথচ গয়কোচিয়ার ওই বিশ্বকাপে খেলারই কথা ছিল না। গ্রুপপর্বে আর্জেন্টিনার এক নম্বর গোলরক্ষক নেরি পাম্পিডো আহত হওয়ায় সুযোগ মেলে এবং ম্যারাডোনাকেও ছাপিয়ে গয়কোচিয়া হয়ে যান আর্জেন্টিনার ‘জাতীয় বীর’। যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে গয়কোচিয়ার বীরত্বে প্ররোচিত হয়েই ইতালির বিপক্ষে সেমিফাইনালটিকেও কোনোমতে টাইব্রেকারে টেনে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই খেলেছিল আর্জেন্টিনা। পরশু হল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে অবশ্যই তা নয়। তবে দুই দলই যেমন হিসাব কষে সাবধানী খেলা খেলল, সেটি যত না ফুটবল, তার চেয়ে বেশি ‘দাবা’! সেমিফাইনালে কোনো দলই হারতে চাইবে না জানা কথাই। কিন্তু জয়ের জন্য ঝাঁপানোর চেয়ে পরাজয় এড়ানোর চেষ্টাটা এমনই চোখে লাগল যে, মিডিয়া ট্রিবিউনে কে যেন রসিকতা করলেন, ‘আসলে কোনো দলই ফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হতে চাইছে না!’
শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ওঠায় জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ সেমিফাইনালটি অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে লিওনেল মেসির মনে। কিন্তু ‘মেসি-জাদু’তে ম্যাচটিকে দর্শকদের মনে স্মরণীয় করে রাখতে তিনিও ব্যর্থ। খেলার একেবারে শেষ দিকে ম্যাক্সি রদ্রিগেজকে বাড়ানো স্বর্গীয় ওই পাসের মতো দু-একটি মুহূর্ত বাদ দিলে খুঁজেই পাওয়া যায়নি তাঁকে। ডাচদের বিশেষ মনোযোগ ছিল তাঁর প্রতি। তা সেটি কোন ম্যাচে থাকে না? তাই বলে ১২০ মিনিটের খেলায় একবারও বক্সের মধ্যে বলে তাঁর পায়ের ছোঁয়া লাগবে না! শেষ পর্যন্ত সেই ছোঁয়া লাগল টাইব্রেকারে এবং পেনাল্টিতে মেসির গোলটিই ফাইনালের পথে আর্জেন্টিনার প্রথম ধাপ।
না, ভুল বলা হলো। আসলে দ্বিতীয় ধাপ। এর আগেই হল্যান্ডের প্রথম শটটিই যে ঠেকিয়ে দিয়েছেন রোমেরো। পরে স্নাইডারের নেওয়া তৃতীয় শটটিও ঠেকিয়ে টাইব্রেকারের শেষ শট দুটির আর প্রয়োজনই রাখেননি।
অসহায় চোখে তাকিয়ে তা দেখতে হলো টিম ক্রালকে। কোয়ার্টার ফাইনালে হল্যান্ডের জয়ের নায়ক এদিন টাইব্রেকার-নাটকের অসহায় দর্শক। কোস্টারিকার ম্যাচে অতিরিক্ত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে শুধু টাইব্রেকারের জন্যই ক্রালকে নামিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন লুই ফন গাল। এদিন আগেই তিনটি পরিবর্তন করে ফেলায় তুরুপের তাস আর খেলাই হলো না। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি কি ওখানেই জিতে গেল? সিলেসেন হল্যান্ডের এক নম্বর গোলরক্ষক ঠিক আছে, কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পেশাদার ক্যারিয়ারেই তাঁর পেনাল্টি ঠেকানোর কোনো ঘটনা নেই।
আর্জেন্টিনা ম্যাচ জেতেনি, জিতেছে টাইব্রেকার—সংবাদ সম্মেলনে লুই ফন গাল এটি মনে করিয়ে দেবেন স্বাভাবিক। আশ্চর্য হলো, ফন গাল নন, তা মনে করিয়ে দিলেন কি না আলেসান্দ্রো সাবেলাই। ‘আমরা হয়তো পরিষ্কার সুযোগ বেশি পেয়েছি, তবে ম্যাচটা ছিল সমানে সমান। সত্যিকার ড্র বলতে যা বোঝায়। অন্য কোনো ফল হলেও আমি এ কথাই বলতাম।’
রেকর্ড বইয়েও ড্র-ই লেখা থাকবে। তবে তা নিয়ে আর্জেন্টাইনদের মাথা ঘামাতে বয়েই গেছে। সাবেলার সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগেই খবর এল, আর্জেন্টিনার রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছে। চলছে উৎসব এবং সেই উৎসবে রোমেরোর নামে জয়ধ্বনি।
আর্জেন্টাইনদের কারণে-অকারণে ঈশ্বরকে টেনে আসার একটা প্রবণতা আছে। ‘ঈশ্বরের হাত’ বলে ম্যারাডোনার মাধ্যমেই এটির শুরু কি না কে জানে! সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডে এই অ্যারেনা করিন্থিয়ানসের একটা পোস্টের মালিকানাও ঈশ্বরকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বল সেখানে লেগে ফিরেছে বলে সেটি ‘ঈশ্বরের পোস্ট’।
আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলে দেওয়া সার্জিও রোমেরোর হাত দুটিও আর শুধুই তাঁর থাকছে না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার হাতে করা ওই গোলটির নাম হয়ে গেছে—‘লা মানো দে দিওস’। ‘মানো’ মানে হাত। রোমেরোর ক্ষেত্রে সেটি শুধু বহুবচন হয়ে যাচ্ছে—লা মানোস দে দিওস। ঈশ্বরের দুই হাত।
সেমিফাইনালে টাইব্রেকার যদি দুই যুগ আগে-পরের দুই বিশ্বকাপকে মিলিয়ে দিয়ে থাকে, মিল আছে আরেকটি। এবারও ফাইনালে প্রতিপক্ষ সেই জার্মানরা। আর্জেন্টিনা অবশ্য চাইবে, মিলটা যেন ওখানেই শেষ হয়!

Sunday, June 23, 2013

জুটি বাঁধলেন তামিম-আয়েশা by উৎপল শুভ্র

কাজীর দেউড়ির ইটরঙা পাঁচতলা বাড়িটার গায়ে সপ্তাহ খানেক ধরেই লাল-নীল-হলুদ বাতির খেলা। কাল রাতে বাতিগুলোর ঔজ্জ্বল্য কি আরেকটু বেড়ে গেল! যে কারণে পাঁচতলা ওই ভবনটির এমন রংবেরঙের আলোর মালা পরা, এই রাতেই যে সেটির মধুরেণ সমাপয়েৎ হলো।

Saturday, June 1, 2013

বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্ধকার জগৎ সত্য যে কঠিন...by উৎপল শুভ্র

সাংবাদিকের কাজ সত্য উদ্ঘাটন করা এবং সেটি সবাইকে জানিয়ে দেওয়া। দায়িত্ব পালনের সার্থকতা বোধ ছাড়াও এতে আনন্দ আছে। পেশাদারি তৃপ্তি আছে। কিন্তু সাংবাদিক যতই পেশাদার হন, মানুষও তো বটে।

Thursday, January 31, 2013

‘ব্যাটিং জিনিসটাই আমার খুব প্রিয় ছিল’ by উৎপল শুভ্র

উৎপল শুভ্র: এত বছর ক্রিকেট খেলার পর, যে ক্রিকেট একরকম জীবনই হয়ে গিয়েছিল আপনার, সেটি ছেড়ে দেওয়ার পর কখনো শূন্যতার একটা অনুভূতি হয়নি?

Thursday, December 6, 2012

বপ্নযাত্রা থামিয়ে দিলেন স্যামুয়েলস by উৎপল শুভ্র

স্বপ্নযাত্রায় আপাতত বিরতি পড়ল। ‘আপাতত’-ই তো? তা হলে ভালো। নইলে ইতিহাস কিন্তু উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করবে। ২-০ এগিয়ে গিয়েও পাঁচ ম্যাচের সিরিজ হারার ঘটনা ওয়ানডে ইতিহাসে মাত্র দুটি। এর একটি দুকূলপ্লাবী আনন্দে ভাসিয়েছিল বাংলাদেশকে।

Monday, December 3, 2012

বিজয়ের মাসে বিজয়ের ব্যাটে জয় by উৎপল শুভ্র

সারা বিশ্ব দিন উদ্যাপন করে। বাংলাদেশ তো তা করেই, সঙ্গে মাসও। এই দেশে ফেব্রুয়ারি মানেই অমর একুশের মাস, মার্চ শুরু স্বাধীনতার গান গেয়ে, ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই পূর্ব দিগন্তে রক্তলাল সূর্যের আভা। খুলনার গ্যালারিতে কাল এক দর্শকের তুলে ধরা প্ল্যাকার্ডটা আবারও তা মনে করিয়ে দিল।

Saturday, December 1, 2012

‘রানার মাঠে’ দাপুটে জয় by উৎপল শুভ্র

ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামটাতেই শুধু মিল। ২০০৭ বিশ্বকাপ হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। আর এখানে প্রতিপক্ষের নাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তার পরও কোথায় এসে ২০০৭ সালের ১৭ মার্চ আর ২০১২-এর ৩০ নভেম্বর যেন বারবার মিলে যেতে চাইল! মিলিয়ে দিলেন মানজারুল ইসলাম রানা!

Sunday, November 25, 2012

অর্জনের দিনে না-পাওয়ার বেদনাও পোড়াল সাকিবকে by উৎপল শুভ্র

স্টেডিয়ামে পিন পড়লেও বোধ হয় সেই শব্দটা শোনা যেত! স্তব্ধ গ্যালারিতে দর্শকদের চোখে অবিশ্বাস—এতক্ষণ ধরে যে মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা, সেটির এমন পরিণতি! মিড অফে ক্যাচটি নিয়ে টিনো বেস্ট তখন উল্লাসে মাতোয়ারা। ফিরে যাচ্ছেন সাকিব আল হাসান।

Wednesday, November 21, 2012

খুলনায় আজ শুরু উৎসবের টেস্ট by উৎপল শুভ্র

দুপুরবেলায় বিরাট এক মিছিল বেরোল। সামনে শ খানেক মোটরসাইকেল। পেছনে বেশ কয়েকটা গাড়ি, যার একটি থেকে হ্যান্ডমাইকে কী সব নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। লাল-সবুজ উড়ছে অনেকের হাতে। ওই মিছিলে কিছুক্ষণের জন্য খুলনা হয়ে গেল ‘ঢাকা’! রাস্তায় যানজট।

Saturday, November 17, 2012

শেষ দিনে রোমাঞ্চের আবাহন by উৎপল শুভ্র

টেস্ট ম্যাচ হলো পেঁয়াজের মতো। একটি পরত ছাড়ালে দেখা দেয় আরেকটি পরত। আকারে আলাদা, কখনো কখনো রঙেও। ঝাঁজেও বোধহয় তারতম্য হয়! ঢাকা টেস্টের প্রথম তিন দিন রঙে-ঝাঁজে প্রায় একই রকম। বলের ওপর ব্যাটের একচ্ছত্র আধিপত্যের গান।

Thursday, November 15, 2012

প্রয়োজন ধৈর্যের বটিকা সেবন by উৎপল শুভ্র

দ্বিতীয় দিন শেষে দেখা গেল, হিসাবটা খুব সহজ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। স্কোরবোর্ডে ১৬৪ রান। করতেও হবে আর ঠিক ১৬৪। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস ৪ উইকেটে ৫২৭—এটা জানা থাকলে এই ‘১৬৪’-এর চক্কর গোলমেলে লাগতে পারে।

Wednesday, September 19, 2012

ছুটির দিনেও উঁকি দিচ্ছে নিউজিল্যান্ড by উৎপল শুভ্র

ক্যান্ডিতে এসে প্রথম দিনটা ক্রিকেট থেকে দূরে থাকল বাংলাদেশ দল। তবে খেলা থেকে নয়। রিসোর্টপম ক্যান্ডির মাহাভেলি রিচ হোটেলের গেম রুম সরগরম করে রাখলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। কেউ বিলিয়ার্ড খেললেন, কেউ ক্যারম, কেউ বা দাবা। টেবিল টেনিসও বাদ গেল না। অনেকে ঘুরে ঘুরে সব খেলাই।

Tuesday, September 18, 2012

আজ শুরু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ- কোনো ফেবারিট নেই! by উৎপল শুভ্র

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের মহানায়ক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ঘোর সমালোচক। ‘এটা হলো তিন মিনিটে ম্যাগি নুডলেসর মতো। ব্যাং, ব্যাং...সব শেষ! আমি এটাকে ক্রিকেট মনে করি না’—টি-টোয়েন্টি নিয়ে অর্জুনা রানাতুঙ্গার বিখ্যাত উক্তির সঙ্গে শ্রীলঙ্কানরা একমত হয়ে গেল নাকি?