Sunday, September 27, 2009

বেলুচিস্তান কি আরেক বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে -পাকিস্তান by কুলদীপ নায়ার

পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সেখানে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, বেলুচিস্তান প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানকে এখন বাস্তবে একই রকম অবস্থার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রদেশটি ক্রমেই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যেমন ঘটেছিল। তখনকার মতো এখনো সেনাবাহিনী প্রচণ্ড প্রতাপশালী। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো তখন বাংলাদেশে সেনা অভিযানের পক্ষে ছিলেন, আজও বেলুচিস্তানে একই পথ অনুসরণ করা হচ্ছে।
পাকিস্তান ভেঙে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। বেলুচিস্তানও একই পথ অনুসরণ করতে পারে, যদি পাকিস্তান সেখানে তার সামরিক অভিযান বিষয়ে সতর্ক না হয়। মুক্ত হাওয়ায় বাঁচার জন্যে একটুখানি জায়গা দাবি করায় নিজ দেশের মানুষকে যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে তা জনমনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষত সহজে ঘোচানো যাবে না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে পাকিস্তানের শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল।
বছরখানেক আগে সার্কভুক্ত এক দেশে একটি সম্মেলনে বেলুচ ন্যাশনাল মুভমেন্টের এক প্রতিনিধির সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে যদি বেলুচিস্তানের সীমান্ত থাকত, তাহলে প্রদেশটি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইতিমধ্যে ভারতে যোগ দিত। নয়াদিল্লির প্রতি ইসলামাবাদের সন্দেহের দৃষ্টি এ সব কারণে। বেলুচদের ওপর নিষ্ঠুরতার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমন ঘটনার কথা আমি শুনেছিলাম। আমি জেনেছিলাম, ঢাকায় সমাজের মাথাগুলোকে কীভাবে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছিল।
গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি বেলুচদের কাছে ক্ষমা চেয়ে এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠিক কাজটি করেছিলেন বলে আমি মনে করি। বেলুচ লিবারেশন আর্মি, বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি ও বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট—তিনটি সশস্ত্র সংগঠনই যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু আসিফ আলী জারদারি সেনা প্রত্যাহার, নিখোঁজদের উদ্ধার তত্পরতা, রাজবন্দীদের মুক্তি ও বেলুচিস্তানে সেনানিবাস স্থাপন বন্ধ করার মতো বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলেন। জারদারি সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বোঝাতে সমর্থ হননি যে সেনা প্রত্যাহার করা দরকার। নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে শক্তি প্রদর্শন নয়, দরকার সহমর্মিতা।
অবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে আবারও খারাপ হয়েছে। বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার অনেক ভবনে উড়ছে স্বাধীনতার পতাকা। স্কুলে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাওয়া হচ্ছে না। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নবাব আকবর বাগতির তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পণ্ড করতে গেলে সম্প্রতি সেখানে সংঘর্ষ বাধে। এটা খুবই স্পষ্ট যে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ সেনা অভিযানের মাধ্যমে বাগতিকে হত্যা করেন। কিন্তু জারদারির শাসনকালে খুনিদের শাস্তি দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি বাগতি ‘হত্যা’র দায়ে মোশাররফের বিরুদ্ধে একটা মামলা পর্যন্ত করতে পারেননি। মোশাররফের বিরুদ্ধে তাদের যে ক্ষোভ ছিল, তা এখন গিয়ে পড়ছে পিপিপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর। ক্ষোভ প্রশমনে পিপিপি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
যদি বেলুচদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে বেলুচিস্তানকে এখনো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব। সাড়ে তিন দশকেরও বেশি আগের কথা। আকবর বাগতি তখন বেলুচিস্তানের গভর্নর। তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। তিনি বারবার আমাকে বলেছিলেন, জুলফিকার আলী ভুট্টোকে অবশ্যই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এটাই ছিল সত্যিকারের দাবি। আমরা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কথা বলেছিলাম এবং আন্দাজ করতে পেরেছিলাম, বাগতির চাওয়া ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া সবকিছু ইসলামাবাদ থেকে কোয়েটার হাতে ন্যস্ত করতে হবে। পরের দিন আমি ভুট্টোকে এ বিষয়ে অবগত করলে তিনি জানান, আমাদের পাঁচ ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনার টেপ তিনি ইতিমধ্যে হাতে পেয়ে গেছেন। এমনই ছিল ভুট্টোর কাজের ধরন। ফলস্বরূপ তিনি বাগতিকে গভর্নর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং দেশ শাসনের জন্য একনায়কতান্ত্রিক পথ বেছে নেন।
ইসলামাবাদ সরকার বেলুচদের নির্মমভাবে দমন করতে লাগল। নিরাপত্তা বাহিনী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বেলুচ ন্যাশনাল মুভমেন্টের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ বেলুচসহ আরও তিনজন জনপ্রিয় নেতাকে হত্যা করল। বিদ্রোহী নেতা-কর্মীদের প্রতি দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকল। এসবই পুরনো পদ্ধতি, যার জন্য পাকিস্তানকে মূল্য দিতে হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। তবে এটা সত্য যে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতা সেখানে নেই। তবে প্রয়াত আকবর বাগতির নাতি ২৮ বছরের উদ্যমী তরুণ ব্রামদাগ বাগতি তাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের মধ্যমণিতে পরিণত হতে যাচ্ছেন। জারদারি যদি বিষয়গুলো নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাহলে হয়তো বা বেলুচিস্তানের সমস্যার সমাধানে সফল হতেন। সেনাবাহিনীর চোখ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি যা দেখছেন, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের পরিণতিই উঁকি দিচ্ছে।
পাকিস্তানের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দেশটিতে প্রদেশভিত্তিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু পাকিস্তানের ট্র্যাজেডি হচ্ছে, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়ে পাঞ্জাব সব সময়ই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থেকেছে। এটা বলা খুবই কঠিন, কীভাবে ভবিষ্যতে বেলুচিস্তানের পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট যে ভারতের ঘাড়ে দোষ চাপানো হবে, অথবা যুদ্ধ প্রতিরোধে বেলুচিস্তানে বিপুল থেকে বিপুলতর সেনা মোতায়েন করা হবে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: ফিরোজ জামান চৌধুরী
* কুলদীপ নায়ার: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক।

এখন বড় ব্যবসা হলো কোম্পানি করে শেয়ার বিক্রি by আবু আহমেদ

আমাদের শেয়ারবাজারটাকে আমরা বড় করতে চেয়েছি। এর সুযোগ নিয়ে অনেকেই বাজারে শেয়ার বিক্রি করছে উচ্চ প্রিমিয়াম নিয়ে। গত ১০ বছরে কোম্পানির স্পন্সররা, বিশেষ করে ব্যাংক ও বীমা খাতের যে পরিমাণ অর্থ শেয়ার বেচে নিজেদের জন্য আয় করে নিয়েছে, তা রীতিমতো চোখ ধাঁধার বিষয়। ৫০ লাখ টাকা দিয়ে ব্যাংকের স্পন্সর বা উদ্যোক্তা হয়ে মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় শুধু শেয়ার বিক্রি করেই অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এর কয়েক গুণ টাকা। আর বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে স্পন্সরদের প্রাথমিক অর্থ ছিল আরও কম, কিন্তু লাভ হয়েছে অনেক বেশি।
ব্যাংকের মূলধনকে বাড়াতে হবে—বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নিয়ম মানতে গিয়ে প্রতিষ্ঠাতা ব্যাংক মালিকেরা বোনাসের পর বোনাস শেয়ার ইস্যু করেছেন এবং ওই সব শেয়ারকে চড়া মূল্যে বাজারে বিক্রয় করে দিয়ে বেশ ভালো মুনাফা ঘরে তুলে নিয়েছেন। এই বিষয়টি সত্য হয়েছে বীমা ও লিজিং কোম্পানির ক্ষেত্রেও। এই দুই ক্ষেত্রে পুঁজি বাড়ানোর বাধ্যবাধকতা না থাকলেও শুধু অতিরিক্ত অর্থ আয়ের জন্য এসব কোম্পানির পরিচালকেরা বোনাস শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদারতা দেখিয়েছেন। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভুল করে হোক, শুদ্ধ করে হোক শুধু বোনাস শেয়ার পাবেন—এই আশায় বাজার থেকে উদ্যোক্তাদের শেয়ারগুলোকে বেশ উঁচু মূল্যেই কিনে নিয়েছেন। বিগত কয়েক বছর শেয়ারের উঁচু মূল্যের পেছনে কাজ করেছে শেয়ারের জোগান-স্বল্পতাও। যে শেয়ারের যে মূল্য হওয়া উচিত ছিল, শুধু জোগানের তুলনায় চাহিদা বেড়ে গিয়ে ওই সব শেয়ার দ্বিগুণ, তিন গুণে বিক্রয় হয়েছে। ক্রমান্বয়ে ব্যাংকের মূলধন-ভিত্তি বিস্তৃত হয়েছে, সেই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর নগদ মুনাফা দেওয়ার ক্ষমতাও কমেছে। এই সত্যটা বুঝতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনেক সময় লেগেছে।
ব্যাংকগুলোর মুনাফা প্রদানের প্রকৃত ক্ষমতা কতটুকু, তা আগামী কয়েক বছরে বোঝা যাবে। বীমা কোম্পানির নতুন আইন ও তদারকি কর্তৃপক্ষ হবে বলে বাজারে অনেকে উত্ফুল্ল। কিন্তু তাদের ওই উত্ফুল্লতার পরিমাণকে বাট্টাকরণকৃত করা উচিত এই ভেবে যে নতুন আইনে নতুন তদারকি কর্তৃপক্ষ হলে ওই সব কোম্পানির জন্য সহজে ব্যবসাকরণের সুবিধাগুলোও তিরোহিত হয়ে যেতে পারে। তখন বীমা কোম্পানির শেয়ার মূল্যও ব্যাংক কোম্পানির শেয়ার মূল্যের মতো কমতে পারে।
যা-ই হোক, গত এক যুগের পর্যবেক্ষণ থেকে এটা বুঝেছি যে কাউকে সরকার খাতির করতে চাইলে তাকে একটা ব্যাংক বা কমপক্ষে একটা বীমা কোম্পানির লাইসেন্স দিয়ে তা করতে পারে। কারণ, এসব কোম্পানিতে মূলধন খাটানোর তুলনায় লাভ অনেক বেশি। একটি ছোট দোকানের মালিক ছিল বা পিতার বেকার ছেলে ছিল সেও সুযোগ করে দেওয়া ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির পরিচালক হয়ে এখন অনেক অর্থের মালিক। তাদের লাভ অন্যভাবেও এসেছে। ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে বসে ভাতাদি তো নিয়েছেনই, অন্যদিকে কেউ কেউ পরোক্ষভাবে হলেও ওই সব আর্থিক কোম্পানির সঙ্গে বা তাদের সহায়তা নিয়ে ব্যবসা করেছেন। সমাজে তাদের একটা পরিচিতিও হয়েছে।
প্রথম দিকে সরকার একটু শক্ত ছিল যে কেউ ব্যাংকের পরিচালক বা উদ্যোক্তা থাকলে অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা উদ্যোক্তা হতে পারবে না। অর্থবিত্তের লোকদের চাপের মুখে সেই বাধা আজ অপসারিত।
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বিধি জারি করেছে যে ব্যাংকের সর্বোচ্চ পরিচালক সংখ্যা হবে ১৩ জন এবং কেউ ছয় বছরের বেশি একটানা ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারবেন না। এই বিধিকে প্রথমে ব্যাংক মালিকেরা কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কোর্টে হেরে যাওয়ার পর যেভাবে বোর্ডগুলো গঠন করা হলো তাতে দেখা গেল, যে উদ্দেশ্যে ওই বিধিটা জারি করা হয়েছিল সে উদ্দেশ্যটাই অর্জিত হলো না। উদ্যোক্তারা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসতে পারলেন না ঠিকই, কিন্তু তদস্থলে তাঁদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা বসতে শুরু করলেন। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে আরও ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তবুও শত শত দরখাস্ত বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের কাছে পড়ে আছে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি চেয়ে। কেন? সেটা তো বুঝতেই পারছেন!
শেয়ারবাজার হলো টাকার বাজার। তবে সবার জন্য নয়; সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য তো নয়ই। এটা ভালো বাজার হলো কিছু অতি চালাক লোকের জন্য, যাঁরা রেগুলেশনের ফাঁককে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ে ধনী হতে চেয়েছেন। অনেক সময় তাত্ত্বিক অর্থে এঁরা আইন ও বিধি পালন করেন সত্য, কিন্তু এঁদের কাজ অবশ্যই আইনি চেতনার বিরুদ্ধে যায়।
এত দিন আমরা জানতাম, মিউচ্যুয়াল ফান্ড হলো বাজারকে স্থিতিশীল রাখার জন্য অন্যতম ভালো আর্থিক হাতিয়ার। কিন্তু এখন এগুলো হয়ে পড়েছে অস্থিতিশীলতার ভালো অস্ত্র। এত দিন আমরা জানতাম, মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠন করার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা যে পুঁজি জোগান দিয়েছেন সে পুঁজি কোথায়, কীভাবে খেটেছে, তা আগে দেখাতে হবে, এখন আর সেই শর্তের বালাই নেই। এখন অতি উদারভাবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে বাজারে আসতে দেওয়া হচ্ছে এবং যেহেতু তা গঠন করে বাজারজাত করতে পারলেই কয়েক গুণ বেশি মূল্যে ওই ফান্ডকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রয় করা যায়, সে জন্য অনেকে এখন প্রচুর টাকার মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে বাজারে আসছে। এ ক্ষেত্রে স্পন্সরদের বেলায় এবং কথিত প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রেও কোনো রকম সময়গত বাধানিষেধ বা বিক্রির ওপর লক-ইন বলতে কিছু নেই। বড় আকারের মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠন করে ওই ফান্ডের অধিকাংশ ইউনিটকে যদি প্লেসমেন্ট বা বাজারে আসার আগেই পছন্দমতো প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া যায়, তাহলে একদিকে যেমন অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত হলো, অন্যদিকে ওই অর্থের জন্য সুদও দিতে হলো না। প্লেসমেন্টে বিক্রয় করার বিষয়টি এসেছে যাতে উদ্যোক্তারা পুরো ফান্ডকে বাজারে বেচতে না পারে সেই ভাবনা থেকে। কিন্তু আমাদের বাজারে শেয়ার এবং সেই সঙ্গে মিউচ্যুয়াল ফান্ডেরও এত চাহিদা যে প্লেসমেন্ট বা আগে বিক্রির প্রয়োজনই পড়ে না।
তবুও রেগুলেটর ঘুমিয়ে আছে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে বিনিয়োগকারীরা যেমন ভুল বুঝেছে, তেমনি এর উপস্থাপনও ভুলভাবে হচ্ছে। কে বলেছে মিউচ্যুয়াল ফান্ড শেয়ার সরবরাহ বাড়ায়? যেটা বাড়ে সেটা হলো অর্থ। ফলে ছোট্ট এই বাজারে রেগুলেশনের ফাঁককে নিজ পক্ষে ব্যবহার করতে গিয়ে যাঁরা বড় বড় ফান্ড ম্যানেজার সাজছেন, লাভ আপাতত তাঁদেরই হতে পারে মাত্র, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অবশেষে শুধুই ঠকবে। একপর্যায়ে মিউচ্যুয়াল ফান্ড হয়ে পড়বে কেলেঙ্কারির হাতিয়ার এবং সবশেষে পরিত্যাজ্য ফান্ড।
তাই অনুরোধ করব, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে রেগুলেশনকে কড়াকড়ি করার জন্য, বিশেষ করে আমাদের এই বাজার, যে বাজারে বিনিয়োগকারীরা এটাকেও একটা শেয়ার ভেবে নেটওয়ার্থের কয়েক গুণ বেশি মূল্যে খরিদ করছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ডে এত বেশি মূলধনী প্রাপ্যতা ঘটে শুধু আমাদের মতো বাজারেই। প্রায় ২১ লাখ বিনিয়োগকারীর মধ্যে যে সবাই বুঝে-শুনে শেয়ার কিনছে, এমন নয়। অনেকেই শেয়ার কেনার খাতিরে শেয়ার কেনে। অনেকটা লটারির মতো। এতে বড় খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে তারা জিতবে না। এদেরকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে অল্প কিছু চালাক লোক শত কোটি টাকা তাদের পকেটে তুলে নিচ্ছে। ব্যবসা নেই, আয় নেই অথচ কোম্পানি বোনাস শেয়ার দিচ্ছে। এটা রেগুলেটর কীভাবে অনুমোদন দিচ্ছে। শুধু শেয়ার বেচে বড়লোক হওয়ার এই সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তা সমানে বোনাস-রাইট শেয়ার দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দিন পর এরা নোটিশ ছাড়ে, এদের বোনাস শেয়ারগুলো বাজারমূল্যে বেচা হবে। এর থেকে বড় ব্যবসা বাংলাদেশ অর্থনীতিতে আর কোথায় আছে?
* আবু আহমেদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঋণের টাকায় ‘হ-য-ব-র-ল’ করা গুরুতর অপরাধ -লালন শাহ সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি

সুকুমার রায় ‘হযবরল’-এ লিখেছিলেন, ‘ছিল একটা রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল’। বর্তমানে লালন শাহ সেতু নামে পরিচিত পাকশী সেতু প্রকল্পকে আদর্শ হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি বলাই সংগত। কয়েক দফা সংশোধনী আনার পরও, সব খরচ বাড়িয়ে দেখিয়েও বিপুল অর্থের কোনো হদিস দিতে না পারা গুরুতর দুর্নীতি! এক হাজার সাড়ে ২২ কোটি টাকা খরচের অতিরিক্ত প্রায় ১১৫ কোটি টাকার হদিস না থাকা কর্তাব্যক্তিদের যোগসাজশ ছাড়া হওয়া অসম্ভব!
গত আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে পাকশী সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পায় একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। সেই কাজ সম্পন্ন হয় বিএনপি জোট সরকারের দ্বিতীয় আমলের শেষাশেষি। এর মধ্যে প্রকল্প-ব্যয় কয়েক দফা বাড়ানো হয়। সেই বর্ধিত বরাদ্দ একনেকের অনুমোদনও পায়। কিন্তু ২০০৭ সালের জুন মাসে প্রকল্পটি সমাপ্ত বলে ঘোষণার সময় বিপুল অর্থ অব্যয়িত থাকতে দেখা যায়। পরে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রকল্প সংশোধন করে প্রকল্প-ব্যয় ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কমিয়ে দেয়। কিন্তু প্রকল্পের অধীনে তোলা এই টাকা সরকারকে ফেরত দেওয়া হয় না। এই বিপুল অর্থের কোনো হদিসই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দিতে পারেননি। ‘সরকারি মাল, দরিয়া মে ঢাল’ বলে যে জনশ্রুতি রয়েছে, সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তদন্তে মিলল তারই আলামত।
প্রকল্পটির জন্য ঋণ নেওয়া হয়েছিল জাপানের কাছ থেকে। কাজ পেয়েছে চীনা কোম্পানি এবং দুই সরকারের আমলে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেছে দুই মন্ত্রীর দুই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এবং সেই কাজেরই ফল হলো প্রায় ১১৫ কোটি টাকা লোপাট হওয়া! বিদেশি সাহায্য ও ঋণের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এভাবেই দুর্নীতির সুড়ঙ্গ দিয়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু এর চড়াসুদের মাশুল ও খেসারত টানতে হয় জনগণকেই। দুর্নীতি ও বিদেশি সাহায্য অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের পরিপূরক। ২০০০ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশে দুর্নীতিবিষয়ক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ যদি দুর্নীতি কমিয়ে আনতে পারে, তাহলে জাতীয় উত্পাদন দুই থেকে তিন শতাংশ বেড়ে যাবে। বর্তমানে দুর্নীতিতে লোপাট হওয়া অর্থ এবং বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ প্রায় একই। এই পাকশী সেতু প্রকল্পের মতো অজস্র সরকারি প্রকল্প এবং এ-সম্পর্কিত দুর্নীতি এসব ঋণের টাকাতেই হয়ে থাকে। সরকারের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি আমলাতন্ত্র হয় এর সুফলভোগী। তাদের থামাতে সরকারি প্রকল্পগুলোর অর্থব্যয়ে স্বচ্ছতা, কর্তাব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা তাই জাতীয় উন্নয়নেরই জরুরি শর্ত।
কিন্তু কেবল আইনের বলে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাওয়া রশি দিয়ে পাহাড় বাঁধার অভিলাষের শামিল। প্রয়োজন সর্বব্যাপী জনসচেতনতা, প্রতিটি মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি ও সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি। সবকিছুর সঙ্গে আপস করা সম্ভব, কিন্তু দুর্নীতির সঙ্গে নয়। জাতীয় পর্যায়ে দুর্নীতি বরদাশত করা মানে পতনের চোরাবালিতে আরও বেশি করে ডুবতে থাকা।

স্বাস্থ্যনীতির সংস্কারমূলক কিছু প্রস্তাব -স্বাস্থ্যসেবা by মো. আহাদ আলী

মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া জনগণের একটি অন্যতম সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে এ পর্যন্ত ব্যাপক স্বাস্থ্য অবকাঠামো তৈরি এবং জনবল নিয়োগ হলেও আজ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তোলা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের অপ্রতুলতা, দুর্নীতির পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনার ব্যাপক ত্রুটির জন্যই মূলত জনগণ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে অতীতের চেয়ে এখন বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। অতীতে ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো চিহ্নিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাবই ছিল তা সমাধানের প্রধান অন্তরায়।
বর্তমান সরকার নতুন করে স্বাস্থ্যনীতির প্রস্তাবনা জাতির কাছে উপস্থাপন করেছে। এ বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করছে। অতীতেও এমন স্বাস্থ্যনীতির প্রস্তাবনা কম হয়নি। কিন্তু নীতি কখনো খারাপ হয়নি। সমস্যা হয়েছে নীতি বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নিয়ে।
এ অবস্থার অবসানের লক্ষ্যে চিকিত্সাসেবায় নিয়োজিত চিকিত্সকসহ সবার আজ ভাবার অবকাশ নিশ্চয়ই আছে। আট হাজার চিকিত্সকের এ সর্ববৃহত্ ক্যাডার সার্ভিস দিয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে বহুমুখী স্বাস্থ্যসেবা (চিকিত্সাশিক্ষা, হাসপাতাল ও জনস্বাস্থ্যসেবা) একসঙ্গে অব্যাহত রাখা সম্ভব কি? সম্ভব নয় বলেই দেশের বিজ্ঞজন, দাতাগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন মহল থেকে অহরহ দাবি উঠছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংস্কার আবশ্যক। গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে তিনটি অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালনা করা প্রয়োজন।

১. চিকিত্সাশিক্ষা অধিদপ্তর
বাংলাদেশে শিক্ষা আর সেবা একীভূত অবস্থায় অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে না থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মেডিকেল এডুকেশন, হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা একীভূত অবস্থায় পরিচালনার কারণে কোনোটারই মানের উন্নতি হয়নি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবে দিন দিন সেবার মান নিম্নগামী। সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও কৃষিশিক্ষার মতো মেডিকেল শিক্ষাকে পৃথক অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালনা করা আজ অত্যন্ত জরুরি। পৃথক অধিদপ্তর করলে কোনো একাডেমিক অধ্যাপক গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধিকর্তা হয়ে পদে পদে হোঁচট খাবেন না। যোগ্যতা, দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার নিরিখে তিনি মেডিকেল এডুকেশন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা সচিব হতে পারবেন। মেডিকেল এডুকেশন অধিদপ্তরের অধীনে সব গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল কলেজ, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ও আন্ডার গ্রাজুয়েট (NTC, MATS, MTI) চিকিত্সাশিক্ষার প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট টিচিং হাসপাতাল (সব মেডিকেল কলেজ, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হাসপাতাল) নিয়ন্ত্রিত হবে। অন্যান্য শিক্ষা ক্যাডারের মতো একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার ও বিষয়ভিত্তিক সাব-ক্যাডার থাকবে। যেখানে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পরিকল্পনা ও গবেষণা, ক্রয়, সরবরাহসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। মেডিকেল এডুকেশন অধিদপ্তরের চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে জনগণের চাহিদা অনুসারে দক্ষ ও কার্যক্ষম মেডিকেল জনবল তৈরি করা। মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে ক্যাডার সার্ভিসের পরিবর্তে স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এ ছাড়া মেডিকেল শিক্ষার মান সুষম ও উন্নত করতে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কারিকুলাম ও পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করা উচিত।

২. হাসপাতাল সেবা অধিদপ্তর
হাসপাতালের সেবার মান ভালো নয়, সেটা সবাই জানে এবং চিকিত্সকেরাও দ্বিমত করেন না। কিন্তু এর জন্য শুধু চিকিত্সকদেরই দায়ী করা হয়ে থাকে। বিদ্যমান কাঠামোর আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল পরিচালকের পক্ষে সারা দেশের সব হাসপাতাল পরিচালনা করা একটি দুঃসাধ্য কাজ। আর তার ক্ষমতাই বা কতটুকু হাসপাতাল সেবার মান উন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। থানা পর্যায়ের ৩১ বা ৫০ শয্যার সব হাসপাতাল, জেলা পর্যায়ের ৫০, ১০০, ২০০ বা ২৫০ শয্যার সব হাসপাতাল (টিচিং হাসপাতাল ছাড়া) একটি অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালনা করা উচিত। এ অধিদপ্তরের অধীনে একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার এবং বিষয়ভিত্তিক সাব-ক্যাডার (যেমনটি রেল, পিডব্লিউডি ইত্যাদিতে আছে) থাকবে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পরিকল্পনা ও গবেষণা, দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, উচ্চতর ডিগ্রি, ক্রয় ব্যবস্থাপনাসহ যাবতীয় কাজ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। টিচিং হাসপাতাল ছাড়া শয্যাবিশিষ্ট দেশের সব হাসপাতালের পদগুলোকে সাব-ক্যাডারে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। সাব-ক্যাডারের শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং সাব-ক্যাডারে নিয়োগকৃত চিকিত্সকদের মেধাতালিকামোতাবেক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ থাকবে। এ অধিদপ্তরের পদোন্নতির ক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রির পাশাপাশি একই কর্মক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের কর্ম-অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

৩. জনস্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিভাগের কর্মসূচির মুখ্য উদ্দেশ্য অর্জনের একটি কর্মকৌশল হচ্ছে গ্রামপর্যায়ে অত্যাবশ্যক স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ ইএসপি বাস্তবায়ন করা। মূলত, ইএসপি বাস্তবায়নে প্রধান যে বাধা এসেছে তা হলো স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগকে একীভূত করতে গিয়ে যা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। একটি ব্যয়-সাশ্রয়ী, জনমুখী ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা গ্রামপর্যায়ে নিশ্চিত করতে ইএসপি সার্ভিসকে কেন্দ্র করে জনস্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অধীন একজন চিকিত্সা কর্মকর্তা (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও MO (R&CH) কাজ করবেন। উপজেলায় ৩১ বা ৫০ শয্যার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বা নিয়ন্ত্রণ UH&FPO করবেন না। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের জনবল আরএমও বা কনসালট্যান্ট বা সহকারী পরিচালক (হা. সেবা) সে দায়িত্ব পালন করবেন। অনুরূপভাবে জেলার সিভিল সার্জন সদর হাসপাতালসহ উপজেলা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন। তিনি বর্তমান ইএসপি সেবার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও প্রশাসন পরিচালনা করবেন। জেলাপর্যায়ে সিভিল সার্জন বা জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা (পরিবর্তিত নাম) সব উপজেলার কাজকর্মের জন্য দায়ী থাকবেন। তাঁর অধীন তিনজন অতিরিক্ত সিভিল সার্জন বা অতিরিক্ত জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা (পদ সৃষ্টিসাপেক্ষে) দায়িত্ব পালন করবেন। এ অধিদপ্তরের অধীন একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার থাকবে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পরিকল্পনা ও গবেষণা-উপকরণ সরবরাহ, ক্রয়সহ যাবতীয় কাজ জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র এবং স্বাস্থ্য-উপকেন্দ্রগুলোকে একটিতে একীভূত করে সেখানে একটি করে মোট চার হাজার ৫০০ নতুন চিকিত্সা কর্মকর্তা ইএসপির ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিত্সা কর্মকর্তা (ডিজিজ কন্ট্রোল) এবং চিকিত্সা কর্মকর্তা (R&CH) পদ দুটি উচ্চতর পদে (১১ হাজার টাকা স্কেলে) উন্নীত করতে হবে। মেধার ভিত্তিতে এ অধিদপ্তরের নিয়োগকৃত চিকিত্সকেরা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বা পরিকল্পনা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ পাবেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপরিউক্ত তিন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা এক অধিদপ্তর থেকে অন্য অধিদপ্তরে বদলি হতে পারবেন না। পেশাভিত্তিক দেশ-বিদেশের প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গ্রহণ করবেন। তাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের অপচয় হবে না—যেমনটা এখন হচ্ছে। হাসপাতাল সেবা অধিদপ্তরের অধীনে বিভাগীয় পর্যায়ে পরিচালক (হা. সেবা), জেলায় উপপরিচালক (হা. সেবা), উপজেলায় সহকারী পরিচালক (হা. সেবা), আবাসিক চিকিত্সা কর্মকর্তা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন। অনুরূপভাবে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে বিভাগে পরিচালক (জনস্বাস্থ্য), জেলায় সিভিল সার্জন বা জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং উপজেলায় UH&FPO-এর পদকে ডেপুটি সিভিল সার্জন পদে পরিবর্তন করা যেতে পারে।
এ প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
* ডা. মো. আহাদ আলী: বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক।

সব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ চাই -শিক্ষা by রোবায়েত ফেরদৌস

২০০৯ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট চার লাখ ৪২ হাজার ৩৮৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন (প্রথম আলো, ২৩ আগস্ট ২০০৯)। এর সঙ্গে আছেন গতবারের এমন অকৃতকার্যরা, যাঁরা কোনো উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেননি। সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম বর্ষে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিরাট এক ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ নিয়েও অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবেন না কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে।
ভালো ফলের আনন্দ শিক্ষার্থীদের মনে যে ঊর্ধ্বমুখী প্রত্যাশা তৈরি করে, মনের মতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারার বেদনা পরক্ষণেই তাঁদের মনে নিম্নমুখী হতাশার জন্ম দেয়। আর কেবল জিপিএ-৫ কেন, বাকি যাঁরা কষ্ট, মেধা প্রয়োগ করে দু-দুটি পাবলিক পরীক্ষার বৈতরণী পার হলেন, তাঁদের কী হবে? সব আশা-প্রত্যাশা কি থেমে যাবে? তা তো হতে পারে না। এখানে তাই রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। যিনি পড়তে চান না, তাঁর কথা আলাদা; কিন্তু যিনি শিক্ষাজীবনের সামনের উঠোনটা দেখতে পান, খানিকটা আরও সামনে হেঁটে যেতে চান, রাষ্ট্রের উচিত তাঁর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্নযাত্রা, উচ্চশিক্ষাই হতে পারে তাঁর প্রধান মাধ্যম। কাউকে বাদ দিয়ে এ স্বপ্নযাত্রা সম্ভব নয়, এ যাত্রায় সঙ্গী হবে প্রত্যেকে এবং সবাই।
দেশের মোট ২৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (যার মধ্যে আছে সাধারণ, প্রকৌশলী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো) অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির জন্য আসন নির্ধারিত আছে মাত্র এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৮টি আসন। ১৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন আছে দুই হাজার ২৬০; লেদার, টেক্সটাইল, কারিগরি ও বেসরকারি মেডিকেল মিলিয়ে আরও আছে চার হাজার আসন (ভোরের কাগজ, ২৭ জুলাই ২০০৯)। এর বাইরে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৬০ হাজার আসন আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, হাতে গোনা কয়েকটি বাদ দিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগই সার্টিফিকেট বিক্রির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের না আছে নিজস্ব ক্যাম্পাস, না আছে গ্রন্থাগার বা গবেষণাগার। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত বা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালির মাধ্যমে চলছে ওসব। আমরা দেখছি, ভর্তি প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে উচ্চশিক্ষার নামে সনদ বিক্রেতা একশ্রেণীর ভুয়া, অযোগ্য ও অবৈধ প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন খবরের কাগজে চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় বিদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা স্থাপনের যেমন কোনো বৈধতা দেশে নেই, তেমনি সুযোগ নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা স্থাপনের। তাই বলে এ রকম প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন কিন্তু বন্ধ নেই।
এর পরে বাকি থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সারা দেশে এর আওতায় সরকারি অনার্স কলেজ আছে ৪১টি, বেসরকারি অনার্স কলেজ আছে ২০টি, সরকারি মাস্টার্স কলেজ ৬১টি, বেসরকারি মাস্টার্স কলেজ ২৮টি, সরকারি ডিগ্রি কলেজ ১৩৯টি, বেসরকারি ডিগ্রি কলেজ এক হাজার ৪৮টি (যুগান্তর, ৮ আগস্ট ২০০৯)। অঙ্কের হিসাবে এর শিক্ষার্থী সংখ্যা বিশাল, মাথা গুনলে তা হয় এক লাখ ৬০ হাজার; দুঃখজনক যে এ কেবল বৃহত্ পরিমাণকেই নির্দেশ করে, কোনো গুণগত অনুষঙ্গ এখানকার শিক্ষার সঙ্গে যায় না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন এসব তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পঠন-পাঠনের মান, শিক্ষকদের যোগ্যতা, লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরির অবস্থা সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ থেকেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সেখানে সস্তা বা অদরকারি বিষয় খুলে এক সকালে নিজেদের ’বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ ঘোষণা করে দেয়, দেনদরবার করে সরকারি অনুমোদন বের করে নেয়। ‘ব্যস ইহার পর আর কিচ্ছুটি করিবার নাই, মহা ধুমধামে তাহার কার্য চলিতে থাকে। কারণ, জাতিকে শিক্ষিত করিবার গুরুভার তাহার উপরেই ন্যস্ত হইয়াছে।’
আমি মনে করি, কলেজকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা বা একটি ভালো কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করার চিন্তাটিই একটি মস্ত বড় ভুল। এর মধ্য দিয়ে দুটি ক্ষতিসাধিত হয়—এক. ঘোষিত ওই বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ‘হ্যাঙওভার’ কোনো দিনই কাটিয়ে উঠতে পারে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত আর উদার জ্ঞান-চিন্তার যে আবহ, গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির যে আকাঙ্ক্ষা, সেই সংস্কৃতি কোনো দিনই সেখানে গড়ে ওঠে না। দুই. কলেজ হিসেবে যা ছিল ভালো, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় সেখানে উচ্চমাধ্যমিক বা ডিগ্রি পর্যায়ের পঠন-পাঠনেও ধস নামে, আর অনার্স শিক্ষার কী হাল হয়, পাঠক তা জানেন। এ কারণেই বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এসব কলেজে ভর্তি হতে অনাগ্রহ দেখায়; কিন্তু তাদের কোনো গত্যন্তর থাকে না।
তো এই যখন অবস্থা, তখন এর থেকে উত্তরণের উপায় কী? কেউ কেউ সমাধান হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান বিভাগের আসনসংখ্যা বাড়ানো, দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বা দ্বিতীয় শিফট চালু করার প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু এগুলো ভালো কোনো সমাধান নয়। এর মধ্য দিয়ে বরং সমস্যা জর্জরিত বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও বহুবিধ সমস্যায় জড়িয়ে পড়বে। কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যা, অপর্যাপ্ত গবেষণাগার, শ্রেণীকক্ষের অপ্রতুলতার মতো শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অতীব জরুরি সমস্যা মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই এ ক্ষেত্রে বিকল্প প্রস্তাব হচ্ছে, সরকারকে বাংলাদেশের সব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। যেহেতু এর সঙ্গে বিপুল অর্থের বিষয়টি জড়িত, তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে ১০-১৫ বছর মেয়াদে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।
খসড়া হিসেব মতে বাংলাদেশের মোট ২৪টি জেলায় ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। অর্থাত্ ২৪ জেলায় উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান আছে ৪৫টি। খেয়াল করুন, বাকি ৪০টি জেলায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ নেই। কোন জেলায় শিক্ষার হার কেমন, পথঘাট, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যপরিস্থিতি বা আর্থসামাজিক অবস্থা কেমন— এসব বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। যেসব জেলা ওই সব সূচকে পিছিয়ে আছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেখানেই সর্বাগ্রে বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ স্থাপন করতে হবে। এ জন্য বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ রাখতে হবে। মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা কেবল উচ্চশিক্ষার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জাতির স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও জড়িত। মেডিকেল কলেজের শিক্ষা অনুষঙ্গ হিসেবে যেহেতু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়, সেহেতু জেলা পর্যায়ের প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মানও কিছুটা উন্নত হবে ধরা নেওয়া যায়। আমার জানামতে, বিভিন্ন উন্নয়ন সূচক ব্যবহার করে বিবিএসের জেলাভিত্তিক রিপোর্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে জামালপুর ও গাইবান্ধাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রতি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ স্থাপনের যে পরিকল্পনা সরকার নেবে বলে আশা করছি—এ দুটো জেলা থেকেই তার বাস্তবায়ন শুরু করতে পারে।
* রোবায়েত ফেরদৌস: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
robaet.ferdous@gmail.com