Friday, July 10, 2015

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় সরকার হতে পারে: কাজী জাফর by ছলিম উল্লাহ মেজবাহ

জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান প্রবীণ রাজনীতিবিদ কাজী জাফর আহমদ বলেছেন, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় সরকার হতে পারে। আর সে সরকারের অধীনেই দেশে সবার অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনাই বেশি। মানবকণ্ঠের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এককালের চীনাপন্থি বাম রাজনীতিবিদ ও এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী কাজ জাফর আহমদ একথা বলেন। শরীর বেঁকে বসলেই অস্ট্রেলিয়া চলে যান, সুস্থ হলেই দেশে ফিরে রাজনীতিতে ঢেউ তুলতে চান। এক সময়ে তিনি ছিলেন চারদলীয় জোটের নেপথ্য রূপকার। এখন সম্প্রসারিত ২০ দলীয় জোটে আছেন। ইফতার রাজনীতিতে খুব সক্রিয়। খালেদা জিয়ার ডানপাশ দখল করে বসেছেন গত ক’দিনের ইফতারে এককালের এই বাম নেতা। তিনি বলেন, সরকার এ বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চাইবে। কিন্তু শেষরক্ষা হবে না। সব কিছু মিলিয়ে দেশ গণঅভ্যুত্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ২০ দলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামী আছে এবং থাকবে মন্তব্য করে জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ বলেছেন, ঈদের পরে ২০ দল ঘুরে দাঁড়াবে। আগের চেয়ে এ জোট আরো শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, বেগম জিয়ার আবেদনে সাড়া দিয়ে ২০ দল আরো সম্প্রসারিত হবে।
রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসভবনে সম্প্রতি মানবকণ্ঠের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কাজী জাফর আহমদ এসব কথা বলেন।
জামায়াতের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে মন্তব্য করে কাজী জাফর আহমদ বলেন, বিএনপি বা ২০ দলের মধ্যে কোনো ভাঙন সৃষ্টি হবে না। বরং ২০ দলের এবং বিএনপির মধ্যে ঐক্য আরো সম্প্রসারিত হবে। মোট কথা বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠছে। তাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের কিছু মতপার্থক্য থাকতে পারে। সুতরাং বিএনপির মধ্যেও মতপার্থক্য থাকা অসম্ভব নয়। কিন্তু আমার ৬০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি এই মতপার্থক্য কোনো ভাঙনের দিকে যাবে না। বরং সম্প্রতি খালেদা জিয়া ইফতার পার্টিতে ২০ দলের বাইরে কয়েক শীর্ষ নেতাকে উদ্দেশ করে বলেছেন আসুন আমরা আলোচনা করি। কীভাবে দেশকে বাঁচাব, আমাদের মধ্যে কে বড়, কে ছোট সেই প্রশ্ন বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে কীভাবে এই জালিম সরকারকে পরিবর্তন করতে পারি। তিনি বলেন, সেই সময় আমি লক্ষ্য করেছি বেগম জিয়ার এই আহ্বানে ২০ দলের ভেতরে এবং বাইরে শীর্ষ নেতাদের একটি নীরব আন্তরিক সমর্থন ছিল। আমার মনে হয় কিছু রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ২০ দলের মধ্যে কোনো প্রকার ভাঙন সৃষ্টি করবে না।
আরেক প্রশ্নের জবাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করে কাজী জাফর আহমদ বলেন, দেশ তো একটা পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে সরকার ক্ষমতায় থাকতে চায়। যতই স্টিমরোলার ও নির্যাতন চালাক বিএনপিসহ ২০ দলকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না সরকার। ইতিহাস বলে এটা কখনো সম্ভব হবে না। এমন এক পরিস্থিতিতে দেশে ক্ষমতা পরিবর্তনের একটা সুস্পষ্ট আলামত দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকার যতই চেষ্টা করুক নির্যাতন চালিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে।
নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সরকার কায়েম হতে পারে জানিয়ে কাজী জাফর আহমদ বলেন, কেউ কেউ মনে করেন ড. ইউনূস আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু আমি বলতে চাই শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে ড. ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নরেন্দ্র মোদি একজন ঝানু রাজনীতিবিদ। যেভাবেই হোক মোদি ভারতের স্বার্থ দেখবেন।
ভারতের জনগণ মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রতি যে সম্মান জুগিয়েছে, তেমনি এখনো আমাদের প্রতি তাদের সেই সমর্থন অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অন্ধ ভারতবিরোধী বা অন্ধ ভারত সমর্থক নই। আমরা ভারতের রাষ্ট্রীয় আগ্রাসী নীতির সমালোচনা করি। এটা সত্য নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের কাছ থেকে যা নেয়ার সবই নিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তির ব্যবধান এত বেশি, বিশেষ করে তিস্তার চুক্তি না হওয়া। তিনি বলেন, যদিও আমাদের ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশে বর্তমান ক্ষমতাসীন শাসক চক্রের অবদান বেশি। একটা অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশের জন্য মোদির সফরে প্রত্যাশিত সুফল পায়নি বলেও দাবি তার।

পদদলনে নিহত ২২ জনই নারী ও শিশু

ময়মনসিংহ শহরে আজ শুক্রবার ভোরে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদদলিত হয়ে যে ২২ জন নিহত হয়েছেন, এর মধ্যে ২০ জনই নারী। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। তারা হলো ছিদ্দিক (১২) ও লামিয়া (৫)।
শহরের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল ইসলামের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ২২ জনের লাশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২১ জনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে লামিয়া ও ছিদ্দিক নামের শিশু রয়েছে। বাকি ২০ জন বিভিন্ন বয়সী নারী।
ময়মনসিংহ শহরে আজ ভোরে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা যান ২২ জন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রত্যক্ষদর্শী ময়না (৭০)। ছবি: জগলুল পাশা, ময়মনসিংহ
ওসির দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ১৯ জন হলেন ফজিলা বেগম (৭৫), হাজেরা (৭০), রহিমা বেগম (৬৫), ফাতেমা বেগম (৬০), রিনা রানী দে (৬০), সৃষ্টি রানী সরকার (৫৫), জোহরা খাতুন (৫২), নাজমা বেগম (৫০), খোদেজা (৫০), হামিদা বেগম (৪৫), ফাতেমা বেগম (৪২), সখিনা (৪২), শাহারন বেগম (৪০), রিজিয়া আক্তার (৪০), মমতাজ বেগম (৪০), সুফিয়া বেগম (৩৫), সামু বেগম (৩৫), আদুরি বেগম (৩৫) ও রুবিয়া আক্তার (২২)। অপর জন অজ্ঞাতনামা নারী।
জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা গেছেন মা খোদেজা বেগম। মায়ের শোকে মিতু আক্তারের আহাজারি। ছবিটি আজ ময়মনসিংহের শহরের থানার ঘাট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: জগলুল পাশা, ময়মনসিংহ
পদদলনের ঘটনা সম্পর্কে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক সঞ্জীব কুমার চক্রবর্তীর ভাষ্য, এলাকার ব্যবসায়ী ও নুরানি জর্দা ফ্যাক্টরির মালিক শামীম তালুকদার প্রতি বছরই জাকাতের কাপড় দেন। আজ তাঁর বাড়িতে জাকাতের কাপড় দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় নির্ধারণ করা ছিল না। এ কারণে সেহেরির পর থেকে সেখানে দুস্থ মানুষের ভিড় জমতে থাকে। শামীম তালুকদারের বাড়ির সামনের রাস্তাটি তেমন চওড়া নয়। অতিরিক্ত মানুষের চাপ ঠেকাতে ভোর পাঁচটার দিকে ওই বাড়ির প্রবেশ ফটক খুলে দেওয়া হয়। এ সময় হুড়োহুড়ি করে বাড়ির ভেতর ঢুকতে গিয়ে কেউ কেউ পড়ে যান। এতে পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
মা খোদেজা বেগমের মৃত্যুতে মেয়ে মিতু আক্তারের আহাজারি। ছবি: জগলুল পাশা, ময়মনসিংহ
সঞ্জীব কুমার চক্রবর্তী বলেন, ওই ঘটনার পর স্বজনেরা নিহতদের লাশ নিয়ে যায়। এ কারণে এ দুর্ঘটনায় ঠিক কত জন নিহত হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ায় এসব লাশের ময়নাতদন্ত প্রয়োজন। এ জন্য স্বজনদের নিয়ে যাওয়া লাশগুলো উদ্ধার করতে পুলিশ বিভিন্ন বস্তিতে তল্লাশি চালাচ্ছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মাহবুবুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় জাকাতদাতা শামীম তালুকদারসহ ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। আগামী বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক’র শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এ আমন্ত্রণ জানান।
রাশিয়ার উফা নগরীতে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা এসসিও’র শীর্ষ সম্মেলনের অবকাশে দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের সময় এ আমন্ত্রণ জানানো হয়। দু’দেশের এক যৌথ বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শংকর।
অবশ্য এর আগে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভারত অস্বীকার করেছিল। পাক পররাষ্ট্র সচিব এজাজ চৌধুরী বলেছেন, আন্তরিক পরিবেশে নওয়াজ ও মোদির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় এবং আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে দুই নেতা আলোচনা করেছেন বলে জানান তিনি। শান্তি নিশ্চিত করতে এবং উন্নয়ন এগিয়ে নিতে পাকিস্তান ও ভারতের  সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে দুই নেতা সম্মত হয়েছেন বলেও জানান এজাজ চৌধুরী।
এদিকে জয়শংকর জানান, নয়াদিল্লিতে পাক-ভারত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠক আয়োজন এবং সেখানে সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত সব বিষয়ে আলোচনার বিষয়েও দুই প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন।

পতিদাহ by আন্দালিব রাশদী

২৩ নভেম্বর ১৯০২।
একটু আগে শ্রীমতী মৃণালিনী দেবীর আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বেরোনোর আগে তার অবিনশ্বর আত্মাকে নশ্বর দেহের নির্দিষ্ট কোটরে আটকে রাখার জন্য হোমিওপ্যাথ ও অ্যালোপ্যাথ প্রচেষ্টার কোনো ত্রুটি করা হয়নি। ২৬ দিন আগে ২৯ অক্টোবর যখন তার জন্য বেডপ্যান কেনা হয়, তখনই আশঙ্কা জেগেছিল ভব বোধ হয় আর টিকবে না। তার স্বামী রবি কোনো দিনও স্ত্রীকে ভব বলে ডাকেনি, বরং তার শ্বশুর বেণীমাধবের দেওয়া নাম ‘ভবতারিণী’ পাল্টে নিজের পছন্দের নাম ‘মৃণালিনী’ চাপিয়ে দিয়েছে পাতলা টিংটিংয়ে মেয়েটির ওপর। বিয়ের সময় রবির বয়স ২২ বছর ৭ মাস আর মেয়ের ৯ বছর ৯ মাস। মেয়েটি দেখতেও তেমন সুশ্রী নয়। ফরসা ও সুদর্শন মেয়ের জন্য যথেষ্ট খোঁজাখুঁজি করা হলেও যশোরের পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে সে সময় বিয়ের যোগ্য আর কোনো সুন্দরী মেয়ে পাওয়া যায়নি। ভালোতে-মন্দেতে মিলিয়ে রবির সঙ্গে উনিশ বছর ঘর করে চিতায় উঠল মৃণালিনী। মনে কিঞ্চিৎ পাপ ছিল বলেই তা মোচন করতে শেষ সময়ে রবি মন দিয়েছিল স্ত্রীর সেবায়। শেষ দিন মৃণালিনী নির্বাক থাকলেও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল রবির দিকে। দুর্বোধ্য সেই চোখের ভাষা। সাদামাটা শেষকৃত্যে রবির বুড়ো বাবা দেবেন ঠাকুর খরচ করেছিলেন ২৮ টাকা ২ পয়সা।
টাকাপয়সার যোগ-বিয়োগ যাঁরা করেছেন, তাঁরা এটা বলতে ছাড়েননি, মেয়েমানুষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সাঙ্গ করতে এত্তগুলো টাকা বেরিয়ে গেল!
রবি সটকে পড়ার তালে ছিল। সেটাই হওয়ার কথা। হ্যাঁ, ঠাকুরবাড়ির এতগুলো কর্মচারীর নাকের ডগার ওপর দিয়ে পালিয়েই গেল রবি। দেশের যে কানুন সবার জন্য প্রযোজ্য, রবির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হবে কেন?
দেবেন ঠাকুর যে টাকা বউমার জন্য খরচ করলেন, এর সঙ্গে আর গোটা দশেক যোগ করলে রবির অন্ত্যেষ্টিকর্মও সারা যেত। কিছু বাড়তি বাঁশ, খড়ি আর ঘি। তা ছাড়া রবির শরীরেও যথেষ্ট চেকনাই। একবার আগুন ধরে গেলে শরীরের স্নেহ-মাখন-ঘি আপনি উতলে উঠে অগ্নিশিখাকে লেলিহান করে তুলত। দেশলাইয়ের কাঠি খরচ হতো একটাই। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদের বুদ্ধিশুদ্ধির ঘাটতি আছে। নইলে পালিয়ে যাওয়া রবিকে ধরে চিতায় তুলতে এত পেরেশান হতে হয়! চিতা সাজানোর খরচ তো আছেই। পতিদাহ তো আর ধর্মের বাইরে কিছু নয়। বাংলায় আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। রবির জন্য বছরটা এমনিতে ভালো যায়নি। গত বছর পৌষ মাসের ৭ তারিখ, ডিসেম্বরের ২২, রবি শান্তিনিকেতনে যে স্কুলটা বসিয়েছে, তার খরচ জোগাতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। শুরুতেই তো আর ট্যুশন ফি আর বোর্ডিং চার্জ চাওয়া যায় না। আগে স্কুলটা জমে উঠুক, তখন দেখা যাবে। কুষ্টিয়ায় যে ব্যবসা খুলেছিল, তাতে ভীষণ মার খেল। পুরীর বাড়িটা বেচতে হলো। এই হতভাগী বউটাও নিজের কিছু অলংকার ছেড়ে দিয়েছিল স্কুলের জন্য। স্কুলে প্রথম ব্যাচে যোগ দেওয়া শিক্ষকদের মধ্যে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়সহ তিনজন গ্রীষ্মের ছুটির পর শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেননি। এর মধ্যেই আবার স্ত্রী বিয়োগ! লোকজন রাস্তায় নামল। স্ত্রীর চিতার আগুন পুরোপুরি নেভার আগেই পতিকে শুইয়ে ফেলতে হবে। পালিয়ে যাবে কত দূর? জলে-স্থলে-অন্তরিক্ষে চৌকি বসিয়ে ওর অবস্থান শনাক্ত করা হবে। তারপর পাঠানো হবে নিকটবর্তী স্ন্যাচার ব্রিগেড, তারাই প্রতিরোধ ও প্রতিকূলতার মধ্যে রবিকে ছিনিয়ে এনে প্রয়োজনে হাত-পা বেঁধে চিতায় শুইয়ে দেবে। এ কেমন কথা! চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যাবে। অথচ এই মানুষই না নিজের দেহত্যাগ করে আত্মাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল হাজার মাইল দূরে ঘুমন্ত স্ত্রীর কাছে। ১৮৯০-এর ২৪ আগস্ট রোববার। বোম্বে থেকে জাহাজে চড়ে বিলেতে যাচ্ছে রবি। এডেন থেকে নিজ হাতে সে স্ত্রীকে লিখেছে, রোববার দিন রাতে তার আত্মা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে জোড়াসাঁকোয় চলে যায়। মৃণালিনী তখন একটা বড় খাটে শুয়ে। এত দূর এসে বউটাকে না ছুঁয়ে যায় কেমন করে—‘আমি তোমাকে একটু একটু আদর করলুম আর বললুম ছোট বউ মনে রেখো আজ রবিবার রাত্তিরে শরীর ছেড়ে বেরিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করে গেলুম—বিলেত থেকে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করব তুমি আমাকে দেখতে পেরেছিলে কি না।’ রাজ্যের মানুষকে ডজন ডজন চিঠি পাঠিয়েছে রবি কিন্তু উনিশ বছরের বউকে চিঠি লিখেছে মাত্র তিন ডজন। স্বীকার করুক কি না-ই করুক, পূর্ববঙ্গের যশোরের এই মেয়েটিকে সে কিছুটা উপেক্ষাই করেছে। উপেক্ষার বড় প্রমাণ যখন মৃণালিনীর চিতা বহ্নিমান, কোথায় একজন একনিষ্ঠ স্বামীর মতো স্ত্রীর চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়বে, চারদিকে প্রবল বাদ্য বেজে চলবে, জীবনের অগ্নিশুদ্ধ আত্মা হাত ধরাধরি করে মিলিয়ে যাবে অসীম শূন্যে, কিন্তু তা না করে সে পালিয়ে গেল লোকচক্ষুর অন্তরালে।
২. পতিই হোক কি পত্নী—যে আগে যাবে, যাওয়ার সময় সঙ্গীকে নিয়ে যাবে সঙ্গে। কিন্তু তখন তো বাংলা এমন নারীবান্ধব ছিল না। পতিরাই যাওয়ার সময় পত্নীকে সঙ্গী করত। দু-একজন দুর্বিনীত স্ত্রী চিতা থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়তে চেষ্টা করত, তাতে কাজ হতো না। চিতার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে নিয়োজিত বাঁশের লাঠি বাহিনী রে রে করে তেড়ে আসত—পালাবি কোথায় হতভাগী? বাঁশ-পেটা করে তাকে ছুড়ে ফেলা হতো চিতার সবচেয়ে গনগনে অগ্নিকুণ্ডে। ঘাটের মড়াই হোক কি তারুণ্য টগবগে খোকাই হোক, ভস্মীভূত হতে হতে স্মিতহাস্যে বলে উঠত, পালাবি কোথায় হতভাগী? আমার সঙ্গে ওপারে চল। বাকিংহ্যামশায়ারের ছেলে, প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম বেন্টিংক আর ডেভোনশায়ারের ডিউক উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিশের একমাত্র কন্যা ডরোথির পুত্র লর্ড উইলিয়াম হেনরি ক্যাভেন্ডিশ বেন্টিংক যখন ভারতবর্ষ শাসন করছেন, সতীদাহে খুব মনঃক্ষুণ্ন হলেন। তাঁকে আরও প্ররোচনা দিলেন রাজা রামমোহন রায়। রামমোহনেরও একজন প্রিয় বউদি ছিলেন। দাদার মৃত্যুর পর যখন সেই বউদিটিকে চিতায় ওঠানো হচ্ছে, রামমোহন বাধা দিয়েছিলেন, বউদিকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ ও প্ররোচনা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই নাফরমানি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে দেননি সমাজপতি মুরব্বিরা। অনেক দিন পর ইংরেজের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রামমোহন সেই শোধটাই নিলেন। বেন্টিংকের সই ও সিলমোহর নিয়ে ৪ ডিসেম্বর ১৮২৯ সালে জারি হলো সে বছরের ১৭ নম্বর আইন: বেঙ্গল সতী রেগুলেশন। সতীর সহমরণ চর্চা নিষিদ্ধ তো করা হলোই, সেই সঙ্গে সহমরণে সহায়তাকারী কিংবা বাধ্যকারীদের জন্য বরাদ্দ হলো ফৌজদারি দণ্ড। যে নারী সানন্দে স্বামীর চিতায় আরোহণ করে সহাস্যে ভস্মীভূত হওয়ার চ্যালেঞ্জ নেয়, সেই না অরুন্ধতীর মতো স্বর্গগামী হয়। স্বামীকে অনুসরণ করে যে নারী পরপারের যাত্রী হয়, লাভ করে তিন কোটি পঞ্চাশ লাখ বছর আনন্দময় সহবাসের গ্যারান্টি। পিতৃকুল, মাতৃকুল এবং কুমারী অবস্থায় যে কুলে আগমন করেছে, তিন কুলের সমুদয় পাপ স্খলন করে তাদেরও স্বর্গারোহণের নিশ্চয়তা দিতে পারে সেই নারী, এমনকি ব্রাহ্মণ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ থেকেও স্বামীকে মুক্ত করে নিয়ে স্বর্গে চলে আসতে পারে অগ্নিশুচিস্নাত মর্ত্যের এই দেবী।
রবি লিখে লিখে যথেষ্ট হাত পাকিয়েছে। কী কথা লিখেছে?
খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর
বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে।
দাও সাড়া দাও, এই দিকে চাও,
এসো দুই বাহু বাড়ায়ে।
ঠিকই লিখেছে। মৃণালিনী দুই বাহু বাড়ায়েই আসছে। দুই বাহুতে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। মরণলোকের দুয়ার খুলে ছুটে আসা এই নারীর বাহুলগ্ন হতে হবে এই আতঙ্কে রবি ছুটছে তো ছুটছেই।
অথচ এই রবিই লিখেছে:
তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে আলোয় আকাশ ভরা।
তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে
ফুল্ল শ্যামল ধরা। কেমন করে সে মিলন হবে? পতিদাহের আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসেছে। শেষ পর্যন্ত রবি ধরা পড়ল শাহজাদপুর কুঠিবাড়িতে। নিলাম ডাকে ১৩ টাকায় কেনা এই কুঠিবাড়ির একটি গোপন কুঠুরিতে লুকিয়েছিল আর নারী নাম জপছিল—ও মৃণালিনী, ও মৃণালিনী। বিড়বিড় করে সে বলল, হে নারীদরদি লর্ড বেন্টিংক, আপনি আইন করে সতীদাহ নিবারণ করলেন কিন্তু পতিদাহ নিয়ে তো একটি কথাও বললেন না। হে রাজা রামমোহন রায়, বউদিকে আপনি ভালোবাসতেন বলেই তো তাকে চিতায় তুলতে চাননি, বউদিকে ভালো তো আমিও বাসতাম। আপনার তিন স্ত্রীর দুজন তো আপনার জীবদ্দশায়ই লোকান্তরিত হলেন, কই চিতায় ওঠার জন্য আপনাকে তো কেউ জোর-জবরদস্তি করেননি। নাকি এপারে স্ত্রীসঙ্গ যতটুকু পেয়েছেন, তাতেই যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে মনে করে ওপারে কেবল পুরুষবেষ্টিত থাকার মানসে সতীবর্জিত বিলেতে চলে গেলেন। আমি এলাম শাহজাদপুর, তা-ও ধরা পড়ে গেলাম। ঘাতকেরা বাইরে দাঁড়িয়ে। চিতা সাজিয়ে রেখেছে। আমাকে মৃণালিনীর কাছে পাঠিয়ে দেবে। আপনি সময়মতো কেটে পড়লেন, আমার জন্মেরও ২৮ বছর আগে ১৮৩৩-এ ম্যানিনজাইটিসে ভুগে দেহ রাখলেন ব্রিস্টল শহরে। বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন। পতিদাহকারীদের পাল্লায় আপনাকে পড়তে হয়নি। দরজায় প্রবল ঘা পড়ছে। কপাট খোল দেবেন ঠাকুরের ছাওয়াল, তোর খবর আছে। চিতা গরম থাকতে থাকতে তোকে ধরে নিয়ে শুইয়ে দিতে হবে। রবির চোখে অশ্রু নেমে আসে। এ জীবনে দিদিমার দেখা সে পায়নি। সুন্দরী সেই নারী নির্বসনা হোন কি পোশাকাবৃত্ত থাকুন, তাঁর নাম দিগম্বরী। তিনিও যশোরের মেয়ে, রামতনু বাবু আর আনন্দময়ী দেবীর কন্যা, জগদ্ধাত্রী প্রতিমার মতো মুখের বর্ণ ও গড়ন, সে তুলনায় মৃণালিনী তো কিছুই নয়। দিগম্বরীও পারেননি তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ ঠাকুরকে সহমরণে বাধ্য করতে। দ্বারকানাথ রামমোহনের প্ররোচনায় মুসলমান বাবুর্চির হাতের রান্না খেতেন, ম্লেচ্ছ খ্রিষ্টানদের সঙ্গে বসে শেরি-শ্যাম্পেন পান করতেন, ইউরোপীয় বাদ্য শুনতেন, যৌন উত্তেজক নৃত্যও উপভোগ করতেন। দিদিমা এসব ভ্রষ্টাচার সহ্য করতে না পেরে তাঁর সঙ্গে নিশিযাপন ও সঙ্গম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন—‘যতবার তিনি দ্বারকানাথের সহিত কথা কহিতে বাধ্য হইতেন, ততবারই সাতঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করিয়া নিজেকে পরিশুদ্ধ করিতেন।’ রবির সেই দিদিমা ২১ জানুয়ারি ১৮৩৯ দেহত্যাগ করেন। নির্বিকার দ্বারকানাথ তাঁকে চিতায় উঠিয়ে দেন, একবারও তাঁর মনে হয়নি স্ত্রীর সঙ্গী হয়ে ওপারে চলে যাবেন, ঝাঁপিয়ে পড়বেন স্ত্রীর চিতায়। ১৮৪৫-এর মার্চে দ্বারকানাথ বিলেত চলে গেলেন। ১৮৪৬-এর আগস্টের প্রথম দিন তিনি অবস্থান করছিলেন সেইন্ট জর্জ হোটেলে, সেদিন ছিল প্রচণ্ড ঝড়বাদল। এরই মধ্যে দ্বারকানাথের পৌরুষ আত্মা দেহমুক্ত হয়ে গেল। তাঁর সঙ্গে সহমরণে যাওয়ার মতো কোনো নারীর সন্ধান মেলেনি। পাঁচ দিন পর কোনো ধর্মীয় আচার ছাড়াই তাঁর আত্মাহীন দেহ সমাহিত করা হলো কেনসাল গ্রিন সিমেট্রিতে আর ব্রাহ্ম আচারমতে, শেষকৃত্যের জন্য তাঁর হৃৎপিণ্ড পাঠিয়ে দেওয়া হলো কলকাতায়। কই, তাঁকেও তো পতিদাহের শিকার হতে হয়নি। রবির এবার মায়ের কথা মনে পড়ল। যে ব্রাহ্মমুহূর্তে যশোরের দক্ষিণডিহি গ্রামের সারদাসুন্দরী দেবী লোকান্তরিত হলেন, পতিদাহের ভয়েই হোক কি অন্য কোনো কারণেই হোক, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। রবির বয়স তখন কত? তখনো ১৪ হয়নি। সারদা দেবী যে রোগে ভুগছিলেন কী নাম তার? কর্কট! তঁার হাতে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। হোমিওপ্যাথির আর্নিকা দিয়ে চিকিৎসা শুরু হলেও প্রফেসর প্যাট্রিজ এফআরসিএসও তাঁর চিকিৎসা করেন। রবির বাবাকে একটার পর একটা টেলিগ্রাম পাঠানো হয়, সারদার জীবনের শেষ বছরটিতে একটিবারের জন্যও তাঁকে দেখতে আসেননি তিনি। চিতার ছাইয়ের শেষ কণাটুকু বাতাসে উড়ে যাওয়ার অনেক পরে দেবেন ঠাকুর কলকাতায় ফিরে আসেন। পিতামহ ও পিতার পাপ এবং নিজের উপেক্ষার প্রায়শ্চিত্তই রবিকে করতে হবে। স্ন্যাচার স্কয়াডের চৌকস যুবকেরা ঘরের দরজা ভেঙে ফেলল। আতঙ্কিত রবি অশ্রুসিক্ত ঝাপসা চোখে তেমন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। গনগনে আগুনের লেলিহান শিখায় মৃত্যু আসন্ন জেনে চিৎকার করে বলতে চাইছে, ও কথা আমি বলিনি, আমার কথা নয়।
কোন কথা?
মরণ রে,
তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।
মেঘবরন তুঝ, মেঘজটাজূট
রক্তকমলকর, রক্ত অধরপুট,
তাপবিমোচন করুণ কোর তব
মৃত্যু-অমৃত করে দান। চ্যাংদোলা করে হাত-পা বাঁধা রবিকে চার বেহারার পালকিতে তুলে দেওয়ার আগে ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে বলল, পতিদাহই যদি করবে আমাকে তোমরা, তখন কেন করলে না?
তখন মানে?
আরও ১৮ বছর আগে, ১৮৮৪-র ২১ এপ্রিল, সেদিন কেন আমাকে ধরলে না। আমাকেও কাদম্বরীর সঙ্গে...। রবি কথা শেষ করতে পারে না। ভেতর থেকে উত্থিত কান্না তার দেহ ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে। তাহলে তোকে কেন, জ্যোতিকে পতিদাহের চিতায় তুলতে হতো। সে-ই তো কাদম্বরীর স্বামী। চোখ মুছতে মুছতে রবি বলল, সে তো কাগজে-কলমে। জ্যোতিদা বড্ড ঠকিয়েছে এই মেয়েটিকে। আমি একা আর কতটুকু ক্ষতিপূরণ করতে পেরেছি। এর মধ্যে আবার মৃণালিনী ঢুকে পড়ে বেচারির জীবনটাকে আরও কষ্টকর করে তুলল। আত্মহত্যার প্রথমবারের চেষ্টাটা বিফলে গেল, কিন্তু সাড়ে তিন বছর পর কাদম্বরী যখন আত্মঘাতী আফিম সেবন করল, তখন তাকে আর কে বাঁচায়। দুই দিন পর কাদম্বরীকে শ্মশানে নেওয়ার সময় আমিও তো উপস্থিত ছিলাম। আমাকে সেখানে চেপে ধরলেও তো পারতে। রবিকে আর কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তাকে পালকিতে উঠিয়ে বেহারারা ছুটল। ওদিকে চিতায় বর্ষণ করা হলো আরও গব্যঘৃত। আগুন জ্বলতে থাকুক, যেখানেই থাকুক রবিকে দিয়েই শুরু করতে হবে বিশ শতকের প্রথম পতিদাহ। কাদম্বরীর কী দোষ? জ্যোতির সঙ্গে নটীবিনোদিনীরা, রবির ঘরে নতুন বউ। মরতেই তো হবে। দেরি করে কী লাভ। কাদম্বরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালাতে, পত্রিকার মুখ বন্ধ করতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদের খরচ হয়েছে সাকল্যে ৫২ টাকা। মৃত্যু-আতঙ্ক ও কাদম্বরীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দৃশ্যপটে পালকিবন্দী রবি ধীরে ধীরে আবৃত্তি করছে:
হয়ত জান না দেবী অদৃশ্য বাঁধন দিয়া
নিয়মিত পথে এক ফিরাইছ
মোর হিয়া।
গেছি দূরে, গেছি দূরে, সেই
আকর্ষণ আছে,
পথভ্রষ্ট হই নাই আহারি অটল বলে।
নহিলে হৃদয়ে মম ছিন্ন ধূমকেতু সম
দিশাহারা হইত সে
অনন্ত আকাশতলে। রবির মৃত্যুভয় কাটতে থাকে। কাদম্বরীও ওপারে। তার কাছেই যেতে হবে মৃণালিনীর চিতায় সওয়ার হয়ে। রবির ভস্ম আউলা বাতাসে অখণ্ড বঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। সেই ভস্মে সুফলা হয়ে উঠল রবিকরোজ্জ্বল বাংলাদেশ।

যাই হোক আশরাফ তো বিতর্কিত ছিলেন না by দীন ইসলাম

আভাস পাওয়া গিয়েছিল আগেই। মঙ্গলবার ছিল গুজব। একদিন বাদে এসে হলো সত্য। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়  (এলজিআরডি) মন্ত্রীর দপ্তর হারালেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। কেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের ভাগ্য বিপর্যয় হলো এ প্রশ্ন এখন সর্বত্র। মন্ত্রণালয়ে অনুপস্থিতির অভিযোগ তার বিরুদ্ধে পুরনো। গত মেয়াদের সে রেকর্ড জানার পরও এবার তাকে মন্ত্রী করা হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক এলজিআরডি মন্ত্রী হবেন ‘গণতান্ত্রিক যুগে’ এটা বাংলাদেশে অনেকটা রীতিতেই পরিণত হয়েছিল। গতকালই প্রথম এর ব্যতিক্রম দেখা গেলো। এলজিআরডি মন্ত্রী হলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তার ইমেজ ঘাটতি না থাকলেও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি কখনোই প্রভাবশালী ছিলেন না। এলজিআরডি মন্ত্রী হওয়ায় দলেও তার গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার ইংগিত হতে পারে।
জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতেন। দলীয় সভানেত্রীর বিশ্বস্ত হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়ে জিল্লুর রহমানের সঙ্গে মিলে শেখ হাসিনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন তিনি। দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরও কর্মীদের সময় না দেয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। তবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোন অভিযোগ ছিল না। তাকে নিয়ে বিতর্কও ছিল না। ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিপদের সময় সবসময়ই শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। কিছুদিন আগেই ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, আওয়ামী লীগে সবাই মোশতাক হয় নাই। সবাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। অনেকেই নিজের জীবন দিয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বাস রক্ষা করেছিলেন। পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, বর্তমান মন্ত্রিসভায় অনেক মন্ত্রীকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দুর্নীতির মামলার সাজা আর গম কেলেঙ্কারি নিয়ে সাম্প্রতিককালে চরম বিতর্কে পড়েন দুই মন্ত্রী। এ ছাড়া, অনেকের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তাদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হলো সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ যেন অসুস্থ রাজনীতির কাছেই হেরে গেলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
তবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অনুপস্থিতির অভিযোগও বহুল আলোচিত। এলজিআরডি মন্ত্রী হিসেবে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নেন ২০১৪ সালের ১২ই জানুয়ারি। পরদিন ১৩ই জানুয়ারি সকাল ১০টায় মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য সচিবালয়ের দপ্তরে যান। সেখানে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিবসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় করেন। দুপুরে তিনি সচিবালয় ত্যাগ করেন। একই বছরের ২১শে মে অর্থাৎ পাঁচ মাস পর দুই ঘণ্টার জন্য নিজের কার্যালয়ে যান সৈয়দ আশরাফ। ওই দিন ইউএনডিপি’র একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক করেই দপ্তর থেকে বেরিয়ে যান। অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কিছু বলেননি। এরপর মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিয়মিত অংশ নিলেও পা বাড়াননি নিজ দপ্তরের দিকে। অন্যদিকে মহাজোট সরকারের প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদেও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ দপ্তরে গিয়েছিলেন সব মিলিয়ে ২৫ দিন। মন্ত্রণালয়ের খুব জরুরি নথিপত্র থাকলে বিশেষ ব্যবস্থায় বাসা থেকে মন্ত্রীর স্বাক্ষর করিয়ে আনা হতো। ওই কাজটিও করতেন তার এপিএস। মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) অশোক মাধব রায়ের ভূমিকা ছিল এক্ষেত্রে অনেকটাই গৌণ। মন্ত্রীর অহেতুক অনুপস্থিতির বিষয়টিকে সঠিক মনে করেন না সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নিয়েছিলেন দায়িত্ব পালনের জন্য। তিনি মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী। তাকে প্রত্যেক কর্মদিবসেই দপ্তরে থাকা উচিত ছিল। তার অনুপস্থিতিতে অবশ্যই দাপ্তরিক কাজের ব্যাঘাত ঘটেছে। যদি মন্ত্রী অসুস্থ থাকেন, কিংবা দলের জরুরি কাজে, কোন অনুষ্ঠানে বা বিদেশে থাকেন তাহলে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। দেশে থাকলে তাকে অবশ্যই মন্ত্রণালয়ে অফিস করা উচিত ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, মন্ত্রী হিসেবে তার অনুপস্থিতির কারণে সরকারের পাশাপাশি পুরো দেশ বিব্রত হয়েছে। আমি মনে করি এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব অবহেলা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মহাজোট সরকারের প্রথম তিন-চার মাস বাদ দিলে বাকি সময়টুকুতে আর  তেমন একটা সচিবালয়ে যাননি মন্ত্রী। এর ফলে গত পাঁচ বছরে বড় ধরনের শূন্যতাও সৃষ্টি হয় গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে। যার ফলে মাঠপর্যায় থেকে দলীয় সংসদ সদস্য এবং দলের জেলাপর্যায়ের নেতারা ঢাকায় মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজের এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও মন্ত্রীর দেখা পেতেন না। একই অবস্থা নতুন সরকার গঠনের পরও বিদ্যমান ছিল। এলজিআরডি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে গণমানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হচ্ছে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ রাস্তাঘাটের উন্নয়নে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এলজিআরডি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে সৈয়দ আশরাফুল দায়িত্ব পালন করলেও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় পার্টির মসিউর রহমান রাঙ্গা শুধু পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিমন্ত্রীকে আন-অফিসিয়ালি বলে দেয়া হয়, তার বিভাগের জরুরি নথিতে তিনিই যেন স্বাক্ষর করে দেন। খুব জরুরি না হলে মন্ত্রীর কাছে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুব জরুরি কাজ না হলে কোন কর্মকর্তাই মন্ত্রীর বাসভবনে যেতেন না। মন্ত্রীর অনুপস্থিতির কারণে মন্ত্রণালয়ে ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ কাজই সচিবপর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক এক সচিব জানান, জরুরি কোন কাজ হলে নথি মন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দিতাম। মন্ত্রীর এপিএস তাতে স্বাক্ষর করিয়ে আনতেন। আমরা সব নথিই মন্ত্রীর বাসায় পাঠাতাম। সেগুলোতে তিনি স্বাক্ষর করেন। মন্ত্রীর সঙ্গে তার তেমন দেখা হতো না।

এবার সরকার পতনে ঘুষ দেয়ায় বেরলুসকোনির কারাদণ্ড

সিলভিও বেরলুসকোনি
ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য জনপ্রতিনিধি হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
তৎকালীন মধ্য-বামপন্থী সরকারের পতন ঘটাতে ২০০৬ সালে এক সিনেটরকে ঘুষ দেওয়ার দায়ে বেরলুসকোনিকে গতকাল বুধবার দেশটির নেপলসের একটি আদালত এ দণ্ড দেন। বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বেরলুসকোনির আইনজীবী নিকোলো ঘেদিনি আদালতের এই রায়কে ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে আইনি মারপ্যাঁচে ৭৮ বছর বয়সী বেরলুসকোনিকে আদালতের দেওয়া কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে না বলেও মনে করেন তিনি।
বেরলুসকোনির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রোমানো প্রোদির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সিনেটর সার্জিও দি গ্রেগরিওকে ৩৩ লাখ ইউরো ঘুষ দিয়েছেন তিনি। এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন বেরলুসকোনি। তবে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাঁকে দণ্ড দিয়েছেন আদালত।
এর আগে একাধিক মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন দেশটির চারবারের প্রধানমন্ত্রী বেরলুসকোনি।

গাড়ির ওপর ক্ষোভ কেন? by আবদুর রশিদ

৬ জুলাই মারধরের শিকার হন তিতুমীর কলেজের
ছাত্রলীগের দুই কর্মী। এর জের ধরে তাঁদের তাণ্ডব
প্রতিরোধে রাস্তায় নামেন এলাকাবাসী । কলেজের
সামনে পুলিশি পাহারা (ইনসেটে) l ছবি: প্রথম আলো
ছাত্র সংগঠনের সব ক্ষোভ যেন রাস্তার গাড়ি আর স্থানীয় দোকান পাটের ওপর। সংগঠনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল? এলাকায় আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ? দলে কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় ক্ষোভ?—এই সব কিছু ঘিরে যে সহিংস অবস্থা তৈরি হয় তার প্রথম শিকার হয় রাস্তার গাড়ি ও স্থানীয় দোকান-পাট। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে মানুষকে চলতে হচ্ছে আতঙ্ক নিয়ে।
জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন প্রতিক্রিয়া দেখানোর ধরন বদলে গেছে। বহু বছর ধরে কিছু হলেই গাড়ি-দোকানপাট ভাঙার ঘটনা ঘটছে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, অন্যান্য দেশেও হয়। আসলে যখন একটি জায়গায় অনেক মানুষের সমাগম ঘটে, তখন তাদের ওপর কারওরই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একজন একটি কাজ করলে, সবাই তাকে অনুসরণ করে। অধিক মানুষ বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়ায় তাদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয় না।’
গত ৬ জুলাই সরকারি তিতুমীর কলেজে ছাত্রলীগের এক কর্মীকে এলাকাবাসী মারধর করেছে—এমন অভিযোগে কলেজের সামনের রাস্তায় অন্তত ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করেন ওই কলেজের ছাত্রলীগ কর্মীরা। স্থানীয় দোকানপাট ও হকারদের দোকানও গুঁড়িয়ে দেন তাঁরা। কিন্তু কেন গাড়ি কিংবা দোকান ভাঙচুর হয়েছে সেটা তাঁদের অনেকেই জানতেন না।
ভাঙচুরের শিকার হওয়া একটি গাড়ির মালিক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ওই এলাকায় থাকেন। তাঁর গাড়ি তিতুমীর কলেজ এলাকায় আসা মাত্রই ভাঙচুর করে ছাত্রলীগ। অনেক অনুনয়-বিনয় করেও তিনি কাউকে নিবৃত্ত করতে পারেননি।
ওই দিন তিতুমীর কলেজের উল্টো দিকে রাস্তার পাশে ডিম, কলা ও শসার দোকান নিয়ে বসে ছিলেন বৃদ্ধ বাহার মিয়া। তিনি বলেন, মারামারি চলার সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা তাঁর দোকানের সব ডিম ভেঙে ফেলেন, কলাগুলো কেটে রাস্তা ফেলে দেন। অন্য দোকানিরা দ্রুত তাঁদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে ভেতরে বসে থাকেন। এরপর ছাত্রলীগের তিতুমীর কলেজ শাখার সভাপতি কাজী মিরাজুল ইসলাম (ডলার) ও সাধারণ সম্পাদক মানিক হোসেনের নেতৃত্বে গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
তিতুমীর কলেজের সামনের দুজন ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, ৬ জুলাই ছাত্রলীগ যা ঘটিয়েছে তাতে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা কোনো সরকারি যানবাহন ভাঙেনি। তারা যে সব গাড়ি ভেঙেছে তা সাধারণ মানুষেরই। আর পুলিশ এসেছে ঘটনার অনেক পরে। এর আগে সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে।
আজ বুধবার তিতুমীর কলেজের গেটে ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। স্থানীয় লোকজন যেন কলেজের দখল না নিতে পারে এ জন্য গেটে তাঁরা পাহারা দিচ্ছিলেন। সেখানে ছাত্রলীগের এক কর্মীর কাছে এই প্রতিবেদক জিজ্ঞাসা করেন—‘সংঘর্ষ হয়েছে এলাকাবাসীর সঙ্গে, আপনারা রাস্তার গাড়ি ভেঙেছেন কেন? ’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আমাদের এক কর্মীকে মারধরের পরে যখন প্রতিরোধ করতে এক জায়গায় জড়ো হই তখনই রাস্তায় ভাঙচুর করা হয়। এটা আমাদের অপরাধ বলতে পারেন।’
গত বছর ৮ সেপ্টেম্বর তিতুমীর কলেজ ও মিরপুরের বাঙলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে পদ না পেয়ে ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশীরা রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচুর চালায়। তিতুমীর কলেজের কমিটিতে পদ না পেয়ে আগের কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও জাহিদুল ইসলাম কিছু কর্মী নিয়ে প্রথমে কলেজগেটে বিক্ষোভ করে। পরে তারা রাস্তায় নেমে দেড় শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করে। অন্যদিকে মিরপুর বাঙলা কলেজে কমিটিতে পদ না পেয়ে রাস্তার গাড়ি ভাঙচুর করেন ছাত্রলীগ নেতা শহিদুল ইসলাম (শান্ত) ও মো. সুমনের কর্মীরা।
পদ দেয়নি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ, সাধারণ মানুষের গাড়ির ওপর ক্ষোভ কেন?—জানতে চাইলে তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, ‘রাস্তায় লাঠি নিয়ে নামলে মাথায় কাজ করে না। সামনে যা পাই, তাই ভাঙ্গি।’
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক নাসরীন বলেন, তাদের বুঝতে হবে, এ ঘটনার জন্য রাস্তার গাড়ি দায়ী নয়। যারা সংশ্লিষ্ট তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। রাষ্ট্রে সবারই নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে। সবাইকে এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে।’
তিতুমীর কলেজের সামনের রাস্তার গাড়ি ভাঙার ঘটনার বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই কলেজের মাঠের দখল ও শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় শ্রমিক লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ও রাব্বির অনুসারী স্থানীয় লোকজন। এ নিয়ে প্রায়ই কলেজ ছাত্রলীগের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থক সংগঠনের বাগ্‌বিতণ্ডা ও সংঘর্ষ হয়। কিছু হলেই ছাত্রলীগ এসে রাস্তায় অবস্থান নেয়, আর স্থানীয়রা তাদের এলাকায় চলে যায়। কাউকে না পেয়ে রাস্তার গাড়ির ওপর ক্ষোভ মেটায় তারা।
জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন প্রথমে আলোকে বলেন, ‘যাঁর মধ্যে ন্যূনতম শিক্ষা আছে, সে কখনো এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করতে পারে না। কারণ ঘটনার জন্য তো গাড়ি কিংবা দোকানপাট দায়ী নয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে নয়—এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সংগঠনের স্ব স্ব ইউনিটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সক্রিয় হতে হবে।

মসজিদে আজান হয় না নামাজ বন্ধ by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

পবিত্র রমজান মাস। পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য এ মাসে বাড়তি আমল-ইবাদত করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। কিন্তু সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে সব যেন থমকে আছে। আজান শুনে নয়, রোজা ভাঙতে হচ্ছে ঘড়ি দেখে। সেহরিও খেতে হচ্ছে ঘড়ি দেখে, মসজিদ থেকে কোন ঘোষণা আসে না। কারণ তালা দেয়া মসজিদে আজান হয় না, নামাজও বন্ধ আছে। দুই পক্ষের বিরোধের জেরে ৪ঠা জুলাই থেকে জকিগঞ্জের হালঘাট জামে মসজিদে আজান-নামাজ সবই বন্ধ আছে। তবে এর আগে ঘটে আরও এক নাটক। যা গড়ায় থানা পুলিশ পর্যন্ত।
আজান-নামাজ নিয়ে এমন ‘কানামাছি’ হালঘাট জামে মসজিদে নতুন নয়। চলতি বছরেই এ নিয়ে তিন দফা বন্ধ হলো আজান ও নামাজ। গত মার্চ মাসে মসজিদের মাওলানা কামাল উদ্দিন বিদায় নিলে ১৫/১৬ দিন মসজিদে কোন আজান হয়নি, নামাজও হয়নি। কামাল উদ্দিন মসজিদ ছেড়েছিলেন কোন উপায়ন্তর না দেখেই। দরিদ্র এ মাওলানা মাসিক তিন হাজার টাকা বেতন ও গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে খাওয়ার ব্যবস্থার বিনিময়ে এ মসজিদে ইমাম নিযুক্ত হয়েছিলেন। খাবার পেলেও বেতন ঠিকঠাক মতো পাচ্ছিলেন না কামাল উদ্দিন। স্ত্রী ও তিন সন্তানের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। তাই মসজিদ ছেড়ে যান। তবে কথা দেন, বেতনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে তিনি আবার ফিরে আসবেন। ফিরে এসেছিলেনও। রমজান শুরুর তিন দিন আগে মাওলানা কামাল উদ্দিনকে আবার ফিরিয়ে আনা হয় মসজিদের ইমাম হিসেবে। তিনি ফিরে আসার আগে আরও ১৫/১৬ দিন মসজিদে তালা ঝুলে ছিল। এমনকি পবিত্র শবেবরাতের রাতেও মসজিদ বন্ধ ছিল। নামাজ-আজান হয়নি। ‘চারিত্রিক স্খলনে’র অভিযোগে মাওলানা কামাল উদ্দিনের পর নিয়োগ পাওয়া ইমাম মাওলানা মাসুম আহমদকে অব্যাহতি দেওয়ায়ই মসজিদে এমন অচলাবস্থা নেমে এসেছিল। পরে গ্রামের মানুষের চাপের মুখে মসজিদের কোষাধ্যক্ষ আবদুল মতিন আগের ইমাম মাওলানা কামাল উদ্দিনকে ফিরে আসার অনুরোধ করেন।
নাটকের আরও যেন বাকি ছিল। ৪ঠা জুলাই ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদের ভেতর ঘুমিয়ে ছিলেন মসজিদের ইমাম মাওলানা কামাল উদ্দিন। সকাল ৮টার দিকে প্রতিদিনের মতো গ্রামের শিশুরা মসজিদে পড়তে এসে দেখে মসজিদ বাইরে থেকে তালা দেয়া। ভেতরে বন্দি ইমাম সাহেব। পরে খবর পেয়ে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ এসে তালা কেটে উদ্ধার করে মসজিদের ইমামকে। নিরাপত্তার স্বার্থে গাড়িতে উঠিয়ে তাকে থানায় নিয়ে যায়।
মসজিদ নিয়ে এমন ছেলেখেলার নেপথ্যে রয়েছে গোষ্ঠী বিরোধ, যার শুরু ২০০৭ সাল থেকে- মানবজমিনের অনুসন্ধান এমনটিই বলছে। ২০০৭ সালে হালঘাট গ্রামের জনৈক হোসেন আহমদ বিদেশ যাত্রা উপলক্ষে তার টাকা ও কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা রাখেন গ্রামের কাপড় ব্যবসায়ী খলিলুর রহমানের কাছে। এরই সূত্রে গ্রামের বাসিন্দা আবদুল বাসিত ও আছাব আলীসহ কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধ বাঁধে খলিলুর রহমানের। এ নিয়ে সালিশ বৈঠকও হয়। কিন্তু কোন কিনারা না হওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০০৮ সালের ১২ই এপ্রিল মামলা ঠুকেন ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান। মামলায় আবদুল বাসিত এবং আছাব আলীর দুই ছেলে ইসমাইল ও আলী হোসেনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। খলিলুর রহমানের ভাতিজা আবদুল মতিনই এখন হালঘাট জামে মসজিদের কোষাধ্যক্ষ। পুরনো বিরোধের কারণে তাকে মানতে চাইছেন না আবদুল বাসিত ও আছাব আলীর গোষ্ঠীর লোকেরা। মূলত এ বিরোধের কারণেই মসজিদে ইমাম নিয়োগ-অব্যাহতির খেলা চলছে। যার ফলে বারেবারেই মসজিদে তালা ঝুলছে, বন্ধ হচ্ছে নামাজ-আজান।
সর্বশেষ ইমাম কামাল উদ্দিনকে আটকে রেখে মসজিদে তালা ঝুলানোর পর পুলিশ দু’পক্ষকেই থানায় ডেকেছিল। আবদুল বাসিত ও আছাব আলীর গোষ্ঠীর লোকজন তাতে সাড়া দেননি। এমতাবস্থায় মসজিদ কমিটিকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয় থানা থেকে। কিন্তু কে মসজিদে তালা দিয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়ায় ৮ই জুলাই পর্যন্ত সময় চায়  মসজিদ কমিটি। এরই মাঝে ৬ই জুলাই আছাব আলীর ভাই ইব্রাহিম আলী ইমাম সাহেবকে তালাবদ্ধ করার ঘটনায় থানায় একটি অভিযোগ দেন। এতে তিনি মসজিদের কোষাধ্যক্ষ আবদুল মতিন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল মান্নানকে অভিযুক্ত করেন।
জকিগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) শওকত হোসেন মানবজমিনকে বলেন, হালঘাট মসজিদে ইমামকে আটকে রাখার ঘটনায় অভিযোগ এলেও এ পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি।

বাঙালির পরাজয়ে বাঙালিই বিজয়ী by জুয়েল রাজ

লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ খুব আপসোস করছেন। টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের নেতৃত্ব বাঙালির হাতছাড়া হওয়া নিয়ে। আসলেই কি বাঙালির  হাতছাড়া টাওয়ার হ্যামলেট?
টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচনে পরাজিত হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্বতন্ত্র প্রার্থী রাবিনা খান। বিজয়ী হলেন লেবার প্রার্থী জন বিগস। জয় পরাজয়ের মূল নিয়ামক ছিলেন বাঙালি ভোটার। ৩৩ শতাংশ বাঙালি অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকা টাওয়ার হ্যামলেট। নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৩৭ শতাংশের সামান্য কিছু বেশি। সেখানে বাঙালি প্রার্থীর ভরাডুবির কারণ থাকার কথা না। কিন্তু প্রত্যাশিত ভরাডুবি রোধ করা যায় নি।
নির্বাচনে যতোটা না হেরেছেন রাবিনা খান, তাঁর চেয়ে বেশি হেরেছেন সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমান। কম বেশি সবাই জানেন, রাবিনা খান স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচন করলেও মূলত তিনি ছিলেন লুৎফুর রহমানের প্রার্থী। নির্বাচনের পিছনে কলকাঠি নেড়েছেন সাবেক মেয়র। একজন কাউন্সিলর হিসাবে যে ২৬ হাজার ভোট তিনি পেয়েছেন তা আসলে লুৎফুর রহমানের ভোট। আর এই ভোটারদের সিংহভাগ বাঙালি ও আফ্রিকান ভোটার যারা ভোট করেছেন ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে।
লুৎফুর রহমান ও তাঁর রাজনীতি ঘিরে বাঙালি কমিউনিটি স্পষ্টত দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। প্রগতিশীল ধারাটি যারা এক সময় তাঁকে সমর্থন দিয়েছিল, তারা দিনদিন লুৎফুর রহমানের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। আর এর কারণ হিসাবে সবাই তাঁর জামায়াত প্রীতিকেই দায়ী করেন।
ব্যাক্তি লুৎফুরের কাছে হয়তো এর বিকল্পও ছিল না। বাঙালিদের লেবার প্রীতির বাইরে এসে স্বতন্ত্রপ্রার্থী রাজনীতির ফলাফল কি হতো সেটা অনুমেয়। তাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই হয়তো তিনি জোট বেঁধেছিলেন। কিন্তু অভিমূন্য চক্র ভেদ করে আর বের হয়ে আসতে পারেন নি তিনি। এটা একান্তই আমার ব্যাক্তিগত ধারণা।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো আদালতের রায়ে ভোট জালিয়াতি ও দূর্নীতির অভিযোগ  প্রমাণ হওয়ার পরেও ব্যাক্তি লুৎফুর রহমানকে অনেকেই ভালমানুষ হিসাবেই চিহ্নিত করেন। বাঙালিদের মনে আলাদা একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে তাঁর জন্য। তাঁদের মতে ব্যাক্তি লুৎফুর রহমান অপরাধী নয়, যতোটা না অপরাধী মেয়র লুৎফুর রহমান। আর তাঁর অপরাধের জন্য সবাই দায়ী করেন তাঁর চারপাশে যারা ঘিরে ছিলেন সেই সব মানুষদের। যারা নিজেদের স্বার্থে ধর্মের লেবাসে আটকে রেখেছিলেন মেয়র লুৎফুর রহমানকে।
আড়ালে আবডালে টাওয়ার হ্যামলেটকে ইসলামী রিপাবলিক অব টাওয়ার হ্যামলেট বলে ডাকতেন। ভিন্ন সংস্কৃতির আধুনিক ব্রিটেনে অতিধর্মীয়তা অনেকে সহজ ভাবে নিতে পারেননি। পাশাপাশি ইসলামী সংগঠন ও এর নেতৃবৃন্দ কাউন্সিল থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করারও অভিযোগ ছিল।
মুসলমান আর বাঙালি মুসলমানের মধ্যে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁর মজ্জাগত। জোর করে বাঙালিত্ব বাদ দিয়ে শুধু মুসলামান বানানো সত্যিই কঠিন। আর যারা বাঙালিত্ব বাদ দিয়ে শুধু মুসলমান বানাতে চাইছেন, তারাই ঘিরে রেখেছিল চারপাশ। লুৎফুর রহমানের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন সবাই। সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতের সাথে তাঁর সখ্যতা।
তাই নির্বাচনে বাঙালির কাছেই হেরে গেছেন লুৎফুর রহমান। বাঙালি ভোটাররা চেয়েছেন মেয়রের অভিযোগের অপবাদ থেকে মুক্তি। তাই বাঙালি প্রার্থী রাবিনা খানের পরিবর্তে বেছে নিয়েছেন নন বাঙালি জন বিগসকে। সংসদ নির্বাচনে লেবারের জয়জয়কার পূর্ব লন্ডনে দীর্ঘ দিনের। বিপুল ভোটে দুই দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন বাঙালি প্রার্থী রুশনারা আলী ও লাইম হাউজ পপলার আসনে জেমস ফিজফেট্রিক ৫ বার লেবার থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু মেয়র নির্বাচনে বাঙ্গালিয়ানার কাছে হেরে গিয়েছিল লেবার। যদিও প্রথমবার হেরেছিল ব্যাক্তি লুৎফুর রহমানের কাছে। রাবিনা খান বিজয়ী হলে লুৎফুর রহমানের চক্রভেদ করা খুব কঠিন ছিল। টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিল সেই তিমিরেই থাকত। তাই টাওয়ার হ্যামলেট নির্বাচনে জন বিগসের বিজয় জরুরি ছিল।
ব্যাক্তি লুৎফুর রহমানের জন্য অন্য অনেকের মতোই আমারও ব্যাক্তিগত আপসোস আছে। অপার সম্ভাবনার মৃত্যুর জন্য। যার ব্যাক্তি ক্যারিশমা কমিউনিটির অর্জনের পাল্লাকে আরো ভারী করতে পারতো। অঙ্কুরেই যা বিনিষ্ট হল।
জন বিগসের বিজয়ও বাঙালির জরুরি ছিল। বাঙালি তিন লেবার দলীয় এমপি যেভাবে জন বিগসের জন্য নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছিলেন তাঁদের আত্মসম্মান রক্ষার্থে ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই মোটা দাগে বলা যায় এবারের টাওয়ার হ্যামলেট নির্বাচন বাঙালির সঙ্গে বাঙালির প্রতিযোগিতা ছিল। বাঙালির কাছেই হেরেছে বাঙালি, আবার বাঙালির কাছেই বিজয়ী হয়েছে বাঙালি। জন বিগস, রাবিনা  সেখানে উপলক্ষ্য মাত্র। এবার অপেক্ষার পালা। জন বিগস  টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের বাঙালিকে কী উপহার দেন।
(লেখকঃ ব্রিকলেনের বার্তা সম্পাদক ও দৈনিক মানবকণ্ঠের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি)

আশরাফকে অব্যাহতি এলজিআরডিতে মোশাররফ, কিশোরগঞ্জে প্রতিক্রিয়া

গুঞ্জনই সত্যি হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মহাসচিব সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। প্রধানমন্ত্রীর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদধারী সৈয়দ আশরাফ বাদ পড়ায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসেছেন শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা হোসেন পুতুলের শ্বশুর এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মানবজমিনকে জানান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এখন থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে যাবেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও মন্ত্রী থাকছেন সৈয়দ আশরাফ। তবে তার কোন দপ্তর থাকছে না। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দুই মন্ত্রীর দপ্তর বদল-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬-এর রুল ৩(৪)-এ দেয়া ক্ষমতাবলে দুই মন্ত্রীর দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হলো। প্রেসিডেন্টের আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্বাক্ষরিত আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। এ আদেশের মাধ্যমে ১৯৯১ সালের পর ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের বাইরে কোন নেতা এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন। এর আগে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকারে জিল্লুর রহমানও একইভাবে এ মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। বিএনপির ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। এদিকে বিকালে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হওয়ার পর যুবলীগের ইফতারে যোগ দেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সেখানে তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি। এর আগে গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুপস্থিত থাকায় সদ্য সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। একনেক সভায় এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীদের অনেকেই ধারণা প্রকাশ করেন, তাকে অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে। একনেক সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে একান্তে কথা বলায় গুঞ্জন আরও জোরদার হয়। তবে মন্ত্রিসভায় রদবদল ও দপ্তর বণ্টনের দাপ্তরিক কাজ করা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন একই দিন বিকালে বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোন নির্দেশনা বা সংকেত নেই। একই দিন সন্ধ্যায় নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ শহরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত ইফতারে অংশ নেয়ার সময় তিনি বিষয়টিকে গুজব বলে অভিহিত করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একনেক সভায় উত্থাপনের জন্য আটটি প্রকল্প তালিকায় প্রথমেই ছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’। পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ সভার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরপরই প্রথম প্রকল্প হিসেবে এ প্রকল্প পাসের জন্য ওঠানো হয়। এ সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী কেউই উপস্থিত ছিলেন না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন বলেন, ছয় হাজার কোটি টাকার এত বড় প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দুজন মন্ত্রী রয়েছেন, একজনও আসেননি। তাই এ প্রকল্প একনেক সভা থেকে প্রত্যাহার করা হোক। তাদের মতামত নিয়ে প্রকল্পটি পাস করা দরকার। তখনই প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা তাতে বাধা দিয়ে বলেন, প্রকল্পটা প্রত্যাহার করবেন না। তিনি যখন মিটিংয়ে আসেন না, আমি তাকে সরিয়ে (চেঞ্জ করে) দিচ্ছি। এখানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আছেন, তাকে আজই (মঙ্গলবার) চেঞ্জ করতে বলব। এরপর একনেক সভার নিয়মিত কার্যক্রম চলতে থাকে। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে আলাদা কথা বলেন। এরপর সৈয়দ আশরাফকে অব্যাহতির সারসংক্ষেপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। গতকাল তা অনুমোদন হয়ে ফেরত আসায় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছরের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর সৈয়দ আশরাফের বাদ পড়ার মধ্য দিয়ে কার্যত প্রথম পরিবর্তন এলো। এর আগে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বাদ পড়েন। নতুন এলজিআরডি মন্ত্রী রুরাল ওয়ার্কার্স প্রোগ্রামের প্রথম প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মোশাররফ এলজিইডি বিভাগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর শেখ হাসিনার সরকারে স্থান পান খন্দকার মোশাররফ। ২০০৯ সালের মন্ত্রিসভায়ও তিনি শুরু থেকে রয়েছেন। অন্যদিকে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বন্দি হওয়ার প্রেক্ষাপটে দলে সাধারণ সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান সৈয়দ আশরাফ। তখন বিরূপ পরিস্থিতিতে আশরাফের সফলতার মধ্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল মুক্তি পেলেও দায়িত্বে আর ফিরতে পারেননি। পরে ২০০৯ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আশরাফ। তার আগে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার সরকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন আশরাফ। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনা আবার সরকার গঠন করলে দলের সাধারণ সম্পাদককে একই মন্ত্রণালয়ই দেন শেখ হাসিনা। এর আগে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জেলখানায় সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর লন্ডনে চলে যান আশরাফ। সেখানে আওয়ামী লীগে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার ওই সরকারে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হন আশরাফ। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন তিনি।
আশরাফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে অব্যাহতি দেয়ার খবরে কিশোরগঞ্জে দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা নেমে এসেছে। দলমত নির্বিশেষে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ এ নিয়ে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। পরিচ্ছন্ন ও ত্যাগী রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আশরাফ ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়েছেন, এমন মন্তব্যও করেছেন কেউ কেউ। দু’দিনের কিশোরগঞ্জ সফর শেষে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পরদিন গতকাল বিকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে সৈয়দ আশরাফকে অব্যাহতি দেয়ার খবর গত মঙ্গলবার দুপুরের দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেও বিকালে সৈয়দ আশরাফ কিশোরগঞ্জ পৌঁছে এটিকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেন। এই রাজনীতিকের অব্যাহতির খবর স্বভাবতই ব্যথিত ও বিস্মিত করেছে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে।
জেলা কৃষক লীগের সভাপতি ও স্থানীয় দৈনিক শতাব্দীর কণ্ঠের সম্পাদক আহমেদ উল্লাহ বলেন, এমন খবরে কিশোরগঞ্জবাসী হতাশ। এর ফলে জেলায় দলীয় রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোও হুমকির মুখে পড়বে।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আতাউর রহমান বলেন, উনার মতো একজন সৎ রাজনীতিবিদকে অব্যাহতি দেয়ায় কিশোরগঞ্জবাসী হতাশ ও মর্মাহত। এই সিদ্ধান্তের ফলে জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েও কিশোরগঞ্জবাসী শঙ্কিত।
সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শরীফ আহমদ সাদী বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নিরেট একজন ভাল মানুষ। ব্যতিক্রমী কিছু গুণের অধিকারী। তার মন্ত্রিপরিষদে না থাকার খবর কিশোরগঞ্জবাসীর জন্য একটি বিরাট দুঃসংবাদ।
হোসেনপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আয়ুব আলী বলেন, আমরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। এতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বাদল রহমান বলেন, দলের দুঃসময় ও ক্রান্তিলগ্নে সৈয়দ আশরাফ সব সময়ে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তার পিতা জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলাম শত প্রলোভনেও মাথা নত করেননি। নিজের জীবন দিয়ে আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। সেই গর্বিত রক্তের উত্তরাধিকার সৈয়দ আশরাফও দলের এক পরীক্ষিত বন্ধু। তাকে এভাবে অব্যাহতি দেয়া মোটেও সমীচীন হয়নি। কিশোরগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে আমরা তার পুনর্বহাল দাবি করছি।
কিশোরগঞ্জ সম্মিলিত নাগরিক আন্দোলনের সমন্বয়কারী এনায়েত করিম বলেন, সুস্থ ধারার রাজনীতিবিদদের যদি এভাবে সরে যেতে হয়, তাহলে নেতৃত্ব চলে যাবে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে।
জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশের হাল ধরেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন কারাবন্দি, তখন সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও দলের হাল ধরে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্ত করেন এবং নেতৃত্বের আসনে ফিরিয়ে আনেন। তাই কেন তাকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে, সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। আমাদের প্রত্যাশা, দল ও দেশের স্বার্থে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে পুনর্বহাল করা হোক। আর এটিই কিশোরগঞ্জবাসীর দাবি।
সদরের গাগলাইল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক ভূঁইয়া বলেন, এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে সৈয়দ আশরাফকে অব্যাহতি দেয়ার খবরটি আমাদের ব্যথিত করেছে। দলের দুঃসময়ের এই কাণ্ডারিকে এভাবে সরিয়ে দেয়া সঠিক হয়নি। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করছি।
শহরের গাইটাল এলাকার ‘রিকশাচালক মজলু মিয়া বলেন, হুনলাম নজরুল সাবের ছেলেরে মন্ত্রী থাইক্যা বাদ দিচে। হের মতো একটা ভালা মানুষরে বাদ দিয়্যা দেঅন ভালা অইছে না।’
দল গোছানের কাজ করবো: মোশাররফ হোসেন
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও নতুন দায়িত্ব পাওয়া এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, আগে দল গোছানোর কাজ তারপর প্রধানমন্ত্রীর একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাস্তবায়ন। দেশের গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নের ব্রত দিয়ে কাজ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করলেন তিনি। মন্ত্রী গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা হতে জেলা আওয়ামী লীগের আয়োজনে ফরিদপুরে এক ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে এসে তার নিজ বাড়ি শহরের বদরপুরের হাসিনা মঞ্জিলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, তিনি তার কর্মজীবন শুরু  করেন এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। দেশের গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নে এ মন্ত্রণালয় বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি আশা করছেন দ্রুতই তিনি দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে পারবেন। এ সময় ফরিদপুরে জেলা প্রশাসক সরদার সরাফত আলী, পুলিশ সুপার জামিল হাসান, ফরিদপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরসহ শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তাকে জেলা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন  এবং শহরের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ হতে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।

দুর্নীতিতে জিডিপির ক্ষতি ২ থেকে ৩ শতাংশ

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেেেছন, বাংলাদেশে দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জিডিপির আরও ১ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। তবে দুর্নীতি বন্ধ করতে সরকার তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলনকক্ষে ঋণদাতাগোষ্ঠীর স্থানীয় পরামর্শক গ্রুপের (এলসিজি) সঙ্গে এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান ও উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন সংস্থা প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১ কোটি ৮৭ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটা অত্যন্ত ‘উচ্চাভিলাষী’। এ লক্ষ্য পূরণ করা ‘খুবই কঠিন’ হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মুহিত বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সংজ্ঞায় দেশে বেকারের বাস্তব চিত্র আসেনি। বাস্তবে দেশে বেকারের সংখ্যা আরও বেশি।
এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান সন্তোষজনক হলেও মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার মান ভাল নয়। এজন্য মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার মান বাড়াতে হবে।
টানা ছয় বছর ধরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পেছনে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার কমে আসার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মুহিত বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ অনন্য। কিন্তু এদেশে আয় বৈষম্য বেশি। এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সপ্তম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।
মুহিত বলেন, বর্তমানে দেশের আর্থিক খাতগুলোতে বিপর্যয় চলছে, সেগুলো আমরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। তা কাটিয়ে উঠতে কিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, পদ্ধতিগুলোর ফলে আর্থিক খাতের বিপর্যয় আর থাকবে না। তিনি বলেন, প্রাইভেট খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ খাতে কেন বিনিয়োগ বাড়ছে না তা বুঝতে পারছি না। তবে মনে হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা একটা বড় সমস্যা। বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি কমাতে আমরা আইসিটি’র ওপর জোর দিচ্ছি। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধান নির্বাচনী স্লোগান ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ব। সুতরাং আমরা এই খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এতে জিডিপি’তে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাবে। সভায় জানানো হয়, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার বিদেশী সহায়তা প্রয়োজন হবে। ৫ বছরে দাতাদের কাছ থেকে এ অর্থ সংগ্রহে করণীয় নির্ধারণেই এলসিজির সঙ্গে সরকারের এ বৈঠক।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম তার উপস্থাপনায় বলেন, আগামী ৫ বছরে দেশের দারিদ্র্য ১৮.৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় সরকার। সেই সঙ্গে অতিদারিদ্র্য ৮.৯ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য নিরসনের এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশের দারিদ্র্য বর্তমানে ২৪.৮ শতাংশ থেকে অর্থবছর ২০১৬-তে ২৩.৫ শতাংশ, অর্থবছর ২০১৭-তে ২২.৩ শতাংশ, অর্থবছর ১৮-এ ২১ শতাংশ, অর্থবছর ২০১৯-এ ১৯.৮ শতাংশ এবং ২০২০ অর্থবছরে ১৮.৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।

পথের কাঁটা অপসারণ করেই এগোতে হবে by এম আবদুল হাফিজ

দেশের উন্নতি বা অগ্রগতি যে ব্যক্তি, মহল বা সরকারের উদ্যোগ বা প্রচেষ্টায়ই তা হোক, যে কোনো দেশপ্রেমিক ও দেশের মঙ্গলাকাক্সক্ষী নাগরিকেরই তাতে উল্লসিত হওয়ার কথা এবং সাধ্যানুসারে সেই প্রচেষ্টায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে শামিল হওয়া দরকার। এই নিবন্ধনকারও দেশমাতৃকার নতুন নতুন গৌরবে বিভূষিত হওয়াতে অনির্বচনীয় পুলক এবং শিহরণ অনুভব করে। আমার মনে হয় এই অনুভূতি সার্বজনীন। সংযুক্ত পাকিস্তানের আমলে খেলায় বিশেষ করে ক্রিকেট, গলফ বা পোলোর মতো অভিজাত ও আন্তর্জাতিক খেলার ভুবনটি পাঞ্জাবি পাঠানদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই ভূখণ্ডের মানুষদের খেলার জগতে ইচ্ছাকৃত বর্জনে আমরা সংযত কারণেই ব্যথিত হয়েছি এবং হীনম্মন্যতায় ভুগেছি। অথচ ক্রিকেটপ্রীতি ও নৈপুণ্য আমাদের আয়ত্তের বাইরে ছিল না। কিন্তু সেই ক্রিকেট কদাচিৎ আমাদের প্রবেশাধিকার ছিল।
পাকিস্তানের অন্যান্য খেলায়ও যখন জাতীয় দল সংগঠিত হতো সেগুলোতেও সংযুক্ত পাকিস্তানের পড়ন্ত বেলায়ও বাঙালিরা অচ্ছুত ও আনাড়িই বিবেচিত হয়ে এসেছে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। তবে নিখিল পাকিস্তান সামরিক দলগুলোর প্রতিযোগিতায় কিছু কিছু বাঙালির ছিটেফোঁটা অন্তর্র্ভুক্তি দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের কাউকে এমনকি সাঁতার প্রতিযোগিতায়ই খুব একটা দেখা  যেত না। অথচ সেই পঞ্চাশের দশকেই ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সে সময়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন। বর্তমান ক্রীড়াবান্ধব সরকার ক্রীড়া জগতে আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধ্যত্ব ঘুচিয়েছে। আগে যাদের দেশের পশ্চিমাংশেই ক্রিকেট খেলতে বা দেখতে যাওয়াটাই স্বপ্নবৎ ছিল তারা এখন কয়েকটি মহাদেশে পরিব্যাপ্ত ক্রিকেট বিশ্ব চষে বেড়াচ্ছেন। বিশ্বে ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশি অভিবাসীদের বদৌলতে তাদের প্রণোদনা দিতে সুদূর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা ইংল্যান্ডে তাদের দর্শকের অভাব নেই। এদিকে ঢাকাও আর ক্রীড়ামোদীদের নিষিদ্ধ গন্তব্য নয়। বিশ্বের নামি-দামি ক্রিকেট তারকাদের এখন এ দেশে পদচারণা। কিছুদিন আগেই পাকিস্তান ও ভারতের ক্রিকেটাররা খেলে যাওয়ার পর এখন সদলবলে এলো দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বায়িত বিশ্বে প্রত্যেক দেশকেই এখন একটি ব্র্যান্ড হিসেবে বিপণনের বিষয় আছে। সেই কাজটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় খেলোয়াড়দের মাধ্যমে। আনন্দের বিষয় এই যে, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। অথচ কয়েক যুগ পূর্বেই আমরা তালি বাজানোর দলভুক্ত ছিলাম। পাকিস্তান, ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কানদের ক্রিকেট দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে পছন্দের দলটিকে চিয়ার আপ করতাম।
সে অবস্থা পাল্টে গেছে। কখনো কখনো বিদেশে গিয়ে হোমসিক হয়ে স্বদেশের খবর জানতে উদগ্রীব হই। রাজ্যের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঘেঁটে ঘুঁটে যখনই কোনো সুবেশ চৌকস উপস্থাপক বা পথের কাঁটা অপসারণ করেই এগোতে হবেউপস্থাপিকাকে দেখি বুঝতে পারি এটা অবশ্যই বাংলাদেশের চ্যানেল। পাকিস্তান আমলে আমাদের সর্বোত্তম পরিধেয় ছিল পাজামা ও হাফশার্ট। কলেজে পড়ার সময়েও অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে দেখেছি রোগা-পটকা নগ্নপদ। এখন সে অবস্থা নেই। বুঝতে বাকি থাকে না যে দেশ অনেকটাই এগিয়েছে। আর আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের তো কথাই নেই। এখন তো এ শিল্প অনেক বেশি অগ্রসর। সেই সিকি শতাব্দী পূর্বে নব্বইয়ের দশকে আমি সুইজারল্যান্ডের বার্নভিত্তিক সুইস পিস ফাউন্ডেশনে একটি পরিবেশ গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিলাম। প্রকল্প প্রধান ও তার সেক্রেটারি (পরে স্ত্রী) ম্যারেনের জন্য প্রকল্পের সমন্বয় সভাগুলোর সময়ে কিছু গিফট নিয়ে যেতাম। আমাদের গার্মেন্টস শিল্প তখনো এখনকার মতো বিকশিত হয়নি। তাই তখন একমাত্র ভরসা ছিল আড়ং সামগ্রী, আমার সামান্য আড়ং উপহার সামগ্রীতেই তারা কি যে উচ্ছ্বসিত হতেন। বুঝিয়ে বলতে পারব না। এই আমার দেশ এবং সূচি শিল্পের কদর। আমার এক সন্তান কানাডার নাগরিক। তাকে ও পরিবারকে দেখতে গড়পরতা বছরে একবার সে দেশে যেতে হয়। ফিরে আসলে স্বজন-বন্ধুরা হাপিত্যেস তাকিয়ে থাকত যে কি এনেছি ওদের জন্য ওদেশ থেকে। আমাদের দেশে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রথমবার কিছু কাপড় চোপড় এনেছিলাম। মুখে না বললেও বুঝেছি যে আমার আনা বিদেশি মাল ওদের পছন্দ হয়নি। বরং কানাডায় বসবাসরত আমার সন্তান আমাকে পই পই বুঝিয়েছে যে ওখানে যাই কিনি না কেন সেগুলো অবশ্যই বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি এ বড়জোর চীনা বা তাইওয়ানিজ। বরং আর্মি ওদের জন্য ঢাকা থেকে যাই নিয়ে গিয়েছি, সেগুলোই ওদের পছন্দ। অভিজ্ঞতাই বুঝেছি যে বাংলাদেশে প্রস্তুত গার্মেন্টস ছাড়াও চামরাজাত জিনিস, যেমন জুতা, বেল্ট, ব্যাগ ইত্যাদি অনেক উন্নতমানের।
আজকের বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা খাদ্যের জোগান। স্বাধীনতার প্রাক্কালে আমরা সাত কোটি মানুষ ছিলাম এ দেশে। সাত কোটি মানুষ নিয়েই সে সময়ে আমরা একটি খাদ্য ঘাটতি দেশ অস্তিত্বে এনেছিলাম। ভাবতে অবাক লাগে কোন জাদু বলে ষোলো কোটি মানুষের এখনকার বাংলাদেশ থেকে আমরা খাদ্য রফতানি করি। মনে হয় যেন মহান আল্লাহ তার বারাকাহ এ দেশকে উজাড় করে দিয়েছেন। তাই বলে বাংলাদেশ সমস্যা বিবজিত নয়। আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বাধিক প্রকট সমস্যা এখন। দেশ রয়েছে নৈতিকতা অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেখানে মাদক ও মানবপাচার একই সমান্তরালে অগ্রসরমান। আরো আছে দুর্নীতির সংক্রামক বিস্তার এবং হাজার কোটি টাকার এলিট শ্রেণীর সহাবস্থানে বস্তিবাসী হতদরিদ্ররা। আছে আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। আছে মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে অপহরণ, বাছবিচারহীন যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ। আরো আছে ক্রমবর্ধমান বিচারবহির্ভূত এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু।
আমরা কি নানাবিধ অপরাধ ও অবক্ষয়ের মোকাবিলা করতে পারি না। যারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে ধাপে ধাপে উন্নয়নের সোপান বেয়ে একটি উচ্চতায় পৌঁছবার উদ্দেশ্যে সামনে ধাবমান তারা অবশ্যই সংকট উন্নয়নের পথ জানেন। আমরা সঙ্গত কারণেই আশাবাদী হতে চাই, থাকতে চাই। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়ক এখন অনেক প্রশস্ত।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনাপ্রধান

গ্রিসে ব্যাংক বন্ধের খবরে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে ধস: এক দিনে শীর্ষ ধনীদের ক্ষতি ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা by আশরাফুল ইসলাম

বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা বিশ্বায়নের প্রভাব ভালোই টের পেলেন গত সপ্তাহে। গ্রিসে এক সপ্তাহ ব্যাংক বন্ধ থাকবে—এ খবরে পুঁজিবাজারে যে ধস নামে, তাতে বিল গেটসসহ ৪০০ ধনাঢ্য ব্যক্তি গত সোমবার একসঙ্গে হারিয়েছেন ৭ হাজার কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে এই অর্থ দিয়ে ২০টি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব।
শেয়ারবাজারের পতনে এর আগে কবে শীর্ষ ধনীরা এক দিনে এ রকম বিশাল লোকসানে পড়েছেন, তা এখন রীতিমতো গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটের শুরুটা মূলত ইউরোপের দেশ গ্রিসকে নিয়ে। টাকার অভাবে গ্রিস সরকার এক সপ্তাহের জন্য দেশটিতে সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। একটি দেশের পুরো ব্যাংকিং অবস্থা অচল হয়ে পড়ার আতঙ্ক বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বড় পুঁজিবাজারগুলোয়। একই সময়ে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়।
অনলাইনে বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেল, পুরো এক সপ্তাহের জন্য আর কোনো দেশ তাদের ব্যাংক বন্ধ করেনি। গ্রিসের ব্যাংকগুলো সাত দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে তাই এ আতঙ্ক।
সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের হিসাবে, ওই এক দিনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্পেনের বস্ত্র ব্যবসায়ী আমানসিও ওর্তেগা। তিনি হারিয়েছেন ২২০ কোটি ডলার বা ১৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস-এর শীর্ষ ধনীর তালিকায় তিনি আছেন চতুর্থ অবস্থানে। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৬ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের ক্ষতিও একেবারে কম নয়। এক দিনেই তিনি হারিয়েছেন ১৪০ কোটি ডলার। আর ফোর্বস-এর তালিকার তৃতীয় স্থানে থাকা বিনিয়োগগুরু ওয়ারেন বাফেটের ক্ষতি ১৬০ কোটি ডলার। এক দিনে মোট সম্পদের ২ থেকে ৩ শতাংশ হারানো এই ধনীদের জন্য অনেকটাই অভাবনীয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ওলট-পালট না হলে এক বছরেও তাঁদের সম্পদ এত কমে না।
বিল গেটসের ব্যাপারে যেখানে রসিকতা করে বলা হয়, দিনে এক লাখ ডলার করে খরচ করলে ১০০ বছরেও সব টাকা খরচ করে শেষ করতে পারবে না তাঁর পরিবার।
পুঁজিবাজারের এই ধসে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের যখন মাথায় হাত, তখন তা অনেকটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছে আফ্রিকার শীর্ষ ধনী আলিকো ডাংগোটের জন্য। একই দিনে তিনি আয় করেছেন ১৮ কোটি ডলার। তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ডাংগোটে সিমেন্টের শেয়ারের দাম প্রায় আড়াই শতাংশ বেড়ে যায়। এতে তাঁর সম্পদ বেড়ে এক লাফে হয়েছে ১ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে এক দিনে বিশ্বের ৪০০ শীর্ষ ধনী তাঁদের মোট সম্পদের দেড় শতাংশ হারিয়েছেন।
বিশ্বের সব বড় পুঁজিবাজারে গত সোমবার সূচক পড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ৬ শতাংশ সূচক কমেছে চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জে। এটি দেশটির প্রধান তিন পুঁজিবাজারের একটি। সূচক হারানোর এই ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি শেনজেন পুঁজিবাজার।
চীনের মতো না হলেও কম যায়নি ইউরোপের পুঁজিবাজারগুলোও। ইউরো স্টক ইনডেক্সের সূচক ওই দিন কমে যায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সূচক কমেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পুঁজিবাজার সূচক স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর (এসঅ্যান্ডপি) ও নাসডাকের। এ দুই পুঁজিবাজারে সূচক ২ শতাংশের বেশি কমেছে।
ফোর্বস, ব্লুমবার্গের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবমতে, বিশ্বের ৪০০ শীর্ষ ধনীর মোট সম্পদের পরিমাণ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার বা ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। গ্রিস-সংকটের এক ধাক্কায় এই ধনী ব্যক্তিদের প্রত্যেকে গড়ে হারিয়েছেন ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তাই এ কথা এখন বলাই যায় যে বিশ্বায়নের ধাক্কা সবার গায়েই লাগে।
৪০০ ধনাঢ্য ব্যক্তি এক দিনে ৭ হাজার কোটি ডলার খুইয়েছেন। এই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশে ২০টি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব
বিশ্বের শীর্ষ ধনী
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস
হারিয়েছেন ১৪০ কোটি ডলার
বিনিয়োগগুরু
বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ধনী ওয়ারেন বাফেট খুইয়েছেন ১৬০ কোটি ডলার
সর্বোচ্চ ক্ষতি
বিশ্বের চতুর্থ শীর্ষ ধনী স্পেনের আমানসিও ওর্তেগার ক্ষতি হয় ২২০ কোটি ডলার
ভাগ্যবান ধনী
আফ্রিকার শীর্ষ ধনী আলিকো ডাংগোটে আয় করেন ১৮ কোটি ডলার

২০১১ সালেও মধ্যম আয়ের বাংলাদেশী ছিলেন ১.৪ ভাগ

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রেক্ষাপটে কাকতালীয়ভাবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পিউ ফাউন্ডেশন বিশ্বব্যাপী পরিচালিত একটি দারিদ্র্য ও উন্নয়নসূচক প্রকাশ করেছে। ৮ই জুলাই প্রকাশিত ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য কমতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, গতকাল যিনি দরিদ্র ছিলেন, আজ তিনি মধ্যম শ্রেণীতে (মধ্যবিত্তে) উন্নীত হয়েছেন। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনও নিম্ন আয়ের রয়ে গেছেন। আর ১৫ ভাগ এখনও ‘দরিদ্র’। পিউর সমীক্ষায় বাংলাদেশসহ ১১১টি দেশের আয় ও ভোগের তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংক সম্প্রতি বলেছে, বাংলাদেশ নিম্ন আয় থেকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। একইসঙ্গে অন্য আরও তিনটি দেশের অবস্থারও বদল ঘটেছে। তারা হল কেনিয়া, মিয়ানমার ও তাজিকিস্তান। গত ১৪ই মে মাসে বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটেসটিকস (বিবিএস) বলেছে, বাংলাদেশীদের মাথাপিছু আয় ১১৯০ ডলার থেকে বেড়ে ১৩১৪ ডলার হয়েছে।
ওদিকে পিউর নতুন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থা চিত্রিত হয়েছে এভাবে: ২০০১ সালে দরিদ্র ৫৫ দশমিক ২ ভাগ। নিম্ন আয় ৪৩ . ৭ ভাগ। মধ্যম আয় ১ দশমিক শূন্য। উচ্চ মধ্যবিত্ত দশমিক দুই। তখন জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ১৩ কোটি। ২০১১ সালে জনসংখ্যা ১৫ কোটির বেশি। আর দরিদ্র ৩৯ ভাগ। নিম্ন আয় ৫৯.৩ ভাগ। মধ্যম আয় ১ দশমিক চার। উচ্চ মধ্যবিত্ত দশমিক তিন।
ওয়াকিবহাল বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দারিদ্র্য পরিস্থিতির নিশ্চয় উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু তাই বলে কোন নাটকীয় পরিবর্তন ঘটার কোন কারণ নেই। ২০১১ সালে যেখানে ৫৯ ভাগ মানুষ নিম্ন আয়ের এবং মাত্র ১ ভাগ মানুষ মধ্যম আয়ের ছিলেন  সেখানে বিশ্ব ব্যাংক বর্ণিত ‘নিম্ন মধ্য আয়ের’ দেশ বলতে বিরাট কোন পরিবর্তন আশা করা যায় না। বাংলাদেশে এমন কিছুই ঘটেনি যার বৈশ্বিক সাধারণ গড়কে কোনভাবে অতিক্রম করেছে বলে প্রতীয়মান হতে পারে। 
পিউ বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন কে দরিদ্র, আর কি করে নিম্ন আয় ও মধ্যম আয়ের মান নির্ধারণ করা হয়। তাদের কথায়, দু ডলার বা তার কমে দিন গুজরানকারী মানুষের সংখ্যা ২০০১ সালে ২৯ ভাগ ছিল, সেটা এখন কমেছে। কিন্তু তাই বলে তাদের উন্নতি আহামরি নয়, আগের চেয়ে অবস্থার সামান্য বদল ঘটেছে। ২০১১ সালে যাদেরকে ‘‘নিম্ন আয়ের’’ হিসেবে দেখানো হয়েছে তারাই ৫৬ ভাগ , আর তারা দৈনন্দিন ২ থেকে ১০ ডলার খরচ করে জীবন ধারণ করেছে। পিউ প্রতিবেদনে ‘মধ্য’’ ও ‘‘উচ্চ’’ আয়ের মানুষের একটা সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। যারা প্রতিদিন ১০ থেকে ৫০ ডলার অর্থাৎ প্রায় ৮শ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ করেন, তাদেরকে ‘‘মিডল’’ ও ‘‘আপার মিডল’’ বলা হয়েছে।
আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্য রেখা আর অবশিষ্ট বিশ্বের দারিদ্র্য সীমা এক নয়। ২০১১ সালে সরকারিভাবে চারজনের একটি মার্কিন পরিবারের দারিদ্র্য রেখায় থাকা বলতে বোঝাতো যারা বছরে ২৩,০২১ মার্কিন ডলার (প্রতিদিন ৬৩ ডলার) খরচ করে থাকে। এই মার্কিন দারিদ্র্য রেখার উপরে বিশ্বের মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ বাস করে।
গতকাল নিউইয়র্ক টাইমসে সোমিনি সেনগুপ্ত এক প্রতিবেদনে বলেছেন, জাতিসংঘ এ সপ্তাহের গোড়ায় মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল (সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য) বিষয়ে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে উল্লেখ করা কিছু মন্তব্যের প্রতিফলন ঘটেছে পিউ রিপোর্টেও। সোমিনি লিখেছেন, জাতিসংঘের ওই রিপোর্ট বলেছে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা বলতে যারা সোয়া ডলারের কমে জীবনযাপন করতো তাদের বোঝানো হতো। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যবর্তী সিকি শতাব্দীতে এই রকম লোকের সংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমেছে। এখন পিউ রিপোর্ট অধিকতর সংযমী ভাষায় বলেছে, ‘‘এই যে যাদের আয় বেড়েছে, তাতে কিন্তু তাদের দারিদ্র্য সেভাবে ঘোচেনি, বিশেষ করে এটা ভারত ও বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে ঘটেছে, যেখানে হঠাৎ চাকরি হারানো বা অসুস্থ হয়ে পড়া  জনগোষ্ঠীর জন্য কোন নিরাপত্তা রক্ষাকবচ নেই।
উল্লেখ্য, পিউ রিপোর্টে এই ইঙ্গিত রয়েছে যে,  যিনি প্রতিদিন ১০ ডলার খরচ করেন তাকে মধ্যবিত্ত বলার ব্যাপারে বিশ্বে ঐক্যমত বাড়ছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ ডলার খরচা করার মতো লোকের সংখ্যা ২০০১ এর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ  বেড়ে ২০১১ সালে ৭৮৪ মিলিয়নে উন্নীত হয়। তবে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসতি হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া ও সাব সাহারান আফ্রিকার নাম আগের মতোই অটুট রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে মাদক বাণিজ্যে ২২ পুলিশ, তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ by নুরুজ্জামান লাবু

মাদক ব্যবসা প্রতিরোধে যাদের অভিযান চালানোর কথা, খোদ সেই পুলিশ সদস্যরাই জড়িয়ে পড়ছে মাদক বাণিজ্যে। পুলিশ পাহারায় রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা। জেলার প্রায় সব কটি থানা পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ সদস্যদের এ কাজে সহযোগিতা করছে তাদের কথিত সোর্স। শুধু মাদক ব্যবসাই নয়, সোর্সের মাধ্যমে চাঁদাবাজিও করছে এসব পুলিশ সদস্য। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের ২২ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ৮ জন কথিত সোর্স ও ২১ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। গত ৫ই জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম মফিজুল হক স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এই চিঠিতে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় একাধিক নেতাকর্মীর নামও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ জেলার কতিপয় অসাধু পুলিশ সদস্য, তাদের কথিত সোর্সরা প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা নিচ্ছেন। এসব মাদক ব্যবসায়ীরাই পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে সংশ্লিষ্ট অসাধু পুলিশ সদস্যদের সহায়তা নিয়ে মাদক ব্যবসা করে থাকে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সোর্সদের সঙ্গে অসাধু পুলিশ সদস্যরা নিজেরাও মাদক ব্যবসা এবং চাঁদাবাজি করছে। প্রতিবেদনে যে ২২ জন অসাধু পুলিশ সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলো- বন্দর থানার ওসি নজরুল ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক মোকারম হোসেন, এসআই ভিক্টর ব্যানার্জী; সদর থানার এসআই মিজানুর রহমান মিজান, এএসআই রাজু আহম্মেদ; সদর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই (টিআই) মোজামেম্মল হক; ফতুল্লা থানার এসআই আজিজুল হক, আশিষ কুমার দাশ ও কামরুজ্জামান, এএসআই ইমরান হোসেন, সাইফুল মালেক ও কামরুল ইসলাম; সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই আলেক ও তুষার; সোনারগাঁও থানার এসআই ইয়াছিন মুন্সি, অজয় কুমার পাল, আলী রেজা, নাসির উদ্দিন; রূপগঞ্জ থানার এসআই আলাউদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, জাহাঙ্গীর আলম ও রূপগঞ্জের ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই রবিউল ইসলাম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ জেলা একটি অপরাধ প্রধান, শিল্পসমৃদ্ধ এবং ঘনবসতি এলাকা। এলাকাটি মাদক চোরাচালানের রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ কারণে ফতুল্লা থানায় অবৈধ অর্থলোভী পুলিশ সদস্যদের তদবির করে বদলি হয়ে আসার প্রবণতা রয়েছে। অবৈধ অর্থলোভী ডিবি ও পুলিশ সদস্যরা মূলত সোর্সদের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের পথ সুগম করে থাকে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়া মাতৃসদন ভবনের মালিক ও ঢাকায় কর্মরত কাস্টম বিভাগের সুপার শ্রী সুজিৎ দীর্ঘদিন ধরে জেলায় অবৈধভাবে বিদেশী মদ ও বিয়ার সরবরাহ করে থাকে। তাকে সহায়তা করে সদর থানার সেকেন্ড অফিসার মিজানুর রহমান মিজান। কাস্টম সুপার সুজিৎ, এসআই মিজান ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মুন্না নিয়মিত ঢাকা থেকে মাদকদ্রব্য নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যায়। মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রে তারা এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে থাকে। অধিকাংশ সময় ভোর বেলায় এসআই মিজানের ক্লিয়ারেন্স এবং কাউন্সিলর মুন্নার পাহারায় নারায়ণগঞ্জে মাদক ঢুকে। সুজিৎ নিয়মিত নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় বড় অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে থাকে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, নারায়নগঞ্জ শহরের শহীদ মিনার এলাকাসহ শহরের ফুটপাথগুলোতে হকারদের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। সদর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মোজাম্মেল হকের পাহারায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা চলছে। এর বাইরে মোজাম্মেল ফুটপাথের হকারদের কাছ থেকে দিন হিসেবে সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০-৬০ টাকা অবৈধ ভাড়া উত্তোলন করে। এসব হকারদের মাদক ব্যবসায় ব্যবহার করে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী সুমন মোল্লা গ্রুপ। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও মোল্লা গ্রুপ মাদকের হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করে আসছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁও থানাধীন ললাটি গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেন, সেনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা  শামীম, বারেক, খোকন ও লিটনসহ ৮-৯ জনের একটি সিন্ডিকেট মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসকল মাদক ব্যবসায়ীরা সোনারগাঁও থানাধীন মেঘনাঘাট, আননন্দবাজার, মোগড়াপাড়া, বারদি, কাঁচপুর, বৈদ্যের বাজার, শম্ভুপুরা, জামপুর, কাইকেরটেক, তালতলা, আশিয়ারচর, নয়াপুর, সেনপাড়া ও সাদীপুর এলকাকাকে স্পট হিসেবে বেছে নিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব স্পটে সাধারণত হিরোইন, ফেন্সিডিল, মদ, গাঁজা ও ইয়াবা বেশি বিক্রি হয়। সোনারগাঁও থানার এসআই ইয়াসিন মুন্সী, এসআই অজয় কুমার পাল, এসআই আলী রেজা এবং নাসির উদ্দীন এসব মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে থাকে।
প্রতিবেদনের তথ্য মতে, সিদ্ধিরগঞ্জের মাদক ব্যবসায় সহায়তা করেন থানার এসআই আলেক ও তুষার। পুলিশের পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন থানা যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান মতি ও যুবলীগ নেতা শহিদুল্লাহ ওরফে কালা মানিক। সিদ্ধিরগঞ্জের এনায়েতনগর, কুমিল্লা পট্টি, গোদনাইল পাঠানটুলি, জেলপাড়া পুল, আদমজি ইপিজেড, মুক্তি স্মরনি, চট্টগ্রাম রোড ও ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকা মাদক স্পট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। কালা মানিকের সহযোগীদের মধ্যে কেটু সুমন, দেলোয়ার হোসেন দুলু, ডাকাত মাসুম অন্যতম। দেলোয়ার সম্প্রতি মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলো। তবে কিছুদিনের মধ্যেই সে জামিনে বের হয়ে এবার পুলিশের সোর্স পরিচয়ে আবারও মাদক ব্যবসায় নিয়োজিত হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ বা ডিবি সদস্যরা  সাধারণত বিভিন্ন মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আসামিদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের সম্পর্ক গড়ে তোলে। অনেক আসামিরা পুলিশের অনুকম্পায় জামিনে মুক্ত হয়ে সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করে। পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে আগের চাইতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবেদনে ৮ জন সোর্সের তালিকা দেয়া হয়েছে, যারা হলো সদর উপজেলার ইউএনওর বাড়িসংলগ্ন ডিবির সোর্স আবদুর রশিদ, ফতুল্লার লালখার পুলিশ সোর্স শিবু, ধর্মগঞ্জের জাফর, ব্যাংক কলোনির জাকির হোসেন, রেলওয়ে স্টেশনের পান্না, পঞ্চবটির আনোয়ার ও বাদল এবং নন্দলালপুরের ডিবির সোর্স নওফেল। প্রতিবেদনে বলা হয়, সোর্স নামধারী ব্যক্তিরা অবৈধ অস্ত্র কিনে তা দিয়ে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে শিল্পপতি ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে থাকে। ফতুল্লা থানাধীন ৯১ (নতুন), ২/১ (পুরাতন), নিউ চাষাঢ়া, জামতলার বাসিন্দা মেহেদী হাসান মানিক ডিবি পুলিশের সোর্স পরিচয়ে স্থানীয় বিভিন্ন বাড়িল মালিক ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ভয় দেখিয়ে ও ব্ল্যাক মেইলিং করে চাঁদা আদায় করছে।
প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের একটি তালিকাও সংযুক্ত করা হয়েছে। ওই তালিকায় ২১ জনের নাম রয়েছে। তারা হলো মাসদাইর বেকারীর মোড়ের রকমত (৪০), শাসনগাঁওয়ের নূর হোসেন (৩৫), ফতুল্লার মীর সোহেল (৪০), কাইয়ুমপুরের ফহিজুল ইসলাম (৩৫), বইটা শরীফ এলাকার শরীফুল ইসলাম (৩৫) ও পাগলা হামিদ (৩৫)ম কুতুব আইল কাঠেরপুলের গিয়াস উদ্দিন ওরফে কাইল্যা গেমু (৪০), আজমত আলী (৩৮), দক্ষিণ সস্তাপুরের মাহবুবুল হক টগর (৪২), মঞ্জুরুল হক মাহী (৩৫), কতোয়ালের বাগের মনির হোসেন ওরফে কুত্তা মনির (৪০), পশ্চিম সস্তাপুরের নজরুল ইসলাম ওরফে ছোট নজরুল (৩৫), ইসদাইরের মাসুম (৪০), রসুলপুরের খালেক মুন্সী (৩২), শান্তিধারার মোস্তফা (৪১), গাবতলার মোর আলী (৪৫), মাসদাইরের উজ্জল (৪০), লালপুর টাগারপারের ছিনতাই বাবু (৩০), তল্লার জবনে আলম বিপ্লব (৪০) ও পঞ্চবটির জজ মিয়া (৩২)।

২০ বছর পর বাড়ল ভূমি উন্নয়ন কর by এম এ বাবর

ভূমি উন্নয়ন করসহ বিভিন্ন ফি বাড়িয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। চলতি মাস (জুলাই’ ১৫) থেকেই নতুন কর হার কার্যকর হবে এবং এর আগে ১৯৯৫ সালের ৩০ মে জারি করা এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে। খাস জমি ছাড়া সব সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, পরিবার বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে ভূমি উন্নয়ন কর প্রযোজ্য হবে। আর নতুন কর হার অনুযায়ী কোনো জমি ব্যবহারের প্রকৃতি পরিবর্তন হলে জমির মালিককে নিজ উদ্যোগে এসি ল্যান্ড অফিসে গিয়ে কর পুনর্নির্ধারণ করে নিতে হবে। এ সংক্রান্ত আবেদন পাওয়ার পর সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি পাঁচ বছর পর কর ও ফি পুনর্নির্ধারণ করা উচিত। কারণ তাদের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। এই মুহূর্তে নামজারি, দাখিলা, জাবেদা নকলসহ বিভিন্ন খাতে সরকার যে ফি পায় তা দিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক আয় পাঁচশ’ কোটি টাকার কাছাকাছি। কিন্তু খরচ প্রায় সোয়া ছয়শ’ কোটি টাকা। তাই সেবার মান উন্নয়নে ভূমি কর পুনর্নির্ধারণ করা করাই যুক্তিসঙ্গত।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা গেছে, হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করে ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমি করের আওতামুক্ত থাকলেও বেড়েছে অন্যান্য খাতের জমির কর। জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে কৃষি ও অকৃষি জমির জন্য পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষিজমির ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক কৃষিজমির পরিমাণ ২৫ বিঘা (৮ দশমিক ২৫ একর) হলে কোনো ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হবে না। বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ ছাড়া এই মওকুফের আওতায় আখ ও লবণ চাষ এবং কৃষকের পুকুরের জমি আওতামুক্ত থাকবে। তবে ২৫ বিঘার ওপরে হলে বা কোনো সংস্থা কর্তৃক যে কোনো পরিমাণ কৃষিজমি অধিকৃত হলে (সংস্থা বলতে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ বা দখলে কৃষিজমি), অথবা চা, কফি, রাবার, ফুল-ফলের বাগান, বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ, চিংড়ি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খামার ইত্যাদি বিশেষ কাজে ভূমি ব্যবহার করলে ভূমির পরিমাণ যাই হোক না কেন, প্রতি শতকে বছরে ২ টাকা হারে কর দিতে হবে। আর এই কৃষিজমি গ্রামে বা পৌর এলাকা কিংবা যেখানেই হোক না কেন, সব স্থানেই একই শর্ত প্রযোজ্য হবে। এছাড়া যেসব জমি ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফের আওতায় থাকবে সংশ্লিষ্ট জমির প্রতিটি হোল্ডিংয়ের ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফ বাবদ দাখিলা প্রদানের জন্য জমির মালিকের কাছ থেকে বার্ষিক ১০ টাকা আদায় করতে হবে। ১৯৯৫ সালের প্রজ্ঞাপনে শুধু ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমি করের আওতামুক্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু উল্লিখিত দিকনির্দেশনার কিছুই ছিল না।
এদিকে অকৃষি জমির ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণে এলাকাভিত্তিক ছয়টি ধাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ক’ ধাপে রয়েছে- ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনভুক্ত এলাকা। এখানে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর প্রতি শতকে তিনশ’ টাকা, শিল্প কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর দেড়শ’ টাকা এবং আবাসিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘খ’ ধাপে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনভুক্ত এলাকা। ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলা, সাভার, ধামরাই, চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী ও কক্সবাজার জেলা সদরের পৌর এলাকা। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌর এলাকা এবং সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর ও মেঘনাঘাট এলাকা। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি, জামিরদিয়া, ধানসুর, ভানডাব, কাঁঠালি ও মেহেরবাড়ি মৌজা। নোয়াখালী জেলার চৌমুহনী পৌর এলাকা। এছাড়া রয়েছে রাজউকের আওতাধীন পূর্বাচল আবাসিক এলাকা। এখানে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর প্রতি শতকে ২৫০ টাকা, শিল্প কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ১৫০ টাকা এবং আবাসিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘গ’ ধাপে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, নোয়াখালী, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর, কৃষ্টিয়া, যশোর ও পটুয়াখালী জেলা সদরের পৌর এলাকা। গাজীপুর জেলার শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার আটরা গিলাতলা ইউনিয়ন ও দামোদর ইউনিয়নের মশিখালী মৌজা। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌর এলাকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ, কুমিল্লা জেলার লাকসাম ও চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলা। ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা পৌর এলাকা এবং টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর পৌর এলাকা। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর পৌরসভা। এছাড়া রয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরববাজার পৌর এলাকা। এখানে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর প্রতি শতকে দুইশ’ টাকা, শিল্প কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ১২৫ টাকা এবং আবাসিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘ঘ’ ধাপে অন্যান্য জেলা সদরের পৌর এলাকা। অন্যান্য সব প্রথম শ্রেণীর পৌর এলাকা। নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি ও চাটখিল পৌর এলাকা এবং লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ ও রায়পুর পৌর এলাকা। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়ন। বগুড়া জেলার শান্তাহার পৌর এলাকা ও শেরপুর পৌর এলাকা। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি পৌর এলাকা এবং পাবনা জেলার ঈশ্বরদী পৌর এলাকা। খুলনা জেলার দীঘলিয়া উপজেলার যৌগীপুর ইউনিয়ন ও আড়ংঘাটা ইউনিয়ন, বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়ন, ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়ন এবং যশোর জেলার অভয়নগর পৌরসভা। দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর পৌরসভা। এছাড়া এই ধাপে রয়েছে নোয়াখালী জেলার বশুরহাট পৌর এলাকা। এখানে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর প্রতি শতকে একশ’ টাকা, শিল্প কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ৭৫ টাকা এবং আবাসিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘ঙ’ ধাপে অন্য সব পৌর এলাকা। এখানে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর প্রতি শতকে নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ টাকা, শিল্পকাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ৪০ টাকা এবং আবাসিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘চ’ ধাপে পৌর এলাকা ঘোষিত হয়নি এমন এলাকা ভূমি উন্নয়ন করের আওতায় আসবে। এখানে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর প্রতি শতকে ৪০ টাকা, শিল্পকাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ৩০ টাকা এবং আবাসিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জমির উন্নয়ন কর ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়েছে, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়যোগ্য কোনো জমির পরিমাণে শতকের ভগ্নাংশ থাকলে তা পরবর্তী পূর্ণ শতক ধরে ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারিত হবে। এছাড়া সার্বিকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে নিজ উদ্যোগে এলাকা পরিদর্শন করে ভূমি ব্যবহারের প্রকৃত ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি ব্যবহারের প্রকৃতি পরিবর্তনের কারণে ভূমি উন্নয়ন কর পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) অবহিত করে অনুমোদন নিতে হবে। কোনো জমি ব্যবহারের প্রকৃতি পরিবর্তন হলে জমির মালিককে নিজ উদ্যোগে এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। আর কেউ এসি ল্যান্ডের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে তিনি সংশ্লিষ্ট জেলার এডিসি (রাজস্ব) বরাবর আপিল করতে পারবেন। একইভাবে তিনি যদি এডিসির সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হন তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করতে পারবেন। এরপর কেউ চাইলে বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভূমি আপিল বোর্ডেও যেতে পারবেন। ভূমি আপিল বোর্ডকে এ ধরনের কেস একটি যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।

গুঞ্জনই সত্য হলো

গতকাল যুবলীগের ইফতার অনুষ্ঠানে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম
সৈয়দ আশরাফ দপ্তরবিহীন মন্ত্রী, স্থানীয় সরকারের দায়িত্বে খন্দকার মোশাররফ
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত মঙ্গলবার তাঁর অব্যাহতি পাওয়ার গুঞ্জনকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর প্রায় ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন, যিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। এখন পুরোনো মন্ত্রণালয়টি থাকছে তাঁর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে।
সৈয়দ আশরাফকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করায় দলের মধ্যে যাঁরা খুশি, তাঁদের অনেকেই আবার নাখোশ ওই মন্ত্রণালয়ে তুলনামূলক কম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ায়। নব্বই-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলের সাধারণ সম্পাদকই আর্থিক বা দলীয় বিবেচনায় এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে মন্ত্রিসভা থেকে আরও অন্তত তিনজন বিতর্কিত মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে গুঞ্জন রয়েছে। শিগগিরই এই রদবদল হতে পারে বলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আভাস পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’
গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুপস্থিত থাকায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আভাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে ওই দিন ব্যাপক আলোচনা হলেও সন্ধ্যার দিকে সৈয়দ আশরাফ বিষয়টিকে গুজব বলে এতে কান না দেওয়ার পরামর্শ দেন।

গতকাল দুপুরে সৈয়দ আশরাফকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। তাঁরা প্রায় এক ঘণ্টা একান্তে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এ সময় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রস্তাব তিনি মেনে নেন। দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে তিনি থাকছেন। দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল হওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বেও তিনি থাকবেন। আগামী ডিসেম্বরে ওই কাউন্সিল হওয়ার কথা।
গতকাল দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হওয়ার পরও সৈয়দ আশরাফ স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন। বিকেলে তিনি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর দলীয় কার্যালয়ে যুবলীগের ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ সময় সাংবাদিকেরা অনেক চেষ্টা করলেও তিনি এ বিষয়ে কিছু বলেননি।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, এটা তাঁর প্রাপ্য ছিল। তাঁর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই দল ও সরকারে আলোচনা-সমালোচনা ছিল।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, মঙ্গলবার একনেকের সভায় অনুপস্থিত থাকায় সৈয়দ আশরাফকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। মন্ত্রণালয়ে না যাওয়া, সরকার ও দলের অনুষ্ঠানে মাঝেমধ্যে যোগ দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে সরকার ও দলের ভেতর সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। এ ছাড়া সরকার ও দলের নিচু থেকে উঁচু স্তরের নেতাদের অনেকেই তাঁর সমালোচনা করতেন।
আপাতদৃষ্টিতে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযোগ ছিল, তিনি মন্ত্রণালয়ে যান না। কিন্তু ওই মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ সময়মতো হয়নি কিংবা কাজে দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়েছে—এমন ব্যক্তিগত অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে শোনা যায়নি। তবে দল থেকে নেওয়া তাঁর একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়ম-সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে।
দলীয় কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশ না নেওয়া এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সারা দেশে দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, পরামর্শ ও দল পরিচালনায় তাঁর একধরনের অনাগ্রহ থাকার অভিযোগ নতুন নয়। এই অভিযোগের ভিত্তি থাকলেও দলের পদ থেকে তাঁকে সরানো হয়নি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, সরকার যে প্রক্রিয়ায় বা পদ্ধতিতে চলে, তার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে তাঁর ভিন্নমত ছিল। সর্বশেষ একনেক সভায় তাঁর মন্ত্রণালয়ের ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার যে বিশাল প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়, ওই প্রকল্প নেওয়ার বিষয়েও তাঁর সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি।
বিভিন্ন সময়ে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থায় শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ, ওই সব পদে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সঙ্গে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এর অনেকগুলোই হয়েছে তাঁর অমতে। ঢাকার দুটি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২৮ এপ্রিলের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে সরকারের নির্দেশনাও গিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে। এটি পদ্ধতিগতভাবে সঠিক না হওয়ায় আগের প্রস্তাব ফেরত এনে নতুন করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। এ রকম আরও কিছু পদ্ধতিগত ও প্রক্রিয়াগত বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। জেলা পরিষদে সরকারের মনোনীত প্রশাসক দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন তিনি। তাঁর মত ছিল, জেলা পরিষদে নির্বাচন করা অথবা কিছুই না করা। এ ছাড়া গত আড়াই বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১৪ জন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে তাঁর মত নেওয়া হয়নি।
সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’ নিয়ে বেপরোয়া অনিয়ম ও দুর্নীতি হলেও এর প্রকল্প পরিচালক প্রশান্ত কুমার কর্মকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি তিনি। প্রকল্প পরিচালক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে মন্ত্রী হিসেবে তাঁকে পাশ কাটিয়ে যান। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রশান্ত কুমারের দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরও বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। একপর্যায়ে মন্ত্রী হিসেবে ওই প্রকল্পের যেসব নথিতে তাঁর সইয়ের দরকার ছিল, তা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন সৈয়দ আশরাফ। তিনি আগে দুর্নীতির তদন্ত করা এবং প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার কারণ তদন্ত করতে বলেন, এরপর সই দেবেন বলেও জানান। কিন্তু পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ধীরগতিতে এগোয়।
এর আগে নবম সংসদের মেয়াদকালে যখন প্রথম সাংসদদের হাতে সরাসরি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে, তখন তিনি এর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেছিলেন, এই টাকা সাংসদদের হাতে সরাসরি দেওয়া হলে তা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠবে। এর পরিবর্তে তিনি সাংসদদের দেওয়া প্রকল্পের বিপরীতে টাকা বরাদ্দের পক্ষে অবস্থান নেন। ওই সংসদে বিএনপির সাংসদেরাও ছিলেন। কিন্তু সরকারের প্রস্তাব ছিল, শুধু সরকারদলীয় সাংসদদের ওই অর্থ দেওয়া। তিনি এরও বিরোধিতা করে সব সাংসদের জন্য বরাদ্দের পক্ষে অবস্থান নেন। এসব ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থানই কার্যকর হয়। তবে এ নিয়ে সরকারের ভেতরে তাঁর সম্পর্কে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় ও দলে সৈয়দ আশরাফের নিষ্ক্রিয়তা প্রধানমন্ত্রী এক প্রকার মেনেই নিয়েছিলেন। নইলে গত প্রায় সাড়ে ছয় বছর কীভাবে থাকলেন। তবে মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সৈয়দ আশরাফের অবস্থান মন্ত্রণালয়ে দুর্বল হতে থাকে। এর আগের মেয়াদে স্থানীয় সরকারে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জাহাঙ্গীর কবির নানক দায়িত্ব পালন করায় এবং তিনি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় খুব একটা সমস্যা হয়নি। প্রতিমন্ত্রীই তখন মন্ত্রণালয় চালিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ভিন্ন দলের একজন নেতাকে প্রতিমন্ত্রী করায় এবং সৈয়দ আশরাফ নিষ্ক্রিয় থাকায় মন্ত্রণালয়ে আমলাতন্ত্রের খবরদারি বেড়ে যায় এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এই মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হয়।
সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে চলমান মতবিরোধ উসকানি পায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের একটি বক্তব্যে। একনেক সভায় তিনি বলেন, ছয় হাজার কোটি টাকার এত বড় প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দুজন মন্ত্রী রয়েছেন, একজনও আসেননি। তাই এ প্রকল্প একনেক সভা থেকে প্রত্যাহার করা হোক। তাঁদের মতামত নিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন করা দরকার।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা বলেন, প্রকল্পটা প্রত্যাহার করবেন না। উনি যখন আসেন না, উনাকে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ওই দিন পরিবর্তন না করলেও দুই দিন পর তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা: ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, নতুন দায়িত্ব পেয়ে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘আমার প্রথম ও প্রধান কাজ হবে প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী কর্মসূচি “একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প” বাস্তবায়নের মাধ্যমে পল্লি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।’ গতকাল বিকেলে ফরিদপুর শহরতলির বদরপুর এলাকার নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রী এ কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর বেয়াই খন্দকার মোশাররফ। বলেন, এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামের উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। এই কাজ করার সুবাদে গ্রামীণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নত জনপদ গড়ে তোলা হবে।
ক্ষুব্ধ কিশোরগঞ্জবাসী: নিজস্ব প্রতিবেদক, ভৈরব জানান, সৈয়দ আশরাফকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ায় এলাকার লোকজন বেজায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। চা দোকানি নাসির মিয়া বলেন, ‘হুনুইন, ভালা মানুষের ভাত নাই।’ শহরের নগুয়া মহল্লার অটোরিকশা গ্যারেজের মালিক তামিম মিয়ার মন্তব্য, ‘শুধু কি ভাত নাই, দামও নাই। তা না হইলে কি আর সৈয়দ আশরাফের মতো সৎ ও বিনয়ী এক নেতাকে মন্ত্রিত্ব হারাতে হয়?’
এর ফলে কিশোরগঞ্জের চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা অনেকের। তাঁর অব্যাহতির খবরে ভেঙে পড়েন দলীয় নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে তাঁর এলাকার সাধারণ মানুষও।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ আফজাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর তো হাত নেই। তবে আমাদের নেতা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নেই, ভাবতে খারাপ লাগছে।’