Tuesday, March 13, 2018

বৈশ্বিক উষ্ণতা: ভুক্তভোগী দরিদ্ররা

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে বাড়ছে দুর্যোগ। বিজ্ঞানীরা বরাবর বলেন, এই দুর্যোগ যতটা প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মানবসৃষ্ট। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বিশ্বের দরিদ্র অঞ্চলগুলো। যার মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশ অন্যতম। আফ্রিকার মরু অঞ্চলে খরার মৌসুম একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। সে সময় নদী শুকিয়ে যায়। অনাহারে ভোগে গবাদিপশু। অনেক সময় খাদ্য সঙ্কটে মারাও যায়। তবে প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে এরপর আসে বর্ষার মৌসুম। বৃষ্টিতে উর্বর হয় ভূমি। জন্মে নতুন ফসলাদি। খরার ক্ষতি পুষিয়ে নেন কৃষক। গবাদিপশু বংশবিস্তার করে। বাচ্চারা প্রতিবেলা দুধ খেতে পারে। সপ্তাহে দুই একদিন আহারে মাংস জোটে। এমনই ছিল সেখানকার সাধারণ জীবনচক্র।
তবে এখন সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অন্যান্য আফ্রিকান প্রতিবেশি অঞ্চলগুলোর মতো কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলও দিন দিন উত্তপ্ত ও রুক্ষ হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা সেখানে বৈশ্বিক উষ্ণতার আগ্রাসন দেখতে পাচ্ছেন। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বিংশ শতাব্দীতে ওই অঞ্চল যেভাবে খরতপ্ত হয়েছে, তা গত দুই হাজার বছরের মধ্যে দ্রুততম। দুই দশকে অঞ্চলটিতে দুর্ভিক্ষ হানা দিয়েছে ৪ বার। বারবার দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হবার ফলে পৃথিবীর দরিদ্রতম ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের অস্তিত্ব পড়েছে হুমকির মুখে। ক্ষুধা এবং দারিদ্র চরম আকার ধারণ করেছে। এমতাবস্থায়, আফ্রিকান উপমহাদেশের কেনিয়া, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। তিনটি দেশেই দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। কমপক্ষে এক কোটি বিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছে। তাদেরই একজন মারিও তেদে। তার জন্ম এমন এক অঞ্চলে যেখানে অনেকেরই বয়সের হিসেব নেই। মারিও বর্তমানে বার্ধক্যে উপনীত। তিনি জানান, একটা সময়ে তার দুই শতাধিক ছাগল ছিল। ২০১১ সালের দুর্ভিক্ষে যার অধিকাংশ মারা যায়। ২০১৭'র দুর্ভিক্ষে মারা যায় আরও কিছু। বর্তমানে মাত্র ৫ টি ছাগল অবশিষ্ট আছে। যা দিয়ে তার জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। দুর্ভিক্ষে যে শুধু গবাদিপশুই বিলীন হয়ে গেছে এমনটা নয়। দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পানি সঙ্কট। কেনিয়ার তুরকানা নামক অঞ্চলে পানি সংগ্রহ করতে মহিলাদের হেটে দৈনিক গড়ে সাড়ে সাত মাইল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। প্রচ- দাবদাহে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে গাছপালা। ওই অঞ্চলের আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ লোশানি। দুর্ভিক্ষে নিজ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানিয়ে তিনি বলেন, ১ বছর আগেও আমার ১৫০ টি ছাগল ছিল। বর্তমানে আছে মাত্র ৩০ টি। তিনি বলেন, যদি এভাবেই দুর্ভিক্ষ আসতে থাকে, তবে আমাদের আর করার কিছুই থাকবে না।
অনাবৃষ্টি হলেই 'শেষ'
আফ্রিকান অঞ্চলে বৃষ্টির আচরণ পাল্টে গেছে। দিন দিন পুরো অঞ্চল আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আবহাওয়া পূর্বাভাষে সামনের দিনগুলোতেও ইতিবাচক কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অনাবৃষ্টির ধারা বজায় থাকলে অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী জেসিকা টিয়ারনি ওই অঞ্চলের ভূ-উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, পুরো অঞ্চলটি বর্তমানে অতীতের চেয়ে দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতার ক্রমাগত বৃদ্ধিকে দায়ি করেন। কেনিয়ার জাতীয় দুর্ভিক্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান জেমস ওডর শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, এখন থেকে প্রতি ৫ বছর অন্তর ১ বার করে দুর্ভিক্ষ হানা দেবে। ইথিওপিয়ার অবস্থা কেনিয়ার চেয়েও করুণ। দেশটির দক্ষিন-পূর্ব অঞ্চলে তিন বছর ধরে বৃষ্টি হয় না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সঙ্কট যোগ হয়ে এ সময়ে মারা গেছে দুই লাখেরও বেশি মানুষ। সোমালিয়ায় ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কটে ভুগছে ২৭ লাখেরও বেশি মানুষ। এ অবস্থাকে জাতিসংঘ 'গুরুতর খাদ্যসঙ্কট' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় ২০১৭ সালে দুর্ভিক্ষ এড়াতে সক্ষম হয় দেশটি। এর আগে ২০১১ সালের দুর্ভিক্ষে দেশটিতে মারা যায় আড়াই লক্ষাধিক মানুষ। যার অর্ধেকই ছিল শিশু।
উত্তপ্ততা, শুষ্কতা এর ক্ষুধাকাতরতা আফ্রিকান দরিদ্র অঞ্চলসমূহকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখেই ঠেলে দিচ্ছে না। এ অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে সংঘাত, হানাহানি। অভাবের তাড়নায় অধিবাসীরা এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আফ্রিকান অঞ্চলের একটা বড় অংশ বিরানভূমিতে পরিণত হবে।
(নিই ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধের সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন নাজমুস সাদাত পারভেজ)

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে উদ্যোগ জোরালো করুন -জাতিসংঘের বিশেষ উপদেষ্টা

রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও সম্মানের সঙ্গে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও প্রভাবশালী দেশগুলোকে উদ্যোগ জোরদার আহ্বান জানিয়েছেন গণহত্যা রোধ বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েং। মঙ্গলবার রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন এ আহ্বান জানান। বর্বর নির্যাতন ও বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সঙ্গে ফেরাতে মিয়ানমার এখনও সত্যিকারের প্রচেষ্টা দেখায়নি মন্তব্য করে জাতিসংঘ দূত এ অবস্থায় সংকট সমাধানে চীন, ভারত ও অন্যান্য প্রভাবশালী দেশকে ভূমিকা রাখা এবং নৈতিক নেতৃত্ব দেয়ার আহ্বান জানান। এ সময় আদামা দিয়েং বাংলাদেশের নৈতিক নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উদ্বাস্তু ও স্থানীয়দের সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য আরো অধিক কিছু করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতাও চান। কোন কারণে উদ্বাস্তু ও স্থানীয়দের মাঝে যাতে ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনার সৃষ্টি না হয় সে জন্য দুই সম্প্রদায়ের মাঝে সংলাপ আয়োজন করতে বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দেন বিশ্ব সংস্থার ওই প্রতিনিধি।
উদ্বাস্তুদের নিজ ইচ্ছার বাইরে প্রত্যাবাসন করা হবে না বলে বাংলাদেশের যে অঙ্গীকার রয়েছে তা স্মরণ করে তিনি বলেন, এতে আমি উৎসাহ পেয়েছি। ৪ দিনের বাংলাদেশ সফর বিশেস করে সফরের উল্লেখ্যযোগ্য সময় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কক্সবাজার জেলায় কাটানোর প্রসঙ্গ তুলে জাতিসংঘ দূত বলেন, সেখানে গিয়ে আমি যা শুনেছি এবং দেখেছি তাতে এটা পরিষ্কার যে অধিকাংশ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান। কিন্তু যখন শুধুমাত্র নিরাপত্তা, সম্মান ও মৌলিক অধিকার পাওয়া যাবে তখনই তারা সেটা করতে চান। তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত এসব ব্যাপারে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কোনো সত্যিকারের প্রচেষ্টা দেখায়নি। উদ্বাস্তুরা এখনো সীমান্ত অতিক্রম করছেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়ে আমরা পুনরায় ব্যর্থ হতে পারি না। তারা যা সহ্য করেছে তা কোনো মানুষের করার কথা ছিল না। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান রয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে। তারা সেটা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদে ঘরে ফেরানোর পরিবেশ তৈরি এবং অন্য নাগরিকদের মতো একই অধিকার দেয়ার মাধ্যমে করতে পারে। সেই সঙ্গে আরও নৃশংসতামূলক অপরাধের ঝুঁকি থেকে এই জনগোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফিরে গেলেরোহিঙ্গারা অধিকতর অপরাধের ঝুঁকিতে পারে বলে আশংকা জানান আদামা দিয়েং। গত বছরের আগস্ট থেকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে বর্বর অভিযান পরিচালনা করেছে তা ‘অনুমিত ও প্রতিরোধ যোগ্য’ ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, নৃশংসতামূলক অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে আমি কয়েকবার সতর্ক করে দিলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বালিতে মাথা গুঁজে ছিল। যার ফলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে জীবন, সম্মান ও ঘর হারিয়ে মূল্য দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা পরিষ্কার: মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক অপরাধ হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের শুধুমাত্র তারা যা, তা হওয়ার কারণে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা ও অপদস্থ করা হয়েছে। আমি যেসব তথ্য পেয়েছি তাতে দেখা যায়, অপরাধীদের উদ্দেশ্য ছিল উত্তর রাখাইন থেকে তাদের অস্তিত্ব মুছে দেয়া, সম্ভবত এমনকি রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করে দেয়া। যা প্রমাণ হলে হবে গণহত্যার অপরাধ।’ বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে গত ৭ মার্চ সরকারি সফরে বাংলাদেশ আসেন বিশেষ উপদেষ্টা আদামা। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখা ছিল তার সফরের উদ্দেশ্য। জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা রোধ বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা মূলত গণহত্যার ধরন ও কারণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজ করেন। সেই সাথে তিনি গণহত্যার ঝুঁকি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে সতর্ক করে দেন এবং এবিষয়ে সহযোগিতা অর্জনের জন্য সমর্থন আদায়ে কাজ করেন।

রাজনীতির ইতিহাসে বিষ দিয়ে হত্যার যত চেষ্টা

সমপ্রতি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত এক পক্ষত্যাগী রুশ গোয়েন্দা ও তার মেয়েকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পক্ষত্যাগী রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়ে ইউলিয়াকে বিষ প্রয়োগের ঘটনায় সন্দেহের আঙ্গুল তোলা হচ্ছে রাশিয়ার দিকে। কারণ, স্ক্রিপাল যুক্তরাজ্যের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন। এই ঘটনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমপর্কে টানাপোড়ন দেখা দিয়েছে। পুরো বিশ্বজুড়েই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এই ঘটনা। এমন বিষ প্রয়োগের ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগেও আরো এক রুশ গুপ্তচর আলেকজান্দার লিতভিনেনকোকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল যুক্তরাজ্যে। লিতভিনেনকোর শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছিল তেজষ্ক্রিয় পোলোনিয়াম। তার বিষক্রিয়ায় তিনি মারা যান। এ দু’টি ঘটনা কাকতালীয়ভাবে খুব কাছাকাছি। স্ক্রিপাল ও তার মেয়ে এখন হাসপাতালে জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন। সের্গেই স্ক্রিপাল, তার মেয়ে ও লিতভিনেনকোর মতো আরো বহু মানুষকে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব হত্যাচেষ্টার কোনোটা হয়েছে সফল। আর কোনোটা বিফল। নিচে এ রকম কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করা হলো। 
সের্গেই স্ক্রিপাল
৬৬ বছর বয়সী সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপালকে বৃটেনের স্যালিসবেরি শহরের একটি শপিং মলের সামনে অজ্ঞান অবস্থায় একটি বেঞ্চের উপর পাওয়া যায়। তিনি কোনো অজ্ঞাত বিষের শিকার হয়েছেন বলে পুলিশের ধারণা।
কিম জং নাম
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বৈমাত্রেয় ভাই কিম জং নাম ২০১৭ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে প্রাণ হারান। দৃশ্যত দুই মহিলা তাঁর মুখে ভিএক্স নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ মাখিয়ে দিয়েছিলেন। গতমাসে মালয়েশিয়ার একটি আদালতে অভিযুক্তদের বিচার চলার সময় জানা যায় যে, আক্রান্ত হওয়ার সময় কিম জং নাম-এর পিঠের ব্যাগে ভিএক্স বিষের ডজন খানেক অ্যামপুল ছিল।
আলেক্সান্ডার লিটভিনেঙ্কো
সাবেক রুশ গুপ্তচর লিটভিনেঙ্কো দেশ ছেড়ে বৃটেনে আশ্রয় নেবার পর সাংবাদিকতা শুরু করেন। রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস এফএসবি ও পুতিনের বিরুদ্ধে দু’টি বই লিখেন। ২০০৬ সালের ২৩শে নভেম্বর দু’জন সাবেক কেজিবি কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর লিটভিনেঙ্কো অসুস্থ হয়ে পড়েন ও পরে হাসপাতালে প্রাণত্যাগ করেন। সরকারি তদন্তে দেখা যায় যে, তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম-২১০ বিষের ক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ভিক্টর ইউশ্চেঙ্কো
ইউক্রেনের বিরোধী নেতা ইউশ্চেঙ্কো ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে দেখা যায়, একটি ভাইরাল ইনফেকশন ও সেই সঙ্গে রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার ফলে তার ‘অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটিস’ হয়েছে। এর ফলে ইউশ্চেঙ্কোর জন্ডিস হয়, মুখ ফুলে যায় এবং ত্বকে এক ধরনের দাগ থেকে যায়, যা ডাইঅক্সিন বিষের প্রভাবে ঘটে থাকতে পারে বলে চিকিৎসকদের ধারণা। ইউশ্চেঙ্কো দাবি করেন, সরকারি চররা তাকে বিষ দিয়েছে।
খালেদ মেশাল
১৯৯৭ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর ইসরাইলের গুপ্তচর বিভাগ হামাস এর নেতা খালেদ মেশালকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। কথিত আছে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বয়ং নাকি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মেশাল জর্ডানের আম্মানে অবস্থিত হামাসের কার্যালয় থেকে বেরোনোর সময় দু’জন ইসরায়েলি গুপ্তচর তাঁর কানে কোনো বিষাক্ত পদার্থ ‘সেপ্র’ করে। মেশাল অক্ষতই থাকেন এবং পরে ঐ দুই ইসরায়েলি গুপ্তচরকে ধরাও সম্ভব হয়।
গেয়র্গি মার্কভ
১৯৭৮ সালে বুলগেরীয় সরকারবিরোধী মার্কভ বিবিসি’তে কাজ শেষ করে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন  হঠাৎ একটা সুচের মত কিছু একটা তার উরু ফুঁড়ে দেয়। মার্কভ আশপাশে তাকালে দেখেন, এক পথচারী তার ছাতা মাটি থেকে তুলছে। ছুঁচ ফোঁটার জায়গাটা ফুলে উঠে চারদিনের মধ্যে মার্কভ প্রাণ হারান। ময়না তদন্ত অনুসারে, একটি ০.২ মিলিগ্রাম রিসিন বিষের পেলেট থেকে মার্কভের মৃত্য ঘটেছে। পথচারীর ছাতা থেকেই পেলেটটা ছোঁড়া হয়েছিল, বলে অনেকের বিশ্বাস।
গ্রিগরি রাসপুটিন
রুশ বিপ্লবের ঠিক আগে রাসপুটিন একজন আধ্যাত্মিক শক্তিসমপন্ন গুনিন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯১৬ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের ইয়ুসুপভ প্রাসাদে আসেন প্রিন্স ফেলিক্স ইয়ুসুপভের আমন্ত্রণে। প্রিন্স ইয়ুসুপভ তাকে পটাসিয়াম সায়ানাইড বিষ মাখানো কেক খেতে দেন ও সায়ানাইড মাখানো পাত্রে সুরা পরিবেশন করেন। তবে সেই বিষাক্ত কেক ও সুরা থেকে রাসপুটিন মারা যাননি। অবশেষে, রাসপুটিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
(ডয়েচে ভেলে অবলম্বনে)

সহিংসতা নয়, চাই নারীর মর্যাদা by দিলরুবা খানম প্রধান

ব্যক্তির সুষ্ঠু বিকাশ, কাঙ্ক্ষিত ও সুস্থ জীবনের জন্য সামাজিকীকরণ প্রয়োজন। সামাজিকীকরণের প্রথম ও শক্তিশালী ক্ষেত্র হলো পরিবার। পরিবার মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু সেই পরিবারেই নারীর প্রতি সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে স্বামীর দ্বারা জীবনের কোনো না কোনো সময় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী। বৃহত্তম বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের ২০১৭ সালে সংঘটিত নারী নির্যাতন সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে :নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে ৮২ শতাংশ বিবাহিত, ১৭ শতাংশ অবিবাহিত এবং অন্যান্য এক শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, বিবাহিত নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি ২০১৭ সালে মোট ১০ হাজার ৫৯৬টি নারী নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। যার মধ্যে ৭৭ শতাংশ পারিবারিক নির্যাতন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ নারী বিবাহিত জীবনে একবার হলেও নিজ গৃহে নির্যাতিত হন। এক থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নির্যাতনের ধরন : যৌতুকজনিত, যৌন, শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নির্যাতন। এর মধ্যে যৌতুকজনিত যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহ মাত্রায়। ২০১৭ সালে সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিশ্নেষণে দেখা যায়, ৩২ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে যৌতুকজনিত কারণে আর পারিবারিক সংঘাতজনিত কারণে ২৪ শতাংশ নির্যাতন হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৮৯৪ জন নারীশিশু (১৮ বছরের নিচে) যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনের ধরনগুলো হলো :ধর্ষণ, জখম, পর্নোগ্রাফির শিকার। যার মধ্যে ৫৯৩ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর শিশুহত্যা বা শিশুর আত্মহত্যার ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। নারীশিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিত মানুষ দ্বারাই নির্যাতিত হচ্ছে। সমাজের একেবারে নিম্নস্তর থেকে উচ্চতর পর্যন্ত এসব সহিংসতার চিত্র ফুটে উঠছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে সারাদেশে নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৭ হাজার ৭৩টি মামলা হয়েছে। বিবিএসের জরিপে আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ নির্যাতনের বিপরীতে মাত্র ২.৬ শতাংশ বিবাহিত নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। নির্যাতিত নারীরা সামাজিক মর্যাদা, আইনি জটিলতা, মানবিকতা সর্বোপরি বৃহত্তর পারিবারিক স্বার্থে পুরুষের পাশবিকতা ও নিষ্ঠুরতা সত্ত্বেও উদার হচ্ছেন, তাদের ক্ষমা করছেন, বস্তুত পুরুষকে করুণা করছেন। নারীরা মেনে নিয়ে বা মানিয়ে নিয়ে সমাজে চলছেন। যখন কোনো নারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সঙ্গে তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, নারী নির্যাতনের কারণে বছরে মোট জিডিপির ২.১৩ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রের উন্নয়নের ওপরও। অন্যদিকে বর্তমানে নারীর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক সফলতা ও অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আজকের নারীরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। নারীরা শুধু ঘর আর সন্তান সামলানো নয়, বিভিন্ন পেশায়, নীতিনির্ধারণী, সাহিত্য, ক্রীড়া এমনকি পর্বতারোহণের মতো চ্যালেঞ্জিং কাজেও সফলতা দেখাচ্ছেন। পোশাক শিল্পে নারীর অবদান গর্ব করার মতো। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করছেন, সহযাত্রী হিসেবে কাজ করছেন। সাম্যবাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, 'বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।' নারীদের যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করে নারী-পুরুষে সমতা আনয়ন করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন পুরুষশাসিত সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন। আর নারীর ক্ষমতায়নের প্রধান শর্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বতা। এই স্বাধীনতা ভোগ করছেন নারী সমাজের ক্ষুদ্র অংশ, বিস্তৃত অংশ নানাভাবে নিপীড়ন ও নির্মমতার শিকার হচ্ছেন। বর্তমান যুগে নারীর অনেক প্রাপ্তি নারীর সামনে এগিয়ে চলাকে সাফল্যের দ্বারে পৌঁছে দিচ্ছে; অন্যদিকে নারীর প্রতি সহিংসতা নারীর পথচলাকে ও অগ্রসরতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
নারীরা এখন অনেক আত্মসচেতন ও প্রতিবাদী হয়েছেন। বর্তমান সময়ে নারীদের ভোগ্যপণ্য ভাবার সুযোগ নেই। তারা এখন অনেক আত্মপ্রত্যয়ী। নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির অর্ধেক হলো নারী আর নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। নারী সমাজকে যখন সামাজিক কুসংস্কার, অশিক্ষা, ধর্মীয় গোঁড়ামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে অন্ধকারে, অন্তরালে রাখা ছিল, তখন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া নারী সমাজকে জাগ্রত করে সভ্যতার আলোয় উদ্ভাসিত করতে এগিয়ে আসেন। তিনি যথাযথ বলেছেন- 'নারী-পুরুষ একটি গাড়ি দুটি চাকা।' নারী-পুরুষ সমঅধিকার ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে আমাদের পবিত্র সংবিধানে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। পরিবার যেহেতু প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার থেকেই ছেলেসন্তানটিকে নারীর প্রতি ইতিবাচক ও শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে হবে। পুরুষশাষিত সমাজে পুরুষের কর্তৃত্বপরায়ণতা ও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা পরিহার করে বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারীর প্রতি পুরুষের সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি, আচার-আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। নারী নির্যাতন সংক্রান্ত বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও অনুষ্ঠানাদিতে পুরুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। যদিও নারী সংগঠনগুলো বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং বর্তমান সরকারও নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তারপরও সর্বোপরি রাষ্ট্রকে শুধু আইন প্রণয়ন বা সংশোধন নয়, প্রয়োগেও কঠোর হতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতার ধরন, কৌশল ও নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, ঘটছে নিষ্ঠুরতম ঘটনা। নারীর প্রতি আর সহিংসতা নয়, সর্বাগ্রে আপনারা মানুষ হন, তাদের মানুষ ভাবুন এবং তাদের প্রতি মানবিক ও শ্রদ্ধাশীল হোন। নারী-পুরুষ একসঙ্গে একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবার, সমাজ ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণে এক কাতারে আসুন। আর নারীর প্রতি যে ১৮ শতাংশ পুরুষ মানবিক, শ্রদ্ধাশীল, সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আছেন, শ্রদ্ধা রইল তাদের প্রতি। এ বছর আন্তজার্তিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল-'সময় এখন নারীর : উন্নয়নে তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরে কর্মজীবন ধারা', যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী।
ডেপুটি কিউরেটর, শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুরবস্থা by বদরুদ্দীন উমর

যারা শহরে বাস করেন, তারা একবার এক-আধ ঘণ্টার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে নিয়ে জেলা শহরের হাসপাতালগুলো একবার ঘুরে এলেই তাদের বোঝার অসুবিধা হবে না, চিকিৎসার অভাবে, অবহেলিত চিকিৎসায় এবং প্রকৃত চিকিৎসাসেবার অনুপস্থিতিতে গরিবদের অবস্থা কী রকম। এদিক দিয়ে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা যে আরও শোচনীয়। গ্রামাঞ্চলে কিছু চিকিৎসা কেন্দ্র ও সরকারি হাসপাতাল আছে। কিন্তু হাসপাতাল থাকলেও সেখানে চিকিৎসা নেই, নার্স নেই, ওষুধপত্র নেই। কিছু যন্ত্রপাতি পড়ে থাকলেও সেগুলোর কোনো ব্যবহার নেই। গ্রামের হাসপাতালে নিযুক্ত ও বদলি হওয়া চিকিৎসকরা গ্রামে থেকে নিজেদের দায়িত্ব পালন তো করেনই না, উপরন্তু তারা গ্রামে থাকেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসার অব্যবস্থার কথা বলে মাঝেমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এর প্রতিকারের জন্য তিনি নিজেকে বদ্ধপরিকর বলে ঘোষণা করেন। গতকাল ১১ মার্চ তিনি বলেন, 'গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। সে জন্য জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের কর্মস্থলে ডাক্তারদের উপস্থিতি সরকার যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে চায়।' (সমকাল, ১২.৩.২০১৮) এ ধরনের প্রতিশ্রুতি নির্বাচনের সময় সকলেই দিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া এক কথা এবং তা কার্যকর করা অন্য কথা। সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি দিলেও গত চার বছরে সে প্রতিশ্রুতির কী হলো? প্রতিশ্রুতি কি পালন করা হয়েছে? তিনি বলেছেন, 'আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে পাঁচ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচনের আগে আরও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাড়ে চার হাজার নার্স নিয়োগের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সরা উপজেলায় অবস্থান করে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন।' (ঐ) কীভাবে তারা এই কাজ করবেন? গত ৯ বছরে সরকারি ক্ষমতায় থেকে তারা চিকিৎসকদের গ্রামে যেতে বাধ্য করতে না পারলেও এখন তারা কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করবেন? তিনি নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেছেন, 'মফস্বলে পদায়ন করা হলে কিছুদিন পরই তদবির করে তারা শহরে চলে আসেন।' (ঐ) এতদিন এভাবেই চলে আসছে বছরের পর বছর। তা ছাড়া তদবির করে ডাক্তারদের শহরে চলে আসার কথা তিনি বলেছেন। এ তদবির কোথায় ও কাদের কাছে করা হয়? এটা কি তার নিজের মন্ত্রণালয়েই হয় না? এই তদবির কি করা হয় অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে? 'কর্মস্থলে থাকে না ৬০% চিকিৎসক, তদারকির দায়িত্ব কার' শীর্ষক অন্য একটি রিপোর্টে বলা হচ্ছে, 'অনেকে বদলি ঠেকাতে মন্ত্রণালয়ে তদবির করছেন। কয়েকজনের বদলির আদেশ এরই মধ্যে বাতিলও হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের কয়েকজন নেতা ঢাকার বাইরে বদলি করা কয়েকজন চিকিৎসকের বদলির আদেশ বাতিল করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে একটি সূত্র সমকালকে নিশ্চিত করেছে। ওই নেতারা উৎকোচের বিনিময়ে ড্যাব নেতাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উচ্চ পর্যায়ে লবিং-তদবির করছেন বলেও জানা গেছে। এ অবস্থায় উপজেলায় চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা এবং সিভিল সার্জনের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন চিকিৎসকরা।' (ঐ) এখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা এবং সিভিল সার্জনের সঙ্গে 'সমঝোতার' অর্থ কী? অর্থ কি এই নয় যে, ঘুষ খেয়ে তারা এই 'সমঝোতায়' এসেছেন? এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নতুন করে দশ হাজার চিকিৎসককে গ্রামে পাঠিয়ে সেখানে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার যে কথা বলেছেন, তার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু? দুর্নীতি তার নিজের মন্ত্রণালয়েই রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে এবং এ দুর্নীতির সঙ্গে সরকারি লোকদের, সরকার সমর্থক চিকিৎসকদের সম্পর্ক যে কী- এটা কি কাকেও বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে? বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে যখন এই অবস্থা, যখন চিকিৎসকদের চরম অমানবিক ও স্বার্থপর চরিত্র, যখন উৎকটভাবে তাদের নানা কার্যকলাপের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, তখন কানাডার শত শত চিকিৎসকের মানবিক বোধের এক রিপোর্ট ৯ মার্চ ২০১৮ তারিখে লন্ডনের The Guardian পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানকার কুইবেক প্রদেশের ৮০০ চিকিৎসক প্রাদেশিক সরকার তাদের যে বেতন বৃদ্ধি করেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এক বিবৃতি দিয়েছেন! তারা এই বৃদ্ধি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তারা যে বেতন পান, সেটা তাদের জন্য যথেষ্ট। কাজেই তাদেরকে দেওয়া বর্ধিত বেতন প্রদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে অন্য কর্মীদের মধ্যে নার্স এবং অন্যদের দেওয়া দরকার। প্রাদেশিক সরকারকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে তারা বলেছেন- 'ÔWe, Quebec doctors, are asking that the salary increases granted to physicians be cancelled and that the resources of the system be to better distributed for the good of healthcare workersÕ.. এ ছাড়া গার্ডিয়ানের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে-The letter says recent pay raises negotiated by this professional associations as ÔshockingÕ, given the Ôdraconian cutsÕ that have lift nurses, orderlies and others overworked and underpaid, as well as led to a widespread lack of services for patients.Õ কানাডীয় এই চিকিৎসকদের দ্বারা তাদের বেতন বৃদ্ধি প্রত্যাখ্যান করে যেভাবে কুইবেক প্রাদেশিক সরকারের কাছে সাধারণভাবে সেখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, এটা যে তাদের উচ্চ মানবিক বোধের, নৈতিক বোধের ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয়- এ নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে? এ ক্ষেত্রে বলা দরকার যে, সাধারণভাবে আমাদের দেশের সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা তুলনায় কানাডার চিকিৎসা ব্যবস্থা বহুগুণে উন্নত। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে বৈষম্য আছে তার বিরুদ্ধেই উপরোক্ত ৮০০ জন চিকিৎসক তাদের প্রতিবাদ চিঠি প্রাদেশিক সরকারকে দিয়েছেন। এর সঙ্গে তুলনায় আমাদের দেশের চিকিৎসকদের সাধারণ অবস্থা কী? তারা যেভাবে গরিব রোগীদের গলায় ছুরি চালিয়ে নিজেদের ফি বৃদ্ধি করেন, হাসপাতালে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন না, বিশেষত সরকারি বেতন নিয়মিত পাওয়া সত্ত্বেও গ্রামের গরিবদের চিকিৎসা দানের জন্য কর্মস্থলে থাকার প্রয়োজনবোধ করেন না, একে কী বলা যাবে? এর মধ্যে মনুষ্যত্বের সামান্য পরিচয়ও কি আছে? এই মনুষ্যত্বহীন ও দায়িত্বহীন চিকিৎসকদের তাদের কাজ করতে, গ্রামাঞ্চলে নিজেদের কর্মস্থলে থাকতে বাধ্য করার উপায় এখানেও আছে। কিন্তু সরকার তার ধারেকাছেও যায় না। যারা নিজেদের কর্মস্থলে মাসের পর মাস অনুপস্থিত থাকেন এবং যেখানে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অবগত থাকে, সেখানে তাদেরকে নিয়মিত বেতন দিয়ে আসা হয় এবং তাদের জন্য কোনো তদারকি ও শাস্তির ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের আজ এটাই সর্বপ্রধান সংকট। এ দেশে সাধারণভাবে যেমন অপরাধের জন্য শাস্তি নেই, তেমনি চিকিৎসকরা নিজেদের দায়িত্ব পালন না করে চরম অমানবিকতা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিলেও তাদের কোনো শাস্তি নেই। ঘুষ-দুর্নীতি চালিয়ে, সরকারি দলের খেদমত করে ও তাদেরকে সমর্থন জুগিয়ে এরা নিরাপদেই থাকে। সমৃদ্ধশালী বুর্জোয়া রাষ্ট্রের শোষণ-নির্যাতন অনেক রকম থাকে। কিন্তু বুর্জোয়া শ্রেণির একাংশের মধ্যে যে সভ্য আচরণ ও মানবিক বোধ আছে, এটা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এখানে মনে রাখা দরকার, কোনো সমাজের লোক হঠাৎ করে ধন-সম্পত্তির মালিক হলে, সমাজে সুবিধাভোগী হিসেবে অনেক কিছু ভোগ করলেও তারা নিজেরা এবং তাদের সহযোগী বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পীদের মধ্যে যে বিকশিত মানবিক বোধ থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এদিক দিয়ে বাংলাদেশের ধন-সম্পদশালী ও নানাভাবে সুবিধাবাদী সব ধরনের লোকেরা যে প্রকৃত অর্থে বুর্জোয়া চরিত্র অর্জন করেছে, এটা বলার উপায় নেই। বাংলাদেশে আজ যে শোষণ-নির্যাতন-নৈরাজ্য সব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তার দিকে তাকালে অন্য মত পোষণ করা কোনো সৎ লোকের পক্ষেই সম্ভব নয়।

দ্রব্যমূল্য মানুষের কষ্ট বাড়াচ্ছে by এম হাফিজ উদ্দিন খান

নানা রকম পরিসংখ্যান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের মানুষের আয় বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের আয়ের ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নানা রকম প্রশ্নও আছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। মানুষের সঞ্চিত অর্থে হাত পড়ছে এবং আয় বাড়া সত্ত্বেও সমাজে এ জন্য ইতিবাচক প্রভাব যেভাবে পরিলক্ষিত হওয়ার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। নিকট অতীতে বাংলাদেশ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) প্রতিবেদনেও এমন তথ্যচিত্রই উপস্থাপিত হয়েছে। ক্যাবের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় গত চার বছরের মধ্যে বেড়েছে সর্বোচ্চ। তাদের হিসাব মতে, ২০১৪ সালের পর রাজধানীর দুই কোটির বেশি মানুষকে পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়তে হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১৬ কোটির মধ্যে ১২ কোটি মানুষকেই অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার পঁচাত্তর শতাংশকেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের চড়া মূল্য তাদের বাড়তি আয় খেয়ে ফেলেছে। সর্বাধিক বিরূপ প্রভাব পড়েছে অতিদরিদ্র দুই কোটি মানুষের ওপর। উন্নয়নের সুফল তারা পাচ্ছে না। বাজারে চাল নিয়ে এরই মধ্যে অন্যরকম চালবাজি হয়েছে। সীমিত আয়ের মানুষের খরচের বড় অংশই চলে যায় চাল কেনায়। গত বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চালের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। আমাদের দেশে প্রায় সব মানুষের খাদ্য ভাত। এমতাবস্থায় চালের দাম বাড়লে তো মূল্যস্ম্ফীতি বাড়বেই। বাজারে আবার চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এ চিত্র গণমাধ্যমে ফুটে উঠেছে। চাল আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পণ্য। এর প্রয়োজন সর্বাগ্রে। অন্যান্য পণ্যের চেয়ে চালের দাম বৃদ্ধি মানুষকে খুব সহজে স্পর্শ করে। চালের বাজার দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আছে অশুভ চক্রের মুঠোবন্দি। এ ক্ষেত্রে আড়তদার, মজুদদার, পাইকার এবং অসাধু চাতাল মালিক মিলে যে চক্র গড়ে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, এর সুফল মেলা ভার। আমাদের দেশে বহুবার আমন-বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। কারণ বাজারমূল্যের চেয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্য কম হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হওয়া তো সম্ভব নয়। এখানে অতীতে এমনটি হয়েছে। এর সুযোগ নিয়েছে অসাধু মহল। পেঁয়াজ নিয়ে ঘটে গেল তুঘলকি কাণ্ড। বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসার পর দামের ঊর্ধ্বগতিই লক্ষ্য করা গেছে বেশ কিছুদিন। এখন যদিও নিম্নমুখী, তবুও তা যৌক্তিক প্রত্যাশামতো নয়। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে দৃশ্যত সরকারের উদ্যোগ-আয়োজন কম না হলেও এসব উদ্যোগ-আয়োজন যে ত্রুটিমুক্ত নয়, বিদ্যমান পরিস্থিতি সে কথাও বলে দেয়। বাজারের ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে কি ব্যর্থ হচ্ছে- বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এমন প্রশ্ন দাঁড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে বাজারে যাচ্ছেতাই কাণ্ডকীর্তি চালাতে না পারে, এ জন্য টিসিবিকে শক্তিশালী করার তাগিদ ইতিমধ্যে বহুবার নানা মহল থেকে এসেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আশানুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু যে পণ্যদ্রব্যের দামই বেড়েছে তাই নয়, বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম, পরিবহন ব্যয়, বাসা ভাড়া। অর্থনীতির সূত্রমতে, উৎপাদন ব্যয় ছাড়াও জিনিসপত্রের দাম বাজারের চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। প্রয়োজনীয় খাতে ভর্তুকি হ্রাসের বিরূপ প্রভাবও রয়েছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পুরো সময়জুড়েই দেশে ৫৮ লাখ ২৩ হাজার টন খাদ্যশস্য (চাল ও গম) আমদানি করা হয়েছিল, যা ছিল ওই সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ আমদানি। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ ওই পরিমাণও ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এবার হাওরাঞ্চলের বন্যায় সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ- এই ছয় জেলায় গত বছরের মে মাস পর্যন্ত সময়ে ২ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে যায়, যা ওই অঞ্চলের মোট আবাদি জমির পরিমাণের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ। এতে ওই অঞ্চলের প্রায় ৬ লাখ টন ধান নষ্ট হয়েছে বলে তখন এক সেমিনারে জানিয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। যদিও বেসরকারি সংস্থার হিসাবে হাওরাঞ্চলে বন্যার কারণে প্রায় ২২ লাখ টন ফলসহানি হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি অঞ্চলে নেক ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসলহানি হয়। এ অবস্থায় দেশের চাহিদা মেটাতে চাল আমদানি করে সরকার। তখন বাজার ও অর্থনীতির বিশ্নেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন, দেশে বিদ্যমান চাহিদার বিপরীতে বর্তমান সরকারের খাদ্য মজুদ বেশ সন্তোষজনক। এ অবস্থায় ফসলহানির পরিমাণ ও কৃষক স্বার্থ বিবেচনা করে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে সাময়িকভাবে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ভোক্তার কোনো কাজেই আসবে না। অবিবেচনাপ্রসূত কোনো সিদ্ধান্তে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলে পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়বে এবং জনজীবন এর বিরূপ প্রভাব থেকে বাইরে থাকতে পারবে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ কথা বলা যায় যে, নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা কিংবা সীমা আরও বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হলো, বেসরকারি পর্যায়ে চালের মজুদ যতই থাকুক না কেন সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে সরকারের মজুদ বাড়িয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রির কার্যক্রম জোরদার করা। আরও একটি বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা যে, আতপ চাল খোলাবাজারে না দিয়ে সিদ্ধ চাল দেওয়া। কারণ আতপ চাল সিংহভাগ মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলে না। এ জন্য আতপ চাল কিনতে মানুষ আগ্রহ দেখায় না। গরিব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা তাদের এ ব্যাপারে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অবশ্যই চালের সরবরাহ বাড়ানো দরকার। এই কথাগুলো নানা মহল থেকে এ পর্যন্ত বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা কথাগুলো তেমন একটা আমলে নিচ্ছেন বলে বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে না। ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে আন্দোলন হয়, কিন্তু জনসাধারণের অধিকারের বিষয় নিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কি আমাদের রাজনীতিকরা কথা বলেন? রাজনীতির মূল লক্ষ্য যদি হয় জনকল্যাণ, তাহলে রাজনীতিকরা কেন এসব দিকে যথাযথভাবে দৃষ্টিপাত না করে ক্ষমতার রাজনীতির ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী? সাধারণ মানুষের বিড়ম্বনা কি তাদের স্পর্শ করে না? মানুষ তো কত রকম বিড়ম্বনা সয়ে চলেছে তাদের চোখের সামনে; কিন্তু তারা তো এসব ব্যাপারে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সরব নন। আগেই বলেছি, চাল অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পণ্য এবং প্রয়োজন সর্বাগ্রে। অন্যান্য পণ্যের চেয়ে চালের দাম মানুষকে খুব সহজে স্পর্শ করে। চালের বাজার দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আছে অশুভ চক্রের মুঠোবন্দি। এ ক্ষেত্রে আড়তদার, মজুদদার, পাইকার, অসাধু চাতাল মালিক মিলে যে চক্র গড়ে উঠেছে- তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, এর সুফল মেলা ভার। আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে একটি মহল আরেকটি মহলকে দোষারোপ করে। কিন্তু এসব বিষয় নজরদারির দায়দায়িত্ব যাদের, অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিকারে যাদের কঠোর হওয়ার কথা তারা যদি দোষারোপের গণ্ডিবদ্ধ থাকে, তাহলে মানুষ সুফল আশা করবে কীভাবে! যারা হীন চক্রান্তে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষকে তো এর বিরূপ ফল ভোগ করতেই হবে। এমনটি তো কোনোভাবেই কাম্য নয়। কোনো গোষ্ঠীর হাতে যদি বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে যায়, তাহলে ভোক্তার স্বার্থের চরম হানি ঘটবে, এটিই তো স্বাভাবিক। ভোক্তাকে সুরক্ষা দিতে হলে অবশ্যই সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির মানে তো এই নয় যে, যার যা খুশি তাই করার সুযোগ বিরাজ করবে কিংবা ব্যবস্থার পথ সুগম থাকবে। সরকারের সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলদের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আবারও অত্যন্ত জোর দিয়েই বলি, একই সঙ্গে টিসিবিকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। ভোক্তার স্বার্থরক্ষা করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ বাজারের ওপর সরকারের নজরদারি বৃদ্ধি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের মূলোৎপাটন ভিন্ন গত্যন্তর নেই। মূল কথা হচ্ছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে রাখতে হলে একটি কমিটমেন্ট প্রয়োজন। বাজার নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যত সরকারের তরফে নানারকম পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যত সুফল মেলেনি কিংবা মিলছে না। কেন? এই কেনর উত্তর সন্ধান করাটা জরুরি। এর আগে কয়েক দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় আরও কয়েকটি পণ্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। বাজার নামক স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা কেন খুব জরুরি, আশা করি এর বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার যদি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে তাহলে এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হতে বাধ্য।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

'সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন' এই ধুয়াটির নেপথ্যের রহস্য কী? by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আজ এমন একটি লেখা লিখছি, যা পাঠ করে আমার একশ্রেণির পাঠক হয়তো এই ভেবে দুঃখ পাবেন যে, দেশময় যখন দেশি-বিদেশি শক্তিশালী মহল থেকে 'সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন' অনুষ্ঠানের দাবি উঠেছে, তখন আমি এই দাবির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করছি কেন? আমি সহৃদয় পাঠকদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমি নিজেও এই দাবিটির সমর্থক। দেশের সব ছোট-বড় দেশপ্রেমিক দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু এবং পরিচ্ছন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক- এটার বিরোধিতা কেউ করতে পারে না। বিএনপি এই নির্বাচনে যোগ দিক এবং জয়ী হলে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করুক- এটা সবার সঙ্গে আমারও আন্তরিক কামনা। কিন্তু আমার সন্দেহ, 'সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন'- এই স্লোগান অথবা দাবিটি দেশি-বিদেশি বিশেষ মহল তাদের রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। দাবিটি এতই নির্দোষ এবং নিরপেক্ষ মনে হয় যে, সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারবে না, এর ভেতর কোনো রাজনৈতিক কূটকৌশল লুকানো আছে। ২০১৮ সালের প্রত্যাশিত সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো নিবন্ধিত দলেরই (নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অযোগ্য ঘোষিত দল বা দলগুলো ছাড়া) কোনো রকমের বাধা নেই। বিএনপির তো নেই-ই। সুতরাং আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ যে প্রত্যাশিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একমাত্র বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার কথা বলছে। এটা তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এ অবস্থায় আমাদের একটি সুশীল সমাজ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমা কয়েকটি দেশ 'সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন' অনুষ্ঠানের স্লোগানটি হঠাৎ এত বেশি লুফে নিয়েছেন কেন? তাদের দাবি তো সরকারের কাছে একটাই হওয়া উচিত, নির্বাচন যেন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়। তাহলে অন্যান্য পশ্চিমা দেশের মতো ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। বিএনপির ধুয়া, এই সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। এটা তাদের সন্দেহ, কোনো প্রমাণ নেই। তথাপি নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের মাধ্যমে কঠোর পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিএনপির ওপরই নির্বাচনে যোগ দেওয়ার চাপ দেওয়া উচিত পশ্চিমা দেশগুলোর। তা না করে কিছু পশ্চিমা দেশ এবং আমাদের একটি সুশীল সমাজ স্লোগান তুলেছে, 'সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন'। আমার ধারণা, 'সব দল' কথাটা এখানে স্মোকস্ট্ক্রিন; আসল কথায় বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন যেন না হয়। আর বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে হবে আওয়ামী লীগ সরকারকেই। সেটা হাসিনা সরকার কীভাবে করতে পারে? একমাত্র তাদের দাবি মেনে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তাদের পছন্দমতো তথাকথিত নির্বাচন সহায়ক সরকার গঠন করে সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা দ্বারা।
তাই নয় কি? এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি মহলগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে তাদের উচিত, এই নির্বাচন আরও অবাধ ও সুষ্ঠু করার ব্যাপারে তাদের তদারকির ব্যবস্থা সম্পর্কে বিএনপিকে আশ্বস্ত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য চাপ দেওয়া। অন্যদিকে বিএনপিরও উচিত, অন্যান্য দেশের মতো ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক ব্যবস্থা মেনে নিয়ে সরকারের কাছে জোর দাবি তোলা, তাদের শান্তিপূর্ণ সভা-শোভাযাত্রায় পুলিশের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, গ্রেফতারকৃত কর্মী ও নেতাদের বিরাট অংশকে মুক্তি দেওয়া এবং অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরির নিশ্চিত ব্যবস্থা করা। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য তারা একদিকে লিগ্যাল ব্যাটেল এবং পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালাতে পারেন। তাতে আওয়ামী লীগ সরকার বাধা দিলে জনগণই এই সরকারের ওপর বিগড়ে যাবে এবং নির্বাচনে তার প্রভাব পড়বে। বিএনপি নেতারা তো স্বীকার করছেন, তাদের নেত্রী জেলে যাওয়ার পর দল আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। আসলে কিছু পশ্চিমা দেশ এবং তাদের অনুগ্রহপুষ্ট দেশি বুদ্ধিজীবী ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব করার জন্য যে খেলাটি খেলেছিলেন, এখন আবার সেই খেলাটিই অন্যভাবে খেলতে চান। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠান- এটা সবার কাছেই মনে হবে একটি নির্দোষ ও নিরপেক্ষ দাবি। সরল জনমনে এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি দ্বারা তারা চান, সব দল নয়, বিএনপিকে নির্বাচনে টানতেই হবে এবং সে জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। সেই ব্যবস্থা হলো বিএনপির সব ন্যায়-অন্যায় দাবি মেনে নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের দৃশ্যত পরাজয় মেনে নেওয়া। এই আসল কথাটা মুখে বলতে না পেরে তারা সবার অংশগ্রহণের আপ্তবাক্যের আড়ালে নতুন খেলাটি খেলছেন। তা না হলে এই দেশি-বিদেশি মহলগুলো বিএনপির ওপরই চাপ দিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য। অন্যদিকে সরকারকেও পরামর্শ দিত, কীভাবে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান আরও নিশ্চিত করা যায়। আমাদের সুশীল সমাজের কেউ কেউ ঠারেঠোরে বলার চেষ্টা করছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনটি বৈধ হয়নি। কারণ, তাতে সবার (বিএনপির) অংশগ্রহণ ছিল না। কিন্তু তারা ভুলে যান, কোনো দেশে ক্ষমতাসীন দল যখন কোনো বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয় না, তখন সেই নির্বাচন সুষ্ঠু বলে বিবেচিত হয় না। ২০১৪ সালে বিএনপিকে নির্বাচনে যোগ দিতে বাধা দেওয়া হয়নি। তারা কিছু অবাস্তব দাবি তুলে নিজেরাই নির্বাচনে যায়নি। অথচ সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ সব নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে জয়লাভও করেছে। কোনো দল নিজেদের ইচ্ছায় নির্বাচনে না গেলে সেই নির্বাচন যদি অবৈধ হয়, তাহলে ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া সরকারের আমলে পাকিস্তানে যে সাধারণ নির্বাচন হয়, তাতে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মতো একটা বড় দল (কারও কারও মতে, তখন পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল) 'ভোটের আগে ভাত চাই' এই দাবি তুলে নির্বাচন বয়কট করা সত্ত্বেও সেই নির্বাচন বৈধ বিবেচিত হলো কীভাবে? একশ্রেণির ব্রিটিশ ও মার্কিন কূটনীতিকও বাংলাদেশে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধুয়ায় কণ্ঠ মিলিয়েছেন। তারা ভুলে গেছেন, রোডেশিয়ায় যখন ব্রিটিশ শাসনবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, তখন ব্রিটিশ সরকার সেখানে নির্বাচন দেয়, যাতে তারা একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে। নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে তারা কৌশলে দেশটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল রবার্ট মুগাবের দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করে। অতঃপর তাদের তাঁবেদার একটি দলকে নির্বাচনে জিতিয়ে এনে দলটির নেতা বিশপ মুজারেওয়াকে সরকার গঠন করতে দিয়েছিলেন। মুজারেওয়া অবশ্য বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ওই নির্বাচন ও মুজারেওয়া সরকারকে বৈধ বলে চালাতে চেয়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছে কয়েক বছর আগে আফগানিস্তানে কারজাই সরকারকে নিয়ে। এ রকম উদাহরণ অনেক আছে। আমার যতদূর মনে পড়ে, এখন যারা বাংলাদেশে প্রচ্ছন্নভাবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাদের মধ্যে একজন ড. কামাল হোসেন তখন পাপেট কারজাই সরকারের পরামর্শদাতা হয়ে সম্ভবত জাতিসংঘের পক্ষে কাবুলে গিয়েছিলেন।
কারজাইকে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট করার জন্য যে নির্বাচনটি হয়েছিল, তা ছিল নির্বাচনের নামে এক নির্লজ্জ প্রহসন। আর সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের ইচ্ছায় নির্বাচনে না আসায় ২০১৪ সালে তাদের ছাড়া নির্বাচন হওয়ায় এবং গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায়, দেশ-বিদেশের এই গণতন্ত্রপ্রেমীদের রাতে সুনিদ্রা হয় না। খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হওয়া আদালতের ব্যাপার। তাতে নাক গলানো কারও উচিত নয়। এটা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দলও বলেছে। আর সাধারণ নির্বাচন রাজনৈতিক ব্যাপার। এ সম্পর্কে সবারই কথা বলার অধিকার আছে। এ দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। নিম্ন আদালতের রায়ে যদি কোনো ভুল থাকে, তাহলে তা সংশোধনের জন্য হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট আছে। উচ্চ আদালতে মামলা চালানোর জন্য বিএনপি তো তাদের অনুগত এক ঝাঁক আইনজীবী থাকা সত্ত্বেও ড. কামাল হোসেনের কাছে ধর্ণা দিয়েছে। তিনি নাকি পরামর্শ দিতে রাজিও হয়েছেন (যদিও তিনি ক্রিমিনাল কেসের আইনজীবী নন)। তাহলে বিএনপি কেন আদালতের এখতিয়ার আর রাজনৈতিক অধিকার- এ দুটি আলাদা বিষয়কে গুলাচ্ছে? খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাব না- এই দাবি তোলার অবকাশ তাদের কোথায়? এখন প্রশ্ন, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কি সরকারকে আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করে দিতে হবে? আওয়ামী লীগের উচিত, সাধারণ নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক দাবি-দাওয়ার কাছে মাথানত না করে দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আরও নিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করা এবং অনাবশ্যক ধরপাকড় বন্ধ করা। অন্যদিকে বিএনপিরও উচিত, নানা দাবি-দাওয়ার আড়ালে আসন্ন নির্বাচন বানচালের চেষ্টা না করে নির্বাচনে যোগ দেওয়া এবং দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার ব্যবস্থা করা। আর আমাদের বিদেশি হিতৈষীরা যদি সত্যই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারে আন্তরিক হন, তাহলে ২০০১ সালের খেলা না খেলে বিএনপি যাতে নির্বাচনে আসে, তার চেষ্টা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে হয়, সে জন্য সরকারকে সহযোগিতা করা।

সুধারামের তিন রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নোয়াখালীর সুধারামের চার রাজাকারের মধ্যে ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া অপর আসামিকে ২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি আমির হোসেন ও বিচারক আবু আহমেদ জমাদার। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আমির হোসেন ওরফে আমির আলী, মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন ও আবুল কালাম ওরফে এ কে এম মনসুর।  কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হলেন আবদুল কুদ্দুস। আসামিদের মধ্যে আবুল কালাম ওরফে এ কে এম মনসুর বর্তমানে পলাতক। এরআগে গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন।  গত ৬ ফেব্রুয়ারি এ মামলার উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ যে কোন দিন রায় ঘোষণা করা হবে। এর ৩৪ দিন পর গতকাল রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন বিচারক। আসামিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই এলাকায় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের তিনটি অভিযোগ রয়েছে।
এ মামলার আসামিরা হলেন- আমির আহমেদ ওরফে আমির আলী, মো. জয়নাল আবেদীন, আবদুল কুদ্দুস ও আবুল কালাম ওরফে এ কে এম মনসুর। তাদের মধ্যে মনসুর পলাতক। মামলার আরেক আসামি ইউসুফ আলী গ্রেফতার হওয়ার পর অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়ায় তার নাম বাদ দেওয়া হয়। মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর জাহিদ ইমাম ও রেজিয়া সুলতানা চমন। আসামি পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তরিকুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম ও মাসুদ রানা। প্রসিকিউশন পক্ষে ১৫জন সাক্ষী দেন এবং এবং আসামিপক্ষ কোন সাফাই সাক্ষী দেয়নি। এ মামলায় পাঁচ জনের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৬ নভেম্বর তদন্ত শুরু হলেও অভিযোগ গঠনের আগেই আসামি মো. ইউসুফ আলী গ্রেফতারের পর অসুস্থ হয়ে মারা যান। ২০১৫সালের ১৪ অক্টোবর নোয়াখালী ও লক্ষীপুর থেকে চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ২০১৬ সালের ২০ জুন চার আসামিকে হত্যা, লুণ্ঠণ ও অগ্নিসংযোগের তিন ঘটনায় অভিযুক্ত করে চার্জ গঠন করেন ট্রাইবূ্যনাল। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় নোয়াখালীর সুধারামে ১১১জনকে হত্যা ও গণহত্যার তিনটি অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রথম অভিযোগ, একাত্তরের ১৫ জুন বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নোয়াখালীর সুধারামের শ্রীপুর ও সোনাপুরে আসামিরা ৪১জন নিরিহ-নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে এবং তাদের বাড়ী-ঘর লুট করে। ২য় অভিযোগ, একাত্তরের ১৩ সেপ্টেম্বর আমীর আলীর নেতৃত্বে অপর দুই রাজাকার মনসুর ও জয়নাল সুধারামের পশ্চিম করিমপুর ও দেবীপুর গ্রামের ২জনকে আটক করে নির্যাতনের পর হত্যা করে। ৩য় অভিযোগ একই দিনে সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আসামি আমীর ও মনসুর রামহরিতালুক, দেবীপুর ও উত্তর চাকলাদারগ্রামে ৩শ জনকে আটক করে নির্যাতন চালায় এবং তার মধ্যে থেকে বেছে বেছে ৯জনকে গুলি করে হত্যা করে।

রোহিঙ্গাদের পোড়া বাড়িতে সেনা অবকাঠামো, হেলিপ্যাড, সড়ক

উদ্বেগজনক হারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে সামরিকীকরণ করা হচ্ছে। সেখানে পুড়িয়ে দেয়া রোহিঙ্গাদের বসতভিটা, সম্পত্তি গ্রাস করছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর জন্য নানা রকম ঘাঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে সেখানে। কয়েক মাস আগে যেসব স্থানে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, তা বুলডোজার দিয়ে সমান করে দেয়া হচ্ছে। সেখানে এক সময় জনবসতি ছিল- এমন চিহ্ন পর্যন্ত রাখা হচ্ছে না। এসব স্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে সেনা ঘাঁটি, হেলিপ্যাড। পুড়িয়ে দেয়া গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে সড়ক। ‘রিমেকিং রাখাইন স্টেট’ শীর্ষক সর্বশেষ রিপোর্টে এসব কথা বলেছে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ২৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে সোমবার। এতে ব্যবহৃত হয়েছে স্যাটেলাইটে তোলা সর্বশেষ ছবি। যুক্ত করা হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য। সবকিছু বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ক্রাইসিস রেসপন্স পরিচালক তিরানা হাসান বলেছেন, রাখাইনে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো নাটকীয় গতিতে সেনাবাহিনী ভূমি গ্রাস করছে। যেসব বাহিনী সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের জন্যই ওই সব স্থানে গড়ে তোলা হচ্ছে ঘাঁটি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের যেসব গ্রাম বা জমি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তার ওপর দিয়েই নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন নতুন সড়ক ও অবকাঠামো। এর ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আরো কমে গেছে। তিরানা হাসান বলেন, এর ফলে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফেরত যাওয়া এখন সুদূরপরাহত। শুধু তাদের বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এমন নয়। এখন সেখানে নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, রাখাইনে কীভাবে রোহিঙ্গাদের শত শত গ্রাম খেয়াল খুশিমতো এবং টার্গেট করে সেনাবাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছে তা প্রামাণ্য আকারে উপস্থাপন করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অন্যরা। সোনবাহিনী শিশু, নারী, পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। গণহারে ধর্ষণ করেছে বালিকা ও নারীদের। এ ছাড়া তাদের ওপর চালানো হয়েছে অন্যান্য যৌন সন্ত্রাস। পর্যায়ক্রমিকভাবে তারা পুড়িয়ে দিয়েছে শত শত গ্রাম। ঘটিয়েছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এর ফলে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অ্যামনেস্টি তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে প্রকাশ করেছে, কীভাবে জানুয়ারি থেকে বুলডোজার দিয়ে রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে দেয়া বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। এমন কি ওইসব বাড়ি বা গ্রামগুলোর চারপাশের গাছপালা ও সবজি ক্ষেতও নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। বেশির ভাগ এলাকা এমন করে দেয়া হয়েছে যে, কেউ এখন আর তা চিনতে পারবে না। এর ফলে মারাত্মক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো অপরাধের প্রমাণ কর্তৃপক্ষ একেবারে মুছে দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তদন্তে কিছুই ধরা না পড়ে। তিরানা হাসান বলেন, পুরো গ্রামকে বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া অবিশ্বাস্য রকম উদ্বেগের বিষয়। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সব প্রমাণ মুছে দিচ্ছে। তবে তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো সেখানে এখন দ্রুতগতিতে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে অবকাঠামো। নির্মাণ করা হচ্ছে সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশের জন্য আবাসন। নির্মাণ করা হচ্ছে হেলিপ্যাড। যে গতিতে এই নির্মাণকাজ চলছে তা আরো উদ্বেগজনক। স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে হাতেগোনা দু’এক মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ওইসব গ্রামে নতুন নতুন অবকাঠামো গজিয়ে উঠছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পুরো গ্রাম, আশেপাশের বন কেটে জায়গা বানানো হয়েছে। স্যাটেলাইটের ছবিতে নিশ্চিত করে বলা হয়েছে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের জন্য কমপক্ষে তিনটি ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি নির্মাণ করা হয়েছে মংডু এলাকায়। একটি নির্মাণ করা হয়েছে বুথিডংয়ে। দৃশ্যত এসব অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে জানুয়ারিতে। সবচেয়ে বড় অবকাঠামো বা ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে বুথিডং এলাকায় আহ লেল চুং গ্রামে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সেখানকার নির্ধারিত এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদেরকে জোর করে উচ্ছেদ করেছে সেনাবাহিনী। জানুয়ারিতে ওই এলাকা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন ৩১ বছর বয়সী একজন পুরুষ। তিনি বলেছেন, ওই অঞ্চলের মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। তারা সেখানে থাকতে চাইছে না। কারণ, তাদের ওপর আরো সহিংসতা চালানো হতে পারে। মংডু শহরের বাইরে কান কাইয়া নামের একটি গ্রামের স্যাটেলাইট ছবি ধারণ করেছে অ্যামনেস্টি। আগস্টের দু’মাস পরে ওই গ্রামের ধারণ করা ছবিতে দেখা যায় বসতি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু মার্চের শুরুতে ধারণ করা ছবিতে দেখা যায়, ওই সব জমির ওপর ভবন দৃশ্যমান। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করছে, এটা হতে পারে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন ঘাঁটির অংশ। একই রকম ভবন বা ভবন নির্মাণের তৎপরতা দেখা গেছে ইন ডিন গ্রামে। এই গ্রামেই ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিল মিয়ানমার। উল্লেখ্য, ২৫শে আগস্ট রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা শুরুর পরে বাধ্য হয়ে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এর বেশির ভাগই মুসলিম। তাদের ওপর চালানো এই নৃশংসতাকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ জাতি নিধন বলে আখ্যায়িত করেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমার। তারা দাবি করে, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ওপর আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) চালানো হামলার জবাবে তারা অভিযান চালায় রাখাইনে। কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ সেনাবাহিনী আরসার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নামে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেছে। এটা জাতি নিধন। এর পর থেকে ওই এলাকায় কোনো মানবাধিকারকর্মী বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককে যেতে দেয়া হয় নি। অনুমতি পান নি জাতিসংঘের তদন্তকারীরাও। জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মৌলিক অধিকার বা নিরাপত্তার বিষয়ে গ্যারান্টি ছাড়া বেশির ভাগ রোহিঙ্গা ফিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে। এ অবস্থায় অ্যামনেস্টি তার রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বলেছে, রোহিঙ্গারা যে জায়গা-জমি ফেলে এসেছেন তা জাতিগত বৌদ্ধ ও অমুসলিম গ্রুপগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হবে। এর মধ্য দিয়ে রাখাইনে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার প্রমাণ মুছে দেয়া হবে। এ বিষয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

দেড় হাজার প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়ে ভাসছে পাঁচ জাহাজ

পোশাক খাতসহ প্রায় ২০টি শিল্প খাতের কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় ভাসছে কনটেইনারবাহী পাঁচটি জাহাজ। এসব জাহাজ কখন জেটিতে ভেড়ানো যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিদেশি এই পাঁচটি জাহাজের স্থানীয় এজেন্সি পরিচালনার কাজ কে করবে, তা নিয়ে জটিলতায় জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ানোর অনুমতি মিলছে না। এজেন্সি পরিচালনার কাজ পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্বে পড়ে ভুগছেন আমদানিকারকেরা। এই পাঁচ জাহাজে চট্টগ্রাম, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, হবিগঞ্জ, রংপুরসহ ১৩ জেলার প্রায় দেড় হাজার শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানি পণ্যবাহী ৬ হাজার ১৩ একক কনটেইনার রয়েছে বলে জাহাজ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বন্দর জলসীমায় আসা জাহাজ জেটিতে ভিড়তে দুই-তিন দিন দেরি হলে যেখানে ব্যবসায়ীদের উৎকণ্ঠা শুরু হয়, সেখানে এই পাঁচ জাহাজের একটি ‘এমভি টিআর আরামিস’ ২৩ দিন ধরে পণ্য নিয়ে ভাসছে। এ ছাড়া এমভি থরস্কাই ১১ দিন, ক্যাপ অ্যারাক্সস ৯ দিন, এমভি চার্লি ৮ দিন এবং ক্যাপ ওরিয়েন্ট ৫ দিন ধরে বাংলাদেশের জলসীমায় ভাসছে। এসব জাহাজে আমদানি করা শিল্পের কাঁচামাল না পেয়ে ইতিমধ্যে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন পোশাক শিল্পকারখানার মালিকেরা। কারণ, পণ্য উৎপাদনের জন্য তাঁরা সময় পান বড়জোর তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ। পণ্য উৎপাদনের অধিকাংশ সময় চলে গেলেও তাঁরা কাঁচামাল হাতে পাচ্ছেন না। এর মধ্যে এনভয় টেক্সটাইল, রিজেন্সি গার্মেন্টস, বেক্সিমকো ফ্যাশন, ফিয়াত ফ্যাশন, মিলেনিয়াম টেক্সটাইল প্রমুখ কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া ওষুধ, কাচ, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সিরামিক, রং, সিমেন্ট, প্রসাধন, কাগজ, পলিথিন, প্লাইউড, সার, প্লাস্টিক, গাড়ি সংযোজন, টায়ার, আসবাব, চা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জুতা প্রস্তুতকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্য রয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর বন্দর ও জাহাজীকরণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘পণ্য উৎপাদনের জন্য বিদেশি ক্রেতারা সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় দেন। এর মধ্যে যদি ২৩ দিনেও কারখানায় পণ্য না ঢোকে, তাহলে তো উড়োজাহাজে পণ্য পাঠানো ছাড়া বিকল্প উপায় থাকবে না।’
এই পাঁচটি জাহাজের তিনটিতে আছে বিএসআরএম গ্রুপের রড তৈরির কাঁচামাল স্ক্র্যাপ ও রাসায়নিক। এর মধ্যে ‘টিআর আরামিস’ জাহাজে আনা ৩৫ কনটেইনার পণ্য ২৩ দিনেও হাতে পায়নি তারা। বিএসআরএম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, নির্ধারিত সময়ে পণ্য হাতে না পাওয়ায় উৎপাদনে ব্যাঘাত হচ্ছে। একই জাহাজে গাজীপুরের কাশিমপুরে ডেনিম কারখানার জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে ডেলটা গ্রুপ। এসব যন্ত্রপাতি না পাওয়ায় কারখানাটি চালু করা যাচ্ছে না। জানা গেছে, এসব জাহাজে যে দেড় হাজার প্রতিষ্ঠানের পণ্য আনা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ইউনিলিভার, স্কয়ার গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, ট্রান্সকম গ্রুপ, অ্যাপেক্স ট্যানারি, বসুন্ধরা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাভানা, প্রাণ-আরএফএল, আবুল খায়ের গ্রুপ, কেডিএস গ্রুপ, পারটেক্স, জিপিএইচ, কেএসআরএম, যমুনা গ্রুপ, বার্জার পেইন্টস, লিনডে বাংলাদেশ, নেসলে, সেনাকল্যাণ সংস্থা, আরএকে সিরামিক, পেডরোলো গ্রুপ প্রমুখ। কাস্টমস সূত্র জানায়, এজেন্সি পরিচালনা হস্তান্তর নিয়ে যে দুটি প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্ব চলছে তার একটি হলো মেসার্স সি মেরিন শিপিং লাইনস লিমিটেড। অপরটি হলো মার্কো শিপিং কোম্পানি। কনটেইনার জাহাজ পরিচালনাকারী সিঙ্গাপুরভিত্তিক ফার শিপিং লাইনস লিমিটেডের বাংলাদেশের এজেন্ট ছিল সি মেরিন। ৩১ জানুয়ারি সি মেরিন শিপিং লাইনস লিমিটেডের সঙ্গে ফার শিপিং কোম্পানির এজেন্সি পরিচালনা চুক্তি শেষ হয়। এরপরই বিদেশি কোম্পানিটি সি মেরিনকে বাদ দিয়ে মার্কো শিপিং কোম্পানিকে এজেন্সি পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেয়। নিয়োগ পাওয়ার পর ফার শিপিংয়ের পক্ষে বন্দরে আসা জাহাজের কাজ করার অনুমতি চেয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে মার্কো শিপিং। নিয়মানুযায়ী, এজেন্সি হস্তান্তর করতে হলে আগের কোম্পানির সঙ্গে দেনা-পাওনা পরিশোধের সমঝোতা করতে হয়। এরপর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দুই পক্ষের উপস্থিতিতে যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানকে এজেন্সি পরিচালনার অনুমতি দেয়। এই নিয়মানুযায়ী, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যৌথ ঘোষণাপত্র প্রদানের জন্য চিঠি দেয় দুই পক্ষকেই। সি মেরিন যৌথ ঘোষণাপত্র প্রদান না করায় ফার শিপিং কোম্পানিটির পক্ষে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়দেনা গ্রহণসংক্রান্ত অঙ্গীকারনামা কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে প্রদান করে মার্কো শিপিং। এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি বন্দরে সাময়িকভাবে কাজ করার জন্য মার্কো শিপিংকে শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মার্কো শিপিংকে চূড়ান্ত অনুমোদন না দেওয়ায় তারা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে।

খেলাপি ঋণ আর কত বাড়বে?

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত আঞ্চলিক ব্যাংকিং সম্মেলনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক বললেও পুরো সত্য বলা হয় না। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল ও ভারত যোগ দেয়। এই তিন দেশে খেলাপি ঋণের হারে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। যেখানে নেপালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গড়ে ১ দশমিক ৭১ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ গড়ে ২৫ শতাংশ। আর বেসিক ব্যাংক ও বিডিবিএলে সেই পরিমাণ ৫০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সাল পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর গত নয় বছরে সেই ঋণ বেড়ে হয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার খারাপ ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ এখন ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ৪৮টি ব্যাংকের মধ্যে ১৩টির আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ। এর কারণ রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা মহলের চাপে ব্যাংকগুলো নিয়মবহির্ভূত ঋণ দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের হল–মার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গে নতুন যুক্ত হয়েছে জনতা ব্যাংক থেকে এ্যাননটেক্স নামে একটি গ্রুপকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ঘটনা। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে একধরনের নৈরাজ্য চলছে। অথচ যেকোনো দেশের অর্থনীতির চাকা সুচারুভাবে চালাতে সুস্থ ও সমৃদ্ধ ব্যাংকিং খাত আবশ্যক। গত তিন দশকে বাংলাদেশে অর্থনীতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেরও বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু সেই বিকাশ যে সুস্থধারায় প্রবাহিত হয়নি, তার প্রমাণ ১৩টি ব্যাংকের বেহাল অবস্থা। সরকারি খাতের ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় আরও ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি প্রায় নির্বাসিত। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।
এ ক্ষেত্রে আইনের সীমাবদ্ধতা যেমন আছে, তেমনি আছে নজরদারির ঘাটতিও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থও তারা উদ্ধার করতে পারেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকটিই যদি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে না থাকতে পারে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি অন্যের দুর্নীতি-অনিয়ম কীভাবে ধরবে? বিআইবিএমের আঞ্চলিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে যেসব সুপারিশ করেছেন, তা বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষ সরকার সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক পদে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়, যাঁদের ব্যাংকিং সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাঁদের অতীতটাও পরখ করা প্রয়োজন। টাকা থাকলে যে কেউ ব্যাংকের শেয়ার কিনতে পারেন, কিন্তু পরিচালক হতে হলে তাঁর ন্যূনতম যোগ্যতা থাকতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য একাধিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। এ কারণেই একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটেছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ সীমা ছাড়িয়েছে, কোনো কোনো ব্যাংক গ্রাহকদের আস্থা হারিয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত ব্যাংকিং খাতের সংকট উত্তরণে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে সরকার আরও তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমতি দিতে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। মূলধনের অভাবে যেখানে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো চলতে পারছে না, সেখানে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা সংকটকে আরও বাড়াবে। অতএব, নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চিন্তা বাদ দিন। চালু ব্যাংকগুলো যাতে ভালোভাবে চলে, সেই উদ্যোগ নিন।

চা–বাগানের টিলা কাটা

এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে একটি চা–বাগানের ভেতর শ্রমিকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো টিলা কাটবে আর বাগান কর্তৃপক্ষ তার কিছুই জানবে না। সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগান কর্তৃপক্ষ সে কাজটিই করতে চেয়েছে। তারা বাগানের ভেতরে টিলা কাটার দায় শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। শুধু তা–ই নয়, বাগান কর্তৃপক্ষ টিলা কাটার ঘটনা ধামাচাপা দিতে প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদককে আটকেও রেখেছিল। সোমবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত শনিবার বাগান এলাকায় বাঘের বিচরণ লক্ষ করতে বন বিভাগের ক্যামেরা ট্র্যাকিং করতে গিয়ে বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী দেখেন, মালনীছড়া চা–বাগানের ভেতরে সাতটি টিলা কাটা হচ্ছে। এর মধ্যে তিনটি টিলার বেশির ভাগ কাটা হয়ে গেছে। এ সময় প্রথম আলোর আলোকচিত্রী আনিস মাহমুদ টিলা কাটার ছবি তুললে চা-বাগানের ব্যবস্থাপকের দপ্তর থেকে একদল লোক তাঁদের আটক করে। পরে অবশ্য পুলিশ ও সাংবাদিকদের সহায়তায় তাঁরা ছাড়া পান। এ ঘটনা পরদিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন সরেজমিনে বাগান এলাকায় গেলে বাগান ব্যবস্থাপকের দপ্তরের কর্মকর্তারা টিলা কাটার বিষয়টি পুরোপুরি চা-শ্রমিকদের ঘাড়ে চাপান এবং এ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান।
মালনীছড়া চা–বাগান বাংলাদেশের বৃহত্তম এবং প্রথম প্রতিষ্ঠিত চা–বাগান। এখানকার ১ হাজার ৫০০ একর জায়গাজুড়ে শতাধিক টিলায় রয়েছে রাবারবাগান ও পাদদেশে আছে চা-বাগান। পরিবেশ আইন অনুযায়ী, পাহাড়-টিলা কাটা নিষিদ্ধ ও শাস্তিমূলক অপরাধ হলেও কিছু অর্থলোভী মানুষের কারণে মালনীছড়া চা-বাগানের এসব টিলা ধ্বংস করা হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক।  প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ৩০ বছর মেয়াদি দুই দফায় বন্দোবস্ত নিয়ে রাগীব আলী এ বাগান পরিচালনা করছেন, যিনি কিনা মালনীছড়ার পাশের তারাপুর চা-বাগান দখল ও সরকারের হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দণ্ডিত। তাঁর বিরুদ্ধে চা-বাগানের ‘উন্নয়নের’ নামে টিলা কাটার অভিযোগ রয়েছে। চা-বাগান ইজারা আইনে টিলা কাটলে অথবা ভূমিরূপ পরিবর্তন করলে চা-বাগান বন্দোবস্ত প্রদানের বিধি লঙ্ঘিত হয়। এ জন্য আগেই ইজারা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, কোনো অনুমোদনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ইজারা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই টিলা কাটা চলছে। এখন মালনীছড়া চা-বাগান কর্তৃপক্ষ টিলা কাটার দায় শ্রমিকদের ওপর চাপালেও পরিবেশ অধিদপ্তর চা-বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের উপপরিচালক। কেননা, শ্রমিকেরা তো আর বাগান পরিচালনা করছেন না। আমরা আশা করব, পরিবেশ অধিদপ্তর অনতিবিলম্বে মালনীছড়া চা-বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।

সভা–সমাবেশের অধিকার

কয়েক দিন ধরে বিএনপি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা ও ধরপাকড়ের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে সভা করার আনুষ্ঠানিক অনুমতি চেয়েও তা মিলছে না। আজ সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার অনুমতি চেয়ে বিএনপির তরফে যে আবেদন করা হয়েছে, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তার অনুমতি মেলেনি। এই সরকারের আমলে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা বিএনপির জন্য এটাই প্রথম নয়। বরং সভা-সমাবেশ করার অনুমতি না পাওয়াই যেন তাদের সাধারণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ৩৭ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ সংবিধানপ্রদত্ত এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের; কিন্তু আমরা লক্ষ করছি উল্টো প্রবণতা। সরকারের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলসহ বিরুদ্ধ মতাবলম্বী বিভিন্ন সংগঠনের এই অধিকার প্রায়ই লঙ্ঘিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কোনো দল বা সংগঠন সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন ইত্যাদি কর্মসূচির আয়োজন করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তাদের ওপর নির্দয়ভাবে বলপ্রয়োগ করে। এমনকি নারীরাও লাঞ্ছনাপূর্ণ নির্যাতনের শিকার হন। শনিবার কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীদের মিছিলেও পুলিশকে একই ভূমিকায় দেখা গেছে। সম্প্রতি বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশের হামলা ও পণ্ড করা প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি রাস্তা বন্ধ করে বেআইনিভাবে সমাবেশ করতে যাওয়ায় পুলিশ বাধা দিয়েছে। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ কোথাও রাস্তা বন্ধ করে সভা-সমাবেশ করে না।
কিন্তু আমরা দেখেছি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাস্তায় সমাবেশ বা কর্মসূচি পালন না করলেও তাদের কর্মসূচির কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে হয় এবং তা ব্যাপক জনদুর্ভোগের কারণ ঘটায়। গত সাতই মার্চের কর্মসূচি তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। সেদিন সভাগামী মিছিল থেকে তরুণী লাঞ্ছনার অভিযোগে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিক থেকেও এ ব্যাপারে পক্ষপাতমূলক আচরণ লক্ষ করা যায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো অথবা সরকারের সমর্থক অন্য কোনো দলের সভা–সমাবেশে পুলিশ সাধারণত বাধা দেয় না। তাদের সব বাধা শুধু সরকারবিরোধী দল ও সংগঠনগুলোর কর্মসূচিতে। সরকারবিরোধী দলগুলোর ক্ষেত্রেই শুধু জনশৃঙ্খলার যুক্তি তুলে ধরা হয়। পুলিশের সদস্যরা প্রায়ই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে সরকার একদিকে রাস্তায় বিরোধী পক্ষকে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না, আবার অন্যদিকে নির্ধারিত স্থানে সমাবেশ করার অনুমতিও দিচ্ছে না। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সমাবেশ করেছে, ওয়ার্কার্স পার্টি জনসভা করছে। বিএনপি কেন সেই সুযোগ পাবে না? এটা ঠিক যে দল বা সংগঠনই সভা-সমাবেশ করুক না কেন, তাতে জনগণ দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে। এ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বের করা দরকার। কোথাও রাস্তা বন্ধ করে কর্মসূচি পালন করা হলে তার প্রভাবে আশপাশের এলাকায় যানবাহন চলাচলে অচলাবস্থা দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তাসহ সব সড়কের জন্যই এ কথা প্রযোজ্য। সমাবেশ ও জনসভার জন্য নির্ধারিত স্থান থাকা উচিত। কর্মদিবসে জনসভা না করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে করার বিষয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোকেও একমত হতে হবে। সে ক্ষেত্রে যানজটে নাকাল নগরবাসী কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।

হবিগঞ্জের বাঁধ সংস্কার

হবিগঞ্জ জেলায় গত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যে বরাদ্দ দিয়েছে, তা কার্যত বাস্তবতাবিবর্জিত। পাউবোর এ ধরনের কর্মকাণ্ডে এ প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক যে তারা কি আদৌ বাঁধ মেরামত করতে চায়, নাকি লোক দেখানো উদ্যোগ নিয়ে দায়িত্ব সারতে চায়? শনিবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত বছরের বন্যায় হবিগঞ্জ জেলার প্রায় ৪০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল সম্পূর্ণভাবে এবং প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমির ফসল অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি পাউবোর হবিগঞ্জ কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত ওই ৪০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধের মধ্যে অতি জরুরি ৩৫ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের জন্য পাউবোর সদর দপ্তরে একটি চাহিদাপত্র পাঠায়। এর বিপরীতে যে বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তা দিয়ে ওই কাজ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোন বিবেচনায় ৩৫ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারে পাউবোর সদর দপ্তর চলতি অর্থবছরে মাত্র ২ কোটি ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিল, তা এক বড় প্রশ্ন। পাউবো যে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে, তা দিয়ে ১৩ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করা সম্ভব। ফলে এই যাত্রায় ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে সংস্কার হচ্ছে মাত্র ১৩ কিলোমিটার। ফলে বাকি ২৭ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারহীন অবস্থায় থেকে যাচ্ছে।
সামনে বর্ষা আসছে। স্থানীয় কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, এই বাঁধ সংস্কারবিহীন থেকে গেলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জেলার প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১০ হেক্টর জমির বোরো ফসল ঝুঁকিতে পড়বে। আর নতুন করে ভাঙন দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে তা তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। হবিগঞ্জের ভাটি এলাকার কৃষকেরা এক ফসলি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এ দিয়েই চলে এ অঞ্চলের কৃষকের সারা বছরের অন্নসংস্থান। এটা তাঁদ ের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎসও বটে। কিন্তু এখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সঠিক সময়ে এবং টেকসই কায়দায় ফসল রক্ষা বাঁধতৈরি এবং মেরামত না করা। এ কাজটি যথাযথভাবে না করায় ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আটটি বন্যায় কৃষকেরা তাঁদের ফসল ঘরে তুলতেপারেননি। এখন জেলার ফসল রক্ষা বাঁধগুলো যদি সংস্কার করা না হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বিপুল পরিমাণ বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বোঝা যায় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পাউবো সদর দপ্তর যথাযথ উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আগামী বর্ষার আগেই পুরো বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারে পাউবোকে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।

বিমান দুর্ঘটনা : ও জীবন–মৃত্যুর ম্যানেজার এত মরছি কেন বাংলাদেশিরা?

একসঙ্গে আজ কাঁদছে বাংলাদেশ ও নেপাল। কাঠমান্ডুর ট্যাক্সিচালকদের যদি জিজ্ঞাসা করেন, বাংলাদেশে গেছেন? ডু ইউ নো বাংলাদেশ? বেশির ভাগই বলবেন, খুব চিনি। আই নো বাংলাদেশ, আই লাভ বাংলাদেশ। আরেকটু জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারবেন, বাংলাদেশ বলতে তাঁদের বেশির ভাগই বোঝেন আমাদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিকেই। কেউ কেউ হয়তো আশপাশের সস্তা হোটেল পর্যন্ত গেছেন। নেপালের শ্রমিকদের মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার ট্রানজিট বাংলাদেশ। সমুদ্রহীন নেপালের জন্য এটাই সহজ ও সস্তা রুট। আকাশ থেকে দেখা বাংলাদেশকে তাঁদের ভালো লেগে যায়। বাংলাদেশের বিশাল নদীগুলিকে মনে হয় সমুদ্র। ঠিক যেভাবে মাউন্ট এভারেস্টের বিশালতা ও শুভ্র সোনালি রূপ সমীহ ও বিস্ময় জাগায় আমাদের মনে। কাঠমান্ডুর এক ভদ্রলোক চাঁদপুরে মেঘনার মোহনাকে সমুদ্র বলে ভেবেছিলেন! নাগরকোটে পাহাড়ে চড়তে চড়তে ক্ষীণ ঝরনা দেখিয়ে সঙ্গের নেপালি বন্ধুকে বলেছিলাম, এই চিকন জলধারাই আমাদের দেশে গিয়ে বিশাল নদী হয়ে যায়। তোমাদের হিমালয়গলা পানিই বাংলাদেশকে বাঁচায়। নেপাল থেকে সব সময় জীবনই আসত, এবার এল মৃত্যুর ঢল। কেন? বিমান বাংলাদেশে করে ঢাকায় ফেরার পথে পরিচয় হয় নেপালি যুবক রাজুর সঙ্গে।
কাতারে শ্রমিকের কাজ করেন। পরিচয়ের পর কী তাঁর খাতির-যত্ন। ঢাকায় নামার পর বিদায়ের সময় তাঁর চোখ ছলছল। সেই ত্রিভুবন বিমানবন্দর আজ আবারও কাঁদাল। গতকালের ভয়াবহ ঘটনাটির পর ছবিতেও দেখলাম, পাশাপাশি শুয়ে আছে বাংলাদেশি ও নেপালিদের লাশগুলো। তার কিছুক্ষণ আগেও যখন পাশাপাশি বসে ছিল প্লেনে, তখন হয়তো কথা হয়েছিল, গল্প হয়েছিল। বিপ্লব ও নির্বাচনের পর নেপালে এখন আশাবাদের জোয়ার। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ থেকে ছুটিতে বাড়ি যেতে চাওয়া ১৩ নেপালি ছাত্রছাত্রী, কিংবা প্রশিক্ষণে আসা ১৬ পর্যটনকর্মীরা হয়তো নতুন নেপাল নিয়ে উচ্ছ্বসিতই ছিল। হয়তো সেসব কথা বলছিল বাংলাদেশি সহযাত্রীদের। সেই সহযাত্রীদের মধ্যে হয়তো ছিল ৩ মার্চে বিয়ে করে হানিমুনে যাওয়া চট্টগ্রামের মিনহাজ ও আঁখি। মেহেদি হাসান রোমিও নামের বরের সঙ্গে তৃতীয়বারের হানিমুনে যাচ্ছে নেপালে। আলোকচিত্রী প্রিয়ক গেছেন স্ত্রী অ্যানি ও সন্তান প্রয়ন্ময়ীকে নিয়ে। সঙ্গে বন্ধু স্বর্ণা। তাহসিন ও তানিম দুই বন্ধু আর নেই, নেই সরকারি কর্মকর্তা উম্মে সালমা ও নাজিয়া আফরিন চৌধুরী। কারও বাবা-মা মারা গেছেন, কেউবা মারা গেছে পরিবারসুদ্ধ। স্মৃতি হয়ে গেছে রফিক জামান, সানজিদা হক ও তাঁদের সন্তান অনিরুদ্ধ। পাশাপাশি হলুদ লাশের ব্যাগে তাঁরা শুয়ে ছিলেন নেপালি মানুষদের সঙ্গে। একসঙ্গে কাঠমান্ডু যেতে গিয়ে একসঙ্গে চলে গেলেন জীবনের ওপারে। গন্তব্য বদলায়নি তাঁদের। কেন, কার দোষে? রহস্য কাটেনি। ইউএস-বাংলার অভিজ্ঞ পাইলটের সঙ্গে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারের কথোপকথনের রেকর্ড প্রকাশের পর প্রশ্ন আরও জটিল হয়েছে। যাঁরা সবকিছু খুলে বলতে পারতেন, সেই তিন পাইলটই মারা গেছেন। বিমানের ব্ল্যাকবক্সই কেবল ভরসা। কিন্তু সত্য জানতে লেগে যাবে অনেক দিন। তদন্ত হোক, সত্যটা জানা হোক। মৃত্যুর বিরুদ্ধে সত্য একটা সান্ত্বনা ও রক্ষাকবচ। গাফিলতি কার তা জানা গেলে অন্তত ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকবে।
কিন্তু আরও সহজ-সরল সত্য হলো, অবিশ্বাস্য অবহেলা। যে দেশে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের নাট-বল্টু আলগা করা থাকে, সেই দেশে জননিরাপত্তার অবস্থা কোন রসাতলে নেমেছে, ভাবা যায়! এ দেশে সবই খরচযোগ্য হয়ে গেছে। মানুষ খরচযোগ্য, জীবন সস্তা, জবাবদিহিটাই শুধু দামি। অবিশ্বাস দানা বেঁধেছে। নিয়মিতভাবে হুতাশে মরে যাচ্ছে একেকজন। এই মৃত্যুগুলো ব্যক্তিগত না, আমাদের যৌথ মৃত্যুরই অংশ। ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার বলেছিলেন, আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো শোকযাত্রা উদ্‌যাপন করে চলেছি (We are each of us celebrating some funeral)। তিনি কথাটা বলেছিলেন আধুনিক সময়ে ব্যক্তি মানুষের কথা ভেবে। আধুনিকতা আমাদের দূরে নিয়ে যায়, বিদেশ–বিভুঁইয়ে মরে যান স্বদেশিরা। শুধু ব্যক্তিগত না, জাতীয়ভাবেও সামষ্টিক মৃত্যুর শোকমিছিল করে চলেছি। গত ১৫ দিনে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জন শ্রমিক নিহত হলেন, আহত কমপক্ষে ১৫ জন। তার পরে নারায়ণগঞ্জে বাস-লরির সংঘর্ষে নিহত হন ৯ জন। একই সময়ে সিলেটে পাথরের কেয়ারি ধসে মারা যান বেশ কয়েকজন শ্রমিক। বছরে প্রায় আট হাজার মানুষ মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। গরিব মানুষের মৃত্যুর শোক আমাদের অনেককে না ছুঁলেও মধ্যবিত্তের অপঘাতের মৃত্যু ঠিকই দম চেপে ধরে। মনে হয়, আমাদের একটা অংশের মৃত্যু হলো। মনে হয়, এভাবে তো আমরাও মরে যেতে পারি! গরিব মানুষের জীবন যেমন ঝুঁকির কিনারা দিয়ে চলে, মধ্যবিত্ত জীবনের কাছেও চলে এসেছে মৃত্যুর সেই কুৎসিত সাঁড়াশি। তার চাপ এড়াতে পারি না আমরা। হয়তো আমরা এখন বুঝতে পারছি, সব জীবনই সমান, সব রক্তই মানুষের, সব অশ্রুই সমান নোনা। যার যায়, তার সবটাই যায়। জীবন তুচ্ছ হয়ে গেছে এ দেশে। তুচ্ছ মানুষেরা এতই তুচ্ছ যে তাদের মৃত্যুকেও তুচ্ছ করে দেওয়া যায়। তুচ্ছ মানে ফালতু, সস্তা, খরচযোগ্য, এমনকি হত্যাযোগ্যও। যেমন গতকাল পুলিশের রিমান্ডে থাকার পরই মরে গেলেন ছাত্রদলের এক নেতা।
রোমান সাম্রাজ্যের আইনে এ ধরনের মানুষকে বলা হতো ‘হোমো সাসের’। তারা স্বাধীন নাগরিকও ছিল না, আবার তাদের দাসও বলা যেত না। তাদের হত্যায় অপরাধ হতো না। আত্মপক্ষ সমর্থনের যোগ্যতা ছিল না তাদের। তাদের মৃত্যু কখনো পবিত্রতার মর্যাদা তথা শহীদি সম্মান পেত না। অবহেলা আর নিষ্ঠুরতায় আমরা কি সম্মিলিতভাবে হোমো সাসের দশায় পড়ে যাচ্ছি? দুর্ঘটনাই বলি আর অপঘাতই বলি, জীবনের চেয়ে মৃত্যুই এখানে বেশি সাবলীল ও গতিশীল। স্বজনদের কাটা ঘায়ে বিচার না হওয়ার লবণ লাগে বারবার। কমে যাচ্ছে জবাবদিহি চাইবার সাহস। সর্বশেষ, মিরপুরে আগুনে লেগে বা লাগিয়ে পুড়ে বা পোড়ানো হয়েছে ২৫ হাজার বস্তিবাসীর ঘরবাড়ি-সহায়সম্পদ। ২৫ মার্চের কালরাতেও বস্তি পোড়ানো হয়েছিল, মনে পড়ে কি? আগুন লাগার সময়গুলো চমৎকার। রাজনৈতিক ডামাডোল, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক শোরগোল কিংবা অন্য কোনো হট্টগোলের মধ্যে অবলীলায় আগুন লেগে যায় মিরপুরে বা কালশীতে বা করাইল বস্তিতে। এগুলো দুর্ঘটনা, না পরিকল্পিত কাজ, তা জানা যায় না। যেমন জানা যায় না, এত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পরও দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য কবে জীবনবান্ধব হবে, মানুষবান্ধব হবে। মৃত্যুগুলো যেমন আলাদা নয়, সমস্যাগুলোও তেমন বিচ্ছিন্ন না। বাঁচতে হলে তাই জানতে হবে। জানতে হবে সত্য, আর চাইতে হবে জবাবদিহি। ওপরঅলা জীবন–মৃত্যুর মালিক। কিন্তু জীবন ও অধিকারের ম্যানেজার তো সরকার। তাঁদের কাছে দাবি তোলাই জীবনের পয়লা শর্ত এখনকার বাংলাদেশে।
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

রাজনীতিতে নারীর অবস্থান কোথায়? by বদিউল আলম মজুমদার

সম্প্রতি আমরা বহু ঘটা করে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করেছি। এই দিবস পালন করতে গিয়ে আমাদের কাছে আবারও সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে বাংলাদেশের নারীরা বহু ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও আমাদের সমাজে তাঁরা এখনো ব্যাপকভাবে বঞ্চিত, নিগৃহীত, নির্যাতিত ও অবহেলিত। এই বঞ্চনা ও নিগ্রহের অন্যতম কারণ হলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রীয় থেকে পারিবারিক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের ব্যাপক পশ্চাৎপদতা। আর এই পশ্চাৎপদতা কার্যকরভাবে অবসান করতে হলে প্রয়োজন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। তবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরের কমিটি থেকে শুরু করে সংসদ ও প্রশাসনে নারী-পুরুষের অনুপাত দেখলেই তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ
মূলত জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারীরা ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এ ধরনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নারীদের জন্য সংসদে ৫০টি আসন সংরক্ষণের বিধান রয়েছে, যা মূলত আলংকারিক। তবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সত্যিকারের প্রতিফলন ঘটে সংসদের সাধারণ আসনে নারীর প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে, যে ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও এখনো গর্ব করার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৮ সালের নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রার্থীর হার ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ-মোট ১ হাজার ৫৬৬ জনের মধ্যে মাত্র ৫৭ জন, জয়লাভ করেন মাত্র ১৯ জন। তবে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমে যায়। নির্বাচনে ২৭টি আসনে নারী প্রার্থী ছিলেন ২৮ জন (৩০০ আসনে মোট প্রার্থী ৫৪৩ জন)। জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠী হিসেবে মাত্র ৬ (৩০০ জনের মধ্যে ১৮ জন) শতাংশ আসনে নারীদের বিজয়ী হওয়া রাজনীতিতে নারীর সম্মানজনক অবস্থানের প্রতিফলন নয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ
সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নারীর অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চার হাজার ইউপিতে মাত্র ২৯ জন নারী চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন। পক্ষান্তরে ২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ২২৬ জন, জয়ী হন ২৩ জন। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নারীর অংশগ্রহণ খুবই কম ছিল। এসডিসির গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের ব্যবধানে উপজেলা নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ ৪৮ শতাংশ কমেছে (প্রথম আলো, ২৩ এপ্রিল ২০১৬)। ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯০০; আর ২০১৪ সালের ৪৫৮টি উপজেলা নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০৭ জনে। এই হিসাবে ২০০৯ সালে প্রতি উপজেলায় ৭ থেকে ৯ জন নারী প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০১৪ সালে এই হার গড়ে দাঁড়ায় ৩ থেকে ৪ জনে। একইভাবে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে মাত্র ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ নারী মেয়র পদে জয়লাভ করেন।
রাজনৈতিক দলে নারীর প্রতিনিধিত্ব
রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হলে নারীরা দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। প্রসঙ্গত, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের সর্বস্তরে ২০২০ সালের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করার বিধান ২০০৯ সালে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এ যুক্ত করা হয়, যাতে রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। আমরা মনে করি, প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে এ ধরনের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব ভবিষ্যতে নারীর জন্য ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লক্ষ্যপূরণের আর মাত্র তিন বছর বাকি থাকলেও বর্তমানে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় স্তরে বা কমিটিতে নারীর এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব নেই। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে মাত্র চারজন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটিতে রয়েছেন মাত্র একজন নারী। আওয়ামী লীগের ৪০ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে দুজন মাত্র নারী আছেন। ৭৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদে মাত্র ছয়জন নারী রয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আটজনের মধ্যে একজনও নারী নেই। অন্যদিকে বিএনপিতে একই পদে ১০ জনের বিপরীতে নারী আছেন মাত্র দুজন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক পদে চারজনের বিপরীতে নারী মাত্র একজন। কিন্তু বিএনপিতে একই পদে কোনো নারী সদস্য নেই (মোট সদস্য: আটজন)। ৭৮ সদস্য নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে নারী আছেন মাত্র ১৫ জন, যেখানে বিএনপিতে আছেন মাত্র ৬৫ জন (মোট সদস্য: ৫০২ জন)। ২০২০ সাল পূর্ণ হতে আর দুই বছর বাকি। এই অবস্থায় দলে এক-তৃতীয়াংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব রাখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান জানতে চেয়ে ইসির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। ৪০টি দলের মধ্যে ১০টি দল নারী নেতৃত্বের বিষয়ে বর্তমানে দলের কী অবস্থান, তা ইসিকে জানিয়েছে। দলগুলোর প্রদত্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে ৪০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে একটিমাত্র দল (গণফ্রন্ট) তাদের নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি আনতে পেরেছে। প্রতিবেদন থেকে আরও দেখা যায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৮১ জনের মধ্যে ১৫ জন নারী; শতকরা হারে তা ১৮ শতাংশ। সংসদে দলের সরাসরি আসনে বিজয়ী ১৬ জন নারী রয়েছেন। বিএনপির সব স্তরের কমিটিতে ১৫ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছেন। আর জাতীয় পার্টির সব পর্যায়ের কমিটিতে নারী রয়েছেন ২০ শতাংশ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৮ মার্চ ২০১৮)। অনেকের মতে, দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনী সহিংসতা এবং সংঘাতের দিকে হাঁটার কারণেই দলের কার্যক্রমে ও নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। প্রসঙ্গত, সরকার পরিচালনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও এখনো তা আশাব্যঞ্জক নয়। দশম সংসদে সর্বমোট ৫১ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন (৯ দশমিক ৮ শতাংশ) নারী মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি সুস্পষ্ট যে আমাদের সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে সংরক্ষণ-পদ্ধতি থাকলেও তা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর মূল কারণ হলো পদ্ধতিটিই ত্রুটিপূর্ণ। এতে নারীর প্রতিনিধিত্ব মূলত প্রতীকী।
তবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংরক্ষণ-ব্যবস্থার মধ্যে উৎকৃষ্টতর পদ্ধতি হতে পারে ঘূর্ণমান পদ্ধতি, যা ভারতের পঞ্চায়েত প্রথায় বিরাজমান। এই পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব আসন থেকে পর্যায়ক্রমে একজন নারী সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পান। উদাহরণস্বরূপ, যদি আমাদের জাতীয় সংসদের এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং এগুলো ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে পূরণের সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে প্রথম টার্মে লটারি কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ১০০ আসন চিহ্নিত করে এগুলো নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হবে। এসব নির্ধারিত ১০০ আসনে শুধু নারীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অন্য ২০০ আসন নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। পরবর্তী নির্বাচনে আগেরবারের ২০০ উন্মুক্ত আসনের মধ্য থেকে লটারি কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ১০০ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হবে। অন্য ২০০ আসন, যার মধ্যে প্রথমবারের ১০০ সংরক্ষিত আসন অন্তর্ভুক্ত, নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তৃতীয় টার্মে অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত হবে এবং অন্য ২০০ আসন উন্মুক্ত হয়ে যাবে। যত দিন পর্যন্ত নারী পুরুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনে জিতে আসার মতো অবস্থানে না আসবে, তত দিন এই সংরক্ষণ-পদ্ধতি অব্যাহত থাকবে। ঘূর্ণমান পদ্ধতি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে নারীর জন্যও একই ধরনের নির্বাচনী এলাকা থাকে, যেগুলো থেকে তাঁরা সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসেন; ফলে যোগ্য ও কর্মদক্ষ নারীরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকাকে গড়ে তোলার সুযোগ পান, যা পরবর্তী নির্বাচনে পুরুষদের সঙ্গে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসার সক্ষমতা সৃষ্টি করে। তাই একসময় নারীর সমপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সংসদে আসন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাই ফুরিয়ে যায়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক

কোটার সংখ্যা অবশ্যই কমানো উচিত by জোবাইদা নাসরীন

সরকারি চাকরিতে যোগদানের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়ানোর দাবির পাশাপাশি সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে। কোটা সংস্কারের পাঁচ দফা দাবিতে কাল ১৪ মার্চ সারা দেশে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ও ঢাকায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে। এই পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে কোটা ৫৬ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে ওই সব পদে মেধাভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া, কোটায় বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া, অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ করা, কোটা-সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা। দাবিগুলো যৌক্তিক এবং সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। বাংলাদেশে সরকারি চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসহ নানা জায়গায় কোটাব্যবস্থা প্রচলিত আছে ৷ এই কোটাব্যবস্থার পেছনের কারণ হলো অনগ্রসর শ্রেণি বা অঞ্চলকে সামনে নিয়ে আসা। তাঁদের বাড়তি সুবিধা দিয়ে সমতাবিধানের লক্ষ্যে কোটার প্রবর্তন করা হয় স্বাধীনতার পরেই ৷ যেহেতু নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী-এরা সামাজিক কারণেই পিছিয়ে আছে, তাই তাদের এগিয়ে আনার জন্যই তাদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করা হয়। এখনো কোটার জন্য আন্দোলন করছে বিভিন্ন অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা। এদের বাদেই কিন্তু মোট কোটার পরিমাণ ৫৫ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ১ দশমিক ১০ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ; ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ১ শতাংশ; ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা পোষ্যদের জন্য ৩০ শতাংশ; নারীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা ছাড়াও জেলা কোটায় ১০ শতাংশ নিয়োগ হয়। এই হিসাবে মোট প্রায় ৫৬ শতাংশ নিয়োগ হচ্ছে কোটার মাধ্যমে। অর্থাৎ সরকারি চাকরির অর্ধেকেরও বেশি কোটার দখলে, মেধার ভিত্তিতে চাকরি পাচ্ছে অর্ধেকেরও কম, ৪৪ শতাংশ৷ আন্দোলনকারীদের মতে, প্রতি বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী। আন্দোলনকারীরা বলছেন, কোটা পদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬ তম হন, তাহলে তিনি চাকরি না-ও পেতে পারেন। কারণ, ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জন চাকরি পাবেন। অন্যদিকে কোটার কারণে কেউ ৭ হাজারতম হয়েও চাকরি পেতে পারেন। কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ২৮ থেকে ৩৫ তম বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে ৫ হাজার পদ শূন্য রয়ে গেছে। তবে কিছুটা নড়াচড়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা এসেছে যে কোটার আসন পূরণ না হলে মেধার শীর্ষে থাকাদের থেকে পূরণ করা হবে। আন্দোলনকারীরা যুক্তি পাড়ছেন, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাঁরা জাতির বীর সন্তান। তাঁদের মধ্যে যাঁরা সনদধারী, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাবেন। কিন্তু বয়স বিবেচনায় এখন আর এই মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই চাকরিপ্রার্থী নন। তবে চাকরিরতরা বাড়তি এক বছর চাকরি করতে পারছেন এবং তাঁরা রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা পান। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন না আন্দোলনকারীরা। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনির জন্য কোটার বিপক্ষে তাঁদের অবস্থান। মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহারেও রয়েছে বৈষম্য। জানা গেছে, বীরাঙ্গনাদের সন্তানেরা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কোটার সুবিধা ব্যবহার করতে পারছেন না, যদিও বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। কারণ, বীরাঙ্গনাদের বেশির ভাগেরই সনদ নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার পর অনেকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিতে তৎপর হয়ে ওঠেন এবং অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেই মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে নেন। এই কোটা পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো আমরা কোটা বিষয়ে কোনো পুনর্মূল্যায়ন করি না। যেমন, এই কোটাব্যবস্থার কারণে সমতার জায়গাটি প্রতিবছর কতটুকু এগোল, সে বিষয়ে কোনো ধরনের গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। সে কারণে আমরা এটাও জানি না যে কোটার কারণে সেই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা কতটুকু বাড়ল। এর ফলে কোটাব্যবস্থা প্রণয়নের মূল লক্ষ্য স্থির থাকছে না। কোটা আসলে কাদের দরকার, কতটুকু দরকার, এ বছর এত শতাংশ কোটায় একটা অনগ্রসর জনগোষ্ঠী কতটুকু এগোবে এবং এর পরের বছর কতটুকু কোটা থাকবে, সেই বিষয়গুলো যদি বিশ্লেষণ করা যেত, তাহলে এ ধরনের সংকট কাটানো যায় বলে মনে হয়। নারী কোটার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কোন অঞ্চলের নারীরা পিছিয়ে আছেন, তাঁদের কতটুকু কোটা দরকার, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। ঢালাওভাবে সবার ক্ষেত্রে কোটার প্রয়োজন নেই। তাই অন্তত তিন বছর পরপর কোটাব্যবস্থার মূল্যায়ন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যা কোটা পদ্ধতি সংস্কারে বড় ভূমিকা রাখবে। যদি এমন নিয়ম করা হয় যে কোটার সুবিধা একজন ব্যক্তি জীবনে একবারই ব্যবহার করতে পারবেন, তাহলে মনে হয় কোটার সঠিক ব্যবহার হবে। ধরা যাক, যিনি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্য কোথাও কোটার ভিত্তিতে সুযোগ পেয়েছেন, তিনি চাকরির ক্ষেত্রে আর সেটি পাবেন না। সেখানে যাঁরা এই সুযোগ আগে ব্যবহার করেননি তাঁরা পাবেন। তাহলে কোটার সুযোগ সবাই কম-বেশি ব্যবহার করতে পারবেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য কোটা দরকার। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটা ঠিক আছে, কিন্তু তারও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কোটা রাখা জরুরি কি না, সেটি সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। আরেকটি বিষয় এখানে বলা প্রয়োজন যে আমরা শুধু বিসিএসে কোটা বিষয়ে বলছি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই কোটাব্যবস্থার দাপটে অনেক যোগ্য প্রার্থী ঢুকতে পারছেন না। সেখানে রয়েছে পোষ্য কোটা। বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই পদগুলো মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও পোষ্য কোটার দখলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ পোষ্য কোটার দখলে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রেও পোষ্য কোটার দাপট। সেখানে শুধু পাস নম্বর পেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সন্তানেরা ভর্তির সুযোগ পান। এ ক্ষেত্রেও মনে হয় কিছুটা লাগাম টানা প্রয়োজন। কেননা, মা-বাবা-মায়ের চাকরির যোগ্যতায় কেউ বাড়তি সুযোগ পাবেন, সেটা কাম্য নয়। কোটার প্রয়োজন নিশ্চিতভাবেই আছে, তবে সেটি যেন যৌক্তিক বিবেচনায় হয়, একবারই যেন এই সুযোগ ব্যবহার করা হয় প্রকৃতই অনগ্রসর জনগোষ্ঠী কিংবা অনগ্রসর এলাকার জন্য, সে বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি।
জোবাইদা নাসরীন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
zobaidanasreen@gmail.com

বকশিশের পাশাপাশি হিসাবের পাওনা দিন by আলী ইমাম মজুমদার

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রাধিকার কোটার শূন্য পদ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হবে। আগেও ক্ষেত্রভেদে মাঝেমধ্যে এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হতো। কখনো শূন্যই পড়ে থাকত পদগুলো। স্বাধীনতার পর কোটাব্যবস্থা যখন চালু করা হয়, তখন প্রাধিকারধারী প্রার্থী পাওয়া না গেলে পদ শূন্য রাখার বিধান ছিল না। আপনা থেকেই নিয়োগকর্তারা সেই মর্মে সিদ্ধান্ত নিতেন। এই নির্দয় সিদ্ধান্তটি পরে নেওয়া হয়েছে। সরকারের পদ শূন্য পড়ে থাকবে। বঞ্চিত হবে সেবাগ্রহীতারা। অথচ মেধাতালিকায় থেকে যেত যোগ্য প্রার্থীরা। বর্তমান সিদ্ধান্তটি এসেছে জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স ও মিডওয়াইফ পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে। যতটুকু জানা যায়, এ দুটি পদে নিয়োগ পাবে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ জন প্রার্থী। এসব পদের জন্য কোটাধারী প্রার্থী তেমন পাওয়া যাবে না, এটা সহজেই অনুমেয়। তাই পদগুলো শূন্য ফেলে না রেখে পূরণ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেকোনো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রাধিকার কোটাধারী কোনো প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে তা পূরণ করা হবে। তবে এটা যে কোটাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু কিছুটা সুফল দেবে। বিশেষ করে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদের ন্যায় বিশেষায়িত পদগুলোতে প্রাধিকার কোটাধারী এতসংখ্যক প্রার্থী সব স্তর অতিক্রম করে আসতে পারে না। পারে না সরকারি কলেজগুলোর অনেক বিভাগের শিক্ষক পদেও। তাই মূল সমস্যার ঈপ্সিত সমাধান করতে না পারলেও সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক অবদান রাখবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা দীর্ঘদিনের অনুসৃত একটি ভ্রান্ত পথ থেকে সরলেন। তাঁদের উপলব্ধি দেরিতে হলেও ভালো দিকে মোড় নিয়েছে, এটা বলতেই হবে।
তবে সমস্যার ব্যাপকতার তুলনায় এটার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য নয়। মনে হচ্ছে কিছু বকশিশই দেওয়া হলো। হিসাবের পাওনা নিয়ে কিছুই হলো না। সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণব্যবস্থাটি দেশের সাম্প্রতিক সময়ে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়ের একটি। অনেক বিশ্লেষক তাঁদের বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই ব্যবস্থার কুফল বিভিন্নভাবে তুলে ধরছেন। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি অস্থিরতাও লক্ষণীয়। যাঁরা শিগগিরই চাকরির বাজারে আসবেন, তাঁরাই সবচেয়ে বিচলিত ও উৎকণ্ঠিত। প্রাধিকার কোটাধারী সতীর্থর চেয়ে ভালো ছাত্র হয়ে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো ফল করেও না-ও পেতে পারেন একই মাপের চাকরি। আর কেউ কেউ চাকরিই পাবেন না। তাই তাঁদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে বিচলিত হওয়া অসংগত নয়। সুতরাং এই ব্যবস্থাকে ন্যায়ভিত্তিক করার দাবি যৌক্তিক। তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় কিছু ফল দিতে শুরু করেছে। দেশের গুণীজনদের প্রায় সবাই এ বিষয়ে বলছেন। গণমাধ্যমও জোরদারভাবে তুলে ধরছে সমস্যাটি। দেরিতে হলেও নীতিনির্ধারকদের এটা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। তাঁদের প্রতিশ্রুত মেধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের পথে সরকারকে যেতে হবে। সেই পথে যেতে কিছু বাধাবিপত্তি থাকবেই। যারা এগুলোর সুবিধাভোগী তারা তা অব্যাহত রাখতে চাইবে, এটাও স্বাভাবিক। সব দিক থেকে বিচার-বিবেচনা করে সরকার নেবে সিদ্ধান্ত। যেমনটি নেওয়া হলো গত মন্ত্রিসভার বৈঠকে। এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কোনো শ্রেণির উপকারভোগী জনসংখ্যার অনুপাত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন রয়েছে এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের সামগ্রিক স্বার্থকে সর্বোচ্চে স্থান দেওয়া। স্বাধীনতার চেতনা অনুসারে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সংরক্ষণ শুধু সমাজের অনগ্রসর শ্রেণি বা অঞ্চলের জন্য, সংবিধানের এই অনুচ্ছেদকে হেলাফেলা করা অনুচিত হবে। জনপ্রশাসন আজ মেধাশূন্যতায় ধুঁকছে। দীর্ঘদিন ধরে যদি এখানে মেধাবীদের প্রবেশাধিকারকে সংকুচিত করে রাখা হয়, তাহলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। তাই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে দর-কষাকষিতে আমরা ঈপ্সিত সাফল্য অর্জন করতে পারছি না। যুগের দাবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশাসনে নতুন গতিও তেমনভাবে আসেনি। জনগণ ঈপ্সিত সেবা থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। মেধার বিকল্প কোনো ক্ষেত্রেই নেই, এটা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া সংগত সমাজের সবচেয়ে মেধাবীদের এদিকে আকর্ষণের চেষ্টা করা। তা না করে বরং আমরা এখনো হাঁটছি বিপরীত দিকে। এটা অনস্বীকার্য, সমাজের অনগ্রসর অংশকে শাসনব্যবস্থার মূল স্রোতোধারায় আনতে মেধাকে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। এরূপ অতীতেও হয়েছে। তবে এর আকৃতি ও প্রকৃতি এমনটা ছিল না। অতি সম্প্রতি যে ছাড়টুকু দেওয়া হলো, এর সুফল পাবে বিশেষায়িত ক্যাডারের কিছুসংখ্যক প্রার্থী। সাধারণ ক্যাডারের যেমন-প্রশাসন, পররাষ্ট্র, পুলিশ, কর, শুল্ক, হিসাব, নিরীক্ষাসহ অন্যান্য ক্যাডারের প্রার্থীরা এর সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কেননা, এগুলোতে চাকরির সংখ্যা অনেক কম। আর এখানে প্রাধিকার কোটাধারীরা কোনোমতে পাস করতে পারলেই ভালো একটি চাকরি পেয়ে যায়। এমনটাই অতীতের অনেক পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে। তেমনি মেধাতালিকায় ওপরের দিকে থেকেও সেই মানের চাকরি পায়নি বা শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয় অনেককে। এখন সম্মিলিত মেধাতালিকাও প্রকাশ করা হয় না। কয়েক বছর আগেও তা হতো।
এমনকি বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তদের কারা মেধাতালিকা বা প্রাধিকার কোটা থেকে স্থান পেল, এর কোনো উল্লেখ থাকে না। সুতরাং এই বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার প্রয়োগও করা হয় অস্বচ্ছভাবে। আর একটি বিষয় আমাদের এখানে এ-বিষয়ক আলোচনায় উপেক্ষিত থাকছে। প্রাধিকার কোটার উদ্দেশ্য হচ্ছে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী বা অঞ্চলকে অন্যদের সঙ্গে সমান পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য এটি একটি বিশেষ সুযোগ। অনেক জাত-পাতের দেশ ভারতে এ নিয়ে ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। সেখানেও এখন নিয়ম হয়েছে, অনগ্রসর শ্রেণির কোনো প্রার্থী পিতা কিংবা মাতা দ্বিতীয় শ্রেণি বা এর ওপরের সরকারি বা অনুরূপ বেসরকারি চাকরি করলে কিংবা একটি নির্ধারিত পরিমাণ বার্ষিক আয় হলে সেই প্রার্থী কোটা সুবিধা পাবে না। আর কেউ সেই সুবিধার আওতায় চাকরি পেলে তার পরবর্তী প্রজন্ম তা পাবে না। নারী, প্রতিবন্ধী বা জেলা কোটা ছাড়া অন্য কোটাগুলোর জন্য আমরা এই নিয়ম কি করতে পারি না? জেলা কোটার বিভক্তি এখানে একটি জটিল অবস্থানে রয়েছে। সরকারের তথ্যানুসারে, আর্থসামাজিক বিবেচনায় অনগ্রসর কিছু জেলার জন্য একটি থোক কোটা রেখে অন্য জেলাগুলোকে এর আওতা থেকে বাদ দেওয়া সংগত। ছোট একটি দেশে ১৬ কোটি মানুষ। গুটি কয় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে বাদ দিলে সবার ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধরনধারণ একই। এখানে এই তীব্র বিভাজনের মানসিকতা কোনো উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমনিতেই উঁচু মানের ছাত্ররা এখন বিদেশমুখী। ক্রমে ছোট হয়ে আসা পৃথিবীতে এটি অস্বাভাবিকও নয়। যেখানে উন্নত জীবনের হাতছানি পাবে, সেদিকেই ছুটবে তারুণ্য। কিন্তু সবাই তো বিদেশে যেতে পারে না। আমাদের বাকি সবাইকে তো এখানেই থাকতে হবে। এখানেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে সব ক্ষেত্রে। এগুলোকে ধরে রাখা এবং আরও গতিশীল করার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো। তা করতে হলে জনপ্রশাসনে মেধার দৈন্য দূর করতে হবে। এরূপ করার জন্য অনেক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তার মধ্যে একটি হচ্ছে নিয়োগ স্তরে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া। সেই অনুপাত কত হবে তা নিয়ে মতান্তর আছে। তবে মেধা কোটাকেই যে প্রাধান্য দিতে হবে, তাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যেসব ক্ষেত্রে প্রাধিকার কোটাধারী প্রার্থী পাওয়া যাবে না, সেখানে মেধাতালিকা থেকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োপযোগী। পাশাপাশি একই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে কোটাব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
majumderali1950@gmail.com

চীনে আজীবন একনায়ক by কামাল আহমেদ

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম কংগ্রেসে যখন সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক ভাবনাকে সি-র চিন্তাধারা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখনই ধারণা করা হয়েছিল এ রকম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। চীনা বিপ্লবের নেতা ও পার্টির চেয়ারম্যান মাও সে-তুংয়ের রাজনৈতিক ভাবনা যেভাবে মাওয়ের চিন্তাধারা হিসেবে দলে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং অনুসৃত হয়েছিল, দলের সেক্রেটারি জেনারেল সি-র রাজনৈতিক দিশার অনুরূপ স্বীকৃতিলাভ ইঙ্গিতবহ ছিল বৈকি। মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ১৫ বছরের কিশোর সি দলের নির্দেশে লাখো তরুণের মতোই দেশকে জানতে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ফিরে গিয়েছিলেন। বলা হয়, তিনি গুহায় জীবন যাপন করেছেন। শাংসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে সাত বছর অবস্থানের পর ২২ বছর বয়সে তিনি বলেছিলেন, তিনি আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ এবং তাঁর জীবনের লক্ষ্য তিনি ঠিক করে ফেলেছেন। তাঁর জীবনের সেই লক্ষ্য কী ছিল, তা আমাদের অনেকেরই জানা ছিল না। কিন্তু ধারণা করি, ১১ মার্চ রোববার চীনের পার্লামেন্ট বা পিপলস কংগ্রেস তাঁর সেই লক্ষ্য পূরণ করেছে। দেড় শ কোটি মানুষের দেশে তিনি এখন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। ঊনবিংশ কংগ্রেসেই তাঁর ভাবধারার যে মূল কথাটি আমরা জেনেছিলাম তা হলো, তিনি বলেছিলেন চীনকে মহান জাতি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন। প্রেসিডেন্ট পদে পাঁচ বছরের দুটি মেয়াদের অবসান ঘটানোর সংশোধনী অনুমোদনের পর পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান ঝ্যাং দেজিয়াং দলের সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, চীনকে আবার মহান জাতিতে রূপান্তরের জন্য প্রেসিডেন্ট সি-র পেছনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। চীনকে আবার মহান বানানোর বিষয়টি অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-এর মতো। চীনকে আবারও মহান জাতিতে রূপান্তরে প্রেসিডেন্ট সি-র ভাবধারাকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি উগ্র সংস্করণ থেকে খুব একটা আলাদা করা যাবে কি না, তা আগামী দিনগুলোতে নিশ্চয়ই আরও স্পষ্ট হবে।
মাওয়ের জীবদ্দশায় চীন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে তাদের লড়তে হয়েছে। কিন্তু একুশ শতকে চীনে শিল্প ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে গেছে। দেশটি গত কয়েক দশকে ‘বিশ্বের কারখানা’র খ্যাতি অর্জনের পর এখন নজর দিয়েছে সৃজনশীল অর্থনীতির দিকে। বিশ্বে এখন তারা দ্বিতীয় প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। স্বভাবতই, প্রেসিডেন্ট সি-র ভাবধারার প্রচারে এখন আলো ঝলমলে শহরগুলো রঙিন বিলবোর্ডে ভরা। রাজনীতির পণ্ডিতেরা বলে থাকেন যে চীনের অভাবিত অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ তরুণ নেতৃত্ব। দলের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে কেউ দুই মেয়াদের বেশি থাকতে না পারায় নতুন নেতারা নতুন উদ্দীপনা ও উদ্যোগ নিয়ে দলে নতুন জীবনীশক্তি যোগ করেছিলেন। স্পষ্টতই এখন সেই ধারার অবসান ঘটছে। তবে গত কংগ্রেসে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি পলিটব্যুরো এবং কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে যাঁদের ওই বিধির কারণে সরে যেতে হয়েছিল, তাঁদের প্রতিক্রিয়া কী হয়, এখন সেটাও অবশ্য দেখার বিষয়। সি-র এই আজীবন ক্ষমতায় থাকার বিরোধিতা দেশটির ভেতরের কেউ খুব একটা করার সাহস পাবেন বলে মনে হয় না। তবে অবসরে থাকা সংবাদপত্রের একজন সাবেক সম্পাদক লি দাতং, যিনি এর আগে উদারপন্থী সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তিনি একটি খোলা চিঠিতে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গার্ডিয়ান তাঁর চিঠি উদ্ধৃত করেছে। লি দাতং বলেছেন, ‘এই পদক্ষেপ চীন ও চীনা জনগণকে ধ্বংস করে দেবে। সুতরাং আমি চুপ থাকতে পারি না। আমি তাদের (পার্টি) জানাতে চাই যে প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করার মতো লোক আছে।’ হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্যারি হুয়াং লিখেছেন, ‘ইতিহাস দেখিয়ে দিয়েছে যে আজীবন দায়িত্বে থাকার চেষ্টা করেও অনেক নেতাই সফল হননি। অনেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, অন্যরা তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন।’ প্রেসিডেন্ট সি-র জীবনীকার এলিজাবেথ ইকোনমির ভাষায় বৈশ্বিক বিষয়গুলোর কেন্দ্রে চীনকে প্রতিষ্ঠা করতে তাঁর কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি যে বিশ্বাস করেন, ক্ষমতার সব চাবি নিজের দখলে নেওয়ার মধ্যে তাঁর সেই প্রত্যয়ের প্রতিফলন ঘটেছে। দল ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব একক কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত থাকার আরেকটি বিপদের কথাও এলিজাবেথ মনে করিয়ে দিয়েছেন, যেটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি কমতে থাকে কিংবা কোনো একটি বড় দুর্যোগ দেখা দেয়, তাহলে সম্ভাব্য ব্যর্থতার দায়ও এককভাবে তাঁর কাঁধেই বর্তাবে। সাবেক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র রাশিয়ার লৌহমানব পুতিন গত ২০ বছর একটানা ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে সামান্য কৌশলী হয়ে কিছুকাল প্রধানমন্ত্রীর পদেও আসীন হয়েছিলেন। কিন্তু চীনে প্রেসিডেন্ট সি সে রকম কোনো রাখঢাকের ধার ধারেননি। চীনের এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু যে চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিধিতে আবদ্ধ থাকবে, তা নয়। পুরো এশিয়া এবং বাকি বিশ্বকেও এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।