Monday, June 8, 2015

মোদির সফর- বাংলাদেশের সঙ্গে সদ্ভাব কেন জরুরি? by আলী রীয়াজ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি বাংলাদেশে তাঁর দুই দিনের সফরের প্রথম দিনের কার্যক্রম শেষ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা, নৈশভোজ এবং বিভিন্ন চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। আজ রোববার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি যখন ফিরতি যাত্রা করবেন, তখন গণমাধ্যমের প্রধান বিষয় হবে এ সফর কতটা সফল, দুই পক্ষ এ সফর থেকে কী অর্জন করেছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ হবে কি না, এ বিষয়ে বিস্তর অনুমান এবং প্রচারণার পরে তাঁদের আজ রোববার সাক্ষাতের কথা; ফলে সারা দিন এবং সম্ভবত তার পরেও এ নিয়ে আলোচনা চলবে। গত কয়েক দিনে যেমন বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা না করার অবিবেচক সিদ্ধান্তের পরিণতি বিএনপির জন্য ভালো হয়নি, তেমনি উল্লিখিত হবে এ সাক্ষাতের জন্য বিএনপি এবং তার নেত্রীকে তাঁর আগের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কতটা সরে আসতে হয়েছে। আজ মোদি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে যে বক্তব্য দেবেন তার বিষয় ও সুর দুই-ই ভালো করে লক্ষ করার বিষয়।
গত কয়েক দিনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দিকে তাকিয়ে এ কথা বললে অতিরঞ্জন হবে না যে সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশেই, বিশেষত বাংলাদেশে, উৎসাহ ছিল অভূতপূর্ব। সম্ভবত অতীতে ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে জামায়াতে ইসলামী থেকে সিপিবি পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দল এতটা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়নি। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ঢাকা সফর করেন, সে সময় যতটা আগ্রহ ও উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়েছিল, এবার উৎসাহের মাত্রা তার চেয়ে বেশি বলেই মনে হয়েছে। এই সফরের সাফল্য বিবেচনা করতে হলে কী কারণে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, সেটা মনে রাখা দরকার।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে এটা ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বড় ধরনের উন্নতি ঘটবে। ভারতের তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে দলগতভাবে এবং আদর্শিক অবস্থান থেকেও আওয়ামী লীগের যোগাযোগ থাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে অবশ্যম্ভাবী বলেই মনে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর তাঁর জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে ঢাকা আসবেন, সেটা ছিল নিশ্চিত বিষয়, সেটা না হলেই বরং বিস্ময়ের কারণ তৈরি হতো।
বিপরীতক্রমে ২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতার হাতবদলের পর অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল, আপাতদৃষ্টে আদর্শিকভাবে বিপরীতমুখী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে সম্পর্ক আগের মতো উষ্ণ থাকবে কি না। বাংলাদেশে সরকারবিরোধীদের একাংশ, প্রধানত বিএনপির নেতারা তাঁদের ‘প্রত্যাশা’কে ‘সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ’ বলে মনে করে আনন্দিত হয়েছিলেন; তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ছিল যে আওয়ামী লীগ ভারতের কাছ থেকে একধরনের চাপের মুখে পড়বে। ভারত তার জাতীয় স্বার্থেই আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়েছে, দলীয় বিবেচনায় নয়, সেটা তাঁরা বুঝতে সক্ষম হননি।
এতত্সত্ত্বেও অনেকে ভেবেছিলেন যে ২০১৪ সালের বাংলাদেশের নির্বাচনে কংগ্রেস যতটা আগ বাড়িয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে, বিজেপি সম্ভবত তাতে রাশ টেনে ধরবে। ফলে অনেকেই গত বছরে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক অনুসরণ করেছেন। মোদির সফরের আগে ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা স্থলসীমানা চুক্তিটি পার্লামেন্টে পাস করানোর পর ধরে নেওয়া হচ্ছে যে বিজেপি সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিতে আগ্রহী এবং তার লক্ষ্য ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ানো। এটা কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়, অন্য প্রতিবেশীদের বিষয়েও এ ধরনের ইঙ্গিতই মোদি সরকার দিয়েছে। এ বিবেচনায় মনমোহন সিংয়ের সরকারের সঙ্গে মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটা পার্থক্য আছে। গত কয়েক মাসে দক্ষিণ
এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদি সরকারের উদ্যোগ এবং পদক্ষেপের মধ্যেই এটা স্পষ্ট। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারতের আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি দুই বিবেচনাকে মাথায় রেখে অনেকে মোদির এ সফরকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কেবল এ দুই বিবেচনার আলোকে বিচার করাই যথেষ্ট বলে আমার মনে হয় না। ভারত তার জাতীয় স্বার্থ—যার উপাদান হচ্ছে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক—সেগুলো বিবেচনায় রেখেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দেখছে। ভারতের এ চিন্তাকাঠামোয় তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে, বিশেষত বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক খুবই জরুরি। ভারতের বিবেচনা কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়, তার একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিবেচনা রয়েছে। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ‘লুক ইস্ট’ নীতিকে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিতে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ভারত গত এক বছরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে। আর তার পেছনে কাজ করছে চীনের সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভারত চীনকেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে এবং সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে সে দক্ষিণ এশিয়া নয়, দেখছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাকে। সেখানে তারা বাণিজ্যিক এবং নিরাপত্তা দুভাবেই চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জোরদার করছে। উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য বাড়ছে, গত বছরে তার মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ ছিল ওই অঞ্চলে, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের চেয়ে বেশি। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গত বছরে ছিল ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মতো, তার পরিমাণ এখন আরও বাড়ছে।
বাণিজ্যিকভাবেই কেবল নয়, সামরিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে ভারত এ অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। প্রযুক্তিগতভাবে এ অঞ্চলের সবচেয়ে অগ্রসর নৌ-শক্তি জাপানের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির চেষ্টার লক্ষ্য ভারত মহাসাগরে তার প্রভাবকে জোরদার করা। চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ভারত ভিয়েতনামকে কেবল ১০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণই দেয়নি, একই সঙ্গে নৌযানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার প্রস্তাবও দিয়েছে। ভারত দক্ষিণ চীন উপসাগরে চলাচলের ভিয়েতনামের অধিকারের প্রতি সমর্থন দিয়েছে, যা চীনের মোটেই পছন্দের বিষয় নয়। মিয়ানমারে ভারতের বিনিয়োগ এবং তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টার উদ্দেশ্যও একই। যুক্তরাষ্ট্র যদিও ভারত মহাসাগরে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে, কিন্তু চীনের প্রভাবকে মোকাবিলায় স্থানীয় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারতের কোনো বিকল্প নেই বলেই সে ধরে নিয়েছে। ভারত সেই সুযোগকে যতটা সম্ভব তার স্বার্থে ব্যবহার করছে।
ভারতের এই আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই যুক্ত আছে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক, কেননা ভারত অবশ্যই আশা করে যে চীনের প্রভাব বিস্তার মোকাবিলায় বাংলাদেশ তার সঙ্গে থাকবে; অন্ততপক্ষে চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না। একই সঙ্গে ভারত এটাও আশা করে যে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা চালাবে না। গত এক দশকে চীন যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ায় তার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে এবং তার প্রভাবের মাত্রা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে, সেহেতু ভারতের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে সেই প্রভাব বলয়ের বাইরে রাখা। শুধু তা-ই নয়, ভারত অবশ্যই আশা করে যে তার নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ যেন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে না ওঠে। বাংলাদেশ ভারতের নিরাপত্তার জন্য কোনো রকমভাবে চ্যালেঞ্জ হলে ভারতকে কেবল এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে এবং তার সম্পদ ব্যবহার করতে হবে তা নয়, ভৌগোলিক কারণে চীন তা থেকে সুবিধা পাবে। এসব বিবেচনায়ই ভারত মনে করে, বাংলাদেশে এমন সরকার থাকা দরকার, যার সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল সৌহার্দ্যপূর্ণই নয়, নির্ভরযোগ্য বলেও বিবেচিত হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির এ বিবেচনাই এখন পর্যন্ত ভারতের বাংলাদেশ নীতির নিয়ামক বলে মনে হয়। সেই দিক থেকে আওয়ামী লীগের প্রতি বিজেপি সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে দুটো প্রশ্ন উঠতে পারে; প্রথমত, সাম্প্রতিক কালে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বিএনপির ভারতবিষয়ক নীতিতে পরিবর্তন ভারতের নীতিনির্ধারকদের ওপরে কোনো রকম প্রভাব ফেলবে কি না; দ্বিতীয়ত, স্বল্প মেয়াদে এ নীতি ভারতের জন্য সুফলদায়ক হলেও বাংলাদেশ যদি অব্যাহতভাবে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তবে সেটা মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি ভারতের জন্য ইতিবাচক কি না।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

তিস্তা নিয়ে আশার আলো দেখছে ঢাকা

ঢাকা থেকে শনিবার রাতেই কলকাতায় ফিরে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফিরলেন রবিবার সন্ধ্যায়। কিন্তু যুগলের ‘সফল সফর’ শেষে আশা জিইয়ে রইল বাংলাদেশের রাজধানী শহরে। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেল সেই ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’!
মোদী বলেছিলেন, ‘‘মমতাজি সফরসঙ্গী হওয়ায় আমি খুশি!’’ ঢাকা চাইছে সংঘাত পর্ব কাটিয়ে নয়াদিল্লি-কলকাতার এই খুশি খুশি ভাবটাই টিকে থাকুক। এর ফলেই স্থল সীমান্ত চুক্তির জট ছাড়ানো গিয়েছে। তার পর এ বার সূত্র মিলুক তিস্তার জল বণ্টনের!
অতীতে মনমোহন সিংহের সরকারও তিস্তার জট ছাড়াতে সক্রিয় হয়েছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে জল বণ্টন সূত্র এক প্রকার চূড়ান্ত করে তার পর মমতার ছাড়পত্র চেয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কেন্দ্রের এই চাপিয়ে দেওয়ার নীতি মানেননি মমতা। কলকাতার সেই মেজাজ বুঝেই এ বার কৌশল সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সমাধান সূত্র খুঁজে বার করার দায়িত্ব তিনি দিয়েছেন খোদ মমতাকেই। গত কাল আগে নিজেদের মধ্যে একান্ত আলোচনায় বোঝাপড়া সেরে নিয়ে তার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একত্রে বৈঠকে বসেন মোদী ও মমতা। সেই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া আঞ্চলিক পরিকাঠামো উন্নয়নের কিছু প্রস্তাব ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন প্রধানমন্ত্রী। নেপাল, ভুটানের মতো ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং সিকিম-সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উন্নয়নের কাজ একযোগে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মমতার প্রস্তাব বাস্তববাদী বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের কর্তারাও। এ হেন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জাতীয়তাবাদী, আন্তরিক এবং সমস্যা সমাধানের সূত্র দিতে সচেষ্ট।’’ প্রসঙ্গত, ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর ঢাকা সফরে তিস্তা সমস্যার সমাধান সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী নিজেও সেই বার্তাই দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন হল, সমাধান সূত্র তা হলে কী হতে পারে?
সাউথ ব্লকের কর্তারা জানাচ্ছেন, ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীর অবশ্যই কথা হবে। কিন্তু তারই পাশাপাশি অফিসার পর্যায়ে একটা মেকানিজমও তৈরি করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারও আবার দুটি স্তর থাকবে। বিদেশসচিব এস জয়শঙ্কর ও রাজ্যের মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্র সমাধান সূত্র খুঁজতে আলোচনা চালাবেন। আবার আর একটি স্তরে আলোচনা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব ভাস্কর খুলবে এবং মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের সচিব গৌতম সান্যাল। এর মধ্যেই এই দুই স্তরে আলোচনা শুরুও হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্রকে তিস্তা চুক্তির খসড়া সম্পর্কে রাজ্য সরকারের আপত্তিগুলি এক-দুই করে জানিয়েছেন মুখ্যসচিব। এমনকী জল প্রবাহের যে সব পরিসংখ্যান খসড়ায় দেওয়া হয়েছে, তাতেও কিছু ভুলভ্রান্তি রয়েছে বলে দাবি রাজ্য সরকারের। তিস্তায় জলের স্রোত ও পরিমাণ সম্পর্কে কল্যাণ রুদ্র কমিটি মমতার কাছে আগেই রিপোর্ট পেশ করেছে। সেটি প্রকাশ করা না-হলেও তার মোদ্দা বক্তব্য কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে। তবে সূত্রের মতে, ওই রিপোর্টেও চুক্তির পক্ষেই মত দেওয়া হয়েছে। তবে তিস্তা চুক্তি কী ভাবে উত্তরবঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তার কিছু সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে রিপোর্টে। সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রী উমা ভারতীর সঙ্গেও আবার পশ্চিমবঙ্গের সেচমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েক প্রস্ত আলোচনা হয়েছে।
রাজ্যে সরকারের বক্তব্য, বাস্তবে শুখা মরসুমে তিস্তায় জলই থাকে না। বর্ষায় তিস্তা যখন জলে ভাসে তখন এমনিতেই ওপর থেকে নীচে জলের স্রোত যায়। বাংলাদেশও তখন পর্যাপ্ত জল পায়। সুতরাং মূল সমস্যা হচ্ছে, শুখা মরসুমে জল ভাগাভাগি নিয়ে। রাজ্যের প্রশ্ন— শুখা মরসুমে জল না-থাকলে বা নামমাত্র থাকলে তার ভাগ বাংলাদেশকে দেওয়া যাবে কী ভাবে? তার ওপর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সিকিম অন্তত আটটি বাঁধে বেঁধেছে তিস্তাকে। যদিও সিকিম সরকারের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সে জন্য জলের স্রোত কমেনি। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই দাবি মানতে নারাজ।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার কিছু বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রকে। এক, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিস্তার ভূগর্ভস্থ জল ওপরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাতে শুখা মরসুমেও অনেক জল পাওয়া যাবে। মুখ্যসচিব এই প্রস্তাবের ব্যাপারে কেন্দ্রকে সবিস্তার জানিয়েছেন। দুই, গুজরাতে জলের অভাব থাকায় সেখানে নদী নালার মধ্যে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে জলাধার নির্মাণ করে জল সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছোট ছোট নদী নালা থেকে জল সরু হয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে আসে।  জলাধার নির্মাণ করে ধরে রাখলে তা ব্যবহার করা যায়, অপচয়ও হয় না। এই প্রকল্পে খরচও কম। এই সূত্র তিস্তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। তিন, তিস্তা চুক্তি সম্পাদন হলে বিশ্বব্যাঙ্কও অর্থ সাহায্য করতে প্রস্তুত। ওই টাকায় তিস্তার সংস্কার ও নাব্যতা বাড়ানো যেতে পারে।
বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে বলা হচ্ছে, এখন যে খসড়া চুক্তি রয়েছে তার মেয়াদ দশ বছর ধার্য করা হয়েছিল। অর্থাৎ এটাও চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। খসড়ায় বলা হয়েছে, তিস্তার জল অর্ধেক অনুপাতে দুই দেশের মধ্যে ভাগ হবে। দুই দেশ যে জল পাবে, তার কিছুটা করে অংশ আবার তিস্তাকেই নাব্য রাখতে ‘চার্জিং’-এর কাজে ব্যবহার করা হবে। তবে রাজ্য সরকারের বক্তব্য, গঙ্গায় জল পরিমাপ করা সহজ ছিল। তিস্তার ক্ষেত্রে তা নয়। তাই নানা জনের নানা মত রয়েছে। সেই কারণেই সবিস্তার আলোচনা করে সমাধান সূত্র বার করাটা প্রয়োজন। মোদ্দা কথা হল, পরিকাঠামো উন্নয়ন করে যদি পশ্চিমবঙ্গে তিস্তার অংশে জল ও তার স্রোত কেন্দ্র যথাযথ রাখতে পারে, তা হলে মমতা সরকারের আপত্তি নেই। রাজ্যের বক্তব্য— এই কথাটা স্থল সীমান্ত চুক্তির ক্ষেত্রেও মমতা বলেছিলেন। ওই চুক্তি নিয়ে রাজ্যের আপত্তি ছিল না। রাজ্যের বক্তব্য ছিল, চুক্তির জন্য কেন্দ্র রাজ্যকে  কী পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেবে, সেটি সুনিশ্চিত হওয়া চাই। রাজ্যের সেই দাবি মেনে নিয়েই স্থল সীমান্ত চুক্তির জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন বাবদ রাজ্যকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা দিতে সম্মত হয়েছে কেন্দ্র। রাজ্যের মতে, এ ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের মনোভাব একই থাকলে তিস্তার জল দ্রুত বাংলাদেশের দিকে গড়াতেই পারে।
মোদীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শীঘ্র ভারত সফরে আসবেন। তাঁর সেই সফরে তিস্তা নিয়ে আলোচনা হবে। হাসিনার সফরের আগে ঢাকার তরফে এই আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত উপদেষ্টাকে নিয়োগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিস্তা নিয়ে প্রত্যাশার পারাও চড়ছে পদ্মাপারে। বাংলাদেশের এক কূটনীতিকের কথায়— মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় কলকাতায় ফেরার সময় তাঁর সঙ্গে বাক্স ভরে প্রচুর মিষ্টি পাঠিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিস্তা প্রশ্নে নয়াদিল্লি ও কলকাতা থেকে পাল্টা মিঠে খবরের অপেক্ষাতেই রইলেন বাংলাদেশের মানুষ।
- আনন্দবাজার

অদ্ভুত এক আইনের শাসন! by কামাল আহমেদ

আমাদের সদা পরিবর্তনশীল এবং নাটকীয়তায় ভরা রাজনৈতিক ডামাডোলের চাপে বাইরের দুনিয়ার অনেক বড় বড় ঘটনা সংবাদপত্রের পাতা এবং টেলিভিশনের পর্দায় প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যায়। বেশি দূরের নয়, ভারত মহাসাগরেরই এ রকম একটি দেশের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার অনেক কিছুর সঙ্গেই আমাদের অদ্ভুত রকমের মিল। আর ওই সাদৃশ্যগুলোর জন্যই ভবিষ্যতের ঝুঁকিগুলোও প্রায় এক। ওই দ্বীপরাষ্ট্রে প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর রাজনীতি প্রতিপক্ষকে যেভাবে কোণঠাসা করে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলার চেষ্টায় রত, ঠিক সেভাবেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থীর শেষ ভরসাস্থল আদালতকে তা কীভাবে ধ্বংসের প্রান্তসীমায় নিয়ে গেছে তা অবিশ্বাস্য। এবং বিস্ময়কর হলেও সত্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ওই রাষ্ট্রটির এসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধসে পড়ার প্রক্রিয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জানালেও বাস্তবে তারা নিরুপায় দর্শক মাত্র। প্রায় ৩০ বছর দেশটি একজন স্বৈরশাসকের শাসনে পরিচালিত হলেও তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি খুব একটা খারাপ ছিল না। কিন্তু গণতান্ত্রিক অধিকারের আকাঙ্ক্ষার স্ফুরণে ২০০৮ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় একটি অবাধ নির্বাচন, যার গ্রহণযোগ্যতা দেশটির ভেতরে এবং বাইরে সর্বত্র একেবারে প্রশ্নাতীত ছিল। একেবারে নতুন প্রজন্মের এক নেতার নেতৃত্বে গঠিত সরকার তার গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নিয়ে চার বছর খুব ভালোই দেশ চালায়। কিন্তু পরাস্ত স্বৈরশাসকের অনুসারী ও সহযোগীদের পুনরুজ্জীবন ২০১২ সালে দেশটিতে সৃষ্টি করে চরম অস্থিরতার। ওই অস্থিরতার সূত্রপাত বিচার বিভাগের সংস্কারের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। সুপ্রিম কোর্ট, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সাবেক স্বৈরশাসকের রাজনৈতিক সহযোগীদের যোগসাজশে নির্বাচিত সরকার উৎখাত—সেই সরকারপ্রধানকে বিচারের মুখোমুখি করা, ভবিষ্যতে সব নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার উদ্যোগ—এসবই ছিল ছকবঁাধা প্রতিশোধের রাজনীতি।
ঘটনাক্রম যদি এখানেই থামত, তা-ও হয়তো দেশটিকে আবার গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন স্বৈরশাসকের যেসব উত্তরসূরি পুনর্জন্ম লাভ করেছেন, তঁারা নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করতে চান। সুপ্রিম কোর্টে কোনো ধরনের স্বাধীনচেতা বিচারকের অবস্থান যাতে আর না থাকে, তা নিশ্চিত করার মানসে তঁারা আইন সংশোধন করে বিচারকের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতিসহ দুজনকে বাদ দিয়ে আদালত পুনর্গঠনের কাজটি করে ফেলেছেন। দেশটির বিচার বিভাগে এখন যা চলছে, তাকে অনেকেই বেছে বেছে ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা বা ‘সিলেক্টিভ ইউজ অব ক্রিমিনাল জাস্টিস’ বলে অভিহিত করেছেন (সূত্র: ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য, চার্লস ট্যানকের নিবন্ধ-প্যারাডাইজ ইন পেরিল: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২৫ মে ২০১৫)।
পাশাপাশি সেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিককে এক ফৌজদারি মামলায় তড়িঘড়ি বিচার করে ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। যে মামলায় তাঁকে দণ্ডিত করা হয়েছে, তাঁর বিচার সম্পর্কে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল হোসেইন গত ১৩ মার্চ এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে বিচারটি একদিকে যেমন ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হয়নি, তেমনি তা দেশটির নিজস্ব সংবিধান ও আইনও অনুসরণ করেনি। ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করার পর মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে ১১ দিনে শুনানি করে তঁাকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড দেওয়া হয়। তঁাকে আপিলের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতেও অবিশ্বাস্য তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট। কেননা, আপিলে সবাই যেখানে ৯০ দিন সময় পান, তঁাকে দেওয়া হয়েছে ১০ দিন (সূত্র: জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতি)। ওই রাজনীতিকের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের আরও কয়েকজনকে একই ধরনের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে এবং সর্বসম্প্রতি অন্য একটি বিরোধী দলের নেতার বিরুদ্ধেও জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য, চার্লস ট্যানক যে দ্বীপমালার রাষ্ট্রকে স্বর্গ বলে অভিহিত করেছেন, সেই দেশটি আমাদেরই প্রতিবেশী—সার্কের অন্যতম সদস্য মালদ্বীপ। ৩০ বছরের স্বৈরশাসক হলেন মামুন আবদুল গাইয়ুম, প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং বর্তমানের শাসক গাইয়ুম পরিবারের প্রতিনিধি, তাঁর সৎভাই আবদুল্লাহ ইয়ামিন। নাশিদের ক্ষমতাচ্যুতির পর তঁাকে জেলে পোরা এবং তঁার দলের ওপর যে দমনমূলক কার্যক্রম চলেছিল, তার পটভূমিতে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনে প্রাথমিক বাধা পেরিয়ে নাশিদ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। কিন্তু প্রথম দফায় ২০ শতাংশ ভোট বেশি পেলেও তা বাতিল করে যে দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়, তাতে নানা অনিয়মের মধ্যে তিনি হেরে যান এবং বিস্ময়কর বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হন ইয়ামিন।
মালদ্বীপের রাজনীতিতে সংকট যতটা, তার সূত্রপাত যে আদালতকে কেন্দ্র করে, এই নিবন্ধের মূল বিষয় সেই আদালত। মালদ্বীপে বিচারকদের নিয়োগ এবং শৃঙ্খলার বিষয়গুলো পরিচালনা ও তদারকের জন্য গণতান্ত্রিক শাসনামলে একটি আইন প্রণীত হয়, যা জুডিকেচার অ্যাক্ট নামে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন নির্বাচিত হওয়ার এক বছর পর গত ১১ ডিসেম্বর দেশটির পার্লামেন্ট (পিপলস মজলিশ) জুডিকেচার অ্যাক্টের একটি সংশোধনী পাস করে। আর ঠিক তার তিন দিন পর ১৪ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সংখ্যা সাতজন থেকে কমিয়ে পঁাচজনে নামানো, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আহমেদ ফয়েজ এবং আরেকজন বিচারপতি মুতাসিম আদনানকে অপসারণের সিদ্ধান্ত ওই পিপলস মজলিশে অনুমোদিত হয়।
বিচার বিভাগের ওপর এই অভাবিত এবং বিরল হস্তক্ষেপের ঘটনায় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়। বিচারক এবং আইনজীবীদের স্বাধীনতার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি, স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, গ্যাব্রিয়েলা ক্নাউল ২২ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় এই দুজন বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়েছে, তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি এবং তাতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। কোন কারণে তঁাদের অপসারণ করা হয়েছে, তা প্রকাশ না করার বিষয়টি বিশেষভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে এই সিদ্ধান্ত দেশটির বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে এবং সর্বস্তরে ভীতিকর প্রভাব ফেলবে। বিবৃতিতে মিস ক্নাউল বলেন যে মালদ্বীপের সংবিধান অনুযায়ী জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন তখনই কোনো বিচারককে অপসারণের সুপারিশ করতে পারে, যখন তিনি চরম অযোগ্যতা অথবা অসদাচরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী অক্ষমতা অথবা ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হওয়ার বিষয়ে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ছাড়া কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় না বলে উল্লেখ করে তিনি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের প্রতি ওই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার আহ্বান জানান।
মালদ্বীপের সর্বোচ্চ আদালতের ওপর রাজনীতির এই খড়্গ চেপে বসার পেছনের ইতিহাসটিও বেশ গুরুত্ববহ। ৩০ বছরের স্বৈরশাসনকালে গাইয়ুম পরিবার এবং তঁাদের আশীর্বাদপুষ্টরাই মূলত বিচার বিভাগে প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে মোহাম্মদ নাশিদের উত্থান-পরবর্তী গণতন্ত্রায়ণের কালে তঁাদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি থেকেই গেছে। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে ফৌজদারি আদালতের একজন প্রভাবশালী বিচারক আবদুল্লা মোহাম্মদকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়ার পর যে হাঙ্গামা শুরু হয়, তাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট নাশিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এখন সেই বিচারককে জোর করে অপহরণ এবং আটকের আদেশ দেওয়ার অপরাধেই নাশিদের কারাদণ্ড হলো। এই অভিযোগে একবার তিনি অব্যাহতি পাওয়ার পর তঁাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিচার করে এই সাজা দেওয়া হয় (মালদিভস এক্স লিডার মোহাম্মদ নাশিদ জেইলড ফর থার্টিন ইয়ারস, বিবিসি, ১৩ মার্চ, ২০১৫)।
তবে মালদ্বীপে বিচার বিভাগকে ঘিরে নাটকীয়তার সবচেয়ে করুণ অধ্যায়টি হচ্ছে অপসারিত প্রধান বিচারপতি আহমেদ ফয়েজকে ঘিরেই। বিচারপতি ফয়েজই প্রেসিডেন্ট নাশিদকে উৎখাতের বিষয়টিকে বৈধ বলে রায় দিয়েছিলেন। আবার নির্বাচনের যে দফায় নাশিদ এগিয়ে ছিলেন, সেই নির্বাচনকে বাতিলের কাজটিও তিনিই করেছিলেন। নির্বাচন কমিশনের অন্তত চারজনকে তিনি কথিত আদালতের কর্তৃত্ব উপেক্ষার দায়ে জেলে পাঠিয়েছেন। এমনকি তিনি দেশটির আরেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার কমিশনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার বিচার শুরু করেছিলেন। কারণ, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে পেশ করা মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা ছিল। দুর্ভাগ্য, বিচারপতি ফয়েজের যে তিনি অপরাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর তঁার প্রয়োজন ফুরিয়েছে এবং কোনো কারণ না দেখিয়েই তঁাকে অপসারণ করা হয়েছে। তঁার সঙ্গে অন্য যে বিচারপতি অপসারিত হয়েছেন, সেই বিচারপতি মুহতাসিম আদনানকে অবশ্য আদালতের একমাত্র স্বাধীন বিবেক বলে মনে করা হতো (সূত্র: মিউটিনি অব দ্য স্টেট: মালদিভস গেটস অ্যাওয়ে উইথ অ্যানাদার ক্যু দেতাঁ, আইসাথ ভেলেজিনির ব্লগ)। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বিচার বিভাগ যখন ক্ষমতাসীন নেতা প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের হাতের মুঠোয়, তখন দেশের ভেতরের ভিন্নমত কিংবা বিদেশিদের উদ্বেগ-সমালোচনা এগুলোর কোনো কিছুই কি আর কাজে আসে? এ এক অদ্ভুত আইনের শাসন—নবজীবনপ্রাপ্ত স্বৈরশাসন!
বাড়তি হিসেবে ইয়ামিন সরকার কাকতালীয়ভাবে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি অপ্রত্যাশিত সুবিধাও পেয়ে গেছে। চীন এবং ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের খেলায় ভারত ক্ষমতাসীনদের রুষ্ট করার ঝুঁকি নিতে কোনোভাবেই রাজি নয়, কেননা চীন মালদ্বীপের একটি দ্বীপে তার নৌঘাঁটি বানানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা রয়েছে।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

মোদি বলতেই পারেন জয়ী তিনি আজ

সুখ চাহি নাই মহারাজ। জয়, জয় চেয়েছিনু। জয়ী আমি আজ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতা নরেন্দ্র দামাদোর দাস মোদি পড়েছেন কি-না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, তিনিও জয় চান এবং তার নিজের জীবনটা জয়েরই ইতিহাস। দুই দিনের এক ব্যস্ত সফর শেষে ফিরে গেলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যে সফরকে সব মহল থেকে বর্ণনা করা হয়েছে ঐতিহাসিক হিসেবে। অভূতপূর্ব তো বটেই। শনিবার সকাল ১০টার কিছু পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পরপরই আসলে তিনি তৈরি করেন এক নতুন ইতিহাস। এই প্রথম কোন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এলেন কোন ধরনের বিরোধিতা ছাড়াই। সব রাজনৈতিক দলই স্বাগত জানায় তাকে। আর এই সুর ধরে রাখেন মোদি নিজেও। তিনি মুগ্ধতা তৈরি করতে ভালবাসেন। একে একে ছুটে গেলেন জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার্তা দিলেন বাংলা ভাষায়। বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম আর মুক্তিসংগ্রামের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তার আবেগ প্রকাশ করলেন অকপটে। বঙ্গবন্ধুকে অভিহিত করলেন যুগশ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে। অটল বিহারী বাজপেয়ীর পক্ষে স্বাধীনতা সম্মাননা গ্রহণ করতে গিয়ে বয়ান করলেন তিনি নিজে কিভাবে সমর্থন করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে। বাজপেয়ীর কথা ধার করে তার দীপ্ত উচ্চারণ, রক্তের মধ্য দিয়ে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা কখনও ভাঙে না।
এটা সত্য, এই সফরে নরেন্দ্র মোদি উন্নয়নের কথাই বেশি বলেছেন। তবে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এ সফর কম বার্তাবহ নয়। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার দেখা হবে কি-না তা নিয়ে চাপানউতোর চলেছে বেশ। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় সব দল-মতের মানুষের প্রতিনিধিদের সঙ্গেই দেখা হলো তার। তালিকা থেকে বাদ যাননি সংসদের বিরোধী নেত্রী রওশন এরশাদ, রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু। খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্ত বৈঠকও হলো। এর আগের দিনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। যে বৈঠকে অনেকটা নাটকীয়ভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুই দেশের বৈঠকে স্বাক্ষরিত হয় ১৯টি চুক্তি সমঝোতা স্মারক। সীমান্ত চুক্তির দলিল বিনিমিয়ও হয়। ঐতিহাসিক এ ঘটনায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায় ছিটমহলগুলোতে।
এসব চুক্তি সমঝোতায় ভারত কি পেলো তা অনেকটাই স্পষ্ট। চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর ব্যবহারে ভারতকে সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ। মোদির সফর শুরুর আগে এক ভারতীয় সাংবাদিক লিখেছিলেন, নদীতে নয় দরিয়ায় ঢেউ তুলতে চান মোদি। তবে শুধু দরিয়াতে ঢেউ তুলেই ক্ষান্ত হননি তিনি। সমঝোতা আর স্মারকে একটি বিষয় পরিষ্কার, জল আর সড়ক দুই পথেই ট্রানজিট পেয়ে গেছে ভারত। তবে নদীর বেলাতেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নরেন্দ মোদি। বলেছেন, তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি সমস্যার ন্যায্য সমাধান হবে সীমান্তের মতোই। তবে এসব চুক্তিতে বাংলাদেশের লাভের বিষয়টি আস্তে আস্তে পরিষ্কার হবে বলে মনে করেন কোন কোন পর্যবেক্ষক। যদিও বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশের অবকাঠামো এখনও ট্রানজিটের জন্য প্রস্তুত নয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান যেমনটা বলেছেন, আমাদের অবকাঠামো এখনও প্রস্তুত নয়। এর জন্য আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে।
ঐতিহাসিক এই সফরে নরেন্দ্র মোদি মুগ্ধ করেছেন বাংলাদেশের মানুষকে। রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকায় তিনি সরকার ও বিরোধী উভয় শিবিরেরই মন জয় করেছেন। তার এ সফরে উল্লসিত ক্ষমতাসীন দল। অন্যদিকে, সন্তুষ্ট বিরোধী শিবিরও। বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, মোদির সঙ্গে সুন্দর আলোচনা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তার বক্তব্য শুনতে এক কাতারে উপস্থিত ছিলেন সব দলের নেতারা। সফরের শেষ বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে তার আবেগি যোগাযোগের কথা বলেছেন। যে কারণে হিসাবের চোখে নয় নরেন্দ্র মোদিকে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশের এক আবেগি বন্ধু হিসেবে। দুই দিনের ঢাকা সফর শেষে নরেন্দ্র মোদি বলতেই পারেন, জয়, জয় চেয়েছিনু। জয়ী আমি আজ।
ঢাকেশ্বরীতে পূজা দিয়ে দিন শুরু: জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীতে অর্ঘ্য ও আরতি নিবেদন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল সকালে তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজা, আরতি ও প্রার্থনা শেষে তার দিনের কর্মসূচি শুরু করেন। সেখান থেকে তিনি যান রামকৃষ্ণ মিশন মঠ ও মন্দিরে। সেখানেও অর্ঘ্য নিবেদন ও প্রার্থনা করেন তিনি। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তায় নরেন্দ্র মোদিকে বহনকারী গাড়িবহর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মূল ফটকের কাছে পৌঁছলে তাকে অভ্যর্থনা জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সভাপতি মেজর (অব.) সি আর দত্ত, সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ, সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত কুমার দেব, ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জে এল ভৌমিক, সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ সাহা মণিসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এ সময় উলুধ্বনি ও ফুল দিয়ে তাকে বরণ করা হয়। অভ্যর্থনা শেষে মোদি যান মন্দিরে। সেখানে দেবদেবীর উদ্দেশে করজোড়ে প্রণাম করে তিনি কিছু সময় প্রার্থনা করেন। পরে দেবদেবীর উদ্দেশে আরতি নিবেদন করেন তিনি। সংক্ষিপ্ত পূজাপর্ব শেষে চরণামৃত গ্রহণ করেন মোদি। মন্দিরে তাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সভাপতি মেজর (অব.) সি আর দত্ত। এরপর নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পক্ষ থেকে একটি রেপ্লিকা ও ক্রেস্ট উপহার হিসেবে তুলে দেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ ও ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ। এ সময় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পরে শিবমন্দির পরিদর্শন শেষে ঢাকেশ্বরী মন্দির ত্যাগ করেন নরেন্দ্র মোদি।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাসগুপ্ত বলেন, নরেন্দ্র মোদি বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। মন্দিরে পুজো দিয়েছেন, প্রার্থনা করেছেন। আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। এদিকে সকাল ৯টার কিছু পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসেন রামকৃষ্ণ মিশন মঠ ও মন্দিরে। সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানান, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন (বেলুড় মঠ)-এর সাধারণ সম্পাদক স্বামী সুহিতানন্দ মহারাজ, ঢাকা মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ধ্রুবেশানন্দ মহারাজসহ দেশের বিভিন্ন মিশন থেকে আসা সন্ন্যাসী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ফুল দিয়ে বরণ করার পাশাপাশি এ সময় তাদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় বৈদিক মন্ত্র। তিনটি কন্যা শিশু অতিথির কপালে চন্দনের ফোঁটা দেয়। বৈদিক মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদি চলে যান মন্দিরে। সেখানে ফুল, বেলপাতা দিয়ে পুজো করে আরতি করেন তিনি। কিছু সময় প্রার্থনাও করেন মোদি। পুজোপর্ব শেষে তিনি উপস্থিত সন্ন্যাসী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তাদের সঙ্গে হাত মেলান। অংশ নেন ফটোসেশনে। ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন এবং শতবর্ষী রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট ও গুজরাটি ভাষায় লিখিত ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দের জীবনচরিত গ্রন্থ উপহার হিসেবে দেয়া হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করে রামকৃষ্ণ মিশন ত্যাগ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ধ্রুবেশানন্দ মহারাজ বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাদের এখানে এসেছিলেন। আমরা তাকে সনাতন প্রথা অনুযায়ী বরণ করেছি। প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করে তিনি পূজা ও প্রার্থনা করেছেন।
ভারতীয় অনুদানে ছয় প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন মোদি: ওদিকে গতকাল দুপুরের আগে ঢাকার বারিধারায় ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন চান্সেরি কমপ্লেক্সে গিয়ে ছয়টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরে কমপ্লেক্স চত্বরে রোপণ করেন বকুলের চারা। প্রকল্প ছয়টির মধ্যে রয়েছে- নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী গার্লস হোস্টেল; ঢাকার মিরপুরের অন্ধ শিক্ষা ও পুনর্বাসন উন্নয়ন কেন্দ্র ভবনের চতুর্থ তলা নির্মাণ এবং টাঙ্গাইলে মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন ও বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে হিন্দি বিভাগ প্রতিষ্ঠা, সংগীত বিভাগে রেকর্ডিং স্টুডিও এবং নৃত্যকলা বিভাগে সহযোগিতা প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন মোদি। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পের উদ্বোধন শেষে সবার সঙ্গে ক্যামেরার সামনেও দাঁড়ান মোদি।
মোদি-রওশন বৈঠক: এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত করার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। গতকাল বিকালে সোনারগাঁও হোটেলে মোদির সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে তিনি নিজেই সেই তথ্য জানান। বলেন, মোদি আশ্বাস দিয়েছেন, শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ২০ মিনিট স্থায়ী বৈঠকে রওশনের সঙ্গে ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ ও তাজুল ইসলাম চৌধুরী। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়ে রওশন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়ায় আমরা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোরও ধীরে ধীরে সমাধান হবে।’ আটকে থাকা তিস্তা নিয়ে কথা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এটা নিয়েও কথা বলেছি, তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান হবে। তিনি বলেছেন, আমরা সবাই এক সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করলে সবক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে। তবে বিএনপিবিহীন গত সংসদ নির্বাচন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কোন কথা হয়নি বলে জানান বিরোধীদলীয় নেতা। বৈঠক জাতীয় পার্টির নির্বাচনী প্রতীক নাঙ্গলের একটি কোটপিন মোদিকে পরিয়ে দেন রওশন।
বাম নেতাদের সঙ্গে বৈঠক: রওশনের পর জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। ইনু সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্ত চুক্তির সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনাকে পানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে যেতে হবে। কারণ পানি হচ্ছে উন্নয়নের বিষয়। ভারত-বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূর করতে হলে পানি সমস্যার সমাধান দরকার।’ ‘তিস্তা এবং ফেনী নদীর পানি সমস্যার সমাধনে উনি (মোদি) ইতিবাচক কথা বলেছেন, অতি দ্রুত তিনি এগুলোর সমাধান করবেন বলে বলেছেন; আমরা তাকে স্বাগত জানিয়েছি।’ ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে চক্রান্তের কথা মোদী উল্লেখ করেছেন বলে তথ্যমন্ত্রী জানান।
ঢাকা ছাড়ার আগে টুইটে মোদি ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ’: ৩৬ ঘণ্টার সফর শেষে দিল্লির বিমানে পা দেয়ার আগে এক টুইট বার্তায় নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ। এই সফর আমার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকবে। এই সফর বাংলাদেশ-ভারত অংশীদারিত্ব  আরও সুদৃঢ় করবে।’  গত রাত ৮টা ৪০ মিনিটে ভারতী বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে চড়ে দিল্লির পথে রওনা হন এখানে দুদিনের রাষ্ট্রীয় সফর করে যাওয়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। তাকে বিদায় জানাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে  উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাওয়ার আগে মোদি বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি তিন ভাষাতেই বিদায়ী টুইট করেন। পরপর দুটি বাংলা টুইটে মোদি তার ঢাকা সফরের অর্জন তুলে ধরেন। বলেন, এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- আমরা অতীতে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সাফল্যের সঙ্গে কাটিয়ে উঠেছি। এটি আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করবে। মোদিকে বিদায় জানাতে  বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, শনিবার  সকাল সোয়া ১০টার দুদিনের সফরে ঢাকায় আসেন নরেন্দ্র মোদি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটা ছিল তার ২০তম দেশ সফর।

অভিবাসী–সংকট ও মিয়ানমার, দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে

গত শুক্রবার ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিয়ো মিন্ট থানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে বাংলাদেশ সরকার সমুচিত বক্তব্য পেশ করেছে। কারণ, বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সম্পর্কে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের রাখাইন-বিষয়ক মন্ত্রী উ জ আয়ে নং যে মন্তব্য করেছেন, তার পেছনে কাজ করেছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে সাগরে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে মিয়ানমারের দায় ঢাকার এবং তা বাংলাদেশের ওপর চাপানোর দুরভিসন্ধি।
গত ২৯ মে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বহুপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমার সরকার মানব পাচার সমস্যার সমাধানে সমন্বিত পন্থার পক্ষে সায় দিয়েছিল, কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের যে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে, তাদের মন্ত্রীর মন্তব্যে তারই ইঙ্গিত মেলে। এই মন্ত্রীর আগে মিয়ানমার বলেছিল, মিয়ানমারের উপকূলে উদ্ধার হওয়া সব লোক বাংলাদেশি। জেনেশুনেই তারা মিথ্যাচার করে আসছে। মিয়ানমার সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত যে, সরকারি হিসাবে ২৬ হাজার এবং বেসরকারি হিসাবে তিন থেকে চার লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশ এখনো ভরণপোষণ করে চলেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের ‘আর্থসামাজিক দুরবস্থা’র কথা না বলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের দায় স্বীকার ও তা অবিলম্বে বন্ধ করার উদ্যোগ মিয়ানমার সরকারের নেওয়া উচিত। সে জন্য রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে এবং নাগরিকদের সব অধিকার সুরক্ষার পদক্ষেপ নিতে হবে।
আর বর্তমানে সাগরে যেসব বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে, তারা কে কোন দেশের, তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে হবে, এ ব্যাপারে মিয়ানমারের সততাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গারা যেহেতু মিয়ানমারের নাগরিক নয়, তাই উদ্ধার হওয়া সব লোক বাংলাদেশি—তাদের এ ধরনের চালাকিপূর্ণ কথাবার্তার সমুচিত জবাব দিতে হবে।
দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে সহযোগিতার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জোরালো কূটনৈতিক প্রয়াস চালানোর পাশাপাশি মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর ওপরেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ছেলেবেলা থেকেই সংগঠক মোদি

জন্মের সময়েই যেন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা। ছোটবেলা থেকেই দক্ষ সংগঠক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন সব কাজে। সামান্য রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করার পর নিজের প্রতিভা, একাগ্রতা আর অধ্যবসায়ে আজ ভারতের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই মোদির নেশা ছিল যে কোনো কাজ সর্বোচ্চ দক্ষতায় সম্পন্ন করা। একজন আচারনিষ্ঠ হিন্দু হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু বিজেপির মতাদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের (আরএসএস) প্রচারক হিসেবে ১৯৭০ সালে। তবে একেবারে শুরুতে তার দায়িত্ব ছিল আহমেদাবাদে আরএসএসের সদর দফতরের মেঝে পরিষ্কার করা।
সকালে দুধ নিয়ে আসা, অফিস প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখার ‘দায়িত্ব’ পালনের পাশাপাশি সাংগঠনিক যে কোনো কাজে ছিল দারুণ আগ্রহ ও সক্ষমতা। এতেই সিনিয়রদের নজরে পড়ে যান তিনি। বিজেপিতে যোগ দেয়ার পর দলের প্রয়োজনে বিভিন্ন নাজুক ও জটিলতাপূর্ণ অঞ্চলে সিনিয়ররা মোদিকে পাঠাতেন। দেখা যেত, প্রতিটি কাজেই মোদি অসাধারণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। মিছিল সমাবেশের আয়োজনে কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় দলীয় প্রভাবহীন এলাকাতেও মোদি সবসময় প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যেতেন। এখন পর্যন্ত অধীনস্থ সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও দায়িত্বশীল হওয়ার ওপর জোর দেন। আজ সারা দুনিয়া জানে, মোদি একজন ডায়নামিক ক্রমবিকাশী নেতা। যিনি তার নিজের রাজ্য গুজরাটকে উন্নয়নের মডেল করে তুলেছেন। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন যেন দেবতা মাইদাসের স্পর্শে সেখানেই সোনা ফলেছে। তার নেয়া প্রতিটি প্রকল্পেই সাফল্যের গল্প।

সুলতান হতে যাচ্ছেন এরদোগান?

লম্বা স্লিম মধ্যবয়স্ক মানুষটি তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যারিশমাটিক নেতা। ৬১ বছর বয়সেও মাথাভর্তি চুল। গত ১২ বছর ধরে রাজনীতিতে ভিন্নধর্মী ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান। তিন বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন কোনো মুসলিম দেশে প্রেসিডেনসিয়াল সফরে গেলেন, তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম পাঁচ মিত্র দেশের অন্যতম বলে উল্লেখ করলেন। এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘একজন নেতা কীভাবে একইসঙ্গে ইসলামিক, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান।’ কিন্তু এরদোগানকে নিয়ে পশ্চিমাদের উচ্ছ্বাস ক্রমেই কমে এসেছে। জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে এরদোগান তুর্কি সাম্রাজ্যে সুলতান হয়ে বসতে পারেন এমন আশংকা করছে তারা। আজ রোববার অনুষ্ঠিতব্য দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত তুরস্কের সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলো। ২৪তম এ সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবারও ক্ষমতায় আসতে পারে এরদোগানের দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হতে পারেন একেপির আহমেদ দাভেতোগলু। পার্লামেন্টের ৫৫০ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ২৭৬ আসন।
নির্বাচনপূর্ব জরিপ বলছে ৩২৭ আসন পেতে যাচ্ছে একেপি। এরদোগান গত বছর ৫২ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার বিলোপ করে প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা চালু করতে তুরস্কের সংবিধান পরিবর্তন করতে চান। প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা চালু হবে কিনা তা নির্ভর করছে এ নির্বাচনে একেপি কত বেশি আসনে জয়লাভ করতে পারে তার ওপর। দলটি যদি ৬০ শতাংশ আসনে জয় লাভ করে তাহলে তারা গণভোটের প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই নতুন করে সংবিধান রচনা ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে। কুর্দিপন্থী বামপন্থী দল এইচডিপি নির্বাচনে জয়লাভ করবে তা অনেকটাই অসম্ভব বিষয়। তবে কুর্দি জনগণ নির্বাচনে বিরাট সাফল্য লাভের আশা করছে। রিপাবলিকান পার্টির নেতা কেমাল কিলিকদার ওগলুও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশা করছেন। এ নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের মেয়াদের জন্য একটি গণভোট মনে করা হচ্ছে। এক সময় বলা হতো, তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোলমডেল সৃষ্টি করেছেন। তবে তার সমালোচকরা এখন বলছেন, অনেক আগেই তিনি গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে এসেছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থেকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করে দিয়ে নিজের হাতে বিপুল ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংহত করতে নতুন করে সংবিধান রচনা করতে যাচ্ছেন। আর এর মাধ্যমে তিনি কার্যত হয়ে উঠবেন সাম্রাজ্য অধিপতি বা সুলতান। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, কামাল আতাতুর্কের কঠোর শাসনে তুরস্কের ভূমি থেকে ইসলামি চেতনা ও ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার ক্ষত সারিয়ে তুলছেন ধর্মপরায়ণ এরদোগান। ধর্ম পালনে কাউকে বাধ্য যেমন করবেন না, তেমনি ধর্ম পালনে কেউ যেন বাধা না দিতে পারে সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। গত শনিবার ৫৬২ বছর আগের অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বার্ষিকীতে ১০ লাখের অধিক ভক্তসমর্থকের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যারা নামাজের জন্য আমাদের আহ্বান আযানের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের জন্য কোনো পথ খোলা রাখব না।’ এসময় জনসমুদ্র থেকে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি ওঠে।

দরিয়া কিনারে এখনো দুঃখ অথৈ by ফারুক ওয়াসিফ

‘তাজা হাওয়া বয়, খুঁজিয়া দেশের ভুঁই, ও মোর স্বদেশী জাদু, কোথায় রহিলি তুই!’ ওয়েস্টল্যান্ড/টি এস এলিয়ট
‘জল দেখিলেই নির্বাসিতের দেশের কথা মনে পড়ে’; আত্মঘাতী বাঙালি পুস্তকখ্যাত কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার ছেলে নীরদ সি চৌধুরীর এই কথাটা অন্যভাবে ফলে গেল—আমাদের দেশহারা-সাগরভাসা তরুণদের বেলায়। অচেনা সমুদ্রে মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁদের কোন দেশের কথা মনে পড়ছিল? অভাবের তাড়নায় যে দেশ তারা ছেড়ে এসেছে, নাকি যে দেশে সুখ মিলবে সেই পরবাসের কথা? স্বদেশে করুণাবঞ্চিত হয়েই তারা ভিনদেশের জলসীমান্তে উপস্থিত। করুণা ভিক্ষা করেই তারা বলেছে, ভাসা পথে আমরা এসেছি তোমার কিনারে হে সভ্যতা। আমরা সাতভাই চম্পা মাতৃকাচিহ্ন কপালে করে এসে ঠেকেছি এই বিপাকে—পরিণামে। আমাদের কোলে-কাঁখে শিশু, ঘরপোড়া কাঠে কালো কালো যিশু। দরিয়া কিনারে আজ দুঃখ অথৈ, করজোড়ে বলি, গ্রহণ করো রহম করো ভাই।
তাঁদের গ্রহণে সব রাষ্ট্রেরই হৃদয় পাষাণ হয়ে যায়। তাঁরা বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের জলে, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গলে-পাহাড়ে, আরবের মরুতে, রাশিয়া ও তুরস্কের তুষারে, কিংবা ভূমধ্যসাগরের চারপাশের যুধ্যমান সীমান্তগুলোতে মরে পড়ে থাকছেন। এই খবর এত দিন কমই জানা যেত। মানব পাচার, আধুনিক দাসত্ব, শ্রমদাসত্ব ইত্যাদির অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করাই ছিল আমাদের রাষ্ট্রীয় চল। উন্নয়নের মাড়াই কল থেকে রসের পাশাপাশি কী পরিমাণ গাদ ও ছিবড়া তৈরি হচ্ছে, তার পরিমাপ আমরা করতে রাজি ছিলাম না। প্রদীপের নিচেই রাজ্যের অন্ধকার জমে আছে, সেটা নীতিনির্ধারকেরা জেনেও জানেননি, শুনতেও চাননি। মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্নে দেশবাসীকে বিভোর করায় বদ্ধপরিকর ছিল আমাদের সরকার। কিন্তু এক ঝলকে দিবাস্বপ্ন ভেঙে গেল, আমরা জানলাম আমাদের মানুষেরা কতটা অসহায় আর বিশ্বে আমরা কতটা বন্ধুহীন।
রবীন্দ্রনাথের কাদম্বিনী যেমন প্রমাণ করিয়াছিল যে অন্তত মরবার আগ পর্যন্ত সে বেঁচেই ছিল; তেমনি সাগরে ভাসমান জীবিত ও মৃত এবং জঙ্গলে গোর পাওয়া বাংলাদেশিরা জানিয়ে যাচ্ছে, মৃত্যুর আগে কোন দোজখে তারা বাঁচার চেষ্টা করছিল। দেশের ভেতরের বাঁচাও এমনই কঠিন যে প্রবাসে দৈবের বশে পড়তেও তারা দ্বিধা করেনি। এ রকম চরম অমানবিক অবস্থায় পড়া জীবনকে দাসত্ব বলা হয়। ওয়ার্ল্ড স্লেভারি ইনডেক্স নামক আন্তর্জাতিক জরিপে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৪৩৫ শতাংশ মানুষ আধুনিক দাসত্বের শিকার। বিশ্বে এখন দাসত্বের জীবনে বন্দী মানুষের সংখ্যা ৩৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন। এর মধ্যে বাংলাদেশের ভাগে আছে প্রায় সাত লাখ। এর কয়েক গুণ বেশি মানুষ দাসত্বের হুমকির কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বেশি দাস আছে এমন দেশের তালিকায় ভারত প্রথম আর বাংলাদেশ নবম। এটা কিন্তু দেশের ভেতরের হিসাব। আমাদের যত লোক দেশের বাইরে দাসোপম পেশায় বন্দী, সেই হিসাব যোগ করলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে। এ ধরনের দাসত্বের পরিস্থিতি দূর করায় কোন সরকার কতটা সচেষ্ট, সেই তালিকায় বাংলাদেশ ১৬৭ দেশের মধ্যে ৬০তম। র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ পেয়েছে তিনটা সি। এর অর্থ আধুনিক দাসত্ব দূর করায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ খুবই কম। আক্রান্তদের পক্ষে কাজ করার মতো সেবা কার্যক্রমও অপ্রতুল।
পাচারের শিকারদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন তথা পাচারজালকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করায় আমাদের সরকারের নীতি, প্রতিষ্ঠান ও আইন পর্যাপ্ত নয়। তারা আক্রান্তদের বিষয়ে উদাসীন তো বটেই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আক্রান্তদেরই অপরাধী বলে দোষায় বা শাস্তি দেয় বা সে রকম আইন টিকিয়ে রাখে। সম্প্রতি বেআইনি পথে সাগর অতিক্রম করে বিদেশে যাওয়া হতভাগ্যদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উক্তি এবং স্বরাষ্ট্র-পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করার মধ্যেই পাচার হওয়া মানুষদের বিষয়ে ওয়ার্ল্ড স্লেভারি ইনডেক্সের মূল্যায়নের সত্যতা মিলে যায়। যাঁরা সরকারের সাফাই গাইবেন, তাঁদের ওই প্রতিবেদনের প্রথম পৃষ্ঠায় মনীষী উইলবার উইলবারফোর্সের উক্তিটি জানাতে পারি: তুমি হয়তো অন্যভাবে বিষয়টাকে দেখতে পারো, কিন্তু তুমি আর কখনোই বলতে পারবে না যে তুমি জানতে না!
এই জরিপে দাসত্ব বাড়ার শর্তগুলোর মধ্যে বলা হয়েছে, যেসব দেশের উন্নয়ন বিষম অথবা ধীর, মানবাধিকার হুমকিগ্রস্ত এবং রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা বেশি, সেখানেই দাসত্ব সৃষ্টির ঝুঁকি বেশি। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে সে রকম একটি দেশ হিসেবেই দেখানো হয়েছে। ২০০৯-১১ সালের থেকে ২০১২-১৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের মাত্রা ধেই ধেই করে বেড়েছে (যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদন)। এক হিসাবে গত ১০ বছরে পাকিস্তানেই পাচার হয়ে গেছে প্রায় ৩০ হাজার নারী-শিশু ও যুবক। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গমনকারীদের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। এদের অনেকেই জোরপূর্বক যৌন দাসত্ব অথবা গৃহ দাসত্বে আটক। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায়ও আমরা আছি। কাতারের ৯০ শতাংশ মানুষই বিদেশি। এদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও ব্যাপক। তাদের কত অংশ অমানবিক দশায় দিন কাটায়, তার কোনো হিসাবই আমরা রাখিনি। একসময় মধ্যপ্রাচ্যে উটের জকি হওয়া বাংলাদেশি বালকদের দুর্ভাগ্যের গল্প আন্তর্জাতিক শিরোনাম হতো। এখন প্রচারিত হয় বিরাট বিরাট ইমারত তৈরিতে দাসত্ব খাটা বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের কথা। এতে নাকি সরকারের ভাবমূর্তি যায়। মানবতার মূর্তির চাইতে ভাবের গরিমা বড় হয়ে গেলে সেই ভাব টেকানো মুশকিলই বটে।
মিয়ানমারকে অনেকেই বলছেন শরণার্থী/দাস তৈরির কারখানা। পরিকল্পিতভাবে সেখানে শরণার্থী তৈরি করা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা গণহত্যা ও নিপীড়ন, ধর্ষণের মুখে শরণার্থী হচ্ছে। কিন্তু খোলা সাগরে বাদামের খোলার মতো নৌকায় কে ওঠাচ্ছে বাংলাদেশিদের? শুধুই কি দালালেরা দায়ী? অর্থনীতি দায়ী নয় মোটেই? আমাদের কৃষক অঢেল ফলন ফলিয়েও মুনাফা তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই ওঠাতে পারে না। এই কৃষকের সন্তান তো দেশছাড়া হতে চাইবেই। বাংলাদেশের ইটখোলাগুলোতে, চিংড়িঘেরে, চা-বাগানে, অবহেলার শিকার আইলা ও সিডর দুর্গত এলাকায়, জলবায়ু দুর্যোগে পেশা ও আবাসন হারানো জনপদে একেবারে তলার মানুষেরা কী অবস্থায় দিন যাপন করে, সেটা কি আমরা জানি? রানা প্লাজা ও তাজরীনের ঘটনার পরে তো আর গোপন নেই যে পোশাকশিল্পের একটি অংশে অকহতব্য অমানবিকতা এখনো চলছে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু লাখ লাখ দরিদ্র আর ওই সাত-আট লাখ দাসকে যদি বলা হয়, সাগরপথে পালালে আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারবে; তারা কি যাবে না? বিদেশ মানেই ডলার, এই গল্প তো আমরা প্রচার করেছি। মধ্যপ্রাচ্যে জেনেশুনে কাফালা নামক শ্রমদাসত্বের মধ্যে তো আমরাই সরকারিভাবে তরুণদের পাঠাই। আরবের যে দেশগুলোতে নারীর জন্য অধিকার বলতে কিছু নেই, সেসব দেশে গৃহপরিচারিকার মতো অনানুষ্ঠানিক দাসত্বের মধ্যে তো সরকারিভাবে চুক্তি করেই পাঠানো হচ্ছে নারীদের! আমাদের ডলার-দিনার আসে দেশের ভেতরে নিম্ন মজুরির রপ্তানিমুখী শিল্প এবং বিদেশে শ্রমদাসত্বের সুবাদে। বিশ্বায়ন ও উন্নয়নের সব গালগল্প মনে নিয়েই বলতে হচ্ছে, এই একচোখা উন্নয়নের পাশেই রয়েছে আরেক চোখের নির্মম অন্ধত্ব।
এই উন্নয়ন এক কূল গড়ে তো আরেক কূল ভাঙে। এই বিশ্বায়ন ক্ষমতাবানদের জন্য সব সীমান্ত, বেড়া, দেয়াল, চেকপোস্ট উঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু শ্রমকে করেছে বাধাগ্রস্ত। পুঁজি, বিনিয়োগ, পণ্য, পর্যটকেরা তরলের মতো অবাধে কিংবা পাখির মতো মুক্ত ডানায় দশদিকে ছুটে যেতে পারলেও, সসম্মানে জীবিকা অর্জনে ইচ্ছুক মানুষেরা পদে পদে থমকান। তারা যেন বিশ্বায়িত মহাসমুদ্রে আটকে পড়া দ্বীপবাসীর মতো। এলিটরা যতটাই আন্তর্জাতিক, তাঁরা ততটাই অঞ্চলবন্দী। আজ যদি আমরা কর্মপ্রত্যাশী অভিবাসীদের ক্লাস এইট পাস করিয়ে কিছুটা প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘অবৈধ’ পথেও পাঠাতাম, তাহলেও সস্তা শ্রমের লোভে মালয়েশিয়া বা কাতারের মতো দেশ তাদের ফিরিয়ে দিত না। ক্ষুধা ও উচ্চাশা ছাড়া আর কোনো অর্থনৈতিক যোগ্যতাই এসব মানুষকে আমরা দিতে পারিনি! তাদের ভুখা-নাঙা শরীর চলমান উন্নয়নের অমানবিকতার দর্পণ। থাই-মালয়ের সাগরে-জঙ্গলে এই বিশ্বায়ন ও প্রগতির গর্ব গুম হয়ে গেছে।
মানবসমাজ চিরকাল অভিবাসনপ্রবণই ছিল। সভ্যতা ও সমাজ বিস্তারের চালিকাশক্তি ছিল অভিবাসন। পুঁজি ও পণ্যের মতো, জ্ঞান ও চিন্তার মতো, শ্রমের অবাধ চলাচল বহুদিনের বহু মানুষের দাবি। কার্যত, শ্রমের চলাচল ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতির সুষম বিকাশ হবে না, ভারসাম্য আসবে না। অভিবাসন তাই অবৈধ হয় না, বরং একে আইনি কাঠামোর মধ্যে কীভাবে আরও সহজ করা যায়, সেই পথ বের করতে হবে। তা ছাড়া উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর যে সমৃদ্ধি একসময়কার উপনিবেশিত দেশগুলোর সম্পদে হয়েছে, সেই উন্নতিতে গরিব দেশের মানুষেরও হক আছে।
যখন রোহিঙ্গারা দলে দলে আসছিল, চাইছিল আমাদের রহম, তখন আমরা তাদের সাগরে ঠেলে দিয়ে যা করেছি, আজ আমাদের লোকের সঙ্গে সেটাই করছে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। তারা দেখেও না দেখে, জেনেও না জেনে এদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে রাখছিল। আজ যদি আমাদের উন্নয়নের মডেল, আমাদের অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আমাদের রাজনীতির নিষ্ঠুরতার সংশোধন না করি, তাহলে সাগরে দিশা হারানো এই মানুষগুলোর পরিণতিই বরণ করবে লাখো বাংলাদেশি। জলবায়ু দুর্যোগে যখন অনেক অঞ্চল বিরান, জলমগ্ন ও বন্ধ্যা হয়ে যাবে, যখন প্রাকৃতিক নিয়মে মাটির উর্বরতা শক্তি ফুরিয়ে যাবে, যখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়বে, কিংবা আমরা পড়ব ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে, তখন সমুদ্র ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। আজকের দুর্দশার মধ্যে সেই দুর্দিনের ইশারা।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

মোদিকে খালেদা বললেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির বিষয়টিই ভারতের সফররত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে তুলে ধরেছে বিএনপি। গ্লোবাল বিশ্বে বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যা এ অঞ্চলের জন্য অস্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে বলেও জানিয়েছে দলটি। বৈঠক শেষে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান গণমাধ্যমকে দেয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। এর আগে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বিকাল ৪টা থেকে দীর্ঘ ৪৫ মিনিট বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রথম ৩০ মিনিট বিএনপি প্রতিনিধি দলসহ এবং শেষ ১৫ মিনিট দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে গাড়িতে ওঠার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাস্যোজ্জ্বল খালেদা জিয়া বলেন, ‘সুন্দর আলোচনা হয়েছে।’ পরে দু’দফা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ড. মঈন খান। তিনি বলেন, অত্যন্ত চমৎকার পরিবেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকটি সম্পন্ন হয়েছে। ইংরেজিতে যাকে বলে, এ ভেরি করডিয়াল অ্যাটমোস্ফেয়ার। তিনি বলেন, আমরা দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিটি বিষয় বৈঠকে উল্লেখ করেছি। সার্কের পরিমণ্ডলে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। ড. মঈন খান বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- আজকের বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সে বিষয়টি হচ্ছে- বাংলাদেশে আজকে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি। বাংলাদেশে যদি গণতন্ত্র না থাকে, সেটা কেবল বাংলাদেশ নয়; আমরা মনে করি- সেটা এ সমগ্র অঞ্চলের জন্য একটি অস্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, আমরা এ কথা প্রায়শ বলি- আজকে আমরা বাস করি একটি গ্লোবাল ভিলেজে। আমি নিজের পরিমণ্ডলে শান্তশিষ্ট হয়ে ঘুমিয়ে থাকব, অন্য কেউ এখানে কোন রকমের সমস্যার সৃষ্টি করবে না; এটা হতে পারে না। কাজেই, আজকে বাংলাদেশে আমরা যেভাবে যে পরিস্থিতিতে আছি, বিরোধী দলের ওপর চলছে অত্যাচার। আমাদের দলের মহাসচিব থেকে শুরু করে স্থায়ী কমিটির সদস্য, তৃণমূল পর্যায়ের হাজার হাজার কর্মীদের ওপরে যেভাবে অত্যাচার-অনাচার করা হচ্ছে, সে বিষয়গুলো গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনায় আপনা-আপনি ওঠে এসেছে। কাজেই আজকে ভারতে যেভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নিজের জীবনে প্রমাণ করেছেন; তৃণমূল থেকে তিনি যেভাবে ভারতের সর্বোচ্চ পদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন; সেটা সম্ভব হয়েছে কেবল গণতন্ত্রের কারণে। কাজেই এটা অত্যন্ত স্পষ্ট, আজকে কেবল দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল নয়; বিশ্বের কোথাও গণতন্ত্র ব্যতিরেকে কোন মানুষের উপকার হতে পারে না। জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হতে পারে না। বাংলাদেশে আজকের এ জনপ্রতিনিধিত্ববিহীন সরকার যেভাবে এদেশে উন্নয়নের কথা বলছে, সে উন্নয়ন অর্থহীন। যদি সেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা না থাকে। সে উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। ড. মঈন খান বলেন, আমাদের দেশের যে যুবসমাজ, নারী সমাজ ও শিশু তাদের প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য; এদেশের মানুষের মূল যে কর্মসংস্থান, এদেশের মানুষের যে শিক্ষা, সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবকিছুর জন্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরটি হচ্ছে- এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। একমাত্র মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা এবং মানুষের জবাবদিহিতার মাধ্যমেই বাংলাদেশের সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব হতে পারে। এ বিষয়টিকেই আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপি ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মঈন খান বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার যে আলোচনা সেটি কোন দাবি-দাওয়ার বিষয়ে নয়। কাজেই আপনারা যে প্রশ্নটি করেছেন, আমি সবিনয়ে সেটা নিচ্ছি না। বিএনপি স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশে যেভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী সে ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আমরা বাংলাদেশে সৃষ্টি করতে পারিনি। যেখানে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন সরকারের কথায় চলে। যেখানে বাংলাদেশের প্রশাসন সরকারের কথায় চলে। যেখানে বাংলাদেশের ব্যবস্থার কাছে মানুষ বিচার প্রার্থনা করে পায় না, যে দেশে পুলিশবাহিনী রাজনৈতিকভাবে হয়রানি এবং অত্যাচার করে এবং যে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু দলীয় ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এদেশে গণতন্ত্র নেই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে কথাগুলোই আলোচনায় উঠে এসেছে। বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কি বলেছেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মঈন খান বলেন, এ প্রশ্নটি আমাদের করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। যখন ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রেস কনফারেন্স করা হবে সেখানে আপনারা প্রশ্নটি করলেই যুক্তিযুক্ত হবে। তারা তাদের তরফ থেকে বক্তব্য দেবেন। এটা যুক্তিসংগত নয়, তারা কি বলেছে সেটা আমরা বলব। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা অনেক বিষয়ে আলোচনা করেছি। যেসব বিষয় আমাদের আলোচনায় উঠে এসেছে, আমি সেগুলো স্পষ্টভাবেই আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আজকে বুঝতে হবে- বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন তথা আমরা যদি একটি মধ্যম আয়ের দেশ বা একটি উচ্চ আয়ের দেশে যেতে চাই, তাহলে কেবল ঢাকা শহরে বড় বড় অবকাঠামো তৈরি করলে সেটা হবে না। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে। মানুষের অধিকার মানুষকে ফিরে দিতে হবে। মানুষের যে ভোটের অধিকার সেটা ফিরিয়ে দিতে হবে। এ কথাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এ কথাগুলোই গুরুত্বের সঙ্গে এখানে আলোচিত হয়েছে। ড. মঈন খান বলেন, ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী। আমরা হয়তো জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের চেয়ে ছোট হতে পারি, আয়তনের দিক দিয়ে ছোট হতে পারি। কিন্তু আমরা এ কথাটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি যে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বেশিরভাগ সূচক ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা অনেক উপরে অবস্থান করছি। এমন পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে, গণতন্ত্র। এক্ষেত্রে আমরা ভারতের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছি। কোন গণতান্ত্রিক আচরণ আমরা সরকারের কাছে পাইনি। দেশের ১৬ কোটি মানুষ এটাই প্রত্যাশা করে। যাতে আগামীতে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়া যায়। তারা যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে। কিন্তু এদেশে যদি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার সৃষ্টি না হয় তবে সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ড. মঈন খান বলেন, আমরা বলেছি, দুটি দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। দেশে কোন সরকার আছে, তা মূল কথা নয়। সরকার আসবে, যাবে। কিন্তু জনগণ চিরদিনই থাকবে। সেজন্য দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্ক অটুট থাকা প্রয়োজন। ‘গণতন্ত্রহীনতার’ বিষয়টি কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলা হল- জানতে চাইলে মঈন খান বলেন, তিনি (মোদি) গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন নেতা। তার জীবন-আদর্শ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ভারতের তৃণমূল থেকে আজ তিনি সর্বোচ্চ পদে এসেছেন। এটা সম্ভব হয়েছে, ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার জন্য। যারা গণতন্ত্রকে মূল্য দেয়, তাদের সঙ্গেই গণতন্ত্রের কথা বলা যায়। তাই আমরা বলেছি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিএনপি নেতা বলেন, যারা গণতন্ত্রকে ধূলিস্যাৎ করেছে, তাদের সঙ্গে গণতন্ত্রের আলোচনা করা অত্যন্ত কঠিন। যদিও আমরা বারবার প্রস্তাব দিয়েছি, কয়েক বছর ধরে, আসুন আমরা আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থার নিরসন করি। মোদি আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সেটাকে যদি বাস্তবায়িত করতে হয়, গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে উন্নয়ন করতে হবে। আমরা স্পষ্ট করেছি, গণতন্ত্র ব্যতিরেকে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার মধ্যে ওয়ান অন ওয়ান আলোচনা হয়েছে। সেখানে তারা পারস্পরিকভাবে কথা বলেছেন, কেবল তারাই ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকে বিএনপি প্রতিনিধি দলে অংশ নেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমেদ। বিএনপি সূত্র জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও বিএনপির অবস্থান নিয়ে একটি প্রতিবেদন, মুদ্রিত ও ভিডিও সমন্বয়ে একটি ফাইল হস্তান্তর করেছেন। এদিকে কয়েক দিন ধরে ঢাকা শহরের ব্যাপক যানজটের কারণে বৈঠকে অংশ নেয়ার জন্য আগেভাগেই দুপুর আড়াইটার সময় গুলশানের বাসভবন থেকে সোনারগাঁও হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন খালেদা জিয়া। নির্ধারিত সময়সূচির বেশ আগেভাগেই সোয়া তিনটায় তিনি কাওরান বাজার পৌঁছেন। সেখানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর কার্যালয়ে আধঘণ্টার মতো বিশ্রাম নেন তিনি। পরে বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটে তিনি প্রতিনিধি দল নিয়ে সোনারগাঁও হোটেলে পৌঁছেন।
মোদিকে খালেদার উপহার
সাক্ষাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মা হীরাবাইয়ের জন্য তাঁতের বোনা জামদানি শাড়ি ও চাদর উপহার দেন খালেদা জিয়া। এছাড়া মোদিকে উপহার দিয়েছেন পাঞ্জাবি ও কোটি। বিএনপি নেতারা জানান, শনিবার রাতে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে এসব উপহার সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়।

ভারত গণতন্ত্রের পক্ষে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে -৬৫ দফা যৌথ ঘোষণা

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘নতুন দিগন্ত উন্মোচন’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। দুই দিনের রাষ্ট্রীয় ওই সফরের সমাপনী লগ্নে গতকাল হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই তিনি সফরটিকে মূল্যায়ন করেন। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে বিদেশ সচিব জানান, তার দেশ এবং সরকারের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। ভারত গণতন্ত্রের সমর্থন করে তবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। সংবাদ সম্মেলনে সচিবের কাছে প্রশ্ন ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বৈঠক নিয়ে। ওই বৈঠকে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য খালেদা জিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি’র গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে বলে প্রতিনিধিদলের নেতারা জানিয়েছেন। তবে সেখানে মোদি বা ভারতের তরফে কি বলা হয়েছে সে সম্পর্কে বিএনপি মুখ খুলেনি। সঙ্গত কারণেই বিদেশ সচিবের কাছে মোদি-খালেদা বৈঠক নিয়ে জানতে চান সাংবাদিকরা। বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস. জয়শঙ্কর সাংবাদিকদের বলেন, ভারত যে গণতন্ত্রের সর্মথন করে এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে বৈঠকে। ৪০ মিনিটের এই বৈঠকের মধ্যে ১৫ মিনিট নরেন্দ্র মোদি এবং খালেদা জিয়া একান্তে আলাপ করেন। এদিকে দেশীয় বিভিন্ন বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, সেখানে আউটকাম নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দিয়েছেন ভারতীয় ওই কূটনীতিক। সেখানে তিনি বলেন, খুলনা-কলকাতা রুটে দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু বিষয়ে এরই মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। অচিরেই এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানসহ অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা উন্নয়নে ভারত যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন এস. জয়শঙ্কর। ভেড়ামারা থেকে বহরমপুর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ লাইনের কাজ এগিয়ে চলছে বলেও জানান দিনি। মুক্তিয?ুদ্ধে শহীদ ভারতীয় সেনাদের সম্মাননা জানানোর উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন তিনি। এতে তারা গর্বিত বলেও উল্লেখ করেছেন। সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ, ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ ও ফার্স্ট সেক্রেটারি সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন।
৬৫ দফা যৌথ ঘোষণায় যা আছে: এদিকে বিকালের ওই সংবাদ সম্মেলনে দুই সরকার প্রধানের সম্মতিতে জারি হওয়া যৌথ ঘোষণা (জয়েন্ট ডিক্লারেশন) পাঠ করেন ভারতের বিদেশ সচিব। নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন ঘোষণা বা নয়া দিশা শীর্ষক ওই যৌথ ঘোষণায় ৬৫ দফা রয়েছে। সেখানে সফরের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। জানানো হয়েছে স্থলসীমান্ত চুক্তির দলিল হস্তান্তর এবং এ সংক্রান্ত নতুন প্রোটকল সই হওয়া যে ২২টি বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত ঐকমত্য হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ওই ঘোষণায়। সেখানে তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা এবং টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের একটি শান্তিপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানের পৌঁছানোর কথা যেমন রয়েছে, তেমনি শিক্ষা সংস্কৃতি পর্যটন বিনোদনের মতো বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার কথাও রয়েছে। এ কথায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যত বিষয় রয়েছে তার কম-বেশি সবই সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের। এই ঘোষণা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উল্লিখিত বিষয়াদিতে আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। শনিবার থেকে রোববার সন্ধ্যা অবধি মোদি এখানে যেসব কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছেন তার সবই উল্লেখ রয়েছে ওই ঘোষণায়। সবচেয়ে শুরুত্বপূর্ণ যেসব চুক্তি হয়েছে তাহলো- স্থলসীমান্ত চুক্তি-প্রটোকল অনুসমর্থনের দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সফরে ভারতের দীর্ঘ দিনের চাওয়া সড়ক ও নৌ-পথে ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটির দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। দুটি সড়কে বাস চলাচলের উদ্বোধন হয়েছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়িকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সম্মাননা জানিয়েছে বাংলাদেশ। মোদির হাতে তা তুলে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ। বঙ্গভবনের সেই আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। যৌথ ঘোষণায় সে সবের উল্লেখ রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে তার উল্লেখ রয়েছে ঘোষণাতেও। সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে মোদি অঙ্গীকার করেছেন বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ-ভারত কিভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে সে বিষয়ে জোর দিয়েছেন মোদি-হাসিনা।
টিপাইমুখে একতরফা কিছু হবে না, সীমান্ত হত্যা ‘জিরো’তে নামানো হবে: যৌথ ঘোষণায় টিপাইমুখে একতরফা কোন পদক্ষেপ না নেয়ার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছেন মোদি। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা জিরোতে নিয়ে আসার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন তিনি। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক এবং কনস্যুলার কার্যক্রম জোরদারে মোদি-হাসিনা উভয়ে সম্মত হয়েছেন। গোহাটিতে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন প্রতিষ্ঠা এবং আগরতলায় ভিসা অফিসকে সহকারী হাইকমিশনে উন্নীত করা। একই সময় সিলেট এবং খুলনায় ভারতের সহকারী হাইকমিশন খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বহুমুখী আর্থিক প্রাতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালীকরণ এবং সংস্কারে প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া হয়েছে যৌথ ওই ঘোষণায়। 
‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা’ প্রসঙ্গে ঘোষণায় যা আছে: বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির গুরুত্ব ও প্রয়োজনের ওপর জোরদার করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। এক্ষেত্রে তিনি বেসরকারি খাতের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ভারতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা (এসইজি) বরাদ্দ করতে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান মোদি। কোস্টাল শিপিং চুক্তি স্বাক্ষর স্বাগত জানিয়েছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। এ চুক্তি দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এ ছাড়াও তারা নতুন বাণিজ্য সুযোগ যোগ করার মধ্য দিয়ে প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড, পিআইডব্লিউটিটি নবায়ন করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। ইন্টারন্যাশনাল জুট স্টাডি গ্রুম নামের সাবেক একটি সংগঠনের উত্তরসূরি একটি সংগঠন গড়ে তুলতে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করবেন বলে সম্মত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের জন্য ভারত থেকে ঝামেলামুক্ত তুলা সরবরাহ করার বিষয়ে ভারতের আশ্বাসের প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পিপল টু পিপল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নির্বিঘ্ন মাল্টি-মোডাল কানেক্টিভিটির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। আর এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত নানা উদ্যোগের প্রশংসা করেছে ভারত। দুদেশের মধ্যে মাল্টি মোডাল ট্রান্সপোর্ট এগ্রিমেন্ট নিয়ে সমঝোতা শুরু এবং এ নিয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনেও তারা সম্মত হয়েছে। ঢাকা-শিলং-গোয়াহাটি ও কলকাতা-ঢাকা-কলকাতা, এ দুটি বাস সেবা চালু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ প্রস্তাবিত খুলনা-কলকাতা ও যশোর-কলকাতা এ দুটি নতুন বাস সেবাও উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা সম্পন্ন হবার পর কার্যকর হতে পারে বলে জানিয়েছেন মোদি। রেলওয়ে খাতে চলমান সহযোগিতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ-ভারত সংযোগকারী কলকাতা-ঢাকা মৈত্রি বাসসহ রেল সেবার যাত্রীদের জন্য ভারতে উপযুক্ত একটি স্থানে ইন্টারন্যাশনাল প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন মোদি। কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত কাজগুলো সহজ করতে এটা নির্মাণ করা হবে। ৮০ কোটি ডলারের প্রথম ঋণ যা পরে অতিরিক্ত ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০ কোটি ডলার বাড়ানো হয়েছিল তার যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছে তাতে উভয় প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মোদি ২০০ কোটি ডলারের দ্বিতীয় আরেকটি ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। বিদ্যুৎ, পানি সম্পদ, বাণিজ্য, ট্রানজিট এবং যোগাযোগ খাতে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে সম্মত হয় উভয় প্রধানমন্ত্রী। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বিষয়ক বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা। উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে স্থল সীমান্ত স্টেশনে বাণিজ্য সুবিধার উন্নয়ন করার সম্ভাব্য উপায় বিবেচনা করছেন চার দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন নতুন খাত যেমন পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মহাকাশ, স্বাস্থ্য, পাট ও বস্ত্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফিশারিজসহ অন্যান্য খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি’র অধীনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগিতার প্রশংসা করেন তারা। বাংলাদেশ থেকে আরও গবেষক ও বিজ্ঞানিদের ভারতীয় বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণ এবং নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মোদি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রথম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ ২০১৭ সালে মহাকাশে প্রেরণ করা হবে যা বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাবে। ভারত সার্ক স্যাটেলাইট প্রকল্প গ্রহণ করায় ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। সমুদ্র সীমা নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সমঝোতা হওয়ার উভয়েই সন্তোষ প্রকাশ করছেন। সমুদ্রভিত্তিক ব্লু ইকোনমি ও ম্যারিটাইম কো-অপারেশন উন্নয়নে পরস্পর নিবিড়ভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন তারা। জলবায়ু পরিবর্তনকে মানবজাতির জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উভয়ে একমত হয়েছেন এবং তা মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার গুরুত্ব জোর দিয়ে বলেছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে ৭০ হাজার উন্নত রান্নার চুলা স্থাপনের জন্য ইন্ডিয়া এনডাওমেন্ট ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ এর কাছ থেকে ৫ কোটি ভারতীয় রুপি সহায়তা বাস্তবায়ন করতে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। প্রযুক্তি বিষয়ক পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে সৌরবিদ্যুৎ পরিচালিত হোম-সিস্টেম স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষা খাতে চলমান সহযোগিতার স্বীকৃতি দিয়ে এ খাতে পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন উভয় প্রধানমন্ত্রী। স্মল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে ভারতের দেয়া সহযোগিতার প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইটিইসি কার্যক্রমের অধীনে বাংলাদেশের জন্য দক্ষতা তৈরি কার্যক্রমে স্বতন্ত্র শক্তি বৃদ্ধির জন্য ভারতকে ধন্যবাদ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।