Thursday, July 11, 2019

টঙ্গীতে ঝর্ণার বাড়িতে ফের এলেন রানি ম্যাক্সিমা

টঙ্গীর বনমালা সড়ক ধরে এগোলে ৫-৭ মিনিটের পথ ঝর্ণা ইসলামের বাড়ি। গতকাল বুধবার বনমালা সড়ক ও ওই বাড়ির চিত্র ছিল পুরোপুরি অন্যরকম। বাড়ি ঘিরে সাজসাজ রব, চারদিকে উত্সুক জনতা। প্রধান সড়ক থেকে বাড়ির আশপাশ সর্বত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শক্ত অবস্থান।
ঘড়ির কাঁটায় বিকেল ৪টা। কঠোর নিরাপত্তায় চকচকে একটি গাড়িতে চড়ে ঝর্ণা ইসলামের বাড়ির সামনে আসেন নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমা। ফুলের তোড়া হাতে গাড়ির দিকে এগিয়ে যান ঝর্ণা। এর আগেই গাড়ি থেকে নেমে ঝর্ণাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন রানি। উচ্ছ্বসিত ঝর্ণা কুশল বিনিময় শেষে রানিকে নিয়ে যান নিজ নামে বাড়িতে গড়া ‘ঝর্ণা ফেব্রিকস অ্যান্ড ফ্যাশন হাউসে’। প্রায় ১৫ মিনিট অবস্থানকালে ঝর্ণার কারখানা ও সফলতা দেখে মুগ্ধ হন রানি। একটি ফ্লোর নিয়ে কাপড় তৈরি করতে প্রয়োজনীয় সব কিছু দেওয়ারও আশ্বাস দেন তিনি।
চার বছর আগেও বাংলাদেশে এসে ঝর্ণা ইসলামের এই ফ্যাশন হাউস পরিদর্শনে আসেন রানি ম্যাক্সিমা। যাওয়ার আগে কথা দিয়ে গিয়েছিলেন আবারও আসবেন। গতকাল তিনি নিজের সেই প্রতিশ্রুতি রাখলেন।
ঝর্ণা ইসলাম, গাজীপুরের টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার সফল এক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার নাম। ১৯৯৮ সালে ব্যাংকের পাঁচ হাজার টাকায় একটি মেশিন কিনে বুটিকের কাজ শুরু করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘ঝর্ণা ফেব্রিকস অ্যান্ড ফ্যাশন হাউস’। কঠোর পরিশ্রমে কয়েক বছরেই সফলতা পান তিনি।
গতকাল অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে ঝর্ণা ইসলাম বলেন, ‘রানি কারখানার পরিবেশ ও আমার সাফল্যকে সাধুবাদ জানান।’ নিজের পথচলার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৪ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন বেকার। তবে অভাব না থাকলেও স্বপ্ন ছিল বসে না থেকে একটা কিছু করার। ওই স্বপ্ন থেকেই একটি মেশিন কিনে আশপাশের নারীদের জামায় সুতার কাজ শুরু করেন। চাহিদা বাড়তে থাকায় ১৯৯৮ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি মেশিন কিনে সুতার কাজের পাশাপাশি বুটিকের কাজ শুরু করেন।
এদিকে ২০১৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে টঙ্গীতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। ঝর্ণার সাফল্যের গল্প শুনে তিনি তাঁর ফ্যাশন হাউস পরিদর্শন করেন। মুগ্ধ হয়ে ফ্যাশন হাউসের ভিডিও এবং একটি স্কার্ট কিনে রানি ম্যাক্সিমার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠান রাষ্ট্রদূত। ভিডিও ও স্কার্ট দেখে রানি ঝর্ণার ফ্যাশন হাউস দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে ঝর্ণার ফ্যাশন হাউস পরিদর্শন করে মুগ্ধ হন রানি। দেশে ফিরে ঝর্ণার জন্য তিনটি মেশিন পাঠান রানি। বর্তমানে তাঁর হাউসে মেশিনসংখ্যা ৯টি। এসব মেশিন ও অন্য ইউনিটে কাজ করেন ১৬ জন নারী।
গতকাল রানির এই পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন, পুলিশের ডিসি শরীফ, ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং টঙ্গী জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার আহসানুল হক।
টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি কামাল হোসেন বলেন, রানির আগমন উপলক্ষে পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দায়িত্বরত ছিলেন বিভিন্ন বাহিনীর পাঁচ শতাধিক সদস্য।

বাংলাদেশকে শিক্ষকের ভূমিকায় দেখছেন মুন: জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের বিস্তৃতি এবং এর প্রভাব প্রশমনে নিজেদের সক্রিয় উদ্যোগ সম্পর্কে আরো সচেতন হতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, আমি আপনাদের সকলকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সচেতন থাকতে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করছি। তিনি বুধবার রাজধানীর একটি  হোটেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দু’দিনব্যাপী জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’র (জিসিএ) ঢাকা বৈঠকে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন। সরকার প্রধান বলেন, বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে যা সকলে সহজে কাজে লাগাতে পারি। তথাপি আমি বলতে চাই, অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেজন্য সুষ্ঠু প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে না। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের  প্রেসিডেন্ট হিলদা সি. হেইন, গ্লোবাল কমিশন অন এডাপটেশন’র চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন, সম্মেলনের কো-চেয়ার এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. ক্রিস্টালিনা জর্জিওভা সম্মেলনে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সামনের সারিতে থেকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্য নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপ ও কৌশল সম্পর্কে বান-কি-মুন বলেন, অবশ্যই আমরা এখানে বাংলাদেশের কাছে শিখতে এসেছি।
অভিযোজনের বিষয়ে শেখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশই হচ্ছে সবচেয়ে ভাল শিক্ষক। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী শাহাবউদ্দিন বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী তার দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন, গ্লোবাল কমিশন অব এডাপটেশন’র সহযোগিতায় আমরা জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সঠিক অভিযোজন কৌশলের পাশাপাশি সাশ্রয়ী পন্থা ও ঝুঁকি নিরসন ব্যবস্থার সুবিধা  পেতে চাই। তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানে অনুষ্ঠিতব্য ক্লাইমেট চেঞ্জ সামিটের প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর জন্য। ওই সম্মেলনে এলডিসিভুক্ত দেশসমূহ ও বাংলাদেশর পক্ষ থেকে আমাকে বক্তব্য দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে একটি ‘রিজিওনাল অ্যাডাপটেশন সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অভিযোজন প্রক্রিয়ায় অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের দাবী রাখে। আমি বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয় বিবেচনা করতে আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি। তিনি এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়ায় বান-কি মুনকে ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন ঢাকা সম্মেলনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব অনুমিত সময়ের আগেই আমাদের প্রত্যেকের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সেজন্য, এর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বকে বিনিয়োগে আরও বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, আমি শুধু নিজের দেশ নিয়ে ভাবি না। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে অনেক ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জ হারিয়ে যাবে। তখন সেখানকার মানুষ কোথায় যাবে, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে।
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বলেন, তাদের আমরা মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু তাদের কারণে আমাদের ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। ওখানে আমাদের যত পাহাড়ি এলাকা বা জঙ্গল ছিল সেগুলো কেটে-ছেঁটে বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে এলাকাটি অনেকটা অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকার প্রধান বলেন, এজন্য আমরা চাই দ্রুততম সময়ে তারা নিজ দেশে ফেরত যাক। তারা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের দেশে ফিরে যাবে, ততই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল। জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী পৃথিবীর উষ্ণতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্প স্তরের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উপরে পৌঁছেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল মানব ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। তিনি বলেন,‘জার্মান ওয়াচ’র ক্লাইমেট চেঞ্জ ভার্নাবিলিটি ইনডেক্স- ২০১৮ অনুসারে, ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৬ সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল ৬ষ্ঠতম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এডিবি’র জলবায়ু এবং অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আমাদের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ কমে যাবে। যদি বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যাবে। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সমুদ্রতল বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বাড়ার ফলে বাংলাদেশের বিস্তৃত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৬০ লাখ জলবায়ু অভিবাসী রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, তাঁর সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে যে বিশাল উন্নতি হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে আজ তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। জনগণের জন্য অভিযোজন ব্যবস্থা তৈরি করতে তাঁর সরকারের নিরলসভাবে কাজ করা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, গত এক দশকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ অভিযোজনের মাধ্যমে নিরসনের জন্য বছরে প্রায় একশো কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করছি। এ সময় তিনি জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির জন্য ৪২ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি এই ফান্ডে বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেন। সরকার প্রধান তার বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীব বৈচিত্র রক্ষায় সরকারর বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে এক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জলবায়ু অভিযোজনে ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ বাংলাদেশ: এদিকে জলবায়ু অভিযোজনে বাংলাদেশকে ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশকে ‘অলৌকিক’ হিসেবেও বর্ণনা করেন তিনি। ‘গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’ বিষয়ে ঢাকা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় কোরীয়ান ওই কূটনীতিক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা আর যদি এক মিটারও বাড়ে তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে। সামপ্রতিক ঘূর্ণিঝড় ফণীতে ১২ জনের প্রাণহানির সঙ্গে পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণ নেয়া ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তুলনা করেন বান কি-মুন। তিনি বলেন, যথার্থ আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কমিউনিটিভিত্তিক পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও সাইক্লোন সেন্টার থাকার ফলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই ১৬ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, অভিযোজন অনুশীলনে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার যে নেতৃত্ব অর্জন করেছে তা অলৌকিকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
ঢাকায় অভিযোজন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব মুনের: এদিকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ও গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপ্টেশন-এর চেয়ারম্যান বান কি-মুন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি বৈশ্বিক অভিযোজন কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এই প্রস্তাব দেন। রাজধানীর একটি হোটেলে দু’ব্যাপী ঢাকা বৈঠকের যোগদানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মার্শাল আইল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ড. হিলদা সি. হেইনে বান কি-মুনের সঙ্গে ছিলেন বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি ইহ্‌সানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব জলবায়ূ পরিবর্তনের অভিযোজনের জন্য বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে বর্ননা করে বলেন, জলবায়ূ পরিবর্তনের অভিযোজনে বাংলাদেশ সেরা শিক্ষক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আপনি (শেখ হাসিনা) বিশ্ব নেতাদের মধ্যে অন্যতম যিনি জলবায়ূ পরিবর্তনের সমস্যাটি নিয়ে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বান কি-মুন প্রধানমন্ত্রী উদ্দেশে বলেন, আমি আপনার অব্যাহত প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাবান। ওদিকে ওই বৈঠক শেষে বান কি মুন কক্সবাজারস্থ রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং জলবায়ু উদবাস্তুদের আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেন।

ভারতের বিদায় by ইশতিয়াক পারভেজ

ভারতকে হারিয়ে নিউজিল্যান্ডের উল্লাস
ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য এক গল্প প্রায় লিখেই ফেলেছিলেন রবীন্দ্র জাদেজা। ধোনির সঙ্গে তার ১১৬ রানের অবিশ্বাস্য জুটিতে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সেরা প্রত্যাবর্তনের স্বপ্নও দেখছিল ভারত। আটে নেমে ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস খেলেও জাদেজা দলকে এনে দিতে পারলেন না রূপকথার জয়। রোমাঞ্চকর লড়াই ১৮ রানে জিতে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলো নিউজিল্যান্ড। ২০১১ সালে দেশের মাটিতে শিরোপা জয়ের পর ভারত টানা দ্বিতীয়বার বিদায় নিলো বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে। ৩৭ রানে ৩ উইকেট নিয়েছেন হেনরি। ৩৪ রানে ২ উইকেট মিচেল স্যান্টনারের। হেনরি শেষ পর্যন্ত ম্যাচ সেরা।
ম্যানচেস্টারে মাথার ওপরের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শুরু থেকেই খেল দেখাতে শুরু করে কিউই পেসাররা। ৩.১ ওভারে ৫ রান তুলতে নেই ৩ উইকেট! ২৪০ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামা ভারতের হার তখন মনে হয়েছে শুধুই সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ক্রিকেট যে গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা, সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্র জাদেজা। আর মহেন্দ্র সিং ধোনি বোঝাতে শুরু করেছিলেন, ভারতীয় ক্রিকেট তাকে কোথায় রাখবে, সেটি প্রমাণের ম্যাচ এটাই। কিন্তু দম আটকানো এ ম্যাচে নিউজিল্যান্ড শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করেছে, তারা আর শুধুই সেমিফাইনালের দল নয়। এদিন ভারতের ইনিংসের শুরুতে ফাইনালে ওঠার পথেই ছিলেন নিউজিল্যান্ডের পেসাররা। লোকেশ রাহুল, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলির ভারতীয় টপ অর্ডারের এ তিন স্তম্ভকে দলীয় ৫ রানের মধ্যেই ফিরিয়ে ম্যাচটা নিজেদের দিকে টেনে এনেছিলেন ট্রেন্ট বোল্ট আর ম্যাট হেনরি পেস জুটি। এরপর জুটি গড়ার চেষ্টায় খণ্ড খণ্ড লড়াইয়েও হেরেছে ভারত। তবে রবীন্দ্র জাদেজা এসে উইকেটে ধোনির সঙ্গে যোগ দিলে ক্রমে ম্যাচে ফেরে ভারত। ৩১তম ওভারে জুটি বাঁধেন দুজন। তখনো ১১৪ বলে ১৪৬ রানের দূরত্বে ভারত। হাতে মাত্র ৪ উইকেট। সপ্তম উইকেটে ১১৬ রানের জুটি গড়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ধোনি-জাদেজা জুটি। ইনিংসের শুরুর মতো ভারতের শেষ পতনটুকু শুরু হয় ৪৭.৫ ওভার থেকে। বোল্টকে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ দেন জাদেজা (৫৯ বলে ৭৭)। ওই ওভার শেষে জয়ের জন্য ১২ বলে ৩১ রান দরকার ছিল ভারতের। ৪৯তম ওভারে এসে ম্যাচটা হেলে পড়ে কিউইদের দিকে। লকি ফার্গুসনের করা ওই ওভারে রান আউট হন ধোনি (৭২ বলে ৫০)। আর শেষ বলে ভুবনেশ্বর কুমারকে তুলে নেন ফার্গুসন। এতে হাতে ১ উইকেট রেখে শেষ ওভারে ২৩ রান তোলার প্রায় ‘অসম্ভব’ সমীকরণে পড়ে যায় ভারত। জিমি নিশাম এসে তৃতীয় বলে যুজবেন্দ্র চাহালকে তুলে নিয়ে নিশ্চিত করেন কিউইদের ফাইনাল।
এর আগে রিজার্ভ ডেতে গড়ানো প্রথম সেমিফাইনালে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৩৯ রান তোলে নিউজিল্যান্ড। রস টেইলর ফিরলেন রান আউটে। শেষ দিকে সেভাবে ঝড় তুলতে পারলেন না আর কেউ। আগের দিনের স্কোরের সঙ্গে তাই খুব বেশি রান যোগ করতে পারেনি নিউজিল্যান্ড।
গতকাল রিজার্ভ ডেতে ২৩ বলে তিন উইকেট হারিয়ে কিউরা যোগ করতে পেরেছে ২৮ রান। আগেরদিন বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে ৪৬.১ ওভারে তাদের রান ছিল ৫ উইকেটে ২১১। উইকেটে ছিলেন দুই থিতু ব্যাটসম্যান। কিন্তু নতুন দিনে তো চ্যালেঞ্জ আবার প্রথম থেকেই শুরুর মতো। সেখানেই থমকে যায় নিউজিল্যান্ড। ৬৭ রানে দিন শুরু করা টেইলর ৭৬ রানে ফিরেছেন রবীন্দ্র জাদেজার সরাসরি থ্রোতে। বাকিরা তেমন কিছু করতে পারেনি। ভুবনেশ্বর কুমার ও জসপ্রিত বুমরাহ দারুণ বোলিংয়ে এ দিনের প্রায় চার ওভারে চার এসেছে কেবল একটি। এই দুই বোলার আগের দিন কিউইদের ভুগিয়েছিলেন নতুন বলেও। আগের দিনের একটির সঙ্গে গতকাল আরো দুই উইকেট নিয়ে ভারতের সফলতম বোলার ভুবনেশ্বর। মাত্র ৩৪ রানে তিন উইকেট নেন এই পেসার। বুমরাহ, পান্ডিয়া, জাদেজা ও চাহাল নেন একটি করে উইকেট।

দুর্নীতি রোধে সরকারি সেবা ডিজিটাল করা হচ্ছে : জয়

প্রধানমন্ত্রীর  তথ্য ও প্রযুক্তি (আইসিটি) উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, দুর্নীতি  রোধে সকল সেবা ডিজিটাল করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে সরকার। গতকাল আগারগাঁওয়ের বিআইসিসি অডিটোরিয়ামে জাতীয় সংসদ সচিবালয় আয়োজিত ‘ডিজিটাল  বাংলাদেশ: সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় তিনি একথা বলেন। সজীব ওয়াজেদ বলেন, সরকারের সকল  সেবা ডিজিটাল করা হলে দুর্নীতির কোন সুযোগ থাকবে না। তিনি আরো বলেন, ১ হাজার ৫শ’ সরকারি সেবার ৩শ’টি ইতোমধ্যে ডিজিটাল করা হয়েছে। বাকি সকল  সেবাকে ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের সকল সেবা ডিজিটাল হতে থাকায় ক্রমান্বয়ে দুর্নীতিও কমে আসছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন  ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী এবং আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান এতে সভাপতিত্ব করেন।
জয় দেশকে এগিয়ে নিতে পুরোনো আইন ও নীতি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমরা এখন বিশ্বায়নের যুগে বাস করছি।
বেশি বেশি বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আমাদের অর্থনীতি আরো উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমাদের মধ্যে অনেকেরই সাধারণ ধারণা দেশে কোন বিদেশী কোম্পানির বিনিয়োগ করার মানেই হলো তারা  কেবল মুনাফাই অর্জন করবে। কিন্তু বিদেশী কোম্পানিগুলো কেবল মুনাফাই অর্জন করে না তারা কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করে। আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করা উচিত।
তিনি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এসব দেশে যে কোন বিদেশী  কোম্পানি সহজেই বিনিয়োগ ও ব্যবসা করতে পারে, যা ওই সব দেশের অর্থনীতির গতিকে ত্বরান্বিত করে। আমাদেরও এভাবেই কাজ করা উচিত। তিনি বলেন, কেবলমাত্র সরকার সবকিছু করতে পারবে না। সরকার সবকিছু করতে চাইলে সেখানে সিস্টেম লস থাকবে। কিন্তু বেসরকারি খাতে সিস্টেম লস খুব একটা হয় না। জয় বলেন, এগিয়ে যেতে হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতিযোগি হিসেবে না দেখে বরং তাদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য টেলিকমিউনিকেশন নীতির পরিবর্তন করা হবে। আইসিটি খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন দিক তুলে ধরে জয় বলেন, আইসিটি খাতে খুব স্বল্প সময়ে এতো দ্রুত উন্নয়ন খুব কম দেশই অর্জন করতে পেরেছে। কর্মশালায় ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী নতুন প্রজন্মকে মানব সম্পদ হিসেবে তৈরি করতে তাদেরকে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, পার্লামেন্ট এবং আইসিটি বিভাগকে ডিজিটাল করতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং ডাক ও  টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ   প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।

সিরিয়ায় ১২ সদস্যের বৃটিশ জঙ্গি পরিবারের সবাই নিহত

বৃটেনের লুটন শহরের বাসিন্দা মুহাম্মদ মান্নান। স্ত্রী, সন্তানসহ তার ১২ সদস্যের যৌথ পরিবার। তাদের সবাইকে নিয়েই ২০১৫ সালে বৃটেন থেকে সিরিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। লক্ষ্য আবু বকর আল বাগদাদির নেতৃত্বে থাকা ইসলামিক স্টেটের খেলাফত রক্ষায় যুদ্ধ করা। পরিবারের সকল সদস্য মিলে আইএসে যোগ দেয়ার এ ঘটনাটি সে সময় বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সমপ্রতি বৃটিশ ট্যাবলয়েড ডেলি মেইল নিশ্চিত করেছে যে, সিরিয়ায় পাড়ি দেয়া এই জিহাদি পরিবারের সকল সদস্যই একটি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে। পরিবারটির ৩ সদস্য আগেই আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা পড়েছিল। এরপর এক বিমান হামলায় নিহত হয় পরিবারের বেঁচে থাকা বাকি সদস্যরাও।
এর মধ্যে ছিল এক থেকে শুরু করে এগারো বছর বয়সের ৩ শিশুও। তবে মুহাম্মদ মান্নান ও তার স্ত্রী মিনেরা আইএসের সাবেক রাজধানীতে স্বাভাবিক মৃত্যুর সৌভাগ্য পেয়েছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
জঙ্গি মুহাম্মদ মান্নান এর আগেও আরেকটি বিয়ে করেছিল। সেখানে থাকা তার এক সন্তান শালিম সিরিয়ার এই বিমান হামলার ঘটনা নিশ্চিত করেছেন। ডেলি মেইলকে তিনি বলেন, তারা সবাই নিহত হয়েছে। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি নিশ্চিত হতে যে কবে ও কীভাবে তারা মারা গেছেন। এত দিন পর আমরা জানতে পেরেছি সত্যিকার অর্থে সিরিয়ায় কী হয়েছে। এটা ছিল এক বেদনাদায়ক পরিণতি।
মুহাম্মদ মান্নান ও তার পরিবার ২০১৫ সালের মে মাসে তুরস্ক থেকে প্রতিবেশী সিরিয়ায় প্রবেশ করে। তারা যখন বৃটেনে ফিরে আসছিল না তখন তাদের আত্মীয়রা তাদেরকে নিখোঁজ হিসেবে পুলিশকে জানান দেয়। এর ঠিক ২ মাসের মাথায় পরিবারটি এক বিবৃতি পাঠিয়ে ইসলামিক স্টেটের খেলাফতের পক্ষে নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করে। এতে জঙ্গি পরিবারটি লেখে, এই খেলাফত শরিয়া আইনে পরিচালিত এবং দুর্নীতিমুক্ত। মুহাম্মদ মান্নানের আগের তোলা একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়।
তবে তার এক সন্তান পরবর্তীকালে একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিল যে, তার পিতাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে সিরিয়া নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং একপর্যায়ে সে বৃটেনে ফিরে আসার জন্য তাদেরকে অনুরোধ করতে শুরু করে। ৭৫ বছর বয়স্ক মুহাম্মদ মান্নান ডায়াবেটিসসহ অনেক ধরনের রোগে আক্রান্ত ছিল। ছোটখাটো এসব রোগেই প্রায় বিনা চিকিৎসায় রাক্কাতে তার মৃত্যু হয়। তার স্ত্রী মিনেরাও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
২০১৭ সালের অক্টোবরে মার্কিন সমর্থিত সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে তাদের দুই ছোট ছেলে মোহাম্মদ জায়েদ হুসাইন (২৫) ও মোহাম্মদ তৌফিক হুসাইন (১৯) নিহত হয়। এ যুদ্ধের মার্কিন সেনারা রাক্কা দখল করে নেয়। পরিবারের বাকি সদস্যরা অন্যান্য জিহাদিদের সঙ্গে পালিয়ে যায় এবং বাঘুজে এসে আশ্রয় নেয়। আইএসের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বাঘুজে এসে জড়ো হয় দেশজুড়ে পালিয়ে থাকা সব জঙ্গিরা। প্রায় এক মাস বাঘুজ ঘিরে রেখে কুর্দি যোদ্ধারা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এখানেই কুর্দিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা পড়ে আরেক সন্তান মোহাম্মদ আবিল কাশেম সাকের (৩১)। পুরো বাঘুজে কুর্দি বাহিনী অতি আত্মবিশ্বাসী জিহাদিদের বিরুদ্ধে একচেটিয়া জয় পায়। এরপর পরিবারের বেঁচে থাকা শিশু সদস্য ও নারী জিহাদিরা বাঘুজ থেকে পালানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু এবার তারা সফল হয় না। এক বিমান হামলায় তারা সকলেই নিহত হয়। মুহাম্মদ মান্নানের এক কাজিন আব্দুল খালিদ জানান যে, বাঘুজে আইএসের সর্বশেষ দুর্গের পতনের পর প্রাণ বাঁচাতে তারা বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে লুকিয়ে থাকার পরিকল্পনা করে। কিন্তু বাঘুজের চারদিকে প্রচণ্ড বোমা বর্ষণ করা হচ্ছিল। আর এতেই সকলের মৃত্যু হয়। মুহাম্মদ মান্নান স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে নামাজি হিসেবে পরিচিত ছিল। লুটনের বারি পার্ক মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়ত তিনি। তাই তার ও তার পরিবারের মৃত্যুর খবর দ্রুতই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই মসজিদের সভাপতি আবুল হুসাইন বলেন, মান্নান ছিলেন একজন ভাল মানুষ। আমরা যখন জানতে পেরেছি সে সিরিয়া চলে গেছে তখন সবাই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছি। কেউই বিশ্বাস করতে পারিনি, তার মতো মানুষ এমন ঘৃণ্য কিছু করতে পারে। আমরা যে মান্নানকে চিনতাম সে এরকম ছিল না।

মার্কিন-তালেবান আলোচনায় শান্তির আশা জাগলেও, বাধা রয়ে গেছে by লি ওয়েইজিয়ান

তালেবানদের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দানকারী মার্কিন বিশেষ দূত জালমাই খলিলজাদ শনিবার বলেছেন যে, চলমান আলোচনাটি এ যাবতকালের সমস্ত আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে ফলপ্রসূ হয়েছে। দুই পক্ষ গত মঙ্গলবারও কাতারে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা অব্যাহত রাখবে।
জুনের শেষ দিকে সপ্তম দফা মার্কিন-তালেবান আলোচনা শুরু হয়। তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই বলেছে তারা এখানে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এবং একটা ফলাফল আশা করছেন।
এবারের আলোচনায় আফগানিস্তান থেকে বিদেশী সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং জানা গেছে, এ ব্যাপারে অগ্রগতি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন যে, তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিতে চান। মার্কিন নীতির এটা সাধারণ দিক। যে সব জায়গায় সেনা রাখা দরকার নেই বলে মনে করবে ওয়াশিংটন, সেখান থেকে তারা সেনা সরিয়ে নেবে।
যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেখানে সেনা মোতায়েন করেছে, বিপুল খরচ করেছে, কিন্তু অর্জন করেছে অতি সামান্য। ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধেও একই রকম ফল পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের সময় থেকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সেনা প্রত্যাহারের গতি আরও বাড়ান সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আর ট্রাম্প চান আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের পুরোপুরি দেশে ফিরিয়ে নিতে।
সন্ত্রাস দমনই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য মনে করা হয়। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল তাদের প্রধান শত্রু শেষ হয়ে গেছে এবং এখন তারা এখান থেকে সরে যাবে। কিন্তু মার্কিন সেনাদের প্রস্থানের পর তালেবানরা আবার দেশের নিয়ন্ত্রণ নিক, এটা চায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায় এবং এটাও তারা বুঝেছে যে, তালেবানদের অত সহজে দমানো যাবে না। সে কারণে তালেবানদের সাথে আলোচনায় বসেছে যুক্তরাষ্ট্র, যাতে তারা সরে যাওয়ার পরও তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
যুদ্ধ এলাকা থেকে সরে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটা সাধারণ কৌশল। এর কিছুটা তাদের নিজেদের পদক্ষেপ, আর পরিস্থিতির কারণে কিছুটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তাদের। এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলে ওবামা যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, মূলত চীনের উত্থানের প্রেক্ষিতেই সেটা করা হয়েছিল। ট্রাম্প চীনকে কৌশলগত প্রতিযোগি ঘোষণা দিয়ে তাদের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছেন এবং চীনের সাথে পুরোদমে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
২৫ জুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও পূর্বঘোষণা ছাড়াই আফগানিস্তান সফরে যান। সেই সফরে তিনি ঘোষণা দেন যে, ১ সেপ্টেম্বরের আগেই একটা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু এত দ্রুত চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাবে, এ ধরনের কোন চুক্তি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বিবেচনায়, এবং আফগানিস্তানের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুসারে, একটি মাত্র আলোচনায় এমনকি সাময়িক চুক্তি হওয়াটাও খুবই কঠিন।
তালেবানরা যদি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আফগান রাজনীতিতে অংশ নেয়, তাহলে এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য সেটা হবে উল্লেখযোগ্য একটা অর্জন। তবে আলোচনার আরেকটি পক্ষ এখনও বাইরেই রয়ে গেছে, সেটা হলো তালেবানদের সাথে আফগান সরকারের আলোচনা।
শান্তি আলোচনা সঠিকপথেই এগুচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় আরও প্যাঁচ ও বাঁক অপেক্ষা করছে।

কেন ব্যর্থ হলো বাংলাদেশ? by রবিউল ইসলাম

বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে বাংলাদেশ দল এখন দেশের পথে। অথচ অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ মঞ্চে গিয়েছিল তারা। কিন্তু ৪৭ দিনের লড়াইয়ে শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে মাশরাফি বাহিনীকে। এই ব্যর্থতা কেবল পারফরম্যান্সের কারণেই নয়, সঠিক পরিকল্পনার অভাব, খেলোয়াড়দের ইনজুরিসহ আরও অনেক কারণেই হয়েছে।
তার ওপর বিশ্বকাপ শুরুর আগ থেকে দলের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। বিশেষ করে মাহমুদউল্লাহ। চলতি বছরের শুরুর দিকে নিউজিল্যান্ডে খেলতে গিয়ে কাঁধের ইনজুরিতে পড়েন। দেশে ফিরে কিছুটা সুস্থ হলেও বোলিং করার মতো অবস্থায় ফিরতে পারেননি। তাই আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের পাশাপাশি বিশ্বকাপে বোলার মাহমুদউল্লাহর সার্ভিস পায়নি বাংলাদেশ। এছাড়া ফিটনেসের ঘাটতি থাকায় পুরো বিশ্বকাপেই মাহমুদউল্লাহর ব্যাটিং ছিল অস্বস্তিতে ভরা। মাশরাফি প্রায়ই বলতেন, ‘মাহমুদউল্লাহ বোলিংটা পেলেও দল উপকৃত হতো।’ কিন্তু বোলিংতো পেলোই না, ব্যাটিংয়েও ছিলেন না -আপ টু দ্য মার্ক।
মাহমুদউল্লাহর মতো অধিনায়ক মাশরাফিরও একই অবস্থা। মাশরাফি চোট নিয়ে নিয়মিতই খেলেন আসছেন। এইসব চোটকে পাত্তা দেননি কখনো। এভাবে ব্যথা সয়েও দলের জন্য আত্মনিবেদনের কারণে বরাবরই তিনি প্রশংসিত। কিন্তু আয়ারল্যান্ড সিরিজ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ৬৪ দিনের লম্বা সফরে মাশরাফি খুব একটা স্বস্তি নিয়ে খেলতে পারেনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে পা ফুলে যাওয়াতে খেলতেই চাননি তিনি! শেষ পর্যন্ত খেললেও পারফরম্যান্সের পরিবর্তন হয়নি। আগের ম্যাচগুলোর মতো শেষ ম্যাচেও তার হাতে সাফল্য ধরা দেয়নি।
মাশরাফি নতুন বলে সব সময়ই ব্রেক থ্রু এনে দেন। কিন্তু এবার মাশরাফিসহ দলের অন্য পেসাররা নতুন বলের ব্যবহারটি ঠিকমতো করতে পারেনি। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ ম্যাচে ৫৬ ওভার বল করে ৩৬১ রান খরচ করে পেয়েছেন মাত্র ১ উইকেট। আলো ঝলমলে ক্যারিয়ারে এমনটা মাশরাফি আর দেখেননি। বলের গতি কমিয়ে লাইন-লেন্থ মেনে সাফল্য পাচ্ছিলেন নিয়মিত। কিন্তু এবার ইনজুরি ও টানা খেলার ধকল সামলাতে না পেরে মুদ্রার উল্টা পিঠও দেখতে হলো বাংলাদেশের সফলতম এই পেসারকে। তার এমন পারফরম্যান্সের প্রভাবটা পড়েছে পুরো দলের ওপরও।
অপর দিকে বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি ম্যাচে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনার অভাবও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। এমনকি আবহাওয়া, উইকেট পর্যবেক্ষণের অদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রীতিমতো। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে উইকেট পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি বলেই বাংলাদেশ স্কোরবোর্ডে পর্যাপ্ত রান তুলতে ব্যর্থ হয়েছে!
যেমন ওভালে ব্যবহৃত উইকেটে খেলেছিল বাংলাদেশ। ওই ম্যাচের উইকেটটি ২৫৬/২৭০ রান হলেই যথেষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশ তিনশো রানের পেছনে ছুটতে গিয়ে অলআউট হয়েছে ২৪৪ রানে। ড্রেসিংরুম থেকে বার্তাও পাঠানো হয়েছিল ৩০০ রান করো, নয়তো পারবে না! অথচ এই উইকেটটি কোনওভাবেই তিনশো রানের ছিল না। ভুল বার্তায় বাংলাদেশ ম্যাচটি হেরে গেছে ২ উইকেটে। একই ধরনের পরিস্থিতিতে সাউদাম্পটনে আফগানিস্তানেক হারিয়েছিল যথাযথ ভাবে উইকেট পর্যবেক্ষণ করেই।
বাংলাদেশের আরও একটি বড় ভুল- টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই প্রতিপক্ষদের জয়-পরাজয়ের বিন্দুতে ভাগ করে ফেলা। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে যাওয়ার ছক কষেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু টুর্নামেন্টের আগে এমন ছকই মূলত কাল হয়েছে শেষ পর্যন্ত। নির্ধারিত ম্যাচগুলোর তিনটি জিতলেও বাকি ম্যাচগুলোতে জয়ের মুখ দেখা হয়নি। তার ওপর ছিল বৃষ্টির বাধা।
নির্ধারিত ম্যাচের বাইরের বেশ কয়েকটি ম্যাচের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ সেরা ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করেছে। হয়তো ব্যাক অব দ্য মাইন্ডে এই দলের বিপক্ষে জেতা সম্ভব নয়-এই মানসিকতা কাজ করেছে। যে কারণে এই ম্যাচ জয়ের হিসেবের মধ্যে ছিল না!
টুর্নামেন্টের অষ্টম স্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দৃষ্টিকটু ফিল্ডিং ও ক্যাচ মিসের মহড়া। পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচের দিনও মাশরাফি নিজেদের এমন অবস্থানের জন্য বাজে ফিল্ডিং ও ক্যাচ মিসকেই দায়ী করেছেন।
আর টুর্নামেন্ট শেষে পুরো দলের আক্ষেপ হয়ে আছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কেন উইলিয়ামসনকে নিশ্চিত রান আউট করতে না পারার ব্যর্থতা। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সাব্বির রহমান ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যাচ মিস করে তাকে জীবন দিয়েছিলেন। ভারতের বিপক্ষে বাঁচা মরার লড়াইয়েও দলের অন্যতম সেরা ফিল্ডার তামিম ওপেনার রোহিত শর্মার ক্যাচ ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর তাতে ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে বাংলাদেশ। এমন একটি-দুটি ক্যাচ হলে হতো। কিন্তু সব মিলিয়ে ৮টি ক্যাচ মিস হয়েছে বাংলাদেশের। এই ক্যাচগুলো নিতে পারলে হয়তো সেমিফাইনাল খেলার প্রস্তুতি নিতে পারতো মাশরাফিরা।
মাশরাফিও প্রতিটি ম্যাচ শেষে প্রায়ই বলেছেন, ‘বোলাররা সব সময় ফিল্ডারদের উজ্জীবিত করতে পারবে না। যখন বোলারদের কোন কিছুই ঠিক মতো হবে না। তখন ফিল্ডাররা ভালো একটি ক্যাচ নিয়ে কিংবা ভালো একটি ফিল্ডিং করে বোলারদের উজ্জীবিত করতে পারে। কিন্তু আমাদের ফিল্ডাররা যেন আরও নেতিয়ে পড়ে।’
অবশ্য এত নেতিবাচকতার পরেও বাংলাদেশের একজন কেবল রাজার আসনে বসে আছেন। পুরো টুর্নামেন্টে এই রাজাকে খানিকটা সাহায্য করতে পারলেই বাংলাদেশের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্নটা পূরণ হতো। কিন্তু সাকিবকে সেই সঙ্গ দিতে পারেনি তার সতীর্থরা। তাইতো পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ হেরে মাশরাফি সাকিবের কাছে ‍দুঃখ প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করলেন না।

‘জয় শ্রীরাম’ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য অমর্ত্য সেনের by পরিতোষ পাল

গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি আশাতিরিক্ত ফল করার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে রাজ্যের পরিবেশকে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে নানা মহল থেকে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। এই স্লোগান যে বাংলার সংস্কৃতি নয়-  সে কথা জোরের সঙ্গে বলছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা। তবে এবার এই জয় শ্রীরাম স্লোগান নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন। ৫ জুলাই শুক্রবার কলকাতায় দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে জয় শ্রীরাম স্লোগান প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেন বলেছেন, বঙ্গ সংস্কৃতিতে কোনও কালেই এ ধরনের স্লোগানের কোনও জায়গা ছিল না। বাংলায় এ সব ‘ইদানীংকালে’র আমদানি। নতুন এই সংস্কৃতি আমদানির পিছনে বিভেদের রাজনীতি কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। বঙ্গ সংস্কৃতি এবং হিন্দুত্ববাদের ‘আস্ফালন’ নিয়ে এদিন অমর্ত্য সেন সরব হয়েছেন। তিনি বলেছেন, যখন শুনি কাউকে রিকসা থেকে নামিয়ে কিছু একটা বুলি আওড়াতে বলা হচ্ছে এবং তিনি বলেননি বলে মাথায় লাঠি মারা হচ্ছে, তখন শঙ্কা হয়।
বিভিন্ন জাত, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য আমরা রাখতে দিতে চাই না। ইদানীং এটা বেড়েছে। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, ধর্মীয় ভেদাভেদ থেকে হিংসা কেন? ভারতীয় সংবিধানে সমস্ত ধর্মাচরণের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতিতে কলকাতা’ নিয়ে বলতে গিয়েও টেনে এনেছেন ধর্মীয় বিভেদের বিষয়টি। তিনি বলেছেন, আজ যখন শুনি বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ ভীত, শঙ্কিত হয়ে রাস্তায় বেরোন এই শহরে, তখন আমার গর্বের শহরকে চিনতে পারি না। এ সব নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, একসময় হিন্দু মহাসভা (বিজেপির পূর্বসুরী) পশ্চিমবঙ্গে বিভেদের বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা করেছিল। এখন বিজেপি ঠিক সেই একই উদ্দেশ্যে বাংলায় ‘জয় শ্রীরাম’ সংস্কৃতির আমদানি ঘটানোর চেষ্টা করছে। নেবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, জয় শ্রীরাম, রাম নবমী, এ সব কোনও কিছুর সঙ্গেই বাঙালির কোনও যোগ নেই। এখানে দুর্গাপুজোই হয়। বিজেপির তথাকথিত গেরুয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অমর্ত্য সেন প্রথম থেকেই মুখ খুলে চলেছেন। এমনকি নালন্দা বিশ্বাবিদ্যালয়ের দায়িত্ব থেকেও সরে এসেছিলেন।
বাইক চালকদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে লিফলেট
কলকাতার  রাস্তায় বাইক চালকদের দৌরাত্ম্যে মানুষ অতিষ্ট হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি এই বাইক চালকরা রেসের নামে বেপরোয়া বাইক চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। অনেক বাইক চালকের মৃত্যু হয়েছে রেস করতে গিয়ে। কলকাতার উড়াল পুলগুলি হয়েছে রাতে বাইক চালকদের রেসিংয়ের জায়গা। সম্প্রতি পুলিশ অবশ্য রাত বাড়ার সঙ্গে উড়ালপুলে বাইক চালানো নিষিদ্ধ করেছে। বেপরোয়া বাইক চালানো নিয়ে বিভিন্ন এলাকার বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে পুলিশ লিফলেট বিলি করে সকলকে সচেতন করার চেষ্টা শুরু করেছে। পুলিশের মতে, অবাধ্য বাইক চালকদের সকলেরই বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অনেকেরই রয়েছে দামী ও আধুনিক বাইক। বাইক চালকদের অভব্যতার শিকার হচ্ছেন বহু সাধারণ মানুষ। কয়েকদিন আগেই এক মহিলা মডেল এবং এক মহিলা বক্সার বাইকারদের হাতে নিগৃহীতও হয়েছেন। অবাধ্য বাইক চালকদের হাতে নিগৃহীত হচ্ছেন পুলিশ সার্জেন্টরাও। এসব বাইক চালকরা মাথায় কোনও হেলমেট পরেন না। এমনকি আইনি কাগজপত্রের তোয়াক্কাও করে না। বেপরোয়া বাইক চালকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে এবং এদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৫ দিন ধরে কলকাতা পুলিশ বিশেষ কিছু এলাকা চিহ্নিত করে  নাকা চেকিং চালু করেছে। প্রতি রাতে বেপরোয়া বাইক চালকদের ধরপাকড় ও হাজার খানেক বাইক বাজেয়াপ্ত করে এখনও অনেককেই বাগে আনা যায় নি। সম্প্রতি পার্ক সার্কাস এলাকায় নাকা চেকিং এড়াতে এক কর্তব্যরত পুলিশ সার্জেন্টকে কয়েকশ মিটার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এক বাইকার। এখনও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ কর্তাদের একাংশ বাইক চালকের বেপরোয়া মনোভাব দেখে অবাক ।
শঙ্কর হলেন কলকাতার নতুন শেরিফ
কলকাতার নতুন শেরিফ নিযুক্ত হয়েছেন লেখক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়।  সাহিত্য জগতে যিনি শঙ্কর নামেই সমধিক পরিচিত। আগামী সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এই পদের দায়িত্ব নেবেন । কলকাতার শেরিফ পদটি এখন শুধুমাত্র অলঙ্কার। মুম্বইয়ের মতো শহরে এই পদ অনেকদিন আগেই অবলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু কলকাতায় এটি এখনও টিকে রয়েছে। ১৭৭৪ সালে এক সনদের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের রাজা (তৃতীয়) এই পদটি চালু করেছিলেন। এক বছরের মেয়াদের এই পদে সাবেক আমলা, খেলোয়াড়, অভিনেতা, চিকিৎসক থেকে অনেকেই এই পদ অলংঙ্কৃত করেছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা সুচিত্রা মিত্র ছিলেন প্রথম মহিলা শেরিফ। তবে এর আগে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শেরিফ হয়েছিলেন। আর এবার শেরিফ হয়েছেন আরেক লেখক। শঙ্করের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোরের বনগ্রামে।  তবে ছোটবেলা কেটেছে হাওড়ায়। জীবনের এক পর্যায়ে  কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের অধীনে কাজ করেছেন শংকর। সেই জীবন নিয়ে লিখেছেন ‘কত অজানারে’। এছাড়াও  ‘চৌরঙ্গী’, ‘জনঅরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’ সহ নব্বইটিরও বেশি  জনপ্রিয় বইয়ের প্রণেতা তিনি। রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দকে নিয়ে ভিন্ন ধরণের একাধিক গ্রন্থও রচনা করেছেন। এখনও সক্রিয় তার কলম।  এক সময় ডালপ সংস্থার জনসংযোগের দায়িত্বও পালন করেছেন। এছাড়া ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগেরও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি দীর্ঘদিন।
কলকাতার গাছ গুনবে পুরসভা
কলকাতা শহরে কত গাছ রয়েছে এবং কত ধরণের গাছ রয়েছে, এমন প্রশ্নের কোনও উত্তর জানতে চাইলে দেশের প্রাচীনতম কলকাতা পুরসভার কর্তারা নিশ্চুপ। শহরে সবুজের পরিমাণই বা কত তা নিয়ে পুরসভা অন্ধকারে। অথচ পুরসভায় রয়েছে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে দেখভালের জন্য আলাদা দপ্তর (এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেরিটেজ ডিপার্টমেন্ট)।  রয়েছে পুরসভার পার্ক ও উদ্যান সংক্রান্ত আলাদা দপ্তরও। কিন্তু এই মুহূর্তে কলকাতা শহরে গাছের সংখ্যা কত, সেগুলির বয়স কত বা কয়েক বছরে কত গাছ কাটা হয়েছে, এ সংক্রান্ত কোনও তথ্যই নেই কলকাতা পুর প্রশাসনের কাছে। এমনকি কত গাছ লাগানো হয়েছে বা সেগুলি বেঁচে রয়েছে কিনা তারও কোনও তথ্য নেই। শুধু পুরসভাই নয়, রাজ্য বন দপ্তরে কাছেও এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য নেই। ফলে শুধু রাতের অন্ধকারেই নয়, দিনেদুপুরেও এই প্রাচীন শহর থেকে গাছ লোপাট হয়ে যাচ্ছে। পুরসভাও অন্যায়ভাবে গাছ কাটছে বলে অভিযোগ তুলেছেন পরিবেশবাদীরা। আর এই পরিবেশবাদীদের চাপে পড়েই টনক নড়েছে পুরকর্তাদের। শেষ পর্যন্ত  শহরের গাছ গণনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুরসভা। জানা গেছে, বরো (কয়েকটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি বরো) ধরে ধরে সরেজমিনে দেখা হবে কত সংখ্যক গাছ রয়েছে। সেই গাছগুলিই বা কি কি ধরণের। তাদের বয়সই বা  কত, তাও খুঁজে দেখা হবে।  পুরসভার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, গাছ গণনা হলে বোঝা যাবে একটি এলাকায় কত গাছ রয়েছে এবং সেই সংখ্যা কমছে কি না। এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে এ সবের নির্দিষ্ট তথ্যই নেই। অথচ পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, ২০১২ সাল নাগাদ এক বার গাছ গণনায় উদ্যোগী হয়েছিল পুরসভা। তার ফল কেউ জানতে পারেনি। অথচ গাছ গণনা হলে শহরের গাছের প্রকৃত চিত্রটা উঠে আসতো। আর এর ফলে সার্বিক গাছরোপণ নীতি নিয়েও একটি সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হতো।
ইসকনের রথে যুদ্ধবিমান সুখোইয়ের চাকা
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ প্রচার সংস্থা ইসকন গত ৪৮ বছরে ধরে কলকাতায় রথযাত্রা উপলক্ষ্যে তিনটি রথ বের করে আসছে। পুরীর রথের অনুকরণে তৈরি এইসব রথের চাকা একসময় লোহার হলেও কলকাতার রাস্তার কথা ভেবে লাগানো হয়েছিল বোয়িং ৭৭৭ বিমানের চাকা। অবশ্য একমাত্র জগন্নাথ দেবের রথেই রয়েছে টায়ারের চাকা। অন্য দুটি রথে এখনও লাগানো লোহার চাকা। গত কয়েক দশক ধরে চলা টায়ারের চাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে সমস্যা। রথের প্রস্তুতকারক মার্কিন প্রকৌশলি গ্যারি উইলিয়াম রবার্টস মূল রথের চাকা পরিবর্তনের সুপারিশ করার পরই চাকার মাপজোখ নিয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল বোয়িংয়ের চাকা বা টায়ার প্রস্তুতকারক সংস্থা ডানলপের সঙ্গে। কিন্তু তারা অপরগতা জানানোয় বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন ইসকনের কর্তা ব্যক্তিরা। পরে তারা বিমানের টায়ার প্রস্তুতকারক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শেষপর্যন্ত ঠিক হয় যেহেতু সুখোই বিমানের জন্য নির্দিষ্ট টায়ার খুবই শক্তিশালী, তাই সেটি লাগানোরই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরপরেই ইসকনের কর্তারা যোগাযোগ করেছেন, সুখোইয়ের টায়ার তৈরির ভারতে একমাত্র সংস্থা এমআরএফের সঙ্গে। তারাই দেবে সুখোইয়ের টায়ার। সেটিই লাগানো হবে জগন্নাথ দেবের রথে। তবে ইসকন সূত্রে বলা হয়েছে, আগামী বছরেই রথের চাকা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী সম্মেলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী এক সম্মেলন চলাকালে ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদেই ওই আয়োজনের সামনে অবস্থান নিয়েছে শত শত মার্কিনি। তারা বলেন, জায়নবাদ বর্ণবৈষম্যের সামিল।  অন্যদিকে সম্মেলনে বক্তাদের দাবি, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই মুহূর্তে ইতিহাসের সেরা সম্পর্ক বিরাজ করছে।
প্রতিবছরই এই খ্রিস্টান-জায়ন সম্মেলনে যু্ক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ থেকে হাজার হাজার প্রতিনিধি অংশ নেয়। ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সমর্থনে এটা অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্ম। আয়োজকদের দাবি, প্রথমদিনেই ইসরায়েলপন্থী অনেক বিশেষ অতিথি অংশ নিয়েছেন। আর এতে করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়লের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বলে মন্তব্য করেছে ইসরায়েলপন্থী ওই খ্রিস্টানদের গ্রুপটি। সম্মেলনে অংশ নিয়েছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ও হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা পরামর্শক জন বোল্টনের মতো কর্মকর্তারা। অন্যদিকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এই আয়োজন নিয়ে কিছু জানতে চাইলে আয়োজকরা মন্তব্য করেননি। তাদের অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহের অনুমতিও দেওয়া হয়নি।
এদিকে সম্মেলনের বাইরেই প্রায় ১০০ জন অধিকারকর্মী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদের আন্দোলন করছেন। জেরুজালেমে শান্তি নিয়ে কাজ করা খ্রিস্টান সংগঠন ফ্রেন্ডস অব সাবিল অব নর্থ আমেরিকার নির্বাহী পরিচালক তারেক আবুয়াত্তা বলেন, তার সংগঠনের সদস্যরা ইসরায়েল দখলদারিত্বের অবিচার সম্পর্কে তুলে ধরতে চায়। তিনি বলেন আমাদের অবস্থান নেওয়া জরুরি। এর আগে দিনের শুরুতে ওই সম্মেলনে আবুয়াত্তা বলেছিলেন, জায়নবাদ বর্ণবৈষম্যের সামিল।
আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন এর সহযোগী পরিচালক তাহের হেরজাল্লাহ বলেন, পেন্স ও পম্মেপওর উপস্থিতি এই সম্মেলনকে বৈধতা দিয়েছে। তিনি বলেন, উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদ ও ডানপন্থী ইভাঞ্জেলিকালসের মধ্যে সংযোগও এমন সম্মেলনে স্পষ্ট।
শিকাগোর নর্থ পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও ধর্ম বিষয়ক অধ্যাপক ডোনাল্ড ওয়াগনার বলেন, ধারণা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ থোক ১৮ শতাংশ ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টান আসলে মৌলবাদী খ্রিস্টান জায়নিস্ট। আর তারাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সমর্থক।
হেরজাল্লাহ বলেন, এই সম্মেলনে ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন এটাই ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনও আগ্রহ নেই।
ট্রাম্প প্রশাসনের সিনিয়র কমকর্তারা ফিলিস্তিনিদের চাপ প্রয়োগ করে কথিত ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ মেনে নিতে পবাধ্য করেছে। গত মাসে এই চুক্তির অর্থনৈতিক রুপরেখা প্রকাশ করা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনি নেতারা।
এর আগে সম্মেলনে উপস্থিতিদের উদ্দেশ্যে পম্পেও বলেন, ইসরায়েলের প্রতি ট্রাম্পের অঙ্গীকার রক্ষা তার অন্যতম সেরা কাজ। তিনি বলেন, ইরানের ওপর ইতিহাসের সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করেছি আমরা। আর এখানেই শেষ নয়। আমরা ইসরায়েলকের গোলান হাইটসকে তাদের নিজেদের ঘোষণার করার স্বীকৃতি দিয়েছি।
এছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসা নিয়েও আলোচনা করা হয়। নেতানিয়াহু এজন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ইসরায়েল তার প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
ইসারায়েলপন্থী গ্রুপ আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)সবকিছু পবেক্ষণ করলেও বিশেষজ্ঞদের দাবি মার্কিন নীতিতে খ্রিস্টান-জায়নবাদী সংগঠনগুলোর প্রভাব আড়ালেই থেকে যায়।
আইপ্যাকের দাবি, তাদের সদস্য সংখ্যা এক লাখ। অন্যদিকে সিইউএফআইয়ের সদস্য সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের মেনোনাইট গির্জায় কাজ করা ফিলিস্তিনি-আমেরিকান খ্রিস্টান জোনাথান বলেন, মার্কিন নীতির বেশিরভাগ বিশ্লেষণেই এগুলো বাদ দেওয়া হয় এবং গভীর পর্যবেক্ষণ করা হয় না। তিনি বলেন, আমি একে অনেক বড় সমস্যা মনে করি। মার্কিন কংগ্রেস ইসরায়েলের পক্ষপাতিত্ব করে। বিশেষ করে রিপাবলিকানরা।এর সাথে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ইহুদি সম্প্রদায়ের যোগসাজস আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই নীতি খুবই স্বচ্ছ।

আটক হওয়ার ভয়ে হরমুজ প্রণালিতে ঢুকছে না ব্রিটিশ তেল ট্যাংকার

ব্রিটিশ তেল কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি সুপার তেল ট্যাংকার আটক হওয়ার ভয়ে হরমুজ প্রণালীতে না ঢুকে পারস্য উপসাগরে সৌদি উপকূলে অবস্থান করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের মুখে জিব্রাল্টার প্রণালীতে ব্রিটিশ নৌবাহিনী গত ৪ জুলাই আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে একটি ইরানি সুপার তেল ট্যাংকার আটক করার পর তেহরান ব্রিটেনের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছিল।
ব্রিটিশ সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারটি ‘ইরানের হাতে আটক হওয়ার ভয়ে’ হরমুজ প্রণালীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে না।
ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের সুপার তেল ট্যাংকার 'ব্রিটিশ হেরিটেজ'
গত সপ্তাহে আমেরিকার অনুরোধে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশ নৌবাহিনী অবৈধভাবে ইরানের সুপার তেল ট্যাংকার ‘গ্রেস-ওয়ান’কে আটক করে।ইরান এ ঘটনাকে 'জলদস্যুতা' হিসেবে আখ্যায়িত করে ট্যাংকারটি অবিলম্বে ছেড়ে দেয়ার জন্য লন্ডনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির হাতামি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ব্রিটেন এ পদক্ষেপের উপযুক্ত জবাব পাবে।
সৌদি উপকূলে অবস্থান করা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের তেল ট্যাংকারটির নাম ‘ব্রিটিশ হেরিটেজ’ যা ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বহন করতে সক্ষম। গত ৬ জুলাই এই ট্যাংকারটির হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে ইরাকে বসরা বন্দরে পৌঁছার কথা থাকলেও তিন দিন ধরে সেটি সৌদি উপকূলে নোঙর ফেলে অবস্থান করছে।
ব্লুমবার্গ বলেছে, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম এই ভয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে যে, জিব্রাল্টার প্রণালীতে ইরানি তেল ট্যাংকার আটকের প্রতিশোধ নিতে ‘ব্রিটিশ হেরিটেজ’কে আটক করতে পারে তেহরান।
ইরাকের বসরা থেকে তেল নিয়ে তা উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে সরবরাহ করার কথা ছিল ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারটির। কিন্তু ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চালানটির বুকিং বাতিল হয়ে গেছে।
জিব্রাল্টার প্রণালী থেকে এই তেল ট্যাংকারটিকে আটক করেছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী

ট্রাম্প একজন খুদে গুন্ডা: জো বাইডেন

ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী জো বাইডেন বলেছেন, ট্রাম্প একজন ‘বুলি’ বা খুদে গুন্ডা। এই রকম দুর্বৃত্ত সারা জীবনে তিনি অনেক দেখেছেন। অতএব তাঁকে দেখে ভয় পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। গত শুক্রবার সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেন।
জো বাইডেন বলেন, ‘বালক অবস্থায় আমি তোতলাতাম। তা দেখে যারা আমাকে ঠাট্টা করত, সেই সব খুদে গুন্ডার মুখ বরাবর আমি ঘুষি দিতাম। ট্রাম্প হলো সেই রকম একজন বুলি।’
২০১৬ সালের নির্বাচনী বিতর্কে ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন যখন কথা বলছিলেন, সেই সময় তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে ভড়কে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে কথা স্মরণ করে বাইডেন বলেন, ‘আমার পেছনে একবার আসুক না, তাঁকে আমি দেখে নেব।’ রীতিমতো মুঠি উঁচু করে আঘাত হানার ভঙ্গি করে বাইডেন এ কথা বলেন।
গত শুক্রবার সাংবাদিকেরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বাইডেনের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি মাথা নেড়ে জানান, তিনি মোটেই একজন ‘বুলি’ নন। ‘তবে অন্য কোনো দেশ আমার কাছ থেকে অন্যায় সুবিধা আদায় করে নেবে, আমি তা মোটেই পছন্দ করি না।’
এক সপ্তাহ আগে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের বাছাইপর্বের প্রথম টিভি বিতর্কে ভালো ফল করতে ব্যর্থ হওয়ার পর সিএনএনের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জো বাইডেন ফের আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। সেই বিতর্কে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত সিনেটর কমলা হ্যারিস আমেরিকার বর্ণ সমস্যা প্রশ্নে বাইডেনের অবস্থান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
সিএনএনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বাইডেন হ্যারিসের সমালোচনা করলেও তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেননি। তিনি স্বীকার করেন, বিতর্কে সমালোচনার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন, তবে হ্যারিস যেভাবে তাঁকে আক্রমণ করেন, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি স্মরণ করেন, তাঁর প্রয়াত পুত্র ও ডেলাওয়ারের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল বো বাইডেনের সঙ্গে কমলা হ্যারিসের ভালো সম্পর্ক ছিল। সে সময় তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন।
বিতর্কের পর প্রাথমিকভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেও ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মধ্যে জনমত জরিপে বাইডেন এখনো শীর্ষে রয়েছেন। তাঁর থেকে সামান্য ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন কমলা হ্যারিস।

সৌদী থেকে ফোন- বিলকিসের লাশ পাওয়া গেছে মরুভূমিতে

গত ৭ জুলাই রোববার সকাল অনুমানিক ৯টা। সৌদি থেকে একটি ফোন আসে বিলকিসের স্বামীর নিকট। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে জানায়, রিয়াদের নিকটবর্তী পাহাড়ি এলাকার মরুভূমিতে বিলকিসের (৩৩) লাশ পাওয়া গেছে।
এ খবরে শোকের মাতম চলছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরি ইউনিয়নের উত্তর লোহাজুরি গ্রামের বিলকিসদের বাড়িতে।
২০/২২ দিন আগে বিলকিস বেগম তার স্বামী নিয়াশা মিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় জানিয়েছিলেন, গৃহকর্তা তাকে নানাভাবে নির্যাতন করে। আর আমি যাতে এসব বিষয় কাউকে জানাতে না পারি সেজন্য ফোন নিয়ে যাওয়ারও হুমকি দিয়েছেন। তার পরদিন থেকেই বিলকিসের ফোন বন্ধ পাওয়া যাওয়ায়। তার সঙ্গে আর স্বামী কিংবা পরিবারের কেউ যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। পরিবারের লোকজন চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটাচ্ছিলেন। এরপর গত রোববার মুঠোফোনে সংবাদ আসে বিলকিসের লাশ পড়ে আছে মরুভূমিতে।
এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে বিলকিস বেগমের গ্রামের বাড়িতে। সংবাদ পেয়ে শোকার্ত এলাকাবাসীর ঢল নামে। বিলকিসের ছোট্ট দুটি মেয়ে ও দুটি ছেলে শিশুকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিল শাশুড়ি ও অন্যান্য স্বজনরা।
এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলকিসের স্বামী নিয়াশা মিয়া জানান, ৭ জুলাই  রোববার সকাল ৯টার দিকে একই ইউনিয়নের আতুশাল গ্রামের সৌদি প্রবাসী আহমেদ মিয়াকে ফোন করে জানান বিলকিস মারা গেছেন। রিয়াদের অদূরে পাহাড়ি মরুভূমি এলাকায় তার লাশ পাওয়া গেছে। আহমেদ মিয়া এ খবর বাড়িতে পৌঁছায়।
এ খবর পাওয়ার পর নিয়াশা মিয়া বিলকিসের গৃহকর্তার ফোনে অসংখ্যবার ফোন করেন। কিন্তু রিং হলেও কেউ ধরছেন না।
এ পরিস্থিতিতে তিনি দালাল আলম এবং রিক্রুটিং এজেন্সি ঢাকার সেগুনবাগিচার মেসার্স ঝুমুর ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা রিয়াদে যোগাযোগ করে ঘটনাটি জেনে নিশ্চিত হয়ে জানানোর আশ্বাস দিলেও তারা কোন সংবাদ দিতে পারেনি। ঝুমুর ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজহারুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল দিলে হাবিবুর রহমান পরিচয় দিয়ে অফিসের এক ব্যক্তি জানান, বিলকিস মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতের জন্য রিয়াদে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকায় অবস্থানরত এ কোম্পানির এজেন্ট এক সৌদি নাগরিককেও এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানাতে খবর দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, পরিবারের অভাব ঘুচাতে চার মাস আগে স্থানীয় দালাল দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের বড় বাড়ির হাছেন বেপারির ছেলে আলম মিয়াকে ধরে ওই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজ করতে সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিলেন কৃষি শ্রমিক নিয়াশা মিয়ার স্ত্রী বিলকিস বেগম। ওই দালাল আলমের হাত ধরে একই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কিছুদিনের ব্যবধানে এ গ্রামের বিভিন্ন বয়সের ১২ নারী কর্মী সোদি আরবে প্রেরণ করেন।
এদের মধ্যে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মৃত রহমত আলীর মেয়ে জোহরা বেগম (২৫) ও আকাশ মিয়ার স্ত্রী বিলকিস আক্তার (৩৫) দেড় মাসের মাথায় গুরুতর মরণব্যাধিতে আক্রান্ত থাকার কৌশল অবলম্বন করে দেশে ফিরে আসেন।
এ গ্রামের রেনু মিয়া জানান, তার স্ত্রী জোৎস্না বেগমও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে রিয়াদে বন্দিদশায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তার স্ত্রী জোৎস্না বেগমকে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি গরু বিক্রি করে দালালকে ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু এখনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বা তাকে দেশেও ফিরিয়ে আনছে না।
এ রকম নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনায় দৃশ্যতঃ উত্তর লোহাজুরি গ্রাম জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। গৃহকর্তাদের অমানুষিক নির্যাতন পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার স্বপ্নে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, সৌদি প্রবাসী এসব গৃহকর্মীর স্বজনরা বিনিদ্র রজনী কাটাচ্ছেন । তারা এখন তাদের স্ত্রী, কন্যা ও বোনকে নির্বিঘ্নে দেশে ফিরিয়ে আনতে চান।

কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের আহ্বান by রিফাত ফরিদ

জাতিসংঘ আবারও ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে এবং অভিযোগ তদন্তের জন্য কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
অফিস অব দ্য ইউনাইটেড নেশান্স হাই কমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস (ওএইচসিএইচআর) সোমবার ৪৩ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে একই সাথে পাকিস্তানের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আটক করা হয়।
ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পুরো কাশ্মীর অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে এবং এই অঞ্চল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দুইবার যুদ্ধও হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আত্মঘাতি হামলায় ভারতের ৪০ সেনা নিহত হওয়ার পর দুই দেশ আরেকবার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। পাকিস্তান-ভিত্তিক একটি বিদ্রোহী গ্রুপ ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
জাতিসংঘের রিপোর্টে ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে ২০১৬ সালে বিদ্রোহী কমান্ডার বুরহান ওয়ানির হত্যার পরে যে সব সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত করা হয়।
ওয়ানির হত্যাকাণ্ডের পর পাঁচ মাস ধরে চলা বিক্ষোভে শতাধিক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়। এটা ভারতের শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি করে কাশ্মীরীদের মধ্যে।
নয়াদিল্লী জবাবে এ অঞ্চলে তাদের নিরাপত্তা অভিযান আরও জোরদার করে। ফলে আরও বিদ্রোহী ও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়।
জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর কোয়ালিশান অব সিভিল সোসাইটির (জেকেসিসিএস) তথ্য মতে, গত বছরে ১৬০ জন বেসামরিক নাগরিক, ২৬৭ জন বিদ্রোহী এবং ১৫৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে। ২০০৮ সালের পর থেকে এই সংখ্যাটা সর্বোচ্চ।
মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি
জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ফেব্রুয়ারির আত্মঘাতী হামলার পর কাশ্মীরে যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, সে পরিস্থিতিতে সাধারণের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ভারত-শাসিত কাশ্মীরের কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারী, রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষ এবং অন্যান্য নাগরিক সমাজের কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের বিধিবহির্ভূত আটকাদেশ অব্যাহত রেখেছে।
কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাদের যে বিশেষ দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে, সেটির সমালোচনা করে রিপোর্টে বিতর্কিত আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট (এএফএসপিএ) বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই অ্যাক্টের কারণে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার বিষয়টি কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্যকেও বেসামরিক আদালতে বিচারের অনুমতি দেয়নি।

ডয়েচে ব্যাংক: ১৮ হাজার কর্মীর ছাটাই শুরু

ইক্যুইটি সেলস ও ট্রেডিং খাতে নিয়োজিত ১৮ হাজার কর্মীর চাকরি ছাটাই শুরু করেছে ডয়েচে ব্যাংক। গত সোমবার থেকে ছাটাই শুরু হয়েছে। এর আগে রোববার এক ঘোষণায় ছাটাইয়ের বিষয়টি জানিয়েছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকটির লন্ডন, নিউ ইয়র্ক ও টোকিও শাখার কর্মীদের জানিয়ে দেয়া হয় যে, তাদের চাকরি থাকছে না। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।
খবরে বলা হয়, সোমবার লন্ডনের বহু কর্মীর ব্যাংকে প্রবেশাধিকার বাতিল করে দেয়া হয়। কাজে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন অনেকেই। ব্যাংকটির এক মুখপাত্র জানিয়েছে, নিজেদের ব্যবসাকে নতুন করে গড়ে তুলতেই এই ছাটাই করা হচ্ছে। ব্যাংকের কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হবে।
তাদের বিনিয়োগ ব্যাংকিং বাণিজ্য সংকুচিত করে ব্যাংকটিকে আরো কার্যক্ষম ও শক্তিশালী করে তোলা হবে।
ডয়েচে ব্যাংকের লন্ডন শাখায় প্রায় ৮ হাজার কর্মী নিয়োজিত আছেন। চাকরি ছাটাইয়ের প্রভাব সেখানে কীভাবে পড়বে সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। এদিকে, ব্যাংকটির ট্রেডিং খাতের বেশিরভাগ কাজই সম্পন্ন হয় হংকংয়ে। এই ছাটাই সেখানে কিরকম প্রভাব ফেলবে সে বিষয়েও কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
রয়টার্স জানিয়েছে, বেশ কয়েক বছর ধরে ইক্যুইটি সেলস ও ট্রেডিং নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ডয়েচে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নিজেদের ব্যবসাকে নতুন করে গড়ে তুলতে এর আগেও একাধিকবার পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। এপ্রিলে প্রতিদ্বনন্দ্বী কমার্স ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণ সংক্রান্ত একটি আলোচনা ব্যর্থ হয় তাদের। এরপর প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
ব্যাংকে প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টিয়ান সেওয়িং জানিয়েছেন, এই ছাটাই খুবই বেদনাদায়ক, কিন্তু ব্যাংকটির সাফল্য নিশ্চিত করতে অনিবার্য। সোমবার শেয়ার বাজারে ব্যাংকটি ৫ শতাংশ দরপতনের সম্মুখীন হয়েছে। চাকরি ছাটাইয়ের খবরে চমকে গেছেন অনেক বিনিয়োগকারীই।
ডয়েচে ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে তাদের কর্মীর সংখ্যা ৭৪ হাজারে নামিয়ে আনবে তারা। এতে তাদের লোকসান হবে ৮৩০ কোটি ডলার। আগামী তিন বছর ধরে নতুন সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাবে ব্যাংকটি। ব্যাংকটির এক মুখপাত্র জানান, আমরা আমাদের ব্যবসাটিকে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয়তা ভিত্তিতে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিশ্বজুড়ে কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহায়তা দেয়ার জন্য অর্থায়ন ও ট্রেজারিতে বিশেষায়িত একটি ডেডিকেটেড কর্পোরেট ব্যাংক স্থাপন করছি আমরা। ডয়েচে ব্যাংক আন্তর্জাতিক ব্যাংক হয়েই থাকবে। আমাদের গ্রাহকরা তাই চান।
এদিকে, ব্যাংকের পুনর্গঠন পরিকল্পনার স্বার্থে পদত্যাগ করতে হচ্ছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্যকেও। ব্যাংকটির প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা সিলভি ম্যাথেরাট ও প্রাাইভেট অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রধান ফ্রাংক স্ট্রস ৩১ জুলাই বিদায় নিচ্ছেন। চাকরি ছাড়ছেন ব্যাংকটির এক শীর্ষ কর্মকর্তাও। শুক্রবার এক ঘোষণায় ব্যাংকটি জানিয়েছে, তাদের বিনিয়োগ খাতের প্রধান গার্থ রিচি।

৪.৫ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আইএইএ’র কাছে হস্তান্তর করেছে ইরান

বেহরুজ কামালবান্দি
ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার মাত্রা ৩.৭ থেকে প্রায় ৪.৫-এ উন্নীত করেছে বলে জানিয়েছে ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা। এ সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালবান্দি ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নয়া মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নমুনা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ’র পরিদর্শকদের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কামালবান্দি আরো জানান, ইরানের পরমাণু চুল্লিগুলোর জন্য যে মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন তা এখন অভ্যন্তরীণভাবেই উৎপন্ন হচ্ছে। তিনি জানান, পরমাণু সমঝোতা থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়া এবং ইউরোপের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি পালন না করার প্রতিবাদে ইরান এ সমঝোতার নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বলেন, পাশ্চাত্যের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ অব্যাহত থাকলে শতকরা ২০ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনাও তার দেশের রয়েছে।
ইরান গত চার বছর ধরে পরমাণু সমঝোতা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলেও ২০১৮ সালের মে মাসে আমেরিকা এটি থেকে অন্যায়ভাবে বেরিয়ে যায়। এরপর ইউরোপ ইরানকে এ সমঝোতা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও তা পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।  পশ্চিমা দেশগুলোর এ ন্যক্কারজনক আচরণের প্রতিক্রিয়ায় ইরান গত ৮ মে পাশ্চাত্যকে ৬০ দিনের সময়সীমা বেধে দিয়ে বলেছিল, এ সময়ের মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে। তা না হলে তেহরান এ সমঝোতায় নিজের দেয়া কিছু প্রতিশ্রুতি পালন স্থগিত রাখবে। তেহরানের দেয়া সে সময়সীমা গত ৭ জুলাই শেষ হওয়ার পর ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।
ইরানের একটি পরমাণু স্থাপনার অভ্যন্তরীণ দৃশ্য (ফাইল ছবি)

অনিয়ম তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি সুজনের: ২১৩ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা অনিয়মের তথ্য উপস্থাপন করেছে নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক। এসব অনিয়মের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের দায়ী করে  তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। নির্বাচনের কেন্দ্র ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে সুজন জানিয়েছে, ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের ৪০ হাজার ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। আর ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১২৭টি কেন্দ্রে, ৯৮ শতাংশ ভোট পড়েছে ২০৪ কেন্দ্রে, ৯৭ শতাংশ  ভোট পড়েছে ৩৫৮ কেন্দ্রে এবং ৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছে ৫১৬ ভোটকেন্দ্রে। এছাড়া ৭৫টি নির্বাচনী এলাকায় ৫৮৭টি কেন্দ্রের সব ভোট পড়েছে বিজয়ী প্রার্থীর প্রতীকে। গত ৯ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ রিপোর্ট তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এ রিপোর্ট পর্যালোচনা করে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, দুনিয়ার ইতিহাসে এক শ’ বছরে যেখানে একটা কেন্দ্রে এক শ’ পার্সেন্ট ভোট হয় না, সেখানে আমাদের দুই শ’র বেশি কেন্দ্রে এক শ’ পার্সেন্টের বেশি ভোট হয়েছে।
প্রায় ৬শ’ কেন্দ্রে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি দলের প্রার্থী একটা ভোটও পাননি- এটাতো  চরম অসদাচরণ।
সংবাদ সম্মেলনে ‘লিখিত বক্তব্য’র কপি দেখিয়ে তিনি বলেন, এটা প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাপ্ত অভিযোগ হিসেবে মনে হতে পারে। সাংবিধানিক পদে পদাতিক ব্যক্তির ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের কাছে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ ধারা অনুসারে সরাসরি প্রাপ্ত অভিযোগ বা অন্য কোনো উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্টের যদি মনে হয় এই অসদাচরণ সংক্রান্ত অভিযোগ বা তথ্য কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা আছে, যৌক্তিকতা আছে সে ব্যাপারে তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অর্থাৎ যার ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হবে কি হবে না সেটা অনুসন্ধান, বিচার করার জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে পারেন।
শাহদীন মালিক বলেন, প্রধান বিচারপতি, জৈষ্ঠ্যতা অনুসারে পদ অনুযায়ী দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অসাদাচরণের জন্য পদে থাকবেন কি থাকবেন না সেজন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে পারেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কিভাবে কাজ করবে এ বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, সুজনের সংবাদ সম্মেলনে যে তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে তা নির্বাচন কমিশনের প্রদত্ত তথ্য। এটার ব্যাপারে সরকার বলতে পারবে না যে এই তথ্যের উৎস নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে।
হাস্যরস করে তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘায়ু লাভের একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের অনেক বড় বড় মন্ত্রীদের এলাকায় ১শ’ ভাগ ভোট পড়েছে। তার মানে তাদের ওই কেন্দ্রে যারা ভোটার ছিলো তারা কেউ মারা যাননি। দীর্ঘায়ূ লাভ করতে চাইলে ওই সব কেন্দ্রের এলাকায় গিয়ে বসবাস করতে হবে। তাতে মারা যাওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে!
তিনি বলেন, দুনিয়ার ইতিহাসে ভোটাভুটির বয়স ১০০ বছরের বেশি না। ৭০’র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিও এক শ’ ভাগ ভোট পায়নি। আমরা বোধ হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিকেও ছাড়িয়ে গেছি। এই নির্বাচন, এর বাস্তবভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণের পর ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে’ তা পাগল ছাড়া কেউ দাবি করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উচ্চ আদালতে নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা সম্পর্কে শাহদীন মালিক বলেন, আমি জড়িত না একটির সঙ্গেও।  তবে শুনেছি ৭৪-৭৫টি আসনে নির্বাচনী অনিয়মের বিষয়ে মামলা হয়েছে। ইলেকশন মামলার আইনজীবীদের আমি বলতে চাই, সাক্ষী হাজির করার দরকার নেই, কেন্দ্র ভিত্তিক রেজাল্ট বিচারপতিকে দেখান। বলেন, এই কেন্দ্রে আমার দলের প্রার্থী একটা ভোটও পায়নি, অপর দলের প্রার্থী এক শ’ ভাগ ভোট পেয়েছে। এখানে এক শ’ ভাগ ভোট পড়েছে। কেন্দ্র ভিত্তিক রেজাল্ট দেখালে নির্বাচনে যে কারচুপি হয়েছে সেটা আইনগতভাবে প্রমাণ করার জন্য এর  চেয়ে বেশি কিছু দরকার নেই।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সোজামিলের নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করে বিশিষ্ট কলামনিস্ট গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও অতীতে অনেক রকম গোঁজামিল আমরা দেখেছি। কিন্তু এবারের নির্বাচন কমিশন গোঁজামিলে না গিয়ে তারা একেবারে সোজামিলে চলে গিয়েছে। সোজামিলের বিষয়টি হচ্ছে শতভাগ। শতভাগের চেয়ে সোজামিল আর হয় না। অতীতে আমরা গোঁজামিল দেখেছি, এবার দেখলাম সোজামিল। 
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং নির্বাচনের প্রতি মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের রাস্তা রুদ্ধ হয়ে গেলে তা কারো জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজনের নির্বাহী সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক নির্বাচন। এ নির্বাচনকে আমরা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলতে পারি না। এটাকে বলতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ অসাদাচরণ। এই কারচুপির নির্বাচন আয়োজনের বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে যেন আর কোনো নির্বাচন না হয়। কারচুপির নির্বাচনের কারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মানের অবনতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষ নির্বাচনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। নির্বাচন কমিশন যে তথ্য দিয়েছে তাতে নূন্যতম কোনো সততা নেই। তারা নির্বাচন করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে। সংবাদ সম্মেলনে সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান সুচনা বক্তব্য রাখেন।
প্রতিবেদনে যা আছে: সংবাদ সম্মেলনে ফল বিশ্লেষণের প্রতিবেদন তুলে ধরেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার। এতে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ৩০০টি আসনের ৪০ হাজার ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচন হয়েছে তারমধ্যে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এটা ইতিহাসে এই প্রথম ঘটেছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ভোট গ্রহণ হলেও সেখানে ভোট পড়েছিল ৪০ দশমিক ০৪ ভাগ। এছাড়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১২৭ কেন্দ্রে, ৯৮ শতাংশ ভোট পড়েছে ২০৪টি ভোটকেন্দ্রে, ৯৭ শতাংশ ভোট পড়েছে ৩৫৮ ভোটকেন্দ্রে এবং ৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছে ৫১৬ ভোটকেন্দ্রে। মোটের উপর দেখা যায় ৯৬ থেকে ১০০ শতাংশ ভোট পড়েছে ১ হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে। এছাড়াও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬,৪৮৪ টি ভোটকেন্দ্রে, ৮০ থেকে ৮৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১৫,৭১৯টি ভোটকেন্দ্রে, ৭০ থেকে ৭৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১০ হাজার ৭৩টি ভোটকেন্দ্রে। এ নির্বাচনে ২০ থেকে ৩৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ৩০১টি কেন্দ্রে, ১০ থেকে ১৯ শতাংশ  ভোট পড়েছে ২০টি কেন্দ্রে এবং ১০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে ১১টি ভোটকেন্দ্রে।
এতে বলা হয়, নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের সঙ্গে প্রধান বিরোধী দলের ধানের শীষ প্রতীকের ভোটের তফাৎ আকাশ-পাতাল। ইতিপূর্বে কোনো নির্বাচনে এমন পার্থক্য দেখা যায়নি। এ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে বৈধ ভোটের সংখ্যা  ৬ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৬৬ ভোট তথা ৭৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সেখানে ধানের শীষ প্রতীকে বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ কোটি ৯ লাখ ৯১ হাজার ২৩১ ভোট তথা ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর লাঙ্গল প্রতীকে ভোট সংখ্যা ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার ৯২০ ভোট। যা মোট ভোটের ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শতভাগ ভোট পড়া কেন্দ্রসমূহের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সব থেকে বেশি এবং বরিশাল বিভাগে সব থেকে কম কেন্দ্র। চট্টগ্রামের ২৫টি আসনের আওতাভুক্ত ৫৩টি ভোটকেন্দ্রে এবং বরিশালের ২টি আসনের ৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এছাড়া রংপুর বিভাগের ১৪টি আসনের আওতাভুক্ত ৫২টি কেন্দ্রে, ঢাকা বিভাগের ২১টি আসনের আওতাভুক্ত ৩২টি কেন্দ্রে, রাজশাহী বিভাগের ১৫টি আসনের আওতাভুক্ত ২৯টি কেন্দ্রে, ময়মনসিংহ বিভাগের ১২টি আসনের আওতাভুক্ত ২৩টি কেন্দ্রে, সিলেট বিভাগের ১০টি আসনের আওতাভুক্ত ১৭টি কেন্দ্রে, খুলনা বিভাগের ৪টি আসনের আওতাভুক্ত ৪টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। অন্যদিকে ২১৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮১টি তথা ৮৪ দশমিক ৯৭ শতাংশে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে বিজয়ী ৯০ জন সংসদ সদস্য, ২১টি আসনে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ জাতীয় পার্টি থেকে বিজয়ী ১০ জন সংসদ সদস্য এবং ৮টি তথা ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে বিজয়ী ১ জন সংসদ সদস্য বিজয়ী হয়েছেন।
এছাড়া ৭৫টি আসনের ৫৮৭টি কেন্দ্রের শতভাগ বৈধ ভোট শুধুমাত্র একজন করে প্রার্থী পেয়েছেন। অন্য কোনো প্রার্থী ১ ভোটও পাননি। এই ৫৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৬ টিতে ৯৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ সকল ভোট পেয়েছেন নৌকা প্রতীকের এবং ১টি কেন্দ্রের ০ দশমিক ১৭শতাংশ সকল ভোট পেয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী। এই ৭৫টি আসনের ৭৪টিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এবং ১টিতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। যে আসনের (মাগুরা-২) আওতাভূক্ত একটি ভোটকেন্দ্রে সকল ভোট ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন, সেখানেও জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী।
রিপোর্টে বলা হয়, অতীতের ৪টি নির্বাচনে যে সকল আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে সেসব আসনে এই নির্বাচনে বিএনপ্থির ভোট প্রাপ্তির হার এতই কমেছে যে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ১৮টি আসনের মধ্যে দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিল না। বাকী ১৬টি আসনের মধ্যে ১৪টি আসনেই বিএনপির ভোট কমেছে। এসব আসনে নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৫৫ দশমিক ৬৭ ভাগ ভোট পেলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট পেয়েছে ২ দশমিক ০২ শতাংশ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাতিল ভোটের সংখ্যাও বেড়েছে। ৩০০টি আসনে গড়ে বাতিল ভোটের শতকরা হার ১ দশমিক ০৬ শতাংশ।  ৩৪২টি কেন্দ্রে ১১ থেকে ৬১ শতাংশ  পর্যন্ত ভোট বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৭৯৫টি কেন্দ্রে কোনো ভোটই বাতিল হয়নি। সর্বোচ্চ ৬১ ভাগ ভোট বাতিল হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ্তুনোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়্থ ভোটকেন্দ্রে। শতভাগ ভোট পড়া ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে বাতিল ভোটের হার ছিল ১৫ দশমিক ১৬ শতাংশ।
সাধারণ ব্যালট পেপারে এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের মধ্যেও তারতাম্য দেখা যায়। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ৬টি নির্বাচনী এলাকায় ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়। এই ৬টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬২ দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছে চট্টগ্রাম-৯ আসনে এবং সবচেয়ে কম ৪৩ দশমিক ০৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ঢাকা-১৩ আসনে। ৬টি আসনে ইভিএম-এ ভোট পড়ার গড় ছিল ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ। ইভিএমে সবচেয়ে কম ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছে রংপুর-৩ আসনের দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল এ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে এবং সবচেয়ে বেশি ৮৯ দশমিক ১৪ ভাগ ভোট পড়েছে চট্টগ্রাম-৯ আসনের আব্দুল বারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে।
এসব আসনে নৌকা প্রতীকের ভোট প্রাপ্তির গড় ৭৬ দশমিক ৮৬ ভাগ হলেও ইভিএম-এ ৫৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একইভাবে সকল আসনে ধানের শীষ প্রতীকের ভোট প্রাপ্তির গড় ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। জাতীয় গড়ের তুলনায় ইভিএমে নৌকা প্রতীকে ভোট ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম এবং ধানের শীষে ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি ভোট পড়েছে। ইভিএমে ভোটপড়ার হার কেন কম, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের তাদের কেন্দ্রভিত্তিক প্রকাশিত ফলাফলে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া নেই।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ার হার নিয়ে সুজন-এর সংবাদ সম্মেলন