Friday, August 2, 2024

বাংলাদেশে সহিংসতায় কমপক্ষে ৩২ শিশু নিহত -ইউনিসেফের বিবৃতি

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতায়  কমপক্ষে ৩২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। আরও অনেক শিশু আহত হয়েছে এবং অনেককে আটক করা হয়েছে। এ তথ্য দিয়ে শুক্রবার একটি বিবৃতি দিয়েছে ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক সঞ্জয় উইজেসেকেরা। বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, আমি বাংলাদেশ থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ফিরে এসেছি এবং সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং শিশুদের ওপর চলমান অস্থিরতার প্রভাব নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

বিবৃতিতে সঞ্জয় বলেছেন, ইউনিসেফ এখন নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশে জুলাইয়ের বিক্ষোভে কমপক্ষে ৩২ জন শিশু নিহত হয়েছে, আরও অনেক শিশু আহত হয়েছে এবং অনেককে আটক করা হয়েছে। এ এক ভয়াবহ ক্ষতি। ইউনিসেফ সকল সহিংসতার নিন্দা জানায়। আমি কন্যা ও পুত্র হারানো পরিবারগুলোর প্রতি ইউনিসেফের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা জানাই। শিশুদের সর্বদা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফের ওই কর্মকর্তা।
সঞ্জয় বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতি ও প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে সচেতন রয়েছেন। তিনি বলেছেন, সেখানে শিশুদের আটক করা হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে একটি শিশুর জন্য আইনের আওতায় আসা কতোটা ভয়াবহ হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশনের সঙ্গে একমত হয়ে যেখানে বাংলাদেশ শিশুদের অধিকারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘে স্বাক্ষর করেছে তাতে দেশটির এমন আচরণ উদ্বেগজনক।এক্ষেত্রে ইউনিসেফ শিশুদের এভাবে আটকের নিন্দা জানায়। কোনো বিক্ষোভে নিছক উপস্থিতির জন্য এভাবে কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার বা আটক করা উচিত নয় বলেও মনে করে ইউনিসেফ।
সহিংস পরিস্থিতিতে আটক হওয়া শিশুদের সহায়তা করা ইউনিসেফের দায়িত্ব উল্লেখ করে বিবৃতিতে সঞ্জয় বলেছেন, আমি ইউনিসেফ সমর্থিত চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ পর্যবেক্ষণ করেছি যা সহিংস অবস্থা সৃষ্টির পর থেকে ২৫০ শতাংশ বেশি কল পেয়েছে। আমি দেখেছি কীভাবে ইউনিসেফের প্রশিক্ষিত কাউন্সিলররা শিশুদের উদ্বেগের কথা শোনেন, তাদের উপযুক্ত পরিষেবাগুলো উল্লেখ করেন। ইউনিসেফের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সহিংস পরিস্থিতি শুরুর পর প্রায় ১১০০ কর্মী শিশুদের উদ্বেগ শুনেছেন এবং তাদের মানসিক অবস্থা উন্নয়নে পরামর্শ দিয়েছেন।
শিশুদের সহিংস পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত বিদ্যালয় খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি মনে করে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায় হলো বিদ্যালয়গুলো দ্রুত চালু করা। বন্ধু এবং শিক্ষকদের সঙ্গে পুনরায় তাদের মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। বাংলাদেশের এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে প্রায় ৩ কোটি শিশু শিক্ষার্থী তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছে। এ বছর এমনিতেই বৈরি আবহাওয়ার ফলে বেশ কিছুদিন বিদ্যালয় বন্ধ ছিল। এক্ষেত্রে শিশুরা যত পাঠের বাহিরে থাকবে তাতে তাদের ভবিষ্যৎ তত হুমকির মধ্যে পড়বে বলে মনে করে ইউনিসেফ। ইউনিসেফ তরুণদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে যোগদানের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থাটি মনে করে শিশুরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাই কথা বলার সময় শিশুদের অধিকার রক্ষা করা উচিত।

ক্ষমা চেয়ে সরকারকে পদত্যাগ করার আহ্বান ফখরুলের

হত্যা ও নির্যাতনের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, শুধু হামলা নয়, শুক্রবারের কর্মসূচি বানচাল করতে ফেসবুক, টেলিগ্রামসহ সামাজিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন সাইট বন্ধ করে দেয় সরকার। প্রকৃতি ও সরকারি প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকসহ জনসাধারণের সম্মিলিত স্বতঃস্ফূর্ত গণমিছিল প্রমাণ করে সমগ্র দেশ আজ রাষ্ট্রঘাতী-প্রাণঘাতী স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। দমন-নিপীড়ন বন্ধ করে গণহত্যা ও নির্যাতনের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে সরকারকে আর কোনো ক্ষতি না করে অবিলম্বে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকারের সশস্ত্র হামলায় গণহত্যার শিকার নিহত ছাত্র-জনতার আত্মার মাগফেরাত কামনায় এবং হত্যাকারীদের বিচার ও আটককৃতদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল দোয়া ও গণমিছিলের কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের ন্যক্কারজনক সশস্ত্র হামলা চলায়। হবিগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় নিরীহ শ্রমিক মুশতাক মিয়া নিহত হন এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষ আহত হয়েছেন। সিলেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে অসংখ্য মানুষকে আহত করে।

ফখরুল বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দৈনিক কালবেলার সিলেট ব্যুরোর সংবাদদাতা মিঠু দাস জয় গুলিবিদ্ধ হন। উত্তরায় পুলিশ এবং আওয়ামী ক্যডাররা গুলি ছুড়ে আহত করেছে শিক্ষার্থীদের। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সেখানে নারী শিক্ষার্থীদেরকে একটি বাসায় আটকে রাখে। নরসিংদীতে ছাত্রীদের মিছিলে মহিলা আওয়ামী লীগের উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা হামলা চালায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নির্মম, নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে সরকার ধিকৃত, ঘৃণিত হলেও জাতিসংঘসহ দেশ-বিদেশের কারও কথায় কর্ণপাত না করে হত্যা, নিষ্ঠুর হামলা, নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে রেকর্ডসংখ্যক মিথ্যা মামলার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আইনজীবীরা মামলার কাগজ তুলতে গেলে তা না দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এসব মামলায় নিরীহ শিক্ষার্থী, জনসাধারণসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তার ও গ্রেপ্তার বাণিজ্য করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাহার, হয়রানি ও গ্রেপ্তার বাণিজ্য বন্ধ করারও দাবি জানান।

বিএনপি মহাসচিব হবিগঞ্জে নিহত মুশতাক মিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। পাশাপাশি হবিগঞ্জ, সিলেট ও খুলনাসহ অন্যান্য স্থানে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন তিনি।

খুব কাছ থেকে গুলি মর্মান্তিক সংঘর্ষের ছবি প্রকাশ পাচ্ছে: এএফপি’র রিপোর্ট

বার্তা সংস্থা এএফপি এক রিপোর্টে বলেছে, দেশ জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া এবং আবার তা চালু হওয়ার পর লাখ লাখ বাংলাদেশি অনলাইনে ফিরেছেন। তারা নিজেদের ঘরের ভেতর বন্দি করে রেখেছিলেন। এ সময়ে তারা যেসব কথা শুধু শুনেছেন, তাদের অনেকে পুলিশের সেই ভয়াবহ দমনপীড়নের দৃশ্য দেখে স্তব্ধ। গত মাসে  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০৬ জন নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার মেয়াদে সরকারি চাকরিতে বিধির বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলনে এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতা। নিহতদের মধ্যে কিছু পথচারী এবং কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে, নিহতদের বেশির ভাগই মারা গেছেন পুলিশের গুলিতে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করার নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ১১ দিন পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। এ জন্য নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার সংঘর্ষের ফুটেজ সংবাদ ভিত্তিক সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে ছিল ব্যাপকভাবে অনুপস্থিত। এরপর সচল করা হয়েছে ইন্টারনেট মোবাইল নেটওয়ার্ক। এর আগে কী ঘটেছে সে সম্পর্কে ধারণা করতে পেরেছিলেন খুব কম মানুষই। যদিও এই অস্থিরতা শান্ত হয়েছে। কিছু তরতাজা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি করছে পুলিশ। ফলে এই সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে। একজন যুবককে এক পুলিশ কর্মকর্তা গুলি করেছেন। তাকে অন্য একজন টেনে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এমন একটি শর্ট ক্লিপের জবাবে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারী লিখেছেন, আমাদের ভাই ও বোনদের এভাবে কেমন করে হত্যা করছে পুলিশ?

ওই ফুটেজটি রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা যাত্রাবাড়ীরÑ বিষয়টি নিশ্চিত হতে সক্ষম হয়েছে এএফপি। সেখানে তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী ভিডিওটি শনাক্ত করতে সহায়তা করেছেন। তারা সবাই প্রতিশোধ নেয়ার ভয়ে নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ২০শে জুলাই অস্থিরতার চরম পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করার জন্য সরকার দেশ জুড়ে কারফিউ ঘোষণা দিয়ে সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেয়। এরপরই ওই ঘটনা ঘটে। তিন প্রত্যক্ষদর্শীর একজন বলেন, ভিডিওর ওই ব্যক্তি ১৮ বছর বয়সী ইমাম হোসেন তায়েম। তাকে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ। কিন্তু গুলি করার আগে সে প্রতিবাদ বিক্ষোভে অংশ নেয়নি। ওই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, মাটিতে পড়ে যায় তায়েম। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থল থেকে দু’জন মানুষ সরে যান। কিন্তু একজন যুবক ফিরে গিয়ে তার বন্ধুকে টেনে সরানোর চেষ্টা করেন। তায়েমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তার পিতা মইনুল হোসেন বলেন, পরের দিনই তিনি মারা যান। তায়েমের বড়ভাই তুহিন বলেন, তায়েম কোনো বিক্ষোভকারী ছিল না। কারফিউ’র বিরতির সময় সে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছিল।  ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পর তায়েমের এই ভিডিও দেখেছেন কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ। ৬০ সেকেন্ডের এই ভিডিওক্লিপের শেয়ার হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ সহ অন্যান্য প্ল্যাটফরমে।
কিছু দিন আগে রামপুরা থেকে ধারণ করা আরেকটি ভিডিও যাচাই করেছে এএফপি। এতে দেখা যায়, একটি নির্মাণাধীন ভবনে পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টাকারী এক যুবককে খুব কাছ থেকে গুলি করছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, ওই ব্যক্তি ভবনটিতে উঠে পালাতে চেয়েছিলেন। ফেসবুকে এই ভিডিও ক্লিপটি দেখেছেন কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ। ফেসবুকের একজন ব্যবহারকারী এটা দেখে কমেন্টে লিখেছেন, ‘এই ভিডিও দেখে কতোবার কেঁদেছি জানি না। আমি এখনো কাঁদছি। একটি স্বাধীন দেশে এটা হতে পারে না।’
১৫ বছরের শাসনকালে বিরোধী দলগুলোকে একপেশে করে ফেলা এবং নিষ্ঠুরভাবে ভিন্নমতকে দমন করার অভিযোগে সরকারকে দায়ী করেছে অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর প্রেস ফ্রিডম সূচকে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫ নম্বরে। এই অবস্থান রাশিয়ার নিচে এবং সৌদি আরবের উপরে। গত মাসের অস্থিরতার সময়ে প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মেগাসিটির মানুষ তাদের ঘরের ভেতর থেকে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়েছেন। কিন্তু টেলিভিশনে তা ভয়াবহভাবে সেন্সর করার ফলে তা ছিল অনুপস্থিত। বিশৃঙ্খলাকারীদের ওপর পুলিশি জবাব দেখানো হয়নি বললেই চলে। পক্ষান্তরে তারা প্রচার করেছে বিক্ষোভকারীদের দেয়া অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের দৃশ্য। ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দেখতে পেয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অনেক স্থানে ‘বেআইনি’ শক্তি প্রয়োগ করেছে পুলিশ। পুলিশি অভিযানের নিন্দা জানিয়েছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল। একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিচার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এক বিবৃতিতে জোসেপ বোরেল বলেন, বিক্ষোভকারী ও অন্যদের বিরুদ্ধে আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত এবং প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অনেক ঘটনার পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের কথা সপ্তাহান্তে প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেছেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা চরম ধৈর্য দেখিয়েছেন। সরকারি ভবনগুলোতে হামলা ঠেকাতে প্রয়োজন হয়েছে যখন, শুধু তখনই গুলি করেছে। যখন তারা দেখেছেন সম্পত্তি সুরক্ষিত করা যাচ্ছে না, তখন গুলি করতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ।

বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্রের লড়াই by ড. মুবাশ্বার হাসান

শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস দমনপীড়নের মধ্য দিয়ে সরকারের সর্বগ্রাসী উদ্দেশ্য প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ পেয়েছে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতায় স্থিতিস্থাপকতার (রিসাইলেন্স) বিষয়ও। এই সঙ্কটকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতির ‘আত্মার লড়াই’ (ব্যাটল ফর সাউল) হিসেবে দেখা যেতে পারে। একদিকে আছেন ৭৬ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৫ বছর ধরে তিনি খাঁটি, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করেননি। তিনি বাংলাদেশকে স্বৈরতন্ত্র থেকে একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছেন বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে তার এই সর্বগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গিতে কেউ তার বা তার সরকারের কোনো জবাবদিহিতা চাইতে পারবেন না। যদি কেউ প্রতিবাদ করেন তাহলে সহিংস দমনপীড়নের মুখে পড়তে হয় তাকে বা তাদেরকে। এর মধ্যে আছে মৃত্যু, নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম ও বন্দি করে রাখা।

প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে যেকোনো রকম সহিংসতাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ এবং ‘ষড়যন্ত্রকারী’দের কাজ বলে অভিহিত করা হয়। বলা হয়, তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত পিতা ও দেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নকে পথচ্যুত করতে চায়।এই লড়াইয়ের অন্যদিকে আছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষ। তারা সরকারের জবাবদিহি চায়। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর অংশগ্রহণ চায়। সরকারি চাকরিতে সুষ্ঠু অধিকারের দাবিতে তারা তাদের গণতান্ত্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চর্চা করতে চান, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে।

১৫ বছর ধরে সব স্তরের বাংলাদেশি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের মুখে তাদের সহনশীলতা প্রদর্শন করেছেন। এবং একে চ্যালেঞ্জ করার জন্য নতুন কৌশল অবলম্বন করেছেন। শেখ হাসিনার সর্বগ্রাসী উচ্চাকাঙ্খার বিরুদ্ধে বর্তমানে ছাত্রদের চাপ হলো ‘ডেমোক্রেটিক ব্রিকোলেজ’-এর একটি উদাহরণ। ডেমোক্রেটিক ব্রিকোলেজ হলো এমন একটি সৃষ্টিশীল উপায় যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল সরকার এবং জনগণের অংশগ্রহণের আদর্শকে সমুন্নত করা হয়। স্বৈরাচারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয়।

এর আগে ২০১৮ সালের বিক্ষোভের সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরসুরিদের জন্য সরকারি চাকরিতে শতকরা ৩০ ভাগ কোটা বাতিল দাবি করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওই কোটা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। তারা আরও অভিযোগ করেন যে, শেখ হাসিনার সরকার তার দলীয় ক্যাডারদেরকে নিয়োগ দেয়ার জন্য এই কোটা ব্যবহার করছিলেন। ২০১৮ সালের বিক্ষোভে কোটা ব্যবস্থা বাতিল হয়।
তবে তা এ বছর আবার ফেরানো হয়। এতে বহু শিক্ষার্থী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করার পাশাপাশি র‌্যালি করতে থাকেন। এ সময়ে তারা তাদের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদ করার অধিকার প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য মন্তব্য করেন। রাজাকার একটি অবমাননাকর শব্দ। এটা দিয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে যারা নৃশংসতা চালিয়েছিল বা চালাতে সহায়তা করেছিল তাদেরকে বোঝানো হয়। তার এই অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা উল্টো স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে একজন স্বৈরাচার বলে আখ্যায়িত করতে থাকে।

এই প্রতিবাদ থামাতে শেখ হাসিনার সরকার প্রথমে তার দল আওয়ামী লীগের ছাত্র বিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নামায়। তারা লাঠি, পিস্তল ও অন্যান্য অস্ত্র হাতে বৈষম্যমূলকভাবে হামলা করে। এমনকি তারা নারী শিক্ষার্থীদেরও ছাড় দেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগকে সমর্থন দিতে দেখা গেছে পুলিশকে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে।

এমন অবস্থায় ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। অভিযোগ করা হয়েছে যে, তারা ঢাকায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন স্টেশনে আগুন দিয়েছে। এই টেলিভিশন স্টেশনকে সরকারের মুখপত্র হিসেবে দেখা হয়।

প্রতিবাদকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ, সেনবাহিনী, বিজিবি, ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ ও গোয়েন্দা এজেন্সিসহ সব নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের মোতায়েন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইন্টারনেট ব্লাকআউট করে দেয়া হয়। জারি করা হয় কঠোর কারফিউ। হামলাকারী বা উত্তেজিত জনতার ভিড় দেখতে তাদের বিরুদ্ধে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়।
এর ফলাফল ভয়াবহ। হিসাব অনুযায়ী, এতে নিহত হয়েছেন প্রায় ২০০ মানুষ। এর বেশির ভাগই ছাত্র। নিহতদের মধ্যে বেশ কিছু শিশু আছে। শিক্ষার্থীরা এবং কিছু মিডিয়ার সূত্র দাবি করেছে, নিহতের প্রকৃত এই সংখ্যা অনেক বেশি। মিডিয়ার রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি করতে ব্যবহার করা হয়েছে হেলিকপ্টার। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিক্ষোভকারীদের দমন করতে ব্যবহার করা হয়েছে ইউএন লেখা সংবলিত ভেহিক্যালস। দেশটির নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবির দায়িত্ব হলো দেশের সীমান্ত রক্ষা করা। তাদেরকে দেখা গেছে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুলি করতে।

এর মধ্যে সরকার কোটা কমিয়ে ৭ ভাগ করেছে। এর মধ্যে শতকরা ৫ ভাগ রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরিদের জন্য। দুই ভাগ রাখা হয়েছে নৃগোষ্ঠী এবং বিকলাঙ্গ বা ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য। এর মধ্য দিয়ে দমনপীড়নের নৃশংসতা মুছে দেয়া যায় না। এমন দমনপীড়নের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো শোনা যায়নি।

সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট ফিরে আসার পর ভয়াবহতা ফুটে উঠছে ভিডিও ও ছবিতে। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে রাস্তায় গুলি করতে দেখা যাচ্ছে। তাদেরকে রাস্তার ওপর ফেলে রেখেছিল তারা। অনেকের অঙ্গহানী হয়েছে। এমনকি চোখ হারিয়েছেন। ছাত্র আন্দোলনের বেশ কিছু নেতাকে জোরপূর্বক অদৃশ্য করে  ফেলা হয়। তাদেরকে নির্যাতন চালানো হয় এবং সরকার জোর করে তাদের সম্মতি আদায় করে। যাহোক শেখ হাসিনা দৃশ্যত রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু তিনি বহু মানুষের হৃদয় ও মন জয় করতে পারবেন না।

যেসব ছাত্রনেতাকে জোরপূর্বক তুলে নেয়া হয়েছিল, নির্যাতন করা হয়েছিল এবং পরে মুক্তি দেয়া হয়েছে- তারা আশা ছেড়ে দিচ্ছেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে, অশ্রুসজল চোখে এবং স্পষ্ট ব্যথা নিয়ে তারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গণহত্যার দায় শেখ হাসিনাকে মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

(লেখক নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব অসলোতে ডিপার্টমেন্ট অব কালচারাল স্টাডিজ অ্যান্ড অরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজের পোস্টডক্টরাল গবেষক ফেলো। তার গবেষণায় অর্থায়ন করেছে নরওয়েজিয়ান রিসার্স কাউন্সিল।)

(অনলাইন ৩৬০ ইনফো, টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে)

টিউলিপ সিদ্দিকের বাসা ভাড়া নিয়ে ব্রিটেনে সংসদীয় কমিশনারের তদন্ত

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ড নজরদারি কমিশনার নতুন সরকারের ইকোনমিক মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, লন্ডনে একটি ফ্ল্যাট থেকে ভাড়া আয় হিসেবে নথিভুক্ত না করার কারণে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সংসদ সদস্যর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ব্রিটিশ সংসদ হাউস অফ কমন্সের স্ট্যান্ডার্ড কমিশনারের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেট আসনের এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ৩০ জুলাই তদন্ত খোলা হয়।

হাউস অফ কমন্সের কোড অফ কন্ডাক্ট-এর ক্যাটেগরি ৩ (যুক্তরাজ্যের কোন সূত্র থেকে উপহার, আয় বা আপ্যায়ন গ্রহণ করা) এবং ক্যাটেগরি ৬ (ভূমি ও সম্পদ)-এর অধীনে সময় অনুযায়ী তথ্য রেজিস্টার না করার জন্য তদন্ত করা হচ্ছে বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়।

ব্রিটিশ সংসদের স্ট্যান্ডার্ড কমিশনারের দায়িত্ব হচ্ছে সদস্যদের আচরণের উপর নজরদারি করা, যার মধ্যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাদের আর্থিক স্বার্থ রেজিস্টার করা। এর মাধ্যমে, কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িত আছে, তা প্রকাশ করতে হয়।

বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিজ সিদ্দিক হচ্ছেন নব-নির্বাচিত সংসদের প্রথম সদস্য যাকে স্ট্যান্ডার্ড কমিশনারের তদন্তের আওতায় আনা হলো।

'অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি'

লেবার পার্টির একজন মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানায়, 'টিউলিপ এ‘বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড কমিশনারের সাথে সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করবে।'

টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার বড় মেয়ে। তিনি ২০১৫ সাল থেকে টানা চারবার সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন।

এর আগে লেবার পার্টি স্থানীয় পত্রিকা দ্য ডেইলি মেইলকে বলেছিল, এই আয় রেজিস্টার করার ব্যর্থতা ছিল একটি 'দাপ্তরিক অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি।'

বিগত সংসদের তিনজন সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলমান আছে।

বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক এমপি বব স্টুয়ারটের বিরুদ্ধে স্বার্থ সম্পর্কে ঘোষণা না দেয়া এবং তদন্তের সাথে অসহযোগিতা করার অভিযোগ আছে।

প্রাক্তন কনজারভেটিভ এবং বর্তমানে রিক্লেইম পার্টির এমপি অ্যান্ড্রু ব্রিজেন স্বার্থ রেজিস্টার করার বিষয়ে এবং প্রাক্তন কনজারভেটিভ স্যার কনর বার্নসকে গোপনীয় তথ্য ব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত করা হচ্ছে।

বিগত সংসদে স্ট্যান্ডার্ড কমিশনার ১০০ জনের বেশি এমপি’র বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। তবে বেশির ভাগ ‘রেক্টিফিকেশনের’ মাধ্যমে সমাধান করা হয়। এই পদ্ধতিতে এমপিরা কমন্সের নিয়মাবলীর ছোট বা অনিচ্ছাকৃত লঙ্ঘন ঠিক করে নিতে পারে।
সূত্র : ভয়েস অব আমেরিকা
ব্রিটিশ সরকারের ইকোনমিক মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিক - ফাইল ছবি

কোটা আন্দোলনের আড়ালে জঙ্গিরা তাদের হিংস্র দাঁত দেখিয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতি কোটা বিরোধী আন্দোলনের ছদ্মবেশে জঙ্গিবাদের বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান হবে না। প্রধানমন্ত্রী আবারো জাতিসংঘ (ইউএন) এবং অন্যান্য দেশের কাছে তাদের দক্ষতার মাধ্যমে দেশব্যাপী তাণ্ডব চলাকালীন প্রতিটি ঘটনার তদন্তে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ-এ স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি ও আলোচনা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশ কৃষক লীগ (বিকেএল) এই কর্মসূচির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুর নাহার লাইলী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশ কৃষক লীগের সভাপতি সমীর চন্দের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি। অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের শহীদ ও সামপ্রতিক সহিংসতায় নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, জামায়াত ও শিবির আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে এবং তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে। সবাইকে এ লক্ষ্যে সতর্ক থাকতে হবে এবং আমি দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করছি। সামপ্রতিক সহিংসতায় বহু মানুষের প্রাণহানি ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোটা আন্দোলনের আড়ালে জঙ্গিরা তাদের হিংস্র দাঁত দেখিয়েছে। আমি প্রত্যেকটি হত্যাযজ্ঞের তদন্ত চাই যে, এর পেছনে কারা রয়েছে এবং কীভাবে এবং কী কী ঘটনা ঘটেছে। সরকার সামপ্রতিক সহিংসতায় ছয়জনের মৃত্যুর তদন্তের জন্য এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। পরে কমিশন গঠনের পর বিপুল সংখ্যক ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় এর পরিধি সমপ্রসারণ করে তিন সদস্য করা হয়। শেখ হাসিনা প্রতিটি বিষয়ে তদন্তের জন্য জাতিসংঘকে তাদের বিশেষজ্ঞ পাঠানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যদি কোনো দেশ চায়, তারা বিশেষজ্ঞও পাঠাতে পারে। যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের নির্মিত সম্পত্তি ধ্বংস করে দেশবাসীর ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা তারা আর সহ্য করবেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশব্যাপী মিথ্যা অপপ্রচার সমানে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি ক্ষমতায় থেকে মানুষের জীবন নেবো, সেটা তো কখনো হতে পারে না। আমি তো নিজেই সবকিছু হারিয়েছি এবং গ্রেনেড হামলা, বোমা হামলা ও সরাসরি গুলি করে বারবার আমাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে এবং আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। তারপরেও আমি সাহস নিয়ে কাজ করে গেছি। ভয়ও পাইনি, পিছুও হটিনি। কারণ আমার লক্ষ্য এ দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন- সে কাজটা আমাকে করতে হবে। শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমি বলতাম ‘টাইম ইজ টু শর্ট’। কেননা যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময়ে ঘাতক আমাকে আঘাত করতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আঁশ, আমি মানুষের জন্য কাজ করবো। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এমনভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পোড়ানো হলো- ঠিক ফিলিস্তিনের গাজায় যেভাবে হাসপাতালে বোমা হামলা করে ধ্বংস করা, শিশু হত্যা ও মানুষ হত্যা সেই একই ঘটনা যেন এখানে ঘটানো হচ্ছে। এটাই হচ্ছে সব থেকে দুর্ভাগ্যের। একটা কোটা আন্দোলনের নাম দিয়ে এই ভাবে একটা নাশকতা ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা! যে জন্য তিনি ১৭ তারিখ টেলিভিশন ভাষণে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি শিক্ষক ও অভিভাবকদের বলেছিলাম যে, আপনাদের সন্তানদের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে, আপনারা সন্তানদেরকে বের হতে দিয়েন না। কারণ আমি তো জানি এদেশে জঙ্গিবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কতোদূর কি করতে পারে। আমি তাদেরকে সতর্ক করেছি যে, আপিল বিভাগের রায়ে শিক্ষার্থীদের হতাশ হতে হবে না। তাদের যেটা দাবি সেটা এসে যাবে। কারণ আদালত ও আইন মেনেই সকলকে চলতে হয়। তিনি বলেন, তারপরেও আজকে বাংলাদেশে এতগুলো প্রাণ যে ঝরে গেল এর দায় দায়িত্ব কার? একটা জিনিস গেলে আবার গড়ে তোলা যায়, কিন্তু জীবন গেলে তো আর ফিরে পাওয়া যায় না। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, যারা আপনজন হারিয়েছেন, যে মা তার সন্তান হারিয়েছেন, যে সন্তান তার বাবা হারিয়েছেন তাদের কি কষ্ট সেটা আর কেউ না বুঝুক, আমি তো বুঝি। স্বজন হারাবার বেদনা নিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করে এদেশে ফিরে এসেছিলাম যেন দেশের মানুষ দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে একটা সুন্দর ও উন্নত জীবন পায়, স্বাধীনতার সুফল পায়- সে আশায়। তিনি বলেন, গ্রামগঞ্জসহ প্রতিটি জনপদ ও মানুষের জীবন উন্নত করে দেয়াটাই কি তার অপরাধ? তিনি আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। ঘটনার তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করে দিয়েছেন, কারও দাবির অপেক্ষায় রাখেননি বলে জানান। যখন ৬ জন মারা গিয়েছিল, তখন তিনি ঘটনার তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন করে দেন। এখন আরও ঘটনা ঘটার প্রেক্ষিতে তিন সদস্য বিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের কর্মপরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি চাই প্রত্যেকটি জিনিসের তদন্ত হোক। কারণ এর পেছনে কি কি ভাবে কি কি ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তে বেরিয়ে আসুক। আমি জাতিসংঘের কাছেও আবেদন করেছি, তারা যেন তাদের বিশেষজ্ঞ পাঠায়, অন্য কোনো দেশ যদি চায় তারাও যেন বিশেষজ্ঞ পাঠায়। তিনি আরও বলেন, যেই দায়ী থাক, আমাদের তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

নিজের ফেসবুক লাল করলেন ড. ইউনূস by তারিক চয়ন

‘রক্ত লাল’ প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার সরব হয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশ। মুখে আর মাথায় লাল কাপড় বেঁধে মিছিল-র‌্যালি হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়েছিলেন এসব কর্মসূচিতে, শিল্পী-সংস্কৃতিসেবীরাও যোগ দেন। চোখে-মুখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা। এরপর প্রতিবাদ চলে অনলাইন ও অফলাইনে। যা কিনা এখনও চলছে।

ওইদিন থেকে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাল রক্তে ছেয়ে যায়। কারো আইডিতে প্রবেশ করলে যেমন লাল রঙ দেখা যায়, তেমনি কারো পোস্ট দেখতে গেলেও চোখে পড়ে লাল রঙ। শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে কোটি কোটি নেটিজেন নিজেদের ফেসবুক 'প্রোফাইল পিকচার' কিংবা 'কাভার ফটো' পরিবর্তন করে লাল রঙ সেঁটে দেন। বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে খ্যাতনামা অনেক ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি, এমনকি বিদেশিরাও এমনটা করেছেন। অনেকে এখনও করছেন।

এবার সে তালিকায় যুক্ত হলেন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী, অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। বৃহস্পতিবার (০১ আগস্ট) ফেসবুকে নিজের অফিসিয়াল এবং ভেরিফাইড (ব্লু টিক যুক্ত) পেইজের প্রোফাইল পিকচার লাল করেন প্রফেসর ইউনূস। তার ওই পেইজে দেশ-বিদেশের প্রায় ২৫ লাখ ফলোয়ার রয়েছেন। মূহুর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে বিষয়টি। আধা ঘন্টা যেতেই আড়াই হাজার বার শেয়ার করা হয় তার প্রোফাইল পিকচার। লাইকের বন্যার পাশাপাশি কমেন্ট সেকশনে প্রায় সবাই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।

সাকিব, এবার প্রশ্নটা নিজেকে করেন by সৌরভ কুমার দাস

২০১৯ সালে তামিম ইকবাল, ২০২৪ সালে সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের সাবেক দুই অধিনায়কের একই প্রশ্ন, 'দেশের জন্য কি করেছেন?' প্রশ্নটা তামিম করেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে আর সাকিব করলেন গ্যালারিতে। কিন্তু প্রায় দেড় যুগ বাংলাদেশের জার্সি গায়ে দেয়ার পর এখন দুজনের নিজেদের কি প্রশ্ন করা উচিত না যে, তারা দেশের জন্য ঠিক কি করেছেন।

সম্প্রতি কানাডার গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি খেলতে যাওয়া সাকিব এক প্রবাসী দর্শকের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়ান। সেই দর্শককে তিনি এক পর্যায়ে প্রশ্ন করে বসেন, ‘আপনি দেশের জন্য কী করেছেন’? বারবার তিনি একই প্রশ্ন করতে থাকেন। সেই দর্শক তাকে ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে বলেন। জবাবে আরও রেগে গিয়ে সাকিব কর্তব্যরত পুলিশকে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেন বলেও দাবি সেই ভক্তের। আশেপাশের দর্শকরাও তখন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সাকিবের ওপর।

সাকিব আল হাসানের ক্যারিয়ারে বিতর্কের অভাব নেই। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট তো বটেই, মাঠের বাইরেও তার কুকীর্তি নিয়ে আস্ত একটা বই লেখা যাবে। দেশের হয়ে ১৮ বছর ক্রিকেট খেলছেন, অথচ অর্জনের ভান্ডারে নেই একটা একটা এশিয়া কাপ ট্রফিও! বরং দিনের দিন নিয়ম ভেঙেছেন, উতরে গেছেন পারফরম্যান্স দিয়ে। অথচ শৃঙ্খলাটাই হওয়ার কথা ছিল তার মানদণ্ড।

২০১১ বিশ্বকাপ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ম্যাচের পর গ্যালারির দিকে মিডল ফিঙ্গার দেখান সাকিব। এই জঘন্য ঘটনাতেও তখন অধিনায়কের বিপক্ষে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যে ব্রডকাস্টিং ক্যামেরায় গোপনাঙ্গ দেখিয়ে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিও তিনিই করেছিলেন। পরের বছর সাকিবের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে মানবপাচারের। সেবারও সাকিবকে কোনো জেরার মুখে পড়তে হয়নি।

২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে দারুণ পারফর্ম করেন সাকিব। বিশ্বজুড়ে সমাদৃতও হয়েছেন। ঠিক তার কয়েকদিন পরই আইসিসি তাকে নিষিদ্ধ করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েও আইসিসিকে না জানানো। এই কাণ্ডে একবছরের স্থগিত নিষেধাজ্ঞাসহ মোট ২ বছর নিষিদ্ধ হন সাকিব। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাকিব জুয়ারির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ডিলেট করেন, আইসিসি সেটা উদ্ধার করতে না পারার কারণেই বড় শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পান সাকিব।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ১৩ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পর (তখন পর্যন্ত), একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগে খেলার পর, সবমিলিয়ে সাত থেকে আটশ ম্যাচ খেলার পর একজন ক্রিকেটার কিভাবে অমন ভুল করেন? অথচ প্রতিটি টুর্নামেন্ট, সিরিজ শুরুর আগেই ফিক্সিংয়ের ব্যাপারে বিশেষভাবে জানানো হয়। তারপরও সাকিব ভুল করলেন, কিন্তু পাশে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষকে। অথচ সেই সাকিবই সাধারণ দর্শককে প্রশ্ন করে বসেন!

তাহলে সাকিব দেশের জন্য কি করেছেন, তার আরও কিছু নমুনা দেখা যাক। সাতক্ষীরায় একটি কাঁকড়ার খামারের ব্যবসা ছিল সাকিব আল হাসানের। সেই কারখানা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা আছে। অনেকেই নানা সময়ে টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তবে এই ব্যবসা আলচনায় আসে ২০২২ সালের এপ্রিলে, সাকিবের ফার্মে কাজ করা প্রায় ২০০ শ্রমিক চার মাসের বেতন না পেয়ে বিক্ষোভ করেন।

একই বছরের মে মাসে রংপুরে সরকার দলীয় এক নেতার সাথে সাকিবের খোলা প্রতিষ্ঠান "বুরাক কমোডিটিজ এক্সচেঞ্জ"- এর বিরুদ্ধে প্রতারনার অভিযোগ উঠে আসে সংবাদ মাধ্যমে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে শেয়ার বাজারে রেজিস্ট্রেশনে বাবার নামও ভুল লেখেন সাকিব। এটা নিয়েও সমালোচনা হয় অনেক।

একই বছরের সেপ্টেম্বরে সাকিবের প্রতিষ্ঠান মোনার্ক মার্টের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় শেয়ারবাজার ম্যানুপুলেশনে নাম আসে। ২০২৩ বিপিএলে বিপিএলের দল ফরচুন বরিশালের স্পন্সর ছিল মোনাক মার্ট, যে দলের অধিনায়কও ছিলেন সাকিব। কয়েক মাস পর এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই আবারো একই অভিযোগ আসে ম্যানুপুলেশনের।

গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে সতীর্থকে নিয়ে সাক্ষাৎকারে বিতর্কিত সব মন্তব্য করেন সাকিব। একই বছরে সাকিব আল হাসানের বোন জান্নাতুল ফেরদৌসের নাম আসে ভারতের বেটিং সাইট স্ক্যামের এক তদন্তে। ধারণা করা হয়, সাকিব নিজেই তার বোনের নাম ব্যবহার করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, সাকিবকে একটি ঘটনাতেও জবাবদিহিতা করতে হয়নি।

আরও একটা ঘটনা বলি, কয়েক মাস আগে দুবাইয়ে আরাভ খান নামের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দোকান উদ্বোধন করতে যান সাকিব। যে কিনা বাংলাদেশে খুনের মামলার আসামি, ইন্টারপোলেও মোস্ট ওয়ান্টেডের লিস্টে নাম আছে তার। ওই সফরে সাকিবের সঙ্গে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি তারকা গিয়েছিলেন। পরে প্রত্যেককে ডিবি অফিসে ডেকে জিজ্ঞাসা করা হয়। কিন্তু একবারের জন্যও সাকিবকে কেউ জেরাও করেনন।

আর ক্রিকেটে তো সাকিবে যেন একচ্ছত্র অধিপতি। কোনো সিরিজে আগে সবার কৌতূহল থাকে তিনি খেলবেন কিনা! কয়েকদিন আগে এক নির্বাচক আলাপকালে বলছিলেন সাকিব খেলবেন কিনা সেটা তাদের হাতে থাকে না।

১৭ বছরের ক্যারিয়ার সাকিবের, গড়েছেন অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড। একসঙ্গে তিন ফরম্যাটে অলরাউন্ডারদের শীর্ষে থাকার মতো বিরল রেকর্ডও আছে তার। এর মধ্যে নিজের জেনারেশনের সেরা অলরাউন্ডারের খেতাবও পেয়েছেন। একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবেও আছে একাধিক রেকর্ড। নিঃসন্দেহে একজন কিংবদন্তী, কিন্তু যদি প্রশ্ন করি বাংলাদেশকে কি জিতিয়েছেন? তবে ইতিহাস আলো থেকে আঁধারেই ফিরে আসে

১৭ বছর হয়ে গেলো বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন, তবে কি সেটা বিনামূল্যে? অবশ্যই না। মাসে বেতন নেন সবার চেয়ে বেশি। বছরে একটা টেস্ট খেলেও বেতন নেন তিন ফর‍্যমাটের! শুধু সাকিব নয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে প্রায় সবাই মনে করে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে অনেক বড় কিছু করে ফেলেছেন। আদৌ কি তাই? ব্যাপারটা হচ্ছে, টাকার বিনিময়ে খেলা।

তাও দর্শকরা তাদের মাথায় তুলে রাখে। টানা হারলেও সমর্থকরা আবার মাঠমুখী হন। বোর্ডের শাস্তির জবাবেও সমর্থকরা পাশে থাকেন ভরসা হয়ে। অথচ সেই সমর্থকদের চারআনা পয়সার মূল্য দেন না সাকিবরা। তারা ধরেই নিয়েছেন, সমর্থকরা যে কোনো পরিস্থিতিতে তাদের পাশে থাকবেন কিন্তু বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা করতে পারবেন না।

দল খারাপ করলে সংবাদ সম্মেলনে কোনো প্রশ্নেরই সোজা উত্তর দেন না সাকিব। উল্টো সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরী করেন। আর ভক্ত সমর্থকরা ঠিকই সেটা নিয়েই মেতে ওঠেন। সেই সমর্থকরাই কিন্তু এখন সাকিবকে ফেসবুকে ধুয়ে ফেলছেন, সমালোচনায় বিদ্ধ করছেন সবখানে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারের শেষ পরিণতি কিন্তু খুব একটা ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ১৭ বছর দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পর সাকিবের এখন নিজেকেই তাই প্রশ্ন করা উচিত, দেশের জন্য কি করেছেন।

সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে: মাহমুদুর রহমান মান্না

সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন গণতন্ত্র মঞ্চের নতুন সমন্বয়কারী ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। পাশাপাশি মঞ্চের পক্ষ থেকে সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোটা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে থাকারও ঘোষণা দেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তোপখানা রোডে নাগরিক ঐক্যের কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যেভাবে লড়াই করছে শিক্ষার্থীরা, যেভাবে লড়াই করছেন শিক্ষকরা, গুণীজন, মুরুব্বিরা, আইনজীবীরা, সাংবাদিকরা, সবাই যে রকম করে নেমেছেন তাতে এই সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বেজেছে। আমরা আগেই বলেছি, এই পরিস্থিতি ওরা (সরকার) গায়ের জোরে মোকাবিলা করতে পারবে না। বাংলাদেশের টোটাল ফোর্স নামানো হয়েছে মুভমেন্ট যারা করছে তাদের বিরুদ্ধে। থামাতে তো পারেনি। সরকার সবরকম নির্যাতন করবার পরেও এই আন্দোলন বন্ধ করতে পারেনি। এই আন্দোলন বাড়ছে, আন্দোলন আরও বাড়বে। গণতন্ত্র মঞ্চ তার সঙ্গে শুরু থেকে ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত এই সরকারের পরাজয় না হয়।

তিনি বলেন, আমরা ?শুরু থেকে বলেছি, তোমরা অবৈধভাবে ক্ষমতায় আছো, নির্বাচন করছো না। অতএব নির্বাচন না করে ক্ষমতায় থাকতে গেলে আরও বল প্রয়োগেই তোমাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে। একদম চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা-হত্যাকারীর জায়গায় পৌঁছাবার আগেই ক্ষমতা থেকে চলে যাও। আমাদের আজকে একই আবেদন, এখনো হয়তো সময় আছে, আমি বলছি- এখনো হয়তো সময় আছে পদত্যাগ করো। তারপরে দেশ কীভাবে চলবে- সেটা এদেশের জনগণ বুঝবে। তোমরা জনগণের দুশমনে পরিণত হয়েছো, তোমরা জনগণের জন্য কিছু করতে পারবে না। বোধ-বুদ্ধি যদি এখনো থাকে তাহলে জনগণের কথা শুনে, দেয়ালের কথা শুনে পদত্যাগ করেন। যত তাড়াতাড়ি পদত্যাগ করবেন ততই ভালো।

মান্না বলেন, এই আন্দোলন কেবলমাত্র কোটার আন্দোলন নয়, এটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলন এখন সরাসরি এসব হত্যার বিচার চায়, ওই সমস্ত মন্ত্রী যারা গুলির নির্দেশ দিয়েছেন, উস্কে দিয়েছেন ছাত্রলীগকে, তাদের পদত্যাগ চায় দল থেকে এবং সরকার থেকে। খোদ প্রধানমন্ত্রী সমস্ত হত্যাকাণ্ডের দায় নিয়ে যাতে জনগণের কাছে ক্ষমা চান- সেজন্য তারা (শিক্ষার্থীরা) দাবি করেছে। এগুলো মানতে হবে। খারাপ লাগে শুনতে। এতবড় নেত্রী, বাপরে বাপ। বাঘে গরুতে একসঙ্গে পানি খায়, তিনি এ রকম করবেন। কিন্তু ইতিহাস এমন তার চাইতে বড় বড় মানুষের এই কাজগুলো করতে হয়েছে। আমি বলবো, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেন। যেভাবে রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতন করছেন, এই নির্যাতন বন্ধ করেন। অবিলম্বে তাদেরকে মুক্তি দেন। এটা যদি না করেন তাহলে শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটাও আপনারা দেখবেন।

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, গত কয়েকদিনের ছাত্র-তরুণদের আন্দোলনের ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারকে তারা একভাবে বিদায় দিয়ে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার আমরা বলেছি, এক সরকারের ভাগ্য এখন একটা চিকন সুতার উপরে ঝুলছে।

সরকার টিকে আছে কেবলমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরে, তারা যদি কেবলমাত্র রাষ্ট্র বা প্রজাতন্ত্রের বাহিনী হিসেবে তারা যদি পেশাদারি নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন এই সরকারের একদিন বা এক মুহূর্তের জন্য আর ক্ষমতায় থাকার কোনো সুযোগ বাস্তবে কোনো অবকাশ নেই।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, আজকে বাংলাদেশে এ রকম একটি হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরে এই লাশের কারবালায় দাঁড়িয়ে এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার আর কোনো অধিকার নেই, এই কথা এখন বাংলার ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দেখেছেন তাদের (সরকার) রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে সারা দেশের মানুষ লাল কাপড়ে, লাল ফিতায়, ফেসবুক লাল প্রতীকে ভরে দিয়েছে। এই যে গণঅনাস্থা, এটা জনগণের এই সরকারের প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থা জানিয়েছে। এই অবস্থা আর চলতে পারে না। আমরা সরকারকে বলি, এটা একটা রাজনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক সমাধান করতে হবে। সমাধান হচ্ছে পদত্যাগ করুন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন। রাজনৈতিকভাবে আলাপ-আলোচনা করে সেটা ঠিক করতে পারবো এবং দেশে গণতান্ত্রিক সরকার একমাত্র ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এদেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হবেই।
সংবাদ সম্মেলনে ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, রাষ্ট্র্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী হাসনাত কাইয়ুম ও জেএসডি’র সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বক্তব্য রাখেন।

হেরে গেলেন আব্দুর রহমান by মো. আল-আমিন সরকার

গত ২০শে জুলাই কারফিউর প্রথম দিনে পান খেতে দোকানে যান মাধবদীর কাজী হাফেজ আ. রহমান (৪৪)। এ সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিজিবি’র ছোড়া গুলিতে পেটের এপাশ ওপাশ ভেদ হয়ে যায় তার। এতে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গেলে তিনি ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেখান থেকে তাকে প্রথমে স্থানীয় ও পরে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে টানা এগারো দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ার পর অবশেষে ৩১শে জুলাই বুধবার সকাল ৭টায় তিনি মৃত্যুর কাছে হার মানেন।

নিহত আ. রহমানের বাড়ি মাধবদী থানার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের চৌয়া গ্রামে। তার পিতার নাম মৃত মাওলানা কাজী আমিন উদ্দিন। তিনি স্থানীয় বিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে কাজীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি স্থানীয় পাঁচদোনা বাজারে একটি ছোট মুদি দোকান পরিচালনা করতেন।
বুধবার সন্ধ্যায় সরজমিন তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। পাশাপাশি সবার মাঝেই দেখা যায় অজানা আতঙ্ক। ঘটনা খুলে বলতেও যেন তারা ভয় পাচ্ছিলেন। অবশেষে দৈনিক মানবজমিন প্রতিনিধি পরিচয় দেয়ার পর তারা ঘটনার বিবরণ দেন। নিহতের পরিবার জানায়, কারফিউ এর প্রথম দিনে ইন্টারনেট ও সংবাদ মাধ্যম সহজলভ্য না থাকায় অনেকটা না জেনেই বেলা ৩টার দিকে বাড়ি থেকে দুপুরের খাওয়া সেরে আ. রহমান দোকানে যান। এরপর বেলা সোয়া ৩টার দিকে তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে ছেলেসহ আত্মীয়রা গিয়ে তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

আ. গাফফার নামে ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বেলা সোয়া ৩টার দিকে পান খাওয়ার জন্য পার্শ্ববর্তী এক দোকানে যান কাজী আ. রহমান। এ সময় বিজিবির একটি টহলরত দল পাঁচদোনা মোড় এলাকায় গাড়ি থেকে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকলে একটি গুলি এসে আ. রহমানের পেটের একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে তার নাড়িভুড়ি বের হয়ে গেলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে বাড়ির লোকজনসহ স্থানীয়রা এসে তাকে উদ্ধার করে ভ্যান গাড়িতে করে হাসপাতালে নিতে চাইলে আবারো বিজিবি গুলি ছোড়ে এবং এতেও কয়েকজন আহত হয় বলে আ. গাফফার জানান।

কাজী আ. রহমানের নবম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে তৈয়বুর রহমান (১৪) জানান, টানা এগারোদিন ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে অসহনীয় যন্ত্রণা ভুগে ৩১শে জুলাই বুধবার তিনি মারা যান। একই দিন তার নিজ বাড়ি সংলগ্ন চৌয়া পূর্বপাড়া দাখিল মাদ্রাসায় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তৈয়বুর আরও জানায়, মা ও তিন বোন, এক ভাইয়ের সংসারে সে সবার ছোট। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বাকি দু’জনের মধ্যে একজন আলিম ও আরেকজন দাখিল পরীক্ষার্থী। বাবার ক্ষুদ্র আয়েই তাদের সংসার চলতো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তৈয়বুর বলে তার বাবা তো কোনো রাজনীতি করতো না, তবে কেন তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো? কি ছিল তার অপরাধ? তাদের পরিবারকে এখন কে দেখবে, কে দেবে ভরণপোষণ? কারও পরিবারে যেন এমনটা না হয় এমনটাই তার প্রত্যাশা।
এদিকে, বিজিবি’র গুলিতে নিহতের ঘটনায় সরকারের কাছে ন্যায্য বিচারসহ পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্বজনরা।

গুলিতে প্রাণ গেল হাবিবের সন্তানদের নিয়ে দিশাহারা স্ত্রী by হাসান পিন্টু

ভোলার লালমোহন উপজেলার ৪০ বছর বয়সী মো. হাবিব। ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চরমোল্লাজী এলাকার কাদের মৌলভী বাড়ির মৃত শফিউল্যাহর ৫ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। খুব ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান। এরপর তার মা সন্তানদের নিয়ে জীবিকার তাগিদে চলে যান ঢাকায়। সেখানে তিনি একটি কারখানায় কাজ করে বড় করে তোলেন হাবিবসহ অন্যান্য সন্তানদের। কিছুটা বড় হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় হাবিবের জীবন সংগ্রাম। বেছে নেন ড্রাইভিং পেশা। কখনো সিএনজি আবার কখনো প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে চালাতেন। ২৪ বছর আগে বিয়ে করেন হাবিব। তার ৩ কন্যা সন্তান এবং এক পুত্র সন্তান রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকতেন ঢাকার শনির আখড়ার ধনিয়া পাটেরবাগ এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। সুন্দরভাবেই চলছিল হাবিবের সংসার।

গত ২০শে জুলাই তার পরিবারের সদস্যদের সব আনন্দ রূপ নেয় বিষাদে। ওইদিন ঢাকায় চলছিল আন্দোলনকারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ। তবুও জীবিকার তাগিদে বের হন গ্যারেজে রাখা সিএনজি বের করতে। গ্যারেজে যাওয়ার আগেই হঠাৎ করে গুলিবিদ্ধ হন হাবিব। লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তাকে দুই পথচারী নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। খবর পেয়ে হাবিবের নিথর দেহ দেখতে ছুটে যান ছেলে-মেয়ে এবং ছোট ভাইসহ স্বজনরা। তাদের সেখানে পৌঁছানোর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় লাশ শনাক্ত করতে। এরপর তারা খোঁজা শুরু করেন লাশ। একপর্যায়ে খোঁজ মেলে হাবিবের প্রাণহীন দেহের। ময়নাতদন্ত শেষে ওই লাশ স্বজনদের বুঝিয়ে দেয়া হয় ২১শে জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে। এরইমধ্যে নরম হয়ে যায় হাবিবের মরদেহ। যার জন্য আর হাবিবের মরদেহ গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চরমোল্লাজীতে নেয়া সম্ভব হয়নি। স্বজনরা বাধ্য হয়ে জুরাইন কবরস্থানে হাবিবের লাশ দাফন করেন।

বর্তমানে চরম বিপাকে তার স্ত্রী-সন্তানরা। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন হাবিব। তার অনুপস্থিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাবিবের স্ত্রী মোসা. আয়েশা বেগম। সন্তানদের মধ্যে সবার বড় মেয়ে। সে ইন্টারমেডিয়েটে পড়ালেখা করে। এরপরই ছেলে মো. রিয়াদ। তার বয়স ১৫ বা ১৬। সংসার চালাতে বাবাকে সাহায্য করতে স্থানীয় একটি সুইস কারখানায় চাকরি নেন রিয়াদ। এ ছাড়া তিন বছর ও এক বছর বয়সী আরও দুই মেয়ে বাসায় মায়ের সঙ্গেই থাকে। এদের ভবিষ্যতের চিন্তায় দিশাহারা হাবিবের স্ত্রী আয়েশা বেগম। মুঠোফোনে হাবিবের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীর তো কোনো দোষ ছিল না, তাহলে কেন আমার নিরীহ স্বামীকে মারা হলো? স্বামী তো এখন আর দুনিয়াতে নেই। দাবি করেও আর স্বামীকে ফিরে পাবো না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে কোনো সহযোগিতা করা হয় তাহলে খুবই উপকার হবে।

মুঠোফোনে প্রতিবেদককে নিহত হাবিবের ছোটভাই মো. নূরউদ্দিন জানান, ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে যাই। ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ গ্রহণ করি। আমার ভাই হাবিবের হৃদপিণ্ড ও কোমরে দুইটি গুলি লেগেছে। লাশ গ্রহণের পর থেকে দাফন পর্যন্ত আমি উপস্থিত ছিলাম। ভাইকে দাফন করে রেখে এসেছি। তবে তার স্ত্রী-সন্তানদের এখন কী হবে? আমার ভাইয়ের বিবাহ উপযুক্ত একজন মেয়ে আছে। এ ছাড়া ছোট আরও দুই মেয়েসহ একজন ছেলেও আছে। আমার ভাই-ই ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। এখন তিনি নেই। তার পরিবারের সদস্যদের কী হবে? ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তার স্ত্রী-সন্তানদের আমার সাধ্যের মধ্যে সহযোগিতা করছি। এভাবে আর কতোদিন সহযোগিতা করতে পারবো। আমি নিজেও তেমন সচ্ছল না। তাই সরকারের কাছে আমার অনুরোধ; আমার মৃত ভাইয়ের সন্তানদের কথা মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করে যেন আর্থিকভাবে তাদের সহযোগিতা করা হয়।

তিনি আরও জানান, ছোট বেলায় আমরা মায়ের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসার পর তেমন আর এলাকায় যাওয়া হয়নি। এই সুযোগে গ্রামে থাকা চাচারা আমাদের জমি তাদের নামে করিয়ে নিয়েছেন। যার জন্য গ্রামে আর আমাদের নিজস্ব কোনো জমি বা সম্পত্তি কিছুই নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমরা ঢাকায় ভাড়া বাসায়ই থাকছি। আমার মৃত ভাই হাবিবের স্ত্রী-সন্তানদেরও এখন বাধ্য হয়ে ঢাকাতেই থাকতে হবে।
এ ব্যাপারে লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাহবুব উল আলম বলেন, ঢাকার আন্দোলনে লালমোহন উপজেলার মোট ৭ জন নিহত হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা তাদের তথ্য সংগ্রহ করেছি।

নববধূকে ঘরে তোলার আগেই গুলিতে ঝরে গেল আল-আমিনের প্রাণ by জাহিদ হাসান

জুমার নামাজ পড়তে যেতে ছেলেটা বলে গেল শ্বশুরবাড়ি যাবে। আমি বললাম সাবধানে যাইস। বাসার পাশেই মসজিদ। রাস্তার এপার-ওপার। নামাজ পড়ে বের হয় আমার মানিক, সঙ্গে ছিল তার দুই বন্ধু। একজনের পায়ে গুলি লাগে। তবুও দু’জন কোনোরকম দৌড়ে আসতে পারলেও আমার পাখিটা আর উঠতে পারে নাই। রাস্তায় নাকি কেউ ভয়ে তার লাশ ধরেনি অনেকক্ষণ।’

গত ১৯শে জুলাই (শুক্রবার) কারফিউর দিনে ঢাকার সাভারের রেডিও কলোনিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় সাইমন ইসলাম আল-আমিন (২৩)।
জানা গেছে, সাইমন ইসলাম আল-আমিন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর মধ্যপাড়ার মো. বাবুল ও মনোয়ারা বেগম দম্পতির মেজো ছেলে। তিনি সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। একই এলাকার একটি ফ্যাক্টরিতে নতুন কাজ পেয়েছেন।

বাবা গাজীপুরে কাজ করতেন। ১৯শে জুলাই (শুক্রবার) নিহতের পর শনিবার তার লাশ দাফন করা হয় নানাবাড়ি বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামে। সেখানেই তাকে কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়।
আল-আমিনের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমাদের বাসা সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায়। মসজিদ আমাদের বাসা থেকে সামান্য দূরে। রাস্তা পার হয়ে যেতে হয়। ছেলেটা রাস্তা পার হয়ে জুমার নামাজ পড়তে যায়। নামাজ শেষে ফিরছিল বাসায়। নামাজ শেষে বাসা থেকে গুলির শব্দ শুনে বের হই। সামনেই রাস্তার মোড়ে পাম্পের সামনে লোকজন জড়ো হয়ে আছে। আমি দেখে চলে আসি। শুনছিলাম আল-আমিন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমার মনটা কেমন কেমন জানি করছিল। এরপরেও আবার বাসায় ফিরি। কিছুক্ষণ পর তার এক বন্ধু কল দিয়ে বললো, আল-আমিন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তখন মনে হয়েছিল মানুষ আমার ছেলেকে পড়ে যেতে দেখেই দূরে গিয়ে জড়ো হয়েছিল। আমি বাসা থেকে বের হতে হতে আরেকটা কল আসে, হাসপাতাল থেকে করা অচেনা ওই নম্বরে বলতেছিল, খালাম্মা আল-আমিন মারা গেছে। এ সময় চারিদিকে আর্তনাদের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি দৌড়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখি পাখিটার রক্তাক্ত শরীর পড়ে আছে। যেন হাসতেছিল আমাকে দেখে।’
আল আমিনের বাবা মো. বাবুল বলেন, ‘ঘটনার পর আমাকে কেউ একজন কল দিয়ে বলেন, আপনার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। আরেকজন এই নম্বরেই বলেন মারা গেছে। আমি তখন আমার কর্মস্থল গাজীপুরে। আমি বিশ্বাস করিনি। কারণ, সকালে আল-আমিনের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার ছেলেটা আমাকে কতো অনুরোধ করে বলেছিল যেন বের না হই। আমিও বের না হওয়ার ওয়াদা করি। কিন্তু আমি বের না হলেও আমার ছেলেটাকে আর দেখা হলো না। তার লাশ নিয়ে বাড়ি আসলাম।’
এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন ছেলে হারানো বাবা। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার ছেলে রাজনীতি করে না। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে আর পড়াশোনা করেনি। আবার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরিকল্পনা করছিল। ছেলেটা নামাজে গেছে। তার কী অন্যায় ছিল? কোন দোষে তাকে গুলি মারা হলো?’
বুক চাপড়ে আহাজারি করে আল-আমিনের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ঘরের পাখিকে ২৩ বছর না খেয়ে না পরে বাঁচিয়ে রেখেছি। টাকা-পয়সার জন্য বাবুটারে পড়াশোনা করাতে পারিনি। পরে কাজ করতে যায়। জুলাই মাসের দুই তারিখে কাজে গিয়ে বেতন পাওয়ার আগেই মারা গেছে। ইচ্ছে ছিল বড় ভাইয়ের প্রবাসে যাওয়ার ঋণ শেষ করে আবার পড়াশোনা করবে। ভালো চাকরি পেয়ে সংসারের হাল ধরবে। গত ৫ মাস আগে বিয়ে করেছে। বউটাকে আর তুলে আনতে পারি নাই। এর আগেই আমার ছেলেটাকে খুন করে দিল তারা।’
তিনি জানান, শুক্রবার সারারাত কোনো এম্বুলেন্স খুঁজেও পাওয়া যায়নি। পরে শনিবার ভোরে কুমিল্লার লাকসাম থেকে একটি এম্বুলেন্স গিয়ে তার লাশ আনে। পরদিন সকাল ১০টায় ময়নাতদন্ত বা পুলিশ রিপোর্ট ছাড়াই তার লাশ দাফন করা হয়।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘সেদিন তেমন কোনো ঝামেলা হয়নি। আমার ছেলেটাকে কেন মারলো তারা? আমার ছেলে আন্দোলনও করেনি সংগ্রামও করেনি। নামাজ পড়তে গেছে। আর লাশ হয়ে ফিরেছে। পুলিশ এসে বলছে আমাকে ক্ষতিপূরণ দেবে। কিন্তু আমার ছেলে কি আর ফিরে আসবে?’

আমার নাতিপুতি ক্যামনে চইলবো কে খাওন খোরাক দিবো by শাহাবুদ্দিন সিকদার

রাজধানী ঢাকায় কোটা আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন হোসেন (২৫)। নিহত হোসেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট থানাধীন নীলকমল ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড চর নুরুল আমিন গ্রামের মৃত: জাফরের ছেলে। পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতেন মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে। তিনি মালবাহী ট্রাক চালাতেন। গত ১৯শে জুলাই  বৃহস্পতিবার রাত ২টা ৩০ মিনিটে হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তার লাশ উদ্ধার করে ২০শে জুলাই শুক্রবার  গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। নিহত হোসেনের মৃত্যুতে এলাকায় এখন শোকের মাতম।

নিহত হোসেনের মা রিনা বেগম মোবাইলে জানায়, প্রায় ১০ বছর আগে ৩ ছেলে ১ মেয়েকে রেখে আমার স্বামী মো. জাফর মৃত্যুবরণ করেন। বড় ছেলে হাসান (২৭) একজন অটো রিকশাচালক। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার ভিন্ন। দ্বিতীয় ছেলে নিহত হোসেন (২৫)।

সে ছিল ট্রাক ড্রাইভার। দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ভিন্ন সংসার চালাতো। তৃতীয় ছেলে রাকিব (২০)। সে হলো প্রতিবন্ধী। চতুর্থ হলো সাথী বেগম (১২)। বাবার মৃত্যুর পর এদেরকে নিয়ে আমি অনেক কষ্টে ইট ভাঙার কাজ করে সংসার চালাতাম। ছেলেগুলো বড় হলো। হাসান এবং হোসেনকে বিয়ে করালাম। তাদের সংসার হয়েছে। তারা আলাদা সংসার চালায়। প্রতিবন্ধী রাকিব ও ছোট মেয়েটা নিয়া আমি ভিন্ন বাসায় থাকি। আমি বর্তমানে পুরাতন বিল্ডিং ভাঙার কাজ করি। দৈনিক ২/৩শ’ টাকা করে পাই। এ নিয়ে কোনোরকমে সংসার চলছে। আমার ছেলে নিহত হোসেন ট্রাক চালাতো। ঘটনার রাত ১৯শে জুলাই বৃহস্পতিবার ট্রাকটি গাবতলী রেখে রাত ২টা ৩০ মিনিটে মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে পৌঁছলে কোথা থেকে যেন গুলিতে নিহত হয় ছেলে মো. হোসেন। সংবাদ পেয়ে রাত ৩টায় গিয়ে দেখি আমার ছেলের নিথর দেহ পড়ে আছে মাটিতে। স্থানীয়রা জানায়, আরও ১ জনের লাশও এখানে পড়েছিল। সেটি কারা যেন নিয়ে গেছে। আহত হয়েছে অন্য একজন ছেলে। সেটি নেয়া হয়েছে কোনো এক হাসপাতালে। তাদের পরিচয় আমি জানি না। আমার ছেলের লাশ উদ্ধার করে ২০শে জুলাই শুক্রবার বেলা ১১টায় ঘটনাস্থল মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যান জামে মসজিদ সংলগ্ন জানাজা শেষে এম্বুলেন্সযোগে ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসি। ঐদিন রাত এশার নামাজের পর দ্বিতীয়বার জানাজার শেষে তার নানাবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।  মা রিনা বেগম আরও জানান, ছোটবেলায় তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। অনেক কষ্টে ছেলে- মেয়েদেরকে বড় করেছি। এখন হোসেনও মারা গেছে। নিহত হোসেনের দুই মেয়ে লিমা (৫) ও সীমা (২ বছর ৬ মাস)। আছে স্ত্রী হাসনুর (২১)। হোসেনের মৃত্যুর পর বর্তমানে আমরা ঢাকায় আছি। মা রিনা বেগম বিলাপ দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমগো জাগা-জমি বইলতে কিছু নাই। আমার নাতিপুতি ক্যামনে চইলবো। কে খাওন খোরাক দিব। হে আল্লাহ্‌ তোমার কাছে বিচার। প্রধানমন্ত্রী যেন আমাগরে একটু সহযোগিতা করে। এটাই আমার দাবি।’

বুলেটের আঘাত কেড়ে নিলো মাহমুদের পরিবারের হাসি by খলিলুর রহমান

নিদারুণ ভাতের কষ্ট আর দারিদ্র্যকে মাড়িয়ে সবেমাত্র এক যুগ হলো সুখের মুখ দেখেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা দুলাল মাহমুদ (৩৮)। ঘর করার জন্য গ্রামে কিনেছিলেন এক টুকরো জমিও। বাবা-মা, স্ত্রী আর দুই ফুটফুটে সন্তানকে নিয়ে পেতেছিলেন সুখের সংসার। তবে সেসব আজ শুধুই স্মৃতি। বুলেটের আঘাত কেড়ে নিয়েছে গোটা পরিবারটির হাসি। ছেলে আর বাড়ি ফিরবে না, ডাকবে না মা বলে। এই কথা মনে করতেই ডুকরে কেঁদে উঠেন মা জলেখা বিবি। বিচার চান ছেলে হত্যার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুলাল মাহমুদের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার চরখাগুটিয়া চৌকিদার কান্দি এলাকায়। সিদ্দিক খালাসী ও জলেখা বিবির ৭ সন্তানের মধ্যে তিনি চতুর্থ। ছোটবেলা থেকেই দারুণ অর্থকষ্টে দিন কেটেছে তাদের।

একদিকে বাবা কুষ্ঠুরোগী আর অন্যদিকে গরিব  হওয়ায় ছোটবেলা থেকে কাজ শুরু করেন দুলাল। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কখনো চালিয়েছেন ভ্যান, আবার কখনো দিয়েছেন কৃষাণ। ২০০১ সালে পূর্ব নাওডোবা পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরে ভাতের অভাবে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমান মুন্সীগঞ্জ জেলায়। সেখানে একটি বাড়িতে লজিং থেকে শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক ও কলেজ জীবন। এরপর ঢাকায় শুরু করেন চাকরির সন্ধান। ১৪ বছর আগে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে চাকরি হয় তার। আস্তে আস্তে সুদিন ফিরে আসে। ৮ বছর আগে বিয়ে করেন। বর্তমানে তার সংসারে ৭ বছরের আদিয়াত ও সাড়ে তিন বছরের আরিশা নামের দুটি সন্তান রয়েছে।
গত ১৮ই জুলাই বিকাল থেকেই ঢাকার আজিমপুর এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। এদিন অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন দুলাল মাহমুদ। তিনি বাসার সামনে গলির মাথায় আসতেই হঠাৎ করে এক ঝাঁক রাবার বুলেট এসে বিদ্ধ করে তার হাত আর পেটের অংশে। মুহূর্তে সব শেষ। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন দুলাল। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে নিয়ে স্থানীয়রা ছুটে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এর পরের দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। পরে গ্রামের বাড়িতে তার মরদেহ দাফন করা হয়।
সরজমিন দুলাল মাহমুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার কিনে রাখা একখণ্ড জমির পাশে তাকে কবর দেয়া হয়েছে। মা জলেখা বিবি তজবিহ জপে ছেলের জন্য দোয়া করছেন। ছেলের শোকে পাথর হয়ে বসে আছেন বাবা সিদ্দিক খালাসীও। সন্তান দুলাল মাহমুদের এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না মা জলেখা বিবি। তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি তার।
জলেখা বিবি বলেন, ‘ছোটবেলা থিকা পোলারে দুইডা টাকা দিতে পারি নাই। নিজে বদলা দিয়া, মানুষের দোকানে কাম কইরা পড়ালেহা করছে। এহন সে চাকরি পাইছে। কিন্তু আমার নির্দোষ পোলাডারে মাইরা ফেললো। আমার বুক খালি কইরা, আমার নাতি-নাতকুর দুইডারে এতিম বানাইয়া দিলো। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ ছোট ভাই জসিম খালাসী বলেন, টাকার অভাবে আমরা ভাইরা আর কেউ পড়াশোনা করতে পারি নাই। দুলাল ভাই নিজে পড়াশোনার জন্য ভ্যান চালাইছে, মানুষের বাড়িতে কাম করেছে। তিনিই আমাগো দেইখা রাখতো। আজ তিনি আর নাই। আমাদের একটাই দাবি, ভাইয়ের পরিবারটির পাশে যেন সরকার দাঁড়ায়।
কোয়েল নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দুলাল ভাই কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এমনকি বেশি মানুষের ভিড় কিংবা আড্ডা পছন্দ করতেন না। আমরা শুনেছি, ওনি অনেক কষ্ট করে এই অবস্থানে এসেছেন। তাদের বাড়ি থেকে বর্ষায় রাস্তায় আসতে পানি পড়ে। তিনি গামছা পরে পানি পাড় হয়ে, জামাকাপড় পরিবর্তন করে স্কুলে যেতেন। খুব মেধাবী ছিলেন। তার এমন মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না।
পূর্ব নাওডোবা পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ইদ্রিস আলী বলেন, আমরা ওকে কখনো দেখিনি রাজনীতি করতে বা কারও সঙ্গে উচ্চবাক্যে কথা বলতে। ভীষণ গরিব পরিবারের সন্তান ছিল দুলাল। আমাদের স্কুল থেকে পাস করার পর একপর্যায়ে শুধু ভাতের অভাবে, পড়াশোনার জন্য মুন্সীগঞ্জে চলে যায়। সেখানে লজিং মাস্টার থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন একটা ভালো অবস্থানে এসেছিল। হঠাৎ করে এমন ঘটনা আমাদের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা চাই সরকার পরিবারটির পাশে দাঁড়াক। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুরের প্যানেল আইনজীবী রওশনআরা বলেন, জাজিরার দুলাল মাহমুদ ঢাকায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন। তার পরিবারে বৃদ্ধ মা-বাবা আর দুটি সন্তান ও স্ত্রী রয়েছে। এই অবস্থায় কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি বিপাকে পড়েছেন। আমরা চাই সরকার পরিবারটির পাশে দাঁড়াক।

বরগুনায় ৬ পরিবারে চলছে মাতম

দেশে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে ৬ জনের বাড়ি বরগুনা জেলায়। এদের মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলার ২, বেতাগী উপজেলার ২, তালতলী উপজেলার ১ এবং বামনা উপজেলার ১ জন। তারা সবাই গুলিতে নিহত হয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই ছিলেন নিম্নআয়ের মানুষ। ঢাকায় কেউ দিনমজুর, অটোচালক, ঠেলাগাড়ির শ্রমিক, মোটর মেকানিক, ভ্যানচালক, প্রাইভেটকারচালক, কেউবা আবার টাইল্‌স মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। নিহতদের পরিবারে একদিকে মাতম চলছে, অন্যদিকে বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। অনেকের পরিবারের আয়ের মাধ্যম একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন সূত্র ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা কেউই সংঘর্ষে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। কাজ থেকে বাসায় ফেরার পথে অথবা বাসা থেকে কাজে যাওয়ার পথে আর না হয় কাজ করার সময় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মারা গেছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের তথ্যমতে, নিহতরা হলেন বরগুনা সদর উপজেলার ৮ নম্বর সদর ইউনিয়নের কালিরতবক গ্রামের দুলাল হাওলাদারের ছেলে মো. মিজানুর রহমান (৩০), সদর উপজেলার ২ নম্বর গৌরীচন্ন ইউনিয়নের দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামের টিটু মৃধার ছেলে সায়েম মৃধা (২১), তালতলী উপজেলার মৌপাড়া গ্রামের আলতাফ হোসেনের ছেলে আমির হোসেন (২৬), বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের নীলখোলা এলাকার আবদুর রহিমের ছেলে মো. টিটু (৩৫), একই ইউনিয়নের উত্তর করুনা গ্রামের মো. তৈয়ব আলীর ছেলে মো. লিটন (২৮) ও বামনা উপজেলার লক্ষ্মীপুরা গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে মো. শাকিল (২০)। জানা যায়, নিহত মিজানুর রহমান ঢাকার মানিকনগর এলাকায় দিনমজুরের কাজ করতেন।

গত ২০শে জুলাই সন্ধ্যায় কাজ থেকে বাসায় ফেরার পথে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেন। সায়েম মৃধা আবদুল্লাপুর এলাকায় মোটর মেকানিকের কাজ করতেন। গত ১৯শে জুলাই সন্ধ্যায় আবদুল্লাপুর বাসস্ট্যান্ডে তার মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। স্বজনরা তাকে আবদুল্লাপুর গণকবরে দাফন করেন। আমির হোসেন শহরে অটোরিকশা চালাতেন। তিনি গত ১৯শে জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। দুই সন্তানের জনক টিটু ছিলেন প্রাইভেটকার চালক।

গত ১৯শে জুলাই দুপুর ১টার দিকে ধানমণ্ডি গ্রিন রোডে মাথায় গুলি লেগে গুরুতর আহত হন। পরে গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। লিটন টাইল্‌স মিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি গত ১৮ই জুলাই বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মধ্য বাড্ডা এলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া শাকিল চালাতেন ভ্যানগাড়ি। গত ২০শে জুলাই জুরাইন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ যায় তার। নিহত টিটুর স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, তার স্বামী সর্বশেষ গত ১১ই জুলাই বাড়ি থেকে কর্মস্থল ঢাকায় যান। বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই ঘরে বাজার ছিল না। এরই মধ্যে গত শুক্রবার বিকালে ফোন করে তাদের এক নিকট আত্মীয় জানান, তোমার স্বামীর গায়ে গুলি লেগেছে। সে ধানমণ্ডির গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আয়েশা বেগম আরও বলেন, আমার স্বামী একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। সে তো কোনো আন্দোলন করেনি। তারপরেও বিনা অপরাধে তাকে জীবন দিতে হলো। ছেলে সাইমুন বাবার জন্য পাগল ছিল। ওকে কিছুতেই থামাতে পারছি না। শুধু বাবাকেই খুঁজছে। মেয়ে তামান্না ঠিকমতো খাবার খাচ্ছে না। আমি অবুঝ সন্তানদের কী বুঝ দেবো? আমার সংসার কীভাবে চলবে?
নিহত মিজানুর রহমানের বাবা দুলাল হাওলাদার বলেন, আমার ছেলে কোরবানির ঈদের একদিন পরেই ঢাকা চলে গেছে। সে ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতো। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আমার ভায়রা ভাই ফোন দিয়ে বলে মিজানুর কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সেখানে থাকা লোকজনের সহযোগিতায় তাকে মুগদা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিসাধীন অবস্থায় মারা যায়। মিজানুর রহমান আরও বলেন, আমার সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। এর মধ্যে ছোট ছোট দু’টি ছেলেমেয়ে রেখে মারা গেছে মিজানুর। কীভাবে চলবে সংসার, কে দেখবে ওদের? অনেক অসহায় হয়ে পড়েছি আমরা।
বরগুনা সদর উপজেলার ৮ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল কুদ্দুস আলো আকন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঘটনায় আমার ইউনিয়নের মিজানুর রহমান নামের একজন নিহত হয়েছেন। মিজানুরের পরিবার অনেক অসহায় ও ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতো। ঘটনা শুনে আমরা মিজানুরের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে মিজানুরের পরিবারকে কিছু সহযোগিতা করেছি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।

এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুখ আহম্মেদ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে বেতাগী উপজেলার ২ জন নিহত হয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি এবং খাদ্যসামগ্রী দিয়েছি।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মোহা. রফিকুল ইসলাম বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় এ জেলার যারা নিহত হয়েছেন তাদের প্রত্যেক পরিবারের খোঁজখবর আমরা নিয়েছি।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ সাহায্য দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে যেসকল অনুদান আসবে তা নিহতের পরিবারকে দেয়া হবে।

গুলি কেড়ে নিলো কাইয়ুমের পরিবারের স্বপ্ন

বেগমগঞ্জ উপজেলার ১০ নং নরোত্তমপুর ইউনিয়নের মোরশেদ আলম চেয়ারম্যানবাড়ীর  আবদুল কাইয়ুম ছয় মাস আগে কাজ শিখতে ঢাকায় গিয়েছিল। সে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। স্বপ্ন ছিল কাজ শিখে পরিবারের হাল ধরবে। এর আগে সে চলে গেল না ফেরার দেশে। স্বপ্নগুলো চুরমার হয়ে গেল। স্বপ্ন ছিল অনেক বড় হয়ে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবে। এর আগেই এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেল না ফেরার দেশে। ১৭ বছর বয়সী আবদুল কাইয়ুম আহাদ কোনো রাজনীতি করতো না; পড়তো না কোনো স্কুল কিংবা মাদ্রাসায়। জীবিকার তাগিদে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই গ্রাম ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমায় সে। যাত্রাবাড়ীতে সে রেফ্রিজারেটর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) মেরামতের কাজ শিখতো।

কাজ শেখার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলে আর কাজ শেখা হলো না। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের পাশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় গুলিতে ঝাঁঝরা হয় তার শরীর। এরপর গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সড়কের পাশ থেকে কাইয়ুমকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন কয়েকজন পথচারী। পরে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর স্বজনেরা খবর পেয়ে ওখান থেকে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসেন ।
গত শুক্রবার সকাল ৯টায় তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। এলাকাবাসী ও ঘটনাস্থলে লোকজন জানান, একই ঘটনায় গুলিতে কাইয়ুম ছাড়াও আরও দু’জন নিহত হয়েছেন। তাদের কারও লাশেরই ময়নাতদন্ত করা হয়নি। স্বজনেরা এসব লাশ বাড়িতে নিয়ে গেছেন। বেগমগঞ্জ নরোত্তমপুরে কাইয়ুমের গ্রামের বাড়িতে ঢুকতেই ভেতর থেকে ভেসে আসছিল স্বজনদের আহাজারি। সন্তানের জন্য বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন মা বিবি খোদেজা। কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের কেন আমার ছেলেকে হত্যা করা হলো। কার কাছে আমি বিচার চাইবো কে আমার বিচার করবে। মায়ের কান্নার আহাজারিতে পাশে থাকা লোকগুলো কান্নাকাটি করছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনদের সান্ত্বনা তাকে এতটুকুও শান্ত করতে পারছিল না। বিলাপ করতে করতে বারবার তিনি বলছিলেন, ‘আমার বুকের মানিকের কী অপরাধ ছিল। সে তো কোনো দল করতো না। তাকে কেন এভাবে গুলি করে মারা হলো। আমি এর বিচার চাই।’ বিবি খোদেজা বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে কাইয়ুমকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে রাত ন’টার দিকে এক ব্যক্তি ফোন ধরে হাসপাতালে যেতে বলেন। চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে কাইয়ুম ছিল সেজো। আদরের সন্তানের কথা বলতে গিয়ে খোদেজা বলেন, ‘আমার ছেলের বুকে গুলি করা হয়েছে। মুখ, গলাসহ বুক গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। ডান হাতের কনুই, বাঁ হাঁটু ও বুকের বাঁ পাশে গুলি করা হয়েছে। গুলি করে ছেলেকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয়েছে। কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের? কারা আমার বুকের মানিকেরে এভাবে মারলো? আমি কী নিয়ে থাকবো?’ কাইয়ুমের বাবা আলাউদ্দিন বলেন, টাকা- পয়সার অভাবে ছেলেকে বেশি পড়াশোনা করাতে পারি নাই। আর ‘পড়ালেখার প্রতি কিছুটা অনাগ্রহ ছিল কাইয়ুমের। ছেলেটার বয়স কম হলেও অনেক লম্বা হয়ে গেছে। তাই সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ছয় মাস আগে তাকে যাত্রাবাড়ীতে একটি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিজ ও এসি মেরামতের কাজ শিখতে পাঠাই। অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। ছেলে কাজ শিখবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। খুব কাছে থেকে ইচ্ছা করে তাকে গুলি করা হয়েছে। তার তো কোনো অপরাধ ছিল না।’ আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না কী কারণে আমার ছেলেটাকে গুলি করে হত্যা করলো আমি এটার বিচার চাই। কাইয়ুমের বড় ভাই শুভ আহমেদ তুহিন বলেন, ঢাকায় কাইয়ুম যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো, সেখানে কথা বলে জেনেছেন, তার ভাই বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে কাজ শেষ করে ম্যানেজারের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে নাশতা করতে বের হয়েছিল। এমন সময় ২ পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। পরে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের পাশের একটি রাস্তায় দৌড়ে পালানোর সময় পুলিশ কাইয়ুমকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়। ভাই হারার বেদনা কত যে কষ্টের তা আপনাকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমি আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই এ বলে ভাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। চৌমুহনী সরকারি এসএ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস মঞ্জুরুল আজিম সুমন বলেন, এ ন্যক্কারজনক হত্যা কারও জন্য কাম্য নয়। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করেন।

যারা রক্ষা করবে তারাই জনগণের ওপর বন্দুক চালাচ্ছে: জিএম কাদের

বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এমপি বলেছেন, অত্যন্ত দুঃখজনক কথা হলো সরকারি দল রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে জনগণের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে। ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে তাদের মতামত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। যারা দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে রক্ষা করবে, তারা জনগণের উপর বন্দুক তাক করে রয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণে দেশের নিরীহ জনগণ, শিশু, গৃহিণী, পথচারী মারা গেছে। রংপুরে দু’দিনের সফরে এসে সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

জিএম কাদের বলেন, সরকার যাদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে তাদের কাউকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পায়নি। আমার প্রশ্ন হলো তাহলে কেন নির্বিচারে এমন গণহত্যা করা হলো। হেলিকপ্টার থেকে, বাড়ির ছাদ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কীভাবে বুঝলো কে সন্ত্রাসী, কে ভালো, কে শিশু। সরকারের এমন  কর্মকাণ্ডে আজ দেশের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে। দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।

আবারো জনগণ মাঠে নামবে, মানুষ মারা যাবে। একসময় বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে সন্ত্রাসী জাতি হিসেবে চিহ্নিত হবে। আমি মনে করি এ থেকে উত্তরণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ চেয়েছিলাম। কিন্তু দেশে একনায়কতন্ত্র ও চরমভাবে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে। নাশকতার দায় বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়ে চাপানো নিয়ে জিএম কাদের বলেন, সংঘর্ষের শুরু থেকে বিএনপি-জামায়াত বলে বলে যতবার সরকার যেভাবে প্রচার করুক না কেন, আমি ঢাকায় দেখেছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। জনগণ সরকারের একথা গ্রহণ করেনি। এটি জনগণের সংগ্রাম। বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টির কেউ থাকলে তারা ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে গিয়েছিল। আন্দোলন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত এজেন্ডা দিয়েছিল সরকার এটিকেও প্রমাণ করতে পারেনি। মানুষও গ্রহণযোগ্যভাবে এটিকে গ্রহণ করেনি।
জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি বন্ধ নিয়ে জিএম কাদের বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক অর্ডারে বন্ধ করা ঠিক নয়। জনগণ তাদের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষতিকারক মনে করলে তারা বয়কট করবে। এক সময় সেই রাজনৈতিক দল বিলীন হয়ে যাবে।  সরকার এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কেন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলো, তাদের কি উদ্দেশ্য রয়েছে এসব প্রশ্ন আমাদের মনে। সেই সঙ্গে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে সরকার বড় ধরনের নির্যাতনে যাবে কিনা এটি নিয়েও আমাদের সংশয় রয়েছে।  
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এসএম ইয়াসিরসহ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা।

শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে রাজপথে শিল্পীরা

কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে ও তাদের দেয়া ৯ দফা দাবির পক্ষে একাত্মতা ঘোষণা করে রাজপথে নেমেছেন শিল্পীরা। বৃহত্তর চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, থিয়েটার, গণমাধ্যমসহ দৃশ্যমাধ্যমের নানা শাখার কর্মীরা ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ’-এর ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে হত্যা-সহিংসতা-গণগ্রেপ্তার হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়েছে গতকাল সকালে। মামুনুর রশীদ, মোশাররফ করিম, আজমেরি হক বাঁধন, সিয়াম আহমেদ, জাকিয়া বারী মম, রোবেনা রেজা জুঁই, মিথিলা, অর্ষা, নির্মাতা অমিতাভ রেজা, আশফাক নিপুণসহ অনেক শিল্পীই বৃষ্টি উপেক্ষা করে নানা ব্যানার নিয়ে সমবেত হন ফার্মগেটে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক- এমন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সেখানকার চারপাশ। তাছাড়া বিভিন্ন গান গেয়েও নিজেদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা। এ সময় মামুনুর রশীদ বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর এভাবে আক্রমণ এটা গণতন্ত্র হতে পারে না। আমরা এসবের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি। সিয়াম আহমেদ বলেন, আমার পক্ষ থেকে আলাদা কিছু বলার নাই। সারা দেশের মানুষের যে দাবি সেটাই আমার দাবি।

যখন এত মানুষ একটা দাবি নিয়ে এক হয় তখন একটু হলেও মাথায় আনা দরকার সেটা। আমাদের ভাইবোনরা মারা যাচ্ছে। আপনি যদি সুস্থ সবল মানুষ হন তবে রাতে ঘুমাতে পারবেন না। আমার কানে এখনো মুগ্ধর ‘পানি লাগবে’ কানে বাজে। আমরা সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করি। দেশের মানুষের জন্য কাজ করি। ছাত্ররা আমাদের প্রধান দর্শক। তাদের পাশে যদি না থাকি তবে কাজ করার দরকার নেই। কেন কাজ করবো। আমার ছেলেও আজ থেকে ১৫ বছর পর বলবে তুমি তখন কী করেছো! কী জবাব দেবো। তাই অবশ্যই আমি শিক্ষার্থীদের পক্ষে। যারা মারা গেছেন আন্দোলন করতে গিয়ে তাদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ শান্তি পাবে না। এটা আমার বিশ্বাস। আজমেরী হক বাঁধন বলেন, আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আসলে আমার যদি বিবেক থেকে থাকে তবে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার কোনো কারণ দেখছি না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, যেদিন থেকে গুলি চলেছে, সেদিন থেকেই আমরা সবাই মানসিকভাবে ভালো নেই। একটুও শান্তিতে নেই। আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্ম। যারা মারা গেছেন তাদের হত্যার বিচার চাই। এ শিক্ষার্থীদের মাঝে আমার সন্তান থাকতে পারতো।

আবারো জ্বলে উঠেছে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন: বিবিসি’র প্রতিবেদন

কোটা আন্দোলনকে ঘিরে ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরপাকড় নিয়ে আবারো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। বুধবার ‘ফ্রেশ ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ স্টুডেন্ট প্রটেস্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাপক ধরপাকড় এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের চড়াও হওয়াকে কেন্দ্র করে আবারো উত্তপ্ত বাংলাদেশ। গত কয়েকদিনে আটক হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে বুধবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে নামে শিক্ষার্থীরা। তারা আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে। যাতে আবারো দেশ জুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সিলেটে শিক্ষার্থী এবং পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সেখানে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া বুধবার রাজধানী ঢাকা সহ অন্যান্য জেলায়ও পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। জুলাই মাস জুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ছিল বাংলাদেশ। কোটা সংস্কারের দাবিতে সড়ক-মহাসড়কে বিক্ষোভ করেছে তারা।  সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

যাতে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আন্দোলনরত প্রায় ১০ হাজার ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মূলত নিহতদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার এবং আটক ছাত্র-জনতার মুক্তির দাবিতে আবারো উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। জুলাইয়ের শেষ দিনে দেশটিতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আটকের খবর পাওয়া গেছে।

বরিশাল থেকে বিবিসি’র প্রতিনিধির পাঠানো ছবির বরাতে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বরিশালে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়েছে পুলিশ। সেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করতে দেখা গেছে। গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। এদিন গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই নারী শিক্ষার্থী ছিল। বুধবার শিক্ষার্থীরা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, তারা ‘হত্যা, গ্রেপ্তার, হামলা এবং ছাত্র ও গুমের বিরুদ্ধে নতুন কর্মসূচি দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী বিক্ষোভ করছে। জুলাই মাসের শুরু থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। পরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী নিহত হলে রাতারাতি পুরো দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে এবং ব্যাপক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। পরে ২১শে জুলাই সুপ্রিম কোর্ট কোটা ৭ শতাংশ সংরক্ষণের রায় দেন। তবে শিক্ষার্থীদের নিহত এবং তাদের গণগ্রেপ্তার করার প্রতিবাদে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। তারা দেশটির বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে বলে বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে।

দেশের এমন সহিংস পরিস্থিতির জন্য সরকার প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে দেশ জুড়ে সরকারের দমন-পীড়নের সমালোচনা করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তির আলোচনা স্থগিত করেছে। মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান জোসেপ বোরেল বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছেন এবং অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, স্থগিত সহযোগিতা চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ইইউ এবং বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা।

শাবি ফটকে তিন ঘণ্টা উত্তেজনা

‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচিকে ঘিরে গতকাল বিকালে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এলাকায় তিন ঘণ্টার উত্তেজনা ছিল। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। এ সময় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। এদিকে; পুলিশ ভোররাতে আটক করা তিন শিক্ষার্থীকে ছেড়ে দিয়েছে। গতকাল বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের বাইরে বিক্ষোভের সময় বহিরাগত দু’জনকে আটক করেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের গতকাল ছিল ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচি। কর্মসূচি পালনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে বিকাল ৩টায় জড়ো হওয়ার জন্য বুধবার রাতেই ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। তবে তার আগেই কয়েকশ’ পুলিশ গিয়ে অবস্থান নেয় ফটক সহ আশপাশে। এই অবস্থায়ও বিকাল ৩টার দিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নগরের টুকেরবাজার এলাকা থেকে পৃথক দুটি মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে আসে।


একই সময় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ফটকের সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে অবস্থান নেয়। তাদের অবস্থানের কারণে ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে লাঠিচার্জ চালায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নগরের সুরমা আবাসিক এলাকায় অবস্থান নেয়। এবং টুকেরবাজার থেকে আসা অংশটি তেমুখী এলাকা দিয়ে চলে যায়। বিকাল পৌনে চারটার দিকে তেমুখী পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ সেখানে বাধা দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ওই এলাকা থেকে পুলিশ বহিরাগত দুই শিক্ষার্থীকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ- পুলিশ কমিশনার আজবাহার আলী শেখ। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন; শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সড়ক থেকে সরে তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করুক। কিন্তু টুকেরবাজার থেকে আসা অংশের কর্মীরা পুলিশের উদ্দেশ্যে ইটপাটকেল ছুড়ে। তবে; পুলিশ কাউকেই সড়কে অবস্থান করতে দেয়নি। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে; তেমুখী এলাকায় সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অবস্থান ছিল। তারা সড়কে অবস্থান না নিলেও সড়কের পাশে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচি পালন করেছেন। পুলিশ তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে লাঠিচার্জ চালিয়ে বাধা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের অবস্থানের সময় তেমুখী, বিশ্ববিদ্যালয় ফটক এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন। এ সময় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক দিয়ে প্রায় আধাঘণ্টা যানবাহন চলেনি। এদিকে পুলিশের বাধার মুখে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের  বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা সুরমা আবাসিক এলাকার প্রবেশ মুখে এসে অবস্থান নেয়। এ সময় সেখানেও শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- বিকাল চারটার দিকে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সুরমা আবাসিক এলাকায় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় পুলিশেরও একটি বড় দল সেখানে অবস্থান করছিল। পুলিশ তাদের সরিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এ সময় সেখানে তারা সমাবেশও করে। সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ফয়সল হোসেন সহ সিনিয়র ছাত্ররা বক্তব্য রাখেন। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন- তাদের কর্মসূচি চলমান থাকবে। পুলিশ তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে অগণতান্ত্রিক মনোভাব দেখাচ্ছে। সমাবেশের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি সমাপ্ত করে চলে যায়। এদিকে ভোররাতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক দুই শিক্ষার্থী এবং এমসি কলেজের এক শিক্ষার্থীকে নগরের নেহারী পাড়া আবাসিক এলাকার একটি মেস থেকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে দুপুরে থানায় গিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশ তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। গতকাল বিকালে যখন বিশ্ববিদ্যালয় ফটক ও আশপাশের এলাকায় ওই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় শিক্ষকদের অবস্থানও ছিল সেখানে। তবে; তারা কোনো কর্মসূচি পালন করেননি। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের অরক্ষিত রেখে তারা ঘরে চলে যেতে পারেন না। যতক্ষণ শিক্ষার্থীরা সড়কে থাকবে ততোক্ষণ তারাও অবস্থান করবেন। সন্ধ্যায় যখন শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি শেষ করে তখন শিক্ষকরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক এলাকা থেকে চলে যান। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষকরা বুধবার শাবি এলাকায় কর্মসূচি পালন করেছিলেন। 

প্রাণহানি-সহিংসতা: আন্তর্জাতিক তদন্তে জোর কূটনীতিকদের by মিজানুর রহমান

কোটা সংস্কার আন্দোলনে দুই শতাধিক মৃত্যু, হাজার হাজার আহত এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি পুনর্ব্যক্ত করলেন ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত। বৃহস্পতিবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত জরুরি কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতিনিধিরা প্রায় অভিন্ন সুরে কোটা আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানি ও সহিংসতার আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। সরকার এরইমধ্যে বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জানিয়ে তারা দেশীয় তদন্ত কাজে ফরেনসিক তথা কারিগরি সহায়তা নেয়ার কথা জানান। ব্রিফিংয়ে সরকারের প্রতিনিধিরা কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে বিভিন্ন ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেন। অনেকটা বাধ্য হয়েই আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বল প্রয়োগ করেছে বলে তারা কূটনীতিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। ব্রিফিং সূত্র বলছে, এ নিয়ে পররাষ্ট্র সচিবের স্বাগত বক্তব্যের পর উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে ফ্লোর নেন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গেয়েন লুইস। তিনি সহিংসতা ব্যাপকতার বিষয়টি তুলে ধরে শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, পুলিশ, শিশুসহ প্রত্যেকটি প্রাণহানির বিশ্বাসযোগ্য তদন্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তীতে ফ্লোর নেন বৈঠকে উপস্থিত কানাডিয়ান হাইকমিশনার লিলি নিকোলস। তিনি জাতিসংঘ দূতের সঙ্গে অভিন্ন অবস্থান ব্যক্ত করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন।

সূত্র বলছে, কোটা সংস্কার আন্দোলেনে ব্যাপক প্রাণহানির পর লাখো মানুষের বিরুদ্ধে মামলা ও গণগ্রেপ্তারে দেশব্যাপী আতঙ্ক এবং চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। এতে নতুন করে আর কোনো জানমালের ক্ষতি দেখতে চায় না আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়। দেশজুড়ে সংঘাত-প্রাণহানি এবং ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গত সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদকে যৌথ চিঠি দেয় ঢাকার ১৪ মিশন। সেই চিঠিতে সংকটের টেকসই সমাধান খোঁজার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নতুন প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংলাপের তাগিদ দেয়া হয়। সেই আহ্বান বিবেচনায় সরকার গৃহীত পদক্ষেপগুলোর বিষয়ে অবহিত করতে কূটনীতিক ব্রিফিংয়ের উদ্যোগ নেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অপ্রত্যাশিতভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ সফর দীর্ঘ হওয়ার প্রেক্ষিতে (অর্থাৎ মন্ত্রী ব্রাসেলস থেকে লন্ডন হয়ে ফেরার নির্দেশনা থাকায়) পররাষ্ট্র সচিব ব্রিফিংটি করেন। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর পাঠানো যৌথ চিঠির ১৪ সিগনেটরি যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও অস্ট্রেলিয়া দূতাবাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ডেলিগেশন কার্যালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াও জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি, ভারত, চীন, রাশিয়া ও সৌদি রাষ্ট্রদূত বিশেষভাবে আমন্ত্রিত ছিলেন। মন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে চলমান সংকট সমাধানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের জবাবদিহি, আটককৃত ব্যক্তিদের বিচারে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং যত দ্রুত সম্ভব সারা দেশে পুরোদমে ইন্টারনেট চালুর অনুরোধ জানানো হয়েছিল। চিঠিতে আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে তারা ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের সংলাপের তাগিদ দিয়েছিলেন। চিঠিতে ২১শে জুলাই কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জবাবদিহি নিশ্চিতে সরকারের আন্তরিকতা প্রশংসনীয়। সহিংসতায় জড়িত সন্দেহে আটককৃতদের বিচারে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার তাগিদও ছিল ১৪ মিশনের সেই চিঠিতে। সূত্র বলছে, ১লা আগস্টের ব্রিফিংয়ে ইন্টারনেট সচল করা এবং ডিবি হেফাজত থেকে ৬ সমন্বয়কের মুক্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়, যা কূটনীতিকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ওদিকে ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, সহিংসতার ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পাঠানোর প্রস্তাব এখনই স্বাগত জানাতে চায় না বাংলাদেশ। চলমান বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার। কারণ এটি রাষ্ট্রের উদ্যোগ। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়া-ভারত-যুক্তরাজ্যসহ ২২টি দেশ ও জাতিসংঘের মিশন প্রধানদের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফ করা হয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব জানান, ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও কূটনীতিকদের দেখানো হয়েছে। এখানে তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি ছিল তা বিভিন্ন ফুটেজেই স্পষ্ট। গত কয়েকদিনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে বলে দাবি করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কয়েকটি দেশ সরকারের ব্যাখ্যা শুনতে চেয়েছিল বলে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, সামপ্রতিক ঘটনা নিয়ে দেশে এবং বিদেশে নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এতে করে যাতে কূটনীতিকরা প্রাভাবিত না হন সেজন্য এবং এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে বিদেশি মিশনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখবে সরকার। সচিব বলেন, চলমান ঘটনা নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা জানতে অনেক দেশ আগ্রহী ছিল। গ্রেপ্তারের সংখ্যা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হচ্ছে কি না, বাকস্বাধীনতা আছে কি না- এসব বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে কয়েকটি দেশের। র?্যাব হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেনি বিষয়টি প্রমাণ করে- এমন ভিডিও দেখানো হয় বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের। আন্দোলনকারীদের কর্মসূচিতে বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, যেসব জায়গায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করছে সেখানে বাধা দেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশে গঠিত তদন্ত কমিটিকে জাতিসংঘ কারিগরি সহায়তা করতে চাইলে সরকারের আপত্তি নেই বলে জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, তবে আলাদা কোনো তদন্ত কমিটিতে এখনই উৎসাহ নেই সরকারের।

সরকারের প্রতি অনাস্থা নেই বিদেশিদের: নাঈমুল ইসলাম
ওদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে চলমান ঘটনায় সরকারের প্রতি বিদেশিদের অনাস্থা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে কোনো সমস্যা নেই।’

৩২ ঘণ্টা অনশন, মুক্ত ৬ সমন্বয়ক

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়কের ৩২ ঘণ্টা অনশনের পর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গতকাল বেলা পৌনে ২টার দিকে ডিবি কার্যালয় থেকে তাদের নিজ নিজ পরিবারের প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করে ডিবি। পরে পরিবারের সঙ্গে ডিবি কার্যালয় থেকে কালো রঙের গাড়িতে বেরিয়ে তারা বাসায় চলে যান। মুক্ত হওয়া সমন্বয়করা হলেন- নাহিদ ইসলাম, মো. সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, মো. আবু বাকের মজুমদার, আসিফ মাহমুদ ও নুসরাত তাবাসসুম। এর আগে ভোর ৬টার দিকে ডিবি থেকে ৬ সমন্বয়কের পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানানো হয় সকাল ৯টার দিকে সমন্বয়কদের ছেড়ে দেয়া হবে। তাই তারা যেন ডিবি কার্যালয়ে চলে আসেন। পরিবারের সদস্যরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ডিবি কার্যালয়ের অভ্যর্থনা কক্ষে অপেক্ষা করতে থাকেন। দুপুর দেড়টার দিকে স্বজনদের ডিবির ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়। ভেতরে প্রবেশ করার পর তাদের কাছে সমন্বয়কদের হস্তান্তর করা হয়।

নিরাপত্তা হেফাজতের কথা বলে গত শুক্রবার বিকালে তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকেরকে ধানমণ্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে তুলে আনা হয়। নাহিদ ও আসিফ অসুস্থতাজনিত কারণে সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। বাকেরও সেখানে উপস্থিত থাকায় তাকেও তুলে আনা হয়। পরদিন শনিবার সন্ধ্যায় সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। এরপর রোববার ভোরে মিরপুরের এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তুলে আনা হয় নুসরাত তাবাসসুমকে। এরপর থেকে তারা মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন। ডিবি প্রথম থেকে বলে আসছিল, সমন্বয়করা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। তাই তাদের নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা হেফাজতের কথা বলে ৬ সমন্বয়ককে ডিবিতে রাখা নিয়ে দেশ জুড়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয় ডিবি। এ নিয়ে বিভিন্ন মহল নড়েচড়ে বসে। শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। সোমবার সমন্বয়কদের অবিলম্বে মুক্তি এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি না চালাতে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দাখিল করেন আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন ও আইনুন্নাহার সিদ্দিকা। সোমবার ও মঙ্গলবার রিটের ওপর হাইকোর্টের এই দ্বৈত বেঞ্চে শুনানি হয়। আদালতের গতকালের কার্যতালিকায় রিটটি আদেশের জন্য ১০ নম্বর ক্রমিকে ছিল। তবে অসুস্থতার কারণে বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসাইন দোলন বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়েছেন। এজন্য এই ২দিন শুনানি হয়নি। এর আগে গত ১৯শে জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ায় এক বন্ধুর বাসা থেকে নাহিদকে তুলে আনা হয়েছিল। ২৪ ঘণ্টা পর পূর্বাচল এলাকায় তাকে পাওয়া যায়। ওই সময় নাহিদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে তিনি চিকিৎসার জন্য গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি হন। অপর দুই সমন্বয়ক আসিফ ও বাকেরকেও একই দিন তুলে নেয়া হয়েছিল। পাঁচ দিন পর তাদের দুজনকে চোখবাঁধা অবস্থায় যেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল সেখানে ফেলে যাওয়া হয়। এরপর থেকে আসিফও গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন বাকেরও।

নাহিদের বাবা বদরুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেককে ডিবির আলাদা আলাদা গাড়ি দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ৩২ ঘণ্টা অনশনের কারণে তারা সবাই ক্লান্ত। এদিকে, গতকাল সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ মানবজমিনকে বলেছেন, আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। টানা ৩২ ঘণ্টা অনশন করে আমরা সফল হয়েছি। আমাদের তারা হাইকোর্ট দেখানো শুরু করেছে। তারা বলছেন, বিষয়টি হাইকোর্টে চলে গেছে। আমাদের কিছু করার নেই। বিষয়টি আমরা মেনে না নিয়ে বুধবার রাত থেকে অনশন শুরু করি। প্রথম অনশন শুরু করে আসিফ মাহমুদ। আমাদের ৬ জনকে আলাদা আলাদা সেলে রাখা হয়। যাতে করে পরস্পরের মধ্যে কোনো আলোচনা না করতে পারি। ডিবি কার্যালয়ের পুকুরের দিকে দেখা হলে হঠাৎ জানতে পারি সমন্বয়ক আসিফ অনশনে আছেন। পরে আমরা সবাই একসঙ্গে শুরু করলাম। অনশনের কারণে সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদারের মাত্রাতিরিক্ত গ্লুকোজ কমে যায়। বৃহস্পতিবার সকালে বাকেরকে পানি খাওয়ানো হয়। কিন্তু বের হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা বাকিরা অনশন ভাঙিনি। এর অন্যতম কারণ ছিল, হয় আমাদের গ্রেপ্তার দেখাবে অথবা ছেড়ে দিবে। ২৪ ঘণ্টার বেশি হেফাজতে রাখার সিস্টেম তো কোথাও নেই। ইতিমধ্যে ৬ দিন হয়ে গেছে। হাইকোর্টের শুনানি একেকটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে পেছাচ্ছিল। আমাদের প্রত্যেকের একজন করে নিজস্ব অভিভাবক আসলে জিম্মানামায় সই করে দুপুরে ৬ জনকে আলাদা আলাদাভাবে ছাড়া হয়। হাসনাত বলেন, এখন যেহেতু মানসিকভাবে আমরা বিপর্যস্ত। ৬ দিন ধরে একধরনের গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। এই পুরো সময়টাতে বাইরে কী হয়েছে, আন্দোলন কোন পর্যায়ে আছে আমরা কিছুই জানি না। শুনেছি গণগ্রেপ্তার চলছে। বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে আমরা একটি সমন্বিত বক্তব্য জানাবো। ইতিমধ্যে দেখেছি অখণ্ড বক্তব্যের কারণে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন সময়ে আমাদের ওপর বিভাজন পলিসি আরোপের চেষ্টা করেছে। পরিস্থিতিটা আমরা একটু পর্যবেক্ষণ করে নিজেরা একটু সুস্থ হই, ডাক্তার দেখাই তারপর সমন্বিত সিদ্ধান্ত জানাবো। এই মুহূর্তে আমরা একটি নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আন্দোলন-কেন্দ্রিক সমপ্রতি গোয়েন্দা কার্যালয়ে থাকাকালীন আমরা যে একটি বক্তব্য উপস্থাপন করেছি এই বিষয়ে আমাদের বক্তব্য আছে। তবে সেটা আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানাবো। এদিকে হাসনাত তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেন, এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেউই মুক্ত নই। এই গণগ্রেপ্তার গণঘৃণার নামান্তর। আমাদের মুক্তি তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটিও মুক্তি পাবেন। এই গণগ্রেপ্তার কেবল নিরপরাধ মানুষের অধিকার হরণ নয় বরং আমাদের সমগ্র সমাজের উপর চাপিয়ে দেয়া একটি নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন। এটি মুক্তচিন্তা ও মানবাধিকারের প্রতি এক ভয়ানক আঘাত। আমাদের এই আন্দোলন শুধুমাত্র ব্যক্তির মুক্তির জন্য নয় বরং বৈষম্য, নিপীড়ন, গণগ্রেপ্তার এবং ছাত্র নির্যাতনের বিরুদ্ধে।

ওদিকে নিরাপত্তা হেফাজত থেকে মুক্ত সারজিস আলম তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কথা দিয়েছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের থেকে কাউকে  গ্রেপ্তার করবেন না, মামলা দিয়ে হয়রানি করবেন না। আপনারা কথা রাখেননি। আপনারা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর আঘাত করেছেন। সারা দেশে আমার স্কুল কলেজের ভাইবোনদের ওপর লাঠিচার্জ করেছেন। যাকে ইচ্ছা তাকে জেলে পাঠিয়েছেন। আন্দোলনকারীকে খুঁজে না পেলে বাসা থেকে ভাইকে তুলে নিয়েছেন, বাবাকে হুমকি দিয়েছেন। মাশরুর তার উদাহরণ। যারা একটিবারের জন্যও এই আন্দোলনে এসেছে তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারে না, গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকে। এমন অনেকে আছে যাদের পরিবার এখনো তাদের খোঁজ পায়নি। এমন তো হওয়া উচিত ছিল না। কোথায় মহাখালীর সেতু ভবন আর কোথায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ আপনারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে মহাখালীর সেতু ভবনে হামলার জন্য গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলেন। সঙ্গে আছেন আসিফ মাহতাব স্যার, মাশরুরসহ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অসংখ্য শিক্ষার্থী। রিকশা থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলছেন, বাসা থেকে তুলে নিয়ে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন। আমার বোনদের রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছেন। কী ভাবছেন? এভাবেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে? তিনি আরও লিখেছেন, ৬ দিনের ডিবি হেফাজত দিয়ে ৬ জনকে আটকে রাখা যায় কিন্তু এই বাংলাদেশের পুরো তরুণ প্রজন্মকে কীভাবে আটকে রাখবেন? দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন প্রতিনিয়ত সেগুলো কীভাবে নিবৃত করবেন? পুলিশ ভাইদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলি। এ দেশের মানুষের ক্ষোভ আপনাদের ওপর নয়, পুলিশের ওপর নয়। এই ক্ষোভ আপনার গায়ের ওই পোশাকটার ওপর। যে পোশাকটাকে ইউজ করে বছরের পর বছর আপনাদের দিয়ে এ দেশের অসংখ্য মানুষকে দমন-পীড়ন করা হয়েছে, অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে, জেল আর আদালতের প্রাঙ্গণে চক্কর কাটানো হয়েছে, সেই পোশাকটার ওপর। ওই পোশাকটা ছেড়ে আসুন আমাদের সঙ্গে, বুকে টেনে নিবো। এ পথ যেহেতু সত্যের পথ, ন্যায়ের পথ, তাই যেকোনো কিছু মোকাবিলা করতে আমরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নই। যতদিন না এ বাংলাদেশ  আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে, গণগ্রেপ্তার, জুলুম, নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে ততদিন এ লড়াই চলবে।

তরুণরা আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে কিন্তু কেন এমনটা হলো

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট ঘটনাকে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, জনগণ ভোটাধিকার ও আইনের শাসনের মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এটা এখন অধিকার আদায়ের আন্দোলন। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব কথা বলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনের দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার তার বক্তব্যে বলেন, তরুণদের সমর্থনে ২০০৮ সালে আওয়ামী সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু আজকে সেই তরুণরাই আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু কেন এমনটা হলো, তা ভেবে দেখা দরকার। তিনি বলেন, আজকে ছাত্রসমাজ ও তরুণরা যে দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে তার সঙ্গে আমরা একাত্মতা পোষণ করছি এবং তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, কোটা আন্দোলন সহ অন্যান্য আন্দোলন হলো রোগের উপসর্গ মাত্র, রোগটা হলো ব্যাপক গুরুতর ও ভয়াবহ। আজকে ছাত্ররা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত।

ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থক না হলে তাদের চাকরির নিশ্চয়তা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্ররা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে, বাকস্বাধীনতা ও তাদের জীবনের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা ভোটাধিকার ও মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আর এই অধিকারগুলো অভিভাজ্য। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিগত তিনটি নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে জনগণের সম্মতিবিহীন একটি সরকার গঠন করেছে, যার কোনো লেজিটিমেসি নেই। এই সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণের অন্যান্য রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার হরণ করেছে। আমরা খুনসহ সকল অন্যায়ের ন্যায়বিচার চাই। আমাদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ সকল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দলীয় পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করার অবসান চাই। তা না হলে বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার থাকবে না।

নাগরিক উদ্যোগের জাকির হোসেন বলেন, ক্ষমতাসীন দল অভিনব পদ্ধতিতে বিগত তিনটি নির্বাচন আয়োজন করেছেন তারা। এর মাধ্যমে দেশের সংবিধান ও নিজ দলের সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, এটি একটি ঐতিহ্যবাহী দল। তাই এই দলের অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই দলের মধ্যে যে অসততা তৈরি হয়েছে তা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। একটি রাজনৈতিক সমাধানে আসা ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বিরাজমান সংকট নিরসনে সরকারের দিক থেকে কোনো আন্তরিক ও কার্যকর প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। এত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে যে, তা ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই। এবার যদি বিচার না পাই, তাহলে হয়তো বাংলাদেশ থেকে বিচার শব্দটা একবারেই ওঠে যাবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের মাধ্যমে বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের চুপ হয়ে যাওয়ার বা সান্ত্বনা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, এই আন্দোলনে সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ৬১ জন মারা গিয়েছিল। তার চার গুণ বেশি মানুষ মারা গেছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে। এবারের গণঅভ্যুত্থানে নারী, শিশু, চিকিৎসক, শিক্ষকসহ সব পেশার মানুষের সর্বজনীন উপস্থিতি ছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট ঘটনাকে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ জানিয়ে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, একসময় বলতাম এরশাদের হাতে শিক্ষার্থীদের রক্ত- ইতিহাস বলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ব্যর্থ হয় না। এবারের আন্দোলনও ব্যর্থ হবে না। টগবগে তরুণদের প্রাণ গেছে। রোবায়েত ফেরদৌস আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিজ দলের নেতাকর্মীদের ভুয়া ভুয়া স্লোগানের মুখে পড়তে হয়েছে। মতবিনিময় ডেকে কথা বলতে না দেয়ায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে। তার মানে আপনি নিজ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংলাপেই তিনি অসৎ, ধূর্ততার পরিচয় দেন। কীভাবে বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপ করবেন? ছাত্রদের দাবির সঙ্গে সংলাপে কীভাবে সৎ হবেন?

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিসমাপ্তি এখনো ঘটেনি। প্রথম অবস্থায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসার উদ্যোগ নিলে, আজকে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়তো বা হতো না।

দিলীপ কুমার সরকার বলেন, যে বিষয়গুলোর ওপর সরকারের গুরুত্ব আরোপ জরুরি তা হলো: নিহতদের নাম- পরিচয়সহ বিস্তারিত বিবরণ সংবলিত তালিকা প্রকাশ করা। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সহিংসতার সব ঘটনার স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের ব্যবস্থা করা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহার, নতুন করে মামলা না দেয়া, গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দেয়া এবং গায়েবি মামলা ও ব্লকরেইড দিয়ে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার বন্ধ করা। আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের নিরাপত্তা দেয়া এবং ভবিষ্যতে হয়রানি না করার অঙ্গীকার করা। শিক্ষার ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে বাকস্বাধীনতাসহ জনগণের সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান অনুযায়ী লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং স্বাধীন ছাত্ররাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার বন্ধ করা এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো থেকে বিরত থাকা।

রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস: রাজপথে শিক্ষার্থী শিক্ষক, শিল্পী নাগরিক সমাজ

কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে এবার রাজপথে নেমেছেন শিক্ষক, নাগরিক সমাজ, আইনজীবী ও শিল্পীরা। গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তারা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা-মামলা,  আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি এবং শিক্ষার্থী হত্যার বিচারের দাবিতে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এসব কর্মসূচি থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশব্যাপী পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেন শিক্ষকরা। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষিত ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচিও পালিত হয় গতকাল। এর মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধায় কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়। এ সময় ১২ শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের তুলে নেয়ার চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মানববন্ধনে আসতে বাধা দেন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়াও সারা দেশে আটক শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দিতে ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই শিক্ষকের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও সারা দেশে শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা।
বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাবেশ’ ব্যানারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও শিক্ষকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। সমাবেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও একই দাবিতে এর আগে সকাল ১০টায় লোক প্রশাসন ও ১১টায় অর্থনীতি বিভাগ আলাদা ব্যানারে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।

এসময় শিক্ষার্থীদের ওপর যারা গুলি চালিয়েছে তাদের বিচার না করে উল্টো শিক্ষার্থীদের আটক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। দেশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন গোটা জাতির মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এসময় সর্বস্তরের মানুষকে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খান বলেন, চট্টগ্রামে শিক্ষকদের বাসার সামনে বোমা ফেলা হয়েছে। শিক্ষকদের নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সরকার ভুলে গিয়েছে এখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, জনতা বলতে আলাদা কিছু নেই। বাংলাদেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সরকার যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সেই যুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণই জয়লাভ করবে। একটি ছেলেকেও জেলে রেখে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম করা যাবে না। যেভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে তাতে একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি করেছে সরকার। দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ নেই, গাজা, ইউক্রেনে পরিণত হয়েছে। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে সরকার, নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধে?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোরশিদা ওয়াহিদ হক বলেন, আমাদেরও এই আন্দোলনে আর হারানোর কিছু নাই। কিন্তু অনেক কিছু পাওয়ার আছে। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কোবরাতুল দীপা বলেন, ভয় যেমন সংক্রামক, সাহসও তেমনি সংক্রামক। বুকে সাহস নিয়ে আমাদের সন্তানদের রক্ষা করতে হবে। একটি খুনি সরকারের কাছে আমি বিচার চাই না, কারণ সে নিজেই খুনি।  

এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লাইকা বশির বলেন, এটা কোনো স্বাধীন দেশ? এটা যদি স্বাধীন দেশ হয় তাহলে এমন স্বাধীন দেশ আমি চাই না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, আমাদের শিক্ষকদের বাড়ির সামনে ককটেল নিক্ষেপ, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আহ্বান করবো এমন কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসুন। নয়তো আপনাদেরই সরে যেতে হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থী হত্যার আন্তর্জাতিক তদন্ত করতে হবে, প্রতিটি মানুষের রক্তের হিসাব নিতে হবে। এখন এই আন্দোলন জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবির আন্দোলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, এভাবে দেশের মানুষকে অন্যায়ভাবে গুম, খুন জেলে ভরা আর চলবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে পারছে না। আমি শিক্ষক, আমাকে পুলিশকে আইডি কার্ড দেখাতে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কী উপাচার্যের কর্তৃত্বে চলে নাকি পুলিশ কনস্টেবলের কর্তৃত্বে চলে? আমরা শিক্ষাঙ্গন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যাহার চাই। শিক্ষার্থী হত্যার বিচার ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাই।
এরপর বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যে যান। সেখান থেকে মৌন মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে যান। এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান নিহতদের প্রতি।

নাগরিক সমাজের ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম: ঢাকাসহ সারা দেশে আটক সকল শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ছেড়ে দিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে ডিএমপি’র গোয়েন্দা কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এ দাবি জানান বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে আটক ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ মানুষ বিনা বিচারে আটক ও আইনানুগ ব্যবস্থা ছাড়া আটকদের অনতিবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। এটা হচ্ছে আমাদের প্রধান দাবি। আমরা শুনেছি কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এতে আমরা খুশি, কিন্তু সন্তুষ্ট নই। কারণ এখনো ঢাকাসহ সারা দেশে আটক ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ মানুষ বিনা বিচারে আটক আছে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত যেভাবে নিরপরাধ মানুষ মারা গেছে সকলের বিচার করতে হবে। সেই বিচারের জন্য জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে হবে। স্কুল-কলেজ খুলে দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সেখান থেকে সরাতে হবে। ইন্টারনেটের অবাধ সেবা দিতে হবে। আপনারা বলেছেন, এই ঘটনার কারণে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। এটা আমি বিশ্বাস করি না। ভাবমূর্তি যদি নষ্ট হয় সেটা সরকারের হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় বন্দুক, গুলি কেনা হয়েছে। সেই বন্দুক দিয়ে আমার দেশের মানুষকে মারা হবে, এজন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। এটা কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য না। অন্যায়-অত্যাচার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শুধুমাত্র এই ৬ জন আটকের বিষয় নয়, সার্বিকভাবে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এই সংস্থাগুলো, তার পেছনে মূল বিষয় হলো দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা হয়েছে। সেই ধারণা হচ্ছে-তারা বিচারহীনতা উপভোগ করতে পারবে চিরদিন। যদি তাই হয়, তাহলে আপনি কেন মিথ্যা কথা বলছেন। বন্ধ করুন মিথ্যা কথা। আপনি বলুন-আমি নির্বিচারে গুলি করেছি। ছাত্রদের হত্যা করেছি। এই মিথ্যাচার নির্ভর সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে সরে আসতে হবে। কারণ দেশবাসী জেনে গেছে, এটা মিথ্যাচারের কারাগার। সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সকল প্রতিষ্ঠানগুলো মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে। প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিটা বিষয়ে জনগণকে মুর্খ মনে করেছে, অথচ নিজেরা যে মুর্খতার পরিচয় দিয়েছে সেটা তারা ভুলে গেছে। এই মুর্খতা, অন্ধত্ব এবং মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে তারা যে কাজগুলো করেছে সেটা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, আইনের লঙ্ঘন করেছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে উদ্দেশ্য করে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যে পেশাগত উৎকর্ষের কথা তারা বলে থাকেন, যে প্রশিক্ষণ তারা পেয়েছেন সেগুলোকে পদদলিত করে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে তাদের মানদণ্ডে দেশবাসীকে বিচার করার কেনো সুযোগ নেই। দেশবাসী তাদের মতো মুর্খ নয়। তারা যে মিথ্যাচার করেছে, মুর্খতা দেখিয়েছে সেটা দেশবাসী বুঝে গেছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে হেফাজতে নেয়ার সমালোচনা করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আপনাদের কে বললো যে আপনাদের কাছে তারা নিরাপদবোধ করবে? নিরাপত্তার সংজ্ঞা দিয়ে দিয়েন, আমরা সংবিধানে দেখবো হেফাজতের আইনে কী কী আছে। তিনি বলেন, আমরা আসার আগে তাদের (সমন্বয়কদের) ছেড়ে দিয়েছেন বলে শুনেছি। তারা তাদের পরিবারের কাছে গেছে কিনা, তা এখনো জানি না। ছেড়ে দেয়া মানে কিন্তু শুধু পরিবারের কাছে আবদ্ধ নয়। তারা যে কাজটি করেছে, তাতে কোনো অন্যায় নেই। তারা যেন মুক্তভাবে তাদের কাজটি করতে পারে আমরা সে নিশ্চয়তা চাই। আপনারা কোন ক্ষমতাবলে আটকে রাখলেন? সংবিধানের কোথায় এই ক্ষমতা আপনাকে দেয়া হয়েছে। এই সমস্ত প্রথার চিরতরে অবসান হতে হবে।

আপনারা আমাদেরকে দাস মনে করেন? যখন ইচ্ছা বাসা থেকে তুলে আনবেন। যতদিন ইচ্ছা আটকে রাখবেন। তখন আমাদের নুডুল্‌স, পোলাও, ডিম খাওয়াবেন। কার টাকায় খাওয়ান এগুলো? আমাদের টাকায় তো খাওয়ান? আমাদের এগুলো খাওয়ার দরকার নাই। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি পুলিশ চাই না। আমরা বাংলাদেশের পুলিশ চাই। আপনার (পুলিশ) জনগণের জন্য কাজ করবেন। বাংলাদেশের পুলিশ হবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের সকল শিক্ষার্থীকে যদি ছেড়ে দেয়া না হয়, যদি হত্যার বিচার করা না হয়, যদি অবিলম্বে শিক্ষাঙ্গন খুলে দেয়া না হয় তাহলে আমাদের বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আরও কঠোর ও অব্যাহত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিন সমন্বয়ককে জোর করে ডিবি অফিসে আটকে রাখা হয়েছিল। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, ডিবির তৎকালীন প্রধান হারুনসহ যারা এই কাজটি করেছে তাদের প্রত্যেকেই অপহরণ মামলার আসামি।

নারী নেত্রী শিরীন হক বলেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাউকে ধরে আনা কোনো দেশের আইনে আছে? এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং আমরা এটার বিচার চাই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন, আমাদের অনেক শিক্ষার্থী কারাগারে। আটকে রাখা সকল শিক্ষার্থীকে মুক্তি দিতে হবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন, আমার প্রশ্ন, আমরা কী কোনো জরুরি অবস্থার মধ্যে আছি? যদি না থাকি তাহলে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার, সভা-সমাবেশের অধিকার, বাক?-স্বাধীনতার অধিকার-এগুলো কেন নিশ্চিত করা হচ্ছে না এবং রাস্তায় কেন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে? কী এমন ঘটেছে যে জরুরি অবস্থার মতো পরিবেশ বাংলাদেশে জারি আছে। এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে।

ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, সমন্বয়কদের যেমন ছেড়ে দিয়েছেন, সকল শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ছেড়ে দিতে হবে। সমস্ত দেশের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য সরকারে বসেছেন। আমাদের সন্তানদের রক্তে রঞ্জিত করার জন্য আপনাদের ওইখানে বসিয়ে রাখা হয়নি। সমস্ত কারফিউ তুলে নেবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমস্ত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তুলে নেবেন। সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। তা আটকে রাখার অধিকার আপনাদের কারও নেই।

সরকারি সংস্থা উবিনীগ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতি নির্ধারণী গবেষণা) এর নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন, এখনো অনেক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আপনারা এটা বন্ধ করেন। যারা অপরাধ করেছে তাদের ধরেন। যারা হুকুমদাতা আমরা তাদের বিচার চাই। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আরিফ নূর বলেন, জুলাই মাসে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাই। পাশাপাশি প্রত্যেকটি হত্যার জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, কিন্তু এই শাস্তি বর্তমান সরকারের কাছে নয়, পরবর্তীতে যে সরকার আসবে তাদের কাছে চাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের রুশাদ ফরিদী বলেন, আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। আগামীকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিকাল ৩টায় দ্রোহ যাত্রা নামে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এই সমাবেশে ছাত্র-শিক্ষক সুধী সমাজ অংশগ্রহণ করবেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের বেসরকারি সংগঠন এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম ইন বাংলাদেশের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন।

‘হত্যা’র বিচার চাইলেন শিল্পীরা:
ওদিকে রাজধানীর ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও নানা মাধ্যমের কলাকুশলীরা। এ সময় তারা শিক্ষার্থীদের হত্যার বিচার দাবি করেন। গতকাল বৃষ্টিতে ভিজে ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকারের কঠোর দমন প্রক্রিয়া ও গুলিতে ছাত্র-জনতা হত্যার’ প্রতিবাদ জানান তারা। মানিক মিয়া এভিনিউয়ে শিল্পীদের সমাবেশ হওয়ার কথা থাকলেও পুলিশের বাধায় সেখানে করতে পারেননি তারা। ফার্মগেটের সমাবেশস্থলেও ছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য।

জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পী মোশারফ করিম বলেন, আমাদের দেশে যে অবস্থা বর্তমানে সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আমরা ঘরে বসে থাকার মতো অবস্থায় নেই। আমরা শান্তি চাই। রক্ত দেখতে চাই না। গোলাগুলি, রক্ত দেখতে চাই না। আমি ও আমরা সাধারণ মানুষ। আমরা শান্তি চাই। জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বলেন, আমরা ভালো দিন দেখতে চাই। যেদিন থেকে গুলি চলেছে, সেদিন থেকেই আমরা মানসিকভাবে ভালো নেই। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্ম। যারা মারা গেছে, তাদের হত্যার বিচার চাই।

ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক সিয়াম আহমেদ বলেন, আমার পক্ষ থেকে আলাদা করে কিছু বলার নেই। পুরো দেশের মানুষের একই কথা। দেশের মানুষ যখন একসঙ্গে কোনো ন্যায্য দাবি রাখে তখন সেটা একটু হলেও মাথায় আনা দরকার সেটা অবশ্যই ফেলে দেয়ার মতো নয়। তিনি বলেন, আমার যে ভাই এবং বোনটা মারা গেল আপনি যদি সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানুষ হন তাহলে রাতে ঘুমাতে পারবেন না। আমার কানে এখনো বাজে, কারও পানি লাগবে? দেখুন কতো পানি আসছে এখন। এটা যতদিন মাথায় থাকবে ততদিন শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না বাংলাদেশের মানুষ। আজকে ছাত্ররাই আমাদের মূল দর্শকশ্রোতা। যাদের আমাদের প্রয়োজন, আমরা যদি তাদের পক্ষ হয়ে না দাঁড়াতে পারি তাহলে কেন কাজ করলাম।

জনপ্রিয় পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, এই রাজনীতি, ভয়ের রাজনীতি, এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে রাজনীতি, যেভাবে গুলি করা হচ্ছে, এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল আরও আগে। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন মামুনুর রশীদ, আকরাম খান, পিপলু আর খান, ঋতু সাত্তার, আমরিন মুসা, আশফাক নিপুণ, সুকর্ণ শাহেদসহ অনেকে। বৃষ্টির কারণে সবাই বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করেছেন। সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন নির্মাতা নূরুল আলম আতিক, মাতিয়া বানু শুকু, রেদওয়ান রনি, তানিম নূর, নুহাশ হুমায়ূন, সৈয়দ আহমেদ শাওকী, আদনান আল রাজীব, শঙ্খ দাশ গুপ্ত, অভিনয়শিল্পী ইরেশ যাকের, জাকিয়া বারী মম, সুকর্ণ শাহেদ, মোস্তফা মনওয়ার, দিপু ইমাম, সাবিলা নূর, প্রবর রিপন, শ্যামল মাওলা, রাফিয়াত রশিদ মিথিলা প্রমুখ।

বাদ জুমা দেশব্যাপী দোয়ার আহ্বান হেফাজতের

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দেশের চলমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আগামীকাল বাদজুমা দেশব্যাপী দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন । বৃহস্পতিবার বা'দ আসর জামিআতুল মানহাল উত্তরায় মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে হেফাজত আমীর ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে এ আহ্বান জানান । তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী কোটা সংস্কার ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে দেশব্যাপী নিরীহ ছাত্রদের সাথে প্রশাসনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে শত শত  ছাত্র-জনতা নিহত হয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। যৌক্তিক এ আন্দোলনকে দমন করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক ছাত্র জনতার ওপর বলপ্রয়োগ ও বেপরোয়া নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এছাড়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতাকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

আমীরে হেফাজত আরও বলেন, চলমান নাজুক পরিস্থিতিতে আসুন আমরা সকলেই আমাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন। আমি দেশের সকল মসজিদের ইমাম ও খতীবদেরকে কূনুতে নাজেলা পড়ে দেশ ও জাতির কল্যানে এবং বিচার বহির্ভূত জুলুম থেকে নিরস্ত্র মানুষকে হেফাজতের জন্য দু’আ করার জন্য বিশেষভাবে আহবান জানাচ্ছি।

বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সমগ্র দেশকে গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের যে কালো ইতিহাস রচনা করা হয়েছে, তার পূঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তাৎক্ষণিক জানা সম্ভব হচ্ছিল না। পরবর্তিতে বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলো রীতিমতো রোমহর্ষক ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ পরিস্থিতিতে দেশের সর্বত্র আতঙ্কময় ভয়াবহ এক অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দেশে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়।

তিনি বলেন, ইসলামে কুরআন হাদিসের আইন বহির্ভূত সব রকম হত্যা, রক্তপাত, অরাজকতা, সন্ত্রাস ও সহিংসতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআ'লা বলেন, কেউ যদি কোনো মুসলমানকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তাহলে তার শাস্তি চিরস্থায়ী জাহান্নাম। আর আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধাণ্বিত হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং তার জন্য তিনি মহাশাস্তি প্রস্তুত করবেন। (সূরা নিসা- আয়াত নং ৯৩) আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল; আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল। (সূরা মায়িদাহ-আয়াত নং ৩২) হত্যা এমন একটি জঘন্য অপরাধ, যা আল্লাহর কাছে কঠিন ও মারাত্মক গুনাহ হিসেবে বিবেচিত এবং এর শাস্তি অত্যান্ত ভয়ানক। আল্লাহ তাআ'লা এই ব্যাপারে আমাদেরকে কুরআনুল কারিমে সতর্ক করেছেন।

তিনি আরো বলেন, সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- ছাত্রদের কাউকে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হবে না, মামলাও দেবে না; কিন্তু সারা দেশে ছাত্রদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে। একদিকে সরকার সহানুভূতির কথা বললেও অন্যদিকে ছাত্র জনতার ওপর হামলা ও মামলা অব্যাহত রেখেছে। আমরা সরকারের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দেশের এই উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য অবিলম্বে সরকারকে সব ধরনের রাজনৈতিক অপকৌশল, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং অহেতুক হামলা ও মিথ্যা মামলার হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

সরকারের প্রতি তিনি জোর দাবি জানিয়ে আরো বলেন, দ্রুত সময়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল করুন। সাথে সাথে ছাত্রদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে তা বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে দেশে শান্তি শৃংখলা ফিরিয়ে আনুন। কোটা সংস্কার ছাত্র আন্দোলনে দেশজুড়ে যেই নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে, তার নিরেপক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করুন। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিন। এছাড়া এখন পর্যন্ত যারা নিখোঁজ রয়েছে তাদের সন্ধান দিন এবং জনসম্মুখে দ্রুত হাজির করুন।

তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে দেশ ও জাতির জান-মালের যে সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা বর্ণনা করা অসাধ্য ব্যাপার। এই সংঘাত এবং অরাজকতা এখনই বন্ধ করতে হবে। কালক্ষেপণ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, এ দাবি এখন শুধুমাত্র ছাত্রদের দাবি নয়। এটা আজ জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। তাই আমরা সরকার প্রধানসহ দায়িত্বশীল  মহলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা এ বিষয়ে সর্বোচ্চ বিনম্রতার পরিচয় দিয়ে সর্বাগ্রে ছাত্র জনতার যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নিন। এছাড়া প্রশাসনের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের প্রতি আহবান থাকবে, বিক্ষোভকারী ছাত্র জনতার সাথে সর্বোচ্চ সহনশীল আচরণ করুন।

এই আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে হেফাজত মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান বলেন, আমরা নিহতদের মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। আমরা নিহতদের পরিবার, পরিজনদের ক্ষতিপূরণ প্রদাণ করতে এবং আহতদের দ্রুত সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। এছাড়া এই আন্দোলনে যারা হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি হেফাজতের নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

এ সময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী, মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মুফতি মুনির হুসাইন কাসেমী, মুফতি বশিরুল্লাহ, মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, মাওলানা মুসা বিন ইজহার, মুফতী কিফায়াতুল্লাহ আজহারী, মুফতি কামাল উদ্দিন, মুফতি জাকির হুসাইন কাসেমী, মুফতী আনিসুর রহমান ,মাওলানা আফসার মাহমুদ, মাওলানা রাশেদ বিন নূর, মাওলানা শরিফুল্লাহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।