Showing posts with label শিক্ষা অধিকার. Show all posts
Showing posts with label শিক্ষা অধিকার. Show all posts

Sunday, September 21, 2025

সরকার বদলায় কিন্তু শিক্ষার অবহেলা বদলায় না by মোস্তাফিজুর রহমান

স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে একের পর এক সরকার এসেছে, শিক্ষা কমিশন গঠন হয়েছে, বড় বড় নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। সরকারের রূপ পাল্টেছে, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অবহেলা বদলায়নি। আজকের বাংলাদেশে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী, দেড় লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১০ লাখের বেশি শিক্ষক রয়েছেন।

প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার ৯৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, মাধ্যমিকেও ভর্তি বেড়েছে। সংখ্যার হিসাবে নিঃসন্দেহে ভালো শোনায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভর্তি ও পরীক্ষার সাফল্য কি শিক্ষার্থীদের দক্ষ করছে? বাস্তব উত্তর হচ্ছে ‘না’। তারা ডিগ্রি হাতে পাচ্ছে, কিন্তু শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার মতো সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা কিংবা বিদেশি ভাষার দক্ষতা, যা আধুনিক চাকরির বাজারে জরুরি—এসব দক্ষতা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।

কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার শিক্ষাকে কখনোই প্রকৃত অর্থে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেনি, বরং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে। আর শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে গিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা গবেষণায় বিনিয়োগ না করে ভরসা করা হয়েছে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং আর গাইড বইয়ের ওপর।

শিক্ষা বাজেটই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ (জিডিপির ২.৪৯ শতাংশ)। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা কমতে কমতে নেমে এসেছে বাজেটের ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে। আমরা আশা করেছিলাম বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে হয়তো ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হবে। বাস্তবে তা হলো না, হতাশা রয়ে গেল।

করোনা মহামারির অভিঘাত এখনো কাটেনি। গণসাক্ষরতা অভিযান-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৪২৭ দিনের মধ্যে ২৭৯ দিন স্কুল বন্ধ ছিল। অর্থাৎ মাত্র ১৪৮ দিন ক্লাস হয়েছে। এত দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি শিশুদের শেখার ক্ষতি করেছে ভয়াবহভাবে। এ ঘাটতি পূরণে কোনো বিশেষ উদ্যোগ না থাকায় নতুন প্রজন্ম ‘হারানো প্রজন্মে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

শিক্ষায় বৈষম্য বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও গরিবের মধ্যে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে এই বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। প্রাথমিক স্তরে অনেক ধরনের—সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা, এনজিও স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ইত্যাদি। ফলে শিক্ষার্থীদের মান, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে। এই বৈষম্যকে আরও গভীর করেছে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশ নিতে পারবে। অথচ দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এনজিও ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে। এ সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বৈষম্য তৈরি করছে।

এই পটভূমিতে সরকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি–৫) হাতে নিয়েছে এবং ২০২৭ সাল থেকে নতুন পাঠ্যক্রম শ্রেণিকক্ষে চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি বড় সুযোগ হলেও আশঙ্কা রয়ে গেছে। কারণ, এর পূর্ববর্তী কর্মসূচি (পিইডিপি–৪) জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩–এর জন্য ডিজাইন করা হলেও পরে জুন ২০২৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো এর ১৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি, যা আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিকে নির্দেশ করে। আর এবারও যদি সেই ধারাবাহিকতা থাকে, তবে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে না।

পিইডিপি–৫ সফল করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে একীভূত করতে হবে। পাঠ্যক্রমকে কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই প্রযুক্তিশিক্ষা, জীবনদক্ষতা, কারিগরি জ্ঞান ও উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা বাড়ানো। এগুলো ছাড়া মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।

সরকার একা এই সংস্কার করতে পারবে না। নাগরিক সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনজিওগুলো বহু বছর ধরে শিশুশিক্ষা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে আনা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সহায়তা ও কমিউনিটি স্কুলে কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। কমিউনিটির অংশগ্রহণও অপরিহার্য। শিক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে অনেক বড় বড় কথা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো তরুণেরা ডিগ্রি পেলেও চাকরি পাচ্ছেন না, দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। সরকার বদলায়, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অবহেলা বদলায় না।

এখন সময় এসেছে সত্যিকারের পরিবর্তনের। যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা যায়; যদি সরকার, এনজিও, শিক্ষক সংগঠন ও কমিউনিটি একসঙ্গে কাজ করে এবং বৈষম্য দূরীকরণকে মূল লক্ষ্য বানায়, তবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ বদলানো সম্ভব। শিক্ষা শুধু ডিগ্রি নয়, এটি কর্মসংস্থান ও জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি। সেই চাবিকেই শক্ত হাতে ধরতে হবে, না হলে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল কথার ফুলঝুরিই হয়ে থাকবে।

* মোস্তাফিজুর রহমান, লেখক ও গবেষক
- smostafiz_r@yahoo.com

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-07%2F9k6q9i42%2Feducation.JPG?rect=86%2C0%2C897%2C598&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Saturday, August 30, 2025

ডিপ্লোমাধারী ও স্নাতক প্রকৌশলীদের মধ্যে কেন এই দ্বন্দ্ব by মাহবুবুর রাজ্জাক

সারা দেশের ছাত্র প্রকৌশলীরা গতকাল বুধবার তিন দফা দাবিতে শাহবাগে জমায়েত হয়েছিলেন। তাঁদের দাবিগুলোর মূল কথাটি হলো সরকারি চাকরিতে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা বাতিল করতে হবে। প্রকৌশলী পদ ও পদবি হবে শুধু স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই দাবিগুলোর সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই।

দেশের প্রকৌশল খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রশাসনের উচিত ছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসা। অথচ পুলিশ তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত পরিবেশ তৈরি করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

অন্যদিকে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরাও আন্দোলনে আছেন। তাঁরা নিজেদের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিতে চান এবং প্রকৌশলীদের জন্য উপযুক্ত পদগুলোয় বর্ধিত হারে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের পদায়ন চান। এর বাইরে তাঁদের কিছু কিছু দাবি স্বার্থগত দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। দাবিগুলোর সঙ্গে আবার একমত নন স্নাতক প্রকৌশলীরা।  

দেশের শিল্পায়ন ও উন্নয়নে প্রকৌশলী ও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের সমন্বিত টিমওয়ার্ক প্রয়োজন। প্রকৌশলীদের কাজ প্রকৌশলীদেরই করতে হবে। তেমনি প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের কাজও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদেরই করতে হবে। দুই দলের কাজই একটা আরেকটার পরিপূরক। কাজেই রেষারেষি নয়, প্রয়োজন কাজের সুষম বণ্টন। উভয় পক্ষের উচিত আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যাগুলোর সমাধান করা এবং প্রকৌশল খাতের সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করা।

আমাদের বুঝতে হবে ‘প্রকৌশলী’ শব্দটি কোনো বংশগত পদবি নয়। উন্নত বিশ্বে শুধু একাডেমিক সনদের বলে প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করা যায় না। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর পেশাগত দক্ষতার একটি স্তর অতিক্রম করে প্রফেশনাল পরীক্ষা পাস করলেই কেবল প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়া যায়। প্রকৌশলী পদবিটি তিনিই ব্যবহার করতে পারেন, যিনি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার মান পূরণ করেছেন এবং নির্ধারিত সময় পরপর তাঁর লাইসেন্স নবায়ন করেছেন।

তাঁরা প্রকৌশলকাজে স্বাক্ষর, ডিজাইন অনুমোদন ও নিরীক্ষণ করলে ধরে নেওয়া যায় যে পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করেই তা করেছেন।
প্রকৌশলীদের জন্য একটি কোড অব এথিকস অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকে। এতে দুর্নীতি, পক্ষপাত, গাফিলতি থেকে বিরত থাকা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার শপথ থাকে। তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য আইনগতভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে একজন প্রকৌশলী তাঁর লাইসেন্স হারান এবং প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অধিকারও হারান।

প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করা যায়—এমন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেশে এখন বেড়েছে। তাই প্রকৌশল পেশায় মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সরকারের উচিত প্রকৌশলী, প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীসহ প্রকৌশল খাতে সব পেশাজীবীর জন্য পেশাগত ট্রেনিং, রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স চালু করা।

সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে চাকরির জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। যত বড় ডিগ্রিই থাকুক, লাইসেন্সবিহীন কাউকেই প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকলে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরা কেন, কার্যত স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও প্রকৌশল পদবি ব্যবহার করতে পারেন না।

বর্তমানে স্নাতক প্রকৌশলীদের এন্ট্রি পদ নবম গ্রেডের, আর প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের এন্ট্রি পদ দশম গ্রেডের। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নবম গ্রেডের ৩৩ শতাংশ পদ আবার ডিপ্লোমাধারীদের পদোন্নতি দিয়ে পূরণ করার রীতি চালু করা হয়। কার্যত কোথাও কোথাও এর চেয়েও অনেক বেশি পদ ডিপ্লোমাধারীদের দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রথমত নবম গ্রেডে স্নাতক প্রকৌশলীদের ঢোকার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত ডিপ্লোমাধারীরা পদোন্নতির মাধ্যমে এমন সব পদে পদায়িত হচ্ছেন, যেসব পদে স্নাতক প্রকৌশলীরাও বিসিএস ছাড়া যোগ দিতে পারে না। এটি স্নাতক প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে একটি বড় রকমের বৈষম্য এবং প্রকৌশল খাতের জন্য অশনিসংকেত।

প্রশ্ন হলো স্নাতক প্রকৌশলীদের কর্মক্ষেত্রে ডিপ্লোমাধারীরা পদায়িত হতে পারেন কি না? উত্তর হলো ‘না’। ডিপ্লোমাধারীরা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত নন। তাঁদের কর্মক্ষেত্র আলাদা। তাই উচিত হবে তাঁদের চাকরি, পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য অবিলম্বে প্রকৌশলীদের সমান্তরাল আরেকটি ধারা চালু করা।

ফলে স্নাতক প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের পদ ও কাজ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হবে। প্রকৌশল খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী দলের মধ্যে অকারণ রেষারেষি বন্ধ হবে। দুই দল নিঃশঙ্কচিত্তে কাজে মনোযোগ দিলে কাজের গতি ও দক্ষতাও বাড়বে।

প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় ব্যবস্থাপনা সংকট প্রকট। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তারা সংস্থার প্রধান হয়ে থাকেন। তাঁরা প্রকৌশলীদের পেশাগত সমস্যার প্রতি সুবিচার করতে পারেন না।

সম্প্রতি একজন উপদেষ্টা দেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। অথচ এই প্রকৌশলীরাই বিদেশের মাটিতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। সমস্যা প্রকৌশল শিক্ষায় নয়, সমস্যা প্রকৌশল সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনায়। প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় কাজের গতিশীলতা আনতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রকৌশল প্রশাসন ক্যাডার সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এতে দেশের প্রকৌশল খাতে উন্নততর নেতৃত্ব তৈরি হবে। সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের দ্বন্দ্বে মেধার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পেশাতেই মেধার প্রয়োজন; এমনকি যিনি ফসল ফলান তাঁরও। মেধার প্রমাণ দেখিয়েই স্নাতক ও ডিপ্লোমা সনদ অর্জন করতে হয়। তবে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুরোর কিছু সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে।

কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞ শিক্ষকের স্বল্পতা, গবেষণাগারের অভাব, যন্ত্রপাতির অভাব, সঠিক মূল্যায়নের অভাব ইত্যাদি। বলতে দ্বিধা নেই, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো বেশি অবহেলার স্বীকার। এই দায় ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। ডিপ্লোমাধারীরা যেন তাঁদের কাজে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন, সেভাবে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের।  
   
বলা হয়, ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষার পথ সীমিত করে রাখা হয়েছে। এটি অবশ্যই অনুচিত। উচ্চমাধ্যমিক বাদ দিয়ে ডিপ্লোমা সনদের জন্য চার চারটি বছর ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, তা–ও ভেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে ভালো হয়, পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দুই বছরে কারিগরি বোর্ডের আওতায় উচ্চমাধ্যমিক সনদ দিয়ে যাঁরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তাঁদের যদি সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়। যাঁরা তারপর পলিটেকনিকে কারিগরি ধারায় থাকবেন, তাঁরা দুই বা তিন বছরে প্রকৌশলে ডিপ্লোমা নিয়ে হয় শ্রমবাজারে যাবেন, নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে দুই বছরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে পারবেন।

তবে ভুলে গেলে চলবে না, সবাই প্রকৌশলী হতে চাইলে সেটাও প্রকৌশল খাতের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সহায়ক নয়। তাই ডিপ্লোমাধারীদের জন্য প্রস্তাবিত ক্যাডারে সম্মানজনকভাবে পেশাগত বিকাশের সুযোগ থাকতে হবে, যাতে তাঁরাও সন্তুষ্টচিত্তে পেশায় মনোযোগী হতে দ্বিধান্বিত না হন।

পরিশেষে প্রকৌশল খাতে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন তাঁরা সর্বশেষ প্রযুক্তি ও নীতিমালা সম্পর্কে হালনাগাদ থাকেন এবং সর্বোচ্চ পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেন।

* ড. মাহবুবুর রাজ্জাক, অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।
- ই-মেইল: mmrazzaque@me.buet.ac.bd
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-28%2Fsz8hyf9a%2FUntitled-3.jpg?rect=2%2C0%2C1677%2C1118&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
স্নাতক প্রকৌশলী এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিক্ষোভ। ছবি: প্রথম আলো

Friday, September 20, 2024

ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর: দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা, তীব্র ক্ষোভ

ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দিনে দুজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম (এফ এইচ) হলে চোর সন্দেহে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেন একদল শিক্ষার্থী। আর জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে কয়েক দফা মারধর করে হত্যা করা হয়। এ দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের একজন ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগী নেতা, অন্যদের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ক ও ছাত্রদলের চার নেতা-কর্মীসহ কিছু শিক্ষার্থী জড়িত বলে জানা গেছে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আহসান লাবিবকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে এবং ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এদিকে খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মোহাম্মদ মামুন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার ভোরের এ ঘটনার জের ধরে গতকাল দীঘিনালায় পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় ‘মব জাস্টিস’ (উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর বিচার) চলতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার দুপুরে এফ এইচ হলের মাঠে শিক্ষার্থীদের খেলা চলাকালে কয়েকজনের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ চুরি হয়। পরে রাত আটটার দিকে তোফাজ্জল হোসেন নামের এক যুবক মাঠে ঢুকলে তাঁকে চোর সন্দেহে ধরে হলের অতিথিকক্ষে নিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শুরু হয় মারধর। পরে ওই যুবককে হলের ক্যানটিনে রাতের খাবার খাওয়ানো হয়। এরপর আবার আরেকটি অতিথিকক্ষে নিয়ে পেটানো হয়। মারধরের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

মারধরের খবর পেয়ে হলের আবাসিক শিক্ষকেরা রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গেলেও তোফাজ্জলকে উদ্ধার করতে পারেননি। গুরুতর আহত অবস্থায় রাত ১২টার পর তোফাজ্জলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান কয়েকজন শিক্ষার্থী। রাত পৌনে একটার দিকে ওই যুবককে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

গতকাল বিকেলে ছয় শিক্ষার্থীকে এফ এইচ হল থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন জালাল মিয়া, মোহাম্মদ সুমন, মোত্তাকিন সাকিন, আল হোসাইন সাজ্জাদ, আহসানউল্লাহ ও ওয়াজিবুল আলম। তাঁরা সবাই এফ এইচ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। জালাল মিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপসম্পাদক ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে তিনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগে করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয় হন।

গ্রেপ্তারের আগে জালাল মিয়া প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, জুনিয়র কিছু শিক্ষার্থী সন্দেহের বশে ওই যুবককে হলের অতিথিকক্ষে ধরে এনে স্টাম্প দিয়ে মারধর করেন। শিক্ষকেরা ডাকলে তিনি সেখানে যান। তবে তিনি কাউকে মারধর করেননি। তিনি জুনিয়রদের বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

ঘটনা তদন্তে এফ এইচ হলের আবাসিক শিক্ষক আলমগীর কবিরকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে এফ এইচ হলের চার শিক্ষার্থীকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি শুক্রবার সকালে প্রতিবেদন দেবে।

জানা গেছে, নিহত তোফাজ্জলের (৩২) গ্রামের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নে। তাঁর আসল নাম মাসুদ কামাল। একসময় কাঁঠালতলী ইউনিয়ন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। তোফাজ্জলের ভাবি শরীফা আক্তার প্রথম আলোর পাথরঘাটা প্রতিনিধিকে বলেন, বাবা, মা ও একমাত্র বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তোফাজ্জল মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

বিক্ষোভ, প্রতিবাদ

তোফাজ্জলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গতকাল ভোরে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ করেন কিছু শিক্ষার্থী। সকালে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ মিছিলের পর এফ এইচ হলের প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ করেন ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী। বিকেলের দিকে ‘গণতন্ত্রকামী শিক্ষার্থীবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’–এর ব্যানারে ক্যাম্পাসে আরেকটি বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। এসব কর্মসূচি থেকে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘মব জাস্টিস’ আখ্যা দিয়ে বিচারবহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা-প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগরে হত্যা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটুনিতে নিহত শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা ফটকের একটি সেলুনের সামনে পরিচিত একজনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন শামীম। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী সেখানে শামীমকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাঁকে টেনে ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে আরও কয়েকজন মিলে মারধর করেন।

সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম এবং নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। তাঁরা শামীমকে প্রক্টর কার্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার করিডরে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী সেখানে গিয়ে শামীমকে আবার মারধর করেন।

প্রক্টরিয়াল টিম তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপত্তা শাখার করিডরে রেখে ফটকে তালা দেয়। এরপর ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী তালা ভেঙে শামীমকে বেধড়ক মারধর করেন।

বুধবার রাত সোয়া আটটার দিকে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা গুরুতর আহত শামীমকে আশুলিয়া থানা–পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে পুলিশ রাত নয়টার দিকে সাভারের গণ স্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে শামীম মোল্লার মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ অভিযোগ করলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, গত ১৫ জুলাই রাতে ছাত্র আন্দোলনের সময় শামীমসহ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। এই অভিযোগে বুধবার তাঁকে মারধর করা হয়। শামীমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও তুচ্ছ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগও ছিল।

মারধরে জড়িত যাঁরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম ব্যাচের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শামীম মোল্লার মৃত্যুর ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মোহাম্মদ রাজন মিয়া, একই বিভাগের রাজু আহমেদ, ইংরেজি বিভাগের হামিদুল্লাহ সালমান, একই বিভাগের মাহমুদুল হাসান রায়হান, ইতিহাস বিভাগের জুবায়ের আহমেদ, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের আতিকুজ্জামান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সোহাগ মিয়া এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আহসান লাবিব।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে আহসান লাবিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাহাঙ্গীরনগর শাখার সমন্বয়ক। রাজু, রাজন ও হামিদুল্লাহ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ ভুঁইয়াও এ ঘটনায় জড়িত বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাবিবের অব্যাহতি বহাল থাকবে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে, তা ন্যক্কারজনক। একটি তদন্ত কমিটি করার প্রস্তুতি শেষের দিকে। তাৎক্ষণিকভাবে উপাচার্যের যতটুকু এখতিয়ার, তা করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সাময়িক বহিষ্কার এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনভর বিক্ষোভ

শামীম মোল্লার মৃত্যুর ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে দিনভর বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বিক্ষোভ করেন একদল শিক্ষার্থী। গতকাল বেলা ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে দুপুরে শিক্ষার্থীদের আরেকটি দলও একই দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন। ঘটনার বিচার নিশ্চিতসহ চার দফা দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেয় প্রগতিশীল শিক্ষকদের একটি দল।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন প্রতিবেদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিনিধি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

Tuesday, November 15, 2011

দেশে দেশে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ by জোবাইদা নাসরীন

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও চিলি এখন আন্দোলনের দেশ—ভৌগোলিকতার ব্যবধান কমে এখন মতাদর্শিক লড়াইয়ে অবস্থান করছে এক জায়গায়। এ তিনটি ভূখণ্ডেই লড়ছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। সবারই অভিন্ন আহ্বান—শিক্ষা সবার জন্য হোক, শুধু ধনীর জন্য নয়। শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে তাঁদের এ লড়াই। রাজনৈতিক দুনিয়ার ভূগোল পরিবর্তন হচ্ছে রাতারাতিই।
এ বছরের মে মাসে ২০১১-১২ বাজেট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে চিলির শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। ৯ নভেম্বর চিলিয়ান পোর্ট অব ভ্যালপারাইসোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী একত্র হন। সেদিন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদল কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে যায়। সেদিন প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পাঁচ হাজার পুলিশ মোতায়েন করে। আন্দোলনরত ২০ জন শিক্ষার্থীকে পুলিশ আটক করে।
‘উই আর অকুপাই হার্ভার্ড। উই ওয়ান্ট এ ইউনিভার্সিটি ফর দ্য নাইনটি নাইন পারসেন্ট, নট এ করপোরেশন ফর দি ওয়ান পারসেন্ট’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে শিক্ষার মানের দিক থেকে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ের তালিকায় প্রথম স্থান পাওয়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যা সাতটায় হার্ভার্ড ইয়ার্ডে শোভাযাত্রা বের করেন। যদিও ২ নভেম্বর অকল্যান্ডে গণবিস্ফোরণের পর হার্ভার্ডের ৭০ জন শিক্ষার্থী প্রচলিত অর্থশাস্ত্রের ব্যাখ্যা ও শিক্ষা মেনে না নেওয়া এবং সবার জন্য শিক্ষার দাবিতে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতির অধ্যাপকদের ক্লাস বর্জনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। ৯ নভেম্বরের শোভাযাত্রায় প্রতিবাদী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল পাঁচ শতাধিক। দ্রোহের আগুন ছড়াচ্ছে সব জায়গায়। একই দাবিতে এর আগেই গত সেপ্টেম্বর মাসেই উত্তাল হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা। এই অকুপাই এডুকেশনের দাবিতে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা ক্রুজ ক্যাম্পাসে ছোট্ট ছোট্ট স্কুলশিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রবীণেরাও নেমে এসেছেন। তাঁদের হাতে লিফলেট, ব্যানার—যাতে লেখা, ‘মানি ফর স্কুলস’, ‘উই ওয়ান্ট ইউনিভার্সিটি ফর দ্য নাইনটি পার্সেন্ট’।
ঠিক একই দিন একই দাবিতেই লল্ডনেও তৈরি হয় সাড়াজাগানো ছাত্রবিক্ষোভ। ইংল্যান্ডের টিভি চ্যানেল, পত্রিকা এবং বাসের আলাপচারিতায়ও স্থান পাচ্ছে একই বিষয়। শুধু শিক্ষার্থীরা নন, অভিভাবকেরাও যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে কথা বলছেন। দূরে অবস্থানের কারণে যাঁরা আন্দোলনে যোগ দিতে পারছেন না, তাঁরাও সংহতি প্রকাশ করছেন। যদিও লন্ডনের বাইরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থী এই বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময় অপেক্ষাকৃত কম বয়সী শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় নিয়ে আসছেন বিষয়টিকে। গত ৯ নভেম্বর মধ্য লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে যে ছাত্র আন্দোলন হয়, তা অনেকের মধ্যেই বোধের এক নতুন মাত্রা তৈরি করে। টেলিভিশনে সেদিনের আন্দোলনের চিত্র না দেখলে, লন্ডনের পাশের অঞ্চলগুলো থেকে সেই আন্দোলনের তীব্রতা বোঝা কঠিন ছিল। ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতে প্ল্যাকার্ড, পোস্টার। তারা সেগুলো নিয়েই নির্ভয়ে ঘুরছে। এ মাসের প্রথম থেকেই দফায় দফায় বিভিন্নভাবে আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট কমানো অর্থাৎ শিক্ষা খাতে বাজেট কমে যাওয়াই এই প্রতিবাদের সূচনা করে। গত বছরের ঠিক এ সময়ই লন্ডনেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিলেন টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে। গত জুনে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষা খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তার আহ্বান, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেট কমানো এবং ফি বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে তাঁরা ‘ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন অ্যাগেনস্ট ফিস অ্যান্ড কাট’ ব্যানারে যে মোর্চা তৈরি হয়, এর প্রথম উদ্যোগ নেয় অ্যাবেরিস্টুয়াথ বিশ্ববিদ্যালয়। এই মোর্চা তৈরির প্রাক্কালে শিক্ষার্থীরা প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী ডেভিড উইলেটসের প্রতি তাঁদের অনাস্থা ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে তাঁদের স্মারকলিপিতে স্পষ্টই লেখা ছিল, ‘ইউ আর রং অন টিউশন ফিস, ইউ আর রং অন ফান্ডিং ফিস, ইউ আর রং অন মার্জারস’।
সেই মোর্চারই সফল আয়োজন ছিল ৯ নভেম্বরের বিক্ষোভ। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, মিছিলে প্রায় দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার শিক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের দাবি, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। সকাল থেকেই ছোটখাটো জমায়েত দুপুর নাগাদ বিক্ষোভে পরিণত হয়। লক্ষ্য ছিল, সেই বিক্ষোভ ওয়াল স্ট্রিটে গিয়ে শেষ হবে। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দীর্ঘ তর্কাতর্কি এবং ২৪ জন শিক্ষার্থীর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সেটি ট্রাফালগার স্কয়ারেই শেষ হয়। সরকার এই আন্দোলন ঠেকাতে চার শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করেছিল। তবে বিক্ষোভকারীরা জোর কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁরা টিউশন ফি কমাতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কাটছাঁট করা থেকে সরকারকে বিরত থাকতে বাধ্য করবে এবং তাঁদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। শিক্ষার্থীরা আরও জানিয়েছেন, তাঁরা আগামী ৩০ নভেম্বর একই দাবিতে ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্থানীয় বাজেট কর্তনবিরোধী গ্রুপগুলোর ডাকা বিক্ষোভে একাত্মতা ঘোষণা করবে। এ আন্দোলনের পাশাপাশি ‘ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন অ্যাগেনস্ট ফিস অ্যান্ড কাট’-এর নারী শাখা ২৫ নভেম্বর নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা বিলোপ দিবসে ‘নো টু ফিস, নো টু প্রাইভেটাইজেশন অব এডুকেশন, নো টু সেক্সইজম টু এডুকেশন’—এ দাবিতে সবাইকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে নামার জন্য অনুরোধ করেছে। তারা বলেছে, সরকারের এই বাজেট কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নারী স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই নীতির কারণে একক অভিভাবক যেসব নারী আছেন, তাঁরা তাঁদের মোট আয়ের ১৮ শতাংশ হারাবেন। নার্সারি ও নার্সিং হোম প্রভিশনে কাটছাঁট হওয়ায় পরিবারের বৃদ্ধ সদস্যদের দায়দায়িত্ব নারীদের ওপরই বর্তাবে। এই কর্তনপ্রক্রিয়ায় পড়েছে হিউম্যানিজ টিচিং, যা মূলত নারীরাই পড়াত। এটি ১০০ শতাংশই বাদ হয়েছে।
একই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দেশজুড়ে এত বড় ছাত্রবিক্ষোভ আর কখনো হয়েছে কি না জানি না; তবে আদর্শিক বিশ্বের ধারণা পাল্টে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি—এটা বোঝা যাচ্ছে। সারা বিশ্বেই মানুষ সমতার জন্য লড়ছে। বিশ্বজুড়ে অকুপাই এডুকেশন আন্দোলন আমাদের সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। চিলি, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডজুড়ে এই আন্দোলনের ইঙ্গিত দুনিয়া দখল করা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক বড়সড় প্রতিবাদী নড়াচড়া। তবে কি এই শিক্ষার্থীরাই রচনা করতে যাচ্ছেন দুনিয়া পাল্টানোর নতুন ইতিহাস?
জোবাইদা নাসরীন: সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ডারহাম ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
zoaidanasreen@gmail.com