Showing posts with label যৌন আবেদনময়ী. Show all posts
Showing posts with label যৌন আবেদনময়ী. Show all posts

Sunday, June 28, 2026

গুহামানবদের চুম্বন, এবং...

মানবসভ্যতার বহু পুরোনো এক রহস্যে আলো ফেলেছে নতুন এক গবেষণা। তাতে বলা হয়েছে, মানুষ ও নিয়ান্ডারথালরা শুধু মিলনই করত না, তারা একে অপরকে চুম্বনও করত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে মানুষের চুম্বনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন ডেইলি মেইল বলছে, নিয়ান্ডারথাল হলো মানুষের ঘনিষ্ঠ পূর্বপুরুষ। তারা প্রায় ৪ লাখ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ায় বসবাস করত।

আগের গবেষণায় জানা গিয়েছিল, আধুনিক মানুষের জিনে আজও নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ পাওয়া যায়। অর্থাৎ দুই প্রজাতির মধ্যে যৌনসম্পর্ক ঘটেছিল। তবে চুম্বনও সেই মিলনের অংশ ছিল কি না, তা এতদিন অজানাই ছিল। গবেষণার সহ-লেখক ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ক্যাথরিন ট্যালবট বলেন, চুম্বন আমাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার মনে হলেও, মানব সভ্যতার মাত্র ৪৬ শতাংশ সংস্কৃতিতে এটি নথিবদ্ধ। সমাজভেদে এর অর্থ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এটি কি আদিম আচরণ, নাকি সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন- এটাই ছিল বড় প্রশ্ন। গরিলা, শিম্পাঞ্জি, বনোবো থেকে শুরু করে সাদা ভাল্লুক, নেকড়ে এমনকি অ্যালবাট্রস- অনেক প্রাণি চুম্বনের মতো আচরণ করে। কেউ মুখে মুখ দেয়, কেউ নাক ছোঁয়ায়, কেউ মাথা ঠেকায়- যা সামাজিক বা প্রজনন আচরণের অংশ। তবে বিবর্তনগতভাবে চুম্বন হলো এক ‘রহস্যময় আচরণ’। কারণ এতে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। অথচ প্রজননে সরাসরি কোনও সুবিধা দেয় বলে মনে হয় না। গবেষকরা আধুনিক প্রাইমেটদের আচরণ নিয়ে সংগ্রহ করা বিপুল তথ্য ব্যবহার করেন- যেমন শিম্পাঞ্জি, বনোবো, ওরাংওটাং কি ধরনের চুম্বন-সদৃশ আচরণ করে। তারা চুম্বনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে- ‘আক্রমণাত্মক নয়, মুখে-মুখে স্পর্শ, যার মধ্যে খাবার আদান-প্রদান হয় না।’ এরপর জটিল পরিসংখ্যানভিত্তিক বাইসিয়ান মডেলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে বিবর্তনের বিভিন্ন শাখায় চুম্বনের সম্ভাব্য উৎস নির্ণয় করা হয়। মডেলটি এক কোটি বার চালানো হয়, যাতে ফলাফল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চুম্বনের উৎপত্তি দুই কোটি ১৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৬৯ লাখ বছর আগের এক পূর্বপুরুষে। এই পূর্বপুরুষ থেকে সৃষ্টি চারটি গ্রেট এপ। তারা হলো ওরাংওটাং, গরিলা, প্যান (শিম্পাঞ্জি ও বনোবো) এবং হোমো (যার একমাত্র জীবিত সদস্য আধুনিক মানুষ)।

গবেষকদের মতে, নিয়ান্ডারথালরাও জীবদ্দশায় চুম্বনের আচরণ করত। এটি সমর্থন করছে আগের প্রমাণ- মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের মুখের জীবাণু  আদান-প্রদান হয়েছিল, যা লালার মাধ্যমে ছাড়া সম্ভব নয়। গবেষণা বলছে- মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের শারীরিক সান্নিধ্য শুধু মিলনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং চুম্বন, আদর, ঘনিষ্ঠ স্পর্শ- সবই ঘটত। যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন- প্রাগৈতিহাসিক যুগে মিলন সবসময়ই হয়তো ‘সম্মতিতে’ হয়নি। প্রফেসর পল পেটিট ডেইলি মেইলকে বলেন, আমরা ধরে নিই মিলন ছিল সম্মতিপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হল- সে যুগে অনেক সময়ই হয়তো কারও কোনও বিকল্প ছিল না। যদি সম্মতিপূর্ণ হয়ে থাকে- তবে অবশ্যই চুম্বন ও আলিঙ্গন ছিল মিলনের অংশ।
চুম্বন প্রায় সব বড় এপ প্রজাতির মধ্যেই আজও দেখা যায়। অর্থাৎ এটি টিকে আছে লক্ষ লক্ষ বছর। তবে কেন এটি বিবর্তনে বজায় রইল। তার কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। একটি ধারণা হলো- চুম্বনের মূল ছিল পরস্পরের গায় থেকে উকুন-টিক পড়া সরানো। পরবর্তীকালে এটি যৌন উত্তেজনা ও অন্তরঙ্গতার অংশ হয়ে ওঠে।
https://mzamin.com/uploads/news/main/190205_Abul-6.webp

Monday, June 15, 2026

কেনিয়ায় কারা এই ‘ম্যাডাম’, কীভাবে শিশুদের বিপদগামী করেন তাঁরা

আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় শিশুদের যৌনবৃত্তিতে জড়াচ্ছেন কিছু নারী। সেখানে এসব নারীকে ‘ম্যাডাম’ নামে ডাকা হয়ে থাকে। তাঁরা মাত্র ১৩ বছর বয়সী শিশুদের পর্যন্ত যৌনকর্মে জড়াতে বাধ্য করছেন। বিবিসি আফ্রিকা আই–এর এক অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউতে দিনরাত ট্রাক ও লরি চলাচল করে। পণ্য ও মানুষ নিয়ে এসব যানবাহন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, এমনকি উগান্ডা, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্রের মতো অন্য দেশ পর্যন্ত যায়।

শহরটির অবস্থান নাইরোবি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) দূরে। এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি আগে থেকেই যৌন ব্যবসার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এটি শিশুদের যৌন নিপীড়নের জায়গাও হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের শুরুতে বিবিসি আফ্রিকা আইয়ের দুজন নারী অনুসন্ধানী প্রতিবেদক যৌনকর্মী সেজে ওই শহরের যৌন ব্যবসা চক্রের ভেতরে ঢুকে পড়েন। ওই দুই অনুসন্ধানী সাংবাদিক এমন ভাব করছিলেন, যেন কীভাবে ‘ম্যাডাম’ হওয়া যায়, তা তাঁরা শিখতে চান।

ওই দুই সাংবাদিক গোপনে কিছু ভিডিও ধারণ করেছেন। ভিডিওতে অন্য দুজন নারীকে কথা বলতে শোনা যায়। তাঁরা বলছিলেন, এটা যে বেআইনি কাজ, তা তাঁরা জানেন। এরপর ওই দুই নারী বিবিসির সাংবাদিকদের সঙ্গে যৌন পেশায় জড়িত কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের পরিচয় করিয়ে দেন।

বিবিসি ওই ভিডিও এবং তাদের পাওয়া সব তথ্য গত মার্চে কেনিয়ার পুলিশকে দেয়। বিবিসির ধারণা, এরপর ‘ম্যাডামরা’ তাঁদের জায়গা বদলে ফেলেছেন। পুলিশ বলেছে, যেসব নারী ও মেয়েদের ভিডিওতে দেখা গেছে, তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

কেনিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। মামলায় জিততে হলে পুলিশের ও সংশ্লিষ্ট শিশুর সাক্ষ্য দরকার হয়। কিন্তু বেশির ভাগ সময় শিশুরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়।

বিবিসির রাতের আঁধারে গোপনে ধারণ করা ঝাপসা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী নিজেকে ‘নিয়ামবুরা’ নামে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি হেসে হেসে বলছেন, ‘তারা তো এখনো বাচ্চা। তাই একটু মিষ্টি দিলেই সহজে কাবু করে ফেলা যায়।’

নিয়ামবুরা নামের ওই নারী বলেন, ‘মাই মাহিউতে যৌনবৃত্তি যেন নগদ ফসলের মতো। ট্রাকচালকেরাই এর মূল চালিকাশক্তি। আমরা সেখান থেকেই মুনাফা করি। মাই মাহিউতে এটা এখন একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে।’

নিয়ামবুরা বলেন, তাঁর কাছে মাত্র ১৩ বছর বয়সী একটি মেয়ে আসে। সে ছয় মাস ধরে যৌন পেশায় কাজ করছে।

নিয়ামবুরা আরও বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে কাজ করাটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আপনি তাদের শহরে খোলাখুলি আনতে পারেন না। আমি শুধু গভীর রাতে, চুপিসারে তাদের বাইরে নিয়ে আসি।’

কেনিয়ার জাতীয় আইনে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের নিজেদের সম্মতিতে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে অনেক পৌরসভায় স্থানীয় আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাই মাহিউ শহরটি নাকুরু কাউন্টির অন্তর্ভুক্ত। সেখানে এটা নিষিদ্ধ নয়।

তবে কেনিয়ার দণ্ডবিধি অনুযায়ী, যৌনবৃত্তি থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবন যাপন করাটা বেআইনি। হোক তিনি যৌনকর্মী নিজে বা কোনো দালাল। ১৮ বছরের কমবয়সী কোনো শিশুকে যৌন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিক্রি বা পাচার করার অপরাধে ১০ বছর থেকে শুরু করে আমৃত্যু কারাদণ্ড হতে পারে।

আরেকটি সাক্ষাতে নিয়ামবুরা গোপনে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তিনজন কিশোরী একটি সোফায় বসে ছিল। আরেকজন বসে ছিল একটি কাঠের চেয়ারে। এরপর নিয়ামবুরা ঘর থেকে বের হয়ে যান। আর এতে অনুসন্ধানকারী একা একা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।

মেয়েরা জানায়, তাদের দিনে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়।

একজন মেয়ে বলে,‘ অনেক সময় এক দিনেই অনেক লোকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে হয়। খদ্দেররা এমন সব কাজ করতে বাধ্য করেন, যা কল্পনাও করা যায় না।’

কেনিয়ায় কতজন শিশুকে জোর করে যৌন ব্যবসায় যুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১২ সালে কেনিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছিল, প্রায় ৩০ হাজার শিশু তখন যৌনকাজে জড়িত ছিল।

কেনিয়ার তৎকালীন সরকার এবং বর্তমানে বিলুপ্ত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ইরাডিকেট চাইল্ড প্রস্টিটিউশন ইন কেনিয়া’র দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল।
২০২২ সালে গ্লোবাল ফান্ড টু অ্যান্ড মডার্ন স্লেভারি নামের এনজিও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিলিফি ও কোয়ালে কাউন্টিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিশুকে জোর করে যৌনকর্মে যুক্ত করা হয়েছে।

বিবিসির আরেক অনুসন্ধানী সাংবাদিক যৌনপল্লির অন্য এক নারীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেন। ওই নারী নিজের নাম চেপ্টু বলে উল্লেখ করেন।

বিবিসির সাংবাদিককে চেপ্টু বলেন, তিনি কমবয়সী মেয়েদের বিক্রি করে জীবিকা উপার্জন করেন এবং আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারেন। বেআইনি হওয়ায় এ ধরনের ব্যবসা খুব গোপনে করতে হয়।

চেপ্টু আরও বলেন, ‘যদি কেউ ছোট মেয়ের চাহিদা জানান, আমি তাঁদের কাছে অর্থ চাই। আমাদের নিয়মিত কিছু খদ্দেরও আছেন, যাঁরা বারবার তাদের জন্য ফিরে আসেন।’

চেপ্টু গোপন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে একটি ক্লাবে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অধীন কাজ করা চারজন মেয়ে ছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ১৩ বছর। বাকিরা বলেছে, তাদের বয়স ১৫।

কমবয়সী মেয়েদের থেকে কত আয় হয়, সে বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন চেপ্টু। তিনি বলেন, মেয়েরা প্রতি ৩ হাজার কেনিয়ান শিলিং (প্রায় ২৩ ডলার বা ১৭ পাউন্ড) আয় করলে, তাতে তার নিজের ভাগের পরিমাণ হয় ২ হাজার ৫০০ শিলিং (প্রায় ১৯ ডলার বা ১৪ পাউন্ড)।

আরেক সাক্ষাতে মাই মাহিউ শহরের একটি বাড়িতে চেপ্টু অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে একা রেখে চলে যান। ওই মেয়েদের একজন বলে, সে গড়ে প্রতিদিন পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য হয়।

কেনিয়ার যৌনবৃত্তি এক জটিল ও অন্ধকার জগৎ। সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ উভয়ই শিশুদের যৌনবৃত্তিতে নিয়ে আসার সঙ্গে জড়িত।

মাই মাহিউ শহরে ঠিক কতজন শিশুকে জোর করে এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের এই ছোট্ট শহরে তাদের খুঁজে পাওয়া খুব সহজ।

‘বেবি গার্ল’ নামে পরিচিত এক সাবেক যৌনকর্মী এখন মাই মাহিউ শহরে যৌন নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা মেয়েদের আশ্রয় ও সহায়তা দেন। বর্তমানে ৬১ বছর বয়সী এ নারী ৪০ বছর যৌনকাজে জড়িত ছিলেন। তাঁর বয়স যখন ২০-এর কোটায়, তখন তিনি পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে এসে পথে বসেন। তাঁর সঙ্গে তিন সন্তান ছিল এবং তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে তিনি যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

বাড়ির সামনের অংশে একটি আলো ঝলমলে ঘরে কাঠের টেবিলে বসে এই নারী বিবিসির সাংবাদিককে চারজন তরুণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই চারজনকে শৈশবে মাই মাহিউ শহরের কিছু ‘ম্যাডাম’ জোর করে যৌনবৃত্তির পথে ঠেলে দিয়েছিলেন।

প্রত্যেক তরুণীই বলেছেন, হয় তাঁদের মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল অথবা মা-বাবা বেঁচে ছিলেন না, নয়তো বাড়িতে তাঁদের নির্যাতনের শিকার হতে হতো। তাঁরা নিজেদের বাড়ি থেকে পালিয়ে নিরাপত্তা পাওয়ার আশায় মাই মাহিউতে এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে আবারও নিপীড়নের শিকার হন তাঁরা।

মিশেল নামের এক তরুণী বলেন, ১২ বছর বয়সে তিনি মা–বাবাকে এইচআইভির কারণে হারিয়েছিলেন। তারপর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। রাস্তায় এক লোকের সঙ্গে দেখা হয়। ওই লোক তাঁকে থাকার জায়গা দেন। কিন্তু তাঁর ওপর যৌন নিপীড়ন শুরু করেন।

দুই বছর পর মাই মাহিউর এক ‘ম্যাডাম’ তাঁর কাছে এসে তাঁকে যৌনকর্মে যুক্ত হতে বাধ্য করেন।

লিলিয়ান নামের ১৯ বছর বয়সী আরেক তরুণী বলেন, ছোটবেলাতেই তিনি মা–বাবাকে হারিয়েছেন। তিনি তাঁর চাচার কাছে ছিলেন। ওই চাচা তাঁকে গোসলের সময় গোপনে ভিডিও করেন এবং সেই ভিডিও বন্ধুদের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে পরে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।

ঘটনার সময় লিলিয়ানের বয়স ১২ বছর ছিল। তিনি তখন পালিয়ে যান। এরপর আবার এক ট্রাকচালকের হাতে ধর্ষণের শিকার হন। ওই ট্রাকচালকই তাঁকে মাই মাহিউতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে এক নারী তাঁকে সেখানে যৌনকর্মের সঙ্গে যুক্ত করেন।

এই তরুণীরা এখন ‘বেবি গার্ল’-এর আশ্রয়ে আছেন। তাঁদের দুজন এখন ফটোগ্রাফি স্টুডিওতে আর দুজন সৌন্দর্য চর্চাকেন্দ্রে কাজ করছেন।

তাঁরা সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ‘বেবি গার্লকে’ সহযোগিতা করেন।

লিলিয়ান ফটোগ্রাফি শেখা এবং অতীতের নির্যাতনের ক্ষত থেকে সেরে ওঠার ওপর মনোনিবেশ করেছেন।

লিলিয়ান বলেন, ‘আমি আর ভয় পাই না। কারণ, “বেবি গার্ল” আমার পাশে আছেন। তিনি আমাদের অতীতকে ভুলে যেতে সাহায্য করছেন।’

কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউ যৌন ব্যবসার এলাকা হিসেবে পরিচিত
কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউ যৌন ব্যবসার এলাকা হিসেবে পরিচিত। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে

Thursday, June 11, 2026

হালালা সেন্টার: যৌনতার ফাঁদ নাকি ধর্মীয় সমাজের ল্যাবরেটরি টেস্ট by মনযূরুল হক

ভার্চ্যুয়াল জগৎ মাঝেমধ্যে আমাদের চেনা সমাজের ওপর এমন এক ল্যাবরেটরি টেস্ট চালায়, যার ফলাফল দেখে শিউরে উঠতে হয়। সম্প্রতি ফেসবুকে ঘটে যাওয়া ‘হালালা সেন্টার’ নামক একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন এবং তা ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনা আমাদের তেমন এক নগ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

একটি ভুয়া আইডি থেকে তালাকপ্রাপ্ত নারীদের পুনরায় আগের স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দেওয়ার ‘সুবিধার্থে’ ‘হিল্লা’ বিয়ে করার জন্য পুরুষদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। পরবর্তী পোস্টে জানা যায়, এ ‘প্রস্তাবে’ সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশের হাজার পুরুষ ই-মেইলে নিজেদের সিভি পাঠিয়েছেন। বিতর্ক তুঙ্গে উঠলে কারও অভিযোগের ভিত্তিতে ‘পুলিশ ডেকেছে’—এমন ক্ষোভ থেকে ‘গোপন রাখার শর্তে’ পাঠানো সিভিগুলোর মধ্য থেকে ৮০টি ই–মেইলের স্ক্রিনশট ও ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ফাঁস করে দেওয়া হয়।

এ তালিকায় যেমন আছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী; তেমনই আছেন হাফেজ, আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসাশিক্ষক, মাদ্রাসা পরিচালক। দুঃখের কথা হলো, প্রকাশিত ছবিগুলোর বড় অংশ ধর্মীয় লেবাসের মানুষ। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আইডি পরিচালনাকারী স্বীকার করেন, ‘পুরো প্রতিষ্ঠানটি ছিল কাল্পনিক, তবে ফাঁস হওয়া সিভির একটিও ভুয়া ছিল না।’

যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাঁদের অনেকে দাবি করছেন যে তাঁদের জিমেইল হ্যাকড হয়েছে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ‘মজার ছলে’ দুষ্টামি করতে গিয়ে তাঁরা এই ফাঁদে পড়েছেন। এটি সত্যি হলে, তা আরও ভয়াবহ বিপদের কথা বলে। সাইবার অপরাধের এই যুগে যে কারও ছবি বা জীবনবৃত্তান্ত ব্যবহার করে তাঁকে এভাবে ব্ল্যাকমেল বা সামাজিক ফাঁদে ফেলা সম্ভব। তবে যাঁরা জেনেশুনে, সজ্ঞানে এমন ‘কুৎসিত’ উদ্দেশ্যে নিজেদের তথ্য পাঠিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সামাজিক লজ্জাকে বলা যায় তাঁদের নিজেদের কর্মের ফল।

কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের আড়ালে যে সত্য ঢাকা পড়ে যায়, তা হলো একজন নারীকে সাময়িকভাবে বিয়ে করে ‘উপভোগের পর মর্জিমতো ছেড়ে দেওয়া বৈধ অধিকার’ রয়েছে—এমন একটি কদর্য সুযোগ লুফে নিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিশেষ করে ধর্মীয় ভাবধারার মানুষের ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে এখানে। সুস্থ সামাজিক কাঠামোর জন্য এটি বড় ধরনের সংকেত। বিয়ের মতো একটি পবিত্র ও সামাজিক বন্ধনকে যারা চুক্তির পণ্যে পরিণত করতে উদ্‌গ্রীব, তারা আমাদের চারপাশের চেনা মানুষই।

এ ঘটনাকে সমাজতাত্ত্বিক বিচারে দেখলে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের ‘অ্যানোমি’ বা আদর্শহীনতার তত্ত্বটি মনে পড়ে। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজে যখন দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন একধরনের নিয়মহীনতা বা শূন্যতা তৈরি হয়। সেখানে তখন মানুষ যেকোনো উপায়ে নিজের আদিম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার সুযোগ খোঁজে। তা ছাড়া এখানে নারীকে অবলীলায় প্রথম স্বামীর কাছে ফেরার ‘উপায়’ হিসেবেও মানুষকে ব্যবহার করার মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন, মানুষকে কখনো অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের ‘উপায়’ বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়; প্রত্যেক মানুষ নিজেই একেকটি লক্ষ্য।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজে কেন এমন একটি গরল দেখা গেল? যে সমাজে প্রতিনিয়ত ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটছে, ধর্মীয় আলোচনা হচ্ছে, সেই সমাজের আলেম, হাফেজ বা ইমামদের একটা অংশ কীভাবে এমন একটি জঘন্য ফাঁদে পা দিতে পারে?

উত্তরে অনেকে বলবেন, এর প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষার আত্মিক দিকটিকে বাদ দিয়ে কেবল ‘আইনি চতুরতা’র মানসিকতা। কেউ আরও গভীরে দর্শন দেবেন, ধর্ম যখন মানুষের ভেতরের নৈতিকতাকে পরিশুদ্ধ না করে শুধু বাহ্যিক লেবাস আর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের সুবিধাবাদী চরিত্রের জন্ম হয়। ধর্ম তখন হয় কিছু অন্তঃসারশূন্য বিধিনিষেধের যোগফল। ফলে একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ও বহন করতে পারে আবার ‘উপভোগ করে ছেড়ে দেওয়ার’ লোভে সিভিও পাঠাতে পারে। এটি ধর্মের ত্রুটি নয়; বরং ধর্মকে আপন স্বার্থে ব্যবহার করার বিকৃত মনস্তত্ত্ব।

আমার কাছে কারণটি অন্য রকম। আমাদের এই চেনা ধর্মীয় সমাজের অবয়ব বা আয়তন দিন দিন বাড়ছে, তারা সামাজিকভাবে ক্ষমতায়িতও হচ্ছে, কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্মীয় সুশাসন পরিচালনার কোনো একক ‘অথরিটি’ বা অভিভাবকত্ব তৈরি হয়নি অথবা বলতে হয় অভিভাবকত্বের ছড়াছড়ি। দেশের ধর্মীয় শ্রেণিই ধর্মের যুক্তিকে কেন্দ্র করে এত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

এ অঞ্চলে আত্মশুদ্ধি শেখার অন্যতম বড় একটি মিশনারি সংগঠন হলো তাবলিগ, অথচ আজ তাদের মধ্যেও তীব্র বিভাজন। রাজনৈতিক পরিসরে ইসলামপন্থীদের বিভাজিত দলের সংখ্যা অনেকের মতে শতাধিক। শিক্ষাধারায়ও ঢুকে পড়েছে হাজারো বিভক্তি; দেশে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে হাজারো ‘প্রাইভেট’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এত বিপুল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভক্তির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ধর্মীয় ব্যাখ্যায়। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একেকটি গ্রুপ এখন অন্ধের মতো যে যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে আর একশ্রেণি নিজেদের অন্যায় স্বার্থে তা লুফেও নিচ্ছে।

আরেকটি রূঢ় বাস্তবতা হলো ধর্মীয় সমাজের একাংশের তীব্র আর্থিক দৈন্য। বিশেষ করে লাখো মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে চরম সংকটে পড়েছেন, তেমনি সাধারণ শিক্ষিত বেকারশ্রেণিও দিশাহারা। এই বিপুল কর্মহীন পুরুষের একটি বড় অংশ ধর্মের মোড়কে তৈরি হওয়া নানা ফন্দিফিকিরে পা দিচ্ছেন। কারণ, ইদানীং আমরা প্রায়ই ধর্মকে উপজীব্য করে গড়ে ওঠা চটকদার ‘ব্যবসায়িক প্রকল্প’ বা উদ্যোগের উদ্বোধন দেখতে পাচ্ছি।

দেখা যায়, কাল্পনিক হালালা সেন্টারে যাঁরা সিভি পাঠিয়েছেন, তাঁদের অনেকে ই-মেইলে সরাসরি আর্থিক বিষয়টি সামনে এনেছেন। কেউ অবলীলায় লিখেছেন, তিনি তালাকপ্রাপ্ত নারীকে বিয়ে করতে প্রস্তুত, তবে তিনি নিজে গরিব; তাই তাঁর ‘আর্থিক সুবিধার’ বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়! আবার কেউ কেউ প্রবাসী বা বড় ব্যবসায়ী, তাঁরা এই পাতানো বিয়ের বিনিময়ে প্রয়োজনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে রাজি।

তালাকপ্রাপ্ত নারীদের ঢাল বানিয়ে ‘হালালা সেন্টার’ খোলা, ‘দ্বীনে ফেরা’ মডেল কর্তৃক ম্যারেজ মিডিয়ার মতো অদ্ভুত উদ্যোগ নেওয়া কিংবা ‘মাসনা কলোনি’ নামক বহুবিবাহের আবাসিক ভবনের ঘোষণা দেওয়া—এসবই হলো সমাজে কোনো একক ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকার এবং যথেচ্ছ ব্যাখ্যার সংকট।

অথচ ইসলামে স্ত্রীর সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছেদের পর ‘হালালা’ পন্থা অবলম্বন করে তাঁকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ অবৈধ। সাজানো বিয়ের মাধ্যমে কোনো নারী তাঁর স্বামীর জন্য আইনি বা ধর্মীয়ভাবে ‘হালাল’ হন না; বরং প্রথম স্বামীর ঘরে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাতানো বিয়ের চুক্তি যে করে, হাদিসে তাকে বলা হয়েছে ‘ধার করা ষাঁড়’।

এই হিল্লা সম্পাদনকারী ব্যক্তি এবং যার জন্য এই পাতানো বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে (অর্থাৎ প্রথম স্বামী)—উভয়ে চরমভাবে অভিশপ্ত। মহানবী (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক’ (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮)। আর ‘যে ব্যক্তি হালালা করে এবং যার জন্য হালালা করা হয়—উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত’ (সুনানে তিরমিজি: ১১১৯)। এক হাদিসে তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কি তোমাদের ধার করা ষাঁড় সম্পর্কে জানাব না?’ সাহাবিগণ বললেন, ‘অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল।’ তিনি বললেন, ‘সে হলো হালালাকারী ব্যক্তি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৩৬)

শুদ্ধ জীবনব্যবস্থার মূল কথা হলো, বিয়ে কোনো চুক্তিবদ্ধ ব্যবসা নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনেও এ ধরনের জোরপূর্বক বা সামাজিক চাপের মুখে দেওয়া ‘হিল্লা বিয়ে’র কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। দেশের উচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে সামাজিক সালিসের নামে নারীদের হিল্লা বিয়েতে বাধ্য করাকে অবৈধ, নারী নির্যাতন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

ডিজিটাল দুনিয়ার এই কথিত হালালা সেন্টারের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে নৈতিক শিক্ষার অভাব থাকলে প্রযুক্তির আলো মানুষকে আলোকিত করার পরিবর্তে আরও বেশি অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ধর্মীয় সমাজের এই যে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা এবং অনিয়ন্ত্রিত নানামুখী ব্যাখ্যা—এর নানা সমাধান অনেকে খুঁজেছেন বা খুঁজছেন। অনেকে মনে করেন, ধর্মীয় সুশাসনের (রিলিজিয়াস গভর্নেন্স) ব্যবস্থা করা। মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়ার মতো অনেক মুসলিম দেশে একটি প্রশাসনিক কাঠামো থাকে, যার মাধ্যমে কোনো স্বীকৃত সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দেশের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, আচার-অনুষ্ঠান, উপাসনালয়, ধর্মীয় শিক্ষা এবং ফতোয়া বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করে। ধর্মের নামে যে কেউ যেন যথেচ্ছ ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকে এবং সমাজে একটি সুশৃঙ্খল ধর্মীয় পরিবেশ বজায় থাকে।

এখন আমাদের সমাজে যে ধরনের ধর্মীয় মতাদর্শিক বিভাজন, তাতে এমন প্রশাসনিক কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মনে করতে পারেন রাষ্ট্র এখানে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। তা ছাড়া রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থাও এমন সুসংহত হয়ে উঠতে পারেনি, যা ধর্মীয় সমাজের মধ্যে সুশৃঙ্খলা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে শুরুতে ধর্মীয় সমাজগুলোর বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানকেই এগিয়ে আসতে হবে হালালা সেন্টারের মতো উদ্ভূত সংকট ঠেকাতে।

ইন্টারনেট বা ই-মেইলের মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মানুষ যখন এমন এক কুপ্রথার অংশ হতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে, শিক্ষার আলো আমাদের মনকে স্পর্শ করতে পারছে না, ধর্মের নীতিকথাও প্রাণে লাগছে না। এ ধরনের অপব্যাখ্যা ও লালসার বাজার বন্ধ করতে হলে আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও সমাজের নেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক বিশৃঙ্খলার মূলে হাত দিতে হবে।

* মনযূরুল হক, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
- ই–মেইল: manzurul.haque267@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ফেসবুকে হালালা সেন্টারের বিজ্ঞাপন
ফেসবুকে হালালা সেন্টারের বিজ্ঞাপন

Wednesday, June 10, 2026

ক্যালিফোর্নিয়ায় ছাত্রের সঙ্গে শিক্ষিকার যৌন সম্পর্ক, মামলা, অতঃপর...

মানবজমিনঃ ক্যালিফোর্নিয়ার এক স্কুলের এক সহযোগী বা এইড এক কিশোর ছাত্রের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের দায় স্বীকার করেছেন। এর ফলে তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন। সান ডিয়েগো এলাকার একটি হাই স্কুলে কাজ করার সময় ওই ছাত্রের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর তাকে যৌনসঙ্গী করেন। ওই সহযোগী বা শিক্ষিকা ৩২ বছরের লিসেট ওর্তেগা ভেলেস। তিনি বৃহস্পতিবার আদালতে স্বীকার করেন, মার ভিস্তা হাই স্কুলের ১৭ বছর বয়সী এক ছাত্রের সঙ্গে অবৈধ মাত্রাহীন যৌন সম্পকে জড়িত ছিলেন। অ্যাটর্নি কার্যালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর জানিয়েছে এনবিসি ৭ সান দিয়েগো।

সান ডিয়েগো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানায়, অভিযোগ ওঠে শিক্ষার্থীর এক সহায়ক বা এইড এক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িত। এরপর  ১৯ মে ইম্পেরিয়াল বিচ ক্যাম্পাসে পুলিশকে ডাকা হয়। তদন্তে উঠে আসে যে, ভেলেসের ওই ছাত্রের সঙ্গে বিকৃত সম্পর্ক প্রায় এক বছর ধরে স্কুলের বাইরে চালিয়ে আসছিলেন। তদন্তকারীরা বলেন, ভেলেস ওই ছাত্রকে কাউকে কিছু না বলতে চাপ দিতেন। ভেলেসকে নিয়োগ দিয়েছিল রো হেলথ নামের একটি তৃতীয় পক্ষের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

তারা স্কুল, প্রাইভেট নার্সিং হোম ও অন্য প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্স সরবরাহ করে। ২১ মে ২০২৫ ভেলেসকে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে একাধিক যৌন অপরাধে মামলা করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে আছে, অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে ওরাল সেক্স। অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্ক। অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে সাক্ষাতের আয়োজন।  অশ্লীল কাজের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যোগাযোগ। ভুক্তভোগীকে অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ভেলেসের সাজা ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ অক্টোবর ২০২৫, দক্ষিণ কাউন্টি কোর্টহাউস, চুলা ভিস্তায়। তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেতে পারেন। তবে দোষ স্বীকার চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট শাস্তির মেয়াদ উল্লেখ নেই- সাজা নির্ধারণ করবেন বিচারক।  রো হেলথ জানায়, তারা সম্পূর্ণ ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে কর্মী নিয়োগ দেয় এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে জানায়, আমরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বাগ্রে রাখি। এসব অভিযোগ আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি এবং যথাযথ তদন্ত ও প্রতিক্রিয়ার জন্য কাজ করছি।

mzamin

Monday, June 8, 2026

ভারতে ৩০ লাখ যৌনকর্মী

প্রায় এক বছর আগে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল তার স্বামী। যখন সংসার ছিল, তখন দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির ভাড়া এক কুঁড়েঘরে থাকতো সুমনা। কিন্তু এরপর শহরের ব্যস্ততম কেন্দ্রে পাড়ি জমায় সে। ফুলশোভিত সালোয়ার কামিজ পরে আর চোখে কাজল লাগিয়ে সে প্রতিদিন ২ থেকে তিনজন খদ্দেরের আশায় থাকে। বিনিময়ে প্রতিবার ৩০০ রুপির মতো পায়। খদ্দেরদের বেশির ভাগই গাড়িচালক। তবে সুমনার মতে, মাঝেমাঝে কিছু ভদ্র আর সুন্দর পোশাক পরা লোকও যায় তার কাছে। তার পরিবার কিন্তু এসব জানে না। তারা জানে, সে হয়তো কোন অফিসে চাকরি করে। তার লেখাপড়া জানা নেই। তার কিশোর ছেলেটি স্কুল শেষ করা পর্যন্ত সে মুক্ত। এ সময়ে ঘরে যাকে খুশি তাকে নেয়া যায়। যা খুশি তা-ই করা যায়। তাই ছেলে স্কুল থেকে না ফেরা পর্যন্ত সে এ কাজ চালিয়ে যায়। সে জানে ভিক্ষা করা অবৈধ। কিন্তু পতিতাবৃত্তি অবৈধ কিনা সেটা আসলেই অসপষ্ট। কনডম ব্যবহারের সুবিধাটা সে জানে। কিন্তু তার খদ্দেররা সে সব খুব কমই ব্যবহার করে। কোন দালাল নেই সুমনার। আবার তাকে কেউ পাচার করে আনেনি এ পথে। তার মতো একই পরিস্থিতি বীণার। তুলনামূলক কমবয়সী সে। ফোনে যোগাযোগ করে ধনী খদ্দের ধরে সে। কর্মকর্তারা জানান, ভারতে এমন প্রায় ৩০ লাখ যৌনকর্মী রয়েছে। তবে এটা সপষ্ট যে, এদের মধ্যে কিছু আছে টাকার প্রয়োজনে এ পেশায়। কিছু মেয়েকে বাধ্য করা হয়েছে এ পথে আসতে। আবার কিছু আছে স্বেচ্ছায় এ পথে পা বাড়ানো। অল ইন্ডিয়া নেটওয়ার্ক অব সেক্স ওয়ার্কার্স-এর প্রেসিডেন্ট ভারতী দে যুক্তি দেখালেন, পতিতাবৃতি ঐচ্ছিক বিষয়। তাই যৌনকর্মীদের অন্য মানুষের মতো সমান অধিকার থাকা উচিত। এ শিল্প নারীভিত্তিক। তবে মূলত স্বল্পশিক্ষিত অনেক গরিব অভিবাসী মেয়েই এর মূল ভিত্তি। এরা ভারতের শ্রমবাজারে খুব অল্পবেতন পায়। তাই বাধ্য হয়ে তুলনামূলক বেশি অর্থের জন্য এ পেশায় আসতে হয় তাদের। ভারতীদের মতো অনেকে চান যৌনবৃত্তিকে ছায়া থেকে সরিয়ে নিয়ে আসতে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের সেপশাল র‌্যাপোর্টিয়ার বলেন, ভারতে যৌনকর্মীদের অপরাধী হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ হলে তারা আরও শক্ত হবে। পাঁচ বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, পতিতাবৃত্তি আইনসিদ্ধ হওয়া উচিত। এরপর ভারতের জাতীয় নারী কমিশন এ সমপর্কে তাদের পূর্বের অবস্থানে পরিবর্তন আনে। এর প্রধান ললিতা কুমারামঙ্গলাম মনে করেন, পাচার করে এ পেশায় আসতে বাধ্য করা ও শিশুদের এ পেশায় নিয়ে আসা থামানো সম্ভব নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে। যৌনকর্মী ও তাদের খদ্দেরদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে এইচআইভি বিস্তার সীমিত করা সম্ভব। এ সমপর্কিত আইনের সংশোধনকল্পে সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ প্যানেলের কাছে একথা তিনি জানাবেন। জিবি রোডের পতিতালয়গুলো নিয়ে বই লিখেছেন মায়ানক অস্টেন সুফি। তিনি বলেন, তার জানাশোনা প্রত্যেক যৌনকর্মী বৈধ হতে চায়। এখনও পতিতারা বিভিন্ন কারণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে দ্বিধা করে। এছাড়া পুলিশি হয়রানি তো আছেই। যৌনবৃত্তিতে আসতে অনেককে বাধ্য করা হয়। এ বিষয়ের অবসান জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এসবের অবসানে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। মানবপাচার বিরোধী সংগঠন ‘আপনে আপ’ জানিয়েছে, গ্রামের মেয়েদের শহরে নিয়ে যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করায় যেসব দালাল, তারা ওই মেয়ের পরিবারকে প্রতিমাসে মাত্র ৪ হাজার রুপি পরিশোধ করে। বিভিন্ন পতিতালয়ে এনজিও ও পুলিশের অভিযান প্রায়শই ব্যর্থ হয়। কেননা, পরিবারটি একই দালালের কাছে আবার মেয়েটিকে ফিরিয়ে দেয়। আবার তরুণীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে বা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এ কাজে বাধ্য করা হয়। আপনে আপ দাবি করেছে, এক-তৃতীয়াংশ যৌনকর্মীই ১৮ বছরের নিচে। তবে সংস্থাটি এ পেশা বৈধতা দেয়ার বিরোধিতা করেছে। তাদের যুক্তি, এর ফলে যৌনবৃত্তির চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে আরও মানবপাচার বৃদ্ধি পাবে। এর পরিবর্তে আপনে আপ প্রচার চালাচ্ছে, ‘কুল ম্যান ডোন্ট বাই সেক্স’-  অর্থাৎ সত্যিকার পুরুষ কখনও অর্থ দিয়ে যৌনতা কেনে না। অর্থাৎ তারা চাইছে, পতিতাবৃত্তির চাহিদা যাতে সমাজে কমে যায়। তবে এর সফলতা পাবার সম্ভাবনা কম। আবার একে আইনসিদ্ধ করার সম্ভাবনাও কম। কোন  রাজনীতিবিদই এর পক্ষে নন। তাছাড়া রক্ষণশীল দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এ আইনকে সমর্থন করবে না বোঝাই যাচ্ছে। ফলে যৌনতার বিক্রিটা ভারতে অন্ধকারের মধ্যেই অব্যাহত থাকবে। এর চাহিদাও কমবে না, আবার এর ব্যাপারে ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে রাখা হবে।
সূত্র দ্য ইকোনমিস্ট

Thursday, May 28, 2026

কিশোরদের যৌন সম্পর্ক কি অপরাধ, কী চাচ্ছেন ভারতের শিশু অধিকারকর্মীরা

ভারতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য যৌন সম্পর্ক বেআইনি। প্রচলিত আইনে এটিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এ বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন দেশটির আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং। এ–সংক্রান্ত আইনকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ভারতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জয়সিং যুক্তি দেন, পারস্পরিক সম্মতিতে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক শোষণমূলক নয় কিংবা নিপীড়নমূলকও নয়। এ ধরনের সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধের আওতার বাইরে রাখতে আদালতের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।

আদালতে জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক নথিতে জয়সিং বলেন, আইনের মাধ্যমে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো নিপীড়ন রোধ করা, ওই সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার জয়সিংয়ের এই দাবির বিরোধিতা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের যৌন সম্পর্কের বৈধতা দিলে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। এতে তারা নিপীড়ন ও শোষণের শিকার হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টে জয়সিংয়ের এই চ্যালেঞ্জের কারণে ভারতে আবারও যৌন সম্পর্কে সম্মতি এবং শিশুদের যৌন সুরক্ষা আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। শিশুদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের প্রধান আইন পসকো অ্যাক্ট-২০১২।

এ আইন অনুযায়ী, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেও ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যৌন সম্পর্কে জড়ালে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিষয়টি পসকো আইন থেকে বাদ দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে ভারতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের এই আইনের আওতামুক্ত রাখলে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে। অন্যদিকে এই মতের বিরোধীরা বলছেন, এতে মানব পাচার ও বাল্যবিবাহের মতো অপরাধ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিপীড়নের শিকার হলে কিশোর-কিশোরীরা কি আদৌ প্রমাণের দায়ভার বহন করতে সক্ষম? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ করে দেয় কে। আর এই আইন আদতে কার স্বার্থ রক্ষা করে?

অনেক দেশের মতো ভারতেও যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে এই বয়স ভিন্ন হতে পারে। তবে ভারতজুড়ে একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া আছে।

ইউরোপের অধিকাংশ দেশ কিংবা যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশে যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়স ১৬। কিন্তু ভারতে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা এর চেয়ে বেশি।

১৮৬০ সালে যখন ভারতে ফৌজদারি বিধি চালু হয়, তখন যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির ন্যূনতম বয়স ছিল ১০ বছর। ১৯৪০ সালে এই বিধি সংশোধনের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হয়।

পরে ২০১২ সালে পসকো আইনের মধ্য দিয়ে বড় পরিবর্তন আসে। এতে যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স ১৮ বছরে উন্নীত করা হয়। এক বছর পর ভারতের ফৌজদারি আইন এই পরিবর্তন অনুযায়ী সংশোধিত হয়। ২০২৪ সালে প্রণীত নতুন দণ্ডবিধিতেও এই বয়সসীমা বহাল রাখা হয়েছে।

ভারতে কিশোর-কিশোরীদের সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক কেন অপরাধ

কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেক শিশু অধিকারকর্মী এবং এমনকি আদালতও যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়সসীমার সমালোচনা করেছেন এবং এই বয়সসীমা ১৬ বছরে নামিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পসকো আইন কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্করা এ ধরনের সম্পর্কে বাধা দিতে এই আইনের অপব্যবহার করেন। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে।

ভারতে এখনো যৌনতা একটি নিষিদ্ধ ও অস্বস্তিকর বিষয়। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোটি কোটি ভারতীয় কিশোর-কিশোরী যৌন সম্পর্কে সক্রিয়।

শিশুদের যৌন নিপীড়ন রোধে কাজ করা সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন-মুসকানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শর্মিলা রাজ বলেন, ‘আমাদের সমাজ জাত, শ্রেণি ও ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত। ফলে সহজেই এ আইনের অপব্যবহার করা যায়।’

২০২২ সালে কর্ণাটক হাইকোর্ট ভারতের আইন সংস্কার সংস্থা ল’ কমিশনকে নির্দেশ দেন, যেন তারা পসকো আইনের আওতায় যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স পুনর্বিবেচনা করে। এ ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে বলা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, বহু ক্ষেত্রে ১৬ বছর পেরোনো কিশোরীরা প্রেমে পড়ে পালিয়ে যায় এবং যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু পরে শুধু ছেলেটির বিরুদ্ধে পসকো আইন ও দণ্ডবিধির আওতায় অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।

পরের বছর ২০২৩ সালে ল’ কমিশনের প্রতিবেদনে বয়সসীমা কমানোর প্রস্তাব নাকচ করা হয়। তবে কমিশন সুপারিশ করেছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে সাজা দেওয়ার সময় বিচারকদের জন্য ‘নির্দেশিত বিচারিক বিবেচনার’ সুযোগ রাখা উচিত। এর অর্থ হলো বিচারক যাতে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকে সাজা কমাতে বা মওকুফ করতে পারেন।

এটি এখনো কার্যকর না হলেও মামলার তথ্য ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে ভারতের বিভিন্ন আদালত এই নীতির ভিত্তিতে জামিন, খালাস বা মামলা বাতিলের সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।

শর্মিলা রাজসহ অনেক শিশু অধিকারকর্মী চান, এই বিধানটি যাতে আইনে পরিণত হয়। শুধু প্রস্তাব আকারে থাকলে আদালত তা উপেক্ষা করতে পারেন।

ইন্দিরা জয়সিং মনে করেন, শুধু বিচারকের বিবেচনা যথেষ্ট নয়। কারণ, অভিযুক্তকে পুলিশের জেরা, আদালতের দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও সামাজিক লজ্জার মুখোমুখি হতে হয়। ভারতের বিচারব্যবস্থা এতটাই ধীর যে বহু মানুষ এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই শাস্তি পেয়ে যান।

ইন্দিরা জয়সিং আরও বলেন, প্রতিটি মামলা বিচারকের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া সেরা সমাধান নয়। কারণ, এতে ফলাফল অসম হতে পারে এবং পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কাও থেকে যায়।

ভারতে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পসকো আইনের আওতায় বিশেষ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই লাখ।

জয়সিংয়ের দাবি, বয়সের ব্যবধান যদি খুব সামান্য হয় এবং উভয়েই সম্পর্কের জন্য সম্মত থাকে, তবে সে যৌন সম্পর্ককে যাতে ধর্ষণ বা শোষণের মতো অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করা হয়।

প্রতীকী ছবি: রয়টার্স  
প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

Thursday, March 26, 2026

এপস্টিন–অনিল আম্বানির ফাঁস হওয়া বার্তায় ‘দীর্ঘাঙ্গী সুইডিশ স্বর্ণকেশী’

প্রয়াত কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের প্রভাববলয় যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নতুন করে ফাঁস হওয়া মার্কিন বিচার বিভাগের নথিতে দেখা গেছে, ভারতের শিল্পপতি অনিল আম্বানির সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গালফ নিউজ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এপস্টিন ও অনিল আম্বানির মধ্যে আদান–প্রদান হওয়া একাধিক বার্তায় ব্যবসা, বিশ্ব পরিস্থিতি, নারী এবং সরাসরি সাক্ষাতের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
২০১৭ সালের মার্চে পাঠানো এক বার্তায় অনিল আম্বানি এপস্টিনের কাছে জানতে চান—‘তুমি কার কথা বলবে?’ জবাবে এপস্টিন লেখেন, ‘একজন দীর্ঘাঙ্গী সুইডিশ স্বর্ণকেশী নারী, যেন সফরটা মজার হয়।’এর পরপরই আম্বানির উত্তর ছিল—‘ওটার ব্যবস্থা করো।’

প্যারিস ও নিউইয়র্কে বৈঠকের পরিকল্পনা

নথিতে প্যারিসে সাক্ষাতের পরিকল্পনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপারে ২০১৮ সালে দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১৯ সালের মে মাসে অনিল আম্বানি নিউইয়র্ক সফরের পরিকল্পনা করলে এপস্টিন তাঁকে ম্যানহাটনে নিজের বাসায় আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে তিনি লেখেন, ‘যদি তুমি কারও সঙ্গে একান্তে দেখা করতে চাও, আমাকে জানিও।’

আম্বানি পরিবার ও হলিউড সংযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপস্টিন আম্বানি পরিবারের ব্যবসায়িক ইতিহাস সম্পর্কেও আগ্রহী ছিলেন। এ কারণে তিনি ‘আম্বানি অ্যান্ড সন্স’ ও ‘স্ট্রর্মস ইন দ্য সী উইন্ড: আম্বানি ভার্সেস আম্বানি’ বই দুটি সংগ্রহ করেছিলেন।

আদান–প্রদান হওয়া বার্তাগুলো থেকে জানা গেছে, হলিউডে আম্বানির যোগাযোগের ব্যাপারে জানতে চাইতেন এপস্টিন। এক কথোপকথনে তিনি জানতে চান, ‘এমন কোনো অভিনেত্রী বা মডেল আছে, যিনি আম্বানির রুচির প্রতিনিধিত্ব করেন? আশা করছি মেরিল স্ট্রিপ না। এ ক্ষেত্রে আমি কোনো সহযোগিতা করতে পারব না।’

জবাবে অনিল আম্বানি বলেন, তাঁর রুচি আরও ভালো। তাঁদের পরবর্তী সিনেমায় স্কারলেট জোহানসন অভিনয় করবেন। জবাবে এপস্টিন লেখেন, ‘আমি খুশি যে তুমি বয়স্কদের চেয়ে তরুণ স্বর্ণকেশী পছন্দ করো।’

রিলায়েন্স এন্টারটেইনমেন্ট সহপ্রযোজনায় নির্মিত ‘ঘোস্ট ইন দ্য শেল’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন স্কারলেট জোহানসন।

৬৬ বছর বয়সী অনিল আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের নিয়ন্ত্রণ তাঁর ভাই ৬৮ বছর বয়সী মুকেশ আম্বানির হাতে। বর্তমানে তিনি এশিয়ার ধনীতম ব্যক্তি। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৯৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।  

গত এক দশকে এই দুই ভাইয়ের আর্থিক অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। অনিল আম্বানি বর্তমানে আর্থিক সংকটে পড়েছেন এবং ভারতে কথিত ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

পরামর্শ নিয়ে, আটঘাট বেঁধে

এসব বার্তা চালাচালি বলছে, এপস্টিন তাঁর বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে চাইতেন—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও। এই লক্ষ্যে তিনি আম্বানি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করেন।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনিল আম্বানি সম্পর্কে ভারতীয় বংশোদ্ভুত মার্কিন গুরু দীপক চোপড়া এপস্টিনকে বলেন, তিনি অত্যন্ত ধনী। খুব বেশি পরিচিতি হতে আগ্রহী ও সেলিব্রিটি–সচেতন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দুই ভাই অনিল ও মুকেশ আম্বানির মধ্যে সম্পর্ক ভালো নয়।

আম্বানি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে এপস্টিন টম প্রিটজকার ও পিটার থিয়েলের মতো ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেন। প্রিটজকার পরামর্শ দেন, অনিলের সঙ্গে পিটার থিয়েলের পরিচিত হওয়া উচিত।

২০১৯ সালের মে মাসে নিউইয়র্কে সাক্ষাতের পর এপস্টিন অনিল আম্বানিকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আজকের দিনটা দারুণ ছিল, তোমার সঙ্গে দেখা করে ভালো লাগল।’

জেফরি এপস্টিন ও অনিল আম্বানি
জেফরি এপস্টিন ও অনিল আম্বানি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Tuesday, March 24, 2026

যৌনতার দ্বীপে অভিজাতদের ক্ষমতা–চরিত্রের নগ্ন চেহারা by প্রতাপ ভানু মেহতা

এপস্টেইন কেলেঙ্কারির ভয়াবহতায় একটি দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা সম্ভবত কাকতালীয় কিছু নয়। এই কেলেঙ্কারি এখন আমেরিকার অভিজাত শ্রেণির বিস্তৃত অংশকে জড়িয়ে ফেলেছে। এটি আধুনিকতার একটি কল্পনা ও তার অন্যতম নৃশংস নৈতিক বিভীষিকাকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।

ইতিহাসে নানা সময়ে দ্বীপকে কল্পনা করা হয়েছে এমন এক জায়গা হিসেবে, যেখানে আধুনিক সমাজ নিজের সবচেয়ে বিপজ্জনক কল্পনাগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারে।

আলোকপ্রাপ্ত যুগে ধারণা ছিল—দ্বীপ মানে মূল সমাজের বাইরে থাকা একটি নিরাপদ এলাকা। সেখানে নৈতিক নিয়ম, সামাজিক শালীনতা বা যৌন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে রাখা যায়। মানুষ ইচ্ছেমতো ভোগে মেতে উঠতে পারে, কিন্তু তাতে মূল সমাজের নৈতিক কাঠামো নষ্ট হবে না। কারণ, সবকিছুই ঘটছে ‘ব্যতিক্রমী’ এক জায়গায়, ‘অফশোরে’, মানে সমুদ্রের ওপারে।

এই একই যুক্তি পরে শুধু যৌনতার ক্ষেত্রে নয়, আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হয়েছে। ‘অফশোরিং’ মানে হলো অপরাধ বা অনৈতিক কাজকে এমন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া, যেখানে মনে হয় তা মূল ব্যবস্থাকে স্পর্শ করছে না। যেন কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং বা আর্থিক প্রতারণা কোথাও দূরে ঘটছে, তাই পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষতি হচ্ছে না।

এভাবে অপরাধ, যৌন সহিংসতা, লাগামছাড়া ভোগ আর আর্থিক বিশ্বাসঘাতকতাকে ‘সমুদ্রের ওপারে’ পাঠানো একদিকে ভয়ংকর, আবার অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের মনে একধরনের স্বস্তিও দেয়। তাঁদের মনে হয়, সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে না। কারণ, তা নাকি কেন্দ্রের ভেতরে নয়। কিন্তু এই স্বস্তিই আসলে এক মারাত্মক ভ্রান্তি।

আর্থিক অপরাধকে ‘অফশোরে’ সরিয়ে দিলে তা ছোট বা প্রান্তিক হয়ে যায়, এটা সত্য নয়। বরং এসব অফশোর ব্যবস্থা মূল আর্থিক কেন্দ্রের অপরাধকে আরও বড়, আরও শক্তিশালী করে তোলে। অর্থাৎ অপরাধ দূরে সরে যায় না, উল্টো কেন্দ্রের ভেতরেই তার প্রভাব বাড়ে।

একই ভুল ধারণা ছিল অভিজাতদের মনেও। তাঁরা ভেবেছিলেন, মূল সমাজকে নষ্ট না করেই তাঁরা গোপনে তাঁদের সবচেয়ে বিকৃত ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারবেন। কিন্তু জেফ্রি এপস্টেইনের আশপাশে যাঁরা ঘুরেছেন, তাঁরা কোনো স্বাধীনচেতা বিদ্রোহী ছিলেন না। তাঁরা সামাজিক নিয়ম ভাঙার সাহসী আন্দোলনও করছিলেন না।

আসলে তাঁরা আধুনিকতার এক অন্ধকার দিক বাস্তবে প্রয়োগ করছিলেন। এখানে কল্পনাই হয়ে উঠেছে অশ্লীল পণ্যে ভরা। মানুষকে, বিশেষ করে দেহকে, ব্যবহার করা হয়েছে কেনাবেচার জিনিস হিসেবে। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মানুষ নিজেকে পর্যন্ত অপমান করতে প্রস্তুত হয়েছে।

এই অভিজাত শ্রেণির ভেতরে একই সঙ্গে আছে ভয়ংকর দায়মুক্তির অনুভূতি বা আইনের ঊর্ধ্বে থাকার আত্মবিশ্বাস এবং মানসিকভাবে অপরিণত আচরণ। এখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু সংযম নেই; প্রভাব আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই।

এপস্টেইন ফাইল নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। সব নথি কি সত্যিই প্রকাশিত হয়েছে? ভুক্তভোগীদের অধিকার কি সুরক্ষিত হবে? ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টি—উভয় দলই যখন জড়িত, তখন কার লাভ হবে? এই নথিগুলো আমেরিকার কিছু অভিজাত মানুষের এক নির্মম ‘এক্স-রে’ তুলে ধরে।

যে মানুষগুলো মানসিকভাবে অপরিণত, ভেতরে ভঙ্গুর, কিন্তু বাইরে অসম্ভব ক্ষমতাবান—তাঁরা আসলে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

আসল রহস্য হলো, জেফ্রি এপস্টেইন কীভাবে নিজেকে এমন জায়গায় বসাতে পারলেন, যেখানে বিশ্বরাজনীতির বড় বড় শক্তির পথও যেন তাঁর মধ্য দিয়েই যেত। কেন রাষ্ট্র, ধনকুবের আর ক্ষমতাশালীরা ভাবলেন—এই লোককে ছাড়া কাজ চলবে না?

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঝগড়া হলেও একটা ব্যাপারে তারা প্রায় একমত—এই কেলেঙ্কারিকে ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখাতে হবে। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, এটা কিছু ব্যক্তির বিচ্যুতি, পুরো শাসকশ্রেণির স্বাভাবিক চেহারা নয়। ঠিক যেমন আগে দ্বীপ বা উপনিবেশকে এমন জায়গা ভাবা হতো, যেখানে অভিজাতরা ইচ্ছেমতো নিয়ম ভাঙতে পারে, কিন্তু মূল সমাজ নাকি অক্ষত থাকে। এখানে একই কৌশল চলছে—অভিজাতদের অনৈতিক আচরণকে আলাদা করে দেখানো, যেন কেন্দ্রের নৈতিক ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে না পড়ে।

এখানে আধুনিক রাজনীতির এক গভীর অসুখ ধরা পড়ে। আজ ক্ষমতা আর নৈতিকতা বা ব্যক্তিগত গুণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ক্ষমতা টিকে থাকে অস্বচ্ছতা, নির্লজ্জ আচরণ, আইনের জটিল ভাষা, প্রচারণা আর নানা প্রক্রিয়াগত চালাকির ওপর। ভয়াবহ অপরাধ চোখের সামনে থাকলেও সেগুলো নিয়ে কথা না বলে শক্তি খরচ হয় আইনি ফাঁকফোকর আর শব্দের খেলায়।

আধুনিকতাকে এক পুরোনো ভয় এখনো তাড়া করে। এ মুহূর্ত সবচেয়ে ভালো বুঝিয়েছিলেন প্রাচীন রোমান ইতিহাসবিদেরা—ট্যাসিটাস, স্যালাস্ট ও লিভি। তাঁরা বলেছিলেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে যখন যৌন অবক্ষয় আর সহিংসতা ঢুকে পড়ে, তখন তা রাজনৈতিক পতনের লক্ষণ হয়ে ওঠে। আমরা ‘আধুনিক’রা অবশ্য নিজেদের আলাদা মনে করি।

আমরা বলি, ব্যক্তিগত জীবন আর রাষ্ট্রীয় কাজ আলাদা। আমাদের কাছে দুর্নীতি মানে নৈতিক পতন নয়, বরং প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন।
কিন্তু জে জি এ পোকক মনে করিয়ে দেন একটি বড় দ্বন্দ্বের কথা। আমরা প্রকাশ্যে বলি, যৌন অবক্ষয় সমাজ ভাঙার কারণ নয়; আসল কারণ অর্থনীতি বা রাজনীতি। তবু আমরা ‘গুণ’ বা নৈতিকতার ভাষা পুরোপুরি ছাড়তে পারি না। কারণ, মনে মনে একটা সন্দেহ থেকেই যায়—যদি এসব অবক্ষয় সরাসরি কারণ না–ও হয়, তবু এগুলো ক্ষমতার ভেতরের সত্যটা প্রকাশ করে দেয়।

নিশ্চয়ই এপস্টেইন ফাইলের ভেতরে নানা স্তর আছে, যেগুলো আলাদা করে বুঝতে হবে। কেউ আইনগতভাবে অপরাধ করেছে। কেউ নৈতিকভাবে জঘন্য কাজে জড়িয়েছে। আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে দোষী না হলেও এমন এক ক্ষমতা ও জ্ঞানের কাঠামোকে সমর্থন করেছে, যা লজ্জাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে।

এপস্টেইন ফাইল ব্যক্তিগত অপরাধ বা নির্দোষিতার প্রশ্ন নয়। এটি সমষ্টিগত ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে। আর যখন সেই সমষ্টিগত ক্ষমতা যৌন, আর্থিক, আইনি, রাজনৈতিক, এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকেও লজ্জা ও দায়মুক্তির সঙ্গে সারিবদ্ধ করে, তখন প্রশ্ন জাগে—রোমান ইতিহাসবিদেরা কি ঠিকই কিছু দেখেছিলেন? তাঁরা ভেবেছিলেন, সাম্রাজ্য ভাঙে তখনই, যখন অভিজাতেরা কোনো ক্ষেত্রেই আর আত্মসংযম রাখতে পারেন না।

রোমানরা যে সংকটের কথা জানত, সেটাই আজকের সংকট। এ ধরনের অভিজাতদের আর কোনো নৈতিক কর্তৃত্ব অবশিষ্ট থাকে না। ক্ষমতায় থেকেও তাঁরা ভীত। নিজেদের কুকর্ম ঢাকতে তাঁরা আরও কী ধরনের সহিংসতায় যেতে পারেন, তা কে জানে।

* প্রতাপ ভানু মেহতা, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-31%2Fuxh4nrtc%2FThumn-02.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
(ওপরে বাঁ থেকে ডানে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেফরি এপস্টেইন, (নিচে বাঁ থেকে ডানে) ইলন মাস্ক, বিল গেটস। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Saturday, February 7, 2026

এপস্টেইনের নথিতে বিল গেটসের নাম আসার পর কী বলছেন সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিতে সাবেক স্বামী বিল গেটসের নাম থাকা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ধনকুবের ও সমাজসেবী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস। তিনি বলেন, এ ঘটনায় সাবেক স্বামী বিল গেটসের সঙ্গে তাঁর বিবাহিত জীবনে কাটানো যন্ত্রণাদায়ক সময়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর-এর এক পডকাস্টে মেলিন্ডা গেটস এ কথা বলেছেন।
মেলিন্ডা মনে করেন, এপস্টেইন–সম্পর্কিত নথিতে তাঁর সাবেক স্বামীসহ আরও যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের সবাইকে এর জবাব দিতে হবে।

মেলিন্ডা আরও বলেন, ‘সব সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছিলাম বলে আমার খুবই স্বস্তি হচ্ছে।’

২৭ বছর বিবাহিত সম্পর্কে থাকার পর ২০২১ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস দম্পতির বিচ্ছেদ হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি প্রয়াত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন–সম্পর্কিত যেসব নতুন নথি প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে বিল গেটসের নামও উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিল গেটস যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমিত কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তবে বিল গেটস এই অভিযোগকে ‘একেবারে অমূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বিল গেটসের এক মুখপাত্র বলেন, এ অভিযোগ পুরোপুরি ‘অমূলক ও মিথ্যা।’

মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে বিল গেটসের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি।

অবশ্য, এপস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলা নারীদের কেউই বিল গেটসের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ করেননি। নথিতে বিল গেটসের নাম থাকার মানেই যে তাঁর অপরাধে জড়িত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমন নয়।

এনপিআরের ওয়াইল্ড কার্ড পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেলিন্ডা গেটস বলেন, ‘এসব বিষয় সামনে এলে তা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে যায়, তাই না? কারণ, এতে আমার বিবাহিত জীবনের খুব, খুব কষ্টদায়ক কিছু সময়ের কথা আবার মনে পড়ে যায়।’

মেলিন্ডা আরও বলেন, ‘যেসব প্রশ্ন এখনো থেকে গেছে, তার সবকিছু জানা আমার পক্ষে সম্ভবও নয়। সেই প্রশ্নগুলোর জবাব তাঁদেরই দিতে হবে, এমনকি আমার সাবেক স্বামীকেও। এসবের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদেরই, আমার নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচ্ছেদের আগে এপস্টেইনের সঙ্গে স্বামীর যোগাযোগ থাকা নিয়ে মেলিন্ডা গেটস অস্বস্তিতে ছিলেন। তাঁদের বিচ্ছেদের ঘোষণা আসার পর বিল গেটস ২০১৯ সালে মাইক্রোসফটের এক কর্মীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গত সপ্তাহে এপস্টেইন–সংক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশ করেছে। বিল গেটসকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো ওই সব নথির অন্তর্ভুক্ত।

এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৮ জুলাইয়ের দুটি ই–মেইলও আছে, যেগুলো এপস্টেইন খসড়াভাবে লিখেছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সেগুলো আদৌ বিল গেটসের কাছে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ই–মেইল দুটি এপস্টেইনের ই–মেইল অ্যাকাউন্ট থেকেই সেন্ট হয়ে আবার তা একই অ্যাকাউন্টে ফিরে এসেছে। এতে বিল গেটসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ই–মেইল ঠিকানা দেখা যায়নি। ই–মেইল দুটিতে কোনো স্বাক্ষরও নেই।

ই–মেইল দুটির একটি দাতব্য সংস্থা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে পদত্যাগপত্রের মতো করে লেখা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, রুশ নারীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের পর বিল গেটস যে সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন, তা সামাল দিতে তাঁকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হয়েছে।

অন্য ই–মেইলটি শুরু হয়েছে ‘প্রিয় বিল’ সম্বোধনে। এতে বিল গেটস বন্ধুত্বের ইতি টানায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে আরও দাবি করা হয়েছে, বিল গেটস যৌনবাহিত সংক্রমণ আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি সে বিষয়টি তৎকালীন স্ত্রী মেলিন্ডার কাছ থেকেও গোপন রাখতে চেয়েছিলেন।

এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগটি বিল গেটস ও তাঁর প্রতিনিধিরা বরাবরই নাকচ করে আসছেন। গেটস আগে বলেছিলেন, একটি দাতব্য প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করতে দুজন একসঙ্গে শুধু কয়েকটি নৈশভোজ করেছিলেন, তবে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

সর্বশেষ অভিযোগের পর বিল গেটসের এক মুখপাত্র বলেন, এসব নথি থেকে যা বোঝা যায়, তা হলো গেটসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক না থাকায় এপস্টেনের হতাশা এবং কাউকে ফাঁসানো ও বদনাম করতে সে কত দূর যেতে পারত।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টেইন–সংক্রান্ত যেসব নথি, ই–মেইল ও ছবি প্রকাশ করেছে, সেগুলোর অনেকটিই কুখ্যাত এ যৌন নিপীড়কের বিস্তৃত যোগাযোগ নেটওয়ার্কের চিত্র উঠে এসেছে। এতে বড় বড় তারকা, ব্যবসায়ী ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের তথ্য রয়েছে।

২০০৮ সালে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে যৌনবৃত্তিতে প্রলুব্ধ করার দায়ে এপস্টেইন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও প্রভাবশালী মানুষদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় ছিল।

যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে পাচারসংক্রান্ত অন্য একটি মামলায় বিচার চলাকালে ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান এপস্টেইন।

২০২১ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস দম্পতির বিচ্ছেদ হয়
২০২১ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস দম্পতির বিচ্ছেদ হয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, February 5, 2026

এপস্টিন ফাইলস: বিশ্ব এলিটদের গোপন ও ভয়াবহ সব রহস্যের উন্মোচন

বিশ্বের ক্ষমতাধর এলিটদের নোংরা লেনদেনের যদি কোনো লিখিত দলিল থেকে থাকে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ‘এপস্টিন ফাইলস’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প থেকে বিল ক্লিনটন, এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজাতদের খুব কম মানুষই আছেন, যাদের নাম এই কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারী জেফ্রি এপস্টিনের নেটওয়ার্কের ছায়া থেকে মুক্ত। এ খবর দিয়ে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বলছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির শুরু থেকেই যে কেলেঙ্কারি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল, তা এবার আরও বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয় কুখ্যাত এপস্টিন ফাইলসের নতুন একটি বড় অংশ প্রকাশ করেছে। এটা রাজনৈতিক অঙ্গনে একেবারে বোমা ফাটানোর মতো। এতে প্রকাশ্যে চলে এসেছে বিশ্বনেতা, স্বঘোষিত দানবীর যেমন বিল গেটস, এবং প্রযুক্তি জগতের প্রভাবশালী ধনকুবের ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের নাম। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে এলিটদের বিলাসিতা, প্রভাব এবং গোপন অনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত এই বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। নথিগুলো দেখতে গেলেই একটি অস্বাভাবিক সতর্কবার্তা চোখে পড়ে। ফাইলসে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীকে নিশ্চিত করতে হয় যে, তিনি ১৮ বছরের বেশি বয়সী। এই সতর্কতাই ইঙ্গিত দেয়, বিষয়বস্তু কতোটা ভয়ঙ্কর ও অস্বস্তিকর। নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে রহস্যজনক মৃত্যুর সাত বছরেরও বেশি সময় পরও জেফ্রি এপস্টিনের রেখে যাওয়া অন্ধকার লিগ্যাসি কীভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনাম দখল করে আছে, তা এসব নথিতে স্পষ্ট। নতুন প্রকাশিত ফাইলগুলো ইঙ্গিত দেয়, এই কলঙ্কিত অর্থলগ্নিকারীর প্রভাব বিশ্ব ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নথিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, হিলারি ক্লিনটন এবং জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে এপস্টিনের যোগসূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একটি ইয়টে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। যদিও এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো এপস্টিনের গোপন জগতকে ঘিরে এলিটদের অতিরিক্ত ভোগ, গোপনীয়তা ও কথিত শোষণের বিষয়টিকে আরও ঘনীভূত করে। এপস্টিনের পরিধিতে ঘোরাফেরা করেছেন প্রায় সব ক্ষেত্রের প্রভাবশালী ‘এ-লিস্টার’রা। ফুটবল তারকা ডেভিড বেকহ্যাম, প্রিন্স অ্যানড্রু, বৃটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সবাই এই কলঙ্কিত অর্থলগ্নিকারীর বিশাল কুখ্যাতির গ্যালারিতে হাজির। আইন মন্ত্রণালয়ের লাখ লাখ নথির মাধ্যমে সেগুলো এখন জনসমক্ষে হাজির।
একটি তথ্য বিশেষ নিষ্ঠুর বিদ্রুপ তৈরি করে। বিল গেটসের নাম উঠে এসেছে এমন নথিতে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এপস্টিনের ব্যবস্থাপনায় হওয়া এক সাক্ষাতের ঘটনা ঘটে। এরপর তিনি যৌনরোগে আক্রান্ত হন। এপস্টিন নিজে শুধু মানব পাচারের অভিযোগেই নয়, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী হিসেবেও কুখ্যাত। এই নথির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ২০১৫ সালের একটি ই-মেইল বিনিময়। তাতে এপস্টিনের সহযোগীরা নিজেদের স্বার্থে মালালা ইউসুফজাই ও তার ফাউন্ডেশনকে সমর্থন দেয়ার কথা নিয়ে আলোচনা করেন। মালালা আদৌ কোনো সহায়তা পেয়েছিলেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে এই আলোচনাই দেখিয়ে দেয় যে, এপস্টিন কীভাবে বিশ্ব জুড়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও মহৎ উদ্যোগগুলোর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিতে চাইতেন। আরেকটি ই-মেইলে তার দীর্ঘদিনের সহকারী লেসলি গ্রফ মালালা ফান্ডে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের শূন্যপদের কথা উল্লেখ করেন- যেন এপস্টিনের কোনো যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সেখানে বেতনভুক্ত পদ পাওয়া যায় কিনা, তা যাচাই করছিলেন।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, দেশটির পোলিও নির্মূল কর্মসূচি এপস্টিনের নজরে ছিল। নরওয়ের প্রভাবশালী কূটনীতিক ও অসলো চুক্তির অন্যতম স্থপতি তেরিয়ে রড-লারসেন তাকে এ বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিচ্ছিলেন। এমনকি বিল গেটসের পোলিও নির্মূল সংক্রান্ত উদ্যোগ- পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক ও যোগাযোগ, এসব সম্পর্কেও এপস্টিন অবগত ছিলেন। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাঠানো আই-মেসেজগুলোতে, গ্রেপ্তারের এক বছর আগে, পাকিস্তানের নতুন নেতৃত্বের প্রতি এপস্টিনের প্রকাশ্য বিদ্বেষও ফুটে ওঠে। ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তিনি তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, শান্তির জন্য তিনি এরদোগান, খোমেনি, শি বা পুতিনের চেয়েও বড় হুমকি। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত নেতাদের সঙ্গে তুলনা টেনে আনেন সামনে।
শুনতে দুঃসাহসিক লাগলেও, এপস্টিনের কাছে কোনো বিষয়ই নিষিদ্ধ ছিল না। একটি আংশিক গোপন অ্যাকাউন্ট থেকে ফরওয়ার্ড করা ২০১৮ সালের আরেকটি ই-মেইলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিতর্কিত সিন্ধু পানি চুক্তি বা ‘ওয়াটার ওয়ার্স’ নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়, যা বহু বছর পর ভারতের চুক্তি স্থগিতের হুমকির মধ্যদিয়ে আবার আলোচনায় আসে।

এই ই-মেইলটি পাঠানো হয়েছিল অ্যাডাম লুপেলকে এবং কপি ছিল নাদিয়া আল সাইদের কাছে। দু’জনই তখন ইনস্টিটিউট অব পিসে কর্মরত। এতে বোঝা যায়, জনসমক্ষে আসার বহু আগেই এপস্টিন সংবেদনশীল ও উচ্চঝুঁকির ভূরাজনৈতিক বিরোধে আগ্রহী ছিলেন। পাকিস্তানের পাশের দেশ ভারতে এপস্টিন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদির কাছে। যার হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি তাকে দেশের ভেতরে প্রায় পূজনীয় করে তুলেছে। ই-মেইল ও টেক্সট বার্তাগুলোতে দেখা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত এই অর্থলগ্নিকারী ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে প্রভাব বিস্তারের জন্য সক্রিয় চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এমনকি মোদির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী দলের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। যা দেখিয়ে দেয় যে, পশ্চিমা দুনিয়ার বাইরেও ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেকে জড়িয়ে নেয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল এপস্টিনের। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মোদি এপস্টিনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক অস্বীকার করলেও, প্রতিবেদনে বলা হয়- ইসরাইল সফর নিয়ে তিনি নাকি এপস্টিনের পরামর্শ চেয়েছিলেন। যেখানে তিনি গান গেয়েছিলেন ও নেচেছিলেন বলেও দাবি রয়েছে।

এপস্টিন ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের দুই মাসেরও কম সময় আগে মোদি ও ট্রাম্পের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিলেন। এপস্টিন সংযোগ নিয়ে যারা নথিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের মতে, এগুলো শুধু একজন বিশ্বমঞ্চে মন্তব্য করতে ভয় না পাওয়া ব্যক্তির ছবি ফুটিয়ে তোলে না। বরং এতে এমন একজন মানুষের চিত্র ফুটে ওঠে, যিনি রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে জটিল এক প্রভাবের জাল বুনেছিলেন। যখন ও যেখানে তার প্রয়োজন হয়েছে, সেখানেই ক্ষমতার করিডোরে নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন শীতল হিসাবনিকাশে। নতুন নথিতে আরও রয়েছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসা তথ্য ও অভিযোগের অভ্যন্তরীণ মেমো ও সারসংক্ষেপ। এর অনেকগুলোতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম যৌন অসদাচরণের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত। নথিগুলো আরও দেখায়, অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগ। ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ফ্লোরিডা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য বৈঠকের আয়োজন নিয়ে ই-মেইলে ইলন মাস্কের নাম পাওয়া যায়, যদিও তিনি বারবার কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। বিল গেটসের নামও বৈঠক ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চিঠিপত্রে এসেছে, যা তিনিও অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, বৃটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র‍্যানসন এবং হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টারা- স্টিভ ব্যানন ও ক্যাথি রুমলার বারবার নথিতে উঠে এসেছেন। যা প্রমাণ করে এপস্টিনের জালের কোনো সীমানা ছিল না।

সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো এপস্টিনের নির্যাতনের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বহু আগেই জানতো। এফবিআইয়ের অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, ২০০৬-২০০৭ সালেই এপস্টিনের ফ্লোরিডার বাড়িতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জড়িত একাধিক অভিযোগ সম্পর্কে এজেন্টরা অবগত ছিলেন। কিন্তু ফেডারেল কৌঁসুলিরা সেগুলো প্রায় উপেক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত এপস্টিন অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এক সমঝোতা চুক্তি করেন। অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেয়ার দায় স্বীকার করেন এবং মাত্র ১৮ মাস কারাভোগ করেন। এপস্টিনের আন্তর্জাতিক প্রভাবের পরিধি আরও স্পষ্ট হয় বৃটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে।
https://mzamin.com/uploads/news/main/201652_1.webp

Wednesday, February 4, 2026

ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করেছিলেন এপস্টেইন, অভিযোগ আরেক নারীর

ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য এবং রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন আরও এক নারী। তাঁর অভিযোগ, অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন তাঁকে যুক্তরাজ্যে পাঠিয়েছিলেন। ওই নারীর আইনজীবী বিবিসিকে এসব কথা বলেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাটি ২০১০ সালে অ্যান্ড্রুর বাসভবন রয়েল লজে ঘটেছে। ওই নারী ব্রিটিশ নাগরিক নন এবং ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল বিশের কোঠায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনি সংস্থা এডওয়ার্ডস হেন্ডারসনের আইনজীবী ব্র্যাড এডওয়ার্ডস ওই নারীর পক্ষে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। সেই নারীর বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর আইনজীবী বলেছেন, অ্যান্ড্রুর সঙ্গে রাত কাটানোর পর তাঁকে (অভিযোগকারী নারী) বাকিংহাম প্যালেস ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছিল। সেখানে চা-আপ্যায়নও করা হয়।

আইনজীবী আরও বলেন, ‘আমরা অন্তত এমন একজন নারীর কথা বলছি, যাঁকে জেফরি এপস্টেইন অ্যান্ড্রুর কাছে পাঠিয়েছিলেন। অ্যান্ড্রুর সঙ্গে একটি রাত কাটানোর পর তাঁকে বাকিংহাম প্যালেস ঘুরে দেখার সুযোগও দেওয়া হয়েছিল।’

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি নিউজ অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে এখন পর্যন্ত তিনি এসব অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলেননি।

বাকিংহাম প্যালেসে সাধারণত ভ্রমণকারীদের নামের তালিকা রাখা হয়। তবে বিবিসির পক্ষে ওই নারীর পরিচয় প্রকাশ না করে তাঁর সেখানে যাওয়ার বিষয়টির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এডওয়ার্ডস বিশ্বজুড়ে এপস্টেইনের হাতে নিগৃহীত দুই শতাধিক ভুক্তভোগীর পক্ষে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। তিনি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী আরেক নারী ভার্জিনিয়া জিউফ্রের আইনজীবীও ছিলেন। জিউফ্রে অভিযোগ করেছিলেন, ২০০১ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য তাঁকে লন্ডনে আনা হয়েছিল। ওই সময় জিউফ্রের বয়স ছিল ১৭ বছর।

জিউফ্রের দাবি, ২০০১ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে তাঁকে আরও দুবার অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়। এর মধ্যে একবার নিউইয়র্কে এবং আরেকবার এপস্টেইনের ব্যক্তিগত ক্যারিবীয় দ্বীপে দুজনের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়েছে।

ফ্লোরিডায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে প্ররোচনা দেওয়ার দায়ে এপস্টেইনকে ২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তিনি ২০১০ সালের জুলাইয়ে তাঁর সাজার মেয়াদ শেষ করেন। বিচার চলাকালে ২০১৯ সালে কারাগারে মারা যান এপস্টেইন।

ফ্লোরিডাভিত্তিক আইনজীবী এডওয়ার্ডস বিবিসিকে বলেন, একসঙ্গে রাত কাটানোর আগে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তাঁর মক্কেলের যোগাযোগ হয়েছিল।

এডওয়ার্ডস আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অ্যান্ড্রুর কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল। তবে অ্যান্ড্রু তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে খুব একটা সম্পৃক্ত নন বলে মনে হয়েছে। আইনজীবী বলেছেন, রাজা চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যান্ড্রুর ‘খেতাব, উপাধি ও মর্যাদা’ বাতিল করার পর তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

জিউফ্রের মরণোত্তর স্মৃতিকথা প্রকাশের পর গত বছর অক্টোবর মাসে অ্যান্ড্রুর প্রিন্স উপাধি বাতিল করা হয়। বলা হয়, তিনি এখন থেকে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর হিসেবে পরিচিত হবেন। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়, তাঁকে উইন্ডসর এস্টেটের রয়েল লজ বাসভবন ছাড়তে হবে। তিনি ২০০৪ সাল থেকে সেখানে বসবাস করে আসছিলেন।

ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। ২০২২ সালে আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের সমঝোতায় বিষয়টি নিষ্পন্ন করা হয়। জিউফ্রে গত বছর আত্মহত্যা করেন।

অ্যান্ড্রু বরাবরই জিউফ্রের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর
অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, February 3, 2026

নতুন নথি প্রকাশ: এপস্টেইনের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্ক ধারণার চেয়েও অনেক গভীর ছিল

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গত শুক্রবার জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত আরও নথি প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে, কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের যোগাযোগ ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপচারিতা আগে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

প্রকাশিত নথিপত্রের কিছু ই–মেইল থেকে জানা যায়, মাস্ক ও এপস্টেইন অন্তত পৃথক দুটি উপলক্ষ ঘিরে নিজেদের মধ্যে আন্তরিকভাবে বার্তা আদান-প্রদান করেছেন। এতে এপস্টেইনের মালিকানাধীন দ্বীপে মাস্কের ভ্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মাস্ক ও এপস্টেইন ২০১২ ও ২০১৩ সালে ওই ই–মেইলগুলো চালাচালি করেন। এতে দেখা যায়, তাঁরা দুজনে মিলে মাস্ক কবে ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপে যাবেন, তা ঠিক করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু যাতায়াত সংক্রান্ত জটিলতার (লজিস্টিকস) কারণে মাস্কের সেই দ্বীপে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি।

মাস্ক ২০১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর এপস্টেইনকে লিখেছিলেন, ‘ছুটিতে আমি সেন্ট বার্তস এলাকায় থাকব। সেখানে যাওয়ার ভালো সময় কোনটা?’

উল্লেখ্য, সেন্ট বার্তস হিসেবে পরিচিত সেন্ট বার্থেলেমি ফরাসি ভাষাভাষি একটি ক্যারিবীয় দ্বীপ। ধনকুবের ও তারকারা অবকাশযাপনে এই দ্বীপে যান।

জবাবে এপস্টেইন লিখেছিলেন, ‘১ থেকে ৮ জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন। যখন খুশি আসুন। আপনার জন্য সব সময় দরজা খোলা।’

মাস্ক পরবর্তী কয়েকটি ই–মেইলে নিজের সফরসূচি নিয়ে কথা বলেন। দুজনে ২ জানুয়ারি ভ্রমণের তারিখ ঠিক করেন। কিন্তু এপস্টেইন শেষ মুহূর্তে মাস্ককে জানান, তাঁকে নিউইয়র্কে থাকতে হচ্ছে।

এপস্টেইন দুঃখ প্রকাশ করে মাস্ককে লিখেছিলেন, ‘দুঃসংবাদ—কর্মব্যস্ততার কারণে দুর্ভাগ্যবশত আমাকে নিউইয়র্কে থাকতে হবে। আমি সত্যিই খুব আশা করেছিলাম, আমরা একসঙ্গে কিছু আনন্দঘন সময় কাটাব। আমি খুব হতাশ। আশা করি, আমরা শিগগিরই আরেকটি সময়সূচি ঠিক করতে পারব।’

এপস্টেইন ২০১২ সালের নভেম্বরে ই–মেইলে মাস্ককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘দ্বীপে আসার হেলিকপ্টারে আপনারা কতজন থাকবেন?’ জবাবে মাস্ক লিখেছিলেন, ‘সম্ভবত শুধু তালুলাহ (মাস্কের সাবেক স্ত্রী তালুলাহ রিলি) ও আমি। আপনার দ্বীপের সবচেয়ে বড় পার্টি কবে হবে?’

এপস্টেইন আরেকটি ই–মেইলে মাস্ককে ভ্রমণের জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং তাঁর হেলিকপ্টার ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

এপস্টেইনের ওই ই–মেইলের জবাবে ২০১২ সালের ২৫ ডিসেম্বর মাস্ক লিখেছিলেন, ‘আপনার কি কোনো পার্টির পরিকল্পনা আছে? এ বছর আমি প্রচুর কাজ করছি। তাই আমার বাচ্চারা বড়দিনের পর বাড়ি গেলে আমি সেন্ট বার্তস বা অন্য কোথাও গিয়ে পার্টি করতে এবং মন খুলে আনন্দ করতে চাই। আমন্ত্রণের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আমি যা চাইছি, তা শান্ত দ্বীপে থাকার ঠিক উল্টো।’

জবাবে এপস্টেইন লিখেছিলেন, ‘বুঝতে পেরেছি। তাহলে সেন্ট বার্তসে দেখা হবে। তবে আমার দ্বীপে (নারী-পুরুষের) অনুপাত তালুলাহর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।’
জবাবে মাস্ক লিখেছিলেন, ‘অনুপাত তালুলাহর জন্য কোনো সমস্যা নয়।’

এরপর ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি এপস্টেইনকে ই–মেইল করে মাস্ক বলেন, ‘সফরটি আর হচ্ছে না।’ তিনি লেখেন, ‘এবার যাতায়াত সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিয়েছে।’

ইলন মাস্ক সব সময় এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কড়া সমালোচনা করে এসেছেন। তবে এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর নিজের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি এত দিন যে তিনি অস্বীকার করে আসছিলেন, নতুন প্রকাশিত ই–মেইলে উল্টো চিত্র দেখা গেছে।

এক অনুষ্ঠানে ২০১৯ সালে তিনি বলেছিলেন, এপস্টেইন স্পষ্টতই একজন খারাপ চরিত্রের মানুষ। তিনি একাধিকবার তাঁকে নিজের মালিকানাধীন দ্বীপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা নাকচ করে দিয়েছিলেন।’

এর আগে মাস্ক দাবি করেছিলেন, তিনি গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলকে (এপস্টেইনের সহযোগী) চিনতেন না এবং তাঁদের একসঙ্গে তোলা ছবিটি অনাকাঙ্ক্ষিত। এ মার্কিন ধনকুবের আরও দাবি করেছিলেন, তিনি এপস্টেইনের নিউইয়র্কের বাসায় তালুলাহসহ মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য গিয়েছিলেন। তালুলাহর লেখা একটি বইয়ের জন্য গবেষণার কাজে তাঁরা গিয়েছিলেন। তবে নির্দিষ্ট তারিখ বলেননি।

এপস্টেইনের সঙ্গে ই-মেইল যোগাযোগের নথি প্রকাশের পর মাস্ক বা তাঁর কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী এপস্টেইন ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে কারাবন্দী অবস্থায় আত্মহত্যা করেন।

মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। ওয়াশিংটন ডিসিতে, ১৯ নভেম্বর ২০২৫
মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। ওয়াশিংটন ডিসিতে, ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Wednesday, December 31, 2025

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই। রবিবার তার প্রতিষ্ঠিত বার্দো ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। অভিনয়জীবনে বার্দো ৫০টিরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। এরপর তিনি নিজেকে প্রাণী অধিকার আন্দোলনে উৎসর্গ করেন। জীবনের পরবর্তী দশকগুলোতে তিনি চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী সম্প্রদায়, মুসলিম ও অভিবাসীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কারণে বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে পাঁচবার দোষী সাব্যস্ত হন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফ্রান্স ২৪।

এতে আরও বলা হয়, যৌবনে বার্দো ছিলেন নিরঙ্কুশ এক যৌন-প্রতীক। তার মোহময়ী শারীরিক আবেদন ও মুক্ত জীবনযাপন তৎকালীন ১৯৫০-এর দশকে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু খুব শিগগিরই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির সেই অবিরাম অনুসরণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং সবকিছু ছেড়ে দেন পশুদের জন্য কাজ করতে। শুরুর দিনে যখন তার বাঁকানো দেহরেখা, কাজল নয়ন আর অভিমানী ঠোঁট ফরাসি চলচ্চিত্রের পোস্টারজুড়ে ছড়িয়ে ছিল, তখন ‘বিবি’ নামে পরিচিত এই অভিনেত্রীকে প্রায়ই তুলনা করা হতো মেরিলিন মনরোর সঙ্গে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে, হঠাৎ একদিন তিনি খ্যাতির সেই নীল জগতকে বিদায় জানান। অবহেলিত প্রাণীদের দেখভাল করার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, তিনি ‘প্রতিদিন সুন্দর হতে হতে অসুস্থ’ হয়ে পড়েছিলেন। তার অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত অভিনয়জীবনে বার্দো একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করলেও সমালোচকদের কাছ থেকে খুব বেশি প্রশংসা পাননি। তার পঞ্চাশটির বেশি চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই ছিল মজাদার। তবে তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি, কেবল কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। ১৯৫৬ সালে ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’ ছবিতে তিনি ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। সেই তরুণীর প্রেম জড়িয়ে পড়ে এক ত্রিভুজ প্রেমে। ছবিটি পরিচালনা করেন তার তৎকালীন স্বামী রজার ভাদিম। ভাদিমের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, এই তরুণ নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠবেন ‘সমস্ত বিবাহিত পুরুষের নাগালের বাইরে থাকা কল্পনার নারী’ এবং তার সেই কথাই সত্যি হয়। ছবিটির এক বিখ্যাত দৃশ্যে, কোমর পর্যন্ত চেরা স্কার্ট পরে মাম্বো নাচতে থাকা বার্দোর মুক্ত যৌনশক্তির প্রকাশ তাকে দেবীর মর্যাদা দেয়। যদিও তা একই সঙ্গে তা চলচ্চিত্র সেন্সরদের বিরক্তির কারণ হয়। সাত বছর পর জ্যঁ-লুক গদারের ‘কনটেম্পট’-এ এক হতাশ, নির্জীব স্ত্রী চরিত্রে তার অভিনয়ও পরিণত হয় চলচ্চিত্রকিংবদন্তির অংশে। প্রযোজক ও দর্শকদের নগ্নদৃশ্যের প্রত্যাশার সঙ্গে গদার এমনভাবে দৃশ্য নির্মাণ করেন যেখানে বিছানায় শুয়ে থাকা বার্দোর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোলাজ তৈরি করা হয়। আর তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, তার শরীরের কোন অংশটি তার সবচেয়ে প্রিয়।

১৯৫৮ সালে ফরাসি লেখিকা মার্গারিত দ্যুরাস লিখেছিলেন- ‘রানী বার্দো দাঁড়ায় সেখানেই, যেখানে নীতিনৈতিকতার শেষ সীমানা।’ এক বছর পর দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার মন্তব্য করেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো চলেন। আর এটাই মানুষকে বিচলিত করে।
কিন্তু ‘স্বাধীনচেতা নারী’ রূপে নিজের এই জন-ইমেজে আনন্দ খুঁজে পাননি বার্দো; বরং তিনি সংগ্রাম করেছেন বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টির বিরুদ্ধে। ১৯৬০ সালে ২৬তম জন্মদিনে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আর ১৯৭৩ সালে চল্লিশে পা দেয়ার আগে তিনি পুরোপুরি সরে দাঁড়ান আলো-ঝলমলে জীবন থেকে। ১৯৭৮ সালে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম আমার ক্যারিয়ার সম্পূর্ণভাবে আমার শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে। তাই আমি সিনেমা ছেড়ে দিলাম। যেমন আমি সবসময় পুরুষদের ছেড়ে যাই, আগে।’

১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্ম নেয়া বার্দো বেড়ে উঠেছিলেন সচ্ছল, ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক পরিবারে। চারবার বিয়ে করা বার্দোর একমাত্র সন্তান নিকোলা। তার পিতা বার্দোর দ্বিতীয় স্বামী অভিনেতা জ্যাক শারিয়ের। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি সেন্ট-ট্রোপেজে প্রায় নির্জন জীবন বেছে নেন এবং এরপর থেকে প্রাণীঅধিকারই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান পরিচয়। ১৯৮০-এর দশকে কানাডায় বার্ষিক সীলশাবক হত্যাযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ২০১১ সালে ডব্লিউডব্লিউএফ’কে দেয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘ওই দৃশ্যগুলো আমি কখনো ভুলতে পারি না। যন্ত্রণাভরা সেই আর্তচিৎকার এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সেগুলোই আমাকে শক্তি দিয়েছে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করার, প্রাণীর জীবনের পক্ষে।’

প্রাণী সুরক্ষার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন। তিনি শিশু সীল, হাতি, পশুবলি প্রথা ও ঘোড়া জবাইখানা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করেন। পরবর্তী জীবনে বার্দো ক্রমশ চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী, মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের কারণে তাকে পাঁচবার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে। ২০০৩ সালের বই ‘এ ক্রাই ইন দ্য সাইলেন্স’-এ তিনি সতর্ক করেন ফ্রান্সের গোপন, বিপজ্জনক, নিয়ন্ত্রণহীন অনুপ্রবেশ সম্পর্কে। ২০১২ ও ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন দেন অতি ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেনকে । তিনি তাকে বলেন ‘২১শ শতকের জোয়ান অব আর্ক’।

ফ্যাশন ও চলচ্চিত্র জগত থেকে সরে যাওয়ার বহু বছর পরও বার্দো সেই জগতগুলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। পশমের পোশাক পরার বিরুদ্ধে ছিলেন সরব এবং গর্বের সঙ্গে এড়িয়ে গিয়েছেন প্লাস্টিক সার্জারি। ২০১৭ সালে হার্ভে  ওয়েনস্টিন কেলেঙ্কারির পর যখন মি-টু আন্দোলন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনও তিনি উল্টো স্রোতে হাঁটেন। ২০১৮ সালে প্যারিস ম্যাচ’কে তিনি বলেন, বেশিরভাগই ভণ্ডামি ও হাস্যকর আচরণ করছে। তার মতে, অনেক অভিনেত্রী প্রযোজকদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। আর পরে আলোচনায় আসার জন্য বলে বসে তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা যখন আমাকে সুন্দর বলত, বা বলত আমার নাকি সুন্দর পশ্চাৎদেশ- আমি সেটাকে আকর্ষণীয়ই মনে করতাম।’

mzamin

Friday, December 26, 2025

এপস্টেইন মামলার আরও ১০ লাখের বেশি নথি খুঁজে পাওয়ার কথা বলেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক প্রয়াত জেফরি এপস্টেইন মামলাসংশ্লিষ্ট আরও ১০ লাখের বেশি নথি খুঁজে পেয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, আগামী কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসব নথি প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং নিউইয়র্কের ফেডারেল প্রসিকিউটররা বিচার বিভাগকে (ডিওজে) এই নতুন তথ্য পাওয়ার বিষয়টি অবহিত করেছেন।

গতকাল বুধবার বিচার বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার জন্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো আড়াল করতে আমাদের আইনজীবীরা দিনরাত কাজ করছেন। তারপর যত দ্রুত সম্ভব আমরা নথিগুলো প্রকাশ করব।’

বিভাগটি আরও জানায়, সব নথি প্রকাশ করতে আরও ‘কয়েক সপ্তাহ’ সময় লাগতে পারে। নতুন একটি আইনের অধীন এপস্টেইন–সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশের সময়সীমা ১৯ ডিসেম্বর নির্ধারিত থাকলেও তা করতে ব্যর্থ হওয়ায় চাপের মুখে রয়েছে বিচার বিভাগ।

সংস্থাটি বলেছে, তারা ফেডারেল আইন এবং নির্দেশনা অনুযায়ী নথিগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

তবে এফবিআই এবং সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের মার্কিন অ্যাটর্নি কীভাবে এই বিপুলসংখ্যক নতুন নথি খুঁজে পেলেন, তা বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি।

মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া একটি আইনের আওতায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টেইনের অপরাধসংক্রান্ত হাজারো নতুন নথি প্রকাশ করেছে। ওই আইনের আওতায় এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রকাশিত নথিগুলোতে ভিডিও, ছবি, ই–মেইল এবং তদন্ত প্রতিবেদন রয়েছে। তবে এগুলোর কিছু জায়গায় কালো করে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আর কিছু নথি একেবারেই জনসমক্ষে আনা হয়নি।

শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনো কয়েক লাখ নথি প্রকাশ হওয়া বাকি।

২০১৫ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামের এক নারী। তাঁর অভিযোগ, যৌন ব্যবসার কাজে লাগানোর জন্য আরও কয়েকজন অল্প বয়সী নারীর সঙ্গে তাঁকেও পাচার করেছিলেন জেফরি এপস্টেইন ও তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। ওই সময় ভার্জিনিয়া কিশোরী ছিলেন।

২০১৯ সালে শিশুদের যৌন নিপীড়ন এবং যৌন ব্যবসার জন্য নারী পাচারসহ নানা অভিযোগে এপস্টেইনকে গ্রেপ্তার করা হয়; কিন্তু বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগেই কারাগারে এপস্টেইনের ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার হয়। পরে জানানো হয়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এমন একটি যৌন চক্র চালাতেন, যেখানে কিশোরীদের যৌনকর্মের জন্য সমাজের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হতো।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নিউইয়র্কের একটি আদালতের বিচারক এপস্টেইনের মামলার নথিগুলো প্রকাশের অনুমতি দেন। এসব নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, স্টিফেন হকিংসহ খ্যাতনামা ব্যক্তিদের নাম আসায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বজুড়ে শোরগোল পড়ে যায়।

জেফরি এপস্টেইন ও তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল
জেফরি এপস্টেইন ও তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, November 4, 2025

চীনা প্রতিষ্ঠান শিনের বিরুদ্ধে শিশুবৎ যৌন পুতুল বিক্রির অভিযোগ

চীনের ই-কমার্স প্লাটফর্ম শিনের বিরুদ্ধে অনলাইনে সেক্স ডল বা যৌন পুতুল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ফ্রান্সের ভোক্তা পর্যবেক্ষক সংস্থার তরফে এ অভিযোগ দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির তরফে বলা হয়, অনলাইনে শিশুর মুখাবয়ব সদৃশ যৌন পুতুল বিক্রি করছে এশিয়ার ই-কমার্স ওই প্লাটফর্ম। যা শিশু পর্নোগ্রাফির নির্দেশক। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ফ্রান্সের ভোক্তা বিষয়ক ও জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ডিজিসিসিআরএফ বলেছে, পুতুলগুলোর অনলাইন বর্ণনসা এবং শ্রেণীবিন্যাস বিষয়বস্তু হিসেবে পর্নোগ্রাফির দিকে সন্দেহ প্রবল করে।

যদিও শিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের পণ্যগুলোর সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠায় তারা ইতিমধ্যেই সেগুলো ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কিভাবে ওই যৌন পণ্যগুলো বিক্রির তালিকায় প্রদর্শন করা হয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি অন্য বিতর্কিত পণ্যগুলো সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যেসব পণ্য তাদের বিক্রি তালিকায় যুক্ত হয়েছে সেগুলো খতিয়ে দেখছে শিন। প্যারিসে নিজেদের বিক্রয় কেন্দ্র খোলার প্রস্ততি নেয়ার প্রাক্কালে এমন অভিযোগের মুখোমুখি হলো শিন। ফলে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছে এই সুপার ফ্যাশন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। 

https://mzamin.com/uploads/news/main/187690_Kaium-1.webp

Saturday, October 18, 2025

১৩ বছরের বালকের সন্তানের মা হয়েছেন শিক্ষিকা

ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে একজন শিক্ষিকা ১৩ বছর বয়সী এক বালকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। সেই সম্পর্কের ফলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে একটি সন্তান প্রসব করেন। এখন ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে সেই সন্তানের পিতা ১৩ বছরের ওই বালক। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির। অনলাইন ডেইলি মেইল এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেছে, শিক্ষিকার নাম লরা ক্যারন (২৫)। বুধবার সকালে নিউ জার্সির কেপ মে আদালতে যৌন নির্যাতনের মামলার শুনানিতে হাজির হন তিনি। সাদা পোশাকে গম্ভীর ভঙ্গিতে হাজির হওয়া মিডল টাউনশিপ এলিমেন্টারি স্কুলের এই পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষিকাকে আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল। তার আইনজীবী জন ডব্লিউ টুমেলটি বিচারকের কাছে আরও সময় চান। মামলার অগ্রগতি চলাকালীন ক্যারনকে তার চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ২০১৯ সালে তিনি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, ডিএনএ টেস্টে দেখা গেছে, ওই ছেলেই সন্তানের পিতা। ফলে, এখন মামলার সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। প্রসিকিউশন পক্ষ আগে ক্যারনকে দোষ স্বীকারের বিনিময়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাব দেয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ক্যারনের কমপক্ষে ১০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৪০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। শুনানির পর তিনি দ্রুত আদালত থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং একজন আলোকচিত্রী থেকে মুখ আড়াল করতে কালো জ্যাকেট ব্যবহার করেন। কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। ক্যারনের সঙ্গে ছিলেন তার ভাই ও বাবা। সাংবাদিকরা গাড়ির কাছে এলে তার পিতা চিৎকার করে বলেন, আমার গাড়ি থেকে দূরে থাকো! কিছুক্ষণ পর তারা দ্রুত গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান। এর আগে এ বছর, যে ছেলেটির বয়স তখন ১৩ ছিল (এবং ক্যারনের বয়স ছিল ২৮), তখন সে ডেইলি মেইল’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করে, আসলে সেও ক্যারনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল প্রথমে। এখন ২০ বছর বয়সী কলেজ শিক্ষার্থী সে। দাবি করেছে, সে কোনো ভিকটিম নয়; বরং এখনো ক্যারনকে ভালোবাসে এবং একসময় তার সঙ্গে সংসার করতে চায়। সে বলে, ওরা সব অভিযোগ তুলে নিক। আমি কখনো গ্রুমড হইনি, রেপড হইনি, বা ম্যানিপুলেটেড হইনি। তিনিই কোনো কিছু শুরু করেননি। সবকিছু আমি শুরু করেছি। তবে প্রসিকিউশন বলছে, তখন ছেলেটির বয়স ছিল ১৩, অথচ নিউ জার্সিতে যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার সম্মতির বয়স ১৬ বছর। ফলে বিষয়টি আইনের চোখে শিশু যৌন নির্যাতন। ক্যারনের সঙ্গে ছেলেটির পরিচয় হয় যখন তিনি তার বড় বোনকে পড়াতেন। ছেলেটির পরিবার ক্যারনের ওপর এতটাই আস্থা রাখতো যে, তাকে নিজেদের বাড়িতে রাত কাটাতে দিতো। কিন্তু পরবর্তীতে ক্যারন গর্ভবতী হন এবং ২০১৯ সালে সন্তানের জন্ম দেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছেলেটির পিতা একটি ছবিতে শিশুটিকে দেখে হতবাক হন। কারণ শিশুটির চেহারা তার ছেলের সঙ্গে বেশ মিল। তখনই তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানুয়ারি মাসে ক্যারনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন প্রতিভাবান এক তরুণ ক্রীড়াবিদ হয়ে ওঠা ছেলেটি নিজের পিতার প্রতি ক্ষুব্ধ। সে বলছে, সবকিছুর শুরু হয়েছিল ফেসবুকে আমার পিতার এক পোস্ট দিয়ে। আমি চাইনি তাকে (ক্যারনকে) এভাবে হেয় করা হোক। সে আরও বলেছে, মানুষ জানে না তিনি আমার পরিবারের জন্য কী করেছেন। আমি তাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। তিনি সবসময় আমাদের পাশে ছিলেন। ক্যারনের পরবর্তী আদালতের হাজিরা আগামী মাসে নির্ধারিত হয়েছে।
mzamin

Wednesday, September 24, 2025

আলোর নিচে অন্ধকার: দুবাইয়ের গ্ল্যামার পাড়ায় যৌন ব্যবসা

দুবাইয়ের সবচেয়ে ঝলমলে এলাকাগুলোর আড়ালে চলে অন্য এক ব্যবসা। সেখানে আদিম নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে ধনীরা। তাদের মনোরঞ্জনের জন্য নারীদের ব্যবহার করে একটি চক্র। তারা বিভিন্ন নারীকে প্রলুব্ধ করে অথবা উঁচু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেখানে খদ্দেরের মন রক্ষা করে। এমনই এক যৌন কারবারি চক্রের মূল হোতাকে শনাক্ত করেছে বিবিসির অনুসন্ধান। তিনি চার্লস মুসেগওয়া। নিজেকে লন্ডনের সাবেক বাসচালক হিসেবে পরিচয় দেন। বিবিসির ছদ্মবেশধারী রিপোর্টারকে বলেন, তিনি এক রাতের জন্য কমপক্ষে ১০০০ ডলারের (৭৪০ পাউন্ড) বিনিময়ে নারী সরবরাহ করতে পারেন। তার দাবি, এসব নারী গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ‘প্রায় সবকিছুই’ করতে রাজি। বছরের পর বছর ধরে দুবাইয়ের বন্য সেক্স পার্টির গুজব শোনা যাচ্ছিল। টিকটকে এ বিষয়ের একটি হ্যাশট্যাগ ইতিমধ্যেই ৪৫ কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে। সেখানে নানা কৌতুক, প্যারোডি এবং অতিরঞ্জিত রিপোর্ট ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ করা হয়, অর্থলোভী কিছু প্রভাবশালী নারী নিজেদের জীবনযাত্রা চালাতে চরম মাত্রার যৌন অনুরোধ মেনে নেন।

কিন্তু বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের অনুসন্ধান বলছে, বাস্তবতা আরও ভয়ংকর। উগান্ডার তরুণীরা জানান, তারা ভেবেছিলেন দুবাই গিয়ে সুপারমার্কেট বা হোটেলে কাজ করবেন। কিন্তু মুসেগওয়ার নেটওয়ার্কে আটকা পড়ে বাধ্য হন যৌনকর্মে। মিয়া ছদ্মনামের এক যুবতী জানান, এক গ্রাহক নিয়মিতভাবে নারীদের উপর মলত্যাগ করার দাবি করতো। তিনি বলেন, মুসেগওয়ার চক্রে পড়ার পর তাকে ঋণের ফাঁদে ফেলা হয়। আগমনের পর জানানো হয় তিনি ২০০০ পাউন্ড ঋণী। দুই সপ্তাহের মধ্যে সেটি দ্বিগুণ হয়ে যায়- ভিসা, বিমান টিকিট, থাকা ও খাবারের নামে।

মোনিক কারুঙ্গি নামের এক তরুণী পশ্চিম উগান্ডা থেকে দুবাই যান। কিছুদিনের মধ্যেই মুসেগওয়ার কাছে ২৭০০০ ডলারের বেশি ঋণে জড়িয়ে পড়েন। তার পরিবার জানায়, তিনি কান্না ভেজা ভয়েস নোট পাঠাতেন। মোনিক ও কায়লা বিরুঙ্গি নামের আরও এক উগান্ডান তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু হয় দুবাইয়ের উঁচু ভবন থেকে পড়ে। যদিও পুলিশ এটিকে আত্মহত্যা বলেছে, পরিবারের দাবি সঠিক তদন্ত হয়নি। মোনিকের আত্মীয় মাইকেল জানান, তিনি যখন ঘটনাস্থলে যান, দেখেন অ্যাপার্টমেন্টে মাদক, যৌনকর্ম আর চার্লস মুসেগওয়া নিজেই নারীদের সঙ্গে বিছানায়। তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে মুসেগওয়া বলেন, আমি ২৫ বছর ধরে দুবাইয়ে আছি। দুবাই আমার। তুমি আমাকে রিপোর্ট করতে পারবে না।

আমি-ই দূতাবাস। মিয়া ও কিয়েরা উভয়েই নিরপেক্ষভাবে এই বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ট্রয় নামের একজন আগে মুসেগওয়ার নেটওয়ার্কে কাজ করতেন। তিনি জানান মুসেগওয়া নাইট ক্লাবগুলোর নিরাপত্তা কর্মীদের ঘুষ দিতেন, যাতে তার নারীরা সেখানে প্রবেশ করে গ্রাহক খুঁজতে পারে। মুসেগওয়া নিজেকে আড়ালে রাখতে অন্যদের নামে অ্যাপার্টমেন্ট ও গাড়ি ভাড়া নিতেন। ফলে কোনো কাগজপত্রে তার নাম থাকত না।

মোনিকের স্বপ্ন ও করুণ পরিণতি:
মোনিক একসময় নতুন চাকরি পেয়ে খুশি হন। ভাবেন, যৌন ব্যবসা থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু ২০২২ সালের মে মাসে তিনি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পড়ে মারা যান। তার দেহ কখনো পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়নি। ধারণা করা হয়, দুবাইয়ের আল কুসাইস কবরস্থানের ‘দ্য আননোন’ অংশে অজ্ঞাত কবরেই শায়িত আছেন তিনি।

উগান্ডায় বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে কাজ করতে যাওয়া বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা বছরে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার কর রাজস্ব এনে দেয় দেশটিতে। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর শোষণ। মানবাধিকারকর্মী মারিয়াম মুইজা জানান, তিনি উপসাগর অঞ্চল থেকে কমপক্ষে ৭০০ নারীকে উদ্ধার করেছেন। তার ভাষায়, মানুষকে বলা হয় সুপারমার্কেটে চাকরি দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়।

মুসেগওয়ার বক্তব্য:
সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চার্লস ‘অ্যাবি’ মুসেগওয়া। তার দাবি, আমি শুধু পার্টি আয়োজন করি। বড় খরচকারী লোকজন টেবিলে আসে, মেয়েরা স্বেচ্ছায় আসে। আমি কোনো অবৈধ ব্যবসা চালাই না। তিনি আরও দাবি করেন, মোনিক ও কায়লার মৃত্যু যথাযথভাবে পুলিশ তদন্ত করেছে এবং তিনি তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবে বিবিসি আল বারশা পুলিশ স্টেশনে কেস ফাইল দেখতে চাইলে কোনো সাড়া মেলেনি।

mzamin

Friday, September 19, 2025

দুবাইয়ে বিকৃত যৌন ব্যবসা চক্রের প্রধানকে চিহ্নিত করল বিবিসির এক অনুসন্ধান

বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশনসের রুনাকো সেলিনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে নির্বাচিত অংশ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের সবচেয়ে চাকচিক্যপূর্ণ এলাকায় একটি যৌন ব্যবসা এবং অসহায় নারীদের শোষণ–নির্যাতনের মূল হোতাকে চিহ্নিত করেছে বিবিসির অনুসন্ধানী দল।

চার্লস মোসিগা নামের ওই ব্যক্তি পরিচয়-গোপনকারী বিবিসি প্রতিবেদককে বলেন, এক সেক্স পার্টির জন্য তিনি ন্যূনতম এক হাজার ডলার দরে নারী সরবরাহ করতে পারবেন। তাঁরা অনেকেই গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে ‘প্রায় সবকিছুই’ করতে পারবে। মোসিগা লন্ডন শহরের সবেক একজন বাসচালক হিসেবে নিজের পরিচয় দেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উন্মত্ত ‘সেক্স পার্টি’ নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা কথা চালু আছে। টিকটকে এ-সংক্রান্ত একটি হ্যাশট্যাগ ৪৫ কোটি বারেরও বেশি দেখা হয়েছে। এটা ধরে অনেক ব্যঙ্গাত্মক ও জল্পনামূলক তথাকথিত অনুসন্ধানী কনটেন্ট ছড়িয়েছে। সেগুলোতে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে অর্থলোভী কিছু নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সারের ভূমিকা নেন এবং তাঁরা গোপনে মানুষের যথেচ্ছ যৌন চাহিদা মিটিয়ে বিলাসী জীবনযাপনের খরচ জোগান।

বিবিসির অনুসন্ধানী দলকে বলা হয়েছে, বাস্তবতা আরও ভয়াবহ।

উগান্ডার কয়েকজন তরুণী বিবিসিকে বলেছেন, তাঁরা কখনো ভাবেননি, মোসিগার অধীনে তাঁদের যৌনকর্ম করতে হবে। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, তাঁরা সুপার মার্কেট বা হোটেলের মতো কোনো জায়গায় কাজ করার জন্য আরব আমিরাতে যাচ্ছেন।

‘মিয়া’ (ছদ্মনাম) বলেন, মোসিগার আনা গ্রাহকদের অন্তত একজন নিয়মিত মেয়েদের গায়ে মলত্যাগ করতে চান। তিনি বলেন, মোসিগার চক্র তাঁকে ফাঁদে ফেলে এ কাজে জড়িয়েছে।

মোসিগা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি শুধু বাড়িওয়ালাদের মাধ্যমে নারীদের বাসা পেতে সহায়তা করেন। আর তাঁরা মোসিগার সঙ্গে বিভিন্ন পার্টিতে যান, কারণ তাঁর সঙ্গে দুবাইয়ের অনেক ধনাঢ্য মানুষের যোগাযোগ আছে।

অনুসন্ধানে বিবিসি আরও জানতে পেরেছে, মোসিগার সঙ্গে যোগসূত্র থাকা দুই নারী দুবাইয়ের সুউচ্চ ভবন থেকে পড়ে মারা গেছেন। যদিও তাঁদের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের স্বজন ও বন্ধুরা মনে করেন, পুলিশের আরও তদন্ত করা উচিত ছিল।

মোসিগা বলেন, ঘটনা দুটি দুবাই পুলিশ তদন্ত করেছে। এ–সংক্রান্ত তথ্যের জন্য তিনি বিবিসিকে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু পুলিশ বিবিসির অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

মারা যাওয়া দুই নারীর একজন মোনিক কারুঙ্গি। তিনি পশ্চিম উগান্ডা থেকে দুবাইয়ে আসেন। মোসিগার জন্য কাজ করা আরও অনেক মেয়ের সঙ্গে একটি ফ্ল্যাটে মোনিকের ঠাঁই হয়।

একজন নারী বলেন, তিনি ২০২২ সালে মোনিকের সঙ্গে ওই ফ্ল্যাটে থেকেছেন। বিবিসি এই নারীর নাম দিয়েছে কেইরা।

কেইরা বলেন, ‘(মোসিগার) ওই ফ্ল্যাটটি ছিল বাজারের মতো। সেখানে প্রায় ৫০টি মেয়ে একসঙ্গে থাকত। সে (মোনিক) খুশি ছিল না। কারণ, সে যা চেয়েছিল, তা পায়নি।’

মোনিকের বোন রিতা বলেন, একটি সুপার মার্কেটে কাজ করবেন ভেবে তাঁর বোন দুবাই গিয়েছিলেন।

মোনিকের সঙ্গে মিয়ারও পরিচয় ছিল। বিবিসিকে মিয়া বলেন, ‘আমি বাড়ি ফিরেতে চাইলে তিনি (মোসিগা) সহিংস হয়ে ওঠেন। তিনি জানান, দুবাই আসার পর মোসিগা তাঁকে বলেছিলেন—তিনি ইতিমধ্যে মিয়ার কাছে ২ হাজার ৭১১ ডলার পান। ঠিক সময়ে পরিশোধ না করলে দুই সপ্তাহের মধ্যে এটা দ্বিগুণ হবে।

মিয়া বলেন, ‘বিমান টিকিট, ভিসা খরচ, বাসা ভাড়া, খাবার খরচ মেটাতে তোমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। পুরুষদের কাছে অনুনয় করতে হবে, যাতে তারা কাছে আসে ও শয্যাসঙ্গী হয়।’

মাইকেল (ছদ্মনাম) নামে মোনিকের এক আত্মীয় বিবিসিকে বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মোসিগার কাছে মোনিকের প্রায় ২৭ হাজার ডলার ঋণ জমে গিয়েছিল। মোনিকে প্রায়ই মাইকেলকে কাঁদতে কাঁদতে ভয়েস নোট পাঠিয়ে এ কথাগুলো বলত।

মিয়া বলেন, তাঁদের গ্রাহকদের বেশির ভাগই ছিলেন ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ মানুষ। এদের অনেকের চরম বিকৃত যৌন চাহিদা ছিল। নিচু গলায় তিনি বলেন, একজন গ্রাহক মেয়েদের ওপর মলত্যাগ করে সেটা খেতে বলতেন।

লেক্সি নামের (ছদ্মনাম) আরেক নারী বলেন, অন্য একটি চক্রের ফাঁদে পড়ে তিনি এই কাজে জড়িয়েছেন। তিনিও বলেন, গ্রাহকেরা প্রায়ই এমনটা করতে চাইতেন। একজন গ্রাহকের অমানুষিক ঘৃণাপূর্ণ বিকৃত চাহিদা বর্ণনা করেন তিনি। বলেন, এমন অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর বিশ্বাস জন্মেছে যে, এসব চরম বিকৃত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে জাতিবিদ্বেষ বা বর্ণবিদ্বেষের ব্যাপার থাকতে পারে।

লেক্সি বলেন, ‘প্রতিবার যখন আমি বলতাম, এগুলো করতে চাই না, তাঁরা আরও মজা পেত। তাঁরা এমন কাউকে চাইত, যে কিনা কাঁদবে, চিৎকার করবে ও পালাতে চাইবে। এমন কেউ, যে হবে কৃষ্ণাঙ্গ।’

লেক্সি বলেন, তিনি পুলিশের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে বলেছিল, ‘তোমরা আফ্রিকানরা একে অপরের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছ। আমরা এতে জড়াতে চাই না। তারপর তাঁরা ফোন কেটে দেয়।

দুবাই পুলিশের কাছে বিবিসি এই অভিযোগ তুলে ধরলেও তারা কোনো উত্তর দেয়নি।

পরবর্তী সময়ে অবশ্য লেক্সি উগান্ডায় ফিরতে সক্ষম হন। বর্তমানে তিনি এ ধরনের চক্রের ফাঁদে পড়া নারীদের উদ্ধার ও সহায়তায় কাজ করছেন।

চার্লস মোসিগাকে খুঁজে পাওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। বিবিসির অনুসন্ধানকারী দলটি শুধু অনলাইনে তাঁর একটি ছবি পেয়েছিল। সেটিও ছিল পেছন থেকে তোলা, তা ছাড়া, নানা নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন মোসিগা।

উন্মুক্ত উৎস থেকে নেওয়া তথ্য, ছদ্মবেশে অনুসন্ধান এবং মোসিগা চক্রের এক সাবেক সদস্যের দেওয়া তথ্য—সব মিলিয়ে অনুসন্ধানকারী দল তাঁকে দুবাইয়ের মধ্যবিত্ত এলাকা জুমেইরাহতে খুঁজে পায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, মোসিগার ব্যবসা মূলত অবমাননাকর যৌনকর্মের জন্য নারীদের সরবরাহ করা। বিষয়টি যাচাই করতে অনুসন্ধানী দল একজন ছদ্মবেশী প্রতিবেদককে পাঠায়। তিনি নিজেকে একজন অনুষ্ঠান আয়োজক হিসেবে পরিচয় দেন, যিনি বিলাসবহুল পার্টিগুলোর জন্য নারী খুঁজছেন।

অনুসন্ধানকারী দল যখন মোসিগার সঙ্গে তাঁর ব্যবসার বিষয়ে কথা বলছিল, তখন তাঁকে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছিল।

মোসিগা বলেন, ‘আমাদের কাছে ২৫ জনের মতো মেয়ে আছে। এদের অনেকেই মুক্তমনা…তারা প্রায় সবকিছুই করতে পারে।’

খরচের ব্যাপারে মোসিগা বলেন, রাতপ্রতি একেকজনের জন্য এক হাজার ডলার থেকে শুরু। তবে অস্বাভাবিক কাজের জন্য বেশি অর্থ দিতে হবে। তিনি বিবিসির রিপোর্টারকে একটা নমুনা রাতের দাওয়াত দেন।

মোসিগা বলেন, এই ব্যবসা তাঁর অতি প্রিয়। লটারিতে ১০ লাখ পাউন্ড জিতলেও তিনি এ ব্যবসা চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, ‘এটি এখন আমারই একটি অংশ হয়ে গেছে।’

ট্রয় নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি মোসিগার চক্রের অপারেশনস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। চক্রটি কীভাবে পরিচালিত হয় সে বিষয়ে তিনি বিবিসির অনুসন্ধানী দলকে তথ্য দেন।

ট্রয় বলেন, মোসিগা বিভিন্ন নৈশক্লাবের নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা দেন, যাতে তাঁর পাঠানো নারীরা ভেতরে ঢুকে গ্রাহক খুঁজতে পারে।

ট্রয়ের দাবি, মোসিগা এত দিন এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে পেরেছেন কারণ, তিনি আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রে কখনো নিজের নাম ব্যবহার করতেন না। গাড়িচালক, গাড়ি ও বাড়ি ভাড়াসহ সব কাজে ট্রয় এবং তাঁর মতো অন্যদের নাম ব্যবহার করা হতো।

২০২২ সালের ২৭ এপ্রিলে দুবাইয়ে প্রবাসীদের মধ্যে জনপ্রিয় আবাসিক এলাকা আল বারশায় একটি সেলফি তুলে পোস্ট করেছিলেন মোনিক। এর চারদিন পরই তিনি মারা যান। দুবাইয়ে আসার চার মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মিয়ার বলছেন, মোনিক যত দিন ছিলেন, মোসিগার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত ঝগড়া হতে দেখেছেন। মোনিক মোসিগার চাহিদা পূরণ করতে অস্বীকার করছিলেন এবং চক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজে পেয়েছিল।

মিয়া বলেন, মোনিক একটি চাকরি পেয়েছিলেন। তিনি উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ভেবেছিলেন, অবশেষে ঘৃণ্য জীবন থেকে মুক্তি পাবেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।

মোসিগার ভাড়া করা ফ্ল্যাট ছেড়ে প্রায় ১০ মিনিট হাঁটা দূরত্বে অন্য একটি ফ্ল্যাটে চলে যান মোনিক। ২০২২ সালের ১ মে ওই বাসার বারান্দা থেকে তিনি নিচে পড়ে যান।

মোনিকের আত্মীয় মাইকেল তখন দুবাইতে ছিলেন। তিনি বলেন, মোনিকের মৃত্যুর কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। পুলিশ তাঁকে বলেছিল, তারা তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ, মোনিকের বাসা থেকে মাদক ও অ্যালকোহল পাওয়া গেছে। বারান্দায় শুধু মোনিকের আঙুলের ছাপ ছিল।

মাইকেল হাসপাতাল থেকে মোনিকের মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু এতে উল্লেখ ছিল না, তিনি কীভাবে মারা গেছেন।

মোনিকের পরিবারের জন্য এখন শোকের সঙ্গে ভয় মিলেমিশে গেছে। ভয় অন্য পরিবারগুলোর জন্য, যারা একই ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বিবিসি চার্লস অ্যাবি মোসিগার কাছে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি অবৈধ যৌন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এগুলো সব মিথ্যা।’

এদিকে মোনিকের পরিবার তাঁর লাশ পায়নি। বিবিসির অনুসন্ধান বলছে, তাঁকে দুবাইয়ে আলকুসাইস কবরস্থানের ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ অংশে দাফন করা হয়েছে। -বিবিসি

চার্লস মোসিগা
চার্লস মোসিগা। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

Thursday, September 11, 2025

নাবালক শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষিকার যৌন সম্পর্ক, গ্রেপ্তার

মানবজমিনঃ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ওয়েস্ট ভ্যালির একটি বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষিকা এক নাবালক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এ অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই স্কুলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যত্ন নেয়া হয়। অনলাইন ফক্স ১০ ফনিক্স এ খবর দিয়েছে। এতে আদালতের নথি উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২৪ বছর বয়সী শিক্ষিকা শার্লট হিউজবির বিরুদ্ধে নাবালক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর তদন্ত শুরু হয় ২৮ আগস্ট। ওইদিন অস্টিন সেন্টারস ফর এক্সেপশনাল স্টুডেন্টস (এসিইএস) পিওরিয়া ক্যাম্পাসে ডাকা হয় পুলিশকে। সেখানকার সুপারিনটেনডেন্ট ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী ও হিউজবির মধ্যে ‘অশোভন টেক্সট মেসেজ’ খুঁজে পান। হিউজবি ওই স্কুলে থেরাপিউটিক সাপোর্ট স্টাফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কোর্ট ডকুমেন্টে বলা হয়, এক শিক্ষার্থী কাউন্সেলিং সেশনে জানায় যে ভুক্তভোগী জানিয়েছে, তার সঙ্গে এক শিক্ষিকার যৌন সম্পর্ক রয়েছে।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে একটি ভিডিওও উদ্ধার করা হয়। তাতে তাকে হিউজবির সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াতে দেখা যায়। আরেকজন শিক্ষার্থী জানায়, একটি সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ চ্যাটে ওই ভিডিও শেয়ার করা হয়। এরপরই হিউজবিকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়। ভুক্তভোগীর বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, তার সন্তানের সঙ্গে ‘অ্যাঞ্জি’ নামে ১৮ বছর বয়সী এক মেয়ের সম্পর্কে রয়েছে। কিন্তু পরে জানতে পারেন, ‘অ্যাঞ্জি’ আসলে হিউজবি। শিক্ষার্থীর পিতা আরও জানান, ২০২৪ সাল থেকে তার সন্তান প্রায় সপ্তাহান্তেই হিউজবির সঙ্গে থেকেছে এবং ২০২৫ সালের গ্রীষ্মকালীন ছুটির বেশিরভাগ সময়ও হিউজবির সঙ্গে কাটিয়েছে। তিনি কখনও জানতেন না যে হিউজবি আসলে ২৪ বছর বয়সী এবং তার সন্তানের স্কুলের কর্মী, একজন শিক্ষিকা। ভুক্তভোগী ফরেনসিক সাক্ষাৎকারে পুলিশের কাছে জানায়, স্কুলে পরিচয়ের কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই তাদের সম্পর্ক শুরু হয় এবং নিয়মিত যৌন সম্পর্ক ছিল। এক পর্যায়ে হিউজবি একটি হোটেল রুম ভাড়া নিয়ে তাকে সেখানে ডাকেন, তাদের সম্পর্ক ভিডিওতে ধারণ করেন এবং এমনকি বলেন- সে যেন তাকে মা হতে বা সন্তান জন্মদানে সহায়তা করে।

৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ হিউজবির সঙ্গে কথা বলে এবং তিনি ভুক্তভোগীর সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ বার যৌন সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। এরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নথি অনুযায়ী, হিউজবি ছয় বছর ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে আগে কখনও কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এক বিবৃতিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ২৮শে আগস্ট আমরা একজন কর্মী ও এক শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুলের বাইরে ও সময়ের বাইরে সম্ভাব্য অসদাচরণের খবর পাই। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাই, ওই নারী কর্মী বা শিক্ষিকার চাকরি স্থগিত করি এবং পূর্ণ তদন্ত শুরু করি। ২৯শে আগস্ট চাকরি থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ৩রা সেপ্টেম্বর আমরা জানতে পারি, পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়েছে। গত ৩০ বছর ধরে যেমন করে আসছি, ভবিষ্যতেও আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।

https://mzamin.com/uploads/news/main/178930_Abul-7.webp

Wednesday, June 11, 2025

শিক্ষিকার যৌনতার ক্ষুধা, অতঃপর...

আরও এক বিকৃত রুচির শিক্ষিকার সন্ধান মিলেছে। তিনি শারীরিক ক্ষুধা মেটাতে তারই এক ছাত্রকে শিকারে পরিণত করেছেন। এ ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও রাজ্যের হ্যামিলটন কাউন্টিতে অবস্থিত সেন্ট জাভিয়ার হাই স্কুলে। আজ মঙ্গলবার এ মামলায় রায় দেয়ার কথা বিচারকের। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিনসিনাতি। অভিযোগ উঠেছে, ওই শিক্ষিকা আরও শিক্ষার্থীকে যৌনতায় উদ্দীপ্ত করেছেন।

২০২৪ সালের অক্টোবরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ওই স্কুলের লার্নিং সেন্টারের প্রধান এমিলি নাটলি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এমিলির বয়স ৪২ বছর। তিনি বিবাহিত। সন্তান আছে। এমিলি নাটলি ওই স্কুলের একটি প্রোগ্রামের সমন্বয়ক। এই প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সম্পর্কে শিক্ষাদানে সহায়তা করে। ওই স্কুলের স্টাফরা এ বিষয়টি সব ক্যাথোলিক হাইস্কুলের প্রিন্সিপালের কাছে এমিলি সম্পর্কে রিপোর্ট করেন। এসব কথা বলা হয়েছে আদালতে দাখিল করা ডকুমেন্টে। এতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৭ই অক্টোবর ওই বালকের মা শিক্ষার্থী বিষয়ক ডিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, যা ঘটেছে সে সম্পর্কে পিতামাতার কাছে সব বলেছে তার টিনেজ ছেলে। পরের দিন ছিল সোমবার। এদিন ওই টিনেজ বালক স্কুল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বলেন, এমিলি নাটলি অবাহতভাবে তাকে টেক্সট ম্যাসেজ পাঠাতেন। নিজের নগ্ন ছবি পাঠাতেন। কমপক্ষে চারবার তাদের মধ্যে সরাসরি শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। ওই সময় এই টিনেজারের বয়স ছিল ১৭ বছর। ২০২৩ সালের শেষের দিকে প্রথম তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়। এক পর্যায়ে এমিলি নাটলির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় ওই শিক্ষার্থী। কিন্তু এ কথা শুনে এমিলি আত্মহত্যা করার হুমকি দেন। বালকটি যাতে মুখ বন্ধ করে রাখে এ জন্য তাকে অর্থ দিতেন এমিলি নাটলি। আভ্যন্তরীণ তদন্তের পর ২০২৪ সালের ১১ই অক্টোবর স্কুল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে যে, এমিলিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর তিন সপ্তাহ পরে বেশ কিছু অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। এ বছর এপ্রিলে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ স্বীকার করেন তিনি। আজ ১০ই জুন এমিলি নাটলিকে জেলে পাঠানো হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার কথা হ্যামিলটন কাউন্টি কমন প্লিয়াস বিচারক জেনিফার ব্রাঞ্চ। ওহাইওর আইন অনুযায়ী এমিলি নাটলির ১০ বছরের জেল হতে পারে। তবে সেখানে জেল একেবারে বাধ্যতামূলক নয়।

ওদিকে ৯ই জুন প্রসিকিউটররা স্থানীয় বেশ কিছু মামলার রায়ের বিষয় আদালতের কাছে তুলে ধরেছেন। তাতে স্কুলে নিয়োজিত ব্যক্তিদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের অভিযোগে জেলে পাঠানোর নজির তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ক্যালিরিয়ান হাই স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষিকা জুলি হাটজেরোয়েডারকে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগে দুই বছরের জেল দেয়া হয়। ২০১৪ সালে ডাটের হাউ স্কুলের একজন স্পেশাল শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক মাউকেল জনসনকে তিন বছরের জেল দেয়া হয়। বাটলার কাউন্টিতে অবস্থিত নিউ মিয়ামি হাই স্কুলের একজন শিক্ষক জাস্টিন ম্যাডেনকে ২০১৫ সালে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং অন্য একজনকে রগরগে ম্যাসেজ দেয়ার অভিযোগে তিন বছরের জেল দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে এমিলি নাটলি মাত্র ১৭ বছর বয়সী একটি ছাত্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এবং অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। এসব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাকে জেল দেয়ার আবেদন করা হয়েছে। তার শিকার শিক্ষার্থী, তার পিতামাতা এবং সেন্ট জাভিয়ার হাই স্কুলের কর্মকর্তারা চান এমিলি নাটলিকে ১০ বছরের জেল দেয়া হোক।

mzamin