Thursday, March 7, 2019

সংসদে যা বললেন সুলতান মনসুর

শপথ নেয়ার দিনেই সংসদ অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে ১১ মিনিট বক্তব্যও রেখেছেন। ৭ই মার্চের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সুলতান মনসুর বলেন, আজ ঐতিহাসিক দিবস অর্থাৎ ৭ই মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, গোপালগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ নিয়ে সাড়ে ৬ কোটি মানুষের যে বাংলাদেশ সেই বাঙালিকে যিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তার নাম হচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সেদিনকার বঙ্গবন্ধু। সেই ৭ই মার্চে আজকে আমি মহান জাতীয় সংসদে শপথ গ্রহণ করেছি। প্রথম দিনেই আমাকে ভাষণ দেয়ার সুযোগ করে দেয়াই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তিনি বলেন, এখানে যারা আছেন সকল সংসদ সদস্য, আমার শ্রদ্ধেয় নেতাও রয়েছেন। সহকর্মী আছেন। আমার কর্মীও আছেন।
আমার ভাই বোনেরা আছেন। আমার নেত্রীও আছেন। অর্থাৎ সংসদ নেত্রী আছেন। যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য আজকে সংসদে যারা আছেন তারা এক জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। আমিই বোধহয় একজন নীলমনি যে বর্তমানে জোটের বাইরে অন্য জোট থেকে নির্বাচিত হয়েছি। এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মৌলভৗবাজর-২ আসনের কুলাউড়ার মানুষের স্বত:স্ফুর্ত সমর্থনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে এখানে এসছি। সরকার প্রধান হিসেবে আজকে সংসদ নেত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, নির্বাচনে অন্তত আমার নির্বাচনী এলাকায় কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অন্য এলাকায় কি ঘটেছে জানি না। অন্যরা তাদের বিবেকের আদালতে তারাই বলতে পারবেন। সুলতান মনসুর বলেন, আজকে আমারও কিন্তু ওইখানে থাকার কথা ছিল। অর্থাৎ যদি ওই জোটের পক্ষ হয়ে রাজনীতি করতাম। আজ থেকে ১৮ বছর আগে এই সংসদে আমার আসার সুযোগ হয়েছিল। আপনি (স্পিকার) যে আসনে বসে আছেন ওই আসনে বসেছিলেন মরহুম আলহাজ¦ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। আর ছিলেন আজকের প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ সাহেব। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, রাজনীতির ছন্দপতনের কারনে হয়তো আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় আমি একটি রাজনৈতিক করাগারের মধ্যে ছিলাম।
গত ১৮ বছরে যদিও আমি এমপি ছিলাম না বা এইখানে ছিলাম না তবে আমি রাজনৈতিকভাবে চিন্তার দিক দিয়ে নিষ্ক্রিয় ছিলাম না। আর যে বিশ্বাস নিয়ে আজ ৭ই মার্চ যাকে নিয়ে আলোচনা ১৯৬৭-৬৮ সালে স্কুল ছাত্র থাকা অবস্থায় যাকে ঘিরে, যার শ্লোগান দিয়ে রাজনীতি জীবন শুরু করেছিলাম- পদ্মা, মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, মিথ্যা অসত্য ষড়যন্ত্রমূলক মামলা মানি না মানব না। সেই জায়গা থেকে সেই বিশ্বাস থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচ্যুত হয়নি। যদিও জোটগতভাবে বা রাজনৈতিকভাবে বর্তমানে হয়তো আমার নেতাদের সঙ্গে ওই জোটে নেই। কিন্তু আজ থেকে ৫২ বছর আগে যে বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলাম, সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই আমি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে নির্বাচন করে আপনাদের সকলের দোয়াতে এই জাতীয় সংসদে এসেছি। তাই আমি কৃতজ্ঞতা জানাই আমার সংসদীয় আসন মৌলভীবাজার-কুলাউড়ার জনগণকে।
তিনি বলেন, মহাজোটের বিরোধী যারা ছিল তারাও আমাকে ভোট দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা, জাতির পিতার অনুসারীরাও আমাকে ভোট দিয়ে সর্বস্তরের জনগণ আমাকে এখানে পাঠিয়েছে। কারণ আমার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। যাই হোক, আজকে সেই ৭ই মার্চে আামি বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। আমি নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি নিজেকে আজকে এইভাবে সম্মানীত বোধ করি-জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সেই ৭ই মার্চে শপথ নিতে পেরেছি। অনেকের মনঃপুত বক্তব্য হয়তো আমি আজকে না রাখতে পারি তবে আশা করব আপনার (স্পিকার) কাছে মহাজোটের বিরোধী একজন অন্য জোটের ব্যক্তি হয়ে যাতে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারি, জনগণের কথা বলতে পারি, বাংলার মানুষের কথা বলতে পারি, সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলতে পারি। এবং বঙ্গবন্ধু যে কথা বলেছেন যে জনগণই ক্ষমতার উৎস সেই জনগণের স্বার্থে কথা বলে যাতে সারাজীবন রাজনীতি করতে পারি সেই শেল্টার পাব বলে আশা করি। সেই সহযোগিতা পাব বলে আশা করি। এমনকি সংসদ নেত্রীও সেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন মনে করি।   এখানে ৯৯ পার্সেন্ট হচ্ছে এক জোটে আর আমি অন্য জোট থেকে এসে রাজনীতি করছি। তবে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু এই প্রশ্নে কোন আপস নেই। বাংলাদেশ জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু এক নামে পরিচিত। সুলতান মনসুর বলেন, সংসদ নেত্রী বলেছেন জাতীয় ঐক্যের কথা। আজ সেই ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

ত্বকীর জবানবন্দি by ড. সফিউদ্দিন আহমদ

দেখতে দেখতে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ছয় বছর পেরিয়ে গেল। ত্বকী হত্যার পর আমি নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে আমার পাশেই ছিলেন ত্বকীর বাবা। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের আদর্শিক মেলবন্ধন। সাংগঠনিক কাজে তিনি আমার রায়পুরার বাড়িতে গিয়েছেন। একজন আদর্শিক সাথী হিসেবে আমি তাকে যতোটুকু জেনেছি তিনি একজন সুসংস্কৃত, পরিমার্জিত ও নন্দিত মানুষ, সব সময়ই তার মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তবে ত্বকী হত্যার পর যদিও আমার মনে হয়েছে প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড এক বিধ্বস্ত প্রান্তর। অথবা সুনামিতে ক্ষত-বিক্ষত এক বিবর্ণ ছবি।
এরপরও তিনি বিভ্রান্ত বা আদর্শচ্যুত হন নি।
একদিন মানুষের শত্রু ছিল সাপ, বাঘ, সিংহ, হিংস্র জন্তু ও ভয়াল প্রকৃতি। আজ মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু মানুষ। এইমাত্র যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করেছে তার জন্য এক ফোঁটা দুধ বরাদ্দ নেই- কিন্তু তাকে হত্যা করার জন্য রয়েছে লক্ষ কোটি ডলার পাউন্ডের অস্ত্র। আজ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা মানুষকে হত্যা করার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আবিষ্কার। যুদ্ধোন্মাদ রক্তপাগল এই নরঘাতক মানুষকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণ- ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু নিবাইছে তব আলো,/তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?’
ত্বকীকে নিয়ে কোনো দার্শনিকতার প্রয়োজন নেই। তার কবিতার মাধ্যমেই জনান্তিকে সে যে জবানবন্দি দিয়ে গেছে- এই জবানবন্দিতেই পুরো ত্বকীকে খুঁজে পাওয়া যাবে এবং তার বাবার লেখাটিও তার জীবনের মূল আকর। প্রথমেই আমি বলবো যে, হয়তো পারিবারিক আবহ বিশেষ করে তার আদর্শিক বাবা ও মা’র চিন্তা-চেতনার অভিযোজনায়ই ছোটকাল থেকেই তার মনে জীবন, জগৎ, বৈশ্বিক বলয়, দেশ, মাটি ও মানুষ, বিশ্বপ্রকৃতি এবং শোষণ-পেষণ ও নির্যাতন সম্বন্ধে একটা জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসার উৎসারণ ঘটেছিল। আর এমনটি ছিল বলেই তার মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগে তার কলম থেকে বের হলো-
আমি প্রস্তর হয়ে মরলাম উদ্ভিদ হতে
উদ্ভিদ হয়ে মরি, তো উত্থিত প্রাণে
মানুষ হয়ে উঠলাম পরে, যখন সত্য উদ্ভাসিত হলো
ভয় কিসের? দ্বিধা কেন মৃত্যুতে?
একজন কিশোরের এই ভাবনা, এই চিন্তা বিশ্বের তাবৎ দর্শন, জীবন-জগৎ ও বিবর্তন-আবর্তনকে উতরিয়ে, সমস্ত দর্শনকে উজিয়ে আমাদের বিস্মিত ও স্তম্ভিত করে দেয়। মনে মনে ভাবি এ কী কোন অলৌকিক বাণী! এ দর্শনের পাঠ সে কোথায় পেলো? কেউ কী কল্পনা করতে পারেন যে এ দর্শন কোনো এক কিশোরের!
কিশোর ত্বকী যে বয়সে নিহত হয়েছে এ সময়টা ছিল কল্পনার, রঙিন কাঁচ দিয়ে রঙিন পৃথিবীকে দেখার। এ বয়সের পৃথিবীটা গানময়, প্রাণময়, আনন্দময়, প্রজাপতির রঙিন পাখায় ভর করা এবং আকাশে লক্ষ তারার দেয়ালি উৎসবে মেতে ওঠা, ফুল নিয়ে পাখি নিয়ে মাতোয়ারা হওয়া। কিন্তু না, কিশোর ত্বকী কল্পনার রঙিন কাঁচ দিয়ে পৃথিবী দেখে নি। সে দেখেছে- খুন, সন্ত্রাস, হত্যা, শোষণ, নির্যাতন, অন্যায় ও অত্যাচার এবং দেখেছে, ‘জননী মাগিছে ভিক্ষা ঘরে ঢেকে রেখে ছেলের লাশ।’ সমাজের এই দৃশ্য ত্বকীকে চকিত করে। সে উঁকি দিয়ে তাকায় সময়ের ঘড়ির কাঁটার দিকে। মিথ্যে হয়ে যায় তার কাছে ‘মানুষ মানুষের জন্য’। মানুষের এই দানবীয় হুঙ্কার ও পৈশাচিক কাণ্ড দেখে এই কিশোর চিৎকার করে।
কার্ল মার্কস শ্রেণি চরিত্রের কথা বলেছেন। ঘাতকশ্রেণির ঘাতকেরা চিরদিনই ঘাতক এবং তারা একই শ্রেণির। হিটলার, আলবদর, আলশামস, রাজাকার আর সকল নরখেকো নরঘাতক শ্রেণি চরিত্র হিসেবে তারা একই। এরা দেবোপম গোবিন্দদেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সোমেন চন্দ ও ত্বকীকে একই পদ্ধতিতে হত্যা করে। এরা নির্মম, নিষ্ঠুর, এরা ক্ষুধার্ত কুকুর। এদের হাতে কারো রক্ষা নেই। ওরা জান্তব পশু। রক্তের খেলায়, রক্তের হোলি-উৎসবে ওরা মেতে ওঠে। কিশোর কবি ত্বকী এ বিষয়টি ভালো করেই উপলব্ধি করেছিল। তার রক্তকণিকার প্রবাহে, প্রাণের স্পন্দনে এ চেতনা চন্‌ চন্‌ স্পন্দনে স্পন্দিত হয়ে উঠেছে।
ত্বকীর কবিতা যতোই পড়ি ততোই আমি বিস্মিত হই তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য চেতনা এবং তীক্ষ্ণ ও তীব্র সমাজ সচেতনতা বোধে। মুগ্ধতায় ভরে দেয় আমাকে বাণী বিন্যাস, শব্দ প্রয়োগ ও বক্তব্যের ওজস্বিতায়। তার কবিতা পড়লে মনে হয় সে তার বয়সকে ছাড়িয়ে অনেকটাই সামনে এগিয়ে গেছে এবং পরিণত ফুল ও ফল দেয়ার সময় এসেছে।
এখানে একটি বিষয় আমাকে বলতে হচ্ছে যে, আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দীর উত্তরণে এসেছি। কিন্তু আমাদের সন্তানদের, আমাদের শিক্ষার্থীদের কেন জানি এখনো পুরোপুরিভাবে মৃত্তিকাস্পর্শী ও শিকড় সন্ধানী করে তুলতে পারি নি। কেনো জানি এখনো তাদের দেশ, সমাজ, মাটি ও মানুষ এবং জীবন জিজ্ঞাসা ও আত্মজিজ্ঞাসায়, উৎসের সন্ধানে, স্বরূপের সন্ধানে ও আত্মপরিচয়ে অনুসন্ধিৎসু করে তুলতে পারি নি। এ ব্যর্থতা আমাদেরই। আমরা যারা শিক্ষক এবং কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী। আমরা তো আমাদের মহিমান্বিত অতীত ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে এবং আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আমাদের শিক্ষার্থী তথা আমাদের আজকের প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারি নি। এবং এক ধরনের ঔপন্যাসিক ও কল্পলোক আমাদের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের তাদের কল্পকাহিনীতে আকাশে উড়িয়ে ও দূরায়ন বাসনার নৌকায় ভাসিয়ে মৃত্তিকাবিচ্যুত ও শিকড়বিহীন করে নেশায় মাতোয়ারা করে তুলছে। এবং তারা শেষ পর্যন্ত টানেলে আশ্রয় নেয়- হিরোইন ও মাদকাসক্ত হয়ে যায়।
আমাকে বিস্মিত করে ত্বকীর দেশ, সমাজ, মানুষ ও স্বদেশ চিন্তা এবং মহান ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার ভাবনা। এ সাধারণ কথা নয় যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দী পরও আজকের এই কিশোর মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নতুন করে ভাবছে। ত্বকীর শিকড় মহিমান্বিত অতীত আর গৌরবোজ্জ্বল বাংলাদেশের হৃদয়ে প্রোথিত। ত্বকীর মন-মানসের গভীরতায়- বলা যায় মুক্তিযুদ্ধ তার হৃদস্পন্দনে, আত্মার গভীরে, রক্তকণিকার প্রবাহে ও প্রাণের স্তরে স্তরে। আর এসব কিছুরই মূল আকর তার বাবা-মা ও পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আবহ। আমি বিস্মিত হই কিশোর ত্বকী যখন বলে, ‘সবারই আদর্শ হবে বাংলাদেশের সেইসব সন্তান/যাঁরা যুদ্ধের ডাক দিয়েছিল,/ যাঁরা অপেক্ষায় আছে আজো একটি বিচারের-/একটি বিচার/ যা শেষ করার জন্যে তাঁরা/যুদ্ধের সেই সব নায়কেরা/ডাক দিয়ে যায়-/জাতির জন্যে, জেগে ওঠার জন্যে/ওই জাতির জন্যে; যারা ধ্বংসের মধ্যেও/নতুন জীবনের ডাক দিয়ে যায়;/ তুমি কি শুনতে পাও/সেই সব শহীদদের কণ্ঠস্বর?’
ত্বকী প্রত্যয়ী, আশাবাদী। সে জানে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তের বদলে, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তের বদলে ক্ষুধাহীন, শ্রেণিহীন, শোষণহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। সামনে ওই নতুন সূর্য উঠবে। এই ত্বকীর আশাবাদ, ‘অবশ্যই বাংলাদেশ জেগে উঠবে/সামনের উজ্জ্বল দিন/মেঘমুক্ত আকাশ/আমার রূপসী বাংলাদেশ/কোথায় আর সব/যাঁরা ধাবমান/যাঁরা পেছনেও নেতৃত্বে থাকে /যাঁরা ভয়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করে/তাঁরা অপেক্ষায় আছে,/তুমি ফিরে এসো, /ফিরে এসো সেখান থেকে/ফিরে এসো /আমার বাংলাদেশ।’
ত্বকীর কবিতাগুলো ভালো করে পড়লেই উপলব্ধি করা যাবে যে, তার কবিতায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে একটি প্রতিবাদী চেতনা এবং সমাজ প্রগতি ও সমস্ত প্রতিবন্ধকতা থেকে মানুষের মুক্তি। কবিতাকে ত্বকী বিলাসী আর্টের চর্চা করেনি অথবা কলাকৈবল্যবাদীদের মতো ‘কেবলই স্বপন করেছি বপন পবনে’ এমন নয়। তার কবিতার অন্তরের উদ্ভাস বিশ্লেষণ করলেই আমরা দেখতে পাবো- সেখানে একটা দৈশিক ও সামাজিক উপযোগিতা আছে। আমরা বলবো কল্পনা থেকে নয়- ত্বকীর কবিতায় যে তীব্র তীক্ষ্ণ সমাজ সচেতনতা তা আদর্শিক চেতনার আত্মস্থতা থেকে। কারণ বাবা-মা’র আদর্শের বুনন তার হৃদয়তন্ত্রিতে। কাজেই এ জমিনে প্রগতির ফসল, সাম্যের ফসল ও মানবমুক্তির ফসল ফলবেই। শ্রমে-ঘামে সিক্ত মানুষের মিছিল ও প্রগতির পতাকা হাতে জনতার মিছিল সামনে যাবেই।
আমাকে মুগ্ধতায় ভরে দেয় ত্বকীর কবিতার বিষয়বস্তু, শিরোনাম, প্রতীক, উপমা, উদাহরণ ও উৎপ্রেক্ষা, তার বাণীবিন্যাস ও চিত্রকল্প। তার কবিতা পড়লে কখনো বোঝা যায় না যে, এক কিশোরের লেখা। সে মিতবাক, প্রমিত ও সংযমিত। আর তার ধ্যানে ও জ্ঞানে, ভাব ও মনন-পরিমণ্ডলে দ্রবীভূত হয়ে আছে মানুষ, বাংলাদেশ ও স্বাদেশিক চেতনা-।
ত্বকীর মধ্যে জেগে উঠেছিল বিশ্ব-বোধ ও বৈশ্বিক চেতনা। মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদের দুর্গ- এ দুর্গ ভেঙে মানুষকে একই কাতারে দাঁড়াতে হবে। ভুলে যেতে হবে এই ভেদাভেদ-বৈষম্য। নজরুল যেমন এক মোহনায় দাঁড়িয়ে এক মিলনের গান গাওয়ার কথা বলেছেন- তেমনি কিশোর ত্বকীও বলেছে- ‘সমগ্র মানবজাতি আজ এক কাতারে দাঁড়াবে-/হিংসা বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে,/ জলাঞ্জলি দিয়ে হিসেব কষা,/ ছড়িয়ে দেবে ভালোবাসার গান-/ বলবে মানুষ চাই সমানে সমান।’
ত্বকীর ‘কারা সেই রাজহাঁস’ কবিতাটি আমাদের হৃদয়কেও ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত করে। মনে পড়ে তমসা তীরে নিষ্ঠুর ব্যাধ ক্রৌঞ্চ পাখির বুকে তীর নিক্ষেপ করেছিল- ক্রৌঞ্চপাখির বিদীর্ণ বক্ষ থেকে টপটপ করে পড়েছিল রক্তের ফেঁাঁটা। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে বাল্মীকির কণ্ঠ থেকে বের হয়ে আসে অলৌকিক ছন্দ ও কাব্যবাণী- তেমনি আমাদের সমাজে খুন, হত্যা, লাশের মিছিল দেখে ত্বকীর হৃদয়ও ক্ষতাক্ত ও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।
তার বাবার জবানীতে- ‘বন্ধুবান্ধব- হইহুল্লোড় খুব একটা পছন্দ করতো না। বন্ধু তেমন একটা ছিলও না। বন্ধু বলতে হয়তো আমিই ছিলাম। কারণ ওর যা বলার, যতটুকু বলার প্রয়োজন বোধ করতো, আমার সঙ্গেই করতো। কারো বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ ছিল না। বন্ধু, পরিজন, শিক্ষক কারো সম্পর্কে কখনো কোনো অভিযোগ করেনি। কেউ দুঃখ পাবে, এমন আচরণ ছিল ওর নীতি ও রীতিবিরুদ্ধ। দূরের বা অপছন্দের কেউ হলেও না। ছিল স্বল্প ও মৃদুভাষী। প্রকৌশলী হওয়ার ইচ্ছে ছিল। বলেছিলাম, এ-লেভেল শেষে দেশের বাইরে চলে যাও। পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এসো। ও দেশের বাইরে যেতে চাইতো না। মাকে বলতো, দেশে থেকে কি লেখাপড়া হবে না? দেশের পড়াশোনা কি এতই খারাপ যে বাইরে যেতেই হবে? আমি শুনে বললাম, বাইরে যাওয়াটা দোষের কিছু না। আমাদের সামনের যে মানুষগুলো রয়েছেন, তারা সবাই তো বাইরে গিয়েছেন, বিশ্ব ঘুরেছেন। বাইরে না গেলে ভেতরটাকে ঠিক জানা যায় না। ভেতরটা ভালো করে জানার জন্য, বোঝার জন্য হলেও বাহিরটাকে জানার প্রয়োজন পড়ে। আমার সঙ্গে কিছুই বললো না। পরে মাকে বললো, তোমাদের ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না, থাকতে পারবো না।’
ত্বকীর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বিস্মিত হই। দু’চোখ দিয়ে সে মহাবিশ্বকে, দূর নাক্ষত্রিক জগৎকে দেখে নিতে চায়। এ চোখের সঙ্গে একমাত্র তুলনা মেলে র‌্যাঁবোর। ত্বকী আর র‌্যাঁবোর চোখে কি দুরন্ত চাহনি, কী দুরন্ত আহ্বান ও অনালোকিত-অনালোচিত এবং অচেনা জগতের ভাষা। ত্বকীর চোখে যেনো কল্পনা ও আগুনের স্ফূরণ আবার কখনো সংগ্রামের বিজয় উল্লাসের ঝলক।
ত্বকীরা সব সময়ই দুশমনের দুর্জয় দুর্গ ভেঙে, কালের করাল প্রহরাকে উত্তরণে সমসাময়িককে পেছনে ফেলে যায় বলেই সাম্প্রদায়িক চণ্ডশক্তি, কালের বৃত্তে বন্দি রক্ষণশীলরা, প্রথাবদ্ধ ও প্রগতির প্রতিরোধকারীরা ত্বকীদের সহ্য করতে পারে না। আর তাই তাদের হত্যা করে রক্তের হোলি-উৎসবে মেতে ওঠে। অবশ্যি হত্যার পরও ত্বকীরা কালোত্তীর্ণ হয়ে বেঁচে থাকে মানুষের মনে, প্রাণে ও রক্তকণিকার স্পন্দনে। তাই ত্বকীদের নিমন্ত্রণ- কালে কালে, লোকে লোকে, আলোকে আলোকে।
ত্বকীর এই নির্মম হত্যার সঙ্গে সঙ্গে আমার স্মরণে এসেছে ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী ও সোমেন চন্দকে। আমি বার বার দেখি একই অভিযোজনায় তারা দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে উচ্চারণ করছেন-
‘ও আমার দেশের মাটি
      তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।’
ড. সফিউদ্দিন আহমদ: শিক্ষাবিদ, লেখক,
সভাপতি: বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।

সন্তানকে স্বনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী করে তোলার কলা কৌশল

একটি শিশুকে স্বনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী করতে কেমন হবে অভিভাবকত্ব এ নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক কম হয়নি। মনোবিদ জাঁ পিঁয়াজে তাঁর সামনে বেড়ে ওঠা পরিবারের ছোটদের উপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এই সিদ্ধান্তে এলেন যে, শৈশব থেকে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথে অভিভাবকদের তিনটি ধাপ মনে রাখতে হবে। প্রথম ধাপ, সেই শিশুর আশপাশের জগৎ (স্কিমা)। পরের ধাপে তার যোগ্য সংমিশ্রণ ও তার পরের ধাপে তাদের পরিণত হয়ে ওঠা।
এদিকে মনোবৈজ্ঞানিক বলবি ‘অ্যাটাচমেন্ট’ তত্ত্বের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। যে মানুষটির সঙ্গে বাচ্চাটি বেড়ে ওঠার কালে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে সেই তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই মানুষটি তার মা বা বাবা। কিন্তু যার ক্ষেত্রে বাবা-মা দুজনেই চাকরিরত, তার ক্ষেত্রে সেই মানুষটি অনায়াসে হয়ে উঠতে পারে কাজের বুয়া।
বলবি বলছেন, দুই বছরের মধ্যে এই বন্ধন কোনও কারণে ভেঙে গেলে বাচ্চার পাকাপাকিভাবে অবসাদগ্রস্ত বা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
কখনও কখনও একটা স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা কাজ করতে থাকে তার মনের ভিতর।
তবে ছেলেমেয়ে ‘মানুষ’ করে তোলা নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেলটি করেন বমরিন্ড। তাঁর মতে, অভিভাবকত্ব প্রধানত চার রকম। প্রথমটি কঠোর শাসনে ভরা, পান থেকে চুন খসলেই উত্তমমধ্যম। বমরিন্ডের মতে 'অথরিটেরিয়ান'। দ্বিতীয়টিতে শাসন অবশ্যই আছে, তবে নিয়মানুবর্তিতার বাঁধনের আড়ালেই রয়েছে স্নেহের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ও।
মনোবিদদের মতে, এই ধরনের 'অথরিটেটিভ' অভিভাবকত্ব সন্তানের ব্যক্তিত্বগঠনের জন্য সবচেয়ে অনুকুল। আর আছে  আদর দিয়ে সন্তানকে ‘বাঁদর’ তৈরি করা ইন্ডালজেন্ট অভিভাকত্ব ও পরম ঔদাসীন্যের ‘নেগলিজেন্ট’ অভিভাকত্ব।
সন্তান প্রতিপালনের রীতিনীতি এক-এক দেশে এক-এক রকম। সুইডেনে বাচ্চাদের এক বছর বয়স থেকেই 'ডে কেয়ার'- এ দেওয়ার চল আছে। জাপানে চার থেকে সাত বছর হলেই তাকে একা রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার এমনটা আমেরিকায় ঘটলে বাবা-মাকে দায়িত্বহীন বলা হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের সন্তান লালনপালনের কায়দা বিভিন্ন।
অভিভাবকত্ব নিয়ে নানান পরীক্ষা চলেছে। চতুরাশ্রমে শিক্ষাগুরুই শিশুকে স্বাবলম্বী করতেন। সেখানে বাবা মায়ের ভূমিকা নগণ্য। তার পর যৌথ পরিবারে প্রবল হল বয়োজ্যেষ্ঠর হুকুমদারি। যৌথ পরিবার ভেঙে গেলে ছোট পরিবারে বাবা ও মায়ের বোঝাপড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। বিশেষত,  সমাজের নিচের তলায় স্ত্রীশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা গেমচেঞ্জার হয়ে ওঠে। আণবিক থেকে আমাদের দেশের এক শ্রেণির পরিবার সিঙ্গল পেরেন্টহুডের দিকে ঝুঁকছে। সেখানে আবার সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে কাজের বুয়ার ভূমিকা। এক কথায় আমাদের দেশে এখনও অভিভাবকত্ব নিয়ে বিবর্তন চলছেই।
স্কুলের রিপোর্ট কার্ডটাই সব নয়। তার বাইরেটাও দেখতে ও চিনতে শেখান। সন্তানের শৈশবকে শুধু বইয়ের পাতায় বন্ধ করবেন না। আদর যেমন করবেন শাসনও সে রকম করুন। সন্তানকে পড়ানো ও শাসনের পাশাপাশি কিছুটা সময় ওদের সঙ্গে নিছক আনন্দে হইহই করে কাটান। বয়ঃসন্ধিতে সন্তানের বন্ধু হন। ওর সমস্যার কথা শুনুন। ওর ভরসা হন। স্বামী-স্ত্রীর অশান্তি বা মতের অমিলের আঁচ যেন সন্তানকে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগায়। সামাজিক রীতি-নীতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ সন্তানকে শেখান।
সূত্র: আনন্দবাজার

এই মুহূর্তে দেশে ফেরার পরিকল্পনা নেই, জামায়াতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল ভুল -সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক

জামায়াতের পদত্যাগী নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধিতার যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, তা ভুল ছিল, যার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া উচিত। ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে পদত্যাগের ধারণা নাকচ করে তিনি বলেন, এটা পুরোপুরি অসত্য। এই মুহূর্তে তার বাংলাদেশে ফেরার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এসব কথা বলেন।

প্রশ্ন: আপনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন এই কারণ দেখিয়ে যে, জামায়াত তাদের ’৭১-এর ভূমিকার জন্য জনগণের কাছে জমা চায়নি। কিন্তু আপনার বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার নয় যে জামায়াত কিসের জন্য ক্ষমা চাইবে?
উত্তর: আমি আমার পদত্যাগপত্রে স্পষ্ট করেই বলেছি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাতে ব্যর্থ হয়েছিল। আমার দৃষ্টিতে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরোধিতার যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, তা ভুল ছিল, যার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

প্রশ্ন: প্রশ্ন উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আপনার ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতৃবৃন্দের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে আপনি যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

উত্তর: এখানে কোনো রকম অসঙ্গতি নেই। রাজনৈতিকভাবে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা আর যুদ্ধাপরাধ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। একটি রাজনৈতিক ভূমিকা, আরেকটি ফৌজদারি অপরাধ। এই পার্থক্যটা অনেকেই খেয়াল করেন না। জামায়াতে ইসলামীকে আমি তাদের একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে বলেছি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন, ইউকে বার এসোসিয়েশন এবং অন্য অনেক সংগঠন এই বিচারের উদ্যোগকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু এই সবক’টি সংগঠনই পরবর্তীতে দাবি করেছে যে, সংশ্লিষ্ট আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সে কারণে এই বিচারকার্য সর্বত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এছাড়াও আমি বেশ কয়েকবার বলেছি, যে আইনের অধীনে বিচারকার্য চলছে তা অসাংবিধানিক। ডিফেন্স দলের প্রধান হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও সাক্ষ্য প্রমাণ পর্যালোচনা করার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচারকার্য পরিচালিত হলে ট্রাইব্যুনালে আমার সকল মক্কেল নির্দোষ প্রমাণিত হতেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

প্রশ্ন: জামায়াতে ইসলামীর অনেক নেতাকর্মী মনে করেন যে, ১৯৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার মানে হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ স্বীকার করে নেয়া। মন্তব্য করুন।

উত্তর: এটা বড় ধরনের ভুল ধারণা। স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমা চাওয়াকে কোনোভাবেই ব্যক্তি বিশেষ কর্তৃক খুন, ধর্ষণ বা যুদ্ধকালীন কোনো ফৌজদারি অপরাধের স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধ প্রমাণ করতে হলে আদালতে অভিযোগের সমর্থনে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ দাখিল করতে হয়। অতীতে বহুবার বলেছি, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সমর্থনে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণাদি দাখিল করতে পারেনি।

প্রশ্ন: এই মন্তব্য অনেকেই করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করলেও আপনি আপনার আদর্শ পরিত্যাগ করেননি। আপনার আদর্শ কি? আপনি কি তা পরিত্যাগ করেছেন?

উত্তর: ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি আমার বিশ্বাস অবশ্যই আমি পরিত্যাগ করিনি। আমি বিশ্বাস করি, একজন মুসলমান হিসেবে সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ, অর্থাৎ ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা আমার দায়িত্ব।
দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম ত্যাগ করার মানে কোনোভাবেই ইসলামী মূল্যবোধ পরিত্যাগ করা নয়। বরং আমি আশা করছি এখন বিভিন্ন ফোরামে সক্রিয় হয়ে আমার দায়িত্বটি ব্যাপক পরিসরে ও আরো ভালোভাবে পালন করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন: জামায়াতের ইতিহাসে শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কারও পদত্যাগ বিরল। জামায়াত থেকে পদত্যাগ মানে ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্যে ও আদর্শ থেকে বিচ্যুতি হিসেবে ধরে নেয়া হয়। আপনি কি মনে করেন যে রাজনীতি থেকে পদত্যাগ করে আপনি ইসলামী আন্দোলন পরিত্যাগ করেছেন?

উত্তর: এটা সঠিক নয়। ইসলামের খেদমত কিংবা একজন মুসলমান হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের জন্য একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে হবে এ রকম কোনো আবশ্যিকতা নেই। আমি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান কিংবা একটি নতুন দল গঠন করছি না। তার মানে এই নয়, আমার যে বিশ্বাস ও দায়িত্ব তা আমি পালন করবো না। পৃথিবীব্যাপী অনেক বিজ্ঞানী, পেশাজীবী, শিক্ষক, কবি, লেখক, সাংবাদিক রয়েছেন যারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও ইসলামের প্রয়োজনে ও প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

প্রশ্ন: আপনি কি দেশে ফেরার উদ্দেশ্য সরকারের সাথে যোগাযোগ করে পদত্যাগ করেছেন?
উত্তর: এটা পুরোপুরি অসত্য। আমি বিগত কয়েক বছর ধরে লন্ডনে আইন পেশায় নিয়োজিত আছি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ফেরার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।

ইসরায়েলের সমালোচনা করে বিপাকে মুসলিম কংগ্রেস সদস্য

সোমালিয়া থেকে আসা উদ্বাস্তু ইলহান ওমর গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিনেসোটা থেকে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন। চলতি কংগ্রেসের দুজন মুসলিম নারী সদস্যের মধ্যে তিনি একজন। ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের জন্য তিনি এর আগে সমালোচিত হয়েছেন। এবার ইসরায়েলের সমালোচনা করে প্রতিনিধি পরিষদে আনুষ্ঠানিক নিন্দা প্রস্তাবের সম্মুখীন হয়েছেন তিনি।
গত সপ্তাহে এক বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে ইলহান ওমর বলেন, আমেরিকার কোনো কোনো লোকের মধ্যে ভিন্ন দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের প্রবণতা রয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যের কোথাও ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করেননি। তবে কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই ধরে নেন যে তিনি ইসরায়েলের কথাই বলছেন।
এর আগে ইলহান ওমর ইসরায়েলের পক্ষে লবিং করে—এমন একটি গ্রুপের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সবই হচ্ছে টাকার খেলা।
সে সময় ডেমোক্রেটিক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ওমরকে ডেকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, যাতে এ রকম বেফাঁস কথা তিনি না বলেন। পেলোসির সঙ্গে কথা বলার পর ওমর দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন।
দ্বৈত আনুগত্যের কথা বলে ওমর রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় দলের প্রভাবশালী সদস্যদের কোপানলে পড়েন। তাঁরা ইসরায়েলের প্রবল সমর্থক হিসেবে পরিচিত। সে কারণে তাঁরা ওমরের কথাকে নিজেদের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে ধরে নেন।
রিপাবলিকান নেতারা ওমরের মন্তব্যকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে বর্ণনা করে অবিলম্বে তাঁর ব্যাপারে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের দাবি তোলেন। তাঁদের কেউ কেউ ওমরকে কংগ্রেসের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি থেকে বহিষ্কারেরও দাবি তোলেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এই বক্তব্য সমর্থন করেন। তিনি ওমরের বক্তব্যকে ইসরায়েলের জন্য একটি অশুভ বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন।
তবে ওমরের সমর্থনে এগিয়ে আসেন কংগ্রেসের একাধিক নবনির্বাচিত সদস্য। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিয়া-করতেজ। তিনি প্রশ্ন করেন, মন্তব্যের কারণে যাঁরা ওমরকে কমিটি থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন, তাঁরা তো হিস্পানিক বা অন্যান্য জাতির প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের জন্য কখনো ক্ষমা চাননি। এঁরাই একসময় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে কেনিয়ায় ফিরে যেতে বলেছিলেন।
ওমরকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার সঙ্গে যুক্ত করে ভার্জিনিয়ার রিপাবলিকান পার্টি একটি পোস্টার প্রকাশ করেছে। এই পোস্টারের নিন্দা করে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল সদস্য প্রমীলা জয়পাল বলেছেন, ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য কোনো কংগ্রেস সদস্যকে নিন্দা প্রস্তাবের সম্মুখীন হতে হয়নি।
বিখ্যাত মানবাধিকারকর্মী ফিলিস বেনিস জানান, যে অনুষ্ঠানে ওমর তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য করেন, তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি এমন কোনো কথাই বলেননি, যা ইহুদিবিদ্বেষী।
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ওমরবিরোধী উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ইসরায়েলি লবিং গ্রুপ এইপ্যাক। এ থেকে বোঝা যায়, গ্রুপটি কতটা শক্তিশালী।
ওমরের নাম উল্লেখ না করে বুধবার এক প্রস্তাবে সব ধরনের ইহুদি বিদ্বেষকে নিন্দা করা হবে মর্মে একটি খসড়া বিলি করা হয়েছিল। কিন্তু ডেমোক্রেটিক পার্টির বামঘেঁষা অংশের প্রতিবাদের কারণে প্রস্তাবটি পরিবর্তন করা হয়। এখন প্রস্তাবে ইহুদি বিদ্বেষের পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের নিন্দা করা হবে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, বুধবারের বদলে কাল বৃহস্পতিবার এই প্রশ্নে ভোট হবে।
ডেমোক্রেটিক হুইপ জেমস ক্লাইবার্ন বলেছেন, প্রস্তাবটির লক্ষ্য হবে সব ধরনের ঘৃণা ও বিদ্বেষের নিন্দা জানানো।

পুলিশ-পরিবহন মালিক পরস্পর দোষারোপ by একরামুল হক ও আবদুর রাজ্জাক

সাড়ে তিন বছর আগেই ঢাকা–চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম–কক্সবাজারসহ দেশের ২২টি মহাসড়কে সিএনজিচালিত তিন চাকার যানবাহন, অটোরিকশা, অটোটেম্পো ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিছু মহাসড়কে অটোরিকশাসহ নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল করছে। এতে কখনো কখনো মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনা এড়ানো এবং বড় গাড়ির চলাচলে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে দেশের ২২ মহাসড়কে অটোরিকশাসহ ধীরগতির গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়।
পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মহাসড়কে অটোরিকশাসহ ধীরগতির গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু পরিবহন সংগঠন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। তাঁদের কারণেই শক্ত অবস্থানে যেতে পারছে না হাইওয়ে পুলিশ। তবে পরিবহন মালিক সংগঠন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অভিযোগ, পুলিশ ‘টোকেন–বাণিজ্য’ করতে ছোট গাড়ি চালাচ্ছে।
সরেজমিন চিত্র
গত শনিবার চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়ার কেরানীহাট থেকে কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক পর্যন্ত শত শত অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। প্রায় প্রতিটি বাজারে যাত্রী ওঠানামা করছিল অটোরিকশাগুলো। কেরানীহাট থেকে মইজ্জারটেক পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ৪৪ কিলোমিটার। এই পথে অন্তত ডজনখানেক হাটবাজার রয়েছে। এই হাট থেকে ওই হাটে যেতে স্থানীয় লোকজন অটোরিকশায় ভ্রমণ করছিলেন। কিন্তু হাইওয়ে কিংবা জেলা ট্রাফিক পুলিশের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।
স্থানীয় চালক ও যাত্রীরা জানায়, সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতে মহাসড়কে নিষিদ্ধ অটোরিকশা চলাচল বেড়ে যায়। কারণ, তখন কর্মজীবী লোকজন গ্রামমুখী হন।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে গাড়ি চালানোর কারণ জানতে চাইলে গত সোমবার দুপুরে পটিয়া থানার মোড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক নুরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে চালানোর জন্য গাড়িটি কেনা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এতে হাজার হাজার চালকের মতো তিনিও সমস্যায় পড়েন।
নুরুল ইসলাম আরও বলেন, গ্রামের সড়কগুলোতে শত শত অটোরিকশা চলছে। কিন্তু যাত্রীর সংখ্যা কম থাকায় তাঁরা মহাসড়কে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। নইলে প্রতিযোগিতার বাজারে মালিকের দৈনিক জমাও তাঁরা দিতে পারবেন না।
একই দিন চন্দনাইশে কথা হয় অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ বোরহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে কম দূরত্বের গন্তব্যে যাত্রীরা বাস পায় না। এ জন্য তারা অটোরিকশা বেছে নেয়। মহাসড়কে অটোরিকশা চালালে যাত্রী পাওয়া যায়।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিএনজি থ্রি হুইলার মালিক পরিষদের সভাপতি মহিউদ্দিন বলেন, গ্রামের রাস্তায় অটোরিকশা চালিয়ে সন্তোষজনক আয় সম্ভব নয় বলে অনেকে মহাসড়কে চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। এ জন্য কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেছেন। নইলে শত শত গাড়ি মহাসড়কে চলবে কেন?
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে এই মহাসড়কটি চার লেনের হওয়ায় উল্টো পথে অটোরিকশা বেশি চলাচল করে।
হাইওয়ে পুলিশের বক্তব্য মানতে চায় না পরিবহন মালিক সমিতি
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছোট গাড়ি চলাচলের কারণ জানতে চাইলে কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মহাসড়কে বড় গাড়ির অভাবে স্থানীয় যাত্রীরা ছোট গাড়ি বেছে নিয়েছে। তবে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ হয়েছে। যদিও দু–চারটি চুরি করে উল্টো পথে চলছে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে ছোট গাড়ি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে পুলিশ উদ্যোগ নিয়েছে।
মহাসড়কে বড় গাড়ি তথা বাসের স্বল্পতার কারণ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, কিছু পরিবহন সমিতি এবং স্থানীয় প্রতিনিধি রাস্তায় বড় গাড়ি নামাতে বাধা দেন। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আনা হয়েছে। মহাসড়কে বাসের কোনো বিকল্প নেই।
হাইওয়ে পুলিশ সুপারের বক্তব্য মানতে রাজি নন চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম।। তিনি বলেন, অবৈধ গাড়ির টোকেন–বাণিজ্য বন্ধ হলে পুলিশের আয় কমে যাবে। এ জন্য মহাসড়কে ছোট গাড়ি চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না।
মঞ্জুরুল আলম আরও বলেন, কোন মহাসড়কে যাত্রীর সংখ্যা কত তা জরিপ করে বড় গাড়ি নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পুলিশের টোকেন–বাণিজ্য বন্ধ না হলে সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না।

কান্নায় ভারি বাতাস- ডিএনএ পরীক্ষায় মিললো ১১ জনের লাশ by রুদ্র মিজান

লাশকাটা ঘরের সামনে মানুষের ভিড়। কেউ চিৎকার করে কাঁদছেন। কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে কান্নার শব্দ। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে গেছে কারও কারও। কাঁদছেন স্বজনহারা মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্বজনের পুড়ে যাওয়া লাশ। চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে নিহত হয়েছেন তারা।
বিকৃত লাশ। চেনার উপায় ছিল না। দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ছিল সংরক্ষণাগারে। অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় মিলেছে ১১ জনের পরিচয়।
খবর পেয়ে লাশ নিতে এসেছেন স্বজনরা। কেউ সন্তান হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ হারিয়েছেন বাবা-মা। গতকাল অন্তত আটটি লাশ নিতে ঢামেক মর্গে ভিড় করেন স্বজনরা। মা শিরীনের সঙ্গে বাবার লাশ নিতে এসেছিলো পাঁচ মাসের শিশু আবুল হোসেন। স্বামীর লাশ দেখার পর থেকেই চিৎকার করে কাঁদছিলেন তিনি। মায়ের কান্না দেখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল শিশুটি। মায়ের চোখের জল মুছে দিচ্ছিলো কচি হাতে। এক পর্যায়ে শিশু সন্তানকে অন্যের কাছে রেখে দুই হাতে লাশবাহী এম্বুলেন্স ধরে বলছিলেন, আমার সন্তানের বাবা কেন নাইগো, আমার সন্তান এখন কাকে বাবা বলে ডাকবে...।
শিরীনের কান্না দেখে চোখের জল ধরে লাখতে পারেন নি আশেপাশের লোকজন। পৃথিবীর তেমন কিছুই বুঝে না নুরুজ্জামান-শিরীন দম্পতির অবোধ শিশুটি। অথচ জীবনের শুরুতেই সে হারিয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড়ছায়া বাবাকে। ডিএনএ পরীক্ষার পর গতকাল নিশ্চিত হওয়া গেছে চুড়িহাট্টার আগুনে পুড়ে মারা গেছেন শিশুটির পিতা নুরুজ্জামান।
শিশু সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দেলপাড়া থাকতেন নুরুজ্জামান। তিনি ময়মনসিংহের তারাকান্দার বোয়ালকান্দির সোহরাব  হোসেনের একমাত্র ছেলে। ঢাকায় রিকশা চালাতেন। ঘটনার দিনও সকালে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন। প্রতিদিনের মতো রাতে বাসায় ফিরলেও সে রাতে আর বাসায় ফেরা হয়নি নুরুজ্জামানের। পুরান ঢাকার অগ্নিকাণ্ডের কিছুক্ষণ আগে স্ত্রী শিরীনকে নুরুজ্জামান বলেছিলেন, ‘আমি চকবাজারে জ্যামে আছি। অনেক শব্দ। কিছুই বুঝতে পারছি না। পরে ফোন দাও। আমার ফিরতে দেরি হবে।’ কিন্তু নুরুজ্জামানের আর ফেরা হয়নি। কথাও হয়নি স্ত্রীর সঙ্গে। ২০শে ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার অগ্নিকাণ্ডের পরদিন নুরুজ্জামানকে খুঁজেছেন শিরীন। কোথাও পাননি। এমনকি মর্গের ৬৭টি লাশ দেখেছেন। চিনতে পারেন নি। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ডিএনএ নমুনা দেন। তারপরই আজ সিআইডি থেকে তাকে জানানো হয় নুরুজ্জামানের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। সেই লাশ নিতে এসেছেন তিনি ও তার সন্তান এবং নিহত নুরুজ্জামানের বোন বেগম।
পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। কথাটি বলছিলেন কলেজছাত্রী ফাতেমা তুজ জোহরা ওরফে বৃষ্টির পিতা জসিম উদ্দিন। বৃষ্টি বেঁচে আছে নাকি নেই, নিশ্চিত ছিলেন না তারা। ঘটনার দিন বান্ধবী দোলা আর বৃষ্টি শিল্পকলার একটি অনুষ্ঠান শেষে চকবাজারের বাসায় ফিরছিলেন। তারপর থেকে তাদের আর খোঁজ নেই। আগুনে পোড়া লাশ দেখেও বৃষ্টিকে চিনতে পারেন নি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেই গতকাল লাশটি শনাক্ত হয়েছে। বৃষ্টির মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার মা শামসুন্নাহার। সারাটি দিন মায়ের সঙ্গে সময় কাটতো মেয়ের। লালবাগ  পোস্তার ৪১/১ হাজী রহিম বক্স লেনের বাসায় বৃষ্টির নানা স্মৃতিচিহ্ন। তার শোয়ার খাট, বইপত্র, কসমেটিকস ও শখের গিটার পড়ে আছে। দেয়ালে তাকালেই তার আঁকা আল্পনা দেখতে পান। এগুলো দেখে দেখে আর মেয়ের জামা বুকে জড়িয়ে সারাক্ষণ কান্না করেন শামসুন্নাহার। আজ (গতকাল) খবর পেয়ে সিআইডি অফিস ও ঢামেক মর্গে ছুটে যান এই হতভাগা মা-বাবা। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। এতদিন পর অন্তত মেয়ের লাশ পেয়েছেন এতেই সান্ত্বনা  খোঁজার চেষ্টা করছেন বাবা জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, মেয়ের লাশ পেয়েছি। কবরটা অন্তত দিতে পারবো। আজিমপুরে বৃষ্টির লাশ দাফন করা হবে বলে জানান তার স্বজনরা।
রিকশায় করে স্ত্রী নাসরিন জাহান ও সাত বছর বয়সী সন্তান আফতাহী রাজাকে নিয়ে চুড়িহাট্টার বাসায় ফিরছিলেন সালেহ আহমদ লিপু। এরমধ্যেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। লাশও পাচ্ছিলেন না স্বজনরা। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে লিপু ও নাসরিনের লাশ পাওয়া গেছে গতকাল। লিপুর মামা আবদুল আজিজ জানান, একটি আইসক্রিম কোম্পানিতে চাকরি করতো লিপু আর নাসরিন চাকরি করতো চুড়িহাট্টার আশিক টাওয়ারে। পরিবারের তিনজনই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তবে শিশুটির লাশ এখনো পাননি তারা। আজিজ বলেন, লাশ বিকৃত, দেখার কিছু নেই। লাশ পেয়েছি- এটাই বড় কথা। এখন দাফন করবো।
বাবার লাশ সন্তানরা সহ্য করতে পারবে না। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই ঘুমের মধ্যে ‘বাবা বাবা’ বলে চিৎকার করে শাহীনের তিন সন্তান। তাই তাদের বাসায় রেখে স্বজনদের সহযোগিতায় স্বামীর লাশ নিতে এসেছিলেন ময়না বেগম। কাঁদতে কাঁদতে বোরকা পরা ময়না বলছিলেন, ছয় বছর বয়সী হুমায়রা বাবার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে। কলিংবেল বাজলেই দ্রুত দরজার পাশে ছুটে যায়। ‘আব্বু, তুমি আসছো’ বলে চিৎকার করে। ১ বছর বয়সী সাফোয়ান ও ১১ বছর বয়সী হাফসা একদম নীরব হয়ে গেছে। সারাদিন চুপচাপ। ওরা আমাকে জড়িয়ে কান্না করে। আমি তাদের বাবাকে কীভাবে ফিরিয়ে আনবো। আল্লাহ কেন তিন সন্তানের পিতাকে এভাবে নিয়ে গেলেন। চুড়িহাট্টা এলাকাতেই শাহীন-ময়না দম্পতির বাসা। ঘটনার দিন মসজিদে নামাজ শেষে রাজমহল রেস্টুরেন্টে চা পান করতে যান। তারপরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
১১ লাশের পরিচয় শনাক্তের পর গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি জানিয়েছে, ৪৮ জন নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে মোট ৪৮টি রেফারেন্স ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডি’র ফরেনসিক দল। ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে দুই ধাপে পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে ১৫টি লাশ থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়। সেই সঙ্গে ৪৮ জন দাবিদারের ডিএনএ প্রোফাইল করা হয়। প্রথম ধাপ থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ প্রোফাইল, ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ১১ লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। বাকি চার জনের পরিচয় নির্ণয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
দ্বিতীয় ধাপে পাঁচটি অজ্ঞাত লাশের হাড় থেকে ডিএনএ পরীক্ষার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি দুই সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে জানায় সিআইডি। চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পরপরই সিআইডি’র দুটি ক্রাইমসিন ঘটনাস্থলে যায়। পরবর্তীতে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির একটি বিশেষজ্ঞ দল ডিএনএ নমুনা (রক্ত, টিস্যু, হাড় ও বাক্কাল সোয়াব) সংগ্রহের কাজ শুরু করে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে যৌথভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে মোট ৬৭টি লাশ থেকে ২৫৬টি ক্রাইমসিন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ২৩শে ফেব্রুয়ারি একটি বিচ্ছিন্ন হাতকে পৃথক আলামত হিসেবে গণ্য করে সেটি থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ফলে মোট ডিএনএ নমুনা দাঁড়ায় ২৫৭টি।
ঢামেক মর্গ থেকে লাশ হস্তান্তরের সময় ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শফিকুল ইসলাম বলেন, ১১টি লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এরমধ্যে আটটি লাশ বুধবার হস্তান্তর হয়েছে। বাকি তিনটি লাশ বৃহস্পতিবার হস্তান্তর হতে পারে। তাদের স্বজনরা আসতে দেরি হওয়ায় বুধবার লাশ তিনটি হস্তান্তর সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

দোলনচাঁপায় নারীদের স্বাচ্ছন্দ্যের যাত্রা

বাসটি দেখতে পেলেই কিছুটা পথ দৌড়ে হলেও ওঠার চেষ্টা করেন তানিয়া সুলতানা। পেশায় চিকিৎসক এই নারী বলেন, ধাক্কাধাক্কি নেই, সিট মেলে। ফ্যানগুলোও চলে। সবচেয়ে স্বস্তির কথা, হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় নেই।
দোলনচাঁপা বাস সার্ভিস নিয়ে গত মঙ্গলবার বিকেলে এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান এই নারী। বাসের অন্য যাত্রীদের অভিজ্ঞতাও মোটামুটি একই রকম। তবে বয়সভেদে সবাই বাসের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
রাজধানীর নারীদের যাতায়াতে সেবার পরিধি বাড়াতে গত বছরের ২ জুন মিরপুর ১২ নম্বর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দোলনচাঁপা নামে একটি বাস চালু করে র‌্যাংগস গ্রুপ এবং ভারতীয় ভলভো আইশার ভেহিক্যাল লিমিটেড। নারী যাত্রীদের আগ্রহের কারণে আরও তিনটি বাড়িয়ে এখন দোলনচাঁপা বাসের সংখ্যা চার। দুই রুটে প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত বাসগুলো চলে।
দুটি করে দোলনচাঁপা সকাল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে মিরপুর ১২ নম্বর এবং মিরপুর ইসিবি চত্বর থেকে মতিঝিল এবং আজিমপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এ জন্য যাত্রীকে দূরত্বভেদে ভাড়া দিতে হয় পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা। এর পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নারীদের জন্য রাজধানীতে ১৭টি বাস চলে।
গতকাল বিকেলে মিরপুরের ১২ নম্বর থেকে দোলনচাঁপা বাসে উঠে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত আসাতে দেখা যায়, যাত্রীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবু ৩৭ আসনের বাসে কয়েকটি আসন ফাঁকাই ছিল। আগে বাসটির বিষয়ে নারীরা তেমন জানতেন না। এখন নারীরা জানেন এবং বাসটি পেলে ওঠার চেষ্টা করেন।
মেয়ে নুরজাহান আক্তারকে নিয়ে শাহবাগে যাবেন মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা রেহানা পারভীন। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও গন্তব্যে যেতে পছন্দসই বাস পাচ্ছিলেন না। এমন সময় বেগুনি রঙের দোলনচাঁপা বাস তাঁদের চোখে পড়ে। মা-মেয়ে দ্রুত উঠে পড়েন। রেহানা বলেন, এই বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা ভালো। অন্য বাসে যখন ভিড়ের জন্য ওঠা দায়, তখন এটাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করা যায়।
একটি বাসে ৯ মাস ধরে চালকের সহকারীর হিসেবে আছেন রোজিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘বাসে পুরুষ তোলার নিয়ম নেই বলে অনেক নারী সঙ্গে থাকা পুরুষকে রেখে উঠতে পারেন না। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো নারী অবশ্য সঙ্গে থাকা পুরুষ সদস্যকে রেখে বাসে ওঠেন। তবে কম বয়সী ছেলে হলে তুলে নেই। সকালে এবং সন্ধ্যায় যাত্রীর সংখ্যা বেশি থাকে।’
স্কুল–ফেরত ছেলেকে নিয়ে বাসে উঠেছেন শায়লা আহমেদ। তিনি নিয়মিত এই বাসে তেজকুনিপাড়ার বাসায় ফেরেন বলে জানান। উদ্যোক্তা এই নারী বলেন, নারীরা এখন নানামুখী কাজে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু যাতায়াতেও বিভিন্ন রকমের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ ধরনের বাসের সংখ্যা আরও বাড়ালে নারীদের চলাচল সহজ হবে।
যাত্রীরা জানান, গণপরিবহনে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা তিক্ত, কখনো কখনো ভয়ংকর। সিট নেই বলে নারী যাত্রীদের বাসে উঠতে দেওয়া হয় না। চালকের সহকারীরা ওঠা-নামা করার সময় গায়ে হাত দেন। খারাপ ব্যবহার করেন। পুরুষ সহযাত্রীর হাতে হেনস্তা হতে হয়। নারীদের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বাসের সংখ্যা বাড়ালে ভোগান্তি-হয়রানি কমবে বলে জানান তাঁরা।
দোলনচাঁপা কর্তৃপক্ষ জানায়, সেবার পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি দোলনচাঁপা বাসে চারটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং একটি হেল্পলাইন নম্বরও রয়েছে। অগ্নি নিরাপত্তার জন্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও রাখা আছে।
র‌্যাংগস মোটরস লিমিটেডের দোলনচাঁপা প্রকল্প তদারকি কর্মকর্তা শামিতা তাবাসসুম প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রীদের চাহিদার ভিত্তিতে বাসের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বাসের সেবা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে জানাশোনা এবং সেবা নেওয়ার হার বাড়লে পর্যায়ক্রমে বাসের সংখ্যা ১০ পর্যন্ত বাড়ানো হবে।

যে দেশের প্রেসিডেন্টকে বলা হয় ‘জীবন্ত লাশ’

আলজেরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিজের পঞ্চম মেয়াদের জন্য নির্বাচন করছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট আব্দেল আজিজ বুতেফলিকাকে তার সমালোচকরা বলেন 'জীবন্মৃত'।
আব্দেল আজিজ বুতেফলিকার বয়স এখন ৮২ বছর কিন্তু তিনি অবসর গ্রহণে ইচ্ছুক নন।
যদিও ২০১৩ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
এরপর থেকেই তাকে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে শোনা যায়নি। যদিও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার পঞ্চম মেয়াদের জন্য নির্বাচন করছেন তিনি।
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে ১৮ই এপ্রিলের ভোটে তিনি জিতেও যেতে পারেন। যদিও ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার পর শাসনক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টার বিরুদ্ধে ক্ষোভও দেখা যাচ্ছে অনেক।
সারাদেশে লাখ লাখ মানুষ বিশেষ করে তরুণরা শুক্রবারও রাস্তায় নেমে এসেছিলো অসুস্থ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিতে।
আরব বসন্ত শুরু হওয়ার পর এটাকেই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বলে মনে করা হচ্ছে এবং রাজধানী আলজিয়ার্সে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে হয়েছে।
যদিও তাদের এসব প্রতিবাদ প্রেসিডেন্ট বুতেফলিকার কানে যায়নি।
তিনি প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলেননি কারণ তিন সুইজারল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দ্য লিভিং ডেড বা জীবন্মৃত
আব্দেল আজিজ বুতেফলিকার চরম সমালোচকরা তাকে 'দ্য লিভিং ডেড' বা জীবন্ত লাশ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
উত্তর আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা মাস বলেন বিরোধীরা তাকে 'দা ফ্রেম'ও বলে থাকেন। কারণ অসুস্থতা ও কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না পারা। এমনকি প্রার্থিতা ঘোষণার দিনসহ অনেক অনুষ্ঠানেই তার বাধাই করা ছবি রাখা হয়েছিলো তার নিজের উপস্থিতির পরিবর্তে।
"এমনকি তার অবস্থা নিয়ে এতোই অনিশ্চয়তা যে গত সোমবার প্যারিসে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতকে একটি বিবৃতি দিতে হয়েছিলো যে প্রেসিডেন্ট এখনো জীবিত আছেন"।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট যদি তার প্রাত্যহিক কাজ করতে না পারেন তার তার দায়িত্বে কে ?
রক্ত ও মৃত্যুর দশক: বুতেফলিকা কিভাবে ক্ষমতায় আসেন
আলজেরিয়াকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রবলা হলেও দেশটি পরিচালিত হয় আসলে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা অনুযায়ী।
একদল সামরিক কর্মকর্তা আর অনির্বাচিত ব্যবসায়ীরা দেশ চালানোর ক্ষেত্রে বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন এবং তারাই রাজত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন যখন অসুস্থ প্রেসিডেন্ট অবস্থান নিয়ে আছেন এক কোনায় - বলছিলেন বিবিসির মোহামেদ ইয়াহিয়া।
সাংবাদিক মার্ক মারজাইনদাস আলজেরিয়ায় বসবাস ও কাজ করতেন ৯০'এর দশকে।
তার মতে, "৯০ এর দশকে গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উত্থান হয়েছিলো প্রেসিডেন্ট বুতেফলিকার। এরপর থেকেই ক্ষমতা আসলে রাজনীতিক ও সামরিক একটি যৌথ মাফিয়া চক্রের কাছে"।
তারাই এরপর মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হয়।
আজকের আলজেরিয়াকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ৯০ এর দশকে কি ঘটেছিলো সেদিকে।
দেশটি দীর্ঘ যুদ্ধের পর ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিলো।
এরপর ভঙ্গুর গণতন্ত্রের পথ দরে ইসলামপন্থীরা ১৯৯০ সালের নির্বাচনে জয়ী হলে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করে।
এরপর গৃহযুদ্ধে এক দশকে প্রায় দু লাখ মানুষ নিহত হয়।
সাংবাদিক মার্ক মারজাইনদাসের মতে সেটি ছিলো আলজেরিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার সময়।
পরে ১৯৯৯ সালে আব্দেল আজিজ বুতেফলিকা ক্ষমতায় আসেন।
কিন্তু এখন তিনি দুর্বল, আর এ সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে নানা দল ও উপদল।
অন্যদিকে তার পুন:নির্বাচনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে তরুণরা।
তারা শ্লোগান দিচ্ছে 'বাই বাই বুতেফলিকা'।
স্থানীয় মিডিয়ার মতে গত ত্রিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে যার নেতৃত্বে আসলে ছাত্র ও বিভিন্ন খাতের তরুণরা।
বয়সে তরুণ এ দেশটির জনসংখ্যা চার কোটির সামান্য বেশি।
এর মধ্যেই রোববার রাতে প্রেসিডেন্টের একটি চিঠি পড়ে শোনানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে।
যেখানে তিনি বলেন, "প্রতিবাদকারীদের গভীর কান্না আমি শুনেছি।"
তিনি তাই অঙ্গীকার করেন যে পুননির্বাচিত হলে রাজনৈতিক সংস্কার ও আরেকটি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের জন্য তিনি একটি কনফারেন্সের আয়োজন করবেন।
যদিও নতুন প্রজন্মের কাছে এ ধরনের ভারী কথাবার্তার কতটা মূল্য আছে সেটি সময়ই বলে দেবে।
সূত্রঃ বিবিসি

মতুয়াদের বড় মা’র মৃত্যু পরিবারে বিরোধ তীব্র করল

ভারতে মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্মমাতা বড় মা হিসেবে পরিচিত বীনাপাণী দেবী মঙ্গলবার রাতে কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন। তার বয়স হয়েছিল ১০১ বছর। কিছুদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। বুধবার পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন। মতুয়া সম্প্রদায়ের এই গুরুমাতার জন্ম অবিভক্ত ভারতের বরিশাল জেলার জব্দকাঠিতে। অল্প বয়সেই গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির মতুয়া আশ্রমের প্রমথ রঞ্জন ঠাকুরকে বিয়ে করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি স্বামীকে নিয়ে চলে যান কলকাতা। পরবর্তীতে উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের আশ্রম গড়েন।
স্বামীর মৃত্যুর পর তার দুই ছেলেকে নিয়ে আশ্রমের দায়িত্ব নেন তিনি।
বড় মার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে কয়েক লাখ মতুয়ার মধ্যে। বড় মার মৃত্যুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শোকবার্তায় বড়মার চলে যাওয়াকে অপূরণীয় ক্ষতি বলে বর্ণনা করেছেন। তবে বড়মার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরবাড়িতে পারিবারিক বিরোধ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে চলেছে। বড় মার ছোট নাতি শান্তনু ঠাকুর অভিযোগ করেছেন, বড় মাকে খুন করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ জানতে তিনি সিবিআই তদন্তের দাবি করেছেন। বড় মা বেঁচে থাকাকালীন অবস্থাতেই ঠাকুর পরিবারে বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। মতুয়া মহাসংঘও দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে। এক ভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বড় মার বড় পুত্র প্রয়াত কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের স্ত্রী তৃণমূল এমপি মমতাবালা ঠাকুর।
অন্য অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শান্তনু ঠাকুর। আসলে রাজনীতিই এই বিরোধের অন্যতম কারণ। বড়মার বড় বধূ মমতা বালা ঠাকুর তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তিনি তৃণমূলের হয়ে এমপিও হয়েছেন। অন্যদিকে বড় মার ছোট পুত্র  মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর এবং তার পুত্র শান্তনু বিজেপির ঘনিষ্ঠ। বাংলাদেশ থেকে চলে আসা মতুয়া সম্পদায়ের কয়েক লাখ মানুষ পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলায় রয়েছেন। ভোট ব্যাংক হিসেবে রাজনৈতিক দলের কাছে এদের গুরুত্ব যথেষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি রাজ্য বিধানসভার আসনের ৫৭টি আসনের এখনো নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে রয়েছে মতুয়ারা। পাশাপাশি লোকসভার ৪২টি আসনের মধ্যে ১০টি আসনেরও নির্ণায়ক শক্তি তারা। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী অনেক দিন ধরেই বড় মার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলেন।
কিছুদিন ধরে বিজেপিও সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। কিছুদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বড়মাকে প্রণাম করতে ঠাকুরনগরের আশ্রমেও গিয়েছিলেন। বড় মার অনুপস্থিতিতে মতুয়া মহাসংঘের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে লড়াই শুরুর আশঙ্কা রয়েছে। কে হবেন নতুন ধর্মগুরু সেটাই নির্ধারণের জটিলতা রয়েছে। তবে বিভ্রান্ত মতুয়াদের একাংশ আর রাজনীতি চাইছেন না।

পাট খাতকে লাভজনক করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পাট ও পাট জাতীয় পণ্যের রপ্তানির জন্য প্রণোদনা সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাট শিল্পকে টেকসই করতে ও এ খাতকে লাভজনক করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় পাট দিবস-২০১৯ এবং বহুমুখী পাটপণ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাট এমন একটি পণ্য যার কিছুই ফেলনা নয়, অতএব কেন এতে লোকসান হবে, আমি কোনো লোকসানের কথা শুনতে চাই না বরং পাটশিল্প কিভাবে লাভজনক হয় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, নতুন পণ্যের উদ্ভাবনার মাধ্যমে আমরা এই খাতকে লাভজনক করতে পারবো। যারা হতাশাপূর্ণ আমি তাদের মধ্যে নেই, আমি সর্বদা আশাবাদী। সরকার সব সময় এই খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা দিয়েছে। তবে আমরা চাই বেসরকারি খাতও এই খাতের প্রতি আরো গুরুত্ব দিক। বেসরকারি খাত এই খাতে যত বেশি গুরুত্ব্ব দেবে পাটশিল্প ততই বিকশিত হবে। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে অন্যান্য খাতে উদ্দীপক সুবিধা দিয়েছে।
পাটখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও এই সুবিধা দেয়া হবে, যাতে তারা আরো বেশি পাটপণ্য রপ্তানি করতে পারে। তিনি বলেন, অন্যান্য রপ্তানিমুখী পণ্য যে ইনসেনটিভ পাচ্ছে, পাটপণ্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ইনসেনটিভ দেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাট পরিবেশবান্ধব ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য একটি আঁশ।
শিল্প বিপ্লবের সময় থেকেই অন্যান্য কৃত্রিম আঁশের স্থান দখল করে পাটের যাত্রা শুরু। পাটের আঁশের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অন্য অনেক আঁশের সঙ্গে মিশ্রণ করে একে ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া, এ আঁশ পচনশীল বিধায় পরিবেশের ক্ষতি করে না। তিনি বলেন, পাট এক সময় আমাদের অর্থনীতির বুনিয়াদ ছিল। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে ছিল পাটের সম্পৃক্ততা। ছয়দফা আন্দোলনের ঘোষণায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে পাটের অবদানের বিষয়টি তুলে ধরেন। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও পাট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৯০ ভাগ আসত পাট খাত থেকে। কিন্তু কিছুটা কৃত্রিম আঁশের আগ্রাসনের ফলে আবার কিছুটা ৭৫-পরবর্তী সরকারগুলোর অব্যবস্থপনার কারণে আমাদের দেশের পাট খাতে মন্দা নেমে এসেছিল। মাঝে কিছুটা সময় পাটের মন্দ সময় গেলেও এখন নতুন করে পাট শিল্পের সুদিন ফিরে আসছে। সারাবিশ্বের মানুষ ক্ষতির দিক বিবেচনায় নিয়ে কৃত্রিম আঁশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার পাটের মতো প্রাকৃতিক আঁশের দিকে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের নজর দিতে হবে।
এ খাতে গবেষণা বাড়াতে হবে। পাটের রপ্তানি বাড়াতে নতুন-নতুন বাজার ধরতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে পাট উৎপাদন ও পাটের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ রক্ষায় আমরা পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০ ও পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বিধিমালা, ২০১৩ প্রণয়ন করেছি। সরকার ইতিমধ্যে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি ও মসলা জাতীয় পণ্যসহ ১৯টি পণ্য মোড়কিকরণে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। এই আইন বাস্তবায়নের ফলে দেশের অভ্যন্তরে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ কোটি পাটের চাহিদা বাড়ার সৃষ্টি হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যকে বহুমুখী করার বিষয়টিকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছি। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রায় ৬৫০ জন বেসরকারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। ওই সকল উদ্যোক্তা প্রায় ২৮০ ধরনের পাটের পণ্য তৈরি, বাজারজাত এবং রপ্তানি করছে।
তিনি বলেন, পাটের সুতা, বস্তা, চট, কার্পেট ইত্যাদি প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি পাট দিয়ে পর্দার কাপড়, কুশন কভার, কার্পেট, শাড়ি ইত্যাদি তৈরি হয়। গরম কাপড় তৈরির জন্য উলের সঙ্গে মিশ্রণ করা যায়। পাট খড়ি থেকে উন্নতমানের কার্বন তৈরি হচ্ছে। পাটের আঁশ থেকে প্রসাধনী, ওষুধ, রং ইত্যাদি তৈরি সম্ভব। বাঁশ এবং কাঠের বিকল্প হিসেবে পার্টিকেল বোর্ড, কাগজের মণ্ড ও কাগজ তৈরিতেও পাট খড়ি ব্যবহৃত হয়। সমপ্রতি পাট থেকে জুট পলিমার তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। যা দিয়ে পলিথিন ব্যাগের বিকল্প ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরি করা হচ্ছে। সোনালি ব্যাগের ব্যবহার দ্রুত প্রসারের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, শিল্পখাত বিবেচনায় পাটশিল্প এখনও বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কাঁচাপাট, প্রচলিত পাটপণ্য এবং বহুমুখী পাটজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রায় ১০২৫.৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২০০৫-০৬ অর্থবছরে পাটখাত হতে রপ্তানি আয় হয়েছিল মাত্র ৪৩০.৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০২ সালে এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজীসহ বেশ কয়েকটি পাটকল বন্ধ করে দিয়েছিল। এতে মিলের প্রায় ২৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বন্ধ পাটকলসমূহ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমরা ৫টি বন্ধ পাটকল চালু করেছি। এর ফলে প্রায় ১০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কৃষি ও শিল্প প্রধানত, এই দুটো খাতের সমন্বয়ে পাট খাত। কৃষকেরা পাট উৎপাদন করে থাকেন আর উৎপাদিত পাট ব্যবহৃত হয় শিল্পখাতে। কাজেই পাট খাতের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য কৃষি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। আমরা ততটুকুই পাট উৎপাদন করবো যতটুকু আমরা ব্যবহার করতে পারবো। এই ব্যবহারের মধ্যে রপ্তানিও থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০২৩-২৪ সাল নাগাদ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। এ সময়ে আমরা মাথাপিছু আয় ২,৭৫০ মার্কিন ডলার এবং রপ্তানি আয় ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি।
এ লক্ষ্য অর্জনে একদিকে প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ, অন্যদিকে আমাদের পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা বহুমুখীকরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পাটজাত পণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমি মনে করি। এজন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আমরা সফলকাম হতে পারবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ে তোলা। আসুন, লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভূমিকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলি।
অনুষ্ঠানে পাট খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি পুরস্কার তুলে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বিআইসিসি চত্বরে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আয়োজন অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মির্জা আজম। মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মিজানুর রহমান স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এবারের পাট দিবসের স্লোগান হচ্ছে সোনালী আঁশের সোনালী দেশ, জাতির পিতার বাংলাদেশ।
আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসা নয়, সাম্য-ভ্রাতৃত্বে ও ঐক্যে বিশ্বাসী: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দলমতনির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আমরা সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং ঐক্যে বিশ্বাসী। এ জন্য আমরা বিভিন্ন সময় জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছি। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার অভিশাপমুক্ত বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। এজন্য আমি দলমতনির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা চাই। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সংসদ অধিবেশনে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর-পর্বে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সাহিদুজ্জামানের প্রশ্নের লিখিত জবাবে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের দৃষ্টিতে দেশের সকল নাগরিক সমান। সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ সবসময়ই জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির ওপর আস্থাশীল। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ জরুরি। আমরা ব্যক্তি হিসেবে বিভিন্ন দল/সংগঠন করতে পারি, আমাদের মতের ভিন্নতাও থাকতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় প্রতিপক্ষ দলকে নিঃশেষ করার অপচেষ্টা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ এবং এর দলের নেতাকর্মীগণ এ ধরনের বৈরী আচরণের শিকার হয়েছেন বার বার। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের দুঃশাসনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের পরদিন থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং সমর্থকগণ চরম নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবেও বারবার হামলার শিকার হয়েছি।
২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আমার এবং আমাদের দলের নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। আমার দলের ২২ নেতাকর্মীসহ সেদিন মোট ২৪ জন নিহত এবং ৫ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন। যারা বেঁচে আছেন শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। শেখ হাসিনা বলেন, গত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ের পর আমরা টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছি। আমাদের দৃষ্টিতে দলমতনির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিক সমান। আমরা সবার জন্য কাজ করবো। গত ২৫শে জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে আমি বলেছিলাম, ‘...এখন আমাদের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের ঐক্যের যোগসূত্র হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাম্য ও ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আমরা দেশের সকল নিবন্ধিত দলের সঙ্গে সংলাপ করেছি। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা সংসদকে সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছি।
সংসদের বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটি গঠন করেছি। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে আমাদের আজকের বাংলাদেশ। ৪২ বছর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় থাকার পর গত বছরের ১৭ই মার্চ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের দুর্নীতি-দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই দেশের অগ্রযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। আবার দুর্নীতিতে নিপতিত হয় দেশ। হাওয়া ভবনের নামে তারেক জিয়া চালাতে থাকে লুটপাট। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকের প্রায় সবগুলোতেই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে থাকে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে আবার দেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়।
বিগত ১০ বছর ধরে এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি যে, পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প নিজেদের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। পদ্মা সেতুসহ আমরা ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। এ ছাড়া আমার নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত ১০টি বিশেষ উদ্যোগও বাস্তবায়ন করছি, যা ‘শেখ হাসিনার ১০ বিশেষ উদ্যোগ’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের এই উন্নয়ন এবং অদম্য অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে। আশির দশকের তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ কাটিয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন বিস্ময় হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত উন্মোচিত হচ্ছে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
সরকার প্রধান বলেন, দ্রুততম সময়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়নে আমাদের সরকারের সক্ষমতা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এটি শুধু আমাদের দাবি নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত সত্য। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বের রোল মডেল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সমৃদ্ধ ও উন্নত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় দুঃখী ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আওয়ামী লীগ সরকারের মূল লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য পূরণে নিরলসভাবে কাজ করতে আমি ও আমার সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

ইরাকে জিজ্ঞাসাবাদে শিশু নির্যাতন: এইচআরডব্লিউ

আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইরাকি শিশুদের ওপর নির্যাতন চালানোর বিষয়টিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া’ বলেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। আজ বুধবার এইচআরডব্লিউয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শিশুদের ‘খুবই ত্রুটিপূর্ণ’ প্রক্রিয়ায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নির্যাতন করে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
কুর্দি আঞ্চলিক সরকারের অধীনে বন্দী থাকা এবং আগে বন্দী ছিল—এমন ২৯ শিশুর সঙ্গে কথা বলেছে এইচআরডব্লিউ। একই সঙ্গে বিচারিক সূত্র, কারারক্ষী ও বন্দীদের আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে তারা।
২০১৭ সালে আইএস প্রতিহত করা হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় ইরাক। তবে এখনো অনেক নারী, পুরুষ, শিশু, এমনকি বিদেশি নাগরিককে আইএসের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত করছে তারা।
এইচআরডব্লিউ তার প্রতিবেদনে বলেছে, ইরাকি কর্তৃপক্ষ ও কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার (কেআরজি) সন্দেহভাজন শিশুদের বিষয়ে যেভাবে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করে, তা খুবই ত্রুটিপূর্ণ। প্রায়ই নির্বিচারে আটক ও অন্যায় বিচার করা হয়। শিশুদের মারধর করা হয়। কথা আদায়ের জন্য ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। এমনকি আত্মীয়, আইনি প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলতে দেওয়া হয় না। নির্যাতনের চোটে জিহাদি দলে অংশগ্রহণ না করেও অনেকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। দেখা গেছে, দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে ক্যাম্প ও চেকপয়েন্ট থেকে অনেক শিশুকে আটক করা হয়।
কেআরজি পুলিশের হাতে বন্দী ১৪ বছরের এক শিশু বলে, ‘তারা আমার পুরো শরীরে প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পেটায়। প্রথমেই তারা বলে, আমাকে স্বীকার করতে হবে আমি আইএসে ছিলাম। আমি বাধ্য হয়ে স্বীকার করি।’
এইচআরডব্লিউ যে শিশুদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই জানায়, তারা আইএসের হয়ে যুদ্ধ করেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কুর্দি আদালতে শিশুদের পক্ষে কোনো আইনজীবী থাকে না। শুনানি ১০ মিনিটের বেশি হয় না। বেশির ভাগ সময় কুর্দি ভাষায় শুনানি হয়। আরবিভাষী ওই শিশুরা যার কিছুই বুঝতে পারে না। বিচার শেষে কেআরজি আদালত শিশুদের ছয় থেকে নয় মাসের কারাদণ্ড দেন। অন্যদিকে, ফেডারেল আদালতে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মান লঙ্ঘন করে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের মধ্যেই তাদের রাখা হয়। এমনকি ছাড়া পাওয়ার পরও এই গ্রেপ্তার–আতঙ্ক, নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ পায় না তারা।
ফেডারেল কারাগারে থাকা ১৭ বছরের এক কিশোর বলে, ‘প্রতিদিনই যেন একটা নির্যাতন। তারা আমাদের প্রতিদিন মারত।’
এইচআরডব্লিউ বলছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত আইএসে জড়িত সন্দেহে প্রায় দেড় হাজার শিশুকে অভিযুক্ত করেছে ইরাকি ও কুর্দি কর্তৃপক্ষ। অন্তত ১৮৫ জন বিদেশিসহ শত শত শিশু ইতিমধ্যেই সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এইচআরডব্লিউ মনে করে, ইরাকের ফেডারেল ও কেআরজি সরকারের এই শিশু গ্রেপ্তার বন্ধ করা উচিত। যদি কেউ হিংস্র কোনো অপরাধে জড়িত থাকে, তখনই কেবল আইনের আওতায় তার বিচার করা উচিত।

বছর না ঘুরতেই পুরোনো চিত্র

বর্ষায় এলাকা জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে গত বছর কাটাসুর খাল খনন করেছিল ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সেই খাল আবার প্রায় আগের মতো হয়ে গেছে। খালের বিভিন্ন অংশ ভরে গেছে ময়লা-আবর্জনায়। গত শনিবার খালটি ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।
খালটির শুরু রায়েরবাজার পুলপাড় এলাকা থেকে। এঁকেবেঁকে খালটি গিয়ে মিশেছে রামচন্দ্রপুর খালের সঙ্গে। প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালে বর্ষায় রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুর এলাকার পানি এসে পড়ে।
স্থানীয় লোকজন জানান, খালটির কারণে বর্ষায় মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকায় পানি জমে না। কিন্তু ভারী বৃষ্টি হলে রায়েরবাজারের পুলপাড় এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিত। এ অবস্থায় গত বছর খালটি পুনঃখনন করে ঢাকা ওয়াসা। খননের পরপর খালের অবস্থা অনেক ভালো ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটি আবার আগের অবস্থায় চলে এসেছে।
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, গত বছর খালটির প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ খনন করা হয়েছিল। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা।
শনিবার খালটি ঘুরে দেখা গেছে, খালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কাটাসুর কাঁচাবাজারের পাশে। এই অংশে খালের ওপর তৈরি সরু কালভার্টগুলোর নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয় না বললেই চলে। কালভার্টের চারপাশজুড়ে জমেছে বারোয়ারি বর্জ্য। এ ছাড়া খালের বিভিন্ন অংশে পয়োনিষ্কাশনের নালা, অবৈধ পানি ও গ্যাসের লাইন দেখা গেছে।
খালটির এই অবস্থার জন্য স্থানীয় লোকজন সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা—দুই সংস্থাকেই দুষছেন। তাঁরা বলেন, খালের দুই পাশে নিম্ন আয়ের মানুষের বাস। তাঁরা গৃহস্থালির সব বর্জ্যই খালে ফেলেন। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এসব বাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের তেমন তৎপরতা নেই। দুই পাশের বাসিন্দারা খাল রক্ষায় সচেতনও নয়। অন্যদিকে খাল রক্ষার দায়িত্বে থাকা ওয়াসারও নিয়মিত কোনো তদারকি নেই। পাশাপাশি এই এলাকায় ওয়াসার পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় আশপাশের বাড়ি থেকে পয়োবর্জ্য ফেলা হয় খালে। এতে খালের পানি নোংরা হয়ে যায়। পানি থেকে আসে কটু গন্ধ।
খালটি ঘুরে দেখা গেছে, খালটির দুই পাড়ের বড় অংশই বাঁধাই করা। খাল রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় লোকজন যাতে খালের পাড় ধরে হাঁটতে পারে, সে জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে খালটির পাড় বাঁধাই করেছিল ওয়াসা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, খালের নোংরা পানি, দুর্গন্ধ, দৃষ্টিকটুভাবে পড়ে থাকা আবর্জনা, দৃশ্যমান পয়োনিষ্কাশনের নালার সংযোগ—এসব কারণে সাধারণ মানুষ পাড় দিয়ে হাঁটতে আগ্রহ দেখায় না। স্থানীয় বাসিন্দা মেফতাহুল জান্নাত বলেন, খালের যে অবস্থা, তাতে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে পাড় ধরে হাঁটা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে একবার তিনি খালের পাড়ে হাঁটতে গিয়েছিলেন। কিন্তু নোংরা পরিবেশ দেখে দ্রুত সেখান থেকে চলে আসেন। তিনি বলেন, খালটি আবর্জনামুক্ত ও খালের সঙ্গে যুক্ত পয়োনালাগুলো বন্ধ করে দিলে খালের পানি ও পরিবেশের উন্নতি হতো। তখন বর্ষায় জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির পাশাপাশি খালের পাড়ে হাঁটাচলারও সুযোগ পেত স্থানীয় লোকজন।
জানতে চাইলে ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) এ কে এম সহিদ উদ্দিন বলেন, ‘কঠিন বর্জ্য তো খালে ফেলার কথা নয়। এটি দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। আমরা সিটি করপোরেশনকে বারবার বলেছি, খালে যাতে বর্জ্য ফেলা না হয়, তা নিশ্চিত করতে। খাল খননের পর বছরজুড়ে সেখানে কঠিন বর্জ্য ফেললে পরের বছর আর খননকাজে আসার কথা নয়।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা (অঞ্চল-৫) মফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘খালে ময়লা না ফেলতে আমরা সব সময় নিরুৎসাহিত করি। ময়লা ফেলার জন্য আমাদের এসটিএস, কনটেইনার আছে। তারপরও অনেকেই খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলে। খালে ফেলা ময়লা ওয়াসাকেই সরাতে হবে। কারণ, খালের মালিক ওয়াসা। এটির রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব ওয়াসার।’
এমন অবস্থায় কীভাবে খাল রক্ষা করা যায়, জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, খাল রক্ষা ও খালের পরিবেশ উন্নয়নে স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা খালে কাউকে ময়লা ফেলতে না দেয় এবং নিজেরাও ময়লা না ফেলে। প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক সংগঠন গড়তে হবে, যারা খাল দেখভাল করবে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে এ দায়িত্ব নিতে হবে। না হলে বছরে একবার খনন করে খাল রক্ষা করা যাবে না।