Tuesday, April 7, 2015

নৌপরিবহনমন্ত্রী অযথা দুর্ভোগ বাড়ালেন

খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ০৫ এপ্রিল ২০১৫ রাজধানীতে
শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী-মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের
গণপদযাত্রা। ওই কর্মসূচির কারণে সড়কের এক পাশে যান
চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে প্রচণ্ড যানজটে
পড়তে হয় নগরবাসীকে। পরীবাগ সংলগ্ন কাজী নজরুল
ইসলাম অ্যাভিনিউ থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আদালতে হাজির হওয়ার দিনটিতে রাজধানীর যান চলাচলে যে বাড়তি চাপ পড়তে পারে, তা নগরবাসীর ধারণার বাইরে ছিল না। রাজধানীবাসীকে এখন আগাম সাত-পাঁচ ভেবে পা ফেলতে হয়। সে কারণে তাঁরা হয়তো আদালতপাড়া ও বিএনপির নেত্রীর বাসভবনে চলাচলের বিষয়টি মাথায় রেখে দিনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু নগরবাসী উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে দৃশ্যত খোদ নৌপরিবহনমন্ত্রী ঠিক ওই দিনই পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিলেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত ওই পদযাত্রা কর্মসূচির কারণে পুলিশ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বলেছেন, ‘নৌপরিবহনমন্ত্রীর পদযাত্রা কর্মসূচির কারণে রাস্তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’ কিন্তু তিনি এটা প্রকাশ করেননি যে কোন ক্ষমতাবলে তাঁরা রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন। আইনসংগতভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাঁর ছিল কি না। যদি তর্কের খাতিরে কেউ মেনেও নেন যে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের দাবিতে তাঁর আদালতে হাজির হওয়ার দিনটিতেই নৌপরিবহনমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রীকে রাস্তার ওপরে ট্রাকে স্থাপন করা মঞ্চে বক্তৃতা করতে হবে এবং পদযাত্রার মতো কর্মসূচিও দিতে হবে, তা হলেও সরকারের তরফে এই ভাষ্য আসা দরকার যে এ ধরনের কর্মসূচি পালনে সরকারের কোন কর্তৃপক্ষের কাছে এ জন্য কবে কখন অনুমতি চাওয়া হয়েছিল এবং কী শর্তে তা মঞ্জুর করা হয়েছিল। এটা যদি অনুমতিপ্রাপ্ত না হয়, তাহলে বলতেই হবে যে গ্রেপ্তার হওয়ার দাবি তুলতে গিয়ে তিনি নিজেই আইনের পরিপন্থী কাজ করেছেন। আমরা জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে যেকোনো ধরনের হরতাল, ধর্মঘট, পিকেটিং ইত্যাদি ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতিবাদ করে আসছি, সেই অবস্থানের ধারাবাহিকতায় নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন পদযাত্রা কর্মসূচিরও নিন্দা জানাই। এই কর্মসূচি ছিল অপ্রয়োজনীয় ও অসময়োপযোগী।

‘নির্বাচন কমিশন ফরমায়েশী ভূমিকা পালন করছে’

৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও নির্বাচন কমিশন সরকারের ফরমায়েশী ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। গণমাধ্যমে পাঠানো দলের সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এ অভিযোগ করেন। নজরুল ইসলাম খান বলেন,  দেশের প্রচলিত আইনে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ স্থানীয় সরকারের কোন পদে নির্বাচনের জন্য কোন রাজনৈতিক দল কাউকে মনোনীত করতে পারে না এবং সরকারি পদধারী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ এসব নির্বাচনে কোন প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না। অথচ মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে আনিসুল হকের প্রতি তার সমর্থন ঘোষণা করেছেন এবং পরবর্তীতে তার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত দলীয় সভায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই নিয়ে পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে টক শোগুলোতে পর্যালোচনা ও সমালোচনা হলেও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনিয়ম পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন না শোনা, না জানা ও না বোঝার ভান করে নিন্দা কুড়ালেও লজ্জিত হয়েছে বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা দেয়ার জন্য সামান্য এক ত্রুটি দেখিয়ে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিয়েছে। নামে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বর্তমান বশংবদ নির্বাচন কমিশন ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনী প্রহসনে যেমন ফরমায়েসী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করে বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছে-এবারও তারই পুনরাবৃত্তি শুরু করেছে। যেদিন মিন্টুর মনোনয়নপত্রে সমর্থনকারীর বিষয়ে প্রশ্ন তুলে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে সেই একই দিনে মনোনয়নপত্রের ছোটখাটো ভুল সংশোধনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোশনের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার প্রার্থীদের কয়েক ঘন্টা সময় দিয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসার তেমন সুযোগ দিলে জনাব মিন্টু ওই নির্বাচনী এলাকার লাখ লাখ সমর্থকের মধ্য থেকে একজনকে সমর্থক হিসাবে দেখাতে পারতেন। অন্যদিকে মিন্টুর সমর্থনকারী ঢাকা মহানগরের বাসিন্দা হিসেবে প্রয়োজনীয় সব প্রমাণ হাজির করা সত্বেও আপিল নিষ্পত্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা তা আমলে না নিয়ে মনোনয়ন পত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় জনাব মিন্টুকে উচ্চ আদালতে যেতে হয়েছে। নজরুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকাবাসীর পাশাপাশি মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী জেনেছেন যে, বিরোধী দল সমর্থক জনপ্রিয় বহু প্রার্থীকে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা কিভাবে নমিনেশন পেপার কিনতে বাধা দিয়েছে, নমিনেশন পেপার কেনার অপরাধে হেনস্তা করেছে এবং নমিনেশন পেপার জমা না দেয়ার জন্য অন্যায়ভাবে চাপ দিয়েছে। মিরপুরের এক মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়ন পত্র কেনার পর বাসায় তাকে না পেয়ে তার স্বামীকে নির্দয় নির্যাতন করে গ্রেফতার করা হয়েছে। এধরণের কর্মকান্ডের উদ্দেশ্য হলো সরকার দলীয় প্রার্থীদের যেকোনভাবে বিজয়ী করা। এসব ব্যাপারেও নির্বাচন কমিশন স্বজ্ঞানে নিশ্চুপ হয়ে আছে। তিনি বলেন, নানা মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বিএনপি ও ২০ দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে কারাগারে আটক, পায়ে গুলি করে পঙ্গু কিংবা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য করা এবং বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে গুম করে নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করার সুযোগে সরকার শূন্য মাঠে গোল দেয়ার উদ্দেশ্যে হঠাৎ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি ও ২০ দলের কৌশলী সিদ্ধান্তের ফলে গোটা পরিস্থিতি তাদের বিপক্ষে চলে যাওয়ায় এখন আজ্ঞাবহ প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে মাঠে নামিয়েছে। তিনি বলেন, গত ৬টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় প্রমাণ করেছে যে জনগণ মোটামুটি শান্তিপূর্র্র্ণ পরিবেশ পেলে খুন, গুম এবং জনগণের অধিকার ও অর্থলুটকারী সরকারের সমর্থক প্রার্থীদের ভোট দেবে না। সেকারণেই সরকার বিরোধী দলের প্রার্থীদের ওপর অত্যাচার করে, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে এবং সর্বশেষ মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিলের হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে সংকট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। আমরা অবিলম্বে এসব অপতৎপরতা থেকে বিরত হওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির মতো নির্বাচনী নাটক করার যে কোন প্রচেষ্টা জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে অবশ্যই প্রতিহত করবে।

দূষিত খাবারে মরছে ২০ লাখ মানুষ

পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এবারের স্লোগান
নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার, সুষ্ঠু জীবনের অঙ্গীকার
ক্ষুধা লাগুক আর না লাগুক সব সময়ই এটা-সেটা খাচ্ছি আমরা। তৃষ্ণা মেটাতে পান করছি পানি, কোমল পানীয় ও চা-কফি। কিন্তু এসব খাবার কতটা স্বাস্থ্যকর তার খবর কি আমরা রাখি? খাবারের সঙ্গে মিশে থাকছে বিষ! তা তিলে তিলে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে মরণব্যাধি ক্যানসারসহ নানা রোগের দিকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে দূষিত খাদ্য খেয়ে ও পানি পান করে প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা যায়।
আজ ৭ এপ্রিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। বাংলাদেশে এবার দিবসটি পালিত হচ্ছে ‘নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার: সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিপাদ্য ‘খামার থেকে বাসন পর্যন্ত নিরাপদ রাখুন খাবার’।
খাদ্য ও পানিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া, প্যারাসাইটস, ভাইরাস ও নানা রাসায়নিক পদার্থের কারণে দুই শরও বেশি রোগ হতে পারে। লাখ লাখ মানুষ এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে মৃত্যুও ঘটে অনেকের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয়ে বছরে ১৫ লাখ শিশু মারা যায়। আর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার এসব ঘটনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে খাবার ও পানীয় থেকে। অথচ সঠিকভাবে খাবার প্রস্তুত করা হলে খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ অনেকটাই সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া এ বিষয়ে জানিয়েছে।
অনিরাপদ খাবার থেকে স্নায়বিক রোগ এমনকি ক্যানসারও হতে পারে। খাবারের সমস্যা থেকে সাধারণত যেসব উপসর্গ বেশি দেখা যায় তার মধ্যে আছে পেটে ব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া। খাবারের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত ধাতব কিংবা প্রাকৃতিকভাবে থাকা টক্সিনের কারণে এমন হতে পারে। অন্যদিকে ভেজাল দুধ হচ্ছে আরেক সমস্যা। দুধ যেন দ্রুত নষ্ট না হয়, সে জন্য সরবরাহকারীরা দুধের মধ্যে অনেক সময় লবণ ও আখের রসের চিনি মেশায়। এ দুধ পানের ফলে একাধিক ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দেয়।
যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময় নানাভাবে খাবারে পচন ধরতে পারে। খাবার ঠিকমতো সংরক্ষণ না করলে, রান্না বা খাবারের আগে তা ভালোভাবে ধোয়া না হলে, অথবা ভালোভাবে রান্না না হলে খাবারে পচন ধরতে পারে। বর্তমানে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ফসল উৎপাদন, কর্তন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বিতরণের মতো নানা ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাই খাবার নিরাপদ থাকাটা জরুরি। খাদ্যবাহিত রোগে সবচেয়ে বেশি ভুগে থাকে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, অসুস্থ এবং বয়স্করা। এমন কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আছে যা ওষুধের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা এখন পুরো বিশ্বেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে সরকার, শিল্প কারখানা, উৎপাদক, বিদ্যায়তন ও ভোক্তা পর্যায়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
নিরাপদ খাবারের জন্য বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। আপনি নিজে এ বিষয়ে সচেতন হোন, আপনার পরিবারকে সচেতন করুন এবং কাছের মানুষদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করুন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
-খাবার ধরার আগে বা তৈরির আগে হাত ধুয়ে নিন
-শৌচাগার থেকে বের হয়ে অবশ্যই হাত ধুয়ে নিতে হবে
-রান্নাঘর পরিষ্কার রাখুন। কেননা সেখানেই সবচেয়ে বেশি জীবাণু থাকে
-পোকামাকড় ও পোষা প্রাণী থেকে খাবার দূরে রাখুন
খাবার আলাদা রাখুন
-মাংস, পোলট্রি ও সামুদ্রিক খাবার অন্য খাবার থেকে আলাদা রাখুন
-শুধু ঘরেই নয়, কেনাকাটার সময়ও এগুলো খেয়াল রাখতে হবে
-টাটকা খাবার প্রক্রিয়াজাত করার সময় ছুরি ও কাটিং বোর্ড ব্যবহার করতে হবে
-কাঁচা খাবার ও তৈরি খাবার যাতে মিশে না যায় সে জন্য আলাদা পাত্রে রাখুন
রান্না করতে হবে ভালো করে
-বিশেষ করে মাংস, ডিম ও সামুদ্রিক খাবার ভালো করে রান্না করতে হবে। যাতে মাংসের ভেতরকার পানি না থাকে
-স্যুপ জাতীয় খাবার অবশ্যই ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় রান্না করতে হবে
-রান্না করা খাবার পরে খেলে খাওয়ার আগে আবার গরম করে নিন
খাবার রাখতে হবে নিরাপদ তাপমাত্রায়
-ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় খাবার দুই ঘণ্টার বেশি রাখা যাবে না
-রান্না করা সব খাবার এবং পচনশীল খাবার ফ্রিজে ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার নিচে রাখতে হবে
-ফিজে রাখা খাবার পরিবেশনের আগে ৬০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় গরম করতে হবে
-ফ্রিজেও বেশিদিন খাবার সংরক্ষণ করা উচিত নয়
-ফ্রিজে রাখা খাবার কখনো ঘরের তাপমাত্রায় গলানো উচিত নয়
নিরাপদ পানি ব্যবহার
-নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন অথবা পানিকে আগে নিরাপদ করুন
-তাজা ও স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচন করুন
-স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রক্রিয়াজাত খাবার ব্যবহার করুন। যেমন পাস্তুরিত দুধ
-মেয়াদউত্তীর্ণ খাবার ব্যবহার করবেন না

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করতে এইচআরডব্লিউ’র আহ্বান

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ‘ত্রুটিপূর্ণ বিচার প্রক্রিয়ায়’ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামরারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ড স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে। এইচআরডব্লিউ’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবিলম্বে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ডের রায় স্থগিত করা এবং মামলাটি স্বাধীনভাবে পুনর্বিবেচনা না করা পর্যন্ত তা কর্তৃপক্ষের মুলতবি রাখা উচিত।
এতে বলা হয়, ‘গুরুতর ত্রুটিযুক্ত’ বিচারের পর ২০১৫ সালের ৬ই এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ডের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দেয়, যার অর্থ তিনি আসন্ন মৃত্যুদ-ের সম্মুখীন। এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, মৃত্যুদন্ড একটি অপরিবর্তনযোগ্য ও নিষ্ঠুর শাস্তি। বিচার বিভাগ যখন এ ধরনের শাস্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গরূপে পুনর্বিবেচনা করতে ব্যর্থ হন, তখন সেটি আরও গর্হিত পর্যায়ে উপনীত হয়। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচারসমূহ নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের পুনঃপুনঃ ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের মহামারীতে বিপর্যস্ত, যেখানে পক্ষপাতহীন বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা আবশ্যক। গতকাল হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশ: সাসপেন্ড ডেথ সেনটেন্স অব ওয়ার ক্রাইমস অ্যাকিউজড’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানানো হয়।
ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ১৯৭১ সালে ভয়াবহ যেসব যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, তার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘকাল থেকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। কিন্তু, এ বিচারসমূহ আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার মানদন্ডে হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ মানদ-ের নীতিতে অবিচল থাকা আবশ্যক, বিশেষ করে জীবন যখন বিপন্নপ্রায়। তিনি বলেন, কামারুজ্জামানের বিচার প্রক্রিয়া যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তাতে সে মানদ-সমূহ অনুসরণ করা হয়েছে, তেমনটা বলা যায় না।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবিলম্বে মৃত্যুদন্ড স্থগিত করার দীর্ঘদিনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংগঠনের মতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে মৃত্যুদ- সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ব্র্যাড অ্যাডামস আরও বলেন, বাংলাদেশে সরকারের উচিত আইন কার্যকরের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড স্থগিত করা এবং যে রাষ্ট্রগুলো ইতোমধ্যেই এ ধরনের বর্বরোচিত রেওয়াজের বিলোপ ঘটিয়েছে, অচিরেই সঙ্গে যোগ দেয়া।
কামারুজ্জামানের বিচার প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তার আপিল আবেদন আমলে না নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সে আবেদন খারিজ করে দেয় এবং মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) নির্দেশে ২০১০ সালের জুলাইয়ের কামারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠন করা হয় আইসিটি। ওই য্ুেদ্ধর পর পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ। কিন্তু, জামায়াতে ইসলামীর এ নেতাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো, সে সম্পর্কে তাকে কোন কারণ জানানো হয়নি। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন’ তার গ্রেপ্তারকে বিধিবহির্ভূত ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে। বিচার চলাকালীন আদালত বিধিবহির্ভূতভাবে আসামী পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগকে সীমিত করে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও নথিপত্র উপস্থাপনেও এ সীমাবদ্ধতা কার্যকর ছিল। এভাবে কামারুজ্জামানের বিচার প্রক্রিয়ার আরও কয়েকটি অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয় এইচডব্লিউ’র প্রতিবেদনে।

কোকোর কবরে কাঁদলেন খালেদা

প্রথমবারের মতো ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গাড়ি থেকে নেমে কবরের সামনে গিয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। টিস্যু দিয়ে বারবার চোখের পানি মুছলেও থামছিল না অশ্রুপাত। অনেকক্ষণ ধরে অঝোর ধারায় তার এ কান্না সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি করে। এ সময় পাশ থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন ছোটভাই শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত তার ছোট ছেলে কোকো  যখন আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন তখন তিনি আন্দোলন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিজের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনেকটাই অবরুদ্ধ। দেশে লাশ আনার পর কার্যালয়ের উঠোনেই শেষবারের মতো ছেলেকে দেখেছিলেন তিনি। তারপর আন্দোলনের স্বার্থেই তিনি কার্যালয় থেকে বের হননি। তাই ছেলের কবরও জিয়ারত করা হয়নি। ফলে গতকাল স্বাভাবিকভাবেই উথলে উঠেছিল তার মাতৃত্বের আবেগ। এর আগে বিকাল ৪টার দিকে কোকোর কবরের ওপরে টানানো হয় ত্রিপল আর খালেদা জিয়ার বসার জন্য আনা হয় চেয়ার। বিকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিকাল ৫টা ৩৯ মিনিটে তার গুলশানের বাসভবন ফিরোজা থেকে রওনা হন খালেদা জিয়া। বিকাল ৫টা ৪৯ মিনিটে তিনি বনানী কবরস্থানে পৌঁছান। খালেদা জিয়া কবরস্থান এলাকায় পৌঁছালে নেতাকর্মীদের প্রচণ্ড ভিড় লেগে যায়। ভিড়ের জন্য প্রায় ১০ মিনিট গাড়িতে বসে অপেক্ষা করেন তিনি। সিএসএফ সদস্যরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলে তিনি গাড়ি থেকে নেমে ছেলের কবরের সামনে দাঁড়ান। এসময় কবরের পাশে ছিলেন মহিলা দলের নেত্রী ও সিনিয়র নেতারা। বনানী সিটি করপোরেশন কবরস্থানে ছেলের কবরের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত দলের নেতাকর্মীরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কিছুসময় পর কোকোর আত্মার শান্তি কামনায় অনুষ্ঠিত মোনাজাতে অংশ নেন খালেদা জিয়া। মোনাজাত শেষে কোকোর কবরের পাশে একটি চেয়ারে কিছু সময় বসে থাকেন তিনি। প্রায় ১০ মিনিট চেয়ারে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন। যতক্ষণ কবরের পাশে ছিলেন ততক্ষণ ছেলের স্মৃতি মনে করে কাঁদেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। একপর্যায়ে বাঁশের বেড়ার ওপর দিয়ে নুইয়ে ছেলের কবরে মমতাময়ী মায়ের হাতের স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেন। এরপর ৬টা ২০ মিনিটে কোকোর কবরপ্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন তিনি। কবরস্থানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন, মীর নাছিরউদ্দিন, সাহিবউদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ওলামা দলের সভাপতি হাফেজ আবদুল মালেক, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নেছারউদ্দিন আহমেদ, কৃষক দলের যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান সম্রাট, মহিলা দলের নেত্রী নুরে আরা সাফা, শিরিন সুলতানা, সুলতানা আহমেদ, হেলেন জেরিন খান, শাম্মী আক্তার, নিলুফার চৌধুরী মনি, শামা ওবায়েদসহ কয়েক সহস্রাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, গত ২৪শে জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। ২৭শে জানুয়ারি তার লাশ দেশে এনে বনানী কবরস্থানে বি-ব্লকের ১৮নং সারিতে অবস্থিত ১,৮৩৮/১৪৭নং কবরে দাফন করা হয়। ওদিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে ৩রা জানুয়ারি রাত থেকে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। এরপর কার্যালয় থেকেই ছেলেকে শেষ বিদায় জানান তিনি। কার্যালয় থেকে বের হতে না পারায় ছেলের কবর জিয়ারত করতে পারেননি। ৯২ দিন পর রোববার গুলশান কার্যালয় থেকে বের হয়ে আদালতে জামিন প্রার্থনা করেন তিনি। আদালত জামিন দিলে বাসায় ফিরে যান খালেদা জিয়া। এরপর প্রথমবারের মতো ছেলের কবর জিয়ারত করতে যান তিনি। এর আগে ২৮শে জানুয়ারি কোকো’র কবর জিয়ারত করেছেন তার স্ত্রী শর্মিলা রহমান, দুই সন্তান জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমান, বড় মামি নাসরিন সাঈদ, ছোট মামা শামীম ইস্কান্দার, ছোট মামি কানিজ ফাতেমাসহ পরিবারের সদস্যরা।
খালেদার সঙ্গে কাজী জাফরের বৈঠক
স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন ২০ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমেদ। গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠক শেষে কাজী জাফর আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসময় দলের মহাসচিব  মোস্তফা জামাল হায়দারও উপস্থিত ছিলেন। কোকোর কবর জিয়ারত শেষে খালেদা জিয়া গুলশানের বাসায় ফিরে আসার পরপরই কাজী জাফরের গাড়ি ওই বাসায়  ঢোকে। এরপর প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন তারা। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কাজী জাফর আহমেদ আজ রাতে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে কাজী জাফরের মেয়ে থাকেন।
ফজলুল রহমানের মৃত্যুতে খালেদার শোক
এদিকে ময়মনসিংহ-১০ গফরগাঁও আসনের সাবেক এমপি, জেলা বিএনপি’র সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও গফরগাঁও থানা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. ফজলুর রহমান সুলতানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি স্বাক্ষরিত  গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোকবাণী তিনি বলেন,  মো. ফজলুর রহমান সুলতানের মৃত্যুতে তার এলাকাবাসীর ন্যায় আমিও গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রবেশ করেই মরহুম মো. ফজলুুুুুুুুর রহমান সুলতান নিজ রাজনৈতিক আদর্শ থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি। রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে দলের সকল কার্যক্রমে নিজেকে যুক্ত রাখেন নানাবিধ সংকট ও দুঃসময়ের মধ্যে। তার মৃত্যুতে শুধু ময়মনসিংহবাসীই নয় বরং দেশবাসী একজন প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদকে হারালো যার শূন্যস্থান সহজে পূরণ হওয়ার নয়। মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান খালেদা জিয়া।

আওয়ামী লীগ কি ভয় পেয়েছে? by সোহরাব হাসান

যাঁরা সরকারের অন্ধ সমালোচক—তার ভালো কাজও বাঁকা চোখে দেখেন—তাঁরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বিএনপি এলে তিন সিটি করপোরেশন (ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম) নির্বাচনই হবে না। ক্ষমতাসীনেরা যেকোনো অজুহাতে সেটি বানচাল করে দেবেন। অন্যদিকে বিএনপির কট্টর বিরোধিতাকারীরা এ ধারণা দিয়েছিলেন যে দলটি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে না। নির্বাচনে যদি আসেও, কোনো না কোনো বাহানায় সরে দাঁড়াবে। কিন্তু আশার কথা, এই দলবাজ নৈরাশ্যবাদী বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে রাজনীতিকেরা বেশি বাস্তববাদী। দুই পক্ষের পরম ‘শুভানুধ্যায়ীদের’ চরম মতকে অসার প্রমাণ করে দিয়ে সরকার তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বাধাটি সরিয়ে নিয়েছে এবং বিএনপিও ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন বর্জন না করে ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবে হলেও ভোটযুদ্ধে নেমে পড়েছে। দুই পক্ষ জাতীয় রাজনীতির সব ক্ষেত্রে এই মনোভাব দেখালে দেশ অনেক অঘটন থেকেই রেহাই পেত।
নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ‘ছাড়পত্র’ ছাড়া তারা স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন করতে পারে না। এ কারণেই ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনটি এত দিন আটকে ছিল। ইতিমধ্যে ইসি তিন সিটির মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে এবং প্রার্থীরা অনানুষ্ঠানিক প্রচারও চালাচ্ছেন। ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার।
ঢাকা উত্তরে ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় বিএনপি বেশ বেকায়দায় পড়েছে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক, যিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে লড়ছেন। দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে বহু মামলা। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্য প্রচারে আসতে পারবেন কি না বলা কঠিন। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাঈদ খোকন। মান-অভিমান ভুলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে সমর্থন জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও স্বতন্ত্র সাংসদ হাজি সেলিম, পদত্যাগপত্র ছিঁড়ে ফেলায় যিনি জাতীয় সংসদেই আক্ষেপ করেছিলেন। আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিকল্প প্রার্থী কে হবেন—মাহী বি চৌধুরী, না আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল—বিএনপি হাইকমান্ড এখনো সেই সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। তা সত্ত্বেও আওয়ামী শিবিরে উদ্বেগ লক্ষণীয়। ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রামে দুই দলের অবস্থান সংহত। প্রার্থী ধার করে আনতে হয়নি। সেখানে আওয়ামী লীগের পুরো নেতৃত্ব আ জ ম নাছিরের পক্ষে এবং মনজুর আলমের পক্ষে অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপি।
কিছুদিন আগেও দেশে পেট্রলবোমা, ককটেল, বাসে, অফিসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা এবং তার বিপরীতে পাইকারি মামলা, গণগ্রেপ্তার ও ক্রসফায়ারের যে মহড়া চলছিল, সেটি পুরোপুরি বন্ধ না হলেও স্তিমিত হয়ে আসছে। তখন রাজনীতিটা হয়ে পড়েছিল সন্ত্রাসনির্ভর। একদিকে বোমাসন্ত্রাস আরেক দিকে দমন-পীড়ন। মানুষ বড় অসহায় বোধ করেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে সিটি নির্বাচন দেশবাসীর জন্য অনেকটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই স্বস্তি কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে নির্বাচনটি কেমন হবে, তার ওপর। যদি নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, মানুষ যদি নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন এবং ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটে, তাহলে মানুুষ খুশি হবেন। পাঁচ বছর পর চট্টগ্রাম সিটি এবং ১৩ বছর পর ঢাকা সিটি নির্বাচিত প্রতিনিধি পাবে।
চরম বৈরী ও বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক পরিবেশে যে সিটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে প্রার্থীর চেয়ে ভোটাররা বেশি বিবেচনায় নেবেন দল তথা শীর্ষ নেতৃত্বকে। অনেকের মতে, এই নির্বাচনে আরও একবার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা যাচাই হবে।
নির্বাচন করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, তাঁদের সমর্থক দলগুলোর সহায়তা ছাড়া তাদের পক্ষে এই গুরুদায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। নির্বাচনের তিনটি প্রক্রিয়া আছে। প্রথমত, ভোটারদের কাছে প্রার্থীর বক্তব্য তুলে ধরা অর্থাৎ প্রচারণা। দ্বিতীয়ত, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং তৃতীয়ত, ফলাফলে জনরায়ের প্রতিফলন। এর যেকোনো একটিতে ব্যত্যয় ঘটলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।
কয়েক দিন আগে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল সিইসির সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনে সবার সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে কিছু দাবি পেশ করেছে; যার মধ্যে আছে প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের ওপর থেকে ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার, নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় খুলে দেওয়া ও বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া। দাবিগুলো যৌক্তিক। নির্বাচন কমিশনের উচিত অবিলম্বে বিএনপি অফিসের তালা খোলার ব্যবস্থা করা। এর বিনিময়ে বিএনপিকেও হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে হবে। আর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তব্য ইসিকে সর্বতোভাবে সহায়তা করা। ইসিকে কথা নয়, কাজ দিয়েই প্রমাণ করতে হবে তারা দক্ষ, যোগ্য এবং নিরপেক্ষ। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই কমিশনই অনেকগুলো সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে পেরেছে। এখন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি এ টি এম শামসুল হুদা কিংবা মোহাম্মদ আবু হেনা হবেন, নাকি এম এ সাদেক ও এম এ আজিজ হবেন? এ টি এম শামসুল হুদা ২০০৮ সালে প্রতিকূল পরিবেশে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করেছিলেন। আবু হেনা শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে কারচুপির অভিযোগ থাকায় ঘাটাইল উপনির্বাচনের ফলাফল গেজেট বিজ্ঞপ্তি করেননি। তাঁর পদত্যাগের পরই সেটি হয়েছিল। এম এ সাদেক ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন করে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছিলেন। এম এ আজিজের আত্মম্ভরিতার কারণে ২০০৭ সালে নির্বাচনটিই করা সম্ভব হয়নি।
এবার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ যদি সিটি নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু করতে পারেন, তাহলে তাঁর অতীতের অনেক ব্যর্থতা মানুষ ভুলে যাবে। তিনি সফল হলে রাজনীতিতেই কেবল সুস্থতা ফিরে আসবে না, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে জট তৈরি হয়েছে, তা খোলার পথও সুগম হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠবে। একে অপরের বুকে ছুরি মারতে আস্তিনের ভেতরে ছুরি নিয়ে ঘুরবে না। সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিরোধী দল সরকারকে যতই চাপে রাখুক না কেন, হরতাল-অবরোধ চালিয়ে যেতে পারবে না।
কিন্তু নির্বাচনটি যদি সুষ্ঠু না হয়, তাহলে কী হবে কেউ বলতে পারে না। সরকারি দলের নেতারা যতই তারস্বরে বিরোধী পক্ষকে জঙ্গি বোমাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করুন না কেন, মানুষ শুনবে না। দেশ আরও দীর্ঘস্থায়ী হরতাল-অবরোধের কবলে চলে যাবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, এটাই বাংলাদেশের শেষ নির্বাচন নয়।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হলে বিরোধী দলের ধ্বংসাত্মক হরতাল-অবরোধের অবসান ঘটবে এবং সরকারের দমন-পীড়ন বন্ধ হবে আশা করা যায়। এমনকি আগামী নির্বাচনের সময় ও নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়াও অসম্ভব নয়। নির্বাচনের বিষয়ে উভয় পক্ষ কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্ব পালনকারী একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, এই নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচনও হতে পারে। তিনি কি সত্যি সত্যি জাতীয় নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছেন?
অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সর্বশেষ প্রস্তাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে বলে জেদ ধরেননি। তিনি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনার কথা বলেছেন। তাই উভয়ে যদি দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, তাহলে একটি সমঝোতায় আসা সম্ভব বলেই মনে করি। নিকট বা সুদূর অতীতে
যা-ই ঘটুক না কেন, রাজনীতিকদের সামনেই তাকাতে হবে।
নির্বাচনে কে জয়ী হবে, সেটি ঠিক করবেন ভোটাররা। স্থানীয় সরকার সংস্থার এই নির্বাচনে সরকারি দল হেরে গেলেও সরকারের ক্ষতি নেই। ক্ষমতারও পরিবর্তন হবে না; বরং সরকার বলতে পারবে, তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে যদি জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে না পারে এবং জনরায়ের প্রতিফলন না ঘটে, তখন বিরোধী দলের অভিযোগই সত্য প্রমাণিত হবে যে এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে পারে না।
সিটি নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে দুই পক্ষই নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বিরোধী দল যেমন হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি খণ্ডিতভাবে হলেও জারি রেখে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে চায়, তেমনি সরকারও বিরোধী দলকে ছাড় না দেওয়ার কথা বলে আসছে। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন ছাড় দেওয়া না–দেওয়ার বিষয় নয়। বিষয়টি ভোটারদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বলেছেন, স্বচ্ছতাই শক্তি। ফল যা হোক, নির্বাচন স্বচ্ছ হতে হবে। এটি সাধু উপলব্ধি। কিন্তু নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় তার প্রতিফলন ঘটবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। কোনো কোনো মন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন, যে করেই হোক তিন সিটিতেই জিততে হবে। আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা একদিকে বলছেন, বিএনপির জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, দল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অন্যদিকে যে করেই হোক জেতার জন্য মন্ত্রীরা নির্দেশ দিচ্ছেন। এটি কি ভয়ের লক্ষণ নয়?
যদি আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে এতটাই আস্থাশীল হন, তাহলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়ত বিষোদ্গার কেন? বাস্তবতা হলো, হরতাল-অবরোধের নামে নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারার কারণে জনগণ বিএনপির কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং সেই ফিরিয়ে নেওয়া মুখ আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়েছে—এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত সোয়া ৪ লাখ মানুষ কোনো ধরনের ত্রাণ পায়নি দুর্গতরা by আনোয়ার পারভেজ

শনিবারের কালবৈশাখীতে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা
হাটের এই গাছটি উপড়ে পড়ে। ছবিটি গতকাল দুপুরে তোলা
বগুড়ার ইসলামপুরের হরিগাড়ি গ্রামের নারী আসমা বেগম। ১০ মাস আগে স্বামী রফিকুল ইসলামকে হারিয়েছেন। সেই শোক না সামলাতেই গত শনিবার সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ঝড়ে এক টুকরো টিনের বসতঘরটি হারালেন তিনি। একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে স্বামীর স্মৃতিভরা ঘরটি হারিয়ে এখন তিনি দিশেহারা। পেটে নেই খাবার, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁইও।
শুধু আসমাই নন, তাঁর মতোই অসহায়, দিশেহারা ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বগুড়ার বহু মানুষ। ওই প্রচণ্ড ঝড়ে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় ২০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বগুড়া সদরেই মারা গেছেন সাতজন। তাঁদের তিনজন শহরতলীর পালশা এলাকার। আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আরও অনেকে।
ঝড়ের দুই দিন পরও দুর্গত এলাকায় কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সাহায্য পৌঁছায়নি। বসতবাড়ি লন্ডভন্ড হয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া মানুষের পাশে কেউ দাঁড়াননি। দু-একজন সাংসদ খোঁজখবর নিয়েছেন; এটুকুই।
এদিকে গতকাল তৃতীয় দিনেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শহরবাসীকে। বিদ্যুতের অভাবে হাসপাতাল, সরকারি কলেজের ছাত্রীনিবাসগুলোতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। গতকাল সরেজমিনে দুর্গত এলাকার এমনই দুর্ভোগ-দুর্দশার দেখা মিলেছে।
পালশা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বহু বাড়ির টিনের চালা নেই। অনেক বাড়ি ধ্বংসস্তূপ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। অর্ধশতাধিক বিদ্যুতের খুঁটিও ভেঙে গেছে। উপড়ে আছে দুই শতাধিক গাছ। লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি মেরামতের চেষ্টা করছেন। অনেকেই ধ্বংসস্তূপে সর্বস্ব চাপা পড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে কাটাচ্ছেন।
দুপুরে আসমা নামের এক নারী বললেন, ‘অন্যের বাড়িত কাজ করি। স্বামীর ঘর ছাড়া মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। ঘরে নবম শ্রেণিপড়ুয়া এক কন্যা। দুই দিন ধরে ঘর মেরামতের টাকার জন্য পাগলের মতো মানুষের কাছে হাত পেতেছি। কোনো জনপ্রতিনিধি এক টাকা দিয়েও সাহায্য করেননি। প্রতিবেশী কয়েকজন মিলে আড়াই হাজার টাকা সাহায্য দিয়েছে। রাজু নামে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের একজন সুইপার দিয়েছেন দেড় হাজার টাকা। এই টাকায় টিন কিনে বাড়ি ফিরছি।’
মধ্যপালশা পাকা সড়কের পাশে বিধ্বস্ত টিনের ঘরের পাশে গালে হাত দিয়ে বসে ছিলেন দুই বোন মাসুদা বেগম ও হাওয়া বেগম। মাসুদার স্বামী দিনমজুর। হাওয়া স্বামীহারা। মাসুদা বলেন, ‘অন্যের বাসাবাড়িতে দুই বোন কাজ করি। ছয় শ টাকায় দুটো ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। আমার
সঙ্গে স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়ে। বোনের ঘরে স্কুলপড়ুয়া এক মেয়ে। ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়েছে ঘরের ওপর। আসবাবপত্র, রান্নার জিনিসপত্র সবকিছুই চাপা পড়েছে।’
হাওয়া বেগম বলেন, ‘তিন দিন ধরে ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে অনাহারে। রান্নার হাঁড়ি নেই। পরনের কাপড় থেকে চাল-লবণ, সব ওই চাপা পড়া ঘরের ভেতর। বাচ্চাদের কষ্ট দেখে একজন ১০০ টাকা দিয়েছেন। সেটা দিয়ে চিড়া-গুড় খেয়ে বেঁচে আছি।’
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন দিনে কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কর্মকর্তা দুর্গত এলাকায় যাননি। ২০ জন মানুষ মারা যাওয়ার পরও জেলার সাত সাংসদের বেশির ভাগ এলাকায় অনুপস্থিত। বগুড়া সদরে প্রাণহানি বেশি ঘটলেও এখানকার সাংসদ নুরুল ইসলাম ওমরও ঢাকায় রয়েছেন।
সাংসদ ও প্রশাসনের ভাষ্য: সাংসদ নুরুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলাকায় থেকে তো লাভ নেই। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে খালি হাতে দাঁড়ানো যায় না। এলাকায় গেলেই লোকজন সাহায্য চাইবে। সাহায্য তো আর বগুড়ায় বসে থেকে এমনি এমনি মিলবে না। সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বরাদ্দের জন্যই মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিচ্ছি। কিছু ব্যবস্থা করি, তারপর এলাকায় যাব।’
জেলা প্রশাসক শফিকুর রেজা বিশ্বাস বলেন, নিহত পরিবারের জন্য নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বগুড়া শহর বা পৌর এলাকায় এ মুহূর্তে কোনো সাহায্য দেওয়া সম্ভব না হলেও গৃহনির্মাণ সহায়তার তালিকায় ক্ষতিগ্রস্তদের নাম অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা দেওয়া হবে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাকিল মাহমুদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাঁচ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ পেয়েছি। তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। মঙ্গলবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মধ্যে বিতরণ করতে পারব বলে আশা রাখি।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. খোরশেদ আলম বলেন, ঝড়ে ৯২ হাজার পরিবারের ৪ লাখ ১৭ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২৮ হাজার ৬৬৭টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ও ৭০ হাজার বাড়িঘর এবং ২৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন আহতরা: ঝড়ে সরকারি হিসাবেই আহত ব্যক্তির সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁদের অধিকাংশই চিকিৎসাধীন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বেলা ১১টার দিকে জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, অনেকে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে আছেন। যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।
যন্ত্রণাকাতর এ রকমই একজন সদরের কইচর গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক আমজাদ হোসেন। পুকুরে মাছের খাবার দিতে বের হয়েছিলেন তিনি। ঝড় শুরুর আগেই পা বাড়ান বাড়ির দিকে। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছার আগেই ঝড়ে গাছের নিচে চাপা পড়েন। এরপর চেতনা হারান।
সদরের অন্তাহার গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম মুঠোফোনে ফ্লেক্সিলোড করতে গিয়েছিল বাজারে। ঝড় শুরু হলে একটি প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়ালে সেটি ভেঙে নিচে চাপা পড়ে সে। লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এখনো ভয়ে আঁতকে উঠছে সে। গোটা শরীর তার ব্যান্ডেজে মোড়া।
হাসপাতালের পরিচালক এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ঝড়ের পর থেকে এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৭১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
বিদ্যুৎ নেই, দুর্ভোগ: ঝড়ের এক দিন পর রোববার রাত থেকে শহরের কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও সিংহভাগ এলাকা রয়েছে বিদ্যুৎবিহীন। এসব এলাকায় পানি-সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের একমাত্র ছাত্রীনিবাস বেগম রোকেয়া হলের ছাত্রী বৃষ্টি খন্দকার বলেন, ‘তিন শ আসনের এ হলে ছয় শতাধিক ছাত্রীর বাস। তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। গরমে কক্ষে টেকা যায় না। ঝড়ের পর থেকেই পানি নেই। গোসল-খাওয়া সব বন্ধ।’

আয়োডিনের অভাব মেটাবে কপালের টিপ

কপালে টিপ দেয়া ছাড়া বাঙালি তথা ভারতীয় নারীদের সাজগোজ পূর্ণ হয় না। বিশেষ করে হিন্দু মেয়েরা ধর্মীয় কারণেও কপালে সিঁদুরের লাল টিপ দিয়ে থাকে। কিন্তু ভারতীয় নারীদের কপালের লাল টিপটি শুধু এখন সাজগোজের জন্যই ব্যবহার হবে না, খেয়াল রাখবে স্বাস্থ্যেরও। ‘জীবন বিন্দি’ নামের বিশেষ একধরনের টিপ এখন থেকে দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের দেহে আয়োডিনের অভাব মেটাবে।
গ্রে গ্র“প নামের সিঙ্গাপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘জীবন বিন্দি’ নামের এই বিশেষ ধরনের টিপটি সম্প্রতি ভারতে নিয়ে এসেছে। আয়োডিনে ঠাসা এই টিপগুলো নারীদের কপালকে রাঙা করে তুলবে। কর্মব্যস্ত মহিলাদের ঘামের সঙ্গে টিপের ভেতরের আয়োডিনের বিশেষ মিশ্রণটি তাদের শরীরে মিশে যাবে। আর তা থেকেই লোমকুপ পথে পৌঁছে যাবে শরীরের প্রয়োজনীয় পরিমাণের আয়োডিন। ইতিমধ্যেই নাকি ভিডিও দেখিয়ে বিভিন্ন গ্রামের নারীদের মধ্যে এই টিপ বিতরণ করা হচ্ছে। ইন্ডিয়া টাইমস।

বার্সার ত্রাতা ম্যাথিউ

মেসি, নেইমার, সুয়ারেজ- এমন ত্রিফলা আক্রমণভাগ যে দলের সম্পদ, তাদের ঈর্ষা না করে কি পারা যায়! কিন্তু রোববার রাতে এই তিনজনের কেউ নন, বার্সেলোনার ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন জেরেমি ম্যাথিউ। জাভির ফ্রিকিকে উড়ে গিয়ে এই ফরাসি সেন্টার-ব্যাক হেডে যখন ম্যাচের একমাত্র গোল করেন, শেষ বাঁশি বাজতে তখন ১৬ মিনিট বাকি। সেল্টা ভিগো হয়তো ভেবেছিল, এক পয়েন্ট নিয়ে তারা মাঠ ছাড়বে। কিন্তু নিয়তি ম্যাথিউকে পাঠিয়ে দেন বার্সার ত্রাতা হিসেবে।
দিনের প্রথম ম্যাচে রোনাল্ডোর পাঁচ গোলে রিয়াল মাদ্রিদ ৯-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল গ্রানাডাকে। তাই সেল্টা ভিগোর মাঠে মেসি-ম্যাজিক দেখার জন্য উন্মুখ ছিল কাতালান সমর্থকরা। কিন্তু আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডকে প্রথমার্ধে অনেকটা বোতলবন্দি করে রাখে সেল্টা। দ্বিতীয়ার্ধে বার্সা গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠে। তবুও অচলায়তন ভাঙতে ৭৪ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় তাদের। ম্যাচ শেষে ম্যাথিউ যা বলেছেন, তার জায়গায় অন্য কেউ হলেও একই কথা বলতেন, ‘পুরো তিন পয়েন্ট পেয়েছি। এটাই গুরুত্বপূর্ণ।’ তার সংযোজন, ‘রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে গোল করি কিংবা সেল্টার বিপক্ষে- আমার কাছে দুটিই সমান।’ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালের চেয়ে চার পয়েন্টে এগিয়ে যাওয়া কাতালানরা এখন শিরোপা-স্বপ্নে বিভোর। নয়টি ম্যাচ বাকি। প্রতি সপ্তাহান্তে তো আর মেসি জ্বলে উঠতে পারেন না। তাই প্রতিটি জয়ের জন্য বার্সার একজন ম্যাথিউ দরকার। যিনি পার্শ্বচরিত্র থেকে মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠবেন। বার্সেলোনা প্রথম সুযোগ পায় ১৩ মিনিটে।
দানি আলভেসের কাছ থেকে বল পেয়ে আচমকা দৌড়ে ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে ডান-পায়ের জোরাল শট নেন মেসি। সেন্টার গোলরক্ষক বল ঠেকানোর পর তা যায় নেইমারের পায়ে। নেইমারের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তিন মিনিট পর ডি-বক্সে বল পেয়েছিলেন লুইস সুয়ারেজ। শট নেয়ার আগেই তা বিপদমুক্ত করেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা। ২৩ মিনিটে বল পেয়েই শট নিয়েছিলেন সুয়ারেজ, এবারও গোল হয়নি। ২৯ মিনিটে বার্সেলোনার পেনাল্টি বক্সে বল পেয়েছিলেন সেল্টার নলিতো। বিপদমুক্ত করেন বার্সার গোলরক্ষক ব্রাভো। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দারুণ এক শটে বল জালে জড়িয়েছিলেন নেইমার। অফসাইডের ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত দিয়ে গোলটি বাতিল করেন রেফারি। ৫৪ মিনিটে বল পেয়েছিলেন মেসি, অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় তার শট। অবশেষে ৭৪ মিনিটে সাফল্যের মুখ দেখে অতিথিরা। জাভির ফ্রিকিকে উড়ন্ত হেডে বল জালে জড়ান ম্যাথিউ। এ জয়ে ২৯ ম্যাচে ৭১ পয়েন্ট নিয়ে শিরোপা লড়াইয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বার্সেলোনা। রিয়াল মাদ্রিদ চার পয়েন্ট কম নিয়ে আছে দ্বিতীয় স্থানে। তৃতীয় স্থানে থাকা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অ্যাটলেটিকোর পয়েন্ট ৬২। ওয়েবসাইট।

সাইবার মাধ্যমে জঙ্গিরা: রাষ্ট্র এখনো ঘুমিয়ে by মিজানুর রহমান খান

এক মাসের ব্যবধানে অভিজিৎ রায় ও ওয়াশিকুর হত্যাকাণ্ডের পর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এরপর কে? মত প্রকাশের জন্য হুমায়ুন আজাদ হত্যাকাণ্ডের পর এক দশকের বিরতিতে ঘটে ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ড। কিন্তু রাজীব থেকে অভিজিতে আসতে দুই বছর, আর অভিজিৎ থেকে ওয়াশিকুরে পৌঁছাতে সময় লেগেছে এক মাস। আমরা অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনজন ব্লগারকে হারালাম। এই তিনটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডই কেবল নয়, ব্লগারদের ওপর পরিচালিত আরও কয়েকটি হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জঙ্গিরা অনলাইনকে মাধ্যম হিসেবে অপব্যবহার করে ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে।
‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামের একটি সংগঠনের কথা গণমাধ্যমে খুব আসছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই আনসারুল্লাহর অস্তিত্ব ও কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হলো অনলাইন। অভিজিৎ ও ওয়াশিকুর—এই দুই খুনের সঙ্গেই তাদের ‘স্লিপার সেল’-এর যোগসূত্র রয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। ওয়াশিকুরের খুনের বিচার হবে ফৌজদারি আইনে। কিন্তু তাঁকে খুন করতে গিয়ে যদি সাইবার স্পেসের অপব্যবহার ঘটে, তাহলে তার বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু সাইবার আইনে জঙ্গিদের বিচার ও দণ্ড ও তাদের মোকাবিলা করতে চাইলে একটি অনুকূল অবকাঠামো, যথাযথ সাজসরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল থাকতে হবে।
আমরা একটা চকিত অনুসন্ধান চালিয়েছি গত বুধবার। খুবই দুর্ভাগ্য যে ২০০৬ সালে পাস হওয়া তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ব্যবহার কার্যকর ক্ষেত্রে হচ্ছে না। বিতর্কিত তথ্যপ্রযুক্তি আইন, যা সাইবার অপরাধীদের দমন করবে, তার চেয়ে অনেক বেশি আলোচিত হচ্ছে সরকারবিরোধী ভিন্নমতকে দমন করার কাজে ব্যবহারের জন্য। ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে গত সপ্তাহে এই কলামে আলোচনা করেছি। তাতে দেখা গেছে, রাষ্ট্রযন্ত্র এই আইনকে সরকারবিরোধী মত দমনে ব্যবহারে বেশি উৎসাহী।
অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সাইবার স্পেসে জঙ্গি প্রতিরোধের জায়গা থেকেও দেখার অভ্যাসটা গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, অনগ্রসর গণতান্ত্রিক দেশগুলো সাইবার আইন করতে গিয়ে সরকারের সমালোচকদের শায়েস্তা করার দিকটি মাথায় রেখেছে। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। ফিলিপাইন ২০১২ সালে সাইবার আইন করল, কিন্তু তার কার্যকারিতা সুপ্রিম কোর্ট স্থগিত করলেন, কারণ সরকারের সমালোচকদের শায়েস্তা করার বিধান সেখানে ছিল। ফিলিপাইনের মতো দেশ যা পারে বা পারবে, তা বাংলাদেশ করতে গেলে কতগুলো ভয়ানক বিপদ ঘটতে পারে। আর সেটা হলো ধর্মের প্রশ্ন। এখানে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে।
উগ্রপন্থীদের দমন করা আর সমালোচকদের একই অস্ত্রে ঘায়েল করতে গেলে তা বুমেরাং হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র কী ধরনের অস্ত্রপাতি নিয়ে ধেয়ে আসা সাইবার সুনামি মোকাবিলায় বসে আছে, সেটা জানতে গিয়ে যে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেল, তা বিস্মিত হওয়ার মতো। কান ঝালাপালা করা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর, হুমকি-ধমকি ও স্তুতিবাদ প্রচারণার তুলনায় সাইবার মাধ্যম ব্যবহার করে জঙ্গিদের তৎপরতা বা অপরাধ দমনে প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এখনো যে প্রায় শূন্যের কোঠায়, সেটা মানতে কষ্ট হচ্ছে। যে বিড়াল ইঁদুর মারে, তার গোঁফ দেখে নাকি চেনা যায়। তাই সারা বিশ্বে সাইবার অপরাধ, বিশেষ করে জঙ্গিগোষ্ঠীর যোগাযোগ, অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিং নিয়ে এত হইচই, তা নিয়ে আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকবলটা কী রকম, তার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কারণ, সাইবার অপরাধ ঠিক আর দশটা অপরাধের খুনখারাবির মতো প্রশিক্ষণহীন পুলিশি জনবলের মামুলি কাজ হওয়ার নয়। তাই কতজন লোককে এই রাষ্ট্র বিশেষভাবে সাইবার অপরাধ দমনে ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত রেখেছে, তা জানাটাকেই বড় কর্তব্য মনে করলাম।
র্যা ব ও ডিবি—উভয় সংস্থাই অবশ্য মনে করে যে সাইবার অপরাধ ও এই মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে নানা অপরাধ তৎপরতার ওপর নজরদারি ও তা দমন করা বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত তাদের প্রস্তুতি শোচনীয় বললেও কম বলা হবে। আমরা আশা করব, র্যা ব ও ডিবির বক্তব্যকে নীতিনির্ধারকেরা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবেন। প্রথমে যোগাযোগ করি সাইবার বিষয়ে তদারকের দায়িত্বে থাকা ডিবির জয়েন্ট কমিশনার মনিরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি আমাকে খুদে বার্তায় লেখেন: ‘ঢাকা মহানগর পুলিশের কোনো সাইবার ক্রাইম সেল ছিল না। আমি বিদ্যমান জনবল থেকে পাঁচজনকে দিয়ে একটি ক্ষুদ্র সেল গঠনের চেষ্টা করছি। কিন্তু তার জন্য কোনো আলাদা প্রশিক্ষণ কিংবা যন্ত্রপাতি নেই। যারা কাজ করছে, তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও যোগ্যতাবলে কিছু কিছু কাজ করছে। পুলিশের শুধু সিআইডিতে ১০ থেকে ১২ জনের একটি ইউনিট আছে, আর র্যা বের একটি শক্তিশালী সাইবার ইউনিট রয়েছে।’
এরপর যোগাযোগ করি র্যা বের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানের সঙ্গে। তিনি সাইবার বিষয়ে একটি কাজে দিল্লিতে ছিলেন। তিনি টেলিফোনে যা বললেন, তাতে র্যা বের শক্তিশালী সাইবার ইউনিট থাকার ধারণা টেকে না। কারণ, অনধিক ১০ জনের সমন্বয়ে তাঁদের যে সেলটি সক্রিয়, তার নামকরণেই সেটা স্পষ্ট। এর নাম সাইবার প্রোপাগান্ডা সেল। অবশ্য কর্নেল জিয়া বলেন যে সাইবার অপরাধ বিষয়ে র্যা বকে শক্তিশালী করার চিন্তাভাবনা চলছে। ডিবি কমিশনারও জানালেন, সিআইডির ইউনিটকে ৪০ সদস্যের এবং ঢাকা মহানগর পুলিশে ২০ সদস্যের একটি ইউনিট গঠনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে। সীমান্তহীন সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হওয়া রাষ্ট্রের এই প্রস্তুতিও অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে করণীয় নির্ধারণে অবিলম্বে একটি বিশেষ কমিটি হওয়া উচিত।
এই রাষ্ট্র ২০০৬ সালে সাইবার অপরাধ দমনে ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান করে। এর সাত বছর পরে ২০১৩ সালে প্রথম সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করল দৃশ্যত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিতে। এই রাষ্ট্র সাইবার জঙ্গিদের কাছে এই বার্তা দিতে এখনো বেশ দূরে যে সাইবার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল এসেছে সাইবার অপরাধ দমনে। ওয়াশিকুরের যে ঘাতকেরা ধরা পড়েছে, তারা মগজ ধোলাইয়ের শিকার। কিন্তু এর মূল পরিকল্পনাকারীরাই হতে পারে সাইবার অপরাধী, যাঁদের কথায় ধরা পড়া দুই মাদ্রাসাছাত্র ঢাকায় এসেছিল। নেপথ্যে থাকা এই কুশীলবেরা হলো সাইবার স্বাধীনতার নতুন শত্রু। আর বাংলাদেশের এই নতুন শত্রুদের নতুন রণক্ষেত্র হলো ইন্টারনেটের জগৎ।
আইএসের মতো শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশি উগ্রপন্থীদের যোগাযোগটা ক্রমেই দৃশ্যমান বা প্রকৃত হলেও হতে পারে, এটা ধরে নিয়েই বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। উগ্রপন্থীদের বর্তমানে দৃশ্যত নির্জীব থাকা বা ঘুম পাড়িয়ে রাখতে সক্ষম হওয়া দেখে আশ্বস্ত হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। কারণ, গ্রেপ্তার হওয়া দুই অনুশোচনাহীন, এমনকি কৃতকর্মের জন্য গর্বিত দুই জঙ্গি জানান দিচ্ছে, তাদের মতো লোক দিয়ে যেকোনো সময় সহজেই অনর্থ ঘটানো সম্ভব। জঙ্গিরা ও তাদের আন্তর্জাতিক মুরব্বিরা বুঝে গিয়েছে বাংলাদেশের সমাজে জঙ্গিবাদের প্রতি জনসমর্থন যতই ন্যূনতম হোক না কেন, তারা চাইলে যা নয় তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ভয় পাইয়ে দিতে পারে।
ইন্টারনেট নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। মত প্রকাশের জন্য হত্যাকাণ্ডকে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, আইএসের প্রতি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতসহ পশ্চিমা সমাজের বিপথগামী তরুণ-তরুণীদের আকৃষ্ট ও তাদের বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার পেছনে অনলাইন মাধ্যমে সাইবার জঙ্গিরাই মূল ভূমিকা রাখছে। অভিজিৎ রায়কে হত্যা করার মতো
ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে ফারাবী জামিন নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এই ফারাবী নিজে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কি না, তার চেয়ে বড় কথা হত্যাকাণ্ড সংঘটনের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র তাঁকে নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন ছিল না।
সাইবার মাধ্যম ব্যবহার করে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের কোনো অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন আমরা করতে পারিনি। যদিও কয়েকজন ‘জঙ্গি’ ব্লগারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আগেই বলেছি, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ এখন পর্যন্ত এমন একটি সাইবার নেটওয়ার্ক, যার বিস্তারিত জানা ও বোঝা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এটা স্পষ্ট যে অন্যান্য সাইবার অপরাধ ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সাইবার জঙ্গিরা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে এক ভয়ানক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাই তাদের পরবর্তী নিশানা কে বা কারা, তার সুলুক সন্ধানে আমাদের দক্ষ সাইবার গোয়েন্দা ও প্রশাসন তৈরি করতে হবে। অথচ এখনো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাইবার নজরদারির ব্যবস্থা ভীষণ দুর্বল কিংবা অনুপস্থিত। অভিজিৎ রায়কে খুনের ঘটনায় দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশের দায়মুক্তি আমাদের অবাক করেছে।
মার্কিন সমীক্ষা সংস্থা পিউর জরিপমতে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ শতাংশের নিচে, তবে এটা ক্রমবর্ধমান। সুতরাং নীতিনির্ধারকদের সামনে মুখ্য বিবেচনার বিষয় হলো, সাইবার মাধ্যম ব্যবহার করে জঙ্গি তৎপরতাসহ নানা অপরাধ সুনামিতে রূপ নেওয়ার আগে উপযুক্ত রক্ষাকবচ সৃষ্টি করতে হবে। সাইবার ট্রাইব্যুনালে যেসব ব্লগার আসামি হয়েছেন, তাঁদের গায়ে কথিতমতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের গন্ধ লেগে আছে। প্রধানমন্ত্রীকে অবমাননা করার ঘটনায় সাইবার আদালত দণ্ড দিয়েছেন। সাইবার-কাণ্ডের হদিস পেতে র্যা ব দামি যন্ত্র কিনছে। সাইবার জঙ্গি ধরার কাজে তা ব্যবহার করা হলে বিষয়টি স্বস্তির, কিন্তু সরকারের প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহৃত হলে তা উদ্বেগের। মত প্রকাশের জন্য সরকারযন্ত্র যদি মানুষ খুন করে, তাহলে সেই সরকারযন্ত্র মত প্রকাশের জন্য খুনের দায়ে সাইবার জঙ্গিদের বিচার করার নৈতিক সাহস হারাতে পারে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

জলাবদ্ধতার বৃত্তে ‘বন্দী’ চট্টগ্রাম

সিডিএ অ্যাভিনিউ। চট্টগ্রাম নগরের মূল সড়ক এটি।
গতকাল বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় সড়কের মুরাদপুর এলাকা।
ছবিটি বেলা একটায় তোলা l সৌরভ দাশ
কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও বা বুকসমান। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম নগরের চিত্র ছিল এমনই। সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে সরু গলি থেকে রাজপথ হয়ে পড়ে জলাবদ্ধ। সেই সঙ্গে দিনভর তীব্র যানজট ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে মানুষের।
প্রবল বৃষ্টিতে নগরের চকবাজার, কাপাসগোলা ও চাক্তাই এলাকায় বেশ কিছু বিপণিবিতান ও বাসার নিচতলায় পানি ঢুকেছে। চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১০৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা সাতটা) থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন তিনজন।
তবে বৃষ্টিতে নগর জলাবদ্ধ হলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এর দায় চাপাচ্ছে নগরবাসীর ওপর। বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেলেও করপোরেশন এ অবস্থাকে জলজট বলছে। সিটি করপোরেশনের সচিব রশিদ আহমদ মুঠোফোনে গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরের সব খাল-নালা নিয়মিত খনন করা হয়। কিন্তু খননের কিছুদিন পরেই লোকজন সেখানে ময়লা-আবর্জনা ও পলিথিন নিক্ষেপ করে। এতে পানিনিষ্কাশন-প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে। আর আজ (গতকাল) যা হয়েছে, তা জলাবদ্ধতা নয়, জলজট।’
বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকেন অটোরিকশা ও রিকশাচালকেরা। যাত্রীদের কাছে ২০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আবার বাড়তি ভাড়া দিতে চেয়েও অনেককে রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। সড়কে জমে থাকা পানিতে বিকল হয়ে যায় অনেক যানবাহন। বিকেলের পর নগরে বাস, টেম্পো, রাইডারসহ অন্য যানবাহন চলাচল কমে যায়। এতে অফিস-ফেরত মানুষ দুর্ভোগের শিকার হন।
নগরের এনায়েতবাজার এলাকায় দুপুরে কথা হয় এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. ইশতিয়াকের সঙ্গে। সকালে চকবাজার এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা না পেয়ে অনেকক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাকে। অনেকটা পথ হেঁটে রিকশা পেলেও প্রবল বৃষ্টির কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই জামাকাপড় ভিজে যায় তার। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার জন্য কোনো যানবাহনও পাচ্ছে না ইশতিয়াক।
মো. আলমগীর নামে এক সিএনজি অটোরিকশাচালক বলেন, ‘যেদিকে যাই, সেদিকেই যানজট আর পানি। কীভাবে গাড়ি চালাব? নিউ মার্কেট থেকে প্রবর্তক যেতে এক ঘণ্টা লেগেছে।’ স্বাভাবিক অবস্থায় ওই দূরত্ব যেতে ২০ মিনিট লাগে।
নগরের মুরাদপুর, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, কাপাসগোলা, বাকলিয়া, ডিসি রোড, আগ্রাবাদ, সিডিএ আবাসিক এলাকা, হালিশহর, নয়াবাজার, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, শুলকবহর, চকবাজার, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, প্রবর্তক মোড়, নাসিরাবাদ, মোহরা, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশসহ নগরের বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়।
দুপুরে ষোলশহর ও মুরাদপুর এলাকায় সড়কের দুই পাশে কয়েক শ যানবাহন আটকা পড়ে। উড়ালসড়ক নির্মাণের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এবার এ এলাকায় জলাবদ্ধতা বেশি হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, মুরাদপুর ও ষোলশহর এলাকায় প্রতি বর্ষায় পানি ওঠে। কিন্তু বৃষ্টি থামার সঙ্গে সঙ্গে পানি নেমে যায়। এবার ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হওয়ায় সড়ক অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নালা-নর্দমাও ভরাট হয়ে গেছে। ফলে দ্রুত পানি নামতে পারেনি।
জলাবদ্ধতার কারণে নগরের প্রবর্তক মোড়, মেহেদিবাগ, মুরাদপুর, ষোলশহর, বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদ সড়কে যানজট দেখা দেয়। মেহেদিবাগ-চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়কে অন্তত এক ঘণ্টা ধরে যানবাহন চলাচল স্থবির ছিল। পানির কারণে প্রবর্তক মোড় অতিক্রম করতে না পারায় বিকেলের দিকে ওই সড়কে শত শত গাড়ি এক জায়গায় স্থবির হয়ে ছিল।
পতেঙ্গা আবহাওয়া দপ্তরের আবহাওয়াবিদ নিলুফার জাহান জানান, সাধারণত চৈত্র মাসে এ ধরনের ভারি বৃষ্টি হয় না। মে মাসের দিকে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। লঘুচাপের বর্ধিতাংশের প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যখন পশ্চিম দিকে কোনো লঘুচাপ হয় তখন তার বর্ধিতাংশের প্রভাবে বাংলাদেশ উপকূলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টি হয়।
দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির কারণে আসকারদিঘির পাড়, জামালখান, আন্দরকিল্লা, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ-সংযোগ বন্ধ রাখে বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঝড়-বৃষ্টি হলে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য বিদ্যুৎ-সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। গতকাল বেশ কিছু এলাকায় সকালে ও বিকেলে কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে তা আবার চালু করা হয়।
বৃষ্টি হলেই কেন জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম—এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি জেরিনা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জনগণ—কারও মধ্যে টেকসই নগর গড়ার চিন্তা নেই। নগরে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই অতিবৃষ্টি হলেই নগরে পানি জমে যায়।
বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতে নগরের ফিশারিঘাটে দুজন ও বোয়ালখালীতে একজন নিহত হয়েছেন। ফিশারিঘাট এলাকায় বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন মো. কবির হোসেন (৩০) ও মো. মফিজ আলম (২৬)। দুজনের বাড়িই কক্সবাজারের মহেশখালীতে।
মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) জহিরুল ইসলাম জানান, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে ফিশারিঘাট ১ নম্বর জেটিতে কয়েকজন মৎস্যজীবী জাল পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ বজ্রপাত হয়। এতে চারজন গুরুতর আহত হন। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তাঁদের হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক কবির ও মফিজকে মৃত ঘোষণা করেন।
বোয়ালখালীতে বজ্রপাতে মারা গেছেন আরও একজন। নিহত আবদুল হালিম (৪২) নামে অপর একজন। নিহত আবদুল হালিম বোয়ালখালী মধ্যম চরণদ্বীপ হাজিপাড়ার মৃত দেলা মিয়ার ছেলে। বোয়ালখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামসুল ইসলাম জানান, বেলা একটার দিকে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ফসলের খেতে কাজ করছিলেন আবদুল হালিম। ওই সময় বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।

৭৪ শতাংশ চিকিৎসাকেন্দ্রেই মৌলিক সরঞ্জামের অভাব by শিশির মোড়ল

দেশের ৭৪ শতাংশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ন্যূনতম মৌলিক সরঞ্জামের অভাব আছে। ৯৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ প্রতিরোধের মানসম্পন্ন ব্যবস্থা নেই। স্বাভাবিক প্রসবসেবার ব্যবস্থা আছে ৩৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে।
সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান জরিপ ২০১৪’-তে দেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতির এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) চালিত ও ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর জাতীয় এই জরিপ চালানো হয়। জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে শিশুদের টিকাদানের হার কমছে। ৬১ শতাংশ সেবাপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার সময় রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা হয় না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামোর দিক থেকে দেশ অনেক এগিয়েছে। কিন্তু সেবার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। জরিপে সেটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট), অ্যাসোসিয়েটস ফর কমিউনিটি অ্যান্ড পপুলেশন রিসার্চ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইসিএফ ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে এ জরিপ করেছে। জরিপে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকার এবং ইউএসএআইডি। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। আজ ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের আগে এই ফল প্রকাশ করা হলো।
জরিপে ১ হাজার ৫৪৮টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল ২৯৪টি, ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি ক্লিনিক ও সেবাকেন্দ্র ৫৯০টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ৪২০টি, এনজিও ক্লিনিক ও হাসপাতাল ১৫৭টি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ৮৭টি। গত বছরের ২২ মে থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান ও সেবাকেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা।
জরিপ সম্পর্কে নিপোর্টের সাবেক পরিচালক (গবেষণা) আহমেদ-আল-সাবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই জরিপ থেকে ভিত্তিমূলক তথ্য পাওয়া গেছে। জরিপে ত্রুটিগুলো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে।’
জরিপের ফলের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। গতকালের অনুষ্ঠানে উপস্থিত কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের পরিচালক মাখদুমা নার্গিস প্রথম আলোকে বলেন, সব কমিউনিটি ক্লিনিকে ওজন মাপার যন্ত্র, থার্মোমিটার আছে। ৫০ শতাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকে বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু এ জরিপে এর প্রতিফলন নেই।
সহায়ক সুযোগ-সুবিধা: জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ৭০ শতাংশ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকে। ৮১ শতাংশ এনজিও ক্লিনিক ও ৯৮ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালে নিয়মিত বিদ্যুৎ আছে।
৮৭ শতাংশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন পানি সরবরাহ আছে। গ্রামীণ এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে খারাপ। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বরিশাল বিভাগে। এই বিভাগের ৩৩ শতাংশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন পানির সরবরাহ নেই।
জরিপে দেখা গেছে, সেবা নিতে আসা মানুষের জন্য ২৮ শতাংশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাট্রিন নেই। সরকারি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের ৮৬ শতাংশে রোগীদের জন্য ল্যাট্রিন আছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও এনজিও ক্লিনিকে এই হার আরও কিছু বেশি। তবে ১০ শতাংশ জেলা হাসপাতালে, ১৭ শতাংশ উপজেলা হাসপাতালে এবং ৪২ শতাংশ মা ও শিশুসেবাকেন্দ্রে জরুরি যানবাহন সেবা নেই। সরকারের ইউনিয়ন পর্যায়ের কোনো প্রতিষ্ঠানে এবং কোনো কমিউনিটি ক্লিনিকেই জরুরি যানবাহন সেবার ব্যবস্থা নেই। নবজাতক ও প্রসূতি মৃত্যুর অন্যতম কারণ জরুরি প্রয়োজনে যানবাহনের অভাবে রোগীকে হাসপাতালে নিতে না পারা।
অনেকে অভিযোগ করেন, সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা হয় না। জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা হয় না। এ কারণে রোগী খোলামেলাভাবে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। ৩৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার আছে। এই পাঁচ ধরনের সহায়ক সুযোগ আছে মাত্র ১১ শতাংশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে।
মৌলিক সরঞ্জাম: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (২০১২ সাল) নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্রে ছয়টি চিকিৎসা-সরঞ্জাম থাকা আবশ্যক। এগুলো হচ্ছে বয়স্কদের ওজন পরিমাপ যন্ত্র, শিশুদের ওজন পরিমাপ যন্ত্র, থার্মোমিটার, স্টেথিসকোপ, রক্তচাপ পরিমাপ যন্ত্র এবং বাতি।
জরিপে দেখা গেছে, ৭৪ শতাংশ চিকিৎসাকেন্দ্রেই এসব সরঞ্জামের অভাব আছে। ২৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এই ছয় ধরনের সরঞ্জামের সবগুলোই আছে। জরিপকারীরা ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে স্টেথিসকোপ, ৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে থার্মোমিটার, ১৩ শতাংশে রক্তচাপ মাপা যন্ত্র, ১৮ শতাংশে বয়স্কদের ওজন পরিমাপ যন্ত্র এবং ৪৩ শতাংশে শিশুদের ওজন পরিমাপ যন্ত্র পাননি। ৬০ শতাংশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে আলো বা বাতির ব্যবস্থা নেই।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ: নিয়ন্ত্রণ নির্দেশনা মেনে চললে এবং কড়া নজরদারি থাকলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। জীবাণুমুক্ত করা সরঞ্জাম, ইনসেনেটর যন্ত্রপাতি, ব্যবহৃত ধারালো ছুরি-কাঁচি রাখার পাত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সিরিঞ্জ ও সুই ফেলার ব্যবস্থা, সাবান, প্রবহমান পানি, গ্লাভস, মুখোশ, গাউন—এসব সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে।
জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০টির মধ্যে দুটি চিকিৎসাকেন্দ্রে ধারালো ছুরি-কাঁচি, সিরিঞ্জ ও সুই ফেলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে প্রবহমান পানি ও সাবান নেই। ২৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে সেবাকর্মীদের মুখোশ পরার ব্যবস্থা আছে। ৮৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে জীবাণুমুক্ত করার সরঞ্জাম নেই। ১৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নির্দেশনা মানার কথা বলা হয়। আর ওপরে উল্লিখিত নয় ধরনের জিনিসই আছে মাত্র ৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে।
রোগনির্ণয় ক্ষমতা: চিকিৎসা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও মানসম্পন্ন সেবা দেওয়ার জন্য পাঁচটি পরীক্ষা (হিমোগ্লোবিন, রক্তে শর্করা, প্রস্রাবে প্রোটিন, প্রস্রাবে শর্করা এবং গর্ভাবস্থা) ও এক্স-রে দরকার হয়। এগুলো ন্যূনতম প্রয়োজন। জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ পরীক্ষা করা হয়—এমন প্রতিষ্ঠান ১০ শতাংশেরও কম। হিমোগ্লোবিন ও রক্তে শর্করা পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে যথাক্রমে ১২ ও ৭ শতাংশ চিকিৎসাকেন্দ্রে। গর্ভাবস্থা পরীক্ষা হয় ৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। প্রস্রাবে প্রোটিন ও শর্করা পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে যথাক্রমে ৬ ও ৫ শতাংশ চিকিৎসাকেন্দ্রে। এই পাঁচ ধরনের পরীক্ষাই করা হয় মাত্র ৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে।
জরিপে দেখা গেছে, সরকারি পর্যায়ে জেলা ও উপজেলার নিচে কোনো প্রতিষ্ঠানে এক্স-রে যন্ত্র নেই। তার পরও ২৭ শতাংশ জেলা হাসপাতালে এক্স-রে যন্ত্র চালু পাওয়া যায়নি। তবে ৬২ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালে এই যন্ত্র আছে। এনজিওগুলোর ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রটি দেখা যায়।
গতকাল অনুষ্ঠানে জরিপ প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশ উপস্থাপন করেন ইউএসএআইডির গবেষণা উপদেষ্টা কান্তা জামিল, যুক্তরাষ্ট্রের আইসিএফের পরামর্শক আহমেদ আল-সাবির, সেভ দ্য চিলড্রেনের মা ও শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রধান ইশতিয়াক মান্নান, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক শামস-এল-আরেফিন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ কারার জুনায়েত আহসান, নিপোর্টের মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহসানুল আলম, একই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী শাহীন সুলতানা। সভাপতিত্ব করেন নিপোর্টের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন।

সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার by সৈয়দ আবুল মকসুদ

অন্যান্য বছরের মতো এবারও কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকেরা এসেছেন। প্রায় সবারই একই ধরনের প্রশ্ন: স্বাধীনতার ৪৪ বছর হলো। একাত্তরে প্রত্যাশা কী ছিল এবং এই সময়ে প্রাপ্তি কতটা?
প্রথাগত প্রশ্নের প্রথাগত জবাব দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। বলেছি, ৪৪ বছরে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের অর্জন তো অবশ্যই আছে। ব্যর্থতার কথা শুনতে ভালো লাগে না, তা না বলাই ভালো। আর প্রত্যাশা কী ছিল—সেসব পুরোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা আরও বিরক্তিকর। প্রত্যাশা ব্যক্তির মনের ভেতরের ব্যাপার। আমার প্রত্যাশা এক রকম ছিল তো আরেকজনের প্রত্যাশা ছিল আরেক রকম। এমনও হতে পারে, একাত্তরে একজনের যা প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে তার প্রাপ্তি ঘটেছে হাজার গুণ বেশি। একাত্তরে অনেকের স্বপ্ন ছিল, দেশ একদিন স্বাধীন হবে, বেতনও একটু বাড়বে, চাল-ডাল, মাছ-তরকারির দাম একটু কমবে এবং মাসে ২৫ থেকে ৩০ টাকা ব্যাংকে জমাবেন। এখন তাঁর কাছে ব্যাংকগুলোর আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা পাওনা বকেয়া আছে। আমি কয়েকজন সংবাদকর্মীকে বলেছি, আমাদের মতো অক্ষম ও অসন্তুষ্ট মানুষের মতামত না নিয়ে সেই ধরনের মানুষদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কথা জিজ্ঞেস করুন। তাঁরা দেবেন সবচেয়ে শ্রুতিমধুর উত্তর। ওই ধরনের মানুষের অনেককেই আপনি চিনতে পারবেন তাঁদের পোশাক থেকে। কয়েক বছর যাবৎ তাঁদের জামা-কাপড়ের রঙে লাল ও সবুজ কিছুটা থাকবেই। তাঁদের স্ত্রীদের আনুষ্ঠানিক পোশাক শাড়ি হলে থাকবে জমিন সবুজ এবং পাড়টা লাল, ব্লাউজেও লাল-সবুজ থাকবেই এবং সালোয়ার-কামিজ হলে একটা যদি লাল হয় তো অন্যটা সবুজ। ওড়নাটা দুই রঙের যেকোনো একটির শেড। এখন পোশাকেই দেশপ্রেমের প্রকাশ পায়। চিরকাল যা ছিল বুকের গহনতম ভেতরের জিনিস, আজ তা শরীরের ওপরে সাঁটানো।
একাত্তরের ১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলা গ্রামে যে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পঠিত হয়, তাতে ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে... সার্বভৌম জনগণের প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকার প্রকাশ করা হয়। বলতে গেলে সেদিন প্রায় সবার প্রত্যাশা ওইটুকুই ছিল। তবে তার পরেও কারও কারও ব্যক্তিগত স্বপ্ন থাকলেও থাকতে পারে। যেমন আথালে গরু আছে তিনটি, তা দিয়ে সাত বিঘা জমিতে হাল দেওয়া কঠিন, স্বাধীনতার পরে আর এক জোড়া ষাঁড় যদি কেনা যায়! শ্রমিক এলাকার কোনো শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধা ভেবে থাকতে পারেন স্বাধীনতার পরে বেতন কুড়ি টাকা বাড়তে পারে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এমন কোনো কেরানি বা লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক (এলডিসি) স্বপ্ন দেখলেও দেখতে পারেন দেশ স্বাধীন হলে একটা প্রমোশন পেয়ে হেডক্লার্ক বা আপার ডিভিশন ক্লার্ক (ইউডিসি) হতে পারেন, কারণ একই পদে চাকরি হলো ১১ বছর। একজন ইউডিসি সেকশন অফিসার হওয়ার প্রত্যাশা করতেই পারেন।
তবে স্বাধীনতার চেতনা একটি সম্মিলিত একক চেতনা, স্বাধীনতার স্বপ্ন একটি ঐক্যবদ্ধ স্বপ্ন। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা, লাভ-লোকসানের কোনো সম্পর্ক নেই। তা থাকলে স্বাধীনতার জন্য মানুষ অকাতরে জীবন দিতে পারে না। স্বাধীনতার জন্য যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, তিনি খুব ভালোই জানেন, তাঁর মৃত্যুর পরে তিনি সব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে যাবেন। বেতনও বাড়বে না, প্রমোশনও হবে না, ব্যাংক থেকে ঋণও নেওয়া যাবে না ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে, সুতরাং তা ফেরত না দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
ষাটের দশকে আমরা যারা সরাসরি কোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না, তবে স্বৈরশাসন ও পশ্চিমাদের দখলদারত্ব অপছন্দ করতাম, অত্যাচার ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরোধিতা করতাম, ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা দেখতে চাইতাম, তাদের কাছে ওই অবস্থার বিকল্প ছিল উদারতাবাদ ও মার্ক্সীয় বামপন্থা। যে দল পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে কথা বলত, তাকে সমর্থন দিতাম তার একজন কর্মী না হয়েও। যে দল সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করত, তাকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিতাম ওই দলের একজন ক্যাডারের মতোই। ষাটের দশকে আমাদের স্বপ্ন ছিল ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের পরাস্ত করে উদার গণতান্ত্রিক ও অসামরিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার। সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন ঘটে বৈদ্যনাথতলার ঘোষণায়।
বৈদ্যনাথতলার ঘোষণার পক্ষকাল আগে থেকেই আমাদের মতো তরুণেরা যার যার মতো এবং ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে’ যা করণীয় তা-ই করছিল। কিন্তু ১৭ এপ্রিলের ঘোষণায় যখন বলা হলো আমাদের জন্মভূমিতে ‘এটি জনগণের প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন সব অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ দূর হয়ে যায়। বৈদ্যনাথতলার ঘোষণায় কিছুমাত্র ফাঁকি ছিল, অস্পষ্টতা ছিল—তা সেদিনও রেডিওতে শুনে মনে করিনি, আজও করি না। তবে এইটুকু শুধু লক্ষ করি যে ওই ঘোষণার প্রতিজ্ঞার সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতার আসমান-জমিন ফারাক।
১৯৭০-এর ডিসেম্বর থেকে ’৭১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২টি মাস আমি স্বাধীনতা বলতে বুঝেছি, রাষ্ট্রের অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে দেশের প্রত্যেক নাগরিক মুক্ত থাকবে। সেটাই আমার বিবেচনায় ছিল মুক্তি ও স্বাধীনতা। সেই মুক্তির সংগ্রামের শেষ অধ্যায়টির সূচনা ১৯৭১-এর মার্চ মাসে। রাষ্ট্রের অন্যায্য ও অমানবিক হস্তক্ষেপ যেন ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশকে ব্যাহত না করে। রাষ্ট্র হবে উদারতাবাদী বা লিবারেল।
রাষ্ট্রের সেই উদারতা অবশ্য আমরা চাই না, যেখানে একজন ব্যক্তিস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে বলবে আমাকে ডাকাতি করার অধিকার দাও, সরকারি জমি ও নদীর তীর দখল করার অধিকার দাও বা একটি মেয়েকে রাস্তায় উত্ত্যক্ত করার অধিকার দাও। আমি সেই ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে, যা প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনভাবে তার ইতিবাচক বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে। আমি চাইব সরকারের নীতির ঘোর বিরোধী একটি মেয়ে বা ছেলে তার প্রতিভা বিকাশের জন্য, তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানোর জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আনুকূল্য পাবে। কারণ, ভিন্নমত পোষণের জন্মগত অধিকার তার যেমন রয়েছে, তেমনি তার মেধার স্বাধীন বিকাশ ও দক্ষতা প্রয়োগের পূর্ণ সুযোগ পাওয়ার অধিকারও রয়েছে। একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো এই বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রেখে উদার ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। বড় বড় দালান ও সেতু বানানোর চেয়ে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা আগে জরুরি। উদারতাবাদের শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়? উদারতাবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি অন্ধ মতাদর্শী ও গোঁড়াদেরও জায়গা করে দেয়। কিন্তু অনুদার স্বৈরশাসন তাদের মতের বিপরীত—তা উদারই হোক বা প্রতিক্রিয়াশীলই হোক—কাউকেই সহ্য করে না। একটি বিরক্তিকর প্রবণতা আমাদের একশ্রেণির কথিত প্রগতিশীলদের মধ্যে লক্ষ করা যায়। রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীলদের ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এবং আরও বহু ব্যাপারে তাঁরা কঠোর সমালোচনার অধিকার চান। কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ে রক্ষণশীলদের চিন্তার অধিকারকে হরণ করতে দ্বিধা করেন না। অনেক প্রগতিশীল চান সব মানুষ তাঁদের প্রতি সম্মান দেখাবে, কিন্তু তাঁরা ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে কথা বলবেন না। তাঁরা প্রতিপক্ষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন। ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাসের পরিবেশ যে সমাজে ও রাষ্ট্রে নেই, সে সমাজ উদার ও আধুনিক নয়, সে সমাজ মধ্যযুগীয়। সে সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কোনো মূল্য নেই।
সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ও দাবি ছিল বাংলাদেশের মানুষের। কিন্তু আশির দশক থেকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল অবস্থাটা আর রইল না। তা ছাড়া, ষাটের দশকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে বৈপ্লবিক অবস্থা সৃষ্টি হয়, তা ’৭০ ও ’৮০-র দশকে ধরে রাখার মতো সমাজবাদী নেতা বাংলাদেশে ছিলেন না। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট বলে যারা পরিচিত, তারা বহুকাল মহাত্মা মার্ক্সের নামটিও মুখে নেয় না, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথাও বলে না, প্রতিদিন ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে রাজনীতিতে অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছে। মার্ক্সবাদী দর্শনের প্রয়োগ ছাড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সাম্প্রদায়িকতা রোগ নয়, উপসর্গ।
সোভিয়েত ইউনিয়ন খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার পর উপযুক্ত নেতৃত্ব থাকলে উদারতাবাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা আমাদের জন্য সহজ ছিল। কারণ, শাশ্বত বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যেই উদারতাবাদ রয়েছে। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা রয়েছে। সহাবস্থানের স্বভাব বাঙালির মধ্যে রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অসাংবিধানিক সামরিক শাসন ও সাংবিধানিক স্বৈরশাসন বিশেষ করে সামরিক-আধা সামরিক অপশাসন বাংলাদেশে একটি উদারতাবাদী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণের পথ রোধ করে দেয়। যে মানবিক মর্যাদার অঙ্গীকার করা হয়েছিল একাত্তরে বৈদ্যনাথতলায়, তা থেকে বাংলাদেশ সরে আসে। রাষ্ট্রে সবাই সমান নয়, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারও কারও ক্ষেত্রে যতটা প্রাপ্য, তার চেয়ে বেশি প্রযোজ্য।
উপযুক্ত ভাতাপ্রাপ্ত দলীয় পাবলিসিটি অফিসারের মতো অনেক স্বনামধন্য বিদ্বান প্রচার করছেন, অর্থনীতিই সব। গোলটেবিল ও মহাসমাবেশে প্রদত্ত তাঁদের বক্তৃতা থেকে শোনা যায় দেশের অর্থনীতি (এবং তাঁদের নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থা) ভালো হলে সব সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাঁদের তত্ত্ব—মুক্তবাজার অর্থনীতি দারিদ্র্য কমায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সামাজিক বৈষম্য কমায় প্রভৃতি। আমাদের মতো অল্প জ্ঞানগম্য যাদের, তারা এই ধারণার সমর্থক নই। বাজার অর্থনীতি কিছু মানুষকে অবশ্যই অতি দ্রুত বিত্তবান বানাতে পারে। বাজার অর্থনীতি দুর্নীতি বাড়ায় এবং প্রতিযোগিতা দিয়ে স্বার্থপর হতে শেখায়। বাজার অর্থনীতিতে বিত্তবান শ্রেণিটি তাদের স্বার্থের অনুকূল হলে স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে, ভিন্নমত দমন করতে সরকারকে বুদ্ধি–পরামর্শ দেয় ও সহযোগিতা করে। নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে অতি দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশ হতে গিয়ে যদি খুনখারাবি, অপহরণ, গুম প্রভৃতি অপরাধে সমাজ অস্থির হয়ে ওঠে, মানুষের মানবিক মর্যাদা বলে কিছু না থাকে, তাতে জনগণের লাভটা কী?
বাংলার মাটি আজ অগণিত কৃতী ব্যক্তির ছবিসংবলিত সুশোভিত বিলবোর্ড ও ডিজিটাল ব্যানারে পরিপূর্ণ। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মানুষও অত ডিজিটাল ব্যানার দেখেনি। আমার যদি অর্থবিত্ত ও সংগতি থাকত, আমিও সারা দেশে রাস্তায় রাস্তায় টাঙিয়ে দিতাম ডিজিটাল ব্যানার। তাতে লেখা থাকত বৈদ্যনাথতলায় উচ্চারিত ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত’ করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দাবি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

নেতাদের ঐক্য কর্মী পর্যন্ত পৌঁছাবে তো? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

নাগরিক কমিটি বা উন্নয়ন আন্দোলন ইত্যাদি নাম ব্যবহার করা হচ্ছে বটে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন যে আসলে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাই, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। প্রার্থী বা সমর্থকদের বক্তব্যেও তেমন রাখঢাকের বালাই নেই। চট্টগ্রামে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থীসহ আরও যে নয়জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কজন প্রত্যাহার করবেন বা প্রার্থিতা অব্যাহত রাখবেন, সেই হিসাবে না গিয়ে এখনই বলে দেওয়া যায়, মেয়র পদের লড়াইটি হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই।
বড় দুই দলে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন বেশ কজন। দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির এবং কোষাধ্যক্ষ ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। অন্যদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে সদ্যবিদায়ী মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে পুনর্বার প্রার্থী করা হবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধা-সংশয় ছিল। ডা. শাহাদাত হোসেনকে চেয়েছিলেন কর্মী-সমর্থকদের একাংশ। কেন্দ্র থেকে আমীর খসরু মাহমুদকে প্রার্থী করার আগ্রহ দেখানো হয়েছিল বলে শোনা যায়। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেছেন।
অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ নাছিরকে এবং বিএনপি মনজুরকেই বেছে নিয়েছে। বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্ত বড় দুটি দলেরই একাংশের কর্মী-সমর্থকদের খুশি করতে পারেনি। এর তাৎক্ষণিক কিছু প্রতিক্রিয়াও আমরা দেখতে পেয়েছি।
দলীয় মনোনয়নের সংবাদ শুনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে ছুটে গেছেন অনেক নেতা-কর্মী-সমর্থক। তাঁকে প্রার্থী হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ধরনা দিয়েছেন বাড়ির সামনে। কিন্তু তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না বলে জানালে ক্ষুব্ধ ও বিমর্ষ হয়েছেন। মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর হতাশার কথা ব্যক্ত করেছেন।
বিএনপি থেকে মনজুর আলমকে মনোনয়ন (সমর্থন) দেওয়া হতে পারে, এমন খবর চাউর হওয়ার পর নগর ছাত্রদলের সভাপতি গাজী সিরাজের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা মিছিল নিয়ে গিয়েছিলেন আমীর খসরুর বাসভবনে। পাঁচলাইশ এলাকায় মনজুর আলমের কুশপুতুল দাহ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কর্মীরা। মনজুর আলম দলের আন্দোলন-সংগ্রামে কখনো ছিলেন না, তিনি আসলে দিনে বিএনপি, রাতে আওয়ামী লীগ—এসব বিষোদ্গারও করা হয়েছে তাঁর নামে।
কিন্তু দিন যত গেছে, প্রার্থী পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখতে না পেয়ে ধীরে ধীরে থিতিয়ে গেছে উভয় দলের বিক্ষুব্ধ কর্মীদের প্রকাশ্য তৎপরতা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন তাঁরা। তবে দলীয় প্রার্থীকে মেনে নিলেও কতটা মনে নিতে পেরেছেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের সম্ভাবনা বা সংকট অনেকটাই নির্ভরশীল বলে মনে করি আমরা।
আ জ ম নাছির মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় তাঁর পাশে ছিলেন মহিউদ্দিন, ছালামসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। নির্বাচন সামনে রেখে নাছিরের সংবাদ সম্মেলনে দীর্ঘদিন পর এক মঞ্চে দেখা গেছে মহানগর আওয়ামী লীগের সব নেতাকে। অথচ নতুন কমিটি হওয়ার পর থেকে পদ-পদবি নিয়ে নানা বিরোধের কারণে নগর আওয়ামী লীগের কোনো সভায় সব নেতাকে একত্রে দেখা যায়নি এর আগে। নাছিরের মনোনয়নের পরে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ‘আমিসহ অনেকেই মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন সব ভেদাভেদ ভুলে নাছিরকে সমর্থন দিয়েছি। যাঁরা মনোনয়ন চেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সামান্য হতাশা থাকবে। তবে সেই হতাশা নিরসন করে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। আমাদের কাছে জয়ের বিকল্প নেই।’
একই রকম ঐক্যের মনোভাব দেখা গেছে বিএনপির নেতাদের মধ্যেও। মনজুর আলমের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন নোমান-খসরুসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা। চট্টগ্রাম নগর বিএনপিতে নানা সময়ে নানা মেরুকরণ দেখা গেছে আগে। নিকট অতীতে আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে আমীর খসরুর বিরোধ যেমন বহুল আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি নগর বিএনপির সভাপতি খসরুর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেনের বিরোধও বহু ঘটনার জন্ম দিয়েছে। শাহাদাতের অনুসারীরা অনেকে এখনো মনে করেন, মেয়র পদের প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন খসরু। তবে মামলা ও গ্রেপ্তারের শঙ্কার মধ্যে শাহাদাতের প্রার্থী হওয়া যে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ডা. শাহাদাত বলেছেন, ‘প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ ছিল। কিন্তু আগ্রহ থাকলেও অনেক সময় অনেক কিছু হয় না। তৃণমূলের কর্মীরা চেয়েছিলেন এমন একজনকে দল সমর্থন করুক, যিনি আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন। ওই দিক থেকে তৃণমূলে ক্ষোভ আছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে দল যেহেতু সমর্থন দিয়েছে, তাই ক্ষোভ ভুলে দলের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করতে হবে।’ অন্যত্র শাহাদাত বলেছেন, ‘...আমি নেতা-কর্মীদের বলে দিয়েছি মেয়র পদে মনজুর আলমের পক্ষে কাজ করার জন্য। মামলাজট কাটিয়ে আমিও শিগগির তাঁর পক্ষে মাঠে নামব।’
গত ৩১ মার্চ হোটেল পেনিনসুলায় একজন মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী, ছয়জন সাংসদসহ আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতারা যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন, মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন সেটাকে যতই ‘গেট টুগেদার’ বলে উল্লেখ করুন, তা যে আসলে নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণী বৈঠক, তাতে কোনো সংশয় নেই। যদিও প্রার্থী আ জ ম নাছির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু ‘গেট টুগেদারে’ একজন মন্ত্রী ‘যেকোনো প্রকারে হোক জিততে হবে’ ধরনের বক্তব্য দিতে পারেন কি না, তাতে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয় কি না, এ প্রশ্ন উঠবেই। যা-ই হোক, এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতারা যে তাঁদের প্রার্থীর পক্ষে এককাট্টা, সেই বার্তা পাওয়া গেছে।
মনজুর আলমের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে আবদুল্লাহ আল নোমানকে, প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আমীর খসরু মাহমুদ। অন্যদিকে, নাছিরের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ইসহাক মিয়া ও সদস্যসচিব মহিউদ্দিন চৌধুরী। এ যেন বাঘে-মোষে এক ঘাটে পানি খাওয়া। অর্থাৎ এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় দুটি দলই অন্তর্দলীয় নানা কোন্দল দূরে ঠেলে দিয়ে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য (নির্বাচনে বিজয়) অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে নেতাদের মধ্যে যে ঐক্যের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তা যদি তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে সঞ্চারিত করা যায়, সেটা হবে দুই দলেরই দীর্ঘমেয়াদি লাভ। এই নির্বাচনের সূত্রে দীর্ঘদিনের গ্রুপিং রাজনীতির অবসান ঘটলে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে। আর যদি গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেওয়ার ছক কষতে থাকেন নেতাদের কেউ, তাতে নির্বাচনে ফলাফল বিপর্যয় শুধু নয়, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভোগ করতে হবে আরও বহু দিন।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

কার কত অস্ত্র

মুখে ন্যায়নীতি আর সাম্যের কথা বিশ্বনেতারা যতই বলুন না কেন, বাস্তবে কিন্তু জোর যার মুলুক তার। যার কবজি যত সবল, আধিপত্য বিস্তারেও তাঁর সুবিধা তত। এক্ষেত্রে আসল খুঁটি হচ্ছে সমরাস্ত্র। এই সামরিক ক্ষমতা দিয়েই বিচার করা হয়-কার খুঁটিতে কত জোর। সামরিক ক্ষমতায় বলীয়ান হতে বিত্তবান দেশগুলোর চেষ্টার বিরাম নেই। ধনী দেশগুলো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে সর্বাধুনিক অস্ত্র বাগাতে তৎপর। এই সুযোগে পরাশক্তির দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া অস্ত্র বেচে মোটা অঙ্কের দাঁ মারছে। এভাবে বিশ্বের কোনো দেশ অস্ত্র তৈরি করে, কোনোটি বা অস্ত্র বাগিয়ে ক্ষমতাবান হচ্ছে।  সম্প্রতি গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার (জিএফপি) বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতার একটি সূচক প্রকাশ করেছে। এই সুচকে বিশ্বের ১২৬টি দেশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  পারমাণবিক অস্ত্র বাদ দিয়ে প্রচলিত যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে করা এই সুচকে শীর্ষস্থানীয় পাঁচ দেশ হলো-যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত ও যুক্তরাজ্য। দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা বিশ্লেষণে স্থল, নৌ ও বিমান শক্তির পাশাপাশি সম্পদ, অর্থ, ভৌগোলিক বিষয়াবলি প্রভৃতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জিএফপির সূচক অনুযায়ী প্রথম পাঁচটি দেশের সামরিক সক্ষমতার একটা সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হলো:

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার (জিএফপি) প্রকাশিত বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতার সূচকে সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র। ফাইল ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র: সামরিক সক্ষমতায় সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সামরিক বাহিনীতে যুদ্ধের জন্য সক্রিয় সদস্য ১৪ লাখ। সংরক্ষিত সক্রিয় সদস্য ১১ লাখ।
স্থলযুদ্ধের জন্য ট্যাংক আছে আট হাজার ৮৪৮টি। সমরাসে৶র সাঁজোয়া যান (এএফভি) ৪১ হাজার ৬২টি। স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু আগ্নেয়াস্ত্র (এসপিজি) এক হাজার ৯৩৪টি। টাওয়েড-আর্টিলারি (এক হাজার ২৯৯ টি। মাল্টিপল লান্স রকেট সিস্টেমস (এমএলআরএস) এক হাজার ৩৩১ টি।
দেশটির সামরিক বাহিনীর মোট বিমান ১৩ হাজার ৮৯২টি। যুদ্ধবিমান দুই হাজার ২০৭টি। ফিক্সড-উইং অ্যাটাক এয়ারক্রাফট দুই হাজার ৭৯৭ টি। পরিবহন বিমান পাঁচ হাজার ৩৬৬ টি। প্রশিক্ষণ বিমান দুই হাজার ৮০৯ টি। হেলিকপ্টার ছয় হাজার ১৯৬ টি। অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৯২০টি।
মোট নৌপথে সক্ষমতা বাড়ানোর মতো নৌযান ৪৭৩টি। বিমান বহনে সক্ষম রণতরী ২০ টি। ফ্রিগেট ১০ টি। ডেস্ট্রয়ার ৬২ টি, সাবমেরিন ৭২ টি। কোস্টাল ডিফেন্স ক্র্যাফট ১৩ টি, মেরিন ওয়ারফেয়ার ১১ টি।

জিএফপির বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতায় রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স

রাশিয়া: সামরিক সক্ষমতায় বিশ্বে রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়। দেশটির সামরিক বাহিনীতে যুদ্ধের জন্য সক্রিয় সদস্য সাত লাখ ৬৬ হাজার ৫৫ জন। সক্রিয় সংরক্ষিত সদস্য ২৪ লাখ ৮৫ হাজার।
স্থল যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার ট্যাংক আছে ১৫ হাজার ৩৯৮ টি। অস্ত্রবাহী যুদ্ধযান (এএফভি) আছে ৩১ হাজার ২৯৮টি। সেলফ-প্রপেল্ড গান (এসপিজি) পাঁচ হাজার ৯৭২টি। টাওয়েড-আর্টিলারি চার হাজার ৬২৫টি। মাল্টিপেল লান্স রকেট সিস্টেমস (এমএলআরএস) তিন হাজার ৭৯৩টি।
দেশটির মোট সামরিক বিমান তিন হাজার ৪২৯টি। যুদ্ধবিমান ৭৬৯টি। ফিক্সড-উইং অ্যাটাক এয়ারক্রাফট এক হাজার ৩০৫ টি। পরিবহন বিমান ১ হাজার ৮৩টি। প্রশিক্ষণ বিমান ৩৪৬টি। হেলিকপ্টার এক হাজার ১২০টি। অ্যাটাক হেলিকপ্টার ১১১টি।
মোট নৌ-সক্ষমতা ৩৫২টি। বিমানবহনে সক্ষম রণতরী একটি। ফ্রিগেট চারটি। ডেস্ট্রয়ার ১২টি, করভেট ৭৪টি, সাবমেরিন ৫৫টি, কোস্টাল ডিফেন্স ক্র্যাফট ৬৫টি এবং মেরিন ওয়ারফেয়ার ৩৪টি।

সামরিক সক্ষমতায় তৃতীয় অবস্থানে চীন। ফাইল ছবি: রয়টার্স
চীন: সামরিক সক্ষমতায় তৃতীয় অবস্থানে আছে চীন। যুদ্ধের জন্য দেশটির সক্রিয় সদস্য ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। সক্রিয় সংরক্ষিত সদস্য ২৩ লাখ।
স্থল যুদ্ধের জন্য চীনের ট্যাংক আছে নয় হাজার ১৫০টি। অস্ত্রবাহী যুদ্ধযান (এএফভি) আছে ৪ হাজার ৭৮৮টি। সেলফ-প্রপেল্ড গান (এসপিজি) ১ হাজার ৭১০টি। টাওয়েড-আর্টিলারি ছয় হাজার ২৪৬টি। মাল্টিপেল লান্স রকেট সিস্টেমস (এমএলআরএস) এক হাজার ৭৭০টি।
দেশটির মোট সামরিক বিমান দুই হাজার ৮৬০টি। যুদ্ধবিমান এক হাজার ৬৬টি। ফিক্সড-উইং অ্যাটাক এয়ারক্র্যাফট এক হাজার ৩১১টি। পরিবহন বিমান ৮৭৬টি। প্রশিক্ষণ বিমান ৩৫২টি। হেলিকপ্টার ৯০৮টি। অ্যাটাক হেলিকপ্টার ১৯৬টি।
মোট নৌ-সক্ষমতা ৬৭৩টি। বিমান বহনে সক্ষম রণতরী একটি। ফ্রিগেট ৪৭টি। ডেস্ট্রয়ার ২৫টি, করভেট ২৩টি। সাবমেরিন ৬৭টি, কোস্টাল ডিফেন্স ক্র্যাফট ১১টি, মেরিন ওয়ারফেয়ার ছয়টি।

সামরিক সক্ষমতায় ভারতের অবস্থান চতুর্থ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ভারত: সামরিক সক্ষমতায় ভারতের অবস্থান চতুর্থ। যুদ্ধের জন্য দেশটির সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ১৩ লাখ ২৫ হাজার। সক্রিয় সংরক্ষিত সদস্য ২১ লাখ ৪৩ হাজার।
স্থল যুদ্ধের জন্য ভারতের ট্যাংক আছে ছয় হাজার ৪৬৪টি। অস্ত্রবাহী যুদ্ধযান (এএফভি) আছে ৬ হাজার ৭০৪টি। সেলফ-প্রপেল্ড গান (এসপিজি) ২৯০টি। টাওয়েড-আর্টিলারি সাত হাজার ৪১৪টি। মাল্টিপেল লান্স রকেট সিস্টেমস (এমএলআরএস) ২৯২টি।
ভারতের মোট সামরিক বিমান এক হাজার ৯০৫টি। যুদ্ধবিমান ৬২৯টি। ফিক্সড-উইং অ্যাটাক এয়ারক্র্যাফট ৭৬১টি। পরিবহন বিমান ৬৬৭টি। প্রশিক্ষণ বিমান ২৬৩টি। হেলিকপ্টার ৫৮৪টি। অ্যাটাক হেলিকপ্টার ২০টি।
মোট নৌ-সক্ষমতা ২০২টি। বিমানবহনে সক্ষম রণতরী দুটি। ফ্রিগেট ১৫টি। ডেস্ট্রয়ার নয়টি, করভেট ২৫টি, সাবমেরিন ১৫টি, কোস্টাল ডিফেন্স ক্র্যাফট ৪৬টি, মেরিন ওয়ারফেয়ার সাতটি।
সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাজ্য পঞ্চম। ফাইল ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাজ্য: সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাজ্য আছে পঞ্চম অবস্থানে। যুদ্ধের জন্য দেশটির সক্রিয় সদস্য সংখ্যা এক লাখ ৪৬ হাজার ৯৮০। সক্রিয় সংরক্ষিত সদস্য এক লাখ ৮২ হাজার।
স্থল যুদ্ধের জন্য যুক্তরাজ্যের ট্যাংক আছে ৪০৭টি। অস্ত্রবাহী যুদ্ধযান (এএফভি) আছে পাঁচ হাজার ৯৪৮ টি। সেলফ-প্রপেল্ড গান (এসপিজি) ৮৯টি। টাওয়েড-আর্টিলারি ১৩৮টি। মাল্টিপেল লান্স রকেট সিস্টেমস (এমএলআরএস) ৪২টি।
যুক্তরাজ্যের মোট সামরিক বিমান ৯৩৬টি। যুদ্ধবিমান ৮৯টি। ফিক্সড-উইং অ্যাটাক এয়ারক্র্যাফট ১৬০টি। পরিবহন বিমান ৩৬৫টি। প্রশিক্ষণ বিমান ৩৪৩টি। হেলিকপ্টার ৪০২টি। অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৫৬টি।
মোট নৌ-সক্ষমতা ৬৬টি। বিমান বহনে সক্ষম রণতরী একটি। ফ্রিগেট ১৩টি। ডেস্ট্রয়ার ছয় টি। সাবমেরিন ১০টি। কোস্টাল ডিফেন্স ক্র্যাফট ২৮টি, মেরিন ওয়ারফেয়ার ১৫টি।

উড়ে গেল বুনো হাঁস by শরীফ খান

তেরখাদার সেই হাঁস দুটি l ছবি: লেখক
‘চাচা! হাঁসগুলো কি কিনলেন? নাকি বেচবেন?’
প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ ভদ্রলোক বাইসাইকেলের ব্রেক কষলেন, বাঁ পা মাটিতে ঠেকিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নাতি-পুতিগে জন্যি রাজৈর বাজারের কাছ থেইকে কিইনে আনলাম গোপনে। অতিথি পাহি তো! পুলিশি মেলা ঝামেলা করে।’
আমি চারটি হাঁসই দেখলাম, সাইকেলের রডে ঝুলানো। চারটির পা-ই একত্রে বাঁধা। বললাম, ‘পুলিশ যদি আপনাকে ধরে?’
বৃদ্ধ লোকটি এবার রাস্তার পাশে দাঁড় করানো আমাদের আট সিটের মাইক্রোবাসটির দিকে তাকালেন একবার, নেমে পড়লেন সিট থেকে, চোখ দুটি তার ঘোলা হয়ে গেছে ভয়ে—রডে ঝোলানো চারটি হাঁসের চোখের মতো। ‘ভয় নেই চাচা, কিন্তু আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে হাঁসগুলোকে।’ বললাম আমি। উনি তড়িঘড়ি হাঁস চারটিকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘আমি তাহলে যাই স্যার?’ উত্তরে আমি গম্ভীরভাবে বললাম, ‘যান, কত দিয়ে কিনেছিলেন?’ ‘তের শো টাহা,’ বলেই উনি সাইকেলে চাপলেন। আমরা হাঁস চারটি উড়িয়ে দিলাম আকাশে। না, কোনো আনন্দ পেলাম না। হয়তোবা ওরা আবারও পড়বে পেশাদার-নেশাদার নানা রকম শিকারির ফাঁদে, চড়বে রান্নাঘরের চুলায়। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, পাখি চারটি মাদারীপুরের রাজৈরে এসেছিল বাগেরহাটের চিতলমারী বা ফকিরহাট অঞ্চল থেকে।
ঘটনাটি গত ফেব্রুয়ারি মাসের, আমার এক অনুজপ্রতিম বন্ধুর সঙ্গে মোট ছয়জন ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলাম বরিশালের বানারীপাড়ার এক গ্রামে। যাওয়ার পথেই মাদারীপুরের রাজৈরের কাছাকাছি ঘটনা এটি। ২০১১ সালের শীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম খুলনার তেরখাদা উপজেলায়। যে গ্রামে গিয়েছিলাম এবং যার সঙ্গে গিয়েছিলাম, তিনি আমার জন্য একজোড়া বুনো হাঁস কিনেছিলেন ৯৫০ টাকায়। তখন আমার সঙ্গে ক্যামেরা ছিল, ছবি তোলা হলো। রাজৈরের হাঁস চারটির ছবি তোলা যায়নি, আমাদের কারও কাছেই ক্যামেরা ছিল না। মোবাইলে ক্যামেরা ছিল, মোটেই উন্নত মানের নয়। তেরখাদার হাঁস দুটিও ছেড়ে দিয়েছিলাম (২৮/৯/২০১৩)।
যে ছয়টি হাঁসের কথা বললাম, সেগুলোকে ফকিরহাট অঞ্চলে বলা হয় চড়ুই হাঁস, নাইরোলি। জিরিয়া হাঁস, নীলপক্ষÿবলাকা নামেও পরিচিত এরা। ইংরেজি নাম Gargany, বৈজ্ঞানিক নাম Anas querquedula, মাপ ৩৯ সেন্টিমিটার। আমাদের পরিযায়ী বুনো হাঁস এটি। শীত মৌসুমে যথেষ্টই দেখা মেলে এদের হাওর-বাঁওড়ে। মূল খাদ্য মূলত শামুক-গুগলীসহ নানা রকম জলজ শস্যবীজ, মাছ ও কচি ঘাস-পাতা-কুঁড়ি।
বেশ বড় দলে চলে এরা। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোতে এখন কম পরিমাণে হলেও শিকারিদের কবলে পড়তে হয় এদের। তবে ফকিরহাট-মোল্লাহাট-চিতলমারীজোড়া ‘উত্তরের হাওরে’ এরা ধরা পড়ে বেশি। ওই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সচেতন জনগণ ও বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাবের তৎপরতায় বিক্রি করা আজকাল খুবই মুশকিল। তাই শিকার ছড়িয়ে দেওয়া হয় দূর-বহুদূরে। আমার বিশ্বাস, রাজৈরের হাঁস চারটি ছিল ও রকমেরই। কত ছোট বুনো হাঁস! তবু রক্ষা পায় না ওরা। রক্ষা করার উপায়টা কী?

বিষয় ক্রিকেট by আবুল হায়াত

ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট খেলতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও মাঠে গিয়ে প্রায়ই ক্রিকেট খেলেছি। নিজেকে আমি মোটামুটি ক্রিকেটার বলতে পারি। শুধু ক্রিকেটার বললে ভুল হবে—অলরাউন্ড ক্রিকেটার বলতে হবে। কারণ ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—সবই করতাম। অবশ্য সবই খুব বাজে মানের ছিল, শেষ পর্যন্ত আম্পায়ারিং করে অবসর নিয়ে ফেলি। সেখানেও বাজে আম্পায়ারিংয়ের অভিযোগ ছিল আমার বিরুদ্ধে।
তাতেও অবসর হয়নি। কারণ, এখনো আমি ক্রিকেটের শ্রোতা ও দর্শক। রাত-দিন যখনই ক্রিকেট খেলা হয়, আমি আছি। হয় রেডিওতে, নয় টিভিতে। সেটা সম্ভব না হলে ইন্টারনেটে।
ক্রিকেট আজ একটি জাতীয় আলোচনার বিষয়। আমরা সদ্য একটি বিশ্বকাপ খেলে এসেছি অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে। আমাদের ছেলেরা এবারেই সবচেয়ে ভালো খেলা প্রদর্শন করেছে। কাপ পাব না জেনেও আমরা ভারতের সঙ্গে খেলাটা জিততে চেয়েছিলাম। খেলাতে জিততে কে না চায়। ভালোই খেলছিল ছেলেরা। তারপর কী ঘটল তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই আশা করি। আশাহত আমরা। ক্ষুব্ধ পুরো জাতি।
আমার ক্রিকেটভক্তির কারণে আমার স্ত্রী শিরীন আগে প্রায়ই বিরক্ত হতো। রেডিও কেড়ে নিত, টিভি বন্ধ করে দিত, আবার কখনো বলত—থাক, কী বলত সেটা নাহয় না-ই শুনলেন। আসল কথাটা বলি।
সে এখন ক্রিকেটভক্ত। বাংলাদেশ যখন থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিচ্ছে তখন থেকেই ক্রমেই বাড়ছে তার আগ্রহ। এবং এখন সে নিজে নিজেই আমার অনুপস্থিতিতেও ক্রিকেট দেখে। উপলব্ধি করে এর অন্তঃস্থ মজাটা। সেদিন রুবেলের নো বল এবং মাহমুদউল্লাহর আউটের পর সে যদি ইয়ান গোল্ড আর আলিম দারকে হাতের কাছে পেত, খোদা জানেন, কী করে ফেলত! আর শ্রীনিবাসন নামটা তো এখন তার কাছে সাক্ষাৎ শয়তান।
ক্রিকেটে চুরি-চামারি নতুন কিছু নয়। খেলাটা শুরুর সময় থেকেই চলে আসছে জেতার জন্য নানা ছলচাতুরী। এ ক্ষেত্রে আম্পায়ারের অবদানটাই মুখ্য। তাঁদের উৎকোচ দিয়েই এ কাজ সাধিত হতো। এবং এখনো হয় বোধ হয়।
খেলাটার মূল রয়েছে ইউরোপে। কেউ বলেন হল্যান্ড এর জন্মদাতা। কোথায় যেন পড়েছিলাম চীনই প্রথম ক্রিকেট খেলে। তবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সূত্র বলে, খেলাটা আবিষ্কৃত হয় ষোড়শ শতকে গ্রেট ব্রিটেনের সাসেক্সে। বাচ্চাদের খেলা হিসেবেই এর উৎপত্তি। অনেকটা ডান্ডাগুলি খেলা আরকি। একটা গোলাকার (পাথর কিংবা কাঠের) বস্তুকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে দূর করা ছিল এই খেলার মূল লক্ষ্য। পরে বয়স্করাও মজা পেয়ে খেলা শুরু করেন ক্রিকেট। ১৬১১ সালে মজার ঘটনাও ঘটে এই খেলা নিয়ে। দুই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা হয়, রোববার চার্চে প্রার্থনায় না গিয়ে ক্রিকেট খেলার অপরাধে। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয় ১৮৪৪ সালে আর ১৮৭৭ সালে শুরু হয় টেস্ট ম্যাচ। ক্রমে ক্রমে নানা ফর্ম এসেছে: এক দিনের খেলা, সিক্স-এ সাইড, সিঙ্গেল উইকেট, টি-টোয়েন্টি ইত্যাদি। পাঁচ দিনের টেস্ট খেলায় ঝিমানো ভাব চলে আসায় তৈরি করা হয় এসব দর্শক-উদ্দীপক ফর্ম।
ভারত উপমহাদেশে ১৭৩৭ সাল থেকে চালু হয় ক্রিকেট, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বদৌলতে। তারা গড়ে তোলে শহর মাদ্রাজ, মুম্বাই, কলকাতা। এই স্থানগুলোতেই গড়ে ওঠে ক্রিকেট ক্লাব। প্রথম শ্রেণির প্রথম ম্যাচ হয়, কলকাতা-মাদ্রাজ, ১৮৬৪ সালে। খেলাটা কোথায় হয়েছিল, জানা নেই অবশ্য আমার।
ক্রমেই ঢাকায়ও বিস্তারিত হয় ক্রিকেট। সেদিন কোথায় যেন পড়লাম, আমির খানের লগন সিনেমার কাহিনিটি বাস্তবে ঘটেছিল আমাদের ঢাকায়। ব্রিটিশ টিমকে হারিয়েছিল ঢাকার ছেলেরা। পর পর দুই বিশ্বকাপে আমরা আবার তা করে দেখিয়েছি।
ও হ্যাঁ, ফিরে আসি চুরি–চামারির ব্যাপারে। তার আগে দুটো চুটকি হয়ে যাক না!
এক মহিলা ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়েছেন। তিনি খেলাটা বোঝেন না। একজন আউট হতেই সবাই হর্ষধ্বনি করে ওঠে। উনি পাশের লোককে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী হলো ভাই?’
‘এখনই একজন এলবি হয়ে গেল।’
‘ও তাই? ক্যাচটা কে নিল?’
তখন নিউজিল্যান্ড সবচেয়ে দুর্বল ছিল। একবার টেস্টে ২৬ রানে অলআউট হয়েছিল। প্রথম ব্যক্তি: একজন দর্শক ক্রিকেট খেলার সময় বাথরুমে গেলে কী হারাবেন? দ্বিতীয় ব্যক্তি: পুরো নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংটাই মিস করবে।
সেদিন ফেসবুকে দেখলাম, নুডলস রান্না শেখাচ্ছে। তামিম ইকবাল ব্যাটিংয়ে নামলেই চুলায় চাপাবেন আর আউট হলেই নামিয়ে ফেলবেন। তাহলেই নুডলস তৈরি।
আবার যেদিন ভালো খেলল তামিম, সেদিন স্ট্যাটাস দেখলাম, আজ যাঁরা নুডলস রান্না করেছেন, সবারটাই পুড়ে গেছে।
হ্যাঁ, এবার চুরির ঘটনায় আসা যাক।
একেবারে পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে পাকিস্তানে আসে এমসিসি (ইংল্যান্ড) দল। আম্পায়ার সেবার ঝাঁকে ঝাঁকে ব্রিটিশদের আউট দেয়। পায়ে লাগলেই এলবি। খেপে গিয়ে এক রাতে আম্পায়ারকে রুম থেকে তুলে নিয়ে মদের বালতিতে চুবিয়েছিল ইংলিশ খেলোয়াড়েরা।
সত্তরের দশকে কলকাতায় পাকিস্তান জিতছিল প্রায়। বৃষ্টিতে ঝামেলা হচ্ছিল সেদিন। সেই সুযোগে আম্পায়ার গাঙ্গুলী দিলেন খেলা বন্ধ করে, আইন ভঙ্গ করে। তখনো ডিএল মেথড চালু হয়নি, বেঁচে যায় ভারত পরাজয় থেকে।
নিউজিল্যান্ডে খেলা হচ্ছে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। নিউজিল্যান্ডের আম্পায়ার কোনো আউটই দিচ্ছিলেন না। ইংলিশ খেলোয়াড়েরা ত্যক্ত-বিরক্ত। এ সময় একজন হলেন সরাসরি বোল্ড। ইংলিশ প্লেয়ার আম্পায়ারের কাছে এসে বলেন: হাউ ইজ দ্যাট?
আম্পায়ার: সে বোল্ড হয়েছে।
ইংলিশ প্লেয়ার: বোল্ড হয়েছে তা তো দেখছি, আউট হয়েছে কি?
ক্রিকেটে প্রচুর আইন রয়েছে নিয়ন্ত্রণের জন্য। প্রথমতই বলা হয়, এটা ভদ্রলোকের খেলা, ভদ্রতা মানিয়ে চলতে হবে। নট টু রিজন হোয়াই, বাট টু ডু অর ডাই। এদিক-ওদিক কিছু হলেই আপনাকে আইন দেখানো হবে।
খেলায় আম্পায়ার স্বাগতিক দলের হয়ে পক্ষপাতিত্ব করছিলেন, বিরোধী ক্যাপ্টেন অবশেষে আম্পায়ারের কাছে গিয়ে বলেন, খুবই ভদ্র ভঙ্গিতে: স্যার, আইসিসিতে চিন্তা করার ব্যাপারে কোনো আইন আছে কি?
আম্পায়ার: না। কেন, আপনি কি কিছু চিন্তা করছেন?
ক্যাপ্টেন: জি। আমরা মানে আমার দল, আমি নিশ্চিত আমার গোটা জাতি চিন্তা করছে আপনি একটা চোর!
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন।
আবুল হায়াত: নাট্যব্যক্তিত্ব।