Showing posts with label নেপাল. Show all posts
Showing posts with label নেপাল. Show all posts

Monday, March 9, 2026

নেপালের নির্বাচনে বিশাল জয়ের পথে বালেন্দ্র শাহর দল

নেপালের সাধারণ নির্বাচনে বিশাল জয়ের পথে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি সভায় দলটি দুই-তৃতীয়াংশ আসন অর্জনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। নেপালের নির্বাচন কমিশনের আজ রোববার দেওয়া সর্বশেষ তথ্যে এই চিত্র দেখা গেছে।

দেশটির ১৬৫টি একক নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ১৬৪টির ফলাফল ও এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের নাম জানা গেছে। এর মধ্যে আরএসপি সরাসরি ১১২টি আসনে জয় পেয়েছে এবং আরও ১৩টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। সমানুপাতিক পদ্ধতির আসনগুলো যুক্ত হলে সংসদের নিম্নকক্ষে আরএসপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সমানুপাতিক পদ্ধতির ভোট গণনায়ও আরএসপি বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছে। দেশজুড়ে গণনা করা মোট ৩৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৭১টি ভোটের মধ্যে আরএসপি পেয়েছে ১৭ লাখ ৬৩ হাজার ৬টি ভোট। এটি এখন পর্যন্ত গণনা করা ভোটের প্রায় অর্ধেক এবং অন্য সব দলের পাওয়া সম্মিলিত ভোটের চেয়েও বেশি।

এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা নেপালি কংগ্রেস পেয়েছে ৬ লাখ ৩৯৯ ভোট। এ ছাড়া সিপিএন-ইউএমএল ৫ লাখ ২ হাজার ৫৫২ ভোট, নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি ২ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৮ ভোট, রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৪৪ ভোট এবং শ্রম সংস্কৃতি পার্টি ৭৪ হাজার ১১৫ ভোট পেয়েছে।

সরাসরি ভোটের লড়াইয়ে নেপালি কংগ্রেস ১৬টি আসনে জয় পেয়েছে এবং ১টিতে এগিয়ে আছে। সিপিএন-ইউএমএল ৭টিতে জয়ী হয়েছে ও ৩টিতে এগিয়ে আছে। নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি ৫টি আসনে জয় পেয়েছে ও ২টিতে এগিয়ে আছে। এ ছাড়া শ্রম সংস্কৃতি পার্টি ২টিতে জয়ী ও ১টিতে এগিয়ে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ১টি করে আসনে জয় পেয়েছেন। একটি নির্বাচনী এলাকার তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

নেপালের ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি সভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১৮৪টি আসন প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের গণনা পদ্ধতি অনুযায়ী, সমানুপাতিক আসনগুলো বণ্টনের পর আরএসপি এই ‘ম্যাজিক ফিগার’ পার করবে অথবা এর খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। এমনটি হলে অন্য কোনো দলের সমর্থন ছাড়াই এককভাবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা পাবে দলটি। তবে ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরই সমানুপাতিক আসনের পূর্ণাঙ্গ বণ্টন চূড়ান্ত হবে।

র‍্যাপার থেকে রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়া বালেন্দ্র শাহর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নির্বাচনের ফলাফলে এগিয়ে আছে
র‍্যাপার থেকে রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়া বালেন্দ্র শাহর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নির্বাচনের ফলাফলে এগিয়ে আছে। ছবি: রয়টার্স

Wednesday, January 14, 2026

নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না: সুশীলা কারকি

নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি। দেশটির অন্তর্বর্তী প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে কাঠমান্ডুতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

কারকি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ও জেন-জি প্রজন্মের একাংশ প্রতিনিয়ত সরকারকে লক্ষ্য করে সমালোচনা ও কটূক্তি করছে এবং প্রায় প্রতিদিনই সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, নানা মহল থেকে আসা মৌখিক আক্রমণ সত্ত্বেও তার নেতৃত্বাধীন সরকার ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।

তিনি বলেন, মনে হচ্ছে আমরা যেন এক হঠাৎ ঝড়ের মতো পরিস্থিতিতে আছি। রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের তীব্র সমালোচনা করছে, কেউ কেউ প্রতিদিন সরকার ছাড়ার হুমকিও দিচ্ছে। জেন-জি তরুণরাও বলছে- আজ ছাড়ো, কাল ছাড়ো, পরশু ছাড়ো। কিন্তু ‘ছাড়া’ বলতে তারা কী বোঝে? আমরা যদি ছেড়েও দিই, পরদিনই আবার আমাদের গালমন্দ করা হয়। তারা বলে, তোমরা সুযোগ পেয়েছিলে, এখন পালিয়ে যাচ্ছ। আমরা যেন দোলকের মতো অবস্থায় আছি। কঠোর পরিশ্রম করছি, সব কষ্ট ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করছি।

তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশার কথাও তুলে ধরেন কারকি। তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে- নির্বাচনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা বাইরে কোথাও গেলেও আনন্দ খুঁজে পাই না। আমাদের কথাও লিখুন। এখানে ২৫ থেকে ৩০ জন জেন-জি তরুণ রয়েছে, প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছে।

সুশীলা কারকি জোর দিয়ে বলেন, আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না। আমরা বাংলাদেশ চাই না। বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় তারা এমন এক অবস্থার মধ্যে রয়েছেন, যেখানে কোথাও গেলেই স্বস্তি বা আনন্দ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

mzamin

Wednesday, December 31, 2025

বিশ্বজুড়ে জেন-জি আবার রাজনীতিতে আশার আলো জ্বালাচ্ছে by নাইরি উডস

২০২৫ সালের শেষ মাসটি ছিল বেশ হতাশাজনক। নির্বিচার গুলি, নানা সংকট আর তীব্র মেরুকরণের খবরের শিরোনামে সংবাদমাধ্যম ভরা ছিল। তবু এ অন্ধকার সময়ের মধ্যেও একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ভবিষ্যতের জন্য আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের নানা দেশে তরুণ প্রজন্ম এখন জোরালোভাবে চাকরি, সাশ্রয়ী খাদ্য ও জ্বালানি, অর্থনৈতিক সুযোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি তুলছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে পরিষ্কার একটি বার্তা দিচ্ছে, ‘শুনুন ও ব্যবস্থা নিন, নইলে সরে দাঁড়ান।’

নেপাল এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির সরকার ২৬টি বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে। এসব প্ল্যাটফর্মে রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে তথ্য প্রকাশ পাচ্ছিল। ফলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ৭৩ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পরিস্থিতি সামলানোর বদলে রাস্তায় নামা হাজারো কিশোর-তরুণকে নিয়ে বিদ্রূপ করেন। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১৯ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হলে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনে আগুন দেন এবং ওলির ব্যক্তিগত বাসভবনে হামলা চালান। পরদিনই তিনি পদত্যাগ করেন।

অনেকে মনে করেন, এ আন্দোলনের ঢেউ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায়। সে সময় দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে তরুণদের নেতৃত্বে বড় আন্দোলন গড়ে ওঠে। তাঁরা তৎকালীন ৭২ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের কার্যালয়ের সামনে ক্যাম্প স্থাপন করেন। অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা তাঁর পরিবার দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে জড়িত। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের বাসভবনে ঢুকে পড়লে গোতাবায়াকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়।

এর দুই বছর পর বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। সরকার তখন টেলিযোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং কঠোর পুলিশি দমন চালায়। এতে শত শত সাধারণ মানুষ নিহত হন। কিন্তু এ সহিংসতা আন্দোলন দমন করতে পারেনি; বরং আরও হাজার হাজার মানুষ এতে যুক্ত হন। ঢাকায় বিক্ষোভকারীরা দ্রুত তৎকালীন ৭৬ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় ও বাসভবনের দিকে মিছিল বের করেন। এর পরপরই তিনি ভারতে পালিয়ে যান।

প্রায় একই সময়ে কেনিয়ায় প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে জেন–জির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন, শতাধিক আহত হন এবং অনেককে বিনা কারণে আটক করা হয়। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনে ঢুকে আগুন দিলে রুটো কর বৃদ্ধি প্রত্যাহার করেন এবং তাঁর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যকে বরখাস্ত করেন। চলতি বছরের জুনে আবারও বিক্ষোভ শুরু হয়, যা জনরোষের গভীরতা স্পষ্ট করে।

এদিকে পেরুতে পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে ওঠে। মানুষ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ঘুষ কেলেঙ্কারিতে তদন্তাধীন প্রেসিডেন্ট দিনা বলুয়ার্তেকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

দেশে দেশে দেখা গেছে, জেন–জির নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনগুলো খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য ছড়িয়েছেন, সংগঠন গড়েছেন এবং নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। সরকার যখন এসব মাধ্যম বন্ধ করেছে, তখন তাঁরা এনক্রিপটেড সার্ভার, এমনকি অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মেও সংগঠিত হয়েছেন। আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মুখে তাঁরা পিছু হটেননি; বরং আন্দোলন আরও জোরালো করেছেন।

এ আন্দোলন শুধু একটি প্রজন্ম বা একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। ধনী ও দরিদ্র—সব দেশের শ্রমজীবী মানুষের অভিন্ন উদ্বেগই এতে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট, কোভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ ও ক্রমবর্ধমান অভিবাসন চাপ—এসব মিলিয়ে মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো ক্রমেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। তবে জেন–জি আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চান না। তাঁরা চান এমন সরকার, যারা চাকরি দেবে, দুর্নীতি দমন করবে এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিনিয়োগ করবে। এসব দাবি বাস্তবসম্মত এবং এগুলো পূরণের পথও আছে।

যুব বেকারত্ব তার একটি উদাহরণ। এক দশক আগে পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, গ্রিস ও স্পেন—এই ‘পিআইআইজিএস’ দেশগুলো তীব্র ঋণসংকটে ভুগছিল। এখন তাদের চারটি দেশ যুব বেকারত্ব নাটকীয়ভাবে কমিয়েছে। পর্তুগালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্ব ২০১৪ সালের ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে নেমে এসেছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশে। আয়ারল্যান্ডে তা ২৪ দশমিক ২ থেকে কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রিসে ৫২ দশমিক ৮ থেকে ২০২৪ সালে নেমেছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে। স্পেনে একই সময়ে হার কমেছে ৫৩ দশমিক ২ থেকে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশে।

এ অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইয়ুথ গ্যারান্টি’ কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় সরকারগুলো প্রতিশ্রুতি দেয়—স্কুল শেষ করার বা বেকার হওয়ার চার মাসের মধ্যে তরুণদের চাকরি, প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ সুযোগ বা পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হবে। সব সমস্যা মেটেনি, কিন্তু এটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কী করা সম্ভব। দুর্নীতি দমন অবশ্য আরও কঠিন। আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, মলদোভা ও ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা তা প্রমাণ করে। তবু অগ্রগতি সম্ভব। এ জন্য দরকার দক্ষ ও ভালো বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী, শক্তিশালী নজরদারি ও অডিট ব্যবস্থা এবং প্রকৃত রাজনৈতিক জবাবদিহি। ই-গভর্ন্যান্সও সহায়ক হতে পারে। রুয়ান্ডার ডিজিটাল সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা দুর্নীতির সুযোগ কমিয়েছে। জর্জিয়ায় পুরোপুরি ইলেকট্রনিক টেন্ডার ব্যবস্থা চালুর ফলে প্রথম দিকে পরিমাপযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে।

স্বচ্ছতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি যখন সহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তা ছড়িয়ে পড়ে। আর যখন তা প্রকাশ পায়, তখন সামাজিক চাপ ও সুনামের ঝুঁকি দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করে। তাই হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, সহজলভ্য দুর্নীতিবিরোধী তথ্যভান্ডার ও ব্যবসায়িক খাতের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।

* নাইরি উডস, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের ডিন
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়
নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ছবি: এএফপি

Friday, December 5, 2025

দিল্লির চোখে নেপালের ছাত্ররা ভালো কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্ররা ভয়ঙ্কর কেনো?

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের পরই যেন যুদ্ধ আর সার্কাসের মঞ্চে পরিণত হয় ভারতীয় মিডিয়ার নিউজরুম আর স্টুডিওগুলো। ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা শুরু হয় বাংলাদেশের আন্দোলন মূলত কট্টরপন্থী। সেই সাথে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ছড়ানো শুরু হয় একের পর এক প্রোপাগাণ্ডা। দেশটির প্রায় সকল মিডিয়াই নগ্নভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো শুরু করে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের প্রথম শ্রেনীর নেতা ও সরকার নিয়ে। এদিকে সহিংস গণ অভ্যুত্থানের পর গত ৯ সেপ্টেম্বর পতন হয় নেপালের সরকারের। গণঅভ্যুত্থানের ফলে গঠিত নতুন অন্তবর্তী সরকার ও নেপালের ছাত্র জনতাকে সরাসরি শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

প্রশ্ন হচ্ছে, দিল্লির চোখে নেপালের ছাত্ররা ভালো কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্ররা ভয়ঙ্কর কেনো?

Friday, October 24, 2025

নেপালের গণ–অভ্যুত্থান ভারতের মাথাব্যথা বাড়াল by আনবারাসান এথিরাজন

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের ঝড় উঠেছে। এবার ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু নেপাল। সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়। এটি দ্রুতই ভয়াবহ রূপ নেয়। অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনে হামলা চালান এবং একাধিক রাজনীতিবিদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে।

অনেকের কাছে কাঠমান্ডুর এই দৃশ্য ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা কিংবা ২০২৪ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের পুনরাবৃত্তিকে মনে করিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশেই গণবিক্ষোভ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পতন এবং রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থার এক ধরনের মিল পাওয়া যায়।

ভারতের বিশেষ দুশ্চিন্তা

নেপালের সংকট ভারতের জন্য শুধু প্রতিবেশীর অস্থিরতা নয়, বরং কৌশলগত দুশ্চিন্তার কারণ। নেপাল ভারতের একেবারে ঘনিষ্ঠ দেশ। ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনে দুই দেশ নিবিড়ভাবে যুক্ত।

নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত ১,৭৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই সীমান্ত পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। এসব সীমান্ত পুরোপুরি উন্মুক্ত। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভিসা বা পাসপোর্ট ছাড়াই এপার-ওপার যাতায়াত করেন। দুই দেশের মানুষ পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত। এমনকি গ্রামীণ স্তরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনও তাঁদের মধ্যে গভীর।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের ঘটনাবলি নিয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ লিখেছেন, ‘নেপালের সহিংসতা হৃদয়বিদারক। বহু তরুণ প্রাণ হারিয়েছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। নেপালের স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ একই সঙ্গে তিনি নেপালের জনগণকে শান্তিপূর্ণ পথে এগোনোর আহ্বান জানান। পরে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের নিয়ে তিনি জরুরি নিরাপত্তা বৈঠকও করেন।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেমন শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থানে দিল্লি অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছিল, নেপালের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল। বিশেষত, প্রধানমন্ত্রী পিকে শর্মা ওলির শিগগিরই দিল্লি সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন সব ভেস্তে গেল।

কৌশলগত হিসাব

ভারতের জন্য নেপালের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর দিকে চীনের ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড নেপালের সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি। দক্ষিণে নেপালের ভৌগোলিক পথ দিয়েই সরাসরি ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রবেশ সম্ভব। তাই নেপাল শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাবের কেন্দ্রবিন্দু।

তা ছাড়া ভারতের ভেতরে বিপুলসংখ্যক নেপালি প্রবাসী রয়েছেন। সরকারি হিসেবে এই সংখ্যা ৩৫ লাখ। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাঁরা শ্রমবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষ চুক্তির আওতায় নেপালের প্রায় ৩২ হাজার গোর্খা সেনা বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করছেন।

নেপাল হিন্দু তীর্থস্থান হিসেবেও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিনাথ মন্দিরসহ বহু পবিত্র স্থানে প্রতিবছর হাজার হাজার ভারতীয় তীর্থযাত্রী ভ্রমণ করেন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও নেপাল ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের সঙ্গে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বেশির ভাগই নেপালের আমদানি—বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি।

কূটনৈতিক জটিলতা

যদিও কাঠমান্ডুতে বুধবার থেকে কিছুটা শান্তি ফিরেছে, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে রয়েছে জনগণের গভীর ক্ষোভ। নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল—ওলির নেতৃত্বাধীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল), শের বাহাদুর দেউবার নেপালি কংগ্রেস, এবং পুষ্প কমল দাহালের (প্রচণ্ড) নেতৃত্বাধীন মাওবাদী কেন্দ্র—সব কটির প্রতিই জনগণের আস্থা কমে গেছে। অথচ ভারতের সঙ্গে এই তিন দলেরই দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিক্ষোভকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন নেতৃত্ব কে হবেন? যতক্ষণ না তা পরিষ্কার হচ্ছে, ততক্ষণ দিল্লি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঙ্গীতা থাপলিয়াল বলেছেন, ‘ভারত চাইবে না নেপালে বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হোক। তাই তারা সংযত ও সতর্ক পদক্ষেপ নেবে।’

এখানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও উঠে আসে। দিল্লির সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। কিন্তু হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটা শীতল। কারণ দিল্লি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে।

ভারত-নেপালের সম্পর্কেও আগের টানাপোড়েন এখনো মীমাংসিত হয়নি। ২০১৯ সালে ভারত যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছিল, সেখানে নেপালের দাবি করা কিছু ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নেপাল পাল্টা নিজস্ব মানচিত্র প্রকাশ করে। সম্প্রতি ভারত ও চীন নেপালের দাবি করা লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহার করে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়। ওলি গত মাসে চীন সফরে গিয়ে এই বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।

ভারতের করণীয়

এমন জটিল প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য করণীয় হলো একদিকে নেপালের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করা, অন্যদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করা। কারণ বিক্ষোভের মূল চালিকা শক্তি হলো তরুণেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত নেপালি শিক্ষার্থীদের জন্য ফেলোশিপ বাড়াতে পারে, কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারে, যাতে তরুণ প্রজন্ম ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক অনুভব করে।

কিন্তু ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) কার্যত অচল হয়ে আছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। বাংলাদেশে নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের। মিয়ানমার ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে আছে। আর এখন নেপালের অস্থিরতা দিল্লির কূটনৈতিক বোঝা আরও বাড়াল।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অশোক মেহতা এই প্রেক্ষাপটে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভারত তার মহাশক্তি হওয়ার স্বপ্নে এতটাই মগ্ন যে কাছের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে নজর দিতে ভুলে গেছে। অথচ মহাশক্তি হওয়ার প্রথম শর্ত হলো একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল প্রতিবেশ।’

নেপালের সাম্প্রতিক অস্থিরতা তাই শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি, আর ভারতের জন্য বিশেষ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। দিল্লিকে এখন একদিকে প্রতিবেশী নেপালের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ প্রশমিত করতে হবে। নইলে নেপালের মতো ছোট দেশেও ভারতের প্রভাব ক্ষয়ে যেতে পারে। আর সেটি হলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে চীনকে এগিয়ে দেবে।

* আনবারাসান এথিরাজন, বিবিসির সাউথ এশিয়া রিজিওনাল এডিটর
- বিবিসি নিউজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নেপাল সরকারের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা
নেপাল সরকারের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এএফপি

Friday, October 3, 2025

জেন-জি বিদ্রোহ: এশিয়ায় ফিরছে আরব বসন্ত? by মীনা কান্ডাসামি

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত ভূখণ্ডে এক নতুন ‘ভিজ্যুয়াল ব্যাকরণে’ প্রতিরোধ রচিত হচ্ছে। এটি এখন আর কোনো লুকোনো বা আড়ালে চলা সংগ্রাম নয়; বরং একেবারে লাইভস্ট্রিম হয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

এখানে বিপ্লবের চিত্রনাট্য যাঁরা লিখছেন, তাঁরা কোনো পেশাদার বিপ্লবী নন। তাঁরা সেই সব সাধারণ তরুণ-তরুণী, যাঁদের আর হারানোর কিছু নেই। তাঁদের আন্দোলনের ছবি আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। আমরা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে শয়নকক্ষের খাটে শুয়ে থাকা প্রতিবাদকারীদের সেলফি তুলতে দেখেছি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে ঢুকে পড়া উল্লসিত জনতার একই ছবি দেখেছি। আমরা নেপালের পার্লামেন্ট ভবন জ্বলতে থাকা আগুন দেখেছি।

এ সবই জেনারেশন জেড বা জেন-জির হতাশা, বঞ্চনা ও ক্ষোভের ভাষা। এখানে বিদ্রোহ এক প্রবল বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।

গত বছর বাংলাদেশে, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় আর অতিসম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া ও নেপালে তরুণেরা ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। কোথাও তাঁরা শাসকদের উৎখাত করেছেন, কোথাও–বা গদি নড়িয়ে দিয়েছেন। এতগুলো দেশে একসঙ্গে এমন দৃশ্য কি নিছক কাকতালীয়? মোটেও না। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় বৈশ্বিক প্রবণতা—সংগঠিত বামপন্থী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পতন। যে আন্দোলনগুলো একসময় দুর্নীতি, বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে তরুণদের পাশে দাঁড়াত, আজ তারা ছিন্নভিন্ন, দুর্বল কিংবা অস্তিত্ব হারানোর পথে।

এশিয়ার একেক দেশে সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়েছে নানা কারণে। এর পেছনে কোথাও ভয়াবহ বেকারত্ব, কোথাও দুর্নীতিগ্রস্ত ও দমনমূলক অভিজাত শ্রেণি, কোথাও তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, আবার কোথাও ধনী-গরিবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য কাজ করেছে। অথচ এসবের বিরুদ্ধে যে প্রগতিশীল শক্তি একসময় সোচ্চার ছিল, তারা এখন এতটাই অকার্যকর যে তরুণদের কাছে তারা আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে রাগান্বিত তরুণদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে তাঁদের স্মার্টফোন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তাঁদের মিছিল ও আন্দোলনের সমন্বয়ের হাতিয়ার। তবে এর ভেতরে কোনো দৃঢ় নেতৃত্ব নেই, নেই কোনো সুসংহত মতাদর্শ, নেই কোনো স্পষ্ট বিপ্লব-পরবর্তী স্বপ্নের রূপরেখা। তবু এই শূন্যতার মধ্যেই গড়ে উঠছে এক নতুন বাস্তবতা। এটি যেন এশিয়ায় আরব বসন্তের পুনর্জন্ম।

শ্রীলঙ্কায় যখন লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের খেলাপি অবস্থায় লাখো মানুষ খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ কিনতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখনই আমরা রাজাপক্ষে পরিবারতন্ত্রের পতন ঘটতে দেখলাম। বাংলাদেশে যুব বেকারত্ব আর চাকরির কোটাব্যবস্থা (যা শাসক আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে বলে মনে করা হতো) সরকার পতনের মূল কারণ হয়ে ওঠে। ইন্দোনেশিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষাকে খর্ব করা আইন আগুনে ঘি ঢালে। তা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতায় বিস্ফোরিত হয়। নেপালেও একই ধরনের বিষাক্ত সমীকরণ তৈরি হয়। সেখানে পুলিশের গুলিতে প্রতিবাদকারীদের মৃত্যু দেশকে রাজনৈতিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয় এবং প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করে।

এই জনক্ষোভ যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন তা সরাসরি গিয়ে আঘাত করে পার্লামেন্ট ভবন, প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ কিংবা রাজনীতিবিদদের বাড়ির মতো ক্ষমতার প্রতীকগুলোর ওপর। ডিজিটাল সংহতির মাধ্যমেই এই আন্দোলনগুলো সংগঠিত হয়।

তরুণদের এই প্রতিবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এক নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল ডানপন্থী ইকো-চেম্বার ও বিভাজনের জায়গা। কিন্তু বাস্তবে এখানে জন্ম নিচ্ছে বিরোধী প্রতিষ্ঠান ও দুর্নীতিবিরোধী এক প্রবল তরঙ্গ। এটি জেন-জিকে একত্র করছে। তবে সমস্যাটা হলো এ অঞ্চলে উদারবাদী রাজনীতির ভয়াবহ ভগ্নদশার কারণে তরুণেরা কোনো ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব পাচ্ছেন না।

ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর শাসন (১৯৬৭-১৯৯৮) বামপন্থাকে নির্মূল করে দিয়েছিল। সেই ব্যবস্থা আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নেপালের সাবেক মাওবাদীরা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ করে ক্ষমতায় এসে জড়িয়ে পড়েছে সেই একই দুর্নীতিতে, যা কিনা তারা একসময় ধ্বংস করার শপথ নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কায় জাতিগত সংকীর্ণতা বামপন্থাকে গ্রাস করেছে। আর বাংলাদেশে বামপন্থা প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

এক দশকের বেশি আগে টুইটার ছিল আরব বসন্তের চালিকা শক্তি। আজকের এশিয়ায় সেই জায়গা নিয়েছে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক। প্রায়ই জেন-জিকে খাটো করে বলা হয়, তারা দুর্বল, ঝুঁকি নিতে ভয় পায় আর রিল-দুনিয়ার মধ্যে আটকে পড়েছে। অথচ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্রোহগুলো তার সম্পূর্ণ উল্টো প্রমাণ হাজির করছে। আদতে এই প্রজন্ম বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সোশ্যাল মিডিয়াকে তারা রূপান্তর করেছে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রথম থেকেই আন্দোলন সহিংস হয়নি। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নই আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বুঝতে শিখেছেন, শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি বা রাজনৈতিক সংস্কার নয়, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জবাবদিহিও তাঁদের দাবির অংশ হতে হবে।

নেপালে আন্দোলনের শুরুটা ছিল উৎসবমুখর ও নির্দোষ। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরা নিজেরাই ভেবেছিলেন, আন্দোলন শেষে তাঁরা জায়গাটা পরিষ্কার করে দেবেন। কিন্তু সেই পরিবেশ একমুহূর্তেই বদলে যায়, যখন পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকতে চাওয়া প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় সহিংসতাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ইন্দোনেশিয়ায় আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনই, যখন তরুণ ডেলিভারি কর্মী আফফান কুরনিয়াওয়ান পুলিশের দমন অভিযানে এক সাঁজোয়া গাড়ির চাপায় মারা যান। ইতিহাসে এর অনুরূপ উদাহরণ আছে। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ার তরুণ ফেরিওয়ালা মোহাম্মদ বুয়াজিজি তাঁর পণ্য পুলিশ কেড়ে নেওয়ায় আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। সেই আগুনই পুরো আরব বিশ্বকে গ্রাস করেছিল।

ইন্টারনেট সেন্সরশিপও পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। নেপালে যখন #নেপবেবি হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়ে অভিজাতদের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিকে প্রকাশ্যে আনল, তখন সরকার অনলাইন সমালোচনাকে প্রাণঘাতী হুমকি হিসেবে দেখল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে তারা ভেবেছিল তরুণদের রাগ দমন করবে। কিন্তু বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি বিদ্রোহী হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন।

তবে আরব বসন্তের শেষ পরিণতি এক সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো আশার জোয়ার থেকে ধ্বংসস্তূপে গড়িয়ে পড়া। আজকের এশিয়ার বিদ্রোহেরও একই পরিণতি ঘটতে পারে। কারণ, ক্ষোভ জিইয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি এখনো বিদ্যমান। যদি তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্য বামপন্থী বা প্রগতিশীল বিকল্প তৈরি না হয়, তাহলে সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা—ক্ষোভ, সামরিক অভ্যুত্থান, সাম্প্রদায়িক সংঘাত।

তবু এবার কিছু আলাদা। জেন-জি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে রাজনীতির পরিপূরক হিসেবে নয়, রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখছে। তারা বুঝে গেছে, পুরোনো আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা নতুন কিছু গড়ে তুলছে। তারা বিকেন্দ্রীভূত, কিন্তু ভয়ংকর কার্যকর। তারা নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছে। আর যারা ক্ষমতায় আছে, যদি এই কণ্ঠকে উপেক্ষা করে, তবে সেই উপেক্ষা তাদের জন্যই এক ভয়ানক বিপদ হয়ে উঠবে।

মীনা কান্ডাসামি, ভারতের চেন্নাইভিত্তিক লেখক
- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নেপালে বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন
নেপালে বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। ছবি: এএফপি

Tuesday, September 30, 2025

নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা: এরপর দক্ষিণ এশিয়ায় কোথায় আগুন জ্বলবে!

লোহার ফটকের কাঁপন যেন ঢাকের শব্দে রূপ নিল, জনতা এগিয়ে এলো ঢেউয়ের মতো। দেহের সমুদ্র ভেঙে ফেলল ব্যারিকেড- যা মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও ক্ষমতার প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেশের নেতার বাড়ির করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো কাদামাখা পায়ের গর্জন। কেউ ভাঙল জানালা ও শিল্পকর্ম, কেউ তুলে নিল বিলাসবহুল বিছানার চাদর কিংবা জুতো। যে অট্টালিকা এতদিন কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে ছিল, অস্পৃশ্য, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে- তা হঠাৎ করেই কয়েক ঘণ্টার জন্য জনগণের হাতে চলে এলো। এ দৃশ্য নেপালের, গত সপ্তাহের। তবে এটি একইসাথে শ্রীলঙ্কার (২০২২) এবং বাংলাদেশের (২০২৪) ছবিও। অনলাইন আল জাজিরায় প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত ৩ কোটি মানুষের দেশ নেপাল এখন এমন এক পথে হাঁটছে যা প্রচলিত নির্বাচনী গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। একের পর এক যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে দক্ষিণ এশিয়ায় সরকার পতন ঘটছে। তাই প্রশ্ন উঠছে- বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চল কি জেনারেশন জেড বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে?

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, এটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। এক ধরনের নতুন অস্থিরতার রাজনীতি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রায় ১০ হাজার নেপালি তরুণ- যাদের মধ্যে প্রবাসীরাও ছিলেন, তারা একজন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করল না শারীরিক ভোটে, না নির্বাচনী ব্যালটে, বরং গেমারদের প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তিন দিনের আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে, নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে ৭০ জনেরও বেশি নিহত হন। পরে নেপাল সরকার মার্চে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি যখন আন্দোলনকারীদের ‘জেন জেড উৎস’ নিয়ে ঠাট্টা করলেন, তার অল্প কিছুদিন পরেই তাকে পদত্যাগ করতে হলো। বার্তা স্পষ্ট- রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আস্থাহীন তরুণরা নিজেদের ক্ষমতাসীন ঘোষণা করছে যখন তারা প্রতারিত মনে করছে। স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রতিবাদের ইতিহাস আছে। কিন্তু শাসক পতনের ঘটনা বিরল। এটি সামরিক অভ্যুত্থান বা প্রচলিত রাজনৈতিক সংঘাতের ধারা নয়, বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রূপ।

তিন ভিন্ন প্রেক্ষাপট, এক অভিন্ন দৃশ্য

শ্রীলঙ্কা (২০২২): অর্থনৈতিক ধস, ঋণ খেলাপি, জ্বালানি ও খাদ্য ঘাটতি, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। জন্ম নিল ‘আরাগালায়া’ (সংগ্রাম) আন্দোলন। যুবকরা ‘গোটা গো ভিলেজ’ বানালো কলম্বো প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের সামনে। জুলাইতে প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ (২০২৪): বৈষম্যমূলক চাকরির কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পুলিশি দমনপীড়নে শত শত নিহত হন। পরে আন্দোলন রূপ নেয় শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান দাবিতে। আগস্টে হাসিনা পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে ভারতে পালান।
নেপাল (২০২৫): সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ, তীব্র বৈষম্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ৭০ জনের বেশি। পার্লামেন্ট ও মিডিয়া হাউসেও আগুন জ্বলে ওঠে। অবশেষে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী ওলি।

সাধারণ সূত্র: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে জেন জেড
মানবাধিকার সংস্থার মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, এই দেশগুলোতে যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মূল কারণ একই- অমীমাংসিত বৈষম্য, দুর্নীতি, প্রবীণ রাজনীতিকদের প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন শাসন। জেন জেড তাদের জীবনে দুটি বড় মন্দা দেখেছে- ২০০৮-০৯ সময়ে এবং কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধস। এ প্রজন্ম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের শাসন করেছেন দাদা-দাদীর বয়সী নেতারা।  তার মধ্যে নেপালে ওলি (৭৩), বাংলাদেশে হাসিনা (৭৬), শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে (৭৪)। তরুণদের নৈতিক ক্ষোভ প্রবল হয়েছে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্যমূলক বিলাসিতার প্রদর্শনী এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের জীবনযাত্রা দেখে।

ডিজিটাল প্রজন্মের শক্তি
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রুমেলা সেন বলেন, রাগান্বিত দৃশ্যের বাইরে দেখলে বোঝা যায়, এই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা হলো ‘গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’ ডিজিটাল দক্ষতার কারণে তারা অনায়াসে অনলাইনে সংগঠন, প্রচার ও প্রতিবাদের নতুন কৌশল তৈরি করছে। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করলে বা প্ল্যাটফর্ম ব্লক করলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। তিনি বলেন, এ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে যেতে দেখছে। তাদের ক্ষোভ একেবারেই সত্যিকারের।

একে অপরের কাছ থেকে শিক্ষা
রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী জীবন শর্মা বলেন, নেপালি তরুণরা শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের আন্দোলন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এসব বিদ্রোহ আলাদা নয়, বরং গভীর হতাশা থেকে জন্ম নেয়া। স্ট্যানিল্যান্ডও বলেন, এরা একে অপরকে দেখছে, শিখছে এবং অনুপ্রাণিত হচ্ছে।
অবশেষে প্রশ্ন রয়ে যায়-এরপর কোথায় আগুন জ্বলবে?
https://mzamin.com/uploads/news/main/180299_Untitled-10.webp

Monday, September 29, 2025

গণ–অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ–নেপালে যে ৫টি জায়গায় বিস্ময়কর মিল by সুশীম মুকুল

নেপালের সরকার পতনের সঙ্গে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের সরকার পতনের বিস্ময়কর মিল দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে যেমন ছোট্ট একটি ইস্যু থেকে তরুণদের আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু হয়েছিল এবং তার জের ধরে নির্বাচিত সরকারের পতন হয়েছিল; নেপালেও তা–ই ঘটল।

কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করার পর সেখানে সেনাপ্রধান কার্যত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। পুরো ঘটনাই যেন ঢাকার ঘটনা পুনরাবৃত্তি। বিশেষ করে পাঁচটি ক্ষেত্রে এই দুই দেশের ঘটনায় আশ্চর্য রকমের মিল পাওয়া যাচ্ছে।

১. তরুণদের নেতৃত্ব

বাংলাদেশের মতো নেপালেও আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি। কাঠমান্ডু থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এক দিনে ছড়িয়ে পড়ে পোখারা, বিরাটনগর, ভরতপুরসহ ৭৭ জেলার রাজধানীতে। নেপালের ৩ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ জেন–জি; আর ৯০ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। তাই আন্দোলন মুহূর্তেই ব্যাপক হয়ে ওঠে।

স্কুল-কলেজের পোশাক পরা হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছিল। ‘যুবসমাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে’ স্লোগান তুলেছিল, যেটি সংগঠিত করেছিল এনজিও ‘হামি নেপাল’। এর নেতৃত্বে ছিলেন ৩৬ বছর বয়সী কর্মী সুদান গুরুং।

এই তরুণেরা ‘নেপো বেবি’ আর ‘নেপো কিডস’-এর বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিজাত পরিবারের সন্তানদের চাকচিক্যময় জীবনযাত্রা নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কারণ, কোটা আওয়ামী লীগের অনুগতদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করছিল। এখানেও প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিলেও পরে আন্দোলনে মৌলবাদী গোষ্ঠী ঢুকে পড়ে।

দুই দেশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল তরুণদের মূল হাতিয়ার। বাংলাদেশে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ, আর নেপালে টিকটক (যেটি নিষিদ্ধ হয়নি) ও ভিপিএন আন্দোলন জমাতে ভূমিকা রেখেছিল।

২. ছোট্ট ট্রিগার থেকে বড় বিস্ফোরণ

বাংলাদেশে কোটা আন্দোলন আর নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ—দুটিই তুলনামূলক ছোট ইস্যু ছিল। কিন্তু এগুলো আড়ালে থাকা দুর্নীতি, বৈষম্য আর অকার্যকর শাসনের ওপর চাপা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে তোলে।

নেপালে ৪ সেপ্টেম্বর তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুং ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, স্থানীয়ভাবে নিবন্ধন না করা, ঘৃণা ছড়ানো ঠেকানো, প্রতারণা রোধ ইত্যাদি। কিন্তু জনগণের চোখে এটা ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের চেষ্টা।

টিকটক আগে থেকেই নিবন্ধন করায় নিষিদ্ধ হয়নি। আর সেটিই আন্দোলনকারীদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে যেমন কোটা নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়টা ছিল আসলে স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির প্রতীক, তেমনি নেপালে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করা ছিল তরুণদের কণ্ঠরোধের প্রতীক।

ফলাফল একই হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘ আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার পতন হযেছে। আর নেপালে মাত্র দুই দিনেই অলি সরকারের পতন হয়েছে।

৩. বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু

বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাজারো মানুষ মারা যায়। সরকারি হিসাবে ১ হাজার জন আর পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস জানান, প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন নিহত হয়েছিলেন।

নেপালে প্রথম দিনের সংঘর্ষেই ২০ জন নিহত হন। তাঁদের বেশির ভাগই তরুণ শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে যেমন বিক্ষোভকারীদের হত্যার পর আন্দোলন তীব্র হয়েছিল, নেপালেও প্রথম দিনের মৃত্যুগুলো দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

৪. মন্ত্রীদের বাড়ি ও সরকারি স্থাপনায় হামলা

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার গণভবন, সংসদ ভবন, মন্ত্রীদের বাড়ি, থানা—সব জায়গায় হামলা হয়েছিল।

নেপালেও একই দৃশ্য। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী অলির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। তাঁকে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক ও বিরোধী দলের নেতা পুষ্প কমল দহলের বাসায় হামলা হয়। অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাউডেলকে আন্দোলনকারীরা প্রকাশ্যে মারধর করেন।

দুই দেশেই মন্ত্রীর বাড়ি, সরকারি কার্যালয় ও সংসদে হামলা হয়েছিল। এই আক্রমণগুলো ছিল দুর্নীতি আর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ।

৫. প্রধানমন্ত্রীর পতন আর সেনাবাহিনীর ভূমিকা

বাংলাদেশে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে বলেন। সেনাবাহিনী জানায়, তারা জনগণের পাশে থাকবে, গুলি চালাবে না। ৫ আগস্ট হাসিনাকে হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়তে হয়।

নেপালেও একই ঘটনা। সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেল অলিকে বলেন, সেনাবাহিনী স্থিতিশীলতা আনতে পারবে, যদি তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে মঙ্গলবার অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আসরে বাংলাদেশের কোটাব্যবস্থা আর নেপালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ—দুটিই তরুণদের ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। দুই দেশেই আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা, পরে সাধারণ জনগণ তাতে যোগ দেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ দুটি দেশ ভারতের প্রতিবেশী ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই দুই সরকারের পতন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন নির্দেশ করছে।

* সুশীম মুকুল, ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক
- ইন্ডিয়া টুডে থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে নেওয়া

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2Fr9hnssbt%2Fsocial-media-ban.webp?rect=32%2C0%2C582%2C388&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভে উত্তাল রাজপথ। কাঠমান্ডু, নেপাল, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Sunday, September 21, 2025

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু: ভুটান কি যুব-ভূমিকম্প টের পাচ্ছে? by নামগে জাম

কুয়েন্সেলের নিবন্ধঃ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বিশাল মঞ্চে টেকটোনিক পরিবর্তন ঘটছে। ঢাকা শহরের বর্ষামাখা রাস্তাগুলো থেকে শুরু করে কাঠমান্ডুর উঁচু উপত্যকা পর্যন্ত এক প্রজন্ম-নির্ধারণ করে দেয়া কম্পন অনুভূত হচ্ছে। এটি এক ‘যুব-ভূমিকম্প’ (ইয়ুথ আর্থকোয়েক)। এটা যুব প্রজন্মের ডিজিটালপ্রজন্ম নাগরিকদের চালিত এক ভূমিকম্পের মতো ঢেউ। এই যুব সমাজ আর স্থিতাবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন নাটকীয় গণআন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে দেয়। নেপালে চলমান সংস্কার আন্দোলনও কোনো বিচ্ছিন্ন ঝড় নয়। বরং এগুলো গভীর আঞ্চলিক রূপান্তরের ইঙ্গিত, যা হিমালয়ের ওপার থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি দেশের জন্য শিক্ষার বার্তা নিয়ে, আমাদের স্নেহের ড্রাগন কিংডম ভুটানসহ।

ভুটানের জন্য, যা তার স্থিতিশীলতা ও অনন্য উন্নয়ন দর্শনের জন্য পরিচিত, এসব ঘটনা আতঙ্কের কারণ নয়। বরং এগুলো আমাদের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে যে নীতিগুলো মেনে এসেছে- আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব, তার শক্তিশালী স্বীকৃতি। মূল প্রশ্ন হলো, আমরা এসব অস্থিরতা থেকে মুক্ত কিনা তা নয়; বরং আমরা কি আমাদের প্রতিবেশী রাজধানীগুলোর রাস্তায় লেখা শিক্ষাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছি?

ঢাকার প্লাবন: ভেঙে যাওয়া আস্থার কেস স্টাডি
আঞ্চলিক পরিবর্তনের ব্যাপ্তি বুঝতে হলে প্রথমে তাকাতে হবে বাংলাদেশের দিকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো দশক ধরে অধ্যয়ন করা হবে। যা শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে ছাত্র প্রতিবাদ দিয়ে, তা অবিশ্বাস্য গতিতে রূপ নেয় দেশব্যাপী আন্দোলনে এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয় সরকারের পতনের আন্দোলনে। কোটার ইস্যু ছিল কেবল স্ফুলিঙ্গ; মূলত এটি ছিল এক প্রজন্মের ক্ষোভের বিস্ফোরণ- একটি ব্যবস্থা, যা তাদের কাছে অস্বচ্ছ, জবাবদিহিতাহীন ও অন্যায্য মনে হয়েছিল।

বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দায়মুক্তি এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তরুণদের আকাঙ্ক্ষার ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ জমে উঠছিল। ছাত্ররা কেবল চাকরি চাইছিল না; তারা চাইছিল সমান সুযোগ, যেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আন্দোলনের দ্রুত বিস্তার সম্ভব হয়েছিল ডিজিটাল টুলসের কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের স্নায়ুতন্ত্র, যা বাস্তব সময়ে সংগঠন ও গতিশীলতা তৈরি করেছিল। এ ঘটনা নতুন বাস্তবতা তুলে ধরল: আজকের দিনে সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো- ডিজিটালি সংযুক্ত তরুণদের আস্থা হারিয়ে ফেলা। ঢাকার শিক্ষা স্পষ্ট: সুশাসনের ভিত্তি যখন ভেঙে পড়ার মতো মনে হয়, তখন রাজনৈতিক ভূমিকম্প দ্রুত ও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

কাঠমান্ডুর ঐকমত্য: স্থায়ী সংস্কারের আহ্বান
বাংলাদেশের ঘটনাগুলো ছিল আকস্মিক প্লাবন; আর কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি হলো পরিবর্তনের দীর্ঘস্থায়ী স্রোত। ‘জেনারেশন জেড আন্দোলন’ কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি হলো এক বিপ্লবী আহ্বান। দশকের পর দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ তরুণ নেপালিরা এবার রাস্তায় নেমেছে স্পষ্ট বার্তা নিয়ে: তারা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তির মৌলিক পুনর্গঠন চায়।
তাদের ক্ষোভ কোনো একক নেতার বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। তারা দায়মুক্তির অবসান, স্বজনপ্রীতির বদলে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতাপূর্ণ সরকার দাবি করছে। এই আন্দোলন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- গণতন্ত্র কেবল ভোট দেয়া নয়; বরং এটি প্রতিদিনের সুশাসনের চর্চা। তরুণরা গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করছে না; তারা চাইছে এর একটি উন্নত সংস্করণ- যেখানে জনসেবা দায়িত্ব, ব্যক্তিগত স্বার্থলাভের সুযোগ নয়।

ভুটানের আয়না: আতঙ্ক নয়, আত্মপ্রত্যয়
ভুটানের জন্য সবচেয়ে সহজ, কিন্তু মারাত্মক ভ্রান্তি হবে আঞ্চলিক ঘটনাগুলোকে দূর থেকে উদাসীনভাবে দেখা। আমাদের রাজতন্ত্রের প্রজ্ঞায় পরিচালিত স্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলের ঈর্ষার বিষয়। আমাদের মোট জাতীয় সুখ দর্শন আমাদের জাতীয় সত্তায় সুশাসন, ন্যায় ও সাম্যের নীতিকে প্রোথিত করেছে।
তাই ঢাকার প্রতিধ্বনি ও কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি আমাদের কাছে ধ্বংসের সতর্কবার্তা নয়; বরং এগুলো আমাদের বেছে নেওয়া পথের বহিঃস্বীকৃতি। এগুলো আয়নার মতো আমাদের অর্জনের মূল্য এবং এগুলো রক্ষা করার অপরিসীম গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অস্থিরতা বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে- যখন ভুটানের লালিত নীতিগুলো ক্ষয়ে যায়, তখন কী ঘটে।

আত্মতুষ্টি কোনো বিকল্প নয়
আমাদের প্রজ্ঞা স্বীকার করা কেবল প্রথম ধাপ। আঞ্চলিক যুব-ভূমিকম্প থেকে প্রকৃত শিক্ষা হলো- সুশাসন কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাই বর্তমান সরকারসহ ভবিষ্যতের প্রতিটি সরকারকে সক্রিয়ভাবে শুনতে হবে।
প্রথমত, আমাদের নিজেদের তরুণদের কথা শুনতে হবে। চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক একসময় বলেছিলেন: ‘দেশের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মের হাতে।’ এই কথাটি আজও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিশারী। ভুটানের তরুণরা আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, বৈশ্বিকভাবে সচেতন এবং ডিজিটালি সংযুক্ত। আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা-বিচার বিভাগ, সিভিল সার্ভিস, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া- ভুটানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সংলাপ হচ্ছে।

আমাদের প্রশ্ন করতে হবে:
সংলাপের চ্যানেলগুলো কি খোলা ও কার্যকর? তরুণরা কি মনে করে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে?
দ্বিতীয়ত, আমাদের মূল নীতিগুলো রক্ষা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংস্থার প্রতি অক্লান্ত সমর্থন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জবাবদিহিতা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি দৃশ্যমান হতে হবে। যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তখন এটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে আইনের শাসন পরম। যখন সরকারের সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ হয়, তখন এটি হতাশার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা তৈরি করে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল যুগে স্বচ্ছতা আর ঐচ্ছিক নয়। তথ্য অবাধে প্রবাহিত হয়, নাগরিকদের কাছে নেতাদের খতিয়ে দেখার আরও বেশি উপায় আছে। অস্বচ্ছভাবে কাজ করার যে কোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। সরকারকে অবশ্যই নতুন বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করতে হবে- নীতিমালা ব্যাখ্যা করে জানানো, সিদ্ধান্তের বিষয়ে খোলামেলা থাকা, চ্যালেঞ্জ স্বীকার করা। যে সরকার তার জনগণের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেয়, সেই সরকারই আস্থা অর্জন করে।

উপসংহার
ঢাকা থেকে প্রতিধ্বনি ও কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি হুমকি নয়, বরং এক গর্জন তোলা শিক্ষা। এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়- আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে জাতীয় স্থিতিশীলতার অপরিহার্য উপাদান। মনোযোগ দিয়ে শুনে, এই মূল্যবোধগুলোতে আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্নিশ্চিত করে এবং জনগণের- বিশেষ করে তরুণদের- আস্থা ক্রমাগত অর্জন করে ভুটান নিশ্চিত করতে পারে যে ‘যুব-ভূমিকম্প’ আমাদের কাছে গবেষণার বিষয় থাকবে, অভিজ্ঞতার নয়। আমাদের স্থায়ী শান্তি এর ওপরই নির্ভর করছে।

(লেখক: নামগে জাম (এলএলএম), ইউনেস্কো মাদঞ্জীত সিং সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজ (ইউএমএসএআইএলএস), এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ) 

mzamin

Thursday, September 18, 2025

নির্বাসিত তিব্বতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বললেন নেপালে চীনা দূতাবাসের হস্তক্ষেপ, ভারতের জন্য সতর্কবার্তা

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর স্থানীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা, বিশেষ করে নেপালে। এমন অভিযোগ তুলেছেন তিব্বতের  নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী লবসাং সাংয়ে। একইসঙ্গে তিনি ভারতকেও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের এক পডকাস্টে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে সাংয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন চীনের ‘বিস্তারবাদী’ নীতির বিষয়ে এবং ভারতের প্রভাব খর্ব করার উদ্দেশ্যে চীনের প্রচেষ্টার ব্যাপারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ভারতও কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের মতো বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে তিব্বত প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে কি না, তখন সাংয়ে বলেন- তিনি মনে করেন না ভারত সেই পথ অনুসরণ করছে।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চীন পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। যাতে ভারতের প্রভাবকে সীমিত করা যায়। সাংয়ে বলেন, ভারতের চীনের সঙ্গে বড় স্বার্থ জড়িত। শুধু তিব্বত নয়, শুধু সীমান্ত এলাকা নয়। সব প্রতিবেশী দেশেই তাকান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হোক বা মধ্য এশিয়া- যেখানেই ভারত প্রভাব বিস্তার করতে চায় বা সম্পর্ক গড়তে চায়, চীন সবসময় সেখানে উপস্থিত থেকে ‘চেকমেট’ করার চেষ্টা করছে।

নেপালের উদাহরণ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, চীনা কর্মকর্তারা কাঠমান্ডুতে ‘সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি’ হয়ে উঠেছেন, ‘সম্ভবত ভারতীয় বা মার্কিন দূতাবাসের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী।’ তিনি বলেন, একই ধরনের হস্তক্ষেপ ভুটান, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাতেও দৃশ্যমান। সাংয়ের ভাষায়, তারা এসে হস্তক্ষেপ করে, প্রভাব খাটায়। আমি বলছি না তারা আপনাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু তারা আপনার ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, আপনি যে বড় প্রশ্ন তুললেন- এশিয়ায় কত দেশ তিব্বতের বিষয়ে কথা বলবে, কারণ তারা চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চায় না- এটা একদিকে সত্যি। কিন্তু অন্যদিকে আমরা বলি, তিব্বতে যা ঘটেছে, তা একদিন আপনাদের সঙ্গেও ঘটবে। যদি আপনি তিব্বতের ইতিহাস বুঝতে ও অধ্যয়ন করতে না চান, তাহলে একই ঘটনা আপনার দেশেও ঘটবে।

নেপালের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ধরা যাক নেপাল- তারা আগে বিশ্বাস করত না, তাই না? এখন হ্যাঁ, চীনা দূতাবাস ও কর্মকর্তারা স্থানীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। কাঠমান্ডুতে চীনা দূতাবাস সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী- ভারতীয় বা আমেরিকান দূতাবাসের চেয়েও বেশি, অনেকে এমনটাই বলে। সাংয়ে জানান, চীন যেভাবে পুরোপুরি তিব্বতের ওপর ভৌত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, সেটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। কিন্তু অন্যান্য দেশে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং দূতাবাসের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ এখন সুস্পষ্ট বাস্তবতা। তিনি আরও বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের তিব্বত সফরগুলো আসলে ভারতের জন্য কৌশলগত বার্তা। সীমান্ত ভাগাভাগি ও অঞ্চলে চীনের ব্যাপক সেনা মোতায়েনের দিকটি উল্লেখ করে সাংয়ে বলেন, শি-এর সর্বশেষ সেনাদের উদ্দেশে দেয়া বক্তৃতার প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়নি- যেটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বেইজিং সফরের সঙ্গে মিলে যায়। তবে সাংয়ে দাবি করেন, তিনি ‘নিশ্চিত’ যে এতে ভারতবিরোধী যুদ্ধ বা অনুপ্রবেশের প্রস্তুতির বার্তাই দেয়া হয়েছে।

নিজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে সাংয়ে বলেন, তিব্বতি জনগণ দেশ ছাড়ার পর অস্থায়ী আশ্রয় পেয়েছিল ভারতে। ‘একজন বৌদ্ধ হিসেবে আমরা অস্থায়িত্বে বিশ্বাস করি। একবার দেশ হারালে, আপনি যাযাবর হয়ে যান,’- তিনি বলেন। ভারত হয়ে উঠেছিল তাদের ‘বাসস্থান’, যদিও বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তার স্থায়ী বন্ধন রয়েছে। যখনই আমি ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দর দিয়ে বের হই, দিল্লির বাতাসের গন্ধ পেলেই মনটা শান্ত হয়ে যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিব্বতি ও ভারতীয়দের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ়। যখনই আমি ভারতীয়দের সঙ্গে দেখা করি, সঙ্গে সঙ্গে বলি ‘নমস্কার’... তখনই বন্ধুত্ব হয়ে যায়।
সাংয়ে স্মরণ করেন, তার ২০১১ থেকে ২০২১ মেয়াদে বহুবার ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতার সময় চীনের চাপ বেড়েছিল।

২০১৮ সালের ‘থ্যাঙ্ক ইউ ইন্ডিয়া’ অনুষ্ঠান উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ওই সময়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় ভারত সরকার কর্মকর্তাদের অংশ না নিতে পরামর্শ দিয়েছিল, ফলে অনুষ্ঠান সীমিত আকারে পালিত হয়। তবুও সাংয়ে জোর দিয়ে বলেন, ভারত সবসময় তিব্বতিদের পাশে থেকেছে। কোনো দল বা কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হোক না কেন, ভারত সবসময় তিব্বতিদের ভালোভাবে দেখেছে। তিব্বতিদের জন্য এর চেয়ে ভালো আতিথেয় আমরা কল্পনা করতে পারি না- তিনি বলেন। তিব্বতি পরিচয়, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার পেছনে ভারতের সহায়তাকেই তিনি কৃতিত্ব দেন।

mzamin

Wednesday, September 17, 2025

দ্য প্রিন্টের নিবন্ধ: ভারত জানিয়ে দিল, নেপাল নীতিতে ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেয়া হয়েছে by ঋষি গুপ্ত

ভারত কবে শেষবার প্রকাশ্যে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেছে? সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কসংক্রান্ত বিরোধও গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি কোনো মন্তব্য ছাড়া-  কেবল কৃষকের অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গ বাদ দিলে। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটল। মণিপুরে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকিকে অভিনন্দন জানালেন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য শুভেচ্ছা জানালেন। মোদি তার বক্তব্যে কারকিকে নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান এবং একে নারীর ক্ষমতায়নের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত বলে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেন যে কারকি নেপালে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবেন।

দুই প্রতিবেশী দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বন্ধনের প্রেক্ষাপটে মোদির এই বার্তাটি ছিল গঠনমূলক। বিশেষত যখন নেপাল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ‘ওল্ডিগার্কি’- বৃদ্ধ নেতৃত্বের শাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে।

কেন মোদি নেপালের প্রসঙ্গ তুললেন?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মোদির এক্স পোস্টের মাধ্যমে বার্তা ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল। তাহলে কেন মণিপুরের জনসভায় মোদি নেপালের কথা বললেন? এর উত্তর নিহিত রয়েছে নেপালের জেনারেশন জেডের (জেন-জি) ভূমিকায়। তারাই ‘ওল্ডিগার্কি’র অবসান ঘটিয়ে কারকির নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নয়াদিল্লি বুঝে গেছে, নেপাল নীতিতে এখন নতুন সূচনা প্রয়োজন। এতদিন ভারত মূলত নেপালের ঐতিহ্যবাহী দল ও বৃদ্ধ নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের সমালোচনা ছিল যে নয়াদিল্লি প্রতিবেশী দেশগুলোতে বহুমুখী সংযোগ গড়ে তোলেনি। তার নির্দিষ্ট প্রিয়পাত্র- বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও নেপালে শের বাহাদুর দেউবার নেপালি কংগ্রেস। কিন্তু সঙ্কট বা রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় নতুন নেতৃত্বকে সঙ্গে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ত। এখানেই ভারত নীতি পরিবর্তন করছে। মোদি তার বক্তব্যে নেপালের তরুণদের প্রশংসা করেন, যারা অস্থির সময়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, তরুণরা ৮-৯ সেপ্টেম্বরের আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত শহর পরিষ্কার করেছে এবং ভবনগুলো সাদা রঙে রাঙিয়েছে। এভাবেই ভারত জানিয়ে দিল, নেপাল নীতিতে ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেয়া হয়েছে এবং তরুণ নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া হবে।

নতুন প্রজন্ম ও ভারতের চ্যালেঞ্জ
জেন জি ইতিহাসের বোঝা বহন করে না। তারা বাস্তববাদীভাবে বিদেশনীতি চালাবে এবং সুযোগ ও অর্থনৈতিক সুবিধা যেখান থেকে আসবে সেখানে ঝুঁকবে। ভারতের উচিত তাদের স্বাভাবিক পছন্দ হওয়া, কারণ ভারত নেপালের উন্নয়নে বড় অংশীদার, তৃতীয় দেশের বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং সংকটে (যেমন ২০১৫ সালের ভূমিকম্প) প্রথম সাড়া দিয়েছে। তবে তরুণ প্রজন্ম ভারতের সঙ্গে ২০১৫ সালের কথিত সীমান্ত অবরোধ ও ২০২০ সালের লিপুলেখ-কালাপানি বিরোধ দেখেছে। ঐতিহ্যবাহী দলগুলো এসব ইস্যুকে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে ভোটের কাজে লাগিয়েছে। তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব নিয়ে আরও সরব হতে পারে। হ্যাশট্যাগ ব্যাক অব ইন্ডিয়া এবং হ্যাশট্যাগ গো ব্যাক ইন্ডিয়া ট্রেন্ডে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।

চীনের প্রভাব
চীন গত এক দশকে নেপালি তরুণদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে শিক্ষা বৃত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ইত্যাদির মাধ্যমে। সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে নেপালি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। তরুণদের একাংশ মনে করে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নেপালের উন্নয়নের সুযোগ। চীন আপাতত চুপচাপ থাকলেও, তরুণ নেতৃত্বাধীন নেপালকে স্বাগত জানাতে পিছপা হবে না। ভৌগোলিকভাবে নেপালকে চীন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশেরদ্বার হিসেবে দেখে।

নেপালে জেন জি যখন মূলধারার ভূমিকায় আসছে, ভারত দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে ইতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। তরুণদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে নয়াদিল্লি স্পষ্ট করছে যে নেপাল নীতিতে পুনর্গঠন ঘটেছে এবং তরুণদের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা এখন অপরিহার্য।

mzamin

Tuesday, September 16, 2025

কেন নেপালের এ সংকট দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ নেপালের প্রধানমন্ত্রী (পদত্যাগ করা) কে পি শর্মা অলি গত রোববার রাজধানী কাঠমান্ডুতে পরবর্তী দিন এক বড় বিক্ষোভ আয়োজন করায় তরুণদের উপহাস করেছিলেন। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলেন তাঁরা।

অলি বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীরা নিজেদের ‘জেন-জি’ (জেনারেশন জেড) বলে মনে করেন এবং তাঁরা যা চান, তা-ই দাবি করতে পারেন।

৪৮ ঘণ্টার কম সময়ে, অলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। যে ‘জেন-জি’ আন্দোলনকে তিনি অবহেলার সঙ্গে দেখেছিলেন, তাঁরাই এখন নেপালের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলছেন।

অলির ওই বক্তব্যের পরদিন গত সোমবার পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জেরে মঙ্গলবার বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা সংসদ ভবন এবং কয়েকজন রাজনীতিবিদের বাড়িতে আগুন দেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীও চাপের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তিনিও পদত্যাগ করেন। সোমবার ও মঙ্গলবারের সহিংসতায় মোট ৩১ জন নিহত হয়েছেন।

নাটকীয় এ ঘটনাপ্রবাহ নেপালকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাম্প্রতিকতম কেন্দ্র বানিয়েছে। এর আগে তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনে ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও ২০২৪ সালে একই অঞ্চলের বাংলাদেশে সরকারের পতন ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু তিন কোটি জনসংখ্যার দেশটিকেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বকে প্রভাবিত করবে। কারণ, নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস খুবই পরিবর্তনশীল ও উত্তাল এবং দেশটি ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে রাখার চেষ্টা করে থাকে।

নেপালে কী ঘটছে

৮ সেপ্টেম্বর হাজার হাজার তরুণ সরকারের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা তাঁদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ কমপ্লেক্সে ঢুকে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও জলকামান ব্যবহার করে। এতে নিহত হন অন্তত ১৯ জন। এ ঘটনা দেশজুড়ে তরুণদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

মঙ্গলবার আরও বড় ও ভয়ানক বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজনীতিবিদদের বাড়ি ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর করে আগুন লাগান বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা। নেপালের সবচেয়ে বড় সংবাদমাধ্যম কান্তিপুর পাবলিকেশন্সের ভবনেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এদিন দুপুরের দিকে অলি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে ‘জেন-জি আন্দোলন’ হিসেবে নিজেদের অভিহিত করা বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা এখন সংসদ ভেঙে দেওয়া, নতুন নির্বাচন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও ৮ সেপ্টেম্বরের গুলির নির্দেশদাতাদের বিচার দাবি করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে সেনারা রাস্তায় নেমেছেন এবং কাঠমান্ডুতে কারফিউ জারি করা হয়েছে।

নেপালে এ ধরনের বড় ছাত্র আন্দোলন নতুন নয়। দেশটির আধুনিক ইতিহাস ছাত্র আন্দোলন, রাজপ্রাসাদের হস্তক্ষেপ ও সহিংসতায় ভরা। এর মধ্যে রয়েছে এক দশকের গৃহযুদ্ধও।

রানা শাসন থেকে পঞ্চায়েত যুগ

কিছু শিক্ষিত নেপালি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ এ পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতায় তাঁরা নেপালে রানাদের সরাসরি শাসন অবসানের বৃহত্তর আন্দোলনে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত হন।

১৯৫১ সালে রানাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন নেপালের প্রথম আধুনিক বিপ্লবে রূপ নেয়। রানাদের একটি চুক্তির মাধ্যমে পরোক্ষ শাসন মেনে নিতে হয়। পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রাজা ত্রিভুবন দেশে ফেরেন। রানা ও তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস (এনসি) মিলে একটি সরকার গঠন করে।

১৯৫৯ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়। এনসির বিশ্বেশ্বর প্রসাদ কৈরালা প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু এক বছর পরই রাজা মাহেন্দ্র বীরবিক্রম কৈরালা সরকারের পতন ঘটান ও প্রায় তিন দশক ধরে রাজনৈতিক দলবিহীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করেন।

রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় ছাত্র আন্দোলন একমাত্র প্রতিবাদের পথ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন হয়।

ধীরে ধীরে আন্দোলন পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পতন ঘটায় ১৯৯০ সালে এবং সংসদীয় রাজনীতির দরজা আবার খুলে যায়।

সশস্ত্র বিদ্রোহ ও প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব

১৯৯৬-২০০৬, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য লড়াই চালায়। এতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।

২০০৬ সালে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও ছাত্রদের আন্দোলন রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। এতে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ২০০৮ সালে নেপালকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।

এর পর থেকে নেপালের তিনটি প্রধান দল—কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (সম্মিলিত মার্ক্সবাদী ও লেনিনবাদী) তথা সিপিএন-ইউএমএল, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) তথা সিপিএন-এমসি এবং নেপালি কংগ্রেসের (এনসি) আট নেতা দেশকে ১৪ বার নেতৃত্ব দেন। অলি চতুর্থবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অলি সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিক্ষোভ ফুঁসে ওঠার কারণ হলেও, জেন-জি আন্দোলন বহু বছর ধরে জমে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন।

কাঠমান্ডুর অনুসন্ধানী সাংবাদিক রজনীশ ভান্ডারি বলেন, এ আন্দোলন শাসকদের দুর্নীতি, খামখেয়ালি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভকেই তুলে ধরেছে।

‘এ আন্দোলন দেখায়, নেপালের তরুণেরা শাসকদের প্রতি ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন। কারণ, তাঁরা তরুণদের দাবির প্রতি কর্ণপাত করেননি, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেননি এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ চালিয়ে গেছেন’, রজনীশ বলেন আল-জাজিরাকে।

কাঠমান্ডুর নাগরিক ও ডিজিটাল অধিকারকর্মী আশীর্বাদ ত্রিপাঠী বলেন, ‘এ বিক্ষোভ এক রাতের ঘটনা নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ক্ষমতার অপব্যবহার আর দুর্নীতির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি। তিন প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রবীণ নেতাদের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ জমে ছিল তরুণদের। নেতারা শুধু প্রধানমন্ত্রীর পদে পালাবদল ঘটিয়েছেন, ঠিক যেন মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা।’

প্রতিবেশী দেশ ও ক্ষমতার রাজনীতি

নেপালে যা ঘটছে, তা শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

নেপাল পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৮৮৫ কিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে ১৯৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। দেশটি দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে অবস্থিত-উত্তরে চীন; দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত।

ঐতিহাসিকভাবে প্রতিবেশী ভারতের ঘনিষ্ঠ হলেও দেশটির সঙ্গে নেপালের রাজনৈতিক সম্পর্ক দেশি রাজনীতির সঙ্গে বদলে যায়। অলি বেশির ভাগ সময় চীনের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তাঁর পদত্যাগ কাঠমান্ডুতে রাজনৈতিক ভারসাম্যের নতুন দুয়ার খুলেছে।

সমাজবিজ্ঞানী লোকরঞ্জন পরাজৌলি বলেন, পরবর্তী শাসক কে হচ্ছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে সম্ভবত তিনি ‘স্বাধীন’ ব্যক্তি হবেন, যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন ও সেনাবাহিনীর আস্থাভাজন।

কিছু বিশ্লেষক সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকিকে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী প্রধান হিসেবে দেখছেন। অন্যরা কাঠমান্ডুর মেয়র ও ৩৫ বছর বয়সী র‍্যাপ সংগীতশিল্পী বালেন্দ্র শাহকেও (বালেন শাহ নামে বেশি পরিচিত) বিকল্প মনে করছেন।

যা–ই হোক, নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাঠমান্ডুর একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন, নতুন নেতা যে-ই হোন না কেন, ভারত ও চীন দেশটিতে স্থিতিশীলতা এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করবে, এমন সরকার চাইবে।

ত্রিপাঠী বলেন, তবে নেপাল সব সময় দুই প্রতিবেশী দেশ-ভারত ও চীনের সঙ্গে সমতার সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

আঞ্চলিক হিসাব–নিকাশ

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশেষজ্ঞ আলী হাসান বলেন, অলির পতন বেইজিংয়ের জন্য ধাক্কা ও নয়াদিল্লির জন্য সুযোগ হতে পারে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির কিছু অংশ নেপালের রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা মনে করে, রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে ফেরানো উচিত। তবে ‘জেন-জি আন্দোলন’ তাদের (রাজতন্ত্রপন্থীদের) পক্ষে নয়।

এ বছরের শুরুতে নেপালের সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র কাঠমান্ডুতে ব্যাপক গণসংবর্ধনা পান। এতে বোঝা যায়, নেপালি সমাজের একটি অংশ এখনো সাবেক শাসকদের সমর্থন করে। হাসান বলেন, যদি বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলন লাভবান হয়, তবে ভারতের বিজেপিও এর সুফল পেতে পারে।

তবে আলী হাসান আরও বলেন, অলিকে সরিয়ে দেওয়া ‘জেন-জি’ বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা জ্ঞানেন্দ্রর প্রত্যাবর্তনের পক্ষে নন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানও নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মনোযোগ দিয়ে দেখছে। পাকিস্তানের সঙ্গে নেপালের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও তা কৌশলগত গুরুত্বের মধ্যেই সীমিত।

তবু নেপালের শাসকেরা মাঝেমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করেছেন ভারতকে মনে করিয়ে দিতে যে তাঁদেরও আঞ্চলিক বিকল্প আছে। ১৯৬০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সরকার কৈরালা সরকারকে বরখাস্ত করায় নেপালের রাজা মাহেন্দ্রের সমালোচনা করেছিল। এক বছর পর নেপালের রাজা পাকিস্তান সফর করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে উষ্ণ আতিথ্য প্রদান করেন।

অতিসম্প্রতি, চলতি বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় যখন বন্দুকধারীরা ভারতশাসিত কাশ্মীরে ২৬ জনকে হত্যা করে, নেপাল পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির একটি প্রতিনিধিদলকে অভ্যর্থনা জানায়। এতে নয়াদিল্লির ভ্রু কুঁচকে যায়। ভারতের দৃষ্টিতে অলি সব সময় চীনের (যা পাকিস্তানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র) সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

পাকিস্তানও সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখেছে, বিশেষ করে ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে সংসদে আস্থা ভোটের মাধ্যমে সরানোর পর। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নেপালের বর্তমান সংকট পাকিস্তানের শাসক মহলকেও উদ্বিগ্ন করতে পারে।

আলী হাসান বলেন, ‘পাকিস্তানের অভিজাতরা হয়তো ভাবছেন, তাঁদের ক্ষমতা কতটা নিরাপদ। কারণ, তাঁদের ওপর প্রায়ই এমন অভিযোগ আসে, যা বাংলাদেশি, শ্রীলঙ্কান ও নেপালি বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা তাঁদের শাসকদের বিরুদ্ধে জানিয়েছেন, যেমন সরকার শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখে, সাধারণ মানুষের কথা উপেক্ষা করে ও অত্যন্ত স্বৈরাচারী।’

তবে নাম না প্রকাশ করার শর্তে অনিচ্ছুক কাঠমান্ডুর একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন, নেপালের দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন নেতার প্রধান অগ্রাধিকার হবে না, তিনি যে-ই হোন। তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে নেপালের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু ভারত বা চীনের মতো তা নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলে না। এ ছাড়া নেপালের সরকারগুলোর পাকিস্তানের ব্যাপারে কোনো বিশেষ নীতি নেই।’

নেপালের পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা
নেপালের পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। ছবি: এএফপি

Saturday, September 13, 2025

নেপালে এই বিদ্রোহের পেছনের কারণ কী, পরিণতি কী by আলতাফ পারভেজ

প্রথমে কম বয়সীদের দিয়ে শুরু হলেও ক্রমে নেপালের বিক্ষোভে মধ্যবয়সী যুবারাও শামিল হন এবং শেষমেশ এটা অনেকটা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের চেহারা নেয়। নেপালে বিক্ষোভের কারণ অনুসন্ধান করেছেন আলতাফ পারভেজ

নেপালে রাজনৈতিক অসন্তোষের ব্যাপকতা পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে চমকে দিয়েছে। সমকালীন ইতিহাসে একদিনে রাজনৈতিক কারণে এত মানুষের মৃত্যুর নজির ছিল না এ দেশে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কাঠমান্ডুসহ দেশের অনেক স্থানে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে।

প্রাথমিক খবরগুলোয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করাকে তরুণসমাজের অসন্তোষের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও আসল সমস্যা দেশটির দুর্নীতি ও প্রধান প্রধান দলের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে গভীর হতাশা। বিক্ষোভের ব্যাপকতায় ভূরাজনৈতিক উপাদানও যুক্ত আছে বলে অনুমান করছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।

বিক্ষোভের উৎস দুর্নীতির ব্যাপকতা

বৃহস্পতিবার ছাব্বিশটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা থেকে সর্বশেষ ঘটনার সূত্রপাত। মূলত এর প্রতিবাদেই কিশোর-তরুণেরা বিক্ষোভে নামেন। কাঠমান্ডুর পাশাপাশি বিক্ষোভ ছড়ায় আরও অনেক শহরে। মানুষ দ্বিতীয় দিনের মতো কারফিউ অগ্রাহ্য করে বিক্ষোভ করছে। সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও কতটা সফল হবে, তা বলা মুশকিল। এ ক্ষেত্রে বিদেশি সাহায্য চাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

তরুণসমাজের আন্দোলনে নামার নৈতিক ও আইনগত যুক্তি হিসেবে ছিল সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ। যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। তবে একই অনুচ্ছেদ, বাংলাদেশের মতো এটাও যুক্ত আছে, সরকার সামাজিক শান্তির প্রয়োজনে মতামতের প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সেই সূত্রেই যোগাযোগমাধ্যমের ওপর চড়াও হয়েছিল সরকার। এর বাইরে গোয়েন্দা বিভাগকে টেলিফোনে আড়ি পাতার অধিকার দিয়ে একটা আইন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে সম্প্রতি। সেটা শহুরে শিক্ষিত সমাজকে অসন্তুষ্ট করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের ঘোষণাকে মিছিল আহ্বানকারীরা শ্রেণিগতভাবে দুইভাবে নিয়েছিল। অনেক নিম্নবিত্ত তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা করেন। তাঁরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানেরাও এতে খেপে যান, কারণ তাঁদের সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ছন্দপতন ঘটায় এটা। অনেকের পড়ালেখার ধরনেও সমস্যা বাধে সরকারের সিদ্ধান্তে।

নেপালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাংলাদেশের মতোই বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকদের রাজনৈতিক কথাবার্তার বড় এক পরিসর। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা যদিও শুরুতে বিক্ষোভের সংগঠক ছিলেন না এবং মিছিলেও সংখ্যায় কমই ছিল—কিন্তু সরকারের মিডিয়া নিষিদ্ধের পেছনে দুর্নীতির আলাপ বন্ধের ষড়যন্ত্র দেখছিল তারা।

প্রথমে কম বয়সীদের দিয়ে শুরু হলেও ক্রমে বিক্ষোভে মধ্যবয়সী যুবারাও শামিল হন এবং শেষমেশ এটা অনেকটা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের চেহারা নেয় এবং দ্বিতীয় দিন সেটা অনিয়ন্ত্রিত দাবানলের মতো পোড়াচ্ছে নেপালকে। বিক্ষোভের ধরনে প্রধান বিরোধী দলগুলোর বয়োবৃদ্ধ নেতাদের জন্যও গভীর সতর্কবার্তা রয়েছে। ফলে এটা থেকে তাদের ফায়দা নেওয়া এখনই সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্বব্যাপী জেন-জিদের আন্দোলনে যা দেখা যায়, নেপালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি—তাৎক্ষণিকভাবে অনেক তারকাশিল্পী বিক্ষোভকারীদের পক্ষ নিয়েছেন। তারকারা বরাবরই পেশাগত স্বার্থে তরুণদের সঙ্গে থাকতে চান। আবার তরুণেরাও তাঁদের প্রিয় তারকার সমর্থন দেখলে বাড়তি চাঙা হন।

নেপালেও সোমবার তা-ই হলো। তবে নিজস্ব ন্যায্য ক্ষোভ বা প্রিয় তারকাদের সমর্থন ও অংশগ্রহণ যে কারণেই হোক বিক্ষোভকারীরা আন্দোলন শুরুর কিছু সময় পরই হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। ব্যাপক ভাঙচুর শুরু করেন। এ সময় রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরা গুলি চালালে তাৎক্ষণিকভাবে মারা গেছেন ১৯ জন। আহত মানুষের সংখ্যাও বিপুল। দ্বিতীয় দিন শেষে পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে, তা কেউ বলতে পারছে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় নজর রাখছে পরাশক্তিগুলো

কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন চলতি জোট সরকারের জন্য প্রথম দিনের ঘটনাবলি নিশ্চিতভাবে বড় এক ধাক্কা ছিল। পরদিন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগই করতে হয়। গত বছর জুলাইয়ে অলির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে অদ্ভুত এক মেরুকরণের মাধ্যমে। অলির দল ইউএমএল (ইউনাইটেড মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী পার্টি) জোট করেছে নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে। অলি নিজে চীনঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে নেপালি কংগ্রেসের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির সঙ্গে। পার্লামেন্টে দলগুলোর আসন-ক্ষমতা এমন যে কেউই সেখানে এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারায় অনেকটা ভিন্ন আদর্শের হয়েও অলির সঙ্গে জোট করেছিল নেপালি কংগ্রেস।
২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে নেপালি কংগ্রেসের সদস্য আছেন ৮৮ জন, অলির দলের আছেন ৭৬ জন এবং মাওবাদী কেন্দ্রের আছেন ৩২ জন। অলির আগে মাওবাদী প্রচণ্ড একই পার্লামেন্টে ভিন্ন আরেক মেরুকরণে প্রধানমন্ত্রী থেকেছিলেন কিছুদিন।

দেশটিতে ক্ষমতার এ রকম পালাবদলে ভারত ও চীনের ভূমিকা অনেক সময়ই বেশ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

সোমবারের সহিংসতায় ভারত ও চীনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাতটি দেশের দূতাবাস একটা বিবৃতি দিয়েছিল। বিবৃতির ভাষায় বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সহানুভূতি দেখা গেছে। অলি সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে পুরো বিষয়টা চীনের জন্য একটা আঘাত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

কাঠমান্ডুর কূটনৈতিক পল্লিতে অনেকে নেপালের ঘটনাকে বাংলাদেশের গত বছর আগস্ট অধ্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করতে চাইছেন এবং ভূরাজনীতির যোগ-বিয়োগ মিলাতেও সচেষ্ট এখন।

নেপালের দৈনিকগুলোয় গতকাল খোলামেলাভাবেই লেখা হয়েছে তাদের বিক্ষুব্ধ তরুণেরা বাংলাদেশের গত বছরের আন্দোলন এবং ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের সাম্প্রতিক জনবিক্ষোভ দেখে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ। বলা হচ্ছে, এই তিন দেশের তরুণসমাজের দুর্নীতিবিরোধী আওয়াজ নেপালের জেন-জিকে বিশেষভাবে রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করেছে।

নেপালে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের বিশেষ খরা চলছে বহুদিন থেকে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আত্মীয়স্বজনের বিলাসী জীবনের ছবি দেখে দেখে মানুষ ক্লান্ত। বেশ কয়েক মাস ধরে রাজনীতিবিদদের পুত্র-কন্যাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিষোদ্‌গার চলছে। এ রকম বিলাসী সমাজকে ‘নেপো-কিড’ নামে ট্রল করে থাকে নেপালি জেন-জিরা।

প্রভাবশালী পরিবারগুলোর এ রকম ‘নেপো-কিড’দের দুর্নীতির প্রায় প্রতিটি ঘটনায় প্রশাসনের উদাসীনতায়ও জেন-জি ক্ষুব্ধ ছিল। এসবই এই বিক্ষোভের সামাজিক প্রধান জ্বালানি ছিল। তবে বিক্ষোভের পেছনে আরেকটি ভূরাজনৈতিক যোগসূত্র থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। নেপালের দাবি করা একটা সীমান্ত অঞ্চলে ভারত ও চীন যৌথ ‘বর্ডার হাট’ করতে চাওয়ায় সাধারণ নেপালিরা দুই সপ্তাহ ধরে ব্যাপক ক্ষুব্ধ।

কালাপানি নামের এই এলাকাটি যদিও ভারতের দখলে এবং তারা চীনের সঙ্গে সেখানকার লিপুলেখ এলাকায় বাজার বসাতে চাইছে এখন—কিন্তু নেপালিরা মনে করে এই অঞ্চল আগে তাদেরই ছিল। ২০১৯ থেকে ভারত এটা তাদের মানচিত্রে দেখাচ্ছে এবং চীন সেটা মেনে নিচ্ছে। সাধারণ নেপালিরা চাইছিল তাদের সরকার শক্তভাবে এই দাবিতে ভারত ও চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াক।

কিন্তু বর্তমান জোট সরকারের প্রধান দল নেপালি কংগ্রেস ভারতপন্থী এবং দ্বিতীয় শরিক ইউএমএল চীনপন্থী হওয়ায় এ নিয়ে খুব বেশি প্রতিবাদ ওঠেনি। অন্যান্য প্রধান বিরোধী দলও সম্ভবত এ বিষয়ে ভারতকে বেশি চটাতে চাইছিল না। নেপালে অতীতেও এ রকম হয়েছে—প্রথম সারির রাজনীতিবিদেরা বিদেশি বন্ধুদের খুশি রাখতে গিয়ে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার দায় এড়িয়ে গেছেন।

আবার যে ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সরকার আয়কর না দেওয়া এবং নথিভুক্ত না হওয়ার দায়ে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল, তারাও এই বিক্ষোভের পরোক্ষ ইন্ধনদাতা হিসেবে আছে। নিষিদ্ধের মাধ্যমে তাদের বিপুল মুনাফার বাজার হারানোর অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তারাও চাইছিল শক্ত ধাঁচের এক দফা বিক্ষোভ হোক।

বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন সংগঠক বলছেন, পার্লামেন্টে আক্রমণের কোনো লক্ষ্য ছিল না তাদের। কিছু গোষ্ঠী জমায়েতকে ব্যবহার করে ভাঙচুরের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় দিন থেকে পরিস্থিতিতে তাদের আর নিয়ন্ত্রণ নেই।

জনজীবন এবং রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা

প্রথম দিনের বিক্ষোভ শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগকালে তিনি বলেন, রক্তপাতের নৈতিক দায় তার। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে মানুষের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পদত্যাগের দাবিও বেশ সমর্থন পেতে শুরু করে। তৃতীয় প্রধান দল ‘মাওবাদী কেন্দ্র’ এ বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিল। এখন অলি পদত্যাগের পর নতুন সরকার—নাকি নতুন নির্বাচন হবে, সেটা অস্পষ্ট। কারণ, রাজধানীতে স্পষ্টত এখন কারও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই।

সাধারণ মানুষ মনে করছে, বিক্ষোভ দমনে সরকার অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে। কেউ কেউ সরকারকে শিশু হত্যাকারী বলেও উল্লেখ করছিল। পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী অলির জন্য একটা সুবিধার দিক ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দলের ছিলেন না। যেহেতু দেশটিতে জোট সরকার চলছে, সেই সূত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন নেপালি কংগ্রেস থেকে। তবে দ্বিতীয় দিন অলি দায় এড়ানোর সব সুবিধার বাইরে চলে গেছেন। পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দলে হয়তো তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বই বিপন্ন হলো।

বয়স ৭৪ বছর বয়স হওয়ায় গত সপ্তাহ পর্যন্ত অলিকে অবসরে যাওয়ার জন্য চাপে রেখেছিলেন দলীয় তরুণেরা। এখন হত্যাকাণ্ডের ও পদত্যাগের পর নিশ্চিতভাবে দলের ভেতর থেকে নতুন করে তাঁকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হবে।

ইউএমএলেতে নিয়ম ছিল বয়স ৭৪ হলে এবং পরপর দুবার কোনো পদে থাকলে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হবে। অলি সেটা মানতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং চলতি বিক্ষোভের আগের দিনই তাঁর প্রভাবে দলের একটা কমিটি এই নিয়ম পাল্টানোর ঘোষণা দেয়। মূলত পুনরায় দলের চেয়ারম্যান হতে তাঁকে পথ করে দিতেই দলীয় নিয়ম পাল্টানো হয়।
এসব ঘটনাও নেপালজুড়ে বিরক্তি তৈরি করেছে। সবাই ভাবছে প্রবীণেরা কোনোভাবেই জায়গা ছাড়তে ইচ্ছুক নন। এখন মনে হচ্ছে তরুণেরা নিজেরাই রাজনীতিবিদদের তাড়াতে নেমেছেন।

প্রধানমন্ত্রী সোমবারের সহিংসতার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা সরাননি। তবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তাঁর পদত্যাগে সেটা সহজ হলো। সরকারের অংশীদার নেপালি কংগ্রেসও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে। এই দলের প্রভাবশালী নেতা শেখর কৈরালা সরকার থেকে কংগ্রেসকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন।

দলটির সম্পাদক গগন কুমার থাপা বলেছেন, রক্তপাতের দায় প্রধানমন্ত্রীরও। অলির ছোঁয়া থেকে সবাই এখন দূরে সরতে চাইছেন।

বিরোধী দলগুলো বেশি চাপ প্রয়োগ করতে পারলে শিগগিরই হয়তো আগাম নির্বাচন আদায় করতে পারবে। যদিও স্বাভাবিক নিয়মে পরবর্তী পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছর। সোমবারের রক্তপাতের পরই সবার আগে নির্বাচন চেয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। তারা পার্লামেন্টে চতুর্থ বড় দল। বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচন হলে তরুণদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা দলগুলো বাড়তি ভোট পেতে পারে। অন্তত শহরাঞ্চলে।

তবে নির্বাচন হলে বিশেষভাবে লাভবান হবে রাজতন্ত্রপন্থী দল—যাদের নাম আবার ‘প্রজাতন্ত্রী পার্টি’। শেষোক্ত এই দলও চলতি সামাজিক অসন্তোষকে নির্বাচন পর্যন্ত গড়িয়ে নিতে ইচ্ছুক। তারা কংগ্রেস, ইউএমএলের পাশাপাশি বিরোধী দল মাওবাদীদেরও বিরোধী।

রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী নাগরিক সমাজের অনেক প্রভাবশালীও জেন-জিদের চলতি আন্দোলনে বেশ উৎসাহ দেখাচ্ছে। এর মধ্যে আছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দুর্গা প্রসাই। দুর্গা এবং সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্রের নাতি হিরেন্দ্র শাহ জেন-জি বিক্ষোভে শামিল হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেন-জিরা তাদের আসতে নিষেধ করেন। অনেকের সন্দেহ দ্বিতীয় দিনের সহিংসতায় তাদের হাত আছে।

২০০৮ সালে রাজার হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান দলগুলো প্রায় সবাই একাধিকবার করে সরকারে নেতৃত্ব দিয়েও দেশটির জনজীবনে অর্থনৈতিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য বদল ঘটাতে পারেনি। ফলে রাজতন্ত্রীদের প্রতি জনসমাজে একরূপ পক্ষপাতও বাড়ছে।

মাওবাদী কেন্দ্রের প্রচণ্ড এবং অপর মার্ক্সবাদী নেতা কে পি শর্মা অলি ইতিমধ্যে তিনবার করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবা এ পর্যন্ত পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বলা হয়, নেপাল এই তিন নেতার হাতে বন্দী। ঘুরেফিরে তাঁরাই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, কিন্তু দেশটির ভাগ্যের বদল ঘটছে না। মূলত এই হতাশা থেকেই নেপালে ৮ সেপ্টেম্বরের রক্তপাত এবং পরের দিনের সহিংসতা হলো।

এসব ঘটনায় দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো পুরো ভেঙে না পড়লেও আমূল এক ঝাঁকুনি খেল। এতে করে দেশটির রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে জেন-জির অভিষেক ঘটল। ভবিষ্যতের ভোটের রাজনীতিতে এর প্রভাব হতে পারে বিপুল—যার পুরোটা এখনই অনুমান করা যাচ্ছে না।

তবে নেপালের তরুণেরা স্পষ্টত কোনো দলের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের আর দেখতে চাইছেন না। তাঁরা মনে করছেন, তাঁরা নেপালে আর্থসামাজিক রূপান্তর ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তরুণেরা একই সঙ্গে দেশটিকে গভীর এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়ও ফেলেছেন।

* আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2F7cpj8oyl%2F12.jpg?rect=0%2C0%2C4160%2C2773&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনকারীরা। সে সময় অনেকের গায়ে জড়ানো ছিল দেশটির জাতীয় পতাকা। কাঠমান্ডু, নেপাল, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এএফপি

Friday, September 12, 2025

নেপালের তরুণেরা কেন থামছে না? by চার্লি ক্যাম্পবেল

নেপালে গত সপ্তাহে শুরু হয় গণবিক্ষোভের ডাক, যা আরও তীব্র হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের নিষেধাজ্ঞার পর। মঙ্গলবার সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও এবং প্রধানমন্ত্রী খাদগ প্রাসাদ শর্মা অলি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের পদত্যাগের পরও বিক্ষোভ থামেনি। নেপাল থেকে স্বৈরশাসকেরা কী শিক্ষা পেতে পারেন, তা নিয়ে লিখেছেন টাইম–এর এডিটর অ্যাট লার্জ চার্লি ক্যাম্পবেল

সেনা-নিয়ন্ত্রিত কারফিউ ঘোষণার পর বুধবার নেপালে এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। তার আগে দুই দিন ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজধানী কাঠমান্ডু ও অন্যান্য শহর অচল হয়ে পড়ে।

মূলত তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালানো, পার্লামেন্ট, মন্ত্রণালয় ও সরকারি অফিসে ভাঙচুর এবং রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হামলা চালান। এমনকি মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টারেরও প্রয়োজন হয়।

এই সহিংসতায় অন্তত কমপক্ষে ২২ জন প্রাণ হারান এবং শত শত মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আহত হন। সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার বন্ধের চেষ্টাকে এই সহিংসতার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশটির প্রায় তিন কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ, যা জন্ম নিয়েছে রাজনৈতিক দুর্নীতি ও ব্যাপক বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

২.

নেপাল সরকার ফেসবুক, ইউটিউব, এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, সেগুলো নিবন্ধন ও সরকারি নজরদারির নিয়ম মানেনি।

কিন্তু বিক্ষোভকারীরা মনে করেন, এটি মূলত তরুণদের ক্ষোভ দমন করার পদক্ষেপ। তরুণেরা ক্ষুব্ধ ছিলেন রাজনৈতিক অভিজাতদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে, যা অনলাইনে প্রদর্শিত হচ্ছিল, যাঁদের ‘নেপো কিডস’ বলা হচ্ছে।

সাধারণ নেপালি জনগণ যে বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তার সঙ্গে অনলাইনে অভিজাত পরিবারের সন্তানদের জৌলুশপূর্ণ জীবনযাপনের বৈপরীত্য ক্রমে ক্ষোভ বাড়ায়।

গত সপ্তাহে শুরু হয় গণবিক্ষোভের ডাক, যা আরও তীব্র হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের অদক্ষ নিষেধাজ্ঞার পর। মঙ্গলবার সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও এবং প্রধানমন্ত্রী খাদগ প্রাসাদ শর্মা অলি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের পদত্যাগের পরও অশান্তি কমেনি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘নেপালের সরকার আসলে নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিধিনিষেধ ব্যবহার করে এই ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে চেয়েছিল। কিন্তু তা সম্পূর্ণ উল্টো ফল দিয়েছে।’

৩.

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জন–আন্দোলন গড়ে তোলার শক্তি এশিয়ার জন্য নতুন নয়। ইন্টারনেট ইতিমধ্যেই ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরকার পতনের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এমনকি আজও এটি ইন্দোনেশিয়ায় অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।

তবে এই ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১০ সালের আরব বসন্তে, যখন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় অনলাইনে সংগঠিত এক ধারাবাহিক সরকারবিরোধী আন্দোলন ঝড় তোলে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি এক স্পষ্ট পূর্বাভাস; আরব বসন্তের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার প্রচেষ্টা যেন ‘এক হাইড্রার মাথা কাটার’ মতো কাজ করেছিল।

এতে রাষ্ট্রের প্রকাশ্য বাক্‌স্বাধীনতা ও সমাবেশের অধিকার অস্বীকার করার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিক্ষোভকারীদের অভিযোগকে বৈধতা দেয় এবং তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি আরও বাড়ায়।

৪.

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে আরব বসন্তের পর অনেক স্বৈরশাসক দেশে কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করে। নেপালের উত্তর সীমান্তের ওপারে চীনের গ্রেট ফায়ারওয়াল হয়ে ওঠে কড়াভাবে নিয়ন্ত্রিত অনলাইন স্পেসের প্রতীক। গ্রেট ফায়ারওয়াল কেবল ‘অবাঞ্ছিত বাইরের তথ্য’ই আটকায় না, দেশীয় রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ও ছেঁটে ফেলে এবং নিষিদ্ধ করে।

তবে গ্রেট ফায়ারওয়াল হলো চীনের বহুস্তরীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার একটি অংশমাত্র। সেখানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ বা মোবাইল সিম কার্ড কিনতে হলে সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র প্রয়োজন।

এমনকি পাবলিক ওয়াই–ফাই ব্যবহার করতে হলেও ফোন নম্বর যাচাই করতে হয়, যা আবার জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। আর চীনের সর্বব্যাপী মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম উইচ্যাট ব্যবহারকারীদের এক শতাধিক সদস্যবিশিষ্ট গ্রুপে যোগ দিতে হলে ব্যাংক তথ্য নিবন্ধন করতে হয়।

এই বহুবিধ যাচাইয়ের কারণে অনলাইন ফোরামে নামবিহীন পোস্টও আইনি পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ফলে তৈরি হয়েছে একধরনের সেলফ-সেন্সরশিপের সংস্কৃতি। যখনই কোনো সমস্যা দেখা দেয়, দমন-পীড়ন হয় দ্রুত ও কঠোরভাবে।

যেমন ২০২৩ সালের নভেম্বরে চীনের সাংবাদিক ও কর্মী সান লিন পুলিশের মারধরে মারা যান। তিনি প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্ট করেছিলেন।

পরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি অনলাইনে তাঁর মৃত্যু নিয়ে যেকোনো আলোচনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ক্রমবর্ধমানভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ব্যবহার করা হচ্ছে দ্রুত আপত্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও মুছে ফেলার জন্য।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পার্ক স্ট্র্যাটেজিসের এশিয়া অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শন কিং মন্তব্য করেন, বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা হয়তো কাঠমান্ডুর সহকর্মীদের দিকে করুণা ও আনন্দ নিয়ে তাকাচ্ছেন। তাঁরা মনে মনে কৃতজ্ঞ হচ্ছেন যে মূল ভূখণ্ড চীনের নেটিজেনরা কখনোই সেই জিনিস মিস করে না, যার জন্য নেপালি জনগণ এত কঠিন লড়াই করছে।

৫.

কেবল স্বৈরচারী রাষ্ট্রগুলোই নয়, তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশও অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে।

ফ্রিডম হাউসের ২০২৪ সালের ফ্রিডম অন দ্য নেট প্রতিবেদনের মতে, গত বছর টানা ১৪তম বারের মতো বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে। সমীক্ষাকৃত বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ এখন উন্মুক্ত ও মুক্ত ইন্টারনেট ভোগ করছে।

নেপালের অপর প্রান্তে, স্বৈরতান্ত্রিক চীনের বিপরীতে, ভারত হয়ে উঠেছে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের এক পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র—কীভাবে অনলাইন বক্তব্য নিয়ন্ত্রণে ক্রমশ জটিল কৌশল প্রয়োগ করছে, তা দেখানোর জন্য।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সাল থেকে ভারত তার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে, যেখানে এখন কেবল আইটি বা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নয়, বরং আরও অনেক সরকারি কর্মকর্তাকে সরাসরি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে কনটেন্ট অপসারণের নির্দেশ প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

গত বছরের জাতীয় নির্বাচনের আগে ভারত সরকার একটি ‘ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট’ গঠনের উদ্যোগ নেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল কথিত ভুয়া রিপোর্টিং সংশোধন করা। তবে সাংবাদিক ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে ছিল। এরপরও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্যঙ্গ করে আঁকা কার্টুন থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী পদদলনের খবর পর্যন্ত সবই অপসারণের ওই নির্দেশনার আওতায় এসেছে।

৬.

অবশ্যই সম্পূর্ণ অবারিত ও নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেটও সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। যেমন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যায় অনলাইনে ঘৃণা ও ভ্রান্ত তথ্য প্রচার ছিল অন্যতম কারণ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া–বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ সব সময় একধরনের দ্বিমুখী অস্ত্রের মতো। কারণ, কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই সহিংসতা উসকে দিতে পারে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।

নেপালের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা অনিশ্চিত। দেশটির জনগণ মাথাপিছু বার্ষিক আয়ের ক্ষেত্রে এখনো ১ হাজার ৪০০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে এবং জীবনযাত্রা নিয়ে সংগ্রাম করছে। আর যুব বেকারত্ব প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি তরুণ দেশ ছাড়ছেন বিদেশে কাজের সন্ধানে, প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যে।

বিক্ষোভকারীরা দাবি তুলেছেন, সংসদ ভেঙে দেওয়া, সংসদ সদস্যদের গণপদত্যাগ, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশদাতা কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বরখাস্ত এবং নতুন নির্বাচনের আয়োজন। তবে শুধু এসব দাবি পূরণ করলেই নেপালের সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

অন্তত এই আশা করা যায় যে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমালোচনা উপেক্ষা না করে তা শোনার অভ্যাস করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলোর জন্য কিংবা যারা স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগোতে চায়, তাদের উল্টো শিক্ষা হলো ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াই অস্তিত্বের ঝুঁকি। কারণ, একবার বোতলের ভেতর থেকে দৈত্য বেরিয়ে গেলে তাকে আর ফেরানো যায় না, আর তা চেষ্টা করলে বরং আগুনে ঘি ঢালার মতো হয়।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ক্ষোভ আর রাগ কোনো বিস্ময়ের বিষয় হওয়া উচিত নয় নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে, যদি তাঁরা কেবল বিক্ষুব্ধদের কথা শোনার সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু প্রায়ই যা ঘটে, সমস্যাগুলো সমাধান করার পরিবর্তে সরকারগুলো সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার পথই বেছে নেয়।

* চার্লি ক্যাম্পবেল, টাইম–এর এডিটর অ্যাট লার্জ
- টাইম–এর অনলাইন সংস্করণ থেকে নেওয়া, অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

দেয়ালের একটি গ্রাফিতিতে লেখা ‘হত্যাকারীকে ফাঁসিতে ঝোলাও’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভের পর অনেকটা শান্ত নেপাল। কাঠমান্ডু, ১১ সেপ্টেম্বর
দেয়ালের একটি গ্রাফিতিতে লেখা ‘হত্যাকারীকে ফাঁসিতে ঝোলাও’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভের পর অনেকটা শান্ত নেপাল। কাঠমান্ডু, ১১ সেপ্টেম্বর। ছবি: রয়টার্স

নেপালেও শোনা গেল ‘ডোন্ট মেস উইথ জেন-জি’ by সারফুদ্দিন আহমেদ

কে পি শর্মা অলি যখন হেলিকপ্টারে করে পালাচ্ছিলেন; পাবলিকের দাবড়ানি খাওয়া মন্ত্রীদের যখন সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে ‘নিরাপদ জায়গায়’ নিয়ে যাচ্ছিল; গুলিতে নিহত আন্দোলনকারীদের স্বজন-সহযোদ্ধারা যখন প্রচণ্ড আক্রোশে এমপি-মন্ত্রী-আমলাদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছিলেন; ক্ষমতাচ্যুত সরকারের লোকজনের পালানো ঠেকাতে যখন কাঠমান্ডু বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে খবর আসছিল; তখন মাথার মধ্যে শুনতে পাচ্ছিলাম ‘শূন্য-প্রজন্মের’ আইকনিক ধমক—‘ডোন্ট মেস উইথ জেন-জি’।

সোজা বাংলায়—‘খবরদার! জেন-জির সঙ্গে পাঙ্গা নিতে যাইয়ো না।’

অলির সরকার সেই কাজটাই করেছে। তারা জেন-জি খেপিয়ে ধরা খেয়েছে। এই জেন-জি চলে স্মার্ট গতিতে। তারা সোজা কথা সোজাভাবে এবং অবশ্যই অতি সংক্ষেপে বলতে ও শুনতে পছন্দ করে।

স্মার্টফোনেই তারা কাজের বেশির ভাগ সেরে ফেলে। যে কথাটা বলতে তিনটি বাক্য লাগে, তা তারা বলে তিন শব্দে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন অক্ষরে।

পানির অপর নাম যেমন জীবন, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি; বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জেন-জির শ্বাসপ্রশ্বাস।

এই জিনিস অলির সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব আর এক্স (আগের টুইটার) এক রাতেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

আমাদের এখানে আমলা-মন্ত্রী-এমপিদের অনেকের ছেলেমেয়ে ১৫ লাখ টাকার ছাগল কিনে, কিংবা ১০ লাখ টাকার লেহেঙ্গা পরে, কিংবা ১০ কোটি টাকার গাড়ি কিনে দেখনদারি সেলফি দেওয়ার পর ভাইরাল হয়েছিলেন।

তার জেরে কাউকে কাউকে কঠিন বিপদে পড়তে হয়েছিল। ঠিক সেই কায়দায় নেপালে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের ছেলেমেয়ে নানা ধরনের বিলাসবহুল ফুর্তিফার্তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়েছিলেন।

অনেকের দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে চলে এসেছিল। সেসব খবর ও ছবি বঞ্চনার আগুনে পুড়তে থাকা জেন-জিকে খেপিয়ে তুলেছিল। রাজনীতিকদের সন্তানদের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাক-গয়না প্রদর্শনের ছবি তাঁরা ভাইরাল করেছেন।

এই ‘আলালের ঘরের দুলাল’দের নাম দেওয়া হয়েছে, ‘নেপো কিডস’। #NepoKids এবং #PoliticiansNepoBabyNepal হ্যাশট্যাগে ‘নেপো কিডস’দের চৌদ্দগুষ্টির কীর্তিকলাপের ফিরিস্তি তুলে ধরা হচ্ছিল।

সরকার যখন দেখল রাজনীতিকদের ধুতি খুলে যাচ্ছে, তখন ফট করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, এক্স—সব বন্ধ করে দেওয়া হলো। তার মানে, যে মাধ্যমগুলো জেন-জির শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো, সেগুলো সরকার দুম করে বন্ধ করে দিয়েছিল।

ধারণা করি, এই অঞ্চলের ‘বুড়িয়ে যাওয়া’ রাজনীতিকদের প্রধান সমস্যা হলো, তাঁরা বুঝতে পারেন না, জেন-জি দুবেলা না খেয়ে থাকতে রাজি, কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তারা সহ্য করতে পারে না।

ইন্টারনেট বন্ধ করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া মানে সরাসরি তাদের গলা টিপে ধরা। এতে তাদের দমবন্ধের অনুভূতি হয়। এতে তারা চরমভাবে অপমান বোধ করে।

সরকারের লোকজন দুর্নীতি করবে, আর সেই দুর্নীতির কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে বা ট্রল করে হালকা হওয়ার সুযোগও থাকবে না—এটা জেন-জি মানতে পারে না।

তাদের এই মানতে না–পারাটাই সরকার পতনের পেট্রলে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি হয়েছে।

সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছিল, এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছিল, তাই এগুলো বন্ধ করা হয়েছে।

জেন-জি ঠিকই বুঝেছে, ‘ইন্টারনেট এমনি এমনি বন্ধ হয়ে গেছে’র মতো এটাও একটা ‘চালাকি মার্কা’ কথা। আর এই প্রজন্মের সবচেয়ে অপছন্দ হলো সোজা না বলে ঘুরিয়ে বলা কথা বা চালাকি করা কথা। এতে তারা প্রচণ্ড বিরক্ত হয়েছে।

সেই বিরক্তি থেকে তারা রাস্তায় নেমেছে। বিক্ষোভ করেছে। তাদের এই বিক্ষোভে নিশ্চয়ই সরকারবিরোধী শক্তিগুলোর সমর্থন ছিল। কিন্তু কেউ সামনে আসেনি। পেছন থেকে আন্দোলনে সহায়তা করেছে। গত বছর ঠিক এই জিনিস আমরা বাংলাদেশে দেখেছি।

গত বছর আমাদের দেশে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন চলছিল, তখন আন্দোলনকারীদের মধ্যে কোন নেতার কী নাম, কী পরিচয়; তা নিয়ে জেন-জিকে অতটা মাথা ঘামাতে দেখিনি।

নেপালেও একই ঘটনা দেখা গেছে। সরকার ফেলে দেওয়ার মতো এত বড় কাণ্ড তারা ঘটিয়ে ফেলল, কিন্তু কেউ ঠিকমতো জানে না, এই আন্দোলনের মূল নেতা কে। আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা ছিল ‘নামহীন, গৃহহীন...দীপ্তিহীন, কীর্তিহীন’। শুধু এইটুকু সবাই জেনেছে, তারা ‘জেন-জি’।

কোনো দল বা ব্যক্তি এই আন্দোলনের মালিকানা দাবি করেনি। এটা ছিল সচেতন কৌশল। কারণ, এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর মতো নেপালেও রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্নীতি আর লুটেপুটে খাওয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হয়।

এ কারণে তারা আন্দোলনটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলের নাম–গন্ধ রাখেনি। খুব পরিচিত কেউ আন্দোলনটির নেতৃত্বে ছিলেন না।

এই তরুণেরা খুব সচেতনভাবে, অর্থাৎ মেটিকিউলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে দলীয় সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে একটি বিবেকনির্ভর আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তাতেই সরকার পড়ে গেছে।

অনেকেই বলছেন, দুর্নীতিবাজ অলির সরকার পালানোয় উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এখন রাজতন্ত্রপন্থী ও হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায় চলে যেতে পারে। নতুন করে সেখানে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হতে পারে।

তবে সুখের কথা, সামনে যা-ই হোক, যারাই ক্ষমতায় যাক—এই অভ্যুত্থান তাদের সামনে অন্তত সেই কড়া ধমক হাজির করেছে—‘ডোন্ট মেস উইথ জেন-জি।’

* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
- ই–মেইল: sarfuddin2003@gmail.com

এই অঞ্চলের ‘বুড়িয়ে যাওয়া’ রাজনীতিকদের প্রধান সমস্যা হলো, তাঁরা বুঝতে পারেন না, জেন-জি দুবেলা না খেয়ে থাকতে রাজি, কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তারা সহ্য করতে পারে না।
এই অঞ্চলের ‘বুড়িয়ে যাওয়া’ রাজনীতিকদের প্রধান সমস্যা হলো, তাঁরা বুঝতে পারেন না, জেন-জি দুবেলা না খেয়ে থাকতে রাজি, কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তারা সহ্য করতে পারে না। ছবি: এএফপি

নেপালে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে জেন-জিদের পছন্দ কে এই সুশীলা কারকি

নেপালে রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভের পর স্থিতিশীলতা ফেরাতে জেন–জি তথা তরুণদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে সেনাবাহিনী। বিক্ষোভের জেরে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর নেপালে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে চলছে আলোচনা। এ সরকারের প্রধান হিসেবে জেন–জিরা সমর্থন দিচ্ছেন দেশটির প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকিকে।

নেপালে দুই দিনের বিক্ষোভের মুখে গত মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি। সেদিন রাত থেকেই দেশের ‘পরিস্থিতির’ নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। বিভিন্ন শহরে মোতায়েন করা হয় সেনাসদস্যদের। এরই মধ্যে বুধবার তরুণদের সঙ্গে প্রথম দফায় বৈঠক করেন সেনা কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবারও তাঁদের আলোচনায় বসার কথা ছিল।

নেপালে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হচ্ছেন, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টাও চালানো হচ্ছে। আর জেন–জি প্রতিনিধি ওজাশ্বি রাজ থাপা সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের প্রধান হিসেবে সুশীলা কারকির নাম বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীকে জানানো হয়েছে।

ওজাশ্বি রাজ থাপার ভাষ্যমতে, বিক্ষোভকারীরা চান নেপালের পার্লামেন্ট যেন ভেঙে দেওয়া হয়। তবে দেশের সংবিধান বাতিল করার পক্ষে নন তাঁরা। আপাতত সংশোধনই যথেষ্ট বলে মনে করছেন। আর বিক্ষোভকারীরা ক্ষমতায় থাকতে চান না বলে এএফপিকে জানিয়েছেন তাঁদের আরেক প্রতিনিধি সুদান গুরুং। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারে কোনো অবস্থান চাই না। আমরা প্রকৃত সংস্কার চাই।’

কে এই সুশীলা

জেন–জিদের পছন্দের প্রার্থী সুশীলা কারকির বয়স ৭৩ বছর। ২০১৬ সালে নেপালের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে অবসরে। জেন–জি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে আলোচনার বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন একজন রয়টার্সকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিতে সুশীলা রাজি আছেন। এখন তাঁকে নিয়োগের উপায় খোঁজা হচ্ছে।

নেপালের স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সরকারপ্রধান হওয়ার প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাওদেল ও সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন সুশীলা। এ বিষয়ে জানতে তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে সাড়া মেলেনি। সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেননি তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নিয়ে আলোচনার মধ্যে বৃহস্পতিবার একটি বিবৃতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তাতে তিনি বলেছেন, বর্তমানের কঠিন পরিস্থিতির সমাধান করতে সব ধরনের চেষ্টা করছেন তিনি। গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে এ চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে—এ বিষয়ে সবাইকে আশ্বস্ত থাকতে বলেন প্রেসিডেন্ট।

নেপালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সুজিত কুমার ঝা। ৩৪ বছর বয়সী এই যুবক বলেন, ‘আমরা সুশীলাকে একজন সাহসী এবং নিজ সংকল্পে অটল মানুষ হিসেবে চিনি।’ তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের সবাই সুশীলাকে সরকারপ্রধান হিসেবে সমর্থন করছেন না। তাই সর্বসম্মতভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’

আলোচনায় আরও যাঁরা

নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে জেন–জিদের পছন্দ হিসেবে কুলমান গিসিংয়ের নামও শোনা যাচ্ছে। তিনি দেশটির বিদ্যুৎ বোর্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। নেপালের বিদ্যুৎ–বিভ্রাট মোকাবিলা করে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি। সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি তাঁকে বিদ্যুৎ বোর্ডের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতি দিয়ে কুলমান গিসিংয়ের প্রতি সমর্থন জানান বিক্ষোভকারীদের একাংশ। বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবিধানিকভাবে সুশীলা কারকি অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হতে পারেন না। কারণ, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের বিচারিক কাজের বাইরে অন্য কোনো দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ আছে। আর জেন–জিদের নেতা হওয়ার জন্য তিনি ‘অনেক বয়স্ক’।  

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে কাঠমান্ডুর সাবেক ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহর নাম শোনা যাচ্ছিল। একজন র‌্যাপার হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে তাঁর। তবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি লিখেছেন, সুশীলা কারকির প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

নিহত বেড়ে ৩৪

নেপালে দুর্নীতি, বেকারত্ব, বৈষম্য ও রাজনীতিবিদদের স্বজনপ্রীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এরই মধ্যে সম্প্রতি ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়। এর জেরেই সোমবার থেকে বিক্ষোভে নামেন তরুণেরা। সেদিনই বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত হন।

বৃহস্পতিবার নেপালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এদিন পর্যন্ত বিক্ষোভের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি। এদিনও কাঠমান্ডুতে কারফিউ জারি ছিল। রাস্তায় ছিল সেনাসদস্যদের উপস্থিতি। বন্ধ ছিল স্কুল, কলেজ ও দোকানপাট। তবে জরুরি কিছু সেবা চালু করা হয়।

সুশীলা কারকি
সুশীলা কারকি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, September 11, 2025

ভারতের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললেন ক্ষমতাচ্যুত কেপি শর্মা

স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ভারতকে চ্যালেঞ্জ জানানোয় প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর অভিযোগ করেছেন নেপালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। গতকাল মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) জেন-জির বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন কেপি শর্মা।

গুঞ্জন ওঠে, তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তবে অলির খোঁজ মিলেছে। তিনি এখনো নেপালেই অবস্থান করছেন এবং সামরিক বাহিনীর সুরক্ষায় শিবপুরী এলাকায় রয়েছেন। সেখান থেকে তিনি সরাসরি জেন জি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বার্তাও দিয়েছেন।

বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) নেপালি সংবাদমাধ্যম খবর হাব এই তথ্য জানিয়েছে।

আজ নিজ দলের মহাসচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন কেপি শর্মা। সেখানে নিজের প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর জন্য ভারতকে দায়ী করেছেন তিনি।

চিঠিতে তিনি বলেন, যদি আমি লিপুলেখ অঞ্চল নিয়ে প্রশ্ন না তুলতাম এবং অযোধ্যা ও দেবতা রাম নিয়ে কথা না বলতাম, তাহলে আমি হয়তো ক্ষমতায় থাকতাম। আমি ক্ষমতা হারিয়েছি কারণ অযোধ্যতায় দেবতা রামের জন্ম হয়েছে, এই দাবির বিরোধিতা করেছিলাম।

ভারত ও নেপালের মধ্যে লিপুলেখ গিরিপথকে কেন্দ্র করে বিরোধ রয়েছে। এই বিতর্কের মূলে রয়েছে কালাপানি অঞ্চল। ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে এই অঞ্চলটির মাধ্যমে সীমান্ত নির্ধারিত হয়েছে। কালী নদীর উৎপত্তিস্থলকে নির্ধারণ করে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

নেপালের দাবি হলো, কালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুড়া থেকে, যা লিপুলেখের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। তাদের দাবি এ অনুযায়ী, কালাপানি ও লিপুলেখ উভয়ই নেপালের ভূখণ্ড। অন্যদিকে, ভারতের দাবি নদীটি কালাপানি গ্রামের কাছে শুরু হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলটিকে নিজেদের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অংশ হিসেবে দাবি করে তারা।

কেপি শর্মা অলির সরকার এ অঞ্চল নিয়ে কঠোর ছিল। অলি ঘোষণা দেন, ‘মহাকালী নদীর পূর্ব দিকের লিম্পিয়াধুড়া, লিপুলেখ এবং কালাপানি নেপালের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’

এই ঘোষণার পর ভারতকে ওই অঞ্চলে রাস্তা নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করতে অনুরোধ করেছিল নেপাল। এমনকি দেশটি চীনকে জানিয়েছিল, এটি তাদের ভূখণ্ড। তবে ভারত নেপালের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, ১৯৫৪ সাল থেকে তারা লিপুলেখ দিয়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করছে।

২০২০ সালের জুলাইয়ে কেপি শর্মা অলি বলেছিলেন, দেবতা রাম ভারতে নয়, নেপালে জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি মন্তব্য করে বলেন, ‘রামের অযোধ্যা রাজ্য নেপালের পূর্ব বীরগঞ্জে অবস্থিত। ভারত আরেকটি ভুয়া অযোধ্যা তৈরি করেছে।’

ওই সময় অলি বলেন, দেবতা রাম সীতাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ভারতে জন্ম নেওয়া রাম কীভাবে নেপালের জনকপুরের সীতাকে বিয়ে করেছিলেন?

প্রাচীন আমলে দূরের স্থানে বিয়ের প্রচলন ছিল না বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা আছে সীতা ভারতের রামকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু রাম ভারতীয় নয় নেপালি ছিলেন।’

প্রশ্ন রেখে আরও বলেন, ‘রাম কীভাবে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে নেপালের জনকপুরে সীতাকে বিয়ে করতে এসেছিলেন? প্রাচীন আমলে দূরের স্থানে বিয়ের প্রচলন ছিল না। ওই সময় কোনো ফোনও ছিল না। তাহলে তারা কীভাবে যোগাযোগ করেছিলেন? প্রাচীন আমলে আশপাশের রাজ্যগুলোর মধ্যে বিয়ে হতো। এত দূর গিয়ে কেউ বিয়ে করত না।’

এমন বক্তব্য দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ভারতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছিল।

সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে

কে পি শর্মা অলি ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত

Wednesday, September 10, 2025

নয়া রাজনীতির পথে নেপাল, আলোচনায় কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র

হিমালয় কন্যা খ্যাত নেপাল আজ রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, নেপালে পুরনো রাজনীতির অবসান ঘটেছে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা হচ্ছে। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ, যিনি তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়, বহু দশক ধরে নেপালের শাসনব্যবস্থা ছিল কিছু রাজনীতিবিদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে। তারা দেশকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছেন এবং জনগণকে দেখেছেন দাস হিসেবে। এই পুরনো প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের প্রতিনিধিত্ব করেন কেপি শর্মা ওলি, শের বাহাদুর দেউবা, পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) প্রমুখ। তরুণদের উপর গুলি চালানোর মতো সহিংস দমননীতি অনুসরণ করে ওলি সরকার নিজের পতনের পথ নিজেই তৈরি করে দেয়। সোমবারের সেই বর্বর হামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পদত্যাগ করেন তিনি।

সম্পাদকীয়টি বলছে, এবারের গণআন্দোলন ছিল আত্মত্যাগে ভরা, তবু গভীরভাবে সচেতন ও সংগঠিত। লাখো মানুষ রাজপথে নেমেছে। তাদের একটাই দাবি- পরিবর্তন। তারা নতুন নেতৃত্ব চায়। চায় জবাবদিহিতা ও সুশাসন। এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল জেনারেশন জেড বা জেন জি। অর্থাৎ তরুণ ও নবীন নাগরিকরা। যারা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণরা এখন সরাসরি কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন- এসো বালেন্দ্র, আমাদের এই সংকট থেকে রক্ষা করো। ১৯৯০ এবং ২০০৬ সালের মতো বড় রাজনৈতিক পালাবদলের সময় যেমন নেতৃত্ব উঠে এসেছিল আন্দোলনের মাঝ থেকে, তেমনি এবারও বালেন্দ্র হয়ে উঠেছেন জাতির প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু।

সম্পাদকীয় মতে, নেপালের সামনে এখন যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা এক ঐতিহাসিক মোড়। এই পরিবর্তনকে অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়োজন নতুন পরিকল্পনা, শান্তি, সংলাপ এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার রূপরেখা। এই প্রক্রিয়ায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের মাধ্যমে নতুন নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী, বিরোধী দলসমূহ এবং সাধারণ জনগণের উচিত- তরুণ নেতৃত্ব ও বালেন্দ্রর প্রতি আস্থা রাখা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো। কারণ, এখন সময় এসেছে কার্যকর এবং নৈতিক নেতৃত্বের।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট বলছে, এবারের আন্দোলন শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়- এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য সংগ্রাম। এই সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হবে জবাবদিহিতা, সুশাসন ও নৈতিকতা। আর সেই নতুন নেপালের চালকের আসনে গোটা জাতি বালেন্দ্র শাহকে দেখতে চায়।

জেন-জি’র বিজয়, নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলি’র পদত্যাগ

তীব্র জনরোষের পর অবশেষে পদত্যাগ করলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। কিছুক্ষণ আগে তিনি টেলিভিশনে দেয়া বিবৃতিতে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এ খবরে আনন্দে ভাসছে নেপাল। পদত্যাগ করার পর ওলি’র ভবিষ্যত কি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে মিডিয়ায় একটি কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। তাহলো তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন। আশ্রয় নিতে পারেন অন্য কোনো দেশে। যদি তা-ই হয়, তাহলে তিনি বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মতো পরিণতি ভোগ করতে পারেন। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ওলি বলেছেন, তিনি সাংবিধানিক সমাধানের পথ তৈরি করে দেয়ার জন্য পদত্যাগ করছেন।

এর আগে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন ধরিয়ে দেয় বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপির বাসভবনে। এ অবস্থায় দেশটির আভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল অচল হয়ে গেছে। আংশিক বন্ধ হয়ে গেছে কাঠমান্ডু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মঙ্গলবার সানেপায় শাসকদল নেপালি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় জেন-জি আন্দোলনকারীরা। আগুনে পুড়ছে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির ব্যক্তিগত বাসভবন। দাউ দাউ জ্বলছে আরও মন্ত্রী, এমপিদের বাসভবন। বিক্ষোভকারীদের এখন একটাই দাবি পদত্যাগ করতে হবে প্রধানমন্ত্রী ওলি’কে। কিন্তু এক বিবৃতিতে তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু ক্ষোভের আগুন কিছুতেই প্রশমিত হয়নি। কারফিউ ভঙ্গ করে বিভিন্ন শহরে নেমে পড়েছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ওলি’র পদত্যাগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে প্রভাবশালী পত্রিকা কাঠমান্ডু পোস্ট।

অনলাইন এনডিটিভি বলছে, এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষি বিষয়ক মন্ত্রী সহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাউডেলের বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে।  আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে মন্ত্রী আরজু রানা দেউবা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখাকের বাড়িতে। জ্বলছে যোগাযোগ বিষয়ক মন্ত্রী পৃথ্বি শুভ গুরুংয়ের বাসভবন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচণ্ডের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। এর বাইরে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।

কাঠমান্ডু পোস্ট আরও বলছে, সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে ১৯ তরুণ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর থেকেই এ আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করে। এ ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে দুর্নীতি ও কুশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ সড়ক বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি ও বড় বড় রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। কাঠমান্ডু উপত্যকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। অশান্তি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।

mzamin

নেপালে বাংলাদেশের স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে by কে. এম. সীথি

দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক গণ-অভ্যুত্থান দেখা গেছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার আরাগালয় (জনতার সংগ্রাম) আন্দোলন একজন প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেয়।

২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র জনতার আন্দোলন কয়েক দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটায়। পাকিস্তান রাস্তায় সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে টলতে থাকে। আর এবার পালা নেপালের।

হিমালয়ান প্রজাতন্ত্র নেপাল কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতার মুখে পড়েছে। কাঠমান্ডু ও অন্যান্য বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে প্রবল বিক্ষোভের ঝড়। এর নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেনারেশন জেড বা জেন-জি।

দুর্নীতি, ব্যর্থ শাসন এবং হঠাৎ করে ডিজিটাল স্বাধীনতার ওপর হামলার মিশ্রণ এই আন্দোলনের জ্বালানি। সেখানে এ পর্যন্ত ১৯ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শত শত মানুষ। সেনাবাহিনী এখন রাস্তায়।

ধারণা করা হচ্ছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে। শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড ভাঙছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। এমনকি সংসদ ভবনের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছে।
এসব দৃশ্য পুরো অঞ্চলকে নাড়া দিয়েছে। নেপাল নামের যে দেশটিকে বাইরে থেকে অনেকেই শান্ত একটি পর্যটন স্বর্গ বলে ভাবেন, আজ সে দেশ গণবিপ্লবের ময়দানে পরিণত হয়েছে।

এই অস্থিরতার স্ফুলিঙ্গ ছিল সরকারের একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তটি হলো দুই ডজনেরও বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব আর এক্স (আগের টুইটার) এক রাতেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেবল টিকটক টিকে ছিল, কারণ তারা সরকারের নিবন্ধন নীতি মেনে নিয়েছিল। সরকারের ব্যাখ্যা ছিল—বিধি লঙ্ঘন, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও অনলাইন অপব্যবহারের কারণে এগুলো বন্ধ করা হয়েছে।

কিন্তু তরুণ নেপালিদের কাছে এটি ছিল স্রেফ সেন্সরশিপ। তাঁরা এটিকে নিজেদের মতপ্রকাশ, সংগঠন গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল যুগে বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছেন।

শুরুতে নির্দিষ্ট স্থানে সমাবেশ হলেও দ্রুত তা গণমিছিলে রূপ নেয়। এটি ছড়িয়ে পড়ে কাঠমান্ডু, পোখারা, বিরাটনগর ও ভরতপুরে। আন্দোলনকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে দেন। সরকারি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এমনকি সংসদ ভবনও আক্রান্ত হয়।

কঠোর দমননীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র এসবের জবাব দিয়েছে। রাস্তায় গুলি ছোড়া হয়েছে। রাবার বুলেট আর টিয়ারগ্যাসে বাতাস ভরে গেছে। লাঠিপেটায় বহু মানুষ রক্তাক্ত হয়েছে।

সরকারি বাহিনীর ধরপাকড়ের পর হাসপাতালে শয্যা ফুরিয়ে গিয়েছিল, কারণ আহতদের ভিড় সামলানো যাচ্ছিল না। কারফিউ আর রাস্তা অবরোধে এখনো পাড়া-মহল্লা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে সেনা নামানো হয়েছে।

তবুও প্রতিবাদ থামেনি। বরং তা আরও বড় হয়েছে। আরও ক্ষুব্ধ হয়েছে—যেন তরুণ প্রজন্ম বিশ্বাস করে বসেছে, সরকার কেবল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার জন্যই তাদের ওপর দমন চালাচ্ছে। যা শুরু হয়েছিল ডিজিটাল অধিকারের দাবিতে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

ক্ষমতাসীন অভিজাতরা ভেবেছিলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করলেই বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তার উল্টোটা হয়েছে। এটাই তরুণদের জন্য হয়ে উঠেছে স্লোগান ও সংগ্রামের ডাক।

‘দুর্নীতি বন্ধ করো, সামাজিক মাধ্যম নয়’—এটিই এখন আন্দোলনের মূল স্লোগান। এটি প্রকৃত ক্ষতকে সামনে এনেছে। সেই ক্ষতটি হলো, দশকের পর দশক ধরে নেপালের রাজনীতিকে গ্রাস করা দুর্নীতি আর দায়মুক্তির সংস্কৃতি।

নেপালের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীলতা ও কেলেঙ্কারিতে ভরা। সরকার গড়া ও ভাঙা যেন এক অন্তহীন খেলা। জোট ভেঙে যায় তুচ্ছ প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। নেতারা সহজেই দলবদল করেন। কিন্তু যে জিনিস কখনো বদলায় না, তা হলো দুর্নীতির কালো ছায়া।

শুধু ২০২৫ সালেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ বিষয়ক মন্ত্রী ঘুষের অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন। এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।

বিমানবন্দর নির্মাণে জালিয়াতি, নেপাল টেলিকমে অর্থ আত্মসাৎ, অভিবাসন দপ্তরে চাঁদাবাজি—এসব কেলেঙ্কারিতে রীতিমতো তোলপাড় হয়েছে। স্বর্ণ চোরাচালান ও শরণার্থী প্রতারণা কেলেঙ্কারিতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখেছে, বড় নেতাদের আসলে কোনো সাজা হয় না। সেখানে দেখা যায়, তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়, নিচুতলার কর্মীরা শাস্তি পান, অথচ ক্ষমতাবানরা বেঁচে যান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনীতিকদের সন্তানদের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাক-গয়না প্রদর্শনের ছবি ভাইরাল হয়েছে। তাঁদের ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে—‘নেপো কিডস’। #NepoKids এবং #PoliticiansNepoBabyNepal হ্যাশট্যাগ সেখানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

একটি তীব্র তুলনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে—‘তাদের সন্তানরা গুচির ব্যাগ নিয়ে ফেরে, আমাদের সন্তানরা কফিনে ফেরে।’

এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সেই বাস্তবতা: নেতাদের সন্তানরা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরে দামি পণ্যের ঝাঁপি নিয়ে, আর সাধারণ পরিবারের সন্তানরা অসুরক্ষিত প্রবাসী শ্রমের শিকার হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে কফিনে লাশ হয়ে ফেরে।

এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি জনআস্থাকে ভেঙে চুরমার করেছে। অর্থনীতি তীব্র ধাক্কা খেয়েছে। নেপালিরা কর দেন, কিন্তু এর বিনিময়ে সড়ক, হাসপাতাল, স্কুলের উন্নতি পান না। মন্ত্রীরা কেবল নিজেদের পকেট ভারী করেন।

তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হওয়া কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ঘটনা নয়, এটি জনগণের চোখে ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত শ্রেণির অপরাধ ঢাকার নতুন কৌশল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই ছিল সেই মঞ্চ, যেখানে তরুণেরা নেতাদের বিরুদ্ধে ‘ডিজিটাল ট্রায়াল’ চালাতেন। মিম, ভিডিও ও ভাইরাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দুর্নীতি ফাঁস করতেন।

এই প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করার পদক্ষেপ ছিল যেন সেই নৈতিক জবাবদিহিকে শ্বাসরোধ করে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা।

এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে জেন-জি। নেপালে এটাই সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার গোষ্ঠী। এ প্রজন্ম বড় হয়েছে স্মার্টফোন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বৈশ্বিক সংযোগের ভেতর দিয়ে।

কিন্তু তাঁদের অনেকেই দেশে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পর্যটন ও সেবা খাতের সংকুচিত সুযোগের মধ্যে তাঁরা আটকে আছেন অথবা বাধ্য হচ্ছেন অনিশ্চিত গিগ অর্থনীতির কাজে যুক্ত হতে। অন্যরা দেশ ছাড়ছেন, যোগ দিচ্ছেন সেই প্রবাসী শ্রমিকদের দলে, যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স নেপালের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

এই রকম একটা সময়ে জেন-জি সেই হতাশাকে আন্দোলনে রূপ দিল। তাঁরা মিম, হ্যাশট্যাগ আর নাটুকা স্কিট ব্যবহার করে দুর্নীতিকে তুলে ধরলেন এক প্রজন্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে।

তাঁরা এনক্রিপটেড চ্যাট আর অফলাইন নেটওয়ার্কে মিছিল সংগঠিত করলেন। আন্দোলনে দেখা গেল এমন সব প্ল্যাকার্ড, যেগুলো সরাসরি ভাইরাল পোস্ট থেকে অনুপ্রাণিত। অনলাইন আর অফলাইনের সীমারেখা একেবারে ঝাপসা হয়ে গেল। যে প্ল্যাটফর্মগুলো আগে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের জায়গা ছিল, তার সম্প্রসারণ হয়ে উঠল রাজপথ।

এই আন্দোলন ছিল নেতাবিহীন। কোনো দল বা ব্যক্তি এর মালিকানা দাবি করতে পারেনি। এটা ছিল সচেতন কৌশল। নেপালে রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্নীতি আর সুযোগসন্ধানীর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই দলীয় সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে তরুণেরা তৈরি করল এক বিবেক-নির্ভর আন্দোলন। সেই আন্দোলনের মূল বক্তব্য হলো—‘ক্ষমতা দখলের জন্য নয়’।

তাঁরা কৌশল আর অনুপ্রেরণা নিয়েছেন শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলন থেকে, যেখানে যুবকেরা প্রতিষ্ঠিত অভিজাতদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। নেপালে এই আন্দোলন নীতি বা নীতিমালার চেয়েও বেশি মর্যাদার প্রশ্নে দাঁড়িয়েছে। এটা মূলত এক রাষ্ট্রের কাছে সম্মান দাবি, যে রাষ্ট্র তাঁদের সব সময় অবাধ্য শিশু হিসেবে দেখেছে।
তবে ঝুঁকিও আছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ডিজিটাল ট্রায়াল’ অনেক সময় পক্ষপাত আর ভুয়া তথ্য ছড়ায়। আর রাগ-ক্ষোভ যে বাস্তব সংস্কারে রূপ নেবে তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু যা স্পষ্ট তা হলো—একটা পুরো প্রজন্ম আর নেতাদের পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে না। তাঁরা নিজেরাই পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার এখন এমন এক ঝড়ের কেন্দ্রে, যেটা তারা সামলাতে পারছে না। প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত উল্টো বিপর্যয় ডেকে এনেছে। দুর্নীতির কেলেঙ্কারি জনরোষকে আরও তীব্র করেছে।

সহিংস দমননীতিতে শিক্ষার্থীরা শহীদে পরিণত হয়েছে, প্রজন্মের বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। ইতিমধ্যেই মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেছেন। একের পর এক জরুরি কেবিনেট বৈঠক হচ্ছে। এমনকি উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির মামলাগুলোতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার বিভাগও এখন তীব্র সমালোচনার মুখে।

অনেক নেপালির কাছে রাষ্ট্র আর তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে এক অভিজাত ক্লাব—যারা জবাবদিহির বাইরে, শোনার চেয়ে চুপ করিয়ে দেওয়াতেই বেশি আগ্রহী। এ কারণেই রাজতন্ত্রপন্থী সমাবেশ আবারও মাথা তুলছে।

সাংবিধানিক পরিবর্তনের দাবি ফিসফিস করে শোনা যাচ্ছে। ওলির সরকার কেবল কর্তৃত্বকে নয়, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিটুকুকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
যদি দমননীতি চলতেই থাকে, তবে অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ইতিমধ্যেই টলে গেছে। নেপালের প্রাণরেখাখ্যাত পর্যটন খাত হুমকির মুখে। প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। নেপালের এই আন্দোলনে ভারতও শঙ্কিত। কারণ ইতিহাসে দেখা গেছে, নেপালের অস্থিরতা অনেক সময় সীমান্ত ছাপিয়ে যায়। শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের প্রতিধ্বনি এখানে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

মৃত্যুর সংখ্যা যত বাড়বে, নেপালের তরুণ আন্দোলন ততই তীব্র হবে। এটা নিঃসন্দেহে এক প্রজন্মের বিদ্রোহ—দুর্নীতি, বঞ্চনা আর দমননীতির বিরুদ্ধে। এ বিদ্রোহ শাসক শ্রেণিকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—‘যে রাজনীতি এত দিন চলে আসছিল, তার অবসান হয়েছে।’

রাষ্ট্রের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। হয় তারা নিষেধাজ্ঞা, গুলি আর ঘুষের নীতি আঁকড়ে ধরতে পারে যা কিনা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভাঙবে। অথবা তারা সংলাপের দরজা খুলতে পারে, সেন্সরশিপ তুলে নিতে পারে, আর সত্যিকারের সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতির মোকাবিলা করতে পারে।

সরকার কোন পথ বেছে নেবে তার ওপরই নির্ভর করছে—২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর কেবল আরেকটি অস্থিরতার অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে, নাকি এটি হবে নতুন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা।

পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই একটা স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কায়, বাংলাদেশে, আর এখন নেপালে—তরুণ প্রজন্মই ব্যর্থ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। যে সামাজিক মাধ্যমকে একসময় তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো, সেটাই হয়ে উঠেছে সংগঠন, দুর্নীতি ফাঁস আর বিদ্রোহের হাতিয়ার।

সরকারগুলো যখন একে বন্ধ করতে চেয়েছে, তখন তারা আবিষ্কার করেছে—দমননীতি কেবল বিদ্রোহকেই উসকে দেয়।

অঞ্চলের পুরোনো অভিজাত শ্রেণিকে এখন সতর্ক হতে হবে। তারা চাইলেই এই জোয়ার থামাতে পারবে না। নতুন প্রজন্ম ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়ছে—আর তারা চুপচাপ ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা রাখে না।

* কে. এম. সীথি, মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কেরালা) ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ অ্যান্ড এক্সটেনশন (আইইউএসএসআরই)-এর পরিচালক
- ইউরেশিয়া রিভিউ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

কাঠমান্ডুতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ। এতে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়।
কাঠমান্ডুতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ। এতে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়। ছবি: এএফপি