Saturday, August 22, 2026
ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ইসলাম বিদ্বেষকে হাতিয়ার করছে ইসরাইল
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রচারণা বেড়েছে। ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’-এর মতো উদ্যোগ এবং মুসলিমদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মসজিদে হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধেও বিদ্বেষমূলক রাজনীতি জোরদার হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়কার অবস্থানের সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর বুশ একটি মসজিদে গিয়ে বলেছিলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু বর্তমান মার্কিন ডানপন্থি রাজনীতিতে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা অনেকটাই অনুপস্থিত।
ইসরাইলও এই রাজনৈতিক পরিবেশকে কাজে লাগাচ্ছে বলে মতামত নিবন্ধটিতে দাবি করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেরুজালেমে ইসরাইল আয়োজিত একটি ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী সম্মেলনে ইউরোপের বিভিন্ন কট্টর ডানপন্থি দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। নেতানিয়াহু সেখানে ‘র্যাডিক্যাল ইসলামের আগ্রাসন’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এসব রাজনৈতিক শক্তিকে মিত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রবণতার পেছনে ট্রাম্পপন্থি রাজনীতির পাশাপাশি ইসরাইলের জনসংযোগ ও ‘হাসবারা’ প্রচারণারও ভূমিকা রয়েছে। ইসরাইলি সরকার পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম ও মুসলিম অভিবাসীদের ঘিরে ভয় তৈরি করে নিজেদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে সামনে আনতে চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কানাডাতেও ইসরাইল-সমর্থিত একটি প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম অভিবাসীদের হুমকি হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগ উঠেছিল।
ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি সমালোচকদের মোকাবিলায় আরো আগ্রাসী প্রচারণার পথ বেছে নিয়েছে। এ প্রচারণায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর ডানপন্থিদের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কও দৃঢ় হচ্ছে।
তবে ইসলামোফোবিয়া উসকে দিয়ে ইসরাইল পশ্চিমা জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে। মুসলিম প্রার্থীদের নির্বাচনী সাফল্যও দেখাচ্ছে যে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে।
নিবন্ধের শেষ দিকে বলা হয়, ভয় ও বিদ্বেষ সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে পারলেও তা পশ্চিমা সমাজে বিভাজন ও সহিংসতা আরো বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইসরাইল যদি পশ্চিমা সমর্থন ধরে রাখতে চায়, তাহলে ইসলামোফোবিয়াকে উসকে দেওয়ার পরিবর্তে সমতা, শান্তি ও রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোই বেশি কার্যকর হতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোরও উচিত বিদেশি প্রভাব ও প্রচারণার বিষয়টি উপলব্ধি করে নিজেদের বহুত্ববাদী মূল্যবোধ রক্ষা করা।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Friday, April 3, 2026
গর্জনকারী ধোঁয়া by অচিন সেন
ভিক্টোরিয়া ফলস চিংগোলা থেকে সাতশত কিলোমিটার দূরে লিভিং স্টোন প্রদেশের দক্ষিণ প্রান্তে। যাত্রাপথ মসৃণ আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত সাউথ আফ্রিকা থেকে উত্তরে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হাইওয়ে- আফ্রিকার বিভিন্ন রাজ্যগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সূত্রে সংযোগকারী রাজপথ। হাইওয়ের দু’পাশের জনপদগুলো দূরে দূরে এবং জনবিরল। ফলে রাস্তাঘাট অতিমাত্রায় ভিড়ে আক্রান্ত নয়। তাই কোথাও যানজট দেখা যায়নি। পাশের লেনগুলো দিয়ে মালাবোঝাই ট্রাক কন্টেনারগুলো ছুটে চলেছে অন্তত একশ’ কিলোমিটার বেগে আপনাপন গন্তব্যভিমুখে। আমাদের পক্ষে সাতশত কিলোমিটার পথ একদিনে অতিক্রম করা অসম্ভব কিছু ছিল নাÑ আবার অনায়াসলদ্ধও নয়। তাই অসচ্ছন্দ ভেবে যাত্রাপথে বিরতি ঘটাই। জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকায় এক রাত্রি হোটেল বাস নিই।
পরের দিন সকাল সকাল প্রাতঃরাশ সেরে হোটেল থেকে লিভিং স্টোন অভিমুখে যাত্রা করি। এখনো বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। সফর লম্বা হলেও রাস্তার ধকল অনুভূত হয়নি। ফেব্রুয়ারি মাস ওখানে বর্ষাকাল। যাত্রাপথে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। আমার ধারণার বিপরীতে রাস্তার দু’ধারে সবুজ পত্রপল্লবে শোভিত বৃক্ষসারি। আমার ধারণা ছিল গোটা আফ্রিকা মহাদেশটাই রুক্ষ্ম, শুষ্ক।
কিন্তু একটা জিনিসের অভাব চোখে পড়ার মতো। রাস্তার ধারে আমাদের দেশের মতো চায়ের দোকান মেলা ভার। চায়ের তৃষ্ণা মেটাতে যেখানে হোটেল কিংবা মোটেল পাওয়া যায় সেখানে যাত্রাবিরতি নিতে হয়। তবে বাক্যবিনিময়ে ভাষা সমস্যা হয় না। স্থানীয় লোকজন শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলেই ইংরেজি ভাষায় অভ্যস্ত- কারণ ইংলিশ জাম্বিয়ায় সরকারি ভাষা হিসেবে বিবেচিত ১৯৬৪ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরেও। যাই হোক, লোকজন, জলবায়ু, ভূপ্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে হতে ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই জাম্বিয়ার সাউদার্ন প্রদেশ লিভিং স্টোনে পৌঁছে গেলাম। বেলা থাকতে থাকতে পূর্ব নির্দিষ্ট হোটেলে আশ্রয় পেলেও বহু আকাক্সিক্ষত ভিক্টোরিয়া ফলস দর্শনে আর শরীর নিতে চাইলো না। এখানে সূর্যাস্ত যায় সন্ধ্যা আটটায়। আটটার মধ্যেই ডিনার সেরে নিঝুম সন্ধ্যায় দূর থেকে ভেসে আসা রাগাশ্রয়ী গর্জন- কখনো বিস্ফারিত, কখনো স্তিমিত, শুনতে শুনতে কখন যে হোটেলের সুসজ্জিত বিছানায় নিদ্রায় ঢলে পড়েছি বুঝতে পারিনি- চোখের পাতা যখন নির্মিলিত হয়, তখন পরদিন সকাল সাতটা। তখনো শুনতে পাচ্ছি- সমুদ্রের পাড় ভাঙা ঢেউয়ের মতো অবিরাম নিরলস গর্জন জানান দিচ্ছে।
ভিক্টোরিয়ার এই আহ্বান উপেক্ষা করা আমাদের আর তর সইছিল না। তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা রওনা দিলাম ভিক্টোরিয়া অভিমুখে। হোটেলের অনতিদূরে ভিক্টোরিয়ার আবিষ্কর্তা ডেভিট লিভিং স্টোনের খোদাই করা মর্মর মূর্তি। স্কটল্যান্ড অধিবাসী ডেভিড লিভিং স্টোন একজন খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী মিশনারি এবং অনুসন্ধানকারী যিনি ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সুরিয়া এথনিক গ্রুপের প্রধান ঝবশবষরঃঁ-র সহায়তায় দুর্ভেদ্য জলজঙ্গলে ঘেরা গ্রহের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত ভিক্টোরিয়া ফলস আবিষ্কার করেন। সেই থেকে বিশ্বের এক ভয়ংকর সুন্দর প্রাকৃতিক সম্ভারের দরজা খুলে যায় বিশ্ববাসীর কাছে। ভিক্টোরিয়া ফলস কেবলমাত্র ভ্রমণ পিপাসুদের আকর্ষণ করে না- দলে দলে আসতে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে।
অভিজিৎ চাকরি সূত্রে জাম্বিয়ায় দশ/বার বছর প্রবাসী থাকায় বেশ কয়েকবার লিভিং স্টোনে ভিক্টোরিয়া ফলস দর্শনে আসে- তাই আমাদের পথ প্রদর্শন এবং ফলস দর্শনে আর গাইড নেয়ার দরকার পরে না। তার কথামতো মস্তক আবরণ এবং বর্ষাতী পরিহিত হয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ি। যত অগ্রসর হতে থাকি ভিক্টোরিয়ার গর্জন ক্রমশ বাড়ছেÑ শুনতে পাই। এইবার বুঝতে পারলাম, ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের নাম স্থানীয় ভাষায় গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ কেন বলা হয়। গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ কথার অর্থ ঞযব ধসড়ৎব ঃযধঃ ঞযঁহফরৎং. যতই এগোই জলীয় বাষ্পের ধোঁয়া ঊর্ধ্বপানে উঠতে দেখতে পাই। ১.৭ কিলোমিটারব্যাপী জলরাশি ১০০ মিটার নিচে গিরিসংকটে ভয়ঙ্কর গর্জনে আছড়ে পড়ছেÑ ফলে জলানু বাষ্পে পরিণত হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে উঠে উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে পুনরায় তরলায়িত হয়ে বৃষ্টি আকারে নিচে পতিত হচ্ছে। সেই বিনা মেঘে বৃষ্টির বহর এমনই যে, সামনের যা কিছু দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
উচ্চতায় ও ব্যপ্তিতে যথাক্রমে ৩৫৪ ফুট এবং ৫৬০৪ আকারের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম প্রাকৃতিক ওয়াটার ফলস হিসেবে বিশ্বকোষে স্বীকৃত। ভিক্টোরিয়ার উচ্চতা উত্তর আমেরিকার নায়াগ্রা ফলসের দ্বিগুণ। গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ-’র জল গর্জে পতিত হয়ে আফ্রিকার চতুর্থ বৃহত্তম নদী জাম্বেজি নদীতে মিশে প্রবাহিত হচ্ছে। জাম্বেজি জিম্বাবুয়ে এবং জাম্বিয়া রাজ্যের সীমারেখা এবং এই দু’টি দেশ ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত দ্বারা পর্যটকদের অবশ্যই দর্শনীয় স্থান। হেলিকপ্টারে উড়ে যাওয়ার সময় আমাদেরও উপর থেকে জলপ্রপাত, নেবানাল পার্ক, জাম্বেজি নদী এবং আরও অনেক কিছু দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে লিভিং স্টোন দ্বারা ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আবিষ্কার হওয়ার পর আফ্রিকা মহাদেশের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলের পরিচিতি অনেকগুণ বেড়ে যায়- শুধু পর্যটনকে ঘিরে নয়, খনিজ-বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল হয়ে ওঠে সম্পদ আহরণকারীদের কাছে এক লোভনীয় কেন্দ্র- উল্লেখ্য ডাইমন্ড, তাম্র, এমনকি সোনার খনিজ আকর, বহুমূল্য বনজ গাছপালা এবং গাছদণ্ড ও প্রাণীজ চর্ম এর বিশাল ভাণ্ডার। ১৮৯০ সালে এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আহরণ করতে এগিয়ে আসে এক দুঃসাহসিক বৃটিশ নাগরিক সিসিল রোডস তিনি জাম্বেজি নদীর উত্তরাশেং তার কর্মকাণ্ডের সূচনাপর্বে স্থাপন করেন ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানি। ঠিক আমাদের দেশে যেমন বৃটিশ ধুরন্ধররা বাণিজ্যকল্পে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
সিসিল রোডস তার কাজের সুবিধার্থে ঐ ছোট ভূখণ্ডকে দুই ভাগে ভাগ করে জাম্বেজির উত্তর ভাগের নাম দেন উত্তর রোডেশিয়া এবং পরবর্তীকালে দক্ষিণাংশের নামকরণ করেন দক্ষিণ রোডেশিয়া। বৃটিশ রুল চলাকালীন উপরোক্ত দেশ দু’টি বিশ্বে উত্তর রোডেশিয়া এবং দক্ষিণ রোডেশিয়া নামেই রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ১৯৬৪ সালে ডেভিড কেনেথ কাউন্ডার নেতৃত্বে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর উত্তর রোডেশিয়ার নাম সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত হয় জাম্বিয়া এবং ১৯৮০ সালে রবার্ট মোগাবের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ রোডেশিয়া পৃথিবীর মানচিত্রে জিম্বাবুয়ে নামে পরিচিতি লাভ করে।
আর ডেভিড লিভিং স্টোনই বৃটিশ সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার নামেই জলপ্রপাতটির নামকরণ করেন ‘ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত’।

Wednesday, January 14, 2026
বাংলাদেশের নির্বাচন হবে গণতন্ত্রের বড় পরীক্ষা by গ্রেস করকোরান
এই সনদটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি রূপরেখা। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক ভোটব্যবস্থা, নির্বাহী ক্ষমতার ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সনদটি পাস হলে এটি বহু দশক ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র ভেঙে দিতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মূলত দুটি বড় দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তা হলো আওয়ামী লীগ। এর নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্টের কন্যা শেখ হাসিনা। অন্যটি হলো বিএনপি। এর নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তার ছেলে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে যুব নেতৃত্বাধীন বর্ষা বিপ্লব দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। এ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি ওঠে। বিক্ষোভকারীরা আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নীতি, বৈষম্য এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ওই বছরের আগস্টের শুরুতে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে চলে যান নয়াদিল্লিতে। এরপর আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে।
বিপ্লবের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের গত মাসে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি এবং তাদের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল এবং অতীতে বিএনপির মিত্র ছিল। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আদালতের রায়ে ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে নির্বাচন করার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ায় দলটি নিষিদ্ধ হয়। তবে দুই সপ্তাহ আগে জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দেয় যে, তারা জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট গঠন করবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি একটি মধ্যপন্থী, বহুত্ববাদী ও ছাত্রনেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল। এই জোটে আরও সাতটি দল যুক্ত হয়েছে।
বিপ্লব ও শেখ হাসিনার দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতির দিকে গেছে। শেখ হাসিনার সমর্থক হিসেবে বিবেচিত অনেকের ওপর পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। হাদিকে হত্যার পর এই ধরনের হামলা আরও বেড়েছে। আশঙ্কা বাড়ছে যে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরের উগ্র ও ডানপন্থী শক্তিগুলো এই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।
নির্বাচনের পরেও ভারতবিরোধী মনোভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি। এখন ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। এই সম্পর্কগুলো কীভাবে বিকশিত হয়, তা ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। চীন ও পাকিস্তান সমর্থিত একটি বাংলাদেশ নয়াদিল্লির জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশ নিজেকে এ অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ঢাকা আসিয়ানে যোগদানের চেষ্টা করছে এবং পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে সার্ক পুনর্জীবিত করার কথাও ভাবছে- যা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও চাপের মুখে ফেলবে। স্বল্পমেয়াদে আসিয়ানের সদস্যপদ পাওয়া কঠিন হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে বাংলাদেশ সক্রিয় উদ্যোগ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার বাংলাদেশের আসিয়ান সদস্যপদে বাধা দিতে পারে। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ঢাকা এই সংকট মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিতে পারে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় ও পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী একটি স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে- যা তারা নাকি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনা করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো চরমপন্থী ও ডানপন্থী মতাদর্শের উত্থান, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রশ্নে। দেশে ধর্মীয় অনুশীলন ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রবণতা বেড়েছে এবং আরও রক্ষণশীল ইসলামি ব্যাখ্যা জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও খারাপ হলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট বাংলাদেশের জন্য এক সন্ধিক্ষণ। এই প্রক্রিয়া যদি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে, নাকি পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোকেই টিকিয়ে রাখে- তা নির্ধারণ করবে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ। এই নির্বাচনের ফলাফল দেখাবে, গণআন্দোলন সত্যিই টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে রূপ নিতে পারে কি না।
(অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দ্য ইন্টারপ্রেটার থেকে অনুবাদ)

Tuesday, January 6, 2026
সাবাহ’র নিবন্ধ: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ভাবনা by আসিফ বিন আলী
আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে, মুসলিম বিশ্বে স্বীকৃতি ও অবস্থান নির্ধারণের রাজনীতির ভেতর দিয়ে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সম্মেলনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তুরস্ক দূতাবাস খোলে। আর বাংলাদেশ ১৯৮১ সালে আঙ্কারায় মিশন স্থাপন করে। এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় যাত্রাপথের প্রাথমিক পর্যায়েই বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়। পথটি অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। কিছু অস্বস্তিকর মুহূর্তও এসেছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রতিধ্বনি তোলে। তবে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর সম্পর্কটি নতুন ধরনের গভীরতা পায়। তুরস্ক কেবল বিবৃতি দেয়নি; স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাপ লাঘবে মানবিক সহায়তাও বাড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজে লাগানো যায়। বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় নজর দেয়। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের এক সংবেদনশীল অংশে অবস্থান করছে। সেখানে প্রভাব বিস্তারে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে এবং প্রতিবেশী মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা নয়; এটি এক ধরনের বীমা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে, যা খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক চাপের মতো ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করেছে। ঢাকা ও আঙ্কারা যদি দূরদর্শী হয়, তবে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার হুড়োহুড়ি না বানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখবে।
উদারবাদী ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দৃষ্টি টানে বাজার, নীতি ও অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বেড়ে ২০২৪ সালে ১ বিলিয়ন ডলার (৪১ বিলিয়ন তুর্কি লিরা) ছাড়িয়েছে। সম্ভাবনার তুলনায় এ সংখ্যা এখনো মোটামুটি মানের। এটি সাফল্যের গল্পের চেয়ে শুরু বিন্দু বলাই ভালো। বাংলাদেশের রয়েছে তরুণ শ্রমশক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়া ও তার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ বাজারের কাছাকাছি অবস্থান। তুরস্কের আছে উৎপাদন, মধ্যম-স্তরের প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক বাজারে সক্রিয় কোম্পানির নেটওয়ার্কে অভিজ্ঞতা। এই শক্তিগুলো ঠিকভাবে মেলাতে পারলে অংশীদারিত্বটি সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের বাইরে গিয়ে সহউৎপাদনের স্তরে উঠতে পারে।
আরেকটি ক্ষেত্র আছে, যেখানে দুই দেশই ভারী মূল্য দিয়েছে এবং তাই জোরালো কণ্ঠস্বর অর্জন করেছে- শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের রাজনীতি। তুরস্ক বহু বছর ধরে লক্ষ লক্ষ সিরীয়কে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার মধ্যেই রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা বহন করছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ ও তুরস্ককে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে কথা বলার নৈতিক ভিত্তি দেয় এবং জাতিসংঘ ও ওআইসিতে বক্তৃতার বাইরে বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করে।
গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্র কেবল স্বার্থের যোগফল নয়; রাষ্ট্র হলো সমাজ। তাই কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ ও তুরস্ক দুই দেশেরই জনজীবনে ইসলামের ভূমিকা আছে, যা একে অপরের ইতিহাস ও রাজনীতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। বৃহত্তর উম্মাহর অন্তর্ভুক্তির ধারণা আবেগী গুরুত্ব বহন করে। বাংলায় ডাব করা তুর্কি ধারাবাহিক এখন বহু বাংলাদেশির নিয়মিত বিনোদন। ঢাকার তরুণরা তুর্কি খাবারে আগ্রহী। বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান, বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন; কেউ কেউ একাডেমিক বা পেশাগত ভূমিকায় সেখানেই থেকে যান। বাইরে থেকে এগুলো ছোট মনে হলেও, এগুলো মানুষে-মানুষে এমন এক সেতু গড়ে তোলে, যা কূটনৈতিক স্লোগানের চেয়ে ভাঙা কঠিন। রাজনৈতিক হাওয়া বদলালে- যা বদলাবেই- এই মানবিক বন্ধনগুলো সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু কণ্ঠ বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে যেন অন্য কারও বিপরীতে একটি পছন্দ হিসেবে উপস্থাপন করছে; যেন ঢাকাকে তুরস্ক ও ভারতের মধ্যে, কিংবা তুরস্ক ও চীনের মধ্যে বেছে নিতে হবে। শুনতে নাটকীয় হলেও এটি দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক চিন্তা। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ, যার ভিন্ন ভিন্ন কারণে ভিন্ন ভিন্ন অংশীদার প্রয়োজন। অবকাঠামো অর্থায়ন ও নির্মাণে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। ভারত সেই প্রতিবেশী, যার সঙ্গে নদী, সীমান্ত, ট্রানজিট রুট এবং সীমান্তপারের জটিল সামাজিক বন্ধন রয়েছে। তুরস্ক বাংলাদেশের একটি উদীয়মান অংশীদার- প্রতিরক্ষা উৎপাদন, মানবিক কূটনীতি ও বাণিজ্যে যার ওজন বাড়ছে। এসব ভূমিকা পরস্পর বদলযোগ্য নয়। এগুলো তাকের ওপর রাখা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডও নয়। কোনো সম্পর্ককে কৃত্রিম দ্বৈততার মধ্যে ঠেলে দিলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। বিকল্প বাড়ালে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ে; কোনো শিবিরে আনুগত্য প্রমাণ করতে সেতু ভাঙলে নয়।
বাংলাদেশ-তুরস্ক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি বাহ্যিক নয়- অভ্যন্তরীণ। বাংলাদেশের রাজনীতি নানা স্রোতে গঠিত- ইসলামপন্থী, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী, বাঙালি জাতীয়তাবাদী- প্রতিটির ইতিহাসপাঠ ও পররাষ্ট্রনীতি পছন্দ আলাদা। মতবৈচিত্র্য সমস্যা নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন বিদেশি সম্পর্ককে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করার হাতিয়ার বানানো হয়। তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক যদি বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের আরেকটি অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে সম্পর্কটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। গঠনমূলক পথ হলো- সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর মনোযোগ রাখা। যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নিরাপদ অভিবাসন, ন্যায্য বাণিজ্য, বিশ্বাসযোগ্য মানবিক উদ্যোগ এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
২০২৬ সালের নির্বাচন ও ঢাকায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার দিকে তাকালে, বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের মূল শব্দ হওয়া উচিত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। সরকার আসে-যায়; রাষ্ট্র থাকে। উভয় পক্ষ যদি সত্যিকারের অংশীদারিত্ব চায়, তবে এমন অভ্যাস ও ব্যবস্থাপনা দরকার, যা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ক্ষমতাসীনদের ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশ ও তুরস্কের অংশীদারিত্বকে অর্থবহ করতে নাটকীয় গল্প বা অভিন্ন শত্রুর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
(তুরস্কের পত্রিকা ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ)

Sunday, November 30, 2025
দ্য উইকে শেখ হাসিনার নিবন্ধ, অস্বীকারের রাজনীতি ও অসত্য চর্চার নমুনা by শাহাদাৎ স্বাধীন
শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদেরও কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতীয় গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।
এসব বক্তব্যে যেসব অসঙ্গতি ও অপতথ্য থাকে তা যেমন আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীর জন্য হতাশাজনক, বাংলাদেশের জনগণের প্রতিও অবমাননাকর।
বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যম এসব বক্তব্যের হুবহু অনুবাদ প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করছে। অথচ শেখ হাসিনার দাবি করা বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা এবং সঠিক তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল।
গত ১৫-১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় শেখ হাসিনার নীতি ছিল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বারবার বলা। এটি করতে গিয়ে তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হতেন। লেখক হুমায়ুন আজাদও বলেছিলেন, ‘সত্য একবার বলতে হয়, সত্য বারবার বললে মিথ্যার মতো শোনায়। মিথ্যা বারবার বলতে হয়, মিথ্যা বারবার বললে সত্য বলে মনে হয়।’ দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা সেই তাঁর আগের নীতি এখনো অবলম্বন করছেন।
দেশে একটি রক্তস্নাত গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র ১৫ মাস হতে চলেছে, অথচ সেই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তি, ছাত্রদের শক্তি, নাগরিক সমাজ ও কলমসৈনিকেরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে গেছেন। যে সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমেছিল, তাদের অনেকের প্রত্যাশা ফিকে হয়ে গেছে। কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর ও ন্যায্য দাবির প্রতি যেমন কর্ণপাত করা হয়নি, তেমনি উপেক্ষিত হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়।
গণ-অভ্যুত্থানের নারী কণ্ঠ যেমন অদৃশ্য হয়ে গেছে, তেমনি গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে একটি বিশেষ মতাদর্শকেই বিশেষ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ফলে ৩ আগস্টের শহীদ মিনার কিংবা ৫ আগস্টের সকালের যে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধে ছিল জাতি, তা আজ নানা দলে-উপদলে বিভক্ত। গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বা স্পিরিট বিনির্মাণের পক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও চিন্তাচেতনার বিকাশে জাতি হিসেবে আমাদের কাজ এখনো খুবই অল্প।
এ দুর্বলতার সুযোগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা নানা মিথ্যার ফুলঝুরি নিয়ে আবার হাজির হচ্ছেন। দ্য ইনডিপেনডেন্ট, এএফপি, রয়টার্স–এর সঙ্গে সাক্ষাৎকার শেষ করে তিনি এবার দ্য উইক–এ একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সম্প্রতি দিল্লি থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাটিতে ‘অতীতেও আমি অনির্বাচিত রাজনীতিবিদদের মোকাবিলা করেছি’ শিরোনামে শেখ হাসিনার নিবন্ধটি প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর এই লেখা যেন ‘বাঘ আর বোকা কৃষকের গল্পের’ পুনরাবৃত্তি। তিনি ভাবছেন, দেশের মানুষ বোকা কৃষক।
শেখ হাসিনার নিবন্ধটিতে অপতথ্যের অনেক উপাদান আছে। কারণ, তিনি অনেক অসত্য তথ্যকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন তা সত্য মনে হয়; আর সত্যকে এমনভাবে গোপন করেছেন যেন তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে বর্ণনা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের মানুষের ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের সংগ্রাম, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনের প্রাণহানি (জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন অনুযায়ী) এবং ২০ হাজার মানুষের আহত হওয়াকে অসম্মান ও অমর্যাদা করেছেন।
১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তিরা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ‘মুসলিম ভাইকে আলাদা করার গভীর ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানকে ছোট করতে চায়; শেখ হাসিনা যেন ভিন্নভাবে তাদের একটি রূপ ধারণ করেছেন। নিবন্ধে শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলকে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে বলে উপস্থাপন করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জবাবদিহিহীন এলিটদের ‘অনির্বাচিত’ সরকার হিসেবে বর্ননা করেছেন।
কিন্তু কেমন ছিল শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের স্বর্ণযুগ? তিনি অসংখ্য গুম, খুন ও হেফাজতে মৃত্যু ঘটিয়েছেন; বিরোধী দল ও মতকে নির্যাতন, দমন–পীড়নের ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। আয়নাঘরের মতো নিকৃষ্ট বন্দিশালা বানিয়েছেন।
বাংলাদেশি মানবাধিকার গবেষকদের মাধ্যমে নথিভুক্ত তথ্য ও সুইডেনভিত্তিক নেত্র নিউজের বিশ্লেষণ অনুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত ২ হাজার ৫৯৭ জনকে বিচারবহির্ভূত ও হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে। (নেত্র নিউজ, ১৩ নভেম্বর ২০২৩)।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদনকে উদ্ধৃতি করে প্রচারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ২ হাজার ৬৯৯টি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ৬৭৭টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে। (দৈনিক বণিক বার্তা, ১২ আগস্ট ২০২৪)
শেখ হাসিনার শাসনামলে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের নামে সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্ট ও নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, যা বর্ণনাতীত। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের পাঁচ বছর সময়ে এই আইনের অধীন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মীসহ ৪ হাজার ৫২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৫৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। (দৈনিক প্রথম আলো, ৩০ এপ্রিল ২০২৪)। এই আইনে লেখক মুশতাক আহমেদ তাঁর ফেসবুক পোস্টের কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কারাগারের হেফাজতে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
শেখ হাসিনা যে বর্তমান সরকারকে অনির্বাচিত সরকার বলছেন, তা টেকনিক্যালি সঠিক, তবে এই সরকার বিশেষ পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মতামতের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীদের মতানৈক্যের ভিত্তিতে এবং সংস্কার ও একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের জন্য তা গঠন করা হয়েছে। আর এটি গণ-অভ্যুত্থানের সরকার। গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা আসা সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিত বলাই তো অপ্রাসঙ্গিক।
শেখ হাসিনা তাঁর কলামে স্বীকার করেছেন, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করায় তা অংশগ্রহণমূলক ছিল না। তিনি এ দায় ২০১৪ সালের বিরোধী দলের সহিংসতার ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো সংকটে পড়ে তাঁর সরকার একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করায়।
বিরোধী দলকে দমন–পীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে হাসিনা সরকার। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে তাঁর অধীন নির্বাচনের মাধ্যমে ডামি প্রার্থী দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। ২০১৮ সালে তাঁকে বিশ্বাস করে বিরোধী দল ভোটে গেলে তাঁর সরকার রাতেই ভোটের ব্যালট বাক্স ভরে রাখে।
বিরোধী দল দমনে তিনি কঠোর ছিলেন তা বোঝা যায় এক পরিসংখ্যান থেকে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭১টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার আসামির সংখ্যা ৪০ লাখের ওপরে। (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩)।
‘আমার পিতা সব করেছেন, আমি সব করেছি’—এই আত্মমুগ্ধতার চক্র থেকে শেখ হাসিনা এখনো বের হতে পারেননি। তার নিবন্ধের পুরোটা জুড়ে এর প্রতিফলন আছে। তিনি নিজেকে এখানে আবার ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যেখানে শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছিল, যা ফাঁস হওয়া ফোনালাপে স্পষ্ট হয়েছে এবং সাবেক আইজিপিও রাজসাক্ষী হিসেবে স্বীকার করেছেন।
১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি, যার মধ্যে ১০ থেকে ১২ শতাংশ ছিল শিশু, এমন নৃশংসতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজেকে ‘ভিকটিম’ বা ভুক্তভোগী হিসেবে প্রচার করা একধরনের ভিক্টিমহুড পলিটিকস। শেখ হাসিনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ঘুরিয়ে দিতে চান, অথচ তাঁকে কৃতকর্মের জন্য আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
নিবন্ধে শেখ হাসিনার ভাষায়, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মের বিক্ষোভের পর থেকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হারিয়ে যাওয়া প্রত্যেক বাংলাদেশির জীবনের জন্য তিনি শোকাহত। পরক্ষণেই তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে যেখানে তাঁর সরকার প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তাঁর রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা অস্ত্র হাতে মাঠে ছিলেন, নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালিয়েছেন, তার দায় ‘নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের ভুল সিদ্ধান্তের ওপর চাপিয়েছেন’।
অথচ শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে চলা এ হত্যাকাণ্ড চলাকালে দেশের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানানো বা নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শোকপ্রকাশের বদলে মেট্রোরেলের কাচ ভাঙা দেখতে গিয়ে কেঁদেছেন।
শেখ হাসিনা নিবন্ধজুড়ে তাঁর সরকারের উন্নয়ন বাহাস করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর সরকার প্রত্যেক বাংলাদেশিকে উন্নত গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু এগুলোর পেছনে যে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, তা এড়িয়ে গেছেন তিনি।
ঢাকা শহরের গণপরিবহনের পরিস্থিতি তো আমরা জানিই। প্রশ্নপত্র ফাঁস, জিপিএ–৫ ও পাসের হার বাড়িয়ে দেওয়া, নিয়োগ বাণিজ্যসহ শিক্ষাখাতে যে অরাজকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, তা–ও কখনো ভুলবার নয়। সরকারের সমালোচনার কারণে আবরার ফাহাদকে চরম নির্যাতন করে হত্যাই করা হলো। আরও বহু নিপীড়নের ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো পরিবেশবিরোধী প্রকল্প তিনি বাতিল করেননি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে উঠেছে।
শেখ হাসিনা তাঁর এমপি–মন্ত্রী–নেতা ও ঘনিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে একের পর এক ব্যাংক লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাঁদের অর্থপাচারের ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় পর্যন্ত তোলপাড় তুলেছে।
শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তিনি একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থা গড়েছেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ আইনের অধীন সমানভাবে আচরণ পাবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁর সরকারের সময়ে ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধমন্দিরের হামলা ও ভাঙচুরের বিচার তিনি সম্পন্ন করেননি। শুধু রামু নয়, নাসিরনগর, কুমিল্লা, রংপুরসহ অনেক জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
২০২১ সালে তাঁর সরকারের সময়ে ১৯টি জেলার দুর্গামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতার ৫৩টি ঘটনা ঘটে। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১)। তাঁর সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালের এসব ঘটনায় ৫৪টি মামলা হয়, কিন্তু ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুসারে ৪২টির কার্যক্রম শুরু হয়নি। (দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ অক্টোবর ২০২৩)।
এসব সাম্প্রদায়িক হামলায় তাঁদের দলের অনেকের সম্পৃক্ত থাকারও অভিযোগ আছে। ফলে তিনি নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ঠিকাদার হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যা আসলে অসংগতিপূর্ণ।
নিবন্ধের শেষে শেখ হাসিনা প্রার্থনা করেছেন, ‘দেশ আবারও সত্যিকারের গণতন্ত্রে ফিরে আসুক।’ হ্যাঁ, দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য এত সংগ্রাম, ত্যাগ, তিতিক্ষা। ১৬ বছর ধরে দেশকে অগণতান্ত্রিক পথে নেওয়ার যাবতীয় কার্যক্রমই তিনি করেছেন। পরিহাসের বিষয় হলো, সেই তিনিই আবার ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ হিসেবে ভূষিত হতেন নিজ দলে।
প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার কাছে ‘সত্যিকারের গণতন্ত্র’ কোনটি? তাঁর ১৬ বছরের শাসনামলে যে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকেই কি তিনি সত্যিকারের গণতন্ত্র বলছেন? তাহলে তিনি নিশ্চয়ই আবারও ভুল করছেন।
* শাহাদাৎ স্বাধীন, গণমাধ্যমকর্মী ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Tuesday, April 8, 2025
‘আমি নিতান্তই কোনো সংখ্যা হতে চাই না, আমি গাজার এক বাস্তব গল্প’
মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখতে পাব, তা আমার ধারণায় ছিল না। আমি ভাবতাম, মৃত্যু হুট করেই আসে, আমরা এটা অনুভব করতে পারি না। তবে এ যুদ্ধ চলাকালে তারা ধীরে ধীরে আমাদের সব পরিস্থিতিরই মুখোমুখি করেছে।
ঘটনা ঘটার আগেই আমরা ভুগছি। যেমন বাড়িতে বোমা হামলার আশঙ্কা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে রেখেছে।
শুরু হওয়া সে যুদ্ধ এখনো আছে, কিন্তু ভয়ের সেই অনুভূতি ভেতরে চাপা থেকে গেছে। এই ভয় আমার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এমনকি আমার মনে হচ্ছে, এটা আর কোনো ধকল নিতে পারবে না।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমাদের অনেক কাছাকাছি চলে আসা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে সামলাতে আমি হিমশিম খাচ্ছি। আমার মনে আছে, যখন নেতজারিম এলাকা থেকে ট্যাংকগুলো ঢুকছিল, তখন আমি স্তম্ভিত হয়ে আমার সব বন্ধুর কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলাম: ‘তারা গাজায় কীভাবে ঢুকল? আমি কি স্বপ্ন দেখছি?!’
তারা কবে গাজা থেকে সরবে, এটি আবার কবে মুক্ত হবে, সে অপেক্ষায় আছি আমি।
এখন আমি যেখানে থাকি, সেই আল–ফুখারি এলাকার খুব কাছে চলে এসেছে ইসরায়েলি সেনারা। খান ইউনিসের পূর্বে এবং রাফার উত্তরে এর অবস্থান। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে খান ইউনিস এলাকার শেষ এবং রাফার শুরু।
তারা এতটাই কাছে চলে এসেছে যে আমরা প্রতিনিয়ত ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের অবিরাম সেসব শব্দ শুনতে হচ্ছে।
এ যুদ্ধ ভিন্ন ধরনের। আমার আগের অভিজ্ঞতার চেয়ে এটা অনেকটাই আলাদা।
আমি নিতান্তই একটা সংখ্যা হতে চাই না।
মৃতদের ‘অজ্ঞাত ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা বা গণকবরে শুইয়ে দিতে দেখার পর থেকে আমার মাথায় বিষয়টা গেঁথে আছে। এর মধ্যে কিছু কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গও আছে, যা শনাক্তই করা যায়নি।
এটা কি সম্ভব যে আমার কাফনের ওপর শুধু ‘কালো/নীল ব্লাউজ পরা তরুণী’ লেখা থাকবে?
আমি কি ‘অজ্ঞাত ব্যক্তি’ হিসেবে মারা যাব, শুধুই একটি সংখ্যা হিসেবে?
আমি চাই, আমার আশপাশে থাকা প্রত্যেকে আমার গল্প মনে রাখুক। আমি কোনো সংখ্যা নই।
আমি সেই মেয়ে যে কিনা গাজায় কঠোর অবরোধ চলাকালে অন্য রকম পরিস্থিতিতে হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য সব জায়গায় কাজ খুঁজছিলাম। কারণ, অবরোধের কবলে পড়ে আমার বাবা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার চাকরি হারিয়েছেন।
আমি আমার পরিবারের বড় মেয়ে এবং আমি আমার বাবাকে সহযোগিতা করতে চাই। আমি চাই আমাদের থাকার জন্য একটি ভালো বাড়ি থাকুক।
অপেক্ষা করুন...আমি কিছুই ভুলতে চাই না।
আমি একজন শরণার্থী। আমার দাদা-দাদি শরণার্থী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলি দখলদারির কারণে তাঁদের নিজের জমি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।
আমার দাদা-দাদি গাজা উপত্যকায় যান এবং শহরের পশ্চিমে খান ইউনিসে শরণার্থীশিবিরে থাকতেন।
ওই শিবিরে আমার জন্ম, তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমাকে সেখানে জীবন কাটাতে দেয়নি।
২০০০ সালে ইসরায়েলি বাহিনী আমাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। দুই বছর আমাদের আশ্রয়হীন থাকতে হয়েছে। আমরা বসবাসের অযোগ্য একটি বাড়ি থেকে আরেকটিতে স্থানান্তরিত হতে থাকলাম। ২০০৩ সালে আইএনআরডব্লিউএ আল–ফুখারিতে আমাদের আরেকটি বাড়ি না দেওয়া পর্যন্ত এমন অবস্থাই চলতে থাকল।
কৃষিজমিতে ভরা এই এলাকা দারুণ। আমরা সেখানে জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। যেখানটায় আমরা থাকতাম, তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ইউরোপিয়ান হাউজিং’। সেখানে অবস্থিত ইউরোপিয়ান হাসপাতালের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়।
বাড়িটি ছোট ছিল। মা-বাবাসহ পাঁচজনের পরিবারের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। বাড়িতে বাড়তি রুমের প্রয়োজন ছিল, একটি লিভিং রুমের প্রয়োজন ছিল। রান্নাঘরে সংস্কার করানোর দরকার ছিল।
যা–ই হোক, প্রায় ১২ বছর আমরা সেখানে ছিলাম। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব, ২০১৫ সালের দিকে আমি বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য কাজ শুরু করলাম। আরাম করে থাকার মতো একটি বাড়ি বানাতে আমি তাঁকে সাহায্য করলাম। হ্যাঁ, আমরা সেটা করতে পেরেছিলাম। তবে তা খুব কষ্টসাধ্য ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর মাত্র তিন মাস আগে আমাদের বাড়ি তৈরির কাজ শেষ হয়।
হ্যাঁ, আমাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় ১০ বছর ধরে তিলে তিলে আমরা বাড়িটি পুনর্নির্মাণ করেছি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে আমরা বাড়ির কাজ শেষ করি।
যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজায় অবরুদ্ধ অবস্থা ও দুর্বিষহ জীবন নিয়ে আমি হিমশিম খাচ্ছিলাম। এরপর যুদ্ধ আমাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিল, আমার হৃদয়কে দুমড়ে–মুচড়ে দিল এবং আমি আমার মনোযোগের কেন্দ্র হারিয়ে ফেললাম।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমরা কিছুর জন্য লড়াই চালাচ্ছি। টিকে থাকার জন্য লড়ছি, ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় যেন মারা না যাই, তার জন্য লড়ছি। যেসব ভয়াবহতা আমরা দেখছি, তার জন্য যেন মনোবল না হারিয়ে ফেলি, সেটা নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করছি।
আমরা যেকোনো উপায়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। আমরা বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি। আমার জীবনে আমি চারটি বাড়িতে থেকেছি এবং কাছাকাছি জায়গায় ইসরায়েলি বোমা হামলার ঘটনায় প্রতিটি বাড়িই ধ্বংস হয়েছে।
আমাদের থাকার কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। যুদ্ধবিরতির আগে আমরা ৫০০ দিন আতঙ্কে কাটিয়েছি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুদ্ধের সময় আমি যা করিনি, তা হলো কান্না। আমি শক্ত থাকার চেষ্টা করেছি এবং আমার দুঃখ ও রাগ ভেতরে চেপে রেখেছি। এতে আমার হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ পড়েছে, এটি আরও দুর্বল হয়ে গেছে।
আমি আমার চারপাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সবার প্রতি ইতিবাচক ছিলাম এবং সমর্থন দিয়েছিলাম। হ্যাঁ, উত্তরের মানুষেরা ফিরে আসবে। হ্যাঁ, সেনাবাহিনী নেতজারিম থেকে সরে যাবে। আমি সবাইকে সাহস জোগাতে চেয়েছিলাম, যদিও আমার ভেতরে একটা বিরাট দুর্বলতা ছিল, যা আমি দেখাতে চাইনি।
আমার মনে হয়েছিল, যদি এটি দেখিয়ে ফেলি, তাহলে আমি এই ভয়াবহ যুদ্ধে শেষ হয়ে যাব।
যুদ্ধবিরতি ছিল আমার বেঁচে থাকার বড় আশা। আমার মনে হয়েছিল, আমি টিকে গেছি। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।
যখন লোকেরা ভাবছিল, যুদ্ধ কি আবার ফিরে আসবে? আমি তখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘না, আমার মনে হয় না, এটি আবার ফিরবে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।’
যুদ্ধ ফিরে এসেছে এবং আগের চেয়ে বেশি আমার কাছাকাছি চলে এসেছে। অবিরাম গোলাবর্ষণের কারণে ক্রমাগত ভয় নিয়ে বেঁচে আছি। তারা আমাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে—রকেট, বিমান ও ট্যাংকের গোলা। ট্যাংক থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ হয়, নজরদারি ড্রোন উড়তে থাকে, সবকিছুই ভয়ংকর।
আমি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সত্যিই ঘুমাইনি। তন্দ্রার ভাব হলেই বিস্ফোরণের শব্দে জেগে উঠি এবং দৌড়াতে থাকি। কোথায় যেতে চাইছি তা জানা থাকে না, কিন্তু আমি ঘরের ভেতর দৌড়াতে থাকি।
একনাগাড়ে আতঙ্কিত হতে হতে আমি আমার বুকের ওপর হাত দিয়ে ভাবি, এই হৃৎপিণ্ড আর বেশি সইতে পারবে কি না।
এ জন্য আমি আমার সব বন্ধুকে একটি বার্তা পাঠিয়েছি। আমি তাদের বলেছি, আমার গল্পটি নিয়ে কথা বলতে যেন আমি নেহাতই একটি সংখ্যা না হয়ে যাই।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমার আশপাশের এলাকা ধ্বংস করে দেওয়ায় আমরা অসহনীয় দিন কাটাচ্ছি। এখানে এখনো অনেক পরিবার বাস করছে। তারা চলে যেতে চায় না, কারণ বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টি মানুষকে শারীরিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়।
আমার মনে আছে, প্রথম বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাটি ছিল ২০০০ সালে। তখন আমার বয়স ছিল প্রায় আট বছর।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বুলডোজার খান ইউনিস আশ্রয়শিবিরে এসে আমার চাচার ও দাদার বাড়ি ধ্বংস করে দেয়। তারপর কোনো কারণে এগুলো আমাদের বাড়িতে এসে থেমে যায়। আমরা চলে গেলাম। ওই সময় পবিত্র রমজান মাস ছিল এবং আমার মা–বাবা ভেবেছিলেন যে আমরা পরে ফিরে আসতে পারব। আমাদের সাময়িকভাবে আশ্রয়ের জন্য তাঁরা একটি জরাজীর্ণ ঘরের সন্ধান পান।
আমরা যে আমাদের বাড়ি হারিয়েছি, এটা আমি মেনে নিতে পারিনি। তাই আমি সেই বাড়িতে ফিরে যেতাম যেখানে আমার দাদা-দাদির সঙ্গে কাটানো সুন্দর স্মৃতিগুলো ছিল। আমি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে মাকে দিয়েছিলাম।
ঈদের আগের রাতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল। ঈদুল ফিতরের প্রথম দিনে আমি ও আমার পরিবার সেখানে গেলাম। নতুন জামাকাপড় পরে ধ্বংসস্তূপে ঈদ উদ্যাপনের কথা আমার মনে পড়ে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমাদের কিছুই রাখতে দিচ্ছে না। তারা সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের মনে যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই তারা অবশিষ্ট রাখছে না। ভয়াবহ এই সেনাবাহিনীর হাত থেকে বিশ্ব যদি আমাদের না বাঁচায়, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে, আমার জানা নেই। জানি না, আমার হৃৎপিণ্ড অবিরত চলা এসব শব্দ আর বেশি নিতে পারবে কি না।
আমাকে কখনো ভুলে যাবেন না। আমি আমার জীবনের জন্য কঠিন লড়াই লড়েছি। সাংবাদিক ও শিক্ষক হিসেবে ১০ বছর আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, নিজেকে নিবেদিত করেছি।
আমার শিক্ষার্থীদের আমি ভালোবাসি। সহকর্মীদের সঙ্গে আমার সুন্দর স্মৃতি আছে।
গাজায় জীবনযাপন কখনোই সহজ নয়। তবে আমরা এটাকে ভালোবাসি। অন্য কোনো বাসভূমিকে আমরা ভালোবাসতে পারি না।
![]() |
| রুওয়াইদা আমির গাজায় ১০ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ছবি: আল–জাজিরার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া |
![]() |
| ২০২২ সালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রুওয়াইদা আমির। ছবি: আল–জাজিরার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া |
Monday, March 3, 2025
বাংলাদেশের এত বিশেষত্ব কী? by ড্যান মোজেনা
যারা বাংলাদেশের প্রতি আমার স্থায়ী ভালোবাসার কথা জানেন, তারা মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন করে জানতে চান- ‘বাংলাদেশের এত বিশেষত্ব কী?’ এই প্রশ্নটির একটি সরল উত্তর আছে। তা হলো- জনগণ, বাংলাদেশের চমৎকার মানুষগুলোই হলো এর কারণ। এ জন্যই আমার কাছে দেশটি এত স্পেশাল। রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দেশটির পুরো ৬৪টি জেলা সফর করেছি। যেখানেই সফরে গিয়েছি দেখেছি বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ- তার মধ্যে আছেন কৃষক, গ্রামের নারী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, মেডিকেল ওয়ার্কার, রাস্তার হকার, দোকানদার, ব্যবসায়ী, তৈরি পোশাকের শ্রমিকরা- তারা সবাই কঠোর পরিশ্রম করেন। তারা একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, সমৃদ্ধ, সুস্থ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য সৃজনশীলতার সঙ্গে কাজ করেন। যা ছিল ‘আন্তর্জাতিকভাবে তলাবিহীন ঝুড়ি’ খ্যাত দেশটির জন্য সুদূরপরাহত। ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন দেশটিকে নিয়ে ওই মন্তব্য করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিক।
স্বৈরাচারের আবেশ ও নিষ্পেষণে দেশটির জনগণ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। পুরো জাতি হিসেবে এর বিরুদ্ধে গত জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশি জনগণ তাদের ম্যাজিক ও বিস্ময়ের পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শন করেছেন। এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্ররা। তারা সেই ছাত্র, যারা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন- যেখানে তাদের নিজেদের, তাদের পরিবারের এবং সম্প্রদায়ের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে নাগরিকরা অবাধে এবং নিরাপদে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এই আশা করাটা কী খুব বেশি? আমি তা মনে করি না। এমনকি শিক্ষার্থীরাও মনে করেন না। তাই তারা নতুন বাংলাদেশের সন্ধানে অবিচল। দুঃখজনক হলো- এই জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে কেউ কেউ আত্মত্যাগ করেছেন।
‘এনাফ’ বা যথেষ্ট হয়েছে- এমনটা ঘোষণা দিয়ে নিষ্পেষণকে দূরে ছুড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা নয়। পূর্বে জনগণ মুক্তির যেসব প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তার ইতিটা ভালো হয়নি। কারণ, নিষ্পেষণকারী শক্তির নতুন করে আবির্ভাব হয়েছে এবং আবার জনগণের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। আমি মনে করি, এবার বিষয়টি ভিন্ন হবে। শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, পূর্বের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাতেই তাদের কাজ শেষ নয়। এটা হলো একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য তাদের যে বিরাট লক্ষ্য আছে তার একটিমাত্র পদক্ষেপ। ইতিহাস বলে যে, বিপ্লবীরা যখন ক্ষমতায় বিদ্যমান কাঠামোকে উৎখাত করে তাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অর্জন করে তখন মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার জন্য লড়াই শুরু হয়ে যায়। এটা হয় ততক্ষণ পর্যন্ত যখন একজন নেতা নেতৃত্বের শীর্ষে উঠে না আসেন এবং অন্য নেতারা হারিয়ে যান অথবা তাদের খারাপ কিছু ঘটে। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নিয়েছেন এবং একটি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। এ জন্য তাদেরকে বড় রকমের কৃতিত্ব দিতে হয়। তাদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে কুস্তি করার পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ থেকেছেন এবং তাদের এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোকিত মানুষ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। প্রফেসর ইউনূস একজন অনুপ্রেরণাদায়ক বাছাই। তার কোনো ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। তিনি নিজের জন্য কোনো ক্ষমতা চান না। তাকে আরও প্রমাণ দেয়ার কিছু নেই। এরই মধ্যে তিনি একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। আমি বিশ্বাস করি এই চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্য তিনি তার প্রিয় বাংলাদেশের জন্য একটি পথ বের করতে সরলভাবে সহায়তা করছেন।
এই বিপ্লব একটি মুক্ত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের কাছে দীর্ঘদিনের অধরা স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক ঐতিহাসিক সুযোগ। যে স্বপ্ন বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত কিন্তু উত্তাল ইতিহাসের দুঃখজনকভাবে বার বার চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে। সামনের পথ অপ্রত্যাশিত বিপদের (ট্রেচারাস)। বাংলাদেশ যখন নিজেকে পুনর্গঠনের জন্য লড়াই করছে, তখন কেউ কেউ চাইছে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ব্যর্থ হোক। উগ্রপন্থি এবং অন্যরা তাদের নিজেদের এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সুযোগ খুঁজছে। অন্যদের মনে ক্ষোভ ও ক্রোধ ভরা। বিগত সরকারের নৃশংসতার বাস্তবায়ন করে বা সুবিধা নিয়েছেন যারা তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে তৎপর তারা।
এই নেতিবাচক শক্তি অস্থিতি সৃষ্টি করছে। তারা এমন এক সময়ে জনগণের মধ্যে ঘৃণাকে এবং বিভক্তিকে গাঢ় করছে যখন বাংলাদেশিদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে একটি টেকসই গণতন্ত্র সৃষ্টির জন্য। যে গণতন্ত্র সব নাগরিকের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। এই লক্ষ্যে একমাত্র পথ খোলা আছে। তা হলো, প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বের অধীনে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। আমি আশা করবো এই ক্রান্তিকালে সব বাংলাদেশি এই সরকারকে সহায়তা করে অন্তর্বর্তী এই সরকারের পাশে থাকবেন। এই সরকারকে দেখতে সাহায্য করবেন যে, এটি বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক পথে চালু করার জন্য ঠিক কি করেছে, কোথায় ভুল করেছে এবং কোথায় এটি আরও ভালো করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সঠিকভাবে করতে পারে।
এবার গণতন্ত্র বিনির্মাণে বাংলাদেশের জয় হবেই নাগরিকদের মধ্যে এই আশা টেকসই করাটা হলো অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারকে বহুবিধ ফ্রন্টে কাজ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে আছে ক) সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। খ) মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক সেবা সরবরাহ করতে হচ্ছে। গ) দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি কার্যকর অভিযান চালাতে হচ্ছে। ঘ) এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা কর্মসংস্থান এবং জীবনমান উন্নত করবে। ঙ) বিগত সরকারের যারা জনগণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জঘন্য কাজ করেছে তাদের জবাবদিহিতা করানো। চ) পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা, যারা জনগণের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত কম পদক্ষেপ নিয়েছেন তাদেরকে দক্ষিণ আফ্রিকার মডেল অনুসরণ করে একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসন করা। এই প্রক্রিয়ায় এসব ব্যক্তি তাদের অতীতের পাপ সম্পর্কে জনগণের সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে, ভিকটিমদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং বাংলাদেশের উদীয়মান গণতন্ত্রের জন্য তাদেরকে প্রতিশ্রুতিশীল থাকতে হবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সংস্কার করতে হবে, যাতে বাংলাদেশিরা কার্যকরভাবে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পারেন, নতুন রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করতে পারেন অথবা বিদ্যমান বিরোধী দলগুলো তাদের নিজেদেরকে নতুন করে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করার মধ্যদিয়ে তা করতে পারে। এমন হলে দলীয় নেতাকর্মীরা অবাধে তাদের দলীয় নেতা বাছাই করতে পারবেন।
এসব চ্যালেঞ্জের গভীরতা এবং তীব্রতার বিষয়ে প্রশংসা করি আমি। তা সত্ত্বেও, আমি বাংলাদেশের জনগণের ওপর আস্থাশীল যে, অন্তর্বর্তী সরকারের অংশীদারিত্বের অধীনে এসব চ্যালেঞ্জের জয় বেরিয়ে আসবে। তাতে নির্বাচনী সংস্কার বেরিয়ে আসবে, যাতে নাগরিকরা অবাধে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। বাংলাদেশকে শুধু ভালোবাসেন এমন একজনের পক্ষ থেকে এটা কি শুধু ইচ্ছাপূরণের চিন্তা? আমি তা মনে করি না। বাংলাদেশিরা জানেন যে, এটা তাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তারা তাদের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বহুবার চুরমার হয়ে যেতে দেখেছেন। স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসাকে মেনে নেবেন না বাংলাদেশিরা। তারা গণতন্ত্রের চেয়ে কম কিছুকে মেনে নেবেন না।
(লেখক: বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তার এই লেখাটি অনলাইন দ্য ডেইলি স্টার থেকে অনুবাদ)

Saturday, January 25, 2025
‘মানুষ কেন মানুষ মারে’ by আবু এন এম ওয়াহিদ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সংক্ষেপে যা লিখেছিলেন তার মর্মার্থ দাঁড়ায় এরকম, অন্য প্রজাতির জন্তু জানোয়ারেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করলেও তারা একজন আরেকজনকে কখনো প্রাণে মারে না। আমরা জানি - কাকের মাংস কাক খায় না। বাঘ, বাঘকে খুন করে না। এমন কি একটা পিঁপড়াও আরেকটা পিঁপড়াকে কখনো বধ করতে উদ্যত হয় না। আহার নিয়ে ক্ষুধার্থ দুই কুকুর কাড়াকাড়ি করে। কামড়াকামড়িও করে। লড়াই শেষে যার গায়ে জোর বেশি সেই খাবারের দখল নেয়। দুর্বল কুকুর লেজ গুটিয়ে পালায়। এখানেই তাদের মধ্যকার সংঘাতের স্থায়ী মীমাংসা হয়ে যায়। একটা আরেকটাকে হত্যা করে না। করার প্রয়োজনও পড়ে না।
এছাড়া বিপরীত লিঙ্গের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও পশুকুলে অহরহ ঝগড়াঝাটি হতে দেখা যায়। কিন্তু কোনো সময়ই তা খুনখারাবি পর্যন্ত গড়ায় না। এখানেও দৈহিক শক্তিবলে একটা জিতে। অন্যটা হেরে রনে ভঙ্গ দেয়। ওই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে লেখক আরো বলেছিলেন, একই ধরনের দ্বন্দ্বে, মানুষ পশুর চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র হতে পারে। বাইবেল থেকে তিনি মানবজীবনের সূচনালগ্নে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের উদাহরণ টেনে এনেছিলেন। আমরা অনেকেই জানি, হাবিল-কাবিলের কথা মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআনেও আছে।
এবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্যের পরিধিকে বাড়িয়ে বিষয়টার আরেকটু গভীরে যেতে চাই। দেখতে চাই, মানুষের স্বজাতি নিধনের ডালপালা কতদূর বিস্তৃত ও প্রসারিত হতে পারে। পেটের খিদে ও যৌন প্রতিযোগিতায় প্রাণিকুলে স্বজাতির মধ্যে ঝগড়াঝাটি হয়। সংঘাতও বাঁধে। কিন্তু মানুষের মতো একটা আরেকটাকে হত্যা করে না। এর দু’টো কারণ থাকতে পারে। প্রথমতঃ যে বিষয়েই ঝগড়া হোক না কেন, এক পশুর প্রতি স্বজাতি আরেক পশুর একটা ন্যুনতম মমত্ববোধ বা দরদ থাকে। এজন্যে তাদের মারামারিতে একটা প্রাকৃতিক সীমারেখা টানা হয়ে যায় এবং তারা সচেতনভাবে কোনো সময়ই সেই লাল রেখা অতিক্রম করে না। এটা যদি ঠিক হয়, তাহলে পশুকুল অবচেতন বা অবুঝ নয়। আর তা যদি না হয়, তাহলে দ্বিতীয়টাই ঠিক, অর্থাৎ তারা স্বভাবজাতভাবেই মানুষের চেয়ে কম হিংস্র। কারণ তাদের লড়াইয়ের শেষ পরিণতি কখনো মানুষের মতো এত বীভৎস, এত মারাত্মক, এত ধ্বংসাত্মকএবং আত্মঘাতীহয় না। যেভাবেই দেখি না কেন, বিষয়টি সভ্য মানবকুলের জন্যে যে সম্মানসূচক নয় তা বলাই বাহুল্য।
এ ছাড়া মানুষের সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ের পরিধিটা পশুকুলের চেয়ে আরো অনেক গভীরে প্রোথিত ও প্রসারিত। মানুষে মানুষে সংঘাত শুধু বিত্ত-বৈভব ও নারীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যেই হয় না। হয় আরো অনেক কারণে। যেমন সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষের সাথে চলছে মানুষের নিরন্তর লড়াই। এ লড়াইয়ে অনেক সময় একজন আরেকজনকে বধ করতে দ্বিধাবোধ করে না। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতার মূল উৎস রাজনীতি। তাই রাজনীতিকে কেন্দ্র করে ঘটে অনেক ষড়যন্ত্র এবং খুনখারাবি। এ ছাড়াও, মানুষ যদি মনে করে কারো কারণে তার মানসম্মান অথবা সুনাম বর্তমানে নষ্ট হচ্ছে কিংবা ভবিষ্যতে হতে পারে, তবে সে তাকেও হত্যা করতে প্রবৃত্ত হতে পারে। মানুষের মধ্যে ভাড়াটে খুনিও থাকে। টাকার বিনিময়ে একজনের নির্দেশে ওই জাতীয় খুনিরা সহজেই আরেকজনকে নিধন করে ফেলতে পারে। তবে এরও চূড়ান্ত লক্ষ্যের মধ্যে অর্থবিত্ত, ক্ষমতা, মানসম্মান ও নারীই প্রধান। মানুষ স্রেফ রাগের বশবর্তী হয়েও মানুষকে মেরে ফেলতে সচেষ্ট হয়। তবে রাগেরও মূল কারণ হতে পারে টাকাপয়সা, জমিজমা, সম্ভ্রম, কিংবা এজাতীয় কোনো অনুষঙ্গ। অনেক সময়ে মানুষ মদ-গাঁজা খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে বিবেকবুদ্ধি হারিয়ে সামান্য কারণেও প্রতিপক্ষের প্রাণ হরণ করতে পারে। অনিচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা বশতঃও মানুষের হাতে মানুষের মৃত্যু অসম্ভব নয়। মিল কারখানা ও রাস্তাঘাটে যন্ত্রযান চালাতে গিয়েও একজন আরেকজনকে মেরে ফেলতে পারে। মনুষ্যকূলে আরেকটি ঘটনা ঘটতে পারে - পশুকুলে যার কোনো আশঙ্কা নেই। কিছু কিছু মানসিক বিকারগ্রস্ত লোক উদ্দেশ্যহীনভাবে অকারণেও মানুষ মারতে পারে।
পশুর সাথে পশুর লড়াইয়ের মীমংসা হয় কেবলমাত্র দৈহিক শক্তির ভিত্তিতে, অর্থাৎ যে দুর্বল সে সবলের কাছে হেরে পালিয়ে যায়। নতুন করে লড়াইয়ের জন্যে ফের ঘুরে দাঁড়ায় না। কিন্তু মানুষের মধ্যকার সংঘাতে জয়-পরাজয়ের মীমাংসা শুধু গায়ের জোরেই হয় না। এখানে আরো বিবেচ্য বিষয় আছে। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী। সে শরীরে দুর্বল হলে পালিয়ে যাওয়ার পরও নতুন বুদ্ধি এঁটে সবলকে হারাবার নিমিত্তে নতুন উদ্যমে নতুন ফন্দি নিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে আবার আক্রমণ রচনা করতে পারে। পশুর বেলা বুদ্ধিবৃত্তিক পুনরাক্রমণের কোনো অবকাশ থাকে না। এখানে আরেকটা ব্যাপার থাকতে পারে। মানুষের স্মৃতিশক্তি অনেক তীক্ষ্ণ। তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী। শক্তিমান প্রতিপক্ষের কাছে দুর্বল মানুষটা প্রথমবার হেরে গিয়ে পশুর মতো পালিয়ে গেলেও সে পরাজয়ের কথা, বেদনার কথা, অপমানের কথা সহজে ভুলে না। আর ভুলে না বলেই সে নতুন করে লড়াই পরিকল্পনা নিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। যেহেতু দুর্বল একাজ করতে পারে তাই সবল তাকে আগেই হত্যা করারও চেষ্টা করে এবং অনেক সময় সফলও হয়।
আরেকটা ব্যাপার আছে বাইবেল এবং কোরআনে যার যোগসূত্র পাওয়া যায়। মানুষের পেছনে ক্রমাগত কাজ করে যায় শয়তান বা ইবলিস। শয়তানের ধর্মই হচ্ছে মানুষকে খারাপ কাজে কুমন্ত্রণা দেওয়া ও ভালো কাজ থেকে দূরে রাখা। খুনখারাবি একটি জঘন্য অপরাধ। এটা শয়তানের খুব প্রিয় কাজ। সে এমন কাজে সর্বদা মানুষকে প্ররোচিত করে থাকে। কোনো কোনো সময় সফলও হয়। শয়তান যখন স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে বেরিয়ে আসে তখন সে আল্লাহর কাছে এই শক্তি চেয়ে নিয়েছে যাতে সে সব সময় মানবসন্তানকে খারাপ কাজে কুমন্ত্রণা দিতে পারে। প্রভাবিত করতে পারে। জন্তু-জানোয়ারের পেছনে লাগার জন্যে শয়তান এমন বর আল্লাহর কাছে চায়নি। পায়ওনি।
পশুর পাশবিকতার সঙ্গে মানুষের হিংস্রতার আরেকটা বড় পার্থক্য আছে। মনুষ্যসন্তান পশুকুলের চেয়ে অনেক বেশি সমাজবদ্ধ জীবন-যাপন করে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করে। মানুষ ব্যক্তিগত ও সাষ্টিক পর্যায়ে অন্তর্গতভাবে বৈষয়িক ও স্বার্থপর। তাই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যখন-তখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো সময় এ নিয়ে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে বিধ্বংসী যুদ্ধ বেঁধে যাওয়াও অসম্ভব নয়। যুদ্ধে স্ব স্ব দেশের সীমানা রক্ষা করা যার যার সেনাবাহিনীর পবিত্র দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। এ জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক দেশের সেনাবাহিনী আরেক দেশের সৈন্যদের এমন কি বেসামরিক জনগণকেও হত্যা করতে পারে। এতে দেখা যায় মানুষ যেমন বদ মতলবে মানুষ মারতে পারে তেমনি আবার সৎ ও মহৎ কারণেও মানুষের প্রাণ সংহার করতে দ্বিধা করে না। পশুদের মধ্যে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
পবিত্র কোরআনের সূত্র ধরে আরেকটা কথা বলা যায়। আল্লাহ পশুকে এমন স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে, তারা সবসময়ই পশুর মতোই আচরণ করে। পক্ষান্তরে মানুষকে তিনি বানিয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ অবয়বে। মহৎ গুণাবলী দিয়ে। তথাপি সময় সময় সে পশুর মতো আচরণ করতে পারে। আবার কখনোবা জেদ মেটাতে পশুর চেয়েও অনেক নিচে তার অবনমন ঘটাতে পারে।
সাম্প্রতিক কালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। মানুষ শত্রু নিধনের অকল্পনীয় ও সীমাহীন শক্তি সঞ্চয় করেছে। তারা এখন একটি মাত্র বোমা-বিস্ফোরণে হাজার হাজার এমনকি লক্ষ লক্ষ মানুষও মেরে ফেলতে পারে। আজকাল রিমোট ডিভাইসের মাধ্যমে কোলেটারেল ড্যামেজ ছাড়াও কোনো বিশেষ সময়ে, বিশেষ জায়গায়, বিশেষ টার্গেটকে নীরবে উড়িয়ে দেওয়া যায়। এগুলো পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে। রাষ্ট্রীয় খরচে। তবে জঘন্য গণহত্যা ও নগ্ন গুপ্তহত্যার সব কলা-কৌশল শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। মানুষ-মারার ‘মহোৎসব’-এর এই নতুন মাত্রার কথা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছেন আমার অগ্রজতুল্য বন্ধু, অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক আনিসুল ইসলাম।
এই আলোচনাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেছেন মিশরীয় কৌতুকাভিনেতা বাসাম ইউসুফ। তিনি বলছেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যাঁরা অল্প সময়ে সহজে অধিক মানুষ মারতে পারে তাঁর জন্যে কেবল মারাত্মক মারণাস্ত্র আবিস্কার করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। বিশ্বজনমত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তারা অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে আরো কয়েকটি কাজ করেছে। তারা প্রথমে অপবাদ ও অপমান সহকারে শত্রুদের একটি অপ-নাম কিংবা বদ-নাম দিয়ে থাকে। তারপর খারাপ নামধারীদের নিধন করার অযুহাত হিসেবে মনগড়া একটি চমকপ্রদ আখ্যান (Narrative) তৈরি করে। ‘ওরা ‘খারাপ মানুষ’। ওরা ‘অমানুষ’। ওদের মারাই যায়।’ এ প্রসঙ্গে বাসাম ইউসুফ আরো কঠিন ও চমৎকার একটি কথা বলেছেন। যারা শত্রুর নামে মানুষ মারছে তারা জানে না, ‘প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের আপন মনুষ্যত্বকেই নিরন্তর বলি দিয়ে যাচ্ছে।’
পুনশ্চ: সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবি-ঔপন্যাসিক Ñ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রশ্নের যে উত্তর ও ব্যাখ্যা আমি দেওয়ার চেষ্টা করেছি তার সবটুকু আমার নিজের নয়। কিছু আমার। কিছু এখান-ওখান থেকে কুড়িয়ে তোলা। সে যাই হোক, সুনীলবাবু বেঁচে থাকলে কি তিনি আমার এ বিশ্লেষণের সঙ্গেসহমত পোষণ করতেন? আপনাদের কী মনে হয়?
লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক - টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি;
এডিটর - জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ। Email: wahid2569@gmail.com
Friday, December 27, 2024
মির্জা গালিবের যত বিপত্তি by জাভেদ হুসেন
বিচারক উঠে নিজের চেম্বারে রওনা হয়েছেন, মৃদুভাষী উকিল একটা কবিতার পঙ্ক্তির দ্বিতীয় লাইন পড়লেন:
‘কওন জিতা হ্যাঁয় তেরে জুলফ কে সর হোতে তক’
(কে বাঁচে তোমার কেশগুচ্ছ সাজিয়ে নেওয়া পর্যন্ত?)
কবিতা শুনে বিচারক থেমে গেলেন। উকিল সাহেবকে বললেন, প্রথম লাইনটাও পড়ুন। উকিল পড়লেন:
‘আহ কো চাহিয়ে ইক উম্র আসর হোতে তক’
(একটা দীর্ঘশ্বাসের ফল ফলতে একটা জীবন দরকার)
বিচারক চলে যাওয়ার আগে আদালতের কর্মচারীকে বললেন, এই মামলার তারিখ আগামী সপ্তাহে রাখবেন। বিচারকের নাম তিরথ সিং ঠাকুর। উকিল ছিলেন নাজমি ওয়াজিরি। মামলা চলছিল দিল্লি হাইকোর্টে। আর শেরটা মির্জা গালিবের।
মির্জা গালিব এই মামলায় খোদ উকিলের পরিত্রাতা হলেন। কিন্তু নিজের জীবনে ঝুটঝামেলা তাঁর পিছু ছাড়েনি। অর্থাভাব, পাওনাদারের অপমান আর আদালতে নালিশ, কয়েদবাস—কী ছিল না তাঁর জীবনে?
পেনশনের ঝামেলা
আইন, মামলা আর আদালতের সঙ্গে মির্জা গালিবকে মোটামুটি সারা জীবনই কাটাতে হয়েছে। তাঁর সৈনিক বাবা মির্জা আবদুল্লাহ বেগ মারা যান ১৮০৩ সালে। গালিবের বয়স তখন ৫। পরিবারের দায়িত্ব তুলে নেন চাচা মির্জা নসরুল্লাহ বেগ।
১৮০৬ সালে চাচাও মারা গেলেন দুর্ঘটনায়। পরিবারের পেনশন ঠিক হলো বছরে ১০ হাজার টাকা। সে টাকা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল ফিরোজপুর ঝিরকার জমিদারির ওপর। ইংরেজদের চাপিয়ে দেওয়া পেনশনের টাকা দিতে জমিদারদের খুব আগ্রহ থাকার কথাও নয়। পেনশনের টাকা নেমে এল বছরে তিন হাজার টাকায়। শেষে বিভিন্ন দাবিদারদের মধ্যে ভাগ হয়ে গালিবের ভাগে এল মাসে ৬২ টাকা ৫০ আনা।
গালিবের জীবনের অর্ধেক কেটেছে পেনশনের প্রাপ্য টাকা আদায় করতে দেনদরবার আর মামলা করে। প্রথমে প্রভাবশালী বন্ধুদের সহায়তা নিয়ে ব্যর্থ হয়ে মামলা করেছেন। সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।
দেনদরবারে কলকাতায়
গালিবের বয়স যখন ১৪ বছর, ১৮১১ সালে পারিবারিক বন্ধুদের পরামর্শে দিল্লির ব্রিটিশ রেসিডেন্ট স্যার চার্লস মেটকাফের কাছে দরবার করলেন। সেখান থেকে জানলেন, গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিল উইলিয়াম এমহার্স্ট ছাড়া এ সিদ্ধান্ত আর কেউ দিতে পারবেন না। এমহার্স্ট সাহেবের দপ্তর ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায়।
গালিব যুবক বয়সে, ১৮২৬ সালে রওনা দিলেন কলকাতায়। পৌঁছালেন দেড় বছর পর। পথে বিভিন্ন জায়গায় থামলেন। বিভিন্ন দরবারে অতিথি হলেন। কাশি দেখে অভিভূত হয়ে লিখলেন ফারসি মসনভি, ‘চারাগে দ্যায়ের’, মানে মন্দিরের প্রদীপ। কলকাতায় গিয়ে পৌঁছালেন ১৮২৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। থাকলেন দেড় বছর।
গালিব শিগগিরই ব্রিটিশ চিফ সেক্রেটারি এন্ড্রু স্টারলিং আর তাঁর সহযোগী সাইমন ফেজারের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে ফেললেন। বিষয় উত্থাপিত হলো গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিলের দরবারে। তিনি জানালেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছু করার নেই। দিল্লির রেসিডেন্ট সাহেব যদি মামলার দায়িত্ব দেন, তাহলে তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
এর মধ্যে দিল্লির রেসিডেন্ট ম্যাটকাফ সাহেব বদলি হয়ে গেছেন। বদলিতে এসেছেন এডওয়ার্ড কোলব্রুক। এই সাহেবকে গালিব ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। গালিব দিল্লির বিখ্যাত উকিল পণ্ডিত হিরা নন্দকে দায়িত্ব দিলেন রেসিডেন্টের দরবারে বিষয় সুরাহা করার। ডাকযোগে কাগজপত্র পাঠালেন। মামলা চালানোর খরচ জোগাড় হলো কিছু দামি জিনিসপত্র বিক্রি করে। ওকালতনামা পাঠানো হলো। এর মধ্যে কোলব্রুক সাহেব বদলি হয়ে গেলেন। নতুন রেসিডেন্ট হলেন উইলিয়াম ফ্রেজার। আগের ওকালতনামা বাতিল হলো। সব চেষ্টা গেল জলে।
এ সময় গালিব কলকাতার সদর দিওয়ানি আদালতে আবেদন করলেন। এই আদালতও জানালেন যে মামলায় তাঁদের এখতিয়ার নেই। ব্যর্থ মনোরথ গালিব দিল্লিতে ফিরলেন ১৮২৯ সালের আগস্টে। তবে নতুন যুগের কলকাতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি লিখেছিলেন:
‘কলকাতার কথা মনে করিয়ে দিলে হে বন্ধু
যেন আমার বুকে তির মারলে, হায় হায়।’
এদিকে দিল্লিতে রেসিডেন্টের দরবারেও মামলা খারিজ হয়ে গেল। গালিব আপিল করলেন লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালকদের আদালতে। ফলাফল শূন্য।
ফ্রেজার হত্যা মামলা
লন্ডন থেকে আবেদন খারিজ হওয়ার পর গালিবের স্ত্রী উমরাও বেগমের চাচাতো ভাই বললেন যে তিনি দিল্লির রেসিডেন্ট ফ্রেজার সাহেবকে পেনশনের জন্য রাজি করাতে পারবেন। তবে এর জন্য খরচাপাতি লাগবে। গালিব আবার টাকা ধার নিয়ে দিলেন।
এর কিছুদিন পরেই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল। ১৮৩৫ সালের ২২ মার্চ ফ্রেজার সাহেব খুন হলেন। কিসনগড়ের রাজার বাড়িতে পার্টি শেষ করে ফিরছিলেন রাতে। পথে আততায়ী গুলি করে তাঁকে হত্যা করে। পুলিশ আততায়ীকে খুঁজে গ্রেপ্তার করে। নাম করিম উদ্দিন। জেরায় তিনি স্বীকার করেন যে হত্যার নির্দেশ পেয়েছেন নওয়াব শামসউদ্দিনের কাছ থেকে। উমরাও বেগমের যে ভাই গালিবের মামলা ফ্রেজার সাহেবের কাছে তদবির করছিলেন, শামসউদ্দিন তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই। শামসউদ্দিনদের জমিদারি থেকেই গালিবের পেনশনের টাকা আসত। তা নিয়ে শামসউদ্দিনের আপত্তি ছিল। বিবাদও ছিল সৎভাইয়ের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে। বিবাদে ফ্রেজার শামসউদ্দিনের পক্ষে ছিলেন না।
আরও সমস্যা ছিল। শামসউদ্দিন বিয়ে করেছিলেন ওয়াজির খানম নামের এক নারীকে। ওয়াজির ছিলেন একজন তাওয়ায়েফ। ফ্রেজারের তাঁর সঙ্গে আগে থেকে সখ্য ছিল। সব মিলিয়ে শামসউদ্দিন গ্রেপ্তার হলেন। রায়ে তাঁর হলো ফাঁসি। ফ্রেজার ছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহী লোক, গালিবের বন্ধুস্থানীয়। আর নওয়াব শামসউদ্দিন তাঁর বিরোধী। আবার পরিবারের আত্মীয়। হত্যা মামলায় গালিব জড়িয়ে পড়লেন। দিল্লির ম্যাজিস্ট্রেট মামলায় তাঁর জবানবন্দি নিয়েছিলেন।
শামসউদ্দিনের ফাঁসিতে দিল্লিতে প্রবল আলোড়ন শুরু হলো। অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস, তিনি নির্দোষ। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের শিকার। ফাঁসির পর তিনি শহীদের মর্যাদা পেয়ে গেলেন প্রায়। আর গালিব পুলিশকে জবানবন্দি দিয়ে দিল্লিবাসীর কাছে তকমা পেয়ে গেলেন বিশ্বাসঘাতকের। এটা অবশ্য অন্যায্য ছিল। প্রথমত, জবানবন্দি তাঁকে দিতেই হতো। আর দ্বিতীয়ত, পুরো ঘটনায় তাঁর ক্ষতিই হয়েছিল। একদিকে ফ্রেজারের মতো প্রভাবশালী বন্ধুস্থানীয় লোক হারালেন। অপর দিকে ঝিরকার নবাবদের জমিদারি বাজেয়াপ্ত হলো। তিনি চিরকালের মতো পেনশন বাড়ানোর সুযোগ হারালেন।
বাকি জীবন গালিবের আর্থিক দৈন্যে কেটেছে। নিজের অবস্থা যেমন হোক না কেন, বাড়িতে সব মিলিয়ে পোষ্য ছিল ২০ জন। কেমন করে সংসার চালাতেন, কোত্থেকে আসত টাকা? বন্ধু সুরুরকে লেখা ১৮৬২ সালের এক চিঠিতে এর কিছু বয়ান পাওয়া যায়, ‘বেশ কিছুদিন পর দিল্লির বাদশাহ আমাকে মাসে ৫০ টাকায় নিয়োগ দিলেন। যুবরাজ বরাদ্দ করলেন বছরে ৪০০ টাকা। এর দুই বছর পরে যুবরাজ মারা গেলেন। আমার কাসিদা পড়ে আওধের বাদশাহ ওয়াজিদ আলী শাহ বছরে ৫০০ টাকা বরাদ্দ করলেন। তিনিও দুই বছরের বেশি টিকে থাকতে পারলেন না। মানে, বেঁচে তিনি এখনো আছেন, কিন্তু তাঁর রাজত্ব নেই। দিল্লির রাজত্বের প্রাণ একটু বেশি শক্ত ছিল। আমাকে সাত বছর খাবার জোগানোর ব্যবস্থা করে তারপর ধ্বংস হলো।’
চৌসরের দায়, জুয়ার দায়
মোগল আমলে সামান্য টাকা বাজি রেখে চৌসর খেলা খুব একটা দোষের কিছু ছিল না। কিন্তু ইংরেজদের নতুন শাসনে তা হলো দণ্ডনীয় অপরাধ। গালিব পাশা ফেলে চৌসর খেলতেন নিজ ঘরে। কাছের কিছু বন্ধুর সঙ্গে। আগের কোতোয়াল ছিলেন গালিবের বন্ধু। ফলে কখনো সমস্যা হয়নি। সেই কোতোয়াল বদলি হলেন। নতুন কোতোয়াল এলেন ফয়জুল হাসান খান। তিনি মোগল ক্ষয়িষ্ণু অভিজাতদের মান-সম্মানের ধার ধারতেন না।
জুয়া খেলার অভিযোগে গালিবের বাড়িতে পুলিশের অভিযান হয়েছিল। জরিমানা গুনতে হয়েছিল ১০০ টাকা। তাহলে এরপরও কেন তিনি ঘরে বসে টাকা বাজি রেখে পাশা খেলছিলেন? কারণ বোধ হয় এই যে তিনি ইংরেজ প্রশাসনে বেশ কিছু প্রভাবশালী বন্ধু পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, তেমন কিছু হলে তাঁরা রক্ষা করবেন। কিন্তু গালিবের ভুল ভাঙল। তিনি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হলেন। বিচার আর শাস্তিও হলো। ২০০ টাকা নগদ অর্থদণ্ড আর ছয় মাস সশ্রম জেল। ৫০ টাকা বাড়তি দিলে বিনাশ্রম কয়েদ।
পুরো ছয় মাস গালিবকে জেল খাটতে হয়নি। তিন মাস পর মুক্তি পেয়েছিলেন। কী কারণে এই রেয়াত, তা আজ আর জানা যায় না। তবে এ ঘটনায় গালিবের মন ভেঙে গিয়েছিল। অস্তমিত বংশগৌরব, তবু মনে গর্ব ছিল, বড় কবি তিনি। কিন্তু এই কয়েদ খাটার ঘটনায় কাছের মানুষদের ওপর আস্থাও যে কবির টলে গিয়েছিল, জেলে কাটানো সময় নিয়ে লেখা একটা ফারসি কবিতায় তা বোঝা যায়:
‘পুরোনো বন্ধুরা, বৃথা করো না কষ্ট
আমাকে দেখতে আসার
নেড়ো না কড়া আমার দরজার, কে খুলবে আর এই দ্বার
বন্দী তস্কর আমার বন্ধু এখন, তারাই আমার কদরদান
তাদের কোলাহল থামিয়ে বলি,
“বাইরে নেই বিশ্বস্ততা বলে কিছু”’
দেনার দায়
এদিকে বাজারে দেনা বেড়ে অবস্থা করুণ। কলকাতায় গিয়ে পেনশনের টাকা ফিরে পাবেন বলে আশা ছিল। সে আশার গুড়ে বালি পড়েছে। পাওনাদারেরা সব জেনে গেছেন সে কথা। তাঁরা টাকার জন্য অস্থির। বাড়ির সামনে এসে ভিড় করে থাকেন। হইহল্লা করেন। বিপদের এই ঘনঘটা দেখে গালিব নাকি বলেছিলেন, ‘খোদার পাঠানো সব বিপদ দুনিয়ায় নেমেই জিজ্ঞাসা করে, গালিবের বাড়িটা কোথায়?’
তবে স্বভাবসিদ্ধ রসিকতা তিনি ভোলেননি। দেনাদারদের হাতে নাজেহাল হয়ে এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘মানুষ অন্যের কষ্ট দেখলে আনন্দ পায়। আমিও এক কায়দা শিখে নিয়েছি। নিজেকে আরেকজন ভেবে নিয়ে নিজের বিপদে নিজেই মজা পাই।’
মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই দেনার টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন গালিব। বিভিন্ন জায়গায় অর্থসহায়তা চেয়ে চিঠি লিখেও কোনো সাড়া পাননি। আর চিন্তা ছিল স্ত্রী উমরাওকে নিয়েও। তাঁর মৃত্যুর পর নিকটজন বলতে এমন কেউ ছিল না যে এই নারীর সহায় হবে।
নিজের দেনা শোধ করতে না পারলেও মির্জা গালিব আমাদের ঋণী করে গেলেন। এখনো অনেক অজ্ঞাত উর্দু কবি নিজেদের কবিতা গালিবের বলে প্রচার করেন। তবে সেসব জাল কবিতা কোনোমতেই গালিবের নয়, পড়লেই বোঝা যায়।
হায় রে, মৃত্যুর পরও কবিতা লেখা থামল না গালিবের!

Wednesday, December 11, 2024
টেকসই উন্নয়নের অন্তরায় তামাক by এবিএম জুবায়ের
তামাক ব্যবহারজনিত ব্যাপক মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি এসডিজি’র তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রা- সুস্বাস্থ্য অর্জনের অন্যতম অন্তরায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর মাসিক খরচের ৫ শতাংশ তামাক ব্যবহারে এবং ১০ শতাংশ তামাক ব্যবহারজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হয়। তামাকজনিত মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ফলে বছরে আরও ৬৫২.৮৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষয়ক্ষতি হয়। কাজেই তামাক ব্যবহারে দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হয় (লক্ষ্যমাত্রা-১)। ক্রমবর্ধমান তামাক চাষের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি (লক্ষ্যমাত্রা-২) ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা (লক্ষ্যমাত্রা-৪) এবং লিঙ্গ সমতা (লক্ষ্যমাত্রা-৫) টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলেও বাংলাদেশের বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন চলছে মূলত শিশু ও নারী শ্রম ব্যবহার করে। কারখানার শিশু শ্রমিকরা পাচ্ছে না শিক্ষা লাভের সুযোগ। বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার না করেও, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু। এই ব্যাপক বৈষম্য টিকিয়ে রেখে, টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। এ ছাড়াও তামাক ব্যবহারের কারণে কর্মক্ষম মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ করে, যা দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে (লক্ষ্যমাত্রা-৮) বাধাগ্রস্ত করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী তামাক ব্যবহারজনিত বৈশ্বিক মৃত্যুর পরিমাণ বছরে ৮০ লাখেরও বেশি এবং এই মৃত্যুভারের ৮০ ভাগই বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে। এধরনের বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ বৈষম্য হ্রাস (লক্ষ্যমাত্রা-১০) ব্যতীত টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভবপর নয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা শহরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি হলেও পাবলিক প্লেস-এ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হওয়ার চিত্র ঠিক উল্টো। শহরের আবদ্ধ স্থানে বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান। যা টেকসই নগর ও তার অধিবাসীদের (লক্ষ্যমাত্রা-১১) নিরাপদ রাখার বড় অন্তরায়। তামাক চাষ সারা পৃথিবীর ২-৪ শতাংশ বন উজাড়ের জন্য দায়ী। বাংলাদেশে তামাকচুল্লিতে পাতা পোড়াতে গিয়ে উজাড় হচ্ছে দেশের ৩০ শতাংশ বন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের (লক্ষ্যমাত্রা-১৩) ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল কোস্টাল ক্লিন-আপ বাংলাদেশসহ ১২২টি দেশের সাগর থেকে যেসব বর্জ্য সংগ্রহ করে তার মধ্যে ১ম স্থানে ছিল সিগারেট ফিল্টার। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন সিগারেট ফিল্টার প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষপর্যন্ত সাগরে দূষণ সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, সিগারেট ফিল্টার প্রকৃতিতে মিশে যেতে ১২ বছর পর্যন্ত সময় নেয়। কাজেই সিগারেট সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ব্যবস্থার (লক্ষ্যমাত্রা-১৪) অন্যতম অন্তরায়। সর্বোপরি, তামাকপণ্য উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহারজনিত ক্ষয়ক্ষতি প্রভৃতি সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তামাক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অন্যতম অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তামাক নিয়ন্ত্রণ তথা এফসিটিসি-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পূর্বশর্ত বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশে এফসিটিসি-এর কার্যকর বাস্তবায়ন মোটাদাগে দুটো কারণে অত্যন্ত জরুরি। এক: এফসিটিসি বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে এসডিজি’র তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রা ‘স্বাস্থ্যসম্মত জীবনমান নিশ্চিতকরণ এবং সব বয়সের সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা’ অর্জন সম্ভব নয়। দুই: এসডিজি’র অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও তামাক একটা বড় ধরনের বাধা, যা এফসিটিসি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই অপসারণ করতে হবে।
উপরন্তু, এফসিটিসি’র আর্টিকেল ৬ অনুযায়ী তামাকপণ্যের উপর কার্যকরভাবে কর আরোপের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করা গেলে একদিকে এর ব্যবহার কমবে অন্যদিকে রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। অতিরিক্ত এই অর্থ এফসিটিসি’র বাস্তবায়ন ও এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গৃহীত কর্মকাণ্ডের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে বড় হুমকি তামাক। তবে এফসিটিসি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তামাকজনিত বাধা অপসারণের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আর এ লক্ষ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি এফসিটিসি-এর আলোকে শক্তিশালীকরণ এবং এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে তামাক কোম্পানি সর্বদা তৎপর থাকবে এফসিটিসি বাস্তবায়ন যেন কখনই সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় না আসে। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হবে কোম্পানির কূটকৌশলে বিভ্রান্ত না হয়ে এফসিটিসি’র বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসা এবং জনস্বাস্থ্যকে সবার উপরে রেখে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা।
ইমেইল: basharzubair@hotmail.com

Sunday, October 6, 2024
বড় মানুষদের ভাঁড় চাটুকারগণ by শায়ের খান
ভাঁড় বা চাটুকার এই অঞ্চলের এক চমকপ্রদ চরিত্র। এদের দেখা যায় ধনবান বা ক্ষমতাবানদের আশপাশে। এই রাজা-বাদশাহ-সওদাগর কিংবা প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী এমন। এদের চারপাশেই নিজেদের সেট করে নেয় ভাঁড় চাটুকাররা। এরা ছলেবলে মূল ব্যক্তিকে প্রাচীরের মতো ঘিরে রাখে। একসময় ভাঁড় চাটুকার হয়ে ওঠে আসল ব্যক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাঁশের চেয়ে যেমন কঞ্চি বড়।
এ অঞ্চলে আমরা এমন এক ভাঁড়ের নাম জানি- গোপাল ভাঁড়। সে ছিল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পালিত ভাঁড়। নির্মম সত্য হচ্ছে, ইতিহাস রচিত হয়েছে গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।
মোগল সম্রাট আকবরও ভাঁড় চাটুকার পছন্দ করতেন। কথিত আছে, সম্রাটের এক পরোটা ভাজা হতো এক কড়াই ঘি’য়ে আর এক বাটি শাহী হালুয়া রান্না হতো দশ কেজি ঘি’য়ে। এমন তেলে-ঘিয়ের মানুষ একটু তেলবাজি পছন্দ করবেন-এটাই স্বাভাবিক। তার সেনাপতি মানসিংহ ছিল শিখ ঘরানার। মানসিংহের ফুফুকে আকবর করলেন বিয়ে। মানে সেনাপতিকে বানিয়ে ফেললেন ভাতিজা। হয়তো আমাদের এই ঐতিহাসিক ফুফু বলিউডের সায়রা বানু বা শিল্পা শেঠীর চেয়ে কম সুন্দরী ছিলেন না।
সম্রাট আকবর ছিলেন বড় মাপের মোগল। যে বাংলা নববর্ষ পালনে ঢাকার ভং ধরা এলিটরা ২০০০ টাকা দিয়ে মাটির শানকিতে পান্তা ইলিশ খায়, তাদের বেশির ভাগেরই ধারণা এই নববর্ষ রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতন থেকে এসেছে। আসলে এই পহেলা বৈশাখ চালু করেছিলেন সম্রাট আকবর।
খাজনা দিতে অস্বীকার করায় ঢাকার ঈশা খাঁ-কে শায়েস্তা করতে আকবর দিল্লি থেকে ঢাকায় পাঠান ভাতিজা মানসিংহকে। ঈশা খাঁ’র সঙ্গে যুদ্ধে মানসিংহের তরবারি ভেঙে যায়, তিনি হেরে যান। যুদ্ধটা হয়েছিল আমাদের ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাছে। কাঁচপুর ব্রিজ পার হলে যে জায়গাটা, সেখানে। মানসিংহের এই পরাজয় এই বার্তাই দেয় যে, আপনি যত বড় আর ক্ষমতাবানই হোন, স্বজনপ্রীতি আর চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় দিলে আপনি ডুববেন ।
আকবরের নবরত্নের একজন ছিলেন বীরবল। উনাকে অনেকে ভাঁড় ভাবলেও আসলে ছিলেন একজন ফিলোসফার। তার ছিল সুতীক্ষ্ণ সেন্স অফ হিউমার আর পাণ্ডিত্য। তাকে সঠিক মূল্যায়িত করতে না পারাটা ছিল আকবরের আরেক ব্যর্থতা।
আমরা দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর কোনো চাটুকার খুঁজে পাইনি। তার ছিল বিশ্বস্ত সহচর যুদ্ধবাজ স্ট্যালিয়ন ঘোড়া ব্যুসেফেলোস। এই ব্যুসেফেলোসকে নিয়ে আলেকজান্ডার বহু যুদ্ধ জয় করেছেন। ব্যুসেফেলোস এশিয়ার এক দেশে যুদ্ধে আহত হয়ে মারা গিয়েছিল। তার স্মরণে আলেকজান্ডার জায়গাটার নাম রেখেছিলেন- ব্যুসেফেলা। ধারণা করা হয় পাকিস্তানের পাঞ্জাবের জেলোম শহর হচ্ছে সেই প্রাচীন ব্যুসেফেলা। চাটুকারের বদলে বিশ্বস্ত সাহসী ব্যুসেফেলোসকে নিয়ে আলেকজান্ডার জিতেছিলেন সব যুদ্ধ।
আরেক দিগ্বিজয়ী বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্টও কোনো ভাঁড় চাটুকার পছন্দ করতেন না। একটা ছোট্ট ঘটনায় সেটা বোঝা যাবে।
নেপোলিয়ন দেখতে ছিলেন ছোটখাটো। একদিন তার বিশাল লাইব্রেরির উঁচু শেলফ থেকে একটা বই নিতে তার কষ্ট হচ্ছিলো। পাশে দাঁড়ানো এক জেনারেল বললো-‘স্যার, আমি পেড়ে দিচ্ছি, আমি আপনার চেয়ে বড়।’ নেপোলিয়ন ঠাণ্ডা চোখে জেনারেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জেনারেল, আপনি আমার চেয়ে বড় না, আপনি আমার চেয়ে লম্বা।’
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাঁড়ামি চাটুকারিতাকে সরকারি মর্যাদায় আসন দিয়েছিল স্বৈরশাসক এরশাদ। তার মন্ত্রী-এমপিদের জনসমক্ষে চাটুকারিতা ছিল কিংবদন্তি। একটা উদাহরণ দিলেই বাকিদেরটা জানা যাবে।
এরশাদের প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ এরশাদের সঙ্গে সঙ্গে রোবোটের মতো আচরণ করতেন। এরশাদ হাসলে তিনি হাসতেন, এরশাদ কাঁদলে তিনি কাঁদতেন, এরশাদ তালি দিলে তিনি তালি দিতেন। কখনো এরশাদ হাঁচি দিলে আড়চোখে দেখে নিতেন সেটা হাঁচি না কান্না। হাঁচি কনফার্ম হলে তিনিও একটা হাঁচি দিতেন।
ভাঁড় চাটুকারের বাম্পার ফলন হয়েছিল বিগত সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়। অলিগলি-রাজপথে চাটুকার। দেশে গড়ে উঠলো চাটুকারের হাজার হাজার ফার্ম। কর্মী চাটুকার, নেতা চাটুকার। অভিনয়শিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, মন্ত্রশিল্পী-টনকে টন চাটুকার। নির্লজ্জ চাটুকার, বেহায়া চাটুকার। সাংবাদিকতা আর সংবাদ সম্মেলনের নামে চলতে লাগলো চাটুকারিতার মহোৎসব। আর ভাঁড়ামি? এই ভাঁড়ের নাম শুনলে লেখক হুমায়ূন আহমেদ স্যার ফিরে এসে ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’র মতো আরেক উপন্যাস লিখবেন- ‘উড়ে যায় কাকপক্ষী’। তবে এই ‘কাক’ উপন্যাস লিখে তিনি স্ত্রী শাওনের সঙ্গে দেখা করতেন কিনা সন্দেহ। হুমায়ূন স্যার নিশ্চয়ই চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় দিতেন না।
বড় মানুষদের ভাঁড় চাটুকার নিয়ে চলতে নেই। তাতে বড় বড় ট্র্যাজিক উপন্যাস রচিত হতে পারে। কেউ হয়তো কাক ছাড়িয়ে লিখে ফেলতে পারে ‘উড়ে যায় চিলপক্ষী’।
মানুষ কি চিলপক্ষীর দিগন্তে উড়ে যাওয়াটা দেখেনি?
(লেখক: নাট্যকার- ফিল্মমেকার)

Wednesday, September 4, 2024
এই মুরগির দাম ৭ লাখ টাকা, একেকটি ডিমের দাম ২ হাজার টাকা by জাহিদ হোসাইন খান
কেন এত বিখ্যাত
জাভানি ভাষায় সেমানি অর্থ পুরোপুরি কালো। আয়াম মানে মুরগি। আয়াম সেমানি মুরগি অন্য এক প্রজাতি কেদু মুরগি থেকে এসেছে। কেদু মুরগি জাভার কেদু অঞ্চলের একটি স্থানীয় জাত। এই জাতের মুরগিটি কেবল তার কালো পালকের কারণেই নয়, কালো ত্বক, হাড়, পেশি ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গের কৃষ্ণবর্ণের কারণে আলোচিত।
ফাইব্রোমেলানোসিস নামের জেনেটিক মিউটেশনের কারণে এদের শরীরে মেলানিনের অত্যধিক উৎপাদন হয়। ফাইব্রোমেলানোসিসের কারণে এসব মুরগির মেলানিন থাকে সাধারণ মুরগির তুলনায় ১০ গুণ। সবচেয়ে গভীর রঞ্জকওয়ালা প্রাণী হিসেবে এই মুরগির পালক থেকে শুরু করে ঠোঁট, জিব, চোখ, নখ, মাংস ও শরীর কালো হয়। ডিমও কালো হয়।
একটি উচ্চমানের আয়াম সেমানির দাম ৬ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। একেকটি ডিম বিক্রি হয় ১৬ ডলার বা প্রায় ২ হাজার টাকায়।
যাঁরা ইউরোপের কালো রঙের সংস্কৃতি, যেমন মেকআপ, পোশাক ধারণ করেন, তাঁদেরকে বলে ‘গথিক’। গথিক সংস্কৃতিধারীদের বলে ‘গথ’। কালো রঙের বলে এই মুরগিকে গথ মুরগিও বলা হয়। আর স্টার ওয়ার্স কাল্পনিক দুনিয়ার এক সম্প্রদায়ের নাম সিথ। তাদের স্মরণে এই মুরগিকে সিথ লর্ড পাখিও বলা হয়।
সত্যিই সৌভাগ্য আনে এই মুরগি?
এই মুরগির জাত ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপ থেকে উদ্ভূত। ধারণা করা হয়, ১২ শতক থেকে এই মুরগি ভিন্ন রঙের কারণে ধর্মীয় ও রহস্যময় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডাচ ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনকারীরা পরে এটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। জ্যান স্টিভেরিং নামের একজন ডাচ খামারি ১৯৯৮ সালে এই মুরগি প্রথম ইউরোপে আমদানি করেন। এর ফলে চেক প্রজাতন্ত্রের মানুষদের আয়াম সেমানি চোখে দেখা ও চেখে দেখার সুযোগ হয়।
জাভানিজ সংস্কৃতিতে আয়াম সেমানিকে ‘পবিত্র পাখি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই মুরগি রহস্যময় ক্ষমতার অধিকারী বলে তাঁদের বিশ্বাস। প্রায়ই আচার ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে এই মুরগির ব্যবহার দেখা যায়। বলা হয়, এই মুরগি সৌভাগ্য আনে, খারাপ আত্মা থেকে রক্ষা করে ও আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। জাভা অঞ্চলে এখনো অনেকে আয়াম সেমানি মুরগিকে সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বাড়িতে রাখে মানুষ। সত্যিই কতটা সৌভাগ্য আনে, তা অবশ্য নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
আলোচিত রেসিপি
আয়াম সেমানি দিয়ে রান্না করা পদেরও বেশ খ্যাতি আছে। এই মুরগির মাংস অন্যান্য জাতের তুলনায় চর্বিহীন ও স্বাদে বেশ মজাদার। কালো রঙের বলে অনেকে অবশ্য এই মুরগির মাংস খেতে চান না। আয়াম সেমানির মাংসে তৈরি বিখ্যাত খাবারের মধ্যে একটি আয়াম সেমানি স্যুপ। একটি ঐতিহ্যবাহী ইন্দোনেশীয় খাবার হিসেবে জনপ্রিয়। এই স্যুপ সাধারণত হলুদ, আদা, রসুন ও লেমন গ্রাসের মতো বিভিন্ন ভেষজ এবং মসলা দিয়ে রান্না করা হয়। আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হলো আয়াম সেমানি রেনদাং। এই রেসিপিতে মুরগিকে নারকেল দুধ ও মসলার মিশ্রণে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়।

Tuesday, September 3, 2024
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে দোটানায় পড়েছে ভারত -দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ
৫ইআগস্ট হাসিনার দেশত্যাগের পর বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবনে আক্রমণ করে। সারা বাংলাদেশ আনন্দের সাথে দিনটি উদযাপন করে। কিন্তু নয়া দিলিতে ক্ষমতার করিডোরে, হাসিনার শাসনের পতনকে একটি বিপর্যয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। ভারত দীর্ঘদিন ধরে হাসিনাকে সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে।
১৯৭৫ সালে তার পিতা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর একবার হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল এবং ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার আগে পর্যন্ত তিনি তার স্বামী ও সন্তানসহ ছয় বছরেরও বেশি সময় ভারতে নির্বাসনে ছিলেন।
নয়া দিল্লিতে বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয় দলের সঙ্গে হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক বাংলাদেশকে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত আঞ্চলিক মিত্র হতে সাহায্য করেছে। একই সাথে বাংলাদেশকে চীনের খপ্পর থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তার প্রথম মেয়াদে এবং তারপরে ২০০৯তে পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর, হাসিনা পানিপথে অ্যাক্সেস এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সাথে লাভজনক চুক্তি করার মাধ্যমে ভারতের দিকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন।
বিনিময়ে, তার শাসনব্যবস্থা ক্রমবর্ধমানভাবে নিপীড়ক ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠলেও ভারত সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখে। বরং ভারতীয় কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিরোধীরা বাংলাদেশের বিষয়ে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করার অভিযোগ তোলে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশকে একটি কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন মেনে নেয়ার জন্য চাপ দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি ভারত। জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বিদেশি কোনো সরকার প্রধান হিসেবে হাসিনাই প্রথম ভারত সফর করেন। গত ১৫ বছরে দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃতি ধীরে ধীরে বাংলাদেশে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখার ফল
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের একজন সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি মূলত একজন ব্যক্তি এবং একটি দলের সাথে সম্পর্ক হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকজন বিশ্লেষকের মতো মুনিরও জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করার জন্য নয়া দিল্লিকে আহ্বান জানিয়েছেন। শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ এবং নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ব্যাপক সংস্কার এবং হাসিনা সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও ইউনূস মনে করেন এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জের কাজ। মুনির বলছেন- ‘এখন ভারতকে মেনে নিতে হবে যে শেখ হাসিনা চলে গেছেন, তিনি এখন ইতিহাস। দু’দেশের সম্পর্ককে সম্পূর্ণরূপে পুনঃস্থাপন করতে হবে। সরকার পরিবর্তনের ওপর কোনো সম্পর্ক নির্ভর করতে পারে না।’
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সামনে আরো একটি হুমকির বিষয় হলো- ভারতে হাসিনার উপস্থিতি। যদিও তার পরিবার বলছে, হাসিনা ভারতে স্থায়ীভাবে থাকবেন না এবং তার প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়নি, তবে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য অধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান কল আসছে ভারতের কাছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা ও অপহরণে ভূমিকা রাখার অভিযোগে ১০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সাথে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। যদিও হাসিনার সরকার এর আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। হাসিনা ভারত সফরে যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন তাও বাতিল করেছে বাংলাদেশ সরকার।
এই সপ্তাহে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে সরাসরি আবেদন করেন। অভিযোগ করেন, হাসিনা বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য ভারতকে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আলমগীর বলেন, ‘আপনাদের (ভারত) কাছে আমাদের আহ্বান যে- আপনারা তাকে আইনি উপায়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করুন। তার বিচারের সিদ্ধান্ত এদেশের মানুষ নিয়েছে। তাকে সেই বিচারের মুখোমুখি হতে দিন।’
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ তথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজ বলেছেন- ‘হাসিনার আকস্মিক পতনে ভারতকে একটি ‘গুরুতর গোয়েন্দা ব্যর্থতার’ মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যার অর্থ উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক বিপর্যয়ের জন্য ভারত অপ্রস্তুত ছিল। ক্রমবর্ধমান ভারত-বিরোধী মনোভাব এখন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।’ ড. আলী রীয়াজ মনে করেন- ‘ভারত রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে গুরুত্ব না দিয়ে হাসিনা ও তার দলের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে সব ডিম এক ঝুড়িতে রেখেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অলীক নীতি অনুসরণ করেছে। ফলস্বরূপ, ভারত এখন নিজেই একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।’
হাসিনা সরকারের পতনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারতের মোদি সরকারের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের নতুন শাসনের দ্বারা গণতান্ত্রিক সংস্কারের উল্লেখ সেভাবে পাওয়া যায়নি। পরিবর্তে প্রতিবেশী দেশে অস্থিরতা এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের হুমকির বিষয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন মোদি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে ফোনালাপের পর মোদির প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টিতে আবারও জোর দেয়া হয়েছিল। মার্কিন বিবৃতিতে বাংলাদেশের বিষয়ে কোনো উল্লেখ না থাকলেও ভারতীয় পক্ষ বলেছে যে- ‘দুই দেশের নেতা স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন’। মোদির মন্তব্যগুলি সীমান্তের ওপারে সমালোচিত হয়েছে। একজন বাংলাদেশী ভাষ্যকার বলেন, ‘আমরা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি না। আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছি।’
অন্তর্বর্তী সরকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও আশার আলো জাগাচ্ছে by জে. মনোজ মুকুন্দ নারাভানে
ইতিবাচক ফল: সফল বিপ্লবগুলো বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৫) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত করেছিল।
মিশ্র ফল: ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে, দেশে একটি প্রজাতন্ত্র গঠনের দিকে পরিচালিত করেছিল, কিন্তু এর ফলে সন্ত্রাসের রাজত্ব এবং শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান ঘটে। একইভাবে, জর্জিয়া (২০০৩), ইউক্রেন (২০০৪) এবং কিরগিজস্তানে (২০০৫) বিপ্লবগুলো উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক লাভ অর্জন করেছে, টেকসই সংস্কার এবং স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য তুলে ধরেছে।
নেতিবাচক ফল: কিছু বিপ্লব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, যা থেকে জন্ম নেয় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। উদাহরণস্বরূপ, আরব বসন্ত (২০১০-১২) সিরিয়া এবং লিবিয়ার মতো দেশে গৃহযুদ্ধের দিকে পরিচালিত করেছিল।
বাংলাদেশের বিপ্লব
৫ই আগস্ট, বাংলাদেশে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ফলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বহু বছর ধরে জমে থাকা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর দ্বারা উদ্দীপিত হয়েছিল। যা ক্রমেই একটি পূর্ণ মাত্রার বিপ্লবের রূপ নেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য সরকারি চাকরিতে একটি বিতর্কিত কোটা পদ্ধতির পুনঃস্থাপন, বিক্ষোভের একটি প্রধান কারণ ছিল। এই ব্যবস্থাটিকে অনেক শিক্ষার্থী অন্যায্য বলে মনে করেন, বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব বিদ্যমান। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া, যার মধ্যে বলপ্রয়োগ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, ছাত্রনেতা আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে অর্থবহ সংলাপের উল্লেখযোগ্য অভাব ছিল। গঠনমূলক সম্পৃক্ততা এবং সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ মোকাবিলা করা হয়তো এই গণবিক্ষোভ রোধ করতে পারতো। বিপ্লব শুধু কোটা পদ্ধতি নিয়ে নয়, দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিস্তৃত বিষয় নিয়েও ছিল। এই পদ্ধতিগত সমস্যাগুলোকে সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করলে অস্থিরতা প্রশমিত হতে পারতো। একটি সরকার যা ক্রমবর্ধমানভাবে কর্তৃত্ববাদী এবং বাস্তবতা থেকে দূরে, বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছিল।
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
যদিও বিপ্লবের তাৎক্ষণিক দাবিগুলো উন্নত শাসন এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে, গভীরভাবে বসে থাকা সমস্যাগুলোর জন্য ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। বিক্ষোভের পুনরুত্থান রোধ করতে বর্তমান ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। আসলে এই বিক্ষোভের পেছনে ছিল দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, যা সব সীমা অতিক্রম করে যায়। বাংলাদেশে ছাত্র বিপ্লবের ভবিষ্যৎ আশাপ্রদ, যা উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অনেকটা পোল্যান্ডে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মতো (১৯৮০)। বাংলাদেশ এবং পোল্যান্ড উভয় ছাত্র বিক্ষোভে, বিশ্ববিদ্যালয় এবং হোস্টেলগুলো কার্যকলাপ এবং পরিকল্পনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দুই দেশের সরকারও কড়া হাতে বিক্ষোভ দমানোর চেষ্টা করেছিল, ফলে বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। সামনের দিকে এগোতে হলে বাংলাদেশে সতর্ক নেতৃত্ব এবং প্রতিবাদ উদ্রেককারী অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ইতিমধ্যে এই প্রতিবাদ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে যা দেশের ভবিষ্যৎকে ভালোভাবে গঠন করতে পারে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং এতে সিনিয়র পদে ছাত্র নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সরকার দেশকে স্থিতিশীল করার জন্য কাজ করছে এবং আন্দোলনকারীদের দাবির সমাধান করছে। নতুন যে অশান্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। ছাত্র আন্দোলনকারীরা তাদের আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কথা ভাবছে, অবশ্যই ‘বেগমদের যুদ্ধ’-এর বাইরে গিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিবাদ থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার রূপান্তরকে প্রতিফলিত করে। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও, ভবিষ্যৎ আশার আলো জাগাচ্ছে জনগণের মনে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এমন একটি চ্যালেঞ্জ যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে। তরুণ নেতাদের সম্পৃক্ততা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের জন্ম দেয়। বিপ্লব আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলোকে তুলে ধরেছে।
ভারতের ওপর প্রভাব
ভারতের যেকোনো প্রতিবেশী দেশে, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে দেশটি স্থল সীমান্ত ভাগ করে, যেমন পাকিস্তান বা মিয়ানমার, সবসময় ভারতকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের ছাত্র বিপ্লব ভারতের জন্য বেশ কিছু প্রভাব ফেলে:
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক: এই উত্থান ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অবনতির দিকে নিয়ে গেছে, যা আগে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। ভারত তার দীর্ঘস্থায়ী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ না করে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছে। যদিও ভারত জোর দিয়েছিল যে এই অস্থিরতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তবুও সহিংসতার মধ্যে ছাত্র সহ হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের সুবিধাও করে দিয়েছে দেশটি।
অর্থনৈতিক প্রভাব: এই বিক্ষোভ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ব্যাহত করেছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে সেইসব ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যাদের বাংলাদেশে কোম্পানি রয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ: ভারতে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে বিক্ষোভের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তৃতীয় ফ্রন্টের হুমকি সহ যেকোনো আন্তঃসীমান্ত প্রভাব ঠেকাতে ভারতকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে দু’ দেশের সামরিক পর্যায়ে সম্পৃক্ততা প্রয়োজন, কারণ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
মানবিক এবং সামাজিক প্রভাব: সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রবাসীরা উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা মেডিকেল প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েও ভারতে ফিরে আসছে। এর আগে ইউক্রেন (২০২২) এবং সুদান (২০২৩) থেকেও ভারতীয় নাগরিকদের সরিয়ে আনা হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিদেশে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য আরও ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার দিকটি তুলে ধরে। বাংলাদেশে ছাত্র বিপ্লব প্রাথমিকভাবে একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এর প্রভাব ভারতে অনুভূত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের কাছ থেকে ভারত-বাংলাদেশের সকল চুক্তি পর্যালোচনা করার আহ্বান সহ বাংলাদেশে ভারত বিরোধী মনোভাব ভালো লক্ষণ নয়।এই পরিস্থিতির জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন, সমস্ত স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে যোগাযোগের চ্যানেলগুলো উন্মুক্ত রাখা আবশ্যক।
লেখক: ভারতীয় সেনার একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল। যিনি ২৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
Monday, August 26, 2024
হাসিনার প্রস্থানের পর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু -ব্লুমবার্গের নিবন্ধ
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানির উৎস বাংলাদেশের একটি অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প তুলে ধরা হয়। কিন্তু ভট্টাচার্য বলছেন, ‘হাসিনার প্রশাসন সম্ভবত রপ্তানি, মুদ্রাস্ফীতি এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ভুল তথ্য প্রকাশ করেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে।’
হাসিনা, যিনি গণবিক্ষোভের মুখে পড়ে পদত্যাগ করেন এবং এই মাসে ভারতে পালিয়ে যান। ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮.৩৬ ট্রিলিয়ন টাকা দেশি ও বিদেশি ঋণের বোঝা রেখে গেছেন। যা তিন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সমান।
ভট্টাচার্য বাংলাদেশের জন্য তিনটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করেছেন: সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঘাটতি। তিনি বলছেন, ‘গত কয়েক বছরে স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়েছে এবং হাসিনা এর জন্য ইউক্রেনের যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। যদিও আমরা মনে করি এটা যুক্তিযুক্ত নয়’।
বাংলাদেশের ট্যাক্স -টু-জিডিপি অনুপাত ৭.৩%, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন একটি। এই অনুপাত ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে ৮.৮% এ উন্নীত হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, ‘সবথেকে বড় বিভ্রান্তির জায়গা হলো আপনার ৫% থেকে ৭% স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি রয়েছে এবং আপনি কর সংগ্রহ করেন না। যার অর্থ দাঁড়ায় হয় প্রবৃদ্ধি কাল্পনিক ছিল, অথবা যারা প্রবৃদ্ধি থেকে উৎপন্ন আয় থেকে উপকৃত হয়েছে তারা করের আওতায় আসেনি। সম্ভবত এর একটি বড় অংশ দেশের বাইরে ফানেল করা হয়েছিল।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক কাজ হলো বিদ্যুতের মতো জরুরি পরিষেবার জন্য অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করা। নবনিযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গত সপ্তাহে বলেছেন যে, দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাথে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তার জন্য আলোচনা চালাচ্ছে এবং অন্যান্য বহু-পাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে তহবিল চাইছে। রপ্তানিতে ব্যাঘাত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যা বর্তমান সংকটের আগে থেকেই কমে গিয়েছিল। গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। বাংলাদেশ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেপো রেট ৫০ পয়েন্ট বাড়িয়েছে। আদানি পাওয়ারের বাংলাদেশের কাছ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া রয়েছে।
১৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যার বাংলাদেশ উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন পেতে আদৌ প্রস্তুত কিনা। সরকার পরিবর্তন এবং পরবর্তীতে সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণে জাতিসংঘ সম্প্রতি সলোমন দ্বীপপুঞ্জের এলডিসি ক্যাটাগরির বাইরে যাওয়ার বিষয়টি স্থগিত করেছে। ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশ যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তা গ্র্যাজুয়েশনের সমস্যা নয় বরং উন্নয়নের সমস্যা। অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও দেশ ট্র্যাকে রয়েছে।’
জাতিসংঘের প্যানেলে থাকা এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বাংলাদেশ এখনও গ্রাজুয়েশন স্তরের জন্য তিনটি মানদণ্ডের উপরে রয়েছে: মাথাপিছু জিএনআই, মানব সম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দুর্বলতা সূচক।
প্রবল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, গত সপ্তাহে সহিংস বিক্ষোভে ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান যেকোনো কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্লেবুকে অনায়াসে জায়গা করে নিতে পারে। সবশেষে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, ‘বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। প্রথমে, আপনি বহুত্ববাদকে ঘৃণা করতে শুরু করেন , তারপরে আপনি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা বাতিল করেন, এবং তারওপরে আপনি আপনার পক্ষপাতদুষ্ট লোকদের সমস্ত প্রতিষ্ঠানে রাখেন - অগত্যা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে দেশ চলে। যাকে এককথায় চাটুকারিতা বলা যায়।’
Saturday, August 24, 2024
প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে 'মোদির রাজনীতি' -ফরেন পলিসির নিবন্ধ by সুশান্ত সিং
তবে বাংলাদেশকে তার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি চলতি মাসে ছাত্র বিদ্রোহের চাপের মুখে পড়ে পদত্যাগ করার আগে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, মোদির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশে, হাসিনার যাত্রাপথের সূচনা গণতান্ত্রিক পথে হলেও পরে তিনি একজন কর্তৃত্ববাদী শাসকে রূপান্তরিত হন। তার বিরুদ্ধে দেশের মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়তে থাকে। সরকারী চাকরির কোটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে হাসিনা সরকারের ব্যাপক দমন পীড়ন দেশব্যাপী অস্থিরতার জন্ম দেয় । শেষমেশ ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান হাসিনা এবং বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশে হাসিনার জনপ্রিয়তা কম হওয়া সত্ত্বেও, তার পদত্যাগ ভারতীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংস্থার কাছে একটি ধাক্কা হিসাবে প্রতিপন্ন হয়েছে। ভারত তার শাসনামলে হাসিনাকে সম্পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে এসেছে , এমনকি অন্যান্য স্টেকহোল্ডার এবং বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগ উপেক্ষা করেও ।
মোদির অধীনে, নয়াদিল্লি তার বেশিরভাগ ছোট প্রতিবেশীদের সাথে এই নীতি গ্রহণ করেছে, কখনও কখনও তার পরিণতি হয়েছে দুর্ভাগ্যজনক। এটা স্পষ্ট যে, তার প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের নীতিগত ব্যর্থতা শুধুমাত্র বহিরাগত ঘটনার কারণে নয়। এগুলির সাথে ভারতের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও সম্পৃক্ত। মোদির শক্তিশালী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে গিয়ে নয়াদিল্লি দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে ভারতের উদারপন্থী মনোভাবকে ক্ষুণ্ন করেছে। কর্পোরেট স্বার্থের জন্য হাসিনার মতো সরকারগুলির সাথে মোদির ঘনিষ্ঠ আচরণ - নয়াদিল্লির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে৷
মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থ, বিশেষ করে বাংলাদেশে ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৯ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) যা মুসলমানদের বাদ দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলিতে নির্যাতিত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগ করে দিয়েছে , বাংলাদেশি জনসাধারণের মধ্যে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরে মুসলমানদের প্রতি বিজেপি সরকারের অশোভন আচরণের জন্যও বিদেশে সমালোচিত হয়েছেন মোদি। ২০২১ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় সহিংস দাঙ্গার সম্মুখীন হয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী । হাসিনার পদত্যাগ ভারত সরকারের জন্য আত্মোপলব্ধির সুযোগ করে দিয়েছে, কিন্তু এটি নীতি সংশোধনে ভারত সরকারকে চালিত করবে কিনা তা বলা কঠিন। বাংলাদেশে ভারতের কলঙ্কিত ভাবমূর্তি দক্ষিণ এশিয়ায় মোদি সরকারের প্রথম বড় ব্যর্থতা নয়। একটি প্রকৃত হিন্দু রাষ্ট্র-এর অনুসরণ শুধুমাত্র ভারতের জন্যই ক্ষতিকর নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেও এর বিপর্যয়কর ফলাফল ডেকে আনতে পারে।
হাসিনার সঙ্গে ভারতের গভীর সম্পর্ক
শেখ হাসিনার পিতা তথা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর, হাসিনা এবং তার বোন ভারতে আশ্রয় নেন। তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০০৯ সালে পাকাপাকিভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ফিরে আসার আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের পর থেকে তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসকে রূপান্তরিত হন- যার নিশানায় ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক এবং অধিকার কর্মীরা। হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ দল আওয়ামী লীগ, কট্টরপন্থী ইসলামী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ভারতবিরোধী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে ঘাঁটি স্থাপন করতে দেননি হাসিনা। ভারত অন্য সবাইকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র হাসিনাকে সমর্থন করে গেছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে তিনি ক্ষমতা হারালে, ‘বাংলাদেশ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলির প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হবে।’ এমনকি এই বছর, হাসিনা একটি বির্তকিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর, ভারত গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ নিয়ে বাংলাদেশের উপর চাপ প্রয়োগ বন্ধ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের কাছে তদবির করেছিল।
হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাক্ষী থেকেছে এবং সামরিক বাহিনী সহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছেন। ফলস্বরূপ, ভারত ধরে নিয়েছিল যে প্রতিবাদ সত্ত্বেও হাসিনা শাসন চালিয়ে যাবেন। কিন্তু এই মাসে নিরাপত্তাবাহিনী যখন হাসিনাকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বলে তখন কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়াদিল্লিকেও হতবাক করে দেয়। কোনো পশ্চিমা সরকার তাকে আশ্রয় দেয়নি, নয়াদিল্লিতেই আত্মগোপন করে আছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী । ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান। প্রতিবেশী কূটনীতির ক্ষেত্রে ভারতের অতি-নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গি - হাসিনার প্রতি নয়াদিল্লির নিঃশর্ত সমর্থনে প্রতিফলিত। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, জাতিগত, ভৌগলিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারত এটিকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। নয়াদিল্লি তার প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া করেছে, ফলে এই দেশগুলিতে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী দেশের বৃহত্তর জনসাধারণের অনুভূতির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে ভারত , রাজনৈতিক বিরোধীদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে যার পরিণতি গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ ।
২০২১ সালে মিয়ানমারে, একটি অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার পক্ষে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের এড়িয়ে গেছে ভারত। আফগানিস্তানে আফগানদের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে তালেবান শাসকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ভারতের, নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তার আচরণে প্রকাশ পেয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর আচরণের ভুরি ভুরি অভিযোগ সামনে এসেছে।
মোদির শক্তিশালী রাজনীতি ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতিকেও প্রভাবিত করেছে । মোদি বিতর্কিত ভারত-চীন সীমান্তে চীনের অনুপ্রবেশের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখলেও, ভারতের ছোট প্রতিবেশীদের কাছে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ভারত ২০১৫ সালে মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের ট্রানজিট ক্যাম্পের বিরুদ্ধে একটি আন্তঃসীমান্ত অভিযান শুরু করে। একই বছর ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও নেপালের উপর একটি বাণিজ্য অবরোধ জারি করে ভারত। গত বছর মোদির সমর্থকরা ভারতীয় পর্যটকদের মালদ্বীপ বয়কট করার জন্য একটি প্রচারণা শুরু করেছিল, কারণ মালদ্বীপের কয়েকজন মন্ত্রী মোদির সমালোচনা করেছিলেন ।
বাংলাদেশের জনগণের মনে ভারতের সীমান্ত পুলিশের কঠোর আচরণের পাশাপাশি পানি বন্টন , ট্রানজিট সুবিধা এবং অন্যান্য বাণিজ্য-সম্পর্কিত সমস্যাগুলির বিষয়ে নয়াদিল্লির পদক্ষেপ সম্পর্কে ক্ষোভ রয়েছে। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভ হাসিনার ওপর গিয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয় । ভারতের রাজনৈতিক বিরোধীরা মোদি ঘনিষ্ঠ ফার্মগুলিকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেবার জন্য সমালোচনা করে এসেছেন , বিশেষ করে ধনকুবের গৌতম আদানির মালিকানাধীন ফার্মগুলিকে । এই ঘনিষ্ঠতা ভারতের প্রতিবেশীদেরও নোযোগ আকর্ষণ করেছে। গত বছর, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে তার পাওয়ার প্লান্ট মারফত ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বলে ঘোষণা করার পর হাসিনার সাথে একটি ছবি পোস্ট করেছিল। ভীষণই ব্যয়বহুল এই প্ল্যান্টের জন্য বাংলাদেশকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন যে হাসিনার 'রাজনৈতিক বৈধতা সুরক্ষিত করতে মোদির রাজনৈতিক অনুগ্রহ প্রয়োজন। বহুত্ববাদ , কর্তৃত্ববাদ এবং ক্রোনিজম বাংলাদেশে ভারতের সমস্যায় অবদান রেখেছে , কিন্তু মোদি সরকারের হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসরণ আরও ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৯ সিএএ আইন শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৃত হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করেছে। যে সকল নির্যাতিত সম্প্রদায়গুলি ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিল তাদের মধ্যে ছিল বাংলাদেশের হিন্দুরা। এর জেরে বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নিয়েছে ভারত বিরোধী মনোভাব। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য সামনে এসেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (মোদির কার্যত ডানহাত) বাংলাদেশি অভিবাসীদের উইপোকা, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে অভিহিত করেছেন ।
CAA-এর আগে, ভারতীয় বিচার বিভাগ আইনি নাগরিকদের নথিভুক্ত করার জন্য এবং আসামের সীমান্ত রাজ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি কঠোর জরিপের নির্দেশ দিয়েছিল- যাকে সমালোচকরা অনথিভুক্ত ভারতীয় মুসলমানদের টার্গেট করার একটি উপায় হিসাবে দেখেন। অমিত শাহ এই জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) দেশব্যাপী কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।যদিও নয়াদিল্লি এনআরসিকে একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ মনে করে ,ভারতের ‘অবৈধ বিদেশি নাগরিক’ সমস্যার মূলে তাকেই রাখা হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন যে CAA এবং NRC লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পারে।
এদিকে, হাসিনার সরকার দেশের মধ্যে এই ধারণাকে শক্তিশালী করতে থাকে যে তিনি নয়াদিল্লির অঙ্গুলি হেলনে চলছেন। ২০২২ সালে যখন একজন বিজেপি মুখপাত্র মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) উদ্দেশে অপমানজনক মন্তব্য করেছিলেন, তখন এটি অনেক মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলো। কিন্তু হাসিনা সরকার বিষয়টিকে ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ বলে উল্লেখ করে হালকা করার চেষ্টা করেন । বাংলাদেশে অভিযোগ বাড়তে শুরু করে এবং ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি বিজেপি সরকারের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যমূলক আচরণ ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই বছর ভারতের নির্বাচনী প্রচারে মোদির মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভাব কারোর নজর এড়ায়নি। এদিকে গত বছর, তিনিই একটি নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধন করেছিলেন যেখানে ভারতের সমস্ত ছোট প্রতিবেশীদের নিয়ে বড় বড় করে চিত্রিত আছে 'অখন্ড ভারত' ("অবিচ্ছিন্ন ভারত")।
মোদির জাতীয় ভাষণ
গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে, মোদি ভারতের ১.৪ বিলিয়ন নাগরিকদের বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা বলেছিলেন। এটি ছিল ভারতকে বহুধর্মীয় এবং বহুভাষিক দেশ হিসেবে নয় বরং শুধুমাত্র একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে ফ্রেম করার কৌশলী উপায়। এটা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে বিজেপি সরকার তার ডানপন্থী সমর্থক এবং মিডিয়ার নিন্দা করতে অস্বীকার করেছে যারা সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যার বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে ।
মোদির সরকারের এখন আত্ম-বিশ্লেষণের ক্ষমতা কমে আসছে বলে মনে করছেন অনেকে। বাংলাদেশে হাসিনার পদত্যাগের ঘটনাগুলির জন্য পাকিস্তান, চীন বা ইসলামপন্থীদের দোষারোপ করার পরিবর্তে, ভারতের উচিত তার প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো। যারা দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন । যদিও ভারতকে অনেকে একটি ক্রমবর্ধমান শক্তি হিসাবে দেখে , তবে এর প্রতিবেশীরা মনে করে ভারত তুলনামূলকভাবে দুর্বল।ভৌগোলিক কারণে তার ছোট প্রতিবেশীদের অবশ্যই ভারতের সাথে কাজ করতে হবে, এই পরিস্থিতিতে নতুন দিল্লির উচিত এখনই নতুন চুক্তির বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করা।
লেখক ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক এবং ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনের একজন পরামর্শক সম্পাদক।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...


