Monday, March 16, 2026

বিউটি পার্লারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড

মানিকগঞ্জের একটি পার্লারের আড়ালে নারীদের জোরপূর্বক অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নামাতে বাধ্য করা হয় এমন অভিযোগ এনে মামলা করেছে এক নারী। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রস্তাবে রাজি না হলে করা হয় মারধরসহ হাত-পা বেঁধে নির্যাতন।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এক নারী কর্মচারী মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পার্লারটি হলো মানিকগঞ্জ শহরের এলজিইডি অফিসের পশ্চিম পাশে রাইসা বিউটি ঘর পার্লার।

মামলার বাদী জানান, তিনি ওই বিউটি পার্লারে চাকরি করতেন। বেশ কিছু দিন চাকরি করার একপর্যায়ে পার্লারের মালিক রত্না ইয়াছমিন ও তার সহযোগীরা তাকে দেহব্যবসায় বাধ্য করার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে গত ১১ মার্চ ১৩ বছর বয়সী তার ছোট ছোট বোন পার্লারে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। এমন সময় আমার বোনকে পার্লারের মালিকসহ তার চক্রের সদস্যরা দেখেন। পরে তারা আমার বোনকে দিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড করানোর জন্য প্রস্তাব দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় গত ১৪ মার্চ রাত আনুমানিক ১টার দিকে আসামিরা আমার বাসায় গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে।

ভুক্তভোগী আরও জানান, বোনসহ আমি অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় আমাকে পার্লারে নিয়ে লোহার রড দিয়ে মারধর করে। শিকল দিয়ে হাত বেঁধে রাখে এবং আমার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। আমি বাড়ি না ফেরায় আমার স্বজনরা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে।

অভিযুক্তরা হলেন, সদর উপজেলার পশ্চিম বান্দুটিয়া গ্রামের পার্লারের মালিক রত্মা ইয়াছমিন, তার ছেলে মো. তুষার রহমান (২৬), দেড় গ্রাম এলাকার তাজনীন আক্তার চাঁদনী (২৬), পশ্চিম সেওতা এলাকার রিফাত (২৫), ও রজ্জব (২৫), বাইচাইল গ্রামের জহিরুল ইসলাম টিপুসহ (৪৫) অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনের নামে মামলা করা হয়।

এ বিষয়ে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকরাম হোসেন জানান, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আমরা এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। 

ভুক্তভোগী নারী। ছবি : সংগৃহীত
ভুক্তভোগী নারী। ছবি : সংগৃহীত

যে ৭ কারণে ইরান যুদ্ধে জয়ের ঘোষণা দিতে পারছেন না ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধ নিয়ে এক চরম সংকটময় পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যেমন বুক ফুলিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারছেন না; তেমনি মনে হচ্ছে এমন একটি যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন, যা দিন দিন আরও বড় ও জটিল হয়ে উঠছে। আর বন্ধ করলেও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি, যুদ্ধে টিকে থাকার চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে।

ট্রাম্প এখনো তার পূর্বসূরি লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি, যারা পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করেছিলেন। কিন্তু চারপাশের পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, সামনে তেমনই কোনো বড় বিপদ আসছে।

সিএনএনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক স্টিভেন কলিনসনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অন্তত সাতটি বড় কারণ, যার জন্য ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধ জয়ের দাবি করতে পারছেন না।

১. হরমুজ প্রণালির গোলকধাঁধা

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল রপ্তানির প্রধান ধমনি, যা ইরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ট্রাম্পের বিশাল সামরিক আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও স্রেফ শক্তি প্রয়োগ করে এই পথ সচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত নেভি ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনানের মতে, ‘হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে না পারলে আপনি বিজয় দাবি করতে পারেন না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এটি পুনরায় খুলে দেওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন, যদি না অসম্ভব হয়।’

‘প্রেসিডেন্টের আশাবাদকে আমি সম্মান জানাই... কিন্তু প্রথম এক বা দুই দিন পরই বিজয় ঘোষণা করা মোটেও সঠিক কাজ নয়। এটি আমাদের ধারণার চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে চলবে’ বলেন তিনি। সস্তা ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে ইরান এই পথ বন্ধ রাখায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে, যা ট্রাম্পের জন্য এক বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক ধাঁধা তৈরি করেছে।

২. ইরানি বর্তমান শাসনের স্থায়িত্ব

মার্কিন হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করায় শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের মতে, নতুন এই নেতৃত্ব আগের চেয়েও বেশি কট্টরপন্থি হতে পারে, যা অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’-র কৌশলগত সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

৩. ইসরায়েলের ভিন্ন কৌশল

যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা এখন আর এককভাবে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে নেই। ট্রাম্প যদি রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধ শেষ করতেও চান, ইসরায়েল তা মানবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য আমেরিকার চেয়ে ভিন্ন। ইসরায়েল ইরানের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও ইসরায়েল তাতে রাজি না-ও হতে পারে। যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ‘যৌথ সিদ্ধান্তের’ মন্তব্য অনেকের মনে এই উদ্বেগ জাগিয়েছে যে, মার্কিন সামরিক সিদ্ধান্তে একটি বিদেশি রাষ্ট্রের অন্যায্য প্রভাব রয়েছে।

৪. যুদ্ধের স্পষ্ট লক্ষ্যের অভাব

এই যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট বিজয়গাথা নেই। হোয়াইট হাউস কখনো বলছে লক্ষ্য পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, কখনো ইঙ্গিত দিচ্ছে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের। লক্ষ্য স্থির না থাকায় ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছালে একে ‘বিজয়’ বলা যাবে, তা নিয়ে খোদ প্রশাসনের ভেতরেই অস্পষ্টতা ও বৈপরীত্য রয়েছে।

৫. পারমাণবিক কর্মসূচির অমীমাংসিত প্রশ্ন

ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘গুঁড়িয়ে’ দিয়েছেন। কিন্তু জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার (আইএইএ) মতে, ইসফাহান কেন্দ্রে এখনো প্রায় ২০০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত থাকতে পারে। এই মজুত নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন কখনোই নিশ্চিত হতে পারবে না যে, ইরান ভবিষ্যতে আবার পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করবে না।

৬. ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্থবিরতা

ট্রাম্প আশা করেছিলেন যুদ্ধের ধাক্কায় ইরানি জনগণ বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো বড় বিদ্রোহ দেখা যায়নি। উল্টো অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে সরকারের অবস্থান আরও সংহত হতে পারে এবং যুদ্ধ শেষে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আরও কঠোর দমন-পীড়ন নেমে আসতে পারে।

৭. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ

যুদ্ধের প্রভাবে আমেরিকায় তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সম্প্রতি ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে সহিংসতার ঘটনাগুলো অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে। মার্কিন সেনাদের মৃত্যু এবং জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।

পরিশেষে, ১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানি বা জাপানের বিরুদ্ধে জয়ের মতো পরিষ্কার বিজয় এখনকার যুদ্ধে বিরল। ট্রাম্প এখন নিজের বেছে নেওয়া যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতির মুখোমুখি। সামরিক শক্তি কমে যাওয়া এবং দুর্বল প্রতিপক্ষ ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষায় জয়ী হওয়ার আগেই তাকে একটি ‘জয়’ নিয়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। 

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তেল ইসরায়েলের তেল আবিবসহ অন্তত ৩টি শহর কেঁপে উঠেছে। সংঘাতের ১৬তম দিন রোববার (১৫ মার্চ) ইহুদিবাদী ভূখণ্ডটি লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলার দাবি করেছে ইরান।


ইরান যুদ্ধে প্রকাশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা

কিছু মহলে আশাবাদ থাকলেও ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ হচ্ছে কিংবা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় এ সংকটের দ্রুত সমাধান হবে, এমনটা দাবি করার সময় এখনো আসেনি। পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতার পরীক্ষা চলছে। তবে সংঘাতের এই প্রাথমিক পর্যায়েই কিছু গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে নিজের আধিপত্য পুনরুদ্ধারের এই সর্বশেষ চেষ্টার পর বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আসলে কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনই হারিয়ে যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পতনের মতো পরিস্থিতি আপাতত কল্পনাপ্রসূত বলেই মনে হয়। রাশিয়া, চীন, ভারত ও অন্যান্য বড় শক্তির কাছে আসল প্রশ্ন এটা নয় যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে থাকবে কি না; বরং প্রশ্নটা হলো, পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় দেশটি নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নেবে।

বিশেষ করে রাশিয়ার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্ক একই সঙ্গে নিবিড় ও সংঘাতময়। ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাসের কারণেই রাশিয়ার কৌশলগত হিসাব-নিকাশে পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা সব সময়ই গুরুত্ব পাবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতের ক্ষমতার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে রাশিয়াকে এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে।

ইরানে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা যেতে পারে। এ ঘটনা এমন এক বিশ্বে মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে, যেখানে কোনো দেশই আর যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা নেতৃত্ব মেনে নিতে রাজি নয়। ইরান আর কত দিন এই সামরিক চাপ সইতে পারবে, মিত্রদের কাছ থেকে কেমন সহায়তা পাবে এবং ওয়াশিংটন নিজেই–বা কত দিন এ অভিযান চালিয়ে যাবে, তা এখনো অস্পষ্ট। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে, এ অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রত্যাশার সীমাকেও অতিক্রম করেছে।

ইরান-ইসরায়েল চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে একটি পরস্পরবিরোধী চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ইসরায়েলি নেতৃত্ব তাদের লক্ষ্য অর্জনে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। বিপরীতে ইরানের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধক্ষমতা দেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিস্ময় লক্ষ করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র এ সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে।

মূলত এই অর্থনৈতিক চাপের কারণে এমন গুঞ্জন ছড়াচ্ছে যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করতে ওয়াশিংটন হয়তো গোপনে কোনো দক্ষ মধ্যস্থতাকারীর খোঁজ করছে।

বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাশিয়া ইরানি জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। মস্কো মনে করে, ইরান বিনা উসকানিতে হামলার শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়াকে তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে রাশিয়া মূলত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সার্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং এ ব্যবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অবস্থান নিয়ে চিন্তিত।

যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থান বুঝতে একটি চিকিৎসাশাস্ত্রীয় উপমা ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বরাজনীতির দেহে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা ‘নিওপ্লাজম’ বা টিউমারের মতো। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো এই ‘টিউমার’ পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয় না। বরং এটি রাজনৈতিক দেহের বিবর্তনের সঙ্গে মিলেমিশে যায় এবং একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অনন্য অবস্থান অর্জন করেছিল, তা কেবল তাদের একচেটিয়া শ্রেষ্ঠত্বের ফল ছিল না; বরং তা ছিল বিশেষ কিছু ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ফসল। সে সময় পশ্চিম ইউরোপ যুদ্ধে বিধ্বস্ত ছিল। চীনে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চলছিল এবং সোভিয়েত রাশিয়া সাম্যবাদী ব্যবস্থার কারণে বিশ্ব থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল। এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্বের আসনে বসার সুযোগ করে দিয়েছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই নেতৃত্ব রোমান সাম্রাজ্য বা চেঙ্গিস খানের মতো প্রথাগত কোনো সাম্রাজ্য বিজয়ের ফসল ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র বড় কোনো সামরিক যুদ্ধের মাধ্যমে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেনি; বরং বিশ্বের অন্য শক্তিগুলো যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত ছিল, তখনই দেশটি সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এ অর্থে যুক্তরাষ্ট্র ছিল অনেকটা মরুভূমির কাফেলার সেই ‘শেষ উট’-এর মতো, যে কিনা অন্যদের পিছিয়ে পড়ার সুযোগে হঠাৎ করেই সবার সামনে চলে আসে এবং কাফেলার নেতৃত্ব দিতে শুরু করে।

তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেই শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে থাকা ঐতিহাসিক কারণগুলো অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন অন্য শক্তিগুলোর পিছিয়ে থাকার আর কোনো বাস্তব কারণ নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বিশ্বরাজনীতির একমাত্র আধিপত্যশীল শক্তি থাকার বদলে একজন সাধারণ বা স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

বর্তমান ইরান সংকট মূলত এ পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। বিশাল সম্পদ আর সমরাস্ত্রের শক্তি থাকলেও পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়ে ইরানের মতো একটি বড় ও লড়াকু দেশকে কাবু করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়। আর পরমাণু যুদ্ধের পথটি সব পক্ষের জন্যই আসলে অকল্পনীয়।

বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিস্ময় বাড়ছে ইরানের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধক্ষমতা দেখে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র এ সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে দৃশ্যত উদ্বিগ্ন। তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে।

মূলত এই অর্থনৈতিক চাপের কারণেই এমন গুঞ্জন ছড়াচ্ছে যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করতে ওয়াশিংটন হয়তো গোপনে কোনো দক্ষ মধ্যস্থতাকারীর খোঁজ করছে। আর এ কারণেই বর্তমানে যে তিক্ত শিক্ষা অর্জিত হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত মঙ্গলজনক হতে পারে।

একই সঙ্গে এ পরিস্থিতি নিয়ে চরম কোনো বিপর্যয়কর চিন্তা পরিহার করা প্রয়োজন। মার্কিন আধিপত্যের অবসান মানেই বিশ্বে অনিবার্যভাবে বিশৃঙ্খলা নেমে আসবে—এমন ধারণা মূলত বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার একটি কৌশলমাত্র। বরং অনেক দিক থেকেই একটি সুষম আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এবং এটি কাম্যও বটে।

রাশিয়ার ইতিহাস থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই রাশিয়া অনেক সময় নিজের পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থ হাসিলে দেশটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। আঠারো ও উনিশ শতকে রাশিয়ার এসব লক্ষ্য মূলত ব্রিটেনের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। পরবর্তীকালে রাশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার ত্রিমুখী সম্পর্ক বিশ্বরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

বর্তমানে বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপ ও চীন—উভয় পক্ষের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চাপ অনিচ্ছাকৃতভাবেই এমন একটি সুষম ব্যবস্থা তৈরির পথ প্রশস্ত করছে। সেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। আর এমন একটি পরিণতি রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গেই মূলত সংগতিপূর্ণ।

বর্তমান অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে ভবিষ্যতে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবে, তা আগের তুলনায় নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল হবে। এ পরিবর্তনের পথে যুদ্ধ কিংবা নানা সংকট দেখা দিতে পারে; তবে এসব ঘটনা যেন মূল রূপান্তরের বিষয়টি আড়াল না করে।

বড় ধরনের কোনো ভয়াবহ সংঘাত ছাড়াই যদি বিশ্ব এ পরিবর্তনের সময়টুকু পার করতে পারে, তবে বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেই টিকে থাকবে। তবে এর কারণ এই নয় যে বিশ্বের এখন মার্কিন নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন; বরং অন্য শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্ব দেবে বলেই দেশটি প্রাসঙ্গিক থাকবে।

সহজ কথায়, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব থাকবে ঠিকই, তবে তা আগের মতো একক আধিপত্যের নয়।

গত শনিবার রাতে তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে আজাদি টাওয়ার এলাকায় হামলা চালানো হয়
গত শনিবার রাতে তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে আজাদি টাওয়ার এলাকায় হামলা চালানো হয়। ছবি: এএফপি

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেঁপে উঠল ইসরায়েল

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তেল ইসরায়েলের তেল আবিবসহ অন্তত ৩টি শহর কেঁপে উঠেছে। সংঘাতের ১৬তম দিন রোববার (১৫ মার্চ) ইহুদিবাদী ভূখণ্ডটি লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলার দাবি করেছে ইরান।

এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।

এই হামলায় মধ্য ইসরায়েলে ২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া দখল করা পশ্চিম তীরে আরও তিন ইসরায়েলি আহত হয়েছেন। আহতের মাত্রা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কিছু জানা যায়নি।

দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে মাগেন ডেভিড অ্যাডম উদ্ধারকারী সংস্থার বরাত দিয়ে বলা হয়, ইসরায়েলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫০ বছর বয়সী দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একটি ক্লাস্টার বোমা বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র থেকে দেশটির দক্ষিণতম শহর ইলাত এবং মধ্যাঞ্চলজুড়ে উপ-বোমা বা সাবমিউনিশন ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে ইলাতের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ক্লাস্টার বোমাযুক্ত একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছে। 

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি : সংগৃহীত
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি : সংগৃহীত