Sunday, June 8, 2014

মিসরে অচিরেই সফল বিপ্লব হবে

মিসরে সেনা শাসিত জালিম সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত ও কারাবন্দি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। কারাগার থেকে পাঠানো তার এ বার্তা মুরসির টুইটারে প্রকাশ করা হয়েছে। মুরসিবিরোধী সামরিক অভ্যুত্থানের নায়ক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার একদিন পর এ বার্তা প্রকাশিত হয়। বার্তায় মিসরের জনগণকে সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অচিরেই সফল বিপ্লব হবে। নিজ সমর্থকদের কাছে লেখা মুরসির বার্তায় বলা হয়েছে, আপনাদের প্রতি মিসরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে। আপনারা বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করে দেবেন বলে জনগণ আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে... বিপ্লব আপনাদের ওপর নির্ভর করছে এবং আমার বিশ্বাস আপনারা এ বিপ্লবকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবেন। কারাগার থেকে পাঠানো এ বার্তায় মুরসি ক্ষমতায় থাকাকালে কিছু ভুল করার কথা স্বীকার করেছেন। সেইসঙ্গে দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি সঠিক কাজ যেমন করেছি তেমনি আমার কিছু ভুলও ছিল। কিন্তু আমি আপনাদের বা এই দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং ভবিষ্যতেও করব না। গত বছর জুলাই মাসে ব্রাদারহুড নেতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন জেনারেল সিসি। এরপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে হাজার হাজার ব্রাদারহুড কর্মী নিহত হন। আরও হাজার হাজার মুরসি সমর্থককে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এরই মধ্যে প্রহসনের বিচারে সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের দায়ে শত শত ব্রাদারহুড কর্মীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আল আরাবিয়া, আল আহরাম।
যৌন হয়রানির নতুন শাস্তি
মিসরে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকা যৌন হয়রানি বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন শাস্তির বিধান ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। মিসরের অন্তর্বর্তীকালীন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট আদলি মানসুর বৃহস্পতিবার এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে নতুন এ আইনের ঘোষণা দেন বলে শুক্রবার আল আহরামের খবরে জানানো হয়েছে। এ আইনের অধীনে কেউ নির্যাতনকারী হিসেবে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে সর্বনিু ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল, অনাদায়ে ৪০০ থেকে ৭ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জোরপূর্বক বা অস্ত্রের মুখে যৌন হয়রানি প্রমাণিত হলে নিুে ২ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হবে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ একাধিকবার আসতে থাকলে প্রতিবার দ্বিগুণ হবে শাস্তির পরিমাণ। এছাড়া কাউকে পর্নোগ্রাফিতে আহ্বান জানালে, যৌন হয়রানিমূলক বাক্য ছুড়ে দিলে বা অঙ্গভঙ্গি করে অমর্যাদা করার চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। পূর্বেকার একটি আইন সংশোধন করে এ ডিক্রি জারি করা হয়েছে। পূর্বের আইনটিতে যৌন হয়রানিকারীর বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট অভিযোগ দাঁড় করানো সম্ভব হতো না। বিচ্ছিন্ন মানহানি বা আক্রমণের অভিযোগ করা যেত মাত্র। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে আরব বসন্তের কালে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক হোসনি মোবারকের পতন আন্দোলনে মিসরীয় নারীরা বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল।

ওসমান পরিবারের পাশে প্রধানমন্ত্রী, জনগণের পাশে?

ত্বকীর খুনিরা আজও ধরাছেঁায়ার বাইরে
গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের শোকপ্রস্তাবের ওপর দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওসমান পরিবারকে প্রয়োজনে দেখাশোনা করার কথা বলেছেন৷ একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য ও সাংসদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর সমবেদনা ও সহানুভূতি থাকা স্বাভাবিক৷ তিনি এই পরিবারের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াবেন এবং দেখাশোনা করবেন, তাতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়৷ কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারটি, যাদের কথা ছাড়া সেখানে গাছের পাতাও নড়ে না, হঠাৎ করে তাদের দেখাশোনার প্রশ্ন কেন এল? নারায়ণগঞ্জের গডফাদার হিসেবে খ্যাত যে শামীম ওসমান কিছুদিন আগেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পায়ের তলায় পিষে মারার হুমকি দিতেন, তাঁকে কেন মৃত্যুভীতিতে পেয়ে বসল? কেন তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিলেন? মানুষ তখন ক্ষমা চায়, যখন তাঁর ভেতরে অতীত কর্মের জন্য অনুশোচনা জাগে৷ কিন্তু শামীম ওসমানের শারীর-ভাষা তার বিপরীত ইঙ্গিতই দেয়৷ তিনি সাংবাদিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অবিরাম বিষোদ্গার করে চলেছেন৷ আর প্রথম আলোর প্রতি তাঁর আক্রোশের কারণ, পত্রিকাটি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে৷ সাত খুনের প্রধান আসামি পলাতক নূর হোসেনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের গোপন বিষয়টি প্রথম অালো প্রকাশ করে শামীম ওসমানের মুখোশ খুলে দিয়েছে৷ সেই কথোপকথনে দেখা যায়, তিনি সন্ত্রাসী নূর হোসেনকে আত্মসমর্পণ করতে বলেননি, পালিয়ে যাওয়ার সুপরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশের কোনো আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পাসপোর্টে সিল বা ভিসা লাগে না। শামীম ওসমান তাঁকে জিজ্ঞেস করেছেন, পাসপোর্টে সিল আছে কি না? সম্ভবত তিনি নূর হোসেনকে ভারতের কোনো আদালতে আত্মসমর্পণ করতে এবং জনৈক গৌরদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। সর্বশেষ খবর, নূর হোসেন পশ্চিমবঙ্গের কোথাও পালিয়ে আছেন৷
ওসমান পরিবারের সদস্য ও জাতীয় পার্টির সাংসদ নাসিম ওসমানের মৃত্যু হয়েছে বিদেশের মাটিতে, অসুখে৷ তিনি ঘাতকের গুলিতে মারা যাননি৷ তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সমবেদনা ও সহানুভূতি জানালেন, অনুরূপ সমবেদনা কি নারায়ণগঞ্জে ঘাতকের হাতে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা তাঁর কাছে আশা করতে পারেন না? প্রধানমন্ত্রী কি প্রয়োজনে সেসব শোকাহত পরিবারকে দেখাশোনা করবেন না? নারায়ণগঞ্জে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাত খুনের আগে গত বছরের ৮ মার্চ মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী নিহত হয়৷ সে ছিল ও-লেভেলের মেধাবী ছাত্র৷ ও-লেভেল পরীক্ষায় একটি বিষয়ে সে সারা দেশে এবং একটি বিষয়ে সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে৷ কিন্তু পরীক্ষার সেই ফল ত্বকী দেখে যেতে পারেনি৷ তার আগেই তাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়৷ কারা তাকে খুন করেছে, কেন খুন করেছে তা নারায়ণগঞ্জে ব্যাপকভাবে আলোচিত৷ কিন্তু ত্বকী হত্যার তদন্তকাজ যখন শেষ পর‌্যায়ে, তখনই র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক জাহাঙ্গীর আলমকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলো৷ তার পরই সবকিছু থেমে যায়৷ কার ইঙ্গিতে? র৵াব-১১-এর অধিনায়কের বদলির সঙ্গে ত্বকী হত্যার তদন্তকাজ শেষ না হওয়া এবং পরবর্তী সাত খুনের ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার৷ গত ১৫ মাসেও ত্বকী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি৷ সেটি কি এ কারণে নয় যে এই হত্যার সঙ্গে সেই পরিবারের যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষী আছে? সেটি কি এ কারণে নয় যে ত্বকীর বাবা নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিলেন? সেটি কি এ কারণে নয় যে ত্বকীর বাবা গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন? সেটি কি এ কারণে নয় যে ত্বকীর বাবা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন? প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পার্টির নেতা নাসিম ওসমানের মৃত্যুতে যে সমবেদনা প্রকাশ করেছেন, নিহত ত্বকীর মা-বাবাও কি তাঁর কাছ থেকে অনুরূপ সমবেদনা পেতে পারেন না?
আশির দশকে রফিউর রাব্বি যখন ১৫ দলের কর্মী হিসেবে শেখ হাসিনার আহ্বানে স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন, নাসিম ওসমানেরা তখন এরশাদের লাঠিয়াল হিসেবে সেই আন্দোলন ভাঙতেই ব্যস্ত ছিলেন৷ এখন রফিউর রাব্বি সন্তান হত্যার বিচার চাইলেই কেন তা ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়ে যাবে? নাসিম ওসমানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘১৫ আগস্ট জািতর পিতাকে হত্যা করা হয়। তার আগের দিন নাসিমের বিয়ে ছিল। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে নাসিম হত্যার প্রতিশোধ নিতে গৃহবধূকে ফেলে রেখে চলে যায়। কোনো টান তাকে আটকাতে পারেনি। সে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেবে।’ (প্রথম আলো, ৪ জুন ২০১৪) বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে নববধূকে ফেলে চলে যাওয়া নাসিম ওসমান কিন্তু শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে থাকেননি। স্বৈরাচারী এরশাদের যুব সংহতির নেতা হয়ে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ঠেঙাতেই ব্যস্ত ছিলেন৷ অার সেই কাজে নূর হোসেন নামের এক দানবকেও দলে টেনে নিয়েছিলেন, যে পরবর্তীকালে ওসমান পরিবারের আরেক সদস্য শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন এবং সাত খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন৷ জাতীয় সংসদে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী অারও বলেছেন, ‘কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কোনো পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে হেয় বা ধ্বংস করার জন্য যে প্রচেষ্টা, সে বিষয়ে জাতিকে সজাগ থাকতে হবে।
..যাঁরা বারবার আঘাতের লক্ষ্যে পরিণত হন। ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য কিছু হলেও বড় করে লেখা হয়। অনেকে অনেক বড় অপরাধ করে; কিন্তু তা কেউ দেখে না। (প্রথম আলো, ৪ জুন ২০১৪) প্রধানমন্ত্রী যাকে ‘ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য কিছু’ বলেছেন, তা যে কতটা ভয়ংকর হয়ে ওঠে, সেটি প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগদলীয় সাবেক সাংসদ সারাহ্ হোসেন কবরীর চেয়ে ভালো কেউ জানেন না৷ প্রধানমন্ত্রী কোনো পরিবারকে হেয় না করার সদুপদেশ দিয়েছেন৷ কিন্তু একটি পরিবার কীভাবে পাঁচ বছর ধরে তাঁরই দলের একজন নারী সাংসদ ও দেশের প্রখ্যাত অভিনেত্রীকে পদে পদে নাজেহাল ও অপমান করেছে, তাতে কি তিনি হেয়প্রতিপন্ন হননি? জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির বৈঠকে শামীম ওসমান যে সাংসদ কবরীকে তেড়ে এসেছিলেন, সে ঘটনাও কি নারীর মর‌্যাদা রক্ষায় নিবেদিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে সামান্য কিছু বলে প্রতীয়মান হয়েছে? প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জের যে পরিবারটিকে দেখাশোনা করার কথা বলেছেন, সেই পরিবারটি যতই ঐতিহ্যবাহী হোক না কেন, এখন তারা কী করছে? ত্বকী হত্যার সঙ্গে ওসমান পরিবারের সম্পৃক্ততা কেবল অভিযোগেই সীমিত নয়৷ সাক্ষ্যসাবুদও আছে৷ ত্বকী হত্যা মামলার আসামি সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে ১৬৪ ধারায় যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা কীভাবে অগ্রাহ্য করবেন? সুলতান শওকত বলেছেন, ‘গত ৬ মার্চ রাতে শহরের কলেজ রোডে আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে খুন করা হয়। খুনের পর লাশ বস্তাবন্দী করে আজমেরী ওসমানের গাড়িতে তুলে চারারগোপে নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তাঁর জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি ৬ মার্চ বিকেলে শহরের কলেজ রোডে আজমেরী ওসমানের অফিস উইনার ফ্যাশনে যান। অফিসের অভ্যর্থনাকক্ষে তখন কাজল, শিপন, জেকিসহ আরও কয়েকজন বল খেলছিলেন। তিনি অনেকক্ষণ ধরে খেলা দেখেন। একপর‌্যায়ে তিনি অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটরে দেখতে পান, রাজীব ও কালাম টয়োটা এক্স ফিল্ডার গাড়ি নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।
রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাজীব, কালাম, মামুন ও লিটন ত্বকীকে নিয়ে আজমেরীর অফিসে আসেন। রাজীব ও কালাম ত্বকীকে আজমেরীর কক্ষে নিয়ে যান। এর দেড় ঘণ্টা পর কাজল তাঁকে (সুলতান শওকত) বলেন, ‘চলো তো দেখি, কাকে নিয়ে এসেছে।’ এরপর তাঁরা দুজন আজমেরীর পাশের কক্ষে যান। এ সময় আজমেরীর কক্ষ থেকে চিৎকার, চেঁচামেচি, গালাগালের শব্দ আসছিল। রাত ১২টার দিকে আজমেরী তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন। দরজা খোলার পর তিনি (শওকত) দেখতে পান, আজমেরীর কক্ষের ভেতর কালাম, লিটন, রাজীব ও মামুন দাঁড়িয়ে আছেন। আর ত্বকীর লাশ চোখবাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে মেঝেতে। দরজা খুলে বের হয়ে এসে আজমেরী কাজলকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সব শেষ। তোরা যেখানে পারিস লাশটা ফেলে আয়।’ সুলতান শওকত আরও বলেছেন, ‘লিটন, রাজীব ও কালাম ত্বকীর লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় আজমেরী তাঁকেও (শওকত) তাঁদের সঙ্গে যেতে বলেন। তিনি এতে রাজি না হলে আজমেরী শোকেস লক্ষ্য করে পিস্তল থেকে দুটি গুলি করেন। এরপর তিনিসহ রাজীব, কালাম, লিটন ও মামুন মিলে ত্বকীর লাশ আজমেরীর টয়োটা এক্স ফিল্ডার গাড়ির পেছনে তোলেন। চালক জামশেদ গাড়ি চালিয়ে চারারগোপে নিয়ে যান। রাত দেড়টার দিকে চারারগোপে ১৬ তলা দেলোয়ার টাওয়ারের বিপরীতে গাড়িটি থামে। পরে চালকের পাশের আসনে বসে শওকত গাড়ি পাহারা দেন। রাজীব, লিটন, মামুন ও কালাম ত্বকীর লাশ নিয়ে নদীর দিকে যান। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর তাঁরা লাশটি ফেলে ফিরে আসেন। এরপর সবাই আবার আজমেরীর অফিসে যান। সেখান থেকে যে যাঁর মতো চলে যান। গত সোমবার দিবাগত রাত দেড়টায় রূপগঞ্জ থেকে সুলতান শওকতকে গ্রেপ্তার করা হয়।
(প্রথম আলো, ১৫ নভেম্বর ২০১৩) সুলতান শওকতের এই জবানবন্দি কেবল প্রথম আলো নয়, দেশের সব পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছে৷ ছাপা হয়েছে কীভাবে আজমেরী ওসমানের ব্যবসায়ী অফিস উইনার ফ্যাশনকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো৷ একটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার লিটন গত বছরের ৩০ জুলাই আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ত্বকী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য জানান। ওই জবানবন্দিতে সুলতান শওকতের নাম আসে। এর পর থেকে র‌্যাব সুলতান শওকতকে খুঁজছিল। লিটন হচ্ছেন আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। লিটনের জবানবন্দির পর ৭ আগস্ট র‌্যাব-১১-এর সদস্যরা শহরের কলেজ রোডে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে পরিচিত আজমেরী ওসমানের অফিসে অভিযান চালিয়ে রক্তমাখা জিনস প্যান্ট ও গজারির লাঠি এবং নাইলনের রশি উদ্ধার করেন। দেয়ালে ও শোকেসে অসংখ্য গুলির আলামত পাওয়া যায়। (সূত্র: ওই) কে এই আজমেরী ওসমান? এই আজমেরী ওসমান হলো ত্বকী হত্যা মামলার আসামি, প্রয়াত নাসিম ওসমানের ছেলে ও শামীম ওসমানের ভাতিজা৷ খুনের মামলার অন্যতম আসামি সুলতান শওকত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পরই উচ্চ আদালত থেকে তাঁকে জামিন করিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে ত্বকী হত্যার কোনো সাক্ষী না থাকে৷ যেমন পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে সাত হত্যার প্রধান আসামি নূর হোসেনকেও৷ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কেউ অন্যায় করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷’ নারায়ণগঞ্জের মানুষ, নিহতদের স্বজনেরা সাত খুনের পাশাপাশি ত্বকী হত্যার বিচারও দেখতে চান৷ প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিয়েছেন৷ কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সাধারণ ও নিরীহ মানুষ, স্বজনহারা শোকাহত মানুষ ওসমান পরিবারের হাতে নিয়ত নিগৃহীত হচ্ছেন, তাদের দেখাশোনা কে করবেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

ট্যাক্সিক্যাব সমাচার

উপাখ্যানটি বহুশ্রুত, সত্য-মিত্যা জানি না, তবে সত্য হওয়ারই সমূহ সম্ভাবনা: বিতর্কিত ও স্বদেশ থেকে বহিষ্কৃত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন লেখক-সাংবাদিক মিনার মাহমুদ। তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর তিনি দীর্ঘদিন আমেরিকায় বাস করে সাম্প্রতিক কালে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর হঠাৎ করে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। তো আমেরিকায় অবস্থানকালে তিনি নিউইয়র্ক নগরে ট্যাক্সিক্যাব চালাতেন। সে সময় একদিন যাত্রী হিসেবে তাঁর ট্যাক্সিতে ওঠেন একজন সাদা মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। রাস্তায় যানজটে আটকা পড়ে (নিউইয়র্ক শহরেও আজকাল বেশ যানজট হয়) ভদ্রলোক ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে গল্প করতে শুরু করে দিলেন। একপর্যায়ে চালক বাংলাদেশ থেকে আগত জানতে পেরে তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন, চালক তসলিমা নাসরিনকে চেনেন কি না। ‘চিনবা না কেন, সে তো আমার এক্স-ওয়াইফ’—মিনার মাহমুদ জবাব দিলেন। ভদ্রলোক তৎক্ষণাৎ মিটারে প্রদর্শিত ভাড়া মিটিয়ে মাঝপথে ট্যাক্সি থেকে নেমে গিয়ে চালকের উদ্দেশে উপদেশ ছুড়ে মারলেন, ‘নেভার ড্রাইভ হোয়েন ইউ আর ড্রাংক—মাতাল অবস্থায় কখনো গাড়ি চালিয়ো না।’ স্পষ্টতই তসলিমা নাসরিনের সাবেক স্বামী ট্যাক্সিক্যাব চালান, এটা মেনে নিতে পশ্চিমা ভদ্রলোকের কষ্ট হচ্ছিল বৈকি! তা সে যাই হোক। সরকার সম্প্রতি আমাদের রাজধানী নগরে নাগরিকদের সুবিধার্থে নতুন আঙ্গিকে একটি ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস প্রবর্তন করেছে। এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি যখন বিলেতে বসবাসরত তখন ওখানকার টেলিভিশনে প্রদর্শিত জ্ঞান ও বুদ্ধিভিত্তিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘মাস্টারমাইন্ড’-এ লন্ডনের এক ট্যাক্সিক্যাব চালক চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন যে ট্যাক্সি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই তিনি ট্যাক্সিতে বসে সাধারণ জ্ঞানের বই পড়তেন।
আমাদের দেশে এটা কল্পনাও করা যায় না। আমাদের দেশের এক মন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন—গাড়ি চালাতে বিদ্যাশিক্ষার প্রয়োজন নেই; রাস্তায় গাড়ি চালানোকালে কে গরু আর কে মানুষ, এটা নির্ণয় করতে পারলেই হলো। তবে জনগণের সুবিধার্থে প্রবর্তিত এই সার্ভিস কতটা জনবান্ধব হয়েছে, তা ভাবার বিষয়; কেননা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে স্ট্যান্ড থেকে যাত্রীর অবস্থান পর্যন্ত আমার ভাড়াটাও নাকি অযৌক্তিকভাবে যাত্রীকেই দিতে হবে। ফিরে আসি নিউইয়র্কের হলুদ বর্ণের ট্যাক্সি ক্যাবের চালকদের কথায়। নিউইয়র্কের এক ট্যাক্সিচালক পূর্ব-পরিচিত ম্যানহাটনের জনৈক কোটিপতিকে তাঁর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার পর কোটিপতি তাঁকে ভাড়ার ওপরে যৎসামান্য ‘টিপস’ প্রদান করলে তিনি বলে বসেছিলেন, ‘আপনার মেয়ে কিন্তু আমাকে এর থেকে অনেক বেশি টিপস দিয়ে থাকেন। প্রত্যুত্তরে কোটিপতি বললেন, ‘হতে পারে; ওর বাপ তো কোটিপতি। আমার বাপ কোটিপতি হলে আমিও তোমাকে তদ্রূপ টিপস দিতাম।’ অবশ্য কথাবার্তায় লন্ডনের বিখ্যাত কালো ট্যাক্সিক্যাবের চালকেরাও কম যান না। গল্প আছে: একবার এক আমেরিকান পর্যটক বিলাতে বেড়াতে এসে সেখানকার কালো ট্যাক্সিতে করে লন্ডনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। ট্যাক্সিচালক যতই বিশাল ও সুউচ্চ অট্টালিকা দেখান না কেন, ওঁর মুখে স্রেফ এক কথা—‘আমাদের দেশে এ রকম বিল্ডিং আমরা বড়জোর সাত দিনে তৈরি করতে পারি।’ এমনকি বাকিংহাম প্রাসাদের বেলায়ও ওঁর কাছ থেকে একই রকম মন্তব্য পাওয়া গেল। ততক্ষণে ইংরেজ ট্যাক্সিচালকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটার উপক্রম হয়েছে, কিন্তু তিনি যাত্রীকে চটাতে চাচ্ছেন না। অবশেষে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবনের কাছে এসে যাত্রী ‘ওটা কী’ জিজ্ঞেস করতেই ট্যাক্সিচালক বলে উঠলেন, ‘দুঃখিত, আমি বলতে পারব না, স্যার। আজ সকালে আমি যখন এদিকে ট্যাক্সি চালিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন ওটা এখানে ছিল না।’ তা নিউইয়র্ক ও লন্ডনের ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে খোশগল্প যখন হলো, প্যারিসের ট্যাক্সিচালকেরা বাদ যাবেন কেন?
প্যারিসের ট্যাক্সিচালকেরা যুক্তি প্রয়োগে ওস্তাদ। গল্প আছে: শার্লক হোমস-এর স্রষ্টা বিখ্যাত ইংরেজ গোয়েন্দা কাহিিন লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েল একবার প্যারিসে ট্যাক্সিক্যাবে করে স্টেশন থেকে তাঁর হোটেলে পৌঁছান এবং তিনি যখন ট্যাক্সি থেকে নামতে যাচ্ছেন তখন চালক বলে উঠলেন, ‘মেখ্ছি (ধন্যবাদ), মাঁসিয়ো কোনান ডয়েল।’ ডয়েল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কে, এটা আপনি কীভাবে জানলেন? ‘প্রত্যুত্তরে ট্যাক্সিচালক যা বললেন তাতে বিখ্যাত গোয়েন্দা কাহিিন লেখকের চক্ষু চড়কগাছ।’ আজকের পত্রিকায় একটা খবর ছিল যে আপনি আজ প্যারিসে পৌঁছবেন, চালক বলে যেতে লাগলেন, ‘আপনার চেহারা দেখে আমি বুঝে নিয়েছি যে আপনি একজন ইংরেজ। তদুপরি আপনার নাম আপনার সঙ্গের লাগেজে লিখা আছে।’ আর হ্যাঁ, দুনিয়ার সর্বত্র ট্যাক্সিক্যাব চালকেরা সুযোগ পেলেই যে সোজা রাস্তার পরিবর্তে ঘুরপথে ঘুরিয়ে নিয়ে প্যাসেঞ্জারের পকেট খালি করার প্রয়াস পান, এ কথাটা সুবিদিত। যে কারণে জনৈক রসিক ব্যক্তি একদা বলেছিলেন, ইংরেজিতে ‘ট্যাক্সক্যাব’ না বলে ‘ট্যাক্সিডার্মি ক্যাব’ বলা উচিত, যেহেতু চালকেরা সুযোগ পেলেই যাত্রীদের চামড়া তুলে নেন। নিউইয়র্কের একজন ট্যাক্সিক্যাব চালক মি. রবার্টসন ও একজন িগর্জার বিশপ ফাদার ফ্লিন একই দিনে পরলোকগমন করলে সেইন্ট িপটার স্বর্গের পার্লি গেটে উভয়কে অভ্যর্থনা জানিয়ে ট্যাক্সিক্যাব চালকের জন্য বরাদ্দ করলেন একটি প্রাসাদোপম অট্টালিকা nআর বিশপের জন্য বরাদ্দ করলেন একটি মামুলি একতলা ভবন। বিশপ এতে আপত্তি জানালে সেইন্ট িপটার বললেন, ‘আমরা ইহলোকে কাজের ফলাফলের ওপর এখানে আবাসন বরাদ্দ করে থাকি। আপনি যখন িগর্জায় সারমন দিতেন তখন সেথায় লোকজন ঘুমাত, আর ট্যাক্সিচালক যখন রাস্তায় তীব্রগতিতে গাড়ি চালাত তখন আরোহীরা তো বটেই, রাস্তার লোকজনও কেবল ঈশ্বরের নাম জপ করত।’
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷