Saturday, July 31, 2010

জননেতা নূরুল ইসলাম by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

গণতন্ত্রী পার্টির একসময়ের সভাপতি, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রাণপুরুষ এবং চৌদ্দ দলের প্রথম সারির সংগঠক জননেতা নূরুল ইসলামের আজ ৬৮তম জন্মবার্ষিকী। বেঁচে থাকলে তাঁকে আজ জাতীয় সংসদেও সক্রিয় দেখা যেত, যেমন দেখা যেত সংসদের বাইরে। জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয়, দরিদ্র এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের সংগ্রামে, তাদের পাশে। তাঁর সক্রিয়তার পরিসমাপ্তি ঘটল তাঁর লালমাটিয়ার ফ্ল্যাটে ২০০৮ সালে ডিসেম্বরের ৩ তারিখের এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে এবং একমাত্র ছেলে তমোহর ইসলামসহ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই মৃত্যুর ভয়াবহতা অকল্পনীয়, এই মৃত্যুর শোক অবহনযোগ্য। তার পরও যদি আগুনের ঘটনাটি হতো বৈদ্যুতিক কোনো দুর্ঘটনা অথবা অসাবধানতা থেকে, তাহলে হয়তো একটা দূরবর্তী সান্ত্বনা থাকত, সেই মৃত্যুকে জীবনচক্রের একটি অপ্রত্যাশিত পরিণতি হিসেবে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তসহ যতগুলো তদন্ত হয়েছে, দেখা গেছে, আগুনের ঘটনাটি পরিকল্পিত। অর্থাৎ কেউ নূরুল ইসলামের মৃত্যু চেয়েছে, মৃত্যু ঘটানোর জন্য পরিকল্পনা করেছে এবং এই পরিকল্পনা সফল হয়েছে। নূরুল ইসলামকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তমোহরকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
২০০৮ সালের ৩ ডিসেম্বর নূরুল ইসলামের ফ্ল্যাটে যে আগুন লাগে, তার দুটি কারণ তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের দু-এক কর্তাব্যক্তিকে উল্লেখ করতে দেখেছি (দেখেছি, অর্থাৎ টিভি চ্যানেলে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে)। এর একটি হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট এবং অন্যটি একটি ফ্রিজের কম্প্রেসর বিস্ফোরণ। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কয়েকজন পরিদর্শক একসময় শর্টসার্কিটের পক্ষে অবস্থান নেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁরা জানান, ফ্রিজ ও টেবিল ল্যাম্পের জন্য ব্যবহূত মাল্টিপ্লাগ এক্সটেনশন কর্ডটি তাঁরা ভস্মীভূত অবস্থায় দেখেন, কাজেই তাঁদের ধারণা এই মাল্টিপ্লাগ থেকে শর্টসার্কিটের মাধ্যমে আগুন লাগতে পারে। অবশ্য অগ্নিকাণ্ডের দুই সপ্তাহ পর এই পরিদর্শক দলটিই জানাচ্ছে, ফ্ল্যাটের মেইন সার্কিট ব্রেকারটি ও দুটি সিঙ্গেল সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ অর্থাৎ বন্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রিজের সকেট পয়েন্টের ভেতর তার জ্বলা অবস্থায় পাওয়া গেলেও ভেতরের অংশের ইনসু্যুলেশন ও তার অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। পরিদর্শক দলের মতামত ছিল, যেহেতু বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়েছে, সেহেতু বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে আগুন লাগার আশঙ্কা নেই। টিভি চ্যানেলগুলোর খবর যাঁরা শুনেছেন ও দেখেছেন, অথবা ওই ফ্ল্যাটে যাঁরা গেছেন তাঁরা জানেন, ফ্রিজের কম্প্রেসর বিস্ফোরণের প্রশ্নই আসে না, যেহেতু ফ্রিজটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল এবং কম্প্রেসরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আগুনের তীব্রতা এমনই স্থানিক ছিল যে, সিলিংয়ের পাখার ব্লেড বেঁকে গেছে, অথচ সোফার ফোমের গদিতে সেই আগুনের আঁচ লাগেনি, এই আগুনের ঘটনা নিয়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ তাঁদের মতামত দিয়েছেন এবং তাতে নাশকতামূলক কোনো বিস্ফোরণ ঘটানোর ব্যাপারে তাঁরা জোর দিয়েছেন। বিস্ফোরণটি ছিল তীব্র এবং তা থেকে প্রচুর ধোঁয়া নির্গত হয়েছিল। বিস্ফোরণের ঝাপটা যেদিকে গেছে, সেদিকটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে কোনো প্রভাব পড়েনি। নূরুল ইসলাম ও তমোহর মারা গেছেন বিষাক্ত ধোঁয়া এবং আগুনের তাপে।
এই মৃত্যু নিয়ে একটি মামলা হয়েছিল। মামলা হলে তদন্ত হয়, এ ক্ষেত্রেও তদন্ত হয়েছে। এবং তদন্ত সচরাচর যে রকম হয়, সে রকম ঢিমেতালেই হয়েছে। একসময় মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে সেটিকে চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তাতে চঞ্চলতা বাড়েনি, সেই একই তালে এটি চলছে। কবে নাগাদ এই মামলার নিষ্পত্তি হবে, প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং যে সন্দেহ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে আগুন লাগার ঘটনাটি পরিকল্পিত, তা প্রমাণিত অথবা অপ্রমাণিত হবে, আর প্রমাণিত হলে যারা এটি ঘটিয়েছে, তারা শাস্তি পাবে, আমরা তা জানি না। তবে সকল দেশবাসীর সঙ্গে আমরা আশা করব, সরকার এ ব্যাপারে আরও আন্তরিক হবে। এর আগে শাহ মোহাম্মদ কিবরিয়ার হত্যা ঘটনাটিরও কোনো নিষ্পত্তি হয়নি অথচ কত বৃহস্পতিবার নীল পোশাক পরে ‘শান্তির সপক্ষে নীলিমা’ এই চেতনায় মানববন্ধন করল তাঁর পরিবার ও গুণগ্রাহীরা। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার বাংলাদেশে হয় না—এটি খুবই বেদনাদায়ক।
এই লেখার শুরুতে নূরুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয়টিই তুলে ধরেছি, কিন্তু তিনি তো শুধু একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন সন্তান, স্বামী, পিতা, ভাই, বন্ধু। এই প্রতিটি পরিচয়ে তাঁর ছিল অসামান্য সফলতা। আমরা যারা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছি, কাছ থেকে তাঁকে দেখেছি, তারা জানি, কী অসাধারণ সারল্য আর বিনয় ছিল মানুষটির, কী অসীম ধৈর্য এবং ভালোবাসা। একজন অগ্রজের স্নেহে অনেক দাবি তিনি অনেকের মেটাতেন, বিপদে-আপদে সঙ্গী হতেন। অথচ যখন তাঁর প্রয়োজন ছিল এক বা দুজন সঙ্গীর, ফ্ল্যাটের দরজাটা যারা ভাঙবে, বাইরে সজীব বাতাসে নিয়ে যাবে তাঁকে ও তমোহরকে, তখন কেউ ছিল না। হয়তো একটি জীবনেরই বড় একটি আয়রনি। কিন্তু নূরুল ইসলাম আজীবন মানুষের বিপদে সে রকম সঙ্গী হওয়ারই সাধনা করেছেন।
তিনি বেঁচে থাকলে রাজনীতিতে কতখানি অবদান রাখতে পারতেন, সে অনুমানে যাব না—কেননা রাজনীতি আমাদের সুস্থ নয়। নূরুল ইসলাম নিজেও অসুস্থ রাজনীতির বলি। কিন্তু তিনি যে বিবেকের ও ন্যায়বোধের পক্ষে একজন শক্তি হয়েই থাকতেন, এ কথাটা নিশ্চিন্তভাবে বলা যায়।
নূরুল ইসলামের স্মৃতি জেগে থাকবে যত দিন তাঁর বিশ্বাসের মানুষজন এই বাংলাদেশে থাকবে। তাঁকে আমার শ্রদ্ধা।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখুন -ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

আল্লাহ তাআলার অফুরন্ত রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অপার মহিমা নিয়ে বছর ঘুরে মাহে রমজান সমাগত। এ মাসে পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রোজাদার মুমিন বান্দাদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন। অথচ এ পবিত্র মাসকে পুঁজি করে একশ্রেণীর কালোবাজারি অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও দ্রব্যসামগ্রীর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন। ফলে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঘটে। এতে রোজাদার সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষকে নিদারুণ ভোগান্তি পোহাতে হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে খাদ্যপণ্য মজুদ ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিয়মিত লাভের পরিবর্তে ক্রেতাসাধারণকে ঠকিয়ে এবং সংকটের আবহ সৃষ্টি করে অধিক মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা অমানবিক। ইসলাম এ ধরনের জঘন্য কাজকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে ধর্মপ্রাণ ব্যবসায়ীদের সব সময় বিরত থাকা উচিত।
ইসলামের দৃষ্টিতে দ্রব্যমূল্য বাজারে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চাহিদা ও জোগানের আলোকে নির্ধারিত হবে। তবে বাজার প্রক্রিয়াকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ব্যাহত করতে না পারে, সে জন্য সরকার তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারবে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ক্রয়-বিক্রয়ে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মজুদদারি সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিকোণ রয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিকভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি করতে পারেন না। যদি এমনটি কেউ করে বসেন, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মসাৎকারী হিসেবে সাব্যস্ত হবেন। এভাবে মাহে রমজান বা বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে যখন অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্যের স্ফীতি ঘটাতে চান, তখন সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করতে পারবে বলে ইসলামি আইনবিদ বা ফকিহগণ অভিমত প্রকাশ করেছেন। সরকার কর্তৃক ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে আরবিতে ‘তাসয়ির’ বলা হয়। এ ক্ষেত্রে ভোক্তা ও উৎপাদক কোনো শ্রেণীরই ক্ষতিসাধন করা যাবে না, উভয় শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে। ইসলামের এ ব্যবস্থা থেকে ধারণা নিয়ে সরকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে দ্রব্যমূল্যের তালিকা টাঙানো বাধ্যতামূলক করতে পারে। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘ব্যবসায়ী যদি সীমাতিরিক্ত মূল্য গ্রহণ করে এ সুযোগে যে, ক্রেতা পণ্যের প্রকৃত মূল্য জানে না, তাহলে এই অতিরিক্ত পরিমাণের মূল্য সুদ পর্যায়ে গণ্য হবে।’
ব্যবসায়ীদের বিবেকহীন ও অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ডের কারণে কখনো কখনো দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়ে পড়ে। মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে বাজার প্রক্রিয়াকে রক্ষার জন্য ইসলাম মজুদদারি, মুনাফাখোরি, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা ও দালালির মতো কার্যক্রমকে অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘মজুদদার খুবই নিকৃষ্টতম ব্যক্তি। যদি জিনিসপত্রের দাম হ্রাস পায় তবে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। আর যদি দর পরে বেড়ে যায় তবে আনন্দিত হয়।’ (মিশকাত)
আমরা দেখে আসছি যে যখন মাহে রমজান শুরু হয়, তখনই মুনাফাখোরদের কিছু চক্র তৎপর হয়ে ওঠে। ফলে জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তাই রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আওতায় রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত আবশ্যক। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ যদি মুসলমানদের থেকে নিজেদের খাদ্যশস্য আটকিয়ে রাখে, তবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর মহামারি ও দরিদ্র্যতা চাপিয়ে দেন।’ (ইবনে মাজা ও বায়হাকি)
মানুষের অসহায় দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে যারা মজুদদারি, কালোবাজারি করে, তারা মানুষ নামের অমানুষ। সেসব ভণ্ড প্রতারকেরা রমজান মাস এলে লোক দেখানো সিয়াম সাধনায় রত থেকে মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে এবং পরে অধিক হারে মুনাফা লুটে নেয়। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবসা। অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তারা সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় কষ্ট দেয়। এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি খেটে খাওয়া মানুষ প্রতিনিয়ত তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে প্রবঞ্চিত, শোষিত ও বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে রমজান মাসেও সাধারণ মানুষ একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। অথচ পণ্যসামগ্রী মজুদ করে মূল্যবৃদ্ধি বা অধিক মুনাফা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পণ্য আমদানি করে বাজার দামে বিক্রয় করে, তার উপার্জনে আল্লাহর রহমত রয়েছে। আর যে ব্যক্তি আমদানি করে চড়া দামে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করে রাখে, তাদের প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।’
রোজাদার মানুষের কথা ভেবে যাঁরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁরা জনসাধারণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার মানসে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধকল্পে ব্যবস্থ্থা নিতে পারেন। রমজান মাসে রোজাদার মানুষকে যেন কষ্ট বরণ করতে না হয় এবং একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট থেকে বর্তমানে ‘আল-হিসবা’ ব্যবস্থ্থা চালু করে বাজারকে কলুষমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে ‘মূল্য নিয়ন্ত্রণ সেল’ গঠন করে শহর, নগর, বন্দর, গ্রাম—সর্বত্রই সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের নজরদারির আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। ব্যবসায় মূল্যপ্রবাহকে কেউ যেন ঊর্ধ্বমুখী করে না তোলে, সে ক্ষেত্রে ইসলামে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি মুসলমানদের লেনদেনে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ ঘটালে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আগুনের হাড়ের ওপর তাকে বসিয়ে শাস্তি দেবেন।’
রমজান মাস একটি ধর্মীয় আচার ও পবিত্র বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মাহে রমজান পরিশুদ্ধির মাস হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নৈতিক অধঃপতন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সামাজিক সমস্যা, সচেতনতার অভাব প্রভৃতি সেই আত্মনিয়ন্ত্রণকে বাধাগ্রস্ত করে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হলে সমাজের প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মানুষকে সৎ মনোভাবাপন্ন, নির্লোভ, মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। মজুদদারি, ধোঁকাবাজি, সুদি লেনদেনসহ সব ধরনের ইসলামি আদর্শ বিবর্জিত কার্যাবলি রোধ করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা, ইসলামসম্মত সেবামূলক ভূমিকা মাহে রমজানে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং আসুন, মাহে রমজানে ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলি। মুনাফাখোরি, মজুদদারি, ফাটকাবাজারি, কালোবাজারি ও সুদসহ অবৈধ পন্থায় লেনদেনে অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকি।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
dr.munimkhan@prothom-alo.info

একটি বড় শূন্য by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

অভিনেতা থেকে নেতা আসাদুজ্জামান নূর। পাশে বসে জিজ্ঞেস করলাম, কোনটা মজার? বললেন, দুটোই। দুটো দুই রকমের। নীলফামারীর হাটুরে বাহেরা যখন ছুটে এসে ভালোবাসা জানায় তখন এক রকম, নাটকে অভিনয়ের পর দর্শকের ভালোবাসার আপ্লুত দৃষ্টি যখন, তখন আরেক রকম। বাবা আব্বাসউদ্দীনের ইচ্ছে ছিল আমি অভিনেতা হই, তাঁর জীবনের দুটি ইচ্ছার একটি। প্রথম জীবনে ব্যারিস্টার অভিমুখী ও পরের জীবনে অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছা। তাঁর প্রথম ছেলে ব্যারিস্টার ও দ্বিতীয় ছেলে বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করার শেষেও অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন থেকে দূরে।
পরিচালক এহেতশাম ১৯৫৯-এ চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের অফার দিয়ে বসেন আমাকে দুম্ করে। নায়ক নাদিম তখনো নাজির বেগ, ঘোরাফেরা করছেন জীবিকার সন্ধানে। তখনো অফার পাননি, আমি পেয়েছিলাম। বাবা মৃত্যুশয্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ হয়নি। জীবন থেকে অভিনয় সরে গেল। দূর থেকে বহু দূরে।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমার সমসাময়িক। কবি-সুগায়ক, পরে অধ্যাপক। বললেন, সুজিতকে গানের লাইনে দিলাম। এ দেশে গানকে পেশা করা বেশ সাহসের ব্যাপার। বললাম, চিন্তা করবেন না। সময় বদলেছে। সুজিত পারবে। আসফুদ্দৌলা, আনোয়ারউদ্দিন খান ও আমি গানের লাইনে থেকেও পেশা হিসেবে নিতে পারিনি। আজও শিল্পী হইনি, অভিনেতা হইনি। কী হলাম? কিছুই না, একটি বড় শূন্য, এ বিগ জিরো।
শূন্যের কথা বলতে বসেছি। ’৬২ সালে সিএসএস পরীক্ষায় জিজ্ঞেস করলেন অনুসন্ধানী চোখ, জীবনের লক্ষ্য কী তোমার? বললাম, মানুষ হব, ভালো মানুষ। বললেন, বুঝলাম, কী ধরনের মানুষ? বললাম, শিল্পী হব, সাহিত্যিক হব। আটজোড়া চোখ একে অন্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। আমার উত্তর খাপছাড়া, লক্ষ্যশূন্য। বুঝতে পারছি, ফলাফল এগোচ্ছে শূন্যের দিকে। লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেও মৌখিকে পেলাম জিরোর কাছাকাছি। অর্থাৎ টায়ে টায়ে পাস, তাতে চাকরি হয় না।
বড় চাকরি পেলাম হাইসন্স কোম্পানিতে। জেনারেল ম্যানেজার, ঈর্ষণীয় সুবিধা। বাদ সাধল কপাল। ৭০ জন কর্মচারী এসে বললেন, দেশ এখন স্বাধীন। এই বিশাল সম্পত্তি সরকারের কাছে নয়, লিখে দিন আমাদের নামে। দিইনি। নালিশ ঠুকে দিলেন সর্বোচ্চ ঠিকানায়। হলাম জিরো।
নিজের কোম্পানি খুললাম। দিন কতক ভালোই গেল। স্বাধীন হওয়ার প্রথম দিন থেকে যারা ঘর বেঁধেছে অসৎ চিন্তায়, তারা এগোতে পারবে কেমন করে। সামনে মিষ্টি হাসি, পেছনে ছুরি। বড় অফিসার আপ্লুত কণ্ঠে বললেন, আব্বাসী সাহেব, আমি আপনার বাবার ঘনিষ্ঠ, তাঁর গান বাজিয়েই আমার সকাল। আরেকজন বললেন, আপনার ভগ্নি জাতির সম্পদ। আরেকজন বললেন, আপনার ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি আমি খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখি। যাঁরা যত ভালো ব্যবহার করেছেন, ব্যবসায়ী জীবনে (তিরিশ বছর) তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি ততটাই শূন্য। তাঁরা সবাই অসৎ তা বলছি না, সাহায্য পেয়েছি সামান্যই। কোটির ব্যবসায় ঘুষের প্রত্যক্ষ অংশীদারদের নামধাম বলে না দিয়েও ঘটনা জেনেছি ‘জীবন নদীর উজানে’-তে। সৎ থেকে অসৎকে পৃথক করা না পর্যন্ত পেছনে পড়ে থাকব আমরা। চুপ করে থেকে হজম না করার জন্য উপদেশ দিয়েছিলাম বন্ধুদের, যখন ছিলাম ঢাকা চেম্বারে পরিচালক, চার বছর। কেউ আমল দেয়নি সেদিন, দায়ে পড়ে আজ কিছুটা সোচ্চার।
আবু হেনা মোস্তফা কামালের কথায় আবার আসি। তিনি ছিলেন আমাদের কালের একজন জিনিয়াস, যেমন অধ্যাপনা, তেমনি কাব্য সাধনা, তেমনি মিষ্টি তাঁর গীত রচনা। একদিন বললেন, সকালে তোমার জন্য গান লিখেছি। দেখ, পছন্দ হয় কি না:
‘স্বপ্নঝরা নদীর বাঁকে আকাশ যখন কপোল রাখে সেইক্ষণে
তোমায় আমি দেখেছিলাম আমার চোখের অঞ্জনে’
এরপর:
‘মহুয়ার বনে বনে মৌমাছি ওড়ে মনবিলাসে
ঝিকিমিকি রোদ লাগে পলাশে’
আনোয়ারউদ্দিন খানের সুরে গানগুলো ফিরে আসে নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে যখন গাইতে বসি।
সবচেয়ে মজার হতো হেনা ভাইয়ের তীর্যক মন্তব্য। বেঁচে থাকলে আজ হয়তো আমার মতো কলাম লিখতেন। যা লিখতেন না পড়ে নিতে হতো তাঁর চোখের ভাষায়। একদিন একজন শিল্পীকে উপস্থাপনা করছেন টেলিভিশনে। প্রশংসাবাক্য ছুড়ে দিতে কার্পণ্য নেই তাঁর। সামনে পড়তেই তাকালেন আমার দিকে। আমার প্রশ্ন তাঁর চোখে চোখে, এই শিল্পীর জন্য এত প্রশংসা? আর ওঁর উত্তর ছিল চোখে চোখে, এ তো গানই শেখেনি। একটু বাড়িয়ে বললাম আর কী।
একদিন বললেন: জীবনে সবই পেলাম, পেলাম না জীবনকে।
ভাবছিলাম, আজ কেন তাঁর এই উদাসীন দার্শনিকতা। শূন্যতাবোধ মাঝেমধ্যে জীবন ছুঁয়ে যায় বৈকি। এ বিগ জিরো বা একটি বড় শূন্য আমি নিজেই। অপরিসীম শূন্যতার মাঝে জীবনের অন্বেষায় ব্যাপৃত।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: লেখক ও সংগীতব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net

ভবিষ্যতের বিপর্যয় এড়ানোর শিক্ষা -আপিল বিভাগের রায় by আকবর আলি খান

সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে ১৯৭৫ সালের পরে আইনগত দিক থেকে যে অনাচার রয়েছে তার একটা সুদীর্ঘ বয়ান রয়েছে। এটা সবার পড়া উচিত এবং আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমরা দেখেছি এবং এই রায় থেকেও বোঝা যাচ্ছে, অতীতে শুধু সরকারের নির্বাহী বিভাগ বা রাজনীতিকেরাই ভুল করেননি, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও বাড়াবাড়ি করেছেন, আইন ভঙ্গ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোও সংবিধান সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেনি। গোটা জাতিই সেই ভুল করেছে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতিও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং তৎকালীন সামরিক শাসনের অধীনে প্রধান সামরিক প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিচার বিভাগের কোনো কোনো সদস্যের এভাবে জড়িয়ে পড়া দুর্ভাগ্যজনক এবং এর থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত। এই রায়ের বিশদ বিবরণ থেকে কীভাবে ভবিষ্যতে আমরা এ ধরনের বিপর্যয় এড়িয়ে যেতে পারি, সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে।
তবে উচ্চ আদালত এর আগে এ বিষয়ে যে রায় দিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে তার কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করা হয়েছে। এই সংশোধনকর্মের ফলে সেনা শাসন কর্তৃক গৃহীত অনেকগুলো আইনগত ব্যবস্থা বহাল রাখার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায় পূর্ণাঙ্গরূপে টিকে থাকলে সেই সময়ের সমস্ত অসাংবিধানিক নির্দেশ ও ফরমানই বাতিল হয়ে যেত। আপিল বিভাগ এই অংশটি সংশোধন করে দিয়েছে। এর ফলে সংবিধানের নিরিখে আগের অবস্থা থেকে খুব বড় আকারের পরিবর্তন ঘটবে না। হাইকোর্টের রায় সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলে আগের সব অন্যায়ই বাতিল হতো। তবে ’৭৫-’৭৯ পর্যন্ত যেসব ফরমান জারি হয়েছে তার কতকগুলো সুপ্রিম কোর্ট বৈধতা দিয়ে বিজ্ঞোচিত কাজ করেছেন। নইলে পুরো দেশের জন্য সমস্যা হতো। সবকিছু রাতারাতি ওলটপালট করার ফল ইতিবাচক নাও হতে পারত।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ উচ্চ আদালতের রায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করেছেন। হাইকোর্টের রায়ে চতুর্থ তফসিলের যেসব পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদের যে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, তার তাৎপর্য হলো, যেসব ঘোষণা সংবিধানের পরিপন্থী ছিল, সেগুলো আপিল বিভাগ রেখে দিয়েছেন। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট উভয়ই চতুর্থ সংশোধনীতে যেসব বিধান রাখা হয়েছিল, সেগুলোর বিষয়ে কিছু বলেননি। ফলে সামরিক আইনের যেসব আদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা তার কিছু কিছু রয়ে গেল। এর অর্থ তাঁরা স্বীকার করে নিয়েছেন, ওই সব সংশোধনী সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী ছিল না।
তবে এই রায়ের ফলে সাংবিধানিক চেতনার একটা বড় পরিবর্তন ঘটেছে। আগে সংবিধান সমর্থন করে না এমন কর্মকাণ্ডের সমর্থনে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন বা ডকট্রিন অব নেসেসিটির কথা বলা হতো। আগে নির্বাহী বিভাগ প্রয়োজনের ভিত্তিতে কিছু ব্যবস্থা নিতে পারত, পরে যা আদালত কর্তৃক বৈধতা দেওয়া হতো বা সে রকমটাই ব্যাখ্যা করা হতো। এ রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় নীতি হিসেবে তাঁরা জনস্বার্থের বিবেচনার কথা বলতেন। এবং জনস্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে এগুলোকে স্বীকার করে নেওয়া হতো। তবে এখন সে রকম কিছু করা হলে আদালত সেটা মাফ করতে পারেন কিন্তু বৈধতা দিতে পারবেন না। এককথায় বললে, অতীতে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’কে মেনে নেওয়া হয়েছিল; এখন হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট বলছেন, কোনো জরুরি প্রয়োজনেও সেটা মেনে নেওয়া যাবে না। ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনের বিধানের জায়গায় এল ‘ডকট্রিন অব কনডোনেশন’ বা ক্ষমার বিধান।
আমি মনে করি, অতীতের সামরিক শাসকদের বিচার করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে আইনের শাসন সম্পর্কেও সবার সজাগ থাকা উচিত। আইন মানার সংস্কৃতি যদি আমরা গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে এ ধরনের রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো লাভ হবে না। সেই সংস্কৃতি বিকশিত না হলে সামরিক শাসনের মতো অনাচার বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে। তবে এ কথাও বলা দরকার যে আইন দিয়ে সামরিক শাসন দূর করা যায় না। সমগ্র দেশবাসীর মধ্যে সামরিক শাসন তথা বেআইনি শাসনবিরোধী চেতনা প্রবল হলে সামরিক শাসন কখনো কায়েম থাকতে পারে না। যেমন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা বিভিন্ন পদাধিকারী ব্যক্তি যদি রাজি না হন, তাহলে সামরিক শাসকদের পক্ষে তাঁদের ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। এ দিকটি আগে নিশ্চিত করতে হবে।
এই রায়ে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা তো বিধান করে কায়েম করা যাবে না। বাংলাদেশে তো কেউ-ই ধর্মনিরপেক্ষ না। সবাই মুখে মুখে এটা বলে। আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তো বলা রয়েছে, কোরআন ও সুন্নাবিরোধী কোনো আইন তারা করবে না। এটাও তো ধর্ম নিয়ে এক ধরনের রাজনীতি। কাজেই ধর্মনিরপেক্ষতা কায়েম করতে হলে আগে এর সংজ্ঞা যথাযথভাবে ঠিক করতে হবে। এবং এটা কার্যকর করতে হলে সংসদে এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করতে হবে।
সংবিধানে শুধু নীতিমালা দেওয়া রয়েছে। আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে সংবিধানে এক জায়গায় বলা হয়েছে যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা পাবে, তারা আইনসম্মতভাবেই কাজ করতে পারবে। সংবিধানের বর্তমান নীতি অনুযায়ী ব্যক্তির ধর্মাচরণ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তথা মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডাগুলোর ধর্মপালনের স্বাধীনতা থাকবে। যেটা কেউ পারবে না, তা হলো ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার। এখন এর সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। আমাদের সংবিধানে ইসলামকে যে রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে এই নীতিমালার সংগতিবিধান করতে হবে। এই রায়ে ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু পরের সামরিক শাসনের ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন করতে হবে, তা নিয়ে এখন আমাদের নতুন করে বিচারবিশ্লেষণ করতে হবে। আর এ কাজ সংসদীয় কমিটিই করতে পারে।
তবে আশঙ্কা রয়েছে যে সবাই এই রায়কে নিজ নিজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চেষ্টা করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এর গভীর প্রভাব পড়বে না। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে আইন না করা পর্যন্ত জামায়াত বা ধর্মীয় দলগুলোর তেমন কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয় না।
এই রায় এবং সংবিধান সংশোধন এখন নানাভাবেই জড়িত বিষয় হয়ে গেছে। সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটিও গঠন করে দিয়েছে। সংসদীয় কমিটির কাজ হবে সবাইকে ডেকে ডেকে বক্তব্য শোনা। এ জন্য গণশুনানির ব্যবস্থা করতে হবে এবং বিশেষজ্ঞদের ডেকে প্রশ্ন করে তাঁদের অভিমত জানার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে কমিটিতে বিশেষজ্ঞ না থাকার কুফল এড়ানো যাবে। যেহেতু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদকেই নিতে হবে, সেহেতু আমি সংসদীয় কমিটির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই না।
আকবর আলি খান: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

সেশনজটের ব্যাধি -শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা থেকে কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিক্ষা নেবেন

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সিঁড়ি হওয়ার কথা ছিল জীবনে সাফল্যের সোপান, সেই সিঁড়ি পিছলে তিনি হারিয়ে গেলেন। সেশনজটের কারণে শিক্ষাজীবন শেষ না হওয়ার হতাশায় আত্মহত্যাই করতে হলো তাঁকে। তাই তিনি লিখে গেছেন অন্তিম অভিযোগ, ‘আমার সুইসাইডের জন্য ইউনিভার্সিটি দায়ী, সেশনজট দায়ী।’ অভিযোগকারী ছাত্র সোহান আত্মহত্যা করে এই জট থেকে পরিত্রাণ খুঁজেছেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তারা কীভাবে সেই দায় থেকে পরিত্রাণ নেবেন?
গত বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সোহানের (২৫) এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরটি আমাদের বিচলিত করেছে। সোহান তাঁর অন্য বন্ধুদের মতো পড়ালেখা শেষ করে উপার্জনের জগতে ঢুকতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন একমাত্র উপার্জনকারী মায়ের চাপ কমাতে। সুস্থ, স্বাভাবিক তরুণ ছিলেন সোহান। নিজের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘নাম: স্বাপ্নিক সোহান, পেশা: স্বপ্ন দেখা, শখ: গান শোনা।’ অথচ ঠিকানার ঘরে লিখেছেন, বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি সমুদ্রের জলরাশির কথা। হতাশার সাগর থেকে বাঁচতে সোহান সত্যিকার সাগরে ঝাঁপ দিয়েছেন। জীবন দিয়ে তিনি কি তাহলে আমাদের কোনো বার্তা দিয়ে গেলেন? বলে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ শিক্ষার অভিভাবকদের দায়ের কথা?
সেশনজট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুরারোগ্য ব্যাধি। সময়ের মধ্যে পাঠক্রম শেষ করায় অবহেলা, পরীক্ষার খাতা দেখে সময়মতো তার ফল প্রকাশে গাফিলতি ইত্যাকার নানা কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা শেষ করতে পারেন না। এক বছর, দুই বছর, কোনো কোনো বিভাগে তিন-চার বছরেরও জট লেগে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রশাসনের এতে ক্ষতি হয় না। বরং কোর্স শেষ না করার ওই সময়টা অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ব্যয় করে লাভবানও হন। ওই সময়টায় তাঁরা ঠিকই বেতন পান, কিন্তু শিক্ষার্থীর জীবন থেকে এই সময়টা চিরতরে হারিয়ে যায়। এই সময়টাই কিন্তু যৌবনের সোনালি সময়। এই অতিরিক্ত সময়ের জন্য পরিবারকেও ব্যয় করতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। কেবল সেশনজটই নয়, প্রশাসনের অবহেলা, সন্ত্রাসীদের দাপটসহ এ ধরনের আরও কিছু কারণে শিক্ষার্থীদের একটা অংশ যথাযথভাবে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারে না।
এ ধরনের যাবতীয় দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনারই ফসল হলো সোহানের আত্মহত্যা। এ ধরনের আরও ভুক্তভোগী রয়েছে। সোহানের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুষ্ঠু শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই কেবল এর প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব।

পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় -সুপ্রিম কোর্টকে ধন্যবাদ, সংসদের সামনে অনেক দায়িত্ব

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগকে ধন্যবাদ। ৩৫ বছর পর বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি অবিকল পুনরুজ্জীবিত হলো। এতে জনগণের চোখে সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদা অনেক উঁচুতে উঠল।
সর্বসম্মতিতে আপিল বিভাগ শুধু সামরিক শাসনকে বেআইনি নয়, সব ধরনের সংবিধানবহির্ভূত রোমাঞ্চপনাকেও তাঁরা ‘গুডবাই’ জানিয়েছেন। আপিল বিভাগের ১৮৪ পৃষ্ঠার মাইলফলক রায়ের এটাই শেষ বাক্য। সংবিধানের চেয়ে সামরিক ফরমান বড়, আদালত তার এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলেন। এমনকি তাঁরা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট এতকাল ভুল করে সামরিক ফরমানকে বৈধতা দিয়ে চলেছিলেন। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই অর্জন ধরে রাখা। আর এটা মূলগতভাবে নির্ভর করছে রাজনীতিকদের অঙ্গীকারের ওপর। আমরা আশা করব, জাতীয় সংসদ আপিল বিভাগের রায় থেকে পাওয়া অর্জনকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় নিতে সচেষ্ট হবে।
বিভিন্ন রায়ে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত যেসব নির্দেশনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে বিশেষ সংসদীয় কমিটিকে। কমিটিকে গভীরভাবে বুঝতে হবে, সুপ্রিম কোর্ট কেন রায় দিতে গিয়ে নীতিগত কারণে পঞ্চম সংশোধনীকে বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছেন, আবার সেই অবৈধ সামরিক ফরমান দিয়ে আনা কতিপয় সংশোধনীকে মার্জনা করেছেন। কতিপয় সামরিক ফরমানকে ‘গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য উপকারী’ হিসেবে তাঁদের গণ্য করতে হয়েছে। সেই অর্থে পঞ্চম সংশোধনীর কিছু অংশ যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ভূমিকা রেখেছে, তা একটি অপ্রিয় সত্য। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে কোনো বাগিবতণ্ডা কাম্য নয়। যেটা এখন দরকার, সেটা হলো আত্মজিজ্ঞাসা।
ধর্মভিত্তিক দল ও সেনাছাউনিতে ভর করে বেড়ে ওঠা সেই বিএনপি আর আজকের বিএনপি এক নয়। অসাম্প্রদায়িক পরিবর্তনগুলো মেনে নিলে বিএনপির ক্ষতি হবে না। আর আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে, আদালতের রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংসদীয় কমিটির হওয়ার নয়। ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে আমরা বলব, ইতিমধ্যেই সংশোধিত অনুচ্ছেদগুলো যথাস্থানে রেখে আইন মন্ত্রণালয় যেন অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করে। আপিল বিভাগের রায়ে আমরা যা পেলাম, তা সংসদীয় অর্জন নয়। সংসদ কী দেবে, সেটার জন্য আমরা অপেক্ষায় আছি। প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া নজিরবিহীন নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, উচ্চ আদালতের বিচারকসহ সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগদানের উপযুক্ত পদ্ধতি প্রবর্তন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের কোনো লাভজনক পদে বহাল না রাখা-সংক্রান্ত বাহাত্তরের মূল বিধান পুনরুজ্জীবন, সংসদ কার্যকর করতে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-ব্যবস্থার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যা গণতন্ত্রের জন্য দরকারি।
সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে বুঝতে হবে, সাংবিধানিক পথচলা থেকে ছিটকে পড়ার ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের ব্যর্থতা কতটা ভূমিকা পালন করে। আপিল বিভাগের রায়ের সুফল অবশ্যই আমাদের পেতে হবে। সংসদ যাতে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, সে জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে। সংসদীয় কমিটি এ পর্যন্ত আশাবাদ জাগিয়ে রাখছে। একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক সংবিধান গড়ার সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়।

থাইল্যান্ডের ৬টি প্রদেশ থেকে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হবে

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আপিসিত ভেজ্জাজিওয়া গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, ছয়টি প্রদেশ থেকে খুব শিগগিরই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হবে। তবে রাজধানী ব্যাংককে জরুরি অবস্থা বহাল থাকবে। গত রোববার এক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় সেখানে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
থাইল্যান্ডে জরুরি অবস্থা জারির ফলে একসঙ্গে পাঁচজন জড়ো হতে পারেন না এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অভিযোগ ছাড়াই সন্দেহভাজন যেকোনো ব্যক্তিকে আটক করতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী আপিসিত বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর পরামর্শে তিনি থাইল্যান্ডের মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চোনবুরি, আয়ুত্থাইয়া, নং বুয়া লাম ফু, মহা সরখাম, মুকদাহান ও ছাইয়াফুম প্রদেশে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হবে।
ধীরে ধীরে সব প্রদেশ থেকে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার কথা স্বীকার করে আপিসিত বলেন, গত রোববার ব্যাংককের বাসস্ট্যান্ডে বোমা হামলায় একজনের মৃত্যু ও ১০ জন আহত হওয়ার পর সেখানে এখনো জরুরি অবস্থা বহালরাখা দরকার।
জরুরি অবস্থা জারির পর থেকে তা তুলে নিতে থাইল্যান্ড সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও মানবাধিকার দলগুলোর চাপের মুখে রয়েছে।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত: কারজাই

আফগান যুদ্ধে তালেবানকে সহায়তার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
প্রেসিডেন্ট কারজাই অভিযোগ করেন, পাকিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো ইচ্ছা পশ্চিমা দেশগুলোর নেই। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগানিস্তানের বাইরে থেকে যারা সন্ত্রাসীদের অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হামিদ কারজাই বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এখন সেই প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমাদের অবশ্যই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু আফগানিস্তানে নয়, আফগানিস্তানের বাইরে সন্ত্রাসের মদদদাতাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে হবে।
উইকিলিকসে আফগান যুদ্ধ বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য প্রকাশকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও দুঃখনজনক কাজ বলে মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট কারজাই। তিনি বলেন, এতে তথ্যদাতাদের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে তাঁদের জীবন হুমকির সম্মুখীন হবে।
উইকিলিকস নামের একটি সংগঠনের ওয়েবসাইটে গত রোববার আফগান যুদ্ধ বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৯২ হাজারেরও বেশি নথি ফাঁস করা হয়। এসব নথিতে বলা হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আফগান যুদ্ধে তালেবানকে সহযোগিতা করছে।

ইরানের পরমাণু ইস্যু নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ দাভুতোগলু ইস্তাম্বুলে সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো প্রস্তাবিত পরমাণু জ্বালানি বিনিময়ে রাজি হলে ইরান ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে দেবে বলে ইরানের পক্ষ থেকে গত রোববার তাঁর কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে তেহরানের আলোচনা আবার শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দাভুতোগলুর মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ‘মিশ্র ইঙ্গিত’ পাঠায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় জাতি তেহরানের সঙ্গে বৈঠকে বসার জন্য ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে জেনেভায় পরমাণু ইস্যু নিয়ে ইরান শেষবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও জার্মানির সঙ্গে আলোচনায় বসে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পি জে ক্রাউলি বলেছেন, গত অক্টোবরের মতো কয়েক সপ্তাহ পরে একই ধরনের আলোচনা হতে পারে বলে তাঁরা আশা করছেন। তবে আলোচনার চেয়ে একটি প্রক্রিয়ার ভেতরে পৌঁছনোর ব্যপারে তাঁরা বেশি আগ্রহী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা ৩.৫ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করেছে। এ ঘোষণায় ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপকরণ উৎপাদন করছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ বেড়ে যায়।
এ আশঙ্কা থেকেই গত মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে।
অস্ট্রেলিয়ার অবরোধ: পরমাণু ইস্যুতে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়া ইরানের বিরুদ্ধে তাদের আরোপিত অবরোধ আরও কড়া করেছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন স্মিথ বলেছেন, নতুন এই পদক্ষেপে ইরানের শতাধিক শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসায়ীদের ওপর ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে বিনিয়োগ করার ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি সই

মিয়ানমারের সামরিক জান্তাপ্রধান জেনারেল থান শোয়ের পাঁচ দিনব্যাপী ভারত সফর গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। তাঁর এ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
অপরাধ দমনে প্রতিবেশী দেশ দুটি আইনি সহযোগিতাবিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির আওতায় ভারত সরকার সীমান্তবর্তী উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বিদ্রোহীদের অপসারণে অভিযান চালাতে পারবে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচাররোধেও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
মিয়ানমারের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে রাস্তা তৈরির জন্য ছয় কোটি মার্কিন ডলার দিতে রাজি হয়েছে ভারত। এ ছাড়া আরও এক কোটি ডলার দিতে রাজি হয়েছে নয়াদিল্লি। মিয়ানমার এই অর্থ দিয়ে ভারত থেকে কৃষি যন্ত্রপাতি কিনবে।
এদিকে সামরিক জান্তাপ্রধানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সারা বিশ্বের মানবাধিকার কর্মী ও মিয়ানমারের প্রবাসী নাগরিকেরা। দিল্লিতে বসবাসকারী গণতন্ত্রপন্থী মিয়ানমারের প্রবাসী নাগরিকেরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তাঁদের সঙ্গে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে সামরিক অভিযানের পর এসব ভিক্ষু মিয়ানমার থেকে ভারতে পালিয়ে যান।
দিল্লিভিত্তিক একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বলেছে, থান শোয়ের এ সফরকালে ভারত সরকার মিয়ানমারের আসন্ন নির্বাচনের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ নির্বাচন যাতে বহির্বিশ্বে বিশ্বাসযোগ্য হয়, সে ব্যাপারে থান শোয়েকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

স্থায়ীভাবে তেল নিঃসরণ বন্ধ হয়নি এখনো

মেক্সিকো উপসাগরে মার্কিন তেলক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে গত বুধবার। দুর্ঘটনার ফলে এই তেলক্ষেত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) তেল নিঃসরণ বন্ধ, পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা, ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক কোম্পানিটি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদেও পরিবর্তন এনেছে। বিপি জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে তারা এক হাজার ৭০০ কোটি ডলার লোকসান দিয়েছে। এই ক্ষতি ব্রিটেনের করপোরেট ইতিহাসে বড় বড় ক্ষতিগুলোর একটি। কিন্তু তেলনিঃসরণ এখনো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়নি।
দুর্ঘটনার ১০০ দিনে বিপি খুব দ্রুতই স্থায়ীভাবে তেল নিঃসরণ বন্ধ করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছে। তেল নিঃসরণের ফলে উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ, প্রাণী ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুর্ঘটনার পর টনি হেওয়ার্ডকে সরিয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রবার্ট ডাডলিকে সিইওর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ১ অক্টোবর প্রথম মার্কিন নাগরিক হিসেবে ব্রিটেনের কোম্পানি বিপির দায়িত্ব নেবেন ডাডলি। বিপিকে দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত তিন হাজার কোটি ডলারের সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বিপি তিন হাজার ২২২ কোটি ডলার ব্যয় করছে। এর মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া দুই হাজার কোটি ডলারও রয়েছে। এক হিসাবে দেখা যায়, দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সাগরে মিশেছে।
বিপির পক্ষ থেকে গত মঙ্গলবার জানানো হয়, চলতি বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে তারা এক হাজার ৭০০ কোটি ডলার লোকসান দিয়েছে। তবে কোম্পানিটি তাদের খরচের বিস্তারিত বিবরণ দেয়নি।
এদিকে অনেক বিশ্লেষকের মতে, সাগরের পানি পরিষ্কার, ওই এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজনের ক্ষতিপূরণে বিপির এই অর্থ পর্যাপ্ত নয়।
সমন্বয়কারী রিয়ার অ্যাডমিরাল জন জুকুনফট বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর প্রথম ১০০ দিনকে আমি আলাদা করছি। তবে আমাদের সামনে এখনো অনেক কাজ পড়ে আছে। আমরা এখনো স্থায়ীভাবে তেল নিঃসরণ বন্ধ করতে পারিনি। সবার আগে এই কাজটিই করতে হবে।’
বিপি কর্তৃপক্ষ জানায়, তেল নিঃসরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে আগামী সোমবার থেকে চূড়ান্ত কাজ শুরু হবে। গত এপ্রিলে দুর্ঘটনার পর দুই সপ্তাহ আগে অস্থায়ীভাবে তেল নিঃসরণ বন্ধ করতে সক্ষম হয় বিপি।
যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের কাছে মেক্সিকো উপসাগরের তেলক্ষেত্রে ২০ এপ্রিল ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক মাইল দীর্ঘ পাইপ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পানিতে মিশেছে। ফলে সাগরের জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

মাওবাদীদের জন্য আর্থিক প্যাকেজ

মাওবাদীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ফের আহ্বান জানাল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে আত্মসমর্পণকারীদের জন্য ঘোষণা করেছে আর্থিক প্যাকেজ। বুধবার এই লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের পক্ষে ঘোষণা জারি করা হয়েছে। বুধবার থেকেই ওই আর্থিক প্যাকেজ কার্যকর হয়েছে।
আর্থিক প্যাকেজে বলা হয়েছে, মাওবাদীরা অস্ত্রসমর্পণ করে রাজ্য সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তাঁদের প্রত্যেককে আগামী তিন বছরের জন্য প্রতি মাসে দুই হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এবং একই সঙ্গে প্রত্যেককে দেওয়া হবে এককালীন দেড় লাখ রুপি। এ ছাড়া স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়াও আত্মসমর্পণের সময় মেশিনগান জমা দিলে ২৫ হাজার, রাইফেল ও একে-৪৭ জমা দিলে ১৫ হাজার, রিভলবার ও পিস্তল জমা দিলে তিন হাজার, স্যাটেলাইট ফোন ১০ হাজার, ল্যান্ড মাইন তিন হাজার এবং বিস্ফোরক প্রতি কেজির জন্য দেওয়া হবে এক হাজার রুপি করে আর্থিক অনুদান।
এদিকে গত মঙ্গলবার ভারতের লোকসভায় এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মাকেন জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ভারতের মাওবাদী প্রভাবিত নয়টি রাজ্যে মাওবাদীরা সর্বমোট এক হাজার ২৩৪টি হামলা করেছে। এই হামলার মধ্যে ২০৩টি হামলাই হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এসব হামলায় নিহত হয়েছে ৩৬২ জন সাধারণ মানুষ এবং ২১১ জন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ৫৭৩। আর পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে মাওবাদী নিহত হয়েছে ১০২ জন। আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে এক হাজার ৪৮৩ জন মাওবাদীকে।

কাস্ত্রোর আত্মজীবনী ‘স্ট্র্যাটেজিক ভিক্ট্রি’ প্রকাশিত হবে আগস্টে

কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশের পরিকল্পনা করছেন। বিপ্লবী এই নেতার আত্মজীবনীর নাম হবে দ্য স্ট্র্যাটেজিক ভিক্ট্রি। আগস্ট মাসে এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হবে। কিউবাডিবেট ডট সিইউ নামের সরকারি ওয়েবসাইটে কাস্ত্রো নিজেই এ কথা জানান।
১৯৫৮ সালে কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কয়েক শ বিপ্লবীর কাছে কিউবার একনায়ক ফুলগেনসিও বাতিস্তার সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। দ্য স্ট্র্যাটেজিক ভিক্ট্রির প্রথম খণ্ডে মূলত এই বিষয়টিই তুলে ধরা হবে। ৮৩ বছর বয়সী কাস্ত্রো বলেন, ২০০৬ সালে অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি বইটির ব্যাপারে কয়েক মাস কাজ করেন। তিনি জানান, বইটির জন্য প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি নামের মধ্যে হাউ থ্রি হান্ড্রেড ডিফিটেড টেন থাউজ্যান্ড নামটি বিবেচনা করেছিলেন তিনি। পরে এর নাম দেন দ্য স্ট্র্যাটেজিক ভিক্ট্রি।
কাস্ত্রো ২৫ অধ্যায়ের বইটিতে বেশ কিছু ছবি, মানচিত্র ও একনায়ক বাতিস্তার বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া তাঁর শৈশব ও একজন বিপ্লবী হিসেবে গড়ে ওঠার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
কাস্ত্রো তাঁর আত্মজীবনী লিখতে কিউবার সাংবাদিক কাতিউসকা ব্লাংকোর সহযোগিতা নেন।

রাষ্ট্রীয় শোক পালন ১১৫টি লাশ উদ্ধার

বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১৫২ জন যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনায় পাকিস্তান গতকাল বৃহস্পতিবার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে এ পর্যন্ত ১১৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিধ্বস্ত বিমানটির ব্ল্যাক বক্স এখনো পাওয়া যায়নি। এ কারণে কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি।
এয়ার ব্লু নামের একটি বেসরকারি কোম্পানির এয়ারবাস এ৩২১ বিমানটি গত বুধবার রাজধানী ইসলামাবাদের উত্তরে মারগালা পার্বত্য এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে তখন ১৪৬ জন যাত্রী এবং ছয়জন ক্রু ছিল। এটি বন্দরনগর করাচি থেকে রাজধানী ইসলামাবাদে যাচ্ছিল। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এ বিমান দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী গতকাল দেশব্যাপী শোক পালন করা হয়। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে সব জায়গায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী কামার জামান কায়রা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১১৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

রাকাবের নতুন এমডি প্রদীপ কুমার দত্ত

প্রদীপ কুমার দত্ত সম্প্রতি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি সোনালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
প্রদীপ কুমার দত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর ১৯৭৭ সালে সিনিয়র অফিসার হিসেবে সোনালী ব্যাংকে যোগ দেন।
২০০৩ সালে প্রদীপ কুমার দত্ত মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি লাভ করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে যোগ দেন। ২০০৫ সালে তিনি আবার সোনালী ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে বদলি হন। ২০০৮ সালে তিনি পদোন্নতি পেয়ে সোনালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে উন্নীত হন।
কর্মজীবনে তিনি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, নেপাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স, সেমিনার ও কর্মশালায় অংশ নেন।

রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির ক্ষমতা বাড়ল

ক্ষমতা বেড়েছে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি)। এ-সংক্রান্ত বিলটি এর মধ্যে রুশ পার্লামেন্টের নিম্ন ও উচ্চকক্ষের অনুমোদন পেয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এই বিলে স্বাক্ষর করায় তা আইনে পরিণত হয়। গতকাল ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।
এই আইনের বলে অপরাধ ঘটাতে পারে—এমন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের হুঁশিয়ার করতে পারবে এফএসবি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই বিল অনুমোদনের সমালোচনা করে বলেছে, এ আইনের মাধ্যমে এফএসবি নিজেই আইনের উর্ধ্বে থেকে যাবে। এতে গোয়েন্দা সংস্থাটি সোভিয়েত যুগের পূর্বসূরি কেজিবির মতো ক্ষমতা অর্জন করবে।
সমালোচকেরা বলছেন, এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকদের কাজের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। সরকারবিরোধী সংগঠনের বিরুদ্ধেও আইনটি প্রয়োগ হতে পারে।
আইনটির সমালোচনা করে বিরোধী দল বলেছে, এফএসবির ক্ষমতা এর মধ্যে চরমে পৌঁছেছে। এখন এই সংস্থাকে আরও ক্ষমতা দেওয়ায় মেদভেদেভের উদারনীতিকরণ অঙ্গীকারে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
এর আগে এই বিলে একটি সংশোধনী আনা হয়। তা ছিল এফএসবি সন্দেহভাজনদের নিজ কার্যালয়ে ডেকে এনে হুঁশিয়ার করতে পারবে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রবল প্রতিবাদের মুখে আইনপ্রণেতারা এ সংশোধনী প্রত্যাহার করেন।
চলতি মাসের শুরুতে এ আইন অনুমোদনে কট্টর অবস্থান নেন মেদভেদেভ। তিনি বলেন, আইনটি চালু করার লক্ষ্য হচ্ছে রাশিয়ার আইন ব্যবস্থাকে উন্নত করা।

সিএমও-এশিয়ার সেরা বিজনেস স্কুল পুরস্কার পেল বিআইবিএম

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে (বিআইবিএম) ‘বেস্ট বি-স্কুল লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করেছে ভারতভিত্তিক সংগঠন সিএমও-এশিয়া।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক বন্দনা সাহা সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মাননা গ্রহণ করেন।
সিএমও-এশিয়া শিল্প-বাণিজ্য ও ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের বিপণন ও ব্র্যান্ড কর্মকর্তাদের মধ্যে আধুনিক জ্ঞানের আদান-প্রদানে ব্যাপৃত। সিএমও-এশিয়া ও ওয়ার্ল্ড ব্র্যান্ড কংগ্রেসের উপদেষ্টামণ্ডলী এশিয়ার সর্বোত্তম বিজনেস স্কুল নির্বাচিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত।
উল্লেখ্য, বিআইবিএম একটি শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও গবেষণাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। এটি ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং এতে মাস্টার্স ইন ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (এমবিএম) নামে একটি বিজনেস প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এই কোর্সটির জন্যই মূলত বিআইবিএম এশিয়ার সর্বোত্তম বিজনেস স্কুল পুরস্কার পাওয়ার জন্য জুরি বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ঢাকায় একসঙ্গে বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের চারটি প্রদর্শনী চলছে

বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের ওপর ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চার দিনের চারটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এখন চলছে। প্রদর্শনীগুলো হচ্ছে: ‘১১তম টেক্সটেক বাংলাদেশ ২০১০ ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো’, ‘৫ম ডাই+কেম বাংলাদেশ ২০১০ এক্সপো’, ‘৪র্থ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার্ন অ্যান্ড ফেব্রিক শো ২০১০’ এবং ‘৮ম মেশিন এক্সপো বাংলাদেশ ২০১০’।
কনফারেন্স অ্যান্ড এক্সিবিশন ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস (সেমস) বাংলাদেশের সহযোগিতায় ‘সেমস’ ইউএসএ এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। গত বুধবার শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত চলবে। এতে প্রদর্শনীগুলোতে বিশ্বের ২৬টি দেশের চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।
সাধারণ ও বাণিজ্যিক দর্শনার্থীদের জন্য নাম নিবন্ধনের মাধ্যমে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত এই প্রদর্শনী পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান প্রধান অতিথি হিসেবে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি হাবিবুর রহমান, বিজিএমইএর সহসভাপতি ফারুক হাসান, বিজিএফএফএমইএর সভাপতি হারুন-উর-রশিদ, সেমস-গ্লোবাল ও এশিয়া-প্যাসেফিকের প্রেসিডেন্ট ও গ্রুপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহেরুন এন ইসলাম।
বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের আধুনিক প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল, ডাইস, কেমিক্যালস, আন্তর্জাতিক ইয়ার্ন এবং ফেব্রিকস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সেবা ও পণ্য প্রদর্শন করছে।
সেমস ১১ বছর ধরে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে আসছে।

ফাটকা বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকতে গভর্নরের আহ্বান

ব্যাংক-ব্যবস্থায় ঝুঁকি কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকনির্দেশনা অনুসরণে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান।
গভর্নর বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত পথে উচ্চহারে মুনাফার জন্য ছুটতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে কোনোভাবেই বাড়তি ঝুঁকির মুখে ফেলা ঠিক হবে না।’ তিনি ফাটকামূলক স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগে জড়িয়ে না পড়ার জন্যও ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরাটন হোটেলে তিন দিনব্যাপী ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানের এক মেলা উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এই আহ্বান জানান। দেশের ২৬টি ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠান তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত এই মেলায় অংশগ্রহণ করছে। খবর ইউএনবির।
গভর্নর বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে যখন বড় বড় ব্যাংকে লালবাতি জ্বলেছে ও বিশ্ব আর্থিক সংকটে বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিপর্যয় নেমে এসেছে, তখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা সবাইকে বিস্মিত করেছে।’
কিন্তু এতে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংক খাতকে আরও শক্তিশালী হতে হবে।
তিনি ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনার দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য সে দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংক খাতের অবদানের কথা উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ব্যাংক-ব্যবস্থা সমাজেরই একটি অংশ। এ ধরনের মেলার মাধ্যমে মানুষজন ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে পারবে। ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা ভেঙে গ্রাহকদের কাছে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারবে।
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শেরাটন হোটেলের মহাব্যবস্থাপক আহমদ বুখারী হামজা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম মজুমদার, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি কে মাহমুদ সাত্তার এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কাজী রফিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন ঘোষণার পর গভর্নর মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। মেলা আগামী শনিবার পর্যন্ত চলবে।

ফ্যাব্রিগাসের ভয়

‘কী করা উচিত’ সেটি জানতে সেস ফ্যাব্রিগাসের উচিত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে পরামর্শ করা। ২০০৮ সালে রোনালদোকে ঘিরেও এমন অনেক শোরগোল হয়েছে। ফ্যাব্রিগাসের বার্সেলোনায় ফেরা নিয়ে এবার যেটা হলো। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, রোনালদো ম্যানইউর অনুশীলনে ফিরলে সমর্থকেরা দুয়ো দেবে। একই আশঙ্কা আর্সেনাল অধিনায়কেরও।
বার্সায় অন্তত এই মৌসুমে ফেরা হচ্ছে না। শিগগিরই বিশ্বকাপ-পরবর্তী ছুটি শেষ করে আর্সেনালের অনুশীলনে যোগ দেবেন ফ্যাব্রিগাস। এই মিডফিল্ডারকে কীভাবে আর্সেনাল সমর্থকেরা বরণ করে নেয়, সেটাই এখন দেখার।
দিদিয়ের দ্রগবাও চেলসিতেই থেকে যাচ্ছেন। ম্যানচেস্টার সিটি হাত বাড়িয়েছে। দ্রগবাও মুখের ওপর ‘না’ বলেননি। তবে চেলসি জানিয়েছে, এই মৌসুমে কোনো তারকা ফুটবলার বিক্রি তারা করবে না।
এসি মিলান এই মৌসুমে আর খেলোয়াড় কিনবে না। তাই ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার লুইস ফ্যাবিয়ানোর সেভিয়া থেকে মিলানে যাওয়ার খবরটিকে স্রেফ গুঞ্জন বলেই ধরে নিতে হচ্ছে। আর স্টুটগার্ট থেকে স্যামি খেদিরাকে প্রায় কিনেই ফেলেছে রিয়াল মাদ্রিদ।

দূরপাল্লার সাঁতারে ৬ পর্যবেক্ষক

প্রতিযোগিতা দূরপাল্লার সাঁতারের। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর মুর্শিদাবাদে ভাগীরথী নদীতে অনুষ্ঠেয় এই সাঁতারের জন্য ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ দলের সঙ্গে পর্যবেক্ষক হিসেবে যাচ্ছেন আরও ৬ জন।
গত ২৪ জুলাই মিরপুর সাঁতার কমপ্লেক্সে হওয়া বাছাইয়ে প্রতিযোগী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয় নৌবাহিনীর রুবেল রানা, মনিরুল ইসলাম, সেনাবাহিনীর নিয়ামুল হক, বিকেএসপির পলাশ চৌধুরী, আনসারের সবুরা খাতুন ও বিকেএসপির সীমা সুলতানাকে। এঁদের সঙ্গী ৬ জন লাইফ-সেভার, ২ জন কোচ ও ১ জন ম্যানেজার। এর সঙ্গে পর্যবেক্ষক হিসেবে যাচ্ছেন কাজী মনিরুল ইসলাম, নিয়াজ আলী, শেখ সেলিম আহমেদ, কারার ছামেদুল, দীন আমিন ও নূর-এ-আফরোজ দিলু।
ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান, ‘এভাবে পর্যবেক্ষক হিসেবে যাওয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে বারবার করে আমাদের অনুরোধ করলে তো আমরা না করতে পারি না। সেখানে গিয়ে আসলে ওদের কিছুই করার থাকে না। প্রমোদ ভ্রমণ আর কেনাকাটা করতেই দিন যায় এসব পর্যবেক্ষকদের।’ পর্যবেক্ষক দলের সদস্য নিয়াজ আলী অবশ্য বিষয়টি অন্যভাবে দেখছেন, ‘সাবেক সাঁতারু হিসেবে আমরা যেতেই পারি পর্যবেক্ষক হিসেবে। এর আগেও অনেকে গিয়েছেন। তবে আমরা ফেডারেশনের খরচে সেখানে যাচ্ছি না। নৌবাহিনীর খরচে যাচ্ছি। শুধু ফেডারেশনের কাছ থেকে অনুমতি নিচ্ছি।’

রিকেলমে ফিরবেন

অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জিতেছেন। কিন্তু তার চেয়েও শতগুণ কঠিন একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সার্জিও বাতিস্তা। ম্যারাডোনা-বলয় থেকে আবারও বেরিয়ে এসে আর্জেন্টিনা যে নতুন যুগে যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেই অন্তর্বর্তী সময়টার ভার তাঁর ওপরই। দলের ভারপ্রাপ্ত কোচের গুরুদায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধেই।
আপাতত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কোনো টুর্নামেন্ট নেই আর্জেন্টিনার। নতুন স্থায়ী কোচ নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত প্রীতি ম্যাচগুলোয় কাজ করতে হবে তাঁকে। ১১ আগস্ট ডাবলিনে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ আছে। এরপর ৭ সেপ্টেম্বর বুয়েনস এইরেসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের সঙ্গে খেলবে আর্জেন্টিনা। এরই মধ্যে হয়তো নতুন কোচ ঠিক করে ফেলবে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। যেই দায়িত্বে আসুন না কেন, তাঁর জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে হুয়ান রোমান রিকেলমেকে আবারও ফিরিয়ে আনা। লিওনেল মেসির ‘মেসি’ হয়ে উঠতে রিকেলমেকে খুবই দরকার। এ কারণে রিকেলমেকে ফেরানোর দাবি আবারও উঠেছে আর্জেন্টিনায়।
আয়ারল্যান্ড ম্যাচের দল ঘোষণা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। স্বাভাবিকভাবেই ‘অবসর’ নিয়ে ফেলা রিকেলমে ওই দলে নেই। তবে বোকা জুনিয়র্সের এই প্লে-মেকার যদি ফিরতে চান, তাঁর জন্য দলের দরজা খোলা আছে বলেই জানালেন বাতিস্তা, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলো, ওর সঙ্গে ডিয়েগোর একটা সমস্যা ছিল। তবে রোমান আমার খুবই ভালো বন্ধু। যদি ভালো অবস্থায় থাকে অবশ্যই ওকে দলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
ম্যারাডোনার সঙ্গে অভিমান এবং সেখান থেকে বাদানুবাদে জড়িয়ে আরও একবার অবসরের ঘোষণা দিয়ে দেন রিকেলমে। আগামী বছর নিজ দেশে কোপা আমেরিকা। কোপার সবচেয়ে সফল দল আর্জেন্টিনা ১৯৯৩ সালের পর আবারও শিরোপা পুনরুদ্ধারে উন্মুখ। এই দলে রিকেলমেকে চাইছে অনেকেই। ৩২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার নিজে অবশ্য জাতীয় দলে ফেরা না-ফেরা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল

সিনিয়র ডিভিশন ফুটবলের সুপার লিগে কাল ফকিরাপুল ক্লাব ৩-১ গোলে হারিয়েছে উত্তর বারিধারা ক্লাবকে। জয়ী দলের ওয়াহেদ দুটি ও সাগর ১টি গোল করেছেন। উত্তর বারিধারার গোলটি শাহাদাতের। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে সানরাইজ ও অগ্রণী ব্যাংকের ম্যাচটি গোলশূন্য হয়েছে।

জাতীয় যুব কাবাডি

অ্যাটমাই প্রোডাক্টস জাতীয় যুব কাবাডির সেমিফাইনালে উঠেছে টাঙ্গাইল, রাজশাহী, ঢাকা ও যশোর। ঢাকা কাবাডি স্টেডিয়ামে কাল চূড়ান্ত পর্বের খেলায় টাঙ্গাইল ১টি লোনাসহ ২৮-১৫ পয়েন্টে কুমিল্লাকে, রাজশাহী ২টি লোনাসহ ৪৮-৩৬ পয়েন্টে পিরোজপুরকে, ঢাকা ৩টি লোনাসহ ৪৭-২৫ পয়েন্টে ফরিদপুরকে ও যশোর ১টি লোনাসহ ২৫-১৭ পয়েন্টে দিনাজপুরকে হারিয়েছে। টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে সারা দেশের ৮টি আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন ঢাকা, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, দিনাজপুর, ফরিদপুর, পিরোজপুর ও যশোর।

ম্যানইউ-চেলসির দুই নীতি

লিভারপুল অতীত ঐতিহ্যের কঙ্কাল বয়ে বেড়াচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। এ মৌসুমেও গঠনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে ক্লাবটিকে। আর্সেনালেরও অত ধার কোথায়! ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ‘সোহরাব-রুস্তম’ আসলে এখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও চেলসিই। গত কয়েকটি মৌসুমেই শিরোপা লড়াই এই দুই দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কদিন পরই শুরু হচ্ছে আরেকটা শিরোপা লড়াই। ইউরোপের ফুটবল এখন তারই অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এর আগে তৈরি হয়ে নিচ্ছে দলগুলো। প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতি তো আছেই, দলবদলের বাজার থেকে প্রয়োজনীয় খেলোয়াড় নিয়ে নিচ্ছে তারা। তবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সোহরাব আর রুস্তম এই গুছিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে হাঁটছে দুই পথে।
ম্যানইউ বলছে, দলবদলের বাজারে অহেতুক টাকা-পয়সা খরচ তারা করবে না, নিজেদের যে তরুণ প্রতিভা আছে কাজে লাগাবে তাঁদেরই। চেলসির দর্শন ভিন্ন। শিরোপা জয়ের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করতে রাজি রুশ ধনকুবের রোমান আব্রামোভিচের দল। ক্লাব কর্তৃপক্ষ কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে টাকা খরচের ‘লাইসেন্স’ দিয়ে দিয়েছে।
নিকট অতীতে তরুণ দল নিয়েই সাফল্য পেয়েছে ম্যানইউ। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও ওয়েইন রুনির তারুণ্যে ভর করে হ্যাটট্রিক প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছে ম্যানইউ। ২০০৮ সালে জিতেছে তারা চ্যাম্পিয়নস লিগ। রোনালদো-রুনিদের আগে ডেভিড বেকহাম, রায়ান গিগস, পল স্কোলসদের মতো একঝাঁক তরুণ ম্যানইউকে নিয়ে গিয়েছিলেন সাফল্যের চূড়ায়। ১৯৯৯ সালে ম্যানইউ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল তাঁদেরই কৃতিত্বে।
বেকহাম গেছেন, শেষ হয়েছে রোনালদো-যুগও। তবে এখন ম্যানইউতে আছেন জনি ইভানস, টম ক্লিভার্লি, ড্যারেন গিবসন, রাফায়েল, মাচেদাদের মতো তরুণ খেলোয়াড়। এঁদের সঙ্গে ম্যানইউতে যোগ দিয়েছেন মেক্সিকোর ২২ বছর বয়সী তারকা হাভিয়ের হার্নান্দেজ। সবাই মিলে ম্যানইউকে দারুণ আরেকটা মৌসুম এনে দিতে পারবেন বলে বিশ্বাস ম্যানেজার অ্যালেক্স ফার্গুসনের, ‘আমি ওদের নিয়ে খুশি। আমার মনে হয়, ভালো কিছুই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তরুণ খেলোয়াড়দের বেড়ে উঠতে দেওয়ায় আমাদের সুনাম আছে। আর এটা আমাদের ক্লাবের শক্তিশালী একটা দিক।’
এই শক্তিটা নেই বলেই প্রায় প্রতি মৌসুমেই খেলোয়াড় কেনায় প্রচুর টাকা খরচ করতে হয় চেলসিকে। এবারও ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত অবশ্য একজনকেই চুক্তিবদ্ধ করেছেন আনচেলত্তি—লিভারপুলের ইসরায়েলি তারকা ইয়সি বেনায়ুন।
এখন অবশ্য বেশ কয়েকজন তারকার পেছনে ছুটছে চেলসি। এর মধ্যে তাদের দৃষ্টিটা বেশি পড়েছে লিভারপুলের স্প্যানিশ স্ট্রাইকার ফার্নান্দো তোরেসের দিকে। ক্লাবের প্রধান নির্বাহী রন গুরলে বলেছেন কোচ আনচেলত্তিকে টাকা খরচের ‘লাইসেন্স’ দিয়ে দেওয়ার কথা, ‘কার্লো যদি এক বা দুজন খেলোয়াড় আনতে চায়, তাহলে তিনি সেটা করতে পারেন।’

Friday, July 30, 2010

সংবিধান সংশোধনে সবাইকে দরকার by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন এখন জোর আলোচনার বিষয়। সংসদে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একটি কমিটি নির্বাচনের পর এটা স্পষ্ট যে ক্ষমতাসীন জোট সংবিধানের বিভিন্ন ধারা সংশোধনের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। উচ্চ আদালতের দেওয়া একটি রায়, যার পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা এখনো জানা যায়নি, সেটাকে উপলক্ষ করেই এই উদ্যোগ। বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের ঘটনা নতুন নয়। গত ৩৮ বছরে বৃহত্তর সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের আলোকে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনেকেই উপলব্ধি করেন। সংবিধান সংশোধনের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে অতীতে তাগিদ দিয়েছি। আমার ধারণা, বাংলাদেশের মূল সংবিধান এবং তার পরে উপর্যুপরি অবিবেচনাপ্রসূত পরিবর্তন—সবই সংবিধানের বিভিন্ন দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে। সে কারণেই সংবিধানের একটা বড় ধরনের পরিবর্তন খুবই জরুরি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কী হবে? নিঃসন্দেহে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা কেবল সংসদেরই আছে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য আছেন সরকারি জোটে, তাঁরা চাইলেই সংশোধনী আনতে পারেন। মৌলিক পরিবর্তন আনা হলে তার জন্য গণভোটের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সংবিধানের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন, সংযোজন কি কেবল সংসদ সদস্যদেরই বিষয়? তদুপরি সংবিধান সংশোধনে তাড়াহুড়ো করাই রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তার কারণও আমরা জানি। এ ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো প্রয়োজন আছে বলে কারোরই মনে করার কারণ নেই। এযাবৎ সরকারি জোটের কার্যক্রম থেকে মনে হচ্ছে, তারা এই রেওয়াজ অনুসরণ করতে উৎসাহী। সংবিধান সংশোধনের প্রধান লক্ষ্য কী, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। গত ৩৮ বছরের অভিজ্ঞতায় যেসব দুর্বলতা লক্ষ করা গেছে, সেগুলো এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করা হবে কি না, তা সরকারি দলের সদস্যরা বলেননি। বরং তাঁদের কথাবার্তায় মনে হয় বিশেষ কয়েকটি ধারা পরিবর্তনের জন্যই তাঁরা বেশি উৎসাহী।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংবিধান প্রণয়নের বিভিন্ন রকম প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। যেসব দেশে যুদ্ধ বা সংঘাতের পর নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে লক্ষ করেছেন, বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন এটা বোঝার জন্য যে, সবার জন্য ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না। কেননা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা ছাড়া সংবিধান কোনো অবস্থাতেই ভবিষ্যৎ-সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা করতে পারে না। সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব সব ক্ষেত্রেই জনপ্রতিনিধিরাই পালন করেছেন, কিন্তু কেবল জনপ্রতিনিধিদের বিবেচনাই সংবিধানের ভিত্তি হয়নি। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যেসব দেশ পরবর্তী সময়ে স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, জাতীয় আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে সংবিধানের বিভিন্ন দিক সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তৈরির ক্ষেত্রে শেষ পর্বের সূচনা হয় ১৭৮৬ সালে এনাপলিস কনভেনশনের মধ্য দিয়ে। সেখানেই একটি সংবিধান কনভেশনের ডাক দেওয়া হয়। ফিলাডেলফিয়ায় ওই অধিবেশন বসে ১৪ মে ১৭৮৭ সালে, কিন্তু কোরামের অভাবে আরও ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। ২৫ মে শুরু হয় কনভেনশন, শেষ হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। এই পাঁচ মাসের কনভেনশনের পটভূমিকায় ছিল ১৭৮১ সালে স্বাক্ষরিত আর্টিকেলস অব কনফেডারেশন থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোয় বিভিন্ন রকম দলিল-দস্তাবেজ, চুক্তি, আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের এই সংবিধান রচনার পরও তা নিয়ে এর রচয়িতারা যে আলোচনা-বিতর্ক অব্যাহত রেখেছিলেন, এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ১৭৮৭-৮৮ সালে নিউইয়র্কের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ৮৭টি রচনা। এগুলোর লেখক হলেন আলেকজান্ডার হেমিলটন, জেমস মেডিসন ও জন জে। এই রচনাগুলো ‘ফেডারিলিস্ট পেপার’ বলে পরিচিত এবং সংবিধান-বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর শিক্ষার্থীদের অবশ্য পাঠ্য। ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের পুরোনো যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সংবিধান প্রণয়নপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আলাপ-আলোচনা, ব্যাখ্যা-পাল্টা ব্যাখ্যা, সমঝোতা ও বিশ্লেষণ। কিন্তু এটা কেবল নতুন সংবিধান তৈরির জন্যই প্রয়োজন, তা নয়। বরং যখনই একটি সংবিধানকে সবার অধিকারের রক্ষাকবচে পরিণত করার চেষ্টা হয়, তখনই দরকার উন্মুক্ত জাতীয় আলোচনা। বাংলাদেশের সংবিধান তৈরির সময় এই বিবেচনা সংবিধানপ্রণেতাদের ছিল না। বিশিষ্ট লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ (প্রথম আলো, ২৩ জুলাই ২০১০) এদিকে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। এ নিয়ে পুনরুক্তির প্রয়োজন নেই।
সংবিধান প্রণয়ন ও সংবিধানের মৌল বিষয়গুলো সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হওয়া খুবই জরুরি। শেষাবধি আইনপ্রণেতারাই সংবিধানের পরিবর্তন, পরিবর্ধন করবেন। কিন্তু সেটা যথেষ্ট কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। যে কারণে বিভিন্ন দেশে সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনের জন্য সংবিধান কমিশন নিয়োগের উদাহরণ রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সংবিধানকে বদল করে নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব কেবল নির্বাচনে বিজয়ী দলই নেয়নি। প্রথমে সেখানে কনভেনশন ফর ডেমোক্রেটিক সাউথ আফ্রিকা গঠন করা হয়। তাতে অগ্রগতি না হওয়ায় ‘মাল্টিপার্টি নেগোশিয়েটিং প্রসেস’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কেবল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছিল, তা নয়। সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ছিল এই প্রক্রিয়ার অন্যতম দিক। তিন পর্যায়ে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। প্রথম পর্যায়ে কমিটির কাছে ১৭ লাখ মন্তব্য জমা পড়েছিল। এক হাজারের বেশি কর্মশালা আয়োজন করে ৯৫ হাজার সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও কমিটি কর্মকর্তারা কথা বলেছিলেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল নির্ধারণ করে দেয়, এসব মন্তব্যের কোনগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। সর্বসাকল্যে ১৩ হাজার ৪৩৩টি লিখিত মন্তব্য সংবিধানপ্রণেতাদের বিবেচনার জন্য গৃহীত হয়। এর ১০ শতাংশ এসেছিল বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের কাছ থেকে। এর ভিত্তিতে যে খসড়া সংবিধান তৈরি হয়, তা বিলি করে আবারও মন্তব্য চাওয়া হয়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দুই লাখ ৫০ হাজার পরামর্শ ও মন্তব্য জমা পড়ে। সর্বশেষ যখন খসড়াটি সংসদে আলোচনা হয়, সেসব অধিবেশন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এসব প্রচেষ্টার লক্ষ্য ছিল একটাই, সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি সংবিধান তৈরি করা।
আলবেনিয়ায় নতুন সংবিধান তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৯৭ সালের শেষ পর্যায়ে। সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত চলা এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে বিভিন্ন উন্মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে সাধারণ জনগণ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) এবং আইন বিশ্লেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা হয়। এরই আলোকে তৈরি হয় একটি খসড়া। সংবিধান কমিশনের তৈরি করা এই খসড়ার ওপর সবার মতামত গ্রহণ করার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়। লক্ষণীয় যে, খসড়া সংবিধানের ২৫ শতাংশ ধারা-উপধারায় পরিবর্তন আনা হয় সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামতের ভিত্তিতে। ইরিত্রিয়ায় সংবিধান প্রণয়নের জন্য ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কমিশনও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের জন্য চেষ্টা চালায়। তাতে শুধু যে ইরিত্রিয়ায় বসবাসরতরাই অংশ নিয়েছিল, তা নয়; প্রবাসে বসবাসরত সাড়ে সাত লাখ ইরিত্রীয় তাদের মন্তব্য ও পরামর্শ তুলে ধরে।
অনেকেই হয়তো আমার দেওয়া এসব উদাহরণের সমালোচনা করতে পারেন এই বলে যে, এগুলো সংবিধান তৈরিপ্রক্রিয়া, সংশোধনের নয়। এসব উদাহরণ থেকে যে বিষয়টি লক্ষ করার, তা হলো সর্বসাধারণের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা। সংবিধান তৈরি এবং বিশেষ করে একে আরও বেশি গণতান্ত্রিক করে তুলতে চাইলে সংবিধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণ একে স্থায়ী ও শক্তিশালী করে। এতে করে জনসাধারণের মধ্যে সংবিধান ও সংবিধান-প্রদত্ত অধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়। ফলে সংবিধান রক্ষার জন্য তাদের ভেতরে তাগিদ দেখা দেয়।
বাংলাদেশে বারবার সংবিধান লঙ্ঘনের ইতিহাস সবার জানা। সাধারণ জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সংবিধানের বিভিন্ন বিধিবিধান নিয়ে সচেতনতা অত্যন্ত কম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী ভবিষ্যতে সংবিধান লঙ্ঘন ও বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল বন্ধের জন্যই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবিধানে লেখা থাকলেই অবৈধ ক্ষমতা দখল বন্ধ হবে বলে মনে হয় না, তবে সংবিধান বিষয়ে সচেতনতা গণতন্ত্র ও অধিকার রক্ষায় জনগণকে অধিকতর উৎসাহী করবে—এমনটা আশা করা যেতে পারে।
দেশের প্রধান বিরোধী দল সংসদীয় কমিটিতে তাদের কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। তাঁরা এ কমিটিতে শেষাবধি অংশগ্রহণ করবেন কি না, সেটা দেখার বিষয়। দলগতভাবে তাঁরা অংশ না নিলে লাভবান হবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল যদি প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত করতে ব্যর্থ হয় সংশোধনীগুলো খুব সংকীর্ণ বিবেচনায় তৈরি করে এবং তাড়াহুড়ো করে প্রক্রিয়াটি শেষ করে, তবে তা বিরোধী দলের জন্য ইতিবাচক হয়ে উঠবে এবং দেশের জন্য হবে মারাত্মক ক্ষতিকর।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভারসিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

‘একটা তোড়া লন, আফা’ by সৈয়দা আখতার জাহান

বিজয় সরণি হয়ে ফার্মগেট আসার এই রাস্তাটাতে কিছু মুখ আমার পরিচিত হয়ে গেছে। প্রতিদিনই তারা আসে, ‘আফা, ফুল লন’। সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়া আর বিকেলে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরা। না, ফুল কেনা হয় না আমার। সচেতন বা অসচেতনভাবে বলে দেয়, না, লাগবে না। ফুল যে ভালোবাসি না তেমন নয়, তবে চার দেয়ালের ঘরটাতে ওদের একাকী রাখতে ইচ্ছে করে না আমার।
যথারীতি অফিস থেকে রিকশায় বাড়ি ফেরার পথে বিজয় সরণির দীর্ঘ যানজট। ‘আফা একটা তোড়া লন’,—শুনে চিন্তা ভঙ্গ হলো।
প্রশ্ন করি, কী নাম তোমার?
হাসি মুখে উত্তর—আলী হাসান।
একটা তোড়া কত করে বিক্রি করো?
‘আফা, গোলাপ তোড়া ১০ ট্যাকা।’
বলি, তুমি আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে, যদি তোমার ফুল বিক্রিতে সমস্যা না হয়।
আলী হাসান হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
আলী হাসানের বয়স আট বছরের মতো। বাবা বেলাল হোসেন মারা গেছেন। মা দেলোয়ারা বেগম বেঁচে আছেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে আলী হাসান বড়।
ওর একটা বোন আছে। বোনের বয়স কত জিজ্ঞেস করতেই হাতের উচ্চতায় যা দেখাল তাতে ওর বোনটার বয়স ছয় বছর হবে বলে মনে হলো। ছোট ভাইটার বয়স তিন বছরের মতো।
আলী হাসানেরা এখানে গাবতলীতে থাকে। ঢাকায় এসেছে দুবছর আগে। ওদের বাড়ি দিনাজপুরের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বাবা মারা যাওয়ার পর জীবিকার সন্ধানে ওর মা তিন সন্তান নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। আলী হাসানের মা রঙের কারখানায় কাজ করেন। আলী হাসান আগে একটা দোকানে কাজ করত। ছয় মাস হয় ও ফুল বিক্রি করছে।
দিনে কতগুলো তোড়া বিক্রি করো?—জানতে চাই ওর কাছে
‘জানি না, তয় হইবো ৫০-৬০টা। আফা, আমরা তো তোড়া বানাই না, মালিকে বানায়, আমরা বেচি। প্রত্যেক তোড়ায় দুই টাকা কইরা পাই। তয়, ১০ ট্যাকার বেশি বেচবার পারলে বেশিও পাই।’
আলী হাসানের দিন শুরু হয় ভোরে। ৮-৯টায় লোকাল বাসে চড়ে চলে আসে বিজয় সরণিতে। অপেক্ষা ফুলের গাড়ি আসার। গাড়ি আসলে শুরু হয় তোড়া বানানোর কাজ। কাজটা ওদের না হলেও আলী হাসানের মতো আরও যেসব বাচ্চারা ফুল বিক্রি করে, তারা হাত লাগায় কাজে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে ওরা ফুলের তোড়া নিয়ে বিক্রি শুরু করে।
আলী হাসান লেখাপড়া জানে না। স্কুলে যাওয়ার সময় ও সুযোগ কোনোটাই হয়নি তার। প্রশ্ন তাহলে টাকা চেনে কী করে। দুষ্টুমির হাসি ওর চোখে-মুখে। ‘মামুর ব্যাটারা শিখাইছে।’
দিনে কত টাকা আয় হয়?
আলী হাসান বলল, ‘আফা, একাক দিন একাক রহম। কোনো দিন ১০০, কোনো দিন ১৫০-২০০। ঠিক নাই। কোনো কোনো দিন গাড়ি কইরা যাওনের সময় স্যার-আফারা ৫০০-১০০০ ট্যাকা দেন।’
এমন কয়বার পাইছ?
‘আমি একবার পাইছি। তয়, অন্যরা আরও বেশিবার পাইছে। আফা, ঈদের আগে গাড়ি কইরা আইয়া স্যার-আফারা নতুন জামাকাপড়ও দিয়া যায়।’
আলী হাসানের মা রঙের কারখানায় কাজ করেন এবং ওভারটাইম করে মাসে তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকা আয় করেন। গাবতলীর ছোট ঘরটার ভাড়া মাসে এক হাজার ২০০ টাকা।
‘মায়ের একার আয়ে সংসার চলে না বইলাই তো ফুল বেচি আমি। সহালে বাসারতন খাইয়া আই আর দুপরের জন্য বাটিতে ভইরা লইয়া আসি। বাসায় ফিরি রাতের ১০টা বাজে।’
আলী হাসানের ছোট্ট একটা স্বপ্ন আছে। সেটা পূরণ করার জন্য মাটির ব্যাংকে টাকা জমা করছে। কত টাকা জমেছে তা সে জানে না। একবারে ভাঙলে জানতে পারবে পরিমাণটা আসলে কত।
জমানো টাকা দিয়ে সে তার বাড়িতে গিয়ে জমি কিনে ওখানেই থাকবে। স্কুলে ভর্তি হবে। এখানে স্কুলে গেলে ‘মালিকে’ রাগ হয়। সে সময় আর কেউ রাগ করবে না।
এটা বড় কোনো স্বপ্ন না হলেও আলী হাসানদের জন্য বড়। জানি না, স্বপ্নটা এই ছোট্ট আলী হাসানকে বাঁচিয়ে রাখবে, না আলী হাসান স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখবে। তবে চাইব, ‘ওর ছোট্ট দুচোখে দেখা এই স্বপ্নটা পূরণ হোক।’
আমি আলী হাসানের কাছ থেকে একটা ফুলের তোড়া কিনলাম। ও আমাকে প্রশ্ন করল, ‘আফা, এত কিছু জানলেন। আপনি কি পত্রিকায় লেখবেন?’
হেসে বলি, তুমি পত্রিকা চেনো?
‘হ, চিনি। আমাগো লগের অনেকে পত্রিকা ব্যাচে। তাগোর কাছের পত্রিকাতন ছবি দেখি। পড়তে তো আর পারি না।’
সিগন্যাল সবুজ সংকেতে জানিয়ে দিল এবার আমরা যেতে পারি। আলী হাসান রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠে দাঁড়াল। আমি বললাম, ভালো থেকো আলী হাসান। আলী হাসান উত্তর দিল, ‘আবার দেহা হইবো, আফা।’

সাংসদদের ‘বিশেষ অধিকার’ সীমাহীন হতে পারে না by বদিউল আলম মজুমদার

বিগত কয়েক সপ্তাহে সংবাদপত্রের কয়েকটি শিরোনাম নাগরিক হিসেবে আমাদের চরমভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। প্রথম শিরোনামটি হলো ‘রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে সংসদীয় কমিটি’ (আমাদের সময়, ৬ জুলাই ২০১০)।
পরদিন ‘নূরুল হুদাকে শোকজ করবে সংসদীয় কমিটি’ এই শিরোনামে আরেকটি সংবাদ প্রকাশিত হয় (কালের কণ্ঠ, ৭ জুলাই ২০১০)। সংবাদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ৬ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সাংসদদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় রাজউকের চেয়ারম্যান নূরুল হুদাকে কমিটির পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হবে। জনাব হুদার কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে এবং জবাবে কমিটি সন্তুষ্ট না হলে তাঁকে অপসারণের দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে ড্যাপ সম্পর্কে কোনো সভা-সেমিনারে তাঁকে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে কমিটি।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকের শুরুতেই কমিটির সদস্যরা অভিযোগ তোলেন, ‘সাংসদদের ব্যাপারে ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করার সাহস রাজউক চেয়ারম্যান কোত্থেকে পেলেন? এর জবাব তাঁর কাছ থেকে নিতে হবে। ড্যাপ নিয়ে রাজউকসহ একটি মহলের আগ্রহ দেখে মনে হচ্ছে, তাদের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, যার সঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যানও জড়িত।’
অপর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা করতে অনুমতি লাগবে’ (প্রথম আলো, ১৪ জুলাই ২০১০)। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর বিরুদ্ধে এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে মারধর করার অভিযোগে মামলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ একজন সাংসদ। তাঁর বিরুদ্ধে মামলার আগে যেমন চিন্তা করা উচিত ছিল, তেমনি মামলা নেওয়ার সময় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিষয়টি অবহিত করা উচিত ছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাংসদদের ছোটখাটো ভুলের বিষয়ে মামলা করার আগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, অনুমতি নিতে হবে। উল্লেখ্য, এ ঘটনার জন্য পরবর্তীকালে পুলিশের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া হয় এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য আইজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, তদন্তের পর যদি সার্জেন্ট কিংবা ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা হবে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর সমতুল্য।
এ তিনটি খবরই ‘পার্লামেন্টারি প্রিভিলেজ’ বা সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি-সম্পর্কিত। অর্থাৎ অভিযোগ, নূরুল হুদা তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে সাংসদদের মর্যাদাহানি এবং সংসদের অবমাননা করেছেন।
আমাদের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি-সম্পর্কিত। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘(১) সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না। (২) সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর উপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে, তিনি এই সকল ক্ষমতাপ্রয়োগ-সম্পর্কিত কোন ব্যাপারে কোনো আদালতের এখতিয়ারের অধীন হইবেন না। (৩) সংসদে বা সংসদের কোন কমিটিতে কিছু বলা বা ভোট দানের জন্য কোন সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে কোন আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৪) সংসদ কর্তৃক বা সংসদের কর্তৃত্বে কোন রিপোর্ট, কাগজপত্র, ভোট বা কার্যধারা প্রকাশের জন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৫) এ অনুচ্ছেদ-সাপেক্ষে সংসদের আইন-দ্বারা সংসদের, সংসদের কমিটিসমূহের এবং সংসদ-সদস্যদের বিশেষ-অধিকার নির্ধারণ করা যাইতে পারিবে।’ এ ছাড়া সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদও সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যপরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রেও আইনের দ্বারা এ ক্ষমতা কার্যকর করার কথা।
সংবিধানের এ দুটি ধারাকে কার্যকরতা দেওয়ার জন্য আমাদের দেশে অদ্যাবধি কোনো আইন প্রণীত হয়নি। সংসদ ও সাংসদদের অধিকার ক্ষুণ্নের অভিযোগে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই। বস্তুত গত বছর ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে গঠিত সংসদীয় কমিটি সাবেক স্পিকার ও বর্তমান সাংসদ জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পেলেও এ-সম্পর্কিত আইন ও দৃষ্টান্তের অভাবে তাঁর বিরুদ্ধে সংসদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বিশেষ অধিকার প্রয়োগের পদ্ধতি বলা আছে, কিন্তু এতে বিশেষ অধিকার সংজ্ঞায়িত এবং এর পরিধিও নির্ধারণ করা হয়নি। আর এ জন্যই আইনের প্রয়োজন।
সংসদীয় বিশেষ অধিকার এবং দায়মুক্তির সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এরেসকাইন মে, ‘সংসদের বিশেষ অধিকার হলো কতগুলো স্বাতন্ত্র্য অধিকারের সমষ্টি, যা প্রত্যেক সাংসদ ব্যক্তিগতভাবে এবং সংসদের উভয় পক্ষই উপভোগ করে। এগুলো অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভোগ করা অধিকারের চেয়ে অতিরিক্ত অধিকার এবং এগুলো ছাড়া সংসদ ও সাংসদেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম। তাই যদিও বিশেষ অধিকার রাষ্ট্রীয় আইনের অংশ, তবু এগুলোর মাধ্যমে অনেকটা সাধারণ আইনের আওতা থেকে তাঁদের রেহাই দেওয়া হয়।’ আমাদের দেশে অবশ্য উচ্চকক্ষ নেই। তাই উচ্চকক্ষের কথা আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্যও নয়।
সংসদীয় বিশেষ অধিকারগুলোকে দুভাবে বিভাজন করা যায়: কতগুলো এককভাবে সাংসদদের জন্য প্রযোজ্য এবং অন্যগুলো পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্যক্তি সাংসদদের বেলায় প্রযোজ্য বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির ক্ষেত্রগুলো হলো: ক. বাকস্বাধীনতা, খ. দেওয়ানি মামলায় গ্রেপ্তার থেকে অব্যাহতি, গ. জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি, এবং ঘ. সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি। এগুলো মূলত দায়মুক্তি-সম্পর্কিত অধিকার এবং এগুলোর ফলে ব্যক্তি সাংসদদের স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭২-১৭৬ ধারায় এসব বিষয়সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও ক্ষমতাগুলো হলো: ক. শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার অধিকার। কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার বা সংসদ অবমাননার জন্য শাস্তি প্রদান, যার মধ্যে দুর্নীতি, অপকর্ম ও অসদাচরণের জন্য সাংসদকে বহিষ্কার এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। সংসদের এ ধরনের অধিকারকে শাস্তিমূলক ক্ষমতা বলা হয়। খ. সংসদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ব্যবস্থাপনা বা কার্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণসম্পর্কিত ক্ষমতা। গ. সাংসদদের উপস্থিতি ও কার্যকরতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা। ঘ. তদন্ত করার, সাক্ষী ও রেকর্ডপত্র তলব করার ক্ষমতা। আমাদের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২০১-২০৩ ধারায় এ-সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। ঙ. সাক্ষীদের শপথ প্রদানের ক্ষমতা। আমাদের কার্যপ্রণালি বিধির ২০৪-২০৫ ধারা এ বিষয়সম্পর্কিত। চ. মানহানিকর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন কাগজপত্র প্রকাশ করার ক্ষমতা।
বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ অধিকার (privileges), ক্ষমতা (powers) ও দায়মুক্তির (immunities) মধ্যে বিভাজন করা আবশ্যক, যদিও তা অনেক সময় করা হয় না। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সরকারের মতে, ‘নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে “বিশেষ অধিকার” হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন বা অবমাননার দায়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকারকে ক্ষমতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সংসদে যেকোনো কিছু বলার জন্য কোনো সাংসদ দায়ী না হওয়ার অধিকারই “দায়মুক্তি”।’ [বিশেষ রেফারেন্স অনুচ্ছেদ ১৪৩, এআইআর (১৯৬৫, এসসি ৭৪৫)]
রাজউকের চেয়ারম্যানকে দুটি সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে একই অভিযোগে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত একটি অভাবনীয় ঘটনা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। এ ছাড়া বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত সাংবিধানিক বিধানের কার্যকরতা প্রদানের জন্য কোনো আইনও নেই। তাই এ অধিকার প্রয়োগ করে তাঁকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত সংসদীয় কমিটিদ্বয়ের এখতিয়ারবহির্ভূত বলেই আমাদের ধারণা। আইন ও দৃষ্টান্ত নেই বলে জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না যায়, তাহলে জনাব হুদাকে কোন অধিকারে কারণ দর্শাতে বলা হবে? তাই অনেকের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংসদীয় বিশেষ অধিকারের অপব্যবহার বৈ কিছু নয়। এ ছাড়া আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান...।’ আমরা আশা করি, স্পিকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় রুলিং দেবেন, যা তিনি করেছিলেন গত অক্টোবর মাসে তাঁর সহকর্মী ব্যারিস্টার সরকারের ক্ষেত্রে।
জনাব নূরুল হুদা কী বলেছিলেন, যার জন্য আমাদের অনেক সাংসদ তাঁর বিরুদ্ধে এককাট্টা এবং এত ক্ষিপ্ত? তিনি কি মিথ্যা কিছু বলেছিলেন? তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে কি তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেছেন?
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে ব্লাস্টের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড: বাস্তবায়ন এবং করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, পরিকল্পিত পরিবেশ ও বাসোপযোগী ঢাকা চাইলে ড্যাপ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল ব্যক্তিগত স্বার্থে এর বিরোধিতা করছে। দু-চারটা সংবাদপত্রও ড্যাপ ও রাজউকের সমালোচনা করছে। তারা ড্যাপ চায় না; রাজউককেও তুলে দিতে চাইছে। তাদের ইচ্ছা বাস্তবায়িত হলে কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। এই শহর কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হবে। তিনি আরও বলেন, যেসব সাংসদ আবাসনব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাঁরা সংসদে ড্যাপের বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘এ দেশে কে কী করবে? একজন সাংসদ গুলশান এলাকায় ছয়তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ১৬ তলা করেছেন’ (প্রথম আলো, ১ জুলাই ২০১০)।
উপরিউক্ত প্রতিবেদন থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, জনাব হুদা মিথ্যা কিছু বলেননি। এসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিরোধিতার মুখে ড্যাপ বাস্তবায়ন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তার সঙ্গে সঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যানের সত্যকথন অনেক নাগরিককেই আশ্বস্ত করেছে।
জনাব হুদা মিথ্যাচার করেননি কিংবা আইনও অমান্য করেননি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের আইনপ্রণেতাদের কেউ কেউ আইন ভঙ্গ করেছেন। যিনি ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১৬ তলা ইমারত নির্মাণ করেছেন, তিনি অবশ্যই আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গলি প্রদর্শন করেছেন। একই সঙ্গে আইন ভঙ্গ করেছেন আমাদের সেসব সাংসদ, যাঁরা আবাসনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েও গৃহায়ণ ও গণপূর্তসম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য হয়েছেন। কার্যপ্রণালি বিধির ১৮৮(২) অনুযায়ী, ‘এমন কোন সদস্য (সংসদীয়) কমিটিতে নিযুক্ত হইবেন না, যাহার ব্যক্তিগত, আর্থিক ও পরোক্ষ স্বার্থ কমিটিতে বিবেচিত হইতে পারে এমন বিষয়ের সহিত সংশ্লিষ্ট আছে।’ উল্লেখ্য, কার্যপ্রণালি বিধি সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত এবং আইনের সমতুল্য। তাই সাংসদদের এককাট্টা হয়ে জনাব হুদার বিরুদ্ধে চড়াও হওয়া দুই বিঘা জমির ‘আমি আজ চোর বটে...’ বিখ্যাত লাইনটির কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রসঙ্গত, শুধু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত কমিটিতেই নয়, স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে এমন সাংসদেরা আরও অনেক সংসদীয় কমিটিতেও রয়েছেন, যার বিরুদ্ধে আমরা বহুদিন থেকেই সোচ্চার (সমকাল, ১ জুলাই ২০১০)। আমরা আনন্দিত যে প্রধানমন্ত্রী অন্তত ১৪ জন সাংসদের রদবদলের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন, যার জন্য তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ (সমকাল, ১৭ জুলাই ২০১০)।
সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে আসা যাক। সাংসদেরা যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে তাঁদের বাকস্বাধীনতাসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে দায়মুক্ত করা হয়। কিন্তু কোনো দেশেই ফৌজদারি অপরাধ থেকে সাংসদদের দায়মুক্ত করার উদাহরণ আমাদের জানা নেই। এ ছাড়া আইনপ্রণেতারা কি আইনের ঊর্ধ্বে? তা হবে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগতিপূর্ণ। সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা সংসদীয় বিশেষ অধিকারের পরিধিকে সীমাহীন, বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং যার পরিণতিও অশুভ হতে বাধ্য।
এ ছাড়া আমাদের বর্তমান সংসদে কিছু সদস্য আছেন, যাঁরা তাঁদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের (যেমন, সরকারি কর্মকর্তাদের মারধর) মাধ্যমে মহান জাতীয় সংসদের মর্যাদাহানি করেছেন। ১৮ জন সাংসদ মিথ্যা হলফনামা দিয়ে রাজউকের প্লটের জন্য আবেদন করেছেন, যা নৈতিক স্খলনজনিত গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এ পর্যন্ত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, এ ব্যাপারে কাউকে উচ্চবাচ্য করতেও আমরা শুনিনি।
পরিশেষে, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে, সংসদকে কার্যকর ও কলুষমুক্ত করতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন সাংসদদের আইন ও বিধিবিধান মেনে চলা এবং নৈতিকতাবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়া। একই সঙ্গে প্রয়োজন যেসব সাংসদ জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন এবং অন্যায় কাজে বা অসদাচরণে লিপ্ত হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া প্রয়োজন সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিষয়টি নির্ধারণ করার লক্ষ্যে দ্রুততার সঙ্গে একটি আইন প্রণয়ন। সাংসদেরা যাতে তাঁদের সংসদীয় পদ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে জরুরি প্রয়োজন তাঁদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা। আরও প্রয়োজন সব ক্ষমতাধরের সম্পদের হিসাব প্রদান। স্মরণ করা যেতে পারে, আচরণবিধি প্রণয়ন এবং বার্ষিকভাবে সম্পদের হিসাব প্রদান ও প্রকাশ ‘দিনবদলের সনদে’র অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত। এসব বিষয়ের প্রতি আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

বাঘের জন্য by খসরু চৌধুরী

আজ আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। পৃথিবীর ১৩টি বাঘ অধ্যুষিত দেশসহ অন্যান্য দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে বাঘ সম্প্রদায়ের শুভ কামনায়।
১৯৭৩ সালে ভারতে বাঘ রক্ষার প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকে বিশ্ব বন্য প্রাণী তহবিল, স্মিথসোনিয়ান প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠানের বন্য প্রাণীবিষয়ক প্রচারণার প্রধান প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় বাঘ। শুধু বাঘ অধ্যুষিত দেশেই নয়, পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলো—যেগুলোতে কখনোই বাঘ ছিল না, তারাও বাঘ রক্ষার প্রচারণায় শামিল হয়।
বাঘের মোট আটটি উপপ্রজাতির মধ্যে ওই সময়ের মধ্যেই দুটো উপপ্রজাতি বিলুপ্ত, একটি বিলুপ্তপ্রায় (বর্তমানে বিলুপ্ত) এবং একটি প্রজাতির বাঘের অস্তিত্ব প্রশ্নে সম্মুখীন। বিশেষজ্ঞরা দেখতে পাচ্ছিলেন, উপমহাদেশের বাংলা বাঘ, ইন্দোচীন বাঘ, সুমাত্রা বাঘ ও রাশিয়ান দূরপ্রাচ্যের বাঘের মধ্যে জেনেটিক্যাল ভবিষ্যৎ আছে। অন্য বাঘ প্রজাতি, দক্ষিণ চীনা আমুর বাঘ বনে কটি আছে বা আদৌ আছে কি না সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান ছিলেন।
উপমহাদেশে যেহেতু বাংলা বাঘের সংখ্যা অন্যান্য বাঘ দলের চেয়ে অনেক বেশি, সে কারণে বিশ্ব বন্য প্রাণী তহবিল ভারতীয় সংরক্ষিত বাঘের জঙ্গলগুলোয় বাঘ সংরক্ষণের জন্য ভারত সরকারকে উৎসাহিত করে সহায়তা দেয়। ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এ বিষয়ে নিজেও অত্যন্ত উৎসাহী ছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকেই প্রকল্প চালু রাখতে আর্থিক সহায়তা দেন।
বিশ্ব বন্য প্রাণী তহবিলের ট্রাস্টি গাই মাউন্টকোর্ট সে সময় সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণের জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বাঘ সংরক্ষণের পক্ষে মত দেন। সে সময়ই বাংলাদেশ বন্য প্রাণী আইন প্রণয়ন হয়। কিন্তু বন বিভাগের অনীহা, বিশেষজ্ঞের অভাবে বাংলাদেশে বাঘ প্রকল্প আর চালু হয়নি।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বাঘ অধ্যুষিত দেশ চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া অধিকাংশ দেশই বাঘ সংরক্ষণে এগিয়ে আসে। ষাটের (১৯৬০) দশকে যেখানে বাঘ বিশেষজ্ঞরা ভাবছিলেন, বাঘ সম্প্রদায় একবিংশ শতাব্দী দেখবে না, সেখানে নব্বইয়ের দশকের সাফল্যে সবাই উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন। ফলে আগেভাগেই বাঘ সংরক্ষণের সাফল্য উদ্যাপিত হয়। কিন্তু বাঘ বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, আশির দশকের (১৯৮০) মধ্যেই পৃথিবীর আট উপপ্রজাতির বাঘের তিনটি শেষ হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়ায় আমেরিকান কার্পেট বম্বিং, জঙ্গল জ্বালিয়ে দেওয়ায়, জঙ্গলের খালগুলোয় বিষ প্রয়োগ করায় মানুষ, অন্যান্য বন্য প্রাণীসহ বাঘও প্রচুর পরিমাণে মারা পড়ে। ফলে ইন্দোচীনা বাঘ বিলুপ্তির মুখোমুখি দাঁড়ায়। এদিকে জাপানি কাঠের চাহিদা মেটাতে মালয় উপদ্বীপের ও ইন্দোনেশীয় জঙ্গল শেষ হওয়ার মুখে। গোদের ওপর মারাত্মক বিষফোঁড়ার মতো দেখা দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী চীনা টোটকা ওষুধ। এই ওষুধে বাঘের দেহের কোনো না কোনো অংশ ব্যবহূত হয়। চীনই একমাত্র দেশ, যে দেশে বাঘের তিনটি উপপ্রজাতি (ইন্দোচীনা বাঘ, দক্ষিণ চীনা বাঘ বা আমুর বাঘ ও সাইবেরীয় বাঘ) বাস করে। তবে আমুর বাঘের অবস্থা খুবই খারাপ। জঙ্গলে মাত্র ৩০টি বাঘ আছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
বাঘ প্রজাতির উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিজ্ঞানীরা সাইবেরিয়াকে চিহ্নিত করেন। সাইবেরীয় বাঘের জঙ্গল অনেক বড়। এখানে বাঘও প্রচুর ছিল। কিন্তু গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পটপরিবর্তনের ডামাডোলের সুযোগে সংঘবদ্ধ শিকারিরা প্রচুর বাঘ মেরে ফেলে। সেই সঙ্গে বাঘের জঙ্গলও কেটে ফেলে। এখন মার্কিন ও রুশ বিজ্ঞানীরা মিলিতভাবে সাইবেরীয় বাঘ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। সুমাত্রা বাঘের সংকট হচ্ছে তাদের বাসস্থান ছোট হয়ে আসছে। বিশেষ করে জঙ্গল কেটে পামঅয়েল ও আখের ক্ষেত তৈরি করায় সুমাত্রা বাঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তিত।
সারা বিশ্বে বাঘের অস্তিত্ব নেই হওয়ার আশঙ্কায়, সেই সময় বিশ্বব্যাংক এগিয়ে এসেছে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার (২০২০ সালের মধ্যে) অভিপ্রায় নিয়ে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাঘের জঙ্গলগুলোর আশপাশের অধিবাসীরা অত্যন্ত গরিব। জঙ্গলের উপজাতই তাদের আয়ের প্রধান উৎস্য। এসব জঙ্গলের বর্তমান অবস্থা, ধারণক্ষমতা নিরূপণ না করেই বিশ্বব্যাংকের এই উচ্চাভিলাসী অভিপ্রায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশে যারাই মাঠপর্যায়ে বাঘ চর্চা করেন, তাদের একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। প্রশ্নটি হচ্ছে, বাঘের মতো একটি মারাত্মক প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার দরকার কী? বাঘের ওপর মানুষের ক্ষোভটা এ জন্য যে বাঘ মানুষ মারে বলে? তাহলে বলতে হয়, বছরে সুন্দরবনে বাঘের হাতে মারা পড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন (কোনো কোনো বছর অবশ্যই বেশি), অথচ সাপের হাতে মারা পড়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। হাতির হাতে গড়ে আটজন। অথচ সাপ, হাতির বিরুদ্ধে মানুষ এতটা খেপা নয়। খোঁজ নিয়ে জেনেছি অন্যান্য প্রাণীর হাতে মানুষ মারা পড়লে সেটাকে দুর্ভাগ্য মনে করা হয়। বাঘ শুধু মানুষ মারেই না, সুযোগ পেলে মারা মানুষ খেয়েও ফেলে। এ ব্যাপারটি মানুষের মনস্তত্ব কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। বাঘ বাঁচাতে হলে এই সমস্যার সমাধান করা দরকার।
যেকোনো বাঘের জঙ্গলের স্বাস্থ্যরক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি বাঘ। বাঘ শুধু খাদ্য শৃঙ্খলচক্রের সর্বোচ্চ অবস্থানেই থাকে না, সে প্রাকৃতিক পাহারাদারও। বাঘ আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ধারক-বাহক। পৃথিবীর অনেকগুলো দেশের সাধারণ মানুষ বাংলাদেশ চেনে না। কিন্তু বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি ছাড়া পৃথিবীর কোনো চিড়িয়াখানাই পরিপূর্ণ হয় না। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর ওপর যত বই লেখা হয়েছে, তাদের মধ্যে বাঘের ওপর লেখা বই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে বাংলা বাঘের ওপর বই সিংহভাগ দখল করে আছে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য হচ্ছে বাংলাদেশ সুন্দরবনের ৬০১৭ বর্গকিলোমিটারের খুব সামান্য এলাকাই বন বিভাগ তথা বাংলাদেশ সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। সুন্দরবনের প্রধান নিয়ন্ত্রক হচ্ছে কয়েকটি ডাকাত দল। সুন্দরবনের ৮০টির মতো টহল ফাঁড়ির অধিকাংশেরই অস্ত্রপাতি বন বিভাগ সরিয়ে এনেছে ডাকাতদের ভয়ে। বনের পেশাদাররা সরকারকে যত বনকর দেয়, ডাকাতদের দিতে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। গাছচোর, মাছচোর, হরিণচোরের আশ্রয় ডাকাত দল। বেশ কয়েকটি টহল ফাঁড়ি ডাকাত দলের রাত্রিবাসের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা বন-কর দিয়ে গোল, গরান, আগামরা সুন্দরী কাটে, ডাকাতদের উদ্বৃত্ত টাকা দিতে হয় বলে ঘের ক্রেতারা বরাদ্দকৃত জঙ্গলের চেয়ে বেশি এলাকার বন কাটে।
এই ডাকাত কণ্টকিত বনেই আমাদের বাঘের আবাস। বাঘ বাঁচাবে কারা? বন বিভাগ না ডাকাত দল?
খসরু চৌধুরী: লেখক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ।

আঙ্গু কাবিলা বনাম মাঙ্গু কাবিলার অন্তহীন যুদ্ধ by ফারুক ওয়াসিফ

অমুককে প্রতিরোধ করতে তমুকের দলবলের রাস্তা আটকে সশস্ত্র পাহারা বসানোর ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ পরিচিত। গত শুক্রবারের প্রথম আলোর একটি খবর ও ছবিতে দেখা যায়, ফরিদপুরের এক এলাকায় মাঠের মধ্যে একদল গ্রামবাসী লাঠি-বল্লম-সড়কি আর বেতের তৈরি ঢাল হাতে বসে আছে। প্রতিপক্ষকে দেখামাত্রই হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়তে তারা প্রস্তুত। সেদিন সংসদের উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে আয়মন আকবরের ফরিদপুরে আসার কথা থাকায় শ্রমমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের লোকদের এই রণসাজ। আগের দিনও তারা একচোট লড়াই করে নিয়েছে। সেই লড়াইয়ে তিনজন গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজন আহত হয়। চর দখলের কায়দায় মারামারির জন্য তাদের তৈরি থাকা দেখে মনে পড়ে মোকাবেলা নামের একটি ঢাকাই ছবির কথা।
সেই ছবিতে এফডিসির দুই বিখ্যাত অ্যাকশন হিরো ওয়াসিম আর জসিমকে দেখা যায় দুই গোত্রসর্দারের ভূমিকায়। গোত্র দুটির নাম আঙ্গু কাবিলা আর মাঙ্গু কাবিলা। আঙ্গু আর মাঙ্গু কাবিলার মধ্যে বিরোধের কোনো শেষ নেই। নতুন হলো নায়িকা নিয়ে বিবাদ। ছবিজুড়ে নায়ক-নায়িকার নাচগানে ভরপুর দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায় দুই গোত্রপতির হুংকার এবং লাঠি-বল্লম-তলোয়ার নিয়ে মারামারি। মাঝেমধ্যে তারা বাঘ সেদ্ধ করে ভোজ খায়! তো একটি দৃশ্যে দেখা গেল আজব কাবিলার লোকজনের সেই বাঘ-ভোজ অনুষ্ঠানের পেছন দিয়ে একটি গাড়ি চলে যাচ্ছে। তেমনি একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল বাংলাদেশের সেটে আমরা দেখতে পাচ্ছি মান্ধাতা আমলের লেঠেল-লড়াই।
সভ্যতা যেন এ দেশকে বাইপাস করে চলে গেছে। বাইরে যতই আধুনিক রোশনাই ভেতরে এখনো সেই আঙ্গু কাবিলা আর মাঙ্গু কাবিলার যুগ। কাবিলায় কাবিলায় ভাগ হয়ে আছে সবাই, আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি কাবিলা, একই দলের বিভিন্ন উপদলীয় কাবিলা, এলাকাভিত্তিক কাবিলাসহ গ্রুপিংয়ের হাজারো ফেরকা। আর এদের ভেতরে পদ, ক্ষমতা বা অর্থ নিয়ে বিরোধ মীমাংসার অব্যর্থ উপায় হলো ‘যুদ্ধ’। এবং পরিশেষে ‘জো জিতা ওহি সিকান্দর’; যিনি জিতবেন, তিনিই হবেন অধিপতি। তিনিই পাবেন ঊর্ধ্বতন নেতাদের বাহবা আর নিচের কর্মীদের জিন্দাবাদ।
মধ্যযুগের বাংলায় শান্তিপূর্ণ যুগের পাশাপাশি কিছু সময়ের জন্য এ রকম অবস্থা বিরাজ করছিল। সে সময় যিনিই গায়ের জোরে সিংহাসন দখল করতেন, তিনিই দিল্লির সম্রাটের কাছে নজরানার বিনিময়ে ‘সুবেদার’, ‘নবাব’ প্রভৃতি উপাধি কিনে এনে রাজত্ব করতে পারতেন। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধ-মীমাংসার এই রীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বলয়ে এখনো স্বমহিমায় বিরাজমান। সহিংসতার ক্ষমতাই এখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি। যে হরতালে বিরোধী দল বেশি ক্যাডার নামাতে পারে, সেই হরতাল সফল; আর বিরোধী দলগুলোকে দাবড়ানির ওপর রাখতে পারাই সরকারের রাজনৈতিক সাফল্য। ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে গ্রাম-শহরে দলীয় ও উপদলীয় হানাহানির মধ্যেও এই সহিংসতার সংস্কৃতিরই প্রসার।
ঢাকাই ছবির মতো উত্তেজিত সংলাপ আর ঢাক গুড়গুড় আবহ সংগীতই যেন আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও স্থায়ী সুর। টেলিভিশনের টক শো, জনসভার বক্তৃতা, রাজনৈতিক পোস্টারের ভাষাসহ হেন জায়গা নেই যেখানে উত্তেজনা ও বিবাদের ভাষা ও ভঙ্গি অকাতরে ব্যবহূত হয় না। এসবের প্রভাব সবার ওপরে পড়ে এবং উত্তেজনা আর অস্থিরতা হয়ে ওঠে রাজনীতি ও সংস্কৃতির মূল ভাব। খেয়াল করলে দেখা যাবে এই সহিংসতা পুরুষের সৃষ্টি। এই যুদ্ধংদেহী মেজাজ তাদেরই এবং এর ব্যবহারকারীও তারা। এই ব্যাটাগিরি রাজনৈতিক আচরণকেও অনেকটা প্রভাবিত করে।
কিন্তু দোষ কি কেবল রাজনীতির? সমাজের মানুষ যেমন, রাজনীতিতে তারই প্রতিফলন ঘটে। আমাদের রাষ্ট্র-রাজনীতি থেকে সমাজ ও পরিবার—সবখানেই কি সহিংসতার সংস্কৃতিরই জয়জয়কার দেখা যায় না? ১৮ জুলাই ফেনীর এক কলেজছাত্র দুর্ঘটনায় নিহত হয়। পরপরই তার সহপাঠীরা শহরজুড়ে তাণ্ডব চালায়। একটি হাসপাতাল ও ৩০টি বাস ভাঙচুর করা হয়, ছয়টি বাস পোড়ে এবং মারধরও চলে। গোটা শহর দুপুর ১২টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত অচল থাকে, মহাসড়ক থাকে অবরুদ্ধ। দায়ী যারা, তাদের বিচারের দাবির থেকে প্রতিহিংসার আবেগটাই বড় হয়ে ওঠে কেন? হয়তো তারা বুঝে ফেলেছে, বিচার-প্রক্রিয়ার অপরাধী ছাড়া পেতে পারে কিংবা পুলিশে তাদের আস্থা নেই। কিংবা তারা হয়তো বিচারই চায় না, চায় প্রতিহিংসার চরিতার্থতা। প্রতিহিংসা হলো সহিংসতার জরুরি রসায়ন, এটা ছাড়া ঠিক সংঘাত জমে না। যে দেশে অপরাধ হলে বিচার হয়, সে দেশে এভাবে বিচারের দাবির পথ প্রতিহিংসার আবেগ দখল করতে পারে না। অন্য দিকে আন্দোলনের ধৈর্য্য কম বলেই কি ভাংচুরের উৎসাহ বেশি?
দ্বন্দ্ব মীমাংসায় বলপ্রয়োগের দাওয়াই কত ‘জনপ্রিয়’, বিপুলসংখ্যক ফৌজদারি মামলার দিকে তাকালেও তা ধরা পড়ে। আইন ভূমিকা রাখে খুন-জখম তথা বলপ্রয়োগ ঘটে যাওয়ার পর। পারিবারিক কলহ থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক বিরোধ, ধর্মীয় বিতর্ক, দাম্পত্য কলহসহ এমন কোনো ক্ষেত্র কি পাওয়া যায়, যেখানে বলপ্রয়োগের ব্যবহার নেই, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নেই? পথচলতি নানা ঘটনা এমনকি রিকশায় রিকশায় বাধাবাধি, বাসে-সিএনজিতে যাত্রী-চালকে বচসা, এমনকি পাড়াপড়শির কাজিয়ারও শেষ হতে দেখা যায় বলপ্রয়োগে। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় মাইকে ঘোষণা দিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষের কথাও আমরা শুনি। আর যেখানে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে না, বুঝতে হবে সেখানে বলপ্রয়োগের ভয়ে দুর্বল প্রতিপক্ষ চুপ হয়ে মেনে নিয়েছে।
বলপ্রয়োগের পথে দ্বন্দ্ব মীমাংসার এই ধারা কিংবা প্রতিহিংসার বাসনা সমাজকেও সহিংসতায় অভ্যস্ত করে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী স্বয়ং প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীমানুষের ওপর চড়াও হয়। এভাবে পাল্টাপাল্টি সহিংসতায় সমাজের মধ্যে নৈরাজ্যবাদী প্রবণতা আরও গেড়ে বসে। সব সময় যে তা প্রকট থাকে তা নয়, অনেক সময় তা চাপা উত্তেজনার আকারে সমাজ-রাষ্ট্রের শিরায় শিরায় বইতে থাকে। তারপর হঠাৎ একদিন বিডিআর বিদ্রোহের মতো ট্র্যাজেডির জন্ম হয় কিংবা ঘটে যায় কানসাট-ফুলবাড়ী বা শনির আখড়ার মতো জনরোষের বিস্ফোরণ।
শৃঙ্খলা ও স্বার্থের খাতিরে বলপ্রয়োগের ব্যবস্থা রাখতেই হয় রাষ্ট্রকে। পুলিশ-মিলিটারি-র‌্যাব-সোয়াতেরও সেটাই কাজ। কিন্তু আইন ও বিচার, সংলাপ ও আপস এবং প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ মীমাংসাকে ছাপিয়ে সংঘাত যখন আগে চলে আসে তখন বুঝতে হয় যে, রাষ্ট্রটি পরিণত নয়, সমাজ সাবলীল নয়। সংঘাত প্রশমনে আমাদের যেমন আছে আদালত, আছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংসদ থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদ, আছে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো। এ ধরনের সংস্থাগুলো অনেকটা সেফটি ভালেভর মতো কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে মনে হয় ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার বাষ্প বের করে দিয়ে আইন ও বিচারের পথ সুগম করার সেফটি ভাল্ভগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। আপস-মীমাংসার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকরতার দশা কাজির গরুর মতো, যাদের অস্তিত্ব কেবল কেতাবে, গোয়ালে নয়।
ফরিদপুরের ওই ঘটনার কথাই ধরা যাক, একজন সংসদীয় উপনেতা আর একজন শ্রমমন্ত্রী—দুজনই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একজনের পুত্রের রাজনৈতিক অভিলাষ যদি অপরের বাসনার পথে বাধা হয়, তার মীমাংসা তো জেলা কমিটি বা কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমেই হতে পারত। কিন্তু সেসবের দ্বারস্থ না হয়ে তাঁরা নামলেন শক্তির পাল্লা দিতে। তাঁরা কি ধরে নিয়েছিলেন যে তাঁদের ওপরে কোনো আইন বা কর্তৃপক্ষ নেই? বিরোধ মীমাংসার প্রাতিষ্ঠানিক উপায়গুলোর প্রতি এই অনীহা সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের পথে বিরাট বাধা। আঙ্গু কাবিলা বনাম মাঙ্গু কাবিলার গোত্রীয় সংঘাতের পরিবেশ নৈরাজ্যের পরিবেশ। বিরোধীদের হরতাল-অবরোধ, ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়ন অথবা তৃতীয় কোনো শক্তির গায়ের জোরে ক্ষমতা দখলের ঘটনা এ পরিবেশেই ঘটার সুযোগ পায়। আর জনগণ হয় রাজনীতি বিমুখ।
বলপ্রয়োগের বিকল্প হিসেবে সুশাসন বা গুড গভর্নেন্স দিয়ে সংঘাতের ক্ষেত্রকে প্রশমিত করার ব্যর্থতা রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ব্যর্থতা। এই নৈরাজ্য ও বলপ্রয়োগের বাস্তবতা শাসকশ্রেণীর তৈরি হলেও জনগণের আয়নায় তার প্রতিফলন ঘটে, তলার শ্রেণীগুলোর আচরণেও তার প্রতিধ্বনি ওঠে। পোশাকশ্রমিকদের কোনো ফরিয়াদেই যখন সরকার ও মালিকপক্ষের টনক নড়ে না, তখনই তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়। গায়ের জোরে শোষণের বিপরীতে দেখা যায় গা দিয়ে প্রতিরোধের প্রতিবাদ। কানসাট, ফুলবাড়ী, শনির আখড়ায় জনগণের নিরুপায় ক্ষমতা প্রদর্শনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না, যদি যার যা কাজ সে তা করত। যদি সব আদালতে অন্তত আইন অনুযায়ী বিচারের নিশ্চয়তা থাকত, যদি দুদকে অন্তত বড় দুর্নীতিগুলো ধরা পড়ত। সংসদে যদি জনগণের স্বার্থের কথা আলোচিত হতো, রাজনৈতিক দলে যদি গণতন্ত্র থাকত এবং বড় দলগুলো জনগণকে ‘আশার ছলনে’ না ভুলিয়ে জনস্বার্থ রক্ষার কিছুটা চেষ্টা করত। তাহলে আঙ্গু কাবিলা আর মাঙ্গু কাবিলার এই অন্তহীন যুদ্ধ আমাদের দেখতে হতো না।
যাঁরা নিজেদের কাবিলা সর্দার ভাবছেন, পুুষছেন নিজস্ব বাহিনী, এলাকাকে ভাবছেন জমিদারি, তাঁদের বুঝতে হবে দেশের অধিকাংশ মানুষ রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে কাবিলা-যুগ পার হয়ে এসেছে।তারা জননেতা চায় ও জাতীয়নেতা চায়, কাবিলা সর্দার নয়।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

বন্যার মৃদু পদধ্বনি -দুর্যোগ সীমিত হলেও সরকারের প্রস্তুতি রাখতে হবে

বর্ষা আসে, সঙ্গে আসে বন্যা। কিন্তু এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আবহাওয়াবিদেরা স্বাভাবিক বন্যার বেশি কিছু হওয়ার আশঙ্কা করছেন না। বাংলাদেশ প্লাবন সমভূমির দেশ হওয়ায় প্রতিবছর ৩০ শতাংশ এলাকায় বছরের মাঝামাঝি বন্যা হওয়ার কথা। তার আলামত ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে। তবে গত এক সপ্তাহের গণমাধ্যমের খবরে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল কিছুটা প্লাবিত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া চর এলাকায় নদীভাঙনে ইতিমধ্যে অজস্র মানুষ ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে।
মৌসুমি বায়ু এবার অনেক দেরিতে হওয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তবে উজান থেকে আসা পানি পদ্মা, যমুনা ও তিস্তা নদীর কিছু এলাকায় উপচে পড়ছে। এ ছাড়া নদীর গতিপ্রবাহে নানারকম স্থাপনা নির্মাণ এবং প্লাবনভূমি কমে যাওয়ায় বন্যার ভোগান্তি কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি এখনো সহনীয় হলেও আগস্টের শুরুতে অতিবর্ষণ ও উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢলে বন্যার প্রকোপ কিছুটা বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোর নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় জীবনযাপন করছে। সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও মুন্সিগঞ্জে নদীভাঙনও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। ফরিদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যা মোকাবিলা বাঁধের ওপর চাপ বাড়ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বলছে, দুর্যোগ বড় না হলেও সরকারের প্রস্তুত থাকাই কর্তব্য। বিশেষ করে জরুরি ত্রাণ, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও ডায়রিয়া ঠেকানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজের অভাব ঘটায় গরিব মানুষের বিকল্প আয়ের সংস্থান করতে হবে।
বন্যা একই সঙ্গে অভিশাপ ও আশীর্বাদ। নদীবাহিত পলি জমে জমেই বাংলাদেশের জন্ম। বন্যায় এই পলি সমতলে ছড়িয়ে মাটির উর্বরতাও বাড়ায়। আবার ভুল নদীশাসনে নদীগর্ভ উঁচু হওয়ায় নদী অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, চিরাচরিত পথে বন্যার সঙ্গে বসবাসের প্রস্তুতি নিয়ে রাখাই কার্যকর বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অন্যদিকে, পানির গমনপথ দখল করে ঘরবাড়ি-স্থাপনা তৈরি হওয়ায় একদিকে বন্যার পলিসমৃদ্ধ পানি যেমন কৃষি জমিতে যেতে পারছে না, আবার কোথাও কোথাও তা জলাবদ্ধতারও জন্ম দিচ্ছে। তাই ওপর থেকে নামা পানি যাতে সহজে খাল-বিল-জলাশয়ে ছড়িয়ে বিনা বাধায় সমুদ্রে নেমে যেতে পারে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার -ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই চূড়ান্ত লক্ষ্য

আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক ট্রাইব্যুনাল গঠনের চার মাস পর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের আনুষ্ঠানিক বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার খবরটি নিঃসন্দেহে সুখবর। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে এ দেশের নিরস্ত্র, নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে প্রবল জনমতের প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালের এই কর্মতৎপরতা এমন প্রতীতি সৃষ্টি করবে যে শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের বিচার হচ্ছে, তাঁদের শাস্তির মাধ্যমে অনেক দেরিতে হলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পেতে যাচ্ছে।
তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত সোমবার প্রথমবারের মতো শুনানি করেন। ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আরেক নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে। এই আসামিরা অন্য কয়েকটি মামলায় এখন কারাগারে আটক রয়েছেন, তাঁদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার করার জন্য ট্রাইব্যুনাল ২ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন এবং ওই সময়ের মধ্যে এ আদেশ কার্যকর হয়েছে কি না তা জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এই আসামিরা দেশের একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা। জামায়াতে ইসলামী নামের সেই দলটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম-প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দলটির এই রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, তার নেতা-কর্মীদের দ্বারা খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনসহ এমন কিছু অপরাধ সংঘটন, যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে বিচারযোগ্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৩৯ বছরেও সেই বিচার সংঘটিত হয়নি; তার কারণ ছিল রাজনৈতিক এবং বলা বাহুল্য, সে রাজনীতি আইনের শাসনকে অস্বীকার করেছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের সুরক্ষা দিয়েছে। তবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এমনই এক অপরাধ, যা বিচারের সময়সীমা কখনো শেষ হয়ে যায় না। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর আজ যখন সেই অপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো, তখন আমাদের মনে রাখা ভালো যে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই এ বিচার-প্রক্রিয়ার লক্ষ্য। বাংলাদেশ সেই অন্যায় রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আইনের শাসনকেই যথার্থ পন্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে এই বিচার-প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা, ট্রাইব্যুনালের বিচার-প্রক্রিয়া সম্পাদনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে যে জামায়াতের এ অভিযোগ ভিত্তিহীন, এখানে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। বিচার-প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করা, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বাধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিচারকে সর্বমহলে প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য করার দায়িত্ব বর্তেছে রাষ্ট্রপক্ষ, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন শাখার ওপর। ১৯৭১ সালের নয় মাসজুড়ে উল্লিখিত আসামিদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কার্যকলাপের অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর এখনো জীবিত থাকার কথা। সাক্ষ্য দিয়ে তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশন শাখাকে সহযোগিতা করতে তাঁদেরও এগিয়ে আসা উচিত।
আমরা আশা করি, আইনের শাসনের প্রতি সর্বোচ্চ অঙ্গীকার নিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়াকে সর্বাধিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হবে।

চলচ্চিত্রে অভিষেক হলো ফরাসি ফার্স্ট লেডি কার্লা ব্রুনির

চলচ্চিত্রে অভিষেক হলো ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির স্ত্রী কার্লা ব্রুনির। গত মঙ্গলবার মার্কিন পরিচালক উডি অ্যালেনের একটি চলচ্চিত্রে হলিউড তারকা ওয়েন উইলসনের সঙ্গে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিষেক হলো। প্যারিসে চলচ্চিত্রটির শুটিং চলছে।
শুটিং শুরু হওয়ার আগে উডি অ্যালেন সাবেক মডেল কার্লা ব্রুনিকে মিডনাইট ইন প্যারিস চলচ্চিত্রের সেটে স্বাগত জানান। ছোট একটি মুদি দোকানে কয়েক ঘণ্টা ধরে এই শুটিং চলে। এ সময় রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুটিং দেখতে জড়ো হয় অনেক মানুষ। এ সময় ব্রুনির দেহরক্ষীদের সতর্ক উপস্থিতি দেখা যায়।
চলতি মাসের শুরুর দিকে উডি অ্যালেন প্যারিসে তাঁর নতুন এ ছবির কাজ শুরু করেন।
এই রোমান্টিক কমেডি চলচ্চিত্রে ফরাসি অভিনেত্রী মারিয়ন কোটিলার্ড এবং মার্কিন অভিনেত্রী র‌্যাচেল ম্যাক অ্যাডামস ও ক্যাথি বেটসও অভিনয় করছেন।

মেক্সিকোতে ৮টি কাটা মাথা উদ্ধার

 মেক্সিকোর পুলিশ মানুষের আটটি কাটা মাথা উদ্ধার করেছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর দুরাঙ্গ থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব হতভাগ্য ব্যক্তির বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছর। পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এসব মাথা উদ্ধার করে। দুরাঙ্গ শহরে মাদক ব্যবসা নিয়ে গালফ ও সিনালোয়া গোষ্ঠীর মধ্যে কয়েক মাস ধরে সংঘর্ষ চলছে। এরই জেরে তাঁদের এভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান থান শোয়ে হায়দরাবাদে

মিয়ানমারের সামরিক জান্তাপ্রধান জেনারেল থান শোয়ে গতকাল বুধবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে হায়দরাবাদ গেছেন। নয়দিল্লিতে গত মঙ্গলবার তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই দিনে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
থান শোয়ের ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশের সীমান্তে নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি চুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া ছয় কোটি ডলার ব্যয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরামের সঙ্গে মিয়ানমারের সংযোগ সড়ক স্থাপনের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
হায়দরাবাদে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে থান শোয়ের। এরপর তিনি কলকাতা যাবেন। সেখান থেকে আজ তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ভারতে থান শোয়ের এই আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরের সমালোচনা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-দ.কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়া শেষ

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে চার দিনের যৌথ সামরিক মহড়া গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু যুদ্ধের হুমকি উপেক্ষা করে জাপান সাগরে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে উত্তর কোরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের উদ্দেশে আগামী সোমবার সিউলে মার্কিন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা আলোচনায় বসবেন বলে জানা গেছে।
উত্তর কোরিয়া গত মঙ্গলবার কোরিয়া যুদ্ধের ৫৭তম বার্ষিকী পালন করেছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক কনসার্টে অংশ নেন দেশটির নেতা কিম জং ইল।
কয়েক বছরের মধ্যে দুই দেশের সবচেয়ে বড় এই সামরিক মহড়ায় মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন, অন্য ২০টি যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজ, চারটি এফ-২২ র‌্যাপটর স্টিলথ যুদ্ধবিমানসহ ২০০টি বিমান ও আট হাজার সেনা অংশ নেন। দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় যৌথ মহড়া শেষ হয়। মার্কিন একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে আমরা যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছি। যাতে দক্ষিণ কোরিয়া যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করে তাদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী সূত্র জানায়, গত রোববার থেকে কোরিয়া সীমান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক তৎপরতা দেখা যায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উত্তর কোরিয়া দেশটিতে সাইবার হামলা চালাতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছে সিউলের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা ইয়োনহ্যাপ জানায়, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিশেষ দূত রবার্ট এইনহর্ন শিগগিরই সিউল পৌঁছাবেন। উত্তর কোরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপসহ আরও কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে আগামী সোমবার মার্কিন ও কোরিয়ার কর্মকর্তাদের বৈঠকে যোগ দেবেন তিনি।
উত্তর কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা কেসিএনএ গতকাল জানায়, কোরিয়া যুদ্ধের ৫৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কনসার্টে যোগ দেন দেশটির প্রেসিডেন্ট কিম জং ইল। এ সময় ‘২৭ জুলাই আমাদের বিজয় দিবস’, ‘আমাদের নেতা সবচেয়ে ভালো’ প্রভৃতি স্লোগানে প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানো হয়।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধজাহাজ চেওনান গত ২৬ মার্চ পীতসাগরে ডুবে যায়। এতে ৪৬ জন নাবিকের মৃত্যু হয়। ২০ মে পাঁচ জাতির সমন্বয়ে গঠিত একটি তদন্ত দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার টর্পেডোর আঘাতে ওই যুদ্ধজাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। উত্তর কোরিয়া অবশ্য বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে।

যুদ্ধাহত সঙ্গীদের চিকিৎসায় রক্ত চুরি করে আল-কায়েদা

ইরাকে আল কায়েদা জঙ্গিরা যুদ্ধাহত সঙ্গীদের জন্য রক্ত চুরি করছে। নিজস্ব আদলে গড়ে তুলেছে হাসপাতাল ও ব্লাডব্যাংক। মূলত গ্রেপ্তার এড়াতেই তারা এ কাজ করছে বলে ইরাকের বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান।
আনবার প্রদেশের চিকিৎসক হাদাদ হামাদ জানান, আল-কায়েদা জঙ্গিরা রক্ত ও চিকিৎসার সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য প্রায়ই বিভিন্ন হাসপাতালে হামলা চালায়। তারা ২০০৫ সালে আল কাইম হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ব্লাডব্যাংকের সব রক্ত নিয়ে যায়। এসব রক্ত তারা হাসপাতালের কাছেই একটি গ্রামে নিয়ে গিয়ে আহত সঙ্গীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করে।
রক্তের জন্য সিরিয়া সীমান্তসংলগ্ন ইরাকের বিভিন্ন হাসপাতালেও প্রায়ই হামলা চালায় আল-কায়েদা। চলতি গ্রীষ্মেও চিকিৎসা সহায়তা ও চাহিদামতো রক্ত সরবরাহের জন্য আনবার প্রদেশের একটি হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সহায়তা না করলে তাদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ওই হুমকির পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে হাসপাতালটি কয়েক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
সুন্নি অধ্যুষিত এলাকায় কাজ করেন এমন কয়েকজন চিকিৎসক জানান, সম্ভবত আল-কায়েদার নিজস্ব বিশেষজ্ঞ দল আছে। তারা রক্তের গ্রুপ মেলানোসহ আহত ব্যক্তিদের শরীরে রক্ত সঞ্চালনের কাজটি নিখুঁতভাবে করে থাকে।

জাপানে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পর্যালোচনার ঘোষণা বিচারমন্ত্রীর

জাপানে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া দুই ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ভোরে টোকিও কারাগারে তাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়। গত বছর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম ফাঁসি কার্যকর করা হলো। ফাঁসি কার্যকর করার সময় বিচারমন্ত্রী কিকো চিবা উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরোধিতা করে আসছিলেন। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পর্যালোচনার জন্য গতকাল তিনি একটি কমিটি গঠন করার কথা ঘোষণা করেন।
যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তাঁরা হলেন কাজুও শিনোজাওয়া (৫৯) ও হিদেনোরি ওগাতা (৩৩)। একটি গয়নার দোকানে গুলিবর্ষণ করে ছয় নারীকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হন শিনোজাওয়া। ওগাতা একজন নারী ও একজন পুরুষকে হত্যা করেন। দুটিই ২০০৩ সালের ঘটনা।
কিকো চিবা জাপানের প্রথম বিচারমন্ত্রী, যিনি সরকারিভাবে কোনো মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার ঘটনা সরাসরি দেখলেন। ফাঁসি দেওয়ার পর মন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তিনি চান তাঁর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি দল ঘটনাটি পর্যালোচনা করুক।
কিকো চিবা বলেন, ‘ফাঁসি কার্যকর হওয়ার ঘটনা আমি নিজ চোখে দেখেছি। ঘটনাটি আবার আমাকে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে তাড়িত করেছে। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে যে মৌলিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, তা আবার জোরালোভাবে অনুভব করছি।’

উইকিলিকসে ফাঁস করা তথ্যে নতুন কিছু নেই: ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, উইকিলিকসের ওয়েবসাইটে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ফাঁস করা নথির মধ্যে নতুন কিছু নেই। এসব বিষয় নিয়ে এর আগেও অনেক বিতর্ক হয়েছে। তিনি আফগানিস্তান-পাকিস্তানের সম্পর্কে তাঁর নীতির প্রতি সমর্থন জানাতে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানান। উইকিলিকসে তথ্য ফাঁস হওয়ার পর গত মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে কথা বললেন প্রেসিডেন্ট ওবামা।
উইকিলিকস নামের একটি সংগঠনের ওয়বেসাইটে গত রোববার মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৯২ হাজারেরও বেশি নথি ফাঁস করা হয়। এসব নথিতে বলা হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) আফগান যুদ্ধে তালেবানকে সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি ইরানও তালেবানকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তথ্য ফাঁস প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তিনি বলেন, উইকিলিকসে প্রকাশ হওয়া তথ্য সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। কিন্তু এতে এমন কোনো তথ্য নেই, যা মার্কিন জনগণ আগে থেকে জানে না। প্রকাশিত সব বিষয় নিয়ে এর আগেও বিতর্ক হয়েছে। এখন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বিষয়ে মার্কিননীতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ওবামা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মার্কিন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় তহবিলের জন্য সমর্থন দিতে কংগ্রেস নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
মার্কিন সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন গত মঙ্গলবার বলেন, তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনায় আফগানিস্তানে মার্কিন কৌশলের কোনো পরিবর্তন হবে না। পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। মুলেন বলেন, ‘তথ্যগুলো আমি দেখেছি। কিন্তু এসব তথ্যে এমন কিছু নেই, যার কারণে মার্কিননীতি বা কৌশল নতুনভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ফাঁস হওয়া এসব তথ্য নিয়ে গত বছর পর্যালোচনা হয়েছে।
উইকিলকিসে তথ্য ফাঁসের পর মার্কিন আইনপ্রণেতারা আফগান যুদ্ধের বিরোধিতা করেন। গত মঙ্গলবার তাঁরা আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারেরও দাবি জানান।
আফগান যুদ্ধে পাকিস্তানের দ্বৈতনীতির কারণে ইসলামাবাদের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা র‌্যাংগিন দাদফার স্পানটা এই আহ্বান জানান।
আফগান যুদ্ধে পাকিস্তানের দ্বৈতনীতির কঠোর সমালোচনা করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখমাত্র মঙ্গলবার বলেন, সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার নীতি পুরোপুরি নিন্দনীয়। এমন কাজ থেকে পাকিস্তানের বিরত থাকা উচিত।

শান্তি আলোচনায় যেতে আব্বাস ‘অসম্ভব’ শর্ত দিয়েছেন

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সরাসরি শান্তি আলোচনায় যেতে ‘অসম্ভব’ শর্ত জুড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ইসরায়েলের উপপ্রধানমন্ত্রী সিলভান শ্যালম। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ শান্তি আলোচনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মিসরের রাজধানী কায়রোতে আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আজকের পূর্বনির্ধারিত বৈঠকের আগে সিলভান শ্যালম গতকাল বুধবার এ মন্তব্য করেন।
ইসরায়েলের সরকারি রেডিওকে শ্যালম বলেন, মাহমুদ আব্বাস তিনটি অসম্ভব শর্ত দিয়েছেন। শর্তের মধ্যে আছে, ২০০৮ সালে আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকে আলোচনা শুরু করতে হবে। ওই আলোচনায় ১৯৬৭ সালে দখল ভূমি থেকে ইসরায়েলিদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করে ফিলিস্তিনিরা যাতে সেখানে বসতি স্থাপন শুরু করতে পারে, সে দাবি করা হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল যেকোনো সময় মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি আছে। তবে ফিলিস্তিনিরা বৈঠক সফল করার নিশ্চয়তা চেয়েছে। কারণ, আগের সব বৈঠকই ব্যর্থ হয়েছে।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে গাজা উপত্যকায় লড়াই শুরু হলে প্রত্যক্ষ শান্তি আলোচনা ভেস্তে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র তিন মাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশে হামলা চালাবে

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী তিন মাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত দুটি দেশে হামলা চালাবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি গত সোমবার ধারণ করা হয়।
ইরান আক্রান্ত হবে কি না, সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট সুনির্দিষ্টভাবে তা বলেননি। কোন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি এ ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, সে বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে যান।
পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। যদিও দেশ দুটি আশঙ্কা করছে, ইরান পরমাণু বোমা তৈরির জোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
গত মঙ্গলবার প্রচারিত সাক্ষাৎকারে আহমাদিনেজাদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী তিন মাসের মধ্যে এ অঞ্চলের দুটি দেশে সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটি যে এ অঞ্চলে হামলার ষড়যন্ত্র করছে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে আছে। ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।
পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তারও তীব্র সমালোচনা করেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তাঁরা ইরানকে বাগে আনার যে চেষ্টা চলছে, তা ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে।

ওয়াশিং মেশিনে বিষধর সাপ

ওয়াশিং মেশিনে কিছু কাপড় দিয়েছিলেন ওয়েন্ডি ফলি (৫১)। একচোট ধোয়া শেষে যন্ত্রটির দরজা খুলে যেই তিনি কাপড়গুলো বের করতে যাবেন, অমনি ভয়ে তাঁর মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। কাপড়গুলোর মধ্যে কুণ্ডলি পাকিয়ে আছে বড় একটি বিষধর সাপ। যুক্তরাজ্যের ডেভনের এক্সেটার শহরে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল বুধবার সান পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে এ কথা জানা যায়।
দুই সন্তানের মা ওয়েন্ডি ফলি বলেন, ‘ধোয়া শেষে ওয়াশিং মেশিনের দরজা খুলে কাপড়গুলো যখন বের করতে যাব, তখন দেখি কিছু একটা পড়ে আছে কাপড়ের মধ্যে। ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখি, একটি সাপ। প্রথমে ধরে নিয়েছিলাম বাচ্চাদের খেলনা সাপ এটি। পরে দেখি, বারবার জিভ বের হচ্ছে ওটার। এর পর চোখের পলকে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়ে সাপটি।
এরপর থেকে ওয়েন্ডি ফলির জন্য শুরু হয় আতঙ্কের প্রহর। পরদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন সাপটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভয়ে ভয়ে কাটাতে হয় তাঁকে। ফলি বলেন, ‘শুরুতে দুই সন্তানকে নিয়ে আমি বাড়ির বাইরে চলে যাই। রাতে দুই সন্তানকে বিছানায় পাঠিয়ে আমি সারা রাত বসে থাকি। কেবলই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সাপটা বের হয়ে আসে।’