Sunday, March 6, 2016

১০০০ কুমারি যে যোগগুরুর শয্যাসঙ্গী

অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে গ্রেগরিয়ান বিভোলারু (৬৪)। ১০০০ কুমারিকে শয্যাসঙ্গী করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। সর্বশেষ সে ১৫ বছর বয়সী একটি বালিকা অ্যাগনেস আরাবেলা মারকুইসের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সে একটি যোগ ব্যায়ামের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো। তার মধ্যে ছিল ১৫ বছর বয়সী ওই বালিকা। তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হলে লোকজন তার আস্তানায় হামলা চালায়। অভিযোগ করা হয়, সেখানে মাত্রা অতিক্রম করে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। গ্রেগরিয়ান বিভোলারু রোমানিয়ার যোগগুরু। অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগে ২০০৪ সাল থেকে সে ছিল পুলিশি দৌড়ের ওপর। ২০১৩ সালে আদালত তাকে ছয় বছরের জেল দেয়। এরপর থেকেই সে পলাতক। কিন্তু সম্প্রতি সে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে প্যারিসে। আর তাই পুরনো হলেও এ ঘটনাটি উঠে এসেছে বৃটিশ মিডিয়ায়। এতে বলা হয়েছে, ওই যোগগুরু নিজেই দাবি করেছে যে, সে ১০০০ কুমারি মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়েছে। ২০০৪ সালে যখন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ওই বালিকার সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয় তখন তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রোমানিয়া। এক পর্যায়ে তাকে আটক করে সুইডেন। কিন্তু তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় ওই দেশটি। সেখানে সে ম্যাগনাস অরোলসন নাম ধারণ করে। সর্বশেষ তাকে আটক করা হয় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। এখন তাকে রোমানিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারকরা। উল্লেখ্য, ১৯৯০ এর দশকে মুভমেন্ট ফর স্পিরিচুয়াল ইন্টিগ্রেটশন ইন অ্যাবসলিউট নামে যোগ ব্যায়ামের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে সে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে সে শুরু করে যোগ ব্যায়াম চর্চা। অল্প সময়ের মধ্যে এ খাতে বেশ নাম করে ফেলে। ফলে ভক্তরা দলে দলে তার কাছে যাওয়া শুরু করে। এ সুযোগ ব্যবহার করে বিভোলারু। সে বেছে বেছে কুমারি মেয়েদের দিকে নজর ফেলে। তাদেরকে শারীরিক সম্পর্কের বিনিময়ে দিব্যশক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সহজে তার প্রতারণার ফাঁদে পা রাখে কুমারিরা। তাকে যে অ্যাগনেস আরাবেলা মারকুইসের মামলায় জেল দেয়া হয়েছে সেই অ্যাগনেস এখন বাস করেন পর্তুগালে।

তোপের মুখে আমার পিতা by তাহমিমা আনাম

বেশ কয়েকটি ভিডিও ও ছবিতে চোখ বুলিয়েছি আমি। প্রথমটির শিরোনাম ‘স্বীকারোক্তি’। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি পত্রিকার সম্পাদককে উদ্দেশ্য করে বেশ লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিচ্ছেন একজন টক-শো উপস্থাপক। আরও নীচে রয়েছে একটি ছবি। সেখানে আমি দেখলাম, এই লোকটির কুশপুত্তলিকা দাহ করছে একদল মানুষ। আরেকটি ছবি ছিল এমন। ফটোশপকৃত ছবিটিতে এ লোকটির মাথার সঙ্গে শিং লাগানো হয়েছে। এরপর আছে সংবাদ। তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা কেবল বাড়ছে - ৩০, ৪০, ৭০...।  সর্বশেষ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একটি বিবৃতি: এই সম্পাদকের উচিৎ পদত্যাগ করা ও বিচারের মুখোমুখি হওয়া।
এই সম্পাদক হলেন আমার পিতা, মাহফুজ আনাম। আর পত্রিকাটি হলো দ্য ডেইলি স্টার, ইংরেজি ভাষার যে পত্রিকাটি তিনি ২৫ বছর আগে সহ-প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমার বাবা একসময় কৌতুক করে বলতেন, তার একটি ইচ্ছা ছিল, আইসক্রিমের দোকান দেয়া। কিন্তু তার বদলে ৪১ বছর বয়সে তিনি জাতিসংঘের ক্যারিয়ার ছেড়ে এলেন একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠার জন্য।
আমার বয়স তখন ১৫। ওই সময় আমরা থাইল্যান্ডে থাকতাম। শিগগিরই, বাক্সপেটরা গুছিয়ে আমরা ফিরে গেলাম আমাদের আদি শহর ঢাকায়। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে পত্রিকাটির জন্ম। সবে তখন প্রেসিডেন্ট এইচ. এম. এরশাদের সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটেছে। গণতন্ত্রের এ সূচনালগ্নে আমার পিতা বাংলাদেশে ফিরতে পেরেছিলেন। যে দেশটিকে তিনি ২০ বছর আগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন করতে সাহায্য করেছিলেন, সে দেশের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করতে তিনি ফিরেছিলেন। পত্রিকার সম্পাদকের কার্যভার গ্রহণের মাসকয়েকের মধ্যেই, বিরোধী দলের প্রতি সমঝোতার হাত বাড়াতে ও দ্বিদলীয় ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়ায় আমার বাবা প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সমালোচনা করলেন। এরপর, পার্লামেন্ট বয়কট করা ও প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে হরতালের আশ্রয় নেওয়ায় তিনি বিরোধী দলেরও নিন্দা জানালেন। গভীরভাবে বিভাজিত তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশে, তিনি স্বাধীন সাংবাদিকতার একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। বৃহত্তর মঙ্গলের পক্ষে থাকতে ব্যর্থ হলেই, তিনি উভয় দলের কড়া সমালোচনা করে যাচ্ছিলেন।
দেশের সর্বাধিক পঠিত ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা হয়ে উঠে দ্য ডেইলি স্টার। সঙ্গে আছে বাংলা ভাষার একটি সহ-প্রকাশনা - প্রথম আলো। একসঙ্গে, এ দু’টি পত্রিকা দেশের স্বাধীন প্রিন্ট মিডিয়ার একটি বড় শক্তি। একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম তুলনামূলক যে স্বাধীনতা ভোগ করে, তার সত্যায়ন এ দু’টি পত্রিকা। এটি গর্ব করার মতো একটি বিষয় এ অঞ্চলে, যেখানে সাংবাদিকরা নিয়মিতই কারাবরণ করেন, গুম হয়ে যান।
কিন্তু এরপরও, আমার বাবা রাষ্ট্রের শক্তিশালী কাঠামো থেকে মুক্ত নন। সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা, সেনাবাহিনী, পুলিশ - সব প্রতিষ্ঠান, যাদের কাছ থেকে তিনি স্বচ্ছতা দাবি করে আসছেন, তাদের কাছ থেকেই চাপের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। তবে এ বিষয়গুলো ২০০৭ সালের চেয়ে কখনই এত বড় পরিসরে ছিল না। তখন জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে সেনাসমর্থিত একটি তত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর ক্ষমতা দখল করে ছিল। এ সময়কালে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রান্সক্রিপ্ট, অডিওটেপ ও ভিডিও আকারে গণমাধ্যমে খবর পাঠাতো। সেখানে অনেক মানুষকে সরকারী কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়। এ কর্মকর্তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এ প্রতিবেদনগুলো স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এরপরও অন্যসব গণমাধ্যমের মতো ডেইলি স্টারও সেসব সংবাদ প্রকাশ করেছিল। ২০০৭ সালের জুলাইয়ে, হাসিনাকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে প্রায় ১১ মাস আটক রাখা হয়।
যখন সামরিক শাসনের অবসান ঘটে, যেসব স্বাক্ষীরা হাসিনাকে অভিযুক্ত করেছিলেন, তারা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। তারা দাবি করেন, তাদের কাছ থেকে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছিল। এ বিষয়গুলো ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি, নির্দিষ্ট সময় পরে, অর্থাৎ ৩রা ফেব্রুয়ারি, যুক্তি-উপাত্ত দিয়ে যাচাই ব্যতিরেকে ওই সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্তের জন্য দু:খপ্রকাশ করেন আমার বাবা। ডেইলি স্টারের ২৫ তম বার্ষিকী উপলক্ষে তিনি একটি টক-শো অনুষ্ঠানে গিয়ে এসব বলেন।
পরেরদিন সকালে, আকাশ-বাতাসে কেবল ভেসে বেড়াচ্ছে তার ‘স্বীকারোক্তি’। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ আমার পিতাকে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তারের দাবি জানালেন। তার অভিযোগ, শেখ হাসিনার বন্দিত্বের জন্য আমার পিতাই দায়ী। এরপর থেকে সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতে আমার পিতার বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ফৌজদারি মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের হলো।
ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোকে রাষ্ট্র কর্তৃক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার এটি সর্বশেষ একটি অধ্যায় মাত্র। ২০১৫ সালের মার্চে, নিষিদ্ধ ইসলামি গোষ্ঠী হিজবুত তাহরিরের নিয়োগসংক্রান্ত একটি পোস্টারের ছবি প্রকাশ করে ডেইলি স্টার। ছবির ক্যাপশন ছিল: ‘কুৎসিত মস্তক উঁচু করছে সন্ত্রাসবাদ’। হাসিনা পার্লামেন্টে বললেন, এই ছবি প্রকাশ করে পত্রিকাটি ‘মৌলবাদীদের প্রচারে সাহায্য করেছে’। তিনি আরও বলেন, এ ছবি যারা প্রকাশ করেছে, রাষ্ট্র তাদের ‘বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’ নেবে। আগস্টে টেলিকম খাত থেকে হঠাত করে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, এ নির্দেশ দিয়েছিল রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা।
এখন আবার এসব। সন্দেহ নেই, যাচাই-বাছাই করার অযোগ্য প্রতিবেদন কারান্তরীন ব্যক্তিদের ‘স্বীকারোক্তি’র ভিত্তিতে প্রকাশ করা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিৎ, যদিও এ চর্চা বাংলাদেশে খুবই সাধারণ। এটি হতে পারতো দেশের সাংবাদিকতা চর্চা পর্যালোচনা করার দারুণ একটি সুযোগ। তার পরিবর্তে, এ সুযোগের অপব্যবহার করে রাষ্ট্র মুক্তমত চেপে ধরার প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করেছে। যখন এ ধরণের কিছু এমন কারও সঙ্গে ঘটে, যাকে আপনি ভালোবাসেন, তখন তার নিরাপত্তা ব্যতিত অন্য কিছুর ওপর মনোনিবেশ করা কঠিন। তারপরও, আমার পিতার ওপর যে হয়রানি চলছে, তা কেবল এক ব্যক্তির ওপর সরকারের ক্রোধের বিষয় নয়; বরং এটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ ও সমালোচনার জায়গা সঙ্কুচিত করার একটি বিষয়।
হাসিনা এবার নিজেই প্রকাশ্যে বলেছেন যে, তিনিও তার গ্রেপ্তারের পেছনে আমার পিতার হাত থাকার গুজব বিশ্বাস করেন। যে গোয়েন্দা টাস্কফোর্স ওই স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল, বা যে বিচারিক প্রক্রিয়ায় হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, অথবা যে কর্মকর্তারা তার গ্রেপ্তারের পেছনে দায়ী ছিল, তাদের বিষয়ে তদন্ত না করে, সরকার রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একটি সংবাদপত্রের ওপর।
ওইদিন আমি লন্ডনে থাকা অবস্থায়, আমার বাবা আমাকে একটি টেক্সট মেসেজ পাঠান। তিনি লিখেছেন, ‘১৭০০ কোটি ডলারের মামলা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। দেশের মোট বাজেটের চেয়েও এটি বেশি।’ এ শব্দগুলোর পেছনে তার হাসির শব্দ আমি শুনতে পাই। আমি এ হাসির পেছনের দুঃখটাও বুঝতে পারি।
আমার জানতে ইচ্ছে করে, আমি এখন যেমন বোধ করছি, এমনটা কি তিনিও বোধ করেছিলেন ১৯৫৮ সালে, যখন তার পিতাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী হওয়ার দায়ে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক একনায়কতান্ত্রিক সরকার গ্রেপ্তার করেছিল। আমার দাদা কারাগারে চার বছর কাটিয়েছিলেন। যখন তার স্বাস্থ্যের এতটাই অবনতি হয় যে কর্তৃপক্ষ ভয় পেয়ে যায় কারাগারেই হয়তো তিনি মারা যাবেন, তখনই কেবল তাকে মুক্তি দেয়া হয়।
এক বছর আগে, ব্লগার ও মুক্তমতের পক্ষের অ্যাক্টিভিস্ট অভিজিৎ রায়কে একুশে বই মেলা থেকে ফেরার পথে হত্যা করা হয়। তখন আমরা ওই সহিংস চরমপন্থীদের ভয় পেতে থাকি, যারা রাস্তায় আমাদের লেখকদের হত্যা করছিল। এখন, খোদ রাষ্ট্রকেই ভয় হয়, যে রাষ্ট্র রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন করছে। এক অহেতুক আতঙ্কগ্রস্থ (প্যারানয়েড) সরকার ও সহিংস চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হুমকির মাঝে পড়ে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হলো মুক্ত গণমাধ্যম।
আমি এখন ওই আইসক্রিম দোকানটার স্বপ্ন দেখি, দেখি তার মিষ্টি কোমলতাকে। স্বপ্ন দেখি অন্য এক জীবন, যেটি হয়তো আমাদের হতো। অবশ্যই, এ স্বপ্ন কখনই বাস্তব হয়ে উঠার নয়। রক্তে মিশে আছে ভিন্নমত। এবং গল্পটার মর্মার্থ এখন অবশ্যই বুঝতে হবে। আমার পিতার সবচেয়ে খারাপ কিছু হওয়ার আশঙ্কা করি আমি। তবে, তার জন্য সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে, ব্যক্তিগতভাবে। তার এ যন্ত্রণার জন্য তার প্রিয় দেশ আরেকটু দীন হয়ে উঠবে।
[তাহমিমা আনাম একজন লেখিকা ও নৃবিজ্ঞানী। তিনি ‘অ্যা গোল্ডেন এইজ’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। এছাড়া তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসের একজন কন্ট্রিবিউটিং অপিনিয়ন রাইটার। তার আরেকটি পরিচয়, তিনি বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের কন্যা। উপরের লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তার নিবন্ধের অনুবাদ। ভাষান্তর: নাজমুল আহসান।]

প্রধান বিচারপতির কণ্ঠে বিএনপি-জামায়াতের সুর; অভিযোগ কামরুলের, ‘বিতর্কিত’ মন্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের

খাদ্যমন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেছেন, জামায়াত-বিএনপি ও তাদের লবিস্টরা যে সুরে কথা বলছেন, সে কথাটা আজকে প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে বলেছেন।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক যৌথসভায় কামরুল ইসলাম এসব কথা বলেন।
কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আগামী ৮ তারিখ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর আপিলের রায়। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার আমরা করছি। চারজনের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। নিজামীর মৃত্যুদণ্ড আপিলে বহাল রেখেছে। এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, যথাসময় কার্যকর হবে।’ তিনি বলেন, ‘আগামী ৮ তারিখ তাঁদের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি, যিনি কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগ করেছেন, তাঁর লবিস্ট ডেভিড বার্গম্যান আন্তর্জাতিক বিশ্বে এই বিচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন...তাঁর দেহটা কারাগারের কনডেম সেলে, কিন্তু তাঁর অর্থ বাইরে সক্রিয়, তৎপর ও ষড়যন্ত্র করছে। আমরা অতীতে সব রায়ের সময় যেভাবে মাঠে ছিলাম, ৮ তারিখ তেমনি মাঠে থাকব।’
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, আজকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই বিচার সম্পর্কে কথা উঠছে। প্রসিকিউশন রাজনীতি করছে, এ কথা উঠছে। অর্থাৎ জামায়াত-বিএনপি এবং তাদের লবিস্টরা যে সুরে কথা বলছে, সে কথাটা আজকে প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে বলেছেন। প্রসিকিউশন ও ইনভেস্টিগেশনকে এক কাতারে দাঁড় করানোর কথাও তিনি (প্রধান বিচারপতি) বলেছেন। অথচ এই প্রসিকিউশন ২৩টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন।
কামরুল আরও বলেন, ‘আমরা এত কিছু বুঝি না, আমরা প্রত্যাশিত রায় চাই। একজন মন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থী হিসেবে আমি এই মামলারও বিচারপ্রার্থী। বিচারপ্রার্থীরা আজ হতাশ। এই বিচারের রায় কী হবে তাদের মনে একটা সন্দেহ আছে। আমরা প্রত্যাশা করি আমাদের সন্দেহ দূর হবে। আমরা প্রত্যাশিত রায় ৮ তারিখ পাব।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘৮ তারিখ মীর কাসেম আলীর রায় ঘোষণা হবে। আমরা অধীর আগ্রহে বসে আছি, তাঁর সর্বোচ্চ সাজা দেখার জন্য। শহীদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই, যদি ওলট-পালট হয় তাহলে শহীদদের আত্মা তাঁদের ক্ষমা করবে না।’
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কামাল আহমেদ মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যৌথসভায় আরও বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ।
‘বিতর্কিত’ মন্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের
বিচার বিভাগ নিয়ে ‘বিতর্কিত’ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের মন্ত্রীদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, তাঁদের বক্তব্য বিচার বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আজ রোববার নিজ কার্যালয়ে যাওয়ার পথে এ বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল এ কথা বলেন।
গতকাল শনিবার একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এক আলোচনায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর আপিল বিষয়ে তীব্র সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। খাদ্যমন্ত্রী এই মামলার পুনঃশুনানি দাবি করে তাতে প্রধান বিচারপতি এবং রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অংশ না নেওয়ার দাবি জানান।
এই বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বিচার বিভাগ নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তাঁদের এই বক্তব্য বিচার বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের বক্তব্য অসাংবিধানিক। আগামী ৮ মার্চ মীর কাসেমের আপিলের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে তিনি সবাইকে আহ্বান জানান।
মীর কাসেমের আপিল পুনঃশুনানির দাবি- প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করলেন দুই মন্ত্রী
মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর আপিল বিষয়ে তীব্র সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। খাদ্যমন্ত্রী এই মামলার পুনঃশুনানি দাবি করে তাতে প্রধান বিচারপতি এবং রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেন।
গতকাল শনিবার ধানমন্ডির বিলিয়া মিলনায়তনে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত ’৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র: সরকার, বিচার বিভাগ ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় দুই মন্ত্রী এই দাবি জানান। ৮ মার্চ মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় হবে। এ রায় দেওয়ার দুই দিন আগে এই দাবি জানানো হলো।
এই মামলার আপিলের শুনানিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দলের কাজ নিয়ে প্রধান বিচারপতির অসন্তোষ ও মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, অ্যাটর্নি জেনারেলও একই সুরে কথা বলছেন। গতকালের আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক প্রধান বিচারপতির মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান।
ওই গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে বক্তারা আরও যেসব মন্তব্য করেছেন, তা আদালত অবমাননাকর বিবেচনায় প্রকাশ করা হলো না।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রধান বিচারপতি এ মুহূর্তে দেশের বাইরে আছেন। তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধান বিচারপতি বর্তমানে নেপালে রয়েছেন এবং সোমবার তিনি দেশে ফিরবেন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিচারাধীন মামলা বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রফিক-উল হকও।
যোগাযোগ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, মন্ত্রীদের দাবির সপক্ষে আদৌ কোনো তথ্য-প্রমাণ আছে কি না, সেটা জানা নেই। যেকোনো মামলার বিচারকাজে ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ইত্যাদি দেখে যদি আদালত মনে করেন, মামলা ত্রুটিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়েছে, সঠিক তথ্য উঠে আসেনি, সে ক্ষেত্রে আদালতই নতুন করে মামলাটি শুনানির জন্য পাঠাতে পারেন। এ জন্য কারও দাবির প্রয়োজন হয় না।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিচারাধীন মামলা নিয়ে দুজন মন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এতে প্রমাণ হয়, সরকার যেকোনো পন্থায়, এমনকি বিচারকদের হুমকি দিয়ে হলেও আসামিকে সাজা দিতে চায়। তিনি মনে করেন, দুই মন্ত্রীর বক্তব্য বিচার বিভাগকে হেয় ও অবমাননা করে। সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিচার বিভাগকে এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
মীর কাসেম আলীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব আরও বলেন, বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে তাঁদের দাবি বিচার বিভাগের প্রতি অনাস্থার শামিল।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের পরিচালনায় গোলটেবিল আলোচনায় আরও অংশ নেন শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি শামসুল হুদা, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সহসভাপতি কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী, সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, জনকণ্ঠ-এর নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল-মালুম ও তুরিন আফরোজ। সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য পাঠ করে শোনান তাঁর মেয়ে নাদিয়া চৌধুরী।
উল্লেখ্য, গতকালের আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামী দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। তাই এ দলকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য আইন সংশোধনের প্রস্তাব করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীরা ভোট দিতে পারবেন না। তাঁরা নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবেন না।

তুরস্কে সরকারবিরোধী সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণ নিল সরকার

তুরস্কের সর্বাধিক প্রচারিত ‘দৈনিক জামান’-এ পুলিশি অভিযান চালিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সরকার। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আন্দালুর বরাত দিয়ে শনিবার আলজাজিরার এক খবরে এ কথা জানানো হয়। শুক্রবার মধ্যরাতে তুরস্কের সবচেয়ে বড় সংবাদপত্র ‘জামান’র কার্যালয়ে ঢুকে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় বাইরে সমবেত সমর্থক ও বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও জলকামানও চালানো হয়। এর আগে সংবাদপত্রটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার জন্য আদালতের এক রুল জারি করা হয়। আদালতের সেই নির্দেশের ভিত্তিতেই পুলিশ অভিযান চালায় এর কার্যালয়ে। দৈনিক জামান’র প্রচার সংখ্যা ছিল সাড়ে ছয় লাখ। পত্রিকাটি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগানের রাজনৈতিক বিরোধী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের সমর্থক ছিল। এ কারণে সরকার পত্রিকাটি ‘কবজা’ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জামান পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এটি হিজমাত আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক পাদ্রি ফেতুল্লাহ গুলানের নেতৃত্বে এ হিজমাত আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয় আদালত। সমর্থকদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান নিক্ষেপ করা হয় জামান’র এডিটর-ইন-চিফ আবদুল হামিত বিলিসি বলেন, ‘গত তিন-চার বছর ধরেই এই চর্চা চলে আসছে। যারাই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধেই মামলা দেয়া হয় অথবা কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।’ এটা আমাদের দেশের জন্য অন্ধকার অধ্যায়। তবে একদা এই ফেতুল্লাহ গুলান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগানের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। পরে তাদের দু’জনের মতানৈক্য হয়। এ সময় সমর্থকরা জামান কার্যালয়ের বাইরে সমবেত হয়ে স্লোগান দেন। স্লোগানে তারা বলেন, ‘মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা যাবে না।’ বেশ কিছু হিজমাত আন্দোলন সমর্থককে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে দৈনিক জামান জব্দের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের বিভিন্ন সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) নির্বাহী পরিচালক জোয়েল সিমন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আজকের এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তুরস্কে সমালোচনাধর্মী সাংবাদিকতার অবশিষ্টাংশকে গলা টিপে ধরা হল।’

তুরস্কে সরকারবিরোধী সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণ নিল সরকার

তুরস্কের সর্বাধিক প্রচারিত ‘দৈনিক জামান’-এ পুলিশি অভিযান চালিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সরকার। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আন্দালুর বরাত দিয়ে শনিবার আলজাজিরার এক খবরে এ কথা জানানো হয়। শুক্রবার মধ্যরাতে তুরস্কের সবচেয়ে বড় সংবাদপত্র ‘জামান’র কার্যালয়ে ঢুকে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় বাইরে সমবেত সমর্থক ও বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও জলকামানও চালানো হয়। এর আগে সংবাদপত্রটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার জন্য আদালতের এক রুল জারি করা হয়। আদালতের সেই নির্দেশের ভিত্তিতেই পুলিশ অভিযান চালায় এর কার্যালয়ে। দৈনিক জামান’র প্রচার সংখ্যা ছিল সাড়ে ছয় লাখ। পত্রিকাটি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগানের রাজনৈতিক বিরোধী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের সমর্থক ছিল। এ কারণে সরকার পত্রিকাটি ‘কবজা’ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জামান পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এটি হিজমাত আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক পাদ্রি ফেতুল্লাহ গুলানের নেতৃত্বে এ হিজমাত আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয় আদালত। সমর্থকদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান নিক্ষেপ করা হয় জামান’র এডিটর-ইন-চিফ আবদুল হামিত বিলিসি বলেন, ‘গত তিন-চার বছর ধরেই এই চর্চা চলে আসছে। যারাই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধেই মামলা দেয়া হয় অথবা কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।’ এটা আমাদের দেশের জন্য অন্ধকার অধ্যায়। তবে একদা এই ফেতুল্লাহ গুলান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগানের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। পরে তাদের দু’জনের মতানৈক্য হয়। এ সময় সমর্থকরা জামান কার্যালয়ের বাইরে সমবেত হয়ে স্লোগান দেন। স্লোগানে তারা বলেন, ‘মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা যাবে না।’ বেশ কিছু হিজমাত আন্দোলন সমর্থককে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে দৈনিক জামান জব্দের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের বিভিন্ন সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) নির্বাহী পরিচালক জোয়েল সিমন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আজকের এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তুরস্কে সমালোচনাধর্মী সাংবাদিকতার অবশিষ্টাংশকে গলা টিপে ধরা হল।’

একনজরে টি ২০তে বাংলাদেশ-ভারত

এশিয়া কাপের ফাইনালে আজ স্বাগতিক বাংলাদেশের মুখোমুখি হচ্ছে ভারত। এর আগে টি ২০ ফরম্যাটে তিনবার মুখোমুখি হয়েছে দু’দল। দেখে নেয়া যাক ফল-
প্রথম ম্যাচ : ভারত-বাংলাদেশ টি ২০তে প্রথম মুখোমুখি হয় ২০০৯ বিশ্বকাপে। নটিংহ্যামের ট্রেন্টব্রিজে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ২৫ রানে জিতেছিল ভারত। গ্রুপপর্বের ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে পাঁচ উইকেটে ১৮০ রান করেছিল টসজয়ী ভারত। গৌতম গম্ভীরের হাফ সেঞ্চুরি ছাড়াও যুবরাজ সিং ৪১ ও রোহিত শর্মা ৩৬ রান করেছিলেন। বাংলাদেশের নাঈম ইসলাম পেয়েছিলেন দুটি উইকেট। একটি করে উইকেট পান সাকিব আল হাসান, রুবেল হোসেন ও শাহাদাত হোসেন। জবাবে আট উইকেটে ১৫৫ রান করে বাংলাদেশ। জুনায়েদ সিদ্দিকীর ৪১ ও নাঈম ইসলামের ২৮ রান। ভারতের বোলার প্রজ্ঞান ওঝা চার উইকেট পান।
দ্বিতীয় ম্যাচ : ভারতের বিপক্ষে টি ২০তে বাংলাদেশের দ্বিতীয় লড়াই হয় ২০১৪ সালে। এটিও বিশ্বকাপের ম্যাচ। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে আট উইকেটে জিতেছিলেন ধোনিরা। টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে সাত উইকেটে ১৩৮ রান করেছিল বাংলাদেশ। এনামুল হক ৪৪ ও অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ২৪ রান করে আউট হয়েছিলেন। ৩৩ রান নিয়ে অপরাজিত থাকেন মাহমুদউল্লাহ। ভারতের অমিত মিশ্র তিনটি ও অশ্বিন দুটি উইকেট নেন। জবাবে ১৮.৩ ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে জয়ী হয় ভারত। রোহিত শর্মা ৫৬ রানে আউট হন। বিরাট কোহলি ৫৭ ও ধোনি ২২ রান নিয়ে অপরাজিত থাকেন। বাংলাদেশের পক্ষে আল-আমিন ও মাশরাফি দুটি উইকেট শিকার করেন।
তৃতীয় ম্যাচ : ভারতের বিপক্ষে টি ২০তে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ এবারের এশিয়া কাপে। সেই ম্যাচে ৪৫ রানে হেরেছে স্বাগতিকরা। টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে ভারত ছয় উইকেটে ১৬৬ রান করে। রোহিত শর্মা করেন ৮৩ রান। শেষদিকে হার্দিক পান্ডে ৩১ রান করেন। বাংলাদেশের বোলার আল-আমিন তিনটি উইকেট পান। একটি করে উইকেট নেন মাশরাফি, সাকিব ও মাহমুদউল্লাহ। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নির্ধারিত ওভারে সাত উইকেট হারিয়ে ১২১ রান করে বাংলাদেশ। সাব্বির রহমানের ৪৪ রানই বড় স্কোর। মুশফিক ১৬ ও তাসকিন ১৫ রান করেন। আশিষ নেহরা তিনটি উইকেট নিয়ে ভারতের সেরা বোলার।

সজল-মম’র আবারও নাটকে ফিরে আসা

বহু ঘটা করেই চলচ্চিত্রের পিচ্ছিল পথে পা রেখেছিলেন জাকিয়া বারি মম। কয়েকটি ছবিতে কাজ করেছেন। মুক্তিও পেয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ সফলতা আসেনি। অপেক্ষার প্রহর শেষে ফের টিভি পর্দার দিকেই নজর দিলেন এ অভিনেত্রী। যদিও বিশেষ দিবসে দু’একটি নাটকে তাকে দেখা গেছে। এবার পুরোদমেই ফিরলেন। ফিরতি যাত্রায় সঙ্গে নিয়েছেন সজলকে। সম্প্রতি এ দুই তারকা ‘ফিরে আসা’ নামের একটি খণ্ড নাটকে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন।
শরীফ জাহানের রচনায় নাটকটি পরিচলনা করেছেন রোমান খান। রোমান্টিক ঘরানার এ নাটকটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে সজল বলেন, ‘যেহেতু এখন চলচ্চিত্রে কাজ করছি। তাই নাটকে কাজ করার ব্যাপারে গল্প নির্বাচনে আমি আরও একটু বেশি চুজি হয়েছি। ফিরে আসা নাটকের গল্পে নতুনত্ব আছে। মমর সঙ্গে আমার কাজের বোঝাপড়া সবসময়ই আন্তরিক। নতুন কাজটি দর্শকের ভালো লাগবে।’ মম বলেন, ‘চমৎকার গল্পের একটি নাটক ফিরে আসা। ইউনিটের সবাই বেশ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেছেন। দর্শকের ভালোলাগার মতো একটি নাটক হয়েছে।’ শিগগিরই একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে নাটকটি প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানান।

অন্ধ-আনুগত্য গণতন্ত্রের অলংকার নয় by মাহমুদুর রহমান মান্না

৩ অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত কার্যকরী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণত নতুন কমিটির সদস্যদের পরস্পর পরিচিতি অনুষ্ঠানের মতো হয় এটা। একটা সফল সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যে কমিটি গঠিত হয়, এর অব্যবহিত পরই হয়ে থাকে এ সভা। এতে আনন্দঘন পরিবেশ থাকে, হাসি উচ্ছলতা থাকে, রাজনীতিও থাকে, সে খুব গভীর নয়। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে, রাজনীতির মেজাজ বদলেছে, রাজনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সিরিয়াস হয়েছে। ফলে নতুন কমিটির সভায় আনন্দ হয়তো থাকছে, কিন্তু রাজনীতিও থাকছে। এবং সেটা খুব হালকা মাপের নয়।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এবারের সভা একেবারে অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিত না হলেও খুব বিলম্ব করেও হয়নি। দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল আগে থেকেই একটি ইস্যু হয়ে গিয়েছিলেন, যাঁকে কেন্দ্র করে পরিবেশটা বেশ খানিকটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সিনিয়র নেতাদের কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। একজন তো এত দূর বলেছিলেন যে আব্দুল জলিলকে শোকজ নোটিশ দেওয়া হবে।
জনাব জলিল তাঁর পুত্রকে লিংকনস ইন-এ ভর্তি করানোর জন্য সপরিবার লন্ডন গিয়েছিলেন। সেখানে বাংলা টিভিকে তিনি একটি সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে রীতিমতো ঝড় তুলে দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই কমিটির সভায় বিষয়টি প্রথমেই গুরুত্বের সঙ্গে এসেছিল। সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাসিম, বর্তমান দুজন সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন নেতা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আব্দুল জলিলের শাস্তি দাবি করেন। মজার ব্যাপার, সভার আগে যে তিনজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী ও ওবায়দুল কাদের বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, তাঁরা এই সভায় নিশ্চুপ ছিলেন।
দেশব্যাপী প্রায় সবাই নিশ্চিত ছিলেন, আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সদ্য আমেরিকায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন থেকে ফেরত আসা দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, আপনারা তো অনেক নিন্দা করেছেন তাঁর কথার; আর শাস্তির দরকার কী?
না, আমার বলাটা হয়তো পুরোপুরি ঠিক হলো না। সবাই অবাক হয়েছেন তা বোধহয় নয়। সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, ওবায়দুল কাদেরেরা বোধহয় অবাক হননি। হলে তো তাঁরা কথা বলতেন। তাঁরা বোধহয় জানতেন, নেত্রী কী করবেন। নাসিম সাহেবরা জানতেন না। তাই নেত্রী সমাপনী বক্তৃতা দেওয়ার সময়ও মো. নাসিম উঠে দাঁড়িয়ে আবারও আব্দুল জলিলের শাস্তি দাবি করেন। দু-একজন আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে জলিল সাহেব প্রকাশ্যে যেভাবে নেত্রীর বিরোধিতা করেছেন, তার শাস্তি না দিলে দলের নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে। তাঁদের কথার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, জলিল সাহেব তো প্রকাশ্যে আমার বিরোধিতা করেছেন। অনেকে যে পেছনে, ড্রইংরুমে বসে সব সময় আমার সমালোচনা করেন।
শেখ হাসিনা এই বলে সভা শেষ করেন যে বিষয়টি আমার ওপর ছেড়ে দিন। প্রয়োজনে আমি পরে ব্যবস্থা নেব। কেউ কেউ অন্তত একটা শোকজ নোটিশ দেওয়ার কথা বলেন। নেত্রী তাও নাকচ করে দেন। অচিন্ত্যপূর্ব নয়? আমি মাননীয় সভানেত্রীকে এ জন্য একটা ধন্যবাদ জানাতে চাই।
লন্ডনে জলিল সাহেব কী এমন কথা বললেন, যা নিয়ে এমন দেশকাঁপানো ঝড় উঠে গেল? এমন তো নয় যে জলিল সাহেব এই প্রথম কথা বললেন। এর আগেও তিনি পার্লামেন্টে লম্বা-চওড়া বক্তৃতা দিয়েছেন, সংবাদপত্রে সাক্ষাত্কার দিয়েছেন, যেখানে তিনি মন্ত্রিসভা এবং দলের নবগঠিত কমিটি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। তখন কিন্তু কেউ এমন ঝড় তোলেননি।
আব্দুল জলিল এর আগে যেসব কথা তুলেছিলেন, এর মধ্যে দুটি বিষয় ছিল প্রণিধানযোগ্য।
এক. সামরিক বাহিনীর যাঁরা এক-এগারোর হোতা ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; দুই. মন্ত্রিসভা ও নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিকে তিনি নবরত্ন আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, এঁরা দেশ ও দল—দুটিকেই ডোবাবে। নয় মাসে সরকারের সাফল্য বলতে কিছু নেই।
অভিযোগ দুটিই গুরুতর এবং মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল। প্রেসিডিয়াম এবং কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতাই মনে করেন, এক-এগারোর হোতারা মূলত ক্ষমতা দখলকারী। আবার অনেকে মনে করেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের হাত থেকে বাঁচার জন্য এক-এগারোর বিকল্প ছিল না। এই সেদিনও নিউইয়র্কে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রীর তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় এক-এগারোর প্রশংসা করেন। আব্দুল জলিলের প্রথম অভিযোগ নিয়ে আলোচনার অবকাশ এখানে নেই (এ নিয়ে আলাদা একটি লেখার ইচ্ছা আমার আছে)। দ্বিতীয় অভিযোগটি আলোচনার দাবি রাখে। এটা এমন একটা অভিযোগ, যার প্রতি ব্যাপক সমর্থন থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ দল ও দেশে বঞ্চিতের সংখ্যাই বেশি।
আমাদের দেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীই মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ ক্ষমতা এককভাবে তাঁরই। এর আগের বারও এভাবেই মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তখন কিন্তু এত কথা ওঠেনি। কেন? কারণ, তখন যা হয়েছিল সেটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এবার যা হয়েছে তা প্রত্যাশিত ছিল না। এ মন্ত্রিসভা কি এর চেয়ে ভালো হতে পারত না? নিশ্চয়ই পারত। কিন্তু সেই আরও ভালোর সীমা কত দূর, সেটা বলা যাবে না। আব্দুল জলিল মনে করেন, এ মন্ত্রিসভা যোগ্য নয়। তারা ব্যর্থ হবে। তা তিনি মনে করতেই পারেন। এ কথার জবাব ইতিহাস দেবে। আর দেবেন শেখ হাসিনা। একটা সফল, সুশাসন পরিচালনার মাধ্যমেই তিনি এ সংশয়ের জবাব দিতে পারবেন। এ দায়িত্ব এককভাবে তাঁরই।
এ ক্ষেত্রে একটা কথা তাঁর এখন থেকেই ভাবা উচিত। জলিল সাহেব যে বলেছেন, এই কয় মাসে সরকারের কোনো সাফল্য নেই, মানুষ কিন্তু সে রকমটি মনে করে। ইতিমধ্যে চিনির দাম কমাতে পারেনি সরকার, চালের দামও বাড়তে শুরু করেছে; অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম তো আগেই বেড়েছে। ভয়াবহভাবে বেড়েছে টেন্ডারবাজি, প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে সেই সব খবর। পটুয়াখালীর গণধর্ষণ এবং তার ভিডিও টেপ ধারণ নিয়ে বিদেশি দূতাবাস উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
পার্টির নতুন নেতৃত্বের প্রশ্নটিও এখানে বিবেচনার দাবিদার। কেমন হয়েছে নতুন কমিটি? আবার একই রকম জবাব আসবে পর্যবেক্ষক মহল থেকে: অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ভোয়ার ইকবাল বাহার চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাত্কালে শেখ হাসিনা অবশ্য বলেছেন, তিনি সিনিয়রদের রেখেছেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর চেয়ারম্যান হিসেবে, যেটা তাঁর বিবেচনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তা ঠিক। এবারের সংসদে স্থায়ী কমিটিগুলোকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাঁরা যে পার্টির মূল নেতৃত্ব থেকে বাদ পড়েছেন, সে কথাও ঠিক।
এ ছাড়া সভানেত্রী যে বলেছেন, পার্টির অভিজ্ঞ ও সিনিয়র নেতাদের কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি, তাও মনে হয় খানিকটা ভুলে যাওয়া থেকে উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির অনেকেই এবার বাদ পড়েছেন, যাঁরা পঞ্চাশ-ষাটের কোঠায়। তাঁদের অনেকে এমনকি নমিনেশনও পাননি।
আব্দুল জলিলের শেষ কথায় আসি, যেটা নিয়ে এত হুলস্থূল হয়ে গেল। অবশ্য জলিল যে ঠিক কী কথা লন্ডনের ওই টিভিকে বলেছেন, তা নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুলও নিশ্চিত নন। এখানে যেভাবে পত্রিকায় এসেছে, আমি তারই ভিত্তিতে বলছি। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, আব্দুল জলিল বিগত সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, এ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করেছিল আওয়ামী লীগ। এটা একটা সমঝোতার নির্বাচন।
প্রথমেই বলা দরকার, পত্রিকায় যেভাবে খবরটা এসেছে, তা দলের জন্য বিব্রতকর হয়েছে। জলিল সাহেব এর আগেও তাঁর কথা বলেছেন। সেখানে তিনি এও বলেছেন, যত দিন জীবিত থাকবেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ করবেন। সে ক্ষেত্রে এ রকম একটি সাক্ষাত্কার তাঁর দেওয়া উচিত হয়নি। এতে বিরোধী দলের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু বিরোধী দল এটাকে নিয়ে যে হইচই করছে, তা কতটা যৌক্তিক?
২০০৮ সালে যে নির্বাচন হলো, সেটা কি একটা জাতীয় মতৈক্যের বা সমঝোতার ফসল নয়? বেশ কয়েকবার আওয়ামী লীগ, ১৪ দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বসেনি? বিএনপি, জামায়াত বসেনি। সবাই মিলে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারে রাজি হয়ে নির্বাচনে যায়নি? এই সংস্কার তো আওয়ামী লীগই চেয়েছিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেটি করার চেষ্টা করছিল। এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়ার পেছনে সামরিক বাহিনী তো ছিলই। বিএনপি এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল, না পেরে শেষ পর্যন্ত তাদেরও রাজি হতে হয়েছিল।
অন্যায় হয় যদি তিনি বলেন, এই যে নির্বাচনের ফল, যাতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেল, সেটি এই আঁতাতের ফসল। তাহলে সত্যিই তো জনাব জলিলও বা এমপি থাকেন কীভাবে। সে ক্ষেত্রে জলিল সাহেবকে যে ক্ষমা করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা, তা শুধু তাঁর অতীত ভূমিকার কথা স্মরণ করেই।
জলিল সাহেবের যে কথাটা দলের জন্য বিব্রতকর, সেটা হলো ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে দলের দহরম-মহরম নিয়ে কথা তোলা। এ কথা সবাই জানেন, ডিজিএফআই-ই তখন ছিল মূল ক্ষমতার অধিকারী। ব্যক্তিগত বা দলীয় কারণে অনেকে তাদের সঙ্গে কথা বলে থাকতেই পারেন। দলীয় নেত্রীর মুক্তির কথা চিন্তা করে পুরো প্রেসিডিয়ামও বৈঠক করে থাকতে পারে তাদের সঙ্গে। বিএনপি বসেনি তাদের সঙ্গে? বেগম জিয়া বা তাঁর সন্তান তারেক রহমান কি এমনি এমনি মুক্তি পেয়েছেন? কথা বলতে হয়নি? তাঁদের একটি গ্রুপ তো ডিজিএফআইয়ের কথায় দলই ভেঙে ফেলেছিল।
শেখ হাসিনা যে এসব নিয়ে বেশি দূর এগোননি, তা সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই। তিনি জানেন, অনেক দূর যেতে হবে তাঁকে। অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ তাঁর সামনে। দলের মধ্যে অটুট ঐক্য দরকার। দরকার জাতীয় ঐক্যের।
মাহমুদুর রহমান মান্না: রাজনীতিক, কলাম লেখক

‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন! by এ কে এম জাকারিয়া

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা এবারই প্রথম রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে স্থানীয় সরকারের সবগুলো পর্যায়ের নির্বাচন এর আগে নির্দলীয়ভাবে হলেও এসব নির্বাচনকে কখনো রাজনীতির বাইরে রাখা যায়নি। স্থানীয় সরকারের যেকোনো স্তরের নির্বাচনের পর ফলাফলে কোন দল কতটি পেয়েছে, সেই হিসাব-নিকাশই আমরা গণমাধ্যমে দেখে এসেছি।
গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক পরিচয় ও মনোনয়নে হতে শুরু করেছে। এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন রাজনৈতিক মনোনয়নে প্রথমবারের মতো নির্বাচন—এ বিষয়টিকে ছাপিয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে তা হচ্ছে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুলসংখ্যক ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা। স্থানীয় সরকারের এই স্তরে এ ধরনের নজির আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ঢেউ বা ধারা কি তবে দেশের সব পর্যায়ের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পাকা জায়গা করে নিতে যাচ্ছে?
নির্বাচন মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর সঙ্গে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বিষয়টি যায় না। নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচিত হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে যে অবিশ্বাস্যসংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাতে বিষয়টি আর ‘ব্যতিক্রম’-এর মধ্যে আটকে থাকেনি। কিন্তু এটা পুরো নির্বাচনটিকেই একটি ‘ব্যতিক্রমী’ নির্বাচনে পরিণত করছে। এমন একটি নির্বাচনের দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক। এবং তা নিরাপদও বটে। ধরে নিচ্ছি, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যত সমালোচনা, এর দায় সবই বিএনপির। সরকারি দলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে পারি, বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার অবস্থান নেওয়ার কারণেই এমন একটি ব্যতিক্রমী নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি ও তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু কৌতূহলের সঙ্গে আমরা দেখছি, সেই ব্যতিক্রমই যেন এখন নিয়ম ও রীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। অথবা এর লক্ষণ দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে।
২০১৪ সালের জাতীয় ও ‘রাজনৈতিক’ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের অর্ধেকের বেশি সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক পরিচয়ে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে দেখা গেল যে ২৩৪ জন পৌরসভা চেয়ারম্যানের মধ্যে ৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা সবাই সরকারি দলের প্রার্থী। পৌরসভার এর আগের নির্বাচনটির (২০১১ সালে অনুষ্ঠিত) যেসব তথ্য নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণকারী নাগরিক প্রতিষ্ঠান সুজনের সূত্রে পাওয়া যায়, সেখানে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত বলে কিছুর উল্লেখ দেখা যায়নি। ধরে নিতে পারি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ‘মৃদু’ প্রভাব পড়েছিল পৌরসভা নির্বাচনে।
কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রভাব সম্ভবত ‘মৃদু’ থেকে দিনে দিনে ‘শক্তিশালী’ হতে শুরু করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ে এখন পর্যন্ত যে আলামত দেখা যাচ্ছে, তাতে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি বেশ পোক্তভাবেই জেঁকে বসেছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ সম্ভবত সে কারণে আগেভাগেই এ নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন। ‘ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আমাদের কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এটা হতেই পারে। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত সাত বছরে যে উন্নয়ন করেছে, তাতে মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।’ আসলেই তো, কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেই পারেন! ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের উদাহরণ তো আমাদের সামনে রয়েছে। সেই নির্বাচনে যদি অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন, তবে ইউপিতে ‘কিছু প্রার্থী’ এভাবে নির্বাচিত হতে সমস্যা কী! তবে ‘উন্নয়ন’-এর সঙ্গে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সম্পর্কটা কোথায়, হানিফের বক্তব্যে তা অবশ্য পরিষ্কার হলো না।
প্রথম দফায় যে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে এরই মধ্যে অন্তত ২৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এঁরা সবাই আওয়ামী লীগের। আরও প্রায় ২৬টি ইউনিয়নেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কারণে এই ইউনিয়নগুলোতে এখন শুধু আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীরা রয়েছেন। যাঁদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাঁদের আপিল ও আপত্তির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে থাকবে।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা ছিল গতকাল ২ মার্চ। এই পর্ব শেষ হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে! আগের দুটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন এমন নজির কোথাও উল্লেখ নেই। নির্বাচন কমিশনের কাগজপত্রেও পাওয়া যায়নি, সুজনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিএনপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে ১১৪টি আসনে দলটির কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ২০টিতে নানা কারণে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি। তাদের অভিযোগ, বাধা দেওয়ার কারণে ৮৩টি ইউনিয়ন পরিষদে তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এ অভিযোগ মেনে নেয়নি। কমিশন বলেছে, এ ধরনের অভিযোগের কোনো সত্যতা তারা পায়নি।
আমাদের বেয়াড়া ও কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগে, নির্বাচন কমিশন কি আসলেই এসব অভিযোগের সত্যতা খোঁজার চেষ্টা করেছিল? যে ৮৩ জন বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি, তাঁরা সবাই দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা কাগজ পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে যেখানে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাওয়াই একটা বড় ঘটনা, সেখানে মনোনয়ন পাওয়ার পরও বিএনপির এতসংখ্যক মনোনয়নপত্র দাখিল করা থেকে বিরত থাকবে, এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? কোনো কারণ ছাড়া কি এমনটি ঘটতে পারে? নির্বাচন কমিশন কি ভেবে দেখেছে যে কী এমন কারণ ঘটল, যাতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিলেন না? নির্বাচন কমিশন তাদের ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছে, কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক তাতে কী আসে যায়!
বিএনপির আশঙ্কা, যে ধরনের চাপ ও কৌশল সরকারের তরফে অব্যাহত রাখা হয়েছে, তাতে বিএনপির প্রার্থীর সংখ্যা আরও কমতে পারে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রথম দফা ইউপি নির্বাচনের এই নজির পরের দফাগুলোতে আরও জোরেশোরে পড়ার আশঙ্কাকেই জোরদার করছে। সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের উদ্যোগ–আয়োজন, মনোনয়নপত্র দাখিলসহ নানা কর্মকাণ্ড ঠিক রেখে শেষ পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়ার প্রথাটি দিনে দিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রার্থীদের চাওয়াটিও যেন অনেকটাই এ রকম যে নির্বাচনে অংশ নেবেন ঠিকই, কিন্তু কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকবে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি না হয়ে যদি নির্বাচিত হওয়া যায়, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে কে চায়!
প্রথম দফায় যে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে অর্ধেকেরও বেশি আসনে এখনো আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। পত্রপত্রিকার খবর বলছে, ৪১২টি ইউনিয়নে মনোনয়ন পাওয়া আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। এ অবস্থায় ১১৪টি আসনে বিএনপির প্রার্থী না থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা খুব স্বস্তিতে আছেন বলে মনে হয় না। নিজ দলের বিদ্রোহীরা তাঁদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন। ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হওয়ার আশায় ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত যে প্রার্থীরা, তাঁদের অনেকেরই আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছেন এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বিএনপিকে সামলানো বা কোণঠাসা করার কাজটি আওয়ামী লীগের জন্য যতটা সহজ, নিজ দলের বিদ্রোহীদের জন্য ততটা নয় বলেই তো মনে হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের সবচেয়ে দোরগোড়ার সরকার। এই নির্বাচন নিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সব সময়ই উৎসাহ ও উদ্দীপনায় মেতেছে। ব্যাপক অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। দলীয় ভিত্তিতে হওয়ার পর ইউপি নির্বাচন কি তবে সেই সৌন্দর্য হারানোর দিকে যাচ্ছে? নাকি ‘নির্বাচন’-এর অর্থ বা সংজ্ঞা স্থায়ীভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগ–আয়োজন চলছে?
তবে মনে হচ্ছে, এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কিছুটা হলেও ‘নির্বাচন’ হয়ে উঠবে বা নির্বাচন বলতে যে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বোঝায় তার স্বাদ হয়তো মিলবে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কল্যাণে। হোক না আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ, তা-ও তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা! ভাগ্যিস আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা রয়েছেন!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

দুই শিশু হত্যা: রিমান্ডে একই কথা বলছেন জেসমিন by নুরুজ্জামান লাবু ও রুদ্র মিজান

পুলিশের কাছেও একই কথা বলছেন দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজেই স্বীকারোক্তি দেয়া মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। তিনি বলছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণেই তাদের হত্যা করেছেন তিনি। বর্ণনাও দিচ্ছেন একই। কিন্তু র‌্যাবের মতো তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরাও এই যুক্তি মেনে নিতে পারছে না। রিমান্ডে নিয়ে নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তারা। জানার চেষ্টা করছে দুই শিশু হত্যার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না। কিংবা জেসমিনের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে আর কেউ সম্পৃক্ত ছিল কি না।
এদিকে দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন স্বজনরা। তারা মনে করেন, অন্য কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু এতে ফেঁসে গেছেন দুই সন্তানের মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। এ ঘটনায় দুই গৃহশিক্ষকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। কিন্তু দুই গৃহশিক্ষক কেন তাদের হত্যা করবে বা তাদের লাভ কী- এ বিষয়ে কোনো উত্তর নেই তাদের কাছে। কিংবা জেসমিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না থাকলে কারা হত্যা করলো? শয়নকক্ষে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে জেসমিনও ছিলেন। তার সামনেই যদি  অন্য কেউ হত্যা করে তবে তাদের নাম তিনি বলছেন না কেন? এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি স্বজনরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। মা নিজেই বারবার স্বীকার করছে সে নিজেই দুই সন্তানকে হত্যা করেছে। হত্যার কারণও বলছে আগের মতোই। এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না তা জানার চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সূত্র জানায়, গতকাল ছিল জেসমিনের পাঁচ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন। তাকে থানার মহিলা হাজতখানায় রাখা হয়েছে। দুজন নারী পুলিশ সদস্য সর্বদা তার সঙ্গে থাকেন। গতকাল সকালে, দুপুরে ও রাতে তিনি স্বাভাবিকভাবে খাবার খেয়েছেন। রাতে ও দিনের বিভিন্ন সময়ে কৌশলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কিন্তু প্রতিবার জিজ্ঞাসাবাদেই তিনি একই কথা বলছেন। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ নেই বলেও পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন তিনি। সূত্র জানায়, তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের সময় ওই বাসায় থাকা দুই ভাইবোনের দাদি হাসিনা বেগম, তাদের তিন গৃহশিক্ষক, ঘটনাস্থলে প্রথম উপস্থিত হওয়া খালা আফরোজা মালেক নীলা, দুই শিশুর বাবা আমানের বন্ধু জাহিদ, আজিম ও তাদের গাড়িচালকসহ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
নিহত দুই শিশুর খালা আফরোজা মালেক নীলা জানিয়েছেন, বোনের ফোন পেয়ে তিনি যখন ওই বাসায় যান তখন বাসার দরজা খোলা ছিল। তিনি শয়নকক্ষে গিয়ে অরণীকে মেঝেতে ও আলভীকে খাটে দেখতে পান। অথচ বন্ধু জাহিদ জানিয়েছেন, তিনি ওই কক্ষে গিয়ে দুজনকেই খাটে দেখেছেন। কিন্তু ঘটনার বিহ্বলতায় তারা ঘুর্ণাক্ষরেও টের পাননি এটি হত্যাকাণ্ড হতে পারে। তাহলে হাসপাতালে নেয়ার আগে তারা পুলিশকে খবর দিতেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার কারণে অনেক আলামত নষ্ট হয়ে গেছে। দুই শিশুকে বাসা থেকে প্রথমে স্থানীয় আল-রাজী হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়। এ কারণে দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যায় ব্যবহৃত আঙুলের ছাপ পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে। তার পরও পুলিশ অন্তত ৮টি নমুন সংগ্রহ করে আদালতের অনুমতি নিয়ে সিআইডির  ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, এসব পরীক্ষা শেষ হতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে।
এদিকে জেসমিনের বরাত দিয়ে তার চাচাতো ভাই জামালপুরের চর পলিশা জেএল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সোলায়মান সরকার জানান, ঘটনার দিন ২৯শে ফেব্রুয়ারি গৃহশিক্ষক শিউলি অরণীকে পড়াচ্ছিলেন। আরেক গৃহশিক্ষকের আসার কথা সন্ধ্যার পরে। কিন্তু ওই গৃহশিক্ষক বেলা ৩টার পরেই বাসায় গিয়ে উপস্থিত হন। একপর্যায়ে জোহরের নামাজ পড়ার অজুহাতে ভেতরে যান ওই গৃহশিক্ষক। নামাজ পড়ার সময়ে ভেতরের কক্ষে ঘুমিয়েছিলেন জেসমিন। ঘুম থেকে জেগে দুই শিশুর নিস্তেজ দেহ দেখতে পান তিনি। সোলায়মান মনে করেন, এখানে রহস্য রয়েছে। এজন্য ওই দুই মহিলা গৃহশিক্ষককে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত জেসমিন নিজেই র‌্যাবের কাছে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য না বলে মনে করেন তিনি। একইভাবে স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল জলিল বলেন, আমানউল্লাহ আমান উদীয়মান ভালো একজন ব্যবসায়ী। আমান-জেসমিন দম্পতির দুই সন্তানও ভালো স্কুলে লেখাপড়া করতো। সেখানে হত্যাকাণ্ডের যে কারণের কথা বলা হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। এছাড়া তাদের পরিবারের কারও মানসিক সমস্যা ছিল বলেও জানা নেই কারও। জামালপুরের ইকবালপুরের শহীদ আবদুল হামিদ সড়কের জেসমিনদের শান্তি নীড় নামক বাড়িতে গেলে কথা হয় জেসমিনের একমাত্র ভাই জাকির হোসনে সরকার বুলবুলের সঙ্গে। বুলবুল জানান, তার বোন জেসমনি ও ভগ্নিপতি আমানের মধ্যে সুন্দর দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল। জেসমিনের কোনো মানসিক সমস্যা ছিল না। তবে ২০০০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় তার পিতা আবদুল মালেক সরকারের মৃত্যুর পর থেকে রাতে কম ঘুম হয় তার মায়ের। এছাড়া তেমন কোনো সমস্যা নেই বলে জানান তিনি। জেসমিন তার সন্তানদের হত্যা করতে পারে তা বিশ্বাস করেন না বুলবুল। তিনি মনে করেন, অন্য কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে কারা ঘটাতে পারে এ সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই তার।
বুলবুল জানান, প্রথম দিকে জেসমিন ও আমানের মায়েরও মনে হয়েছে একদিন আগে বাসায় আনা চাইনিজ খেয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। জেসমিনের ছোট বোন মিলি যখন ঘটনার পরপর বাসায় যায় তখন আমানের মা তাকে এ কথা বলেন বলে জানান বুলবুল। যে কারণে সন্তানদের ময়নাতদন্তেও অনীহা প্রকাশে করেন জেসমিন।
অর্থ-সম্পত্তি সম্পর্কে আমানের স্বজনরা জানিয়েছেন, আমান-জেসমিনের পরিবার স্বচ্ছল ছিল। কিন্তু জামালপুর সদরে এবং গ্রামের বাড়িতে তেমন কোনো সম্পত্তি নেই তার। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই কারও। তবে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, দুই সন্তান নুসরাত আমান অরণি ও আলভী আমান হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার মাহফুজা মালেক জেসমিনের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই সাংবাদিক ও স্বজনরা জামালপুরের ইকবালপুরের জেসমিনদের বাড়িতে ভিড় করেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই কথা বলতে চাননি পরিবারের সদস্যরা।
প্রসঙ্গত, গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি রামপুরা বনশ্রীর বি ব্লকের চার নম্বর সড়কের নয় নম্বর বাড়িতে হত্যা করা হয় অরণী ও আলভীকে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রথমে রেস্টুরেন্টের খাবারের বিষক্রিয়ার কারণের কথা বলা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। তবে ময়নাতদন্ত শেষে ১লা মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস জানান, তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পরে জামালপুর থেকে দুই শিশুর পিতা আমানুল্লাহ, মা জেসমিন ও খালা আফরোজা মিলাকে আটক করে র‌্যাব। ৩রা মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব জানায় জেসমনি নিজেই তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেছে। নিহত আলভী আমান বনশ্রীর ওই বাসার পাশের হলি ক্রিসেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের নার্সারির ছাত্র। স্কুলের প্রভাতী (গোলাপ) শাখায় পড়তো সে। আলভীর বোন নুসরাত আমান ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

তিন বছরেও আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত প্রতিবেদন

নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের
তিন বছর আজ। হত্যাকারীরা চিহ্নিতঃ বিচার অনিশ্চিত
আজ ৬ই মার্চ। ২০১৩ সালের এই দিন বিকালে বাসা থেকে বেরিয়ে দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় নারায়ণগঞ্জের মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুদিন পর ৮ই মার্চ বাসার ৫০০ গজ দূরে শীতলক্ষ্যা নদীর চারারগোপ খালের তীর থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ এই ৩ বছরেও ত্বকী হত্যার বিচার শুরু হওয়া তো দূরের কথা, চার্জশিটও (অভিযোগপত্র) দেয়া হয়নি। কবে নাগাদ সেই চার্জশিট দেয়া হবে তা অনিশ্চিত। উচ্চ আদালতের আদেশে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন  (র‌্যাব) ত্বকী হত্যা মামলাটি তদন্ত করলেও তদন্ত প্রতিবেদন এ পর্যন্ত আলো মুখ না দেখায় হতাশ নারায়ণগঞ্জবাসী। সেই সঙ্গে হতাশা প্রকাশ করেছেন জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
তবে গতকাল শনিবার দুপুরে র‌্যাব-১১-এর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে অবস্থিত প্রধান কার্যালয়ে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান সংবাদকর্মীদের ডেকে বলেন, ত্বকী হত্যার তদন্ত চলমান। মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমরা এর খুঁটিনাটি সবকিছু বিশ্লেষণ করছি। চেষ্টা করছি যাতে সুন্দর, গ্রহণযোগ্য একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো। তবে তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হননি। সেই সঙ্গে কবে নাগাদ ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া সম্ভব হবে সেই বিষয়েও তিনি সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, ত্বকী খুন হবার আগেও দেশে এত শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেনি। ত্বকী হত্যার পর যদি বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে হতো, তাহলেও হয়তো দেশের এত শিশুকে খুনের শিকার হতে হতো না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশকে আজ কোথায় টেনে নিয়ে গেছে? এখন যে কোনো তুচ্ছ ঘটনার বলি হচ্ছে অবুঝ শিশুরা। রফিউর রাব্বি প্রশ্ন রেখে বলেন, খুনিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে রাষ্ট্রের এত ভয় কেন? খুনিরা কী এতটাই শক্তিশালী।
র‌্যাবের তদন্তে উঠে আসে ত্বকী হত্যায় প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানসহ ১১ জন অংশ নিয়েছিল। তবে হত্যায় শামীম ওসমান বা ছেলে অয়ন ওসমানের জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ পায়নি র‌্যাব। হত্যায় সম্পৃক্তদের মধ্যে ৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছিল। ওই ৩ জনের মধ্যে ভ্রমর জামিন নিয়ে এখন ফেরারি। তায়েব উদ্দিন আহমেদ জ্যাকি জামিন পেলেও নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেন। গত বছরের শেষদিকে আজমেরী ওসমানের শহরের খানপুরের আস্তানায় পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালালেও সেখানে উপস্থিত আজমেরী ওসমানকে পুলিশ বা র‌্যাব গ্রেপ্তার করেনি। ফলে শহরে এখনও প্রকাশ্যেই অবস্থান করছে আজমেরী ওসমান।
জেলার সুশীল সমাজের দাবি
জেলা সিপিবির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম বলেন, র‌্যাবের তদন্তে ত্বকী হত্যাকারীরা চিহ্নিত হয়েছে। চার্জশিটও প্রায় প্রস্তুত ছিল বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু কেন তা আদালতে জমা দেয়া হয়নি সে উত্তর এখনো মেলেনি। আমরা জানি হত্যার রহস্য উদঘাটনের কারণে চার্জশিট দিতে দেরি হয়। কিন্তু ত্বকীর বিষয়ে হয়েছে তার উল্টো।
জেলা বাসদের সমন্বয়ক নিখিল দাস বলেন, সরকার যদি চায় তাহলে যে কোনো ঘটনার বিচার কাজ দ্রুত হয়। যার প্রমাণ রাজন ও রাবিক হত্যার ঘটনা। কিন্তু ত্বকীর ক্ষেত্রে সরকারের কোনো আন্তরিকতা নেই। কারণ, ত্বকী হত্যায় সরকার সমর্থিতরা জড়িত। এ কারণেই ত্বকী হত্যার বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি জিয়াউল ইসলাম কাজল বলেন, গত ৩ বছরেও আমরা ত্বকী হত্যার কোনো বিচার পাইনি। দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাই। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন দেশের সব শিশু হত্যার বিচার হবে। তাহলে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না কেন?
জেলা ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, গত ৩ বছরে ত্বকী হত্যার বিচার না হওয়ায় খুনি ও সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে দেশে আরও অনেক শিশু হত্যার শিকার হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, আমরা ত্বকীসহ সারাদেশে সব শিশু হত্যার বিচার দাবি করি। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেদিনও বলেছেন তিনি শিশু হত্যাকারীদের ঘৃণা করেন। তাই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে আমাদের প্রত্যাশা, তিনি ত্বকীসহ দেশের সব শিশু হত্যার বিচার করবেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ই মার্চ অপহৃত হয় ত্বকী। ৮ই মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর নিহতের বাবা রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন, যেখানে অজ্ঞাতজনদের আসামি করা হয়। পরে ১৮ই মার্চ রফিউর রাব্বি পুলিশকে অবগতিপত্রে শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ছাত্রলীগের জেলা কমিটির সহ-সভাপতি রাজীব দাস, জেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক জহিরুল ইসলাম পারভেজসহ ৭ জনকে অভিযুক্ত করেন।
উচ্চ আদালতের আদেশে পরবর্তীতে মামলাটির তদন্ত শুরু করেন র‌্যাব।  তদন্ত করতে গিয়ে র‌্যাব এ পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ত্বকী হত্যার জন্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমীর ওসমানের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। পরে ভ্রমর জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যায়। বর্তমানে সে পলাতক।