Monday, November 24, 2014

প্রথমার বইমেলার উদ্বোধন- দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন মূসা: আনিসুজ্জামান

(ছবি- এবিএম মূসার স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদিত রাজধানীতে শাহবাগ বইমেলা উদ্বোধন করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ছবি-সাহাদাত পারভেজ) চারটা বাজতেই নবীন-প্রবীণ লেখক-পাঠকে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের সামনের চত্বরটি। উৎসবমুখর পরিবেশে অতিথিদের নিয়ে শাহবাগ বইমেলা উদ্বোধনের ঘোষণা দেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আজ সোমবার শুরু হয়েছে এই মেলা। ১০ দিন চলবে মেলা। শেষ হবে আগামী ৪ ডিসেম্বর। প্রথমা প্রকাশন আয়োজিত শাহবাগ বইমেলাটি প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসার স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদন করা হয়েছে। প্রথম দিনই এসেছে এবিএম মূসার আত্মজীবনী বেলা যে বয়ে যায়, মহিউদ্দিন আহমদের জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ে রাজনীতি বইগুলো।
মেলার উদ্বোধন শেষে এবিএম মূসার আত্মজীবনী গ্রন্থ বেলা যে বয়ে যায়–এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। পরে বই সম্পর্কে কথা বলেন আনিসুজ্জামান। তিনি মজা করে বলেন, ‘তাঁর (এবিএম মূসা) সঙ্গে আমার পরিচয় অল্প কিছুদিনের। এইতো ১৯৫১ সালের ডিসেম্বরে। এরপর আর কখনো সম্পর্কে ছেদ পড়েনি। সাংবাদিক হিসেবে তিনি যে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন, এর কোনো ইয়ত্তা নেই।’ তিনি বলেন, বইটির প্রথম অংশ যেভাবে বিস্তারিত লিখেছেন, পরের অংশ সেভাবে লিখতে পারেননি। শেষদিকে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বিস্তারিতভাবে লিখে যেতে পারলে আমরা অনেক উপকৃত হতাম। তার পরও বইটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার অনেক কারণ আছে।’ মূসার আত্মজীবনী গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন আনিসুজ্জামান।
চিত্রশিল্পী আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘মূসা ভাই ছবির ইলাস্ট্রেশন ও এডিটিং ভালো বুঝতেন। এ নিয়ে তাঁর উৎসাহের কমতি ছিল না।’ তিনি মূসার গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে বইটি প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছিল। বইটির নামটি মূসা ভাই দিয়ে গেছেন। বইমেলা তাঁকে নিবেদনের উদ্দশ্য হচ্ছে তাঁর স্মৃতির প্রতি ও কাজের প্রতি সম্মান দেখানো।’
এবিএম মূসার জ্যেষ্ঠ কন্যা পারভীন সুলতানা বলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি বাবা কীভাবে সবকিছু বর্ণনা করলেন, সেটা আমার কাছে বিস্ময় লাগে।’
এদিকে মেলায় প্রথমা প্রকাশনের বইয়ের সঙ্গে আছে প্রথমা বইয়ের দুনিয়ার ভান্ডার থেকে তুলে আনা দেশি-বিদেশি নানা ধরনের বই, পত্রপত্রিকা ও ছোট কাগজ। মেলায় প্রথমা প্রকাশনের বই বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৬০ শতাংশ কমিশনে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বইমেলা খোলা থাকবে। চলবে আগামী ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ, আনিসুল হক, এবিএম মূসার মেয়ে মরিয়ম সুলতানা ও শারমিন মূসা প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রীকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার খোলা চিঠি

(ছবি: ২০ নভেম্বর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ছাত্রলীগের সভাপতি হুসাইন মোহাম্মদ সাগর গুলিবিদ্ধ হন। তিনি এখন সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: প্রথম আলো) ‘গুলিবিদ্ধ হলাম আমরা। এক সহযোদ্ধাকে সারা জীবনের জন্য হারালাম। আমরা আবার গ্রেপ্তার...।’-এ আক্ষেপ সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ছাত্রলীগের সভাপতি হুসাইন মোহাম্মদ সাগরের। ২০ নভেম্বর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সাগর গুলিবিদ্ধ হয়ে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ছাত্রলীগের কর্মী সুমন চন্দ্র দাস ওই দিন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাগরের সঙ্গে গিয়েছিলেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোয় এবং নিহত সুমন ছাত্রলীগের কেউ নয় বলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সাগর ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খোলা চিঠি’তে ঘটনার বর্ণনা দেন। গতকাল রোববার রাতে সাগরের ই-মেইল থেকে চিঠিটি সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়।
আজ সোমবার যোগাযোগ করলে হোসাইন মোহাম্মদ সাগর খোলা চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই দিন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপট, সুমন হত্যাকাণ্ড ও আমাদের বহিরাগত বলে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা হচ্ছে বলে অসুস্থ অবস্থায় সহকর্মীর মাধ্যমে চিঠি লিখেছি এবং তাতে প্রকৃত বিষয় তুলে ধরেছি।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খোলা চিঠির শুরুতে সাগর লেখেন, ‘আমি হুসাইন মোহাম্মদ সাগর। সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মাস্টার্স প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র। বংশ পরাক্রমায় আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমি যখন বুঝতে শিখিনি তখনই বাবা-ভাইদের সঙ্গে গ্রামের মেঠোপথ ধরে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ছোট বাজারে যাই। আমার বড় ভাই ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি আমি। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত শিবিরের আস্তানা হিসেবে সিলেটে পরিচিত ছিল। যার প্রতিটি সেমিস্টারে ছিল শিবিরের সাংগঠনিক কমিটি। আজ এই ক্যাম্পাসটি শিবিরমুক্ত। আমি, নিহত সুমন চন্দ্র দাস ও ছাত্রলীগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা ক্যাম্পাসটি শিবিরমুক্ত করি, যা তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সিলেটের আওয়ামী রাজনীতির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছে আমাদের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।’
সুমন হত্যা ও শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের যাওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘সেদিন সকাল নয়টার দিকে আমার কাছে খবর আসে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ছাত্রলীগের সহসভাপতি অঞ্জন দাসের ওপর হামলা হয়েছে। নিজের একজন সহকর্মী ভাইয়ের ওপর হামলার কথা শুনে আমি, সুমন চন্দ্র দাসসহ ১০-১৫ জন তাৎক্ষণিক ছুটে যাই। গিয়ে সেখানে হতবিহ্বল হই। পূর্ব থেকে ওৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা বৃষ্টির মতো গুলি চালায়। ওদের গুলি আমার সামনে থাকা সুমন চন্দ্র দাসের ওপর লাগে। সে তৎক্ষণাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে একটি গুলি আমার পেটে লাগে। আরও কয়েকজন বন্ধু গুলিবিদ্ধ হয়। সুমন চন্দ্র দাস হাসপাতালে আনার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। আমিসহ আরও কয়েকজন বন্ধু শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের নেতা অঞ্জন দাস গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিহত সুমনের যাত্রী হওয়ার প্রহর গুনছি। সুমন যেন আমাদেরই ডাকছে। বলছে, বাড়ি থেকে মায়ের হাতের নাড়ু এনেছি। আমি কি একা খাব, তোমরা খাবে না? এই অবস্থায় পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তার করে নজরবন্দী করে রাখে।’
গুলিবিদ্ধ হয়ে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাগর। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হলাম আমরা। এক সহযোদ্ধাকে সারা জীবনের জন্য হারালাম। আমরা আবার গ্রেপ্তার। তাতেও দুঃখ নেই। এরচেয়ে বড় দুঃখ হচ্ছে, আমাদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ভাই সত্যিকার ঘটনা না জেনে (যা পত্রপত্রিকায়ও এসেছে) তথ্য বিভ্রাটে প্ররোচিত হয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিহত সুমন চন্দ্র দাস ছাত্রলীগের কেউ নয়। তখন আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না, প্রাণপ্রিয় নেত্রী। সুমন ছিল একজন মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান। তিন বোনের একমাত্র আদরের ভাই। সে আমাদের প্রায়ই বলত, ছাত্রলীগের রাজনীতি করে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা বাবার ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণাতে। সেজন্য সব সময় মিছিলের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিত। তাঁর মৃত্যু হয়েছে সামনে থাকার জন্য।’
ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলে সাগর চিঠিতে বলেন, ‘মাননীয় নেত্রী, আপনার কাছে প্রশ্ন, ছাত্রলীগের কমিটিতে কয়জন কর্মীর স্থান আছে? প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হাজার হাজার, লাখ লাখ কর্মী রয়েছে। আপনি জানেন, অধিকাংশ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ১০ বছর পর্যন্ত পার হয়ে যায়। তাই সুমন চন্দ্র দাসের মতো ত্যাগী কর্মীরা নেতা হতে পারে না। এরা কর্মী হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখে। আর সুমনও আমাদের মতো কর্মী দিয়ে সোহাগ ভাইরা নেতা। এ জন্য সুমন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে, সন্ত্রাসীদের গুলিতে জীবন দিয়েও ছাত্রলীগের কর্মী হতে পারল না। আমার মনে হয়, তাঁর নামের সঙ্গে দাস না থাকলে হয়তো তাঁকে শিবির কর্মী বলে চালিয়ে দেওয়া হতো।’
খোলা চিঠির শেষ পর্যায়ে সাগর লেখেন, ‘নেত্রী আপনার কাছে আকুল আবেদন হাসপাতালের বেডে শুয়ে, বাঁচব কিনা মরব জানি না। বাঁচলে পুলিশি নির্যাতন কবে বন্ধ হবে জানি না। কিন্তু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই, কমিটি গঠনের দীর্ঘসূত্রতায় যে লাখ লাখ কর্মী কমিটিতে স্থান পায় না, তারাও ছাত্রলীগের কর্মী। আমার বন্ধু মারা গেছে, আমরা গুলিবিদ্ধ হয়েছি, পুলিশ নির্যাতন চালাচ্ছে, তাতে কষ্ট নেই। আপনি শুধু সোহাগ ভাইকে একবার বলুন, আমরা ছাত্রলীগের কর্মী, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। আমাদের সেই অধিকারটুকু যাতে উনি কেড়ে না নেন।’
-বিনীত, হুসাইন মোহাম্মদ সাগর, ছাত্রলীগের একজন কর্মী।

কুতুবদিয়ায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কমিউনিটি ইন্টারেকটিভ সভা অনুষ্টিত by হাছান কুতুবী

কুতুবদিয়ায় নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, মা-শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয় কমিউনিটি ইন্টারেকটিভ সভায় পরিকল্পিত পরিবার গঠন এবং পসূতি মা-শিশুর প্রতি অধিক যত্নশীল হওয়ার জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়। মা-শিশুর মৃত্যু হার কমাতে বিষয়ের তাৎপর্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য উপস্থিত কমিউনিটি লিডারদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানানো হয়। ইউএনএফপির সহযোগীতায় এমসি এইস সার্ভিসেস ইউনিটের আয়োজনে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ এ সভা বাস্তবায়ন করেছে। বড়ঘোপ ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শাকের উল্লাহ বিএসসির সভাপতিত্বে পরিষদ মিলনায়তনে সোমবার অনুষ্টিত সভায় কক্সবার জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা.দীপক তালুকদার প্রধান অতিথি ছিলেন। সভায় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.শাহাবুদ্দিন ও ইউএনএফপির কক্সবাজার প্রতিনিধি নজমুল হাসান বিশেষ অতিথি ছিলেন। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বিধান কান্তি রুদ্র সভায় স্বাগত বক্তব্য বক্তব্য রাখেন। লেমশীখালী ইউনিয়ন প.প.পরিদর্শক নাজেম উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্টিত সভায় বড়ঘোপ ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ হাছান, কুতুবদিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক হাছান কুতুবী, কুতুবদিয়া হাই স্কুলের প্রবীণ শিক্ষক আক্কাস উদ্দিন, শিক্ষিকা জিন্নাত আরা ও মাওলানা জাফর আলম এতে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্যদের মাঝে ইউপি মেম্বার নাছির উদ্দিন, আবুল কালাম, আখতার উদ্দিন, রেজাউল করিম, সালাউদ্দিন, ফরিদা জাফর, রোকছানা বেগম ও সেলিনা আখতারসহ প.প.বিভাগের মাঠকর্মীগণ উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপির বোধোদয় হোক by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের পর থেকেই মানুষের মাঝে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এ ক্ষোভকে শক্তিতে পরিণত করে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে একটি পক্ষপাতহীন ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে বিএনপি যে সমর্থ হয়নি, এটি দিবালোকের মতো সত্য। কেন সমর্থ হয়নি? এর কারণ কি বিএনপি অনুসন্ধান করেছে? মনে হয় না। কারণ অনুসন্ধান করলে বিএনপির কর্মকাণ্ডের মধ্যেই তার প্রতিফলন দেখা যেত। বিএনপি ৫ জানুয়ারির আগে যে অবস্থায় ছিল, বর্তমানেও সে অবস্থায়ই আছে।
বিএনপির নির্দলীয় সরকারের দাবিটি গণতান্ত্রিক। এর প্রতি বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষের সমর্থন ছিল। এ দাবি আলোর মুখ কেন দেখেনি তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন, প্রয়োজন এর যথাযথ কারণ অনুসন্ধান; না হলে বিএনপির আন্দোলন আবার হোঁচট খাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
জামালপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নীলফামারী, নাটোর ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খালেদা জিয়ার জনসভা দেখে মনে হয়, জনগণ বিএনপির সঙ্গে আছে। এখন এ জনতার শক্তিকে বিএনপি কীভাবে কাজে লাগাতে চায়- সেটিই বড় প্রশ্ন। আন্দোলনে সাফল্য পেতে হলে এ জনতার শক্তিকে রাজপথে আনতে হবে; কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, তৃণমূলের বিএনপির সঙ্গে কেন্দ্রের বিএনপির পার্থক্য নির্ণয় করা যায় অনায়াসে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নজিরবিহীন ধৈর্য ও অসীম কষ্ট সহিষ্ণু এবং অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী। যেকোনো প্রতিকূল অবস্থায়ও তারা দলের হাল শক্তভাবে ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। বিএনপির দুর্বলতা মূলত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে। এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠাই বিএনপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হলে ব্যর্থ, অযোগ্য, পলায়নপর, অরাজনৈতিক ও ভীতু-কাপুরুষ নেতাদের পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। পলায়নপর ও কাপুরুষোচিত মনোবৃত্তির কারণে ত্যাগী ও সাহসী কর্মীদের মন ভেঙে যায়, তারা রাজপথে নামার সাহস হারিয়ে ফেলে। বিরোধ যখন তুঙ্গে ওঠে, তখনই নেতৃত্ব প্রকাশের সময়। মানুষের বিপদে যে সামনে এসে দাঁড়ায়, তাকে মানুষ নেতার মর্যাদা দেয়।
পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিল, ভারত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কী? উত্তরে নেহেরু বলেছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ইংল্যান্ড, এটা অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন হয়ে ভারতের অনুকূলে আসার সম্ভাবনা আছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে প্রতীয়মান হয়, পণ্ডিত নেহেরুর কথাই সত্য হতে যাচ্ছে। এ দূরদর্শিতার কারণেই নেহেরুকে পণ্ডিত বলা হতো। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের ভবিষ্যত কী? এ প্রশ্ন আজ রাজনীতিকদের কাছে, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের কাছে। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর দেশের বর্তমান নেতৃত্বের কাছে আছে বলে মনে হয় না।
ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি অনৈতিক সরকার দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একটা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশকে আচ্ছন্ন করেছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তাতে নিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে দেশ। ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি। ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প এবং জনশক্তি রফতানি।
বর্তমানে দেশে যে সংকট চলছে, তিন বছর আগেও তা ছিল না। সমস্যাগুলো সুকৌশলে সৃষ্টি করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের মধ্য দিয়ে মূলত সংকটের আবির্ভাব। সরকার আদালতের ওপর দায় চাপিয়ে একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। উচ্চ আদালত আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার আদালতের মতকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। আর তাতেই সংকটের সূত্রপাত। ফলে দেশ এখন এক অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছে।
বিগত দিনে রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রচুর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে বোঝা যায়, সুকৌশলে জাতিকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রের ভিত্তিও জনগণ; জনগণকে বিপন্ন করে রাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারে না। অযাচিত শক্তি প্রয়োগ সমস্যা সমাধানের পথ নয়। এভাবে কোনো সমস্যার সমাধান হয়েছে- পৃথিবীতে এমন নজির নেই। সমস্যা কেন সৃষ্টি হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। কোনো সামাজিক শক্তিকে বিপথে ঠেলে দেয়া অপরিণামদর্শী কাজ।
রাজনীতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ক্ষমতাসীনরা দমন-পীড়ন ও হত্যার পথ বেছে নেয় এবং অযাচিত শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালায়। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলও তাই করছে। তারা রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ প্রবণতা ক্ষমতাসীনদের জন্য ভবিষ্যতে অশনি সংকেত হয়ে আবির্ভূত হতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার পরিণতি যে কখনও ভালো হয় না, তার প্রমাণ রয়েছে ভূরি ভূরি। আশা করি সরকার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে।
যারা দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের আচরণ দায়িত্বহীন হওয়ার সুযোগ নেই। দায়িত্বহীন নেতৃত্বের কাছে দেশের অগ্রগতি আশা করা যায় না। এটা কি সরকার উপলব্ধি করে? প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। প্রশ্ন হল, সে আলোচনা শুরু হচ্ছে না কেন? ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার মধ্যে কোনো প্রশান্তি আছে বলে তো মনে হয় না। একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। তাহলেই অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা কেটে যাবে। রাজনীতিকরা আসীন হবেন মর্যাদার আসনে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি ও গবেষণা হওয়া উচিত by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ নিবাচনকে ঘিরে রাজনীতি আবর্তিত হয়। কারণ, এমন নির্বাচনে যে দল জয়লাভ করে, সে দলই সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। স্থানীয় সরকারসহ অন্য যত রকম নির্বাচন আছে, ওই সব নির্বাচনে জয়লাভ করে একটি দল তার ভাবমূর্তির উন্নতি করতে পারলেও ক্ষমতায় যেতে পারে না। সে কারণে অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ নির্বাচন অধিক গুরুত্ব পায়। যেসব দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দেশ সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে।
কোনো দেশে যদি সংসদ নির্বাচনে দুর্নীতি-কারচুপি হয়, ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে না পারেন, তাহলে ওই নির্বাচনকে সবারই নিন্দা করা উচিত। কারণ, দুর্নীতি-কারচুপিরগঠন সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ওই দেশগুলোতে নির্বাচন স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচনে জনগণ যে রায় প্রদান করেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো সে রায় মেনে নেয়। নির্বাচনের পর পরাজিত দল বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তাদের দেশ পরিচালনায় সহায়তা করার প্রতিশ্র“তি প্রদান করে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের পূর্বাপর কোনো রকম রাজনৈতিক সহিংসতা হয় না। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের প্রার্থীর পক্ষে বাযদি নির্বাচনেধাহীনভাবে প্রচার-প্রচারণা করতে পারে এবং ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট প্রদান করেন। কিন্তু যেসব দেশে গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি, ওই দেশগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচন সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় না। শক্তিশালী দল বা ক্ষমতাসীন দল অনেক সময় দুর্নীতি-কারচুপি বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে নির্বাচন জিততে চেষ্টা করে। এর ফলে অন্য দলগুলো ওই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে চায় না। ফলে দেশে সরকারবিরোধিতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। কাজেই একটি দেশে সংসদ নির্বাচন স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য না হলে ওই নির্বাচনকে সমর্থন করলে এবং ওই রকম নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন হয়ে কোনো সরকার দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত হলে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো আবারও দুর্নীতি-কারচুপি করতে উৎসাহিত হয়। এ জন্য নির্বাচন নিয়ে লেখক-গবেষকদের বেশি বেশি করে কাজ করা উচিত। প্রতিটি নির্বাচনের ত্র“টি-বিচ্যুতি ও ভালো-মন্দ ভোটারদের কাছে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা উচিত। বাংলাদেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশে লেখক-গবেষকদের এ প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল। এখানে লেখক-গবেষক-প্রকাশকদের মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। ফলে নির্বাচন নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি তুলনামূলকভাবে কম হয়। এ ক্ষেত্রে যদিও কিছু কাজ হয়, সেগুলোয় অনেক ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে অধিকাংশ নির্বাচনের ওপর সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রবন্ধ ও প্রতিবেদন এবং দেশী-বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রকাশিত রিপোর্ট পাওয়া যায়। তবে এসব প্রতিবেদনের মধ্যে বস্তুনিষ্ঠতা এবং গভীর গবেষণার সুস্পষ্ট অভাব থাকে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে যেসব নির্বাচনে দুর্নীতি-কারচুপি যত বেশি হয়েছে, সে নির্বাচনগুলোর ওপর গবেষণা কাজ তত কম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যেমন, চতুর্থ ও ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক দুর্নীতি-কারচুপি হলেও ওই দুটি নির্বাচনের ওপর খুব বেশি গবেষণাকাজ লক্ষ্য করা যায় নি, যদিও পঞ্চম ও সপ্তম সংসদ নির্বাচন মোটামুটি ভালো হলেও ওই দুটি নির্বাচনের ওপর বেশ কিছু গবেষণাকাজ চোখে পড়ে। আসলে হওয়া উচিত ঠিক এর বিপরীত। নির্বাচন নিয়ে যেসব লেখক-গবেষক কাজ করেন, তারা অস্বচ্ছ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হওয়ার কথা চিন্তা করে এ বিষয়ে কলম ধরতে নিরুৎসাহিত হন কিনা, সে বিষয়টি ভেবে দেখার মতো। সরকারের গুডবুকে থাকতে উৎসাহী অনেক লেখক-গবেষক অস্বচ্ছ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে হয়তো ওই নির্বাচনের জারিজুরি উন্মোচন করতে চান না।
স্বচ্ছ, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর বেশি বেশি কাজ না করে সমাজবিজ্ঞানীদের উচিত অস্বচ্ছ ও দুর্নীতি-কারচুপির নির্বাচনগুলোর ওপর বেশি করে গবেষণাকাজ করা। এ লক্ষ্যে দশম সংসদ নির্বাচনের ওপর কাজ হওয়া উচিত সবচেয়ে বেশি। কারণ, সংসদ নির্বাচনগুলোর মধ্যে এ নির্বাচনটিতে সবচেয়ে বেশি, দুর্নীতি-কারচুপি এবং নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু লেখালেখি ও প্রকাশনায় তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ পাঠকরা ভাবতে পারেন যে, দশম সংসদ নির্বাচনের ওপর লেখক-গবেষকরা লিখলে তো আর নির্বাচনটি ভালো হয়ে যাবে না। তাহলে ওই নির্বাচনের ওপর লেখক-গবেষকরা না লিখলে অসুবিধা কোথায়? অসুবিধা আছে। বিষয়টি খোলাসা করা দরকার।
সম্মানিত পাঠক, মনে করুন আজ থেকে ১৫-২০ বছর পর নির্বাচনকেন্দ্রিক সাধারণ আলোচনায় যদি কেউ বলেন, বাংলাদেশে এরশাদ আমলে তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালো হয়নি; বিএনপি আমলে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক সন্ত্রাস-দুর্নীতি-কারচুপি হয়েছে; মহাজোট আমলে দশম সংসদ নির্বাচনেও অনেক দুর্নীতি-কারচুপি-সন্ত্রাস হয়েছে এবং উল্লিখিত নির্বাচনগুলো একদম ভালো হয়নি; তাহলে সাধারণ মানুষ হয়তো সে বিশ্লেষণ মেনে নেবেন। কারণ, সাধারণ মানুষ নির্বাচনবিষয়ক খুঁটিনাটি কিছুই দীর্ঘদিন মনে রাখতে পারবেন না। আর দীর্ঘদিন পর দশম সংসদ নির্বাচনকে অন্য দুর্নীতি-কারচুপির নির্বাচনের সঙ্গে একই কাতারভুক্ত করে মূল্যায়ন যদি সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেন, তাহলে তা হবে একটি নির্জলা একাডেমিক ভ্রষ্ট্রাচার। আর এমনটি হলে এর জন্য আজকের নিষ্ক্রিয় মুখ-চোখ বোজা সুবিধাবাদী একাডেমিক এবং লেখক-গবেষকরাই দায়ী থাকবেন। কারণ, দশম সংসদ নির্বাচনটিকে কিছুতেই অন্য পাঁচ-দশটি নির্বাচনের সঙ্গে একই কাতারভুক্ত করে মূল্যায়ন করা যথার্থ নয়। না বললেও চলে, ওই নির্বাচনটিতে দুর্নীতি-কারচুপি, সহিংসতা এবং নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কায়দাটি ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সে কারণে ওই নির্বাচনটিকে অন্য দুর্নীতির নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে আলোচনা করলে তা সঠিক হবে না। ভুলে না যাওয়া ভালো, দশম সংসদ নির্বাচনটি ছিল পৃথিবীর সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কারণ, সেবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করে। বাকি ১৫৭টি আসনের মধ্যে ৯০টি আসনে নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে রিটার্নিং অফিসার ও প্রিসাইডিং অফিসারদের প্রেরিত ভোটসংখ্যায় মিল ছিল না। বিরোধীদলীয় বর্জন এবং সহিংসতায় ভোট কেন্দ্রে গিয়েছিলেন অত্যন্ত নগণ্যসংখ্যক ভোটার।
বাংলাদেশের লেখক-গবেষক এবং সুশীল সমাজ সদস্যদের সবসময় সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার ব্যাপারে সাহসী ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। এদের অনেকের মধ্যেই সুবিধাবাদী মনোভাব কাজ করে এবং ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে অনেক সময় এদের অনেকেই নীতিভ্রষ্ট্র হয়ে পড়েন। সত্য এবং সাহসী উচ্চারণ করার মতো লেখক-গবেষকের সংখ্যা কমতে থাকলে ভবিষ্যতে দশম সংসদ নির্বাচনের মতো বিরল বৈশিষ্ট্যের অস্বচ্ছ ও নেতিবাচক নির্বাচনকে আর দশ-পাঁচটি দুর্নীতি-কারচুপির নির্বাচনের সঙ্গে একই কাতারভুক্ত করে ফেলা অসম্ভব হবে না। দশম সংসদ নির্বাচনকে এর প্রাপ্য স্থানে অধিষ্ঠিত রাখতে হলে বর্তমান সময়ের লেখক-গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের এ নির্বাচনটিকে তাদের গবেষণার আগ্রহের বিষয়বস্তুতে পরিণত করতে হবে। এ নির্বাচনটির নেতিবাচকতা তুলে ধরে বেশি বেশি করে এর ওপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং বই-পুস্তক লিখতে হবে যাতে করে এ নির্বাচনের একটি অনুপুঙ্খ একাডেমিক রেকর্ড ভবিষ্যৎ নির্বাচন গবেষকদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। এমন কাজ করতে পারলে ভবিষ্যতের সুবিধাবাদী নির্বাচনী গবেষকরা আর এ নির্বাচনটিকে অন্য নেতিবাচক নির্বাচনগুলোর সঙ্গে এক কাতারে ফেলে আলোচনা ও মূল্যায়ন করতে পারবেন না। আর বর্তমানের লেখক-গবেষকরা যদি সুবিধাবাদে প্রভাবিত হয়ে এ বিষয়ে কলম না ধরেন, তাহলে ভবিষ্যতে আলোচ্য নির্বাচনের বিকৃত মূল্যায়নের জন্য এ শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও লেখক গবেষকদেরই দায়ী করা হবে।
একটি দেশের সুশীল সমাজ এবং জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবী যদি কিছু ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য মিথ্যাকে মিথ্যা এবং সত্যকে সত্য বলা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে সে দেশে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা পিছিয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার জনসমর্থন না থাকলেও কিছু কিছু বিরোধী নেতা, সুবিধাবাদী সুশীল সমাজ এবং একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ক্রয় করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে প্রয়াস পায়। তবে এ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয় এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বে সরকার অগণতান্ত্রিক উপায়ে টিকে থাকতে চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন ও অনৈক্য বৃদ্ধি পায় এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে দেশের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরার মধ্য দিয়ে দেশ পিছিয়ে পড়ে। কাজেই লেখক-বুদ্ধিজীবীদের উচিত অগণতান্ত্রিক ও অস্বচ্ছ নির্বাচনের প্রতি উচ্চকণ্ঠে সমালোচনামুখর হয়ে ওই রকম নির্বাচনের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে কলম ধরা। আর এভাবেই সরকারকে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এবং সঠিক গণতান্ত্রিক পথে দেশ পরিচালনার জন্য চাপে রাখা যাবে। লেখক-বুদ্ধিজীবীরা এমন সাহসী ভূমিকা পালন করলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং দেশ স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

অগ্নিদগ্ধ কিংবা বিধ্বস্ত হওয়া শ্রমিকের নিয়তি হতে পারে না by অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল

২৪ নভেম্বর ২০১২ তাজরিন গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। এর চার মাস পরেই সাভারের রানা প্লাজার ভবন ধসে ১ হাজার ১৩৭ জনের করুণ মৃত্যুর ঘটনাটি ছিল গত বছর বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার একটি। এ দুটি ঘটনায় সারা দেশের মানুষ ও বিশ্ব বিবেক স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। অত্যন্ত হৃদয়বিদারক হল এত কিছুর পরও ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিহত শ্রমিক পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ না পাওয়া।
জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সব মৌলিক অধিকারের প্রধান। বাংলাদেশের সংবিধানে আর্টিকেল ৩১, ৩২ ও ৩৪-এ প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, জীবন ও ব্যক্তির স্বাধীনতার অধিকার, জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদির সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে, যা ইউনিভার্সেল হিউম্যান রাইটস ও মানবাধিকার সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাদের কারণে মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে উপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণ না করলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাজরীন গার্মেন্টে কলাপসিবল গেটে তালা লাগানো অবস্থায় অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকদের নিচে নামতে না দেয়া এবং শ্রমআইন-কারখানাআইন অমান্য করার পরও অভিযুক্ত গার্মেন্ট মালিক দেলোয়ার হোসেনকে জামিনে মুক্তি দেয়া, রানা প্লাজা ধসে জড়িত দায়ী-দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেয়া এবং বিজিএমইএ-এর পাশ কাটানো ইত্যাদি কেউ মেনে নিতে পারেনি। একইসঙ্গে সহস্রাধিক প্রাণহানির ঘটনা কেন ঘটল, কোন কোন অবহেলা (negligence),
ত্রুটি ও আইন লংঘনের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে; এগুলোর জন্য দায়ী-দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কী ঘাটতি রয়েছে-এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা দরকার। এক্ষেত্রে আইন সংশোধন এবং বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা উচিত বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তাজরীন ফ্যাশনের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হয়েছে ৬ বা ৭ লাখ করে টাকা। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল ও মন্ত্রণালয়ের টাকা অর্থাৎ জনগণের টাকা আছে। বিজিএমইএ ও বায়ার আছে। কিন্তু মালিকের কোনো টাকার কথা শোনা যায়নি। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকজন। আহতদের অনেকের চিকিৎসার খবর নেই। রানা প্লাজার ভয়ংকর ঘটনার পর বিজিএমইএ নেতারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ক্ষতিপূরণের অর্থ অন্তত তাজরীনের চেয়ে কম হবে না, বেশিই হবে। বলেছেন, আহতদের চিকিৎসার সব দায়িত্ব তাদের। মিডিয়ার যতদিন মনোযোগ ছিল, ততদিন এসব কথা শোনা গেছে। মিডিয়া সরে যাওয়ার পর তাদের কথা আর কাজের মধ্যে ব্যাপক ফারাক পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারা কি আশা করেছেন, সময়ে সবাই ভুলে যাবে সব? দেশের আরও অঘটনে চাপা পড়ে যাবে তাদের সব কলংক?
রানা প্লাজা ধসে পড়ার সময় প্রকৃতপক্ষে কত লোক সেখানে ছিলেন, তার কোনো হিসাব এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যদিও সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভবন ধসের পর ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত ও ১ হাজার ১৩৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। জীবিত ও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা শ্রমিকদের সংখ্যা যোগ করলে তা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৭৫। যারা জীবিত উদ্ধার হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে মারা যান ১৮ জন। যদিও এ সংখ্যা স্থির নয়। সে হিসাবে মৃতের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৭। এছাড়াও উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে দু’জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৯৭৬টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ২৯১টি অশনাক্ত লাশ দাফন করা হয়েছে জুরাইন কবরস্থানে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে ১ হাজার ১৬৭ জন আহতের একটি তালিকা আছে। আদালতে জমা দেয়া প্রধান কারখানা পরিদর্শকের তালিকায় নিখোঁজের সংখ্যা ৩৭৯ হলেও ঢাকা জেলা প্রশাসকের তালিকায় রয়েছে ৩৭৬ জনের নাম। ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে লাশের দাবি করে রক্তের নমুনা জমা দিয়েছেন ৫৫৩ জন। সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি শুরু থেকে থাকলেও এখন পর্যন্ত সরকার বা বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ তা দূর করতে পারেনি। তাই আপনজনের খোঁজ না পাওয়া কিংবা সরকারি-বেসরকারি সাহায্য থেকে অনেক পরিবারের বঞ্চিত হওয়ার আশংকা থেকেই যাচ্ছে।
ক্ষতিপূরণ কত হওয়া উচিত সেটা নিয়ে নানা হিসাব আছে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষারত কয়েকজন প্রবাসী শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন পদ্ধতি ও দেশের বিদ্যমান মজুরি কাঠামো বিশ্লেষণ করে ক্ষতিপূরণের একটি ছক দিয়েছেন। তাতে ক্ষতিপূরণ দাঁড়ায় সর্বনিু প্রায় ৯ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৫৪ লাখ টাকা। অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ লিখেছিলেন ১৮৫৫ সালের চরম দুর্ঘটনা আইন অনুযায়ী গড়ে কম করে ধরলেও ক্ষতিপূরণ দাঁড়ায় ৪৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে আইএলওসহ আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মজুরি কাঠামো বিবেচনা করে পরিবার প্রতি ক্ষতিপূরণ দাঁড়ায় প্রায় ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট সবারই অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। অনুপাত অনুযায়ী সরকার শতকরা ৯ ভাগ, বিজিএমইএ শতকরা ১৮ ভাগ, মালিক ২৮ ভাগ এবং ব্র্যান্ড বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান শতকরা ৪৫ ভাগ বহন করবেন।
রানা প্লাজায় ভয়ংকর জীবননাশের পর দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে বহু সভা-সম্মেলন হচ্ছে। অনেক রকম প্রতিশ্রুতিও শোনা যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে টাকাও উঠেছে। কিন্তু শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিয়ে এখনও বিজিএমইএ বা সরকার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি।
মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের এ ব্যবসায় মালিকপক্ষ মুনাফা অর্জন করেই চলবে আর অন্যদিকে যাদের মেহনত ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে এই শিল্প, তারা কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতায় থাকবে, মৌলিক অধিকারবঞ্চিত হয়ে থাকবে, তা হতে পারে না।
শ্রমশক্তি বা শ্রমজীবীদের জীবনের নিরাপত্তা প্রদান করা গার্মেন্ট শিল্পের স্বার্থেই প্রয়োজন। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যতীত গার্মেন্ট শিল্পের অগ্রগতি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প-কারখানায় কয়েকদিন পরপর অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনায় বিদেশী বায়ার/ক্রেতাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কর্মস্থলে শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টি গার্মেন্ট মালিকরা না ভেবে শুধু মুনাফা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। যার কারণে ক্রেতারা বাংলাদেশের শ্রমপরিবেশ নিয়ে অসন্তুষ্ট।
অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ গার্মেন্ট ব্যবসা এবং এর উৎপাদিত পণ্য একটি গ্লোবাল চেইন বিজনেসের অন্তর্ভুক্ত। শ্রমিকদের আগুনে পুড়ে মরা অথবা তাদের রক্ত দিয়ে বানানো পোশাক সাধারণ ক্রেতারা ব্যবহার করে না। তাই তাদের এই প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক।
সরকার এখন পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে এমন কোনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার বা শাস্তি দেখাতে পারেনি, যা দ্বারা শ্রমিক বা ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হতে পারে। বিজিএমইএ কয়েকটি মিটিং এবং ৩-৪ বার মিলাদ পড়ানো ছাড়া নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে উদাহরণ দেয়ার মতো তেমন কিছুই করেনি। বিজ্ঞজনরা মনে করেন, গার্মেন্ট শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে।
এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে দেশের স্বার্থে, শ্রমিকের স্বার্থে এবং জাতির স্বার্থে। তবে শোষণ বা শ্রমিকের লাশের ওপর এ শিল্পের অগ্রগতি হবে না।
অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল : সভাপতি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল-গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, কেন্দ্রীয় কমিটি

জ্ঞানী যেখানে পা রাখতে ভয় পায় অর্বাচীন সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে by মাহবুব কামাল

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন- ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যারা মেনে নেয় না, তারা অর্বাচীন। তার কথার প্রত্যুত্তরে বিএনপির মির্জা ফখরুল বলেছেন- অর্বাচীন শব্দের অর্থ কী আমি জানি না, তবে প্রধানমন্ত্রীর কথা যদি সত্য ধরি, তাহলে পৃথিবীর সবাই কি অর্বাচীন?
ফখরুল সাহেবকে অর্বাচীন শব্দের অর্থটাই বোঝানো যাক আগে। অভিধানে এই শব্দের অর্থ দেয়া আছে- অপরিপক্ববুদ্ধি। বাংলা ভাষায় যাদের দক্ষতা কম, তারা ভাবতে পারেন, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি কোথায়? অর্থটা তো হওয়া উচিত- অপরিপক্ব বুদ্ধি যার। না, অপরিপক্ব ও বুদ্ধি শব্দ দুটিকে সংযুক্ত করায় ব্যক্তিটিকে নির্দেশ করার প্রয়োজন হয় না। হতবুদ্ধি মানে যেমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অর্থাৎ কী করতে হবে বুঝে উঠতে পারেন না যিনি, তেমনি অপরিপক্ববুদ্ধি মানে যার বুদ্ধি অপরিপক্ব অর্থাৎ অর্বাচীন (এই অযাচিত জ্ঞানদানের জন্য দুঃখিত)। তো মানুষই যে কেবল অর্বাচীন হয় তা নয়, জীবজন্তুও হতে পারে। ছাগল যেমন। আবার মানুষের মধ্যে যারা সাধ্যের অতীত কিছু করতে চায়, তারাও অর্বাচীন। পাকিস্তান আমলে আমার এলাকার পার্শ্ববর্তী আরামবাগের এক যুবক উর্দু সালতানাত ছবিটি দেখার পর নায়িকা নিলোকে বিয়ে করার জন্য উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। সে পশ্চিম পাকিস্তানে ছুটে যেতে পারে ভয়ে তার অভিভাবকরা শেষ পর্যন্ত তাকে শেকলে বেঁধে রেখেছিল। অর্বাচীন আর কাকে বলে! সম্ভাবনা নষ্ট করেন যিনি, তিনিও এক ধরনের অর্বাচীন। কখনও আবার জন্মসূত্রে প্রখর বুদ্ধি থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাবে অথবা কোনো বিষয়ে মোহগ্রস্ত হলে অর্বাচীন হয়ে পড়েন অনেকে। আমি একবার ফার্মাসিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট এক ধীমানকে নিষেধ করেছিলাম তার পছন্দের মেয়েটিকে বিয়ে করতে। শোনেনি। মেয়েটির প্রতি এতটাই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল সে যে, আমার চামড়ায় পৃথিবীর আলো-বাতাস তার চেয়ে যে বেশি লেগেছে, তা চিন্তা করারও ফুরসত পায়নি। যা হওয়ার তা-ই হয়েছে, আট মাসের মাথায় সেপারেশন। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরের অর্বাচীন নিয়ে আরেকটু বলি। কখনও কখনও পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত দুই অর্বাচীন বুদ্ধিমান সাজার চেষ্টা করেন। আস্তিক-নাস্তিকের ঝগড়া-বিবাদ শুনলেই তা বোঝা যায়। বিষয়টা বিশ্বাসের অথচ যুক্তি দেখানোর চেষ্টা চলে। এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, জ্ঞানী যেখানে পা রাখতে ভয় পায়, অর্বাচীন সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্বাচীন রাজনীতিক এই পদদ্বৈতটি ব্যবহার করি না আমি। এখানে কোনো রাজনীতিককে অর্বাচীন বললে মনে হতে পারে, রাজনীতিক ও অর্বাচীনতা বুঝি দুটি আলাদা বিষয়। অথবা রাজনীতিকের সর্বাচীনতা বলতেও আছে কিছু। সম্ভাবনা নষ্টকারীকে অর্বাচীন বলা চলে বলে এ দেশের ক্ষমতায় চড়েছেন এমন সব রাজনীতিকই কমবেশি অর্বাচীন (ক্ষমতায় বসেননি যিনি বা যারা, তারা বেঁচে গেলেন! যার রান্না খাইনি, সে বড় রাঁধুনি)। এমনকি বঙ্গবন্ধুও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা এক বড় ইতিবাচক শক্তির সম্ভাবনা নষ্ট করেছেন। রাজনীতিক সম্প্রদায়ের কারও কারও সদিচ্ছা থাকলেও বুদ্ধিটা কম বলে অর্বাচীন অভিধা থেকে তাদের রেহাই নেই। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সৎ উদ্দেশ্য থাকার পরও বামপন্থী দলগুলো অর্বাচীনের মতো আচরণ করেছিল। অবশ্য বর্তমানে ৫-৬টি বড় রাজনৈতিক দলের অতিরিক্ত যে শখানেক নিউক্লিয়াস ধরনের ক্ষুদ্রাকৃতির দল আছে, সেগুলোর নেতৃত্বকে অর্বাচীন বলা যাবে না। তারা আসলে বুদ্ধিমানের বুদ্ধিমান। একটা লেটার হেড ও একটা রাবার স্ট্যাম্প দিয়ে যোগ্যতার অধিক কিছু অর্জন করে চলেছেন তারা। দেশের সম্ভাবনা বিনষ্টকারী রাজনীতিকদের যে অর্বাচীন বলছি, সেখানেও একটু ফাঁক আছে। ভোগ-বিলাস চরিতার্থ করতে পারছেন বলে এক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের অর্বাচীন বলা যাবে না, যদিও চূড়ান্ত অর্থে তারা অর্বাচীনই। একজন মানুষের জীবনে জনপ্রিয়তাই শেষ আকাক্সক্ষা হওয়া উচিত। ভোগ-বিলাসে রসনা-বাসনা তৃপ্ত হয়, জনপ্রিয় হওয়া যায় না। দেশ ও মানবজাতির কল্যাণ করলে সমষ্টির কল্যাণটাই হয় না শুধু, নিজেও জনপ্রিয় হওয়া যায়। একইসঙ্গে এই দুই লাভ চায় না যে, সে অর্বাচীন নয় তো কী? ছাতির চেয়ে বুক-পকেট বড় হয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গে ফিরে আসি।
দুই.
কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে হলে কী দরকার হয়? সংবিধান নিয়ে অনানুষ্ঠানিক যত লেখাপড়াই করুন না কেউ, হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্টে প্র্যাকটিস না করলে তাকে সংবিধান-বিশেষজ্ঞ ধরা হয় না। যাকগে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ কী অবৈধ, সেটা সংবিধান-বিশেষজ্ঞরাই করুন, নির্বাচন যে গ্রহণযোগ্য হয়নি, তা আমরা চর্মচক্ষুতেই দেখেছি, এজন্য বিদেশী পর্যবেক্ষকের সনদের দরকার নেই। আমরা একটা ফ্রেশ নির্বাচনও চাই, তবে সেই চাওয়া একজন অর্বাচীনের নয়, বুদ্ধিমানের। ফ্রেশ নির্বাচনের দাবিটা ন্যায়সঙ্গতও; কিন্তু বিএনপি নেতৃত্ব কি কখনও ভেবে দেখেছেন, এই দাবির পক্ষে তাদের ডাকে রাস্তায় নামছে না কেন লোক? তারা হয়তো বলবেন, পুলিশ ঠ্যাঙ্গালে নামবে কীভাবে? এটা মুখ রক্ষার যুক্তি। দাবিটা প্রাণের হলে সেই প্রাণই বলবে- তুমি রাস্তায় নামো, ঝরলে আমিই ঝরবো। শুনুন তাহলে। দেশের অধিকাংশ মানুষই মনে করেন, ফ্রেশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আপনারাই জিতবেন। কিন্তু? সাধারণ মানুষের এই কিন্তুটা একটু সাজিয়ে বলি। ২০০১
সালের বিজয়ের পর আপনারা যে ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, এবার জিতলে সেই ব্যাধি মহামারীর
আকার ধারণ করবে। ব্যাধিই মহামারী হয়, স্বাস্থ্য নয়, অর্থাৎ আপনাদের দু-একজনের স্বাস্থ্য ছড়াবে না, ব্যাধিটা ছড়াবে। কেউ কেউ এমনও মনে করেন, অবস্থাটা এবার গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে চলে যাবে। কারণ, ক্ষমতাসীন হিসেবে রাষ্ট্রযন্ত্রের সুবিধা ভোগ করবেন বলে শক্তির ভারসাম্যে আপনারা এগিয়ে থাকবেন ঠিকই, আওয়ামী লীগও গ্রাসরুটের দল হিসেবে কম যাবে না। এই গৃহযুদ্ধ অথবা গৃহযুদ্ধাবস্থার ক্যাজুয়ালটি কে হতে চায় বলুন। মির্জা ফখরুলকে প্রশ্ন করি, বিদেশীদের যারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মানতে পারেননি, তারা অর্বাচীন নয় বুঝলাম; কিন্তু কে সেই অর্বাচীন হিন্দু, যে আবারও তার বোন অথবা স্ত্রী ধর্ষিত হবে এই আশংকা মাথায় নিয়ে পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে হাজির হবেন নয়াপল্টনে? হিন্দু কেন, মুসলমানের কথাই বলি। তিনি মুসলমান এবং যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী- কেন নামবেন রাস্তায়? অথবা নিজে রাজনীতি করেন না; কিন্তু শ্বশুর আওয়ামী লীগ নেতা, প্রিয় শ্যালক ছাত্রলীগের নেতা, তিনি? কিংবা আওয়ামী সরকারের ব্যর্থতায় বিমুখ হয়ে বিএনপিকে ভোট দিলেও প্রতি ১৫ আগস্টে ৩২ নম্বরে যান বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে,
তিনিই বা কেন শরিক হবেন ওই বাড়িটি ভাঙার আন্দোলনে? হ্যাঁ, তিনি মনে করছেন, শেখ হাসিনা যেহেতু খালেদা
জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি ভেঙে ফেলেছেন, তাই ক্ষমতায় এলে আপনারা ৩২ নম্বরের বাড়িটি ভেঙে ফেলতে পারেন। সমাজে রাজনীতির যত ধরনের স্টেকহোল্ডার আছে, সেগুলোর খোঁজ রাখতে হবে মির্জা ফখরুলদের এবং হিসাব মেলানোর জন্য কী করা দরকার, এ নিবন্ধের শেষে তা খুঁজে পাওয়া যাবে।
ঘটনাচক্রে আমার বন্ধুদের মধ্যে বিএনপিমনার সংখ্যাই বেশি। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে বলে তারা মহাচিন্তিত। পারলে আগামীকালই নির্বাচন করতে হবে (আসলে খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় বসাতে হবে)। দেশে গণতন্ত্র নেই, এ কী যা তা কথা! এদের যদি বলি, গণতন্ত্র যে নেই সেটা তো আমিও দেখতে পাচ্ছি, চলুন গণতন্ত্র যাতে চিরস্থায়ী হতে পারে সেজন্য ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেমগুলো নিয়ে আন্দোলন করি- প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমাই, যে ক্ষমতাবলে তিনি একক সিদ্ধান্তে যা খুশি তাই করতে পারছেন- তারা রাজি হন না। তাদের সাফ কথা- নির্বাচনটা আগে হতে হবে। বোঝাই যায়, তারা সিস্টেমগুলো নিয়ে যে বিচলিত নন, তার কারণ এগুলো অবিকল না থাকলে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগকে ঠ্যাঙ্গানো যাবে না। এই বন্ধুরা মুখে যাই বলুন, তারা সম্ভবত খুশি এই ভেবে যে, শেখ হাসিনা বিচারপতিদের অভিশংসনের একটা ব্যবস্থা করে রেখেছেন। মিউজিক্যাল চেয়ার খেলায় ক্ষমতার সঙ্গে আইনের বালিশটাও তো একসময় না একসময় আমাদের হাতে এসে ঠেকবেই। তখন সংক্ষুব্ধদের রিট নাকচ করবেন না যে বিচারপতি, তার দেখভাল পার্লামেন্টই করবে। আর পুলিশ? রেশনের একটা ইউনিট বাড়িয়ে অথবা একটা ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে তাদের দিয়ে কী না করানো যায়। প্রসঙ্গত বলি, বর্তমান সরকার নতুন পে-স্কেল দিলে এই পুলিশ হয়তো আর ডিএমপি কমিশনারের ব্রিফ শোনার অপেক্ষায় থাকবে না, নিজেরাই ব্রিফ তৈরি করে উষ্টা (আছাড়) খেতে খেতে দৌড়াবে বিএনপির জনসভার দিকে।
আমরা এ দেশেই বেড়ে উঠেছি, এদেশেই বাস করি। আমাদের কেউ উল্টাপাল্টা বোঝাতে পারবেন না, হাসিনা-খালেদাও না। আমরা কী দেখছি? অশিক্ষিত তিনটি শ্রেণী- গ্রামীণ কৃষক, শহুরে বস্ত্র-বালিকা আর দেশের বাইরের ওয়েজ আর্নার- এরা প্রতিনিয়তই সম্ভাবনা তৈরি করছেন আর শিক্ষিত রাজনীতিক শ্রেণী কাঁচি হাতে সম্ভাবনার চুল ছেঁটে চলেছেন, বাকি শুধু ক্ষুর হাতে নেয়ার। সম্ভাবনার মাথা ন্যাড়া করবেনই- এই তাদের ব্রত। এখন আমরা আর বিশ্বাস করি না, নতুন নির্বাচন হলেই নতুন জীবন শুরু হয়, নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। পৃথিবীর কোন্ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোন্ বইতে লিখেছেন, প্রতিশোধ ছাড়া গণতন্ত্র হয় না? মির্জা ফখরুলকে তাই বলি, প্রধানমন্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে নিজেদের অর্বাচীন অপবাদ থেকে মুক্ত রাখুন। দুই নম্বর কথা, অন্তত তিনটি বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করলে তা যে রক্ষা করবেন, জাতির সামনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তা উপস্থাপন করুন।
এক. বঙ্গবন্ধুর ছবি অফিস-আদালত থেকে নামাবেন না। তার সমালোচনা যদি করতেই হয়, ভারতীয়রা যেভাবে গান্ধীর সমালোচনা করে থাকেন, সেভাবে সম্মানের সঙ্গেই করবেন। দুই. যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবেন। তিন. প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হবেন না। ক্ষমতাসীনরা যদি বুঝতে পারেন, বিরোধী দলে গেলে তারা মর্যাদার আসনেই থাকবেন, তাহলে স্বচ্ছ নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয় দুটো সহজ হয়ে যায়। উন্নত দেশ কেন, পার্শ্ববর্তী ভারতের দিকে তাকালেই বুঝবেন এটা। প্রধানমন্ত্রীকে জানান এ প্রতিজ্ঞার কথা, তাহলে তনি রিথিংক করার সুযোগ পাবেন। তিনি তো মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ভাবছেনই না। না ভাবলে ভাবান্তর হবে কীভাবে? তাকে ভাবার সুযোগ দিন আর তার যদি ভাবান্তর না হয়; কথা দিলাম, আমরা মাঠে নামবো।
পুনশ্চঃ-১. অর্বাচীন নিয়ে অনেক কথাই হয়েছে, আরেকটু বলি প্লিজ! কখনও কখনও অতি বুদ্ধিমান অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধির কাউকে অর্বাচীন বানিয়ে ফেলতে পারেন। একটা উদাহরণ দিই। জুলোজিস্টের চোখ দিয়ে মোরগ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, এটি শুধু নির্বিচার যৌনাচারীই নয়, চালাক-চতুর প্রাণীও বটে। সে কী করবে, সবখানেই তো মানুষের পদচারণা, জবাই হওয়ার আশংকা মাথায় নিয়েই সন্ধ্যার পর খোপে ফেরে তাই।
তো গৃহকর্ত্রী দেখছেন, দিনের বেলায় হঠাৎ করে মেহমান এলে মোরগ আর ধরা যায় না। তিনি তাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন, হাতের তালুতে ধান রেখে কাছে টানার প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ পেয়ে মোরগের মাথা কন্ডিশন্ড হয়ে পড়লো। যেদিন সে টেবিল-চিকেন হবে, সেদিনও অর্বাচীনের মতো ধরা দিল গৃহকর্ত্রীর হাতে।
জুলোজিস্ট মোরগকে অর্বাচীন প্রমাণ করলেন, তিনি নিজে কীভাবে অর্বাচীনে পরিণত হচ্ছেন, দেখুন। এক জুলোজিস্ট ফড়িং নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি ফড়িংয়ের একটি পাখা ছিঁড়ে ওড়ো দেখি বলে সেটিকে ছেড়ে দিলেন। ফড়িং কোনো রকমে উড়লো। এবার তিনি দুটি পাখাই ছিঁড়ে বললেন, এবার ওড়ো দেখি। ফড়িংটি ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। জুলোজিস্ট সিদ্ধান্ত টানলেন- ফড়িংয়ের দুটি পাখাই ছিঁড়ে ফেললে সে কানে শোনে না।
পুনশ্চঃ-২. এই লেখায় ছাগলের উদাহরণ টেনেছি। লাইনটি লেখার সময় একটি বিশেষ ছাগলের কথা মনে পড়েছিল। অরিজিনাল ছাগলটি দেখার ভাগ্য হয়নি, লন্ডনে রেপ্লিকা (প্রতিমূর্তি) দেখেছিলাম। কাঠ খোদাই করে পিকাসো নির্মাণ করেছেন একটি ছাগলের তাৎপর্যপূর্ণ ভাস্কর্য। ছাগলটি কুৎসিত। গর্ভবতী বলে তার পেট বেঢপ, লোমগুলো ময়লাযুক্ত, খসখসে; মাথার দিকটা উটের গ্রীবার মতো শরীরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে মানুষের স্বার্থ যেখানে, সেই দুধের বাঁট সুন্দর, চকচকে। ছাগলটির বয়স যা, তাতে এতোদিনে মাটন চপ হয়ে ডাইনিং টেবিলে থাকার কথা, তার পূর্বসূরিরা গত হয়েছে যেভাবে। এ ছাগলটি বেঁচে আছে তার প্রজনন ক্ষমতার জোরে। পেটে বাচ্চা, স্বার্থটা এখানে দুধের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশটাকেও পিকাসোর এই ছাগলটির সঙ্গে তুলনা করা যায়। পুরো দেশটিকে কদর্য করে রেখেছি আমরা, শুধু স্বার্থ যেখানে, সেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়, বিদেশী ডোনারদের প্রবেশদ্বার এয়ারপোর্ট ও তাদের থাকার হোটেল, বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির অফিস, অভিজাততন্ত্রের আবাসভূমি ইত্যাদি ঝকঝকে-তকতকে করেই রাখিনি শুধু, সেগুলোর সুরক্ষাও দিয়েছি। রাষ্ট্রটিকে হয়তো এতোদিনে ধ্বংসই করে ফেলতাম। হ্যাঁ, এই রাষ্ট্রও বেঁচে আছে প্রজনন ক্ষমতার জোরেই। কৃষক ছাগলের বাচ্চা বিয়ানোর মতো প্রতি বছর ফসল ফলায়, শ্রমিক প্রতিদিন উৎপাদন করে, প্রবাসীরা প্রতিদিন টাকা পাঠায়- রাষ্ট্রের এই প্রজনন ক্ষমতা আছে বলেই তো লুট করে সুখে আছি।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

অনলাইনে মন্তব্যের দিন শেষ?

পাঠকেরা অনলাইনে খবর পড়ার পাশাপাশি সেই খবরে তাঁদের নিজস্ব মন্তব্য লিখতে চান। মন্তব্য লেখার এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়ও বটে । কিন্তু এখন বড় ওয়েবসাইটগুলো তাদের মন্তব্য বিভাগটি ছেঁটে ফেলছে। সম্প্রতি প্রভাবশালী রিকোড ব্লগ তাদের ওয়েবসাইটে পাঠকদের মন্তব্য প্রকাশ না করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রযুক্তি ব্লগ হিসেবে বেশ প্রভাবশালী রিকোড। গত বৃহস্পতিবার তাদের কমেন্ট ফোরাম বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে রিকোড কর্তৃপক্ষ। ওয়েবসাইটে মন্তব্যের পরিবর্তে পাঠকদের আলোচনার জন্য তাদের সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে যেতে বলেছে।
রিকোডের সহনির্বাহী সম্পাদক কারা সুইসহার বলেছেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি। যেহেতু আমরা পাঠকদের মতামতকে গুরুত্ব দিই তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বেশ কঠিনই ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের এই পথেই হাঁটতে হলো। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে, আমাদের লেখা প্রতিবেদনের বিষয় নিয়ে সেখানেই বেশি আলোচনা হচ্ছে। এতে আমাদের সাইটে যেসব মন্তব্য আসছে তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা দরকারি মন্তব্য হচ্ছে না।’
রিকোড ছাড়াও সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট তাদের মন্তব্য বিভাগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে কিংবা খুব কম মন্তব্য প্রকাশ করছে। এর মধ্যে রয়েছে রয়টার্স, পপুলার সায়েন্স, শিকাগো-সান। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্তব্য বন্ধ করার কারণ হচ্ছে ট্রল। এখন কমেন্ট ফোরাম ইন্টারনেট ট্রল বা ইন্টারনেট দানবদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। যারা গণ্ডগোল পাকানোর বা বিতর্ক সৃষ্টির জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো খবরে কিংবা বার্তাবোর্ডে উসকানিমূলক বার্তা পোস্ট করেন তাদের ট্রল বলা হয়। বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটে তাদের মন্তব্য বন্ধ করে দেওয়ার কারণ হিসেবে ইন্টারনেট ট্রলদের শিষ্টাচারের অভাবকেই মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ খবরে বাজে মন্তব্য বেশি আসার কারণেই বড় ওয়েবসাইটগুলো মন্তব্য বিভাগ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পপুলার সায়েন্স গত সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিল, ১৪১ বছর পুরোনো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিনের সংবাদ শাখা হিসেবে তারা প্রাণবন্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্ক তৈরির মাধ্যমে বিজ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রল এবং স্প্যামবটদের অত্যাচারে তাদের সেই উদ্যোগ বন্ধ করতে হয়েছে। রিকোডের মতোই রয়টার্সও তাদের মন্তব্য বিভাগ বন্ধ করার জন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের জনপ্রিয়তাকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে।
৭ নভেম্বর এক পোস্টে রয়টার্স জানিয়েছে, প্রকাশিত খবর নিয়ে অধিক যুক্তি ও নানা মতের আলোচনা-সমালোচনা কিংবা প্রশংসার বিষয়গুলো তারা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও অনলাইন ফোরামকেন্দ্রিক করে ফেলেছে। এ ছাড়া মন্তব্য পুরোপুরি মুছে দেওয়ার পরিবর্তে তা সম্পাদনার ক্ষেত্রে তারা আরও বেশি কঠোর হয়েছে।
এদিকে গাউকার মিডিয়ার জনপ্রিয় বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট যেমন—গাউকার, জেজেবেল, লাইফহ্যাকার, ডেডস্পিন এবং গিজমোডোতে মন্তব্য সম্পাদনা শুরু করা হয়েছে। বিরক্তিকর ও উসকানিমূলক মন্তব্যের কারণেই এসব সাইটে মন্তব্য সম্পাদনার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়েছে।
বার্তা সংস্থা সিএনএনও মন্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ভিন্ন পথে হেঁটেছে। এ বছরের আগস্ট মাস থেকে অধিকাংশ খবরে মন্তব্য করার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু খবরে মন্তব্য করার জন্য সুযোগ দেয় সিএনএন, যাতে বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্ক তৈরি করা যায়। এই বিতর্কে লেখক, সম্পাদকও অংশ নেন। এ ক্ষেত্রেও মন্তব্য সম্পাদনা করা হয়। সিএনএন জানিয়েছে, ইন্টারনেট ট্রলদের আটকানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করা হলেও তারা ঠিকই কোনো ফাঁক গলে বেরিয়ে পড়েন।

ফেসবুকের সংবাদপত্র নিয়ে আশঙ্কায় বিশ্বমিডিয়া

জল্পনাটা উস্কে দিয়েছিলেন খোদ ফেসবুকের স্রষ্টা মার্ক জুকারবার্গ। নভেম্বরের গোড়াতেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, বিশ্ববাসীর জন্য সবথেকে ‘পার্সোনালাইজড নিউজপেপার’ নিয়ে আসবেন। এক বিলিয়নেরও বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীর কাছে দৈনিক পৌঁছে যাবে এই ই-পেপার। একটি সাধারণ সংবাদপত্র যেমন সব পাঠককেই একই সংবাদ পরিবেশন করে, জুকারবার্গ সেই ধারণাই বদলে দিতে চান। তার স্বপ্ন, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের উপর নির্ভর করে বানানো হবে এক একটি ‘নিউজপেপার’। যেখানে এক ছাদের নিচে বিশ্বের সব খবর তো মিলবেই, পাশাপাশি থাকবে প্রত্যেক ফেসবুক ইউজারের পছন্দের বিষয় নিয়ে খবরও। থাকবে নিউজ ফিড, বন্ধুদের স্টেটাস ও ছবিও। ইউএসএ টুডে-র সাবেক সম্পাদক কেন পলসন বলছেন, খবরের জগতে বিপ্লব হতে চলেছে। এটা ভাল না খারাপ বলতে পারব না। গতানুগতিক সংবাদপত্র কখনই পাঠকদের এই পরিষেবা দিতে পারবে না। যদিও সকলেই কেনের মত আশাবাদী হতে পারছেন না। অনেকেরই অভিযোগ, ফেসবুকের মত মার্কেটিং জায়েন্ট মিডিয়া ব্যবসাতেও নেমে পড়লে সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখা তাদের পক্ষে মুশকিল হবে। ফেসবুকের এই সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় অবশ্য কোনো সাংবাদিকরা নির্ণয় করবেন না। গাণিতিক নিয়মে কার কাছে কোন খবর যাবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক হবে।

৫ দিন ৮ ফুট গভীর ড্রেনে থেকেও জীবিত

কথায় আছে রাখে আল্লাহ মারে কে? জন্মের পর নবজাতক শিশুটিকে নর্দমার ড্রেনে ফেলে দিয়ে ছিলেন তার মা। এরপর ৮ ফুট গভীর ড্রেনে কেটে যায় পাঁচ দিন। কিন্তু অলৌকিকভাবে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন পথচারীরা। হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ৫ দিনের বেশি সময় ধরে ড্রেনে পড়ে থাকা শিশুটিকে গত রোববার উদ্ধার করা হয়েছে। শিশুটি মারাত্মক অসুস্থ হলেও তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। শিশুটিকে ড্রেনের ৮ ফুট নিচের গর্ত  থেকে উদ্ধার করা হয়। রাস্তার পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় দুই আরোহী শিশুটির কান্নার শব্দ শুনে তার অবস্থান নিশ্চিত করেন। পুলিশের ধারণা, শিশুটি গত সোমবার জন্মগ্রহণ করেছে। জন্মের পর তাকে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে সরু ড্রেনে ফেলে  দেয়া হয়। হাসপাতালের নথিপত্র ঘেঁটে পুলিশ শিশুটির মাকে শনাক্ত করে আটক করে। শিশুটি বর্তমানে সিডনির ওয়েস্টমেড চিলড্রেনস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আদালতে সোমবার শিশুটির মা জানান, অবৈধ সম্পর্কের ফলে শিশুটি জন্মগ্রহণ করেছে। এ কারণে সদ্যজাত ছেলেশিশুটির মৃত্যু চেয়েছিলেন ওই নারী। তবে জন্মদাতার নাম উল্লেখ করেননি তিনি। আগামী শুক্রবার মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

‘অবাঞ্চিত নন লতিফ সিদ্দিকী’ -সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

হজ ও তাবলীগ জামাত নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগ থেকে বাদ পড়া লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেছেন, লতিফ সিদ্দিকীকে অবাঞ্ছিত নাগরিক ঘোষণা করা হয়নি। অভিযোগ মাথায় নিয়ে পাসপোর্ট, ভিসা থাকলে দেশে আসতেই পারেন। আইনের শাসন পাবার অধিকার সবারই আছে। আজ দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে  নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী নামের একটি সংগঠন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ইমাম (এইচ টি ইমাম) সাহেব লন্ডন গেছেন, লতিফ সাহেব দেশে আসছেন। কেউ আসে, কেউ যায়। তিনি বলেন, সরকারের বিচার সরকার করেছে। দলের বিচার দল করেছে। এখন আদালত কি করে, সেটা দেখতে হবে। নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী সরকার এ ব্যাপারে কিছু করবে না। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোন ডিকটেশন (নির্দেশ) দেয়া যাবে না। সুরঞ্জিত বলেন, ‘আমাদের একজন অভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী আছেন। তাঁর ধৈর্য ও ত্যাগ নিয়ে আমাদের কোন প্রশ্ন নেই। লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে তাই এখনই অধীর ও অধৈর্য হওয়ার কিছু নাই। আইন আইনের গতিতে চলবে। এর কোন ব্যত্যয় ঘটবে না।’ তিনি বলেন, কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করবেন না। এটা করে লাভ হবে না। আইন থেকে কেউ রেহাই পাবে না।

লতিফ সিদ্দিকী আসলে কোথায়?

লতিফ সিদ্দিকীর অবস্থান নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন এসেছে লতিফ সিদ্দিকী আসলে কোথায়। তার আইনজীবী নুরুল ইসলাম সুজন সকালে বলেছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী জামিন নিতে হাইকোর্টে এসেছেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। গণমাধ্যম নিজ দায়িত্বেই সংবাদ প্রকাশ করেছে। সকাল থেকেই গুঞ্জন ছিল লতিফ সিদ্দিকী হাইকোর্টে জামিন নিতে আসছেন। গতকাল রাতে আচমকা দেশে আসার পর তাকে গ্রেফতার না করায় লতিফ সিদ্দিকী আগাম জামিন চাইতে পারেন বা আত্মসমর্পণ করতে পারেন এমন আলোচনা ছিল। তবে আদালতে আসা নিয়ে আইনজীবীর দুরকম বক্তব্যে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা লতিফ সিদ্দিকীর অবস্থান নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।

লতিফ সিদ্দিকীকে দ্রুত গ্রেফতারের তাগিদ আদালতের
ধর্মীয় অনরুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় লতিফ সিদ্দিকীকে আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের নির্দেশ চেয়ে আবেদন করেছেন একটি মামলার বাদী। আজ সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুর রহমানের আদালতে মামলার বাদী আইনজীবী আবেদ রেজা এ আবেদন করেন। একই আদালতে তিনি লতিফ সিদ্দিকীকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কাছে পেয়েও গ্রেফতার না করায়  দায়িত্বে অবহেলার জন্য তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশের আইজিকে নির্দেশ দেয়ারও আবেদন জানান। আবেদনের শুনানি শেষে সিদ্দিকীকে দ্রুত গ্রেফতারের তাগিদ দেন আদালত। আর দ্বিতীয় আবেদনটি নথিভুক্ত করেন।

রাক্ষসী মা!

মায়ের কোল শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ মনে করা হয়। পৃথিবীর সূচনা থেকে মা সকল মমতার আধার ও কেন্দ্রবিন্দু। অথচ সেই মা যদি নিজ সন্তানকে হত্যার চেষ্টা চালায় তাহলে তাকে রাক্ষসী মা ছাড়া আর কিইবা বলা যেতে পারে। এর চেয়ে চরম মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুরতম কাজ পৃথিবীতে আর কী হতে পারে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় এ ধরণের একটি ঘটনা ঘটেছে। নিজ সন্তানকে ড্রেনে ফেলে দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় মা। পুত্র শিশুটি টানা পাঁচ দিন প্রায় আট দশমিক দুই ফুট গভীর ময়লার ড্রেনে পড়ে ছিল। শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করার পর এমনই ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। এ ঘটনায় সোমবার ওই মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। সিডনির পশ্চিমাঞ্চলে ওই ময়লার ড্রেনের পাশ দিয়ে সাইকেল চালানোর একটি রাস্তা ছিল। রোববার সকালে ওই রাস্তা দিয়ে সাইকেল-আরোহীরা যাওয়ার সময় শিশুটির কান্নার শব্দ শুনতে পান। পরে কয়েকজন মিলে ড্রেনের ভারী ঢাকনা তুলে শিশুটিকে দেখেন। এ সময় শিশুটি হাসপাতালের কম্বলে পেঁচানো ছিল। শিশুটি কিভাবে এত দিন বেঁচে ছিল এ ব্যাপারে অবশ্য বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। পুলিশ জানায়, শিশুটিকে উদ্ধারের পর অনেক খোঁজাখুঁজি করে তার মাকে বের করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নবজাতককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিশুটি মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ময়লার ড্রেনে পড়ে ছিল। রোববার শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। এরপর নবজাতককে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে এক মহিলার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। পুলিশ ধারণা করছে, সোমবার শিশুটির জন্ম হয়েছে এবং ১৮ নভেম্বর মঙ্গলবার তাকে ড্রেনে ফেলে দেয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির অবস্থা গুরুতর তবে স্থিতিশীল রয়েছে। আদালতের নথি থেকে জানা যায়, ওই নারী তার নবজাতককে ড্রেনে ফেলার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন, শিশুটি মারা যেতে পারে।
সূত্র : এএফপি।

ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিল তিউনিসীয়রা

তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন এক তরুণী। ২০১১
সালে আরব বসন্তে বেন আলীর পতনের পর গতকাল দেশটির
মানুষ প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেন।
‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের সূচনা হওয়া তিউনিসিয়ায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল রোববার। তিউনিসিয়ার গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য এই নির্বাচনকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মেহেদি জোমা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছেন। খবর এএফপি ও বিবিসির। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়ায় এটাই প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এতে মোট ২৭ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী অশীতিপর বেজি কাইদ এসেবসি (৮৭) জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে আছেন। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ দল নিদা তিউনিস গত মাসের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। এসেবসির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মুনসেফ মারজুকি। গতকালের নির্বাচনে প্রায় ৫৩ লাখ ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার কথা।
কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে আগামী ৩১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে। কট্টর ইসলামপন্থীরা সহিংসতা ঘটাতে পারে, এই আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্রগুলোর আশপাশে ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গতকাল রাজধানী তিউনিসের উপকণ্ঠে একটি কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বেজি কাইদ এসেবসি। এ সময় তিনি ‘তিউনিসিয়া দীর্ঘজীবী হোক’ বলে স্লোগান দেন। ২০১১ সালে তিউনিসিয়ার একনায়ক জাইন আল আবেদিন বেন আলীর বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। দেশটির গণতন্ত্রকামী মানুষের টানা আন্দোলনের ফলে ওই বছরই পদত্যাগে বাধ্য হন ১৯৮৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা বেন আলী। সেই থেকে দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট চলছে। তিউনিসিয়ার আন্দোলনের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে অনেক আরব দেশের মানুষই সংস্কারের দাবিতে পথে নামে। দেশে দেশে শুরু হয় আরব বসন্ত নামে পরিচিতি পাওয়া আন্দোলন।

সর্বদলীয় সভা বর্জন ক্ষুব্ধ মমতার

সারদা কেলেঙ্কারিতে একের পর এক দলীয় নেতা গ্রেপ্তার হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর মহা খেপেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ কারণে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস গতকাল অনুষ্ঠিত পার্লামেন্টের সর্বদলীয় সভায় যোগ দেয়নি। খবর এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার। পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ সোমবার। এর আগে সর্বদলীয় সভা ডাকা হয়। গতকাল তৃণমূলের মুখপাত্র ও রাজ্যসভার সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়ান টুইটারে বলেন, ‘সর্বদলীয় সভায় তৃণমূল যাচ্ছে না। আমরা বিজেপির আজ্ঞাবহ নই।’ সারদা কেলেঙ্কারিতে জড়িত অভিযোগে প্রথমে দলীয় সাংসদ কুণাল ঘোষ ও পরে গত শুক্রবার রাজ্যসভা সদস্য সৃঞ্জয় বোস গ্রেপ্তার হন। গত শনিবার ওই গ্রেপ্তারের পর কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে এক সভায় মমতা বলেন, ‘পারলে আমাকে জেলে পাঠাক।
দেখি কত বড় জেল আছে ওদের। আমাদের আঘাত করলে পাল্টা আঘাত করব।’ মমতা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত জওহরলাল নেহরুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়াতেই বিজেপি তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। এসব গ্রেপ্তার তারই প্রতিফল। তিনি বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ দলের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় ওরা প্রতিশোধ নিচ্ছে। আমিও চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি। আমার বিজেপির সার্টিফিকেট দরকার নেই।’ বিরোধী দল কংগ্রেস সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে নেহরুর জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে বাম এবং ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাসী দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ডাক পায়নি ক্ষমতাসীন বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনে মমতার তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে বিপুল বিজয় পেলেও স্বস্তিতে নেই তিনি। ওই নির্বাচনে দুটি আসন ছিনিয়ে নেয় বিজেপি। আবার পরে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে একটি আসন ছিনিয়ে নিয়ে দলটি রাজ্য বিধানসভায় খাতা খোলে। আগামী বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গে আসন বাড়ানোর জন্য বিজেপির তোড়জোড়ে কিছুটা শঙ্কিত মমতার তৃণমূল।

অভিবাসী শ্রমিকদের রক্ষায় উদ্যোগ নিন

অভিবাসী শ্রমিকদের অন্যায়-অবিচার থেকে সুরক্ষা দিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ৯০টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার সংগঠন। চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় পারস্য উপসাগর ও এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর শ্রমমন্ত্রীদের বৈঠক উপলক্ষে সংগঠনগুলো গতকাল রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানায়। খবর এএফপির। বিবৃতিতে বলা হয়, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলের লাখ লাখ শ্রমিক বেতন না পাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম অবিচারের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে আছে শারীরিক নির্যাতন, জোর করে কাজ করানো বা পাসপোর্ট আটকে রাখা। উপসাগরীয় এলাকার তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সংগঠন গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ও এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর শ্রমমন্ত্রীদের তৃতীয় দফার বৈঠক আবুধাবিতে ২৬-২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) মধ্যপ্রাচ্য নারী অধিকার গবেষক রত্না বেগম বলেন, ‘লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা গৃহকর্মে নিযুক্ত শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন বা নির্মাণশ্রমিকদের মধ্যে আঁতকে ওঠার মতো মৃত্যুর হার—ঘটনা যা-ই হোক না কেন,
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগের বিষয়ে জরুরি ও ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।’ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর অন্যতম হলো এইচআরডব্লিউ। এই তালিকায় আরও আছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন ও ইন্টারন্যাশনাল ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নাম। জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে দুই লাখ ৪০ হাজার গৃহকর্মীসহ দুই কোটি ৩০ লাখ বিদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। জিসিসির দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতার। বিদেশি শ্রমিকদের জন্য ‘কাফালা’ নামের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থার কারণে এই দেশগুলো ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে আসছে। জিসিসি এলাকাজুড়ে এ পদ্ধতি বিভিন্ন মাত্রায় কাজে লাগানো হয়। ৯০ সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এর কারণে বেশির ভাগ শ্রমিকই চুক্তি শেষ হওয়ার আগে নিয়োগকর্তার সম্মতি ছাড়া নতুন কোনো চাকরিতে ঢুকতে পারেন না। এ কারণে তাঁরা অনেক সময় নির্যাতনমূলক পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে থাকেন।

লতিফ সিদ্দিকী গ্রেফতার না হলে বৃহস্পতিবার হরতাল

সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আগামী বুধবারের মধ্যে গ্রেফতার করা না হলে বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে হেফাজতে ইসলাম। একই দাবিতে আগামীকাল মঙ্গলবার সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়।
আজ সোমবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় বাদ জোহর হেফাজতে ইসলামের এক বৈঠকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। হেফাজতের আমির আল্লামা আহমদ শফী বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক শেষে হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মইন উদ্দিন রুহি নয়া দিগন্তকে কর্মসূচির কথা নিশ্চিত করেন। বৈঠকে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও মহাসচিবসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে তুষার কমেছে এবার বন্যার আশংকা

যুক্তরাষ্ট্রে তুষারপাত কমে এসেছে। তবে এর ফলে বরফ গলা পানিতে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়া পূর্বাভাসকারীরা। বৃষ্টিপাত হলে বেশ কয়েকটি ভবন ধসে পড়তে পারে বলে নিউইয়র্ক স্টেটের কর্মকর্তারা আশংকা করছেন। ঝড়ে ওই এলাকায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্মরণকালের মধ্যে মারাত্মক এ তুষারপাতে ওই অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খবর এএফপির।
বাফেলো নগরীতে সাধারণত এক বছরে যে পরিমাণ তুষারপাত হয় তিন দিনের তুষার ঝড়ে আনুমানিক সেই পরিমাণ তুষার পড়েছে। নগরীর কোনো কোনো অংশে ২.৪ মিটার (৮ফুট) পুরু বরফ জমেছে। কোনো কোনো স্থানে চলতি সপ্তাহের চেয়ে আরও ০.৯ মিটার (৩ ফুট) বেশি বরফ জমা হয়েছে। ঝড় সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের অধিকাংশই প্রচণ্ড শীতে ও হৃদরোগে মারা গেছে। অনেকে তুষার ঝড়ের কবলে পড়ে মারা যায়। প্রবল তুষার ঝড়ে রাজ্যের বেশ কয়েকটি স্থানের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

হিটলারের জলরঙের চিত্রকর্ম বিক্রি

প্রায় একশ’ বছর আগে তরুণ অ্যাডলফ হিটলারের আঁকা একটি জল রঙের চিত্রকর্ম ১ কোটি ২৫ লাখ টাকায় (১ লাখ ৬১ হাজার ডলারে) বিক্রি হয়েছে। শনিবার জার্মানির নুরেমবার্গ শহরে নিলামে এটি বিক্রি হয়ে বলে জানিয়েছে নিলাম হাউস ওয়েডলার। তবে ক্রেতার নাম প্রকাশ করা হয়নি। ১৯১৪ সালে মিউনিখ সিটি হলের চিত্র এঁকেছিলেন হিটলার, যখন তার বয়স ছিল কুড়ির কোটায়। দু’জন বয়স্ক সহোদরা এটি নিলামে তোলেন। তাদের দাদা ১৯১৬ সালে এটি কিনেছিলেন। চিত্রকর্মটির আয়তন ১১ ইঞ্চি বাই ৮.৭ ইঞ্চি। তরুণ বয়সে হিটলার ভিয়েনা চারুকলা একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তার সে আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। তবে আঁকাআঁকি চালিয়ে যান তিনি। পর্যটকদের কাছে তিনি তার চিত্রকর্ম বিক্রি করতেন। বোদ্ধারা হিটলারের চিত্রকর্মকে মাঝারি মানের বলে মনে করেন। বড় বড় নিলাম হাউসগুলো তার চিত্রকর্ম নিলামে তুলতে আগ্রহ দেখায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই নুরেমবার্গেই নাৎসি নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়। যুদ্ধের শেষ দিকে হিটলার বার্লিনের একটি বাঙ্কারে আত্মহত্যা করেন। এএফপি

ইরান-ছয় জাতি চুক্তি অনিশ্চিত

দু’পক্ষের দরকষাকষিতে শেষ পর্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ইরান-ছয় জাতি পরমাণু চুক্তি। আজ সোমবার ডেডলাইন পার হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালানো হলেও আপাতত এই চুক্তি অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সময়সীমার আগে কোনো চুক্তি না হলে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে পরমাণু সংক্রান্ত আলোচনা এক বছর পর্যন্ত চালিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে ইরান। খবর এএফপি, বিবিসি, আলজাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমসের।
এদিকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ইরানের পরমাণু বিষয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্যে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর নেতারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২৪ নভেম্বর নির্দিষ্ট সময়সীমাকে সামনে রেখে রোববার বিশ্ব নেতারা অচলাবস্থা ভেঙে চূড়ান্ত সময়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও চূড়ান্ত সমঝোতায় উপনীত হতে পারছেন না। ভিয়েনায় আলোচনায় অংশ নেয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেন, আমরা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আশা করছি একটা অগ্রগতি হবে। তবে তিনি আশংকাও প্রকাশ করেন, আমাদের মধ্যে এখনও ব্যাপক মতপার্থক্য রয়ে গেছে। আমরা তা কমিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কেরি শুক্রবার তার প্যারিস যাওয়া স্থগিত করে আলোচনার জন্য ভিয়েনায় রয়ে যান। শনিবার তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত তিন দিনে এটি তাদের চতুর্থ বৈঠক। চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ইরান চাচ্ছে তার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের বিষয়ে ব্যাপক ছাড়। ইরানের দাবি অবরোধের বিষয়ে ব্যাপক ছাড় দেয়া হলেই কেবল তার বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি হ্রাস করবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি সূত্র বলছে, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও বেশ মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ফলে এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। এক ইউরোপীয় সূত্র বলছে, আলোচনায় তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই সামান্য। মস্কোর প্রধান আলোচক সের্গেই র‌্যাভকভ বলেছেন, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেই কেবল রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এতে যোগ দেবেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ শুক্রবার মস্কো থেকে বলেছেন, সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। অভাব কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার। জন কেরি টেলিফোনে লাভরভকে সর্বশেষ তথ্য সম্পর্কে অবহিত করছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া কেরি তুরস্ক, কানাডাসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও এ বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এদিকে অনেক বিশেষজ্ঞেরই ধারণা সময়সীমা সম্ভবত বাড়ানো হতে পারে। এর আগে ২০ জুলাই নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও তা পরে বাড়ানো হয়। কিন্তু কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি এখনও আলোচনায় আসেনি। সিনিয়র এক মার্কিন কর্মকর্তা বলছেন, সোমবার রাতের মধ্যে চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা এখনও রয়ে গেছে। সে লক্ষ্য নিয়েই আলোচনা চলছে। উল্লেখ্য, ইরানসহ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য এবং জার্মানি ২৪ নভেম্বরের মধ্যে অন্তর্বর্তী থেকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ফেব্র“য়ারি মাস থেকেই মূলত আলোচনা চালিয়ে আসছে। স্থায়ী চুক্তি হলে আশা করা হচ্ছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভয় অনেকটাই দূর হবে। পশ্চিমা দেশসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ভয় বেসামরিক কর্মসূচির আড়ালে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু তেহরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এদিকে ইরান বলছে, এই আলোচনা এক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। নতুন করে সময়সীমা বাড়ানো হবে জেনেভা চুক্তির আওতায়। এই চুক্তির আওতায় ইরান অবরোধ সামান্য শিথিলের বিনিময়ে পরমাণু কর্মসূচি হ্রাস করেছে।

বয়স বাড়াতে ছয় পাইলটের ৭০ লাখ টাকা ঘুষ

পরস্পরকে জড়িয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন দেশে সোনা চোরাচালানের সবচেয়ে বড় মামলায় গ্রেফতার হওয়া বিমানের তিন কর্মকর্তাসহ ৫ জন। রোববার সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর হাকিমের পৃথক ৫টি আদালতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, স্বীকারোক্তিতে পরোক্ষভাবে সোনা চোরাচালানে তারা নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে তারা এ কাজ করেছেন। বিমানের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার নামও তারা জবানবন্দিতে প্রকাশ করেছেন।
এর আগে সোনা চোরাচালানে দেশের সবচে বড় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) মিনহাজুল ইসলাম রোববার বিকালে রিমান্ড শেষে বিমানের তিন কর্মকর্তাসহ ৫ জনকে মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করেন। এর মধ্যে সোনা চোরাচালানের মূলহোতা মাহমুদুল হক পলাশকে হাজির করা হয় মহানগর হাকিম মারুফ হোসেনের আদালতে। বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেনকে হাজির করা হয় আসাদুজ্জামান নূরের আদালতে। শিডিউল ম্যানেজার তোজাম্মেল হোসেনকে মহানগর হাকিম অমিত কুমার দে, প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং বিভাগের প্রধান ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদকে এসএম আশিকুর রহমানের এবং মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদকে মহানগর হাকিম আনোয়ার সাদাতের আদালতে হাজির করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা মহানগর হাকিমের ৫ আদালতের খাস কামরায় গ্রেফতারকৃতরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন। এরপর রাত ৭টার দিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
এর আগে গোয়েন্দা পুলিশের অব্যাহত জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ভেঙে পড়েন সোনা চোরাচালানের মূলহোতা মাহমুদুল হক পলাশ। সোনা চোরাচালানের নানা তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে ফাঁস করার পর আদালতেও জবানবন্দি দিতে রাজি হন তিনি। বিমানের প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং বিভাগের প্রধান ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ ও শিডিউল ম্যানেজার তোজাম্মেল হোসেনও জবানবন্দি দিতে রাজি হন। তবে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছিল না বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেনকে।
এদিকে সোনা চোরাচালানের গডফাদার পলাশ ও তার স্ত্রী নুরজাহান সিন্ডিকেটের সদস্য বিমানের ৫ পাইলট ২ ফাস্ট অফিসার ও সিকিউরিটি বিভাগের একজন জেনারেল ম্যানেজারের নাম পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) নেতা। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এরা হলেন- ক্যাপ্টেন ফজল, ক্যাপ্টেন মুনির, ক্যাপ্টেন ছিদ্দিক, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ, ক্যাপ্টেন আমিনুল, ক্যাপ্টেন জামিল, ফাস্ট অফিসার মুসাউর, ফাস্ট অফিসার শামীম, সিকিউরিটি বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মমিনুল ও জেনারেল ম্যানেজার আতিক সোবহান। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট পাইলটদের বয়স বাড়ানোর জন্য বিমানের একজন বোর্ড মেম্বারকে ৭০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছিল। আর এই ঘুষের পুরো লেনদেনটি তদারকি করেছেন পলাশ। জানা গেছে, এই ৭০ লাখ টাকার মধ্যে বিমানের ফান্ডে জমা দেয়া হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। ওই বোর্ড মেম্বার কৌশলে বিমানকে এই টাকা আদায় করে দেন। বাকি টাকা বিমানের পরিচালনা পর্যদের ওই বোর্ড মেম্বারকে দেয়ার কথা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, পলাশ ও তার স্ত্রী কেবিন ক্রু নুরজাহানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাইলটদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পলাশ দেশের বাইরে গেলে এসব পাইলট তাকে বিমানের ককপিটে বসিয়ে ফ্লাইট চালাতেন। বয়স বাড়ানোর আগে প্রায় এক মাস ধরে বাপা অফিসে পলাশকে এদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে দেখা গেছে। এ ছাড়া উত্তরা এলাকায় সালাউদ্দিন নামে বিমানের এক ঠিকাদারের অফিসে পলাশকে এসব পাইলটকে নিয়ে আড্ডা দেয়ার অভিযোগ আছে।

সাপ নয় আলমারিতে ছিল লাশ

মা নূরজাহান বেগম এগিয়ে গেলে সুমন তাকে থামিয়ে বলেন, আলমারিতে হাত দিও না, ওখানে সাপ। নূরজাহান বেগম তখন আর হাত দেননি। পরে স্ত্রী নির্যাতনের মামলায় সুমনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তাকে ছাড়াতে মা থানায় যাওয়া-মাত্র সুমন জিজ্ঞেস করেন, আলমারিতে হাত দিয়েছ নাকি? ওখানে হাত দিও না। তাহলে সবার তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। সুমনের কথায় সন্দেহ হয় নূরজাহান বেগমের। পরে বাসায় ফিরে আলমারি খুলে দেখতে পান আলাউদ্দিনের লাশ।
ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর লালবাগ থানার নবাবগঞ্জ এলাকার ডুরিআঙ্গুল লেনে। রোববার সকাল ১০টার দিকে গলায় তার প্যাঁচানো লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আলাউদ্দিন শিকদার সম্পর্কে সুমনের খালাতো ভাই।
লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল মুত্তাকিন জানান, নিহত আলাউদ্দিন শিকদারের বাসা পাশের ছোটবাট মসজিদ এলাকায়। যে বাসায় লাশটি পাওয়া গেছে সেটি নিহতের খালার বাড়ি। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তার খালাতো ভাই জুবায়ের হোসেন সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সুমনের মা নূরজাহান বেগম এবং ভাই মো. রাজনকেও আটক করেছে পুলিশ। লালবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আজগর আলী বলেন, নিহতের গলায় তার প্যাঁচানো ছিল। লাশ লেপের কাভার দিয়ে স্টিলের আলমারিতে গুছিয়ে রাখা ছিল। অন্তত একদিন আগে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আলাউদ্দিন নিউমার্কেটে শাপলা ট্রেডার্স নামে একটি মাছের আড়তে কাজ করতেন। ওই আড়তের মালিক সম্পর্কে আলাউদ্দিনের ভগ্নিপতি। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আলাউদ্দিন ছিলেন দ্বিতীয়। নিহতের বাবা হোসেন শিকদার বলেন, শনিবার সুমন ফোনে টাকা ধার চাইলে আলাউদ্দিন তার বাসায় গিয়ে কথা বলবে বলে জানায়। দুপুরের পর সে সুমনের বাসায় যায়। এরপর থেকেই তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
লালবাগ পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) মফিজুদ্দিন আহমেদ বলেন, সুমন মাদকাসক্ত। স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে। তার স্ত্রীর বাবার বাড়ি পাশের মহল্লায়। ছয় মাস ধরে তার স্ত্রী সেখানেই থাকছেন। সুমনের সন্দেহ ছিল, তার স্ত্রীর সঙ্গে আলাউদ্দিনের সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে খুন করে থাকতে পারেন।
পুলিশ জানায়, শনিবার সুমন তার শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও স্ত্রীকে মারধর করে। এতে ওই বাসার লোকরা পুলিশ খবর দেয়। পরে পুলিশ গিয়ে সুমনকে আটক করে থানায় আনে।
নিহত আলাউদ্দিনের ভাই লিটন শিকদার দাবি করেন, সুমন নিজের স্ত্রীকে মিথ্যা সন্দেহ করে আলাউদ্দিনকে জড়িয়ে খারাপ কথা বলে হত্যা করেছে। তিনি জানান, শনিবার সকাল থেকেই আলাউদ্দিনকে খুঁজে না পাওয়ায় তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। শনিবার বিকালে ডুরিআঙ্গুল লেনে এক বৃদ্ধ মারা গেলে তার বন্ধুরাও সেখানে যান। তখন তিনি আলাউদ্দিনের বিষয়ে জানতে চান।
লিটন জানান, তিনি গ্রেফতার সুমনকে দেখতে যান লালবাগ থানায়। তখন তার ভাই রাজন ও মা নূরজাহানও ছিলেন। থানার ভেতরে সুমন তার মাকে বলে, আলমিরায় হাত দিয়েছ নাকি? তখন তার মা বলে, না এখনও দেইনি। সুমন হাত দিতে নিষেধ করে। পরে তার খালা বাসায় ফিরে আলমারিতে লাশ পেয়ে পুলিশে খবর দেন।

বরিশালে ছাত্রলীগ নেতাদের অনেকেই হঠাৎ বড় লোক

কি পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন বরিশালের ছাত্রলীগ নেতারা? এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের। তাদের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আর বিপুল বিত্তবৈভব দেখেই এমন প্রশ্ন। আর তার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। পদ-পদবির লড়াই আর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মুখোমুখি নেতাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডই জন্ম দিয়েছে এসব প্রশ্ন। পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলনসহ নানাভাবে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে আনছেন টেন্ডার এবং চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ। এর মাধ্যমে এসব নেতা বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। এই বড়লোক নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা।
সাবেক মেয়র মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পরেই মূলত ছন্দপতন ঘটে এখানকার ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। জেলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সংসদ সদস্য হাসানাত আবদুল্লাহর হাতে চলে গেলেও মহানগর ছাত্রলীগ নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। নগর সভাপতি জসিমউদ্দিনের বিরুদ্ধে উঠে পক্ষত্যাগ করে হাসানাত আবদুল্লাহর দিকে চলে যাওয়ার অভিযোগ। যদিও এই অভিযোগ তিনি কখনোই স্বীকার করেননি। বরং তাকে নিয়মিত দেখা যায় বর্তমান সংসদ সদস্য হিরনপত্নী জেবুন্নেসা আফরোজ ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর পাশে।
বিরোধী পক্ষের মতে, এসব আসলে লোক দেখানো। মহানগর সম্পাদক অসীম দেওয়ানের মতো তিনিও এখন হাসানাতের পক্ষে। প্রকাশ্যে এমপি জেবুন্নেসার সঙ্গে থেকে দুদিক থেকেই চলছে তার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা। কথিত এই পক্ষত্যাগ নিয়ে হিরনপন্থী ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে জসিমের চলছে মারাত্মক দ্বন্দ্ব। কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়ে গেছে। এরই মধ্যে সপ্তাহখানেক আগে হঠাৎ করে নগরীর দুটি সরকারি কলেজের কমিটি ভেঙে দেয় মহানগর ছাত্রলীগ। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। অভিযোগ উঠে টেন্ডার এবং চাঁদাবাজির। মাত্র কবছরে কিছু শীর্ষ নেতা কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার কাহিনী ফাঁস হয়ে যেতে থাকে।
কমিটি ভাঙার পরপরই গত সপ্তাহে মহানগর ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ এবং সরকারি বরিশাল কলেজের নেতারা। টানা ৩ বছর ধরে দুই নেতার কমিটি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও মহানগর কমিটি বহাল রাখার প্রতিবাদ জানায় তারা। সংবাদ সম্মেলনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় জসিম উদ্দিন এবং অসীম দেওয়ানকে।
বিলুপ্ত ঘোষিত সরকারি হাতেম আলী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল ইসলাম বাপ্পি এবং সরকারি বরিশাল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক চঞ্চল দাস পাপ্পা অভিযোগ করেন, কোনো কমিটি ভাঙার নৈতিক অধিকার তাদের নেই। কেননা মহানগর কমিটিই বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ। গত ৩ বছরে তারা তাদের নিজেদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি পর্যন্ত করতে পারেনি। মহানগর সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। টেন্ডার ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এ দুজন।
কত টাকার মালিক হলে বরিশাল নগরীর ব্যস্ততম এলাকায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের জমি কেনার জন্য বায়না চুক্তি করা যায় প্রশ্ন করে পাপ্পা বলেন, এরা ছাত্রলীগকে ধ্বংস করছে। এদের নেতৃত্ব আমরা মানি না। এই সংবাদ সম্মেলনের একদিন পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে জসিম-অসীম সর্মথক ওই দুই কলেজের ছাত্রলীগের অপর পক্ষ। সেখানে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয় প্রতিপক্ষের নেতাদের বিরুদ্ধে। ওই সংবাদ সম্মেলন শেষে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা ও মারামারির ঘটনা ঘটে।
মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান যুগান্তরকে বলেন, ১০ বছরের পুরনো দুটি কমিটি ভেঙে দিয়েছি। হাতেম আলী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন সেরনিয়াবাত বর্তমানে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। বরিশাল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মোর্শেদ আলম মিরাজ ১৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় চালাতে গিয়ে আমরা কিছু জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছি। আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা সত্য নয়। খুব শিগগিরই মহানগর ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে। আর নতুন কমিটি না হওয়া পর্যন্ত আমরা দায়িত্বে থাকব। তাছাড়া আমাদের কমিটি থাকবে কি থাকবে না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র। এখানে কলেজ পর্যায়ের নেতাদের কিছু বলার কোনো অধিকার নেই।
হাতেম আলী কলেজের বিলুপ্ত ঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সুমন সেরনিয়াবাত বলেন, কমিটি ভেঙে দেয়ার অধিকার তাদের আছে। তবে তা করার আগে আমার সঙ্গে আলাপ করতে পারতেন। বিষয়টি আমার কাছে অসাংগঠনিক মনে হয়েছে। পাল্টাপাল্টি এসব সংবাদ সম্মেলনের আগেও দুপক্ষের বিরোধে বহুবার এসেছে নেতাদের বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ। কোটি কোটি টাকার টেন্ডার দখল, গুচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সঠিক পদ্ধতিতে টেন্ডার হতে না দেয়া, লটারিতে বাধা দেয়া, জমি দখল, সাধারণ ঠিকাদারদের মারধর এবং ভর্তি বাণিজ্যসহ কলেজ ক্যাম্পাসে নেতাদের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে খবর ছাপা হয়েছে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায়।
বরিশাল নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, এমনিতেই বর্তমানে ছাত্রলীগের নানা কর্মকাণ্ডে বিব্রত সরকার। ছাত্রলীগকে বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগের বিষফোঁড়া। এ অবস্থায় বরিশালে যেখানে খোদ ছাত্রলীগ নেতারাই নিজেদের বিরুদ্ধে আনছেন দুর্নীতির অভিযোগ সেখানে তা তদন্ত হওয়া দরকার।
বিএম কলেজ কর্মপরিষদের সহ-সভাপতি ছাত্রলীগ নেতা মঈন তুষার বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কথা বলা এখন একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। হুট করে যে কেউ বলে দেন যে, আমরা দুর্নীতিবাজ। আমি চাই, এসব অভিযোগের তদন্ত হোক। কেউ দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হোক। আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয় তাহলে যারা এসব মিথ্যা অভিযোগ তুলে ছাত্রলীগের চরিত্র হনন করছে তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে তাও ঠিক করতে হবে।

বিদেশ যেতে প্রাণঘাতী উপায় নয়

বিশ্ব কর্মসংস্থান বাজারের সুবিধা পেতে বিদেশে চাকরি প্রার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণ জোরদার করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার ইস্কাটনে ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণকালে তিনি এ নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী তার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ মন্ত্রণালয়ে আসেন।
নৌকা, ট্রলার ও ছোট জাহাজে করে সমুদ্রপথে বিদেশে লোক পাঠাতে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ও অসাধু চক্রের কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশ যেতে যেন প্রাণঘাতী উপায় অবলম্বন না করা হয় এজন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে। তিনি বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারকদের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো অবশ্যই ব্যবসা করবে, কিন্তু মানুষকে শোষণ নয়। তিনি বলেন, সরকার বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে বন্ধ করার জন্য নয়- বরং তাদের আইন ও নীতি মেনে বিদেশে লোক পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) জনশক্তি রফতানির উদ্যোগ নিয়েছে। বিদেশে চাকরি প্রার্থীরা বেসরকারি এজেন্সির দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছে উল্লেখ করে এ ব্যাপারে জনগণের মাঝে সচেতনতা গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, প্রথমে বেসরকারি এজেন্সিগুলো আমাদের এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পেরেছে, জনশক্তি রফতানি স্থিতিশীল রাখা, দুর্নীতি রোধ ও অবৈধ চর্চা বন্ধে এ উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জনশক্তি রফতানি খাতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন বিশ্বের ১৫৯টি দেশে বাংলাদেশের চাকরির বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাকরি বাজারে আমাদের জনশক্তির অধিকতর সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য আমাদের অধিকতর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। প্রবাসীদের জন্য তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন কল্যাণমূলক পদক্ষেপের উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে চৌকস কূটনৈতিক তৎপরতায় মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৬৫ হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক বৈধতা পেয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে বিএনপি শাসন আমলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়ায় আরও ১ লাখ বাংলাদেশী অবৈধ হয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন বিদেশে চাকরি প্রার্থীদের তাদের কাক্সিক্ষত দেশের আইন-কানুন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য দেয়া হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে বিদেশে চাকরি প্রার্থী তার বিমান ভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য ঋণ নিতে পারে। তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যা দেখাশোনা করতে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে নতুন মিশন খোলা হয়েছে। ১৫টি লেবার উইং খোলা হয়েছে, যা ৫ থেকে ৬ লাখ শ্রমিককে বিদেশে কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনশক্তি রফতানি কর্মকাণ্ড তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে- এতে ২০ লাখ শ্রমিক ডাটাবেজের আওতায় এসেছে। প্রত্যেক প্রবাসী শ্রমিকের জন্য বায়োমেট্রিক স্মার্ট কার্ড চালু হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও সচিব ড. খন্দকার শওকত হোসেন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

খালেদা জিয়ার লিভ টু আপিলের আদেশ আজ

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় অভিযোগ আমলে নেয়া ও অভিযোগ গঠন বাতিল বিষয়ে খালেদা জিয়ার লিভ টু আপিলের ওপর আজ আদেশ দেয়া হবে। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ শেষে রোববার আদেশের এ দিন ধার্য করেন। অন্যদিকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় করা লিভ টু আপিলের ওপর আপিল বিভাগে শুনানি অব্যাহত রয়েছে। এ দুটি মামলায় আজ বিশেষ জজ আদালত-৩ এ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। রোববার সকালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় করা লিভ টু আপিলের ওপর শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। পরে শুনানি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের লাখ লাখ মামলা বিভিন্ন আদালতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত মুলতবি রয়েছে। সেসব মামলা শুনানির জন্য সরকারপক্ষ থেকে এতটা উৎসাহ কখনও দেখান হয় না। এই মামলায় সরকারের এত উৎসাহের মূল কারণ, এটা একটা রাজনৈতিক মামলা এবং এখানে খালেদা জিয়া আসামি। এছাড়া এই মামলাটা নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করার কোনো কারণ নেই।
এ সময় তিনি বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেয়ার পর আপিলের শুনানির জন্য দুটি দিন নির্দিষ্ট করেছিলেন। কিন্তু এই মামলার ক্ষেত্রে সেটারও খেলাপ করে একনাগাড়ে শুনানি করা হচ্ছে। এর ফলে জনমনে একটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে এত উৎসাহ কেন?
আদালতের শুনানিতে তিনি বলেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টে সরকার কোনো অর্থ দেয়নি। একটা পয়সাও এখানে আত্মসাৎ হয়নি। এখানে কোনো অনিয়ম হলে ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী বিচার হতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এর আগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় করা লিভ টু আপিলের শুনানি করেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও এজে মোহাম্মদ আলী। শুনানিকালে আদালতে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, ব্যারিস্টার এহসানুর রহমান প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে অনিয়মের অভিযোগে দুদক ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক। ২০১১ সালের ৮ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় আরও একটি মামলা করে দুদক।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আদালত একই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর এই মামলায় অভিযোগ আমলে নেন। অভিযোগ আমলে নেয়ার আদেশ বাতিল চেয়ে খালেদা জিয়ার পক্ষে হাইকোর্টে একটি আবেদন দায়ের করা হয়। ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ওই আবেদন খারিজ করে রায় দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে বেগম জিয়া ২০১২ সালের ২৬ ফেব্র“য়ারি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করেন।
অন্যদিকে গত ১৯ মার্চ এ দুটি মামলায় অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক বাসুদেব রায়। এ অভিযোগ গঠন আইনানুগ হয়নি দাবি করে তা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন খালেদা জিয়া। এই দুটি আবেদন গত ২৩ এপ্রিল খারিজ করেন হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে খালেদার পক্ষে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় করা দুটি লিভ টু আপিলের ওপর আজ আদেশ দেয়া হবে। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় করা লিভ টু আপিলের শুনানি অব্যাহত রয়েছে।

নওয়াপাড়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে আওয়ামী লীগ নেতা নিহত

অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নওয়াপাড়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোল্লা ওলিয়ার রহমানকে (৫৫) সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করেছে। রোববার সকাল ৭টার দিকে নওয়াপাড়া বাইপাস সড়কের গুয়াখোলা মধ্যপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।
মোল্লা ওলিয়ার রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জন্মভূমির নওয়াপাড়া ব্যুরো প্রধানও ছিলেন তিনি।
তাকে হত্যার প্রতিবাদে দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রোববার বাইপাস সড়কসহ যশোর-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে দিনভর বিক্ষোভ করেছে। ঘটনার পরপরই বন্ধ হয়ে যায় নওয়াপাড়া শহরের সব দোকানপাট। পুলিশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইউনুস আলী নামের এক যুবককে আটক করেছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, মোল্লা ওলিয়ার রহমান প্রতিদিনের মতো রোববারও প্রাতঃভ্রমণে বের হন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মালেকও তার সঙ্গে ছিলেন। বাইপাস সড়ক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ডিএন টেক্সটাইল মিলের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় গুয়াখোলা মধ্যপাড়ার আরাফাত মসজিদের সামনে পৌঁছলে মোটরসাইকেলে অস্ত্রধারী তিন সন্ত্রাসী খুব কাছ থেকে মোল্লা ওলিয়ারকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি করে। গুলি দুটি তার বুকে লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আবদুল মালেক চিৎকার শুরু করেন। সন্ত্রাসীরা তাকেও গুলি করতে উদ্যত হয়। কিন্তু ততক্ষণে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসায় সন্ত্রাসীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সকালে ওলিয়ার রহমানকে গুলি করার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধরা বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও আসবাবপত্র জ্বালিয়ে যশোর-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয় হাজারও মানুষকে। বিকাল পর্যন্ত এ বিক্ষোভ চলছিল। দুপুরে তার লাশ নওয়াপাড়ায় এসে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন দলীয় নেতাকর্মী, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নওয়াপাড়া পৌরসভায় প্রথম, শংকরপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় ও সিরাজকাঠি গ্রামে তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।
মোল্লা ওলিয়ার রহমানকে হত্যার কারণ কী তাৎক্ষণিকভাবে তা জানাতে পারেনি কেউই। অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছয়রুদ্দিন আহমেদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সরখোলা গ্রামের হাকিম মোল্লার পুত্র ইউনুস আলীকে আটক করা হয়েছে।

অপরাধী শনাক্ত করবে যন্ত্র

অপরাধী শনাক্ত করতে এখন আর প্রয়োজন হবে না রিমান্ডে নেয়ার। ডিএনএ পরীক্ষা করার অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়েই মাত্র ৯০ মিনিটের মধ্যে শনাক্ত করা যাবে অপরাধীকে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা রাজ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এমনি যন্ত্র র‌্যাপিড এইচআইটি শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনতিবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের সবকটি রাজ্যেই এ যন্ত্রটি বসানোর ভাবনা রয়েছে দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, ডিফেন্স এবং জাস্টিস বিভাগের। অবশ্য এর আগেই চীন, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া আড়াই লাখ ডলার মূল্যের এ যন্ত্রটি পরীক্ষামূলকভাবে বসিয়ে আশানুরূপ ফল পায়। সম্ভাব্য অপরাধীর দাঁত, ঘাড়, হাত, সিগারেটের অংশ, কাপড় এবং অন্যান্য জিনিস থেকে নেয়া নমুনা বিশ্লেষণ করে যন্ত্রটি সিদ্ধান্ত দেয়। যদি লাল সংকেত দেখায় তবে পরীক্ষিত ব্যক্তিটি অপরাধী, আর সবুজ সংকেত মানে নির্দোষ।
তবে যন্ত্রটি ব্যবহারকারীদের একজন জেনিফার লিংক বলেন, ‘যন্ত্র যদি কোনো সময় বিকল হয়ে যায় তখন কী করা হবে তা এখনই ভেবে রাখা উচিত। আমরা এমন কিছু কেস পেয়েছি যাতে দেখেছি অপরাধীদের ঠিকভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। অপরাধী নিজের অপরাধ স্বীকার করার পরেও যন্ত্রটি তাকে নির্দোষ বলছিল।’

নরসিংদীতে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা

নরসিংদীতে যৌতুকের জন্য বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় স্বামীর দেয়া আগুনে দগ্ধ হয়ে এক নববধূর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় রায়পুরা উপজেলার বাহেরচর গ্রামে স্ত্রী সুবর্ণা আক্তারের গায়ে আগুন দেয় স্বামী ইলিয়াছ হোসেন। আহত অবস্থায় সুবর্ণাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকাল সাড়ে সাতটায় তার মৃত্যু হয়।
নিহত সুবর্ণা বাহেরচর গ্রামের আনোয়ার হোসেন কাজলের মেয়ে। সে নরসিংদী সরকারি কলেজের ২০১৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তার স্বামী ইলিয়াছ শহরের নাগরিয়াকান্দী এলাকার খোকা মানিকের ছেলে। কৃষক কাজলের ৭ ছেলেমেয়ের মধ্যে সুবর্ণা ছিল সবার বড়। কলেজে যাতায়াতের পথে সুবর্ণার সঙ্গে বখাটে ইলিয়াছের পরিচয় হয়। প্রথমদিকে সুবর্ণা ইলিয়াছের প্রস্তাবে সাড়া না দিলেও এক পর্যায়ে সম্মত হয়। সম্পর্কের দুই মাস যেতে না যেতেই ইলিয়াছ সুবর্ণাকে বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। অন্যথায় সে আত্মহত্যা করবে বলে তাকে মানসিক চাপ দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুই পরিবারের সম্মতিতে ৮ নভেম্বর তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় কথা ছিল, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সুবর্ণাকে শ্বশুরবাড়িতে তুলে দেয়া হবে। ওই সময় যৌতুকের ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি। তবে বিয়ের পরই ইলিয়াছের পরিবারের সদস্যদের আচরণ দ্রুত বদলে যায়। শনিবার বিকালে নিজের বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে সুবর্ণার বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে ইলিয়াছ তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আশংকাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, আগুনে সুবর্ণার শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।
হাসপাতালে আহত অবস্থায় সুবর্ণা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ঘরে ঢোকামাত্রই ইলিয়াছ যৌতুকের টাকার কথা জানতে চায়। কিন্তু বাবার কাছে টাকা চাইতে অস্বীকৃতি জানালে ইলিয়াছ সঙ্গে থাকা কেরোসিন সুবর্ণার গায়ে ঢেলে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সুবর্ণার মা মর্জিনা বেগম জানান, ইলিয়াছ যৌতুক বাবদ ২ লাখ টাকা, ২ ভরি স্বর্ণ ও আসবাবপত্র দাবি করে। সকালে (শনিবার) সুবর্ণা আমাকে বিষয়টি জানিয়ে কান্নাকাটি করে কলেজে নির্বাচনী পরীক্ষা দিতে যায়। সন্ধ্যায় ইলিয়াছ তাকে পুড়িয়ে হত্যা করে।
নিহতের বোন স্বর্ণা ইসলাম বলেন, বিয়ের এক সপ্তাহ পর থেকেই সে একা কান্নাকাটি করত। কিন্তু মুখ খুলে আমাদের কিছু বলত না। আপু নিজের মধ্যে কষ্ট পুষে রাখত। সুবর্ণাকে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, সুবর্ণা কলেজের মেধাবী ছাত্রী ছিল। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য নির্বাচনী পরীক্ষা দিচ্ছিল সে। যৌতুকের জন্য তার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি। রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এখনও পরিবার থেকে কোনো মামলা হয়নি। ঘাতককে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। যৌতুকের জন্য সুবর্ণাকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে জেলা মহিলা পরিষদ। সংগঠনটির সভাপতি আশালতা সাহা বলেন, এ ঘটনা দুঃখজনক। আর যেন কোনো নারী সুবর্ণার মতো ভাগ্যবরণ না করেন সে জন্য পাষণ্ড স্বামীর কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।

তুচ্ছ কারণে খুন

‘স্ত্রীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করায় আমি অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে দেখা করতে যাই। কিন্তু তিনি আমার কথা না শুনে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেন। এই অপমান আমি কোনোভাবেই মানতে পারিনি। তাই চিন্তা করলাম শফিউলকে ‘সাইজ’ করতে হবে। এ জন্য আমি উজ্জ্বল ও মানিকের সঙ্গে কথা বলে তাদের সাহায্য চাই। তারা আমার কথামতো কাজ করেছে।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলনকে খুনের মূল পরিকল্পনাকারী আবদুস সামাদ ওরফে পিন্টু (৩৪) র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছে। গতকাল পিন্টুসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এরপর ঢাকায় র‌্যাব সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পুরো বিষয়টি খোলাসা করেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।
গ্রেফতারকৃত অন্যরা হল- আরিফুল ইসলাম মানিক (৩৩), সবুজ শেখ (১৮), সিরাজুল ইসলাম ওরফে কালু (২২), আল মামুন (৩১) ও ইব্রাহিম খলিল ওরফে টোকাই বাবু (২১)। এরা সবাই রাজশাহী যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী।
র‌্যাব জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আবদুস সামাদ পিন্টু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদার ছিলেন। তার স্ত্রী নাসরিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগে সেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত। দাফতরিক বিষয়ে পিন্টুর স্ত্রীর সঙ্গে অধ্যাপক শফিউল দুর্ব্যবহার করেন। স্ত্রীর কাছে ঘটনার শোনার পর দুর্ব্যবহারের কারণ জানতে শফিউলের কার্যালয়ে গেলে পিন্টুর সঙ্গে ‘খারাপ ব্যবহার’ করেন অধ্যাপক। এতে পিন্টু চরম অপমানিত বোধ করেন। অপমানের বদলা নেয়ার জন্য প্রথমে অধ্যাপককে ভয় দেখানোর পরিকল্পনা হয়। এর অংশ হিসেবে তার পায়ের দিকে ছুরিকাঘাত করার সিদ্ধান্তও হয়। কিন্তু ১৫ নভেম্বর চৌদ্দপায়া এলাকায় ফল গবেষণা কেন্দ্রের দক্ষিণের সড়কে দুষ্কৃতকারীরা অধ্যাপক শফিউলের ঘাড়ে কোপ দেয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এ সময় এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত এবং চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নিশ্চিত মৃত ভেবে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এরপর অধ্যাপককে ম–মূর্ষু অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি মারা যান। ঘটনার পর থেকে র‌্যাব ও পুলিশ ঘাতকদের গ্রেফতারে মাঠে নামে।
সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, অধ্যাপক শফিউল খুনের ঘটনায় ১১ জন জড়িত ছিল। এদের মধ্যে ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে তিনজন। বাকি ২ জন পলাতক রয়েছে। র‌্যাব তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
ওদিকে অধ্যাপক খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৪ জনকে গ্রেফতার করেছে রাজশাহী মহানগর পুলিশ। রোববার র‌্যাব সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সংস্থার আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, রাবির এই শিক্ষক খুনের পর র‌্যাব-৫ এর গোয়েন্দা দল অনুসন্ধানে নামে। তারা খবর পায় হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী আবদুস সামাদ ওরফে পিন্টু মতিহার থানার বিনোদপুরে দাশমারিতে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। ওই তথ্যর ভিত্তিতে শনিবার পিন্টুকে গ্রেফতার করা হয়।
পিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তার সঙ্গে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী আরও তিনজন ছিলেন। তারা একই থানাধীন কাপাসিয়ায় অবস্থান করছে। সে অনুযায়ী র‌্যাব রোববার দিবাগত রাতে কাপাসিয়া পালপাড়া ঢালের আমবাগান থেকে মানিক, সবুজ ও কালুকে গ্রেফতার করে। এই তিনজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যানুযায়ী রোববার ভোরে গাজীপুরের টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকা থেকে আল মামুন ও টোকাই বাবুকে গ্রেফতার করা হয়।
অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য রাজশাহী জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের কাছে পিন্টু ক্ষোভের কথা জানায় এবং তার সঙ্গে পরামর্শ করে। পরে উজ্জ্বল বিষয়টি নিয়ে ওই শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন। অধ্যাপকের সঙ্গে যুবদল নেতা উজ্জ্বলেরও কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায় উজ্জ্বল নিজেও অপমানিত বোধ করেন। এ ঘটনার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী শফিউলকে ‘ভয়’ দেখানো জন্য উজ্জ্বল ও পিন্টু তাদের পরিচিত মানিককে দায়িত্ব দেয়। মানিক তাদের পরামর্শে অধ্যাপক শফিউলের ওপর হামলা চালান। গ্রেফতারকৃতরা দাবি করেন, তাদের হত্যা পরিকল্পনা ছিল না। তাদের পরিকল্পনা ছিল অধ্যাপক শফিউলকে দু-একটি কোপ দিয়ে আহত করা।
মানিক জানায়, পিন্টু তাকে বারবার ফোন করে অধ্যাপক শফিউলের ওপর হামলা করতে বলে। কিন্তু সে শফিউলকে না চেনায় তিনদিন হামলা চালাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। এক পর্যায়ে পিন্টু তাকে ফোন করে বলেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই সে অধ্যাপক শফিউলকে চিনিয়ে দেবে।’ কথা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪/৫টি স্থানে অবস্থান নেয় খুনিরা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বাসার দিকে যাওয়ার সময় পিন্টু অধ্যাপক শফিউলকে চিনিয়ে দেন। এরপর মানিকসহ অন্যরা শফিউলের ওপর হামলা চালান। মানিক র‌্যাবকে জানিয়েছে, ১৫ নভেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাউজিং সোসাইটি (বিহাস) সংলগ্ন চৌদ্দপায়া এলাকায় পৌঁছার পর পিন্টু শিক্ষকের গাড়ি দেখিয়ে দেয়। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী মানিক প্রথমে শিক্ষককে কোপায়। এতে তিনি আহত হলে সবুজ শিক্ষকের মাথায় চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। সবুজের চাপাতির কোপে শিক্ষক মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তারপর মামুন, আরিফ, বাবু ও কালুসহ সবাই চাপাতি, হাঁসুয়া ও চাকু দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। মৃত্য নিশ্চিত করে ঘটনাস্থল থেকে সবাই পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পিন্টু এবং উজ্জ্বল দু’জনই উপস্থিত ছিল।

প্রাথমিক সমাপনীতে প্রথম দিনে অনুপস্থিত দেড় লাখ শিক্ষার্থী

নিবন্ধন করেও প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। রোববার সারা দেশে ওই পরীক্ষা শুরু হয়। অপরদিকে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে সারা দেশে ২ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া অনিয়মের অভিযোগে ৪ জন শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়। প্রথম দিন ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকার চারটি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি পরীক্ষার সার্বিক পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর জানিয়েছে, এবার শিশুদের এই পাবলিক পরীক্ষায় সর্বমোট প্রার্থী ছিল ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ২৬৫ জন। কিন্তু প্রথম দিনেই ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪০ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়নি। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে ২৭ লাখ ৮৯ হাজার ৬৯৯ পরীক্ষার্থীর অংশ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু অংশ নিয়েছে ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ৯৫৭ জন। এ পরীক্ষায় মোট অনুপস্থিত ১ লাখ ২ হাজার ৭৪২ জন। আর ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ৩ লাখ ৬ হাজার ১০২ জনের অংশ নেয়ার কথা ছিল। অংশ নিয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪০৪ জন। এ পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল ৪০ হাজার ৬৯৮ জন। সেই হিসাবে প্রাথমিক সমাপনীতে ৯৬ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং ইবতেদায়িতে ৮৬ দশমিক ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। এবার সারা দেশে ৬ হাজার ৭৯১টি কেন্দ্রে এই দুই পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। দেশের বাইরে ১১টি কেন্দ্রে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। বেলা ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত পরীক্ষা নেয়া হয়। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় রাখা হয়েছে। এ পরীক্ষা শেষ হবে ৩০ নভেম্বর। পরীক্ষা ফলাফলের ভিত্তিতে প্রাথমিক বৃত্তি দেয়া হবে।
৪ শিক্ষক বহিষ্কার : অনিয়মের অভিযোগে মেহেরপুরের গাংনীতে পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বরত চার শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত শিক্ষকরা হলেন- শালদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজা নাজমুল ইসলাম, চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তারিকুজ্জামান, একই স্কুলের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম ও ইকুড়ী নব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা প্রিয়াংকা খাতুন। গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল আমিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকালে তিন শিক্ষককে মোবাইল ফোন রাখার দায়ে ও প্রিয়াংকার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ থাকার কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সরকারের দেনা চার লাখ কোটি টাকা

সরকার চার লাখ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত ঋণভারে জর্জরিত। রাজনৈতিক কারণে উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশ ও বিদেশ থেকে এই পরিমাণ অর্থ ঋণ করতে হয়েছে সরকারগুলোকে। যথাযথ খাতে ব্যয় না হওয়ায় ঋণের টাকার অপচয় হচ্ছে। এর সঙ্গে সুদ যোগ হওয়ায় ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে জনগণের ওপর চাপ বাড়ছে। আবার বাড়তি ঋণের কারণে বেড়ে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির হার- যা মানুষের আয় খেয়ে ফেলছে। ঋণের কারণে দু’দিক থেকেই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় ঋণ মানুষের উপকারে আসছে না।
সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণের ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ ২০১৪-এর অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশ করা তথ্য মতে, স্বাধীনতার পর থেকে গত জুন পর্যন্ত সরকারগুলোর দেশে-বিদেশে ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর থেকে গত জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দশ বছরের ঋণ তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দেশীয় বিভিন্ন উৎস থেকে নেয়া হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা নেয়া হয়েছে বৈদেশিক উৎস থেকে। ঋণের বিপরীতে প্রতি বছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ঋণের অংক বাড়ার সঙ্গে সুদ পরিশোধের পরিমাণও বাড়ছে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের ৭৫ শতাংশ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। অথচ ঋণের পুরোটাই থাকছে দেশের মানুষের ওপর।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর সরকার যে ঋণ করছে তার প্রায় সবটাই কোনো না কোনোভাবে দেশের সাধারণ জনগণের ওপর পড়ছে। এ বিষয়ে উন্নয়ন অন্বেষণের ওই গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের ঋণের বোঝা যত বাড়ছে, জনগণের মাথাপিছু দেনার পরিমাণও ততোধিক হারে বাড়ছে। এর ফলে চলতি অর্থবছর শেষে দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৮ হাজার ৫৬ টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১৫ হাজার ৯৬৯ এবং বৈদেশিক ঋণ ১২ হাজার ৮৭ টাকা।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ যুগান্তরকে বলেন, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় সরকারকে ঘাটতি বাজেট করতে হচ্ছে। ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছে। তিনি ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি কর ফাঁকির প্রবণতা বন্ধের ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছেন। তার মতে, কর ফাঁকি বন্ধ হলে রাজস্ব আয় এমনিতেই বেড়ে যাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার বৈদেশিক ঋণ নেয়ার বিষয়ে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করছে। ফলে ওই খাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া সরকারও কঠিন শর্তে বৈদেশিক ঋণ নিচ্ছে। যার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটি ডলার। এসব ঋণ পরিশোধের সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। সে হিসাবে এসব ঋণের কারণে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা থাকায় গত অর্থবছরে সরকারের ঋণের অংক কমে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ কমলেও বাড়ছে ব্যাংকবহির্ভূত ঋণের পরিমাণ। ফলে সার্বিকভাবে সরকারের ঋণের অংক বাড়ছে- যা সুদের পরিমাণও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাজেট ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বিক ঘাটতি রাখা হয়েছে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। এই ঘাটতি বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ নিয়ে পূরণ করা হবে। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ২৪ হাজার ২৭৫ কোটি এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৪৩ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১২ হাজার ৫৬ কোটি টাকা নেয়া হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে গত ফেরুয়ারি পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের স্থিতির মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে ২১১ কোটি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ৭১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সঞ্চয়কারীরা এখন সরকারি সঞ্চয়পত্রে ব্যাপক হারে বিনিয়োগ করছে। ফলে এই খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণ বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৫ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, দেশীয় প্রেক্ষাপটে এখনও বৈদেশিক ঋণ উদ্বেগের পর্যায়ে যায়নি। কারণ বাংলাদেশের নেয়া বৈদেশিক ঋণের প্রায় বেশির ভাগই দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমাত্রা সুদের।
তবে উদ্বেগের ক্ষেত্রটি হচ্ছে, দেশীয় উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া। কারণ এ ঋণে গড়ে সরকারকে ১০ শতাংশ হারে সুদ দিতে হচ্ছে। আর তা মোট ঋণের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে এ খাতে। তিনি মনে করেন, ঋণ যেহেতু করতেই হচ্ছে সেক্ষেত্রে দেশের চেয়ে বিদেশী উৎসের ঋণই সাশ্রয়ী। তাই অভ্যন্তরীণ থেকে ঋণ নিয়ে চাপে না ফেলে এ মুহূর্তে পাইপলাইনে আটকে থাকা বিদেশী ঋণগুলো গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যুগান্তরকে বলেন, আয় বুঝে ব্যয় নির্ধারণ না করে অযৌক্তিকভাবে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধিই পাহাড়সম এই দেনার মুখ্য কারণ। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে সরকারের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কখনোই শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়ের বরাদ্দ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয়ের খাতেও বরাদ্দ সংকুচিত হয়ে পড়ছে- যা পরোক্ষভাবে বাড়াচ্ছে সরকারের দেনার বোঝা। যে কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারকে ‘কুল রাখি না শ্যাম রাখি’ পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।
তিনি এর থেকে উত্তরণে বাজেট ঘাটতি ও ঋণের প্রতিকূল প্রভাব মোকাবেলায় মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসংক্রান্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসকাপ) এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় আর্থিক, মুদ্রা এবং বিনিময় হারসংক্রান্ত সামষ্টিক অর্থনীতির নীতিগুলো স্বাধীনভাবে প্রণয়ন করতে পারছে না। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্যবিমোচন ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।