Wednesday, October 14, 2015

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যু’ by গোলাম ফারুক

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয় মৃত বা মৃতপ্রায়—বেশি দিন আগের কথা নয়, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম ও মনোভাব পর্যালোচনা করে ২০১০ ও ২০১৫ সালে প্রকাশিত দুটি নিবন্ধে ব্রিটিশ তাত্ত্বিক টেরি ইগলটন এই মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেননি যে উন্নত দেশগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাকচিক্য কিংবা ধনদৌলতে ঘাটতি পড়েছে। বরং তা আরও বেড়েছে। ঘাটতি পড়েছে মানবিক বিদ্যাশিক্ষায়। আধুনিক পুঁজিবাদের তল্পিবাহক হতে গিয়ে মানবিক বিষয়গুলো শিকেয় তুলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ‘করপোরেট প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ কিংবা ‘করপোরেট গবেষণাকেন্দ্রে’ পরিণত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
আমরা যদি দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকাই, তাহলে দেখব ইগলটন যে অর্থে বলেছেন সে অর্থে তো বটেই, স্বাভাবিক অর্থেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মৃতপ্রায়। উচ্চমার্গীয় শিক্ষা নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুরসত তো রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের নেই-ই, এমনকি টাকাকড়ি নিয়ে আসতে পারে, এ রকম শিক্ষাও তাদের কাছে গরিবের ঘোড়ারোগ বলে ভ্রম হয়। কেন এ রকমটা ঘটে, কেনই-বা এ রকম ঘটা উচিত নয় আর কী করলে উচ্চশিক্ষা, ইগলটন কথিত সেই মর্যাদা না পেলেও, অন্তত সাধারণভাবে বেঁচে থাকবে।
বিষয়টা কি এমন যে উচ্চশিক্ষার চাহিদা নেই বলে রাষ্ট্র পরিচালকেরা একে উপেক্ষা করেন? বরং প্রচুর চাহিদা আছে এবং তা পূরণ করতে গিয়েই দরিদ্র ও ক্ষেত্রবিশেষে অপরিণামদর্শী সরকারগুলো শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস করে। দেখা যাক চাহিদাটা কেমন। প্রথমত, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ এশিয়ায় বাস করে। উপরন্তু, তাদের অধিকাংশই তরুণ (২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩৭ শতাংশ অর্থাৎ ৬১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ১৮ বছরের নিচে)। স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিবাদের আবহে বেড়ে ওঠা এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী উদ্যমী ও ইগলটনের অর্থে না হলেও, শিক্ষাপিপাসু। এই এলাকার মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক। এমনকি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত ধনবান ও ক্ষমতাশালী লোকেরাও নিজেদের নামের পাশে ‘বিএসসি’ লিখে সম্মানিত বোধ করেন। এতদঞ্চলে উচ্চশিক্ষার চাহিদা বাড়ার আরও কারণ হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি, কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে অহেতুক বিরূপ ধারণা, দ্রুত বর্ধনশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং কৃষি খাতের তুলনায় শিল্প ও সেবা খাতের উন্নতি।
চাহিদার তুলনায় আর্থিক অসংগতিই কি উচ্চশিক্ষায় ধস নামার একমাত্র কারণ? তা নয়। বরং উচ্চশিক্ষাই হতে পারে আর্থিক সচ্ছলতা লাভের কার্যকর ও টেকসই হাতিয়ার। সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েই সরকারগুলো উচ্চশিক্ষাকে ইগলটনের ভাষায় ‘জীবন’ দান করতে না পারলেও লাভজনক করতে পারে। একটি দেশের সরকার যদি গবেষণায় বিনিয়োগ করে, সে দেশের অর্থনীতি চাঙা হতে সময় লাগে না। রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্টে ১ শতাংশ অগ্রগতি হলে উৎপাদন বাড়ে ০.০৫ থেকে ০.১৫ শতাংশ। ওইসিডি (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আরও চমকপ্রদ। সেখানে উচ্চশিক্ষায় প্রতিটি ডলারের বিনিয়োগ সুদে-আসলে ফেরত এসেছে। সেখানকার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষিত মানুষের উপার্জনে পার্থক্য হয় প্রায় ২৫ থেকে ১১৯ শতাংশ। যদি কোনো দেশের নাগরিকেরা এক বছর বেশি পড়ার সুযোগ পায়, সে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ থেকে ৬ শতাংশ বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, কেবল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক গ্র্যাজুয়েট দিয়ে আর আধুনিক অর্থনীতিকে সামলানো সম্ভব নয়।
উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগে আশু লাভ হয় না। তবে তা কেবল ইগলটনের ‘উচ্চশিক্ষার’ ক্ষেত্রে খাটে, বিশ্ববিদ্যালয়রূপী ‘করপোরেশন প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ বা ‘করপোরেশন গবেষণাকেন্দ্রের’ ক্ষেত্রে খাটে না। আমার ধারণা, দক্ষিণ এশিয়ার কর্তাব্যক্তিরা হয় এই দুই ধরনের উচ্চশিক্ষার পার্থক্য সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন না অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা গবেষকেরা যে উচ্চশিক্ষাকে লাভজনক করতে পারবেন, এ রকম ভরসা পাচ্ছেন না। তাই গবেষণার এত আকাল। মজার ব্যাপার হচ্ছে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা থাকলেও পাকিস্তানি গবেষকেরা এ ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছেন। যেমন ২০০২ সালে ওই দেশের প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছিল ৮০০ আর ২০১১-তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২০০-তে (অবশ্য তাদের মান নিয়ে অনেকের সংশয় আছে)। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নেপালে। মাত্র ১ শতাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিএইচডি প্রদান করে।
এসব কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ পিছিয়ে আছে। আমরা যদি ২০১২-১৩ সালের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব টিএইচই (টাইমস হায়ার এডুকেশন) র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ১০০টা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এই অঞ্চলের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। তবে প্রথম ৪০০টির মধ্যে ভারতের তিনটি আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) আছে। আর কিউএস র্যাঙ্কিংয়ের প্রথম ৫০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারতের চারটি আইআইটি এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি’ স্থান পেয়েছে। অন্য দেশগুলোর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান খুবই হতাশাজনক।
সরকারগুলোর (ভারত ছাড়া) পক্ষ থেকে এই হতাশাজনক পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও বেসরকারি খাত এগিয়ে আসছে। তৈরি হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আর উচ্চবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েরা চলে যাচ্ছে বাইরে। যেমন ২০১১-১২ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে ৫৯ হাজার, বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৪১, নেপাল থেকে ২ হাজার ৮২২, পাকিস্তান থেকে ১ হাজার ৯০০ এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ১ হাজার ৪১২ জন পোস্টগ্র্যাজুয়েট ছাত্র কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গেছে।
এখন দেখা যাক দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশে কীভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ হয়েছে। এই অঞ্চলে ১৯৮০-এর দশকে যেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বই ছিল না, মাত্র দুই দশকে তার ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে। যেমন ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৯ শতাংশ বেসরকারি (এখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরা হয়নি) এবং তা দ্রুত বিকাশমান। আফগানিস্তানের অবস্থাটাও অনেকটা একই রকম। আনুপাতিক হারে এই দুটি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃদ্ধির হার প্রায় সমান সমান এবং এতদঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। এরপরেই পাকিস্তানের অবস্থান। ওখানে ৪৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি। তবে ওখানকার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি সরকারি টাকায় চলে না। প্রচুর বিনিয়োগ করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ২০০৮-এর পর সরকার হঠাৎ করে এক বছরের মধ্যে উচ্চশিক্ষার বাজেট ৮৩ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এখন ওদের ট্রাস্টি বোর্ড ছাত্র-বেতন এবং কিছু বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্থসংস্থান করে। ভারতে ৩৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বেসরকারি খাতটি এখনো বিকশিত হয়নি।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভারতে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কম, তার কারণ সরকারি বিনিয়োগ। দেশটির ১১তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উচ্চশিক্ষা খাতের বরাদ্দ নয় গুণ বাড়ানো হয়েছে। সেখানে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রের পেছনে সরকারি ব্যয় সবচেয়ে বেশি—জিডিপি পার ক্যাপিটার ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশ (২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী)। বাংলাদেশে সবচেয়ে কম ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ (২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী); নেপালে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ (২০১০) ও শ্রীলঙ্কায় ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ (২০১০)। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের হিসাব পাওয়া যায়নি।
এবার বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসা যাক। উপর্যুক্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা যদি উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের সূচক হয়, তাহলে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এগিয়ে আছে; যদি ছাত্র-বেতনে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রণোদনা মনে করা হয়, তাহলে শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশ এগিয়ে আছে; যদি উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা বা উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা উচ্চশিক্ষা বিকাশের পূর্বশর্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে; যদি জিডিপি বৃদ্ধির হার উচ্চশিক্ষার সহায়ক হয়, তাহলেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের পরেই। সাম্প্রতিক কালে কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরও, বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে মূলত সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে।
সরকারি বিনিয়োগ কমানোর অর্থ হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা আরও প্রকট। প্রথমত, এরা ছাত্র-বেতনের ওপর নির্ভর করে, বিদেশের মতো ফান্ড দিয়ে সাহায্য করবে এ রকম বড় করপোরেট পুঁজি এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, সম্ভবত অর্থাভাবেই, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যূনতম যা যা প্রয়োজন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নেই। তৃতীয়ত, পদোন্নতির জন্য কিছু নামকাওয়াস্তে গবেষণা হলেও সরকারি বিধিনিষেধের কারণে এরা পিএইচডি/এমফিল কোর্স চালু করতে পারেনি। চতুর্থত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় অবস্থাপন্ন ও মেধাবী ছাত্রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক দরিদ্র ও কম মেধাবী ছাত্ররা এখানে ভর্তি হয়। ফলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এ রকম: যাদের সরকারি ভর্তুকির (প্রায় ৯০ শতাংশ) দরকার নেই, তারাই তা ভোগ করে আর যাদের দরকার তারা ক্ষেত্রবিশেষে জায়গাজমি বিক্রি করে কোনোরকমে লেখাপড়া চালিয়ে যায়।
এ রকম অবস্থায় বড়জোর বিশ্ববিদ্যালয়মুখী কিছু বেসরকারি ‘করপোরেট প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ তৈরি হতে পারে, ‘করপোরেট গবেষণাকেন্দ্র’ নয়। এখন হয় সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে, নাহয় ভারতের মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে পাকিস্তানের মতো খালি বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, দেখতে হবে এই বিনিয়োগ যেন যোগ্য প্রশাসক ও মেধাবী ছাত্র-শিক্ষকের হাতে পড়ে লাভজনক হয়ে ওঠে—প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাবলম্বী হয়। তাতে ইগলটনের ‘মৃত্যু’ এড়ানো যাবে কি না বলা মুশকিল, তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে অন্তত লাভজনক করপোরেট গবেষণাকেন্দ্রে পরিণত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তথ্যসূত্র
১। Higher education in South Asia (২০১৩), দ্য ইকোনমিস্ট
২। Higher education across Asia (২০১১), এডিবি
গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।
faruk.golam@yahoo.com

বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড গুলোর নেপথ্যে কারা?

বাংলাদেশে ধারাবাহিক বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন। এসব হত্যার জন্য দায়ী কারা সে বিষয়ে খুব সামান্যই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি দুই বিদেশী নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নতুন করে বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।  এসব হত্যার পেছনে দায়ী কে তা নিয়ে বিবিসির সাংবাদিক আকবর হোসেন একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। ‘হু ইজ বিহাইন্ড দ্য বাংলাদেশ কিলিংস?’ বা বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড গুলোর নেপথ্যে কে- শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে তিনি বেশ কিছু প্রশ্ন  তুলে তার বিশ্লেষণ করেছেন।
ইসলামিক স্টেট বা আইএস  জঙ্গিরা কি হামলা চালিয়ে থাকতে পারে?
এ প্রশ্নের জবাবে তিনি লিখেছেন- ইতালির এনজিও কর্মী সিজার তাভেলা ও জাপানের  খামারি কুনিও হোশির ওপর হামলা একই ধরনের। বলা হচ্ছে, দুটি ঘটনায়ই আইএস হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে দ্রুততার সঙ্গে দেশে আইএস থাকার কথা অস্বীকার করেছে সরকার। নিরাপত্তা বিষয়ক সূত্রগুলো বিশ্বাস করছে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশে আইএস কার্যক্রম চালাচ্ছে এমন দাবির বিষয়ে তারা সন্দিহান। সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, আন্ডারগ্রাউন্ডের প্রতিটি  জঙ্গি সংগঠনের কিছু আন্তঃসম্পর্ক থাকে। কারণ, তারা একই আদর্শ পোষণ করে। তবে আমি নিশ্চিত নই, বিদেশী হত্যাকাণ্ডে আইএসের কোন যোগসূত্র আছে কিনা।
বিদেশীদের ওপর হামলার জন্য কাকে দায়ী করা হচ্ছে?
এ প্রশ্ন তুলে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে- প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা দুই বিদেশী নাগরিককে হত্যার জন্য বিরোধী দল বিএনপিকে দায়ী করেছেন। তবে বিএনপি তা অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিরপেক্ষ তদন্তকে ব্যাহত করবে। খুনিদের চিহ্নিত করতে পুলিশের ওপর রয়েছে আন্তর্জাতিক চাপ। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা জঙ্গি গ্রুপগুলোর উত্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এতে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে।
অন্য হামলাগুলোয়ও কি কোন যোগসূত্র আছে?
জবাবে বলা হয়েছে, এ বছর বাংলাদেশে হত্যা করা হয়েছে চারজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারকে। অন্য হামলাগুলোও মুসলিম প্রধান এই দেশটির ধর্মনিরপেক্ষতায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত সপ্তাহে দেশের উত্তরাঞ্চলে খ্রিষ্টান এক ধর্মযাজকের গলা কেটে  হত্যার চেষ্টা করে হামলাকারীরা। এজন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত জামা’আতুল মুজাহিদীনের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মাদ খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তিনি ইসলামের সুফি মতবাদের একজন পরামর্শক ছিলেন। তিনি পীর হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। গত বছর আরও দুজন পীরকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ঘাতকদের কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক ভাষ্যকার তারেক শামসুর রেহমান বলেন, একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না এমন স্বধর্মীয় লোকদের টার্গেট করে জঙ্গিরা। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধারার ইসলাম প্রচলিত। এ দেশটি সুন্নিপ্রধান দেশ। যদিও এসব হামলার ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদা- হত্যা করা হয়েছে বিদেশীকে, বাংলাদেশীকে, মুসলিমকে, হামলা হয়েছে একজন খ্রিষ্টানের ওপর, হত্যা করা হয়েছে নাস্তিক ব্লগারদের- তবে পুলিশ মনে করে এসব হামলার মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। পুলিশের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, একই গ্রুপ ব্লগার ও পীরদের হত্যার জন্য দায়ী থাকতে পারে। ওই গ্রুপই খ্রিষ্টান ধর্মযাজকের ওপর হামলা করে থাকতে পারে। কারণ, হামলার  ধরণটা হুবহু একই রকম। পুলিশের আরেকটি সূত্র বলেছেন, ব্লগার ও বিদেশী হত্যার মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে, যদিও খুনিরা একই গ্রুপের নয়। পুলিশ বলেছে, ব্লগার হত্যায় জড়িত কট্টরপন্থি ইসলামিক গ্রুপ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। চার ব্লগার হত্যায় ১০ থেকে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা সরাসরি ওই গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকবে এমন কথা নেই।
জঙ্গি সহিংসতা উত্থানের নেপথ্যে কি?
হামলার নেপথ্যে যারা তাদের বিষয়টি অস্পষ্ট। তবে এটা পরিষ্কার, জঙ্গি গ্রুপগুলো ক্রমাগত সক্রিয় হচ্ছে বাংলাদেশে। দেশে এখন কতগুলো মৌলবাদী গ্রুপ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তা কেউ জানে না। তবে নিরাপত্তাবিষয়ক একটি সূত্র বলেছেন, এমন গ্রুপের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫। গত বছরে পুলিশ বিভিন্ন ইসলামিক গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে শতাধিক ব্যক্তিকে। এছাড়া তারা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক বৃটিশ নাগরিকসহ প্রায় ২০ জনকে  আটক করেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তারা আইএসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল। তারেক শামসুর রেহমান মনে করেন, জঙ্গি গ্রুপে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবস্থা একটি ফ্যাক্টর। তিনি বলেন, অনেক মানুষ দারিদ্র্যে বসবাস করছেন। তাই ধর্মের নাম করে মানুষকে জঙ্গি তৎপরতায় টানা খুব সহজ। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক যে অসন্তোষ তার সুযোগ নিচ্ছে ইসলামপন্থি জঙ্গিরা। এ সুযোগে তারা পুনর্গঠিত হচ্ছে। জঙ্গি কর্মকাণ্ডকে দমন করার চেয়ে সরকারবিরোধী কর্মীদের দমনে বেশি সময় ব্যয় করছে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলীয় জোট বর্জন করায় শেখ হাসিনা সরকারের বিষয়ে কিছু পশ্চিমা দেশের খুঁতখুঁতানি আছে। বছরের প্রথম তিন মাসে দেশের বেশির ভাগ অংশে ছিল অবরোধ। এ অবরোধ দিয়ে বিরোধীরা নতুন নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। এ অস্থিরতায় নিহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, জঙ্গি হুমকি অবজ্ঞা করা উচিত নয় বাংলাদেশের। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রয়োজন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

টাইমস স্কোয়ারে বিবস্ত্র নারী

নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার। সেখানে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের চলাফেরা। সেই ব্যস্ত এলাকায় অকস্মাৎ বিবস্ত্র দুই নারী। তারা শরীরের উপরিভাগে কিছুই পরেন নি। কাপড়ের পরিবর্তে সেখানে লাল, সাদা আর নীল রঙ ব্যবহার করে আঁকাআকি করা হয়েছে। পরণে কাপড় বলতে ইংরেজিতে যাকে থংস বলে তাই। পায়ে হাই হিল।  চারপাশের অসংখ্য মানুষ হা করে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না। তারা অবলীলায় ২ বছরের কোন শিশুর সঙ্গে সেলফি দিচ্ছে তো আবার ছবি তুলছে। নারী , পুরুষ, ছেলেবুড়ো এগিয়ে যাচ্ছে তাদের কাছে ছবি তুলতে। ব্যস অমনি ক্লিক। তাদের সঙ্গে ছবি উঠে যাচ্ছে উদ্ভট আচরণের ওই নারীর। তারা একজন দু’জন নয়, কমপক্ষে তিনজন। তবে বার্তা সংস্থার ক্যামেরায় এমন দু’জন নারীকে ধারণ করা হয়েছে। বিবস্ত্র ওই দু’ নারীর এক জন সাইরা নিকোল (২৯)। তিনি বলেছেন, তারা সবই করতে পারেন । কারণ, তারা তো আর সংবিধান পাল্টে দিচ্ছেন না! এর আগেও এমন হয়েছে। এই টাইম স্কোয়ারে উত্তেজিত কোন নারী হয়তো পথচারীকে জাপ্টে ধরেছেন। তার বাহু জড়িয়ে ধরছেন। এক পর্যায়ে তাকে বাধ্য করছেন চবি তুলতে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিও বলেছেন, একজন মানুষ ও একজন পিতা হিসেবে আমি বলবো নিউ ইয়র্কের ব্যস্ততম স্থানে এভাবে একজন নারী নিজেকে উন্মুক্ত বক্ষে তুলে ধরবেন। আর তাকে সমর্থন দিতে হবে। এটা যথার্থ নয়। নিউ ইয়র্ক সিটিতে এভাবে নিজেদের তুলে ধরতে পারেন না একজন নারী। ব্যবসায়ী গ্রুপ টাইমস স্কোয়ার এলায়েন্সের প্রেসিডেন্ট টিম টম্পকিনস বলেছেন, এসব নগ্ন নারী আক্ষরিক অর্থে নারীদের কান্নার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। যদি আপনি তাদেরকে শরীর ঢাকার কথা বলেন তাহলে উল্টো হুমকি দেয়া হবে আপনাকে। সিটি কাউন্সিলম্যান কোরে জনসন বলেছেন, এক্ষেত্রে বিধিনিষেধ দেয়া দরকার। এর অর্থ এই নয় যে, এসব মানুষ টাইমস স্কোয়ারে যেতে পারবে না। কিন্তু মানুষের গাদাগাদি ও জননিরাপত্তার স্বার্থে তাদেরকে থাকতে হবে একটি চিহ্নিত বা বিশেষায়িত এলাকায়।

নিখোঁজ সাংসদ, এলোপাতাড়ি মন্ত্রিকুল by শাহদীন মালিক

প্রায়ই মাননীয় মন্ত্রিকুলের বক্তব্যে আমরা যেকোনো ইস্যুর ভিন্ন ভিন্ন দিকের ব্যাপারে আলোকিত হয়ে হরহামেশা পুলকিত হই। নিকট অতীেত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল টক শোগুলোতে কোনো একটা বিষয়ে বা ইস্যুতে আলোচনা করার জন্য টক শো ভেদে দু-তিন-চারজনকে ডাকত। অংশগ্রহণকারীরা কেউ সাংবাদিক, কেউ বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এনজিও কর্মকর্তা ইত্যাদি। এই হরেক গোছের অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত তুলে ধরতেন। আইনজীবীরাও সুযোগ পেতেন, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও মাঝেমধ্যে সামরিক কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী—সবাই থাকতেন ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলের বিভিন্ন টক শোতে। মতবিরোধ হতো, বাহাস হতো, দু-চারবার গালমন্দও যে হয়নি তা-ও নয়। সব হয়েছে। ধারণা হয়, টক শোগুলো বেশ ‘পপুলার’ হয়ে উঠেছিল।
টক শোতে অংশগ্রহণকারীর ভিন্ন ভিন্ন মতামতের প্রভাব—ধারণা হয়—মন্ত্রিকুলের ওপর আছর করেছে। টক শোর অংশগ্রহণকারীরা যেহেতু একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিতেন, তর্ক-বিতর্ক-বাহাস করতেন এবং মতানৈক্যের কারণেই তাঁদের পপুলারিটি—এই চিন্তা থেকেই পপুলার হওয়ার জন্যই বোধ হয় মন্ত্রিকুল একই বিষয়ে বিভিন্ন মতামত বিশ্লেষণ জাতিকে উপহার দিচ্ছেন।
অধমের এই মূল্যায়নের ভিত্তি হলো ইদানীং দুই বিদেশি হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, সে ব্যাপারে মাননীয় মন্ত্রিকুলের মতামত ও বিশ্লেষণ। টক শোগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা কস্মিনকালেও যেমন একে অপরের সঙ্গে একমত হতে চাইতেন না, তেমনি আজকাল মন্ত্রিকুলও বোধ হয় পণ করেছেন ভিন্নমত পোষণ করবেনই। একজন যদি বলেন যে আইএস আছে, তো অন্যজন বলেন নেই। কেউ বলেন বিদেশি জঙ্গি, আর কেউ বলেন দেশি। কারও মতে গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, কারও মতে দেশীয় চক্রান্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন, সাবেক এক প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে দেশকে অস্থিতিশীল ইত্যাদি করার জন্য—ইত্যাদি।
বলা বাহুল্য, আগের টক শো আর নেই। মন্ত্রীরাই তো তার্কিকের জায়গা নিয়ে নিয়েছেন। যেহেতু মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনলেই আপনি যেকোনো ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ পাবেন, তাই আজকাল টক শো দেখা কমে গেছে। চ্যানেলওয়ালারাও সেটা টের পেয়েছে। তাই টক শোগুলোতে আজকাল মতৈক্যই বেশি। কেউ হয়তো সরকারি দলের কট্টর সমর্থক, কারও সমর্থন কিছুটা প্রচ্ছন্ন। অতটা প্রকট না। এই সুযোগে মাননীয় মন্ত্রিকুলকে গায়ে পড়ে একটু সাবধান করে দিই। টক শোগুলোতে আজকাল যে নির্জলা-নির্ভেজাল তোষামোদি হয়, তাতে একটু খেয়াল রাখবেন ওই টক শোওয়ালারা আপনাদের না আবার গদিশূন্য করতে লেগে পড়ে।
প্রশ্ন জাগে, আপনারা কেমনে জানলেন, কারা এই দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখে রা নেই। ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে কুল্লে চার দিন পরেই নিস্তার। ১০ দিন রিমান্ড শেষে আরও রিমান্ড চাওয়াই যেখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে বিদেশি হত্যায় চার দিনেই রিমান্ড শেষ।
সচরাচরের মতো এবং অন্য সরকারগুলোর সময়ের মতো যেসব মন্ত্রী বেশি সবজান্তা, তদন্তের ভার তাঁদেরই নেওয়া উচিত। বিদেশিরা নিঃসন্দেহে শঙ্কিত। বিভিন্ন রঙের অ্যালার্ট তাঁরা জারি করে বসে আছেন। বায়াররা বিদেশে মিটিং ডাকছে। অধম ধানমন্ডিতে মিটিং ডাকলাম, গুলশান থেকেই আসতে চায় না। বলে, এখন বারণ আছে। সেটা ছিল বিজিবি নামার আগে। ধারণা করছি, জানালার পর্দা সরিয়ে টহল যান একেবারে তাঁদের গুলশান-বারিধারার অ্যাপার্টমেন্টের জানালার নিচে দেখে তারা ধানমন্ডি তো নয়ই, হয়তো হজরত শাহজালালমুখী হবেন। খোদ রাজধানীতে দিনদুপুরে সান্ত্রিবাহী বিরাট বিরাট গাড়ি দেখে তাঁরা যদি ভাবেন যে এই যুদ্ধ-যুদ্ধ দেশে থাকা নিরাপদ নয়, তাহলে অন্তত অধম তাঁদের দোষারোপ করব না। আর বিদেশি গণমাধ্যমে রাজধানীর গুলশান-বারিধারায় যদি সামরিক পোশাকে বিজিবির টহল দেওয়ার ‘ফুটেজ’ প্রচারিত হয়? পরিণতি পাঠকেরাই সহজে অনুমান করতে পারবেন।
২.
টক শোগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা কস্মিনকালেও যেমন একে অপরের সঙ্গে একমত হতে চাইতেন না, তেমনি আজকাল মন্ত্রিকুলও বোধ হয় পণ করেছেন ভিন্নমত পোষণ করবেনই। একজন যদি বলেন যে আইএস আছে, তো অন্যজন বলেন নেই। কেউ বলেন বিদেশি জঙ্গি, আর কেউ বলেন দেশি সরকারদলীয় সাংসদ, স্পষ্টতই অপরাধে অভিযুক্ত—তাঁকেই পুলিশ খুঁজে পায় না বেশ কিছুদিন ধরে। গোলাগুলি করা তাঁর নাকি বেশ কিছুকালের অভ্যাস (‘সামান্য ঘটনায় গুলি করা তাঁর স্বভাব’ শিরোনামে ১১ অক্টোবর, ২০১৫-এর প্রথম আলোর তৃতীয় পৃষ্ঠার খবর দ্রষ্টব্য)। যেহেতু মাননীয় সাংসদ, সেহেতু পুলিশের কাছে তাঁর নাম-ঠিকানা, ছবি, ফোন নম্বর—সবই থাকার কথা। তা-ও তারা পাচ্ছে না। অবশ্য ইতিমধ্যে অনেক সংবাদকর্মীই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। অনেকেই জানেন। জানে পুলিশ।
গ্রেপ্তার না করার সম্ভাব্য কারণ তিনটি। প্রথমত, অদক্ষতা। খুঁজেই পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, পেয়েও গ্রেপ্তার করছে না—আর্থিক বা অন্য কোনো তদ্রূপ কারণে। তৃতীয়ত, ‘রাজনৈতিক নির্দেশ’ নেই। কারণ, এক বা একাধিক যেটাই হোক, জনমনের নিরাপত্তার জন্য কোনো কারণই আস্থার সৃষ্টি করে না। অদক্ষ পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না। অথবা দক্ষতা থাকলেও তারা যদি আর্থিক অথবা রাজনৈতিক কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে অর্থ বা রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকা জনগণের জন্য পুলিশ সহায়ক নয়।
আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতন তো আছেই। বিদেশি হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা হবে বলে অধম আশাবাদী নয়। বলা বাহুল্য, এ হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা আমরা সবাই চাই। বিদেশিরাও আশ্বস্ত হবে, ভরসা পাবে, বিদেশিদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বহাল থাকবে। কিন্তু এত কিছু পাব কি এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে? তবে আশায় থাকতে দোষ কী।
৩.
বিভিন্ন জাতির হরেক গোছের আর্কাইভ থাকে। বর্তমানকাল ভিডিওর যুগ। সবার মুঠোফোনে আজকাল ভিডিওর সুব্যবস্থা আছে। তাই অধমের প্রস্তাব—আমরা একটি ঘুষের ভিডিও আর্কাইভ চালু করি। প্রথম আলো (৯ অক্টোবর, প্রথম পাতার খবর) বলছে, ‘গুনে গুনে ঘুষ খান তিনি’-এর ছয় মিনিটের ভিডিওটা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে, বিশেষত যাঁরা ঘুষ দেবেন, তাঁরা যদি তাঁদের ঘুষ প্রদানের ভিডিও চিত্র গ্রহণ করেন এবং আপাতত সেটা কখন কীভাবে দেখা যাবে, সে খবর প্রচার করেন, তাহলে ‘বক্স অফিস হিট’ না হলেও উৎসাহী দর্শকের কমতি হওয়ার কথা নয়।
বলা বাহুল্য, এরূপ ভিডিও সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে আদালতে পাত্তা পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যল্প। মাঝপথে আছে দুদক নামক প্রতিষ্ঠান, সেই প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে ঘুষ-দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ ঘুষ নেওয়া-দেওয়ার ভিডিওটা নেহাত আর্কাইভে সংরক্ষণের জন্য।
তবে হ্যাঁ, যদি এ দেশে কখনো আইন, বিচার ইত্যাদি ফেরত আসে, ঘুষ-দুর্নীতি আবার খারাপ বলে বিবেচিত হয়; দুদক সাফাই সার্টিফিকেট দেওয়ার পরিবর্তে ঘুষখোরদের সন্ধান করে, নির্বাচন কমিশন আসলেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১৫-১৬ বছরের অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিবর্তে ভোটার তালাশ করে, ইত্যাদি ইত্যাদি যদি হয়, তখন নাহয় ভিডিও দেখে ঘুষখোর খোঁজা হবে।
আইনের শাসন আর গণতন্ত্র ছাড়া পৃথিবীর দু-তিনটি দেশে উন্নতি হয়েছে। আর তাই দেখে গত ৫০ বছরে শ খানেক দেশ আইন আর গণতন্ত্র ছাড়াই উন্নতি করার পথ ধরেছিল। হয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, কঙ্গো, রুয়ান্ডা, নাইজেরিয়া, সুদান—অগায়রা, অগায়রা। প্রায় কেউই পারেনি। আমরা কি পারব উন্নতি করতে? আইন অমান্যকারী সাংসদেরা কি ধরা পড়বেন?
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

‘গুনে গুনে ঘুষ নেওয়া’—বিস্ময়ের কিছু নেই by আলী ইমাম মজুমদার

প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ঢাকার নিয়ন্ত্রক, অফিসে বসে ঘুষ নিয়ে দর-কষাকষি এবং গুনে টাকা নিয়ে পকেট বোঝাই করার একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে। সংবাদ সূত্র থেকে জানা যায়, সবুজ কার্পেটে আচ্ছাদিত সরকারি এ কক্ষে বসেই ঘুষের কারবার চালাচ্ছেন তিনি। পাঁচটি ভিডিওচিত্রে ঘুষ গ্রহণের এ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে যাঁর সুযোগ আছে, তাঁদের একটি বড় অংশই অবৈধভাবে টাকা নিয়ে থাকেন। এটা অনেকটা খোলামেলা বিষয়। তাই খবরটি অভিনব নয়। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এরূপ না হলে আমরা পৃথিবীর বহুল দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হতাম না। পরপর পাঁচবার তো শীর্ষেই ছিলাম। সূচকের কিছুটা উন্নতি হলেও তা উল্লেখ করার মতো নয়।
তবে এভাবে অবৈধ লেনদেনের ভিডিওচিত্র ধারণ অভিনব বটে। যাঁরা এটা করেছেন, তাঁদের নৈতিকতা বা সরকারি অফিসের নিরাপত্তাভঙ্গের বিষয়ে হয়তো কথা বলা যাবে। তবে এটা করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশের চলমান সংস্কৃতির দিকটি নতুনভাবে তুলে ধরে তাঁরা প্রশংসার কাজ করেছেন বলেই ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। চোখে আঙুল দিয়ে তাঁরা দেখিয়ে দিলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের কোন কোন কর্মকর্তা কী করছেন! কতটা দুঃসাহসী হলে একজন কর্মকর্তা এমন পর্যায়ে যেতে পারেন, তা–ও ভাবনার বিষয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার বলে মন্তব্য করেছেন। তবে অন্যরা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে ঘুষ নিতে প্রেরণা দেবেন কেন, এটা দুর্বোধ্য। আর টাকা তো তিনি নিজ পকেটেই নিলেন। ভিডিওচিত্র ও কথোপকথন এ বিষয়ে অনেকটা পরিষ্কার ধারণাই দেয়।
আরও জানা যায়, তিনি এমনটাই করে থাকেন। তাঁর অতীত চাকরিজীবনেও শৃঙ্খলাবহির্ভূত কাজের জন্য তাৎক্ষণিক বদলি হয়েছেন একাধিকবার। হতে পারে ভুক্তভোগীরা সেই অফিসের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় এ ভিডিও করতে সক্ষম হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কিছুটা অনিয়মতান্ত্রিক পথে হলেও ঘটনাটি জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য তো তাঁদের সাধুবাদই দিতে হবে। যেমনটা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন উইকিলিকস–খ্যাত জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কিংবা সিআইএর সঙ্গে একসময়ে সংশ্লিষ্ট এডওয়ার্ড স্নোডেন। তাঁদের বিপক্ষে অনেক কথা বলা হলেও ফাঁস করা তথ্য কোনোটি অসত্য—এমনটা কেউ বলছেন না। এসব তথ্যের অনৈতিক দিকগুলো নিয়েও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নীরব। সুতরাং, সত্যিকারের ঘটনা যদি কিছুটা অনিয়মতান্ত্রিকভাবেও নজরে চলে আসে, তবে যাঁরা তা আনলেন, তাঁদের দায়ী করা অনৈতিক। বিবেচ্য ক্ষেত্রে কারা ভিডিও করলেন আর কীভাবে, সেদিকে নজর না দিয়ে ভিডিওতে আসা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়াই যৌক্তিক।
আলোচনা প্রাসঙ্গিক যে আলোচ্য আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জানা যায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটির প্রতিবেদনও দ্রুত পাওয়া যাবে, এমনটাই বলা হচ্ছে। আর ওই প্রতিবেদন ভিন্ন দিকে যাওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। প্রতিবেদনের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে সেই কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত ও বিভাগীয় প্রসিডিং করা হবে, এমনটাই বলেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। ঘটনার প্রকৃতি এরূপই দাবি করে। এ ক্ষেত্রে একটি কঠোর বার্তা যত দ্রুত সম্ভব দেওয়া উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) এখানে সংশ্লিষ্ট করা যেতে পারে। কোনো দেশেই সব অপরাধী চিহ্নিত হয় না। আর আমাদের দেশে তো নয়ই। তারপরও অনেক অপরাধী আইনের ফাঁকে পার পেয়ে যায়। এমনটা যাতে এ ক্ষেত্রে না হতে পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার যত্নশীল হওয়া আবশ্যক।
বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন জাগে, কেন এমনটা হচ্ছে? বিভিন্ন অফিস-আদালতে দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না। এই মিছিলে যোগ দিয়েছে বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশও। ফলে পূর্ণ হয়েছে ষোলোকলা। সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি যাদের নজরদারি করার কথা, তারাও এর অংশীদার হয়ে গেলে ভয়ভীতি আর থাকে না। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদককে অনেক শক্তিশালী করে ঢেলে সাজানো হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সর্বত্রই কোথাও না কোথাও গলদ থেকে যায়। পার পেয়ে যাচ্ছেন প্রকৃত দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা। দায়মুক্তি নামক একটি প্রশাসনিক পরিভাষা সাম্প্রতিক কালে চালু হয়েছে এ মহলে। প্রকৃতপক্ষে বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের উৎসাহিত করছে।
আমদানি-রপ্তানির যে নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আমাদের চলমান সংস্কৃতি অনুসারে কোনো কোনো পদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাকে তাঁর পক্ষে নিতে সচেষ্ট হতে পারেন। হয়তো হবেনও। দুদকেও তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী জুটে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বিভাগীয় মামলা খুব দ্রুত না–ও চলতে পারে—এরূপ আশঙ্কা কেউ কেউ অসমীচীন ভাবতে পারেন অবৈধ আয় ও সম্পদ সম্পর্কে দুদকের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেরও দেখার কথা। তারাও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র বছাড়া এ ব্যাপারে কোনো আগ্রাসী ভূমিকায় আছে, এমনটা বলা যাবে না। যে সমাজে অবৈধ অর্থ অর্জন ও ভোগে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই, সেখানে দুর্নীতি হওয়াই স্বাভাবিক। যাঁরা ভালো আছেন, তাঁরা তা আছেন নিছকই উঁচু মূল্যবোধ থেকে। আবার তাঁদের কেউ কেউ সুযোগ নেই বলেও দুর্নীতি করতে পারছেন না। জ্ঞাত আয়ের উৎস নেই বা আয় সীমিত অথচ বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন, এমন অনেকেই আছেন আমাদের সমাজে। তাঁরা শুধুই রাজনৈতিক নেতা-কর্মী নন; বেশ কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও আছেন সেই মিছিলের শরিকদার। আছেন অন্যান্য পেশা বা পেশাবিহীন কেউ কেউ। এ কাফেলায় যাঁরা নেই, ক্ষেত্রবিশেষে তাঁরা নাজেহাল হন। কেউবা চিহ্নিত হন অক্ষম বলে। অথচ রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো অপরাধীর দণ্ডবিধানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। উল্লেখ্য, দণ্ড দেন আদালত। কিন্তু আদালতের কাছে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্তৃপক্ষেরই। এই আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে আমাদের দেশেও একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন। দণ্ড বহাল ছিল সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। এটা সম্ভব হয়েছিল রাজনৈতিক প্রত্যয়ের জন্য। উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা হয় আদালতে। মামলা পরিচালনা করা হয় নিষ্ঠার সঙ্গে। ফলে অপরাধী দণ্ডিত হয়েছেন।
দুর্নীতি আমাদের সমাজের সব স্তরেই অবস্থান নিয়েছে। বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এটা ব্যাপক গতি লাভ করতে থাকে। আর সেই গতি আজও অপ্রতিরোধ্য। এ বিষয়ে বিভিন্ন সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেও সফল হয়নি। এ সরকারও দিনবদলের সনদে একই অঙ্গীকার করেছে অনেক জোরদারভাবে। কিছু বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কোনো কার্যক্রম এখনো দৃশ্যমান নয়। অবশ্য বিষয়টি রাতারাতি সমাধানের নয়। তবে শুভ সূচনার জন্য সময় অনেক চলে গেছে। ইন্দোনেশিয়া দুই দশক আগেও দুর্নীতির জন্য কুখ্যাত রাষ্ট্র ছিল। সেখানে আমাদের দুদকের মতোই একটি প্রতিষ্ঠান এ সময়ে সমাজচিত্রে, বিশেষ করে প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। গভর্নরসহ বহু পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের হাতে। দণ্ডিত হয়েছেন আদালত কর্তৃক। তাহলে আমাদের এখানে এটা সম্ভব নয়, এমনটা বলা যাবে না। চাইলে অবশ্যই সম্ভব।
আমদানি-রপ্তানির যে নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আমাদের চলমান সংস্কৃতি অনুসারে কোনো কোনো পদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাকে তাঁর পক্ষে নিতে সচেষ্ট হতে পারেন। হয়তো হবেনও। দুদকেও তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী জুটে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বিভাগীয় মামলা খুব দ্রুত না–ও চলতে পারে—এরূপ আশঙ্কা কেউ কেউ অসমীচীন ভাবতে পারেন। কিন্তু বিরাজমান পরিপ্রেক্ষিতে অস্বাভাবিক মনে করার কোনো কারণ নেই। ঘটনাটি গোটা দেশবাসী দেখল এবং জানল। দেখলেন সৎ ও অসৎ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী। এমন ক্ষেত্রেও যদি দ্রুত উচিত দণ্ডবিধান না হয়, তবে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা পাবেন সবুজসংকেত। হতাশ হবেন সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হবেন সমাজসচেতন নাগরিক। সেই কর্মকর্তা যে কাজ করেছেন, তাঁর প্রতি এ বিষয়ে সহানুভূতি দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। এটাকে বিবেচনায় নিয়ে সব আশঙ্কাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের প্রতি একটি লালসংকেত দেবে, এমন দাবি স্বাভাবিক। ঘটনাটিতে আমরা বিস্মিত হইনি। আবার এত সবের পরেও তিনি যদি পার পেয়ে যান, তাতেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। তবে থাকবে ক্ষোভ ও হতাশা। প্রত্যাশা রইল, এমনটা ঘটবে না।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

রাজধানীর এ কী হাল by খালিদ সাইফুল্লাহ

বৃষ্টিতে গতকাল নয়াপল্টন থেকে ফকিরেরপুলমুখী
সড়কে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এতে যানবাহন ও
পথচারীদের পোহাতে হয় দুর্ভোগ : নাসিম সিকদার
অসময়ের হঠাৎ বৃষ্টিতে জনজীবনে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। সিটি করপোরেশন, ওয়াসার নানা পরিকল্পনা ও যন্ত্র আনার গল্প নগরজীবনে উন্নতির কোনো ছাপ ফেলতে পারছে না; বরং চিরচেনা দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। বৃষ্টির পানির সাথে ড্রেনের দুর্গন্ধময় পানি একাকার হয়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি। বৃষ্টির সাথে যানজট একে অপরের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। আধা ঘণ্টা পথ অতিক্রম করতেই পার হয়ে যাচ্ছে তিন ঘণ্টা। তবে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের দাবি গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কোথাও পানি জমেনি।
এ বছর এমনিতেই পুরো বর্ষা মওসুম জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তার ওপর আশ্বিনের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করেই মওসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সোমবারের পর গতকালও সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কখনো হালকা আবার কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আর এতেই রাজধানীর চিরচেনা রূপ আবারো হাজির হয়েছে। যে সড়কেই যাওয়া যায় সেখানেই পানি জমে রয়েছে। ড্রেন তো আগেই ভর্তি ময়লা আবর্জনায়, তাই বৃষ্টির পানি যাওয়ার কোনো পথ নেই। এ কারণে এক একটি সড়কই যেন পরিণত হয়েছে বড় ড্রেনে। অলি-গলি থেকে মূল সড়ক সর্বত্রই পানি থই থই করছে। এতে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে।
সরেজমিন দেখা যায়, কাকরাইল, শান্তিনগর, বিজয়নগর থেকে ফকিরাপুল-আরামবাগ-মতিঝিল এলাকায় সড়কে হাঁটু পানি জমে। এতে যানবাহন আটকে পড়ে। সৃষ্টি হয় যানজটের। জলাবদ্ধতার কারণে অনেকগুলো সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে। অটোরিকশা পরিবর্তন করে অনেককে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে। মগবাজার, মৌচাক হয়ে মালিবাগ রেলগেট, রামপুরা ব্রিজ, মেরুল বাড্ডা, মধ্যবাড্ডা এলাকায় হাঁটু পানি জমে যায়। জমে যাওয়া পানির কারণে অটোরিকশা ও অন্য যানবাহন রাস্তায় আটকে পড়ে। মধ্যবাড্ডায় রাস্তার ওপর ময়লার ভাগাড় পানিতে মিশে সড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দেয়।
মালিবাগ থেকে রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর সড়কেও পানিতে থই থই করতে থাকে। নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর থেকে বারিধারা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এতে যানবাহন আটকে পড়ে। দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। রিকশায় বাড়তি ভাড়া দিয়ে অনেককে অফিস ও কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে। উত্তরার এয়ারপোর্ট সড়ক, জসীমউদ্দীন রোড, গুলশান-বনানী, মহাখালী ফাইওভারের নিচে, আইসিসিডিডিআরবি থেকে মহাখালী বাসস্টান্ড পর্যন্ত হাঁটু পানি জমে যায়। পানির সাথে রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা মিলে দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা।
কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকার সব সড়ক ও স্টেশনের প্রবেশমুখ হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়। পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ায় যাত্রীরা চরম বিড়ম্বনার শিকার হন। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে সদরঘাট টার্মিনাল পর্যন্ত, ঢাকা মেডিক্যালের সামনে রাস্তা, গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারের সামনে পানি জমে যায়। মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে বৃষ্টির পানি দেখা যায়। বৃষ্টির পানিতে নিউমার্কেটের নিচতলার অধিকাংশ দোকানপাট তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও হাঁটু পানি উঠে যায়। নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এ মার্কেটের বহু দোকানিকে বৃষ্টি থেকে তাদের জিনিসপত্র রার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাথের হকারদের দোকানপাটও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। সাইন্স ল্যাব থেকে নিউমার্কেট হয়ে বলাকা পর্যন্ত এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন ক্রেতা, বিক্রেতা ও যাত্রীরা। শহীদ মিনার এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন সড়কও পানিতে তলিয়ে যায়। তৌহিদুর রহমান নামে এক রিকশাযাত্রী জানান, রাস্তায় পানি থাকায় চলতে গিয়ে ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হয়। কোথায় গর্ত আছে তাও বোঝা যায় না। এজন্য অনেক সাবধানে চলতে হয়েছে। আবার অনেকে সাবধান হলেও চোরা গর্তে পড়ে রাস্তায় কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে গেছেন।
সড়কে পানি জমে যাওয়ায় গণপরিবহন, রিকশাসহ সব ধরনের যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। যানজটে পড়ে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে যাত্রীদের। রেজা করিম নামে এক যাত্রী জানান, মগবাজার থেকে ৬ নম্বর বাসে পল্টন আসতেই তার তিন ঘণ্টা লেগে গেছে।
জলাবদ্ধতা দূর করতে দুই সিটি করপোরেশন সম্প্রতি দফায় দফায় মতবিনিময় সভা করেছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা শোনা গেছে। উত্তর সিটি করপোরেশন সম্প্রতি ঘটা করে জেড অ্যান্ড সাকার মেশিন নিয়ে এসেছে। যা দিয়ে খুব দ্রুত পানি অপসারণ করা যায় বলে তাদের দাবি। কিন্তু এসব কিছুই কাজে আসছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টির পানি জমে থাকছে বিভিন্ন সড়কে। তবে এটি মানতে চান না উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হক। তার দাবি বৃষ্টি হলেও উত্তর সিটির কোথাও গতকাল পানি জমেনি। একই ধরনের অভিমত ঢাকা ওয়াসারও। ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল আলম চৌধুরী জানান, গতকাল রাজধানীর কোনো সড়কেই পানি জমেনি। পাম্পের মাধ্যমে পানি অপসারণ ছাড়াও ওয়াসার কর্মচারীরা পানি অপসারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ায় পানি জমতে পারেনি বলে তার দাবি।

ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভের মুখে ইসরাইল চলে গেলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি

ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি মঙ্গলবার বিক্ষোভের মুখে স্কুল উদ্বোধন না করেই ফিলিস্তিন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। পূর্ব জেরুজালেমের আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শন করার সময়ে শত শত ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনি ছাত্র প্রণবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। ভারতের সঙ্গে ইহুদিবাদী ইসরাইলের ক্রম বর্ধমান বন্ধুত্বের বিরুদ্ধে এ বিক্ষোভ করা হয়।
বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের হাতে যে সব প্ল্যাকার্ড ছিল তাতে লেখা ছিল, ‘দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে কেনো সহযোগিতা করছে ভারত’, ‘ইহুদিবাদী ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলুন ভারতের প্রেসিডেন্ট’, ‘নির্মমভাবে ফিলিস্তিনিদের হত্যার বিরুদ্ধে চুপ থাকবেন না ভারতের প্রেসিডেন্ট।’ একই সঙ্গে বিক্ষোভরত ছাত্ররা ইহুদিবাদী ইসরাইলকে বয়কট করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানায়। পূর্ব জেরুজালেম ইসরাইলি সেনাদের হাতে ছাত্র হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকে বিক্ষোভকারীরা।
এর আগে তিনি আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ প্রযুক্তি কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পক্ষ থেকে সম্মানসূচক নাইট অব পিস ডিগ্রিতে ভূষিত করা হয়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু’র নামে একটি স্কুল উদ্বোধনের কথা থাকলেও ছাত্র বিক্ষোভের কারণে সৃষ্ট প্রচণ্ড উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রণব মুখার্জি। পরে তিনি সড়ক পথে ইসরাইল চলে যান। ইসরাইল সফরকারী প্রথম ভারতীয় প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি । বৃহস্পতিবার হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করবে বলে কথা রয়েছে।
ইসরাইল সফরে ভারতের রাষ্ট্রপতি
ভারত ও ইসরাইলের সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী আজ থেকে তার ঐতিহাসিক ইসরাইল সফর শুরু করেছেন।
এই প্রথম ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতা ইসরায়েলে গেলেন, আর এই সফরে মুখার্জী সে দেশের পার্লামেন্ট নেসেটেও ভাষণ দেবেন।
এই একই সফরে একটা দিন ফিলিস্তিনকেও বরাদ্দ করে ভারত যদিও তার পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে, পর্যবেক্ষকরা বলছেন ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করার ক্ষেত্রে ভারতের যে আর কোনো দ্বিধাই নেই রাষ্ট্রপতির সফর তারই প্রমাণ।
আরব লীগের বাইরে বিশ্বের প্রথম যে দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তারা ভারত। ফিলিস্তিনি আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসের আরাফতের সঙ্গেও ভারতীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতা ছিল সুবিদিত।
কিন্তু ১৯৯২তে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই প্রতিরক্ষা-কৃষি-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি থেকে শুরু করে জঙ্গী দমন নানা ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা বেড়েছে – আর অন্যদিকে ধীরে ধীরে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে ভারত-ফিলিস্তিনের সম্পর্কে।
এ বছরের গোড়ায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ভোটাভুটিতেও প্রথমবারের মতো বিরত থেকেছে ভারত। আর এমন এক পটভূমিতেই মঙ্গলবার ইসরাইলে তার সফর শুরু করেছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি (ইস্ট) অনিল ওয়াধওয়া-র কথায়, ‘ভারত ও ইসরাইল উভয় দেশই তাদের জন্মলগ্ন থেকে মানবসভ্যতা ও ইতিহাসে স্থায়ী দাগ রেখে গেছে। ভিন্ন পথে হলেও দুদেশের স্বাধীনতাও প্রায় একই সঙ্গে, আর তাদের দেশগঠন আর গণতন্ত্রের পথে যাত্রাও শুরু একই সময়ে। এই দুই দেশই তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রতিরক্ষা, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ওপর ভীষণ গুরুত্ব দিচ্ছে।’
জেরুসালেমে আজ রাষ্ট্রপতি মুখার্জী দেখা করছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-র সঙ্গে, কাল তার বৈঠক সে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। সফরে দুই দেশের মধ্যে অজস্র সমঝোতা স্বাক্ষরিত হবে বলেও কথা রয়েছে।
ইসরাইলে তিনি কাটাচ্ছেন প্রায় তিনদিন, সেখানে ফিলিস্তিনে ছিলেন মাত্র একটা দিন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব বা মুখপাত্র বেণু রাজামণি বলছিলেন প্রথম কোনো ভারতীয় নেতা হিসেবে এই দেশগুলোতে এক ঐতিহাসিক সফরে যেতে পেরে রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত আনন্দিত।
‘ব্যক্তিগতভাবেও তার আগে কখনো ওই অঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ইসরায়েলের পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়া বা সে দেশের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময় ছাড়াও হিব্রু ইউনিভার্সিটি তাকে সাম্মানিক ডক্টরেটে ভূষিত করবে’, জানান রাজামণি।
পর্যবেক্ষকরাও বলছেন রাষ্ট্রপতির এই সফর কোনো রুটিন বিদেশযাত্রা নয়, বরং ভারত-ইসরাইল সম্পর্কেই একটা পাকাপাকি সিলমোহর।

আওয়ামী লীগ কি ববীকাসিকে ছাড় দিতে যাচ্ছে? by বদিউর রহমান

রাজনীতি পাটিগণিত কিংবা জ্যামিতির সূত্র দিয়ে চলে না। রাজনীতি সুযোগ বুঝে সাহিত্য হয়ে পড়ে, তা কবিতাই হোক আর গল্পই হোক। রাজনীতিতে কে যে কখন কার দোস্ত বা প্রেমিক হয়ে পড়বেন, তা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো আগেভাগে সর্বদা আঁচ করা যায় না। তারপরও চলনে-বলনে কিংবা হাসিতে-কাশিতে মন যে কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে, তা বোধহয় পাকা-ঘুঘুরা কিছুটা হলেও বুঝে নেয়। অমরা অধমরা রাজনীতি তেমন বুঝি না, কিন্তু রাজনীতির হালহকিকতে আগ্রহী থাকি, কার হাঁড়ির ভাত কে কীভাবে খাচ্ছে বা খেতে চাচ্ছে তা দেখতে পারি। ক্ষমতার জন্য যদি নীতি একটু এদিক-সেদিক করতেও হয়, তা রাজনীতিতে বোধহয় অনৈতিক নয়। এ জন্যই তো বলা হয়ে থাকে যে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আরও বলা হয়ে থাকে, রাজনীতিতে কেউ চিরশত্র“ নয়, আবার কেউ চিরমিত্রও নয়। দেশ সেবার জন্য যে যখন যে নীতি অনুসরণ করে, যে দলে যায় তখন তার জন্য সে নীতি এবং সে দলই হবে উত্তম নীতি এবং উত্তম দল। মরহুম কিংবা জীবিত- ক’জন রাজনীতিকের উদাহরণ দেব? আজ এ-দলে তো কাল ও-দলে, পরশু না হয় নিজেরই একটা দল। বাংলাদেশে দলপতি বা দলবাজ হলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে না পারলেও ক্ষমতাসীন দল থেকে অন্তত কলাটা-মুলাটার সুযোগ নেয়া যায়, নাকি?
তা না হলে নাম না-জানা, লোক-না-থাকা এত এত দল হল কীভাবে?ব্যক্তিভিত্তিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক একজন্যা বা দু’জন্যা দলগুলোর সভাপতি বা চেয়ারম্যানকে জনগণের অনেকে হয়তো চেনেন। কিন্তু তার বা তাদের দলকে মানুষ প্রায় চেনেই না। গ্রামগঞ্জে যখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করি, তখন অনেক হাসির খোরাক জোটে। দলের শেষে লীগ শুনলেই সাধারণ মানুষ ভাবে ওই দলটা আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গসংগঠন, আর দলের শেষে দল থাকলে ভাবে ওটা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কোনো অংশ। তার মানেটা কী? মানে হচ্ছে সারা দেশে আওয়ামী লীগ (আলী) আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বাজাদ) ছাড়া অন্য দলকে মানুষ তেমন চেনেই না। এমন অচেনা-অজানা দলের কর্ণধারদের কিন্তু নামে চেনে অনেকে। এমন নামগুলোর মধ্যে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কর্নেল (অব.) অলি, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা (ব্যানাহুদা হিসেবে বেশি পরিচিত), ড. ফেরদৌস কোরেশী, ড. কামাল হোসেন, মেজর জেনারেল ইব্রাহীম, হাসানুল হক ইনু, আসম রব, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, রাশেদ খান মেনন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী (ববীকাসি) বীর উত্তম অন্যতম। ব্যক্তি-খ্যাতিতে তারা স্বনামধন্য। অবশ্যই বলা চলে জনগণের কাছে কমবেশি পরিচিত এবং সম্মানীয় তো বটেই।
কিন্তু তাদের দলের নাম জিজ্ঞেস করলে সাধারণ মানুষ বোঝে না, চেনে না; হাসে। কেউ কেউ, ওই যে আগে বললাম, আলী কিংবা বাজাদের অঙ্গসংগঠন হিসেবেই মনে করে ফেলে। আমি একবার ববীকাসির দল সম্পর্কে একজনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ও, বাঘা সিদ্দিকীর দল তো আওয়ামী লীগেরই অংশ। শেখ হাসিনার সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা একটি নাম দিয়েছে আর কী! কী জঘন্য, জ্বলজ্যান্ত একটা আলাদা দল ববীকাসির কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, অথচ বলে কিনা আওয়ামী লীগের অংশ! আরেকজন রাজনীতি সম্পর্কে বেশ সচেতন মনে হল, বললেন, বাঘা সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত; তাই বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের নামানুসারে তার দলের নাম রেখেছে। আমরা বাঘা সিদ্দিকীকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই নামে চিনি, তার সাহসে আমরা গর্বিত হই, শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার অকৃত্রিম প্রতিবাদ আমাদের অন্তরে তার জন্য আলাদা সম্মানের স্থান সৃষ্টি করে। কিন্তু বড় কষ্ট লাগে, তাকে আলাদা দল করার পর যখন গামছাওয়ালা বলেও কেউ কেউ ঠাট্টা-মশকরা করে। কিছুদিন আগে ফুটপাতে গামছা বিছিয়ে টাকা উঠানো নিয়ে তো হেসেছেই।
আমি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে তার বক্তৃতা শুনেছি। চমৎকার তার বাচনভঙ্গি, উন্নত তার শব্দশৈলী, সুনিপুণ তার বিষয়বস্তুর অবতারণা, সর্বোপরি সুবিন্যস্ত তার বিষয়ভিত্তিক কথামালা। আমার ভালো লেগেছে তার আলোচনার সময়ের মাত্রাজ্ঞানও। কিন্তু একজন বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধা ও কিংবদন্তিতুল্য বীর উত্তম হয়েও তিনি স্বাধীনতার পর সোনার বাংলা প্রকৌশলী সংস্থা (প্রা.) লিমিটেড নামে যে নির্মাণ সংস্থা গঠন করেছিলেন তা তার নিজের জন্য কল্যাণই বরং বহন করে এনেছে বলা যেতে পারে। তার নেতৃত্বাধীন এ প্রতিষ্ঠানের ‘অপকর্ম’ নিয়ে, ব্যর্থতা নিয়ে সচিত্র খবর পত্রপত্রিকায় এসেছিল। এমনও শুনেছিলাম, তার এ সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্তও করা হয়েছিল। তার সংস্থা অনেক সেতু অসমাপ্ত রেখে বদনাম কুড়িয়েছিল। আমি আগে এক লেখায় তাকে বঙ্গবীরের সঙ্গে ‘অসমাপ্ত সেতু বীর’ খেতাবে ভূষিত করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেছিলাম। অতি সম্প্রতি তিনি ‘কেন এমন হলো!’ শিরোনামে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ সেপ্টেম্বর; ১৫) এ প্রতিষ্ঠান গঠনের এবং ঋণের সুদ মাফ সম্পর্কিত পূর্ব খবরের ব্যাপারে তার নিজস্ব কিছুটা ব্যাখ্যা তুলেও ধরেছেন। তিনি বলেন যেমন চমৎকার, তেমনি লিখেনও রসালোভাবে, যদিও তার অনেক লেখাকেই আমি ‘হাবির মা কিস্সা’ রূপেই গণ্য করি। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরই ‘সময়ের প্রয়োজনে’ এ নির্মাণ সংস্থা গঠনের তার দাবি কি সর্বগ্রাহ্য বা সর্বজন-সমর্থিত হবে? কী এমন ‘সময়ের প্রয়োজন’ ছিল যে বাঘা সিদ্দিকীকে এমন একটা নির্মাণ সংস্থা গঠন করতে হবে? তার লেখার মধ্যে প্রায়ই তার কিছু না-পাওয়ার হতাশা উঠে আসে, যদিও তিনি প্রকাশ্যে ভাব দেখাতে চান যে তার কোনো ‘চাহিদা’ নেই। ‘৯ কোটি টাকা সুদ মাফ পেলেন কাদের সিদ্দিকী’- এর প্রতিবাদমূলক মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি কি প্রকারান্তরে তার না-পাওয়ার বেদনাকে আরও প্রকাশ্য করেননি? তা না হলে তার মতো স্বনামধন্য বীর উত্তম কীভাবে লেখেন ‘স্বাধীনতার পর আমি যদি মতিঝিলের কোথাও লক্ষণ রেখা টেনে দিতাম কার বাবার সাধ্য ছিল সে দাগ মুছে দেয়া? না, তেমন ক্ষমতা কারও ছিল না’? এত বড় স্পর্ধাপূর্ণ মন্তব্য ববীকাসিকে মানায় না। এমন মন্তব্য তাকে ‘ছোট’ করেছে, আমরা কষ্ট পেয়েছি। তার বড় করুণ মন্তব্য ‘এক সময় যারা আমার বোচকা টানতে স্বর্গসুখ অনুভব করত, এখন তাদের কত হাজার হাজার কোটি, ঢাকার এখানে ওখানে কত জায়গা-জমি। তারপরও তারা সৎ, আমরা অসৎ। তারা ভালো, আমরা খারাপ।’ আমাদের বড় ভাবায়, তার হতাশা যখন প্রকাশ্য হয়। আমরা যদি বলি, ববীকাসি, আপনিও তো নির্মাণ সংস্থাটা করেছিলেন হাজার কোটির মালিক হতেই, নয় কি? হয়তো আপনি সফল হতে পারেননি, অন্যরা পেরেছে। সময়ে বোচকা টানার লোকেরা মনিবও হয়, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। অয়োময় নাটকে জমিদার বাড়ি শেষতক কে কিনেছিল তা দেখেননি? আমরা বলব, স্বাধীনতার পর আপনারা দেশকে সঠিক পথে চালাতে চরম ব্যর্থ হয়েছিলেন বলেই এখন এত দুঃখ করতে পারছেন, নচেৎ এ সুযোগই বা কোথায় পেতেন?
এখন ববীকাসি একজন রাজনীতিক, একজন্যা দলের ‘পতি’ হলেও তিনি দলপতি। এবার তার সোনার বাংলার ৯ কোটি টাকা সুদ মাফে আমরা ঈর্ষান্বিত নই। হোক তার প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সুদ, তার ভাষায় তার ব্যক্তিগত নয়; কিন্তু সুদ তো মাফ হয়েছে, নাকি? অংকের হেরফেরের বিষয় হয়তো সমাধান হবে। সংশ্লিষ্ট ডিজিএম ‘অসত্য’ খবরের প্রতিবাদ না করলে ববীকাসি তার নামে মামলা করবেন মর্মে লিখেছেন। এগুলো তাদের বিষয়। কিন্তু আমরা ভাবছি, তাকে না হোক, তার সংস্থাকেই বা এ সুদ কেন মাফ করা হল? আচ্ছা, তাও হোক, কত হাজার হাজার কোটি টাকা কতভাবে লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, সে তুলনায় একজন বীর উত্তমের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান বিবেচনায় ৯ কোটি টাকা সুদ মাফ ‘তুচ্ছই’ বলা চলে। বীর উত্তমের দাবি বিবেচনা আমাদের জন্য স্বস্তিদায়কও বটে। ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনের সুরাহা তাদের হিসাবের এবং দাবির বিষয়। কিন্তু টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনের আগে এ সুদ মাফ কি অন্য কোনো রাজনৈতিক ছাড়? আলী কি লতিফ সিদ্দিকীর আসনে ববীকাসিকে ছাড় দিতে যাচ্ছে? এ সুদ মাফ কি তাকে নির্বাচনের জন্য সাফ-সুরত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ? ববীকাসি গত বছর ধরে যেভাবে শেখ হাসিনার প্রশংসায় এবং তোষণে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, শেখ হাসিনার তাকে লেখা চিঠি ফুটপাতেও প্রদর্শন করেছেন, ‘আলোর দিশা পেতে’ শেখ হাসিনার কাছে প্রতিকার কামনা করেছেন, তাতে আমরা বোধহয় আঁচ করতে পারছি যে আলী বোধহয় টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে ববীকাসিকে ছাড় দিতেও পারে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরুক, আলাদা সংসার করে হলেও, তাও মন্দের ভালো। তাহলে অন্তত মতিয়া-ইনুদের প্রতি হয়তো তার ক্ষোভ কিছুটা হলেও কমতে পারে। কিন্তু আমরা বলব, আলী যেন এতদ্বিষয়ে আবেগে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়। আলীকে ভাবতে হবে, ববীকাসিকে ছাড় দিলে আলীর আদৌ কোনো লাভ হবে কিনা। ববীকাসির লাভের জন্য আলী যেন ‘খাদে’ না পড়ে-সেটাই আমাদের কাম্য।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

৫৪ ধারায় আটকের পর কারাগারে ২২ বছর by মনির হোসেন

পাগল সন্দেহে ৫৪ ধারায় আটক হওয়ার পর ফজলু মিয়ার একে একে ২২ বছর কেটে গেল কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে। কবে মুক্তি পাবেন তা-ও তিনি জানেন না। অবশ্য ২০০২ সালে আদালতের বিচারক তাকে সুস্থ উল্লেখ করে জামিন দেন এবং বাড়ি পৌঁছে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও জেল সুপারকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এরপরও আইনি মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে তার মুক্তির প্রক্রিয়া।
কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার মুক্তি পেতে আইনগত কোনো বাধা নেই। স্ত্রী, নিকটাত্মীয় কেউ এলেই তার জিম্মায় তাকে মুক্তি দেয়া সম্ভব। কিন্তু ফজলুর পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সাথে নানাভাবে যোগাযোগের পরও কেউ তাকে নিতে আসছে না। যার কারণে সবকিছু ঠিক থাকার পরও তাকে মুক্তি দেয়া যাচ্ছে না। কারাগারে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত ফজলুকে ১৯৫ বার আদালতে তোলা হয়।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ফজলু মিয়ার সাথে সাক্ষাৎ ও এ মামলা-সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
অভিযোগ রয়েছে, ফজলু মিয়ার পালিত বাবা গোলাম মওলার কোনো সন্তান নেই। গোলাম মওলা ও তার স্ত্রী মারা গেছেন। এখন তার এক ভাগিনা রয়েছেন। তিনি বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (ওএসডি) । রহস্যজনক কারণে তিনি ফজলুকে চেনেন না বলে কারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন। যার কারণে বছরের পর বছর ফজলু মিয়াকে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে। এতে এক দিকে যেমন তার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্য দিকে আইনের শাসনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
এ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করা হয় ২০০৫ সালে। পরে আদালতের নির্দেশের পর ফজলু মিয়ার মুক্তির প্রক্রিয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। সিলেট কারা হাসপাতালের সহকারী সার্জন তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনা জেলা কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। পরে সেখান থেকে আবার তাকে ফিরিয়ে আনা হয়।
সহকারী সার্জন তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বন্দী ফজলু মিয়া সিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগছেন। তাকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের পরামর্শ মতে ওই কারাগারে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এবং ফলোআপ করানো হচ্ছে। ইতঃপূর্বে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আদালতের নির্দেশে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে তার অবস্থা ভালো। প্রতিবেদন দেয়ার পরও কেটে গেছে আরো ১০ বছর; ফজলু মিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কোনো সমাধানে আসতে পারেনি কারা কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর সিলেটে জেলা ও দায়রা জজের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইন ও পরিকল্পনা)। সেখানে ফজলু মিয়ার বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেলখাটার বিষয় উত্থাপন করে সিলেট কারা কর্তৃপক্ষ। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ ফজলুর পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে তার এলাকাবাসী, আত্মীয়স্বজন, সমাজসেবা অধিদফতর, পাবনা মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিøষ্টদের সাথে যোগাযোগ শুরু করে।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে খোঁজ নিতে গেলে এ প্রতিবেদকের সাক্ষাৎ হয় ফজলু মিয়ার। একসময়ের টগবগে যুবক ফজলু মিয়া এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। কথা বললে মুখ দিয়ে বের হয় লালা। মাথায় টুপি। কাউকে দেখলেই ফজলু হাত তুলে আগে সালাম দেন। ফজলুর কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল আপনি কি পাগল? জবাবে ফজলুর সোজা উত্তরÑ না আমি পাগল না। যারা আমাকে পাগল বলে তারা মিছা কথা বলে। পিতার নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, সৈয়দ গোলাম মওলা (পালক)। মাতার নাম নয়ন মনি। স্ত্রী, সন্তান আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সন্তান নেই। দুই স্ত্রী ছিল। একজনের নাম লাইলী বেগম, আরেকজন হোসনে আরা। আমার সাথে তারা বেঈমানি করায় দুইজনকে ছেড়ে দিয়েছি। কত দিন ধরে কারাগারে আছেন জানতে চাইলে তিনি গুনে গুনে বলেন ২২ বছর। কবে যাবেন বাড়িতে এমন কথার উত্তরে ফজলুর সোজা কথা ওরা এলেই আমি বাড়ি যাবো। এক ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড় বলে জানান।
এ ব্যাপারে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো: ছগীর মিয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি এ কারাগারে আসার পর কয়েকজন পুরনো বন্দী পেয়েছি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দিন ধরে কারাগারে আছেন ফজলু মিয়া। তার নথিপত্র ঘেঁটে জানতে পারি গোলাম মওলা ফজলু মিয়ার আসল বাবা নন। পালক বাবা। তাকে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে গোলাম মওলা এনে বড় করেছেন। গোলাম মওলা ও তার স্ত্রী দুইজনেই মারা গেছেন। তিনি বলেন, গোলাম মওলার কোনো সন্তান নেই। তবে তার এক ভাগিনা বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি (ওএসডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমি তার সাথে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তিনি তাকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ফজলুকে যখন কোতোয়ালি থানা পুলিশ আটক করেছিল তখন তাকে পাগল আইনে আটক করেছিল। তিনি জানতে চান যদি ফজলু মিয়া পাগল হয়ে থাকেন, তাহলে তার ঠিকানা হবে সমাজসেবা অধিদফতরের কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে, কারাগারে নয়। তারপরও তাকে বছরের পর বছর কারাগারেই কাটাতে হচ্ছে। সর্বশেষ ফজলুর মুক্তির বিষয়টি নিয়ে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ আব্দুল আহাদ উপস্থিত ছিলেন। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ফজলুকে ২০০২ সালেই আদালত জামিন দিয়েছিলেন। আদালতের নির্দেশনা ছিল তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। কিন্তু ওই সময়ে দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আদালতে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ফজলু মিয়ার কোনো আত্মীয়স্বজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন প্রতিবেদন পাওয়ার পরই আমরা তার আত্মীয়স্বজন খুঁজতে শুরু করি। কিন্তু অদ্যাবধি তাকে কেউ নিতে না আসায় আমরা ফজলু মিয়াকে মুক্তি দিতে পারিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে পাগল আইনের ১৩ ধারায় ফজলুর বিরুদ্ধে সিলেটের কোতোয়ালি থানার ডায়েরি নং-৬৯২, ধারা কার্যবিধির ৫৪ ধারায় সিলেট সদর থানার ট্রাফিক সার্জেন্ট মো: জাকির হোসেন বাদি হয়ে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৯৯৩ সালের ৭ নভেম্বর বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটের সময় সাক্ষীদের মাধ্যমে বর্ণিত পাগলকে প্রেরণ করিয়া জানাই যে, উল্লেখিত পাগল বেশ কিছু দিন যাবৎ বন্দর পয়েন্ট সুরমা পয়েন্ট এবং কোর্টের আশপাশে পাগলামি করিয়া নিরীহ মানুষকে হয়রানি করিতেছে। এমনকি যানবাহন চলাচলের সময় রাস্তার মাঝে বসিয়া থাকে এবং মাঝে মধ্যে গাড়ির নিচে লাফ দিয়া পড়ার চেষ্টা করে। আবার মাঝে মধ্যে কুদরতউল্লাহ মসজিদে প্রবেশ করিয়া নামাজের সময় মুসল্লিদের কাপড় ধরিয়া টানাটানি করে ও মুসল্লিদের মাথার টুপি কাড়িয়া নিয়ে আসে। ফলে উল্লেখিত এলাকাকে অতিষ্ঠ করিয়া ফেলিয়াছে। তাহাকে থানায় নিয়ে আমি পাগল আইনে প্রসিকিউশন দেয়ার নিমিত্তে আদালতের কার্যবিধি আইনের ৫৪ ধারায় পুনরায় গ্রেফতার করি। উল্লিখিত পাগলকে জিজ্ঞাসাবাদে সে কোনো প্রকার নাম ঠিকানা বলে না। নাম ঠিকানা জানার জন্য অনেক চেষ্টা করা হইয়াছে। তবে বিভিন্ন লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিয়া তাহার নাম ফজলু মিয়া বলিয়া জানা যায়। কিন্তু কেহ তাহার নাম ঠিকানা বলিতে পারে না। কেউ কেউ বলে তার বাড়ি ময়মনসিংহে। মামলার অভিযোগে ফজলু মিয়ার পিতার নাম মৃত সৈয়দ গোলাম মওলা, ঠিকানা ধরাদরপুর, থানা কোতোয়ালি, জেলা সিলেট (বর্তমানে দক্ষিণ সুরমা) উল্লেখ করা হয়।’
এরপর থেকে ফজলু মিয়াকে কারাগার থেকে আদালতে আনানেয়া হতে থাকে। ১০ বছর পর ফজলু মিয়াকে ২০০২ সালের ২৮ জানুয়ারি সিলেটের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট কে এম তারিকুল ইসলাম জামিন প্রদান করেন। বিচারক তার আদেশের অনুলিপিতে উল্লেখ করেন, কথিত পাগল মো: ফজলু মিয়াকে জেল থেকে কোর্টে আনা হয়। নোটিশ জারি ছাড়া ফেরত পাওয়া যায়। দেখা গেল আসামির পালক বাবা মৃত। প্রতিবেদন মতে আসামিকে সুস্থ বলে প্রতীয়মান হয়। তাকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওসি (পিএস) দক্ষিণ সুরমাকে বলা হলো। আদেশের কপি ওসি সুরমা ও জেল সুপারকে দেয়া হোক।
গতকাল মঙ্গলবার সিলেটের সাবেক প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক, বর্তমানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কে এম তারিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি ওই সময় ফজলু মিয়াকে সুস্থ দেখে জামিনের আদেশ দিয়েছিলাম। পেশকারও সেই আদেশ ওসি দক্ষিণ সুরমা ও জেল সুপারের কাছে পাঠিয়েছেন। আদালতের আদেশ তামিল করার দায়িত্ব ছিল তাদের। তা ছাড়া একজন বন্দীর কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দী থাকা খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গতকাল সিলেটের একাধিক ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, মারা যাওয়া গোলাম মওলার সম্পত্তির দাবিদার হবেন ফজলু মিয়া। এমনও হতে পারে ওই জমিজমার ভাগ না দেয়ার জন্য পাগল সাজিয়ে কারাগারে বন্দী করে রেখেছে। সরকার এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়তে পারে। আর কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন ফজলু মিয়া। তবে সেই দিন ফজলু মিয়ার জীবনে কবে আসবে সেটিই এখন প্রশ্ন।

ব্রহ্মপুত্রের ওপর চীনের নতুন বাঁধ

চীন তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর নির্মিত একটি পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র মঙ্গলবার চালু করেছে। এর ফলে ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ভারত ও বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ছয়টি ইউনিটের সবগুলো চালু করা হয়েছে।
তিব্বতে এটাই চীনের বৃহত্তম বাঁধ। রাজধানী লাসা থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে কেন্দ্রটির অবস্থান। জাংমু হাইড্রোপাওয়ার স্টেশন নামের এই কেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। এই কেন্দ্রে বছরে ২.৫ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এর মাধ্যমে মধ্য তিব্বতের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত নভেম্বরে প্রথম ইউনিটটির কার্যক্রম শুরু হয়। চীনা কর্তৃপক্ষ বলছে, এই বাধের ফলে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহে সমস্যা হবে না। কারণ এতে পানি জমিয়ে রাখা হবে না। তবে অনেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই বাঁধের ফলে অতিরিক্ত পানি থেকে আকস্মিক মারাত্মক বন্যা হতে পারে।
সূত্র : পিটিআই

কাল মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিনের রিভিউ আবেদন, রিভিউয়ের জন্য দুই প্রশ্ন মুজাহিদের

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আইনজীবীরা
গতকাল কেন্দ্রীয় কারাগারে তার সাথে সাক্ষাতের
পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন : নয়া দিগন্ত
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পক্ষে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন আজ বুধবার দায়ের করা হবে। গতকাল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুজাহিদের সাথে সাক্ষাৎ শেষে তার অন্যতম আইনজীবী মো: শিশির মনির এ কথা জানান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পক্ষেও আজ রিভিউ আবেদন দায়ের করা হবে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান আলফেসানী এ কথা জানিয়েছেন। গত ৬ অক্টোবর অ্যাডভোকেট আলফেসানী কাশিমপুর কারাগারে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে রিভিউ আবেদন দায়ের করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ দেন।
মুজাহিদের দুই প্রশ্ন : গতকাল বেলা ৩টায় আইনজীবীদের সাক্ষাৎকালে রিভিউ আবেদন দায়ের করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দু’টি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।
এই প্রশ্ন দু’টি হচ্ছেÑ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেরায় স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন রাজাকার, আলবদর বা শান্তি কমিটির কোনো তালিকায় জনাব মুজাহিদের নাম নেই। হঠাৎ করে ৪২ বছর পর কিভাবে তিনি আলবদরের কমান্ডার হয়ে গেলেন?
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছেÑ ১৯৭১ সালে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ২৩ বছর বয়সের একজন ছাত্র ছিলেন। একজন ছাত্র কিভাবে আধা-সামরিক বাহিনীর কমান্ডার হতে পারেন? কে কখন কোথায় তাকে এই পদে নিয়োগ দিলেন এই মর্মে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো মৌখিক বা দালিলিক সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারেনি।
অ্যাডভোকেট মো: শিশির মনির বলেন, তার এই প্রশ্নগুলো পুনর্বিবেচনার আবেদনে (রিভিউ পিটিশন) অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং বুধবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিভিউ পিটিশনটি দায়ের করা হবে। এই আইনজীবী জানান, মুজাহিদ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি মনে করেন আপিল বিভাগ তার পুনর্বিবেচনার আবেদনটি মঞ্জুর করবেন এবং দণ্ড মওকুফ করে তাকে বেকসুর খালাস দেবেন।
গতকাল বেলা ৩টায় অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের নেতৃত্বে পাঁচজন আইনজীবী মুজাহিদের সাক্ষাতের জন্য কারাগারে প্রবেশ করেন। শিশির মনির ছাড়া অন্য চার আইনজীবী হলেন- মসিউল আলম, এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, মতিউর রহমান আকন্দ ও আসাদ উদ্দিন।
সাাৎ শেষে বিকেল ৪টার দিকে জেলগেটে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন শিশির মনির। তিনি বলেন, রিভিউ আবেদন চূড়ান্ত করার ল্েয আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সাথে সাাৎ করেছি আমরা। তিনি রিভিউ আবেদনের বিষয়ে আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ আছেন। তিনি দেশবাসীকে সালাম জানিয়েছেন এবং সবার দোয়া চেয়েছেন। বুধবার সকালে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আমরা রিভিউ আবেদন দাখিল করব।
গত ২ অক্টোবর অ্যাডভোকেট মো: শিশির মনিরের নেতৃত্বে পাঁচজন আইনজীবী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সাথে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে তারা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন এবং রিভিউ করার বিষয়ে আলোচনা করেন।
এরপর ৯ অক্টোবর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন তার স্ত্রী তামান্না-ই-জাহানসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য। সাক্ষাৎ শেষে বেগম মুজাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিলের ওপর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন এবং তা কারা কর্তৃপরে কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
পরদিন ২ অক্টোবর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সাথে রিভিউ আবেদন দায়েরের বিষয়ে পরামর্শ করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার পাঁচজন আইনজীবী সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে তিনি আইনজীবীদের রিভিউ আবেদন দায়ের করার পরামর্শ দেন।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীরা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরই জানিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি হাতে পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই তারা রিভিউ আবেদন করবেন।
গত ১৬ জুন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং ২৯ জুলাই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিল মামলার সংপ্তি রায় দেন আপিল বিভাগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদেরের এ রায় দেন।
১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনাল-১ ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

ইসরাইলি গুলিতে মুমূর্ষ ফিলিস্তিনিকে শূকর খাওয়ানোর চেষ্টা

ইসরাইলি গুলিতে মারাত্মক জখম এক ফিলিস্তিনিকে একটি হাসপাতালে জোর করে শূকরের টুকরা খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি ওই লোকটি অল্প সময় পর মারা যায়।
গত কয়েক দিন ধরে ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি উত্তেজনা চলছে। গত ১২ দিনে জেরুসালেম, পশ্চিম তীর এবং গাজায় চার ইসরাইলি এবং ২৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আল আকসা মসজিদে ইহুদিদের প্রবেশ নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
হেবরন নগরীর কাছে কিরিয়াত আরবা নামের একটি ইহুদি বসতিতে এক ইসরাইলি পুলিশকে ছুরিকাঘাত করার অভিযোগ ওই ফিলিস্তিনির ওপর গুলি চালানো হয়েছিল। পরে মুমূর্ষ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই চলে তাকে শূকরের টুকরা খাওয়ানোর চেষ্টা।
হাসপাতাল থেকে ওই লোকই দৃশ্যটি ভিডিও করে প্রকাশ করে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির ফুটেজে দেখা যায়, ইসরাইলি ওই বসতি স্থাপনকারী শূকর মাংসের টুকরা বলে চিকিৎসকদের কাছাকাছি হচ্ছেন। তারপর তিনি টুকরাটি আহত ফিলিস্তিনির মুখে ও গায়ে স্পর্শ করছেন। টুকরাটি সত্যিই শূকরের কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। মুসলিম এবং ইহুদি উভয় ধর্মেই শূকর হারাম।

বাংলাদেশে কি আইএস সক্রিয়?

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার পর প্রশ্ন উঠেছে দেশটিতে ‘ইসলামিক স্টেট’ সক্রিয় আছে কিনা। তথ্যপ্রমাণের ইঙ্গিত একদিকে; আর সরকারের কথা ভিন্ন। ডয়েচে ভেলের বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। এতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) উভয় বিদেশী হত্যার দায় স্বীকার করে বলে খবর আসে। এদিকে, মার্কিনভিত্তিক সাইট (এসআইটিই) ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ ও মিডল-ইস্ট মিডিয়া রিসার্স ইনস্টিটিউট ওই দাবি নিশ্চিত করে। উভয় সংগঠন উগ্রপন্থি সংগঠনগুলোর ইন্টারনেট তৎপরতা নজরদারি করে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো এটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ সফরে সতর্কতা এবং দেশটিতে বসবাসরত বিদেশীদের নিরাপত্তা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট তার দেশের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঢাকার যুদ্ধে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইসিসের উত্থানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রয়োজনীয় সবকিছুই আমাদের আছে। এদিকে বাংলাদেশের বৃটিশ দূতাবাস টুইটারে বার্তা দেয়, ‘দেশটিতে সন্ত্রাসবাদের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। বিদেশীদের টার্গেট করে আরও হামলা হতে পারে।’ তবে বাংলাদেশের পুলিশ বা সরকার এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য আইএসের দায় নিশ্চিত করতে চায় নি। এর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এটা তার সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে বিরোধীদের ষড়যন্ত্র। হাসিনার ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদও একই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন। এ অবস্থা বিস্মিত হওয়ার মতো নয়। তিনি দাবি করেছেন, এসব হামলার পেছনে বিএনপি-জামায়াত রয়েছে। ৭ই অক্টোবর তার ফেসবুক পাতায় তিনি লিখেছেন, ‘তারা দেশের বিরুদ্ধে বিদেশী সরকারগুলোর অবস্থান পাল্টানোর প্রচেষ্টায় এবং দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে এগুলো করেছে।’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি এসব অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সরকার অন্যদের দোষারোপ করে ‘নিজেদের ব্যর্থতা লুকানোর চেষ্টা করছে’। ৮ই অক্টোবর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে’ সকল রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্য’ সৃষ্টির আহ্বান জানায় সরকারের প্রতি। একদিকে শেখ হাসিনাকে যখন মনে হচ্ছে তিনি বাংলাদেশে আইএস কর্মীদের কোন প্রমাণ না দেখতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ তখন স্থানীয় মিডিয়ায় এমন তথ্যপ্রমাণের কমতি নেই। ঢাকাভিত্তিক একজন সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক নুর খান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। গত ১৮ মাসে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই সন্ত্রাসী সংগঠনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমও তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ, তথ্য ও ছবি প্রকাশ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এও জানি যে, কিছু বাংলাদেশী আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় গিয়েছে। অতীতে পুলিশ অনেকবার তা নিশ্চিত করেছে।’ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ শহিদুল আলম খান যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ‘সাম্প্রতিক দুই বিদেশী হত্যা নিয়ে কোন উপসংহার টানার সময় এখনও আসেনি। সুষ্ঠু এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ পুলিশি তদন্ত এখন সব থেকে বেশি অগ্রাধিকার।’ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডগুলো যে সুপরিকল্পিত তা স্পষ্ট। আইএস যদি এতে সম্পৃক্ত নাও থাকে, তাদের সমর্থকরা বাংলাদেশে সক্রিয় আছে। আর সাধারণ জঙ্গিও আছে।’ এদিকে সাইট গ্রুপের পরিচালক রিটা ক্যাট্‌জ আইএসের করা দাবি উপেক্ষা না করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশে ওই সন্ত্রাসী সংগঠন সক্রিয় থাকার জোরালো তথ্য-প্রমাণ তার কাছে আছে। এ ইস্যুতে তার অবস্থান তুলে ধরে ৯ই অক্টোবর কয়েকটি টুইট করেন তিনি। একটি টুইটে তিনি বলেছেন, ‘এসব দাবি উড়িয়ে না দিতে এবং বাংলাদেশে আইসিস সমর্থকদের উপস্থিতি অস্বীকার না করতে আমি বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতি পরামর্শ জানাই।’ আরেক টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘এর পরিবর্তে আইসিস হুমকি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উচিত তা নিয়ে গবেষণা করা এবং বুঝতে পারা।’ বাংলাদেশে এ বছর চার জন ব্লগার ও দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব হত্যার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিভিত্তিক আলি রিয়াজ তার নিজ দেশে সাম্প্রতিক সিরিজ হত্যার ঘটনাপ্রবাহে উদ্বিগ্ন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘এসব হত্যাকাণ্ডগুলো অত্যন্ত অশুভ সংকেত। একটি ধারা (প্যাটার্ন) অবলম্বন করে জঙ্গিরা হামলাগুলো চালিয়েছে যা সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে। কেননা, এসব হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির ওপর বিরাট প্রভাব ফেলবে।’ বাংলাদেশে অনেকেই আলি রিয়াজের মতো একইভাবে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা দেশের জঙ্গিদের মধ্যে অবস্থান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা জোরদার করছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট।

‘তোমাদের লজ্জা থাকা উচিত’ : ইহুদি সেনাদের ফিলিস্তিনি বৃদ্ধ

পশ্চিমতীর ও গাজায় নির্বিচারে ফিলিস্তিনি হত্যার ঘটনায় ইসরাইলি সৈন্যদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেন এক ফিলিস্তিনি বৃদ্ধ। ওই সাহসী বৃদ্ধ অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ইসরাইলি সেনাবাহিনী কাছে ছুটে গিয়ে তাদের তিরস্কার করে বলেন, ‘তোমরা নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি বর্ষণ করছ। তোমাদের লজ্জা থাকা উচিত।’ ফিলিস্তিনের ওই সাহসী বৃদ্ধার নাম জিয়াদ আবু হালের। ৬৫ বছরের ওই বৃদ্ধ ইসরাইলি সেনাদের তিরস্কার করে বলেন,‘তোমরা ছোট ছোট বাচ্চার ওপর কীভাবে গুলি চালাচ্ছ?’
এসময় এক সেনা তার দিকে বন্দুক উঁচিয়ে ধরে তাকে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়। কিন্তু ভয় পাওয়ার পাত্র নন জিয়াদ। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা আমাকে আটক করতে পারবে না। আমি এ স্থান ছেড়ে যাব না।’ তিনি তখন চিৎকার করে বলতে থাকেন,‘তোমরা ওই ফিলিস্তিনি শিশুদের আটক কর। তবুও গুলি করো না। আর কত রক্ত চাও তোমরা? আজকেও দুই কিশোরকে সমাহিত করা হয়েছে। আর কত লাশ চাই তোমাদের? তোমাদের কি লজ্জা নেই-তোমারা কি মানুষ না? তোমরা কি কুকুর, না শূকর?’
ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে বুক চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন জিয়াদ। এসময় তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকরা। তারা তাকে মাটি থেকে উঠিয়ে সেনাদের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে প্রাথমিক চিকিৎসার পর জিয়াদকে ছেড়ে দেয়া হয় । ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় পশ্চিম তীর ও গাজায় গত ১২ দিনে চলতি মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২৩ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু ও কিশোরও রয়েছে।

কুনমিংয়ের ইউনান সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. ইউনূস

 ইউনান সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবর্ধনা শেষে ঐতিহ্যবাহী
রঙিন পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের মাঝে ড. ইউনূস
চীনের কুনমিংয়ে অবস্থিত ইউনান সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (Yunnan Normal University) ইউনূস সামাজিক ব্যবসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গত ১০ই অক্টোবর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বাংলাদেশী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস কুনমিং গমন করেন। তাকে অভ্যর্থনা জানান ইউনান সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ইয়ে লিয়াওইয়ান, উপাচার্য প্রফেসর ইউয়ান ইচুয়ান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। তারা প্রফেসর ইউনূসকে ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখান। মাত্র ৭ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টি ২.৫ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত তার নতুন ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা ৪০ হাজার, যার ৬৫ শতাংশ মেয়ে। ক্যাম্পাসে অবস্থান করে এমন ছাত্রের সংখ্যা ৩০ হাজার। শিক্ষকের সংখ্যা ২,৩০০। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ও নেতৃস্থানীয় শিক্ষকরা প্রফেসর ইউনূসকে একটি বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। ইউনানের ছাত্রীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক পরে অনুষ্ঠানটি ঘিরে রাখে। প্রফেসর ইউনূস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও শহরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাৎসরিক বক্তৃতা প্রদান করেন। বক্তৃতার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ও উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে বাৎসরিক বক্তৃতা প্রদানকারী বিশিষ্ট চীনা ও আন্তর্জাতিক গুণীবৃন্দের ছবি-সমৃদ্ধ গ্যালারি প্রফেসর ইউনূসকে ঘুরিয়ে দেখান। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনূস সামাজিক ব্যবসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন এবং এ কেন্দ্র গড়ে তোলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা প্রদানের উদ্দেশে প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে অনুষ্ঠান মঞ্চে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। প্রফেসর ইউনূস তার বক্তব্যে বিশ্বকে পরিবর্তন করতে তরুণদের সৃষ্টিশীল শক্তির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ওই দিনই ফুডিয়ান ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রফেসর ইউনূসকে ওই ব্যাংকে অভ্যর্থনা জানান। ফুডিয়ান ব্যাংক গ্রামীণ চায়নার সহযোগিতায় ব্যাংকটির একটি গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ শাখা স্থাপন করতে যাচ্ছে।

তুরস্কে বোমা হামলায় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে by টিম আরানগো ও সাইলান ইয়েগিনসু

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার প্রধান রেলস্টেশনের
কাছে জোড়া বোমা বিস্ফোরণে প্রায় ১০০ নিহত
আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ১০০ মানুষ মারা যাওয়ার এক দিন পর রোববার হাজার হাজার শোকসন্তপ্ত নারী-পুরুষ আঙ্কারায় জড়ো হয়ে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ঘটনাস্থলে ফুল দিয়েছেন, সরকারের নিন্দা করেছেন। সেদিন যাঁরা জড়ো হয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন কুর্দি। আর শনিবারের দুটি মারাত্মক বোমা বিস্ফোরণে নিহত ব্যক্তিদেরও বেশির ভাগই ছিলেন কুর্দি। তাঁরা সেখানে পতাকা নাড়িয়েছেন আর তুর্কি রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, এই হামলার জন্য তাঁরা তুর্কি রাষ্ট্রকেই দোষী করেছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে উল্লেখ করে লোকে স্লোগান দিয়েছে, ‘খুনি এরদোয়ান’। তারা আরও স্লোগান দিয়েছে, ‘খুনি পুলিশ’, খুনি রাষ্ট্র’। ‘আমরা আজ শান্তির দাবিতে একত্র হয়েছি, বন্ধুদের জন্য শোক করার জন্য জড়ো হয়েছি। কিন্তু আমরা একই সঙ্গে সরকারের কাছে জবাবও চাইছি।’ কথাটি বলেছেন কুর্দি কর্মী একিম আরতাস। তিনি আরও বলেন, ‘কুর্দিদের বিরুদ্ধে গত চার মাসে এ রকম আরও তিনটি হামলা হয়েছে, আর তার জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি। আমরা উত্তর চাই। আমরা জানতে চাই, সরকার কেন কুর্দিদের ওপর এমন হামলা হতে দিচ্ছে।’
কোনো গোষ্ঠীই এখন পর্যন্ত এই জোড়া হামলার দায় স্বীকার করেনি। কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলা দুটি খুব সম্ভবত আত্মঘাতী হামলাকারীরা চালিয়েছে। কিন্তু কর্মকর্তারা বললেন এক কথা, আর সরকার করল আরেক। সরকার দুই সম্ভাব্য অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে: ইসলামিক স্টেটের সুন্নি জঙ্গি ও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) বিদ্রোহী।
তুরস্কের গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, দেশটির সরকার কেন্দ্রীয় আনাতোলিয়ান শহর কোনিয়া ও উপকূলীয় শহর আনতালিয়ায় আইএস বা আইসিস জঙ্গি সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে তারা শনিবারের হামলার সঙ্গে জড়িত কি না, তা পরিষ্কার নয়। অনলাইনে প্রকাশিত বিবৃতি অনুসারে, তুর্কি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক ও উত্তর ইরাকে পিকেকের ওপর বোমা বর্ষণ করেছে। এই যুদ্ধংদেহী গোষ্ঠীটি তুরস্কের সঙ্গে গত তিন দশক ধরে যুদ্ধ করছে, কিন্তু সম্প্রতি তারা সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসেছিল।
শনিবার আঙ্কারায় বোমা হামলার কয়েক ঘণ্টা পরেই পিকেকে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। তারা বলেছে, ১ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারা আর কোনো আক্রমণ করবে না। কিন্তু তুরস্ক সরকার নিজের প্রচারণা চালু রাখায় বোঝা যায়, এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির দিকে এগোবে না।
সরকারি হিসাবে শনিবারের হামলায় ৯৫ জন মারা গিয়েছে, কিন্তু কুর্দি কর্মকর্তারা বলছেন, মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হবে। সেদিন আঙ্কারার সেই সমাবেশে বাসের ছাদে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন কুর্দিদের সমর্থিত পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির সেলাহাতিন দেমিরতাস। তিনি বলেছেন, সেদিনের হামলায় ১২৮ জন মারা গেছে। দেমিরতাস সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন, তারাই এ হামলা চালিয়েছে। আর রোববার তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেননি, নির্বাচনে জেতার প্রতিজ্ঞা করেছেন।
‘আমরা প্রতিশোধ চাইব না, সহিংসতা আরও সহিংসতার জন্ম দেয়, আমরা ১ নভেম্বরের নির্বাচনে ন্যায়বিচার চাইব,’ দেমিরতাস বলেছেন। তিনি আরও কিছু কথা বলেছেন, সেটাও উদ্ধৃত করা জরুরি: ‘নিপীড়িত ও অপমানিত মানুষেরা অভিন্ন জীবন যাপন করতে পারে, আমরা একদল দুরাচারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি না।’
এই নভেম্বরেই তুরস্কে হঠাৎ করেই আগাম নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে তো এমনিই অস্থিতিশীলতা ছিল, হামলার কারণে তার মধ্যেই আবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ বছরের জুনেই যে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২০০২ সালের পর এই প্রথম সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে জোটবিষয়ক আলোচনা ব্যর্থ হলে এরদোয়ান আরেকটি নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব গ্রাজের অধ্যাপক কেরেম ওকতেম বলেছেন, ‘১ নভেম্বরের নির্বাচন হবে কি না, সেটা এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর নির্বাচন হলেও সেটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।’ কেরেম ওকতেম অ্যাংগ্রি নেশন: টারকি সিন্স ১৯৮৯ গ্রন্থের লেখক।
জুনের নির্বাচনের পর তুরস্কের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা গভীরতর হয়েছে, আর সহিংসতাও বেড়েছে। তুরস্ক রাষ্ট্র ও পিকেকের মধ্যকার দুই বছরের শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়েছে, ওদিকে জঙ্গিরা হামলার পরিমাণ বাড়িয়েছে আর এরদোয়ান সেনাবাহিনীকে হুকুম দিয়েছেন, এদের ওপর আবার বোমাবর্ষণ শুরু করো।
তুরস্ক পিকেকের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, এই ব্যাপারটা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক চুক্তির পর। সেই চুক্তি অনুসারে, মার্কিন নেতৃত্বধীন যে জোট ইসলামিক স্টেটের ওপর বোমা বর্ষণ করছে, তারা তুরস্কের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। ফলে অনেকের কাছে মনে হচ্ছে, তুরস্কের অগ্রাধিকার হচ্ছে কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের উচ্চাভিলাষের রাশ টেনে ধরা, ইসলামিক স্টেটকে মোকাবিলা করা নয়।
জুনের নির্বাচনে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এইচডিপি প্রথমবারের মতো সংসদে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশ ভোট পায়, এর মাধ্যমে তারা এরদোয়ানকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে বঞ্চিত করে। এরপর দেখা গেল, কুর্দিদের আন্দোলনে বেসামরিক অংশের ওপর হামলা শুরু হলো, নেতাদের গ্রেপ্তার করা হলো। আর সরকারি কর্মকর্তারা বলতে শুরু করলেন, পিকেকের সহিংসতার সঙ্গে দেমিরতাস ও অন্য কুর্দি নেতাদের সম্পর্ক আছে।
ওকতেম বলেছেন, কুর্দিদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে, তাতে তিনি মোটেও বিস্মিত নন। জুলাই মাসে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শহর সুরুকে বোমা বর্ষণ করা হয়, যে হামলায় ৩০ জনেরও বেশি কুর্দি কর্মী নিহত হন। আবার দিয়ারবাকিরে কুর্দিদের একটি রাজনৈতিক মিছিলেও হামলা হয়। তুর্কি নেতাদের বিভেদ সৃষ্টিকারী বাগাড়ম্বরের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ‘কে এইচডিপির ওপর হামলা চালিয়েছে, আর তার নেতাদের মানবিক গুণাবলি পিষে পিষে মরেছে।’
ওকতেম তুরস্কের ইতিহাসের টালমাটাল পর্যায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৭০-এর দশকের রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে দেশটি প্রায় টুকরো টুকরো হয়ে যেতে বসেছিল, আর ১৯৯০-এর দশক ছিল কুর্দি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উত্তুঙ্গ কাল। তিনি বলেছেন, প্রতিটি ঘটনার পরই বোঝা গেছে, সহিংসতা তথাকথিত গভীর রাষ্ট্রের কাজ, অন্তত কিছুটা হলেও। এটা আসলে কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে গঠিত এক ছায়াচ্ছন্ন নেটওয়ার্ক, যাদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক আছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া।
টিম আরানগো: নিউইয়র্ক টাইমসের বাগদাদ ব্যুরোর প্রধান
সাইলান ইয়েগিনসু: নিউইয়র্ক টাইমসের ইস্তাম্বুল সংবাদদাতা।