Friday, August 21, 2020

২১শে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা: শেখ হাসিনার সমাবেশে বোমা হামলার সেনা মোতায়েনের চিন্তা ছিল বিএনপি সরকারের by আকবর হোসেন

২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রায়ই সমাবেশ করতো আওয়ামী লীগ। তবে সব সমাবেশ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকতেন না।
২১শে অগাস্ট-এর সে সমাবেশ শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকবেন - এ কথা আগেই প্রচার করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা সে সমাবেশে থাকবেন বলেই দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতারাও সমাবেশ উপস্থিত হয়েছিলেন। একই সাথে দলের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিও ছিল বেশি।
সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা সবাইকে একদিকে যেমন চমকে দিয়েছিল, তেমনি জনমনে ব্যাপক আতঙ্কও তৈরি হয়েছিল।
ঘটনার পরপরই দেশর বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করেন।
শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অন্য সিনিয়র নেতাদের অবস্থা জানার জন্য উদগ্রীব ছিলেন দলটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের নেতা-কর্মীরা।
ঘটনার পরদিনই দেশের চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম এবং সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় হরতালের ডাক দেয় স্থানীয় আওয়ামী। হরতালের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশংকা ভর করেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপর।
২৪ এবং ২৫শে অগাস্ট দেশজুড়ে হরতালের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের সাথে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত চলতে থাকে।
তখন টানা দিনের হরতাল এতোটাই জোরালো ছিল যে তৎকালীন বিএনপি সরকার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়ে উঠে।
দৈনিক প্রথম আলো তখন সংবাদ শিরোনাম করেছিল, " স্বতঃস্ফূর্ত হরতালে অচল সারা দেশ।"
আওয়ামী লীগের এই হরতালে সমর্থন দেয় গণফোরাম, জাসদ এবং তাদের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলো।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে 'রেড অ্যালার্ট' জারি করে। স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য দেশের সকল জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের বিশেষ বার্তা দেয়া হয়।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের চিন্তা-ভাবনা ছিল তৎকালীন সরকারের।
২১শে অগাস্টে গ্রেনেড হামলার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে পরে ছিল জুতা, স্যন্ডেল - এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড
গ্রেনেড হামলার কয়েকদিন পরে বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের সাথে বৈঠক করেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে লুৎফুজ্জামান বাবরকে।
গ্রেনেড হামলার পর একদিকে যখন দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল চাপের মুখে পড়ে তৎকালীন বিএনপি সরকার।
বিএনপির সরকারের সময় একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ রা করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে বলেন, গ্রেনেড হামলায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য ভারত এবং পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে থেকে।
বিশেষ করে তখন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঠিক তিন মাস আগে সিলেট সফররত ব্রিটিশ হাইকমিশনার মি: চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা হয়েছিল।
এদিকে দেশের ভেতরে প্রবল অস্থিরতা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ - এই দুই পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য শেখ হাসিনার সাথে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কিন্তু শেখ হাসিনার দিক থেকে কোন আগ্রহ দেখানো হয়নি।
শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে দৈনিক প্রথম আলো লিখেছিল, "আসলে খালেদা জিয়াকে রক্ষার জন্য একটি বিশেষ মহল মাঠে নেমেছে। যারা সমঝোতার কথা বলবে, আমি বলব তারাই খুনি।"
খালেদা জিয়া যখন একদিকে সংলাপের মনোভাব করছিলেন, তখন বিএনপির কোন কোন নেতা গ্রেনেড হামলার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে নানা বক্তব্য দেন।
গ্রেনেড হামলার এক সপ্তাহ পরে আওয়ামী লীগসহ ১১ দল এবং জাসদ এ সভায় এক দফা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয়।
তাদের এই এক দফা ছিল - সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তোলা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল বিএনপি সরকার।

গ্রেনেড হামলা :দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র by ড. এম এ মান্নান

ঘটনাটি একেবারেই অকল্পনীয়। রাজনীতিতে যে বিশাল ঘুণপোকা ধরেছিল তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এ ঘটনায়। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদদের উপর দমন-নিপীড়ন চালাতে পারে তার নজিরবিহীন প্রমাণ সেদিন সৃষ্টি করেছিল তত্কালীন সরকার যার নেতৃত্বে ছিল আক্ষরিক অর্থেই স্বাধীনতাবিরোধীরা। এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ আর মানবতাবিরোধী ঘটনা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ ঘটাতে পারে তা একেবারেই অকল্পনীয়। কিন্তু অকল্পনীয় ঘটনাই ঘটে গেল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় আওয়ামী লীগ আহূত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে, যার সামনের সারিতে ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যিনি তখন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী। বিশ্বে নজিরবিহীন এ ঘটনাটি দৃশ্যতই ঘটানো হয়েছিল শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ তথা বিরোধী দলকে নেতৃত্ব শূন্য করে দেওয়ার লক্ষ্যে, যেমনটা তারা চেয়েছিল পঁচাত্তরে। সে বছরের ১৫ আগস্ট তারাই শেষ করে দিয়েছে জাতির জনককে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকারকে, এ দেশের ভবিষ্যত্ বিনির্মাণের উদ্যোগকারীকে। বিশ্বের কেউ ভাবতে পেরেছে বলে মনে হয় না এমন বর্বরোচিত আর নারকীয় ঘটনা কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থেকে ঘটাতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তরা এদেশে সেরূপটা ঘটিয়েছে; তাও ঘটিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে এবং তাদের পেছনের ইন্ধনদাতা আর সরাসরি সাহায্যকারী পাকিস্তান থেকে সমরাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেড এনে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এরূপ বিধ্বংসী আর্জেস গ্রেনেড নামক বোমা-অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে মেরে ফেলা হলো চব্বিশ জনকে আর আহত করা হলো পাঁচ শতাধিক মানুষকে। শরীরে স্প্লিন্টারের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে এখনও ১৫ বছর পরেও বহু আহত হওয়া নাগরিক যারা দেশকে ভালোবেসে গিয়েছিল স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির দলের কর্মপরিকল্পনার কথা শুনতে সেদিনের জনসভায়। তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যাসহ তারা চেয়েছিল দেশে একটা অরাজক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে যাতে মানুষ তখনকার দেশবিরোধী শক্তির তৈরি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো টু শব্দটিও না করে। গণতন্ত্র তো অনেক আগেই তাদের পূর্বসুরি সামরিক সরকার হত্যা করে শুধু কঙ্কালটা রেখে গিয়েছিল।

তবে বিগত ১৯১৮ সালের ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় বোমা হামলা সংক্রান্ত মামলার রায়ের বিষয়টি শোনার পর স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, যাকে মূল টার্গেট বানানো হয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যার হাতেই হামলাকারী আর ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হয়েছে, সকল আইন মেনে, দেশের প্রচলিত আইনের আওতায়।

অনেক দেরিতে হলেও বিচার হয়েছে এ মর্মান্তিক, পৈশাচিক ঘটনার। প্রমাণ হয়েছে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে সব সময় কাঁদে না। বিচার হয় এবং হবে এমন ধরনের হামলার, নৃশংসতার। তবে সে সময়কার সরকার কোনোভাবেই চায়নি বিচার হোক। কারণ তারাই তো ছিল নাটেরগুরু, তারাই তো ঘটিয়েছে পুরো ঘটনা, স্বেচ্ছায়, অবলীলায়। বরং মামলা না নিয়ে এবং জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে সরকার পক্ষ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে; এক সদস্যবিশিষ্ট কমিশন তৈরি করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসতে না পারলে তারা সফল হতো নিঃসন্দেহে। দুর্ভাগ্য তাদের। তাদের ইচ্ছা মাটিতে ডেবে গেল। ১৪ বছর পরে বিচার হয়েছে সেই শেখ হাসিনার আমলেই, যাকে তারা নির্মূল করতে চেয়েছিল। একেই বলে ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস। ষড়যন্ত্রকারীদের গডফাদার ও বোমা হামলার নির্দেশকারী তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ সন্তান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন আর ১৯ জনের ফাঁসির রায় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে।

হামলাকারীরা চেয়েছিল তারা সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেবে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। আছেই তো মাত্র দুই জন। এ দুই জনকে শেষ করতে পারলেই তো তাদের পোয়াবার। ১৯৭৫ সালের একই মাসের সাত দিন আগেই তো শেষ করে দিয়েছে তাদেরই দোসররা জাতির জনককে। আসলে আগস্ট মাসটিই যেন দেশ বিরোধীদের আঁচলে বাঁধা একটি মাস। এ মাসকেই কেন তারা সব সময় বেছে নেয়? এজন্যই কি যে, এ মাসের চৌদ্দ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস, ব্রিটিশদের সৃষ্ট একটি আজগুবি রাষ্ট্রের জন্মদিবস। পরবর্তীকালেও তারা এ মাসটিকে বেছে নিয়েছিল সারা দেশের সব জেলায় বোমা হামলার জন্য। সিরিজ বোমা হামলা। ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল সারা দেশের মেরুদণ্ড। জঘন্য মনোবৃত্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সারা দেশের মানুষের ওপর। কারো জানের মায়া নেই তাদের মধ্যে। আসলে তারা জনসাধারণের তোয়াক্কা করে না, কদর করে শুধু তাদের হীনস্বার্থকে। দেশকে তাদের কবজায় নিয়ে আসা, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টাকেই তারা গুরুত্ব দেয় সব সময়, জনমানুষের স্বার্থ নয়। তারা এখনো ভুলতে পারেনি তাদের একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি। এরা কিন্তু কখনোই চুপ করে থাকবে না। সুযোগ পেলেই তারা ফণা তুলবে। এদের ব্যাপারে সাবধানতা সব সময়ের জন্য। নতুবা সর্বনাশ হয়ে যাবে দেশের। বিপন্ন হবে জনমানুষের ভবিষ্যত্। সময় এসেছে এসব বর্বর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার।

বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেকেই সবকিছু বিস্তারিত জানতাম না। বিচারের রায়ের বিবরণ থেকে জানতে পারি, ভালো মানুষের উর্দি গায়ে দেওয়া ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের জঘন্য আর নোংরা মনের পরিচয়। পত্রিকা থেকেই জানতে পারলাম, ষড়যন্ত্রকারী আর হামলাকারীদের মধ্যে ছিল তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, হুজির আমির ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং দেশ-বিদেশ থেকে জঙ্গিপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক জঙ্গি। এরা সবাই পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার পর থেকে তাদের ষড়যন্ত্র আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে চক্রান্তের জাল বুনতেই থাকে। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তারা অনেক বেশি তত্পর হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার পর যখন তিনি সামনের দিকে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তারা দিশেহারা হয়ে শুরু করে গভীর ষড়যন্ত্র।

বিচার হয়েছে। তাই বলে ষড়যন্ত্র থেমে যায়নি। বোমা হামলার কুশীলবরা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। এরাই দেশে জঙ্গিপনাকে উসকে দিচ্ছে, নিজেরাও জঙ্গিদের সঙ্গে মিলেমিশে অরাজকতার জন্য ঘোঁট পাকাচ্ছে। তারই নজির আমরা পেয়েছি রায় দেওয়ার পরপরই। মাস্টারমাইন্ডের বাপের বাড়ির এলাকায় বগুড়াতে ষড়যন্ত্রকারীদের দোসররা নীলফামারী থেকে ঢাকাগামী বাসে পেট্রোলবোমা হামলা করে তিন জনকে আহত করে এবং অন্যান্য নাশকতার চেষ্টা চালায়। নারায়ণগঞ্জের তিনটি এলাকায়ও বোমা ছুঁড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে। পরের বছরই অর্থাত্ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে দেশের ৪৫০টি স্পটে চালানো হয় বোমা হামলা। এ হামলার ঘটনায় জড়িত ৫০ জন জঙ্গিকে এখনও ধরা হয়নি এবং বিচার কার্যক্রম ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। ৩৩টি মামলা এখনও বিচারাধীন। এসব দুর্বৃত্তরা বিগত কয়েক মাসের মধ্যে রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশসহ অন্যান্য পুলিশের ওপর বোমা হামলা করেছে।

আমরা চাই, এ দেশে এমনতরো নৃশংস বর্বরোচিত রাজনৈতিক হামলা চিরতরে নিপাত হোক; সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধাভাব তৈরি হোক; আজকের এবং আগামীর প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি উত্সাহী হয়ে উঠুক। আমরা মনেপ্রাণে কামনা করি, রাজনীতি করা মানুষদের প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব দূর হোক; জনগণের মন থেকে রাজনীতি-আতঙ্ক সরে যাক। আমরা আরো চাই, দুর্বৃত্ত শ্রেণির লোকেরা রাজনীতিতে না আসুক, রাজনীতির নদীটার স্বচ্ছ পানিকে ঘোলা করে আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় আর অর্থের যোগান দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করার মতো পরিবেশ তৈরি না করুক; আর্জেস গ্রেনেডের মতো সমরাস্ত্র সরবরাহ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আর জনগণকে হত্যার ধারা চালু রাখার সংস্কৃতি চিরতরে বিদূরিত হোক এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা জনগণের কাছে আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি নিয়ে হাজির হোক। আমরা সর্বান্তকরণে কামনা করি, জনগণ নিশ্চিন্ত মনে রাজনৈতিক সমাবেশে, সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করুক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ, উদ্দেশ, কর্মসূচি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করুক। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, সে দেশের মাটি থেকে চিরতরে লুপ্ত হোক সকল প্রকার হানাহানি, অপরাজনীতি, জঙ্গিপনা আর সাধারণ মানুষ হত্যার ঘৃণ্য খেলা। আলো ছড়িয়ে পড়ুক বাংলার আকাশে, মেধাবী তরুণরা এগিয়ে আসুক রাজনীতিতে এবং তৈরি করুক উজ্জ্বল আলোদীপ্ত রাজনীতির পুষ্পধাম। প্রত্যাশা করি, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করুক, চাকরিজীবীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করুক, কৃষকরা মাঠে থাকুক, শ্রমিকরা কলকারখানায় নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাক, মাঝি তার নৌকায় পাল তুলে দিয়ে মনের আনন্দে ভাটিয়ালী সুরের ঝলক তুলুক, আলেম-মাশায়েখরা মানুষের অন্তরে মহান সৃষ্টিকর্তার নুরানী আলোর দীপ্তি ছড়িয়ে দিক আর রাজনীতির ময়দানে থাকা ব্যক্তিরাই শুধু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, ঠিক যেমনটি হয় উন্নত দেশগুলোতে। এ দেশের জনগণ উন্নয়ন চায়; চায় দেশ এগিয়ে যাক চলমান প্রগতির পথ ধরে আর প্রতিষ্ঠিত হোক সুশাসনের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ।

>>>লেখক :কলামিস্ট, উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা: যেভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন শেখ হাসিনা

আপডেট- ২১ অগাস্ট ২০১৭: বাংলাদেশের ইতিহাসেএখন পর্যন্ত নৃশংস সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে, ২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা তার একটি। ঐ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাবও ফেলেছে। ২০০৪ সালের ঐ দিনে যা ঘটেছিল এবং যেভাবে ঘটেছিল, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল বিবিসি বাংলার চল্লিশে বাংলাদেশ অনুষ্ঠানমালার জন্য।
২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট শনিবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে জড়ো হয়েছিলেন সিনিয়র নেতারা। দলটির প্রধান এবং তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা ছিলেন ঐ সমাবেশের প্রধান অতিথি।
আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে রাস্তায় একটি ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। বিকেল তিনটা থেকে দলটির কিছু মধ্যম সারির নেতা বক্তব্য দেয়া শুরু করেন।
বিকেল চারটার দিকে শুরু হয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য দেয়ার পালা। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখনও এসে পৌঁছাননি। দলের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকরা শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় ছিলেন।
ঐ সমাবেশে তখন উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের তৎকালীন সদস্য ও বর্তমানে শিল্পমন্ত্রী আমির হেসেন আমু।
২০১১ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আমির হোসেন আমু বলেন, "নেত্রীর বক্তব্য শেষ হবার সাথে সাথে হঠাৎ করে বিকট শব্দ শুনলাম। প্রথমে আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, এদিক-ওদিক তাকালাম। তখন চারপাশে চিৎকার শুনতে পেলাম।"
এভাবে দফায়-দফায় বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠে। সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রথমে বুঝতে পারেননি যে এটি ছিল গ্রেনেড হামলা। অনেকেই ভেবেছিলেন বোমা হামলা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করেছিলেন।
গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা
যখন গ্রেনেড হামলা শুরু হলো, তখন মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনার চারপাশে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেন - যাতে তাঁর গায়ে কোন আঘাত না লাগে।
যেসব নেতা শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। তখন মি: হানিফের মাথায় গ্রেনেডের আঘাত লেগেছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের শেষের দিকে তিনি মারা যান।
গ্রেনেড হামলার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নেতা-কর্মীরা জীবন দিয়ে তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন।
কান্না জড়িত কণ্ঠে বিবিসি বাংলাকে শেখ হাসিনা বলেন, "আমার নেতা-কর্মীরা সবাই আমাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে অনেকেই ইনজিউরড (আহত) হয়েছে। তাদের রক্ত এখনও আমার কাপড়ে লেগে আছে। আমার নেতা-কর্মীরা তাদের জীবন দিয়েই আমাকে বাঁচিয়েছে।"
ঐ গ্রেনেড হামলায় ২৪জন নিহত, আর আহত হয় আরও অনেকে।
গ্রেনেড হামলার দিন বিবিসি বাংলার জন্য আওয়ামী লীগের ঐ সমাবেশের খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তৎকালীন সংবাদদাতা হাসান মাসুদ।
ঘটনার ভয়াবহতা দেখে তিনি রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যান তখন।
হাসান মাসুদের বর্ণনা ছিল এ রকম: "আমি প্রথম যে দৃশ্যটা সেখানে দেখেছিলাম আইভি রহমানের। আমি ওনাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। উনি বসা, চোখ দুটো খোলা, নির্বাক। ঠিক মঞ্চের সামনে দু'পাশে দু'জন লোক তাকে ধরে রেখেছে।"
"আইভী রহমানকে দেখে আমি ঘটনার ভয়াবহতা বুঝে গেলাম। মঞ্চের চারপাশে প্রচুর স্যান্ডেল-জুতা পড়ে ছিল। প্রচুর নিহত ও আহত মানুষ ছিল চারপাশে। কারো হাত নাই, কারো পা নাই।"
২১শে অগাস্টে গ্রেনেড হামলার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে পরে ছিল জুতা, স্যন্ডেল - এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড
হাসান মাসুদের বর্ণনা অনুযায়ী ১২টির বেশি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়েছিল। আরো কয়েকটি গ্রেনেড অবিস্ফোরিত অবস্থায় পড়ে ছিল।
গ্রেনেড হামলায় আহত অনেকেই এখনও শরীরে আঘাত নিয়ে বেঁচে আছেন। এদের একজন নাসিমা ফেরেদৗসি। তাঁর শরীরে এখনও দেড় হাজারের মতো গ্রেনেডের স্প্লিনটার রয়েছে। শরীরের ভেতর এসব স্প্লিনটার নিয়ে যন্ত্রণা-কাতর জীবন পার করছেন নাসিমা ফেরদৌসি।
ঘটনার দিন মঞ্চের খুব কাছেই অবস্থান করছিলেন নাসিমা ফেরদৌসি।
২০১১ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নাসিমা ফেরদৌসি বলেন, "হঠাৎ করে এক বিকট আওয়াজ শুনলাম। এরপর আরেকটি আওয়াজ। আমি দৌঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমরা পা নড়ছিল না।"
"দ্বিতীয় আওয়াজের সাথে সাথে দেখলাম আমার শরীর রক্তে ভেসে গেছে। এরপর আমি সেন্সলেস (অজ্ঞান) হয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে দেখলাম লাশ আর লাশ। আমি বলছিলাম বাঁচাও-বাঁচাও।"
কিছুক্ষণ পরে আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন নাসিমা ফেরদৌসি। আশপাশের সবাই ভেবেছিল নাসিমা ফেরদৌসি মারা গেছে। তাকে মৃত ভেবে একটি মৃতদেহবাহী ট্রাকে তোলা হয়। তখন আবারও জ্ঞান ফিরে আসে নাসিমা ফেরদৌসির। ব্যথায় চিৎকার করে তিনি আবারও বলতে থাকেন 'বাঁচাও-বাঁচাও'।
গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমান, যিনি পরে মারা যান
গ্রেনেড হামলায় নাসিমা ফেরদৌসির দুটো পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার পা দু'টো কোন রকমে টিকে যায়। কিন্তু চার বছর তাকে কাটাতে হয়েছে হুইল চেয়ারে।
ভয়ানক ঐ দিনের কথা মনে করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নাসিমা ফেরদৌসি।
২১শে অগাস্টের হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আহতদের সাহায্যে এগিয়ে না এসে পুলিশ উল্টো তাদের হেনস্থা করেছে। সে সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়েও নানা বিতর্ক এবং প্রশ্ন রয়েছ।
ঘটনার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "আমাদের নেতা-কর্মীরা যখন আহতদের সাহায্য করতে গেছে, ঠিক সে সময় পুলিশ উল্টো টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও তাদের গ্রেফতার করতে শুরু করেছে।"
শেখ হাসিনা বলেন, আহতদের সাহায্য করতে এগিয়ে না এসে পুলিশ যখন উল্টো টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ ও গ্রেফতার করতে শুরু করলো, তখন বুঝতে পারা যায় যে এ ঘটনা তাদের মদদে হয়েছে।
এই মামলার বিচার কাজ এখনও নিম্ন আদালতে চলছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে দুই প্রধান দলের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রদূতরা গ্রেনেড হামলার পর শেখ হাসিনাকে দেখতে গিয়েছিলেন
আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, তাদের দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার জন্যই সেদিনের গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল।
এই ধারণার সাথে অনেকেই একমত পোষণ করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তিক্ত, যার একটি বড় কারণ হচ্ছে ২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা। গ্রেনেড হামলার ঘটনা দুই দলকে আরও বেশি বিপরীত মেরুতে ঠেলে দিয়েছে।
গ্রেনেড হামলার সময় এবং তারপরের তদন্ত নিয়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় প্রশ্ন উঠেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে।
জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই হামলার ঘটনায় পুনরায় তদন্ত হয়।
সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর নাম আসে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুনরায় তদন্ত হয়।
ঐ তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপি'র অন্যতম শীর্ষ নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সহ বেশ কয়েকজন পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং পুলিশের সাবেক তিনজন মহাপরিদর্শক বা আইজিপি'র নাম আসে।
বিএনপি অবশ্য এই তদন্তকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক' বলে বর্ণনা করে।
ঘটনার পরের দিন শেখ হাসিনা যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখনও তিনি হত-বিহ্বল

২১ আগস্ট ও শেখ হাসিনা by অধ্যাপক ড. নাসিম বানু

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুরতম এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বর্হিভূত বর্বরোচিত ঘটনা হলো— ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ওপরে গ্রেনেড হামলা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসন করা। বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কারণ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির কাছে অন্যতম প্রধান বাধার নাম হলেন শেখ হাসিনা। কখনো তার নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায়, আবার কখনো তার গাড়িবহরে হামলা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে আর এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় এবং ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে তাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা করার কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে একটি ট্রাক এনে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার আগে সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ভাষণ শেষে তিনি “জয় বাংলা” “জয় বঙ্গবন্ধু” বলার সঙ্গে সঙ্গে পর পর দুটি আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হয়, শুরু হয় গুলির আওয়াজ। হামলায় আহত নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা সাহায্য করতে গেলে পুলিশ তাদের ওপরে টিয়ারসেল ছুড়ে উদ্ধার কাজে সাহায্য না করে ব্যাহত করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয় পুলিশ সেই সময় মামলার আলামত সংরক্ষণ না করে তা নষ্ট এবং বিলীন করে দিতে উদ্যোগী হয় বলেও অভিযোগ উঠে আসে। মঞ্চে উপস্থিত নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে সেদিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে গ্রেনেড হামলার হাত থেকে রক্ষা করেন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। অপূরণীয় ক্ষতি হয় ২১ শে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের। দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন।

এদের মধ্যে আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জালড়ে ২৪ আগস্ট মারা যান। এবং প্রায় দেড় বছর পরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জালড়ে ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের মৃত্যু হয়। প্রায় কয়েকশ জন নেতাকর্মী আহত হন যারা হয় শরীরে স্প্লিন্টার বহন করে যন্ত্রণায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে অথবা পঙ্গু জীবনযাপন করছে। যার ফলশ্রুতিতে কয়েকশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রেনেড হামলার বিচারক তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ২১ শে আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার যে ষড়যন্ত্র তার মূল পরিকল্পনা হয়েছিল হাওয়া ভবনে। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার ২৩ বছর দুই মাস পর জাতি, জাতির পিতা হত্যার দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয় বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ জাতির পিতাকে হত্যা করার পর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট শনিবার আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। শেখ হাসিনাকে হালকা নাসতা করানো হবে: এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। তত্কালীন রাষ্ট্রযন্ত্রীয় সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ-এর সম্মুখে যুদ্ধে ব্যবহূত স্পেশালাইজড মরণাস্ত্র, আর্জেন্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে কেন এই মরণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয় দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা। রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে। বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেও গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়।

আমাদের জাতির পিতার কন্যা বেঁচে গেলেন, বেঁচে গেলেন আমাদের জন্য, বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব দেবার জন্য, মুক্তি যুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য, তারুণ্যের বাংলাদেশ গড়ার জন্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য।

>>>লেখক : ডিন, ফ্যাকাল্টি অব স্যোশাল সায়েন্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

‘তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল’ by আশরাফুল ইসলাম

আইভি রহমান। পুরো নাম জেবুন্নাহার আইভি। ২১শে আগস্টে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৪শে আগস্ট আজন্ম রাজনৈতিক এই নেতা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তার চির প্রস্থানে জন্মস্থান ভৈরবের মানুষ হারায় তার একান্ত সুহৃদ, প্রিয় আইভি আপাকে। পৈশাচিক গ্রেনেড হামলায় প্রিয় আইভি আপার গুরুতর আহত হওয়ার খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো ভৈরব। পরদিন ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। হরতালে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আবদুল কুদ্দুস (৩২) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী।
নিহত কুদ্দুসের পরিবার বিচার না পেলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা হয় ৩টি মিথ্যা মামলা।

ওই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে দৈনিক মানবজমিন-এর ভৈরব প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২২শে আগস্ট দিনটি ভৈরববাসীর জন্য এক কালোদিন। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান আহতসহ হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদে ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এ হরতাল আহ্বান করে। হরতালের সমর্থনে ভোর থেকে নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজার আওয়ামী লীগ অফিসে জড়ো হন। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটি ভৈরব বাজার রেলজংশনের মনমরা রেলসেতুর কাছে পিকেটারদের কবলে পড়ে। উত্তেজিত জনতা ট্রেনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগ কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ও টিয়ার শেল ছোড়ে। গুলিতে আবদুল কুদ্দুস নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন। ঘটনার পর উত্তাল হয়ে পড়ে ভৈরব। এ ঘটনায় পুলিশ ভৈরবের ২ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৩টি মিথ্যা মামলা করে। মিথ্যা মামলা করায় আওয়ামী লীগ লাগাতার কর্মসূচি দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালায়। গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে ভৈরব ছাড়তে বাধ্য হন। পুলিশ দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ অফিস অবরুদ্ধ করে রাখে।

সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বলেন, সর্বদা পরিশ্রমী, অক্লান্ত ছুটে চলা আইভি রহমান আজ স্মৃতির সাদা ফ্রেমে বাঁধা নিশ্চুপ ছবি হলেও, ভৈরববাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কাছে তিনি জীবন্ত, চলমান। তিনি বেঁচে আছেন তার কর্মের মধ্য দিয়ে।

ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক উলফাত আরা জাহান জানান, ১৯৯৬ সালে তিনি যখন ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন, আইভি রহমান তখন কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান। ভৈরবে আসলেই তিনি ডাকতেন। কথা ও কাজে এক ছিলেন তিনি। দেশীয় খাবার খেতে পছন্দ করতেন তিনি। শুঁটকির ভর্তা ছিল তার প্রিয় খাবার। ১৯৯৮ সালে মহিলা সংস্থার অফিস নির্মাণ ছাড়াও মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তিনি ভৈরব বাজারে মহিলা সমবায় মার্কেটের জন্য জায়গা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। উলফাত আরা জাহান বলেন, নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার এমন মানুষ আর দেখা যায় না। গ্রেনেড হামলার ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তিনি ভৈরবে এসেছিলেন।

সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উলফাত আরা জাহান বলেন, ওই বছর ভৈরবে বন্যা হয়েছিল। নিজ এলাকার দুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে জলাবদ্ধ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাড়ি বাড়ি ছুটে গিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ত্রাণসামগ্রী। জন্মস্থান ভৈরবে তিনি আজীবন এভাবে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভানেত্রী ও জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতির অবৈতনিক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে এখানকার নারীদের উন্নয়ন এবং সমাজের অবহেলিত শিশু, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে তিনি ব্যাপক কাজ করেন। সেসব অসহায় মানুষের কাছে আইভি রহমান এখনো দেবীতুল্য। উলফাত আরা জাহান জানান, একেবারেই সাধারণ জীবনযাপন করতেন আইভি রহমান। পরতেন সুতির শাড়ি। আমৃত্যু মানুষকে ভালোবেসে গেছেন, তাদের ভালোবাসা পেয়েছেন। মানুষকে অকাতরে দান করলেও সেসব প্রচার করতেন না তিনি। তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল।

১৯৪৪ সালের ৭ই জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব শহরের চণ্ডিবের গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সভ্রান্ত এক পরিবারে তার জন্ম। পিতা মরহুম জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ এবং ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। মা হাসিনা বেগম ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। ৮ বোন ও ৪ ভাইয়ের মধ্যে আইভি পঞ্চম। ছেলেবেলা থেকেই আইভি ছিলেন শান্ত স্বভাবের, তবে প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তার ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বভাবের জন্য তাকে বাইরে থেকে খুব কঠিন মনে হলেও, আদতে তিনি ছিলেন খুবই দরদি মনের মানুষ। যারা মিশেছে, কাছে গেছে তারাই পেয়েছে অপরিসীম ভালোবাসা, আদর, মমতা আর সহযোগিতা। প্রথম দর্শনেই আইভিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নবম শ্রেণি পড়ুয়া আইভির সঙ্গে ১৯৫৮ সালের ২৭শে জুন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমানের বিয়ে হলে নামের পরে ‘রহমান’ যুক্ত হয়। এ নামেই তিনি পরিচিতি পান দেশব্যাপী। শুধু আওয়ামী রাজনীতির জন্য নয়, আইভি রহমান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে পারিবারিকভাবেও জড়িত ছিলেন। তার বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার শাশুড়ি। একমাত্র ছেলে বিসিবি সভাপতি ও সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন, দুই মেয়ে তানিয়া বখ্‌ত ও তনিমা রহমান ময়না এবং তাদের ছেলেমেয়ে ও স্বামী জিল্লুর রহমানকে নিয়ে তার পারিবারিক জীবন ছিল খুবই গোছানো। গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে আইভি রহমানের মৃত্যুর পর তাই বিষাদভরা কণ্ঠে মো. জিল্লুর রহমান জানিয়েছিলেন, ‘আইভিকে ছাড়া আমি জীবন্মৃত।’ ভৈরবের বাড়ির ‘গৃহকোণ’ নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আইভি ভবন’। এই বাড়িটিতে ভৈরববাসীর সঙ্গে আইভি রহমানের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আইভির অসামপ্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একই সঙ্গে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালে আইভি রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে জাতীয় মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী হন। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আইভি রহমান চলে গেছেন বার বছর হলো। কিন্তু ভৈরবে ‘আইভি ভবন’ আছে আগের মতোই। সেখানে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে এসে অশ্রু-পুষ্পে ভৈরববাসী স্মরণ করেন তাদের প্রিয় নেত্রী আইভি রহমানকে। বাংলার এই কৃতী সন্তানের স্মরণে ভৈরবের কমলপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নির্মাণ করা হয়েছে ‘আইভি রহমান গেইট’। চণ্ডিবের গ্রামের নিজ বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ভৈরব জিল্লুর রহমান সরকারি মহিলা কলেজের একটি ছাত্রীনিবাসের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। আইভি রহমান নিহত হওয়ার পর তার নামে ভৈরবে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিল এলাকাবাসী। কিন্তু সেটি আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

বিবিসির অনুসন্ধান: তাজমহল কি কখনো হিন্দু মন্দির ছিল?

লাখ লাখ মানুষ তাজমহল দেখতে ভারতে যায়
বিতর্কিত দাবি: তাজমহল ছিল হিন্দু মন্দির!
লাস্ট আপডেট- ৩ নভেম্বর ২০১৭: একজন ভারতীয় এমপি এবং কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী দাবি করছে তাজমহল ছিল একটি হিন্দু মন্দির। ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির ভিনয় কাটিয়ার এমনকি তাজমহলের নাম বদলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। তিনি বলছেন, একজন হিন্দু শাসক তাজমহল তৈরি করেছেন।
ভারতের গণমাধ্যমে তার এই দাবি ব্যাপক প্রচার পায়। অনেক ডানপন্থী গোষ্ঠী তাঁর এই দাবি সমর্থন করে।
বিবিসির 'রিয়েলিটি চেক' অনুসন্ধানের রায়:
এই দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রমাণ নেই। বরঞ্চ ইতিহাসবিদদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, এমনকি ভারত সরকার পর্যন্ত মনে করেন, এই সৌধ ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন।

তাজমহল কে তৈরি করেছে?

ভারতের সরকারীভাবে সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট শাহ জাহান তাজমহল তৈরি করেছিলেন তাঁর মৃত স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে।
ভারতের মোগল শাসকরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে তারা ভারত শাসন করে।
মোগল শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে ইসলামী শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।
শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপারে মোগলদের যে অনুরাগ, তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হয় তাজমহলকে।
ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ তাজমহলকে বর্ণনা করেছে 'মোগল স্থাপত্যকলার চূড়ান্ত নিদর্শন' হিসেবে।
আর তাজমহল নিয়ে ভারত সরকারের যে ওয়েবসাইট আছে, তাতে বলা হচ্ছে, "ইসলামী স্থাপত্যকলার সঙ্গে ভারতের স্থানীয় স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে গড়ে উঠা সেসময়ের স্থাপত্য রীতির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহারণ এটি।"
এতে আরও বলা হয়, মোগলরা যখন তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ করে, তখনও তারা তাদের পারস্য এবং তুর্কী-মোঙ্গল শেকড় নিয়ে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু ততদিনে তারা একই সঙ্গে নিজেদের ভারতীয় বলেও ভাবতে শুরু করেছে।
ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বিবিসিকে বলেন, "তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। সেখানে যে কখনো কোন মন্দির ছিল তার কোন প্রমাণ নেই।"
"তাজমহল তৈরি হওয়ার আগে সেখানে হিন্দু শাসক জয় সিং এর একটি 'হাভেলি' (প্রাসাদোপম বাড়ি) ছিল।"
"শাহজাহান এই হিন্দু শাসক জয় সিং এর কাছ থেকে হাভেলিটি কিনে নেন। এ নিয়ে একটি 'ফরমান' জারি করা হয়েছিল। সেটা এখনো আছে। এই ফরমানে দেখা যাচ্ছে মোগলরা তাদের বিভিন্ন চুক্তি এবং ইতিহাস রক্ষায় বেশ সচেতন ছিল।"
রানা সাফভি বলেন, ডাব্লিউ ই বেগলি এবং জেড এ ডেসাহাসের লেখা একটি বইতে এসব দলিল সংকলন করা আছে।.
" এসব বই পড়ে আমি উপলব্ধি করি, এসব ভবন এবং সৌধের ইতিহাস কত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই বই পড়েই আমি যুক্তি দিতে পারি যে তাজমহল তৈরি হয়েছে রাজা জয় সিং এর বাড়ির জমির ওপর, এবং সেখানে কোন ধর্মীয় ভবন থাকার কোন উল্লেখ কোথাও নেই।
আরেকজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হারবনস মুখিয়াও রানা সাফভির সঙ্গে একমত।
'শাহজাহান যে তাঁর স্ত্রীর স্মরণে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন এ নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।"
ভারতের স্কুল পাঠ্য বই এবং বিভিন্ন সরকারী সাইটেও তাজমহলকে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

মন্দির তত্ত্ব:

তাহলে তাজমহল যে মন্দির ছিল সেই কাহিনী কোত্থেকে আসলো?
তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার দাবি ভিনয় কাটিয়ারই যে প্রথম জানিয়েছেন তা নয়।
এর আগে ডানপন্থী ইতিহাসবিদ পিএন ওক ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করা 'তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি' বইতে এই সৌধকে 'তেজো মহল' বলে দাবি করেন।
বইতে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে এটি ছিল আদতে একটি হিন্দু মন্দির এবং একজন রাজপুত শাসক এটি তৈরি করেন।
মিস্টার ওক মনে করেন, সম্রাট শাহজাহান এটি দখল করে সেটিকে পরে তাজমহল নাম দিয়েছেন।
লেখক সচ্চিনানন্দ শেভডে ইতিহাসবিদ পিএন ওকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি বিবিসির মারাঠী সার্ভিসকে বলেন, সরকারের উচিত 'প্রকৃত সত্য' উন্মোচনের জন্য একটি দল নিয়োগ করা।
"তাজমহল কোন মুসলিম স্থাপত্য নয়। এটি আসলে একটি হিন্দু স্থাপত্য", দাবি করছেন তিনি।
কিন্তু সরকারের তাজমহল ওয়েসবাইটে দাবি করা হচ্ছে, এই স্থাপত্য পারস্য, ভারতীয় এবং ইসলামী স্থাপত্যকলার সংমিশ্রন।

স্থাপত্য রীতি:

মিস্টার কাটিয়ারএবং মিস্টার শেভডে, উভয়েই যুক্তি দেন যে, তাজমহলের স্থাপত্যে অনেক হিন্দু স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে।
"তাজমহলের শীর্ষে একটি অর্ধাকৃতি চাঁদ আছে। ইসলামিক স্থাপত্যে এই চাঁদটি সাধারণত বাঁকা থাকে। কিন্তু তাজমহলের চাঁদ বাঁকা নয়। এই চাঁদ আসলে হিন্দু দেবতা শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত।"
"এছাড়া এই সৌধ চূড়ায় একটি কলসও আছে। সেখানে আমের পাতা এবং উল্টে রাখা নারকেলও আছে। এগুলো হিন্দু প্রতীক। ইসলামী সংস্কৃতিতে ফুল, পশুর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও তাজমহলে এসব ব্যবহার করা হয়েছে।
মিস্টার মুখিয়া অবশ্য এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
"স্থাপত্য রীতি সব সময় বদলায় এবং সেখানে বহু সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। মোগল স্থাপত্যকলাও এর ব্যতিক্রম নয়। কলস হিন্দু স্থাপত্যরীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু অনেক মোগল স্থাপত্যেও এটি দেখা যায়, তাজমহলেও। মোগলদের তৈরি আরও অনেক স্থাপত্যে কলস এবং পাতা দেখা যাবে।"

এখন কেন এই বিতর্ক:

বহু যুগ ধরে ভারতের পর্যটন বিভাগ সেদেশে পর্যটক টেনে আনার জন্য তাজমহলকে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে তুলে ধরছে। শাহজাহান এবং মমতাজ মহলের প্রেম নিয়ে অনেক কবি-লেখক রচনা করেছেন অনেক কাহিনী।
কাজেই হঠাৎ ভিনয় কার্টিয়ার এরকম কিছু দাবি তুলে কি অর্জন করতে চাইছেন?
ভারতে যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে, তখন তিনি এরকম একটা বিতকির্ত দাবি তুলেছেন। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলটির রাজনীতিকরা 'হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব' প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ ধরণের বিতর্কিত দাবি একই সঙ্গে রাজনীতিকদের একটা সুযোগ করে দেয় কর্মসংস্থান বা অর্থনীতির অবস্থার মতো বাস্তব ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে।
যদিও সরকার এখনো পর্যন্ত তাজমহল বিষয়ক এই দাবিকে সমর্থন করেনি, ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো এ নিয়ে সরব।
এরকম একটি গোষ্ঠী এমন দাবিও তুলেছে যে, তাজমহলে হিন্দুদের পুজা করতে দিতে হবে।
(বিবিসি নিউজের 'রিয়েলিটি চেক' নানা বিতর্কিত দাবি এবং 'ফেইক নিউজে'র মধ্য থেকে প্রকৃত ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করে)
তাজমহল: স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতি অম্লান রাখতে সম্রাট শাহজাহান তৈরি করেন এই সৌধ।

ভয়াল ২১শে আগস্ট আজ

ভয়াল ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বার্ষিকী আজ। ২০০৪ সালের এই দিনে  ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী’ সমাবেশ রক্তাক্ত হয় সন্ত্রাসের থাবায়। বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতা-কর্মী শাহাদাত বরণ করেন। গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী। আহত হন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ। আহত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অনেকে এখনও স্প্লিন্টারের আঘাত নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আওয়ামী লীগ জানিয়েছে, দলকে নেতৃত্ব শূন্য করতে সংগঠনের সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ দলের প্রথম সারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ওই ঘৃণ্য হামলা চালায় ঘাতকচক্র। শুধু গ্রেনেড হামলাই নয়, সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হয় ছয় রাউন্ড গুলি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আহত হন। তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দিবসটি উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, মোমবাতি প্রজ্জ্বলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে দলের নেতা কর্মীরা আজ সকাল ৯ টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত বেদীতে পুস্পার্ঘ নিবেদন করবেন।

একইদিন বিকাল ৪টায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বক্তব্য রাখবেন দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের কালরাতের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রক্তপিপাসু বিএনপি-জামায়াত অশুভ জোটের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় রাজনৈতিক সমাবেশে এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ওইদিন  শেখ হাসিনার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আকস্মিক গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে মারাত্মক বিশৃংখলা, দিনের আলো মুছে গিয়ে এক ধোয়াচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঢাকা’র তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতা এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তাৎক্ষণিকভাবে এক মানব বলয় তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে শেখ হাসিনাকে গ্রেনেডের হাত থেকে রক্ষা করেন। মেয়র হানিফের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত অস্ত্রোপচার করার কথা থাকলেও গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে থাকার কারণে তার অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি ব্যাংকক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে শেখ হাসিনা গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় উল্লেখযোগ্য নিহতরা হলেন- আইভি রহমান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অবঃ) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া। মারাত্মক আহতরা হলেন শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক (প্রয়াত), সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (প্রয়াত), ওবায়দুল কাদের, এডভোকেট সাহারা খাতুন, মোহাম্মদ হানিফ, এএফএম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা পারভীন, এডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দিপ্তী, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিক প্রমুখ।

ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টার অভিযোগ ছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন ছিল তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও। সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকার এ হামলার পুনারায় তদন্তের নির্দেশ দিলে এবং সাড়ে তিন বছর পর বিলম্বিত পুলিশ চার্জশিট নথিভুক্ত করা হয়। পুনরায় তদন্তে পুলিশ এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে চিহ্নিত করে। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিয়ে গত বছরের ১০ই অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত। এই রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এক বিবৃতিতে সকল নেতা, কর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে কর্মসূচি পালনের আহবান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সব শাখার নেতৃবৃন্দকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করে দিবসটি স্মরণ ও পালন করার আহ্বান জানান।