Thursday, July 31, 2014

দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আ'লীগ: ফখরুল

বিএনপি শার্ন্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিতে চায় কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকার সংলাপের পথ বন্ধ করে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অতীতের আন্দোলনে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এবারের আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।
বিএনপির মূখপাত্র বলেন, সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা হলে ভালো হয় অন্যথায় আন্দোলনের বিকল্প কোন পথ নেই। আন্দোলনের মাধমেই দাবি আদায় করা হবে। অতীত আন্দোলনের ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি বলেন, এবার তীব্র আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনা হবে। ফখরুল বলেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপি দল মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী পেশার জনগণকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে সরকার পতনের কর্মসূচি দিবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী দিনের আন্দোলনকে ঘিরে এবার ঢাকা মহানগরকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

Wednesday, July 30, 2014

ইসরাইলি অবরোধ না তোলা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে: হামাস

যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে কায়রোতে ফিলিস্তিনি নানা পক্ষের বৈঠকের আগ মুহূর্তে ইসরাইলের সাথে কোন ধরনের যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছেন হামাসের সামরিক বিভাগের কমান্ডার। একটি বেশ কঠোর বার্তায় মোহাম্মদ দিইফ বলেন, ইসরাইলি হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এবং ফিলিস্তিনি সীমান্তে ইসরাইলি অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তাদের যুদ্ধ চলবে।
খবর বিবিসি বাংলার। আগ্রাসন বন্ধ না হলে কোন ধরনের যুদ্ধবিরতি তার যোদ্ধারা মেনে নেবে না এমন মন্তব্য করে মোহাম্মদ দিইফ বলেন, তার যোদ্ধারা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। ওদিকে গাজায় ইসরাইল তার বোমা হামলা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে খবর আসছে। গাযায় গত ২৪ ঘণ্টায় একশর বেশি বেসামরিক নাগরির নিহত হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ২৩ দিনের হামলায় ১২শর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর একটি বিশাল অংশ শিশু। এর বাইরে আরো সাত হাজারের মতো মানুষ আহত হয়েছে। গাযার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে প্রায় দুলক্ষ নাগরিক তাদের আশ্রয়ে রয়েছে। ঘরছাড়া এই মানুষদের সাহায্য দিতে সেখানে জাতিসংঘের রসদ ফুরিয়ে আসছে। জাতিসংঘ বলছে ইসরাইলকে দুলক্ষ মানুষের ঘরছাড়া হওয়ার দায়ভার নিতে হবে।

Tuesday, July 29, 2014

ঈদের দিনেও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৮ শিশুসহ নিহত ১০

হামাস ঘোষিত অস্ত্রবিরতি ও সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘের আহ্বান সত্ত্বেও ঈদের দিন গাজায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে আট শিশুসহ নিহত হয়েছে ১০ জন। সোমবার শহরের একটি খেলার মাঠে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ওই শিশুরা নিহত হয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলি জঙ্গিবিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করা হয় বলে গাজার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কাছাকাছি সময়ে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র গাজার প্রধান হাসপাতাল শিফার প্রাঙ্গণে একটি ভবনে আঘাত হানে। তবে  ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা এসব হামলার কথা অস্বীকার করে বলেছে, খেলার মাঠে আঘাত হানা ক্ষেপনাস্ত্রটি গাজা থেকে নিক্ষেপের সময় বিস্ফোরিত হয়। শিফা হাসপাতালের কাছে বিস্ফোরিত ক্ষেপনাস্ত্রটিও ফিলিস্তিনি, যেটা গাজা থেকে ইসরায়েলে নিক্ষেপের চেষ্টার সময় ভুলক্রমে হাসপাতালে গিয়ে পরে। ইসরায়েলে গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গাজার কাছে ইসরায়েলেরে এশকল অঞ্চলে মর্টার হামলায় তিন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে।
সোমবার সকালে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আশকালন লক্ষ্য করে গাজা থেকে ছোঁড়া এক রকেট হামলার জবাবে ইসরায়েল আবার হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল পিটার লারনার হামলা শুরু করার জন্য হামাসের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে আগ্রহী হলেও হামাস আগ্রহী নয়। অন্যদিকে, হামাসের মুখপাত্র ইহাব-আল ঘুসেইন বলেছেন, গাজা সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে শান্তি আসবে না। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার অধিকার, সীমান্ত খুলে দেওয়া এবং অবরোধের অবসান ঘটিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আহ্বান জানিয়েছে হামাস। গত ৮ জুলাই থেকে চালানো ইসরায়েলি হামলায় এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রোববার রাতে অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

Monday, July 28, 2014

সাব্বাশ হামাস!! সাব্বাশ ফিলিস্তিন!! by ফরহাদ মজহার

এক.
এ লেখা যখন লিখছি তখন গাজায় নয়দিনে ইসরাইলের বোমা হামলায় কমপক্ষে ২২৬ জন মারা গিয়েছে, আহত হয়েছে ১৬৮৫। এদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে রয়েছে শিশু ও নারী। সারে সারে কফিন দিয়ে মোড়ানো শিশুদের লাশ সারা দুনিয়ায় মানুষের বিবেককে আহত ও সংবেদনা জাগ্রত করেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। মানুষ নিন্দা জানাচ্ছে নানান ভাবে। বাংলাদেশ ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু ‘গাজায় হত্যা বন্ধ কর’, ‘শিশু হত্যা বন্ধ কর’, ‘Stop Killing in Gaza’, ‘Stop Killing Children’, এইসব প্লাকার্ড হাতে বাংলাদেশে এবং বিভিন্ন দেশে ভদ্রলোকী শ্লোগান দিয়ে শহরের নিরাপদ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে হাজার চেঁচামেচি করলেও ইসরাইল বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করবে না, করছে না, এবং তাদের বোমা মারাও থামবে না। অতীতেও ইসরাইল তোয়াক্কা করে নি, এখনও করবে না। আজকের খবর হচ্ছে সাময়িক যুদ্ধ বিরতিতে দুই পই সম্মত হয়েছে। কিন্তু সেটা সাময়িক। যুদ্ধ শুরুর আগে ফিলিস্তিনে যে অবস্থা থাকে তাকে এক হিসাবে লম্বা যুদ্ধবিরতি বলা চলে। এই বাস্তবতা মনে রেখেই ফিলিস্তিনের আলোচনা করতে হবে।
ফিলিস্তিন ও সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে তাকে সরলীকরণ করে বোঝার চেষ্টা বোকামি। কিন্তু সাধ্য মতো চেষ্টা করা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীর কোন প্রকট প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে না ঘটলেও তার প্রভাব গভীর। বাংলাদেশ বিশ্বসভা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। বাংলাদেশের আগামি দিনের রাজনীতি নানা ভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীর দ্বারা প্রভাবিত হবে। আগামি আলোচনার সূত্র হিসাবে আজ শুধু কিছু বিষয় উত্থাপন করে রাখব। গাজায় ইসরাইলী হামলার যারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, তাদের প্রতি সংহতি জানানোই মূল উদ্দেশ্য। সেটা করতে গিয়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি আমাদের একাত্মতার জায়গাটুকু খানিক সাফ করে রাখবার চেষ্টা করব।
এটা পরিষ্কার যারা প্লাকার্ড হাতে প্রতিবাদ করছেন তারা তাঁদের ব্যক্তিগত বিবেকের তাড়া থেকে করছেন। ব্যক্তির দায়বোধ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে এর বেশী কিছু করার আছে কিনা সেটা এই দায়বোধে রাস্তায় প্লাকার্ড ও ব্যানার হাতে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে ভাববার একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটাও কম নয়। নিদেন পক্ষে  ফিলিস্তিন নিয়ে আমাদের আরো গভীর ভাবে ভাববার উৎসাহ বাড়বে।
তবে জেনে হোক বা না জেনে হোক, যখন আমরা শুধু শান্তি, অস্ত্র বিরতি, ও সদর্থে হত্যার নিন্দা করি, তখন আমরা ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তি সংগ্রামের বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত সশস্ত্র যুদ্ধকে ‘ক্রিমিনালাইজ’ করার শর্ত তৈরি করি। শান্তি, অহিংসা ও যুদ্ধ বিরতির কথা বলে বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেও অনেক ভদ্রলোকী বয়ান ছিল। তাদের কথা শুনলে আমরা আজও পাকিস্তানের উপনিবেশ থাকতাম। ইসরাইলের বোমা হামলা ও হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করলেও, হামাসসহ ফিলিস্তিনীদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমরা নীরব। অথচ দরকার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি একাত্মতা জানানো। সেই যুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের সম্পর্কে আমাদের অনেক ভুল ধারণা আছে। পাশ্চাত্য প্রচার প্রপাগান্ডার শিকার হয়ে আছি অনেকেই। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। আপাতত মনে রাখা দরকার হামাস গাজায় গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব। দুই হাজার সাত সাল থেকেই হামাস গাজার নির্বাচিত প্রতিনিধি। ফিলিস্তিন পার্লামেন্টে ২০০৬ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে হামাস আল ফাতাহকে পরাজিত করে। সেই থেকে তারাই কর্তৃত্বের আসনে আছেন।
এ কারণে ইসরাইল ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষক রাষ্ট্রগুলোর মানদণ্ড দিয়ে হামাসকে বিচার করা যাবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, জর্দান ও ইউরোপের অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র ছাড়া হামাসকে নেতিবাচক ভাবে অন্য কেউ দেখে না। তাদের মধ্যে চিন, রাশিয়া, তুরস্ক ছাড়াও অনেক আরব দেশ রয়েছে। ফিলিস্তিনী জনগণ কিভাবে কাদের নেতৃত্বে তাদের ন্যায়সঙ্গত লড়াই চালিয়ে যাবে সেটা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তারপরও হামাসের সমালোচনা হতে পারে। অবশ্যই। কিন্তু যারা ইসরাইলের নিন্দা করছেন তারাই আবার ইসরাইলী প্রপাগান্ডার কারণে হামাসকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন বলছেন। তারা আসলে গাজার ফিলিস্তিনীদেরই মূলত সন্ত্রাসী বলছেন, কারণ এই ফিলিস্তিনীরাই হামাসকে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হিসাবে মেনে নিয়েছে। ফিলিস্তিনীরা জাতিগত ভাবেই ‘সন্ত্রাসী’ সেটা ইসরাইলের প্রচার। হামাসকে সন্ত্রাসী বলা মানে ইসরাইলী প্রচারে সায় দেওয়া। সেই প্রচারে সায় দিয়ে গাজায় বোমা হামলা ও শিশু হত্যার নিন্দা তামাশা হয়ে যায়। যারা মরছে তারা তো ইসরাইলের যুক্তি অনুসারে ‘সন্ত্রাসী’ আর ইসরাইল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত বোমা হামলা চালাচ্ছে। স্ববিরোধী অবস্থান নিয়ে গাজার হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ঠিক কিনা সেটা সবাইকে ভেবে দেখতে বলব।
আসলে এ লড়াইকে জায়নবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুগের ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’ হিশাবে বুঝতে না পারলে আমরা মারাত্মক ভুল করব। বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতাও আমরা ধরতে পারব না।
আমরা উপনিবেশ সম্পর্কে জানি। কারণ আমরা ইংরেজের অধীনে ছিলাম। ইংরেজ আমাদের রাজনৈতিক ভাবে পরাধীন করেছিল সম্পদের লোভে। সেটা স্রেফ লুণ্ঠন যেমন তেমনি আইন করে জমি থেকে খাজনা পাওয়া থেকে শুরু করে, এই উপমহাদেশকে তাদের পণ্যের বাজারে পরিণত করা ইত্যাদি ছিল সেই উপনিবেশের কিছু দিক। আমাদের শ্রম শক্তিও তারা শোষণ করেছে। সাম্রাজ্যবাদের এই রূপটা আমাদের চেনা। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় ইউরোপের সাদা মানুষেরা গিয়ে যখন পুরা মহাদেশ তাদের দখলে নিয়ে নিল, তখন তারা ইংরেজের মতো শুধু ঔপনিবেশিক সম্পর্কের ভিত্তিতে শোষণ করে নি। সেই মহাদেশের আদি অধিবাসীদের অধিকাংশকেই তারা নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। বহু জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এখনও যারা বেঁচে আছে তাদেরকে তারা তাদের নির্দিষ্ট জায়গাতে বন্দিশালার মতো ‘রিজার্ভ’ বানিয়ে অদৃশ্য করে রেখেছে। সেইসব দেশে ইউরোপীয়রা শুধু ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে নি, দেশ দখল করে নিয়ে নিজেরাই সেখানে বস্তি গেড়ে বসেছে। পুরা মহাদেশ তাদের দখলে নিয়ে নিয়েছে তারা। যেসব জাতি ধ্বংস ও বিলুপ্ত হয়েছে তাদের কথা আমরা খুব একটা শুনি না। যারা এখনও ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে সেই জাতিগুলো বিলুপ্তির পথে।
এই যে স্থানীয় অধিবাসীদের উৎখাত ও হত্যা করা এবং করতে না পারলে রিজার্ভে রেখে দেওয়া আর পুরা দেশ, মহাদেশ বা ভূখণ্ড দখল করে নেওয়া একেই বলা হয় ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’। এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা আছে। পাঠকদের জন্য আপাতত এই তথ্যটুকুই যথেষ্ট। উপনিবেশ স্থাপন করে বিলাতে বসে শোষণ লুণ্ঠন আর স্থানীয় অধিবাসীদের উৎখাত করে নিজেরা বসতি স্থাপন করার উপনিবেশ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। আমাদের অভিজ্ঞতায় সেটা নাই বলে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’-এর ভয়াবহতা আমরা বুঝতে পারি না। যে কারণে ফিলিস্তিনীদের লড়াইয়ের মর্ম বুঝতেও আমরা অধিকাংশই অক্ষম। ইহুদিদের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে অতি দরদী হয়ে যারা ইসরাইলের পাবলম্বন করার অর্থ সেটলার কলোনিয়ালিজমের পক্ষে বলা। এই ধরনের উপনিবেশীকরণের যারা শিকার তারা যখন সেই ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে জানপরান লড়ে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য আমরা বুঝি না। বুঝি না বলেই তাদের ন্যায়যুদ্ধকে অতি অনায়াসে ‘সন্ত্রাস’ বলতে আমাদের বাঁধে না।
ইউরোপ থেকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা যখন পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় ফিলিস্তিনীদের ভূমি দখল করে নিল আর সেটাকেই তাদের ভূখণ্ড দাবি করে ফিলিস্তিনীদের তাড়িয়ে দিল সেটা অবশ্য নতুন ধরনের সেটলার কলোনিয়ালিজম। কারণ সেটা সম্ভব হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রত্য সহায়তায়। অতীতের সেটলার কলোনিয়ালিজমের সঙ্গে এখানে তার পার্থক্য আছে। ফিলিস্তিনীদের তাহলে শুধু ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়লে হচ্ছে না, সেটলার কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়ে উঠেছে। এ এক অসম ও অসম্ভব যুদ্ধ। আর সে কারণেই অতীতের যে কোন গণযুদ্ধের চেয়ে ফিলিস্তিনীদের লড়াই মানবেতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও দুনিয়ার সকল মানুষের ঐতিহাসিক অভিমুখ নতুন করে নির্ণয়ের লড়াই।
এরপর রয়েছে জায়নিজম (zionism) বা জায়নবাদ। প্রথমত বুঝতে হবে জায়নবাদ হচ্ছে ইহুদি জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ থেকে সে আলাদা কিছু না। জায়নবাদীরাও তাদের সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামই বলে। ইউরোপে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত ইহুদিদের পক্ষে দাঁড়ানো ও তাদের অধিকারের জন্য লড়াই সে কারণে ন্যায্য। কিন্তু নিপীড়িত জনগোষ্ঠির পক্ষে দাঁড়ানো আর জায়নবাদের পক্ষে দাঁড়ানো এক কথা নয়।
জাতীয়তাবাদ তার আত্মপরিচয়কে ভূমিসংশ্লিষ্ট দেখে। মাতৃভূমি জাতীয়তাবাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিরাও সেই অনুপ্রেরণায় নিজেদের জন্য একটি বাসভূমি (homeland) বা দেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু ইহুদিরা দীর্ঘকাল ধরেই বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করছে। নিজ বাসভূমির বাস্তবায়নের কথা ভাবতে গিয়ে তারা দাবি করতে শুরু করে এক কালে বহু হাজার বছর আগে তারা প্যালেস্টাইনে বাস করত। অতএব প্যালেস্টাইনের ভূখণ্ডের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে। এই দাবিতে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সহযোগিতায় তারা ফিলিস্তিন দখল করে সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। আধুনিক কালের জাতীয়তাবাদী যুগেই ইহুদি জাতীয়তাবাদ বা জায়নবাদের উদ্ভব, বিকাশ ও শক্তিবৃদ্ধি।
জায়নবাদ কথাটা আমরা শুনি, কিন্তু অধিকাংশই বুঝি না ব্যাপারটা আসলে কী। অন্যের ভূখণ্ড দখল করা ও সেই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসীদের বিতাড়িত করবার পক্ষে যুক্তি লাগে। তো জাতিবাদী ইহুদিরা দাবি করে তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী আল্লাহর সঙ্গে তাদের একটা চুক্তি হয়েছে, সেই চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের একটি ভূখণ্ড আল্লাহ শুধু তাদের জন্যই বরাদ্দ করেছেন। সেটাই ইসরায়েল। তো এই ভূখণ্ডে তাদের বসতি স্থাপন ও একটি আধুনিক রাষ্ট্র বানাতে দিতে হবে। সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় তারা তাই করেছে।
জায়নবাদীরা এটাও দাবি করে বনী-ইস্রাইল বা ইহুদিরা বিশেষ একটি ‘জাতি’ এবং এই জাতিকে আল্লাহ ‘বিশেষভাবে মনোনীত’ করেছেন। আল্লাহ তাদের বিনা শর্তে ইহকালে এবং পরকালের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অন্য যে কোন জাতির চেয়ে তারা শ্রেষ্ঠ এবং অন্যান্য জাতি তাদের তুলনায় হীন। ফলে, অন্যসকল মানুষের চেয়ে তাদের মর্যাদা আলাদা। পাপ-পুণ্যের হিসাবও তাদের জন্য আলাদা। ইহুদিরা ছাড়া অন্য কেউই আল্লাহর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। শুধু জন্মসূত্রে ইহুদি হবার কারণেই তারা যা কিছুই করুক না কেন পরকালের সকল পুরষ্কার শুধু তাদেরই প্রাপ্য। তারা সুদ খাক, পাপ করুক কিম্বা অন্যের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করুক তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর শাস্তির বিধানও আলাদা।
বলাবাহুল্য, আল্লাহর সঙ্গে কোন জাতির এরকম চুক্তি হয়েছে, কিম্বা আল্লাহ কোন বিশেষ জাতিকে অন্য সকল মানুষকে বাদ দিয়ে বিশেষ কোন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন  এটা ধর্মতত্ত্ব হিসাবে থাকতেই পারে। তার ভাল মন্দ বিচারও ভিন্ন বিষয়। তাছাড়া একই কথার ভিন্ন মানে বা ভিন্ন ব্যাখ্যাও হতে পারে। আর এমন অনেক গোঁড়া ইহুদিও আছেন যারা জাতীয়তাবাদী বা জায়নবাদী ইহুদির সঙ্গে মোটেও একমত নন। হজরত মুসার অনুসারী হওয়া আর জাতীয়তাবাদী ইহুদি হওয়া এক কথা নয়। মুশকিল হচ্ছে এ চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প হিসাবে জায়নবাদীরা আরব ভূখণ্ডে বাস্তবায়িত করেছে। ফলে এক দুঃসহ নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। ইসরাইল সেই পরিস্থিতিকে বারবারই অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।
তাহলে বুঝতে হবে জায়নবাদ আর জাতীয়তাবাদ একই কথা  সেটা বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হোক কিম্বা হোক মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্য যে কোন নামের জাতীয়তাবাদ। বাঙালি বা বাংলাদেশী বলে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চিরকালীন ও অবিচ্ছেদ্য  এই মতাদর্শ জায়নবাদ থেকে আলাদা কিছু নয়। আধুনিক ও তথাকথিত সেকুলার কালে জায়নবাদে জাতীয়তাবাদের এই ধর্মীয় রূপটাই আমরা প্রত্যক্ষ করি। পার্থক্য হচ্ছে জায়নবাদ দাবি করে, আল্লাহর সঙ্গে ইহুদি জাতির একটা ‘চুক্তি’ হয়েছে, অতএব ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতিসত্তার পূর্ণ বিকাশের জন্য ইহুদিদের নিয়ে একটি ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করতেই হবে, এর বিরুদ্ধে কোন ইহলৌকিক বা সেকুলার যুক্তি খাটবে না। অন্য কোন ধর্মের যুক্তিও খাটবে না। আমরা ধর্মের যুক্তি দেই না। কিন্তু বলি যে আমরা বাঙালি জাতি। অতএব বাঙালি জাতি হিসাবে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আমাদেরই একমাত্র অধিকার। জাতি হিসাবে আমাদের একটি জাতিবাদী রাষ্ট্র দরকার  এর গায়ে ধর্মের পোশাক না থাকলেও জাতীয়তাবাদের জোর ধর্ম বিশ্বাসের মতোই।
ধর্মগ্রন্থের কাহিনী অনুযায়ী ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে যারা দাঁড়ান, তারা মূলত জায়নবাদেরই সমর্থক। জায়নবাদের যুক্তি মেনে নিলে হিন্দুর জন্য একটি হিন্দু রাষ্ট্র, মুসলমানদের জন্য মুসলমান বা ইসলামি রাষ্ট্র, খ্রিস্টানদের জন্য খ্রিস্টান রাষ্ট্র, বৌদ্ধদের জন্য বৌদ্ধ রাষ্ট্র এই সবের পক্ষে একই সঙ্গে দাঁড়ানো হয়। মুখে বলি আর না বলি, ধর্মগ্রন্থে থাকুক বা না থাকুক, জায়নবাদ অন্য সকল ধর্মের জায়নবাদী দাবিকেই ন্যায্য করে তোলে। একই সঙ্গে একটি ভূখণ্ডের সঙ্গে একটি জাতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের জাতীয়তাবাদী বয়ানকেও বটে।
আরো নানান কারণ ছাড়াও জাতীয়তাবাদ ভয়াবহ জিনিস। এর মধ্যে কমিউনিস্টদের জাতীয়তাবাদ হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চরিত্রের। সশস্ত্র হোক কি নিরস্ত্র কমিউনিস্ট যে কোন নিপীড়িত জাতীর মুক্তি সংগ্রামকে নিঃশর্ত সমর্থন করে, কিন্তু কোন প্রকার কাল্পনিক ‘জাতি’ বা ‘জাতীয়তাবাদ’কে প্রশ্রয় দেয় না। বিভিন্ন দেশে কমিউনিজমের বারোটা বাজাবার ক্ষেত্রে এদের অবদান অসামান্যই বলতে হবে।

দুই.
চল্লিশ দশকের শেষ দিকে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অবশিষ্ট গুলোর পরিসমাপ্তি ঘটতে শুরু করে। আমাদের এ অঞ্চলে সাতচল্লিশ সালে ইংরেজ শাসনের অবসান যেমন। কিন্তু আশ্চর্য যে একই সময়ে সাম্রাজ্যবাদ নতুন কিসিমের উপনিবেশ বানাতে শুরু করে। নতুন ধরনের ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’। তারা ইউরোপ থেকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বিতাড়িত করে তাদের জন্য আরব ভূখণ্ডে জবরদস্তি চিরস্থায়ী আবাস বানিয়ে তাকে রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়। আর সেটা করতে গিয়ে ফিলিস্তিনীদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়, তারা দেশান্তরী হয়। বিভিন্ন জায়গায় তাদের আশ্রয় হয় শরণার্থী শিবিরে। এই অপরাধকে ন্যায্যতা দেবার জন্য বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের নির্যাতন ও গণহারে মারাকে (holocaust) অজুহাত হিসাবে খাড়া করা হয়েছে। সাদা মানুষগুলো এর আগে ইউরোপ থেকে গিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ইত্যাদি মহাদেশে বসতি স্থাপন করেছে। সেই মহাদেশের আদি অধিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে মহাদেশগুলো দখল করে নিয়েছে তারা। যাদের হত্যা করতে পারে নি তাদের এখনও রেখে দিয়েছে রিজার্ভে। আফ্রিকা মহাদেশের অনেককে দাস বানিয়েছে তারা। আমেরিকান ইন্ডিয়ান, মায়া, ইনকা ইত্যাদি সভ্যতাকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে তারা। সে ইতিহাস বড়ই নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংস। সেই সকল হোলোকস্টের কথা ভুলে গিয়ে আজ সাম্রাজ্যবাদ শুধু ইউরোপের হোলোকস্টের কথা বলে। শুধু তাই নয়। সকল প্রকার মারণাস্ত্রে জায়নবাদী ইসরাইলকে সজ্জিত করেছে তারাই। সকল প্রকার আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে ফিলিস্তিনীদের নিজ জন্মভূমি থেকে তারা উৎখাতই শুধু করে নি, নির্মম ভাবে হত্যা করছে বছরের পর বছর। আরব দেশগুলোতে টিকিয়ে রেখেছে তাঁবেদার শাসকগোষ্ঠী। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও ফিলিস্তিনীরা তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।
ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা চর্চার (anti-semitism) পরিণতি হিসাবে তাদের নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আবার সেই ইহুদি নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাকেই সাম্রাজ্যবাদ মহিয়ান করতে চায় কেন? কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের স্বার্থ রা করার পেছনে তাদের জ্বালানি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত সন্দেহ নাই, কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে তাদের অতীতের জঘন্য ও ঘৃণ্য অপরাধ লুকিয়ে রাখার মতলব। যেন ইহুদি হোলকস্টের কাহিনী দিয়ে উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকায় সংঘটিত অন্যান্য হোলকস্টের কথা ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ইউরোপের এই সাদা মানুষগুলোই কি আদিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা করে নি? জনগোষ্ঠির পর জনগোষ্ঠিকে কি নিশ্চিহ্ন করে দেয় নি? এই কিছুদিন আগেও কালোদের দড়িতে কি লটকিয়ে মারে নি তারা? পুড়িয়ে হত্যা করে নি? সেই সকল হোলকস্টের কী হোল? তাহলে আমাদের পরিষ্কার বুঝতে হবে দুনিয়ায় ইহুদিরাই একমাত্র নির্যাতীত জাতি নয়, অন্যান্য নির্যাতীত জাতিকে যেভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে তাদের ইতিহাস কি আমরা কি মনে রেখেছি? ইহুদিদের ওপর নির্যাতন নিন্দনীয়। কিন্তু ইহুদি নির্যাতনের কাহিনী দিয়ে মানবেতিহাসের অন্য সকল নির্যাতনকে গৌণ ও অদৃশ্য করে ফেলা মহা অপরাধ।
আমরা ইতিহাস ভুলে যাই। ভুলে যাই তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ বা পাশ্চাত্য সভ্যতার ইঁটপাথরগুলো তৈরি হয়েছে সেইসব মানুষের হাড় দিয়ে যাদের গায়ের রঙ ছিল কালো, বাদামি বা অন্য রঙের। বর্ণবাদ আমাদের নিজেদের কলিজাকে কয়লার কালিতে কালো করে ফেলেছে। তাই যারা ইহুদিদের রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে দাঁড়িয়ে আজ ফিলিস্তিনী জনগণকে সেই রাষ্ট্র মেনে নেবার কথা বলেন, তারা জায়নবাদের পক্ষেই শুধু দাঁড়ান না, একই সঙ্গে তারা বর্ণবাদের পক্ষেও বটে। ফিলিস্তিনী জনগণের সংগ্রাম এই দুইয়েরই বিরুদ্ধে।
অন্য জনগোষ্ঠি নিশ্চিহ্ন হয়েছে, কিম্বা ধুঁকছে তাদের জন্য বরাদ্দ ‘রিজার্ভ’ গুলোতে। কিন্তু ফিলিস্তিনীরা দমে নি। গাজাকে কুখ্যাত প্রিজন হাউস বানাবার পরেও লড়ছে তারা। এই জন্যই আমাদের বলতে হবে, সাবাশ হামাস! গাজা থেকে প্রতিটি রকেট ছোঁড়ার অর্থ সেই সব হোলকস্টের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আমেরিকান ইন্ডিয়ান, মায়া, ইনকা, দাস হিসাবে ধরে নিয়ে যাওয়া আমেরিকায় আফ্রিকার কালো মানুষসহ আরো অগুনতি মানুষ যাদের ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদ মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর।
আমাদের বলতে হবে, সাবাশ ফিলিস্তিন! সাম্রাজ্যবাদী যুগে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে তোমাদের লড়াই। সাম্রাজ্যবাদের হৃদপিণ্ড এখানেই। এর বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া জাতীয়তাবাদ, জায়নবাদ ও পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিলয় ঘটিয়ে দুনিয়ার সকল মানুষের ঐক্য কায়েমের জন্য শর্ত তৈরি অসম্ভব। অন্য কোন শর্টকাট রাস্তা নাই।
দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী ও জায়নবাদী বহুত আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে তারাই নিকৃষ্ট যারা প্রগতির ভান ধরে। জায়নবাদের সবচেয়ে চরম বিকার এদের মধ্যেই আপাদমস্তক দৃশ্যমান হয়। নিজেদের পোষা মতাদর্শের সঙ্গে মিলে না বলে এরাই নিপীড়িত জনগোষ্ঠির ন্যায্য যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়ায়।
এই যুগ ভণ্ড, কাপুরুষ, নিপীড়ক ও জালিম বিশ্বব্যবস্থার ধ্বজাধারীদের যুগ নয়। এই যুগ সৎ, পরিচ্ছন্ন ও সাহসীদের যুগ। যারা কোনপ্রকার দোদুল্যমানতা ছাড়া হুংকার দিয়ে বলতে পারে সাবাশ ফিলিস্তিন। সাবাশ হামাস, সাবাশ দুনিয়ার যে যেখানে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে লড়ছে। লড়বে।
আবারও বলি সাবাশ ফিলিস্তিন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তোমরা আমাদের পাশে ছিলে, সকল জাতীয়তাবাদী ও জায়নবাদী সংকীর্ণতা ছিন্ন করে বাংলাদেশের বীর ছেলেরা তোমাদের জন্য রক্ত দিয়েছে, শহিদ হয়েছে। আমরা তোমাদের পাশে আছি। থাকব।

১৭ জুলাই ২০১৪। ২ শ্রাবণ ১৪২১। শ্যামলী।
farhadmazhar@hotmail.com

ঈদে শুভেচ্ছা ও ‘হুমকিবিনিময়’ by সোহরাব হাসান

ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই খুশি কতটা নিরবচ্ছিন্ন, বলা কঠিন। ঈদের আগে দেশের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদ শুভেচ্ছা-কার্ড বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে পাঠিয়েছেন। এর আগে খালেদা জিয়াও শুভেচ্ছা-কার্ড পৌঁছে দিয়েছেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নয়, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে। শুভেচ্ছাবিনিময়ের সময়ও তিনি জানিয়ে দিলেন যে, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি মেনে নিচ্ছেন না।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে তিনি কার কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি নতুন নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছেন? আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর তো সেই দাবি পূরণের ক্ষমতা নেই। নির্বাচন বা তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা দুটোর ব্যাপারেই তাঁর কথা বলতে হবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। আলোচনা বা আন্দোলন করতে হবে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী মেনেই।
ঈদের আগে দুই নেত্রীর শুভেচ্ছাবিনিময়ের পাশাপাশি দুই দলের মধ্যে কয়েক দফা হুমকিও বিনিময় হয়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসন ঈদের পর কঠোর আন্দোলন হবে বলে আগাম ঘোষণা দিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন ওমরাহ পালন করতে। সেখানে সাড়ে চার বছর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা হয়, যিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানও বটে। দলের নেতারাও নাকি জানেন না রাজনীতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কী কথা হয়েছে।
দেশের মানুষ কঠোর আন্দোলনের কথা শুনলেই শঙ্কিত হয়। ২০১৩ সালটি জুড়ে তারা কঠোর আন্দোলনের স্বরূপ দেখেছে। কঠোর আন্দোলন মানে হরতাল-অবরোধ। আন্দোলন মানে বাসে-ট্রেনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা। বোমা-ককটেল মেরে মানুষ হত্যা।
অন্যদিকে আন্দোলন দমনের নামে চলে পুলিশ-র্যাবের ঝটিকা অভিযান। ব্যাপক ধরপাকড়। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন। একটি বোমাবাজকে বমাল ধরতে না পারলেও হাজার হাজার মানুষকে আসামি করে মামলা দায়ের। গ্রেপ্তার বাণিজ্য।
বিএনপির আন্দোলনের হুমকির জবাবে আওয়ামী লীগের নেতারাও পাল্টা রণহুংকার ছেড়েছেন। কেউ বলছেন, যত গর্জে তত বর্ষে না। বিএনপি পাঁচ বছরে কিছু করতে পারেনি, এখনো পারবে না। কেউ বলছেন, বিএনপিকে মাঠেই নামতে দেওয়া হবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির সঙ্গে আলোচনার আহ্বান নাকচ করেন দিয়ে বলেছেন, মাঠেই দেখা যাবে,  দেখা যাক কে কতটি গোল দিতে পারে। সম্প্রতি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাত গোল খাওয়ার কথাটি মনে রেখেই সম্ভবত শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিপক্ষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের ডেকে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তুমুল যুদ্ধের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন।
দেশের মানুষ কিন্তু তুমুল যুদ্ধ দেখতে চায় না। তারা চায় ঈদের নির্মল আনন্দ। অনাবিল খুশি উদযাপন করতে। ২০১৩ সালের পুরো সময়টাই তারা তুমুল যুদ্ধ দেখেছে। আন্দোলন ও আন্দোলন দমনের নামে চলেছে সেই যুদ্ধ।
ঈদের পরে কী হবে, এখনই বলা না গেলেও ঈদের আগেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা যে একে অপরকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, তাতে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। তাহলে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের একটা মহা প্রলয় আসন্ন? দুই পক্ষই রণদামামা বাজিয়ে চলেছে।
গত বছরের ঈদের আগে-পরে বিরোধী দলের কর্মসূচি থাকায় অনেকেই ভয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাননি, গিয়ে যদি ঠিক সময়ে ফিরতে না পারেন। এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। রিজভী সাহেব তুমুল যুদ্ধের কথা বললেও ঈদের পরই সেটা শুরু হচ্ছে না। তিনি বলেছেন, প্রথমে আন্দোলনের কুচকাওয়াজ। আর মাঠ থাকবে জনগণের দখলে।
বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা সবকিছুই করেন জনগণের নামে, জনগণের দোহাই দিয়ে। কিন্তু তাঁদের (সরকারি ও বিরোধী উভয় দল) কর্মকাণ্ডে যে সেই জনগণ জিম্মি হয়ে পড়ে, সে নিয়ে মাথা ঘামান না।
জনগণের নামে কেউ আন্দোলন করেন। কেউ একতরফা নির্বাচন করেন। কিন্তু যে জনগণকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন সেই জনগণের সুখ-সুবিধার কথা তাঁরা ভাবেন না। ভাবলে ঈদের এই নির্মল আনন্দের ক্ষণে একে অপরকে হুমকি দিতে পারতেন না। তাঁরা বলতে পারতেন, যা হবে ঈদের পরে। আসুন, আমরা সবাই মিলে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিই।

ঈদ, তোবার শ্রমিক ও গাজার নিহত শিশুরা by সোহরাব হাসান

বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা অনেকটা স্বস্তিদায়ক ছিল। মহাসড়কে যানজটের মাত্রাও অপেক্ষাকৃত কম। আবহাওয়াও ছিল সহনীয়—বেশি বৃষ্টি নয়, বেশি রোদও নয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।

>>নয় বছর বয়সী ফিলিস্তিনি এই মেয়েটি ঘরের বাইরে খেলছিল। এমন সময় ইসরায়েলি বোমা হামলায় স্প্লিন্টারবিদ্ধ তার শরীর। ছবিটি গাজা শহরের বেইত লাহিয়া এলাকার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা। ছবি: এএফপি
কিন্তু এবারে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি তোবা গ্রুপের তিন হাজার শ্রমিক। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি অবরুদ্ধ গাজার লাখ লাখ মানুষ। ২০১২ সালে তোবা গ্রুপের তাজরীন কারখানা পুড়ে শতাধিক শ্রমিক মারা যান এর মালিক দেলোয়ার হোসেনের অবহেলার কারণে। ঘটনার দেড় বছর পার হলেও নিহত শ্রমিকদের পরিবার ও আহত শ্রমিকেরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পেয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন।
সেই তোবা গ্রুপেরই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তিন হাজার শ্রমিক বেতন-বোনাসের দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন গত সোমবার। ঈদের দিনও তাঁরা অনশনে ছিলেন। যেখানে বেতন পেয়েই মানুষের চলা কঠিন, সেখানে তিন মাস বেতন না পেয়ে এই শ্রমিকেরা যে চরম বিপাকে পড়েছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
টেলিভিশনে আমরা দেখলাম, কারখানা চত্বরে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করছেন। কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদছেন, আহাজারি করছেন। বাংলাদেশে গরিব শ্রমিকদের কান্না ছাড়া কী আছে? ঈদের আগে সরকারি ও বিএনপির নেতারা আন্দোলন নিয়ে বাগযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। একে অপরকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু ঈদের দিনে অনশনরত শ্রমিকদের পাশে কেউ দাঁড়াননি। সরকারি বা বিএনপির কোনো শ্রমিকনেতাও সেখানে যাননি। শ্রমিকেরা বেতন-বোনাসের দাবিতে কারখানা চত্বরে অনশন করছেন; আর বাড়িতে তাঁদের প্রিয়জনেরা অপেক্ষায় আছেন কবে বেতন-বোনাস নিয়ে তাঁরা বাড়ি যাবেন।
শ্রমিকেরা বলছেন, বিজিএমইএ চাইলে ঈদের আগেই সমস্যার সমাধান করতে পারত। সমাধান করতে পারত হয়তো সরকারও। কিন্তু তারা কেউ এগিয়ে আসেনি। বিজিএমইএ তৈরি পোশাক মালিকদের প্রতিষ্ঠান। তাই বলে তাঁরা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার তথা বেতন-ভাতার বিষয়টি এভাবে উপেক্ষা করতে পারে না। তোবা গার্মেন্টসের সম্পত্তি বিক্রি করেই যদি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে হয়, তাহলে সেই উদ্যোগ তাঁরা আগে নিল না কেন? এখন বলছেন, দাম পাচ্ছে না।  শ্রমিকেরা কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেনের শাশুড়িকেও কারখানা ভবনে আটকে রেখেছেন। ব্যক্তি হিসেবে তাঁর আটককে আমরা সমর্থন করি না। কিন্তু তিনি যদি তোবা গ্রুপের মালিকদের কেউ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকেও দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বলেছেন, কারখানা বিক্রি না করে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা যাবে না। কারখানা বিক্রি করতে দু-তিন মাস দেরি হলে কি শ্রমিকেরা ততদিন না খেয়ে থাকবেন?
বাংলাদেশে একশ্রেণির মানুষ শ্রমিকদের ঘামে-রক্তে গড়া সম্পদের মালিক হলেও সেই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কিংবা নিরাপত্তা দিতে চান না। এ কারণেই তাজরীন গার্মেন্টস ও রানা প্লাজার ঘটনা ঘটছে। তোবা গ্রুপের তিন হাজার শ্রমিককে যারা আমরণ অনশনে যেতে বাধ্য করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অবিলম্বে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে।
দ্বিতীয় বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটেছে গাজা উপত্যকায়। গত কয়েক দিনে সেখানে হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী ১১ শতাধিক নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশু হত্যা করেছে। এমনকি সোমবার সেখানে যখন ঈদ উদযাপিত হচ্ছিল, তখন ইসরায়েলি বাহিনী হামলা অব্যাহত রেখেছিল। তাদের নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি নামাজ আদায়রত মুসল্লিরা, হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রোগীরা। রেহাই পায়নি ঈদের দিন পার্কে খেলতে যাওয়া শিশুরাও। ইসরায়েলি বাহিনী ধ্বংস করেছে বসতবাড়ি, স্কুল, হাসপাতালসহ সব ধরনের বেসামরিক স্থাপনা।
কিন্তু গাজায় এই ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক যেভাবে সোচ্চার হওয়ার কথা, সেভাবে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি।  জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুচ্চ আহ্বানকে পাত্তা দিচ্ছে না এই জায়ানবাদী রাষ্ট্রটি। নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত অস্ত্রবিরতির আহ্বানও আমলে নিচ্ছে না তারা।
মারাত্মক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র না বানালেও সাদ্দাম হোসেনের ওপর সেই দায় চাপিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন চালিয়েছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে প্রহসনমূলক বিচারের নামে তাঁকে হত্যা করা হয়। সাদ্দাম তাঁর দেশে যে অপরাধ করেছেন, তার চেয়ে বেশি অপরাধ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গাজা ও পশ্চিম তীরে।  মানবাধিকারের এই মোড়লেরা এখন নীরব কেন? ইসরায়েলকে মৃদু ভর্ত্সনা ছাড়া কিছুই করছে না তারা। কেন এই স্ববিরোধী ভূমিকা? কেন এই আত্মপ্রতারণা?
জন কেরির মধ্যপ্রাচ্য মিশন তখনই সফল হবে যখন তিনি যুদ্ধবাজ ইসরায়েলকে নিরস্ত্র করতে পারবেন। অন্যথায় শান্তিরই ললিত বাণী ব্যর্থ পরিহাস হয়ে দেখা দেবে। এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব ও তাদের সংস্থা ওআইসির ভূমিকাও লজ্জাজনক।

পথে বিস্তর ভোগান্তি তবু ঘরে ফেরার আনন্দ

ঈদে সীমাহীন ভোগান্তি ও ঝুঁকির মধ্যে গন্তব্যে গেছেন শেষ সময়ের যাত্রীরা। শিল্প-কারখানা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস শেষে রোববার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে জনসে াত নামে। কাক্সিক্ষত যানবাহন না পাওয়া, যানজটসহ নানা ভোগান্তির শিকার হন এসব ঘরমুখো মানুষ। ঢাকায় বাস ও ট্রেনের সিডিউলে বিপর্যয় নেমে আসে। একই সঙ্গে দেখা দেয় পরিবহন সংকট। কাক্সিক্ষত যানবাহন পেতে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে অসংখ্য মানুষ বৃষ্টি মৌসুমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে চড়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন বিকল্প পথ। অপরদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন নৌপথের যাত্রীদের। পথিমধ্যে যাত্রীবোঝাই একটি লঞ্চের তলা ফেটে গেলেও অল্পের জন্য দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার যাত্রী। অপর এক লঞ্চের ইঞ্জিন মাঝপথে নষ্ট হয়ে ঝুঁকিতে পড়েন যাত্রীরা। ঢাকার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে জনভোগান্তির নানা চিত্র দেখা গেছে। ঈদে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যাওয়ায় ফাঁকা হতে শুরু করেছে ঢাকা।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রাতে বৃষ্টির কারণে শ্লথগতিতে বাস চলেছে। অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে যানজট। এ কারণে অনেক বাস নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় ঢুকতে পারেনি। এসব কারণে গণপরিবহনের সিডিউল ভেঙে পড়েছে। এছাড়া পোশাক ও শিল্প-কারখানা এবং সরকারি-বেসরকারি অফিস রোববার একযোগে বন্ধ হওয়ার পর যাত্রীদের ঢল নামে। এত সংখ্যক যাত্রী একই সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে পরিবহনের সামর্থ্য গণপরিবহনের নেই। এ কারণেই ভোগান্তির শিকার যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ক্ষুব্ধ যাত্রীরা ৫-৭টি লঞ্চে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছে। মারধর করেছে বাস শ্রমিকদের।
রাজধানীর বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের আনন্দ প্রিয়জনের সঙ্গে উপভোগ করতে শেষ মুহুর্তের বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল নেমেছে। সব দুর্ভোগ-বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে শিকড়ের টানে ছুটছেন তারা। হাত-কাঁধে ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে কাক্সিক্ষত যানে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। কেউ সফল হয়েছেন, আবার অনেকেই বিফল। ঈদযাত্রীদের পদচারণায় টার্মিনালগুলোর কোথাও যেন একটু ফাঁকা নেই। সর্বত্র টুইটম্বুর। যে যেভাবে সুযোগ পেয়েছেন সেভাবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাস ও লঞ্চের মালিক-শ্রমিকরা বাড়তি ভাড়া নেয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন। অতিরিক্ত আয়ের আশায় ঝুঁকি নিয়ে ছাদে যাত্রী বহন করেছেন। যাত্রীদের অভিযোগ, ভিড়ের মাঝে পকেটমার, লাগেজ পার্টির তৎপরতা বেড়ে গেছে। অনেকেই মোবাইল, মানিব্যাগ ও ব্যাগ খুইয়েছেন।
বাসের সিডিউল বিপর্যয় : যাত্রীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে বাসের নির্ধারিত সিডিউল। রোববার বেশির ভাগ বাস নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ১ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে ছেড়ে গেছে। বাস কাউন্টারগুলোতে শত শত মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীরা বেশি সমস্যায় পড়েন। বাসের সিডিউল ভেঙে পড়ার কারণ জানতে চাইলে পরিবহন শ্রমিকরা জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ফেরি রুটে শনিবার রাতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফেরির চলাচলে সমস্যা হয়। বাস পারাপারে অতিরিক্ত সময় লাগছে। এসব কারণ ছাড়াও পথে যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় বাস ঢুকতে পারছে না। বরিশালগামী যাত্রী ওহিদুজ্জামান জানান, সাকুরা পরিবহনের বাস ৭টায় ছাড়ার কথা থাকলেও ১০টা পর্যন্ত ওই গাড়ি গাবতলী আসেনি। সিলেটগামী যাত্রী মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, সোহাগ পরিবহনের টিকিট আগে সংগ্রহ করেছেন। সকাল ৭টার গাড়ি ১০টা পর্যন্ত কাউন্টারে আসেনি। কখন গাড়িটি ছেড়ে যাবে তা তিনি জানেন না।
বাস-ট্রাকের ছাদে চড়ে বাড়ি ফেরা : রাজধানী থেকে বিভিন্ন দূরপাল্লার রুটে বাসের ছাদ ও ট্রাকে চড়ে গন্তব্যে গেছেন অনেক যাত্রী। আগাম টিকিট সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়া এবং নিু আয়ের মানুষ মূলত এসব যানবাহনে চড়েছেন। ঢাকা থেকে রাজশাহী, সৈয়দপুর, দিনাজপুর, রংপুর, দাউদকান্দি, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, নরসিংদীসহ বিভিন্ন রুটের বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে ও ছাদে চড়ে যেতে দেখা গেছে। গাড়ির নির্ধারিত সিটের বাইরে হাঁটার পথে মোড়া ও ইঞ্জিন কভারের ওপর যাত্রী নেয়া হয়েছে। নিু আয়ের মানুষরা জানান, জীবনের ঝুঁকি জেনেও কম ভাড়ায় গন্তব্যে যাচ্ছেন তারা।
এদিকে ঈদে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাস মালিকরা ঢাকার ভেতরে চলাচলকারী সিটি সার্ভিস ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলাচল করে এমন বাস ঢাকা থেকে দূরপাল্লার রুটে যাত্রী নিয়ে গেছে। এসব বাস পথিমধ্যে নষ্ট হয়ে সড়কে যানজটের সৃষ্টি করে- পুলিশের কাছে এমন তথ্য থাকা সত্ত্বেও চলাচলের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে সায়েদাবাদ থেকে কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, দাউদকান্দি, মহাখালী থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর, গাবতলী থেকে পাবনা, রাজশাহীসহ বেশ কিছু রুটে পুরনো ভাঙাচোরা বাস ছেড়ে গেছে।
নৌপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা : বৃষ্টি মৌসুমে নদী উত্তাল, বেড়েছে পানিপ্রবাহ। এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছেড়েছে ৪১ রুটের লঞ্চ। প্রতিটি লঞ্চের ছাদে বহন করা হয়েছে। নদীর মাঝপথে নৌকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যাত্রী তোলা হয়েছে। রোববার ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া সুন্দরবন, সুরভী, কীর্তনখোলা, দ্বীপরাজ, পারাবতসহ অন্য সবগুলো লঞ্চই ছাদে যাত্রী নিয়ে গেছে। নৌপথে দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের যাওয়ার অন্যতম স্থান ঢাকা নদীবন্দরে (সদরঘাট) সকাল থেকে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পন্টুনে আসামাত্রই লঞ্চগুলোতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে যাত্রীদের উঠতে দেখা যায়। অল্পসংখ্যক লোক কেবিন ও সোফার আগাম টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন। এর বাইরে বিশালসংখ্যক যাত্রী লঞ্চের পাটাতনে (ডেকে) আসন পেতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যারা ডেকে জায়গা পাননি তারা লঞ্চের ছাদে চড়েই গন্তব্যে রওনা হন। সদরঘাট ঘুরে দেখা গেছে, দুপুর থেকেই বেশির ভাগ লঞ্চ যাত্রীতে টইটম্বুর। কোথাও যাত্রীদের বসার জায়গা নেই। এমনকি কেবিনের সামনের রাস্তায় মানুষ বসে আছে। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে অনেকে। তবুও আরও বেশি যাত্রী নেয়ার আশায় এসব লঞ্চ ছাড়েননি মালিকরা। এ নিয়ে অনেক যাত্রী প্রতিবাদ ও হৈচৈ করলে লঞ্চের কর্মচারী ও ঘাট শ্রমিকরা তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করছে। এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ যাত্রীরা ৫-৭টি লঞ্চে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নৌচলাচল সংস্থার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন বীরবিক্রম বলেন, গার্মেন্টের কিছু উৎচ্ছৃখল শ্রমিক তাড়াতাড়ি লঞ্চ ছাড়তে বাধ্য করার কৌশল হিসেবে হামলা চালিয়েছে।
বিকল্প পথে বাড়ি ফেরা : গণপরিবহনের সঙ্কট থাকায় বিকল্প পথে গন্তব্যে গেছেন অনেকে। মাইক্রোবাস, ট্যাক্সিক্যাব ও লোকাল বাস রিজার্ভ করে গেছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি গেছেন।

যুদ্ধবিরতি শেষ না হতেই গাজায় ফের হামলা

২৪ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির সময় শেষ না হতেই আবারও গাজায় ভয়াবহ হামলা শুরু করেছে ইসরাইল। স্থলবাহিনীর ট্যাংকের গোলা নিক্ষেপের পাশাপাশি অব্যাহত আছে বিমান, স্থল ও নৌ হামলা। মানবিক অস্ত্রবিরতি প্রত্যাখ্যান করে হামাস রকেট হামলা চালিয়ে যাচ্ছে অভিযোগ করে রোববার সকালে এক বিবৃতিতে পুনরায় হামলা শুরু করার ঘোষণা দেয় ইসরাইল। এর আগে শনিবার ১২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি সফলভাবে শেষ হওয়ার পর জাতিসংঘের অনুরোধে বিরতি আরও ১২ ঘণ্টা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল ইসরাইলি মন্ত্রিসভা। তবে রোববার দুপুরে হামাস ঘোষণা করে ঈদ উপলক্ষে তারা ২৪ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলের তরফ থেকে এর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এদিকে গাজায় লাশের মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। গত ২০ দিনে নিহত হয়েছেন ১০৫০ জন ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, ইতিমধ্যে প্রায় দেড় লাখ গাজাবাসী বাড়িঘর হারিয়েছেন। বিবিসি, আলজাজিরা ও এএফপিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পাঠানো খবর।

রোবাবর সকালে ইসরাইলি হামলায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার জরুরি বিভাগের মুখপাত্র আশরাফ আল কুদার বলেন, সেন্ট্রাল গাজার নিকটবর্তী সীমান্তের কাছে ট্যাংকের গোলার আঘাতে দুজন নিহত হন। এছাড়া খান ইউনিস শহরে বোমা হামলায় অন্যজন নিহত হয়েছেন। পরবর্তীকালে আরও বেশ কয়েকটি হামলায় নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শনিবার ১২ ঘণ্টা যুদ্ধবিরতির পর রোববার রাতে জাতিসংঘের অনুরোধে আরও ১২ ঘণ্টার বিরতিতে সম্মত হয় ইসরাইল। তবে কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই ইসরাইলি সেনারা এক বিবৃতিতে জানায়, হামাস যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করে রকেট হামলা অব্যাহত রাখায় তারাও পুনরায় গাজায় হামলা শুরু করতে যাচ্ছে। রোববার সকালে হামাসের ছোড়া কমপক্ষে ৫টি রকেট ইসরাইলের ভূখণ্ডে আঘাত করেছে বলে অভিযোগ করে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। গাজার বাসিন্দারা জানান, ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই গাজা উপত্যকায় আগের মতো গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে। এএফপির খবরে বলা হয়, বর্ধিত ১২ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টা যেতেই গাজায় হামলা শুরু করে ইসরাইল।
অপরদিকে যুদ্ধবিরতির সময়টিকে নতুন হামলা চালানোর প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করেছে ইসরাইল- এই অভিযোগ করে ইসরাইলি সেনারা গাজা ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো যুদ্ধবিরতি মানবে না বলে জানিয়েছে হামাস। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮ জুলাই থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলের প্রায় একতরফা বর্বর হামলায় এক হাজার ৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাড়ে ছয় হাজার। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। হতাহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। বাড়ি-ঘর ছেড়েছেন প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি। অন্যদিকে ইসরাইল দাবি করেছে, হামাসের হামলায় তাদের তিন বেসামরিক নাগরিক ও ৪৩ সেনা নিহত হয়েছেন।
২৪ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হামাস : শনিবার রাতে জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সাড়া না দিলেও রোববার বিকালে হামাস মুখপাত্র সামি আবু জুহরি জানান, পবিত্র ঈদ উপলক্ষে তারা ২৪ ঘণ্টার মানবিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি। তিনি জানান, স্থানীয় সময় রোববার বেলা ২টা থেকে যুদ্ধবিরতিতে তারা সম্মত। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলের পক্ষ থেকে এর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। গাজার আলজাজিরার প্রতিবেদক স্টেফানি ডেকার জানিয়েছেন, অস্ত্রবিরতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে কোনো চুক্তির খবর পাওয়া যায়নি।
যেভাবে হামলার শুরু : ইসরাইলি তিন কিশোরকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৮ জুলাই থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরাইল। হামাসই ওই ঘটনা ঘটায় বলে দাবি করে ইসরাইল। তবে হামাস তা অস্বীকার করে। পরে ফিলিস্তিনি এক কিশোরকে একইভাবে হত্যা ও অপহরণের পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এরপর গাজা থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছে এমন দাবি তুলে ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে এ হামলা শুরু করে ইসরাইল। এর আগে ২০১২ সালের নভেম্বরে গাজায় অভিযান চালায় ইসরাইল। তখন আট দিনের মাথায় মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের শুরু। এরপর থেকে নিয়মিত রক্ত ঝরলেও আজও তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

গাজায় রক্তে ভেজা ঈদ

ইসরাইলের গাজা হামলার বিশ দিনে গাজা হয়ে উঠেছে মৃত্যুনগরী। ঈদুল ফিতরের মহোৎসবেও শোকস্তব্ধ থাকবে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। ‘রাস্তায় আল্পনা নেই। সারারাত ধরে ঈদগা ময়দান সাজানোর কোলাহল নেই। শোরগোল নেই। অলিগলিতে দলে দলে জটলা পাকানোর আওয়াজ নেই- ঈদের আগের রাতে যে নগরীতে আতশবাজির ফোয়ারা ফুটতো, সেখানে এখন বোমা ফাটে। মুহূর্তে মুহূর্তে পাক খাচ্ছে ইসরাইলের বোমারু বিমান। বসতবাড়ির ধ্বংসস্তূপে বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া নিরীহ মানুষের শরীর। ঘরের মেঝে বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে রক্ত। শুধু রক্ত। দেয়ালে রক্ত, গলিতে রক্ত, উঠানে রক্ত- ছোপ ছোপ রক্ত আর শুকনো মাংসের দাগ। বিধ্বস্ত জনপদে গতবারের সেই উৎসব আমেজ নেই- শাজাইয়াতে নিজের ভগ্ন-বাড়ির দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করলেন মনির আল বালাওয়ি (৩২)। তার কথায়, ‘গাজায় এবার ঈদ নেই। এবারের ঈদ রক্তে ভেজা, প্রাণ নেই! যে হাসিতে কষ্ট থাকে, যে আনন্দ রক্তে মাখানো তাতে তৃপ্তি থাকে না।’
বালাওয়ি বলেন, গাজায় এখন অনেক বাবা আছেন যার ছেলে গতকালই মারা গেছে। এমন অনেক দাদিই আছেন যিনি আশা করে ছিলেন নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ঈদ-আনন্দে মেতে উঠবেন। অনেক নববধূরই স্বামীর সঙ্গে প্রথম ঈদ-কাটানোর স্বপ্নটা পূরণ হবে না। বেগম আলকাফরানা নামের এক নারী বলেন, কে জানে ঈদের দিনের ইসরাইল হামলা চালাবে কিনা। ঈদের দিনেও বাবাকে তার সন্তানের লাশ দাফন করতে হবে না?
এদিকে ইসরাইলের বর্বরতা আর গণহত্যার কাছে হার মেনেছে সভ্যতা। আধুনিক শিক্ষা, সভ্যতা ও মানবতাকে পায়ে দলে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর দখলদার সরকার আট বছর অবরুদ্ধ থাকা ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চালিয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। ইহুদিবাদী সেনাদের বর্বরতায় শেষ পর্যন্ত গাজায় এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে শহীদের সংখ্যা। সবশেষ খবর অনুযায়ী, গাজা কর্তৃপক্ষকে তৈরি করতে হয়েছে ১,০৪৯ নম্বর কফিন।
ইসরাইলের অত্যাধুনিক এফ-১৬ জঙ্গিবিমান, রকমারি বোমা আর ট্যাংকের গোলার আঘাতে এক মৃত্যুপুরীর নাম এখন গাজা। বিধ্বস্ত ভবনগুলোর নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে রাশি রাশি লাশ। শনিবার সকালের দিকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৪৭টি মৃতদেহ।
সব হিসাব মিলিয়ে গাজায় শহীদের সংখ্যা এখন ১,০৪৯। তবে এ সংখ্যা স্থির নয়, বাড়তে পারে লাশের সংখ্যা- এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন গাজার স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা। জাতিসংঘের হিসাব মতে, নিহতদের শতকরা অন্তত ৮০ ভাগ বেসামরিক নাগরিক।
হামাস ধ্বংসের পরিণতি ভয়াবহ : পেন্টাগন প্রধান
গাজার প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে ধ্বংস করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে ইসরাইলকে হুশিয়ার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল ফ্লিন। শনিবার কলোরাডোর অ্যাসপেন সিকিউরিটি ফোরামে এ হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। এ খবর দিয়েছে সংবাদ মাধ্যম রয়টার্স।
পেন্টাগন প্রধান বলেছেন, হামাসকে ধ্বংস করা হলে, এর জায়গায় যারা আসবে তারা আরও ভয়ংকর হবে। তাই চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি জানান, হামাস টানেল তৈরিতে পারদর্শী। এর মাধ্যমে কৌশলে ইসরাইলের ওপর হামলা চালাবে তারা। কিন্তু এরপরও হামাসকে ধ্বংস করা কোনো সমাধান নয় বলে ইসরাইলকে পরামর্শ দেন তিনি।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল ফ্লিন বলেন, যদি হামাসকে ধ্বংস অথবা নিশ্চিহ্ন করা হয়, তাহলে এর সমাপ্তি ভয়াবহ হবে। আর এ অঞ্চলের সমস্যা হবে আরও ভয়াবহ। ফিলিস্তিন টেলিগ্রাফ।

গাজাজুড়েই ধ্বংসস্তূপ

গাজায় ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবিতে
গতকাল হংকংয়ে বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি
ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা ভূখণ্ড। ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরুর পর ট্যাংকের গোলার পাশাপাশি যুদ্ধবিমান থেকে যে পরিমাণ বোমা ফেলা হয়, তাতে গাজার অনেক ভবন যে নিশ্চিহ্ন হবে, সেটা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু গত শনিবার যুদ্ধবিরতির সময় গাজায় যে ধ্বংসের চিহ্ন দেখা গেল, তাতে স্তম্ভিত গাজাবাসী। খবর ওয়াশিংটন পোস্টের। ১২ ঘণ্টার ওই যুদ্ধবিরতির সময় গাজাবাসীর সামনে স্পষ্ট হয় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তাঁরা। নারীরা বিলাপ করছেন না। পুরুষেরা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছেন। সামনে শুধুই ধ্বংসস্তূপ। ভাঙা দেয়াল, খোলা ইট, কংক্রিট, রড বেরিয়ে আছে কোথাও কোথাও। ভাঙা দেয়ালে বুলেট বা গোলার চিহ্ন স্পষ্ট। কোনো কোনো ধ্বংসস্তূপে তখনো ট্যাংকের গোলা বা বোমার আগুন জ্বলছে। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলছেন, ১২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির আগের ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টা ইসরায়েলি গোলা-বোমার নৃশংসতার চিহ্ন বহন করছে এই ধ্বংসস্তূপ। কূটনীতিকেরা যখন একটি মানবিক যুদ্ধবিরতির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ইসরায়েল ভয়াবহ এই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠে। গাজার পূর্বাঞ্চলের শাজাইয়া শহরের বাসিন্দা রাফেত সুকার তাঁর বিধ্বস্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এখানে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়ে গেছে। হামলায় রাফেত সুকারের বা​ড়ির পেছনের অর্ধেক অংশ মাটিতে মিশে গেছে। রাফেত সুকারের ভাই রামি সুকার বলেন, ‘ইসরায়েলি বর্বরতার এই চিত্র দেখে এখন মনে হচ্ছে, এই হামলার পরও আমরা আসলে অলৌকিকভাবে বেঁচে আছি।’ আসলে গাজায় এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে হামলায় চালায়নি ইসরায়েল। আগের দিনও ​যেখানে চারতলা ভবন দাঁড়িয়ে ছিল, পরদিন সেখানে ধ্বংসস্তূপ। মসজিদের মিনারগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল সাক্ষী হয়ে আছে বেপরোয়া ইসরায়েলি হামলার। জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে থাকা আশ্রয়শিবির ও হাসপাতালেও বেশ কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে। পানির পাম্প স্টেশনে চালানো হামলায় মেশিনগুলো বিকল হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ​ স্টেশনেও হামলা চালানো হয়েছে। অদূরে রাস্তায় বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে এবং তার ছিঁড়ে পড়ে আছে। যুদ্ধবিরতির সময়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন গাজার জরুরি বিভাগের কর্মীরা। হতাহত ব্য​ক্তিদের উদ্ধারে সাইরেন বাজিয়ে চলছে অ্যাম্বুলেন্স। তবে ধ্বংসস্তূপের কারণে কোথাও কোথাও আটকা পড়ছে। বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পথ তৈরি করা হচ্ছে। বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিহত তো বটেই, আহত অনেকেও আটকা পড়ে আছেন। জরুরি বিভাগের কর্মী ইউসুফ আবিদ আল-হামিদ বলেন, ‘হতাহত ব্যক্তিদের বের করে আনতে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে। এ কাজের জন্য আমাদের ভারী যন্ত্রপাতি দরকার। খালি হাতে আমরা কিছুই করতে পারব না।’ ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা থেকে রেহাই পায়নি গৃহপালিত প্রাণীও। গাজার বিভিন্ন মাঠ, খামার ও বাড়িতে গরু, ঘোড়া ও গাধা মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মেষে​র খামারেও গোলা ছোড়া হয়েছে। গাজার উত্তরাঞ্চলে বেইত হানুন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই হয়েছে গাজা ভূখণ্ডের ক্ষমতায় থাকা কট্টরপন্থী ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের যোদ্ধাদের। সেখানে কোনো কোনো জায়গায় বুলেটের চিহ্ন ও রক্তের দাগ দেখা যায়। কোথাও কোথাও পড়ে আছে ব্যান্ডেজের সাদা কাপড়। বেইত হানুনের বাসিন্দা জুহায়ের হামাদ ১৭ দিন পর নিজের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখেন, তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ‘বাচ্চাদের জন্য কিছু কাপড় নিতে এসেছিলাম। ধ্বংসস্তূপের নিচে সবকিছু চাপা পড়ে গেছে।’ বলছিলেন জুহায়ের হামাদ। এখানে চারতলা একটি ভবনে চার ভাইসহ পরিবার নিয়ে থাকতেন মোহাম্মদ হেলু। তিনি বলেন, ‘এই ভবন তৈরি করতে ২০ বছর পরিশ্রম করেছি। এখন সবকিছু শেষ হয়ে গেল।’

ব্ল্যাক বক্সের ​তথ্যে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের প্রমাণ মিলেছে

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মালয়েশীয় উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে বলে শুরু থেকেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের একটি ব্ল্যাক বক্সের তথ্যেও প্রাথমিকভাবে সেই প্রমাণ মিলেছে। অপ্রকাশিত ওই তথ্যে দেখা গেছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গোলার টুকরার আঘাতে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে। খবর বিবিসি, সিবিএস ও এএফপির। উড়োজাহাজ-সংক্রান্ত ইউরোপের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘যে উদ্দেশ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, তা সফল হয়েছে।’ নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী উড়োজাহাজটি ১৭ জুলাই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়। এতে ১৫ জন ক্রুসহ ২৯৮ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। ঘটনার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে আসছে, রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করেছে। তবে রাশিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে। ঘটনা তদন্তে কয়েক দিন ধরে নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ার একদল তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আছেন। তাঁরা বলছেন, কী কারণে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে, সে সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণ পেতে হলে আরও অনেক কাজ করতে হবে। এখনো অনেক ভয়াবহ, বীভৎ​স ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হচ্ছে বলে তাঁরা জানান। ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতাসংক্রান্ত সংস্থা ওএসসিইর তদন্ত কর্মকর্তা মাইকেল বোরকিউরকিউ বলেন, পাসপোর্ট, আইডি কার্ড, ক্রেডিট কার্ডের মতো আরোহীদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এখনো পাওয়া যাচ্ছে।
এ ছাড়া ঘটনাস্থলের আশপাশে মানুষের দেহাবশেষেরও সন্ধান পাচ্ছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। প্রায় ১০০ আরোহীর হিসাব এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মকর্তারা জানান, উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষে বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট গর্তের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডাচ কর্মকর্তারা এখন এ বিষয়টির ওপরই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ ও দেহাবশেষ তদন্তের আওতায় আনা খুবই কঠিন। তা ছাড়া নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তো রয়েছেই। ডাচ বিশেষজ্ঞদের ভ্রমণ বাতিল: ইউক্রেনের সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই আগের চেয়ে আরও তীব্র হয়েছে। এ কারণে নেদারল্যান্ডস থেকে বিশেষজ্ঞদের আরেকটি দল ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছে। এর আগে মালয়েশিয়া বলেছিল, আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। তা ছাড়া সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যেও একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি হয়েছে। এর পরও প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক কর্মকর্তারা। এদিকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎ​স্কের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত গ্রাবোভ গ্রামের মাত্র এক কিলোমিটার দূরে গতকাল প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। আতঙ্কিত লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার স্থানের পাশে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। গ্রাবোভ গ্রামের পাশেই মালয়েশীয় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে।

গুদামঘর থেকে নেতাজির গাড়ি উদ্ধার

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক নেতাজি
সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যবহৃত ৯০ বছরের পুরোনো
একটি ‘বেবি অস্টিন’ গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাশের রাজ্য ঝাড়খন্ডের ধানবাদ থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যবহৃত ৯০ বছরের পুরোনো একটি ‘বেবি অস্টিন’ গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। ধানবাদের ওয়ারি কোক প্লান্টের একটি গুদামঘরে পরিত্যক্ত অবস্থায় নেতাজির গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই গাড়িটি এখানে পড়ে থাকলেও এত দিন কারোর নজরে আসেনি। সম্প্রতি এই গুদামঘর সংস্কারের সময় হদিস পাওয়া যায় গাড়িটির।
১৯৩০ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় গাড়িটিতেই করে ওই এলাকায় ঘুরেছেন নেতাজি। অবশ্য গাড়িটির মালিক নেতাজি ছিলেন না। এটি ছিল তাঁর চাচা অশোক বসুর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অশোক বসুকে গাড়িটি দিয়েছিল। পরে নেতাজিকে গাড়িটি ব্যবহারের জন্য দেন তিনি। সেই থেকে এটি ব্যবহার করেন নেতাজি। এই গাড়িটি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কলকাতার নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

ঈদের পর মাঠ দখলের লড়াই

ঈদের পর সরকার পতন আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন ২০ দলীয় জোট নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। মাঠেই দেখা হবে বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উভয় জোটের সিনিয়র নেতারাও দিচ্ছেন পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি। এই পরিস্থিতিতে আবারও দেশে সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। ঈদের পর রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে সবার মধ্যে বিরাজ করছে অজানা আতঙ্ক। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রহর গুনছেন সাধারণ জনগণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় দেশ আবারও ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব সহিংস পরিস্থিতির দিকে এগোতে যাচ্ছে। ঈদের পর বিএনপি মাঠে নামলে এবং সরকার তা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নামালে নিশ্চিতভাবেই তা সংঘাতের জন্ম দেবে। নিজ নিজ অবস্থানে কোন পক্ষ ছাড় না দিলে এ অবস্থার উন্নতি ঘটার কোন সম্ভাবনা নেই। সে  ক্ষেত্রে জনমনে সৃষ্ট আতঙ্ক আরও বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা।
৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আন্দোলনে ব্যাপক সংঘাতের ঘটনা ঘটে। একদলীয় নির্বাচন ঠেকানোসহ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে বিরোধী পক্ষের কয়েক মাসব্যাপী আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ হতাহত ও সম্পদহানি হয়। কিন্তু আগে থেকেই দুই পক্ষকে সমঝোতার তাগিদ দিয়েছিল জাতিসংঘসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল। বন্ধু রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অব্যাহত তাগিদেও সৃষ্ট সঙ্কটের উত্তরণ ঘটেনি। এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর দফায় দফায় হস্তক্ষেপের পর হয়নি সমঝোতা। এই অবস্থায় অনেকটা একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয় ৫ই জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ওই নির্বাচনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে দল গুছিয়ে আন্দোলনে নামার কথা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর রমজানে বিভিন্ন ইফতার পার্টির বক্তৃতায় ঈদের পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন তিনি। সরকার আন্দোলন মোকাবিলার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং গুলি করেও তা ঠেকানো যাবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন খালেদা জিয়া। এছাড়া আন্দোলন সফল করতে আগের কমিটি বিলুপ্ত করে ঢাকা মহানগরের নতুন আহ্বায়ক কমিটিও ঘোষণা করেছেন খালেদা জিয়া। এদিকে বিএনপির আন্দোলনের হুঁশিয়ারির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আন্দোলন করতে তারা মাঠে নামুক না। মাঠের দেখা মাঠেই হবে। ফুটবল খেলা মাঠেই হয়। খেলা হবে মাঠেই। দুই নেত্রীর পাল্টাপাল্টি হুমকিতে চরম আতঙ্কে ভুগছে দেশের সাধারণ মানুষ। এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ঈদের পর দখলদার ও অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নতুন করে গণআন্দোলন শুরু করা হবে। দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ এই শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে শরিক হবেন আশা করি। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আমরা পাঁচ বছর ধরে আন্দোলন করছি। ঈদের পর আবার সেই আন্দোলন শুরু হবে। জনগণের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। মির্জা আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবিসির সাক্ষাৎকারে সংলাপ সমঝোতার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা সংলাপ চাচ্ছেন না। সংলাপ-সমঝোতা না হলে বিএনপির সামনেও আন্দোলন ছাড়া কোন পথ খোলা নেই। ওদিকে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দুনিয়ার কোথাও বলা নেই নির্বাচনের আগে সংলাপ করতে হবে। তাই সংলাপের প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ীই হবে।
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মহানগর বিএনপির নবনির্বাচিত আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস বলেছেন, ঈদের পর ঈমানী দায়িত্ব নিয়ে সরকার পতন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে বিএনপি এবং বর্তমান সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সরকার বিএনপির আলোচনার আহ্বান অগ্রাহ্য করলে রাজপথে তুমুল যুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাবে। তবে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, বিএনপি বলছে আন্দোলনে যাবে। আওয়ামী লীগও প্রস্তুত। ঈদের পর আমরা বিএনপিকে রাজপথেই মোকাবিলা করবো।  খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য করলে তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিতে সরকারের বাধা দেয়ার কোন পরিকল্পনা নেই। ২০১৩ সালের মতো  নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করলে অবস্থা খারাপ হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, বিএনপির আন্দোলন কার জন্য, কিসের আন্দোলন? তারা সরকার পতনের হুমকি দিচ্ছেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। বাংলাদেশের শান্তিকামী মানুষ আর বিএনপিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দেখতে চান না। তাদের আন্দোলনের সঙ্গে জনগণের বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই। তিনি বলেন, আমরা আগামী সাড়ে চার বছর ক্ষমতায় থাকবো। ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না। সাড়ে চার বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করা হবে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। কারণ শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। আওয়ামী লীগের এ সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বলেন, ঈদের পর আমরা সারা দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করবো। জেলা সম্মেলন, সভা-সেমিনার, সমাবেশ করে সংগঠনকে শক্তিশালী করা হবে যাতে বিএনপি-জামায়াত চক্রের যে  কোনো আন্দোলন সাংগঠনিকভাবে মোকাবিলা করা হবে।
এদিকে সংসদে বিরোধীদল জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি থেকে মানুষ পরিত্রাণ চায়। আর জাতীয় পার্টিই পারে আওয়ামী লীগ বিএনপি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে। বর্তমানে জাতীয় পার্টি সংসদে প্রধান বিরোধী দল। আগামীতে জাতীয় পার্টি ১৫১ আসনের টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছে। লক্ষ্য সরকার গঠন করা। একদিকে সংগঠনকে শক্তিশালী করবো। অন্যদিকে প্রাথমিকভাবে ঢাকার পাশের জেলাগুলোতে জনসভা করবো। পর্যায়ক্রমে সাতটি বিভাগীয় শহরে মহাসমাবেশ শেষে ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীতে সম্মেলন হবে। আগামী বছরের প্রথম দিন থেকে নতুন উদ্যোগে জাতীয় পার্টির পথচলা শুরু হবে। সরকারের সফলতা ব্যর্থতা গণমুখী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংসদে ও রাজপথে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

গাজাজুড়েই ধ্বংসস্তূপ

ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা ভূখণ্ড। ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরুর পর ট্যাংকের গোলার পাশাপাশি যুদ্ধবিমান থেকে যে পরিমাণ বোমা ফেলা হয়, তাতে গাজার অনেক ভবন যে নিশ্চিহ্ন হবে, সেটা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু গত শনিবার যুদ্ধবিরতির সময় গাজায় যে ধ্বংসের চিহ্ন দেখা গেল, তাতে স্তম্ভিত গাজাবাসী। খবর ওয়াশিংটন পোস্টের।
১২ ঘণ্টার ওই যুদ্ধবিরতির সময় গাজাবাসীর সামনে স্পষ্ট হয় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তাঁরা। নারীরা বিলাপ করছেন না। পুরুষেরা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছেন। সামনে শুধুই ধ্বংসস্তূপ। ভাঙা দেয়াল, খোলা ইট, কংক্রিট, রড বেরিয়ে আছে কোথাও কোথাও। ভাঙা দেয়ালে বুলেট বা গোলার চিহ্ন স্পষ্ট। কোনো কোনো ধ্বংসস্তূপে তখনো ট্যাংকের গোলা বা বোমার আগুন জ্বলছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলছেন, ১২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির আগের ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টা ইসরায়েলি গোলা-বোমার নৃশংসতার চিহ্ন বহন করছে এই ধ্বংসস্তূপ। কূটনীতিকেরা যখন একটি মানবিক যুদ্ধবিরতির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ইসরায়েল ভয়াবহ এই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠে।
গাজার পূর্বাঞ্চলের শাজাইয়া শহরের বাসিন্দা রাফেত সুকার তাঁর বিধ্বস্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এখানে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়ে গেছে। হামলায় রাফেত সুকারের বা​ড়ির পেছনের অর্ধেক অংশ মাটিতে মিশে গেছে। রাফেত সুকারের ভাই রামি সুকার বলেন, ‘ইসরায়েলি বর্বরতার এই চিত্র দেখে এখন মনে হচ্ছে, এই হামলার পরও আমরা আসলে অলৌকিকভাবে বেঁচে আছি।’
আসলে গাজায় এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে হামলায় চালায়নি ইসরায়েল। আগের দিনও ​যেখানে চারতলা ভবন দাঁড়িয়ে ছিল, পরদিন সেখানে ধ্বংসস্তূপ। মসজিদের মিনারগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল সাক্ষী হয়ে আছে বেপরোয়া ইসরায়েলি হামলার। জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে থাকা আশ্রয়শিবির ও হাসপাতালেও বেশ কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে। পানির পাম্প স্টেশনে চালানো হামলায় মেশিনগুলো বিকল হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ​ স্টেশনেও হামলা চালানো হয়েছে। অদূরে রাস্তায় বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে এবং তার ছিঁড়ে পড়ে আছে।
যুদ্ধবিরতির সময়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন গাজার জরুরি বিভাগের কর্মীরা। হতাহত ব্য​ক্তিদের উদ্ধারে সাইরেন বাজিয়ে চলছে অ্যাম্বুলেন্স। তবে ধ্বংসস্তূপের কারণে কোথাও কোথাও আটকা পড়ছে। বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পথ তৈরি করা হচ্ছে।
বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিহত তো বটেই, আহত অনেকেও আটকা পড়ে আছেন। জরুরি বিভাগের কর্মী ইউসুফ আবিদ আল-হামিদ বলেন, ‘হতাহত ব্যক্তিদের বের করে আনতে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে। এ কাজের জন্য আমাদের ভারী যন্ত্রপাতি দরকার। খালি হাতে আমরা কিছুই করতে পারব না।’
ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা থেকে রেহাই পায়নি গৃহপালিত প্রাণীও। গাজার বিভিন্ন মাঠ, খামার ও বাড়িতে গরু, ঘোড়া ও গাধা মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মেষে​র খামারেও গোলা ছোড়া হয়েছে।
গাজার উত্তরাঞ্চলে বেইত হানুন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই হয়েছে গাজা ভূখণ্ডের ক্ষমতায় থাকা কট্টরপন্থী ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের যোদ্ধাদের। সেখানে কোনো কোনো জায়গায় বুলেটের চিহ্ন ও রক্তের দাগ দেখা যায়। কোথাও কোথাও পড়ে আছে ব্যান্ডেজের সাদা কাপড়।
বেইত হানুনের বাসিন্দা জুহায়ের হামাদ ১৭ দিন পর নিজের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখেন, তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ‘বাচ্চাদের জন্য কিছু কাপড় নিতে এসেছিলাম। ধ্বংসস্তূপের নিচে সবকিছু চাপা পড়ে গেছে।’ বলছিলেন জুহায়ের হামাদ।
এখানে চারতলা একটি ভবনে চার ভাইসহ পরিবার নিয়ে থাকতেন মোহাম্মদ হেলু। তিনি বলেন, ‘এই ভবন তৈরি করতে ২০ বছর পরিশ্রম করেছি। এখন সবকিছু শেষ হয়ে গেল।’

গাজার ঈদে রক্ত আর লাশ

ইসরায়েলের একতরফা বর্বর হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা এখন ধ্বংসস্তূপ। গাজার বাতাসে লাশের গন্ধ। ট্যাংকের গোলা, বোমার আগুনে জ্বলছে গাজা। বন্দুকের গুলি, শিশুর কান্না আর রক্তের মধ্যেই গাজায় আজ উদযাপিত হচ্ছে ঈদ।

ঈদে খাবার নেই গাজার শিশুদের। নেই নতুন পোশাক। হাতে নেই মা, বাবার কিনে দেওয়া খেলনা। তারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে ছুটছে। গোলা বা বোমার আঘাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে ছুটছেন মা। পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ সবাই ছুটছেন। যে করেই হোক বাঁচতে হবে তাঁদের।
আল জাজিরা ও বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদ সামনে রেখে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গাজায় অবিলম্বে ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল রোববার মধ্যরাতে জাতিসংঘ ওই বিবৃতি দেয়।
গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গাজায় শর্তহীন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে গতকাল স্থানীয় সময় মধ্যরাত পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা। তবে সাময়িক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামাস রকেট হামলা চালিয়ে যাচ্ছে—এই অজুহাতে গতকাল সকাল থেকে গাজায় আবার বিমান, স্থল ও নৌ হামলা শুরু করে ইসরায়েল। দেশটির সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। এর মধ্যে জাতিসংঘ আবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।

গত ১৯ দিনে গাজায় ইসরায়েলের প্রায় একতরফা বর্বর হামলায় এক হাজার ৪৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। এ ছাড়া হামাসের ছোড়া রকেট হামলায় ইসরায়েলের ৪৬ জন নিহত হয়েছে।

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার সূত্রপাত ৮ জুলাই। ইসরায়েলি তিন কিশোরকে সম্প্রতি অপহরণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই হামলা শুরু হয়। হামাসই ওই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে মনে করে ইসরায়েল। তবে হামাস তা অস্বীকার করেছে। পরে ফিলিস্তিনি এক কিশোরকে একইভাবে হত্যা ও অপহরণের পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এরপর গাজা থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছে—এমন দাবি তুলে ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ শুরু করে ইসরায়েল।

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের শুরু। এর পর থেকে নিয়মিত রক্ত ঝরলেও আজও তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের স্বাধীন সত্তা মেনে নিতে রাজি নয় ইসরায়েল।

গাজায় রক্তে ভেজা ঈদ

ইসরাইলের গাজা হামলার বিশ দিনে গাজা হয়ে উঠেছে মৃত্যুনগরী। ঈদুল ফিতরের মহোৎসবেও শোকস্তব্ধ থাকবে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। ‘রাস্তায় আল্পনা নেই। সারারাত ধরে ঈদগা ময়দান সাজানোর কোলাহল নেই। শোরগোল নেই। অলিগলিতে দলে দলে জটলা পাকানোর আওয়াজ নেই- ঈদের আগের রাতে যে নগরীতে আতশবাজির ফোয়ারা ফুটতো, সেখানে এখন বোমা ফাটে। মুহূর্তে মুহূর্তে পাক খাচ্ছে ইসরাইলের বোমারু বিমান। বসতবাড়ির ধ্বংসস্তূপে বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া নিরীহ মানুষের শরীর। ঘরের মেঝে বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে রক্ত। শুধু রক্ত। দেয়ালে রক্ত, গলিতে রক্ত, উঠানে রক্ত- ছোপ ছোপ রক্ত আর শুকনো মাংসের দাগ। বিধ্বস্ত জনপদে গতবারের সেই উৎসব আমেজ নেই- শাজাইয়াতে নিজের ভগ্ন-বাড়ির দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করলেন মনির আল বালাওয়ি (৩২)।
তার কথায়, ‘গাজায় এবার ঈদ নেই। এবারের ঈদ রক্তে ভেজা, প্রাণ নেই! যে হাসিতে কষ্ট থাকে, যে আনন্দ রক্তে মাখানো তাতে তৃপ্তি থাকে না।’ বালাওয়ি বলেন, গাজায় এখন অনেক বাবা আছেন যার ছেলে গতকালই মারা গেছে। এমন অনেক দাদিই আছেন যিনি আশা করে ছিলেন নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ঈদ-আনন্দে মেতে উঠবেন। অনেক নববধূরই স্বামীর সঙ্গে প্রথম ঈদ-কাটানোর স্বপ্নটা পূরণ হবে না। বেগম আলকাফরানা নামের এক নারী বলেন, কে জানে ঈদের দিনের ইসরাইল হামলা চালাবে কিনা। ঈদের দিনেও বাবাকে তার সন্তানের লাশ দাফন করতে হবে না? এদিকে ইসরাইলের বর্বরতা আর গণহত্যার কাছে হার মেনেছে সভ্যতা। আধুনিক শিক্ষা, সভ্যতা ও মানবতাকে পায়ে দলে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর দখলদার সরকার আট বছর অবরুদ্ধ থাকা ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চালিয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। ইহুদিবাদী সেনাদের বর্বরতায় শেষ পর্যন্ত গাজায় এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে শহীদের সংখ্যা। সবশেষ খবর অনুযায়ী, গাজা কর্তৃপক্ষকে তৈরি করতে হয়েছে ১,০৪৯ নম্বর কফিন। ইসরাইলের অত্যাধুনিক এফ-১৬ জঙ্গিবিমান, রকমারি বোমা আর ট্যাংকের গোলার আঘাতে এক মৃত্যুপুরীর নাম এখন গাজা। বিধ্বস্ত ভবনগুলোর নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে রাশি রাশি লাশ। শনিবার সকালের দিকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৪৭টি মৃতদেহ। সব হিসাব মিলিয়ে গাজায় শহীদের সংখ্যা এখন ১,০৪৯। তবে এ সংখ্যা স্থির নয়, বাড়তে পারে লাশের সংখ্যা- এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন গাজার স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা। জাতিসংঘের হিসাব মতে, নিহতদের শতকরা অন্তত ৮০ ভাগ বেসামরিক নাগরিক। হামাস ধ্বংসের পরিণতি ভয়াবহ : পেন্টাগন প্রধান
গাজার প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে ধ্বংস করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে ইসরাইলকে হুশিয়ার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল ফ্লিন। শনিবার কলোরাডোর অ্যাসপেন সিকিউরিটি ফোরামে এ হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। এ খবর দিয়েছে সংবাদ মাধ্যম রয়টার্স।
পেন্টাগন প্রধান বলেছেন, হামাসকে ধ্বংস করা হলে, এর জায়গায় যারা আসবে তারা আরও ভয়ংকর হবে। তাই চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি জানান, হামাস টানেল তৈরিতে পারদর্শী। এর মাধ্যমে কৌশলে ইসরাইলের ওপর হামলা চালাবে তারা। কিন্তু এরপরও হামাসকে ধ্বংস করা কোনো সমাধান নয় বলে ইসরাইলকে পরামর্শ দেন তিনি। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল ফ্লিন বলেন, যদি হামাসকে ধ্বংস অথবা নিশ্চিহ্ন করা হয়, তাহলে এর সমাপ্তি ভয়াবহ হবে। আর এ অঞ্চলের সমস্যা হবে আরও ভয়াবহ। ফিলিস্তিন টেলিগ্রাফ।

দুনিয়ায় সুখ নেই বেহেশতেই শান্তি

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত এক মার্কিনির ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে আল কায়দার সহযোগী একটি সংগঠন। যাতে দেখা যাচ্ছে যে- একজন মার্কিনি আত্মঘাতী হামলার আগে হাসিমুখে বলছেন, দুনিয়ায় সুখ নেই, বেহেশতে গেলেই কল্পনাতীত শান্তি পাওয়া যাবে। সিরিয়ায় ৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হল। আল-নুসরা ফ্রন্ট শুক্রবার ওই ভিডিওটি প্রকাশ করে। এতে মার্কিন নাগরিক মোহাম্মদ আবু-সালহা এবং অন্যান্য জিহাদিদের দেখা যায়। গত ২৫ মে সিরিয়ার ইদলিবে কয়েকটি সেনা চৌকিতে আÍঘাতী হামলায় চালায় তারা। এর মধ্যে অন্য একজন মালদ্বীপের।
ভিডিওতে আবু-সালহাকে হাসিমুখে ভাঙা ভাঙা আরবিতে কথা বলতে দেখা যায়। ‘আমি পরকালে বেহেশতে শান্তিতে থাকতে চাই। এখানে কিছু নেই এবং আমার আÍা শান্তি পাচ্ছে না। বেহেশতই উত্তম। লোকজন যখন মারা যায় তখন তারা হয় বেহেশত অথবা দোজখে যায়। (বেহেশতে) কল্পনাতীত সুখ রয়েছে’, বলেন আবু-সালহা। নুসরা ফ্রন্ট জানায়, ১৬ টন ট্রাকভর্তি বিস্ফোরক নিয়ে সেনাবাহিনীর একটি জমায়েতে আÍঘাতী হামলা চালায় আবু-সালহা। তবে এতে কতজন মারা গেছে তা জানা যায়নি। আল-নুসরার অফিশিয়াল চ্যানেল আল-মানারা আল-বায়দায় প্রচারিত ভিডিওতে ২০-২২ বছরের দাড়িওয়ালা ওই যুবককে আরও বলতে দেখা যায়, ‘আমি কোনো টাকা-পয়সা ছাড়াই সিরিয়ায় এসেছি একটি বন্দুক ও একটি থলে কিনব বলে। সৃষ্টিকর্তা আমাকে একটি বন্দুক ও থলে দিয়েছেন। সবকিছুই দিয়েছেন এমনকি আমি যা চাই তার থেকেও বেশিকিছু।’ ফ্লোরিডা থেকে আসা ওই হামলাকারী গত ২৫ মে সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-জাবরিন এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি তল্লাশিচৌকিতে বোমা হামলা চালিয়েছিল। হামলার ৬ দিন পর মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করে ২০১৩ সালে সিরিয়া সফরে যাওয়া মার্কিন নাগরিক আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে।

টানবাজার থেকে টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইল যৌনপিল্লটি মাটির সঙ্গে মেশানোর
কাজ প্রায় শেষ। ছবি: কামনাশীষ শেখর
তাঁরা তিনজনই সোফার একেবারে কিনারায় শরীর ঠেকিয়ে টান টান হয়ে বসে ছিলেন। হাতগুলো কোলের কাছে জড়সড়। ভঙ্গিতে অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা। যেন এখনই তাঁদের ছুটে পালাতে হতে পারে। তাঁরা তিনজনই এত রোগা! যেন কত দিন খেতে পান না। তাঁদের মুখে হতবিহ্বল অসহায়তা লেপ্টে রয়েছে। টাঙ্গাইল শহরের কান্দাপাড়া যৌনপল্লি উচ্ছেদের দিন দশেক পর সে শহরেই এক অফিসে তাঁদের মুখোমুখি হই। বুকের মধ্যে মোচড় দেয়। চেহারাগুলো মনের মধ্যে গেঁথে যায়। তাঁদের বয়স ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে।
পল্লিটিতে ঘর ভাড়া করে থেকে যৌনসেবা বিক্রি করতেন তাঁরা। চলতি মাসের গোড়ায় শুরু হওয়া উচ্ছেদ আন্দোলনের চূড়ান্ত দিনে ১২ জুলাই হুড়োহুড়ি করে পাড়া ছেড়েছিলেন৷ গাঢ় নীল জামা পরা মেয়েটি বলেন, ‘জানের মায়ায় বের হয়ে আসছি।’ সাদা-নীল ছাপা শাড়ি পরা মেয়েটি জানান, বিকেলে একদল লোক দুই ঘণ্টার মধ্যে পাড়া না ছাড়লে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেয়। বিদ্যুতের সংযোগ কেটে দেওয়া হয়। তাঁর সম্পদ একটি জাজিম, তিনটি তোশক, দুটি বৈদ্যুতিক পাখা আর কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিলের কিছুই সঙ্গে আনতে পারেননি। তাঁর শিশুসন্তানকে এক আত্মীয়ের কাছে ছেড়ে এসে নিজে রাস্তায় রাস্তায় তাড়া খেয়ে বেড়াচ্ছেন। তারই মধ্যে ‘লোকজন করে’ পেট বাঁচানোর ধান্দা। রাস্তায় নাকি আরও অনেক মেয়ে উঠেছেন। দিনে তাঁরা তিনজন একটি এনজিওর দিবা-আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠেন। রাতে পথেই কাজ করে খোলা বারান্দায় ঘুম। তাঁরা বলেন, রাতে ছেলেরা তাড়া করে, মারধর করে। সন্তানসম্ভবা এক যৌনকর্মীকে মেরে পা ফুলিয়ে দিয়েছে। নীল-জামা জানান, সারা রাত ঘুরে হয়তো ৫০ থেকে ১০০ টাকা আয় হয়। গত রাতে তাঁর গলায় ছুরি ঠেকিয়ে টাকা কেড়ে নিয়ে গেছে মহল্লার মাস্তানেরা। ধর্ষণের শিকারও হতে হয়েছে। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছেন, এ কথা বলতে গিয়ে গলাটা তাঁর বুজে আসে। এই তিনজনের মুখ চোখের সামনে থেকে সরছে না। অনেক দিন আগে এক বন্ধুর মুখে শোনা গানটি মাথার মধ্যে ঘুরছে—‘শরীর বেচি, শরীর বেচি, শুনেন ভদ্রজন/ রাতের নায়ক যারা, তারাই দিনের বিচারক/ জীবনটারে কোন জীবনে থুই, ভাঙাচোরা মন...।’ ১৫ বছর আগের একটি দৃশ্যও চোখে ভাসছে। ২৪ জুলাই ১৯৯৯।
শেষ রাতের অন্ধকারে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা আর কয়েক শ পুলিশ উচ্ছেদ করেছিল নারায়ণগঞ্জের টানবাজার ও নিমতলি যৌনপল্লি। সকালে টানবাজারে সুনসান বাড়িগুলো ঘুরে দেখছিলাম। ভেতর দিকের একটি ঘরে এক খোপে একটি মেয়ের দেখা পাই। তিনি রাতে জ্বরে বেহুঁশ ছিলেন। উচ্ছেদ ও ধরপাকড়ের তাণ্ডব টের পাননি। সকালে কবরের নীরবতায় জেগে ওঠে নিজের তছনছ হয়ে যাওয়া জগৎ দেখছিলেন। তাঁর দৃষ্টির শূন্যতা ভোলার নয়। টানবাজার উচ্ছেদের নেপথ্যে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সরকারদলীয় সাংসদ শামীম ওসমান (বর্তমানেও সাংসদ তিনি)। পুনর্বাসনের নাম করে উচ্ছেদের সেই যজ্ঞে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আশীর্বাদ ও সক্রিয় সমর্থন ছিল। সাংসদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, যৌনপল্লির বিএনপিপন্থী বাড়িওয়ালাদের আর্থিক কোমর ভেঙে দেওয়া। ১৫ বছর পর আরেক জুলাইয়ে টাঙ্গাইলের যৌনপল্লিটি উচ্ছেদের নেপথ্য নায়ক হিসেবে যাঁর এবং যাঁদের নাম নানা মহলে গুঞ্জরিত, তাঁরাও সপরিবারে সরকারি দল করেন। তাঁরা হচ্ছেন পৌর মেয়র সহিদুর রহমান খান ওরফে মুক্তি (শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) এবং তাঁর ভাই জাহিদুর রহিম খান কাঁকন (জেলা ব্যবসায়ী ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক ও চেম্বারের সভাপতি)। টাঙ্গাইল-৩ আসনের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান ওরফে রানা তাঁদেরই আরেক ভাই। আরও এক ভাই সানিয়াত খান ওরফে বাপ্পা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি৷ খান ভাইয়েদের পৈতৃক বাড়ি কান্দাপাড়া যৌনপল্লির গা ঘেঁষে। বারান্দা ও ছাদ থেকে পাড়াটি স্পষ্ট চোখে পড়ার কথা। ২৩ জুলাই সকালে গিয়ে দেখা যায়, তিন একর (৩০২ শতাংশ) আয়তনের পাড়াটি মাটির সঙ্গে মেশানোর কাজ প্রায় শেষ। বাদ পড়েনি যৌনকর্মীদের ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থল ‘মা ফাতিমার মন্দিরে’র চত্বরও।
উঁচু সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে মজুরেরা ইতস্তত বাড়িঘর ভাঙছেন। কে তাঁদের কাজ করাচ্ছেন? কয়েকজন বলেন, বাড়িওয়ালা। কয়েকজন চুপ। ইট-সুরকির ধ্বংসস্তূপে অবহেলায় পড়ে রয়েছে হাসিমুখ নায়কের সঙ্গে একটি মেয়ের কারসাজি করা ছবি—একটি স্বপ্নের অবশেষ। কয়েকটি আধভাঙা ঘরের সামনে একপাটি হিলতোলা জুতা, বাচ্চার পায়ের জুতা আর ছেঁড়া কনডম। শ-দেড়েক বছর বয়সী এই যৌনপল্লিতে বেসরকারি সংস্থা এইচআইভি/এইডস অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের (হাসাব) একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প চলত। গত জুনে করা তাদের জরিপ বলছে, এখানে ৮০৪টি কক্ষে ৬২২ জন সক্রিয় যৌনকর্মী ১২৯টি শিশুসন্তানসহ থাকত। সাবেক যৌনকর্মী বা মাসি, নিয়মিত সঙ্গী বাবুসহ বাসিন্দার সংখ্যা ছিল হাজার খানেক। কান্দাপাড়ার যৌনকর্মীদের সংগঠন নারী মুক্তি সংঘের হিসাবে বাসিন্দার সংখ্যাটি আরও বড়। পাড়ার জমি ব্যক্তিমালিকানার। পৌরসভার তালিকা অনুযায়ী, ৬৮টি হোল্ডিংয়ে বাড়িওয়ালার সংখ্যা ৬৩। তাঁদের প্রায় ৪০ জন সাবেক যৌনকর্মী নারী। পুরুষ বাড়িওয়ালাদেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ যৌনকর্মীদের আত্মীয়। অনেক বাড়িওয়ালা শহর ও শহরতলিতে বাড়ি করে থাকতেন। দৈনিক ভাড়া তুলতেন; ঘর তথা যৌনকর্মীপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বা আরও বেশি। ২২ জুলাই রাতে শহরের কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়েছিলাম কয়েকজন বাড়িওয়ালার খোঁজে। গিয়ে দেখি থমথমে আতঙ্ক। এলাকাবাসী কোনো ভাড়াটেকে আশ্রয় দিতে দিচ্ছে না, বাড়িওয়ালাদেরও কাউকে কাউকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। শহর থেকে ‘ছেলেপিলে’ গিয়েও মানবাধিকারকর্মীদের কাছে মুখ না খুলতে শাসিয়ে এসেছে।
উচ্ছেদ-আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১ জুলাই ‘টাঙ্গাইল অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করে। কমিটির সভাপতি আলহাজ মাওলানা আবদুল আজিজ হেফাজতে ইসলামের জেলা আমির। সদস্যরা মূলত বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার আলেম-মুনসি। (টানবাজার উচ্ছেদেও এমন একটি ‘নাগরিক কমিটি’ সামনে ছিল।) এ কমিটি ৬ জুলাই পৌর মেয়রের কাছে ‘দেহব্যবসাকেন্দ্র’ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবিতে স্মারকলিপি দেয়। ১০ জুলাই থেকে কিছু লোক যৌনকর্মীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখে। ১২ থেকে ১৩ জুলাই সকালের মধ্যে আতঙ্কিত বাসিন্দারা পল্লি ছাড়ে। পরদিন থেকে চাপের মুখে বাড়িগুলো ভাঙা শুরু হয়৷ এদিকে যৌনকর্মী, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি খোদ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও একান্তে বলছেন, এ আন্দোলনের পেছনের শক্তি পৌর মেয়র ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা। ঠারেঠোরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে মেয়র এবং তাঁর ভাই কাঁকনের নাম। ভয়-সন্ত্রাস যাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছানোয়ার হোসেন ওরফে ছানু (জেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক) ও নাছির উদ্দিন নূরুর (জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক) নাম আসছে বেশি। তাঁরা মেয়রের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। প্রতিরোধ কমিটির সহসভাপতি আলহাজ মো. বাদশা মিয়ার চামড়ার আড়ত যৌনপল্লির ঘরের দুয়ারে। কথিত আছে, তোড়া বাড়িওয়ালির কবরের ওপর। মেয়রের সংশ্লিষ্টতার কথা বাদশা একবাক্যে নাকচ করে দিলেন। বললেন, ১৩ জুলাই সকালে তিনি ছানু ও নূরুকে পল্লির সামনে দেখেছিলেন। তবে তাঁরা নাকি মেয়েদের হেফাজত করার জন্য গিয়েছিলেন।
বাদশার কথা, কোনো হুমকি-ধমকি হয়নি, বাড়িওয়ালারা নিজেরাই ঘর খালি করে চলে গেছেন। এদিকে প্রশাসনের ওপরের দিকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাংবাদিকেরা নারায়ণগঞ্জ আর ওসমান ভাইদের নিয়ে মাতামাতি করেন কিন্তু শামীম ওসমানও নাকি খান ভাইদের কাছে শিশু। তারপর পৌরসভার দিকে যাত্রাকালে শহরজুড়ে সাঁটা নেতা তিন ভাইয়ের পোস্টারগুলো মন দিয়ে দেখলাম। মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি হলো বড় চমৎকার। ফিনফিনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা মেয়র কথা বললেন গালে টোল-ফেলা মধুর হাসিমুখে। তিনি জানান, অভিযোগগুলোর কোনো সুযোগই নেই, কেননা মেয়েরা স্বেচ্ছায় পেশা বদল করতে পাড়া ছেড়েছেন। প্রশাসনের ওই কর্মকর্তাটি আর যৌনকর্মীসহ অনেকেই মনে করছেন, উচ্ছেদ আসলে হয়েছে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পল্লিটির দামি জমি দখলের জন্য। মেয়র এ কথা শুনেও হতবাক হলেন। এর আগে অভিযোগগুলো উড়িয়ে দিয়েছিলেন মেয়রের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি, যিনি আবার সাবেক যৌনকর্মী এক বাড়িওয়ালির স্বামী। তিনি তাঁদের ৫৩টি ঘরের দৈনিক বাড়িভাড়া (১০ হাজার টাকার বেশি) হারিয়ে শোকে কাতর ছিলেন। তবে বললেন, সামনে অবশ্যই জমি ফেরত পাবেন। অন্য বাড়িওয়ালা যাঁদের সঙ্গে কথা বলা গেছে, তাঁরা অবশ্য ভরসা পাচ্ছেন না। বাড়িওয়ালিরা বিশেষ করে শঙ্কিত। বাড়িওয়ালি আর সরদারনি—যাঁরা মেয়ে খাটিয়ে খেতেন—তাঁদের তবু কিছু একটা কিনারা হয়তো হবে। কিন্তু একেবারেই সাধারণ যে যৌনকর্মীরা দারিদ্র্য, অপরাধ আর নানা রকমের শোষণে পর্যুদস্ত জীবনই কাটাতেন, তাঁরা হয়তো একেবারেই ভেসে গেলেন। নীল ছাপা শাড়ি মেয়েটি যেমন বলছিলেন, ‘এইভাবে জীবন পালন করা যায় না। কুত্তার জীবনও এর চেয়ে ভালো।’ উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আগেও তাঁরা প্রশাসন বা এনজিও-মানবাধিকারকর্মী দরদিদের কাউকেই যে কার্যকরভাবে পাশে পাননি! পুরো প্রক্রিয়াটি নাকি জেনে-বুঝে ওঠার আগেই সম্পন্ন হয়ে গেছে!
কুররাতুল-আইন-তাহমিনা: সাংবাদিক।

বিশ্ব অর্থনীতির ফাটল ও বাংলাদেশ

রঘুরাম রাজন এর বিখ্যাত গ্রন্থ ফল্ট লাইনস
যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে ২০০৭-এর আর্থিক সংকট থেকে উদ্ভূত মন্দা যখন আরেক উন্নত বিশ্ব ইউরোপের আর্থিক ভিত নড়বড়ে করে দেয়, তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। দেরি হয়ে গেছে বলার কারণ, এই সংকটের বিষয়ে সতর্কবাণী করা হলেও তাতে কেউ কর্ণপাত করেনি। এই সতর্কতার আগাম ঘোষণাকারীদের একজন ছিলেন রঘুরাম রাজন, তখনকার আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং বর্তমানে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ফল্ট লাইনস: হাউ ফ্র্যাকচারস স্টিল থ্রেটেন দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি (২০১০) প্রকাশিত হওয়ার পাঁচ বছর আগেই এক সম্মেলনে তিনি তাঁর প্রবন্ধে আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ বিপদগুলো তুলে ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে একটা বড় ধরনের সংকট নেমে আসতে পারে। সে সময় তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণীতে কেউ কর্ণপাত করেনি, বরং ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি। ‘ফল্ট লাইনস’ নামের মাজেজা বোঝানোর জন্য ভূতাত্ত্বিক একটা রূপক ব্যবহার করেছেন তিনি। ভূতত্ত্বে ফল্ট বলতে বোঝায় চ্যুতি, অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরে ফাটল দেখা দিলে তার কারণে ভূগর্ভে যে ধস বা চ্যুতি হয়, তার প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে চ্যুতি ঘটতে পারে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভূমিকম্পের মাধ্যমে। এই চ্যুতির সৃষ্টি হয় ভূগর্ভে শিলাস্তরের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ কিংবা যেকোনো বিরূপ প্রভাবের কারণে।
আমেরিকা ও তার সন্নিহিত অর্থনীতিগুলোতে সাধারণ চোখে অদৃশ্য অর্থনৈতিক ফাটলগুলোকেই তিনি ভূতত্ত্বের চ্যুতির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এবং তাঁর ধারণাকে অগ্রাহ্য করার ফলাফল ভোগ করেছিল বিশ্ব অর্থনীতি। তাঁর আশঙ্কা যখন সত্যিই ফলে যায়, তখন ‘নিউজ প্রোগ্রামগুলো, ম্যাগাজিনগুলো, বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতেরা এমনকি ইংল্যান্ডের রানি—সবাই একই প্রশ্ন বিভিন্নভাবে করতে থাকেন, ‘এটা যে আসছে, তা কেউ দেখেনি কেন?’ রাজন বলেন যে অনেকেই দেখতে পেয়ে সাবধানও করেছিল। তিনি সখেদে লেখেন, ‘সমস্যা এটা ছিল না যে কেউ এই বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দেয়নি, সমস্যা এটাই ছিল যে যাঁরা একটা অতিরঞ্জিত অর্থনীতি থেকে লাভবান হয়েছেন—যাঁদের মধ্যে অনেক লোকই ছিলেন—তাঁদের শোনার আগ্রহ ছিল কম।’ রাজনের বইটিতে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কিছু মারাত্মক হুমকির আভাস দেওয়া হয়েছে, যেগুলোকে ভূগর্ভস্তরের অদৃশ্যমান ফাটল হিসেবে রূপকায়িত করা হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয় তাঁর এই আভাসের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতির একটা চাঙা অবস্থার সুযোগে সৃষ্টি হয়েছিল এসব ফাটল। আমেরিকার হাউজিং খাতে দ্রুত ঋণ স্ফীতি থেকে যে বিশাল বুদ্বুদ তৈরি হয়েছিল, তার ঢেউ এসে পড়েছিল ইউরোপীয় অর্থনীতিতেও। অথচ অতীতের এজাতীয় বিপর্যয়গুলো আঞ্চলিকভাবেই সীমাবব্ধ থাকত। বিপর্যয়ের এই উৎসটির মূলে ছিল পর্যাপ্ত তারল্য এবং অপরিমিত ঋণঝুঁকি। গ্রাহক-ঋণগ্রহীতা, ব্যাংক ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়া লোভের কারণে উপেক্ষা করা হয়েছিল সব ধরনের ঝুঁকি।
বইটির মূল যে প্রতিপাদ্য, বিশ্ব অর্থনীতির সামনের ফাটল বা ঝুঁকিগুলো আমাদের অর্থনীতির জন্য দূরাগত মনে হলেও ২০০৭-০৮ সালের বিশ্ববিপর্যয়ের অভিজ্ঞতার পর সেই ভরসার স্থানটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। যেমন প্রথম ফাটলটি দেখা গেছে আমেরিকায়, ওপরের দিকের মানুষের আয় অনুপাতহীনভাবে বেড়ে গেলে রাজনীতিবিদেরা মধ্যবিত্ত ভোট ব্যাংকটির ওপর মনোযোগ দেয়, তাদের চাকরি-বাকরি, বেতন ইত্যাদির দ্রুত সমাধান নেই বলে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা বরং এই শ্রেণিটির জন্য সুলভ ভোক্তাঋণ, বাড়ি কেনার ঋণ—এসবের ব্যবস্থা করে দেন। রাজনের বর্ণিত এটিই প্রথম ফাটল। আমরা জানি, এই সুলভ ঋণের বুদ্বুদ বিস্ফোরিত হয়ে কীভাবে মার্কিন অর্থনীতি এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য দেশের অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করেছিল। রাজন এই লক্ষণের মধ্যে একটা ফাটল দেখতে পেলেও এখানে মূলত দুটি দুর্বলতা ক্রিয়াশীল। প্রথমটি আমেরিকার মানুষের ভেতরকার ক্রমবর্ধমান আয়ের বৈষম্য। তিনি তাঁর বইতেই দেখিয়েছেন, ১৯৭৬ সালে সে দেশের ওপরের শ্রেণির ১ শতাংশ মানুষের কাছে যেত মোট আয়ের ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, কিন্তু ২০০৭ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ ১৯৭৬ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে প্রকৃত আয় যতটুকু বেড়েছে, তার ৫৮ শতাংশ গেছে সমাজের ওপরের ১ শতাংশ মানুষের কাছে। এখানে আমরা স্মরণ করতে পারি ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের কথা। পুঁজিপতি ও বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থলোভ, সীমাহীন দুর্নীতি, সরকারি নীতিনির্ধারণে ধনবাদী পরিবার ও প্রতিষ্ঠানসমূহের অন্যায় প্রভাবের কারণেই ঘটে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনা। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। ক্রমবর্ধমান এই শ্রেণিবৈষম্য ঘোচানোর কোনো ত্বরিত ব্যবস্থা নেই বলে মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাতেই মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল ঋণবাজার, যাতে তারা তাদের আয়-স্বল্পতার বিষয়টা অনুভব করতে না পারে। এই ব্যবস্থা কিংবা অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে আমেরিকার ‘সাব-প্রাইম মর্টগেজ’ সংকটের মধ্য দিয়ে। আর দ্বিতীয় দুর্বলতাটি হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায় সস্তা ঋণের ঢালাও ব্যবস্থা। রাজন মন্তব্য করেন, ‘একটা পয়সাওয়ালা সরকারের ছড়িয়ে দেওয়া সস্তা টাকা যখন পরিশীলিত, প্রতিযোগিতাপূর্ণ, অনৈতিক আর্থিক খাতের মুনাফালোভের সংস্পর্শে আসে, তখন একটা গভীর ফাটল তৈরি হয়।’
রাজন দ্বিতীয় ফাটলটি আবিষ্কার করেছেন রপ্তানি খাতের ওপর কিছু দেশের অতিনির্ভরশীলতার কৌশলের ভেতর। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানিনির্ভর কৌশল সাময়িকভাবে ফলদায়ী এবং কার্যকর হলেও সেটি দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করা উচিত নয়। তাঁর মতে, বিদেশি ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত রপ্তানিকারক দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ভোগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক শক্ত অবস্থানে থাকার জন্য এসব দেশ রপ্তানি খাতের ওপর সম্পূর্ণ গুরুত্ব আরোপ করলেও অভ্যন্তরীণ পণ্য ও সেবা খাতে বহু দুর্বলতা পুঞ্জীভূত হতে থাকে। রাজন জাপান ও জার্মানির উদাহরণ টেনেছেন এ প্রসঙ্গে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ক্যানন, টয়োটা বা স্যামসাংয়ের মতো বড় জাপানি কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজারের বিরাট অংশ দখল করতে পারলেও দেশটি অন্যান্য সেবা খাতে অদক্ষ রয়ে গেছে। যেমন জাপানের কোনো ব্যাংক এইচএসবিসির মতো, কোনো সুপার স্টোর ওয়ালমার্টের মতো কিংবা কোনো রেস্তোরাঁ ম্যাকডোনাল্ডসের মতো প্রতিষ্ঠা পায়নি। চীনের বর্তমান আগ্রাসী রপ্তানিনীতির ভবিষ্যৎ বিপদ সম্পর্কেও সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন তিনি। রঘুরাম রাজন তৃতীয় ফাটলটি আবিষ্কার করেন শিল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ গ্রহণের প্রবণতার ভেতর। ১৯৯০ সালের পূর্ব এশীয় সংকটের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের জন্য উন্নত দেশ থেকে ঋণ গ্রহণ কীভাবে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিদেশি ঋণদাতারা তাদের ঋণকে সুরক্ষিত করার জন্য স্বল্পমেয়াদি ঋণ মঞ্জুর করে, যাতে দ্রুত তাদের লগ্নি ফিরিয়ে নেওয়া যায়, ঋণ শোধের শর্তও থাকে বিদেশি মুদ্রায়, যাতে গ্রহীতা দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন বা মুদ্রাস্ফীতির কারণে পরিশোধযোগ্য ঋণ কমে না যায় এবং ঋণ ছাড় করানোর ব্যবস্থা হয় স্থানীয় কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে, যাতে পরিশোধে ব্যর্থতার কোনো সম্ভাবনা থাকলে সেটা সরকারি নিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্ব মোচনের প্রয়াসের মধ্যে চতুর্থ ফাটলটি আবিষ্কার করেছেন রাজন। তাঁর মতে, স্বল্পমেয়াদি বেকার ভাতা ও স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ খরচ সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি দুর্বলতর করে তোলে। আমেরিকার সরকারি বিনিয়োগ যথেষ্ট না হওয়ায় বেকারত্ব মোচনের জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিষয়টিকে মুদ্রানীতির সঙ্গে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে এই ফাটল তৈরি হয়। রাজন তাঁর বইতে এসব আর্থিক বিপর্যয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারকদের নেতিবাচক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। বইটির ভূমিকার একাধিক জায়গায় তিনি রাজনীতির দায়দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, খুব মারাত্মক কিছু ফাটলের দায়ভার অর্থনীতিতে নয়, রাজনীতির মধ্যে নিহিত।
তাঁর মতে, রাজনীতিবিদেরা সেসব উপেক্ষা করেই যাবেন কিংবা নেহাত এড়াতে না পারলে কাউকে বলির পাঁঠা বানাবেন। তিনি মনে করেন, এই উপেক্ষার কারণ এই নয় যে এসব পরিবর্তন করা কঠিন। কারণ এ-ও যে এসব ফাটলের কিছু কিছু রাজনীতিবিদের মাধ্যমেও বিস্তৃত হয়। আরেক জায়গায় তিনি আরও স্পষ্টভাবে লিখেছেন, প্রায় সব আর্থিক সংকটের রয়েছে রাজনৈতিক উৎস, যদিও তা ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা হয় এবং এসব উত্তরণেও দরকার হয় শক্ত রাজনৈতিক শক্তি। রঘুরাম রাজন তাঁর উপেক্ষিত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লেখ করে নিজেকে গ্রিক পুরাণের ক্যাসেন্ড্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত এসব ফাটল আরও বিস্তৃত হয়ে আবার কোন বিপর্যয় ঘটাবে, তার আশঙ্কা আমাদের অর্থ খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া কিছু দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০১০-এর শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, তারপর হল-মার্ক এবং সর্বশেষ বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি—এই সবকিছুই ছিল রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট কিংবা রাজনীতি-সুরক্ষিত। সর্বশেষ বেসিক ব্যাংকে ঋণ বিতরণের নামে যে নির্লজ্জ লুণ্ঠন চলেছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভয়ংকর যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তার পরও কারও কোনো টনক না নড়া এবং শেষে কেবল দু-একজনকে বলির পাঁঠা বানানোর ঘটনার মতো রাজনৈতিক পদক্ষেপের কথা রঘুরাম রাজনের বইতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। এর আগের ঘটনাগুলোতেও এ রকম রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা প্রভাবের প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল। পরিতাপের বিষয়, আমরা বা আমাদের রাজনীতিবিদেরা কখনোই শিক্ষা গ্রহণ করি না। রাজনের ভবিষ্যদ্বাণী যেমন উপেক্ষা করেছিলেন নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আমাদের দেশেও ঠিক সেটাই ঘটে সব সময়। এই নিবন্ধ কিংবা রাজনের গ্রন্থ—কোনো কিছু থেকেই কেউ শিক্ষা গ্রহণ করবে না। আর তাই একের পর এক এজাতীয় ঘটনা ঘটতেই থাকে, যার কোনো প্রতিবিধান আমরা আজ অবধি দেখতে পাইনি। এবং তার প্রধানতম কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

অভিশংসন উদ্যোগ কেন সমর্থনযোগ্য?

কী কারণে জানি না, দলনির্বিশেষে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী ও আইনবিদদের একটি প্রভাবশালী অংশ বছরের পর বছর ধরে সেই ১৯৭৭ সালে জেনারেল আইয়ুবের কাছ থেকে ধার করে জেনারেল জিয়া যে স্যুট পরেছিলেন, তাতে কোনো অসংগতি দেখেন না। এর মধ্যে তাঁরা বিচারিক জবাবদিহির নিখুঁত সৌন্দর্য ও স্বাধীনতা অবলোকন করে চলেছেন। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের দৃষ্টান্ত পর্যালোচনা করলে সহজে চোখে পড়ে যে, বাংলাদেশ একটি স্যুটের কেবল ওপরের অংশ পরে আছে। এর মানে হলো উন্নত বিশ্ব যাঁরা বিচারক অপসারণে অভিশংসনপ্রথা অনুসরণ করেন, তাঁদেরও জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে। আর সেটাও কেবল বিচারক সমন্বয়ে গঠিত। সংসদ কোনো ইমপিচমেন্ট মোশন পাস করলে সবার আগে ওই কাউন্সিল অনুসন্ধান করে। যদি তারা প্রাথমিক প্রমাণ না পায়, তাহলে মোশন আর এগোয় না। সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে।
প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সচেতন মহলের অনেকেই একটি গুরুতর ভুল ধারণা পোষণ করছেন। আর সেটাই সম্ভবত মূল বিপত্তি ঘটাচ্ছে। সেটা হলো, কাউন্সিল মানেই হলো বিচারক অপসারণের সব ক্ষমতা ঐতিহ্যগতভাবে সুপ্রিম কোর্টের। আর অভিশংসন মানেই আদালতের সব ক্ষমতা খর্ব হওয়া। আগে যে ক্ষমতা আদালতের ছিল, সেটা আর তাঁর থাকবে না। সংসদের কাছে চলে যাবে। কীভাবে এই ভুল ধারণা ছড়াল? ১৯৫৬ সালে যখন প্রথম আলোচনা হলো, তখনই ভুলের সূচনা। বলা হয়েছিল, রাজনীতিকেরা অপরিপক্ব। তাই ওঁদের হাতে এত বড় মহতী দায়িত্ব অর্পণ করা যাবে না। কেবল কাউন্সিলকেই সবটুকু দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু পাকিস্তান শেষতক অভিশংসনই নিল। কিন্তু এটা চালু রাখতে হলে সাক্ষী গোপাল হলেও একটা সংসদ লাগে। সামরিক শাসনে সংসদ থাকে না। জেনারেল আইয়ুব প্রথম এই নজিরবিহীন কাউন্সিল চালু করলেন। তবে জেনারেল জিয়া ও তাঁর মিত্ররা বিচার বিভাগের তথাকথিত স্বাধীনতায় এতটাই মজলেন যে, তাঁরা আরেকটি মারাত্মক ক্ষতি করলেন। উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে এটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, বিচারক হয়ে বিচারকেরা যখন কোনো বিচারককে অপসারণের সুপারিশ করবেন, তখন সেটা চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে না। ভারত জন্ম থেকে তা মেনে আসছে। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ১৯৯২ সালে রায় দিয়েছেন, তিন সদস্যের জুডিশিয়াল কাউন্সিল যখন অপসারণ করতে বলবে, তখন সেটা হবে তার কথায় প্রস্তাবমাত্র। আইয়ুবও সেটা মেনেছিলেন। কিন্তু জিয়া মানলেন না। তবে তাঁর অগোচরেও হতে পারে। কেরানি-কীর্তি বা অসাবধানতাও হতে পারে। বাংলাদেশ সংবিধানের কাউন্সিলসংক্রান্ত ৯৬ অনুচ্ছেদ পাকিস্তানের সংবিধান থেকে অবিকল নকল করা হলো।
কেবল একটি শব্দ বাদে। পাকিস্তানের বিধান ছিল এবং এখনো আছে, কাউন্সিল যে ক্ষেত্রে অপসারণের সুপারিশ করবে, তখন রাষ্ট্রপতি অপসারণ করতে পারেন। আর বাংলাদেশে করা হলো রাষ্ট্রপতি অপসারণ করবেন। ‘মে’ মুছে ‘শ্যাল’ বসানো হয়েছিল। কাউন্সিলের সুপারিশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ রহিত করা হয়েছিল। আমরা সুপারিশ করব কাউন্সিল রেখেই অভিশংসনপ্রথা আনতে হবে। এর অর্থ দাঁড়াবে বিচারকেরা এখনকার চেয়ে আরও বেশি সুরক্ষা লাভ করবেন। সেটা এই অর্থে যে, তাঁদের অপসারণে বা জবাবদিহির বিষয়টি বর্তমানের পাকিস্তানি মান থেকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে। ÿক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক থেকেও আমরা মনে করি, যেভাবে কাউন্সিল বর্তমানে আছে, সেভাবে এটা থাকতে পারে না। যদি দেখা যায়, ৯৬ অনুচ্ছেদ ফেলে দিয়ে ১৯৭২ সালের বিধানটা কেবল অবিকল প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে, তাকে কার্যকর করতে পূর্ণাঙ্গ আইন করা হচ্ছে না, তখন বুঝতে হবে এটা প্রায় শতভাগ একটি রাজনৈতিক চমক। কেবল বিচার বিভাগকে ভয় দেখানোর জন্যও হতে পারে। ইমপিচমেন্টসংক্রান্ত একটি বিধান বাহাত্তরে লেখা হলেও তাকে কার্যকর করতে কোনো আইন করা হয়নি। এই আইনটাই আসল। কিন্তু এ নিয়ে কোনো কথা নেই। আর এই আইন না করার ফলে এ দেশের মানুষ ইমপিচমেন্ট সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ ধারণা পায়নি। ভারত ১৯৬৮ সালে এই আইন পাস করেছিল। এরপর ১৯৯২ সালে প্রথম বিচারপতি রামস্বামীকে অপসারণের উদ্যোগ নিলে সুপ্রিম কোর্টকে চারটে মামলায় রায় দিতে হয়। অভিশংসনে যাওয়ার আলোচনা শুরু না হতেই হাইকোর্টে রিট দায়েরের তোড়জোড় তাই অবাক করার মতো কোনো বিষয় নয়। বিশ্বের যেসব দেশ ইমপিচমেন্টপ্রথা অনুসরণ করে চলেছে, তার অধিকাংশই বিচার বিভাগকে যুক্ত রেখেছে। তাই সোজা কথায় ইমপিচমেন্ট হলো এমন একটি ব্যবস্থা,
যেখানে আমাদের বিদ্যমান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বা তার মতো সংস্থা প্রাথমিক অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করে থাকে। পুলিশি অভিযোগপত্র কি চূড়ান্ত? যদি তাই হতো, তাহলে তো বিচারের ধারণা চুলোয় যেত। আদালতের দরকার পড়ত না। সভ্য দুনিয়ায় কাউকে অপসারণে এমনতর কাউন্সিলের সুপারিশ হলো কিছুটা পুলিশি অভিযোগপত্রের মতো। যার ভিত্তিতে সংসদ বিচার করতে বসে। সেপারেশন অব পাওয়ার যেহেতু মানতে হবে, তাই সংসদ বিচারকের বিচার করে থাকে। একটি ইমপিচমেন্টের দুটি দিক থাকে। একটি বিচারিক, অন্যটি রাজনৈতিক। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, অভিশংসন একান্তভাবে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এর বিরুদ্ধে আপিল চলবে না। এ কথা উপমহাদেশের ক্ষেত্রে খাটে না। আমাদের জন্যও নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। তার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি অবিচ্ছেদ্য। এ-সংক্রান্ত আলোচনায় একটা রাখঢাক দেখা যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিশংসনসংক্রান্ত আইনে একটি উপযুক্ত সংশোধনী আনতে ভারতের আইন কমিশন ৫০০ পৃষ্ঠার রিপোর্ট লিখেছে। তার আলোকে ২০০৫ ও ২০০৬ সালে দুটো বিল পাস করানোর ব্যর্থ চেষ্টার পরে ২০১০ সালে আরও সংশোধনী এনে লোকসভা তা পাস করলেও তা কার্যকর হয়নি। সবশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে কেবিনেট এর একটি সংশোধনী আনার প্রস্তাব অনুমোদন করলেও তা লোকসভায় পাস হতে পারেনি। আমাদের আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, যিনি পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলায় বাহাত্তরের সংবিধানের অনেক বিধান জীবিত করলেও এই অভিশংসনে আটকে যান। কারণ, তিনি হয়তো দেখেন, তাহলে বাকশালের চেহারাটা বোরোবে। চতুর্থ সংশোধনীতে ওই অভিশংসন বাতিল হয়েছিল। এর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির নোটিশে অপসারণের বিধান ছিল। আওয়ামী তরিকার আইনবিদেরা যে জিয়াকে অন্তত এই প্রশ্নে নির্দিষ্টভাবে গালি দেন না, তার কারণ তাহলে ওই অপ্রিয় সত্যটা বেরোবে। সবাই মানবেন, নোটিশের চেয়ে কাউন্সিল হাজার গুণে শ্রেয়।
এখন আইন কমিশন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে গোপনীয়তার সঙ্গে অভিশংসনে যেতে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। এটা পীড়াদায়ক যে, আইন কমিশন বিষয়টির গোপনীয়তা রক্ষা করছে। এ ব্যাপারে কোথাও কোনো ধরনের গোপনীয়তা মার্জনা করা যাবে না। কিন্তু আগেই বলেছি, কাউন্সিল হলো আধখানা স্যুট। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের কাউন্সিলকে ‘পিয়ার রিভিউ’, মানে অপসারণ-অযোগ্য ছোটখাটো অসদাচারণের দায়ে ‘মাইনর মেজার্স’ (লঘু শাস্তি) নেওয়ার এখতিয়ার প্রয়োগ করতে দেখা যায়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টকে সর্বাগ্রে এই ‘পিয়ার রিভিউ’ মানতে হবে। কার্যকর করতে হবে। অপসারণ করা তো অনেক দূরের কথা। কেউ বলবেন, এ কথা তো কখনো সংবিধানে লেখা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এ প্রশ্ন উঠেছিল। তাদের উচ্চ আদালত বলেছেন, এ কথা সংবিধানে লেখার দরকার নেই। অথচ বাংলাদেশের প্রত্যেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারকদের এই ‘পিয়ার রিভিউ’র ধারণাকে আত্মস্থ করা কিংবা আলোচনা করার গরজ অনুভব করতেও আমরা দেখিনি। অবসরে গিয়েও তাঁরা নীরবতা পালন করেন। আর অনেক রাজনীতিক এসব আদৌ বোঝেন কি না, তা সন্দেহের বিষয়। ১৯৭০ (চান্দলার) থেকে ২০০১ (ম্যাকব্রাইড) পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালত অর্ধডজন রায়ে বলেছেন, অপসারণ ব্যতিরেকে বিচারকেরা নিজেদের বিচার নিজেরাই করতে পারেন। কারণ, ‘পিয়ার রিভিউ একটি আন্তর্জাতিক রীতি’। ১৯৯৫ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই অভিমত দৃঢ়তার সঙ্গে সমর্থন করেছেন। পাঁচটি কাজ তাঁরা করতে পারেন। উপদেশপত্র জারি, অবসর নেওয়ার অনুরোধ,
সীমিত সময়ের জন্য বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা, সতর্কতা ও তিরস্কার। ভারতের আইন কমিশন বলেছে, এই তিরস্কার করাটা প্রকাশ্যে বা গোপনে হতে পারে। এই ‘সেলফ রেগুলেশন’ কীভাবে, কোথায় লেখা হবে, সেটা নিয়ে সর্বাগ্রে আলোচনা শুরু হোক। আদালতেরই কায়েমি ক্ষমতা সংসদ নিয়ে নিচ্ছে কিংবা জবাবদিহি প্রশ্নে সংসদকে কিছুতেই যুক্ত করা যাবে না কিংবা আদালত অপরিপক্ব সাংসদদের পাল্লায় পড়ছে—এ ধরনের বোধ সৃষ্টি করার যেকোনো প্রবণতা পরিত্যাজ্য। পক্ষে-বিপক্ষে যাঁরা কোমর বাঁধতে শুরু করেছেন, তাঁদের উচিত বিশ্ব কীভাবে চলছে, সেটা খোলা মনে পর্যালোচনা করা। অমুক বনাম অমুক লড়াইয়ের হুজুগ সৃষ্টিকারীদের কাছে সংযম ও বোধোদয় আশা করি। সংসদীয় অভিশংসন সমর্থন করলেও সেটা কী প্রক্রিয়ায়, সেটাই জ্বলন্ত প্রশ্ন। সংবিধানে কী লেখা হবে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়াটা জানা। জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বহাল রেখেই সুরাহা বের করতে হবে। ২০০৫ সালের ব্রিটিশ আইন, ১৯৮৫ সালের কানাডীয় আইনের অধীনে উপ-আইন এবং জার্মান সংবিধানে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে ১৯৩৯ সালে যে ÿক্ষমতা (যেমন বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহার) অনুচ্চ ছিল, সেটা ১৯৮০ ও ২০০২ সালের মধ্যে দুটি সংশোধনীতে উচ্চকিত হয়েছে। বিচারপতি ভেঙ্কটচালিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০০১ সালের ভারতীয় সংবিধান সংস্কার কমিশনও এর পক্ষে মত দিয়েছে। আমরাও বলি, জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে তাদের এখতিয়ার স্পষ্ট করে দিতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com