Tuesday, June 9, 2015

মোদির সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার বৈঠক নিয়ে ক্রমশ কৌতূহল বাড়ছে

১৫ মিনিটের একান্ত বৈঠক। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার। কৌতূহল ক্রমশই বাড়ছে। বিএনপি নেতারাও রয়েছেন অন্ধকারে। খালেদা জিয়া এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কোন কথা বলেননি। তবে তারা বলছেন, বিএনপি নেত্রীকে বৈঠকের পর বেশ উৎফুল্ল দেখা গেছে।
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক নিয়ে চাপানউতোর কম হয়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার দেখা হওয়ার সুযোগ নেই। যদিও একই দিনে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্কর পরিষ্কার করেন, বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে মোদির বৈঠক হবে। অবশ্য সাউথ ব্লকে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বৈঠকের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
নরেন্দ্র মোদি তার দুই দিনের সফরে কোন বক্তব্যে গণতন্ত্রের কথা বলেননি। তবে বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে গণতন্ত্রের কথা উঠেছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত। এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির মনোভাব পরে পরিষ্কার করেন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, ভারত গণতন্ত্রের পক্ষে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতের আধিপত্য ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। একসময়কার ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এখন রেস থেকে পুরোপুরিই ছিটকে পড়েছে। এক্ষেত্রে এখন ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করা হচ্ছে চীনকে, বিশেষ করে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে। যদিও চীন ও ভারতের মধ্যেও ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরালো হচ্ছে। তবে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার খবরে মোদির বাংলাদেশ সফরকে নেতিবাচকভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এ সফরকে স্বাগতই জানিয়েছে। যদিও দেশটির পক্ষ থেকে এটাও পরিষ্কার করা হয়েছে, ভারতের চোখে নয়, নিজস্ব চোখেই বাংলাদেশকে দেখে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।
ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণেও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। অতীতে বিএনপিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যদিও পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রতি ভারতের সমর্থন ছিল। তবে পরে ওই অবস্থান পুরোপুরি উল্টে যায়। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারই ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য সমর্থক ছিল। বিএনপির একটি অংশের আশা ছিল, নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ ব্যাপারে নাটকীয় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তেমন পরিবর্তন না আসায় তাদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। তবে তারপরও এখনকার বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বিএনপির এক ধরনের যোগাযোগ রয়েছে। যদিও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর অবস্থান এখনও দিল্লির কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। দৃশ্যত ভারত সরকারের ইচ্ছা পূরণে বাংলাদেশের সবপক্ষই এখন প্রস্তুত রয়েছে। এ অবস্থায় নরেন্দ্র মোদি চলে যাওয়ার পরও তার সফর নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কোন ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়নি।
নরেন্দ্র মোদির সফরে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কোন বার্তা ছিল কিনা অথবা খালেদা জিয়াকে মোদি আসলে কী বলেছেন তা আগামী কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হওয়া শুরু করবে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

রোহিঙ্গা ও বর্মি বৌদ্ধ মৌলবাদ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

সাগরে ভাসা ভাগ্যহত রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা নারী
আমি, আমার এই লেখাটি যিনি কম্পিউটারে লিখেছেন তিনি, যিনি সম্পাদনা করেছেন তিনি, এর কোনো একজন পাঠক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন বন্ধু—আমাদের থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যাওয়ার শখ। ওই দুই দেশের ভিসা শুধু নয়, বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছাড়াই রওনা দিই। কক্সবাজার ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত সাম্পানে যাত্রা শুরু করি। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উপকূলের কথা বাদই দিই। বাংলাদেশের উপকূল থেকে বিনা বাধায় যেতে পারব কি না? আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা বা বাধা দেওয়ার কেউ ডাঙায় ও বঙ্গোপসাগরের পানিতে আছেন কি না?
অথবা এর বিপরীতটি। যে ঘাট থেকে নৌকা যায়, সে ঘাটে নৌকা আসেও। অন্য কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশের জনগণের কোনো বন্ধু ১০টি নৌকাবোঝাই অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গ্রেনেড নিয়ে আমাদের পানিসীমায় প্রবেশ করলেন। এবং নির্বিঘ্নে ফাইভ-ফিফটি-ফাইভ সিগারেট বলে অমূল্য মালামাল খালাস করলেন। তখন কক্সবাজার কর্তৃপক্ষের ভূমিকাটা কী হবে?
এসব হলো কথার কথা বা অনুমানের কথা। শতভাগ বাস্তবতা হলো, আমাদের ঘাট থেকে প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ তাদের জন্মভূমিকে হাত নেড়ে টা টা বলে কোনো এক অজানা গন্তব্যে রওনা দিচ্ছে। রাষ্ট্রের বেতন–ভাতা পাওয়া কর্মচারীদের কেউই তাঁদের ছায়াটাও দেখলেন না। এর অর্থ হলো, আমাদের সমুদ্রসীমানা অতি সুরক্ষিত। আমাদের দুটো পেট্রোলবোটও নেই।
সমুদ্রতীরবর্তী জেলা কর্তৃপক্ষ বলবে, সমুদ্রজয়ের পরে আমরা যে ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ’ পেয়েছি, ওসব দেখাশোনার দায়িত্ব সেখানকার কর্তৃপক্ষের। কিন্তু সেখানে উত্তাল ঢেউ বলে এখনো কোনো পোস্টিং হয়নি। সেখানে যা হচ্ছে তা হলো বিদেশি কোম্পানিকে গ্যাসক্ষেত্র ইজারা দেওয়ার কাজ। সুতরাং দ্বিতীয় বাংলাদেশে কে কী করে বা কে কোথায় যায়-আসে, তা দেখার দায়িত্ব জেলা কর্তৃপক্ষের বা দেশের অন্য কারও নয়।
সত্য ও বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের চোখে ছানি পড়লেও সে ঝাপসা দেখতে পেত। রাষ্ট্র অন্ধ হয়ে গেছে, তার দুই চোখ কানা।
মধ্য বঙ্গোপসাগরে বা আন্দামান সাগরে যা ঘটছে তা কোনো ছেলেখেলা নয়। ছোট ব্যাপার নয়। বিরাট ব্যাপার। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের ব্যাপার। তাই এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের চোখে ঘুম নেই। বিভিন্ন বিশ্ব সংস্থার কর্মকর্তারা ফাইল বগলে নিয়ে ছোটাছুটি করছেন।
বাংলাদেশ বহুদিন আগে একবার বিশ্বগণমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছিল ১৯৭১ সালে, আর একবার এখন ২০১৫-র রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তীর মাসে। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার কথা বিশ্বগণমাধ্যমে যতটা না প্রচার পেয়েছে তার চেয়ে বেশি বিশ্ববাসীর মনোযোগ ছিল যে লাখ লাখ উদ্বাস্তু বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে, তাদের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি। বৈধ বা অবৈধ অভিবাসী বা উদ্বাস্তুদের বেদনা বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। দেশ-বিদেশের নেতাদের বিচলিত না করলেও।
বর্তমানে সাগরের মৌসুমি উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে নৌকায় যে ট্র্যাজেডি, তার জন্য বাংলাদেশ সরকার একা দায়ী নয়। তা যে নয়, সে কথা আন্তর্জাতিক মহল জানে। বাংলাদেশের দুই নিকটতম প্রতিবেশীর একটি মিয়ানমার। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে মিয়ানমারের মানুষের সম্পর্ক হাজার হাজার বছরের। সে সম্পর্ক অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক। সে দেশের মানুষ বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেছেন, চাকরিবাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যও করেছেন। ব্রিটিশ আমলে বাঙালিরাও সেখানে গিয়ে চাকরিবাকরি করেছেন। অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রেঙ্গুনে অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের অফিসে কেরানি ছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে সেখানকার জেলে নিয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। গান্ধীজি বাঙালিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে রেঙ্গুন গেছেন। আমি পুরোনো কাগজপত্রে দেখেছি, ১৯৪৭-এর আগস্টে যখন পাকিস্তান স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন আরাকান পূর্ব পাকিস্তানে আসবে কি না, তা নিয়ে কথাবার্তা ও আন্দোলন হয়েছিল। বিখ্যাত নেত্রী সু চির বাবা তখনকার খ্যাতনামা নেতা অং সানের সঙ্গে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা হয়। সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি আজও কোনো ইতিহাসের বইতে স্থান পায়নি।
দীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসনে মিয়ানমারের মানুষ নিষ্পেষিত। পৃথিবীতে তার প্রধান বন্ধু চীন। বাংলাদেশও মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী। গণতন্ত্রপন্থী সু চি বহুদিন সামরিক শাসকদের দ্বারা গৃহবন্দী ছিলেন। তাঁর প্রতি পশ্চিমাদের অনুকম্পার সৃষ্টি হয়। তাঁর যতটা না প্রচার প্রাপ্য, তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম তাঁকে মাথায় তুলেছে। তাঁকে তারা তদবির করে ‘শান্তিতে নোবেল পুরস্কার’ পাইয়ে দেয়। ‘শান্তিতে’ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কতটা যোগ্য তিনি তা নিয়ে সুইডিশ একাডেমির কোনো সন্দেহ না থাকলেও তাঁর প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের গভীর সন্দেহ রয়েছে। তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য গণতন্ত্রের বুলি আওড়ান। রোহিঙ্গা ইস্যুর পরে সুইডিশ একাডেমি ভেবে দেখবে, তাদের নির্বাচন কতটা উপযুক্ত ছিল। তাঁর মধ্যে গণতন্ত্রের চেতনা হয়তো প্রবল, কিন্তু মানবতাবাদী চেতনা কতটা, সে পরিচয় আমরা পাইনি।
‘মিয়ানমার’ নাম ধারণের আগে এর নাম ছিল বার্মা, ছোটবেলায় আমরা বলতাম ব্রহ্মদেশ। আশির দশকেও এর সরকারি নাম ছিল ‘সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অব দ্য ইউনিয়ন অব বার্মা’। অতি গালভরা নাম। চীনের পাশে বলে ‘সোশ্যালিস্ট’ কথাটা যোগ করা হয়ে থাকবে। মার্ক্সবাদী দর্শনের লেশমাত্র সে দেশে ছিল না। যা হোক, আমেরিকা-ইউরোপের চাপে সামরিক জান্তা এখন গণতন্ত্রে উত্তরণের আয়োজন করেছে। সামনে নির্বাচন। শান্তিবাদী(!) সু চির চোখ সেদিকে। কে কোথায় অত্যাচারিত হলো, মরল বা বাঁচল অথবা নির্যাতিত হয়ে দেশ ত্যাগ করল, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর অবকাশ কোথায় তাঁর।
নৃতাত্ত্বিকভাবে মিয়ানমারের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ তিব্বতীয় বর্মি, কারেন ও শান বংশোদ্ভূত বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান আছে ১০-১৫ শতাংশ। মুসলমানদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। তারা হাজার বছর ধরে বাস করে আরাকান প্রদেশে। আরাকানের সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে। সরকারি ভাষা বার্মিজ, রোহিঙ্গারা বাংলায় কথা বলেন। এককালে, মধ্যযুগে আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা হয়েছে। মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ আলাওল (১৬০৭-১৬৮০) আরাকান রাজদরবারের কবি ছিলেন। তাঁর অমর কীর্তি পদ্মাবতী, সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল, সিকান্দারনামা প্রভৃতি আরাকান রাজদরবারেই রচিত। আরাকান রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় দৌলত কাজী রচনা করেন সতী ময়না ও লোর চন্দ্রাণী।
পৃথিবীর কোনো আধুনিক রাষ্ট্রই একটিমাত্র ভাষাভাষী ও একটিমাত্র ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে গঠিত নয়। প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই বহুজাতিক ও বহু ধর্মাবলম্বী মানুষের। কয়েক দশক যাবৎ মিয়ানমারে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে। যাকে পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন বৌদ্ধ মৌলবাদ, যা কিছুকাল যাবৎ ফ্যাসিবাদী রূপ নিয়েছে। তার প্রধান শিকার আরাকানি রোহিঙ্গারা। তাদের অপরাধ দুটি, এক. তারা বাংলায় কথা বলে, দুই. তারা মুসলমান—বৌদ্ধ নয়। অথচ মহামতি বুদ্ধ ছিলেন শান্তি ও করুণার অবতার।
পশ্চিমারা এখন বলছেন রোহিঙ্গাস আর ওয়ান অব দ্য মোস্ট পারসেকিউটেড গ্রুপস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড—রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীর একটি। সে জন্যই ভাগ্যক্রমে উপকূলে পৌঁছে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে রোহিঙ্গা এক নারী বলেছেন: সমুদ্রের মধ্যে নৌকায় মরতে গেছিলাম, সেই বিপৎসংকুল সমুদ্র কি আমাদের দেশটার চেয়ে খারাপ? প্রথম আলোর প্রতিনিধি টিপু সুলতানের কাছে থাইল্যান্ডের এক ক্যাম্পে এক আরাকানি রোহিঙ্গা নারী বলেছেন: ‘আঁরার দেশইত তো কোনো জোয়ান পোলা নাই। সবটি তো পালাইয়ে। আরাকানে অবিবাহিয়্যা মাইয়্যা পোলার অনেক বিপদ।’ অবিবাহিত বা বিবাহিত নয়, কোনো রোহিঙ্গা মুসলমান যুবতীই নিরাপদ নয়, তাদের ‘অনেক বিপদ’। অর্থাৎ তারা দিনদুপুরে যেখানে-সেখানে ধর্ষণের শিকার হতে পারে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী শান্তিবাদী সু চির তাতে করুণার উদ্রেক করে না। তিনি দিল্লি সফরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বলেছেন। এখনো তিনি নীরব। তিনি বৌদ্ধ মৌলবাদী। তাঁর দরকার ভোট—তাতে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের বর্বরতাকে সমর্থন দিতে হয়, তাতেও তাঁর দ্বিধা নেই।
আজকে বঙ্গোপসাগরে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী ও রোহিঙ্গাদের যে ট্র্যাজেডি, তার মূলে মিয়ানমার সরকারের মুসলিমবিরোধী ফ্যাসিবাদী নীতি। সারা পৃথিবীর মানুষ এখন তা জেনে গেছে এবং মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে ধিক্কার জানাচ্ছে। তারা মেরে-কেটে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে বাধ্য করেছে। এখানে এসে তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ও সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বেঁচে থাকার জন্য তারা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটছে।
তাহলে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা দালাল ও মানব পাচারকারীদের প্ররোচনায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে কেন? অভাব ও বেকারত্ব। তাদের কাজ নেই, পেটে ক্ষুধা। বাড়িতেও না খেয়ে মরবে, সমুদ্রে গিয়ে মরছে। তৃতীয় বিশ্বের সব দেশেই স্থায়ী চাকরিজীবীর সংখ্যা মাত্র এক-চতুর্থাংশ। চার ভাগের তিন ভাগই হয় বেকার অথবা অস্থায়ী শ্রমিক। ভাসমান মানুষেরাই জীবিকার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে যেতে চায়।
টিভির পর্দা থেকে ধ্বনিত হচ্ছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিন্দুক ভরে গেছে বৈদেশিক মুদ্রায়। ২২ বিলিয়ন ডলার বিদেশ থেকে এসেছে। তথ্য অসত্য নয়। কৃষক ও সরকারের গোলাঘরভর্তি ধান-চাল। তারপরও লাখ লাখ যুবক দেশত্যাগ করে কেন? সমুদ্রে গিয়ে প্রস্রাব খেয়ে তেষ্টা মেটাতে হয় কেন?
অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের বহু আইন আছে, আইএলও সনদ আছে, অনেক রকম আন্তর্জাতিক আইন আছে। জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধেও আইনকানুন প্রচুর। অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদের প্রশ্নে একযোগে কাজ করতে হয় তিনটি দেশকে: সে যে দেশের নাগরিক, যে দেশ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং যে দেশটি তার গন্তব্য। তাকে নিরাপত্তা দেওয়া তিন দেশেরই দায়িত্ব। অভিবাসী অবৈধ হলেও তাকে আশ্রয় দিতে হবে, না খাইয়ে মারা আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ।
আমরা আর দেশে দেশে গণকবরে বাংলাদেশিদের কঙ্কাল দেখতে চাই না। অবৈধ শ্রমিক পাচারে, তাদের থেকে মুক্তিপণ বাণিজ্যে, তাদের হত্যা-নির্যাতনে শুধু বাংলাদেশি নয়, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মানুষেরাও জড়িত। বিশ্বজনমত এখন মিয়ানমারের প্রতিকূলে। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারে বাংলাদেশ। কয়েকটি ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক সম্পর্কে সাফল্য দেখেছি। অভিবাসী শ্রমিক বিষয়টি গোঁজামিল দিয়ে সাময়িক সমাধান নয়। সরকারের আশু কর্তব্য, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে এবং দেশ থেকে মানব পাচার রোধে আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য নিয়ে স্থায়ীভাবে মীমাংসা করা। বিদেশগামীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে অমানবিক। মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সমুদ্রে ভাসমান বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা জরুরি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

ভারতের গণমাধ্যমে মোদির বাংলাদেশ সফরের নানা দিক

বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক সফরের নানা দিক নিয়ে শিরোনাম করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম। এসব শিরোনামে বিশেষভাবে স্থল সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময়, বাস যোগাযোগ উদ্বোধন, তিস্তা সমস্যা সমাধানে মোদির আশাব্যঞ্জক বক্তব্যসহ দু’দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো উঠে আসে। আনন্দবাজার তাদের শিরোনাম করে, ‘পদ্মা পাড়ে তিস্তার বার্তা, ছিটমহলের পথ ধরে সমাধান খুঁজছেন মোদি।’ এ প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশের ঘড়িতে তখন বিকাল চারটে কুড়ি। ঘড়ির সময় যা-ই বলুক, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে এ সময়টা এক নতুন সূর্যোদয়ের মুহূর্ত। অবশেষে বাস্তবায়িত হল স্থল সীমান্ত চুক্তি। দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে ফেললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এক নতুন দিশা পেলেন ছিটমহলবাসী। শেখ হাসিনার কার্যালয়ের শাপলা হলে এ ঐতিহাসিক মুহূর্তকে নয়া মাত্রা দিয়ে মঞ্চে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর পাশে উপস্থিত থাকলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, শুধু ছিটমহল সমস্যার সমাধান নয়। এদিন আরও একটি দ্বিপাক্ষিক সমস্যা মেটার মঞ্চও প্রস্তুত করে রাখলেন নরেন্দ্র মোদি। এক রকম নিঃশব্দে তিস্তা জলবণ্টনের বিষয়টি উঠে এল। বিবৃতিতে মোদি বলেন, ‘স্থল সীমান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে আমরা রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক সৌভ্রাতৃত্ব দেখিয়েছি। এ ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী যে, রাজ্য সরকারগুলোর সহায়তা নিয়ে তিস্তা এবং ফেনী নদীর জলবণ্টনের সমাধানও করা যাবে।’ পত্রিকাটি সফর নিয়ে আরও অনেক শিরোনাম করেছে। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল- ‘কোন কৌশলে মমতাকে পাশে পেলেন মোদি।’ বাস উদ্বোধন নিয়ে প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়েছে, ‘পাশাপাশি দুই প্রধানমন্ত্রী, সঙ্গে মমতাও।’ ‘স্বাক্ষরিত হল স্থল সীমান্ত চুক্তি।’ ‘মোদির গাড়িতে সওয়ার হয়ে হাসিনার কাছে মমতা।’ ‘অনর্গল কথা, ঢাকায় মমতাই যেন সুষমা।’ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘বিকেলে মোদির সঙ্গে বৈঠক, অথচ মমতার সঙ্গে বাংলায় অনর্গল কথা বলে চলেছেন হাসিনা। শুনছেন আর হাসছেন মোদি। একটি বাঙালি মেয়েকে অনুবাদক হিসেবে দিল্লি থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি কখনও সেই কথাবার্তা হিন্দিতে তর্জমা করে দিচ্ছিলেন। ঘাড় নাড়ছিলেন মোদি। সুষমা স্বরাজ যাননি, ঢাকায় মমতাই যেন বিদেশমন্ত্রী। চুক্তি পর্ব মেটার পরে মমতাকে দেখিয়ে হাসিনাকে বললেন মোদি, ‘৮০ ভাগ কাজ কিন্তু উনিই করে দিয়েছেন!’ জিনিউজ তাদের শিরোনাম করে, ‘আমি বাংলায় টুইট করি’, বাংলাদেশ সফরে বাংলায় টুইট করলেন মোদি-মমতা।’ ‘এই সময়’ পত্রিকা তাদের শিরোনাম করেছে, ‘আবার ইতিহাস ঢাকায়, স্থল সীমান্ত চুক্তি সই, রাজ্য পাশে থাকলে সমাধান হবে তিস্তারও, সফর প্রধানমন্ত্রীর, আলোয় মমতাও।’ প্রতিবেদনটিতে রাজ্যের সমর্থন নিয়ে তিস্তা ও ফেনী নদীর স্থলবণ্টন নিয়ে নিরপেক্ষ সমাধানের আশ্বাস, বাংলাদেশকে ২ বিলিয়ন ঋণ সহায়তা, বাস উদ্বোধন, বিদ্যুৎ সহায়তা, ২২ চুক্তি ও বাণিজ্য চুক্তিসহ নানা বিষয়। পত্রিকাটি আরও শিরোনাম করে, ‘বাসে উঠে দিলখোলা মেজাজে মোদি-মমতা।’ ‘মোদির উপহার।’ ‘ওরা এখন ভারতীয়, খুশির ঢেউ তেরঙায়।’ ‘মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রধানমন্ত্রীর।’ ‘বর্তমান পত্রিকা’ বিভিন্ন দিক নিয়ে শিরোনাম করেছে, ‘ঢাকায় মমতা ও হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পরে মোদির আশ্বাস, রাজ্য চাইলেই তিস্তা চুক্তি।’ ‘মোদি-মমতা বাংলাদেশ সফর নিয়ে কটাক্ষ, বামেদের হাতুড়ির তুলনায় ফুলের আঘাত বেশি, তৃণমূল সুপ্রিমোকে তোপ রাহুলের।’

রাশিয়াকে একঘরে করতে হবে : ওবামা

বিশ্বের শিল্পোন্নত সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর জোট জি-৭ এর শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেনে আগ্রাসন রুখে দিয়ে রাশিয়াকে একঘরে করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। জার্মানির দক্ষিণ বাভারিয়ার বিলাসবহুল এলমাউ ক্যাসল হোটেলে রোববার দু’দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে স্বাগতিক জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজি, কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে অংশ নিয়েছেন।
খবর বিবিসি ও এএফপির। নস্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় ৪১তম জি-৭ সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সম্মেলনের এজেন্ডা সম্পর্কে ওবামা বলেন, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। গত বছর ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়া রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার পদ স্থগিত করে জোটের নাম জি-৭ রাখা হয়েছে। এর আগে জোটটি জি-৮ নামে পরিচিত ছিল। আর এ কারণেই সম্মেলনে উপস্থিত হতে পারেননি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন।
ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে রাশিয়া অব্যাহতভাবে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে কিয়েভকে চাপে রেখেছে বলে পশ্চিমাদের অভিযোগ। সৈন্য পাঠিয়ে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের সাহায্য করছেন পুতিন। তবে রাশিয়া এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মস্কোর ওপর এর মধ্যে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। জি-৭ সম্মেলনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নতুন উপায় ও কৌশল বের করতে চান পশ্চিমা নেতারা। ইইউভুক্ত কোনো দেশ যদি মস্কোর ওপর অবরোধ উঠিয়ে নিতে প্রলুব্ধ হয়, তাকে সাহায্য করার বিষয়ে জার্মানি, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তি চায়।

মুসার সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা by মোর্শেদ নোমান

মুসা বিন শমসের। ফাইল ছবি
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া হিসাব অনুযায়ী মুসা বিন শমসেরের সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। দুদকের সম্পদ বিবরণী নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রোববার আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পদের হিসাব জমা দেন বিতর্কিত এই ব্যবসায়ী। দুদকের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সূত্র জানায়, মুসার জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে তাঁর ১২ বিলিয়ন ডলার জমা রয়েছে, যা বাংলাদেশি টাকায় ৯৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে)। সম্পদ বিবরণীতে তিনি জানিয়েছেন, সুইস ব্যাংকে তাঁর এ পরিমাণ অর্থ ‘ফ্রিজ’ (সাময়িক জব্দ) অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়াও সুইস ব্যাংকের ভল্টে ৯০ মিলিয়ন ডলার দামের (বাংলাদেশি প্রায় সাতশ কোটি টাকা) অলংকার জমা আছে। দেশে তাঁর সম্পদের মধ্যে গুলশান ও বনানীতে দুটো বাড়ি, সাভার ও গাজিপুরে ১২০০ বিঘা জমির কথাও বিবরণীতে তুলে ধরেছেন।
দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মো. সাহাবুদ্দিন আজ প্রথম আলোকে বলেন, মুসা বিন শমসের তাঁর সম্পদ বিবরণীতে যে হিসাব তুলে ধরেছেন তার আয়ের উৎস সঠিক কি না সেটা যাচাই করে দেখবেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। এর মধ্যে মিথ্যা তথ্য রয়েছে কি না সেটাও যাচাই করা হবে।
সম্পদ বিবরণীতে সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের বিষয়ে মুসা জানিয়েছেন, সুইস ব্যাংকে তার ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন অস্ত্র এবং ক্রুড ওয়েল ব্যবসা থেকে। তবে সুইস ব্যাংকে তাঁর যে হিসাবটি রয়েছে সেটি যৌথ অ্যাকাউন্ট বলে তিনি সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন। যৌথ অ্যাকাউন্টকারীদের সঙ্গে ‘ডিড অব এগ্রিমেন্ট’ থাকার কারণে ওই অ্যাকাউন্টে অন্যদের কি পরিমাণ অর্থ রয়েছে এবং ওই অ্যাকাউন্টের অংশীদার কতজন সে বিষয়ে উল্লেখ করা যাবে না বলে দুদককে জানিয়েছেন মুসা। এ কারণে সুইস ব্যাংকে কেবল তাঁর নিজের অংশের তথ্যই দুদকের কাছে জমা দিয়েছেন মুসা বিন শমসের।
দুদকের শীর্ষ পর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা আজ প্রথম আলোকে বলেন, সম্পদ বিবরণীতে সুইস ব্যাংকে জমা থাকা অর্থের বিষয়টি উল্লেখ করায় দুদক নিশ্চিত হতে পেরেছে সুইস ব্যাংকে জমার থাকা অর্থের বিষয়ে। এত দিন দুদকের কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য ছিল না। তাঁরা বলেন, এর আগে সুইস ব্যাংকে তাঁর অর্থের কথা শোনা গেলেও এ পরিমাণ অর্থ তাঁর আদৌ আছে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল। অনেকে এমনও মন্তব্য করেছেন, নিজেকে আলোচনায় রাখতেই মুসার পক্ষ থেকে সুইস ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকার গল্প শোনানো হচ্ছে। সম্পদ বিবরণীতে সুইস ব্যাংকে জব্দকৃত অর্থের বিস্তারিত তথ্য দেওয়ায় এখন সন্দেহ অনেকটা দূর হয়েছে বলে দুদক কর্মকর্তারা মনে করেন।
দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, সম্পদ বিবরণীতে মুসা বিন শমসের সুইস ব্যাংকে ১২ বিলিয়ন ডলারের যে হিসাব দিয়েছেন তা দুদকের কাছে একটি দালিলিক তথ্য। দুদক এখন তা খতিয়ে দেখবে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুদক এখন সুইস ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ অর্থ সম্পর্কে জানতে চাইবে। তাঁরা বলেন, দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে সুইস ব্যাংকের অর্থসহ যেসব সম্পদের হিসাব দিয়েছেন সেগুলোর বিষয়ে কোনো তথ্য গোপন বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলে দুদক আইন ২০০৪ এর ২৬ (২) ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দুদকের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সুইস ব্যাংকের লকারে মুসার ৯০ মিলিয়ন ডলার দামের যে অলংকারের কথা বলেছেন সেগুলো বিভিন্ন সময় কেনা হয়েছে এবং উপহার হিসেবে পাওয়া বলে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি নিজের পরিবারের সদস্যদের কাছে থাকা অলংকারের তথ্যও তুলে ধরেছেন। তবে সেগুলোর দামের বিষয়টি সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি।
সম্পদ বিবরণীতে গাজীপুর ও সাভারে তাঁর নামে প্রায় ১২শ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন মুসা বিন শমসের। তাঁর দাবি, স্বাধীনতাত্তোরকালে ওইসব সম্পত্তি ক্রয় করলেও সেগুলো বর্তমানে তাঁর দখলে নেই। এসব সম্পত্তির বর্তমান বাজার মূল্য (এক বিঘা এক কোটি টাকা হিসেবে) প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকারও বেশি। অধিকাংশ সময় দেশের বাইরে থাকায় এসব সম্পত্তির খাজনা পরিশোধ করে নামজারি করা সম্ভব হয়নি। এখন তিনি জমিগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন বলেও জানিয়েছেন মুসা। এ সব সম্পদের বাইরে ফরিদপুরে মুসার পৈত্রিক বাড়ি রয়েছে। এছাড়া গুলশানে ‘দ্য প্যালেস’ নামে প্রাসাদতুল্য বাড়িটি তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা চৌধুরীর নামে।
বাংলাদেশে নিজের ব্যবসায়িক কাজের তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে সম্পদ বিবরণীতে মুসা জানিয়েছেন, বনানীতে মেসার্স ড্যাটকো লিমিটেড নামে একটি জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তিনি। এর আরও কয়েকজন অংশীদার রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির নামে ঢাকায় দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তবে তাঁর নিজ নামে দেশে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কথা সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করেননি এ ব্যবসায়ী।
সম্পদের হিসাব দিতে গত ১৯ মে মুসাকে নোটিশ পাঠায় দুদক। বিশেষ বাহক মারফত বনানীতে মুসার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ড্যাটকোতে এই নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশ জারির চার দিন পর দুদকের কাছে আরও সাত কর্মদিবস সময় চান তিনি।
এর আগে গত ৫ মে কমিশনের দৈনন্দিন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মুসা বিন শমসেরের নামে সম্পদের হিসাব জানানোর নোটিশ জারির অনুমোদন দেন দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান।
গত বছরের জুন মাসে বিজনেস এশিয়া নামের একটি সাময়িকীর ঈদ সংখ্যায় মুসাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের সূত্রে একই বছরের ৩ নভেম্বর কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে মুসার সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ওই সাময়িকীতে এই ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তাঁর জীবনযাত্রা, আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর প্রায় ৪০ জন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বহর নিয়ে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সুইস ব্যাংকে জব্দকৃত তার অর্থ অবমুক্ত হলে এসব অর্থ পদ্মাসেতু নির্মাণসহ মানবকল্যাণে ব্যয় করবেন তিনি।
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে মুসা দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে তাঁর কোনো অর্থই সুইস ব্যাংকে জমা হয়নি। ৪২ বছর বিদেশে বৈধভাবে ব্যবসার মাধ্যমেই তিনি ১২ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছেন, যা সুইস ব্যাংকে তাঁর নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, মিসর, সিরিয়া ও পাকিস্তানসহ অনেক দেশের সরকারি প্রতিরক্ষা ক্রয় সংক্রান্ত পাওনা পরিশোধের অর্থ ওই সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সুইস ব্যাংকে তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে একটি দল অভিযোগটির অনুসন্ধান করছেন।