Tuesday, January 6, 2015

‘সরকারি অবরোধে’ ভোগান্তি, আজ থেকে বিরোধী​ জোটের লাগাতার অবরোধ- সংঘাতে অশান্ত দেশ, নিহত ৪

(বিএনপির এক কর্মীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, পেটাচ্ছেন আওয়ামী লীগের কর্মীরা। কাল রাজধানীর শাহজাহানপুরে l ছবি: প্রথম আলো) রাজধানী ঢাকাকে আবারও সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করল সরকার। গত রোববার থেকে টানা দুই দিন সড়কপথ, রেলপথ ও নৌপথে ঢাকামুখী যাত্রা ঠেকিয়ে রাখার কারণে একধরনের ‘সরকারি অবরোধ’ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আজ থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের সড়কপথ, রেলপথ ও নৌপথে অবরোধ কর্মসূচি ডেকেছে বিরোধী জোট। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা সমাবেশ করতে চাইলে এবং পুলিশ ও সরকার-সমর্থকেরা তা প্রতিহত করায় ঢাকাসহ সারা দেশে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে চারজন নিহত হয়েছেন। সারা দেশে আহত হয়েছেন ১৬১ জন। নিহত ব্যক্তিরা সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী।
রাতে বিএনপির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকালের সংঘর্ষে তাদের তিনজন নিহত ও ৩৫০ জন আহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ৪০০। তবে স্থানীয় বিএনপি চারজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, গত রবি ও সোমবার রাজধানী থেকে ১৯১ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এঁদের মধ্যে পাঁচজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত এক বছর করে কারাদণ্ড দেন।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল গতকাল ঢাকায় ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালনের কর্মসূচি দিয়েছিল। সরকারি দল পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ নামে। ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে সরকার ও বিরোধী পক্ষ এ মারমুখী অবস্থান নিয়েছে।
শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে রোববার ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর ছুটি। ‘সরকারি অবরোধ’ আর বিরোধীদের তা ভাঙার চেষ্টার মাঝখানে পড়ে টানা তিন দিনের ছুটিতে যাওয়া মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আজ থেকে আবার ২০ দলের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এ কর্মসূচি মোকাবিলায় সরকার পুলিশি ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি রাজধানীতে বিজিবি মোতায়েন করেছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল রাতে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিরোধী দলের অবরোধে সরকারি দল মাঠে থেকে সব ধরনের সহিংসতা, নাশকতা প্রতিহত করবে।
ডিএমপি রোববার বিকেল পাঁচটা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শনিবার রাত থেকে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে কার্যত অবরুদ্ধ। গতকাল সোমবার কার্যালয়ের ফটকে তালা লাগিয়ে, এলোপাতাড়ি বালুর ট্রাক ফেলে এবং পুলিশের তৈরি ‘মানব দেয়াল’ খালেদা জিয়ার চলাচলের পথ রুদ্ধ করে ফেলে।
ডিএমপির পক্ষ থেকে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের পরও সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা পুলিশের সহায়তায় ঢাকায় সভা-সমাবেশ করেন এবং বিরোধীদের সমবেত হওয়া প্রতিহত করেন। তাঁদের রাজধানীর রাজপথে লাঠি হাতে মিছিল করতে দেখা যায়। ট্রাক, গাড়ি ও মোটরসাইকেলে চড়েও মহড়া দেন তাঁরা।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, এটা পুলিশের ব্যাপার। তারাই বলতে পারবে।
গত দুই বছরে তৃতীয়বারের মতো ‘সরকারি অবরোধে’ রাজধানী ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো। এর আগে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ডাকা ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচি উপলক্ষে ঢাকামুখী আগমন ঠেকান সরকার-সমর্থকেরা। এভাবে অবরোধের ঘটনা ঘটে ২০১২ সালের ১২ মার্চে ২০-দলীয় জোটের ‘চল চল ঢাকা চল’ কর্মসূচি উপলক্ষেও।
সংঘর্ষ: রাজধানীর প্রেসক্লাবসহ অন্তত পাঁচটি স্থানে বিএনপির সঙ্গে পুলিশ ও সরকার-সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে কাল। আরও বেশ কিছু স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
নাটোর শহরে বিএনপির মিছিলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন মারা যান। নিহত রাকিব মুন্সি ও রায়হান আলীকে নিজেদের নেতা-কর্মী বলে দাবি করেছে বিএনপি। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১০ থেকে ১২ জন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করতে গেলে ২০ দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এতে একজন নিহত ও আহত হন ১৫ জন। নিহত জমশেদ আলীকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছে বিএনপি।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে বিএনপির নেতা মজির উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। এ ঘটনায় সাংবাদিকসহ আহত হন ৩০ জন।
প্রতিবাদে রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে স্থানীয় বিএনপি।
ঢাকা অবরুদ্ধ: সরেজমিন, ভুক্তভোগী ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির কর্মসূচি উপলক্ষে রোববার সকাল থেকেই ঢাকামুখী দূরপাল্লার পরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু যানবাহন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পর ফিরে আসতে বাধ্য করা হয়।
ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার টার্মিনালগুলোতে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা পাহারা বসিয়ে পরিবহন চলাচল বন্ধ করেন। এ ছাড়া ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে বসানো হয় কয়েক স্তরের তল্লাশিচৌকি।
রোববার বিকেলে ও সোমবার সকালে মানিকগঞ্জ, ধামরাই, নবীনগর, সাভার ও আমিনবাজারে পুলিশ ও সরকারদলীয় লোকজনের কড়া পাহারা দেখা গেছে। সাভার থেকে গাবতলী পর্যন্ত কয়েক শ মিটার পরপর ‘পুলিশ চেকপোস্ট’ লেখা স্ট্যান্ড বসিয়ে তল্লাশি করতে দেখা গেছে। অসংখ্য পুলিশ, রিকশা-ভ্যান ও ট্রাক পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। সাভারের হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, গাবতলী ও মাজার রোডে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের একসঙ্গে যানবাহন তল্লাশি করতে দেখা গেছে।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়নি। তবে ঢাকামুখী ট্রেনে টিকিট বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্টেশনগুলোতে যাত্রীরা গেলেই বলে দেওয়া হয়েছে ‘টিকিট নেই’। কমলাপুর স্টেশনে টিকিটবিহীন যাত্রীদের ধরার জন্য কড়া পাহারা বসানো হয়।
দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬০-৬৫টি লঞ্চ সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আসে। গতকাল সোমবার এসেছে মাত্র ১০-১২টি লঞ্চ। সেগুলোও মাঝ নদীতে ভিড়িয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। দক্ষিণের জেলাগুলোর লঞ্চ টার্মিনালেও ছিল পাহারা।
একজন পরিবহন মালিক বলেন, সরকারি অবরোধে বাস চালানো নিষেধ। বিরোধী দলের অবরোধের ঘোষণার পর চালানোর জন্য চাপাচাপি শুরু হবে। আসলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা ফাটা বাঁশের চিপায় পড়ে গেছেন। যাত্রীরাও গালাগাল করছে পরিবহনশ্রমিকদের।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, সরকারের বাধা নয়, নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকে বাস চালাননি। বিরোধীদের অবরোধে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবরোধ তো স্পষ্ট করা হয়নি। মালিকেরা বাস চালাবেন।’
ছুটি মাটি হয়ে গেছে: তিন দিনের ছুটি পেয়ে স্ত্রীসহ রাজশাহী বেড়াতে গিয়েছিলেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম। দেশ ট্রাভেলসের একটি বাসে চেপে রোববার সকাল আটটায় ঢাকার উদ্দেশে রাজশাহী থেকে রওনা হন। কিন্তু শহরতলির কাটাখালীতে আসার পরই চালকের ফোনে কল আসে, বাস ফিরিয়ে নিতে হবে টার্মিনালে।
তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ফোন পেয়েই চালক বাস ঘুরিয়ে চলতে শুরু করেন। রাজশাহী টার্মিনালে পৌঁছে দেখেন, তাঁদের আগে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন কোম্পানির আরও ১০-১২টি বাসও ফিরে এসেছে। এরপর ট্রেনের টিকিটের চেষ্টা করেও পাননি। তিনি বলেন, ‘সোমবার অফিস করার কথা ছিল। বসকে বলার পর হতাশা প্রকাশ করেছেন। আর কিছুই বলেননি।’
ব্যাংক কর্মকর্তা শামীমা সুলতানাও রাজশাহী গিয়েছিলেন অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে। রোববার আড়াইটায় ফিরবেন বলে অগ্রিম বাসের টিকিটও কেটে রেখেছিলেন। কিন্তু দুপুর ১২টায় জানতে পারেন বাস চলবে না। সোমবার দুপুরে অন্য একটি বাসের টিকিট কেটে সেটাও ফেরত দেন।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে গাবতলীতে রিকশা ভাড়া করতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হন মোখলেছুর রহমান। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত চালক ভাড়া হেঁকেছেন ১২০ টাকা। এ জন্যই তাঁর উত্তেজনা। তিনি একটি আবাসন কোম্পানির প্রকল্প ব্যবস্থাপক।

‘গুরুতর’ অসুস্থ খালেদা, খালেদাকে রক্ষা করা হাসিনার দায়িত্ব: -নাসিম

গুলশানের নিজ রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার সকাল থেকে দুইবার বমি করেছেন তিনি। দিনভর ছিল বমি বমি ভাব। চোখ ও নাক দিয়ে ঝরছে পানি। মাথা ব্যথা ও  জ্বালা-পোড়া করছে শরীর। শ্বাসকষ্ট ও ঘন ঘন কাশি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শারীরিক সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন খালেদা জিয়া। সোমবার বিকালে তার গাড়ি লক্ষ্য করে পুলিশের ছোড়া পিপার স্প্রেতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল। খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরে সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণে তার শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে গুলশান কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন প্রেস সচিব। তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারি নিরাপত্তার নামে ‘অবরুদ্ধ’ খালেদা জিয়ার গাড়ি লক্ষ্য করে পুলিশ ভয়ঙ্কর পিপার স্প্রে করেছিল। এ ঘটনা সারা দেশের মানুষ অবলোকন করেছে। এরপর থেকেই দেশের নানা প্রান্তে থাকা বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। এরই প্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার নির্দেশক্রমে দেশবাসীকে জানাচ্ছি, তার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভাল নেই। মারুফ কামাল বলেন, সকাল থেকে দুইবার বমি করেছেন খালেদা জিয়া। এছাড়া, সারাদিন তার বমি বমি ভাব অব্যাহত ছিল। ব্যক্তিগত চিকিৎসক মামুনুর রহমান মামুনসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে বিএনপি চেয়ারপারসনকে অক্সিজেন ও নেবুলাইজার দেয়া হচ্ছে। দুইজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার চিকিৎসা করছেন। খালেদা জিয়ার চোখ এবং নাক দিয়ে পানি ঝরছে। তার শরীর জ্বালা-পোড়া করছে। মারুফ কামাল বলেন, এর আগে শিক্ষকদের ওপর এই পিপার স্প্রে করা হয়েছিল। কয়েকজন আহতসহ একজন শিক্ষক পিপার স্প্রের যন্ত্রণায় নিহতও হয়েছিলেন। এর প্রেক্ষিতে এই স্প্রে ব্যবহার না করার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশও আছে। হাইকোর্টের এ নির্দেশ অমান্য করে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসনকে লক্ষ্য করে পিপার স্প্রে করা হয়েছে। আমরা এর নিন্দা জানাচ্ছি। একইসঙ্গে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করছি। রাতে গুলশানের অবরুদ্ধ কার্যালয়ের ভেতরে যে ক’জন সাংবাদিক রয়েছেন, তারাই এ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। বাইরে থেকে কোন সাংবাদিককে পুলিশ প্রবেশ করতে দেয়নি।
খালেদাকে রক্ষা করা হাসিনার দায়িত্ব: নাসিম
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, শেখ হাসিনার দায়িত্ব খালেদা জিয়াকে রক্ষা করা। তাঁর ওপর যদি হামলা হতো, এর দায়ভার সরকারকেই নিতে হতো। তাঁর নিরাপত্তার কারণেই তাঁকে বের হতে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনের বটতলায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত এই কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ২৫০ ব্যাগ রক্ত দেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যদি রাস্তায় নেমে পড়তেন, পুলিশ হয়তো থাকবে, তাঁর সঙ্গে হয়তো কিছু লোকজনও থাকত। এর মধ্যে একজন যদি ঢুকে পড়ে তাঁকে (খালেদা জিয়াকে) আঘাত করে, তবে দায়ী হবে আমাদের সরকার। এর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করার জন্য ভাড়া করা একজন খুনি ভারতের বীরভূমে ধরা পড়ে। এর আগে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে গিয়ে ২১ আগস্ট ২৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশে যেকোনো জিনিস হতে পারে। আমাকে যদি গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, তাদের কাছে ইনফরমেশন আছে যে একজন নেত্রীকে হত্যা করে এ দেশে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করা হবে, এ দেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করা হবে, তবে আমরা তা বিশ্বাস করব না কেন বলুন।’
মন্ত্রী বলেন, ‘একজন দায়িত্ববান নেত্রী যদি এভাবে আঘাতের সম্মুখীন হন, তবে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের নয় কি? কার ভরসায় আমরা তাঁকে ছেড়ে দেব। তাঁর নেতা-কর্মীরা কেউ এখন নেই। এখন শেখ হাসিনার দায়িত্ব খালেদা জিয়াকে রক্ষা করা।’ তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় খালেদা জিয়া যেভাবে পরাজিত হয়েছেন, আন্দোলনের মাঠেও তিনি পরাজিত। যুদ্ধ ক্ষেত্রে যখন সেনাপতি অস্ত্র হাতে নেমে যান, তখন বোঝা যায় আর কোনো সৈনিক অবশিষ্ট নেই। ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক এ বি তাজুল ইসলাম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, এনামুল হক, মাহমুদ হাসান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সারা দেশে নয়টি গাড়িতে আগুন

(বিএনপির ডাকা অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে আজ মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে রাজউক ভবনের সামনের সড়কে দুর্বৃত্তরা একটি বাস ও একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ছবি: ফোকাস বাংলা) বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের প্রথম দিন আজ সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা পর্যন্ত সারা দেশে নয়টি যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে । এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই আটটি গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্তব্যরত কর্মকর্তা শাহজাদী সুলতানা জানান, এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। তিনি জানান, বেলা আড়াইটার দিকে পল্টনে রাজউক ভবনের বিপরীত দিকে বিআরটিসির একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় বাসের পাশেই থাকা একটি ব্যক্তিগত গাড়িও আগুনে পুড়ে যায়। প্রায় একই সময়ে তাঁতীবাজার মোড়ে আরেকটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে শাহবাগে একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। প্রায় একই সময়ে মিরপুর ১০ নম্বরে বিকল্প সিটি পরিবহনের একটি বাস দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে যায়।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গুলিস্তান ও মহাখালীতে দুটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। তেজগাঁও অঞ্চলের পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক সিরাজুল কবির জানান, সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে বনানী থেকে মিরপুর ১৪ নম্বর রুটে চলাচলকারী খালি একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। বাসটি ওই সময় আমতলী মদিনা হোটেলের সামেন দাঁড়িয়ে ছিল। আগুনে বাসের বেশ কয়েকটি আসন পুড়ে গেছে। গাড়ির চালক ও সহকারীকে আটক করা হয়েছে।
একই সময়ে লালবাগ থানার পোস্তা পুলিশ ফাঁড়ির সামনের সড়কে পিকআপ ভ্যানে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন আমজাদ হোসেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, আমজাদ পিকআপ নিয়ে কামরাঙ্গির চর বেড়িবাঁধ থেকে চানখারপুল আসছিলেন। পোস্তা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এলে কয়েকজন দুর্বৃত্ত গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রল ছুড়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। তিনি গাড়ি থেকে নেমে পড়লেও তাঁর বাঁ-হাত আগুনে ঝলসে যায়। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নেন। আগুনে গাড়িটি পুড়ে যায়। দুর্বৃত্তরা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় বলে জানান তিনি। এ ছাড়া রাজশাহীর বিনোদপুরে একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ

গত বছরের  ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের এক বছর পূর্তিতে ‘৫ই জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা ও কালো দিবস’  উপলক্ষে  বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে যুক্তরাজ্য বিএনপি। সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত যুক্তরাজ্য বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে অবস্থান করে। নানা দাবি সম্বলিত ব্যানার, প্ল্যাকার্ড নিয়ে ও মাথায় কালো কাপড় বেঁধে নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনে চাপ প্রয়োগের জন্য বৃটিশ সরকারের প্রতি দাবি জানান। এই দাবিতে তারা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বরাবর একটি স্মারকলিপিও দিয়েছেন। যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতৃত্বে যুবদল, তরুণ দল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এই বিক্ষোভে অংশ নেন। ‘ডাউন ডাউন শেখ হাসিনা, শেইম শেইম শেখ হাসিনা, হাসিনা মাস্ট গো, কিলার হাসিনা গো এ ওয়ে’ ইত্যাদি নানা দাবি সম্বলিত ব্যানার নিয়ে জ্বালোরে জ্বালো আগুন জ্বালো, একশান একশান ডাইরেক্ট একশন ইত্যাদি নানা শ্লোগান দিতে দেয়। গত বছরের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের দিনটিকে বিএনপি গণতন্ত্রের হত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এ উপলক্ষে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে এক সংক্ষিপ্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান। যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুসের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমেদের পরিচালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন সিটিজেন মুভমেন্ট ইউকের আহ্বায়ক এম এ মালেক, যুক্তরাজ্য বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল হামিদ চৌধুরী, সহ সভাপতি তৈমুছ আলী, আক্তার হোসেন, মঞ্জুরুস সামাদ চৌধুরী, মুজিবুর রহমান মুজিব, প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ চৌধুরী, সহসাধারণ সম্পাদক এডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল, প্রচার সম্পাদক এম এ কাইয়ুম প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ৫ই জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা ও কালো দিবস উপলক্ষে বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারের যে ডাক দিয়েছেন যে ডাকে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ মতো শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করা পর্যন্ত সবাইকে রাজপথে অবস্থান করতে হবে। বক্তারা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। জনগণের চাওয়া ছিল একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু তারা জানে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তারা বিজয় লাভ করতে পারবে না ; তাই ৫ই জানুয়ারি তামাশার নির্বাচনের মাধ্যমে তারা জোর করে ক্ষমতা দখল করে আছে। সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, তাদের দাবি একটাই শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে যাতে  একটি চাপ তৈরি হয় সেজন্য তারা বিদেশের মাটিতে এমন কর্মসূচি পালন করছেন বলে জানান। শেখ হাসিনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত নেতাকর্মীরা রাজপথে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, গণতন্ত্রের কালো দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্য, আমেরিকাসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দলের নির্দেশনা অনুযায়ী বেলজেয়িাম, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে স্থানীয় নেতাকর্মীরা সংশ্লিষ্ট দেশের পার্লামেন্ট কিংবা জাতিসংঘ অফিসের সামনে অবস্থান নিয়েছেন। উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য বিএনপির উপদেষ্টা নসরুল্লাহ খান জুনায়েদ, শামীম আহমেদ,  সহ সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ, শাবি’র সাবেক সহকারী অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান, যুক্তরাজ্য যুবদলের আহ্বায়ক দেওয়ান মুকাদ্দেম চৌধুরী নিয়াজ, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাসির আহমেদ শাহীন, সদস্য সচিব আবুল হোসেন, জাসাস সভাপতি এম এ সালাম, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, যুক্তরাজ্য আইনজীবি ফোরামের আহ্বায়ক ব্যারিষ্টার তারেক বিন আজিজ, সদস্য সচিব বিপ্লব পোদ্দার প্রমুখ।

শ্যালা নদীতে আবারও নৌ চলাচলের অনুমতি

সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে আবারও নৌযান চলাচলের অনুমতি দিল সরকার। তবে আপাতত কোনো তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করতে পারবে না। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কাল বুধবার সকাল থেকে শুধু দিনের বেলা নৌযান চলাচল করতে পারবে। গত ৯ ডিসেম্বর শ্যালা নদীতে সাড়ে তিন লাখ লিটার তেলসহ একটি ট্যাঙ্কারডুবির ২৮ দিনের মাথায় সরকার এই অনুমতি দিল। তেল ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার ওই পথটি বন্ধ করে দিয়েছিল। এর আগে ২০১১ সালের এপ্রিলে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীতে একটি নৌপথ চালু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিইউটিএ)। গত এক বছরে এই পথে মোট তিনটি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত ৯ ডিসেম্বরের দুর্ঘটনায় সুন্দরবনের প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে বলে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তেল ছড়িয়ে পড়ায় সুন্দরবনের প্রাণীদের খাদ্যচক্র ভেঙে পড়েছে।
আজ মঙ্গলবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। নৌ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নৌ পরিবহনসচিব শফিক আলম মেহেদী, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব নজিবুর রহমান প্রমুখ।  ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নৌযানগুলোর দিনের বেলায় সুন্দরবন এলাকা (বিশেষ করে শ্যালা নদী) অতিক্রম করতে হবে। কুয়াশা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় দিনের বেলায়ও শ্যালা নদীতে নৌযান চলাচল করতে পারবে না।
৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর জাতিসংঘ, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে সুন্দরবন দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধের সুপারিশ করা হয়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল এখনো তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করেনি। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং সুপারিশ দেওয়ার কথা রয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিল। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের খননকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বুধবার সকাল থেকে শ্যালা নদী দিয়ে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাময়িকভাবে নৌযান চলাচল করতে পারবে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের খননকাজ জুন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। সুন্দরবন এলাকায় শ্যালা নদী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য কোস্টগার্ড দায়িত্ব পালন করবে। কোস্টগার্ডকে সহায়তা করবে বিআইডব্লিউটিএ, বন বিভাগ, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর।
বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, উল্লিখিত পথে চলাচলকারী জাহাজের ফিটনেস সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের সহায়তায় কোস্টগার্ড চেক করতে পারবে। সাগরে চলাচল করতে সক্ষম জাহাজ সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।

হ্যাপীর রিট খারিজ

জাতীয় দলের ক্রিকেটার রুবেল হোসেনকে বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ দেয়ার জন্য চিত্রনায়িকা নাজনীন আক্তার হ্যাপী দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্টে। আজ বিচারপতি গাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আবেদনটি হাইকোর্টে শুনানির জন্য উঠলে হ্যাপীর আইনজীবী মো. ইউনুস আলী আকন্দ অনুপস্থিত থাকায় আবেদনটি খারিজ করে দেন আদালত। এর আগে ক্রিকেটার রুবেল হোসেনকে বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ দেয়ার জন্য, জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড থেকে রুবেল হোসেনের নাম বাদ দিয়ে তার পাসপোর্ট জব্দ করার নির্দেশনা চেয়ে ওই রিট আবেদন করা হয়েছিল। এছাড়া হ্যাপীর দায়ের করা রাজধানীর মিরপুর মডেল থানার মামলায় তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম এবং পাঁচ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে আসামির জামিন না দেয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আসামি রুবেলের হাত থেকে হ্যাপীর ‘জীবন রক্ষায়’ পুলিশি নিরাপত্তা দিতে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না- তা জানতে রুল চাওয়া হয়েছিল।

‘গ্রেপ্তারের মহোৎসবে মেতে উঠেছে সরকার’

সরকার দেশব্যাপী গ্রেপ্তারের মহোৎসবে মেতে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ অভিযোগ করেন। খালেদা জিয়া বলেন, আমাকে রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রেখে বর্তমান অবৈধ ফ্যাসিস্ট সরকার দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে গ্রেপ্তার করেছে। দেশব্যাপী একই কায়দায় গ্রেপ্তারি অভিযানের মহোৎসবে মেতে উঠেছে।  কেবল বিরোধী দলের নেতাকর্মীই নয় বরং সাধারণ মানুষও এখন পুলিশি আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে। বর্তমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের প্রতি জনগণের ন্যূনতম সমর্থন নেই। তাই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের ওপর নির্যাতন নিপীড়ণের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের জনগণকে ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের সকল অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। অবিলম্বে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ গ্রেপ্তারকৃত সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবি জানানিয়েছেন বিরোধী জোট নেতা। এদিকে পৃথক বিবৃতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে তার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন দলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ।

বের হওয়ার পরই ফখরুল গ্রেপ্তার- ফখরুলের মুক্তি দাবি করে খালেদার বিবৃতি

(জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বের হওয়ার পরই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত একটি গাড়িতে ওঠেন। এরপর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবি: মনিরুল আলম) সংবাদ সম্মেলন শেষে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বের হওয়ার পরই গ্রেপ্তার হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ মঙ্গলবার বিকেল সোয়া চারটার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আগামীকাল মির্জা ফখরুলকে আদালতে নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ) মাসুদুর রহমানের ভাষ্য, বিএনপির নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। তাঁর জানামতে ৬০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। কোন মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। আদালতে নেওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
বিকেলে সংবাদ সম্মেলন শেষে মির্জা ফখরুল প্রেসক্লাব থেকে বের হন। ফটক পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশকে প্রস্তুত হতে দেখা যায়। ফটকের সামনে পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যান রাখা ছিল। মির্জা ফখরুল ব্যক্তিগত একটি গাড়িতে ওঠেন। পরে সেখানে ডিবির এক সদস্য ওঠেন। এরপর গাড়িটি নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ির পেছনে পুলিশের প্রিজন ভ্যান ও বেশ কয়েকটি গাড়ি ছিল।
বিএনপির নেতা ফখরুল প্রেসক্লাবের ফটকে আসার সময় আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের একটি মিছিল থেকে ‘ধর ধর ফখরুলরে ধর’ বলে স্লোগান দেওয়া হতে থাকে। মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়।
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি সারা রাত জাতীয় প্রেসক্লাবে ছিলেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের ঐতিহ্যগত আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। এ জন্য তিনি সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান। তিনি আরও বলেন, দেশ কারাগারে পরিণত হয়েছে। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকেরা বরাবরই প্রেসক্লাবে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রেসক্লাবের দরজা তাঁদের জন্য খোলা ছিল। এটা নিয়ে কেউ কটাক্ষ করেননি। শওকত মাহমুদ আরও বলেন, মির্জা ফখরুল প্রেসক্লাব থেকে বের হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকেরা তাঁকে যেতে দেননি। কারণ বাইরে গেলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতো।
ফখরুলের মুক্তি দাবি করে খালেদার বিবৃতি- সরকার গ্রেপ্তার অভিযানের মহোৎসবে মেতেছে
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, অবৈধ ফ্যাসিস্ট সরকার দেশব্যাপী গ্রেপ্তারি অভিযানের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। আজ মঙ্গলবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মাথায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমাকে আমার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রেখে বর্তমান অবৈধ ফ্যাসিস্ট সরকার দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে গ্রেপ্তারসহ দেশব্যাপী একই কায়দায় গ্রেপ্তারি অভিযানের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। কেবল বিরোধী দলের নেতা-কর্মীই নয়, বরং সাধারণ মানুষও এখন পুলিশি আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে। বর্তমান রাষ্ট্রীয়ÿক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের প্রতি জনগণের ন্যূনতম সমর্থন নেই বলেই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এবং রাষ্ট্রÿক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের ওপর নির্যাতন নিপীড়নের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি দেশের জনগণকে ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের সকল অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুলসহ সব ‘রাজবন্দীর’ বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান বিবৃতিতে। আজ বিকেলে সংবাদ সম্মেলন শেষে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বের হওয়ার পরই গ্রেপ্তার হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গ্রেপ্তারের পর বিকেল সোয়া চারটার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। আগামীকাল মির্জা ফখরুলকে আদালতে নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সঙ্কট সমাধানে আলোচনার আহবান এরশাদের

চলমান সঙ্কট সমাধানে সব দল নিয়ে এক টেবিলে আলোচনায় বসার আহবান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।  এক বিবৃেিত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন দেশ আবার চরম রাজনৈতিক সংঘাত, অস্থিরতা, হানাহানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নতুন বছরের শুরু থেকেই এই সংঘাতের রাজনীতি শুরু হয়েছে। সরকারও অসহিষ্ণু হয়ে বিরোধী পক্ষের উপর মারমুখী আচরণ চালাতে শুরু করেছে। বিবৃতিতে তিনি বলেন, সংঘাতের রাজনীতির কারণে গণতন্ত্র এখন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। এই কারণে ইতিমধ্যে অনেক প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে গেছে। এ ধরণের ঘটনায় আমি দুঃখিত ও মর্মাহত। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারীরা সরকার বিরোধী আন্দোলনের নামে জনগণকে জিম্মি করার মতো কর্মসূচি গ্রহণ করছে। অপরদিকে সরকারও প্রতিপক্ষকে দমনের নামে আগ্রাসীদের মতো ভূমিকা পালন করছে। আমরা এর কোনোটাকেই মেনে নিতে পারি না। বিবৃতিতে এরশাদ বলেন আমরা মনে করি- জনগণের স্বার্থের কথা চিন্তা করে উভয় পক্ষকেই নমনীয় এবং শান্ত থাকতে হবে। সকল দলের সাথে আলাপ-আলোচনা মাধ্যমে সংকট নিরসনে শান্তিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। প্রতিবাদের ভাষা পরিবর্তন করতে হবে। আমি পয়লা জানুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত মহাসমাবেশেই আশংকা করেছিলাম যে, ৫ই জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দেশে আবার সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। দেশবাসী শান্তি চায়- নিরাপত্তা চায় এবং তারা দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায়। ঔপনিবেশিক আমলের সেই হরতাল-অবরোধের মতো নেতিবাচক অপরাজনীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর ফলে জনমনে চরম আতঙ্ক-অনিশ্চয়তা নেমে আসছে। এই অবস্থায় একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ চলতে পারে না এবং সংঘাত ও গণতন্ত্রও একসঙ্গে  চলতে পারেনা। এতে বলা হয় আমার সেই আশংকাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মহাসমাবেশেই আমি সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলামÑআসুন আমরা একটি সর্বদলীয় কনভেনশনে মিলিত হয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে সর্বসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমি আবারও সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাই- আসুন এক টেবিলে আলোচনায় বসি এবং সংকট নিরসনের উপায় উদ্ভাবন করি।

মির্জা ফখরুল গ্রেফতার, খালেদার নিন্দা

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারের পর তাকে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এছাড়া ফখরুলকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে রংপুর বিভাগে হরতাল ডেকেছে বিএনপি। সোমবার প্রেস ক্লাবে পেশাজীবীদের সম্মেলনে যোগ দিতে এসে বাধার মুখে পড়ে অবস্থান করছিলেন। প্রায় ২৪ ঘন্টা অবস্থান শেষে মঙ্গলবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে বের হওয়ার সময় বিকেল সোয়া চারটায় তাকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকাল পৌনে ৪টার দিকে সংবাদ সম্মেলন শেষে ফখরুল নিজের গাড়িতে চড়ে প্রেস ক্লাব থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রধান ফটকে পুলিশ তার গাড়িটি আটকে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ ফটকে আটকে রাখার এক পর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের গাড়িতেই উঠে পড়েন। এরপর সোয়া ৪টার দিকে গাড়িটি মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ের দিকে রওনা হয়। ফখরুলের গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সামনে ছিল ডিবির মাইক্রোবাসটি, পেছন পেছন যায় প্রিজন ভ্যান ও পুলিশ ভ্যানটি।
ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া উইং) মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, 'মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। আমার জানা মতে, ৬০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। কোন মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। আদালতে নেওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।' তিনি আরো জানান, বুধবার আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে। বর্তমানে তাকে ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। এর আগে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বিএনপি নেতাকর্মীদের দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে সবচেয়ে বড় সংকট উপস্থিত হয়েছে। সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত জনগণের ভোটের অধিকার এবং মানুষের বিচার পাবার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। সে অধিকার ফিরে পেতে তিনি সবাইকে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানান।
এদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেফতারের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'অন্যায়ভাবে' মির্জা ফখরুলকে আটক করা হয়েছে। সরকার দেশব্যাপী 'গ্রেফতারি অভিযানের মহোৎসবে' মেতে উঠেছে।  তিনি বলেন, 'আমাকে আমার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রেখে বর্তমান অবৈধ ফ্যাসিস্ট সরকার দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে গ্রেফতারসহ দেশব্যাপী একই কায়দায় গ্রেফতারি অভিযানের মহোৎসবে মেতে উঠেছে।'
কেবল বিরোধী দলের নেতাকর্মীই নয় বরং সাধারণ মানুষও এখন পুলিশি আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে- এমন অভিযোগ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, 'বর্তমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের প্রতি জনগণের ন্যূনতম সমর্থন নেই বলেই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের ওপর নির্যাতন নিপীড়ণের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি দেশের জনগণকে ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের সকল অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।'

রাজশাহীতে শিবির-পুলিশ সংঘর্ষ

(রাজশাহী নগরের সপুরা এলাকায় আজ মঙ্গলবার শিবিরকর্মীরা পুলিশের বন্দুক কেড়ে নিয়ে পুলিশকে পেটায়। ছবি: প্রথম আলো) ২০ দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ কর্মসূচিতে রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে শিবির কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশের দুই সদস্য গুরুত্বর আহত হয়েছেন। আহত পুলিশ কনস্টেবল আমজাদ ও শফিকুলকে উদ্ধার করে বিজিবি। পরে তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার সকাল সোয়া দশটার দিকে মহানগরীর শালবাগান এলাকার পাশে আলিফ-লাম-মিম ভাটার সামনে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। অবরোধের সমর্থনে ছাত্রশিবির কর্মীরা মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ও রাস্তায় পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় পুলিশ বাধা দিলে শিবির কর্মীরা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। গাড়িতে থাকা পুলিশ কনস্টেবল আমজাদ ও শফিকুল গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে শিবির কর্মীরা তাদের ঘিরে ধরে ইট ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। শিবির কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে থাকা অস্ত্রও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। >>মানবজমিন
বন্দুক কেড়ে পুলিশকে পেটাল শিবির -
রাজশাহীতে আবার গাড়িতে হামলা করে বন্দুক কেড়ে নিয়ে পুলিশকে পেটালেন ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। আজ মঙ্গলবার সকালে নগরের সপুরা এলাকায় আলিফ লাম মিম ইটভাটার সামনে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে এই এলাকার পার্শ্ববর্তী শালবাগান এলাকায় একইভাবে পুলিশকে পিটিয়েছিল শিবির। হামলায় আহত পুলিশ সদস্যরা হচ্ছেন শাহ মখদুম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর হোসেন এবং কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন ও জামাল উদ্দিন। এঁদের মধ্যে গুরুতর আহত শফিকুল ও আমজাদকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। অপর দুজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আজ সকাল ১০টার দিকে শিবিরের কর্মীরা রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের সপুরা এলাকায় আলিফ লাম মিম ইটভাটার পাশে রাস্তায় আগুন দিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এ সময় নগরের শাহ মখদুম থানার একটি পুলিশ ভ্যান সেদিকে যাচ্ছিল। শিবিরের অবরোধ দেখে পুলিশ গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তার আগেই শিবিরের কর্মীরা পুলিশ ভ্যানটিকে ধাওয়া করে ঘিরে ফেলেন ও ভাঙচুর করেন। এ সময় কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম ও আমজাদ হোসেন গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে শিবির-কর্মীরা তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁরা শফিকুল ইসলামের বন্দুক কেড়ে নিয়ে তাঁকে পিটিয়ে রাস্তার ধারে ফেলে দেন। তাঁরা আমজাদ হোসেনকেও পেটান। যাওয়ার সময় তাঁরা খানিকটা দূরে বন্দুকটি ফেলে চলে যান। এ সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ধাওয়া করলে শিবির-কর্মীরা পালিয়ে যান। কনস্টেবল শফিকুলের মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছিল এ সময়।
রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘শিবির-কর্মীরা রাস্তায় পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে অবরোধ করছিলেন। পুলিশ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে শিবিরের কর্মীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে দুজন কনস্টেবল আহত হয়েছেন। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় দোষীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
এর আগে ২০১২ সালের ৬ নভেম্বর নগরের সাহেববাজার এলাকায় বন্দুক কেড়ে নিয়ে শিবির-কর্মীরা পুলিশকে পিটিয়ে বন্দুক ভেঙে ফেলেন। এরপর ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল নগরের শালবাগান এলাকায় অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পুলিশের এসআই জাহাঙ্গীর হোসেনকে পিটিয়ে জখম করেন শিবির-কর্মীরা। >>প্রথম আলো

রাজধানীতে তিন গাড়িতে আগুন

(রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজউকের সামনে দুর্বৃত্তরা বিআরটিসির বাসে অগ্নিসংযোগ করে। এতে কেউ হতাহত হয়নি। কাউকে আটক করাও সম্ভব হয়নি। বাসের পাশেই থাকা একটি ব্যক্তিগত গাড়িও আগুনে পুড়ে গেছে। পরে অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা আগুন নেভান। ছবি: মনিরুল আলম) বিরোধী জোটের ডাকা অবরোধের প্রথম দিনে রাজধানীতে তিনটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে সাভার পরিবহনের একটি বাসে প্রথম আগুন দেয়া হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যে রাজউক এভিনিউতে একটি বাস ও প্রাইভেট কারে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে আসার আগেই গাড়ি দুটি পুড়ে যায়।

নিরাপত্তার জন্যই প্রেসক্লাবে থাকতে হয়েছে: ফখরুল, প্রেসক্লাবেই থাকবেন ফখরুল -শওকত

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিতেই সোমবার বিকেল থেকে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি মঙ্গলবার বিকেলে প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান।
মির্জা ফখরুল বলেন, এর আগেও জাতীয় নেতৃবৃন্দ জাতীয় প্রেসক্লাবে অবস্থান নিয়েছেন। তারা সাংবাদিকদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। আমিও নিরাপত্তার কারণে এখানে এসেছিলাম। আথিয়েতার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রেসক্লাবেই থাকবেন ফখরুল -শওকত
নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় প্রেসক্লাবে থাকবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপিপন্থি সাংবাদিক নেতারা।
মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের প্রতিনিধি ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ এ কথা জানান।
মির্জা ফখরুলকে প্রেসক্লাব থেকে বের করে দেওয়ার দাবিতে আওয়ামীপন্থি সাংবাদিকদের কনফারেন্স লাউঞ্জে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বিএনপিপন্থি সাংবাদিকরা এই ঘোষণা দিলেন।
এ সময় তিনি মির্জা ফখরুলকে মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী বলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের কড়া সমালোচনা করেন।
শওকত মাহমুদ বলেন, মির্জা ফখরুল এখানে রয়েছেন, আমাদের কাছে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ তাকে সন্ত্রাসী বলে তাদের হাতে তুলে দিতে বলেননি।
সরকারি নীলনকশা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ ধরনের কথা বলা হচ্ছে। আর হানিফদের কথামত সাংবাদিকদের একটি অংশ প্রেসক্লাবে এসে উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

প্রেসক্লাব ‘বহিরাগত’মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান

(জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বের করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ। একপর্যায়ে তারা ফটকের গেটের ওপর দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালায়। ছবি: মনিরুল আলম) জাতীয় প্রেসক্লাব ‘বহিরাগত’মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক নেতারা। তাঁদের দাবি, কর্তৃপক্ষকে প্রেসক্লাব ‘বহিরাগত’মুক্ত করতে হবে। তা না করলে সাধারণ সদস্যরা ব্যবস্থা নেবেন। তখন উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় তাঁদেরই (প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ) নিতে হবে বলে তাঁরা হুঁশিয়ার করেন। আজ মঙ্গলবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে প্রেসক্লাবে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী এ কথা বলেন। গতকাল সোমবার দুপুর থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রেসক্লাবের ভেতরে রয়েছেন। সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রেসক্লাবে আশ্রয় নেওয়া মির্জা ফখরুলসহ সব রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে বের করে দিতে প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানানো হয়। প্রেসক্লাবকে একটি রাজনৈতিক দলের আখড়া বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ কারণেই কর্তৃপক্ষ ফখরুলসহ নেতা-কর্মীদের রাতভর আশ্রয় দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের জায়গা। এটাকে রাজনৈতিক কার্যালয় হতে দেব না।’
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস সচিব ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল কালাম আজাদ, বিএফইউজের মহাসচিব আব্দুল জলিল ভুঁইয়া, ঢাকা জার্নালিস্ট ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ ব্রিফিংয়ের আগে বেলা একটার দিকে প্রেসক্লাবে আশ্রয় নেওয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে ‘বহিরাগত’ উল্লেখ করে তাঁকে বের করে দেওয়ার দাবিতে প্রেসক্লাবের ভেতরে অবস্থান নেন আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকেরা। প্রেসক্লাবের দোতলায় তাঁরা মিছিল করেন ও স্লোগান দেন। একই সময় প্রেসক্লাবের মূল ফটকে ফখরুলকে বের করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ। প্রেসক্লাবের ভেতরও তাঁরা ঢোকার চেষ্টা করেন।
প্রেসক্লাবের ভেতরে অবস্থান নেওয়া আওয়ামী পন্থী সাংবাদিক নেতা শাবান মাহমুদ বলেন, ‘প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের জন্য। এখানে কোনো বহিরাগতের জায়গা নেই। পেশাদার সাংবাদিকেরা এখানে থাকবেন। ভিন্ন মতের হলেও আমরা সহাবস্থান করব। আমরা কোনো লাঠালাঠি, মারামারি চাই না।’ সাংবাদিক নেতাদের মিছিল থেকে ‘রাজাকারের আস্তানা প্রেসক্লাবে হবে না’, ‘প্রেসক্লাবের পবিত্র মাটিতে বহিরাগতের ঠাঁই নাই’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ আগে পৌনে একটার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ। দলের শতাধিক নেতা-কর্মী প্রেসক্লাবের ফটকে ধাক্কা দেন। ভেতরে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বের করে দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান বলেন, মির্জা ফখরুলকে প্রেসক্লাবের ভেতর থেকে বের করে দিতে হবে। ফটকে ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়। পুলিশকে এ সময় নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। সকালে জানানো হয়, মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি প্রেসক্লাবের ভেতর থেকে বাইরে আসেননি। প্রেসক্লাবের সামনে অনেক পুলিশ রয়েছে।
জানা গেছে, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদের ঘরে রয়েছেন মির্জা ফখরুল। ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে রাজপথের কর্মসূচি গতকাল ঢুকে পড়েছিল জাতীয় প্রেসক্লাবে। প্রায় দিনভর সেখানে সরকার-সমর্থক ও বিরোধীদের বিভিন্ন কর্মসূচি, উত্তেজনা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। বেলা আড়াইটার দিকে অনেকটা আকস্মিকভাবে প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল। এর পর থেকে বেলা দেড়টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ক্লাবের ভেতরই অবস্থান করছেন। দলীয় সূত্র জানায়, রাতে তিনি গ্রেপ্তার হতে চান না। আজ সকালে গ্রেপ্তার হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাবের ভেতরই তিনি অপেক্ষা করছেন।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা এখন রুদ্ধ: খালেদা, ইটিভি চেয়ারম্যান আবদুস সালামের মুক্তি দাবি

পর্নোগ্রাফি আইনে গ্রেপ্তার বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভির (ইটিভি) চেয়ারম্যান আবদুস সালামের মুক্তি দাবি করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে তিনি ইটিভিসহ বন্ধ সব গণমাধ্যম খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে খালেদা জিয়া এই দাবি জানান। বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি।
ইটিভি বন্ধ ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে স্বাধীন মত প্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা স্বীকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার। বর্তমান সরকারের আমলে জনগণের সকল অধিকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় হরণ করা হয়েছে। রুদ্ধ করা হয়েছে নির্ভিকভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে।’
তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক আমার দেশ’ বন্ধ এবং সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে অন্তরীণ রেখেছে। এছাড়া বেসরকারি টিভি ‘চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’
বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘এখন সকল গণমাধ্যমকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বিরোধী দল ও মত দমনে এ ধরনের অন্যায় ও ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ড গণতন্ত্রের জন্য কখনোই শুভ নয়।’
তিনি বলেন, ‘তাই সম্প্রতি বন্ধ করে দেয়া একুশে টিভিসহ সকল বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়া এবং গ্রেপ্তার একুশে টিভির চেয়ারম্যান আবদুস সালামসহ সকল সাংবাদিকের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
জামায়াতের নিন্দা
একই ঘটনার সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্বেচ্ছায় অবরুদ্ধ’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বের হতে না দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এক বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এ নিন্দা জানান।
তিনি বলেন, ‘দেশের চলমান ঘটনা প্রমাণ করছে, আওয়ামী মহাজোট স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছে। দেশে প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নেই। সরকার দেশকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।’
সরকারের তৈরি করা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে দেশ ও জনগণকে উদ্ধারে সবাইকে গণআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি।
উল্লেখ্য, কারওয়ান বাজারে ইটিভির কার্যালয় থেকে সোমবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এর আগে গতকাল সোমবার দুপুর থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইটিভির সম্প্রচারে বিঘ্ন সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া যায়।

অবরোধে আটকে গেছে সবজি

(বিএনপির ডাকা অবরোধ চলাকালে আজ রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ট্রাকে বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে বাঁধাকপি। ছবি: জাহিদুল করিম) শনিবার সকালে বাঁধাকপিভর্তি ট্রাক নিয়ে যশোর থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজার এসেছেন হাফিজুর রহমান। ওই দিন রাতেই তাঁর চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি খারাপ থাকায় বাঁধাকপি বিক্রি হয়নি, তাই আর যেতেও পারেননি। এখন লাগাতার অবরোধে আটকে গেছে হাফিজুরের সবজির ব্যবসা। কেবল হাফিজুরই নন, অবরোধে ট্রাক চলাচল অচল হওয়ায় দেশজুড়েই সবজি ব্যবসায়ীরা রাজধানীতে পণ্য আনতে পারছেন না।
ট্রাকচালক, কারওয়ান বাজারের আড়তদার, শ্রমিক, খুচরা ব্যবসায়ী ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গাড়ি রাখার স্থানের টোল তোলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্য দিনের তুলনায় আজ সকালে সবজিবোঝাই ট্রাক এসেছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা ট্রাকচালক মো. তমেজ উদ্দিন জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর কাছাকাছি সমস্যা থাকায় তিনি চার ঘণ্টা দেরিতে ঢাকায় পৌঁছান। তিনি বলেন, ‘রাত একটার সময় আসার কথা, পৌঁছাইছি ফজরের সময়।’
ট্রাকচালক ও আড়তদারদের অভিযোগ, দেশের পরিস্থিতি খারাপ থাকায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কারওয়ান বাজারে সবজি কিনতে আসা পাইকাররাও আসছেন না। শনিবার থেকে ট্রাক নিয়ে বসে থাকা চালক মো. আলমগীর বলেন, ‘দুই দিন, দুই রাত বইয়াও একগাড়ি মাল বেচা হয় নাই, যে মাল এক রাত্তিরে বেচা যায়।’
আড়তদার মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের অবস্থা খারাপ থাকায় কাস্টমার কম আসছে। কোনো ঝামেলা না থাকলে ওদের মাল বেচা হতো, তখন তারা মাল নিতে আসত।’
কারওয়ান বাজারের শ্রমিক জহিরুল ইসলাম জানান, অন্যান্য দিন বোঝা বয়ে দুপুরের মধ্যে তাঁর ৬০০-৭০০ টাকা আয় হয়। আজ বেলা ১১টা পর্যন্ত তিনি মাত্র ২০০ টাকা পেয়েছেন।
কারওয়ান বাজারের আড়তদার ও ব্যবসায়ীদরে সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে সবজি বেশি আসে মেহেরপুর, যশোর, ঈশ্বরদী, পাবনা, রাজশাহী ও চুয়াডাঙ্গা থেকে।
আমাদের আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, এসব জেলা থেকেও সবজিবোঝাই ট্রাক ছেড়ে আসেনি।
মেহেরপুর: মেহেরপুরের পণ্য পরিবহন সমিতির সভাপতি হাফিজুর রহমানের ভাষ্য, প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০টি ট্রাক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সবজি নিয়ে যায়। তবে গত দুই দিনে কোনো ট্রাকই ছাড়া হয়নি। ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে একাধিক ব্যবসায়ী সবজির চাহিদা জানিয়ে সবজি পাঠাতে অনুরোধ করছেন। কিন্তু ট্রাক মালিক সমিতি পরিস্থিতি না বুঝে ট্রাক ছাড়বে না বলে ব্যবসায়ীদের জানিয়েছে।
ঈশ্বরদী: ঈশ্বরদীর আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই দিন সবজিবোঝাই কোনো ট্রাক ঈশ্বরদী ছাড়েনি। তাঁদের মতে, প্রতিদিন সবজিবোঝাই প্রায় ১৫০টি ট্রাক ঢাকার বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছাড়ে।
পাবনা: জেলার ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রানা বিশ্বাসের ভাষ্য, তাঁদের তালিকাভুক্ত ৪০০টি ট্রাক রয়েছে। অবরোধের কারণে কোনো ট্রাক পাবনা ছাড়েনি। যেগুলো বাইরে ছিল, সেগুলো আর পাবনায় যেতে পারেনি।
যশোর: বাড়িনগর সবজি বাজারের হাট মালিক ফরিদুল ইসলামের ভাষ্য, গতকাল রাতে ২০টির মতো ট্রাক সবজি নিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, কারওয়ান বাজার ও হেমায়েতপুরের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। তবে যশোরের ব্যাপারি আতিয়ার রহমান জানান, যে ট্রাকের ভাড়া ছিল দৈনিক ১৮ হাজার টাকা, তা নেওয়া হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার।
চুয়াডাঙ্গা: অবরোধে সবজি ও পানবাহী ট্রাক চুয়াডাঙ্গা ছেড়ে যায়নি। চুয়াডাঙ্গা ট্রাক বন্দোবস্তকারী অফিসের একজন কর্মী মনির হাসান জানান, প্রতিদিন স্থানীয় বিভিন্ন হাটবাজার ও সরাসরি গ্রাম থেকে অন্তত ১০০ ট্রাক ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছাড়লেও গতকাল রাতে কোনো ট্রাক চুয়াডাঙ্গা ছেড়ে যায়নি।

বিচ্ছিন্ন সহিংসতায় বিরোধী জোটের অবরোধ, তাঁতীবাজারে বাসে আগুন

বিচ্ছিন্ন সহিংসতায় সারাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দূরপাল্লার কোন যানবাহন রাজধানী ছাড়ছে না। তবে ট্রেন এবং লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। রাজধানীর ভেতরে যানবাহন চলাচলও অনেকটা স্বাভাবিক। ভোরে কদমতলী লাল মসজিদ এলাকায় পুলিশের একটি লেগুনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় একজন আনসার সদস্য আহত হয়েছেন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। রাজধানীর কয়েকটি স্থানে জামায়াত-শিবির কর্মীরা অবরোধের সমর্থনে মিছিল বের করে। নারায়ণগঞ্জে বিএনপি কর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসময় কমপক্ষে পাঁচ জন বিএনপি কর্মী আহত হন। পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে।
তাঁতীবাজারে বাসে আগুন
সমাবেশ করতে না দেয়ার প্রতিবাদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধের প্রথম দিনে রাজধানীর তাঁতীবাজারে একটি বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা নাজমা আক্তার জানান, মঙ্গলবার বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে সাভার পরিবহনের বাসটিতে আগুন দেয়া হয়।তিনি বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সাভার-গুলিস্তান-সদরঘাট রুটের বাসটি তাঁতীবাজারে পৌঁছানোর পর ওই এলাকায় একটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এর পরপরই বাসটির পিছনের দিকে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
যাত্রীরা দ্রুত নেমে যাওয়ায় কেউ আহত হননি বলে জানান বাসের চালক।
৫ জানুয়ারি পূর্ব ঘোষিত ‘‘গণতন্ত্র হত্যা’ দিবসের’ কর্মসূচি পালন করতে বাধা দিলে সোমবার বিকেলে সারা দেশে লাগাতার অবরোধের ডাক দেন জোটের নেতা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া।

প্রেস ক্লাবে মির্জা ফখরুল অবরুদ্ধ, পুলিশে দেয়ার আহবান হানিফের, ভেতরে ঢোকার চেষ্টা প্রজন্ম লীগের

(প্রেসক্লাবে দিনভর উত্তেজনা- মির্জা ফখরুল ক্লাবের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছেন) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক পুলিশ প্রেস ক্লাবের চারদিক অবরোধ করে রেখেছে। প্রেস ক্লাবের তিনটি গেটই ঘিরে রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। রয়েছে পুলিশের জলকামান, এপিসি। এ ছাড়া মঙ্গলবার সকালে প্রেস ক্লাবের আশপাশের রাস্তার গলির মুখেও পুলিশের অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। প্রেস ক্লাবে প্রবেশকারী প্রায় সবার দেহ তল্লাশী করা হচ্ছে। জানা গেছে, গতকাল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেশাজীবীদের সমাবেশে যোগ দেয়ার পর প্রেস ক্লাবেই অবস্থান করেছেন। রাতে তিনি প্রেস ক্লাব থেকে আর বের হননি। প্রেস ক্লাব এলাকায় গুজব রয়েছে, মির্জা ফখরুল যেকোনো সময় গ্রেফতার হতে পারেন। ফখরুলের সাথে প্রেস ক্লাবে অবস্থান করছেন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, সম্মিলিত পেশাজীবীর ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজী, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ। কিছুক্ষণের মধ্যে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শিবলী নোমান বলেন, প্রেস ক্লাবে যেকোনো প্রকার নাশকতা ঠেকাতে আমাদের এই অবস্থান। আমাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে আগাম কিছুই বলার নেই।
ফখরুলকে পুলিশে দেয়ার আহবান হানিফের
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফেরারী ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি আখ্যায়িত করে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে জাতীয় প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অবরোধ প্রত্যাখ্যান করে মহানগর আওয়ামী লীগের জমায়েতে সাংবাদিকদের মাধ্যমে এ আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, প্রেস কাব সাংবাদিকদের জায়গা। সেখানে একজন ফেরারী, ওয়ান্টেড আসামি কেন লুকিয়ে থাকবে? প্রেস কাব কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাব, এই আসামিকে পুলিশের হাতে তুলে দিন।
হানিফ বলেন, খালেদা জিয়া কর্মসূচি দিয়েছিলেন। তার কর্মসূচিতে তার দলের নেতা-কর্মীরাই মাঠে নামেনি। এই ক্ষোভে তার নির্দেশে তার দলের সন্ত্রাসীরা গাড়ি পুড়িয়েছে। এভাবে বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হচ্ছে। কর্মসূচি ব্যর্থ হওয়ায় খালেদা জিয়া আবার অবরোধ ডেকেছেন। কিসের অবরোধ? কোথায় অবরোধ হচ্ছে? দেশের জনগণ ঘৃণাভরে এই অবরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। খালেদা জিয়া দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছেন। এ জন্যই অবরোধ ডেকেছেন। জনগণ যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদের অবরোধ মানে না। বিশ্ব ইজতেমার মধ্যে বিএনপির অবরোধ প্রসঙ্গে হানিফ বলেন, সরকার নির্বিঘেœ ইজতেমা পালনের জন্য যা যা করা দরকার, তাই করবে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম প্রমুখ।
প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা প্রজন্ম লীগের
জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ। দলের শতাধিক নেতাকর্মী প্রেসক্লাবের ফটকে ধাক্কা দিচ্ছেন। ভেতরে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বের করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা। গতকাল সোমবার দুপুর থেকে মির্জা ফখরুল প্রেসক্লাবের ভেতরে রয়েছেন। আজ মঙ্গলবার বেলা পৌনে একটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম ল​ীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান বলেন, মির্জা ফখরুলকে প্রেসক্লাবের ভেতর থেকে বের করে দিতে হবে। ফটকে ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। পুলিশকে এ সময় নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। সকালে জানানো হয়, মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি প্রেসক্লাবের ভেতর থেকে বাইরে আসেননি। প্রেসক্লাবের সামনে অসংখ্য পুলিশ রয়েছে। জানা গেছে, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদের ঘরে রয়েছেন মির্জা ফখরুল। ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে রাজপথের কর্মসূচি গতকাল ঢুকে পড়েছিল জাতীয় প্রেসক্লাবে। প্রায় দিনভর সেখানে সরকার-সমর্থক ও বিরোধীদের বিভিন্ন কর্মসূচি, উত্তেজনা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। বেলা আড়াইটার দিকে অনেকটা আকস্মিকভাবে প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল। এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ক্লাবের ভেতরই অবস্থান করছেন। দলীয় সূত্র জানায়, রাতের বেলায় তিনি গ্রেপ্তার হতে চান না। আজ মঙ্গলবার সকালে গ্রেপ্তার হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাবের ভেতরেই তিনি অপেক্ষা করছেন।

একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

একুশে টেলিভিশনের (ইটিভি) চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করেছে। গতরাতে ইটিভি কার্যালয়ের নীচ থেকে তাকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্যান্টনমেন্ট থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৬শে নভেম্বর ক্যান্টনমেন্ট থানায় এক নারী এ মামলাটি দায়ের করেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একুশে টেলিভিশনের অপরাধ বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘একুশের চোখ’ এ প্রচারিত প্রতিবেদনের কারণে এ মামলা দায়ের করা হয়। ইটিভির কর্মকর্তা সাঈদ মুন্না জানান, রাত সাড়ে তিনটার দিকে বাসায় যাওয়ার সময় অফিসের নীচ থেকে ডিবি পুলিশের একটি দল ইটিভি চেয়ারম্যানকে আটক করে নিয়ে যায়। ইটিভি চেয়ারম্যানের গাড়ি চালক বাদল সাংবাদিকদের জানান, চেয়ারম্যানকে নিয়ে ইটিভির গাড়ি পার্কিং থেকে বের হতেই হঠাৎ ১০/১২ জন লোক এসে গাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা আবদুস সালামের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে নামতে বলে। তিনি নামতে অস্বীকৃতি জানালে একজন জোর করে গাড়ি চালককে নামিয়ে দেয়। এরপর সাদা পোশাকদারী একজন গাড়িতে উঠে চালিয়ে নিয়ে যায়। তারা বলে যায়, তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে যাচ্ছি। গাড়ি চালক জানান, ডিবি সদস্যদের কাছে ওয়াকিটকি ও রিভলবার ছিল। একজন ডিবি লেখা কটি পরে ছিল।

রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস ছাড়ছে না

বিএনপির দেশব্যাপী চলমান অবরোধ কর্মসূচিতে রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছাড়ছে না। অবরোধ, যাত্রী না থাকা ও ঝুঁকির কথা চিন্তা করে অবরোধের মধ্যে বাস না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাস মালিকরা। গাবতলী ও আমিনবাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাটুরিয়া রুটে কয়েকটি লোকাল বাস ছেড়ে গেছে। এছাড়া গাবতলী-সাভার রুটে বিআরটিসিসহ কয়েকটি পরিবহনের বাস ছেড়ে গেছে। তবে দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। একই চিত্র মহাখালীর। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে কোনো বাস ছেড়ে যাচ্ছে না। বেশিরভাগ কাউন্টারই বন্ধ রয়েছে। সায়েদাবাদ বার্সি টার্মিনাল থেকেও দূরপাল্লার বাস ছাড়ছে না। দক্ষিণাঞ্চলগামী গাড়িগুলো টার্মিনালের মধ্যে রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কিছু যানবাহন কাঁচপুর  পর্যন্ত চলাচল করছে। টার্মিনালের সব কাউন্টারই বলা যায় বন্ধ। গাবতলীর হানিফ পরিবহনের সঞ্জীব বাবু জানান, তারা সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে রাতে ২/৩টি গাড়ি ছাড়া হতে পারে।

পুলিশ কইল, ‘চল’...

(বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয় থেকে বের হয়ে বাঁ দিকে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে গুলশান মডেল কলেজের সামনে আড়াআড়িভাবে দুটি ট্রাক রাখা হয়। গতকাল দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলো) রোববার রাতে বালুভর্তি ট্রাক নিয়ে গাবতলী থেকে উত্তরা যাচ্ছিলেন ভোলার ছেলে নুরুন্নবী। তিন মাস বেকার ছিলেন। এটাই প্রথম ‘ট্রিপ’। কিন্তু বিসমিল্লাহতেই গলদ। বনানীর কাছে পুলিশ ধরেছে। কোথায়, কেন যেতে হবে, সেসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলেছে, ‘চল, এই গাড়ি যেই দিকে যাবে, সোজা সেই দিকে যাবি।’
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ রোববার রাতে যে ১০টি ট্রাক ও একটি পিকআপ এনে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে বসিয়েছে, তার সাতটিই গাবতলী থেকে বনানী, গুলশান ও শাহজাদপুরের দিকে যাচ্ছিল। ছয়টি গাড়িতে নির্মাণসামগ্রী থাকলেও চারটি ট্রাক ছিল একদম ফাঁকা। ট্রাকগুলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, রংপুর ও খুলনা থেকে নিবন্ধিত। তবে এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচির ডাক দিলে আগের রাত থেকে খালেদা জিয়ার বাড়ির মূল ফটকের সামনে ট্রাক রাখা হয়েছিল। তার ওপর দাঁড়িয়ে টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার চালাচ্ছিল। এ দফায় ট্রাকগুলো রাখা হয়েছে কার্যালয়ের দুই পাশে।
ট্রাকচালক নুরুন্নবী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদে বাড়ি গেছিলাম। আইসা শুনি চাকরি গ্যাছে। কাইলই প্রথম টিপ মারতে বাইর হইছি। পাঁচ-ছয়টা টিপ মারার কথা আছিল। এক টিপে আমি দেড় শ, মালিক সাড়ে চাইর শ। এহন সরকার আইনা এইহানে বসাইছে। মালিক কি বইসা থাকলে ট্যাকা দিব?’
যানবাহনের সঙ্গে নুরুন্নবীর মতো কমপক্ষে ৩৫ জন লোক আটকা পড়েছেন। তাঁরা ট্রাকচালক, চালকের সহযোগী, ইট, বালু বা খোয়াবাহী বাহনের দিনমজুর। দিন এনে দিন খান। বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান আছে। কারও কারও বৃদ্ধ বাবা-মাও আছেন। স্বজনেরা দুশ্চিন্তা করবেন বলে অনেকে বাড়িতে খবর দেননি। অনেকে স্ত্রীকে দিয়েছেন। উদ্বিগ্ন স্ত্রী বারবার খোঁজ করছেন স্বামীর। সন্তানেরা বাবার অপেক্ষায়।
অবরুদ্ধ এই মানুষগুলো বলেছেন, তাঁরা কাজ করলে টাকা পান, নইলে পান না। পটুয়াখালী থেকে আসা দিনমজুর মো. আব্বাস প্রতি রাতে কাজ করেন। সপ্তাহে দুই হাজার টাকার মতো রোজগার তাঁর। এক হাজার টাকা বাড়িতে পাঠান স্ত্রী ও চার সন্তানের জন্য। কত দিন এ অবস্থা চলবে, কীভাবে টাকাপয়সা জোগাড় হবে—এই ভেবে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। গতকাল বিকেল পর্যন্ত বাড়িতে খবর দেননি। ট্রাকচালক টাকা দিয়েছিলেন, রুটি-কলা কিনে খেয়েছেন।
তবে দুপুরে পুলিশ ট্রাকপ্রতি ১০০ টাকা করে দিয়েছে বলে জানান ট্রাকের লোকজন। মো. সেলিম নামের এক ট্রাকচালক জানান, তাঁর ট্রাকে দিনমজুরসহ পাঁচজন ছিলেন। দুজন বাসায় চলে গেছেন। গুলশানের মতো জায়গায় ১০০ টাকায় একজনেরই খাওয়া হয় না বলে অনুযোগ করছিলেন। নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে বাকি দুজনের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ট্রাকের ভালোমন্দের মতো ট্রাকে থাকা শ্রমিকদের দেখভাল করাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে জানালেন তিনি।
অপর এক ট্রাকচালক রাগে-ক্ষোভে বলছিলেন, ‘এই শ্যাষ। আর কুনো দিন ট্রাকই চালামু না। মাছ মারুম। এক কেজি চিংড়ি ধরতে পারলে চাইর শ টাকা। রাস্তায় বাইর হমু। পুলিশ ডর দ্যাখায়া বহায়া রাখব। এই সব আর ভাল্লাগে না।’
আটকে থাকা গাড়িগুলোর একটি ছিল মাটিভর্তি পিকআপ। পিকআপের চালক মো.আলমগীর বলেন, ‘পুলিশরে কইলাম, স্যার, আমার গাড়িতে তো বালু নাই, আমারে নিয়া কী করবেন। কইল, কবর দিমু। কবর দিতে মাটি লাগব। এরপর দেখি ইটের গাড়িও আনছে। কবর বোধ হয় বান্ধাইব।’

কর্তৃত্ববাদী শাসন মানুষ মেনে নেবে না by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি এখন একে অপরের মুখোমুখি। প্রতিদিন চলছে হুমকি-পাল্টা হুমকি। উভয় রাজনৈতিক শক্তি বলছে একে-অপরকে বাংলাদেশের কোথাও জনসভা করতে দেবে না। এরই মধ্যে বিএনপি ঢাকা ও গাজীপুরে তাদের পূর্বনির্ধারিত জনসভা করতে পারেনি। এসব জনসভায় বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে গাজীপুরে খালেদা জিয়ার বক্তৃতা দেয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। রাজধানীতে তার গুলশানের কার্যালয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে পুলিশ। একটি গণতান্ত্রিক দেশে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী জনসভা করতে পারবেন না, বক্তৃতা দিতে পারবেন না- এটা কি শোভনীয়? এতে কি সরকারের দুর্বলতাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে না?
বিরোধী দলকে স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করতে না দিয়ে সরকার কী স্বার্থ হাসিল করতে চায়, তা জাতির কাছে স্পষ্ট নয়। এর মাধ্যমে তারা যদি ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে চায়, তাহলে বলতে হয়, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র প্রিয়। কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসন এদেশের মানুষ মেনে নেয়নি, নেবেও না। তারা যথাসময়ে ফুঁসে উঠবে এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটাবে। কাজেই এখনও সময় আছে সংশোধন হওয়ার এবং দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার। সেই লক্ষ্যে সরকার সংলাপের দরজা খুলে দিতে পারে, বসতে পারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে। এ একটি কাজে বাংলাদেশ অন্তত ১০ বছর এগিয়ে যাবে। চাঙ্গা হবে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। ব্যবসায়ীরা ফিরে পাবেন আস্থা, তাদের ফ্ল্যাট বিক্রি করতে সরকারের দ্বারস্থ হতে হবে না। অন্যদিকে খালেদা জিয়াও সংলাপের জন্য প্রস্তুত। তিনি বারবার সরকারকে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। ২৮ ডিসেম্বরও চীনের রাষ্ট্রদূতকে তার অভিব্যক্তি জানিয়েছেন। তাছাড়া চীনের রাষ্ট্রদূতও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। আমরা চাই, নতুন বছরের শুরুতেই সংলাপের পরিবেশ তৈরি হোক। মানুষ যাতে নতুন বছরটি কাটাতে পারে স্বস্তির মধ্য দিয়ে।
আমরা লক্ষ্য করছি, সরকার খালেদা জিয়ার সংলাপের আহ্বানকে কোনো গুরুত্ব তো দিচ্ছেই না, উল্টো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে প্রতিনিয়ত বিষোদগার করে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন, বিএনপিকে নির্বাসনে পাঠানো হবে; কেউ বলছেন, বিএনপিকে রাজপথে নামতে দেয়া হবে না, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি করতে দেয়া হবে না, বিএনপির সব শীর্ষ নেতাকে নেয়া হবে জেলে ইত্যাদি। ক্ষমতায় থাকলে অনেক কিছু বলা যায়, করা যায়; কিন্তু ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয় সে ভাবনাও থাকতে হবে। অতীতে আমরা অনেক মন্ত্রীকে দেখেছি বোরকা পরে পালাতে, বস্তিতে আশ্রয় নিতে এবং জীবন ভিক্ষা চাইতে। আমরা দেখেছি আইয়ুব-ইয়াহিয়ার পরিণতি। কাজেই সংযত ভাষায় কথা বলাই সমীচীন, তাতে আখেরে পস্তাতে হয় না।
দেশে যে এতদিন একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করেছে, এর কৃতিত্ব জনগণ ও খালেদা জিয়ার। দেশের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি নেত্রী প্রায় এক বছর কোনো ধরনের উত্তেজনাকর ও সহিংস কর্মসূচি দেয়া থেকে বিরত থেকেছেন এবং তিনি বারবার সরকারকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। তার এ আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। মানুষের মনের অভিব্যক্তিই তার মুখ দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। মানুষ চায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই চলমান রাজনৈতিক সংকটের দ্রুত সমাধান হোক এবং সব দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।
দৃশ্যত বারবার আহ্বানে এটাই প্রতীয়মান হয়, খালেদা জিয়া বাস্তবিকেই চান দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করুক। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্ব একটি তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে ছিটকে পড়তে হবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির মূলস্রোত থেকে।
খালেদা জিয়া যদি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিরুদ্ধে গত এক বছরে ৫০টি হরতাল ডাকতেন, তাহলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে বর্তমানের চেয়ে খারাপ অবস্থায় নিপতিত হতো। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তিনি দেশে শান্তি বজায় রাখতে সরকারকে সহায়তা করেছেন।
তবে দেশে যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে, তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে সর্বমহলে। কারণ দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনা প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে দেশে শান্তির ধারাবাহিকতা আশা করা যায় না। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশে হয়নি। একতরফা ও ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে সংসদ ও সরকার। এ নির্বাচনে একটি মাত্র ভোট পড়ার আগেই নির্বাচিত হয়ে গেছে পরবর্তী সরকার, যা নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এ নির্বাচনে ভোট দেননি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতিসহ দেশের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি। এ নিয়ে মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভও বিরাজমান আছে। সরকারের উচিত মানুষের এ ক্ষোভ আমলে নেয়া এবং দ্রুত একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের পথ সুনিশ্চিত করা। তাতে দূর হবে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট।
সংলাপ-সমঝোতার জন্য বিরোধী জোট অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষায় থাকবে- এমনটি মনে করার কারণ নেই। এটি খালেদা জিয়া বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে ব্যক্তও করেছেন। কাজেই চলমান সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের আহ্বানকে দেখতে হবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে। সংলাপ-সমঝোতার জন্য এগিয়ে আসতে হবে ক্ষমতাসীন দলকে, কারণ তারাই ড্রাইভিং সিটে, তারা রাজনীতিকে যেদিকে নিয়ে যাবেন, রাজনীতি কার্যত সেদিকেই যাবে।
প্রায় বছরজুড়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল শান্ত। রাজপথে বিরোধী দলের তেমন কোনো সহিংস কর্মসূচি ছিল না। এ শান্ত পরিস্থিতি সরকার কাজে লাগায়নি। তারা নির্বিকার থেকেছে, আর পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার কৌশল এঁটেছে। তারা রাষ্ট্রীয় মেশিনারি ব্যবহার করছে বিরোধী দলকে দমন করতে। কিন্তু এর ফল যে রাষ্ট্রের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার কিছু নমুনা দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে। গুম, খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে একের পর এক। এটি চলমান কুশাসনের একটা ফল।
ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে রাজনীতি নিয়ে বিপজ্জনক খেলা শুরু করা হয়েছে। এ খেলার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না, কোথাও কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হচ্ছে না। ধ্বংস ছাড়া এ বিপজ্জনক খেলার পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। পত্রিকায় এসেছে, দেশের অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, দেশে কোনো বিদেশী বিনিয়োগ নেই! নেই দেশী বিনিয়োগও! শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি না হওয়ায় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ব্যবসা-বাণিজ্য বলা যায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। কর্মসংস্থানের পথ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলে বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যদ্বাণী করছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের ভয়ানক ক্ষতি করতে পারে। এর আগে কানাডা, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই কথা বলেছে। তারা এও বলেছে, যত দ্রুত সম্ভব একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। তাতে রাজনীতিতে ফিরে আসবে স্থিতিশীলতা।
এসব কথা ক্ষমতাসীনদের আমলে নিতে হবে। বিপজ্জনক রাজনৈতিক পথ থেকে ফিরে আসতে হবে। সংলাপের আহ্বানে সাড়া দিতে হবে। ক্ষমতাসীনদের বুঝতে হবে, অযাচিত শক্তি প্রয়োগ দুর্বলতার প্রকাশ। এভাবে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করা যায় না। কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে হলে দেশে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে আর সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে সর্বগ্রাসী সংকটের মধ্যে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখা দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। এ নির্মোহ সত্যটি শাসক দলকে অনুধাবন করতে হবে দ্রুত।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সফরকারী বিজেপি নেতার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন by ড. মাহবুব উল্লাহ্

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় নেতা তথাগত রায় বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর ভারতের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’ তিনি বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের একজোট হয়ে আওয়ামী লীগকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানান (প্রথম আলো, ৩ জানুয়ারি ২০১৫)।
‘বেদান্ত সংস্কৃত মঞ্চ বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন ‘পূজা পুনর্মিলনী, বিশ্বজুড়ে বিশ্বময়ী’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজেপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য তথাগত রায় বলেছেন, ‘আমি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এটা বলতে পারি না। আমরা একটি দেশের সঙ্গে দেশের মানুষের সম্পর্ক স্থাপন করি। তবে বাংলাদেশের বিষয়টা ভিন্ন, আপনাদের (উপস্থিতদের উদ্দেশে) বোঝার জন্য বলছি। ভারত সরকার আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। ভারত সরকার উপলব্ধি করেছে, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার চেয়ে ভালো কোনো সরকার হতে পারে না। এখানকার হিন্দুদের জন্যও এর চেয়ে ভালো সরকার কি হতে পারে?’
তথাগত রায় বলেন, ‘আমরা এটা মনে করি। আপনারা কি মনে করেন এদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো সরকারের ওপর ভরসা করা যায়? ভাবুন, যদি অন্যদের ওপর ভরসা করা না যায়, তাহলে পুরো সমর্থন আওয়ামী লীগকে দিন। প্রকাশ্যে সমর্থন না দিলে আওয়ামী লীগ আপনাদের ব্যাপারে পুরোপুরি বুঝতে পারবে না।’ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক এ সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের পাওনা ভারত বুঝিয়ে দেবে। তিস্তা ও স্থলসীমান্ত চুক্তি হবে, এটা নিশ্চিত করেই বলতে পারি। তবে বাংলাদেশ কী পরিমাণ পানি পাবে, সেটা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে।’ বিজেপির এ কেন্দ্রীয় নেতা একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলেন, ‘২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ জনের মধ্যে ৮০ হিন্দু ও ২০ জন মুসলমান ছিল। কিন্তু এখন হিন্দু ৭২ আর মুসলমান ২৮। বাংলাদেশে হিন্দু কমার কারণ আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কেন? এর কারণ, অনুপ্রবেশ ও হিন্দুদের কম প্রজনন। তার আশংকা, একদিন বাঙালি হিন্দু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ভারতীয় জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা তথাগত রায়ের বক্তব্যকে খুব হালকাভাবে নেয়া যায় না। তিনি বাংলাদেশ সফরে এসে কথাগুলো বলেছেন এমন এক সময়, যখন এর দু’দিন পর ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার পালন করছে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট দিবসটিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে পালন করতে চাইছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। তথাগত বাবু কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাই নন, তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। সুতরাং ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারের মনোভাব সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা থাকারই কথা। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত অন্য দেশের জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়টি ভিন্ন। তিনি আরও জানিয়ে দিয়েছেন ভারত সরকার আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের জন্য শেখ হাসিনার সরকারের চেয়ে ভালো কোনো সরকার হতে পারে না। তিনি বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়কে একজোট হয়ে প্রকাশ্যে এ সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করতে আহ্বান জানিয়েছেন। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কী হতে পারে? তার বক্তব্যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির পরিষ্কার উসকানি বিদ্যমান। অথচ আমরা মনে করি, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী আছে। তবে তারা ধর্মীয় পরিচয়ে বিভাজিত হতে পারে না। বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু প্রশ্নটি অবান্তর। একথা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া একাধিকবার স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। তার দৃষ্টিতে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশী। তাহলে হিন্দু সম্প্রদায়ের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে তাদের বিশেষ একটি দলের পক্ষে অবস্থান নেয়ার আহ্বান কেন জানানো হচ্ছে? এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানোর অপকৌশল ছাড়া আর কী হতে পারে?
তথাগত বাবুর দৃষ্টিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গটি ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্ক থেকে আলাদা। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের দাদাগিরি সুবিদিত। বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত অতিরিক্ত সুবিধা নিতে চায়। এজন্যই বাংলাদেশের বিষয়টি ভারতের কাছে ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। তবে শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারত তার অন্য প্রতিবেশীদের বেলাতেও প্রায় একই ধরনের নীতিতে বিশ্বাসী। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে বলে ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে অতিরিক্ত অনেক কিছু পেতে চায়। এ ব্যাপারটি বাংলাদেশের অনেক নাগরিকের কাছে স্পষ্ট না হলেও ভারতীয় নেত্রীবর্গের বিভিন্ন উক্তির ফলে আজ হোক, কাল হোক স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকই কামনা করে। তবে তাদের সেই সৎ আকাক্সক্ষা ও শুভেচ্ছা ভারতের বৃহৎ প্রতিবেশীসুলভ দাম্ভিকতার ফলে সঠিক পথে এগোতে পারছে না। পৃথিবীর অনেক দেশেরই বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ যে বৃহৎ রাষ্ট্রকে প্রতিবেশী হিসেবে পেয়েছে তার আচরণ পৃথিবীর অন্য যে কোনো বৃহৎ প্রতিবেশীর আচরণকে ম্লান করে দেবে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায়শই বাংলাদেশী নাগরিকদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে। সীমান্ত হত্যার ইতিহাসে ফেলানী হত্যা সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তথাগত বাবু বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পাওনা ভারত বুঝিয়ে দেবে। ভারত কি বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশী নাগরিকদের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে? সমকালীন বিশ্বে মানবাধিকারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে। গুয়ান্তানামো বে কারাগারে বন্দিদের ওপর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র নিষ্ঠুর নির্যাতনের কাহিনী মার্কিন সিনেটের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। বিলম্বে হলেও সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। বিশ্বময় সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ কর্কট রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় লোকসভার একটি কমিটি যদি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যার ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করত, তাহলে কিছুটা হলেও বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণজনিত কষ্টের উপশম হতো। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, বিশেষ করে উভয় দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক খানিকটা হলেও সুখকর হতো। তথাগত বাবুর মতে তিস্তা সমস্যার সমাধান হবে। তবে বাংলাদেশ কতটুকু পানি পাবে সেটা নির্ধারিত হবে আলোচনা করে। অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস, বাংলাদেশের ভাগ্যে অতিরিক্ত কয় ফোঁটা পানি মিলবে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ ভারত ইতিমধ্যেই সিকিম ও বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে গজলডোবায় অনেক বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অবশিষ্ট যে পানি আছে তাতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ কয়েকশ’ কিউসেকের বেশি পানি পায় না। তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহের পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগ করতে হলে ভারতকে তার নির্মিত বাঁধগুলো অপসারণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেও একতরফাভাবে অভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার করা যায় না। ভারত এসব নিয়মনীতির থোড়াই তোয়াক্কা করে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সময় বলেছিলেন, নির্বাচনের পর বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত কমে যাওয়া সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে তথাগত বাবু মোদির নির্বাচনপূর্বক ঘোষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাই বলেছেন। আবারও যদি পুশইনের মতো ঘটনা ঘটতে শুরু করে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকবে?
ভারতের জাতীয় নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর বিএনপিকে আশ্বস্তবোধ করতে দেখা গেছে। বিএনপি দ্রুত গতিতে মোদির বিজয়কে অভিনন্দিত করেছে। এর অবশ্য একটা কারণ রয়েছে। মোদির পূর্বসূরি মোরারজি দেশাইর সরকার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কর্তৃক প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যার একটি প্রকল্প থামিয়ে দিয়েছিল। ওই সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও উন্নতি ঘটেছিল। যদিও বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। মোদির বিজয়ের পর অনুরূপ কিছুর পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে বিএনপি নেতৃত্ব আশা করেছিল। কিন্তু কাজের কাজ কী হয়েছে সেটা তারাই বলতে পারবে। তবে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা কূটনৈতিক দিক থেকে সঠিক পদক্ষেপই বলা যায়। এক্ষেত্রে ভুলে গেলে চলবে না ভারত রাষ্ট্রটির চরিত্র কী। এটি একটি সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র। এ সম্প্র্রসারণবাদের দর্শন চালু করেছিল দীর্ঘদিন ভারতের ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসদলীয় সরকার। মনে করা হয়েছিল, এটা নিছকই একটা দলীয় উপসর্গ। দলবদল হলে অবস্থারও পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু সে রকম কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে আসার কথা উঠেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ সফরে আসেন, তাহলে দৃশ্যত সেটা হবে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সংহতি। বর্তমান ভারত সরকার বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করছে তা আমরা জানি না। তবে মোদি যদি এ সফরের সুযোগে সেরকম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জনচক্ষুর আড়ালেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাগাদা দেন, তাহলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার পথে সেটি হবে একটি শুভ উদ্যোগ। নরেন্দ্র মোদির সরকার নিশ্চয়ই তার কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে অবগত আছেন, বাংলাদেশে গত ছয় বছরে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা’ খুব শান্তিতে দিনাতিপাত করতে পারেননি। তাদের মন্দির-বিগ্রহ ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের জমিজমা, বাড়িঘর দখল হয়েছে। এসব কিছু ঘটেছে কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তির লোভের ফলে। ক্ষমতাসীন সরকার এদের কতটা দমন ও নিবৃত্ত করতে পেরেছে সেটাও দেখার বিষয়। সবশেষে বলতে হয়, তথাগত রায় যা বলেছেন, তা যদি সত্যি সত্যি ভারতের বিজেপি সরকারের নীতি হয়, তাহলে দুই দেশের জনগণের সম্পর্কে দূরত্ব বেড়ে যেতে পারে। সে রকম কিছু কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।
ড. মাহবুব উল্লাহ : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

গত কয়েক দিন ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত হচ্ছে, এতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে। গণতন্ত্রে এমন সংঘাতের কোনো জায়গা নেই। বিশ্বের যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে দ্বন্দ্বমান রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর বিভিন্ন বিষয়ে মতভিন্নতা থাকে। কিন্তু একটি জায়গায় তারা একমত পোষণ করে, সেটি হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ ও জনকল্যাণ। গত বছরের ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচনটি হয়েছিল তার পেছনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল। সে নির্বাচনে বিএনপির বর্জন করার সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল তা এখন প্রমাণিত। আমার ধারণা, বিএনপি যদি ওই নির্বাচনে অংশ নিত তাতে তাদের জয় অসম্ভব ছিল না। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি, শেখ হাসিনা যখন ফোনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সংলাপের আহ্বান জানান, তিনি সে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। সেদিন তিনি শেখ হাসিনার ওই আহ্বান প্রত্যাখ্যান না করলে আজ খালেদা জিয়া সংলাপের বিষয়ে যে ৭ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিয়ে তখন আলোচনা হতে পারত। একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসার জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ওপর চাপ থাকত। কিন্তু সেটি হয়নি। এখন ক্ষমতাসীন জোট যে অবস্থানে আছে তাতে তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, চীন, জাপান, রাশিয়া ও ভারত বর্তমান সরকারকে মেনে নিয়েছে। গত এক বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জন সরকারের কঠোর অবস্থানের সাহস জুগিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ও তার জোট- তাদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। দেশবাসী সহিংসতা ও হরতালের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপরও দুই দলের সংলাপের প্রয়োজনীয়তা আছে। এ প্রয়োজনীয়তা দেশের স্বার্থে, অর্থনীতির স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে। আমার মনে হয়, বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার না করে এবং বঙ্গবন্ধুকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংলাপের সম্ভাবনা থাকবে না। ফলে বলা যায়- বল এখন বড় দুই দলের কোর্টেই। সরকারকে সংলাপ শুরু করতে হবে দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে। একই কারণে বিএনপিকেও সংলাপ শুরু করতে হবে। ভুল বোঝাবুঝির জায়গাগুলো প্রথমে পরিষ্কার করা উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে হবে। সেজন্য দরকার অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সংঘাত এসবের বিপক্ষে দাঁড়ায়। সংঘাত কোনো সমাধান দেয় না। বরং সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আমাদের সবার উচিত দেশটাকে মাথায় রেখে রাজনৈতিক সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বর্তমানকে দখল করতে গিয়ে সরকার ভবিষ্যৎকে ভয়ংকর করে তুলছে by আনু মোহাম্মদ

বর্তমান সরকারের এক বছর পূর্তির দিনে এক শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চিত নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে দেশে। সরকার বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন জোটের সভা-সমাবেশ বন্ধ করতে গিয়ে পুরো দেশকে অচলাবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। মাঠে নামিয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ছাড়াও দলীয় বিভিন্ন বাহিনী। সরকারের এই অগণতান্ত্রিক ভূমিকা তার দুর্বলতাকেই প্রকট করে তুলেছে। যে ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে এ সরকার ক্ষমতায় এসেছে তাতে এ সরকারকে বলা যায় স্বনির্বাচিত সরকার। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কারণে আইনগত বৈধতা থাকলেও বর্তমান সরকার সামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেনি। সরকারের নিজের দুর্বলতার কারণে পুলিশ ও র‌্যাবের কোনো কোনো সদস্য যে আচরণ করছে তা দুঃখজনক।
নিজের দুর্বলতার কারণেই সরকার দিন দিন আরও বেশি স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠছে। সরকার নিজের দুর্বলতা ঢাকতে গিয়ে দেশের ভেতরে-বাইরের অনেক শক্তির সঙ্গে আপস করছে। ছাড় দিতে হচ্ছে অনেক কিছু। দেশী-বিদেশী অনেকের দাবি-আবদার মানতে হচ্ছে। অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি ওপর ভর করে চলতে হচ্ছে। জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করতে হচ্ছে। দেশে বর্তমান যে শাসন ব্যবস্থা চলছে তাকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসন, পুলিশ-র‌্যাবসহ নানা বাহিনী সরকারি দলের বিভিন্ন অংশ- সবাইকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ফলে নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকার- কোনো কিছুই রক্ষিত হচ্ছে না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম-খুন-গ্রেফতার বাণিজ্য- এগুলো আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সুবিধাভোগী যারা, তাদের হাতে সারা দেশের মানুষ জিম্মি এবং একক ক্ষমতার কারণে লুণ্ঠন-দখল নিয়ে সরকারি দলের মধ্যেই সংঘাত-সহিংসতা সৃষ্টি হচ্ছে। জনস্বার্থে কাজ করলে, জনগণের ওপর ভরসা করতে পারলে সভা-সমাবেশ-নির্বাচন কোনো কিছু নিয়েই সরকারের ভয় থাকত না। কিন্তু সর্বজনের স্বার্থবিরোধী কাজ করায় তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে বল প্রয়োগের ওপর।
এ ধরনের সন্ত্রাসী রাজনীতি ও লুটেরা অর্থনীতিকে স্থায়িত্ব দেয়ার বাসনায় সরকার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার এ বেপরোয়া ভূমিকার কারণে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো তাদের হারানো বৈধতা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে; দেশী-বিদেশী নানা স্বার্থগোষ্ঠী সুযোগ খুঁজছে আরও দখলদারিত্বের। সরকার বর্তমানকে দখল করতে গিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আনু মোহাম্মদ : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রামে পুলিশের গুলি, ২০ দলের সভা পণ্ড- আসলাম চৌধুরীসহ দুই শতাধিক আটক, চট্টগ্রামে আজ হরতাল

(চট্টগ্রামে ২০-দলীয় জোটের সমাবেশ পণ্ড হয়ে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন নেতা-কর্মীরা। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এ সময় নেতা-কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়েন। গতকাল বিকেলে তোলা ছবি l সৌরভ দাশ) পুলিশের গুলিতে গতকাল সোমবার চট্টগ্রামে ২০-দলীয় জোটের সভা পণ্ড হয়ে গেছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ২০-দলীয় জোটের কর্মীদের সংঘর্ষে পুলিশের তিন সদস্যসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। পুলিশের অভিযানে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরীসহ দুই শতাধিক ব্যক্তি আটক হয়েছেন। সমাবেশে পুলিশের গুলি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের আটকের প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি। চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল রাত ১০টার দিকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
২০ দলের কর্মীরা নাসিমন ভবনের পাশে একটি মিনিট্রাক ও বিজয় মেলার কয়েকটি খালি স্টলে আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় অর্ধশতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১৫টি পেট্রলবোমা উদ্ধার করে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সামনে থেকে একটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা সোয়া তিনটার দিকে শিবিরের একটি মিছিল বিএনপির কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে নূর আহমেদ সড়কের সমাবেশে যোগ দেয়। এরপর শিবিরের ২০-২৫ জন কর্মী কাজীর দেউড়ি এলাকায় কালো কাপড়ে ‘গণতন্ত্র’ লেখা প্রতীকী কফিন নিয়ে মিছিল শুরু করেন। এ সময় মিছিলকারীরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে একটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তখন কাজীর দেউড়ি এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্র জানায়, কাজীর দেউড়ি এলাকার উত্তেজনা নূর আহমেদ সড়কের সমাবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় মাইক থেকে নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। একপর্যায়ে বিকেল চারটা দুই মিনিটে লাভলেইন প্রান্ত থেকে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়ে। পুলিশের গুলি শুরু হলে হাজার হাজার নেতা-কর্মী বিভিন্ন অলিগলির ভেতরে চলে যান। এ সময় ২০-দলীয় জোটের অনেক কর্মী পুলিশের দিকে বৃষ্টির মতো ঢিল ছুড়তে শুরু করেন। আলমাস সিনেমা, সার্কিট হাউস, ওয়াসা মোড়, চট্টেশ্বরী মোড়, কাজীর দেউড়ি, লাভলেইন মোড় ও আসকারদীঘি সড়ক এলাকায় প্রতিরোধের চেষ্টা চালান ২০ দলের নেতা-কর্মীরা। এ সময় পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়ে।একপর্যায়ে টিকতে না পেরে ২০ দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে ঘটনাস্থল ছেড়ে যান। সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন কর্মীবেষ্টিত হয়ে নিজ নিজ বাড়ি চলে যান। বিকেলে স্কুল ছুটি হওয়ায় পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই পুলিশ ও ২০-দলীয় জোটের সংঘর্ষের মধ্যে পড়েন। এ সময় তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন।
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পুলিশের অনুমতি নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করছিলাম। আড়াই-তিন লাখ নেতা-কর্মী আমাদের সমাবেশে যোগ দেন। ওপরের নির্দেশে পুলিশ আমাদের সভা পণ্ড করে দেয়। এ জন্য শেখ হাসিনার সরকারকে একদিন জবাবদিহি করতে হবে।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল জলিল মণ্ডল বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর আমরা ২০ দলকে অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু সমাবেশের অদূরে কাজীর দেউড়ি ও আসকারদীঘি সড়ক এলাকায় ছাত্রশিবিরের কর্মীরা পুলিশের ওপর বিনা উসকানিতে ককটেল নিক্ষেপ করে। এ কারণে আমরা ওদের সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।’ তিনি জানান, পুলিশ শতাধিক ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
কোতোয়ালি অঞ্চলের সহকারী পুলিশ কমিশনার শাহ মো. আবদুর রউফ রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রথম আলোকে জানান, ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধাদানসহ নাশকতার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশের অভিযানে দুই শতাধিক ব্যক্তি আটক হয়েছেন।
এদিকে পণ্ড হয়ে যাওয়ার আগে নূর আহমেদ সড়কের সমাবেশে হাজারো নেতা-কর্মী যোগ দেন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম, উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী। সমাবেশ পণ্ড হয়ে যাওয়ায় জ্যেষ্ঠ নেতারা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি।

সরকারের আচরণে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ by হায়দার আকবর খান রনো

২০১৪ থেকে ২০১৫ সাল- গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ এতটুকুও এগোতে পারল না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রহসনমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় এলো, তারা গত এক বছরেও গণতান্ত্রিক আচরণ করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হল গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। গণতন্ত্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান একে একে ধ্বংস করা হয়েছে। র‌্যাব-পুলিশ প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা হয়েছে সম্প্রচার নীতিমালা। জনৈক মন্ত্রী বেসামাল অবস্থায় সত্য কথাটি বলে ফেলেছিলেন, সম্প্রচার নীতি পাস হোক, খবিশ সাংবাদিকদের দেখে নেব।
বিচার বিভাগকেও সংসদের অধীনস্ত করার প্রস্তুতি চলছে। গুম, খুন ও পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবশেষে আজকের রাজনৈতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে, গণতন্ত্রের অবশিষ্টটুকুও নেই। শাসক দল ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে জোরগলায় বলছে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে গণতন্ত্রের বিদায় দিবস কোনটি?
বিএনপি এ দিনটিকে গণতন্ত্রের হত্যা দিবস বলে আখ্যায়িত করেছে। বিএনপি অবশ্য গত এক বছরে অনেক আস্ফালন করলেও কোনো বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। কারণ আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও গণতান্ত্রিক দল নয়। জনগণ তাদের শাসনামলও দেখেছে। মনে পড়ে, তাদের শাসনামলে ক্লিন হার্ট অপারেশনে বহু নিরীহ মানুষকে যৌথ বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছিল। অনেকে নিহত হয়েছিলেন। সংসদে আইন পাস করে হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল। সাধারণ মানুষ তাদের জন্য জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নামবে কেন?
উপরন্তু বিএনপি যেভাবে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ঘর করছে, তাতে তাদের প্রতি আমারও কোনো সহানুভূতি নেই। কিন্তু প্রশ্ন সেটা নয়। আজ যখন খালেদা জিয়াকে ঘরে তালাবদ্ধ করে আটক রাখা হয়, বালুর ট্রাক দিয়ে অভিনব অপকৌশলে বন্দি রাখা হয়; অথচ বলা হয়, তাকে নিরাপত্তার খাতিরে নাকি এসব করা হচ্ছে- তখন আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন মিথ্যাচার দেখে স্তম্ভিত হই। সরকারের এ আচরণ তো ফ্যাসিবাদেরই লক্ষণ। ফ্যাসিবাদ একবার চেপে বসলে সাধারণ মানুষই তো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দুই পক্ষের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি অবসানের লক্ষ্যে সব কার্যকরী রাজনৈতিক দল এবং সমাজের চিন্তাশীল মানুষকে একসঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। সমঝোতার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক আচরণের বিধিমালা তৈরি করে তা মেনে চলার অঙ্গীকার করতে হবে।
সবশেষে জনগণের ওপরই আমাদের আস্থা রাখতে হবে।
হায়দার আকবর খান রনো : রাজনীতিক; বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য

প্রেসক্লাবে দিনভর উত্তেজনা- মির্জা ফখরুল ক্লাবের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছেন

৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে রাজপথের কর্মসূচি গতকাল সোমবার ঢুকে পড়েছিল জাতীয় প্রেসক্লাবে। প্রায় দিনভর সেখানে সরকার-সমর্থক ও বিরোধীদের বিভিন্ন কর্মসূচি, উত্তেজনা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। বেলা আড়াইটায় অনেকটা আকস্মিকভাবে প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ক্লাবের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। প্রেসক্লাবের বাইরে তখন বিপুলসংখ্যক পুলিশ অপেক্ষায় ছিল।
এর আগে গতকাল বিকেলে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের ব্যানারে লাঠি হাতে সরকার-সমর্থক একদল যুবক জাতীয় প্রেসক্লাবের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে বিএনপি-সমর্থক কয়েকজন কর্মীকে পিটিয়েছেন। এ ঘটনার সময় ক্লাব চত্বরে ব্যাপক হইচই ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের সুঠামদেহী যুবকেরা প্রায় দিনভর লাঠি হাতে অবস্থান নেন। তাঁদের মাথায় ও হাতে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের কাপড়ের ব্যান্ড থাকলেও এঁরা সরকার-সমর্থক বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাঁদের লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা ও প্রজন্ম লীগের পতাকা লাগানো ছিল। এ সময় তাঁদের আশপাশে এবং প্রেসক্লাব ঘিরে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের দেখা গেছে।
অন্যদিকে প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে সমাবেশ আয়োজন করা হলেও ওই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই ছিলেন বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের সমর্থক। মিলনায়তনে বক্তৃতা শেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাইরে না গিয়ে প্রেসক্লাবের মূল ভবনের ভেতরে যাওয়ার সময় দলের নেতা-কর্মীরাও মিছিল করে তাঁর সঙ্গে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন। তাঁরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্লাবের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে। এতে অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে যায়। তখন দরজার পাশে স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিকদের নামফলক আবৃত করা কাচ ভেঙে যায়।
অদূরেই ক্লাবের মূল ফটকের ভেতরের দিকে সরকার-সমর্থক সাংবাদিকদের সমাবেশ থেকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া হয়। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও হইচইয়ের কারণে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংখ্যায় কম থাকলেও সরকার-সমর্থক সাংবাদিকেরা ক্লাব চত্বরে মিছিল বের করেন। অন্যদিকে বিএনপি-সমর্থকেরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্লাব চত্বর প্রকম্পিত করে তোলেন। তাঁদের কেউ কেউ ক্লাব মিলনায়তনের পাশে লাঠিসোঁঠা ও ঢিল জোগাড় করতে থাকেন। এই অবস্থার মধ্যে ক্লাবের মূল ফটকের বাইরের রাস্তায় লাঠি হাতে অবস্থান করা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের কর্মীরা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়েন। ফটক না খোলায় তাঁরা ক্লাবের একজন নিরাপত্তা কর্মীকে মারধর করেন। ওই যুবকেরা লাঠি নিয়ে কয়েকজনকে পেটাতে পেটাতে প্রেসক্লাব মিলনায়তনের দিকে নিয়ে যান। এ সময় বিএনপি-সমর্থকদের অনেকেই আত্মরক্ষার জন্য প্রেসক্লাবের মূল ভবনে বিভিন্ন তলায় গিয়ে আশ্রয় নেন। ক্লাবের নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীরা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খান। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল লাঠি হাতে ঢুকে পড়া ওই যুবকদের নিবৃত করেন।
৫ জানুয়ারি উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে গতকাল দিনভর ছিল সভা-সমাবেশ, আলোচনা ও উত্তেজনা। গতকাল সকালে সরকার-সমর্থক ও সরকারবিরোধী দুই পক্ষের সাংবাদিক নেতারা সমঝোতায় পৌঁছান যে, ক্লাবের ভেতর রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু সকালের দিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ প্রেসক্লাবের মূল ফটকের ভেতরের দিকে সরকার-সমর্থক বলে পরিচিত সাংবাদিকদের সমাবেশে বক্তৃতা দেন। এর নাম দেওয়া হয় জঙ্গিবাদবিরোধী সাংবাদিক সমাবেশ। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক ও বর্তমান নেতারা এই সমাবেশে বক্তৃতা করেন।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, জাতীয় প্রেসক্লাবকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। মনজুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, গত ৫ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন বর্জন করেনি, প্রতিহত করতে চেয়েছিল। আর তা করতে গিয়ে তারা ২৪২ জনকে হত্যা করেছে এবং এ জন্য তাদের বিচার হওয়া উচিত। সমাবেশে সাংবাদিক নেতাদের মধ্যে শাজাহান মিয়া, শফিকুর রহমান, আবদুল জলিল ভূঁইয়া প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
ওই সমাবেশ চলাকালে দুপুরের পর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে শুরু হয় পেশাজীবীদের সমাবেশ। এতে যোগ দিয়ে মির্জা ফখরুল গত বছরের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন সংসদ নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আজকের এ দিন আমাদের জাতীয় জীবনে একটি কলঙ্কিত দিন। এই দিনে আমরা ভোটের অধিকার হারিয়েছি। গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়েছি।’
গত দুই দিনে ঢাকাসহ সারা দেশের পরিস্থিতির উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার একদিকে পাহারা বসিয়েছে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবিকে, অন্যদিকে তাদের পেটুয়া বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে নিরীহ সাধারণ নাগরিকদের ওপর। তিনি বলেন, এই কারাগার ভেঙে ফেলতে হবে। লাথি মার ভাঙ রে তালা, যত সব বন্দিশালা—কবি নজরুল ইসলামের সেই কবিতা বারবার করে বলতে হবে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পেশাজীবীদের মর্যাদা ও অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ এ সমাবেশ করে। এতে সভাপতিত্ব করে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজী। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বেসরকারি শিক্ষকনেতা মো. সেলিম ভূঁইয়া, সাংবাদিক নেতা আবদুল হাই সিকদার, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ প্রমুখ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন|
সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের কর্মসূচি শেষেই মারপিটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে দুই পক্ষের সাংবাদিক নেতারা ক্লাবের একটি কক্ষে বৈঠক করেন। এ সময় ইকবাল সোবহান চৌধুরী, রুহুল আমিন গাজী, মনজুরুল আহসান বুলবুল, শওকত মাহমুদসহ কয়েকজন সাংবাদিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রেসক্লাব থেকে বহিরাগতদের বের করা নিয়ে আলোচনা হয় বলে বৈঠক সূত্র জানায়।

সন্ধ্যার দিকে প্রেসক্লাব ভিআইপি লাউঞ্জে মির্জা ফখরুলের প্রেস ব্রিফিংয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন গণমাধ্যমকর্মীরা। কিন্তু সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ওই কক্ষে ব্রিফিং করে সরকার-সমর্থক সাংবাদিক নেতারা বলেন, বিএনপি-সমর্থিত নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিয়ে ক্লাবের ফটকের পাশে শহীদ সাংবাদিকের স্মৃতিফলক ভেঙে ফেলেছেন।

রাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ক্লাবের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। ক্লাবের বাইরে অসংখ্য পুলিশ রয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, রাতের বেলায় তিনি গ্রেপ্তার হতে চান না। আজ মঙ্গলবার সকালে গ্রেপ্তার হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাবের ভেতরেই তিনি অপেক্ষা করছেন।

বছর শেষে সরকারের অবস্থান কেমন

৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর এক বছর পার করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, তারা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে বিএনপি এখনো সরকারের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলেছেন, সরকার আইনগত বা সাংবিধানিক দিক থেকে বৈধতার কথা বললেও নৈতিকতার প্রশ্নে দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করেছিল। যদিও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করতে পারেনি এবং ওই জোটের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল। লাগাতার অবরোধ, নাশকতা, সহিংসতার মধ্যে নির্বাচন হলেও সেই একতরফা নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও একটা অস্বস্তি ছিল। অনেক প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে দলটিকে। এক বছরে সব প্রশ্ন বা অস্বস্তি কাটিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার এখন শক্ত অবস্থানে এসেছে, এমনটাই দাবি করছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। দলটির সিনিয়র নেতা এবং মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সমালোচনাকে এখন আওয়ামী লীগ গুরুত্ব দিচ্ছে না। আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন, তাদের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকরাও অস্বস্তি কাটিয়ে একটি অবস্থানে এসেছে এবং নেতারা সেটাকেও শক্তি হিসেবে দেখছেন। বিএনপি অবশ্য এখন নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে আনছে। অন্যদিকে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বছর পুরো হওয়ার দিনকে কেন্দ্র করে বিএনপির কর্মসূচির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। এমন পরিস্থিতিতে অজ্ঞাত জায়গা থেকে টেলিফোনে বিবিসি বাংলার সাথে কথা বলছিলেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বক্তব্য হচ্ছে,গণতন্ত্রের রীতিনীতি অনুসরণ করলে সরকার নৈতিকতার প্রশ্ন এড়াতে পারে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর একবছরে রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল না। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্য অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে একতরফা নির্বাচন করা বা রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে গুরুত্ব না দিয়েও সরকার এগুতে পারছে। তবে সরকারের জন্য অনুকূল সব বিষয় বিবেচনায় নিলেও নৈতিকতার প্রশ্ন থেকে যায় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ কিন্তু পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করছেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এখন সরকারের অবস্থান বুঝতে পেরেছে বলে তারা মনে করেন। তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, নৈতিক অবস্থানের দুর্বলতা যখন থাকছে, তখন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আওয়ামী লীগ নেতারা তা বিশ্বাস করতে রাজি নন। তারা রাজনৈতিক ইস্যুতে কঠোর মনোভাব নিয়ে এগুনোর কথাই বলছেন। -বিবিসি