Sunday, June 6, 2010

এক হয়ে বাঁচাতে হবে এই পৃথিবীর সন্তানদের by শিখ্তী সানী

ধরিত্রীমাতার বিস্তীর্ণ ভূমি, নীল আকাশ, নদী-সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত—কিছুই কারও একার সম্পদ নয়। সবার অধিকার এখানে সমান। সীমিত এই ‘সাধারণ’ প্রাকৃতিক সম্পদগুলো যখন একক কোনো গোষ্ঠী বা দলের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হয়, তখন হয়তো সাময়িকভাবে আকর্ষণীয় একটি লভ্যাংশ গিয়ে হাজির হয় তাদের কাছে। কিন্তু সুবিধাভোগী দলটির যথেচ্ছ অনধিকার চর্চায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে সম্পদগুলো। ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতে থাকে তাদের প্রাণশক্তি। এ বিপর্যয়ের দায় এসে পড়ে সবার ঘাড়ে; যারা এই অন্যায় চর্চায় সঙ্গও দেয়নি, লাভও পায়নি তাদের ওপরও। এটাই ‘ট্র্যাজেডি অব দ্য কমন্স’, পরিবেশবাদীদের কাছে আলোচিত একটি শব্দ। ১৯৬৮ সালে বিজ্ঞানবিষয়ক একটি জার্নালে গ্যারেট হার্ডিন তুলে ধরেন এই ধারণা। হার্ডিন দেখিয়েছিলেন, মধ্যযুগে ইউরোপের বহু বিস্তীর্ণ চারণভূমি উন্মুক্ত পড়ে থাকত। স্বার্থান্বেষী মানুষ তাদের সুবিধার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করত, যতক্ষণ চারণভূমিটি তার উর্বরতাশক্তি হারিয়ে রুক্ষ হয়ে না যেত। তারপর তারা চলে যেত অন্য কোথাও। রুক্ষ ভূমির দায় এসে পড়ত নির্দোষ মনুষ্যজাতির ঘাড়ে। হার্ডিনের এই সুরটিই এই শতাব্দীতে করুণভাবে বাজছে আমাদের কানে, বাংলাদেশসহ ক্ষুদ্র দ্বীপ ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ক্ষতির শিকার। উন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক আকাশছোঁয়া সমৃদ্ধির বলি আমাদের এই ‘সাধারণ’ সম্পদগুলো। এর দায় নিতে হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলোকে, তাদের মানুষগুলোকে। তারা জানে না জলবায়ু পরিবর্তনের কথা, কিন্তু প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলছে তার প্রভাবের সঙ্গে। উন্নত রাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী অর্থনীতির কঠিন মূল্য দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে, এ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অসংখ্য মানুষকে। হতদরিদ্র্র ও দুস্থ মানুষগুলো কি জানে, কোন মূল্য দিচ্ছে তারা?
‘এই পৃথিবী মুনাফার জন্য নয়। বাসযোগ্য আর কোনো পৃথিবীও নেই’—এই ছিল কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনে অসংখ্য পরিবেশবাদীর স্লোগান। উন্নত দেশগুলোর অনাগ্রহের কারণে ক্ষোভে উত্তাল ছিল কোপেনহেগেন। আইনি বাধ্যবাধকতার কোনো চুক্তিতে পৌঁছা যায়নি, প্রাপ্তি বলতে শুধু অঙ্গীকারনামা। আমাদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কমেনি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই চরম শঙ্কিত হই আমরা। উৎকণ্ঠিত হই অনাগত প্রজন্মের কথা ভেবে। আজ ৫ জুন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে মানুষের পরিবেশের ওপর জাতিসংঘের একটি সম্মেলন থেকে সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে পরিবেশ বাঁচানোর ডাক আসে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে পরের বছর থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের আয়োজন করা হয়। এবারের স্লোগান—বহু প্রজাতি, এক গ্রহ, এক ভবিষ্যৎ। ২০১০ সালকে ঘোষণা করা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য বছর’।
আজ থেকে প্রায় সোয়া শ বছর আগেই মনুষ্যজাতিকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল, শিল্পায়নের ক্রমাগত আদিখ্যেতার মারাত্মক প্রভাব পড়বে জলবায়ুর ওপর। এটা আজ সারা পৃথিবীর দলিল। বদলে গেছে পৃথিবী, বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। বায়ুমণ্ডলে বাড়ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড আর গ্রিনহাউস গ্যাস। ফলে বিপর্যয়ের শিকার মানুষ ও পৃথিবীর বৈচিত্র্যময় জীবজগৎ। বিলীন হয়ে গেছে অনেকের অস্তিত্ব, বাকিরা বিলুপ্তির পথে।
বাংলাদেশের প্রাচুর্যময় জীববৈচিত্র্যও আজ হুমকির মুখে পড়েছে। ধুঁকতে থাকা নদী ও মিঠা পানিতে অবশিষ্ট আছে ২০০ প্রজাতির মাছ ও ১৫০ প্রজাতির পাখি। সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে পাওয়া যাবে ৪৪২ প্রজাতির মাছ ও ৩২ প্রজাতির চিংড়ি, কাঁকড়া ও কচ্ছপ প্রজাতির প্রাণী। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে অবশিষ্ট আছে ৩০০ প্রজাতির গাছ, ৪০০ প্রজাতির মাছ ও ২০০ প্রজাতির পাখি। বিগত দশকগুলোতে ১৮ প্রজাতির গুরুত্বপূর্ণ পাখি ও প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্তির খাতায় আছে বাকিদের নাম। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা, বনাঞ্চল উজাড়, মরুকরণ, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের ক্রমাগত চাহিদা পূরণ এবং ধ্বংসাত্মক লিপ্সা বাস্তুসংস্থানের চক্রে এনেছে মারাত্মক ক্ষয়। প্রতিবছর বাংলাদেশে ছয়-সাতটি বড় ও মাঝারি আকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। বড় ধরনের দুর্যোগের আঘাত সহ্য করতে না-করতেই আরেকটি আছড়ে পড়ে এখানে। ২০০৭-এর সিডরের ক্ষত থেকে আজও আমরা উঠে দাঁড়াতে পারিনি। সিডরের আঘাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে গিয়ে সুন্দরবন হয়েছে ক্ষতবিক্ষত। সেই সঙ্গে নুয়ে পড়েছে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ আর জীববৈচিত্র্যও। কে বইবে এই আর্তনাদ?
বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় তিন হাজার ২০০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার কাতরভাবে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে লড়ছে। আমাদের সুন্দরবনে অবশিষ্ট আছে মাত্র ৪০০-৪৫০টি বাঘ। তাই যখন মানুষের হাতে একটি বাঘের মৃত্যুর খবর আমরা পাই, তখন শঙ্কা এসে ভর করে আমাদের ওপর। হিসাবে কমতে থাকে বাঘের সংখ্যা... ৩৯৯, ৩৯৮...। এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অন্য সব জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতিকে আটকে রাখার উপায় আমাদের নেই, কিন্তু আমরা পারি নিজেদের দোষগুলো সংশোধনের, লোভ আর স্বার্থের বাণিজ্য বন্ধ করতে। আমাদের এক হয়ে বাঁচাতে হবে এই পৃথিবীকে, এর সন্তানদের। আমাদের এক হওয়ার শক্তিই উন্নত দেশগুলোকে বাধ্য করবে তার অন্যায় চর্চার ভার নিতে। একটাই ভবিষ্যৎ, একটাই পৃথিবী। আসুন, একে বাঁচাই।

প্রার্থীদের ভালো-মন্দ: একটি ঝটিকা দৈবচয়ন সমীক্ষা by মশিউল আলম

‘মেয়র পদপ্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীর তিনটা গুণের কথা বলেন।’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে প্রকৌশলী রতন কুমার খাস্তগীর (৬০) বললেন, ‘উনার উপস্থিত বুদ্ধি ভালো, সাহসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, লোকজনকে কীভাবে ম্যানেজ করতে হয় সেসব কায়দা-কানুন উনার খুব ভালো জানা।’
‘এবার বলেন তাঁর তিনটা দোষের কথা।’
প্রকৌশলী খাস্তগীর: ‘উনার মুখ খারাপ, উদ্ধত, ডিকটেটর।’
বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী মঞ্জুর আলম সম্পর্কেও একই প্রশ্ন করলাম তাঁকে। তিনি বললেন, ‘মঞ্জুর সাহেব বিনয়ী মানুষ, ব্যবহার ভালো। এ ছাড়া আর কিছু বলতে পারব না। উনার খারাপের মধ্যে হলো, উনি সারা জীবন আওয়ামী লীগে ছিলেন, এখন মেয়র হওয়ার জন্য বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।’
‘যাকে ভোট দিয়ে মেয়র বানাবেন, তাঁর কাছে কী দাবি করবেন? আর কোন কোন কাজ করতে নিষেধ করবেন?’
প্রকৌশলী খাস্তগীরের উত্তর, ‘সব দিক দিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়ন করতে হবে। আর নিষেধ করি, মেয়রের চেয়ারে বসে জনগণের মতামতকে অবজ্ঞা করবেন না। একাই সব সিদ্ধান্ত নেবেন না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, শুধু নিজের এলাকার উন্নয়ন করবেন না। আর মহিউদ্দিন সাহেব যদি আবার মেয়র হন, তাহলে তিনি যেন বেশি বাণিজ্যকরণ না করেন। লালদিঘিতে সুইমিংপুল করার দরকার নাই।’
প্লাইউড-পারটেক্স ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান চৌধুরী (৫৪) বললেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী উগ্র, ১৫ বছর মেয়র ছিলেন, কী উন্নয়ন করেছেন?’ মঞ্জুর আলম সম্পর্কে বললেন, ‘তিনি অত্যন্ত সৎ ও বিনয়ী লোক। দক্ষ ব্যক্তিও বটে, ৬০টা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন দক্ষতার সঙ্গে।’ মোটর যন্ত্রাংশের ব্যবসায়ী মো. নাসিম (৬৪) বললেন, ‘মহিউদ্দিন রাগী লোক, কিন্তু রাগের দরকার আছে। মঞ্জুর আলম খারাপ না।’
রাফি (২০), জামশেদ (২১), জোসেফ (২২), সোহান (২২), রাকিব (২০), রিয়াজ (২২)—সবাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁদের সবার বক্তব্য প্রায় একই রকম: মহিউদ্দিন চৌধুরী অনেক প্রতিষ্ঠান করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। মেয়র হিসেবে যখন কাজ করেছেন, দলীয়ভাবে কিছু করেননি। বিএনপির আমলে যা করেছেন, আওয়ামী লীগের আমলেও তাই। তবে তিনি সিটি করপোরেশনের আয় বাড়ানোর জন্য সবকিছু বাণিজ্যকরণ করতে চাইছেন—এটা খারাপ। লালখান বাজারে অনেকগুলো খুব পুরোনো বটগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ভেঙে; খেলার মাঠ, পার্ক নষ্ট করে তিনি মার্কেট, আবাসিক প্রকল্প এসব করতে চান। এগুলো করা চলবে না। আর রাস্তাঘাটের বিশৃঙ্খলা, যানজট—এসব দিকে তাঁর নজর ছিল না। নগরে পাবলিক টয়লেট নেই বললেই চলে, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে না, মশার যন্ত্রণায় মানুষ অস্থির। শহরের মধ্যে দিনের বেলা ট্রাক চলাচল করে, পুলিশ নিজেই আইন ভঙ্গ করে রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি চালায়। ওয়ান-ওয়ে রাস্তাগুলো নামেই শুধু ওয়ান-ওয়ে, কেউ কিছু মানে না। মেয়েদের চলাফেরায় অসুবিধা, বখাটেরা তরুণীদের উত্ত্যক্ত করে, দিনের বেলায় মাদক সেবন চলে। ট্যাক্সি, সিএনজি অটোরিকশাগুলো মিটারে চলে না, বাড়তি ভাড়া নেয়।
ওই শিক্ষার্থীরা সবাই বললেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী আগে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। এখন তাঁর জনপ্রিয়তা অনেক কমে গেছে। তাঁরা আরও বলেন, মঞ্জুর আলম সম্পর্কে তাঁরা বেশি জানেন না। তবে তাঁর আচার-ব্যবহার ভালো। কিন্তু মেয়র হওয়ার জন্য তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, এটা ঠিক করেননি। বিএনপি যদি তাঁকে এতই ভালোবাসত, তাহলে সংসদ নির্বাচনে তারা তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি কেন?
ওই শিক্ষার্থীদের সবারই বক্তব্য, যিনি মেয়র হবেন, তিনি যেন লক্ষ রাখেন নগরের জনগণ কী চায়, কী চায় না। জনগণের মতামত নিয়েই সব কাজ করতে হবে। বেশির ভাগ মানুষ যেটা চাইবে না, সেটা করা চলবে না।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী ইশরাত বললেন, মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ এত বেশি যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে খোঁজখবর রাখার সময় হয় না বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর। তাঁরা জানেন না কোন প্রার্থীর কী অঙ্গীকার। তবে তাঁরা ভোট দেবেন। একই কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র শাহরিয়ারের বক্তব্যও অভিন্ন। অবশ্য রিজওয়ানা হক নামের পঞ্চম বর্ষেরই আরেক মেডিকেল শিক্ষার্থী বললেন অন্য কথা, নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বেশ খোঁজখবর রাখছেন, কোন প্রার্থীর কী বক্তব্য সেসব খেয়াল করছেন। কিন্তু তাঁদের দোষ-গুণ বা যোগ্যতা-অযোগ্যতা নিয়ে কিছু বলতে চাইলেন না তিনি।
এক বিপণিবিতানে কথা হলো তিনজন গৃহিণীর সঙ্গে। তাঁরা বিশেষ কিছু বলতে চান না। তাঁরা চান, মেয়র যে-ই হোক, নগরে শান্তিশৃঙ্খলা, চলাফেরায় নিরাপত্তা থাকুক (ছিনতাই খুব হচ্ছে, প্রবর্তকের মোড় নাকি এক ভয়ংকর জায়গা), যানজট দূর হোক। ভোট দেওয়ার আগে তাঁরা স্বামী বা পরিবারের মুরব্বিদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবেন, নাকি নিজের সিদ্ধান্তেই নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন—এই প্রশ্নে একজন বললেন, ‘আমার ভোট আমিই দিব। কারও সাথে আলাপ করার তো দরকার নাই।’ অন্য দুজন অবশ্য বললেন, তাঁরা স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করবেন, কাকে ভোট দিলে ভালো হয়।
কাকে ভোট দেবেন? এমন অনধিকারচর্চামূলক প্রশ্ন কাউকেই জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু পাঁচজন রিকশাচালক, তিনজন ভ্যানগাড়িচালক, দুজন বাদামবিক্রেতা, একজন ফলবিক্রেতা আমাকে বলেছেন, তাঁরা ভোট দেবেন মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। কেন? রিকশাওয়ালাদের উত্তর, মহিউদ্দিন মেয়র থাকলে রিকশার লাইসেন্স নিতে হবে না, রিকশায় হারিকেন লাগাতে হবে না, রাস্তার পাশে রিকশা নিয়ে দাঁড়ালে পুলিশ এসে তাড়িয়ে দেবে না। বাদামবিক্রেতা ও ফলবিক্রেতার বক্তব্য, মহিউদ্দিন তাঁদের ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করবেন না।
প্রশ্ন ছিল পাঁচ রকমের: ১. যাঁকে ভোট দিয়ে মেয়র বানাবেন, তাঁর কাছে আপনার দাবি কী? ২. মেয়রকে কী কী করতে নিষেধ করবেন? ৩. মহিউদ্দিন চৌধুরীর তিনটা গুণ আর তিনটা দোষ কী কী? ৪. মঞ্জুর আলমের তিনটা গুণ আর তিনটা দোষ কী কী? ৫. নির্বাচন কমিশন কি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে?
প্রশ্নগুলো করেছিলাম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মোট ৫০ জন ভোটারকে। তাঁদের বয়স ২০ থেকে ৬৫ বছর। নারী ১৫ জন, পুরুষ ৩৫। পেশা: রিকশাচালক (পাঁচজন), ভ্যানগাড়িচালক (তিনজন), বাদামবিক্রেতা (দুজন), ফলবিক্রেতা (একজন), হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী (একজন), গার্মেন্টস কোম্পানির মাইক্রোবাসচালক (একজন), ছাত্র (আটজন), ছাত্রী (পাঁচজন), ব্যবসায়ী (পাঁচজন), অবসরভোগী (তিনজন), দরজি (একজন), তৈরি পোশাক-কারখানার নারীকর্মী (পাঁচজন), গৃহবধূ (তিনজন), রেস্টুরেন্টের ওয়েটার (একজন), হোটেলের বাবুর্চি (একজন), মসজিদের বারান্দায় গল্পরত মুসল্লি (পাঁচজন)।
সব প্রশ্নের পুরো উত্তর অধিকাংশের কাছেই পাওয়া যায়নি। বিশেষত নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে কি না—এই প্রশ্নে দ্বিধান্বিত ছিলেন বেশির ভাগ উত্তরদাতা। শুধু একজন বলেছেন, নির্বাচন কমিশন মোটামুটি নিরপেক্ষ আছে। তবে কখনো কখনো তাঁর মনে হয়, আওয়ামী লীগের দিকে কমিশনের ‘ঝোঁক’ একটু বেশি। অবশ্য তিনি মনে করেন, এখনই বলা যাচ্ছে না, সামনের দিনগুলোতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও বেশি করে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
ওপরের প্রশ্নগুলোর বাইরে একটি বিষয়ে অনেক লোকের মন্তব্য লক্ষ করার মতো। তাঁরা মনে করেন, প্রার্থী কোন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন সেটা তাঁদের কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতাই প্রধান ব্যাপার। ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে নাকি রাজনৈতিক দলের কোনো ভূমিকাই নেই।
৪১টি ওয়ার্ডের ১৭ লাখ ভোটারের মধ্যে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পাওয়া মাত্র ৫০ জনের মতামত থেকে প্রকৃত পরিস্থিতির কিছুই হয়তো সত্যিকার অর্থে বোঝা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ভোটযুদ্ধের আরও অনেক নেপথ্য বিষয় থাকে। সেগুলোর সবই আছে এখানেও। মহিউদ্দিন চৌধুরী শেখ হাসিনার অনুমোদন পাওয়ার পর আওয়ামী লীগের ভেতরে কোন্দল কমেছে বলে অনেকেই বলছেন। কিন্তু বিএনপিতে সমস্যা আছে, দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মঞ্জুর আলমকে মনোনীত করলেও চট্টগ্রাম বিএনপির সব অংশই যে আন্তরিকভাবে তাঁর পক্ষে কাজ করছে—এমন কথা শোনা যাচ্ছে না। বরং তিনি নির্বাচনী অন্তর্ঘাতের শিকার হতে পারেন এমন আশঙ্কার কথাও শোনা যাচ্ছে। আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে মঞ্জুর আলমকে সমর্থন দেওয়ার পর কেউ কেউ বলছেন, এর ফলে মঞ্জুর আলম হয়তো জামায়াতের বিশ-পঁচিশ হাজার ভোট পাবেন, কিন্তু হারাবেন অন্তত পঞ্চাশ হাজার ভোটারকে, যাঁরা মহিউদ্দিন চৌধুরীর কিছু কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে একটা পরিবর্তনের জন্য মঞ্জুর আলমকে ভোট দিতেন। কিন্তু তাঁরা বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সখ্য পছন্দ করেন না বলে জামায়াত-প্রার্থীর মঞ্জুরকে সমর্থন করাটা মঞ্জুরের জন্য হতে পারে হিতে বিপরীত।
তবু এখানে অনেক মানুষের মুখেই শুনতে পাচ্ছি, আসন্ন নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মঞ্জুর আলমের মধ্যে খুব শক্ত লড়াই হবে।
চট্টগ্রাম, ৩ জুন, ২০১০
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

জীববৈচিত্র্যপূর্ণ একটি পৃথিবীই আমাদের স্বপ্ন



আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। আটত্রিশতমবারের মতো দিনটি পালন করতে যাচ্ছে পৃথিবীবাসী। ১৯৭৩ সালের আগে পরিবেশ নিয়ে দিবস পালন করার কথা কেউ ভাবেনি। এমনকি জাতিসংঘও না। মোটামুটি ২০০ বছর আগেও গাছপালা-নদী-বাতাস-মাটি-আবহাওয়া ও দূষণ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। আঠারো শতকের শিল্পবিপ্লব এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি—এ দুটো কারণে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়ে যায় অতিমাত্রায়। ফলে কোনো বাছবিচার না করেই প্রকৃতি থেকে সম্পদ আহরণের পর্ব চলতে থাকে। খুব বেশি দিন লাগেনি। শ-খানেক বছরের মধ্যে বিপদের আশঙ্কা টের পাওয়া যায়।
প্রথমে বিজ্ঞানীরা তথ্য-উপাত্ত জড় করে আসন্ন ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেন। শুরুতে কেউ বিশ্বাসই করতে চায়নি। ধীরে ধীরে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এবং হরেক রকম পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় টনক নড়ে। পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারক-রাষ্ট্রনায়ক পর্যায়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয় গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। একটা কিছু করতেই হবে এমন মনোভাব নিয়ে জাতিসংঘের উদ্যোগে ৫ থেকে ১৬ জুন ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোম শহরে অনুষ্ঠিত হয়, যা স্টকহোম সম্মেলন নামেই পরিচিত। পরিবেশ বিষয়ে এটিই প্রথম আয়োজিত বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলন থেকেই দুনিয়াজুড়ে পরিবেশ আন্দোলনের সূচনা হয়। সে বছরের ১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২১১২তম সভায় প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয় পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্টকহোম সম্মেলনের নীতিমালা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার। তার পর থেকে প্রতিবছর দুনিয়াজুড়ে জাতিসংঘের ‘পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি’ নামের সংগঠনটির উদ্যোগে পালন করা হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘Many Species. One Planet. One Future’। সুন্দর শব্দচয়নে বাংলা করা হয় ‘জীববৈচিত্র্যপূর্ণ একটি পৃথিবীই আমাদের স্বপ্ন’। রিও সম্মেলনে গৃহীত (বাংলাদেশও অন্যতম স্বাক্ষরকারী) সংজ্ঞা অনুসারে স্থল, সমুদ্র, জলভাগ প্রতিবেশসহ সব এলাকার জীবন্ত প্রাণী ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্যই হলো জীববৈচিত্র্য। ব্যাপক দূষণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার দরুন পরিবর্তিত জলবায়ুতে জীববৈচিত্র্য আজ বিপন্ন। কোটি কোটি বছর ধরে গড়ে ওঠা ভারসাম্যপূর্ণ জীববৈচিত্র্য মানুষের কৃতকর্মের কারণে ধ্বংসের মুখোমুখি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতি ২০ মিনিটে ধরণীর বুক থেকে চিরবিদায় নিচ্ছে কোনো না কোনো জীবপ্রজাতি। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে রেখে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে প্রচারণা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই বছরটিকে জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য বর্ষ’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে। সব ধরনের প্রাণিকুলের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ছাড়া এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের বসবাস অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাই আমাদের আজকের স্বপ্ন: ‘জীববৈচিত্র্যপূর্ণ একটি পৃথিবী’।
এ বছর স্বাগতিক শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে রুয়ান্ডা সিটি। ‘হাজার পাহাড়ের দেশ নামে খ্যাত পূর্ব আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার রাজধানী শহর। পাহাড়-পর্বতে ঘেরা সবুজ দেশটি সমৃদ্ধ পরিবেশগত সম্পদ দ্বারা। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিজ সম্পদও রয়েছে প্রচুর। প্রায় ৭৫০টি পাহাড়ি গরিলা আছে, যা বিশ্ব বিবেচনায় তৃতীয়। ১৫১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ৬৭০ প্রজাতির পাখির জীববৈচিত্র্য নিয়েই রুয়ান্ডা। নতুন করে গ্রহণ করেছে সবুজায়নের নীতিমালা। রুয়ান্ডা ইতিমধ্যে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছে। জ্বালানি সংগ্রহের জন্য সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, মিথেনগ্যাস প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রাকৃতিক বাদল বন (Rain Forest) সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্যই রুয়ান্ডা লাভ করেছে ২০১০ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের স্বাগতিক হওয়ার গৌরব। আর দেশটিও মেতে উঠেছে সবুজ আন্দোলনে।
বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত পৃথিবীতে মোটামুটি ৪৫ হাজার স্তন্যপায়ী, ১৫ হাজার সরীসৃপ ও উভচর, নয় হাজার পাখি ও ২১ হাজার মাছের প্রজাতি নথিভুক্ত করেছেন। এর মধ্যে গত ২০০ বছরে প্রায় দুই শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং এক শতাংশের বেশি পাখির প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে গেছে। একসময় সমৃদ্ধ আমাদের দেশেও জীববৈচিত্র্য আজ চরম হুমকির মুখে আছে। বাংলাদশে কম করে পাঁচ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, মাছসহ ৭০৮ প্রজাতির জলচর প্রাণী, ২২ প্রজাতির উভচর, ১০৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১১০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী জীব এবং ৩৮৮ প্রজাতির পাখি আছে। গত কয়েক বছরে আমাদের পরিবেশ থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে অনেক প্রজাতির জীবজন্তু ও উদ্ভিদ। ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট, বাংলাদেশের সমীক্ষা অনুসারে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিরূপ পরিবেশের কারণে ইতিমধ্যে ১৩ প্রজাতির প্রাণী আমরা হারিয়েছি। হুমকির মুখে আছে প্রায় ৮০০ প্রজাতি। হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর মধ্যে রায়েছে: ময়ূর, কুমির, নেকড়ে, বুনো মহিষ, নীলগাই ও গন্ডার। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ধীরে ধীরে আরও ১৫০ প্রজাতির প্রাণী যোগ দেবে হারিয়ে যাওয়ার মিছিলে।
জীববৈচিত্র্যের বিপন্নতার একটা কারণ কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই যেকোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রতিক্রিয়ার বিবরণ এবং পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। এগুলোর মাধ্যমে প্রকল্পটির কারণে পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিরূপণ করা সম্ভব। যদি কোনো পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জীববৈচিত্র্যসহ পরিবেশের ওপর অসমাধানযোগ্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে, তাহলে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ অনুসারে আমাদের দেশে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের জন্য পরিবেশের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং অবস্থা অনুযায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পগুলোকে সবুজ, কমলা-ক, কমলা-খ ও লাল—এই চার শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে কেবল লাল শ্রেণীর শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পগুলোর জন্যই পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুষ্ঠু সংরক্ষণের জন্য সব শ্রেণীর শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পগুলোর জন্যই পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় হয়তো কিছুটা বাড়বে। কিন্তু পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুষ্ঠু সংরক্ষণের বৃহত্তর স্বার্থে ওই বাড়তি ব্যয় আমাদের মেনে নেওয়াই উচিত। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
এই গ্রহের পরিবেশকে মানুষ ও প্রাণিজগতের জন্য বাসযোগ্য রাখতে কাজ করে যাওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখেই বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। অনাদিকাল থেকে আমাদের সবুজ গ্রহটি ছিল প্রাণিকুলের এক চমৎকার আবাস। দীর্ঘদিন একে অপরের পরিপূরক হয়ে পরম শান্তিতে বসবাস করেছে। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির ভারসাম্যের সীমা লঙ্ঘন করে চলেছে। এতে ক্রমশ এই পৃথিবী হয়ে উঠছে প্রাণিকুলের বসবাসের অযোগ্য। এখনই সতর্ক হওয়ার সময়। নতুবা চরম মূল্য দিতে হবে। সুতরাং জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা ছাড়া কোনো বিকল্প আমদের সামনে নেই।
ফায়জুল আজিম: বিচারক, ঢাকা বিভাগীয় পরিবেশ আদালত।
azimfowzul@yahoo.com

ঢাকায় জীবন ঝুঁকিপূর্ণ by জামিলুর রেজা চৌধুরী



বেগুনবাড়ির ভবন উপড়ে যাওয়ার ঘটনার পর এখন পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের থমকে দিয়েছে। এতগুলো মানুষের জীবন এত করুণভাবে চলে গেল, এত পরিবার স্বজন হারা হলো যে তা সহ্য করা কঠিন। খুবই দুঃখের ও শোকের ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনাগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যায় না। এর দায় কাউকে না কাউকে নিতে হবে।
প্রথম দায় যারা আইন অমান্য করে ভবন নির্মাণ করেছে তাদের। বেগুনবাড়িতে উপড়ে যাওয়া ভবনটি যেখানে ছিল, সেখানে তো কোনো ভবনই নির্মিত হওয়ার কথা নয়। জায়গাটি বর্জ্য পদার্থ ফেলে ফেলে ভরাট করা হচ্ছিল। এ রকম নাজুক জায়গায় বিধিমালা অনুসরণ না করে ভবন বানানো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। কেবল নির্মাণই নয়, ওই ভবনটির মালিক ওটাকে ওপরের দিকে বাড়িয়েও যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয়ত, সরকারের যেসব সংস্থার ওপর ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে, এটা তাদেরও ব্যর্থতা। তারা কেন দেখল না যে অনুমোদন ছাড়া ভবন তৈরি হচ্ছে? তারা যদি মনে করে, মানুষ তাদের কাছে অনুমতির জন্য নিজে থেকেই আসবে, তা ঠিক নয়। তাদের দায়িত্ব হলো, যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা পালন করা হচ্ছে কি না তা নজরদারি করা। তার জন্য তাদের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া ছিল। কিন্তু তারা সেটা প্রয়োগ করেনি। এসব ক্ষেত্রে আগাম ভবন নির্মাণ বন্ধ করা যায়। সে কারণেই এটা যতটা না দুর্ঘটনা তার থেকে বেশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা।
রাজধানীর ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের দিকটা দেখার জন্য রাজউক সৃষ্টি করা হয়েছিল। যখন এটা করা হয়েছিল তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ লাখ। কিন্তু এখন রাজধানীতে দেড় কোটির মতো লোকের বাস। ঢাকার আয়তন ও জটিলতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু রাজউকের জনবল কেন বাড়ানো হলো না?
এখন রাজউকের ওপর অনেক দায়িত্ব। তারা জমি ডেভেলপ করে বিক্রি করে, তারা রাস্তাঘাট বানায়, ফ্লাইওভার বানায়। এসব ক্ষেত্রে তারা হলো বাস্তবায়নকারী সংস্থা। অন্যদিকে রাজউকই হলো ভবন নির্মাণের বিধিমালা বাস্তবায়নের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। অর্থাৎ একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদের। এ বিষয়ে অনেক কমিটি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারকে অনেক সুপারিশও করা হয়েছে যে একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের কাজ করতে পারে না। টেলিফোন, জ্বালানিসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রে এ দুটো দায়িত্ব আলাদা সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। বারবার সুপারিশ করা হয়েছে যে রাজউককে কিছু দায়িত্ব থেকে মুক্ত করা হোক, যাতে তারা ভালোভাবে কাজ করতে পারে। রেগুলেটরি দায়িত্ব তথা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণসহ নজরদারির দায়িত্বটি অন্য কারও হাতে দেওয়া উচিত।
সিটি করপোরেশনেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, একই কাজের জন্য দুই সংস্থা থাকলে কার্যত কেউই দায়িত্ব নেয় না। এক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে বলে মনে হয়।
ঢাকার জনবসতি কমাতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুনের বিপদ বেশি থাকে এবং ক্ষয়ক্ষতিও বেশি হয়। পুরান ঢাকার ওই ভয়াবহ আগুনের বেলায়ও সেটাই দেখা গেছে। আবার সেখানেই দাহ্য পদার্থে ভরা শিল্প-কারখানা রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কোনো কঠিন কাজ না। কারণ এগুলোর জন্য তো অনুমতি লাগে। সেই অনুমতি তাদের কে দিল?
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেই এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে, ঢাকায় জীবনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে তাদের শোক মর্মান্তিক। অন্যদিকে এত বড় দুর্ঘটনার খবর তো বিশ্বে প্রচারিত হবে। তাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও তো সংকট হবে যে, সরকার কী করছে।
পুরান ঢাকার মতো সমগ্র ঢাকাই তীব্র ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। নতুন ঢাকাতেও তো গায়ে গায়ে লাগানো ভবন। জাপান গার্ডেন সিটির মতো নতুন স্থাপনায়ও তো আগুন লাগছে। গুলশান ও ধানমন্ডির অভিজাত এলাকা ছাড়া বাদবাকি ঢাকার অবস্থা দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারকে এখন সাধারণ ভবনমালিক থেকে শুরু করে ডেভেলপারদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বলা হয়, তারা অনেক শক্তিশালী। এটা কি কখনো হয় যে কোনো দেশের সরকার বলছে, তাদের চেয়ে প্রাইভেট সেক্টর বেশি শক্তিশালী, তারা কথা শোনে না? কারণটি এই, যারা ক্ষমতাবান ডেভেলপার তারা আবার রাজনীতিতেও ক্রিয়াশীল। রাজনীতির ওপর তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান। তারা অনেক শক্তিমান।
এসবের বিরুদ্ধে কেউ তো তেমন কথা বলছে না। ওসমানী উদ্যান আন্দোলন, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে নাগরিক সমাজের নানা অংশ সোচ্চার ছিল। তারপর সরকার কিছু লোকদেখানো কাজ করেছে। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধানের তেমন চেষ্টা কেউ করছে না। তাই আমরা বড় কোনো সাফল্যের মুখ দেখি না। মূলত সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। যে আইন আছে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যার দায়িত্ব হবে যত ভবন হবে তার মান নিয়ন্ত্রণ করা এবং তা পরিকল্পনামাফিক হচ্ছে কি না তা দেখা। এবং প্রতিষ্ঠানটি হবে বিকেন্দ্রীকৃত। বিভিন্ন স্থানে তাদের দপ্তর থাকবে। তারা সরেজমিনে ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার সম্পর্কে যে আইন আছে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করার জন্য যেসব নীতিমালা প্রণীত রয়েছে তা কার্যকর করবে।
জামিলুর রেজা চৌধুরী: প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ।

এক-নগরের দেশ হয়ে বাঁচবে বাংলাদেশ by আবুল মোমেন

প্রতিবার ঢাকায় গিয়ে বুঝি যে নগরটির গতি আরও মন্থর হয়েছে। কোথাও যেতে-আসতে দু-তিন ঘণ্টা চলে যায়। ফলে দিনে একটির বেশি কাজ করা কঠিন। খবর বেরিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ১০০টি করে নতুন গাড়ি ঢাকার রাস্তায় নামছে। তার মানে বছরে ৩৬ হাজার গাড়ি। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এক দিন ঢাকা শহর থেমে যাবে, এভাবে চললে সেদিনটি খুব দূরে নয়।
তা ছাড়া গ্রাম আর মফস্বল থেকে প্রতিদিন রাজধানী ঢাকায় শত-সহস্র নতুন মানুষ এসে ভিড় করছে। ঢাকা জনসংখ্যায় এবং নগর স্থাপনায় দ্রুত বর্ধনশীল একটি নগর। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষ এবং যথাযথ আইনকানুন থাকলেও মানুষের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, বেপরোয়া চাহিদার কাছে সবই অসহায় ও অকেজো হয়ে পড়ছে। গত ২০-৩০ বছরে এই বর্ধিষ্ণুতার খেসারত দিয়ে ঢাকা মোটামুটি একটি কংক্রিটের জঙ্গল বা বস্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। পূর্বাভাস আছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
ঢাকার ঘনায়মান বিপর্যয়ের কিছু লক্ষণ এখনই প্রকট হয়ে উঠেছে। এই নগরকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গাসহ সব কটি নদীর পানি মানুষ ও তার কর্মকাণ্ডের (যেমন—দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং শিল্পবর্জ্য ফেলা) ফলে সৃষ্ট বর্জ্যের কারণে ভয়ানকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। দূষণের ফলে পানিতে অক্সিজেন এত কমে গেছে যে কোনো প্রাণীর পক্ষে সেসব নদীতে বাঁচা সম্ভব নয়, জলজ প্রাণীর পক্ষেও নয়।
প্রশ্ন হলো, সব মানুষ ঢাকায় ছুটছে কেন? আর ঢাকায় যাঁরা একবার থাকছেন, তাঁরা ঢাকা ছাড়েন না কেন? এই প্রশ্ন দুটির উত্তরের মধ্যেই ঢাকার মৃত্যুপথযাত্রী নগরে পরিণত হওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।
আমি চট্টগ্রাম শহরে থাকি। এটি ’৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই এ অঞ্চলের দ্বিতীয় নগর। হাজার বছরের পুরোনো (বস্তুত দুই হাজার বছরের) বন্দরকে ঘিরে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে এটি দেশের ব্যতিক্রমী অনন্য গুরুত্বের এক নগর, আজকাল তোয়াজ করে বাণিজ্যিক রাজধানীও বলা হয়। কিন্তু দেশের এই দ্বিতীয় নগরটি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। মোটা দাগে বোঝার সুবিধার জন্য বলা যায়, স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত যদি ঢাকা-চট্টগ্রামের নাগরিকজীবনের সুযোগ-সুবিধা ও মানের অনুপাত হয় ৫৫-৪৫, তো এখন তা ৮০-২০-এ এসে ঠেকেছে। এর কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক তথা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রাপ্তির সঙ্গে যুক্ত সব সরকারি প্রধান দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত। অতীতে কাস্টমস, আমদানি-রপ্তানি, শিল্প-বাণিজ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ব্যক্তিদের দপ্তর, এমনকি কোনো কোনো দেশি-বিদেশি ব্যাংকের প্রধান দপ্তরও চট্টগ্রামেই ছিল। ফলে এখানে বসেই ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানা চালানো সম্ভব ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে ঢাকায়।
ক্ষমতা ও প্রভাবশালী নাগরিকদের যদি মোটা দাগে চারটি ভাগ করি, তা হবে আমলা ও পেশাজীবী, বণিক (শিল্পপতিসহ), রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী। তাঁরা স্বভাবতই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে চান আবার তাঁদের ঘিরে ক্ষমতার চক্র মজবুত ও প্রসারিত হয়। ফলে তাঁদের ঘিরে ঢাকায় ক্ষমতার মৌরসিপাট্টা তৈরি হয়েছে। এটা সর্বতোভাবে আমাদের দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করে। বিকাশ ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে সারা দেশের উৎসাহী মানুষ ঢাকাতেই ভিড় জমাচ্ছে। আর এভাবে বাংলাদেশ এক-নগরের শহরে পরিণত হয়েছে।
আজকে বাস্তবতাটা কেমন দাঁড়িয়েছে তা বোঝাতে প্রথমে চট্টগ্রাম থেকেই কয়েকটি উদাহরণ দেব।
সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলের অধিকাংশ বিদেশি কোম্পানির (অফিস এবং কারখানা) আস্তানা ছিল চট্টগ্রামে, কিন্তু স্বাধীনতার পর দিনে দিনে প্রশাসনের ঢাকাকেন্দ্রিকতার ফলে একে একে সব্বাই হয় সদর দপ্তর কিংবা সদর দপ্তর ও উৎপাদনব্যবস্থা সবটাই ঢাকায় সরিয়ে নিয়েছে। দেশীয় বড় বণিক-ধনিকেরাও বারবার চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতের ঝামেলা এড়াতে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে চট্টগ্রামের জনজীবনে তাঁদের অবদান কমে আসছে। আর এর পরিণতিতে শিল্প, সাহিত্য ও তরুণ-কিশোরদের সব সাংস্কৃতিক উদ্যোগ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্থবির হয়ে পড়ছে। তাতে নাগরিকজীবন হারাচ্ছে প্রাণবন্ততা ও হয়ে পড়ছে নির্জীব, স্থবির। বিকেন্দ্রীকরণের নামে বাংলাদেশ সরকারের যে দু-একটি অফিসের সদর দপ্তর চট্টগ্রামে রাখা/স্থানান্তরিত হয়েছে, সেগুলোতে দেখা যায় কর্তাব্যক্তিরা উচ্চতর সিদ্ধান্তের বাধ্যবাধকতার কথা বলে প্রতি সপ্তাহে তিন দিন, বড় জোর চার দিন চট্টগ্রামে কাটিয়ে বাকি তিন-চার দিন ঢাকায় থাকার ব্যবস্থা করে নেন।
ফলে ঘটনার বিপরীত একটি চিত্রও আমাদের জানা থাকা দরকার। ব্রিটিশ আমল থেকে আইন বা নিয়ম ছিল, খোঁজ নিয়ে জেনেছি সে নিয়ম এখনো আছে, সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে পরিবার নিয়ে থাকতে হবে। এভাবে পদস্থ শিক্ষিত পরিবারগুলোকে ঘিরেই আমাদের মফস্বল শহর, মহকুমা শহরগুলোতে একটি আলোকিত সমাজ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আজকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে যেকোনো স্তরের আমলা—জেলা প্রশাসক থেকে থানার দারোগা পর্যন্ত সবাই পরিবার রাখেন ঢাকায়।
প্রশ্ন করলে স্ত্রীর চাকরি, ছেলেমেয়ের উন্নত লেখাপড়া, বাবা-মায়ের চিকিৎসার অজুহাত তুলে দেন। এই অস্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা কীভাবে কাউকে দুর্নীতিতে, কাউকে অনীতির দিকে ঠেলে দেয়। ছোট-বড় আমলাদের হাতে একটি নগরকে প্রাণবন্ত করে তোলার যথেষ্ট সুযোগ ও ক্ষমতা থাকে, যদি তাঁরা তার সদ্ব্যবহার করেন। এভাবেই অতীতে ছোট ছোট শহরগুলোর সাংস্কৃতিক ও সমাজজীবন আলোকিত ও সার্থক হয়ে উঠেছিল। দু-একটি উদাহরণ দেব। বাংলা ভাষার প্রবাদপ্রতিম নাট্যকার-গীতিকার ডি এল রায় খুলনায় ডিএম থাকাকালে নাট্যদল করে শহরকে মাতিয়েছিলেন, সেই দল এই সেদিনও সক্রিয় ছিল। প্রশাসক আখতার হামিদ খান কুমিল্লায় এক মহৎ ও বড় কাজের সূচনা করেছিলেন, রংপুরে সে যুগে ঘূর্ণমান মঞ্চে নাটক হতো আর তুলসী লাহিড়ির মতো নাট্যব্যক্তিত্ব সেখানে থেকেই কাজ করেছেন, লেখক অন্নদাশংকর রায় চট্টগ্রামে এডিএম হিসেবে নিয়মিত সাহিত্যসভায় যোগ দেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে কাঙাল হরিনাথ (হরিনাথ মজুমদার) প্রকাশ করেছিলেন গ্রামবার্তা প্রকাশিকা—এ অঞ্চলের প্রথম সংবাদপত্র। শান্তিনিকেতন থেকে পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রী গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে এসেছিলেন চট্টগ্রামে, বললেন সুচক্রদণ্ডি গ্রামে যেতে হবে। একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেন? উত্তর—সে যে তীর্থস্থান। বিস্মিত প্রশ্ন—কেন, কীভাবে? তখন ক্ষিতিমোহন স্মিত হেসে বললেন, কারণ সেখানে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ থাকেন। অমর সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় বাস করেননি কখনো। বাংলা ভাষার বিখ্যাত সাহিত্যিক সতীনাথ ভাদুড়ী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন যথাক্রমে পাটনা ও লখনৌতে।
পাঞ্জাবি আমলা নিয়াজ মোহাম্মদ খান মহকুমা শাসক হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আর জেলা প্রশাসক হিসেবে চট্টগ্রামে স্টেডিয়াম বানিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে পুলিশের বড় কর্তা খালেক সাহেব পুলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাকিস্তান আমলে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মোকাম্মেল হক আর বাংলাদেশ আমলে ঔপন্যাসিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের মতো জেলা প্রশাসকদের সোৎসাহ পৃষ্ঠপোষকতায় চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিকজীবন ছিল প্রাণচঞ্চল, সজীব ও সার্থক। অন্যান্য জেলার ইতিহাসও একই রকম হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের দিকে তাকালেও দেখা যাবে পাকিস্তান আমলে বাঘা বাঘা রাজনীতিকেরা নিজ নিজ শহরে থেকে রাজনীতি করেই জাতীয় নেতা হয়েছেন। আমাদের চার জাতীয় নেতার মধ্যে তিনজনই—সৈয়দ নজরুল ময়মনসিংহে, কামরুজ্জামান রাজশাহীতে এবং মনসুর আলী পাবনায়—নিজ নিজ শহরে বাস করেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছেন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এভাবেই তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের শীর্ষ নেতা এবং সর্বোপরি জাতীয় নেতার মর্যাদা পেয়েছেন। আজকের দিনে কেবল ভোটের সময় নেতারা টাকার বান্ডিল নিয়ে এলাকায় আসেন। অন্য সময় ঢাকায় বসে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখা আর ক্ষমতার ভাগ নেওয়ায় ব্যস্ত থাকেন, এলাকা ও জনগণের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক থাকে না।
একসময় ঢাকা-চট্টগ্রাম ছাড়াও পূর্ব বাংলার কত শহরের আর্থিক সমৃদ্ধি ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের খবর আমরা পেতাম—নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, চাঁদপুর, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ এমনি কত নাম বলা যাবে।
অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দেশের সব মফস্বল শহর সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে মৃত্যুপথযাত্রী। সবখানে অভাব-অনটনের ছাপ, সামর্থ্যের দৈন্য, সম্পদের অভাব, পৃষ্ঠপোষকতার অনটন।
এর প্রত্যক্ষ এবং নগদ ফল হলো সব অঞ্চলের মেধাবী, প্রতিভাবান, দক্ষ, পারঙ্গম এবং স্বভাবত উচ্চাভিলাষী (এটা দোষের কিছু নয়) তরুণেরা নিজ নিজ এলাকার দৈন্যের মধ্যে থেকে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চায় না। সুযোগের জন্য ঢাকায় পাড়ি জমায়। আমাদের সাহিত্য, সংগীত, নাটক, ক্রীড়া, চলচ্চিত্র—সব ক্ষেত্রের গুণীজন ও তারকারা নিজ নিজ জেলা ছেড়ে ঢাকায় আস্তানা গাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এভাবে শহরগুলো নেতৃত্বহীন, অভিভাবকহীন, পৃষ্ঠপোষকতাহীন হয়ে সবাই মিলে অসহায় গতানুগতিক একঘেয়ে জীবনের ঘানি টানতে বাধ্য হচ্ছে। যাঁরা নিজ এলাকার ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে তরুণ বয়সে ঢাকা পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি, তাঁদের বেশির ভাগ জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে হতাশায় ও ক্ষোভে সিনিক্যাল হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ছোট হলেও জনসংখ্যা আমাদের বিশাল। ফলে সিঙ্গাপুরের মতো নগররাষ্ট্র হওয়ার উপায় আমাদের নেই, একই কারণে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের মতো এক-নগরের রাষ্ট্র হয়ে সমৃদ্ধি অর্জন বা সফল হওয়ার কোনো উপায় বা পথ নেই। সুদূর অতীতকাল থেকেই এখানে বিভিন্ন অঞ্চলে সমৃদ্ধ নগর গড়ে উঠেছিল—সোনারগাঁ, গৌড়, পাণ্ডুয়া, তাম্রলিপ্ত, কর্ণসুবর্ণ ইত্যাদি অনেক নাম বলা যায়। ফলে এই দেশ যদি আজকে এক-নগরের দেশে পরিণত হয়, তাহলে তা হবে অন্য সব নগর ও জনপদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-সমৃদ্ধিকে মূল্য হিসেবে গুনে। অর্থাৎ এভাবে ঢাকাও মরবে দেশও মরবে, যে প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
এ রকম হওয়াটা আমাদের জন্য স্বাভাবিক ছিল না। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের রাজধানীটি দেশের প্রায় কেন্দ্রে অবস্থিত, বেশির ভাগ দেশের মতো এক পাশে নয়। সুপরিকল্পিত দ্রুতগামী রেল-নেটওয়ার্ক তৈরি করে দেশের ৬৪টি জেলা শহরের মধ্যে ৪৮টিরই রাজধানীর সঙ্গে দুই ঘণ্টা বা তার কম সময়ের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। তাতে ঢাকায় ভিড় করে বসবাস না করে নিজ নিজ জেলা শহরে বাস করেই লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় কাজও করতে পারবে, অন্যান্য যোগাযোগও রাখতে পারবে। মুম্বাইতে প্রতিদিন ৬০ লাখ কর্মজীবী মানুষ এভাবে চলাচল করে থাকে। কলকাতার আশপাশে টাউনশিপ গড়ে তোলায় এখন খোদ কলকাতা শহরের জনসংখ্যা কমে গেছে, তার প্রভাব এতটাই হয়েছে যে ইদানীং কলকাতার লোকসভা ও বিধানসভার আসন কমাতে হয়েছে।
এ অবস্থায় রাজধানী ঢাকাকে মেরে সারা দেশকে মারার এ ব্যবস্থা আমরা কি চালিয়ে যাব, নাকি আমরা বাঁচতে চাই? বাঁচার যে সহজ সুযোগ আছে, সেগুলো কি আমরা গ্রহণ করব? যদি বাঁচতে চাই তাহলে তিনটি কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে হবে—১. ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য শহর-শহরতলির দ্রুতগামী রেল-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা। ২. সব সরকারি কর্মকর্তার নিজ নিজ কর্মস্থলে বসবাসের আইন/নিয়ম প্রয়োগ করা এবং ৩. আজকের উন্নত ই-যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে ক্ষমতা ও প্রশাসনকে যথার্থই বিকেন্দ্রকরণ করা।
সর্বত্র ভালো স্কুল, ভালো হাসপাতাল, ভালো চিকিৎসক চাই বলে ধুয়া তুললে চলবে না। মানুষ বসতি শুরু করলে নিজ প্রয়োজন ও তাগিদেই সেসব তৈরি করে নেবে, অতীতে যেমন করেছে। সরকারের কাজ হবে সহযোগিতা দেওয়া। অতীতে তো সব সেবামূলক ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সেভাবেই হয়েছিল। এভাবে দেশের অন্যান্য নগরও যথার্থ নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ হবে। মানুষ না থাকলে উন্নয়ন কীভাবে হবে?
>>>আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

জাতীয় শিক্ষানীতি -বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন গোটা জাতির জন্য একটি আশাজাগানিয়া ঘটনা। বিলম্বে হলেও একটি সময়োপযোগী, প্রাগ্রসর ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ৩৯ বছরে বহু শিক্ষা কমিশন ও কমিটি গঠন এবং প্রতিবেদন তৈরি হলেও কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান শিক্ষানীতির ভাগ্যে তা ঘটবে না বলেই প্রত্যাশা।
অতীতে প্রায় প্রতিটি সরকার পূর্ববর্তী শিক্ষানীতি নির্বিচারে বাতিল করে দিয়ে নতুন কিছু করার মহড়া চালাত। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা প্রণয়ন কমিটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরির সময় অতীতের সব শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে। বিশেষ করে ড. কুদরাত-এ-খুদা ও শামসুল হক কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণীত হয় বলে জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদেরা। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করা, প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলিক বিষয়ে অভিন্ন পাঠ্যক্রম, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়ানো ছিল সময়ের দাবি। আদিবাসী শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ স্টাডিজ অন্তর্ভুক্তিও কম সাহসের কথা নয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সরকারের পরিবর্তন হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষানীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় মতৈক্য থাকা প্রয়োজন। এবার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে সর্বস্তরে ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতে। সরকারি ওয়েবসাইট ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় শিক্ষানীতি চূড়ান্ত অনুমোদনকালে যথাসম্ভব সেসব পরামর্শ আমলে নেওয়া হয়েছে। খসড়া প্রতিবেদনে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা থাকলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সেই শব্দ পরিহার করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা পুনঃস্থাপন করা হয়। একে অনেকে আপসবাদী মনোভাবের প্রকাশ মনে করলেও জাতীয় মতৈক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন নিয়ে কালক্ষেপণ কাম্য নয়। সংসদে জাতীয় শিক্ষানীতি বিল পাস করে যত দ্রুত সম্ভব, এর বাস্তবায়নকাজ শুরু করে দিতে হবে। ভালো নীতি হওয়াই যথেষ্ট নয়, কত দিনে ও কতটা সুচারুভাবে তা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক ভালো নীতি দেশ ও জনগণের কল্যাণে আসেনি সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। দলীয় সংকীর্ণতা যেন এই মহৎ উদ্যোগকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে না পারে, খেয়াল রাখতে হবে সেদিকেও।

এ মৃত্যুর জবাব কী -পরিকল্পিত নগরায়ণ না হলে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে

বেগুনবাড়িতে পাঁচতলা ভবন উপড়ে ২৫ জনের মৃত্যুর পরপরই পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীর জীবন যে কত তুচ্ছ, সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। ঘরে-বাইরে নিয়ত এখানে মৃত্যু হানা দেয়। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে একটি ভবনে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন লাগে এবং মুহূর্তে তা পাশের ভবনগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। সরু গলি ও পাশাপাশি ভবন থাকার কারণে সেখানকার বাসিন্দারা আটকা পড়েন। ভবনগুলো পরিণত হয় মৃত্যুকূপে। রাত নয়টার দিকে আগুন লাগলেও দমকল বাহিনী রাত ১২টার আগে তা নেভাতে সক্ষম হয়নি। পুলিশ এ পর্যন্ত ১২০টি লাশ উদ্ধার করেছে।
এ মৃত্যুর জন্য কারা দায়ী? দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও তার কুশীলবেরা। তাঁদের মধ্যে যেমন বাড়ির মালিক আছেন, তেমনি আছেন রাজউকের কর্মকর্তা, আছেন ডিসিসির কর্তাব্যক্তিরাও। এত সরু রাস্তার পাশে কীভাবে বহুতল ভবন গড়ে উঠল? কারা গড়লেন? কীভাবে রাজউক গায়ে গায়ে লাগা ভবন নির্মাণের অনুমতি দিল? একটি ভবন নির্মাণ করতে হলে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। সেখানকার বাড়ির মালিকেরা কি তা মেনেছিলেন? না মানলে রাজউক কীভাবে অনুমতি দিল? বিনা অনুমতিতে বাড়ি নির্মাণ করলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিতে হবে। এভাবে বেঘোরে মানুষ মারা যাবে, তা মেনে নেওয়া যায় না।
নিমতলীতে আগুনে পুড়ে যে অসহায় নারী-পুরুষ ও শিশু মারা গেছে, তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা জানাই গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা। এই মর্মবিদারক ঘটনা কেবল শোকসন্তপ্ত পরিবারকেই শোকাহত করেনি, ব্যথিত করেছে গোটা দেশবাসীকে। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সরকার আজ শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমিয়েছে দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে। কিন্তু তা স্বজনহারাদের কান্না থামাতে পারবে কি?
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে কমিটি গঠিত হলেও তার প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখবে কি না, সে ব্যাপারে সংশয় আছে। প্রতিবারই দুর্ঘটনার পর প্রশাসনে কিছুটা নড়াচড়া লক্ষ করা যায়। তারপর সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে। এবারে তেমনটি হবে না বলে আশা করি। যাঁদের ‘সামান্য ভুলে’ এ অসামান্য ক্ষতি হলো, তাঁদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে। আর কত দুর্ঘটনার শিকার হবে সাধারণ মানুষ? মানবসৃষ্ট এ বিপর্যয় রোধে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। মহানগরে যেসব অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো অবিলম্বে ভেঙে ফেলতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ও অসহায় মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকবে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না। ভবিষ্যতে যাতে কেউ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যত্রতত্র অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ না করতে পারে, সে ব্যাপারে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে তার আগে অবশ্যই সরষের ভেতরে যে ভূত আছে, তা তাড়ানো জরুরি।

পিয়ংইয়ংকে নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিন

উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি মিউং বাক। গতকাল শুক্রবার সিঙ্গাপুরে একটি নিরাপত্তা সম্মেলনে তিনি আহ্বান জানান। এদিকে উত্তর কোরিয়া গতকাল হুমকি দিয়েছে, জাতিসংঘে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে এর কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও নির্বাহী কার্যালয় ব্লু হাউস থেকে জানানো হয়, সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট লি কোরীয় উপদ্বীপের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা নিয়ে ছয় জাতির আলোচনায় পিয়ংইয়ংকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
লি বলেন, পরমাণু অস্ত্রের জোরে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে টিকে থাকার যে ধারণা, তা থেকে উত্তর কোরিয়াকে বের করে আনার উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও অংশ নিতে হবে।

নভেম্বরে ভারত সফর করবেন বারাক ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আগামী নভেম্বরে ভারত সফর করবেন। গত বৃহস্পতিবার ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ শেষে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ওবামা এ ঘোষণা দেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা পারস্পরিক স্বার্থ ও বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আইনের শাসন জোরদারের ব্যাপারেও তাঁরা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
দুই দেশের সংলাপে আফগানিস্তান, নিরাপত্তা ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক সংযোগ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। হিলারি ক্লিনটন বলেন, কেবল চুক্তি করার ক্ষেত্র তৈরি না করে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সন্দেহ দূর করতে হবে।
এস এম কৃষ্ণা বলেন, দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে আরও অনেক কিছু করতে হবে। দেশ দুটি জ্বালানি, কৃষি, উচ্চপ্রযুক্তি ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলোতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। সংলাপ শেষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ওবামা বলেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে নভেম্বরের শুরুতে ভারত সফর করব। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আমাকে এ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।’
ওবামার ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া সফর বাতিল
অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আসন্ন সফর বাতিল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ১৩ জুন ওবামার সপ্তাহব্যাপী এ সফর শুরু হওয়ার কথা ছিল।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস জানান, যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা উপকূলের কাছে মেক্সিকো উপসাগরে তেল উপচে পড়ার ঘটনাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামাল দিতেই ওবামার এ সিদ্ধান্ত।

জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন নাওতো কান

জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপানের (ডিপিজে) নেতা নাওতো কান। গতকাল শুক্রবার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে তিনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৯৭ ভোট বেশি পেয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। আগামী সপ্তাহে সম্রাট আকিহিতো নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
৪৮০ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে ৪৭৭ ভোট পড়ে। এর মধ্যে নাওতো কানের পক্ষে পড়ে ৩১৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান বিরোধী দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রধান সাদাকাজু তানিগাকি পেয়েছেন ১১৬ ভোট। বাকি ভোটগুলো পান ছোট কয়েকটি দলের প্রার্থীরা। নির্বাচনের কিছুক্ষণ পরে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ কাউন্সিলর পরিষদ কানকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেয়।
এর আগে নিজ দলের সাংসদদের ভোটে ডিপিজের প্রধান নির্বাচিত হন নাওতো কান। অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দলের পরিবেশবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান শিনজি তারুতোকো তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে নাওতো কানের পক্ষে ২৯১ এবং শিনজির পক্ষে ১২৯ ভোট পড়ে।
ডিপিজের প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পর নাওতো কান বলেন, ‘আমার প্রথম কাজ হবে দেশের পুনর্গঠন ও আমাদের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি দলের সদস্যদের মধ্যে “আমরা পারি”এ বিশ্বাস দৃঢ় করা।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মূল ভিত্তি অটুট থাকবে। তবে ওকিনাওয়া দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটির ব্যাপারে তাঁর অবস্থান কী হবে, তা উল্লেখ করেননি কান।
দেশের অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাপানের অর্থনীতি গত ২০ বছর থেকে একই অবস্থায় রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বন্ধ রয়েছে। তরুণেরা চাকরি পাচ্ছে না। নীতিনির্ধারকদের ভুল নীতিমালার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমরা একই সময়ে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা অর্জন করতে পারি।’ তিনি সরকারি বিশাল ঋণ কমিয়ে আনার ব্যাপারেও অঙ্গীকার করেন।
দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই মুহূর্তে নিজেদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি রোডম্যাপ নিশ্চিত করাই নতুন নেতৃত্বের ডিপিজের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এর আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইউকিয়ো হাতোইয়ামা তাঁর মন্ত্রিসভাসহ আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। পরে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। নাওতো কানের নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাপান গত চার বছরে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পেল।
গত সেপ্টেম্বরে ডিপিজে ক্ষমতায় এলে নাওতো কান উপপ্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। পাশাপাশি তাঁকে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ব্যুরোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক মন্দার প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও নেন তিনি।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইউকিয়ো হাতোইয়ামা গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে দেশটির ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ওই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসায় কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে গত বুধবার তিনি পদত্যাগ করেন।

আগ্নেয়গিরির ছাই শনাক্ত করতে বিমানে রাডার

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে সৃষ্ট ছাইয়ের মেঘের কারণে যাতে আর বিমান অচল না হয়, সে জন্য এক নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে যাচ্ছে কম খরচের এয়ারলাইন ‘ইজিজেট’। দূর থেকেই ছাইয়ের মেঘ শনাক্ত করার জন্য তারা বিমানে রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করবে।
সম্প্রতি আইসল্যান্ডের এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে আকাশে ছড়িয়ে পড়া ছাইয়ে ইউরোপজুড়ে বিমান চলাচলে নজিরবিহীন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। মহাদেশজুড়ে প্রায় এক সপ্তাহ বিমান চলাচল বন্ধ ছিল।
বিমানে স্থাপিত এই রাডার বিমানের সামনে ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকা এবং পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ৫০ হাজার ফুট উচ্চতার মধ্যে ছাইয়ের মেঘ শনাক্ত করতে পারবে। রাডারে ধারণ করা চিত্র একই সঙ্গে দেখতে পাবে বিমানের পাইলট এবং নিচের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। ফলে পাইলট ছাইয়ের মেঘ এড়িয়ে বিমান চালাতে পারবেন।
এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে এয়ারবর্ন ভলকানিক অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার অ্যান্ড ডিটেক্টর (এভিওআইডি বা অ্যাভয়েড)। নরওয়ের ইনস্টিটিউট ফর এয়ার রিসার্চের ফ্রেড প্রাটা এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন।
ইজিজেটের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি হ্যারিসন বলেন, ‘এই রাডারের মাধ্যমে বিমান ছাইয়ের মেঘ শনাক্ত এবং তা এড়িয়ে চলতে সক্ষম হবে।

সৌদি প্রিন্স ও খ্রিষ্টানদের অপহরণের আহবান আল-কায়েদার

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা সৌদি আরবের প্রিন্স, মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও খ্রিষ্টান নাগরিকদের অপহরণ করার জন্য এর সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আল-কায়েদার নিহত এক জঙ্গির স্ত্রীকে কারাগার থেকে ছেড়ে দিতে সৌদি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সংগঠনটি এ আহ্বান জানায়। গত বহস্পতিবার একটি অডিও বার্তায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ কথা বলা হয়েছে।
বার্তায় আল-কায়েদার ইয়েমেন শাখার নেতা সাঈদ আল শিহির জানান, ধর্মপ্রচারক হায়লা আল কাসায়েরকে রিয়াদের উত্তরে কাসিম নগর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি সৌদি আল-কায়েদার একজন সদস্যের বিধবা স্ত্রী। ওই আল-কায়েদা সদস্য ছয় বছর আগে রিয়াদের উত্তরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে নিহত হন। বিবৃতিতে আল-কায়েদা যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, কারাগার থেকে আমাদের বন্দীকে মুক্ত করতে সৌদি রাজপরিবারের সদস্য অপহরণ করতে হবে।

৮৯-এর বিক্ষোভ দমনে মরতেও প্রস্তুত ছিলেন লি পেং!

চীনের তিয়েন-আনমেন স্কোয়ারে ছাত্রবিক্ষোভ দমনে তখনকার প্রেসিডেন্ট লি পেং নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। হংকংভিত্তিক পত্রিকা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট গতকাল শুক্রবার একটি অপ্রকাশিত বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। লি-র লেখা বিভিন্ন ডায়েরি থেকে এ বইটি লেখা হয়েছে।
১৯৮৯ সালে রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে গণতন্ত্রের দাবিতে ব্যাপক ছাত্রবিক্ষোভ হয়। সেনা সদস্যরা গুলি চালিয়ে এ বিক্ষোভ দমন করেন। এতে শ শ মানুষ নিহত হয়।
ছাত্রবিক্ষোভ দমনে প্রধানমন্ত্রী লি পেং কঠোর অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন। ‘বেইজিংয়ের কসাই’খ্যাত এই নেতা তখন বলেছিলেন, ‘বিক্ষোভের শুরু থেকেই এর ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে আমি প্রস্তুত ছিলাম।’
পত্রিকাটি বইটির বরাত দিয়ে জানায়, লি পেং বলেছিলেন, ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে চীনকে রক্ষায় প্রয়োজনে আমি নিজের জীবন ও আমার পরিবারকে বিসর্জন দেব।’
সামরিক আইন জারি করে ছাত্রবিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যে অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তা এসব ডায়রিতে উল্লেখ রয়েছে। বিক্ষোভ দমনে সামরিক আইন জারি করায় প্রধানমন্ত্রী লি কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ৮১ বছর বয়সী লি বর্তমানে অসুস্থ।
পত্রিকাটি জানায়, ২২ জুন ‘লি পেং’স জুন ৪ ডায়েরি নামে বইটি প্রকাশ করা হবে। ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত লেখা লি পেংয়ের বিভিন্ন ডায়েরি থেকে বইটি লেখা হয়েছে।
বইটির প্রকাশক বাও পু বলেছেন, বইটি নিয়ে কয়েক মাস গবেষণা করা হয়েছে। এখানে ভুল তথ্য থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।

মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে কাসাবের আপিল

ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া পাকিস্তানি সন্ত্রাসী আজমল আমির কাসাব রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর পক্ষে আইনি বিতর্কে লড়ার জন্য তিনি একজন আইনজীবী চেয়ে আবেদন করেন। খবর পিটিআইয়ের।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কাসাব কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টে এই আপিল করেন। আইনজীবীর জন্য তিনি আবেদন করেন কোর্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস কমিটির (এইচসিএলএসসি) কাছে। এইচসিএলএসসি এখন এ আবেদন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জে এন প্যাটেলের কাছে পেশ করবে।
হাইকোর্টের যে বেঞ্চে কাসাবের আপিলের শুনানি হবে, সেখানে তাঁর উপস্থিত থাকার অধিকার আছে। কাসাব এখন আর্থার রোড কারাগারে আছেন। সেখান থেকে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে তাঁকে আদালতে নিয়ে আসা হবে।
কর্মকর্তারা জানান, মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের জন্য কাসাবকে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়। তিনি ৩০ দিনের মধ্যে এই আপিল করেন। তাঁর আপিলের আবেদন এরই মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে। গত ৩ মে কাসাবকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করেন। এরপর তাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
এর আগে বিচার চলাকালে আইনজীবী নিয়োগে কাসাব অপারগতা প্রকাশ করলে বিনা মূল্যে তাঁকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। ওই সময় আব্বাস কাজমি ও কেপি পাওয়ার নামের দুজন আইনজীবী নিয়োগ করেন বিচারক এম এল তাহালিয়ানি। পরে অসহযোগিতার অভিযোগে আদালত কাজমিকে সরিয়ে নেন। পাওয়ার শেষ পর্যন্ত কাসাবকে আইনি সহায়তা দেন।

মিয়ানমার পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে

মিয়ানমার তার অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে পরমাণু অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে সহযোগিতা করছে উত্তর কোরিয়া। মিয়ানমার থেকে গোপনে নিয়ে আসা কিছু নথিপত্র ও ছবিতে এমন আভাস পাওয়া গেছে। সে দেশের একজন দলত্যাগী সেনা কর্মকর্তা এসব নথি ও ছবি গোপনে সরিয়ে নিয়ে আসেন। গতকাল শুক্রবার নরওয়ে ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা জানা যায়। পাঁচ বছর ধরে সমীক্ষা চালানোর পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় বলে সংস্থাটির দাবি।
মিয়ানমার তার পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিতে উত্তর কোরিয়ার সহায়তা নিচ্ছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সিনেটর জিম ওয়েব তাঁর মিয়ানমার সফর স্থগিত করেন। সিনেটে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাসংক্রান্ত বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান ওয়েব। মিয়ানমারের পরমাণু কর্মসূচিবিষয়ক তথ্যের ব্যাপারে তিনি ওই দেশের স্বপক্ষত্যাগী সেনা কর্মকর্তার কথা উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলত্যাগী ওই সেনা কর্মকর্তার নাম সেই থিন উইন। প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রকৌশল হিসেবে তিনি মিয়ানমারে প্রশিক্ষণ নেন। পরে রাশিয়া গিয়ে একজন ক্ষেপণাস্ত্রবিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মিয়ানমারের গোপন পরমাণু স্থাপনায় যাতায়াতের সুযোগ হয় তাঁর। থিন উইন মিয়ানমারের পরমাণু কর্মসূচিকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে নিয়োজিত একটি সামরিক কারাখানার উপ-অধিনায়ক ছিলেন। তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তারা সত্যিই পরমাণু বোমা তৈরি করতে চায়। এটাই তাদের মূল লক্ষ্য।’
থিন উইন গোপনে এমন কিছু নথিপত্র সরিয়ে আনেন, যার মধ্যে পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। রয়েছে এ সংক্রান্ত বেশ কিছু ছবিও। এ ছাড়া পরমাণু চুল্লি তৈরিতে যেসব সরঞ্জাম লাগে, সেসবের ছবিও রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরমাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেলেও পরমাণু অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে মিয়ানমার এখনো অনেক দূরে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সাবেক পরিচালক রবার্ট কেলি এসব নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করে বলেন, মিয়ানমার সম্ভবত ইউরেনিয়াম আহরণ করছে এবং এমন পরমাণু প্রযুক্তি খুঁজছে, যার মাধ্যমে অস্ত্র তৈরি করা যায়।

প্রচণ্ড চাপে বামফ্রন্ট সরকার নির্বাচন এগিয়ে আনার দাবি



একের পর এক নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার এখন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। ১৯৭৭ সালের জুন মাসে ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম বামফ্রন্টকে এই রাজ্যে বিরোধী আসনে বসার কথা ভাবতে হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো এই অবস্থায় বিধানসভা নির্বাচন এগিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে। আগামী বছর মে মাসের মধ্যে এই নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
২০০৮ সালের পঞ্চায়েত (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচনে বামফ্রন্টের চেয়ে এগিয়ে যায় তৃণমূল। সংকেত পাওয়া যায় ৩২ বছরের বাম জমানার অবসানের। এরপর ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে গো-হারা হারে বামফ্রন্ট। এবার সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে বামফ্রন্ট তাদের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। বরং তৃণমূল তার একক শক্তিতে অনেকটাই বলীয়ান।
পৌর নির্বাচনে নিজ দলের বিপুল বিজয়ের পর কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এই সরকার ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। জনগণ এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং, এই সরকারের অবিলম্বে ক্ষমতা ছেড়ে নতুন করে জনগণের রায় নেওয়া উচিত। এই দাবিতে একইভাবে সোচ্চার হয়েছে কংগ্রেসও। তারাও মনে করে ৩৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট সরকারের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে।
রাজ্য কংগ্রেসের নেতারা ভাবতে পারেননি, মমতার দল এককভাবে এতটা সফল হবে। দলের নেতারা বুঝেছেন, তৃণমূলের সঙ্গে জোট ভেঙে কংগ্রেস ভুল করেছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে হটাতে মমতার বিকল্প নেই। এই উপলব্ধি থেকেই কংগ্রেস ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, যে ২৮টি পৌরসভায় ঝুলন্ত অবস্থা তৈরি হয়েছে, সেখানে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস যৌথভাবে বোর্ড গঠন করবে।
এদিকে কংগ্রেসের নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় পৌরসভার নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের দায় স্বীকার করে প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। ইস্তফাপত্র পৌঁছানো হয়েছে দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে। এ ব্যাপারে সোনিয়া অবশ্য এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
অন্যদিকে বামফ্রন্টকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসতে যে কংগ্রেসের সাহায্যের প্রয়োজন, এ কথাটি আবার নতুন করে বুঝতে পেরেছেন মমতাও। তাই মমতাও এখন নতুন করে কংগ্রেসের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, আর এই দুই দলের মধ্যে তিক্ততা নয়। কাজ করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে।
এদিকে বামফ্রন্টের অনেক মন্ত্রীও চাইছেন, এখন জনগণের রায় মেনে নিয়ে বিধানসভা ভেঙে আগাম নির্বাচন ঘোষণা করা হোক।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনবে তুরস্

ত্রাণবাহী নৌবহরে ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় তুরস্কের সরকার বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হতে পারে। এদিকে অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে র‌্যাচেল কোরি নামে আরেকটি জাহাজ গত বৃহস্পতিবার গাজার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। ত্রাণকর্মীরা আশা করছেন, বাধা দেওয়া না হলে আজ শনিবার সকালে এটি গাজা উপকূলে পৌঁছাবে।
তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত আরিঙ্ক তুরস্কভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিকে বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছি আমরা। তবে তৃতীয় একটি দেশের কারণে এক মুহূর্তে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা আমাদের দেশের রীতি নয়।’ সে দেশের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুলও বলেছেন, ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্ক কখনোই আর আগের মতো হবে না। নৌবহরে হামলার পরপরই ইসরায়েল থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে তুরস্ক।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সংবাদমাধ্যম সিএনএনে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ত্রাণবাহী নৌবহরে হামলায় প্রাণহানির ঘটনা দুঃখজনক। কিন্তু এ ঘটনাকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিপ্রক্রিয়া আবার শুরু করার একটি নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন পরোক্ষ শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী জর্জ মিশেল গতকাল ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে বুধবার তিনি ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় গাজা অবরোধ ও ত্রাণবাহী নৌবহরে হামলার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। কর্মকর্তারা জানান, নেতানিয়াহু গাজায় আরোপিত অবরোধ পর্যালোচনার কথা ভাবছেন।
গত সোমবার গাজাবাসীর জন্য ত্রাণবাহী নৌবহরে সহিংস হামলার পর এই ত্রাণ কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তারা ঘোষণা দেন, তাঁরা ইসরায়েলের হুমকিতে দমবেন না, আবারও গাজায় ত্রাণ পাঠানোর চেষ্টা করবেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ত্রাণবাহী জাহাজ র‌্যাচেল কোরি বৃহস্পতিবার গাজার পথে রওনা দেয়। জাহাজে শিশুদের জন্য লেখাপড়ার উপকরণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সিমেন্ট রয়েছে। জাহাজের ১১ জন সাহায্যকর্মীর মধ্যে ছয়জন ব্রিটিশ ও আইরিশ এবং পাঁচজন মালয়েশীয়। এদের মধ্যে রয়েছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিক মেইরিড ম্যাগুইর ও জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব ডেনিস হ্যালিডে। সোমবারের নৌবহরের সঙ্গেই র‌্যাচেল কোরির রওনা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু জাহাজটি নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেনি।
রওনা দেওয়ার পর গতকাল শুক্রবার এই ত্রাণ কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তা সংগঠন ফ্রি গাজা মুভমেন্টের অদ্রে বোমস বলেছিলেন, তাঁরা জাহাজটির সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের ধারণা, ইসরায়েল জাহাজের যোগাযোগব্যবস্থা ‘স্যাবোটাজ’ করেছে। অবশ্য পরে এই উদ্যোগের সহযোগী সংস্থা আয়ারল্যান্ড প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইনের মার্টিন ও’কুইগলে জানান, গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় তাঁরা জাহাজের সাহায্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। র‌্যাচেল কোরি ইসরায়েলের উপকূল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েল অবশ্য আগেই ঘোষণা দিয়েছে যে তারা র‌্যাচেল কোরিকে গাজায় পৌঁছাতে বাধা দেবে। সে দেশের সংবাদবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়াইনেট প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বরাত দিয়ে বলেছে, ‘আমরা র‌্যাচেল কোরিকে আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাব এবং নিরাপত্তা তল্লাশির পর ত্রাণসামগ্রী গাজায় পাঠানোর ব্যবস্থা করব।’
মার্কিন ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ফিলিপ ক্রউলি বৃহস্পতিবার বলেছেন, গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহরে ইসরায়েলি হামলায় তুর্কি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ফুরকান দোগানের (১৯) মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র। ত্রাণবাহী নৌবহরে ইসরায়েলের কমান্ডোদের হামলায় কমপক্ষে নয়জন নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগ তুর্কি। হামলার পর ইসরায়েল ছয়টি জাহাজ ও ত্রাণকর্মীদের আটক করে।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জটিল হয়ে উঠছে

ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রেখে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জটিল হয়ে উঠছে। ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মুসলিম বিশ্বের জন্য নতুন বার্তা ঘোষণা করেছিলেন। ২০০৯ সালের ৪ জুন ঐতিহাসিক কায়রো বক্তৃতায় মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সম্পর্ক বিনির্মাণের ঘোষণা দেন তিনি। কায়রো বক্তৃতার এক বছর গড়ালেও ওয়াশিংটনের নীতিতে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। চলতি সপ্তাহে গাজা অভিমুখী ত্রাণবহরে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপন নিয়ে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক টানাহেঁচড়া চলছে। ত্রাণবহরে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের পরও ওবামা প্রশাসন ইসরায়েলের স্বার্থ থেকে পৃথক অবস্থান প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে। ইসরায়েলকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অনিচ্ছুক না অক্ষম, এ নিয়ে এখন সংশয় সর্বত্র।
আহরাম সেন্টার ফর পলিটিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমাদ গ্যাড বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক নিয়ে এখন দুটি মতই বিরাজমান। এক পক্ষের মতে, প্রেসিডেন্ট ওবামা চাইলেও ইসরায়েলের সঙ্গে অজনপ্রিয় সম্পর্কের নাটকীয় কোনো পরিবর্তন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। অন্য পক্ষের মতে, কায়রো বক্তৃতায় বারাক ওবামা মুসলিম বিশ্বের প্রতি সম্পর্কোন্নয়নের আন্তরিক ঘোষণাই দিয়েছিলেন। এ পক্ষটি এখনো বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্পর্কোন্নয়নের এই চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
প্যারিসভিত্তিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এন্টইন বেসবাউস বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা সত্ত্বেও বহির্বিশ্ব ওয়াশিংটনকে ইসরায়েলের ধর্মপিতা মনে করে।
গাজার জন্য ত্রাণবহরে ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ডের পর ফুঁসে ওঠা মুসলিম বিশ্বের ক্ষোভ প্রশমনে ওয়াশিংটনের উদ্যোগ লক্ষণীয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে এ-সংক্রান্ত বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। পুরো ঘটনার আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে গ্রহণযোগ্য তদন্তের জন্য ইসরায়েলকে চাপ দেওয়া হয়েছে। যদিও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি চুক্তির অপরিহার্য পূর্বশর্ত পালনের জন্য ইসরায়েলকে বাধ্য করানো যায়নি। ওবামা প্রশাসন ফিলিস্তিনে নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধ করতে পারেনি।
উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে আসছেন। বৈঠক করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি-প্রক্রিয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওবামা প্রশাসনের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, হোয়াইট হাউস থেকে ইসরায়েলকে ফরাসি প্রস্তাব অনুযায়ী নৌবহরে হামলার ঘটনা তদন্ত করার জন্য বলা হচ্ছে। ফরাসি প্রস্তাবে রেডক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির তত্ত্বাবধানে তদন্তের কথা বলা হয়েছে। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক আরব বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জটিল হয়ে উঠেছে। তুরস্ক এ পরিস্থিতির আর অবনতি দেখতে চায় না বলে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছে।
গাজায় সম্প্রতি ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক এবং ভারসাম্যমূলক। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। যদিও এমন ঘটনার খবর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের জানা ছিল। ওয়াশিংটন থেকে ইসরায়েলকে আক্রমণাত্মক না হওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল। তার পরও ইসরায়েলি তৎপরতার ওপর যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কোন্নয়নে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কটি এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের বোঝা ঝেড়ে ফেলা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্য ক্রমশ দুরূহ হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট গত শুক্রবারের প্রতিবেদনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে লিখেছে, ইসরায়েল তাদের পদক্ষেপে নিজেদের স্বার্থই দেখছে, উপেক্ষিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ। ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আরও দায়িত্বশীল এবং বিশ্বস্ত হওয়ার জন্য ওবামা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রুনির বালিশ-রহস্য

শেষতক ‘ঘুম নেই’ বলে নিজের যন্ত্রণার কথা জানিয়েছিলেন কর্তাব্যক্তিদের কাছে। ভেড়ার পাল গোনার পন্থাটা হয়তো প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। হয়তো ঢুঁ মেরেছিলেন বিশেষজ্ঞের আস্তানায়। লাভের লাভ কিছুই হয়নি। ‘ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি’ গানটা তো বেচারা ওয়েইন রুনির জানার কথা নয়! না হলে এই গানটা তাঁর কানের কাছে বাজানো যেত। কিংবা ভয় দেখানো যেত রাক্ষস-খোক্কসের গল্প শুনিয়ে! বাংলা না জানার যে কত বিপদ! ওয়েবসাইট।
তবে মুশকিল থাকলে আসানও থাকে। রুনি এখন দিব্যি ঘুমাচ্ছেন। কেমন করে? খেলার পাতায় স্বাস্থ্যপাতার একটা তথ্য জেনে নিন এবেলা। রুনির মতো এমন নির্ঘুম রাত কাটানো মানুষদের দুর্ভোগ লাঘবে সুরেলা এক বালিশই উদ্ভাবন করে ফেলেছে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠান! ছোট ছোট স্পিকার জুড়ে দেওয়া আছে সেই বালিশে। চাইলে যেকোনো সময় নিজের পছন্দের গানটা শোনার ব্যবস্থা আছে তাতে। আছে আইপড ও রেডিও শোনার সুবিধাও। আর তাই রুনি যেখানেই যাচ্ছেন বালিশটাকে বগলদাবা করতে ভুলছেন না মোটেও। তার প্রমাণ গত পরশু দক্ষিণ আফ্রিকায় বিমান থেকে নামার সময়ও পাওয়া গেছে। কোলের সন্তানের মতো রুনি পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে আছেন একটা সাদা বালিশ!
সুরেলা বালিশের প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি জেমি মরিউসেফ জানিয়েছেন, ‘ওয়েইনের সমস্যার কথা শুনে সুরেলা বালিশটি তাঁকে দিয়েছিলাম আমরা।’ বিমানবন্দরে রুনির ওই বালিশ দেখেছে সারা বিশ্ব। এই ফাঁকে মুফতে নিজেদের একটা জম্পেশ বিজ্ঞাপনও হয়ে গেছে মরিউসেফদের। আর বালিশটির দাম কত জানেন? মোটে ২০ পাউন্ড, বাংলাদেশি টাকায় দুই হাজারের মতো।
আপনারও কি ‘ঘুম নেই’?

দুঙ্গা এবং ‘অন্যায়’ চাপ

সাফল্য তিনি কম পাননি, কিন্তু ব্রাজিলের খেলার সৌন্দর্য ধ্বংস করার দায়ে শুরু থেকেই সমালোচকদের ‘প্রিয়’ লক্ষ্যবস্তু কার্লোস দুঙ্গা। এমন এক দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন যাদের কাছে দ্বিতীয় হওয়া মানেই চরম ব্যর্থতা। আবার শুধু জিতলেও চলবে না, খেলতে হবে মন ভারানো ফুটবল। গত চার বছরে ‘চাপ’ জিনিসটার আদ্যান্ত জানা হয়ে গেছে দুঙ্গার। বিশ্বকাপেও চাপটা ব্রাজিলের সঙ্গী থাকবে, এটা স্বীকার করেই দুঙ্গা চাপটাকেই বলছেন ‘অন্যায়।’
‘চাপটা স্বাভাবিক। মাঠে নামলেই জিততে হবে—এটাই ব্রাজিলিয়ান মানসিকতা। আগে যা হয়েছে, তা পেছনে ফেলতে হবে। এই চাপটা স্বাভাবিক, কিন্তু অন্যায়’—বৃহস্পতিবার র‌্যান্ডবার্গে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন দুঙ্গা। যাঁদের কাছে এই মনোবেদনার কথা বলেছেন, সেই সাংবাদিকদের ওপরই দুঙ্গার ক্ষোভটা সবচেয়ে বেশি, ‘এখানেই ব্রাজিলের অন্তত ৩০০ সাংবাদিক আছে, যারা চায় আমরা শিরোপা না জিতি, যাতে তারা বলতে পারে “আমাদের কথাই সত্যি—দুঙ্গা কোপা আমেরিকা ও কনফেডারেশনস কাপ জিতেছিল ভাগ্যের ছোঁয়ায়।” সত্যি বলতে শুধু আমার কাছে নয়, প্রতিটি কোচের কাছেই তারা এমন দাবি করে।’
এই চাপ দুঙ্গার কপালে ভাঁজ ফেললেও ব্রাজিল কোচকে দুশ্চিন্তা থেকে কিছুটা মুক্তি দিয়েছেন হুলিও সিজার ও কাকা। বুধবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছেড়েছিলেন গোলরক্ষক সিজার, কিন্তু চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন আঘাতটা গুরুতর নয়। গতকালই আবার অনুশীলন শুরু করার কথা ছিল দলের মূল গোলরক্ষকের। অন্যদিকে, ইনজুরি থেকে ফেরার পর অনুশীলনে কাকার পারফরম্যান্সে মন ভরছিল না দুঙ্গার। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এক অর্ধ খেলা কাকার খেলা মনে ধরেছে কোচের, ‘প্রথম অনুশীলনে সে মনে হয় নিজেকে নিয়ে একটু উদ্বিগ্ন ছিল, খুব বেশি কিছু করতে চাইছিল। তবে ধীরে ধীরে সে উন্নতি করছে।’
সংবাদ সম্মেলনের পর যা করতে হয়েছে, তাতে অবশ্য খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয় দুঙ্গার। গত বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা মনে রেখে এবার সাধারণ দর্শক তো বটেই, সংবাদকর্মীদের জন্যও ব্রাজিলের অনুশীলনে প্রবেশ নিষিদ্ধ। জার্মানি বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের অনুশীলন দেখার জন্যও টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, পুরো ব্যাপারটাতেই ছাপ ছিল যেন অতি আত্মবিশ্বাসের। গতবারের ব্যর্থতার ফলে এবার তাই উল্টো পথে দুঙ্গা, স্রেফ যে মাঠে ব্রাজিল অনুশীলন করছে সেই র‌্যান্ডবার্গ হাইস্কুলের গুটিকয় ছাত্রছাত্রী দেখতে পাচ্ছে অনুশীলন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সোয়েটের ডোবসোনভিলে স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের অনুশীলন ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। বিশ্বকাপের প্রতিটি দলের জন্যই অন্তত একটি অনুশীলন সেশন উন্মুক্ত করে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে ফিফা। সুযোগ পেয়ে কাকা-ফ্যাবিয়ানোদের অনুশীলন দেখতে ভিড় জমিয়েছিল হাজার দশেক দর্শক। তবে দুঙ্গা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সুযোগ এটাই প্রথম ও শেষ।
ব্রাজিল কোচ আপাতত তাকিয়ে আছেন প্রস্তুতি ম্যাচগুলোর দিকে। বুধবার হারারেতে জিম্বাবুয়েকে ৩-০ গোলে হারানো ব্রাজিল আগামী পরশু আরেকটি ম্যাচ খেলবে তাঞ্জানিয়ার বিপক্ষে, দার এস সালামে। খুব বেশি শক্তিশালী না হওয়া সত্ত্বেও এই দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিল তাদের দেশে গিয়ে খেলছে উচ্চতা আর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। জিম্বাবুয়ে ম্যাচের পরই মিডফিল্ডার এলানো বলেছিলেন, ‘প্রস্তুতি ম্যাচের ফলাফল কোনো ব্যাপার নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো ভালো খেলা, নিজেদের মানিয়ে নেওয়া।’ আর দুঙ্গা বলেছিলেন, ‘আমরা অনেক কিছু শিখেছি।’ তাঞ্জানিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও বড় ব্যবধানে জেতা নয়, দুঙ্গার মূল লক্ষ্য অভিজ্ঞতা অর্জন। দক্ষিণ আফ্রিকায় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে এই অভিজ্ঞতাটুকুই।

প্রথম দিনে দু দলই সমানে সমান



দেশ থেকে একটাও ভালো খবর আসছে না। একদিন ভবন হেলে পড়ার খবর তো আরেক দিন ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ। পুরান ঢাকার নবাব কাটরায় ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ছুঁয়ে গেছে ইংল্যান্ড সফররত ক্রিকেটারদেরও। শোকের প্রতীক হিসেবে কাল ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টে বাংলাদেশ দল খেলতে নেমেছে হাতে কালো কাপড় বেঁধে।
শোক নাকি শক্তিরও উৎস কখনো কখনো। কাল যেন সেই শক্তিটাই খুঁজে পেল সাকিব আল হাসানের দল! দেশে যখন রাষ্ট্রীয় শোকের ঘোষণা, ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশ দল কাটাল বলার মতো একটা দিন। টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে দিনশেষে ৫ উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ডের রান ২৭৫। আলোকস্বল্পতায় ৭ ওভার আগে শেষ হওয়া ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টের প্রথম দিনে তো সমান সমানেই লড়ল বাংলাদেশ!
একাদশ ঠিক করা নিয়ে অনেক রকম সমীকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট শুরুর আগে। তিন পেসার না দুই পেসার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই তামিম ইকবালকে নিয়ে অনিশ্চয়তা। পরশু রাতে চিকিৎসককে দেখানোর আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি তামিম খেলবেনই না! শেষমেশ লর্ডসের মতো এখানেও ইনজুরি-জয়, চিকিৎসক খেলার ছাড়পত্র দিলেন বাঁহাতি এই ওপেনারকে। দলে যে পরিবর্তনটা এসেছে, সেটা তাই তামিমের কারণে নয়। রবিউল আর রুবেলকে বসিয়ে শফিউল আর রাজ্জাককে খেলানোর পরিকল্পনা ছিল আগে থেকেই।
ইংল্যান্ডের মাটিতে মাত্র দুই পেসার নিয়ে টেস্ট খেলতে নামাটা বোকামি হয়ে গেল কি না, আরও এগোলেই বোঝা যাবে সেটা। তবে প্রথম দিনেই পায়ের মাংসপেশিতে টান পড়ে শফিউলের মাঠের বাইরে চলে যাওয়াটা কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে দল নির্বাচনকে। ইনিংসের ৪২তম ওভারে ফিল্ডিং করতে গিয়ে ব্যথা পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুটা সময় বাংলাদেশ এক পেসারের দল হয়েই থাকল। পাঁচ দিনের ম্যাচে যে যেকোনো সময় যে কারও, বিশেষ করে পেসারদের ইনজুরিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে, একাদশ বানানোর সময় টিম ম্যানেজমেন্ট হয়তো সেটা ভুলেই গিয়েছিল! শেষ পর্যন্ত শফিউল মাঠে ফেরায় আপাতত রক্ষা।
এর আগে পেস আক্রমণ শুরুটাও খারাপ করেনি একেবারে। চার ওভারে ২৬ রান দিয়ে ফেলায় শাহাদাতের প্রথম স্পেল ওখানেই বন্ধ করে দিতে হলেও শফিউল তাঁর প্রথম স্পেলে টানা ৯ ওভার বল করেছেন, ১৮ রানে নিয়েছেন অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস আর লর্ডস টেস্টের ডাবল সেঞ্চুরিয়ান জোনাথন ট্রটের উইকেট দুটি। ৪৮ রানে ২ উইকেট হারানো ইংল্যান্ডকে পরের ধাক্কা দুটি দিয়েছেন দুই স্পিনার। দলের ৮৩ রানে রাজ্জাকের বলে অ্যালিস্টার কুক প্রথম স্লিপে জুনায়েদের ক্যাচ হলে ৩ উইকেটে ৯২ রান নিয়ে লাঞ্চে যেতে হয় ইংল্যান্ডকে। ২১৫ রানে চা-বিরতিতে যাওয়ার আগে ইংল্যান্ডের উইকেট পড়েছে আর একটিই, সেটিও গেছে আরেক স্পিনারের দখলে। তবে বোলারের নাম সাকিব আল হাসান আর ব্যাটসম্যান কেভিন পিটারসেন হওয়াতে এই উইকেটটা বিশেষ কিছুই।
বাঁহাতি স্পিনারদের বিপক্ষে কেভিন পিটারসেনের ব্যাটিং দেখার মতো। তেড়েফুঁড়ে ব্যাট চালানো বা ঝোড়ো গতিতে রান তোলা—সবই যেন ভুলে যান তখন! পরিসংখ্যানও এখানে তাঁর দুর্বলতার কথাই বলে। গত দুই বছরে পিটারসেন ১৬ বার আউট হয়েছেন বাঁহাতি স্পিনারের বলে। বাংলাদেশের বিপক্ষে কালকের আগে খেলা তিন টেস্টে তিনবার আউট হয়েছেন সাকিবের বলে, একবার তাঁর উইকেট নিয়েছেন রাজ্জাক। এ ছাড়া ওয়ানডেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সাত ম্যাচ খেলে যে পাঁচ ইনিংস ব্যাট করেছেন, পাঁচবারই কোনো না কোনো বাঁহাতি স্পিনারের শিকার তিনি! রাজ্জাক একাই আউট করেছেন তিনবার, বাকি দুবার প্রয়াত মানজারুল ইসলাম ও সাকিব আল হাসান। মুশফিকুর রহিমের স্টাম্পিংয়ে সাকিব কাল আরও একবার পেলেন পিটারসেনের উইকেট। তবে আউট হওয়ার আগে পিটারসেনও যেন শেষ দেখে নিতে চাইলেন মহাশত্রু হয়ে ওঠা বাঁহাতি স্পিনকে। ৬৪ রানের ইনিংসে সাত বাউন্ডারির পাঁচটিই স্পিনারদের বলে, একমাত্র ছক্কাটিও। পিটারসেনের উইকেট নেওয়ার পর কাল সে কারণেই কি বেশি তৃপ্ত মনে হলো সাকিবকে?
ধাক্কা খেয়ে শুরু হলেও চতুর্থ উইকেটে পিটারসেনের সঙ্গে ৭০ রান ও পরের উইকেটে এউইন মরগানের সঙ্গে আরেকটি ৭০ রানের জুটিতে ইংল্যান্ড ইনিংসের চালিকাশক্তি হয়ে আছেন ইয়ান বেল। ষষ্ঠ উইকেটে ম্যাট প্রিয়রের সঙ্গে ৫২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি, দিনশেষে নিজে ৮৭ রানে অপরাজিত—দলকে সুন্দর দ্বিতীয় দিনের সম্ভাবনাই দেখাচ্ছেন বেল। তবে তিনি এ জন্য ধন্যবাদ দিতে পারেন বাংলাদেশের উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিমকে। ব্যক্তিগত ৩৬ রানের সময় সাকিবের বলে বেলের ক্যাচটা যদি গ্লাভসে পুরতে পারতেন মুশফিকুর, দিনশেষে বাংলাদেশের হাসিটা হতে পারত আরও বিস্তৃত।

বেকেনবাওয়ারের ইতিহাস

১৯৮৪ সালে ফিফা ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের জন্য ইতালিকে মনোনীত করে। বিশ্বকাপ আয়োজনে ইতালির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে সময়ের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য ব্যাপার বিবেচনা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে উঠেছিল বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম দাবিদার। ১৯৮০ সালে অলিম্পিক গেমস আয়োজনের অভিজ্ঞতা থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের আবেদন করে। ১৯৮৪ সালের ১৯ মে ফিফা কংগ্রেসে এক ভোটাভুটিতে ১১-৫ ব্যবধানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতালির কাছে হেরে যায়। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যতম শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যাপারস্যাপার বিশ্বকাপ আয়োজনে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কাজ করে। এর আগে ইতালি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ’৯০-এর বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য আবেদন করে ইংল্যান্ড, গ্রিস ও ফ্রান্স। পরে ইংল্যান্ড, গ্রিস ও ফ্রান্স বিশ্বকাপ আয়োজনের লড়াই থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলে ইতালি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ভোটাভুটি হয়।
তবে ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপকে খেলার মান ও দর্শকদের উপভোগের দিক দিয়ে নিকৃষ্টতম বিশ্বকাপ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ’৯০-এর বিশ্বকাপেই সবচেয়ে কম গোল হয়েছে, দলগুলোর মধ্যে দেখা গেছে অসম্ভব বাজে রকমের রক্ষণাত্মক মানসিকতা এবং ছিল লাল-হলুদ কার্ডের ছড়াছড়ি। সব মিলিয়ে দর্শকেরা একেবারেই এ বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারেনি।
আগেই বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে এর আগে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের মতো গোল-খরা আর কখনই দেখেনি বিশ্ব। সেমিফাইনালে ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলো উঠলেও দুটি সেমিফাইনালই নিষ্পত্তি হয়েছে টাইব্রেকারে। ফাইনালে আর্জেন্টিনার পীড়াদায়ক রক্ষণাত্মক ফুটবল সবার মধ্যে বিরক্তিরই উদ্রেক করেছিল। বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও বিতর্কিত রেফারিং ইতালি বিশ্বকাপকে করেছিল কলুষিত।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা আজও ভুলে যেতে পারেনি মেক্সিকোর রেফারি কোডেশাল মেন্ডেজের সেই বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি। যেই পেনাল্টি গোলেই আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে পশ্চিম জার্মানি জয় করে ’৯০-এর বিশ্বকাপের শিরোপা।
পুরো ’৯০-এর বিশ্বকাপ দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের অভাবে ম্রিয়মাণ থাকলেও এ প্রতিযোগিতায় আশ্চর্য ব্যতিক্রম ছিল লোথার ম্যাথিয়াস, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান আর রুডি ফোলারের জার্মানি। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের কোচিংয়ে জার্মানি ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে দারুণ গতিশীল ও ছকবদ্ধ ফুটবল উপহার দেয়। ’৯০-এর বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ে জার্মানির মতো সংঘবদ্ধ আর কোনো দলকেই মনে হয়নি।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা প্রতিযোগিতা উদ্বোধনী ম্যাচেই ১-০ গোলে হেরে যায় আফ্রিকার প্রতিনিধি ক্যামেরুনের কাছে। ’৯০-এর বিশ্বকাপের বিস্ময় ক্যামেরুন এই প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে সবাইকে চমকে দেয়। কোয়ার্টার ফাইনালে বিতর্কিত রেফারিংয়ের শিকার না হলে তাদের সেমিফাইনালেই দেখা যেত। সেই ম্যাচে দুবার এগিয়ে গিয়েও রেফারির দেওয়া দুটি পেনাল্টি গোলে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায় ক্যামেরুন।
স্বাগতিক ইতালি শক্তিশালী দল নিয়ে মোটামুটি ভালোভাবেই সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এক গোলে এগিয়ে গেলেও পরবর্তীকালে গোল খেয়ে টাইব্রেকারে হেরে যায়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে অবশ্য ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতালি ’৯০-এর বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ অবশ্য স্মরণীয় হয়ে আছে কয়েকজন খেলোয়াড়ের অনন্য নৈপুণ্যের কারণে। প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নিয়মিত গোলরক্ষক পম্পিডোর হাত ভেঙে গেলে পুরো বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনার গোলবার আগলান তরুণ গোলরক্ষক সার্জিও গয়কোচিয়া। পরে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে দুটো করে পেনাল্টি ঠেকিয়ে গয়কোচিয়া আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যান ফাইনালে। আরেক আর্জেন্টাইন ক্লদিও ক্যানিজিয়া ছিলেন ’৯০-এর বিশ্বকাপের উজ্জ্বল নক্ষত্র। দ্বিতীয় রাউন্ডে একমাত্র সফল আক্রমণ থেকে ম্যারাডোনার বাড়ানো বলে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি সুযোগ সন্ধানী গোলের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন ক্যানিজিয়া। সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সমতাসূচক গোলটিও আসে তাঁরই পা থেকে। ইতালির রবার্তো ব্যাজ্জিও ’৯০-এর বিশ্বকাপে নিজেকে ইতালি দলের অন্যতম ভরসায় পরিণত করেন। একই দলের গোলরক্ষক ওয়াল্টার জেঙ্গা পুরো বিশ্বকাপে গোল হজম করেছিলেন মাত্র দুটি। বিশ্বকাপে দীর্ঘসময় অপরাজিত থাকার অনন্য রেকর্ডটিও তাঁর। আরেক ‘আজ্জুরি’ পাওলো মালদিনি এ বিশ্বকাপেই প্রমাণ করে দেন, ইতালির ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হওয়ার সব গুণাবলি তাঁর রয়েছে। আফ্রিকার ‘অদম্য সিংহ’ ক্যামেরুনের ৩৮ বছর বয়স্ক রজার মিলা সঠিক সময়ে চারটি গোল করে দলের সাফল্যে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন। গোল করার পর কর্নার পতাকার কাছে গিয়ে কোমর দুলিয়ে তাঁর অনন্য নৃত্য আজও মনে রেখেছেন ফুটবলামোদীরা। জার্মানির ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান, গোলরক্ষক বেডে ইলগনার, যুগোস্লাভিয়ার ড্রাগন স্টইকোভিচ, চেকোস্লোভাকিয়ার আন্দ্রে স্কুরভি, রুমানিয়ার জর্জ হ্যাজি, ক্যামেরুনের ওমাম বিইক, কানা বিইক, ম্যাকানাকি, ইংল্যান্ডের পল গ্যাসকোয়েন, ডেভিড প্ল্যাট প্রমুখ খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার কারণেই স্মরণীয় হয়ে আছে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের দুজন ‘ফ্লপ’ তারকাও ছিলেন। তাঁরা হলেন নেদারল্যান্ডের রুড খুলিত ও মার্কো ভ্যান বাস্তেন। ১৯৮৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়ন নেদারল্যান্ডের এই দুই তারকাকে নিয়ে বিশ্বকাপের আগ থেকেই অনেক আলোচনা হয়। অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেন, এই দুই তারকার ওপর ভর করেই নেদারল্যান্ড বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে। কিন্তু আদতে পুরো বিশ্বকাপেই খুলিতের একমাত্র কাজ ছিল, মাথাভর্তি অদ্ভুত-দর্শন চুল নাচিয়ে মাঠময় দৌড়িয়ে বেড়ানো আর বাস্তেন বিশ্বকাপে কেন যেন ছিলেন একেবারই নিষ্প্রভ। অথচ এ দুজনকেই নেদারল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা বলা হয়ে থাকে। খুলিত ও বাস্তেন ছাড়াও রোনাল্ড কোয়েম্যান, রাইকার্ডের নেদারল্যান্ড ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল নিয়ে খেলতে এলেও ’৯০-এর বিশ্বকাপে কিছুই করতে পারেনি। তবে রাইকার্ডকে মনে রাখতে হবে অন্য একটি কারণে। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচে রাইকার্ড জার্মানির রুডি ফোলারের সঙ্গে এক ‘থুথু ছোড়াছুড়ি’ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ দুজন দুজনের দিকে রীতিমতো গলা খাঁকারি দিয়ে থুথু ছুড়তে থাকেন। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে এ ঘটনাটি। খেলায় আন্দ্রেস ব্রেইমে ও ক্লিন্সম্যানের দেওয়া দুই গোলে জার্মানি ২-১ গোলে নেদারল্যান্ডকে পরাজিত করে।
এত কথার ভিড়ে হারিয়েই গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এসে যায় ডিয়েগো ম্যারাডোনার নাম। পায়ের পাতায় ইনজুরি নিয়ে পুরো বিশ্বকাপে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ম্যারাডোনা। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের বিপক্ষে চমত্কারভাবে ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে গোলের জন্য বল বানিয়ে দেন ম্যারাডোনা। সেদিন সেই ম্যাচে ওই একবারই ম্যারাডোনা ব্রাজিলীয় রক্ষণভাগের পাহারা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন স্বমহিমায়। একটি বলকেই নিশ্চিত গোলের সুযোগে পরিণত করেন ম্যারাডোনা। ক্যানিজিয়ার সেই গোলটিতেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় ব্রাজিলের।
ফাইনালে মেক্সিকান রেফারি কোডেশাল মেন্ডেজের পেনাল্টি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হলুদ কার্ডের খড়গ পড়ে তাঁর ওপর। ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর ফিফা সভাপতি জোয়াও হ্যাভালাঞ্জের সঙ্গে হাত না মিলিয়ে সবাইকে অবাক করে দেয়। এর পরেই ম্যারাডোনার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার দৃশ্য আজও দাগ কাটে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তদের মনে।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানি ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার খেলাটিকে বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফাইনাল হিসেবে অভিহিত করা হয়। হলুদ কার্ডজনিত কারণে আর্জেন্টিনার পক্ষে সেদিন খেলতে পারেননি ’৯০-এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মূল গোল মেশিন হিসেবে পরিচিত ক্লদিও ক্যানিজিয়া। সে কারণেই হয়তো আর্জেন্টাইন কোচ কার্লোস বিলার্দো পুরো ম্যাচেই রক্ষণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেন। পুরো খেলায় আর্জেন্টিনার কমপক্ষে আটজন খেলোয়াড় দৃষ্টিকটুভাবে রক্ষণসীমানায় দাঁড়িয়ে থেকে জার্মান আক্রমণ ঠেকাতে থাকেন। গোটা ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে একটি আক্রমণও করতে দেখা যায়নি, যার মাধ্যমে গোল হতে পারত। খেলা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে একটি জার্মান আক্রমণ থেকে বিদ্যুত্গতিতে আর্জেন্টিনার বক্সে বল নিয়ে ঢুকে যেতে থাকেন ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান। আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার রবার্তো সেনসিনি ক্লিন্সম্যানকে বাধা দেন। এ সময় ক্লিন্সম্যান ডাইভ দিয়ে পেনাল্টি বক্সের মধ্যে পড়ে গেলে মেক্সিকান রেফারি কোডেশাল মেন্ডেজ পেনাল্টির নির্দেশ দেন। পেনাল্টি থেকে গোল করেন জার্মানির আন্দ্রেস ব্রেইমে। ম্যাচে আর্জেন্টিনা লাল কার্ডজনিত কারণে শেষ পাঁচ মিনিট খেলে নয়জন খেলোয়াড় নিয়ে।
শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষকদের ধারণামতো বিশ্বকাপের শিরোপা ওঠে জার্মানির হাতে। কিন্তু ফাইনালে রেফারির বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিছুটা হলেও কালিমালিপ্ত করে জার্মানির এ সাফল্য। লোথার ম্যাথিয়াস তৃতীয় জার্মান অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপের ট্রফিতে চুমু খান। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের পর কোচ হিসেবেও বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য গৌরবের অধিকারী হন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।

রহমতগঞ্জের জয়

জয় দিয়ে বাংলাদেশ লিগ শেষ করল রহমতগঞ্জ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে কাল পাশবনের হ্যাটট্রিকে তারা হারিয়েছে চট্টগ্রাম আবাহনীকে (৫-১)। দুই গোল করেছেন ইদ্রিস। চট্টগ্রাম আবাহনীর গোলদাতা তারেক। ২৪ খেলায় ২৬ পয়েন্ট নিয়ে সপ্তম রহমতগঞ্জ। ২১ পয়েন্ট নিয়ে চট্টগ্রাম আবাহনী এগারোতম। আজকের খেলা: বিয়ানীবাজার-মুক্তিযোদ্ধা (বিকেল ৩-৩০ মি., সিলেট স্টেডিয়াম)।

হোয়াইটওয়াশ উইন্ডিজ



শেষ ওভারে প্রয়োজন ৭ রান। কাইরন পোলার্ডের প্রথম বলেই চার মারলেন রোয়েলফ ফন ডার মারউই। পরের বলে এল এক রান। শেষ চার বলে দরকার ৩ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আশা জাগাল ওই সিঙ্গেলটিই, স্ট্রাইক পেলেন যে ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান লোনওয়াবো সোসোবে! ফিল্ডারদের কাছাকাছি নিয়ে এলেন ক্রিস গেইল, পরের বলে কোনো রানও হলো না। কিন্তু চতুর্থ বলেই চার মেরে দক্ষিণ আফ্রিকাকে জয় এনে দিলেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথম ব্যাট হাতে নেওয়া সোসোবে। ৫-০ তে হোয়াইটওয়াশ হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাম্প্রতিক লজ্জার ইতিহাসে যোগ হলো আরেকটি অধ্যায়। ফিফটির পাশাপাশি ১ উইকেট নিয়ে ম্যাচ-সেরা জ্যাক ক্যালিস, ৪০২ রান করে সিরিজ-সেরা হাশিম আমলা। ওয়েবসাইট।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৫০ ওভারে ২৫২/৬ (রিচার্ডস ১৯, গেইল ১২, চন্দরপল ৬৭, ড্যারেন ব্রাভো ১৭, ডোয়াইন ব্রাভো ২৬, দিওনারায়ণ ৫৩, পোলার্ড ২৫, স্যামি ১৯*; সোসোবে ২/৩১, মারউই ১/২৭, ক্যালিস ১/৩৮, ম্যাকলরেন ১/৪৬, বোথা ১/৪৮)। দক্ষিণ আফ্রিকা: ৪৯.৪ ওভারে ২৫৫/৯ (আমলা ৪৫, স্মিথ ১২, ক্যালিস ৫৭, ডি ভিলিয়ার্স ১৩, ডুমিনি ৫১, বাউচার ৬, বোথা ২৪, ম্যাকলরেন ১২, মারউই ১০*, ল্যাঙ্গেভেল্ট ৬, সোসোবে ৪*; গেইল ২/৩৮, পোলার্ড ২/৪৮, ব্রাভো ২/৭৩, টেলর ১/৩৬)।

শারমিনকে হারিয়ে দিলেন সাবরিনা

এসএ গেমস ও কমনওয়েলথ শ্যুটিংয়ে সোনাজয়ী শারমিন আক্তারকে (রত্না) হারিয়ে দিয়েছেন সাবরিনা সুলতানা। গুলশান শ্যুটিং রেঞ্জে ২৪তম জাতীয় শ্যুটিংয়ের দ্বিতীয় দিনে কাল মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের বাছাইয়ে রত্না স্কোর করেন ৩৯০। শারমিন আক্তার করেন ৩৯১ এবং সাবরিনার স্কোর ছিল ৩৮৮। কিন্তু পেছন থেকে উঠে এসে শ্যুট অফে প্রথম হয়ে গেছেন সাবরিনা (৪৯০.৫), রত্না দ্বিতীয় (৪৮৯.৯) ও শারমিন (৪৮৯.৪)।
মেয়েদের দশ মিটার রাইফেলের জুনিয়র বিভাগে প্রথম তৃপ্তি দত্ত, পুরুষ ৫০ মিটার প্রোনে প্রথম তৌফিক শাহরিয়ার ও মেয়েদের ২৫ মিটার পিস্তলে প্রথম হয়েছেন মিত্তি দেওয়ান।

ইতিহাস ডাকছে ওদের



সেই ক্লে-কোর্ট। সেই রোলাঁ গাঁরো। শুধু সময়টা বদলে নিন। প্রথম রাউন্ডের জায়গায় বসিয়ে নিন ফাইনাল। আর গত বছরের বদলে পড়ুন এবারের ফ্রেঞ্চ ওপেন। স্থান একই, ‘পাত্র’ও সেই দুজনই, কালটাই শুধু আলাদা। গতবার ফ্রেঞ্চ ওপেনের প্রথম রাউন্ডে মুখোমুখি হওয়া অস্ট্রেলিয়ান সামান্থা স্টাসুর আর ইতালির ফ্রান্সেসকা শিয়াভোনে আজ মুখোমুখি হচ্ছেন সেই একই টুর্নামেন্টের ফাইনালে।
দুজনের সামনেই ইতিহাসের হাতছানি। জিতলে ইভান গুলাগংয়ের পর স্টাসুরই হবেন প্রথম গ্র্যান্ড স্লামজয়ী অস্ট্রেলিয়ান নারী। গুলাগংয়ের কৃতিত্বটাও সেই ১৯৮০ সালের। শিয়াভোনের সামনে তো আরও বড় ইতিহাস ছোঁয়ার আমন্ত্রণ। ট্রফিটা হাতে তুলতে পারলে তিনিই হবেন গ্র্যান্ড স্লামজয়ী প্রথম ইতালিয়ান নারী। আরেকটা মাইলফলকও ছোঁয়া হয়ে যাবে তাঁর। মার্গারেট স্ক্রিভেনের পর র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশের বাইরের কোনো খেলোয়াড় হিসেবে তিনিই হবেন প্রথম গ্র্যান্ড স্লামজয়ী। ১৯৩৩ সালে সর্বশেষ এমন কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন এই ব্রিটিশ।
পেশাদার টেনিস শিয়াভোনে খেলছেন ১২ বছর ধরে। সর্বোচ্চ গ্র্যান্ড স্লাম সাফল্য বলতে ছিল ফ্রেঞ্চ ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনাল। এই ২৯ বছর বয়সে এসে প্রথম ফাইনাল। কেন এত বিলম্ব? শিয়াভোনের উত্তর, ‘আমার মনে হয়, এটা আমারই সময়। হয়তো আগে আমি প্রস্তুত ছিলাম না।’ দুজনের মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানে এগিয়ে আছেন স্টাসুরই। ৫ ম্যাচের চারটিতেই শেষ হাসি হেসেছেন এই অস্ট্রেলিয়ান। আজকের লড়াইয়ে তাই অনেকেরই বাজি স্টাসুরের পক্ষে। লাল মাটিতে একেবারে আগুনে ফর্মে তেতে রয়েছেন তিনি। চতুর্থ রাউন্ড থেকে ধারাবাহিকভাবে হারিয়েছেন সাবেক তিন শীর্ষ তারকা জাস্টিন হেনিন, সেরেনা উইলিয়ামস আর ইয়েলেনা জাঙ্কোভিচকে। স্টাসুরের বড় অস্ত্র তাঁর দুর্দান্ত গতির সার্ভ। স্বদেশি প্যাট রাফটারের বড় ভক্ত স্টাসুর রাত জেগে তাঁর খেলা দেখতেন ছোটবেলায়, ‘আমি প্যাটকে পছন্দ করি। এমনও হয়েছে যে আমি অনেক রাত জেগে থেকেছি এবং সকালে স্কুলে যেতে দেরি হয়েছে। কারণ রাত জেগে তাঁর খেলা দেখতাম।’ এএফপি।
গতবারের চ্যাম্পিয়ন সভেৎলানা কুজনেতসভা নেই। ফাইনালে নেই কোনো নামী তারকাও। তবে র‌্যাঙ্কিংয়ের ৭ নম্বরে থাকা স্টাসুরের সঙ্গে ১৭ নম্বরের শিয়াভোনের লড়াইটা জমতে পারে। ফিলিপ শাতিয়ের সেন্টার কোর্টের দর্শকেরা চাইলে একটু নড়েচড়ে বসতে পারেন। ফাইনালে সোদারলিং-নাদাল: ছেলেদের বিভাগে ফাইনালে উঠেছেন রবিন সোদারলিং ও রাফায়েল নাদাল। সেমিফাইনালে সোদারলিং হারিয়েছেন টমাস বার্ডিচকে, ইয়ূর্গেন মেজলারকে নাদাল।

ইতালির পথ ধরে ফ্রান্সও

গতবারের দুই ফাইনালিস্ট তারা। আলোচনার আলো তাদের ওপর পড়বেই। তবে ইতালি এবার শিরোপা ধরে রাখতে পারবে কি পারবে না এই আলোচনার চেয়ে বেশি কথা হচ্ছে দলে খেলোয়াড়দের বয়স নিয়ে! সেই আলোচনার পাশে হাওয়া দিল ইতালিই, পরশু প্রস্তুতি ম্যাচে মেক্সিকোর কাছে ১-২ গোলে হেরে। আর এশিয়া থেকে বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া চীনের কাছে ১-০ গোলে হেরে কাল ফ্রান্সও যেন জানিয়ে রাখল, এবার তাদের নিয়ে বাজি না ধরাই নিরাপদ।
ইতালি, ফ্রান্স হেরে গেলেও জয় পেয়েছে জার্মানি, বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ৩-১ গোলে। অন্যতম ফেবারিট স্পেন তাদের দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচটিও জিতেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জয়টি জেসাস নাভাসের একমাত্র গোলে।
তারুণ্যের কাছে বয়সের পরাজয়? মেক্সিকোর বিপক্ষে ইতালির হেরে যাওয়াটাকে কি এভাবে দেখা যায়? ইতালি কোচ মার্সেলো লিপ্পি ম্যাচটিতে হেরে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন ক্লান্তি আর দুই দলের শারীরিক শক্তির পার্থক্যকে। অনুশীলন শিবির ইতালির তুরিন থেকে বাসে লম্বা পথ পাড়ি দিয়েই ম্যাচটি খেলতে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে গিয়েছিল ইতালি। লিপ্পির যুক্তিটা তাই উড়িয়েও দেওয়া যায় না।
তবে ১৬ মিনিটে প্রথম গোলটি যেভাবে খেয়েছে ইতালি, তাতে বয়সকে দোষ না দিয়েই বা উপায় কি! জিওভানি ডস সান্টোসের দারুণ এক পাস থেকে গোল করেছেন কার্লোস ভেলা। তাঁকে আটকানোর জন্য জায়গামতো যেতেই পারেননি ইতালি অধিনায়ক ফ্যাবিও ক্যানাভারো। ৮৩ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন হাভিয়ের মেডিনা। এই গোলটিও হয়েছে বিখ্যাত ইতালিয়ান রক্ষণের ভুলেই। ইতালির সান্ত্বনার গোলটি করেছেন লিওনার্দো বোনুচ্চি।
বিশ্বকাপের বল জাবুলানির সবচেয়ে বড় সমালোচকদের একজন ফ্রান্সের গোলরক্ষক হুগো লরিস। কালকের পর আরও উচ্চকিত হওয়ার কথা তাঁর কণ্ঠ। ৬৮ মিনিটে ডেং ঝুশিয়াংয়ের ফ্রিকিকটি যে তাঁকে বোকা বানিয়ে ঢুকে গেল জালে! রিইউনিয়ন দ্বীপে ডেংয়ের এই গোলেই হেরে রেমন্ড ডমেনেখের দল আজ দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছে ভাঙা মন নিয়ে ।
স্পেনের বিষয়টি অবশ্য অন্য রকম। জয়ের ব্যবধানটা ন্যূনতম হলেও সুন্দর গোছানো ফুটবলই উপহার দিয়েছে ভিসেন্তে দেল বস্কের দল। আর্সেনাল প্লে-মেকার সেস ফ্যাব্রিগাসকে এদিনই প্রথম মাঠে পেয়েছে তারা। প্রায় ২ মাস পর মাঠে ফিরতে পেরে তিনিও খুশি। তবে দলের জয়ের নায়ক নাভাস। তাঁর ৮৬ মিনিটের গোলেই জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে স্পেন।
ফ্রাঙ্কফুর্টে জার্মানি বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে জয় পেয়েছে পেছন থেকে উঠে এসে। এডিন জেকোর গোলে ১৫ মিনিটেই এগিয়ে গিয়েছিল বসনিয়া। কিন্তু ২৭ মিনিটের মধ্যে ৩ গোল করে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে জার্মানি। ৪৭ মিনিটে সমতা ফিরিয়েছেন অধিনায়ক লাম। এরপর দুটি পেনাল্টি থেকে ৭৩ ও ৭৪ মিনিটে দুই গোল করে জার্মানিকে জয় এনে দেন বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার।a

...এবং ম্যারাডোনা

প্রথম আলো অফিসের উল্টো দিকের পাঁচতলা ভবনের ছাদে একই লোহার পাইপে তিনটি পতাকা। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা, ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ...সবার ওপরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ। দেখে মনে হলো, অন্তত এই দেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের এর চেয়ে আদর্শ প্রতীকী উপস্থাপনা আর হতে পারে না!
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্ন তো এখন এটাই—ব্রাজিল, না আর্জেন্টিনা? তুলনাটা একটু বেমানান মনে হতে পারে, কিন্তু সেটিই যে মনে হলো! যেন কোরবানির ঈদের আগে-আগে মুখে-মুখে ফেরা সেই প্রশ্ন—গরু, না খাসি?
একটা সময়ে বাংলাদেশের সুস্থ-স্বাভাবিক প্রায় সব মানুষকেই যেমন ‘হয় আবাহনী, নয় মোহামেডান’ বলে ভাগ করা যেত; বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন দুই ভাগ। হয় ব্রাজিল, নয় আর্জেন্টিনা।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলাটা যেখানে স্বপ্ন, এবং ‘আশা’ করা যায় চিরদিনই তা-ই হয়ে থাকবে; অন্য দেশকে সমর্থন করাটা খুবই স্বাভাবিক। যেটি অস্বাভাবিকতার পর্যায়ে পড়ে তা হলো, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে উন্মাদনার বাড়াবাড়ি। তর্কাতর্কি-খোঁচাখুঁচি ঠিক আছে। সমর্থনের মজা তো এটাই। কিন্তু তাই বলে কোথাকার কোন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য মারামারিও করতে হবে!
সেটিও তো হচ্ছে। কদিন আগে কোথায় যেন দু দলের সমর্থকদের তুমুল মারামারি হয়ে গেল। ডেইলি স্টার খবরটার সঙ্গে দারুণ একটা কার্টুন ছেপেছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা হাতে দু দল লাঠিসোঁটা নিয়ে মহারণে লিপ্ত...দুঙ্গা আর ম্যারাডোনা প্রবল বিস্ময়ে একে অন্যকে প্রশ্ন করছেন—‘ওরা আমাদের পতাকা নিয়ে মারামারি করছে কেন?’
এসব দেখেশুনে মাঝেমধ্যে মনে প্রশ্ন জাগে, বিশ্বকাপটা শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাই খেলছে নাকি! আর কোনো দল কি বিশ্বকাপে কিছু করেনি! ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স...স্পেন-পর্তুগাল বিশ্বকাপ না জিতলেও তো দারুণ ফুটবল খেলে।
বিশ্বকাপ জেতাটা আসলে এখানে বিবেচ্যই নয়। আর্জেন্টিনার চেয়ে তো বেশিবার বিশ্বকাপ জিতেছে ইতালি ও জার্মানি। কই, ওদের পতাকা তো বলতে গেলে চোখেই পড়ে না! বাংলাদেশে ওই দু দলের সমর্থক নেই, এমন নয়। ফ্রান্সের খেলাও অনেকে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথে ওই সমর্থকেরা চিৎকার করলেও সেটি ‘চিঁচিঁ’ আওয়াজ বলে মনে হয়!
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকেরা খুব আবেগী। এই যে ইতালি-জার্মানি আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি বিশ্বকাপ জিতেছে—এটা মনে করিয়ে দেওয়াতেই যেমন অনেকে ক্ষুব্ধ হবেন। মজাটা হলো, ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ এই লেখককে ইতালি বা জার্মানির সমর্থক বলবেন না। নির্ঘাত বলবেন, ‘বুঝেছি, এই ব্যাটা ব্রাজিলের সমর্থক!’
এই সমর্থনের আরেকটি ব্যাপারও আমাকে খুব ভাবায়। নিজের দেশ যখন খেলে, ভালো খেলুক-খারাপ খেলুক, সমর্থনে কোনো হেরফের না হওয়াই স্বাভাবিক। যেনতেনভাবে হলেও আমার দেশের জয় তো আমি চাইবই। কিন্তু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে কেন এমন হবে? ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে সাম্বার ছন্দ দেখে যে ব্রাজিলের সমর্থক, সেই ছন্দ হারিয়ে গেলেও সে কেন ব্রাজিল-ব্রাজিল বলে গলা ফাটাবে? আর্জেন্টাইনদের বল স্কিলে মুগ্ধ হয়ে যে আর্জেন্টিনার সমর্থক, ১৯৯০ বিশ্বকাপে জঘন্য নেতিবাচক ফুটবল খেলার পরও সে কেন আর্জেন্টিনা ওই বিশ্বকাপটি জিততে পারেনি বলে হাহাকার করবে?
সমর্থনের এ এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব। যুক্তি দিয়ে যেটির ব্যাখ্যা দেওয়া খুব কঠিন। সমর্থন মানেই যে আবেগ। আর, আবেগ আর যুক্তির তো চির বৈরিতা। তবে বাংলাদেশে যারা আর্জেন্টিনার সমর্থক, একটি শব্দেই তাদের আবেগের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। ম্যারাডোনা!
১৯৮৬ বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের খুব বেশি মানুষ ‘আর্জেন্টিনা’ নামের দেশটা কোথায়, সেটিই জানত না। জানাল সেই বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে অনেকগুলো ব্যাপার একসঙ্গে ঘটল। সেবারই প্রথম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সবচেয়ে বেশি খেলা সরাসরি সম্প্রচারিত হলো। সাদা-কালো ছবির টেলিভিশন রঙিন হয়ে উচ্চবিত্তের সীমা ছাড়িয়ে মধ্যবিত্তের ঘরেও ঢুকতে শুরু করেছে তখন। বাংলাদেশের মানুষ সেবারই প্রথম প্রাণভরে বিশ্বকাপ দেখল। দেখল এক ফুটবল-জাদুকরকেও, রঙিন টেলিভিশন ফুঁড়ে বেরিয়ে যিনি ঢুকে গেলেন মানুষের হূদয়ে।
এরপর যতই সময় পেরিয়েছে, প্রিয় খেলোয়াড় থেকে ম্যারাডোনা হয়ে উঠেছেন এক আবেগের নাম। খেলার বাইরে তাঁর এত সব কাণ্ডকীর্তি, অথচ তাতে যেন আরও হাওয়া লেগেছে ওই আবেগের পালে। ম্যারাডোনা হয়ে উঠেছেন আরও আপন—‘আরে, এ তো অন্য গ্রহের কেউ নয়। আমাদের মতোই একজন। ভুল করে, অন্যায় করে, প্রতিজ্ঞা করে আবার তা ভুলে যায়।’
বাকি বিশ্ব আর্জেন্টিনাকে অন্য পরিচয়েও চেনে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে আর্জেন্টিনা নামটির অর্থ একটাই। ডিয়েগো ম্যারাডোনা!

প্রতি ম্যাচে একটি গোল করার প্রতিশ্রুতি

দলের হয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার স্বপ্ন দেখেন সব ফুটবলারই। তবে উত্তর কোরিয়ার ওয়েইন রুনি হিসেবে পরিচিত জং-তে সেকে একটু ব্যতিক্রম হিসেবেই দেখতে হবে। বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ার প্রতিটি ম্যাচে একটি করে গোল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন এই স্ট্রাইকার।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে উত্তর কোরিয়ার প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, পর্তুগাল ও আইভরিকোস্ট। উত্তর কোরিয়া এমন দল নয়, যারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের পেছনে ফেলে দ্বিতীয় পর্বে উঠতে সক্ষম। তবে উত্তর কোরিয়ার প্রেরণা হয়ে আছেন ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনি। পর্তুগাল ও আইভরিকোস্টকে পেছনে ফেলে ব্রাজিলের সঙ্গে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠবে উত্তর কোরিয়া—এমনটাই বিশ্বাস করেন রুনি।
রুনির বিশ্বাস সার্থক করে তুলতে পারেন স্ট্রাইকার জং-তে সে। ওয়ার্ম আপ ম্যাচে গ্রিসের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে উত্তর কোরিয়া। দলের হয়ে দুটি গোলই করেন জং। বিশ্বকাপ আসরে গিয়ে গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার স্বপ্ন এই স্ট্রাইকার দেখতেই পারেন। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য উত্তর কোরিয়ার উল্লেখ করে রয়টার্সকে আজ শনিবার জং বলেন, ‘গ্রুপ পর্যায়ে এগিয়ে থাকবে ব্রাজিল ও উত্তর কোরিয়া। প্রতিটি ম্যাচে কমপক্ষে একটি করে গোল করার লক্ষ্য আমার।’

ঢাকায় জীবন ঝুঁকিপূর্ণ by জামিলুর রেজা চৌধুরী

বেগুনবাড়ির ভবন উপড়ে যাওয়ার ঘটনার পর এখন পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের থমকে দিয়েছে। এতগুলো মানুষের জীবন এত করুণভাবে চলে গেল, এত পরিবার স্বজন হারা হলো যে তা সহ্য করা কঠিন। খুবই দুঃখের ও শোকের ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনাগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যায় না। এর দায় কাউকে না কাউকে নিতে হবে।
প্রথম দায় যারা আইন অমান্য করে ভবন নির্মাণ করেছে তাদের। বেগুনবাড়িতে উপড়ে যাওয়া ভবনটি যেখানে ছিল, সেখানে তো কোনো ভবনই নির্মিত হওয়ার কথা নয়। জায়গাটি বর্জ্য পদার্থ ফেলে ফেলে ভরাট করা হচ্ছিল। এ রকম নাজুক জায়গায় বিধিমালা অনুসরণ না করে ভবন বানানো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। কেবল নির্মাণই নয়, ওই ভবনটির মালিক ওটাকে ওপরের দিকে বাড়িয়েও যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয়ত, সরকারের যেসব সংস্থার ওপর ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে, এটা তাদেরও ব্যর্থতা। তারা কেন দেখল না যে অনুমোদন ছাড়া ভবন তৈরি হচ্ছে? তারা যদি মনে করে, মানুষ তাদের কাছে অনুমতির জন্য নিজে থেকেই আসবে, তা ঠিক নয়। তাদের দায়িত্ব হলো, যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা পালন করা হচ্ছে কি না তা নজরদারি করা। তার জন্য তাদের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া ছিল। কিন্তু তারা সেটা প্রয়োগ করেনি। এসব ক্ষেত্রে আগাম ভবন নির্মাণ বন্ধ করা যায়। সে কারণেই এটা যতটা না দুর্ঘটনা তার থেকে বেশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা।
রাজধানীর ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের দিকটা দেখার জন্য রাজউক সৃষ্টি করা হয়েছিল। যখন এটা করা হয়েছিল তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ লাখ। কিন্তু এখন রাজধানীতে দেড় কোটির মতো লোকের বাস। ঢাকার আয়তন ও জটিলতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু রাজউকের জনবল কেন বাড়ানো হলো না?
এখন রাজউকের ওপর অনেক দায়িত্ব। তারা জমি ডেভেলপ করে বিক্রি করে, তারা রাস্তাঘাট বানায়, ফ্লাইওভার বানায়। এসব ক্ষেত্রে তারা হলো বাস্তবায়নকারী সংস্থা। অন্যদিকে রাজউকই হলো ভবন নির্মাণের বিধিমালা বাস্তবায়নের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। অর্থাৎ একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদের। এ বিষয়ে অনেক কমিটি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারকে অনেক সুপারিশও করা হয়েছে যে একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের কাজ করতে পারে না। টেলিফোন, জ্বালানিসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রে এ দুটো দায়িত্ব আলাদা সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। বারবার সুপারিশ করা হয়েছে যে রাজউককে কিছু দায়িত্ব থেকে মুক্ত করা হোক, যাতে তারা ভালোভাবে কাজ করতে পারে। রেগুলেটরি দায়িত্ব তথা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণসহ নজরদারির দায়িত্বটি অন্য কারও হাতে দেওয়া উচিত।
সিটি করপোরেশনেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, একই কাজের জন্য দুই সংস্থা থাকলে কার্যত কেউই দায়িত্ব নেয় না। এক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে বলে মনে হয়।
ঢাকার জনবসতি কমাতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুনের বিপদ বেশি থাকে এবং ক্ষয়ক্ষতিও বেশি হয়। পুরান ঢাকার ওই ভয়াবহ আগুনের বেলায়ও সেটাই দেখা গেছে। আবার সেখানেই দাহ্য পদার্থে ভরা শিল্প-কারখানা রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কোনো কঠিন কাজ না। কারণ এগুলোর জন্য তো অনুমতি লাগে। সেই অনুমতি তাদের কে দিল?
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেই এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে, ঢাকায় জীবনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে তাদের শোক মর্মান্তিক। অন্যদিকে এত বড় দুর্ঘটনার খবর তো বিশ্বে প্রচারিত হবে। তাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও তো সংকট হবে যে, সরকার কী করছে।
পুরান ঢাকার মতো সমগ্র ঢাকাই তীব্র ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। নতুন ঢাকাতেও তো গায়ে গায়ে লাগানো ভবন। জাপান গার্ডেন সিটির মতো নতুন স্থাপনায়ও তো আগুন লাগছে। গুলশান ও ধানমন্ডির অভিজাত এলাকা ছাড়া বাদবাকি ঢাকার অবস্থা দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারকে এখন সাধারণ ভবনমালিক থেকে শুরু করে ডেভেলপারদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বলা হয়, তারা অনেক শক্তিশালী। এটা কি কখনো হয় যে কোনো দেশের সরকার বলছে, তাদের চেয়ে প্রাইভেট সেক্টর বেশি শক্তিশালী, তারা কথা শোনে না? কারণটি এই, যারা ক্ষমতাবান ডেভেলপার তারা আবার রাজনীতিতেও ক্রিয়াশীল। রাজনীতির ওপর তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান। তারা অনেক শক্তিমান।
এসবের বিরুদ্ধে কেউ তো তেমন কথা বলছে না। ওসমানী উদ্যান আন্দোলন, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে নাগরিক সমাজের নানা অংশ সোচ্চার ছিল। তারপর সরকার কিছু লোকদেখানো কাজ করেছে। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধানের তেমন চেষ্টা কেউ করছে না। তাই আমরা বড় কোনো সাফল্যের মুখ দেখি না। মূলত সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। যে আইন আছে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যার দায়িত্ব হবে যত ভবন হবে তার মান নিয়ন্ত্রণ করা এবং তা পরিকল্পনামাফিক হচ্ছে কি না তা দেখা। এবং প্রতিষ্ঠানটি হবে বিকেন্দ্রীকৃত। বিভিন্ন স্থানে তাদের দপ্তর থাকবে। তারা সরেজমিনে ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার সম্পর্কে যে আইন আছে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করার জন্য যেসব নীতিমালা প্রণীত রয়েছে তা কার্যকর করবে।
জামিলুর রেজা চৌধুরী: প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনবে তুরস্ক

ত্রাণবাহী নৌবহরে ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় তুরস্কের সরকার বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হতে পারে। এদিকে অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে র‌্যাচেল কোরি নামে আরেকটি জাহাজ গত বৃহস্পতিবার গাজার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। ত্রাণকর্মীরা আশা করছেন, বাধা দেওয়া না হলে আজ শনিবার সকালে এটি গাজা উপকূলে পৌঁছাবে।
তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত আরিঙ্ক তুরস্কভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিকে বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছি আমরা। তবে তৃতীয় একটি দেশের কারণে এক মুহূর্তে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা আমাদের দেশের রীতি নয়।’ সে দেশের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুলও বলেছেন, ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্ক কখনোই আর আগের মতো হবে না। নৌবহরে হামলার পরপরই ইসরায়েল থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে তুরস্ক।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সংবাদমাধ্যম সিএনএনে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ত্রাণবাহী নৌবহরে হামলায় প্রাণহানির ঘটনা দুঃখজনক। কিন্তু এ ঘটনাকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিপ্রক্রিয়া আবার শুরু করার একটি নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন পরোক্ষ শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী জর্জ মিশেল গতকাল ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে বুধবার তিনি ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় গাজা অবরোধ ও ত্রাণবাহী নৌবহরে হামলার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। কর্মকর্তারা জানান, নেতানিয়াহু গাজায় আরোপিত অবরোধ পর্যালোচনার কথা ভাবছেন।
গত সোমবার গাজাবাসীর জন্য ত্রাণবাহী নৌবহরে সহিংস হামলার পর এই ত্রাণ কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তারা ঘোষণা দেন, তাঁরা ইসরায়েলের হুমকিতে দমবেন না, আবারও গাজায় ত্রাণ পাঠানোর চেষ্টা করবেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ত্রাণবাহী জাহাজ র‌্যাচেল কোরি বৃহস্পতিবার গাজার পথে রওনা দেয়। জাহাজে শিশুদের জন্য লেখাপড়ার উপকরণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সিমেন্ট রয়েছে। জাহাজের ১১ জন সাহায্যকর্মীর মধ্যে ছয়জন ব্রিটিশ ও আইরিশ এবং পাঁচজন মালয়েশীয়। এদের মধ্যে রয়েছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিক মেইরিড ম্যাগুইর ও জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব ডেনিস হ্যালিডে। সোমবারের নৌবহরের সঙ্গেই র‌্যাচেল কোরির রওনা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু জাহাজটি নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেনি।
রওনা দেওয়ার পর গতকাল শুক্রবার এই ত্রাণ কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তা সংগঠন ফ্রি গাজা মুভমেন্টের অদ্রে বোমস বলেছিলেন, তাঁরা জাহাজটির সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের ধারণা, ইসরায়েল জাহাজের যোগাযোগব্যবস্থা ‘স্যাবোটাজ’ করেছে। অবশ্য পরে এই উদ্যোগের সহযোগী সংস্থা আয়ারল্যান্ড প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইনের মার্টিন ও’কুইগলে জানান, গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় তাঁরা জাহাজের সাহায্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। র‌্যাচেল কোরি ইসরায়েলের উপকূল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েল অবশ্য আগেই ঘোষণা দিয়েছে যে তারা র‌্যাচেল কোরিকে গাজায় পৌঁছাতে বাধা দেবে। সে দেশের সংবাদবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়াইনেট প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বরাত দিয়ে বলেছে, ‘আমরা র‌্যাচেল কোরিকে আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাব এবং নিরাপত্তা তল্লাশির পর ত্রাণসামগ্রী গাজায় পাঠানোর ব্যবস্থা করব।’
মার্কিন ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ফিলিপ ক্রউলি বৃহস্পতিবার বলেছেন, গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহরে ইসরায়েলি হামলায় তুর্কি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ফুরকান দোগানের (১৯) মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র। ত্রাণবাহী নৌবহরে ইসরায়েলের কমান্ডোদের হামলায় কমপক্ষে নয়জন নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগ তুর্কি। হামলার পর ইসরায়েল ছয়টি জাহাজ ও ত্রাণকর্মীদের আটক করে।

আগ্নেয়গিরির ছাই শনাক্ত করতে বিমানে রাডার

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে সৃষ্ট ছাইয়ের মেঘের কারণে যাতে আর বিমান অচল না হয়, সে জন্য এক নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে যাচ্ছে কম খরচের এয়ারলাইন ‘ইজিজেট’। দূর থেকেই ছাইয়ের মেঘ শনাক্ত করার জন্য তারা বিমানে রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করবে।
সম্প্রতি আইসল্যান্ডের এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে আকাশে ছড়িয়ে পড়া ছাইয়ে ইউরোপজুড়ে বিমান চলাচলে নজিরবিহীন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। মহাদেশজুড়ে প্রায় এক সপ্তাহ বিমান চলাচল বন্ধ ছিল।
বিমানে স্থাপিত এই রাডার বিমানের সামনে ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকা এবং পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ৫০ হাজার ফুট উচ্চতার মধ্যে ছাইয়ের মেঘ শনাক্ত করতে পারবে। রাডারে ধারণ করা চিত্র একই সঙ্গে দেখতে পাবে বিমানের পাইলট এবং নিচের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। ফলে পাইলট ছাইয়ের মেঘ এড়িয়ে বিমান চালাতে পারবেন।
এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে এয়ারবর্ন ভলকানিক অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার অ্যান্ড ডিটেক্টর (এভিওআইডি বা অ্যাভয়েড)। নরওয়ের ইনস্টিটিউট ফর এয়ার রিসার্চের ফ্রেড প্রাটা এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন।
ইজিজেটের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি হ্যারিসন বলেন, ‘এই রাডারের মাধ্যমে বিমান ছাইয়ের মেঘ শনাক্ত এবং তা এড়িয়ে চলতে সক্ষম হবে।

পিয়ংইয়ংকে নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিন

উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি মিউং বাক। গতকাল শুক্রবার সিঙ্গাপুরে একটি নিরাপত্তা সম্মেলনে তিনি আহ্বান জানান। এদিকে উত্তর কোরিয়া গতকাল হুমকি দিয়েছে, জাতিসংঘে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে এর কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও নির্বাহী কার্যালয় ব্লু হাউস থেকে জানানো হয়, সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট লি কোরীয় উপদ্বীপের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা নিয়ে ছয় জাতির আলোচনায় পিয়ংইয়ংকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
লি বলেন, পরমাণু অস্ত্রের জোরে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে টিকে থাকার যে ধারণা, তা থেকে উত্তর কোরিয়াকে বের করে আনার উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও অংশ নিতে হবে।

জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন নাওতো কান

জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপানের (ডিপিজে) নেতা নাওতো কান। গতকাল শুক্রবার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে তিনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৯৭ ভোট বেশি পেয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। আগামী সপ্তাহে সম্রাট আকিহিতো নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
৪৮০ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে ৪৭৭ ভোট পড়ে। এর মধ্যে নাওতো কানের পক্ষে পড়ে ৩১৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান বিরোধী দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রধান সাদাকাজু তানিগাকি পেয়েছেন ১১৬ ভোট। বাকি ভোটগুলো পান ছোট কয়েকটি দলের প্রার্থীরা। নির্বাচনের কিছুক্ষণ পরে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ কাউন্সিলর পরিষদ কানকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেয়।
এর আগে নিজ দলের সাংসদদের ভোটে ডিপিজের প্রধান নির্বাচিত হন নাওতো কান। অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দলের পরিবেশবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান শিনজি তারুতোকো তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে নাওতো কানের পক্ষে ২৯১ এবং শিনজির পক্ষে ১২৯ ভোট পড়ে।
ডিপিজের প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পর নাওতো কান বলেন, ‘আমার প্রথম কাজ হবে দেশের পুনর্গঠন ও আমাদের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি দলের সদস্যদের মধ্যে “আমরা পারি”এ বিশ্বাস দৃঢ় করা।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মূল ভিত্তি অটুট থাকবে। তবে ওকিনাওয়া দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটির ব্যাপারে তাঁর অবস্থান কী হবে, তা উল্লেখ করেননি কান।
দেশের অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাপানের অর্থনীতি গত ২০ বছর থেকে একই অবস্থায় রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বন্ধ রয়েছে। তরুণেরা চাকরি পাচ্ছে না। নীতিনির্ধারকদের ভুল নীতিমালার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমরা একই সময়ে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা অর্জন করতে পারি।’ তিনি সরকারি বিশাল ঋণ কমিয়ে আনার ব্যাপারেও অঙ্গীকার করেন।
দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই মুহূর্তে নিজেদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি রোডম্যাপ নিশ্চিত করাই নতুন নেতৃত্বের ডিপিজের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এর আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইউকিয়ো হাতোইয়ামা তাঁর মন্ত্রিসভাসহ আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। পরে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। নাওতো কানের নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাপান গত চার বছরে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পেল।
গত সেপ্টেম্বরে ডিপিজে ক্ষমতায় এলে নাওতো কান উপপ্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। পাশাপাশি তাঁকে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ব্যুরোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক মন্দার প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও নেন তিনি।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইউকিয়ো হাতোইয়ামা গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে দেশটির ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ওই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসায় কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে গত বুধবার তিনি পদত্যাগ করেন।

মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে কাসাবের আপিল

ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া পাকিস্তানি সন্ত্রাসী আজমল আমির কাসাব রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর পক্ষে আইনি বিতর্কে লড়ার জন্য তিনি একজন আইনজীবী চেয়ে আবেদন করেন। খবর পিটিআইয়ের।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কাসাব কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টে এই আপিল করেন। আইনজীবীর জন্য তিনি আবেদন করেন কোর্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস কমিটির (এইচসিএলএসসি) কাছে। এইচসিএলএসসি এখন এ আবেদন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জে এন প্যাটেলের কাছে পেশ করবে।
হাইকোর্টের যে বেঞ্চে কাসাবের আপিলের শুনানি হবে, সেখানে তাঁর উপস্থিত থাকার অধিকার আছে। কাসাব এখন আর্থার রোড কারাগারে আছেন। সেখান থেকে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে তাঁকে আদালতে নিয়ে আসা হবে।
কর্মকর্তারা জানান, মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের জন্য কাসাবকে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়। তিনি ৩০ দিনের মধ্যে এই আপিল করেন। তাঁর আপিলের আবেদন এরই মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে। গত ৩ মে কাসাবকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করেন। এরপর তাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
এর আগে বিচার চলাকালে আইনজীবী নিয়োগে কাসাব অপারগতা প্রকাশ করলে বিনা মূল্যে তাঁকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। ওই সময় আব্বাস কাজমি ও কেপি পাওয়ার নামের দুজন আইনজীবী নিয়োগ করেন বিচারক এম এল তাহালিয়ানি। পরে অসহযোগিতার অভিযোগে আদালত কাজমিকে সরিয়ে নেন। পাওয়ার শেষ পর্যন্ত কাসাবকে আইনি সহায়তা দেন।

সৌদি প্রিন্স ও খ্রিষ্টানদের অপহরণের আহবান আল-কায়েদার

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা সৌদি আরবের প্রিন্স, মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও খ্রিষ্টান নাগরিকদের অপহরণ করার জন্য এর সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আল-কায়েদার নিহত এক জঙ্গির স্ত্রীকে কারাগার থেকে ছেড়ে দিতে সৌদি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সংগঠনটি এ আহ্বান জানায়। গত বহস্পতিবার একটি অডিও বার্তায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ কথা বলা হয়েছে।
বার্তায় আল-কায়েদার ইয়েমেন শাখার নেতা সাঈদ আল শিহির জানান, ধর্মপ্রচারক হায়লা আল কাসায়েরকে রিয়াদের উত্তরে কাসিম নগর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি সৌদি আল-কায়েদার একজন সদস্যের বিধবা স্ত্রী। ওই আল-কায়েদা সদস্য ছয় বছর আগে রিয়াদের উত্তরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে নিহত হন। বিবৃতিতে আল-কায়েদা যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, কারাগার থেকে আমাদের বন্দীকে মুক্ত করতে সৌদি রাজপরিবারের সদস্য অপহরণ করতে হবে।

মিয়ানমার পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে

মিয়ানমার তার অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে পরমাণু অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে সহযোগিতা করছে উত্তর কোরিয়া। মিয়ানমার থেকে গোপনে নিয়ে আসা কিছু নথিপত্র ও ছবিতে এমন আভাস পাওয়া গেছে। সে দেশের একজন দলত্যাগী সেনা কর্মকর্তা এসব নথি ও ছবি গোপনে সরিয়ে নিয়ে আসেন। গতকাল শুক্রবার নরওয়ে ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা জানা যায়। পাঁচ বছর ধরে সমীক্ষা চালানোর পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় বলে সংস্থাটির দাবি।
মিয়ানমার তার পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিতে উত্তর কোরিয়ার সহায়তা নিচ্ছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সিনেটর জিম ওয়েব তাঁর মিয়ানমার সফর স্থগিত করেন। সিনেটে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাসংক্রান্ত বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান ওয়েব। মিয়ানমারের পরমাণু কর্মসূচিবিষয়ক তথ্যের ব্যাপারে তিনি ওই দেশের স্বপক্ষত্যাগী সেনা কর্মকর্তার কথা উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলত্যাগী ওই সেনা কর্মকর্তার নাম সেই থিন উইন। প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রকৌশল হিসেবে তিনি মিয়ানমারে প্রশিক্ষণ নেন। পরে রাশিয়া গিয়ে একজন ক্ষেপণাস্ত্রবিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মিয়ানমারের গোপন পরমাণু স্থাপনায় যাতায়াতের সুযোগ হয় তাঁর। থিন উইন মিয়ানমারের পরমাণু কর্মসূচিকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে নিয়োজিত একটি সামরিক কারাখানার উপ-অধিনায়ক ছিলেন। তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তারা সত্যিই পরমাণু বোমা তৈরি করতে চায়। এটাই তাদের মূল লক্ষ্য।’
থিন উইন গোপনে এমন কিছু নথিপত্র সরিয়ে আনেন, যার মধ্যে পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। রয়েছে এ সংক্রান্ত বেশ কিছু ছবিও। এ ছাড়া পরমাণু চুল্লি তৈরিতে যেসব সরঞ্জাম লাগে, সেসবের ছবিও রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরমাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেলেও পরমাণু অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে মিয়ানমার এখনো অনেক দূরে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সাবেক পরিচালক রবার্ট কেলি এসব নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করে বলেন, মিয়ানমার সম্ভবত ইউরেনিয়াম আহরণ করছে এবং এমন পরমাণু প্রযুক্তি খুঁজছে, যার মাধ্যমে অস্ত্র তৈরি করা যায়।