Sunday, March 1, 2015

মার্কিন কূটনীতিকদের উপস্থিতি কমাতে চায় ভেনিজুয়েলা

প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো
প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ভেনিজুয়েলায় মার্কিন কূটনীতিকদের উপস্থিতি কমাতে চান এবং এখন থেকে মার্কিন পর্যটকদের ভিসা প্রয়োজন হবে। একে দু’দেশের মধ্যে ক্রমান্বয়ে উত্তেজনা বেড়ে চলার ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরো বলেন, শনিবার ঘোষিত এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন নাক গলানো ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা।
মাদুরো রিপোর্টারদের বলেন, ‘আমাদের দেশকে রক্ষা করতে... আমি ভেনিজুয়েলায় প্রবেশ করছে এমন সকল নাগরিকের জন্য ভিসা বাধ্যতামূলক করা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ নতুন ব্যবস্থার আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার নাগরিকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ভিসা ফি নেয় ভেনিজুয়েলাও মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে একই পরিমাণ ফি নেয়া শুরু করবে। তবে ঠিক কবে থেকে এই নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হবে তা পরিষ্কার নয়।
তবে নতুন এই বিধি-নিষেধের কারণে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগে আগ্রহী ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ভ্রমণকারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরে দেয়া বক্তৃতায় মাদুরো বলেন, কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জন কূটনৈতিক স্টাফ রয়েছে অথচ ওয়াশিংটনে ভেনিজুয়েলার মাত্র ১৭ জন স্টাফ রয়েছে।
মাদুরো কূটনৈতিক মিশনের আকারের ক্ষেত্রে ভিয়েনা কনভেনশনের রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সমতার নীতির কথা উল্লেখ করে তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কারাকাসে মার্কিন দূতাবাসের মার্কিন কর্মকর্তার সংখ্যা হ্রাস, সমন্বয় ও সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে বলা হয়, দূতাবাস কর্মকর্তার সংখ্যা হ্রাস বা ভিসা সংক্রান্ত কোনো বিষয় তাদের জানানো হয়নি। তবে মার্কিন প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, কারাকাস ভেনিজুয়েলা সরকারকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টায় মার্কিন যুক্তিরাষ্ট্র জড়িত বলে অব্যাহতভাবে যে অভিযোগ করে যাচ্ছে তা ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।

পেট্রলবোমায় দগ্ধ আরও দুজনের মৃত্যু by শিপন হাবীব

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) বার্ন ইউনিটে পেট্রলবোমায় দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই দগ্ধ রোগী ভর্তি হচ্ছেন। এদিকে শনিবার ভোরে ও বিকালে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে সুস্থ হয়ে উঠা একজনকে ছুটি দিতে না দিতেই নতুন করে আরও ২ জন দগ্ধ রোগী ভর্তি হয়েছেন। দগ্ধরা দিন-রাত ছটফট করছেন। এ নিয়ে ৫ জানুয়ারি থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার রাতে নতুন করে আরও ৫ জন বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন। যাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশংকাজনক। এ নিয়ে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে ৫১ জন দগ্ধ রোগী ভর্তি রয়েছেন। ৭ জনকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। যাদের অবস্থা আশংকাজনক। ৩১ জন রয়েছেন যাদের শরীর পেট্রলবোমায় ২০ শতাংশ থেকে ৮৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালি পোড়া অবস্থায় ভর্তি রয়েছেন ২৩ জন।
শনিবার বিকাল ৪টা ৭ মিনিটে হেলপার শাকিলের মৃত্যু হয়। শাকিল (১৬) ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের রূপগঞ্জে বাসে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন। তার সঙ্গে ওই বাসের অপর একজন হেলপার শিশু ইয়াসিনও দগ্ধ হয়। পেট্রলবোমায় শাকিলের ৬৭ শতাংশ শরীর পুড়ে গিয়েছিল। শিশু ইয়াসিনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে শাকিলের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন দাদি জরুহা বেগম। জানালেন, শাকিলের যখন ১ বছর তখন তার মা শিল্পী বেগম শাকিলকে রেখে অন্যত্র চলে যায়। তারপর আর কোনোদিন শিল্পী তার সন্তান শাকিলকে দেখতে আসেনি। তার বাবা জসিম উদ্দিনও শাকিলের খোঁজ খবর নেয়নি। নাতিকে তিনিই বড় করেছেন। তার সঙ্গে থাকতেন। বিভিন্ন বাসে হেলপারের কাজ করে জীবন চালাতেন।
এদিকে শুক্রবার রূপগঞ্জে বাসে পেট্রলবোমায় আহত কবির হোসেন শনিবার ভোররাতে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। কবির হোসেনকে শুক্রবার রাতে বার্ন ইউনিটে আনা হলেও তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরে পেট্রলবোমায় তেমন আগুন না লাগলেও মাথায় গুরুতর আঘাত পান। মাথার দু’পাশে পেট্রলবোমার কাচের অংশ ঢুকে পড়েছিল। এ বিষয়ে বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত ডাক্তার অধ্যাপক পার্থশংকর দাস বলেন, কবির হোসেনকে প্রথমে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল। শুক্রবার মধ্যরাতে তাকে ঢামেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। তার মৃত্যু বার্ন ইউনিটে হয়নি, এ পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে নতুন করে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে ৬ জন ভর্তি হয় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এদের মধ্যে ২ জনকে শনিবার দুপুরে চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকি ৪ জন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। শুক্রবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-রূপগঞ্জ এলাকায় রাত ১০টার দিকে ট্রাকে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন ওই ৬ জন।
ওই ৬ জনের মধ্যে ৪৬ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে দিনমজুর হেলাল মিয়া ছটফট করছেন। শনিবার সকালে ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিট সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, দগ্ধ হেলালের পাশে আহাজারি করছেন তারা স্ত্রী স্বপ্না বেগম। হেলালের দুই পা, দুই হাতসহ পুরো শরীর ও কোমর পুড়ে গেছে। পুড়ে গেছে শ্বাসনালিও।
স্বামীর কিছু হলে তিনি বাঁচবেন না জানিয়ে স্ত্রী স্বপ্না বেগম জানান, তাদের বিয়ে হয়েছে ৫ বছর। খুবই দরিদ্র তারা। জুরাইন এলাকায় একটি ঝুপড়ি ঘরে ভাড়া থাকেন। স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন।
হেলালের সঙ্গে দগ্ধ হয়ে আসা দিনমজুর মো. বিল্লাল (২৪), সালাম (২৮) ও রাশেদ (২৯) মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। রাশেদের বৃদ্ধ মা জয়তুননেসা ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। কেউই তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনেকেই মরে যাচ্ছে। তার ছেলের ওই রকম কিছু হলে তিনি বাঁচবেন না। মা জয়তুননেসা জানালেন, রাশেদ তার একমাত্র ছেলে। মাটি কাটার কাজ করে। তার স্ত্রী শিল্পী আক্তার অসুস্থ। ২ মাসের একটি সন্তান রয়েছে তাদের সংসারে। ওই অবস্থায় স্বামীকে দেখতে আসতে পারছে না স্ত্রী।
জয়তুননেসা জানান, পুলিশওতো তার ছেলেকে রক্ষা করতে পারল না। কোন্ অপরাধে তার ছেলেকে জ্বালিয়ে দেয়া হল তা জানতে চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। দগ্ধ সালামের স্ত্রী রোজিনা আক্তার হা-হুতাশ করছেন। বললেন, তার সংসারে সুমাইয়া (৭) ও রাব্বী (৪) নামে দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। স্বামীর রোজগারে সংসার চলে। গত মাসের বাসা ভাড়াও দিতে পারেননি, তাই স্বামী দিনরাত কাজ করছিল অতিরিক্ত টাকা রোজগারের জন্য। দগ্ধ বিল্লালের পাশে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছেন বৃদ্ধ মা ফুলী বেগম। ছেলেকে বিয়ে করাতে পাত্রী দেখা হচ্ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর কদম গ্রামে। ছেলে পাথর ভাঙার কাজ করতো। যে করেই হোক তার ছেলেকে সুস্থ দেখতে চান তিনি। এদিকে আইসিইউ’তে থাকা ৭ জনের অবস্থা খুবই আশংকাজনক জানিয়ে বার্ন ইউনিটের সার্জারি ও বার্ন বিভাগ প্রধান প্রফেসর ডা. সাজ্জাদ খোন্দকার জানিয়েছেন, তারা (চিকিৎসকরা) দিনরাত চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছেন। তারপরও দগ্ধ রোগীদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে শুক্রবার রাতে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করার পর মধ্যরাতে ঢামেক হাসপাতালে প্রেরণ করা কবির হোসেনের মৃত্যু হয়েছে ঢামেক হাসপাতালে। তিনি বলেন, আশংকামুক্ত নয় এমন দগ্ধ রোগীর সংখ্যাও অনেক রয়েছে। যাদের শরীরের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে শ্বাসনালি পুড়ে গেছে, তারা কেউ আশংকামুক্ত নয়। বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রফেসর ডা. সামন্তলাল সেন জানান, এ বার্ন ইউনিটটি তৈরি করা হয়েছিল এমন বর্বর পেট্রলবোমায় দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে নয়। পোড়া মানুষগুলোকে যখন তিনি দেখেন, তখন তিনিসহ কোনো চিকিৎসকই তা সহ্য করতে পারেন না।

‘এমন আলাপ এখন ঘরে-বাইরে সবাই করছে’ -খোকা-মান্নার ফোনালাপের প্রসঙ্গে বঙ্গবীর

খোকা-মান্নার ফোনালাপের প্রসঙ্গ টেনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, তাদের দু’চার কথা আপত্তিকর মনে হতেই পারে। কিন্তু এমন আলাপ এখন ঘরে-বাইরে সবাই করছে। গভীররাতে উঠিয়ে নিয়ে ২০-২২ ঘণ্টা কাউকে আড়ালে রাখা নাগরিক অধিকার হত্যার সামিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোর্টে নেয়ার আগে একদিন এভাবে লুকিয়ে রাখা কি মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়? মতিঝিলের দলীয় কার্যালয়ের অবস্থানের ৩৩তম দিনে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের সমালোচনা করে বলেন, তারা যেভাবে বড়দের অসম্মান করে চলেছেন তাতে ভাবীকাল তাদের বাঙালীর সভ্যতার ধারক-বাহক হিসেবে স্বীকার করবে না। কৃষ্টি-সভ্যতা, আচার-ব্যবহার, বড়কে সম্মান, ছোটকে আদর ভালবাসা করা বাঙালীর হাজার বছরের গর্ব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, তারা দুঃসময়ে জাতিকে অন্ধকারে ঠেলে না দিয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট জাতির বেদনানাশে ভূমিকা নিতে পারতেন।
দেশের চলমান সঙ্কটে দুই প্রধান দলের দুই নেত্রীকে উদ্যোগ নেয়ার দাবিতে গত ২৮শে জানুয়ারী থেকে কাদের সিদ্দিকী ফুটপাতে অবস্থান করে আসছেন। এ কর্মসূচিতে তার সঙ্গে রয়েছেন দলের যুগ্ম-সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হোসেন, যুব আন্দোলনের আহবায়ক হাবিবুন নবী সোহেল, মঈনুদ্দিন উজ্জ্বল, ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক রিফাতুল ইসলাম দীপ, বিল্লাল হোসেন, সাইফুল ইসলাম শিমুলসহ শতাধিক নেতাকর্মী।

মার্কিন ব্লগারকে বাংলাদেশে কেন কুপিয়ে হত্যা করা হলো! by ইশান থারুর

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ও নাস্তিক অভিজিৎ রায়। বৃহস্পতিবার রাতে অজ্ঞাত আততায়ীরা তাকে ঘিরে ধরে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে ঢাকার রাজপথে। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে আছেন। তিনি এখন জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন। সামাজিক মিডিয়া খুললেই তাতে ঘটনার অব্যবহিত পরের ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাবেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, রক্তের ভেতর পড়ে আছেন অভিজিৎ। এর পাশে হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তার স্ত্রী। বার্তা সংস্থা এপি’র মতে, আগে থেকেই পরিচিত ইসলামপন্থি জঙ্গি গ্রুপ আনসার বাংলা ৭ এ ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। তারা টুইটারে বলেছে, ইসলামের বিরুদ্ধে অপরাধের কারণে টার্গেট করা হয় অভিজিৎ রায়কে। তিনি বসবাস করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ঢাকায় গ্রন্থমেলা উপলক্ষে এক সপ্তাহ আগে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি একজন প্রকৌশলী। জনপ্রিয় ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগ চালু করেছিলেন। মানবতাবাদী ও সহনশীলতার জন্য তিনি অর্জন করেন সুনাম। তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনায় বিশ্বাস করেন। তাই হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে সে সংক্রান্ত কোন গোঁড়ামি ছিল না। তার বন্ধুরা বলেছেন, ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করায় মৌলবাদীরা তাকে অনেকবার হত্যার হুমকি দিয়েছে। অভিজিৎ তার ফেসবুকে লিখেছেন- আমি মুক্তচিন্তা ভীষণ পছন্দ করি। আমি নাস্তিক্যবাদী, দর্শন, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও মানুষের অধিকার পছন্দ করি। তার ব্লগ মুক্তমনাতে ৪২ বছর বয়সী অভিজিৎ মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি স্কুলে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। প্যারিসে বিদ্রূপ ম্যাগাজিন চার্লি এবদো অফিসে হামলা হয়েছে। এমন অবস্থায় টুইটারে ধর্মকে ভাইরাসের সঙ্গে তুলনা করেন অভিজিৎ রায়। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমনিতেই খুব জটিল। তার মধ্যে এমন মন্তব্য খুবই বিপজ্জনক। বিশ্বের সবচেয়ে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এখানে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম। ২০১৩ সালে ধর্মনিরপেক্ষ আরেক ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দারকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এ সপ্তাহে অভিজিতের মৃত্যুতে  মুক্ত মত প্রকাশের ক্ষেত্রে একই রকম অবস্থা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত এক লড়াইয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে অর্জন করে স্বাধীনতা। এখানে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার এক রীতি। বাংলাদেশে ধর্মের অবমাননা নিয়ে কোন আইন নেই। নেই কোন সরকারি শরিয়াভিত্তিক আদালত।
এ দেশে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দমনপীড়ন চালাচ্ছেন। এ নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা আছে। যাদের বিরুদ্ধে এমন দমননীতি চালানো হচ্ছে তার মধ্যে আছেন সুপরিচিত কিছু রাজনীতিক। তারা চার দশক আগে স্বাধীনতা যুুদ্ধের সময় এর বিরোধিতা করেছিল। এই দমননীতির প্রতি ২০১৩ সালে ব্যাপক গণতন্ত্রপন্থির সমর্থন প্রকাশ পায়। তারা মৌলবাদ বিরোধী বিক্ষোভ করে। অভিজিৎ রায়ের মতো মুক্ত চিন্তার মানুষদের সহযোগিতা করেননি শেখ হাসিনা। অভিযোগ আছে, তিনি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছেন, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বী ও মুক্ত মত প্রকাশের ধারাকে খর্ব করা হচ্ছে। দেশের প্রধান ইসলামপন্থি দল সহ তার প্রধান বিরোধী দলকে জাতীয় সংসদের বাইরে রাখা হয়েছে। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে যেয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। এতে করে জঙ্গি তৎপরতা ও উগ্রবাদ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ফলশূন্য রাজনৈতিক বিষাক্ত সংস্কৃতি বিদ্যমান। বিচারবহির্ভূত সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও রাজপথের বিক্ষোভের ইতিহাস পাল্টে দেয়া হয়েছে এখানে। ওইসব ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনকে অচল করে দিয়েছে। ইসলাম নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অভিজিতের খুনিরা তাকে হয়তো ঘৃণার চোখে দেখে থাকতে পারে। কিন্তু তারা যে কাজ করেছে তা সুদূরপ্রসারি, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। লন্ডনভিত্তিক ভারতীয় সাংবাদিক সলিল ত্রিপাঠি লিখেছেন-বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হয়ে উঠছে, যেখানে খুনিরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। তারা খুন করছে দায়মুক্তভাবে। এখানে লেখকদের বাধ্য করা হচ্ছে তারা কি বলে তা শুনতে ও তাদের চিন্তাভাবনাকে মনের গহিনে অবরুদ্ধ রাখতে।
ইশান থারুর বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক সিনিয়র সম্পাদক। তিনি পররাষ্ট্র বিষয়ে লিখছেন দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে।
(ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

বন্ধুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কিশোরীকে গণধর্ষণ

বাগেরহাটের রামপালে বন্ধুর কাছথেকে ছিনিয়ে নিয়ে সতেরো বছরের এক কিশোরীকে গণধর্ষণ করেছে ৪ লম্পট যুবক। ঘটনাস্থল থেকে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পুলিশ সেলিম মোল্লা (২৪) নামে এক যুবককে আটক করলেও বাকি তিন লম্পট পালিয়ে গেছে। এসময় পুলিশ নির্যাতনের শিকার কিশোরীকে উদ্ধার করে। শুক্রবার রাতে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা ইউনিয়নের গৌরম্ভা গ্রামে নির্যাতনের এ ঘটনাটি ঘটে। নির্যাতনের স্বীকার কিশোরী বাদী হয়ে রামপাল থানায় সেলিমসহ চারজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। শনিবার বাগেরহাট সদর হাসপাতালে কিশোরীর ডাক্তারী পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সেলিম মোল্লা গৌরম্ভা গ্রামের আমানত মোল্লার ছেলে।
রামপাল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা গ্রামের নয়ন নামে এক ছেলের সঙ্গে প্রায় এক বছর আগে এই কিশোরীর মোবাইলের মাধ্যমে পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্রধরে শুক্রবার বিকেলে নয়ন নামে ওই বন্ধু মোবাইল করে মেয়েটিকে রামপালে আসতে বলে। বন্ধুর ফোন পেয়ে সরল বিশ্বাসে মেয়েটি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার শিয়ালীডাঙ্গা গ্রাম থেকে রামপালে চলে আসে। নয়ন ও তার আরেক বন্ধু প্রদীপসহ দুজনে রামপাল উপজেলার ভান্ডারকোট নামকস্থান থেকে মেয়েটিকে নিয়ে একই উপজেলার আদাঘাট এলাকায় ঘুরতে বের হয়। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা নেমে এলে সেখান থেকে ঘুরে তারা তিনজনে মিলে গৌরম্ভা গ্রামের দিকে রওনা দিলে নয়নের পূর্ব পরিচিত সেলিম, লোকমান, বাবুল ও সেন্টু তাদের পথরোধ ও ভয় ভীতি দিয়ে জোর পূর্বক ওই কিশোরীকে আটকে রেখে নয়ন ও প্রদীপকে চলে যেতে বাধ্য করে । পরে ওই চার যুবক মেয়েটিকে একই গ্রামের একটি বাগানে নিয়ে গনধর্ষণ করে।
কিশোরীর বন্ধু নয়ন ও প্রদীপের মাধ্যমে গ্রামবাসি খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে জানালে পুলিশ সেখানে গিয়ে সেলিমকে গ্রেপ্তার ও ধর্ষিতাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। সেলিম তার তিন বন্ধু মিলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছে বলে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। অন্যদের ধরতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।

এবিএম মূসার স্মরণসভায় ব্যারিস্টার মইনুল ও ইকবাল সোবহান মুখোমুখি

ব্যারিস্টার মইনুল ও ইকবাল সোবহান মুখোমুখি
প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসার স্মরণসভায় দেশের চলমান সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছেন বক্তারা। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এই স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেছেন, চলমান সঙ্কটের উৎস নির্বাচন। এই সঙ্কটের সমাধান তো প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে আবার পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন দেয়া হবে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন তার মতেই ছিল অপূর্ণাঙ্গ। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীকে সেই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আমাদের লজ্জা কেন? তিনি বলেন, এখন কথা বলতে গেলে ভয় পাই। মূসা ভাই নীরব থাকা সমর্থন করেন নি। এজন্য বলছি, নির্বাচন দিলে সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ হতে বাধ্য। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন বাদ দিয়ে পুলিশি কায়দায় সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ করেছেন। এই অবস্থায় সুযোগ নিচ্ছে, সুবিধাবাদীরা। ব্যারিস্টার মইনুল বলেন, আজকে আমরা সাংবাদিক-আইনজীবীরা নিজেদের শক্তি হারিয়ে দলীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছি। এতে কেবল নিজেরাই শক্তিহীন হইনি, পুরো জাতিকে শক্তিহীন করছি। গণতন্ত্র মাঠে মারা যাচ্ছে। গণতন্ত্র রক্ষার শক্তি রাজনীতিবিদরা নন। সাংবাদিক ও আইনজীবীদের এ কাজ করতে হবে। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর মতো দলের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
এবিএম মূসা ও সেতারা মূসা ফাউন্ডেশন  আয়োজিত সভায় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আরও বলেন, চলমান সঙ্কট ভয়াবহ রূপ নেয়ার আগেই সতর্ক করে গেছেন প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসা। তিনি এই সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছিলেন। অস্ত্রের ভাষা যে রাজনীতির ভাষা হতে পারে না, এ কথাও জোর দিয়ে বলে গেছেন। তিনি বলেন, অস্ত্রের ভাষা যদি রাজনীতির ভাষা হয়, তাহলে তার মোকাবিলার ভাষা কি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সৈয়দ আবুল মকসুদের সভাপতিত্বে ও রোবায়েত ফেরদৌসের পরিচালনায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন- প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর, বৈশাখী টিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি কাজী রওনক হোসেন, সাংবাদিক আব্দুর রহীম, গোলাম মর্তুজা প্রমুখ।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করেছেন মূসা ভাই। তিনি সত্যকে সত্য বলেছেন। বিরোধিতা করলে, সেটাও ছিল তথ্যনির্ভর। আমরা এখানে বিতর্ক সৃষ্টি করতে আসিনি। তাই, তার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করছি না। আমানুল্লাহ কবীর বলেন, সাংবাদিকদের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে রাজনীতি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, রাজনীতির ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়েই সাংবাদিকের কাজ। এখন তো সাংবাদিক নেই; সব দলীয় কর্মী। চলমান সঙ্কট সমাধানে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, একদল অপর দলকে অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করছে। পার্থক্য একটাই, কারও অস্ত্রের লাইসেন্স আছে, কারও নেই। অস্ত্র দিয়ে অস্ত্রের মোকাবিলা করতে গেলে রক্তক্ষরণ হবে। তিনি বলেন, এই সঙ্কটের সমাধান করতে হবে টেবিলেই। টেবিলের বাইরে সমাধান করতে গেলে যে পরিণতি হবে, সেটা আমাদের সামনেই দেখতেই পাচ্ছি। অভিজিৎ হত্যা তার উদাহরণ হতে পারে।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, চলমান সঙ্কটের উত্তরণ রাজনীতিবিদরা করতে পারবেন না। এই সঙ্কটের উত্তরণ করতে পারতেন সাংবাদিকরা। কিন্তু আজ কি এমন কোন সাংবাদিক আছেন, যিনি দুই নেত্রীকে বলবেন- ‘এনাফ ইজ এনাফ’ (যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়)। তিনি বলেন, অসুস্থ দলবাজি আমাদের গ্রাস করে ফেলেছে। আমিও সেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াবো। কারণ, আমি নিজেও সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলছি না। অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, শুধু সাংবাদিক নয়, এখন আমরা সবাই একচোখা হয়ে গেছি। আমাদের সমস্ত বিবেক, অনুভূতি, বিবেচনা রুদ্ধ হয়ে গেছে। অনেকে গোটা সুশীল সমাজকে আঘাত করে মান্না ভাইয়ের সমালোচনা করছেন। মান্না ভাইয়ের সমালোচনা করতে হলে ‘রাজনীতিবিদ মান্না’র সমালোচনা করতে হবে। তিনি সারা জীবনই রাজনীতি করেছেন। তার এই বক্তব্যের জন্য ‘রাজনীতিবিদরা’ দায়ী। কারণ, আজকের রাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদকেও বলতে হয়েছে, ‘আন্দোলন করতে হবে।’ তাতে যদি দুয়েকটা লাশ পড়ে পড়ুক।’ তিনি বলেন, আমরা যারা সব সময়ই লাশের রাজনীতির বিরোধিতা করেছি, তাদের মুখে মান্না ভাইয়ের সমালোচনা মানায়। কিন্তু যারা হল দখল করে লাশ ফেলে ক্ষমতায় আরোহণ করেছেন, তাদের মুখে মান্নার সমালোচনা মানায় না।
স্মরণসভায় একপর্যায়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও ইকবাল সোবহান চৌধুরী। এ সময় দুজনই তর্কে জড়িয়ে পড়লে উপস্থিত সদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে ইকবাল সোবহান অনুষ্ঠানস্থলে বসলেও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যান। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের আগে বক্তব্য দেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী। এর আগে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বর্তমান রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে রাজনীতিক ও সাংবাদিকসহ সুশীল সমাজের কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। এর জবাবে ইকবাল সোবহান বক্তব্য দেন। পরে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। বলেন, বর্তমান সঙ্কটের সমাধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এ সময় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রোবায়েত ফেরদৌস বক্তব্য সংক্ষেপ করতে বললে তিনি ক্ষুব্ধ হন। খানিক পরে বক্তব্য শেষ করে তিনি আবারও উপস্থাপককে তার অবস্থান সম্পর্কে বলে নিজ আসনে গিয়ে বসেন। এরপরই ইকবাল সোবহান আবার বক্তব্য দিতে প্রস্তুত হন। তিনি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলেন, এখানে আমরা রাজনীতি করার জন্য আসিনি। এ কথা বলার সঙ্গে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন প্রতিবাদ জানান। এ সময় ইকবাল সোবহান ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে থামতে বলেন। এতে সভাস্থলে খানিকটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ পর্যায়ে ব্যারিস্টার মইনুল বলেন, আমাকে আমার কথা বলতে দেন। থামতে বলছেন কেন? আমাকে কেন কথা বলতে দেবেন না। কেন কথা বলতে গেলে আমাকে আটকানো হবে। দুই জনের তর্ক-বিতর্কে অনুষ্ঠানে মৃদু হট্টগোল সৃষ্টি হয়। এরপরই ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন। সভা শেষে সৈয়দ আবুল মকসুদ অনুষ্ঠানে কিছুটা সমস্যা হয়েছে বলে দুঃখ প্রকাশ করেন। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, সব জায়গায় রাগ করতে নেই। সবার রাগ করতে নেই। সব সময় রাগ করতে নেই। রাগ করার শক্তি লাগে। কোথায় কোথায় রাগ করা যাবে তার একটা পরিমিতিবোধ থাকা উচিৎ। এটা একটা স্মরণসভা। মূসা ভাইকে ভালবেসে দলমত নির্বিশেষে সবাই এখানে উপস্থিত হয়েছি।

দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে এ হামলা তারই প্রতীক -সিপিজে

অভিজিৎ রায় হত্যার দ্রুত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা উচিত বাংলাদেশ সরকারের। এর মাধ্যমে ঘাতকদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়েছে। এ সংগঠনের এশিয়াবিষয়ক কর্মসূচির সমন্বয়ক বব ডায়েটজ নিউ ইয়র্ক থেকে বলেছেন, অজয় রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার ওপর হামলার ঘটনা তদন্ত ও অভিযুক্তদের বিচারের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যেন কোন কাজ বাকি না রাখে, সে জন্য আমরা তার প্রতি আহ্বান জানাই। বাংলাদেশে যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে এই হামলা তারই প্রতীক। এখানে এর আগে সাংবাদিকদের ওপর যেসব হামলা হয়েছে তাতে জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকায় সহিংসতার একটি রীতি দেখা দিয়েছে। সিপিজে’র গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে মন্তব্যকারী ও ব্লগাররা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ঝুঁকিতে রয়েছেন। ওই বিবৃতিতে এর আগে ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দারকে হত্যা ও আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর হামলার ঘটনায় কেউ অভিযুক্ত হয় নি। এর জন্য দায় নেয়নি কেউ। বৃহস্পতিবার অভিজিৎ ও তার স্ত্রী অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বের হওয়ার পর পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অজ্ঞাত দু’ব্যক্তি তাদের ঘিরে ধরে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তারা তাদেরকে কুপিয়ে পালিয়ে যায়। অভিজিৎ ও তার স্ত্রী বন্যাকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা অভিজিতকে মৃত ঘোষণা করেন। বন্যার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলাদেশে এসেছিলেন। পুলিশ এ ঘটনার তদন্ত করছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে নি।

ফের উদ্বেগ ইইউ’র

রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফের উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। চলমান সহিংসতা বন্ধ এবং জনগনের মৌলিক গনতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার তাগিদও পূণর্ব্যক্ত করেছে ইউরোপের ২৮রাষ্ট্রের ওই জোট। ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে ২০০১ সালের করা সহযোগিতা চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাব-গ্রুপ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে গত ২৬ ও ২৭শে ফেব্রুয়ারি বৈঠক করে। ২৬ তারিখের বৈঠকে সুশাসন, মানবাধিকার ও অভিবাসন এবং ২৭ তারিখের বৈঠকে বানিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ-ইইউ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকার একটি অন্যতম ভিত্তি উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি সহিংসতায় শিকার হওয়া সাধারণ যথাযথ বিচারের প্রাপ্য। অপরাধী যারাই হোক, তাদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বৈঠকে আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কমিয়ে আনতে পারে। বৈঠকে ইইউ সাব-গ্রুপ গণতন্ত্র, সুশাসন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে সহযোগিতার কথা জানান। বিশেষ করে বিচারিক কাজে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদ- বাস্তবায়নের কথা বলেছে। এছাড়া আইনের শাসন, বিচার বহির্ভুত হত্যার জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, গনমাধ্যমের স্বাধীনতা, সমাবেশ করতে দেয়া ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা, শ্রম অধিকার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং সংখ্যালঘুর অধিকার, পাবর্ত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন, নারী ও শিশু অধিকার নিশ্চিত, রোহিঙ্গা ইস্যু, মৃত্যুদ- এবং অভিবাসনের মত অভিন্ন স্বার্থ জড়িত বিষয়গুলোতে বরাবরের মত উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এছাড়া মানবাধিকার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি। বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য রাষ্ট্র। ফলে মানবাধিকার উন্নয়ন এবং রক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরো গভীরভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইইউ মানবাধিকার ইস্যুতে আরো আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্য বিষয়ক সাব-গ্রুপ বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউ গত তিন বছরের বাণিজ্যের বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। বৈঠকে ‘ইইউ বিজসেন কাউন্সিল বাংলাদেশে’র করা প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নতি। পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়নে ইইউ আরো সহযোগিতা করার ঘোষণা দিয়েছে।  এ সময়ে নতুন করে ৬৯ কোটি ইউরো ডলার অনুদান দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ অনুদান গনতান্ত্রিক সুশাসন, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

লর্ড অ্যাভাবুরির বিবৃতি- পুলিশ খুনিদের পালিয়ে যেতে দিয়েছে

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুন প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশের পুলিশ এবং তারা খুনিদের পালিয়ে যেতে দিয়েছে। এ ঘটনা বাংলাদেশের চলমান সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ও বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে অবশ্যই একত্রে বসতে হবে। তাদেরকে গণতন্ত্রের পথে ফিরে যেতে হবে। একত্রে সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে হবে। এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছেন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান লর্ড অ্যাভাবুরি। অভিজিৎ রায় হত্যার পর সারা বিশ্ব যখন সোচ্চার তখন গতকাল লর্ড অ্যাভাবুরি কঠিন ভাষায় তার বিবৃতি দেন। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন ব্লগার ধর্মনিরপেক্ষ অভিজিৎ রায়কে প্রচ- নিরাপত্তা বেষ্টিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় গ্রন্থ মেলার কাছে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এর ভয়াবহতা গ্রাস করেছে সারা বিশ্বকে। পুলিশ খুন প্রত্যক্ষ করেছে এবং খুনিদের পালিয়ে যেতে দিয়েছে। নতুন নির্বাচনের দাবিতে বাংলাদেশে চলছে অবরোধ ও বিক্ষোভ। এতে কমপক্ষে ১০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। তাই আওয়ামী লীগ সরকার ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলকে অবশ্যই একত্রে বসতে হবে এবং গণতন্ত্রে ফিরে যেতে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার পথ বের করতে হবে।

ফুটেজ দেখে খুনি শনাক্তের চেষ্টা by নুরুজ্জামান লাবু

লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলায় স্থাপিত সিসি টিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। পুলিশের ধারণা, অভিজিৎ রায়কে যারা হত্যা করেছে তারা গ্রন্থমেলা থেকেই তার পিছু নিয়েছিল। গ্রন্থমেলার ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে অভিজিতের খুনিদের দেখা যেতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জঙ্গি গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে প্রাধান্য দিয়েই তদন্ত চলছে। এদিকে গতকাল দুপুরে নিহত অভিজিৎ রায়ের বাবার সঙ্গে তাদের সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় দেখা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের তিন সদস্যের এক প্রতিনিধি দল। তারা অভিজিতের পরিবারে প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া এফবিআই কর্মকর্তারাও সহযোগিতার জন্য অভিজিতের বাবা অজয় রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওদিকে আলোচিত এই মামলাটি গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে থানা পুলিশের কাছ থেকে মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৯টায় গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসসি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাশের ফুটপাতে অভিজিৎ ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে পেছন থেকে আক্রমণ করে দুর্বৃত্তরা। দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাত অভিজিতের মাথার খুলি কেটে মস্তকে গিয়ে আঘাত লাগে। স্বামীকে বাঁচাতে গেলে দুর্বৃত্তরা রাফিদাকেও আক্রমণ করে। এতে রাফিদার হাতের একটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ও শরীরে জখম হয়। দুজনকেই উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক অভিজিতের মৃত্যু ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় রাফিদাকে পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। নিহত অভিজিৎ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে আমেরিকায় চলে যান। সেখানে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অভিজিৎ হত্যার ঘটনাটি তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছেন। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত খুনিদের কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেননি। মামলাটি থানা পুলিশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবির পরিদর্শক ফজলুর রহমান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ডিবির কর্মকর্তারা একুশে গ্রন্থমেলার বাংলা একডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে স্থাপিত মোট ৭০টি সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। এসব সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, তারা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছেন, অভিজিৎকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ কারণে অভিজিৎ যখন মেলায় প্রবেশ করেছেন তখন থেকেই খুনিরা তার ওপর নজরদারি শুরু করে। মেলায় তারা যেখানে যেখানে ঘুরেছেন খুনিরা তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে থাকতে পারে। পরে মেলা থেকে বেরিয়ে আসার পর সুবিধামতো তারা হামলা চালায়। গোয়েন্দা পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তারা যে বর্ণনা পেয়েছেন তাতে খুনিদের একজনের গায়ে সাদা শার্ট ও অপর একজনের গায়ে কালো কোট জাতীয় কিছু ছিল। তাদের বয়সও ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হবে। ফুটেজে অভিজিৎকে শনাক্ত করে তার পিছু নেয়া লোকজনের মধ্যে খুনিদের কেউ ছিল কি না তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে ডিবির অপর এক কর্মকর্তা জানান, অভিজিতের খুনের দায় স্বীকার করেছে আনসারুল্লাহ বাংলা-৭ নামে একটি সংগঠন।
ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃতদের বরাত দিয়ে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রাজীবকে হত্যার আগে কয়েক দফা রেকি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা একেক জন একেক দায়িত্ব পালন করেছে। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতেও খুনিরা একাধিক দিন রেকি করে থাকতে পারে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) হাসান আরাফাত জানান, একাধিক বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চলছে। খুনিদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করতে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।
আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে ঘিরেই তদন্ত: মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রগুলো বলছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে ঘিরেই আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা ও আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর হামলার ঘটনাসহ বিভিন্ন ব্লগারকে হত্যার হুমকি দেয়ার ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এরই ধারাবাহিকতায় ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছে। রাজীব হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেপ্তারকৃত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রের কাছ থেকে সেসময় আটজনের একটি হিট লিস্ট উদ্ধার করা হয়। ওই হিটলিস্টের চার নম্বর তালিকায় ছিল অভিজিতের নাম। সূত্র জানায়, আনসারুল্লাহ বাংলার সদস্যরা কখনই হত্যাকাণ্ডের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না। তারা ইসলামের দুশমন হিসেবে অভিহিত করে ‘কতল’-এর উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিমউদ্দিন রাহমানী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তবে তার অপারেশনাল উইংয়ের প্রধান ইজাজ আহমেদ বর্তমানে পাকিস্তানে পলাতক রয়েছেন। পাকিস্তানে থেকেই ইজাজ তার অন্যতম ক্যাডার রানার মাধ্যমে কাজ করে থাকেন। ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ডের পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রানার নাম উঠে আসলেও এখন পর্যন্ত তাকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অসংখ্য ‘স্লিপার সেল’ রয়েছে। এসব সেলে ৫-৭ জন সদস্য রয়েছে। একটি সেলের সদস্যরা অপর সেলের সদস্যদের সম্পর্কে কোন তথ্য জানতে পারে না। ফলে কোন স্লিপার সেলের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলে অন্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, বলার মতো কোন তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। পুলিশ কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করছে। তদন্তের স্বার্থে এগুলো বলা ঠিক হবে না।
তদন্তে সহযোগিতা করতে চায় এফবিআই: নিহত অভিজিতের বাবা অজয় রায় জানান, শুক্রবার তার কাছে এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে ফোন করা হয়েছিল। তারা এই ঘটনা ‘টেকওভার’ করতে সহযোগিতা করবে বলে জানায়। তিনি এসময় এফবিআই কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে যে কোন উপায়ে খুনিদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানান। এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের ফ্রাঙ্ক, গিবসন ও ইতি’র সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিহত অভিজিতের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন। তারাও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) তদন্তে সহযোগিতা করবে। এদিকে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এফবিআইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম বলেন, এফবিআইয়ের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়নি। তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন।
রাফিদার অবস্থা উন্নতির পথে: এদিকে অভিজিতের সঙ্গে আক্রমণের শিকার হওয়া স্ত্রী রাফিদার অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে তার পরিবারের সদস্যরা। গতকাল তাকে পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অভিজিতের মৃত্যুর খবর তাকে দেয়া হয়নি বলে পরিবারের এক সদস্য জানান। স্কয়ার হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাফিদার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স, নিউরোলজি ও মেডিসিন ওয়ার্ডের একজন করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সমন্বয় করে চিকিৎসার বিষয়টি দেখভাল করছেন। তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আঙুলের অংশে কৃত্রিম আঙুল লাগানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
স্টল বন্ধ রেখে প্রতিবাদ: এদিকে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল একুশে গ্রন্থমেলার শেষ দিনে বেশ কয়েকটি প্রকাশনা বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অপর দিকে অভিজিতের বই প্রকাশকারী সংস্থা শুদ্ধস্বরের মালিক আহমেদুর রশীদ টুটুলকেও হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় তিনি এ সংক্রান্ত একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। মোহাম্মদপুর থানার ওসি আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, ফেসবুকের একটি লিংক থেকে টুটুলকে হত্যার হুমকি দেয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ করেছেন তিনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, আমেরিকা প্রবাসী লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের ‘অবিশ্বাসের দর্শন’সহ কয়েকটি বই প্রকাশ করেছে প্রকাশনী সংস্থা শুদ্ধস্বর। চলতি গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘শূন্য মহাবিশ্ব’।
অভিজিৎকে হত্যার ঘটনায় ছাত্রদলের নিন্দা: এদিকে লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্রদল। গতকাল এক বিবৃতিতে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান এ প্রতিবাদ জানান। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, জনাকীর্ণ স্থানে, পুলিশের সামনেই এভাবে খুন করে পালিয়ে যাওয়ায় জনগণ আজ ভীত-সন্ত্রস্ত। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করতে আহ্বান জানান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি দাবি করেন।
অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাবিতে আজ ধর্মঘট
লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা এবং তার স্ত্রী রাফিদা বন্যাকে গুরুতর জখমকারীদের বিচার, ক্যাম্পাসসহ সারা দেশে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করেছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। একই সময় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ সমাবেশ করারও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে তারা এ ঘোষণা দেন। এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান তারেক। আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি সৈকত মল্লিক, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লাকি আক্তার, ছাত্রফ্রন্টের দপ্তরবিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দীন প্রিন্স প্রমুখ। ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি হাসান তারেক বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে তাকে আইসিটি আইনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথচ অভিজিৎ হত্যার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কাউকে আটক করতে পারেনি তারা। এটা কি তাদের ব্যর্থতা নয়? তিনি বলেন, এ হত্যার মাধ্যমে মুক্তচিন্তার চরমভাবে আঘাত করা হয়েছে। দেশের মানুষ নিরাপদ নয়। শিক্ষার্থী নিরাপত্তহীনতায় ভুগছে। এ সময় জোটের পক্ষে তিনি ৫ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১লা মার্চ কালো ব্যাজ ধারণ, ৩রা মার্চ বিকালে শাহবাগে ছাত্র-শিক্ষক-জনতা সংহতি সমাবেশ, ৪ঠা মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি প্রদান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন সংস্কৃতিকর্মীদের: পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের ভেতর লেখক অভিজিৎকে কুপিয়ে হত্যা ও তার স্ত্রী বন্যাকে জখম করা এবং পুলিশের নির্লিপ্ততায় তাদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)-তে এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে তারা এ প্রশ্ন তুলেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট প্রতিবাদ সভাটির আয়োজন করে। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুসের সভাপতিত্বে সভায় বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কামরুল হাসান, জোটের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ফকির আলমগীর প্রমুখ।
ঢাবি ভিসি অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের অপরাধ ছিল তারা স্বাধীন বাংলাদেশ, ভাষা আন্দোলন ও প্রগতির পক্ষে। যারা এসবের বিপক্ষে তারাই এ হামলা চালিয়েছে।
নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন যেমন দেশ চেয়েছিলাম, তেমন বাংলাদেশ পাইনি। জনগণ দাঁড়িয়ে আছে, পুলিশের অবস্থান আছে অথচ সেদিন হত্যাকাণ্ডের সময় কেউ এগিয়ে যায়নি। এর প্রধান কারণ আমরা ঐক্যবদ্ধ নই। দেশের সব জনগণের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেজন্যই আমরা তাদের নির্বাচিত করেছি। অথচ তারা সেখানে ব্যর্থ হয়েছে।
হাসান আরিফ বলেন, নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে মধ্যযুগীয় কায়দায় তাদের হত্যা করা হয়েছে। এটি কখনই মেনে নেয়া যায় না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। তা দিতে ব্যর্থ হলে এর দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জোটের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি ঘোষণা করেন গোলাম কুদ্দুস। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আগামী ৬ই মার্চ সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণ-অবস্থান ও অনশন কর্মসূচি।
আজ শ্রদ্ধা জানানো হবে: সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অভিজিৎ রায়ের লাশ আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হবে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করা যাবে। এরপর অভিজিতের ইচ্ছানুযায়ী মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে হস্তান্তর করা হবে।

সরকারের ভেতরে আরেক সরকার? by সোহরাব হাসান

গেলবারের কালের পুরাণে ‘ভুল পথে বিএনপি!’ লেখার পর বহু পাঠকই টেলিফোন ও ই-মেইলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ লেখককে আওয়ামী লীগের দালাল বানানোরও চেষ্টা করেছেন। আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমস্যা হলো কারও পক্ষে না গেলেই তিনি তেড়ে আসেন। আর পক্ষে গেলে জয়ধ্বনি দেন। অনেকেই সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলার চেয়ে জোর করে সাদাকে কালো এবং কালোকে সাদা বলাতে চান। সমাজে যুক্তির ভাষায় কথা বলার ও শোনার মানুষ কমে যাচ্ছে। আর রাজনীতিকদের মধ্যে অসহিষ্ণুতার মাত্রা এতটাই প্রকট যে পান থেকে চুন খসলেই আপনাকে বিদেশি চর কিংবা মৌলবাদীদের দোসর বানিয়ে ছাড়বেন।
অনেকেই বলেছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ভুল করলে বড়জোর সেই দলের নেতা-কর্মী–সমর্থক ও অনুসারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিএনপির ওপর ভরসা রেখে যাঁরা নির্বাচনী বৈতরণি কিংবা আন্দোলনের খেয়া পার হতে চেয়েছিলেন, তাঁরাও বিপদে পড়তে পারেন। কিন্তু সরকার যদি ভুল করে, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় দেশের সব মানুষকে। কথাটি অসত্য নয়। জামায়াতের হাত ধরে বিএনপি পেট্রলবোমার রাজনীতি করায় মানুষ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। সে ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়ার কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা কি একবার পরখ করে দেখেছেন, তাঁদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে না কমেছে। ইদানীং নেতাদের বেলাগাম বক্তৃতা, বিবৃতি ও অসহিষ্ণু আচরণ দেখে মনে হয়, তাঁরা জনসমর্থনের ধারই ধারেন না। তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে একটি পেট্রলবোমা যদি বিএনপির জনপ্রিয়তা ১ শতাংশ কমায়, আওয়ামী লীগের নেতাদের বেলাগাম বক্তৃতা ও হুমকি-ধমকিও তাঁদের জন্যও একই পরিণতি ডেকে আনছে।
এ কথা ঠিক যে গেল বছর ৫ জানুয়ারির চেয়ে এবারের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মানুষ মোটামুটি স্বস্তিতে ছিল। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানা, শিক্ষাঙ্গন মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। বিদ্যুৎ সমস্যাও সহনীয় পর্যায়ে চলে এসেছিল। কিন্তু ৫ জানুয়ারির পরে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী ঘটনায় ওই জোটের নেতা-কর্মীদের যেমন দায় আছে, তেমনি দায় এড়াতে পারেন না ক্ষমতাসীনেরাও। আওয়ামী লীগের নেতারা নিয়ত যে বিএনপিকে উদ্দেশ করে আন্দোলনের মুরোদ নেই বলে উপহাস করে আসছিলেন, সেই উপহাসটি এখন তাঁদের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি নেতারাও বলতে পারেন, দেশ ঠিক রাখার মুরোদ আওয়ামী লীগের নেই। বিএনপির কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতারা, মন্ত্রীরা জোরগলায় বলে আসছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সাত সপ্তাহ পরও পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা মুখে বিএনপি-জামায়াতকে নির্মূল করার ফাঁকা আওয়াজ দিলেও কোনো এক অজ্ঞাত আস্তানা থেকে বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিবের আন্দোলনের এলান পাঠানো অব্যাহত আছে। তাহলে দেশের উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত মানুষ আশ্বস্ত হবে কীভাবে? বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে পুলিশের পাহারায় মন্ত্রীরা গরম বক্তৃতা দিলেই মানুষকে আশ্বস্ত করা যায় না। সরকারি দলের নেতাদের রণহুংকারের মধ্যেই মৌলবাদী জঙ্গিবাদীদের হাতে খুন হলেন লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায়। হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলাকারীরা নিজেদের নাম প্রকাশ্যে বলতে সাহস পায়নি। অভিজিতের হত্যাকারীরা বলেছে।
এই যে বিএনপি-জামায়াত জোট লাগাতার অবরোধ-হরতালের নামে পেট্রলবোমা মেরে জনজীবনে আতঙ্ক তৈরি করছে, তাতে মানুষ তাদের ওপর ভীষণ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। কিন্তু এই ক্ষোভের সুযোগটা আধা পয়সা পরিমাণও সরকার বা সরকারি দল নিতে পারেনি।
পত্রিকায় দেখলাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ভয় পায় না। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তিনি বিএনপির নেত্রীকে অংশ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া মনে রাখবেন, নির্বাচনে আমরা ভয় পাই না। নির্বাচন আমরা করেছি। বারবার নির্বাচন করেছি। আপনি নির্বাচনে এলেন না কেন?’
আমরা যতটা জানি, খালেদা জিয়া একটি নির্বাচনের দাবিতেই আন্দোলন করছেন। তাহলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ভয় পায় কি পায় না, এই প্রশ্ন কেন এল। এটি ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’ প্রবাদটির কথাই মনে করিয়ে দেয়। সম্ভবত আওয়ামী লীগের নেতারা ধরেই নিয়েছেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য আর ভোটের প্রয়োজন হবে না। আগামী নির্বাচনও বিএনপিসহ অধিকাংশ বিরোধী দল বর্জন করবে এবং আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারির মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাবে।
-----২.-----
বাংলাদেশে এক অদ্ভুত অবস্থা চলছে। গণতন্ত্র আছে কিন্তু সংসদের ভেতরে-বাইরে কার্যত বিরোধী দল নেই। সংসদে যে বিরোধী দল আছে, সেটি আবার সরকারেরও অংশ। অর্থাৎ মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মেনে চলতে তারা বাধ্য। আর সংসদের বাইরের বিরোধী দলটি এখন পেট্রলবোমার দলে পরিণত হয়েছে। মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো কাজ নেই। এ অবস্থায় গণমাধ্যমই জনগণের একমাত্র ভরসা। কূটনীতিক-কলাম লেখক মহিউদ্দিন আহমদ একটি কথা প্রায়ই বলেন, গত দুই দশকে বিরোধী দল যেখানে সংসদ বর্জন করে আসছে, সেখানে সংবাদপত্র ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোই বিকল্প বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু এই বিকল্প বিরোধী দল বা গণমাধ্যমের প্রতি সরকারে দৃষ্টিভঙ্গিটা কখনোই অনুকূল ছিল না, এখনো নেই। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে সাংবাদিক টিপু সুলতানকে সরকারদলীয় সাংসদ জয়নাল হাজারীর বাহিনী নির্যাতন করলে প্রথম আলো তাঁর পাশে দাঁড়ায়। তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই সাংসদ প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে ব্যক্তিগত কুৎসা রটান। যদিও পরবর্তীকালে স্পিকার তাঁর সেই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করে দিয়েছিলেন। সেই সাংসদ এখন আওয়ামী লীগ থেকে পরিত্যক্ত।
নবম সংসদেও একাধিক মন্ত্রী ও সাংসদ প্রথম আলো ও এর সম্পাদকের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদ্গার করেছেন। একটি অধিবেশনে আড়াই ঘণ্টা প্রথম আলোর বিরুদ্ধে তাঁরা কথা বলেছেন। সেই ধারা বিরোধী দলবিহীন সংসদেও চলছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে হিযবুত তাহ্রীরের একটি পোস্টারের ছবিসহ খবর ছাপার জন্য ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার–এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। যদিও পোস্টারটির শিরোনাম ছিল জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী ফের তাদের কুৎসিত মাথা তুলেছে। পত্রিকাটির সম্পাদক নিজেও কলাম লিখে জানিয়েছেন, জঙ্গিগোষ্ঠীকে মদদ দেওয়া নয়, বরং তাদের অপতৎপরতা সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক করার জন্যই খবরটি ছাপানো হয়েছে। দুর্ভাগ্য, তাঁর এই ব্যাখ্যায় সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সন্তুষ্ট হননি।
গত বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের গ্রেপ্তার দাবি করে লিখেছেন, ‘ডেইলি স্টার পত্রিকা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের একটি পোস্টার আধা পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপিয়েছে, যেখানে সরকার উৎখাত করতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এসবই হচ্ছে আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজের ক্ষমতা দখলের আরেকটি ষড়যন্ত্র। ছাত্রলীগ সদস্যদের ভুয়া বোমা হামলাকারী বানিয়ে ডেইলি স্টার একের পর এক গল্প ছাপিয়ে যাচ্ছে, যেগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কেউই বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতা বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন না।’ এর আগে তিনি দেশের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক প্রথম আলো না পড়ার জন্য নসিহত করেছিলেন।
সজীব ওয়াজেদ জয় যে সত্য বলেননি, তার প্রমাণ ডেইলি স্টার-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় সম্পাদকের নামে একাধিক লেখা, পত্রিকার সম্পাদকীয় ও নিবন্ধ। ৮ ফেব্রুয়ারির সম্পাদকীয়তে বলা হয়: ‘বিএনপি যে ৭২ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে, আমরা কঠোর ভাষায় এর নিন্দা করি। আমরা আরও কঠোরভাবে এর নিন্দা করি এ কারণে যে, এই হরতালের মাধ্যমে ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে। যে রাজনৈতিক দলটি জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করে বলে দাবি করে, সেই দলটি শিক্ষার্থীদের দুর্দশা সম্পর্কে কীভাবে নির্বিকার থাকে?
প্রথম আলোও সরকারি মহলের নানা অপপ্রচার ও তৎপরতা থেকে মুক্ত নয়। ২০০৭ সালের খবর নিয়ে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পাদকের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলার বাদীরা কোনো না কোনোভাবে সরকারি দল বা বিশেষ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। এসব মামলার কোনো ভিত্তি নেই। সম্পাদককে হয়রানির উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। প্রথম আলোয় খবর নিয়ে দায়ের করা ১৮টি মামলায় উচ্চ আদালত প্রথম আলোর খবরকে সঠিক বলে রায় দিয়েছেন।
প্রথম আলো বরাবরই সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে সমুন্নত রেখে আসছে। প্রথম আলো যেমন সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনা করে, তেমনি বিরোধী দলের সন্ত্রাস ও সহিংসতারও নিন্দা করে। গত দেড় মাসে প্রথম আলো অন্তত ১৫টি সম্পাদকীয়, কয়েক ডজন উপসম্পাদকীয় লিখে বিরোধী দলের জবরদস্তি হরতাল-অবরোধের বিরোধিতা করেছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘অচল হরতাল-অবরোধ’ শিরোনামে লেখা সম্পাদকীয়তে বলা হয়: ‘৫১ দিনের অবরোধ-হরতালে শতাধিক মানুষের মৃত্যু মানুষকে বিচলিত না করে পারে না। এ কারণে হরতালে জনজীবন কিছুটা হলেও ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু একে মানুষের সমর্থনপুষ্ট কোনো আন্দোলন বলে দাবি করা যাবে না। এমনকি বিশিষ্ট রাজনীতি বিজ্ঞানীরাও বলেন, বর্তমানে যা চলছে, সেটা আন্দোলন নয়, সহিংস সন্ত্রাস। আন্দোলনের এ নৃশংস পদ্ধতি সব সময় মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই এ অভিশপ্ত পথ থেকে সরে আসাই হবে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়।’
সম্প্রতি সম্পাদক পরিষদের একটি বিবৃতি নিয়েও মহলবিশেষ বিতর্ক তোলার চেষ্টা করছে। সম্পাদক পরিষদ তার বিবৃতিতে বলেছিল, সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রচারমাধ্যমের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে সংবাদপত্র প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে। এই বিবৃতিতে সম্পাদক ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে যে মন্তব্য করা হয়েছে, সেটি মোটেই অসত্য নয়।
এই বিবৃতির জবাবে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার তথা তথ্য মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। বর্তমানে সরকার বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম পরস্পরের পরিপূরক। তাই সরকার গণমাধ্যমকে সক্রিয় উন্মুক্ত ও গতিশীল রাখতে সদা সচেষ্ট। সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা, ভিন্নমত, সরকারি কাজে ত্রুটি-বিচ্যুতি বা কর্মকর্তাদের আইনবহির্ভূত কাজ বা দুর্নীতির বিষয়ে রিপোর্টিংয়ে কোনো বাধা নেই।...বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে স্বাধীনতা ভোগ করছে।
সরকার যদি গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ না করেই থাকে এবং তারা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে, তাহলে সংসদে কেন সম্পাদকদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার হবে, কেন হয়রানিমূলক মামলা হবে? কেনই বা পত্রিকা অফিসে পুলিশ ঢুকে তল্লাশি চালাবে?
তাহলে কি আমরা ধরে নেব সরকারের ভেতরেও আরেকটি সরকার আছে। তাহলে কি গণমাধ্যমের ওপর এসব খবরদারি ও মাতব্বরির ঘটনা তথ্য মন্ত্রণালয়ের অজ্ঞাতেই ঘটছে? কারা ঘটাচ্ছেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

মিডিয়ার বিপদ by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশে মিডিয়া বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। কিন্তু মিডিয়ার যত বিস্তার ঘটেছে, এর স্বাধীনতাও ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে ততটাই। প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রায় সব বর্তমান সরকারি দল নিয়ন্ত্রিত। বিরোধী দল বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের হাতে যা আছে বা ছিল তা উল্লেখযোগ্য নয়। যাওবা ছিল, তার প্রায় সবই সরকারি রোষে বন্ধ হয়ে গেছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এখন দোর্দণ্ড প্রতাপ। এসব মিডিয়ার মালিক সরকারপন্থীরা। সেখানে এরা এমন সব কর্মী বেছে বেছে নিয়োগ করে, যারাও কট্টর সরকার সমর্থক। এ ক্ষেত্রে মিডিয়া আন্তর্জাতিক বা জাতীয় মান কোনোটাই রক্ষা করার চেষ্টা করে না। সরকার যে প্রচার-প্রপাগান্ডা চালায় বা চালাতে চায়, মিডিয়া সেটাই জোরেশোরে প্রচার করতে থাকে। ফলে এগুলো হয়ে পড়ে বিপজ্জনক ধরনের একপেশে। এখন মিডিয়ায় তেমন প্রচার-প্রপাগান্ডাই চলছে। সরকার কিভাবে মানবাধিকার হরণ করছে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী কিভাবে নরহত্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে, অকারণে সাধারণ মানুষকে গুলি করে পঙ্গু করে দিচ্ছে, চালাচ্ছে গ্রেফতার বাণিজ্য, যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে কিভাবে গ্রামকে গ্রাম তছনছ করে দিচ্ছে, সে সংবাদের ছিটেফোঁটা খবরের কাগজে এলেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তার দেখা পাওয়া ভার। এসব মিডিয়া সরকারের প্রদর্শিত পথে পাল তুলে এগিয়ে যাচ্ছে। তাতে মিডিয়াগুলোর গ্রহণযোগ্যতা একেবারে শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে যদি সহনশীল গণতন্ত্রের চর্চা না থাকে, ভিন্ন মতের রাজনীতির অস্তিত্ব যদি বিপন্ন হয়ে পড়ে, তা হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচারমাধ্যমগুলো বিপন্ন হতে বাধ্য। বর্তমান সরকার, বিরোধী সব মত একেবারে মূল থেকে উৎপাটন করে ফেলতে চাইছে। ভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে মেরে-কেটে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে মুক্তবুদ্ধির লোকেরা যে যেখানে ভিন্ন মত প্রকাশের চেষ্টা করছে, সেখানেই তাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া হচ্ছে।
ক্রমেই স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার খর্ব হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, স্বাধীনভাবে কথা বলতে ১০বার এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে নিতে হচ্ছে। কিন্তু সেটুকুও সহ্য করতে রাজি নয় সরকার। কেউ সত্য কথা বললেই তাকে স্বাধীনতার শত্রু, একাত্তরের ঘাতক কিংবা ঘাতকদের দোসর হিসেবে সাব্যস্ত করা হচ্ছে। আর চিৎকার করে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, এদের সমূলে উৎপাটন করতে হবে। এমনকি এদের পরিবারকেও ছেড়ে দেয়া হবে না। রাজনীতির ভিন্ন মতের কথা তো সরকার শুনতেই চায় না। এমনকি অর্থনীতি সমাজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নিজেদের চিন্তার বাইরে আর কিছুই শুনতে চায় না সরকার। সেটা শুনলে বরং তারা লাভবানই হতো। জনকল্যাণের পথে অগ্রসর হতে পারত। সেই সহনশীলতা ক্রমেই তিরোহিত হচ্ছে।
বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলগুলোকে কোণঠাসা করতে করতে দেশকে একেবারে ধ্বংসের দুয়ারে নিয়ে গেছে সরকার। এ ক্ষেত্রে এরা কোনো দূরদর্শী চিন্তা ভাবনাও করতে নারাজ। কোনো একটি ঘটনা কিংবা সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী ধরনের বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে, সমাজের ভেতরে কী ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে, সে বিষয়ে বর্তমান সরকার উদাসীন। ভিন্ন মত থেকে যে সত্যোপলব্ধি সহজ হতে পারে সেটিও বর্তমান সরকার মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এরকম একটি পরিস্থিতি একটি সমাজকে শুধু পেছনেই ঠেলে। সামনে এগোতে দেয় না। এটি রাজনীতির ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি সত্য সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও।
২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির চরম বিতর্কিত নির্বাচন দেশে এক অভাবনীয় সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। এই সঙ্কটেরও কার্যত জন্ম দেয়া হয়েছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। ওই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সরকার এমন সব বিধান করেছে, যা অনন্তকালের জন্য অপরিবর্তনীয়। কিন্তু কালের পরিসরে যুগের চাহিদায় মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষর পরিবর্তনের ফলে তা অপরিবর্তনযোগ্য থাকতে পারে না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বিলুপ্ত করেছে। জনমত যাচাইয়ের জন্য গণভোট ব্যবস্থা রদ করেছে। মানুষের নানা মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। নানা ধরনের আইন-কানুন করে কেড়ে নেয়া হয়েছে মৌলিক অধিকার। সে পথেই এখন দেশে এক অসহনীয় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রথম থেকেই সরকার খড়গহস্ত মিডিয়ার ওপর। এই ক্ষোভের শুরু প্রধানত টেলিভিশনগুলোর টকশো নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক আগে থেকেই টকশোগুলোকে ভারি টক বলে বিদ্রুপ করেছেন। আর টকশোতে যারা অংশ নেন তাদের চোর-ছ্যাচ্চোর বলে গালিগালাজ করেছেন। কারণ তার মতে, চোরেরাই শুধু চুরি করার ধান্ধায় মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থাকে। যখন রাজপথে সভা সমাবেশ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়, তখন সত্য শুনতে উদগ্রীব থাকে মানুষ। সত্যের সন্ধানে তারা টকশোতে উচ্চারিত ভিন্ন মত শুনতে চায়।
টেলিভিশনের টকশোগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সেখানে আলোচনার জন্য বিভিন্ন মতের মানুষকে একত্রিত করা হতো। এরা যার যার মতো করে তাদের মত প্রকাশের সুযোগ পেতেন। সাধারণ মানুষ এসব ভিন্ন মত থেকে আসল সত্য খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করত। ফলে টকশোগুলোর চমৎকার জনপ্রিয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু যারা স্রোতের বাইরে দাঁড়িয়ে সত্য বলার চেষ্টা করতেন, তারা দ্রুতই সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হলেন। সরকারের তরফ থেকে বারবার ঘোষণা হতে থাকল, এই টকশো-অলারা জাতির শত্রু। অতএব এদেরও সমূলে উৎপাটন করতে হবে।
তখন আওয়ামী গুণ্ডারা টকশো-অলাদের কর্মস্থল বা বাসভবনে হানা দিতে শুরু করল। আওয়ামী এক মন্ত্রী তো নিউ ইয়র্কে অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য ভাষায় টকশোর আলোচকদের গালিগালাজ করে বসলেন। টকশোতে যারা ভিন্ন মত নিয়ে আসেন, তারা ভদ্রলোক। কিন্তু এরকম ভীতি প্রদর্শনের খামোশ হয়ে গেলেন তাদের অনেকেই। এদের মধ্যে বিরোধী দলের লোক ছিলেন। সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক রোষে তাদের বেশির ভাগই এখন কারাগারে। অনেকে আবার পলাতক। সরকারের তরফ থেকে অনেক টিভি চ্যানেলকে জানিয়ে দেয়া হলো, টকশোতে অমুককে আর ডাকা যাবে না। বেশ কয়েকটি বেয়াড়া টকশো সরকারের রোষে বন্ধ হয়ে গেল।
রাজনৈতিক ভিন্ন মত এখন ভয়াবহ রকম সঙ্কুচিত। সেখানে আলোচনার ভিন্নমতও এখন প্রায় নির্বাসনে। সরকার ইতোমধ্যেই চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টেলিভিশন, দিগন্ত টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছে। একুশে টেলিভিশনেরও গলা টিপে ধরেছে সরকার। ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করেনি বটে, তবে সার্ভারদের হুমকি এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, সম্প্রচার চালু থাকলেও চ্যানেলটি যেন কেউ দেখতে না পারে। অথচ এর চেয়ারপারসনও সরকার সমর্থিত লোকই, ভিন্ন মতের কেউ নন। ফলে সরকার সমর্থক চ্যালেনগুলো এখন পড়েছে নানা ধন্ধে। কাকে ডাকবে, কখন বন্ধ হয়ে যাবে চ্যানেল।
সরকারি লোকেরা বলতে শুরু করেছে টকশো, সংবাদপত্র কিংবা সুশীলসমাজ- এদেরও মূলোৎপাটন করা হবে। ভিন্ন মতের রাজনীতিকদের যেভাবে সরকার গলা টিপে ধরেছে, তাতে ইতোমধ্যেই সরকার অনেকখানি অন্ধ হয়ে পড়েছে। তার ওপর যদি মিডিয়ার ওপরেও নিয়ন্ত্রণের খড়গ নামিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সরকার হয়ে পড়বে সম্পূর্ণরূপে গোয়েন্দানির্ভর, জননির্ভরতার লেশমাত্রও থাকবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রথম যে কাজ করছে, তা হলো টিভি চ্যানেলগুলোর লাইভ অনুষ্ঠান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বন্ধ করে দিয়েছে। এগুলো ছিল সরকারের এক ধরনের চোখ। শত ক্যামেরায় যা ধারণ করা যেত সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টে তা ধারণ করা সম্ভব নয়। সে উপলব্ধি সরকার হারিয়ে ফেলেছে।
সারা দেশে ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা যানবাহনে পেট্রলবোমা মেরেছে। তাতে কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অর্ধশতাধিক মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। অনেকেই কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সন্দেহ নেই, এ ঘটনা মর্মান্তিক। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের আতিপাতি মন্ত্রীরা ‘বার্ন ইউনিট’, ‘বার্ন ইউনিট’ বলে এর যাবতীয় দোষ ২০ দলীয় জোটের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। আর বার্ন ইউনিটের কথা বলে তারা ঘোষণা করলেন, যারা সংলাপের কথা বলে তারা জাতির শত্রু। তাদের নির্মূল করতে হবে।
কিন্তু খবরের কাগজে একে একে বের হতে থাকল চাঞ্চল্যকর তথ্য। পেট্রলবোমা মারতে গিয়ে, বানাতে গিয়ে সরকার দলের লোকেরা যখন ধরা পড়তে থাকল, তখন আর এ বিষয়ে সরকারের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার জো থাকল না। সরকার দলের অফিসে পাওয়া গেল বোমার গুদাম। সরকারি এমপির বাড়িতে পাওয়া গেল বোমার কারখানা। বোমা মারতে গিয়ে যারা ধরা পড়ল, দেখা গেল, তাদের বেশির ভাগই সরকারি দলের সদস্য। তখন সরকারি এমপি নেতারা শ’য়ে শ’য়ে সেসব বোমাবাজের নামে চারিত্রিক সার্টিফিকেট ইস্যু করল- ওই বোমাবাজেরা সৎ ও মেধাবী এবং আওয়ামী লীগের কর্মী। অতএব তাদের যেন ছেড়ে দেয়া হয়। সরকার সমর্থিত টিভি চ্যালেনগুলো বার্ন ইউনিটের হাহাকার আর কান্না নিয়ে রিপোর্ট করতে থাকল। আর বার্ন ইউনিট যেন হয়ে গেল একটি শুটিং স্পট। অনেকেই আহত রোগীদের নানা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে চোখে গ্লিসারিন লাগিয়ে কান্নার ছবি তুলতে লাগল।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ রইল অন্ধকারেই। সেটা সরকারি বাহিনীর হাতে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ও আহতদের কাহিনী। এ সব ক্ষেত্রেই পরিবারগুলোর তরফ থেকে দাবি করা হলো যে, তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বারবার সে কথা অস্বীকার করল। তারপর দেখা গেল, তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে সে মারা গেছে বা কোথায়ও তার লাশ পাওয়া গেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেল রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কাউকে ধরে নিয়ে গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চাঁদা দাবি করেছে, পরিবার চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলে হাঁটুর ওপর গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে। অনেকেরই পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। এভাবে এক একটি জীবন ধ্বংস হয়েছে। বিনা অপরাধে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। সেসব পরিবারেও উঠেছে কান্নার রোল। যারা ‘বার্ন ইউনিট’, ‘বার্ন ইউনিট’ করে অনেক কথা বলেছেন, তারা পঙ্গু হাসপাতালে পড়ে থাকা মানুষের আহাজারি শোনেননি। সরকারি কোনো মহলকে এ নিয়ে একটি কথাও বলতে শুনিনি। কিন্তু মিডিয়া যদি স্বাধীন থাকত, তাদের ওপর যদি হস্তক্ষেপ করা না যেত, তাহলে নিশ্চিত করে বলতে পারি, সেখানে পড়ে থাকা আহত অঙ্গহানি রোগীরা ও তার স্বজনরা আসল কথা বলতে পারতেন। সরকার দৃষ্টি দিতে পারত সেদিকেও। তারা মুক্ত থাকতে পারত এই বিপুলসংখ্যক মানুষের অভিসম্পাত থেকে।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ডেইলি স্টার পত্রিকা নিয়ে। ডেইলি স্টার পত্রিকা কিছু দিন আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুত তাহরীরের পোস্টারের একটি ছবি ছেপে লিখেছিল যে, হরতাল অবরোধের সুযোগে ওই সংগঠনটি আবার তাদের কুৎসিত মাথা বের করার চেষ্টা করছে। সংবাদটি সরকারের জন্য শতভাগ পজিটিভ ছিল। কিন্তু কোনো এক উকিল এই মর্মে আদালতে মামলা ঠুকে দেয় যে, ডেইলি স্টার পত্রিকা ওই ছবিটি ছেপে হিজবুত তাহরীরকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছে। শুরুতে আমার নিজের কাছে ব্যাপারটি হাস্যকর মনে হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিলেন, তখন বিষয়টি আর হাস্যকর থাকেনি। এরপর আওয়ামী নেতারা অবিরাম গাল দিতে থাকল ডেইলি স্টার সম্পাদককে। সম্পাদক মাহফুজ আনাম ডেইলি স্টারের প্রথম পাতায় মন্তব্য লিখে এবং টেলিভিশনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিষয়টির কোনো সুরাহা করতে পারছেন না। তার বিরুদ্ধে বিষোদগার চলছে। সরকার বুঝতে পারছে না যে, মিডিয়া দলন বা নিয়ন্ত্রণ করে বা মিডিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে অধিকতর অন্ধত্বই বরণ করতে হয়। চোখের সামনে থেকে নিভে যায় সব আলো। ফলে দিকভ্রান্ত হওয়া ছাড়া তাদের আর গত্যন্তর থাকে না।
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

১৭ বছর পরে মায়ের কোলে ফেরা

১৭ বছর আগে মায়ের কোল থেকে চুরি করা হয়েছিল জিফানি নার্সকে। তন্নতন্ন করে খুঁজে কোথাও হদিস পাওয়া যায়নি তার। ঘটনাচক্রেই ছোট বোনের সূত্র ধরে সেই জিফানিকে খুঁজে পেল তার পরিবার। কেপটাউনের একটি হাসপাতালে ১৯৯৭ সালে জন্ম হয়েছিল জিফানির। জন্মের তিন দিনের মাথায় ঘুমন্ত মায়ের কোল থেকে তাকে চুরি করা হয়। সেই থেকেই তার অপেক্ষায় ছিল বাবা-মা। ঘটনাচক্রে কেপটাউনের একটি স্কুলে জিফানি ও তার আপন ছোট বোন ক্যাসিডি নার্স পড়ত। স্কুলের অনেকেরই তাদের দু’জনের বিভিন্ন দিকে মিল থাকার বিষয়টি নজরে আসে। বিষয়টি ক্যাসিডি তার মা-বাবাকে জানায়। এর মধ্যে একদিন জিফানিকে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় ক্যাসিডি। আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সে। ওইদিনই জিফানির ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করতে দেয় নার্স পরিবার। পরে পুলিশ জানায়, জিফানির ডিএনএ-এর সঙ্গে নার্স পরিবারের ডিএনএ-এর মিল রয়েছে। এ ঘটনার পর জিফানিকে চুরির সঙ্গে জড়িত এক নারীকে আটক করে পুলিশ। ওই নারীই জিফানিকে নিজের সন্তানের মতো করে বড় করেছে। ধারণা করা হচ্ছে ওই নারীর কোনো সন্তান না থাকায় তিনি জিফানিকে চুরি করেছিলেন। জিফানির আরও তিন ভাইবোন রয়েছে। তারপরও জিফানি বড় সন্তান হওয়ায় হারিয়ে যাওয়ার পরও বাবা-মা কখনোই তাকে ভুলতে পারেনি। প্রতি বছরই তারা জিফানির জন্মদিন পালন করতেন। টেলিগ্রাফ।

অভিজিৎ হত্যায় কেবল শোক নয়, আমাদের সম্মিলিত ক্রোধ জাগ্রত হোক by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

কী লিখব? দিনসাতেকের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। ১৮ ফেব্রুয়ারি জেদ্দায় পেঁৗছেছি। মক্কা ও মদিনা হয়ে ২৬ তারিখে লন্ডনে ফিরেছি। সকালে ফিরে এসেছি। সন্ধ্যাবেলাতেই খবর পেয়েছি, অধ্যাপক অজয় রায়ের তরুণ পুত্র অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীকে ঢাকায় টিএসসির মোড়ে জঙ্গিরা নির্মমভাবে কুপিয়েছে এবং তার ফলে অভিজিৎ সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছেন। তার স্ত্রী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। একদিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারা, অন্যদিকে ধর্মের নামে এভাবে অসাম্প্রদায়িক, মেধাবী তরুণ বুদ্ধিজীবী ও সেক্যুলার ব্লগার এবং লেখকদের কুপিয়ে হত্যা করা। দেশটা কি তাহলে ইরাকের কয়েকটি এলাকার মতো আইএসএসের রাজত্ব হয়ে গেল?
ইচ্ছা ছিল লন্ডনে ফিরে এসে জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় সাত দিনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখব। লেখার বিষয় ছিল বিস্তর। জেদ্দায় বাংলাদেশিদের পরিচালনাধীন দুটি আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি ও বাংলামাধ্যমের স্কুল ও কলেজ আছে। তাদের আমন্ত্রণে এবং জেদ্দায় নিযুক্ত আমাদের কনসাল জেনারেল শহিদুল করিম ও তার স্ত্রীর সৌজন্যে আমার এই সৌদি আরব ভ্রমণ। একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরে, দুপুরে ও সন্ধ্যায় একই দিনে জেদ্দায় একুশের তিনটি অনুষ্ঠানে আমাকে অংশ নিতে হয়েছে। জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। তাদের সুখ-দুঃখ সমস্যার কথা জেনেছি। ভেবেছিলাম সেসব নিয়েই লিখব। কিন্তু জেদ্দা থেকে লন্ডনে ফিরে আসতেই অভিজিৎ রায়ের ওপর এ পৈশাচিক হামলা এবং তার মৃত্যুর খবর! ফলে স্বাভাবিকভাবেই সৌদি ভ্রমণকথা আপাতত স্থগিত রইল। লেখার বিষয়বস্তু পাল্টাতে হলো।
অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড নির্মম, কিন্তু নতুন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। কয়েক বছর আগে বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের একই ধরনের হত্যা প্রচেষ্টা (পরিণতিতে মৃত্যু) আমরা দেখেছি। তারপর এই সেদিন বর্তমান আওয়ামী লীগ শামনামলেই আমরা দেখেছি, রাজীবসহ একাধিক তরুণ এবং সেক্যুলার ব্লগারকে এই পৈশাচসিদ্ধ জঙ্গিদের হাতে নির্মম মৃত্যুবরণ। হুমায়ুন আজাদের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উস্কানিদাতারা তখন চিহ্নিত হয়েও সাজা পায়নি। বর্তমান সময়ে সেক্যুলার ব্লগারদের হত্যার নায়করাও তেমন শাস্তি পায়নি; শাস্তি পেয়েছে একাধিক ব্লগার। ধর্মের অবমাননার দায়ে তাদের দু'একজনকে গুরুতর আহত (জঙ্গিদের দ্বারা আক্রান্ত) অবস্থাতেও জেলে পচতে হয়েছে। সেক্যুলার আওয়ামী লীগ সরকারও তাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি এবং এখনও দিতে পারছে তা মনে হয় না।
ধর্মের অবমাননার সংজ্ঞাটা কী? আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে তা নির্ণীত হয়নি। সেক্যুলারিজমের পক্ষে কথা বলাই কি ধর্মের অবমাননা? সম্প্রতি প্যারিসে একটি কার্টুন পত্রিকা সরাসরি মহানবীকে (সা.) নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করায় জঙ্গিরা কার্টুনিস্টদের হত্যা করেছে। তার সঙ্গে বাংলাদেশে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের চরিত্র ও লক্ষ্য কি এক? অভিজিৎ লেখক বা ব্লগার হিসেবে কোনো ধর্মীয় মহাপুরুষকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেননি; কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেননি। তিনি বর্তমানের ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসের ঘোর বিরোধী ছিলেন। অর্থাৎ ছিলেন একজন সেক্যুলারিস্ট। একজন সেক্যুলারিস্ট হলেই কি তাকে হত্যা করার বিধান কোনো ধর্মের রয়েছে? তা যদি না থাকে, তাহলে ধর্মের নামে যারা এই বর্বরতা চালাচ্ছে তারা কে বা কারা? ধর্মের মুখোশের আড়ালে এরা তো আসলে ঘৃণ্য ঘাতক। এরা মানবতার শত্রু। এদের সম্পর্কে কোনো দেশের কোনো সরকারেরই নমনীয় নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে জঙ্গিদের হত্যাকাণ্ডে এক বিপজ্জনক মাত্রা যোগ হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডগুলোকে তারা ধর্মের আবরণে ঢাকছে। জামায়াত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তার নেতাদের সমালোচনা করাকেও ধর্মের অবমাননা বলে চালানো হয়। '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে যাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে, তারা যে যুদ্ধাপরাধ করেছে সে কথা গোপন রেখে ইউরোপে প্রচার করা হচ্ছে। এরা সবাই ইসলামিক স্কলার এবং ইসলামিক স্কলার হওয়াতেই হাসিনা সরকার তাদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ধর্মের উচ্ছেদই এ সরকারের লক্ষ্য। সৌদি আরবে যে সাত দিন ছিলাম তখন দেখেছি, এই প্রচারণাটিই সেখানে প্রবল এবং চালাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত।
অভিজিৎ রায়কেও একজন ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে বহির্বিশ্বে তার হত্যাকাণ্ডকে একজন ধর্মদ্রোহীর শাস্তি বলে চালানোর চেষ্টা হলে বিস্মিত হবো না। বাংলাদেশের জঙ্গি সমর্থক জামায়াতিরা এই চেষ্টা হুমায়ুন আজাদের বেলায় করেছে (তার 'পাক সার জমিন' উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল জামায়াতিদের ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় ব্যভিচারকে ব্যঙ্গ করে, ধর্মকে অবমাননা করে নয়), ব্লগার রাজীবের বেলায় করেছে, এখন অভিজিৎ রায়ের বেলাতেও করা হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এই আন্তর্জাতিক যোগসূত্রের সন্ত্রাস একা সরকারের পক্ষে দমন করা সম্ভব নয়। তবে সরকারের আরও কঠোর হওয়া উচিত। এই বর্বরতা উচ্ছেদের জন্য সংঘবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করা দরকার।
মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমি ধর্ম বা ধর্মীয় মহাপুরুষদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করার অবাধ অধিকারের (যুক্তিসম্মত সমালোচনার নয়) সমর্থক নই। কিন্তু ধর্মের অবমাননার ধুয়া তুলে যারা বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায়, তাদের ধর্ম এবং মানবতা দুয়েরই চরম শত্রু মনে করি। এই শত্রুদেরও মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচানোর জন্য ইউরোপে মানবতার নামে যে ধুয়া তোলা হয়েছে, তা প্রহসন ও ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। মানবতার শত্রুদেরও মৃত্যুদণ্ডদান যদি সমর্থনযোগ্য না হয়, তাহলে সন্ত্রাসীদের দমনের নামে মধ্যপ্রাচ্যে রোজ ড্রোন হামলা চালিয়ে শয়ে শয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে কেন? এই নিহতদের মধ্যে ক'জন সন্ত্রাসী মারা যাচ্ছে?
যেসব দেশ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের জন্ম দিয়েছে ও বহুদিন লালন-পালন করেছে তারাই আজ নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দমনে হিমশিম খাচ্ছে। আমেরিকা যে আইএসএসকে তৈরি করেছে, এখন তারই সঙ্গে যুদ্ধরত। সৌদি আরব এতকাল মধ্যপ্রাচ্যে, পাকিস্তানে, এমনকি বাংলাদেশেও মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের মদদ জুগিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই মৌলবাদী জঙ্গিদের ভয়ে এখন তারাই শঙ্কিত।
আমি সৌদি আরবে থাকাকালীন অবস্থাতেই মক্কা শরিফে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলন। সম্মেলনটির নাম ছিল 'ইসলাম অ্যান্ড কমব্যাটিং টেরর বা ইসলাম ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অনেক ইসলামিক স্কলার ও ওলামা এই সম্মেলনে হাজির হয়ে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস যে ইসলামবিরোধী এবং এই জঙ্গিবাদ দমনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংঘবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কে একটি যুক্ত ইশতেহার প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, দরিদ্র দেশগুলোর বেকার ও অভাবী যুবকদের ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করে সন্ত্রাসী হিসেবে রিত্রুক্রট করা হচ্ছে। এই সন্ত্রাস দমনের উপায় সম্পর্কেও এই আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশেও ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান একদিনে ঘটেনি, আবার একদিনে তার উচ্ছেদ ঘটানো যাবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছর না যেতেই দেশের সেক্যুলার সরকার ও সংবিধান উচ্ছেদ করে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার স্বাধীনতার শত্রু পলাতক মৌলবাদীদের এবং যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করেছিল। পরবর্তীকালে তার দলের সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়ে সেই বিষবৃক্ষ এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। একে নির্মূল করা যে সহজ নয়, তার প্রমাণ হুমায়ুন আজাদ থেকে অভিজিৎ রায় পর্যন্ত অসংখ্য নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের একটি সুশীল সমাজ বর্তমানে আওয়ামী লীগ বিদ্বেষে এবং তার বিরোধিতায় এতই অন্ধ যে, ভয়াবহ জঙ্গিবাদ সম্পর্কে তারা ততটা সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় নয়। ফলে এই দানবের বিরুদ্ধে সামাজিক শক্তি ও ঐক্য দ্বিধাবিভক্ত। আমাদের সুশীল সমাজের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ কতটা দেশ এবং গণস্বার্থবিরোধী তার প্রমাণ ড. কামাল হোসেন গ্রুপের নতুন পাণ্ডা মাহমুদুর রহমান মান্নার ভূমিকা থেকেও ফাঁস হয়ে গেছে। আমি মাত্র ক'দিন আগেই ঢাকার একটি দৈনিকে 'বিএনপির সুশীল সহযোগী' শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছি। তা যে শিগগির এত সত্য হয়ে দাঁড়াবে তা নিজেও ভাবিনি।
অভিজিৎ রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবরে যতটা শোকাহত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি হয়েছি ত্রুক্রদ্ধ। এই পশুদের নিষ্ঠুরতা এবং বর্বরতা আর কতকাল দেশের মানুষকে সহ্য করতে হবে? কতকাল, আর কতকাল এই অব্যাহত নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে এবং কেবল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে দায়িত্ব শেষ করতে হবে? বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ এবং সমাজ গরিব। এ দেশের সন্ত্রাসী রিত্রুক্রট করা এবং লালন করাও সহজ। দু'জন সন্ত্রাসীকে ধরে সাজা দিলেই সন্ত্রাস দমন হবে না; যতদিন তার নতুন রিত্রুক্রট বন্ধ না হয়, এই রিত্রুক্রটকারীদের চিহ্নিত করা ও ধরার ব্যাপারে সরকার কঠোর হোক এবং সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করুক। অভিজিৎ হত্যা কোনো শোক নয়, আমাদের সম্মিলিত সামাজিক ক্রোধকে জাগ্রত করুক। সেই ক্রোধের শক্তিতে যেন আমরা এই দানবচক্রকে নির্মূল করার জন্য সংঘবদ্ধ হই।
লন্ডন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার

এবারের বইমেলা by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

এবারের বইমেলাটা অন্যরকম। আগে কখনও টানা অবরোধ-হরতালে বইমেলা হয়নি। প্রথম প্রথম আমার একটু সন্দেহ ছিল মানুষজন বইমেলায় আসবে কি-না। অবরোধ কিংবা হরতাল পালন করার জন্য মানুষজনই বইমেলা বয়কট করবে সেটা কখনোই ভাবিনি। পেট্রলবোমা-ককটেলের ভয়ে লোকজন মেলায় এসে স্বস্তি পাবে কি-না সেটা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। দেখা গেল, এ দেশের মানুষের পেট্রলবোমা আর ককটেলের জন্য যেটুকু ভয়, বইয়ের জন্য ভালোবাসা তার থেকে অনেক বেশি। আমি সিলেট থাকি, শুক্র-শনিবার বইমেলায় আসতে পারি। এবারে ছুটি নিয়ে পুরো সপ্তাহের জন্য ঢাকা চলে এসেছিলাম বইমেলায় যাওয়ার জন্য। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, এ বইমেলার কোন জিনিসটি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, আমার উত্তরটি হবে খুবই সহজ। আমি বলব, সেটি হচ্ছে বইমেলায় উপস্থিত এ দেশের অতি বিচিত্র মানুষ। মেলায় থাকা অবস্থায় ঘড়ির কাঁটা যখন রাত আটটার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন আমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে জিজ্ঞেস করি, কী হল? আটটা বেজে যাচ্ছে এখনও কিছু ঘটল না?’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলে, ‘ঘটবে! নিশ্চয়ই ঘটবে।’ এবং সত্যি সত্যি ব্যাপারটি ঘটে, আশপাশে কোনো জায়গায় বিকট শব্দ করে একটা ককটেল ফাটে। আমি মেলার শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী কিংবা মধ্যবয়স্ক মানুষের দিকে তাকাই এবং সবিস্ময়ে আবিষ্কার করি, একটি মানুষেরও একটু ভুরু পর্যন্ত কুঞ্চিত হয় না। দেখে মনে হয়, তারা সেই বিকট শব্দটি শুনতেই পায়নি! যে যার মতো মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কথা বলছে, বই দেখছে। ভয় দেখানোর জন্য বোমা ফাটানোর পরও যদি কেউ বিন্দুমাত্র ভয় না পায়, তাহলে বোমাবাজদের জন্য তার থেকে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?
তারপরও মেলাটি নিয়ে আমার ভেতরে একটা দুঃখবোধ আছে। আমার পরিচিত অনেকেই ঢাকার বাইরে থাকে। তাদের মাঝে অনেকেই লেখক, কেউ নতুন লেখক, কেউ অনেকদিন থেকে লেখে। বইমেলা এলে তারা দল বেঁধে বইমেলায় আসে। এবারে তাদের অনেকেই বইমেলায় আসতে পারেনি। নিজের বই বের হয়েছে, বইয়ের স্টলে সেই বইটি দেখতে পারেনি। অবশ্য এটা নিয়ে দুঃখ করলে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে- যখন এসএসসি পরীক্ষার জন্য হরতালে ছাড় দেয়া হয় না, তখন বইমেলা দেখতে আসার জন্য ছাড় দেয়া হবে সেটি আশা করার মতো উৎকট রসিকতা আর কী হতে পারে?
২.
পুরনো লেখালেখি ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, বছরের এ সময়টাতে গত বছর ঠিক একইভাবে আমি বইমেলার ওপর একটা লেখা লিখেছিলাম। লেখার দুটি বিষয় আলাদাভাবে চোখে পড়ল। গতবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে আমার খুব আশা ভঙ্গ হয়েছিল, কারণ আমি লিখেছিলাম, বইমেলাটিকে মোটেও বইমেলা মনে হয়নি, মনে হয়েছে শুধু বই বিক্রি করার জন্য গাদাগাদি করে দাঁড় করানো কিছু বইয়ের স্টল! ঘিঞ্জি স্টলের ভেতর মানুষজন ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটাহাঁটি করছে। এবারে মেলায় এসে আমার সেই দুঃখ দূর হয়েছে। বিশাল এলাকা নিয়ে বইয়ের মেলা, সুন্দর স্টল, তার চেয়েও সুন্দর প্যাভিলিয়ন এবং তার চেয়েও সুন্দর হচ্ছে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ফাঁকা জায়গা। হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে গেলে বসার জন্য বাঁশের তৈরি বেঞ্চ। তার সঙ্গে যদি চা-কফি খাওয়ার জন্য দু-একটি স্টল থাকত তাহলে আমার কোনো দুঃখ থাকত না।
গত বছর আমার আরও একটি খুবই গুরুতর বিষয় নিয়ে দুঃখ ছিল, সেটি হচ্ছে বাথরুমের অভাব। পরিষ্কার বাথরুমের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশাল একটা বক্তৃতা দিয়ে আমি লিখেছিলাম, ‘বাংলা একাডেমির বইমেলার বাথরুমের মতো কুৎসিত, জঘন্য, অপরিষ্কার, অস্বাস্থ্যকর জায়গা পৃথিবীর আর কোথাও নেই!’ শুধু তাই নয়, কোনো একজন বিখ্যাত মানুষের উদ্ধৃতি দিয়ে আমি বলেছিলাম, ‘যে জাতি যত সভ্য তাদের বাথরুমের সংখ্যা তত বেশি এবং তাদের বাথরুম তত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন!’ এবারের বইমেলায় গিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম, এক বছরে আমরা অনেক বেশি সভ্য জাতি হয়ে গেছি। এই বইমেলায় ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন তকতকে বাথরুমের সারি। প্রকৃতির ডাকে যাদের বাথরুমে যেতে হয়েছে, তাদের কাছে বইয়ের স্টলে সাজানো বইয়ের সারি থেকে সেই বাথরুমের সারি কম দৃষ্টিনন্দন মনে হয়নি।
৩.
বইমেলায় অনেক স্টল ছিল। আমি সেগুলোর ভেতর থেকে শুধু একটা স্টলের কথা আলাদা করে বলি। স্টলটির নাম ‘স্পর্শ’ এবং সেই স্টলের বইগুলো অন্যরকম। অন্যান্য স্টলের বইয়ের মতো সেগুলো চোখে দেখে পড়া যায় না, সেগুলো স্পর্শ করে পড়তে হয়, কারণ বইগুলো ব্রেইলে লেখা। যারা চোখে দেখতে পায় না, তাদের জন্য আলাদাভাবে এ বইগুলো ছাপতে হয়। ছয়টি একটু উঁচু হয়ে থাকা ফুটকি দিয়ে ব্রেইল লেখা হয়। যারা দেখতে পায় না, তারা ব্রেইলে লিখতে-পড়তে শিখে। একটা বই তাদের পড়ে শোনালে এর বিষয়বস্তুটা শুনতে পারে, বুঝতে পারে; কিন্তু তাতে তাদের লেখাপড়া শেখা হয় না, বানান শেখা হয় না, বাক্য গঠন শেখা হয় না। তাই যেসব ছেলেমেয়ে চোখে দেখতে পায় না, তাদের লেখাপড়ার জন্য ব্রেইল বই দরকার। আমাদের দেশের দৃষ্টিহীন ছেলেমেয়েরা একদিক থেকে খুব দুর্ভাগ্যের শিকার- তাদের জন্য যথেষ্ট দূরে থাকুক, প্রয়োজনীয় ব্রেইল বইও নেই।
দুই বছর আগে বইমেলায় আমার একটা কিশোর উপন্যাস একই সঙ্গে ছাপা বই এবং ব্রেইল বই হিসেবে বের হয়েছিল। আমার কাছে সেই ব্রেইল বইয়ের দুটি কপি রয়ে গিয়েছিল। আমি সেই বই দুটি উপহার হিসেবে সেই স্টলে নিয়ে গিয়েছিলাম। স্টলে গিয়ে দেখি সেখানে বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে স্কুলের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে, তারা সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী; কিন্তু সবাই স্কুলের ছাত্রছাত্রী। আমি বাচ্চা-কাচ্চাদের জন্য লিখি। এ বয়সী ছেলেমেয়েরা অনেকেই আমার লেখা পড়েছে। ব্রেইলে আমার বই একটির বেশি দুটি আছে কি-না আমার জানা নেই। তাই এসব ছেলেমেয়ে আমার কোনো বই পড়েছে কি-না সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু আমি খুবই অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, ছেলেমেয়েগুলোর কাছে আমার পরিচয় দেয়া মাত্রই তারা আমাকে চিনতে পারল এবং আমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়ে উঠল। বেশ অনেকক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা হল, তারা আমাদের খুব সুরেলা গলায় গান গেয়ে শোনাল।
দেখতে দেখতে ছোট স্টলের সামনে বেশ ভিড় জমে গেল। সাংবাদিকরা নোট বই এবং ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কোথা থেকে জানি একটা টেলিভিশন চ্যানেলও তাদের ক্যামেরা নিয়ে হাজির হল। আমি তখন অনেকদিন থেকে যে স্বপ্নটা লালন করে এসেছিলাম সেটা ঘোষণা করে এলাম। সবাইকে সাক্ষী রেখে বলে এলাম, এখন থেকে যখনই আমি কিশোর-কিশোরী বা ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু লিখব, প্রশাসককে পাণ্ডুলিপি দেয়ার আগে তাদের জন্য একটা শর্ত জুড়ে দেব- একই সঙ্গে সেই বইটি ব্রেইলেও বের করতে হবে। অন্য যারা কিশোর-কিশোরী বা ছেলেমেয়েদের জন্য লেখেন, তাদের সবাইকেও একই কাজ করতে বলব। তাহলে দেখতে দেখতে আমাদের দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের জন্য ব্রেইল বইয়ের বিশাল একটা ভাণ্ডার গড়ে উঠবে। সবাই যদি এগিয়ে আসে তাহলে পরের বছর বইমেলায় হয়তো ‘স্পর্শ’ প্রতিষ্ঠানটি ছোট একটি স্টল নিয়ে কুলাতে পারবে না। ব্রেইল বইয়ের বিশাল ভাণ্ডারের জন্য মস্ত একটি প্যাভিলিয়ন নিতে হবে!
আমি যখন ছেলেমেয়েগুলোর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি তখন তারা বলল, ‘স্যার একটা অটোগ্রাফ!’ আমি ব্রেইলে অটোগ্রাফ দিতে পারি না- তাই সাধারণ কাগজে সাধারণ কলমের অটোগ্রাফ দিয়ে এসেছি- তারা সেটা পেয়েই যথেষ্ট খুশি। এ বয়সটাই মনে হয় অল্পতে খুশি হওয়ার বয়স।
৪.
বইমেলায় গেলেই সবারই নানা ধরনের অভিজ্ঞতা হয়। আমার ধারণা আমার অভিজ্ঞতাটা অন্য অনেকের অভিজ্ঞতা থেকে বেশি চমকপ্রদ। যেমন আমি একটি বই না কিনেই বইয়ের বিশাল বোঝা নিয়ে বাসায় ফিরি। নতুন লেখকেরা আমাকে তাদের বই উপহার দিয়ে যান। সব বই আমার পড়া হয় না; কিন্তু বইগুলো আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি এবং প্রায় সময়েই আমার নিজের প্রথম বইয়ের কথা মনে পড়ে যায়। আমি আমার প্রথম বইটি হাতে নিয়ে যে উত্তেজনা অনুভব করেছিলাম, এ নতুন লেখকরাও নিশ্চয়ই সেই একই উত্তেজনা অনুভব করেন। কিছু কিছু বইয়ের পেছনের কাহিনী অবিশ্বাস্য। যেমন একটি মেয়ে ভিড়ের ভেতর আমাকে তার নিজের হাতে লেখা একটি বই দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। বাসায় এসে বইটি খুলে দেখি তার গ্রামে সবাই তাকে ‘খারাপ মেয়ে’ হিসেবে অপবাদ দেয়ার চেষ্টা করছে। সেই অপবাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে তার জীবনের ইতিহাসটুকু লিখে বই হিসেবে ছাপিয়ে প্রকাশ করে ফেলেছে! বই লেখার এ কাহিনী দিয়েই নিশ্চয়ই একটি বই লিখে ফেলা যায়।
বইমেলায় গিয়ে আমি যেসব বই উপহার পাই তার একটা অংশ থাকে আমাকে উৎসর্গ করা বই। এ বছরটি সেই হিসেবে আমার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ বছরে আমার ঢাকা কলেজের শিক্ষক প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ থেকে শুরু করে অস্টম শ্রেণীর একটা ছাত্রীর লেখা বই আমাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। কতজনের এত বড় পরিসরের মানুষজনের কাছ থেকে বই উৎসর্গ পাওয়ার সৌভাগ্য হয়?
৫.
বইমেলায় সবকিছুই যে ভালো তা নয়, কিছু খারাপ ঘটনাও ঘটে, মানিব্যাগ-মোবাইল অদৃশ্য হয়ে যাওয়া তার একটি। আমি অবশ্য সেটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। পকেটমারা সম্ভবত পৃথিবীর আদিমতম পেশাগুলোর একটি। আমার মা যখন হজে গিয়েছিলেন, সেখানে তার পকেট মেরে দিয়েছিল- আমার সাদাসিধে মা লজ্জায় বহুদিন সেই ঘটনার কথা আমাদের বলেননি। শুনেছি হজের সময় প্লেন ভরে এ দেশের অনেক বিখ্যাত পকেটমার মক্কায় পকেট মারতে যায়! কাজেই বইমেলার ভিড়ের মাঝে কিছু পকেটমার উপার্জন করার জন্য আসবে না, সেটা তো হতে পারে না। লেখক, প্রকাশক, চিংড়ি মাছের মাথা বিক্রেতা, চুড়িওয়ালী, পাইরেটেড বই বিক্রেতা, নতুন লেখকদের ফাঁকি দেয়া প্রকাশকরূপী প্রতারক, ককটেল ফোটানোর সাব কন্ট্রাক্ট নেয়া ছিন্নমূল তরুণ- সবাই যখন কিছু অর্থ উপার্জন করে নিচ্ছে, তখন পকেটমাররা বাকি থাকবে কেন?
তবে বইমেলার (কিংবা অন্য যে কোনো মেলার) যে বিষয়টি আমাকে খুবই কষ্ট দেয় সেটি হচ্ছে, ভিড়ের সুযোগ নিয়ে কিছু পুরুষ যখন মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করে। একটা সময় ছিল যখন মেয়েরা দাঁতে দাঁত চেপে এগুলো সহ্য করেছে- আজকাল করে না। ভিড়ের কারণে সব সময় তারা মানুষটিকে ধরতে পারে না; কিন্তু যদি ধরতে পারে তাহলে তার কপালে বড় ধরনের দুঃখ থাকে। এ বইমেলাতেই ‘ঢিশুম’ শব্দ শুনে দেখি একটি কম বয়সী মেয়ে একজন তরুণের নাকে ঘুষি মেরে দিয়েছে, তারপর ঘুরে অন্য আরেকজনের নাকে! আরেকটি ঢিশুম! (এই বইমেলাতেই আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ ছাত্রীকে একটা বই উৎসর্গ করেছি- আমি ছাত্রীদের কথা দিয়েছিলাম, যারা প্রথম ব্ল্যাকবেল্ট পাবে আমি তাদের একটা বই উৎসর্গ করব। আমি আমার কথা রেখেছি। কাজেই মেয়ে দেখলেই যাদের হাত নিশপিশ করে তারা সাবধান- কখন একজন ব্ল্যাকবেল্টের হাতে পড়ে তুলাধোনা হয়ে যাবে কে বলবে?)।
যা হোক, মন খারাপ করা একটা বিষয় দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই না। একটা মজার ঘটনা বলে লেখা শেষ করি। আজকাল পাঠকরা লেখকদের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য খুবই আগ্রহী। যারা সত্যিকারের লেখক তাদের সত্যিকারের পাঠক থাকে এবং সেই পাঠকরা তাদের লেখকদের কাছ থেকে মোটামুটি একটা সম্মানজনক প্রক্রিয়ায় অটোগ্রাফ নিয়ে থাকেন। আমি যেহেতু কম বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য লেখালেখি করি, আমার অবস্থাটা একটু ভিন্ন- আমার পাঠকরা কম বয়সী এবং তাদের অটোগ্রাফ নেয়ার প্রক্রিয়া যথেষ্ট আদিম। তারা অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য ঘিরে ধরে, চেপে ধরে, ধাক্কাধাক্কি করে, চিৎকার করে এবং প্রয়োজন হলে হুমকি দেয়। মাঝে মাঝে তাদের দেখে মনে হয়, অটোগ্রাফ নামের এ অতি বিচিত্র বিষয়টি নিতে না পারলে তাদের জীবন অর্থহীন হয়ে যাবে। তবে অটোগ্রাফ নিয়ে আমার অতি বিচিত্র অভিজ্ঞতাটি হয়েছে একুশে ফেব্র“য়ারির দুপুরবেলা। অনেকেই আমাকে ঘিরে ধরেছে এবং তাদের সবাইকে ঠেলে একজন তরুণ এগিয়ে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘সাইন করে দেন।’
আমি অন্য কারও বইয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলাম, বললাম, ‘এটা শেষ করেই দিচ্ছি’। তরুণটির ধৈর্য নেই। মেঘ স্বরে বলল, ‘সাইন করে দেন।’
আমি বললাম, ‘একটু দাঁড়াও।’ কিন্তু তার দাঁড়ানোর সময় নেই, রীতিমতো হুমকি দিয়ে বলল, ‘সাইন করেন।’
অবস্থা বেগতিক দেখে আমি তাড়াতাড়ি তার কাগজে অটোগ্রাফ দিলাম। তরুণটি কাগজটি হাতে নিয়ে মোবাইল বের করল। আজকাল সব মোবাইলেই ক্যামেরা থাকে, সে সেই ক্যামেরায় ছবি নিয়ে ভিড় ঠেলে বের হয়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে গেল। ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে? আপনার নাম কী?’
বইমেলায় প্রতিদিনই এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটে আর আমার মনে হয়, আহা বেঁচে থাকাটা কী মজার!
২৫.০২.১৫
মুহম্মদ জাফর ইকবাল : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; লেখক

ভিন্নমত পোষণকারী ও রাজনৈতিক নেতারা নিরাপত্তাহীন -বৃটিশ হোম অফিসের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতারা নিরাপত্তাহীন। স্বাধীন মত প্রকাশের স্থান সঙ্কুচিত হয়েছে। বিরোধী দলপন্থি ব্যক্তিদের টক শোতে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্পাদকরা রয়েছেন প্রচণ্ড চাপে। সরকারের সমালোচনা করা হয় এমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ না করতে এই চাপ দেয়া হচ্ছে। সরকারের সমালোচনা করায় অনেক সাংবাদিককে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। আইসিটি এ্যাক্ট ও সম্প্রচার নীতিমালা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। সরকার নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ কয়েক হাজার মামলা তুলে নিলেও অন্য দলের কারও কোন মামলা প্রত্যাহার করেনি। সরকার সমর্থকদের পেট্রোল বোমা সহ পুলিশ ধরলেও তাদের ছেড়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের  হোম অফিস বাংলাদেশ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। ২৬ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় গত সোমবার। এর শিরোনাম ‘কান্ট্রি ইনফরমেশন অ্যান্ড গাইডেন্স, বাংলাদেশ: অপজিশন টু দ্য গভর্নমেন্ট’। এতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা দ্বারা যারা প্রকৃতপক্ষেই বিচারের সম্মুখীন তাদের সুরক্ষা পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশের পুলিশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিরোধী রাজনীতিক, নারীর সুরক্ষা ও সহিংসতা দমনে ব্যর্থ। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে। এক্ষেত্রে তাদেরকে দেয়া হয়েছে  দায়মুক্তি। তারা স্বীকারোক্তি আদায়ে নির্যাতন করে। এছাড়া বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তারা জড়িত। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার নিজ দলের নেতাকর্মীদের মোট ৭১৭৭টি মামলা প্রত্যাহার করেছে গত ৫ বছরে। এর মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে ১০টি হত্যা মামলা। এ ক্ষেত্রে অন্য দলের কোন নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহার করা হয় নি। বলা হয়, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার নেপথ্যে আছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা, সরকার ও বিরোধী দলের নেতাকর্মী, ছাত্রসংগঠনগুলো। জানুয়ারির শেষ নাগাদ এতে বিএনপির কমপক্ষে ৭০০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৭ জন। দেশের উত্তর অঞ্চলে বিরোধী দল সমর্থন করেন এমন ব্যক্তিদের বাড়িঘর ও দোকানপাঠ ভাঙচুর করা হয়েছে। দমনপীড়নের ফলে নারী ও শিশুসহ শত শত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যখন যে দলই ক্ষমতায় যায়, সেই দলের ছাত্রসংগঠনের অস্ত্রধারীরা মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় লঙ্ঘনকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়। খুন, হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে গত বছর ছাত্রলীগ বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছে। এতে বলা হয়, গত ছয় মাসে ছাত্রলীগ ২৫০ বার নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। অন্য সংগঠনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে ১৫০ বারের বেশি। অস্ত্রধারী ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার বড় কারণ। বাংলাদেশের কোন নাগরিক যুক্তরাজ্যে মানবিক বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চাইলে তা কিভাবে দেখা হবে- এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কি কি করণীয় তা নির্ধারণ করতে ওই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে গত বছর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের বাংলাদেশের অবস্থা। এতে বলা হয়েছে, ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। জাতীয় সংসদে কোন আসন নেই এখন তাদের। তা সত্ত্বেও তারা এখনও প্রধান বিরোধী পক্ষ। এ বছরের ৫ই জানুয়ারি ছিল ওই নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি। এ উপলক্ষে বিএনপি সমাবেশ আহ্বান করে। কিন্তু ঢাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয় থেকে বের হতে দেয়া হয় নি। এতে সৃষ্ট ঘটনায় নোয়াখালীতে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন পুলিশের গুলিতে। সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অনেক মানুষ। বিভিন্ন স্থানে সরকারি দলের লোকজন পেট্রলবোমাসহ ধরা পড়েছে। কিন্তু পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় নি। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৩-১৪ সময়ের প্রায় পুরোটা ও এ বছরের শুরুতে হয়রান, খেয়াল খুশিমতো গ্রেপ্তার, আটক, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ফাঁসির রায় দিয়েছে বিরোধীদলীয় বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। মানবাধিকার বিষয়ক কর্মীরা বলছেন, এ বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করছে সরকার। এতে রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে তাদের মানবাধিকার বিষয়ক কান্ট্রি রিপোর্টে বলেছে, ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা। দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদের কাছে ওই নির্বাচন ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু। একই সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের জন্য নাগরিকদের অধিকার দিয়েছে সংবিধান। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বলছে, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ, এনএসআই ও একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে নিয়োজিত রাখা হয়েছে সরকারের সমালোচকদের দিকে নজর রাখতে। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতিকদের দিকে সরকার নিয়মিতভাবে নজরদারি করে থাকে। ওই রিপোর্টে বলা হয়, ওই সংসদের বেশির ভাগ সময় সংসদে অনুপস্থিত ছিল। ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস রিপোর্ট করে যে, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে তৎকালীন ১৮ দলীয় বিরোধী জোট। ওই নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনের প্রার্থী নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে। ওই নির্বাচনের দিন নিহত হন ২১ জন। শতাধিক স্কুলে স্থাপিত ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘অধিকার’ গত বছর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুুক্তি আইন। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে সরকার অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার। এর মাধ্যমে অনেক বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে জেলে রাখা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টিভি ও ইসলামী টিভির সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সভা-সমাবেশে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যেসব মানুষ বিকল্প চিন্তায় বিশ্বাস করে তাদের ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দিয়ে চাপে রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে জাতীয় সংসদকে। এর ফলে এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা সহ এনজিওগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ ফরেন ডোনেশনস রেগুলেশন অ্যাক্ট অনুমোদন দিয়েছে। এ আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশ করার স্বাধীনতার লঙ্ঘন করবে। এ আইন নিয়ন্ত্রণ করবে মানবাধিকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে, যা বাংলাদেশের সংবিধান ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক ঘোষণার পরিপন্থি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াট তার ২০১৪ সালের বার্ষিক রিপোর্টে বলেছে, সমালোচকদের দমনপীড়ন করার লক্ষ্যে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ধারা এর আগের বছরও ছিল। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে বলেছে, রাজনৈতিক প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও অস্থিরতার সময় সমাবেশের স্বাধীনতা সীমিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ‘অধিকার’ এক রিপোর্টে বলেছে, ক্ষমতাসীন দল একই দিনে তাদের কর্মসূচি ঘোষণায় সহিংসতার আশঙ্কায় অনেকবার জারি করেছে ১৪৪ ধারা। এতে অনেকবার বিরোধীদের সভা বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু যখন শুধু বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার জন্য আইন ব্যবহার করা হয় তখন তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। সরকার বিরোধীদের সমাবেশ বন্ধ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যদের পাঠিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এতে শুধু সমাবেশ করার স্বাধীনতাই লঙ্ঘিতই হয় না, একই সঙ্গে এতে আইন প্রয়োগকারীদের ক্ষমতার অপব্যবহারও হয়। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সংসদে কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও, বিএনপিই দেশের সত্যিকার বিরোধী দল। জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন নিয়ে বর্তমানে সংসদে প্রধান বিরোধী দল। তবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি সরকার মেনে না নেয়ায় ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করার কারণেই জাতীয় পার্টি আজকের অবস্থানে। ঢাকা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট যদিও ২০ দলীয়, তবে এর মধ্যে এমন কিছু দল আছে, যারা নামেমাত্র দল। এদের কয়েকটি দল বিএনপি’র সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় আরেকটি জোট গঠন করেছে। তবে সংবাদ সম্মেলন করা ছাড়া প্রতিষ্ঠার পর ওই জোটের তেমন উল্লেখযোগ্য কোন কর্মকাণ্ড নেই। একই পত্রিকার আরেকটি প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর থেকে ২০১৪ সালের শেষ কয়েক মাস বিএনপির কর্মকাণ্ড অভ্যন্তরীণ সভা ও সংবাদ সম্মেলনেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিএনপির একমাত্র দৃশ্যত কর্মকাণ্ড ছিল, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মাসে এক-দুবার ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে সভা করা। ২০১৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিস শীর্ষক প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মাঝেমাঝে বিরোধী দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার ও বিচারের অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়। তবে কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণেই কোন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয় থেকে নিরাপত্তা বাহিনী বের হতে না দেয়া ও ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার বিষয়টিও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নির্বাচনের বর্ষপূর্তির আগে বিএনপির ২ জ্যেষ্ঠ নেতাসহ ৪০০ সমর্থককে আটক করেছে সরকার। এছাড়া ৬ই ফেব্রুয়ারি দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে। তার আগের দিন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চার বিএনপিকর্মী। ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে খুব বেশি। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ২০১৩ সালে বিভিন্ন সংঘর্ষে প্রায় ৫০০টি মৃত্যু ও ২৪০০০ মানুষের আহত হওয়ার বিষয়টি বিষয়টি লিপিবদ্ধ করেছে। সে সময় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন, মামলা ও হয়রানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ফরেইন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস জানিয়েছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে মারাত্মক আকারে সহিংসতা হয়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ২০১৩ সালে ৫০০ মানুষ বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে ২১৫ জন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, বিরোধীদলীয় কর্মীরাও ব্যাপক সহিংস কর্মকাণ্ড করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় সরকার পাশবিক অভিযান চালিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কিভাবে বিরোধী কর্মীদের ওপর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ও গুম করেছে, সংস্থাটি তা লিপিবদ্ধ করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীকে বৈষম্যমূলকভাবে ব্যবহার, বিরোধী সমর্থকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি উঠে এসেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন সংঘর্ষে অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর বেশির ভাগেরই মৃত্যু হয়েছে পুলিশের সঙ্গে বিরোধী কর্মীদের সংঘর্ষে। এর বাইরেও নিরপেক্ষ উৎস থেকে যাচাই করা না হওয়ায় বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ যুক্ত করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবার ভয়ে সহায়তা করতে রাজি হয়নি। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে যথাক্রমে ২৮ ও ৬ ব্যক্তি নিহত এবং ২৯৮০ ও ১৫৯২ জন আহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে অধিকার। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১০৮ ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, এদের বেশির ভাগই বিরোধীকর্মী। এ সময় সাত ব্যক্তিকে র‌্যাব ও পুলিশ নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এছাড়া জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের উদ্বেগ প্রকাশের বিষয়টিও উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে। সেখানে জাতিসংঘ বলেছিল, ২০১৫ সালের ৫ই জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে এক ডজনেরও বেশি বিরোধীকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ২১শে জানুয়ারি প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তখন পর্যন্ত ৭ হাজারেরও বেশি কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িতদের সবাইকে পুলিশ আটক করে না। বাসে বোমা নিক্ষেপের অনেক ঘটনা পুলিশের উপস্থিতিতে ঘটেছে। অনেক সময় স্থানীয় জনতা শাসক দলের সদস্য বিভিন্ন বোমাবাজদের ধরে পুলিশে তুলে দিলেও, পরে পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলে যৌথবাহিনীর অভিযানে মানুষ ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। এছাড়া বিরোধী সমর্থকদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর সশস্ত্র ও সহিংস কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা
‘অধিকার’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাপক সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও সরকার তাদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মামলাগুলো ২০১৩ সাল জুড়ে প্রত্যাহার করতেই থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ মানবাধিকার গ্রুপগুলোর। গত বছর সেপ্টেম্বরে ডয়েচে ভেলে তার রিপোর্টে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলে, খালেদা জিয়া ও তার তিন সহযোগীর বিরুদ্ধে দুটি দাতব্য সংস্থা থেকে অর্ধ মিলিয়ন ডলারের বেশি আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের মতে, এতে তাকে দোষী প্রমাণ করা গেলে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর যাবজ্জীবন জেল হতে পারে। গত ৫ই জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা নির্বাচিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেই ৬৯ বছর বয়সী ওই নেত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তবে খালেদা জিয়া ও তার পক্ষ দাবি করছেন, এ অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার আপিল আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
যুদ্ধাপরাধের বিচার
দ্য ফ্রিডম হাউজ ২০১৪ রিপোর্টে বলেছে, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০১০ সালে গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এতে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়। তার কোন কোনটার রায় নিয়ে শাহবাগের আন্দোলনের কথাও তুলে ধরা হয়। এর ফলে একজন নেতার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পরে মৃত্যুদণ্ডে রূপ নেয়। তা কার্যকরও করা হয়েছে। এই আদালতের মানদণ্ড আন্তর্জাতিক মানের করার দাবি বিভিন্ন আইনজীবী, মানবাধিকার গ্রুপের। কিন্তু তা অনুসরণ করা হয় নি। অভিযুক্তরা আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ পান নি। তাদের জামিনের অধিকারও দেয়া হয় নি। এতে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের উদ্বেগ  দেখা দেয়। উদ্বেগ রয়েছে সাক্ষী ও বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিয়ে।
সাংবাদিকতা
ফ্রিডম অব দ্য প্রেস ২০১৪- রিপোর্টে বাংলাদেশ নিয়ে বলা হয়েছে, যৌক্তিক বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে সংবিধান। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অপরাধ বিষয়ক আইনে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা সংক্রান্ত বিধিতে মিডিয়াকে বিরত রাখা যেতে পারে। কিন্তু তা মাঝে মাঝেই সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও বিচারে দাঁড় করাতে ব্যবহার করা হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহ বিষয়ক আইন ব্যাপক পরিসরে ব্যবহার করা যায়। তবে ২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি করা হয়েছে তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতার অধীনে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে সাংবাদিকদের। এর অধীনে বিচার ছাড়াই ৯০ দিন আটক রাখা অনুমোদিত। অথবা তাদেরকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করা যেতে পারে। গত কয়েক বছরে বিরোধী দল সমর্থিত পত্রিকা দৈনিক আমার দেশ আইনগত ও বিধিবদ্ধ হুমকিতে পড়েছে কয়েক বছর। এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও বড় অংশীদার মাহমুদুর রহমানকে আটক করা হয়েছে ২০১৩ সালের এপ্রিলে। তার পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের কারণে ধর্মীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ করা হয়েছে। এ অভিযোগের তদন্তকালে তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে। ২০১০-১১ সালে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করা ও ২০১২ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তিনি ১০ মাস জেল খেটেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০১৩ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বেশ কিছু সাংবাদিক ও মানবাধিকার বিষয়ক এনজিওর দেয়া তথ্যমতে- সরকারের শাস্তির ভয়ে সাংবাদিকরা সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করেছেন। যদিও প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা সাধারণ একটি বিষয়, তবু মিডিয়া- বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল। এর পরিণামে মিডিয়া সেলফ সেন্সরশিপ প্রয়োগ করে। পূর্ববর্তী সরকারের মতো, এ সরকারও রাজনৈতিক নেতা ও সমর্থকদের জন্য ব্রডকাস্ট লাইসেন্স ইস্যু করেছে। সাংবাদিকরা পুলিশের হাতে হয়েছেন শারীরিক হামলা, হয়রান। তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেছে পুলিশ। অধিকারের মতে, ওই বছর জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে ১৪৪ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, দু’ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা হামলা করেছে ৩৯ জনের ওপর। রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন অপরাধীর হাতে নিগৃহীত হয়েছেন ২৩৪ জন। গত ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। এতে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, বার্গম্যানকে অভিযুক্ত করার মাধ্যমে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রতি একটি শীতল বার্তা দেয়া হয়েছে। তাহলো- আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সমালোচনা সহ্য করবে না। গত মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, সম্পাদক ও নির্বাহীরা সরকারের পক্ষে যায় না এমন রিপোর্ট কভার করার জন্য হয়রানি হতে হয়েছে। যৌনতা বিষয়ক একটি প্রোগ্রাম প্রচারের অভিযোগে একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যানকে গত ৬ই জানুয়ারি আটক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার জায়গা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন সম্পাদকদের ওপর সরকারের সমালোচনা যাতে না করা হয় সে জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা বিরোধী দলপন্থি তাদেরকে টক শো’তে অংশ নেয়া থেকে বাধা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে অনলাইনে যারা সক্রিয় তাদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। গত মার্চে চট্টগ্রামের দুই টিনেজার তাদের ফেসবুক একাউন্টে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানে এমন পোস্ট ছাড়ার কারণে সহিংস আক্রমণের শিকার হয়। পুলিশ হস্তক্ষেপ করার আগে রাস্তায় প্রহার হরা হয় তাদেরকে। পরে তাদেরকেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুুক্তি আইনের আওতায় আটক করা হয়। জামিন বাতিল করা হয়।
মানবাধিকার বিষয়ক কর্মী
‘অধিকার’-এর ২০১৪ সালের জানুয়ারি-জুন রিপোর্টে বলা হয়, যেকোন  প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ব্যক্তি যদি সরকার বা সরকারের কোন প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করে বা মতামত প্রকাশ করে তাহলে সে বিষয়ে কর্ণপাত করে না সরকার। উল্টো সরকার চরম আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ওইসব প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বা ব্যক্তির সঙ্গে যেকোন উপায়েই হোক জঙ্গি যোগসূত্র খুঁজে বেড়ায় সরকার। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অন্য কোনভাবেও হয়রানি করা হয়। এক্ষেত্রে মানবাধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা সরকারের মূল টার্গেটে রয়েছেন।