Thursday, November 7, 2019

আসছে রোবট প্রযুক্তি: বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি টিকে থাকতে পারবে? by মোয়াজ্জেম হোসেন

রোবট দখলে নিচ্ছে শ্রমিকদের জায়গা
উজ্জ্বল আলোর নীচে লাইন ধরে বসানো সারি সারি সেলাই মেশিন। কাজ করছেন শত শত নারী শ্রমিক। বাংলাদেশের যে কোন গার্মেন্টস কারখানার চিরচেনা দৃশ্য।
এখনো হয়তো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ বা চট্টগ্রামের বড় বড় কারখানায় এমন দৃশ্য দেখা যাবে।
কিন্তু দশ বছর পরের দৃশ্য কল্পনা করা যাক। কেমন হবে তখন বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানা?
নিউইয়র্কের শিমি টেকনোলজি নামের একটি প্রযুক্তি কোম্পানীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সারাহ ক্রেসলির কাছে ভবিষ্যতের ছবিটা পরিস্কার।
"দশ বছর পরের পোশাক কারখানায় খুব অল্প শ্রমিকই আসলে কাজ করবে। রোবটিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি তখনো আমরা হয়তো কিছু কর্মীকে কাজ করতে দেখবো। কারখানা জুড়ে তখন বেশি থাকবে নানা ধরণের স্বয়ংক্রিয় রোবটিক যন্ত্রপাতি। থাকবে অনেক কম্পিউটার। কারখানার বড় অংশ জুড়ে থাকবে ডিজাইন রুম। বেশিরভাগ কর্মী কাজ করবে এই ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে।"
সারাহ ক্রেসলি এর আগে কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল বা গাড়ি নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে। যেভাবে অটোমেশন গাড়ি নির্মাণ শিল্পকে পাল্টে দিয়েছে, এবার পোশাক শিল্পে তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে বলে মনে করেন তিনি।
যে শিল্পে বাংলাদেশে কাজ করে প্রায় চল্লিশ লাখ মানুষ, গত কয়েক দশক ধরে যে খাতে তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বেশি কাজ, তার অবস্থা তাহলে কী দাঁড়াবে?
"এদের ৬০ হতে ৮৮ শতাংশ তাদের কাজ হারাবে অটোমেশনের কারণে। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হবে। এটা আমার হিসেব নয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসেব", জানালেন সারাহ ক্রেসলি।
তার মতে, বাংলাদেশের সামনে বিপদ অনেক রকমের।
প্রথমটা হচ্ছে এই অটোমেশন, যেটা ইতোমধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বদলে যাওয়া ফ্যাশন ট্রেন্ড, যেটা বিরাট প্রভাব ফেলছে পোশাকের ব্রান্ডগুলোর ওপর। আর সবশেষে আছে অটোমেশনের চূড়ান্ত ধাপে পোশাক শিল্পের 'রিশোরিং' বা 'নিয়ারশোরিং।' অর্থাৎ যেখান থেকে এই পোশাক শিল্প বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এসেছে, এই শিল্পের সেখানেই ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি।

ভবিষ্যৎ কী

যে দেশের অর্থনীতির প্রধান ইঞ্জিন হয়ে উঠেছে এই পোশাক শিল্প,তার ভবিষ্যৎ তাহলে কী? ব্যাপারটা নিয়ে কি আসলেই নড়ে-চড়ে বসার সময় এসেছে?
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তাদের একজন ফজলুল হক। বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি। পোশাক শিল্প খাতে অটোমেশনের যে ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে তিনি বিপদ হিসেবে দেখতে রাজী নন। তবে অটোমেশন যে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে, সেটা স্বীকার করলেন তিনি।
"একটা মাঝারি আকারের কারখানার কাটিং সেকশনে দেড়শো-দুশো লোক লাগতো। সেখানে এখন অটোমেটিক কাটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে শ্রমিক লাগে দশ থেকে বারো জন। অর্থাৎ দশ ভাগের এক ভাগ লোক লাগে। এরকম অটোমেশন কিন্তু চলছেই। আগামী দশ বছরে এই শিল্পে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।"
তবে ফজলুল হক বলছেন, বাংলাদেশে অটোমেশনের কারণে যত লোক কাজ হারাচ্ছেন, তাদের আবার এই শিল্পেই কোন না কোনভাবে কর্মসংস্থান হয়ে যাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে এখনো এই শিল্পের আকার বাড়ছে।
এর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করলেন গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার। ট্রেড ইউনিয়ন করতে প্রতিদিন নানা ধরণের কারখানায় তার যাতায়াত। অটোমেশন যে শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, সেটা তিনি নিজ চোখেই দেখতে পান প্রতিদিন।

রোবট আসছে!

"বাংলাদেশে এখন যত বড় ফ্যাক্টরি আছে, বিশেষ করে এ এবং বি ক্যাটাগরির যত ফ্যাক্টরি, সেখানে অনেক নতুন মেশিন আনা হয়েছে। এসব মেশিনে এমন বহু কাজ হচ্ছে, যেগুলো আগে শ্রমিকদের করতে হতো।"
"সূতা কাটা, আয়রন করা, কাটিং, ড্রয়িং, লে-আউট, লোডিং-আনলোডিং - কোন কাজই এখন মেশিন করছে না। বিভিন্ন ধরণের মেশিন চলে আসছে, যেখানে আর আগের মতো শ্রমিকের দরকার হচ্ছে না," বলছেন তিনি।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে এই পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে তিন-চার বছর আগে থেকে। এই খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা ফজলুল হক জানালেন, তিনি নিজের কারখানাতেও এরকম প্রযুক্তি চালু করেছেন।
"কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের প্রতিটি কারখানায় বেশিরভাগ মেশিনে দুজন করে লোক লাগতো। একজন মেশিনটি চালাতেন, আরেকজন উল্টোদিকে বসে সাহায্য করতেন। গত তিন চার বছরে পর্যায়ক্রমে হেল্পারের পদ খালি হয়ে গেছে। মেশিন ঐ জায়গা দখল করে নিয়েছে।"
একটি মাঝারি মাপের কারখানার কাটিং বিভাগে আগে প্রায় দেড়শো-দুশো কর্মীর দরকার হতো। সেখানে এখন অটোমেটিক কাটার মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে যেখানে মাত্র দশ-বারোজন লোক দিয়েই কাজ চালানো যায়। অর্থাৎ দশ ভাগের একভাগ লোক দিয়েই এখন কাজ চালানো যায়।
ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি কারখানাই এখন কম-বেশি এরকম অটোমেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে কী ধরণের মেশিন বা যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে, তা নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে ঢাকার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ। প্রতিষ্ঠানটির ফেলো অর্থনীতিবিদ ড: মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, একটা পরিবর্তন যে শুরু হয়েছে, সেটা স্পষ্ট।
"আগে যে ধরণের মেশিন আমদানি করা হতো, তার চেয়ে অনেক ভিন্ন ধরণের মেশিন এখন আনা হচ্ছে। অনেকে রোবটও আনছেন। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়বে।"
ডঃ রহমানের মতে, এর একটা কারণ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসলে তখন আর বিনা শুল্কের সুবিধা আর পাবে না। তখন তাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। তখন কারখানা মালিকরা প্রযুক্তির দিকেই ঝুঁকবেন।

কমছে নারী শ্রমিক

গার্মেন্টস নেত্রী নাজমা আক্তার বলছেন, মালিকরা নতুন প্রযুক্তির ব্যাপারে এত আগ্রহী হওয়ার কারণ, এটি তাদের আরও বেশি মুনাফার সুযোগ করে দিচ্ছে।
"গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, তারা বলে চারটা লোক যে কাজ করে, একটা মেশিনেই এখন সেই কাজ হয়। একজন শ্রমিককে ন্যূনতম আট হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। চারজন শ্রমিকের পেছনে যায় প্রায় ৩২ হাজার টাকা। কিন্তু এখন নাকি আট হাজার টাকাতেই একটি মেশিন পাওয়া যায়। কাজেই মালিকরা সেই পথেই যাচ্ছেন।"
নাজমা আক্তারের মতে, অটোমেশনের প্রথম শিকার হচ্ছেন কারখানার নারী শ্রমিকরা।
"অনেক কারখানাতেই যেখানে এক হাজার শ্রমিক ছিল। এখন সেখানে হয়তো বড়জোর তিনশো শ্রমিক আছে। বেশিরভাগ জায়গায় নারী শ্রমিকরাই কাজ হারাচ্ছেন।"
গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পোশাক শিল্পে। এখন সেটি স্তিমিত হয়ে আসছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ছাঁটাই শুরু হয়েছে বলে দেখেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ড: মুস্তাফিজুর রহমান।
"এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা নারী কর্মীদের ওপরই পড়ছে। প্রথাগতভাবে এই শিল্পে নারী কর্মীরাই বেশি কাজ করেন। একসময় পোশাক শিল্পে আশি বা নব্বু্ই শতাংশই ছিলেন মহিলা কর্মী। এখন সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে সেটা কমে ষাট শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। এটা আরও কমবে। কারণ অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন মহিলার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না। সেজন্যে নতুন মেশিনে কাজ করার জন্য ছেলেদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।"

অফশোরিং বনাম নিয়ার শোরিং

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটতে শুরু করেছিল আশির দশকের মাঝামাঝি। শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে এধরণের শিল্প যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল তখন তার নাম দেয়া হয়েছিল অফশোরিং।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসি কনসালটেন্সি তাদের এক রিপোর্টে বলছে, অটোমেশনের ফলে এসব শিল্প এখন অনশোরিং, অর্থাৎ আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া, কিংবা নিয়ারশোরিং, অর্থাৎ কাছাকাছি কোন দেশে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে পোশাক শিল্প উদ্যোক্তা ফজলুল হক মনে করেন, এরকম আশংকা তিনি দেখছেন না।
"যেটা বলা হচ্ছে রোবট এসে সব দখল করে নেবে এবং এর ফলে এই শিল্প আর বাংলাদেশে থাকবে না, ইউরোপ-আমেরিকাতেই ফিরে যাবে। কিন্তু এই কথার মধ্যে আমি একটা ফাঁক দেখছি। মানুষের জায়গায় রোবট বসালে তার খরচ কী দাঁড়াবে এবং সেই বিনিয়োগ সবাই করতে পারবে কীনা বা এই রোবটের অপারেশনাল খরচ কী হবে- এগুলোর কোন পরিস্কার জবাব কিন্তু এখনো আমি কোন স্টাডিতে দেখিনি।"
অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমানও মনে করেন, এই শিল্পকে বাংলাদেশে ধরে রাখার সুযোগ এখনো আছে।
"আমি আবার এধরণের আশংকাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাই না কয়েকটি কারণে। এই শিল্প বাংলাদেশে থাকবে কি থাকবে না, সেটা শেষ বিচারে উৎপাদনশীলতা এবং খরচ কী পড়বে, তা দিয়েই নির্ধারিত হবে। এটা এখনো শ্রমঘন শিল্প। এরকম শিল্প নিয়ারশোরিং করতে গেলে সেটা একটা বিরাট বড় চ্যালেজ্ঞ। কারণ এত বিপুল পরিমাণে তৈরি পোশাক সরবরাহ করা কিন্তু সহজ নয়, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলা অনেক সময়ের ব্যাপার।"
আরেকটি বিষয়ের প্রতি তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। বিশ্ব বাজারে পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে চীন আছে শীর্ষস্থানে। তারা মোট চাহিদার তিরিশ শতাংশ সরবরাহ করে। আর এরপর দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশ সরবরাহ করে মাত্র ছয় শতাংশ।
"আমি মনে করি বাংলাদেশের ব্যবসা বাড়ানোর অনেক সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। ঠিক কৌশল নিতে পারলে বাংলাদেশের সুযোগের সীমা কিন্তু এখনো অনেক দূর বিস্তৃত করা সম্ভব।"

কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

কিন্তু এই যে বিরাট প্রযুক্তিগত পরিবর্তন গার্মেন্টস শিল্পকে আমূল বদলে দিচ্ছে, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ? শিমি টেকনোলজিসের সারাহ ক্রিসলি বলছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশের সামনে কোন বিকল্প নেই।
তার আশংকা, যদি এর পেছনে সত্যিকারের কোন বিনিয়োগ করা না হয়, বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। তখন এসব প্রতিষ্ঠান অন্যান্য পোষাক রফতানিকারক দেশে চলে যাবে।
"কিন্তু আমি আসলে চাই না এটা ঘটুক। আমি দেখেছি, বাংলাদেশ গত পাঁচ বছরে কত ধরণের কাজ করেছে। আমি গত ছয় বছর ধরে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছি। কারখানাগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য তারা কত কাজ করেছে, সেটা আমি দেখেছি। আমি চাই বাংলাদেশ পোশাক সরবরাহকারী দেশের শীর্ষে থাকুক। কিন্তু সেজন্যে এই বিষয়টাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং আমি আশা করি তারা সেই সিদ্ধান্ত নেবে।"
সারাহ ক্রেসলির প্রতিষ্ঠান মূলত গার্মেন্টস শিল্পকে অটোমেশনের যুগের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। গত প্রায় ছয় বছর ধরে এ কাজেই তিনি বাংলাদেশে যাতায়ত করছেন। সেখানে তার প্রতিষ্ঠান পাঁচটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বাংলাদেশে সর্বশেষ সফর থেকে নিউইয়র্কে ফেরার পর তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল টেলিফোনে।
"আমরা নিজেদেরকে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের অবস্থানে রেখে কল্পনা করে এই কর্মসূচী তৈরি করেছি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ গার্মেন্টস শ্রমিকের খুব কমই আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ আছে। আমরা আমাদের লার্নিং টুলগুলো তৈরি করেছি একটা গেমের মতো করে। আমরা একটা ভিডিও গেমের মতো ইন্টারফেস তৈরি করেছি, তার সঙ্গে যোগ করেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।"
"এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাংলা শেখানো হবে। ফলে কারখানার কর্মীরা বাংলায় কথা বলে তাদের নির্দেশ দিতে পারবে। এবং হাতের স্পর্শ দিয়েও এসব মেশিন চালানো যাবে।"
শিমি টেকনোলজিসের পাইলট প্রকল্পে গার্মেন্টসের নারী কর্মীরা ডিজিটাল প্যাটার্ন মেকিং এর বেসিকস শিখছে। শিখছে আরও নানা কিছু। এর মাধ্যমে গার্মেন্টস কর্মীরা ডিজিটাল যুগের জন্য তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করেন তিনি।
প্রযুক্তি ভিত্তিক যে নতুন শিল্পবিপ্লবের ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশে, তার ধাক্কায় গার্মেন্টস শিল্প যে আমূল বদলে যেতে চলেছে, তা নিয়ে এই খাতের কারও মনেই কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু রোবটিক প্রযুক্তি যে লাখ লাখ কর্মীর কাজ নিয়ে নেবে, তার কর্মসংস্থান কোথায় হবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনের একটি কারখানা। শুধুই রোবট, খুব বেশি কর্মীর দরকার হয় না এমন কারখানায়

নাশপাতি চাষের অপার সম্ভাবনা by আকমল হোসেন

নাশপাতি বিদেশি ফল। এটি সাধারণত শীতপ্রধান অঞ্চলে ব্যাপক ফলে। সাত সাগরের ওপার থেকে এ দেশে নাশপাতি আসে। অন্য ফলের পাশাপাশি নাশপাতি নামটি অনেকের কাছেই পরিচিত। তবে এই আকর্ষণীয় ও স্বাদু ফলটিও বাংলার মাটিতেও যে ফলতে পারে, এ ধারণা এখনো অনেকের নেই। আর তা শুধু শখের বাগানেই নয়, বাণিজ্যিকভাবে এ দেশে নাশপাতির চাষ সম্ভব।

মৌলভীবাজারের আকবরপুরে অবস্থিত আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে নাশপাতির চাষ হয়েছে। তাতে ফল ধরেছে। বাগানের গাছে ঝুলে আছে থোকা থোকা নাশপাতি। ফলের আকার ও স্বাদ ভালো। আমদানি করা নাশপাতির চেয়ে একটু বেশিই মিষ্টি।

আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, কেন্দ্রের একটি এলাকায় নাশপাতির বাগান। সেখানে অনেকগুলো গাছ। তখন শ্রাবণের রোদে পুড়ছে বাগানটি। নাশপাতি ঝুলে আছে শাখায় শাখায়। রোদ, পোকামাকড় ও কাঠবিড়ালি থেকে নাশপাতি রক্ষা করতে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাগিং প্রযুক্তি। প্রতিটি গাছে সাদা সাদা ব্যাগে মোড়ানো নাশপাতি।

আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, নাশপাতির মাতৃবাগানটি করা হয়েছিল ২০১০ সালে। এতে এখন ৩৫টি গাছ আছে। ফল আসবে কি না, এলেও ফলন কতটা ভালো হবে, স্বাদ হবে কি না—এমন নানা প্রশ্ন ছিল কৃষিবিজ্ঞানীদের মাথায়। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে ২০১৭ সাল থেকে নাশপাতিবাগানে ফল আসতে শুরু করেছে। চৈত্র মাসে ফুল আসে। আর শ্রাবণ-ভাদ্রে ফল তোলার উপযোগী হয়ে ওঠে। ফলনও ভালো, ফলের আকারও বড়। প্রতিটি গাছে ৬০ থেকে ৭০টি নাশপাতি ধরছে। প্রতিটি ফলের গড় ওজন ১৩৫ গ্রাম। ফল বাদামি রঙের। ফলের উপরিভাগের ত্বক কিছুটা খসখসে। শাঁস সাদাটে। খেতে কচকচে ও সুস্বাদু। বিদেশ থেকে যেসব নাশপাতি আনা হয়, তার স্বাদ কিছুটা পানসে। কিন্তু আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের নাশপাতির স্বাদ কিছুটা নোনতা ও বেশ মিষ্টি।

আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন জানিয়েছেন, নাশপাতি মূলত শীতপ্রধান অঞ্চলের ফল। ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়ায় এর ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে। ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়া থেকেই নাশপাতি এ দেশে আমদানি করা হয়। তবে শীতপ্রধান অঞ্চলের হলেও এর কোনো প্রজাতি বা জাত অপেক্ষাকৃত উচ্চ তাপমাত্রায় জন্মাতে ও ফলন হতে পারে। দেশে এই ফলের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি নাশপাতি-১ নামের নাশপাতির একটি জাত অবমুক্ত করে। সেই জাতেরই মাতৃবাগান আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। জাতটি নিয়মিত ফল ধারণে সক্ষম ও উচ্চফলনশীল। নাশপাতির গাছ খাড়া ও অল্প ঝোপ থাকে। পানি নিষ্কাশিত হয়—এমন মাটিতে নাশপাতির চাষ করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে পানিনিষ্কাশনে ভালো সুবিধা ও দোআঁশ মাটি এবং মাটির পিএইচ মান ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ নাশপাতি চাষের জন্য উত্তম। তবে এর চেয়ে কমবেশি হলেও নাশপাতি জন্মাতে ও ফলন দিতে পারে। নাশপাতি চাষের জন্য সূর্যালোক দরকার। শুষ্ক গরম বাতাস নাশপাতির জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে নাশপাতির গাছ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না। সাধারণত শাখা কর্তন এবং গুটি কলমের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়ে থাকে। বর্ষাকাল কলম করার উপযুক্ত সময়। ফল সংগ্রহ এবং গাছের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করার জন্য গাছের উচ্চতা ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার হলে ভেঙে বা ছেঁটে দিলে ভালো। নাশপাতির খাড়া ডালে নতুন শাখা-প্রশাখা কম হয়ে থাকে। শাখা-প্রশাখা কম হলে ফলন কম আসবে। যে কারণে ভারী কিছু বা দড়ি টানার সাহায্যে ঊর্ধ্বমুখী ডালকে মাটির দিকে নুইয়ে দিলে ভালো হয়। এতে করে ডালের বিভিন্ন স্থানে টান বা হালকা ভাঁজের সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং ওই সব টানের স্থানে নতুন কুঁড়ি বা শাখার সৃষ্টি হয়। এতে ফলন ও ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে কড়া রোদে নাশপাতির ত্বক নষ্ট হবে না। ফল সুন্দর থাকবে। পোকামাকড়ও আক্রমণ করতে পারবে না। কাঠবিড়ালি ফসল নষ্ট করতে পারবে না। এ অঞ্চলে কাঠবিড়ালি একটি বড় সমস্যা। কিন্তু ব্যাগিং করা ফল কাঠবিড়ালি নষ্ট করে না। প্রতি হেক্টরে ছয় থেকে সাত টন ফলন হতে পারে। আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে সফল জাতটি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব এলাকায় নাশপাতি হতে পারে নতুন মৌসুমের একটি ফসল। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে যখন আম-কাঁঠাল, আনারস ফুরিয়ে যাবে, তখন এটি বাজারে আসবে। এই ফলের আমদানিনির্ভরতা কমবে।

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এ দেশে এখনো বাণিজ্যিকভাবে নাশপাতির চাষ শুরু হয়নি। কিন্তু এটি একটি অপার সম্ভাবনাময় ফসল। পোকামাকড়, রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম। বৃহত্তর সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকাতে নাশপাতির চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া পানি জমে না, এমন মাটিতেও এই ফলের চাষ হবে।

যেসব কারণে বাড়ছে ক্যানসার by মরিয়ম চম্পা

জাকিয়া সুলতানা। পরিবারের সদস্যদের কাছে পরিচিত ছিলেন জাকি নামেই। ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেন। বিয়েও হয়ে যায় অল্প বয়সেই। স্বামী-সংসার সামলিয়েছেন দুই হাতে। নিজে শিক্ষিত না হলেও সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। সবে জীবনটা তার সামলে উঠেছিল। সন্তানরা সংসারের হাল ধরার চেষ্টায় ছিলেন।
ঠিক এ সময় ৪৮ বছরের এই নারীর জীবনে হানা দেয় ঘাতক ব্যাধি ক্যানসার। শুধু একটি মানুষের জীবনই নয়, তছনছ হয়ে যায় পুরো একটি পরিবার পরিবারের স্বপ্ন।
ক্যানসার এমন এক রোগ যা ব্যক্তির পাশাপাশি পুরো পরিবারের আর্থিক সংগতিতেও আঘাত হানে। তার ছেলে জহিরুল ইসলাম চন্দন বলেন, আমরা পরিবারের সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেও মানসিকভাবে সবাই প্রস্তুত হই দ্রুতই। লড়াইটা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। গত বছর আমাদের কোনো ঈদ ছিল না। আমাদের কোরবানি ছিল লঞ্চে লঞ্চে। ঢাকায় আসি। এরপর এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতাল। একের পর এক টেস্টের কারণে মা’কে হাসপাতালে ভর্তি করাতে বিলম্ব হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সিট পেতেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। শেষ পর্যন্ত সিটের ব্যবস্থা হয়। চিকিৎসকরা অবশ্য তার ক্যানসারের জন্য ভুল চিকিৎসাকে দায়ী করেন। এই লড়াইয়ে হেরে যান জাকিয়া সুলতানা। দুই মাস ১০ দিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ইন্তেকাল করেন তিনি। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। চিকিৎসকরা এর জন্য পরিবেশ এবং খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করেছেন।
সাঈদার বয়স মাত্র ১১ বছর। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। গ্রামের বাড়ি বগুড়া। দেড় বছর আগে তার ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সহায় সম্বল হারিয়ে পথে বসেছেন বাবা মুস্তাক আলী। তার পরেও মনোবল হারাননি। ভেঙ্গে পড়েননি মানসিকভাবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাহায্য তুলে মেয়ের চিকিৎসা করাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। এ পর্যন্ত মেয়ের চিকিৎসাবাবদ প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কেমোথেরাপির পার্শপ্রতিক্রিয়ায় তার একটি চোখের আলো অনেকটা ফুরিয়ে এসেছে। অপর চোখটিতেও কম দেখতে পায়। তার বাবা বলেন, এখন তো আর পারি না। আগে যারা সাহায্য সহযোগিতা করতো তারাও এখন অনেকটা এড়িয়ে চলে। বাধ্য হয়ে স্কুল, কলেজ ও মসজিদ মাদ্রাসায় সাহায্য তুলি। বয়স কম হওয়াতে চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করেছেন নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে থাকলে সাঈদা হয়তো সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাবে। এখন দুই শতাংশ জমির ওপর নিজের বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি হাসপাতালে এসেছেন সালাম। পেশায় রিকশা চালক। তিনি বলেন, দু-বছর আগে যখন স্ত্রী জামিলা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন তখন পরিবারে যেন এক দুর্যোগ নেমে এলো। ক্যানসার আমাদের মতো পরিবারের জন্য একটা বিরাট ধাক্কা। আমাদের তেমন পয়সা কিংবা সামর্থ্য নাই। স্ত্রীর ক্যানসার হওয়ার পর থেকে পরিবারের বাকি সব কিছুই যেন থমকে গেছে। এই যে চিকিৎসা করাতে ঢাকায় এসেছি, বাসায় তালা। আমার সংসার বলতে কিছুই নাই।
ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম মানসিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর শুরু হয় আসল সংগ্রাম। অর্থের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। শুধু আর্থিক বিষয় নয়, একজন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর দীর্ঘ দিনের সেবা, ডাক্তারের কাছে ছুটোছুটি- অনেক পরিবারেই সকল কর্মকাণ্ডে ছেদ তৈরি করে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে ক্যানসার ও কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে অতিমাত্রায় রাসায়নিকযুক্ত ভেজাল খাদ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। রোগী অনুপাতে চিকিৎসা সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ক্যানসার রোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকি বলেন, খাদ্যাভ্যাস দায়ী পাকস্থলী ক্যানসারের জন্য। এক্ষেত্রে শুধু ভেজাল খাবার নয় শাকসবজি কম খেলে পাকস্থলী এবং খাদ্যনালীর ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাছ মাংস বেশি খেলেও ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থকে। তামাকজাত দ্রব্যের কারণে মুখ, খাদ্যনালী, কিডনি, পায়ুপথে ক্যানসারসহ সকল ধরনের ক্যানসার হতে পারে। ফুসফুসের ক্যানসারের জন্য শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি দায়ী হচ্ছে ধূমপান। অর্থাৎ পুরুষদের ফুসফুসে, মুখগহ্বরে, খাদ্যনালী ক্যানসার এগুলোর জন্য সবটাই দায়ী ধূমপান। মেয়েদের জরায়ু, ব্রেস্ট, মুখগহ্বরে বেশি হয়ে থাকে। ঘনঘন বাচ্চা হলে, কম বয়সে বিয়ে ইত্যাদি কারণে জরায়ু ক্যানসার হয়ে থাকে। আনুপাতিক হারে পুরুষরাই আক্রান্ত বেশি হয়। মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যানসারের জন্য স্থূলাকার, ওজন বেশি, জন্মনিয়ন্ত্রণকারী খাবার পিল, বংশগত কারণ দায়ী। ধূমপান, পান জরদা, গুল ইত্যাদি কারণে মুখগহ্বরে ক্যানসার হতে পারে। একক কোনো কারণে মানবদেহে ক্যানসার হয় না। সমষ্টিগত কারণে হয়ে থাকে। একেক দেশের আর্থসামাজিক কারণে একেক ধরনের ক্যানসার হয়ে থাকে। আমাদের সংগঠনের জরিপ অনুযায়ী আমাদের দেশে মোট প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় দুই থেকে তিন লাখ মানুষ নতুন আক্রান্ত হচ্ছে। যার মধ্যে ৫০ ভাগই মারা যায়।
ক্যানসার সচেতনা বৃদ্ধিতে আমরা ঢাকা এবং ঢাকার বাহিরে প্রতি সপ্তাহে দুই বার ফ্রি ক্যাম্পেইন করে থাকি। এবং প্রতি এক থেকে দুই মাস পরপর আমরা বিভিন্ন স্কুল কলেজে ‘ক্যানসার এনসার’ নামে একটি অনুষ্ঠান করি। ক্যানসার সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে আমরা প্রায় ৫০ ভাগ ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারি।
জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন বলেন, বর্তমানে ক্যানসারের জন্য আমাদের পরিবেশ সবচেয়ে বড় দায়ী। এর সঙ্গে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপার আছে। আমাদের দেশে যত্রতত্র এক্সরে মেশিন রয়েছে। কোথাও দেখা যাবে টিনের বেড়া দিয়ে এক্সরে শুরু করে দিয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কারণ এই এক্সরে আমাদের পরিবেশের ব্যাকগ্রাউন্ডের যে রি-অ্যাকশন সেটা আরো উসকে বা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে মানুষ আরো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া তামাকের কারণে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিদেশে প্রতি ১শ জনে তিন জন আক্রান্ত হয়। সেখানে আমাদের দেশে প্রায় ৩০ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে মানুষ তামাক বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে। কাজেই আমরা এই অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করলে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। যেহেতু পরিবেশ এর জন্য দায়ী। তাই ক্যানসার অসুখটা এমন এটা এক শ্রেণির মানুষের হবেই। এভয়েড করতে পারবে না। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে। কারণ, যারা শুরুর দিকে চিকিৎসা করাতে আসে তারা চিকিৎসা সেবা নিয়ে বহু বছর পর্যন্ত বেঁচে আছে।
আমাদের দেশে সাধারণ আক্রান্ত হওয়ার পরে প্রথমে পানি পড়া, এরপর হুজুরের কাছে যায়। এরপর বিভিন্ন রকমের কবিরাজি করে। এই করতে করতে দুই বছর শেষ। তারপর যখন আমাদের কাছে আসে তখন শেষ পর্যায়ে। রোগীকে তিন থেকে চার জনে ধরে নিয়ে আসে। এই পর্যায়ে ক্যানসার না হয়ে আলসার হলেও তার বাঁচার কথা না। কাজেই শরীরে শক্তি থাকা অবস্থায় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে আসতে হবে। অসুখ দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী থাকলে স্থানীয় কোনো হাসপাতালে গিয়ে এক্সরে করিয়ে ডা. দেখালেই বোঝা যাবে তার ক্যানসার হয়েছে কি না। কারো তিন মাস ধরে কাশি হচ্ছে, কারো শরীরে বড় চাকা দেখা দিয়েছে। তারপরেও সে সচেতন না। এক্ষেত্রে আমরা চিকিৎসক, গণমাধ্যমসহ অন্যান্য মিডিয়া যদি বিষয়টি আরো বেশি করে প্রচার করি এবং রোগী শুরুতেই চলে আসে তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যানসার নিরাময় করা সম্ভব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জিল্লুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগে আমাদের দেশে হাসপাতালগুলোতে ক্যানসারের এত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। এখন হরহামেশাই ক্যানসারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে। এখন এমআরআই, সিটিস্ক্যান ও রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই ক্যানসার নিরূপণ করতে পারি। যেটা ১০ বছর আগে মানুষ করতে পারতো না। তা ছাড়া এখন মানুষ অনেক সচেতন। একজন অশিক্ষিত মানুষ শরীরে কোনো অংশে চাকা অনুভব করলে নিজে নিজেই ডায়াগনসিস করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। এখন মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে শরীরের কোথাও একটি চাকা হলেই সেটা থেকে টিউমার বা ক্যানসার হতে পারে।
সার্ভিক্যাল ক্যানসারের আক্রান্ত হয়ে একসময় আমাদের দেশের নারীরা অনেক বেশি সাফার করতো। আমাদের সার্ভিকাল ক্যানসার প্রজেক্ট বা নারীদের জরায়ুমুখে ক্যানসার এবং ব্রেস্ট ক্যানসার অ্যাওয়ার্নেস প্রোগ্রাম রয়েছে। এই দুটি ক্যানসারের সচেতনতা বেড়ে যাওয়াতে এখন প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে ক্যানসার শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। লিভার ক্যানসারের ক্ষেত্রে আমরা হেপাটাইটিস বি ভাইরাসটি যদি প্রতিরোধ করতে পারি তাহলে লিভার সিরোসিসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ফাস্টফুড বা ভাজাপোড়া খাবার, ঝাল খাবার, গ্রিল চিকেন-বিফ, স্পাইসি চিকেন-বিফ এগুলো পরিহার করতে হবে। এসব খাবারের সঙ্গে আমাদের পায়খানার রাস্তায় ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভেজাল খাদ্যের জন্য শুধু মাত্র ক্যানসার নয় অন্যান্য অসুখের পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ক্যানসার থেকে সুরক্ষা পেতে আমাদের সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ করে আমরা যারা দায়িত্বশীল অবস্থানে আছি প্রত্যেককে সম্মিলিতভাবে সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্যানসারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশ্ব ক্যানসার দিবসে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কতগুলো বেসিক বিষয়ে আমরা বিভিন্ন র‌্যালি এবং সমাবেশের মাধ্যমে জনগণকে ক্যানসারের কুফল সম্পর্কে জানিয়ে থাকি। পান, সিগারেট, জরদা, সুপারি, গুল এসব তামাকজাত দ্রব্যের কারণে মুখের ক্যানসার থেকে শুরু করে স্টোমাক, খাদ্যনালী, পায়খানার রাস্তায় পুরো জায়গাতেই ক্যানসারের সৃষ্টি হয়ে থাকে।