Saturday, December 12, 2015

ভায়রা ভাই হচ্ছেন দুই ভাই?

গত তিন মাস ধরে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছেন প্রিন্স উইলিয়ামের ছোট ভাই প্রিন্স হ্যারি এবং রাজবধূ কেট মিডলটনের ছোটবোন পিপা মিডলটন। সম্প্র্রতি একটি আমেরিকান ট্যাবলয়েড এই খবর জানিয়েছে। তাদের দাবি বিগত তিনমাস ধরে ৩১ বছর বয়সী রাজকুমারের সঙ্গে প্রেম করছেন পিপা। যদিও দু’জনেই বিষয়টি লুকানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু সবার দাবি, দু’জনের মধ্যে যে রোম্যান্টিক একটা সম্পর্ক গড়ে উঠছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাদের একত্রে অসাধারণ দেখায় এবং দু’জনের চোখেই ভালোবাসা ছড়ানো।
২০১১ সালে উইলিয়াম আর কেটের রূপকথার মতো বিয়ের পরেই বেশি কাছাকাছি আসেন হ্যারি ও পিপা। গত অক্টোবরে পিপার সঙ্গে তার বছর দুয়েকের বয়ফ্রেন্ড নিকো জ্যাকসনের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। কেননা তখন বিয়ের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না পিপা। বিয়ের জন্য এমন একজনকে খুঁজছিলেন হ্যারি যে কিনা তার মানসিক দুঃসময়গুলো ভাগাভাগি করে নেবে। তাহলে কি ছোট মিডলটনই সেই কাক্সিক্ষত নারী। পিপাই কি হতে যাচ্ছেন রাজ পরিবারের আরেক বধূ? দ্য গার্ডিয়ান

চীনের শীর্ষ ধনী গুয়াংচ্যাং হঠাৎ নিখোঁজ!

চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন গুয়ো গুয়াংচ্যাংকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পর জল্পনা চলছে যে হয়তো পুলিশ তাকে আটক করেছে। গত আগস্ট মাসে গুয়োকে একটি দুর্নীতির মামলায় জড়িত করা হয়। গুয়োর বয়েস মাত্র ৪৮। কিন্তু তার ব্যবসার সাম্রাজ্য এর মধ্যেই সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
ফোর্বস ম্যাগাজিনের অনুমান, তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৭০০ কোটি ডলার এবং তিনি ফরাসি হলিডে ফার্ম ক্লাবমেডও নিয়ন্ত্রণ করেন। তাকে বলা হয় চীনের ওয়ারেন বাফেট- বিনিয়োগের প্রতি তার উৎসাহের জন্য। চীনের একটি সাময়িকী বলছে, গুয়োর কোম্পানি ফোসুন ইন্টারন্যাশনাল বলেছে- তারা বৃহস্পতিবারের পর থেকে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগই করতে পারেনি। কোম্পানিটি শুক্রবার হংকং স্টক এক্সচেঞ্জকে বলেছে, তারা যেন ফোসুন কোম্পানির শেয়ার বেচাকেনা বন্ধ রাখে। বিবিসি

কোনো প্রকার হুমকি এলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন : পুতিন

কোনো হুমকি এলে ‘অত্যন্ত কড়া’ পদক্ষেপ নিতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন। একইসঙ্গে রুশ বাহিনীকে কেউ লক্ষ্যবস্তু বানানোর চক্রান্ত করলে তা-ও কালবিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের এ নির্দেশ দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এ খবর দিয়েছে। সিরিয়ায় রুশ বাহিনীকে ঘিরে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত করে পুতিন বলেন, আমাদের কোনো বাহিনীর জন্য হুমকি এলে অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি কেউ আমাদের বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অপচেষ্টা করে তবে সঙ্গে সঙ্গেই সে অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিতে হবে। কোনো দেশকে ইঙ্গিত না করলেও রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় দেশটির সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে।
এ নিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে রাশিয়া। আইএসের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি রাশিয়ার : সিরিয়ার জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রুশ ডুবোজাহাজের (সাবমেরিন) নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় (যা পানির নিচ থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়) পারমাণবিক অস্ত্র (ওয়ারহেড) যুক্ত করা হতে পারে। বৃহস্পতিবার রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে পুতিন এ কথা বলেন। তিনি বলেন, যদিও পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করাটা একটা সম্ভাবনা মাত্র। তবু তিনি আশা করেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এগুলো কখনোই ব্যবহার করতে হবে না। পুতিন দাবি করেন, গত তিনদিনে তার বাহিনী বিভিন্ন ধরনের ৩০০টি লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে গত মাসে তুরস্কের ধ্বংস করা বিমানের ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারে সিরিয়ার বিশেষ বাহিনীকে সহায়তা করেছে।

জেঁকে বসার আগেই দমন করতে হবে আইএসকে -সাক্ষাৎকারে: রবার্ট গিবসন by রাহীদ এজাজ

রবার্ট গিবসন
ঢাকায় কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের শেষ প্রান্তে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। বাংলাদেশে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
প্রথম আলো: দুই বিদেশি হত্যার পর বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে দেখেন?
রবার্ট গিবসন: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাস আছে। তবে এবারই প্রথম বিদেশিদের ওপর হামলা হচ্ছে, বিদেশিরা খুন হয়েছেন, যা লজ্জাজনক। পশ্চিমা নাগরিকসহ শিয়া ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর সম্প্রতি যেসব হামলা হয়েছে, তার সব কটির দায় স্বীকার করেছে আইএস এবং এটি উদ্বেগের। আমি আশা করব, ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকি থাকার বিষয়টি মেনে নিয়ে সরকার তা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এরপর লোকজনকে এটা দেখাতে পারবে যে, কাজ ও বসবাসের জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ। আইএস এখন পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য সন্ত্রাসী সংগঠন, যা আল-কায়েদার উত্তরসূরি এবং পৃথিবীজুড়ে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন আছে আইএসের প্রতি। কাজেই পুরো পৃথিবী যে ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, এটি আমাদের মেনে নিতে হবে। সেই সঙ্গে মাথায় রাখতে হবে আইএসের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও। খিলাফত প্রতিষ্ঠা নয়, তাদের বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষ প্রমাণিত হয়েছে বৈরুত, তিউনিস ও প্যারিসের নৃশংস হামলাগুলোতে। নিজেদের উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য আইএস পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। তাই আমার বিশ্বাস, তৎপরতা চালানোর জন্য আইএস যেকোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। এ ধরনের গোপন সংগঠনগুলোর লোকজন কোথায় আছে আপনিও জানবেন না। কিন্তু তাদের উপস্থিতির প্রমাণ আপনি দেখবেন এবং এটিও বুঝতে পারবেন যে বাংলাদেশে তাদের প্রয়োজনীয় সমর্থনও আছে। তাই জঙ্গি সংগঠনটি বাংলাদেশে জেঁকে বসার আগেই তাদেরকে আমাদের দমন করতে হবে।
প্রথম আলো: আইএসের বাংলাদেশে উপস্থিতি সম্পর্কে আপনাদের কাছে থাকা তথ্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
রবার্ট গিবসন: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে আইএসের দায় স্বীকারের দাবি থেকেই এখানে তাদের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। কাজেই একটি শক্তি হিসেবে তাদের আবির্ভূত হওয়ার আভাস আছে। আমরা ফের ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা পশ্চিমা স্বার্থে আইএসের হামলা দেখতে চাই না। বাংলাদেশের সরকার, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক আছে এবং আমাদের কাছে যেসব তথ্য আছে, সেগুলো আমরা তাদের দিয়েছি।
প্রথম আলো: আপনারা আসলেই কি তথ্যগুলো দিয়েছেন?
রবার্ট গিবসন: অবশ্যই। আমাদের হাতে যেসব তথ্য ছিল, সবই আমরা সরকারকে দিয়েছি। কোনো কিছুই লুকিয়ে রাখিনি। যেহেতু এখানে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই, তদন্ত চালানোর সামর্থ্যও আমাদের নেই। তা ছাড়া এসব আমাদের কাজও নয়। কাজটা করবে এখানকার গোয়েন্দা সংস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে আমরা যে তথ্য দিয়েছি, তার ভিত্তিতে তারা কাজ করতে পারে।
প্রথম আলো: আপনারা তথ্য দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে!
রবার্ট গিবসন: লোকজনের যে বিভ্রান্তি আছে সেটি বুঝতে পারি। আমরা বলতে পারি না, গুলশানের ‘ক’ নম্বর সড়কের ‘খ’ নম্বর বাড়িতে আইএস আছে। এটি বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা যে সক্রিয়, এ নিয়ে যে তথ্য আমরা তাদের দিয়েছি, সেটির ভিত্তিতে কাজ করা এখানকার সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব। আমি যখন তাদের ঠিকানাই জানি না, তাহলে দেওয়ার সুযোগ কোথায়!
প্রথম আলো: বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের শঙ্কা এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে জঙ্গিদের হত্যার হুমকি এ দেশের ব্যবসার পরিবেশের জন্য কি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে?
রবার্ট গিবসন: এখনই এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হচ্ছে না। আমার ধারণা, শুরুতে এ বিষয়ে লোকজন বেশ সতর্ক ছিলেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং লোকজনও মেনে নিয়েছেন, ঠিক আছে ঝুঁকি হয়তো আছে, তবে এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আমাকে চলতে হবে। পৃথিবী যে প্রতিনিয়ত আরও জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তা সবাই মানছেন। যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়ীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের এবং ওই দেশগুলোর সমৃদ্ধির জন্য কাজ করছেন। আর ঝুঁকির কথা বিবেচনা করেই তাঁদের ব্যবসা করতে হয়। আর এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কাজেই হোটেল, বিমানবন্দরসহ যেসব জায়গায় তাঁদের চলাফেরা করতে হয়, সেখানে তাঁদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তাঁরা এখানে আসতে থাকবেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্য আছে কি না সেটি জরুরি।
প্রথম আলো: বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও বিরোধী নেতা-কর্মীদের হত্যা ইত্যাদি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখন কেমন?
রবার্ট গিবসন: কোনো মুক্ত সমাজেই বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমের মতো বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য নয়। প্রায় নিয়মিতভাবে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা বিষয়গুলো তুলেছি। আর আমাদেরকে সব অভিযোগের যথাযথ তদন্তের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা ছাড়া আলোচিত গুমের ঘটনাগুলোর তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। কারা, কেন এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা খুঁজে বের করা উচিত। এ ধরনের ঘটনাগুলোর সুরাহা না হওয়া গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় না।
প্রথম আলো: আসন্ন পৌর নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কতটা পরিবর্তন আনবে?
রবার্ট গিবসন: ভোটাধিকারের মাধ্যমে লোকজনের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগের প্রেক্ষাপট থেকে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জড়িত সবাই কতটা গঠনমূলকভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন, সেটিও দেখার আছে। সেই সঙ্গে নির্বাচনের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নির্ভয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো: গত এপ্রিলের তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তো সুখকর নয়?
রবার্ট গিবসন: ওই নির্বাচন নিয়ে নানা পর্যায়ে হতাশা আছে। তবে আমাদের হতাশা কয়েকটি বিষয়ে। এটি তো স্পষ্ট হয়েছে যে ভোটারদের অংশগ্রহণের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ ভোটের পরিবেশ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির কাজটা নির্বাচন কমিশনের ছিল। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমাদের একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দরকার এবং এ বিষয়টিতে আমরা উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।
প্রথম আলো: দেড় দশকের মধ্যে দুই দফায় বাংলাদেশে প্রথমে উপ-হাইকমিশনার ও পরে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই সময়টাতে বাংলাদেশের পরিবর্তনটা কীভাবে দেখেন?
প্রথম আলো: ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পরিবর্তন, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পরিবর্তনের হাওয়া আমাকে বিস্মিত করে! ১৫ বছর আগে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ ছিল না, অভাব ছিল শিক্ষা ও সুপেয় পানির। জীবনের মৌলিক চাহিদা আর জীবনযাত্রা নিয়ে মানুষের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এবার এসে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দেখেছি স্বাস্থ্যকর পায়খানা, সুপেয় পানির প্রাচুর্য। সেই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে লোকজনের সচেতনতা আমাকে অবাক করেছে। আমার মতো অনেকের কাছে বিরাট এই পরিবর্তন খুব সহজেই চোখে পড়বে এবং দেশের জন্য এ এক বিরাট অর্জন। দ্বিতীয়ত, আমি যখন ঢাকা ছেড়ে যাই, তখন এত দালানকোঠা ছিল না। এখন তো ঢাকায় আকাশছোঁয়া দালানের ছড়াছড়ি। দেশজুড়ে ব্যাপক উন্নয়নের তৎপরতাও চলছে। প্রতিবছর সাড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট ভালো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি মনে করি, এই হার আরও বেশি হতে পারত। বারবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঘিরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়া, রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার মতো চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জিত হচ্ছে না। আমি যখন আবার বাংলাদেশে ফিরব, তখন হয়তো এ সমস্যাগুলো থাকবে না বলে আশা রাখি।

বিদেশিদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা

জননিরাপত্তায় রাজধানীতে পুলিশি পাহারা
বেশ কয়েকটি উন্নত ও ধনী দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কসংকেত জারি করেছে। মাত্রার হেরফের আছে বটে। তবে অনেকেরই ভাবসাব যে আমাদের দেশটা জঙ্গিতে ভরে গেছে। যেকোনো সময় তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এসব আশঙ্কা একেবারে অমূলক, এমনটা বলা যাবে না। সাম্প্রতিক কালে সন্ত্রাসী হামলায় দুজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রাণনাশী হামলা হচ্ছে কিছু ব্লগারের ওপর। ভিন্নধর্মাবলম্বী ধর্মীয় নেতারাও কেউ কেউ এর শিকার হচ্ছেন। হুমকি এসেছে অনেকের কাছে। এমনকি মুসলমানদের একটি অংশ শিয়া সম্প্রদায়ের ওপরও হামলা হচ্ছে। আরও দুঃখজনক যে এ হামলাগুলো হচ্ছে ইসলামের নামে। এসব ঘটনায় গুটিকয় স্বার্থান্বেষীকে বাদ দিলে গোটা দেশবাসী মর্মাহত। ঘটনার হোতাদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত বিচার সবারই কাম্য। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ বিষয়ে কিছুটা প্রচেষ্টাও নিচ্ছে। তবে সেটা আরও জোরদার ও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর এটা অসম্ভবও নয়। কিন্তু এ বিষয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও এমনটা বলা যাবে না যে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্ক করার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। মাত্র কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা বলে তাদের নির্ধারিত ও সব প্রস্তুতি নেওয়া সফরসূচি বাতিল করে। আবার এর কিছুকাল পরেই তাদের ফুটবল দল এখানে এসে খেলে যায়। বরাবরই এ ধরনের খেলোয়াড়দের জন্য সরকার বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়। সাম্প্রতিক কালের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে তা জোরদারও করা হয়েছে। এতে তাদের আশ্বস্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে দেশটি অতিসম্প্রতি তাদের সব স্বেচ্ছাসেবককে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বলেছে। দূতাবাসকে নির্দেশ দিয়েছে তাদের জনবল ছেঁটে ফেলতে। এতে আমরা শুধু দুঃখিত বললে কম বলা হবে। বরং ক্ষুব্ধও। প্রশ্ন আসে, সব দেশের ক্ষেত্রেই কি তারা এমনটা করে? কয় দিন আগে প্যারিসে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটল, তা গোটা বিশ্ববাসীর জন্যই বেদনাদায়ক। আমরাও এর অংশীদার। সে নগরে তো আইএস নামক জঙ্গি সংগঠনটি নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে এমনটা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে হামেশাই খুনখারাবি হয়। এই সেদিনও ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি হলিডে পার্টির ওপর তিনজন বন্দুকধারীর গুলিতে ১৪ জন নিহত হন। সেখানে মাঝেমধ্যে স্কুলে ঢুকেও গুলি করে বাচ্চাদের মেরে ফেলে কেউ কেউ।
সংবাদপত্র সূত্র থেকে জানা যায়, সে দেশে শুধু এ বছরই ৩৫৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে জোর দাবি থাকলেও অস্ত্র উৎপাদনকারীদের লবিং এটা হতে দিচ্ছে না। বছর কয়েক আগে মুম্বাইয়ের একটি হোটেলসহ নগরের অংশবিশেষ লম্বা সময় মাত্র কয়েকজন দুর্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণে ছিল। খুন হয়েছে অনেক। প্যারিস হামলার পরেই সেখানে একটি শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গেল। হওয়ারই কথা। যত বেদনাদায়কই হোক, কোনো দুর্ঘটনার জন্য তো সব স্থবির হয়ে যায় না। আর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে প্রতিদিন হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক যাচ্ছেন। যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, এমনকি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরাও। এটা তো স্বাভাবিক। হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আমাদের তুলনায় অনেক জোরদার। তাদের বিত্ত-সামর্থ্য বিবেচনায় তাই হওয়ার কথা। তবে সে নিরাপত্তাব্যবস্থার মাঝেই তো ঘটনাগুলো ঘটছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে আগাম সবকিছু জানার সুযোগ নেই। এর ফলেই এমনটা ঘটে। এ কথাটা আমাদের জন্যও প্রযোজ্য। তবে তারা দ্রুত অপরাধী শনাক্তকরণ ও বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়। আর আমাদের এখানে এর ঘাটতি যথেষ্ট। তা ছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ–জাতীয় ঘটনার তদন্ত ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্নমুখী করা হয়। যেমনটা ঘটেছিল ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায়। এখনো এমন কিছু ঘটবে না এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। আর তা ঘটলে প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে যায়। সুযোগ পায় নতুন করে অপরাধ ঘটানোর। তা ছাড়া প্রকৃত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতেও সময়ক্ষেপণ হয় কারণে-অকারণে। এসব করেই আমরা অন্য দেশগুলোকে আমাদের বিষয়ে বিরূপ ও অপমানজনক মন্তব্য করা ও ব্যবস্থা নিতে সুযোগ দিচ্ছি। আর তারাও বিবেচনাহীনভাবে বা ভিন্ন কোনো বিবেচনা থেকে আমাদের মতো দেশকে অপদস্থ করার সুযোগ হাতছাড়া করে না। এ দেশে আইএস নামক জঙ্গি সংগঠন আছে কি নেই—এ নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক।
সেটা থাকুক বা না থাকুক, আমাদের এখানেও জঙ্গি তৎপরতা চলছে এবং তা দ্রুত দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা না করলে ডালপালা মেলে অধিকতর বিপদ ডেকে আনতে পারে। তবে ইউরোপে আইএস যে সক্রিয় সে প্রমাণ তো আমরা সেদিনই দেখলাম। আর আইএস কাদের সহায়তায় গঠিত এবং এর সুবিধাভোগী কারা এটা নিয়ে তো অনেক খোলামেলা কথাবার্তাই হচ্ছে। অন্তত আমাদের মতো দেশ এ বিপজ্জনক খেলায় নামেনি সেটা নিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রও তার নাগরিকদের আমাদের দেশ ভ্রমণে সতর্ক করেছে। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে সে দেশের সরকারের ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ নেতিবাচক। তবে তাদের সুশীল সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছিল, এটা ভুলে যাওয়ার নয়। এককেন্দ্রিক বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অনেক। তা ছাড়া তাদের কিছু কিছু পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে। যেমন, গত জাতীয় নির্বাচনটি সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল। একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সে দুর্বলতা কাটানোর একটি পথ। তবে ইউরোপের কিছু দেশ এমনকি জাতিসংঘ আমাদের মানবাধিকার প্রশ্নে প্রায়ই যেসব কথা বলে, তা তর্কাতীতভাবে মেনে নেওয়া যায় না। মানবাধিকার দেশ, কাল ও স্থানভেদে ভিন্ন মাত্রা পায়। ইউরোপ প্রাণদণ্ড রদ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্য তা করেনি। করেনি জাপান, চীন ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত অনুরাগী মিসর ও সৌদি আরব শত শত লোককে প্রাণদণ্ড দিয়ে থাকে। মিসরে সামরিক বাহিনী তাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রাণদণ্ড দিয়েছে। অবশ্য দণ্ড কার্যকর হয়নি এখনো। এসব ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কোনো জোর প্রতিবাদ করেছে এমনটা আমরা জানি না। আমাদের দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনাই ঘটে থাকে। এগুলো নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে ও হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশও সে বিষয়ে কথা বললে অযৌক্তিক বলা যাবে না। তবে এসব বলতে নিজেদের অবস্থানটি একটু দেখে নিলে ভালো হয়। গুয়ানতানামো বে কারাগারে আটক যুদ্ধবন্দীদের জেনেভা কনভেনশনে স্বীকৃত সুবিধাদির কিছুই দেওয়া হয়নি। বরং সেখানে বছরের পর বছর চলেছে অমানবিক নির্যাতন। হতে পারে ওসামা বিন লাদেন ছিল সন্ত্রাসী নেতা।
আমাদের অনেকের মাঝেই তার জন্য কোনো সহানুভূতি নেই। তবে তারও আইনের আওতায় বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু তা মেনে নেওয়া হয়নি। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অগোচরে সে দেশে সশস্ত্র হামলা করে তার মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়। অবশ্য তারা এগুলো করেছে বলেই আমরাও মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে থাকব, এমন কোনো কথা নয়। পাশ্চাত্য বিশ্বের কাছে আমরা অনেকভাবে ঋণী। আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে তারা সমৃদ্ধ করছে আমাদের জনসম্পদকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা ত্বরান্বিত করছে উন্নয়নের গতি। বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে তাদের দেশে। তাঁরা পেয়েছেন সমৃদ্ধ জীবনের স্বাদ। এ ছাড়া বিপন্ন মানবতার ডাকে ওই দেশগুলো লক্ষণীয়ভাবে সাড়া দেয়। সম্প্রতি সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের ইউরোপই আশ্রয় দিয়েছে উদারভাবে। অথচ তাদের জনশক্তি আমদানি করতে হয়। আমাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার হিসেবেও ইউরোপ আর আমেরিকা সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ওপর নির্ভর করতে হয় আমাদের। তবে একটি জাতির আত্মসম্মান অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সেটি তাদের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি প্রযোজ্য আমাদের ক্ষেত্রেও। অবশ্যই আমরা তাদের পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেব। আর তাদেরও কারণে-অকারণে আমাদের হেয় করার পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

হত্যা মামলার আসামির পক্ষে বিলবোর্ড!

চট্টগ্রামের লালদীঘির ময়দানে বিশাল এক বিলবোর্ড। এক কোণে বঙ্গবন্ধুর ছোট্ট ছবি, তার ঠিক পাশেই প্রধানমন্ত্রীর ছবি আরও ছোট। কিন্তু ডান পাশে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের ছবি সে তুলনায় বিশাল। বাঁ পাশের ছবিটা বিশালতর। বিলবোর্ডের ইনিই নায়ক। এস এম শফিকুল ইসলাম নামের এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়েছে ওই বিলবোর্ডে। তিনি ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক’, ‘আ জ ম নাছির ভাইয়ের একনিষ্ঠ কর্মী ও বিশিষ্ট সমাজসেবক, সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক’! কিন্তু চট্টগ্রামের পুলিশের ভাষ্য, এই ব্যক্তি একটা হত্যা মামলা এবং হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ বিভিন্ন অভিযোগে নয়টা মামলার আসামি। তাঁর সম্পর্কে পুলিশের দেওয়া তথ্য ভয়ংকর। মেহেদী হাসান নামে চট্টগ্রামের যুবলীগের এক কর্মী গত ৪ জুন থানায় জিডি করে আশঙ্কা জানিয়েছিলেন যে শফিকুল ও তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে খুন করাতে পারেন। ১ সেপ্টেম্বর মেহেদী সত্যিই খুন হয়ে যান। মেহেদীর স্ত্রীর অভিযোগ, তাঁর স্বামীকে খুন করিয়েছেন শফিকুলই।
শফিকুল একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহারের দাবিতে শহরের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে, অথচ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সেগুলো সরায়নি। বিলবোর্ডে মেয়রের ছবি আছে বলেই কি? চট্টগ্রাম নগরে অনুমোদন ছাড়াই কি যেকোনো বক্তব্যসংবলিত বিলবোর্ড যথেচ্ছ সংখ্যায় টাঙানো যায়? ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নাম ব্যবহার করে খুনি-সন্ত্রাসীদের আইনের ঊর্ধ্বে বিচরণ ও বারবার অপরাধ সংঘটনের বিষয়টি পুরোনো। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তির জন্য যে এগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর, এমন উপলব্ধিও তাদের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। পুলিশ বলছে, শফিকুল এখন দেশে নেই। কিন্তু হত্যা মামলাসহ ১০টা মামলার আসামি একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে কেন আগেই গ্রেপ্তার করা হয়নি? দলীয় বা স্থানীয় রাজনীতির স্বার্থে আইনের শাসনের ব্যত্যয় ঘটানো অন্যায়। শফিকুলের পক্ষে বিলবোর্ডগুলো আইনের শাসনকে বিদ্রূপ করছে।

ফেসবুক ব্যাটাই চোর by ডক্টর তুহিন মালিক

এক. এক লোক আটতলা বিল্ডিংয়ে কাজ করছে। এমন সময় দৌড়ে এসে একজন খবর দিলো- ‘আবুল, তোমার মেয়ে জরিনা মারা গেছে।’ লোকটা চিৎকার করে দুঃখ সইতে না পেরে আটতলা থেকে লাফ দিলো। পাঁচতলা পর্যন্ত পৌঁছে তার মনে পড়ল, আরে আমার তো জরিনা নামে কোনো মেয়েই নেই। তিনতলা পর্যন্ত পৌঁছে তার মনে পড়ল, আরে আমি তো বিয়েই করিনি। মাটিতে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে তার মনে পড়ল, হায় আমার নাম তো আবুলই না। আমাদের জাতির অবস্থাও সে রকমই বলে মনে হচ্ছে ইদানীং। কারণ, দেশে জনগণের জানমালের কোনোই নিরাপত্তা নেই, এই অভিযোগে সব দোষ ফেসবুকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিব্যি বন্ধ করে দিলাম জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিকে। অথচ জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলুন কিংবা অনৈতিকতা, অশ্লীলতা, উসকানিমূলক প্রপাগান্ডা বা যৌন হয়রানির কথাই বলুন, ফেসবুক কি আসলেই এগুলোর জন্য একা দায়ী? আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, নীতিনৈতিকতা, রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ কিংবা ভিনদেশীয় নগ্ন সংস্কৃতি কি এগুলোর জন্য দায়ী নয়? অথচ হাজার হাজার অশ্লীল পর্নো সাইট আর শত শত ধর্মবিদ্বেষী ব্লগ বন্ধ না করে আমরা ফেসবুক বন্ধ করলাম কেন? আর এগুলোর প্রধান বাহন ভারতীয় সিরিয়াল ও হিন্দি চ্যানেলগুলো বন্ধ না করে শুধু ফেসবুক বন্ধ করলেই কি এসবের দায় মেটানো যাবে? যেভাবে সরকার একতরফাভাবে ফেসবুকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাইছে, তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় যে, ফেসবুক কি জুকারবার্গের, না বাংলাদেশ সরকারের? সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে ফেসবুক বন্ধ করা কি জুতা আবিষ্কারতত্ত্বের পুনরাবৃত্তি নয়? আসলে বেগম খালেদা জিয়া ক’দিন আগে লন্ডনে আয়োজিত সমাবেশে আহ্বান রেখেছিলেন, সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠন ও তথ্য বিতরণে ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগাতে। ব্যস, তাতেই এক মাসের মধ্যে আমরা বন্ধ করে দিলাম সব সোশ্যাল মিডিয়াকে। এ দিকে সরকার বহুমুখী যুক্তি উপস্থাপন করে দেখাচ্ছে যে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ফেসবুক বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বিশ্বের কিছু অগণতান্ত্রিক শাসকদের ফেসবুক বন্ধের উদাহরণও টানছে তারা। অথচ সব কিছুতেই ভারতীয় উদাহরণ টানা এসব লোক চলতি বছরের ২৪ মার্চ ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের ফেসবুকে বাকস্বাধীনতা রক্ষাকল্পে ঐতিহাসিক রায়ের কথা একবারো বলেন না। ভারতে ফেসবুক বন্ধ তো দূরের কথা, ফেসবুকের ওপর সেন্সর আরোপ করে আনা আইনকে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। তা ছাড়া ফেসবুকের স্ট্যাটাস, কমেন্ট, লাইকসহ কোনো পোস্টের জন্য কাউকে গ্রেফতার বা হয়রানি করা যাবে না বলেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে।
দুই. ফেসবুকের মতো সারা বিশ্বে জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির অপব্যবহার রোধকল্পে কোনো কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছি? এত মন্ত্রণালয়, এত মন্ত্রী, আর পুরো দেশকে ডিজিটাল ঘোষণা করেও কেন আমরা সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না? তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে আমরা শুধুই শিখেছি সব কিছু বন্ধ করে দিতে। ক্ষমতা পেলেই আমরা এটা বন্ধ, সেটা বন্ধ, ওকে মারো, ওকে কাটো ফর্মুলায় চলে যাই। অথচ এগুলো যদি বন্ধই করতে হয়, তবে দেশে মন্ত্রীদের কাজ বা দায়িত্ব কী? আসলে প্রযুক্তি বন্ধ করে নয়, বরং প্রযুক্তি দিয়েই প্রযুক্তির অপরাধ রোধ করতে হবে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা বলে ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে দেবেন, অঘোষিতভাবে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেবেন; আর বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা বন্ধ করতে পারবেন না কেন? কান্তজির মন্দিরের রাসমেলায় বোমা হামলাই বা ঠেকাতে পারলেন না কেন? সরকার কি একবারও ভেবে দেখে না যে, এগুলো বন্ধ করে তারা নিজেদের ‘ডিজিটাল সরকারের’ চরিত্রকেই হরণ করছে সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তাই বলে কি সব যানবাহন বন্ধ করে দিতে হবে? রাজনীতিবিদেরা এ দেশে সমানে দুর্নীতি করে আসছে বলে কি রাজনীতিই বন্ধ করে দেবেন? প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কি পরীক্ষা নেয়াই বন্ধ করে দেবেন? মন্ত্রীরা বলছেন, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়, তাই ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু টুইন টাওয়ার ধ্বংস করা হয়েছিল উড়োজাহাজ ব্যবহার করে, তাই বলে কি আমেরিকা উড়োজাহাজ বন্ধ করে দিয়েছে? আসলে একে একে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এবং কঠিন কঠিন আইন করে আর শাস্তি দিয়েও যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ঠুনকো নিরাপত্তার অজুহাত তুলে এগুলোকে বন্ধই করে দেয়া হলো। মানুষের কাছে সত্য ঘটনাগুলো পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম হিসেবে যখন ফেসবুক টিকে রইল, তখন ফেসবুককে ধরে বলা হলো- ‘এই কেষ্ট ব্যাটাই চোর’।
তিন. গত ১৮ নভেম্বর যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দু’জন প্রভাবশালী নেতার ফাঁসি ঘোষণার পর নাশকতার সতর্কতা হিসেবে ফেসবুকসহ ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন কোনো রকম বিন্দুমাত্র নিরাপত্তার হুমকির মোকাবেলাও করতে হয়নি সরকারকে। জনগণের মনে এভাবে ভীতি সৃষ্টি করে এই যে বন্ধ করে দেয়া হলো ফেসবুক, সেটা আর খোলার কোনো খবরই নেই। মন্ত্রীরা বলে বেড়াচ্ছেন, দেশে কোনো জঙ্গির অস্তিত্ব নেই। তাহলে ফেসবুক বন্ধ করলেন কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, আমেরিকার চেয়েও নাকি বাংলাদেশ অনেক বেশি নিরাপদ। তাহলে তো আমেরিকাতে আমাদের আগেই ফেসবুক বন্ধ করা উচিত ছিল! সম্প্রতি ফ্রান্সে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটেছে। কই, ফ্রান্স তো ফেসবুক বন্ধ করেনি; বরং তারা তাদের দক্ষতা, প্রযুক্তি ও মেধা দিয়ে সুদূর ব্রাসেলসে পালিয়ে থাকা প্যারিস হামলার মূল নায়ককে চারজন সঙ্গীসহ নির্মূল করেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, প্রযুক্তি অপরাধ রোধে আমাদের বাহিনীগুলো কি এত দিনে কোনোই সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি?
চার. আইসিটি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সবুজ সঙ্কেত পেলেই ফেসবুক খুলে দেয়া হবে। এক কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী ২২ দিন ধরে ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কবে সবুজ সঙ্কেত দেখতে পাবে! আসলে এই সবুজ সঙ্কেতটি কোথা থেকে আসবে? ফেসবুক আসলে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীন? স্বরাষ্ট্র; পররাষ্ট্র; তথ্য, ডাক ও টেলিযোগাযোগ নাকি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়? অথচ সবাই তো দেখি ফেসবুক নিয়েই অস্থির। দেশের সব মন্ত্রী দলবেঁধে বৈঠক করলেন ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সাথে। ফেসবুকের দক্ষিণ এশিয়ার দু’জন স্টাফের বিপরীতে হাইপাওয়ারের বৈঠক করলেন আমাদের তিনজন মন্ত্রী, জেনারেল পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা, ডজন দুয়েক সিভিল, পুলিশ ও আর্মি অফিসার! ফেসবুকের এই দু’জন স্টাফ এ দেশের হাইপ্রফাইল ব্যক্তিবর্গের কাউন্টার পার্ট হতে পেরে নিশ্চয়ই নিজেদের সৌভাগ্যবানই মনে করছেন। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ সরকার তিনটি জিনিস চেয়েছে- ১. বাংলাদেশে ফেসবুকের অ্যাডমিন বসাতে হবে, ২. ফেসবুক পোস্ট ফিল্টার করার সুযোগ অর্থাৎ কোনটা বাংলাদেশে দেখানো যাবে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকতে হবে এবং ৩. নিরাপত্তা বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। তা ছাড়া ফেসবুকের সাথে বৈঠকে আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় উসকানির বিষয় তুলে ধরা হয়। আমাদের সংস্কৃতির অবস্থানকে স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয় তাদের সামনে। ফটোশপের মাধ্যমে বিকৃত ছবি প্রকাশ করার ঘটনায় তরুণীর আত্মহত্যার কথাও তাদের জানানো হয়। যেসব ফেসবুক পেজ থেকে অপরাধ চালানো হয় সেগুলো বন্ধ করা, আইপি ঠিকানা, পাসওয়ার্ডসহ নানা প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের অনুরোধও জানানো হয়। কিন্তু বিপরীতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের কোম্পানির নীতিমালা ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনের বাইরে তারা যেতে পারবে না। এ জন্য বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ চাইলে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমেও সরকারিভাবে আবেদন করতে পারে। আসলে জুকারবার্গ নিজেও বাকস্বাধীনতার দেশের মানুষ। খোদ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলোও জুকারবার্গের কাছ থেকে এটা আদায় করতে পারেনি। কেননা ফেসবুকের পলিসির সাথে এটা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। এটা করলে ফেসবুকের বিরুদ্ধে গোপনীয়তা ভঙ্গের অভিযোগে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণের মামলার ঝুঁকিতে তারা পড়ে যাবে।
পাঁচ. তবে ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় উসকানি, দেশের সম্মানিত ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ফটোশপের মাধ্যমে বিকৃত ছবি প্রকাশ, অনৈতিকতা, অশ্লীলতা, মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা যৌন হয়রানি নিরসনকল্পে একটা নিয়ন্ত্রণ বলয় তৈরি করতেই হবে। এভাবে লাগামহীনভাবে ব্যক্তিচরিত্র হানি ও অশ্লীল প্রপাগান্ডা রোধ করা না গেলে সামাজিক এ যোগাযোগ মাধ্যমটি তখন আর সামাজিকই থাকবে না। তা ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক নিষিদ্ধ করে তাদের পড়ার টেবিলে বসাতে হবে। ভারত সরকার তাদের দেশে সার্ভার বসিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফেসবুকের সাথে চুক্তি করেছে। গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ফেসবুক সদর দফতর পরিদর্শন করেছেন। এক মাস পর ফেসবুক প্রধান মার্ক জুকারবার্গ ভারত সফর করে গেলেন। তবে ফেসবুকের সাথে ভারত সরকারের এই চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেছেন ক্ষমতাসীন বিজেপির সাবেক নেতা কে এন গোবিন্দাচার্য্য। মামলার অভিযোগ হচ্ছে, এই চুক্তিতে ভারতীয় নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারত সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তা ছাড়া ওয়েবসাইটে আপলোড করা কনটেন্টের মেধাস্বত্ব অধিকার অবাধে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে কোনোরকম লাইসেন্স ছাড়াই দিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে বিদেশী কোম্পানি এ নিয়ে ব্যবসা করবে আর ভারত সরকার কোনো বিনিময় ছাড়াই তাদের সবচেয়ে বড় এজেন্টে পরিণত হবে বলে অভিযোগ আনা হয়। দিল্লি হাইকোর্ট মামলাটি আমলে নিয়ে দ্রুত কেন্দ্রীয় সরকারকে চুক্তির কপি আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মামলাটি এখনো বিচারে নিষ্পত্তি হয়নি।
ছয়. মিথ্যা প্রপাগান্ডা সৃষ্টি করে মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করা থেকে রাষ্ট্রীয় একটা সুরক্ষা প্রত্যেকের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে কয়েক বছর ধরে অসংখবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও আমাদের জাতীয় নেতাদের নিয়ে কটূক্তি বন্ধ করতে পারিনি। এ জন্য হাজারো বন্ধুকে আনফ্রেন্ড ও ব্লকও করতে হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে একাধিকবার তাবলিগ ও ইজতেমা নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। অথচ আমি তখন দেশেই নেই। একুশে টিভির টকশোতে নাকি আমি এ কথা বলেছি বলে প্রচারণা চালিয়ে আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অথচ ঘটনার ছয় মাস আগ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর ধরে আমি একুশে টিভির টকশোতে যাইনি। গত বছর লন্ডনে এক সেমিনারে আমার এক বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজকে বিকৃত করে আমার বিরুদ্ধে একাধিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হয়। কিন্তু এই ভিডিও ফুটেজটি ফেসবুক ও ইউটিউব ছাড়া লন্ডন বা বাংলাদেশের কোনো মিডিয়াতেই প্রকাশ করা হয়নি। অথচ যারা এটা বিকৃত করে ফেসবুক বা ইউটিউবে ছাড়ল, তাদের ধরার কোনো পদক্ষেপই নেয়া হলো না। এ নিয়ে আমি অসংখ্যবার ফেসবুক স্ট্যাটাসে এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক করেও এই মিথ্যা প্রপাগান্ডা রোধ করতে পারিনি। বাধ্য হয়েই আমাকে তখন জাতীয় দৈনিকে লাখ টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিতে হয়।
সাত. একসময় দেশে রেডিও বাংলাদেশ আর বিটিভি ছাড়া ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলতে আর কিছুই ছিল না। এখন ফেসবুকের বদৌলতে শিশু রাজিবের হত্যার প্রমাণ দেখা যায়। সদূর সৌদি আরব থেকে হত্যাকারীকে ফেসবুকের কল্যাণে শনাক্ত করে ধরে আনা সম্ভব হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণেই এখনো আমরা ভালোকে ভালো আর খারাপকে খারাপ বলার একটা প্লাটফর্ম খুঁজে পাচ্ছি। অথচ গত ২০১৩ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইনে ন্যূনতম সাত বছর ও সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখলেও এ আইন শুধু ক্ষমতাসীনের রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার যন্ত্রে রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করার অপরাধে এক তরুণকে জরিমানাসহ সাত বছরের সশ্্রম কারাদণ্ড দিয়েছে সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অথচ শুরু থেকেই এই বির্তকিত আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে গণমাধ্যম ও সুশীলসমাজের প্রবল আপত্তি রয়েছে। কারণ, এটা সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক একটা কালো আইন। এটাকে চ্যালেঞ্জ করে করা রিট মামলায় ২০১০ সালের ২৬ জুলাই হাইকোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছেন। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত হাইকোর্টের এই রুলের জবাব দেয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। তবে এ আইনে অহরহ যে কাউকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে ঠিকই।
আট. এ দিকে বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা করার অভিযোগে গত সপ্তাহে তিনজনকে গ্রেফতার করা হলো। ফেসবুক ব্যবহার করাকে ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে কোনো আইন করা হয়নি। তাই কেউ যদি ফেসবুক ব্যবহার করেই থাকে, তবে তার জেল হবে কেন? বিকল্প পথে ফেসবুকে যাওয়া যদি অপরাধ হয়, তবে বর্তমান সরকার তো বিকল্প পথে গিয়েই ক্ষমতায় টিকে আছে। আর সরকারের সমালোচনা করাই বা কেন দণ্ডনীয় অপরাধ হতে যাবে? সত্য কথা হচ্ছে, যারা মানুষকে দণ্ডের ভয় দেখাচ্ছেন, তারাই আবার প্রতিনিয়ত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েই যাচ্ছেন। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, আমলা, সাংবাদিক, সুশীলÑ কে নেই ফেসবুকে? সবাই হরেক রকমের প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে বিকল্প পথেই ফেসবুক চালাচ্ছেন। প্রতিদিনই হুড়হুড় করে বাড়ছে এদের সংখ্যা। আসলে সরকারি সার্কুলার আর পরোয়ানা দিয়ে কি প্রযুক্তিকে আটকে রাখা সম্ভব হবে ২০১৫ সালের প্রযুক্তির এই বিশ্বে? আচ্ছা, ফেসবুক না হয় অপরাধী, কিন্তু তাই বলে ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ খুলছেন না কেন?
নয়. রাজনীতি করলে সমালোচিত হবেনই। এটা সারা বিশ্বেই সর্বত্র হচ্ছে। সব সময়ই হয়েছে, এখনো হচ্ছে। জনগণ রাজনীতিবিদের খুঁটিনাটি সব কিছুই খেয়াল রাখে। সেগুলো নিয়ে কথাও বলে, সমালোচনাও করে। কেউ বা প্রশংসা করে, কেউ আবার সমালোচনা করে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে নেতারা কেউ কেউ আবার এটাকে উপভোগও করে। আমাদের দেশে সাধারণত রাজনীতিক নেতাদের ব্যক্তিজীবন নেই বললেই চলে। এলাকার হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় স্থানীয় এমপিদের সদর আঙিনা মুখরিত থাকে। তাদের অন্দরমহল পর্যন্ত লোকারণ্য থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এ নিয়ে নেতারা জনসম্মুখে তা বলতে গর্ববোধও করেন। কিন্তু এভাবে সরকারের সমালোচকদের জেলে ঢুকিয়ে দেয়ার দণ্ডাদেশ জনমানুষের মনে চরম ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তা-ও আবার এই অপরাধে চরম গুরুদণ্ড প্রদান! এখন অবস্থা এমন যে, একটা চড়ও মারলাম না, কিন্তু ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয়ার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেয়া হলো! গত বছর সেপ্টেম্বরে বিশ্বজুড়ে পত্রিকার পাতায় ছাপা হলো হোয়াইট হাউজের সামনে ওবামার ব্যঙ্গচিত্র হাতে নিয়ে বিক্ষোভের ছবিগুলো। এ রকম ব্যঙ্গাত্মক ছবি, কার্টুন প্রদর্শন বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের একটা প্রধান উপকরণও বটে। তবে ব্যক্তিগত শালীনতা ভঙ্গ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ সমালোচনা কোনোভাবেই গণতন্ত্রের সাথে মানানসই হতে পারে না। নৈতিকতার স্বার্থেও এগুলো কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের সংবিধানও ৩৯(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টতই বলে দিয়েছে যে, আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে এ রকম আইনি বাধানিষেধও স্বেচ্ছাচারীমূলক হতে পারবে না বলে সংবিধান প্রটেকশন দিয়েছে। যে আইনই আমরা করি না কেন তা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। আবার সমালোচকদেরও অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলতে হবে। এ দেশে আইনের আশ্রয় ও প্রতিকার লাভের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সবার রয়েছে। অধিকার শুধু নেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম অবমাননার বিচার চাইবার। এক দিকে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় বসে একজন শিক্ষক যখন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে কটূক্তি করলে বিদ্যুৎগতিতে তার শাস্তি হয়, অন্য দিকে মহান আল্লাহ ও মহানবী সা:-কে নিয়ে অশ্লীল ব্লগের কোনো বিচার হয় না এই দেশে। আসলে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে এভাবে রুখতে যাওয়া বড়ই বিপজ্জনক। অথচ সরকার ফেসবুক বন্ধ করেই জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে চাইছে। ম্যানহোলের ঢাকনা বন্ধ না করে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পা-কে জুতার মাপে কাটার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
drtuhinmalik@hotmail.com

১১০ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি গ্রাসের অভিযোগ যার কাঁধে by জাবেদ রহিম বিজন

১১০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি সম্পত্তি গ্রাসের অভিযোগ তার কাঁধে। নানাভাবে জাল কাগজপত্র তৈরি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার সরকারি এসব সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে সরকারি তদন্তে। এর বাইরেও অনেক ব্যক্তির সম্পত্তি, এমনকি মসজিদের জায়গা গ্রাস করার অভিযোগ আছে আশরাফ আলী ভূঁইয়া নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, সে একটা জালিয়াত। কিন্তু সরকারি তদন্ত ফাইল চাপা পড়েছে। কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তার বিরুদ্ধে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কয়েকবারই তিনি নোটিশ করে তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু সে আসেনি। নিজের অসুস্থতার কথা বলে স্ত্রীকে দিয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছে প্রতিবারই। যদিও জাল-জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে আশরাফ। তার দাবি, এসবে জড়িত নয় সে।
উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, জাল-ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আশরাফ আলী ভূঁইয়া ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করছে বলে ২০১৪ সালের অক্টোবরে শহরের শেরপুরের বজলুর রহমান মেম্বার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি অভিযোগ দেন। সদর সহকারী কমিশনার ভূমির নির্দেশে এ অভিযোগের তদন্ত করেন পৌর ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। গত ২২শে এপ্রিল তিনি তার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। যাতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও রেকর্ড পর্যালোচনায় আশরাফ আলী ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। কখনও কথিত নিলাম খরিদ, কখনও তথাকথিত বন্দোবস্ত কেইস, কখনও বা জাল দলিল তৈরি করে আশরাফ আলী ভূঁইয়া সরকারি-বেসরকারি বহু মূল্যবান সম্পত্তি গ্রাস করার চেষ্টায় লিপ্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি সম্পত্তির বেলায় তার জালিয়াতির হাত অধিকতর প্রশস্ত। ভুয়া, জাল ও বানোয়াট কাগজপত্রের ভিত্তিতে হাল জরিপে বিরাট অঙ্কের সম্পত্তি নিজ নামে রেকর্ড করে ফেলে সে। কোনো কোনো ভূমি বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রিও করে দেয়। প্রতিবেদনের সঙ্গে জালিয়াতির মাধ্যমে আশরাফ আলী ভূঁইয়ার নিজ নামে রেকর্ড করে নেয়া সরকারি ভূমির একটি বিবরণও দেয়া হয়। ওই বিবরণে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মৌজার ৩২৪৫ ও ৩২৫৫ দাগের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত আনন্দবাজার বাঁশমহালের ১৯ শতক সরকারি ভূমি তথাকথিত বন্দোবস্ত কেইসমূলে আশরাফ আলী ভূঁইয়া তার বলে দাবি করে। এ ভূমির মূল্য ৪০ কোটি টাকা। একই মৌজার ৩৭১২ দাগের টান বাজারস্থ সরকারি দখলাধীন ৭.১৮ শতক জায়গা (বর্তমানে ভিপি কেইস নং-৩৬/৬৯-৭০ মূলে লিজকৃত) নিলাম খরিদ সূত্রে মালিকানা দাবি করে আশরাফ। যার মূল্য ১৫ কোটি টাকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মৌজার ৩৫৭৯ ও ৩৫৮০ দাগের হকার্স মার্কেটে অবস্থিত ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত ৫ কোটি টাকা মূল্যের ১.৬৯ শতাংশ ভূমি বন্দোবস্ত কেইস মূলে নিজের বলে দাবি করে সে। একই মৌজার ২৩৫৪, ২৩৬১, ১০৪৩, ১০৪৪ দাগের টিএরোডের ২৫.০৯ শতাংশ অর্পিত সম্পত্তি জাল দলিলের মাধ্যমে তার নিজের বলে দাবি করে। এ জায়গাটির মূল্য ২০ কোটি টাকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মৌজার ৩১৫৬, ৩১৫৭, ৩১৫৮, ৩০৪৯, ৩০৫০ দাগে সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত আনন্দবাজার চালমহাল, নাথমহাল ও জোড়ামহাল এবং আনন্দবাজারের পেরীফেরী নকশার ৪৫-৫৪ এবং ১১০-১২৮নং পর্যন্ত ২৯টি সরকারি চান্দিনা ভিটির ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ৬.৮২ শতাংশ ভূমি তথাকথিত বন্দোবস্ত কেইস মূলে আশরাফ নিজের বলে দাবি করে। ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি দখলাধীন আনন্দবাজার বুটপট্টি ও নৌকাঘাটের জায়গা, যার সঙ্গে আনন্দ বাজার পেরীফেরী নকশার কয়েকটি দোকান এবং আনন্দবাজার মসজিদের নামে দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তকৃত ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ৭ শতাংশ ভূমি তথাকথিত নিলাম খরিদ সূত্রে আশরাফ তার বলে দাবি করে। এ ভূমি ৩১৩৮ দাগে অবস্থিত। আনন্দবাজার মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, তাদের মসজিদের নামে বন্দোবস্ত দেয়া জায়গাটি আশরাফ তার পৈতৃক বলে দাবি করে মামলা করে। এ মামলায় সে ডিসিকেও আসামি করে। মসজিদের এ জায়গা নিয়ে আমাদের অনেক হয়রানি করেছে সে।
পৌর ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আশরাফ আলী ভূঁইয়া একটা জালিয়াত। আমি তদন্তে এমনই প্রমাণ পেয়েছি।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আশরাফুল আলম বলেন, আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আশরাফকে একাধিকবার নোটিশ করেছি। কিন্তু সে উপস্থিত হয়নি। সে তার স্ত্রীর মাধ্যমে লিখিত বক্তব্য জমা দিয়েছে। আমরা এখন বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেবো। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে আশরাফ আলী ভূঁইয়া। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেয়া তার লিখিত বক্তব্যে বলে, কোনো সময়ই সে দলিলপত্র জাল করেনি। কারও জায়গাও আত্মসাৎ করেনি। তার শত্রুপক্ষীয় লোকজন লোভের বশবর্তী হয়ে এ মিথ্যা অভিযোগ এনেছে। আশরাফ আলী ভূঁইয়ার বাড়ি শহরের শিমরাইকান্দি এলাকায়। তার পিতার নাম আবদুল জব্বার ভূঁইয়া।

দেড় মাসে ১০ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা

হোসেনী দালানে বোমা হামলা - ফাইল ছবি
দেড় মাসে ১০ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় হামলাকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটলেও এর কোনো কিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনায় হামলা হওয়ায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে পরিকল্পনাকারীরা। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর হামলা সন্ত্রাসের নতুন রূপ। এর আগে বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরাও এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েননি। তাই তাদের উচিত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করা। তা না করতে পারলে এ ধরনের ঘটনা  রোধ করা যাবে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় জঙ্গি সংগঠনের পক্ষ থেকে দায় স্বীকার করা হলেও সরকারের তরফে বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক কোনো জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা ছাড়াও সম্প্রতি হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক। আক্রান্ত হয়েছে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দিনাজপুরে একটি মন্দিরে ও ঢাকায় এক খ্রিষ্টান পরিবারে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। রাত সাড়ে ৮টায় ডাবোর ইউনিয়নের জয়নন্দ গ্রামে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) মন্দিরে বোমা হামলা ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ সময় মন্দিরে কীর্তন, ধর্মসভা চলছিল। এ ঘটনায় সন্দেহমূলক দুইজনকে আটক করা হয়েছে। কাহারোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর রহমান জানান, ঘটনার ক্লু উদঘাটনের জন্য তদন্ত চলছে। এর কয়েক দিন আগে গত ৫ই ডিসেম্বর একই উপজেলায় কান্তজিউর মন্দির প্রাঙ্গণে রাসমেলার একটি যাত্রা প্যান্ডেলে ককটেল হামলার ঘটনা ঘটে। রাত ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পরপর তিনটি বিস্ফোরণ হয়। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। ওই ঘটনারও ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। যদিও সন্দেহমূলকভাবে পাঁচ জনকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
গত ৫ই অক্টোবর ঈশ্বরদীর ব্যাপটিস্ট মিশনের ‘ফেইথ বাইবেল চার্চ অব গড’ এর পাদরি লুক সরকারকে শহরের নিজের ভাড়া বাসায় গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার পর অজ্ঞাত কয়েক জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। হামলার পর লুক সরকার জানান, ধর্মীয় কারণেই তার ওপর হামলা হয়েছে। ওই এলাকায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর এর আগে হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। ঘটনার সময় সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রার্থনা করছিলেন তিনি। এ সময় তিন ব্যক্তি ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার গলা কাটার চেষ্টা করে। তার আগে পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশের একটি কক্ষে আটকে রাখে তারা। এ ঘটনায় ছয় জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিমান কুমার দাস জানান, এ পর্যন্ত সাত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই জেএমবি সদস্য ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তারা প্রত্যক্ষভাবে এ ঘটনায় জড়িত বলে জানান তিনি।
গত ১৮ই নভেম্বর ফাদার পিয়েরো পারোলারি (৫০) নামে এক ইতালীয় নাগরিককে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। দিনাজপুর শহরের মির্জাপুর বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে সকাল পৌনে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পিয়েরো পারোলারি পেশায় একজন চিকিৎসক। তিনি শহরের সুইহারী কাথলিক মিশন চার্চের ফাদার। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে দিনাজপুর মিশনে কর্মরত রয়েছেন। এ ঘটনায় জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম ভুট্টুসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি’র উপ-পরিদর্শক বজলুর রশীদ জানান, তদন্ত চলছে। এখনও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মাহবুব আলমকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও বাকি দুইজনকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে জানান তিনি।
গত ২৬শে নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জের হরিপুরে শিয়া মুসলিমদের আল মোস্তফা মসজিদে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে একজন নিহত এবং তিনজন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মুসল্লিরা তখন নামাজ আদায় করছিলেন। তারা যখন সিজদায় তখন তিন যুবক গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার কোন ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনার পর আইএসের পক্ষ থেকে এ হামলার দায় স্বীকার করা হয়। ঘটনার পর পুলিশ সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করলেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য উদঘাটনের খবর দিতে পারেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল বলেন, তদন্ত চলছে। শিগগিরই ঘটনার ক্লু উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে।
গত ২৫শে নভেম্বর সন্ধ্যায় রংপুরের ব্যাপটিস্ট চার্চ সংঘের ফাদার রেভারেন্ড বার্নাবাস হেমব্রেম জানান, তিনিসহ দশজন খ্রিষ্টান ধর্মীয় পাদরি  এবং এনজিও কর্মীকে চিঠির মাধ্যমে হত্যার হুমকি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে বলা হয়েছে, যা খাওয়ার খেয়ে নেন, তারপর আপনাকে পৃথিবী  থেকে যেতে হবে। যারা খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার করে তাদের এক এক করে হত্যা করা হবে। এ বিষয়ে রংপুরের পুলিশ সুপার আবদুর রাজ্জাক বলেন, হুমকি দাতাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সেই সঙ্গে হুমকির শিকার পাদরিদের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।
গত ২৩শে অক্টোবর বোমা হামলায় রক্তাক্ত হয় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল। হামলায় মারা যান দুই জন। আহত হন শতাধিক মানুষ। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার সন্দেহভাজন আসামি আলবানী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে  দারুসসালাম এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়। মহররমের রাতে পুরান ঢাকায় শিয়া ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ‘ইমামবাড়া’ হোসেনি দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে গভীর রাতে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। শিয়া সম্প্রদায়ের চারশো বছরের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিলে আগে এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে রংপুরে কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের চৈতারমোড়ে গত ১০ই নভেম্বর মধ্যরাতে মাজার শরিফের খাদেম রহমত আলীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মাসুদ রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানান কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাসুদসহ দুইজনকে আটক করা হয়েছে। অপর আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও ঢাকায় বাড্ডা এলাকায় পীর খিজির খান, রাজাবাজারে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নুরুল ইসলাম ফারুকী, গোপীবাগে কথিত পীর লুৎফুর রহমানসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে।
গত বৃহস্পতিবার ভোরে ঢাকার তেজগাঁও থানার মহাখালীর আরজতপাড়ার ২৬ নম্বর বাড়িতে এক খ্রিষ্টান পরিবারের সদস্যদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা বাসার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে গুলি বর্ষণ করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ওই পরিবারের তিনজনকে আহত করেছে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, খ্রিষ্টান হওয়ার কারণেই তাদের উপর এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও পুলিশ মনে করছে এটি ডাকাতির ঘটনা। এ বিষয়ে পুলিশের তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ঘটনাস্থল আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ। এটি ডাকাতির ঘটনা বলেই মনে করেন তিনি।
একের পর এক এ ধরনের হামলার ঘটনায় উদ্বিগ্ন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরাও।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইন্সটিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, এসব হামলা যারা করে তারা ইসলাম ধর্মের শিয়া সুন্নির যে ন্যাচারাল ভাগ রয়েছে তা তারা মূল্যায়িত করে না। ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির দেশ। মৌলবাদীরা এই সম্প্রতি নষ্ট করতে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। এসব চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে বাংলাদেশে দুর্বৃত্তরা বড় ধরনের সহিংসতা করতে পারবে না বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক মহা পরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা। তিনি বলেন, এসব ঘটনা রোধে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সজাগ ও সতর্ক হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, জঙ্গিবাদ একটি আন্তর্জাতিক সংকট। তবে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড নেই। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা অনেক সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। আমাদের পুলিশ এর আগে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করেনি। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের আরও আধুনিক করে গড়ে তোলা উচিত।

‘র‌্যাব পরিচয়ে’ রুয়েট ছাত্রলীগ নেতাকে অপহরণ

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতাকে ‘র‌্যাব পরিচয়ে’ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।  বুধবার রাত ৩টার দিকে নগরীর তেরখাদিয়া এলাকার বাড়ি থেকে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় ৬ সদস্যের একটি টিম। তারা একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে বাড়ির সামনে থামেন। এদের মধ্যে ৫ জন র‌্যাবের হাফ জ্যাকেট এবং একজন ডিবি জ্যাকেট পরিধান করে ছিলেন। তবে র‌্যাব ওই এলাকায় সেদিন কোন অভিযান পরিচালনা করেনি বলে দাবি করেছে। আর থানা ও ডিবি পুলিশ বলছে, তারাও এ বিষয়ে কিছু জানে না।
‘নিখোঁজ’ সাইফুজ্জামান সোহাগ রুয়েট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। তার বাড়ি রাজশাহী নগরীর রাজপাড়ার তেরোখাদিয়া পশ্চিমপাড়ায়।
এদিকে অপহরণের দুইদিন পরও সোহাগের কোন সন্ধান না পাওয়ায় গতকাল সকালে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সম্মেলন কক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
সাইফুজ্জামান সোহাগের পিতা আক্কাস উজ জামান বলেন,  বুধবার রাত ৩টার দিকে ১৫ জনের মতো একটি দল একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে এসে র‌্যাব বলে পরিচয় দিয়ে বাড়ির গেট খুলতে বলে। আমরা প্রথম দিকে গেট খুলতে চায়নি। অনেক জোরাজুরির পর গেটখোলার সঙ্গে সঙ্গে তারা তিন তলায় আমার ছেলে সোহাগের ঘরে যায় এবং ওর ল্যাপটপ খুলে কী কী আছে  দেখতে থাকে।
তিনি আরও বলেন, ওই সময় তাকে এবং তার স্ত্রীকে কয়েকজন মিলে ঘিরে রাখে। তারা কথাও বলতে দেয়নি, ছেলের ঘরেও যেতে দেয়নি। কিছুক্ষণ পর ল্যাপটপ ও ক্যামেরাসহ সোহাগকে তারা ধরে নিয়ে যায়।
এ সময় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানতে চাইলে আমাদের বলেছে, ‘সকালে থানায় খোঁজ করবেন।’
সোহাগ বিবাহিত ছিলেন। তার স্ত্রী ঢাকায় মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। খবর পেয়ে ওইদিন বাসায় এসে সে দেখেছে, তার গয়নাও পাওয়া যাচ্ছে না।
সোহাগের পিতা বলেন, ‘আমরা বৃহস্পতিবার সকালে রাজপাড়া থানায় খোঁজ নিতে গেলে বলা হয়েছে, আমার ছেলে সেখানে নেই। পুলিশ নাকি কিছুই জানে না। র‌্যাবের কাছেও গিয়েছি। তারা বলেছে, রাতে নাকি আমাদের এলাকায় কোন অভিযানই চালায়নি।’
অপরদিকে সোহাগের শ্বশুর রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক শেখ রেজাউর রহমান দুলাল মানবজমিনকে জানান, ‘র‌্যাব-ডিবি পুলিশ কেউ এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছে না। তার ও সোহাগের পিতার কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই। তাই কারা অপহরণ করে নিয়ে গেল এ ব্যাপারে নিজে থেকে কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না। অপহরণের সময় ওরা র‌্যাব পরিচয়ে বাড়িতে এসেছিল। এদের মধ্যে ৫ জন র‌্যাবের হাফ জ্যাকেট এবং একজন ডিবি জ্যাকেট পরিধান করে ছিলেন। যারা সবাই মধ্যবয়সী ছিলেন।’
গতকাল বিকালে অভিযোগ করা হলে র‌্যাব-৫ এর একটি টিম বাড়িতে এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। র‌্যাব-৫ উপ অধিনায়ক মেজর সালাম জানান, তাদের কোন দল সোহাগকে গ্রেপ্তারে অভিযানে যায়নি। ওর বাবা আমাদের অভিযোগ দিয়ে গেছেন। আমরা সোহাগের ফোন নাম্বার রেখেছি, ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করা হয়েছে। এ ছাড়া ট্র্যাক করে দেখার চেষ্টা করছি আসলে কি হয়েছে।
সাইফুজ্জামান সোহাগের মা শিরিন জামান জানান, ‘র‌্যাব পরিচয়ে যারা এসেছিল, তারা সোহাগের সঙ্গে তার সহপাঠী এক ছাত্রীর (নাবিলার) বিষয়ে কথা বলেছে।’
রুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান হিমেলও সোহাগের বিষয়ে বিশেষ কিছু জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনা শুনেছি। দলের নেতাকর্মীদের কাছে খোঁজ নিয়েছে। দলের কারও সঙ্গে সোহাগের মনোমালিন্য হয়েছে বলে শুনিনি।’
এ ঘটনায় সোহাগের পিতা একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন জানিয়ে রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ‘আমরা এখনও তার খোঁজ পাইনি। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
গতকাল সংবাদ সম্মেলনে সোহাগের পিতা বলেন, ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ছেলে যদি অপরাধ করেও থাকে, তাহলে তাকে আদালতে সোপর্দ করে আইনের আওতায় আনা হোক।’
তবে ঘটনার দুই দিন পর সংবাদ সম্মেলন করে ছেলে অপহরণের অভিযোগ করায় নানা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। পারিবারিক কোন্দল কিংবা বিপিএল এর বাজি খেলাকে কেন্দ্র করেও অপহরণের  ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

‘বাক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ায় মানুষ ভেবে চিন্তে কথা বলছে’

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ করছেন, ভিন্নমতের বিরুদ্ধে চরম অসহিষ্ণু অবস্থান নিয়ে সরকার কথা বলার স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। তারা আরও বলছেন, সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশে এমন এক ভয়ের সংস্কৃতি চালু হয়েছে, যেখানে অনেকেই মুক্তভাবে তাদের মনের কথা বলতে পারছেন না। ঢাকার শাহবাগ এলাকায় আজিজ মার্কেটে সৃজনশীল প্রকাশকদের বইয়ের দোকানগুলোকে ঘিরে তরুণ লেখকদের আড্ডা থাকে সারাদিনই। এমনই একটি আড্ডায় তরুণ লেখক এবং প্রকাশক রুবিন আহসানের সাথে কথা হয়। সরকার গত তিন সপ্তাহ ফেসবুক যে বন্ধ করে রেখেছিল, তাতে তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। আহসান বলছিলেন, ``ফেসবুক এখন আমাদের মতা প্রকাশের একটা বড় প্লাটফরম হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরন মঞ্চসহ অনেক সামাজিক আন্দোলন এই ফেসবুকের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। সেটা তিন সপ্তাহ বন্ধ রেখে সরকার আমাদের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেছিল।” যদিও ফেসবুক বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু এখন গণমাধ্যমের কাজে বাধা বেশি আসছে এবং তা দৃশ্যমান নয়। এটি আরও বেশি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন দ্য নিউজ টুডে পত্রিকার সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, “এখন দুর্বল গণতন্ত্রের কারণে অদৃশ্য যে বাধা আসছে, তাতে ভয় থেকে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায় সেলফ সেন্সরশীপ তৈরি হয়েছে।” এখনকার পরিবেশ নিয়ে অনেকটা একই ধরণের মূল্যায়ণ দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সুলতানা কামালের। তিনি বলছিলেন, “বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় মানুষ এখন ভেবে চিন্তে কথা বলছে। পরিস্থিতির কারণে মানুষ নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে।” একই সাথে সুলতানা কামাল বলেন, কিছু লিখলে বা কোনো কথা বললে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ উঠবে কিনা, এটিও এখন বড় শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি ব্লগার, লেখক, প্রকাশকদের হত্যার ঘটনাগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল ৭/৮ বছর ধরে বেসরকারি টেলিভিশনগুলোতে টকশোতে নিয়মিত অংশ নিয়ে আসছেন। কিন্তু তিনি বলছিলেন, এক বছর ধরে তাকে ডাকা হয়না। এর কারণ তিনি জানতে পারেননি। তিনি বলছিলেন, সব সরকারের সময়ই বাক স্বাধীনতা সংকুচিত করার চেষ্টা হয়েছে। এখন সেই চেষ্টাটা ভিন্ন ধরণের বলে তিনি মনে করেন। “আগের সরকারগুলো সমালোচক পত্রিকার সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিতো। এই সরকারের সময় দেখা গেলো, দেশের প্রধান দু’টি পত্রিকায় একসঙ্গে বড় টেলিফোন কোম্পানিগুলো, ব্যাংক এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছে কয়েকমাস আগে। এটা সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।” তিনি উল্লেখ করেন, তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় সামাজিক নেটওয়ার্কে বা এর বাইরে কারও মন্তব্য নিয়ে যেকোনো অজুহাতে তাকে আটক করে রাখা যায় এবং অহরহ এ ধরণের ঘটছে। আসিফ নজরুলের ধারণা, ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর সরকার নজিরবিহীনভাবে বাক স্বাধীনতার ওপর আঘাত করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামও মনে করেন,এই মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি সবক্ষেত্রেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, “এখন মানুষ খোলামেলাভাবে সরকারের সমালোচনা করতে সাহস পায় না। বিরোধীদলগুলোর ওপর অনেক ধরণের নির্যাতন নেমে আসছে। গণমাধ্যমের ওপর পরোক্ষ চাপ রয়েছে। সমালোচনা ধ্বংসাত্নক রাজনীতিকে উস্কে দিতে পারে, এমন চিন্তা থেকে হয়তো সরকার একটা অবস্থান নিতে পারে।কিন্তু সেটা ভুল।” বিশ্লেষকরা এটাও বলেছেন, খোলা মনে কথা বলার বা মুক্ত চিন্তার পরিবেশ তৈরি করা না হলে, সেটা সরকার, রাষ্ট্র এবং গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।-বিবিসি

ঢাকায় আসছে মার্কিন প্রতিনিধি দল

ঢাকায় আসছে তিন সদস্যের একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল। দু’দিনের সফরে এ প্রতিনিধি দল রোববার (১৩ ডিসেম্বর) অবতরণ করবে।
প্রতিনিধি দলে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র অধিদফতরের কাউন্সিলর ও রাষ্ট্রদূত থমাস শ্যানন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনপ্রীত সিং আনন্দ।
এ সফরে মার্কিন প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সরকারের কর্তাব্যক্তি ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সেই সঙ্গে সুশিল সমাজের সঙ্গেও কথা বলবেন তারা।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের এ সফর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও সন্ত্রাস দমন ইস্যুগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
দু’দিনের সফর শেষে এ প্রতিনিধি দল সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) শ্রীলঙ্কার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবে।