Monday, July 20, 2026
ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় রাজপথ, দুর্গন্ধে আটকে যায় নিঃশ্বাস by মাহমুদা ডলি
এর মধ্যে দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, ড্রেন ও খানাখন্দে জমে থাকা পানি ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে মিশে পুরো নগরকে আরো নোংরা ও দুর্গন্ধময় করে তুলেছে। কোথাও হাঁটার জায়গা নেই, কোথাও আবার তীব্র দুর্গন্ধে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
একদিকে টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ এবং জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ চরমে। শুধু পথচারী নন, রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীরাও সমান ভোগান্তিতে পড়ছেন। খোলা ম্যানহোল জলাবদ্ধ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় প্রায়ই রিকশার চাকা আটকে যাচ্ছে। আবার বাস, ট্রাক, পিকআপ বা সিএনজি দ্রুতগতিতে চলাচলের সময় নোংরা পানি ছিটকে পথচারী ও যাত্রীদের গায়ে পড়ছে। এমন চিত্র রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটিতেই।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বছরের পর বছর ধরে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে মগবাজার ওয়্যারলেস গেট, মালিবাগ চৌরাস্তা, শান্তিনগরের বিভিন্ন অংশ, মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইন এলাকা এবং কারওয়ান বাজার ও তার আশপাশ।
রেললাইন এখন বর্জ্যের ভাগাড়
সরেজমিনে দেখা যায়, কমলাপুর স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তা, টিটিপাড়া থেকে আর কে মিশন রোড পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে জমে আছে বর্জ্যের স্তূপ। দীর্ঘদিন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এদিকে মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পাশে পশু জবাইয়ের বর্জ্য, পশুর মাথা, কান ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব থেকেও ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভাসমান মানুষের বসতি এবং হকারদের দখলের কারণে নাজেহাল অবস্থা। মালিবাগ রেলগেট থেকে শুরু করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ মানিকনগর বিশ্বরোডের পুরোটা ময়লা-আর্বজনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও আশপাশের বাজারের বর্জ্য বছরের পর বছর রেললাইনের পাশে ফেলতে ফেলতে ছোট-বড় অসংখ্য ময়লার ভাগাড় তৈরি হয়েছে। ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, অন্যদিকে হকারদের দখল—পথচারীদের চলাচলের সুযোগই প্রায় নেই। খোলা জায়গায় জমে থাকা এসব বর্জ্য থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মালিবাগ-শান্তিনগরেও একই চিত্র
মালিবাগ-শান্তিনগর মোড়ে রিকশার জন্য অপেক্ষমাণ এক কর্মজীবী নারী মুখে ওড়না চেপে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, চারপাশের ময়লা নোংরা দুর্গন্ধ আমি পাই আপনি পান না?
মালিবাগ চৌরাস্তার ফুটপাত, আইল্যান্ড ও ওভারব্রিজের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বর্জ্য। মালিবাগ পাবলিক টয়লেটের সামনের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চামেলিবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও মৌচাকমুখী সড়কের দুই পাশজুড়েও একই অবস্থা। ফ্লাইওভারের নিচে টোকাই ও ভাঙারি ব্যবসায়ীদের দখলে তৈরি হয়েছে ময়লার স্তূপ।
রাজধানীর ভেতরে ও তার আশপাশের এলাকাতেও একই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে বাতাসে ধুলাবালুর সঙ্গে উড়তে থাকে পলিথিনসহ ময়লা-আবর্জনা। যত্রতত্র বর্জ্যের স্তূপে চাপা পড়ে যাচ্ছে রাস্তার অর্ধেক অংশ। ফুটপাতের অধিকাংশই প্রস্রাবের কারণে হাঁটার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপরও।
দক্ষিণ ঢাকায়ও ভয়াবহ অবস্থা
দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ডেমরা সড়কের কাজলারপাড় থেকে কোনাপাড়া পর্যন্ত ওয়াসার ড্রেন বর্জ্যে ভরে গেছে। টানা বৃষ্টিতে তা এখন খালের রূপ নিয়েছে। সায়েদাবাদ, ধলপুর, টিকাটুলি, গুলিস্তান, নাজিরাবাজার, শাখারীবাজার, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, জুরাইন ও দোলাইরপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। বহু এলাকায় বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা ও বর্জ্যের কারণে দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উত্তর ঢাকায়ও সংকট
উত্তর সিটির মেরাদিয়া থেকে রামপুরা পর্যন্ত কয়েকটি এসটিএস থাকলেও অনেক জায়গায় খোলা জায়গায় ভেজা ও শুকনা বর্জ্য আলাদা করার সময় ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা পরিমল বাবু প্রতিদিন মালিবাগ হয়ে কারওয়ান বাজারে অফিসে যান। তিনি বলেন, মালিবাগ রেলগেট এলাকায় রাস্তার ওপর পর্যন্ত ময়লা ছড়িয়ে আছে। তার ওপর উন্নয়ন কাজের জন্য বড় বড় গর্তে বৃষ্টির পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে মিরপুর, শেওড়াপাড়া, উত্তরা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও বনানী এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বাসাবাড়ি ও রেস্টুরেন্টের সামনেই বর্জ্য ফেলে রাখা হচ্ছে।
গত ১০ জুলাই মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ায় জলাবদ্ধতা পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম ড্রেনেজ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং দোকানদারদের যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানান। পরে মিরপুর-১২-এর ৬ নম্বর কাঁচাবাজার পরিদর্শন করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি এবং দোকানদার, বাজার কমিটি ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয়, তবুও নেই সমাধান
জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, রাজধানীর ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ছয় হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর ৫৫ শতাংশই যথাযথভাবে সংগ্রহ করা যায় না।
জানা গেছে, গত সাত বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করেছে প্রায় তিন হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। তবু শহরজুড়ে রয়ে গেছে ২৫০টিরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত ভাগাড়। ফলে বিপুল বর্জ্য খাল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানে জমে থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চারটি ধাপ রয়েছে— বাড়ি থেকে প্রাথমিক সংগ্রহ, এসটিএসে জমা, ট্রাকে করে ল্যান্ডফিলে পরিবহন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। কিন্তু এর প্রতিটি ধাপেই দুর্বলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ ধাপ অর্থাৎ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যত নেই। ফলে অধিকাংশ বর্জ্য শেষ পর্যন্ত খোলা জায়গায় ফেলা হয়।
কারওয়ান বাজারে কার্যত নেই নিয়ন্ত্রণ
রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বাজারের ভেতরের ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দখল, অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্যের কারণে কোথাও কোথাও ছয় ফুটে নেমে এসেছে। কিচেন মার্কেটের সামনে মুরগি জবাই ও সবজির বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলায় পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে যায়।
ফুটপাত দখল, উন্মুক্ত ড্রেন, বর্জ্যের স্তূপ, জলাবদ্ধতা ও যানজট—সব মিলিয়ে কারওয়ান বাজারে নগরবাসীর দুর্ভোগ নিত্যদিনের ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পণ্য খালাসের পর ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রেখে যান। নিয়ম অনুযায়ী কনটেইনারে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে পুরো বাজারই আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়।
বর্জ্য থেকে পলিথিন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহকারী সালাম মিয়া বলেন, পুরো বাজারের ময়লা এখানে ফেলা হয়। সিটি করপোরেশনের গাড়ি মাঝে মাঝে কিছু নিয়ে গেলেও অধিকাংশই পড়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞের মত
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এমনিতেই দুর্বল। এর সঙ্গে যদি সময়মতো এলাকা থেকে বর্জ্য অপসারণ না করা হয়, তাহলে রাস্তাজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হবে। সেখান থেকে মশা-মাছিসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়বে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনকে আরো কঠোর হতে হবে।
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার আমার দেশকে বলেন, রেললাইন ও রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা রেলওয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। সেসব এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য তাদের নিজস্ব জনবল রয়েছে। তবে নগরীর অন্যান্য এলাকায় টেকসই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নতুন জনবল নিয়োগ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন।
তিনি আরো বলেন, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কোথাও অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো, কোনো বর্জ্য যেন ২৪ ঘণ্টার বেশি খোলা জায়গায় পড়ে না থাকে।
![]() |
| রাজধানীতে ময়লা অপসারণের অব্যবস্থাপনায় ভুক্তভোগী নগরবাসী। শুক্রবার ফকিরাপুলের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম রোড থেকে তোলা। ছবি: জসীম উদ্দীন |
Tuesday, February 24, 2026
জামায়াতের ‘ঢাকা দখল’ ও বড় উত্থান এবং কিছু ইঙ্গিতের ভোট by মনোজ দে
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এবার ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগ–বিহীন নির্বাচনে এই ভোটের হার নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল প্রায় ৮৭ শতাংশ ভোটার। আর ২০০১ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটার।
গণ–অভ্যুত্থানে প্রশ্নহীন ম্যান্ডেটের মধ্য দিয়ে এলেও গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটা বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্বল শাসন হিসেবেই বিবেচিত হবে। মব সহিংসতার কাছে সরকারের অসহায় আত্মসমর্পণ এবং কোনো কোনো গোষ্ঠীর অতি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠায় মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সরকার ঠিকমতো একটা নির্বাচন করতে পারবে তো? কিন্তু শেষবেলায় সরকার একটা ভালো নির্বাচন দিতে পেরেছে।
১৭ বছর ভোট দিতে না পারা নাগরিকদের ভোট দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, প্রচারণার ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো এবং স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংযত আচরণ; নির্বাচন কমিশনের নেওয়া কড়া নিরাপত্তা ও নজরদারির ফলেই একটা সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। মানুষ যে ভয়হীন পরিবেশে ভোট দিতে কেন্দ্রের দিকে গেছেন, সেই পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ও তৎপরতাকে আলাদাভাবে উল্লেখ করতেই হবে। এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা হয়েছিল।
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর জনতার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা জয়-পরাজয় নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সরকারের একটি দৃশ্যমান দূরত্ব দেখা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের অনেকে এই দূরত্ব তৈরিকে এজেন্ডা হিসেবেই বেছে নেয়। গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী একটি সরকার যেখানে পুলিশি ব্যবস্থা নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিল, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার, অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শক্তিগুলো এবং সশস্ত্র বাহিনী—এই তিন পক্ষের ঐক্যটা ছিল ভীষণ রকম জরুরি।
কিন্তু সেটা না হওয়ায় একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা শাসনের বদলে মবতন্ত্রের মতো ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে নাগরিকদের। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এই সত্যকেই সামনে এনেছে, রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সক্ষমতা আছে।
দুই.
৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থী মারা যাওয়ায় নির্বাচন হয়নি। বাকি দুটি আসনে আইনগত জটিলতায় ফলাফল আটকে আছে। ২৯৭টি আসনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে যাওয়া দলটির মিত্ররা আরও তিনটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এটি দলটির সবচেয়ে বড় বিজয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে দলটি ২০৭টি আসনে জিতেছিল। নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি ১৪০টি আসন পেয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে এককভাবে ১৯৩টি এবং জোটগতভাবে ২১৬টি আসন পেয়েছিল। এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
তবে এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বড় উত্থান হয়েছে। এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৬টি আসনে বিজয়ী হয়েছে দলটি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত হাইপ তুলতে সক্ষম হয় যে এবারের নির্বাচনে একানব্বইয়ের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ফলাফল ঘোষণার পরও সেই টান টান উত্তেজনা তারা জিইয়ে রাখতে পারে।
একানব্বইয়ের নির্বাচনে সব জরিপ ও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল সেবার আওয়ামী লীগ জিততে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিএনপিই জিতেছিল। এর আগে বিএনপির সঙ্গে জোটগত নির্বাচন করে জামায়াত ২০০১ সালে ১৫টি ও ২০০৮ সালে ২টি আসন পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করেছিল জামায়াত, সেবারে দলটি আসন পেয়েছিল ৩টি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন পেয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে এই আলাপ আছে যে সেই নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে তাদের একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল।
তিন.
বাংলাদেশে যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির একটা উত্থান ঘটেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই তার পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যাচ্ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মাজার ভাঙা, বাউলদের ওপর আক্রমণ থেকে শুরু করে নারী, সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাগামছাড়া ঘৃণাচর্চা হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের পর গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন না হওয়ায় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রকৃত চিত্র জানা যাচ্ছিল না। যদিও নির্বাচন দিয়েই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝাটা কঠিন। কেননা, এর একটি অংশ প্রকাশ্যেই গণতন্ত্র ও নির্বাচনবিরোধী। বাস্তবে এই অতি দক্ষিণপন্থী অংশ সমাজে কতটা, সেই চিত্র অধরাই থেকে যাচ্ছে।
নির্বাচনের আগে থেকেই আসিফ মোহাম্মদ শাহানের মতো পর্যবেক্ষকেরা ধারণা দিয়েছিলেন, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে ভালো করবে জামায়াত। ফলাফলেও দেখা গেল খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে জামায়াত পরিষ্কারভাবে ভালো ফল করেছে। সবচেয়ে ভালো করেছে খুলনায়। ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টি জিতেছে তারা। রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসন জিতেছে। জামায়াতের জয় পাওয়া আসনগুলোর বেশির ভাগই ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই অঞ্চলগুলোতে সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আসা জনগোষ্ঠীর ভোট এ ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে রংপুর বিভাগের ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে ঐতিহ্যগত জাতীয় পার্টির ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। এর একটা বড় কারণ হলো, জাতীয় পার্টি যে ডানপন্থার মিশেলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করে, তার সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতি অনেকটা মিলে যায়। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম জাতীয় পার্টি একটি আসনও পায়নি। রংপুরের আসনগুলোতেও তারা বড় ব্যবধানে হেরেছে এবং অনেক আসনে তৃতীয় হয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু এবং গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের বি–টিম হওয়ার রাজনীতি জাতীয় পার্টিকে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
দক্ষিণবঙ্গ ও রাজশাহীর যেসব আসনে বিএনপি পরাজিত হয়েছে, তার অনেকগুলোই দলটির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এসব আসনে হারার পেছনে বড় একটি কারণ হতে পারে বিএনপি তার প্রথাগত সমর্থকদের একটি অংশকে হারিয়েছে। কিছু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরাও জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। কোথাও কোথাও দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় নেতাকে প্রার্থী করায় তারা হেরেছে। কিন্তু এটাই সবটা কারণ নয়। এখানকার অনেক আসনে প্রথাগত আওয়ামী লীগের যেসব ভোটার এবার ভোট দিয়েছেন, তাঁদের একটা অংশ জামায়াতকে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন।
এর পেছনে বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মীদের চাঁদাবাজি ও মামলাবাজিও একটা ভূমিকা রেখেছে। দক্ষিণবঙ্গের অন্তত দুটি আসনের কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও পাড়া, কোথাও গ্রাম ধরে আওয়ামী লীগের প্রথাগত ভোটাররা জামায়াতের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। গ্রামগুলোতে যে গোত্রভিত্তিক বিরোধ থাকে, সেখানে বিভাজনটা অনেকটাই আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি। মোটাদাগে এই সূত্রই এখানে কাজ করেছে
চার.
ঢাকা মহানগরের আসনগুলোতে জামায়াতের উত্থান সবচেয়ে বিস্ময়ের। অতীতে কখনোই জামায়াত ঢাকার কোনো আসন পায়নি। ঢাকার ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতাও খুব বেশি দেখা যায়নি। এবারের নির্বাচনে ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতেই জামায়াত জোট জিতেছে। হেরে যাওয়া আসনগুলোর কয়েকটিতে ভোট ব্যবধান খুব সামান্য। এনসিপির সঙ্গে জোট করায় তরুণ ভোটারদের একটা বড় সমর্থন জামায়াত পেয়ে থাকতে পারে।
গত দেড় বছরে বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগও ভোটারদের একটা অংশকে জামায়াতের দিকে ঝুঁকিয়েছে। বলা হয়ে থাকে ঢাকা যার দখলে পুরো দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সেই দলের হাতে। ঢাকা দখলের জন্য জামায়াত যে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটা ফলাফলই বলে দিচ্ছে। কিছু আসনে ভোটার স্থানান্তরের কৌশল কাজ করেছে। ভোটের অনেক আগে থেকেই, রিকশাচালক, সিএনজিচালক, ফুটপাতের দোকানিদের একটা অংশ জামায়াতের পক্ষে সরব প্রচারণা চালিয়েছেন।
পাঁচ.
জাতীয় পার্টির অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়াসহ এই নির্বাচন আরও কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। একানব্বইয়ের নির্বাচনের পর আর কোনো নির্বাচনেই বামপন্থীরা এককভাবে নির্বাচন করে জিততে পারেনি। বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী ছাড়া বামপন্থীদের কোনো আলোচিত প্রার্থী ছিলেন না। নির্বাচনে তিনি ২২ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। তিনি ছাড়া উল্লেখ করার মতো কেউই ভোট পাননি। এবারের সংসদে বামপন্থীদের কোনো প্রতিনিধি থাকছে না।
নারী ও সংখ্যালঘু জনপ্রতিনিধিও এবারের সংসদে অনেক কম। বিএনপি থেকে ছয়জন ও স্বতন্ত্র হিসেবে রুমিন ফারহানা এবার জিতেছেন। জাতিগত সংখ্যালঘু ২ জন ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ২ জন প্রতিনিধি এবার এমপি হয়েছেন। এর পেছনেও সাম্প্রতিক বছরগুলো, বিশেষ করে গত ১৮ মাসের নারীবিদ্বেষী প্রচার ও ডানপন্থী জোয়ার কাজ করেছে। ফলে ৭ জন নারী আর ৪ জন সংখ্যালঘু সংসদ সদস্য নিয়ে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ হতে চলেছে, সেটা নিয়ে বড় প্রশ্নই থেকে যাবে।
নির্বাচনে বিএনপি তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফলাফলে জিতলেও জামায়াতের বড় উত্থান ঘটেছে। ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ সমর্থন দিয়েছে জামায়াতকে। বিএনপি প্রতি সমর্থন দিয়েছে ৪৯ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোটার। নারীদের, বিশেষ করে শহর অঞ্চলের ও কর্মজীবী নারী ভোটার এবং গত দেড় বছরে নানাভাবে আক্রান্ত জাতিগত, ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত সংখ্যালঘুদের ভোট বিএনপিকে অনেক আসনে জিততে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থার উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ প্রকল্প, ভারতের শাসক দল বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের দমনমূলক শাসনের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক মেরুকরণের দিক থেকেও সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একটি পরিচ্ছন্ন ভোট বাংলাদেশের মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে আপাতত বাঁচিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জের শুরুটা এখন থেকেই।
* মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে জামায়াতে ইসলামি। ছবি : প্রথম আলো |
Monday, January 12, 2026
ঢাকা শহরে একজন ‘জোহরান মামদানি’ কোথায় পাব by কাজী আলিম-উজ-জামান
২০২৫-এর নভেম্বরের নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় প্রমাণ করে, গ্রাসরুট ক্যাম্পেইন বা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের প্রচারণা বড় শক্তিকে রুখে দিতে পারে। মামদানি প্রমাণ করেছেন, সততা আর হাসিমুখ নিয়ে মানুষের কাছে গেলে মানুষ ফিরিয়ে দেয় না।
মামদানির প্রচারণা ছিল সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক। রেন্ট ফ্রিজ অর্থাৎ অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়ানো যাবে না। গণপরিবহন হবে ফ্রি। সরকারি মুদিদোকান থেকে মানুষ সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য থাকবে নিখরচায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র। শহর হবে সবুজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আনা হবে বিপ্লব। আর ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’দের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কড়া ব্যবস্থা। বিশেষ করে এটা ছিল জোহরান মামদানির হাউজিং পলিসির মূল স্তম্ভ।
নিউইয়র্কে ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’ বা ‘স্লামলর্ডস’ বলতে বোঝায়, যাঁরা ভাড়াটেদের অধিকার লঙ্ঘন করে বাড়ির জিনিসপত্র মেরামত করে না, হ্যাজার্ডাস পরিবেশ তৈরি করে রাখে, অবৈধ ফি আরোপ করে। মামদানি এদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ পলিসি নিয়েছেন।
শপথের পরপরই মামদানি ‘মেয়রস অফিস অব মাস এনগেজমেন্ট’ গঠন করেছেন, যাতে নাগরিকেরা সরাসরি শহর পরিচালনায় অংশ নিতে পারেন। নিউইয়র্কবাসীর জন্য এটা একেবারেই নতুন ধারণা। অর্থাৎ সব মিলে পরিবর্তন আসছে।
২.
জোহরান মামদানির মেয়র হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠান দেখছিলাম। ২৪ মিনিট ধরে বক্তৃতা দিলেন তিনি। বললেন বিস্তৃত ও সাহসিকতার সঙ্গে নিউইয়র্ক শাসন করার কথা।
নিশ্চয়ই মামদানির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তিনি যে বিনা পয়সায় অনেক কিছু দেওয়ার বা করার পরিকল্পনা করেছেন, এর জন্য চাই অর্থ। এই অর্থ তিনি আনবেন ধনীদের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করে। কিন্তু সেটা করলে ধনীরা নিউইয়র্ক থেকে ব্যবসা অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিতে পারেন, এমন আলোচনাও আছে। আর যেকোনো কিছু করার জন্য তাঁর প্রয়োজন ‘বিরোধী পক্ষ’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা।
মুখোমুখি অবস্থান থেকে সাম্প্রতিক সময়ে দুজনই সরে এসেছেন। মামদানির সামনে নিশ্চয় আরও অনেক বাধাবিপত্তি আছে, যেগুলো গণমাধ্যমে খুব করে আসেনি। আর কাজ করতে গেলে বাধা, চ্যালেঞ্জ আসবেই। যিনি জনগণের কাজে নামবেন, তাঁর কিছু ভুলও হবে। যিনি কোনো কাজ করবেন না, তাঁর ভুলও হবে না।
প্রায় এক বছর ধরে জোহরান মামদানির কথাবার্তা, আচরণ, ভাষণ, চিন্তা-বিশ্বাস—প্রায় সবকিছু অনুসরণ করছি। কখনো কখনো তাঁকে মনে হয়েছে যেন তরুণ বারাক ওবামা। ২০০৮ সালে ওবামা যখন ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার জন্য লড়ছিলেন, পরে মনোনয়ন পেলেন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করলেন, তাঁর তখনকার সেই ভাষণগুলোর কথা মনে পড়ছিল। মনে হলো, নিউইয়র্কে আরেকজন বারাক ওবামা উঠে এসেছেন।
বিষয়টি আলাপ করছিলাম সহকর্মী তাসনিম আলমের সঙ্গে। তাসনিম মত দিলেন, দুজনের ভাষণের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ওবামা বক্তৃতাটা ভালো দিতেন নিঃসন্দেহে। তবে মামদানির বক্তৃতায় বাড়তি যেটা পাওয়া যায়, সেটা হলো বিশ্বাস। মনে হয় তিনি বিশ্বাস থেকেই কথা বলছেন।
এটা অবশ্য সারা দুনিয়ায় রাজনীতিবিদদের সমস্যা। ভোট বা জনসমর্থনের জন্য বক্তৃতা দিয়ে ফাটিয়ে দেন অনেকেই; কিন্তু সে কথা বিশ্বাস করেন কতজন? রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গল্প অহরহ দেখি বিশ্বজুড়ে। যার বিশ্বাস ও কথার মধ্যে মিল থেকে, তিনিই সঠিক মানুষ, সঠিক রাজনীতিবিদ। জোহরান মামদানিকে এখন পর্যন্ত এ রকম মানুষই মনে হচ্ছে।
শুধু রাজনীতিবিদদের দোষ দিই কেন। আমাদের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী কী করছেন? অপরের মুখে ঝাল খাওয়া বুদ্ধিজীবী অন্তত আমাদের সমাজে কম নেই। আমরা যাঁরা সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট তাঁরাই–বা কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে লিখি? যাঁরা টক–শো করি, কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে বলি? কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য লেখার মানুষ, বলার মানুষ কম নেই এই সমাজে।
৩.
আমাদের এই ঢাকা শহরে একজন মামদানির মতো সোচ্চার মানুষ দরকার। কারণ, এই শহরটা নির্জীব হয়ে পড়েছে। এতটা হতশ্রী ঢাকা শহর আমরা কোনো দিন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এমনিতে কোনো ধরনের উন্নয়নকাজ এই শহরে নেই বা হচ্ছে না। প্রধান সড়ক থেকে একটু সরু সড়ক, গলির মধ্যে ঢুকলে দেখা যায় এই শহরের প্রকৃত চেহারা। ভাঙা সড়ক, ব্যস্ত সড়কের ওপর দোকান, হাজার রকম অন্যায় দেখেও নাগরিকেরা কোনো কথা বলে না। কারণ, এটা এখন ভয়ের শহর। নিজের গা বাঁচিয়ে চলাই এখন নিরাপদ পন্থা।
ধোঁয়া, ধুলাদূষণ, শব্দদূষণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা আর কী বলব?
কিন্তু এভাবে তো একটা শহর দীর্ঘদিন চলতে পারে না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই নির্বাচিত মেয়র নেই। আছেন দুজন প্রশাসক। এর মধ্যে উত্তরে যিনি আছেন, কখনো কখনো তাঁর উপস্থিতি কিছুটা টের পাওয়া যায়। কাজে যতটা, তার চেয়ে কথায় কিছুটা উপস্থিতি তাঁর আছে। কিন্তু দক্ষিণে যিনি প্রশাসক আছেন, তিনি কী কাজ করেন, নাগরিকেরা জানতে পারেন বলে মনে হয় না।
জনপ্রতিনিধি যদি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, তার কিছুটা হলেও জবাবদিহি থাকে। তিনি জানেন, তাঁকে আবার জনগণের দরজায় দাঁড়াতে হবে। আর যিনি নির্বাচিত নন, তিনি দায়বদ্ধ থাকেন, তাঁকে যিনি বা যাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁদের কাছে। অনির্বাচিত মেয়র বা প্রশাসক খুশি থাকেন তাঁর নিয়োগকর্তার ইচ্ছার দাস হয়ে। জনগণ বা মানুষের প্রতি তাঁর কোনো জবাবদিহি নেই।
ঢাকায় প্রতিদিন ৬,৪৬৫ থেকে ৭,৫০০ টন ময়লা উৎপন্ন হয়, কিন্তু কালেকশন রেট মাত্র ৩৭-৫০ শতাংশ। মোট বর্জ্যের ১০ শতাংশ প্লাস্টিক হলেও এর মাত্র ৩৭ শতাংশ রিসাইকেল হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের বাকি অংশ যায় ল্যান্ডফিলে, নদীতে, খালে। মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল দুটোই ক্যাপাসিটি ছাড়িয়ে গেছে, ফলে রাস্তায় ময়লার স্তূপ, নালা বন্ধ, সামান্য বৃষ্টিতে জলজট—এসব আমাদের নিত্যসঙ্গী।
ঢাকায় বছরে বছরে বাড়িভাড়া বাড়ছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা রেন্ট কন্ট্রোল আইন চালু হলে লাখ লাখ ভাড়াটের জীবনযাত্রা সহজ হতো। ঢাকায় দৈনিক ৩-৪ ঘণ্টা জ্যামে নষ্ট হয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলার। কমিউনিটি এনগেজমেন্ট দিয়ে রুট অপটিমাইজ করলে শহরটা চলমান হতো। ফুটপাত দখলমুক্ত হলে মানুষ একটু হাঁটতে পারত, আরেকটু সবুজায়ন হলে মানুষ বড় করে শ্বাস নিতে পারত।
৪.
এই শহরে আমরা চাই একজন জোহরান মামদানির মতো মেয়র, যিনি হবেন তরুণ, সাহসী, প্রোগ্রেসিভ। যিনি বলবেন, ঢাকাকে নোংরা শহর থেকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করব। কিন্তু তিনি কোথা থেকে আসবেন? তিনি তো দূর কোনো আসমান থেকে আসবেন না। আমাদের ভেতর থেকে একজন মামদানিকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণদের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আমরা যাঁরা সাংবাদিক, নাগরিক কিংবা তরুণ, তাঁদের চাপ সৃষ্টি করতে হবে জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য। কোনোভাবেই মাথানত করা যাবে না।
ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রস্তুত তাঁকে খুঁজে বের করতে বা তাঁর মতো নেতৃত্ব গড়ে তুলতে?
* কাজী আলিম-উজ-জামান, প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক।
- ই–মেইল: alim.zaman@prothomalo.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ‘ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার।’কোলাজ: প্রথম আলো |
Friday, November 28, 2025
কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন? by ফাহিমা আক্তার সুমি ও মোহাম্মদ রায়হান
এসব বস্তিতে অসংখ্য বিদ্যুতের সংযোগ অবৈধভাবে টানা থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেগুলো আবার থাকে পুরনো তারের। আবার সেই চোরাই সংযোগে হিটারও চালানো হয়। থাকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। দাহ্য বস্তুতে বৈধ-অবৈধ অনেক কিছুই থাকে এই বস্তিতে। যার কারণে ঘনঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর মহাখালী কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দেড় হাজারের মতো ঘর-বাড়ি ও মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে নিঃস্ব হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত পেরিয়ে দিনভর অবস্থান করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার। ঘরের ছাই ও পোড়া টিনের স্তূপের মধ্যে খুঁজে ফেরেন তাদের শেষ সম্বলটুকু। আগুন লাগার ঘটনার পরে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা পর বুধবার সকালে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত ও প্রাণহানি ঘটেনি। কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। আগুন লাগার পরপর বস্তির বিভিন্ন ঘরে থাকা রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার একের পর এক বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। এতে দ্রুত আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চলতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে এই বস্তিতে লাগা আগুনে পুড়ে যায় অসংখ্য ঘর। গত বছরের ২৪শে মার্চ ও ১৮ই ডিসেম্বরেও আগুনে পুড়ে কড়াইল বস্তির অংশ বিশেষ। প্রায় নব্বই একর জায়গার ওপর ১০ হাজারের মতো ঘর রয়েছে এই বস্তিতে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার খবর পাওয়ার ৩৫ মিনিট পর তিনটি স্টেশনের ইউনিট সেখানে পৌঁছায়। ঢাকার যানজটই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। বড় গাড়িগুলো সরু রাস্তায় ঢুকতে পারেনি। বাধ্য হয়ে দূর থেকে পাইপ টেনে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আগুন ‘ডেভেলপমেন্ট স্টেজে’ পৌঁছে যায়। যত্রতত্র বিদ্যুতের তার এবং বাসায় থাকা গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগুনের উৎস তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, প্রতি বছরই কড়াইল বস্তিতে ফায়ার সার্ভিস মহড়া আয়োজন করে। কিছুদিন আগেই সর্বশেষ মহড়া করা হয়েছিল। সে জন্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে; না হলে আরও দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারতো। পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি, ওয়াসা এবং পাশের ড্রেনের পানি ব্যবহার করা হয়েছে। তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বস্তিতে বিভিন্নভাবে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, কোন আন্দোলন সংগ্রামের সময় কিংবা পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা থাকে। কড়াইল বস্তিতে তো এর আগে বহুবার আগুনের ঘটনা ঘটেছে সেই সময়গুলো কখন? আমরা দেখি অধিকাংশ সময় হলো আন্দোলনের সংগ্রামের সময়। কিংবা আন্দোলন পরবর্তী অবস্থায় নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করার সূত্র ধরে বস্তি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা কিংবা নানা জায়গাতে নানা ভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আর আমাদের এখানে তো প্রান্তিক বা সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মানুষকে পুঁজি করে রাজনীতি তো বহু হয়েছে আরও হবে। যদি ত্রুটি থাকে বা কোনো ধরনের সতর্কতার ঘাটতি থাকে সেটা কীভাবে সংশোধন করা যায় সেক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা নিবে সেটা আমরা প্রত্যাশা করি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার মানবজমিনকে বলেন, কড়াইল বস্তির মঙ্গলবারের অগ্নি দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে বিধায় সে বিষয়ে এখনই কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে কড়াইল বস্তির আগের অগ্নি দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তদন্তে বেশির ভাগ সময়ই দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক থেকে অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেন, বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার জন্য মূল ঝুঁকিগুলো হলো; অসাবধানতা, অনিরাপদ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ ও ব্যবহার, বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল ও খোলা বাতির ব্যবহার।
নিঃস্ব দেড় হাজার পরিবার
মোসাম্মৎ বানু। একদিন আগেও ঘর-সংসার, আসবাবপত্র সবই ছিল তার। মঙ্গলবার মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন সব কেড়ে নিয়েছে তার। শুধু একটি পাটি আর ভর দিয়ে হাঁটা লাঠিই এখন অবলম্বন এই সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধার। তাই গতকাল দুপুরে তার ওই পোড়া ঘরের মেঝেতে বসে বিলাপ করছিলেন মোসাম্মৎ বানু। অশ্রুসিক্ত হয়ে বারংবার বলছিলেন-কিচ্ছু নেই ঘরে, আমার ঘরে কিচ্ছু নেই। আমি কোথায় যাবো? কী খাবো? মানুষের তো ছেলে আছে। মেয়ে আছে। স্বামী আছে। আয়-রোজগারের লোক আছে, আমার তো ছেলেমেয়ে, স্বামী কেউ তো নেই? আমাকে কে জায়গা দিবে? আল্লাহ আমারে কেন উঠায় নেয় না! আমি এখন নতুন ঘর কোথায় পাবো? সারা জীবন ধরে যা দুই-এক টাকা জমা করেছিলাম তাও আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।
মোসাম্মৎ বানু মানবজমিনকে বলেন, আমার চোখে সমস্যা, অপারেশন করা হয়েছে। এর আগে স্ট্রোক হয়েছে আমার। লাঠি ছাড়া এখন আর চলাফেরা করতে পারি না। মঙ্গলবার বস্তিতে দাউ দাউ করে আগুন লাগার পরও একা ঘর থেকে বের হতে পারিনি। দুই জনে ধরে আমাকে আগুন লাগা ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। এর আগে ২০০৪ সালে যখন আমাদের বস্তিতে আগুন লাগে তখনো একই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল। ২০১৭ সালেও আগুনে ঘর পুড়েছে আমার। এই নিয়ে তিনবার। তিনি বলেন, আগে তো দশ জনের কাছ থেকে হাত পেতে নিয়ে এসে কোনো রকমে চলেছি কিন্তু এবার আমি কি করবো!
মোসাম্মদ বানুর মতোই কড়াইল বস্তির অন্তত ১৫ শ’ পরিবারের ঘর আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এদের বেশির ভাগই পরনের কাপড় ছাড়া ঘর থেকে কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি। তাই ঘর পোড়া ছাইয়ের মধ্যে গতকাল অনেক মানুষকে তন্য তন্য করে খুঁজতে দেখা যায় জীবনের শেষ সম্বল, যদি কিছু মেলে। কিছু মানুষকে আবার আগুনে পোড়া ঘরের টিন, ধাতব বস্তু, লোহা- লক্কড় জড়ো করে ভাঙাড়ির কাছে বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর সেগুলো পোড়া স্তূপের পাশেই বসে ছিলেন ফাতেমা আক্তার। মলিন মুখ, হাত দিয়ে চোয়ালে ঠেস দিয়ে বসে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছেন। কাছে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতেমা বলে ওঠেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার ঘর, দোকান, সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই দোকান দিয়ে আমাদের সংসার চলতো। এখন কিচ্ছু নেই। আমার যত পুঁজি ছিল সব এই দোকানে ঢেলেছিলাম, কিছুই রইলো না। ফাতেমা আক্তারের ঋণের টাকা দিয়ে বানানো দোকান পরিচালনাকারী তার স্বামী শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, আমাদের দোকান, বাসা থেকে একটু দূরে ছিল। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অসুস্থ। তাই দুজন মিলেই ভাগে দোকানটা চালাইতাম। মঙ্গলবার যখন আগুন লাগে তখন আমরা বাড়িতে ছিলাম। আগুন লাগার সময় বাইরের চিল্লাচিল্লি শুনে বাইরে এসে দেখি- আমাদের ঘরের চালে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারদিকে আগুন আর আগুন। প্রথমে ঘর থেকে মালপত্র বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। এরপর দোকানের কথা মনে পড়তেই দৌড়ে দোকানের এদিকে আসি। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। কোনোভাবেই দোকানটাকে বাঁচাতে পারিনি।
এখন শুধুমাত্র মোবাইল ফোনটা আর দু’জনের গায়ের কাপড় ছাড়া কিচ্ছু নেই আমাদের। বাসার আসবাবপত্র, থালা-বাসন, টাকা-পয়সা, স্বর্ণ সব পুড়ে গেছে। দোকান ছাড়া আমাদের কোনো আলাদা আয়ের কোনো উৎস নেই যে, তাই করে খাবো। এখন এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র ভরসা।
১৯৯৩ সালে বরগুনা থেকে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে চাকরি নেন মো. জসিম। ওঠেন কড়াইল বস্তিতে। কয়েক বছর চাকরি করার পর নিজেই থাকার ঘরের পাশে পাঁচটি সেলাই মেশিন কিনে শিশুদের পোশাক তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। মঙ্গলাবারের কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন তারও ব্যবসা ধ্বংস করে দিয়েছে। জসিম বলেন- আগুন যখন লাগে তখন আমি, আমার স্ত্রী, ছেলের বউ, নাতিসহ আমরা পাঁচজন বের হয়ে গেছি। সম্বল ছিল আমার সেলাইয়ের মেশিনগুলো। এই আগুন আমার সব পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার সবগুলো সেলাই মেশিই পুড়ে শেষ।
ফাতেমা, জসিমদের মতো কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুনে সর্বস্ব খুইয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে শত শত মানুষ। বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, কড়াইল বস্তির প্রবেশমুখগুলোতে শত শত মানুষ ভিড় করেছে। সকলের চোখে- মুখে হতাশার ছাপ। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন, এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা তাদের সাধ্যমতো ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করছেন। কেউ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, কেউ পানি বিতরণ করছেন, কেউবা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় কড়াইল বস্তিতে লাগা ভয়াভহ আগুনের কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ৫ সদস্যের কমিটির সভাপতি ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ ও সদস্য সচিব ফায়ার সার্ভিস ঢাকার পিএফএম’র সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান। কমিটির সদস্যরা হলেন- ফায়ার সার্ভিস ঢাকা জোন ০২-এর উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা, ফায়ার সার্ভিসের তেজগাঁও স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার, মো. নাজিম উদ্দিন সরকার এবং ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা ২৩-এর ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মো. সোহরাব হোসেন।

Saturday, November 15, 2025
পয়লা অগ্রহায়ণে ‘আদি নববর্ষ’ উদ্যাপন করবে ডাকসু
চারুকলায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্য ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে ‘আদি নববর্ষ’ উদ্যাপন করা হবে। অনুষ্ঠানটি চারটি পর্বে সেদিন রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে। প্রথম পর্বে হবে রংতুলিতে নবান্ন। দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী এবং চারুকলার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জুলাই ও নবান্ন থিমে ছবি আঁকা হবে। মোট ১৫ জন শিল্পী এই পর্বে ছবি আঁকবেন। পর্বটি শুরু হবে সকাল ১০টায়। দ্বিতীয় পর্বে হবে আদি নববর্ষ আনন্দযাত্রা। উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব এটি। চারুকলার সহযোগিতায় আনন্দযাত্রার জন্য তিনটি মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। একটি মোটিফ জুলাই নিয়ে। একটি মোটিফ জেলেজীবন নিয়ে এবং অন্যটি কৃষিজীবন নিয়ে। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের উপস্থাপনা থাকবে এতে। তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের শুভেচ্ছা বিনিময়। বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্যের সদস্য বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে এই পর্বে থাকবে আবৃত্তি, নাচ, গান ও জাদু পরিবেশনা। আমন্ত্রিত অতিথিদের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে থাকবে দেশবরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় সংগীত ও পালাগান।
এ উদ্যাপনের কারণ তুলে ধরে মুসাদ্দিক বলেন, দেশজ সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নববর্ষ উদ্যাপন, যা বর্তমানে পয়লা বৈশাখ হলেও এককালে ছিল পয়লা অগ্রহায়ণ। বাংলা সনের পঞ্জিকায় যে ১২টি মাস আছে, তার মধ্যে ১১টিই নক্ষত্রের নামে। এ ক্ষেত্রে ‘বৈশাখ’ বিশাখা নক্ষত্রের নামে, ‘জ্যৈষ্ঠ’ জ্যাষ্ঠা নক্ষত্রের নামে, ‘আষাঢ়’ আষাঢ়ার নামে এবং এভাবে শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র যথাক্রমে শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, পৌষী, মঘা, ফাল্গুনী ও চিত্রার নামে। যে মাসটি নক্ষত্রের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সেটি হচ্ছে অগ্রহায়ণ; আর এই নামের সঙ্গে মিশে আছে বাংলার কিছু ইতিহাস, কিছু স্মৃতি এবং কিছু বিস্মৃত হয়ে যাওয়া তথ্য।
মুসাদ্দিক ইবনে আলী মোহাম্মদ বলেন, প্রায় প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে নববর্ষের উৎসব উদ্যাপিত হতো। নববর্ষের আদি অনুষ্ঠান হিসেবে ‘আমানি’ উৎসব বা ‘নবান্ন’ উৎসবের কথা বলেছেন ঐতিহাসিকেরা, যা পয়লা অগ্রহায়ণে অনুষ্ঠিত হতো। এটি ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ‘বৈশাখ’ মাসকে বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রচলন করা হয়। কিন্তু বৈশাখকে বছর শুরুর মাস আর পয়লা বৈশাখকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে বাংলার মানুষ উদ্যাপন করেনি বলে দাবি করেন তিনি।
ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। পরে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ব্যবস্থা করেন। কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারেও এভাবে ধীরে ধীরে পয়লা বৈশাখ সম্পর্কে কিছু উৎসাহ-উদ্দীপনার খবরাদি পাওয়া যায়। ১৯৬৭ সালে এই বংলায় প্রথম পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তানি শাসকেরা এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করায় পাকিস্তানবিরোধী মানসিকতার বাঙালির কাছে পয়লা বৈশাখ ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মুসাদ্দিক বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম আজ ভুলতে বসেছে, এককালে পয়লা অগ্রহায়ণই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের নববর্ষ। প্রজন্মকে সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা নবান্ন উৎসবকে আদি নববর্ষ উৎসব নামে উদ্যাপন করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি যুবায়ের, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মিনহাজ ও বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্যের সভাপতি মৃন্ময় মিজান উপস্থিত ছিলেন।
![]() |
| সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক ইবনে আলী মোহাম্মদ। আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। ছবি: সংগৃহীত |
Tuesday, September 16, 2025
ঢাকায় যৌন নির্যাতনে অসুস্থ ছেলেশিশুটি এখন হাসপাতালে, ১ জন গ্রেপ্তার
শিশুটি নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় তার ওই আত্মীয় প্রথমে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত শিশুসহায়তা হেল্পলাইন নম্বরে (১০৯৮) কল করেন। শিশুটির পরিবার, পুলিশ ও ১০৯৮ নম্বরের তথ্য অনুসারে, শিশুটির গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। শিশুটি টানা নির্যাতনের শিকার হলেও শনিবার অসুস্থ হয়ে পড়ার পরই তা জানাজানি হয়। পরে জানা যায়, পাশের ডিম ও ডাবের দোকানের দুই কর্মী হাসিবুর রহমান ও রিয়াজ নিয়মিত শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতেন।
নির্যাতনের শিকার শিশুর ওই আত্মীয় প্রথম আলোকে বলেন, তিনি শনিবার রাতে দোকানের কেনাকাটা করতে বাজারে গিয়েছিলেন। তাঁর দোকানেও দুজন কর্মী ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁর আত্মীয় ওই শিশুটিকে আঘাত করা হয়েছে চোখে। চোখ লাল হয়ে গেছে। আঘাত করার কারণ জানতে চাইলে শিশুটি জানায়, ২০-২২ দিন ধরে হাসিবুর ও রিয়াজ হাসপাতালের পেছনে বাগানে নিয়ে তাকে যৌন নির্যাতন করেন। সে বাধা দিলেও শোনেননি।
শিশুটির ওই আত্মীয় আরও বলেন, নির্যাতনে শিশুটির পুরুষাঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার ওই দুজন আবার তাকে বাগানে নিয়ে যেতে চাইলে সে রাজি হয়নি। এরপরই তাকে আঘাত করেন ওই দুজন। আঘাতে তার চোখ লাল হয়ে যায়। আজ সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং শেরেবাংলা নগর থানায় গিয়ে মামলা করেন। পরে বিকেলে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মেহেদি হাসান প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করার ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় হাসিবুর রহমান নামের একজনকে আসামি করে মামলা করা হয়। আজ দুপুরে মামলার পর আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত থেকে আসামিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০–এর ১০ ধারায় (যৌনপীড়ন ইত্যাদির দণ্ড) বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি যৌনকামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাঁর শরীরের যেকোনো অঙ্গ বা কোনো বস্তু দিয়ে কোনো নারী বা শিশুর যৌনাঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন, তাহলে সেটা হবে যৌনপীড়ন। এই অপরাধে ওই ব্যক্তি সর্বনিম্ন ৩ বছর ও সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮–এর সমন্বয়ক চৌধুরী মোহাম্মদ মোহাইমেন প্রথম আলোকে বলেন, শুধু মেয়েশিশু নয়, ছেলেশিশুরাও যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার মধ্যে পড়ে। অনেক সময় যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা ভবিষ্যতে মা–বাবা হওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাই পরিবারগুলোকে ছেলেশিশুদের দিকেও সমান নজর রাখতে হবে। তারা কোনো ধরনের নির্যাতনের কথা বললে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তিনি জানান, এই শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় ১০৯৮ নম্বরে সহায়তা জানিয়ে কল দেন শিশুটির ভাই। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন এবং এ কাজে সহায়তা দিতে একজন সমাজকর্মীকে নিয়োজিত করেন।
![]() |
| শিশু নিপীড়ন। প্রতীকী ছবি |
Saturday, September 6, 2025
রাজবাড়ীতে নুরাল পাগলার দরবার থমথমে, থানায় অভিযোগ দেয়নি পরিবার
গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দফায় দফায় নুরাল পাগলার দরবারে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা শরিয়ত পরিপন্থীভাবে দাফনের অভিযোগ তুলে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেন।
উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে একদল লোকের এই হামলায় ১০–১২ জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। পুলিশের দুটি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। হামলায় আহত হয়ে মারা যান এক ব্যক্তি।
পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর ঘটনায় গোয়ালন্দ ঘাট থানায় মামলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম মোল্লা বাদী হয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন। যদিও এ মামলায় আজ শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তার নেই। প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল ইসলাম।
নুরাল পাগলার দরবারে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানান ওসি।
আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড জুড়ান মোল্লা পাড়ায় অবস্থিত নুরাল পাগলার দরবারের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ আছে। উৎসুক জনতা ভিড় করছে। দরবারের ভেতর একটি তিনতলা এবং একটি দুইতলা ভবন।
তিনতলা ভবনে পরিবারসহ নুরাল পাগলা থাকতেন। দুটি ভবনের সব কটি কক্ষ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আসবাবপত্র সব খোয়া গেছে। অবশিষ্ট জিনিসপত্র ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভবন থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে নুরাল পাগলার আস্তানা। সেখানে একটি টিনশেড ঘরে বসে ভক্তদের সঙ্গে সময় কাটাতেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর আগে টিনশেড ঘরসহ সমতল ভূমি থেকে কয়েক ফুট উঁচু করে বেদি তৈরি করা হয়। বেদির ওপর একপাশে টিনশেড ঘরে তিনি বসে সময় কাটাতেন। অপর পাশে মৃত্যুর পর তাঁকে কবর দেওয়া হয়। দরবারের ভেতর এখন ধ্বংসস্তূপ। ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কেউ কেউ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ থেকে চাল–ডালসহ জিনিসপত্র কুড়িয়ে নিচ্ছেন। পুলিশ মাঝেমধ্যে উৎসুক জনতাকে সরিয়ে দিচ্ছে।
কুষ্টিয়ার পোড়াদাহ থেকে এসেছেন আবুল হোসেন (৬০) নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার দেশের আলোচিত খবর ছিল নুরাল পাগলার দরবারে হামলা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ফেসবুকে খবরটি দেখে আর থাকতে পারলাম না। কী হয়েছে দেখতে রাতে গোয়ালন্দে এক আত্মীয়ের বাড়ি আসি। আজ সকালে দরবারে এসে দেখে গেলাম। তাঁর কাজ বিতর্কিত ছিল, তাই বলে লাশ কবর থেকে তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি।’
রাজবাড়ীর পাংশা থেকে আসা রত্না বিশ্বাস বলেন, ‘তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন বলে তাঁকে আমরা প্রণাম করতাম। দরবারে হামলার কথা শুনে দেখতে এসেছি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৩ আগষ্ট বার্ধক্যের কারণে মারা যান নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলা। ওই দিন রাতে মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে বিশেষ কায়দায় আস্তানায় তাঁর লাশ দাফন করেন ভক্তরা। এরপর বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কবর সমতল করারসহ কয়েকটি দাবি জানায় স্থানীয় আলেমসহ তৌহিদি জনতা।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা ও উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি ও নুরাল পাগলার পরিবারের কয়েক দফা বৈঠক হয়। তবে কবর নিচু না করায় দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয় ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি। তারা সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারের মধ্যে কবর সমতল করাসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। অন্যথায় শুক্রবার জুমার নামাজের পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং পরে ‘মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, বেলা তিনটার দিকে মঞ্চ থেকে ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা জালাল উদ্দিন প্রামাণিক, সদস্যসচিব বিএনপি নেতা আইয়ুব আলী খান সবাইকে সমাবেশে থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু উত্তেজিত লোকজন মিছিল নিয়ে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা করেন। ভেতর থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন নুরাল পাগলার ভক্তরা। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ সংঘর্ষে দুই পক্ষের অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন।
এ সময় কিছু লোক দরবারের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেন এবং মালামাল লুটপাট করেন। একপর্যায়ে বিকেল পাঁচটার দিকে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে গোয়ালন্দ পদ্মার মোড়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ওপর নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংঘর্ষে আহত রাসেল মোল্লা নামের নুরাল পাগলার এক ভক্ত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। তিনি গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম তেনাপচা গ্রামের আজাদ মোল্লার ছেলে।
![]() |
| নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার বাড়ি ও দরবারের ভেতর শুক্রবার হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। আগুন ধরিয়ে সব পুড়িয়ে দেয়। আস্তানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ধংসস্তুপ। শনিবার সকালে। ছবি: প্রথম আলো |
Thursday, June 12, 2025
শাশুড়ি ও দুই শ্যালককে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে রবিন
গ্রেপ্তারকৃত রবিন ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। তাকে গত ৫ই জুন আদালতে পাঠালে শাশুড়ি ও দুই শ্যালককে হত্যার কথা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এরপর আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। নিহতরা হলেন- গাংগুটিয়া ইউনিয়নের রক্ষিত গ্রামের মৃত রাজা মিয়ার স্ত্রী নারগিস বেগম (৪০), তার দুই ছেলে শামীম হোসেন (১৭) ও সোলায়মান (৬)। বড় ছেলে শামীম ভেকু মেশিনের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন ও ছোট ছেলে সোলায়মান রক্ষিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্লে শ্রেণির ছাত্র ছিল। সূত্র মতে, রক্ষিত গ্রামের রাজা মিয়া ডেকোরেটরের ব্যবসা করতেন। বছরখানেক আগে তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে মারা যান। মেয়ে নাসরিন আক্তারের আড়াই বছর আগে রবিন হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। রাজা মারা যাওয়ার পর তার ডেকোরেটরের ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন রবিন ও নারগিস বেগম। নেশায় আসক্ত রবিন ব্যবসার অধিকাংশ টাকা ব্যয় করে ফেলেন। এ কারণে আড়াই মাস আগে ওই ডেকোরেটরের ব্যবসাও ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন নারগিস বেগম। এ নিয়েই কিছুদিন ধরে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়।
পিবিআই পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা জানান, ডেকোরেটরের ব্যবসা বিক্রির জেরেই রবিন ১লা জুন রাতে কামারপাড়া গ্রামে তার স্ত্রী নাসরিন আক্তারকে নিজ বাড়িতে ঘুমের ঘরে রেখেই ৬ কিলোমিটার দূরে রক্ষিত গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে আসে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সে প্রথমে কৌশলে টিনের বেড়া খুলে তার বড় শ্যালক শামীম হোসেনের ঘরে ঢুকে। এরপর ঘুমন্ত শ্যালককে বালিশচাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। পাশের কক্ষে তার শাশুড়ি নারগিস ও ছোট শ্যালক সোলায়মানকেও একই কায়দায় বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে। পরে দরজা লাগিয়ে রাতেই নিজ বাড়িতে চলে যায় রবিন। পরদিন রবিনের স্ত্রী নাসরিন তার মাকে ১০-১২ বার ফোন করেও না পেয়ে দুপুর ২টার দিকে মায়ের বাড়িতে যান। এ সময় ঘরের দরজা বন্ধ দেখতে পান। এরপর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় দরজা ভেঙে একই খাটে তার মা ও দুই ভাইয়ের লাশ দেখতে পান। পরে থানা পুলিশ তিনটি লাশই উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। পরদিন সন্ধ্যায় তিনজনের জানাজায়ও অংশ নেয় ঘাতক রবিন।
রবিনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার জানান, আমার স্বামী আমাকে ঘুমে রেখে মা ও দুই ভাইকে হত্যা করেছে তা বুঝতেই পারিনি। আমার পরিবারের আমি আর আমার ৬ মাসের মেয়ে ছাড়া এখন আর কেউ রইলো না। আমি রবিনের কঠোর বিচার চাই। পিবিআই জানায়, রবিন তার শাশুড়ি ও দুই শ্যালককে হত্যার পর দু’দিন ভাত খায়নি। সে আত্মহত্যা করার পরিকল্পনাও করেছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। ধামরাই থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, তিন লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে নিহত নারগিস বেগমের ভাই আব্দুর রশিদ অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে রবিন হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করার পর ধামরাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে রবিন জেলহাজতে রয়েছে।

Tuesday, June 10, 2025
ঢাকার ৪ থানায় বিভিন্ন নামে সক্রিয় অর্ধশতাধিক অপরাধী দল by মেহেদী হাসান
সম্প্রতি হাজারীবাগে আলাদা দুটি খুনের ঘটনার পর এ অঞ্চলের অপরাধী দলগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে আদাবর, মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগে এমন অন্তত অর্ধশত অপরাধী দল সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ৫ আগস্টের পর ১০ মাসে এসব অপরাধী দলের হাতে খুন হয়েছেন অন্তত ১১ জন।
পুলিশ ও র্যাবের দেওয়া তথ্য বলছে, ৫ আগস্টের পর এই চারটি থানা এলাকা থেকে মাদক, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও হত্যায় জড়িত অন্তত দেড় হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর মধ্যে র্যাবের হাতেই গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৫৬ জন। এদের অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সময় অপরাধী দলের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হলেও দ্রুততম সময়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুন করে অপরাধে জড়াচ্ছে। এসব অপরাধী দলের কোনোটিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় দিচ্ছে, আবার কোনো অপরাধী দলকে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন। ফলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তারা খুনোখুনিতেও জড়াচ্ছে।
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজারের সাদেক খান কাঁচাবাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি অপরাধী দল ‘অ্যালেক্স ইমন’ ও ‘ডাইল্লা’ গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের সময় ডাইল্লা গ্রুপের সদস্য নাছির বিশ্বাস ও মুন্না নামের দুই তরুণ নিহত হন। দুটি অপরাধী দলের সদস্যরাই চুরি-ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত। অ্যালেক্স ইমন গ্রুপকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল প্রশ্রয় দেন। জোড়া খুনের মামলাতেও পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হয়েছে।
যদিও নাছির বিশ্বাসের বড় ভাই সুমন বিশ্বাস প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর ভাই নাছির পেশায় রাজমিস্ত্রি, কোনো অপরাধী দলের সদস্য ছিলেন না। দুটি অপরাধী দলের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নাছির নিহত হন। তবে স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশ বলছে, নাছিরের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে থানায় মামলা রয়েছে।
এদিকে গত মার্চ ও এপ্রিলে এক মাসের ব্যবধানে মোহাম্মদপুরের শের শাহ সুরী সড়কে আবাসন ব্যবসায়ী মনির আহমেদের বাসায় ঢুকে গুলির ঘটনায় দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে। মনির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চন্দ্রিমা রিয়েল এস্টেটের পরিচালক। এক সন্ত্রাসী তাঁর কাছে চাঁদা চেয়েছিল। এর জেরেই গুলির ঘটনা ঘটেছে। এখন তিনি বাসা থেকে বের হতে ভয় পান।
এ ঘটনা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাটি মূলত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর দ্বন্দ্বের জেরে ঘটেছে। ওই ব্যবসায়ীও একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের অপরাধপ্রবণ চারটি থানার মধ্যে আদাবর ও মোহাম্মদপুর থানা দুটি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মধ্যে পড়েছে। এই বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশি তৎপরতায় এ অঞ্চলে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য অনেক কমে এসেছে। ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে।
তারা ভাসমান অপরাধী, স্থায়ী ঠিকানা নেই
হাজারীবাগের জাফরাবাদে গত ১৫ মে গভীর রাতে একটি পরিবারের সাতজনকে কুপিয়েছে ‘পাটালি গ্রুপ’ নামে একটি অপরাধী গ্রুপের সদস্যরা।
সম্প্রতি জাফরাবাদের ইত্যাদির মোড়ে গিয়ে কথা হয় ভুক্তভোগী পরিবারটির সঙ্গে। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা যায়, চেয়ারে বসে আছেন গৃহকর্তা আবুল কাশেম। বাঁ হাতের পুরোটাই ব্যান্ডেজ মোড়ানো। সেদিনের ঘটনা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার দিন গভীর রাতে তিনজন বাসায় উঁকি দিচ্ছিলেন। কেন বাসায় উঁকি দিচ্ছিলেন, জিজ্ঞেস করতেই পরিবারের সাতজনকে কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায় তারা।
এ ঘটনার পর পুলিশ অভিযানে নেমে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের ২০ জনের বেশি পাটালি গ্রুপের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযানে পাটালি গ্রুপের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি শাহিনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পাটালি গ্রুপের প্রধান আলমগীর ওরফে ফর্মা আলমগীর এখনো পলাতক।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, পাটালি গ্রুপে কতজন সদস্য আছে, এর সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে সংখ্যাটা ৭০ জনের কম নয়। এই দলের সদস্যরা ভাসমান, স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। তারা ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করে। এক এলাকায় অপরাধের পর অন্য এলাকায় চলে যায়।
ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের চারটি থানা এলাকার সীমান্ত ঘেঁষে গাবতলী–সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়ক চলে গেছে। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। এ অঞ্চলে নিম্নআয়ের অনেক মানুষ বসবাস করেন। বেড়িবাঁধ–সংলগ্ন চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান, চাঁন মিয়া হাউজিং, বছিলা, জাফরাবাদ, রায়েরবাজার, গণকটুলী এলাকায় অপরাধী গ্রুপগুলো বেশি সক্রিয়। এই অপরাধী দলগুলো ‘অদ্ভুত’ ধরনের নামে পরিচিত। যেমন ‘টিন এজ টর্নেডো’, ‘পাটালি গ্রুপ’, ‘লও ঠেলা গ্রুপ’, ‘কবজি কাটা গ্রুপ’, ‘ডার্ক স্ট্রাইকার্স’, ‘রেড ভলক্যানো’, ‘ডাইল্লা গ্রুপ’, ‘অ্যালেক্স ইমন গ্রুপ’, ‘লেভেল হাই গ্রুপ’, ‘চাঁন গ্রুপ’, ‘মাউরা গ্রুপ’, ‘ভাইবা ল’, ‘লাল গ্রুপ’, ‘ঠোঁটে ল গ্রুপ’, ‘লাড়া-দে’, ‘মেমোরি গ্রুপ’ ইত্যাদি। অপরাধী দলগুলো নিজেরাই এসব নাম ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়।
পুলিশের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সহকারী কমিশনার এ কে এম মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুর অঞ্চলে অনেক ভাসমান অপরাধী বসবাস করে। বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা নানা ধরনের অপরাধে যুক্ত হয়।
খুনোখুনি থেমে নেই
হাজারীবাগের জাফরাবাদে গত ১৫ মে সন্ধ্যায় একটি কিশোর দলের হাতে খুন হন আলোকচিত্রী নুরুল ইসলাম। বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি তোলার কথা বলে তাঁকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে খুন করে ১০-১২ জনের একটা কিশোর দল। তারা নুরুল ইসলামের কাছ থেকে উন্নত মানের দুটি ক্যামেরাও ছিনিয়ে নেয়।
নুরুল ইসলামের বড় ভাই ওসমান গনি বলেন, নুরুল ইসলামের সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। শুধু ক্যামেরা ছিনিয়ে নিতেই ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়।
নুরুল খুনের আধা ঘণ্টা আগে হাজারীবাগের জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে একটি অপরাধী দলের হাতে খুন হন স্নাতকপড়ুয়া সামিউর রহমান।
পুলিশের ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার শাহ মোস্তফা তারিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন অপরাধী দল এ অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন ভাসমান কিছু অপরাধী হাজারীবাগ ও ধানমন্ডির ‘বর্ডার’ এলাকায় কখনো কখনো সক্রিয় হয়।
আদাবর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কমে যাওয়ার সুযোগে অপরাধী দলগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গত ১০ মাসে এ অঞ্চলে বিভিন্ন অপরাধী দলের হাতে ১১ জন খুন হয়েছেন। শুধু মোহাম্মদপুরেই খুন হয়েছেন সাতজন।
মোহাম্মদপুর অঞ্চলে ‘ভয়ংকর’ অপরাধী দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনায় আসে ‘কবজি কাটা’ গ্রুপ। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই দলের সদস্যরা কবজি কেটে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিত। এই দলের ভাড়াটে খুনিও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাতে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বিল্লাল গাজীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে তারা এই খুন করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে কবজি কাটা গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেন র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন।
গত ২৭ মে মোহাম্মদপুরে সেনাবাহিনীর অভিযানে ফরিদ আহমেদ বাবু ওরফে এক্সেল বাবু নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানিয়েছে, এক্সেল বাবুর বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং ভূমি দখলের অভিযোগে ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে। ‘টিন এজ টর্নেডো, ‘কবজি কাটা গ্রুপ’সহ অন্তত চারটি অপরাধী দলের নেতৃত্ব দেন এক্সেল বাবু। কবজি কাটা গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেন ওরফে কবজি কাটা আনোয়ারের গডফাদার হিসেবেও পরিচিত তিনি।
এদিকে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধী দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে চারজন খুন হয়েছেন। মুজাহির ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অসি আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে অবাধে মাদক ব্যবসা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর এলাকায় বসবাস করেন ব্যাংকার এ এস এম নিয়াজ মোর্শেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকা অনেক দিন ধরেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। তবে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়। এ অঞ্চলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
![]() |
| মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধে সক্রিয় অপরাধী চক্র। প্রতীকী ছবি |
Monday, May 12, 2025
নবাবগঞ্জে আবাসন প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ রিমনের হাতে! by ইমরান হোসেন সুজন
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, সংশ্লিট অফিস সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করার কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা, সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ, মাদক ও নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত আবাসন প্রকল্প দুইটি। দীর্ঘদিনও সরকারি কোনো কর্মকর্তা না আসায় ঘর বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রেও নিজের কর্তৃত্ব জাহির করেন রিমন। উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী নাসির ও স্থানীয় কথিত যুবদল নেতা সুমনকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন নতুন সিন্ডিকেট। তবে আবাসনের কোনো সমস্যা হলে তা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেন না রিমন। আবাসনের সব কিছু তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন।
চরকোন্ডা মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর বাসিন্দা হরিপদ পাল বলেন, পাড়াগ্রামের রিমন ও স্থানীয় সুমন এরাই প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে। কে ঘরে থাকবে, কে থাকবে না সব কিছুই তারা করেন। তারা একটা গ্রুপ তৈরি করছে, তারা তালা ভেঙে ভেঙে মানুষজনকে বের করে দেয় আবার ঢুকায়। টাকার বিনিময়ে ঘর বরাদ্দ হওয়ার ঘটনা সবাই জানে কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় নাই।
একই প্রকল্পের বাসিন্দা সাগির আহমেদ বলেন, সরকার আমাকে ঘর দিছে, আমি না থাকলে সরকার আমাদের বের করে দিবে। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনেও ১০/১২ দিন লাগাতার না থাকলেই ওরা ঘর প্রথমে তালা দেয়, পরবর্তীতে তা অন্যজনকে দিয়ে দেয়। আর এ সিন্ডিকেটের মূলহোতা হলো পাড়াগ্রামের রিমন। তাকে সহযোগিতা করেন উপজেলা ভূমি অফিসের নাসির ও এলাকার কিছু পাতি নেতা।
নজরুল নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, প্রকল্পের বাসিন্দারা খুব কষ্টে আছে। এতদিন হয়ে গেল আমরা কোনো মিটার পাচ্ছি না, গরমে খুব কষ্ট করতে হয়। এ ছাড়া একটা কবরস্থানও নেই, কেউ মারা গেলে মাটি দিতে পারি না। প্রথম থেকেই রিমন ভাই প্রকল্প দুইটির দায়িত্বে আছে। শুধু ঘর তালা দিয়ে অন্যজনকে বুঝিয়ে দেয়ার সময় তাকে দেখি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার এক আত্মীয়ের জন্য একটা ঘরের জন্য ডিসি স্যার ও এসিল্যান্ড অফিসে গিয়েছিলাম। তারা বলেছিল কোনো ঘর নাই আপাতত, তাহলে রিমন ভাই ঘর কীভাবে পায়। আসলে সব টাকার খেলা।
আশুতোষ পাল বলেন, চরকোন্ডা মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এ একপাশই আছে হিন্দুদের জন্য। এখানে সব হিন্দুদের ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যাতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা একসঙ্গে আনন্দ উৎসব পালন করতে পারি। কিন্তু এখন রিমন কয়েকজন মুসলমান পরিবারকে সেখানে ঘর বরাদ্দ দিয়েছে। এতে যেমন ধর্মীয় উৎসব পালনে আমরা বিব্রত হই, তেমনি যিনি ঘর পেয়েছেন তিনিও অস্বস্তিতে পড়েন। তিনি আরও বলেন, যদি চিকিৎসার জন্য আপনি ১৫দিন বাইরে থাকেন, তাহলে ফিরে এসে ঘর পাবেন কিনা সন্দেহ আছে। রিমন স্যাররা সব তালা দিয়ে দখল করে নিবে।
চর মাহতাবপুর (পাড়াগ্রাম) এলাকায় আবাসন প্রকল্প-১ এর সভাপতি নুর ইসলাম বলেন, অফিসের বাইরেও কয়েকজন দালাল আছে, যারা মন মতো লোকজনকে ঘর বরাদ্দ দেয়। এ প্রকল্পে ১৪০ ঘরের মধ্যে এখন ৭০টা মতো পুরাতন পরিবার আছে। আর সবগুলো হাত বদল হয়েছে। রিমনের নেতৃত্বে এসব হয়। আমিও শুনেছি টাকার বিনিময়ে এসব ঘর হাতবদল হয়েছে। এ ছাড়া আবাসন প্রকল্পে মাদকের উপদ্রব বেড়ে গেছে। পানিসহ নানা সমস্যা কিন্তু সমাধানে কেউ এগিয়ে আসে না। এ বিষয়ে অভিযুক্ত রিমন রহমান জানান, আমাকে ভূমি অফিস থেকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। আমি কাউকে ঘর থেকে বের করে দেয় নাই। এসিল্যান্ড অফিসের অনুমতি ছাড়া কাউকে নতুন করে ঘর দেয়ার সুযোগ নেই। যা করি অফিসের অনুমতি নিয়েই করি। অনেকে আছে মাসের পর মাস ঘরে থাকে না, কই আমি তো তাদের ঘরে তালা দেই না। আর টাকার বিনিময়ে ঘর দেয়ার প্রশ্নই আসে না। আসলে একটি চক্র আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আবাসন নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যেন তারা মাদক ব্যবসাসহ অপকর্ম করতে পারেন।
নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসিফ রহমান বলেন, আবাসন প্রকল্পগুলো আমরা দেখভাল করি। স্থানীয় চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় সব কাজ করা হয়। রিমনের ব্যাপারে আমি অবগত নয়। সেখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। খোঁজ নিয়ে দেখবো তাদের কি সমস্যা আছে।

Thursday, May 1, 2025
দোহার নবাবগঞ্জের আতঙ্ক ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ by শামীম আরমান ও ইমরান হোসেন সুজন
দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা ওই চিকিৎসককে অভয় দিয়ে স্বগর্বে বলেন, ডাক্তার সাহেব, আমরা ডাকাত, ডাকাতি করতে এসেছি, আপনাদের মারতে আসি নাই, তাই কোনো আওয়াজ করবেন না। ঘরে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণ আছে আমাদের দিয়ে দেন। এরপর নগদ দেড় লাখ টাকা ও ১০-১২ ভরি স্বর্ণ লুট করে নিয়ে যায়। তবে ডাকাতরা কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করেনি। এ ঘটনায় ওইদিনই নবাবগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ডাকাতরা তার বাড়ির জানালার গ্রিল কেটে ভিতরে প্রবেশ করে। ডাকাতদের একজন মধ্যবয়সী হলেও বাকিদের বয়স ১৫-২৫ এর মধ্যে। তারা সবাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেছিল। দেখে মনে হয়েছে সবাই শিক্ষিত এবং এখনো তুই তুরাকি শব্দ ব্যবহার করেনি। তবে সেই রাতেই স্মৃতি থেকে এখনো বের হতে পারছেন না তারা।
এর আগে ১৫ই এপ্রিল রাতে পার্শ্ববর্তী দোহার উপজেলার পশ্চিম সুতারপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. শাহজাহানের বাড়িতে সশস্ত্র হানা দেন ৬-৭ জনের একটি ডাকাতদল। একই কায়দায় রুমের গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ করে তারা। তখনো ডাকাতরাও মুখ ঢেকে শুধু হাফপ্যান্ট পরে এসেছিল বলে জানা যায়। ২৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ দেড় লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। এর একদিন পর একই কায়দায় উপজেলার নারিশা পশ্চিম চরের গাজী মাহফুজ কাকনের বাড়িতে হানা দিয়ে ৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ৫ লাখ টাকা লুট করে ডাকাতদল। ২ ঘটনার পর বাড়িতে থাকা সিসি ক্যামেরার ডিভিআর নিয়ে যায়। এরপর দোহার থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী পরিবার দু’টি।
জানা যায়, দোহারের দু’টি ও নবাবগঞ্জের একটি ডাকাতির ঘটনায় অনেক কিছুর মিল রয়েছে। সব ঘটনায় একই ধরনের আলামত রয়েছে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডাকাতির শিকার দোহারের ব্যবসায়ী শাহজাহান বলেন, হাফপ্যান্ট পরে মুখ ঢেকে ডাকাতরা বাসায় প্রবেশ করে সব লুট করে নিয়ে যায়। ওরা কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। আমরা ভয়ে তাদের সব দিয়ে দিয়েছি। যাওয়ার সময় তারা মামলা না করার হুমকিও দিয়ে যায়। আরেক ভুক্তভোগী একই উপজেলার নারিশা পশ্চিম চরের হাজী মাহফুজ কাকনও জানান একই কথা। তার বাড়িতেও গ্রিল কেটে হাফপ্যান্ট পরে ডাকাতরা প্রবেশ করে। তার গ্রিলের কাটা অংশে কাপড় পেঁচিয়ে রেখেছিল। তার সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি ডাকাতরা। শুধু ভয় দেখিয়ে হাত-পা-মুখ বেঁধে সব লুট করে নিয়ে যায়। এভাবে ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে দোহার-নবাবগঞ্জের মানুষের মাঝে। ২ উপজেলায় ডাকাতরা এখন ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ হিসেবে পরিচিত। দোহার ও নবাবগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, রাত হলেই এখন আতঙ্কে থাকি। বাসায় ঘুমাবো সেখানেও ডাকাত আতঙ্ক, আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রেখে আসি সেখানে চুরির আতঙ্ক। এদিকে, দোহারে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত একই পরিবারের ৩ জনসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরিদপুরের নগরকান্দা গ্রামের ছাগলদীর খোরশেদ মাতুব্বরের ছেলে ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর ও ভাংগা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের সরোয়ার মাতুব্বরের ছেলে মো. আকরাম মাতুব্বর, লুণ্ঠিত স্বর্ণ বিক্রি ও ডাকাতির তথ্য সংগ্রহ কাজে সহায়তা করা, ওমর আলীর স্ত্রী রাবেয়া বেগম ও মা কমেলা বেগম এবং স্বর্ণ কেনার অপরাধে একই উপজেলার বিনোকদিয়া গ্রামের গোসাই দাস পালের ছেলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল পালকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় তাদের কাছ থেকে ডাকাতির সময় ব্যবহৃত ১টি দেশীয় অস্ত্র ও লুণ্ঠিত ১০ আনা ১ রতি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে দোহার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম জানান, ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর কিছুদিন পূর্বে জামিনে বের হয়ে বাসাভাড়া নিয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা করে এবং চাঞ্চল্যকর দুইটি ডাকাতি সংগঠিত করে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা প্রাথমিকভাবে অত্র ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান তিনি। দোহার থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, দোহারের দুই ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫ জনের মধ্যে ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেয়ায় তাদের আদালত রিমান্ড দেয়নি। নবাবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ডাকাতির ঘটনায় প্রশাসন কাজ করছে। সারারাত নবাবগঞ্জে পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে দোহার থানা পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে।

Tuesday, September 10, 2024
অনিয়ম যেখানে নিয়ম: দালাল সিন্ডিকেটে পোয়াবারো হাসপাতাল-ক্লিনিকের
শক্তিশালী এমন দালাল সিন্ডিকেট ভাঙতে সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে মিটিং করেন। একের পর এক উপজেলা আইনশৃঙখলা সভায় বিষয়টি নিয়ে সরব আলোচনা থাকলেও পরবর্তীতে তা যেন অদৃশ্য কারণে নীরবতায় রূপ নেয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখানো মাত্র তাদের প্রেসক্রিপশন হাসপাতালের ভিতর থেকেই বেসরকারি ক্লিনিকের দালাল চক্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায় তাদের নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে করে খেটে খাওয়া অনেকে অসহায় মানুষ তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে হিমশিম খান। অনেকেই অর্থনৈতিক কারণে পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে না পেরে কোনো রকম ওষুধ কিনে ফিরে যান অল্লাহর উপর ভরসা করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি এক চিকিৎসক জানান, জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওৎ পেতে থাকেন বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধি (দালাল চক্র)। উন্নত চিকিৎসার নাম করে রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রকাশ্যে এমন কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও ক্লিনিকের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া মালিকপক্ষের সঙ্গে দালালচক্রের যোগসাজশও রয়েছে। শুধু দালালই নয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এর পার্শ্ববর্তী জায়গায় গড়ে উঠেছে ৫টি বেসরকারি ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক ন্টোর। অথচ, সরকারি হাসপাতালের খোদ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার দিয়েই এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করা হয়েছে। যার কারণে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা রোগীদের প্রয়োজন মনে করলে আল্ট্রা, ইকোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিয়ে তারা সরকারি হাসপাতালের ডিউটির সময়ে বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে সেবা প্রদান করেন। এর ফলে সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ রোগী। শুধু তাই নয় হাসপাতালের অনেক ডাক্তারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক ভালো থাকায় তাদের সরকারি সেবা না দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগীদের ভালো সেবার কথা বলে সেখানে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ সুযোগে সরকারি হাসপাতালের পাশে গড়ে ওঠা পার্শ্ববর্তী ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিকের দালাল চক্র সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন শিপ্টে ভাগ করে বিভিন্ন ডাক্তারের রুম ও জরুরি বিভাগে অবস্থান করেন। এ ছাড়া প্রশাসন অথবা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সিসি ক্যামেরায় দেখলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জসিম উদ্দিন বিভিন্ন ডাক্তার ও কর্মচারীদের ফোনে সতর্ক করে দেন।
ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, আমাদের কাছে হাসপাতাল বা ডা. জসিম উদ্দিনের ব্যাপারে কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবো। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সবসময় তো আমরা বসে বসে দালালদের পাহারা দিতে পারবো না। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতা প্রয়োজন। পুলিশ বিভাগ থেকেও সহায়তা দরকার। এ ছাড়া যারা দালাল নিয়োগ করেছেন তাদেরও এ ধরনের অপকর্ম থেকে সরে যাওয়া উচিত। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

Saturday, August 3, 2024
ঢাকার পয়েন্টে পয়েন্টে বিক্ষোভ-অবস্থান
আফতাবনগরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কর্মসূচিতে অংশ নিতে জড়ো হয়েছেন কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে রামপুরার আফতাবনগরের জড়ো হন তারা। এ সময় ব্যাপক পুলিশ সদস্যের অবস্থানও লক্ষ্য করা যায়। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রাজধানীর বাড্ডা রামপুরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। এ সময় বাড্ডা থানার অর্ধশতাধিক পুলিশ রাস্তা থেকে সরে গেছে।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ইউআইটিএস ও সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অংশ নিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, এদিন সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শিক্ষার্থীরা অবস্থান শুরু করেন। পরে ১১টা ৫০ মিনিটে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী একযোগে ৯ দফা দাবি আদায়ে স্লোগান দেয়া শুরু করেন।
তারা বলেন, ‘নয় দফা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরবো না। দেশজুড়ে আমাদের ভাই-বোনদের হত্যা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
বনশ্রী বি ব্লকের সামনে আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগন দিতে থাকেন। এছাড়া সায়েন্সল্যাবে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ নানা স্লোগান দিচ্ছেন তারা। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে সকাল থেকে অনেক পুলিশ সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
এদিকে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে অবস্থান নিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে দুপুর ১টার দিকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্রে করে সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করে 'আমার ভাই মরল কেন'সহ বিভিন্ন শ্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। রাজধানীর শনির আখড়ায় সড়কে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা নানা ধরনের স্লোগান দিচ্ছেন। রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়িতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
উল্লেখ্য, সারা দেশে আজ শনিবার বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল শুক্রবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ফেসবুক লাইভে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান।
একইসঙ্গে আগামীকাল রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তারা। ‘সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে খুনের প্রতিবাদ ও ৯ দফা’ দাবিতে এই কর্মসূচির ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
মেট্রোরেল চালু হবে কবে? by নাজমুল হুদা
কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গত ১৮ই জুলাই ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় ব্যাপক সংঘাত হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। ওই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওভার ব্রিজের উপর। সংঘর্ষ চলমান থাকায় তখন মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে ওই সময়ে অন্য স্টেশনগুলোতে চলছিল মেট্রোরেল। একইদিন বিকাল ৫টার দিকে ডিএমটিসিএল এক বিজ্ঞপ্তিতে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অনিবার্য কারণবশত জননিরাপত্তার স্বার্থে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে সর্বশেষ মেট্রো ট্রেন বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।’ তবে ওই বিজ্ঞপ্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে মেট্রোরেলে চলাচল করা যাত্রীদের। আগের মতো লক্কড়-ঝক্কর বাসে চলাচল করতে হচ্ছে তাদের। আগের মতো বাসে যানজটে নাকাল অবস্থার মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রশ্ন তুলেছেন মেট্রোরেল বন্ধ রাখা নিয়ে। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনে মেট্রোরেলের দুই/একটি স্টেশন ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দুই/একটি টোল প্লাজা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেট্রোরেলের ইঞ্জিন, বগি ও লাইনের কোনো ক্ষতি হয়নি বলেই জানি। সে কারণে, ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনগুলো বন্ধ রেখে, মেট্রোরেল অবিলম্বে চালু করা সম্ভব বলে মনে করছি। একইভাবে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল অবকাঠামোর কোনো ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়নি। প্রয়োজনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টোল আদায়ের ব্যবস্থা করে যান চলাচল পুনরায় শুরু করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অজুহাতে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ রেখে মানুষকে কষ্ট দেয়া উচিত নয়। এগুলো সাধারণ মানুষের অর্থে সাধারণ মানুষের সেবার জন্যই নির্মাণ হয়েছে। জনগণ এখন মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কষ্ট পাচ্ছে। মেট্রোরেলের ইঞ্জিন, বগিসমূহ ও লাইনের কোনো ক্ষতি হয়নি বলেই জানি। এই সেবাগুলো চালু রাখাও সরকারেরই দায়িত্ব।
ক্ষতিগ্রস্ত দুই স্টেশন ছাড়া বাকি স্টেশনে মেট্রোরেল চালু করা হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে ডিএমটিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক এর কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এই মুহূর্তে আমি কিছু বলতে পারবো না। এখনো আমরা কেনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী মানবজমিনকে বলেন, কবে মেট্রোরেল চালু হবে সেটা আমরা বলতে পারবো না। জাপানের এক্সপার্ট টিম দেখে গেছে। শুধু দু’টো স্টেশন নয়, আমাদের প্রসেসটা পুরো সিস্টেম নিয়ে চলে। এক্সপার্টরা কাজ করছে। তারা মতামত দিবে। মতামত পেলে আমরা বলতে পারবো। আমরা যত দ্রুত সম্ভব মেট্রোরেল চালানোর চেষ্টা করবো। সময়টা বলতে পারছি না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত দু’টো স্টেশন ঘিরে একটা তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সেখানে টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞরা আছে। তাদের পর্যবেক্ষক দল আসার আগেই যে, বলা হচ্ছে এক বছর লাগবে, ছয় মাস লাগবে; এটা না বলাই যৌক্তিক। তিনি বলেন, মেট্রোরেলে কমিউনিকেশন সিস্টেমে কোনো ক্ষতি না হলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দু’টো স্টেশনে কাঠামোগত ক্ষতি না হলে ওই দু’টি স্টেশন সাময়িক বন্ধ রেখে মেট্রোরেল চলানো যেতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনের সংস্কার চলতে পারে। তিনি বলেন, মেট্রোরেল অপারেশনের সময় সবগুলো স্টেশন তো একসঙ্গে খোলা হয়নি। ধাপে ধাপে খোলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত দুই স্টেশনে যেসব বিষয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সংস্কার কাজ চলতে থাকুক। বাকি স্টেশনগুলো চালু করে মেট্রো চালানো যেতে পারে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক মানবজমিনকে বলেন, আগুনে ভায়াডাক্টের কোনো কাঠামোগত সক্ষমতার ক্ষতি হয়েছে কিনা সেটা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হয়। এটা খুব দ্রুত করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে এই পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল। এই ধরনের বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশেও আছে। অর্থাৎ যখনই জানা যাবে, এখানে কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি তারপর দিন থেকেই দুই স্টেশনে না থেমে মতিঝিল পর্যন্ত অপারেশন চালানো যায়। তবে ওই স্টেশনের সেবা দিতে গেলে পুরো স্টেশনকে সংস্কার করতে হবে। নতুন উপকরণ বিদেশ থেকে নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনগুলোর কাজও দ্রুত ঠিক করা যায়। কমলাপুর পর্যন্ত লাইন বাড়ানো হচ্ছে। সেখানে এই ধরনের স্টেশনের উপকরণ পাইপলাইনে আছে। এটাকে ওই জায়গায় না লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনে ব্যবহার করা যেতে পারে।
Tuesday, March 17, 2020
তাজমহলের প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসা থেকে শিক্ষা নিতে পারে নব্য মোগলবিদ্বেষী ভারত
নারায়ণগঞ্জে নির্মিত বাংলার তাজমহলটি অবশেষে খুলে দেওয়া হয় ২০০৯ সালের ঈদের ঠিক আগে দিয়ে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। মূল আকারে বিচ্যুতি, রঙের বাহুল্য প্রয়োগ ও প্রশ্নবোধক অভিনব নক্সার কারণে এটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
স্থানীয় এক ব্লগার প্রথম পর্যটকদের হতাশা প্রতিফলিত করে বলেন, “তাজমহলটি দেখে আমার মুখ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে কথা বের হলো তা হলো: ‘শালা, শালা।’”
হিন্দি ছবির নিম্নমানের নকলের জন্য কুখ্যাতি (এখন মোগল স্থাপনার জন্যও) অর্জনকারী মনি বলেন, এই বিনিয়োগ আসলে তার দান-খয়রাত। তিনি বলেন, প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখে তাজমহল দেখার। কিন্তু ব্যয়বহুল হওয়ায় খুব কম বাংলাদেশীই তা দেখতে পারে।
![]() |
| ঢাকার কাছে তাজমহলের আদলে তৈরি স্থাপনা একটি জনপ্রিয় পর্যটক আকর্ষণ |
প্রবেশের টিকেটের দাম অনেক বেশি (১০০ টাকা, ভারতের মূল তাজমহলে প্রবেশ করতে লাগে ৪০ রুপির টিকেট) হওয়া সত্ত্বেও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এখনো এটি জনপ্রিয় স্থান। এর কারণ হলো বিশ্বের অত্যশ্চার্য স্থানগুলোর একটি তারা বাংলাদেশেই পাচ্ছে।
স্থাপনাটির চিত্র বাংলাদেশের রিকশা আর্টের অন্যতম জনপ্রিয় বিষয়। অসংখ্য রেস্তোরাঁ, কমিউনিটি সেন্টারের নাম এর নামে রাখা হয়েছে। সরকারি অফিস আদালতগুলোতেও এর মার্বেল গম্বুজ দেখা যায়। সরকারি মগ, ক্যালেন্ডারেও দেখা যায় তাজমহল।
অতীতের সাথে সম্পর্ক
সীমান্তের ওপারে পাকিস্তানেও জাতীয় পরিচিতি-সংশ্লিষ্ট বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাজমহল। পাকিস্তানের জনগণ মনে করে মোগল সাম্রাজ্যের সহজাত উত্তরাধিকারী হিসেবে তারাই তাজমহলের ওপর নৈতিক অধিকার রাখে।
ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নবোধকতা ছাড়াও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই পাকিস্তানকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা অপমানজনক। পূর্ব বাংলাও ছিল মোগল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৬০৮ সালে ঢাকা (তখন পরিচিতি ছিল জাহাঙ্গীরনগর হিসেবে) হয় বাংলা প্রদেশের রাজধানী। কলকাতা তখন ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর শহর। এ কারণেই বাংলাদেশে এখনো মোগল স্থাপনা দেখা যায়। এর উদারণ হলো ঢাকার লালবাগ দুর্গ ও সাত গম্বুজ মসজিদ। অবশ্য সার্বিকভাবে মোগল স্মারক দুর্লভ ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
![]() |
| ঢাকার কাছে তাজমহলের আদলে তৈরি স্থাপনা একটি জনপ্রিয় পর্যটক আকর্ষণ |
অবশ্য বাংলাদেশীদের মধ্যে তাজমহলের প্রতি আকর্ষণ মোটামুটিভাবে ধর্মীয় নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশ সরকার কেন তার সরকারি মগে তাজমহলের ছবি রাখে, এ প্রশ্নের জবাবে এক সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা ও ওই মগের গর্বিত মালিক বলেন, ‘খুব সম্ভবত, এটি সুন্দর দেখায় বলে।’
গত বছর বাংলার তাজমহল পরিদর্শনের সময় আরো বেশি আনন্দ লাগল একই ধরনের আকারে মিসরীয় পিরামিডও সেখানে দেখে। মিসরীয় দূতাবাস দৃশ্যত কপিরাইট লঙ্ঘন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।
![]() |
| তাজমহল রেপ্লিকার সামনে বিক্রি হচ্ছে স্যুভেনির |
Thursday, February 20, 2020
অকার্যকর মেগাসিটি: ঢাকা কেন নর্দমায় সয়লাব
![]() |
| বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর ঢাকা |
পথচারীরা হাতুরি বেলচা দিয়ে রাস্তা খুঁড়ে ফেলেছিল। এক পর্যায়ে তিনজনকে পাওয়া গেলো, মৃত। বাকি চারজনের অবস্থা খুবই গুরুতর। এদের একজন হাসপাতালে মারা যায়। সুজন বললেন, “ওই ঘটনায় আতঙ্ক ভর করে আমাদের মধ্যে। বহু মাস এরপর নর্দমার দিকে তাকাতেও ভয় করতো।”
বাংলাদেশের প্রবল বর্ষার মৌসুমে ঢাকা মাসে কয়েকবার পানির নিচে চলে যায়। ড্রেনগুলোতে অতিরিক্ত চাপ আর শহর নিচু হওয়ায় বাথটাবের মতো সবসময় পানি ভর্তিই থাকে ঢাকা। ঢাকা ট্রিবিউনের মতো পত্রিকাগুলোর পাতা পানিতে ডোবা বাসের ছবিতে ভর্তি হয়ে যায়। শহর বিশেষজ্ঞদের সেই পুরনো অভিমত: ‘আবারও পানির নিচে ঢাকা’ অথবা ‘সেই একই পুরনো অবস্থা’।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে ভারি বৃষ্টিপাতের সময় পথচারীদের এমনকি রাস্তার এপার ওপার যেতেও রিক্সা ব্যবহার করতে হয়েছে।
![]() |
| ঢাকা শহরের স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে বর্ষাকালে তা প্রায়ই উপচে পড়ে, ছবি: গেটি ইমেজ |
জাতিসংঘ হ্যাবিটেটের মতে, ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহর। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এখানে ৪৪,৫০০ জনেরও বেশি মানুষের বসবাস। প্রতিদিনই গ্রাম্য এলাকা থেকে আরও মানুষ আসছে। ক্লিনারদের মাসিক রোজগার গড়ে ২২৫ পাউন্ডের মতো। নিজেদের স্বাস্থ্য ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনসংখ্যার ভাড়ে ন্যুব্জ এখানকার অবকাঠামোগুলোকে কোনরকমে ঠেকিয়ে রেখেছেন তারা।
বহু বহু মানুষ, অতি সামান্য সম্পদ
অতিরিক্ত জনসংখ্যা বলতে বোঝায় কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের বসবাস। অথবা, বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে যত মানুষের জীবন নির্বাহ সম্ভব, তারও অতিরিক্ত মানুষ। এ সব বিবেচনায় ঢাকা একেবারে আদর্শ উদাহরণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশান সায়েন্স বিভাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর অধ্যাপক নুরুন্নবী বললেন, “পৃথিবীতে ঢাকার চেয়েও বড় শহর রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি সেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির দিকে তাকান, তাহলে জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি।”
অতিরিক্ত ঘনবসতি না থাকলেও শহর ঘনবসতিপূর্ণ হতে পারে। সিঙ্গাপুর একটি ছোট্ট দ্বীপ। সেখানকার জনসংখ্যার ঘনত্বও কম নয়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০,২০০ জন। কিন্তু খুব অল্প মানুষই একে অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ বলবে। নাগরিকদের বসতির জায়গা সঙ্কুলানের জন্য বহুতল ভবন গড়া হয়েছে। উপরের দিকে বেড়েছে শহর। অনেক জায়গায় ছাদেও স্কাই-গার্ডেন তৈরি করা হয়েছে।
জনসংখ্যা অতিরিক্ত হয়ে ওঠে তখন, যখন বারতি মানুষের ব্যবস্থাপনার আর কোন উপায় থাকে না।
‘বাধ্য হয়ে এ কাজ করছি’
সুজন বললেন, সরকার ঢাকা শহরটাকে ভালোভাবে পরিচালনার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতটা আশা ছিল, ততটা সফল হয়নি তারা। ঢাকার মধ্যভাগে মোটামুটি ধরনের ফ্লাটে পরিবার নিয়ে বাস করে সে। দুধ চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথা বলছিল সে। পাশেই পানিতে ডুবে থাকা চিপা রাস্তা দিয়ে ঘন্টা বাজিয়ে চলছে রঙচঙা রিক্সাগুলো।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বেশির ভাগ মুসলিম হলেও সুজনের মতো আরও অনেক হিন্দু রয়েছে এ পেশায়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হিন্দুদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়। এখনও তারা বৈষম্যের শিকার। সুজন আবার দলিত শ্রেণীর হিন্দু। পুরো এশিয়াতেই তাদেরকে দেখা হয় ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে। এবং নিকৃষ্ট ধরনের কাজ করতে হয় তাদের। বাংলাদেশে তাদেরকে ডাকা হয় মেথর নামে। অর্থ হলো যারা বিষ্ঠা পরিস্কার করে।
![]() |
| বর্ষাকালজুড়ে ঢাকায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করে, ছবি: এএফপি |
সে জানালো, “পচে যাওয়া বর্জ্যের কারণে নর্দমার নালাগুলো অ্যাসিডিক ও বিষাক্ত হয়ে আছে। তাই ক্লিনাররা শতভাগ নিশ্চিত যে তাদের স্বাস্থ্য সমস্যা হবেই। বিশেষ করে চর্মরোগ হবেই। প্রায়ই তারা এটা বুঝতেও পারে না। স্থানীয় মদের দোকান থেকে তারা মদ কিনে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকে। ঘুমিয়ে গেলেই দুনিয়া থেকে অন্য জগতে চলে যায় তারা। তাদের জ্ঞান থাকলে হয়তো তারা বুঝতে পারতো, স্বাস্থ্যের কি ক্ষতি হচ্ছে তাদের।”
সবচেয়ে নিম্ন বাসযোগ্য শহর
ঢাকায় বসবাস করা মানেই নানা দুর্ভোগের মধ্যে থাকা। যারা গরিব, তারা গজিয়ে ওঠা বস্তিগুলোতে গাদা করে থাকে, যেখানে সংক্রামক রোগব্যাধি এবং আগুন বাতাসের গতিতে ছড়ায়। ঢাকার জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই বস্তিবাসী। মধ্য আর উচ্চবিত্ত শ্রেণীকে আবার তাদের বড় একটা সময় রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকতে হয়। এই শহর প্রায় নিয়মিত ‘সবচেয়ে নিম্ন বাসযোগ্য শহরের’ তালিকার উপরের দিকে থাকে। এ বছর নাইজেরিয়ার লাগোস এবং যুদ্ধ-বিধ্বস্ত লিবিয়া ও সিরিয়ার রাজধানীর পরেই ঢাকার অবস্থান।
আর অনেকটা মজা করে সেটাকেই একটা উন্নতি হিসেবে মন্তব্য করলেন অধ্যাপক নুরুন্নবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের অফিসে বসে কথা বলছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটাতে বেশ কিছু গাছপালা থাকার কারণে একটা সবুজ চেহারা পেয়েছে ক্যাম্পাস, যেটা রাজধানীর আর অন্য কোথাও দেখা যাবে না। নিজের বিষয়টাকে অনেকটা হাস্যরস আর আশাবাদের মিশ্রন হিসেবে দেখেন অধ্যাপক নবী। তিনি বললেন, “এই র্যাংকিংয়ে কয়েক বছর আমরা এক নম্বরে ছিলাম।”
সব সময় অবশ্য চিত্রটা এমন ছিল না। নবী মনে করার চেষ্টা করলেন। ষাটের দশকে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার আগে ঢাকায় শূন্য সড়কে পথ চলতে হতো। পুরনো ঢাকায় মুঘল আমলের ক্যানালগুলোতে গোসল করতো মানুষ। ওই এলাকায় এখনও কয়েক শতাব্দি পুরনো বাড়িঘর রয়েছে। যদিও এগুলোর অনেকগুলো উন্নয়নের চাপায় হারিয়ে গেছে। ক্যানালগুলোও ভর্তি হয়ে গেছে। আর সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে নর্দমা নিষ্কাষণের পথগুলো।
পৃথিবীর আরও বহু জায়গার মতোই বাংলাদেশেও দ্রুত, অপরিকল্পিত শহরায়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধার সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়ন। সাথে এসেছে গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়। সে কারণে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ রাজধানীতে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেছে। এতে প্রচুর চাপ পড়েছে সীমিত সম্পদের উপর। অধ্যাপক নবী বললেন, “আমরা দেখছি গ্রামীণ এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ শহরের দিকে আসছে। মানুষ আসছে তো আসছেই। তাদের বসবাসের জন্য যথেষ্ট আবাসনের ব্যবস্থা কি আমাদের আছে? গরিব মানুষদের বসবাসের জন্য ব্যবস্থা কোথায়?
![]() |
| ঢাকার একজন স্যুয়ারেজ ক্লিনার, ছবি: বারক্রফট |
দুজন আলাদা মেয়রসহ সরকারের সাতটি দফতর জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করছে। এই জটিলতার কারণে একে অন্যের উপর দায় চাপানোটা সহজ হয়ে গেছে। গত জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাইদ খোকন হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে বলেন এ পরিস্থিতির জন্য ওয়াসা দায়ী। কিন্তু তাদেরকে কাজে দেখা যায় না। এর পরপরই খোকনকে দোষারোপ করে ওয়াসা। এর আগে, ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকও বিভিন্ন জলমগ্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি এমন প্রশ্নও করেন যে: “কেউ একজন আমাকে বলুন, এর কি সমাধান?”
‘এ জাতির লোকেরা আরও বহু গল্প লিখবে’
কিন্তু অকার্যকর প্রশাসন বাংলাদেশে কাজ সম্পাদনের জন্য সবসময় বাধা হয়ে থাকেনি। এই দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রশংসা পেয়েছে।
কিছু শহরবিদ এখন বস্তিগুলোর ব্যাপারে বিদ্যমান নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে চাইছেন। শহরের বিস্তারের ফলে যেহেতু জন্ম হার কিছুটা কমে, তাই তাদের মতে এটাকে খানিকটা সমাধানের অংশও ভাবা যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন যে শহুরে এলাকার সীমিত পরিসরে যে সব সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে, সেগুলো পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং সরকারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে।
নবী বলেন, “রাজনৈতিক দলের কথা ভুলে যান, কিন্তু এ দেশের মানুষ আরও অনেক গল্প লিখবে। একদিন জনগণ জেগে উঠবে এবং রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে।”
Wednesday, September 25, 2019
ঢাকায় কাশবন ছুটছেন মানুষ by নূরে আলম জিকু

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












