Monday, June 2, 2014

আওয়ামী লীগ–বিএনপি উভয়ই ফরমালিনযুক্ত by আনু মুহাম্মদ

গত ৩১ মের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেন৷ তাঁর বক্তব্যে অগ্রাধিকার পায় জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা না-করা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বৈধতা, নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদদের দেওয়া সম্মাননা ক্রেস্টের সোনা জালিয়াতির বিষয়৷ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজের দুই প্রতিনিধির প্রতিক্রিয়া এখানে প্রকাশ করা হলো:
সরকারের ভুলভ্রান্তি, অপরাধ, দুর্নীতি, অনিয়ম সম্পর্কে অভিযোগ উঠলে বরাবরই তা অস্বীকার করার সংস্কৃতি সরকারের মধ্যে প্রবল। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও এই অস্বীকারের সংস্কৃতিই প্রধান হয়ে উঠেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা স্মারক হিসেবে বিদেশি বন্ধুদের দেওয়া ক্রেস্টের সোনা জালিয়াতির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন যে এতে কতটা সোনা আছে তা গুরুত্বপূর্ণ না, সম্মাননাই আসল। ঠিকই যে এই সম্মাননা মাটির জিনিস দিয়েও দেওয়া যেত।
কিন্তু স্বর্ণপদক বলে ঢাকঢোল পিটিয়ে তারপর সেখান থেকে ১২ আনা বা ১৬ আনা সোনা সরিয়ে অন্য কিছু দেওয়া চৌর্যবৃত্তি ছাড়া আর কী হতে পারে? এটা শুধু জাতি হিসেবেই আমাদের ছোট করেনি, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকেও তা কলঙ্কিত করেছে। এই জালিয়াতি যাঁরা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এটাই সবার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দায়ী ব্যক্তিদের শঙ্কিত করার বদলে স্বস্তি দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, র্যাব বিএনপির আমলে সৃষ্টি হয়েছে। তাই এর দায় বিএনপিরও। কিন্তু র্যাবের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে আরও আগ্রাসী হয়েছে। র্যাব ও পুলিশ সরকারের প্রভাববলয়ে থেকে দখলদার লুটেরাদের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এই সংস্থাগুলো নদী-জমি দখল, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস রোধ না করে বরং এসব যাঁরা করছে, তাঁদের রক্ষক হিসেবে কাজ করছে। এখন টাকার বিনিময়ে খুনের অভিযোগ এসেছে। বিএনপি আমলে র্যাব গঠিত হয়েছিল বলে তার এখনকার অপরাধ যৌক্তিক হয়ে যায় না।
জাপানের কাছ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়া যাবে বলে প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে ঋণ পাওয়া মানেই উন্নয়ন নয়, বরং তা অনেক সময় ধ্বংস ও নৈরাজ্যের কারণ হয়। যেমন ঋণ নিয়ে সুন্দরবন ধ্বংসের চেষ্টা চলছে, ঋণের প্রকল্পে বনভূমি উজাড় হচ্ছে, নদী খুন হচ্ছে, রেলওয়ে আটকে গেল, পাটশিল্প বিনাশ হলো, জাতীয় সম্পদ হাতছাড়া হচ্ছে। ঋণ কেন, কী শর্তে, কোন কাজে, কাদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হবে—সেসবের ওপর এর ফলাফল নির্ভর করে।
আগামী পাঁচ-ছয় বছরে জাপানের ছয় বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়া যাবে বলে মাতামাতি হচ্ছে, অথচ আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতিবছরই দেশে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাঠাচ্ছেন! তাঁদের জীবন আর সেই বিশাল প্রাপ্তির উৎপাদনশীল ব্যবহার নিয়ে পরিকল্পনা বা উৎসাহ নেই।
‘যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার’ নিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য ও তাঁর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন থেকে মনে হচ্ছে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এটা কোনো আইনি বিষয় নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের দেশে আইন নিজের গতিতে চলে না, চলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার বলে।
১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ যোগ দিলেও পরবর্তীকালে তারা সেখান থেকে পিছিয়ে আসে, জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতও করে। এই সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার–প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই অঙ্গীকার নিয়েই ২০০৮ সালে তারা ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে এই বিচার–প্রক্রিয়ায় শ্লথগতি এবং উল্টো কথায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ ফরমালিন দিয়ে বিএনপিকে তাজা রাখার চেষ্টা করছে— প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত। তবে আমার ব্যাখ্যাটা একটু ভিন্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতা, সন্ত্রাস, দখল, দুর্নীতির বিস্তার না ঘটলে বিএনপির অস্তিত্ব আরও সংকুচিত হতো।
আওয়ামী লীগের বর্তমান ভূমিকাই বিএনপিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর বিএনপি-জামায়াতের রেকর্ড ও সে সম্পর্কে ভীতি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ধরে রেখেছে। সে হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুজন দুজনকে রক্ষা করছে, দুজনই দুজনের ফরমালিন।
জনগণের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজ-দখলদারদের দাপটের মুখে তাঁরা শেষ ভরসা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথায় জনগণ কোনো ভরসা পায় না। ভরসা পায় এই সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজ-দখলদারেরাই।

আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

জামায়াতের বিচার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি দুর্বল by শাহদীন মালিক

জামায়াতের বিচার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি দুর্বল by শাহদীন মালিক

গত ৩১ মের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেন৷ তাঁর বক্তব্যে অগ্রাধিকার পায় জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা না-করা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বৈধতা, নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদদের দেওয়া সম্মাননা ক্রেস্টের সোনা জালিয়াতির বিষয়৷ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজের দুই প্রতিনিধির প্রতিক্রিয়া এখানে প্রকাশ করা হলো:
৩১ মে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের অনেকগুলো দিকই মনঃপূত হয়নি৷ সাদামাটাভাবে যত বড়ই হোক না কেন, তাঁর মতামত গ্রহণ না-করা, সমালোচনা করা কিংবা মতের সঙ্গে দ্বিমত করা—এসব মিলিয়েই গণতন্ত্র৷ সেই গণতন্ত্রচর্চার অংশ হিসেবেই আমার এই প্রতিক্রিয়া৷
প্রথমেই আসে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর বিচার প্রসঙ্গ। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এই মুহূর্তে বিচার সম্ভব নয়৷ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে তাঁর আইনমন্ত্রীই সঠিক বলেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী এ-ও বলেছেন যে তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলে সেটা বিভ্রান্তি ছড়ানো হবে৷ একমত না হওয়াটাই গণতন্ত্র। সেটাকে বিভ্রান্তি বলা অসাধুতা এবং গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়।
জামায়াতের বিচার না-করা প্রসঙ্গে যে আইনি যুক্তিগুলো দেখানো হয়েছে, তার যে কোনো ভিত্তিই নেই, আমি সেই দাবি করছি না। তবে যুক্তিগুলো দুর্বল। বিশেষ করে এক মামলা থাকলে আরেক মামলা হবে না অর্থাৎ জামায়াতের নিবন্ধন-সংক্রান্ত একটি মামলা বিচারাধীন আছে, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মামলার রায়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালও জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে কিছু মন্তব্য করেছেন—এ সবই সত্য। কিন্তু অন্য আদালতে মামলার কারণে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর এখন বিচার করা যাবে না, এটা গ্রহণযোগ্য আইনি যুক্তি নয়। শাস্তির ব্যাপারে আইনের ২০ ধারায় কিছুটা অস্পষ্টতা আছে৷ কিন্তু এই অস্পষ্টতা দূর করার জন্য, জুতসই আইনি ব্যবস্থা দেওয়া খুব কঠিন বলে মনে হচ্ছে না।
আর বিচার না করার পক্ষে যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েই থাকে এবং সেই সিদ্ধান্তকে আইনি মোড়কে দেশবাসীকে উপহার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাতে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সততা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে হাইকোর্টের আদেশে গ্রেপ্তার করায় প্রধানমন্ত্রী যে খুশি হননি, সেটা তাঁর কয়েক দিন আগের মন্তব্যেই আঁচ করা গিয়েছিল। ৩১ মের সংবাদ সম্মেলনে সেটি আরও স্পষ্ট হলো। প্রথমবারে উষ্মা প্রকাশ পেয়েছিল রিট আবেদনকারী আইনজীবীর প্রতি, এবারে তিনি নাখোশ হলেন গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়া বিচারপতিদ্বয়ের প্রতি। হাইকোর্টের আদেশে এই তিন কর্মকর্তার গ্রেপ্তারে দেশবাসী যখন স্বস্তি পেয়েছে, তখন সেটা প্রধানমন্ত্রীর কেন বেপছন্দ হলো, তা বোধগম্য নয়।
আজকাল আমরা প্রধানমন্ত্রীর কটাক্ষ আর সময়ে সময়ে বেফাঁস কথায় হকচকিয়ে যাই না। মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা ক্রেস্টের সোনা নিয়ে যে দুর্নীতি ও জালিয়াতি হয়েছে এবং তাতে সারা বিশ্ববাসীর কাছে লজ্জায় আমাদের মাথা নিচু হয়ে গেছে। আমাদের মন্ত্রী, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বিশ্ববাসীর কাছেও প্রামাণিক দলিল হয়ে আছে৷ কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটা কোনো বড় ব্যাপারই নয়। আসল হোক নকল হোক, সম্মাননা তো দেওয়া হয়েছে, এই বলে তিনি আমাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। আসল ও নকলের ফারাকটা তাঁর কাছে বড় না-ও হতে পারে। কিন্তু অভাগা আমজনতা ওই সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, আসল-নকল—এই সবকিছুই এক চোখে দেখে না। সৎ কর্মে অর্থ আয় আর ঘুষ খেয়ে টাকা জমানোর মধ্যে ইহকাল-পরকালের মতো ফারাক রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেটি বুঝতে না পারলেও ধারণা করি, সম্মাননাপ্রাপ্ত বিদেশি বন্ধুরা ক্রেস্টের জালিয়াতি জানার পরে তাঁদের গর্বে ভরে ওঠা বুকটা নিশ্চয়ই অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে এবং আমাদের প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতার মাত্রাটাও হয়তো অনেক কমে গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর চোখে বিএনপির বড় দোষ ছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া। এখন আরও বড় দোষ হয়েছে আবার নির্বাচন চাওয়া। বিএনপির দোষ-গুণের চেয়ে নাগরিকের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোট দিতে পারা না-পারাটা। আমরা আবার কখন ভোট দিতে পারব, আদৌ পারব কি না এবং পারলেও সেটা পাতানো নির্বাচনে হবে কি না; এসব বিএনপি নির্বাচনে এল না গেল, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের ভোট না পেয়ে, ভোট পেয়েছে—সেটা ধরে নেওয়ার সরকার জনগণের খুব বেশি কল্যাণ করতে পারবে বলে মনে হয় না।
আর এই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে গত নির্বাচনে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব—সবই তাঁর সঙ্গে ছিল। একদম হক কথা। ছিল না শুধু জনগণ৷

শাহদীন মালিক: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; পরিচালক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।

আওয়ামী লীগ–বিএনপি উভয়ই ফরমালিনযুক্ত by আনু মুহাম্মদ

এশিয়া যে পথে হাঁটছে by সাজ্জাদ শরিফ

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডকে দেখাল আকর্ষক এক মডেলের মতো৷ কে বলবে তাঁর এখন ৫২ চলছে? নিখুঁত আর পরিপাটি ঘন নীল রঙের জামা তাঁর দীর্ঘ ছিপছিপে শরীরটিকে ফ্রেমবদ্ধ করে রেখেছে৷ মাথা থেকে ঘাড়ের কাছে এসে থেমে গেছে লালচে সুবিন্যস্ত চুল৷ মঞ্চে উঠলেন মডেলের মতো, সটান দাঁড়িয়ে এশিয়া নিয়ে তাঁর ভাবনা প্রকাশ করলেন ধারালো কণ্ঠে৷
‘নতুন এশিয়ার রূপায়ণ’-এর কার্যকর উপায় খুঁজতে দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে ভাবনা-বিনিময়ের আসর বসেছে৷ এই আসরে উদ্বোধনের পরের দুই দিনে অধিবেশন বসল মোট ৬০টি৷ রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্যের হর্তাকর্তা, দিকপাল বিশেষজ্ঞ আর বাণিজ্য-সহযোগীরা সেখানে এশিয়ার বিকাশ আরও দ্রুত, ফলপ্রসূ ও সুস্থায়ী করার নতুন নতুন উপায়ের কথা বললেন৷
কেন্দ্রীয় অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল জুলিয়া গিলার্ড আর চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি ঝাওজিংকে৷ তবে তাঁদের আগে শুভেচ্ছাবার্তা জানাতে উঠলেন ফিলিস্তিনের সাবেক ও স্বল্পকালীন প্রধানমন্ত্রী সালাম ফাইয়াদ৷ বললেন, পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিচিত্র উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে৷ কিন্তু মুক্তি, ইনসাফ আর সাম্য—মানুষের এই তিন চাহিদা মেটাতে না পারলে কোনো উদ্যোগই স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে না৷ মানুষ যে নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে, তাও তো দুই দশকেরও বেশি হয়ে গেল৷ তাদের জীবনে শান্তি আর সমৃদ্ধির বার্তা কোথায়৷ বললেন, ‘আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ, তা না হলে গোটা বিশ্বব্যবস্থাই একসময় ভেঙে পড়বে৷

জুলিয়া গিলার্ড বললেন, পৃথিবীতে এখন এসেছে পরস্পর-নির্ভর বিকাশের যুগ৷ এশিয়ায় এক চীনই তার অর্থনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে আশপাশের দেশের আর্থিক গতিশীলতার ধরন পাল্টে দিয়েছে, ভেঙে দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ ভাবনার ছক৷ এ শতকের প্রথম ভাগের মধ্যে চীন পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠবে৷ চীনের অর্থনৈতিক বিকাশ যেমন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলেছে, তেমনি তা নতুন কিছু ঝুঁকিও সৃষ্টি করেছে৷ জুলিয়া বললেন, আরব বসন্ত দেখিয়ে দিয়েছে, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি যে শূন্যতা তৈরি করে, তার পথ দিয়ে ভালো কিছু আসা কঠিন হয়ে পড়ে৷ অর্থনীতিতে চীন যা ঘটিয়েছে, তা অলৌকিক৷ কিন্তু সেখানে গণতন্ত্র না এলে এবং মানবাধিকারের ভিত্তি না গড়তে পারলে এ অর্থনীতি এশিয়া ও বিশ্বের জন্য আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে৷ উত্তর কোরিয়া যে নতুন পারমাণবিক হুমকি হয়ে উঠেছে, তার পেছনের শক্তি তো চীনই বটে৷ এ ব্যাপারে জুলিয়ার নিদান হলো, বিশ্বসম্প্রদায়ের মধ্যে এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে, আর তাতে মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে৷
জুলিয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হলো, ভবিষ্যৎ পৃথিবী কোন চেহারা নেবে, সেটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের ওপর৷ সম্পর্কটি আর আগের মতো সরল হবে না, হবে জটিল ও বহুস্তরীয়৷ বিশ্বসম্প্রদায়ের কর্তব্য হবে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা৷
চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি ঝাওজিং মঞ্চে উঠে প্রথমেই এশিয়া সম্পর্কে সবার পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর অনুরোধ করলেন৷ বললেন, বিশ্ব-অর্থনীতিতে এশিয়ার একার অবদানই এখন এক-তৃতীয়াংশ৷ এশিয়া একটি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত মহাদেশ৷ বাইরে থেকে কেউ এসে এতে আঘাত করা অন্যায় হবে৷ স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছে বলা হলেও তার রেশ রয়ে গেছে৷ তিনি বেশ শক্তভাবে বললেন, এশীয় দেশগুলোর সংগত পদক্ষেপে বহিরাগত কেউ যেন বাধা না দেয়৷
লি ঝাওজিং এর পরে যোগ করলেন, তার পরও সব রাষ্ট্রের একটি সাধারণ স্বার্থের জায়গা আছে৷ নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও তাই সংলাপভিত্তিক এই আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসার ঘটছে৷ এশিয়ার বর্তমান সাফল্যগাথার পেছনেও আছে এই সংলাপ৷ জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে সর্বোচ্চ প্রাপ্তির জন্য নানাপক্ষীয় সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে৷
জেজু ফোরামের সেমিনারে, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে জুলিয়া গিলার্ড ও লি ঝাওজিং নিজেদের স্বতন্ত্র মতামত যেমন বেশ স্পষ্ট করেই জানালেন, আবার সব বিরোধ সত্ত্বেও সহযোগিতা ও সংলাপের ওপরও জোর দিলেন একটু তীব্রভাবে৷

সোউল, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে
সাজ্জাদ শরিফ: কবি, সাংবাদিক৷

ক্ষমতার রাজনীতি ও তার পরিণতি by বদিউল আলম মজুমদার

সম্প্রতি সিপিডি আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র’ শীর্ষক একটি সেমিনারে আমার অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়৷ এতে স্বনামধন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান একই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন৷ প্রবন্ধের উপসংহার হলো: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা দখলের জন্য পাগল৷ দলগুলোর অভ্যন্তরে কোনো গণতন্ত্র নেই৷ তারা ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্রে আকণ্ঠ নিমজ্জিত৷ তারা নীতি-আদর্শের ধার ধারে না৷ তারা সন্ত্রাস ও পেশিশক্তি ব্যবহারে এবং দলীয়করণে সিদ্ধহস্ত৷

বাংলাদেশের রাজনীতির যেকোনো নিবিড় পর্যবেক্ষকই দ্বিমত করবেন না যে আমাদের রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতার রাজনীতিতে বিভোর৷ তাঁরা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে বদ্ধপরিকর৷ দলে গণতন্ত্রচর্চার মতো যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য, সেগুলো থেকে তাঁরা বহু দূরে৷ কিন্তু কেন? তার পরিণতিই বা কী? রাজনীতির যেসব গুরুতর সমস্যার কথা অধ্যাপক রওনক জাহান হাজির করেছেন, তার অধিকাংশই রোগের উপসর্গমাত্র৷ তবে রোগের চিকিৎসার জন্য রোগের কারণ চিহ্নিত করা জরুরি৷ আমাদের ধারণা, দুর্নীতিই আমাদের বিরাজমান ক্ষমতার রাজনীতির প্রধান কারণ৷ জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কল্যাণই ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ৷ তাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সর্বস্তরে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের মূলোৎপাটন করা আমাদের অন্যতম জাতীয় অগ্রাধিকার৷
ক্ষমতায় গিয়ে লুটপাট করা যায় এবং সেই লুটপাটের ফসল প্রায় নির্বিঘ্নে ভোগ করা যায়৷ আনুগত্য ‘ক্রয়’ বা অব্যাহত রাখার জন্য ফায়দা হিসেবে তা ব্যবহারও করা যায়৷ এ কারণেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং ক্ষমতার আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, বৈধ আয়ের উৎস ছাড়াই অঢেল অর্থবিত্তের মালিক৷ নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনদের উৎপত্তি এ প্রক্রিয়াতেই ঘটেছে৷ ফায়দা বিতরণের মাধ্যমে আনুগত্য ক্রয়ের কারণে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি হয়৷ এ কারণেই আমাদের দেশে আজ শিক্ষকেরা বিভক্ত, সাংবাদিকেরা বিভক্ত, আইনজীবীরা বিভক্ত, সাংস্কৃতিক কর্মীরা বিভক্ত—এককথায়, পুরো সমাজ বিভক্ত৷ একাত্তরের ঐক্যবদ্ধ জাতি আজ পরস্পরের সঙ্গে প্রায় ‘যুদ্ধে লিপ্ত’ দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এই প্রক্রিয়াতেই৷ লুটপাট করার ও অন্যায় ফায়দা বিতরণের জন্য শাসক শ্রেণির কাউকে সাধারণত জেলে যেতে হয় না৷ অর্থ ও তদবিরের বিনিময়ে তাঁরা পার পেয়ে যান৷ কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধের মামলা ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ প্রত্যাহার করা হয়৷ রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও এসব দুর্বৃত্তের তেমন কোনো মাশুল গুনতে হয় না৷ তাই লুটপাটতন্ত্র কায়েম এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা ভোগই ক্ষমতায় যাওয়ার উম্মত্ত প্রতিযোগিতার প্রধান কারণ বলে আমাদের বিশ্বাস৷
৪৩ বছরের ইতিহাসে একমাত্র সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছাড়া আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তিকেই দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেল খাটতে হয়নি৷ তবে দুর্নীতির অভিযোগে জেল খাটলেও এরশাদ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নির্বাসিত হননি; বরং তিনি আমাদের রাজনীতিতে ‘কিং-মেকারে’ পরিণত হয়েছেন৷ আমাদের প্রধান দুটি দলই—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এরশাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য এখনো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত৷ প্রসঙ্গত, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের প্রাক্কালে প্রণীত তিন জোটের রূপরেখায় আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্য প্রধান দলগুলো এরশাদের দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সমঝোতা না করার অঙ্গীকার করেছিল৷
দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক কাঠামোতে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে ক্ষমতা ‘দখল’ করলেই হয় না, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়৷ আর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়োজন পড়ে৷ সে কারণেই দল ও সব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আমাদের দেশে দুই ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবার বা একান্ত অনুগতদের হাতে কুক্ষিগত৷ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোয় ব্যক্তিতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের অনপুস্থিতি এ ব্যবস্থারই প্রতিফলন৷
ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমাদের দেশে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে দলীয় অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়৷ এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোয় সময় সময় ‘প্রলয়’ ঘটে এবং এগুলো ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে৷ এর মাধ্যমে শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালন হয়৷ এ প্রক্রিয়ায় আইনের শাসন পদদলিত হয়৷ এ ক্ষেত্রে অবশ্য অর্থের প্রভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ এভাবে বর্তমানে আমাদের দেশে এক চরম বিচারহীনতার তথা অবিচারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে৷ সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের খঁুটিস্বরূপ৷ আর খঁুটি দুর্বল হলে রাষ্ট্রের ভিত কেঁপে উঠতে বাধ্য৷
ক্ষমতার উৎস প্রধানত দুটি৷ একটি হলো বল প্রয়োগের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, যা বৈধ ক্ষমতা৷ অন্যটি হলো সরকারবিরোধীদের রাজপথে সহিংসতা সৃষ্টির শক্তি৷ এ দুই ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্য থাকলে অর্থাৎ তাদের ক্ষমতা ‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ হলে, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সাধারণত রাজনৈতিক সমঝোতা সৃষ্টির পথ সুগম হয়৷ তারা কিছু কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ ধরে৷ ফলে ন্যূনতম, অর্থাৎ ‘এক দিনের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়, যা বাস্তবে ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে সমঝোতার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে৷
রাষ্ট্রীয় বৈধ ক্ষমতা অবৈধভাবে ব্যবহার করা গেলে দুই ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে বিরাজমান ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়৷ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণের মাধ্যমে এ ভারসাম্য নষ্ট ও ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ আর ভারসাম্য নষ্ট হলে সমঝোতা ভেঙে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করে ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার পাঁয়তারা করেন, যা ঘটেছিল ২০০৬ সালে৷
রাষ্ট্রীয় বৈধ ক্ষমতা অবৈধভাবে ব্যবহার করা গেলে সে ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়, এমনকি নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টাও চালানো যায়৷ র্যাবকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার এর একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত৷ ২০০৪ সালে র্যাব সৃষ্টি করা হয় মূলত ফায়দা প্রদান ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট সন্ত্রাসীদের শায়েস্তা করার লক্ষ্যে৷ কিন্তু দলীয়করণের কারণে র্যাব ক্রমাগতভাবে দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হতে থাকে, যার নগ্নতম প্রতিফলন ঘটে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময়ে৷ অন্যায়ভাবে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের মাধ্যমে র্যাবের শৃঙ্খলা বহুলাংশে ভেঙে পড়ে এবং এ বাহিনীর কিছু সদস্যের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সৃষ্টি হয়৷ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা এ প্রবণতারই প্রতিফলন বলে আমাদের ধারণা৷
রাজপথে সহিংসতা সৃষ্টির ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো মাস্তান পোষে, সরকারি দলের পক্ষে যা করা অপেক্ষাকৃত সহজ৷ অনেক দিন থেকেই আমাদের রাজনীতিতে তা চলে আসছে৷ ফায়দাতন্ত্রের সম্প্রসারণের ফলে মাস্তানের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ আর এ মাস্তানদের অনেকেই বর্তমানে মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন এবং নির্বাচনী অঙ্গনে প্রবেশ করছেন৷ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারত্ব ইত্যাদি অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যাওয়া এসব মাস্তানের অনেকেই এখন তাঁদের পুরোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনীতির মাঠ থেকে বিতাড়িত করছেন৷ এসব মাস্তানের কেউ কেউ টাকা ও পেশিশক্তি খাটিয়ে এখন মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা বা পৌরসভার চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ইত্যাদি পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন৷ ফলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে রাষ্ট্র আজ, প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমানের ভাষায়, ক্রমাগতভাবে ‘বাজিকরদের’ হাতে চলে যাচ্ছে, যা এক ভয়াবহ অশনিসংকেত৷
রাজনৈতিক দলে ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্র জেঁকে বসার ফলে এমনিতেই রাজনীতিতে মেধাবী ব্যক্তিদের প্রবেশের পথ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে৷ রাজনীতিতে ক্রমাগতভাবে মাস্তানতন্ত্রের বিস্তারের কারণে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা এ অঙ্গন থেকে ভবিষ্যতে সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত হবেন৷ এর ফলে দেশে ক্রমবর্ধমানহারে অযোগ্য ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, যা জাতির জন্য কোনোভাবেই কল্যাণ বয়ে আনবে না৷ এমন পরিস্থিতিতে আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য ভবিষ্যতে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে৷ এ ছাড়া চাঁদা-টেন্ডার তথা ফায়দা প্রাপ্তির প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে এবং সরকারি দলের অভ্যন্তরে খুনখারাবি আরও বাড়বে৷
আর দেশে অযোগ্য, অদক্ষ, দুর্নীতিবাজ ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এর মাশুল পুরো জাতিকেই দিতে হবে৷ কারণ, অপরাধীদের শাসন দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে উগ্রবাদী শক্তির উত্থানের পথকে সুগম করবে৷ ধর্মাশ্রিত শক্তি এরই মধ্যে এই উপমহাদেশে তাদের কুৎসিত চেহারা প্রদর্শন করা শুরু করেছে৷ বিরাজমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে উগ্রবাদের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলেই আমাদের আশঙ্কা৷

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)৷

মানিক মিয়ার সাংবাদিকতা এবং বর্তমান বাংলাদেশ by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

গতকাল (১ জুন রবিবার) ছিল পঞ্চাশের দশকের অপরাজেয় সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যু দিবস। আজ থেকে চার দশকেরও বেশি সময় আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তবু বছর বছর আমরা তাকে স্মরণ করি। কারণ, একজন সম্পাদক থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জাতির বিবেক। এই বিবেকটি তিনি কোনো কারণেই কোনো প্রলোভন ও কোনো ভয়ের কাছে বিক্রি করেননি। তার মতো বিবেকবান সাংবাদিক ও সম্পাদক দেশে জšে§ছিলেন বলেই দেশটি আজ স্বাধীন। এই স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই, তাতে তিনি ছিলেন সাহসী লড়াকু। এই স্বাধীনতা তিনি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু এই স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পর আজ যদি তিনি সহসা সমাধি থেকে জেগে উঠতেন, স্বাধীন বাংলার চেহারা দেখতেন, তাহলে কী ভাবতেন, কী দেখতেন, কী লিখতেন সে কথা আজ সবিস্ময়ে ভাবি।

সেই পঞ্চাশের যুগে, পাকিস্তান আমলে তিনটি নাম ছিল আমাদের সাংবাদিকতার আকাশে ধ্র“বতারা। মানিক মিয়া, জহুর চৌধুরী ও আবদুস সালাম। ইত্তেফাক, সংবাদ ও পাকিস্তান অবজারভার (পরে বাংলাদেশ অবজারভার) এই দুটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিকের সঙ্গে তারা যুক্ত ছিলেন। ইংরেজি দৈনিকটি এখন নেই। বাকি দুটি বাংলা দৈনিকই টিকে আছে। ব্যবসায়ে, প্রচারে, পৃষ্ঠা সংখ্যা ও শোভন অঙ্গসজ্জায় তাদের সমৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু সাহস ও বিবেকের সেই প্রাণস্পন্দন নেই আমাদের সাংবাদিকতায়। তিনটি নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর সাংবাদিকতার আকাশে অনেক নক্ষত্র ফুটেছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি নক্ষত্র। কিন্তু আগের সেই আলোর দ্যুতি নেই।
মানিক মিয়া যখন তার দৈনিকটি প্রকাশ করেন, তখন তার নিজস্ব প্রেস ছিল না; পত্রিকাটি ছিল মাত্র চার পৃষ্ঠা। ওই চার পৃষ্ঠার কাগজ কেনার জন্য রাস্তায় হকারদের কাছে ক্রেতারা ভিড় জমাত। খবর তাদের কাছে প্রধান আকর্ষণ ছিল না। প্রধান আকর্ষণ ছিল ওই কাগজে মানিক মিয়ার প্রতিদিনের নিজস্ব কলাম। মোসাফির এই ছদ্মনামে রাজনৈতিক মঞ্চ শীর্ষক কলামটি তিনি লিখতেন। শোনা যায়, ঢাকায় তখনকার প্রাদেশিক সেক্রেটারিয়েটের চিফ সেক্রেটারি থেকে তার চাপরাশি পর্যন্ত ছিলেন তার কলামের পাঠক। কী জাদুস্পর্শ ছিল তার লেখনীতে, যা তার মতের বিরোধী পাঠককেও এমন মোহমুগ্ধ করে রাখত?
সবাই স্বীকার করেছেন, এমনকি তার সমালোচকরাও। তার লেখা শুধু গতানুগতিক সাংবাদিকতা ছিল না, ছিল একটি স্বপ্ন নির্মাণের জন্য সংগ্রামের দিকদর্শন ও আবাহন। এ স্বপ্নটি ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার। দেশের মানুষকে অভাব, দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত করার। এই সংগ্রামে পঞ্চাশের দশকের তিন পথিকৃৎ সম্পাদকই ছিলেন আপসহীন। তারা বারবার কারাগারে গেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের কাগজের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা নতজানু হননি। সাহস ও বিবেকের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন দেশবাসীর সামনে। সাংবাদিকতাকে অতি মুনাফার ব্যবসা করে তোলেননি; তাকে করেছিলেন তাদের সংগ্রাম ও সাধনার হাতিয়ার।
মানিক মিয়াদের বাংলাদেশ ও আজকের বাংলাদেশের মধ্যে অনেক তফাৎ। তখন বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) ছিল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্বাঞ্চল। আসলে পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকদের দ্বারা শাসিত ও শোষিত একটি উপনিবেশ। শিল্প, বাণিজ্য, ব্যবসা থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে ছিল এই উপনিবেশটি পিছিয়ে। তার সম্পদ ও অর্থ নিত্য পাচার হতো দেশটির পশ্চিম অংশে। ভাষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও উপনিবেশের মানুষের গলাটিপে ধরে তাকে আঠারো ও উনিশ শতকের আফ্রিকার দাস কলোনিতে পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছিল। আজকের উগ্র মৌলবাদ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের তখনই অংকুরোদগম। কিন্তু তা এমন ব্যাপকতা লাভ করেনি। কারণ, সমাজ দেহে তার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ছিল। দেশের সাংবাদিকতা মানুষের বিবেক জাগ্রত রাখার প্রেরণা জোগাত। সত্যবাবু তখনও এমনভাবে রোগগ্রস্ত হননি। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি হয়নি আগ্রাসী লোভ ও পুঁজির দাস।
আর এই পুঁজির দাস একটি বিক্রীত-বিবেক সুশীল সমাজ তখন দেশে গড়ে ওঠেনি। যারা সমাজে সুশীল নামে পরিচিত ছিলেন তারা ছিলেন সত্যই সুশীল। তারা বিদেশের টাকায় বিদেশীদের স্বার্থে নিত্য সভা, সমাবেশ ও গোলটেবিল বৈঠক করে নিজের দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করতেন না। তারা নিত্য থাকতেন জনতার মিছিলের অগ্রভাগে। তারা পাঁচতারা হোটেলের তথাকথিত মতবিনিময় সভায় বা টেলিভিশনের টকশোতে নিত্য নকল সংগ্রামী সাজতেন না। তারা প্রকৃতই থাকতেন সংগ্রামের মাঠে। তাই বাঙালির ভাষা সংগ্রাম সফল হয়েছে। বাংলা হরফ, রবীন্দ্র ও নজরুলসঙ্গীতের বিরুদ্ধে অবাঙালি শাসকদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘাঁটি গাড়ার চক্রান্ত প্রতিহত করা গেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উচ্ছেদ ঘটানো গেছে। মধ্যযুগীয় মৌলবাদের অভ্যুত্থান রোখা গেছে। একাত্তরের মুক্তি সংগ্রাম সফল করা গেছে। বাঙালির এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন শ্রেষ্ঠ অগ্রপথিক ছিলেন মানিক মিয়াও। তাই আমরা বছর বছর তাকে স্মরণ করি।
তার প্রয়াণের চার দশকেরও বেশি সময় পর আজ আমরা নিজেদেরই নিজেরা প্রশ্ন করতে পারি, এই বাংলাদেশ কি পঞ্চাশের ও ষাটের দশকের মানিক মিয়ারা চেয়েছিলেন? আজ যদি তিনি হঠাৎ আজিমপুরে সমাধিতে জেগে ওঠেন এবং সমাধি থেকে বেরিয়ে এসে গোটা বাংলাদেশ নয়, শুধু ঢাকা শহরটা একবার ঘুরে দেখতেন, তাহলে কী ভাবতেন, কী লিখতেন? দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের এত ব্যাপকতা, রাজনীতিতে এই পচন, সন্ত্রাসী মৌলবাদের ভয়াবহ প্রতাপ, শিল্প সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় এই অবক্ষয়, লোভের রাজত্বের প্রতিষ্ঠা, মিথ্যার বেসাতি তার মনে কি পরাধীন আমলের চেয়েও বেশি ক্ষোভ সৃষ্টি করত? তিনি আবার রাজনৈতিক মঞ্চ লেখার জন্য কলম ধরতেন?
আমি মনে মনে ভাবি, ভাগ্যিস মানিক ভাই আজ বেঁচে নেই! বেঁচে থাকলে আজকের আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধেও তাকে কলম ধরতে হতো। তিনি তার প্রিয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারের বিরুদ্ধেও কলম ধরেছিলেন। আমার মনে আছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তিনি রোধ করবেন এবং দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনবেন। এই প্রতিশ্র“তি সোহরাওয়ার্দী সরকার রক্ষা করতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তানে ধান চালের দাম তেমন না বেড়ে শাকসবজি, কাঁচামরিচ, মাছ-মাংসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। তখন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী একটি নতুন থিওরি দিয়েছিলেন। থিওরিটি হল, তার সরকার দেশের এত উন্নয়ন ঘটাচ্ছে যে, কিছুটা মুদ্রাস্ফীতি ঘটছে, তবে তাতে লাভ হচ্ছে উৎপাদনকারী কৃষকদেরও। কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, রসুনের দাম বাড়ার ফলে তারা এখন হাতে ভালো টাকা পাচ্ছে।
নিজের নেতার এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মানিক মিয়া তার কলাম রাজনৈতিক মঞ্চে। তার মন্তব্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক নয়। কৃষক আগে যেখানে এক সের চাল বা দুই সের ধান বিক্রি করে মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো কিনতে পারত; এখন সেখানে দশ সের ধান ও পাঁচ সের চাল বিক্রি করেও তা কিনতে পারছে না। কারণ ধান-চালের দাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসের দাম বাড়ার মধ্যে কোনো সমতা নেই। এই সমতা না আনতে পারলে কাঁচামরিচের দাম বাড়ার ফলে কৃষক লাভবান হওয়ার বদলে তার চালের গোলা শেষ হচ্ছে, তার দারিদ্র্য বাড়ছে সে কথাটা সরকারকে বুঝতে হবে। নইলে আমার উন্নয়নের তত্ত্ব দেশের মানুষকে শুনিয়ে লাভ নেই। আমি এখানে মানিক মিয়ার ভাষায় হুবহু উদ্ধৃতি দিতে পারছি না; কিন্তু নিজের স্মরণ থেকে তার মন্তব্য মোটামুটি তুলে ধরছি।
দুর্নীতি সম্পর্কে তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের (প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয়) সমালোচনায় মানিক মিয়া ছিলেন সরব। তিনি লিখেছিলেন, (ভাষা আমার) মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ক্ষমতায় আসার আগে দুর্নীতিবাজদের প্রকাশ্যে ফাঁসিকাষ্ঠে লটকাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন ক্ষমতায় বসে তার সরকারের আমলে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হওয়া দূরের কথা, তারা প্রশ্রয় পাচ্ছে। আওয়ামী লীগের ছোট-বড় অনেক নেতা এখন পশ্চিম পাকিস্তানে পান রফতানির লাইসেন্সবাজিতে রত। নেতাদের যুক্তি, এতকাল আওয়ামী লীগের কর্মীরা কিছুই পায়নি, এখন একটু পাক। এ পাওয়ার জন্য কি গোটা পান রফতানির ব্যবসাকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করতে হবে? সরকার এখনই সতর্ক হোন। নইলে এই ছোট দুর্নীতির বীজ থেকেই দুর্নীতির বিরাট মহীরুহ গজিয়ে উঠবে। সেই মহীরুহ শুধু আওয়ামী লীগকে নয়, গোটা দেশকে ধ্বংস করবে। তখন আমাদের কারও কিছু করার থাকবে না।
মানিক মিয়ার এ সতর্কবাণী যে কত সঠিক ছিল, চার দশকেরও বেশি সময় পর আজ দেশের অবস্থা, আওয়ামী লীগও আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থা দেখে আমরা তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনের প্রাক্কালে বরিশালে মালেক নামে এক বিতর্কিত রাজনৈতিক কর্মীর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তখনকার সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে এই বলে আওয়ামী লীগকে সতর্ক করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ যেন একজন সন্ত্রাসীকেও দলে আশ্রয় না দেয়। এমনকি নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা না থাকলেও সন্ত্রাসীদের যেন দলে প্রশ্রয় দেয়া না হয়। সন্ত্রাস একবার দেশের রাজনীতিতে ঠাঁই পেলে শুধু গণতন্ত্রই বিপন্ন হবে না; সন্ত্রাস সমাজব্যবস্থাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন করে ফেলবে। সেই তখনই আওয়ামী লীগ দলে যেসব কর্মী ও নেতার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ আছে, তাদের নামের তালিকা তৈরি করে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছিলেন মানিক মিয়া। আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে সন্ত্রাসীদের চরমভাবে মাথা তোলা দেখতে পেতেন, বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানার পর তিনি রাজনৈতিক মঞ্চে কী লেখা লিখতেন তা মাঝে মাঝে আমি ভাবতে চেষ্টা করি।
মানিক মিয়া একবার তার রাজনৈতিক মঞ্চে হয়দিশ কথাটি পথের ঠিকানা অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। জামায়াতিরা তখন দেশে এতটা শক্তিশালী নয়। কিন্তু অসাধুভাবে ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভের চেষ্টা করছে। তারা প্রচার চালালো, মানিক মিয়া হয়দিশ নয় হাদিস কথাটি তার লেখায় ব্যবহার করেছেন এবং পবিত্র হাদিসের অবমাননা করেছেন। তাকে ধর্মের অবমাননাকারী আখ্যা দিয়ে জামায়াতের তখনকার মুখপত্র জাহানে নওতে অবিলম্বে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করা হল। নইলে তার জীবননাশেরও প্রচ্ছন্ন হুমকি দেয়া হয়েছিল। মানিক মিয়া তাদের হুমকির জবাবে লিখেছিলেন, আমি একজন মুসলমান। ধর্ম আমার কাছে বিশ্বাস। ব্যবসা নয়। জামায়াত ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। তাদের হুমকিতে আমি ভীত নই। গণতন্ত্রে যারা বিশ্বাস করেন, তাদের উচিত এ ধর্ম ব্যবসায়ীদের দেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করা। নইলে তারা ধর্মান্ধতার বিষ ছড়িয়ে দেশের অস্তিত্বই একদিন বিপন্ন করে তুলবে। পাঠকদের কাছে আমি ক্ষমা চাই। মানিক মিয়ার লেখাগুলো আমার হাতের কাছে না থাকায় আমি তার লেখার হুবহু উদ্ধৃতি দিতে পারছি না। যা হোক সে যুগে মৌলবাদীদের হুমকির মুখে মানিক মিয়া নতজানু হননি, ক্ষমা চাননি। বরং কড়া জবাব দিয়েছেন। আর এ যুগে মৌলবাদীদের সামান্য চোখ রাঙানিতেই প্রতিষ্ঠিত দৈনিকের সম্পাদক ছুটে গিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিবের কাছে তওবা পড়েন। এখানেই মানিক মিয়ার যুগের সাংবাদিকতার সাহসিকতার বৈশিষ্ট্য।
সন্দেহ নেই মানিক মিয়া আজ যদি বেঁচে থাকতেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা, আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান অবস্থা দেখে চরমভাবে ক্ষুব্ধ হতেন। নারায়ণগঞ্জের হত্যাকাণ্ড, ফেনীর বর্বরতা, দেশময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাস ও দুর্নীতির ধারাবাহিকতার বিরুদ্ধে তিনি কঠোর হতে কলম ধরতেন। আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্যই দেশের অবিশ্বাস্য উন্নয়ন ঘটিয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের সব ফসল যে খেয়ে ফেলছে দলের ভেতরে একশ্রেণীর মন্ত্রী, নেতা ও এমপিদের সন্ত্রাস ও দুর্নীতি এবং দৃঢ় হাতে এই সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের এখনই দমন করা না গেলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন যে হবে ভারতের কংগ্রেসের চেয়েও শোচনীয়ভাবে এ সত্যটা তিনি বিনা দ্বিধায় তুলে ধরতেন। তিনি টিভির টকশোতে যেতেন না; ট্রান্সপারেন্সি বা পলিসি ডায়ালগের সেমিনারে গিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে গলাবাজিও করতেন না। তিনি তার রাজনৈতিক মঞ্চে সঠিক তথ্য ও বক্তব্য তুলে ধরতেন, যা হতো আওয়ামী লীগের জন্য কঠোর সতর্কবাণী এবং দেশবাসীর জন্য পথের নির্দেশ।
দেশবাসীকে উন্নয়নের ছবি দেখিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার খুশি করতে পারবেন না। সর্বাগ্রে তাদের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। দুর্বৃত্ত দমনে প্রশাসনকে শক্তি ও ক্ষমতা জোগাতে হবে। পুলিশ যেন দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার করতে গিয়ে স্থানীয় এমপি অথবা মন্ত্রীর নির্দেশে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। দলের ভেতর থেকে সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিনা দ্বিধায় বহিষ্কার করতে হবে। দেশে গণতন্ত্র স্থায়ী হবে কি করে যদি আইনের শাসনই প্রতিষ্ঠিত না হয়! আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে, জনজীবনে স্বস্তি ও শান্তি না ফিরলে জাপান থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এনে দেশে উন্নয়নের বন্যা বহালেও আওয়ামী লীগ সরকার জনসমর্থনের খুঁটি শক্ত করতে পারবে না। মানিক মিয়া আজ যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে আওয়ামী লীগকে শক্তভাবে একথাটা বোঝাতেন এবং দেশবাসীকেও নতুন সংগ্রামের পথের দিশা দিতেন।
লন্ডন ১ জুন ॥ রবিবার,

ভারতের নতুন সরকার ও বাংলাদেশের রাজনীতি by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এক অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য জয় পেয়েছে, যাকে বলে ভূমিধস বিজয়। এ জয় ভারতবর্ষের রাজনীতিতে সৃষ্টি করেছে ইতিহাস। নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়েছে ভরাডুবি। আশ্চর্যের ব্যাপার হল- গুজরাট, রাজস্থান ও দিল্লিসহ বেশক’টি রাজ্যে কংগ্রেস কোনো আসনই পায়নি। বলতে কষ্ট হয়, বিশ্বের অবিসংবাদিত নেত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসকে আজ মনে হচ্ছে ভারতবর্ষের সবচেয়ে অসহায় একটি রাজনৈতিক দল। ভারতের জনগণ কংগ্রেসের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অকল্পনীয়ভাবে। কেন ভারতের জনগণ কংগ্রেসের কাছ থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং কংগ্রেসের নির্বাচনী বিপর্যয় ঘটল এর কারণ অনুসন্ধান জরুরি।

ভারতে নির্বাচনের এ ফলাফলে নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশের ঝিমিয়ে পড়া রাজনীতি। চলছে বিশ্লেষণ। কেউ বলছে, ভারতে সরকার পরিবর্তন বিএনপির রাজনীতির জন্য সহায়ক হবে- বেকায়দায় পড়বে ক্ষমতাসীন দল; আবার কেউ বলছে, সরকার পরিবর্তন হলেও ভারতের বিদেশ নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না। এসব বিতর্কের মধ্যেই এখন বাংলাদেশের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। ভারতের কংগ্রেস পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের আওয়ামী পরিবারের সখ্য সর্বজনবিদিত। কংগ্রেস ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ একটু বাড়তি সুবিধা যে পায়- এটি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, কংগ্রেসের এ ফলাফল ও বিজেপির ক্ষমতায় যাওয়া ক্ষমতাসীন দল তথা আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের দুঃসংবাদ। তবে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকে, কোনো শত্র“ থাকে না। রাজনীতিতে কোনো এক জায়গায় এসে চরম প্রতিপক্ষও মিত্রে পরিণত হয়। কার সঙ্গে কী সম্পর্ক হবে, সেটা দেখার জন্য আমাদের ধৈর্য সহকারে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
যদিও মোদি বলেছেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি দেশ পরিচালনা করবেন, তবে তার এ কথা কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে- এটি নিয়ে সন্দেহ আছে সর্বমহলে। কারণ মোদি নিজেই একজন উগ্র ধর্মান্ধ। তিনি আরএসএসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংস ও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগানোর সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে। গুজরাটে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার অভিযোগে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগও করেছিলেন। ওই দাঙ্গায় কয়েক হাজার মুসলমান নিহত হয়েছিল, ধ্বংস হয়েছিল বিপুল সম্পদ। সাম্প্রদায়িক চরিত্রের জন্য মোদির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা প্রত্যাহার করা হয় গত ১৯ মে।
দৃশ্যত একজন ব্যক্তি আরোহীর আসন থেকে যখন চালকের আসনে চলে যান, তখন তার ভেতর দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিকভাবেই। আমরা প্রত্যাশা করি, নরেন্দ্র মোদির ভেতরও দায়িত্ববোধ তৈরি হোক। পথের দৃশ্য তার জন্য বদলে যাক, তার সংকীর্ণ মন বড় হোক, তার দৃষ্টি হোক প্রসারিত। ভারত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। একজন আঞ্চলিক নেতা হয়ে মোদি ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতি তার দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে বন্ধুর মতো। কারণ বাংলাদেশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। শত শত কোটি ডলারের পণ্য বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করে থাকে। তাতে চাঙ্গা থাকে ভারতের অর্থনীতি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে অমীমাংসিত। এর মধ্যে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতি অন্যতম।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নানা বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের তিন দিক দিয়েই ভারতের অবস্থান। সেজন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সব নদীর উৎসই ভারতে। ভারত ৩৫টি আন্তঃসীমান্তীয় নদীতে ৫০টি বাঁধ নির্মাণ করেছে, যার ফলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নিকট প্রতিবেশী হিসেবে ভারত আমাদের সঙ্গে এমন বৈরী আচরণ করতে পারে না। আমরা ভারতের নতুন সরকারের কাছে সুবিচার চাই। আমরা আমাদের পানির ন্যায্য অধিকার চাই। আশা করি, ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
আমরা জানি, ভারতের সরকার পরিবর্তন হলেও নীতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। কারণ ভারতের নীতিনির্ধারণী যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, এরা অনেক পাকাপোক্ত। এ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের সরকারকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে থাকে। অতীতে আমরা তাই দেখেছি। এবার অন্তত বাংলাদেশের বেলায় যেন সেটি না ঘটে। কারণ মোদির নেতৃত্বে সরকারটি ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সরকার। এ সরকারের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নাতীত। ভারতীয় জনগণের সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে এ সরকারের পক্ষে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে মোদির সরকারকে কারও ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। কাজেই সদিচ্ছা থাকলে বাংলাদেশের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধান করা মোদির সরকারের জন্য হবে অত্যন্ত সহজ।
অন্য দেশের একটি শক্তিশালী সরকারের কাছ থেকে দ্বিপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে দরকার আরেকটি শক্তিশালী সরকারের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, বাংলাদেশে বর্তমানে সেটি নেই। বর্তমান সরকারের জনসমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ। জনসমর্থনহীন ও নৈতিক ভিত্তিহীন একটি দুর্বল সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য বড় ধরনের দুর্বলতা। এ দুর্বলতা ভারতের স্বার্থের জন্য অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে- এমনটিই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা করতে দরকার একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকারের আর সেটি হতে পারে ভারতের মতো সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও পক্ষপাতহীন নির্বাচনের মাধ্যমে।
নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতিসহ ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত কোনো বিষয়ই বর্তমান সরকারের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব হয়নি। উল্টো ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। বিনিময়ে দেয়নি কিছুই। তবে ভারতে নতুন সরকার এখন ক্ষমতায়। আশা করি, এ নতুন সরকার বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার মূল্য দেবে এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসহ সব অমীমাংমিত বিষয় সমাধানে বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নেবে। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের অধিকার। আর কাপুরুষোচিত মন নিয়ে অধিকার আদায় করা যায় না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আর সেটা যদি হয় পানির মতো অত্যাবশ্যকীয় কিছু, তাহলে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে থাকতে হবে প্রস্তুত।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
belayet-1@yahoo.com

উল্টো পথে গিয়ে মন্ত্রীর গাড়ির চাকা ফুটো

উল্টো পথে গিয়েই প্রথম চাকা ফুটো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্যের। আর তা নিয়ে কথা ওঠে মন্ত্রিসভার বৈঠকের অনির্ধারিত আলোচনায়। মন্ত্রিসভার একজন সদস্য এ আলোচনা তুললে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, আপনাদের নিরাপত্তার জন্যই করা হয়েছে।  
সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদের এক সদস্য এ তথ্য দেন। তবে কোন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির চাকা ফুটো হয়েছে তা বলতে চান নি তিনি।

মন্ত্রী পরিষদের ওই সদস্য জানান, প্রধানমন্ত্রী আলোচনার সময় বলেছেন, গাড়ির চাকা ফুটো হওয়াতো কম ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়। তার চেয়ে মন্ত্রী এমপিদেরই বেশি নিরাপত্তার মূল্যই তো বেশি। তাছাড়া মন্ত্রীদের এলাকাতেই তো ডিভাইস বসানো হয়েছে। এটি প্রশাসনের একটি ভালো উদ্যোগ বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
মন্ত্রিসভার অন্য একজন সদস্য বলেন, যানজট দেখে বুঝে অথবা না বুঝেই হোক চালক উল্টো পথে গাড়ি চালিয়েছেন হেয়ার রোডে। সব পথে তো আর এই প্রতিরোধক বসানো নেই। সে কারণেই হয়তো ভুলটি হয়েছে। হয়তো তার জানা ছিল না এই পথেই ডিভাইস বসানো রয়েছে। সে কারণে ফুটো হয়েছে।
রাজপথে দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকার পর বিরক্ত হয়ে অনেক চালকই উল্টো পথে গাড়ি চালান। এতে অনেক সময় যানজট আরো প্রকট আকার ধারণ করে।
এই প্রবণতা ঠেকাতে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর হেয়ার রোডে প্রতিরোধক যন্ত্র বসিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার বেলা ১১টায় এর উদ্বোধন করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) হাসান মাহমুদ খন্দকার।
সয়ংক্রিয় এই যন্ত্রটি বসানোর পর কোনো গাড়ির চাকা ফুটো হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রথম চাকা ফুটো হওয়ার খবর মেলে মন্ত্রিসভার অনির্ধারিত আলোচনায়।

জামায়াতের বিচার না করা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত by উৎপল রায়

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনে সংশোধনী ছাড়া জামায়াতের বিচারের বিরোধিতা করে আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হকের দেয়া বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, জামায়াতের বিচার না করা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটি রাজনৈতিক কৌশলের একটি অংশ। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যকে প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন প্রসঙ্গে তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে প্রভাবিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বর্তমান আইনে জামায়াতের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এ নিয়ে তোলপাড় চলার মধ্যেই শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যই সমর্থন করেন। এ ব্যাপারে  শিক্ষাবিদ ও ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা বরাবরই জামায়াতকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মত দিয়েছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে যা-ই থাক না কেন তাদের নিষিদ্ধ করার জন্য বিদ্যমান সন্ত্রাসবিরোধী আইনই যথেষ্ট বলে মনে করি। তিনি বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধকরণ প্রশ্নে সরকারের কে কি বললো সে বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই। সরকারের যদি আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকে তাহলে ট্রাইব্যুনাল আইনে যা-ই থাকুক না কেন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের নিষিদ্ধ করা যায়।

এ বিষয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্র্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, জামায়াতের বিচার নিয়ে যা চলছে এটির মূল কারণ হতে পারে রাজনৈতিক। গত ২২ বছর ধরে আমরা বলে আসছি এ বিষয়টিকে যাতে রাজনীতিকরণ করা না হয়। আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তার বক্তব্য বিভ্রান্তিকর এবং তা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে বোঝা যায় আইনটি তিনি ভালভাবে পড়ে দেখেননি। ওনার মাথায় এখনও ফৌজদারি মামলার আইন ঘুরছে। জামায়াতের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শাহরিয়ার কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী আইন বিশেষজ্ঞ নন। তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আইনমন্ত্রী যেভাবে তাকে বুঝিয়েছেন তিনি সেভাবেই বলেছেন। অথবা অন্য কেউ তাকে এভাবে বুঝিয়েছে। এটা যদি সরকারের সিদ্ধান্ত হয় তবে তা হবে খুবই দুঃখজনক। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার সম্ভব জানিয়ে তিনি বলেন, সব আইনে শাস্তির বিধান থাকে না। এই আইনের ২০ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সংগঠনের বিচার করা যাবে। এখন আইনমন্ত্রী হয় জেনে না হয় না জেনে এসব উল্টাপাল্টা কথা বলছেন। শাহরিয়ার কবির বলেন, আইনমন্ত্রী অনেক কারণ দেখিয়েছেন। এখন আমি বলতে চাই নিজামীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ চলাকালে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় ঘোষণা করা হয়নি? তিনি বলেন, সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের শাস্তি কাকে দেয়া হবে এটা তিনি কি করে বলেন? বিষয়টি নির্ধারণ করবেন তো ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা। তিনি বলেন, যদি জামায়াতের বিচার সম্ভব না হতো তাহলে সরকারের আগের আইনমন্ত্রী (ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ)  কিভাবে বলেছিলেন বিচার সম্ভব? তাছাড়া, যে সব আইন বিশেষজ্ঞ জামায়াতের বিচার করা যাবে মর্মে বিবৃতি দিচ্ছেন তারা কি না জেনেবুঝে এসব বলছেন?
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জামায়াতের বিচারে আইনের বাধাকে একটি অজুহাত উল্লেখ করে বলেন, এটি বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যার সঙ্গে আইনের ব্যাখ্যার কোন সম্পর্ক নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বিচার হবে। তিনি এটি বলেননি যে বিচার হবে না। কিন্তু কবে হবে  সেটি বলেননি। এত দূর এসে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এভাবে কথা বলায় আমরা যারপরনাই হতাশ হয়েছি। তিনি বলেন, সরকারের ব্যাখ্যার প্রসঙ্গে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই আইনে এত বড় একটা অসঙ্গতি যদি ছিলই তবে তা আগে ধরা পড়লো না কেন? এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে জামায়াতের বিচার প্রলম্বিত হবে বলে মনে করি।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে একটি ভুল তথ্য বের করানো হয়েছে। তার মুখ থেকে যখন এ ধরনের কথা শোনা হয়, তখন তা হতাশার। কারণ দীর্ঘ দিন পরে হলেও অসীম সাহসিকতার সঙ্গে তিনিই জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াটি শুরু করেছিলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রীকে এই আইনের ব্যাখ্যা সম্পর্কে ভুল বোঝানো হয়েছে অথবা এ বিষয়ে তাকে প্রভাবিত করা হয়েছে। তবে কারা এসব করছে তা জানি না। এটি হতে পারে রাজনৈতিক। কারণ সরকারের মধ্যেও সরকার থাকে। তিনি বলেন, প্রচলিত আইনেই জামায়াতের বিচার সম্ভব। আইনের ২০ (২) ধারায় এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। যেহেতু আইনে সংগঠনের বিচারের বিষয় উল্লেখ করা আছে, সেহেতু বিচার করতে বাধা কোথায়? বাচ্চু বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩-এ আজীবন  কারাবাস ও ৯০ বছরের কারাদ-ের উল্লেখ নেই। তবুও তো ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা দোষীদের এ শাস্তি দিয়েছেন। বেশ ক’টি রায়ে জামায়াতকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাহলে সেই আলোকে জামায়াতের বিচার করতে দোষ কোথায়? বিষয়টি কেবল জুরিসডিকশন ও জাজমেন্টের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি তা-ও সম্ভব না হয় তাহলে প্রয়োজনে আবারও আইনটি সংশোধন করে জামায়াতের বিচার করা হোক।

‘ক্ষতিপূরণ নয় বিচার চাই’

ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে গতকাল উত্তর
প্রদেশের এলাহাবাদে বিক্ষোভ করেন ভারতীয় জনতা
পার্টির (বিজেপি) নারী শাখার কর্মীরা৷ তাঁরা
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের
কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। রয়টার্স
ভারতের উত্তর প্রদেশে গণধর্ষণের পর হত্যার শিকার দুই কিশোরীর একজনের বাবা সরকারের ক্ষতিপূরণের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন৷ তিনি বলেছেন, ‘ক্ষতিপূরণ আমার দরকার নেই, আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই৷ তাঁরা আমার মেয়েকে ফাঁস দিয়ে হত্যা করেছে, আমিও তাঁদের ফাঁসি চাই৷’ খবর এনডিটিভির৷ এদিকে, নিহত কিশোরীর পরিবারের এক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, তাঁদের বক্তব্য পরিবর্তনের জন্য পুলিশ চাপ দিচ্ছে৷ এই অবস্থায় ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার ন্যায়বিচার নিয়ে তাঁদের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে৷ রাজ্যের বাদাউন শহরের কারতা গ্রামের ওই ব্যক্তির ১৫ বছরের কিশোরী মেয়ে ও মেয়েটির চাচাতো বোন (১৪) গত মঙ্গলবার রাতে নিখোঁজ হয়৷
পরদিন গ্রামের একটি গাছে তাঁদের লাশ ঝুলে থাকতে দেখা যায়৷ লাশের ময়নাতদন্তে দুজনকে ধর্ষণের পর হত্যার প্রমাণ মেলে৷ এ ঘটনার পর গতকাল শনিবার পর্যন্ত পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়েছে৷ এঁদের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্যও আছেন৷ কিশোরীদের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ যথাসময়ে ব্যবস্থা নিলে কিশোরীদের জীবিত উদ্ধার করা যেত৷ তারা থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও পুলিশ প্রথমে গ্রহণ করেনি৷ পরে এলাকাবাসীর চাপে তারা ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা নেয়৷ দুই কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যার প্রতিবাদ ও অপরাধীদের বিচারের দাবিতে গতকাল শনিবার রাজধানী নয়াদিল্লি ও উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ হয়েছে৷ উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে ভারতীয় জনতা পার্টির নারী কর্মীরা বিক্ষোভ করেন৷ এ সময় তাঁরা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন ও তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করেন৷ রাহুলের সাক্ষাৎ: ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির সহসভাপতি রাহুল গান্ধী গতকাল উত্তর প্রদেশে গণধর্ষণের পর হত্যার শিকার দুই কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন৷ এ সময় রাহুলের সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা ও তাঁর একান্ত সহযোগী মধুসূদন মিস্ত্রি৷

বিমানবন্দরে বিশেষ সুবিধা চান না প্রিয়াঙ্কা

প্রিয়াঙ্কা গান্ধী
ভারতে কংগ্রেস দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র বিমানবন্দরে তাঁর পরিবারের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে গত শুক্রবার আবেদন জানিয়েছেন৷ খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার৷ ভারতের কোনো বিমানবন্দরে ঢুকতে বা বের হতে গান্ধী পরিবারের সদস্যদের তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয় না৷ সরাসরি গান্ধী পরিবারের সদস্য না হলেও প্রিয়াঙ্কার স্বামী হওয়ায় রবার্ট ভদ্রও ওই সুবিধা ভোগ করতেন৷
ভারতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভদ্রের ওই সুবিধা প্রত্যাহার হতে পারে বলে গুঞ্জন শুরু হয়৷ ভারতের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে স্পেশাল প্রটেকশন গ্রুপ (এসপিজি)৷ গান্ধী পরিবারও এসপিজির নিরাপত্তা পায়৷ সেই এসপিজির প্রধানের কাছে লেখা চিঠিতে প্রিয়াঙ্কা বলেছেন, ‘শুনছি ভদ্রের সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে৷ ...একটি পরিবারের সদস্যরা একই সঙ্গে গিয়ে বিমানবন্দরে আলাদা ক্যাটাগরিতে পড়ার কোনো অর্থ হয় না৷’

আশ্চর্য দ্বীপ জেজু

জেজু দ্বীপ: গাছগাছালির ফাঁকে
ফাঁকে ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্য
জেজু দ্বীপ যেন অপেক্ষা করছিল আমাদের চমকে দেওয়ারই জন্য৷ উড়োজাহাজের আবদ্ধ পেট থেকে নেমে তার আকস্মিক সৌন্দর্যের ঝাপটায় ভাষা হারিয়ে গেল৷ এ দ্বীপের জন্ম ২০ লাখ বছর আগে, আগ্নেয়গিরির লাভা জমে জমে৷ মৃত সেই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ এখন চেনা যায় না৷ ঘন সবুজ গাছের কোমলতায় সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত৷ জেজু দ্বীপের চারপাশে যে জলরাশি, তা কেবল নামেই দক্ষিণ সাগর৷ দ্বীপটি আসলে প্রশান্ত মহাসাগর ভেদ করেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে৷ গাঢ় সবুজ দ্বীপ৷ গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্য৷ এই সমতল, তো এই পাহাড়ি খাড়াই-উতরাই৷
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক বিস্ফোরণের প্রাচুর্য এই দ্বীপটির আদিম নিসর্গ অনেকটা নমনীয় করে এনেছে৷ কিন্তু কেবল নিসর্গের মাত্রাতেই তো নয়, দ্বীপটি চমকপ্রদ হয়ে উঠেছে এর প্রশাসনিক অনন্যতার কারণেও৷ জেজু আগে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার নয় প্রদেশের একটি৷ গণভোটে রায় দিয়ে এ দ্বীপের বাসিন্দারা একে একটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়৷ ২০০৬ সালের ১ জুলাই থেকে এটি কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করে৷ জেজু একদিন ধীরে ধীরে একটি ‘মুক্ত আন্তর্জাতিক নগর’ হয়ে উঠবে, সেটিই এই দ্বীপবাসীর স্বপ্ন৷ কোরিয়া ফাউন্ডেশনের সহযাত্রী জানালেন, কোনো ভিসা ছাড়াই এখানে এসে দিব্যি একটি মাস সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়৷ নতুন এই ব্যবস্থাপনার পর জেজুর মতো চোখধাঁধানো দ্বীপে পর্যটকের স্রোত যে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, তা আর আশ্চর্যের কী! আমরা ১৮টি দেশের ২৩ জন সংবাদকর্মী এই দ্বীপে এসেছি, কোরিয়া ফাউন্ডেশনের তদারকিতে৷ নিছকই বেড়াতে নিয়ে আসা নয়, আমাদের ২৮ মে নবম জেজু ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আঁচ অনুভব করানো তাদের আসল উদ্দেশ্য৷ এ ফোরামের অন্যতম উদ্যোক্তা জেজুর বিশেষ আত্মনির্ভর সরকার৷ এশিয়াতে শান্তি ও সমৃদ্ধির বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করা এ ফোরামের মূল উদ্দেশ্য৷ এবারে তিন দিন ধরে যেসব আলোচনা হলো, তার কেন্দ্রীয় ভাবনা ‘নতুন এশিয়ার রূপায়ণ’৷ ভাবনা এশিয়াকে নিয়ে, কিন্তু আয়োজকেরা যুক্ত করছেন এর বাইরের মানুষদেরও৷ এই ফোরামকে তাঁরা বহুপক্ষীয় মতামত ও সহযোগিতার একটি কেন্দ্রভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে চান৷ আলোচনায় অংশ নিতে তাই এসেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড, চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি ঝাওজিং ও ফিলিস্তিনে স্বল্পকালের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া সালাম ফাইয়াদ৷
আরও এসেছেন বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা৷ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন উপলক্ষে অতিথিদের নৈশভোজে আপ্যায়ন করল কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ বিপুল লোকের এক এলাহি আপ্যায়নপর্ব৷ নৈশভোজ-পূর্ব বক্তব্য রাখলেন এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইয়ুন বিউং-সে৷ বুঝতে অসুবিধা হয় না, এশিয়া বলতে তাঁরা পূর্ব এশিয়াই বোঝান৷ মন্ত্রীর বক্তব্য ছোট, কিন্তু সুচিন্তিত৷ তাতে আকাঙ্ক্ষার ইশারাটি সুস্পষ্ট৷ বললেন, প্রতিটি দেশের বাণিজ্যের প্রসার এখন বিভিন্ন দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল৷ সহযোগিতার হাত যাঁরা গুটিয়ে রাখবেন, তাঁরা শুধু অন্যের নন, নিজেদেরও বিরাট ক্ষতি করবেন৷ নানা দেশের সম্পর্ক তাই নতুন নতুন মাত্রায় জোরালো করতে হবে৷ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য এ যুগে বিশ্বসমাজেরও ঐক্য প্রয়োজন৷ জল-স্থল-আকাশের যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং সাইবার-নিরাপত্তার জন্য সব দেশের একসঙ্গে কাজ করার ওপর তিনি অসম্ভব জোর দিলেন৷ বাণিজ্যের যে বিপুল সম্প্রসার ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে, সাইবার-নিরাপত্তার জন্য বিশ্ব সম্মিলিতভাবে কাজ না করলে তিনি তার বড় অংশই হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা জানালেন৷ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, এ তো সত্য কথা যে ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রসঙ্গ, জাতিবাদের উত্থান, জাতীয় স্বার্থের টানাপোড়েন—এসব কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে রেষারেষি হবে৷ আঞ্চলিক আবহাওয়া তাতে তপ্ত হয়ে পড়বে৷ কোরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের সমবায়ে সংকট মোকাবিলার জন্য ছোট্ট কিন্তু কার্যকর একটি ফোরাম এখন আমাদের দ্রুত গঠন করা দরকার৷’ কোরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণের পরে হাততালির যে স্রোত বয়ে গেল, সহজে কি আর তা থামে! বোঝা গেল, এ হাততালি কেবল সৌজন্যের নয়, অনেকের অন্তরেরও৷
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে
সাজ্জাদ শরিফ: কবি, সাংবাদিক৷

সর্বজনের শিক্ষা কি সম্ভব?

প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন একটি নিয়মিত খবর৷ স্কুল-কলেজের পরীক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী পরীক্ষা, এমনকি বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশ্ন আগাম সরবরাহে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের খবর পাওয়া যায়৷ খবরাখবর বেশি প্রচারিত হলে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়৷ সেই তদন্ত কমিটি যথারীতি কাজ করার সময় পায় না অথবা কিছুই খুঁজে পায় না৷ অপরাধ অব্যাহত থাকে৷ এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবাল গত কিছুদিনে চারটি লেখা লিখেছেন৷ তাঁর সেই লেখাগুলো একসঙ্গে ৮-১০টি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে৷ তিনি তাঁর লেখাগুলোয় তথ্য–প্রমাণসহ দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রশ্নপত্রের শতভাগ আগেই ফাঁস হয়েছে৷ তার পরও শিক্ষামন্ত্রী পরিস্থিতির ভয়াবহতায় পুরোপুরি সায় দেননি৷ একটা কথা স্বীকার করেছেন, পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, তদন্ত কমিটি হয়েছে৷ অন্যগুলোর বিষয়ে তিনি এর আগে যারা ‘ফাঁসের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার’ কথা বলেছিলেন৷ এক শিক্ষার্থী উপায়ান্তর না দেখে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়েছিল থানায়৷ পাশাপাশি নিয়োগ-বাণিজ্য বা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগ এখন সবার জানা গোপন বিষয়৷ ভর্তিও৷ শিক্ষামন্ত্রী কয়েক বছর ধরেই শিক্ষােক্ষত্রে সরকারের সাফল্যের দাবি করে আসছেন৷ সাফল্যের দাবির দুটি দিক প্রধান: ১. পাসের হার এবং ২. জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা৷ এটি ঠিক যে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে৷ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষার পরিবেশ পেলে নিজ যোগ্যতায় যে অনেক দূর যেতে পারে, তার প্রমাণ বহুভাবেই পাই৷ এই দেশের অভিভাবকেরা, এমনকি যাঁদের সহায়সম্বল নেই, তাঁরাও নিজ সন্তানের শিক্ষার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত৷ কিন্তু বর্তমান সাফল্য যতটা সংখ্যা বৃদ্ধি, ততটা কি টেকসই বা মানসম্মত? এ প্রশ্নের পেছনের কারণ সবাই জানেন৷ স্কুল-কলেজ মানে এখন ক্লাসরুমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নয়, অধিক প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষার সকল পর্যায় এখন ঘেরাও করে আছে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং সেন্টার ও গাইড বই৷
এই জগতে প্রতিযোগিতাও অনেক৷ যে তার ক্লায়েন্টদের ভালো ফল নিশ্চিত করতে পারবে, তার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তত বেশি৷ তাদের তাই পর্দার পেছনে হাঁটার, নানা যোগাযোগ ও লেনদেনের রাস্তায় চলতে হয়৷ গত কয়েক বছরে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষা দুটি বেড়েছে৷ কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ছিল শুধু এসএসসি পরীক্ষা৷ এর সঙ্গে যোগ হলো পঞ্চম শ্রেণি (পিএসসি) ও অষ্টম শ্রেণি (জেএসসি)৷ এগুলো চালুর সময় শুনেছিলাম, এসএসসি উঠে যাবে৷ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে তারপর একেবারে পরীক্ষা৷ তা হলো না৷ এসএসসিও থাকল৷ তার মানে চারটি পাবলিক পরীক্ষা৷ ক্লাসেও এখন পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে৷ শুধু তা-ই নয়, গত এক দশকে বইয়ের ভারও বেড়েছে অনেক বেশি৷ তারপর যোগ হলো সৃজনশীল পরীক্ষার ব্যবস্থা৷ এতগুলো পরীক্ষা যোগ হলো, এত জ্ঞানের বিষয় যোগ হলো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হওয়ার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলো৷ সেই অনুযায়ী ক্লাসরুম, শিক্ষক, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ—এগুলোর কেমন উন্নতি হলো? সরকারি প্রাথমিক স্কুলে স্থানসংকুলান হয় না৷ শিক্ষকের অভাব৷ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা আরও কম৷ এই চাহিদা পূরণে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, মাদ্রাসা, ক্যাডেট মাদ্রাসা৷ শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের বই দেখি৷ একদিকে নতুন নতুন কঠিন বিষয়, অন্যদিকে ভুলে ভরা তথ্য, বাংলা-ইংরেজি৷ তাদের প্রতিদিনের রুটিন দেখলে ক্লান্ত লাগে, বিষণ্ন হই৷ ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুল, প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার৷ হৃদয়ে ধারণ করার উপায় নেই৷ মুখস্থ এবং নির্মম প্রতিযোগিতার শিকার তারা৷ স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কত বেড়েছে? ১৯৭২ সালে সরকারি ও বেসরকারি মিলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৫৪৭৷ ১৯৯০ সাল নাগাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার৷ সে সময় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল নয় হাজার৷ এর পর থেকে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ল উল্লেখযোগ্য মাত্রায়৷
১৯৯৫ সালের হিসাবে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা একই আছে, কিন্তু বেসরকারি সংখ্যা নয় হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার৷ ব্যানবেইসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২০১২) সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা এখন ৩৭ হাজার ৬৭২৷ তার মানে ১৯৯০ সালের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা কমেছে৷ আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার, যার বেশির ভাগই বাণিজ্যিক৷ সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রাথমিক স্কুলের দুর্গতির খবর পাওয়া যায়৷ বেঞ্চ নেই, স্থানসংকুলান হয় না, শিক্ষক নেই! যে কজন শিক্ষক আছেন, তাঁদের আবার অনেককে সরকারি নানা দায়িত্বে এদিক-সেদিক যেতে হয়৷ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও চাহিদা অনুযায়ী বাড়েনি৷ সরকারি প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত সব জায়গাতেই শিক্ষক পদ অনেক খালি৷ ল্যাবরেটরি নেই শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ স্কুলে, লাইব্রেরি নেই, বিজ্ঞান ও অঙ্ক শিক্ষক নেই৷ তবে ডিজিটাল কর্মসূচির অধীনে কম্পিউটার গেছে৷ শিক্ষকদের মধ্যে আনুমানিক শতকরা মাত্র ৪০ ভাগ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত৷ এক দশকের আগের হিসাব, প্রায় এক লাখ শিক্ষকের কোনো প্রশিক্ষণ নেই৷ একদিকে পরীক্ষা ও বইয়ের চাপ বৃদ্ধি, অন্যদিকে স্কুল, শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের সংকট৷ তাহলে এর মধ্যে থেকে শিক্ষার্থীরা কী করবে? এই ফাঁক থেকেই সম্প্রসারিত হয়েছে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং ও গাইড বইয়ের তৎপরতা৷ প্রশ্নপত্র ফাঁস—শিক্ষাকে নিয়ে এসব বাণিজ্যিক উন্মাদনারই ফলাফল৷ ‘সকল নাগরিকের জন্য অভিন্ন উন্নতমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব’—এই অবস্থান থেকে বাংলাদেশ সরে গেছে অনেক আগে৷ এর বদলে তার বর্তমান নীতি দাঁড়িয়েছে, ‘মেধা নয়, আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করো৷ টাকা থাকলে শিক্ষা কেনো, স্কুলে বা বাইরে’৷ শিক্ষা নয়, ডিগ্রি কেনাবেচার বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়৷ তার ফলে গত দুই দশকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিকাশ হয়েছে৷ বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতন পৃথিবীর মধ্যে নিম্নতম কয়েকটি দেশের সারিতে৷ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষকদের বেতনের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগ৷
একদিকে বেতন এত কম, অন্যদিকে অর্থ উপার্জনের নানা বাণিজ্যিক পথের সম্প্রসারণ সকল পর্যায়ে শিক্ষকদের বড় অংশকে অস্থির করে রেখেছে৷ পাবলিক বা সর্বজনের প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঘটেছে একধরনের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিকীকরণ আর অন্যদিকে নিজের পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে নানা বাণিজ্যিক তৎপরতায় যুক্ত হওয়া৷ এর বিপরীতে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত একটি দৃশ্যপট চিন্তা করি: প্রতিটি গ্রাম, পাড়া ও মহল্লায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে৷ সেখানে আছেন একদল শিক্ষক, যাঁরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত৷ শিক্ষক অনুপাতে শিক্ষার্থী ৩০ জনের বেশি হচ্ছে না৷ প্রতিটি স্কুলে যথেষ্টসংখ্যক ক্লাসরুম, বেঞ্চ, কম্পিউটর, মাল্টিমিডিয়া আছে৷ সারা দেশে যথেষ্টসংখ্যক উন্নত মানের মাধ্যমিক স্কুল আছে৷ সবগুলোয় ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি আছে৷ অঙ্ক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজসহ সব বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, যথেষ্ট সরঞ্জাম আছে৷ সকল পর্যায়ের স্কুলগুলোয় খেলার মাঠ আছে, গাছপালা আছে, যেখানে সম্ভব সেখানে পুকুর আছে, সাঁতার হয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতার সব ব্যবস্থা আছে৷ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল তৎপরতার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে৷ ক্লাস, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, মাঠ, গাছপালা, পুকুর সব জায়গাতেই শিক্ষা, সবখানেই আনন্দ৷ শিক্ষকেরা ভালো বেতন পাচ্ছেন, শিক্ষকতা তাঁদেরও আনন্দের কাজ, তাঁদের পুরো মনোযোগ প্রতিষ্ঠান ঘিরেই৷ স্কুলেই সব পড়াশোনা হচ্ছে বলে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশনি, গাইড বই—সব উঠে গেছে৷ এসব কাজে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অনেকেই এখন শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন৷ শিক্ষকসংখ্যা অনেক বেড়েছে৷ শিক্ষকতা অনেক আগ্রহের পেশা৷
Qআর ছেলেমেয়েরা? তাদের ঘাড়ে-মাথায়-বুকে বই, টিচার আর মা-বাবার ভীিতকর চাপ নেই৷ মেধা আর সৃজনশীলতা নিয়ে তারা এখন জগতের কাছে উন্মুক্ত৷ বাংলাদেশে আমাদের সন্তানদের জন্য এ রকম শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা কি অসম্ভব? না, খুবই সম্ভব৷ এর জন্য অনেক টাকা দরকার? না, যে টাকা দরকার, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনায় কিছুই না৷ সরকার এই প্রসঙ্গে সব সময়ই বলে এসেছে, এখনো বলবে, আমাদের অর্থ কোথায়? দেশের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে দাবি তুললেই সরকারের এই যুক্তি শোনা যায়৷ জাতীয় আয়ে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ন্যূনতম অনুপাত আছে, এটা হলো শতকরা ৬ ভাগ৷ পৃথিবীতে বহু দেশ এর দ্বিগুণের বেশি ব্যয় করে৷ বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের অংশীদার হলেও তার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনো জাতীয় আয়ের শতকরা ২ ভাগ৷ অর্থাৎ, শিক্ষা বাজেট ন্যূনতম বাজেট তিন গুণ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ৷ কিন্তু এ বছরও শিক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় আরও কমছে বলে শোনা যাচ্ছে৷ এই খাতে আগের বছরে স্কুলঘর নির্মাণ ও মেরামতে যতটা বরাদ্দ ছিল, সেটাও উদ্যোগের অভাবে খরচ হতে পারেনি৷ শতকরা ৬ ভাগ ম ানে তো অনুপাত, যত জাতীয় আয় তার শতকরা ৬ ভাগ৷ অন্য বহু দেশ এর থেকে বেশি ব্যয় করতে পারলে আমাদের অসুবিধা কী? অসুবিধা শিক্ষাকে বাণিজ্য বানানোর নীতি ও দুর্নীতিতে৷ সরকার চাইলে আমরা টাকার উৎস হাতে-কলমে দেখিয়ে দিতে পারি৷ কিন্তু এটাও জানি, কিছু লোকের বাদশাহি শানশওকত আর সর্বজনের সম্পদ চুরি-ডাকাতির নীতি অব্যাহত থাকলে কোটি কোটি মানুষের সর্বজনের শিক্ষার জন্য টাকার অভাব কখনোই মিটবে না৷
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মিয়ানমার সীমান্তে গুলিবিনিময়

মাস দুই ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পক্ষ থেকে এর কারণ জানতে চাওয়া হলে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) গুলিবর্ষণের ঘটনা অস্বীকার করে। কিন্তু সর্বশেষ গত বুধবার তাদের গুলিতে বিজিবির এক সদস্য আহত হওয়ার পর তাঁকে বিজিপির সদস্যরা মিয়ানমারে নিয়ে গেছেন—এ খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ওই অংশে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এর জের ধরে শুক্রবারও দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে গুলিবিনিময় ঘটেছে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে এ রকম ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি মিয়ানমারের প্রতি বিজিবির ওই সদস্যকে িফরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে, যিনি ইতিমধ্যে মারা গেছেন৷ অনেক টালবাহানার পর তারা লাশ ফেরত দিয়েছে, কিন্তু এই মৃত্যুর ব্যাখ্যা কী? তাদের গুলিবর্ষণের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারেও তাদের অঙ্গীকার দাবি করা উচিত৷ আর নাইক্ষ্যংছড়ির ওপাশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় ভীতসন্ত্রস্ত কিছু মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে৷ তারাসহ ব্যবসার কাজে যাদের মিয়ানমার যাতায়াত আছে, তাদের অনেকের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার তাদের সীমান্তের ওই অংশে সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু আইনত দেশটি তা করতে পারে না। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বাংলাদেশের উচিত সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো।
আমরা সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী৷ মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে, রাখাইন রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে ওই অঞ্চলে গিয়ে মাঝেমধ্যেই সহিংসতা চালায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এভাবে সমস্যাটির সমাধান হবে না; আমাদের দিক থেকে সীমান্তে প্রহরা আরও কঠোর করা উচিত, যাতে করে অবৈধ পারাপারের সুযোগ না থাকে৷ আর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া উচিত, রাখাইন রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, সেটার সমাধান তাদেরই করতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ কোনো ধরনের ক্ষতির শিকার হতে রাজি নয়। মানবিক কারণে আমরা ইতিমধ্যেই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছি৷ মিয়ানমারের শাসকেরা যদি ভেবে থাকেন যে তাঁদের রাখাইন রাজ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁরা আরও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য করবেন, আর বাংলাদেশ তা মেনে নেবে, তবে তাঁদের সেই ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়া উচিত৷ তবে সীমান্তে চোরাচালানসহ যেসব অপরাধবৃত্তির খবর পাওয়া যায়, সেগুলো বন্ধ করতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যকার সব সমস্যার সামগ্রিক সমাধানের ব্যাপারে উভয় পক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে।