Wednesday, January 30, 2019

পাখির কলকাকলি আর ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত সোনারচর by জোবায়ের হোসেন

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পর্যটন কেন্দ্রগুলো অন্যসব ঋতুর তুলনায় শীতে বেশি সজ্জিত থাকে। পর্যটকরাও ভ্রমণের জন্য বেছে নেয় এ সময়কে। এই শীতেও ডানা মেলেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে থাকা সোনারচরের প্রকৃতি। দ্বীপটিতে উড়ে আসা অতিথি পাখিদের কলকাকলি সমুদ্র সৈকতের অপরূপ শোভাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অতিথি পাখির কলরব আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে সোনারচরের পরিবেশ। সাগরের আছড়ে পড়া ঢেউগুলোও কোনো চিত্রশিল্পীর রঙ তুলির পরশ মনে হয়। ফেনিল নোনা জলে ভেজা তটরেখায় চলে লাল কাঁকড়াদের ছোটাছুটি। সামান্য দূরেই ঝাউ বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ।
ঝাউ গাছের ঝরা পাতাগুলো শুকনো বালুর ওপর যেন কার্পেটের নরম বিছানায় পরিণত হয়ে আছে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের যাবতীয় আয়োজন রয়েছে এ দ্বীপটিতে। নদী আর সাগরের জল আছড়ে পড়ছে এ দ্বীপের চারপাশে। সোনার চরের চিকচিক বালুতে যেন ভোরের কোমল সূর্য আলো ছড়ায়। অস্তগামী সন্ধ্যার লালিমা তেমনি মায়া ঢালে নিভৃতে। অপরূপ সোনারচর স্বর্ণালী স্বপ্নের মতোই বর্ণিল শোভায় ঘেরা। অন্তত একবার এসে ঘুরে দেখুন দেশের ভেতর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই দ্বীপটিকে।
আয়তন ও আকৃতি: ভূ-খণ্ড পরিমাপের হিসাবে সোনারচরের আয়তন ১০ হাজার একর। চরটি দেখতে অনেকটা বাদামের দানার আকৃতির মতো। সোনারচর ও এর পার্শ্ববর্তী চর আন্ডার মাঝখানে একসময় বড় নদী ছিল। চর পড়ে সে নদী এখন ছোট হয়ে গেছে। শুকনো সময়ে হেঁটেই পার হওয়া যায়। সোনারচর চ্যানেল সরু হয়ে গিয়ে বনের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়াও অগণিত চ্যানেল রয়েছে সোনারচরের আশপাশে। পর্যটকরা ঘুরতে পারেন নৌকা অথবা ট্রলার নিয়ে। চ্যানেলের দুই পাশ জুড়ে বহু পুরনো ম্যানগ্রোভ আর ঝাউ বন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি চরের কোল ঘেঁষে অবস্থান মৌসুমি জেলে ও জেলে শ্রমিকের। এই শীত মৌসুমে নানা স্থান থেকে ব্যবসার জন্য এই চরটিতে আশ্রয় নেয় অগণিত জেলে।
যাওয়ার পথ: প্রথমে পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে গলাচিপা উপজেলায় পৌঁছাতে হবে যেকোনো দর্শনার্থীকে। সেখান থেকে যেকোনো ভাড়া মোটরসাইকেল বা অন্য মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে আগুনমুখা নদীর মোহনায়। আগুনমুখার তীরে পৌঁছালে বুড়াগৌরাঙ্গ ও দাঁড়ছিড়া নদী পাড়ি দিতেই দু’পাশ জুড়ে ঘন ম্যানগ্রোভ বনের দৃশ্য  যে কারো মনকে দ্বিগুণ প্রাণবন্ত করে তুলবে। ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখার মোহনা থেকে ঘণ্টা দুয়েক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপ ‘চর তাপসী’। তাপসীর দুই পাশ জুড়ে বিরল দৃশ্য অতিক্রম কালেই সোনারচরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ দক্ষিণে এগুলেই সোনারচর। স্পিডবোটের ব্যবস্থা রয়েছে। বিত্তবানরা যেতে পারেন স্পিডবোট নিয়েও। এ ছাড়াও রয়েছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে সোনারচর যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে স্পিডবোটযোগে সোনারচরে পৌঁছাতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগবে। আবার কুয়াকাটা থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সোনারচরে যাওয়া যায়।
থাকার জায়গা: সোনারচরে রাত যাপনের জন্য নিরাপদ আরামদায়ক ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে, প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ছোট্ট তিন কক্ষের একটি বাংলো। রয়েছে বন বিভাগের ক্যাম্প। এসব স্থানে রাতে থাকার সুযোগ রয়েছে। চাইলে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যে চরমোন্তাজ ইউনিয়নে গিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে। সেখানে রয়েছে বন বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা স্যাপ বাংলাদেশ ও মহিলা উন্নয়ন সমিতির বাংলো।
সরজমিন সোনারচরের নিকটবর্তী একটি বাজারে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপচারিতা সম্ভব হয়। তাদের দাবি একটাই, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে এই চরের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে হবে। সোনারচরকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার দাবি জানিয়ে তারা বলেন, যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে এটি হবে
দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এখানে পর্যটকদের ভিড় জমবে। পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারেন। পর্যটকরা সোনারচরের পাশেই জাহাজমারা, তুফানিয়া ও শিবচরসহ আরো কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। জানতে চাইলে পটুয়াখালী-৪ (রাঙ্গাবালী-কলাপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মহিব্বুর রহমান মহিব বলেন, দক্ষিণাঞ্চলকে নিয়ে সরকারের মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। এখানকার পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সোনারচরকে পর্যটনশিল্পে যোগ করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অতি শিগগিরই আমরা সুসংবাদ দিতে পারব।

বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে, বিশ্বে অবস্থান ১৩তম -টিআই’র রিপোর্ট

দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৩তম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। ২০১৭ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭তম। ২০১৮ সালে সূচকে ৪ ধাপ পিছিয়ে হয়েছে ১৩তম। আর দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নক্রমানুসারে এখনো বিব্রতকরভাবে আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। ১০০ এর মধ্যে ৪৩ স্কোরকে গড় হিসেবে বিবেচনায় বাংলাদেশের ২০১৮ সালের স্কোর ২৬ হওয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক বলে প্রতীয়মান হয়। এবারের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমেছে। গতকাল রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত ‘দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০১৮’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য দেয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের ২০১৮ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) মঙ্গলবার দুর্নীতির ধারণাসূচক বা করাপশন পারসেপশনস্‌ (সিপিআই) সূচক প্রকাশ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই তথ্য তুলে ধরে বলেন, ১০০ ভিত্তিতে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এবার ২ পয়েন্ট কমে ২৬ হয়েছে। এই স্কেলে শূন্য স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোরকে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসনের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমেছে। তালিকার নিম্নক্রমানুযায়ী ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৩তম, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৪ ধাপ নিম্নে এবং ঊর্ধ্ব ক্রমানুযায়ী ১৪৯তম, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৬ ধাপ অবনতি। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ সর্বনিম্ন অবস্থানে।
টিআই’র এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালিকায় এবারো সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া; স্কোর গতবারের তুলনায় ১ পয়েন্ট বেড়ে ১০ হলেও অবস্থানের নড়চড় হয়নি।
এরপরে রয়েছে যথাক্রমে সিরিয়া, সাউথ সুদান, ইয়েমেন, উত্তর কোরিয়া, সুদান, গিনি-বিসাউ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আফগানিস্তান ও লিবিয়া। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ৮৮ স্কোর নিয়ে তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে উঠে এসেছে ডেনমার্ক। স্কোর কমায় গতবারের তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা নিউজিল্যান্ড এবার নেমে গেছে দ্বিতীয় অবস্থানে। এর পরে রয়েছে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও লুক্সেমবার্গ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এবারের সূচকে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ভুটান। ৬৮ স্কোর নিয়ে ভুটানের অবস্থান সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ২৫ নম্বরে। এরপর ভারত ৭৮ (স্কোর ৪১), শ্রীলঙ্কা ৮৯ (স্কোর ৩৮), পাকিস্তান ১১৭ (স্কোর ৩৩), মালদ্বীপ ১২৪ (স্কোর ৩১), নেপাল ১২৪ (স্কোর ৩১) এবং আফগানিস্তান ১৭২তম (স্কোর ১৬) অবস্থানে রয়েছে। ২৬ স্কোরে বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও উগান্ডা।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের বাদ দিয়ে নিম্ন ও মধ্যম সারিতে ব্যবস্থা নেয়ায় বাংলাদেশ আশানুরূপ উন্নতি করতে পারছে না। আমাদের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে এখন। দল ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ দেখানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে সংবাদ সম্মেলনে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন ইফতেখারুজ্জামান। সেই সঙ্গে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এজন্য জাতীয় দুর্নীতি বিরোধী কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি। এই ধরনের কৌশল প্রণয়ন করা উচিত এবং এটা করা সম্ভব। ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে না পারলে শূন্য সহিষ্ণুতার বিষয়টি বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে আরো উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে তারা সরকারের আজ্ঞাবহ নয়, সেই ম্যান্ডেট তাদের আছে। পরিচয় ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশে যেসব উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বা অভিযুক্ত অথবা দুর্নীতি করেছেন, খুব কম ক্ষেত্রেই তারা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন।
প্রতিবেদন প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুর্নীতিতে আমাদের অবস্থান বৈশ্বিক অবস্থানের চেয়ে অনেক নিচে। এখানে আত্মতুষ্টির কোনো অবস্থা নেই। আমাদের অপার সম্ভাবনার বিষয়টি দুর্নীতির কারণে আটকে আছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ এখানে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ঘোষণা থাকলেও এটার বাস্তবায়ন সেভাবে নেই। উচ্চ পর্যায়ের লোকদের বিচারের আওতায় আনার সেরকম উদাহরণ কম। ব্যাংকখাতে অবারিত দুর্নীতি, জালিয়াতি, ভূমি-নদী-জলাশয় দখল, সরকারি ক্রয়খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে দুর্নীতি এক ধরনের ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমাদের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে দুর্নীতি স্পষ্ট।
এখানে ব্যাংক জালিয়াতি, ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা, রাজনৈতিক প্রভাব, সারা দেশে বিভিন্নভাবে ভূমি সেক্টরে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় ক্রয়খাতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও ক্রমবর্ধমান হারে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের দৃষ্টান্ত খুবই খারাপ। আজকের (গতকাল) গণমাধ্যমেও অর্থপাচারের দৃষ্টান্তের খবর অত্যন্ত বিব্রতকর ও নেতিবাচক। দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা এবং স্বাধীনভাবে কাজ না করার বিষয়গুলোও ক্রমাগতভাবে দুর্বল হচ্ছে। দুদকের কাজের ক্ষেত্রে পদে পদে জবাবদিহিতার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হবে। এককভাবে দুর্নীতি দমনের এ প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতি দমন বা কমিয়ে আনতে পারবে না। এজন্য অপরাপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সক্রিয় ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন টিআইবি’র এই নির্বাহী পরিচালক। আইনের শাসনের যে পরিবেশ সেখানেও ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে যাদের ভয়েস খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেই নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমও শঙ্কিত। কারণ তাদের কণ্ঠস্বর রোধ করা হয়েছে জিডিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো আইন দিয়ে। এক্ষেত্রে পরিবর্তন জরুরি। এটি প্রথম সংসদে সংশোধনের প্রস্তাব করেন তিনি।
এবারের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। তার ওই ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। এখন বাস্তবায়নের পালা। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, সংসদকে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা দরকার। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, এনবিআর, অর্থনৈতিক দুর্নীতির তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আরো বেশি সক্রিয় ভূমিকা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, আসামিদের পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি দমনের বিষয়টি হতে হবে জিরো টলারেন্স। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। আর নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সাধারণের স্বাধীন মত প্রকাশের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। অনুষ্ঠানে টিআইবি’র ব্যবস্থাপনা কমিটির উপদেষ্টা সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
দুর্নীতির ফ্যাক্ট ও ফিগার দেন: দুদক চেয়ারম্যান
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কীসের ভিত্তিতে বাংলাদেশে দুর্নীতির হিসাব করেছে, সে তথ্য-উপাত্ত চেয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। গতকাল প্রকাশিত টিআই’র প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রতিক্রিয়ায় ইকবাল মাহমুদ তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, টিআইকে আমরা আগেও বলেছি যে, আপনারা আপনাদের রিপোর্টের ম্যাথডোলজি আমাদের জানান এবং ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগার দেন। তার মতে, দুর্নীতি কমা-বাড়ার সংখ্যা দিয়ে বোঝানো যথেষ্ট নয়। এই সংখ্যা, নাম্বার। এই নাম্বারই যথেষ্ট না। আপনাকে ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগার দিয়ে বলতে হবে, দুর্নীতি এইভাবে হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, তারা শুধু বলেছে দুর্নীতি কমেনি, বেড়েছে, আমরা আশা করবো রিপোর্টে থাকবে যে দুর্নীতি কেন কমেনি, বেড়েছে। দুর্নীতি বাড়ার কারণ কী? সেই কারণগুলো অ্যাড্রেস করার জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন? যদি টিআই রিপোর্টে সেটা না থাকে, তাহলে এই রিপোর্ট কোনোক্রমেই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো কোনো গবেষণা বিতর্কিত হলেও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনকে তিনি পক্ষপাতমূলক বলতে নারাজ। টিআই’র প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান না করলেও বাংলাদেশে দুর্নীতির পরিস্থিতি নিম্নগতির দিকে বলে দাবি করেন ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, টিআই বলুক যে অমুক জায়গায় অমুক সরকারি লোক, ওই সরকারি কর্মকর্তা-রাজনৈতিক ব্যক্তি ক্ষমতা দিয়ে ওই কাজ করেছে। সেটা তো আমাদের জন্য সুখকর হয়।
সংস্থাটির বাংলাদেশ চ্যাপ্টার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে (টিআইবি) নিজেদের সহযোগী উল্লেখ করে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, লোকাল টিআইকে বলবো, আপনারা অন্ধভাবে টিআইয়ের যে ম্যাথডলজি ইন্টারন্যাশনালি ইউজ করে, সেটা যে সবচেয়ে ভালো, তা না। প্রত্যেক দেশের যে কনটেক্সট, সেই কনটেক্সট অনুসারে টিআই রিসার্চ করেছে কি-না, আমার ধারণা নেই। টিআইয়ের রিপোর্ট পেলে আমরা জানাবো। দুদক দুর্নীতি প্রতিরোধ কাজে দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না-টিআইবি’র এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমাদেরকে দুর্বল বলাটা, উনারাই দুর্বল। আজ পর্যন্ত আমরা কখনো বলিনি যে, আমরা স্বাধীন নই। আমরা অ্যাবসলিউটলি স্বাধীন। সেই কারণে আইনি ম্যান্ডেট নিয়ে যাচ্ছি, কেউ তো আমাদের বাধা দিচ্ছে না। তবে বড় দুর্নীতিবাজদের ধরতে না পারার সমালোচনা মেনে নিয়ে তিনি বলেন, এটা সত্য।

এক বছরেই পাচার ৫০ হাজার কোটি টাকা: গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’র বার্ষিক প্রতিবেদন

বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে ২০১৫ সালে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০০৬ থেকে এক দশকে পাচারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। আমদানি-রপ্তানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করার মাধ্যমেই এই অর্থের বড় অংশ পাচার করা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) এর বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। বিশ্বজুড়ে অর্থপাচার নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে জিএফআই। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে ১৪৮ উন্নয়নশীল দেশের টাকা পাচারের চিত্র। ২০১৫ সালে মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনায় পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৫ ভাগ।
জিএফআই’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় ৫৯০ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২০ ভাগই পাচার হয়েছে নানা কৌশলে। জিএফআই’র হিসাবে, ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে  ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাংলাদেশের মোট বাজেট ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট বাজেটের চেয়েও বেশি টাকা ১০ বছরে পাচার হয়েছে।
মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কত শতাংশ পর্যন্ত অর্থ পাচার হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ করেছে জিএফআই। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দুটি হিসাবই রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে কী পরিমাণ অর্থ দেশের ভেতরে এসেছে, সেই তথ্যও প্রতিবেদনে দেয়া রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের দেয়া অর্থ পাচারের সব হিসাবই রক্ষণশীল, অর্থ পাচারের প্রকৃত পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৪ সালে দেশ থেকে পাচার হয় ৮৯৭ কোটি ডলার। অঙ্কের হিসাবে ২০১৫ সালে এর পরিমাণ কমলেও জিএফআই বলছে, এটি আনুমানিক হিসাব। প্রকৃত পাচারের পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে। পাচারের পাশাপাশি ২০১৫ সালে অবৈধভাবে দেশে এসেছে ২৮০ কোটি ডলার।
সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুসারে, টাকার অঙ্কের দিক দিয়ে ২০১৫ সালে অর্থপাচারে শীর্ষ ৩০ দেশের একটি ছিল বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এশিয়ার ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ফিলিপাইন। দেশটি থেকে পাচার হয়েছে ৫১০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের আগে রয়েছে ভারত। দেশটি থেকে ৯৮০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এর আগে আছে মালয়েশিয়া। দেশটি থেকে পাচার হয়েছে ৩৩.৭ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩৭০ কোটি ডলার।
প্রতিবেদনে অবৈধভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে সাউথ আফ্রিকা। দেশটি থেকে পাচার হয়েছে ১০.২ বিলিয়ন ডলার। এর পর রয়েছে নাইজেরিয়া (৮.৩ বিলিয়ন), তুরস্ক (৮.৪ বিলিয়ন), হাঙ্গেরি (৬.৫ বিলিয়ন), পোলান্ড (৩.১), মেক্সিকো (৪২.৯ বিলিয়ন), ব্রাজিল (১২.২ বিলিয়ন), কলম্বিয়া (৭.৪ বিলিয়ন), চিলি (৪.১ বিলিয়ন)।
মূল প্রতিবেদনে ১৪৮টি দেশের অবৈধ অর্থ প্রবাহের তথ্য দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তার ২৪ শতাংশই হয় উন্নয়নশীল দেশ থেকে। আর প্রতিবছরই অর্থ পাচারের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। মূলত আর্থিক খাতে স্বচ্ছতার অভাবেই অর্থ পাচার বাড়ছে। জিএফআই বলছে, টাকা পাচারের এ প্রবণতা টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা।
জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ২০১২ সালে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার ও ২০১৪ সালে ৭০০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। এ ছাড়া ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং ২০১১ সালে পাচার হয় ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তদন্তে দেখা গেছে, শিল্পের যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে পাওয়া গেছে ছাই, ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্টের বক। এতে শিল্পের কোনো যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বন্দরে শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে খালি কনটেইনার আমদানির ঘটনাও ধরা পড়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, যখন আস্থার সংকটে ভোগেন তখনেই মূলধন বিদেশে নিয়ে যান অনৈতিক পন্থায়। দেশ থেকে টাকা পাচার বেড়ে যাওয়াও এটি একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমে যাওয়ার অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে অর্থ পাচার। এ ছাড়া দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বাড়ছে। তার মতে, অর্থ পাচার রোধ করতে হলে দুর্নীতি কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। নাগরিক জীবনেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, টাকা পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন রয়েছে, আমরা তা পুরোপুরি মেনে চলছি। আন্তর্জাতিকভাবে যেসব তথ্য আসছে, তা সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরবরাহ করছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে চেষ্টায় কোনো ত্রুটি নেই।

৯০,০০০ বন্দি মানবেতর জীবন -মানবজমিন অনুসন্ধান by রুদ্র মিজান

এক ব্যক্তির ঘুমানোর স্থানে ঘুমাচ্ছে দুই থেকে তিন জন। শীতের রাত যেন এক একটি বছর। কাঁথা নেই, কম্বল নেই। মশারি নেই। দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে কাটে প্রতিটি রাত। শৌচাগারে দীর্ঘ লাইন। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েও অমানবিক দুর্ভোগ। মামলায় হাজিরা দিতে গেলে দিনভর থাকতে হয় না খেয়ে।
‘রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ’ স্লোগানে চলা দেশের কারাগারগুলোর চিত্র এটি। ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি নিয়ে চলা কারাগারগুলোতে যেন সমস্যা আর সংকটের শেষ নেই। বাড়তি বন্দির কারণে বাড়তি সমস্যা। অসুস্থ হলেও চিকিৎসা পেতে পোহাতে হয় ঝক্কি। হাসপাতালে নিতে গেলে প্রহর গুনতে হয়। এম্বুলেন্স সংকট। কারাগারে থাকা বন্দিদের বেশির ভাগেরই সাজাপ্রাপ্ত না। তারা সত্যিকার অর্থে অপরাধী কি-না তাও প্রমাণ হয়নি। বন্দিদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক মামলার আসামি।
আর একক মামলা হিসেবে মাদকের মামলার আসামি মোট বন্দির এক-তৃতীয়াংশের বেশি। অনেকেই বন্দি হয়েছেন ‘গায়েবি’ মামলায়। জামিন হলে কেউ কেউ মুক্ত হচ্ছেন। যাদের জামিন হয়নি তারা প্রহর গুনছেন মুক্তির। সারা দেশে রয়েছে ৫৫টি জেলা কারাগার ও ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার মিলে মোট ৬৮টি কারাগার। কারাগারগুলোর ধারণ ক্ষমতা ৪০ হাজার ৬শ’ ৬৪ জন। কিন্তু ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ, তিন গুণ বন্দি থাকেন কোনো কোনো কারাগারে। স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ সংখ্যক বন্দি ছিল গত বছরের শেষদিকে। গত সোমবারের হিসাব অনুসারে সারা দেশে কারাগারে বন্দি রয়েছে ৯১ হাজার ৭শ’ ৪২ জন। তার আগের দিন রোববারে এই সংখ্যা ছিল ৯২ হাজার ১শ’ ৭৭ জন। এর মধ্যে মাদক মামলার আসামি ২৯ হাজার ৬৩ জন। নারী আসামি ৩ হাজার ৩ শ’ ৩২। গত ডিসেম্বরে কারাবন্দির সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ।
কারা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট মাস থেকেই সারা দেশে কারাবন্দির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। তাদের বেশির ভাগই নাশকতা, বিস্ফোরক ও আইনি কাজে বাধার অভিযোগের মামলায় গ্রেপ্তার। আগস্টে সারা দেশে বন্দি ছিল ৮৩ হাজার ৫ শ’ ৬ জন। সেপ্টেম্বর মাসে বন্দির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮ হাজার ৯ শ’ ৭৫ জন। বন্দির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় তখন চুরি, ছিনতাই, মাদকসহ লঘু অপরাধে আটক প্রায় ৭ হাজার জনকে মুক্তি দেয়া হয়। তারপরও বন্দির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। অক্টোবরে ওই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৫ হাজার ৬শ’ ২৫ জনে।  ঢাকা বিভাগের ১৭ কারাগারে বন্দি ধারণ ক্ষমতা রয়েছে ১১ হাজার ৩৪২ জনের। গত আগস্টে এসব কারাগারে বন্দি ছিল ২৮ হাজার ৩শ’ ৪৯ জন। নভেম্বরে বন্দির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৬শ’ জনে।
এই বিপুল সংখ্যক বন্দিকে মানবিক সুবিধা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কারা কর্তৃপক্ষ। দেশের অনেক কারাগারে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। শীতের রাতে ঘরের বাইরেও থাকতে হয়েছে বন্দিদের। কাঁথা জুটে তো বালিশ জুটে না। নিচের বিছানার জন্য কম্বল জুটলেও গায়ের উপরে কম্বল জুটছে না। এসব কম্বলকে ব্যবহার অনুপযোগী বলছেন বন্দিরা। এভাবেই কাটছে বন্দি জীবন। কারা ইতিহাসে বন্দির বালিশ ছিল না। গত নভেম্বর থেকে কারাবন্দিদের মধ্যে বালিশ বিতরণ করা হচ্ছে। খাবার নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত কারাবন্দিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকালে দেয়া হয় পুরনো আটার একটি রুটি ও ছোট এক টুকরো গুড়। দুপুরে নিম্নমানের চালের ভাত, পাতলা ডাল ও সবজি। রাতে সবজি ও মাছ। সপ্তাহে একদিন গরু ও মুরগির মাংস দেয়া হয়।
জেল থেকে বের হয়েছেন এমন বন্দিদের অভিযোগ, সপ্তাহে একদিন মাংস দেয়া হলেও বেশির ভাগের পাতে যায় শুধু  ঝোল। আর মাংস পেলেও বোঝা যায় না তা কিসের মাংস।
জুনায়েদ মিয়া নামের কারামুক্ত একজন জানান, কারাগারের খাবার খাওয়ার মতো না। মনে হয় সিদ্ধ সবজি, যেন মসলাহীন রান্না। এমনকি লবণও ঠিকমতো  দেয়া হয় না। সাধারণ কারাবন্দিদের এভাবেই থাকতে হয়। তবে টাকা ব্যয় করলে আছে ভিন্ন ব্যবস্থা।
বিকাল ৫টা থেকে ৫টা ৩০ মিনিটের মধ্যে কয়েদিদের রাতের খাবার সরবরাহ করা হয়। যাদের আদালতে হাজিরা দিতে নিয়ে যাওয়া হয় তারা বঞ্চিত হন কারাগারের খাবার থেকে। তারা কারাগারে পৌঁছানোর আগেই খাবার বিতরণ শেষ হয়।
কারামুক্ত ইকবাল চৌধুরী জানান, তাকে একটি ‘গায়েবি’ মামলায় ধানমণ্ডি থেকে গত বছরের ১০ই ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। স্থান হয় কেরানীগঞ্জে কারা ওয়ার্ড পদ্মায়। কারাগারের কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, রাত গভীর হলে বাড়ে শীতের তীব্রতা। কাঁপতে থাকেন বন্দিরা। বয়স্কদের অবস্থা করুণ। ফ্লোরে ঢালাও বিছানায় ২০ জনের স্থানে ৫০ জনকে ঘুমাতে হয়। প্রায় জড়াজড়ি অবস্থা। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসেরও উষ্ণতাও শীতের প্রভাবকে মুক্ত করতে পারে না। ঘুমের ঘোরে শীত থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই পাশের ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরেন। ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন অনেকে। সর্দি-কাশি, জ্বর লেগেই থাকে। একটি ওয়ার্ডের ৪৫-৫০ জনের জন্য একটি মাত্র  শৌচাগার। দিনে-রাতে লাইন লেগেই থাকে। রাতের গভীরেও কেউ না কেউ থাকেন সেখানে। করাগারে কী দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করছেন বন্দিরা। দিনটা  যেমন তেমন কাটে, রাতটা দুঃসহ। শীতের রাতে গরম কাপড়, কম্বল বলতে কিছু নেই।
অনেকেই বাইরে থেকে কম্বল কিনেছেন। কিন্তু দরিদ্র বন্দিদের করুণ অবস্থা। কেঁপে-কেশে রাত কাটে তাদের। পাশে শুয়ে অন্য কারও কম্বলে আশ্রয় নেন তারা। একে তো শীতের কষ্ট সেই সঙ্গে আছে মশার উপদ্রব। সারারাত মশার কামড়। সহজে ঘুম আসে না। এই অবস্থায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে যান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারা চিকিৎসক জানান, কারাগারে থাকা কয়েদিরা প্রায়ই চুলকানি জাতীয় চর্মরোগ, পুষ্টিহীনতা, শ্বাসকষ্ট, শারীরিক দুর্বলতা, মনোবিকৃতির মতো জটিলতায় ভোগেন। তবে হঠাৎ কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেলে বিপাকে পড়তে হয় কারা কর্তৃপক্ষকে। কারাগারে রয়েছে চিকিৎসক ও এম্বুলেন্স সংকট। দেশের ৬৮টি কারাগারে রয়েছে মাত্র আট জন চিকিৎসক ও ১১টি এম্বুলেন্স। এমনকি বন্দির সংখ্যা লাখ ছুঁয়ে গেলেও বন্দিদের সেবা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জনবল সংকট রয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কারাগার পরিস্থিতি নিয়ে মানবজমিনকে বলেন, ৪০ হাজার বন্দির স্থানে রাখা হচ্ছে ৯০ হাজারেরও বেশি লোককে। এতে তাদের  মৌলিক অধিকার রক্ষার সুযোগ থাকছে না। বন্দিরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারাগারের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। সেখানে পানির অভাব আছে, বন্দিরা রোগাক্রান্ত হচ্ছেন। জায়গার অভাবে বন্দিরা পালাক্রমে ঘুমাচ্ছেন। এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।  দণ্ডপ্রাপ্তদের সংশোধন করতে কারাগারে নানা ব্যবস্থা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে ইমাম আছেন, বই পাঠের জন্য লাইব্রেরি আছে। এমনকি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এতকিছুর পরও আতঙ্কের ব্যাপার হচ্ছে কারাগারে মরণনেশা মাদক ঢুকছে। মাদক কারাগারে ঢোকার সুযোগ থাকলে অনেকক্ষেত্রেই সংশোধনের আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবে। এসব বিষয়ে অবশ্যই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলে জানান তিনি।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কারা বিভাগে ১২ হাজার ১শ’ ৭৩টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১ হাজার ৫শ’ ৮৯টি। এসব বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন মানবজমিনকে বলেন, নানা সংকটের মধ্য দিয়েই সেবা দিচ্ছে কারাকর্তৃপক্ষ। শীতে যাতে কারাবন্দিদের কষ্ট না হয় এজন্য অতিরিক্ত ২৫ ভাগ কম্বল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কারাগারে ঘরের বাইরেও অনেক বন্দির রাতযাপন সম্পর্কে তিনি বলেন, বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। দু’একটি কারাগারে স্থানের সমস্যা হয়েছে। এটা স্থায়ী কোনো সমস্যা না।

অসম প্রেম: ডেটিংয়ের এক মাসের মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা ইসাবেলা

কথায় বলে প্রেম মানে না বয়স, জাত, কুল। তারই প্রমাণ রেখেছেন জোসেফ কনার (৫৩) ও ইসাবেলা সেইঞ্জ (২০)। তাদের বয়সের ব্যবধান ৩৩ বছর। তাতে কি! ওই যে মনের মিল। সেই থেকে তাদের প্রেম। সেই প্রেম শুধু প্রেমই নয়। একেবারে জোসেফ কনারের দুই সন্তানের মা হয়ে গেছেন ইসাবেলা সেইঞ্জ। তবে এখনও তারা বিয়ে করেন নি।
এ বছরের শেষের দিকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছেন।
তারা দু’জনেই চাকরি করতেন একই স্কুলে। সেখানেই তাদের প্রেমের সূত্রপাত। জোসেফ কনার অবসরপ্রাপ্ত একজন অফিসার। তিনি ওই স্কুলে টিম গেম হিসেবে পরিচিত ল্যাক্রোসে বিষয়ক কোচ ছিলেন। স্কুলে তাদের জানাশোনা হওয়ার পর এক মাস ধরে ডেটিং চলতে থাকে। ডেটিং মানে শুধু ঘোরাঘুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে অবাধ শারীরিক সম্পর্ক। বাধাহীন সেই সম্পর্কে এক মাসের মধ্যেই ইসরাবেলা নিজেকে অন্তঃসত্ত্বা হিসেবে আবিষ্কার করে। সেই সম্পর্কের জের ধরে ইসাবেলার এখন দুটি মেয়ে। প্রথমটির নাম অটাম । বয়স ১৫ মাস। দ্বিতীয়টির নাম উইন্টার। বয়স দেড় মাস।
অন্যদিকে জোসেফ এখন মোট ৬ সন্তানের পিতা। আগের সম্পর্ক থেকে তার রয়েছে চারটি সন্তান। তারা হলেন জোসেফ (৩৪), জ্যাসন (২৪), জাস্টিন (২১) ও জ্যাকুলিন (২৩)। জোসেফ কনার ও ইসাবেলা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মিয়ামির বাসিন্দা। তাদের সম্পর্ক নিজেদের মধ্যে খুবই রোমান্টিক। বয়সের পার্থক্য বুঝতে পারেন না ইসাবেলা। সব কিছু ঠিকঠাক চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু বিদঘুটে অবস্থার সৃষ্টি হয় তখনই, যখন তারা দু’জনে বাইরে যান। ওই সময়টাতে লোকজন জোসেফ কনারকে ভেবে বসে ইসাবেলার পিতা হিসেবে। বিষয়টি খুবই বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায় তখন। ইসাবেলা বলেন, যখনই আমরা একসঙ্গে বাইরে যাই সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ কেউ একজন জিজ্ঞেস করে বসলেন- উনি কি আপনার পিতা? এমন ব্যক্তিদের আমি কখনো কখনো কারেকশন করিয়ে দিই। তা শুনে তারা চুপ মেরে যায়। আবার কেউ কেউ আমাদেরকে নিয়ে মজা করে। কিন্তু আমি যা মনে করি তাহলো প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব মতামত আছে। কিন্তু জীবনটা খুবই সংক্ষিপ্ত। এই সময়টাতে এমন কিছু করা উচিত যা আপনাকে বা আমাকে সুখী করবে।
২০১৬ সালের অক্টোবরে ল্যাক্রোস ক্লাবে প্রথম জোসেফ কনারের সঙ্গে পরিচয় ইসাবেলার। তখন তার বয়স সবে ১৮। ইসাবেলা বলেন, আমি মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হতে চাইছিলাম। তার আগে আমাকে মেডিকেল ট্রেনিং নিতে হয়েছিল। জোসেফ কনার ছিল একজন কোচ। ফলে তার কাছে গেলাম। কথাবার্তা শুরু হলো। এক পর্যায়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। প্রথমে তাকে আমি মোটেও পছন্দ করতাম না। কারণ সে ছিল একটু রাগি। কিন্তু তাকে যখন আমি জানতে পারলাম। রাজনীতি, পরিবার, তার ছেলেমেয়ে নিয়ে কথা বললাম দেখি সে একজন চমৎকার পুরুষ। সে আসলে রাগি নয়। সে শুধু তার টিমের সামনে কড়া থাকে।
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তারা চুটিয়ে ডেটিং দেয়া শুরু করেন। এর এক মাসের মাথায় ইসাবেলা বুঝতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। ইসাবেলা বলেন, যে মাসে আমি তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাত শুরু করি, সেই মাসেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। এতে সব কিছু দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যেতে থাকে। আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু জোসেফ কনার আমার প্রতি ছিল ভীষণ সাপোর্টিভ। আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, আমরা অবশ্যই একসঙ্গে থঅকবো। বসবাস করার জন্য মিয়ামিতে একটি বাসা কিনবো।
২০১৭ সালের আগস্টে জন্ম হয় অটামের। এর ঠিক ৫ মাস পরেই ইসাবেলা আবার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। ইসাবেলা বলেন, অন্য মেয়েদের মতো সব সময়ই আমি মা হতে চেয়েছি। বাচ্চাদের খুব ভালবাসি আমি। তাই আমি দ্বিতীয় সন্তান নিতে প্রস্তুত ছিলাম। সেই থেকে দ্বিতীয় সন্তানের মা হয়েছি।
এ বছরের শেষের দিকে এই যুগল বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু ইসাবেলার চেয়ে ৩৩ বছরের বড় একজন পুরুষের সঙ্গে তার এমন সম্পর্ককে তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না তার পরিবারের সদস্যরা ও বন্ধুরা। ইসাবেলা বলেন, বয়সের এত ব্যবধান নিয়ে আমার পরিবার ছিল উদ্বিগ্ন। যখন তারা জানতে পারলো আমরা খুব সুখী তখন তারা তা মেনে নিয়েছে। আর এমন সম্পর্কের কারণে আমি প্রচুর বন্ধুকে হারিয়েছি। আমি যখন মা হয়েছিল তখন অনেক ছাত্রছাত্রী কলেজে গিয়েছে পড়াশোনা করতে। কিন্তু আমার জীবন ধাবিত হয়েছে ভিন্ন পথে। অন্যদিকে জোসেফ কনার বলেন, আমাদের বয়স কোনো বড় ফ্যাক্টর নয়। আমি বয়সের দিকে তাকাই নি। আমি দেখেছি ইসাবেলার ব্যক্তিত্ব। সে সব কিছু যেভাবে মোকাবিলা করে এবং তার যে পরিপক্বতা তাতে আমি মুগ্ধ। তার ভিতর সব সময় আনন্দ লুকিয়ে থাকে। তাক যখন আমার বন্ধুরা দেখে তারা তো থ’ বনে যায়। কারণ, ইসাবেলা খুবই সুন্দরী। কিভাবে আমার সঙ্গে সে সুখী আছে তা নিয়ে তারা চিন্তিত হয়।

অজ্ঞান পার্টির হোতারা অধরা by শুভ্র দেব

রাজধানীর মগবাজারের একটি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাসায় ফিরছিলেন ৩৮ বছর বয়সী আসাদুর রহমান। পথে ফুটপাথের একটি দোকান থেকে চা খান। ফের বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। হাঁটার সময় তার শরীরে ঝিমুনি আসে। তারপর আর তিনি কিছু বলতে পারেন নি। এই ঘটনার তিনদিন পর তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একটি ওয়ার্ডে। ততক্ষণে তার সঙ্গে থাকা ২৫ হাজার টাকা ও একটি স্যামসাং ব্র্যান্ডের মোবাইলফোন খোয়া গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে।
এরপর ঢামেকে দুই সপ্তাহ চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাসায় ফেরেন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, চা খাওয়ার সময় সেখানে আরো কয়েকজন লোক ছিলেন। চায়ের অর্ডার দেয়ার পরে আমি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলাম। এই সুযোগে হয়তো কেউ চায়ের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে দিয়েছে। মূলত অজ্ঞানপার্টি চক্রের কোনো সদস্য আমার সঙ্গে এমনটাই ঘটিয়েছে।
শুধু আসাদুর রহমান নন রাজধানীসহ সারা দেশে এখন অজ্ঞানপার্টি চক্রের সদস্যরা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তাদের কবল থেকে বাদ যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও নারী শিশু। অর্থ, দামি জিনিস খোয়ানোর পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। গত বছরের পহেলা ডিসেম্বর ভোলার দৌলতখানে অজ্ঞানপার্টির কবলে পড়ে কাশেম হাওলাদার নামের এক তেল বিক্রেতার মৃত্যু হয়েছে। ১৪ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামে অজ্ঞানপার্টি চক্রের খপ্পরে পড়ে মারা গেছেন এক ব্যবসায়ী। তার নাম দুলাল বণিক (৫০)। ওই দিন নগরীর কাস্টম মোড়ে একটি বাস থেকে অচেতন অবস্থায় দুলালকে উদ্ধার করেছিল পুলিশ। গত বছরের ১৬ই নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের রামগতি-চট্টগ্রাম রুটের এ ওয়ান ট্র্যাভেলস নামের একটি নৈশকোচে অজ্ঞানপার্টির কবলে পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৬৬ বছর বয়সী খোরশেদ আলমের। গত বছরের আগস্ট মাসে ডুমুরিয়ায় অজ্ঞানপার্টির কবলে পড়ে অধীর মণ্ডল নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
সূত্র বলছে, বাসস্ট্যান্ড ও ব্যস্ততম এলাকায় নানা ছদ্মবেশে ওঁৎ পেতে থাকে তারা। অভিনব কায়দায় শিকার ধরছে। রাস্তার ধারে ডাব, কোমল পানীয়, বিক্রির আড়ালে চক্রটির সদস্যরা বিভিন্ন ভূমিকায় শিকার ধরার চেষ্টা চালায়। কোমল পানীয় বা বোতলের পানির সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে মানুষকে অজ্ঞান করছে। অজ্ঞান হলেই চক্রের সদস্যরা তাকে বাঁচানোর নাম করে নিরাপদে নিয়ে সব কিছু কেড়ে রাস্তায় ফেলে চলে যাচ্ছে। গণপরিবহনের আসনে ক্লোরোফোম জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ লাগিয়েও অজ্ঞান করা হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঢামেকের চারটি মেডিসিন ওয়ার্ডে অজ্ঞানপার্টির কবলে পড়ে গড়ে প্রতিদিন পাঁচজন করে রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ হিসাবে মাসে ১৫০ জন ও বছরে কম বেশি ১ হাজার ৮শ’ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের বেশিরভাগই অপরিচিত ও অজ্ঞান অবস্থায় আসেন। জ্ঞান ফেরার পরেও তাদের অনেকেই বাসার ঠিকানা ও স্বজনদের মোবাইল নম্বর দিতে ব্যর্থ হন। দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা নিয়ে কেউ সুস্থ হন আবার কেউ মারা যান। রাজধানীতে অজ্ঞানপার্টি চক্রের কবলে পড়া ভুক্তভোগীরা ঢামেক ছাড়াও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড) চিকিৎসা নেন। ঢামেকের মতো এই দুই হাসাপাতালে বছরে আরো হাজেরখানেক ভুক্তভোগী চিকিৎসা নেন। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র একই রকম।
সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অন্তত অর্ধশতাধিক অজ্ঞানপার্টি চক্রের হোতা। তাদের মধ্যে- কানা শহীদ, ফরিদ, টঙ্গির মজিবুর, আকতার মোল্লা, শ্যামপুরের ফারুক, স্বপন, আসলাম, সবুজ, জনি, হোসেন, আবুল, মিন্টু, শিপন, ইয়াকুব, শাহাজাহান, আলমগীর, সেন্টু, লাল মিয়া, কামাল, মাসুম, গিয়াস, লোকমান, শাহীন, ফেরদৌস, আলী, আলম, রনি, জাহিদ, ইদ্রিস, মামুন, রিয়াজ, আজমত, মোস্তফা, রফিক, লিংকন, মুন্না, সালাম, হাশেম, মনোয়ার, রইছ, নুর হোসেন, জলিল, হাফিজ, রহমত, কাশেম অন্যতম। এ ছাড়া নামে বেনামে আরো একাধিক হোতা রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা গ্রুপ রয়েছে। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, অজ্ঞানপার্টি চক্র সাধারণত চারটি ধাপে তাদের কাজ করে। এই চারটি ধাপের প্রথম ধাপে থাকে চক্রের প্রধান হোতা যাদেরকে বলা হয় সর্দার। যাদের শহরের বিভিন্ন এলাকার গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে একটা যোগসাজশ থাকে। এরপরে থাকেন মধ্যেস্থতাকারীরা। যারা বিভিন্ন সময় গাড়িচালককে অজ্ঞান করে নিয়ে আসা গাড়ি মালিকের কাছে টাকার বিনিময়ে ফিরিয়ে দিতে মিডিয়া হিসেবে কাজ করে। আর মাঠপর্যায়ে মানুষকে অজ্ঞান করে মালামাল লুট করার কাজে থাকেন আরো কিছু সদস্য।
তাদেরকে বলা হয় চুর। লুণ্ঠিত মালামাল ও অর্জিত আয়ের ভাগ সবাইকে চুক্তি অনুসারে দেয়া হয়। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হয় অজ্ঞানপার্টি চক্রের সদস্যরা। থানায় মামলা করে তাদেরকে পাঠানো হয় কারাগারে। কিন্তু কিছুদিন যাবার পর তারা জামিনে বের হয়ে ফের শুরু করে একই কাজ। গোয়েন্দাসূত্র বলছে, মাঠে ঘাটে থেকে যাদেরকে গ্রেপ্তার করে আনা হয় তারা ছিঁচকে চোর। তারা ছাড়াও এসব চক্রে বিভিন্ন ধাপে আরো সদস্য জড়িত আছেন। মূলহোতা চক্রের সর্দার সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। তাই মাঠপর্যায়ের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়লেও তাদেরকে জামিনে মুক্ত করা হয় আবার নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার উত্তর বিভাগের গুলশান জোনাল টিম ১৯শে জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানার জমজম টাওয়ারের পেছন থেকে অজ্ঞানপার্টি চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলো- মো. অলী (২৩), তানভীর ইসলাম (২৪), নুর মোহাম্মদ (৩৭), মো. তাইজুউদ্দিন (৪৫), মো. জাকির (৪৫) ও মো. শিপলু (৩০)। আটকের পর তারা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে অজ্ঞান করার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। গোয়েন্দাসূত্রে জানা গেছে, অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা খুব ভোরে বের হয়। বের হওয়ার সময় তারা বিভিন্ন গ্যারেজ থেকে চালক সেজে সিএনজি ভাড়া নেয়। ওই সিএনজিতে আরো দুজন থাকে যারা যাত্রী হিসেবে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। ঘোরাঘুরির সময় তারা যাত্রীবিহীন সিএনজির পিছু নেয়। সুবিধাজনক কোনো চায়ের দোকানে গিয়ে যদি ওই সিএনজি থামে তবে তারাও সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়।
সেখানে গিয়ে অজ্ঞানপার্টি চক্রের সিএনজিচালক দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিচালকের সঙ্গে গল্প শুরু করে। গল্পের ছলে সে তাকে চা খাওয়ার প্রস্তাব করে। তারা আগে থেকে ছোট কোনো কৌটায় চেতনানাশক ওষুধ পানির সঙ্গে মিশিয়ে রাখে। সেটা দেখতে অনেকটা বাদামী রংয়ের। কৌশলে সেই চেতনানাশক লিকিউড ওষুধটা চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। এ সময় চক্রের অন্যান্য সদস্যরা কোথাও যাওয়ার জন্য ভুক্তভোগী চালককে ভাড়া করেন। ওই চালক তাদের নিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর ঝিমিয়ে পড়ে। এই অবস্থা বুঝতে পেরে চক্রের সদস্যরা মাঝপথে কিছু কেনার নাম করে আবার যাত্রা বিরতি দেয়। ততক্ষণে ভুক্তভোগী সিএনজিচালক পুরোপুরি অজ্ঞান হয়ে যায়। কৌশলে তাকে সিএনজি থেকে নামিয়ে তার সিএনজি নিয়ে চম্পট দেয় চক্রের সদস্যরা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সিএনজি নিয়ে যাওয়ার পর ওই চক্রের সদস্যরা তাদের আওতাধীন গ্যারেজে নিয়ে রাখে। পরে সিএনজিতে থাকা কাগজপত্র নিয়ে চক্রের মধ্যেস্থতাকারীরা সিএনজির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এক্ষেত্রে মালিককে থানা পুলিশের ঝামেলা যাতে না করে সেজন্য সতর্ক করে দেয়। আর গাড়ির কন্ডিশন বুঝে মালিকের কাছের টাকার পরিমাণ বলা হয়। তখন শুরু হয় দর কষাকষি। সাধারণত চুরি হওয়া সিএনজি ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয় বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত করেছে। টাকার পরিমাণ নিশ্চিত হওয়ার পর মোবাইল নম্বর দেয়া হয়। ওই নম্বরে টাকা পাওয়ার পর চক্রের সদস্যরা একটি জায়গা থেকে সিএনজি নিয়ে যেতে বলেন। নির্ধারিত স্থানে বেশিরভাগ সময় সিএনজি পাওয়া যায় না। অন্তত ৪/৫টি স্পট ঘুরিয়ে একটি স্থানে সিএনজি রেখে তারা সটকে পড়ে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার উত্তর বিভাগের গুলশান জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম সাকলায়েন মানবজমিনকে বলেন, সিএনজিচালককে অজ্ঞান করে ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ হচ্ছে। ঢাকা মেট্রো এলাকায় নম্বর প্লেটসহ সিএনজির মূল্যে অনেক বেড়ে গেছে। কোনোভাবে একটা সিএনজি চুরি করে নিয়ে গেলে মালিক সেটা লাখ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক সময় চুরি করে তাদের গ্যারেজ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হচ্ছে না। যাওয়ার পথেই অনেক সময় মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা টাকার বিনিময়ে সিএনজি বুঝিয়ে দেয়। সাকলায়েন বলেন, ভুক্তভোগীরা বেশিরভাগ সময় পুলিশকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন না।
এদিকে, গোয়েন্দারা জানিয়েছেন বিভিন্ন সময় অজ্ঞানপার্টি চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে তাদের কাছে ট্রেনেক, এটিভেন, নকটিন, এপিট্রা, মাইলাম, ডরমিকাম, মিডাজোলাম, নাইট্রাজিপাম, লোরাজিপাম, ঘুমের ওষুধ, ডায়বেটিকসের ইনসুলিন, বিষাক্ত মলম পাওয়া গেছে। এসব ওষুধ ব্যবহার করেই তারা মানুষকে অজ্ঞান করে। এসব ওষুধ ব্যবহারের কারণে অনেক সময়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সূত্র বলছে, রাজধানীর ব্যস্ততম যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড, সায়েদাবাদ, আরামবাগ, গাবতলী, মিরপুর, গুলিস্তান, ফার্মগেট, চিড়িয়াখানা, পল্টন, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর, চানখাঁরপুল, ব্যাংক পাড়া মতিঝিল ছাড়াও আরো বিশেষ বিশেষ স্থানে তাদের অবস্থান থাকে। অর্ধশতাধিক অজ্ঞানপার্টি চক্রের অন্তত তিন শতাধিক সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে তৎপতা চালাচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে তাদের তৎপরতা রয়েছে। সাভার, টঙ্গী, গাজীপুরে সক্রিয় একাধিক দল। পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে ইদানীং অজ্ঞানপার্টি চক্রের অনেক সদস্য আটক হয়েছেন। তাই তাদের তৎপরতা কিছুটা কমেছে। এখনো যারা এই কাজে জড়িত আছেন পুলিশ সদস্যরা তাদেরকে নির্মূল করতে কাজ করে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞানপার্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন মুগদার জব্বার আলী। শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি এখন রাজধানীর অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে সবজি বিক্রি করেন। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেন তখনকার নানা কথা। তিনি বলেন, এ ধরনের জঘন্য কাজ করার জন্য হয়তো আজকে আমার এই অবস্থা। অনেকবার পুলিশের কাছে ধরা পড়েছি। জামিনে মুক্ত হয়েছি। ফের শুরু করেছি এই কাজ। আজ বুঝতে পারছি এটা কতটা অপরাধের কাজ ছিল। জেল জরিমানায় এই অপরাধের শাস্তি হতে পারে না। কেন এই কাজ করতেন জবাবে তিনি বলেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে থাকতাম। গ্রামের বাজারে ছোট একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। বিক্রিবাট্টা ভালোই হতো। এক সময় ক্রেতার কাছে বাকির পরিমাণটা বেশি হয়ে যায়। নতুন করে কোনো মালামাল দোকানে উঠাতে পারি নাই। একসময় দোকান বন্ধ করে পূর্ব পরিচিত একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ২০১০ সালের মে মাসে চলে আসি ঢাকায়। এখানে এসে কোনো কাজ জোটেনি। কাওরানবাজারে রাতের বেলা মেন্থির কাজ করতাম। যা আয় হতো তা দিয়ে নিজের খরচ মিটিয়ে বাড়িতে পাঠানো সম্ভব হতো না। বাড়িতে স্ত্রী ছাড়াও আরো তিন সন্তান ছিল। তাদের কোনো টাকা দিতে পারতাম না। অনেকবার ভেবেছি বাড়ি চলে যাব। কিন্তু এলাকার মানুষ হাসাহাসি করবে তাই আর যাওয়া হয়নি। কাওরানবাজারের একটি চায়ের দোকানে পরিচয় হয় কুমিল্লার বাসিন্দা মামুনের সঙ্গে।
তার পাল্লায় পড়েই এ পথে আসি। জব্বার বলেন এসবের পেছনে বড় সিন্ডিকেট কাজ করে। আলাল নামের এক সর্দারের চক্রে আমি কাজ করতাম। পাঁচ বছরেও তার সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই। অজ্ঞান করার কাজে আমরা একসঙ্গে ছয়জন কাজ করতাম। কখনো কোনো সিএনজিচালক আবার কখনো টাকা আছে এমন ব্যক্তিকে টার্গেট করতাম। কাজ বুঝে প্রতি কাজের জন্য ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পাওয়া যেত। কাজ করতে গিয়ে ৫/৬ বার পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ধরা পড়ার পরে জামিনে বের হয়ে আর এই কাজ করি নাই। এখন সবজি বিক্রি করেই সংসার চালাই। কিভাবে অজ্ঞান করতেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ডাবের পানি, জুস, চা, কফি, পান, খেজুর, ঝালমুড়ি, শক্তিবর্ধক হালুয়া, চটপটি, ক্রিম জাতীয় বিস্কুট, চকলেট, রঙিন পানীয় ইত্যাদি খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দিতাম। এ ছাড়া অনেক সময় মরিচের গুঁড়া ও ক্লোরোফোম জাতীয় জিনিস ব্যবহার করতাম। পরে কৌশলে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে খাইয়ে দিতাম। অজ্ঞান হওয়ার পর আমরাই কৌশলে সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে সব কিছু লুটে নিয়ে তাকে রাস্তায় ফেলে রাখতাম।

আসিয়া বিবির সকল বাধা জয়

ব্লাসফেমি বা ধর্মাবমাননার অভিযোগ থেকে আসিয়া বিবিকে অব্যাহতি দেয়ার রায় বহাল রেখেছে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত। এর পূর্বে তাকে বেকসুর খালাসের রায় প্রদান করলে তীব্র বিক্ষোভ গড়ে তোলে কট্টরপন্থি দলগুলো। এতে পাকিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা, অচল হয়ে পড়ে বড় বড় শহরগুলো। এ ছাড়া আসিয়া বিবি ও তার আইনজীবীকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়। এতে তারা তখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এ খবর দিয়েছে আল-জাজিরা।
মঙ্গলবার, ইসলামাবাদে অবস্থিত পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত আসিয়া বিবির বিরুদ্ধে করা রিভিউ পিটিশন বাতিল করে দেয়। এর আগে তিনি ৮ বছর মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে কারাগারে আটক ছিলেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে তাকে অব্যাহতি দেয় দেশটির আদালত।
কিন্তু মুক্তি লাভ করলেও কট্টরপন্থি দলগুলো তাকে হত্যার হুমকি দিতে থাকে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় ও আসিয়া বিবির নিরাপত্তার জন্য মুক্তির পরও তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়। আসিয়া বিবি যাতে পাকিস্তান ছেড়ে না যেতে পারে সে জন্যও আন্দোলন করতে থাকে কট্টরপন্থিরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এখন পুরোপুরি মুক্ত। এখন কানাডায় তার সন্তানদের কাছে পৌঁছানোর পথে আর কোনো বাধাই থাকলো না। বর্তমানে পাকিস্তান সরকারের হেফাজতে গোপন স্থানে রয়েছেন তিনি। এর আগে, ২০০৯ সালে ৫৪ বছর বয়সী এই নারীকে ধর্মাবমাননার অভিযোগে আটক করা হয়। ঘটনার দিন পাঞ্জাব রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় একটি গ্রামের মাঠে দুই মুসলিম নারীর সঙ্গে কাজ করছিলেন আসিয়া বিবি। তিনি খ্রিষ্টান বলে ওই দুই নারী একই পাত্র থেকে পানি খেতে অস্বীকার জানায় আর এ নিয়ে তাদের সঙ্গে তর্ক হয় আসিয়া বিবির। ওই দুই নারী পরবর্তীতে গ্রামে গিয়ে দাবি করে যে, আসিয়া বিবি ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছে। এতে আসিয়া বিবির পরিবারের ওপর হামলা হয় ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। এই মামলা নিয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠে পাকিস্তানের কট্টরদলগুলো। আসিয়া বিবির পক্ষে কথা বলার জন্য পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর সালমান তাসিরকে হত্যা করা হয়। তিনি ব্লাসফেমি আইনের সংস্কারেরও দাবিও তুলেছিলেন। তার এই অবস্থানে ক্ষুব্ধ হয় চরমপন্থিরা। ২০১১ সালে ইসলামাবাদে নিজের দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন তাসির। একই বছর ব্লাসফেমি আইনের আরেক সমালোচক তৎকালীন সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিও বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাকিস্তানি অধিকারকর্মী হাফিজ বলেন, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী আসিয়া বিবিকে হত্যা করতে হবে। তাই দেশ ছাড়লেও আসিয়া বিবি নিরাপদ নন। তিনি আরো বলেন, যদি আসিয়া বিবি বিদেশ চলেও যান, সেখানে কি মুসলিম নেই? সেখানেও তাকে হত্যা করা হতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হক ব্লাসফেমি আইন চালু করে। পাকিস্তানি অধিকারকর্মীরা বলছেন, অনেকক্ষেত্রেই এই আইনকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা মেটানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। খ্রিষ্টান, হিন্দু, এমনকি ইসলামের সংখ্যালঘু গোত্র আহমাদিয়াদের বিরুদ্ধেও এই আইনের অপপ্রয়োগ করা হয়।

রথিশ হত্যায় স্ত্রীর ফাঁসি

চাঞ্চল্যকর অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক ওরফে বাবু সোনা হত্যা মামলায় তার স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার রায় নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাবু সোনার পরিবার ও সহকর্মীরা। চাঞ্চল্যকর বাবু সোনা হত্যাকাণ্ডের রায়কে ঘিরে গতকাল সকাল থেকে আদালতপাড়ায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রংপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আনা হয় হত্যা মামলার অন্যতম আসামি বাবু সোনার স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিককে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে  আদালত চত্বরে উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। বাবু সোনার সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজন, বিভিন্ন ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা রায় জানতে সকাল থেকে ভিড় জমান আদালত পাড়ায়।
বেলা পৌনে ১টায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নেয়া হয় স্নিগ্ধা ভৌমিককে। বিচার কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাবু সোনার আইনজীবী, তার ভাই সুশান্ত ভৌমিক ও বাবু সোনার ছেলে দীপ্ত ভৌমিক।
অপরদিকে, স্নিগ্ধা ভৌমিকের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী স্টেট ডিফেন্স (রাষ্ট্র নিযুক্ত) আইনজীবী বসুনিয়া মো. আরিফুল ইসলাম স্বপন উপস্থিত ছিলেন না। আদালতে তিন পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত রায় পড়েন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবিএম নিজামুল হক। রায়ে ঐতিহ্যগতভাবে পরিবার ও সমাজকে আঘাত করা হয়েছে উল্লেখ করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দেন।
ফাঁসির রায় ঘোষণার পর বাবু সোনার ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক সুবল বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। পুলিশ প্রশাসন যে তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছেন এবং বিজ্ঞ আদালত অতি দ্রুত পর্যায়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যে রায় ঘোষণা করেছেন আমি বাদী হিসেবে এবং পরিবার হিসেবে সন্তোষ প্রকাশ করছি। এ রায়কে আমরা খুশি বলবো না, কারণ আমার দাদাকে তো আর ফিরে পাব না। আমাদের মধ্যমণি ছিল তিনি, আমাদের মাথা ছিলেন তিনি। সেজন্য রায়ে আমরা খুশি কিন্তু তাকে ফেরত না পাওয়ার যে বেদনা সেটাতে অনেক অনেক মর্মাহত।
পূজা উদ্‌যাপন কমিটির জেলা সম্পাদক ধীমান ভট্টাচার্য বলেন, আসামি পক্ষ যদি পরবর্তীতে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে, তাহলে বিচারকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে এই রায় যেন বহাল থাকে।
সরকারী কৌঁসুলি (পিপি) আব্দুল মালেক বলেন, আমাদের বন্ধু অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিককে পরিকল্পিতভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, এই মামলার আজ রায় প্রকাশ হলো। এই মামলায় স্ত্রীর প্রতি যে স্বামীর অগাধ বিশ্বাস সেই বিশ্বাসে আসামি কুঠারাঘাত করেছে। তার অনৈতিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। পরিকল্পিতভাবে অন্যের প্ররোচনায়, অন্যের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের জেরে বাবু সোনাকে হত্যার জন্য বিজ্ঞ আদালত স্নিগ্ধা ভৌমিককে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। আমরা মনে করি এই রায় যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সঙ্গত ও এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
গত বছরের ৩০শে মার্চ নিখোঁজ হন জাপানি নাগরিক হোশি কোনিও,  মাজারের খাদের হত্যা মামলার পিপি এবং যুদ্ধাপরাধী মামলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের সাক্ষী ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা। নিখোঁজের ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। এরপরই মাঠে নামে র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা প্রথমেই পরকীয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্তে মাঠে নামে। পুলিশ বাবু সোনার স্ত্রী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা স্নিগ্ধা ভৌমিক ও তার প্রেমিক একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করে। ওই কললিস্ট দেখে সন্দেহ হলে নগরীর রাধাবল্লভস্থ বাড়ি থেকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে কামরুল মাস্টারকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানায় কামরুল। পুলিশকে সে তথ্য দেয়, ২৯শে মার্চ রাতে অ্যাডভোকেট বাবু সোনাকে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করে স্ত্রী সিগ্ধা ও প্রেমিক কামরুল। তাকে কোট-প্যান্ট, জুতা পরিয়ে পাশের রুমে আলমারিতে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন সকালে তাজহাটে কামরুলের বড় ভাইয়ের নির্মাণাধীন বাড়ির মেঝেতে বাবু সোনার লাশ মাটিতে গর্ত খুঁড়ে চাপা দিয়ে রাখে কামরুল।
এরপর র‌্যাব বাবু পাড়ার রথিশ চন্দ্রের বাড়ি থেকে স্নিগ্ধা ভৌমিককে গ্রেপ্তার করে। তাদের দেয়া তথ্য পেয়ে র‌্যাব গত বছরের ৪ঠা এপ্রিল রাত সোয়া ১টার দিকে বাবু সোনার বাবুপাড়ার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মোল্লাপাড়ায় কামরুল মাস্টারের ভাই খাদেমুল ইসলাম জাফরীর নির্মাণাধীন বাড়ির মেঝে থেকে লাশ উদ্ধার করে। এরপর রথিশ চন্দ্র ভৌমিকের ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক, রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু ও অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিনকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যান লাশ শনাক্তের জন্য। লাশটি ফুলে ফেঁপে যাওয়ায় চিনতে পারা যাচ্ছিল না। এরপর সুশান্ত ভৌমিক ও জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন খুন হওয়া রথিশ চন্দ্র ভৌমিকের পায়ের জুতা দেখে লাশ শনাক্ত করেন।
কামরুল ও স্নিগ্ধার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুসারে এ মামলায় বাবু সোনার সহকারী মিলন মহন্ত ও বাবু সোনাকে চাপা দিতে গর্ত খুঁড়তে সহযোগিতা করায় কামরুল মাস্টারের দুই ছাত্র সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামানকে আসামি করা হয়। দুই ছাত্র কিশোর হওয়ায় মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়ে কিশোর শোধনাগারে পাঠানো হয়। মিলন মহন্ত কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর বিচারকার্য চলাকালীন গত বছরের ১০ই নভেম্বর ভোরের দিকে চাদর পেঁচিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে কামরুল মাস্টার। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। গত বছরের ২১শে অক্টোবর অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয় এ চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ৩০শে অক্টোবর থেকে। ৩৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গতকাল এ হত্যাকাণ্ডের রায় দেয়া হয়।

একইসঙ্গে কি ‘অসমিয়া’ আর ‘বাঙালি’ হওয়া সম্ভব? by ফাহমিদা উর্ণি

ভারতের আসামে আদি জনগোষ্ঠীর (অসমিয়া) তোপের মুখে আত্মপরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত নয় বাঙালিরা। অবৈধ বাংলাদেশি তকমা ঘোচাতে একসময় নিজেদের ভারতীয় পরিচয়কে সামনে আনার প্রচেষ্টা ছিল তাদের। এবার ‘অসমীয়া বাঙালি’ নামের নতুন পরিচয়কে ভর করে টিকে থাকার চেষ্টা নিয়েছে তারা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্থান টাইমস বলছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিদ্বেষ থেকে বাঁচতে অভিবাসী বাঙালিদের একাংশ আত্মপরিচয়ে ‘অসমীয়’ যুক্ত করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে সংস্কৃতি-ভাষা আর পরিচয়ের নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী  এই পরিচয়কে বিভ্রান্তিকর মনে করা হচ্ছে। আসামে বাঙালি জনগোষ্ঠীর অভিবাসনের অতীত ইতিহাসও ওই পরিচয়সূত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে বিভিন্ন আদিবাসী ও জাতিগত গোষ্ঠীর বসবাস।সংশোধিত নাগরিকত্ব বিলকে কেন্দ্র করে আসামে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে বাঙালিরা।  ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর ভারতে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের নাগরিকত্বের সুযোগ ছিল না। তবে সম্প্রতি লোকসভায় পাস হওয়া সংশোধিত নাগরিকত্ব বিল ২০১৬ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশকারী অমুসলিমদের (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, শিখ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত) নাগরিকত্বের বিধান রাখা হয়েছে। বিরোধীরা বলছে, এই আইনটি ১৯৮৫ সালের আসাম অ্যাকর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১৯৮৫ সালের আসাম অ্যাকর্ডে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে থেকে যারা আসামে বাস করছে, তারাই শুধু নাগরিকত্ব পাবে। সংশোধিত বিল নিয়ে নানা মতবিরোধ বাঙালিদের মধ্যে সৃষ্টি করেছে চূড়ান্ত উৎকণ্ঠা। সদ্য পাস হওয়া ‘নাগরিকত্ব সংশোধন বিল’কে কেন্দ্র করে পরিচয়ের সংকট সৃষ্টি হয়েছে কারও কারও মধ্যে।
উগ্র অসমীয়া জাতীয়তাবাদীর রোষানল আসামে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে যে পরিচয়ের সংকট সৃষ্টি করেছে, তা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন বাঙালিরা। এদের একজন বাবলু নন্দী। এ বাঙালি হিন্দু তরুণ হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন ‘আমরা অসমীয়া বাঙালি। শুধু বাঙালি নই আমরা।’
অনেক ভারতীয় নাগরিকের কাছে ‘অসমীয়া বাঙালি’ একটি বিভ্রান্তিকর শব্দ। কারণ, অসমীয়া ও বাঙালি দুটি ভিন্ন কমিউনিটি। তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা ভিন্ন, বংশপরিচয় ভিন্ন। তারচেয়েও বড় বিষয় হলো, অসমীয়াদের একটা বড় অংশ আদিবাসী, বাঙালিরা আদিবাসী নয়। এসব আদিবাসীর স্বতন্ত্র জীবনধারা আছে। তাদের কেউ কেউ তথাকথিত সমতলের আদিবাসী। যেমন বোড়োরা। আবার দিমাসাসের মতো যেসব আদিবাসী পাহাড়ে বসবাস করে তাদের ডাকা হয় পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী হিসেবে।
ইতিহাসে নজর ফেরালে দেখা যায়, বাঙালিরা আসামের আদি জনগোষ্ঠী না হলেও তাদের অভিবাসনের সূচনাকালে তাদেরকে ‘বহিরাগত’ বিবেচনা করা যায় না। আসামে বাঙালি অভিবাসনের পুরনো ইতিহাস তাই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। আহম রাজার কাছ থেকে আসাম ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অধীনে যাওয়ার পর সেখানে কৃষিজীবী বাঙালিদের আবির্ভাব হতে শুরু করে। সেই সময়ের আসাম ছিল জঙ্গলে পরিপূর্ণ। ১৮৫৫ সালে মেজর জন বাটলার নামের একজন ব্রিটিশ সেনা-কর্মকর্তা আসামকে বর্ণনা করেন ‘মানুষ ও পশুপাখি বিহীন এক নির্জন ভূমি’ হিসেবে। ২০ শতকের শুরুর দিকে, ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী লাখ লাখ বাঙালি আসামে গিয়ে বসত গড়ে। কেবল বাংলা থেকে নয়, উড়িষ্যা ও বিহার থেকেও মানুষ সেখানে গিয়ে বসত গড়তে শুরু করে মাটির উর্বরতার কারণে।
আল জাজিরার গত বছরের জুনের এক প্রতিবেদনে আভাস পাওয়া গেছে, স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিবাসন প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কারণে স্থানীয় ও বাঙালি বিভাজনে পর্যবসিত হয়। তারা বলছে, ১৯৩০ সালে সৈয়দ মুহাম্মদ সাদ উল্লাহ সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘অধিক ফসল ফলানোর স্বার্থে’ আরও বাঙালি অভিবাসীকে জায়গা দেওয়ার নীতি আসামে আদিবাসী বনাম আউটসাইডার বিভাজনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।
আসামে বাঙালি বিদ্বেষের ঐতিহাসিক সূত্র পাওয়া যায় অমলেন্দু গুহ’র ‘প্ল্যান্টার রাজ টু স্বরাজ’ নামক বইতে। সেখান থেকে জানা যায়, ১৯৩১ সালে আসামে আদমশুমারির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন সিএস মুলান। বাঙালি অভিবাসীদেরকে ‘এক আক্রমণকারী ও দখলদার সেনাবাহিনী, একটি ভয়ঙ্কর শিকারী পাখি ও কীটপতঙ্গের’ সঙ্গে তুলনা করতেন। মুলান বাঙালি অভিবাসীদেরকে দেখতেন ‘শকুন’ হিসেবে। তার দাবি ছিল, অভিবাসীরা জমি দখলের জন্য শকুনি দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দুই লাখেরই বেশি বাঙালিকে সেসময়কার পূর্ব পাকিস্তানে বিতাড়িত করা হয়েছিল। পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশ ঠেকানো সংক্রান্ত স্কিমের আওতায় ওই বিতাড়ন প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। লেখক রিজওয়ানা শামসাদ তার ‘বাংলাদেশি মাইগ্রেন্টস ইন ইন্ডিয়া: ফরেনার্স, রিফিউজিস অর ইনফিলট্রেটরস?’ বইতে লিখেছেন, বাঙালি বংশোদ্ভূতদেরকে জমি দখলকারী ও বসতি স্থাপনকারী হিসেবে উপস্থাপন করে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছিল। অসমীয় জাতিগত গোষ্ঠীর মানুষদেরকে উপস্থাপন করা হয়েছিল ‘অরক্ষিত’ হিসেবে।
ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার আগে আসামে অভিবাসী হওয়া বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের আদিবাসী দাবি করার প্রবণতা আছে। নেলি গ্রামে বসবাস করেন বাঙালি বংশোদ্ভূত সুলেমান কাসিমি। গত বছর আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা ভূমিপুত্র। আমাদেরকে বাংলাদেশি ডাকবেন না। আমরা ভারতীয়।’
অবিভক্ত ভারতের ঐতিহাসিক সূত্র আদিবাসী অসমীয়াদের সঙ্গে অভিবাসীদের সম্পর্কের বরফ গলাতে পারেনি। ১৯৬০-এর দশকে বাংলাকে আসামের অফিসিয়াল ভাষা করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল এলিট হিন্দু বাঙালিরা। পরে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয় এবং এ প্রচেষ্টা থামিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৮০-এর দশকে আসাম অ্যাকর্ডের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অবৈধ মুসলিম বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদ করতে ছয় বছর ধরে আন্দোলন হয়েছিল। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে তাই সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, এবার অসমিয়া বাঙালি পরিচয় গ্রহণ করে আত্মপরিচয় বিসর্জন দিতে চাইলেও অসমিয়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বরফ গলবে কিনা।

ঢাকায় বাইকে জীবিকা লাখো মানুষের by পিয়াস সরকার

অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র আশরাফুল। লেখাপড়া করে উচ্চ শিক্ষিত হবেন। পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করবেন। এরকম নানা ইচ্ছা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বিধিবাম। একটি সড়ক দুর্ঘটনা তার পিতাকে উপার্জনে অক্ষম করে তুলে। ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে   লেখাপড়ায় ভাটা পড়ে।
আশরাফুল পরিবারের পাশে দাঁড়াতে খুঁজতে থাকেন আয়ের উৎস। অনেক চেষ্টা করেও কোথাও চাকরি পাননি। হতাশ হয়ে পড়েন। পুরো নাম আশরাফুল ইসলাম। ২০১৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন রংপুর সরকারি কলেজ থেকে। এরপর ভর্তি হন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে যাই হোক। পড়ালেখা বন্ধ। চাকরিও পাচ্ছেন না।
হঠাৎ তার ভাবনায় যোগ হয় অ্যাপভিত্তিক বাইক চালানোর বিষয়টি। সেই ভাবনা থেকেই নানার সহযোগিতায় কেনেন একটি পুরাতন মোটরসাইকেল। শুরু করেন অ্যাপভিত্তিক বাইক চালানো। বর্তমানে লেখাপড়া বন্ধ থাকলেও পরিবারকে পাঠাতে পারছেন অর্থ। আশরাফুল বলেন, আমার লেখাপড়া বন্ধ হলেও ছোট বোনের লেখাপড়া চলছে, এতেই আমি খুশি। আর আমারও ইচ্ছা, খুব তাড়াতাড়ি আবার লেখাপড়ায় ফিরে যাবো। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বাইক চালাই। আয় মাসে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। কোনো মাসে ২০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। বাড়িতে পাঠান ১০ হাজার টাকা। শুধু আশরাফুল নয়।
এমন লাখো মানুষের জীবিকার মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই অ্যাপভিত্তিক বাইক সেবা। বিআরটিএ’র সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ঢাকায় নিবন্ধিত বাইকের সংখ্যা ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪৯০টি। এরমধ্যে গেল বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত রাজধানীতে মোট নিবন্ধিত মোটর বাইকের সংখ্যা প্রায় ৭৩ হাজার। এর বেশিরভাগই অ্যাপভিত্তিক সেবা প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার্ড বাইক। যুক্তরাষ্ট্রের রাইড শেয়ারিং অ্যাপভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘উবার’-এর মোটরের প্রায় এক লাখ চালক রাজধানীতে মোটর চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকায় আরেকটি জনপ্রিয় বাইক রাইডিং পাঠাও’র আছে প্রায় দেড় লক্ষাধিক রাইডার। এ ছাড়াও রাজধানীতে সহজ ডট কম, স্যাম, ওভাই, ওবোন ইত্যাদির আওতায় আছে আরো প্রায় ৫০ হাজার রেজিস্ট্রার্ড বাইক। এই হিসাবে রাজধানীতে মোট রেজিস্ট্রার্ড বাইকারের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। তবে এই রাইডারদের অনেকেই একসঙ্গে কয়েকটি অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত। এই ৩ লাখ বাইকারের মধ্যে বিভিন্ন অ্যাপ রাইডারের দৈবচয়নের মাধ্যমে ১শ’ জনের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে ২০ তারিখের রাইডের হিসাবে দেখা যায়- ২৬ জন প্রতিদিন গড়ে বাইক চালিয়েছেন ১ ঘণ্টারও কম। ২১ জন চালিয়েছেন দৈনিক ২-৩ ঘণ্টা।
১২ জন চালিয়েছেন ৩-৪ ঘণ্টা। ১৯ জন চালিয়েছেন ৫-৬ ঘণ্টা। আর ২২ জন চালিয়েছেন দৈনিক ৬-১০ ঘণ্টা। দ্বৈত লাইসেন্সধারীদের বাদ দিয়ে মোট রাইডারের সংখ্যার হিসেবে ১ লাখ ২৩ হাজার রাইডার ৫ ঘণ্টা বা অধিক সময় বাইক চালান। তাদের আয়ের প্রধান উৎস বাইক রাইডিং।
আদনান শাহরিয়ার। বয়স আনুমানিক ২৫। অ্যাপভিত্তিক বাইক চালাচ্ছেন প্রায় বছরখানেক ধরে। তিনি বলেন, বাইক চালিয়েই সংসার চালাই। আমার বিয়ে হয়েছে ৪ মাস আগে। আগে একটি স্টেশনারি দোকানে কম্পোজ, ফটোকপি, প্রিন্ট দেয়ার কাজ করতাম। বেতন ছিল ৮ হাজার টাকা। এখন আমি বাইক চালিয়ে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা মাসে আয় করতে পারি।
শুক্রবার রাত ১০টা। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের সড়কের পাশে তমাল বিশ্বাস নামে আরেকজন রাইডার অপেক্ষায় যাত্রীর। তিনি আগে একটি প্রাইভেট কোম্পানির বাসের চালক ছিলেন। বেতন পেতেন ১২ হাজার টাকা। চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন ফুলটাইম বাইকার। বলেন, বিয়ের পর বাড়তি আয়ের উৎস খুঁজছিলেন। তাই ধার করে একটি বাইক কেনেন। অফিসের কাজ শেষে চালাতেন বাইক। গেল ঈদে নির্ধারিত ছুটির পাশাপাশি চেয়েছিলেন ২ দিনের অতিরিক্ত ছুটি। কিন্তু সেই ছুটি না দেয়ায় রাগের মাথায় ছেড়ে দেন চাকরি। সেই থেকেই ফুলটাইম রাইডার তিনি। তমাল বলেন, চাকরি ছেড়ে ভালোই করছি। এখন যখন খুশি, যেখানে খুশি, যেতে পারি। মন না চাইলে, শরীর খারাপ থাকলেও কোনো সমস্যা নাই। আর এই বাইক সেবা যারা নিচ্ছেন এমন একাধিক ব্যক্তি জানান, রাজধানীর অসহনীয় যানজট এড়িয়ে দ্রুত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধার কারণেই এই সেবা নিয়ে থাকেন তারা। এ ছাড়া এসব রাইডিং সেবায় প্রায় সবসময়ই থাকে ছাড়। নিয়মিত এসব সেবা নেয়া রিয়েল হোসেন বলেন, গড়ে মাসে ২০ দিনই বিভিন্ন শতাংশে ছাড় থাকে। বর্তমানে আমার দুটি সাইটে ৪০ ও ২০ শতাংশ ছাড় আছে।
অন্যদিকে যেভাবে বাড়ছে বাইকের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট-এআরআই’র হিসাবে ২০১৭ সালে রাজধানীতে ৪৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৫৩ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হন। গত বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ঢাকায় ৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৭ জনের মৃত্যু এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের চালকের পাশাপাশি যাত্রীও ছিলেন।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এখন বেশিরভাগ মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী হেলমেট ব্যবহার করেন। যা ইতিবাচক। তবে বাইকের পেছনে বসা যাত্রীরা যে হেলমেট ব্যবহার করেন তা মানসম্পন্ন নয়। হেলমেট হতে হবে যেটা মাথাকে পূর্ণ সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি কান ও থুঁতনি রক্ষা করবে। আর ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেপরোয়া কিংবা ফুটপাথে  মোটরসাইকেল চালানোর দায়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে জরিমানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা সব সময় মোটরসাইকেলের চালকদের সচেতনভাবে ড্রাইভ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

এক লাখ বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ by নূর মোহাম্মদ

চলতি বছর আরো ১ লাখ বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ পূরণের জন্য এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে ইতিমধ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই তালিকা ধরে এখন নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। সম্প্রতি জাতীয় মেধায় প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের পর ১৫ এবং ১৬তম নিবন্ধনের মাধ্যমে এ পদগুলোতে নিয়োগ দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) চেয়ারম্যান এসএম আশফাক হুসেন মানবজমিনকে বলেন, চলতি বছর এক লাখ বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার টার্গেট আছে। ইতিমধ্যে জাতীয় মেধায় প্রায় ৪০ হাজার নিয়োগের সুপারিশ করে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ৬০ হাজার পদ ফাঁকা হবে।
জাতীয় মেধা তালিকার পর আরও চলতি বছর আরও দুটি নিবন্ধন পরীক্ষার মাধ্যমে এ ৬০ হাজার পদে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার শূন্যপদে নিয়োগের জন্য জাতীয় মেধা তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। গত ১৮ই ডিসেম্বর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এনটিআরসিএ। এ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে শিক্ষক পদে ৩১ লাখ আবেদন জমা পড়ে। এ জাতীয় মেধায় প্রকাশের পর যাদের বয়স ৩৫ বছর হয়েছে তারা আর কোনো নিবন্ধন পরীক্ষার আবেদন করতে পারবেন না। এদিকে ১৫তম নিবন্ধন পরীক্ষার তারিখ শিগগিরই প্রকাশ করবে এবং ১৬তম শিক্ষক নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এনটিআরসিএ’র কর্মকর্তারা বলেন, সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে দুই দফা তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৩৯ হাজার ৫৩৫টি শূন্য পদের চাহিদার বিপরীতে জাতীয় মেধা তালিকায় আবেদন সংগ্রহ করে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য তালিকা প্রকাশ করে সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রার্থীর মোবাইল ফোনে এসএমসের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগে চাহিদা দিতো না। দিলেও ভুলবাল দিতো। এনটিআরসিএ ছাড়াও এখন সরাসরি নিয়োগ দেয়া সম্ভব না হওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা দেয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করেছে। সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জেলা শিক্ষা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে সেই তালিকা যাচাইবাছাই করে সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাপ্ত তথ্যমতে চলতি বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ৬০ হাজার পদ ফাঁকা হবে। এসব পদের নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একটি গ্রুপ এ নিয়োগ আটকে দিতে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছে। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আটকাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দারস্থ হয়। সম্প্রতি জাতীয় মেধা তালিকায় নিয়োগ আটকাতে দেড়’শ মতো মামলা হয়েছে। যার প্রতিটি মামলাই ধরন হুবহু এক। শুধু তারিখ ও হাইকোর্টে বেঞ্চ বদল করা।
এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান এস এম আশফাক হুসেন বলেন, এনটিআরসিএ যখনই নিয়োগের উদ্যোগ নেয় তখনই মামলা। কারণ নিয়োগ আটকাতে হবে। তিনি বলেন, কোর্টে জয়ী মামলাগুলো রেফারেন্স হিসেবে দেখানোর পর একসঙ্গে সব মামলা খারিজ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, যত বাধাই আসুক নিয়োগপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাবোই। সারা দেশে শূন্য পদের চাহিদা প্রায় পেয়ে গেছি। জাতীয় মেধার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। চলতি বছর আরও দুটি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার কাজ শুরু করবো।
এনটিআরসিএ কর্মকর্তারা জানান, সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহিলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শরীরচর্চা শিক্ষক পদের জন্য শুধু মহিলা প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধিতদের ই-বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য পদের বিপরীতে সব প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবেন। তবে এক ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে আবেদন করলে পছন্দের ক্রম উল্লেখ করতে হবে। আবেদনকারীর পছন্দের ক্রমানুসারে ও মেধাক্রম অনুসারে মাত্র একটি পদের বিপরীতে নিয়োগের সুপারিশ করা হবে। এছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারী কর্মরত আছেন তারাও অনলাইনে নিয়োগের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে তাদের নিয়োগের আবেদনসমূহ অন্যান্য প্রার্থীদের ন্যায় জাতীয় মেধাতালিকার ভিত্তিতে বাছাইপূর্বক নিষ্পত্তি করা হবে।
আগে বেসরকারি স্কুল, মাদরাসা ও কলেজের প্রধান এবং ম্যানেজিং কমিটি শিক্ষক নিয়োগ দিতেন। এ নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে প্রথম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা চালু করা হয়। এরপরে ১২টি পরীক্ষা নেয়া হয়। এতে পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৩ জন পাস করে। এর মধ্যে চাকরি পেয়েছেন ৬৪ হাজার ৩২২ জন। এনটিআরসিএ শুধু পরীক্ষা নিয়ে সনদ দিতো। আর চাকরি দেয়ার ক্ষমতা আগের মতোই ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকায় নিয়োগ বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ২২শে অক্টোবর এনটিআরসিএ আইন সংশোধন করে মেধা তালিকার মাধ্যমে নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ চালু করে। ২০১৬ সালের ৯ই অক্টোবর প্রথমবারের মতো জাতীয় মেধা তালিকা প্রকাশ করে এনটিআরসিএ।
১ম থেকে ১২তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করেও চাকরি না পেয়ে বঞ্চিতরা আদালতে অর্ধশতাধিক রিট আবেদন করেন। মামলার কারণে গত দুই বছর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ আটকে ছিল। আদালত নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করাদের মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের রায় দিয়েছেন। রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এনটিআরসিএ ৬ লাখ চার হাজার ৬৮৫ জনের মেধা তালিকা প্রকাশ  করে। জেলা ভিত্তিক মেধা তালিকার পরিবর্তে এবার জাতীয় মেধা তালিকার মাধ্যমে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে এক জেলার নিবন্ধিতরা অন্য জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
এদিকে গত মাসে এনটিআরসিএ’র পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এবিএম শওকত ইকবাল শাহিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে সব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, আগামী বছর দুটি শিক্ষক নিবন্ধ পরীক্ষার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১৫তম নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ১৫তম পরীক্ষার কার্যক্রম শেষ করে ১৬তম পরীক্ষা নেয়া হবে। সেজন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে যেসব পদ শূন্য হবে তার বিষয়ভিত্তিক তালিকার আগামী ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে এনটিআরসিএ’র কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ সম্প্রসারণে একনেকে দুটি প্রকল্প অনুমোদন

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন সমপ্রসারণের লক্ষ্যে একই ধরনের দুটি প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ২ হাজার ২১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে  ৪ লাখ ১৫ হাজার নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হবে।
গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এনইসি সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেক সভায় এই দুই প্রকল্পসহ মোট ৯টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। একনেক সভাশেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সভায় ৯টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে মোট ব্যয় হবে ১৬ হাজার ৪৩৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬২০ কোটি ২৭ লাখ টাকা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবে। বাকি ২ লাখ ৫২৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া যাবে।
৯ প্রকল্পের মধ্যে ৫টি নতুন এবং ৪টি সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শিল্প ও কৃষিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের নিশ্চিত করতে ভূমি মন্ত্রণালয়কে একটি জাতীয় নীতি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করতে বলেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী সব মিটার গেজ রেলওয়ে লাইনকে ব্রডগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা তৈরিরও নির্দেশনা দেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রেল, সড়ক ও নৌ পরিবহনের জন্য একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে এক টিকিটে সকল পরিবহনে যাতায়াত করা যায়। উন্নত দেশে এমন ব্যবস্থা চালু আছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সংযোগ সমপ্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কার্যক্রমে ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ সমপ্রসারণের লক্ষে গৃহীত দুই প্রকল্প ২০২২ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে প্রকল্প এলাকায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় চলে আসবে। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের প্রতিটি মানুষ নিরবছিন্ন বিদ্যুৎ পরিসেবা পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রংপুর বিভাগ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন ও উপকেন্দ্র সমপ্রসারণ এবং পুনর্বাসন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ১২৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রংপুর উপকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা ২২০ মেগাওয়াট বৃদ্ধি পাবে এবং রংপুর বিভাগে ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন সংযোগ দেয়া হবে।
এছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণের লক্ষে অনুমোদিত অপর প্রকল্প ‘রাজশাহী বিভাগ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন ও উপকেন্দ্র সমপ্রসারণ এবং পুনর্বাসন’। এতে খরচ হবে ১ হাজার ৯১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে রাজশাহী উপকেন্দ্রের ৪৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি রংপুর বিভাগে ২ লাখ ৩৫ হাজার নতুন সংযোগ দেয়া হবে।
এছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘ডিজিটাল কানেকটিভিটি শক্তিশালীকরণে সুইচিং ও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্প; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘সৈয়দপুর ১৫০ মেগাওয়াট ১০ শতাংশ সিম্পল সাইকেল (এইচএসডি ভিত্তিক) বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন সমপ্রসারণের মাধ্যমে ১৫ লাখ গ্রাহক সংযোগ (১৯.৫ লাখ গ্রাহক সংযোগের সংস্থানসহ-১ম সংশোধিত)’ প্রকল্প।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সাড়ে ১৯ লাখ নতুন সংযোগ আমরা দিতে পারবো। এক সংযোগে পাঁচজন করে মানুষ ধরলেও গড়ে প্রায় এক কোটি মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা পাবেন।
অনুমোদন পাওয়া অপর প্রকল্পসমূহ হলো- রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘৭০টি মিটার গেজ (এমজি) ডিজেল ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভ সংগ্রহ (১ম সংশোধিত) প্রকল্প; প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানকল্পে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড স্থাপন (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্প; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘কক্সবাজারের লিংক রোড-লাবণী মোড় সড়ক (এন-১১০) চারলেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্প; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-টাঙ্গাইল সড়কের ৬ষ্ঠ কিলোমিটারে ১০৩.৪৩ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্প।
প্রবৃদ্ধি-উৎপাদন বাড়ায় টাকা পাচার বেড়েছে: দেশে প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন বাড়ায় টাকা পাচারের পরিমাণও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। গতকাল একনেক সভা শেষে ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী একথা বলেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, যেহেতু আমাদের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে, উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, টাকাও প্রচুর বেশি আগের তুলনায়। টাকা পাচারও বৃদ্ধি পেয়েছে লজিক্যালি আমার মনে হয়। এটা আমাদের নজরে আছে। আমার মনে হয়, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী চিন্তাভাবনা করছেন এটা নিয়ে। ব্যাংকগুলোর ওপরও নির্দেশনা আছে। নানাভাবে আমরা কাজ করছি।

ঢাবি ভিসি’র শিঙ্গাড়া তত্ত্ব নিয়ে তোলপাড়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের একটি বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। যেখানে তিনি চলমান বাজার মূল্যের থেকে অনেক সস্তা দামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাস্তার সার্ভিস দিতে পারাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব ও ঐতিহ্য বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, এটি যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানতে পারে তাহলে গিনিস বুকে রেকর্ড হবে। তার এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টায় ভাইরাল হয়েছে। ট্রল করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাপশন দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
তারা ভিসির এমন বক্তব্যকে ‘সস্তা’ কথা হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে নবীনদের অনুষ্ঠানে গিয়ে সস্তা কথা না বলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আরো অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিতে পারতেন তিনি। এদিকে ভিসির বক্তব্য নিয়ে যেভাবে সমালোচনা হচ্ছে, ঠিক তেমনইভাবে অনেকে ভিসির ভাইরাল হওয়া বক্তব্যকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন।
তারা বলছেন- ভিসি টিএসসির প্রোগ্রামে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ার সার্ভিস নিয়ে কথা বলতেই পারেন। এটা নিয়ে এতো জল ঘোলা করার কিছু নেই। অবশ্য সমালোচকরা ভিসিকে ট্রল করেই ছাড়েনি, বিকৃত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামও। গত রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে কলা অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোতে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানে একটি বক্তব্য রেখেছিলেন। তার পুরো বক্তব্যের মাঝখানের কাট করা ৪৫ সেকেন্ডের বক্তব্যটি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের বক্তব্য জানতে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দুইবার তার প্রটোকল অফিসার জানিয়েছেন তিনি ব্যস্ত আছেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ভিসিকে বলতে দেখা যায়, ‘তুমি পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও পাবে না ১০ টাকায়, ১০ টাকায় এক কাপ চা, একটি শিঙ্গাড়া, একটি চপ এবং একটি সমুচা, ১০ টাকায় পাওয়া যায় বাংলাদেশে। এটি যদি কোনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানতে পারে, বিশ্ববাসী; তাহলে এটি গিনেস বুকে রেকর্ড হবে। ১০ টাকায় এক কাপ চা, গরম পানিও তো ১০ টাকায় পাওয়া যাবে না রাস্তায়। ১০ টাকায় এক কাপ চা, একটি শিঙ্গাড়া, একটি সমুচা এবং একটি চপ-এইগুলো পাওয়া যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে। এটি আমাদের গর্ব, এটি আমাদের ঐতিহ্য।’ তার এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মারুফ আহমেদ নামে এক শিক্ষার্থী ভিডিওটি শেয়ার দিয়ে ক্যাপশনে লেখেন- ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন ভুলেও না জানে। তবে কিন্তু নাম উঠে যাবে।’ অনুপম দত্ত নামে একজন লেখেছেন- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কতটা সম্মানের সেটা আজ শিক্ষকরাই ভুলে গেছেন।
আমার ভাবতেই অবাক লাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০টা গবেষণা হয়েছে, ১০টা জার্নাল ইন্টারন্যাশনালি পাবলিশ হয়েছে, ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিংয়ে ১০ এর মধ্যে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক পিএইচডি করেছেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে- সেখানে শিক্ষকরা হাততালি দেন দশ টাকায় কী কী পাওয়া যায় সেটা নিয়ে। শিক্ষকরা ভুলে যান এই দেশের সাধারণ মানুষের শ্রমের টাকায় তাদের বেতন হয়, ভুলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য। আজ আহমদ ছফার মতো শিক্ষক নেই। তাই এখন ১০ টাকায় খাবার বৃত্তান্ত লেখা হয়।’ আমানুল্লাহ আমান নামে এক শিক্ষার্থী লেখেছেন- ‘শুধু গবেষণা আর উদ্ভাবন দিয়েই যে সেরা হওয়া যায় না বরং সেরা হতে হলে যে দশ টাকার চা, চমুচা, শিঙ্গাড়া আর চপ পাওয়া যেতে হবে এটা তাদেরকে কে বোঝাবে? এ জন্যই উগান্ডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকে।’ শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘তাকে বুঝতে হবে তিনি কোথায় বসে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির চেয়ারের ভার বুঝতে পারবে না অথচ ভিসি হয়ে যাবেন তা মেনে নেয়া যায় না। মাননীয় ভিসি মহোদয় এমন সস্তা কথা বলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই নিচে নামিয়েছেন।’ আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘তিনি এর আগেও অধিভুক্তরা একটা শিঙ্গাড়া চমুচাও খাওয়ার অধিকার রাখে না বলেছিলেন। এখন সিলি একটা বিষয়ে বললেন গিনিস বুকে রেকর্ড হয়ে থাকবে। ভিসির কথা কম বলাই উচিত।
তার বক্তব্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।’ এদিকে ভিসির বক্তব্যের পক্ষেও বক্তব্য রাখছেন অনেকে। নীল অনির্বাণ নামে এক শিক্ষার্থীর বক্তব্যই কপি পেস্ট করে নিজেদের টাইমলাইনে দিচ্ছেন অনেকে। নীল অনির্বাণ লেখেন, ‘টিএসসিতে নবীনবরণের অনুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় ভিসি মহোদয় আমন্ত্রিত। তিনি আসলেন, নবীনদের নিয়ে অনেক কথা বললেন, টিএসসিতে প্রোগ্রাম যেহেতু টিএসসি নিয়েও কথা উঠে আসাটা স্বাভাবিক। তিনি সেই প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক কথা বললেন, মজা করলেন, হাস্যোজ্জ্বল ভাবে বরিশাল এর ভাষাতেও আরো কিছুসময় কথা বললেন। মজার ছলেই তিনি টিএসসি-এর পরিচিত খাবার, চা শিঙ্গাড়া সমুচা নিয়ে কথা বললেন। এর কিছু সময় আগে অবশ্য ২০ টাকার খাবার নিয়েও কথা বলেছেন। ১০-১২ মিনিট বক্তব্যের মধ্যে ৪৫ সেকেন্ড-এর একটা ভিডিও এর পর ভাইরাল হলো। ভিডিও এর এই ৪৫ সেকেন্ড এমন ভাবে কাটা হলো, যার আগের পরিস্থিতিও জানার সুযোগ নেই, পরেও কি হয়েছে আপনারা তা জানেন না। হোমপেজে আসছে, দেখছেন, লাইক কামানোর উদ্দেশ্যে ট্রল করছেন।
অথচ না আপনি অনুষ্ঠানে ছিলেন না আপনি জানেন এই কথা গুলোর প্রাসঙ্গিকতা। আপনাদের বুদ্ধি এবং বিবেককে লাল সালাম।’ এ ছাড়াও অনেক শিক্ষার্থী ফেসবুকে লেখেন, আসলে ট্রল করা আমাদের সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আমরা কোনো ভাবেই বুঝছি না যে আমরা ভিসিকে ট্রল করতে গিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানকে নিচে নামাচ্ছি। এসএম আবদুর রহমান আবির নামে এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে লেখেছেন- ‘ঢাবির ভিসি হিসেবে স্যারের চেয়ে আরো ভালো কেউ দরকার ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা কি স্যারকে ট্রল করতে গিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যায়য়েকে ছোট করছি না? আমরা সমালোচনা অবশ্যই করতে পারি। তবে এটা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না? আমরা যেভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢালাওভাবে ট্রল করছি এতে অন্যরাও আরো সুযোগ পাচ্ছে না?’

মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে রগরগে যৌনতার অভিযোগ, পরিবারের অস্বীকার

কিং অব পপ বা পপ সঙ্গীতের রাজা প্রয়াত মাইকেল জ্যাকসনকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্ক পশ্চিমা দুনিয়ায়। সেই বিতর্ক এখন মিডিয়ার কল্যাণে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। মাইকেল জ্যাকসনের জীবনীভিত্তিক একটি ডকুমেন্টারি নিয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত। ওই ডকুমেন্টারিতে মাইকেল জ্যাকসনকে দেখানো হয়েছে একজন যৌন নির্যাতনকারী হিসেবে। তিনি ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে ‘ওরাল সেক্সে’ মেতে উঠতেন বলে বলা হয়েছে। আর এমন সম্পর্কের কথা তিনি বেমালুম গোপন করে রাখতেন। এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ওয়াডে রবসন (৩৬) এবং জেমস সেফচাক (৪০)। তারাই প্রয়াত শিল্পীর বিরুদ্ধে এমন সব নোংরা অভিযোগ উত্থাপন করেছেন ‘লিভিং নেভারল্যান্ড’ নামের ওই ডকুমেন্টারিতে।

গত সপ্তাহে  যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা’তে সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভাবে ৪ ঘন্টার এই ডকুমেন্টারি দেখানো হয়।
বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ লিখেছে, এ সময় দর্শকদের মধ্যে একরকম আর্তনাদ শোনা গেছে।
প্রয়াত মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে ওই দুই যুবক যেসব অভিযোগ এনেছেন তা প্রত্যাখ্যান করেছে মাইকেল পরিবার ও তার এস্টেট। তারা এমন ডকুমেন্টারিকে মাইকেলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা ও অর্থ হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যমুলক একটি কর্মকান্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মাইকেলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার একটি বর্ণনা রয়েছে এতে। রবসন বলেছেন, তার বয়স তখন ৫ বছর। ওই সময়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৮৭ সালে মাইকেলের ব্যাড শীর্ষক সফরে ড্যান্সে বিজয়ী হন। এ সময়ে মাইকেলের সঙ্গে তার পরিচয়। তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। রবসন দাবি করেছেন, তার বয়স যখন মাত্র ৭ বছর তখন তাকে পর্নো ছবি এবং এলকোহল ধরিয়ে দেন মাইকেল জ্যাকসন। আর এর মধ্য দিয়ে তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। রবসন আরো গুরুত্বর অভিযোগ এনেছেন। বলেছেন, মাইকেলের বেডরুমে পিটার প্যানের একটি কার্ডবোর্ডের অংশবিশেষ ছিল। তার আড়ালে মাইকেল জ্যাকসন ‘মাস্টারবেট’ করতেন। আর তা দেখতে হতো রবসনকে।

অন্যদিকে সেফচাক অভিযোগ করেছেন, তখন তার বয়স ১০ বছর। এ সময়ে মাইকেলের সঙ্গে পেপসির বাণিজ্যিক একটি কার্যক্রমে অংশ নেন তিনি। আর এতেই তাদের মধ্যে তীব্র ঘনিষ্ঠ এক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেফচাক বলেন, এক পর্যায়ে আমার বিছানায় ঘুমাতে শুরু করলেন মাইকেল। পরে মাইকেল তাকে বলেছেন, সেফচাক যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন তার ওপর ‘ওরাল সেক্স’ প্রয়োগ করেছেন তিনি। সেফচাক বলেন, মাইকেল জ্যাকসন আমাকে বলতেন, তার এ ধরনের যৌন অভিজ্ঞতায় আমিই প্রথম। এ ছাড়া মাইকেলই আমাকে ‘মাস্টারবেশন’ বিষয়টিতে পরিচিত করিয়ে তোলেন। আর দ্রুত তা সংক্রমিত হয়। এরপর মাইকেলের নেভারল্যান্ড র‌্যাঞ্চে যখনই সময় হতো তারা যৌন কর্মকান্ডে লিপ্ত হতেন। এসব ঘটতো প্রাসাদে, সুইমিং পুলে, চিলেকোঠায় এমন কি নেভারল্যান্ডের ভিতরকার ট্রেন স্টেশনে। সেফচাক অভিযোগ করেছেন, এসব ঘটনা ঘটতো প্রতিদিনই।

শুনতে খুব খারাপ লাগে, যখন আপনি কারো সঙ্গে প্রথম ডেটিং করতে যাবেন তখন আপনি প্রচুর তৃপ্তি নিয়ে ফিরতে চাইবেন। সেফচাকের মতে, নেভারল্যান্ড র‌্যাঞ্চে ছিল অনেক গোপন বিছানা। গোপন আস্তানা। যেমন একটি তালাবদ্ধ প্রাইভেট বক্স। তার একদিকে তার ছবি সম্বলিত গ্লাস। এখানেই তিনি যৌন নির্যাতন চালাতেন।
রবসন ওই ডকুমেন্টারিতে দাবি করেছেন, মাইকেল জ্যাকসন তার নাম পাল্টে দিয়েছিলেন। রবসনকে তিনি ডাকতেন ‘লিটল ওয়ান’ অথবা ‘ডু ডু’ নামে। এ সময়ে তাকে নিজের ভালবাসা বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন।
ডিজনিল্যান্ড প্যােিস মাইকেলের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছিল মাইকেল জ্যাকোস-হ্যাগেনের। তখন তার বয়স ছিল ১৪ বছর। তিনি বলেছেন, তাকে মাইকেল ডাকতেন ‘রুব্বা রুব্বা’ নামে। কারণ, মাইকেল তাকে বিছানায় কাছে টেনে শরীর মন্থন করতেন।

মাইকেল জ্যাকোস-হ্যাগেন বলেছেন, যখন আমি মাইকেল জ্যাকসনের বিছানায় ঘুমাতাম তখন তিনি শুধু একটি বক্সার শর্টস পরতেন। তার বাহু দিয়ে আমাকে বেষ্টন করতেন এবং তার শরীর আমার শরীরের সঙ্গে চেপে ধরতেন, যেন আমি তার গার্লফ্রেন্ড। আমার মাথায় ও চিবুকে চুমু দিতেন। ঘুমের ভিতর আমি অনেকবার জেগে উঠেছি। দেখি তার হাত আমার শরীরের ওপর। অন্য হাত আমার দু’পায়ের সংযোগস্থলের ওপরে। এতে আমি স্বস্তি বোধ করতাম না। মনে হতো তাকে বাধাও দিতে পারবো না। যখন সেখানে কারো বয়স ১৪ বছর হয় এবং সে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেগাস্টারের শিকারে পরিণত তখন সে না বলতে পারে না। মাইকেল জ্যাকোস-হ্যাগেন বলেন, তিনি কখনো আমার ওপর অতিরঞ্জিত যৌন আচরণ করেন নি। তবে যা করেছেন তার উদ্দেশ্য যৌনতাভিত্তিক। আমার এখন মনে হয়, তিনি আমাকে পরীক্ষা করছিলেন, দেখছিলেন তিনি কতদূর যেতে পারেন।

সেনাপ্রণীত সংবিধান সংশোধনে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলো সু চি’র দল

নোবেল জয়ী অং সান সু চি’র নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) দেশটির সেনাবাহিনী প্রণীত সংবিধান সংশোধনের জন্য পার্লামেন্টে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। মঙ্গলবার পার্লামেন্টের স্পিকার এই ঘোষণা দিয়েছেন। এনএলডি’র প্রস্তাবে সংবিধান সংশোধনের জন্য জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটি গঠন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রায় তিন বছর আগে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর এই প্রথম সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলো সু চি’র দল। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতী এখবর জানিয়েছে।
কথিত গণতান্ত্রিক উত্তোরণের নামে মিয়ানমারে আদতে জারি রয়েছে সেনাশাসন। ২০০৮ সালে সামরিক শাসনামলে প্রণীত সংবিধান অগণতান্ত্রিক হিসেবে সমালোচনার মুখে পড়েছে। সংবিধান অনুযায়ী দেশটির পার্লামেন্টের এক চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং সীমান্তসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর হাতে। শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের ১১টি আসনের মধ্যে ছয়টি আসনেও রয়েছেন সেনাবাহিনী মনোনীত ব্যক্তিরা। গণতান্ত্রিক সরকার বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে সেনা সংখ্যাগরিষ্ঠ এই পরিষদের। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব আনার ফলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এনএলডি ঐতিহাসিক নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর থেকেই এই সংবিধান নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এনএলডি’র বিরোধ চলছে।
পার্লামেন্টের স্পিকার ইউ টি খুন মিয়াত মঙ্গলবার ঘোষণা দেন, কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি দুপুরে পার্লামেন্টে উপস্থাপন করবেন এনএলডির আইনপ্রণেতা ইউ অং কুই নিয়ুন্ট।
স্পিকার প্রস্তাবটি থেকে উদ্ধৃত করে পার্লামেন্টে জানান, সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ যতদ্রুত সম্ভব বাস্তবায়নের জন্য এই প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টকে উপযুক্ত সংখ্যক আইনপ্রণেতাদের নিয়ে একটি জয়েন্ট কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে আইনপ্রণেতারা প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করবেন।
স্পিকারের এই ঘোষণায় আপত্তি জানিয়েছেন পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি। তিনি এই প্রস্তাবের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি দাবি করেন, সংবিধান সংশোধনের কোনও প্রস্তাব পার্লামেন্টে উপস্থাপন করতে হলে সেটার খসড়ায় ন্যূনতম ২০ জন আইনপ্রণেতার স্বাক্ষর প্রয়োজন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাউং মাউং পার্লামেন্টে বলেন, স্পিকার শুধু জয়েন্ট কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন। ফলে কীভাবে এবং কী পরিবর্তন করা হবে তা সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণাই নেই।
জবাবে স্পিকার জানান, তিনি প্রস্তাবটি বিষয়ে শুধু পার্লামেন্টকে অবহিত করেছেন। বলেন, যখন প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য উন্মুক্ত হবে তখন আপনারা বিতর্ক করতে পারবেন। পার্লামেন্ট বহুদলীয় প্রতিষ্ঠান। তাই স্বচ্ছতার স্বার্থে আমরা দলের আইনপ্রণেতাদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।

ধর্মঘটের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০০ গার্মেন্ট শ্রমিক চাকরিচ্যুত -এএফপি’র রিপোর্ট

বাংলাদেশে এ মাসে বেতন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ধর্মঘটে যোগ দেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে তা সহিংস হয়ে ওঠে। এ ধর্মঘটে যোগ দেয়ার কারণে নিন্ম বেতনভুক্ত এসব শ্রমিকের প্রায় ৫০০০ জনকে চাকরিচ্যুত করেছেন কারখানার মালিকরা। বিশে^র বিভিন্ন ব্রান্ডের পোশাক সেলাই করতেন এসব শ্রমিক। মঙ্গলবার এসব তথ্য দিয়েছে পুলিশ। সারাদেশে গার্মেন্ট কারখানায় কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক কয়েক দিনের এ ধর্মঘট, প্রতিবাদে কারখানা ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। এতে ৩০০০ কোটি ডলারের এ শিল্পে বিঘœ সৃষ্টি হয়। ওই প্রতিবাদ বিক্ষোভে পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে।
ঢাকার উপকণ্ঠে আশুলিয়া হলো এ শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। সেখানে বড় বড় খুচরা ক্রেতাদের জন্য পোশাক সেলাই করা হয়। সেখানে সংঘর্ষে একজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন।
পুলিশ বলেছে, প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলাকালে লুটপাট ও ভাঙচুরের অভিযোগে কয়েক হাজার শ্রমিককে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো অভিযোগ করেছে, এ শিল্পে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। দমনপীড়ন চালানো হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এখন পর্যন্ত ৪৮৯৯ জন শ্রমিককে বরখাস্ত করা হয়েছে। একটি কারখানা থেকেই বরখাস্ত করা হয়েছে কমপক্ষে ১২০০ শ্রমিককে। তাদের বেতন মাসে ৯৫ ডলার থেকে শুরু হয়ে আরো উপরে। কিন্তু শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বলছে, বরখাস্ত করা শ্রমিকের বাস্তব সংখ্যা আরো অনেক বেশি, যা ৭ হাজারের কাছাকাচিছ। এ ছাড়া আরো একশত শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন বলেছেন, অনেক শ্রমিক কাজে ফিরতে ভয়ে আছেন। তিনি বলেন, অজ্ঞাত ৩০০০ শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে পীড়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শ্রমিক কারখানায় না যাওয়াকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
বাংলাদেশে রয়েছে ৪৫০০ তৈরি পোশাক কারখানা। এতে কাজ করেন ৪১ লাখ শ্রমিক। চীনের পরেই এ দেশটি সারা বিশে^ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ। বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই আসে এই পোশাক বিক্রি থেকে। তাই এই শিল্প উল্লেখযোগ্য শক্তি রাখে।
শ্রমিকদের ধর্মঘট বন্ধ করতে মোতায়েন করা হয়েছিল পুলিশ। তবে ওই ধর্মঘট মাত্র তখনই শেষ হয় যখন সরকার বেতন সামান্য বৃদ্ধি করতে রাজি হয়। এই বৃদ্ধি এতটাই সামান্য যে, কোনো কোনো শ্রমিকের জন্য তা মাসে মাত্র কয়েক সেন্ট (১০০ সেন্ট সমান এক ডলার)। সোমবার আমস্টার্ডাম ভিত্তিক শ্রমিক অধিকার বিষয়ক সংগঠন ক্লিন ক্লোথস ক্যাম্পেইনের বেন ভ্যানপেপোরস্ট্রেইটি বলেছেন, প্রকৃত সত্য হলো সাম্প্রতিক সংশোধনীর পরও বাংলাদেশের এসব শ্রমিক এখনও খুবই কম মজুরি পাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকার শ্রমিকদের ভীতি প্রদর্শনেেক বেছে নিয়েছে এবং তাদের যেকোনো সংগঠিত হওয়ার চেষ্টাকে দমন করছে।

১৫শ’ টাকার জন্য শিশু খুন!

নির্মম। অমানবিক। মাত্র ১৫শ’ টাকার জন্য প্রাণ দিতে হলো ৭ বছরের এক শিশুকে। নিহত শিশুটির নাম হৃদয় হোসেন সিদ্দিক। নিহত হৃদয়ের বস্তাবন্দি লাশ নিখোঁজের চারদিন পর রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ইয়াসিন আলীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে ।
লালবাগ থানার ওসি সুভাষ কুমার পাল বলেন, হৃদয়ের বাবা রমজান আলী, মা সুমা আক্তার ও দুই ছেলেকে নিয়ে লালবাগ শহীদ নগর এক নম্বর গলির একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। হৃদয় স্থানীয় জগৎমোহন স্কুলে প্লে গ্রুপে পড়ত। গত ২৬শে জানুয়ারি বিকাল ৪টার দিকে খেলার জন্য বাইরে যায় সে।
সেখান থেকে পারিবারিকভাবে পরিচিত ইয়াসিন আলী তাকে নিয়ে যায়। রাত হয়ে গেলে শিশুটি চিৎকার করতে থাকে। পরে শিশুটিকে জানায় তোমার বাবার কাছে ১৫শ’ টাকা পাবো। এটা পরিশোধ করলেই মুক্তি মিলবে। কিন্তু শিশুটি চিৎকার করায় খুন করে ও বস্তাবন্দি লাশ ফেলে দেয়। নিখোঁজের পরদিন লালবাগ থানায় হৃদয়ের নিখোঁজের বিষয়টি জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। পাশাপাশি এলাকায় মাইকিং করা হয়।
কামরাঙ্গীরচর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আল মামুন বলেন, সকালে কামরাঙ্গীরচর আলীনগর দুই নম্বর গলির ইলিয়াছের বাড়ির পাশের গলিতে একটি বস্তা পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ বস্তার ভিতর থেকে হৃদয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরে হৃদয়ের বাবা রমজান আলী তার ছেলের মৃতদেহ শনাক্ত করেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আলীনগর বাজার দুই নম্বর গলি থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

অস্ট্রেলিয়ার ডার্লিং নদীতে আবারও ভেসে উঠলো কয়েক লাখ মৃত মাছ

অস্ট্রেলিয়ার খরা কবলিত মেনিন্দি এলাকায় আবারও মারা গেছে কয়েক লাখ মাছ। পানিতে ভেসে ওঠা মৃত মাছে ছেয়ে গেছে ডার্লিং নদী। জানুয়ারির শুরুর দিকে দশ লাখ মাছ মারা যাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মাথায় নতুন করে বিপুল সংখ্যক মাছের মারা গেলো। আগামী কয়েকদিনে এভাবে গণহারে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।
সম্প্রতি দীর্ঘমেয়াদী খরায় আক্রান্ত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো। সেইসঙ্গে প্রচণ্ডরকমের তাপপ্রবাহ আবহাওয়াকে আরও বৈরি করে তুলেছে। উত্তরাঞ্চলীয় অস্ট্রেলিয়ায় বর্ষাকাল দেরি করে আসার কারণেও কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত মুরে-ডার্লিং রিভার ব্যবস্থারই অংশ হলো ডার্লিং নদী। কয়েক সপ্তাহ আগে সেখানে ভেসে উঠেছিল প্রায় দশ লাখ মৃত মাছ। বিজ্ঞানীরা এর জন্য কম পানি, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া ও বিষাক্ত শেওলার উপস্থিতিকে দায়ী করেছিলেন। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই গত কয়েকদিনে ডার্লিং নদীতে নতুন করে বিপুলসংখ্যক মৃত মাছ ভেসে উঠেছে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের ডিপার্টমেন্ট অব প্রাইমারি ইন্ডাস্ট্রিজের পরিদর্শকরা এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন। এক বিবৃতিতে তারা নিশ্চিত করেছেন, ‘কয়েক লাখ মাছ মারা গেছে’। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ডার্লিং নদীতে আরও বেশি মাছের মৃত্যু হতে পারে। কারণ, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাছকে নাজুক অবস্থায় দেখা গেছে।’ পরিদর্শকদের দাবি, উষ্ণ আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পর তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতার কারণে ‘অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে’। আর সেকারণেই ডার্লিং নদীর মাছের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃষ্টিপাত হওয়ার মতো কোনও পূর্বাভাসও নেই। এমন অবস্থায় আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আরও বেশি সংখ্যক মাছ মারা যাওয়ার ‘উচ্চ ঝুঁকি’ তৈরি হয়েছে।
এভাবে বিপুল সংখ্যক মাছের মৃত্যুর জন্য তীব্র খরাকে দায়ী করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের দাবি, পদ্ধতিগত নিঃশ্বেষকরণ ও নদী দূষণ এর জন্য দায়ী।
মঙ্গলবার (২৯ জানুয়ারি) মেনিন্দি সফর করেছেন নিউ সাউথ ওয়েলস-এর আঞ্চলিক পানিমন্ত্রী নিয়াল ব্লেয়ার। অস্ট্রেলিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম এবিসিকে তিনি জানান, নদীগুলোতে অ্যারেটর (পানিতে অক্সিজের সরবরাহ বাড়ানোর যন্ত্র) স্থাপন করা ছাড়া তার সরকারের হাতে অন্য কোনও উপায় নেই। ‘কোনও কিছুতে অর্থ খরচ করতে না চাওয়ার মতো বিষয় নয় এটি। এখানে কেউ অন্য কোনও বিকল্প প্রস্তাবই দিতে পারেনি। ‘এ মুহূর্তে পরিস্থিতি সামলানোর একমাত্র উপায় হলো এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিশুদ্ধ পানি নিয়ে আসা। এ মুহূর্তে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
উল্লেখ্য, গত বছর বড়দিনের আগেও ডার্লিং নদীতে মৃত মাছ ভেসে উঠেছিল।
অস্ট্রেলিয়ার ডার্লিং নদীতে আবারও ভেসে উঠেছে কয়েক লাখ মৃত মাছ

চিলমারীতে ইটভাটায় নষ্ট হচ্ছে সড়ক

চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমির উর্বর মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়। ইটভাটার আগুনে পুড়ে কমে যাচ্ছে উর্বর জমির পরিমাণ। প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে এক শ্রেণির দালাল দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসা করে আসছে। এতে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব অনুমোদনহীন মাটি ট্রাক (ট্রাক্টর) দিয়ে ইটভাটায় নেয়ায় গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়কগুলো নষ্ট হচ্ছে। গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়ক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। নীতিমালা না মানার জন্য শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্টে। এলাকার সাধারণ মানুষসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
উপজেলার মাছাবান্দা এলাকার আমিনুল, আ. আজিজ, শরীফেরহাট এলাকার বুলেট, আজিজলসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন ব্রিকস (ইটভাটার) ইট তৈরির জন্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারকৃৃত উপকরণ হচ্ছে মাটি। সেই মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে কৃষি জমি থেকে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী দালাল জমির মালিকদের মাটি কাটার জন্য ভুল বুঝিয়ে অনুমোদন ছাড়াই এসব মাটি কাটাসহ নদী তীর এলাকারও মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় সরবরাহ করছে। এসব মাটি লাইসেন্স বিহীন ট্রাক্টরে সরকারি সম্পদ নষ্ট করে বালু, সিমেন্ট, মাটি অবাধে পরিবহন করার কারণে রাতারাতি মালিকরা লাখ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করছে। রাত-দিন মাটি বহনের জন্য গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়কগুলো ভারি চাকায় পিষ্ট হয়ে দেবে ও ভেঙ্গে যাচ্ছে সড়ক। এ ছাড়া মাটি পরিবহনের সুবিধার্থে পাকা-কাঁচা রাস্তাগুলো কেটে নষ্ট করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারি লাখ লাখ টাকায় নির্মাণকৃত পাকা-কাঁচা রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট। সেই সঙ্গে ফসলি জমির প্রাণ জ্বলে যাচ্ছে ভাটার আগুনে।