Showing posts with label মতিউর রহমান চৌধুরী. Show all posts
Showing posts with label মতিউর রহমান চৌধুরী. Show all posts

Sunday, May 11, 2025

ডিবেট পর ডেমোক্রেসি’র অনুষ্ঠানে মতিউর রহমান চৌধুরী: ভূ-রাজনীতির খেলায় যেন আমরা পা না দেই

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বিষয়ে বাংলাদেশকে আরও বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। বলেছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো হচ্ছে, এটা হোক। এ নিয়ে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আমাদের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভূ-রাজনীতিতে একটা খেলা চলছে। আমরা যেন মনের অজান্তে সেই খেলায় পা না দেই। শনিবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণ বিষয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি অয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) অনুষ্ঠিত ওই আয়োজনে বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব ঠেকাতে করণীয় নির্ধারণে ঢাকায় একটি সর্বদলীয় বৈঠকের আহ্বান করতে অন্তর্বর্তী সরকারে প্রতি প্রস্তাব রাখেন। বলেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বেশিদিন চললে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে আমাদের রাজনীতিতে, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমি আহ্বান জানাই প্রফেসর ইউনূসের প্রতি, তিনি যেন সব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন।

মতিউর রহমান চৌধুরী আরও বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমেই দেখেছি যে, ভারতে সামনে দুটো নির্বাচন আছে। বিহার ও পশ্চিববঙ্গে। রাজনৈতিক দিক থেকে ওই দুটি নির্বাচন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য চ্যালেঞ্জ। এই যুদ্ধ পাকিস্তানকেও রক্ষা করতে পারে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কিন্তু নির্বাচিত নন। ইমরান খান এখন জেলে। তার এই যুদ্ধের মধ্যদিয়ে ইমরান খানের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও ফয়সালা হয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী সামনের কাতারে চলে আসছে। পাকিস্তানের জনগণ এখন কী বলবে? তারা বলবে, দেশরক্ষা করেছে আমাদের সেনাবাহিনী। সেজন্য দুইদিকেই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। রাজনীতি বাদ দিয়ে ঐতিহাসিক কারণ লেখা যাবে না। আর ইতিহাস লিখতে হলে রাজনীতি থাকবে। পুশ ইন চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুশ ইনকে বাধা দিতে গিয়ে আমরা এমন কোনো কাণ্ড না ঘটাই যেটা সামাল দিতে পারবো না।

যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি খানিকটা টালমাটাল উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেয়ারবাজার কলাপস্‌ করেছে। আমদানিতে বিরাট চাপ। আমাদের সামনে একটা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এমনিতেই আছে। আরেকটা তৈরি হতে যাচ্ছে। ইস্টার্ন ফ্রন্টে কিন্তু যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এখানে চীন একটা ফ্যাক্টর। ‘সাতকন্যা’র দিকে কিন্তু চীনের নজর রয়েছে। ভূ-রাজনীতিতে এটার প্রভাব অনেক থাকবে। এটাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কাশ্মীরকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাশ্মীর না থাকলে পাকিস্তানের নেতৃত্ব এবং ভারতের নেতৃত্বের ফয়সালা হবে না। ’৪৭-এ ভাগ হয়েছে, তারপরও কেন বিরোধ? সরকার বদলায় এই যুদ্ধের কারণে। আগামীতেও তাই হবে। মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ভুয়া সংবাদের কারণে যেকোনো সময়, যেকোনো সিদ্ধান্তে আমাদের মধ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভুয়া খবর থেকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজনৈতিক যারা সিদ্ধান্ত নেন, তাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। দল নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত। তারা এখন পর্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। কিন্তু জাতিকে টাইম টু টাইম জানাতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে। এরমধ্যেই আমাদের খুব বেশি সতর্ক থাকতে হবে- আমাদের কথা বলা, আচার-আচরণ থেকে সব কিছুতে। যাতে আমাদের গায়ে কোনো আঁচড় না লাগে। যে আঁচড় থেকে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমার-আপনার একটা বক্তব্য কিন্তু দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, হঠাৎ করে আমরা পাকিস্তানের দিকে নজর দিচ্ছি, সম্পর্ক গড়ছি। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, ভারত আমাদেরকে বৈরী মনে করে। প্রতিপক্ষ মনে করে। ভারতের সঙ্গেও আমরা সুসম্পর্ক চাই। পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক চাই। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের দেনা-পাওনার বিষয়টিও আসছে। ভারতের অনেক সিদ্ধান্ত আমরা অপছন্দ করি। কিন্তু লক্ষণীয়- ভারতের যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে সব রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি কথা বলেছেন। তার আগের ঘটনা হচ্ছে কংগ্রেস বলেছে, তিনদিন আগেই অর্থাৎ ১৯শে এপ্রিল তিনি জানতেন, পহেলগামে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে।

নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না, সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দিয়ে দিচ্ছি সেনাবাহিনীর ওপর। এটা কি আসল কথা? না এটা আসল কথা না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া সেনাবাহিনী যুদ্ধ শুরু করে না। বক্তব্যের পর মানবজমিন প্রধান সম্পাদক বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর দেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটকে আপনি কীভাবে দেখেন? তিনি বলেন, টানাপোড়েন চলছে। দুই দেশের মধ্যে শব্দের লড়াই হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়নি, বাণিজ্য আছে। ভারত বরাবরই একঝুড়িতে আম রাখার চেষ্টা করেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া তারা বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাননি। সম্পর্ক রেখেছে, কিন্তু যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে সেটা কমাতে তারা চেষ্টা করেনি। তিনি বলেন, আমরা জানি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। এটা ১৯৭১ সাল থেকে। এই সম্পর্ক বজায় থাকুক, এতে আপত্তি নেই। কিন্তু ভারত এমন আচরণ করছে যেন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো পার্টিকে নেই। এটা ঠিক হয়নি। এখন তাদের নিশ্চই উপলব্ধি হয়েছে বা হবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এতটা খারাপ নয় উল্লেখ তিনি বলেন, তাহলে কিন্তু তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্বীকার করতো না। নরেন্দ্র মোদি-প্রফেসর ইউনূসের মধ্যে বৈঠক হতো না। সম্পর্ক আছে, তিক্ততা আছে। এই সম্পর্কের উন্নতি হওয়া উচিত অবিলম্বে। সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ৬ই মে মধ্যরাতে পাকিস্তানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যে সকল মসজিদ ধ্বংস হয়েছে সেই সব মসজিদেই ঐদিন পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ব্ল্যাক আউটের মধ্যেই সংহতি প্রকাশের জন্য ফজরের ওয়াক্তে একত্রিত হয়েছিল পুরো এলাকার বাসিন্দারা।

এই পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে কোনো উস্কানিতেই মুসলিম-হিন্দুর যুদ্ধ হিসেবে বিদ্বেষ ছড়ানো যাবে না। তবে বিজিপি সরকার কর্তৃক ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করে ভারতীয় মুসলমানদের স্বস্তি প্রদান করা উচিত। তাই এই দুই দেশে অবস্থানকারী মুসলমান ও হিন্দুরা যার যার অবস্থান থেকে ধর্মীয় উত্তেজনা পরিহার করে এই যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করা উচিত। তা না হলে বিশ্ব এই দুই পারমাণবিক শক্তির সংঘাতের ভার বইতে পারবে না। ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মূল কারণ রাজনৈতিক নয় ঐতিহাসিক’ শীর্ষক ছায়া সংসদে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের বিতার্কিকগণ অংশগ্রহণ করেন। এতে জয়লাভ করেন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের বিতার্কিকরা। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন সাংবাদিক মিজানুর রহমান, সাংবাদিক মাঈনুল আলম, ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, সাংবাদিক এ কে এম মঈনুদ্দিন, কবি ও সাংবাদিক জাহানারা পারভিন। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলকে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়।

mzamin

Wednesday, April 30, 2025

দাউদ আমার বন্ধু by মতিউর রহমান চৌধুরী

চলে গেল দাউদ। বলছি- কবি-সাহিত্যিক দাউদ হায়দারের কথা। আমার ৫৪ বছরের বন্ধু। প্রায় কাছাকাছি সময়ে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম। পাতা উল্টালে জন্ম তারিখও দূরে নয়। দাউদ সংবাদে, আমি বাংলার বাণী হয়ে পূর্বদেশে। দাউদ মারা গেল প্রবাসে। ইচ্ছা ছিল বাকি জীবনটা দেশে কাটাতে। তার শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়নি। রাষ্ট্র নামক যন্ত্র তাকে সে সুযোগ দেয়নি। একটি কবিতার জন্য ৫১ বছর নির্বাসনে। এটা বোধ করি ইতিহাসে বিরল। একটি কবিতা লিখেছিল দৈনিক সংবাদে। ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। বঙ্গবন্ধুর প্রশাসন ঝুঁকি না নিয়ে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। তের বছর কেটেছে ভারতে। বাকি জীবন জার্মানিতে। কবি হিসেবে তার নাম-ডাক ছিল। আড্ডাবাজ দাউদ কথা বলতো জমিয়ে। কখনো কারও মুখের দিকে তাকিয়ে নয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! নীরবে-নিভৃতে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেল। দাউদ আমার পরম বন্ধু। প্রেস ক্লাবের আড্ডায় মাঝেমধ্যেই মতপার্থক্য প্রকট হতো। কিন্তু ঝগড়ায় রূপ নেয়নি কখনো। তার সঙ্গে আসলেই আমার  মতের কোনো মিল ছিল না। বিস্তর ফারাক ছিল তার নীতি-আদর্শের প্রতি। ধর্ম নিয়ে লেখার কারণেই নির্বাসনে যেতে হয়েছিল তাকে। বিশ্বাস করুন, কোনোদিন কোনো আড্ডায় তার সঙ্গে ধর্ম নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। এটা তার ব্যক্তিগত মত। সংবাদ কর্তৃপক্ষ কবিতাটি প্রত্যাহার করেছিলেন। সে নিজেও দুঃখ প্রকাশ করেছিল। ৫১ বছরে বাংলাদেশে অনেক সরকার এসেছে। পরিণতি সবার জানা। দাউদ যখন দেশ ছাড়ে তখন ছিল তার পছন্দের সরকার। মাঝখানে বৈরী। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন সরকার এলো তখন একদিন ফোন করে বললো, এবার মনে হয় আমার দেশে ফেরা হবে। কিন্তু এবারো নিয়তি তার পক্ষে নয়। হাসিনার সরকার তাকে জানিয়ে দিলো-ফেরানো সম্ভব নয়। ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল দাউদ। বলেছিল, আসলে ওদের চরিত্র একই। কলকাতা থাকাকালীন তিনবার তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাসায়। তখন আমি কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় কাজ করতাম।  অন্নদাশঙ্কর ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক। দাউদকে পছন্দ করতেন। ছেলের মতো দেখতেন। একদিন আমাদের কলকাতা প্রতিনিধি পরিতোষ পালকে নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাসায় আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম। সে আড্ডায় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন। বাইরে থেকে শুধু দাউদের কণ্ঠই শুনছিলাম। যেকোনো আড্ডা সে মাতিয়ে রাখতো। বার্লিনেও দেখা হয়েছে তিনবার। বিশ্বকাপ ফুটবল কাভার করতে গিয়েছিলাম জার্মানিতে। খবর পেয়ে আগেই বলে রেখেছিল- এবার কিন্তু আমার বাসায় আসবি। আমার হাতেগোনা তিন-চারটা বন্ধু আছে যাদের সঙ্গে তুই-তুই সম্পর্ক। দাউদ এর মধ্যে অন্যতম। কৌতূহল থাকবে বাকিরা কারা। শফিক করিম সাবু, আশরাফ খান ও কলকাতার জয়ন্ত চক্রবর্তী। আমি অনেকের সঙ্গেই তুমি বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। এ নিয়ে আমার স্ত্রী সবসময় বলে, তোমার ছেলের সমান বয়স যাদের তাদেরকেও আপনি বলো কেন? এই প্রশ্নে আমার জবাব নেই। যাই হোক, দাউদের বাসায় যেতে হলো। নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছিল। গল্প করতে করতেই রাত বাজে ৪টা। পরদিন আর্জেন্টিনার খেলা। কী আর করবো। হোটেলে ফিরলাম না। রাতটা কাটিয়ে দিলাম ওর বাসায়। আরেকবার দেখা হলো প্রফেসর ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা সম্মেলনে। সেবার সে আমার হোটেলে এসেছিল। একসঙ্গে খেয়েছিলাম বাইরে। আরেকবার দেখা হয় ডয়চে ভেলেতে। সে তখন ডয়চে ভেলেতে কাজ করে। তাকে নিয়ে কতো কিছুই না লেখা যায়! চার/পাঁচ বছর আগে এক সন্ধ্যায় অফিসে বসে আছি। এমন সময় চলিশোর্ধ্ব এক মহিলা এসে হাজির। পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি শুনেছি দাউদ হায়দার আপনার বন্ধু। জানেন আমি তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করলাম। বললাম, এক মহিলা তোকে বিয়ে করতে চান। অট্টহাসি, কতো মেয়েই তো আমাকে বিয়ে করতে চায়। এটা সেরকমই। ভদ্র মহিলাকে বললাম, আপনি দাউদের সঙ্গেই কথা বলুন। সপ্তাহে দাউদের সঙ্গে আমার একদিন-দু’দিন ফোনে কথা হতো। ঈদসংখ্যা এলেই তাকে স্মরণ করতো কাজল ঘোষ। বহু লেখা তার ছাপা হয়েছে আমাদের কাগজে। যখন তার কোনো লেখা ঢাকার কাগজে ছাপা হতো না তখন আমরা ছেপেছি। শুধু বন্ধুত্বের টানে নয়, লেখার মানে। চমৎকার লিখতো সে। ভাষার প্রতি প্রচণ্ড দখল ছিল। হাসপাতালে অনেকদিন নির্বাক ছিল। ভাবা যায় যে মানুষটি যেকোনো আড্ডার মধ্যমণি সে মানুষটি কাউকে কিছু না বলেই চলে গেল! এটাই কি নিয়তি! আমাদের কলকাতার আরেক বন্ধু রুপায়ণ ভট্টাচার্য এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছে- একটি কবিতার জন্য আজীবন নির্বাসনে যায় যে কবি, সার্থক তার কবিজন্ম। আর একটি কবিতা লিখে যে দেখে না জন্মভূমি তার মতো হতভাগ্য কে রয়েছে! কোথায় তার মৃত্যুস্থল বার্লিন, কোথায় জন্মস্থান পাবনার দোহারপাড়া!
mzamin

Tuesday, January 14, 2025

সাংবাদিকতা আমার নেশা, পেশা by মতিউর রহমান চৌধুরী

সাংবাদিকতা আমার নেশা, পেশা। মিথ্যার কাছে কখনো নিজেকে বিক্রি করে দেইনি। গোটা পরিবার প্রবাসী। প্রচণ্ড চাপ ছিল পরিবার থেকে প্রবাসী হওয়ার। কিন্তু মায়ের ইচ্ছায় ৫২ বছর আগে সাংবাদিকতার নেশাকে পেশা হিসেবেই বেছে নিয়েছিলাম। আপসের চোরাগলিতে হাঁটার অনেক সুযোগ এবং অফার এসেছিল। বিনীতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছি।  দীর্ঘসময় ধরে আমাকে এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ সকালে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার সময় পাক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে যাই। বেঁচে আছি- এটা এক বিস্ময়কর ঘটনা। যুদ্ধ শেষে শেখ ফজলুল হক মণির নির্দেশে সাংবাদিকতায় এসে প্রথমেই ধাক্কা খেলাম । ১৯৭৪ সন,  আমি তখন বাংলার বাণীর রিপোর্টার। ১৭ই মার্চ জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাও করলো। সে রিপোর্ট লেখার কারণে ১৮ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর কেউই আমাকে চাকরি দিতে চাচ্ছিলেন না।

যাইহোক, কিছুদিন পর পূর্বদেশের তৎকালীন সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী আমাকে চাকরি দেন। সেটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। চারটি পত্রিকা রেখে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাকে গেজেটেড সরকারি চাকরিরও অফার করা হয়। কিন্তু সে চাকরিতে আমি যোগ দেইনি। সুইডেন চলে যাব এমনটাই স্থির হয়েছিল। এর মধ্যে পরিবর্তন আসে দেশে। ১৫ই আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের নতুন যাত্রা শুরু হয়। ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ ঘটে দৈনিক দেশবাংলার। সেখানে যোগ দেই। কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব দেয়া হয়। অল্পদিনের মধ্যেই দৈনিক সংবাদে চাকরি হয়ে যায়। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় জিয়াউর রহমান। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় মন্ত্রীরা ঘুষ খাবেন না, তথ্য পাচার করবেন না। কোরআন শরীফ ছুঁয়ে তারা শপথ নেন। এই খবরটা আমার কাছে এসেছিল বিভিন্ন সূত্র থেকে।  ইত্তেফাকের সহকর্মী আলমগীর হোসেনের সহায়তায় খবরটির চূড়ান্ত সত্যতা যাচাই করার পর লিখে দেই।  ব্যানার হেডিং হয়ে যায়। পরদিন হুলস্থূল। জিয়াউর রহমানের প্রেস উপদেষ্টা দাউদ খান মজলিস ডেকে পাঠান বঙ্গভবনে। খবরের সূত্র জানতে চান। এটা বলি কী করে! একমাত্র সম্পাদক ছাড়া আর কারও কাছে সূত্র বলার সুযোগ নেই। এটাই সাংবাদিকতার শপথ। উত্তেজিত দাউদ খান মজলিস ফোন করলেন সংবাদের সম্পাদক আহমেদুল কবিরের কাছে। বললেন, তোমার রিপোর্টার তো আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে। ফিরে এলাম প্রেস ক্লাবে। এরপর সচিবালয়ে ঢুকতেই নিরাপত্তারক্ষী বাধা দিলেন। বললেন, আপনার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হয়ে গেছে। দুপুরের পর অফিসে যেতেই বলা হলো, কবির সাহেব রেগেমেগে অস্থির, দেখা করতে বলেছেন। সম্পাদক আহমেদুল কবির তখন কথা বলছিলেন বার্তা বিভাগের দায়িত্বরত প্রয়াত বজলুর রহমানের সঙ্গে। তিনিই আমার রিপোর্টটি খুব যত্ন সহকারে ছেপেছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল আমি আর যাই করি ভুল রিপোর্ট দেবো না। কবির সাহেব সূত্র জানতে চাইলেন না। বললেন, ওরা তো খবরের সত্যতা অস্বীকার করছে না। তারা শুধু জানতে চাচ্ছে কে খবরটা লিক করেছে। বজলু ভাই তখন আমাকে সমর্থন করলেন। বললেন, ওর দোষ কোথায়। ও তো ঠিকই লিখেছে। কোরআন শরীফ ছুঁয়ে যদি কেউ শপথ ভঙ্গ করে তাহলে এই সমস্যা আমাদের নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি এখানেই হলো না। তিন দফা এসবি অফিসে যেতে হয়েছিল। সংবাদে থাকাকালে বাংলাদেশ চীন থেকে অস্ত্র কিনছে এই রিপোর্ট প্রকাশের পর সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ কয়েকঘণ্টার জন্য আটক রাখে আমাকে। বাতিল হয় অ্যাক্রিডিটেশন। জেনারেল আমসা আমিন ছিলেন দায়িত্বে। বারবার একই প্রশ্ন। কে দিয়েছে আপনাকে এই খবর। বলা চলে, এই সব  রিপোর্টই আমার জন্য ইত্তেফাকের দরজা খুলে দেয়।

ইত্তেফাকের তখন স্বর্ণযুগ। এক দুপুরে ডাক পেলাম সেখান থেকে। ইত্তেফাক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দেখা করতে বলেছেন। এক সাক্ষাতেই চাকরি হয়ে গেল। কূটনৈতিক রিপোর্টারের দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। সে দিনগুলো ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। বহুবার ডিজিএফআই আর এসবি অফিসে যেতে হয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় ইভেন্ট কাভার করার সুযোগ হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে অংশ নেয়ার বিরল সুযোগও আসে। এমনকি বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক ছিলাম। আর এসবের জন্য আজও কৃতজ্ঞতা জানাই সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাছে। বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে ইত্তেফাককে আরও সমৃদ্ধ করেন। পরে যোগ দেন রাজনীতিতে।  মন্ত্রীও হন। সে নিয়ে অবশ্য তখনই লিখিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, একজন সম্পাদক যেখানে মন্ত্রী, এমপি বানান তার কেন মন্ত্রী হতে হবে! যাইহোক, এটা অন্য বিতর্ক। ইত্তেফাকে থাকাকালে নিয়মিতভাবে কলাম লিখতাম সাপ্তাহিক খবরের কাগজে। তখন উপসাগরীয় যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ কাভার করার জন্য সৌদি আরব যাওয়ার  প্রস্তুতিপর্বে দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। তখন এরশাদের জমানা। লেখাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। আমার গাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিয়ে গিয়ে ব্রিজের ওপর থেকে ফেলে দেয়া হয়। মামলা গড়ায় আদালতে।

তৃতীয়মাত্রা-খ্যাত সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের বিরামহীন তাগিদের প্রেক্ষিতে লেখাটা জমা দিয়ে প্লেনে চড়েছিলাম। তারপর তো অনেক কিছু ঘটে যায় দেশে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। হুলিয়া জারি করা হয় আমার বিরুদ্ধে। আবারো বাতিল করা হয় আমার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। প্রধান বিচারপতি তখন সাহাবুদ্দীন আহমদ। তার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ থেকেই ঐতিহাসিক রায় আসে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজের প্রকাশনা ফের চালু হয়। আজ সংবাদমাধ্যম যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছে মূলত বিচারপতি সাহাবুদ্দীনেরই অবদান।  অথচ, তার কথা আমরা কেউই স্মরণ করি না। এখানে বলে রাখা ভালো, দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য লেখার কারণে আমাকে ১৭ ঘণ্টা আটক রাখা হয়েছিল। ইত্তেফাক ছাড়লাম। যোগ দিলাম আজকের কাগজে। অল্পদিন পরেই ছাড়তে হলো মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধের কারণে। পরের ইতিহাস নিজের পায়ে দাঁড়ানো। পারিবারিক সঞ্চয় আর স্ত্রীর বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া অর্থ খুইয়ে বাংলাবাজার পত্রিকা ছেড়ে দিতে হলো। বাংলাবাজারে থাকা অবস্থায় জেলে যেতে হলো। রয়টার্সের সাবেক ব্যুরো প্রধান সিরাজুল ইসলাম কাদিরের একটি রিপোর্ট প্রকাশের কারণেই খালেদা জিয়ার প্রশাসন আমাকে অফিস থেকে গ্রেপ্তার করে। নতুন যাত্রা শুরু হলো মানবজমিন-এ। যত ঝামেলা এখানেই। একটি ক্যাসেট কেলেঙ্কারির রিপোর্ট প্রকাশের জন্য মামলা হলো আদালতে। তখন সাহাবুদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ হাসিনা তখন প্রধানমন্ত্রী। আদালত অবমাননার মামলায় প্রমাণ চেয়ে নির্দেশনা এলো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। এক্ষেত্রে মানবজমিনই ব্যতিক্রম। হাজির করলাম ক্যাসেট। যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিচারপতি লতিফুর রহমান কথা বলছিলেন টেলিফোনে একটি নির্দিষ্ট মামলা নিয়ে। প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ আমার পথে দাঁড়ালেন। যেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ছিল। বিচারপতি পদত্যাগ করলেন। মামলায় আমার এক মাস জেল হলো। সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরীর একদিন। আর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছয় মাস। মামলাটি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। মাঝখানে বিরতি। আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় শেখ হাসিনা। মানবজমিন-এ তার বিরক্তি ছিল প্রচণ্ড। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিলেন। দেশ ছাড়তে বাধ্য হলাম। টানা আট মাস বিদেশে থাকতে হলো। দীর্ঘ সময় অ্যাক্রিডিটেশন পেলাম না। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। ভয়েস অফ আমেরিকা থেকে সরানোর জন্য লবিং করলো হাসিনার প্রশাসন। ২৮ বছর পর ছাড়তে হলো ভয়েস অফ আমেরিকা। কূটনৈতিক পার্টিগুলোতেও এজেন্সির লোকেরা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতো। হাসিনার পতনের তিনদিন আগে ২রা আগস্ট আবার দেশ ছাড়তে হলো আমাকে।

এগুলো সংক্ষিপ্ত বয়ান। তবে,  এখানে দু’টি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর আত্মগোপন এবং গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি খবর। দীর্ঘ ১১ বছর আত্মগোপনে ছিলেন হারিছ চৌধুরী। করোনায় তার মৃত্যু হয়। দাফন করা হয় সাভারে। কিন্তু খবরটি মামুলি কোনো খবর নয়। ১১ বছর ধরে ঢাকার পান্থপথে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান নামে গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু মানবজমিন-এর অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ব্যক্তিই হারিছ চৌধুরী। ২০২২ সনের ৬ই মার্চ আমার এই অনুসন্ধানী রিপোর্টটি প্রকাশের পর চারদিকে হইচই পড়ে যায়। সকল সংবাদমাধ্যম খবরটি লুফে নেয়। জানতে চাওয়া হয় ইন্টারপোল থেকেও। কিন্তু গোয়েন্দারা বরাবরের মতোই অস্বীকার করেন। বলেন, খবরের কোনো সত্যতা নেই, মানবজমিনকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানবজমিন দুঃখ প্রকাশ করেনি। বিষয়টি গড়ায় আদালতে। হারিছ চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা তানজীন চৌধুরীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় মাহমুদুর রহমান নয়, হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন।

পরের খবরটি রীতিমতো চাঞ্চল্যকর। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তখন বলা হয় তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। সেই আলোচিত পদত্যাগপত্রের অনুসন্ধান করতে গিয়েই পাওয়া গেল অবিশ্বাস্য এক খবর। পদত্যাগপত্র নেই কোথাও। এর কারণ কী? তিনি কি পদত্যাগ করেননি? প্রেসিডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দিয়ে যাননি। খবরটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় সরকারি মহলে। রাজনৈতিক নেতারাও উষ্মা প্রকাশ করেন। সপ্তাহখানেক ধরে  মিডিয়াজুড়েই ছিল এই খবরটি। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও খবরটি ঘিরে নানা বিশ্লেষণমূলক রিপোর্ট প্রচার হতে থাকে। প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে চাপ দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি থেমে যায় নানা রাজনৈতিক ইকুয়েশনে।

(হবিগঞ্জ প্রেসক্লাব-এর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে  প্রকাশিত ‘অন্তরালের মুখ’ স্মরণিকা থেকে)

mzamin

Sunday, October 20, 2024

উনি তো কিছুই বলে গেলেন না... by মতিউর রহমান চৌধুরী

ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন কি করেন নি এই নিয়ে বিতর্ক এখনো জারি রয়েছে। হয়তো অনেক দিন থাকবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় একাধিকবার দাবি করেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেননি। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান মিডিয়ার সামনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের খবর জানিয়েছিলেন।

প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রী যদি পদত্যাগ করে থাকেন তাহলে সেটা গেল কোথায়? কারও কাছে এই প্রশ্নের জবাব নেই। তিন সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছি। খোঁজ নিয়েছি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও। যেখানটায় প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র থাকার কথা। কোথাও নেই। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের মুখোমুখি হলাম। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন।

শেখ হাসিনার জমানায় বঙ্গভবন ছিল আমার জন্য নিষিদ্ধ। স্যার, আপনি কেমন আছেন? ভাই, আপনি আমাকে স্যার বলবেন না। আমরা তো দু’জনই একসঙ্গে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম। আমি পাবনায় আর আপনি ঢাকায়। বাংলার বাণীতে দু’জনই কাজ করেছি। পুরনো স্মৃতি স্মরণ করে আবেগ জায়গা করে নিলো অনেকক্ষণ। স্বাভাবিক হতেই প্রশ্ন করলাম আপনার কাছে কি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্রটা আছে? আমি শুনেছি তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু আমার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। বহু চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হয়েছি। তিনি হয়তো সময় পাননি। ৫ই আগস্ট সকাল সাড়ে দশটায় বঙ্গভবনে ফোন এলো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে। বলা হলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন মহামান্য প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। এটা শুনেই প্রস্তুতি শুরু হলো বঙ্গভবনে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফোন এলো তিনি আসছেন না।

প্রেসিডেন্ট বললেন, চারদিকে অস্থিরতার খবর। কী হতে যাচ্ছে জানি না। আমি তো গুজবের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারি না। তাই সামরিক সচিব জেনারেল আদিলকে বললাম খোঁজ নিতে। তার কাছেও কোনো খবর নেই। আমরা অপেক্ষা করছি। টেলিভিশনের স্ক্রলও দেখছি। কোথাও কোনো খবর নেই। এক পর্যায়ে শুনলাম, তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আমাকে কিছুই বলে গেলেন না। যা সত্য তাই আপনাকে বললাম। যাই হোক, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার যখন বঙ্গভবনে এলেন তখন জানার চেষ্টা করেছি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন কি না? একই জবাব। শুনেছি তিনি পদত্যাগ করেছেন। মনে হয় সে সময় পাননি জানানোর। সব কিছু যখন নিয়ন্ত্রণে এলো তখন একদিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এলেন পদত্যাগপত্রের কপি সংগ্রহ করতে। তাকে বললাম, আমিও খুঁজছি। এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট বললেন, এ নিয়ে আর বিতর্কের কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী চলে গেছেন এটাই সত্য। তারপরও কখনো যাতে এ প্রশ্ন না উঠে সে জন্য সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়েছি।

প্রেসিডেন্টের পাঠানো রেফারেন্সের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ৮ই আগস্ট এ সম্পর্কে তাদের মতামত দেন। এতে বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতে এবং নির্বাহী কার্যক্রম সুন্দরভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলীকে শপথবাক্য পাঠ করাতে পারবেন বলে আপিল বিভাগ মতামত দেন।

এর আগে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি অবস্থান করছেন। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ভারত সরকার তাকে ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট দিয়েছে। তা দিয়ে তিনি অন্য কোনো দেশে যেতে পারবেন। যদিও তার রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত তাকে নিরাপত্তাজনিত কারণে আশ্রয় দিতে রাজি হচ্ছে না। কাতার ও সৌদি আরব আগেই অপারগতা জানিয়েছে। শুরুতে বেলারুশের কথা বলা হয়েছিল। কি কারণে সেটা হয়নি তা এখনো অজানা।

হাসিনাকে যে কথা বলতে দেয়া হয়নি
পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণ দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছিলেন- দীর্ঘ নয়, অল্প সময় কথা বলবেন তিনি। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি এবং সেনাপ্রধানের অনাগ্রহে সে সুযোগ পাননি শেখ হাসিনা। তখন তাকে বলা হয়, চারদিকে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। সবাই মারমুখো। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা গণভবনে পৌঁছে যেতে পারে। তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাকে সে সুযোগ দেয়া যাবে না। হাসিনা বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। বক্তৃতার একটি খসড়া তৈরি করেছিলেন তিনি। নানা সূত্রে জানা যায়, এতে তিনি বলতে চেয়েছিলেন- তার ইচ্ছায় নয়, বলপূর্বক তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। কারা এবং কোন বিদেশি শক্তি তার সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছে এটাও তিনি দেশবাসীকে জানাতে চেয়েছিলেন। তাঁর শাসনকালে দেশের কি কি উন্নয়ন হয়েছে তারও বয়ান ছিল। সকাল থেকে দুপুর, এ সময় নানাভাবে দরকষাকষিও চলছিল। বারবার ফোন আসছিল নয়াদিল্লি থেকে। বলা হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঢাকার তরফে দিল্লিকে বলা হয়েছিল- তারা যেন বিমান পাঠিয়ে হাসিনাকে নিয়ে যান। সে অনুরোধে সাড়া দেয়নি দিল্লি। এরপর বাংলাদেশের স্ব-উদ্যোগে বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০ বিমানে তাকে দিল্লি পাঠানো হয়। হাসিনাকে বহনকারী বিমানে আরও দু’জন ছিলেন। তার ছোটবোন শেখ রেহানা ও নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

উনি তো কিছুই বলে গেলেন না...

Wednesday, October 16, 2024

সরকার কি তাহলে প্রতিবিপ্লবের মুখোমুখি? by মতিউর রহমান চৌধুরী

বিপ্লবের ছায়াসঙ্গী হচ্ছে প্রতিবিপ্লব। যেখানেই বিপ্লব সেখানেই প্রতিবিপ্লবের আলামত। কোথাও সফল হয়। কোথাও ব্যর্থ। বাংলাদেশের বিপ্লব নিয়েও দেশে-বিদেশে আলোচনা এখন তুঙ্গে। নানামুখী প্রচারণা। নানা ছক তো আছেই। সরকারের ভেতরেও একটি মহল প্রতিবিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে। যদিও এর আগে অনেকগুলো পরিকল্পনা বা ছক ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু পরাজিতরা বসে নেই। তারা বিজয়ের হাসি হাসতে চায়। তাই বলছে, ক’দিন যায় দেখুন! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন টানটান উত্তেজনা। বলা হচ্ছে, প্রতিবিপ্লব এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অবাধ স্বাধীনতার যুগে এমনটাই স্বাভাবিক। ফিলিপাইনেও বিপ্লবের পর এমনটা ঘটেছিল। সরকারি মহল কি তাহলে চিন্তিত? প্রশ্ন রেখেছিলাম সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে। বললেন, এটা নতুন কোনো খবর নয়। আমরা সবাই জানি এবং দেখছি। নানাভাবে সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। আপনি কি তাহলে চিন্তিত? জবাব দিলেন সোজাসাপটা। বললেন, চোখ-কান খোলা রেখেছি। যা ব্যবস্থা নেয়ার নিচ্ছি। বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব কি তাহলে অবশ্যম্ভাবী! ইতিহাস তো তাই বলে। আমরা আমাদের কাজ করছি। কিছু ভুল-ত্রুটি তো আছেই। এটা দূর করে আমরা গন্তব্যে যেতে চাই। সে গন্তব্য কোথায়? এই প্রশ্ন কেন? আমরা তো বলেছি সংস্কার এবং নির্বাচন, আমরা দুটোই চাই। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে আমরা থাকতে চাই না। আমার তো সব কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। তুমি তো জানো আমি স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখাই। এখন তো আমি আর কোনো স্বপ্নও দেখতে পারি না। যেখানে ছিলাম আমি একজন মুক্ত মানুষ।

এখানে কি আপনি মুক্ত নন? মুক্ত কিনা জানি না, তবে ফাইলে বন্দি। এন্তার ফাইল আমাকে সই করতে হয় প্রতিদিন। অন্যকাজে সময় দিতে পারছি কম- এটা সত্য। বাস্তব সত্য।

সব ফাইল কি পড়তে হয়? সব ফাইল পড়তে হয় না। কিন্তু সই করতে হয়। দুনিয়ায় ফাইল উঠে যাচ্ছে, সবই ডিজিটাল। আমরা এখনো ‘লাল ফিতায় বন্দি’। এই অবস্থার অবসান কবে হবে।

স্যার, সুযোগ যখন পেলাম তখন জানতে ইচ্ছা করে আপনার উপদেষ্টামণ্ডলী কেমন করছেন? পাল্টা প্রশ্ন- তোমার কী ধারণা? আমার ধারণা এখানে মুখ্য নয়, মানুষ কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বললেন, ভালো-মন্দ সবই আছে। কেউ দুর্বল, কেউ সবল। আমি তাদের কাজ দেখছি, মানুষও দেখছে। একটা জায়গায় পৌঁছে তো আমাকে নম্বর দিতে হবে। সেটার কাজ এখন চলছে। মানুষ চেয়ে আছে আমাদের দিকে। আমরা কী পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিলাম এটা তো অজানা নয়। চারদিকে তো অস্থিরতা। মানুষ তো স্বস্তি চায়। নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে- তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়। আর এখানেই শেষ হয়ে গেল ষাট মিনিটের আলোচনা।

mzamin

Tuesday, October 8, 2024

শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবেন হাসিনা by মতিউর রহমান চৌধুরী

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন কী করবেন? দলের দায়িত্ব কাকে দেবেন? তিনিই বা যাবেন কোথায়? এ নিয়ে তিনি মনস্থির করতে পারছেন না। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে ভারতে পালিয়ে যান। এখনো তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। দুবাই চলে যাচ্ছেন- এমনটা চাউর হয়ে আছে ক’দিন থেকে। বিশেষ করে মানবজমিনে রিপোর্ট প্রকাশের পর। মানবজমিন আন্তর্জাতিক চাপের প্রসঙ্গ টেনে খবর দিয়েছিল ভারত সরকার তাকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে পাঠাতে সম্মত হয়েছে। যাই হোক, মাঝেমধ্যে তিনি তার দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। অনেকেই এটাকে ‘অডিও বিপ্লব’ বলছেন। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে অডিও বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে নিমিষেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব কার হাতে দিচ্ছেন। এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র। নেতাকর্মীরাও চাচ্ছেন দলকে সংগঠিত করতে।

সর্বশেষ অডিও বার্তা থেকে জানা যায়, হাসিনা বলছেন- কাকে দায়িত্ব দেবো? যাকেই দেবো সেই তো গ্রেপ্তার হয়ে যাবে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা বলছেন, হাসিনা দলের কাউকেই বিশ্বাস করেন না। তিনি শেষদিন পর্যন্ত চেষ্টা করবেন পরিবারের মধ্যেই কাউকে বেছে নিতে। দু’মাস হয়ে গেল তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন ছোটবোন রেহানা। কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কাজের সূত্রে দিল্লিতে রয়েছেন। মাঝেমধ্যে তিনিও দেখা করছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা করছেন। করছেন শলা-পরামর্শও। এ নিয়ে নানা গুজব তো রয়েছেই। ওদিকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দলকে সংগঠিত করার তাগিদ দিচ্ছেন। ডাকসাইটে সাবেক এক মন্ত্রীকে দল গোছানোর দায়িত্ব দিয়েছেন, অঘোষিতভাবে।

এই নেতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বলছেন, ধৈর্য ধরো নেত্রী সহসাই নির্দেশ দেবেন। এর আগেও এমন অবস্থা হয়েছিল আওয়ামী লীগের। ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল আওয়ামী লীগ। দলের একাংশ ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে অনেক বড় নেতা দেশেই অবস্থান করছিলেন। অনেকে অবশ্য জেলে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই পালিয়ে গেছেন ভারতে। বিদেশে থাকায় ১৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা বেঁচে গিয়েছিলেন। পশ্চিম জার্মানি থেকে ভারতে নিয়েছিলেন রাজনৈতিক আশ্রয়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। শেখ হাসিনার পথ অনুসরণ করেছেন দলটির অনেক বড় বড় নেতা। বলাবলি আছে, যাওয়ার আগ মুহূর্তে কাউকে কিছু না বললেও দলের অন্তত দু’জন নেতাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেতাকর্মীরা যেন ভারতে চলে যায়। এ কারণেই কি সব ‘মাস্টারমাইন্ড’ও ভারতে পৌঁছে গেছেন নিরাপদে!

যারা শেখ হাসিনাকে ডুবিয়েছেন তারাই আবার ঘুর ঘুর করছেন তার চারপাশে। এরাই কিন্তু নিজ দেশের নিরীহ জনগণের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুড়েছিল। যাই হোক, এটা কোনো সেইফ এক্সিটের অংশ কিনা- এ নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। ঢাকায় আত্মগোপনরত কোনো নেতাই মুখ খুলছেন না। বরং যারাই রয়েছেন তাদের প্রায় সবাই শেখ হাসিনাকে দায়ী করছেন। বলছেন, তার একগুঁয়েমি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং সীমাহীন দুর্নীতি দলকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। এই সংকট এখন সর্বগ্রাসী। শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরতে পারবেন? অসংখ্য হত্যা মামলা তার বিরুদ্ধে। গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে চলেছেন।

দলের কেউ কেউ বলছেন, অতিমাত্রায় ভারত নির্ভর হওয়ার কারণে শেখ হাসিনার এমন পরিণতি হয়েছে। সঙ্গে ভারতও একপেশে নীতির কারণে দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছে। আত্মগোপনরত একজন আওয়ামী লীগ নেতা বললেন, হাসিনার সমস্যা হাসিনা নিজেই। আমলাদের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন দলকে ব্যবহার করতেন লাঠিয়াল হিসেবে। দল আর সরকার এক হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে হাসিনার পতনের পর ঐতিহ্যবাহী এই দলটি হারিয়ে গেছে রাজনীতির মাঠ থেকে। আওয়ামী লীগ হয়তো আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু তা সময়ের ব্যাপার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা বিগত সাড়ে ১৫ বছরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, এখন তারাই বলছেন- হাসিনার স্বৈরাচারী মনোভাব চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কতিপয় আমলা ও নেতার ওপর ছিলেন হাসিনা অন্ধ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রোবটের মতো আচরণ করতেন। তাকে যা বলা হতো তাই তিনি বলে যেতেন অবলীলায়। এক পর্যায়ে তিনি বনে গেলেন ‘বিএনপি বিষয়ক মন্ত্রী’। প্রতিদিনই বিএনপি, তারেক রহমান আবার কখনো জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন। ফ্যাশান আর টাকা বানানোর নেশায় তাকে পেয়ে বসেছিল। এখন তিনি কোথায়? সিঙ্গাপুর না ভারত, কেউ বলতে পারছেন না। শুরুতে শোনা গিয়েছিল তিনি নাকি যশোর সেনানিবাসে রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের সাধারণ সম্পাদক যখন নিরাপত্তা বাহিনীকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেন তখনই প্রশ্ন ওঠে এই কাজটি কার। কারফিউ জারি হলে পুলিশ বা সেনাবাহিনী এই নির্দেশ দিয়ে থাকে। আন্দোলন দমাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট- এই বার্তাও দিয়েছিলেন। এতে করে ছাত্রলীগ পরিণত হয় দানবে। জনমানুষের ঘৃণা সৃষ্টি হয় তাদের বিরুদ্ধে। এ জন্য কাদেরকেই দায়ী করা হচ্ছে। তিনি হয়তো বলবেন, আমাকে যা বলা হয়েছিল- আমি তাই বলেছি। সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে এসব নির্দেশে। এখন আসলে পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে। হাসিনার সামনে বিকল্প কী? ভারতে কতোদিন থাকতে পারবেন? বেশিদিন নেই এটা তো এখন স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক চাপে ভারত তাকে বলেছে, ভিন্ন গন্তব্য খোঁজার। সর্বশেষ খবর তিনি দুবাই চলে যেতে পারেন।

হাসিনা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমের নিত্যদিনের হিসাব-নিকাশ পেয়ে যাচ্ছেন মুহূর্তেই। তিনি তার সহকর্মীদের বলছেন, মজা টের পাক। কতোদূর যাবে? দলের গোপালগঞ্জের এক নেতাকে বলেছেন, দেখ এক মাসও টেকে কিনা! শেখ হাসিনা যাই বলেন না কেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনো নড়বড়ে, দুর্বল। দিক নির্দেশনাহীন। পেছনে সেনা সমর্থন না থাকলে তাদের অবস্থা কেমন হবে? সরকারের ভেতরে রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি না থাকায় এমনটা হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। দু’মাস কেটে গেল এভাবেই। সংলাপে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিএনপি চাচ্ছে যৌক্তিক সংস্কার শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন।  জামায়াত হাঁটছে ভিন্ন স্রোতে। তারা চায় সংস্কার শেষে নির্বাচন। এটা কিন্তু বলা হচ্ছে না সংস্কারের জন্য কতোদিন সময় দরকার। জামায়াত হয়তো জানে না এই কৌশল পরাজিত শক্তিকেই উৎসাহিত করবে। তারা অবশ্য বারবার ভুল পথেই পা বাড়ায়। ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ার এক আড্ডায় শোনা গেল, জামায়াতের এই কৌশলকে উৎসাহিত করছে আঞ্চলিক একটি শক্তি। এখানে একটা সত্য কাহিনীর অবতারণা করছি। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনকার ঘটনা। একদিন মুখ্যমন্ত্রীর একান্ত সচিব হাসতে হাসতে এসে বললো, স্যার আজ একটা সুখবর আছে। শেরেবাংলা জানতে চাইলেন কী সেই সুখবর। বলো, বলো! একান্ত সচিব বললেন, স্যার আজ আনন্দবাজার আপনার প্রশংসা করেছে। তখন শেরেবাংলা বললেন, আরে গর্দভ, এটা সুখবর নয়। খোঁজ নিয়ে দেখো আমি কোথাও ভুল করেছি। মনে রেখো, ওরা যখন আমার প্রশংসা করবে তখন বুঝবে আমি ঠিক পথে নেই। আর যখন সমালোচনা করবে তখন বুঝবে আমি সঠিক পথে রয়েছি। ওদিকে ইসলামপন্থিরা সংগঠিত হচ্ছে। তারা নতুন এক কাফেলা তৈরি করতে যাচ্ছে। যেটা এর আগে কখনো হয়নি। এই ভূখণ্ডে নতুন।  নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে এই কাফেলা ততো লম্বা হবে। দেখা যাক না শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়!

mzamin

Monday, September 2, 2024

হাসিনার সামনে দুটো অপশন, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা দেশে ফেরা by মতিউর রহমান চৌধুরী

ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে দুটো অপশন খোলা। হয় ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নতুবা দেশে ফিরে আসা। এই মুহূর্তে আর কোনো বিকল্প নেই। ৭৭ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী এখন ভারতে অবস্থান করছেন। শতাধিক মামলা রুজু হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এরমধ্যে হত্যা মামলাই বেশি। গণহত্যার মামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতেও যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তার পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় ভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা উবে গেছে। ভারতীয় আইন অনুযায়ী বিনা ভিসায় তিনি ৪৫ দিন থাকতে পারবেন। এর মধ্যে কেটে গেছে ২৭ দিন। যা কিছু করার এর মধ্যেই করতে হবে শেখ হাসিনাকে। শেখ রেহানার অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন। তার কাছে রয়েছে বৃটিশ পাসপোর্ট। তিনি ইচ্ছা করলে বৃটেন কিংবা অন্য যেকোনো দেশে যেতে পারেন। ভারত এখন কী করবে। তারা কি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে? যেমনটা দিয়েছিল ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর। ছয় বছর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আশ্রয়ে ছিলেন হাসিনা। যতদূর জানা যায়, ভারত এখন উভয় সংকটে। তারা কি তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করবে? যে সম্পর্ক এখন অনেক তিক্ততায় পরিণত হয়েছে! ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আগের থেকে অনেক অনেক বেশি এখন। বহির্বিশ্বেও ভারতের সামপ্রতিক তৎপরতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দানা বাঁধছে। হাসিনার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সর্বজনবিদিত। ৩৬ দিনে শেখ হাসিনার শাসন খতম হয়ে যাওয়ার পর ভারত বাংলাদেশের উপর নানা চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। সংখ্যালঘু কার্ড ব্যর্থ হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষজন হিন্দুদের বাড়িঘর পাহারা দিয়েছে। ঢালাও অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণা জারি রয়েছে। এই পটভূমিতে ভারত কি শেখ হাসিনাকে প্রোটেকশন দেবে? পাসপোর্ট বাতিল হয়ে যাওয়ায় শেখ হাসিনা এখন উদ্বাস্তু। অন্য কোনো দেশে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা খুবই কঠিন। চীন এবং ভারত হাসিনাকে নিয়ে বাজি ধরেছিল। দুটো দেশই হেরেছে। মাঝখানে জিতে গেছে অন্য একটি দেশ। চীন সতর্ক হয়ে গেছে। ভারত  হাসিনাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছে এখনো। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল ভারত ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাবে। কেউ কেউ নানা অ্যাকশনের কথাও বলেছিলেন। বাস্তবে দেখা গেল উল্টোটা। লালকেল্লা ময়দানে জাতীয় কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বার্তা পৌঁছেছিল ঢাকায় অভ্যুত্থান হয়েছে। মুজিব ডেড। ধীর-স্থির প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজে অংশ নিলেন। তেমন একটা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল না। অবশ্য একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা গেল। তখন বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার সমর সেন দিল্লিতে। তাকে ডেকে পাঠানো হলো। বলা হলো- এক্ষুণি ঢাকায় যেতে হবে। ঢাকা-দিল্লি বিমান যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ঢাকায় কারফিউ। সমর সেন দিল্লি থেকে কলকাতা এলেন বিমানে। বেনাপোল সীমান্ত ক্রস করে বাই রোডে সোজা এলেন ঢাকায়। গন্তব্য বঙ্গভবন। সেখানেই থাকতেন আগস্ট অভ্যুত্থানের খলনায়ক, ষড়যন্ত্রকারী খন্দকার মোশ্‌তাক আহমেদ। দুপুর গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তাহেরউদ্দিন ঠাকুর  মোশ্‌তাককে খবর দিলেন- সমর সেন বঙ্গভবনে পৌঁছে গেছেন। এর পরের দৃশ্য পত্রিকার প্রথম পাতায় পরদিন দেখা গেল। সমর সেন বঙ্গভবনে পৌঁছেই খন্দকার মোশ্‌তাকের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। অন্য কী বার্তা দিয়েছিলেন তা অবশ্য জানা যায়নি। এখনকার পরিস্থিতি কী। শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের পর ভারত কি আসলেই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? যা থেকে ধরে নেয়া যায় তারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করবে? বাস্তব অবস্থা দেখে যে কেউ এই ধারণা করতেই পারেন। ভারত যেটুকু পেয়েছে শেখ হাসিনার কাছ থেকে সেটুকু ধরে রাখতে চায়। তাই বলে হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ দেখাতেও তারা কসুর করছে না। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ভারত অনেক কিছুই নিয়েছে। দিয়েছে স্বল্প। অবশ্য ক্ষমতায় থাকার একচেটিয়া লাইসেন্স দিয়েছে। নির্বাচনগুলোতে প্রভাব বিস্তার করেছে। এক পর্যায়ে তারাই বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ামক শক্তি হিসেবে কলকাঠি নেড়েছে। কখনো গোপনে, কখনো প্রকাশ্যে। চোখ বুজে টিকিয়ে রেখেছে হাসিনার অগণতান্ত্রিক শাসনকে। পরিণতিতে হারিয়েছে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে। দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেন নি। এই অবস্থায় হাসিনা যদি ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে বসেন তখন তাদের নীতি কী হবে তা নিয়ে উভয় সংকটে প্রশাসন। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা দ্বিধাবিভক্ত। হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে চাপ বাড়বে ভারতের উপর। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এরকমই একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ভারতের উদ্বেগ সেভেন সিস্টার নিয়ে। হাসিনার জমানায় স্বস্তি এসেছে। প্রতি বিপ্লবের পথে গিয়ে যেটুকু অর্জন তা হারিয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কাও তাদের মধ্যে রয়েছে। তাদের ভয়, হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ দেখাতে গিয়ে চীনের আগমন ঘটে কিনা! সে নিয়েও তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা নীরবেই তাদের অবস্থান সুসংহত করেছে। ঢাকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যার সঙ্গে রয়েছে পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানের সরাসরি যোগাযোগ। তিনি চাইলে অন্তত একশ’টি দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে যখন তখন কথা বলতে পারেন। এ কারণে ভারত সতর্ক পা ফেলছে। জুলাই বিপ্লবের পর ইউনূসের সরকারকে স্বীকৃতি দিতে ভারত সময় নষ্ট করেনি। হাসিনার পতনে ভারত বিরক্ত। তাই বলে তারা দরজা বন্ধ করে রাখছে না। যে যাই বলুন, বিপ্লবের পরে প্রতি বিপ্লবের ছায়া। তারা যে রসদ  যোগাচ্ছে না তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কূটনৈতিক পণ্ডিতরা নরেন্দ্র মোদির সরকারকে আবেগতাড়িত না হয়ে বাস্তব সিদ্ধান্তের পক্ষে মত দিয়েছেন। পরিবর্তিত এই অবস্থায় হাসিনার দেশে ফেরা ছাড়া আর কী বিকল্প রয়েছে? গণহত্যার অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত হতে চলেছেন। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশ তাকে গ্রহণ করতে চাইবে না। সময় যত গড়াচ্ছে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয়দের মনোভাবেও পরিবর্তন আসছে। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের সঙ্গেই ভারতের সুসম্পর্ক নেই। যেটুকু ছিল বাংলাদেশের সঙ্গেই। ভুল নীতি কৌশল গ্রহণ করে সেটুকু হারাতে চায় না ভারত। কোটা বিরোধী আন্দোলন হাসিনার ভবিষ্যৎ যেমন ফিকে করে দিয়েছে তেমনি বাংলাদেশে ভারতের অবস্থান অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। সামপ্রতিক বন্যা নিয়ে বাংলাদেশিদের প্রতিক্রিয়া দেখে ভারতের নেতৃত্ব বেশ চিন্তিত বলেই মনে হচ্ছে। উত্তরে চীন, পশ্চিমে পাকিস্তান। পূর্বে আরেকটি নিরাপত্তা ফ্রন্ট ভারত খুলবে কি-না তা নিয়ে হিসাবনিকাশ চলছে। কূটনৈতিক পণ্ডিতরা বলছেন, এটা যদি করা হয় তা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গভীর নজর রয়েছে সর্বশেষ ঘটনাবলির উপর।

Sunday, August 18, 2024

বিপ্লব কেন ব্যর্থ হয়? by মতিউর রহমান চৌধুরী

বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব নতুন কোনো ঘটনা নয়। দেশে দেশে বারবার এমনটাই ঘটেছে। কোথাও সফল, কোথাও বা ব্যর্থ। বাংলাদেশের বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবের সময়গুলোর অনেকখানি মিল রয়েছে। ল্যাতিন আমেরিকা থেকে আরব বিশ্ব ও পূর্ব ইউরোপের বিপ্লব পর্যালোচনা করলে এমনটাই দেখা যায়। বিপ্লবের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বিপ্লব পরবর্তী মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আশাবাদ তৈরি হয়। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও এমনটা  দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাস দেখায় যে, এসব প্রত্যাশা কখনো বাস্তবসম্মত হয় না। পরিবর্তন আসতে সময় লাগে।

কিন্তু অল্পতেই মানুষ বিগড়ে যায়। আরব বিশ্বের উদাহরণ তাই। তিউনিশিয়া ও মিশরের শাসকদের পতন হলেও প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। তিউনিশিয়ার বিপ্লব একটি দুর্বল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। যা এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মিশরে অল্পদিন পরেই সেনাশাসন ফিরে আসে। ভেঙে খান খান হয়ে যায় বিপ্লবের আশাগুলো। বিপ্লবের সাফল্য একটি কঠিন পথ। বাংলাদেশেও একই ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে চলেছে। স্থিতিশীল শাসন না হলে মানুষ নানাভাবে অঙ্ক মেলাতে শুরু করবে।  বিপ্লব সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণি-গোষ্ঠীর মিলন ঘটিয়ে থাকে। যারা পরিবর্তনের জন্য একতাবদ্ধ হয়। শক্তিশালী শাসকদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। বিপ্লব ব্যর্থ করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে গুজব। ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। যেমনটা বিরামহীনভাবে চলছে বাংলাদেশে। এক কোটি হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এই গুজবের কোনো ভিত্তি নেই। এই কার্ড খেলার পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম অনবরত মিথ্যা প্রচার করে বিভাজন উস্কে দিচ্ছে।

উত্তর আফ্রিকার তিউনিশিয়াই একমাত্র দেশ যার উত্তরণ ঘটেছে অনেক নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে। ২০১০ সনের ১৭ই ডিসেম্বর বিদ্রোহের জন্ম। রাস্তার এক ফলবিক্রেতা যুবকের কাছে ঘুষ চেয়ে পুলিশ তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। সরকারি দুর্নীতি আর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কারণ লোকেরা চাকরি, উন্নত জীবনযাত্রা এবং বৃহত্তর স্বাধীনতা দাবি করেছিল। এই ঘটনার পর তিউনিশিয়ার পুলিশ শতাধিক মানুষকে হত্যা করে। প্রেসিডেন্ট জাইন আল আবিদিন বেন আলীর সংস্কারের  প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনাস্থা বাড়তেই থাকে। ২০১১ সনের ১৪ই জানুয়ারি বেন আলী তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তিউনিশিয়ার সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে। কোটা আন্দোলন থেকে শুরু। হাসিনার পদত্যাগে শেষ। গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। এখানেও পুলিশ শত শত মানুষকে হত্যা করে। দেশি-বিদেশি নানা শক্তি তাকে ক্ষমতায় রাখার চেষ্টা করেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়। নিজের দেশের লোকদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি করায় মানুষের মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। যা কিনা এই অঞ্চলে নজিরবিহীন। সফল বিপ্লবের পর দুই সপ্তাহ কেটেছে অনেক ষড়যন্ত্র আর চ্যালেঞ্জের মধ্যদিয়ে।

জুডিশিয়াল ক্যু-এর চেষ্টা ছিল অন্যতম। কিছু কিছু ঘটনা বিপ্লবের কর্মকাণ্ডকে বিতর্কিত করে তুলছে। আশার কথা, ঘটনার পর দায় স্বীকার করা হচ্ছে। যেটা আগে হতো না। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস একমাত্র আশার প্রতীক। তাকে ঘিরেই এখন বিপ্লব পরবর্তী সংস্কারের দিকে এগুচ্ছে দেশ।  যদিও সর্বক্ষেত্রে তার নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি। নড়বড়ে এবং ভঙ্গুর পরিস্থিতি সবখানে। শেখ হাসিনার প্রশাসন দিয়ে ইউনূসের শাসন যে চলতে পারে না এটা বোধ করি বিপ্লবের নায়কেরা বুঝতে পারছেন।  

এই অবস্থায় রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি  সঠিক রাজনীতি না করে তাহলে বিপ্লবের সাফল্য ধরে রাখা হয়তো কঠিন হবে। যেমনটা হয়েছে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে। ল্যাতিন আমেরিকার বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। কারণ সেখানকার বিপ্লব ছিল অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায়। ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা হচ্ছে বিপ্লবের পর অর্থনীতি সঠিকভাবে পরিচালনা করা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবের পর সামাজিক উত্তেজনা বাড়াটাই স্বাভাবিক। যা কিনা আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিপ্লবের জন্য একটি বড় হুমকি হলো- প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পুনরুত্থান। যা পুরনো ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ঘটে। অনেকক্ষেত্রে সামরিক অভ্যুত্থানেও শেষ হয়। বাংলাদেশের পতিত  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এই বিপ্লবকে অবৈধ এবং বিশৃঙ্খলা বলে বর্ণনা করেছেন। মিথ্যা প্রচার বিভাজন সৃষ্টি করে। মানুষের মনে নানা সন্দেহ তৈরি হয় । বিপ্লবকে দুর্বল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মনে রাখতে হবে- এসব কৌশল নতুন সরকারকে অস্থিতিশীল করবে। এটা করার অন্যতম উদ্দেশ্য বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করা।  ১৯১৭ সনের রুশ বিপ্লবে রাশিয়ার জার শাসনের অবসান ঘটে। সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার ইতিহাসে একটি বড় বাঁক নেয়। খাদ্য ঘাটতি, সামরিক ব্যর্থতা ও স্বৈরশাসনের কারণে জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই বিক্ষোভ নতুন বিপ্লবে রূপ নেয়। জার নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন। তৈরি হয় শূন্যতা। নতুন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। যার ফলে দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। একইভাবে বাংলাদেশেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে। পুলিশ কাজ করা থেকে বিরত থাকে। যেমনটা রাশিয়াতে হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল। বাংলাদেশে আইন প্রয়োগের অভাবে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয়ের সৃষ্টি হয়। যা জনগণের দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিপ্লবের সাফল্য ধরে রাখার জন্য  মানুষ সংগঠিত হয়। নিজেদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণত, বিপ্লবের পর সামাজিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। যার ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ এবং সংঘাতের সৃষ্টি হয়। রাশিয়ার বিপ্লবের সময় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রমণ হয়। ফলে ভয়ের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিছু ঘটনা অবশ্য ঘটে। যদিও বেশির ভাগ ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক সমর্থকদের দ্বারা উত্তেজনা সৃষ্টিই ছিল মূল লক্ষ্য। কর্মকর্তাদের ব্যাপক পদত্যাগ সরকারকে দুর্বল করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ রাশিয়ার সরকারের পদত্যাগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করে। রাশিয়ার পুলিশ ও বিচারবিভাগের পতনের ফলে পেট্রোগ্রাদে নিয়ন্ত্রণের অভাব হয়। যা জনগণের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।  রাশিয়ায় সরকার ব্যর্থ হওয়ায় বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসে। তারা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যাতে করে জনগণের অধিকার  সীমিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও চরমপন্থিরা বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা লাভ করতে পারে। যেমনটা রাশিয়ায় বিপ্লবী চরমপন্থিরা করেছিল। পৃথিবীর নানা অঞ্চলে বিপ্লবের সাফল্য ও ব্যর্থতা শিখিয়েছে জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছভাবে যোগাযোগ স্থাপন করা না গেলে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি না করলে বিপ্লব লাইনচ্যুত হতে পারে। জনগণকে সঠিক তথ্য এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ রাখাই হচ্ছে প্রধান কাজ। বিপ্লবের চূড়ান্ত পরীক্ষা হচ্ছে নতুন শাসন ব্যবস্থা চালু করা। ল্যাতিন আমেরিকার বিপ্লবী সরকারগুলোর মতো বাংলাদেশের সরকারকেও বিপ্লবী আদর্শ রক্ষা করা হবে অন্যতম কাজ। শাসনের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে বিশৃঙ্খলা বাড়বে। নতুন রাজনৈতিক  ও সামাজিক ব্যবস্থা সব মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য  সহায়ক হচ্ছে কিনা সেটাও সার্বক্ষণিক পর্যালোচনার দরকার। বিপ্লবের সাফল্য ধরে রাখার অনেকটাই নির্ভর করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ওপর। তারা এই বিপ্লবের চালিকা শক্তি। তাদের কথা বলার সময় অধিক মাত্রায় সতর্ক থাকতে হবে। আমরা সবাই জানি অতি প্রচার নয়া সংকটের জন্ম দেয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এর জ্বলন্ত প্রমাণ।  

দেশে দেশে বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর জোর দেয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একনায়কতন্ত্র থেকে সাবধান থাকা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা। তিউনিশিয়ার নবজাত গণতন্ত্র বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইসলামপন্থি উভয় দলগুলোর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালে উত্তেজনা চরম বৃদ্ধি পায়। এ সময় দুই বিশিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ চোকরি বেলাইদ ও মোহাম্মদ ব্রাম্মীকে হত্যা করা হয়। দেশটি তখন রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়। আর তখনই শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।

Monday, April 11, 2022

বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন চার কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ by মতিউর রহমান চৌধুরী

বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন গুরুত্বপূর্ণ? এটাও খোলাসা করেছেন ঢাকাস্থ বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকস। মানবজমিনকে দেয়া একান্ত এক সাক্ষাৎকারে অন্তত চারটা কারণের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। ২০১৯ সালের মার্চ মাস থেকে ঢাকায় বৃটিশ হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯-এর জানুয়ারি পর্যন্ত ফরেন এবং কমনওয়েলথ অফিসে ওয়েস্টার্ন বলকান প্রোগ্রামের অতিরিক্ত পরিচালক ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নীতিনির্ধারণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ওয়াশিংটনে বৃটিশ দূতাবাসের প্রেস অফিসার হিসেবেও অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

রবার্ট ডিকসনের মতে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। মধ্যম আয়ের দেশের জন্য বিশ্ব অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক একটি জায়গা। বাংলাদেশের চমৎকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখার জন্য অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে হবে। প্রয়োজন হবে বিদেশি বিনিয়োগের। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করার আগে সবচেয়ে বেশি যার ওপর গুরুত্ব দেন তা হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। তারা প্রথমেই খুঁজেন সুশাসন। তাই আমার মনে হয়, বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য প্রথম কাজ হচ্ছে একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংস্কার যেমন নিশ্চিত হবে এর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পাবে। এ কারণে আগামীর নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে আমরা তাই মনে করি। অত্যন্ত স্মার্ট, দক্ষ এবং আন্তর্জাতিক দূতিয়ালীতে পারদর্শী এই কূটনীতিকের মতে, মানুষ যাতে অবাধে ভোট দিতে পারে, রাজনৈতিক দলগুলো সভা- সমাবেশ করতে পারে এই বিষয়টির ওপর জোর দিতে হবে বেশি। নির্বাচনের আগে মুক্তভাবে বিতর্ক করার সুযোগ থাকতে হবে। মানুষ যাতে অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এই বিষয়টা আগামী নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাই মিলে এটা নিশ্চিত করতে হবে। সঠিকভাবে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশের ওপর জনগণ এবং প্রার্থীদের যেন আস্থা থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ভূমিকা রাখতে হবে। ফলাফল যাই হোক না কেন, মানুষকে সেটা মেনে নিতে হবে। এটাই নির্বাচনের রীতি। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে মূল সমস্যাটা কি? জবাবে রবার্ট বলেন, অনেক কিছুই বলা যায়। যেমন ২০১৪ সালের নির্বাচন বিরোধী দল বয়কট করেছিল। ২০১৮-এর নির্বাচনের সময় আমি ছিলাম না। কিন্তু আমি জানি ওই নির্বাচন যেভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে কড়া অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য কোনো ভূমিকা পালন করবে কিনা? রবার্ট হাসলেন। বললেন, আমরা বাংলাদেশের বন্ধু। বাংলাদেশের জনগণই নির্বাচন করবে। এটা আমাদের কাজ নয়। ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। এ নিয়ে আমাদের কোনো প্রেসক্রিপশন দেয়া ঠিক হবে না। তবে ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বন্ধু এবং অংশীদার হিসেবে আমরা মনে করি এখানে গণতন্ত্র অত্যাবশ্যক। আমরা অবশ্যই এই নির্বাচনের ওপর গভীরভাবে নজর রাখবো। ঢাকাস্থ কূটনৈতিক মিশনগুলোর সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা থাকা অবস্থায় ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকরা নিয়মিত বৈঠক করতেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা। ১৯৯০, ১৯৯৬ এবং ২০০১-এর নির্বাচনে তারা ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু বিগত দুটি নির্বাচনে (২০১৪ এবং ২০১৮) কূটনীতিকরা কোনো ভূমিকা রাখেননি। কিন্তু অতি সমপ্রতি শোনা যাচ্ছে, তারা টুয়েসডে গ্রুপের মতো একটি গ্রুপ গঠন করতে চাচ্ছেন। এই সম্পর্কে রবার্ট ডিকসনের জবাব, আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে পারছি না। তবে আমার মনে হয় এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বজুড়েই উদার গণতন্ত্র এবং মূল্যবোধ চ্যালেঞ্জের মুখে। এক্ষেত্রে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন সবার জন্য ‘ওয়েকআপ কল’ হিসেবে কাজ করছে। আমরা কি গণতন্ত্রকে বেছে নেব নাকি স্বৈরাচার, কর্তৃত্ববাদকে বেছে নেব? আপনার প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের কূটনীতিকদের মধ্যে এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটা ঠিক, যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।   
রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলাপ করতে গেলে এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশ শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান খুবই আলোচিত। যদিও পাকিস্তানের গল্পটা ভিন্ন। আর শ্রীলঙ্কা ফেঁসে গেছে চীনা ঋণে। এখানে বাংলাদেশের অবস্থান কি? জবাবে বৃটিশ হাইকমিশনার বলেন, আমার মনে হয় বাংলাদেশ অনেক দিক থেকেই ভালো অবস্থানে রয়েছে। পাবলিক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্টে বাংলাদেশের প্রশংসা করতেই হয়। বাংলাদেশের চমৎকার জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি রয়েছে। শ্রীলঙ্কা ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থা তেমন নয়।  রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানকে  কাবু করেছে। বাংলাদেশে যেভাবে  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, যে পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ হচ্ছে তা ধরে রাখতে বাংলাদেশকে আরও কিছু কাজ করতে হবে। তবে অবশ্যই শ্রীলঙ্কার মতো ঋণের ফাঁদে যাতে না পড়ে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ডিকসন সোজাসাপ্টা জবাব দেন। বলেন, আপনাকে বুঝতে হবে চীন ঋণ দিচ্ছে নাকি বিনিয়োগ করছে এবং কী শর্তে করছে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ঋণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে। শুধু চীন নয়, জাপানেরও অনেক বিনিয়োগ আছে। বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি’র সঙ্গেও বাংলাদেশের অনেক ভালো সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করাই ভালো। আপনি বলছেন যে, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার ছাড়া সবকিছু ঠিকঠাক আছে। এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার পটভূমিতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান কি?
কিছুটা গম্ভীর, ডিকসন বললেন, সুন্দর প্রশ্ন। চীন এবং ভারত বাংলাদেশের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী। যুক্তরাষ্ট্র খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অতি সমপ্রতি দু’দেশের মধ্যে কয়েকটি বৈঠকও হয়ে গেল। ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কটা যেমন শক্তিশালী তেমনই দু’দেশের মানুষের সম্পর্কও খুব আন্তরিক। তবে আপনার প্রশ্নের জবাবে আসি। অনেক বাংলাদেশির জন্য যুক্তরাজ্য হলো সেকেন্ড হোম। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে কি হচ্ছে তা জানতে বৃটেনের মানুষ খুব উৎসাহী। বৃটিশ পার্লামেন্টও মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে খোঁজখবর রাখে। সবদিক থেকেই দু’দেশের সম্পর্ক সোহার্দ্যপূর্ণ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েও রবার্ট মতামত দেন এক প্রশ্নের জবাবে। বলেন, আপনি যদি ’৭২-এর সংবিধানের দিকে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন যে, সেখানে গণতন্ত্রের কথা খুব স্পষ্টভাবে বলা আছে। সেই সঙ্গে কথা বলার স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম, ধর্মীয় স্বাধীনতা এসবের প্রতিশ্রুতিও থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যম হচ্ছে আলোকবর্তিকা। ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি করে। সুতরাং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হয় এমন কিছু গণতন্ত্রের জন্য খারাপ। আমরা ১৪ জন কূটনীতিক গতবছর আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি।     
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাব ও তার সাত কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে বৃটেন কীভাবে দেখে? এই প্রশ্নের জবাবে বৃটিশ হাইকমিশনার বলেন, আগেও বলেছি বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে এখানে মানবাধিকারের বিষয়টিকে আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখি। আমেরিকানদের উদ্বেগের কারণটাও আমরা বুঝতে পারি। আমাদের মানবাধিকার বিষয়ক রিপোর্ট প্রতিবছর জুন মাসে প্রকাশিত হয়। আমাদের সর্বশেষ রিপোর্ট পড়লে বোঝা যাবে কোন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নিশ্চয়ই, আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছি। আমাদের এ ব্যাপারে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশিদের জন্য বৃটেনের তরফে কোনো সুসংবাদ রয়েছে কি?  চটজলদি জবাব- হ্যাঁ। বিশেষ করে ইমিগ্রেশন পলিসিতে সুসংবাদ রয়েছে। যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে যোগ্যতা বিবেচনা করার পন্থা পরিবর্তন করার কথা আমরা ভাবছি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে মানুষকে নিয়োগ দেয়া যাবে। নতুন পয়েন্টসভিত্তিক ব্যবস্থায় পেশাদারদের যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পথ সুগম হবে। শিক্ষার্থীরা এখন পড়াশোনা শেষে দু’বছরের জন্য চাকরি করতে পারবে।


Saturday, September 7, 2019

অবরোধ সত্ত্বেও কাতার ঘুরে দাঁড়িয়েছে by মতিউর রহমান চৌধুরী

পারস্য উপসাগরের ক্ষুদ্রকায় দেশ কাতার। বিশ্বকাপ আয়োজন করে তামাম দুনিয়ায় এখন আলোচনায়। অর্থনীতি শক্তিশালী। মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৮ হাজার ৭৮৬ ডলার। প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতে পৃথিবীর তৃতীয় দেশের তালিকায়। রপ্তানিতে দ্বিতীয়। কাতার এয়ারওয়েজ গত পাঁচ বছর একটানা ‘এয়ারলাইন অব দ্য ইয়ার’ হয়েছে। টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘আল জাজিরা’ আরেকটি প্রাণশক্তি।
ইতিমধ্যেই এই টেলিভিশন নেটওয়ার্ক বিশ্বে খ্যাতির শীর্ষে। এই যখন অবস্থা তখনই দুই বছর আগে চারটি মুসলিম দেশ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অবরোধ দিয়ে বসে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর ও বাহরাইন প্রধানত তিনটি অভিযোগে অভিযুক্ত করে কাতারকে। প্রধান অভিযোগ কাতার সন্ত্রাসবাদকে মদত দেয়। কাতার তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে। বলে, এই অভিযোগের বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের কথাও বলা হয় চার দেশের পক্ষ থেকে। আল জাজিরা বন্ধও ছিল অন্যতম দাবি। সব মিলিয়ে দাবি ছিল ১৩টি।

এর পরপরই পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। টান টান উত্তেজনার মধ্যে চার দেশের কূটনীতিকরা কাতার ছেড়ে যান। কাতারও তার কূটনীতিকদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। তখন বিশ্ব অর্থনীতিবিদসহ অনেকেই বলেছিলেন কাতারের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। কারণ, আমদানিনির্ভর একটি দেশ কাতার। প্রায় ৬০ ভাগ পণ্য আমদানি হতো বয়কটকারী চারটি দেশ থেকে। এগিয়ে আসে তুরস্ক ও ইরান। দুধ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড সংকট সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার গরু আমদানি করে কাতার। বছর খানেকের মধ্যেই দুধ উৎপাদনে বড় সাফল্য দেখায়। এখন দুধে সংকট তেমন নেই। সবজির চাষ শুরু হয়। হাঁস-মুরগির খামার রাতারাতি চালু হয়ে যায়।

৩০ বছর ধরে কাতারে রয়েছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আবদুল মতিন পাটোয়ারী। তার ভাষ্য, শুরুতে সংশয় ছিল কাতার কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবে। কাতারের দক্ষ নেতৃত্ব জনগণকে কিছুই বুঝতে দেয়নি। এখন অনেক কিছুতেই তারা স্বাবলম্বী হতে চলেছে। গত শুক্রবার কাতারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, তেলের দাম স্থিতিশীল থাকায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। রপ্তানি আয় বাড়ছে গত বছরের তুলনায়। অর্থনীতির সূচকগুলো উপরের দিকে। রিজার্ভ বেড়েছে। ব্যাংকে তারল্য সংকট নেই। শুরুতে অবশ্য তারল্য সংকট রুখতে ব্যাংককে ৪০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়া হয়। এখন বলা হচ্ছে, ২০২০ সনে জিডিপি আরো ২.৮ ভাগ বৃদ্ধি পাবে। বিদেশি বিনিয়োগের হতাশা কেটেছে।

গত দুই বছরে বিরোধ নিরসনে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বরং, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী বৈষম্যের অভিযোগ এনে মামলা করেছে কাতার। গত মে মাসের শেষের দিকে একাধিক সম্মেলনে যোগ দিতে কাতারের প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন নাসের বিন খালিফা আল থানি সৌদি আরব সফর করেন। সম্মেলনের একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর নিয়েও ভিন্নমত পোষণ করে কাতার। তখন দোহার তরফে বলা হয়, বিবৃতিতে ঐক্যবদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের কথা বলা হয়েছে। অবরোধ বহাল রেখে ঐক্যবদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল হয় কীভাবে?

সংকটের শুরু হয় ২০১৭ সনের ২৩শে মে। কাতারের রাষ্ট্র পরিচালিত বার্তা সংস্থার ওয়েবসাইটে রহস্যজনকভাবে অনুপ্রবেশ করে হ্যাকাররা। তারা সেখানে কাতারের আমীরের ভুয়া উদ্ধৃতি সহকারে একটি খবর প্রকাশ করে। আমীরের ভুয়া ওই মন্তব্যে ইরানের প্রশংসা করা হয়। সমালোচনা করা হয় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার করা হয়। রিয়াদে আরব ও মুসলিম নেতাদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাক্ষাতের দু’দিন পরই এই ঘটনা ঘটে।
এরপর সৌদি আরব ও আরব আমিরাত একযোগে আল জাজিরার ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয়। স্মরণ করা যায় যে, ২০১৪ সালেও একবার কাতারের সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল। তখন তিন দেশই কাতার থেকে নিজেদের কূটনীতিকদের প্রত্যাহার করে। এই উত্তেজনার মূলে যে অভিযোগটি সামনে আনা হয় তা ছিল, বিশ্বজুড়ে মুসলিম ব্রাদারহুডসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইসলামিক আন্দোলনে কাতারের সহায়তা।

এ ছাড়া আল জাজিরার সংবাদ পরিবেশনেও তাদের আপত্তি ছিল। বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতির মধ্যে উত্তেজনা ছড়ালেও তখন সীমান্ত বন্ধ হয়নি। তাছাড়া এই সব দেশ থেকে কাতারের নাগরিকদের চলে যেতে বলা হয়নি। এবারের অবরোধের পর সীমান্ত বন্ধ হয়ে গেছে। লোকজনের আসা-যাওয়া বন্ধ। এমনকি গত দুই বছরে কাতারের কোনো হজ কাফেলা সৌদি আরব যায়নি। দোহার বড় বড় শপিংমলে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার আরব নাগরিক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কিংবা বিমানে করে দোহায় আসতেন। এখন সেটা বন্ধ। দোকানে ক্রেতা কম। বিখ্যাত ভিলাজ্জিও মলে তা-ই দেখা গেল। এ প্রসঙ্গে কাতার টাইমসের ডেপুটি ম্যানেজিং এডিটর কে থমাস চাকো বললেন, এসব তো আছেই। তবে কাতার এই সংকট থেকে বেরিয়ে গেছে। পরিস্থিতি টালমাটাল নয়। বরং স্থিতিশীল, সচল। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে অবরোধ ও তেলের দাম কম থাকা সত্ত্বেও কাতারের অর্থনীতি বেশ ভালোভাবেই সংকট উতরে গেছে।

Sunday, August 25, 2019

ইতালি, ইউরোপীয় রাজনীতির ড্রামা কুইন by মতিউর রহমান চৌধুরী

প্রধানমন্ত্রী কোন্টের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ইতালির রাজনীতি ফের টালমাটাল। নতুন নির্বাচন না ফের কোয়ালিশন   
সরকার- এ নিয়ে দরকষাকষি চলছে। প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লা গত তিনদিনে একাধিক পার্টির সঙ্গে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। এর আগে তিনি মঙ্গলবারের মধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। শনিবার বলেছেন, আরও সময় লাগবে। যদি শেষ পর্যন্ত দলগুলো কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারে তখন হয়তো প্রেসিডেন্ট নয়া নির্বাচনের ডাক দেবেন। গত ২০শে আগস্ট অভ্যন্তরীণ কলহের জেরে প্রধানমন্ত্রী এন্তোনিও কোন্টে পদত্যাগ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনির কট্টর অবস্থানের কারণে সংঘাত শুরু হয়।
সালভিনি ইতালির সবচেয়ে বড় দল দ্য লীগের শীর্ষ নেতা।

ইতালির রাজনীতি বরাবরই অস্থির। গত ৩০ বছরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ১৩ জন। শাসন করেছে ২০টি ভিন্ন সরকার। ইতিহাস থেকে দেখা যায় ইতালিতে কখনও রাজনৈতিক স্থিতি ছিল না। অনেকে মজা করে বলেন, ‘ইতালি হচ্ছে ইউরোপীয় রাজনীতির ড্রামা কুইন’। ইউরোপের অন্যদেশগুলোও এখন এর ভাগ বসাতে চাচ্ছে। বলা হচ্ছে স্পেন এখন নয়া ইতালি হতে যাচ্ছে। গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক এক মতামত কলামে ইতালি ও যুক্তরাজ্যকে জমজ ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শুধু ইতালিতেই নয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর জার্মানিতে সরকার গঠনে ৬ মাস সময় লেগেছিল। সুইডেনে চার মাসের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে ডান-বাম জোট ভেঙে মধ্যবাম সরকার গঠিত হয়। স্পেনে এখনও অচলাবস্থা। ব্রেক্সিট নিয়ে যুক্তরাজ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে লেজে গোবরে অবস্থা। ইতালির ফাররাইট মুভমেন্ট নিজেদের এস্টাবলিশমেন্ট বা বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থা বিরোধী হিসেবে তুলে ধরছে।

ইউরোপজুড়ে সম্প্রতি যে সব জনতোষণপন্থি দলের উত্থান ঘটেছে সেগুলোর মধ্যে এটি একটি। ইতালিতে অভিবাসন ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও একদম বিভক্ত। জার্মানি সুইডেনেও একই অবস্থা। ইতালিতে ডানপন্থি দল দ্য লীগের একটি প্রধান ইস্যু।  ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তুলনায় ইতালির সমস্যা ভিন্ন। দেশটি আসলে অপেক্ষাকৃত নবীন। ১৮৬১ সালে কিংডম অব ইতালি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায়। রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে ইতালি মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু অঞ্চল ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে রাজ পরিবার শাসন করতো। এরপর ইতালির সীমানা পরিবর্তন হলো। বিলুপ্ত হলো রাজ পরিবার। ইতালি পরিবর্তন হলো একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে। ১৯৪৬ সালের পর ইতালির সংবিধান ও রাজনৈতিক কাঠামো মোটা দাগে একই রয়ে গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক চিত্র ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৪৬ সন থেকে ’৯২ সন পর্যন্ত ক্রিশ্চিয়ান ডেমক্রেটিক নামে মধ্যপন্থি দল ও ইতালিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির আধিপত্য ছিল। এরপর রাজনৈতিক দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। যার পরিণতিতে ইতালিকে এখন মূল্য দিতে হচ্ছে। পরিবর্তন এতোটাই নাটকীয় যে, ১৯৯২ সন থেকে বর্তমান সময়কালকে বলা হয়ে থাকে সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র। যদিও এর মধ্য দিয়ে সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কমিউনিস্ট পার্টিতে পরিবর্তন এসেছে ব্যাপক। ক্রিশ্চিয়ান ডেমক্রেটিক পার্টি হারিয়ে যায় ক্রমশ। রঙ্গ মঞ্চে আসে নতুন নতুন দল।

ইতালিতে রাজনৈতিক দল অনেক। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দ্বি-দলীয় শাসন গড়ে ওঠেনি। গত নির্বাচনের আগে একটি নতুন নির্বাচনী আইন সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একক দলের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ এবং জোটের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ ভোট পেলেই সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা যাবে। এর ফলে জোট গঠনে উৎসাহ আরও বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমনই গত ছয় বছরে কোনো একক দল দূরে থাক, কোনো জোটও সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। এর ফলে ইতালিতে সরকার গঠিত হয় কোয়ালিশন বা নানা কিসিমের আদর্শের দল নিয়ে। আদর্শগত ফারাকই নতুন নতুন সংকট তৈরি করে। সরকারের পতনও ঘটে এসব কারণে।

বর্তমান সংকটের কী হবে? এ নিয়ে ইতালিজুড়েই সরব আলোচনা। নতুন নির্বাচন? ফাইভ স্টার মুভমেন্ট? নাকি মধ্য-বাম ডেমক্রেটিক দলের মধ্যে জোট গঠন করে নয়া সরকার?
বলা হচ্ছে, দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট মাত্তেরেল্লার ওপর অনেকখানি নির্ভর করছে। সমঝোতা না হলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা হিসেবে একজন দক্ষ ব্যক্তিকে সাময়িককালের জন্য নিয়োগ দেবেন। এর সবই এখন জল্পনা-কল্পনা। সময়ই বলে দেবে ইতালি কোন্‌ পথে হাঁটবে।

Tuesday, August 20, 2019

কাতারে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন বাংলাদেশিরা by মতিউর রহমান চৌধুরী

কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছেন। অথচ কাতারে বাংলাদেশিদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। চার লাখেরও বেশি বাংলাদেশি এখন কাতারে কর্মরত। এর মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষক, ইমামরা এখানে মাথা উঁচু করেই প্রতিযোগিতায় টিকে আছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান কাতারের জন্ম ইতিহাস পাল্টে দিয়েছেন। রচনা করেছেন নয়া এক ইতিহাস। গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন কাতার কখনও পরাধীন ছিল না। তাই ১৯৭১ সনে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল বলে যে ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছিল এটা সঠিক ইতিহাস নয়।
কাতার সরকারের সিনিয়র গবেষক ড. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একদল গবেষক দীর্ঘকাল গবেষণা করে বের করেছেন, ১৮৭৮ সনের ১৮ই ডিসেম্বর হচ্ছে কাতারের জাতীয় দিবস। ২০০৭ সনের ২১শে জুনের এক ঘোষণায় ১৮ই ডিসেম্বর জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এর আগে ৩রা সেপ্টেম্বর স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হতো। একজন বাংলাদেশি হিসেবে এটা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কাতার সরকার ড. হাবিবুর রহমানের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে নানাভাবে।

এই যখন বাংলাদেশিদের অবস্থান তখন সেখানে বাংলাদেশিরাই নতুন সংকট তৈরি করছেন। বাংলাদেশ থেকে মাদক এনে বিমানবন্দরে ধরা পড়ছেন। এই মুহূর্তে ১৫২ জন বাংলাদেশি মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া কাতারের তিনটি কারাগারে নানা অপরাধে জেলে রয়েছেন ২৩২ জন বাংলাদেশি। অতি সম্প্রতি কয়েক কেজি গাঁজাসহ দুই বাংলাদেশি ধরা পড়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। চেক জালিয়াতি, ভিসা জালিয়াতি, অপহরণ, সদর রাস্তায় ডাকাতির সঙ্গে বাংলাদেশিরা জড়িত রয়েছেন- এটা অনেকটা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাদক ব্যবসার সঙ্গে বাংলাদেশিরা জড়িয়ে পড়ায় এখানকার দূতাবাসও অনেকটা বিব্রত।
রাষ্ট্রদূত আসুদ আহমেদ এই প্রতিনিধিকে বলেন, জনশক্তি রপ্তানিতে কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রেমিটেন্সের দিক থেকেও আমরা উপরে। লোকসংখ্যাও আসছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, মাদক বিষয়ক অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ায় ভাবমূর্তির একটা সংকট তৈরি হচ্ছে। ঢাকা থেকে যখন তারা আসছে তাদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে গাঁজা, ইয়াবা, আফিমসহ নানা ধরনের মাদক। রাষ্ট্রদূত বলেন, এখানে আট লাখ ভারতীয়, ছয় লাখ নেপালি ও বাংলাদেশের চার লাখ মানুষ রয়েছেন।

পরিসংখ্যানের দিক থেকে আমরা তৃতীয়। জেলে দেখা যায় বাংলাদেশিরা ফার্স্ট। আমরা যে কথাটা শুনি, বাংলাদেশিরা বলে থাকেন, ‘তাদেরকে ফাঁসানো হয়েছে। ঢাকার এয়ারপোর্টে ধরা পড়ে না, এখানে এসে ধরা পড়ে।’ তার মতে ঢাকা বিমানবন্দরে নজরদারি জরুরি। তা না হলে এই সংকট বাংলাদেশকে এক কঠিন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতা ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার হোসেন আকন্দ বলেন, এমনিতে শ্রমবাজার সংকটের মধ্যে রয়েছে। আমরা যদি আমাদের ভালোটা না বুঝি তাহলে বিপদ আসতে পারে যে কোনো সময়। কমিউনিটির পক্ষ থেকে আমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করছি অপরাধের মাত্রা কমাতে। তিনি বলেন, মাদক কীভাবে এদেশে আসছে তা দেখতে হবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কমিউনিটির তরফ থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কাউন্সেলিং অন্যতম।

বাংলাদেশ থেকে আসা মহিলারাও নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। এর মধ্যে পাঁচজন মহিলার সাজা হয়েছে বিভিন্ন অপরাধে। শিল্পী আক্তার নামের এক মহিলার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে। অপহরণ, চুরি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে অন্যদের। 
ওদিকে প্রতিযোগিতা দিয়ে যেন অপরাধ বাড়ছে। অপরাধের তালিকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মাদারীপুর জেলার লোকজন শীর্ষে। এই দুই জেলা থেকে আগতদের সম্পর্কে এখানকার পুলিশও বেশ সতর্ক। ইতিমধ্যেই ‘ব্রাহ্মণ’  আর  ‘মাদার’ এই দু’টি নাম তাদের কাছে বেশ পরিচিত।

বিশেষ দ্রষ্টব্য, জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়নি, তবে সংখ্যা কমেছে। দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে দেশটিতে। বাংলাদেশ ইচ্ছা করলে এই সুযোগ নিতে পারে। মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা কাতারে অনেকখানি।

Tuesday, March 26, 2019

এরপরও মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পেলাম না by মতিউর রহমান চৌধুরী

শুরুটা কীভাবে করবো জানি না। কারণ সবকিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২৬শে মার্চ এলে সবই যেন উলটপালট হয়ে যায়। শুধু ভাবি আর ভাবি। এখনো বেঁচে আছি সে তো বিস্ময়কর। বাঁচার কোনো কথাও নয়। অনেকেই বাঁচেনি। পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে কয়জনই-বা বাঁচতে পেরেছিল।
১৯৭১-এর ২৬শে মার্চ সকাল। সাত বন্ধু মিলে মৌলভীবাজারের সদর রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে গেলাম। উদ্দেশ্য পাকবাহিনীর গতি রোধ করা। সারা বাংলা তখন প্রতিরোধে জ্বলছে বারুদের মতো। বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্ব কায়েম হয়ে গেছে পূর্ব বাংলায়। আলোচিত স্বাধীনতা যুদ্ধও শুরু হয়ে গেছে। প্রস্তুতি চারদিকে। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। সমঝোতার  সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
একমাত্র অপশন তখন সরাসরি যুদ্ধ। যেটাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বলছি। কারো ডাকের অপেক্ষায় নয়। ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় পাকবাহিনী নারকীয় হত্যাযজ্ঞের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো সারাদেশে। রাত থেকেই প্রতিরোধের প্রস্তুতি। খালি হাতে কি প্রতিরোধ করবো? কে তখন বাধা দেয়। সাত বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম পাকবাহিনীকে মৌলভীবাজারে রুখতে হবে। কি পাগলামি দেখুন। মৌলভীবাজার গভর্নমেন্ট স্কুলের সামনে গাছপালা, ইট ফেলে রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছি। এমন সময় পেছন থেকে একটি ট্রাক এসে থামলো। আচমকা, জাস্ট হল্ট। পাকসেনারা একে একে ট্রাক থেকে নামলো। সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। পালাবার কোনো সুযোগ নেই। ট্রাকে তুলে নিল সবাইকে। ভয়ে রীতিমতো কাঁপছি। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওরা আমাদেরকে? পরের গন্তব্যই বা কি হবে? শুধু ভাবছি বাড়ির কেউ তো জানতে পারবে না। আমার ভাগ্যে কি ঘটেছে। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে অল্প দূরে সার্কিট হাউসের সামনে গিয়ে থামলো ট্রাক। পাশেই পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। পাকবাহিনী সেখানেই ঘাঁটি গেড়েছে। চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাদেরকে নিয়ে গেল এক অন্ধকার ঘরে।
হাত বাঁধার পর দাঁড়িয়ে থাকতে বললো। সকাল গড়িয়ে দুপুর। কিছু খেতেও দেয় না। বরং হাত বাঁধা আছে কি না একজন দেখে গেল। বিকাল ৩টা। হাত খুলতে এলো এক সেপাই। উর্দুতে কি যেন বললো। এরপর দুখানা রুটি দিল। সঙ্গে কিছু হালুয়া। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। খেতে ইচ্ছে হয়। আবার হয় না। রাগে ক্ষোভে তখনো জ্বলছি। কি করবো? রুটি খেলাম একখানা। কখন যে রাত হয়ে গেছে। বেত নিয়ে এলো এক অফিসার। পায়ে এবং পিঠে আঘাত করতে থাকলো। বাইরে তখন কার্ফু জারি হয়ে গেছে। রাতটা কাটলো এভাবেই। ভোর হতেই শুনলাম আমাদের চার বন্ধুকে ওরা আলাদা করে রেখেছে। এর বেশি কিছুই জানি না। নিজের কথা ভাবছি। ব্রাশফায়ার কি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকলো। দাঁড়াতেই পারছি না। ঘুমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। কারণ পাশের রুম থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
সে কি কান্না! আর কাদের ধরে আনলো। চার বন্ধুর খবরই বা কি? শহরে কি হচ্ছে তাও জানিনা। সহযোদ্ধারা কি করছে তাও জানার উপায় নেই। তিনদিন এভাবেই কেটে গেল। চারদিন পর হাত খুলে দিল ওরা। এখন কি করবে? ছেড়ে দেবে নাকি ব্রাশফায়ারের জন্য নিয়ে যাবে। এই ভাবনার মধ্যেই একটি বাঙালি কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি। চোখ এমনভাবে বাঁধা কিছুই বোঝার উপায় নেই। দেখতেও পাচ্ছি না। অন্ধকার ঘরে আরো কয়েকজনের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি। এক বাঙালি ক্যাপ্টেন এলেন। বাতি জ্বলে উঠলো। বললেন, প্রস্তুতি নাও। কিসের প্রস্তুতি। আমরা তিন বন্ধুকে জড়ো করলো। বাকি চারজনের খবর নেই। রাত বাজে তখন চারটা। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে চললো। বেশ খানিক পথ হাঁটার পর বললো- ওধার যাও।
এখনই বুঝি শেষ। ভয়ে ভয়ে হাঁটছি। কিছুদূর যেতেই টের পেলাম ওরা পেছনে নেই। এরপর হাঁটতে থাকলাম। চৌমুহনায় গিয়ে শুনলাম আমাদের চার সহযোদ্ধাকে মৌলভীবাজার শহরের লাগোয়া মনু ব্রিজের ওপর দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করেছে। শহীদ হয়ে গেছে ওরা চারজন। আর আমি বেঁচে আছি! সে তো বিস্ময়কর। বাড়িতে খবর গেছে পাকবাহিনী আমাকে হত্যা করেছে। বাড়িতে তখন কুলখানিও হয়ে গেছে। কি করে যে বেঁচে গেলাম এই প্রশ্নের জবাব কখনো পাইনি। পাবার কথাও নয়। একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। হেঁটে যখন বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন বড্ড ক্লান্ত। শরীর আর চলছে না। ভয়ে শরীর হিমশীতল হয়ে যাচ্ছে বার বার। এই বুুঝি পাকবাহিনী আসলো। সন্ধ্যায় যখন গ্রামে পা বাড়ালাম তখন শোরগোল পড়ে গেল। অবাক বিস্ময়ে একজন অন্যজনের দিকে তাকাচ্ছে। আমি তখনো বুঝতে পারিনি। কি হয়েছে আসলে। একজন এসে সরাসরি প্রশ্ন করলো, আপনি বেঁচে আছেন? আমরা তো এই বিকালেই আপনার বাড়িতে কুলখানি করে এলাম। কে একজন দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে খবর দিয়েছে- আমি বাড়িতে আসছি। বাড়ির সবাই ছুটে এলো আমাকে দেখতে।
সেটা আমার জীবনে এক ইতিহাস হয়ে রইলো। একা একা বসে যখন ভাবি তখন হিসাব মেলাতে পারি না। একই প্রশ্ন সামনে আসে বার বার। দেশের ডাকে এগিয়ে গিয়েছিলাম কিছু প্রাপ্তির জন্য নয়। যদিও দেশ আমাকে অনেক দিয়েছে। অনেকেই বলেন, কি ব্যাপার আপানার সার্টিফিকেট কই? বিনীতভাবে তাদের বলি, কারো সার্টিফিকেট পাবার জন্য প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নেইনি। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সেদিন পাকিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলাম। গ্রামের বাড়িতেও শান্তি ছিল না। পাকবাহিনীর নজরে ছিল বাড়িটি। আরো একবার তো গ্রেপ্তারই হয়ে গিয়েছিলাম। সেবার বাহুবলে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সাক্ষাত শেষে যখন বাড়ি ফিরছি তখন পথিমধ্যে পাকবাহিনীর এ্যাম্বুশে পড়েছিলাম। জীবন সায়াহ্নে এসে প্রশ্ন জাগে- আসলেই তো একখানা মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পেলাম না কেন? যারা যুদ্ধে অংশ নিল না তারা তো সার্টিফিকেট পেয়ে গেল। সুযোগ-সুবিধা নিল। অদ্ভুত এক দেশের বাসিন্দা আমরা। এখানে সরকার বদলায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকাও বদলে যায়। আর এই অশুভ প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্র মদদ দেয়। স্বাধীনতার পর পর স্বচক্ষে দেখেছি দশ টাকায় মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বিক্রি হতে। দল বেঁধে আমরা পল্টন ময়দানে এসব ভুয়া সার্টিফিকেট পুড়িয়েছি। তৎকালীন পত্রপত্রিকায় আমাদের ছবিও ছাপা হয়েছিল। এ নিয়ে ঝামেলা যে হয়নি তা নয়। এসবি আমাদের পিছু নিয়েছিল। যুদ্ধ শেষে কি করবো? কিছু একটা তো করতে হবে।
৭০ সন থেকেই লেখালেখির অভ্যাস। মফস্বল সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছিলাম। সাপ্তাহিক বাংলার বাণীতেও লিখতে শুরু করলাম। শেখ ফজলুল হক মনি যিনি আমার সাংবাদিকতার গুরু। তার নির্দেশেই পুরোদস্তুর সাংবাদিক হয়ে গেলাম। তিনি বলতেন অস্ত্রের যুদ্ধ শেষ। এখন কলমের যুদ্ধ করতে হবে। তার কথায়, পাকিস্তানিরা সাংবাদিকতাকে কব্‌জা করে রেখেছে। ওদের কাছ থেকে সাংবাদিকতাকে মুক্ত করতে হবে। যোগ দিলাম সাংবাদিকতায়। এখনো আছি। দেখতে দেখতে প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেল। কত কিছুই যে দেখলাম। বার কয়েক জেলেও গেলাম এই পেশাকে ভালোবাসতে গিয়ে। চাকরি হারালাম অন্তত তিনবার। বিদেশেও কাটাতে হলো বেশ কিছু সময়। দেশে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার রূপে স্বীকৃত। বাংলাদেশের সংবিধানেও তা সন্নিবেশিত রয়েছে। কিন্তু কোথায় যেন বাধা! কে যেন পেছন থেকে ডাকছে।

Wednesday, September 19, 2018

বাক্সবন্দি হবে বাকস্বাধীনতা by মতিউর রহমান চৌধুরী

কোনো ওজর আপত্তিতেই কাজ হলো না। শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি সহসাই পাস হতে চলেছে সংসদে। সম্পাদক পরিষদ প্রত্যাখ্যান করেছে। সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোও আপত্তি তুলেছে। সিভিল সোসাইটি বিচ্ছিন্নভাবে কথা বলেছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি মৃতপ্রায়। দলীয় ব্যানারে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় মাঝেমধ্যে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিরামহীনভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। বলছে, এই আইন পাস হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করবে। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো কমবেশি সোচ্চার। ডিজিটাল যুগে এই আইন? সরকার বলছেন ডিজিটাল যুগ মানে এটা নয়- অবাধ লাইসেন্স? যা কিছু বলা বা লেখা যাবে। যা ইচ্ছে লেখার মানে হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা। এটা কখনো কাম্য নয়। এ জন্য কি আইনের দরকার? যে আইন আমার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়। যে আইন সংবিধানের প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায় না। যে আইন বাকস্বাধীনতাকে বাক্সবন্দি করে। মনে রাখা দরকার, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অপরিহার্য অধিকার হচ্ছে বাকস্বাধীনতা। মানুষ কথা বলবে, ভাববে, অন্যের কথা শুনবে। ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা জানাবে। এটাই তো সংবিধান নামক দলিলের কথা। ক্ষমতার বাইরে থেকে আওয়ামী লীগ এ কথাগুলো কতবার বলেছে। লড়াই করেছে রাজপথে। নিকট অতীতে ১২ বছর আগে রাজপথ কাঁপিয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। জরুরি জমানার বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে কথা বলেছে।
সংবাদপত্রের ফাইল ঘাঁটলে অসংখ্য শিরোনাম দেখা যায়- যা কিনা আজকের আওয়ামী লীগের চরিত্রের মধ্যে বিস্তর ফারাক। ভারতে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৬৬/এ ধারাটি বাতিল করে দিয়েছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। বিচারক রায়ে বলেছেন, ধারাটি অসাংবিধানিক। বাকস্বাধীনতার পরিপন্থি, অস্বচ্ছ ও পরিণামে ভয়ঙ্কর। যাই হোক, ইতিহাস মোটেই শাসকদের পক্ষে থাকে না। বাংলাদেশেও দেখেছি। বিদেশেও ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। যে সব দেশ মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় না- ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করে না- সে সব দেশ মুখ থুবড়ে পড়েছে। নিকট অতীতে ইরাক-লিবিয়ার ইতিহাস সবার জানা। আগে উন্নয়ন- পরে গণতন্ত্র চর্চা করতে গিয়ে অনেক দেশের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে। ভিন্নমতকে দমন করা সহজ। বন্দুক পারে না এমন কিছু নেই এই দুনিয়ায়। কিন্তু বন্দুকের তো কোনো দিক নেই। জনগণের প্রতি আস্থা হারিয়ে পৃথিবীতে অনেক শাসকই বন্দুকের প্রতি আস্থাশীল হয়ে পড়েন। আখেরে তাদের দু’কূলই যায়। ক্ষমতা দীর্ঘ করার জন্য বিএনপি অনেক কূটচালের আশ্রয় নিয়েছিল। এর অন্যতম রূপকার ছিলেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জোটের দুই নেতা। খালেদা জিয়া নিজের ইচ্ছায় অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এখনো একই প্রবণতা। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভুলের মিছিল লম্বা হচ্ছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন চালু করে আওয়ামী লীগ বরাবরই নিন্দিত হয়েছে। কখনো প্রশংসা পায়নি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারাই। আজ যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদের অনেকেই বারবার এই আইনে বন্দি হয়েছেন। নির্যাতিত হয়েছেন। ২০০৬ সালের ৮ই অক্টোবর তথ্যপ্রযুক্তি আইন চালু করেছিল বিএনপি। এখন মূল্য দিচ্ছে কড়াভাবে। তাদের জন্য সামনে কি অপেক্ষা করছে কে জানে। স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতার পক্ষে কেউই কথা বলবেন না। অনেকেই অবশ্য ভুলে যান সবকিছুর একটা সীমারেখা আছে। বা থাকতে হবে। শাসকেরা এর সুযোগ নিয়ে ভিন্নমতকে কব্জা করতে চান। বিপত্তিটা সেখানেই। একটা সমাজ কি ভিন্নমত ছাড়া চলতে পারে? ক্ষমতা চিরস্থায়ী ভাবলে অবশ্য কথা নেই। এই পথটা সর্বনাশা। আজ আমাকে আপনি দমন করতে পারেন। ভাবতে পারেন সামনে সব আমার। আমি সবকিছু দমন করবো। কার কি এসে যায়! ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। কাউকেই ক্ষমা করে না। এক সময় বাংলাদেশের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রশংসা করতো সবাই। বিশেষ করে পশ্চিমা দুনিয়া। বলা হতো বাংলাদেশ হচ্ছে একমাত্র মুসলিম দেশ যেখানে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র চর্চা হয়। এখন তারা কি বলছে কারো না জানার কথা নয়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো বিদেশি সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্র আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সরকারের কড়া সমালোচনা করছে।
কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এক ধরনের রোগে পরিণত হয়েছে। মামলার প্রতিও মানুষের আস্থা কমছে। ভয়ের সংস্কৃতি অন্য এক ভয়ের জন্ম দেয়। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি গণভোটে দেন। জনগণ গ্রহণ করলে কেউ আপত্তি জানাবে না। আর যদি কোনো সমালোচনাতেই সরকার কান না দেয় তাহলে ফিল্মী দুনিয়ার সুপারস্টার শাহরুখ খানের বিখ্যাত একটি উক্তির কথা স্মরণ করবো। তার কথায়, সময় বদলে গিয়েছে। মনে যা আছে সেটা বলা বা প্রকাশ না করাই ভালো। কারণ সবাই জানেন। এই মনের কথা বলতে হলে বাথরুমে গিয়ে বরং বলাই ভালো। শাহরুখ খান জিন্দাবাদ।

Wednesday, March 14, 2018

হিজাব বিপ্লব এবং বাংলাদেশি রাজনীতি by মতিউর রহমান চৌধুরী

এক সময় বাইরের দুনিয়ায় অন্তত দুটো বিষয়ে বাংলাদেশের সুনাম ছিল। এক, উদার গণতন্ত্র। অন্যটি হচ্ছে প্রাণবন্ত গণমাধ্যম। এখন দুটোই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি। দুই বেগমের ভারসাম্য রক্ষার গণতন্ত্র। পশ্চিমা দুনিয়ায়ও ছিল বেশ আলোচিত। একবার খালেদা জেতেন। অন্যবার হাসিনা। মাঝখানে দূরত্ব তৈরি হয়। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে। হরতাল-অবরোধে কাবু হয় খালেদার শাসন। তবুও তিনি অনড়। তত্ত্বাবধায়কে যাবেন না। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত সদস্যরা সংসদ থেকে ইস্তফা দেন। সৃষ্টি হয় শূন্যতা। সব আসনে উপনির্বাচন দেয়া সম্ভব নয়। তাই খালেদা জিয়ার পরামর্শদাতারা এক সকালে সিদ্ধান্ত নিলেন সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দেবেন। যথারীতি তাই হলো। বিরোধীরা এলেন না। যাই হোক, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে সংসদের বিলুপ্তি ঘটলো। এর আগে স্যার নিনিয়ান এসেও ঝগড়া থামাতে পারেননি। মিজানুর রহমান চৌধুরীর সেই মুচলেকা শব্দটি সমঝোতা ভেঙে দিয়েছিল। বিএনপি নেতারা সেদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানতে কতিপয় শর্ত দিয়েছিলেন। মিজান চৌধুরী সেদিন বলেছিলেন শর্ত দিয়ে রাজনীতি হয় না। সেদিন কুশলী হননি বিএনপি নেতারা। এর মূল্য তাদের দিতে হয়েছে। নানা সমালোচনা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক গণতন্ত্র এগিয়ে যাচ্ছিলো। ২০০৬-এ এসে আবার হোঁচট। কে হবেন তত্ত্বাবধায়ক প্রধান এ নিয়ে অযথা বিএনপি নেতারা পানি ঘোলা করতে থাকেন। বিচারপতি কে এম হাসানকে মাথায় রেখে কৌশল ঠিক করেন। যা কিনা বিরোধীদের তখনই রাজপথে ঠেলে দেয়। কাজের কাজ কিছু না হলেও বিতর্কিত হন কে এম হাসান। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি কে এম হাসান অন্য যে কোনো বিচারকের তুলনায় এখানে দায়িত্বের প্রতি সৎ হতেন। অযথা তার গায়ে কলঙ্ক লেগে গেল। বিদায় নিলেন তিনি। এরপরের খেলাও অস্বচ্ছ, বাড়তি সুবিধা নেয়ার অপকৌশল। রাজপথ উত্তপ্ত হলো। বিদেশিরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেন। লগি-বৈঠায় প্রাণ গেল ১১ জনের। তাও রাজপথে। এই দেখে বিদেশিরা ভাবলেন এই তো সময়। সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করলেন। জেনারেল মইনের সম্মতি, জেনারেল মাসুদ এক পায়ে খাড়া। জেনারেল আমিন সুযোগের অপেক্ষায়। এখানে রসদ যোগান ব্রিগেডিয়ার বারী। পরিণতিতে এলো ওয়ান ইলেভেন।
নানা খেলা শুরু হলো পর্দার আড়ালে। জেনারেলরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। বিশেষ করে জেনারেল আমিন কৌশলে জেনারেল মইনকে হটিয়ে ক্ষমতা নেয়ার ফন্দি আঁটেন। কিন্তু বিধিবাম। মইন এটা টের পেয়ে অন্য খেলা খেলে দেন। এ দ্বন্দ্বে শিকার হন ব্রিগেডিয়ার বারী। তাকে সরিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হয়। জেনারেল মইন উপায়ান্তর না দেখে পতিত রাজনীতির কাছেই আত্মসমর্পণ করেন।
সংঘাতময় রাজনীতির অবসান হবে এটা ভেবে জনগণ নির্ভেজাল সমর্থন দিতে শুরু করলো। বড় দুই দলেই সংস্কারবাদীদের উত্থান ঘটলো। জেনারেলরা মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হলেন। বাংলাদেশের জনগণকে তারা চেনেন না। এ দেশের জনগণের ভালোবাসা কচুপাতায় পানি রাখার মতো। এই ভালো এই খারাপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের একটি তুচ্ছ ঘটনা জেনারেলদের ভাবিয়ে তুললো। রাজনীতিবিদদের গায়ে দুর্নীতির কলঙ্ক লেপে দিলেন জেনারেলরা। নিজেরাও দুর্নীতিতে ডুবে গেলেন। ভেস্তে গেল মাইনাস টু-এর কথিত ফর্মুলা। দুই নেত্রীকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার কৌশলও ব্যর্থ হলো। দুই নেত্রী যখন জেলে তখন সংলাপ শুরু হলো রাতের অন্ধকারে। শেখ হাসিনা বিদেশ চলে গেলেন। ফিরতে চাইলে হিথ্রো বিমানবন্দরে গতি রোধ। অনেক নাটকীয়তার পর দেশে ফিরলেন। খালেদা তখনও জেলে। সংলাপ চলতে থাকলো নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে। খালেদাকে রাজি করতে সাব-জেলে নানামুখী চেষ্টা চললো। সৌদি আরবে পাঠানোর উদ্যোগ এর আগেই ব্যর্থ হয়েছে।
এক পর্যায়ে খালেদা রাজি হলেন। জেল থেকে মুক্তি পেলেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেন। শেখ হাসিনা কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেলেন। খালেদা চাপে। সারা দেশ সফর করে এসে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অর্থাৎ অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান হলেন। আর এর অন্যতম কারণ ছিল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। যে কমিশন তার দল ভাঙার চেষ্টা করেছে সে কমিশন কতটুকু নিরপেক্ষ হবে সেটা নিয়ে ভাবতে থাকলেন। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তাকে কোনো একটা জায়গা থেকে বলা হলো দল এক রাখার স্বার্থে নির্বাচনে যান। ফলাফল আপনার পক্ষে যাবে না- এমনটাই বলাবলি হচ্ছে। খালেদা উভয় সংকটে। এই অবস্থায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এসে সব উল্টে দিলেন। বললেন ম্যাডাম ফল নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমাদের কাছে খবর আছে আমরাই জিতবো। জেনারেলদের মনোভাবের কথাও তুলে ধরলেন। খালেদা নির্বাচন বর্জনের পথ থেকে সরে দাঁড়ালেন।
নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেলো আওয়ামী লীগ। জামায়াতকে দুষতে শুরু করলেন খালেদা। নির্বাচন বর্জনই শ্রেয় ছিল তখন বিএনপির অনেকেই বলতে থাকলেন। সম্পর্কের অবনতি ঘটলো দু’দলের মধ্যে। এখনো সেটা মেরামত হয়নি। বরং দূরত্ব আরো বেড়েছে। খালেদা যখন জেলখানায় জামায়াত তখন ভবিষ্যৎ নির্বাচনে অংশ নেয়ার চিন্তায় বিভোর। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকছে না- এমনটা চাউর হয়ে গেছে রাজনৈতিক বৈঠকখানায়, মিডিয়ায়। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে ২০০৮-এর নির্বাচনের পর থেকে। খালেদা তার বাড়ি হারান। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হয়। যার জন্য আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ১৭২ দিন হরতাল পালন করেছিল। নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে তারা হেরে যায়। আগুন সন্ত্রাসের কলঙ্ক লাগে গায়ে। নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক না দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে লাভ হতো কি-না তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, এতটা বিপর্যয় হতো না। সংলাপে অংশ নেয়াও ছিল জরুরি। এখানে অবশ্য বলতে হবে বিএনপির ভেতরে রয়েছে আওয়ামী লীগের অনেক শেয়ার হোল্ডার। তারাই খালেদা জিয়াকে বলেছে সরকারের পতন হয়ে যাবে। নির্বাচনে গিয়ে কি লাভ। ভুল বৈদেশিক নীতিও এখানে ভূমিকা রেখেছে। রাজনীতিতে একটি ভুল হাজারো ভুলের জন্ম দেয়। বদলে গেল রাজনীতির দৃশ্যপট। নতুন নতুন কৌশল নিতে থাকে সরকার। মামলা মোকদ্দমায় জর্জরিত হয়ে পড়ে বিএনপি। খালেদা নিজেও চাপের মধ্যে পড়েন। রাজনীতির কৌশল পরিবর্তন করেও শেষ রক্ষা হয়নি। শাসকদল খালেদাকে মাইনাস করে নির্বাচনে যেতে চায়। খালেদা কারাগারে এক দুর্নীতি মামলায়। তার মুক্তির দাবি নিয়ে বিএনপি এখন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে মাঠেই নামতে পারছে না। সরকার হার্ডলাইনে। শান্তিবাবু মারা গেছেন। তারা আর বিএনপিকে দাঁড়াতেই দেবে না। বিএনপিকে কঠিন চাপে রেখে নির্বাচনে যেতে চায় দলটি। বিএনপি কি করবে? নির্বাচন বর্জন করলে দল টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। আবার নির্বাচনে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। খালেদা জিয়া বাইরে থাকলে অন্যরকম হতো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার কারো কথা শুনবে না। বিদেশিরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলবে। নানামুখী চাপ আসবে। ক’দিন পর এই খবর মিডিয়াতেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন হয়ে গেল রাজনীতি। শুরুতে যেটা বলেছিলাম পাশ্চাত্য দুনিয়ায় আলোচিত ছিল দুই বেগমের রাজনীতি। বলা হতো একমাত্র মুসলিম দেশ যেখানে পাশ্চাত্য ধারায় গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে। গর্ব করার বিষয় ছিল। নারীর ক্ষমতায়ন বলে কথা। এখন তা বিদায় নিতে চলেছে। একমুখী চিন্তার দিকে নজর বেশি। এই অবস্থায় আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কি হবে এটা অস্পষ্ট। সংঘাতের দিকে যাবে না এটাই বা কে বলবে?
দুই, বাংলাদেশের গণমাধ্যম নব্বইয়ের পর ছিল উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত। অনেক কিছুই বলা যেতো। লেখা যেতো। সময় বদলে যোগ হয়েছে সেলফ সেন্সরশিপ। এটা নতুন ধরনের সাংবাদিকতা। ট্রাম্পের ফেইক নিউজের ঢেউ বাংলাদেশেও। কোন্‌টি সঠিক, কোন্‌টি বেঠিক এটা বাছাই করা বড় কঠিন। সাংবাদিকতা হয়ে গেছে প্রাপ্তিনির্ভর। সংবাদ সম্মেলনের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। দলীয় রাজনীতির প্রভাবে সাংবাদিকরা এখন আসল ছেড়ে নকল নিয়েই ব্যস্ত। এর ফলে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসও মানুষ ভুলে যাবে। মুক্ত চিন্তা আর কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না হলে এক সময় দেশটা ইরানের পথ ধরতে পারে। এমনিতেই ‘হিজাব বিপ্লবে’ বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কাবু হয়ে পড়েছে। ক্ষমতার মোহে বিভোর ছিলেন ইরানের শাহ। ফল কি দাঁড়িয়েছিল তা সবার জানা।

Wednesday, February 28, 2018

যখন রিপোর্টার ছিলাম: ক্ষমা করুন স্যার! by মতিউর রহমান চৌধুরী

মেলা কাল বাদে লিখছি। নানা কারণে অনেকদিন লিখতে পারিনি বা লিখিনি। মাঝে মাঝেই লেখার প্রচণ্ড ইচ্ছে হয়। আবার নিজেই নিজেকে সংযত করি। বলি কি দরকার। না লিখেও তো ভালোই আছি।
অযথা ঝামেলা আমন্ত্রণের কি প্রয়োজন। কিন্তু বিবেক যে তাড়া করে। যদি না-ই লিখি তাহলে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম কেন? বিলেত প্রবাসী হলে ক্ষতি কি ছিল? এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না। একটা পুরনো লেখা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম আমি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে? আমার সাহস গেল কোথায়? চোখের সামনে অনেক কিছুই তো ঘটছে। অনেকেই বলেন- কি ভাই সেদিন তো সাহসী হয়েছিলেন। এখন তো দেখি চুপ করে বসে আছেন। বলুন তো কি জবাব দেব তাদের। জবাব যে আমার কাছে নেই। শুধু কি লেখা? বলায়ও নানা হিসাবনিকাশ। সেদিন এক আড্ডায় এক ভদ্রলোক সরাসরি বললেন, কি ভাই এখন তো ‘দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য’ লিখতে পারেন না। এরশাদের জমানা। নব্বই সালের শুরুর দিকে সাপ্তাহিক খবরের কাগজে এই লেখাটি লিখেছিলাম। আমি তখন দৈনিক ইত্তেফাকের কূটনৈতিক রিপোর্টার। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ কভার করতে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। খবরের কাগজে নিয়মিত কলাম লিখি। নির্বাহী সম্পাদক জিল্লুর রহমান নাছোড়বান্দা। তৃতীয় মাত্রা খ্যাত জিল্লুর সকালে ফোন করে বললেন মতিভাই লেখা না দিয়ে ঢাকা ছাড়বেন না। বিশ্বাস করুন লেখা অসম্পূর্ণ রেখে বিমান ধরতে গেলাম এয়ারপোর্টে। জিল্লুরকে কি ফাঁকি দিতে পারবো? বিমান পাঁচঘণ্টা বিলম্বে ছাড়বে। ফিরে এলাম বাসায়। স্ত্রী বললেন সে কি? আবার কলম নিয়ে বসলে কেন? বললাম অসম্পূর্ণ লেখাটা শেষ করে দেই। ঠিকই একঘণ্টার মধ্যে লেখা শেষ করে জিল্লুরকে ফোন দিলাম- কাউকে পাঠালে ভালো হয়। একজন এসে লেখাটা নিয়ে গেল। আমি আবার বিমানবন্দরের দিকে ছুটলাম। বিষয়টি এখানেই তো শেষ হওয়ার কথা। সে কি আর হয়? হাফরুল বাতেন সীমান্ত থেকে ফিরে এলাম মদিনায়। সঙ্গে রয়েছেন আরো তিন সাংবাদিক। রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, আমানুল্লাহ কবির, সালাহউদ্দিন বাবর। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হচ্ছি এমন সময় একজন সৌদি প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার বললেন, আপনি এখানে। এইমাত্র বিবিসিতে শুনে এলাম ঢাকায় আপনাকে নিয়ে কত কিছু হচ্ছে। হুলিয়া জারি হয়েছে। আপনার লেখার কারণে সাপ্তাহিক খবরের কাগজের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্পাদক, প্রকাশক কাজী শাহেদ আহমেদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তাই নাকি? এতো সব। এখন তাহলে কি করবো? ঢাকায় ফোন করে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম নতুন কি আর আছে? আতঙ্কিত মাহবুবার কণ্ঠে ভীতির ছাপ। বিপদের কথাই জানালেন। বাড়ির সামনে গোয়েন্দারা গিজ গিজ করছে। খবরের কাগজে ফোন করেও কাউকে পেলাম না। সহকর্মীরা অপেক্ষা করতে বললেন। দেখা যাক না কি দাঁড়ায়। কি আর দাঁড়াবে? এরশাদ সাহেব তো সামান্য সমালোচনাই সহ্য করেন না। কথায় কথায় পত্রিকা বন্ধ করে দেন। কে তাকে রুখবে। একমাত্র ভরসা আদালত। ঠিকই আদালতে গড়ালো বিষয়টি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ ও বিচারপতি মোস্তাফা কামাল তখন  উচ্চ আদালতে সাহসী ভূমিকা রেখে চলেছেন। পত্রিকার প্রকাশনা পুনর্বহাল চেয়ে রিট হলো। যুগান্তকারী রায় দিলেন তারা। এখন থেকে কথায় কথায় পত্রিকা বন্ধ করা যাবে না। সাংবাদিকরা লিখতে পারবেন হাত খুলে। অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে নিজের চিন্তায় এবং বিবেকে। হেরে গেলেন এরশাদ। স্বৈরশাসনের কব্জামুক্ত হলো সাংবাদিকতা। আজ আমরা যেটুকু লিখছি বা বলছি তার জন্য সামান্যতম ক্রেডিট দিতে হলে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ তথা কাজী শাহেদ আহমেদকে দিতে হবে। নিজের কথা এখানে নাই বা বললাম। ইতিহাস হয়তো একদিন বিচার করবে। সেনাবাহিনীর লোক হয়েও সেদিন শাহেদ ভাই যে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন তা এদেশের মুক্ত সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকা উচিত। এরশাদ প্রশাসন পত্রিকা বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি। দেশে ফেরার পর ১৭ ঘণ্টা আমাকে আটকে রাখা হলো। আমার গাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিয়ে গিয়ে ব্রিজের ওপর থেকে ফেলে দেয়া হলো পানিতে। গাড়িটি যখন আনতে গেলাম তখন দেখলাম গাড়ির ওপরে নির্যাতনের চিহ্ন। আদালতে হেরে গিয়ে গাড়ির ওপর উল্লাসের নৃত্য করা হয়েছে। একটা রূপকাশ্রয়ী লেখাতে এত ঝাল হবে তা ভাবিনি কখনো। যে লেখায় এরশাদের নাম পর্যন্ত ছিল না। পাঠকদের জানার জন্য লেখাটি তুলে ধরছি এখানে।
এমন একদিন আসবে যেদিন মূর্খরা উদ্ভট আদেশ জারি করে দেশ শাসন করবে। নির্বোধরা তাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য গর্ব অনুভব করবে। পণ্ডিতরা তাদের পাণ্ডিত্যের জন্য অনুশোচনা বোধ করবেন। দুর্নীতিপরায়ণরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাসে নৃত্য করবে।
সাধক শেখ সাদী এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি অবশ্য সময় বলে যাননি কখন এমন ঘটনা ঘটবে। আমরা প্রতিদিনই এমন ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি। অনেক মিলও খুঁজে পাচ্ছি। তাহলে কি শেখ সাদীর বর্ণিত সেদিন এসে গেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনা করছে কারা? দেশে দেশে কিছু উদ্ভট আদেশ জারির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার খবর আমরা পাচ্ছি। তাদের মূর্খ বলা ঠিক হবে কিনা জানি না। তবে জনগণকে নিয়ে তারা তামাশা করে চলেছে। এমন আদেশ জারি করছে যা না মেনে কোনো উপায় নেই জনতার। এরা জনগণকে ভয় পায় না। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় না। মাঝে মধ্যে জনগণের সঙ্গে অভিনয় করে। বলে-জনগণই আমার শক্তি। আসলে জনগণের পক্ষে তারা কথা বলে না। এরা নিজেদের সবজান্তা মনে করে। জনগণকে বলে দেয়, আমি যা বলবো তাই মেনে চলতে হবে। জনগণের সেবক নয়, তারা চায় জনগণ তাদের সেবা করুক। এরা আইন মানে না। সংবিধান মানে না। তাদের ইচ্ছার ওপর দেশ চলে। দেশে দেশে এমন অবস্থা চলছে। যার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা থাকার কথা নয় বা রাষ্ট্র পরিচালনা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না অথচ তারা বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করে বলে-এভাবে দেশ চলতে পারে না। আজ থেকে আমি যেভাবে বলবো সেভাবে দেশ চলবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মাঝেমধ্যে তাদের উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করেন। তাতে কি যায় আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কিছুই জানেন না বলে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। রাজনীতিবিদরা দেশ চালানোর কোনো যোগ্যতা রাখে না বলে ফরমান জারি করে দেয়। বলে- রাজনীতিবিদরা দেশের সব অনিষ্টের মূল। এদের সমাজ থেকে নির্মূল করে দিতে হবে। ক’দিন পর যখন দেখে রাজনীতিবিদ ছাড়া চলে না তখন আবার রাজনীতিবিদদের ডেকে নিয়ে উজির বানায়। অর্থনীতিবিদদের ভর্ৎসনা করে স্পষ্ট বলে দেয়-এরা অর্থনীতির কি বুঝে? আমি সবই বুঝি। আমি লেফট রাইট করেও সব জেনেছি। বড় বড় বই পড়ার কোনো দরকার নেই। আমি কূটনীতিও বুঝি। সমালোচকরা বলে, আমি নাকি জেনারেল ডিপ্লোম্যাসিতে বিশ্বাস করি। এটা সর্বৈব মিথ্যা। আমি সব কূটনীতিতেই ওস্তাদ। সিদ্ধান্ত নিয়ে পাল্টানোর মধ্যে মজা আছে। পৃথিবীতে ক’জন পারে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে। আমি কারো সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেই না। আমি মনে করি, আমার চাইতে অন্যরা বেশি জানতেই পারে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য সিদ্ধান্ত নেই। সেভাবে কাজ করি। অন্যরা কে কি ভাবলো বা মনে করলো তা নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। আমার কাছে রাষ্ট্র বা জনগণ হচ্ছে পণ্য। সময় বুঝে নিলামে তুলি। অন্য রাষ্ট্রপ্রধান টেলিফোন করলে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাতে থাকি। হার্ভার্ডে পড়ালেখা করা লোককে বলি সে ইংরেজি জানে না। আমার ইংরেজি শুনে বৃটিশরাও বলে কি করে এত সুন্দর ইংলিশ শিখলাম।
আমি মনে করি, আমি ছাড়া সবাই নির্বোধ। তাই আমি বছরের পর বছর তাদের নির্বোধ হিসেবেই বিবেচনা করি। তারা আমার কথা হেরফের করে না। বরং গর্ব অনুভব করে। বলে-আমরা গর্বিত এমন এক সন্তানকে পেয়ে; যিনি না হলে রাষ্ট্র চলতোই না। পল্লীর বন্ধু হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়ে বসে। আমি শহরে থাকি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসা। মাঝেমধ্যে হেলিকপ্টারে উড়ে পল্লীতে যাই। কান্নাকাটি করি তাদের সুখ-দুঃখে। ফিরে এসে বলি এই ব্যাটাদের জন্য শান্তিতে থাকা গেল না। একটা না একটা সমস্যার মধ্যে ওরা থাকেই। কখনও পানিতে, কখনও রোগে-শোকে আবার কখনও অনাহারে। বলেন তো আর কাহাতক পারা যায়। আমি আর পারি না। আমারও তো আরাম-আয়েশের কথা চিন্তা করতে হয়। লোকে আমার সম্পর্কে অযথাই সমালোচনা করে। আমি শত ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু সময় আমোদ-ফুর্তিতে ডুবে থাকি তাও অনেকের সহ্য হয় না। তারা কানাঘুষা করে। অবশ্য জনসমক্ষে কিছু বলে না। তাদের আমি নির্বোধ বলি। জানেন তো আমার রাজ্যে পণ্ডিত বলে তো কেউ নেই। কারণ আমার জ্ঞানের চেয়ে তাদের জ্ঞান বেশি নয়। আমি তাদের বলেই দিয়েছি পাণ্ডিত্য যেন না দেখায়। আমি বৈঠক ডাকি। আলোচনা করতে বলি তাদের মধ্যে। ঘুরে এসে বলি আপনারা এবার বাড়ি যান। সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে ফেলেছি। তারা কোনো প্রশ্ন করে না। জানে, আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কতিপয় লোক ছিল শুধু শুধু আমার সমালোচনা করতো। বলতো আমার নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অধিকার নেই। এখন তারা ক্লান্ত। নিজেরাই বলছে, কেন রাজনীতি করলাম, দেশ স্বাধীন করলাম। এত লেখাপড়া করলাম কেন? তারা নিজেদের পাণ্ডিত্যের জন্য অনুশোচনা করে বলছে-আমি যোগ্য ব্যক্তি। আমার মতো পণ্ডিত লোক হয় না।
দুর্নীতির কথা বলবেন। আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছি। তবে আমাকে লোকে দুর্নীতিবাজ বলে। আমি নাকি টাকা পাচার করি। জনগণের রক্ত শুষে নিচ্ছি। আমার রাজ্যে দুর্নীতিবাজরা উল্লাস করে বলে আমরা দুর্নীতিবাজ-আসুন আমরা দুর্নীতিকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেই। কেউ কেউ সমালোচনার চেষ্টা করে। সুযোগ মতো তাদের নামও খাতায় লিখিয়ে দেই। অথবা মুখ বন্ধ করে দেই চেনাপথে। আমার কাছে জাদু আছে। গভীর রাতে আমার সঙ্গে সবাই দেখা করতে আসে। যারা পল্টনে গরম গরম বক্তৃতা করে তাদের দেখাও পাবেন আমার বাড়িতে। আমি মাঝেমধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তালিকা প্রকাশ করে বলি ওদের এবার রেহাই নেই।
জনগণের সামনে বলি, রাঘববোয়ালদের পাকড়াও করতে হবে। রাতে তাদের ডেকে বলি মনে কিছু করো না। আমাকে বলতে হয়। আমি যে রাষ্ট্র চালাই। তোমাদের কিছু হবে না। তোমরা ধরা পড়লে আমার কি হবে। তোমরাই তো আমার আসল শক্তি, বন্ধু। এ কথা শুনে দুর্নীতিবাজরা উল্লাস করে। এই উল্লাসে আমরা সবাই যোগ দেই।’
পাঠক পড়লেন তো লেখাটি। এখন নিশ্চয়ই দুটো গালি দিচ্ছেন। আর বলছেন, কই গেল আপনার সে সাহস। ক্ষমা করবেন পাঠক। এখন আমার সাহস নেই। বলতে পারেন ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। বরং উল্টো মনে হয় এরশাদ সাহেবকে বলি ‘ক্ষমা করুন স্যার! ক্ষমা করুন।’
ঢাকা, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০১৮