Friday, April 10, 2026

নগরে নতুন রেস্তোরাঁ নোঙ্গর, গেছেন কি

মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে আরও জমজমাট মিরপুর এলাকা। বিপণিবিতান ছাড়াও চালু হয়েছে নানা রকম রেস্তোরাঁ। তেমনই একটি নতুন রেস্তোরাঁ ‘নোঙ্গর’। ঘুরে এসে লিখেছেন হুমায়রা মাহজাবিন

ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মিরপুর–১২–তে একটু সামুদ্রিক আবহ নিয়ে হাজির হয়েছে নোঙ্গর। বন্ধু বা পরিবার–পরিজন নিয়ে খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি ছবি তোলা কিংবা নিরিবিলি বসে আড্ডা দেওয়ার চমৎকার একটি জায়গা। ‘নোঙ্গর’ শব্দটি শুনলেই মনে হয় সমুদ্র বা গভীর নদীর কথা। তাই হয়তো সামুদ্রিক আবহকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে নোঙ্গর। বিশাল জলরাশির বুকে দুলতে থাকা জাহাজ যেমন শেষমেশ নোঙর ফেলে শান্ত হয়, তেমনি নোঙ্গর রেস্তোরাঁটিও যেন ব্যস্ত নাগরিকদের কিছুটা সময়ের জন্য গেড়ে বসার জায়গা।

যেন জাহাজের ডেক

২০২৫ সালে উদ্বোধনের পর থেকে রেস্তোরাঁটি নিয়ে ফেসবুকে অনেক ভিডিও চোখে পড়েছে। সেসব থেকে একটা ধারণা মিললেও রেস্তোরাঁটিতে যাওয়ার পর আরও অভিনব মনে হয়েছে। পল্লবী মেট্রোস্টেশনের কাছেই একটি ভবনের ছাদে প্রায় ছয় হাজার বর্গফুট জায়গাকে নোঙ্গর হিসেবে গড়ে তুলেছেন স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার রাজাউল করিম। রেস্তোরাঁর প্রতিটি অংশকে সাজিয়েছেন ছবি তোলার উপযোগী করে। রেস্তোরাঁর যেদিকেই দাঁড়ান কিংবা বসেন, ছবি হবে ‘ফাটাফাটি’।

নোঙ্গরের জেনারেল ম্যানেজার মহিউদ্দীন ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সমুদ্রের সজীবতাকে প্রাধান্য দিয়ে নোঙ্গরকে সাজানো হয়েছে। তাই রোদ, বৃষ্টি—সবকিছু উপভোগের ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। এ ছাড়া রেস্তোরাঁর সজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে প্রচুর গাছ।

মার্বেল পাথরের সিঁড়ি আমাদের পৌঁছে দেয় ভবনের একদম ওপরে, যেখান থেকে ব্যস্ত শহরের পাশাপাশি মেট্রোরেল চলাচলের দৃশ্য সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়। নুড়িপাথর আর সবুজ কার্পেটের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছ।

রুফটপ রেস্তোরাঁটিকে দুই অংশে ভাগ করে সাজানো হয়েছে। এক পাশে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, অন্য পাশ পুরোপুরি খোলা। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অংশে পায়ের নিচে কাঠের মেঝে দেখে মনে হতেই পারে কোনো জাহাজের ডেক। এই কক্ষের সাজসজ্জা অবশ্য সেই চিন্তায় কিছুটা পরিবর্তন আনবে। উঁচু সিলিংয়ের নিচে প্রতিটি পাশে একেক ধরনের জিনিস। জাহাজের কলকবজা দিয়ে সাজানো একদিকের দেয়াল। কলকবজার সঙ্গে সময়ের মেলবন্ধন ঘটাতে রাখা হয়েছে বড় একটি ঘড়ি। আরেক পাশের দেয়ালে একটি এলইডি স্ক্রিনে নারকেলগাছের সারি। সমুদ্রতীরের আবহ আনতেই এমন দৃশ্যের আয়োজন। অন্দরসজ্জাকে আরও মনোমুগ্ধকর করতে বিভিন্ন ফুলের গাছ ও লাইটের ব্যবহার চোখে পড়ে।

খোলা অংশ

আকাশের নিচের খোলা অংশটিকে বলা যায় রুফটপ রেস্তোরাঁটির মূল আকর্ষণ। এখানে প্রবেশ করলেই প্রথমে চোখে পড়ে একটি পানির ফোয়ারা। সন্ধ্যার আগে আগে ফোয়ারাটি চালু করা হয়, বাহারি আলোর সঙ্গে মিশে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ। ফোয়ারাকে ঘিরে মার্বেল পাথরের সিঁড়ি। সিঁড়িগুলোকে যেন আঁকড়ে ধরে আছে আয়না। সিঁড়ি ও আয়না দিয়ে তৈরি কাঠামোটি যেন ফোয়ারাটিকে আগলে রেখেছে। সন্ধ্যার পর খেতে আসা অতিথিরা সিঁড়ি ও আয়নাকে কেন্দ্র করে ছবি তোলায় ব্যস্ত।

ফোয়ারার কাঠামোতে ইংরেজিতে লেখা ‘Water’, ‘Rain’, ‘Mud’, ‘Stone’, ‘Air’, ‘Cloud’, ‘Soil’, ‘Nongor’, ‘Clay’, ‘Life’, ‘Earth’, ‘Fountain’, ‘Tree’, ‘Grass’, ‘Sky’, ‘Plant’  ইত্যাদি শব্দ। প্রতিটি শব্দই প্রকৃতির একেকটি উপাদান, যার সঙ্গে আছে নোঙ্গর। ছাদের এক প্রান্তে সাগরপাড়ের ছাতাসমেত বসার জায়গার আদলে বসার ব্যবস্থা। নুড়ি বিছানো পথ যেন সমুদ্রের তীরে পৌঁছে দিচ্ছে। ছাতার নিচে এমন খোলা জায়গায় বসেও এক বেলা কাটিয়ে দেওয়া যায়।

রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতি শুক্র ও শনিবার এখানে বিশেষ আয়োজন থাকে। খেতে খেতে উপভোগ করা যায় লাইভ মিউজিক। আয়োজনটির জন্য রেস্তোরাঁর সামনের দিকেই আছে একটি মঞ্চ। যার ওপরে রাখা নোঙর বুঝিয়ে দেয় আপনি এখন কোথায় আছেন। মঞ্চের পাশে সাবেকি ঘরানার গাড়ি আর বাগানবিলাস ফুলের মিতালি তৈরি করেছে পুরোনো দিনের আবহ। দর্শনার্থীদের অনেকেই সে আবহ নিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত।

অন্দরসজ্জা নিয়ে তো অনেক কথাই হলো, এবার খাবারের মেনুটা একটু জানা যাক। এখানে একাধিকবার খেতে আসা অতিথিদের কাছ থেকে জানা গেল, খাবারও ভালো। খাবার ভালো বলার কারণ হলো, ঊর্ধ্বগতির বাজারে মোটামুটি সাশ্রয়ী মূল্যেই উপভোগ করা যাবে থাই, ইন্ডিয়ান বা কন্টিনেন্টাল খাবার। যেহেতু সমুদ্রকে মাথায় রেখে নোঙ্গরের যাত্রা, তাই মেনুর বড় অংশজুড়ে আছে সামুদ্রিক খাবারের পদ।

রেস্তোরাঁটির খোলা অংশে দিনের বেলা রোদ, আলো-বাতাস নিয়ে একধরনের আবহ থাকে, রাতের বেলা আবার কৃত্রিম আলোকসজ্জায় তৈরি হয় ভিন্ন আবহ।

সামুদ্রিক আবহকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে নোঙ্গর
সামুদ্রিক আবহকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে নোঙ্গর। ছবি: লেখক


মালদ্বীপে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের স্কুবা ডাইভিং শেখান হবিগঞ্জের মহব্বত আলী

স্কুবা ডাইভিং সেন্টারে আট মাসের বেশি সময় আছেন, তবু শখ করে কোনো দিন ডাইভিং করেননি মহব্বত আলী। তাঁর এই পানিভীতির কথা তত দিনে সেন্টারের সবার জানা হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে এটা নিয়ে খোঁচাও হজম করতে হয়। তাতে অবশ্য মহব্বতের কিছু যায় আসে না—যা করতে ভয় লাগে, সেটা তিনি কেন করবেন!

একদিন অবশ্য মহব্বতকে সাগরে ডুব দিতেই হলো। দিনটি ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি। মহব্বত আলীর ২৬তম জন্মদিন। তিনি যে রিসোর্টের ডাইভিং সেন্টারে কাজ করেন, তার ব্যবস্থাপক মাত্তেও মনতানারির কড়া নির্দেশ, ‘মহব্বত, আজ তোমাকে পানিতে নামতেই হবে।’ ইতালীয় বসের এমন নির্দেশেও মহব্বত পানিতে নামতে চাইলেন না। তবে সেন্টারের অন্যরাও অনড়, মহব্বতকে ধরে জেটিতে নিয়ে গেল সবাই। তারপর ডাইভিং স্যুট, মাস্কসহ অন্য উপকরণ পরিয়ে ফেলে দিল পানিতে। শুরুতে ভয় পেলেও পরে মহব্বত বুঝলেন এ তো মজার খেলা। এরপর একে একে অন্য সহকর্মীরা নামলে বেশ আনন্দ করলেন সেদিন।

সেই থেকে নোনাপানির সঙ্গে সখ্য। প্রায়ই পানিতে নামেন। ডাইভিংয়ের চেষ্টা করেন। মনে মনে ভাবেন, যদি ডাইভিং শিখতে পারতাম! এমনই একদিন সেই ব্যবস্থাপকই মহব্বতকে প্রস্তাব দিলেন, ‘তুমি ডাইভিংয়ের প্রাথমিক কোর্সটা করে ফেলো।’

কিন্তু কীভাবে? এ জন্য ফি লাগবে, যেতে হবে অন্য সেন্টারে। মহব্বত বলেন, ‘তারও সমাধান করলেন ম্যানেজার। আমাদের রিসোর্টে পারফম্যান্সের ওপর কর্মীদের কাউকে ছুটি দিত, কাউকে দিত বোনাস। সেবার আমাকে আমার বস ছুটিসহ এই কোর্স করার সুযোগ দিলেন।’

সাত দিনের ছুটিতে পাশের একটি ডাইভিং সেন্টারে গিয়ে ‘ওপেন ওয়াটার ডাইভিং কোর্স’ করলেন মহব্বত। দক্ষতার সঙ্গে কোর্সটা করায় প্রশিক্ষকের বাহবা পেলেন, আর পেলেন নির্দেশনা, ‘তুমি চাইলে কিন্তু ডাইভমাস্টার হতে পারো, আমরাও তো ধীরে ধীরেই শিখেছি।’

ভীষণ অনুপ্রাণিত হলেন মহব্বত। তারপর দিনে দিনে নিজের ভাষাগত দক্ষতাও বাড়ালেন। ইংরেজির পাশাপাশি শিখতে থাকলেন ইতালীয় ভাষা। সেন্টারে তাঁর দায়িত্বও বাড়ল। জোগালির কাজ ছেড়ে অতিথি অভ্যর্থনা, তাদের চাহিদা অনুযায়ী সরঞ্জাম সরবরাহ আর সেসব বুঝিয়ে নেওয়ার কাজ তাঁর ওপর বর্তাল। এ দিকে তাঁর মাথায় ডাইভিংয়ের পোকাটা ভালোভাবেই বাসা বেঁধেছে। অ্যাডভান্সড ওপেন ওয়াটার কোর্সটা এবার করতে হবে। সেন্টারে বললেন নিজের আগ্রহের কথা। মহব্বতের বেতন থেকে মাসে মাসে কেটে নেওয়ার শর্তে তাঁকে সেই কোর্সেও পাঠানো হলো।

কোর্স শেষে মহব্বত এবার স্কুবা করতে আসা পর্যটকদের ব্রিফ করা, তাদের গাইড করে সমুদ্রে নেওয়া শুরু করলেন। সেখানে ডাইভমাস্টারের হাতে তুলে দিয়ে নিজে বোটে বসে বসে দেখতেন আর ভাবতেন তিনিও কবে ডাইভমাস্টার হবেন। এরপর রেসকিউ কোর্স করলেন। বেতন বাড়ল, বাড়ল দায়িত্ব। মাত্তেও মনতানারি রিসোর্ট পরিবর্তন করে অন্য একটি রিসোর্টে গেলেন। মহব্বত আগের রিসোর্টেই থেকে গেলেন। তবে সাবেক বসের ডাক পেয়ে মহব্বত গেলেন তাঁর কাছে। এই বসের সহযোগিতায় ২০১৯ সালে স্নোরকেলিং ইনস্ট্রাক্টর কোর্স করে একই পদে নিয়োগ পান।

‘স্নোরকেলিং হলো সমুদ্রের পানিতে ভেসে ভেসে নিচে দেখা। কিন্তু আমার আগ্রহ তো স্কুবাডাইভিং, চেষ্টা করছিলাম ডাইভমাস্টার কোর্সে ভর্তি হওয়ার।’ বলেন মহব্বত।

২০২০ সালে ডাইভমাস্টার কোর্সে ভর্তি হন মহব্বত। কোর্স শেষে স্কুবা স্কুল ইন্টারন্যাশনাল (এসএসআই) থেকে পেশাদার ডাইভমাস্টার সনদও পেলেন। তত দিনে দেশে ফিরে গেছেন মাত্তেও। মহব্বতও খুঁজে নিলেন নতুন গন্তব্য—ইউ অ্যান্ড মি মালদ্বীপ। সেই থেকে ডাইভমাস্টার হিসেবে এই অভিজাত রিসোর্টেই আছেন।

হবিগঞ্জ থেকে মালে

২০০৯ সালে এক বন্ধুর বড় ভাইয়ের মাধ্যমে কাজের খোঁজে মালদ্বীপে যান মহব্বত আলী। কিন্তু দেশটিতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। রিসোর্টে কাজের কথা বলে নিয়ে গেলেও কোনো কাজ দেওয়া হচ্ছিল না। দিন দশেক কেটে যাওয়ার পর মালের একটি ছোট্ট কাপড়ের দোকানে বসানো হয় মহব্বতকে। বিক্রয়কর্মীর কাজ। কিছু একটা তো করতে পারছেন, এই ভেবেই খুশি মহব্বত। তবে মাস শেষে বাধল বিপত্তি। মালিকের কাছে বেতন চাইলে তিনি জানান, মহব্বত তাঁর কর্মী নন, তৃতীয় পক্ষের কাছে বেতন বুঝিয়ে দিয়েছেন।

যা টাকাপয়সা নিয়ে গিয়েছিলেন, তত দিনে সব শেষ। কষ্টেসৃষ্টে চলেন, গোডাউনের মতো একটা ঘরে থাকেন। কাপড়ের দোকানের মালিক একদিন তাঁকে নিজের কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন। নিয়োগের মাস দুয়েক পর প্রথম বেতন পান মাত্র ১০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১০ হাজার টাকা)। কয়েক মাস পর দোকানের ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে চলে যায়। দোকানের মালিক মহব্বতের ওপর নির্ভর করতে চান। তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কম্পিউটার চালাতে পারে কি না। মহব্বতের সেই দক্ষতা আছে। তাঁকে ম্যানেজার পদের প্রস্তাব দেওয়া হলো। প্রস্তাব পেয়ে তিনিও খুশি। মালিক শিখিয়ে নেন কীভাবে বিল করতে হবে, ডিসকাউন্ট কীভাবে সমন্বয় করতে হয় ইত্যাদি দরকারি কাজ।

২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর আর পড়াশোনা এগোয়নি। ঢাকায় দুবার এসে দুটি বিমা কোম্পনিতে চাকরি করে আবার হবিগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান মহব্বত আলী। তারপর বাবার মুদিদোকান আর পরে নিজের সিডি–ডিভিডির দোকান সামলেছেন। এসব কাজের অভিজ্ঞতাও মালদ্বীপে কাপড়ের দোকান সামাল দিতে কাজে দিল। এভাবে বছরখানেক কাজ করার পর সেই বন্ধুর কল, ‘একটা রিসোর্টের ডাইভিং সেন্টারে কাজ আছে। প্রশিক্ষকের সহকারী।’

মহব্বতের কাছে কাজের ধরনের চেয়ে বড় কথা রিসোর্টে কাজ করতে পারবেন। বললেন, ‘রাজি।’

কাপড়ের দোকানের চাকরি ছেড়ে ডাইভিং সেন্টারে যোগ দিলেন। মহব্বত বলছিলেন, ‘দোকানের মালিক আমাকে ছাড়তে চাইছিলেন না। বেতন বাড়ানোরও প্রস্তাব দিলেন। কারণ, কয়েক মাসে তাঁর দোকানে চোখে পড়ার মতো বিক্রি বেড়েছিল। কিন্তু আমি তাঁকে বোঝালাম, রিসোর্টের কাজটাই আমি করতে চাই।’

সেই রিসোর্টে গিয়েই জলের দুনিয়ার সন্ধান পেলেন মহব্বত। রোমাঞ্চকর সেই দুনিয়ায় নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন।

২০১৪ সালে বিয়ে করেছেন মহব্বত। দুই সন্তান নিয়ে হবিগঞ্জেই থাকে তাঁর স্ত্রী। মহব্বত আলী বলেন, ‘যখন বিয়ে করি, তখন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছি। স্ত্রী–সন্তানদের সেভাবে মালদ্বীপে আনতেও পারিনি। এখন সবাইকে নিয়ে ভালো আছি।’

ডাইভমাস্টার হিসেবে প্রতি মাসে এখন তাঁর আয় ২ থেকে ৩ হাজার মার্কিন ডালার। আয়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজটার প্রতি দরদও বেড়েছে। তিনি বললেন, ‘একসময় পানি ভয় পেতাম, এখন এই পানিই আমার সবচেয়ে আপন।’

ডাইভমাস্টার হিসেবে এক অভিজাত রিসোর্টে কাজ করেন মহব্বত আলী
ডাইভমাস্টার হিসেবে এক অভিজাত রিসোর্টে কাজ করেন মহব্বত আলী। ছবি: মহব্বত আলীর সৌজন্যে

মিরপুরের চিড়িয়াখানায় বাঘ-গন্ডারসহ ১৩৭ প্রজাতি, সবচেয়ে বেশি নিশিবক–কানিবক by প্রদীপ সরকার

খাঁচার ভেতর খুনসুটিতে মেতেছে বাঘের ছানা, একটু দূরেই হেলেদুলে হাঁটছে এশীয় হাতি। পাখির খাঁচায় দোল খাচ্ছে বর্ণিল ম্যাকাও। রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় গেলে এমনই এক বৈচিত্র্যের দেখা মেলে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কালো ভালুক, হায়েনা, হাতি, জলহস্তী, ক্যাঙ্গারু, অজগর, ঘড়িয়াল থেকে শুরু করে উটপাখিসহ এখানে রয়েছে ১৩৭ প্রজাতির পশু, পাখি ও মাছ।

প্রথম আলোকে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, বৃহৎ প্রাণী, মাংসাশী, ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি ও অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ মিলিয়ে এখানে মোট প্রাণীর সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৩। দেশের আর কোনো চিড়িয়াখানা কিংবা সাফারি পার্কে একসঙ্গে এত প্রাণীর দেখা মেলে না।

জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর মো. আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এখানে বৃহৎ প্রাণী, সরীসৃপ, ক্ষুদ্র প্রাণী থেকে শুরু করে অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ—সব প্রদর্শন করা হয়। এত প্রজাতি দেশের অন্য কোনো সাফারি কিংবা চিড়িয়াখানায় প্রদর্শিত হয় না।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রজাতির দিক থেকে এখানে সবচেয়ে বেশি রয়েছে পাখি। উটপাখি, ইমু, হাড়গিলাসহ ৬১ প্রজাতির পাখি রয়েছে এখানে। এশীয় হাতি, জিরাফ, আফ্রিকান গন্ডার, জলহস্তীর মতো বৃহৎ প্রাণী আছে ১৯ প্রজাতির। আর রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সাদা সিংহ, এশীয় কালো ভালুকের মতো মাংসাশী প্রাণী আছে ৯ প্রজাতির।

তবে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে নিশিবক বা ওয়াক, কানিবক ও চিত্রা হরিণ। এর মধ্যে নিশিবক ৫২৪টি, কানিবক ৩৮৫টি ও চিত্রা হরিণ রয়েছে ২৯৩টি।

প্রধান আকর্ষণ মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীরা

জাতীয় চিড়িয়াখানার কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, এখানে ৪৮ প্রজাতির ৬৩১টি প্রাণী রয়েছে।

দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীরা। এখানে মাংসাশী ৯টি প্রজাতির ৩৮টি প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে ১৬টি। সম্প্রতি বাঘ দম্পতি বেলি ও টগর চারটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে তিনটিই সাদা (অ্যালবিনো)। এ ছাড়া রয়েছে ১টি আফ্রিকান সাদা সিংহ, ৩টি আফ্রিকান সিংহ, ৬টি শেয়াল, ৪টি এশীয় কালো ভালুক, ১টি চিত্রা হায়েনা ও ২টি ডোরাকাটা হায়েনা। রয়েছে ৩টি মেছো বিড়াল এবং ১টি বনবিড়াল।

তৃণভোজী প্রাণী রয়েছে ১৯ প্রজাতির, যাদের মোট সংখ্যা ৩৮৭। এর মধ্যে এশীয় হাতি ৫টি এবং জলহস্তী আছে ১২টি। দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ জিরাফ রয়েছে ৭টি, যার মধ্যে সম্প্রতি একটির জন্ম হয়েছে। দেশে বিপন্নতার ঝুঁকিতে থাকা গয়াল আছে ২টি।

একটি আফ্রিকান গন্ডারের পাশাপাশি তৃণভোজী প্রাণীর তালিকায় আরও আছে ক্যাঙ্গারু, লামা, ওয়াইল্ডবিস্ট, কমন ইল্যান্ড, ওয়াটার বাক, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, গাধা, ইম্পালা, এক কুঁজওয়ালা উট, ভেড়া, দেশি ও আরবি ঘোড়া। এর মধ্যে অনেক প্রাণীই আফ্রিকান, যা চিড়িয়াখানার বাইরে দেখার সুযোগ এ দেশে নেই।

বানর, সরীসৃপ ও অন্যান্য

চিড়িয়াখানায় নানা প্রজাতির বানরও দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা। এর মধ্যে রয়েছে অলিভ বেবুন, হামাদ্রিয়াস বেবুন, ভারভেট বানর, উল্লুক, রেসাস বানর, হনুমান, লেঙ্গুর ও কুলু বানর। সবচেয়ে বেশি রয়েছে রেসাস বানর, যার সংখ্যা ৬৫। কুলু বানর, উল্লুক ও হামাদ্রিয়াস বেবুন রয়েছে একটি করে। এ ছাড়া সজারু, গিনিপিগ, খরগোশ, উদ বা ভোঁদড় ও ডিগলেঞ্জির দেখাও মিলবে এখানে।

সরীসৃপের মধ্যে কুমির আছে দুই প্রজাতির। মার্শ কুমির ও ইস্টুয়ারিন (লোনা পানির) কুমির। মার্শ কুমির রয়েছে ২টি এবং ইস্টুয়ারিন কুমির রয়েছে ৪টি। চিড়িয়াখানায় অজগর সাপ রয়েছে ৩১টি। আছে ২টি কোবরা বা গোখরা সাপ। আরও দেখা মিলবে ঘড়িয়াল, কচ্ছপ, দাঁড়াশ সাপ ও শঙ্খিনীর।

পাখির কলকাকলিতে মুখর

পাখির সংগ্রহে বেশ সমৃদ্ধ জাতীয় চিড়িয়াখানা। এখানে ৬১টি প্রজাতির ১ হাজার ৯১২টি পাখি রয়েছে। পাখি হলেও উড়তে পারে না এমন ৬টি উটপাখি, ২৩টি ইমু এবং ১টি কেশোয়ারি রয়েছে এখানে।

উড়তে পারা পাখিদের মধ্যে নজর কাড়ে নীল ও সাদা ময়ূর। এই দুই প্রজাতির ময়ূর রয়েছে ১৫২টি। দেখা মিলবে হাড়গিলা, কালো গলা বক, কালেম, নিশিবক, কানিবক, গো-বক, ছোট পানকৌড়ির। লেসার পেলিক্যান, গ্রেট হোয়াইট পেলিক্যান, গ্রেটার ফ্লেমিংগো, টার্কি ও ইন্ডিয়ান সারস ক্রেন প্রজাতির পাখিও রয়েছে। চার প্রজাতির কবুতরের (জালালি, ফ্রিলব্যাক, গিরিবাজ ও দেশি) পাশাপাশি তিন প্রজাতির টিয়া (লাল গলা ১১টি, হিরামন ১৬টি ও হলুদ ৫টি) রয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যে ‘শঙ্খচিল’-এর খোঁজ মেলে, সেই পাখি চিড়িয়াখানায় আছে ৪টি। ভুবনচিল, তিলাবাজ ও কুড়াবাজও দর্শনার্থীদের মন কাড়ে। এখন প্রকৃতিতে শকুন দেখা কঠিন। চিড়িয়াখানায় ২ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা শকুন রয়েছে ২টি এবং গ্রিফন শকুন ৩টি।

এ ছাড়া সাদা কাক, রাজ ধনেশ, ময়না, সাতভায়লা, গো-শালিক, গাঙশালিক, চকোর, মুনিয়া ও মাছরাঙার দেখা মিলবে। বিদেশি পাখির মধ্যে বাজরিগার, সাদা ককাটিল, ধূসর ককাটিল, ফিশার লাভ বার্ড, পিংক লাভ বার্ড, আলেকজেন্দ্রিন প্যারাকিট, টারকুইজ প্যারাকিট, প্যারাডাইজ শেলডাক, সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া, রেড টেল ব্ল্যাক কাকাতুয়া, গোল্ডেন প্যারাকিট ও ফেস্টিভ অ্যামাজন রয়েছে। আছে নানা রঙের ম্যাকাও—স্কারলেট, রেড অ্যান্ড গ্রিন, ব্লু থ্রোটেড, রেড ফ্রন্টেড, মিলিটারি, হায়াসিন্থ ও রুবালিনা ম্যাকাও।

মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম

জাতীয় চিড়িয়াখানায় ২৮ প্রজাতির ৯৮০টি অ্যাকুয়ারিয়াম ফিশ বা মাছ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে গাপ্পি (৩২০টি)। এ ছাড়া টাইগার শার্ক, সাকিং ক্যাটফিশ, গোল্ড ফিশ, ওরেন্ডা ফিশ, কমেট ফিশ, অ্যাঞ্জেল ফিশ, অ্যালবিনো শার্ক, রেইনবো শার্ক, টাইগার কই কার্প, কই কার্প, সিল্কি কই কার্প, সাকিং ক্যাটফিশ (সাদা), শিং মাছ, টাইগার বার্ব, কিসিং গোরামি, ব্লু গোরামি, টেলিচো, ক্যাটফিশ, রেড টেইল ক্যাটফিশ, অস্কার, কচ্ছপ, সিলভার ডলার, পিরানহা, সিলভার শার্ক, বাটারকোফেরি ফিশ, মুনরাইজ ফিশ ও বারবট রয়েছে।

চিড়িয়াখানায় থাকা এসব প্রাণী একে অপরের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। তবে নতুন প্রাণী যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিউরেটর আতিকুর রহমান বলেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে নতুন প্রজাতি এখানে যোগ করা যাচ্ছে না। যেমন স্লথ বা অরিক্সের মতো প্রাণীর প্রতি দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।

ঢাকার মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় হরিণের বিচরণ দেখতে ভিড় জমে দর্শনার্থীদের
ঢাকার মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় হরিণের বিচরণ দেখতে ভিড় জমে দর্শনার্থীদের। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

লালনের কোন গানটি ফরিদা পারভীনকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিত

লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন চলে গেছেন গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শনিবার রাতে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে লালনের নানা ধরনের গান গেয়ে খ্যাতি পেয়েছেন দেশে–বিদেশে। তবে শিল্পী নিজের পছন্দের গান কোনগুলো? লালনের কোন গানগুলো তাঁকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিত।

শুরুতে গাইতেন নজরুলসংগীত। তবে এক নাটকীয় ঘটনা তাঁকে নিয়ে আসে লালনের গানে।

প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফরিদা পারভীন বলেছিলেন, ‘কুষ্টিয়ায় স্থানীয় এক হোমিও চিকিৎসক আমার গানের বেশ মুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন। কিন্তু কেন জানি তিনি আমার কণ্ঠে লালনগীতি শুনতে চাইতেন! তাঁর মনে হতো, লালনের গান আমার কণ্ঠে বেশি ভালো লাগবে। তাই হঠাৎ করেই আমাকে একদিন লালন ফকিরের গান শেখার পরামর্শ দেন। কিন্তু শুরুতে লালনের গান গাইতে চাইনি। আমার এই অনীহা দেখে বাবা আমাকে অনেক বুঝিয়ে গান শেখার জন্য রাজি করান। বলেন, “ভালো না লাগলে গাইবি না।” এই শর্তে রাজি হই এবং লালনসংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করি। “সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন” লালনের বিখ্যাত গানটি শিখি। একই বছর দোলপূর্ণিমা উৎসবে গানটি গাইলে শ্রোতারা আমাকে লালনের আরও একটি গান গাইতে অনুরোধ করেন। তখন আমি গান গাইতে অসম্মতি জানাই। শ্রোতাদের বলি, “আমি একটি গান গাইতে শিখেছি। এটাই ভালোভাবে গাইতে চাই।” এ গানই আমার নতুন পথের দিশা হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে বুঝতে শিখি, কী আছে লালনের গানে। তাঁর গানে মিশে থাকা আধ্যাত্মিক কথা ও দর্শন আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এ পর্যায়ে অনুভব করি, লালন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অনবদ্য এক স্রষ্টা হয়ে উঠেছেন। এটা বোঝার পর লালনের গান ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারি না।’

লালনের কোন গানগুলো সবচেয়ে পছন্দ—একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফরিদা পারভীন বলেছিলেন, ‘সাঁইজির সব গান কিন্তু আমি করিনি আজ পর্যন্ত। কিছু গান যেগুলো করেছি, সেগুলো একেবারে ভাববাদী গান, যেগুলো আমাকে নাড়া দেয়।’ সবেচেয়ে বেশি কোন গানটি নাড়া দেয়—এমন প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী বলেছিলেন, ‘মায়ের কাছে কিন্তু সব সন্তানই সমান। হাতের পাঁচ আঙুলের মধ্যে যেটিতে আমি কামড় দেব সেটিতে কিন্তু ব্যথ্যা পাব। “সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন” গানটির সঙ্গে অন্য রকম আবেগ জড়িয়ে আছে, প্রথম গান তো।’
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্ম নেওয়া ফরিদা পারভীন গানে গানে কাটিয়েছেন ৫৫ বছর। দেশে–বিদেশে পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও সন্মাননা।

ফরিদা পারভীন
ফরিদা পারভীন। প্রথম আলো