Saturday, May 9, 2015

‘সালাহউদ্দিন র‌্যাবের কাছেই আছে’ -খালেদা জিয়া

স্থল সীমান্ত চুক্তির বিল পাস কোন দলের কৃতিত্ব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বলেছেন, কোন দলের দালালিতে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে  ভারত এই সীমান্ত চুক্তির বিল পাস করেছে। এই জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমেদ র‌্যাবের কাছেই আছে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, কাল (রোববার) দুই মাস হয়ে যাচ্ছে আমরা সালাহউদ্দিনের কোন খোঁজ পাইনি। সালাহউদ্দিন র‌্যাবের কাছেই আছে। অবিলম্বে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। অন্যথায় যেখান থেকে তাকে তুলে নেয়া হয়েছে সেখানে রেখে আসা হোক। সালাহউদ্দিনের কোন ক্ষতি হলে এর পরিণতি ভাল হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে জাতীয়তাবাদী কর আইনজীবী ফোরাম ও ঢাকা ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশনের নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট ডাকাতি করেছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন,  সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। সেজন্যই তারা  পুলিশ ও সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে।  তিনি বলেন, পেট্রল বোমার সঙ্গে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের কোন সম্পর্ক নেই। আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই পেট্রল বোমা হামলা চালিয়েছে। মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। খালেদা জিয়া বলেন, দেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার নেই।  এটি পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে গেছে। এজন্যই এখন পুলিশ নিজেরাই বলছে- আমরাই এই সরকারকে টিকিয়ে রেখেছি। তাদের যতদিন দয়া হবে ততদিন এই সরকারকে ক্ষমতায় রাখবে। এর আগে নবনির্বাচিত আইনজীবী নেতারা খালেদা জিয়াকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। আইনজীবী নেতাদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এড. আহমেদ আজম খান, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এড. মাসুদ আহমেদ তালুকদার ও সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক এড. নিতাই রায় চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের সভাপতি আলহাজ মো. মাজম আলী খান, সহ-সভাপতি মো. রাশিদুল হাসান, মো. শামছুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর উল্লাহসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

উচ্ছ্বাসের আবহাওয়াতেই মোদির ঢাকা সফর জুনে by পরিতোষ পাল

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর নিয়ে যে প্রতিবন্ধকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল তা সম্পূর্ণভাবে কেটে গেছে। বকেয়া তিস্তার পানিবণ্টন ও স্থলসীমান্ত চুক্তির মধ্যে অন্তত একটি ভারতের সংসদে পাস হওয়ার পরে দুদেশের কূটনৈতিক মহলে প্রবল উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সেই উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেননি। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে চুক্তি পাস হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ফোন করে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি দ্রুত ঢাকা সফরে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মোদি ইতিমধ্যেই ভুটান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চীন সফরও করবেন। কিন্তু প্রতিবেশী বাংলাদেশ সফর করতে পারছিলেন না বকেয়া চুক্তির মধ্যে অন্তত একটিও না হওয়ায়। এখন সেই বাধা কেটে গিয়েছে। মোদির ঢাকা সফরকে দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলস্টোন হিসেবে চিহ্নিত করার সব রকম প্রয়াস চলছে বলে জানা গেছে। সেজন্য সফরে বেশ কয়েকটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হবে। অনেক কটি প্রটোকল নবায়ন করা হবে। নতুন করে ঋণ সাহায্যেরও প্রতিশ্রুতি দেয়া হতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মোদির ঢাকা সফরের সূচি তৈরির কাজ শুরু করেছেন। তবে একটি সূত্র আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহেই এ সফর হতে পারে বলে জানিয়েছেন। আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, এ সফর সামান্য পিছিয়ে যেতে পারে। তবে জুনেই যে সফর হচ্ছে তা একরকম নিশ্চিত বলে জানা গেছে। কয়েক দিন আগেই স্থলসীমান্ত চুক্তি পাস করানোর নিশ্চিত সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে যেসব আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে সেগুলো সফরের সময় কার্যকর করার ব্যাপারে ভারত উদগ্রীব। এজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের কাজ চলছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা প্রকাশ পেয়েছে সংসদের দুই কক্ষে স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর সংক্রান্ত বিল নিয়ে আলোচনায় ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধির আবেগময় আলোচনায়। আর ভারত সরকারও সহমতের বার্তা প্রতিবেশী বাংলাদেশের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে। কোনরকম রাজনৈতিক সংর্কীর্ণতাকে এ ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। বরং সুষমা স্বরাজ সংসদে বারে বারে সহমতের প্রযোজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশকে খুশি করতে। গত বছর মোদির বিজয়ের পর পরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিনন্দন জানানোর সময়ই নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিযেছিলেন। গত বছরে মে মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে মোদি যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাতে হাসিনাকেও ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এ বছরের মার্চে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয় শঙ্করের হাত দিয় মোদি হাসিনাকে যে চিঠি দিয়েছিলেন তাতে দ্রুত ঢাকা সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনও আগ্রগতি না হওয়ায় এবং সীমান্ত চুক্তি নিয়ে শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়ায় মোদির সফর নিয়ে পররাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয় হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তৈরি হয়েছে প্রবল উচ্ছ্বাসের আবহাওয়া। আর এ আবহাওয়াতেই মোদি ঢাকা-যাত্রায় যাবেন। মোদির সফরের পর পরই বাংরাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও ভারত সফরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দিল্লির সূত্রে বলা হয়েছে। এদিকে ত্রিপুরা সরকার স্থলসীমান্ত চুক্তি সংসদে পাস হওয়ায় অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রীও চুক্তি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

স্টুডেন্ট ভিসায় সংস্কারসহ অভিবাসীদের কড়াকড়ি আসন্ন

বৃটেনে রক্ষণশীল দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় অভিবাসীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কারণ ডেভিড ক্যামেরনের সরকার ক্রমাগতভাবে অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণে কঠোর হয়ে উঠছিলেন। ইশতেহারে অঙ্গীকার আছে যে, আমরা স্টুডেন্ট ভিসায় বড় রকমের সংস্কার সাধন করবো। একবার কারও ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত থাকা ছাত্রদের সংখ্যা হ্রাস করা হবে। লন্ডনের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় -গুলোর মধ্যে যারা লন্ডনে ‘স্যাটেলাইট ক্যাম্পাস’ খুলেছে সেসব বন্ধ করে দেয়া হবে।  ছাত্রদের জন্য বিদ্যমান হাইলি ট্রাস্টেড স্পন্সর সিস্টেমকে রিভিউ করা হবে। যেসব কলেজ বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভিসা স্পন্সরের শর্ত লঙ্ঘন করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা (টার্গেটেড স্যাংশন) নেয়া হবে।  এখন থেকে বৃটেনের প্রত্যেক বাড়িওয়ালাকে বিদেশী ভাড়াটেদের ব্যাপারে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। বাড়ি ভাড়ার চুক্তি করার সময় অভিবাসীদের ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস কি তা তাদেরকে খতিয়ে দেখতে হবে। ব্যবসায়-বানিজ্যের কোন সেক্টর যাতে আংশিক বা পুরোপুরি বিদেশী শ্রমিক নির্ভর না হতে পারে, সেজন্য কড়া নজর রাখা হবে। একটি শর্টেজ অকুপেশন লিস্ট ব্যবহার করে বিদেশ থেকে দক্ষকর্মী আনতে হবে যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে বৃটিশ শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে। ডেভিড ক্যামেরনের ইশতেহার আরও বলেছে, অভিবাসীদের ইংরেজি ভাষায় অবশ্যই পারদর্শী হতে হবে। কাউকে বৃটেনে আসতে হলে তাকে ভাষার ওপর কঠিন পরীক্ষায় পাস করতে হবে। কারণ সরকার অনুবাদের খরচ কমাতে চায়। আমরা আইন এটা বাধ্য করবো যে, প্রত্যেকটি সরকারি খাতে যেখানে জনগণকে সরাসরি সেবা দেয়ার বিষয় রয়েছে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশী শ্রমিকদের অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে হবে। আমাদের সমাজের সঙ্গে অভিবাসীরা ভালভাবে মিশতে পারে সেজন্য যারা ফ্যামিলি ভিসায় বৃটেন আসতে চায় বা ভিসার মেয়াদ বাড়াতে চায় তারা ইংরেজিতে ভাল করলে তাদেরকে উৎসাহিত করা হবে। এছাড়া আগে অনেকেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য দরখাস্ত দিয়ে দীর্ঘদিন বৃটেনে কাটাতে পারতেন। এখন কনজারভেটিভরা নীতি গ্রহণ করবে যে, কারো দরখাস্ত অনির্দিষ্টকাল ধরে ফেলে রাখার সুফল কাউকে পেতে দেয়া হবে না। এমনকি যে ক্ষেত্রে ‘পারিবারিক জীবনের অধিকারের’ প্রশ্ন থাকবে সেখানেও তারা নমনীয়তা দেখাবে না।    
দলটি তার নির্বাচনী ইশতিহারে সাফ উল্লেখ করেছে যে, কোন বিদেশী অপরাধ সংঘটনে অভিযুক্ত হলেই তাকে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। বলা হয়েছে, ‘আগে বহিষ্কার পরে আপিল ভাবনা’ মর্মে যে নীতি তারা নিয়েছিল তা তারা আরও সম্প্রসারিত করবে। রক্ষণশীল দল অভিবাসন সংক্রান্ত রীতিনীতি কঠোরভাবে আরোপ করবে। আমরা এখন থেকে যেসব বিদেশীর আপিল বিচারাধীন এমনকি তার বিষয়টি জুডিশিয়াল রিভিউ চলছে সেজন্য অপেক্ষা করা হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দ্রুত তার দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
ইশতেহার আরও বলেছে, অনেক অভিবাসী মিথ্যা একটা মামলা দায়ের করে নানা ছলছুতায় বৃটেনে বসবাস করার সুযোগ নেয়। অনেকে বিচার থেকে পালিয়ে থাকারও সুযোগ নেয়। আমরা কাউকে এ রকম সুযোগ নিতে দেব না। এদেরকে অপসারণ করতে আমরা নতুন কৌশল নেব। বিদেশীদের যারা অপরাধে জড়িত হবে তাদের খুঁজে বের করতে আমরা স্যাটেলাইটের সাহায্য নেবো।
ইশতেহারে অভিবাসীদের স্বাস্থ্যসুবিধা নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা আরোপের স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। বলা হয়েছে, আগামী সংসদের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অভিবাসীদের মধ্যে যারা ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেম বা এনএইচএস ব্যবহার করেন তাদের কাছ থেকে ৫শ’ মিলিয়ন পাউন্ড আদায় করা হবে। অনেক কমিউনিটিতে অভিবাসনের বিরাট চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা রোধ করতে আমরা একটি নতুন ‘কন্ট্রোলিং মাইগ্রেশন ফান্ড’ চালু করবো। যাতে বিভিন্ন ধরনের সেবার ওপর অভিবাসীরা চাপ সৃষ্টি করতে না পারে।

‘উপার্জনক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তিকে করের আওতায় আনা হবে’ -অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, উপার্জনক্ষম সব ব্যক্তিকে করের আওতায় নিয়ে আসা হবে। একইসঙ্গে প্রতিটি বাড়ির মালিকের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হবে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সস্টিটিউট (পিআরই) আয়োজিত ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আলোকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ তথ্য জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষ বাস করে। এর মধ্যে মাত্র ১১ লাখ লোকের কর দেয়ার বিষয়টি লজ্জাজনক ও অপ্রত্যাশিত। দেশের উপার্জন যোগ্য সব মানুষকে করের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, সব চাকরিজীবীদের বেতনের ওপর কর নির্ধারণ করা হবে। করের হার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে প্রত্যেক মানুষকে করের আওতায় নিয়ে আসা হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অডিট অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪০ লাখ বাড়ি রয়েছে; যার মালিকরা কর দিতে সক্ষম। তবে দেশে করদাতার হার মাত্র ১১ লাখ। প্রত্যেক বাড়ির মালিককে করের আওতায় নিয়ে আসতে এনবিআরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কর না দিয়ে কেউ পার পাবেন না।
গত ছয়টি বাজেটে করনীতি ছিল গতানুগতিক- এমন মন্তব্য করে মুহিত বলেন, এবার এ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। এবারের বাজেটে উৎসে করকে গুরুত্ব দেয়া হবে। পরোক্ষ করের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ করকে রাজস্ব আহরণের প্রধান মাধ্যম করা হবে। করের জন্য বিভিন্ন স্তর তৈরি করে প্রত্যেক মানুষকে এর আওতায় নিয়ে আসা হবে।
পিআরই’র নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সভাপতি নাসিম মনসুর, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ, সেন্টর ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম, এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান আনিস এ খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই’র ভাইস চেয়ারম্যান সিদ্দিক আহমেদ ও নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।

ঋণ বাতিলে হিলারিকে প্রভাবিত করার প্রশ্নই আসে না -ইউনূস সেন্টারের বিবৃতি

কয়েকটি দৈনিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে, ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে ৫ই মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন বলে বলা হয়েছে। মন্তব্যগুলো অসত্য এবং বিভ্রান্তিমূলক হওয়ায় তথাকথিত ওইসব মন্তব্যে আমরা হতবিহ্বল। আমাদের প্রত্যাশা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে ওইসব মন্তব্য আদৌ করেননি। কিন্তু ওই মন্তব্যগুলো ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর আরোপ করা প্রতিটি উদ্ধৃতির আমরা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (সংবাদ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি অনুযায়ী): আমার ও আমার সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে ড. ইউনূস বিশ্বব্যাংক থেকে পদ্মা সেতুর তহবিল বাতিলের জন্য হিলারি ক্লিনটনকে প্রভাবিত করেছেন। তিনি দেশের জন্য ক্ষতিকর।
আমাদের প্রতিক্রিয়া: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথম যখন এ অভিযোগ করেছিলেন, প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তখন বিবৃতিতে বলেছিলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন। আর তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কখনই বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। কাজেই প্রফেসর ইউনূসস পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলে হিলারি ক্লিনটনের প্রভাব ব্যবহার করতে তাকে বলেছেন সেটার প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এমন একটি কাজ তিনি কখনই করবেন না। এটা মর্মাহত করার মতো যে, এমন একটি বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে কোন প্রকার তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন না করেই প্রধানমন্ত্রী এমন মন্তব্য করেছেন বলে তার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জনগনের জন্য কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টিতে প্রফেসর ইউনূস তার জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার কাজ ও অবদান বিশ্বজুড়ে নোবেল শান্তিপুরস্কার এবং অন্যান্য নানা পুরস্কারের মধ্য দিয়ে স্বীকৃত হয়েছে। তিনি সবসময় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সফলতার প্রচার করেছেন। এবং তিনি বাংলাদেশেকে উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে উপস্থাপন করতে সহায়তা করেছেন। তাকে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলাটা খুবই দুঃখজনক। গণমাধ্যমে যেসব বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করা হয়েছে সেগুলো এসেছে গ্রামীণ ফিশারিজ অ্যান্ড লাইভস্টক ফাউন্ডেশনের ওপর ইম্প্লিমেন্টেশন মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ডিভিশনের (আইএমইডি) প্রেজেন্টেশন চলাকালীন। সেখানে উপসংহার টানা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটির পদ্ধতি দরিদ্রদের সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
আমাদের প্রতিক্রিয়া: গ্রামীণ ফিশারিজ কার্যক্রম নিয়ে আইএমইডি’র প্রতিবেদনে টানা উপসংহার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীণ। গ্রামীণ ফিশারিজ গড়ে তোলার জন্য ১৯৮৬ সালে ২৫ বছর মেয়াদে সরকারের কাছ থেকে পুকুর লিজ নেয়। ২০১০ সালে তা সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সরকারের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাকালীন, গ্রামীণ ফিশারিজ পরিত্যক্ত পুকুরগুলোকে ফিশারিজে পরিণত করেছে। মাছ চাষ হওয়া পুকুরের সংখ্যা ৩৩৯ থেকে ৬১৫তে উন্নীত করেছে। মাছ উৎপাদন ৪৬ টন থেকে ২০ হাজার ৪শ’ টনে বৃদ্ধি করেছে। সরকারের কাছে হস্তান্তরের সময় মাছ বিক্রি করে আয়ের পরিমাণ ১২.৮৭ লাখ থেকে ৭০ কোটিরও বেশিতে উন্নীত হয়েছে। প্রকল্পটি সফলভাবে পরিচালিত এবং অত্যন্ত সফল ছিল; লিজ চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় ২০১১ সালে সরকারের কাছে পুকুরগুলো ফিরিয়ে দেয়ার পর যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (সংবাদ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি অনুযায়ী): গ্রামীণফোন, গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীনফোনের যৌথপ্রকল্প হওয়ার কথা ছিল। ড. ইউনূস গ্রামীণফোনের শেয়ার বিক্রি করেছেন।
আমাদের প্রতিক্রিয়া: মূলত গ্রামীণফোন একটি যৌথ প্রকল্পের প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণফোনের একটি মালিক হলো নরওয়ে সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান টেলিনর। গ্রামীণফোনের দ্বিতীয় মালিক হলো গ্রামীণ টেলিকম যা কোম্পানি আইনের ২৮ ধারার অধীনে নিবন্ধিত একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান যার কোন বেসরকারি মালিক নেই। গ্রামীণফোনের বাকি মালিকরা হলেন, বাংলাদেশের অসংখ্য বিনিয়োগকারী/শেয়ারহোল্ডার যারা অব্যাহতভাবে প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে কেনাবেচা করেন। প্রফেসর ইউনূস অতীতেও গ্রামীণফোনের কোন শেয়ারের মালিক ছিলেন না, না এখন তার কোন শেয়ার আছে। কাজেই তার শেয়ার বিক্রির প্রসঙ্গই ওঠে না। কোন সময়ই গ্রামীণ ব্যাংক গ্রামীণফোনের কোন শেয়ারের মালিক ছিল না। কাজেই গ্রামীণ ব্যাংকের জিপি’র শেয়ার বিক্রি করার প্রশ্ন ওঠে না। গ্রামীণফোনের সকল অংশীদারের সম্মতি সাপেক্ষে সাধারণ জনগণের কাছে শেয়ার বিক্রি ব্যতীত গ্রামীণ টেলিকম তাদের কোন শেয়ার বিক্রি করেনি। গ্রামীণ টেলিকম দরিদ্র নারীদের উদ্যোক্তা সুযোগ দেয়ার জন্য গ্রামে ফোন সেবা দেয়ার ভিলেজ পে ফোন প্রোগ্রাম পরিচালনা করে।  এ কার্যক্রমে হাজারও নারী সম্পৃক্ত। তারা এ থেকে ভাল উপার্জন করে থাকেন। গ্রামীণফোনের পথপ্রদর্শনকারী কাজের কারণেই টেলিফোন সেবা আজ এতোটা সুলভ। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও এখন মোবাইল ফোন অধিকাংশ মানুষের নাগালের মধ্যে। গ্রামীণফোনের যে মুনাফা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকমে যায় তা দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণার্থে গৃহীত প্রকল্পগুলোর সহায়তায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (সংবাদ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি অনুযায়ী): দরিদ্র মানুষেরা ক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতির ফাঁদে আটকে যাচ্ছে। এতে চড়া হারে সুদ দিতে হয়। প্রধানত এর লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিক। গ্রামীণ ব্যাংকের ৫৪টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে গ্রামীণ নামটি রয়েছে তা তুলে ধরে কিভাবে দরিদ্ররা ঋণের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে।
আমাদের প্রতিক্রিয়া: গ্রামীণ ব্যাংক আর এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কার্যক্রমগুলো সারা বাংলাদেশ জুড়ে সক্রিয়। এ মডেল সারা বিশ্বে অনুকরণ করা হয়েছে। আর অনেক ইমপ্যাক্ট স্টাডিতে দেখা গেছে যে, প্রচলিত ব্যাংকগুলো যেখানে দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা দেয় না, সেখানে কোন প্রকার জামানত ছাড়া ঋণ দেয়ার মাধ্যমে জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে দরিদ্রদের সুযোগ তৈরি করে দেয়া ক্ষুদ্রঋণ। বাংলাদেশে সক্রিয় সকল রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তুলনায়  গ্রামীন ব্যাংকের সুদের হার সব থেকে কম। গ্রামীণ ব্যাংকে ‘ক্ষুদ্রঋণ ফাঁদ’ নেই। দেশব্যাপী এর ঋণগ্রহীতারা তাদের প্রাপ্ত সেবার অত্যন্ত কদর করে থাকে। গ্রামীণ ব্যাংকের বিরাট একটি অংশের (৭৫ শতাংশ) মালিক ঋণগ্রহীতারা। বোর্ডের বেশির ভাগ সদস্য তারা। ব্যাংকের মালিকদের ক্ষতি করার কোন সুযোগ ব্যাংকের নেই।
গ্রামীণ ব্যাংক শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে। শুধু গত ১২ মাসে (এপ্রিল ২০১৪ থেকে মার্চ ২০১৫) গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ হিসেবে দিয়েছে ১৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। মার্চ ২০১৫ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকে সকল ঋণগ্রহীতার মোট সঞ্চয় ছিল ১০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। একই তারিখ পর্যন্ত দেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৯০২৫ কোটি টাকা। বাংকে ঋণগ্রহীতাদের জমা অর্থের পরিমাণ ব্যাংকের কাছে তাদের ঋণের তুলনায় বেশি। খুব বেশি ব্যাংক এমন রেকর্ডের দাবি করতে পারবে না।
একটি প্রধান দৈনিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি অনুযায়ী, তিনি তার পরিচিত এক নারীর উদাহরণ দিয়েছেন যিনি ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন কিন্তু তাকে ১৬ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকে এটা সম্ভব নয় কেননা জিবির নিয়মে কোন অবস্থাতেই মোট সুদের পরিমাণ দেয়া হয়। পেনশন তহবিল, শিশুদের জন্য শিক্ষাঋণ এবং দুর্যোগকালীন সাহায্য সহ বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক। এছাড়া শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তারা ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছর ব্যাংকের মুনাফা থেকে লভ্যাংশ পাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন সেগুলো স্বতন্ত্র অর্থায়নে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ ব্যাংকের কাছ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে কোন বিনিয়োগ নেই। কাজেই তাদেরকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠান বলা যায় না। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালায় না। কাজেই এসব প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে কিভাবে দরিদ্র মানুষ ‘আটকে যাচ্ছে’ তা বোঝা যাবে সেটা স্পষ্ট নয়।
এটা মর্মাহত হবার মতো বিষয় যে, প্রফেসর ইউনূসের মতো একজন সম্মানীয় ব্যক্তি সম্পর্কে কোন প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়া এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। বিশেষভাবে ব্যক্তিগতভাবে প্রফেসর ইউনূসের জন্য। এগুলো দেশের ভেতরে ও বাইরের মানুষের মনের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে। আমরা এর আগেও এসব অভিযোগ ও ইস্যুর বিস্তারিতভাবে জবাব দিয়েছি। গণমাধ্যম আমাদের সকল প্রতিক্রিয়া বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। এটা দুঃখজনক যে আমাদের প্রতিক্রিয়ার কোন উল্লেখ না একই অভিযোগ বার বার সামনে আসে। সার্বিক রেকর্ড স্পষ্ট ও খোলাসা করার জন্য আমরা আবারও প্রকৃত ও সত্য তথ্যগুলো তুলে ধরলাম।
৭ই মে ইউনূস সেন্টার থেকে পাঠানো বিবৃতি

ক্যামেরনের বিস্ময়কর জয়

অপ্রত্যাশিতভাবে সবাইকে চমকে দিয়ে আবারও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ডেভিড ক্যামেরন। বানের পানির মতো তিনি ভাসিয়ে দিয়েছেন বিরোধী দল লেবার, লিবারেল ডেমোক্রেট ও ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টিসসহ সবাইকে। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে এ দলগুলোর নেতা যথাক্রমে এড মিলিব্যান্ড, নিক ক্লেগ ও নাইজেল ফারাজ পদত্যাগ করেছেন। হারিয়েত হারম্যানকে অস্থায়ীভাবে দেয়া হয়েছে লেবার দলের দায়িত্ব। অন্যদিকে ডেভিড ক্যামেরনকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হচ্ছে না। কারও ওপর ভর না করে তিনি একাই এখন সরকার গঠন করতে পারছেন। এমপিরাসহ প্রধানমন্ত্রী আগামী ১৮ই মে শপথ নেবেন বলে জানিয়েছে অনলাইন হারেটজ পত্রিকা। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বুথফেরত জরিপ, জনমত জরিপ, রাজনৈতিক বোদ্ধাদের পূর্বাভাসকে মিথ্যে প্রমাণ করে তিনি নিজেকে ও সেই সঙ্গে দলকে নিয়ে গেলেন ভিন্ন এক উচ্চতায়। তাই তার কনজারভেটিভ শিবিরে আনন্দ সীমাহীন। নির্বাচনের আগে তিনি ১০ ডাউনিং স্ট্রিট ছেড়ে গিয়েছিলেন। গতকাল যখন কনজারভেটিভ দল তার লক্ষ্যের দিকে ক্রমেই এগিয়ে যেতে থাকে তখন ডেভিড ক্যামেরন বুঝে গিয়েছেন তিনিই হচ্ছেন আগামীর প্রধানমন্ত্রী। তাই তিনি চিরসঙ্গী সামান্থা ক্যামেরনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ছুটে যান সেই ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে। আর বিশ্লেষকরা, বোদ্ধারা অবাক বিস্ময়ে শুধু হিসাবের পরিসংখ্যানের হিসাব মিলাচ্ছিলেন। কিছুতেই যখন হিসাব মিলছিল না তখনই তিন বড় দলের নেতা পরাজয় স্পষ্ট বুঝতে পারেন তারা মঞ্চ থেকে পিছলে পড়েছেন। ফলে সঙ্গে সঙ্গে তারা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। বৃটিশ পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা ৬৫০টি। এর মধ্যে কোন দল যদি ৩২৬টি আসন পায় তাহলে তার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পূরণ হয় এবং ওই দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে। কিন্তু ৩২৬ নয়, ৩৩১ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ডেভিড ক্যামেরনের কনজার্ভেটিভ পার্টি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল লেবার দল। তারা অর্জন করেছে ২৩২টি আসন। স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি পেয়েছে ৫৬ আসন। লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে ৮টি আসন। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি পেয়েছে ৮ আসন। অন্য দলগুলো মিলে পেয়েছেন ১৫টি আসন। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাসে বলেছিলেন, কনজার্ভেটিভ ও লেবার পার্টি কোন পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তারা হয়তো ২৭৩টি করে আসন পেতে পারে। ফলে সরকার গঠন করতে হলে ছোট দলগুলোর ওপর ভর করতে হবে। সেভাবে গঠিত পার্লামেন্ট হবে ঝুলন্ত। তার স্থায়িত্ব হবে স্বল্প সময়ের। এমনকি এক নেতা তো আগামী বড়দিনের আগেই আরেকটি নির্বাচন দিতে হবে এমন এক পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু ধোপে টেকেনি কোন যুক্তি। মানুষ তার গোপন ব্যালটে সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। তবে গতকাল সকালের দিকে বিবিসি যে এক্সিট পোল বা বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করে তাতে বলা হয় কনজারভেটিভ পার্টি ৩১৯ বা ৩৩১ আসন পেতে পারে। শুধু সেই হিসাবটিই বলা চলে শতভাগ সত্যে পরিণত হয়েছে। এভাবে যে বিজয় অর্জিত হয়েছে তাকে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মধুরতম বিজয় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটা দলের জন্য মধুরতম বিজয়। তিনি আরও বলেন, আমি এক এক দল এবং সরকারে নেতৃত্ব দিতে চাই- যে দল- যে সরকার এক জাতি এবং অখণ্ড যুক্তরাজ্যে বিশ্বাসী। এ বিশ্বাসকে আমি পুনরুদ্ধার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি গতকাল ডাউনিং স্টিটে ফেরার পরে সাক্ষাৎ করেছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এখন রানিই তাকে আমন্ত্রণ জানাবেন সরকার গঠনের জন্য। ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বৃটেনের সদস্যপদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠান ও কনজারভেটিভের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবেন তিনি। ওদিকে নির্বাচনে স্কটল্যান্ডে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে স্বাধীনতাপন্থি স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি)। তারা স্কটল্যান্ডের মোট ৫৯ আসনের মধ্যে ৫৬ আসনে বিজয়ী হয়েছে। স্কটল্যান্ডে ৪০টি আসন হারিয়েছে লেবার দল। বাকি ৩টি আসন পেয়েছে অন্যান্য দল। এর ফলে স্কটিশরা এবার তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে আবারও গণভোটের ডাক দিতে পারে। যদি সেটাই হয় তাহলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। এরই মধ্যে এসএনপির এমপি অ্যালেক্স স্যামন্ড হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন ডেভিড ক্যামেরনকে। তিনি বলেছেন, স্কটল্যান্ডের সিংহরা গর্জে উঠেছি। এর মধ্য দিয়ে তিনি আসলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে বৃটেনের অখণ্ডতার বিষয়ে ডেভিড ক্যামেরন জোর দিয়েছেন। তিনি কি পারবেন এসএনপিকে স্বাধীনতার জন্য ওই গণভোট আহ্বান বন্ধ করাতে। নিকোলা স্টারজেনের নেতৃত্বে এসএনপি বিজয়ী হওয়ার পর থেকে বৃহস্পতিবারের রাতটি মধুর রাত হিসেবে ধরা দেয় স্কটল্যান্ডে। এ রাতে স্কটিশরা নির্ঘুম কাটিয়েছেন। তারা রাস্তায় বেরিয়ে বাঁশি বাঁজিয়ে, গাড়ির হর্ন বাজিয়ে, নেচে-গেয়ে উল্লাস করেছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল নির্বাচনী ফল সরাসরি প্রকাশ করছিল। সেখানে উপস্থিতরা মাঝেমধ্যেই পুলকিত হয়ে উঠছিলেন। কেউ বা খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। কারণ, নির্বাচনের এমন ফলের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। কনজারভেটিভদের এমন মধুর বিজয় দেখেই বৃটেনের শেয়ারবাজার হঠাৎ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সূচক তর তর করে উঠে যেতে থাকে ওপরে। এক্সিট পোল যখন পূর্বাভাস দেয় যে ডেভিড ক্যামেরনের কনজার্ভেটিভ পার্টি আবার সরকার গঠন তরতে পারে সঙ্গে সঙ্গে পাউন্ডের দাম শতকরা এক ভাগ বেড়ে ১.৫৪ ডলারে দাঁড়ায়। নির্বাচনে বিজয় অর্জন ছিল ডেভিড ক্যামেরনের জন্য প্রথম লড়াই। এখন তার সামনে দ্বিতীয় লড়াই অপেক্ষা করছে। তা হলো গ্রেট বৃটেনের অখণ্ডতা রক্ষা করা। তা করতে ডেভিড ক্যামেরনকে আপসের পথে যেতে হবে। যদি তিনি এসএনপির প্রধান নিকোলা স্টারজেনকে আরও ক্ষমতা, এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থা, দিয়ে থামাতে পারেন তাহলে হয়তো অখণ্ডতা ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। ডেইলি মেইল খবর দিয়েছে, স্কটল্যান্ডে ৫৬ আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর এরই মধ্যে নিকোলা স্টারজেন তার দাবির তালিকা করা শুরু করেছেন। তিনি কৃচ্ছ্রসাধন ও হলিরুডের জন্য আরও শক্তি চাইতে পারেন।

৩৫০ বছরের ইতিহাস ভাঙলেন ম্যারি ব্লাক

সবচেয়ে কম বয়সী এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ম্যারি ব্লাক। তার বয়স মাত্র ২০ বছর। তিনি স্কটল্যান্ডের এক ছাত্রী। ব্রিটেনের ৩৫০ বছরের ইতিহাসে এত কম বয়সে এ পর্যন্ত আর কোনো এমপি নির্বাচিত হননি। ১৯৬৭ সালে স্কটল্যান্ডের ক্রিস্টোফার মঙ্ক মাত্র ১৩ বছর বয়সে ব্রিটেনের এমপি হয়েছিলেন। মঙ্কের পর এই প্রথম তিনি এত কম বয়সে এমপি নির্বাচিত হলেন। ম্যারি ব্লাক এই স্কটল্যান্ড থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এখনও তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও জননীতির ছাত্রী। সামনে তার স্নাতক শেষবর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা। এরই মধ্যে স্বাধীনতাকামী স্কটিশ পার্টির এমপি নির্বাচিত হলেন পাইসলে ও রেনফ্রেশায়ার সাউথ থেকে। স্বর্ণকেশী ম্যারি ব্লাক নিজের নামের প্রথম অংশকে অর্থাৎ ম্যারি হিসেবেই নিজেকে পরিচয় দেন।
লেবার পার্টির ৪৭ বছর বয়সী পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র ও প্রচারণা দলের প্রধান ডগলাস আলেক্সান্দারকে কুপোকাত করে তিনি এই বিজয় অর্জন করলেন। এ ফল ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে তার সমর্থকদের মাঝে শুরু হয়েছে উল্লাস। এসএনপির প্রার্থী ম্যারি পেয়েছেন ২৩৫৮৪ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির ডগলাস পেয়েছেন ১৭৮০৪ ভোট। তবে ব্লাক নিজে রয়েছেন ধীর স্থির। তিনি সাধারণ স্কটিশদের জীবনমানের উন্নতি করার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। তার জন্ম লেবার পার্টিকে সমর্থন করে এমন একটি পরিবারে। তবে তার পরিবার ভালবাসে স্কটল্যান্ডকে ওদিকে এক্সিটপোল বলছে স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি স্কটল্যান্ডের ৫৯টি আসনের মধ্যে সবগুলোতে বিজয়ী হতে পারে। এখানে এর আগের নির্বাচনে বেশ কিছু আসন পেয়েছিল লেবার পার্টি। সেই আসনগুলোও এবার কব্জা করবে এসএনপি। ম্যারি ব্লাক বলেন, স্কটল্যান্ড দশকের পর দশক অবহেলার শিকার। পাইসলের প্রতি ৫ জন মানুষের মধ্যে একজন বসবাস করছেন দারিদ্র্যে। তাদের জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে চান তিনি।

স্কটল্যান্ডে আবার স্বাধীনতা সুর

ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্কটল্যান্ডের স্বাধীতার প্রসঙ্গটি আবার সামনে চলে এসেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে গণভোটে সামান্য ব্যবধানে স্কটিশ স্বাধীনতার দাবিটি নাকচ হয়ে গেলেও বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) ভূমিধস জয়ের পর ভবিষ্যৎ ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আবার এ ইস্যুটি চলে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
স্কটল্যান্ডের মোট ৫৯টি আসনের মধ্যে ৫৬টি আসনেই জয়লাভ করেছে এসএনপি। পাত্তা পায়নি ক্ষমতাসীন রক্ষণশীলরাও এবং লেবার পার্টি বা লিবারেল ডেমোক্রেটিকের মতো ঘাগু দলগুলোও। তাহলে কি স্কটিশদের স্বাধীনতার জন্য দলটির ৮০ বছরের চেষ্টা সার্থক হতে চলেছে? ভেঙে যেতে বসেছে যুক্তরাজ্য? স্কটল্যান্ডের ভোটগণনা শেষে এটাই জনমনে প্রশ্ন হয়ে ফিরছে। মাত্র কয়েক মাস আগেই স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে স্বাধীনতা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন স্কটিশরা। আজকের নির্বাচনী ফল কি তাহলে আগের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করছেন স্কটিশরা- এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে? উল্লসিত এসএনপি নেতা নিকোলা স্টারজিওন অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর এক শব্দেই দিয়ে দিচ্ছেন- ‘না’। অবশ্য এই ‘না’-তেও খানিকটা পেঁচও কষেছেন তিনি। খবর বিবিসির। তিনি জানান, তার দল পুরো স্কটল্যান্ডের সব মানুষের হয়েই কাজ করবে, কাজ করবে প্রত্যেক স্কটিশের জন্য।

দুই পক্ষের ‘রাজনীতি’ ও প্রতারিত ভোটার by এ কে এম জাকারিয়া

প্রার্থী-ইশতেহার এসব দেখে তিন সিটির ভোটাররা ভোট দেবেন, নাকি ‘রাজনৈতিক’ বিবেচনাই বড় হবে, সে প্রশ্ন রেখেছিলাম আগের এক লেখায় (প্রথম আলো, ২০ এপ্রিল)। ধারণা ছিল, আগের মতো রাজনৈতিক বিবেচনাই এই নির্বাচনগুলোতে মূল হয়ে উঠবে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় সেই হিসাব-নিকাশ এখন আর করা যাচ্ছে না। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে এক বড় ‘রাজনীতিই’ হয়ে গেল! যেখানে নিজেদের মতো করে দুই পক্ষই জিতল।
হঠাৎ করে সরকারের সিটি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক। সাংগঠনিকভাবে বিশৃঙ্খল ও অপ্রস্তুত বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলা ও ৫ জানুয়ারি ভোট বর্জনের মতো আবার কোনো ভুল করে কি না, সেই ফাঁদে ফেলা। অন্যদিকে বিএনপিও তখন একটি কৌশলগতভাবে ভুল, ব্যাপক সমালোচিত (পেট্রলবোমানির্ভর অবরোধ) ও ব্যর্থ আন্দোলন থেকে বের হওয়ার অছিলা খুঁজছিল। এই নির্বাচনকে বিএনপি সেই সুযোগ নিয়েছে। এ ধরনের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো সব সময়ই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির জন্য সুবিধাজনক। কারণ, এসব নির্বাচনে পরাজিত হলে সরকারের বিরুদ্ধে সহজে কারচুপির অভিযোগ তোলা যায়, আর বিজয়ী হলে জনগণ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে, সে দাবি করা যায়। এ কারণেই এসব নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, কোনোটাই সরকারের জন্য খুব স্বস্তি নিয়ে আসে না।
এই নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই অনেক অভিযোগ বা সব প্রার্থীর জন্য সমান মাঠের নিশ্চয়তা নিয়ে শঙ্কা থাকলেও জনমনে তা একটি উৎসাহের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। অনেক তরুণ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থী এবারের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। প্রার্থী, তাঁদের ইশতেহার, শহর নিয়ে তাঁদের পরিকল্পনা, কীভাবে তাঁরা শহরের সমস্যাগুলো দূর করবেন—এসব নিয়ে এবারের গণমাধ্যমে যত মাতামাতি হয়েছে, আগে কখনো তা হয়নি। প্রার্থীরা একই সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, গোলটেবিল বা বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। এগুলোর পরিবেশ ছিল খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ। এসবই আমাদের নাগরিকদের মনে আশা জাগিয়েছিল। সেই নির্বাচন কেন এমন পরিণতি পেল? এমনকি ভোটের দিন সকালেও ভোটারদের মধ্যে যে আগ্রহ ও উৎসবের পরিবেশ বজায় ছিল, তা-ও কিন্তু এমন একটি নির্বাচনের ইঙ্গিত দেয়নি।
একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে সরকারি দলের প্রার্থীদের পরাজিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে খালেদা জিয়ার ‘নীরব প্রতিশোধের’ স্বীকৃতি মেলা, যা সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবেই বিবেচিত হতো। আর সরকারে থাকার নানা সুযোগ নিয়ে নির্বাচনী জয়ী হওয়ার ফল হচ্ছে নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়মের সমালোচনার মুখে পড়া। গত ২৮ এপ্রিল যে নির্বাচন হলো, তাতে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে সরকার শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় পথটিকেই বেছে নিয়েছে। কিন্তু সরকারে থেকে নির্বাচনে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার ও তা ব্যবহার করারও তো একটা মাত্রা থাকে, রাখঢাক থাকে, কৌশল থাকে। বোঝা যায়, শেষ সময়ে এসে সরকার একেবারে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।
নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থক বা সম্ভাব্য এজেন্টদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বা দলের লোকজনের মাধ্যমে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশির অভিযোগ উঠেছে। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছে। তবে সরকারের এ ধরনের অপকর্মের সত্যতা থাকলেও কাগজে-কলমে প্রমাণ করা কঠিন। কিন্তু ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনের দিন বুথ দখল, ব্যালট পেপার ছিনিয়ে গণসিল, সরকারি দল-সমর্থকদের যা খুশি তা-ই করার সুযোগ দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়কের ভূমিকা পালন ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় বা অসহায় দশার বিষয়গুলো তো আর লুকানো বিষয় ছিল না।
নির্বাচনের দিন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের দুটি ওয়ার্ডের সাতটি নির্বাচনী কেন্দ্রে ঘুরেছি। কোনো কেন্দ্রের সামনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের ক্যাম্প বা লোকজন না দেখে ধারণা হয়েছিল যে তাঁরা হয়তো খালেদা জিয়ার আহ্বানে ‘নীরব প্রতিশোধ’ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। আর বিএনপির নেতা-কর্মীরা যেহেতু প্রকাশ্যে মাঠে নেই, তাই তাঁদের ওপর হামলা বা প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকির ঘটনাও চোখে পড়েনি (অন্তত আমার দেখা সাতটি কেন্দ্রে)। প্রশ্ন হচ্ছে, এ অবস্থায় ভোটকেন্দ্র দখল বা গণসিল মারার দরকার হয়ে পড়ল কেন? সকালের দিকে দৃশ্যত যে শান্ত পরিস্থিতিতে ভোট শুরু হয়েছিল, তা বেলা ১১টার পর পাল্টাতে শুরু করল কেন?
আমার দেখা সাতটি কেন্দ্রের মধ্যে দুটি কেন্দ্রে বুথ দখল ও গণসিল মারার ঘটনা ঘটেছে। দুটি ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগে-পরে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। দুটি ঘটনাই ঘটিয়েছেন স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকেরা। সিটি নির্বাচন যে শুধু মেয়র নির্বাচন নয়, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাউন্সিলরও যে নির্বাচিত হবেন এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এসব প্রার্থীরা যে অঘটন ঘটানোর ক্ষমতা রাখেন, সেটা সম্ভবত খুব একটা বিবেচনায় ছিল না।
ভোটের দিন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি দলের সমর্থন পাওয়া কাউন্সিলর প্রার্থী ও সমর্থন না পাওয়া বিদ্রোহী বা প্রভাবশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থকেরা সংঘর্ষ, ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালট পেপারে গণসিল মারার মতো অপকর্মগুলো ঘটিয়েছেন। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেল আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যাপক দাপটের মুখেও প্রায় ২০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অনুপস্থিতিতে সরকার-সমর্থক প্রার্থীদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনাগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন অনেকটা ‘ফ্রেন্ডলি ফাইট’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে নিষ্ক্রিয় থেকেছে। নির্বাচনী কর্মকর্তারও মনে হয় একই কারণে কোনো পদক্ষেপ নিতে উৎসাহী হননি। ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী অনেক আগেভাগেই স্থানীয় থানা-পুলিশকে হাত করে রেখেছেন বলে অনেকের কাছ থেকে অভিযোগ শুনেছি।
ভোটের পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে এভাবেই, এ ধরনের ঘটনার মধ্য দিয়েই। সাংবাদিকদের ক্যামেরা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়ার ফলে বুথ দখল বা ব্যালট পেপারে গণসিল মারার মতো ঘটনাগুলো ঘটানো সহজ হয়েছে। পুলিশ ও সরকারি দলের লোকজন বিভিন্ন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তাতে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে পরিকল্পনা করেই কাজগুলো করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, গণমাধ্যমে যাতে ভোটের কোনো অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা না যায়। কিন্তু মহল্লাকেন্দ্রিক নির্বাচনের এসব অনিয়ম ও সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা চাপা থাকেনি। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির ওপর এসব ঘটনা প্রভাব ফেলে।
ভোটকেন্দ্রে ঘোরার সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকেই নানা জন প্রশ্ন করতে থাকেন, বিএনপি নাকি নির্বাচন বর্জন করেছে? এর ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই যখন বিএনপির আনুষ্ঠানিক ভোট বর্জনের ঘোষণা আসে, তখন নির্বাচনটি আর নির্বাচনই থাকল না। আওয়ামী-সমর্থকদের অনেকেও মনে করলেন, দলের প্রার্থীকে জেতাতে তাঁদের আর কষ্ট করে ভোট না দিতে গেলেও চলবে। ভোটকেন্দ্রগুলো দৃশ্যত ভোটারশূন্য হয়ে পড়ে। এরপর কাউন্সিলর প্রার্থীরা যে যার শক্তি অনুযায়ী নিজেদের পক্ষে ভোট নেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। ততক্ষণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নির্বাচনী কর্মকর্তারাও যেন নির্বাচনটিকে ছেড়ে দিয়েছেন।
নির্বাচন শুরু হতে না হতেই বিএনপি কেন নির্বাচন বর্জন করল? আওয়ামী লীগের অভিযোগ, আগাম পরিকল্পনা করেই এ কাজ করেছে বিএনপি। বাস্তবতা হচ্ছে, অদৃশ্য অনেক জবরদস্তি ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেও সকালের দিকে ভোটের পরিস্থিতি ও ভোটারদের মধ্যে উৎসাহই দেখা গেছে। কিন্তু তাতে ছেদ ধরায় কাউন্সিলর প্রার্থীদের শক্তি দেখানোর মহড়া, বিভিন্ন কেন্দ্রে বুথে ঢুকে গণসিল মারা এবং এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়ক ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালনের মতো দৃশ্যমান ঘটনাগুলো। যেকোনোভাবে নির্বাচনে জেতার নীতি নিয়ে সরকার ও সরকারি দলের উদ্যোগে নির্বাচনকে নষ্ট করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা চূড়ান্ত পরিণতি পায় বিএনপির নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে।
তিন সিটির নির্বাচনে সমতল মাঠ নিশ্চিত হবে বা ভোটের আম্পায়ারিং নিরপেক্ষ হবে, এমন আশা করে নিশ্চয় বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। কোনো খেলায় পক্ষপাতিত্ব হলে নিয়ম হচ্ছে খেলা শেষে অভিযোগ করা। নির্বাচনী খেলায় এই অভিযোগ তোলা যায় জনগণের কাছে। কিন্তু পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে খেলার মাঝখান থেকে সরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে খেলাটিকে ‘পরিত্যক্ত’ করা। বিএনপি আসলে খেলাটিকে পরিত্যক্ত করার পথই নেয়। যে ‘রাজনৈতিক কৌশলের’ অংশ হিসেবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, এর লক্ষ্যটি সম্ভবত ছিল তিন সিটির এই নির্বাচনটিকে পচিয়ে দেওয়া। বিএনপি এ ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল হয়েছে। যেভাবেই হোক তিন তিনটি মেয়রের পদ পেয়ে সরকারি দল যেমন খুশি, তেমনি নির্বাচনটিকে অনেকটা ‘পরিত্যক্ত’ হিসেবে রূপ দিতে পেরে বিএনপিও বড় তৃপ্ত।
‘অরাজনৈতিক’ এই নির্বাচন নিয়ে দুই দলের ‘রাজনীতি’ ভালোই জমল! কিন্তু ২৮ এপ্রিল অনেক আশা আর উৎসাহ নিয়ে যাঁরা সকাল সকাল ভোট দিতে গেলেন, তাঁদের কাছে ব্যাপাটা এখন কেমন ঠেকছে? নিজেকে প্রতারিত মনে হচ্ছে না!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

পরাজয় মেনে মিলিব্যান্ড, ক্লেগ ফারাজের পদত্যাগ

মুহূর্তেই পাল্টে গেছে যুক্তরাজ্যের রাজনীতির দৃশ্যপট। নির্বাচনে ভয়াবহ ভরাডুবির দায় কাঁধে নিয়ে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন লেবার দলের প্রধান এড মিলিব্যান্ড, লিবারেল ডেমোক্রেট দলের প্রধান নিক ক্লেগ ও ডানপন্থি ইউকে ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টির (ইউকিপ) প্রধান নাইজেল ফারাজ। হেরেছেন বহু রথী-মহারথী। তাই যুক্তরাজ্যের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোনদিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে কৌতূহলের অন্ত নেই। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। হতাশাজনক ফলাফলের পরই লেবার দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও দলীয় প্রধান এড মিলিব্যান্ডের পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে। মিলিব্যান্ড দুপুর নাগাদ দলের কেন্দ্রীয় অফিসে যান। সেখানে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তার মুখে স্মিত হাসি থাকলেও তার আড়ালে লুকানো ছিল এক গোপন বেদনা। বৈঠক শেষে এক জনসভায় প্রকাশ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। এ সময় মিলিব্যান্ড বলেন, সময় এসেছে দলের নেতৃত্ব অন্য কারো নেয়ার। দল সফল হয়নি, সেজন্য আমি সত্যিকার অর্থেই দুঃখিত। এড মিলিব্যান্ড নিজের আসন রক্ষা করতে পারলেও হেরে গে
দল থেকে পদত্যাগ করেছেন যুক্তরাজ্যের লিবারেল ডেমোক্রেট দলের প্রধান নিক ক্লেগ। যুক্তরাজ্যের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তার দলের এক রকম ভরাডুবির পর পদত্যাগ করলেন তিনি। এখন পর্যন্ত মাত্র ৮টি আসন পেয়ে স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (এসএনপি) কাছে বৃটেনের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের মর্যাদা হারিয়েছে তার দল। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। দলের এমন ফলাফলের পর তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে আবেগপূর্ণ বিদায়ী ভাষণ দেন সমর্থক ও কর্মীদের প্রতি। এমন ফলাফলকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন, দল প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে। তিনি বলেন, আমি জানতাম, এ নির্বাচনটি হবে লিবারেল ডেমোক্রেটদের জন্য ব্যতিক্রমধর্মী কঠিন। কিন্তু ফলাফল স্পষ্টতই আমাদের আশঙ্কার চেয়েও মারাত্মক খারাপ। প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের নির্বাচনে ৫৭টি আসন পায় লিবারেল ডেমোক্র্যাট। সেবার কোন দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পাওয়ায় লিব-ডেম হয়ে উঠে সরকার গঠনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক। সেবার ‘কিংস মেকার’ নিক ক্লেগ হয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের উপ-প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এবার প্রত্যাশার চেয়েও খারাপ ফলাফল করে তার দল। গতবার জোটসঙ্গী কনজারভেটিভ পার্টি এবার সাহায্য ছাড়াই এককভাবে সরকার গঠনের পথে। এ সমস্ত কিছুর দায় নিচ্ছেন নিক ক্লেগ। নিজের ভাষণে তিনি বলেন, এটা দেখাটা খুবই কষ্টকর যে, আমার বহু বন্ধু ও সহকর্মী হেরেছে। সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। অথচ তারা বহুদিন ধরে নিজেদের আসনে দায়িত্ব পালন করেছে। আমি অবশ্যই সবকিছুর জন্য দায় নেব। সেজন্য আমি ঘোষণা করছি, লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের নেতা হিসেবে আমি পদত্যাগ করতে যাচ্ছি। তবে এ-ও বলেছেন, ভয় ও অভিযোগের জয় হয়েছে, হেরে গেছে লিবারেলিজম। লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের প্রতি যে রায়ই ভোটাররা দিক, যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সংকটের সময় দলটির ভূমিকা ইতিহাসে লেখা থাকবে। পদত্যাগের আগে ক্লেগ এ-ও জানিয়ে গেছেন যে, তার দল ফিরে আসবেই। আবার জয় পাবেই।
পদত্যাগ করেছেন ইউকিপ দলের প্রধান নাইজেল ফারাজ। তার দলের ভোট এবার বেড়েছে। এবার দলটি পেয়েছে যুক্তরাজ্যের মোট ভোটের ১৩ শতাংশেরও বেশি ভোট। কিন্তু নাইজেল ফারাজ নিজের আসনে হেরে গেছেন কনজারভেটিভ দলের ক্রেইগ ম্যাকিনলের কাছে। তার দল পেয়েছে সাকুল্যে একটি আসন। তবে পদত্যাগ করলেও তিনি জানিয়েছেন আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় দলের নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি তিনি ভেবে দেখবেন।
ছেন তার দলের অনেক রথী-মহারথী। ছায়া চ্যান্সেলর এড বলস এর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচার প্রধান ডগলাস আলেক্সান্দার হেরেছেন স্কটল্যান্ডের স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (এসএনপি) ২০ বছর বয়সী প্রার্থী মাইরি ব্লাকের কাছে। স্কটিশ লেবার পার্টির প্রধান জিম মারফিও দেখেছেন হারের মুখ। দলের বাজে ফলাফলের পরও দলীয় সদর দপ্তরে পৌঁছালে উষ্ণ সংবর্ধনাই পান মিলিব্যান্ড। নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, উপ-প্রধান হারিয়েত হারম্যান হবেন দলের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান। এক ভাষণে তিনি বলেন, আমি লেবার দলে যোগ দিয়েছি মাত্র ১৭ বছর বয়সে। কখনও ভাবিনি দলটিকে নেতৃত্ব দেব। আমি গত পাঁচ বছরে আমার সর্বোচ্চ করেছি। তবে তার মতে, নেতৃত্বই পরিবর্তন অর্জনের জন্য একমাত্র নিয়ামক নয়। এর আগে টুইটার বার্তায় কর্মীদের উদ্দেশ্যে মিলিব্যান্ড বলেন, যারা আমার প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছেন তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। তবে ফলাফলের পুরো দায় আমার একার। আবার জানিয়েছেন, তার দল লেবার কখনই দেশের কর্মজীবী মানুষদের পক্ষে লড়াই থামাবে না। বৃটেনের পক্ষে যা কিছু তিনি ভাল বলে বিশ্বাস করেন, তার পক্ষে লড়াই অব্যাহত রাখবেন। ফলাফলের রাতটিকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ‘খুবই হতাশাজনক ও কঠিন’ একটি রাত হিসেবে। ২০১০ সালে যেখানে ২৫৮টি আসন পেয়েছিল লেবার, এবার তারা পেয়েছে ২৩৪টি আসন। তবে ইংল্যান্ড বা ওয়েলসে ভাল করলেও স্কটল্যান্ডেই লেবাররা ডুবেছে। সেখানে গতবছর ৪১টি আসন পেলেও এবার লেবাররা পেয়েছে মাত্র ১টি আসন। এ কথাটিও ছিল মিলিব্যান্ডের ভাষণে। বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদীদের উত্থানেই নিমজ্জিত হয়েছে লেবার পার্টি।

লেবার পার্টি হারল কেন?

অভাবনীয় অভিঘাতে ধসে পড়ল যুক্তরাজ্যের লেবার শিবির। সব জরিপ ও ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত করে শাসক দল কনজারভেটিভ পার্টিকেই ক্ষমতায় বহাল রাখল ব্রিটিশরা। ২০১০ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েও যে কয়টি আসন ধরে রেখেছিল, এবার সেই শক্তিও হাতে থাকল না। কিন্তু কেন এমনটি হল? শেষ মুহূর্তে ভোটাররা কেন রক্ষণশীলতায় আস্থা রাখল? ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের এক বিশ্লেষণে ভুল নেতার ভুল কর্মসূচিতে লেবার পার্টির ভরাডুবি ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ড্যান হজেসের লেখা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে লেবার পার্টি জেতার কোনো চেষ্টা করেনি। তারা স্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু বাস্তবায়নের কঠিন সংগ্রামমুখর পথে হাঁটেনি। নিজেদের উৎসর্গ করার মতো দৃষ্টিভঙ্গি দেখাতে পারেনি। ২০১০ সাল থেকেই দলটি ধারাবাহিকভাবে ভুল পথে হাঁটছে। লেবার পার্টির কেউ কেউ দলকে শ্রমসাধ্য পথে পরিচালিত করতে চেয়েছেন। সেই পথই ছিল দেশের নেতৃত্বের ভার গ্রহণের পথ। কিন্তু অধিকাংশই সেই দুর্গম পথের পরিবর্তে সহজতর রাস্তা খুঁজেছেন।
যেসব আসনে বার বার যাওয়া হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণায় সেসব এলাকায় সফর হয়েছে হয়েছে বেশি। গতবারের কথাই ধরা যাক। লেবার পার্টির দুই নেতার মধ্যে ব্রিটিশ জনগণের মতামত জরিপে যাকে জনপ্রিয় হিসেবে পাওয়া গেছে, তাকে নেতা বানানো হয়নি। ট্রেড ইউনিয়নের পছন্দের লোককে সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। বলা হয়েছিল নেতাকে পেশাদার ও দক্ষ উপদেষ্টাদের মাধ্যমে পরিচালিত হতে। কিন্তু তিনি পরামর্শ নিয়েছেন ব্যক্তিগত পছন্দনীয় ও আদর্শিক বন্ধুদের থেকে। এড মিলিব্যান্ডকে বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, পূর্ববর্তী লেবার সরকারের ভুলগুলো স্বীকার করে বিশেষ করে তাদের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিরোধিতা করতে। কিন্তু তিনি সেসব ভুল নীতির উল্টো সাফাই গাইতে থাকলেন। অর্থনৈতিক ঘাটতি কমানোর সুস্পষ্ট প্রতিশ্র“তি দেয়ার পরামর্শ না মেনে এটাকে এমন বিমূর্ত করে উপস্থাপন করলেন যা জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয় মনে হয়েছে। সরকার পরিচালনার নির্দিষ্ট কর্মসূচি পেশ না করে মিলিব্যান্ড ধারাবাহিক স্লোগান আওড়াতে লাগলেন। ‘এক জাতি’, ‘উত্তম ব্রিটেন’, ‘নতুন প্রজন্ম’ ইত্যাদি অর্থহীন বাগাড়ম্বরে ভরে ছিল তার প্রচারণা। তিনি দলকে রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে নেয়ার কষ্ট না করে যেখানে যেভাবে সুবিধা পেয়েছেন সেভাবেই চালিয়েছেন। এছাড়া রাজনৈতিক বৃহৎ জোট গঠনের একটা পথ খোলা রাখার দরকার ছিল। কিন্তু তিনি ৩৫ শতাংশ ভোটেই খুশি হতে চেয়েছিলেন। এখন হয়ত মিলিব্যান্ড লেবার নেতা হিসেবে পদত্যাগ করছেন। কিন্তু ব্যর্থতার সমস্ত দায়ভার কি নিজের কাঁধে নিচ্ছেন? নাকি দলকেই দোষী করে যাচ্ছেন? এবার কি লেবার পার্টির বোধোদয় হবে?

চৌহালির চর অথবা ছিন্নপত্রের ভুবন by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ফিরোজের বাবা একটা কথা প্রায়ই বলতেন—এবং গভীর বিশ্বাস থেকেই বলতেন—এ দেশে যখন আকাল আসে, মড়কের চেহারা নিয়ে আসে। খুলনা জেলা আদালতের উকিল ছিলেন, অনেক আকাল পার করেছেন। তেতাল্লিশের মন্বন্তর দেখেছেন, সাতচল্লিশের দেশ বিভাগ দেখেছেন। কলকাতার বেক বাগানে বাপ-দাদার ভিটা ছিল। সাতচল্লিশে তাতে আগুন লেগেছিল। সেই আগুনে তাঁর অনেক বিশ্বাস পুড়ে গিয়েছিল। তার পরও বাপ-দাদার পোড়ো ভিটা আঁকড়ে ধরে পড়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য আর পারেননি। ১৯৬৪-তে ঢাকা-কলকাতায় দাঙ্গা হলো—না বাপ-দাদার ভিটায় আর আগুন লাগেনি, কিন্তু কিছু কঠিন চেহারার লোক এসে পরিষ্কার বলে দিল, যদি যেতে চান, ব্যবস্থা হবে।
এরপর আর কি থাকা যায়?
খুলনায় এসে ওকালতি পেশাটা নতুন করে শুরু করতে তেমন সমস্যা হয়নি। ঘরও জুটেছিল একটা, সেটিও গুছিয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু মনটা পড়ে থাকল বেক বাগানে। একদিন—এবং তত দিনে একাত্তর পার হয়ে গেছে—ভাঙা গলায় ফিরোজকে বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথ যদি বেঁচে থাকতেন, এই আগুন তাঁকেও পোড়াত।’ ফিরোজ মাথা নাড়ল। না, কথাটা ঠিক বললাম না। ফিরোজের ভেতরে একটা নকশাল-ফিরোজ ছিল। মাথাটা সে-ই নাড়ল। সে বলল, ‘রবীন্দ্রনাথের ঘোড়ার ডিম হতো। তিনি হয়তো ওই আগুনে একটু ওম পেতেন। এই যা।’ ফিরোজের বাবা তর্ক পছন্দ করতেন না। নিজের ছেলের সঙ্গে তো নয়ই। তিনি যুক্তিবাদী ছিলেন, দেখতেন, ছেলে যুক্তি মানে না, খালি আবেগ থেকে উঁচু গলায় কথা বলে। তিনি চুপ করে মনে মনে ঠাকুরের মালিনী থেকে সুপ্রিয়র কথাগুলো আওড়ালেন; ‘আপন বিশ্বাসে মত্ত। করিয়াছ স্থির শুধু দল বেঁধে সবে। সত্যের মীমাংসা হবে, শুধু উচ্চরবে?/ যুক্তি কিছু নাই?’ ফিরোজের বাবার অবসর বন্ধক দেওয়া ছিল ঠাকুরের হাতে। ফিরোজ যখন ছোট ছিল, এবং বাবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, ঠাকুর তাকেও সঙ্গ দিতেন। তার ‘বীরপুরুষ’-এর আবৃত্তি শুনে পাশের বাসার সুজাতা ফিরোজের বাবাকে বলেছিল, ‘কাকা,
এ ছেলে একদিন কাজী সব্যসাচীকেও ছাড়িয়ে যাবে।’ সুজাতার দারুণ গানের গলা ছিল। মাঝে মাঝে বিকেলে আদালত থেকে ফিরে ফিরোজের বাবা সুজাতাকে ডেকে পাঠাতেন। বলতেন, ‘মা ওই গানটা গাইতে পারো? আজ সারা দিন মনে মনে গানটা বেজেছে। বড় শুনতে ইচ্ছে করছে।’ ফিরোজের মা বলতেন সুজাতা সম্পর্কে, ‘এ মেয়ের গলায় মালতী ঘোষাল বাজেন।’ সুজাতা ছিল সুদীপের বড় বোন। ফিরোজের ভেতর একটা যে নকশালী ছিল বলেছি, সে ছিল এক প্রক্সি-নকশালী, আসল নকশালী ছিল ওই সুদীপ। ১৯৬৪-তে যখন ফিরোজের বাবা দেশ ছাড়েন, সুদীপ তিন দিন ধরে কেঁদেছিল। চাপা স্বভাবের ছেলে, উদাসী মন। ফিরোজ ছিল তার একমাত্র বন্ধু। তারপর চিঠিতে যোগাযোগ ছিল। ১৯৬৮-তে ফিরোজ খুলনা থেকে ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে যোগাযোগটা তরল হলো। ১৯৭১ সালে ছিন্নই হয়ে গেল যোগাযোগ। এর আগে বেশ কয়েক মাস থেকেই ফিরোজ বুঝতে পারছিল, সুদীপের ভেতরে একটা পরিবর্তন আসছে। চরম বামপন্থী হচ্ছে, ফিরোজকেও উৎসাহ দিচ্ছে তার রাস্তায় যেতে।
২. ১৯৭১ সালে আরেকবার ঘর ছাড়তে হলো ফিরোজের বাবাকে। স্ত্রী আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ফের কলকাতা, তবে এবার কলকাতা হয়ে মালদা, এক মামাতো ভাইয়ের আশ্রয়ে। মালদা গিয়ে ফিরোজ যোগাযোগের চেষ্টা করেছে সুদীপের সঙ্গে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। তারপর সে নাম লিখেয়েছে মুক্তিবাহিনীতে। এক ফাঁকে বেক বাগান গিয়ে কড়া নেড়েছে সুদীপের দরজায়। দরজা খুলেছে সুজাতা। ফিরোজকে দেখে সে অবাক হলো, খুশি হলো, উচ্ছ্বাস দেখাল, আবার ভয়ও পেল। একটানে ঘরের ভেতর নিয়ে ফিরোজকে বলল, ‘সুদীপের খোঁজ করাটা বিপজ্জনক।’ কেন বিপজ্জনক, তাও ব্যাখ্যা করল। তারপর চোখের পানি মুছে ফিরোজের গালে হাত বুলিয়ে বলল, ‘সাবধানে থাকিস, বুম্বা।’ বুম্বা নামটা দুই বছর বয়সে ফিরোজ নিজেকেই দিয়েছিল। সেই নামে বরাবর সুজাতা তাকে ডাকত। যুদ্ধ শেষ হলে দেশে ফিরতে হলো ফিরোজকে, যদিও তার ইচ্ছা ছিল সুদীপের তালাশ করে তার সঙ্গে নকশালী যুদ্ধে শরিক হওয়ার। সুজাতা তাকে জানিয়েছিল, নকশালী চিন্তা কীভাবে মূল ধরে সুদীপকে টান দিয়েছিল, তাকে বদলে দিয়েছিল। ফিরোজ জিজ্ঞেস করেছিল সুজাতার পড়াশোনা, গান গাওয়া নিয়ে। সব ছেড়ে ঘরে ঠাঁই নিয়েছিল সুজাতা। সুদীপ চলে যাওয়ার আগে তাকে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিক্রিয়াশীলের গান সে গাইলে তার সঙ্গে সুদীপের ছাড়াছাড়ি হবে। ‘রবীন্দ্রনাথ কেন প্রতিক্রিয়াশীল হবেন?’ ফিরোজ জিজ্ঞেস করেছিল অনেকটা বিস্ময় নিয়ে। ফিরোজের কাঁধটা এক হাতে চেপে ধরে এরপর সুজাতা তাকে বুঝিয়েছিল কেন রবীন্দ্রনাথ প্রতিক্রিয়াশীল। সুজাতার চোখ জ্বলছিল, তার গলার আওয়াজ ফিরোজকে ভুলিয়ে দিয়েছিল একদিন এই গলায় মালতী ঘোষাল বাজতেন। ফিরোজের ভেতরের যে নকশালীর কথা বলেছিলাম, ফিরোজের হয়ে যে কথা বলত, সে বোধ হয় ছিল সুজাতাই। হ্যাঁ।
৩. সুজাতা এরপর একবারই যোগাযোগ করেছিল ফিরোজের সঙ্গে। একটা ছোট চিঠি লিখেছিল, বাহাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে, তাতে জানিয়েছিল, ডিসেম্বরে সুদীপকে পুলিশ মেরে ফেলে। প্রথম খুব পিটুনি দিয়েছে, হাত-পায়ের হাড়গুলো সব ভেঙে দিয়েছে, পাঁজরেরও। তারপর তিনটি গুলি করেছে। গুলি তিনটিই বুকে লেগেছে। চিঠি পেয়ে স্তব্ধ বসে ছিল ফিরোজ। অনেকক্ষণ। তারপর উঠে গিয়ে বাবাকে বলতে গেছে—বাবা ছিন্নপত্র পড়ছিলেন। নিজে খুব ঘরকুনো মানুষ ছিলেন, সে জন্য ছিন্নপত্র পড়তে আলাদা আনন্দ পেতেন, যেন ঠাকুরের সঙ্গে তিনিও বিশ্বসংসারের ভেতর দিয়ে শুধু ভেসে যাচ্ছেন। তাঁর হাত থেকে ছিন্নপত্র নিয়ে রাস্তায় ফেলে এসেছিল ফিরোজ। যেন সুদীপকে পুলিশ মারেনি, মেরেছেন ঠাকুর।
৪. ফিরোজের মুখে লুম্পেন-বুর্জোয়া, মধ্যস্বত্বভোগী, প্রতিক্রিয়াশীল—এসব কথা খইয়ের মতো ফুটত। আমাদের মুখেও। কিন্তু ও যখন এসব বলত, অথবা বলত ‘একদিন সর্বহারারা জাগবে,’ কেন যেন একটা খুব প্রত্যয় তৈরি হতো; মনে হতো, দিনটা এই এল বলে। তবে যা আমাদের অবাক করত, প্রতিক্রিয়াশীলদের তালিকায় বিদ্যাসাগর আর রবীন্দ্রনাথের নাম শুনে, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের। মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের এ রকম একটা বিশ্বাস জেগেছিল যে দেশটা এবার সর্বহারাদের হাতে যাবে, তারা সংগঠিত হয়ে এটি চালাবে। আমাদের মানে ফিরোজ, মিজান, আমি আর সুমন। আমরা সবাই ছিলাম মার্ক্সে ও পরে মাওয়ে নিবেদিত ঘোরতর বাম। এতটাই যে পড়াশোনা প্রায় লাটে উঠেছিল। দিনে-রাতে একটাই চিন্তা, সমাজতন্ত্রের এবং কমরেড মাওয়ের মডেলের বিপ্লবের। আমাদের টেবিলে জমা হতে লাগল বিপ্লবের বইপত্র, আমাদের মগজে ভর করতে থাকল দিনবদলের চিন্তা। তার পরও কেন জানি সুমনটা গান গাইত। ফিরোজ সামনে না থাকলে রবীন্দ্রসংগীত। অপূর্ব গলায়। আর ফিরোজ থাকলে লোকগান। অপূর্ব গলায়। আর মিজান পকেটে রাখা নোটবইতে লিখত কবিতা। শ্রেণিসংগ্রামের। বিপ্লবের। এবং অবাক, প্রেমের।
ফিরোজ বলত, বিপ্লব আর গান একসঙ্গে চলে না। বিপ্লব আর কবিতাতে ঠুকোঠুকি লাগে। ‘চ্যুজ ওয়ান,’ সে রেগে বলত, ‘লাভ ওর রিভল্যুশন।’ রাগলে নির্ভুল ইংরেজি বলত ফিরোজ। ফিরোজের বাবার চিঠি এল একদিন। চিঠি পেয়ে কথা হারিয়ে ফেলল ফিরোজ। চোখ দুটি হয়ে গেল মরা মার্বেলের মতো। কী লিখেছিলেন ফিরোজের বাবা? লিখেছিলেন, সুজাতা মারা গেছে। না গত দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে নয়, মারা গেছে বাহাত্তরের মার্চে। সেই পুলিশের হাতে। সুজাতা ভাইয়ের মৃত্যুর বদলা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু বদলা নিতে গিয়ে সহায়তার জন্য নকশাল খুঁজে খুঁজে বেড়ালে তো পুলিশের নজরে আসবেই। এক টিকটিকি নকশাল সেজে তার হাতে একটা মরা বোমা তুলে দিয়েছিল এবং সেটি বুকে বেঁধে সুজাতা ঢুকে গিয়েছিল এক পুলিশ ফাঁড়িতে। সেই খবর ফিরোজের বাবার কানে পৌঁছায় নয় মাস পর। না, চিঠিতে এতসব কথা লেখা ছিল না। এসব আমরা পরে জেনেছি। ফিরোজের সেই মালদার চাচা এসব খবর নিয়ে খুলনা এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মেয়েটা যে এত বোকা, কেউ ভাবতে পারেনি। না, সুজাতা বোকা ছিল না। সে ছিল বেপরোয়া। মানুষের বুক থেকে ভালোবাসার ধন ছিনিয়ে নিলে মানুষ বোকা বনে যায় না, বরং পরোয়া করা ছেড়ে দেয়।
৫. একদিন শুনলাম, আমাদের পুলিশ খুঁজছে। শেষ পরীক্ষার চার মাসের মতো বাকি। এখন পুলিশ ধরলে পরীক্ষা শেষ। পালাতে হবে। তত দিনে আমাদের শ্রেণিসংগ্রাম মনে মনে সশস্ত্র হচ্ছে। কিন্তু হাতে অস্ত্র নেই। অস্ত্র কেন তাও জানি না। কী করা যায়? কুষ্টিয়াতে ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন আমার দুলু মামা। আমার ছোটবেলার রোল মডেল। আমাদের জরুরি ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘এখন পনেরো-কুড়ি দিন নৌকায় থাকো। ঘুরে বেড়াও। নৌকাটা সবচেয়ে নিরাপদ। কোনো তল্লাশি নেই। এর মধ্যে আমি একটা বিহিত করব। তবে নৌকায় শুধু লুঙ্গি গেঞ্জি পরে থাকতে হবে। সর্বহারা যেহেতু, অসুবিধা হবে না, আশা করি,’ কিছুটা শ্লেষ নিয়ে বললেন দুলু মামা। ‘নৌকায়? পনেরো-কুড়ি দিন?’ ফিরোজ জিজ্ঞেস করল। ‘হ্যাঁ, এবং তৈরি হও,’ মামা বললেন। আমার মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল। ‘মামা’ আমি বললাম, ‘যদি নৌকাতেই থাকতে হয়, ঘুরে বেড়াতে হয়, তাহলে শিলাইদহ থেকে শুরু কেন নয়।’ দুলু মামা হাসলেন। শিলাইদহ তাঁর অতি প্রিয়। কুঠিবাড়ির ছাদে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তিনি মামির গলায় শুনেছেন, ‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে।’ মামি লাজলজ্জা ছাড়াই কথাটি আমাদের বলেছিলেন। ফিরোজ বেঁকে বসল। প্রতিক্রিয়াশীলতার তীর্থকেন্দ্র শিলাইদহ থেকে কিছুতেই নয়। শেষ পর্যন্ত রফা হলো, শিলাইদহ থেকে পাঁচ মাইল উজানে।
৬. আমরা নৌকায় শুয়ে বসে সময় কাটাই, শ্রেণিসংগ্রামের স্বপ্ন দেখি, সর্বহারাদের বিজয়ের ছবি আঁকি, কিন্তু একটা সময় (ফিরোজের বাবার দেওয়া) ছিন্নপত্র পড়ি। সুমন গান গায়। একদিন সে হঠাৎ গেয়ে উঠল ‘আজ কেমন করে গাইছে আকাশ...’ গানের মুখটা শেষও হয়নি, হঠাৎ যেন আকাশ ফেটে বাজ হানল। ‘খবরদার’ ফিরোজ বলল, ‘খবরদার।’ প্রথম খবরদার এ জন্য, গানটা ঠাকুরের; দ্বিতীয় খবরদার, ফিরোজ নিজেই রাগ নিয়ে বলল, এ গানটি সুজাতাদির বিশেষ প্রিয় ছিল। আমার হাত থেকে একদিন ছিন্নপত্র নিয়ে ফেলে দিতে গিয়েছিল ফিরোজ, কিন্তু দিল না। বরং বইটি হাতে বসে রইল চুপচাপ। খুব আস্তে করে বলল, ‘বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন।’ অর্থাৎ তাঁর হাত থেকে ছিন্নপত্র নিয়ে ফেলে দেওয়ায়। এরপর একদিন দেখলাম গলুইতে হেলান দিয়ে বসে আছে ফিরোজ, তার হাতে ছিন্নপত্র। কিন্তু তার চোখ পদ্মার চরে।
৭. এক রাতে অপার্থিব জ্যোৎস্না উঠল, নৌকা তখন চৌহালির ধারে-কাছে। নদীর ওপর জ্যোৎস্নার একটা উদাস করা ভাব আছে; ঘোর ধরানো টান আছে, মানুষকে বদলে ফেলার, তার মাথার ভেতরে ভয়ানক ওলট-পালট করার কারসাজি আছে, যা শহরের মানুষ কস্মিনকালেও টের পাবে না। পদ্মার ওপর বিশাল চর। জ্যোৎস্নায় বালু চিকচিক করে। আমাদের নৌকার দুই মাঝির একজন মালিক ভাই বললেন, ‘নৌকাটা বান্ধি?’ ‘কেন?’ ফিরোজ জিজ্ঞেস করে। মালিক ভাই উত্তর দেন না। জ্যোৎস্না পাওয়া মানুষ কোনো প্রশ্নের ধার ধারে না। তিনি নৌকা বেঁধে চরে নেমে গেলেন। যেতে যেতে বললেন, ‘রাইতটা এইখানে কাটাব।’
৮. অনেক রাতে, জ্যোৎস্না যখন আকন্দের রসের মতো সাদা আর চিতল মাছের পেটের মতো চিকচিক, ফিরোজও তখন চরে পা ফেলল। তার চোখ দূরে মেলা। আমরা নেশা পাওয়া মানুষের মতো পা ফেলে ফেলে হাঁটতে লাগলাম। এবং শুনলাম, কেউ একজন গাইছে, ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে...’ ফিরোজ দৌড় দিল, যতখানি দৌড় চরে দেওয়া সম্ভব। একসময় সে থেমেও গেল। ‘সুজাতাদি?’ ‘কেমন আছিসরে বুম্বা? আয়, বোস, গান, শোন,’ সুজাতাদি বললেন। বুম্বা মানে আমাদের ফিরোজ বালুতে বসে পড়ল। সুজাতাদি বললেন ‘তোরাও বোস।’ তারপর তিনি বললেন, ‘সুদীপ, তুইও।’ সুদীপও বসল আমাদের সঙ্গে। সুদীপকে দেখে আমাদের হতবাক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কেউ অবাক হলো না, ফিরোজ তো মোটেও না। ‘এই চরের বালুর মধ্যে গানের রেখা আঁকা আছে,’ সুজাতাদি বললেন, ‘এই রেখা কোথা থেকে শুরু, কোথায় এদের শেষ, কেউ জানে না। এগুলোকে বলে সঙ লাইনস। আমাদের আদি যাযাবর পুরুষেরা এইসব গানরেখা এঁকে দিতেন যেখানে যেখানে তাঁরা যেতেন—যাতে একটু কান পেতে রাখলেই সেগুলো ধরা দেয়, আর তাঁদের দেখানো পথচলা সহজ হয় তাঁদের পরে আসা সকলের জন্য’, তারপর তিনি গাইলেন ‘আমি কান পেতে রই।’ গান গাওয়া হয়ে গেলে তাকালেন দূরে। আলখাল্লা পরা একজন সাদা দাড়ির মানুষ চর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তাঁর পায়ের আঘাতে উড়তে থাকা ধূলিতে জ্যোৎস্না সুর তুলছে। ‘ওই গানগুলোর কোনোটা তোরা পারিস?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘সুমন সবগুলো পারে,’ ফিরোজ বলল। তারপর সুমন গাইল ‘সার্থক জনম আমার...
৯. আরও অনেক রাতে মনে হলো, চরটা খুব সুনসান, যেন কোনো দিন এর বালুতে কারও পা পড়েনি। কেউ লিখে রাখেনি এর কোনো বিবরণ। তা তো বটেই, পদ্মা-যমুনার কোনো চরই তো দীর্ঘজীবী নয়। তার পরও কেন আমাদের মনে হলো, রাত আরও গাঢ় হলে, রুপালি আলখাল্লা পরে কেউ একজন চাষির মতো বুনে চলেছে গানের পর গান, এর বালুতে যখন অবাক করা জ্যোৎস্না প্রেমিকার চোখের মতো বুজে আসে, আবেশে?
১০. সকালে মালিক ভাই বললেন, ‘রাতে কী অইছিল আপনাদের? জ্বরটর, নাকি নেশাটেশা করেছিলেন?’ হাহ্।

তিন মাসে পাচার ২৫,০০০

বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে মানব পাচার। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পাচারকারীদের নৌকায় করে পাড়ি দিয়েছে আনুমানিক ২৫ হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী। ২০১৪ সালে একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর থেকে প্রকাশিত নিয়মিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল ‘ইরেগুলার মেরিটাইম মুভমেন্টস’ জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫ প্রকাশ করে সংস্থাটি। এতে বলা হয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অনিয়মিত সমুদ্রপথ যাতায়াতের প্রধান রুটটি অব্যাহতভাবে শুরু হচ্ছে বঙ্গোপসাগর থেকে। এখান থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়া পৌঁছানোর আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন হাজারো মানুষ। এ বছরের প্রথম তিন মাসে বঙ্গোপসাগর থেকে অনিয়মিত সমুদ্রপথে যাত্রা করেছে আনুমানিক ২৫ হাজার। আগের দুই বছরের তুলনায় যা প্রায় দ্বিগুণ। অবৈধপথে যাত্রা করে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পৌঁছুতে সক্ষম হওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ইউএনএইচসিআর জানতে সক্ষম হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এসব যাত্রায় কমপক্ষে ৩০০ ব্যক্তি মারা গেছেন। ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে মারা গেছেন মোট ৬২০ জন। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে এদের অনেকের মৃত্যু হয়েছে। অনেকে মারা গেছেন নৌকার ক্রুদের হাতে মারধরের শিকার হয়ে। পুরো নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সাক্ষাৎকারে প্রাপ্ত এসব তথ্য এবং হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করার কোন উপায় নেই বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অনেকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের কথা বলেছেন। উঠে এসেছে, গুম করে পাচার এবং নারীদের অজ্ঞাতসারে ভীনদেশে তাদের বিয়ে ঠিক করার মতো নানা ভয়াবহ চর্চার কথা। ইউএনএইচসিআরের প্রকাশিত ওই রিপোর্ট নিয়ে গতকাল জেনেভায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বক্তব্য রাখেন সংস্থাটির মুখপাত্র আদ্রিয়ান এডওয়ার্ডস। ‘ইরেগুলার মেরিটাইম মুভমেন্টস’ শীর্ষক ৬ পৃষ্ঠার রিপোর্ট নিয়ে তার বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হয় ইউএনএইচসিআরের ওয়েবসাইটে। এতে বলা হয়, এ সপ্তাহে থাইল্যান্ডের ইউএনএইচসিআর কার্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং গণমাধ্যম প্রতিবেদন থেকে মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ডের সোঙ্খলা প্রদেশে পাচারকারীদের ক্যাম্পে গণকবর খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছে। এতে ৩০ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। বলা হয়, এরা এসেছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে। অসুস্থতা বা নির্যাতনে তারা মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। থাই পুলিশ এ ঘটনার তদন্ত করছে; এ বিষয়টা স্বাগত জানায় ইউএনএইচসিআর। একইসঙ্গে সংস্থাটি আশা প্রকাশ করেছে যে, দোষীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। সংস্থাটি আরও উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, বঙ্গোপসাগর থেকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথের পাচার নেটওয়ার্ক পাচারকারীদের জন্য ক্রমেই লোভনীয় হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে সেগুলো পাচারের শিকার হওয়া মানুষদের জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিপজ্জনক হওয়া সত্ত্বেও এসব রুট ব্যবহার করা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে জানা গেছে, পাচারকারীরা নৌকায় কিভাবে যাত্রীদের বাছাই করে। নৌকায় আরোহণের প্রাথমিক মূল্য প্রধানত কম থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও নৌকায় উঠতে দেয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, মালয়েশিয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ উপার্জন থেকে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। নৌকাযাত্রীদের ভুয়া কাজের প্রতিশ্রুতি দেয়ার চর্চা রয়েছে। কখনওবা সামান্য পরিমাণ নগদ অর্থের প্রস্তাবও দেয়া হয়। নৌকায় উঠে কেউ সিদ্ধান্ত পাল্টে ফিরে যেতে চাইলে তাদেরকে থাকতে বাধ্য করা হয়। রাস্তাঘাট থেকে শিশুদের অপহরণ করে নৌকায় উঠানো হয়। যাত্রা শেষে প্রত্যেকের কাছ থেকে যে অর্থ শুষে নেয়া হবে সে বিষয়ে যাত্রীদের কেউই অবগত থাকে না। চোরাচালান দ্রুতই পরিণত হয় মানব পাচারে। পাচারকারীদের ক্যাম্পের পরিস্থিতি বিভীষিকাময়। আটক ব্যক্তিদের পরিজন মুক্তিপণ পরিশোধ করার আগ পর্যন্ত তাদের নির্যাতন করা হয়। অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইউএনএইচসিআরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অর্ধেকের বেশি ব্যক্তি জানিয়েছেন, তাদের ক্যাম্পে কেউ না কেউ আটক অবস্থায় মারা গেছে। এসব ক্যাম্পে মারধর খুবই সাধারণ বিষয়। ধর্ষণও হয়ে থাকে। যারা পালানোর চেষ্টা করেন, তাদের ঝুঁকি থাকে গুলি খাওয়ার। নৌপথে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের ক্রমবর্ধমান চর্চা বিবেচনায় ইউএনএইচসিআর এ অঞ্চলের দেশগুলোকে মানব পাচার প্রতিহত করতে আরও নিবিড়ভাবে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। নিষিদ্ধ এ বাণিজ্যের ওপর অভিযান চালানোর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন চোরাচালানকারী আর মানব পাচারকারীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য নির্দেশ করেছে। একইসঙ্গে চোরাচালান আর পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যেও পার্থক্য উল্লিখিত রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনে। সংস্থাটি বলেছে, অভিবাসী আর শরণার্থীদের যেন পাচারকারীদের অভিমুখী না হতে হয় সেটা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি আইন প্রয়োগের পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অংশ নিতে মানুষ কেন প্রবৃত্ত হচ্ছে তার মূল কারণ খুঁজে বের করে তার সমাধান করতে হবে। একইসঙ্গে তাদের আশ্রয় ও সুরক্ষা দেয়ার জন্য নিরাপদ বিকল্প প্রদান করতে হবে।

কওমি মাদ্রাসা কি আইনের ঊর্ধ্বে? by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি টেলিভিশনে অর্থমন্ত্রীর একটি স্বীকারোক্তি আমাকে এই কলামটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বলেছেন, ‘আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর কারিকুলাম এখন যথেষ্ট উন্নত হলেও কওমি মাদ্রাসার অর্থায়ন যেহেতু সরকার করে না, তাই ওগুলোর কারিকুলামের ব্যাপারে কিছু করা যাচ্ছে না।’
অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তিতে বর্ণিত সরকারের এই অপারগতা একটি দুঃখজনক বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দেশের সংবিধানের ১৭(ক) ধারায় রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছে অঙ্গীকার করছে যে ‘রাষ্ট্র সকল শিশুর জন্য একটি একক মানসম্পন্ন, গণমুখী, সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত চালু করার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’
এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালেই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার পাশাপাশি দেশের সব প্রাথমিক স্কুলকে জাতীয়করণ করেছিল। ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের যে প্রতিবেদনটি সরকার গ্রহণ করেছিল তাতে ওই বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক ও একক মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। ওই রিপোর্টের সুপারিশগুলো ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬-এর ২১ বছরে কোনো সরকারেরই সুবিবেচনা পায়নি, যদিও জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের সরকার নিজেদের পছন্দমাফিক একাধিক শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠন করেছে এবং শিক্ষা নিয়ে এন্তার ‘তুঘলকি এক্সপেরিমেন্ট’ চালিয়েছে। এমনকি শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকার কর্তৃক গঠিত ‘শামসুল হক কমিটির’ রিপোর্টেও এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর মহাজোট সরকার কর্তৃক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারটিকে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এবং বর্তমানে তা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। কিন্তু বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার যুগোপযোগী সংস্কারের বিষয়ে বর্তমান সরকারকে খানিকটা দ্বিধান্বিত মনে হচ্ছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় যে সমস্যাটা গৌণ ছিল, তা গত ৪০ বছরে একটা সংকটে পরিণত হয়েছে এবং তা ‘স্বাধীন কওমি মাদ্রাসার’ নাটকীয় বিস্তারের কারণেই।
ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্তটি ছিল হিন্দুদের জন্য টোল এবং মুসলিমদের জন্য মাদ্রাসা। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার মাধ্যমে যে মাদ্রাসাশিক্ষার ধারা প্রচলিত হয়েছিল, সেটাই নানাবিধ পরিবর্তন-পরিবর্ধন-সংস্কারের মাধ্যমে এ দেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে অনুসৃত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওহাবি আন্দোলনের ঢেউ ভারতে পৌঁছানোর পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিহারের দেওবন্দ মাদ্রাসা একদিকে ইসলামের মৌলবাদী চিন্তাচেতনার প্রসারে নেতৃত্ব প্রদানের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়, অন্যদিকে ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামেও ওহাবি ও ফারায়েজী আন্দোলনের একটা গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়। এই ব্রিটিশবিরোধী অবস্থানের কারণেই দেওবন্দ ঘরানার মাদ্রাসাগুলোতে বাগদাদের আব্বাসীয় শাসনামলের ‘নিজাজিয়া কারিকুলাম’ অব্যাহত রাখা হয়েছিল, যা এখনকার কওমি মাদ্রাসাগুলোতে সামান্য সংস্কার করে চালু রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কওমি মাদ্রাসাগুলোর পরিচয় ‘ওহাবি মাদ্রাসা’ হিসেবে।
বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ মাদ্রাসাশিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করায় গত ৪০ বছরে এ দেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল সম্পদের দান হিসেবে মাদ্রাসাগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদেশি খয়রাত প্রবাহিত হতে শুরু করেছে সত্তর দশকের শেষার্ধ থেকেই, এবং গত ৪০ বছরে এর বড় অংশটাই কওমি মাদ্রাসাগুলো আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে। দেশের মধ্যেও অত্যন্ত সংগঠিত পদ্ধতিতে এসব মাদ্রাসা সারা বছর এবং প্রধানত ধর্মীয় উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে দান-খয়রাত সংগ্রহের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে থাকে। ফলে এই চার দশকে এ দেশের কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধিকে নাটকীয় বলা চলে। এই মাদ্রাসাগুলোতে যেহেতু একই সঙ্গে আবাসিক সুবিধা এবং আহারের ব্যবস্থা থাকে, তাই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য এগুলোর আকর্ষণ ক্রমবর্ধমান। কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রকৃত সংখ্যা কত এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাই কত তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে রয়েছে কি না আমার সন্দেহ আছে—৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ছাত্রছাত্রী এই ধারার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষার সমপর্যায়ে সরকারের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে কওমি মাদ্রাসা চলছে কীভাবে? এ দেশে ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা চালু রয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রী আফসোস করেছেন। এই ১১ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকাটা দেখুন: ১. সরকারি প্রাইমারি স্কুল, ২. এক্সপেরিমেন্টাল প্রাইমারি স্কুল, ৩. রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, ৪. নন-রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, ৫. প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট-সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুল, ৬. কমিউনিটি স্কুল, ৭. স্যাটেলাইট স্কুল, ৮. হাইস্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুল, ৯. এনজিও পরিচালিত স্কুল, ১০. কিন্ডারগার্টেন ও ১১. ইবতেদায়ি মাদ্রাসা।
শিক্ষাজীবনের শুরুতেই শিশুকে এত ধরনের বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার জালে আটকে ফেলার এহেন নৈরাজ্যকর বন্দোবস্তের নজির বিশ্বের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পিতা-মাতার বিত্তের নিক্তিতে ওজন করে নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে কে কিন্ডারগার্টেনে যাবে, কে সরকারি বা বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলে সুযোগ পাবে, কার এনজিও স্কুলে ঠাঁই হবে, আর কাকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় পাঠিয়ে বাবা-মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে যে ‘লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে’ ভাতটা তো অন্তত জুটল! এভাবে সারা জীবনের জন্য ওই শিশুকে বৈষম্যের অসহায় শিকারে পরিণত করে ফেললাম আমরা, যা তার মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এর অপর পিঠে দেশে ইংরেজি মাধ্যম কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা বৃদ্ধিকেও নাটকীয় বলা চলে। মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পিতা-মাতারা তাঁদের সন্তানদের জন্য এখন আর বাংলা মাধ্যম প্রাইমারি স্কুলগুলোকে উপযুক্ত মানসম্পন্ন মনে করছেন না, কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোটাই নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে গত চার দশকে। মাধ্যমিক শিক্ষায় চারটি ধারার সমান্তরাল অবস্থান এখন আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে—ইংরেজি মাধ্যমের নানান কিসিমের মহার্ঘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মূল ধারার বাংলা মাধ্যম সরকারি স্কুল, বাংলা মাধ্যম বেসরকারি স্কুল এবং কয়েক ধরনের মাদ্রাসা। এই বিভাজিত ও বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা এক দেশের মধ্যে চার চারটি পৃথক জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে চলেছি। এ ব্যাপারে আমাদের শাসক মহলের কোনো অপরাধবোধের বালাই নেই, অথচ এটা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য আত্মঘাতী হতে বাধ্য।
এ পর্যায়ে সাধারণ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দাবিদার নির্বিশেষে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা একক মানসম্পন্ন ও বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে সাংবিধানিক বিধিব্যবস্থা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে বসবাস করার সময় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ওই সব দেশে নগরের কোন এলাকার ছেলেমেয়ে কোন স্কুলে পড়বে তা নির্দিষ্ট করা থাকে, পিতা-মাতার ইচ্ছা কিংবা আর্থিক সংগতির ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করে না। যুক্তরাষ্ট্রে এই এলাকাগুলোকে ‘প্রিসিংকট’ বলা হয়। পিতা-মাতা যতই ধনাঢ্য হোক না কেন তাঁদের সন্তানেরা কোন প্রিসিংকটের কোন স্কুলে পড়বে সেটা নগরের স্কুল কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করে দেয়, বাবা-মাকে এ ব্যাপারে নিজেদের ইচ্ছা খাটানোর কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। এ ব্যাপারে সন্তানের মানবাধিকারের রক্ষাকর্তা পিতা-মাতা নয়, রাষ্ট্রই এই ভূমিকা পালন করে।
কোনো সভ্য দেশেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে পিতা-মাতাকে অগ্রাধিকার বা একক অধিকার দেওয়া হয় না। কারণ, পুত্রকন্যা পিতা-মাতার সম্পত্তি নয়। শিশুরা কী ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করবে, সেটা পিতা-মাতার ইচ্ছানুসারে হবে না। এমনকি শিশুর নিজেও এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যুক্তি নেই। যে মৌলিক দর্শন এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য তা হলো বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে কোনো শিশু যদি তার শৈশবকালে যুগোপযোগিতাহীন বা তার অপছন্দের কোনো শিক্ষা গ্রহণে বাধ্য হয় তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ভুল শোধরানোর সুযোগ সে পাবে না। এ বিবেচনা থেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষার তাগিদে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে একক মানসম্পন্ন করার জন্য জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের ‘মানবাধিকার ঘোষণায়’ অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকোর সব সদস্য এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম যুগোপযোগী করার জন্য চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শফীর নেতৃত্বে বেফাক নামের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু গত পাঁচ বছরে ওই কমিটির একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি তাঁর অনাগ্রহের কারণে। সরকারও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার বিবেচনায় হেফাজতে ইসলামের এই মহাপ্রভাবশালী নেতাকে চটাতে চাইছে না। অতএব, কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম সংস্কারের কাজটি পাঁচ বছরে এক কদমও এগোয়নি। সে জন্যই কওমি মাদ্রাসাগুলোর অসাংবিধানিক ‘স্বাধীনতা’ অব্যাহত রয়েছে।
২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মহাবিপজ্জনক তাণ্ডবের পুনরাবৃত্তি চাইছে না সরকার, সেটা বোধগম্য। কিন্তু অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ হয়? জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করার এবং পশ্চাৎপদতার দুষ্ট চক্রে বন্দী করে রাখার অধিকার কোনো ধর্মীয় নেতাকে বা তাঁর জঙ্গিবাদী শাগরেদদের দেওয়া যেতে পারে না, সরকারকে কথাটি মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি। এই ‘অসাংবিধানিক স্বাধীনতা’কে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতেই হবে জাতিকে।
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মানব পাচার বেড়েছে ৬১% by ফারুক ওয়াসিফ ও সুজয় মহাজন

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শংখলা প্রদেশের একটি রাবার বাগানে
পাচারকারীদের এক গোপন ঘাঁটি। সেখানে পড়ে রয়েছে তাঁবু,
হাঁড়ি-পাতিল ও জ্বালানি কাঠ। গতকাল সন্ধান পাওয়া এই ঘাঁটিসহ
এ পর্যন্ত দেশটির গভীর জঙ্গলে ছয়টি ঘাঁটির অস্তিত্ব মিলেছে
সমুদ্রপথে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে এক বছরের ব্যবধানে মানব পাচার বেড়েছে ৬১ শতাংশ। প্রধানত মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাচার হওয়া এসব মানুষের মধ্যে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাও রয়েছে।
গত বছর জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বঙ্গোপসাগর দিয়ে অবৈধভাবে গেছেন ৫৩ হাজার লোক। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩ হাজার। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি পাচারের ঘটনা দেখা গেছে।
অভিবাসন ও মানব পাচারবিষয়ক দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটিং মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট বা রামরুর মতে, এক বছরের ব্যবধানে মানব পাচার বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান খুবই উদ্বেগজনক। পাচার রোধে সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এ সংখ্যা বেড়েছে।
রামরু বলছে, স্থানীয় দালালেরা বেশির ভাগ লোককে ভালো চাকরি ও ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করে। পরে গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পর এসব লোককে জিম্মি করে তাঁদের কাছ থেকে মুক্তিপণ দাবি করা হয় ২ লাখ ২০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত।
রামরুর হিসাবে, ২০১৪ সালে পাচারের সময় বাংলাদেশিদের মধ্যে ৫৪০ জন গভীর সমুদ্রে মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে কেবল সিরাজগঞ্জ জেলার বাসিন্দা প্রায় ৫০০। একই জেলার ২৫০ জনের সন্ধান মিলেছে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন কারাগারে। তিন হাজার ৫০০ পরিবারের অধিকাংশ থেকেই মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করেছে পাচারকারীরা।
রামরু ও ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের করা যৌথ সমীক্ষায় দেখা যায়, জলবায়ু দুর্যোগের কারণে ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষের স্থায়ী নিবাস থেকে স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকেই টার্গেট করা হচ্ছে পাচারের জন্য।
রামরুর পরিচালক তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল, রংপুর ও কুড়িগ্রামের মতো ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার এলাকার লোক, যাঁরা অন্য জেলায় স্থানান্তরের কথাও চিন্তা করতেন না, তাঁরাই এখন সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। কারণ, তাঁদের সামনে উন্নতির আর কোনো পথ নেই।
সরকারি উদ্যোগে জনশক্তি রপ্তানির ব্যর্থতা?: রামরু বলছে, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের (জিটুজি) মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হওয়ার পর থেকে অবৈধ পথে মানব পাচারের ঘটনা বেড়েছে।
এর আগে ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ ছিল। বন্ধ বাজারের দ্বার খুলতে এবং মালয়েশিয়ায় কম খরচে ভোগান্তি ছাড়া কর্মী পাঠানোর উদ্দেশ্যে দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি হয়।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পর সরকারের আহ্বানে ১৪ লাখ লোক নিজেদের নাম নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত গেছেন প্রায় সাত হাজার। অথচ চুক্তির পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে বৈধ পথে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে।
এই চুক্তির সমালোচনা করে তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, এক অর্থে জিটুজি চুক্তিরই ব্যর্থতার পরিণতি অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার। এই চুক্তিটি ব্যর্থ হওয়ায় অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাঁরা ভ্রমণ বা বেড়ানোর নামে ভিসা নিয়ে বিমানে ওই দেশে গিয়ে থেকে যাচ্ছেন। আবার যাঁদের সামর্থ্য নেই, তাঁরা দালালদের প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
২০১২ সালে রামরুর পক্ষ থেকে বার্ষিক অভিবাসন প্রবণতাবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক করা হয় যে মানব পাচার বৈধ অভিবাসনের পথে অন্তরায় হয়ে আসবে।
বেসরকারিভাবে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আলী হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ উপায়ে মানব পাচার বাড়ায় যাঁরা বৈধ অভিবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাঁদেরও ভাবমূর্তির সংকটে পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হযরত আলী প্রথম আলোকে বলেন, মালয়েশিয়ায় কম খরচে জনশক্তি রপ্তানির জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে এ-বিষয়ক চুক্তিও রয়েছে। এখন সরকারি এই উদ্যোগকে সফল করতে দরকার সবার সহযোগিতা।
চুক্তির পর অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা বাড়ার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব বলেন, ‘খরচ কমানোর জন্যই কর্মীদের স্বার্থে এ চুক্তি। সরকারের এমন উদ্যোগের পরও কেউ যেন কারও প্রলোভনে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি না নেন সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’

পদ্মার ঢেউ রে... by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

নজরুলের এই গানটি কে না শুনেছে? মাঝেমধ্যে আমিও গাই। নজরুল তাঁর গানে অনেক দেব-দেবীকে উপস্থাপন করেছেন, যার পরিপূর্ণ ইতিহাস এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এই নদীতীরে ঘুরে বেড়িয়েছি কবির মতো, পদ্মার দেখা পাইনি। তাঁর পদচিহ্ন কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে গানের সুরে সুরে। সুরের মাঝেই অন্বেষণ। এর উজানেই নৌকা ভাসিয়েছেন আরেক কবি, লিখেছেন ‘সোনার তরী’: ‘কোন পারে ভিড়িবে তোমার স্বপন তরী’? নদী ও সংগীতসংশ্লিষ্ট পদ্মা নিয়ে গবেষণার নেই বিরাম। কে এই পদ্মা?
পুরীতে জগন্নাথ দর্শনে বিহ্বল মানুষ প্রভুকে খুঁজে চলেছেন। এ খোঁজার বিরাম নেই। ভারতে হাজার হাজার মন্দির। মন্দিরের মূর্তির পেছনে বিধাতাকে ওরা দেখেনি, আমরা তো নয়–ই। খুঁজতে খুঁজতে পদ্মার দেখা পেলাম। কীভাবে তার কথাই বলব।
কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দের গান সবাই শুনেছেন, আমরাও। পুরীর কাছে একটি গ্রামে থাকত পদ্মা নামের একটি মেয়ে, মালিনীর কন্যা, অথচ গানের গলাটি মধুর চেয়ে মধুর। অনেকের জানা আছে, জয়দেবের লেখা ‘সদুক্তিকর্নামৃত’র ২৬টি শ্লোক বাংলায় রচিত নয়। যদিও আমরা জানি বীরভূম জেলার অজয় নদের তীরে কেন্দুবিল্ব গ্রামের জন্মগ্রহণকারী জয়দেব বাঙালি। তাঁর গান ছিল নৃত্য ও গীতের সমারোহ। লক্ষ্মণ সেনের সভায় জয়দেব নিজেই গাইতেন গীতগোবিন্দের গান। এখানেই পদ্মাদেবীর আগমন। দক্ষিণী নৃত্যে পটীয়সী অসামান্য রূপসী কন্যা পদ্মা, যার মধ্যে রূপায়ণ হতো গীতগোবিন্দের আধ্যাত্মিক রূপ। কথিত আছে, দৈব আদেশে তার সঙ্গে বিবাহ হয় জয়দেবের।
পদ্মা গেয়ে শোনাত জয়দেবের গান আর বেগুনগাছ থেকে তুলত বেগুন। দূর থেকে শ্রীজগন্নাথ নিজেই কোথা থেকে শুনতে পেলেন সে মধুর সংগীত। তার ঘুরে বেড়ানোতে নেই কোনো বাধা। গিয়ে পেলেন সুন্দর একটি মেয়েকে, যে আপন মনে গাইছে গীতগোবিন্দের গান, আপনাতে আপনি বিভোল। পদ্মা জগন্নাথকে দেখেনি, নাম শুনেছে, জানতে পেরেছে, উনিই বিধাতা। উনি সবাইকে ভালোবাসেন, তার মতো একটি গ্রাম্য বালিকাকেও। পদ্মা নিজ আত্মাকেই শোনায় এ গান। ভাবে যদি কোনো দিন বিধাতা তার কাছে এসেই পড়েন, কী করবে সে। অন্তর্যামী সর্ব জীবের কল্যাণে নিয়োজিত, কাউকে উপেক্ষা করেন না, সবাইকে ভালোবাসেন। বালিকা পদ্মা তাঁর মন জয় করল। হলেন বিগলিত, আত্মবিস্মৃত; তিনি যে ভগবান, তা-ও তিনি ভুলে গেলেন। বেগুনগাছের কাঁটায় তাঁর উত্তরীয় মাটিতে পড়ে গেল। পদ্মা গানেই বিভোর। সে এত কিছু লক্ষ করেনি।
কিছু সময় পর পদ্মার ঝুড়ি বেগুনে ভর্তি হয়ে গেল, সে চলে গেল বাগান থেকে। পদ্মার গান শ্রবণ করার পর পরিতৃপ্ত শ্রীজগন্নাথ ফিরে গেলেন তাঁর মন্দিরে। পরদিন সকালে পূজারিরা এলেন প্রাতঃকালীন সেবাকর্মের দায়িত্বে। অবাক হয়ে দেখলেন জগন্নাথের ছেঁড়া বস্ত্র আর তাঁর সেই উত্তরীয়টিও উধাও। পূজারিরা হলেন চিন্তিত। এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারে না, নিশ্চয়ই তাঁদের ত্রুটি হয়েছে শ্রীজগন্নাথকে বস্ত্র পরানোর সময়। তাঁরা শুরু করলেন উপবাস। শ্রীজগন্নাথ স্বপ্নে জানালেন, তোমাদের দোষ নেই, আমি গান শুনতে গিয়েছিলাম ওই মেয়েটির কাছে।
অবিলম্বে চারদিকে খোঁজ পড়ে। পদ্মাকে খুঁজে পাওয়া যায়। গীতগোবিন্দের গায়িকা গ্রামের মেয়ে পদ্মা কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবেনি এভাবে সে হবে সম্মানিত। সংগীতের ঢেউ মিশে গেল তার জীবননদীর স্বরগ্রামের সঙ্গে। পুরীর শ্রীজগন্নাথের মন্দিরে তার আসন হলো স্থায়ী। যেখানে প্রতিদিন শ্রীজগন্নাথের বিশ্রাম গ্রহণের আগে সুললিত কণ্ঠে গান গাইবে নৃত্যপটীয়সী পদ্মা।
এবার শোনা যাক নজরুলের গানটি: ‘পদ্মার ঢেউ রে, মোর শূন্য হৃদয়–পদ্ম নিয়ে যা, যা রে’। এখানে পদ্মা নদীর নামকরণের ইতিহাস নেই, আছে সেই পদ্মের খোঁজ, যার নামে পদ্মা। এত দূর থেকে আমরা শুধু শুনতে পাই ঢেউয়ের শব্দ আর প্রেমিক হৃদয়ের শূন্য হাহাকার, বিসর্জিত যা নদীর ঢেউয়ে।
পদ্মার ঢেউয়ে ঝিলমিল করে যে বঁধুয়ার কৃষ্ণকালো রূপ, তা ফুটে ওঠে সঞ্চারিতে। কৃষ্ণকালো রূপ শ্রীজগন্নাথের, আর কারও নয়। দূর থেকে অবশ্যই চেনা যায় পদ্মাকে। প্রেমের ঘাটে ঘাটে বাঁশি বাজায় যে প্রেমিক, খুঁজে পাওয়া দায় তাকে। চিরদিন সে আশার–দেয়ালী জ্বালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। তার পায়ে সমর্পিত হতে চায় পদ্ম। যেমনটি পদ্মা খুঁজে পায় মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেবতাকে।
পদ্মা রূপ নেয় পদ্মে, যার কাছে নেই মধু, নেই সুগন্ধ, তার রূপের সরসীতে তাই নেই আনন্দ মৌমাছির ঝংকার। পদ্মা রূপ নেয় ঢেউয়ে, যখন তার মাঝে চিকমিক করে ওঠে চাঁদের আলো। চাঁদের আলোয় কৃষ্ণকালো বঁধুয়া।
গানটি গাওয়ার সময় কখনো গায়িকা পদ্মার কথা আগে মনে হয়নি। মনে হতো পদ্মফুলের মধ্যেই পদ্মার অবস্থান। পদ্ম ও পদ্মা যেন সমার্থবোধক। পদ্ম নারীর রূপ, পদ্মাও তা-ই। পদ্ম চায় বাঁশরির তালে যে প্রেমিক নেচে বেড়ায় তার আহ্বানে সাড়া দিতে।
গানটিতে বাঁশরি সঞ্চালনের প্রচুর সুযোগ অর্থাৎ এখানেই অনেকক্ষণ বাঁশরির প্রয়োগ হতে পারে যেমন ওস্তাদেরা ভাটিয়ালি গানের ধুন বাজাতে গিয়ে আশ্রয় নেন প্রলম্বিত তালের কাজে, যেন ওগুলো ঢেউয়ের কারসাজি। একটি ভাটিয়ালি গান তিন মিনিটের, অথচ ভাইটাল গাঙের মাঝিরা ওই গানটি গান প্রলম্বিত সুরে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। পদ্মার ঢেউরেও তা-ই। এটি তিন মিনিটের গান নয়, এটি প্রাণ মাঝির শাশ্বত সংগীত, যে সর্বমুহূর্তে প্রেমিককে খুঁজে ফিরছে। পদ্মাকে খুঁজতে গিয়ে পাই স্রষ্টাকে, সর্বজীবের মঙ্গলের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সাহিত্য-সংগীত ব্যক্তিত্ব।
mabbasi@dhaka.net

জরিপে জরিপে জর্জরিত পুষ্টিচিত্র by আসফিয়া আজিম

বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি কেমন, গত ২৫ এপ্রিল আমরা তার একটি চিত্র পেলাম। সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলো ‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে ২০১৪’-র প্রাথমিক প্রতিবেদন। প্রতি চার বছর পর পর পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ এই জরিপ থেকে দেশের জনবিন্যাস অনুযায়ী স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটা ধারণা পাওয়া যায়। জানা যায়, পরিবর্তনের গতিপথ কোন দিকে চলেছে। এসব ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা নিজেদের কাজের একটি পর্যালোচনা এ থেকে করতে পারেন। এটুকুই তো শুধু নয়, এতে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত ভবিষ্যতে নানা গবেষণা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হবে। বাংলাদেশের আগামী দিনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উদ্যোগের ওপর এর সুগভীর প্রভাব এসে পড়বে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির কোন চিত্র পাওয়া গেল এই জরিপ থেকে?
একনজরে দেখলে সপ্তমবারের মতো পরিচালিত এই জরিপে উন্নয়নকর্মী ও জনস্বাস্থ্যবিদদের উৎসাহিত হওয়ার মতো উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু ফলাফল আছে, বিশেষ করে পুষ্টি ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনটি বলছে, দেশে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা গত চার বছরে ৪১ থেকে কমে ৩৬ শতাংশ হয়েছে। মানে, চার বছর আগের তুলনায় শিশুদের মধ্যে খর্বতার সমস্যা কমেছে। এর সরল অর্থ হলো, দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা এখন কম।
আরেকটি সূচক বলছে, কম ওজনের অপুষ্ট শিশুর সংখ্যাও আগের চেয়ে কমে এসেছে। এ জরিপ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ওজন তাদের বয়স অনুপাতে যতটা থাকা উচিত, দেশের বেশির ভাগ (৬৬ শতাংশ) শিশুর ওজন ততটাই। কম ওজনের এই সূচক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) প্রথমবারের লক্ষ্য পূরণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারক সূচকগুলোর মধ্যে কম ওজন ছিল একটি। প্রতিটি দেশের জন্য তখন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল আলাদা আলাদা। ১৯৯০ সালে এমডিজির সূচনায় বাংলাদেশে কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ২০১৫ সালের মধ্যে ৭১ থেকে ৩৩ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছিল। সরকারের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচিও সে লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১৬ সালের জন্য একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এবারের জরিপে তাহলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলেছে। বিরাট আনন্দ সংবাদই বটে!
তবে ২০১১ সালের তুলনায় এবারের জরিপে দেশের পুষ্টিচিত্র কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ মন খারাপ করে দেওয়ার মতো। নতুন জরিপ বলছে, এবার টিকা নিয়েছে গতবারের চেয়ে ৭ শতাংশ কম শিশু। শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হারও নেমে এসেছে প্রায় ৯ শতাংশ। শিশুদের খাবারের ধরন, পরিমাণ বা প্রকৃতিতেও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। ভিটামিন ‘এ’ সম্পূরক ট্যাবলেট খাওয়ানোর পরিমাণ আগের তুলনায় মোটেই বাড়েনি। এর মানে, শিশুর অপুষ্টি কমাতে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইতিবাচক তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। অথচ শিশুপুষ্টির উন্নতি ঘটেছে, কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, ‘মায়াবীর মতো জাদুবলে’। কীভাবে তা সম্ভব হলো?
সমসাময়িক অন্য কতগুলো সমীক্ষার দিকে নজর ফেলা যাক। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস শিশু ও মাতৃপুষ্টি নিয়ে এর দুই বছর আগে, ২০১২ সালে একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল। তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে খর্বকায় শিশুর পরিমাণ ৪১ শতাংশ এবং বয়স অনুপাতে কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ৩৪ শতাংশের বেশি। এই প্রতিবেদনের সঙ্গে বর্তমান জরিপটির ফারাক বেশ লক্ষণীয়। মাত্র দুই বছরে পুষ্টিচিত্রের এত অভাবিত উন্নতি? চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা বটে।
আবার আরেক দিকে ২০১৪ সালে প্রকাশিত নগর স্বাস্থ্য জরিপ কিন্তু দেখাচ্ছে আরও ভয়াবহ এক চিত্র। নগর এলাকার বস্তিতে প্রতি দুটি শিশুর একজনই খর্বকায়। আর সেখানকার ৪৩ শতাংশ শিশুর ওজনই বয়স অনুপাতে কম। এ হিসাবই বলে দেয়, আমাদের শহরাঞ্চলের বস্তিগুলোতে অপুষ্টি কোন চরমে গিয়ে পৌঁছেছে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশের বেশি এখন শহরবাসী। আর তাদের একটি বড় অংশই বাস করছে বস্তিতে। দেশের উল্লেখযোগ্য এই অংশকে অপুষ্ট রেখে পুষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কি আদৌ কোনোভাবে সম্ভব?
যেকোনো নতুন পরিকল্পনা নিতে, কর্মকৌশলের বদলাতে বা উন্নয়নের পথরেখা পর্যবেক্ষণ করতে তথ্য-উপাত্ত জানা দরকার। পরিস্থিতির সঠিক তথ্য না জানলে উন্নয়নের পথ অনুসন্ধান করা কঠিন। কিন্তু সরকারি এ প্রতিবেদনে দেশের পুষ্টিচিত্রের যেসব তথ্য আমরা পাচ্ছি, তা পরস্পরবিরোধী। এসব তথ্য নিজেরাই নিজেদের দিকে বহু প্রশ্ন তুলে ধরেছে। এসব উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে নতুন কর্মকৌশল নিলে আমাদের ভবিষ্যৎ পুষ্টিচিত্রে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভের তথ্য বলছে, দেশে পুষ্টি অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের অপুষ্টির মাত্রা এখন ‘অতি উচ্চ’ নয়, ‘উচ্চ’। ফলে সাধারণভাবে আমরা ধরে নিতে পারি, অপুষ্টি কমাতে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নেওয়া কর্মকৌশলই অনুসরণীয়। অথচ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের শিশু ও মাতৃপুষ্টি-সংক্রান্ত জরিপ কিংবা নগর স্বাস্থ্য জরিপটি বলছে, দেশে অপুষ্টি না কমে বরং তা স্থির হয়ে আছে; উল্টো কোথাও কোথাও বেড়েছে। এ যদি সত্য হয়, তাহলে তো সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কর্মকৌশলে পরিবর্তন না এনে উপায় নেই। তা-ই তো শুধু নয়, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের অপুষ্টি কমানোর জন্য আলাদা আলাদা কৌশল ও কর্মপদ্ধতিও নিতে হবে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে, তা দেখাতেই কি ‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে ২০১৪’-এ এমনটি করা হলো? এটি কি তাহলে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশের কোঠায় দেখানোর কোনো মরিয়া চেষ্টার অংশ? আমরা কে না চাই, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ দ্রুত পূরণ করুক, মধ্য আয়ের দেশ হয়ে উঠুক। কিন্তু সেটি বাস্তবে না করে কেবল কাগজ-কলমে করতে গেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের শুভংকরের ফাঁকির মধ্যে ফেলে দেব। আমাদের পুষ্টির খাতে এর প্রভাব হবে ভয়ংকর। জাতি হিসেবে তার মাশুল তাহলে কীভাবে যে আমাদের পরিশোধ করতে হবে, সে কথা ভাবতেই ভয় হয়।
আসফিয়া আজিম: জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিকর্মী।

অসম্ভবকে জয় করার চ্যালেঞ্জ by ইশতিয়াক পারভেজ

অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াইয়ে এখন বাংলাদেশ। প্রায় দেড়শ’ বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে যে নজির নেই জিততে সেটাই করে দেখাতে হবে তামিম-সাকিব-মুশফিকদের।
বাংলাদেশের সামনে চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য টার্গেট এখন হিমালয়ের মতোই বরাবর ৫৫০। পাঁচশতাধিক রানের টার্গেট টেস্ট ইতিহাসে অবশ্য আরও ৬৬টি আছে। কিন্তু জয় আছে কতোটিতে? একটিতেও নয়! ৪শ’ ছাড়ানো টর্গেট তাড়া করে জয়ের নজির মাত্র চারটি। তাও ২৫৯টি টার্গেটে। ২০০৩ সালে এন্টিগাতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪১৮ রান তাড়া করে জয় তুলে নিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৬৩ রান ১ উইকেট হারিয়ে। জয় পেতে প্রয়োজন আরও ৪৮৭ রান। হাতে আছে দুইদিন এবং শাহাদাতসহ ৯টি উইকেট। একদিন থাকলে ড্রয়ের সম্ভাবনা থাকতো। এখন হয় জয় না হয় পরাজয়। অংকের হিসাবে দেখে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান অবশ্য আগেই হার মেনে নিয়েছেন। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে তিনি সহজেই স্বীকার করে নেন বিষয়টি। তিনি বলেন, ‘ম্যাচ যে পরিস্থিতিতে তাতে মনে হয় আমরা হারতে চলেছি।’ কিন্তু অংকের রেকর্ড ভাঙা- গড়ার খেলায় মানুষ হেরে যাবে তা নয়। সাকিবও আশা করেন অসম্ভবকেই জয় করতে হবে টাইগারদের ব্যাট হাতে। ৫ উইকেটে ১০৭ রান নিয়ে খেলতে নেমে তৃতীয় দিন ২০৩ রানেই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। ফলোঅন এড়াতে তখনও বাকি ছিল ১৫৫ রান।  মোট রানের অংকেও পিছিয়ে ছিল ৩৫৫ রান। কিন্তু বাংলাদেশকে ফলোঅনে পাঠানোর সুযোগ পেয়েও ছেড়ে দেন পাকিস্তানের অধিনায়ক মিসবাহ-উল হক।
লক্ষ্যাটা বাড়াতে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামেন মধ্যাহ্ন বিরতির একটু আগে। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি পাকিস্তান দল। দলীয় ও ব্যক্তিগত শূন্য রানেই শহীদের বলে হাফিজ ক্যাচ দেন মুশফিকের হাতে। এরপর দলীয় ৪৯ রানের মধ্যে আরও দুটি উইকেটের পতন। সামি আসলামকে ৮ রানে ফিরিয়ে শহীদ দ্বিতীয় উইকেট তুলে নেন। এরপর প্রথম ইনিংসে ডবল সেঞ্চুরি হাঁকানো আজহার সৌম্য সরকারকে ২৫ রান করে প্রথম টেস্ট উইকেট উপহার দেন। দলের হাল ধরেন ইউনুস খান ও অধিনায়ক মিসবাহ-উল হক। ১৬ রানে জীবন পেয়েও প্রথম ইনিংসের মতো সেঞ্চুরি তুলে নিতে পারেননি তিনি। তাইজুল ইসলাম নিজের বলে দুর্দান্ত এক ফিরতি ক্যাচ নিলে ৩৯ রানেই থামেন ইউনুস। ঠিক তখনই অধিনায়ক মিসবাহ-উল হক খেলা শুরু করেন ওয়ানডের ধাঁচে। তবে তাকে সঙ্গ দিতে এসে আরেক সেঞ্চুরিয়ান আসাদ শফিক দ্বিতীয় ইনিংসেও শুভাগত হোমের শিকার। তবে এবার ১৫ রান করেই থামতে হয় তাকে। এবার অধিনায়কের সঙ্গে জুটি বাঁধেন সরফরাজ আহমেদ। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ ব্যাটিং তাণ্ডব চালিয়ে যেতে পারেনি মিসবাহ। মাহদুল্লাহর বলে বিকল্প ফিল্ডার আবুল হাসান রাজুর হাতে ক্যাচ দিয়ে ৮২ রানে থামে তার ইনিংস। ততোক্ষণে খেলেছেন ৭২ বল, হাঁকিয়েছেন ৯টি চার ও ৩টি ছয়ের মার। ১৯৫ রানে ৬ উইকেট হারানোর পরই ইনিংস ঘোষণা করে পাকিস্তান।
দিনের ১৪ ওভার বাকি থাকতে ৫৫০ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু করেন ইমরুল কায়েস ও তামিম ইকবাল। ১১ ওভারে ৪৮ রানের জুটি গড়ে বিনা উইকেটেই দিন শেষ করার ইঙ্গিত দেন। কিন্তু বিধিবাম। ইমরুল ঢাকা টেস্টে দুই ইনিংসের আউট যেন কার্বন কপি। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও ইয়াসির শাহর বলে সরাসরি বোল্ড। তবে এবার ১৬ রান করে। আশার আলো এখনও খুলনা টেস্টে ডবল সেঞ্চুরি হাঁকানো তামিম ইকবাল আছেন ক্রিজে। ৪২ বলে অপরাজিত ৩২ রান করতে তামিম খেলেছেন ৪টি চারের মার। সঙ্গে ১৫ রান করে অপরাজিত আছেন অল্প সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে দেশের ব্যাটিং ভরসা মুমিনুল হক।
অসম্ভবকে জয় করতেই তারা আজ নামবেন ব্যাট হাতে। এর আগে ৪শ’ ছাড়ানো টার্গেট তাড়া করে প্রথম জয়টি টেস্ট ক্রিকেটে দেখা মেলে ১৯৪৮ সালে ৪০৪ রান তাড়া করে ইংল্যান্ডকে হারায় অস্ট্রেলিয়া। এরপর ১৯৭৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৩ রান তাড়া করে জয় পায় ভারত। এরপর ৪১৪ রান তাড়া করে অস্ট্রেলিয়া হারায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে।

খেলাপি বনাম সদাচারী ঋণগ্রহীতা by ফারুক মঈনউদ্দীন

অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংক সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনামূলক নীতিমালা প্রবর্তন করে তাঁদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিকতম এক সার্কুলারে সদাচারী বা ভালো ঋণগ্রহীতাদের সংজ্ঞায়িত করে তাঁদের জন্য সুদের হারে বিশেষ ছাড়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। এ কথা সত্যি, আমাদের দেশে কারণে-অকারণে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের পুনঃতফসিলীকরণ, সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা ও নজির থাকলেও নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রহীতাদের জন্য কোনো সুবিধা বা ছাড়ের ব্যবস্থা নেই। বরং কোনো গ্রহীতা যদি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ মেয়াদপূর্তির আগে সমন্বয় করে দিতে চান, এর জন্য উল্টো আর্লি সেটেলমেন্ট ফি নামে জরিমানা আদায় করার বিধান রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী—চলমান, তলবি ও মেয়াদি—সব ধরনের ঋণ হিসাব বিগত তিন বছরের জন্য নিয়মিত বা স্ট্যান্ডার্ড থাকলে সেই ঋণ হিসাবধারীকে ভালো ঋণগ্রহীতা বলে বিবেচনা করা যাবে। তবে আগের তিন বছরের কোনো এক সময়ে গ্রহীতাদের কেউ বা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যদি কোনো ব্যাংকে বিরূপ মানে শ্রেণীকৃত হয়, তাহলে তাঁরা ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচিত হবেন না।
সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের জন্য যে প্রণোদনা দিতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট বিধিমালাও প্রণয়ন করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলমান ঋণ, তলবি ঋণ কিংবা মেয়াদি ঋণ—সব ক্ষেত্রেই পর পর তিন বছর ঋণ অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করলে তৃতীয় বছরের আদায়কৃত মোট সুদের ওপর কমপক্ষে ১০ শতাংশ ছাড় দিতে হবে। পরবর্তী বছর শেষে ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত থাকলে কিংবা মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলে পরের বছরও ছাড়ের এই বিশেষ সুবিধা বহাল থাকবে। এ ছাড়া গ্রহীতার ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তাঁরা বর্ধিত ঋণসুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলেও বিবেচিত হবেন।
দেশের চলমান ঋণ সংস্কৃতিতে সদাচারী গ্রহীতারা বরাবরই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যান, বরং খেলাপি ও বড় গ্রহীতারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিভিন্ন উপায়ে প্রচারণা পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই নতুন নীতিমালায় সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বীকৃতি বা পুরস্কার দিয়ে তাঁদের সামাজিকভাবে উচ্চাসনে তুলে ধরার জন্যও ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে। এই বিশেষ উদ্যোগটি পল্লি, উপজেলা ও ছোট জেলা সদরের ব্যাংক শাখার গ্রাহকদের মধ্যে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, এ রকম পাদপ্রদীপের আলোয় আসার সুযোগ তাঁদের কমই ঘটে। তবে ব্যাংকিং খাতের অনেকেই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না। তাঁদের বক্তব্য, ভালো ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক প্রথম থেকেই সুদের হারে সুবিধা দিয়ে থাকে। তার ওপর যদি আবার তিন বছর সদাচারী থাকার জন্য আদায়কৃত সুদের অংশ ফেরত দিতে হয়, সেটি ব্যাংকের আয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
এই প্রণোদনা প্রবর্তনের মাস দুয়েক আগে সুবৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের ঋণ হিসাবগুলোকে সহজ শর্তে পুনর্গঠিত করার নতুন যে নীতিমালা ঘোষিত হয়, সেটির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার জন্যই হয়তো সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের পুরস্কৃত করা ও স্বীকৃতি দেওয়ার এই উদ্যোগ। কারণ, নতুন নীতিমালায় ৫০০ কোটি টাকার চেয়ে বেশি ঋণ পুনর্গঠনের জন্য যেসব শিথিল শর্ত প্রণয়ন করা হয়, সেগুলো এই অঙ্কের নিচের গ্রহীতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আবার ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি হলে এসব শর্তের অন্তত একটি (ডাউন পেমেন্ট) আরও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ঋণ পুনর্গঠনের এই সুযোগ যে কেবল সুবৃহৎ খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তা নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ নয় এমন ঋণও এই নীতিমালার অধীনে সর্বোচ্চ ১২ বছরের জন্য পুনর্গঠন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিশাল ঋণ হিসাবের ওপর সুদের হারও নির্ধারণ করা যাবে বিশেষ ছাড়ে, তবে ব্যাংকের তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করলে যা হয় তার চেয়ে কম নয়। অবশ্য ব্যাংকের তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করলেও পুনর্গঠিত ঋণের ওপর ধার্য করা এই সুদের হার ব্যাংকের জন্য কোনোভাবেই লাভজনক হবে না।
এই নীতিমালা প্রণয়নের যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়েছে যে আর্থসামাজিক ও কর্মসংস্থানের নিরিখে বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বিধায় ঋণ আদায়ের স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের মোট কর্মসংস্থানে ও জিডিপিতে ৫০০ কোটি টাকার ওপর ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট কী পরিমাণ অবদান আছে, কিংবা তাঁদের অবদান ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণগ্রহীতাদের চেয়ে বেশি কি না, সে বিষয়ে একটা সংগত প্রশ্ন থেকেই যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অস্থিরতার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াও যদি হয় এই নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য, তাহলেও ৫০০ কোটি টাকার নিচের গ্রহীতারা এই সুবিধা থেকে কেন বঞ্চিত হবেন, সে প্রশ্নেরও কোনো জবাব আমরা দিতে পারছি না। যদি বহির্দেশীয় কিংবা অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সুবৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঋণ পুনর্গঠন–সুবিধা পায়, তাহলে সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল কিংবা নির্ভরশীল নয় এমন অপেক্ষাকৃত ছোট বা মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কেন একই কারণে এই সুবিধা পাবে না, তার কোনো সদুত্তরও ব্যাংকাররা দিতে পারছেন না।
মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা যখন আমাদের তারকা খেলাপিসহ সুবৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের এ রকম ঢালাও ছাড় দিচ্ছি, ঠিক তখনই ভারতে খেলাপি ঋণের প্রবণতা রোধে আরেক প্রস্থ কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘অসহযোগী’ (নন-কো-অপারেটিভ) ঋণগ্রহীতা নাম দিয়ে একটা নতুন শ্রেণি চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাঁচ কোটি রুপির বেশি সব ধরনের ঋণ এই শ্রেণির আওতাভুক্ত। কয়েক বছর আগে ইচ্ছাকৃত (উইলফুল) খেলাপি নামে যে নতুন শ্রেণীকরণ করা হয়েছিল, এটি তার পরের ধাপ। ‘অসহযোগী’ ঋণগ্রহীতা বলতে তাঁদের বোঝানো হচ্ছে, যাঁরা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করেন না, বরং ব্যাংকের ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করেন, নিজেদের আর্থিক সংগতি বা জামানত সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহে বাধা দিয়ে কিংবা সহায়ক জামানত বিক্রি করে ঋণ আদায়ের জন্য ঋণদাতা ব্যাংকের সব তৎপরতাকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংজ্ঞানুযায়ী, এই শ্রেণির ঋণখেলাপিরা ব্যাংকের টাকা তো ফেরত দেনই না, বরং ঋণের টাকা সরিয়ে ফেলে ভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেন কিংবা বন্ধকীকৃত অস্থাবর সম্পদ ব্যাংকের অগোচরে বিক্রি করে দেন। বস্তুত, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তহবিল সরিয়ে ফেলার (ফান্ড ডাইভারশন) বিষয়টি প্রমাণসাপেক্ষ বলে ব্যাংকগুলোকে এই শ্রেণীকরণ করতে গিয়ে নানা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। এই বাধা এড়ানোর জন্য নতুন শ্রেণীকরণের এই উদ্যোগ। কারণ, অসহযোগী ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে এ রকম কোনো প্রমাণের আবশ্যকতা নেই।
উল্লেখ্য, গত বছরের শেষে ভারতের কিংফিশার এয়ারলাইনসের প্রায় সাত হাজার কোটি রুপি খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে কলকাতার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কিংফিশার বিয়ার খ্যাত বিজয় মালিহাকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণা করার পর সে দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রকদের টনক নড়ে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য কলকাতা হাইকোর্ট এই ঘোষণাকে স্থগিত করে দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দরিদ্র ও কৃষকবান্ধব ব্যাংকিং, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক সেল গঠন, গ্রিন ব্যাংকিংসহ মানবিক ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন প্রশংসনীয় ও অনন্য উদ্যোগের পাশাপাশি ৫০০ কোটি টাকা এবং তদূর্ধ্ব ঋণ পুনর্গঠনের একপেশে ছাড়ের বিধানটি আদৌ বাংলাদেশ ব্যাংক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করেছে কি না, সে বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে বিজ্ঞ সমাজের। কারণ, কয়েক বছর আগে সরকার যখন খোলামেলা স্বীকার করেই রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রয়োজনহীনভাবে কিছু নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই প্রভাবকে বাধা দিতে পারেনি।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আমাদের দেশের খেলাপি ঋণ সংস্কৃতিতে বড় গ্রহীতারা সব সময়ই সুদ মওকুফ, হ্রাসকৃত সুদ, দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি–সুবিধাসহ নানা ধরনের ছাড় পেয়ে আসছেন, অথচ এই তারকা খেলাপিরা ঋণ পরিশোধের জন্য তাঁদের জীবনযাপনের কোনো স্বাচ্ছন্দ্য কখনো উৎসর্গ করেছেন, এমন কোনো নজির নেই। এমনকি তাঁদের খেলাপি ঘোষণার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থায় আদালতের স্থগিতাদেশের মতো রক্ষাকবচ ব্যবহার করেও তাঁরা আরও ব্যাংকঋণ গ্রহণের পথ সুগম রাখার প্রয়াস পান। এসব সুবৃহৎ খেলাপির অনেককেই বিভিন্ন সময়ে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বিদেশে সফরসঙ্গী হতেও দেখা যায়।
তবে ভরসার কথা, সুবৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের এই সুযোগটি দেওয়া হয়েছে সীমিত সময়ের জন্য, চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে এ ধরনের ঋণ পুনর্গঠনের প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পেশ করতে হবে। এই ব্যবস্থার পরও কোনো গ্রহীতা আবার খেলাপি হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং শেষাবধি দেউলিয়া আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে ব্যাংকগুলোর। এ রকম কঠোর শর্তের পর সুযোগটি নিতে কয়টা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ, এই সুবিধা গ্রহণ করার পর খেলাপি হলে দেউলিয়া আইনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের পর পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে আবার খেলাপি হয়ে পড়লে সুবৃহৎ এসব গ্রহীতার বিষয়ে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com