Monday, May 4, 2026

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ইরানি গণমাধ্যম

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সতর্কতা উপেক্ষা করার পর জাস্ক দ্বীপের কাছে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে এ কথা জানিয়েছে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র সোমবার ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান শুরু করবে। এর আওতায় হরমুজ প্রণালি থেকে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে বের করতে সহায়তা দেওয়া হবে।

ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পর এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর এল।

এর আগে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়, ইরানের সেনাবাহিনী মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছে।

সূত্র: আল–জাজিরা।

হরমুজ প্রণালিতে কী ঘটেছে

* ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সতর্কতা উপেক্ষা করায় জাস্ক দ্বীপের কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

* এই খবর আসার কয়েক মিনিট আগেই আইআরজিসি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছে ইরানে।

* এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ নামে অভিযান শুরু হচ্ছে। যে দেশগুলো জাহাজগুলো প্রণালিতে আটকে রয়েছে, তাদের অনুরোধে এই অভিযান। আটকে পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সহায়তা দেওয়া হবে এই অভিযানে।

* প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ইরান বারবার সতর্কতা জানিয়ে আসছিল, যে এই অভিযান সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাবে।

সূত্র: আল–জাজিরা।

হরমুজ প্রণালিতে লাল রেখা চিহ্নিত এই মানচিত্র প্রকাশ করে আইআরজিসি জানিয়েছে, এই এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা চিহ্নিত করে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এই মানচিত্র প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের নিয়ন্ত্রিত এলাকা হলো দেশটির মাউন্ট মুবারক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরার দক্ষিণের মধ্যে আঁকা রেখা এবং ইরানে কেশম দ্বীপের শেষ প্রান্ত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইনের মধ্যে আঁকা রেখার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে এই মানচিত্র নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

স্বাস্থ্য খাতের অস্বাস্থ্যকর চিত্র ও একজন মকছেদুল মোমিন by মেহেদি রাসেল

কথায় বলে, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা’। একটি দেশের যখন সবখানে সমস্যা থাকে, তখন তা থেকে উত্তরণের উপায় বের করা দুঃসাধ্য বটে। দেশের সেবামূলক সব কটি খাত এখন দারুণ দুর্দশায় নিমজ্জিত। যে জায়গাগুলোতে কোনো রকম অনিয়ম আর দুর্নীতি হওয়ার কথা ছিল না, সেখানেই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি। খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা—মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের এই তিন জায়গাকে আমরা স্বাধীনতার এত বছর পরও ঠিক করতে পারিনি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এই ব্যর্থতা ভয়াবহ। আমাদের খাদ্য ও পানীয়ে ভেজাল।

দুনিয়াতে খাদ্যদ্রব্যে এত ভেজাল আর কোনো জাতি মেশায় কি না, তা আমার জানা নেই। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি থেকে শুরু করে মুদিখানা, কাঁচাবাজার—কোনো জায়গা থেকেই নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও ভয়াবহ সময় পার করছে এখন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পড়ালেখা ও পরীক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। শুধু সার্টিফিকেট-বাণিজ্য করে, এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে ব্যাঙের ছাতার মতো। লাখ লাখ ছেলেমেয়ের সর্বনাশ করছে তারা। হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো রোগীদের জিম্মি করে টাকা আদায়ের জন্য নতুন নতুন ফন্দি-ফিকির বের করছে প্রতিনিয়ত।

সেবামূলক খাতের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সম্ভবত চিকিৎসা খাতে। সরকারি-বেসরকারি দুই জায়গাতেই এখানে চূড়ান্ত অনিয়ম। বাংলাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছেন, এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। হয় চিকিৎসাসেবা খারাপ, চিকিৎসকের অত সময় থাকে না ঠিকভাবে রোগের বিবরণ শোনার; নয়তো হাসপাতালের পাওনা মেটাতে পকেট গড়ের মাঠ হয়ে যায়। এখানকার চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থা না থাকার কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ পাশের দেশ ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করান। আর উচ্চবিত্তদের জন্য যেসব হাসপাতাল—সেগুলো হাতে গোনা—সেখানে যাওয়ার কথা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা কল্পনাও করেন না।

সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির জন্য সরকারের অনেক পদক্ষেপের কথা শোনা যায়, কিন্তু সেগুলো থেকে যে পরিমাণ সুবিধা পাওয়ার কথা সাধারণ মানুষের, সেই পরিমাণ সুবিধা তাঁরা পান না। কেননা, দায়িত্ব অবহেলার পাশাপাশি গৃহীত পদক্ষেপগুলো প্রায়ই জনসাধারণের কথা মাথায় রেখে নেওয়া হয় না, নেওয়া হয় সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালীদের কী কী লাভ হবে, সেগুলো মাথায় রেখে। ফলে পুরো বিষয়টি একধরনের ‘সিস্টেম লস’-এর মধ্যে পড়ে যায়। সাধারণ মানুষের কাজে লাগে না, এমন ২৩৩টি স্থাপনার খবর সম্প্রতি এসেছে প্রথম আলোর খবরে। সেখানে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অপরিকল্পিতভাবে কোটি কোটি টাকার স্থাপনা তৈরি করেছে, যা আদতে কারও কোনো কাজে আসছে না। ধামরাই উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে ৩ একর জমির ওপর ২০০৬ সালে ৬টি দোতলা ভবন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি হাসপাতাল। সেই হাসপাতালে কোনো দিন কোনো রোগী ভর্তি হননি। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, বরগুনা, কুমিল্লাসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় এমন আরও অনেক হাসপাতাল তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, যেগুলো কোনো কাজে লাগে না। কোথাও চিকিৎসক থাকে না, কোথাও যন্ত্রপাতি নেই, কোথাও আসবাব নেই, কোথাও রোগী নেই। শুধু বিপুল অর্থ অপচয়ের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফাঁকা দালানগুলো।

বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক ও জনসংখ্যার অনুপাত ১: ৬৫৭৯; অর্থাৎ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জায়গাগুলোতে ৬ হাজার ৫৭৯ জনের বিপরীতে ডাক্তার আছেন মাত্র ১ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ১ হাজার জনে কমপক্ষে ১ জন ডাক্তার থাকা উচিত যেকোনো দেশে। যে দেশে হাসপাতালগুলোতে ঘুরে ঘুরে হয়রান অসহায় রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পান না, যে দেশে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যের অভাবে মায়েরা ফুটপাতে বাচ্চার জন্ম দেন; সেই দেশে এমন স্থাপনা পড়ে থাকা, এত বিপুল টাকা অপচয় করাকে কোন স্তরের বিলাসিতা বলা উচিত, তা আমার জানা নেই।

মুন্সিগঞ্জের জেলা হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার, কিন্তু সেটা চলছে ১০০ শয্যার জনবল দিয়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখানে যাঁরা সেবা নিতে আসেন, তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সবাইকে সেবা দেওয়াও যায় না। সেবার মানও খারাপ থাকে। কয়েকটি বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক অথবা ঢাকায় যেতে হয় চিকিৎসা নিতে।

শুধু মুন্সিগঞ্জ সদর নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গার চিত্র মোটামুটি একই। সরকারি হাসপাতালগুলোর সমস্যার কথা বলে শেষ করা যাবে না। প্রতি পদে পদে সেখানে সিন্ডিকেট আর দুর্নীতি। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষসহ অনেক চিকিৎসক সেখানকার অসাধু চক্রের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে রাস্তায় নামেন, মানববন্ধন করেন। তাঁরা বলেন, একশ্রেণির অসাধু কর্মচারীর সিন্ডিকেটের কারণে হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জিম্মি হয়ে পড়ছেন। চিকিৎসকদের যেখানে রাস্তায় নামতে হয়, সেখানে রোগীদের কী অবস্থা, তা সহজেই অনুমেয়। এমন সিন্ডিকেট বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায়। অথচ নিয়ন্ত্রণের কোনো পদক্ষেপ নেই। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

চিকিৎসাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গত বছরের ৩১ অক্টোবর অনশনে বসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান। ওষুধ চুরি থেকে শুরু করে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ—মোটকথা, সব ধরনের দুর্নীতি দেখতে হলে সরকারি হাসপাতালগুলো একটা ভালো জায়গা হতে পারে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এমন দশার কারণে স্বভাবতই মানুষ বেসরকারি হাসপাতালের দিকে ছোটেন। কিন্তু সেখানকার চিত্রও ভয়াবহ। বেসরকারি হাসপাতালের মালিকেরা যেহেতু জানেন সরকারি হাসপাতালের সেবার মান খুব খারাপ, সেখানে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার চেয়ে লটারি জেতা সহজ—তাঁরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। শহরগুলোর অলিগলিতে গজিয়ে ওঠা এসব হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স, সরঞ্জাম না থাকার পরও মানুষ এসব জায়গায় যাচ্ছেন। কেননা সাধারণ মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আইসিডিডিআরবি ২০১৯-২০ সালে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর এক গবেষণা চালায়। সেখানে দেখা যায়, দেশে মাত্র ৬ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স আছে এবং দেশের মোট হাসপাতালের ৮০ শতাংশই বেসরকারি হাসপাতাল। ওই গবেষণায় দেখা যায়, হাসপাতাল হওয়ার জন্য ন্যূনতম শর্তও সেগুলো পূরণ করে না।

দেশে স্বাস্থ্যসেবার এমন অস্বাস্থ্যকর দশার মধ্যে তাই আশার আলো হয়ে ওঠে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। একজন মানুষের একক উদ্যোগে পাল্টে গেছে এ হাসপাতালের চিত্র। কয়েক বছর আগেও ময়লা-আবর্জনা ও মেডিকেল বর্জ্যের দুর্গন্ধে হাসপাতালটিতে টেকা ছিল দায়। দিনে গরু-ছাগল চড়ে বেড়াত হাসপাতালের ভেতরের চৌহদ্দিতে। রাতে মাদকসেবীরা আড্ডা বসাত। চিকিৎসক-নার্সরা বেশি দিন থাকতে চাইতেন না সরকারি এই হাসপাতালে। ফলে সাধারণ মানুষ এখান থেকে কোনো সেবা পেতেন না।

কিন্তু এখন বদলে গেছে পুরো হাসপাতালের চিত্র ও চরিত্র। হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে এখন ঝকঝকে। সবুজে ছেয়ে গেছে চারপাশ। বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে পাঠাগার। চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মচারী আগে এখানে থাকতে চাইতেন না। কিন্তু তাঁদের আবাসন ও অন্যান্য সমস্যা দূর করা হয়েছে। এখন তাঁরা এ হাসপাতালে একবার বদলি হয়ে এলে এখান থেকে আর যেতে চান না। বাংলাদেশের উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে এই চিত্র নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।

প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থা থেকে হাসপাতালটিকে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মকছেদুল মোমিন। কিন্তু এখনো ৩১ শয্যার জনবল নিয়ে চলছে ৫০ শয্যার এ হাসপাতাল। ফলে কিছু জায়গায় সংকট রয়ে গেছে। সংকট থাকা সত্ত্বেও যে পরিবর্তন সম্ভব, তা দেখিয়ে দিয়েছেন মকছেদুল মোমিন। তাঁর আন্তরিকতা ও সেবা দেওয়ার মানসিকতা অন্যান্য হাসপাতাল থেকে এ হাসপাতালকে আলাদা করেছে। এখন প্রচুর মানুষ এখানে সেবা নিতে আসেন।

মানুষকে জিম্মি করাই যখন বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালের স্বাভাবিক চিত্র, সেই জায়গাতে মকছেদুল মোমিনের এমন উদ্যোগ আমাদের আশার আলো দেখায়। নষ্টদের অধিকারে চলে যাওয়া আমাদের সেবা খাতগুলোতে এমন মকছেদুল মোমিনদের প্রয়োজন এখন সবচেয়ে বেশি।

* মেহেদি রাসেল, কবি ও প্রাবন্ধিক
- mehedirasel32@gmail.com

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-01%2Fcf86cdf9-519e-4e1e-a42b-dd2d0c6db086%2Fmaksedul_momin.JPG?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মকছেদুল মোমিন।

কী আছে মেহজাবীনের আলোচিত এই সিনেমায় by পৃথা পারমিতা নাগ

এ শহরের সব মানুষেরই একটা গল্প থাকে। তবে সেই গল্পগুলো বাস্তবসম্মতভাবে খুব কমই পর্দায় উঠে আসে। দর্শক নিজেকে একাত্ম করতে পারেন—এমন গল্পের সিনেমা হাতে গোনা। এ ধারায় একেবারেই ব্যতিক্রম ‘সাবা’। মা আর মেয়ের গল্প নিয়ে সিনেমা; তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া, ঘটতে থাকা টুকরো টুকরো সময়ের গল্প। গল্পের প্রধান চরিত্রও তাঁরা, মা-মেয়ে।

একনজরে
সিনেমা: ‘সাবা’
ধরন: ড্রামা
পরিচালক: মাকসুদ হোসাইন
চিত্রনাট্য: মাকসুদ হোসাইন ও ত্রিলোরা খান
অভিনয়: মেহজাবীন চৌধুরী, রোকোয়া প্রাচী, মোস্তফা মন্‌ওয়ার, সুমন পাটোয়ারী, অশোক ব্যাপারী
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট

নির্মাতা মাকসুদ হোসাইনের শাশুড়ি এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন, মাকে নিয়ে দীর্ঘ এক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যান তাঁর স্ত্রী (সিনেমার সহচিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক) ত্রিলোরা খান। নিজেদের জীবনের সে গল্পই পর্দায় তুলে এনেছেন তাঁরা। ‘জীবন থেকে নেওয়া’, তাই বোধ হয় সাবার আবেগ এতটা ছুঁয়ে যায়।

সাবা করিম (মেহজাবীন চৌধুরী)। ২৪ বছরের তরুণী। মা-মেয়ে একসঙ্গে থাকেন। এক সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের শরীরের নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। বাবা লাপাত্তা। মায়ের ওষুধ, চিকিৎসক, রান্না থেকে ডায়াপার বদলানো—সব একা হাতেই সামলান সাবা। একই সঙ্গে ঘাড়ে তুলে নিতে হয় পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব। মাকে দেখভাল করে সংসার চালাতে হিমশিম খান সাবা। সারা দিন ঘরে থেকে থেকে মা-ও হয়ে ওঠেন খিটমিটে। কিছুই যেন বুঝতে চান না। কখনো তিনিই আরও কঠিন করে তোলেন সাবার জীবন। কিন্তু দিন শেষে সাবা চান তাঁর মা যেন বেঁচে থাকুন, সুস্থ থাকুন। কঠিন এই শহরে সাবাকে নামতে হয় এক অসম যুদ্ধে। মাকে বাঁচানোর এ লড়াইয়ে নিজের মনের বিরুদ্ধে কাজ করতেও তিনি দ্বিধা করেন না। শেষ পর্যন্ত কী হয়, জানতে হলে সিনেমাটি দেখতে হবে।

বিদেশের বিভিন্ন উৎসব ঘুরে দেশের প্রেক্ষাগৃহে ‘সাবা’ মুক্তি পেয়েছে ২৬ সেপ্টেম্বর। টরন্টো, রেড সি, বুসানসহ বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শনীর পর প্রশংসিত হয়েছে ‘সাবা’। কেন? ছবিটি দেখলেই বুঝতে পারবেন। খুব ‘সাধারণ’ গল্প হয়েও দেশের সিনেমায় এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ‘সাবা’। সিনেমার প্রধান শক্তি এর সরলতা। গল্পকে অতিরঞ্জিত করা হয়নি। এটি যেন শুধু সাবার গল্প! চরিত্রগুলোকে নির্মাতা এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, সবকিছু মনে হয় বাস্তব। মা-মেয়ের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব যেমন উঠে এসেছে, তেমনি দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে সাবার মনস্তত্ত্ব।

মায়ের অসুস্থতা আর পারিপার্শ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে একা এক তরুণীর সংগ্রামের গল্প হলেও সাবা দমবন্ধ বিষণ্নতার ছবি নয়। মা ও মেয়ের খুনসুটি দেখতে গিয়ে দর্শক হেসে উঠেছেন বারবার। ছোট ছোট প্রতিটি কাজ থেকেও কীভাবে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, নির্মাতা যেন সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। তেমনি ‘খালি দম নিতে পারলেই কি বাঁচা হয়ে গেল’ সংলাপের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন শয্যাশায়ী মানুষের কষ্টকেও। চিকিৎসকের বারণ সত্ত্বেও মায়ের কাচ্চি নিয়ে পাগলামি ভোজনরসিক বাঙালির চরিত্রেও ফুটে ওঠে।

কীভাবে বেঁচে আছে নিম্ন আর মধ্যবিত্ত
দেশের সিনেমায় নাগরিক জীবন মানেই যেন রঙিন আলোর ঝলকানি কিংবা শহুরে প্রেমিক-প্রেমিকার মেকি দুঃখকষ্ট। সেই পথে না হেঁটে শহরের মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত পরিবারে আলো ফেলেছে সাবা; তুলে এনেছে ঘষ্টা খাওয়া দৈনন্দিন জীবন। ‘সাবা’ রাজনৈতিক সিনেমা নয়, তবে পরোক্ষভাবে ঠিকই নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন নির্মাতা। সংবাদ পাঠিকার ভয়েসওভারে ফাঁপা উন্নয়ন, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তায় তরুণদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা, কোভিড–পরবর্তী বেকারত্ব যেমন এসেছে, তেমনি দেখা গেছে বাড়িতে বাড়িতে পানির সংকট। এসেছে চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা। মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ যখন অসুস্থ হয়, অস্ত্রোপচারের তিন লাখ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বিবেকটাকে পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিতে হয়।
‘সাবা’র আরেক উজ্জ্বল দিক ক্যামেরা, পুরো সিনেমাতেই হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায় জাদু দেখিয়েছেন বরকত হোসেন।

সাবার জীবন অনিশ্চিত, পরের মুহূর্তে কী হবে, তিনি জানেন না। ক্যামেরাও তাই অনিশ্চিতের মতোই সাবাকে অনুসরণ করেছে, সাবা ক্যামেরার কাছে আসেন না; বরং ক্যামেরাই তাঁর প্রতিমুহূর্ত অনুসরণ করে। একই দৃশ্যে কয়েকটি শট নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে, সাবার এক্সপ্রেশন আর অসহায়ত্বের একটি বিন্দুও অনুভব না করে উপায় থাকে না। বরকত হোসেন ও মেহজাবীন জুটি আগে ‘সাবরিনা’, ‘প্রিয় মালতী’তে কাজ করেছেন; তাঁদের বোঝাপড়ার প্রভাব হয়তো ফ্রেমে ফ্রেমে ধরা পড়েছে। বরকত হোসেন ‘সাবা’র সহপ্রযোজক ও পরিবেশকও, ক্যামেরায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।

ক্যামেরাকে যোগ্য সংগত দিয়েছে সামীর আহমেদের সম্পাদনা আর আমান আব্বাসির মিনিমাল আবহসংগীত। গল্পের প্রথম দিকে সব লাল থাকে। বারান্দা লাল, সাবার পরনে মেরুন কার্ডিগান; গল্প যত সামনে এগোয়, সব সবুজ হয়ে যায়। বোঝা যায়, সাবার জীবনে বদল এসেছে।

এই বদল আসে অঙ্কুরের (মোস্তফা মন্‌ওয়ার) হাত ধরে। মায়ের চিকিৎসার জন্য ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে সাবা চাকরির খোঁজে বের হন। নানা জায়গায় প্রত্যাখ্যানের পর অবশেষে তিনি কাজ পান হুক্কা লাউঞ্জে, যেখানে তাঁর ম্যানেজার অঙ্কুরের সঙ্গে সখ্য হয়। অঙ্কুরের সঙ্গ সাবাকে জীবন নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, যে জীবনের স্বপ্ন তিনি এত দিন চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। একপর্যায়ে অঙ্কুর সাবাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি জীবনে কী চাও?’ প্রশ্ন শুনে সাবা থমকে যান। কারণ, জীবনে কী চান, তা তো কখনো ভাবার সুযোগই পাননি!
সাবা চরিত্রে মেহজাবীন চৌধুরী দুর্দান্ত। প্রথম সিনেমা ‘প্রিয় মালতী’ দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন নিজের অভিনয়ক্ষমতা, এ সিনেমায় যেন নিজেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিলেন। ছোট পর্দা, ওটিটি আর ‘প্রিয় মালতী’কে মনে রেখেই বলা যায়, এটি তাঁর ক্যারিয়ার-সেরা অভিনয়।

সাবার প্রতিদিনের সংগ্রাম, একটু মুক্তির আশা, দিনের পর দিন অসুস্থ মায়ের সেবা করতে করতে ভেঙে পড়া—সবই মেহজাবীন ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকারভাবে। সাবার মায়ের চরিত্রে ছিলেন রোকেয়া প্রাচী। অসুস্থ নারীর চরিত্রে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। মেহজাবীন আর তিনি যখন এক ফ্রেমে ছিলেন, দুজনের মধ্যে যেন অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছিল অভিনয়ের। মোস্তফা মন্‌ওয়ারও ছোট চরিত্রে ছিলেন যথাযথ। ছোট চরিত্রে সুমন পাটোয়ারী, অশোক ব্যাপারীও ঠিকঠাক।

সাবায় সাদা বা কালো কোনো চরিত্র নেই। অঙ্কুর দেশের দুর্নীতি নিয়ে বিরক্ত, কিন্তু বিদেশে যাওয়ার জন্য ‘অন্য রকম’ কিছু করতে দ্বিধা করেন না। আবার সাবাও নিজের সবচেয়ে অসহায়ত্বের সময়ে প্রিয় বন্ধুকে ফাঁসিয়ে দেন।
তবে সিনেমাটি নিয়ে কিছু কিন্তু থেকেই যায়। বিশেষ করে সাবার মতো পোড় খাওয়া তরুণী অল্প সময়ের পরিচয়ে সহকর্মীকে কি এতটা ভরসা করতে পারেন? নির্মাতা সাবা ও তাঁর মায়ের সম্পর্ককে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে অন্যান্য চরিত্রের দিকে হয়তো একটু কম মনোযোগ দিয়েছেন।

‘সাবা’য় ঢাকা শহর এসেছে দারুণভাবে, যা মনে করিয়ে দেয় আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’কে। ‘সাবা’য় মোস্তফা মন্‌ওয়ার অভিনীত চরিত্রটি যেন সাদের সিনেমার ছাঁচেই গড়া। সেই সিনেমার মতো ‘সাবা’তেও ঢাকা নিয়ে তিনি নিজের বিরক্তি উগরে দেন। ছবিতে সাবার মাকে গোসল করানোর দৃশ্যটি রূপকভাবে ‘শেষ গোসল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, আজগর ফারহাদির ‘আ সেপারেশন’-এর কথা হয়তো আপনার মনে পড়বে। তবে প্রথম ছবিতেই মাকসুদ হোসাইন নিজের ছাপ রাখতে পেরেছেন; তাই চলতি বছর তো বটেই, ‘সাবা’ হয়তো গত কয়েক বছরের মধ্যে নির্মিত অন্যতম সেরা বাংলাদেশি সিনেমা।

‘সাবা’ সিনেমার পোস্টার। নির্মাতার সৌজন্যে
‘সাবা’ সিনেমার পোস্টার। নির্মাতার সৌজন্যে