Thursday, February 19, 2015

‘মনে হচ্ছে নিজের দেশেই এসেছি’ -ঢাকায় মমতা ব্যানার্জী

তিন দিনের সফরে ঢাকায় নেমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, মনে হচ্ছে নিজের দেশেই এসেছি। এসময় তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। রাত ৯ টার কিছু পরে এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়মিত ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে পৌছান মমতা। আগে থেকে অপেক্ষমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ-১ এ তাকে স্বাগত জানান। পররাষ্ট দপ্তর ও ভারতীয় হাই কমিশনের ঊধ্বতন কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন। এদিকে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২ দিন আগেই সফরের বিস্তারিত জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর আমন্ত্রণে ১৯-২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সফর করবেন মমতা ব্যানার্জি। তার সফরসঙ্গী হিসেবে আসবেন পশ্চিমবঙ্গের নগর উন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, পর্যটন মন্ত্রী ব্রত্য বসু, সংসদ সদস্য দীপক অধিকারী, মুনমুন সেন, সঞ্জয় মিত্র এবং মুখ্য সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তারা। এ ছাড়া তার সফরসঙ্গী হিসেবে আরও থাকবেন প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। সফরকালে মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়োজিত চা-চক্রে অংশ নেবেন। মমতা ব্যানার্জী ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত অমর একুশে উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এ ছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। মুখ্যমন্ত্রী ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) ও ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স কোলকাতা (আইসিসি)-এর সহযোগিতায় ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অব ইন্ডাস্ট্রি (আইবিসিসিআই) নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। এ ছাড়া তিনি ভারতীয় হাইকমিশন আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায়ও যোগ দেবেন। ২০১১ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশে এটি তার প্রথম সফর। মমতা ব্যানার্জীর বাংলাদেশ সফরকালে তার সফরসঙ্গী হিসেবে আরো সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকবেনÑ রাজীব সিনহা, গৌতম স্যানাল, বীরেন্দ্র, কৃষ্ণা গুপ্তা, কুসুম কুমার দ্বিভেদী, স্বরূপ গোস্বামী, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী, গৌতম ঘোষ, সুবোধ সরকার, কল্যাণী কাজী, নচিকেতা চক্রবর্তী ও অরিন্দম শীল। বেসরকারি সদস্যদের মধ্যে রয়েছেনÑ হা¯্রা নেওটিয়া, শ্রীকান্ত মেহতা, অনিন্দ জানা, ইন্দ্রনীল সেন, শিবাজী পাঁজা, বিশ্ব মজুমদার, সুমন চট্যোপাধ্যায়, জনাব আসাবুল, উদিৎ প্রসন্ন মুখার্জী, অশোক মজুমদার, কিংসুক প্রামানিক, দীপঙ্কর নন্দী, পুষণ গুপ্ত, দুর্বার গাঙ্গুলি, সুমাইয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, পল্লবী ঘোষ, উজ্জল সিনহা, রজৎ রায়চৌধুরী, জয়দেব জানা, অগ্নি রায় ও দেবদীপ পুরোহিত।

মমতা ঢাকায়

তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। রাত ৯ টার কিছু পরে এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়মিত ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে পৌছান মমতা। আগে থেকে অপেক্ষমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ-১ এ তাকে স্বাগত জানান। পররাষ্ট দপ্তর ও ভারতীয় হাই কমিশনের ঊধ্বতন কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২ দিন আগেই সফরের বিস্তারিত জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর আমন্ত্রণে ১৯-২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সফর করবেন মমতা ব্যানার্জি। তার সফরসঙ্গী হিসেবে আসবেন পশ্চিমবঙ্গের নগর উন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, পর্যটন মন্ত্রী ব্রত্য বসু, সংসদ সদস্য দীপক অধিকারী, মুনমুন সেন, সঞ্জয় মিত্র এবং মুখ্য সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া তার সফরসঙ্গী হিসেবে আরও থাকবেন প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। সফরকালে মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়োজিত চা-চক্রে অংশ নেবেন।
মমতা ব্যানার্জী ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত অমর একুশে উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এ ছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। মুখ্যমন্ত্রী ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) ও ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স কোলকাতা (আইসিসি)-এর সহযোগিতায় ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অব ইন্ডাস্ট্রি (আইবিসিসিআই) নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। এ ছাড়া তিনি ভারতীয় হাইকমিশন আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায়ও যোগ দেবেন।
২০১১ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশে এটি তার প্রথম সফর। মমতা ব্যানার্জীর বাংলাদেশ সফরকালে তার সফরসঙ্গী হিসেবে আরো সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকবেনÑ রাজীব সিনহা, গৌতম স্যানাল, বীরেন্দ্র, কৃষ্ণা গুপ্তা, কুসুম কুমার দ্বিভেদী, স্বরূপ গোস্বামী, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী, গৌতম ঘোষ, সুবোধ সরকার, কল্যাণী কাজী, নচিকেতা চক্রবর্তী ও অরিন্দম শীল।
বেসরকারি সদস্যদের মধ্যে রয়েছেনÑ হা¯্রা নেওটিয়া, শ্রীকান্ত মেহতা, অনিন্দ জানা, ইন্দ্রনীল সেন, শিবাজী পাঁজা, বিশ্ব মজুমদার, সুমন চট্যোপাধ্যায়, জনাব আসাবুল, উদিৎ প্রসন্ন মুখার্জী, অশোক মজুমদার, কিংসুক প্রামানিক, দীপঙ্কর নন্দী, পুষণ গুপ্ত, দুর্বার গাঙ্গুলি, সুমাইয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, পল্লবী ঘোষ, উজ্জল সিনহা, রজৎ রায়চৌধুরী, জয়দেব জানা, অগ্নি রায় ও দেবদীপ পুরোহিত।

মিয়ানমার ছেড়ে পালাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ

মিয়ানমারের লক্ষাধিক বাসিন্দা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চীনে পালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধাতঙ্কে মিয়ানমার ছেড়ে চীনে পালিয়ে যাচ্ছে দেশটির লাখ লাখ নাগরিক। বুধবারও প্রায় ৯০ হাজার বাসিন্দা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে গেছে। পলাতকদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি কর্মকর্তাদের আনুমানিক ধারণা, ‘প্রায় কয়েক লাখ নাগরিক মিয়ানমার থেকে পালিয়ে গেছে।’ সম্প্রতি চীন সীমান্ত সংলগ্ন শান প্রদেশে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মির (এমএনডিএএ) লড়াইয়ের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৯ সালের পর থেকে চীনসমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী এমএনডিএএ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিল এমএনডিএএ। তবে ২০০৯ সালে এ শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। জাতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে নিজেদের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিই তাদের মূল দাবি। এরপর থেকেই দু’পক্ষের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে আসছে। গত ৯ ফেব্র“য়ারি শান প্রদেশের কংগিয়ান এলাকায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে মর্টার হামলা চালালে ৪৭ সেনাসদস্য নিহত হয়। এরপর থেকেই ওই এলাকার লোকজন সীমান্ত পাড়ি দিতে শুরু করে। বুধবার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ২ ফেব্র“য়ারি থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের নাগরিকদের ৩০ হাজার বার সীমান্ত পাড়ির ঘটনা ঘটেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে। এই প্রথমবারের মতো শরণার্থীদের সংখ্যা প্রকাশ করল চীন সরকার। লিস সেন নামে এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, তার ধারণা গত এক সপ্তাহে সংঘাতকবলিত কোকাং এলাকা থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইং মিয়ানমার সরকার ও এমএনডিএএকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
কোকাং প্রদেশে সামরিক আইন জারি : মিয়ানমারের কোকাং প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে তিন মাসের জন্য সামরিক আইন জারি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইনসেইন। খবর বিবিসি, এএফপি। স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশটির রাজধানী লোকাইয়ে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির সেনাবাহিনী ও কোকাং বিদ্রোহীদের মধ্যে সিরিজ সংঘর্ষের পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে মঙ্গলবার বলা হয়েছে, ১২ ফেব্র“য়ারি থেকে কারফিউ চলার পরও প্রদেশটিতে বিদ্রোহীদের অব্যাহত সংঘর্ষে সরকার সেখানে সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লেইংকে কোকাংয়ের প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। হ্লেইংকে তার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ বা হস্তান্তরের অধিকারও দেয়া হয়েছে।

দেশটি শুধু রাজনীতিবিদদের নয় by আলী ইমাম মজুমদার

রাজনীতি একটি রাষ্ট্রের বুনিয়াদ, এটা অস্বীকার করা যায় না। তাই স্বাভাবিক নিয়মে রাজনীতিবিদেরাই রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। তবে দেশের আমজনতার খুব কম সংখ্যকই প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকেন। কিন্তু সে আমজনতাই দেশটির সব ক্ষমতার মালিক। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে এ অবস্থানটি উচ্চারিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক যে এ অবস্থানের কার্যকর স্বীকৃতি রাজনীতিবিদেরা দিতে চান না। গত মাস দেড়েকের অবস্থা দেখেও এটা ধরে নেওয়া অসংগত হবে না। মনে হচ্ছে রাজনীতিবিদেরা যা চাইবেন, তা-ই করতে হবে এ দেশের মানুষকে।
এমনটা যদি না হতো, তাহলে এ দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ আর প্রায়ই ডাকা হরতাল জনজীবনকে এরূপ স্তব্ধ করে দিত না। আরও ভয়ংকর যে এ হরতাল-অবরোধ কার্যকর করতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাণঘাতী ও মর্মান্তিক যন্ত্রণাদায়ক পেট্রলবোমা। অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কেউ বা হারাচ্ছে জীবন। আর কারও জন্য রইল যন্ত্রণাদায়ক ভবিষ্যৎ। পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গাড়ি, এমনকি নৌযানও। রেললাইন উপড়ে ফেলে দুর্ঘটনার কারণ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আন্দোলন আহ্বানকারীরা অবশ্য বলছেন, তাঁরা এসব ঘটনার জন্য দায়ী নন। আর অতীতেও এর চেয়ে বেশি সময় ধরে হয়েছে হরতাল-অবরোধ। সেগুলো কার্যকর করতেও ক্ষেত্রবিশেষে গাড়িতে গানপাউডার ছড়িয়ে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। ভাঙা ও পোড়ানো হয়েছিল অনেক গাড়ি। মিথ্যা নয়, তবে এ–জাতীয় অমানবিক কার্যক্রমের উৎস অনুসন্ধান ও যথাযথ তদন্ত করে অপরাধীকে দণ্ড দিতে সক্ষম হয়নি কোনো সরকার।
এটা সত্য, আদালত কর্তৃক অপরাধী বলে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এসব ঘটনার জন্য কারা দায়ী, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাবে না। তবে যে বা যাঁরা এ আন্দোলন আহ্বান করেছেন, তাঁদের এসব ঘটনার নৈতিক দায়িত্ব তো অস্বীকার করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। সন্ত্রাসবাদকে যদি প্রশ্রয় দিতে না চান, তাহলে কথায় ও কাজে প্রমাণ করতে হবে।
যেমন, অহিংস অসহযোগ আন্দোলন করতে গিয়ে তা দিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশ উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচোরায় নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালালে তিনজন নিহত হয়। উত্তেজিত জনতা থানা আক্রমণ করে ২৩ জন পুলিশ সদস্যকে জীবন্ত দগ্ধ করে। এর ফলে মহাত্মা গান্ধী সিদ্ধান্তে পৌঁছান জনগণ অহিংস আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হয়নি। তিনি বন্ধ করেন আন্দোলন। নিহত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে অনশনও করেছিলেন। সে সময়েও কিছু লোক ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন করেছিল। ঔপনিবেশিক সরকার তাদের আইনের আওতায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলেও মহাত্মা গান্ধী তাদের কারও পক্ষে কোনো বিবৃতি দিতে সম্মত হননি।
আমরা সেসব ঐতিহ্য ছেড়ে দিয়ে বসে আছি বহুদিন। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র করেছি। কিন্তু গণতন্ত্রের চর্চা বিবৃতি আর বক্তব্যেই সীমিত রয়ে গেছে। গত ২০ বছর যখন যাঁরা বিরোধী দলে গেছেন, সংসদ বর্জন করেছেন লাগাতার। তাঁরাই কারণে-অকারণে হরতাল-অবরোধ ডেকেছেন। এখনো ডাকা হচ্ছে। কিন্তু ভেবে দেখার আছে যে দেশটি ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকে যাচ্ছিল। অর্থনীতি এখন অনেক বেশি পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। উন্নয়নের পাশাপাশি তা আরও বাড়ার কথা। জনগণের চলাচলের প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে।
এ ধরনের সর্বগ্রাসী হরতাল-অবরোধে তো সবই যেতে বসেছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিপর্যস্ত। ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর, যানবাহন শ্রমিক, হকারসহ অনেকেই পথে বসতে চলেছেন। শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে। প্রায় ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থীও এ অবস্থার শিকার। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলও খুবই কমে গেছে। এমনকি নিরাপত্তার স্বার্থে রাত নয়টার পর মহাসড়কে যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল সরকার এখনকার মতো বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রশ্ন আসবে এমনটা কেন হয়। দীর্ঘদিনের একটি মন্দ ঐতিহ্য আমরা ধারণ করছি। এবার যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁরা গত ৫ জানুয়ারি একটি সমাবেশ করতে চেয়েছিলেন। সে সমাবেশটি ছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিচ্যুতির বিশ্লেষণ ও নতুন সংসদ নির্বাচনের দাবিতে। সে নির্বাচনটির সাংবিধানিক শুদ্ধতা যতটাই থাক, রাজনৈতিকভাবে অনস্বীকার্যভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আলোচ্য নির্বাচনটিতে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। আন্দোলনকারী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সুতরাং তারা এ নির্বাচনের সমালোচনা বা নতুন নির্বাচনের দাবিতে সমাবেশ করতে পারে। এর অনুমতি দিলে নিরাপত্তাসংকট যদি বা হতোই, গত দেড় মাসে ঘটে যাওয়া সংকটের চেয়ে বেশি হতো বলে অনেকে মনে করেন না।
হেফাজতে ইসলামকে সমাবেশের অনুমতি এবং এর অপব্যবহার করায় সরকার আইন প্রয়োগ করে কৌশলের পরিচয় দিয়েছিল। এবার এর বিপরীতটা কেন ঘটল, তা অনেকের কাছে বোধগম্য নয়। এর পরও সরকার তাদের কোনো সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। চলমান আন্দোলন দমনের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন কার্যক্রম নিচ্ছে। সহিংসতার বিপক্ষে আপামর জনতা। তা সত্ত্বেও মনে করা হয়, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতাতেই বিচার হওয়া সংগত। সরকারের আপসহীন হওয়া যেমন যৌক্তিক, তেমনি তা হতে হবে আইনের আওতায়। এ বিষয়ে ভিন্নতর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে যেসব অভিযোগ আসছে, তা প্রকৃত সুফল দেবে না।
এখন প্রশ্ন থাকে, এ জাতীয় অবস্থায় সরকার বা আন্দোলনরত দলগুলোর কী করণীয় থাকে। প্রথমেই আন্দোলনকারীদের কথা আসে। তাদের সব অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু আন্দোলনের ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ। তারা কেউ আলোচ্য নির্বাচনের বর্ণিত ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য দায়ী নয়। অথচ দায়ভার আজ তাদের ঘাড়ে। তাদের জীবন-জীবিকা দুটোই হুমকির মুখে। প্রশ্নটি বিবেচনায় রেখে হরতাল-অবরোধ বাদ দিয়েও তো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়া যায়। ঠিক তেমনি আসে সরকারের অবস্থানের বিষয়টি। জনজীবনের নিরাপত্তার
বিধান তাদের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে তারা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাহলে আজ দেশে-বিদেশে যে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে, তা বিবদমান পক্ষ দুটোর সংলাপ। এতে দোষ কী? যুদ্ধরত দুটো পক্ষের মধ্যেও শান্তি আলোচনা হয়। কখনো বা তা হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে।
এ সংলাপ প্রশ্নে যাঁরাই কথা বলেন, তাঁদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়। এটা অশোভন। পক্ষদ্বয় সংলাপে কী গ্রহণ বা বর্জন করবে, তা তাদের বিষয়। কিন্তু সংলাপের পরামর্শ কেউ দিলে তাঁদের বিচার-বুদ্ধি এমনকি দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা আছে, এমনটা মনে হয় না। তাঁরা রাজনীতি না করলেও চলমান সংকটে রাজনীতি নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন। এমনকি কথা বলছে ভিন্ন দেশ এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিও। চলমান বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংযম ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই, এমনটাই অনেকে বলে চলছেন।
ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেছেন, সব পক্ষ যেন কর্মের পরিণতি সম্পর্কে ভাবে। দেশে যাঁরা সংলাপের প্রস্তাব দিচ্ছেন, তাঁদের কেউ কেউ আখ্যায়িত করছেন এক-এগারোর কুশীলব বলে। এক-এগারো নেমে আসার ঘটনাগুলো একটু তলিয়ে দেখা অসংগত হবে না। একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত অবস্থান, প্রস্তাবিত প্রধান উপদেষ্টা ও নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তখনকার বিরোধী দলের প্রবল আপত্তি ও আন্দোলন, একপর্যায়ে সে সময়কার রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বভার গ্রহণ, তাঁর পক্ষপাতসুলভ আচরণ, মহাজোটের নির্বাচন বর্জন ও উভয় পক্ষের মুখোমুখি প্রাণঘাতী আন্দোলন মূলত এক-এগারোকে ডেকে এনেছিল। এগুলোর কোনো দায় অরাজনৈতিক সুশীল সমাজের ওপর বর্তায় না।
অতীতে যা-ই ঘটুক, আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ চাই। আর তা চাই রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বেই। তাঁরা ক্ষেত্রবিশেষে ব্যর্থতার পাশাপাশি দৃশ্যমান প্রশংসনীয় সাফল্যের পরিচয়ও দিয়েছেন। তা দিয়েছেন ১৯৭১ আর ১৯৯০-এ। এবার তাঁরা তা করতে সক্ষম হবেন না, এমনটা ভাবার যৌক্তিক কারণ নেই। তবে তাঁদের কর্মসূচি আর এর মোকাবিলা করতে গিয়ে দেশের আমজনতাকে ভোগান্তির শিকার হতে দেওয়া যাবে না।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

বার্ন ইউনিটে ৯ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন

ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পেট্রলবোমায় দগ্ধ এবড়োথেবড়ো শরীর নিয়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ৫০ জন। তারা একটু উপশমের জন্য হা-হুতাশ করছেন। চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় ভর্তি রয়েছেন ৯ জন। অপরদিকে আশংকাজনক অবস্থায় ভর্তি আছেন আরও কমপক্ষে ২৩ জন। যাদের শরীর ১৫ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। বুধবার ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ঘুরে দেখা গেছে, পেট্রলবোমায় দগ্ধ রোগীদের স্বজনরা দৌড়-ঝাঁপ করছেন। ওয়ার্ড কিংবা ইউনিটে জায়গা না হওয়ায় এখনও বারান্দায় কাতরাচ্ছেন ৮ জন দগ্ধ রোগী। এইচডিইউ ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন ১১ জন, যারা এখনও শংকামুক্ত নয়। ৫৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ হোসেন মিয়া আইসিইউতে বিলাপ করছেন। পেট্রলবোমায় তার শরীর পুড়ে গেছে ৭৫ শতাংশ। ছাগল বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি। ১৫ ফেব্র“য়ারি নরসিংদী এলাকায় কাভার্ড ভ্যানে ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন তিনি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী নূরজাহান বেগম (৫০) স্বামীর কষ্টে থরথর করে কাঁপছেন। ডাক্তার, নার্সরা বেডের পাশে গেলেই জড়িয়ে ধরে বলছেন, তার স্বামীকে যেন যে করেই হউক সুস্থ করে তোলা হয়।
নূরজাহান বেগম জানান, তারা খুবই দরিদ্র। ফেনী নদী ভাঙন এলাকার মানুষ। জায়গা জমি যা ছিল তা নদীই গিলে খেয়েছে। এখন কোনো মতে টিনের একটি ঘর করে ২ ছেলে ও ৪ মেয়েকে নিয়ে থাকছেন খেয়ে না খেয়ে। তার স্বামীই সংসার চালাতেন। সৎ উপার্জনে পরিবার নিয়ে খেয়েপরে বেঁচে ছিলেন। ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। পেট্রলবোমা তার স্বামীর দাড়ি, মাথার চুল সব ছাই করে দিয়েছে।
এদিকে পর্যাপ্ত আইসিইউ ও এইচডিইউ ইউনিট না থাকায় চিকিৎসা প্রদানে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। এমনটা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম যুগান্তরকে জানান, ৪-৫ দিন আগেও এ বার্ন ইউনিটে ৬৪ জন দগ্ধ রোগী ভর্তি ছিল। ১৪ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠায় তাদের মধ্যে ৬ জনকে কুর্মিটোলা ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা সুস্থ রয়েছে। বাকিরা বাসায় চলে গেছেন। তিনি বলেন বেশি দগ্ধ রোগীদের যথাযথ চিকিৎসায় ২টি ওয়ার্ডকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় দুটি এইচডিইউ ইউনিট করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠান প্রমিক্স কোং লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মৌসুমি ইসলাম জানান, আইএফআইসি ব্যাংকের অর্থায়নে তারা দুটি ওর্য়াডকে এইচডিইউ ইউনিট সমপরিমাণের করে তৈরি করে দিচ্ছেন। যে ইউনিট দুটিতে ৩৬টি সয়ংক্রিয় পদ্ধতির বেড স্থাপন করা হবে। গত সপ্তাহে কাজ শুরু করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী আড়াই মাসের মধ্যে তাদের কাজ সম্পন্ন হবে।
প্লাস্টিক সার্জারি ও বার্ন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সাজ্জাদ খোন্দকার যুগান্তরকে জানান, দুটি ওয়ার্ড এইচডিইউ ইউনিটে রূপান্তরিত হলে চিকিৎসা সেবায় তাদের সহায়ক হবে।
তিনি বলেন, দগ্ধ রোগীদের অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে এখনও ৯ জন চরম শংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন। তিনি বলেন, সুস্থ হয়ে উঠা ৭ জনকে কুর্মিটোলা ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আপ ম্যাজিক কি কাগজে-কলমেই থেকে যাবে by তারেক শামসুর রেহমান

দিল্লির বিধানসভার নির্বাচনে আম আদমি পার্টির (আপ) অসাধারণ বিজয় ও আপ ‘সুপ্রিমো’ অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সব প্রতিশ্র“তি কি শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমেই থেকে যাবে? ইতিমধ্যেই হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। কীভাবে অরবিন্দ কেজরিওয়াল তার প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করবেন? কেননা দিল্লির নিজস্ব আয়ের ক্ষেত্রটা খুব বড় নয়। তার ওপর কেন্দ্রে যে সরকার রয়েছে, তার সঙ্গে ‘আপ’-এর সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন আছে। নির্বাচনের আগে কেজরিওয়াল যেসব প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ বিল অর্ধেক করে দেয়া, প্রতি মাসে পরিবারপ্রতি বিনামূল্যে ২০ হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা, ১৫ লাখ সিসিটিভি স্থাপন, ফ্রি ওয়াইফাই, ৫০০ ফ্রি স্কুল, ২০ ফ্রি কলেজ, হাসপাতালে ৩০ হাজার বেড বাড়ানো, ৫৫ হাজার নতুন স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা, ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধ করা ইত্যাদি। এসব প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়নে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ‘ধাক্কা’ খাবেন।
দিল্লির বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদা ৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ‘আপ’ নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কথা বলছে। এক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণের কারণে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা অতিরিক্ত গ্যাসের কারণে গ্যাস বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা দিল্লিতে বেসরকারি খাতে। এরা শতকরা ৫২ ভাগ বেশি আয় করে। এদের আয়-ব্যয় হিসাব করার হুমকি দিয়েছে ‘আপ’। এখন যদি মুখ্যমন্ত্রী বিদ্যুৎ বিল অর্ধেক করার নির্দেশ দেন, তাতে রাজস্ব আয় অনেক কমে যাবে। আয় কমে গেলে কোন খাত থেকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের উন্নয়নের অর্থ জোগাবেন? প্রতি মাসে ২০ হাজার লিটার পানি বিনামূল্যে দেয়ার প্রতিশ্র“তি তিনি দিয়েছেন। অথচ দিল্লির ভূগর্ভে পানির স্তর এ সরবরাহের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে তাকে পার্শ্ববর্তী হরিয়ানা রাজ্যের দিকে তাকাতে হবে। কিন্তু সেখানে রয়েছে বিজেপি সরকার। বিজেপির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। পুরো দিল্লি শহরে ১৫ লাখ সিসিটিভি বসানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে খরচ হবে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা, যা কিনা দিল্লির বার্ষিক আয়ের ৪ গুণ। সিসিটিভির নজরদারির জন্য দরকার হবে আরও ৪ লাখ পুলিশ। এতেও খরচ বাড়বে। এত বিপুল খরচ ‘আপ’ মেটাবে কীভাবে? পত্রিকাগুলো লিখছে, যেখানে বেইজিং ও লন্ডনের মতো শহরে সিসিটিভির সংখ্যা ৪ লাখ ৭০ হাজার ও ৪ লাখ ২০ হাজার, সেখানে দিল্লিতে ১৫ লাখ সিসিটিভি বসানোর প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমেই থেকে যাবে। বর্তমানে দিল্লিতে ১ লাখ পুলিশ রয়েছে। নজরদারির জন্য অতিরিক্ত পুলিশ নিয়োগে খরচ বাড়বে ৫ হাজার কোটি টাকা। হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত বেড বসাতে খরচ হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ৫৫ হাজার অতিরিক্ত কর্মচারী নিয়োগে আরও খরচ হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। দিল্লির বার্ষিক বাজেট ৩৭ হাজার কোটি টাকা। নয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে এ বাজেট বাড়বে। অথচ রাজস্ব আসে মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে ভ্যাট কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কেজরিওয়াল। তাহলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন কীভাবে নয়া মুখ্যমন্ত্রী?
সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে বিজেপির ভোটপ্রাপ্তি এবার কমেছে। অর্থাৎ বিজেপির যে নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক ছিল তাতে ধস নেমেছে। যদিও তাদের নির্দিষ্ট ভোটার আছে। একই সঙ্গে ধস নেমেছে কংগ্রেস ভোটেও। যারা এতদিন কংগ্রেসকে ভোট দিত, তারা এখন কংগ্রেসের ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। গরিব, মধ্যবিত্ত, দলিত মুসলমানরা এতদিন কংগ্রেসকেই ভোট দিয়েছে। এরাই কংগ্রেসের ভোটব্যাংক। এরা এবার আর কংগ্রেসকে ভোট দেয়নি। এরা এখন ‘আপ’ বা এএপিতে তাদের আস্থা খুঁজে পেয়েছে। ফলে এএপির ভোটপ্রাপ্তি বেড়েছে, যা কেজরিওয়ালের সরকার গঠনে সহায়ক হচ্ছে।
একটা প্রশ্ন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই করবেন- যেখানে লোকসভায় সবক’টি আসন পেয়েছিল বিজেপি, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিজেপি সমর্থন হারাল কেন? এর অনেক কারণ আছে। লোকসভা আর বিধানসভার নির্বাচন এক নয়। দুই নির্বাচনের মেজাজ ভিন্ন ধরনের। লোকসভায় জাতীয় ইস্যু প্রাধান্য পায় আর বিধানসভায় প্রাধান্য পায় স্থানীয় ইস্যু। ২০১৪ সালে ভারতব্যাপী একটি পরিবর্তনের ঢেউ ছিল। সেই পরিবর্তনে ক্ষমতাচ্যুত হয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। মোদি নতুন একটা ইমেজ নিয়ে এসেছিলেন। সাধারণ মানুষ তাতে আস্থা রেখেছিল আর কংগ্রেসের ব্যর্থতা ছিল কংগ্রেস ২০১৪ সালে কোনো নতুন রাজনীতি উপহার দিতে পারেনি। কিন্তু দিল্লির বিধানসভার নির্বাচন একটি ভিন্ন বিষয়। এখানে দুর্নীতি, ধর্ষণ ইত্যাদি ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে। কিরণ মোদিকে বিজেপি সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেছিল। এতে সমস্যা হয়েছে একাধিক। দলের ভেতরে, যারা স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারা খুশি হননি। তাদের নীরবতা এএপির অনুকূলে গেছে। উপরন্তু কিরণ বেদী দিল্লির বাসিন্দা নন। তিনি বহিরাগত। রাজনীতিতেও যথেষ্ট অভিজ্ঞ নন। দক্ষ পুলিশ অফিসার হিসেবে তার নামডাক আছে। মানুষ তাকে চেনে দক্ষ ও যোগ্য অফিসার হিসেবে। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়ে নিজেকে সুবিধাবাদী রাজনীতির সঙ্গে জড়ান। তুলনামূলক বিচারে অরবিন্দ কেজরিওয়াল আরও বেশি যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। দিল্লির ১ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের একটা বড় অংশ নিু-মধ্যবিত্ত, দলিত ও মুসলমান। বিজেপি এদের কাছে যেতে পারেনি। কিরণ বেদীর ব্যর্থতা ছিল এখানেই যে, তিনি এ শ্রেণীর সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেননি। তারা কংগ্রেসের পরিবর্তে এএপিকেই ভোট দিয়েছে।
বিজেপির নীতি এবং নরেন্দ্র মোদির নীতি উচ্চবিত্ত তথা ব্যবসায়ী শ্রেণীকে টার্গেট করে পরিচালিত হচ্ছে। বড় বড় ব্যবসার কথা বলেন মোদি। তার আশপাশে নব্য ব্যবসায়ী শ্রেণীর ভিড় বেড়েছে। এতে করে উপেক্ষিত থাকছে মধ্যবিত্ত ও গরিব শ্রেণী। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, ওবামার অনুষ্ঠানে মোদি যে স্যুটটি পরেছিলেন তার দাম প্রায় ১০ লাখ টাকা। লন্ডনের এক ফ্যাশন হাউস থেকে এটি তৈরি করা হয়। মোদি ‘গরিবের বন্ধু’ নন, এমন একটা ইমেজ তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যে। ফলে মধ্যবিত্ত ও দলিত শ্রেণী যে তার ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিরণ বেদী নিজেও কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক। খুব স্বাভাবিকভাবেই দলিত শ্রেণী ধরে নিয়েছে তিনিও মোদির মতো ‘ধনীদের বন্ধু’। শুধু তাই নয়, বিজেপির সমর্থন নিয়ে সংঘ পরিবারের নেতৃত্বে ভারতজুড়ে ‘ঘর ওয়াপসি’ বা ধর্মান্তকরণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ধর্মান্তকরণের (অথবা মূল ধর্মে প্রত্যাবর্তন) নামে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের হিন্দু বা সনাতন ধর্মে দীক্ষিত করার কর্মসূচি ভারতজুড়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খোদ ওবামা ভারত সফরের সময় পরোক্ষভাবে এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। দিল্লির ভোটারদের একটা অংশ শিক্ষিত। তারা বিজেপির এ পরোক্ষ সমর্থনকে সহজভাবে নিতে পারেনি। ভোটের হিসাব-নিকাশে এর প্রভাব পড়েছে।
অতীতে কেজরিওয়ালের অনেক কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়েছিল। যেমন আগেরবার ক্ষমতায় গিয়ে তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করে দিয়েছিলেন। এতে বস্তিবাসী গরিব মানুষ উপকৃত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ এখনও মনে করেন, তিনি এ ধরনের কর্মসূচি আরও দেবেন। তাতে উপকৃত হবে মধ্যবিত্ত। ধনীরা তার কাছ থেকে সুবিধা পাবে না। ফলে ভোট পড়েছে বেশি। তার দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচিতেও মানুষের আস্থা রয়েছে। ভোটারদের একটা বড় অংশই মনে করে, ভারতে দুর্নীতি একটা বড় সমস্যা। এ সমস্যার কারণেই উন্নয়ন ঠিকমতো হচ্ছে না। আর রাজনীতিকদের একটা বড় অংশই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এক্ষেত্রে এএপি ব্যতিক্রম।
দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করল, গেলবারের ত্রিশঙ্কু অবস্থা থেকে রাজ্যটি মুক্তি পেয়েছে। এবার তারা একটি স্থায়ী রাজ্য সরকার পাবে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেজরিওয়াল কতটুকু সফল হবেন, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। তবে এটা ভারতব্যাপী কোনো মডেল হবে না। অনেক রাজ্য আছে, যেখানে স্থানীয় দলগুলো রাজ্য সরকার পরিচালনা করে। মাত্র দু’বছর আগে এএপির আবির্ভাব ভারতব্যাপী তেমন কোনো প্রভাব ফেলেনি। অরবিন্দ কেজরিওয়াল একজন জাতীয় নেতা হিসেবেও স্বীকৃতি পাননি। গত লোকসভায় তার দল কোনো আসন পায়নি। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন তাকে পরিচিত করেছিল। সামান্য একজন সরকারি কর্মচারী থেকে তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন দ্বিতীয়বারের মতো। তার এ অর্জন একেবারে কম নয়। তবে দিল্লির রাজ্য সরকার পরিচালনা করা তার জন্য একটা সমস্যা হতে পারে। কেন্দ্র থেকে তিনি যদি আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা না পান, তাহলে কোনো কর্মসূচিই তিনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। প্রতিশ্রুতি দেয়া যায়; কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন। যদিও মোদি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে সে প্রতিশ্রুতির পেছনে কতটুকু আন্তরিকতা আছে, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। তবে এটা সত্য, কেজরিওয়াল একটা ‘ইমেজ’ ইতিমধ্যে গড়ে তুলেছেন। একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ তিনি চান। কাজটি যে খুব সহজ, তা নয়। ভারতে দুর্নীতি প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায়, জেনেভায় বিভিন্ন ব্যাংকে ভারতীয়দের হাজার হাজার কোটি টাকা রয়েছে। কর ফাঁকি আর দুর্নীতির মাধ্যমে এ টাকা পাচার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ৬০ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে বলেও সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং যে রাজ্যের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন কেজরিওয়াল, সেখানে কর ফাঁকিবাজ আর দুর্নীতিবাজদের সংখ্যা বেশি। এক্ষেত্রে তিনি কতটুকু সফল হবেন, তা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।
কেজরিওয়ালের মূল স্পিরিট হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং শাসন ব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। এজন্যই তিনি প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন বিদ্যুতের বিল অর্ধেক করা, বিনামূল্যে পানি সরবরাহ করা ইত্যাদির। ভয় হয়, এটা না আবার ‘সস্তা স্লোগান’ হয়ে যায়। তবে কেজরিওয়ালের একটা ভালো জিনিস লক্ষণীয়। তিনি নির্বাচনের আগে ও পরে তার বিরোধী পক্ষ, বিশেষ করে কিরণ বেদী সম্পর্কে কোনো খারাপ মন্তব্য করেননি। ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমনটি দেখা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তার পার্থক্য এখানেই।
দিল্লির বিধানসভায় কোনো বিরোধী দল থাকবে না, এটাও একটা খারাপ দিক। ‘আপ’-এর নীতির কোনো সমালোচনা আমরা শুনতে পাব না। এতে করে দায়বদ্ধতার একটা অভাব অনুভূত হবে। এটা কেজরিওয়ালকে একনায়কতন্ত্রী করে তুলতে পারে। তবে স্বীকার করতেই হবে, ভারতীয় রাজনীতিতে একটি ভিন্ন চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হলেন মাত্র ৪৭ বছরের অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ৫ বছর তার জন্য কম সময় নয়। তিনি কতটুকু সফল হবেন, সেটাই দেখার বিষয়।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tsrahamanbd@yahoo.com

পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম বিদ্বেষের মূল কারণ অজ্ঞতা by ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ

ইসলাম বা মুসলমান সম্পর্কে পশ্চিমাদের বৈরিতা বা দ্বিমুখী নীতি নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে এ বৈরিতা, ঘৃণা, অবজ্ঞা ও দ্বিমুখী নীতি চলে আসছে। কয়েক বছর আগে ইরানে বিরোধী দলের গণআন্দোলনের সময় কোনো এক অজ্ঞাত ঘাতকের হাতে নেদা সোলতানা নামের একজন অল্পবয়সী নারী প্রাণ হারায়। সঙ্গে সঙ্গে এ খবর বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমগুলোর সংবাদ শিরোনাম হয়ে ওঠে। পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের মধ্যে এই মর্মান্তিক ঘটনা তোলপাড় সৃষ্টি করা ছাড়াও তাদের মনকে আন্দোলিত করে তোলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নেদা সোলতানার মৃত্যুদৃশ্য দেখে ও শুনে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলেন এবং বলেছিলেন, ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। কয়েক সপ্তাহ পর জার্মানির ড্রেসডেন শহরে আরও মর্মান্তিক একটি ঘটনা ঘটে। মারওয়া-এল-শেরবিনি নামের এক মিসরীয় ভদ্রমহিলাকে হিজাব পরার কারণে এক জার্মান সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গালাগাল করেন। মারওয়া-এল-শেরবিনিকে অপমান করার কারণে ওই চরমপন্থী জার্মান নাগরিককে আদালত ২ হাজার ৮০০ ইউরো জরিমানা করেন। আদালতে উপস্থিত মারওয়া ও তার স্বামীকে উগ্রপন্থী এ জার্মান নাগরিক ক্রোধান্ধ হয়ে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। মারওয়া তাৎক্ষণিকভাবে আদালতে মৃত্যুবরণ করেন। জার্মানিতে মারওয়া ও ইরানে নেদা হত্যাকাণ্ডকে সমান বর্বরোচিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা দরকার ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে মিসরের হিজাব পরা মারওয়া-এল-শেরবিনির নির্মম হত্যাকাণ্ড বারাক ওবামার চোখে পানি আনতে পারেনি এবং ঘটনাটি তার মনে তেমন কোনো প্রভাবও ফেলতে পারেনি। শুধু তাই নয়, পশ্চিমা বিশ্বে এত বড় একটি মর্মান্তিক ঘটনা প্রচার মাধ্যমে শিরোনাম তো দূরের কথা, তেমন কোনো প্রচারও পায়নি। নেদা হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করে পশ্চিমা দেশগুলো সম্পূর্ণ দোষ ইরানের রক্ষণশীল ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বেশ কয়েক মাস বিশ্ববাসীর কাছে ইরানকে হেয় করার অপতৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু মারওয়ার হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, সন্ত্রাস শুধু আরব বা মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সাদা চামড়ার একজন জার্মানও সন্ত্রাসী হতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো প্রায়ই বলে থাকে, মুসলমান সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষ হত্যা করে। মারওয়া কি একজন নিরীহ মানুষ ছিলেন না? মারওয়ার কী অপরাধ ছিল? তিনি হিজাব পরতেন, তিনি মুসলমান ছিলেন- এই কি তার অপরাধ? মুসলমান হিসেবে হিজাব পরার কারণে জার্মানির মতো একটি দেশে একজন নিরীহ মহিলাকে হত্যা এবং তার স্বামীকে হত্যার চেষ্টার ঘটনা পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে তেমন কোনো প্রচার পায়নি বললেই চলে। কেন এই বৈরিতা, কেন এই বৈষম্য বা দ্বৈতনীতি? পশ্চিমা দেশগুলোতে ওইসব খবরই ফলাও করে প্রচার করা হয়, যা আরব বা মুসলমানদের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন। কিন্তু আরব বা মুসলমানরা কি সত্যিকার অর্থে সব পশ্চিমা নাগরিকের পক্ষপাতমূলক আচরণের নিরীহ শিকার? তা অবশ্যই নয়। আমরা পশ্চিমা শব্দটি অবশ্যই ওই অর্থে ব্যবহার করব না, যার অর্থ একচেটিয়ার পর্যায়ে চলে যায়। পাশ্চাত্যের লাখো কোটি মানুষ রয়েছে যারা ইসলামকে ভালোবাসে না, ঘৃণাও করে না। এর কারণ ইসলাম সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই।
পাশ্চাত্যের মানুষদের কাছে মুসলমানরা ইসলামের প্রকৃত ইমেজ বা প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে পারছে না। মুসলমানরা যা করে ও যা বলে এবং সেটাকে পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা থেকে যদি একজন পশ্চিমা নাগরিক প্রকৃত সত্যটি জানতে চেষ্টা করে, তাহলে তিনি উপসংহারে আসবেন? তিনি মনে করবেন, ওসামা বিন লাদেন বা বোকো হারাম অনুসারীরা মধ্যযুগীয় কোনো গুহা থেকে বেরিয়ে এসে ঘোষণা দেবেন- ইসলাম তাকে যত বেশি সম্ভব ইসলামবিরোধী পশ্চিমা ক্রুসেডারকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছে, যদিও তারা শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ করেনি। হয়তো বা তাদের সামনে ফুটে উঠবে- বিশ্বের সব মুসলমান তালেবান মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে গেছে, যারা মেয়েদের সব স্কুল বন্ধ করে দিতে সচেষ্ট। কারণ মহিলারা ধর্মীয় বা বৌদ্ধিকভাবে (Intellectually) পুরুষের সমকক্ষ নয় বলে ইসলাম তাদের শিক্ষাকে নিষিদ্ধ করেছে। তারপর পশ্চিমারা কিছুসংখ্যক স্বঘোষিত আইন বা ইসলাম বিশেষজ্ঞের বাণী পড়বেন এবং জানবেন, কোনো মুসলমান ধর্মান্তরিত হয়ে গেলে তাকে অনুশোচনা করতে হবে অথবা তার গলা কেটে ফেলতে হবে। অনেক তথাকথিত ইসলাম আইনজ্ঞের ভাষায় তারা পড়বেন- ইসলাম গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না এবং একজন মুসলমানের দায়িত্ব হল তার শাসককে মেনে চলা, হোন তিনি শোষক বা প্রজা নিষ্পেষণকারী। তারা চান মহিলারা নেকাবের মাধ্যমে তাদের চেহারা ঢেকে রাখবে, যাতে করে তাদের দেখে বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা জন্ম না নেয়।
কিন্তু পশ্চিমারা জানে না- ইসলামে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার এবং কর্তব্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা এও খুঁজে পাবে না, ইসলামের দৃষ্টিতে কেউ যদি একজন মানুষকে হত্যা করে, তাহলে সে মূলত পুরো মানব সভ্যতাকে হত্যা করল। পশ্চিমারা কখনও পড়েনি- ইসলামের মূলমন্ত্র হল মুক্তি, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার। ইসলাম স্বাধীন চিন্তার ধারক-বাহক। যার ইচ্ছা সে ইসলাম গ্রহণ করবে, যার ইচ্ছা সে তা বর্জন করবে। ধর্মে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। অনুসারীদের মতামত বা স্বীকৃতি ছাড়া কোনো শাসক ক্ষমতায় আসীন হতে পারেন না। এরপরও কি ইসলামকে পশ্চাৎপদ, সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে আমরা পশ্চিমাদের দোষ দেব না?
গত বছর একজন ধর্মবিশেষজ্ঞ অস্ট্রিয়ায় বাস্তবতার নিরিখে ইসলামের ওপর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একজন অতি দয়ালু ও সহনশীল মানুষ। নামাজ পড়ার সময় তিনি যখন সেজদায় যেতেন, তখন তাঁর নাতি হাসান ও হোসাইন (রা.) খেলাচ্ছলে লাফ দিয়ে তার পিঠে উঠে বসতেন। তারা স্বেচ্ছায় না নামা পর্যন্ত তিনি সেজদায় পড়ে থাকতেন, যাতে করে নাতিদের খেলাধুলায় বিঘœ না ঘটে। তারা নেমে গেলে তিনি নামাজ চালিয়ে যেতেন। সেই বিশেষজ্ঞ শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন- আপনারা কি বিশ্বাস করেন, যে মানুষটি শিশুদের খেলাধুলায় বিঘ্ন সৃষ্টি না করার জন্য নামাজ পড়া বন্ধ রাখতেন, তিনি নিরীহ মানুষকে সন্ত্রাসের মাধ্যমে হত্যা করার জন্য ওকালতি করবেন? অনেকেই বক্তৃতাটি শুনে বিমোহিত হয়েছিলেন এবং পরে তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ইসলাম সম্পর্কে জানতে হলে কী করতে হবে? এটা সত্য, পশ্চিমা দেশগুলো আমাদের ঔপনিবেশিক প্রজা বলে মনে করে। সুতরাং নাগরিক হিসেবে আমাদের কোনো অধিকার প্রত্যাশা করা তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় নয়। এটাও সত্য, এসব সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক দেশ তাদের প্রচার মাধ্যমগুলোকে পক্ষপাতমূলক ও ইসলাম বা মুসলমানবিদ্বেষী ভাবধারায় গড়ে তুলেছে। এসব প্রচার মাধ্যমে অনেক বিকৃত ও অসত্য ধারণা দীর্ঘদিন ধরে বারবার উপস্থাপন করার মাধ্যমে জনগণের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা- চেতনায় এর একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির জোর চেষ্ট চালানো হয়। এসব ধারণার মধ্যে থাকে- মুসলমানরা সন্ত্রাসী, চরমপন্থী ও সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিপন্থী। পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতে মুসলমানদের ভিন্নধর্মী মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধকে মূল্যায়নপূর্বক যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাতে পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমানদের বসবাস করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে বোমা হামলার পর ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০০৫ সালের জুলাই থেকে যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশদের সঙ্গে মুসলমানদের বৈরীভাব ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩৬ শতাংশ মুসলমান জানিয়েছেন, তারা বা তাদের পরিবারের এক বা একাধিক সদস্যকে অপমানের শিকার হতে হয়েছে।
ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি ইসলাম বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে সব সময়ই ফায়দা লুটতে সচেষ্ট থাকে। এ দলের নেতা নিক প্রিফিন বলেন, আমরা ইসলাম ও মুসলমানদের আঘাত করি কেন জানেন? সাধারণ মানুষ ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষ অতি সহজে বোঝে ও গ্রহণ করে। পত্রিকার সম্পাদকরা ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষকে পুঁজি করে অতি সহজে মুনাফা লুটতে সক্ষম হয়। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন আঁকার প্রতিবাদে ফ্রান্সের কার্টুন ম্যাগাজিন শার্লি এবদোর কার্যালয় ও অন্যান্য স্থানে ইসলামপন্থী বন্দুকধারীদের গুলিতে সাংবাদিকসহ ১৭ জন নিহত হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা আরও বেড়েছে। ১১ ফেব্র“য়ারি পত্রিকায় পড়লাম, নর্থ ক্যারোলাইনার চ্যাপল হিল শহরে একই পরিবারের তিনজন মুসলমান সদস্যকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শুধু মুসলমান হওয়াই ছিল তাদের অপরাধ!
পাশ্চাত্যের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলোর পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় বিশ্বের বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে উসকে দিয়েছে, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। এ প্রচার মাধ্যমগুলোকে কোনোমতেই গণতন্ত্র, সাম্য, মুক্তির সহায়ক শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।
আজকাল মুসলমানদের এক কথায় সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসের মদদদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। সাধারণ ভাষায় সন্ত্রাস কোনো ক্রিমিনাল অ্যাক্ট নয়- সন্ত্রাস হল পলিটিক্যাল অ্যাক্ট, যা পাশ্চাত্যে সাম্রাজ্যবাদী, বর্ণবাদী ও বিদ্বেষমূলক দ্বৈতনীতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া। পাশ্চাত্যের দেশগুলো যতদিন তাদের সাম্রাজ্যবাদী, বর্ণবাদী ও বিদ্বেষমূলক দ্বৈতনীতি পরিহার না করবে, ততদিন ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব ও সংঘাত বাড়তে থাকবে। এই দূরত্ব ও সংঘাত বিশ্বশান্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়- এ কথা পশ্চিমা দেশগুলো যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, ততই মঙ্গল।
ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ- পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ইইউ

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপ কমিটির প্রতিনিধি দল। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রতিনিধি দলের প্রধান। বুধবার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ইপি প্রতিনিধি দলের বৈঠকের পর শাহরিয়ার আলম জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিনিধি দলের বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই। তার বক্তব্য আজ গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত ওই সংবাদের কপি হাতে নিয়েই মানবাধিকার কমিশনে যান প্রতিনিধি দলের প্রধান ক্রিশিয়ান দান প্রিদা। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, এজন্যই আমাদের এখানে আসা।
বৈঠক শেষে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমান সহিংসতা বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দল। গণগ্রেপ্তারের বিষয়ে ইপি প্রতিনিধি দল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত বিরোধী জোটের সাত হাজার নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিনিধি দল জানিয়েছে।
সকাল ১১টায় প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মানবাধিকার কমিশনে যান। বেলা দুইটায় আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক ও তিনটায় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করবে ইইউ পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল। গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের নেতৃত্বে সরকারের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করে এ প্রতিনিধি দলটি। বৈঠকের পর প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিনিধি দল কোন উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন এমপিসহ ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশ সফরে এসেছে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে। এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইইউ পার্লামেন্টের এমপি ক্রিশ্চিয়ান দান প্রিদা।

কূটনীতিকদের সঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের বৈঠক- সংলাপ, সমঝোতা চাইলেন উদ্বিগ্ন কূটনীতিকেরা

দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা। তাঁরা এ সমস্যার দ্রুত সমাধান চেয়েছেন। এ জন্য তাঁরা সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে চলমান সংকট সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন। কূটনীতিকেরা আরও বলেছেন, বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতাও বন্ধ করতে হবে। কূটনীতিকেরা সহিংসতাকে প্রশ্রয় না দিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপদে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা যে সরকারেরই দায়িত্ব, তা-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন কূটনীতিকেরা।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতিগুলোর ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) গতকাল বুধবার এ দেশে নিযুক্ত কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে রাজধানীর একটি হোটেলে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে বক্তব্য দিতে আহ্বান জানানো হলে পাঁচজন কূটনীতিক এমন মত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বলেন, ‘বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে অন্যান্য দেশের মতো আমরাও উদ্বিগ্ন। সহিংসতায় এ পর্যন্ত যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা আশাবাদী যে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছেই এই সমস্যার সমাধান আছে। এ দেশে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, কার্যকর গণমাধ্যম, তৎপর সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী সমাজকে নিয়েই এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’
বৈঠকে কানাডার হাইকমিশনার বেনওয়া পিয়ের লাঘোমে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা বাণিজ্য এবং এ দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই। কিন্তু এ জন্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। তবে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
চলমান সহিংসতা প্রসঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার এ নিকোলায়েভ বলেন, ‘কে এসবের জন্য দায়ী, এটা কার ভুল, সে নিয়ে আমি কথা বলব না। সরকারের দায়িত্ব দেশের প্রত্যেক মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপদে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা। এখন যেসব সহিংসতা হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে মানুষ হত্যা চলছে, সরকারের সেগুলোও বরদাশত করা গ্রহণযোগ্য হবে না।’ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের অবশ্য কর্তব্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাপানের রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক কিছু অর্জন করেছে। জাপানের বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগ করতে চান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা গ্যাসের স্বল্পতা। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের মতো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ করতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ই ইউ ইয়াং বলেন, এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। সংলাপের মাধ্যমে দেশের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশের মানুষ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজ যে সংলাপের কথা বলছে, সেটাকে তিনি সমর্থন করেন বলে জানান।
কোরিয়ার এই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের ৪০ বছরের বন্ধুত্ব। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৫-৬ শতাংশ যায় কোরিয়ায়। কোরিয়ার ২০০-এর বেশি রপ্তানিকারক বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করেন। এ ধরনের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এসব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ শিগগিরই রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসবে বলেও আশা করেন তিনি।
বৈঠকে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, হল্যান্ড, সুইডেন, ভারতসহ প্রায় ৩০টি দেশের কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন। তবে আর কেউ বক্তব্য দেননি।
বৈঠকের শুরুতে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহ্মদ দেশের অর্থনীতির একটি চিত্র তুলে ধরেন। এর বড় অংশজুড়েই ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ। তিনি বলেন, গত মাসের শুরু থেকেই চলা হরতাল-অবরোধ দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। দেশের অর্থনীতি হরতাল-অবরোধের মতো মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এমন পরিবেশ চান না, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা করতে চান।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জানান, এক দিনের হরতাল-অবরোধে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। টানা ৪৪ দিনের অবরোধ-হরতালে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এ হরতাল-অবরোধের মতো নেতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে তাঁরা কাজ করছেন। তবে অবশ্যই তা প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকে করা হবে।
অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক দুই সভাপতি আনিসুল হক, এ কে আজাদ এবং বর্তমান দুই সহসভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, হেলাল উদ্দিনসহ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এফবিসিসিআই এই প্রথম কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করল। এর আগের বেশ কয়েকজন সভাপতি অতীতে বিভিন্ন সময়ে কূটনীতিকদের নিজের বাসায় ডেকে বৈঠক করেছিলেন। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে এফবিসিসিআই বিদেশি কূটনীতিকদের অবহিত করার প্রয়োজন বোধ করল কেন সে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন সরাসারি কোনো উত্তর দেননি। তবে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই আমরা কূটনীতিকদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করতে চাইছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে তা হয়নি। এখন যেহেতু নির্বাচন বোর্ড গঠিত হতে যাচ্ছে, তাই আমরা আজকে (বুধবার) তাঁদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সভার আয়োজন করি।’

ইউক্রেন- বিশ্বব্যবস্থায় নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত by দিমিত্রি ত্রেনিন

মিনস্কে যুদ্ধবিরতি হলেও পূর্ব ইউক্রেনে শান্তি সমঝোতার বিষয়টি এখনো দূর অস্তই। ইউক্রেনের সাংবিধানিক সংস্কার, ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে কিয়েভের নিয়ন্ত্রণসহ ঐকমত্যের অধিকাংশ ধারাই হয়তো কোনো দিন বাস্তবায়িত হবে না। বেশির পক্ষে এটি আশা করা যায় যে এই দ্বন্দ্ব জমে বরফ হয়ে যাবে আর মানুষ মরাও বন্ধ হবে। কিন্তু সেটাও যে হবে, তা-ও নিশ্চিত নয়। কারণ, যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার আগে বিরতিহীন যুদ্ধ চলছেই।
যুদ্ধবিরতি টিকে গেলে এটা হবে নতুনভাবে বিভাজিত ইউরোপের প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এতে রাশিয়া পূর্বাঞ্চলে প্রায় একা হয়ে পড়বে। আর ইউরোপের বেশির ভাগ অংশ ইউক্রেনকে সমর্থন করছে। ডনবাসের দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলতে থাকলে এই বিভাজন আরও তীব্র হবে। এটা বন্ধ হলেও মীমাংসা হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মানে হচ্ছে, নিকট ভবিষ্যতে ইউরোপ মহাদেশের কোনো অভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে না। এক ও অভিন্ন মানদণ্ড ও আচরণের বিধান থাকবে না। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে স্থিতিশীল মহাদেশ হচ্ছে ইউরোপ, সেখানেও বিশৃঙ্খলার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
ধারণা করা হচ্ছিল যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও তেলের নিম্ন দামের কারণে ক্রেমলিনের নীতি বদলাবে বা ক্রেমলিন নিজেই বদলে যাবে, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে তার সত্যতা প্রতিপন্ন হয়নি। পুতিন এখনো অবাধ্য, অভিজাতেরাও তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। আর রাশিয়ার জনগণ কঠিন অবস্থা পার করলেও তাঁর জনপ্রিয়তার পারদ রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। ইউক্রেন সংকট চলতে থাকলে কী ঘটবে, তারা তা জানে। কিন্তু সেই দোষ তারা চাপায় কিয়েভ, ওয়াশিংটন ও পশ্চিমা নেতাদের ওপর। পুতিন, তা সে যুদ্ধনেতাই হোন বা শান্তিকামীই হোন, তাদের শিরোমণি।
মিনস্কে তিনি তাঁর ন্যূনতম লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন। মস্কোর প্ররোচনায় ডনবাসের বিদ্রোহীরা তাদের কাজ চালাচ্ছে, তাদের উৎখাতে কিয়েভ ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চিরস্থায়ী হলে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র’ শারীরিকভাবে নিরাপদ হবে। আর ট্রান্সনিসত্রিয়ার আদলে সে নিজের রূপান্তর শুরু করতে পারে। রাশিয়ার অস্ত্র ও মানবিক সহায়তার চেয়ে বেশি কিছু পাঠাতে হবে। এতে রাশিয়ার সম্পদের ওপর আরও চাপ পড়বে। কিন্তু এর বিকল্প নেই বললেই চলে। পুতিন ও অধিকাংশ রুশের ক্ষেত্রে এরা ‘আমাদের জনগণ’।
তার পরও পুতিন রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক অবস্থান আরও জোরালো করেছেন। তিনি বলেন, ডনবাস রাশিয়ার অংশ হয়েই থাক। এটা ছাড় নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে একত্র ইউক্রেনের মধ্যে দোনেৎস্ক ও লুগানস্ক কিয়েভের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়াবে। দেশের বাকি অংশের পরিস্থিতি সায় দিলে তারা ডনবাসের বাইরেও তাদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করতে পারে। আর যারা কিয়েভের ময়দানের জয়ে এক বছর পর নিজেদের সরকারের ব্যাপারে মোহভঙ্গ হয়েছে, তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে পারে। যে সরকার দুর্নীতিতে লাগাম দিতে ও সাধারণ ইউক্রেনীয় জনগণের জীবনমান উন্নত করতে পারেনি। দেশের পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধবিরতি টিকে গেলে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সে কীভাবে সংস্কার ও জনপ্রিয় অসন্তোষ আমলে নেয়, তার ওপর।
রাশিয়া যত না ইউক্রেনকে হারিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ইউরোপকে হারিয়েছে। কিছুদিন আগে জার্মান চ্যান্সেলর অাঙ্গেলা ম্যার্কেল ও প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কোইস হল্যান্ড যে রাশিয়া সফরে এলেন, এর ফলেই মিনস্কে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালের স্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হচ্ছে জার্মানি-রাশিয়া সম্পর্ক। এটা বিপজ্জনকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনীতি প্রতিকূল আর ইতিহাস বিভেদকারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭০ বছর পর আজ নানা বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে, কারণ পোল্যান্ড, বাল্টিক রাষ্ট্র ও ইউক্রেনের রাজনীতিকেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের পরাজয়ে সোভিয়েতের ভূমিকা খাটো করার চেষ্টা করছেন। যারা স্তালিনের বিরুদ্ধে হিটলারের পক্ষাবলম্বন করেছিল, তাদের অব্যাহতি দেওয়ার কারণে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ এনেছে।
ফলে ইউক্রেন দ্বন্দ্বের কারণে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, গভীরতর হচ্ছে। রাশিয়ার সরকার আশা করে না যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিনের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। কিন্তু আগের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য হবে, এটাও আশা করা কঠিন। পুতিন যে বছর পাঁচেক আগে ‘ডাবলিন থেকে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত বৃহত্তর ইউরোপের’ ধারণা জার্মান ব্যবসায়ীদের খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তার জায়গায় এখন তিনি চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন। ‘সাংহাই থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ’ পর্যন্ত বৃহত্তর এশিয়ার ধারণা এসেছে। পুতিন আগামী ৯ মে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন, সেদিন তাঁর সম্মানিত অতিথি হিসেবে থাকবেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আর ওদিকে বারাক ওবামাসহ পশ্চিমা অন্য নেতারা এই অনুষ্ঠান বয়কট করবেন।
এটা পুরোটাই প্রতীকী ব্যাপার নয়। এটা নাটকীয় ব্যাপার। রাশিয়া গাজপ্রমের নিজস্ব প্রকল্প দ্য সাউথ স্ট্রিম ছেড়ে তুরস্কের মধ্য দিয়ে গ্রিক সীমান্ত পর্যন্ত একটি গ্যাসলাইন টানবে। এর মধ্য দিয়ে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মিলবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ও মার্কিন মিত্র তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া আরও নীরবে রাশিয়ার সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ওদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেও রাশিয়ার সঙ্গে স্বাভাবিক ও স্পন্দমান সম্পর্ক গড়ে তোলার আশা ছাড়েননি।
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া ইরান ও মিসরের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে, সৌদি আরবের সঙ্গে দেনদরবার করছে। সিরিয়ায় তার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আর গোনার মধ্যে না-ই আনলাম। লাতিন আমেরিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাকিস্তান পর্যন্ত রাশিয়া খদ্দের খুঁজছে, তার নব পুনর্জীবিত সমরশিল্পের জন্য।
ইউক্রেন ভূরাজনৈতিক ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র নয়। দুনিয়ার ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও রাশিয়া মূল বিষয় নয়। তাকে কেন্দ্র করে যে ইউক্রেন ও বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্বরাজনীতির এক নতুন ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে রাশিয়া প্রকাশ্যে ও চীন পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রভাবিত বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তুরস্ক থেকে ভারত ও জাপান পর্যন্ত জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণে এই ব্যবস্থার ক্ষত আরও গভীর হচ্ছে। আইএসকে অবমূল্যায়ন ও ধ্বংস করার প্রচেষ্টা শুধু আংশিক ও নড়বড়ে সাফল্য বয়ে এনেছে।
ইউরোপ মিত্র হিসেবে রাশিয়াকে হারিয়েছে, তার নতুন দায়িত্ব ইউক্রেন। ফলে সে এখন খাবি খাচ্ছে। জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে নেতৃত্ব দিয়েছে, তা খুবই নগণ্য। কিন্তু কৌশলগত লক্ষ্য ও কীভাবে তা অর্জিত হবে, তা যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। ইউরোপ সিকি শতাব্দী ধরে স্থিতিশীলতা ও শান্তির দ্বীপ, বিশ্বদরবারে তার পুনরাবির্ভাব ঘটছে।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
দিমিত্রি ত্রেনিন: কার্নেগি মস্কো সেন্টারের পরিচালক

যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু মন্দির ভাংচুর

যুক্তরাষ্ট্রে একটি হিন্দু মন্দিরে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মন্দিরটি ভাংচুরের পর মন্দিরের দেয়ালে হিংসাত্মক ভাষায় লেখা হয়েছে, ‘গেট আউট’ (বের হয়ে যাও)। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে ভারতে। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারত ও বিশ্ব হিন্দু সম্প্রদায়। নয়াদিল্লি সফর থেকে ফিরে বারাক ওবামা যখন ধর্মীয় সহনশীলতার আবেদন করছেন, ঠিক তখনই ওয়াশিংটনে এ হামলার ঘটনা ঘটল। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের সিয়েটল মেট্রোপলিটনে অবস্থিত একটি মন্দিরের অংশবিশেষ শনিবার ভেঙে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সিয়েটলের এই মন্দির বিশ্বের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যত মন্দির আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড়। মঙ্গলবার এ মন্দিরে শিবরাত্রি উৎসব উদ্যাপিত হবে। প্রভু শিবের কৃপা লাভের আশায় এ উৎসব পালন করে হিন্দু সম্প্রদায়। এ মুহূর্তে এ ধরনের তৎপরতাকে সহিংসতার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পত্র এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, মার্কিন পুলিশের বর্বরতার শিকার এক ভারতীয়,
গুলিতে নিহত এক ভারতীয়, এক মন্দিরে ভাংচুর... মার্টিন লুথার কিং বেঁচে থাকলে সত্যিই দুঃখিত হতেন। এদিকে এ ঘটনায় সিয়েটলের স্নোহোমিশ কাউন্টির কর্মকর্তারা ঘটনার তদন্তে নেমেছেন। সোমবার কাউন্টির শীর্ষ কর্মকর্তারা মন্দির পরিদর্শন করেন। ওয়াশিংটনের বোথেলে অবস্থিত হিন্দু মন্দির ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান নিত্য নিরঞ্জন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে না। তোমরা কারা ‘বের হয়ে যেতে বলছো?’ এটি অভিবাসীদের দেশ।” মন্দিরের সুরক্ষা দিতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন কংগ্রেসের নেতা পিসি চাকো। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বলে থাকে তারা বহুত্ববাদী এবং সমগ্র সত্ত্বা ধারণকারী। কিন্তু যা ঘটে গেল, তা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।’ তিনি বলেন, মার্কিন প্রশাসনকে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর আগেও এই মন্দির গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে দেয়ালে নানা কথা লেখা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছে। শুধু হিন্দু নয়, মুসলিমদের উদ্দেশ করেও একই ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুসলিমদের বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু কে বা কারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ভারতের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত প্রতিক্রিয়া জানাতে চাওয়া হয়েছে।

ট্রেনের টয়লেটে সন্তান প্রসব

প্রসব বেদনায় ট্রেনের টয়লেটে গিয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছেন ভারতের এক নারী। টয়লেটের প্যান দিয়ে নবজাতকটি নিচে পড়ে গেলেও জীবিত পাওয়া গেছে। সোমবার ভারতের রাজস্থান রাজ্যের হনুমানগড় স্টেশন এলাকায় এ অলৌকিক ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার এএফপির খবরে বলা হয়, স্টেশনের অল্প দূরেই কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়িয়েছিল ট্রেনটি। এ সময় মানু নামের ওই যাত্রীর প্রসব বেদনা ওঠে।
তড়িঘড়ি টয়লেটে সন্তান জন্ম দিয়েই অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। রেলওয়ে পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুভাষ বিষ্ণু জানান, ভারতের অধিকাংশ ট্রেনের শৌচাগার থেকে ময়লা সরাসরি রেললাইনে পড়ে। শিশুটিও শৌচাগারের ভেতর দিয়ে রেললাইনের ওপর পড়ে যায়। ট্রেনটি স্টেশনে চলে আসার পর অচেতন প্রসূতিকে টয়লেট থেকে উদ্ধার করা হয়। ওদিকে স্থানীয় এক নিরাপত্তারক্ষী নবজাতককে রেললাইনের ওপর কাঁদতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে খুঁজে পান মা-বাবা। আরেক পুলিশ কর্মকর্তা রাম সিং বলেন, শিশুটি বেঁচে থাকবে, এমনটা বাবা-মা ভাবেননি। তারা খুবই খুশি।

সিসির মসনদ কি উল্টে যাবে? by মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুরসি সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি মনে হয় একটু বেকায়দায় পড়ে গেছেন। যে মরীচিকার টানে তিনি ব্রাদারহুডের সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডাকে ধ্বংস করার দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা যে আসলেই অলীক স্বপ্ন এবং সত্যিকার অর্থেই মরীচিকা তা জেনারেল সিসি টের পেতে শুরু করেছেন। সৌদি আরবের নতুন বাদশাহ সালমান দায়িত্ব গ্রহণের পরই দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি গত ৯ ফেব্রুয়ারি নিজেকে কঠিন এক বিপদে পড়েছেন বলে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। কী এই বিপদ?
বিপদ হলো, তাকে মিসরের জনমতের তোয়াক্কা না করে শত শত মুসলমানের লাশের সারি ডিঙিয়ে ক্ষমতা দখলে যারা সহযোগিতা ও প্ররোচিত করেছিল, সেই ধনকুবের উপসাগরীয় দেশগুলো তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে। জানা গেছে, ওই সব দেশ তাকে বিপুল আর্থিক সহায়তা দেয়া সত্ত্বেও তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের বিদ্রƒপ করে বলেছিলেন, আমি তাদের ঘৃণা করি। আল সিসির ওই গোপন তথ্যটি সম্প্রতি ফাঁস হওয়ার পর উপসাগরীয় নেতারা বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য তাকে তলব করেছেন।
সিসির ওই বক্তব্যের রেকর্ডিং হয়তো এখন প্রমাণ করা কঠিন হবে। তার পরও বেশির ভাগ বিশ্লেষক একমত হয়েছেন যে, বক্তব্যের এই রেকর্ডিং যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। তারা এই বক্তব্যকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবেন। তারা (উপসাগরীয় নেতারা) এই বক্তব্যের ব্যাপারে এখন তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও ভবিষ্যতে হয়তো এটা আরো রাজনৈতিক শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে পারে। ২০১৩ সালে সিসি যখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে, তখন তিনি ওই সব কথা বলেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। ওই বক্তব্যের রেকর্ডিং ২০১৩ সালের। উল্লেখ্য, সিসি পরে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে মিসরের প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হন এবং তিনি এখনো দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বেও রয়েছেন।
কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটির (এইউসি) প্রফেসর ও জর্জ টাউন ভার্সিটির রাজনীতিবিজ্ঞানের ভিজিটিং প্রফেসর ইমাদ শাহীন বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারগুলোর নীরবতা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যে নিউজ সাইটে বিষয়টি পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা হয়তো জালিয়াতিও হতে পারেÑ এ ধরনের আশঙ্কাও রয়েছে। কিন্তু সেটা প্রমাণ করার অফিসিয়াল কিছু নেই।
আমরা আগের গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার পরিণতি দেখেছি। ওই সব বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করার জন্য কেউ আগে এগিয়ে আসেনি অথবা ওই সব তথ্যের আস্থা হানি করার চেষ্টা করেনি। জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মুসলিম খ্রিশ্চিয়ান আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জন ইসপোসিটো এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই পর্যন্ত আমরা এই গোপন তথ্য ফাঁস করার ব্যাপারে আস্থা না আনার মতো দৃঢ় কোনো তথ্য-প্রমাণ পাইনি। গত বছরের শেষের দিকে প্রথম গোপন তথ্য ফাঁসের এ ঘটনা ঘটে। তখন তুরস্কভিত্তিক একটি স্যাটেলাইট স্টেশনে সম্প্রচারিত হয় এটা। সর্বশেষ তথ্য ফাঁসের মতোই পত্রপত্রিকাগুলো সব সাময়িকভাবে অস্বীকার করে; কিন্তু প্রেসিডেন্ট এবং তার ভেতরের সার্কেল এটা প্রত্যাখ্যান করে।
ইসপোসিটো বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে যে আকস্মিকভাবে এটা আসেনি। গোপন তথ্য ফাঁসের কিছু ঘটনার আগে এটা ঘটে এবং এতে সত্যিকারভাবে দেখানো হয় লোকেরা কোথা থেকে আসছে।
বড় প্রশ্ন হচ্ছে এ ব্যাপারে দাতারা কী মনে করবে? বাহ্যিকভাবে এর জবাব হচ্ছে গতানুগতিক ও নিরস। সিসির ফোনকলের বিষয়টি শান্ত হওয়ার পর সৌদি আরবের নতুন বাদশাহ সালমান জোর দেন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো উদ্যোগের চেয়ে উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্ক শক্তিশালী করতে।
কুয়েতের আমির সাবাহ আল জাবের আল সাবাহ সিসিকে আশ্বস্ত করেন যে, মিসরের সাথে ঐক্য সংহতিকে হেয় করার কোনো উদ্যোগ এখন নেই এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো উদ্যোগে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
আগের রেকর্ডিংয়ের সাথে তুলনামূলকভাবে সর্বশেষ ব্যাচে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সাবেক সেনাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট পদে সমাসীন জেনারেল সিসি ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত। ওই রেকর্ডিংয়ে কেবল জেনারেল সিসি ও তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার মধ্যকার কথোপকথন রয়েছে বলে দাবি করা হয়। অধ্যাপক শাহীন বলেন, গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের সংখ্যা বেড়ে যাবে, এটা নিশ্চিত না হলেও এতে সিসি সমর্থক কমে যেতে পারে।
সিসি প্রশাসনের খোলামেলা সমালোচক অধ্যাপক শাহীনকে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মতোই গুপ্তচর বলে অভিযুক্ত করা হয়। অবশ্য তিনি এই অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করেন।
মি ইসপোসিটো বলেন, এই গোপন তথ্য ফাঁসের ফলে দৃশ্যপটে মারাত্মক কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে এতে সিসি ও মিসরের বর্তমান নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। ফলাফল হতে পারে আরো সঙ্ঘাতময়, বিশেষভাবে আগে যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাতে অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি যেমন মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর দমনাভিযান অথবা নির্বাচনী অনিয়ম ইত্যাদি ছিল। কিন্তু সর্বশেষ তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিষয়াদি আলোকপাত করা হয়েছে। এসব তথ্য ফাঁস হওয়ার ফলে সিসির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ধস নামবে এবং ব্যক্তিগতভাবে তিনি হেয় প্রতিপন্ন হবেনÑ ইসপোসিটো এ কথা জানান। সুতরাং ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে সিসির ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি হলে এবং যৌথভাবে উপসাগরীয় দাতাদেশগুলোর পক্ষ থেকেও সিসিকে চাপ দেয়া হতে পারে, তাতে সিসি নিজেকে হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখতে পাবেন।
চাথাম হাউজের সিনিয়র রিচার্স ফেলো জেইন কিনিনমেন্টিও হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, অদূর ভবিষ্যতে সম্পর্ক হয়তো পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণে ধনাঢ্য উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু মিসরের মধ্যে পরস্পর অবিশ্বাসের কারণে বিরোধ শুরু হয়ে যেতে পারে।
ইতোমধ্যেই গুজব ছড়াতে শুরু করেছে। আরো গোপন তথ্য ফাঁস হতে পারে বলে গুজবের ডালপালা গজাচ্ছে।
কুয়েতের সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য নাসের আল দাওয়ালিয়াহর বক্তব্য অনুযায়ী, গোপন তথ্যসংক্রান্ত কমপক্ষে আরো দু’টি রেকর্ডিং আছে। ওয়েবসাইট আরাবিয়া২১ডটকম জানায়, নাসের আল দাওয়ালিয়াহ প্রথম সিসির গোপন তথ্য ফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন। এতে স্পষ্টত, এতই বেদনাদায়ক বিষয় রয়েছে যে, সৌদি কর্তৃপক্ষকে সিসির কোনো ফোনকল শান্ত করতে পারেনি। তিনি টুইটার বার্তায় বলেন, এ জন্য হয়তো সিসির মক্কায় ওমরা বা হজ করতে যাওয়ার প্রয়োজন হবে। জনাব দাওয়ালিয়াহ টুইটার বার্তায় আরো বলেন, গোপন তথ্য ফাঁসের অপর একটি ঘটনায় জানা যায়, মিসরে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজন হবে।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সিসির নেতৃত্বে মুরসি সমর্থকদের বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের ওপর যে দমনাভিযান চালানো হয়, তাতে ব্রাদারহুডের বহু কর্মী সমর্থক নেতা নিহত হন। এসব গণহত্যা চালাতে গিয়ে সিসি উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছিলেন। সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিসরে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন হাজার ৩০০ কোটি ডলার অথবা আরো শত শত কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থান ঠেকাতে মুক্তভাবে মিসরকে দু’হাতে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। কারণ তাদের আশঙ্কা প্রবীণ ধনাঢ্য বাদশাহ এবং তাদের সরকারগুলোর ব্রাদারহুডের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাবে পতন ঘটতে পারে। ইরানের মতো অন্য নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তি ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিস্তার রোধ করতে এবং মিসরকে পুনরায় সঙ্ঘাত থেকে বিরত রাখতে উপসাগরীয় দেশগুলো মিসরকে সহায়তা দিয়েছে।
দুরহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো অ্যান্ড আফটার দ্য শেখস : দ্য কামিং কলাপস অব দ্য গালফ মনার্কি গ্রন্থের লেখক ক্রিস্টোফার ডেভিডসন বলেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষমতাহরণের মতো অভিন্ন লক্ষ্য এবং অন্য সব নির্দেশক পশ্চিমা মিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়নি।
‘উদাহরণস্বরূপ, সিসির সাথে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সম্পর্ক সত্যিকারভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না। এ ব্যাপারে আরো কিছু আভাস পাওয়া যায়, উভয় দেশের সম্পর্ক তেমন মজবুত নয়। সিসির সাথে তার রুশ প্রতিপক্ষের উষ্ণ সম্পর্কে থাকলেও পশ্চিমাদের সাথে সিসির ব্যাপারে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক তেমন একটা উষ্ণ নয়। সিসি গত বছর পুতিনের ক্রিমিয়া দখলকে শুধু নিন্দা জানাতেই অস্বীকৃতি জানাননি, তিনি আগস্টে পুতিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্রচুক্তি স্বাক্ষর করেন। চলতি সপ্তাহে উভয় নেতা কায়রোতে পুনরায় বৈঠকে বসেন এবং বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এমনকি তারা একটি পারমাণবিক প্ল্যান্ট নির্মাণেরও ঘোষণা দেন।
ডেভিডসন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, উপসাগরীয় নীতিনির্ধারণী সার্কেলের অভ্যন্তরে সিসিকে রাখা হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ডেভিডসন বলেন, সিসি মিসরে ব্রাদারহুডের ওপর যে গণহত্যা চালিয়েছে, তা সৌদি আরবের অনেক পর্যায়ে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, সৌদি আরবের রাজপরিবারের সদস্যসহ প্রবীণ সৌদি নাগরিকেরা ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোকে সমর্থন জানাননি। তারা বিশেষভাবে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সময় এবং অন্যান্য সময়েও মুসলিম ব্রাদারহুডকে সহায়তা দেয়ার কথা স্মরণ করেন। সত্যিকার অর্থে ব্রাদারহুডকে আংশিকভাবে সৌদি আরব সহায়তা দিয়ে এসেছে। সুতরাং সৌদি বাদশাহ ও রাজতন্ত্র দৃঢ়তার সাথে সিসির প্রতি সমর্থনদান করার পর ইতিহাস আমাদের এ অবস্থায় কত দিন চলতে দিতে পারে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করেছে। সম্প্রতি রিয়াদে ক্ষমতার পরিবর্তনে আমরা হয়তো দেখতে পাব সিসির সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক আগের মতো আর উষ্ণ থাকবে নাÑ সম্পর্ক ঠাণ্ডা হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। আর ব্রাহারহুডের সাথে সমঝোতা এবং কাতারের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ব্যাপারে সম্ভবত আলোচনা ও সমঝোতা হবে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তেলের দাম যেখানে পতনের মুখে, সেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে এত দৃঢ় অবস্থায় নেই যে, তারা মিসরকে বিশাল অর্থ সহায়তা দিতে পারবে। তেলের দাম পড়ে যাচ্ছে। তাই সৌদি আর্থিক সহায়তাও আগের মতো হয়তো আর সক্রিয়ভাবে দেখা যাবে না। প্রথম দিকে সুটকেস ভর্তি করে মিসরে যে অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে, তা হয়তো আর দেয়া হবে না।
বেশির ভাগ বিশ্লেষক একমত হয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আর্থিক সহায়তার ব্যাপারে কাটছাঁট করবে। এ ব্যাপারে আরো কঠোর কড়াকড়ি এবং জবাবদিহি করা হতে পারে।
ডেভিডসন বলেন, বাদশাহ আবদুল্লাহর আমলে ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল এবং দলটিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। তখন সন্দেহভাজন অনেক ব্রাদারহুড সদস্যকে গ্রেফতারও করা হয়। এখন সম্ভবত বিষয়টি ইউটার্নে রূপ নেবে।
জনাব শাহীন বলেন, উপসাগরীয় এলাকায় এবং মিসরে মিডিয়ায় ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়, সিসি ও উপসাগরীয় নেতারা ছাড়া ইরাকের মতো অথবা সিরিয়া ও লিবিয়ার অবস্থার মতো মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলোতেও অব্যাহতভাবে ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার আবহ সৃষ্টি হবে। চূড়ান্তভাবে এখনো সেখানে অনেক লোক অন্তরীণ এবং বাইরে থেকে এই কাজে নিয়োজিত রয়েছে, যাতে এসব দেশকে ব্যর্থ করে দেয়া যায়।
ডেভিডসন বলেন, আমার সন্দেহ হয় যে, এই নীতিতে পরিবর্তন ঘটবে। কারণ আমেরিকার এই মিত্রদের প্রয়োজন। তাদের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এই মুহূর্তে এই দেশগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এ দিকে এসপোসিটো ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, সিসির প্রতি সমর্থনও রিয়াদ ও আবুধাবীর গভীরে প্রথিত রয়েছে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, প্রথমে সিসির সমর্থনে একটি বড় চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর কোনো কোনো সরকার নিজেরাই আগ্রাসীভাবে এই চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। তারা অন্যান্য সরকারের ওপরও তীব্র চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেÑ এটা শুধু তাদের অঞ্চলে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও। সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, সিসি ও উপসারগীয় দেশগুলোর সম্পর্কে ভবিষ্যতে টানাপড়েন সৃষ্টি হবে, ব্রাদারহুডের সাথে তাদের আগের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নিলে সিসির ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। অপর দিকে, ব্রাদারহুডের পূর্ণশক্তিতে চূড়ান্তভাবে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্রমেই উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে।
khairulbashar407@gmail.com

সমাধানের সদর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে by মাসুদ মজুমদার

সবাই জানতে চান কী হতে যাচ্ছে। যারা জানতে চান তারাও রাজনীতির বোদ্ধা মানুষ। তার পরও আশা করেন আমরা মিডিয়ার মানুষ, বিভিন্ন তথ্যসূত্র আমাদের চোখের সামনে থাকে। তা ছাড়া মঞ্চের নেপথ্যে কী ঘটছে তার খবরও আমরা রাখি বলে মনে করেন। মিডিয়া জগতের মানুষ নিয়ে অন্যান্য পেশার ও সাধারণ মানুষের এমন ধারণা অমুলক নয়। তার পরও বলব, মিডিয়ার মানুষ সবজান্তার ভাব দেখালেও বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ নির্মোহ অবস্থান থেকে পক্ষপাতমুক্ত হয়ে খবর নেয়া ও দেয়ার ক্ষেত্রে মিডিয়ার লোকজন সাংঘাতিকভাবে বিভাজিত ও পক্ষপাতদুষ্ট। একদল সাংবাদিক নিজেদের দলীয় ক্যাডারের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তারা যা দেখেন, সরকারদলীয় চশমা চোখে লাগিয়েই দেখেন। তার ওপর তাদের বিবেক বন্ধক দেয়া আছে। তাদের এখনকার পেশাদারিত্ব সস্তায় বিকোবার পণ্য, যা সরকার সহজেই কিনে নিয়েছে। সরকারি আনুকূল্য যারা নিয়ে নিয়েছে, তাদের বস্তুনিষ্ঠতার জানাজা হয়ে গেছে। একই চিত্র বিপরীত দিকেও থাকা সম্ভব। তবে বিপরীত মেরুর মিডিয়ার লোকদের পেশাদারিত্ব লগ্নি করে দেয়ার সুযোগ এখন নেই। একে তো তারা সংখ্যায় কাকের মতো নয়, তাই ভাত ছিটালেও হুমড়ি খেয়ে পড়ার মতো সেই পরিস্থিতি নেই। বরং ভোল পাল্টিয়ে এই সময়ের সাথে লাগসই হওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টাও করছেন কেউ কেউ।
তার পরও সত্যের বিলুপ্তি ঘটানো যাচ্ছে না কিংবা যাবে না দুটো কারণে। সত্য সব সময় আপন মহিমায় ভাস্বর। ফাঁকফোকর গলিয়ে জনগণের সামনে আসবেই। কখনো বিলম্বে, কখনো তাৎক্ষণিক। দ্বিতীয়ত, এই মুহূর্তে যারাই সত্য উচ্চারণ করছেন, তারা জেনেই কিছু তথ্য দিয়ে দিচ্ছেন। না জেনেও তারা অনেক সত্য তথ্যের জোগান দিচ্ছেন। কারণ সরকারি প্রচার প্রপাগান্ডা এতটা প্রবল অথচ জনগণ সে দিকে মোটেও মনোযোগী নয়। তাই দু’চারটি ভিন্নমতের শব্দও যখন পায়, জনগণ সেটা লুফে নিচ্ছে। সেই ভিন্নমতই এখন জনমত গঠন করে চলেছে। বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপটে হক কথার কাছে অন্য মিডিয়া গুরুত্বহীন হয়ে গিয়েছিল। গণকণ্ঠের চার পাতার দৈনিকটি মানুষ লুকিয়ে পড়ে শত হাতে পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমান সরকার ভিন্নমতের প্রতি যে আচরণ করছে, পরিস্থিতি সেই স্তরে পৌঁছে গেছে। তা ছাড়া তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করা হলে গুজব ডালপালা মেলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তিল তাল হয়। বন্দুকযুদ্ধ ঢাকা যায়নি। বার্ন ইউনিটের মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে প্রহসন জনগণ দেখে ফেলেছে। জনগণ বুঝে নিয়েছে কেন এখন ডিসিসি নির্বাচনের প্রশ্ন উঠছে। গণতন্ত্র নিয়ে এ মায়াকান্নার কথা জনগণ কিভাবে চোখ বন্ধ করে শুনবে!
সরকার মিডিয়া দখল ও নিয়ন্ত্রণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ওপরও হাত বসিয়েছে। সরকার বুঝতে চাচ্ছে না, খালেদা জিয়ার ভাত বন্ধ করলে একটা বড় মাপের চাঞ্চল্যকর ও অমানবিক খবরের জন্ম দেয়। তার বাড়ির সাথে সব সংযোগ বন্ধ করে দিলেও একটা মেসেজ জনগণ পেয়ে যায়। সরকার অনুগতদের লাখো শব্দের টকশো, এই একটি মাত্র খবরের নিচে চাপা পড়ে যায়। একজন মন্ত্রী যখন খালেদা জিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছানোর মতো পুলিশি বক্তব্য দেন, তখন সরকারের জন্য নতুন কোনো শত্রুর প্রয়োজন হয় না। পুলিশের মিথ্যাচার জনগণ আমলেই নেয় না। সারা দিন মন্ত্রীরা যেসব বক্তব্য দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন, তার সবটুকু গিলে খায় একটা দুটো আসফালন। যেসব চ্যানেল ঘাম ঝরিয়ে সরকারকে নানাভাবে সার্ভিস দিতে চাচ্ছে, তার পুরোটা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাচ্ছে ক্রসফায়ার, গণগ্রেফতার, মিটিং মিছিলে বাধা, বাড়ি বাড়ি ও গণতল্লাশির কারণে। সরকারের লোকদের কান্নাকেও মানুষ গ্লিসারিন দিয়ে অভিনয় ভাবছে। সরকার যেন না বুঝেই গুলশান কার্যালয়কে গণতন্ত্র ভবনের মর্যাদায় উন্নীত করে দিলো। একসময় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ছিল গণতান্ত্রিক প্রেরণার উৎস। গুলশান কূটনৈতিক পাড়া, রাজনৈতিক অফিস থাকবে কি না সেই প্রশ্ন তোলা হয়। সেখানে মন্ত্রী মিছিল করেন কোন যুক্তিতে। গণতন্ত্র প্রেমের সরকারদলীয় ডুগডুগি এ জন্যই বিশ্বাসযোগ্য করা যাবে না।
এখন গণতন্ত্রের পক্ষে বললে, মিডিয়ার স্বাধীনতা চাইলে, মানবাধিকারের পক্ষ নিলেও বিরোধী দলের সাত দফার প্রতিফলন ঘটে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিটিও একই স্রোতে মিশবে। সরকার বুঝতে চাইছে না, তারা চরম পন্থায় গেলেও বিরোধী জোটের লাভ। নরম পন্থায় হাঁটলেও লাভটা বিরোধী দলের ঘরে যাবে। সরকার সব পথ বন্ধ করে দিয়ে নিজের অস্তিত্বসঙ্কট বাড়িয়ে তুলেছে। বার্ন ইউনিট আমাদের ক্ষমতার রাজনীতির দগদগে ক্ষত ও কলঙ্ক। এটা সরকার কাজে লাগাতে চেয়েছে বিরোধী জোটকে দমনের একটি প্রক্রিয়া ও কৌশল হিসেবে। রাজনীতির নামে বাড়াবাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ না করে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ ও নাশকতার ভীতি ছড়ানো হচ্ছে বিরোধী দলকে আরো কাবু এবং পশ্চিমা বিশ্বকে প্রলুব্ধ করতে। এখন সরকারের উচিত হবে এর লাভক্ষতি খতিয়ে দেখা। যারাই এর সাথে জড়িত, তারা নিশ্চিতভাবে অপরাধী। মানবতার দুশমন। এদের সরকার ধরতে না পারলে ১০ পয়েন্ট হারায়। পাইকারিভাবে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপিয়ে চড়াও হলে আরো ১০ পয়েন্ট চলে যায়। ব্লেইম গেইমে হারায় অবশিষ্ট পয়েন্ট। কিছু জনগণ বিরোধী দলকে দুষতে চায় কিন্তু সরকারের ভূমিকা তাদের সন্দেহবাণে জর্জরিত করে। তাই সব ঘৃণা, রোষ ও অভিযোগের আঙুল সরকারের দিকে। এক খেটে খাওয়া দিনমজুরের মন্তব্যÑ বাবা, তুমি কেন ক্ষমতা ছাড়ছ না। ছাড়লেই তো সব লেঠা চুকে যায়! এটাই পরিবর্তনকামী মানুষের পালস।
মানুষ নিশ্চিত করে জানে খালেদা জিয়ার জোট অত্যন্ত সাফল্যের সাথে চৌদ্দ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারহীন একদলীয় নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য করে দিয়েছে। সারা পৃথিবী এ বক্তব্যটির সাথে একমত। এই জানুয়ারিতে এসে তার জোট বিশ্ববাসী ও দেশের মানুষকে বুঝাতে পেরেছে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সঙ্কট রয়েছে, যা থেকে উত্তরণের পথ নতুন করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সমঝোতা, নয়তো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে যাবে। রাজনৈতিক সঙ্কট ও গণতন্ত্রহীনতার অন্ধকার থেকেই জন্ম নিয়েছে সব অগণতান্ত্রিক ও নাশকতামূলক অপতৎপরতা। সরকার চেয়েছিল নাশকতার চাদরে রাজনৈতিক সঙ্কটের মুখে কালো নেকাব পরিয়ে দিতে, পারেনি। ঢাকা শহরে কারফিউ দিলেও পাস নিয়ে কয়েক লাখ পেশাজীবী ঢাকার পথে থাকবে। যেকোনো চরম কর্মসূচি দিলেও পঁচিশ লাখ লোক বিভিন্ন তাড়নায় ঘর থেকে রাস্তায় বেরুবে। তাই এগুলো এখন কর্মসূচির সাফল্য ব্যর্থতার সূচক নয়। সরকারি জোরে পোশাক শিল্প শ্রমিক, স্কুলছাত্র ও টোকাই দিয়ে মিছিলের বহর বড় করা কোনো কঠিন কাজ নয়। এটা কোনোভাবেই জনমতের অংশ নয়।
হরতাল হলো কী হলো না, অবরোধ চলল কী চলল না, গুলশান অফিস অবমুক্ত হলো কী হলো না, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলেন কি না, রাজপথে প্রতিবাদী মিছিল হলো কি নাÑ এসব এখন কোনো বিবেচনার বিষয় নয়। বিবেচনা ও ভাবনার বিষয় সরকার কবে ফণা নামাবে। সঙ্কটের সুরাহা কত দ্রুত হবে। সমাধানটা রাজনৈতিক হবে না গোঁজামিলের হবে। সংলাপ নাটক হবে না ভণ্ডামি হবে। না বিলম্বে হলেও কাক্সিত সমাধান আসবে। তবে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন হাইজ্যাক করে সংলাপ সমঝোতার নামে একটি বিটিমের খেলা এখন ওপেন সিক্রেট। তার বাইরেও কোনো কোনো উদ্যোগের ভেতর নিষ্ঠার চাপ আছে। সমাধানের সূত্র আছে। হোক না একটি সমঝোতার সনদ। একটি সাংবিধানিক ভাঙা-গড়ার উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে পারে। সংলাপ-সমঝোতার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে যা চাই না তা আসতে বাধা দেয়া হবে কোন যুক্তিতে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য শুধু বাংলাদেশীরা নির্ধারণ করবেনÑ এমনটি হয়তো আর হবে না। কারণ জেদের দাম লাখ টাকা ধরে সরকার ক্ষমতা খামছে ধরে থাকতে চাইছে। তাই জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি বোঝাপড়া সম্ভবত সবাই চাইবে। সরকার চাইবে শেষ রক্ষার জন্য। বিরোধী দল চাইবে সরকার হঠানোর নিশ্চয়তার জন্য। তা ছাড়া রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সব কিছু খোলা মাঠে হবে না। আলো-আঁধারির মাঝেই রাজনৈতিক নাটকের যবনিকাপাত ঘটবে।
বড় ব্যথা ছোট ব্যথার কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। মশার কামড় যন্ত্রণাদায়ক ও বিরক্তিকর কিন্তু জেল-জুলুম, পুলিশি হয়রানির মুখে ঘর অফিস ও এলাকা ছেড়ে মৃত্যুভয়ে অন্ধকার কোথাও রাত যাপনের কষ্টের কাছে মশার কামড় তুচ্ছ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই অভিজ্ঞতা আমরা সঞ্চয় করেছি। এখন গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাহীন জীবনের কাছে ক্রসফায়ার, গুম ও অপহরণও তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায় বাণিজ্যে ঘাটতি, জনদুর্ভোগ মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। তার চেয়ে বেশি অসহনীয় কষ্ট ও যন্ত্রণার কারণ সরকার সৃষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কট, যা থেকে উত্তরণের পথে চলতে না গিয়ে আমরা সামগ্রিক অর্থে দেউলিয়া হওয়ার পথে।

রাজস্বে কৃচ্ছ্রসাধন বনাম ইউরোপীয় সমাজ by কামাল দারভিস

গত পাঁচ বছরে ইউরোজোন কোনো প্রকাশ্য জনমত ছাড়াই রাজস্ব খাতে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি খুব কঠোরভাবে বজায় রেখে চলেছে। কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এর সামাজিক প্রভাব মারাত্মক হওয়া সত্ত্বেও তারা এটা চালিয়ে গেছে। না, সেটা শুধু ভূমধ্যসাগরের প্রান্তিক অঞ্চলেই নয়, ইউরোপের মূল ভূখণ্ড ফ্রান্সেও তার প্রভাব দেখা গেছে। ইউরোজোনের নেতারা তাঁদের নীতি নিয়ে পুনরায় চিন্তা না করলে গ্রিসের বিপ্লবী সিরিজা পার্টির সাফল্য ইউরোপের অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক ভাঙনের পথে আরও এক পদেক্ষপ হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। অথবা তা ইউরোপের অর্থনৈতিক কৌশলের বাস্তবানুগ ও মঙ্গলকর দিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
অবশ্যই, বিপর্যয়কর ঋণ পুনঃ অর্থায়ন ঠেকানো এবং বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব খাতের ভারসহতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সরকারি সেবার ওপর নির্ভর না করার মতো সম্পদশালী হলে সে রাষ্ট্র রাজস্ব খাতে এমন কৃচ্ছ্রসাধন করতে পারে। অথবা সে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের পঙ্কে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে (ধনীদের হাতে আছে সংবাদমাধ্যম। জনমত নির্ধারণ ও আন্তদেশীয় পুঁজি সঞ্চালনের ক্ষমতাও তাদের হাতে)।
লাখো শ্রমিকের চাকরির সম্ভাবনা নেই, বিশেষ করে তরুণদের, ফলে রাজস্ব খাতের ভারসহতা তাঁদের একমাত্র অগ্রাধিকার হতে পারে না। বেকার ভাতা কমানো হলে তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি ভুগতে হবে। আর শিক্ষা খাতে বাজেট হ্রাস করা হলে তাঁদের সন্তানেরা এর ভুক্তভোগী হবে। তারা ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে কমজোর হয়ে পড়ে।
গ্রিসকে কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে চূড়ান্তভাবে ভুগতে হয়েছে। পেনশন ব্যাপক হারে কমানোর কারণে বয়স্ক মানুষ শেষ জীবনটা মর্যাদার সঙ্গে কাটাতে পারছেন না। যাঁরা কর দেন, তাঁদের ওপর বিশাল বোঝা চাপানো হয়েছে। আর যে ধনীরা বহু আগে বিদেশে টাকা গচ্ছিত রেখেছেন, তাঁরা তাঁদের দায় এড়িয়েই চলছেন। স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্যানসার রোগীই জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে।
তার পরও গ্রিসের ঋণদাতারা এসব উপেক্ষা করে চলছে। এটা পরিষ্কারভাবেই টেকসই নয়। আইএমএফের ইউরোপ বিভাগের সাবেক পরিচালক রেজা মোঘাদাম এ বিষয়টি চিহ্নিত করে গ্রিসের ঋণ মওকুফের আহ্বান জানান। প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশ্বাসযোগ্য কাঠামোগত সংস্কারের ঐকমত্যে পৌঁছানো সাপেক্ষে তিনি এ আহ্বান জানিয়েছিলেন।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সমাজের টেকসই হওয়া জরুরি। ডিজিটাল অর্থনীতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো করে শিশুদের গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা না থাকলে কোনো দেশ উন্নতি করতে পারে না। একইভাবে, অসমতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক হতাশার কারণে সমাজে চরমপন্থী রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটলে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায় না। যেমন, গ্রিসের ফ্যাসিস্ট গোল্ডেন ডন পার্টি বা ফ্রান্সের অতি দক্ষিণপন্থী ইউরোপবিরোধী জাতীয় ফ্রন্ট, তাদের নাকি ২৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন আছে, এ নিয়ে তারা আবার গর্বও করে।
সাধারণত প্রতিকূল সময়ের সহজ শিকারে পরিণত হয় সংখ্যালঘু ও অভিবাসীরা। জোসেফ স্টিগলিৎজ সম্প্রতি বলেছেন, জার্মানিতে সে সময় বেকারত্বের হার ৩০ শতাংশ না হলে হিটলার ক্ষমতায় আসতে পারত না। যখন বড় বড় শহর দ্বারা ঘেরাও ঘেটোগুলোতে থাকা মানুষ চরমপন্থার শিকার হয় বা সহিংসতার প্রতি প্রলুব্ধ হয়, তখন এই আর্থসামাজিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যায়।
করপোরেটরা যতই লাভ করুক না কেন, এসব মৌলিক সামাজিক বিষয়াদি আমলে নেওয়া না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে। রাজস্ব খাতে কিছুটা সতর্ক হতেই হবে। সরকারি বা বেসরকারি খাত যদি ঋণের টাকা ও নতুন ছাপানো টাকা মুক্তভাবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। গরিবেরা আরও আঘাত পাবে। কিন্তু সামাজিক ভারসহতা একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত, অনুচিন্তা নয়।
ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণ হচ্ছে, সামাজিক ভারসহতা নিয়ে শুধু কথার তুবড়ি ছোটানো ও চরম কৃচ্ছ্রসাধনের অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন। টিকে থাকতে সক্ষম এমন একটি সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামো নির্মাণ করা যেমন জরুরি, তেমনি এর মধ্যে ‘মিতব্যয়িতার স্ববিরোধ’ (অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে খাটো করে মন্দার সময় বেশি বেশি সঞ্চয়ের প্রবণতা) হ্রাসে অপরিবর্তনীয় নীতি সংযোজন করাও দরকার। যখন সমন্বিত চাহিদা সমন্বিত সরবরাহের চেয়ে কম হয়, তখন সরকারি ব্যয় বাড়াতে হয়।
সরকার এখন ব্যাষ্টিক অর্থনীতিতে মনোনিবেশ করেছে, এই দৃষ্টিভঙ্গি খুব সংকীর্ণ। তার উচিত, একই গুরুত্ব দিয়ে সমাজের সবচেয়ে কমজোর অংশের জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গৃহায়ণ নিশ্চিত করে এমন সামাজিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। আর নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সামাজিক কর্মসূচির সক্ষমতা বাড়ানো উচিত। উদ্বিগ্ন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা দরকার।
ইউরোপীয় কমিশন ও আইএমএফ তাদের ভুল স্বীকার করেছে। শুধু গ্রিসবিষয়ক সামষ্টিক অর্থনীতির পূর্বাভাসের অপর্যাপ্ততাই নয়, সামাজিক ভারসহতা আমলে না নেওয়াসহ এ কর্মসূচি যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেয়নি, এসবই তারা স্বীকার করে নিয়েছে। তার পরও কিছু কারণে গ্রিসের ঋণদাতারা নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করে ঋণছাড়, নিম্ন রাজস্ব উদ্বৃত্ত, কাঠামোগত সংস্কার প্রভৃতি আমলে নেওয়ার মতো কর্মসূচি প্রণয়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যে কর্মসূচি প্রবৃদ্ধি বাড়াবে ও সামাজিক অখণ্ডতা বজায় রাখবে। এটা চলতে পারে না।
গত পাঁচ বছর আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনের বিষয়টিতে প্রাধান্যে চলে এসেছে। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আরও দূর অস্ত বলে মনে হচ্ছে। ব্যাসেল ২ আর্থিক সংস্কার বাস্তবায়নে নীতিপ্রণেতারা যে পরিমাণ শ্রম ও সম্পদ বিনিয়োগ করেন, সামাজিক ভারসহতা অর্জনেও একই পরিমাণে তা বিনিয়োগ করা উচিত। ইউরোপের ভবিষ্যৎ ও তার বৈশ্বিক ভূমিকা এর ওপরই নির্ভর করছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
কামাল দারভিস: তুরস্কের সাবেক অর্থমন্ত্রী।

ঝাড়–ওয়ালা জাদুকর by হামিদ মীর

মির্জা গালিবের শহর দিল্লি এক ঝাড়–ওয়ালাকে নিজেদের শাসক বানিয়ে নিয়েছে। এই ঝাড়–ওয়ালা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য দিল্লি রাজধানীকে বানিয়ে দিয়েছে এক শিামূলক কাহিনী। এই ঝাড়–ওয়ালার নাম অরবিন্দ কেজরিওয়াল; যিনি দিল্লির রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে মোদির অহঙ্কার ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির নির্বাচনী প্রতীক ঝাড়–। তিনি রাজ্য বিধানসভার ৭০টি আসনের মধ্যে ৬৭টিতে জয়লাভ করে দিল্লিতে শুধু বিজেপি নয়, বরং কংগ্রেসকেও ঝেঁটিয়েছেন। ভারতের কিছু বিশ্লেষক কেজরিওয়ালকে ঝাড়–ওয়ালা জাদুকর আখ্যায়িত করেছেন। তবে কেজরিওয়াল বলেছেন, তিনি কোনো জাদু দেখাননি। আসল জাদু তো দেখিয়েছে দিল্লির ভোটারেরা। এ কথাটাও সত্য। মাত্র কয়েক মাস আগে ২০১৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আম আদমি পার্টি লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৪৩৪টিতে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল। তার মধ্যে মাত্র চারজন জয়লাভ করেন। আর ৪১৪ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। লোকসভার নির্বাচনে দিল্লির সব আসনে বিজেপি একচেটিয়া জয়লাভ করে। মোদি দিল্লিকে বিজেপির লালকেল্লা আখ্যায়িত করেন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এক ঝাড়–ওয়ালা মোদিকে ‘হনুয দিল্লি দূর অস্ত’ (দিল্লি এখনো দূরে)-এর স্মৃতি কিভাবে মনে করিয়ে দিলো! আপনারা এটা জেনে আশ্চর্য হবেন যে, দিল্লিতে বিজেপির পরাজয়ে নওয়াজ শরিফও কিছুটা ভূমিকা রেখেছেন। আমি এক ভারতীয় চ্যানেলে নওয়াজ শরিফের ভূমিকা সম্পর্কে বিশ্লেষণ শুনে বেশ অবাক হলাম। অবশ্যই এর মধ্যে কিছু-না-কিছু সত্য আছে। তবে নওয়াজ শরিফের ভূমিকা নিয়ে মোদি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তপে করার অভিযোগ করতে পারবেন না। নওয়াজ শরিফের ভূমিকার কথা পরে বলছি। আগে আপনারা কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির প্রোপট বুঝে নিন।
কেজরিওয়ালের বয়স ৪৬ বছর। তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু চাকরি করেছেন ইন্ডিয়ান ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে। ইনকাম ট্যাক্সের চাকরির সময় তিনি জানতে পারেন, ভারতের অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা কিভাবে ট্যাক্স চুরি করেন এবং দুর্নীতি কী জিনিস। তিনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং আন্না হাজারের সাথে মিলে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন চালাতে লাগলেন। ২০১১ সালে তিনি আন্না হাজারের সাথে মিলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের দাবি তোলেন এবং দিল্লিতে অনশন ধর্মঘট করেন। সাধারণ জনগণের মাঝে আন্না হাজারের আন্দোলন বেশ সাড়া জাগায়। কিন্তু ভারতের পার্লামেন্টে বিদ্যমান বড় দলগুলো আন্না হাজারের দাবির প্রোপটে দুর্নীতিবিরোধী আইন প্রণয়নে টালবাহানা করে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল আন্না হাজারেকে পরামর্শ দেন, আমাদের নিজেদের একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করে পার্লামেন্টে যাওয়া উচিত। দুর্নীতিকে গোড়া থেকেই উপড়ে ফেলা উচিত। আন্না হাজারের চিন্তাধারা হলো, তিনি শুধু সামাজিক কর্মী, তার রাজনৈতিক কর্মী হওয়া উচিত নয়। কেজরিওয়ালের বক্তব্য হলো, যতণ নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা নিজেরা রাজনীতিতে না আসবে, ততণ দুর্নীতি বন্ধ হবে না। আন্না হাজারে রাজনীতিতে আসতে অনিচ্ছুকই থেকে গেলেন। অবশেষে কেজরিওয়াল আন্না হাজারেকে বিদায় জানালেন এবং ২৬ নভেম্বর, ২০১২ সালে আম আদমি পার্টির ভিত রচনা করেন। এ পার্টি বিপ্লবের স্লোগান দেয়নি, বরং শুধু এ কথা বলেছে, ভারতের আইন অনুসরণ করে সব নাগরিকের সাথে সমান আচরণ করা হবে। ২০১৩ সালে দিল্লির রাজ্য বিধানসভায় আম আদমি পার্টি প্রথমবারের মতো নিজেদের প্রার্থী দাঁড় করায়। কেজরিওয়াল প্রতিশ্র“তি দেন, তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আম আদমি অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধান করবেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিল পাস করাবেন। ২০১৩ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ৭০ আসনের মধ্যে আম আদমি পার্টি ২৮টি আসন পায় এবং বিজেপি পায় ৩১টি। কেজরিওয়াল কংগ্রেসের আটটি আসনের জন্য তাদের সাথে জোট করেন এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি রাজ্য বিধানসভায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে লোকপাল বিল পেশ করলে তার জোটমিত্র কংগ্রেস ও বিজেপি ওই বিল সমর্থনে অসম্মতি জানায়। যখন কেজরিওয়াল দেখলেন, মতা তিনি পেয়েছেন, কিন্তু আইন প্রণয়নের অধিকার পাননি, তখন তিনি মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় মতাকে লাথি মেরে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন। কেজরিওয়ালকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। তার কিছু সঙ্গী পার্টি ছেড়ে চলে গেছেন। তার পরও তিনি হিম্মত হারাননি।
২০১৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি নির্বাচনী প্রচারাভিযানে তার ওপর হামলা করায়। তাকে থাপ্পড় ও জুতা মারা হয়। পরাজয় তার সঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আম আদমি পার্টির ৪১৪ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার পর কিছু বিশ্লেষক কেজরিওয়ালের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ‘শেষ’ হওয়ার দাবি করেন। তার পরও কেজরিওয়াল আম আদমি পার্টির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। তিনি কখনো বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে র‌্যালি বের করেন; কখনো রিকশাচালকদের ধর্মঘটে অংশ নেন; কখনো টিভি চ্যানেলের লাইভশোতে বসে তার অসন্তুষ্ট ভোটারদের কাছে মা চেয়েছেন। অতঃপর তিনি দিল্লির রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে দ্বিতীয়বার অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণার পর মোদি জনসাধারণের মাঝে কেজরিওয়ালকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রƒপ করেন। আম আদমি পার্টি তার নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের প্রতিশ্র“তিকে সবার ওপরে স্থান দেয়। ইশতেহার ঘোষণার পরেই কেজরিওয়াল আম আদমি পার্টির সমস্যাবলির প্রতি মনোযোগ দেন। যে প্রতিশ্র“তিগুলো যুবকদের আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছেÑ সব পাবলিক প্লেসে ইন্টারনেট সুবিধা (ওয়াইফাই সার্ভিস) ফ্রি করে দেয়া হবে। দিল্লির শহরতলিগুলোতে নতুন কলেজ নির্মাণ করা হবে। বিদ্যুৎ ও পানির বিলে ভর্তুকি দেয়ারও প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়। প্রতিটি প্রার্থীর কাছ থেকে এ প্রতিশ্র“তি নেয়া হলো, ‘তারা নির্বাচিত হওয়ার পর লাল বাতিওয়ালা কোনো গাড়ি ব্যবহার করবেন না। বিনা প্রয়োজনে সিকিউরিটি নেবেন না। বড় বাংলোতে থাকবেন না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিল পাসে সহায়তা করবেন।’ আম আদমি পার্টি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিতি লোকদের নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দান করেছে। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য বিদেশে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিকদের কাছে সাহায্যের আবেদন করে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বসাধারণের ধারণা ছিল, দিল্লিতে বিজেপি পুরোটাই জিতে যাবে। কিন্তু যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফরে এলেন, তখন ভারতের জনগণ দেখল, তাদের চা-ওয়ালা প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে সাাতের সময় ১০ লাখ রুপির স্যুট পরে আছেন। ওবামার বন্ধুত্বে আত্মহারা হয়ে গেছেন।
এক দিকে মোদির বিশাল উন্মাদনা ও মতার দাপট, অন্য দিকে কেজরিওয়ালের অনুনয়-বিনয়। মোদি ‘জালেম’ আর কেজরিওয়াল ‘মজলুম’ হয়ে মাঠে নামলেন। এক সমাবেশে মোদি বললেন, ‘আমি সৌভাগ্যবান। আর কেজরিওয়াল দুর্ভাগা।’ ওই বক্তৃতা কেজরিওয়ালকে গ্রহণযোগ্য বানিয়ে দেয়। বিশ্ববাজারে পেট্রল সস্তা হলে নওয়াজ শরিফ বারবার পেট্রলের মূল্য কমিয়ে আনেন। কিন্তু মোদি সে দিকে কোনো মনোযোগ দেন না। আম আদমি পার্টি প্রশ্ন তোলে, এখন পাকিস্তানে পেট্রল সস্তা হতে পারলে ভারতে হয় না কেন? বিজেপি ওই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সমীচীন মনে করেনি। অতঃপর নির্বাচনের দিন নি¤œবর্ণের হিন্দুরা মুসলমান, খ্রিষ্টান ও শিখদের সাথে মিলে একাকার হয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রচারকারী বিজেপির দর্পকে ঝাড়– দিয়ে উঠিয়ে পুরোটাই ঝেড়ে দিয়েছে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির সফলতা পাকিস্তানের শাসক ও ভোটারদের জন্য একটি শিা বটে। সাধারণ মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে গেলে তারা ঝাড়–র জাদু দিয়ে বড় শক্তিধর শাসকদের অহঙ্কার মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এটা শুধু ওই সময় সম্ভব, যখন শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনে কোনো প্রভাব খাটাতে পারবে না। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন না হলে কোনো ঝাড়–ওয়ালাই কোনো জাদু দেখাতে পারবেন না।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১২ ফেব্র“য়ারি, ২০১৫ -এর
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান জানলো ইইউ

দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্য শুনলেন সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্যরা। কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান দান প্রেদার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তারা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান। সরকারের তরফেও তাদের বিস্তারিত ব্রিফ করা হয়। পররাষ্ট্র ভবনের ওই আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামও অংশ নেন। ইইউ সংসদের তিন এমপিসহ ৬ সদস্যের সফররত প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশের মানবাধিবার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এসেছে তারা। সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ ও শ্রম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করছেন। এরই মধ্যে বিএনপি জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মঙ্গলবার সফরের প্রথমদিনেই তারা বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে গতকালের বৈঠক ছাড়াও সফরকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হকের সঙ্গে তাদের বৈঠক হবে। ইইউ প্রতিনিধিরা এখনও গণমাধ্যমের মুখোমুখি হননি। তাদের তরফে কোন বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ হয়নি। গতকালের বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি দেখতে আসা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা এ নিয়ে কোন উদ্বেগের কথা সরকারকে জানাননি দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলকে বিএনপি-জামায়াত জোটের চলমান অবরোধে নাশকতার চিত্র সংবলিত একটি ভিডিও দেখানো হয়। নাশকতা বন্ধে সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়েও তাদের অবহিত করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়তে বিএনপিকে আহ্বান জানিয়ে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগের অবস্থানেই রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নাশকতার চিত্র দেখে তারা বলেছেন সেই আহ্বান এবারও জানিয়ে যাবেন। বিচারবহির্ভূত যে কোন ধরনের হত্যাকাণ্ডসহ  দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি সরজমিন পর্যবেক্ষণে আসা পার্লামেন্টারিয়ান ক্রিশ্চিয়ান দান  প্রেদা (রোমানিয়া)-এর নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ইইউ সংসদীয় প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন- ক্যারল ক্রাসকি (পোল্যান্ড) ও ইয়োসেফ ভেইডেনহোলজার (অস্ট্রিয়া)। গত দুই দশকের মধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপ-কমিটির এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইইউ পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিনিধি দলের ওই সফরটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই সময়ে তাদের না এসে পরবর্তী যে কোন সময়ে আসার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল সরকারের তরফে। কিন্তু ব্রাসেলস তাতে রাজি হয়নি। প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ক্রিশ্চিয়ান দান প্রেদা গত বছর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত দুই প্রস্তাবের অন্যতম প্রস্তাবক। গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রতিনিধিরা ঢাকা মিশন শেষে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি প্রতিবেদন জমা দেবেন।

এক কৃতিমান মানুষকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল
ইসলামের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের
৩০ বছর পূর্তি উৎসব উপলক্ষে ২৭ অক্টোবর ২০১৪ সোমবার আরসি মজুমদার
আর্টস মিলনায়তনে কেন্দ্রের প্রাক্তন সভাপতি ও পরিচালকদের সম্মাননা প্রদান
করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। ছবিতে এমিরিটাস অধ্যাপক
আনিসুজ্জামানকে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে।
আনিসুজ্জামান স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। তার ছাত্র না হয়েও আমি তাকে শিক্ষক হিসেবে মান্য করি। তিনি সার্বিক অর্থেই একজন শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। তিনি জ্ঞান সাধনা করেছেন সারা জীবন। প্রজ্ঞার সঙ্গে নীতি-নিষ্ঠার একটি সংযোগ ঘটিয়েছেন। তিনি সজ্জন ও রুচিশীল মানুষ, স্নিগ্ধ তার ব্যক্তিত্ব। তিনি বন্ধু ও ছাত্রবৎসল এবং তার আছে রসবোধ। পরিবারের প্রতি তিনি দায়বদ্ধ এবং দেশের প্রতিও।
আমাদের দীর্ঘদিনের জাতিগত সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে ড. আনিসুজ্জামান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শুরু হয়, তাতে তিনি ছিলেন সম্মুখসারিতে। তার কণ্ঠে জাতির বিবেকের কণ্ঠই শুনতে পাই। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে তার যে ব্যাপক পরিচিতি দেশে ও বিদেশে- তার মূলে আছে তার নিষ্ঠা ও নিরন্তর চর্চা। তার লেখালেখিকে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি- গবেষণা ও সৃজনশীলধর্মী। গবেষণা কাজে তার বিষয়বস্তু ভাষার ইতিহাস ছাড়িয়ে সংস্কৃতি-পঠন পর্যন্ত বিস্তৃত।
মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন ও বই লিখেছেন। পুরনো বাংলা গদ্য নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ আছে, সে রকম আরেক গ্রন্থ আছে সাহিত্য ও সমাজে বাঙালি নারীর অবস্থান নিয়ে। ২০১২ সালে প্রকাশিত তার ‘ইহজাগতিকতা ও অন্যান্য’ নামের গ্রন্থটি আমার বিবেচনায় তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। ইংরেজিতেও তিনি লিখেছেন এবং বই সম্পাদনা করেছেন। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ নিয়ে তার যে গ্রন্থটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়, তা তাকে আমাদের দেশে সংস্কৃতি-পঠনের ক্ষেত্রে একজন পথিকৃতের মর্যাদা দিয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থ, প্রবন্ধ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি বিদ্বৎসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন, সভা-সেমিনারে আলোচনা করেছেন, যার বিষয়বস্তু সাহিত্য থেকে সংস্কৃতি ও ইতিহাস পর্যন্ত বিস্তৃত। এসবের অনেকই লিপিবদ্ধ হয়নি, যদি হতো তাহলে জাতি এসব বিষয়ে আরও প্রজ্ঞাবান পর্যবেক্ষণের উদাহরণ পেত।
তার সৃজনশীল লেখালেখির মধ্যে প্রধান হচ্ছে তার আত্মজীবনীমূলক লেখা ‘কাল নিরবধি’ ও ‘বিপুলা পৃথিবী’। তার স্মৃতিশক্তি এতটাই প্রখর যে, দিনপঞ্জি না লিখেও দীর্ঘদিন আগে ঘটা কোনো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অথবা কোনো ব্যক্তিগত আলাপচারিতার নিখুঁত বর্ণনা তিনি উল্লিখিত দুই লেখায় দিয়েছেন, যাতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের এবং তার পরের বাংলাদেশের সমাজ চিত্রের একটা বিশ্বস্ত প্রতিফলন আমরা পাই।
ড. আনিসুজ্জামান তার সব লেখায় বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে পারদর্শিতার সঙ্গে ভাষার কুশলী প্রকাশের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ফলে তার লেখা একদিকে যেমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি মনোগ্রাহী। তার পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি প্রখর, ইতিহাস ও জীবনের সত্যের প্রতি তার নিষ্ঠা অবিচল।
তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন, কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন। সর্বশেষ ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেছে। এর মাধ্যমে তার প্রতি যেমন সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তেমনি সম্মান জানানো হয়েছে আমাদের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকে। আজ তার ৭৮তম জন্মবার্ষিকী। আমরা প্রার্থনা করি তিনি সুস্থ থাকবেন এবং দীর্ঘজীবী হবেন। যাতে তিনি জাতির পদপ্রদর্শকের ভূমিকায় দীর্ঘদিন থাকতে পারেন।
ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : লেখক; অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়