Friday, March 4, 2011

প্লাস্টিকপণ্যের কাঁচামাল আমদানির শুল্ক হ্রাস

প্লাস্টিকপণ্যের মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান শুল্কহার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি প্লাস্টিকশিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত চলমান প্রাক-বাজেট আলোচনায় প্লাস্টিকদ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) নেতারা এসব দাবি জানান। এনবিআর চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দীন আহমেদ এতে সভাপতিত্ব করেন।
সভায় বক্তব্য দেন বিপিজিএমইএ সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, মহাসচিব রহমান নান্নু, সহসভাপতি শামীম আহমেদ, সাবেক সভাপতি এ এস এম কামাল উদ্দিন, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক উপদেষ্টা মনজুর আহমেদ প্রমুখ।
বিপিজিএমইএর পক্ষ থেকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমানে প্লাস্টিকশিল্পের মোল্ড ও যন্ত্রপাতি আমদানি পর্যায়ে তিন শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ রয়েছে। শুল্ক আরোপ করায় ভোক্তা পর্যায়ে প্লাস্টিকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই মোল্ড ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত।
বিপিজিএমইএর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, দেশে পেট্রো কেমিক্যালভিত্তিক কোনো শিল্পকারখানা নেই। তাই প্লাস্টিকশিল্পের সব মৌলিক কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এ জন্য বিদ্যমান ৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের দাবি জানানো হয়।
বিপিজিএমইএ সভাপতি শাহেদুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে জানান, রপ্তানির ক্ষেত্রে প্লাস্টিকপণ্যের জাহাজিকরণ খরচ অন্যান্য রপ্তানিপণ্যের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সম্ভাবনাময় প্লাস্টিকশিল্পের রপ্তানিকারকদের ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া উচিত। এ ছাড়া প্লাস্টিকশিল্পের জন্য বন্ড সুবিধা নবায়নের মেয়াদ এক বছরের পরিবর্তে দুই বছর নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
শামীম আহমেদ বলেন, দেশীয় প্লাস্টিকশিল্পকে রক্ষায় আমদানি করা প্লাস্টিকপণ্যের ওপর এন্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করা দরকার। বর্তমানে বেশির ভাগ আমদানি করা প্লাস্টিকপণ্যের ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ রয়েছে। তা বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করা উচিত। তিনি আরও জানান, এই শিল্পের উদ্যোক্তাদের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর কিংবা অগ্রিম বাণিজ্য কর—যেকোনো একটি বহাল রাখলে হয়রানি অনেক কমে যাবে।
এ ছাড়া বিদ্যমান উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে উৎসে ৩ শতাংশ হারে কর হিসাবে কেটে নেওয়ার বিধান বাতিলের সুপারিশ করেন এ এস এম কামাল উদ্দিন।
এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দীন আহমেদ তাঁর বক্তব্যে জানান, বর্তমান সরকার উৎপাদনমুখী শিল্পকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এ জন্য উৎপাদনকারীদেরই বেশি শুল্ক ও কর সুবিধা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে প্লাস্টিকশিল্প বিশেষ নজর পেতে পারে।

সপ্তাহের শেষ দিনে দুই স্টক এক্সচেঞ্জে মূল্যসূচক বেড়েছে

সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে আজ বৃহস্পতিবার দুই স্টক এক্সচেঞ্জে সাধারণ মূল্যসূচক বেশ কিছুটা বেড়েছে। তবে গতকালের চেয়ে লেনদেন কম হয়েছে। সারা দিনই উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের ওঠানামা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এবং মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন পৃথক বৈঠকের মাধ্যমে বাজারের জন্য ইতিবাচক বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। আজ লেনদেনের শুরুতেই এর প্রভাব পড়ে। ফলে চাঙাভাবের মধ্য দিয়ে আজ লেনদেন শুরু হয়। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়ায়, সূচক নেমে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত চাঙাভাবের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে।
বাজার-বিশ্লেষক ও চট্টগ্রামে আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, বাজারে এখনো আস্থার সংকট রয়েছে। গত কয়েক দিনের তুলনায় আজ বাজার অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ। মনে হচ্ছে, সরকারের গৃহীত কার্যক্রম কার্যকর হচ্ছে। তবে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সরকারের সাপোর্ট সার্ভিস জোরালো রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
চিটাগাং ক্যাপিটাল লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার পালিত বলেন, ‘সরকার আপত্কালীন যে তহবিল গঠনের কথা বলেছে, তা আরও বাড়ালে বাজার দাঁড়িয়ে যাবে বলে আশা করি। শেয়ার কেনার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা কার্যক্ষেত্রে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।’
ডিএসই সূত্রে জানা যায়, আজ লেনদেনের শুরুতে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ৫১ পয়েন্ট বেড়ে যায়। তবে ১৫ মিনিটের মাথায় ১০৯ পয়েন্ট সূচক কমে যায়। এরপর ১১টা ২০ মিনিটের পর থেকে সূচক আবার ঘুরে দাঁড়ায়। এরপর কয়েকবার ওঠানামার পর দিন শেষে সাধারণ সূচক ১৩৬.৩ পয়েন্ট বেড়ে পাঁচ হাজার ৪২৮.৪০ পয়েন্টে দাঁড়ায়। আজ মোট ২৫৩টি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ২০৫টির, কমেছে ৪৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। আজ ডিএসইতে ৫০৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা গতকালের চেয়ে ৮৮ কোটি টাকা কম। গতকাল স্টক এক্সচেঞ্জটিতে ৫৯১ কোটি টাকার লেনদেন হয়।
ডিএসইতে আজ লেনদেনে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বেক্সটেক্স, পিএলএফএসএল, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, ম্যাকসন স্পিনিং, সাউথইস্ট ব্যাংক ও গ্রামীণফোন।
অপরদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক আজ ৩৬৮ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৩২৪ দশমিক ৩৫ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এ সময়ে লেনদেন হওয়া ১৭৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ১৩৪টির, কমেছে ৪২টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে আজ মোট ৭৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

শেয়ারবাজার কারসাজির তদন্ত ও বিচার by ফারুক মঈনউদ্দীন

শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের বহু তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ, সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের নানামুখী মন্তব্য, বাজার নিয়ন্ত্রকদের দোদুল্যমান ভুল-শুদ্ধ বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত—সবকিছুকে নাকচ করে দিয়ে শেয়ারবাজারের যে অধোযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই পতন এখন পর্যন্ত রোধ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সদ্য গৃহীত কিছু সিদ্ধান্তকে বাতিল করে আগের নিয়ম পুনর্বহাল করেও বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা যায়নি। পুরোনো নিয়ম পুনর্বহাল, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া নানা ধরনের প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও যখন পতনশীল গতিকে থামানো যায়নি, তখন সংগতভাবেই ধারণা করা যায় যে বাজারে মারাত্মক অনিয়ম কিছু একটা হয়েছিল এবং সেটা হচ্ছে কোনো বিশেষ মহলের কারসাজি। এই কারসাজির বিষয়ে তদন্ত করার জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার প্রধান সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে স্বীকার করলেন যে বাজার কারসাজির হোতাদের অনেককে চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ আছে। কারণ নৈতিকতা ভঙ্গের জন্য দোষারোপ করা যায়, কিন্তু শাস্তি দেওয়া যায় না। যেমন—এসইসির প্রধানের চাকরির মেয়াদ শেষ হলে তিনি যদি কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মার্চেন্ট ব্যাংকিং ইউনিটের প্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত হন, সেটা অনৈতিক হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থার বিধান নেই।
পাঠকের মতে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত শেয়ারবাজার কারসাজি নিয়ে যাবতীয় প্রতিবেদন বা নিবন্ধ যেন আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের চাক্ষুষ প্রমাণসাপেক্ষ বিচারের মতো। ধর্ষক কে জানা গেলেও প্রমাণের অভাবে যেমন তার শাস্তি হয় না, তেমনি শেয়ারবাজারের কারসাজি কারা করেছে, সেটা জানা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না প্রধানত দুটি কারণে—প্রচলিত আইনের অপ্রতুলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব। তদন্ত কমিটির প্রধানের বক্তব্যের পেছনে এই দুটি কারণই প্রচ্ছন্ন। অভিযোগকারী পাঠকের বক্তব্য মেনে নিয়েও বলতে হয়, শেয়ারবাজার কারসাজির মতো ধর্ষণের ঘটনাও দেশে দেশে যুগে যুগে ঘটে আসছে, কিছু মানুষের এই সহজাত দুষ্কর্ম আইন দিয়ে বন্ধ করা যায়নি, অতএব তার চেয়ে ধর্ষণের শিকার যাতে হতে না হয়, তার জন্য পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়াই শ্রেয়তর।
বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির প্রসঙ্গে আঠারো শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে শেয়ারবাজারে বুদ্বুদ সৃষ্টি এবং বিস্ফোরণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিচার ও শাস্তির ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। ইতিহাসে এটি দক্ষিণ সাগর বুদ্বুদ (সাউথ সি বাবল) নামে পরিচিত। সে সময় ইংল্যান্ডের বিপুল সরকারি দেনার ভার লাঘব করার উদ্দেশ্যে ১৭১১ সালে সরকারিভাবে সাউথ সি কোম্পানি গঠন করা হয়। সে কারণে এই কোম্পানিকে দেওয়া হয় দক্ষিণ আমেরিকার স্পেনীয় উপনিবেশের সঙ্গে দাসব্যবসা, সোনা-রুপা এবং অন্য সব পণ্যের একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ। এই অনুকূল সুযোগের বিনিময়ে সরকারের প্রায় এক কোটি পাউন্ডের মতো দেনা শোধ করার জন্য কোম্পানির নতুন শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে বার্ষিক ৬ শতাংশ সুদের বিনিময়ে সরকারে এক কোটি পাউন্ডের দেনাকে শেয়ারে রূপান্তর করতে কোম্পানির কোনো বাধা থাকে না। তবে বাড়তি এই সুদের খরচ মেটানোর জন্য সরকারকে মদ, তামাক, রেশমসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর করারোপ করতে হয়।
লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে সোনা-রুপার খনির অনিঃশেষ মজুদের সম্পর্কে বহু জনশ্রুতি থাকায় কোম্পানিটি গঠিত হওয়ার পর থেকেই মানুষের মনে প্রবল আশা-আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়। তার ওপর কোম্পানির ইনসাইডাররা রটায় যে সেসব দেশকে শেয়ার দিলে তাদের একাধিক বন্দরে কোম্পানির প্রবেশাধিকার থাকবে, সেসব দেশে রপ্তানি করলে বিনিময়ে পাওয়া যাবে বিপুল পরিমাণ সোনা আর রুপা। এসব কারণে কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে। অথচ দক্ষিণ সাগরে কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা পরিচালনা করলেও তাদের সাফল্য ছিল সীমিত।
রাজা প্রথম জর্জ কোম্পানির গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বেড়ে যায়। এ সময় কোম্পানির মূলধন আরও ২০ লাখ পাউন্ড বাড়িয়ে এক কোটি ২০ লাখ পাউন্ডে উন্নীত করে সেখান থেকে বার্ষিক ৫ শতাংশ সুদে সরকারকে ২০ লাখ পাউন্ড ধার দেওয়ার জন্য পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস হয়। ১৭২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন পার্লামেন্টে কোম্পানির মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তখন এটির শেয়ারের দাম ছিল ১২০ পাউন্ড, বিতর্ক চলার সময় ৪০০ পাউন্ড, আর প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর দাম উঠে যায় ৫৫০ পাউন্ডে। সরকারি ঋণ অধিগ্রহণ করে তার পরিবর্তে বাজারে শেয়ার বিক্রি করার যে প্রস্তাব ছিল, সেখানে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও দরপত্র দিয়েছিল, কিন্তু সাউথ সি কোম্পানির প্রতি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ আশীর্বাদ থাকায় এই কোম্পানিই দায়িত্বটা লাভ করে। তবে এই প্রস্তাব লর্ডস ও কমন্স সভার বিতর্কের সময় প্রস্তাবটির বিরুদ্ধাচরণ করে একমাত্র সদস্য রবার্ট ওয়ালপোল সাবধান করে দিয়েছিলেন যে কোম্পানিটির যাবতীয় কার্যকলাপ অনৈতিক এবং এতে করে দেশের শিল্প-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর কোম্পানি ব্যর্থ হলে পুরো দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে। এতৎসত্ত্বেও গুজব রটিয়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম আরও বাড়ানোর প্রয়াস অব্যাহত থাকে। তার ওপর সোর্ড ব্লেড ব্যাংক সাউথ সি কোম্পানির শেয়ার কেনার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে উন্মত্ততা আরও চরমে ওঠে।
কোম্পানি মাত্র ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইস্যু যখন বাজারে আসে, তখন দাম উঠে গেছে এক হাজার পাউন্ডে। সেই উন্মত্ত সময়ে রাজা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ সবাই শেয়ার কিনতে থাকেন। সাধারণ মানুষ এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজনও সোনাদানা গচ্ছিত রেখে শেয়ার কেনার জন্য ছুটতে থাকলে শহরের ট্রাফিক-ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কোম্পানির চতুর্থ ইস্যু বাজারে ছাড়া হয় এক হাজার ১০০ শতাংশ বেশি দামে।
শেষ পর্যন্ত ১৭২০ সালের সেপ্টেম্বরে এই বুদ্বুদ বিস্ফোরিত হয়। দুই হাজার পাউন্ডের শেয়ারের দাম নেমে আসে ১৫০ পাউন্ডে, এবং ডিসেম্বরে ১২৪ পাউন্ডে। অগণিত বিনিয়োগকারীর অর্থনাশের ফলে বিপর্যস্ত হয় তাঁদের জীবন, এমনকি বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনও ২০ হাজার পাউন্ড হারিয়েছিলেন।
ইংল্যান্ডের আর্থিক ইতিহাসের বৃহত্তম এই বিপর্যয়ের বিষয়ে তদন্ত করতে যে কমিটি গঠিত হয়, তার প্রতিবেদনে দেখা যায় কোম্পানির খাতাপত্রে প্রচুর ভুয়া এন্ট্রি, টাকার অঙ্ক লেখা থাকলেও শেয়ারহোল্ডারের নাম ফাঁকা, হিসাবের খাতায় কাটাকুটি, পৃষ্ঠা ছেঁড়া, বহু গুরুত্বপূর্ণ দলিল গায়েব, ইস্যু করা হয়েছে অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি শেয়ার, কিন্তু তার বিপরীতে কোনো দাম আদায় করা হয়নি। অবৈধভাবে ইস্যু করা কোম্পানির বহু শেয়ার দেওয়া হয়েছে আইনসভার সদস্যদের উৎকোচ হিসেবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সূত্র ধরে কোম্পানির পরিচালকদের সংসদে তলব করে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের লাভের টাকা বাজেয়াপ্ত করে আদায় করা হয় সর্বমোট ২০ লাখ পাউন্ড। তবে সামান্য কিছু টাকা রেখে দিতে দেওয়া হয়েছিল, যাতে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারেন তাঁরা। এই ছেড়ে দেওয়া অর্থের পরিমাণ অপরাধের গুরুত্বভেদে ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত। পরিচালকদের মধ্যে যাঁরা আইনসভার সদস্য কিংবা অন্য উচ্চপদে ছিলেন, তাঁদের বরখাস্ত করে কাউকে কাউকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়।
ইংল্যান্ডের পুঁজিবাজারের এই সাড়া জাগানো ঘটনাটি হয়তো আমাদের বর্তমান বাজার বিপর্যয়ের সঙ্গে হুবহু তুলনীয় নয়, তবে কৃত্রিম বুদ্বুদ সৃষ্টির অপতৎপরতা এবং তার সঙ্গে ব্যক্তিগত মুনাফা আদায়ের প্রয়াস অভিন্ন। এ ঘটনার তদন্ত এবং বিচার যে নির্মোহভাবে করা হয়েছিল, আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেটি হয়তো দুরাশা। তদন্ত কমিটির প্রধানের কিছু বক্তব্য এই আশঙ্কাকে দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করে। কমিটির তদন্ত কার্যক্রম আদৌ সফল হবে কি না, সেটা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কারসাজির ওপর তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলেও তার কোনো চূড়ান্ত ফয়সালা হয়নি আজ পর্যন্ত। এবারের তদন্তের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার সম্ভাবনার বিষয়েই সন্দেহ প্রকাশ করছে তদন্ত কমিটি নিজেই।
অতএব তদন্ত প্রতিবেদন, বাজার কারসাজির হোতা, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কারসাজির বিচার ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী হওয়ার খুব বেশি একটা সুযোগ নেই, বিশেষ করে মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির বিরুদ্ধেই যেখানে অভিযোগের গুঞ্জন রয়েছে। তদন্ত কমিটিও প্রকারান্তরে সুকৌশলে এসইসির অসহযোগিতার কথা বলেছে। তবে তদন্ত কমিটির প্রধান একটা কথা বলেছেন যে কারসাজির হোতাদের বিচারের আওতায় আনা না গেলেও তাদের মুখোশ উন্মোচন করা যাবে, যাতে তারা সামাজিকভাবে হেয় হয়। সাউথ সি বুদ্বুদ বিস্ফোরণের পর সেই কোম্পানির পরিচালকেরাও পথে বের হলেই গণধিক্কারের সম্মুখীন হতেন, তবে তাঁরা আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে শাস্তিও পেয়েছিলেন।
বাজার কারসাজির হোতাদের শাস্তির সম্ভাবনা যেহেতু সুদূরপরাহত, সে রকম আইনি বিধানও যেহেতু নেই, দুর্বৃত্তপরায়ণ একটা শ্রেণী সুযোগ পেলে কারসাজির মাধ্যমে মাঝেমধ্যেই সরল ও অনভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের পকেট কেটে নিজের ভাগ্য গড়বে—সে কারণেই সাধারণ মানুষকেই পূর্বসতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যেভাবে ধর্ষণের শিকার হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকেন নারীরা। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের পরিহার করতে হবে দ্রুততম সময়ে সম্পদশালী হওয়ার লোভ, কারণ এটিকেই কাজে লাগায় কারসাজির কুশীলবেরা। সেই সঙ্গে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ভাবতে হবে, একের পর এক কারসাজি করে প্রভাবশালীরা পার পেয়ে গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনষ্ট হওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাজার তথা শিল্পায়নের জন্য মূলধন গঠন-প্রক্রিয়া। প্রকৃতপক্ষে বাজারের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, পক্ষান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিধিবদ্ধতা মেনে চলতে হয়, এবং তাদের রয়েছে আইনকানুনের সীমাবদ্ধতা। সুতরাং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করতে এবং টিকিয়ে রাখতে হলে সব ধরনের কারসাজি ও অনৈতিক কার্যকলাপ রোধে কার্যকর আইনি বিধান রাখতে হবে, যাতে কেউ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনভিজ্ঞতার সুযোগে আখের গুছিয়ে সরে পড়তে না পারে। সরকার যদি ‘অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী’ না হয়ে কারসাজির হোতাদের আইনের আওতায় আনতে পারে, সেটা হবে সরকার ও দেশের জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ, আমাদের দেশে আইনের প্রয়োগ সব সময় সবলের পক্ষেই থাকে—এই দুর্নাম আমরা ঘোচাতে পারব, সরকারের হবে রাজনৈতিক অর্জন এবং বাজারে ফিরে আসবে গতি ও আস্থা।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com

ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীতে ছাঁটাই হচ্ছে ১১ হাজার সেনা

যুক্তরাজ্যে সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ১১ হাজার সেনা ছাঁটাই করা হবে। দেশের রেকর্ড পরিমাণ বাজেট ঘাটতি হ্রাসে সহায়তার জন্য প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত অক্টোবরে দেশের ব্যয় পর্যালোচনা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন বিভিন্ন খাতে ব্যয় হ্রাসের যে আভাস দেন, প্রতিরক্ষা খাতে পদ কমানোর সিদ্ধান্তে এর প্রতিফলন ঘটেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মীসংখ্যা কমিয়ে ১৭ হাজারে নিয়ে আসা হবে।
এক বিবৃতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিয়াম ফক্স বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে সবার জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকবে। তাদের এ কাজের জন্য ভাতার ব্যবস্থা থাকবে। লোকবলের ঘাটতি আমরা স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাব।’
এই সেনা ছাঁটাই আফগান রণাঙ্গনে যুক্তরাজ্যকে বেকায়দায় ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় সাড়ে নয় হাজার ব্রিটিশ সেনা রয়েছে। আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের পরই রয়েছে যুক্তরাজ্য।
টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সেনা কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে সেপ্টেম্বরে। মন্ত্রীরা আফগানিস্তানে কর্মরত সেনাদের ওই কাটছাঁট প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার বিষয়টি সশস্ত্র বাহিনীকে জানিয়েছেন। পদস্থ সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রিচার্ড নাগি বলেন, ‘বার্তাটি আফগান রণাঙ্গনে অবস্থানরত সেনা অধিনায়কদের জানিয়ে দেওয়া হবে।

সৌদি আরবে চিকিৎসা নিচ্ছেন ক্যানসারে আক্রান্ত মোবারক

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক সৌদি আরবে আছেন। সেখানে তিনি ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। গতকাল বুধবার মিসরের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দৈনিক আল আকবর-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোবারক মলাশয় ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত। সৌদি আরবের টাবুক শহরের একটি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন। পাঁচ দিন ধরে তাঁকে কেমোথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক দিন পরই মোবারক টাবুক শহরে চলে যান। তাঁর স্ত্রী সুজান, দুই ছেলে আলা মোবারক ও গামাল মোবারকও টাবুক শহরে অবস্থান করছেন।
তবে সরকারি কোনো দপ্তর থেকে মোবারকের সৌদি আরবে অবস্থান করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। কয়েক দিন ধরেই গুজব চলছে, মোবারক তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ মিসর ছেড়েছেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা গণবিক্ষোভের মুখে গত ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন মোবারক। বলা হচ্ছিল, পদত্যাগের পর তিনি দেশটির অবকাশযাপনকেন্দ্র শারম আল শেখে অবস্থান নেন। ১৯৮১ সালে মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত খুন হলে ক্ষমতায় আসেন মোবারক। এর পর থেকে তিনি দেশটি শাসন করছিলেন।

ইরানে মৌসাভি ও কারৌবির মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ

ইরানের বিরোধীদলীয় নেতা মির হুসেইন মৌসাভি ও মেহেদি কারৌবির মুক্তির দাবিতে রাজধানী তেহরানে গতকাল বুধবার বিক্ষোভ হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এদিকে তেহরানের একজন আইনজীবী ওই দুই নেতার গ্রেপ্তার হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
ইরানের বিরোধীদলীয় একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তেহরানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক লোকদের সংঘর্ষ হয়েছে। বিরোধীদলীয় অপর একটি ওয়েবসাইট জানায়, বিরোধীদলীয় সমর্থকদের সমাবেশ প্রতিহত করার জন্য তেহরানের সড়কে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে তেহরানের আইনজীবী আব্বাস জাফারি বলেন, মৌসাভি ও কারৌবি তাঁদের স্ত্রীসহ নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারের খবর ডাহা মিথ্যা।
গত সোমবার বিরোধীদলীয় ওয়েবসাইটে সর্বপ্রথম প্রকাশ করা হয়, মৌসাভি ও কারৌবিকে তাঁদের স্ত্রীসহ আটক করার পর তেহরানের একটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। গত মাসের শুরুর দিকে তেহরানের সড়কে বিক্ষোভ করার অভিযোগে এই দুই নেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে গৃহবন্দী করা হয়।

ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য দেওয়া যাবে না

নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যে বলবৎ হয়ে গেছে আচরণবিধি। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো রকম ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য দিতে পারবে না। সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য দেওয়া চলবে না। শুধু তা-ই নয়, প্রতিটি ভাষণ ভিডিও করে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠাতে হবে কমিশনে।
কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, সরকারি ভবনের দেয়ালে নির্বাচন নিয়ে কিছু লেখা চলবে না। অন্য কোনো ভবনের দেয়ালে লিখতে হলে ওই ভবনের মালিকের লিখিত অনুমতি নিতে হবে। এ ছাড়া লাইটপোস্ট, সরকারি জমি, বিদ্যুতের খুঁটি, কোনো কাটআউট, ব্যানার, হোর্ডিং লাগাতে পারবে না রাজনৈতিক দলগুলো।
মনোনয়নে তদবির গ্রাহ্য নয়
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই মঙ্গলবার রাতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, মানুষের জন্য যাঁরা কাজ করবেন তাঁদেরই এবার মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে দলের প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে। প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কোনো তদবির গ্রাহ্য হবে না।
জিতলে মুখ্যমন্ত্রী হবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মমতা বলেন, ‘মানুষ যেভাবে চায় সেভাবেই কাজ করব।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বামফ্রন্টের আর সুযোগ আসবে না সরকার গড়ার। সিপিএম চলে যাবে এ রাজ্য থেকে। প্রতিষ্ঠিত হবে গণতন্ত্র।

জুলাইয়ে দ. কোরিয়ায় পৌঁছাবে বোয়িংয়ের গোয়েন্দা বিমান

দক্ষিণ কোরিয়া শত্রুপক্ষের ওপর আগাম নজরদারি পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে গোয়েন্দা বিমান পাবে। গতকাল বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জানান, আগামী জুলাইয়ে এসব বিমান সরবরাহ করা হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, গোয়েন্দা নজরদারি চালানোর উপযোগী করে তৈরি করা বোয়িং ৭৩৭ এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমানের প্রথমটি জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিমানবাহিনীকে সরবরাহ করা হবে। তিনি জানান, এর মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিমানটি ওড়ানো হয়েছে। এখন এটির উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। আরও দুটি বিমান ২০১২ সালের শেষ নাগাদ সরবরাহ করা হবে। ২০০৬ সালে সম্পাদিত ১৬০ কোটি ডলারের একটি চুক্তির অধীনে বোয়িং এসব বিমান সরবরাহ করবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সেনা কর্মকর্তারা জানান, এসব বিমান উত্তর কোরিয়ার ওপর দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা নজরদারির ক্ষমতা বাড়াবে।

আইভরি কোস্টে নয়টি পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ

আইভরি কোস্টে প্রেসিডেন্ট লরা বাগবোর অনুগত সমর্থকদের হয়রানির প্রতিবাদে সে দেশের নয়টি পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে মালিক কর্তৃপক্ষ। মালিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ওই পত্রিকাগুলোর সাংবাদিকেরা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে নানা হুমকি-ধমকির শিকার হচ্ছেন। তাঁরা মৃত্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ওই পত্রিকাগুলো দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিজয়ী আলাসেন ওয়াতারাকে সমর্থন দিয়ে আসছে। গত ২৮ নভেম্বরে আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ওয়াতারার কার্যালয়ে ওই পত্রিকাগুলোর মালিক কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্র জানান, পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত পত্রিকাগুলোর প্রকাশনা বন্ধ থাকবে। এ সময় দেশটিতে সাংবাদিকদের জীবন ক্রমেই ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা-বিষয়ক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) জানায়, আইভরি কোস্টে প্রতিদিন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।
এর আগে আইভরি কোস্টে জাতিসংঘের তদন্ত কর্মকর্তাদের ওপর বাগবোর অনুগত বাহিনী গুলি চালায়। দেশটির অস্ত্র আমদানির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য ওই কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠানো হয়। এ ঘটনার পর থেকে আবিদজানে বাগবো ও ওয়াতারার সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
আবিদজানের উত্তরাঞ্চলীয় আবোবোয় ওয়াতারার সমর্থকদের লড়াই চলছেই। ফলে শত শত মানুষ ওই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আইভরি কোস্টে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি এনডোল্যাম্ব এনগোকোয়ে এক বিবৃতিতে জানান, আবোবোয় জনসংখ্যা আক্ষরিক অর্থেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে।
আইভরি কোস্টের দক্ষিণাঞ্চলীয় কোমাসির শহরে গত সোমবার রাতে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পরদিন সকালে বাগবোর অনুগত লোকেরা হাতে অস্ত্র নিয়ে সড়কে চলাচলকারী যানগুলোতে তল্লাশি চালিয়েছে।
চিকিৎসাবিষয়ক সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় উদ্বাস্তু হওয়া লোকজন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাদের মধ্যে সংক্রামক রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে এ বছরের শুরুর দিকে আবোবোয় কলেরা ছড়িয়ে পড়ে।

‘হাসিখুশি ভরা জীবন আনে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু’

হাসিখুশি থাকুন, পাবেন দীর্ঘ পরমায়ু’—যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক এমনটাই বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, যাঁরা সবসময় আনন্দে থাকেন এবং জীবন সম্পর্কে যাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক, তাঁরা গোমড়ামুখোদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন। নৈরাশ্যবাদীদের তুলনায় তাঁদের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী অ্যাপ্লাইড সাইকোলজি: হেলথ অ্যান্ড ওয়েল-বিইং এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু লাভের সঙ্গে প্রফুল্ল মন-মানসিকতার যোগসূত্র পর্যালোচনা করে ইতিপূর্বে আলাদাভাবে ১৬০টি গবেষণা চালানো হয়। ওই সব গবেষণার প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে গবেষকেরা একটি পুনর্নিরীক্ষণপত্র তৈরি করেন।
গবেষণা দলের প্রধান ও ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস অ্যাডওয়ার্ড ডিয়েনার বলেন, ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্তের অভাবনীয় মিল দেখে তিনি যারপরনাই অবাক হয়েছেন। তিনি বলেন, দু-একটি ছাড়া বেশির ভাগ গবেষণার ফলাফলই বলে দেয়, আনন্দপূর্ণ জীবনযাপনের সঙ্গে দীর্ঘায়ু লাভ ও সুস্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ রোচ

উচ্চতা ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে অন্য অনেকের তুলনায় কেমার রোচ ‘খাটোই’। হালকা-পাতলাও। কিন্তু এই শরীর নিয়েও ১৫০ কিলোমিটার বেগে বল করেন বারবাডোজের ২২ বছরের তরুণ পেসার। কীভাবে সম্ভব?
‘ভালো প্রশ্ন। সম্ভবত এই প্রতিভা ঈশ্বর প্রদত্ত। এ জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি কঠিন পরিশ্রম করব এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে খেলে যেতে চাই’—কাল মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনুশীলনের ফাঁকে বলেছেন কেমার রোচ।
কেমার রোচ নামটা এখন মুখে মুখে। হল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ ৬ উইকেট নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেসার সাড়া ফেলেছেন চলতি বিশ্বকাপে। আগামীকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশ ম্যাচেও তাঁর ওপর থাকবে অনেকটা আলো।
সেই আলোয় নিজেকে কতটা আলোকিত করতে পারবেন, মাঠেই দেখা যাবে। তবে হ্যাটট্রিকের পর বাংলাদেশকে পরোক্ষে হুমকিই দিয়েছিলেন, ‘এই জয়ের পর আমরা দারুণ আত্মবিশ্বাসী। বাংলাদেশের বিপক্ষে আমরা জিততে চাই। জানি, বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। তবে আমরা ওদের চেয়ে ভালো দল।’ সেই রোচ ঢাকায় এসে বলছেন, ‘আমরা যে ফর্ম নিয়ে এখানে এসেছি তাতে আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী। বাংলাদেশ ম্যাচটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। এবং এই ম্যাচে আমরা আমাদের সেরাটাই দিতে চাই।’
বাংলাদেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের কন্ডিশনে খেলা কতটা চ্যালেঞ্জ? রোচ কিন্তু চ্যালেঞ্জ মানছে না, ‘যেখানেই আমরা খেলি না কেন, সেটা চ্যালেঞ্জ নয়। সবাই সেরাটা দিয়ে শুক্রবারের ম্যাচে জেতার চেষ্টা করবে।’
ডোয়াইন ব্রাভোর দল থেকে ছিটকে যাওয়ার প্রসঙ্গও এল। আত্মবিশ্বাসী রোচ এ নিয়ে চিন্তিত নন, ‘কয়েকজন খেলোয়াড়কে তো আমরা অবশ্যই মিস করছি। তবে আমরা আবার আমাদের পুরো শক্তিতে ফিরে এসেছি।’ র্যাঙ্কিংয়ে এখন বাংলাদেশের এক ধাপ পেছনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এটাও গুরুত্ব পাচ্ছে না রোচের কাছে, ‘কে সামনে, কে পেছনে এটা নিয়ে আমরা মোটেও উদ্বিগ্ন নই। ক্রিকেটে নিজেদের দিনে যে কেউ যে কাউকে হারাতে পারে।’
২০০৯ সালে নিজেদের মাঠে বাংলাদেশের কাছে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে হারের বদলা হিসেবে বিশ্বকাপের ম্যাচটাকে দেখছেন না রোচ, ‘আমি মনে করি না এটা প্রতিশোধ নেওয়ার ম্যাচ। আমরা মাঠে নামব এবং জিততে চাইব।’
ঢাকায় আগে খেলেননি বলে এখানকার উইকেট সম্পর্কে ধারণা নেই। এ নিয়ে তাই কিছু বললেনও না, ‘পিচ নিয়ে কিছু বলতে পারব না। সবারই ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব আছে এবং সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করতে পারলে আমরা ধারণা সব ঠিকঠাভাবেই এগোবে। বাংলাদেশ দলকে আমরা দেখেছি এবং গোটা দলের জন্যই পরিকল্পনা করেছি।’ বাংলাদেশের উইকেট পেসারদের জন্য নয় বলে যে ধারণাটা ছড়িয়ে পড়েছে, রোচ উড়িয়ে দিলেন সেটাও, ‘একজন ফাস্ট বোলার সবখানেই দ্রুতগতিতে বল করতে পারে। গতি নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। আমি এখানে এসেছি ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে উইকেট নিতে, ইতিহাস গড়তে।’
বাংলাদেশ নিশ্চয়ই সুযোগটা দিতে চাইবে না হঠাৎ নায়ক হয়ে ওঠা কেমার রোচকে!

চ্যালেঞ্জটা নিচ্ছেন রাজ্জাক

আবদুর রাজ্জাক যেন গোটা স্পিনার সমাজের প্রতিনিধি! ওয়ানডে ক্রিকেটটা যখন দিনে দিনে অনেক বেশি ব্যাটসম্যানের খেলা হয়ে যাচ্ছে, তখন উল্টোস্রোতে বুক চিতিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞ এই বাঁহাতি স্পিনার।
‘রান চাই’ স্লোগান ক্রিকেটে যতই তীব্র হয়ে উঠুক, রাজ্জাক দমছেন না। উইলোবাজদের কাছে আত্মসমর্পণও নয়। তাঁর বাঁহাত, তাঁর ভরাট কণ্ঠ বরং চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে ব্যাটসম্যানদের পক্ষ নেওয়া আধুনিক ওয়ানডেকে, ‘আমি মনে করি এটা ভালো একটা চ্যালেঞ্জ এবং এটা আমি নিচ্ছি। কন্ডিশন প্রতিকূলে থাকার পরও ভালো করতে পারলে, উইকেট পেলে সেটার আনন্দ অন্য রকম।’
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে সেই আনন্দের সন্ধানেই ছিলেন বাংলাদেশের স্পিনাররা। তবে তাঁদের আশার আলো দেখাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের উইকেট। অনুশীলনের ফাঁকে রাজ্জাক নিজেও কাল বলে গেলেন, ‘আগের দুই ম্যাচে স্পিনাররা ভালো টার্ন পায়নি। আশা করি পরের ম্যাচে পাব। উইকেট দেখে মনে হচ্ছে টার্ন একটু বেশি হতে পারে। আগের দুই ম্যাচের তুলনায় অন্তত ভালো হবে।’
উপমহাদেশের বিশ্বকাপ হওয়ার কথা স্পিনারদের বিশ্বকাপ। অথচ এখন পর্যন্ত বোলিং প্রান্তে আলোর মশালটা পেসারদের হাতেই। কেমার রোচ আর লাসিথ মালিঙ্গা হ্যাটট্রিক করলেন, গত ম্যাচে আগুন ঝরিয়েছেন বাংলাদেশের শফিউল ইসলাম। পরিস্থিতি বুঝে রাজ্জাকও মানছেন, ‘প্রথমে আমিও ভেবেছিলাম স্পিনারদের উইকেট হবে। কিন্তু উইকেট খুব স্পোর্টিং। এই উইকেটে শুধু স্পিনের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না।’
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ সেটারই প্রমাণ। ভারতের কাছে হারার পর ওই ম্যাচে আইরিশদের হারিয়ে বিশ্বকাপে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ। কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে আরও অন্তত দুটি ম্যাচ জিততে হবে। তবে ইংল্যান্ড, হল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, বাংলাদেশ দলের চিন্তাজুড়ে এখন শুধুই ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ‘বিশ্বকাপে সব ম্যাচই বড় ম্যাচ। আমরা তাই ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে চাই। এখন যেমন আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ নিয়েই ভাবছি। ইংল্যান্ড, হল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে কী হবে, সেসব নিয়ে আপাতত ভাবছি না।’
গত ম্যাচের পর কালকের আগ পর্যন্ত অনুশীলনের চেয়ে ছুটিই বেশি কাটানো বাংলাদেশ দলের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের আগে বেশ চনমনে ভাব। রাজ্জাক এর মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন আত্মবিশ্বাস। ক্যারিবীয় পেসার কেমার রোচ ঢাকায় আসার আগে বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের তুলনায় তারা কিছুই না। বাংলাদেশে বাংলাদেশকে হারাতেই আসছেন তাঁরা। রোচের কথার জবাবে বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনার পাল্টা আক্রমণে না গিয়ে শুধু আত্মবিশ্বাসের কথাই বললেন, ‘আমি তাঁদের মতো সে রকম কিছু বলতে চাই না। তবে আমরা খুব আত্মবিশ্বাসী। দল এখন খুব ভালো অবস্থায় আছে।’
এই ভালোটা ধরে রাখার দায়িত্ব কালকের ম্যাচে অনেকটাই থাকবে স্পিনারদের হাতে। রাজ্জাকের স্পিনিং উইকেট পাওয়ার আশাটা পূরণ হলে ভালো, না হলেও খুঁজে বের করতে হবে বিকল্প পথ। সেই পথটা কী, রাজ্জাক সেটা আগে বলেছেন, বলেছেন কালও, ‘বোলিংয়ে আমাদের পরিকল্পনা আগের মতোই। লাইন-লেন্থ ঠিক রাখতে হবে, গতিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে।’
ব্যাটিংয়ে ভালো একটা স্কোর দাঁড় করানোর ব্যাপারও আছে। যদিও বিশ্বকাপের আগ থেকে এখন পর্যন্ত পাওয়ার প্লের ব্যাটিংটা সমস্যাই হয়ে আছে বাংলাদেশের জন্য। রাজ্জাক অবশ্য যুক্তি দেখালেন, ‘বিশ্বকাপে উপমহাদেশে কোনো দলই ভালোভাবে পাওয়ার প্লে কাজে লাগাতে পারছে না। প্রথম ম্যাচে শুধু ভারত একটু ভালো খেলেছে। হতে পারে এটা উইকেটের কারণে। পাওয়ার প্লেতে আমাদের পরিকল্পনা হলো, যত বেশি সম্ভব রান করতে হবে, কিন্তু উইকেট হারানো যাবে না।’

সত্যিই ঘুরিয়ে দিলেন কেভিন

দে ঘুরিয়ে’ বিশ্বকাপের থিম সংটা মনে হয় ভালো করেই আত্মস্থ করেছিলেন কেভিন ও’ব্রায়েন। বিশ্বকাপ নাটকের ‘ইংলিশ-আইরিশ লড়াই’ পর্বে সেটার অনুবাদও করলেন সার্থকভাবে। যেন ‘দে ঘুরিয়ে’ গাইতে গাইতে ব্যাট হাতে নামলেন, আর ঘুরিয়ে দিলেন সবকিছু। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনন্য এক সেঞ্চুরি করে ও’ব্রায়েন ভাইদের ছোট জন ঘুরিয়ে দিলেন ম্যাচ। ঘুরিয়ে দিলেন ইংলিশদের মাথা!
৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩২৭—প্রথমে ব্যাট করে রানের পাহাড় গড়েছিল ইংল্যান্ড। এই পাহাড় ডিঙাতে নেমে ১১১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল আয়ারল্যান্ড। কেভিনের জন্য ঘুরিয়ে দেওয়ার মঞ্চ তখন প্রস্তুত। মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন আইরিশ অলরাউন্ডার, করলেন বিশ্বকাপের দ্রুততম সেঞ্চুরি (৫০ বলে), অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দিলেন দলকে, কেড়ে নিলেন পাদপ্রদীপের আলো।
ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসও বলেছেন, ম্যাচ ঘুরে যাওয়ার কথা, ‘ভেবেছিলাম ব্যাটিংয়ে আমরা যা করেছি, সেটাই যথেষ্ট। এর পর আয়ারল্যান্ডের ৫ উইকেট ফেলে দিয়েছি। সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু এটা আমাদের হিসাবেই ছিল না কেভিন এ রকম একটা ইনিংস খেলবে। নিষ্ঠুর একটা ইনিংসই খেলেছে সে।’
কেভিন যে এ রকম কিছু করতে পারেন, সেটা বিশ্বকাপের আগেই বলে রেখেছিলেন আয়ারল্যান্ডের সাবেক অলরাউন্ডার অ্যান্ড্রু ম্যাকগ্লাসান। আয়ারল্যান্ডের বিশ্বকাপ দল বিশ্লেষণ করেছিলেন তিনি। কেভিন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ব্যাট হাতে চাপের মধ্যে ও কতটা স্থির থাকতে পারে, এর প্রমাণ ২০০৭ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে দিয়েছে। ও আবার ব্যাট হাতে ধ্বংসযজ্ঞও চালাতে পারে।’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরশু দুটির সন্নিবেশই দেখা গেছে কেভিনের ব্যাটে।
ইংলিশ বোলারদের রীতিমতো শাসন করেছে তাঁর ব্যাট। জেমস অ্যান্ডারসন, গ্রায়েম সোয়ান, টিম ব্রেসনান—কেউ পাত্তা পাননি কেভিনের কাছে। ৫০ বলে করা সেঞ্চুরিটা থেমেছে ১১৩ রানে। ইংল্যান্ডের কোনো বোলার তাঁকে আউট করতে পারেনি। ঝুঁকিপূর্ণ ডাবল নিতে গিয়ে হয়ে গেছেন রানআউট। এর আগে ৬৩ বলে ১১৩ রানের ইনিংসটি সাজিয়ে গেছেন ১৩টি চার ও ৬টি ছক্কায়। স্ট্রাইক রেট ১৭৯.৩৬।
ওয়ানডে সেঞ্চুরি এর আগেও করেছেন। ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ রান ১৪২। ম্যাচ জেতানো ইনিংসও আছে বেশ কয়েকটি। তবে পরশুর ইনিংসটি তুলনাহীনই বলতে হবে। বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেকে মেলে ধরতে পারার ব্যাপারই যে আলাদা। ‘এটাই মনে হয় আমার সেরা ইনিংস’—কেভিন নিজেই এই ইনিংসটাকে দিয়ে দিয়েছেন সেরার মর্যাদা। সেরা ইনিংস তো এটাকে বলবেনই। ‘চিরশত্রু’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরি। তাও আবার বিশ্বকাপে এবং স্ট্যান্ডে বসে থাকা মা-বাবাসহ পুরো পরিবারের সামনে গড়েছেন অসাধারণ এই কীর্তি।
তবে একটা পর্যায়ে এমন কিছু কল্পনাতেও ভাবতে পারেননি কেভিন। ‘১১১ রানে ৫ উইকেটে পড়ে যাওয়ার পর নিজেকে বলেছিলাম, কোনোমতে ইনিংসটাকে টেনেহিঁচড়ে ৫০ ওভার পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে, তাতে ৮ বা ৯ উইকেট হারিয়ে ২২০ রান হয়তো করা যাবে। আর ভেবেছিলাম ম্যাচটি হবে ভীষণ একঘেয়ে!’
কেভিন যেমন ভাবেননি আয়ারল্যান্ড এ রকম কিছু করতে পারবে, তেমনি স্ট্রাউসও তো ভাবেননি এই ম্যাচ ইংল্যান্ড হেরে যেতে পারে। মানুষ যা ভাবে, সব সময় কি তা হয়! উল্টোটাও যে দেখতে হয় কখনো কখনো! আর না হলে ‘দে ঘুরিয়ে’ থিম সংয়ের সঙ্গে মিল রেখে সবকিছু ঘুরে যাবে কী করে!

আরও আগে ব্যাট করতে চান রাজ্জাক

মূলত বোলার হিসেবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে পদার্পণ করেছিলেন পাকিস্তানি ক্রিকেটার আবদুল রাজ্জাক। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যাটিং সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে তিনি অনায়াসেই অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রমাণও করেছেন। শেষ ১৫ ওভারে মারমুখী ব্যাটিং দিয়ে অনেক সময়ই পাকিস্তানকে বড় সংগ্রহ এনে দিয়েছেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ের সময়ও হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের দুর্দান্ত পারফরমেন্সের পেছনে একটা বড় অবদান ছিল আবদুল রাজ্জাকের।
অত আগের কথা মনে করার চেষ্টা না করলেও চলে। সম্প্রতি আবুধাবিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করে তিনি পাকিস্তানকে এনে দেন স্মরণীয় এক জয়। পাকিস্তান অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি বলেছিলেন, ‘রাজ্জাক একজন সত্যিকারের ম্যাচ উইনার। সে বল বা ব্যাট হাতে যেকোনো সময় খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।’ কিন্তু পাকিস্তানকে ম্যাচ জেতানোর সুযোগটা কী পাচ্ছেন এই অলরাউন্ডার?
বিশ্বকাপের প্রথম দুইটা ম্যাচেই তিনি ব্যাট করতে নেমেছেন একেবারে শেষ মুহূর্তে। দুই ম্যাচ মিলিয়ে খেলতে পেরেছেন মাত্র ১০টি বল। করেছেন ১১ রান। তাঁকে দিয়ে কেন জানি খুব বেশি বলও করাননি শহীদ আফ্রিদি। দুই ম্যাচেই তিনি বল করেছেন ৫ ওভার করে। এতে রাজ্জাকের তো কিছুটা হতাশা হওয়ারই কথা। বোলিংয়ের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করলেও ব্যাটিং অর্ডারে কিছুটা ওপরে উঠে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন রাজ্জাক। তবে দলীয় স্বার্থে যেটা ভালো মনে হবে, সেটাই মাথা পেতে নেবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাজ্জাক বলেছেন, ‘আমি কিছুটা ওপরে ব্যাট করতে চাই। তবে এটা অবশ্যই নির্ভর করবে দলের প্রয়োজনীয়তার ওপর। দলের ভালোর জন্য যেটা দরকার, সেটাই সবাই করবে। দলের জন্য ভালো খেলতে পারাটাই মূল ব্যাপার। আমাদের ব্যাটিং লাইন-আপ খুবই শক্তিশালী। এ জন্যই আমি সুযোগ পাচ্ছি না। কিন্তু যখনই আমাকে দরকার হবে, আমি সেরাটা খেলার চেষ্টা করব।’
নিজের সেরাটা ঢেলে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টাও করে যাচ্ছেন রাজ্জাক। অনুশীলনে বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও কঠোর পরিশ্রম করছেন তিনি। প্রথম দুইটা ম্যাচ জেতার পর পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন-আপ বেশ শক্তিশালী মনে হলেও সতীর্থদের প্রতি রাজ্জাকের সতর্কবার্তা, ‘এখন আমাদের ব্যাটিং লাইনআপ খুবই লম্বা মনে হচ্ছে কারণ সবাই ভালো পারফরমেন্স দেখাচ্ছে। কিন্তু যে দিন কয়েকজন ব্যাটসম্যান খুব তাড়াতাড়ি সাজঘরে ফিরবে, সেদিন এটাকে খুবই ছোট মনে হবে।’ সেদিন যে রাজ্জাককেই জ্বলে উঠতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

‘ইংলিশ বোলাররাই ম্যাচটা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে’

প্রথমে ব্যাট করে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ড যখন ৩২৭ রান দাঁড় করালো, তখন নিদেনপক্ষে ভালো লড়াইয়ের প্রত্যাশাটিই ছিল আইরিশদের কাছে। স্কোর বোর্ডে কোনো রান যোগ না করতেই যখন আয়ারল্যান্ডের প্রথম উইকেট পড়ে গেল, তখন অনেকেই মনে মনে প্রমাদ গুনে থাকতে পারেন, বিরক্তি প্রকাশ করতে পারেন, বিশ্বকাপে আরো একটি ম্যাড়মেড়ে ম্যাচের জন্য। আয়ারল্যান্ডের স্কোর যখন ৫ উইকেটে ১১১, তখনতো খেলা দেখাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন বেশিরভাগ মানুষ। দু’একজন ‘অতি উত্সাহী’ ব্যক্তিবর্গ যাঁরা টিভি সেটের সামনে বসেছিলেন, তাঁরাই কিন্তু দিনশেষে সত্যিকারের ‘বিজয়ী।’ কারণ, তাঁরা যে তখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের খুব দারুণ এক ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী। বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদেরও বোধকরি ঘোর কাটছে না এখনো, তাঁরা যে চোখ-চেয়ে দেখলেন এক অত্যাশ্চর্য ঘটনার, উপভোগ করলেন, কেভিন ও’ব্রায়েন নামের এক লাল চুলো ক্রিকেটারের অতিমানবীয় অথচ স্বপ্নীল এক ইনিংস। যে ইনিংস পুরো খেলারই দিক পরিবর্তন করে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সবচেয়ে দ্রুতগতির সেঞ্চুরি করে কেভিন নিজের দেশকে জিতিয়েছেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। কোথায় উচ্ছাস থাকবে বাঁধভাঙা, কোথায় আবেগের হবেন আপ্লুত, কিন্তু সেই কেভিনই কাল বেঙ্গালুরুতে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সামনে বলে ফেললেন এক নির্মম সত্য কথা। অনেকটা উপযাচক হয়েই যেন ইংলিশ দলকে জানিয়ে দিলেন, ‘এই বোলিং-ফিল্ডিং করলে তোমাদের বিশ্বকাপ জয়তো দূরে থাক, কোয়ার্টার ফাইনালেও যাওয়া হবে না।’
কেভিন ও’ব্রায়েন বলেছেন, ‘আমরা আমাদের খেলাটা খেলে যাচ্ছিলাম।ইংল্যান্ডের বোলারদের বলগুলো ছিল খুবই বাজে। আমরা কেবল সেই বাজে বোলিংয়েরই পূর্ণ সদ্ব্যাহার করেছি।’

কেভিন যখন ব্যাট ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন টেলিভিশন সম্প্রচারই বলে দিচ্ছিল, তাঁর ব্যাটিং তাণ্ডবের উত্তর স্ট্রাউস, ব্রেসনান, ব্রড, সোয়ান, কলিংউডদের কাছে নেই। ফিল্ডিং দেখে মনে হচ্ছিল, আয়ারল্যান্ডের কাছে আসন্ন হারের চিন্তা, ইংলিশদের করে তুলেছে হত বিহ্বল। এতটাই যে, নিজেদের স্বাভাবিক ফিল্ডিংও যেন তাঁরা ভুলে বসে আছেন। ও’ব্রায়েন সেই ব্যাপারটিই কাজে লাগিয়ে আয়ারল্যান্ডকে এনে দিয়েছেন ইতিহাস সেরা এক অবিস্মরণীয় জয়।
‘আমরা কেবল ইংলিশদের দুর্বল বোলিং ফিল্ডিংয়ের সুযোগ নিয়েছি। আমাদের এই ব্যাটিংয়ের কোনো জবাব ইংলিশদের কাছে ছিল না।’ কেভিনের মন্তব্য।
ম্যাচে একটা সময় আয়ারল্যান্ডের আস্কিং রেট অনেক বেশি থাকলেও কেভিনের ব্যাটের ঝড়ে তা সহজ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে কেভিন ও’ব্রায়েন ফিরে গেছেন তাঁর পুরনো কথাতেই। তিনি বলেন, ‘আস্কিং রেট বেশি থাকলেও ইংলিশ বোলাররা প্রতি ওভারেই একটি করে বাজে বল দিয়েছে আমাদের। তাতেই কাজটা সহজ হয়ে যায়। সবমিলিয়ে ইংলিশ বোলাররাই আমাদের হাতে ম্যাচটা তুলে দিয়েছে।’

কানাডাকেও হালকাভাবে নিচ্ছে না পাকিস্তান!

আমরা কাউকেই হালকাভাবে নিচ্ছি না’। বাক্যটা প্রায়ই শক্তিশালী দলগুলো ব্যবহার করে ছোট দলগুলোর বিপক্ষে মাঠে নামার আগে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাঠে খুব হালকাভাবেই খেলতে দেখা যায় বড় দলগুলোকে। তারা জয়ও পায় বেশ হেসেখেলেই। অবশ্য গতকাল ফেবারিট ইংল্যান্ড যেভাবে আয়ারল্যান্ডের কাছে নাকানি-চুবানি খেল, তাতে এখন সত্যিই আর কাউকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ থাকছে না শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর।
আজ কানাডার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে পাকিস্তানের মাথায়ও কী এই চিন্তা থাকবে? সাম্প্রতিক ফর্ম, পারফরমেন্সের বিচারে অবশ্য এমন চিন্তা মাথায় আনতে চাইবেন না অনেকেই। প্রথম দুটি ম্যাচেই দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়েছে শহীদ আফ্রিদিরা। প্রথম ম্যাচে কেনিয়াকে উড়িয়ে দিয়েছে ২০৫ রানের বিশাল ব্যবধানে। দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পেয়েছে ১১ রানের অসাধারণ জয়। ব্যাট হাতে সহ-অধিনায়ক মিসবাহ-উল-হক আর বল হাতে অধিনায়ক আফ্রিদির দুর্দান্ত পারফরমেন্সও নতুন আশার সঞ্চার করেছে পাকিস্তান শিবিরে।
অন্যদিকে প্রতিপক্ষের কাছে সমীহ জাগানোর মতো কিছুই করতে পারেনি কানাডা। প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার কাছে ২১০ রানের হারটা না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে জিম্বাবুয়েও তাদের যেভাবে ১৭৫ রানের বিশাল ব্যবধানে হারাল, তাতে কানাডা বিপদজনক কিছু ঘটাতে পারে এমন চিন্তা মনেই আনছেন না কেউ। অনেকে বলছেন, ‘মহা-অলৌকিক’ কিছুই শুধু আজ পাকিস্তানের জয়টা ঠেকাতে পারে। তবে পাকিস্তান কোচ ওয়াকার ইউনুস কিন্তু আবারও সেই চিরাচরিত কথাটারই পুনরাবৃত্তি করেছেন। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘সবাই জানে, এই বিশ্বকাপটা আমাদের জন্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো ম্যাচই সহজ না। কাউকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভালো খেলেছি। কিন্তু বিশ্বকাপের এখনো অনেকটা পথ বাকি। সামনে আরও অনেক বড় বড় ম্যাচ আছে। কাজেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য কাল (আজ) আমরা আমাদের সেরাটাই খেলার চেষ্টা করব।

পাকিস্তান ১৮৪ রানে অল আউট

কেনিয়ার বিপক্ষে বড় জয়। জয় এসেছে ‘শক্তিশালী’ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও। তবে কলম্বোর প্রেমাদাসায় কানাডার বিপক্ষে ম্যাচে দেখা গেল ‘অসহায়’ এক পাকিস্তানকে। শুরুতেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে শহীদ আফ্রিদির দলের ইনিংস গুটিয়ে গেছে মাত্র ১৮৪ রানে।
দলীয় ১৬ রানে প্রথম, আর ৬৭ রানে চতুর্থ উইকেটের পতন হয় পাকিস্তানের। এর পরও ব্যাটসম্যানরা যে ৪৩ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিং করলেন তার কৃতিত্ব মিসবাহ-উল হক ও উমর আকমলের। বিপর্যয় কাটিয়ে হাল ধরে এ দুজন গড়ে তোলেন ৭৩ রানের জুটি। সাজঘরে ফেরার আগে মিসবাহ ৩৭ ও উমর আকমল দলীয় সংগ্রহে ৪৮ রান যোগ করেন।
পাকিস্তানের ব্যাটিং অর্ডারে প্রথম আঘাতটা আসে মোহাম্মদ হাফিজকে (১১) দিয়ে। ৪২ রানের মাথায় বিদায় নেন আরেক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান আহমেদ শেহজাদ (১২)। দলীয় ৫৫ রানে সাজঘরে ফেরেন ইউনুস খানও (৬)। কামরান আকমল আউট হন ব্যক্তিগত ১৬ রানে।
দিবা-রাত্রির এই ম্যাচে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের সবচেয়ে বেশি ‘অসহায়ত্ব’ উপহার দিয়েছেন হার্ভির বাইদান। এই পেসার শিকার করেন তিনটি উইকেট। কম যাননি রিজওয়ান চিমা, বালাজি রাও ও জিমি হানসারাও। প্রত্যেকেই তুলে নেন দুটি করে উইকেট।

টেস্ট মর্যাদা চায় আয়ারল্যান্ড

বেঙ্গালুরুতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ জয় আয়ারল্যান্ডকে কেবল বিশ্বকাপে দুটি পয়েন্টই এনে দেয়নি, জয়টি দেশটির ক্রিকেটকে অন্যস্তরে নিয়ে যাওয়ারও একটি সোপান হিসেবে কাজ করছে। আপাতত, দলটি বিশ্বকাপের পরের পর্বে যেতে পারুক চাই না পারুক, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় এই জয় আইরিশদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের।
২০০৭ সালের বিশ্বকাপে অভিষেকেই পাকিস্তানকে হারিয়ে ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টাই করে দলটি পৌঁছে গিয়েছিল সুপার এইট পর্বে। সুপার এইটে বাংলাদেশকে হারিয়ে সেরা সহযোগী সদস্য হিসেবে নিজেদের পরিচয় তৈরি করে ফেলে আইরিশ দল। ২০০৯ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়, দেশটির টেস্ট মর্যাদার দাবীকে করেছিল অনেক বেশি জোড়ালো।
আগামী বিশ্বকাপ শীর্ষ দশ দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত আইসিসি নিয়ে ফেলেছে, তাতে নিজেদের অনেক কিছুই প্রমাণের ছিল তথাকথিত ছোট দলগুলোর। অন্যরা যাই করুক, আয়ারল্যান্ড কাল ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আইসিসির সেই সিদ্ধান্তে বড় ধরনের এক আঘাতই করে বসেছে।
দেশটিতে যে ক্রিকেটের ভালোই চর্চা রয়েছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দলটির দুরন্ত মানের ক্রিকেটাররা। কিন্তু, ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার অভিপ্রায়ে এই ক্রিকেটারদের অনেকেই দেশান্তরি হয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছেন। এউইন মরগান তেমনই একজন ক্রিকেটার। যিনি আয়ারল্যান্ডের জন্মেও ইংল্যান্ডের হয়ে দ্যুতি ছড়িয়েছেন। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা অনেক ক্রিকেটারই যেকোনো সময় দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারেন, যদি তাঁরা ইংলিশ ক্রিকেটে ভালো কোনো সুযোগ পেয়ে যান। এটি আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেটকে উচ্চতা দিলেও দেশটির বড় পর্যায়ে খেলার হাহাকারটা বড় বাজেভাবে ফুটিয়ে তোলে।
আয়ারল্যান্ডের অধিনায়ক পোর্টারফিল্ড মনে করেন, একমাত্র টেস্ট মর্যাদাই পারে, আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ভালো ক্রিকেটারদের ইংল্যান্ডে চলে যাওয়া ঠেকাতে।
আগামী বিশ্বকাপে যদি অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ১০-এ নেমে আসে তাহলে আইরিশ ক্রিকেট দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন পোর্টারফিল্ড। তিনি বলেন, একমাত্র বিশ্বকাপ বা আইসিসি আয়োজিত বড় আসরগুলোতেই আমরা বৃহত্ পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাই। এছাড়া, সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমাদের খেলার কোনো সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়মিত সুযোগ পেলেই কেবল ক্রিকেটের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।
পোর্টারফিল্ডের মুখে আইরিশ ক্রিকেটের প্রাণের দাবিটিই ফুটে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, তাঁদের ব্যাপারে আইসিসির সিদ্ধান্তটি কি হয়।