Wednesday, September 18, 2019

আগুনে কি ইরানই ঘি ঢালছে? by অনিম আরাফাত

আরামকো’র দুটি তেলক্ষেত্রে ভয়াবহ ড্রোন হামলাকে বলা হচ্ছে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে হওয়া ইতিহাসের সব থেকে বড় হামলাগুলোর একটি। এতে দেশটি যে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে তা ক্রমাগত সপষ্ট হতে শুরু করেছে। একদিনেই সৌদি আরবের তেল উৎপাদন মাত্রা অর্ধেকে নেমে এসেছে। যে তেলক্ষেত্রে হামলা হয়েছে সেটি শুধু সৌদি আরব নয়, সমগ্র বিশ্বের মধ্যে সব থেকে বড় তেল উৎপাদন কেন্দ্র। আর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এতটাই গুরুতর যে সেখান থেকে পুনরায় তেল উৎপাদন স্বাভাবিক করতে দেশটির কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। ইতিমধ্যে ১৯৯১ সালের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হামলার পর একদিনেই লাফিয়ে ২০ শতাংশ দাম বেড়ে গেছে তেলের। কিন্তু এখনো সপষ্ট নয় এত বড় একটি হামলার পর সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া ঠিক কী হতে চলেছে!
শনিবারের ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের ইরানপন্থি সংগঠন হুতি। সশস্ত্র ওই সংগঠনটির বিরুদ্ধে গত ৪ বছর ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ করছে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট। দীর্ঘ এ সময় হুতিরা বারবার নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে সৌদির শাসকদের বুকে ভয় ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছে। তবে এ বছরের আগপর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা তারা পায়নি। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে প্রায়শই তারা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা টার্গেট করে হামলা পরিচালনা করছে। সপষ্টতই তাদের সক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংগঠনটির দাবি, ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর সৌদি আরবের নির্বিচারে বোমাবর্ষণের জবাবের অংশ হিসেবেই শনিবারের ওই ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
হুতির দাবি অনুযায়ী, দশটি বোমাবাহী ড্রোনের মাধ্যমে ওই হামলা পরিচালনা করা হয়। কিন্তু এ দাবি ইতিমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি সপষ্টভাবেই বলছে, এ হামলার পেছনে সরাসরি ইরানের হাত রয়েছে। হুতির মতো সংগঠনের পক্ষে এ ধরনের হামলা চালানো সম্ভব নয়। হুতির দাবি, এ হামলা চালাতে তাদেরকে সাহায্য করেছে সৌদি আরবের মানুষই। তবে এ দাবিকে অসম্ভবই মনে করা হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে। অন্য যেটি হতে পারে তা হলো, অন্যান্যবারের মতো ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। এ জন্য তাদেরকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে নির্ভুল হামলা চালাতে হয়েছে। সৌদির এত অভ্যন্তরে হুতির এই মাত্রার হামলার সামর্থ্য রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সত্যিকার অর্থে হুতির এ হামলার পেছনে জড়িত থাকার সম্ভাবনা বেশ কম। ইরানের সহযোগিতায় ড্রোন প্রযুক্তিতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা সত্যেও এত বড় পাল্লায় নির্ভুল হামলা হুতিরা চালাতে পারে না। সব থেকে বড় কথা হলো, হুতিকে হামলা চালাতে হলে সৌদি আরবের আধুনিকতম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পার হয়ে ওই হামলা চালাতে হবে। ফলে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে যে, ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল থেকেই এ হামলা পরিচালিত হয়েছে। এটি হামলার শিকার তেলক্ষেত্রগুলো থেকে বেশ কাছেই। ইরাকের সামরিক বাহিনী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স বা পিএমএফ ইরান সরকারসমর্থিত। এটি সৌদি সীমান্ত এলাকায় বেশি সক্রিয় থাকে। সমপ্রতি ওই অঞ্চলে থাকা ইরানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিলো ইসরাইল। ধারণা করা হচ্ছে সেখান থেকেই শনিবারের হামলা চালানো হয়েছে। এ বছরের মে মাসে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে ড্রোন হামলা শুরু হয়। হামলার পর এর দায় স্বীকার করে নেয় হুতি যোদ্ধারা। কিন্তু গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, এসব হামলা ইয়েমেন থেকে নয় বরং ইরাক থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এবং এসব হামলা চালাচ্ছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ইরাকের ইরানপন্থি সামরিক বাহিনী। এ ছাড়া যেসব ড্রোন থেকে শনিবারের হামলাটি চালানো হয়েছে তা পরীক্ষার পর এ দাবি আরো জোরালো হয়েছে। এমন আধুনিক মানের ড্রোন ও বিস্ফোরক একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে থাকা অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হামলার একদিন পর রোববার মিডল ইস্ট আইকে ইরাকের একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ইরাকের অভ্যন্তর থেকেই ওই হামলা পরিচালনা করা হয়েছিলো। তবে ওই কর্মকর্তা নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। নেদারল্যান্ডসের যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ আরউইন ফন ভিন বলেন, হুতি হোক বা যেই হোক না কেনো এ হামলার সঙ্গে ইরান জড়িত ছিলই। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি কর্তৃপক্ষও দাবি করে আসছে, ইরানের রেভ্যুলুশনারি বাহিনী সৌদির আরামকো’র তেলক্ষেত্রগুলোকে টার্গেট করে ক্রুজ মিসাইল হামলার পরিকল্পনা করছে। আর এ হামলা তারা ইরাকের অভ্যন্তর থেকে পরিচালনা করতে চলেছে বলেও আশংকা করেছিলেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। ইতিহাসজুড়ে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ছিল বৈরী সমপর্ক। গত কয়েক বছরেও দেখা গেছে তার প্রকাশ। মধ্যপ্রাচ্যে দু’দেশের মধ্যেকার বৈরী ভাব প্রক্সি যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে আগুন জ্বলছে সামপ্রতিক সময়ে তাতে ঘি ঢালতে শুরু করেছে ইরান। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও তার পশ্চিমা মিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে দেশটি। গত শনিবার সৌদি তেলক্ষেত্রে হামলায় ইরানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকা তারই অংশ। ফলে ওই আগুন থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ মাত্রার যুদ্ধের আশংকা ক্রমাগত জোরালো হচ্ছে।

ভারতের পর বাংলাদেশে

নায়িকা আইরিন অভিনীত ‘পদ্মার ভালোবাসা’ ছবিটি আসছে ২০শে সেপ্টেম্বর ভারতে মুক্তি পাচ্ছে। হারুন-উজ-জামানের পরিচালনায় এ ছবিতে আইরিনের বিপরীতে অভিনয় করেছেন সুমিত সেন। গল্প তৈরি হয়েছে ষাটের দশকের পদ্মাপারের জীবন নিয়ে। আইরিন বলেন, এ ছবিটির প্রযোজনা সংস্থা স্বপ্নচূড়া ফিল্ম ইন্টারন্যাশনাল। তাদের কলকাতায়ও অফিস রয়েছে। তাই প্রযোজক আসছে ২০শে সেপ্টেম্বর প্রথমে ভারতের ২৫টি প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি দিচ্ছেন। সেখানে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করলে আমিও ভারতে যাব। ভারতের পর আগামী ১লা নভেম্বর বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি পাবে। এ ছবিতে বেশ কয়েকটি লুকে আমাকে দর্শকরা দেখতে পাবেন। ছবিটি নিয়ে আমি আশাবাদী। এদিকে এ ছবির বাইরে আইরিন অভিনীত এবং বুলবুল জিলানী পরিচালিত ‘রৌদ্রছায়া’ ছবিটি সামনে মুক্তি পাবে। এ ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন নিরব। এ ছাড়া অরণ্য পলাশের ‘গন্তব্য’ ছবিরও কাজ শেষ করেছেন আইরিন। উল্লেখ্য, নায়িকা আইরিন সুলতানা অভিনীত বেশকিছু ছবি এরইমধ্যে বড় পর্দায় মুক্তি পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘ছেলেটি আবোল তাবোল মেয়েটি পাগল পাগল’, ‘ইউটার্ন’, ‘এক পৃথিবী প্রেম’, ‘মায়াবিনী’ প্রভৃতি।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্ষণ করা হয়েছে আমাকে: বৃটিশ লেবার পার্টির প্রার্থীর অভিযোগ

বৃটেনের নর্থ ওয়েলসের অ্যাবারকনিতে বিরোধী লেবার দলের প্রার্থী এমিলি ওয়েন। তিনি অভিযোগ করেছেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। একই উদ্দেশে তাকে মদ্যপ বানানো হয়েছিল। একটি পাব-এর বাইরে লেবার দলের কর্মী ও সাংবাদিক ওয়েন জোনসের ওপর হামলার পর তিনি নিজের এই তথ্য প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজের ফেসবুক পেজে এমিলি ওয়েন এসব কথা জানিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ।

এমিলি ওয়েন বলেছেন, গত বছর তাকে মদ্যপ করে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ওই সময় তিনি এ বিষয়টি প্রকাশ করেন নি। কিন্তু আগস্টে লন্ডনের একটি পাব-এর বাইরে সাংবাদিক ওয়েন জোনসের ওপর হামলার পর আর মুখ বন্ধ রাখতে পারেননি তিনি। ওয়েন জোনস বলেছেন, তার ওপর পূর্বপরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে উগ্র ডানপন্থিরা। এর প্রেক্ষিতে এমিলি ওয়েন বলেছেন, আমি সহ সব দলের নির্বাচনের প্রার্থী এবং এমপিরা প্রতিদিন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়টি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

২৫ বছর বয়সী এমিলি জোনস কেন এক বছর আগে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের কথা প্রকাশ করেন নি? এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন। তবে তাকে কে ধর্ষণ করেছিল তার নাম বলেননি। তিনি বলেছেন, বহুবিধ কারণে তিনি ধর্ষণের বিষয়টি পুলিশে রিপোর্ট করেন নি। তার ভাষায়, আমার ক্ষোভ ছিল। কিন্তু আমি সেই ক্ষোভ থেকে ধর্ষককে ক্ষমা করে দিয়েছি। তা সত্ত্বেও আমার কিছু বলার আছে। এমন কিছু মানুষ আছে তাদেরকে আমি ক্ষমা করতে পারি না। সাংবাদিক ওয়েন জোনস হামলার বিষয়ে কথা বলতে তার প্লাটফর্ম ব্যবহার করেছেন। আমি আমার প্লাটফর্ম ব্যবহার করবো। কথা বলবো। কথা বলবো সেইসব মানুষের জন্য যারা মনে করেন তাদের কথা কেউ শোনে না। প্রতিদিন উগ্র ডানপন্থিদের হামলার শিকারে পরিণত হন হাজার হাজার মানুষ। তাই আমি বসে থাকতে এবং এসব ঘটতে দিতে পারি না। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সমালোচনা করেন। বলেন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমরা একজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছি, যাকে উগ্র ডানপন্থিরা তাদের নেতা হিসেবে দেখে।

এমিলি জোনস বলেন, রাস্তাঘাটে হামলার শিকার হচ্ছে মানুষজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘৃণাপ্রসূত কথাবার্তা তো এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দেশজুড়ে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এটাই বাস্তবতা এবং এটাই ঘটছে এখন। আমাদের নেতারা একে আর অপ্রাসঙ্গিক বলে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। যদি তারা তা করেন, তাহলে আমাদেরকে একত্রিত হয়ে অবশ্যই এ ধারা থামাতে হবে। বরিস জনসনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, প্রকৃত নেতৃত্ব প্রদর্শন করুন। বন্ধ করুন ঘৃণা। সংবাদ শিরোনাম হতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উদ্ভট মন্তব্য করা বন্ধ করুন। এমন মন্তব্য আপনার গুরুত্বর ক্ষতি করবে। আপনার সমর্থকদেরকে অনলাইনে এবং শারীরিকভাবে ভয়াবহ হামলা বন্ধ করতে বলুন।

লিবিয়ায় বন্দিদশা থেকে বাংলাদেশির আর্তনাদ: আমাকে এই জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন by রুদ্র মিজান

‘আমাকে বাঁচান। আমি এই জীবনে কখনও বিদেশের নাম নেব না। আমাকে এই জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। আমাকে ওরা মেরে ফেলবে।’ এভাবেই দেশে স্বজনদের কাছে বাঁচার আকুতি জানান বিদেশে দালাল চক্রের হাতে জিম্মিরা। প্রায় চার মাস যাবত জিম্মি তারা। রাখা হয়েছে টর্চার সেলে। এটি অন্ধকার ছোট একটি কক্ষ। সেখানে রাখা হয়েছে ১০ থেকে ১২ জনকে। রাত এলেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে দালালরা। একেক জন করে ডেকে নেয় আলাদা কক্ষে। তারপর কান্নায় ভারি হয়ে উঠে বাতাস। বিদেশে-বিভূঁইয়ের এই কান্না চার দেয়ালেই আটকে থাকে। তবে দালালরা মাঝে-মধ্যে কান্নার শব্দ শোনায় দেশে থাকা স্বজনদের। কান্নার শব্দ শুনিয়ে দাবি করে টাকা। দাবিকৃত টাকা না দিলে হত্যা করার হুমকি দেয়। এখানেই শেষ নয় অত্যাচারের। মারধর ছাড়াও খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়। খাবার নেই, পানি নেই। দিনে একবার, কখনও কখনও এক দিন পরপর নাম মাত্র খাবার ও পানি দেয়া হয়। খেয়ে না খেয়ে শরীর শুকিয়ে হাড্ডিসার।

বিভিন্ন উন্নত দেশের কথা বলে তাদের লিবিয়ায় এনে বন্দি করে রাখা হয়েছে। দিনের পর দিন অত্যাচার করে বাড়িতে থাকা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এভাবেই লিবিয়ার টর্চার সেলে অন্যান্যদের সঙ্গে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার তারাশুলের মো. সামাজুল ইসলাম। এ বিষয়ে মানবপাচার ট্রাইবুন্যালে মামলা করেছেন তার চাচা আব্দুল কদ্দুছ। মামলা সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালাতেন তিনি। গরীব কৃষক পরিবারের এই সন্তানকেই টার্গেট করে দালাল চক্র।  একই এলাকার গণেশপুরের নুর আলী তাকে প্রলোভন দেখায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় লক্ষাধিক টাকা বেতনে চাকরির সুযোগ রয়েছে। সেই প্রলোভনে পা দেন সামাজুল। কথানুসারেই এক মাসের মধ্যে নগদ তিন লাখ টাকাসহ ভিসার জন্য পাসপোর্ট, ছবি নুর আলীর নিকট দেন তিনি। অতঃপর গত ১৮ই মে নুর আলী তাকে জানান, সাউথ আফ্রিকার ভিসা হয়েছে। পরদিন ফ্লাইট। দ্রুত আরও দেড় লাখ টাকা দিতে হবে। এবার তাড়াহুড়া করে নিজের শেষ সম্বল সিএনজি অটোরিকশা বিক্রি করে দেড় লাখ টাকা তুলে দেন নুর আলীর হাতে।

১৯শে মে বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি বিমানে তুলে দেয়া হয় সামাজুলকে। জানানো হয়, দুবাইয়ের শারজাহ বিমানবন্দরে দালাল চক্রের লোকজন তাকে গ্রহণ করবে। সেখান থেকে স্থল পথে সাউথ আফ্রিকা পাঠানো হবে তাকে। স্বজনরাও তাকে বিদায় জানালেন। বিমানটি আকাশে উড়লো। সেই যে দেশ ছেড়ে গেলেন এরপর থেকে সামাজুলের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না স্বজনরা। দীর্ঘদিন তার কোনো হদিস নেই। দালাল নুর আলী, এই চক্রের সদস্য রাসেল মিয়া, রাকিব হাসান, নাসির, সুজন, জামান কেউ কোনো সন্ধান দিতে পারে না। দুশ্চিন্তায় পড়ে যান স্বজনরা। এভাবে একে একে প্রায় তিন মাস কাটে। সামাজুল বেঁচে আছে কি-না, তাও জানেন না তারা। গত ১৫ই আগস্ট হঠাৎ করেই ফোনে সামাজুলের কল। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সামাজুল। তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলে তাকে লিবিয়ায় আটকে রাখা হয়েছে। একটি ছোট অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে সামাজুলসহ আরও ১০-১২ জনকে। লিবিয়ায় চক্রটির হয়ে কাজ করে অ্যারাবিয়ানরা। প্রতি রাতেই বেদম প্রহার করা হয় তাদের। চক্রের সদস্যদের দাবি একটাই, টাকা চাই। দেশ থেকে টাকা নিতে চাপ দিচ্ছে তারা।

সামাজুলের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে চক্রটি। সামাজুল হাতে-পায়ে ধরে অনুনয় করেন। সামাজুল জানান, তিনি গরীব। তার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন। সেটিও বিক্রি করে দিয়েছেন বিদেশে যাওয়ার জন্য। এখন তার কিছুই নেই। চক্রের সদস্যদের তাতে মায়া হয় না মোটেও। বরং টাকা না পেয়ে অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায়। আগুন দিয়ে রড গরম করে ছ্যাকা দেয়া হয়। লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করা হয় তাকে। নামমাত্র খাবার দেয়া হয়। কোনোভাবে বেঁচে আছেন তিনি।

সামাজুল ইসলামের বড় ভাই তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা গরীব মানুষ। সামাজুল তার শেষ সম্বল বিক্রি করে সাউথ আফ্রিকা যেতে চেয়েছিলো। দালালরা প্রতারণা করে তাকে লিবিয়া নিয়ে বন্দি করে নির্যাতন করছে। তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। এই অবস্থায় আমার চাচা আদালতে মামলা করেছেন। মামলা দায়েরের পর দালালরা আমার ভাইকে ছেড়ে দেবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এখনও সামাজুলকে ছাড়েনি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চেয়েছে ভুক্তভোগীর পরিবার।

যে কারণে র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাবি’র পতন: নেই পর্যাপ্ত গবেষণা, বিদেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক রাজনীতি by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

দুনিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় কেন নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় -হালজমানায় বহুল আলোচিত এক প্রশ্ন। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার তৈরি করা র‌্যাঙ্কিংয়ে দিনে দিনে নিম্নমুখী প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাবি’র অবস্থান। সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ এক হাজারের মধ্যেও আসেত পারেনি। অথচ এই তালিকায় পাশের দেশ ভারতের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এক হাজারের মধ্যে। এমনকি রাজনীতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিতিশীল দেশ পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থানও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার সংখ্যা ও সুনাম, সাইটেশন বা গবেষণার উদ্ধৃতি, এ খাত থেকে আয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতাসহ ৫টি মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করা হয় প্রতিবছর। র‌্যাঙ্কিংয়ে বিদেশি ছাত্রের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে শূন্য। হায়ার এডুকেশনের র‌্যাঙ্কিয়ে বিশ্বের ৯২টি দেশের ১৩শ বিশ্ববিদ্যালয় অন্তুর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এক হাজারের পরে। অথচ ২০১৬ সালে এই তালিকায় ঢাবির অবস্থান ছিল ৬শ’তে। চার বছরে র‌্যাঙ্কিং পিছিয়েছে ৪শ’ ধাপ। বিশ্বসেরাদের তালিকায় স্থান না পাওয়া নিয়ে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা কাজ করলেও এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই বললেই চলে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে মেধাবীরা ভর্তি হন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন শিক্ষার পরিবেশ, পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব, সাইটেশন বা গবেষণার উদ্ধৃতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ক্ষেত্রে দুর্বলতার কারণে এমনটা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা আরো করুণ বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই গবেষণায় জোর দেয় না। গবেষণা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৩তম বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের মোট ৬৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না। গবেষণার বদলে চলে মুখস্থ-নির্ভর পড়াশোনা। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা খাতে বরাদ্দের হারের চিত্রও বেশ করুণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাজেটের পরিমাণ ছিল ৮১০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। তবে মোট বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৫.০৪ শতাংশ। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৬.৬২ শতাংশ। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্র প্রতিনিধরা এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় সময় বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণার এই বাজেটের অর্থও ব্যয় করতে পারে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে থাকার জন্য গবেষণার এই করুণ দশাই যথেষ্ট। যেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হওয়ার কথা গবেষণা, সেখানে গবেষণার এমন দশা। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশে কোনো গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য শিক্ষকদের বরাদ্দ মাত্র ৭৫০ টাকা। যা দিয়ে বহির্বিশ্বে কখনো গবেষণা উপস্থাপন করা সম্ভব নয় এবং হাস্যকর বটে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রকল্প প্রদানে স্বজনপ্রীতি, ভালো ল্যাব না থাকা, গবেষণায় বরাদ্দে অপ্রতুলতা, ভালো গবেষণার স্বীকৃতি না পাওয়া, পদোন্নতিতে গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রাধান্য দেয়া, মেধাবী শিক্ষকদের গবেষণাবিমুখ হওয়া, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ না থাকা, বিশ্বদ্যিালয়ের ওয়েবসাইটগুলো ভুল তথ্যে ভরা বা আপডেট না থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি না থাকা। ফলে দেশের বাইরে থেকে কেউ যদি জানতে চান বাংলাদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে, ওয়েবসাইট থেকে প্রায় কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

এ ব্যাপারে ঢাবির শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, নানান বিষয় যাচাই-বাছাই করে আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংটা হয়। এখন যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বা জালিয়াতি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায় সেই বিষয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থাকে ক্ষমতাসীন ছাত্রদের দখলে। যার কারণে শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ পায় না। শুনলাম শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে খুব কম নম্বর পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। সেটার অন্যতম কারণ অপরাজনীতি। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না বললেই চলে। আন্তর্জাতিক জার্নালে নেই কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর লেখা। তাহলে কীভাবে র‌্যাঙ্কিংয়ে জায়গা করে নিবে বিশ্ববিদ্যালয়- প্রশ্ন এই শিক্ষার্থী প্রতিনিধির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, এটা এক কথায় বলা যায় যোগাযোগের অভাব। টাইমস হায়ার এডুকেশনের সঙ্গে এবার আমিই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করেছি। তারা যেসব তথ্য চেয়েছে, আমরা তা দেয়ার চেষ্টা করেছি। আগামীবার থেকে অবশ্যই আমাদের একটা অবস্থান হবে। তবে তারা যেসব বিষয় আমাদের কাছে জানতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন বিদেশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী আছে, পিএইচডি এবং এমফিলের শিক্ষার্থী পার্সেন্টেজ কেমন, গবেষণার অবস্থা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত অনার্স মাস্টার্সের ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। তার বাইরে শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় এমফিল বা পিএইচডি করানো হয়। গবেষণা আগের চেয়ে অনেক ভালো করছে। সব মিলিয়ে তো কিছু সংকট আছেই। আমরা চেষ্টা করছি- তাদের সূচকগুলো (পয়েন্ট) কীভাবে আরো বেশি মার্কস পাওয়া যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে। সবাই সেই প্রচেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিষয়টি নিয়ে কথা বলা আমার জন্য বিব্রতকর। তবে আমি যেটা বলবো, ২০১৬ সালে তো বিশ্ববিদ্যালয় এক হাজারের মধ্যেই ছিল। কিন্তু এখন তো সেটার মধ্যেও নেই। কেন নেই প্রশাসন বলতে পারবে। আগের তুলনায় বাজেট বেড়েছে, সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। এখন প্রশাসন বিষয়টি আমলে নিয়ে কাজ করলেই হয়তো ভালো কিছু হবে আশা করি।

বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আকতারুজ্জামান বলেন, আমরা বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে কেন আসতে পারছি না, তা খুঁজে বের করেছি। সংস্থাগুলো যে সূচকে বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিং করে সেই সূচকগুলোতে আমাদের পয়েন্ট ওঠে না। সে ক্ষেত্রে আমাদের অনেক সময় লাগবে। আরো বেশকিছু সংযোজন লাগবে। যেমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব আয়, অনেক মিলিয়ন লাগে। কিন্তু আমরা তো চলি এখনো সরকারের বাজেট দিয়ে। এর বাইরে বিভিন্ন তহবিল লাগে বিভিন্ন কাজে। আরেকটি বিদেশি ছাত্রের পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি ছাত্রের পরিমাণ শুরু থেকেই অনেক কম। আরেকটা বড় বিষয়- যেখানে আমরা একশ’র মধ্যে পেয়েছি মাত্র ষোলো। যেটা সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ। শ্রেণিকক্ষ সেমিনার, লাইব্রেরি, পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা আমাদের এখানে নেই। দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব সুবিধা দিতে পারে শিক্ষার্থীদের আমরা সেটা দিতে পারি না। গবেষণা বিষয় নিয়ে তিনি বলেন, গবেষণা কম হচ্ছে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়কে অপমান করার জন্য অনেকে বলে। এ বিষয়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারলেই আমরা র‌্যাঙ্কিংয়ে আসতে পারবো।

সৌদিতে হুতি হামলা: যুদ্ধ চাই না, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত আছি -ট্রাম্প

যুদ্ধ চান না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি বলেছেন, অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আমরা যুদ্ধের জন্য অধিক প্রস্তুত আছি। সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতিদের ড্রোন হামলার পর যখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে তখন এমন মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি আরো বলেছেন, সৌদি আরবের ওই হামলার নেপথ্যে তেহরান আছে এ বিষয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিশোধ নেয়ার কোনো পথ বেছে নেবেন না তিনি। হুতিরা গত শনিবারের হামলার দায় স্বীকার করলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। হামলার জন্য তিনি সরাসরি দায়ী করেছেন ইরানকে। তবে ট্রাম্প সেরকম মন্তব্য করেননি। তিনি বলেছেন, মনে হচ্ছে এ হামলার জন্য দায়ী ইরান। তাই তিনি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চাইছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ।

ওদিকে সৌদি আরবে তেলক্ষেত্রে হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। শনিবার সৌদি আরবের এবং বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্র আবকাইক এবং খুরাইসে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে সৌদি আরবের তেল উত্তোলন কমে যায় অর্ধেক। ফলে কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায়। ওই দুটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করে বোমা হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম শতকরা প্রায় ২০ ভাগ বেড়ে গেছে। কিন্তু ডনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের পর তা কমে শতকরা প্রায় ১০ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। ট্রাম্প বলেছেন প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের যে মজুত আছে তা ব্যবহার করা হতে পারে। এর পরই দাম কিছুটা কমে আসে।

এমন অবস্থায় হোয়াইট হাউসে একজন সাংবাদিক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে প্রশ্ন করেন, সৌদি আরবের হামলার নেপথ্যে ইরান কিনা। জবাবে ট্রাম্প বলেন, এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে তাই মনে হচ্ছে। আমরা আপনাদেরকে জানাবো। তারপরও বিষয়টিতে নিশ্চিত হলেই আমরা আপনাদেরকে জানাবো। তিনি আরো বলেন, আমরা কারো সঙ্গে যুদ্ধ চাই না। কিন্তু অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আমরা বেশি প্রস্তুত রয়েছি (যুদ্ধের জন্য)। বিষয়টি নিশ্চিত হতে সৌদি আরব সফর করবেন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। পম্পেও বলেছেন, যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে, হামলার জন্য দায়ী ইরান।

স্কাই নিউজ লিখেছে, ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতিদের সমর্থন দেয় ইরান। তারা বলছে, এই হামলার জন্য দায়ী তারা। এমনও সতর্কতা দিয়েছে যে, তারা আরো হামলা চালাবে। তা সত্ত্বেও আবকাইক ও খুরাইসে তেলক্ষেত্রে হামলার জন্য ইরানকেই দায়ী করছে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় ইরানে তৈরি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা ইয়েমেন থেকে ছোড়া হয়নি বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য মিলেছে বলে দাবি করেছেন সৌদি আরবের সামরিক মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল মালকি। জাতিসংঘে তার এই মন্তব্যের প্রতিধ্বনি তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে বলেছেন, যে তথ্য মিলছে তাতে ইঙ্গিত মেলে এই হামলার জন্য ইরান দায়ী। এ ছাড়া ইয়েমেন থেকে হামলা হয়েছে এর পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই তদন্তের ওপর ভিত্তি করে তারা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে নিশ্চিত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

ওদিকে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তিনি বলেছেন, ইয়েমেনের মানুষ তাদের প্রতিরক্ষার বৈধ অধিকার চর্চা করছে। বছরের পর বছর ধরে তাদের বিরুদ্ধে যে আগ্রাসন চলছে তার পাল্টা প্রতিশোধের অংশ ছিল ওই হামলা। ইরানের বার্তা সংস্থা ইনসা রিপোর্ট দিচ্ছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পাচার করে ডিজেল দেয়ার সময় পারস্য উপসাগরে একটি জাহাজকে জব্দ করেছে ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডস। এখানে উল্লেখ্য, এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার লড়াই চলছে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে। ফলে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বড় এক অচলাবস্থা। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। তাদের সঙ্গে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও। ফলে এটাকে অনেক সময় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে একটি প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কিত ভারতের মুসলিমরা -বিবিসির প্রতিবেদন by রাজিনি বিদ্যানাথান

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ঘৃণা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক এই দেশটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অধীনে ক্রমশ ভয়াবহভাবে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। বিবিসিতে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন রাজিনি বিদ্যানাথান।
এতে তিনি লিখেছেন, ভারতে লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট গ্রহণের মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের একজন মুসলিম ব্যবসায়ী তার কাজ শেষে ফিরছিলেন। কিন্তু এ সময় তাকে ঘিরে ধরে দাঙ্গাকারীরা। ওই মুসলিমের নাম শওকত আলী। তাকে একদল দাঙ্গাকারী ঘিরে ধরে কর্দমাক্ত স্থানে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য করে। এরপর তার ওপর হামলা হয়। তাদের একজন শওকত আলীকে ভারতের নাগরিক কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জানতে চান- ‘আপনি কি বাংলাদেশী?’ অন্য একজন শওকত আলীর দিকে আঙ্গুল নাচাতে নাচাতে জানতে চান, কেন এখানে গরুর মাংস বিক্রি করেছেন? এ সময় তার চারপাশে অনেক মানুষ সমবেত হয়। তারা শওকত আলীকে সহায়তা করার পরিবর্তে ঘটনা মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করতে শুরু করে।
প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে। শওকত আলী এখনও ঠিক মতো হাঁটতে পারেন না। রাজিনি বিদ্যানাথান লিখেছেন, তিনি যেখানে দোকান চালান সেখান থেকে অল্প দূরেই তার বাড়িতে গেলাম সাক্ষাত করতে। তিনি বিছানায় পা ক্রস করে দিয়ে বসলেন। কথা বলার সময় অশ্রুতে চোখ ভরে যেতে লাগলো। তিনি বর্ণনা করতে লাগলেন কি ঘটেছিল সেদিন। শওকত আলী বলেন, তারা একটি লাঠি দিয়ে আমাকে পিটিয়েছে। মুখে লাথি মেরেছে। এ সময় তিনি তার থুঁতনির নিচে এবং মাথায় ক্ষতের চিহ্ন দেখান।
কয়েক দশক ধরে ছোট্ট একটি দোকান থেকে গরুর মাংস বিক্রি করে তার পরিবার। কিন্তু এর আগে কখনো তাদেরকে এমন বিপত্তিতে পড়তে হয় নি। ভারতের অনেক রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে গরুর মাংস আসামে বিক্রি করা বৈধ। শওকত আলী শুধু শারীরিকভাবে আহত হন নি। একই সঙ্গে তার মানমর্যাদাও যেন কেড়ে নেয়া হয়েছে। তার ওপর হামলাকারীরা তাকে শূকরের মাংস ভক্ষণ করতে বাধ্য করেছে। তাকে বাধ্য করেছে ওই মাংস চিবাতে এবং তারপর তা গিলে ফেলতে। কান্নায় ভেঙে পড়েন শওকত আলী। তিনি বলেন, আমার এখন বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। আমার ওপর যে আঘাত হানা হয়েছে তা আমার পুরো ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত।
রাজিনি লিখেছেন, যেদিন আমরা শওকত আলীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেলাম, সেদিন তার বাড়িতে সমবেত হলেন স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ। তারা সবাই শওকত আলীর কাহিনী শুনছিলেন। শুনতে শুনতে কেউ কেউ কাঁদতে শুরু করলেন। তাদের মধ্যে ভয়, তারাও কি একই রকম বিপর্যয়ের শিকার হবেন!
বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচন চলছে ভারতে। কিন্তু প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে, কিভাবে দেশটির ১৭ কোটি ২০ লাখ মুসলিমকে কিভাবে সেই যাত্রায় সবার সঙ্গে অঙ্গীভূত করা হচ্ছে তা নিয়ে। গরুর মাংস বিক্রির জন্য অথবা সন্দেহজনকভাবে গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগে আক্রমণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার সর্বশেষ শিকার শওকত আলী। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার এক রিপোর্টে বলে যে, ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতের ১২টি রাজ্যে কমপক্ষে ৪৪ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জনই মুসলিম। একই সময়ে ২০টি রাজ্যে শতাধিক হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় ২৮০ জন। বার্ষিক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মিশেলে ব্যাচেলেট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হয়রানি ও তাদেরকে টার্গেট করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে মুসলিম ও ঐতিহাসিকভাবে যেসব মানুষ পিছিয়ে পড়েছে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে আছেন- যেমন দলিত, তারাই এমন আচরণের শিকার হচ্ছেন।
স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারতে সব ধর্মবিশ্বাসের মানুষের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সহিংসতা কাঙ্খিত নয়। কিন্তু বাস্তব উদ্বেগের বিষয় হলো, যারাই বর্তমানে ক্ষমতা পান তারাই দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভোট করেন। এর সবচেয়ে শিহরণ সৃষ্টিকারী ঘটনারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ভয়াবহ সব গণধর্ষণের পরের একটি বিষয়। গত বছর জানুয়ারিতে আট বছর বয়সী একটি মুসলিম মেয়ে তাদের ঘোড়াকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের কাঠুয়া জেলায় তার বাড়ি। সেখান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। হিন্দুদের একটি মন্দিরে তাকে এক সপ্তাহ জিম্মি রাখা হয়। এ সময়ে তাকে পর্যায়ক্রমে গণধর্ষণ করা হয়। নির্যাতন করা হয়। তারপর তাকে হত্যা করা হয়। এর পরে এ নিয়ে পুলিশ রিপোর্ট দেয়। তাতে বলা হয়, যাযাবর বলে পরিচিত মুসলিম বাকেরওয়াল সম্প্রদায়কে ওই এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি গ্রুপ। এ জন্যই তারা ওই অপরাধ ঘটিয়েছে।
এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কাঠুয়ার প্রত্যন্ত এলাকায় ওই কন্যাশিশুর বাড়ির বাইরে এখন একজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে প্রহরা দিচ্ছেন। রাজিনি লিখেছেন, নিহত কন্যার পিতা আমার সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন, তখন তার চোখ দিয়ে যেন অশ্রুর বাঁধ মানছিল না। তিনি বলছিলেন, অভিযুক্তরা বলেছে ও হলো একজন মুসলিম কন্যা। তাকে হত্যা করো। এতে তারা ভয়ে ভীত হয়ে যাবে এবং এ এলাকা থেকে পালিয়ে যাবে।
কিন্তু ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তারা এক সময় যে বাড়িতে বসবাস করতেন তা তারা ছাড়তে পারেন নি। তারা ওই বাড়ি ছেড়ে যেতে চান না। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। ওই কন্যাশিশুর মা বলেন, আমরা বাড়ির বাইরে যেতে ভয় পাই। ভয় হয় আমাদের জীবনও শেষ করে দিতে পারে। আমরা বাইরে পা বাড়ালেই লোকজন আমাদেরকে প্রহার করার হুমকি দেয়।
আট বছর বয়সী ওই কন্যাশিশুকে হত্যার পর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে। ওই নৃশংসতায় অভিযুক্ত আটজন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পক্ষেই রয়েছে বেশি মানুষের সমর্থন। তারা নির্যাতনে শিকার হয়ে মারা যাওয়া ওই শিশু ও তার পরিবারের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখায় নি। অভিযুক্তদের পক্ষে রাজপথে সমর্থন জানিয়ে যারা বিক্ষোভ করেছে তার মধ্যে রয়েছে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির দু’জন মন্ত্রী চৌধুরী লাল সিং এবং চন্দর প্রকাশ গঙ্গা। ওই সময় এক র‌্যালিতে লাল সিং বলেছিলেন, একজন মেয়ে মারা গেছে। অনেক তদন্ত হচ্ছে। এখানে তো এরকম অনেক নারীই মারা যান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ঘৃণা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক এই দেশটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অধীনে ক্রমশ ভয়াবহভাবে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। বিবিসিতে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন রাজিনি বিদ্যানাথান।
এতে তিনি লিখেছেন, ভারতে লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট গ্রহণের মাত্র কয়েক দিন আগের ঘটনা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের একজন মুসলিম ব্যবসায়ী তার কাজ শেষে ফিরছিলেন। কিন্তু এ সময় তাকে ঘিরে ধরে দাঙ্গাকারীরা। ওই মুসলিমের নাম শওকত আলী। তাকে একদল দাঙ্গাকারী ঘিরে ধরে কর্দমাক্ত স্থানে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য করে। এরপর তার ওপর হামলা হয়। তাদের একজন শওকত আলীকে ভারতের নাগরিক কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জানতে চান- ‘আপনি কি বাংলাদেশি?’ অন্য একজন শওকত আলীর দিকে আঙ্গুল নাচাতে নাচাতে জানতে চান, কেন এখানে গরুর মাংস বিক্রি করেছেন? এ সময় তার চারপাশে অনেক মানুষ সমবেত হয়। তারা শওকত আলীকে সহায়তা করার পরিবর্তে ঘটনা মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করতে শুরু করে। প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে।
শওকত আলী এখনও ঠিক মতো হাঁটতে পারেন না। রাজিনি বিদ্যানাথান লিখেছেন, তিনি যেখানে দোকান চালান সেখান থেকে অল্প দূরেই তার বাড়িতে গেলাম সাক্ষাৎ করতে। তিনি বিছানায় পা ক্রস করে দিয়ে বসলেন। কথা বলার সময় অশ্রুতে চোখ ভরে যেতে লাগলো। তিনি বর্ণনা করতে লাগলেন, কী ঘটেছিল সেদিন। শওকত আলী বলেন, তারা একটি লাঠি দিয়ে আমাকে পিটিয়েছে। মুখে লাথি মেরেছে। এ সময় তিনি তার থুঁতনির নিচে এবং মাথায় ক্ষতের চিহ্ন দেখান।কয়েক দশক ধরে ছোট্ট একটি দোকান থেকে গরুর মাংস বিক্রি করে তার পরিবার। কিন্তু এর আগে কখনো তাদেরকে এমন বিপত্তিতে পড়তে হয়নি। ভারতের অনেক রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে গরুর মাংস আসামে বিক্রি করা বৈধ। শওকত আলী শুধু শারীরিকভাবে আহত হননি। একই সঙ্গে তার মানমর্যাদাও যেন কেড়ে নেয়া হয়েছে। তার ওপর হামলাকারীরা তাকে শূকরের মাংস ভক্ষণ করতে বাধ্য করেছে। তাকে বাধ্য করেছে ওই মাংস চিবাতে এবং তারপর তা গিলে ফেলতে। কান্নায় ভেঙে পড়েন শওকত আলী। তিনি বলেন, আমার এখন বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। আমার ওপর যে আঘাত হানা হয়েছে তা আমার পুরো ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত।
রাজিনি লিখেছেন, যেদিন আমরা শওকত আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম, সেদিন তার বাড়িতে সমবেত হলেন স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ। তারা সবাই শওকত আলীর কাহিনী শুনছিলেন। শুনতে শুনতে কেউ কেউ কাঁদতে শুরু করলেন। তাদের মধ্যে ভয়, তারাও কি একই রকম বিপর্যয়ের শিকার হবেন!
বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচন চলছে ভারতে। কিন্তু প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে, কীভাবে দেশটির ১৭ কোটি ২০ লাখ মুসলিমকে সেই যাত্রায় সবার সঙ্গে অঙ্গীভূত করা হচ্ছে তা নিয়ে। গরুর মাংস বিক্রির জন্য অথবা সন্দেহজনকভাবে গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগে আক্রমণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার সর্বশেষ শিকার শওকত আলী। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার এক রিপোর্টে বলে যে, ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতের ১২টি রাজ্যে কমপক্ষে ৪৪ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জনই মুসলিম। একই সময়ে ২০টি রাজ্যে শতাধিক হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় ২৮০ জন। বার্ষিক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মিশেলে ব্যাচেলেট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হয়রানি ও তাদেরকে টার্গেট করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে মুসলিম ও ঐতিহাসিকভাবে যেসব মানুষ পিছিয়ে পড়েছে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে আছেন- যেমন দলিত, তারাই এমন আচরণের শিকার হচ্ছেন।
স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারতে সব ধর্মবিশ্বাসের মানুষের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সহিংসতা কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু বাস্তব উদ্বেগের বিষয় হলো, যারাই বর্তমানে ক্ষমতা পান তারাই দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভোট করেন। এর সবচেয়ে শিহরণ সৃষ্টিকারী ঘটনারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ভয়াবহ সব গণধর্ষণের পরের একটি বিষয়। গত বছর জানুয়ারিতে আট বছর বয়সী একটি মুসলিম মেয়ে তাদের ঘোড়াকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের কাঠুয়া জেলায় তার বাড়ি। সেখান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। হিন্দুদের একটি মন্দিরে তাকে এক সপ্তাহ জিম্মি রাখা হয়। এ সময়ে তাকে পর্যায়ক্রমে গণধর্ষণ করা হয়। নির্যাতন করা হয়। তারপর তাকে হত্যা করা হয়। এর পরে এ নিয়ে পুলিশ রিপোর্ট দেয়। তাতে বলা হয়, যাযাবর বলে পরিচিত মুসলিম বাকেরওয়াল সম্প্রদায়কে ওই এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি গ্রুপ। এ জন্যই তারা ওই অপরাধ ঘটিয়েছে।
এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কাঠুয়ার প্রত্যন্ত এলাকায় ওই কন্যাশিশুর বাড়ির বাইরে এখন একজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে প্রহরা দিচ্ছেন। রাজিনি লিখেছেন, নিহত কন্যার পিতা আমার সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন, তখন তার চোখ দিয়ে যেন অশ্রুর বাঁধ মানছিল না। তিনি বলছিলেন, অভিযুক্তরা বলেছে ও হলো একজন মুসলিম কন্যা। তাকে হত্যা করো। এতে তারা ভয়ে ভীত হয়ে যাবে এবং এ এলাকা থেকে পালিয়ে যাবে।
কিন্তু ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তারা এক সময় যে বাড়িতে বসবাস করতেন তা তারা ছাড়তে পারেননি। তারা ওই বাড়ি ছেড়ে যেতে চান না। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। ওই কন্যাশিশুর মা বলেন, আমরা বাড়ির বাইরে যেতে ভয় পাই। ভয় হয় আমাদের জীবনও শেষ করে দিতে পারে। আমরা বাইরে পা বাড়ালেই লোকজন আমাদেরকে প্রহার করার হুমকি দেয়।
আট বছর বয়সী ওই কন্যাশিশুকে হত্যার পর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে। ওই নৃশংসতায় অভিযুক্ত আটজন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পক্ষেই রয়েছে বেশি মানুষের সমর্থন। তারা নির্যাতনে শিকার হয়ে মারা যাওয়া ওই শিশু ও তার পরিবারের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখায়নি। অভিযুক্তদের পক্ষে রাজপথে সমর্থন জানিয়ে যারা বিক্ষোভ করেছে তার মধ্যে রয়েছে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির দুজন মন্ত্রী চৌধুরী লাল সিং এবং চন্দর প্রকাশ গঙ্গা। ওই সময় এক র‌্যালিতে লাল সিং বলেছিলেন, একজন মেয়ে মারা গেছে। অনেক তদন্ত হচ্ছে। এখানে তো এরকম অনেক নারীই মারা যান।
আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র হবে ভারত!! ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কিত ভারতের মুসলিমরা
কাশ্মিরে ৮ বছর বয়সী মুসলিম এক কন্যাশিশুকে অপহরণ করে ধর্ষণকারীদের পক্ষ অবলম্বন করে র‌্যালি করেছেন সেখানকার বিজেপি দলীয় মন্ত্রী চৌধুরী লাল সিং এবং চন্দ্রর প্রকাশ গঙ্গা। ওই ধর্ষণের নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু তিনি এই ব্যক্তিদের এমন কর্মের কারণে পদত্যাগ করতে বলেন নি। কিন্তু বেশ কয়েক সপ্তাহের চাপের ফলে তারা পদত্যাগ করেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, ধর্ষণে যুক্ত এবং তাদের পক্ষাবলম্বনকারীদের পক্ষে অবস্থান অব্যাহত রাখেন বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব। তিনি বলেন, দল চায় নি মিস্টার গঙ্গা এবং মিস্টার সিং পদত্যাগ করুন। তারা পদত্যাগ করেছেন এ জন্য যে, মিডিয়া একটি আবহ সৃষ্টি করেছিল, যাতে বলা হয়েছিল তারা ধর্ষণকারীদের সমর্থন করছেন। বিবিসিতে দীর্ঘ প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন রাজিনি বিদ্যানাথান।
তিনি আরো লিখেছেন, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি প্রকাশ্যে ধর্মীয় সহিংসতাকারীদের প্রতি সমর্থন দিয়েছে। যারা মারাত্মকভাবে এসব সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন তাদের প্রতি মারাত্মক অসম্মান দেখানো হয়েছে এর মাধ্যমে। এখানে উল্লেখ্য, বিজিপি ধারণ করে হিন্দু জাতীয়বাদের আদর্শ। দলটির সিনিয়র অনেক কর্মকর্তা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে দাবি তুলেছেন। কিন্তু দলের নেতারা বার বার বলেছেন, তারা সংখ্যালঘুদের বিরোধী নন।
২০১৫ সালে ইট দিয়ে আঘাত করে ৫০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আখলাককে হত্যা করে একটি গ্রুপ। তাদের অভিযোগ, আখলাক গরু জবাই করেছিলেন। আখলাককে খুনিদের কাউকে কাউকে এবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পাশে নির্বাচনী র‌্যালিতে দেখা গেছে। যোগী আদিত্যনাথ প্রচ- ইসলামবিরোধী। এ জন্য গত মাসে তাকে কয়েকদিনের জন্য নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। বিজেপির এই বিতর্কিত রাজনীতিককে মাঝে মাঝেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাশে দেখা যায় একই মঞ্চে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রীপরিষদের বেসামরিক বিমান চলাচল বিষয়ক মন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা অতি সম্প্রতি বিবিসিকে বলেছেন, ২০১৭ সালে এক গরু ব্যবসায়ী মুসলিমকে হত্যার জন্য মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে একদল মানুষকে। তাদের আইনগত ফি মিটানোর জন্য তিনি তাদেরকে অর্থ দিয়েছেন। বিবিসি হিন্দি’র জুগাল পুরোহিতের সঙ্গে দেয়া এক সাক্ষাতকারে জয়ন্ত সিনহা বলেছেন, তিনি ওইসব অভিযুক্তদের সহায়তা করছেন। তারা বিজেপির সদস্য। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন, অভিযুক্তদের অন্যায়ভাবে দোষী দেখানো হয়েছে।
এ ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসের আউটসোর্সিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন শীর্ষস্থানীয় লেখিকা ও রাজনৈতিক অধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়। তিনি বিজেপি সরকারের কড়া সমালোচক। অরুন্ধতী যুক্তি দেখান যে, এমন নজরদারীকারী গ্রুপ এসব অপরাধ করতে সক্ষম হচ্ছে। এর কারণ তাদেরকে উপর থেকে সুরক্ষা দেয়া হয়।
তবে বিজেপির মুখপাত্র নলিন কোহলি একথা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, তার দল ঘৃণাপ্রসূত অপরাধে কোনো ভূমিকা রাখে না। তিনি এক্ষেত্রে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলোর রিপোর্টের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি বলেন, তারা এমন সব পরিসংখ্যান উপস্থাপন করছে, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। কোহলি বলেন, মোদি সরকারের অধীনে বিজেপি দিয়েছে সমাজকল্যাণ। তাতে সুবিধা পেয়েছে সব ধর্মবিশ্বাসের মানুষ। এ দলটি ১৩০ কোটি ভারতীয় নাগরিকের। এ দল ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করে না।
কিন্তু এবার নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অনেকেই আশঙ্কা করেছেন, বিজেপি যদি দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে তাহলে দেশ একটি আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের খুব কাছাকাছি চলে যাবে।
সারাক্ষণ ভয়ে থাকেন তারা
সব ধর্মের মানুষের প্রতি সমান আচরণ করার কথা বলা হলেও ভারতে বৈষম্যের শিকার মুসলিমরা। এবারের নির্বাচনে বিজেপির ম্যানিফেস্টোর অন্যতম পয়েন্ট ছিল, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী কথিত সব বাংলাদেশী অভিবাসী থেকে দেশকে মুক্ত করা হবে। তবে এক্ষেত্রে তারা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, খ্রিস্টান, পারসি ও জৈন সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছে। বলেছে, এসব সম্প্রদায়ের কোনো বাংলাদেশী অবৈধ উপায়ে ভারতে থাকলে তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে। কিন্তু ব্যতিক্রমভাবে এই সাধারণ ক্ষমার বাইরে রাখা হয় মুসলিমদের। অর্থাৎ অন্য সম্প্রদায় ভারতে থাকতে পারলেও বাংলাদেশী কোনো মুসলিম সেখানে নাগরিকত্ব পাবেন না। আর এ উদ্দেশ্যেই আসামে সম্পন্ন হয়েছে এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি। এর উদ্দেশ্য, সেখানে বসবাসকারী (তাদের ভাষায় অবৈধ বাংলাদেশী) মুসলিমদের বের করে দেয়া হবে। নির্বাচনী প্রচারণায় এসব কথিত অভিবাসীদেরকে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ ‘উইপোকা’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি।
অনলাইন বিবিসিতে রাজিনি বিদ্যানাথান লিখেছেন, আসামের গোয়ালপাড়ায় একটি গ্রামে একদল মানুষ প্লাস্টিকের চেয়ারে গোল হয়ে বসেছিলেন। তাদের অনেকের হাতে পেপার। তাতে তাদের পরিবারের সদস্যদের ছবি। গত বছর রাজ্যজুড়ে মানুষদের বলা হয় তাদের পারিবারিক ভিত্তি ও তারা যে ভারতীয় এ বিষয়ে প্রমাণ হাজির করতে। এক্ষেত্রে তাদেরকে সময় বেঁধে দেয়া হয়। বলা হয়, যারা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে আসামে প্রবেশ করেছেন তা তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে।
চার সন্তানের মা উফান। তিনি একটা কাগজের ভাজ খুললেন। এর ওপরে একটি ছবি। এটি তার স্বামীর ছবি। তিনি মারা গেছেন গত বছর। নিচে তার ছোট ছেলেদের ছবি। তার পরিবারের জন্ম ভারতে। কিন্তু তারা কেউই সরকারের নাগরিকপঞ্জিতে নাম নিশ্চিত করাতে পারেন নি। শুধু তারাই নন। ৪০ লাখ অধিবাসী এই তালিকার বাইরে রয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই মুসলিম। তাই উফানের মধ্যে আতঙ্ক তাকে যেকোনো সময় দেশ থেকে বের করে দেয়া হতে পারে।
একই রকম পরিণতির মুখে আছেন মোহাম্মদ সামছুল। তিনি বলেছেন, তার পিতা, পিতামহের জন্ম আসামে। তাদের নাম আছে রেজিস্টারে। সামছুলের কাছে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট থাকা সত্ত্বেও তার নামটি তিনি এনআরসিতে নিবন্ধিত করাতে পারেন নি। তিনি বলেন, আমরা অব্যাহতভাবে আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছি। আমাদের ভয়, রাতে পুলিশ আসবে। তারপর পুরো পরিবারকে কোনো শরণার্থী শিবিরে নিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে বিজেপি শুধু অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়নের মূল লক্ষ্য স্থির করেছে। কিন্তু এই প্রচারণাকে ব্যবহার করা হবে যেকোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে।
বিবিসির প্রতিবেদন by রাজিনি বিদ্যানাথান

চীনে যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে উত্তর কোরীয় নারীদের

চীনের হাজার হাজার উত্তর কোরীয় নারী ও মেয়েশিশুকে যৌন বাণিজ্যে কাজ করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে বলে লন্ডন-ভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। লন্ডন-ভিত্তিক কোরিয়া ফিউচার ইনিশিয়েটিভ বলছে, এই নারীদের অপহরণ করে পতিতা হিসেবে বিক্রি করা হয়, অথবা চীনা পুরুষদের বিয়ে করার জন্য বাধ্য করা হয়।
সংস্থাটির মতে, বিভিন্ন অপরাধ সংস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর এই উত্তর কোরীয় নারীদের নিয়ে ১০ কোটি ডলারের যৌন বাণিজ্য হয়ে থাকে। চীন তার দেশ থেকে উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর কারণে প্রায়ই এই নারীদের কোনো উপায় থাকে না। সে জন্য তারা ফাঁদে আটকা পড়েন এবং বাড়ির ভেতরে নির্যাতন সয়ে যান।
প্রতিবেদনটির লেখক ইউন হি-সুন বলেন, "এসব ভূক্তভোগী নারীদের মাত্র ৩০ চীনা ইউয়ান অর্থাৎ চার ডলারের বিনিময়ে পতিতা হিসেবে বিক্রি করা হয়। মাত্র ১০০০ ইউয়ান বা ১৪০ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করা হয় স্ত্রী হিসেবে।"
"এছাড়া বিশ্বব্যাপী অনলাইন শ্রোতাদের মাধ্যমে শোষণের জন্য সাইবার সেক্সের অন্ধকার জগতে পাচার করা হয়।"
পাচারের শিকার এই মেয়ে ও নারীদের বয়স হয়ে থাকে সাধারণত ১২ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। অনেক সময় এর চেয়ে কম বয়সীরাও পাচারের শিকার হয় বলে রিপোর্টে উঠে আসে। তাদের চীনে নির্যাতন করা হয় না হলে বিক্রি বা অপহরণ করা হয় অথবা সরাসরি উত্তর কোরিয়া থেকে পাচার করা হয়।
অনেককেই একাধিকবার বিক্রি করা হয়েছে এবং নিজ দেশ ছাড়ার এক বছরের মধ্যে কমপক্ষে একবারের জন্য হলেও যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হয়েছে বলে উঠে আসে প্রতিবেদনটিতে।
উত্তর-পূর্ব চীনের অনেক জেলাতে, যেখানে কিনা বেশিরভাগ অভিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে, সেখানকার বহু পতিতাপল্লীতে এমন অনেক নারীকে বন্দী অবস্থায় পতিতা বা দাসীর মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে।
মেয়েরা - যাদের অনেকের বয়স মাত্র নয় বছর - তাদেরকে এবং নারীদের সাইবার সেক্স বাজারে যৌনতায় বাধ্য করা হয়। অনেকসময় ওয়েবক্যামের সামনে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। এইসব অনলাইন গ্রুপের অনেক গ্রাহক দক্ষিণ কোরীয় বলে ধারণা করা হয়।
আবার যেসব নারীদের বিয়েতে বাধ্য করা হয়, তাদের বেশিরভাগকেই ১০০০ থেকে ৫০ হাজার ইউয়ানের বিনিময়ে বিভিন্ন গ্রামে বিক্রি করা হয়। তারা স্বামী দ্বারা ধর্ষিত ও নির্যাতনের শিকার হন বছরের পর বছর।
চীনে অবস্থানরত নারী ভূক্তভোগী সেইসঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানান্তরিত বেঁচে ফেরা নারীদের থেকে যাবতীয় সব তথ্য সংগ্রহ করেছে মানবাধিকার সংস্থা কোরিয়া ফিউচার ইনিশিয়েটিভ।
তাদের মধ্যে একজন মিস পিওন। তিনি এসেছেন, উত্তর কোরিয়ার চোংজিন সিটি থেকে। এই প্রতিবেদনে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা ব্যাখ্যা করেন তিনি:
"আমাকে আরও ছয়জন উত্তর কোরীয় নারীর সঙ্গে একটি হোটেলে বিক্রি করা হয়েছিল, সেটা ছিল মূলত একটা পতিতালয়। আমাদেরকে পর্যাপ্ত খাবার দেয়া হতো না এবং খুব খারাপ ব্যবহার করা হতো।"
"আট মাস পর, আমাদের থেকে কয়েকজনকে পুনরায় বিক্রি করা হয়। দালাল আমার সঙ্গে খুব খারাপ কাজ করেছিল।"
"যখন আমি সেই নতুন পতিতালয়ে আসি, তখন আমার সারা শরীর জুড়ে ক্ষত ছিল। কারণ ওই দালাল আমাকে ভীষণ পেটাত, তার দলের কয়েকজনকে দিয়ে আমার পায়ে কোপাত।"
এইভাবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান মিস কিমও। (এখানে তার গ্রামের বাড়ির পরিচয় পরিবর্তন করা হয়েছে।)
"চীনের দালিয়ান শহরে অনেক দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক বসবাস করেন। আমরা তাদের হোটেল রুমের দরজার নীচে এই বিজ্ঞাপনের কার্ডগুলো দিয়ে রাখি। কার্ডগুলোয় কোরিয়ান ভাষাতে সব লেখা থাকতো।"
"ওই বিজ্ঞাপন কার্ডে লেখা থাকতো যে আমরা তাদের জন্য কি কি সুবিধা ও সেবা দিচ্ছি। আমাদের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন পানশালায় দালালের মাধ্যমে নেয়া হতো।"
"দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়ীদের জন্য উত্তর কোরীয় পতিতা চেয়ে থাকে। পতিতাবৃত্তিতে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল এক দক্ষিণ কোরীয় ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়ার মাধ্যমেই।"- এমনটিই জানান মিস কিম। সূত্র : বিবিসি।

পার্লামেন্ট স্থগিত করা নিয়ে বৃটিশ সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শুরু

গত মাসে পাঁচ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বৃটেনজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একাধিক আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। গত সপ্তাহে এমন এক মামলার রায়ে সিদ্ধান্তটিকে বেআইনি ঘোষণা করে স্কটল্যান্ডের সেশন কোর্ট। এ ছাড়া চলতি মাসের শুরুর দিকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস’র হাইকোর্ট অপর এক মামলার রায়ে জানায়, পার্লামেন্ট স্থগিতের বিষয়টি রাজনৈতিক। এটি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ক্ষমতার আওতাধীন, যা বিচারিক ক্ষমতার বাইরে। এ বিষয়ে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না। দুই আদালতের এমন রায়ের বিরুদ্ধে লন্ডনে বৃটেনের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়। মঙ্গলবার দুই আপিল নিয়ে শুনানি শুরু হয়। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত তিনদিন ধরে এই শুনানি চলবে। মঙ্গলবারের শুনানিতে ইংল্যান্ডের হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলকারী আইনজীবীরা সর্বোচ্চ আদালতকে বলেন, পাঁচ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিত করে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রিত্বের বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অপব্যবহার করেছেন জনসন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বৃটেনের বিচ্ছেদ বা ব্রেক্সিট নিয়ে বিরোধী দল যাতে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা না করতে পারে সেজন্য পার্লামেন্ট স্থগিত করেছেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের ১১ বিচারকের একটি বেঞ্চ দুই আপিলের শুনানি পর্যালোচনা করবেন। এ খবর দিয়েছে দ্য টাইমস।

সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট লেডি হ্যাল জানান, ঐতিহাসিক এই মামলার রায় ব্রেক্সিটের সময়সীমার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। শুনানির আগ দিয়ে দেয়া বক্তব্যে বৃটেনের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ এই বিচারক বলেন, আদালত পার্লামেন্ট স্থগিতের বৈধতা নির্ধারণ নিয়ে কাজ করবে। ব্রেক্সিট সংশ্লিষ্ট বিস্তৃত রাজনৈতিক ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানাবে না।
সুপ্রিম কোর্টে এই শোডাউন নিয়ে জনসনকে উদ্ধৃত করে দ্য টাইমস জানায়, পার্লামেন্ট স্থগিত করার উদ্দেশ্য ছিল পার্লামেন্ট খোলার দিন নতুন বিধানিক এজেন্ডা তুলে ধরতে সরকারকে সুযোগ দেয়া। বিচার ব্যবস্থার ওপর তার পূর্ণ ভরসা রয়েছে। 

পার্লামেন্ট স্থগিতের ঘোষণার পরপরই স্কটল্যান্ডের সেশন কোর্টে জনসনের সিদ্ধান্তকে অবৈধ দাবি করে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বে মামলা করে ৭৫ এমপি। গত সপ্তাহে তাদের পক্ষে রায় দেয় কোর্ট। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে সরকারপক্ষ। অন্যদিকে, ইইউপন্থি অধিকারকর্মী ও ব্যবসায়ী গিনা মিলার ইংল্যান্ডের হাইকোর্টে জনসনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেন। তবে তার বিপক্ষে রায় দেয় আদালত। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তিনি।

মিলারের আইনজীবী লর্ড প্যানিক মঙ্গলবার আদালতকে বলেন, বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসে আরো কোনো প্রধানমন্ত্রী তার ক্ষমতার এমন অপব্যবহার করেননি, যেমনটা জনসন করেছেন। আধুনিক বিচারিক পর্যালোচনার নীতি তৈরির শুরু থেকে এমন ঘটনা ঘটেনি। জনসন পার্লামেন্টের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছেন।

প্যানিক আরো বলেন, জনসন রানীকে পাঁচ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, তিনি চাননি এই সময়ের মধ্যে ব্রেক্সিট নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন তার বিস্তৃত ক্ষমতা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন তখন তার সরকারের নীতিমালায় পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ এড়াতে এমনটি করেছেন তিনি। এই স্থগিতাবস্থার সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই সময়সীমাই প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টকে নীরব করে দিতে চেয়েছেন।

মিলারের আইনজীবী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক। পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ এড়ানোর জন্য এমন নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ সংবিধানের মৌলিক আইনের বিরোধিতা করে। এটা আমাদের সাংবিধানিক আইনের মূলনীতি বিরোধী।

এদিন, সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিক্ষোভ করেছে জনসনের সিদ্ধান্তের বিরোধীরা। প্রায় ৪০ জন বিক্ষোভকারী, ‘গণতন্ত্র রক্ষা কর’, ‘পার্লামেন্ট খুলে দাও’  ও ‘তারা রানীকে ভুল বুঝিয়েছে’ স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ১১ জনের বেঞ্চ গঠিত হলো।

নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন ৯০ মিনিটে

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে আকাশপথে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যেতে সাত ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লাগে। এটি মাত্র দেড় ঘণ্টা বা তারও কম সময়ে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টাভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হারমিয়াস করপোরেশন। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা করেছে, তারা এমন একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ তৈরি করতে যাচ্ছে, যা শব্দের ৫ গুণ গতিতে চলবে।
শব্দের চেয়ে কোনো কিছুর গতি বেশি হলেই তাকে সুপারসনিক বলা হয়। আর সে গতি যদি শব্দের গতির পাঁচ গুণ হয়, তাকে বলা হয় হাইপারসনিক। যানবাহনের সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে শব্দের গতিকে মাক–১ ধরা হয়। সে হিসাবে হাইপারসনিক গতির মাত্রা মাক–৫। হারমিয়াস করপোরেশনের নিউইয়র্ক-লন্ডনের এই উড়োজাহাজ পরিষেবাকে তাই বলা হচ্ছে হাইপারসনিক বা মাক–৫ যাত্রীসেবা।
হারমিয়াসের প্রধান নির্বাহী এজে পিপলিকা বলেন, যাত্রীবাহী হাইপারসনিক উড়োজাহাজ প্রকল্পে ইতিমধ্যে তাঁরা তহবিল সংগ্রহ করেছেন। এটি তৈরিতে এক দশক সময় লাগবে। এর গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ৩ হাজার ৩০০ মাইল।
পরীক্ষামূলকভাবে জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে যুদ্ধবিমানে হাইপারসনিক গতিবেগ অর্জন করা গেলেও যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে এই প্রযুক্তি এখনো ব্যবহার হয় না। বাণিজ্যিকভাবে উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এত গতি অর্জন করতে জ্বালানি খরচ অনেক বেশি পড়বে। পিপলিকা বলেন, তাদের হাইপারসনিক উড়োজাহাজ পরিষেবায় নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে টিকিটের দাম পড়বে তিন হাজার মার্কিন ডলার।

নোয়াবের বিবৃতি: নবম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের রোয়েদাদ বাস্তবসম্মত নয়

সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবাদপত্র শিল্পের বর্তমান সংকট এবং নোয়াবের প্রস্তাবসমূহ বিবেচনায় না নিয়েই সরকার গত ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ নবম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের গেজেট প্রকাশ করেছে (যদিও ওয়েজ বোর্ড গঠনের বিষয়ে আইনগত প্রশ্ন আছে এবং তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি রিট মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে)। নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, নতুন ওয়েজ বোর্ড ঘোষণায় সর্বক্ষেত্রে ৮০% থেকে ৮৫% বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর বাইরেও অনেক প্রান্তিক সুযোগ-সুবিধা অত্যধিক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সবমিলিয়ে এতে দেশের কোনো শিল্পের যে কোনো বেতন স্কেলের তুলনায় বেশি বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। যা নোয়াবের বিবেচনায় বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকার ঘোষিত নবম ওয়েজ বোর্ড বিষয়ে গত ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ নোয়াবের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নোয়াব সদস্যরা নবম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের রোয়েদাদ বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মতামত দেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, সমকাল প্রকাশক এ. কে. আজাদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহ্‌ফুজ আনাম, মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ভোরের কাগজের মুদ্রাকর তারিক সুজাত, বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শাহ হোসেন ইমাম, সংবাদ সম্পাদক ও প্রকাশক আলতামাশ কবির, নিউএজের সম্পাদকীয় বোর্ডের চেয়ারম্যান এ. এস. এম. শহীদুল্লাহ খান ও প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান।

এ বিষয়ে নোয়াব সদস্যরা আরো বলেন, সরকার সংবাদপত্র শিল্পে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করলেও সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব আয় দিয়ে এই ওয়েজ বোর্ডের ব্যয়ভার বহন করতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো বিশেষ সহায়তা ও অনুদান থাকে না। সংবাদপত্রের মালিকরা সব সময়ই সাংবাদিক কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা ও বেতন-ভাতা দেয়ার চেষ্টা করেছে। সেজন্য কষ্ট হলেও কিছু সংবাদপত্র সরকার ঘোষিত ওয়েজ বোর্ডের রোয়েদাদ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে চলছে। কিন্তু বর্তমানে সংবাদপত্র শিল্প অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন সময় পার করছে। সকল পত্রিকার বিজ্ঞাপন আয় ও সার্কুলেশন উভয়ই কমছে ধারাবাহিক আশঙ্কাজনকভাবে। অন্যদিকে সরকারি বিজ্ঞাপনের রেট অনেক কম ও সরকারের কাছে সব সময় বড় অঙ্কের বিল বাকি পড়ে থাকে। আর প্রতি ধাপে-ধাপে ভ্যাট-ট্যাক্সতো রয়েছেই। এ অবস্থায় টিকে থাকতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে এই শিল্পকে। অধিকাংশই সংবাদপত্রই ভর্তুকি দিয়ে চালাচ্ছে। অনেক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর্মীদের বেতনই দিতে পারছে না। এ অবস্থায় নবম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহুমুখী সংকটের মধ্যে ফেলবে। এই শিল্পের সংকটগুলো নিয়ে নোয়াব থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়, ওয়েজ বোর্ড কমিটি, এমনকি মন্ত্রিসভা কমিটিকেও একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

নোয়াব কখনো ওয়েজ বোর্ডের বিরুদ্ধে নয়। সেজন্য অনেক আপত্তি সত্ত্বেও আমরা ওয়েজ বোর্ডের কার্যক্রমেও অংশগ্রহণ করেছি। ওয়েজ বোর্ডকে মালিক-সাংবাদিক উভয়পক্ষের জন্য বাস্তবসম্মত করার অনুরোধ করেছি। কিন্তু আমাদের কোনো প্রস্তাব বিবেচনায় না নিয়ে নতুন করে গ্রেড ভেদে ৮০% থেকে ৮৫% বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা বাস্তব নয়। অতীতেও তাই হয়েছে। বাস্তবে ৪২টি শিল্পের মধ্যে সরকার ঘোষিত ৩৮টি শিল্পের মজুরি বোর্ডের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা ৮ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের ধারে-কাছেও ছিল না। ৯ম ওয়েজ বোর্ডের ঘোষণায় তা আরো বেড়েছে। এমনকি সরকারি পে-স্কেলের বেতনও সংবাদপত্রের চেয়ে অনেক কম। এখন তা আরো বেড়ে যাবে।
৯ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের অধীনে সর্বনিম্ন গ্রেডের (গ্রেড-৬: পিয়ন, দারোয়ান, মালী) মোট বেতন করা হয়েছে ৩৫,৬৭০ টাকা। যেখানে একই রকম কাজের জন্য বর্তমান সরকারি বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডের (গ্রেড-২০) মোট বেতন ১৫,৩৫০ টাকা। অর্থাৎ সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন সরকারি বেতন স্কেলের তুলনায় প্রায় ২০,৩২০ টাকা বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বেতন একেবারেই অবাস্তব। অন্যদিকে ৯ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী একজন রিপোর্টার গ্রেড-৩ এ যোগদান করবে ৬৭,১১২ টাকা বেতনে। যেখানে বর্তমান সরকারি বেতন স্কেলের অধীনে একজন সিভিল ক্যাডার শুরুতে গ্রেড-৯ এ যোগদান করে ৩৫,৬০০ টাকা বেতনে। এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক শুরুতে মোট বেতন পায় ৩৭,৩০৫ টাকা। অর্থাৎ এখানেও সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ড অনুসারে একজন রিপোর্টার একই শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন হলেও একজন সরকারি ১ম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার চেয়ে প্রায় ৩০-৩১ হাজার টাকা বেশি বেতন পাবে। এভাবে তুলনা করলে প্রায় প্রতিটি গ্রেডেই ৯ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের বেতন প্রায় দেড়-দুইগুণ বেশি হয়ে দাঁড়াবে। দেশের কোনো বহুজাতিক কোম্পানির বেতনও এই পর্যায়ে নয়। এই বেতন দেয়া যে কোনো সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের জন্য অসম্ভব ব্যাপার।

৯ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে গ্রেড ভেদে ৮০-৮৫% বেতন বৃদ্ধি ছাড়াও অবাস্তবভাবে প্রান্তিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সাধারণ যাতায়াত ভাতা একধাপে ১০০% বৃদ্ধি, সাংবাদিকদের পেশাগত যাতায়াত ভাতা ৭১% বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক কর্মীদের পেশাগত যাতায়াত ভাতা ১০০% বৃদ্ধি, নৈশ পরিবহন সুবিধার বিকল্প ভাতা ১০০% বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি নোয়াব ওয়েজ বোর্ড থেকে যেসব প্রান্তিক সুবিধাদি বাদ দেয়ার সুপারিশ করেছিল এমন অনেক অপ্রয়োজনীয় ভাতা বাদ না দিয়ে বরং বৃদ্ধি করা হয়েছে যা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত হয়নি বলে নোয়াব মনে করে। তবে বহুকাল পরে ওয়েজ বোর্ডে আয়কর ও গ্র্যাচুইটির বিধানের সঙ্গে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬, ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪ ও অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে যে বৈষম্যমূলক আইনগত দুর্বলতা ছিল তা সংশোধন করা হয়েছে।
এছাড়া ৯ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে নোয়াবের আরো কিছু দাবি ছিল যা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তা হলো:
সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে গ্রেড সংখ্যা মাত্র ৬টি। সরকারের জাতীয় বেতন স্কেলে ২০টি। ব্যাংক-বিমাসহ দেশের অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রেডের সংখ্যা ১৮ থেকে ২২টি পর্যন্ত। তাই সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে গ্রেড সংখ্যা বাড়িয়ে ১৮-২০টি করার জন্য যুক্তিসহ প্রস্তাব করা হয়েছিল।
সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে প্রতি ৩ বছর পর পর এক মাসের মোট বেতন ও ৩০ দিনের বিনোদন ছুটির বিধান রাখা হয়েছে। সরকার ঘোষিত অন্যান্য শিল্পে তা নেই।

৯ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে বাড়ি ভাড়া দেয়া আছে ৬৫%। কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪ এর বিধি ৩৩(এ) অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া ৫০% আয়করমুক্ত। অবশিষ্ট ১৫% ব্যক্তির আয় হিসেবে ব্যক্তি খাতের আয়কর বাড়িয়ে দেয়। তাই সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে বাড়ি ভাড়া ৫০% করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
সার্বিকভাবে নোয়াব থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়, ওয়েজ বোর্ড কমিটি এবং মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে সংবাদপত্র শিল্পের সংকট, সীমাবদ্ধতা ও ৯ম ওয়েজ বোর্ডের ক্ষেত্রে বিবেচনার জন্য যে সকল প্রস্তাব জানানো হয়েছিল তার অধিকাংশই বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সবমিলিয়ে যে ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ দেয়া হয়েছে তা সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এ অবস্থায় ৯ম ওয়েজ বোর্ডের রোয়েদাদ পুনর্বিবেচনাসহ সরকারকে সংবাদপত্র শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে অধিক মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন বলে নোয়াব মনে করছে।

প্রকল্পের কেনাকাটায় সতর্ক থাকার নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর

সমপ্রতি বিভিন্ন প্রকল্পের পণ্য কেনায় অস্বাভাবিক মূল্যের চিত্র উঠে এসেছে। এরকম পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের পণ্যের দাম নির্ধারণে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তুলে ধরেন। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রকল্পে বিভিন্ন পণ্যের অস্বাভাবিক দামের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আনেন তিনি। তখন প্রধানমন্ত্রী পণ্যের দাম নির্ধারণে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ‘বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন আইটেম থাকে, পণ্যের দাম থাকে, সেগুলোর দাম আরও সাবধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তাড়াহুড়া করে, দ্রুত কাজ করতে গিয়ে সেগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হয় না। এমনটি যাতে না হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা অহেতুক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চাই না। আমরা পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সাবধান হতে নির্দেশনা দিয়েছি। প্রকল্পের যে কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজার যাচাই করে দাম নির্ধারণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য নির্দেশনা তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, রাস্তাঘাট প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে রাস্তার পাশে গরিব মানুষের বাড়ি, জমি রক্ষা করতে হবে। একেবারেই না পারা গেলে যথাসময়ে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ঝাড়খণ্ড থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হবে, সেটা দিয়ে শুধু আমদানিই নয়, ভবিষ্যতে হয়তো আমরা রপ্তানিও করতে পারব। প্রকল্প তদারকি করতে আইএমইডিকে শক্তিশালী করতেও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
একনেক সভায় প্রায় ৮ হাজার ৯৬৮ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত ৮টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘বিভাগীয় শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্প। এর মধ্যে সরকার দেবে প্রায় আট হাজার ৯৫২ কোটি ৫৯ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

পরিকল্পনামন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো- সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প যথাক্রমে ‘ময়মনসিংহ (রঘুরামপুর)-ফুলপুর-নকলা-শেরপুর (আর-৩৭১) আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প ও ‘রাজশাহী-নওহাটা-চৌমাসিয়া সড়কের বিন্দুর মোড় হতে বিমানবন্দর হয়ে নওহাটা ব্রিজ পর্যন্ত পেভমেন্ট চার লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্প, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘রাজশাহী মহানগরীর উপশহর মোড় থেকে সোনাদিঘী মোড় এবং মালোপাড়া মোড় হতে সাগরপাড়া মোড় পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ‘আশ্রয়ণ-২ শীর্ষক’ প্রকল্প, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘জুনোসিস এবং আন্ত সীমান্তীয় প্রাণিরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ গবেষণা’ প্রকল্প, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্রেংদেনিং মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন ক্যাপাবিলিটিজ অব আইএমইড (এসএমইসিআই)’ প্রকল্প, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘ভারতের ঝাড়খণ্ড হতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি করার লক্ষ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর থেকে মনাকষা সীমান্ত পর্যন্ত ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ’ প্রকল্প এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘বিভাগীয় শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্প।

বেড়েছে এডিপি বাস্তবায়নের হার: চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার বেড়েছে। এ অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। টাকার অংকে যার পরিমাণ ৯ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। যা গত (২০১৮-১৯) অর্থবছরে এ সময়ে ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। টাকার অংকে যার পরিমাণ ৬ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার বেড়েছে দশমিক ৯৯ শতাংশ, টাকার অংকে ৩ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।

মৃত্যুর আগে রিকশাচালককে যা বলেছিলেন রিফাত

জীবনের শেষ কথাটি রিকশাচালক দুলালকেই বলেছিলেন রিফাত শরীফ। বরগুনায় দুর্বৃত্তদের হাতে গত ২৬শে জুন হত্যার শিকার হন রিফাত। ধারালো অস্ত্রের কোপে রক্তাক্ত রিফাতকে যে রিকশায় করে হাসপাতালে নেয়া হয়, সেই রিকশার চালক দুলাল সেদিনের ভয়াবহ ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন। দুলালের বাড়ি বরগুনা সদর ইউনিয়নের ফরাজীরপুল এলাকায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় তার। স্মৃতি হাতড়ে তিনি সেদিনের পুরো ঘটনাগুলো বলেন।

ঘটনার বিবরণে দুলাল বলেন, ‘সেদিন কলেজ সড়কে খ্যাপ নিয়ে গিয়েছিলাম। মানুষের ভিড়ের কারণে আর সামনের দিকে যাইতে পারি নাই। শুনলাম সামনে কারা যেন কারে মারতেছে। প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দিয়ে আমি রিকশা ঘুরাইয়া কেবল দাঁড়াইছি, সে সময় একটা ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় হাইট্টা আইসা আমার রিকশায় উইঠাই কয়, চাচা আমারে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়া যান। সেটাই ছিল ছেলেটির শেষ কথা। আমি দেখলাম ছেলেটার গলা ও বুকের বামপাশ কাইট্টা রক্ত বাইর হইতেছে। হের জামাডা টাইন্না আমি গলা ও বুকে চাইপ্পা ধইরা হেরে কইলাম, আপনে চাইপ্পা ধরেন, আমি চালাই। আমি হাসপাতালে যাওনের জন্য কেবল সিটে বসছি, চালামু, সে সময় একটা মেয়ে দৌড়ে রিকশায় উইঠা ওই পোলাডারে ধইর‌্যা বসে। আমি তাড়াতাড়ি রিকশা চালাইয়া হাসপাতালের দিকে যাই।

এক মিনিটের মতো রিফাত ঘাড় সোজা করে বসেছিল। কিন্তু এরপর সে মেয়েটির কাঁধে ঢলে পড়ে যায়। আর ঘাড় সোজা করতে পারেনি। আমাদের রিকশার পাশাপাশি একটা লাল পালসার মোটরসাইকেলে দুইটা ছেলে যাচ্ছিল। মেয়েটি চিৎকার করে তাদের কাছে জখম চেপে ধরে রক্ত থামানোর জন্য কাপড় চাইছিল। ওরা সাড়া দেয়নি। আমার কাছে মেয়েটি ফোন চায় তার বাড়িতে জানানোর জন্য। কিন্তু আমার ফোন নাই। পরে ওই মোটরসাইকেলের ছেলেদের কাছেও সে ফোন চায়। বলে, ভাই আপনাদের একটা ফোন দেন, আমি একটু বাবার কাছে ফোন করবো। কিন্তু তারা বলে, আমাদের কাছে ফোন নাই, তুমি হাসপাতালে যাইতেছো যাও।

হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢোকার সময় মেয়েটি একজন লোককে ডাক দেয়। রিকশা থামানোর সঙ্গে সঙ্গে ওই লোক দৌড়ে আসে। রিফাতের অবস্থা দেখেই আমাকে নিয়ে স্ট্রেচার আনতে যায়। আমি আর সেই লোক স্ট্রেচার নিয়ে আসি। রিফাতকে রিকশা থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে তুলে অপারেশন থিয়েটারে দিয়ে আসি।’

দুলাল আরো বলেন, ‘রিফাতকে এম্বুলেন্সে করে বরিশাল নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ আমার রিকশার ছবি তুলে নেয় আর কাগজপত্র নিয়ে যায়। আমার রিকশার কাগজপত্র এখনো পুলিশের কাছেই আছে।’
ঘটনার দিন মিন্নির ডাকে ছুটে এসেছিলেন যিনি: বরগুনা হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে ও রিকশাচালক দুলালের বর্ণনামতে রিকশা থামতেই সাদা গেঞ্জি পরা এক লোক দৌড়ে আসেন। রিকশা চালক দুলালকে সঙ্গে নিয়ে স্ট্রেচার নিয়ে আসেন তিনি। স্ট্রেচারে তুলে রিফাতকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারেও নিয়ে যান। ওই ব্যক্তির নাম আমিনুল ইসলাম মামুন। তিনি একজন এম্বুলেন্স ব্যবসায়ী।

সেই মামুনের সঙ্গেও কথা হয় এ প্রতিনিধির। মামুন বলেন, মিন্নির ডাক শুনেই আমি দ্রুত ছুটে যাই। রিফাতের অবস্থা দেখে দ্রুত রিকশাচালক ভাইকে নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে স্ট্রেচার নিয়ে আসি। সে সময় রিফাত রিকশায় মিন্নির কাঁধে ভর করে বসেছিল। আমি, রিকশাচালক ও মিন্নি তিনজন মিলে রিফাতকে ধরে স্ট্রেচারে তুলি। দ্রুত তাকে ওটিতে নিয়ে যাই।

ডাক্তারের লিখে দেয়া স্লিপ নিয়ে ফার্মেসিতে তিনবার ছুটে যাই। তিনবারে ১ হাজার ৪০০ টাকার ওষুধ কিনে আনি। রিফাতের প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিছুতেই রক্ত বন্ধ করা যাচ্ছিল না। চিকিৎসক কোপের ক্ষতস্থানে গজ ও তুলা দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। তারপর দ্রুত বরিশাল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আমি এম্বুলেন্স ঠিক করে গেটে নিয়ে আসি। এর মধ্যেই রিফাতের বন্ধু ও স্বজনসহ অন্যরা সেখানে আসেন। মিন্নির চাচা সালেহ ও পরে মিন্নির বাবা কিশোরও চলে আসেন। পরে রিফাতকে এম্বুলেন্সে করে বরিশাল নিয়ে যাওয়া হয়। মিন্নি যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করছিল। কিন্তু তার চাচা সালেহ ও বাবা কিশোর যেতে দেননি।

মামুন আরো বলেন, একজন মানুষকে বিপদে সহায়তা করা মানবিক দায়িত্ব। সে যেকোনো মানুষই হোক না কেন। আমিও সেই চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আফসোস, রিফাতকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মাথার কাছে মোবাইল রাখার ক্ষতিকর প্রভাব by ডা. সঞ্চিতা বর্মন

বর্তমানে বিজ্ঞান পুরো বিশ্বকেই আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। মোবাইল ফোনে মুহূর্তেই সারা বিশ্বের খবর আমরা জানতে পারি। তাই কাজ থাকুক আর নাই থাকুক একটু পরপর মোবাইল দেখা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ফলে মোবাইলটাকে আমরা সব সময় নিজের সাথে রাখতে পছন্দ করি এমনকি ঘুমের সময়ও।
কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোন যত বেশি শরীরের কাছাকাছি রাখা হয় স্বাস্থ্য ঝুঁকি তত বেশি। মোবাইল ফোন থেকে যে রেডিয়েশন সব সময় বের হয় তা শরীরের কোষের বিকাশের বাধা সৃষ্টি করে। ফলে নানা ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।
মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করার পর থেকে বন্ধ করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত এটি থেকে রেডিও ট্রান্সমিশন বের হতে থাকে। তাই ঘুমাবার আগে মাথার কাছে মোবাইল রাখলে এ অদৃশ্য তরঙ্গ শরীরে ও মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন করে।
তাই ঘুমানোর সময় মোবাইল বন্ধ করে অন্য যে ঘরে মানুষ থাকে না সেখানে রাখতে হবে অথবা মোবাইল ফোন শরীর থেকে ৩ ফুট দূরত্বে রাখতে হবে।
লেখক: ত্বক, লেজার এন্ড এসথেটিক বিশেষজ্ঞ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশে ক্রমাগত অবনতি; বাংলাদেশে সার্বিক শিক্ষার মান ওই অঞ্চলে অন্য দেশগুলোর তুলনায় নিম্নগামী by আকবর হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল
বাংলাদেশের 'সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ' হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
এমনটাই বলছে টাইমস হায়ার এডুকেশন, যে প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবী জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং নির্ধারণ করে।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সার্বিকভাবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ যে ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে সেটি নিয়ে অনেকে ইতোমধ্যে নানাভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বরাদ্দ টাকা ঠিকমতো খরচ হচ্ছে না।
"আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব নেই, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বার্ষিক বরাদ্দ ছিল ১০ কোটি টাকা। কিন্তু আমি সেটি বাড়িয়ে ৬০ কোটির টাকার বেশি করেছি। কিন্তু আমি খুব দু:খের সাথে লক্ষ্য করেছি এই অর্থটা সঠিকভাবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় হয় না।"
অধ্যাপক মান্নান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করা হয় না এবং সেটি করার প্রয়োজনও বোধ করে না।
"এটা না করলে শিক্ষা বিশ্বমানের হওয়ার কথা তো বাদই দিলাম, এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা খুব বেশি দূরে যেতে পারবো না," বলছিলেন অধ্যাপক মান্নান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ বলতে অনেকগুলো সূচক থাকে। যেমন: শ্রেণীকক্ষের আকার, শ্রেণীকক্ষের ধরণ, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের আসন বিন্যাস ইত্যাদি বিষয়।
তিনি বলেন, এসব মানদণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পিছিয়ে আছে।
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ''টিচিং কোয়ালিটি'' নিম্নগামী হবে না, বরং উর্ধ্বমুখী হবে।
তিনি বলেন, "আমাদের শিক্ষকরা এখন বিশ্বের সেরা-সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি আনছেন। সেজন্য টিচিং কোয়ালিটি নিম্নগামী হবার বিষয়টির সাথে একমত হবার কারণ নেই।"
বিশ্ববিদ্যালয়ে সবসময় যোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছে কিনা সেটি নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক এবং পারিবারিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।
অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন "দেখা যায়, কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোন একজন ব্যক্তিকে সুযোগ করে দেয়ার জন্য যোগ্যতার নির্দিষ্ট মান কমিয়ে দিয়েছে। এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়।"
শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেবার অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান এ ধরণের অভিযোগ মানতে নারাজ।
তিনি বলেন, "আমাদের শিক্ষক নিয়োগে সম্প্রতি একেবারেই অভিযোগ নেই। সুষ্ঠুভাবে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। "
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান মনে করেন, এটি অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে বাংলাদেশে সার্বিক শিক্ষার মান এই অঞ্চলে অন্য দেশগুলোর তুলনায় যে ভালো অবস্থায় আছে একথা বলা যাবে না।
লন্ডন-ভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০২০ সালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে র‍্যাংকিং করেছে সেখানে দেখা গেছে গত চার বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ক্রমাগত অবনতির দিকেই যাচ্ছে।
টাইমস হায়ার এডুকেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং-এর (শিক্ষার পরিবেশ) ক্ষেত্রে ২১.৭ স্কোর করেছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালে সে স্কোর কমে হয়েছে ২০.৪। এবার সেটির সবচেয়ে বড় অবনতি হয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং-এর ক্ষেত্রে ১৬ স্কোর করেছে।

আফগান প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী সমাবেশে হামলায় নিহত ২৬

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণির নির্বাচনী সমাবেশে এক শক্তিশালী আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০ জনের বেশি। রাজধানী কাবুল থেকে উত্তরে পারওয়ান প্রদেশের চারিকারে আয়োজিত ওই সমাবেশে বক্তব্য রাখার কথা ছিল গণির। হামলার সময় সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তিনি। তবে তিনি অক্ষত রয়েছেন। তাকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এদিকে, কাবুলে মার্কিন দূতাবাসের কাছে আরেক বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে ওই বিস্ফোরণে হতাহতের কোনো তথ্য জানা যায়নি। উভয় হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী তালেবান। এ খবর দিয়েছে দ্য টাইমস। খবরে বলা হয়, দুই সপ্তাহ পর আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে গোষ্ঠী তালিবান জানিয়েছে, তারা নির্বাচনে ব্যাঘাত ঘটাবে। দলটি দাবি করে, বর্তমানে আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ ভূ-খণ্ডই তাদের দখলে।

প্রাদেশিক একটি হাসপাতালের প্রধান আবদুল কাসিম সাঙ্গিন বলেছেন, মঙ্গলবারের হামলায় নারী ও শিশুরাও নিহত হয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী সমাবেশে হামলায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা নাসরাত রাহিমি বলেন, বোমারু একটি মোটরসাইকেল চালিয়ে সমাবেশের চেকপয়েন্টে প্রবেশ করে ও নিজেকে উড়িয়ে দেয়। হতাহতের বেশির ভাগই বেসামরিক মানুষ।

এদিকে, কাবুলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কাছে অপর একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে। বিস্ফোরণটি নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে তালেবান দাবি করেছে, দূতাবাসের কাছে হওয়া হামলাটিও আত্মঘাতী হামলা ছিল।

উল্লেখ্য, সমপ্রতি তালেবানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি মাসে তালেবানের এক হামলায় এক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর আলোচনা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রামপ। তার আলোচনা বাতিলের ঘোষণার পর মার্কিন সেনাদের ওপর তালিবানের হামলার হার বেড়েছে। সোমবার জঙ্গি গোষ্ঠীটির অপর এক হামলায় আরো এক মার্কিন সেনার প্রাণহানি হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মোট ১৭ জন মার্কিন সেনা মারা গেছেন।

তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। চুক্তির প্রাথমিক খসড়াও তৈরি করা হয়েছিল। আফগানিস্তান থেকে পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর বদলে দেশটিতে আমেরিকার জন্য হুমকিজনক এমন কোনো জঙ্গি দলকে আশ্রয় না দেয়ার প্রতিশ্রুতি করেছিল তালেবান।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে সুনেরাহ

মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে মডেল-অভিনেত্রী সুনেরাহর প্রথম চলচ্চিত্র ‘ন ডরাই’। এই ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন শরিফুল রাজ। স্টার সিনেপ্লেক্স প্রযোজিত এই ছবিতে অভিনয়ের পর নতুন একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিতে অভিনয় করতে যাচ্ছেন তিনি। সুনেরাহ বলেন, নাম চুড়ান্ত না হওয়া এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করবেন খ্যাতনামা প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ছেলে নুহাশ হুমায়ুন। ভৌতিক কাহিনীর এ ছবিতে দর্শকরা আমাকে এবার দেখতে পাবেন। আগামী ১৯ তারিখ থেকে ঢাকার বিভিন্ন লোকেশনে এর শুটিং শুরু হবে। তিনদিন শুটিং করবো। আশা করছি ভালো কিছু হবে।

জাপানি শিশুরা ঠিক নেই by ফারজানা তাসনিম

অন্যান্য উন্নত দেশের চেয়ে একদিক থেকে জাপানিরা বেশ আলাদা। দেশটির সরকারি তথ্যানুযায়ী, গড়ে সাতজনে একজন শিশুকে বাবা-মা ছেড়ে ১০ বছর কাটাতে হয় ফস্টার হোম বা তত্ত্বাবধায়ক কেন্দ্রে। কিন্তু সেই তত্ত্বাবধায়ক কেন্দ্রগুলোয় শিশুদের ওপর মানসিক নির্যাতন হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। পারিবারিক বন্ধনহীন এসব শিশুকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান সরকার।
মিওয়া মোরিয়ার বয়স তখন কেবল ছয় বছর। হঠাৎ একদিন এক সমাজকর্মী এসে জানালেন, বড়দিনের পার্টিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে। খুশিমনেই রাজি হয়ে গেল মিওয়া। তবে পার্টির কথা বলে মিওয়াকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হলো, সেটি পশ্চিম জাপানের ছোট একটি শহর। প্রায় ৬০টি শিশু একসঙ্গে থাকে সেখানে। মিওয়ার সেই ‘পার্টি’ চলল দীর্ঘ আট বছর ধরে। মাকে ছেড়ে বহুদূরে এসে নতুন জীবনে মিওয়ার সঙ্গী হলো একাকিত্ব, মানসিক নির্যাতন আর ট্রমা।
মিওয়া কখনো জানতে পারেনি, কেন তাকে ঘর ছাড়তে হলো। তাকে শুধু বলা হয়েছিল, পরিবারের চেয়ে ওই গ্রুপে ভালো থাকবে সে।
জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুদের বেড়ে ওঠার কথা পরিবারের সান্নিধ্যে। জাতিসংঘের কথা বাদ দিলেও প্রকৃতির নিয়ম মেনে সারা বিশ্বে বাচ্চারা বাবা-মায়ের কোলেই বড় হচ্ছে। অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে এখানেই পার্থক্য জাপানের। শৈশবে এখানকার বেশির ভাগ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, উপেক্ষিত হয় অথবা বাবা-মাকে ছেড়ে ভিন্ন একটি বাসায় থাকতে বাধ্য হয়। সরকারি তথ্যানুযায়ী, এ ধরনের প্রায় ৩৮ হাজার শিশুর ৮০ ভাগকে তারা আবাসিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, জাপানের সরকার সমস্যাটিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে আইনসভায় উপস্থাপন করেছে। নির্যাতনের কারণে উচ্চমাত্রায় শিশুমৃত্যুর হার সবার টনক নড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে আগামী মার্চ মাসের মধ্যে অবস্থার উন্নতি ঘটাতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এতিম পথশিশুদের তত্ত্বাবধানের জন্য শত শত কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। তখন থেকেই রাষ্ট্র আর এই শিশুদের দায়ভার নেয়নি। বর্তমানে এমন তত্ত্বাবধান কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৬০০। সাময়িক সমাধান হিসেবে চিন্তা করলে কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে পারিবারিক আবহ ছাড়া শিশুদের বেড়ে ওঠা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। গত মাসে সরকারি এক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইনস্টিটিউশনগুলোয় শিশুদের ওপর সহিংস যৌন নির্যাতন বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেছে।
সম্প্রতি শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন—এমন এক আইনপ্রণেতা ইয়াসুহিসা শিওজাকি বলেন, মুখে মুখে সবাই বলে বাচ্চারা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাজে তার কোনো প্রতিফলন নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের হাতের খেলনায় পরিণত হওয়া জাপানে শিশুরা উপেক্ষিত। এই মনোভাবে পরিবর্তন আনতে হবে।
পালানোর সুযোগ নেই
বর্তমানে ২৩ বছর বয়সী মিওয়া জানান, প্রথম যে ইনস্টিটিউশনে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল, তার নাম কোবাতো গাকুয়েন। দিনের পর দিন চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে রাত কাটিয়েছে ছোট্ট মিওয়া। মায়ের কথা মনে পড়ে খুব কষ্ট হতো। একসময় সে বুঝতে পারল চোখের পানি তাকে বাড়িতে ফিরতে দেবে না। সেই থেকে হাল ছেড়ে দিয়ে একদম চুপ হয়ে যায় সে।
ইনস্টিটিউশনের সবাই যে খারাপ ছিল, তা নয়। তবে অধিকাংশ লোকই কোনো সতর্কবার্তা না দিয়ে চলাচল করত। বাচ্চারা অপমানিত হওয়ার ভয়ে সারাক্ষণ কুঁকড়ে থাকত। মিয়া বলেন, ‘ওখানে শত্রুদের হাত থেকে পালানোর কোনো সুযোগ নেই।’ এমন পরিবেশে অনেক শিশু ডেভেলপমেন্টাল ট্রমা ডিসঅর্ডার নামে মানসিক সমস্যায় ভুগতে শুরু করে বলে জানান ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী সাতোরু নিশিযাওয়া।
৪০ বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক কেন্দ্রের শিশুদের নিয়ে কাজ করা সাতোরু বলেন, ‘বাচ্চারা নিজেদের একেবারেই সুরক্ষিত বা নিরাপদ মনে করে না। নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা থেকে ছোটখাটো ব্যাপারে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এসব কারণেই অনেক শিশু নিজেই নিজেকে আহত করে এবং পরবর্তী সময়ে কোনো সম্পর্কে জড়াতে ভয় পায়।’
নির্ঘুম রজনী
ডেভেলপমেন্টাল ট্রমা ডিসঅর্ডারের জলজ্যান্ত উদাহরণ মিওয়ার হাতের ক্ষতচিহ্নগুলো। অন্য কেউ নয়, নিজেই নিজের এমন ক্ষতি করেছে সে। রেগে গেলে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙা তার অভ্যাস। ঘন ঘন ফোন নম্বর বদলে নিজেকে মানসিক সুরক্ষা দিতে চায় মিওয়া। বহু বছর পর পরিবারের কাছে ফিরে আসা মিওয়া নিজের কেসস্টাডি নিয়েই কাজ করছে। কোবাতো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ২৭৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন আদায় করে সে।
সবকিছু পড়ে মিওয়া বুঝতে পেরেছে, সমাজকর্মীরা তার মাকে বুঝিয়েছেন, একটি ভালো চাকরিসন্ধানী মায়ের ক্যারিয়ারের প্রধান বাধা তাঁর বাচ্চা। কাজেই বাচ্চার দায়িত্ব নিয়ে মিওয়ার মাকে একটি নিশ্চিন্ত জীবনের পথ দেখিয়েছিলেন তাঁরা। খুব শিগগির আবার মা-মেয়ে মিলে যেতে পারবে বলে আশ্বাস দেন তাঁরা। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো উদ্যোগ সমাজকর্মীরা নেননি।
এই এক প্রতিবেদন থেকে গোটা সিস্টেমের অবস্থা ফুটে উঠেছে। শিশুকল্যাণকর্মীরা তীব্র সমালোচনার শিকার হচ্ছেন। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই একের পর এক বাচ্চাকে ইনস্টিটিউশনে এনে তুলছেন তাঁরা। বহুদিন পার হয়ে গেলেও পরিবারের কাছে তাদের ফেরত দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। মিওয়া যখন মায়ের কাছে ফিরে আসে, তত দিনে তার বয়স ১৫ ছুঁয়েছে।
আইনপ্রণেতা শিওজাকি এই কর্মীদের মানোন্নয়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ আর লোকবল না থাকায় খুব একটা লাভ হচ্ছে না।
মিওয়ার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার কথা খুব একটা লেখা হয়নি প্রতিবেদনে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সে জানায়, রাতে ঘুম আসে না তার। চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হলে জানা যায়, ধীরে ধীরে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছে মিওয়া। এক বছর ধরে চিকিৎসা চলছে তার।
কোবাতো গাকুয়েনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে গোপনীয়তা নীতির দোহাই দিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তাঁরা।
সামাজিক পথ্য
সরকারি জরিপ অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সে বাচ্চারা যখন ইনস্টিটিউশন ছেড়ে ‘সত্যিকারের দুনিয়ায়’ পা রাখে, তখন একাকিত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাও তাদের গ্রাস করে ফেলে। এমন শিশুদের মধ্যে তিনজনে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। বাকিরা উচ্চবিদ্যালয় পর্যায় থেকেই ঝরে পড়ে। এদের মধ্যে চাকরি করছে—এমন মানুষের সংখ্যাও খুব কম। প্রতি দশজনে একজন সমাজসেবী হয়ে ওঠে। বাকিদের মধ্যে গৃহহীনের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
পারিবারিক বন্ধনহীনতার এই চিত্র পাল্টাতে আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত স্থানীয় সরকারগুলোকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একান্ত বাধ্য হয়ে যদি কাউকে ফস্টার হোম বা তত্ত্বাবধায়ক কেন্দ্রে থাকতেই হয়, সে ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ জন নয়, বরং ছোট পরিবারের আদলে সদস্যসংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। ইনস্টিটিউটের পরিচালকেরা অবশ্য বলছেন, কাজটি খুব একটা সহজ হবে না।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে জোর দিতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছে জাপান সরকার। বাচ্চাকে নিজ পরিবারের সংস্কৃতি মেনে বড় করতে পরিবারগুলোকে উৎসাহ দিচ্ছে তারা।
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় নিজের বাবা-মাকে ছেড়ে হোমে দিন কাটাতে কাটাতে মানসিক সমস্যায় ভুগছে জাপানি শিশুরা। ছবি: রয়টার্স

ঢাকায় বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয় কাবু মধ্যবিত্ত by মরিয়ম চম্পা

জীবন চলছে না। চালিয়ে নিতে হচ্ছে। সংসার যেন এক মহাসমুদ্র। পাড়ি দিতে গিয়ে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে। কি করব বলুন? দিন দিন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। বছর শেষে বাড়িভাড়া বাড়ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল বাড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনায় চলে যাচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
যে টাকা বেতন পাই মাসের অর্ধেকও চলে না। এরপর দ্বারস্থ হতে হয় দোকানির। বাকিতে মাল আনা। ধার করে বাকি দিন চলা। বেতন পেয়ে আবার ধার পরিশোধ করা। দোকান বাকি দেয়া। বাড়ি ভাড়া দেয়া। এভাবেই চলছে জীবন সংসার। বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করা আব্দুল করিম আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলেন। কেমন চলছে সংসার? এ প্রশ্নে তার এ বক্তব্য। করিম বলেন, মনে কষ্ট নিয়ে দিন পার করছি। মন খুলে হাসতে পারিনা অনেক দিন। জানিনা এভাবে কতদিন চলতে পারব। বলতে পারেন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছি।

ঢাকার মিরপুরে তিন কক্ষের একটি বাসায় বসবাস করেন রওশন আরা দম্পতি। স্বামী ও দুই সন্তানসহ তাদের সংসারে সদস্য সংখ্যা চার। স্বামী-স্ত্রী দুজন চাকরি করেও পরিবারের ব্যয় সামলাতে পারছেন না তারা। রওশন আরা বলেন, সব খাতেই ব্যয়ের পরিমান দ্রুতগতিতে বাড়ছে। কিন্তু বাড়ছে না শুধু আয়। সংসার চালানো এখন রীতিমত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বাড়তি ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে মাংস মাসে তিন চার দিন কিনতাম। এখন বাধ্য হয়ে কমিয়ে দিয়েছি। আগে রিকশায় যাতায়াত করলেও, এখন হেঁটে যাই। আগে নিউমার্কেটে মাসে দুই থেকে তিনবার ছোটখাটো শপিং করা হতো- এখন দুই মাসে একবার শপিংয়ে যাওয়া হয়। সপ্তাহের ছুটির দিনে ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাইরে খেতে যেতাম, এখন বাসায় বসে পছন্দের খাবার তৈরি করে দেই।  

গ্রীনরোডের বাসিন্দা রুমিন কবির একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গত দুই বছরে তার বাসাভাড়া বেড়েছে সাড়ে তিন হাজার টাকা। বিদ্যুৎ বিল আগে আসতো সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা, এখন ১২শ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আসে। গ্যাসের বিল বেড়েছে। ডিশ সংযোগ ও ইন্টারনেট বাবদ বিল বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এক বস্তা চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১ হাজার টাকা। ভালো মাছ কেজিপ্রতি ৫০০ টাকার নিচে মেলে না। তিনি বলেন,  যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছি, সেখানে গত দুই বছরে কারও বেতন বাড়েনি। খরচ কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ছেলে-মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে মাসে দু-একবার রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। এখন সেটা বাদ দিয়েছি। ছেলে-মেয়ের জন্য মৌসুমি ফল কিনলেও সেটা এখন অর্ধেকে চলে এসেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি পরিবারে স্থির ব্যয় বেড়েছে বাসাভাড়া, শিক্ষার খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল। ডিশ সংযোগ বিল, গৃহকর্মীর মজুরিও বেড়েছে। ময়লা পরিষ্কার ওয়ালাকে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। আর মাসের শুরুতে বেতন পেয়েই এসব ব্যয় মেটাতে হয় তাই এ ক্ষেত্রে সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ নেই।

এদিকে, কাঁচাবাজারেও ব্যয় বেড়ে চলছে। কোনো কারন ছাড়াই ২৫ টাকার পিয়াজ এখন ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় কিনতে হয়। আদার কেজি ১৯০ থেকে ২শ টাকা। চালের দাম এখন সবচেয়ে বেশি। বেশির ভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। গরু কিংবা খাশির মাংসতো এখন বিলাসিতার খাবারে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে মাংসের দাম হয়েছে দ্বিগুন। ভোজ্যতেল, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, লবন ইত্যাদির দাম বেড়ে যাচ্ছে। ফলে, প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়তে থাকায় ব্যয়বহুল নগরীতে পরিণত হচ্ছে ঢাকা। যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট-এর গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০১৭ সালের মার্চে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল নগরীর তালিকায় শীর্ষ শহর ঢাকা। ‘কস্ট অব লিভিং সার্ভে’ শীর্ষক এ জরিপ খাবার, পোশাক, বাড়িভাড়া, গৃহস্থালি পণ্য, প্রসাধন, পরিবহন, শিক্ষা, বিনোদন ব্যয়সহ ১৬০ ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা হয়। জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিক দিয়ে বিশ্বের মোট ১৩০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ৬২তম।

শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, গ্রামের মানুষ আছেন আরও বিপাকে। ২০১০ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা গিয়েছিল, তাদের গড় আয়ের পরিমাণ মোট ব্যয়ের চেয়ে বেশি। তারা মাসে ৩৬ টাকা সাশ্রয় করতে পারতেন। ২০১৬ সালে দেখা যাচ্ছে তাদের মাসিক ব্যয়-আয়ের চেয়ে ২৮৮ টাকা বেশি।

চলতি বছরের শুরুতে রাজধানীর খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবার দাম বিশ্লেষণ করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলেছে, বিদায়ী বছরে ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীর ১৫টি খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবার মধ্য থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য্য সামগ্রী ও ১৪টি সেবাখাতের তথ্য পর্যালোচনা করে ক্যাব এই হিসাব দিয়েছে। পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫.১৯ শতাংশ। এর আগে ২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল ৮.৪৪ শতাংশ, পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছিল ৭.১৭ শতাংশ। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে গত বছর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয় বৃদ্ধির এই হার ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন রকম ফল বয়ে আনতে পারে। ব্যয় অনুপাতে একজন ব্যক্তির আয় বৃদ্ধি না পেলে সেটা স্বস্তিদায়ক হবে না। আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যদি ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় মানুষের আয় বৃদ্ধি হয় তাহলে সেটাই হবে স্বস্তিদায়ক।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও পিপিআরসি’র নির্বাহী সভাপতি (পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার) ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কয়েকটি কারন রয়েছে। প্রথমত, যাতায়াত খরচের বিষয়ে যদি চিন্তা করি এক্ষেত্রে যাতায়াতের উপর বিশেষ করে গণপরিবহণের ওপর যে ধরনের ইনভেস্টমেন্ট হওয়া দরকার ছিল ওই ধরনের ইনভেস্টমেন্ট কিন্তু করা হয়নি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, নগরের বিনিয়োগগুলো যে সকল খাতে হওয়া দরকার বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবন মানের সঙ্গে যেগুলো জড়িত সেগুলোর ওপর ওই ধরনের বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নেই। যেমন স্বল্প আয়ের আবাসনের ওপর বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত সিমিত। জমিজমা বা রিয়েলএস্টেট কোম্পানির আগ্রহ এবং সরকারেরও উৎসাহিত করার জায়গাগুলোতে বড় ধরনের ঘাটতি আছে।

এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, সাধারণ মানুষের জীবনমানের জায়গাগুলোতে আমাদের যে বিনিয়োগ হওয়া দরকার সেখানে বিনিয়োগ অপর্যাপ্ততা আছে। সেজন্য ঘরভাড়া অথবা যাতায়াত খরচাবলি বেড়েই চলেছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের জীবনযাত্রার খরচটা বাড়ে কেন? খরচের মধ্যে একটি উপাদান হচ্ছে প্রয়োজনীয় উপকরন। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যয় আমরা যেটাকে চাঁদা বলতে অভ্যস্ত। অর্থাৎ শুধুমাত্র উপকরণ নয় বরং অন্যান্য খরচের বোঝাটাও বেশ বেশি। এসব খরচের ধাক্কাগুলো ভোক্তার উপর চলে যায়। উৎপাদনের খরচটা শুধু উৎপাদনের জন্য হচ্ছে না। এটা নানা ধরনের নন ইকোনোমিক খরচগুলো বেশি বলে চূড়ান্তভাবে ভোক্তার কাছে যে দামটা যায় সেটা একটু বেশি হয়ে যায়। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎসহ এই সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়গুলোর সাশ্রয়ী উৎপাদনের দিকে নজর কম। চতুর্থ কারন হচ্ছে, দেশে কর’এর বিন্যাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রত্যক্ষ কর-এর চেয়ে পরোক্ষ করের বোঝা অনেক বেশি।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এটা শুধু ঢাকায় না গ্রামেও এর প্রভাব আছে। মূল ব্যপারটা হলো, আমাদের দেশে আয় বৈষম্যটা বেড়ে গেছে। একদিকে সরকার বলছে উন্নয়ন হচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে শতকরা ৫ ভাগ থেকে ১০ ভাগের। বাকী ৯০ ভাগ জনগনের কোনো অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে না। ।

প্রকৃত আয় না বাড়াতে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। এবং আমাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এটার সমাধান শুধু দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনলে হবে না। আয় বৈষম্য কমাতে হবে। আয় বৈষম্য কমানোর প্রধান হাতিয়ার হবে যারা অত্যন্ত ধনী তাদের কাছ থেকে প্রপারলি ট্যাক্স সংগ্রহ করে জনগনের জন্য ব্যয় করা।

সার্বভৌমত্ব এবং অপরাধের বিচার সোফা চুক্তির বিতর্কিত ইস্যু by পি কে বালাচন্দ্রন

অর্থমন্ত্রী মাঙ্গালা সামারাবিরা ছাড়া শ্রীলংকার বাকি রাজনীতিবিদদের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্ট্যাটাস অব ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট (সোফা) চুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করছেন। প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এ ধরনের কোন চুক্তি তিনি হতে দিবেন না।
সাধারণ বিশ্বাস এই যে সোফা চুক্তির কারণে শ্রীলংকার সার্বভৌমত্বের বিষয়টি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, অথচ বিশ্বের কোন দেশের পক্ষ থেকে কোন ধরনের হুমকি মধ্যে নেই।
তবে, এখনও সম্ভাবনা রয়েছে যে, চীনকে নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র হয়তে কলম্বোর ক্ষমতাশালীদের এই চুক্তিতে আসার ব্যাপারে চাপ দেবে।
কারণ, শ্রীলংকা অন্তত কিছু জটিল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত হতে বাধ্য। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এলটিটিই বিরোধী যুদ্ধে শ্রীলংকাকে কৌশলগত দিক থেকে সহায়তা করেছিল। এলটিটিই’র অস্ত্রবাহী জাহাজের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রই শ্রীলংকাকে দিয়েছিল। চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ অ্যাডমিরাল রবিন্দ্র বিজেগুনারত্নে সিসারা টেলিভিশনে পেথিকাদা অনুষ্ঠানে এটা উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র একই সাথে শ্রীলংকার স্মল বোট স্কোয়াড্রনকে প্রশিক্ষণও দিয়েছিল, যারা এলটিটিই’র সি টাইগারদের পরাজিত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি একটি কোস্ট গার্ড নৌযান উপহারও দিয়েছে।
সোফার বর্তমান খসড়ার ব্যাপারে বিরোধিতা করেছে শ্রীলংকার সামরিক বাহিনী। কিন্তু একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কাও তাদের মধ্যে রয়েছে। সামরিক বাহিনী তাই সতর্কতার সাথে দর কষাকষির মাধ্যমে এমনভাবে সোফা চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে যাতে শ্রীলংকার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন না হয় এবং স্থানীয় সামরিক বাহিনীকে যাতে দর্শক হিসেবে বসে থাকতে না হয়।
গ্লোবালসিকিউরিটি ওয়েবসাইটে গতানুগতিক সোফা চুক্তির একটা ধারণা দেয়া হয়েছে। এখন প্রায় শ’ খানেক সোফা চুক্তি রয়েছে, যেখানে ঘাঁটি স্থাপন বা প্রবেশ সুবিধার কোন বিষয় নেই। বরং অন্য দেশে কর্মরত মার্কিন সেনা ও সম্পত্তির সুরক্ষা ও আইনি বিষয়গুলোর বিবরণ রয়েছে সেখানে।
এ ধরনের চুক্তির উদ্দেশ্য হলো ওই দেশে কর্মরত মার্কিন সেনাদের অধিকার ও দায়দায়িত্বগুলো নির্ধারণ করা। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিমিনাল ও সিভিল আইনি প্রক্রিয়া, পোশাক পরিধানের বিধিবিধান, অস্ত্র বহন, কর ও কাস্টমস মওকুফের বিধান, সেনা ও সরঞ্জামের প্রবেশ ও বাহির হওয়ার নিয়মকানুন, এবং ক্ষয়ক্ষতি পূরণের বিধানসমূহ।
সিভিল/ক্রিমিনাল বিচার প্রক্রিয়া
সোফা চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হলো সিভিল ও ক্রিমিনাল বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়। মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্সের (ডিওডি) দায়িত্ব হলো “বিদেশে যে সব মার্কিন সেনা অপরাধী আইনে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে বা বিদেশের কারাগারে বন্দি হচ্ছে, তাদের জন্য সর্বোচ্চ সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা”।
সে কারণে সোফা চুক্তি যেটা করছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোন সেনা অফিসিয়াল কর্মরত থাকাকালে কোন অপরাধে জড়িত হলে তার বিচার করার প্রাথমিক কর্তৃত্ব থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের, সংশ্লিষ্ট দেশের নয়।
যে সব চুক্তির মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে ওই দেশকে বিচারের প্রাথমিক কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে, সেখানে, মার্কিন ডিওডি সেনাদের ‘ফেয়ার ট্রায়াল গ্যারান্টির’ মাধ্যমে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা পরামর্শের সুযোগ, দোভাষী সুবিধা, বিচার পর্যবেক্ষক এবং কারাগারে সফরের সুবিধা।
ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা
গ্লোবালসিকিউরিটি ওয়েবসাইটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অধীনে যারা কর্মরত এবং তারা অন্য দেশে দায়িত্ব পালনকালে সেখানকার কোন আইন লঙ্ঘন করলে তাদের আইনের অধীনে এনে বিচারের দায়িত্ব মার্কিন সামরিক বাহিনীর।
ডিওডি নির্দেশনায় ‘ন্যায় বিচারের’ জন্য ১৪টি সুরক্ষামূলক বিষয় তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো মার্কিন প্রাদেশিক অপরাধ মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যেটা মার্কিন সংবিধানে ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে।
এই সুরক্ষামূলক বিধানের মধ্যে রয়েছে অযৌক্তিক বিলম্ব ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা। একটা পক্ষপাতহীন আদালতে বিচার করা এবং নির্যাতন, হুমকি বা সহিংস উপায়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা থেকে বিরত থাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডিং অফিসাররা যদি মনে করেন যে, তার অধীনস্থ কোন আমেরিকান বিদেশী কোন আইনের অধীনে সেই অধিকার পাচ্ছে না, যেই অধিকার মার্কিন সংবিধানে তাকে দেয়া হয়েছে, তাহলে তারা ওই দেশকে অনুরোধ করবে যাতে সোফা চুক্তির অধীনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।
ওই দেশের কর্তৃপক্ষ যদি সেই অনুরোধ নাকচ করে দেয়, মার্কিন কমান্ডার সে ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবগত করবে যাতে কূটনৈতিক চ্যানেলে ওই অনুরোধ মানতে চাপ দেয়া হয়। মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা হয়তো ওই দেশের আইনি সুরক্ষা ছাড়া অন্যান্য কারণেও ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং অধিকাংশ দেশেই তারা নিয়মিত এ ধরনের ছাড় পেয়ে আসছে বলে গ্লোবালসিকিউরিটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।
জাপানে যে সব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে সোফা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে চলে আসছে। ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সাথে সোফা চুক্তি স্বাক্ষর করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ওকিনাওয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা অবস্থান করছে। কিন্তু ওকিনাওয়াতাকে কয়েক হাজার মার্কিন সেনার অবস্থান নিয়ে সবসময়ই বিতর্ক চলে এসেছে।
মার্কিন বাহিনীর সদস্য ও আর যারা তাদের হয়ে কাজ করছে, তারা যদি কাজে নিযুক্ত থাকাকালে জাপানের কোন আইন ভঙ্গ করে, তাহলে তাদের বিচারের কর্তৃত্ব ১৭ অনুচ্ছেদের অধীনে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দেয়া হয়েছে। পুলিশ এই অনুচ্ছেদ নিয়ে সবসময় সমস্যায় পড়েছে।
জাপানী পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে জড়িত কেউ মারাত্মক কোন অপরাধে যুক্ত হলে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে সবসময় অসহযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। জাপান টাইমস এক রিপোর্টে এ তথ্য জানিয়েছে।
পত্রিকাটিতে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে সঙ্ঘটিত একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কর্মরত একজন বেসামরিক ব্যক্তি রুফুস জে র‍্যামসি ওকিনাওয়াতে ক্যাম্প ফস্টারে কাজ করছিল। অফিসের কাজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটি নিয়ে যখন সে বাড়ি ফিরছিল, তখন ১৯ বছর বয়সী কোকি ইয়োগির সাথে তার গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় এবং এতে কোকি মারা যায়। কিন্তু এরপরও যুক্তরাষ্ট্র তাকে অন-ডিউটি হিসেবে গণ্য করছে এবং ১৭ অনুচ্ছেদকে ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে জাপানি আইনে পদক্ষেপ নিতে দিচ্ছে না।
তবে, নভেম্বরে, একটা চুক্তি হয়েছে যাতে বলা হয়েছে যে, কেউ ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার মতো ‘মারাত্মক’ কোন অপরাধে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে জাপানি আইনে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি তার বিরুদ্ধে কোন অপরাধের অভিযোগ আনতে না চায়, তবেই কেবল সেই ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এই মামলাটি ওকিনাওয়াতে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও টোকিও সোফা চুক্তিটি সংশোধনের জন্য তীব্র চাপের মুখোমুখি হয়েছে।
জাপান টাইমস আরও বলেছে যে, ১৯৯৫ সালে তিন মার্কিন সেনা কর্তৃক ১২ বছর বয়সী এক মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় সোফা চুক্তি এবং সেখানে মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান – উভয়ের বিরুদ্ধেই ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম নেয়।
পত্রিকাটি বলেছে, “এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সরকার মেরিন্স কর্পস এয়ার স্টেশানকে ওকিনাওয়ার আরও কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরিয়ে নিতে রাজি হয় এবং ৮০০০ মেরিন সেনাকে গুয়ামে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই স্থানান্তরের জন্য টোকিওকে ৬ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে”।
মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের আইনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে এবং সে কারণে মার্কিন সেনা সদস্যদেরকে জাপানি পুলিশের হাতে তুলে দেয়াটা সমস্যাজনক। জাপান টাইমস এটা উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র গ্রেফতারের পর পুলিশ অবশ্যই আটক ব্যক্তিকে তার অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করবে। কিন্তু ফৌজদারি মামলায় জাপানে যারা আটক হয়, তাদের জন্য এটা প্রযোজ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো জাপানে কাউকে আটক করা হলে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোন অভিযোগ ছাড়াই তাকে ২৩ দিন পর্যন্ত আটকে রাখার সুযোগ রয়েছে। এ সময়ে তাকে আইনি সহায়তা নিতে দেয়ারও কোন বাধ্যবাধকতা নাই।
জাপান টাইমসকের নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সোফা চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, জাপানি কর্তৃপক্ষ সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত বা তাদের সুরক্ষিত এলাকার মধ্যে অনুসন্ধান, পরিদর্শনের কোন অনুমতি পাবে না।
জাপানি পুলিশ যদি মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর কাউকে বা তাদের সম্পত্তির মধ্যে তল্লাশি, আটক বা পরিদর্শন করতে চায়, তাহলে তাদেরকে অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে এবং এই আবেদন গ্রহণ বা বর্জন হতে পারে।
একটি উদাহরণ দিয়ে জাপান টাইমস বলেছে: ২০০৪ সালের আগস্টে, একটি মার্কিন মেরিন কর্পস সি স্ট্যালিয়ন হেলিকপ্টার ওকিনাওয়া ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। কেউ এতে নিহত হয়নি বা আহতও হয়নি। কিন্তু বিতর্কের শুরু হয় তখন, যখন নিকটস্থ ফুতেনমা ঘাঁটি থেকে মার্কিন মেরিন সেনারা এসে বিধ্বস্তের জায়গাটি ঘিরে রাখে এবং এমনকি ওকিনাওয়া পুলিশ বা ফায়ার ফাইটারদেরকেও সেখানে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
পরে অনেকটা জোর করে এই পার্থক্য খানিকটা ঘোচানো হয়। কিছুটা প্রবেশের অধিকার দেয়া হয় পুলিশকে। কিন্তু এরপরও ক্ষতিগ্রস্ত হেলিকপ্টারের কিছুই দেখতে পারেনি পুলিশ।